তুষ্টি ভট্টাচার্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তুষ্টি ভট্টাচার্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                        





আমার শূন্যতা  


আমার শূন্যতার মাঝে এক গভীর হ্রদ আছে 

কখনও হ্রদের জল উছলিয়ে ওঠে, বানভাসি হয়  

কখনও হ্রদের দুধ উথলে উঠে পাত্রে পোড়ার দাগ ছেড়ে রেখে 

গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় যে যায়…

কখনও হ্রদের কোলা বুড়বুড়ি কেটে মিইয়ে যেতে চায় নিজের অন্তরে 


আমার শূন্যতার ভেতরে এক মাছ থাকে

ঘাই মারে আর ঘাই মারে গভীর অতলে 

বঁড়শির ঝুলে পড়া দেখতে দেখতে 

টোপের চারপাশে নিঃস্পৃহ মুখে সাঁতড়ে বেড়ায়   


আমার শূন্যতার এক দ্বীপ আছে 

রাত্রি গভীর হলে নোনা জলে ডুবে গিয়ে 

আচমকা ধুয়ে দেয় চোখের প্লবতা। 

শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                      






সাইকেল ( নবম পর্বের পর)


১০)

দিন যায় না জল যায়। দেখতে দেখতে দুমাস কেটে গেল সামুয়েলের এই গ্রামে। যেদিন থেকে বুলবুলকে গিটারে হাত দিতে দিয়েছে সামুয়েল, সেদিন থেকে সেই ছোট্ট রুবাইকেও দিয়েছে তার সাইকেলের চাবি। রুবাইও সাইকেল নিয়ে দিব্যি তরতর করে ঘুরে বেড়ায়। যতক্ষণ সাইকেলটাকে ও কাছে পায়, ততক্ষণ যেন ওকে ভূতে ভর করে। কোনোদিকে হুঁশ থাকে না ছেলেটার। অত বড় সাইকেল লেংচে লেংচে টেনে নিয়ে যায়। সাইকেলটাকে ধুয়ে, মুছে তকতকে করে রাখে। আর কাউকে হাত দিতে দেয় না। এদিকে লকডাউন খুলে যাওয়ার সময় হয়ে এলো প্রায়। আনন্দের সঙ্গে দিন গোণা ছাড়া আর সামুয়েলের কিছু করার ছিল না এই সময়ে। এতদিনে এই গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোর কাছে তো বটেই, বড়দের কাছেও সে ঘরের লোক হয়ে উঠেছে। সে এখন প্রায় শুদ্ধ অসমীয়া বলে। আর ছেলেমেয়েগুলোও স্প্যানিশ শিখে নিয়েছে কিছুটা। একটু বড় হয়েছে যারা, তারা কাজ চালানোর মতো স্প্যানিশ বলতে ও লিখতে শিখে নিয়েছে। আর বুলবুল এখন গোটা একটা গানই বাজাতে পারে গিটারে। স্প্যানিশ সুর পারে, নিজের ভাষার গানও পারে এই অল্প সময়ে। বুলবুলের দেখাদেখি আরও দুএকজন উৎসাহ দেখিয়েছিল গিটার শেখার জন্য। কিন্তু বুলবুল কাউকে গিটার ছুঁতে দেয়নি। ও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ফলে গিটারের মোনোপলি ওর একারই থেকে গেছে। তবুও এই প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর ভেতরে যে এত সুপ্ত প্রতিভা ছিল, সামুয়েল ভাবতে পারেনি আগে। অবশ্য ওদের উসকিয়ে না দিলে এতকিছু হত না ঠিকই। এই লকডাউনের দীর্ঘ দুমাস ওরা খেয়েঘুমিয়ে বাড়িতে কাটিয়ে দিত। লকডাউন উঠে যাবে, সেই আনন্দ যেমন রয়েছে, সামুয়েল চলে যাবে বলে এক্ষণ থেকেই চোরা বিষাদ ছেয়ে যাচ্ছে বাচ্চাগুলোর মনে। সেদিন আচমকাই সামুয়েলের ক্ষুদে রাজকুমারী কেঁদে উঠল। ‘সামুয়েলদাদা তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?’ স্কুলে শেষের হুটোপাটি স্তব্ধ হয়ে গেল আচমকা। সামুয়েল কোনো উত্তর দিতে পারল না। কীই বা বলত ও? যেতে তো হবেই ওকে। টিকিট কনফার্ম হয়ে গেলেই চলে যাবে। এই বিদেশে তো আর সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে না ও! নিজের দেশ, নিজের পরিবার ওকে টানছে ভীষণ ভাবে। কতদিন যে নিজের ঘরে ঘুমোয় না! মায়ের গলা জড়িয়ে গান করে না! বোনের সঙ্গে খুনসুটি করে না! অন্য দেশে অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা যায়? যতই এরা আপন করে নিক না কেন…এবার যাওয়ার সময় হয়েছে তার।

      দেখতে দেখতে সেই প্রতীক্ষিত দিন এসে গেল। দীর্ঘ আড়াই মাস পরে সামুয়েল আজ বাড়ি ফিরবে। চোখের জল আটকিয়ে রাখতে পারছে না ও কিছুতেই। একদিকে বিদায় বেদনা, অন্যদিকে আনন্দ অশ্রু—কে কাকে সামলাবে আজ? বুলবুল কোথায় যেন লুকিয়ে আছে। সামুয়েলের কাছে আসছে না আজ কিছুতেই। রুবাই, সেই ক্ষুদে রাজকন্যে সবাই কাঁদছে। অভিজিৎ আর তার মা তো ঘরের ছেলে বিদায় জানানোর দুঃখে কাতর। পুরো গ্রাম সামুয়েলকে বিদায় জানাতে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়েছে সামুয়েল অভিজিৎকে সঙ্গে নিয়ে। অনেকটা পথ যেতে হবে তাকে। গুয়াহাটি এই গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরের পথ। কিন্তু বুলবুলের কাছ থেকে বিদায় না নিলে সামুয়েল যায় কী করে? অগত্যা অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তাকে সেই স্কুলের আটচালায় আবিষ্কার করা গেল। দরজা বন্ধ করে ফুলে ফুলে কাঁদছে সেই কিশোরী। সামুয়েল ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল নিঃশব্দে। তারও বুক ফেটে যাচ্ছে। চোখের জল কষ্ট করে আটকে রেখেছে। সংযত না থাকলে বুলবুলকে সামলানো দায় হয়ে যাবে এখন। গিটারটা বুলবুলের কোলে নামিয়ে রাখল সামুয়েল। ফোলা ফোলা চোখ মুখ নিয়ে বুলবুল মুখ তুলে তাকালো ওর দিকে। সামুয়েল ওর মাথায় হাত রেখে বলতে শুরু করল, ‘আজ থেকে এই গিটার তোমার কাছে থাকবে। এই গিটার আর আমার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, তুমি ভালো করেই জান। ধরে নাও, আমিই গচ্ছিত রইলাম তোমার কাছে। এবার মন শক্ত করে হাসিমুখে আমাকে বিদায় জানাও। তোমার সামনে এক সুন্দর পৃথিবী রয়েছে। তোমাকে তার উপযুক্ত হতে হবে। এসো, চল এখন আমার সঙ্গে’। চোখ মুছে গিটার কাঁধে নিয়ে বুলবুল সামুয়েলকে বিদায় জানাতে উঠে এলো এবার। রাস্তায় রুবাইকে কাছে ডেকে সামুয়েল সাইকেলের চাবি ওর হাতে দিয়ে বলল, ‘আর এই সাইকেল দিয়ে গেলাম তোমাকে। আমি তোমাদের সঙ্গে রইলাম সারা জীবন। সবার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। এখন তো পৃথিবীটা ছোট হয়ে এসেছে। আমি সময় পেলেই তোমাদের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলব। আর পারলে সামনের বছর এখানে আবারও চলে আসতে পারি! তোমরা আমাকে যেভাবে ঘরের ছেলের মতো ভালোবেসেছ, তার তুলনা নেই। এবার আমাকে তোমরা হাসিমুখে বিদায় জানাও। চল একসঙ্গে গান গাই আজ’…

Voy a reír, voy a bailar
Vivir mi vida lalalalá
Voy a reír, voy a gozar
Vivir mi vida lalalalá

(আমি হাসতে চাই, আমি নাচতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা

আমি হাসতে চাই, আমি আনন্দে থাকতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা।)

 

                (শেষ পর্ব )

          

শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                    



সাইকেল ( অষ্টম পর্বের পর)

 #৯

Para bailar la bamba
Para bailar la bamba
Se necesita una poca de gracia
Una poca de gracia
Pra mi pra ti
Ay arriba, arriba
Ay arriba, arriba
Por ti sere, por ti sere, por ti sere

Yo no soy marinero
Yo no soy marinero
Soy capitan
Soy capitan
Soy capitan

Bamba, bamba
Bamba, bamba
Bamba, bamba
Bamba, bamba

(বাম্বা নাচতে গেলে

বাম্বা নাচতে গেলে

চাই একটুখানি কৃপার,

চাই একটু দয়া

আরও একটু বেশি

আরও আরও বেশি

তোমার জন্য জন্য আমি আছি, তোমারই জন্য আছি

 

