দেবাশিস মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দেবাশিস মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

                                                                     


ফিরে দেখা এক বর্ষার দিন....


সকালে খুব তাড়াতাড়ি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে গেলেও মনটা অস্থির, মেঘলা হয়েছিল দীপের।

বাড়িতে আবারো সেই একই কারণে ঝামেলা। কাল রাতেও রাগে, দুঃখে কিছু খায়নি, সকালেও নয়।

ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নেবে ভেবেছিল কিন্তু মাসের শেষে পকেটের অবস্থাও সুবিধার নয়।

নিজের টেবিলে বসে ব্যাগ থেকে ঘরে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্রের বোঝা বের করে বসল। তাড়াতাড়ি এই

কাজগুলো সেরে ফেললেই বেরিয়ে পড়তে পারবে। ওর সহকর্মী বোধহয় মুখ দেখেই কিছু আঁচ করেছিল।

উঠে এসে বলল, ‘চল একটু চা খেয়ে আসি আগে। আজও না খেয়ে এসেছিস, তাইনা?’

‘না না খেয়েই এসেছি, তবে চল চায়ে তো আপত্তি করার কিছু নেই’। ব্যাগটা ড্রয়ারের নিচে ঢুকিয়ে

উঠেছিল দীপ। ক্যান্টিনে বসার পর শুধু চা নয়, সাথে বাটার টোস্টের অর্ডারও দিয়েছিল রীতা। বাধা

দেওয়ায় বলেছিল, ‘আমি তো খেয়ে আসি নি, একা একা খাবো নাকি। দুটোমাত্র টোস্ট খেতে পারবি না।

সবসময় এমন না না করিস কেন বুঝিনা বাপু’।


কথা বাড়ালো না দীপ। চুপচাপ টোস্টদুটো খেয়ে চায়ে চুমুক দিল। ওকে অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি

চুপচাপ দেখে রীতা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে তোর আজকে মুড ঠিক নেই মনে হচ্ছে। এলি কিসে

অফিসে? অটোতে না রিকশায়?’


‘নাঃরে, হেঁটেই এসেছি। আর মুড আমার ঠিকই আছে আসলে সবকিছু তো একসাথে ঠিক রাখা যায়না।

একটা ঠিক হলে আরেকটা বিগড়ে যায়। জীবনটা সবসময় যে আমার মর্জী মতো চলবে তা তো আর

হওয়ার নয়। সকলে সেই ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। বাদ দে এসব কথা। চল আমি হাতের কাজ শেষ করে

একটু আগে বেরিয়ে যাব আজকে’।


রীতার মুখটা ম্লান হয়ে গেল দীপের কথা শুনে। এতো ভালো একটা ছেলে অথচ জীবন সত্যিই ওর সাথ

দেয়না কখনোই। যখন যা করবে বলে ভাবে তার উল্টোটাই হয়। এতো মেধাবী অথচ সাধারন মানসিকতার

মানুষ। নিজের কথা ভাবেই না তেমন করে, শুধু কিভাবে সংসার আরেকটু সামলে নেবে সেই চেষ্টাই করে

যায়। অথচ ওকে কেউ বুঝতে পারেনা, চায়ও না বুঝতে। রীতা চেষ্টার ত্রুটি রাখেনা। একমাত্র ওই

বোঝে দীপের ভেতরকার যন্ত্রণা। দীপ জানে সেটা, সেজন্যই একমাত্র ওর সামনেই খানিক স্বচ্ছন্দ

বোধ করে।


‘তুই যাবি কোথায়, কলেজে? তোর তো পরীক্ষাও চলে এল সামনে। আজ কি আছে, ক্লাস তো করিস না,

তাহলে?’ রীতার প্রশ্নের উত্তরে, দীপ বলল, ‘পরীক্ষার ফী জমা দিতে হবে। কালকেই শেষদিন।

পরীক্ষাটা না দিতে পারলে হবেই না। আমি একবার যদি না বসি তবে আর এ জীবনে আমার গ্রাজুয়েশন

করা হবেনা। কাল অনেক কষ্টে টাকা যোগাড় করেছি। ভালো লাগেনা আর এভাবে চলতে, তাছাড়া আজ

সব চুকিয়ে আসব....’। কথাটা শেষ না করেই চুপ করে গেল দীপ।


অফিস থেকে বেরোনোর আগেই বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। বর্ষা এসে গেছে। এই অঞ্চলে, একসময়, নিজের

ছোটবেলায় দশ পনেরো কুড়িদিন ধরেও টানা বৃষ্টি হতে দেখেছে দীপ। এখন তেমন হয়না এটাই রক্ষা।

ওর নিজের কোন ছাতা নেই, নেই অনেক কিছুই, সব কথা সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া যায়না একমাত্র

রীতা ছাড়া। মাথার ওপর থেকে ছাতটাই সরে গেছিল যেদিন সেদিন থেকেই এমন একটা অসম পরিস্থিতির

সাথে নিয়ম করে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।


শুধু নিজের জন্য হলে একটা কথা, আজ আরেকজনকে নিয়েও ভাবতে হয়। আর পেরে উঠছে না দীপ।

আজ খুলে বলতেই হবে শ্রাবণীকে সব কথা। ওকে বলতেই হবে, এমন আঘাটায় আটকে থাকা নৌকায়

উঠলে কখনো কোন তীরেই পৌঁছতে পারবেনা ও। ভালবাসার সমস্ত রঙ দেখতে দেখতে ফিকে হয়ে যাবে।

সংশয়, অভাবের সাথে কদিন মানিয়ে চলতে পারবে ও। এমন অভ্যেস তো নেই। নেই সেই অবস্থাও। ওর

জন্য একটা আলোয় ভরা জীবন অপেক্ষা করছে। যেখানে সামান্য একটা মোম আলাদা করে কেনার

ক্ষমতাও নেই দীপের। ওর নাম দীপ হলেও তা যে জ্বালানী ছাড়া, এটা সহ্য করার জন্য, একটা

অন্ধকার ভবিষ্যৎ কিভাবে দেবে ওকে?


বাস রাস্তায় বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হল, ভাবনাগুলোও এইসব সময়ে উড়ে এসে জুড়ে বসে

মনে। ঝিরঝির করে হয়ে যাওয়া অবিশ্রাম বৃষ্টিতে ভিজে গেল ওর একমাথা চুল, ঝাপসা হয়ে এল চশমার

কাঁচ। অটোগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে কিন্তু এদের ভাড়া বেশি। বাসে আটআনা দিলেই যাওয়া যায়।

হোক দেরী। ওর তাড়া নেই।


কলেজের গেটের সামনে পৌঁছনোর আগেই চোখ পড়েছিল দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণীর

দিকে। বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকলেও, ওদের কথা কতটা শুনছে কেজানে। দৃষ্টি তো রাস্তার দিকে।

অপেক্ষায় আছে কখন দীপের দেখা পাওয়া যায়। অফিসে ঢুকে পরীক্ষার ফী টা জমা দিল দীপ আগে।

তারপর হিসেব করে দেখল পকেটে এখন টাকা সাতেক মতো আছে। আজকের দিনটা কাটানো যাবে। কাল

কে দেখেছে? এখন দীপ যে প্রতিদিনের জন্য জ্বলে, বেঁচে থাকে। ওর কথায় রেগে যায় শ্রাবণী। কিন্তু

বোঝেনা যে দীপ যেটা ভাবে সেটাই বলে। বানিয়ে বলার অভ্যেস আগেও ছিল না, নতুন করে শিখতেও

চায়না আর।


দোতলার সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় দেখল শ্রাবণী নেমে আসছে, একাই। মাঝপথে থেমে গেল দীপ। হাসার

চেষ্টা করলেও সেটা হাসি হল কিনা জানেনা। ‘কোথায় যাবে আজ? সোজা বাড়ি নাকি এদিক সেদিক

ঘুরবে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু’।


শ্রাবণীর দৃষ্টি ওর ভেতরকার অনেককিছু পড়ে নিল। আজ দীপের মন ভালো নেই এটাও পরিষ্কার হয়ে

গেল ওর সামনে। রোজ যে বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত করায় আজ সে বাড়ি যেতে বলছে মানে কিছু তো

গণ্ডগোল আছে। ভেতরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে এল শ্রাবণীর। বেশ কদিন ধরেই ও একটা ঝড়ের

অপেক্ষায় রয়েছে। জানে একটা কিছু আসবে। সেটা দীপের তরফ থেকেই হোক বা অন্যকোন জায়গা

থেকে। ওদের এই স্বপ্ন দেখার অধিকারটাকে ভেঙ্গেচুরে খানখান করে দেওয়ার ইচ্ছে শানানোর

মানুষও যে কম নেই। আজ দীপকে বড্ড অস্থির দেখাচ্ছে, আপাত শান্ত, যেকোন বিপদে মাথা ঠান্ডা

রাখা দীপ তো এটা নয়। কি হয়েছে ওর?


