রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

শুভম চক্রবর্তী


এই সপ্তাহের  কবি শুভম চক্রবর্তী ৷তার  লেখালেখির সূত্রপাত ২০১০ সাল নাগাদ অর্থাৎ প্রথম দশকের কবি বলা যায়৷ বাণিজ্যিক-অবাণিজ্যিক নানান পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত তিনটি কাব্যগ্রন্থ আছে - শব্দের বিহ্বল ডানা (২০১৭), শরীরপরব (২০১৮),  আয়াত (২০১৯)। 
কবি ২০১৭ সালে পেয়েছেন 'উতল হাওয়া সাহিত্য সম্মাননা', ২০১৯-এ 'শরীরপরব' কাব্যগ্রন্থের জন্য মাসিক কবিতাপত্র পত্রিকার পক্ষ থেকে 'কবি জয়দেব বসু পুরস্কার'। 
সম্পাদিত পত্রিকা - 'কর্ষণ', 'অনপেক্ষ'।       




অনুচ্চারিত
-------------------



বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর ঝড়
শব্দ করে দরজা খুলছে, বন্ধ হচ্ছে
মেঘ ডাকার রেশ লেগে থাকছে সারা আকাশে
বৃষ্টি ধোয়া বিদ্যুৎ-এর আলোয় আলোকিত সব
এরকম মুহূর্তই তোমার দিকে নিয়ে যায়
স্মৃতি-বিস্মৃতির পরম্পরা টপকে, আদুল হয়ে,
মাছ ধরছে ছেলেরা, পথেই
স্মৃতির মধ্যে ঢুকে যাওয়া এইসব গ্রামজীবনের খণ্ড চিত্র 
পেট ফোলা ব্যাঙ, লুকোনো সাপ, গুরুতর বিদ্যুৎচমক, ছায়া ও অন্ধকারও ঢুকে পড়ে
পুকুরের পাড় ভেঙে জল ঢুকে যায় গ্রামে
পুকুরের পাড় ওঠা দিয়ে জন্মতারিখ নির্ধারণ হওয়া আশি নব্বই বছরের প্রাচীন গ্রামছবির সঙ্গে তোমার স্মৃতি সংযুক্ত হয়ে গেল
খণ্ড খণ্ড জগৎছবি মেশালাম কিঞ্চিৎ  শুশ্রূষা সহযোগে 
এবার আমরা আরশিনগরের দিকে চলে যাব
দুদিনের হোটেলবাস, পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া, অনাথ আশ্রমে থাকা কিছু দিন
আমাদের মধ্যে আর আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চারিত হবে না কখনও
বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর ঝড়, বিদ্যুৎ চমক
কী যেন ধুয়ে, মুছে এক করে দিল


মৃত্যুকে যেমন দেখায় 
---------------------------------

বর্ণ ও বর্ণহীনতার ছড়িয়ে পড়া, অভিযাত্রা এমনই
যেন সকাল থেকে মা ডেকে তুলছে আর কেউ উঠছে না
যেন ভোরের পাখি ডাকা ডাকা আকাশ কবলিত তোমার স্নিগ্ধ মুখ, বিনুনির ওম পৃথিবীর নৈরাজ্য-পীড়িত এলাকার দিকে উড়ে গেল
আর তাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়ে কেউ একটা ছুটে গেল ভেতরের দিকে
সেখানে ছোটেনি কেউ, কেউ আর স্থির হয়ে নেই
ইতস্তত হাওয়ায় কাঁপছে বর্ণদীপখানি
সে আলো সারা গায়ে মেখে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পাগল, প্রশান্ত ঘুমের দেশে, এত জবাফুল




তারারাত্রি
-----------------



তারারাত্রির আকাশে ছড়িয়ে দিলাম মদ, ছড়িয়ে দিলাম মাংসকুচি
রক্তাভ আবেদন ছড়িয়ে পড়লো নিভৃত সর্বাঙ্গে
খুব উট উট পেল আমার
গাভিন কামদুঘার মৌনব্রত পেল
রাত্রি রঙিন খানকির মতো আবেদনময়ী এবং স্থূল
এইসব মেদ, মাংস, পচুই মদের সান্দ্র কুহক ভাসমান হয়ে রইলো আকাশে


