মেঘশ্রী ব্যানার্জী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মেঘশ্রী ব্যানার্জী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

মেঘশ্রী ব্যানার্জী

                                            



বর্ষার একটি দিন"



(১)

নিজের নামটা এক্কেবারে পছন্দ নয় বর্ষার। কী ভীষণ চেনা নাম। ছোট্টবেলা থেকেই সবাই দুলে দুলে মুখস্থ করে নেয় ছয় ঋতু। তারই একটা বর্ষা। কেউ বলে না " কী সুন্দর নাম!" কেউ জিজ্ঞাসা করে না  "নামের মানে কী?" যেন নামটার কোনো গুরুত্বই নেই! অবশ্য বাবা-মা বলেন যুগে যুগে কবিদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হল গিয়ে এই বর্ষা। গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা, ঝুরি ঝুরি গান - এগুলো তো আর এমনি এমনি নয়! সাহিত্যের অঙ্গনে বর্ষার  প্রাধান্যকে তো অস্বীকার করা যায় না! এইসব সান্ত্বনা বাক্য বহুবার শুনে শুনে যে একটু স্পেশাল ফিল হয় না তা নয়, তবু বর্ষাকালটাই তার মোটেও প্রিয় নয়। বিশেষতঃ যার বাড়ির সামনে ব্যাঙে ইয়ে করলেও এক কোমর জল দাঁড়িয়ে যায়, তার নাম বর্ষা হওয়াই উচিৎ নয়, কক্ষনো নয়। 

বারান্দায় গ্রিলের ফাঁকে নাকটা ঢুকিয়ে দিয়ে কানের পাশের গোছা চুল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে পেঁচার মত মুখ করে এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল বর্ষা। কখন বাবাই এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি,
"আজ নাই বা গেলি…"
"অসম্ভব! আজ যেতেই হবে।" 
"এত জল রাস্তায়… টোটো পাবি না, অটোও পাবি না।"
"বাস পেয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। আজ… খুব জরুরি ক্লাস আছে"
"তাহলে চল। ঠাম্মি ভাত বেড়েছে…"
টেবিলে এসে দেখে মা খেতে শুরু করে দিয়েছে। বাবাইও বসে পড়ল। বৃষ্টির দিনে একটু সময় হাতে নিয়ে না বেরোলেই নয়। শুনতেই রোডের কাছে বাড়ি। জল জমলে রিক্সার টিকিও পাওয়া যায় না। ঠাম্মি শুধু ধোঁওয়া ওঠা ভাতই বাড়েনি সাথে ইলিশ মাছ ভাপাও বেড়েছে। এই দুর্ধর্ষ যুগলবন্দী দেখেও মনটা ভালো হল না। এত তাড়াহুড়োতে ইলিশ খাওয়া যায়? ওই যে কথায় বলে চাঁদেরও কলঙ্ক আছে, তেমনই কাঁটা হল ইলিশের কলঙ্ক! মাছভাজার তেল দিয়ে অর্ধেক ভাত সাবড়ে উঠে পড়ল বর্ষা। 
"কিরে...মাছ খেলি না?" মায়ের হতবাক গলা ভেসে আসে, যেন বর্ষা নয় এতক্ষণ বিড়াল বসেছিল চেয়ারে। 
"রাত্রে খাব মা। কাঁটা বাছার সময় নেই।"
"বলবি তো.. আমি বেছে দিচ্ছি… বোস এসে"
"না মা দেরি হয়ে যাবে"
"আজ আর বেরোস নি বর্ষা। রাস্তাঘাটের অবস্থা মোটেও ভালো না…আর তোর যে জায়গায় কলেজ..." মায়ের গলায় বাবার সুর।
"আজকে যেতেই হবে। আজ বৃহস্পতিবার!" 
"বৃহস্পতিবার তো কী হয়েছে? কলেজে নিরামিষ খিচুড়ি ভোজ নাকি?"
"উফফফফ মা… "
"উফফ আবার কী? প্র্যাকটিকালও তো নেই আজ! শুধু ওই ইংলিশ ল্যাবটা আছে। ডুব মেরে দে"
উফফফফফ্! কী বিরক্তিকর! মায়ের সব মনে থাকে কবে কী ক্লাস! আজ সত্যিই কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্র্যাকটিকাল ক্লাস নেই। থিওরি ক্লাসের নোট কারুর থেকে পেলে ম্যানেজ করাই যায়…কিন্তু বর্ষাকে যে আজ যেতেই হবে! কী করে বোঝাবে মাকে? উত্তর না দিয়ে রেডি হতে শুরু করে চুপচাপ। ফার্স্ট ইয়ার। ইউনিফর্ম পরাও জরুরি। একে এই জল, তার উপর সাদা ড্রেস। ভেবে পায় না বর্ষা ইউনিফর্ম মানেই সাদা সাদা কেন? কালো লাল সবুজ বাদামী খয়েরী নয় কেন? এগুলো কী রঙ নয়? যদি নাই হবে, তাহলে বিয়ের সময় সাদা বেনারসী কেন পরে না? যত্তসব। গোটা দুনিয়াটাই গোলমেলে। আর এই যখনতখন বৃষ্টিটাও। 

(২)

যা ভেবেছিল ঠিক তাই! অটো নেই একটাও। টোটোও নেই। অবশ্য নেই বলাটা ঠিক হবে না। রোজ যাত্রী পাওয়ার জন্য মারামারি-কাড়াকাড়ি করা অটো আর টোটোগুলো আজ রাস্তার দু'ধারে জলমগ্ন হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। বাবাকে তো দুম করে বলে বসল বাস পেয়ে যাবে, কিন্তু বাস এলে তো! যদি ভুল করে এসেও পড়ে তার গতি তিনশো বছরের বুড়ো কচ্ছপকেও হার মানায়। ইসসস…. ক্লাসটা মিস হয়ে যাবে!! রাস্তা বেশ ফাঁকা। এতটাই ফাঁকা যে বাজিমাত সিনেমা হলের সামনে দিবারাত্র বদন প্রদর্শনকারী বখাটেগুলোও আজ নেই। বর্ষা একাই পাগল যে কিনা এই বৃষ্টি মাথায় করে কলেজ যাচ্ছে। বাবা-মা পই পই করে আজ বেরোতে মানা করেছিল। তবু তাকে যে আজ আসতেই হতো। কিন্তু… একটা চিন্তা মনে আসতেই পেটের ভিতর গুড়গুড় করতে লাগল। এত বিশ্রী ওয়েদারে এত তোড়জোড় করে, এত জল ভেঙে যার জন্য আকুপাকু করে কলেজে ছুটছে… সে আজ আসবে তো? মুহূর্তে  মুখটা আকাশের চেয়েও কালো করে এলো। যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়বে। 