বেরিয়ে পড়ল দুজনে, ওই শিপশিপে বৃষ্টির মধ্যেই। কলেজ থেকে বেরিয়ে, বিশাল মাঠটা পেরিয়ে যাওয়ার

রাস্তায় দীপকে নিজের ছোট্ট ছাতার নিচে ডাকল শ্রাবণী। ‘শুধু শুধু ভিজছ কেন? ছাতাটা মাথায় থাকলে

মাথাটা অন্তত ভিজবে না’।


দীপ হাসল, ‘আমাকে তো জানোই তুমি। আমার ভালোলাগে বৃষ্টি ভিজতে। ভালোলাগে রোদে পুড়তে। আমার

কিছুই হবেনা। আমার কিছু হতে নেই। আমি ক্রমশ মানুষ থেকে যন্ত্রমানুষ হয়ে যাচ্ছি এটা বেশ বুঝতে

পারি এখন। কোনদিকে যাবে বল তো? চলো আজ বরং নদীটাকে দেখে আসি। বর্ষার জলে কতোটা পুষ্ট

হল দেখি চলো’।


চেনা অচেনা রাস্তা ধরে প্রায় গ্রাম্য রাস্তার শেষে, একসময় পৌঁছে গেছিল নদীবাঁধের কাছে। তারপর

সেই বাঁধ ধরেই রওনা দিল দুজনে। বেশ খানিকটা পথ গাছপালায় ভরা, শুরুতে। বাঁধের নিচের দিকে থাকা

বাড়িগুলোর জানলা দিয়ে দুএকজনের উঁকিঝুঁকিও নজরে এলো বারকয়েক। বেশ বেড়েছে নদীর জল।

অনেকটাই। খানিক দূরে যাওয়ার পর বাড়িগুলো চলে গেল দূরে, এবার পথ অনেকটাই ভালো। শহরের

কাছাকাছি এলে যেমনটা হয়।


‘একটা ছাতা নিয়ে তো বেরোতে পারো। ছোট একটা ছাতা তো তোমার ব্যাগেই ধরে যায়। এভাবে ভেজাটা

ঠিক না’। শ্রাবণীর গলায় অনুযোগের সুর। দীপ বলল, ‘ঘরে গোনাগুনতি ছাতা। আমি তার থেকে একটা

নিয়ে বেরোলে বাকিদের অসুবিধে হবে। আর আমার নিজের বলতে কি আছে? তুমি তো জানো, এই জামা

প্যান্ট যা পরে আছি, এটাও অন্য কারুর। ভাগ্যিস আমার সেই আত্মীয় তার শখে, ঘন ঘন পোশাক

পোশাক বদলায়, একে তাকে না বিলিয়ে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেয়, তা না হলে কি করতাম কে জানে’।


কিছুক্ষন চুপ করে পথ চলার পর আবার কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি ঝমঝম করে শুরু হল বৃষ্টি।

সেইসাথে মেঘের গর্জন। তাড়াতাড়ি একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল দুজনে। এবার একটু

কাছাকাছি বলে হাত ধরে ওর অর্ধেক শরীর ছাতার নিচে টেনে নিল শ্রাবণী। বিকট শব্দে একটা বাজ

পড়ল দূরে। ভয়ে শিউরে উঠে দীপের আরো কাছে ঘেঁষে এল ও। গাছের পাতাগুলো থেকেও বড় বড় ফোঁটায়

জল ঝরছে তখন।


দীপ বলল, ‘আমি অনেক ভেবেছি এই কদিন ধরে। আমি আজো জানিনা যে চক্রব্যূহে আমাকে ঢুকতে

হয়েছে সেখানে তোমার জন্য একটা আলাদা জায়গা আমি আদৌ বানাতে পারব কিনা। তুমি বৈভবের

মধ্যে না থাকলেও অভাবের মধ্যে থাকো না। হয়তো অন্য কোনখানে তুমি আরো বেশী সুখী জীবন পাবে।

এভাবে কদিন পথ চলতে পারব জানিনা। একদিন অভাব অনটন ইত্যাদিরা এতো বেশি শক্তিশালী হয়ে

যাবে, ভালোবাসা পালাবার রাস্তা খুঁজবে। আমার সাথে জড়িয়ে গেলে সে রাস্তাও খুঁজে পাবেনা তুমি। আমি

তোমার জায়গায় কাউকে বসাবো না এটা কথা দিতে পারি। এই কথার নড়চড় হবেনা আমার জীবদ্দশায়।

কিন্তু তোমায় আমি সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিতে চাই। আজ এখুনি কিছু বলতে হবেনা। আজ

সারারাত ভাবো। বারবার ভাবো আমি যে কথাগুলো বলছি সেগুলো। একসময় আমাকে জানিও তোমার মত’।


ওদের এইসব কথার মাঝে, কখন বৃষ্টির জোর কমেছে এটা টেরও পায়নি দীপ, শ্রাবণীও। তখন

বারিধারা নেমেছে শ্রাবণীর দুচোখ দিয়ে, অবিরাম। ছাতার ওপরে থাকা ওর হাতটাতে চাপ দিল দীপ।

‘কেঁদো না। আমি তোমার চোখের জল সহ্য করতে পারিনা। আমি যা বলছি এটাই বাস্তব, আমরা যে পথে

এগোচ্ছি সেটা একটা সুখস্বপ্নের মতো হয়তো মনের এককোণে থেকে যাবে আমাদের দুজনেরই কিন্তু

আমি অন্তত এটা জেনে খুশি হবো, তুমি ভালো আছো, সুখে আছো। চলো এগোই আমরা। বড্ড খিদে পেয়ে

গেছে, এখানে কিছু পাবো কিনা কে জানে’।


বাঁধের রাস্তা ধরে খানিকটা গিয়ে শ্মশানঘাট। তার আগেই একটা সুঁড়ি পথ ধরে নিচে নেমে এলো দুজনে।

কয়েকটা দোকান রয়েছে। একটা ছোট চা, মিস্টির দোকানও আছে। একদিকের ঝাঁপ ফেলা। দোকানী

ভারাক্রান্ত মুখে কাউন্টারের বদলে, উনোনের পাশেই বসা। আজ খদ্দের জুটবে কি জুটবেনা তাই

হয়তো ভাবছে বসে। দীপ জিজ্ঞেস করল, ‘চা হবে দাদা? খাবার কিছু আছে কি?’


উনি আগুনের আঁচ পোয়াতে পোয়াতেই বললেন, ‘শিঙাড়া ভেজেছি এই একটু আগেই, এখনো গরম আছে। চা

হবে। একটু বসতে হবে। জলটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে’। ভেতরে ঢুকে কাঠের বেঞ্চে বসল দুজনে। এতক্ষনে

ব্যাগের চেনটা খুলে সিগারেটের প্যাকেট বের করল দীপ। ভেতরে ছিল বলে এখনো সুস্থ আছে

সিগারেটগুলো। দেশলাই দিয়ে ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিল। শ্রাবণীর হাতে ঘড়ি আছে। কটা বাজে

জিজ্ঞেস করায় বলল, ‘সোয়া তিনটে’। গলাটা ভার শোনালো ওর।


দীপ বলল, ‘চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ি চলো। আজ আর হেঁটে ফিরব না। স্ট্যান্ড থেকে বাস ধরে নিই বরং।

তোমাকে যা বললাম তা আমার মনের কথা। অনেক ভেবেছি আমি। কালও সারারাত ধরে এইসব নিয়েই

ভেবেছি। আমার সামনে যে আর কোনো পথ খোলা নেই শ্রাবণী। হয়তো ভবিষ্যতে খুলেও যেতে পারে

কিন্তু সেদিনের জন্য অপেক্ষা করার কোন উপায় তো নেই। আমার তো অফুরন্ত সময় কিন্তু তুমি?

তোমাকে, তোমার বাড়ির সবাই কি দেবে সে সময়? মনে হয় দেবে না। আজকের আমি যে জায়গায়

দাঁড়িয়ে, সেখানে তোমাকে আমি কি দিতে পারব বলতে পারো?’