মাকড়সার জালের ধারণায় সংকীর্ণ প্যাঁচপয়জারময় আকাশের দিকে তাকালাম
ধোঁয়া তার জাগতিক পাথেয় শুষে মহাজাগতিক কুয়াশায় বুঁদ
ধীরে, মোটা গ্যাদগেদে মেঘে, সিঁদুরমাখানো মথ ঠ্যাং উলটে পেচ্ছাপ করছে
তাকে মানবী অবয়ব দাও
দিগন্তে, লাট খেতে খেতে, ঘুড়িবিপন্নতায়, অস্থির প্রশ্নচিহ্নে, দানবীয় ধর্ষকাম তার চরিতার্থ হবেই
এই নিগূঢ় দ্যোতনাটুকু
সংকীর্ণ প্যাঁচালো মশারিতে ঝালর, আকাশধারণা 


ফিরে এলাম
সঙ্গী কিছু অনুচ্চারিত কথার খুচরো
গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে রয়ে গেল ভেতরে
আর আমি
কাশবন সাঁতরানো দামাল বাচ্চা
সাদা পিষে পিষে পেশি স্ফীত করে তুললাম
স্মৃতি, পলেস্তারা গুঁড়ো 
এতো ঝরে
হাত তুলে তুলে তাকে নাগাল পাব না 

           
 নড়বড়ে হাওয়ায় মৃত্যু-মুহূর্তের যে অনিশ্চয়তা দোলা দিচ্ছে, আমরা তারই পথিক
গাঢ় অন্ধকার রাতে
বিজ্জলতা মাখানো শরীরে
উলোটপালোট গ্রীবায় 
একে অপরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে
অনিঃশেষ খুবলে খুবলে নিচ্ছি আলো, জাদুপরত



দিনলিপি
-------------- 

চাঁদ খুব ঘোলাটে, নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে এইমাত্র দেখলাম
পর্দাহীন জানলার ফাঁক দিয়ে  বিছানার দুলে ওঠা দেখলাম
বাকিটা সঙ্গম, ঝগড়াঝাটি বা শিশুর দুলে ওঠা  ভাবনারা এসে পূর্ণ করে দিল
চাঁদ খুব ঘোলাটে, বাদামি রঙের ধুলোর আস্তরণ সারাগায়ে
দূরে, ব্যালকনিতে, ঝুকে কেউ ফুলগাছে জল দিচ্ছে
ঘন অন্ধকার জল
এই দৃশ্যকে মনে রেখে কালকের দিনটা শুরু করব।


 সর্পিলাকার বিপন্নতা  ১
----------------------------------

শুভম চক্রবর্তীকে নিয়ে শুভম চক্রবর্তীর সংশয় গেল না ! 
ছ'হাতের কাছাকাছি একটা সাপ বারবার পায়ের পাতায় ছোবল 
কিন্তু গিলছে না...
অন্ধকারের যাবতীয় ইন্তিবিন্তি ঘেঁটে যাদের সর্পিলাকার বিপন্নতা একটু লম্বা হয়েছে 
তাদের পাশ সড়সড়িয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে হাওয়া 
এই পাতা এই বৃত্তাকার উপবৃত্তাকার আলোছায়া 
এই দাবানল গোছের কিছু সোঁদা অবসাদ 
তাকে লাট খাওয়াচ্ছে আকাশে কিন্তু হচ্ছে না ভোকাট্টা
কত কত নৌকো চলে গেল
জাহাজও নোঙর ফেলছে
পথিমধ্যে দেহাতী খালাসিরা আঙুল বাড়িয়ে দেখাচ্ছে
দ্যাখ ব্যাটাকে, সমুদ্র চেনে না
দ্যাখ ব্যাটাকে, অকুল ছপাছপ গায়েই মাখেনি
সে শেষতম মৃত ছিল, হয়তো
শেষতম জীবিত 
হয়তোর আগুন ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে কোত্থাও পৌঁছায়নি সে, এখনও
সংশয় গেল না !