আমি নাবিক নই,

আমি নাবিক নই

আমি ক্যাপ্টেন

আমি ক্যাপ্টেন

আমি ক্যাপ্টেন

 

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা )

এইরকম একটা দুরন্ত ছন্দের গান গাইতে গাইতে সামুয়েল প্রায় নাচছিল। গান, নাচ শেষ হলে সমবেত কচি হাসির রোল উঠলে চমকে তাকালো সে। বিচ্ছুগুলো আসলে যায়নি। কাছেপিঠেই ছিল। ওর গিটারের আওয়াজ শুনে আড়াল থেকে সব শুনছিল এতক্ষণ। এরপর ওকে ঘিরে ধরে সবাই হইচই শুরু করল। ওদের বক্তব্যের মূল সুর একটাই—গান শেখাও আমাদের। আমরাও তোমার মতো গাইতে চাই। সামুয়েলও এক পায়ে রাজি। ঠিক হল, কাল স্কুলের শেষে গান শেখানোর ক্লাস শুরু হবে। গিটারও শেখানো হবে। গিটার শেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল বুলবুল। ওর জন্যই প্রধানত গিটার শেখার ক্লাস। বাকিরা গান শিখতে চাইলে শিখবে।

বুলবুল আনন্দে ফুটছে একরকম। ঘরে এসেই স্নান খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটলে সামুয়েলকে ধরল। ‘একবার গিটার ছুঁতে দাও! কিভাবে ধরে একটু দেখিয়ে দাও। আঙুলে আংটির মতো কী পরে ওদুটো?...’ এইসব হাজার বায়নাক্কায় অস্থির হয়ে পড়ল সামুয়েল। ওকে শান্ত হতে বলেও পার পেল না। শেষে একটু বিরক্ত হয়েই সামুয়েল বলল, ‘এই গিটার যদি আমার হৃদয়, তবে ওই সাইকেল আমার মস্তিষ্ক। আমার সাইকেলে বাচ্চাগুলো ওঠে, আমি মুখে কিছু বলি না ঠিকই, কিন্তু আমার বুক ফেটে যায়। আর গিটার আমি কাউকেই ছুঁতে দিইনি এখনও। আশা করি তুমি বুঝবে…’ থমথম করে উঠল চারিদিক হঠাৎ করেই। পিনপতনের শব্দ শোনা যাবে এমন এক নিস্তব্ধ আবহাওয়ায় বুলবুল আচমকা ডুকরে উঠে চলে গেল। আর সামুয়েল কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে কি একটু বেশিই কর্কশ হয়ে পড়েছিল বুলবুলের প্রতি? এতটা কঠিন স্বরে ওকে বলা বোধহয় উচিত হয়নি। কিন্তু ছোঁড়া তির আর বলা কথা কি আর ফিরিয়ে আনা যায়? অগত্যা থম মেরে বসে রইল সামুয়েল।

পরদিন স্কুলের জন্য সকলে হাজির হলেও বুলবুল এলো না। ওর মাকে জিজ্ঞেস করায় জানালেন, ওর নাকি শরীরটা ভালো লাগছে না। সামুয়েল সমস্ত বুঝেও চুপ করে রইল। স্কুল শুরু হল সময় মতো। কিন্তু বাচ্চারা বুঝতে পারছিল, তাদের সামুয়েল দাদার মন ঠিক নেই আজ। সেই প্রাণোচ্ছল মানুষটার কী যেন হয়েছে। আজ তাই স্কুলশেষে গান শেখা হল না ওদের। সামুয়েল সাইকেল নিয়ে ধীরে ধীরে কোথায় যেন চলে গেল। এমনকি দুপুরেও খেতে এলো না সে। অভিজিৎ ফোন করার চেষ্টা করল বেশ কয়েকবার। প্রত্যেকবারই আউট অফ রিচ্‌ বলছিল। বুলবুল চুপচাপ রয়েছে এসব দেখেশুনে। রাগ আরও বেড়ে যাচ্ছিল সামুয়েলের ওপর। স্কুল যেতে কি ও বাধ্য নাকি? নাকি এই স্কুলে পড়লে, পাস করলে রেজাল্ট পাওয়া যায়? এ তো এমনি এমনি স্কুল। খেলাচ্ছলে শেখা। আর তাই তো ও গিটার শিখতে চেয়েছিল। কী এমন দোষ হয়েছে তাতে? ও কি সামুয়েলের গিটার নষ্ট করে ফেলত? বাচ্চা নাকি ও? রাগ, অভিমান মিলে মিশে জমাট বাঁধছিল বুলবুলের বুকে। যে মেয়ে সারাদিন বকবক করে সে সকাল থেকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে—এও তো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বুলবুলের মা ওকে চেপে ধরল এবার। ‘নিশ্চই তুই ছেলেটাকে উল্টোসিধে কিছু বলেছিস! নইলে তো ও এমন নয়। তোর আর বুদ্ধি হবে না। একটা ছেলে পরিবার ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছে…আর তুই ওকে কোথায় দেখভাল করবি, তা না!’ মায়ের বকা খেয়ে বুলবুলের রাগ, অভিমান গলে কান্না হয়ে ঝড়ে পড়ল। অভিজিৎ ওকে টেনে নিয়ে গেল ওর ঘরে। তারপর বোনের থেকে গিটারের কাহিনী জেনে নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল। মনে হয়, সামুয়েল এই গ্রাম ছেড়ে যাবে না। অন্তত যাওয়ার আগে তাকে কিছু না কিছু বলে যাবে। আছে কোথাও এদিক, ওদিক।

বুলবুল চোখ মুছে দাদাকে জানাল, ‘তুই একবার বাইক নিয়ে ওই পাহাড়ের দিকে যা। সামুয়েলদা নিশ্চই ওখানে গিয়ে বসে আছে’। অভিজিৎ ব্যস্ত হয়ে বাইকে স্টার্ট দিল তখনই। আর বুলবুলের প্রত্যাশা মতো টিলার দিকে একটা বড় পাথরের আড়ালে সামুয়েলের সাইকেলটা দেখতে পেল ও। চেনা বাইকের আওয়াজে সামুয়েলও বেড়িয়ে এলো কোনো ফাঁক থেকে। অভিজিতকে দেখতে পেয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে ওকে টেনে নিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। সেখানে তখন একঝাঁক প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে। রঙের খেলা দেখতে দেখতে নাকি ওর দুপুরে খাওয়ার কথা মনে নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল অভিজিৎ।

দূর থেকে অভিজিতের পিছন পিছন সামুয়েলকে সাইকেলে আসতে দেখে বড় করে শ্বাস নিল বুলবুল। থাক বাবা! আর গিটার শিখে তার কাজ নেই। সামুয়েল চলে গেলে কী হত? সারাদিন ছেলেটা খায়নি বলে সন্ধেবেলা অভিজিতের মা পরোটা আর নারকেল দিয়ে ঘুগনি বানিয়েছিল। তৃপ্তি করে খেলে সামুয়েল। ওর খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কতখানি খিদে ছিল ওর পেটে। রাতে যথারীতি গিটার নিয়ে বসে টুংটাং করছিল ও। বুলবুলকে ঘুরঘুর করতে দেখেই ডাক দিল। ‘এই মেয়ে! এদিকে এসো। আমার কথায় রাগ করেছ? এসো। আজই তোমাকে গিটারের প্রথম পাঠ শেখাই’। বুলবুলের সব রাগ, অভিমান জল হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। খুব মনোযোগ দিয়ে সামুয়েলের কাছ থেকে গিটার শিখতে শুরু করল ও। দুচারদিনের মধ্যেই বুলবুলের শেখার ক্ষমতা আর এত সহজে গিটারের প্রাথমিক কলাকৌশল আয়ত্ত্ব করতে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সামুয়েল। আর তাই মনে মনে এক প্রতিজ্ঞা করল নিজের কাছে।  

শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                     



সাইকেল ( সপ্তম পর্বের পর)

