চিঠি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চিঠি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সৌমী আচার্য্য

                   


শরৎ অনুসঙ্গ


সুজনেষু,

আকাশে কালো মেঘ কেটে শরতের সাদা মেঘের আহ্বান স্পষ্ট দেখা দিয়েছে।বেগে বয়ে যাওয়া জলধারার পাশে উঁকি দিতে শুরু করেছে কাশেরা।এখন রোজই এক সাজি ভর্তি শিউলি ফুল বাগানের বড় গাছটার নীচ থেকে তুলে আনে রূপকথা।আমি লাল শানের ছাদ বিহীন গোল বারান্দায় বসে বিদ‍্যাপতি পড়ি আর ও ফুলের মালা গাঁথে।মাঝেমাঝে কৌতূহল নিয়ে আমার দিকে তাকায়।আমি কালো অক্ষরে গভীর মনোযোগ দিয়েও বুঝতে পারি।নাটমন্দিরে দোমাটি চাপাচ্ছে সতীনাথ পাল।এ বছরের পর ও বোধহয় আর ঠাকুর গড়বে না।হাত কাঁপে চোখেও কম দেখে।এবারেও মাতৃমূর্তি গড়ার আগে আপনার কথা আমায় জিজ্ঞাসা করেছে।

-দিদিমণি,পোফেসার বাবু এবার কি আসবে?বোধনের সময় কেমন মন্তর বলতো।আহা ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।মনে হল মা দুগ্গা দুহাত বাড়িয়ে তার থেকে অস্তর নিচ্ছে।

সত‍্যি আপনার সংস্কৃত উচ্চারণ স্পষ্ট নিঁখুত।পারলে সস্ত্রীক আসুন এবার।আপনার জন‍্য দোতলার ঝুল বারান্দাওয়ালা ঘরটা রাখা আছে।আপনার ব‍্যবহারের বহু জিনিস রয়ে গেছে।নাহ্,ওখানে কাওকে থাকতে দেওয়া হয়নি এখনো।মাঝেমাঝে যাই অতীতের মাঝে গিয়ে দাঁড়াই।আপনার বেশ কয়েকটা বই রয়ে গেছে।আমি পড়ি কখনো কখনো।মনে হয় হয়তো এখানেই আঙুল রেখেছিলেন,ছুঁয়ে যাই।পড়তে পড়তে আপনি উদাস হয়ে বারান্দায় তাকিয়ে থাকতেন আমি পিছন থেকে দেখতে পেতাম।খুব ইচ্ছে করতো জানতে চাইবো কি ভাবছেন?রাত জেগে থিসিস লিখতেন আমি টের পেতাম।টুপটুপ করে শিউলি ঝরে পড়তো,শিশির নামতো বাসন্তী বৃন্তে আর আমিও ঘুমিয়ে যেতাম।

আমাদের বাড়ির কলমিপিসি আপনার ঘরখানা মুছে দেয়।আমি তালা খুলে ঝুল বারান্দায় দাঁড়াই।কলমিপিসি একাই বকবক করে।

-পণ্ডিতের খবর পাওনা কোনো?দিনের পর দিন এই ঘর বন্ধ রেখে লাব কি বুঝিনা বাপু।সে তো শুনি বিয়ে করে সংসার ধম্ম করছে।তা তোমার চুল আর কতটা সাদা হলে তুমি বিয়ে করবে?তোমার মা যে কেঁদে কেঁদে অসুখ বাধিয়ে নিল।বুড়ো বাপটার কথাও কি ভাববে না?

গেল মাসে সেই যে চুলে তেল দিতে গিয়ে কয়েকটি রূপোলি তার পেল,সেই থেকে ওর মাথাটাই গেছে।কি করে বোঝাই বলুন তো আপনি বিয়ে করলেই আমার সমস‍্যার সমাধান হয়না।এই একটি বিষয় নিয়ে আমি মা বাবার বিপক্ষে আজো দাঁড়িয়ে আছি।বাবা আজকাল আমার সাথে ভাববাচ‍্যে কথা বলেন।তার মতো নরম মানুষের পক্ষে এই যথেষ্ট রাগ প্রকাশ।তবে আমি মনে মনে হাসি।এটুকু রাগ না করলেই বরং কষ্ট পেতাম।হাজার হোক আমি তার একমাত্র মেয়ে।