‘আমি জানিনা। আমি কিছুই জানিনা। তবে একটা কথা জানি, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি তোমাকে ছাড়া

আর কারুর কথা ভাবিনি কখনো। ভাবতেও পারব না। যদি তুমি আমাকে এরপরও বল অন্য কিছু ভাবতে

তবে অনেকগুলো পথ খোলা আছে আমার কাছে। আমি জীবন কাটাতে হলে তোমার সাথেই কাটাবো, না

হলে জোর করে আমাকে অন্য কোথাও কেউই পাঠাতে পারবে না। তুমি ভাবার জন্য অনেক সময় দিচ্ছো

আমাকে। দরকার নেই সে সময়ের। আমার কথা আমি এখনি জানিয়ে দিলাম তোমাকে। দীপ আমরা তো

কোর্টে, রেজেস্ট্রী করে বিয়ে করে ফেলতে পারি। তাহলে আমাদের দুজনকে আর কেউ আলাদা করতে

পারবে না। তখন আমাদের সময় দিতেই হবে সকলেরই’। একটা আশার আলো যেন জ্বলে উঠলো ওর

মুখে।


‘পারি তো ঠিকই কিন্তু তারপর? সেটাকেও যদি মান্যতা না দেয় কেউ? আসলে আমি চাইনা তুমি তোমার

বাবামায়ের মনে দুঃখ দাও। আমার এখন যেটুকু ক্ষমতা তাতে যে সংসারের হাল ধরে আছি সেটাই

ঠিকমতো চলছে না। তারসাথে তোমার জীবনটাকে জড়িয়ে নেওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই শ্রাবণী।

তার চেয়ে দুরত্বটাকে বাড়িয়ে নেওয়াটাই ভালো হবে,’ কথা বন্ধ করল দীপ। চায়ের দোকানের ভদ্রলোক

একটা ট্রেতে করে দু গ্লাস চা আর প্লেটে শিঙাড়া নিয়ে এসে ওদের সামনের টেবিলে রাখলেন।


দু এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন সামনে তারপর বললেন, ‘কিছু যদি মনে না করেন, একটা কথা বলব?’ একটু

অবাক হয়ে গেল ওরা দুজনেই। ‘হ্যাঁ, বলুন, কি বলবেন’। শান্ত গলায় দীপ বলল।


‘এতটুকু দোকান আমার, তাই ইচ্ছে না থাকলেও দুএকটা কথা কানে চলে আসবেই। আমি আপনাদের

আগেও দেখেছি, এই রাস্তায় হেঁটে যেতে, কলেজের কাছেও। আমার বাড়ি ওদিকেই। বাড়িতে গিয়ে আমার

বৌকে আপনাদের কথাও বলেছি, দুএকবার। আমি নিজেও একসময় পড়তাম ওই কলেজেই। অনেক স্বপ্ন

দেখতাম। গরিবের ঘরে আমাদের মতো মানুষ যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমন সব স্বপ্নই। আমার বৌ আমার

সাথেই পড়ত। এমন একটা টানাপড়েন আমাদের জীবনেও এসেছিল। আমি নিজের অক্ষমতা জানিয়ে সরে

আসতে চেয়েছিলাম আমার বান্ধবীর জীবন থেকে, ঠিক আপনার মতো করে কথাগুলো বলেই। সে রাজী

হয়নি। আমার সাথে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে চেয়েছিল’। চুপ করে গেলেন ভদ্রলোক।


ওনার দৃষ্টি দীপ শ্রাবণীকে ছাড়িয়ে, খোলা একফালি জানালা দিয়ে বাঁধের ওপরে একনাগাড়ে ঝরতে থাকা

মৃদু বৃষ্টিফোঁটাগুলোর সাথে হারিয়ে গেছিল, অতীতের সেই দিনগুলোতে হয়তো। ‘একদিন বাড়ি ছেড়ে এক

কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল সে। এখান থেকে অনেকটা দূরের এক মন্দিরে বিয়ে করে, ওকে বাড়িতে নিয়ে

এসেছিলাম আমি। শুরুতে একটু ঝামেলা যে পোয়াতে হয়নি তা নয়, কিন্তু আমার মা খুব তাড়াতাড়িই

মানিয়ে নিয়েছিল ওর সাথে। পড়াশুনোর মাঝে সামান্য কিছু কাঠের ব্যবসা করতাম। বলতে বাধা নেই,

চোরাই কাঠের ব্যবসাই ছিল সেটা। সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলাম সেখান থেকে। বৌ প্রথমেই আমার

সেই ব্যবসা বন্ধ করিয়ে দিল। বলেছিল, ওর কাছেও কিছু টাকা জমানো আছে সেটা দিয়ে অন্যকোন

ব্যবসা করতে’।


‘খুব ভালো খাবারদাবার তৈরি করতে পারে বলেই, বলেছিল, এমন একটা দোকান খুলতে। প্রথমে ভাড়ায়

দোকানটা নিয়ে শুরু করলাম ব্যবসা। এই শিঙাড়া, চপ, নানারকমের পিঠে ইত্যাদি আমার বৌ, মা মিলে

বাড়িতেই তৈরি করে দেয়। আমি এখানে এনে ভাজি শুধু। আজকের এই দুর্যোগের দিনেও, দিনের শেষে

কিচ্ছু পড়ে থাকবেনা। সব বিক্রি হয়ে যাবে। বৌ বাড়িতে বেশ কিছু বাচ্চাদের পড়ায়। সেখান থেকেও আয়

হয়। শাড়িতে সুতোর কাজ, ফেব্রিকের কাজ ইত্যাদিও করে। তারপর একদিন এই দোকানটাকে কিনে

নিতেও পেরেছি। ভাঙ্গাচোরা কাঠের বাড়িতে দেওয়াল গেঁথে চেহারাও পালটে দিয়েছি। একটা বোন ছিল,

তার বিয়ে দিয়েছি। অথচ এগুলো করতে পারব এমনটা স্বপ্নেও ভাবিও নি কখনো’।


‘আপনি তো সরকারী চাকরি করেন, আজ যে অবস্থায় আছেন, কাল কিন্তু আর তা থাকবেনা। নিজেকে

গুছিয়ে নিতে পারবেন। তাই বলছি, কিছু মনে করবেন না যেন, দিদিভাই যা বলছেন সেটাকেই মানুন। একটা

সম্পর্ক ভেঙে দিতে, কয়েকটা মুহূর্ত লাগে, গড়ে তোলার জন্য সারাটা জীবন তো আছেই আপনাদের

সামনে। আমার শ্বশুরবাড়ি প্রথম অবস্থায় রাগ করলেও পরে সেটা পড়ে গেছে। আজ প্রয়োজনে

আমাকেই ডেকে পাঠান ওরা, ভরসাও করেন’।


‘আমি বলছি, আপনি দিদিভাইয়ের পরামর্শটা মেনে নিন। একটা আইনি বন্ধনে জড়িয়ে যান দুজনে যাতে

ইচ্ছে করলেই ওনাকে আপনার থেকে দূরে কেউ না সরিয়ে দিতে পারে। সেটা একটা ইনস্যুরেন্স হয়ে

থাক না। আপনারা সময় সুযোগ বুঝে বলবেন সে কথা। দরকার না হলে বলবেন না। কিন্তু নিজেদের

মধ্যে কোন দুরত্ব ভুল করেও তৈরি করবেন না। আমার অনুরোধ এটা’। উনি খানিকটা লজ্জা পেয়েই

বললেন, ‘দেখুন কান্ড আপনাদের চা তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেল। দাঁড়ান একটু গরম করে দিই’। চায়ের

গ্লাসদুটো হাতে নিয়ে চলে গেলেন উনি উনোনের সামনে।


দীপ তাকালো শ্রাবণীর দিকে। এক অদ্ভুত আলোর রেখায় ঝলমল করছে ওর মুখ। এই ভদ্রলোকের

কথা যেন ওদের নিজেদের কথাই, ঠিক এমনটা তো দীপ নিজেও ভাবছিল ওনার কথা শোনার সময় আজ

শ্রাবণীকে এই কথাগুলো যে কিভাবে বলেছে তা একমাত্র ও নিজেই জানে। বর্ষার অবিরাম ধারা ধুইয়ে

দিচ্ছিল ওর মুখ তাই শ্রাবণী বুঝতে পারে নি। সবটুকু বৃষ্টির মিষ্টি জলের ধারা নয়, তাতে মিশে ছিল


চোখের লোনা জলও। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েছিল একদৃষ্টে। বুঝে নিতে চাইছিল একে অপরের

গভীরতা। ভদ্রলোক আবারো চায়ের গ্লাস নিয়ে এলেন। এবার একটা বাড়তি গ্লাসও এনেছেন, নিজের

জন্য।


ওদের থেকে একটু দূরের একটা বেঞ্চে বসে বললেন, ‘আমি জানি আপনারা আমার আপনাদের বিষয়ে

কথা বলায় বিরক্ত হননি। আমি যা বলেছি তা আমার মনের কথা, অভিজ্ঞতার কথা। আপনারা সেই ভুল

করতে যাবেন না, যেটার জন্য একদিন পস্তাতে হয়। আমিও করতে যাচ্ছিলাম। আমরা ছেলেরা বোধহয়