এরকমভাবে আর কতক্ষণ একটা স্ল্যাবের উপর দাঁড়িয়ে থাকা যায়? সেটাও স্টেডি নয়। ঢকঢক করছে। নিচে নেমে দাঁড়ালে হাঁটু অবধি জল। সেই সাদা জামায় কাদা কবেই লেগে গেছে শুধু 'কেনে কাদা দিলি?' বলে  চিল্লানোর উপায় নেই। পুরোটাই হয়েছে বর্ষার মর্জিতে। গোমড়া মুখে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে একটা আশার বিন্দু দেখতে পেল - বহুদূরে। বিন্দু ক্রমশঃ বড় হতে হতে সিন্ধু থুড়ি একটা রিক্সার আকার নিচ্ছে। এখনও বোঝা যাচ্ছে না রিক্সাটা খালি নাকি লোক আছে! যদি খালি থাকে আর না দাঁড়ায়? রিক্সাটা এবার বেশ কাছাকাছি এসে গেছে। চালকের চোখে সানগ্লাস। অথচ রোদ ওঠে নি। মাথা মুখ সব উত্কট গোলাপী গামছায় ঢাকা। গায়ে রেইনকোট। যদিও বৃষ্টি নেই। সিটের ওপর শ্যাওলা রঙের ত্রিপল ফেলা। চোপসানো মতো। মানে কেউ বসে নেই। বর্ষা প্রাণপণে হাত নাড়াচ্ছে, এত জোরে যে কব্জি খুলে জলে তলিয়ে গেলেও আশ্চর্য হবে না, "রিক্সা….. অ্যাই রিক্সা….আ…. আ...রে দাঁড়াও দাঁড়াও…."  নাঃ ফস করে বেরিয়ে গেল রিক্সাটা। এদিকে উত্তেজনায় বর্ষা যে কখন হাঁটু জলে নেমে পড়েছে সে নিজেও জানে না। ধুর ধুর ধুর ধুর…! বুকের ওপর ব্যাগপ্যাকটা চেপে স্ল্যাবে ফিরে যাবে না এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে ভাবতে ভাবতে দেখে উল্টোদিক থেকে একটা রিক্সা আসছে। এমনিতেই উল্টোদিকের রিক্সাগুলো দাঁড়াতে চায় না, তার উপর এত জল। ও মা! রিক্সাটা তো ওর দিকেই আসছে… আগের রিক্সাটাই না? যেটা এইমাত্র বর্ষাকে ডিচ করে বেরিয়ে গেল? হ্যাঁ ওইটাই তো! চালকের মাথায় সেই গোলাপি গামছা... রিক্সাটা জমা জলে ঢেউ তুলে এক্কেবারে বর্ষার সামনে এসে থামল, যেন পক্ষীরাজ নিয়ে রাজপুত্তুর।  
"আমার নাম রিক্সা নয়…" হকচকিয়ে যায় বর্ষা! এবার থেকে প্রত্যেকটা রিক্সাকে ডাকার আগে ওদের নাম-ধাম জেনে নিয়ে ডাকতে হবে নাকি! 
"আমি পাল...সুশীল পাল!"
এইরকম জেমস বন্ড মার্কা পরিচয় পর্বে বর্ষার নিচের চোয়াল একহাত ঝুলে পড়তে না পড়তেই ধেয়ে এলো পরের প্রশ্ন
"তুমি চশমা পরোনি কেন?"
এই বর্ষায় ছাতা নেই কেন বা রেইনকোট নেই কেন - এসব প্রশ্নের একটা জাস্টিফিকেশন আছে, কিন্তু চশমা? লোকটা কী পাগল? রিক্সাটা ছেড়ে দেবে? কিন্তু আধ ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে এই অগতির গতি পালবাবুকে পেয়েও ছেড়ে দেওয়াটা কী ঠিক হবে? আশেপাশে যতদূর পারা যায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে আর কোনো খড়কুটো না পেয়ে অগত্যা জিজ্ঞাসা করে বর্ষা 
"কলেজ যাবে?"
"নাঃ! এই বয়সে আর…"
"উফফফফ্ লিলুয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যাবে?"
"ও হ্যাঁ! যাব তো। দেখেই বুঝেছি তুমি কলেজেই যাবে। তাই তো ফিরে এলাম…"
বর্ষা বোঝে না যে সে কী দেখে বুঝল! ব্যাগপ্যাক না উইনিফর্ম! আর কথা না বাড়িয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে ত্রিপল সরিয়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে। রাজ্যের নোংরা ত্রিপলে। বোঁটকা গন্ধ! এই সময়েই আরেকটা গন্ধ ধক করে নাকে এল। এইবার লোকটার এলোমেলো কথার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। মদ্যপ ব্যাটা। এমনিদিনে হলে এই রিক্সায় কিছুতেই চড়ত না বর্ষা। কিন্তু আজ….
"কত নেবে?"
"যা খুশি দিও.." মানেই পরে গিয়ে ঝামেলা করবে। যাক গে যা হয় হবে… ভাড়াটা নেমেই ঠিক করবে না হয়। তবু কলেজের কাছে নামলে চারটে লোকজনের মাঝে বল ভরসা। 