 #৮

পরদিন ভোর থেকে সামুয়েলকে আবার সাইকেল নিয়ে ভ্রমণে বেরোতে দেখল সবাই। সেই আগের মতো মুখে হাসি, আর সুরের গুনগুনানি। তবে বেলার দিকে সে বুলবুলের সঙ্গীদের ডেকে নিল সেই গাছের তলাতেই। তারপর ওদের সঙ্গে ঘন্টাখানেক আলোচনা চলল ওর। অভিজিৎ একটা খাতা, পেন নিয়ে বসে গম্ভীর মুখে কী যেন লিখছিল সেই সময়ে। দূর থেকে ওদের দেখছিল পথচলতি গাঁয়ের লোকজন। কেউ কেউ হেঁকে জিজ্ঞেসও করল, ‘কী গো, এখানে কিসের মিটিং চলছে তোমাদের?’ বুলবুল হেসে বলল, ‘কাকা, কাল তোমাদের বাড়ি যাব আমরা। গিয়ে সব বলব’। কাকাও ঘাড় নেড়ে হেসে চলে গেল। অভিজিতদের বাড়িতে একটা পরিত্যক্ত গোয়াল ঘর ছিল। দুপুরে খেয়েদেয়ে পুরো টিম সেই ঘর ছাইতে শুরু করল। ওদের দেখাদেখি আরও কয়েকটি খুদে এসেছে দুপুরে। কী হচ্ছে বা কী হবে, এই নিয়ে সকলের কৌতূহল খুব। অভিজিতের মা, বাবা, কাকা, কাকিমারা এখন পৃথক রান্নাঘরে রান্না করে। তবে তাদের একটি যৌথ রান্নাঘর ছিল আটচালার। সেই ঘর এতদিন বন্ধই পড়ে থাকত। আজ শেকল খুলে সেই ঘরকে পরিষ্কার করতে লেগে গেছে সারা পরিবার। সে এক হৈহৈ কাণ্ড! কেউ কেউ ভাবছে গাঁয়ের কারুর বিয়ে লাগবে নাকি? অভিজিতের বিয়ে হলে তো এতদিন সবাই জানতে পেরে যেত। যাইই হোক না কেন, এই লক ডাউন পর্বে কিছু একটা যে হতে চলেছে এই গ্রামে, সে নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলল সারা দিনভর।

বরবরুয়াদের জমিজমার অভাব নেই বটে, তবে নগদ টাকার জোগান কম। এদের গ্রামের বেশির ভাগ চাষীরাই এখনও বিনিময় প্রথায় কাজ মেটায়। ধানের বদলে তিসি, সর্ষের বদলে আনাজপাতি…এইরকম। এই আদানপ্রদানের ব্যবস্থাকেই কাজে লাগিয়েছে সামুয়েল। বুদ্ধি তারই। তার কাজের ব্লুপ্রিন্ট রয়েছে অভিজিতের খাতায়। আর বাকি সদস্যরা যেমন বলা হচ্ছে তেমন ভাবে কাজে লেগে পড়ছে। প্রথমেই সামুয়েল ঠিক করে, স্কুল বন্ধ এদের এখন, তাই একটা অস্থায়ী স্কুল বানাবে। যেখানে সে স্প্যানিশ শেখাবে বাচ্চাদের। ওদের শেখার উৎসাহ দেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। আর সেও শিখে নেবে স্প্যানিশের অসমিয়া শব্দের প্রতিরূপ। এর জন্য অভিজিতদের গোয়ালঘরটিই প্রাথমিক ভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। কাল থেকেই চালু হবে তাদের স্কুল। সকাল সাতটা থেকে দশটা স্কুলের সময়। এই তিনঘন্টায় ছেলেমেয়েদের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করবে অভিজিতদের যৌথ রান্নাঘর। আপাতত খর্চা যোগানের দায়িত্ব এই পরিবার তুলে নিয়েছে। এরপর অন্য কেউ সাহায্য করতে চাইলে, নেওয়া হবে।

এই পরিকল্পনা প্রত্যকে বাড়ি ঘুরে ঘুরে জানানো হল পরের দিন। বেশিরভাগ পরিবারই রাজি। সম্পন্ন পরিবার যারা আছে, তারা নিজেরাই যেচে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিল। কয়েক ঘর অবশ্য সব শুনল, মুখে কিছু বলল না। জোর খাটানোর কোনো চিন্তাভাবনাই এদের নেই, সামুয়েলের ব্যস্ততায় সময় কেটে যাবে, ছেলেমেয়েগুলোরও একঘেয়েমি কাটবে। শিক্ষাও হবে কিছু—এই হল উদ্দেশ্য। পরের দিন সকালে বুলবুলের ছজন সঙ্গীরা তো এসেছেই, আরও বারোজন এসে উপস্থিত হল। সকলকে নিজের নিজের আসন, খাতা, পেন নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। এখানের মেয়ে, বউরা বাড়িতেই চমৎকার আসন বোনে। ফলে আসনের অভাব কারুরই নেই, কিন্তু বাড়তি খাতা কেউ কেউ আনতে পারেনি। তবে স্লেট, পেন্সিল সকলেই এনেছে না বলতেই। সামুয়েল স্লেট পেনসিল নিয়েই শুরু করল আজ। একজনের স্লেটে স্প্যানিশের প্রথম বর্ণ লিখে দিল। সেই অনুসারে কপি করতে থাকল সবাই। যেহেতু এরা বড় হয়েছে কিছুটা, তাই খুব বেশি দেরি হল না প্রাথমিক বর্ণ শিক্ষায়। কিছুক্ষণ লেখালেখির পর্বের পরে এবারে সামুয়েল কিছু চলতি শব্দের স্প্যানিশ প্রতিশব্দ শেখাতে শুরু করল ওদের। এই মৌখিক পর্বটা সবথেকে বেশি উপভোগ করল ওরা। মাঝখানে মুড়ি আর আলু, ছোলার তরকারি দিয়ে টিফিন পর্বও মিটে গেল সুন্দর ভাবে। আপাতত সময় শেষ। কাল আবার স্কুলে আসবে ওরা। উৎসাহে, আনন্দে ফুটছিল বাচ্চাগুলো। মনপ্রাণ ভরে উঠছিল সামুয়েলেরও। ওরা চলে গেলে গান ধরল সে-


রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                             


জলের ঘরবাড়ি 



এই আমার ঘর। মাঝরাতে ডাইনিং টেবিলে খালি বোতলগুলো গড়াগড়ি খায়। কারা এত জল খায় রোজ? সকালের জল ভরার দায়িত্ব অনেক। স্বপ্ন সেদিক থেকে হাত, পা ঝাড়া। বিছানায় কেবল দায়িত্ব তৈরি হয় আর সেগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসে জলের বোতলে। বোতলে জল ভরার একটা সঙ্গীত থাকে। বাবা শুনতে পায় সে গান। আমি কান খাড়া করে চেষ্টা করে দেখেছি অনেকবার। লোকোমোটিভের শব্দ ভেসে আসে কানে। সে মূর্ছনারও জবাব নেই।

#

জল খেতে খেতে আমাদের শরীরে বেশিরভাগ অংশই জলীয় হয়ে গেছে। তাহলে রক্ত কোথায় থাকে? এই যে সেদিন চপারের আঘাতে হাত কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল…ওরা কোথায় গেল তবে? বাষ্পীভূত হতে হতে মেঘ হয়ে যায় যারা তাদের নামই মানুষ—একথা ভ্যানগঘ বলেছিল একদিন আমাকে স্বপ্নে এসে। সেই থেকে আমাদের দেয়ালের ছবিগুলো গলে পড়ছে। মেঝের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে জলস্রোত। আমাদের পায়ের পাতা ভিজে যায়, শুকনো মুখ আর তত চোখে পড়ে না।

#

পিকাসো আমাকে শক্ত হতে শিখিয়েছে। সেদিনের ঝড়ে বাইরের গাছটা পড়ে গেলে কুঠার দিয়ে তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিলাম সহজেই। এরকম কত গাছ আর কতগুলো ফ্রাই প্যান যে এলো আর গেল! যেমন পাগলটা যায়। ফিরে এসে গলির পাঁচিলে ঠেঁস দিয়ে বসে থাকে নির্বিকার। একটা মাছি, যাকে ও আর আমি খুব ভালো ভাবে চিনি, ওর কপালে এসে বসে কিছুক্ষণ। তারপর ওর পাশের দেওয়ালে স্থির হয়। ওদের ভালোমন্দ খেতে দিলেও খায় না। প্যাকেটে দেওয়া মুড়ি খেতে খেতে চলে যায় ওরা। কিছু মুড়ির দানা রাস্তায় পড়ে থাকে। মৃতদেহ চলে গেলে খই পড়ে থাকে অবশ্য। ওরা মরে না। ফিরে এসে বসে আবার একদিন। চেনা মাছি আর অচেনা পাগলদের জল খেতে দেখেনি কেউ।   

রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                



ষষ্ঠ পর্বের পর 


 #৭

সেদিনের আনন্দ ফিকে হয়ে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না যদিও। রাতেই টিভির খবরে লকডাউনের ঘোষণা শুনল সারা গ্রাম। পাগলের মতো ট্র্যাভেল এজেন্টদের ফোন করা শুরু করল সামুয়েল আর অভিজিৎ। অভিজিৎ তার চেনা সূত্রের সকলকে ধরাধরি করল, তবুও কিছু উপায় বেরল না। দুদিনের মধ্যে টিকিট পাওয়া গেল না সামুয়েলের। তার যাওয়া আপাতত স্থগিত হল। নিরুপায়, অসহায় সে কী করবে ভেবে পেল না। সে এতই হতাশ হয়ে পড়ল যে, সকালে উঠে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াবার কথা পর্যন্ত মনে পড়ল না ওর। অভিজিৎ নিঃস্পন্দ হয়ে বসে রইল। বাড়ি জুরে শোকের ছায়া নেমে এলো যেন! কেউ আর সামুয়েলের মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। কী বলে ওকে সান্ত্বনা দেবে সেও ভেবে পাচ্ছে না। কবে লক ডাউন উঠবে, কবে অতিমারির প্রকোপ কমবে, কেই বা জানে। এই অবস্থায় কী করণীয় এখন কেউ জানে না। যে বাড়ি ফেরার আনন্দে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে মনে করে সামুয়েলের মন খারাপ হচ্ছিল, সেই গ্রাম এখন তার কাছে বিষ হয়ে উঠল। দেশের অবস্থাও ভালো না। আত্মীয় স্বজনের অকাল মৃত্যুর খবর পাচ্ছে যেটুকু তাতেই ও বুঝেছে, ব্যাপারটাকে আর লঘু করা যাবে না। বা যাচ্ছে না। সারা পৃথিবী জুড়ে এক সঙ্কটকাল এসে উপস্থিত।