এমনধারাই হই। সঙ্গীকে কষ্ট না দেওয়ার বাসনায় দূরে সরে যেতে চাই, অথচ জেনেবুঝে সেই কষ্টই

দিয়ে ফেলি। দিদিভাইদের মতো মেয়েরা যে একটা মস্তবড় বল হয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে এমনটা ভাবিই

না। আপনি দাদা, নিজের ধারণা বদলান। সময় সব ঠিক করে দেয়। সময়ের চেয়ে বেশি শক্তি কারুর নেই।

শুধু দাঁতেদাঁত চেপে একটু অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটা কথা, বিয়ের সময় আমাকে এই ঘটকালির

জন্য নেমন্তন্ন করতে ভুললে চলবে না কিন্তু’।


চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে দুজনেই হেসে উঠল ওনার কথায়। শিঙাড়াটা সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর

বানিয়েছেন ওনার স্ত্রী। খাওয়া শেষ করে টাকা দেবার জন্য পকেটে হাত দিতে যেতেই, ভদ্রলোক হাত

জোর করে বললেন, ‘আমার দোকানে আজ প্রথম এসেছেন আপনারা, আমার কথায় যদি দুটো জীবন

একসাথে মিলে যায় তবে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা হবে। আজ আমি কোনো দাম নেবোনা। এরপর

আপনারা দুজনে স্বামীস্ত্রী হয়ে যেদিন আসবেন সেদিন উসুল করে নেব। কথা দিচ্ছি আমি’।


খানিকটা হতবাক হয়ে গেল ওরা দুজনেই। দীপ ভদ্রলোকের হাতটা চেপে ধরল। ‘একটা মস্তবড় ভাঙনের

হাত থেকে আপনি বাঁচালেন আমাদের। আমি নিজেও চাইনি ওকে দূরে সরিয়ে দিতে। অভাব যেটার ছিল তা

হল নিজের প্রতি আস্থার। আপনি সেটা আমাকে ফিরিয়ে দিলেন আজ। আমি কৃতজ্ঞ থাকব আপনার

কাছে’।


শ্রাবণের অবিশ্রাম ধারা থেমে গিয়ে, পশ্চিম আকাশে মেঘের ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে টুকটুকে লাল রঙের

সুর্য। রাস্তায় জমে যাওয়া জলে, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনের চকচকে লোহার পাতে, গাছগুলোর

ভেজা পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে সেই রক্তিম আভা। দুজনে পা বাড়ালো বাসস্ট্যান্ডের দিকে। কিছুদূর গিয়ে

দুজনেই একবার ফিরে তাকালো। ভদ্রলোক দোকানের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। উনিও হাত নাড়লেন

ওদের দিকে।


দীপ বলল, ‘আমার এখন একটাই কাজ হবে, নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নেওয়া। তোমাকে আমার কাছে

আনতে গেলে যেটুকু দরকার সেভাবে সাজিয়ে নেওয়া সবকিছু। তুমি পারবে তো সব মানিয়ে নিতে,

শ্রাবণী?’


শ্রাবণী হাত বাড়িয়ে দীপের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ‘একবার সুযোগ তো পেতে দাও। আমি সব

ঠিক করে নেব। ঠিক হয়ে যাবে আমার বাড়িও। সময় লাগবে একটু হয়তো, কিন্তু হবেই। আমি জানি।

বিশ্বাস করি। তুমি আমার ওপরে ভরসা করতে পারো’।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

#বুধবারের_প্রবন্ধ_বিষয়_দেশভাগ

খণ্ডিত দেশ- কাদের জন্য?


নাড়ি ছেঁড়ার তীব্র যন্ত্রণা, ছুঁয়ে যায় জন্মান্তর,
ভাবী প্রজন্মে ঘনায় ছায়া, না চাওয়া জন্মদাগ।
দীর্ঘ্যশ্বাস আর চোখের জলে স্বাদ নোনতা রক্তের
কে চায় খন্ডিত দেশ? কাদের জন্য এই দেশভাগ?

বিষয়টাই এমন যে বের করে আনলো বহুদিন ভেতরে জমে থাকা, কবিতার কয়েকটি লাইন। দেশভাগটা আসলে কি? সেটাই আজ আলোচনার বিষয়। একটা এমন বিতর্কিত বিষয়, যা নিয়ে হাজার ঘণ্টা ডিবেট করা যায়, যায় নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকের চোখে বন্যা নিয়ে আসা, বা রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আব্রাহাম লিঙ্কনের দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করা “that these dead shall not have died in vain — that this nation, under God, shall have a new birth of freedom — and that government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.” Gettysburg’ 19th Nov’1863.

পিছিয়ে যাওয়া দরকার, অনেক অনেকগুলো বছর, একদুটো নয় প্রায় ৩০/৪০ লক্ষ বছর আগে যখন আফ্রিকা মহাদেশে অস্ট্রালোপিথেকাসরা বাস করত, দুপায়ে ভর দিয়ে হাঁটত তারা। আরো বেশকিছু পরে উদ্ভব হয় হোমো হাবিলিসদের। এরা প্রকৃত অর্থে মানবই ছিল, গাছের ডাল, পাথর দিয়ে বানাতো অস্ত্র, শিকার করত। তারও দশ লক্ষ বছর পরে মানে ১৫ লক্ষ বছর আগে আসে হোমো ইরেক্টাস। এইবার শুরু হয় তাদের এগিয়ে চলার পালা। অনেক উন্নত অস্ত্রের ব্যবহার, আগুনের ব্যবহার, আশ্রয়স্থল বানানোতে সক্ষম এই জাতিই প্রথম আফ্রিকা ছেড়ে ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এরও অনেক পরে বিবর্তনের মাধ্যমে আসে হোমো স্যাপিয়েন্স বা বুদ্ধিমান মানব। তাদের একটি উপজাতি নিয়ানডার্থালেরা ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়াতে বাস করত, এড়াই প্রথম নিজেদের জাতের মৃতদের কবর দেওয়া শুরু করে, কিন্তু আজ থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আরেকটি উপজাতি বা বর্তমান মানুষেরা জন্ম নেয় ৪০ হাজার বছর আগে। এরা হল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স। এরাই আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়ার সাথে সাথে, এশিয়া ছেড়ে আমেরিকা মহাদেশেও পৌঁছে যায়। এরা দীর্ঘ্যকায় ছিল, পায়ের তুলনায় হাত অনেক বেশি লম্বা ছিল। অস্ত্র ব্যবহারেও পটু ছিল এরা।

ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইতে হচ্ছে এই কারণে যে, এই মানবেরা একদেশ ছেড়ে আরেক দেশে পা ফেলেছিল নিজেদের প্রয়োজনে। শিকারে স্বল্পতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা কারণে এরা দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াত। নব্যপ্রস্তর যুগের পরে, ধীরে ধীরে মানুষেরা গড়ে তোলে নিজেদের স্থায়ী বাসস্থান, গ্রাম, শহর, ভাগ হয় শ্রম। এই সময়কালেই জেরিকো ও চাতাল হুইউক সভ্যতা গড়ে ওঠে। মানুষ নির্ভর করতে শুরু করে কৃষি ব্যবস্থার ওপরে। 
এর পরে অনেক জল বয়ে যায় তাইগ্রীস ও ইউফ্রেতিসের অববাহিকায় (এখনকার ইরাক), মিশরের নীল নদের অববাহিকায়, অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমাংশে, সিন্ধু নদের অববাহিকায় একের পর এক গড়ে উঠতে থাকে মেসোপটেমিয়া, মিশরীয় ও সিন্ধু সভ্যতা আজ থেকে পাঁচ ছয় হাজার বছর আগে। কালের নিয়মে একে একে সেগুলি হারিয়েও যায়। মুছতে শুরু করে এইসব এবং আরো অনেক এমন সভ্যতার, যেমন, ইনকা, অ্যাজটেক, বাইজেন্টাইন, গ্রীস, রোমান ইত্যাদির সীমারেখাও। মানুষেরাই ধীরে ধীরে বিশ্বের বিশালতাকে টুকরো টুকরো করে তৈরি করতে থাকে একেকটি, আলাদা আলাদা দেশের উঠোন। যা আজকের প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়।

শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক মতবাদকে তোল্লা দেওয়ার জন্য, স্বীয় সম্মান খানিকটা হলেও বজায় রাখার খাতিরে, ১৭৭৬ সালের চৌঠা জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাক্ষর হওয়ার পরও ব্রিটিশ সরকার তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় আমেরিকায় লেগে থাকা গৃহযুদ্ধ চলতেই থাকে, দীর্ঘ্য ছয় বছর স্থায়ী হওয়ার পর ১৭৮৩ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার স্বীকৃতি পায়। কিন্তু ভাঙনের খেলা চলতেই থাকে। আজ আমেরিকা কতগুলো খণ্ডে বিভক্ত তা হয়তো অনেকেই মনেও করতে পারেননা। আর একেকটা অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা। তারা কি এই বিভেদের পক্ষে ছিলেন? গ্যাটিসবার্গের কবরখানায় মাটির নীচে শুয়ে থাকা সৈনিকরা, কি আজো জানে যে সে যেখানে শুয়ে আছে সেটা তার নিজের অঞ্চলই নয়।