এই দেখুন আমার পড়াটড়া সব শিকেয় উঠলো আজ।অতীতের ভেতর থেকে কত দৃশ‍্য যে চুপিচুপি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায় কি আর বলি!প্রথম এলেন আমাদের নাটমন্দিরের সামনে সেদিন অষ্টমী।আপনার পাকা গমের মতো রঙ ধূপের অস্বচ্ছতাতেও স্পষ্ট।চৌকো গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা আর মুখ চাপা হাসি।কী বুদ্ধীদীপ্ত চাহনি।আমি তখন অঞ্জলীর ফুলের বাটা হাতে শাড়ি সামলাতে ব‍্যস্ত।হাত বাড়িয়ে বললেন,"আমায় দেবেন?"আমি কিন্তু তখনি উজার করে দিয়েছিলাম।সবটুকু।নিঃস্ব হয়েছিলাম সে মুহূর্তে।পুজো শেষে বড়োরা ভোগের থালা বাড়ির ভেতরে নিচ্ছে আর আমি কলমিপিসির সাথে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা ফুল কুড়িয়ে বেড়াচ্ছি।বাবা এসে বললেন,"এসব ছেড়ে এনাকে দোতলার ঝুল বারান্দাওয়ালা ঘরটি দেখতে নিয়ে যাওয়া হোক"আপনি বোধহয় হাসছেন তাইনা?আসলে সেদিনো ভাববাচ‍্যের দিন ছিলো।আমি যে উপোস করেছি প্রথমবার।বাবার মোটেই পছন্দ নয় মেয়ে উপোস করুক।আমি কিন্তু উপোসের ফল পেয়েছিলাম সেদিনই।অভিলাষ দাদু আপনার থাকার কথা বলেছিলেন বাবাকে।আমাদের শহরে কলেজে পড়াতেন এসেছেন একথা শুনে বাবা এক কথায় রাজি হয়েছিলেন।

মনে হয় এই তো সেদিনের কথা।দশমীর দিন মায়ের বিসর্জন সেরে এসে দেখলাম ফাঁকা মণ্ডবে সাদা ধুতি পরে বসে আছেন।মাটিতে দুটো বড় ব‍্যাগ।বুঝলাম এসেছেন আমাদের বাড়ি।আমি তখন সদ‍্য কলেজে উঠেছি।প্রত‍্যকদিন সকালে আপনার কন্ঠে পাঠ শুনে ঘুম ভাঙতো।নিজের মনে ডুব দিয়ে পাঠ করে যেতেন সারা বাড়ি যেন হাতজোড় করে বসতো আপনার কাছে।যাওয়া আসার পথে সিঁড়ির বাঁকে,খাবারের টেবিলে সর্বত্র দৃষ্টি বিনিময় হতে লাগলো।আমার বুকের ভেতরের যন্ত্রটা এত জোরে আওয়াজ করতো মনে হতো সবাই শুনছে ওর আনন্দ উল্লাস।বছর ঘুরতেই প্রথম শরৎ শিউলি কচুপাতায় করে এনে এক ভোরে দিলেন আমায়।

-ইন্দুলেখা তোমার প্রথম শারদ উপহার আমি দিলাম মনে রেখো।

মনে রেখেছি।রূপকথা এবারেও প্রথম শিউলি আমায় কচু পাতায় করে এনে দিয়েছে।ওর চোখের ভাষায় বুঝেছি আপনার কথা মনে পড়ছে ওর।সপ্তমীর দিন সকালে স্নান সেরে নীল ঢাকাই পরে আপনার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় আপনি এসে দরজায় দাঁড়ালেন।বলে বোঝাতে পারবো না কি ভীষণ সুন্দর লাগছিলো আপনাকে বাদামী পাঞ্জাবী, সাদা পাজামায়।চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন কেন কে জানে?রূপকথা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী।ওকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলনা।ঠিক বুঝে গেল কেন আমি এত আনমনা হয়ে রয়েছি।কতটুকু বয়স অথচ কি ভীষণ বুদ্ধিমতী।আপনি বাড়ি গিয়েছেন।মাকে বলে গেছেন কালীপুজোর পর ফিরবেন।আমার কেবল অস্হির অস্হির লাগে।খেয়ে,স্নান করে,ঘুমিয়ে কিছুতেই স্বস্তি পাইনা।অকারণে চোখে জল আসে।রূপকথা কোমড়ে হাত দিয়ে বেশ রাগ রাগ গলায় বললো,"আমি কিন্তু মাকে এবার সব বলবো দিদি,তুমি এভাবে চললে আবার যদি অসুখটা বাড়ে তখন!তখন কি হবে?পণ্ডিতবাবু তোমায় দেখতে আসবে তো?"