সারাদিন কেটে গেল। বিকেলে কফি নিয়ে বুলবুল এলো সামুয়েলের ঘরে। কফি রেখে কিছু বলবে বলে উশখুশ করছিল ও। কিন্তু কী যে বলবে সেটাই ভুলে গেছে এখন। সামুয়েলের মুখে কেউ যেন একপোঁচ কালি ঢেলে দিয়েছে। অনেক চেষ্টার পর বুলবুল অস্ফুটে বলল, ‘কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। খাও’। ম্লান হেসে কফিতে চুমুক দিল সামুয়েল। অনেক শক্তি সঞ্চয় করে এবার বুলবুল ফরফর করে বলতে শুরু করল…’লক ডাউন হয়েছে তো কী হয়েছে? তুমি কি আমাদের গ্রামে আর কটা দিন থাকতে পারবে না? এই গ্রামের মানুষ, আমরা সবাই তো তোমাকে ভালোবাসি। আপন মনে করি। তাহলে অসুবিধে কোথায়? মানছি, বাড়ির জন্য মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি তো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দেশে, বিদেশে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছ। বাড়িতে আর কদিন থাকতে? দেশে ফেরার উপায় যখন নেই তখন এখানেই মানিয়ে গুছিয়ে থেকে যাও। আমরা হয়ত গরিব, তবু তোমার আদর যত্নের অভাব কখনও হবে না, এটুকু আমি জানি’। বুলবুলের কথার তোরেই হোক, আর কফির প্রভাবে সামুয়েল চাঙ্গা হয়েছে কিছুটা। এবার বুলবুলের ঠানদি মার্কা কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল। ওকে হাসতে দেখে বুলবুল অবাক। ‘হাসছ যে বড়? আমি কি হাসির কথা বললাম?’ হাসি চেপে সামুয়েল বলল, ‘খুব পাকা হয়েছে তো! এমন গিন্নিবান্নিসুলভ কথাবার্তা বোধহয় মেয়েরাই বলতে পারে। যাক্‌, তুমি ঠিকই বলেছ, থাকতে যখন এখানে হবেই, তখন আর মন খারাপ করে লাভ নেই। নাও এই গানটা শোন…’    

Yo no sé por qué a veces me pierdo
Los ojos se me dan vuelta y me muero por dentro
Y me encierro otra vez y no puedo salir
No puedo ver lo lindo de cada momento

গান থামিয়ে বুলবুলকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়েই সামুয়েল বলতে থাকল…

‘আমি জানি না কেন আমি মাঝেমাঝে হারিয়ে যাই

আমার চোখ মাথার ভেতরে ঘুরে বেড়ায় আর তার ভেতরে আমি মরে যাই

আবার আমি নিজেকে বন্দি করে ফেলি আর কোথাও যাই না

প্রতিটি মুহূর্ত যে কত সুন্দর আমি দেখতেও চাই না…’      

 

‘কিন্তু এবার আমি মরে যাব না কিছুতেই। প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করব চোখ খোলা রেখে। এই গ্রামের সবটুকু আমার চাই!’ এই বলে সামুয়েল বুলবুলকে কাছে ডাকল হাত বাড়িয়ে। খানিক ইতস্তত করে বুলবুল কাছে এলো বটে। কিন্তু ওর মুখ দেখেই বোঝা যাছিল ওর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সামুয়েলের গান, আবেগ ওকে স্পর্শ করেছে আগেই। এরপর সামুয়েলের হাতের স্পর্শ পেয়ে সে থরথর করে কেঁপে উঠল। সামুয়েল ওর হাত ধরে ধীরে ধীরে, কেটে কেটে উচ্চারণ করল—‘তুমি আমাকে যত্ন কর। তুমি আমাকে এভাবেই আলো দেখিও’। কিছুটা বুঝে, কিছুটা না বুঝে বুলবুল দৌড়ে এ ঘর থেকে চলে গেল আচমকা। ওর যাওয়া দেখতে দেখতে সামুয়েল আবার কোলে গিটার তুলে নিল। কী একটা গানের সুর বাজিয়ে চলল একটানা।    


রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                    


       


#৬

শেষ পর্যন্ত সামুয়েলের ফেরার টিকিট কনফার্ম হয়ে গেল। আজ থেকে চার দিনের মাথায় তার ফ্লাইট। বাড়ির জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে ওর খুব। কেমন আছে পরিবার, পরিজনেরা? তার দেশ? করোনার প্রকোপ বেড়েছে প্রচণ্ড হারে। কী এক নতুন রোগ এলো, আর তাবড় বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের তাণ্ডব আটকাতে ব্যর্থ হয়ে গেল। অতিমারির সংজ্ঞা কাকে বলে তার আভাস পাচ্ছে সে এখানে বসে। যদিও সামুয়েল জানে না, সেই প্রকোপের তীব্রতা সতিই কতটা। অনুমানে আর সংবাদ মাধ্যমের ভাসা ভাসা খবরে প্রকৃত ঘটনা কিছুতেই বোঝা যায় না। দেশের জন্য মন টানছে ওর। হোম সিক হয়ে পড়ছে। অভিজিতের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ওর এই নিয়ে। মন ভালো রাখার জন্য অভিজিৎ আগামীকাল একটা পিকনিকের আয়োজন করেছে। সবাই মিলে রান্না, খাওয়া হবে। হৈচৈ করে কেটে যাবে সারাদিন।

সেই মতো প্রবল উৎসাহ আর সাইকেল ও গিটার নিয়ে সামুয়েল, অভিজিৎ, বুলবুল আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা সক্কাল সক্কাল হাজির হল সেই বিশাল গাছের নিচে। এই এলাকা তাদের প্রাণ। এখানে জমায়েত না হলে ওদের আনন্দ যেন পুরোমাত্রায় হয় না। ওখানে এসে ওরা দেখে গ্রামের আরও সবাই হাঁড়িকুঁড়ি, উনোন, বালতি গামলা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গেছে। সবজি কাটছে মহিলারা। পুকুরের জ্যান্ত মাছ ধরে নিয়ে এসেছে জাল ফেলে কে যেন। কারা আবার মুরগি ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে এক কড়া ফুটন্ত তেলে চপ ভাজা হচ্ছে। ধামায় করে মুড়ি নিয়ে বসে পড়েছে আপাতত সকলে জলখাবারের আশায়। তেলেভাজার গন্ধে বাতাস উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। সামুয়েলকে দেখেই সকলে হইহই করে উঠল। বাচ্চাগুলো ওর হাত ধরে, জামা ধরে টানাটানি শুরু করল। গান হোক, গান হোক—সমস্বরে দাবী জানালো সবাই। সামুয়েলও হাসিমুখে নাকে গন্ধ টেনে গিটার ধরল-      

Me gusta la canela, me gustas tú.
Me gusta el fuego, me gustas tú.
Me gusta menear, me gustas tú.
Me gusta la Coruña, me gustas tú.
Me gusta Malasaña, me gustas tú.
Me gusta la castaña, me gustas tú.
Me gusta Guatemala, me gustas tú.

গানের এমন ঝঙ্কার যে সকলেই মাতোয়ারা তখন। মানে বোঝাও, মানে বোঝাও বলে অস্থির করে তুলল বাচ্চাগুলো। সামুয়েল যথাসাধ্য চেষ্টা করল-

আমার দারচিনি ভালো লাগে, আমার তোমাকে ভালো লাগে।

আমি আগুন ভালোবাসি, তোমাকেও ভালোবাসি।

আমি নাচতে ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি।

আমার মালাসানা ভালো লাগে, তোমাকেও ভালো লাগে।

আমার কাঠবাদাম ভালো লাগে, তোমাকে ভালো লাগে।

আমি গুয়েতামালাকে ভালো বাসি, তোমাকেও ভালোবাসি।

 