পালবাবু প্যাডেলে চাপ দিয়েই গান ধরেছেন, "জানা অজানা পথে চলেছি…." 
মোবাইলটা চেইন থেকে বের করে টাইম দেখে বর্ষা। এখনও সময় আছে। ক্লাসটা ধরা গেলেও যেতে পারে। আচ্ছা, যাজ্ঞসেনী কি এসে গেছে এতক্ষণে? আলবাত এসে গেছে। আর ফার্স্ট বেঞ্চে থাবা গেড়ে বসেছে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে। শুধু বৃষ্টি কেন! ভূমিকম্প হলেও অর্জুন স্যারের ক্লাস মিস করবে না। দরকার পড়লে হেলিকপ্টারে করে কলেজের ছাতে নামবে! বড়লোকদের সবই ভালো। নামটাও কী ভালো! যাজ্ঞসেনী! নাম শুনে অর্জুন স্যার শুদ্ধুও ইম্প্রেসড! বলেছেন "হোয়াট আ বিউটিফুল নেম!" তারপর থেকে যাজ্ঞসেনীর মাটিতে পা পড়ে না! হায় রে! বর্ষারও যদি অমন সুন্দর একটা ভারিক্কি নাম থাকত! সকালের মনখারাপটা আবার নতুন করে ফিরে এল। 

এই অর্জুনস্যার হলেন কলেজের তামাম ছাত্রী-বাহিনীর ক্রাশ আর ছাত্রদলের হিংসার পাত্র! উনি ক্লাসে ঢুকলে ছাত্রীরা চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়। ক্লাস শুরু হলে মনে হয় আজ সারাটাদিন যেন পিরিয়ড শেষের বেল না বাজে! তার চেয়েও বড় কথা হল, স্যার পড়াতে পড়াতে একটাও বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন না। এমন কী ক্লাসের বাইরেও না! কতবার স্যারকে একটু দেখার আশায়, একটু কথা বলার জন্য অঙ্ক নিয়ে মেয়েরা স্টাফরুমে গেছে টিফিনের সময়… কিন্তু স্যার তখনও অনর্গল ইংলিশে পড়া বুঝিয়ে গেছেন! এ হেন অর্জুন স্যারের জন্যই তো আজ ঘোলা জল কোমরে করে আর দুর্যোগ মাথায় করে কলেজ পানে ধেয়ে চলা।

আসলে হয়েছে কী উনি একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন। আজকে সেটা জমা দেওয়ার শেষ দিন। মেক্যানিক্সের অঙ্কগুলো সব সহজ হয় না। রীতিমত মাথা ঘামিয়ে, বই ঘেঁটে, নেটে খুঁজে নামাতে হয়। বর্ষা এক সপ্তাহ ধরে দিনরাত এক করে সবকটা প্রবলেম সলভ করেছে। যেন ফার্স্ট সেমিস্টারে আর কোনো বিষয় পড়ার দরকারই নেই! ওদিকে বিরোধীপক্ষও জোর কদমে লেগে আছে। অর্জুন স্যারের টাস্ক বলে কথা! কবে, কিভাবে বর্ষা আর যাজ্ঞসেনীর মধ্যে এই সুপ্ত প্রতিযোগিতা শুরু হল তা বলা মুস্কিল! তবে অর্জুন স্যারের ক্লাস থাকলে একদিন যাজ্ঞসেনী দশ মিনিট আগে আসে তো পরেরদিন বর্ষা কুড়ি মিনিট আগে। ফার্স্ট বেঞ্চের দখল নেওয়াটা খুব জরুরি। আজ সকাল অবধিও গোপনসূত্রে খবর পেয়েছে যাজ্ঞসেনী সবকটা প্রবলেম সল্ভ করতে পারে নি। ব্ব্যাস! আর কী চাই? এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? এমনিতেই ওদের রেশারেশিতে শুধুমাত্র নামের জন্য বর্ষা এক গোল খেয়ে বসে আছে। 

"এক লড়কি ভিগিভাগি সি.." কানে আসতেই বর্ষা নড়েচড়ে বসল। জামাটা হাঁটুর নিচে টেনে দিয়ে ব্যাগপ্যাকটা বুকে জড়িয়ে ভুরু কুঁচকে পালবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা আর গান পেল না! ইতর কোথাকার! কলেজ পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই! এইখানে রাস্তাটা এমনিতেই নরক-গুলজার! বসুন্ধরা এখানে ধনধান্যে নয় খানাখন্দে ভরা। রাস্তায় পিচ-সুরকি যাই ঢালা হোক না কেন দু'দিন পরেই দাঁত বেরিয়ে ছিরকুটি হয়ে যায়। রিক্সা ক্রমাগত দোদুল দোলে দুলছে। যেন থইথই জলে টাইটানিক! আর জলের রঙ তো মনে রাখার মত! এ জলকে এক কথায়  ঘোলা বা নোংরা বলা যাবে না। এর একটা বিশেষত্ব আছে। দুই পাশে সারি সারি কারখানার মাল-মশলাগুলোও দিব্যি মিলেমিশে গিয়ে কালো জলের উপর একটা চকচকে গাঢ় হলুদ আস্তরণ ফেলেছে! রঙটা প্রাতঃকালীন একটি বিশেষ বর্জ্য পদার্থের কথা মনে পড়ায়! গা'টা গুলিয়ে উঠল বর্ষার! 