একটা বড় দেশকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার আরো উদাহরণ আছে। স্পেন ও পর্তুগালের ঔপনিবেশিক থাবা থেকে মুক্ত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, চিলি, পানামা, পেরু, বলিভিয়া, উরুগুয়ে প্রভৃতি দেশগুলো সবাই তাদের খানিকটা অংশ খুইয়েছে অন্য দেশের কাছে। সেই ভাগাভাগির ফল আজও দক্ষিণ আমেরিকার জনগণ ভোগ করছেন। প্রবল অনাবৃষ্টি, খরা, ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কাতারে কাতারে মানুষ দেশ ছাড়ছেন।

আফ্রিকা মহাদেশে এই ভাঙনের ফলে এক দেশের খানিকটা জুড়েছে আরেকদেশে, কোথাও বা ভাগই হয়ে গেছে দেশ। অতীতের রোডেশিয়া ব্রিটিশরা ভেঙে উত্তর আর দক্ষিণে ভাগ করে দিয়েছিল ১৯১১ সালে, আজ যা জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে নামে পরিচিত, ভাঙ্গা হয়েছিল মরক্কোকেও পরের বছর, খানিকটা স্পেন খানিকটা নিয়েছে ফ্রান্স। এই ভাগাভাগির রাজনীতিতে, কেনিয়া, আলজেরিয়া, মালি, উগান্ডার ভাগ, দখল, ১৮৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বু’ওর যুদ্ধে, শুধু ব্রিটিশ বা স্থানীয় শ্বেতাঙ্গরাই নয়, প্রাণ হারিয়ে ছিল হাজারো সাধারণ আফ্রিকান নাগরিক। কোনরকমে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর জীবন ধারনের প্রাচীন পদ্ধতি এমন ভাবে ধ্বংস হয়েছিল যে না খেতে পেয়ে মারা গেছিল আরো বহু লোক। যারা টিকে ছিল তাদের দিয়ে শ্রমিকের কাজ করানো হত, সেই ব্যবস্থাও ক্রীতদাস প্রথার চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না। আজো অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, বারবার রক্তাক্ত হচ্ছে। মরছে মানুষ, ঝরছে লাল রক্ত, হ্যাঁ ওই কালো মানুষগুলোর শরীর থেকেও। আর একই রঙের রক্তের কিছু ঔপনিবেশিক দেশ আজো শ্বদন্তে খড়কে কাঠি দিয়ে ক্ষমতার লালসা খোঁচাচ্ছে।

ইউরোপের কথাই যদি ধরা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে ক্ষমতার লড়াই এমন একটা জায়গায় পৌঁছে যায় যে, পৃথিবীর তাবড় শক্তিগুলো নিজেদের পেশী বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করে ছোট ছোট দেশগুলোকে। তাদের দখল করে, ভাগ করে, এক দলের সাথে আরেক দলের লড়াই লাগিয়ে দিয়ে, আখের গোছানোর কাজ করে যাওয়া বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলো যে অবস্থার সৃষ্ঠি করেছিল তার থেকে বেরোনোর রাস্তা আজো হয়নি। আজও তাই বসনিয়া, সার্বিয়াতে রাস্তায় আলপনা দেয় সেই লাল রক্তই। রাতারাতি এক বৃহৎ ক্ষমতাধর দেশ হয়ে উঠেছিল সোভিয়েত রাশিয়া। সারা পৃথিবী জুড়ে আগ্রাসনে পিছিয়ে ছিলনা তারাও। বিংশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে তার অধীনে থাকা ছোট ছোট দেশগুলো স্বাধীনতা ফিরে পায়। কিন্তু একই সাথে গৃহযুদ্ধের আবহ ঘিরে ধরে গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে। সেই রক্তক্ষয়ী লড়াই আজো মাথা চাড়া দেয় মাঝে মাঝেই।

মধ্যপ্রাচ্যে বহু সহস্র বছর ধরে বসবাসকারী হিব্রুভাষী ইহুদীদের বাসভূমিতে কব্জা জমিয়ে রেখেছিল সম্মিলিত আরবদেশগুলি। ফিলিস্থিন নাম দিয়ে সেখানে উসমানীয় সাম্রাজ্য তৈরি করার পর বিতাড়িত ইহুদীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ও তার অনেক আগে থেকেই ইহুদী নিধনকে একটা মহৎ কর্ম হিসেবে মেনে নেওয়া তথাকথিত সভ্য জগতের কিছু অসভ্য মানুষ যে হত্যালীলা চালিয়েছিল তা আজ ইতিহাসের পাতায় কালো কালিতে লেখা আছে। ইহুদীরা জন্মায় এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে যে তাদের প্রমিশড ল্যান্ডে তারা ফিরে যাবেই। সেইমতো ফিলিস্থিনে ফিরে যাওয়া শুরু করে বহু ইহুদী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করায় ১৯৪৭ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ফিলিস্থিনকে ভেঙে দুটুকরো করে আরব ও ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা হবে। এর মধ্যে থাকা জেরিজালেম নগরকে আন্তর্জাতিক শহরের মর্যাদা দেওয়া হবে কেননা, খ্রীস্টান ও মুসলমান, এই দুই ধর্মের মানুষদের কাছেই এটি পবিত্র নগরী।

আরবরা এই জাতিসংঘের এই প্রস্তাবে রাজী না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেওয়ার সাথে সাথে, একই দিনে ডেভিড বেন গুরিয়ন, ইস্রায়েলের জাতির জনক তথা প্রথম প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীন ইস্রায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা করেন। সম্মিলিত আরবশক্তি ইস্রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, কিন্তু দ্রুত ইস্রায়েল সেই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে, দখল করে নেয় আগের চেয়ে বেশি অঞ্চলও। জেরুজালেম শহরের কিছু অংশও তারা দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় যুদ্ধের বিরাম ঘটে এবং ইস্রায়েল স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৬৭ সালে আবারো যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসে। এবার ইস্রায়েল সম্পূর্ন জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং ইস্রায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে। আজো ফিলিস্থিনিদের সাথে, গাজা ভুখন্ডে বসবাসকারী নিরীহ মানুষদের প্রাণ যাচ্ছে এই দেশ দখলের খেলায়। ধর্মভিত্তিক স্থান নিয়ে বা ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাঙ্গাগড়ার রাজনীতি, পৃথিবীতে এই একটাই নয়, আসছি সে প্রসঙ্গে।

আরেক বৃহৎ শক্তিধর দেশ, আমেরিকা, তার মিত্র ফ্রান্সের তৈরি লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম এই তিন দেশের সম্মিলিতরূপ ইন্দোচীন, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান দ্বারা দখল হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সাম্যবাদী নেতা হও চই মিনের নেতৃত্বে ফ্রান্স থেকে ভিয়েতনাম স্বাধীন হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করে। ফ্রান্স স্বীকৃতি না দেওয়ায় ১১৯৪৬ শাল থেকে ফ্রান্সের সাথে ভিয়েতনামীদের যুদ্ধ বাধে। দীর্ঘ্যস্থায়ি এই যুদ্ধের পর দিয়েন বিয়েন ফুর লড়াইতে ফরাসীরা পরাজিত হয়। স্বাধীন ভিয়েতনামকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। উত্তরে সাম্যবাদীরা আর দক্ষিণে অ-সাম্যবাদীরা দেশ গড়ে তোলে। এরপরই শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ। দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাম্যবাদী গেরিলাদের সাথে যুদ্ধে আমেরিকাও জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সম্মিলিত বাহিনীর সাথে গেরিলাদের যুদ্ধ শুরু হয়, কিন্তু গেরিলাদের যুদ্ধকৌশলের কাছে আমেরিকাকে পর্যুদস্ত হতে হয়। ১৯৭৩ সালে আমেরিকা তাদের দেশের জনগণের চাপে ও বাকি বিশ্বের চাপে সেনাপ্রত্যাহারে বাধ্য হয়। যুদ্ধ তবুও চলতে থাকে। শেষে ১১৯৭ সালে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। দুই ভিয়েতনাম সাম্যবাদী সরকারের অধীনে একটি রাষ্ট্র হিসেবে জুড়ে যায়। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, শস্যক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে চরম খাদ্যাভাব ইত্যাদির মধ্যেও অটুট থেকে ভিয়েতনামের এই কৃতিত্ব আজো অনেক দেশের কাছেই গ্রহণযোগ্য ইতিহাস।