সবাই রান্নাবান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল এরপর। সামুয়েলের সাইকেল নিয়ে কসরত শুরু করল কয়েকটি বাচ্চা। কেউ খেলছে, কেউ নিছকই আড্ডা দিচ্ছে, বুলবুল তার বন্ধুদের সঙ্গে কিতকিত খেলছে। ওকে এখন আর কিশোরী মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে নেহাতই এক বালিকা। মায়ায় মন আচ্ছন্ন হয়ে গেল সামুয়েলের। আর কদিন মাত্র থাকবে সে এখানে। কী নিষ্পাপ, পবিত্র মানুষগুলো! এদের মনে থাকবে ওর। এইসব ভাবতে ভাবতে সামুয়েল স্বভাববশত একটু দূরের গাছতলায় গিয়ে বসে ছিল চুপচাপ। হাঁ করে আকাশের মেঘের খেলা দেখছিল। মাংস রান্নার গন্ধ বাতাসে ভাসছে। গ্রামের যত কুকুর, বেড়াল, তারাও অংশ নিয়েছে আজ পিকিনিকে। একটা কুকুর ওর দিকে তাকিয়ে ভুক ভুক করে ডেকে উঠল আচমকা। হয়ত সামুয়েলকে চিনতে পারেনি। ওর ডাক শুনে বুলবুল এগিয়ে এলো। ভুলুকে তাড়িয়ে দিয়ে সামুয়েলকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখানে চুপচাপ বসে আছ কেন? সবাই ওদিকে রয়েছে…তোমার ভালো লাগছে না এখানে?’ ওর কথায় সচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল সামুয়েল। বলল, ‘না না ভালো লাগবে না কেন? খুব ভালো লাগছে। ভাবছি, আর তো কদিন, দেশে ফিরে যাব। তোমাদের গ্রামের ওপর খুব মায়া পড়ে গেছে’। এই বলেই সে গিটারে সুর তুলল-

                 

Voy a reír, voy a bailar
Vivir mi vida lalalalá
Voy a reír, voy a gozar
Vivir mi vida lalalalá

(আমি হাসতে চাই, আমি নাচতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা

আমি হাসতে চাই, আমি আনন্দে থাকতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা।)

বুলবুল এই গানের মানে জানতে চাইল না, গানের সুর আর সামুয়েলের চকচকে চোখের আনন্দ দেখে বুঝে গেল গানের নিহিত অর্থ। নির্দ্বিধায় সামুয়েলের হাত ধরে হাসতে হাসতে ওকে নিয়ে চলল জটলার দিকে।

(ক্রমশঃ)

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                 



সাইকেল

তৃতীয় পর্বের পর 

৪) 

   অভিজিতের সঙ্গে ওদের বাড়িতে পৌঁছল সামুয়েল। শহরে এসে বাইকস্ট্যান্ডে নিজের বাইক রেখে দেয় অভিজিৎ। সেই বাইকের পিছনে বসে প্রায় ঘন্টাখানেক জার্নির পর ওদের গ্রাম। এই সেই বরবরুয়া গ্রাম, ছবির মতো সবুজ ও সুন্দর। প্রথম দেখেই এই গ্রামের প্রেমে পড়ে গেল সামুয়েল। তারপর যে ওর বাড়িতেও আরেক দফা বিস্ময় ওর জন্য অপেক্ষা করছিল, সে ওর ধারনার বাইরে ছিল। ওদের বাড়ির এলাকা গাছের বেড়া দেওয়া। ভেতরে কিছুটা অংশ পাকা বাড়ি, দেখলেই বোঝা যায়, নতুন তৈরি হয়েছে। আর পিছনের দিকে মাটির বাড়ি, মাটির দেওয়ালে আবার সুন্দর কল্কা, ফুল, বাঘ, হরিণের ছবি আঁকা। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। যদিও অভিজিৎ ওকে পাকা বাড়িতেই এনে তুললো। অভিজিতের ঘরেই এলো ওরা। সুন্দর, পরিপাটি, বাহুল্যবর্জিত ঘর। ঘরের একপাশে একটা খাট, আলনা, আর কাঠের চেয়ার, টেবিল। ব্যস্‌। কুলুঙ্গির মতো একটা জায়গায় আয়না টানানো রয়েছে। টেবিলে অভিজিতের ছোটবেলার ছবি একটা। দুচারটে বই। চেয়ারে বসল সামুয়েল। অভিজিতের বাবা মা এলে হাতজোড় করে প্রণাম করল ওদের সামুয়েল। অভিজিৎ জানাল, ওর এক ছোট বোন আছে, ইলেভেনে পড়ে, এখন স্কুলে সে। খুব পাজি নাকি সে! একটা সুন্দর হাসিখুশি পরিবারে এসে সামুয়েল সাতদিনের জন্য আস্তানা গাড়ল। অভিজিৎ রইল পাশের ঘরে, যে ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাল সামুয়েলকে ও। বাবা মায়ের ঘরের পাশেই এক চিলতে বারান্দা ঘিরে পড়ার টেবিল-চেয়ার। ওখানেই নাকি ওর বোন পড়াশুনো করে। মাছের ঝোল দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে টেনে ঘুমলো সামুয়েল। ওকে এভাবে তৃপ্তি করে খেতে দেখে অভিজিতের মাও খুব খুশি! ফলে একাত্ম হতে সামুয়েলের একটুও সময় লাগল না। বিকেলে চা দিতে এলো কাকিমা। অভিজিৎ তখন টেনে নিয়ে এলো বোনকে। রোগা, পাতলা গড়নের এক কিশোরী সে। টানা টানা চোখ, এক ঢাল কালো কোঁকড়া চুল কপাল ঢেকে রেখেছে তার। শ্যামলা মেয়েটির মুখে একটা আলগা শ্রী আছে, এটুকুই। আর রয়েছে চোখ ভর্তি বিস্ময় আর দুষ্টুমি। সামুয়েলের সামনে প্রাথমিক জড়তা কাটছিল না তার। যেহেতু ইংরেজি বলতে সে সড়গড় নয়, তাই কথাবার্তাও কিছু হল না। একটু ফিকে হাসি হেসে বসে রইল খাটের ওপর। আর অনবরত ঠ্যাঙ দুলিয়ে যেতে লাগল। চা পর্বের পর, একসময় সামুয়েল আর পারল না। বলেই ফেলল। ‘তুমি কি পা না দুলিয়ে থাকতে পার না?’ ওর কথায় হকচকিয়ে গেল সেই মেয়ে। আর অভিজিৎ হাহা করে হেসে উঠল। রাগে দাদার দিকে চোখ পাকিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল ও। ওর নাম বুলবুল। সামুয়েল জানল যে বুলবুল এক পাখির নাম। যদিও বুলবুলের একটা পোশাকি নামও আছে। শ্রীময়ী।  

     রাতে খাওয়ার সময় এক ঝলক দেখা গেল বুলবুলকে। অভিজিৎ অনেকবার ডাকল একসঙ্গে খেয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তার সাড়া পাওয়া গেল না। আপন মনেই অভিজিৎ বলে উঠল, রাগ হয়েছে! এই এক রোগ ওর। এমনিতে সব ভাল, শুধু রেগে গেলেই তার মান ভাঙাতে ভীষণ সমস্যা। সামুয়েল বুঝল, একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে ও। আন্তরিক ভাবে তাই অভিজিতকে বলল, তুমি তোমার বোনকে একবার ডাক। আমি খুব লজ্জিত। ক্ষমা চাইব ওর কাছে। কিন্তু বুলবুলের আর দেখা পাওয়া গেল না। কিন্তু সে যে আশপাশেই আছে, এবং ওদের কথা কান খাড়া করে শুনছে সেও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল একটু বাদেই। খেয়ে হাত ধুতে যাওয়ার সময় সামুয়েল শুনল, বারান্দায় এক জোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত পালিয়ে গেল। নিজের মনেই হাসল ও। ভাবল, থাক এখন। একটু মজা নেওয়া যাক বরং! হাত ধুয়ে গিটারে সুর তুলে গান ধরল ও-

Como cada noche desperté pensando en ti

Y en mi reloj todas las horas

vi passar

Porque te vas

(প্রতি রাতের মতো, আমি জেগে উঠব, আর তোমার কথাই ভাবব…আমার ঘড়িতে দেখব সমস্ত সময় পেরিয়ে চলে যাচ্ছে, কারণ তুমি চলে যাচ্ছ…) 


রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                             


দ্বিতীয় পর্বের পর 

৩) 

  খুব ভোরে উঠে পড়ে সামুয়েল। এ তার পুরনো অভ্যেস। ঘুম থেকে উঠেই সাইকেল নিয়ে কসরত করে সে। সাইকেলটাও যেন এই সময়ের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। এইটুকু সময় শুধু তার আর সামুয়েলের। যেহেতু এই গ্রামের রাস্তার প্রায় সবটাই সমতলে, তাই চড়াই উতরাই ভাঙতে সে চলে যায় ওই দূরের পাহাড়ের দিকে। পাহাড় তো নয়, টিলার মতো। পাথুরে কিছুটা হলেও, সবুজে ঢেকে আছে এখন। পায়ে চলা পথ ধরে সামুয়েল আর তার সাইকেল সোজা উঠে যায় পাহাড়ের মাথায়। সূর্যটাও তখন পাহাড়ের মাথায় এসে হাজির হয়। এতদিনে আশেপাশের বসতির সবাই, মায় এই পথঘাট, গাছপালা, পশুপাখি, সবাই জেনে গেছে যে, এক বিদেশী ছেলের সাইকেলের শব্দে তাদের ঘুম ভাঙবে আর সেই ছেলের গলায় থাকবে ভাঙা ভাঙা অসমীয়া গানের কলি। ঠিক এই যেমন এখন যদি কেউ ওই টিলার মাথায় এসে দাঁড়ায়, শুনতে পাবে…