কোনো কোনো কারখানার সাটার অর্ধেক তোলা। লম্বা লম্বা লোহার রডের স্তূপ উবুচুবু হয়ে পিঠ দেখাচ্ছে আইসবার্গের মত। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা সাইকেল আসছে যাচ্ছে। পিছন থেকে একটা রুটের বাস হর্ন দিচ্ছে। ইসসসস... বাসটা সেই এলো অথচ এত দেরিতে। পিছনে বাস আসছে না অ্যানাকোন্ডা তাতে চালকের কোনো হেলদোল নেই। রিক্সাটা এক্কেবারে রাস্তার মাঝখন দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে শামুকের গতিতে এগোচ্ছে। পালবাবু বোধহয় কোনো এক যাত্রাপালা থেকে রিক্সা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আজই সেই পালার যত গান উজাড় করে দিয়ে দম নেবেন। !  "বাস আসছে তো, সাইড করো… হর্ন দিচ্ছে শুনছ না?" একটু থামল গান। বাস আসায় ভারি বিরক্ত। যে রাজপথ আজ তার নামে লিখে দেওয়া হয়েছিল তাতে বাসের ভাগ বসানোটা পালরাজার পছন্দ হল না। তড়াক করে সিট থেকে জলে লাফিয়ে পড়ে প্রবল চেষ্টায় গোঁত্তা খেতে খেতে রিক্সাটা টেনে রাস্তার ধারে নিয়ে গেল। বাসটা রাস্তা খালি পেয়ে হুঙ্কার দিতে দিতে বেরিয়ে গেল। পিছনে ফেলে গেল হলুদ রঙের বড় বড় ঢেউ, যেগুলো রিক্সার মধ্যে এসে জলকেলি খেলতে  লাগল। পাশের একটা ভজনালয় থেকে হরে-কৃষ্ণ হরে-রামো ভেসে আসছে। তার সামনেই ডাঁই হয়ে পড়ে থাকা ভোজন উচ্ছিষ্ট, শালপাতা ভেসে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। সুশীল পাল তিনকোণা সিটে বসেই এবার ভক্তিরসে ডুব দিল, "আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল…" আবেগে ভেসে গিয়ে দুটো হাত হ্যান্ডল ছেড়ে যেইনা কপালে জড়ো হল অমনি প্যাডেলটাও পা ফস্কে গেল! আর রিক্সাটাও টাল সামলাতে না পেরে খেয়ে ওঁত পেতে থাকা  জলমগ্ন গর্তে এপাং ওপাং ঝপাং স্টাইলে উল্টে গেল - যেন ভাসান হওয়া প্রতিমা!

বর্ষা কিছু টের পাওয়ার আগেই বুঝল সে প্রথমে সামনের দিকে তারপরেই বাঁ-পাশে হেলে পড়েছে। যে জল হাঁটু অবধি ছুঁয়ে গেছে বলে ঘেন্নায় কুঁকড়ে ছিল, সেই পিঙ্গল জল থেকে কোনোমতে শুধু মুন্ডুটা বেরিয়ে আছে! বিপদের এখানেই শেষ নয়, সুশীল পাল বিপদ বুঝে উল্টোদিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। ফলতঃ গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে রিক্সাটা ঝপাং করে বর্ষার ঘাড়ে এসে পড়ল। চারিদিকে একটা হই-হই রব, "এই ধর ধর তোল তোল"। রিক্সাটা ধীরে ধীরে সোজা হলে পরে বর্ষা কারুর একটা হাত ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটাও ভিজে সপসপ করছে। টপ্টপ করে জল গড়াচ্ছে। মানে এসাইন্মেন্টটাও…. ইসসসসস!
"দিদি আপনার লাগে নি তো?" 
"দিদি হাসপাতালে যাবেন?"
"দিদি ও দিদি…."
"না না… আমি কলেজ যাবো।"
লোকজন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল… এই অবস্থায় কলেজ? লজ্জায় মাটিতে  মিশে যাচ্ছে বর্ষা! এই অবস্থায় কলেজে যাবেই বা কি করে? এই রিক্সায়? এইভাবে কোনোদিন সেন্টার অফ এট্রাকশন হতে হবে জন্মেও ভাবেনি! ভিড়টাই ত্রাতা হয়ে চটপট বাকি ব্যবস্থা করে ফেলল। কিশোর কুমারের রেপ্লিকাকে চল্লিশ টাকায় বিদেয় করল বর্ষা। সে ব্যাটা শুকনো মুখে আমতা আমতা করে বলেছিল বটে, "আমিই পৌঁছে দিচ্ছি না হয়… আর ক'টা টাকা…" লোকজনের হস্তক্ষেপে পালবাবু পালিয়ে বাঁচল। আরেকটা রিক্সা জোগাড় করে অবশেষে তারাই কলেজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করল।

(৩)

কলেজে গিয়ে যদিও আর বিশেষ কোনো লাভ নেই। অর্জুন স্যারের ক্লাস এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। অ্যাসাইনমেন্টটা ব্যাগে ছিল। নির্ঘাত আধডোবা লেড়ো বিস্কুটের মত দশা এখন তার! তবু পায়ে পায়ে এগোলো। বৃন্দাবন চত্বর আজ ধূ ধূ! নাঃ যতই জল জমুক রাস্তায়, কলেজে তার লেশ মাত্র নেই। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল। দু'একটা স্টুডেন্ট ওঠানামা করছে আর ওকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। ভিজে জামাটা পরে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল বর্ষার। এতক্ষণের ঝুটঝামেলায় জামাটা গায়েই অনেকটা শুকিয়ে গেছে। তবু গা ঘিনঘিনে করছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে ক্লাসের ভিতর উঁকি মারল । গোটা দশ বারোজন বসে আছে। বেশিরভাগই হোস্টেলের। নাঃ যাজ্ঞসেনীকে দেখতে পেল না। আসেনি? না বাইরে গেছে? ক্লাসে আর ঢুকলো না বর্ষা। স্টাফরুমের দিকে এগোলো। অর্জুন স্যার ঘরে নেই। এসেছেন তো? কোনো স্যার বা ম্যামকে জিজ্ঞাসা করে দেখবে? নাঃ থাক! আসলে কারুর নজরে এই দশায় পড়তে চাইছে না।  অ্যাসাইনমেন্টের পাতা দুটো ইতিমধ্যে ব্যাগ থেকে বের করে হাতে নিয়েছে। একদম নষ্ট হয়ে যায় নি। স্যাঁতস্যাঁত করছে কাগজটা। অর্জুন স্যার অনেক সময়ই ল্যাবে থাকেন। বর্ষাদের ফার্স্ট ইয়ারে মেকানিক্সের ল্যাব নেই। কিন্তু সিনিয়রদের আছে। একবার গিয়ে দেখবে? 