অসুখ!হ‍্যাঁ আমার গভীর অসুখ।মাথার ভেতর সব তার ঠিকঠাক জোড়া নেই,মাঝেমাঝেই সব বিদ্রোহ করে ওঠে আর আমি তখন গোঁগোঁ করে আওয়াজ করি,হাত পা বেঁকে যায় দিন তিনেক কাওকে চিনতে পারিনা,কিছু বুঝতে পারিনা।ডাক্তার বলেছিলো মেন্টাল স্ট্রেস যেন কখনো না হয়।আপনাকে বোধহয় বাবা দুঃখ করে সব বলেছিলেন।সব।কিন্তু বাবা এটা বলেননি বাকি সময় আমি এক স্বাভাবিক নারী।ভীষণ স্বাভাবিক।আমার ভালোবাসতে ইচ্ছা করে,ভালোবাসা পেতে মন চায়।বিশেষ ভালোবাসা যা আমার বন্ধুরা এ বয়েসে ভরপুর পাচ্ছে ঠিক তেমন।রূপকথা কাওকে কিছু বলেনি।আমিও নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করেছি।পারিনি।আপনি ফিরলেন।ব‍্যস্ততা বাড়লো আপনার।পড়াশোনা বাড়লো।তবু রোজ সন্ধ‍্যারতির সময় ঠিক নাটমন্দিরে আসতেন।

আমি জানতাম ঈশ্বর ভক্তি,আধ‍্যাত্ম চেতনা এসবের ঊর্ধ্বে আপনার সবচেয়ে প্রিয় এই আবহ।তাই যখন আপনার ঘরে ধূপ রেখে যেত নকুলকাকা আপনি ঐ ধোঁয়ার ভেতর স্হির হয়ে বসে থাকতেন।আমাকে কতবার বলেছেন,"জানো ইন্দুলেখা,শরৎ আমার বড় পছন্দ।কবিরা প্রেম বলতে বর্ষা আর বসন্তকে যত গুরুত্ব দিয়েছেন ততটা শরৎকে দেননি।শরৎকালের মতো এত আনন্দ এত শিহরণ আমি কখনো অনুভব করি না।"

-বেশ তো আপনি লিখুন তেমন এক প্রেমের কাব‍্য।

-কি করে লিখি প্রেম যে কিছুতেই ধরা দেয়না আমায়।

আপনার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে তাকিয়েছিলাম।আমি তো সর্বস্ব উজার করে দিয়ে রেখেছি।সে কি আপনি দেখতেই পাননা?ঠোঁট কেঁপেছে,চোখে জল এসেছে ছুটে বেরিয়ে গেছি।দেখতে দেখতে বর্ষা নেমেছে বাড়ি জুড়ে।বৃষ্টিতে ভিজে ঝুপুস হয়ে ফিরলেন।একগোছা চুল কপালের উপর আদরে লেপ্টে ছিল।গরম চা আর মেঘদূত।দূরে থাকা কোনো নারীর বিরহে কেঁপে উঠছেন ভেতর থেকে,আপনার দুহাতের আঙুল বাতাসের শূন‍্যতাকে আঁকড়ে ধরছে।পারলাম না সংযত হতে।বাইরে প্রবল বৃষ্টি,ভেতরেও।আপনার হাতে হাত রাখলাম আলগোছে।হাত ধরলেন না আমার কেবল স্পর্শ টুকু নিলেন।সেদিনের পর আমায় এড়িয়ে যেতে লাগলেন ভীষণ ভাবে।আমিও দূরে রয়ে গেলাম।