এবার আসা যাক আমাদের নিজের দেশের কথায়। ভারত ভুখন্ড চিরকালই নানা জাতির আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছে। পাঁচহাজার বছরের বেশি পুরোনো এই সভ্যতাকে খন্ড খন্ড করে দেবার, লুন্ঠনের অভিপ্রায় নিয়ে শক, হূণ, পাঠান, মোগল, বিদেশি আরো নানা দেশের আক্রমণের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়েছে এই ভুখন্ডে। তারা কেউ ফিরে গেছে স্বভূমিতে, কেউবা, এই দেশের মাটিকেই নিজের দেশ হিসেবে বেছে নিয়ে থেকে গেছে। বিভিন্ন সভ্যতা মিশেছে, গড়ে উঠেছে ধর্ম, রীতিনীতি, সংস্কৃতির এক মহা মিলনমেলা। কিন্তু তবুও সেইভাবে ভারতকে ভাগ করে দেবার কথা তেমন ভাবে ওঠেনি। প্রবল পরাক্রান্ত মুসলমান ধর্মের মোগল বাদশাহরাও হিন্দু মুসলমানকে পাশাপাশি মিলেমিশে থাকার ব্যাপারেই মত জানিয়েছিলেন।

এরপর, ইংরেজরা ব্যবসার কথা বলে এদেশে এসে, যখন ভারতবর্ষে তাদের অধিকার কায়েম করে বসল, তৈরি করল এক নতুন উপনিবেশ, তখন থেকেই বদলানো শুরু হল অনেক কিছুর। ভাগাভাগির মাধ্যমে বিপক্ষের শক্তি হ্রাস করার নীতিতে বিশ্বাসী ইংরেজরা, এইদেশের কিছু ক্ষমতালোভী মানুষের সাহায্যে দেশের সার্বভৌমত্বকে ভাগ করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। বেনিয়ার চাদর গা থেকে ফেলে দিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল ঔপনিবেশিকের নামাবলী। এই ব্যাপারটা নতুন নয়। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, বেনিয়ার জাত ইংরেজরা এইভাবেই সারা পৃথিবীতে নিজেদের অধিকার কায়েম করেছে।

একে একে স্বাধীন রাজাদের, মোগল সাম্রাজ্যের দেউলে নিভতে শুরু করল প্রদীপ। নানা টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, বিভিন্নভাবে প্রতিরোধ, গণআন্দোলনের রূপে নিজেদের অনীহা জানালেও, ঠিক সেঅর্থে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি এই বিদেশি শাসনকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে। যথাযথ নেতৃত্বের অভাব, মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভীতি, সমস্ত ধ্যানধারণা সরিয়ে রেখে, নিজেদের ভারতবাসী ভেবে এগিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে স্বাধীনতার দাবি সেভাবে জানানোই হয়নি। একের পর এক ভাইসরয়রা এসে তাদের মতো করে শাসন চালিয়েছেন ভারতভূমিতে।

এল, ১৯০৫ সাল, ভাইসরয় হিসেবে তার দ্বিতীয় কার্যকালে লর্ড কার্জন, ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক বিভাগ, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে দ্বিখণ্ডিত করার আদেশ দিলেন। এই আদেশে তৈরি হল মুসলমান প্রধান পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি বিভাগ, এবং হিন্দুপ্রধান বঙ্গদেশ মানে সেকালের পশ্চিমবঙ্গের প্রেসিডেন্সী ও বর্ধমান বিভাগ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা রাজ্য। এবার অনেকদিন বাদে সেই ঝড় উঠল যা তদানিন্তন ব্রিটিশ শাসকেরা ভাবতেও পারেননি। পূর্ববঙ্গে যে সব জমিদারি ছিল তার বেশির ভাগের মালিক ছিলেন বাঙালি হিন্দুরা। তাদের প্রজা ছিল কৃষিকাজে নিযুক্ত মুসলমানেরা। এই ব্যবস্থাপনার ফলে হিন্দু উচ্চবিত্ত শ্রেণীকে বিহারী ও ওড়িয়াদের মাধ্যমে সংখ্যালঘু করে দেবার চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র রোষে ফেটে পড়েন সবাই। শুধুমাত্র জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে সাধারণ অন্দোলনই নয়, এদিক সেদিকে সহিংস আন্দোলনেরও সূত্রপাত হতে লাগল। কলকাতা তখনো ভারতের রাজধানী ফলে সেখান থেকেই আন্দোলন সংঘটিত হতে লাগল। সরকারী অফিসে ডাকাতি, আধিকারিকদের হত্যা ইত্যাদিও চলতে লাগল একই সাথে।

ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য যে ব্যর্থ হয়েছিল তা নয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গের আদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার মধ্যেই, হিন্দু নেতাদের এই বাড় বাড়ন্তে ভীত সন্ত্রস্ত ভারতের মুসলমান উচ্চবিত্ত সম্প্রদায় তাদের ভীতির কথা নতুন ভাইসরয় লর্ড মিন্টোকে জানায়। নানান নথীর সাহায্যে তারা বোঝাতে সক্ষম হন যে মুসলমানদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা দরকার। ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ স্থাপিত হয়। ভারতীয় আর্যসমাজ সেসময় শুধু উত্তরভারতে গোরক্ষাকারী গোষ্ঠিগুলোকে সমর্থন করেনি, বরং মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্রিটিশদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছিল। গোহত্যার প্রতিবাদে ও হিন্দি-উর্দু বিতর্ক নিয়ে এর আগেও ১৮৯৩ সালে জাতিদাঙ্গা লেগে যায়। বহু সাধারণ মানুষ হতাহত হয় সেই দাঙ্গায়। একদেশ ছেড়ে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা অন্য জায়গায় পাড়ি দিতে থাকেন শেষ সহায় সম্বলটুকু সাথে নিয়ে, সাথে নিয়ে দাঙ্গা, সম্ভ্রমহানির লজ্জা, সন্ত্রাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর নাড়ির বাঁধন ছেঁড়া সুতীব্র যন্ত্রণা।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময়, পুর্ববঙ্গের পক্ষে জোরালো সমর্থন ছিল সেখানকার মুসলমানদের, কেননা তারা ছিলেন সংখ্যাগুরু এবং রাজনৈতিক সুবিধালাভের সুযোগ তাদের সামনে এসেছিল, অন্যদিকে হিন্দুরা সেখানে সংখ্যালঘু হলেও বিরোধিতা করেছিলেন তাদের সম্পত্তি, ক্ষমতা ইত্যাদির কথা ভেবে। ব্রিটিশদের এই দাবার চাল নানা আন্দোলনের জন্য ভেস্তে গেলেও, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করলেও, দেশ ভাগের একটা জমি কিন্তু তখন থেকেই তৈরি হয়ে গেছিল। ১৯৪৭ সালে বারবার ভোট নেওয়া হয়েছে, নানাস্তরে, প্রতিবারই বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারেই সবাই সায় দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতা, নোয়াখালি ইত্যাদি জায়গায় মারাত্মক জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার লোকের প্রাণ যায় সেই দাঙ্গায়। হিন্দু মুসলমান দুই জাতির মধ্যে বিভেদের দেওয়াল আরো শক্ত হয়।

বাংলার মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এই দেশভাগ যে শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই হচ্ছে, এবং যেহেতু কল কারখানা, বিভিন্ন শিল্প ইত্যাদি পশ্চিমবঙ্গেই অবস্থিত, পূর্ববঙ্গ সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়বে, উপলব্ধি করে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত না করে একটি স্বতন্ত্র রাজ্য হিসেবে দেখা হোক। ভারতীয় মুসলিম লীগের জাতীয় নেতারা যারা একটি মুসলিম দেশের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তাদের অনেকেই এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। যদিও মহম্মদ আলী জিন্নাহ এই প্রস্তাবের সুফল বুঝতে পেরে একে সমর্থন করেছিলেন। সেইসাথে বাংলা প্রদেশের প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতারা, নেজাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, তার দাদা শরৎ চন্দর বোস, কিরণ শংকর রায় প্রমুখেরাও এই প্রস্থাবের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা আসে জাতীয় কংগ্রেসের নেতা জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ইত্যাদির কাছ থেকে। বাংলার হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। এরপরে সোহরাওয়ার্দী তার প্রস্তাব ফিরিয়ে নেন। অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় কিন্তু দেশভাগ এড়ানো এবং হিন্দু মুসলমানের একসাথে বসবাস করার ইচ্ছের শেষ চেষ্টা যে সোহরাওয়ার্দী এবং বাংলার কয়েকজন কংগ্রেস নেতা করেছিলেন ইতিহাস তার সাক্ষী থেকে যায়।