এই বিল্ডিং থেকে নেমে একটা মাঠ আর তার লাগোয়া ক্যান্টিন, "খেলে খান নয়তো যান"। ক্যান্টিন দেখেই সকালের ইলিশমাছের কথা মনে পড়ে গেল। ল্যাবে উঁকি মারতেই দেখা পেল অর্জুন স্যারের। রাজকীয় মহিমায় চেয়ার আলোকিত করে কিসব খাতা চেক করছেন। ওদের এসাইনমেন্ট পেপার নাকি?
"স্যার আসব?" 
ঘাড় ঘোরালেন অর্জুন স্যার। একটু অবাক। ফার্স্ট ইয়াররা ল্যাবে তো আসে না। 
"কাম ইন"
খুবই সঙ্কুচিত ভঙ্গিতে টেবিলের ওপারে এসে দাঁড়ালো বর্ষা।
"হোয়াট হ্যাপেনড টু ইউ?"
"প...পড়ে গেছি।"
একবার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বললেন, "হোয়্যার? ইন দ্য ক্যাম্পাস?"
"নো স্যার। ইন দ্য রোড। রিক্সা থেকে জলে পড়ে গেছি।"
"জিসাস! আর য়ু হার্ট?"
বর্ষার মনে পড়ছে না ব্যথা আছে কিনা! ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে স্যারের এই কনসার্নটুকু। টেবিলের একপাশটা খুঁটতে খুঁটতে মাথা দু'দিকে নাড়ায়। অ্যাসাইনমেন্টটা এগিয়ে ধরে।
"ইউ কেম টু সাবমিট দিস? রিয়েলি?"
স্যারের গলায় বকুনির আভাস। ঘাড় নাড়ে বর্ষা।
"হোয়াই ইউ ডিডন'ট রিটার্ন হোম? ইউ রিয়েলি ডিডন'ট হ্যাভ টু কাম দিস ফার ফর দ্য এসাইনমেন্ট...ইট কুড ওয়েট!" স্যারের গলা চড়ছে।
অভিমানে মুখটা থমথম করছে বর্ষার। ইট কুড ওয়েট? সত্যি? সকাল থেকে একের পর এক অবশ্যম্ভাবী অনুচিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইলিশ ছেড়ে, বাবা-মার কথা অমান্য করে, জলে ডিগবাজি খেয়ে ছুটে এসেছে শুধুমাত্র যে স্যারের অ্যাসাইনমেন্টটা জমা দিতে, সেই তিনিই কিনা বলছেন না আসলেও চলত? বর্ষার নাম না হয় যাজ্ঞসেনীর মত সুন্দর না,  কিন্তু ওর সিন্সিয়ারিটি ওর কমিটমেন্ট নিয়ে স্যারের কিচ্ছু বলার নেই? ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ম্যামও নিজের কাজ ফেলে এদিকে তাকিয়ে আছেন। সকাল থেকে সহ্য করা সমস্ত অভিমান, লজ্জা, অপমান ঝরঝর করে ঝরে পড়ল। একটু ঘাবড়ে গেলেন স্যার। 
"আরে… কাঁদছ কেন? বোসো বোসো" একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললেন "পরীক্ষা তো নয় যে অ্যাটেন্ড করতেই হবে!"
চোখের জল তবু বাঁধ মানছে না। আধভেজা ওড়না দিয়ে চোখ মুছেই চলেছে। "আজ তো একজনও অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয় নি। একদিন দেরিতে দিলে কী ক্ষতি ছিল?"
ম্যামও উঠে এসেছেন এই টেবিলের কাছে 
"জল খাবে একটু?" 
জল খেতে খেতে একটু ধাতস্ত হল বর্ষা। কান্না থামল। স্যার ততক্ষণে স্যাঁতস্যাঁতে পাতাগুলো যত্ন করে টেবিলের উপর বিছিয়ে পেপারওয়েট চাপা দিচ্ছেন। হঠাৎ বর্ষার খুব ভালো লাগতে শুরু করল। 
"থ্যাঙ্কিউ ম্যাম। থ্যাঙ্কিউ স্যার…" বলে উঠে দাঁড়ালো। 
অর্জুন স্যার বললেন, "এরকম আর কোরো না  বুঝলে?"
মাথা একপাশে হেলাল "আসছি স্যার" 
"একা একা যেতে পারবে?"
"পারব" গলা বুজে এসেছে। 
"ফিরবে কিসে?"
"বাস চলছে"
"সাবধানে যেও।" একটু ইতস্তত করে বললেন, "বাড়ি ফিরে খবর দিও পারলে। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছ তো?"

"দেব…" ল্যাব থেকে বেরিয়ে এল বর্ষা। কী সুন্দর বৃষ্টিভেজা দিন। ডান পায়ে একটা ব্যথা টের পাচ্ছে হাঁটতে গেলে। তবু মনটা খুব খুশি খুশি। হেঁটে তো নয় মনে মনে প্রায় উড়তে উড়তে কলেজের বাইরে চলে এলো। আবারও রিক্সা নিতে হবে। না হয় নেবে! না হয় আবারও পড়ে যাবে! ইসসস…. সুশীল পালকে আরও কুড়িটাকা বেশি দেওয়া উচিৎ ছিল। মনে মনে আক্ষেপ করে শেষে একটা ধন্যবাদই দিয়ে ফেলল তাকে। আজকে তার জন্যই যাজ্ঞসেনীকে একগোল দিয়েছে বর্ষা। না না,  অ্যাসাইনমেন্ট জমা করেছে সেটা কোনো বড় কথা নয়… আজ না হয় কাল সকলেই জমা দেবে। বর্ষার আজ এক পরম প্রাপ্তি হল, যেটা যাজ্ঞসেনীর কোনোদিন হবে না। আজ অর্জুন স্যার ওর সাথে, শুধুমাত্র ওর সাথে বাংলায় কথা বলেছেন! আচ্ছা, মেসেঞ্জারে যখন বর্ষা জানাবে ও বাড়ি পৌঁছে গেছে… স্যার কি উত্তর দেবেন? কোন ভাষায় দেবেন? বাংলা? 