সর্পিলাকার  বিপন্নতা  ২
------------------------------------

সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
রোঁয়া রোঁয়া শরীর মেলে শুয়ে আছে
ভোরবেলাকার স্বল্প আলোয় তার শ্বাসের ওঠানামা হাড়সর্বস্ব দুলিয়ে দুলিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলছে
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
হাঁ-ক্লান্ত বিকেল শেষে, রাতে, ঘুম জমাট বেঁধেছে দেরি করে
সারারাত সে অনিদ্রার সঙ্গে খেলেছে 
খেলেছে পাশে খুলে রাখা এলোমেলো পোশাক নিয়ে 
কোনো শরীর ছিল না
অন্ধকার লাল আলোর টানেল 
একটার পর একটা পেরিয়ে পেরিয়ে যাওয়া
ঝাঁপিয়ে 
গড়াগড়ি 
অন্তর্গত অন্ধকার   ছায়া  খোলাজানালা    ইশারাহীনতা
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
গৎ এখনও পড়েনি
পড়লেই আবার ঠেলে ঠেলে পৌঁছনো
কোথায় কোথায়
লোমশ ভুঁড়ি কুৎসিত কদাকার চা করে দেব সকালে
আমরা বিকেল হচ্ছি না সকাল
সকাল হচ্ছি না বিকেল
তার সিঁধেল পাঁয়তারা পাশে ছড়িয়ে রাখা ছতিচ্ছন্ন জামা ও কাপড় 
মনস্তাত্ত্বিক  চোরা বাঁক 
অন্ধকারকে গাঢ় করে তুলছে
ঝিঁঝি রব আরে গ্রামেই থাকে
তার যাবতীয় ভঙ্গিমা সৃষ্টি পেঁয়াজি সে খুলবে খুলবে করে খোলেনি 
বিছানায় ভুঁই-এ মজা পুকুর চলে এলো
ব্যাঙের কোকরকোকর আর অন্তহীন ঝিঁঝিরব
বলাৎকার 
জ্যোৎস্নারাত
মা গো 
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ, ঘুমোবে কখন 
না ঘুমোলে আমি যে ভিতর নিয়ে জাগতে পারছিনা !


সর্পিলাকার বিপন্নতা  ৩ 
------------------------------

পায়ু ও অণ্ডকোষের মাঝামাঝি যে স্থান সেখানে আমার সব রোমহর্ষ স্থির হয়ে ছিল
তুমি তুমুল জাগাতে...
জিভ দিয়ে, জিঘাংসা দিয়ে
ঘেঁটে তুলতে থিতিয়ে যাওয়া ওয়াক
সব সাপ হয়ে যেত, বড় সাপ সাপ হয়ে যেত সব
তারপর কত যে উল্টেপাল্টে আর সোজা করে নিয়ে
গতানুগতিকতার পুটকি মারতাম 
আজ তুমি নেই স্থিরবৎ জলের সপসপে
বুড়ি, কোমল মনের ভালো মাগি
কুণ্ডলিনী ফেটে যাক ফেটে যাক যা কিছু কঠিন



৭টি মন্তব্য:

  1. মহিউদ্দিন স্যইফ২১ জুন, ২০২০ ৯:২০ AM

    আহা !!! অপরূপ সব কবিতা । আবহমান কে ছুঁয়ে গেল

    উত্তরমুছুন
  2. লেখাগুলো খুবই ভালো লাগলো। এইসব লেখা বারবার পড়তে হয়

    উত্তরমুছুন
  3. প্রত্যেকবার নতুন হয়ে ফিরে আসে এরকম লেখা। কবিকে অগাধ ভালোবাসা...

    উত্তরমুছুন
  4. বেশ ভালো লেখা।

    উত্তরমুছুন
  5. এক স্বতন্ত্র লেখনী।কবিতাগুলি একবার পড়ে হজম হয় না।বার বার পড়তে হয়।তোমার কবিতায় অদ্ভুত একটা দর্শন থাকে।গূঢ় আদিম.....
    "না ঘুমোলে আমি যে ভিতর নিয়ে জাগতে পারছি না।"...এমন সব আশ্চর্য ভাবনা আর দৃশ্যচেতনা মনকে অন্য দিকে সরিয়ে রাখে।শুভেচ্ছা শুভম।

    উত্তরমুছুন