শনিবার করে সন্ধ‍্যায় বাগানে বসে আমরা সারা সপ্তাহে কে কোন গল্পের বই পড়েছি তাই নিয়ে আলোচনা করতাম কিন্তু আপনি প্রতি শনিবার বাড়ি যাওয়া শুরু করলেন।রবিবারের জলখাবার থেকে মাছের কচুরি বাদ পড়তে লাগলো।এবার আর প্রথম শারদ উপহার আপনি দিলেন না।ষষ্ঠীর দিন অস্ত্রদানের মন্ত্র উচ্চারণ করছেন গমগম করছে আমাদের বাড়ি।মনে মনে ভেবেছি এবার জিজ্ঞাসা করবোই ঐ উদাস চোখের গভীর আমাকে দেখার সময় যে কথাগুলো জন্মাতো সেগুলো কি?আমি আপনার কে?এবার পুজোয় সাহসী হবো।এদিকে গভীর রাতে দরজায় টোকা পড়লো।মেঝেতে তোশক পেতে রূপকথা ঘুমাচ্ছে।

-ইন্দুলেখা আমি,একবার বাইরে এসো।

আপনি এসেছেন?এতদিন পর!আমি দরজা খুলে বাইরে এলাম।বাইরে আকাশে ফিকে রঙ।দুজন দুদিকে দাঁড়িয়ে আছি।অনন্ত সময় বয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝে।

-আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ইন্দু।তোমাকে আমি কখনো কোনো ভুল বার্তা দিইনি তবু কেন তুমি আমায় নিয়ে ভাবলে জানিনা।একটা অদ্ভুত বিষন্নতা আমায় ঘিরে থাকে আজকাল।আমি তো কেবল,কেবল...

-দয়া করেছেন তাইনা?

-না দয়া নয় একি বলছো।

-আপনি আর কিছু বলবেন?

-জানিনা তুমি কি ভাবছো তবে আমার মনে হলো তোমাকেই প্রথম বলি,আমি চলে যাচ্ছি।উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে যোগদান করছি।

-বাহ্ জোড়া অভিনন্দন আপনাকে।

আপনি আরো কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু ততক্ষণে আমার মাথার ভেতর আলোর ভেলকি শুরু হয়ে গেছে।ছবির মতো সরে সরে যাচ্ছে বিচিত্র সব রেখা।রূপকথার কাছে শুনেছি আমার প্রবল কাঁপতে থাকা শরীর দুহাতে নিয়ে আপনি চিৎকার করছিলেন।ছুটে এসেছিল সারা বাড়ির লোকজন।চারদিন পর আমি যখন স্বাভাবিক হলাম মা বিসর্জনে চলে গেছেন।নাটমন্দির শূন‍্য,শূন‍্য আপনার ঘর।চলে গেছেন আবার ফিরবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে।আর ফেরেন নি।হয়তো কোনো আশঙ্কা থেকেই ফেরেন নি।

আপনার বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়ে বাবা যখন মাকে বলছিলেন ,"সুস্থ স্বাভাবিক একটি মেয়েকে বিয়ে করে সুখি হতে চাওয়াটা কি খুব অন‍্যায় অরু?তুমি অকারণ মন খারাপ করছো।আমাদের মেয়েকে বিয়ে করে যেচে বোঝা বাড়াবে কেন?তাছাড়া ভেবে দেখো মেয়ের কোনো সর্বনাশ তো করেনি।ভদ্রতার সাথে দূরত্ব বজায় রেখেছে।সুযোগ তো কিছু কম পায়নি।" আমি শুনলাম।মনে মনে খুব হাসলাম।তাইতো কেন যে ভুলে গিয়েছিলাম আমি স্বাভাবিক নই।আর এও তো সত‍্যি আমার কোনো সর্বনাশ আপনি করেন নি।একটা মেয়ের শরীর ছোঁওয়াটাই বড় সর্বনাশ তা আপনি করেন নি।


ভাববেন না কোনো অভিযোগ জানাতে লিখতে বসেছি।দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর পেরিয়ে গেলো।এবার একবার আসুন।ঘুরে যান।নাটমন্দির,এই শিউলি বিছানো বাগান,আপনার ঘর দীর্ঘকাল অপেক্ষা করছে।একবার আসুন।এখন তো আপনি বিবাহিত কেউ জোর করে আমার বোঝা আপনার উপর চাপাবে না।আসুন একবার।মণ্ডবে মায়ের সামনে মন্ত্রোচারণ করুন শুনি।এখানে কেউ আপনাকে ভোলেনি।সবাই শরৎ এলেই আপনার জন‍্য অস্হির হয়ে ওঠে।আসবেন?