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০

মেঘশ্রী ব্যানার্জী

                  



বিজন ঘরে





আয়নার মুখোমুখি হলেই সিঁথির চেরাপথে সোহাগের সাথে অভিজ্ঞতার সহবাস। রূপালি রেখা দিনে দিনে সংখ্যা গরিষ্ঠ। ক'দিন ধরেই ফরসেপটা খুঁজে পাচ্ছি না। বড় বাক্স, ছোট বাক্স, বড় ব্যাগ, ছোট ব্যাগ সব তন্ন তন্ন করে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ গিয়ে পৌঁছলাম পঞ্চাশ নম্বর সাতকড়ি চ্যাটার্জী লেনের বাড়িতে। 


একতলায় দিনের বেলা আলো তেমন ঢোকে না। তাও ছুটির দুপুরে হাফ পর্দা ফেলা জানলার দিকের খাটে দুটো নরম বালিশে মাথা দিয়ে এলোচুলে শুয়ে থাকতে তুমি। আর আমি ফরসেপ হাতে অপরাধী খোঁজার মতোই প্রখর দৃষ্টি দিয়ে ধরতাম আর কুট কুট করে উপড়ে ফেলতাম তোমার মাথার ছোট্ট ছোট্ট পাকাচুলগুলো।


'পাকা চুল তুললে আরও বেশি গজাবে' এই কথাটা হেন লোক নেই যে আমাদের বলে নি। তবু থোড়াই কেয়ার করতাম? আমার উৎসাহ ছিল তোমার তিন গুন। কারণ প্রতি পাকাচুল পিছু প্রথমে দু'টাকা করে পেতাম। তারপর চুল যখন চক্রবৃদ্ধি হারে পেকেই চলল তখন এক টাকা, পঞ্চাশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা, এমনকি শেষে দশ, পাঁচ, এক পয়সায় এসে দাঁড়াল। কই পরোয়া নেহি। আমার লাভের খাতায় তাতেও বেশ ভালোই জমা হত। তখন আবার পাশে ঠোঙা নিয়ে বসতাম যাতে তোলা চুলগুলো ইতস্ততঃ ছড়িয়ে না পড়ে। হিসেবে আমি বড় পাকা! 


তবে এই হিসেবের খেলাটায় তুমি সব সময় আমার গুণতি ভণ্ডুল করে দিতে। পঞ্চাশটা হয়ে গেলে বলতে সবে ত্রিশ। আর আমিও বুঝে শুনে ছদ্মকোপে ফেলে দিতাম সন্না 'যাও আর তুলে দেবো না'। তুমিও তখন 'লক্ষ্মী মেয়ে সোনা মেয়ে'র বন্যা বইয়ে দিতে। শেষে আমি বুদ্ধি বের করলাম ঢ্যাঁড়া কাটার। চুলের চুলচেরা হিসাবে কাঠের বিবর্ণ দরজার পিছনে চক দিয়ে দাগ টেনে দিতাম। পাওনাগণ্ডা না মেটা অবধি সেই দাগের পরের লাইনে আবার দাগ যোগ হত। হিসাব মিটলে যখন কাপড় দিয়ে মুছে দিতে দাগগুলো তখন দরজার পিঠটা ঘোলাটে সাদা হয়ে থাকত। তার উপরেই আবার নতুন করে দাঁড়ি কাটা হত পরের দিন। 


দাঁড়ির কথায় মনে পড়ে গেল, ওই দরজার পিছনেই দাঁড়ি কেটে কেটে গুনতে শিখিয়েছিলে। দশ, কুড়ি, ত্রিশ মানেই আগের ন'টা দাগের পেট বরাবর একটা করে ঢ্যাঁড়া। দিনের আলোর ঘরে প্রবেশে যতটা দ্বিধা, রাতের ল্যাম্প পোস্টের ঘষা ঘষা হলদেটে আলোটার ততই উৎসাহ মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ার। আলো নিভিয়ে দিলেও দিব্য দেখা যায় কড়িকাঠ। যেন একটা মস্ত হারমোনিয়াম কেউ উল্টো করে টাঙিয়ে রেখেছে। তখন তো আর মোবাইল অ্যাপে কাউন্টিং শেখার সুযোগ তৈরি হয়নি। কড়িকাঠ একবার সোজা দিকে আরেকবার উল্টো দিকে গুণেই পঞ্চাশ অবধি রপ্ত হয়ে যেত। দুটোর পরে আর দুটো কড়িকাঠ এগোলে চার, আবার একটা পিছিয়ে এলে তিন - সে এক ভারি মজার যোগ-বিয়োগ। মনে মনে রিড চেপে কখনও বা সা-রে-গা-মা! 


সে বছর বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট ওঠার সময়ে উই লাগা কড়ি-বরগা সব ভাঙা পড়ল। বৃষ্টির জল ছাতে ঘর করতে করতে দেওয়াল বেয়ে নেমে এসে নানারকম ছবি এঁকে দিত। সেই ছবিগুলো কোনোটা মেঘ, ফুল, পরী হয়ে, কোনোটা চাঁদের বুড়ি, কোনওটা বা বিরাটাকার দৈত্য হয়ে দেওয়াল বেয়ে ছাত অবধি উঠে যেত। বাড়িটা ভাঙা পড়ার সময় সেই ছবিগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হাওয়ায় মিশে গেল। যেগুলোর লোহা-লক্করের বাজারে ভালো দাম সেইসব সিঙ্ক পাইপ কল পাম্প ট্যাঙ্ক আগেই বিক্রি হয়ে গেল। কুকুর ঢোকা বন্ধ করতে গলিপথের মুখে যে হুড়কো দেওয়া লোহার গেট, রক ঘিরে আর ওই যে দালানের ওইদিকের দরজা খুলে ছাতে ওঠার আগে ডানদিকের যে মস্ত বড় গ্রিলের দরজা লাগিয়েছিলে - যার এপারে দাঁড়িয়ে ঠায় কল্পনা করতাম বন্দিনী রাজকন্যের জন্য এক রাজকুমার ওই আকাশ পথে উড়ে আসছে - সেগুলোও সব ওরা বিক্রি করে দিল। শুধু দরজাটা পড়ে রইল ভাঙাচোরা স্তূপের উপর। 