ইংরেজরা তাদের শাসনকালের শেষ পর্যায়ে, জাতিগত বৈষম্যের শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। সৃষ্ঠি হয় আরেকটি নতুন দেশ পাকিস্তান, ভারতের পশ্চিম অংশের খানিকটা এবং পূর্ববঙ্গ মিলে। উভয় দেশের মধ্যে এক বিরাট জনগোষ্ঠি এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় যাওয়া শুরু করেন। বিভক্তিকরণের আগেই পাঞ্জাবে লেগে যায় বিশাল দাঙ্গা, তবুও একবছরের মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষ হয়। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এত সহজ হয়নি। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চলা অভিবাসন প্রক্রিয়ায়, ঘরবাড়ি, জমি জায়গা, সবকিছু ছেড়ে দেশ ছেড়ে অন্যদেশে পাড়ি দিতে হয় পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু হিন্দুদের। চলে চরম অত্যাচার, খুনোখুনি, লুটপাট। সব হারিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ চলে আসে পশ্চিমবঙ্গে। শুরু হয় আরেক লড়াই। বেঁচে থাকার লড়াই।

ইংরেজরা যে সুযোগটা খুঁজছিল তা তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল তৎকালীন নেতারা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে মুসলমান, হিন্দুর কিন্তু ব্রিটিশরা ছিল সুরক্ষিত। তারা মজা দেখেছে, কখনো মুসলিম লীগ কখনো কংগ্রেস দুদিকেই হাওয়া দিয়ে গেছে। এই সাম্প্রদায়িকতার আবহ যেন অটুট থাকে, সেই দিকে সবসময় নজর থাকতো তাদের। একের পর এক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে হিন্দু মুসলমান উভয়েরই কিন্তু তখনো শাসনভার নিজেদের কাছে থাকলেও সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়নি ব্রিটিশেরা, বরং উত্তেজনার পারদ আরো ওপরে উঠতে দিয়েছে।

মুসলিম লীগের নেতারা বা জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা তখন যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের খেলায় মত্ত। কে কতখানি ক্ষমতার অধিকারী হবে, কে কোন পদ নেবে সেই নিয়েই আলোচনায় বিভোর ছিল তারা। এই ভাগাভাগির খেলায় মত্ত থাকতে থাকতেই এল সেই দিন ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট। ভারত ভেঙে টুকরো হল। নেপাল ভুটান ইংরেজ শাসনের আওতায় আসেনি বলেই তাদের সীমা অবিকৃত থাকল। শুরু হল এক সীমাহীন অনাচার, অত্যাচারের দিনলিপি। সব হারিয়ে, সযত্নে সাজানো ঘরবাড়ি জমি জায়গাত পিছনে ফেলে কাতারে কাতারে মানুষ এক দেশের বেড়া টপকে শুধু একটু মাথা গোঁজার আশ্রয়ের সন্ধানে চলে আস্তে লাগল। নিরন্ন, নির্বসন, গৃহহীন মানুষগুলোর বুকে তখনো পদ্মার ঢেউ ছলাত ছলাত শব্দ করে চলেছে। চোখে ভাসে সন্ধ্যে বেলায় তুলসীতলায় জ্বালানো প্রদীপের আলো।

এতেই শেষ নয়। দিল্লী, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, কাশ্মীর, গুজরাত, রাজস্থান সবজায়গাতেই তখন শরণার্থীদের ভিড় উপচে পরছে। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সমস্ত জেলা, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় আছড়ে পড়েছে সেই সবহারানো জনসমুদ্র। ধীরে ধীরে সেই অবস্থা কাটতে শুরু করল, কিন্তু আবারো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ লাগল ১৯৭১ সালে। অজুহাত সেই একই। ধর্মের নামে হানাহানি তখনো ছিল, যা আজও আমরা প্রতিনিয়ত দেখে যাই আমাদের দেশে, বিদেশে, নানা জায়গায়।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ, গভীর রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশের ওপরে। ঢাকা শহরে ও অন্যান জায়গায় হিন্দু মুসলমানদের এবং পূর্ববঙ্গে তখনো থাকা হিন্দুদের ওপরে তুমুল জঘন্য অত্যাচার শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সদ্য রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে। প্রথমত নিজেদের সামান্য সম্বল নিয়ে লড়াই শুরু করলেও, ভারতের কাছ থেকে সাহায্য পেতে থাকে গেরিলা বাহিনী। একসময় পাকিস্তানী বাহিনী ঢাকা শহর দখল করে নিলেও ক্রমশ তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল। গৃহযুদ্ধের ফলাফল এভাবে বিরুদ্ধে যাবে তা ভাবতে না পেরে, এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিমান হানা শুরু করে দেয় ডিসেম্বর মাসে।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর, গভীর রাতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সুসজ্জিত ভারতীয় বাহিনী এই অপেক্ষাতেই ছিল। সর্বশক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভারতীয় বাহিনী চারদিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আক্রমণ করে, পূর্বে ত্রিপুরা থেকে সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, উত্তরে কোচবিহার দিনাজপুর ইত্যাদি সীমান্ত থেকে দিনাজপুর, রংপুরের দিকে, পশ্চিম দিক থেকে বাহিনী যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর অভিমুখে আর আরেকটি বাহিনী মেঘালয় হয়ে ময়মনসিং ও জামালপুর অভিমুখে রওনা দেয়। এত দ্রুত ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের সাকরেদ বাংলাদেশী রাজাকারদের পরাস্ত করে যে তা কল্পনাতীত ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, নব্বুই হাজারের বেশি সৈন্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কম্যান্ডার ইন চীফ নিয়াজী ভারতের কাছে আত্ম সমর্পন করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া যে মানুষের মনকে আটকাতে পারেনা, তা আজো দুদেশের সাহিত্য, আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে বারবার সামনে চলে আসে। অন্যদিকে পাকিস্তান সারা পৃথিবীতে আতংকবাদীদের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এরই মধ্যে। ব্রিটিশদের দখলে থাকা বার্মা স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন হয়েছে সিলোন বা বর্তমান শ্রীলঙ্কা। স্বাধীন হয়েছে মালদ্বীপ। কিন্তু এত কিছুর পরও কাঁটাতারের বেড়া মানুষের মনকে বেঁধে রাখতে পারেনি।

রাজনীতিবিদরা আসে, চলে যায়, যে যার নিজের আখের গুছিয়ে নেয়, সেই খেলা আজো চলেছে। পারলে আজো দেশটাকে আরো কয়েকটা ভাগে ভাগ করে দেয় তারা, দিয়েছেও। রাজ্যের সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। দেশভাগ নামক কদর্য শব্দটা, আজো সেই আতঙ্কের বাতাবরণ সৃষ্ঠি করে। সকলের মধ্যে না হলেও অন্তত কিছু মানুষের মনে যারা সেদিনগুলো দেখেছিলেন। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই একই অনুভূতি ছুঁয়ে যায় মানুষকে। আজো দেশভাগের নামে ক্ষমতালোভীদের পাশা খেলা চলছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ভুগছে, মরছে সাধারণ মানুষ।

আমরা সাধারণ মানুষরা শুধু প্রার্থনা করতে পারি যেন আর কোন দেশ এভাবে ভাগ না হয়। যেন মানুষকে নিয়ে রাজনৈতিক খেলা আর কেউ না খেলে। যেন কোন মায়ের কোল, স্ত্রীর স্বামী, শিশুদের বাবা মা যেন প্রাণ না হারায়।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়




#ইচ্ছের_বই      



‘বই’ শব্দটা কানে গেলে চোখে ভেসে ওঠে, সামনে বন্ধুর নানা রঙের পাথরে ঢাকা এক উপত্যকা, ওপরে তুষারাবৃত মানা পর্বত, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে নর-নারায়ণ, ত্রিশূল, নীলকণ্ঠ, আরো অন্য কত শৃঙ্গ। এক ছোট্ট গুহার ভেতরে, নাভি অবধি নেমে আসা সাদা ধবধবে দাড়ি নড়ছে এক সুদর্শন শান্ত, সৌম্য চেহারার বৃদ্ধের। তার অনতিদূরে ভূর্জ্যপত্রের ওপরে দ্রুত হাতে লিখছেন একজন। একি, মানুষের শরীরে হাতির মাথা কেন? তার হাতে কলমের বদলে এটা কি? এযে ওনারই ভাঙ্গা দাঁতের একটা অংশ। সেটাকেই মসীপাত্রে ডুবিয়ে লিখে যাচ্ছেন একমনে। রচনা হচ্ছে মহাভারত।