নিবিড় বনে যে মাতিছে যা/ যা যা দূৰণিলৈ/ হেৰুৱা সুবাসে মাতিছে যা/ সোনৰে সজাটি এৰি থৈ যা/ যা নীলিম আকাশলৈ/ সোনালী ৰদে যে মাতিছে যা/ জোনৰে জোনাকী মাতিছে যা/ যা পখী দূৰণিলৈ/ হেৰুৱা সুবাসে মাতিছে যা

 এই একটি মাত্র গান সে আয়ত্ব করেছে। এই সুর তাকে খুব টানে। অবশ্য জয়ন্ত হাজারিকার বেশ কিছু গানই ভাল লেগেছে ওর, কিন্তু ভাষা আর সুর রপ্ত করতে সময় লাগবে। আর তুলতে হবে ভূপেন হাজারিকার কিছু গান। টিলার ওপর এসে সামুয়েল কিছু ব্যায়াম করে সাইকেল নিয়ে। শরীরে আর এই সাইকেলে জং ধরতে সে দেয় না কোনোমতেই। তাকে সব সময় প্রফুল্ল রাখে সুর আর গান। কত দেশে সে গেছে, কত রকম মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, সব মানুষের মুখ যে ওর মনে থাকে, বা মনে রাখতে চায়, তাও না। কিন্তু সুর সে ভোলে না। কথা ভুলে যায় স্বাভাবিক ভাবেই, কিন্তু সুর মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে। কখন যে কোন সুরে সে গুনগুনিয়ে উঠবে বা গিটারে কী যে সে বাজাবে, সেও জানে না! 

  সেদিন অভিজিতের সঙ্গে আলাপের পরদিনই ওরা আবার এক ক্যাফেতে আড্ডা দিতে বসেছিল। অভিজিৎ গরগাঁওয়ে যুবা উৎসবে ওকে নিয়ে যেতে চাইছিল, চাইছিল বলা ভুল, একরকম জোর করছিল ওকে ওখানে যাবার জন্য। খুব বেশি ভিড় সামুয়েলের ভাল লাগে না, তবু অভিজিতের উপরোধে ওকে রাজি হতে হয়েছিল সেদিন। এখন মনে হয়, সেদিন যদি ওই উৎসবে না যেত ও, এই গ্রামে আসাও হত না ওর। অথবা মণিপুর থেকে সে যদি ফেব্রুয়ারিতে আসামের শিবসাগরে না আসত, তাহলেও অভিজিতের সঙ্গে দেখা হত না। সবই বোধহয় পূর্বনির্ধারিত। নইলে কোথাকার কোন বরবরুয়া গ্রাম, আজ তার নিজের ঘরবাড়ি হয়ে ওঠে! ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল সামুয়েলের মন কেড়ে নিয়েছিল। অসমীয়ার বিহু নাচগান আর সুর, তাল, ছন্দে সে খুব একাত্ম বোধ করেছিল সেদিন। আসলে তার নিজের বাসস্থান যেখানে, সেও তো এমনই এক মায়াময় দেশ। কান্ট্রিসাইডে এক বিরাট খামার রয়েছে ওদের। চাষবাস তাদের পরিবারের রক্তে। আর সুর! তাদের পরিবারের সবারই রক্তের মধ্যেই সুর দৌড়ে বেড়ায়। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যে মুখে হাসি লেগে থাকে স্রেফ এই অজস্র, অনর্গল গান আর সুরের জন্য। টনিকের মতো কাজ করে। 

  একটানা সাতদিন যুবা উৎসবে ভাগ নিয়েছিল ওরা। এমনও হয়েছে, নিজের গিটার নিয়ে নাচেগানে ওদের সঙ্গে মেতে উঠেছে সামুয়েল। এমন একটা প্রাণবন্ত ছেলেকে, বিদেশি হলেও কাছে টানতে কারুর দেরি হয়নি। শেষদিন অভিজিৎ আর সামুয়েল প্রচুর মদ্যপান করে একসঙ্গে। আর সেই সময়েই অভিজিতের সঙ্গে ওর গ্রামে গিয়ে কিছুদিন থাকতে চায় ও। অভিজিৎ অবাক হলেও, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। যদিও একটু কিন্তু কিন্তু ভাব ছিল ওর…একজন সাহেবকে নিয়ে গিয়ে কোথায় থাকতে দেবে, কী খাওয়াবে, ওইরকম গ্রামে সাহেব কি থাকতে পারবে আদৌ…এইসব নিয়ে যখন মনে মনে ভাবছে অভিজিৎ, ভরপেট মদ খেয়েও সামুয়েল কী করে যেন ওর মনের কথা ধরতে পেরে গেছিল। নিজেই জড়ানো গলায় আশ্বাস দিয়েছিল, আমাকে নিয়ে ভেব না। এই সাইকেলে আমি কত যে দেশ ঘুরেছি, কত গ্রাম, জঙ্গল, পথঘাটে না খেয়ে পড়ে থাকতে হয়েছে, জল পর্যন্ত ফুরিয়ে যেত একেক সময়ে, ফলে আমাকে নিয়ে টেনশন কর না। তোমরা যেমন ভাবে থাকবে, আমাকেও সেভাবেই রাখবে।

   তবুও দুরুদুরু বুকে সামুয়েলকে নিয়ে গ্রামে এসেছিল অভিজিৎ। ঠিক হয়েছিল সাতদিন থাকবে এখানে সামুয়েল। তারপর রওনা দেবে দেশের উদ্দেশ্যে। ততদিনে টিকিট কেটে রাখতে হবে। কারণ ওর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে।        


(ক্রমশঃ)

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                  


 সাইকেল 


  

প্রথম পর্বের পর 


২) 

  সামুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল অদ্ভুত ভঙ্গি করে। যেন ও নিজেই ঠিক বুঝতে পারছে না—মন খারাপ লাগছে কিনা। এই বরবরুয়াদের গ্রামটাকে সামুয়েলের খুবই ভালো লেগে গেছে। আর সেই ভালো লাগার মাশুল গুণছে এখানে আটকে পড়ে। ভাগ্য যে এভাবে ওকে আসামের প্রত্যন্ত এক গ্রামে এনে ফেলবে, এনে ফেললেও এখানেই সাময়িক আস্তানা গড়ে দেবে ওর, কে জানত! এই বাচ্চাদুটো ওর খুব ন্যাওটা হয়ে গেছে। একজনের ক্লাস থ্রি, একজনের টু। বড়টার নাম রুবাই আর ছোটটাকে সামুয়েল ডাকে মাদাম বলে। আসলে ও সবার মুনিয়া। রুবাই ওর সাইকেলে উঠে প্যাডেলে পা পৌঁছনোর চেষ্টায় মত্ত। আর মাদাম এখন গিটারে টুংটাং করছেন। মেয়েটার তেলমাখা খোঁচা খোঁচা চুলে হাত বুলিয়ে দিল ও। আদর পেয়ে একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করল ও। তারপর আবার গিটারে মন দিল। যেন এই মুহূর্তে জি শার্পে গিয়ে সে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। এটুকু প্রশ্রয় ওদের দেয় সামুয়েল। শুধু এই দুটি না, আরও কয়েকজন এসে জোটে ওর কাছে। বরাবর ছোটদের পছন্দ করে ও। ওদের পালস্‌ বোঝে, আর তাই যেখানেই যাক, ছোটরা ওকে ঘিরে রাখে। এই বরবরুয়া গ্রামে এসে ওদের ভাষার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল প্রথমটা। তারপর আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছে, ভাঙা ইংরেজিতে বস্তুর নাম বলে বোঝাতে পেরেছে কিছুটা। এভাবেই চলেছে দুপক্ষের ভাষা শেখার খেলা। এখন তো অসমীয়া, স্প্যানিশ আর ইংরেজির সহাবস্থানে গ্রামের বিকেলগুলো মুখর হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে একটা ছোট্ট স্কুলের মতো তৈরি হয়ে গেল এভাবে। ইচ্ছে থাকলে কী না হয়! 