                                ইতি
                                 ইন্দুলেখা

চিত্রঋণ- পারমিতা মন্ডল

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

দেবযানী বিশ্বাস


পূজানীয়া
 মা
তোমার চোখে জল কেন, মা? বাবা বকেছে? দাদু তেড়ে এসেছে খড়ম তুলে? তুমি আজ পেরেছ পালাতে? তোমার পায়ে জড়িয়ে যায় নি তো শাড়ির পাড়? গিঁট বেঁধেছ মনে করে? 

মা, আজ শুয়ে শুয়ে কেবল তোমার কান্নার প্রায় নি:শব্দ বুক চেরা আওয়াজ পাচ্ছি কেন? আমার যে খুব বুকে ব্যথা করছে। গা টা আজ খুব গরম আমার। চোখের গরম জল গড়াচ্ছে, তুমি একটু হাত বুলাবে কপালে?  

দেখেছ মা, আমি কত্তখানি স্বার্থপর!  তোমার কান্না মোছাতে পারলাম না বাইশ বছরেও, অথচ নিজের তিন বছরের প্রতিটা কান্নায় তোমাকে খুঁজি। মা, প্রতাপ আমায় বড্ড বেশি ভালবাসে। অমন ভালবাসা যে আমি চাই নি গো। আমাকে বাইরের কারো সাথে কথা বলতে দেয় না, বলে, ওরা তোকে বিগড়ে দেবে, তুই নষ্ট হয়ে যাবি। আমার রান্না করা শিষ পালং এর ঝোল পাপিয়াকে লুকিয়ে খেতে দিয়েছিলাম বলে হাতে গরম সাড়াশির ছ্যাঁকা দিয়ে দিল। 

মা, জান, আমি এখানে ভাইদাদার সাথে লুকিয়ে বন্ধুত্ব করেছি। ওই চিলেকোঠার ঘরে পূবের জানালার দিকে তাকিয়ে এক মনে বসে থাকে আর কি যেন আঁকে। আমি জামাকাপড় মেলতে উঠলে জানালায় এসে  আমার দিকে তাকিয়ে হাসে, হাত নাড়িয়ে ডাকে। কিন্তু ও ঘরের শিকলি যে আমার খোলা বারণ! আমি জানালার শিক ধরে দাঁড়ালে ভাইদাদা হেসে বলে, এই পাগলখানা থেকে আমায় বার করে নিয়ে যাবি? ওই দূরের মাঠে ছুটবি আমার সাথে? পালাবি ওই রামধনু রঙা দিগন্তে, দুই ভাই বোনে? 

মা, ভাইদাদা তো পাগল নয়। ও কি সুন্দর ছবি আঁকে। কখনো এক খানা জল ভরা চোখ, কখনো হাতটা উঁচু করে হাওয়ায় আঁচল মেলে এক মেয়ে, কখনো লম্বা বিনুনীতে ফিতে বাঁধে কেউ। জান, ও বাড়ির পাপিয়া বলেছে ওই ছবির মেয়েটা নাকি ভাইদাদার ভালবাসা করে বিয়ে করা  বউ ছিল, অল্পদিন বাদেই ওকে নাকি মেরেছিল ওরা- সেই থেকে, সেই থেকে ভাইদাদা পাগল হয়ে গেছে। 