কে আগে কোনটা লিখেছিলেন কে জানে, কিন্তু গুটেনবার্গ ১৪৫৪ সালে ছাপা বই বের করার আগে সম্ভবত প্রাচীনতম বই ছিল ঋগ্বেদ। আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার বছর আগে শ্রুতি হিসেবে পরিচিত বেদকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল ভারতবর্ষে। ভুর্জপত্র বা ভুজপাতা আসলে ভুজগাছের পাতলা ছাল। এই ছাল একবার ছাড়িয়ে নিলে আবারো গজিয়ে যায়। ভুজ একধরনের বার্চ, মূল বাসস্থান বলা ভুল হবে কিন্তু এই ধরণের গাছ উত্তর অ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। পেপার বার্চ-ই খুব সম্ভবত আমাদের ভুর্জপত্র। উচ্চতায় আশি ফুট মতো হয় এই গাছ তাই লেখার কাগজের অভাব হয়না।

ছিলাম বইয়ে চলে গেলাম গাছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে লেখা মহাভারতের সেই পান্ডুলিপি, কথক ও লেখকের মতো কালের গর্ভে চলে গ্যাছে। হয়তো বিজ্ঞান আরো উন্নত হবে। একদিন, আজ থেকে কয়েকশো বছর পরে সেই পান্ডুলিপি কোন ভূমিকম্প, সুনামীর মতো কিছুর পরে আবিষ্কৃত হবে। কিন্তু হাতের কাছে পুরোনো আর কিছু আছে যা দেখা যায়। প্যাপিরাসের ওপরে লেখা, পার্চমেন্টের ওপরে লেখা সবচেয়ে পুরোনো পুঁথি বোধহয় ডেড সী স্ক্রোল, যা এখনো সঠিক ভাবে পাঠদ্ধার হয়ে ওঠে নি।

এছাড়াও ইতালীর ইট্রাস্কান হারানো সভ্যতার আমলে লেখা খাঁটি সোনার পাতলা পাতের ওপরে লেখা বইটি যা আড়াই হাজার বছরের চেয়েও বেশি পুরনো, নিঃসন্দেহে প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকার এক দাবীদার। এরকম আরো অনেক বইই আছে তালিকায় কিন্তু আলোচ্য বিষয় সেটা নয়। এত খেটে গাছের ছালে, সোনায়, পশুচর্মে, পাথরে, পূড়া মাটির ফলকে যারা তাদের সময়কার কথা লিখে গেছেন, তাদের কৃতিত্ব গুটেনবার্গের চে একটুও কম নয়। একেকটা সভ্যতা, সংস্কৃতি, শাসনকালের ইতিহাস এইসব বইয়েরা বহন করে আসছে আজো।

একটা সময় ছিল, অনুষ্ঠান বাড়িতে বই ছাড়া অন্য কিছুর উপহার তেমন ভালো চলত না। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে এমন এক রত্নভান্ডারের সন্ধান পেয়েছিলাম আমার নিজের বাড়িতেই। পাতলা প্লাইউডের তৈরি বড় বড় বাক্সে চাপাতা রপ্তানী হতো সেযুগে। ষাট সত্তর কেজি চাপাতা ধরত একেকটায়। এমন চারটি বাক্স বোঝাই বই, নানা ধরণের পত্রিকার সন্ধান পেয়ে নিজেকে আলাদীনের চেয়েও বড়লোক ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম তখন। পড়ে পড়ে সব যখন শেষ করে এনেছি প্রায় সেসময়, সেগুলির সদ্গতি করা হল। পুরোনো বই, কাগজ ওয়ালার কাছে বিক্রি করার সময় দেখা গেল মোট দেড়শো কেজি ওজন হয়েছে।

আমার বাবা মা বইয়ের ব্যাপারে কখনো বিরক্ত হতেন না। খুব ছোটবেলাতেই, শুরু থেকে হাতে পেয়েছিলাম ইন্দ্রজাল কমিক্সের অরন্যদেব, ম্যানড্রেক, ফ্ল্যাশ গর্ডনকে। তারপর এল কিশোরভারতি, শুকতারা ইত্যাদি পত্রিকা। ভাসতে লাগলাম কল্পনার জগতে। কখনো ডেনকালীর ঘন জঙ্গলে, জানাডুর আশেপাশে, মহাশূণ্যে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে, জুরা কুচাক জয়নাবের সাথে তুষারাবৃত পামীরে, বাসমাচী ডাকাতদের পিছে কাশগড় থেকে তাকলামাকান মরুভূমি হয়ে কিরঘিজস্থান, উজবেকিস্থানের দুর্গম পথে। স্কুলের পড়াশুনার সাথে সাথে চলতে লাগল বইয়ের জগতের সাথে সহবাস। ধীরে ধীরে হাতের কাছে পাওয়া বাংলার সংগ্রহ শেষ করে বিদেশি ভাষার অমোঘ টান টেনে নিয়ে গেল দূর থেকে দূরান্তরে।

পল বাউমার, কাটজেনেস্কী, জাদেন, ক্রপদের সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে বারুদের ঘ্রাণ নিলাম নাকে, ওয়াং-লাং, ওলানদের সাথে চীনের পথে ঘুরে দেখলাম দারিদ্রের সাথে অসম লড়াই, নাকে পৌঁছল অ্যাঙ্গোলা, ভিয়েতনাম, কোরিয়ার মানুষদের রক্তের লোনা গন্ধ। শরীর জুড়ালো কিলিমাঞ্জারোর ঠাণ্ডা হাওয়ায়। হান্টারের সাথে আফ্রিকার ঘন অরণ্যে শিকারের সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি। অ্যামেরিকার কাউবয়দের সাথে ঘোড়ায় চেপে কেটেছে রাতের পর রাত, অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে রেড ইন্ডিয়ানরা, সোনার খোঁজে মরুভূমিতে প্রাণান্তকর পরিস্থিতি কতবার এসেছে সামনে। আলাস্কায় টানা তিন মাস বরফের মধ্যে আটকে থাকা, ক্যাপ্টেন নিমোর জাহাজে পাড়ি দিয়েছি সাতসমুদ্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চোখের সামনে মরতে দেখেছি লাখো ইহুদিকে, আইফেল টাওয়ারের নীচে জমতে দেখেছি বিস্ফোরকের স্তুপ। দেখেছি মাথা উঁচু করে সেবাস্তিপোলের লড়াই। লাল ফৌজের বার্লিন দখল।

দেখেছি সবার চোখে ধুলো দিয়ে হিটলার আর ইভা ব্রাউনের আর্জেন্টিনা পালানো। তৃতীয় রাইখ গড়ে তোলার দানবিক চেষ্টা। দেখেছি মুহুর্তে শেষ হয়ে যাওয়া দুটো শহর। দেখেছি দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে বাঁচানোর প্রাণান্তকর লড়াই। দেখেছি বহুরূপী ফড়েদের করে খাওয়ার বিকৃত লালসা, আজো দেখে যাচ্ছি, মানুষে মানুষে লড়াই বাঁধিয়ে, ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে কিভাবে শুষে খাচ্ছে একদল হিংস্র মানুষ (জানোয়ার বললাম না, কারণ তারা অনেক বেশি মানবিক)।

এই ভ্রমণ, আমার মানসভ্রমণ সম্ভব হয়েছে নামী, অনামী লেখকদের কলমের সাথে কাগজের প্রেমের থেকেই। আমার সন্তানকে ছোট থেকেই বলেছি এসব গল্প, ধরিয়ে দিয়েছি বই, আজ আমার সার্থকতা এখানেই যে আমার সন্তান ভাবছে তার সন্তানকে বইয়ের জগতের সাথেই জুড়ে দেবে ছোটবেলা থেকেই। আমার মনে হয় একজন পিতার, একজন মাতার জীবনে এর চেয়ে বড় সুখের সময় আর আসতেই পারেনা।

কাগজের সাম্রাজ্য ছেড়ে আজ বই নিজের চেহারা পাল্টেছে, আধুনিকতার মোড়কে মুড়েছে নিজেকে, পরিবর্তিত হয়েছে মাধ্যম। হয়তো ভালোর জন্যই। ভবিষ্যৎ এর উত্তর দিতে পারবে। নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছে সেই মাধ্যমে। কিন্তু স্বপ্নগুলো দেখেছি আজো একই ভাবে চলে আসে চোখের সামনে। ঘুমের ঘোরে ঘুরে বেড়ায় পরিচিত বই, পরিচিত চরিত্রেরা। আরেকটা ভোর আসে, নিজেকে তৈরি করি আমার লেখক লেখিকা বন্ধুদের লেখায় ডুবিয়ে দেবার জন্য। সার্থকতা হয়তো একেই বলে। জীবনের সায়াহ্নে এসে একটাই কামনা মনে জেগে থাকে। শেষবার চোখমেলে পৃথিবীটাকে দেখার সময় একটা খোলা বইই থাকে যেন চোখের সামনে আমার।