  জুন, জুলাইয়ের এই ভরা বর্ষায় অবশ্য মাঠেঘাটে ওদের স্কুল বসতে পারে না। কারুর ঘরে, বারান্দায় মায় পরিত্যক্ত গোয়াল বা রান্নাঘরেও চলে ওদের পাঠ। আজ তিনমাস হয়ে গেল এখানে এসে। তিন মাস তো না, যেন এক যুগ! গত বছর আগস্টে স্পেন থেকে উড়ান দিয়েছিল সে জাপানের উদ্দেশ্যে। সঙ্গী ছিল তার সাইকেল। সেই জাপান থেকে সাইকেলে চড়ে একে একে কোরিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, তাইল্যান্ড, মায়ানমার হয়ে মণিপুরে। তারিখটাও মনে আছে! ২৭ জানুয়ারি। কারণ আর কিছু না, সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। বাড়িতে বাবামায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য সে এক সাইবার কাফেতে গিয়েছিল সন্ধেবেলা। ততক্ষণে আশেপাশের অনেকেই জেনে গেছে সাইকেলধারী এই বিদেশী পর্যটকের কথা। অনেকেই আলাপ করছে, হাত মেলাচ্ছে, এরই মধ্যে যখন বাবামায়ের সঙ্গে ও কথা বলছিল স্কাইপে, উচ্ছাস হয়ত বেশি হয়ে পড়েছিল ওর। জন্মদিনে ওঁদের স্নেহ, ভালোবাসা থেকে দূরে থাকলেও আজ এভাবে জাপান থেকে ইন্ডিয়ায় আসতে পারবে, নিজেও ভাবেনি কখনও। সেসময়েই এক যুবকের সঙ্গে চোখচোখি হয় ওর। সে নিজেই হাত বাড়িয়ে দেয় আলাপের জন্য। শিক্ষিত অসমীয়া এই যুবকের নাম অভিজিৎ বরবরুয়া। কী এক প্রাণের টানে বন্ধু হয়ে যায় ওরা খুব সহজেই।

  অভিজিতের মূল আগ্রহ ছিল ওর পর্যটনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা। আর তাই দুজনের মধ্যে ভাব হতে সময় লাগেনি। নাহ খিদে পাচ্ছে খুব। ওরা হয়ত বসে আছে ভাত নিয়ে। অভিজিতের মাকে ও কাকিমা বলে। অনেকবার বোঝানো সত্ত্বেও কাকিমা ওরা দুজনে না খেলে খায় না। এখন আর আকাশকুসুম ভেবে দেরি করলে চলবে না। উঠে পড়ল ও। পুঁচকে দুজন বিদেয় নিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। গিটারটা পিঠে ঝুলিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল ও। আর গলা দিয়ে অজান্তে বেরিয়ে এল-

Hoy en mi ventana

brilla el sol

Y el corazón se pone triste 

contemplando la ciudad

Porque te vas ……

(আজ আমার জানলায় রোদ এসে পড়েছে,/ আর মন হয়ে রয়েছে বিষণ্ণ/ এই শহরকে অভিযুক্ত করছি আমি/কারণ তুমি চলে যাচ্ছ…)  


   সূর্য এখন আর ভোরের নেই। দুপুর গড়িয়ে সে খর হয়ে উঠেছে। কেউ এ শহর ছেড়ে আপাতত চলে যেতেও পারবে না লকডাউনের কারণে। ফলে দুঃখের কিছু নেই তার। গান তো এমনিই গাওয়া। এমনিই…তার অভ্যেস। আর দুঃখ কি কিছু আছে ওর? মনখারাপ? সে সত্যিই বোঝে না এসব। সামুয়েলের মন একটা আলগা পালকের মতো ভাসতে থাকে সব সময়। তুলোর মতো পেঁজা মেঘে ঢেকে আছে এখনকার আকাশ—ঠিক এরকম। যখন খুব মেঘ করে, আকাশ কালো হয়ে আসে, সামুয়েলের খুব ভয় লাগে। মনে হয় কারুর নরম বুকে মুখ লুকিয়ে যদি বেঁচে থাকা যেত নির্ভয়ে… 

)

রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                       


সাইকেল 


১) 

  সাইকেলটা সামনের গাছে ঠেস দিয়ে রাখা।  উলটোদিকে অন্য এক গাছের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে এক যুবক। দুধারে সবুজ ধানক্ষেতে দোলা লেগেছে আচমকাই। একটা ঠান্ডা ভিজে হাওয়া এসে দুলিয়ে দিয়ে গেল সেই যুবকের মনও। গ্রাম বলতে যা ছবি আমাদের চোখের সামনে এসে যায়, অবিকল সেরকমই একটা পিকচার পোস্টকার্ডের ছবি তার চোখের সামনে। খেতের মাঝখান থেকে একফালি পাকা, বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে দুদিকে।  কোথাও কোনো বাড়তি আবর্জনা নেই এই গ্রামে। যখন তখন বর্ষা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই উত্তর পূর্ব সীমান্ত এলাকার গ্রামে। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা দূরেই, ফলে এই অঞ্চলে তেমন জল জমে না। কাদা জমে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে না চারদিক। আর সবুজ যে এত ঘন, নরম আর মোলায়েম হতে পারে এই ছেলেটির তেমন জানা ছিল না আগে। ছোটো ছোটো বাড়িগুলোর বেশিরভাগই পাকা, খড়ের বা টিনের চালে ছাওয়া, নয়ত পাকা ছাদ। ছাদের মাথায় লাউ, কুমড়ো শাক শনশন করে বেড়ে উঠছে এই তেজী হাওয়ায়। যুবক এখন লাউশাক, কুমড়ো শাকের ঘন্ট খেতে শিখেছে, খেতে শিখেছে ভাত, ডাল আর নদীর মাছও। সাইকেল এসবের সাক্ষী। ওর দিকে চোখ গেল তার। সাইকেলটা যেন চোখ মটকে কী একটা ইঙ্গিত করল ওকে। একটু কি আরক্ত হল যুবকের মুখ? সাদা রঙে তামাটে ছোপ পড়লেও তার টকটকে গালে লজ্জার ছাপ। লজ্জা পাওয়ার যে সহজাত বোধ, সেও কি এখানে এসে সে শিখে ফেলল এই ক’মাসে? 

অলস বসার ভঙ্গী ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এবারে সোজা হয়ে বসল সে। পাশে রাখা গিটারে টুংটাং বোল তুলতে গিয়েও থেমে গেল।  তারপর আবার দ্বিধা নিয়ে সুর তুলল, গেয়ে উঠল দু কলি- 

No puede ser

no soy yo

me pesa tanto el corazón

por no ser de hielo cuando el cielo me pide paciencia

  আর সেই সময়েই যেন মাটি ফুঁড়ে দুটি শিশু হাজির হল ওর সামনে। ওদের দেখে গান থামাল সে। কিন্তু শিশুদুটি সমস্বরে বলে উঠল, আবার গাও, আবার গাও। মানে কী এই গানের?

  সে এখন মোটামুটি বোঝে ওদের ভাষা। নিজের ক্ষমতায় যেটুকু কুললো, তাতে বলল, ‘মানে? মানে জেনে কী করবি তোরা? গানের সুরই হল সব। আর কথারও প্রয়োজন আছে বৈকি! তবে তার মানে যেমন খুশি ধরে নিলেই হবে। ওই যে আকাশ দেখছিস, ও আমাকে জিজ্ঞেস করছে—কেন তোমার মন এত ভারি হয়ে আছে আজ? আমি ওকে বললাম—না, না এ আমি নয়, আমি হতেই পারে না। অন্য কেউ, যার মনে বরফ জমেছে, সে আমি নয়, অন্য কেউ, অন্য কেউ……’

এক ক্ষুদে কোলের কাছে ঘেঁষে এল যুবকের। ‘তোমার কি মন খারাপ করছে দেশের জন্য?’  


(ক্রমশঃ)

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

লেবুর গন্ধ 

একটা লেবুর গন্ধ হাত থেকে পড়ে গেল
আর গিয়ে বসল পাতার কাছে
সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে তখনও উঠে আসছে
পাতা পোড়ার ঘ্রাণ
আবছা ধোঁয়ার রেশ চোখ ছাপিয়ে
চলে যাচ্ছে দূরে

এতটাই দূরে, যাকে তুমি দূর বলতেও দ্বিধা করবে
মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে যেমন কেউ বুঝে উঠতে পারে না
এখন তার পা কোথায় পড়ছে
ফ্রিজের কাছাকাছি অথবা বারান্দার ধার ঘেঁষে-

শুধু একটাই লেবুর গন্ধ হাত থেকে ফস্কে গেল বলে
যদি শোক কর
যদি ভাবতে বস, লেবুগাছ বিলুপ্ত হয়ে গ্যাছে-
সে তোমারই ভুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে
কোথায় যে গেল, জানতেও পারবে না।

ঋণ-রমিত দে 

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

তুষ্টি ভট্টাচার্য


শিরিষের স্মৃতি

বরফে পা গেঁথে গেলে লতাটি টান দেয়
চেয়ারের পায়া কেঁপে উঠে ভাবে-
এখনও অনেকগুলো দিন এই সাদা প্রান্তরে
শিরিষের স্মৃতি নিয়ে কেটে যাবে

কে কাকে বহন করছে, এই দ্বিধার সামনে
নতজানু হয়েছে শীতরাত
নিজেকে বিছিয়ে দিয়েছে আজানু সম্ভবে

আজ যদি এইখানে সমস্ত বরফ গলে যায়
চেয়ারের দুঃখ থেকে অন্তত কিছু ভার কমে যেত
লতার কোমলে সবুজের সমারোহ দেখে
হেসে উঠত না কি তারা?

অসম্ভব দৃশ্য থেকে সরে এসে
এইবার তবে কিছু বসা যাক।  
 #
বসে থাকার কালে সারবত্তা বলে কিছু নেই
দুদিকে অলস চোখ বুলিয়ে শুধু দেখে নেওয়া
শুধু সময়ের বিস্তৃত নিভৃত সংলাপ

লতাটিও প্রায় বসে আছে
সিরাজের কথা মনে পড়ে তার
খানিক হুঁকোর ধোঁয়া এলো কোথা থেকে  
কুণ্ডুলি পাকিয়ে তারা এই বুঝি মেঘ হবে, ভাণ করে

বরফের স্তরে স্তরে লুকনো আগুন থেকে
আজও ধোঁয়া ওঠে
ধোঁয়ার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ ক’র না!