ক'দিন পরপর বৃষ্টিতে কাজ বন্ধ ছিল। সকালবেলা পায়ে পায়ে গিয়ে পড়লাম পুরোনো পাড়ায়। বাড়ি ভাঙার জায়গাটা আর ঘেরা নেই। দরকারও নেই। পুরোটাই ফাঁকা মাঠের মতো। ইতিউতি ভগ্নস্তূপ। তার মধ্যেই তুমি সকালে ভাত ডাল আর ঢ্যাঁড়শভাজা নামিয়ে স্নানে চলে গেলে। আপুমা মাছটা সামলে নিল। তারপর বাবা আর তুমি নাকেমুখে গুঁজে একসাথে বেরিয়ে পড়লে। বিকেলে ফেরার সময় সরাসরি দরজায় আসতে না। গ্রিল বসার আগে খোলা রকে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ডাকতে! পিছনে দাঁড়িয়ে থাকত বাবা। কত বড় হয়ে তবে জেনেছি দু'জনের অফিস দু'জায়গায়। 


ফিরেই জামাকাপড় পাল্টে চা বসাতে বসাতে রাতের রান্নার ফর্দটুকু আপুমার সাথে আলোচনা হয়ে গেল। ঠাকুরের সামনে শাঁখ বাজিয়ে একটা ঢিপ করে প্রণাম ঠুকে নিলে। ধূপের গন্ধটা আজও ধক করে নাকে এসে লাগে। দাদু, আপুমা, বাবার নির্দিষ্ট স্টিলের কাপ। আমার জন্য চা নেই, তবে কাপটা কাচের। দুধে বোর্নভিটা গোলা, সাথে চিংড়ির বড়া। প্রথম খোলের ভাজাগুলোয় আমার অধিকার। মেঝেয় বসে তখন স্কুলের পড়া করছি। তুমি পাশে বাটি রেখে গেলে। মাথায় একটা চকাস করে চুমু। সেদিনও মেঝেতেই বসে পড়ছিলাম। পাশের বাড়ির হাবুকাকু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললেন, "জলকাদার উপর কোথায় বসছ! আমাদের ঘরে এসে বোসো!" শুনেছি কাকুদের বাড়িটাও দর করা হয়ে গেছে। আমি আজ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে অতীত দেখছি, আর কাকু দেখছেন ভবিষ্যৎ! 

 

দরজাটার উপর খুব মায়া হচ্ছিল। এই ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে আরও ঝুরঝুরে হয়েছে কাঠগুলো। এখানে ওখানে খয়েরি সবুজ ছাপ। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে যুদ্ধে হারা সৈনিকের মতো। কিন্তু এখনও কেমন তেজ!  আগলে চলেছে নিচের ইট কাঠ পাথরের ডাঁইকে। আমাদের সেই চকের দাগগুলো এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। মলিন হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে প্রায় মিলিয়ে এসেছে। যেন ছোট্ট ছোট্ট শ্বাস নিচ্ছে। এইবুঝি পরেরটা নিতে ভুলে যাবে। কিন্তু আমি ঠিক খুঁজে নিয়েছি। আস্তে আস্তে হাত বোলাই ওগুলোর উপর। ভিজে ভিজে ঠেকে হাত! বৃষ্টির জলই হবে হয়তো! কড়ার গোড়ায় মরচে পড়ে মেটে মেটে রঙ ধরেছে। সেইখান থেকে একসার পিঁপড়ে দল বেঁধে চলেছে। ভেজা কাঠের নির্যাসে জন্ম নিয়েছে একটা উজ্জ্বল সবুজ চারা। তুলতুলে সবুজ কান্ডটা নুইয়ে আছে দুটো কচি পাতার ভারে। মুখটা নামিয়ে লক্ষ্য করলাম, একটা পাতা একটু বড়, আরেকটা ঠিক বাচ্চার মতো জড়োসড়ো হয়ে ঘেঁষে আছে ওর কোলে। দরজাটা আমাদের ভোলেনি। এবড়োখেবড়ো একটা পাথর তুলে দাগ কাটতে গেলাম ওর পাশটায়। দাগ আর পড়ল না। কোন শব্দও হলো না। শুধু একটু দেবে গেল জায়গাটা। 


অঙ্ক তো শিখে নিয়েছি সেই কবেই। শুধু হিসেব মেলানোটা বাকি রয়ে যায়। এখনও দাঁড়ি কাটি। মনে মনে। তোমার জন্মদিনের বয়সটা আর দাঁড়ি কেটেও বাড়াতে পারি না। মৃত্যুদিনের বয়স বাড়ে কেবল। থামাতে পারি না।

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মেঘশ্রী_ব্যানার্জী

#পিছু_ডাক


'কী রে সারাদিন মোবাইলে কী খুটখুট করিস?'

'লিখছি বাবা, লিখছি!'

'লিখছিস? মোবাইলে?'

'হুম'

'ধুর! যত্তসব ছাইপাশ'

'আজ্ঞে না! কাল একটা দশ শব্দের গল্প লিখেছিলাম। হুড়মুড়িয়ে লাইকস পড়েছে! সবার দাবি ২০২০ তে একটা কুড়ি শব্দ তো বনতা হ্যায়!'

'কুড়ি শব্দে একটা জীবনের গল্প? পারবি ধরতে?'

'পারব বাপি, খুব পারব! সবাই পারছে। ইট'স আ চ্যালেঞ্জ!'

'ও… হবেও বা!'