মা, ওরা কি আমাকেও? ছি ছি! কি সব যে বলছি তোমায়। ভয় পেও না, মা। আমি তো শিখে নিয়েছি তোমার থেকে, কেমন করে বেঁচে থাকতে হয়। মা, নিশীথ মামা আসে? এখনও শোনায় তোমাকে নতুন জীবনের গল্প? একদিন দাদু মারতে এলে অনেক খানি দূরে পালিয়ে যেও মা। আর তো আমি তোমার পিছুটান নই। চলে যেও সেই নদীর ধারে, যেখানে কলাপাতায় ছাওয়া ভালবাসার কুটীর, খোলা দাওয়া, মাথার উপর সন্ধ্যাতারা।


ইতি
দেবী

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মৌসুমী মৌ





#ডাকপিয়ন

মেঘ, 
 আমার কিছু ভাল্লাগছেনা| বেশ কিছুদিন পর আবার তোকে লিখতে বসলাম | জানিস সারা পৃথিবীর এই অদ্ভুত অসহায়ত্ব আমাকেও আস্তে আস্তে গ্রাস করছে| আমার ব্যালকনি ছোঁয়া দূরত্বে পল্লবী থাকে জুনিয়র ডাক্তার| একাই থাকে| মাঝে মাঝে বন্ধু বা প্রেমিক যাইহোক বাইকে করে পৌঁছে দিয়ে যায়| ও বাইক থেকে নামলে ছেলেটা হেলমেট খুলে প্রতিদিন ওর হাতে ঠোঁট ছোঁয়ায় আর পল্লবীর তখন সারা মুখ ভীষণ আলো আলো হয়ে যায়| তারপর পিছন ফিরে ছুটতে ছুটতে ফ্ল্যাটে ঢোকে| ওকে হাঁটতে দেখিনা সারাক্ষন দৌড়োচ্ছে|  খুব ব্রাইট চনমনে মিষ্টি মেয়ে| এখন তার আরও একটা পরিচয় ও প্রকৃত সমাজবন্ধু, সাহসী আর সংবেদনশীল| কিন্তু আজ শুনি সেও কয়ারেন্টাইনে| আর প্রকৃতিও দেখ কি অসম্ভব নিশ্চিন্তে আপন খেয়ালে বুঁদ হয়ে রয়েছে| ঠিক তোর মতো| শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্মম| যাকে শাস্তি দিচ্ছি সে মরল কি আধমরা হলো দেখার দরকার নেই | প্রকৃতি, মানুষ, স্বজন প্রয়োজনে সবাই নিষ্ঠুর| 

  যাক সে কথা| জানিস অমিত আমার পরিচিত| আমায় দিদি দিদি করে| চাকরি এখনো পায়নি| এদিকে বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে গত বছর| সেই থেকে হায়ার স্টাডি না করে কোচিং সেন্টারে পড়ায়| কিন্তু দুমাস তার কোনো ইনকাম নেই| কাল পাঁচ মিনিটের জন্য বাজার গেছিলাম দেখা হলো| তখন ওর মুখে সব কথা শুনে আমি বললাম, "আছিতো আমি"| অমিত বলে, দিদি তুমি কত দেবে| ওপরওয়ালা মুখ তুলে না চাইলে এই করোনা সুন্দরীর স্পর্শে সবার মরণ|  আমি যে ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে সান্ত্বনা দেব তার উপায় নেই| ভালোবাসার মানুষদের ছোঁয়াও বারণ| শুধু বলি সব ঠিক হয়ে যাবে | পৃথিবী আবার রোগমুক্ত হবে | সব থেকে মজার কথা কি জানিস যেই জিজ্ঞেস করলাম তোমার বান্ধবী আত্রেয়ীর কি খবর? মন কেমন করা হাসি হেসে বলে সব খবর জানতে নেই কষ্ট পাবে| আপাতত আমার এখন প্রথম চিন্তা কুড়ি তারিখে বাবার কেমোর ডেট| বাবাকে কি করে নিয়ে যাবো! তার সাথে টাকা পয়সার জোগাড়| আমি চুপ হয়ে যাই| ওর চিন্তা আমাকে খুব ভাবায়| এতো গুমোট চারপাশ দমবন্ধ লাগে|  এস.বি.আই এর এ.টি.এম এর সামনে এক মুখ দাড়ি, একমাথা উলুঝুলু চুল নিয়ে রোজকার মত আজও সেই পঁচিশ ছাব্বিশের পাগল ছেলেটা বিড় বিড় করে আকাশের সাথে গল্প করে যাচ্ছে| ও জানে এতো ভালো শ্রোতা এ তল্লাটে আর নেই| আমি একটা স্লাইস ব্রেড ওর হাতে দিয়ে চলে আসি |
তোকে কেন যে সব কথা বলি কে জানে! কোন সুদূরে তুই আর কোথায় আমি! আজ সন্ধেতে এখানে হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি হলো| এই প্রথম বৃষ্টির সে শব্দে তুই নেই| অনেক কিছুতেই এখন নেই জানি কিন্তু বৃষ্টি! তাতেও তুই নেই! এমন নির্মোহ বৃষ্টি অনেকদিন পর দেখলাম| অনেকদিন পর তার মাঝে তোকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা করলাম| যে নিজেই সমুদ্রের দিকে পা বাড়ায়, বৃষ্টি তাকে ভেজাবে এমন সাধ্য কোথায় ! জমা কথার পাহাড় ধ্বসিয়ে লাভ  কি বল | ভালো থাকিস... 
                                           রিমি












বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

রত্নদীপা দে ঘোষ

প্রিয় চোখ 


তখন আমাদের চলছিল খেলা। দুজনের দুটি খেলা। খেলার গলিতে দুটি পায়রা। বকবকমের দাবিদার আমরা দুজনেই। তুমি খেলতে খেলতে বাসছ ভাল । আমি বাসতে বাসতে খেলছি আলো । আকাশটা ছিনিয়ে নেবো , দেখবো কতদূর যারপরনাই তার পরিধি , দেখতে চাই ... আকাশের সাদা কণ্ঠের অরাউরি ... 

আলতোর তারাগুলি , আস্কারার চাঁদ, আমাদের কত যে মুস্কান দিয়েছে আর হাসির মালাই -রাবড়ি ... মঞ্জিলের হারমোনি... থৈ থৈ আমার রাতদিন ধুলোর লতা ... আমাদের সখের চাউনিরা ... লং ড্রাইভের অবিচল ... 

তুমি এখন আছ চোখ ? আমাকে বিসর্জনের পর কেমন আছ ? রাত বাড়লে এখনও অম্নি দূরবীন ? পাও কাছে চাকাহীন তারাদের ভ্রমণসঙ্গী ? ভ্রমসঙ্গী ও বটে ... হাঁটো এখনো নিজের ছায়ার সাথে ? আমার ছায়ার সাথে কথা কও ? খসে পড়া ঝিঁঝিঁদের শব্দ থেকে নিঃশ্বাস ? এখনো তেমনি ... তোপধ্বনির গর্ভ ফুঁড়ে পদ্মদীঘি হাত রাখে কপালে ? 

কেমন আছ চোখ ? পূর্ণকুম্ভে আছ কেমন ? রম্ভাবদলের প্রবল গদ্যকথায় ? লিপিচিত্র আছো , নারীপলির মাটিতে রগরগে বায়ুদূষণ ... আয়নার তন্বীদেহ ... কী চমৎকার ছোপ ছোপ নক্সা ... এমন নক্সাদার ধরিত্রী তুমি এর আগে আর দেখনিকো ... উত্তেজনার চিরুনী ক্রমশ ফালা ফালা ... মিহি সুতোর দাঁত ... এই কি প্রথম ? নাকি দ্বিতীয় ...।, অথবা চতুর্থ তোমার ফিরে-ঘুরে তাকানো ... 

চোখ , তোমার কি ভুল হয় না কোথাও ? জ্বলে পুড়ে ছাই ? 
এই কি তোমার প্রকৃত সাজ ? সাজের অপ্রাকৃত লম্ফ ?
কী ভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যাও সমস্ত চলে যাওয়ার দিকে ?
ফের কি করে আসো ফিরে কাছেআসা শ্রাবণের তীরে ? 