 ছবি - আশীষ পাইন

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

তুষ্টি ভট্টাচার্য




                   পেট গুড়গুড়

    সকাল থেকে খিক খিক খুক খুক হাসিতে পেটটা গুড়গুড় করছে। সিঁড়ির কোণে, বাথরুমে গিয়ে গিয়ে এগারো বার হেসে এলাম লুকিয়ে লুকিয়েছাদে উঠে কুঁড়িগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে বারোতম হাসিটা হেসেই ফেললাম! ওমা, আর যায় কোথা – প্রশ্ন উড়ে এলো , “ কি হল হাসছ কেন ?” কী কেলো ! ধরা পড়েই গেলাম শেষ পর্যন্তগম্ভীর মুখে নেমে ভাবতে বসলাম, এত গুড়গুড়ে হাসির কী কী কারণ থাকতে পারে আমারঘণ্টা দুয়েক ভেবেটেবে কারণগুলোকে লিপিবদ্ধ করে ফেললাম এই ভাবে –
১) চাদ্দিকে লোকজন বেতাল রেটে কেস খাচ্ছে অথবা খাওয়াচ্ছে ,
২) আমি একসাথে গণ্ডা চারেককে মুরগী করতে পেরেছি ,
৩) কবিতা টবিতা আর আসছে না ,
৪) সারাদিন এফবিতে সময় কাটাতে পারছি ,
৫) আমার এক চরম শত্রু, যে কিনা আমার ভয়ে এফবি ছেড়ে পালিয়েছে, তারই উক্তি এটা – আমার সামনের দাঁতগুলো বড় বড় কিনা, তাই ওমনি হাসি হাসি মুখ দেখাচ্ছে,
৬) শেষ হাসিটা আমিই হাসব ভেবে আগে থেকেই আহ্লাদিত হচ্ছি ।
না , আমি পাগল-ছাগল বা বোকাসোকা নই মোটেই । দিব্যি জ্ঞান টনটন করছে । যাই হোক , এখনও হাসির বা পেট গুড়গুড়ের নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাইনিপেটের গুড়গুড় ও হাসি চলছেই ...
    শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের পরামর্শে সাইকিয়াটিস্টের কাছে গেলাম একবার। যাওয়ার সময়ে মনে মনে নিজেকে সমানে উৎসাহ দিয়ে গেলাম, ব্রেভো, ওয়েলডান, ইত্যাদি বলতে বলতে। নিজেকে খুব আধুনিক মনের মানুষ মনে করছিলাম তখন। কেননা, এই যে যাচ্ছি, আমার একবারও সংকোচ হল না, মনে এলো না – ইসস আমি কি পাগল নাকি! কারণ, আমি আধুনিক মনস্ক মানুষ, আমার মনে যদি কোনো সংশয় আসে, আমি সেই মনের জট ছাড়াতে মনের ডাক্তারের কাছে যেতে পিছপা হই না। আমি সত্যিই অত্যাধুনিক হয়ে উঠছি, বুঝতে পারছিলাম নিজেই! যাই হোক, ডাক পড়লে ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম। খুব মিষ্টি করে হেসে ডাক্তারবাবু বসতে বললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন – আপনার সমস্যাটা কী? আমি তো অপেক্ষায় ছিলাম এতক্ষণ, কখন এই প্রশ্ন আসবে। এবার গড়গড় করে আমার গুড়গুড়ের কথা বলে ফেললাম। ভেবেছিলাম, উনি বোধহয় অবাক হবেন। তো দেখলাম, ওনার মুখের একটি রেখাও কাঁপল না। আমাকে দেওয়ালে টানানো একটা বোর্ড দেখিয়ে বললেন, সবুজ আলোটা দেখতে পাচ্ছেন? আমি তো থ! কোথাও কোনো সবুজ আলো নেই এ ঘরে। আর আমি রঙ-কানাও নই, তাহলে! শেষমেশ বলেই ফেললাম – নাহ, এই ঘরে কোনো সবুজ আলো নেই। এবার উনি আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কী কী দেখতে পাচ্ছেন ওই বোর্ডে ?” আমি আবারো খুঁটিয়ে দেখলাম। দেখলাম – একটা নিরীহ বোর্ডে একটা সাধারণ হলুদ বাল্বের নীচে আরও কয়েকটা অতি নিরীহ কাগজ বোর্ড-পিনে গেঁথে ঝুলছে। বুঝতে পারছিলাম না ডাক্তার কী চায়। বোর্ড, বাল্ব না কাগজ! আমি বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে যাওয়ার ভাণ করে, সপাটে গড়গড় করে যা দেখলাম তাই বলে দিলাম।
      ডাক্তার দেখলাম গম্ভীর মুখ করে খসখস করে প্রেশকিপশান লিখতে লাগলেন। আমি ভেতরে ভেতরে আরও ঘামতে লাগলাম। এরপর মুখ তুলে উনি আমায় বললেন, আপনার একটা বিরাট গোলমাল হচ্ছে কোথাও। আমি তুতলে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কো...থাথায়?  তো তিনি একটা খুব শক্ত রোগের নাম বললেন। আমি ওরকম সিনড্রোমের নাম আগে কোথাও শুনিনি। যা থাকে কপালে, এই ভেবে বলেই ফেললাম, ডাক্তার বাবু – আমি কি আর বাঁচবো না! প্লীজ আমায় বাঁচান!! আমি কিছুতেই ডিপ্রেশানের ওষুধ খাবো না, কিছুতেই ইলেক্ট্রিক শক খাবো নাআআআআআআ...। এবার বোধহয় ডাক্তারবাবু ঘাবড়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে পড়ে বললেন, ডোন্ট ওরি, আপনাকে এসব কিছুই করতে হবে না। আপনি শুধু সপ্তাহে একবার আমার চেম্বারে আসবেন, এসে আমার সাথে একটু গল্পটল্প করে যাবেন। আমি অবিশ্বাসের সুরে বললাম – ব্যাস এতেই হবে! একমুখ হাসি নিয়ে তিনি ঘাড় নাড়লেন। আমিও ওনার ফিজ দিয়ে চলে এলাম। পরের সপ্তাহে এলে, উনি আবার সেই বোর্ড আর সবুজ আলোর খেলায় মাতলেন। এবারও যথারীতি আমি সবুজ আলো দেখতে পেলাম না। তার পরের সপ্তাহেও তাই, তার পরেও তাই।
       হঠাৎ রাতে শুয়ে আমার মাথায় এলো, আরে এভাবে ডাক্তার ব্যাটা আমায় উল্লু বানাচ্ছে না তো! শুধুশুধু আমার কিছু পয়সা খসিয়ে দিল! ঠিক আছে আবার গেলে আমি বলে দেবো – হ্যাঁ আমি সবুজ আলো দেখতে পাচ্ছি। ব্যাস যেমন ভাবা তেমনই কাজগটগট করে চেম্বারে ঢুকে প্রশ্নের অপেক্ষায় বসে রইলামঅবশেষে প্রশ্ন এলো – সবুজ আলো দেখতে পাচ্ছেন? আমি উত্তর নিয়েই বসে ছিলাম, ফটাস করে ছিটকে বেরোল উত্তর – হ্যাঁ। আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি আবার বললাম – হ্যাঁএইবার উনি বললেন, আর আসতে হবে না আপনাকে। আপনার রোগ সেরে গেছেঠিক একমাস পরে এসে আমায় রিপোর্ট করবেন, এর মধ্যে আপনার পেট গুড়গুড় আর করেছে কিনা। আমার ঠিক বিশ্বাস হল না, তবুও ভাবলাম দেখাই যাক না, কী হয় একমাসে ! একমাসের মধ্যে যখনই পেট গুড়গুড়ের কথা মনে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের সবুজ আলোর প্রশ্নটাও মাথায় ধাক্কা মেরেছেফলে পেট আর মাথার ভীষণ ঠোকাঠুকিতে গুড়গুড় আর সবুজ আলো দুটোই ভ্যানিশ! নাহ আমার আর পেট গুড়গুড় করে না, আর সবুজ আলো দেখার জন্য ডাক্তারের কাছে ফিজ গুনতেও যেতে হয় না
        এই তো এখন আমি দিব্যি সুস্থ । আমি আর আমার সত্যি-গুড়গুড় নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করি না । মিথ্যে কোনো সবুজ আলোও আর তাড়া করে না। পেট আছে, খিদেওযেমন আলো আছে তার স্বমহিমায় । শুধু ওই পেট গুড়গুড় ভীষণ ভাবে মিথ্যে হয়ে গেছেআর যে মিথ্যে সবুজ আলোর ভয়ে আমি ঠিক হয়ে গেলাম, সেই সবুজ আলো মাথার কোনো লুকনো ঘরে দপদপ করে জ্বলছে আজও