আমি জানি । চোখ তুমি , চোখেও তুমি । চোখেরও তুমি। তুমি এক স্বচ্ছতা । তোমার কোন সৌন্দর্যই পেশাদার নয় ... সামান্য বোহেমিয়ান ধাঁচের যে আঁচ তাই দিয়েই তৈরি তোমার পোশাক ... পাতা জড়ানো ফুটে ওঠা ইথার ... গতিতে অতীতে পূর্ণ তোমার পূর্ণতার গ্যালারি ... 

আজকাল আমিও আঁকি । তোমার আঁকাগুলিকে আমিও করি । ডালপালা , কখনো আহ্লাদী নদী ... একবার তোমার দেখাদেখি , এক কমলা রঙের তাকানোকে এঁকেছিলাম ... কী ডানপিটে তার দুষ্টুমি! দুষ্টুমির চূড়ান্ত নারসিসাস ... 
ছবির প্রান্তে অরোরা বরিয়ালিস ... বেসামাল পাতালের সামাল-সামাল জল ... 

আসলে কি জানো চোখ ... মন জয়ের ক্ষমতাই আসল সৌন্দর্য ... অন্তরালের রাজকীয় ঢাল ... তরবারির দৈত্যাকার ... এই যে তোমাকে দেখছি ... আর তুমিও আমাকে ... দুজনেই জেনে নিচ্ছি দুজনের জানাজানি ... এই যে খামখেয়ালির টুকরো টুকরো অংশগুলি বেঁচে উঠছে ... ভিজে তবকের পাহাড়ে চূড়ান্ত রূপোর বোদল্যার...সেই রেডিয়ামের রেওয়াজ আমাদের রূপো দিচ্ছে অঢেল , সোনাও ... আমিও দেখছি তোমার দেখাগুলিকে লিখছি কলমের কল্মিশাখায় ... তোমার না-দেখাগুলিকেও আচ্ছন্ন রাখছি ... যদি তুমি কখনো আমার না -দেখা গুলিকেও দ্যাখো ... আর লেখো আর সামান্য আঁকা দাও ... বেঁটে বেঁটে লম্বামনের নিখাদ সেতু করো , পরে নাও তোমার দূরত্বের চিত্রময়তা ... 

কেমন আছ ? চোখ ? 
আত্মহত্যার গ্লোরি থেকে সেরে উঠেছ ? 
কালো - নীলাভ ক্লান্তির সোডিয়াম থেকে ? 
আনাচে কানাচে কত যে কাঁচ পোকা ... কাঁচের প্রজাপতি 
ভালবেসেছ চোখ ? 
আবার ভালোবেসেছ ? 
ভালবাসতে গিয়ে ফের আবার ভাগাভাগি 
অনন্ত কদমের বকবকম 
খুঁটে খুঁটে খাচ্ছ ? যেভাবে আমার ? 
আমাকেও শালিখের চূর্ণী ? পরাশর নদীর ঢেউ 
কাঁপিয়ে আর হেসে উঠছ ... তুমি বড়ো আনাড়ি 
সঠিক তাপমাত্রায় কাছে আস্তে জানো না ... 

তুমি যে ঘেমে - নেয়ে একথালা স্নান হয়ে আছ যে চোখ 
আমি কাঁদছি আর তোমার ভারি কাঁধের ওপর 
নামিয়ে রাখছি কথা 

তুমি কথার বেদীতে স্থাপন করছো আমাকে 
আমার ভেতরে স্থাপন করছ পরমেশ্বর সচল স্থির 
আমার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে ব্রহ্মের চেতাবনি 
চেতাবনির ভেতরে জন্ম নিচ্ছে তড়িৎ চুম্বকের চুম্বন 
ব্যক্তিগত নয় , কেজো নয় অদৃশ্য এক দৃশ্যের আভরণ ...

আদরের ভেতরে জড়িয়ে নিচ্ছ আমাকে 
আমার ভেতর চারিয়ে যাচ্ছে কান্না 
তুমি বলছ , এখুনি নিভে যেও না 
জেনে রাখো 
কান্নাই শ্রেষ্ঠ তপোবন 
কান্নাই একমাত্র পদ্মাসন ... 

কেমন আছ চোখ ? 

তোমার সাথে কথা কইলে 
প্রতিটি হোমের আগুন যে 
এক পৃথিবী উপনিষদ ..

ইতি 
তোমার দৃষ্টি ...