'দশ শব্দের গল্পটা পড়বে?'

'হুম পড়া'

'"আজ আকাশ বড্ড কালো। একফালি কালো মেঘ আজ অসীমার মনেও!"'

'তারপর?'

'তারপর আর কী! ফিনিসড!'

'শেষ কী রে? এ তো সবে শুরু…'

'শুরু বললে শুরু, শেষ বললে শেষ… সেটা পাঠক ডিসাইড করবে।'

'তোর পাঠকও আছে?'

'কাম্মন বাপি! ফেসবুক এখন সাহিত্যের নতুন প্ল্যাটফর্ম।'

'এই তোদের বাপ-মেয়ের কচরকচর শেষ হলে খাবি আয়। মেলা কাজ পড়ে আছে। মালতী আসছে না… ঘটিবাটি মেজে ধুয়ে কোথায় একটু সাহায্য করবে দু'জনে তা নয়! খালি ফেসবুক আর মোবাইল!'

'আসছি মাম্মা ডিয়ার…..ম্মুউউয়া….বাপি, তোমার ফেবু অ্যাকাউন্ট আছে না? তোমাকে ট্যাগ করব। লিখতে হবে কিন্তু! সবাই পারছে তুমিও পারবে।'

'আরে আমি তো তেমন…'

'আরে টেক-ফ্যাক্ট নিয়ে চাপ নিও না। আমি আছি তো! ইউ জাস্ট টাইপ!'

বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল তিতাস। মোবাইলটা হাতে ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন মহেনবাবু।

……………………………………………….

'বাবা...আসব?'

'কী চাই?'

'একটু কথা ছিল। একটু সময় যদি…'

'বলো শুনছি'

'একটা নতুন গল্প লিখেছি….একটু যদি পড়ে দেখেন…'

'কী করেছ? লিখেছ?'

'হ্যাঁ বাবা! একটা নতুন গল্প… ছোটকাকুকে পড়িয়েছি। কাকু বলেছেন গল্প্টার একটা ভবিষ্যৎ হতে পারে… আপনি যদি বোধিসত্ত্ব জ্যেঠুকে বলে একটু ওঁর ছাপাখানা থেকে….'

'বাঁদর ছেলে, তুমি গল্প লিখবে? কোবতে লিখবে? কবি হবে? কবি?'

'আআ….. বাবা…. লাগছে!'

'লাগুক! একটা অপোগন্ড মূর্খ তৈরি হচ্ছে দিনদিন! ছোটকাকু, না? ছোটকাকু? ছোটকাকুকে আদর্শ মেনেছেন উনি! ব্যাটা নিজে বাউন্ডুলে…জগৎ সংসারের বোঝেটা কী ও? জানে ও কেমন করে টানছি আমি এত বড় সংসারটা?

আবার কাঁদা হচ্ছে? চোখ মোছো। যাও পড়ায় মন দাও। তুমি বাড়ির বড় ছেলে। অনেক দায়িত্ব! কাব্যি করার বিলাসিতা তোমাকে মানায় না। তোমার পরে ছোটছোট ভাইবোন আছে….। তাদের কথা তোমাকেই ভাবতে হবে।
দাঁড়িয়ে রইলে কেন? যাও…..!' '

.………………………………………………….

'দাঁড়িয়ে রইলে কেন? এসো। তাড়াতাড়ি গিলে আমাকে রেহাই দাও…'

'বাপি এখন নির্ঘাত গল্প লিখছে মা…..'

চশমা খুলে চোখটা মোছেন মহেনবাবু। মেয়ে জানে না, মেয়ের মাও না, তার গল্পের খাতাগুলো কবেই রদ্দির সাথে কিলো দরে বিক্রি হয়ে গেছে!

মেয়েটা লিখছে…. দশ বিশ…. হোক না! তবু তো লিখছে! হয়তো এটাই ওকে আগামীতে উৎসাহ দেবে। বিশ থেকে পঞ্চাশ, পঞ্চাশ থেকে একশো, দু'শ হতে হতে একদিন…..চোখটা আবার ঝাপসা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে মহেনবাবু এগিয়ে যান খাবার টেবিলের দিকে।


শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

মেঘশ্রী ব্যানার্জী







১) অবসর

বারমাস্যার খোপে খোপে 
যত্ন করে সাজিয়ে নিয়েছি ব্যস্ততা
কখনও তার নাম দিয়েছি পরিস্থিতি, কখনও বা কাজ।
তোমার মুখের ছবি আজও ভেসে বেড়ায় অবসরে -
ব্যস্ত মুহূর্তগুলো বেঁচে একখন্ড নিরুপদ্রব নিশ্চিন্ত 
অবসর ছুঁতে চাওয়ার চেষ্টাই বুঝি আলেয়া। 



২) অবিরাম

ঢেউ অবিরাম, আবার সময়ও
ঢেউ অল্প থেমে আসা-যাওয়ার মাঝে 
মেপে দেয় প্রশ্বাসের সময়...
সময় থামে না, থামতে দেয় না। 
প্রতি পলে বয়স বাড়ে তার,
বুঝে নেয় প্রতি মুহূর্তের হিসাব!
নিত্য সমস্যার যাতায়াত হোক ঢেউয়ের মত, 
সময়ের মত নয়।



৩) ঢেউ

সাগরপাড়ে আছড়ে পড়ে ঢেউ প্রবল উচ্ছ্বাসে, 
ঢেউ কি জানে সে কেবল ডাকহরকরা?
শান্ত নীলকান্ত বুকের ঝিনুক-বার্তা বয়ে আনা -
আর নগর-সভ্যতার মালিন্য মুছে নিয়ে যাওয়া জলধিগর্ভে - এই তার যাপন।
উচ্ছাসের স্থায়িত্ব কাচ-ভাঙা শব্দের মতই ক্ষণিকের।
শুভ্র জলকণার ফেনিল মেঘ হয়ে লাফিয়ে ওঠার পরেরটুকুই মিলিয়ে যাওয়া এক লহমায়।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

মেঘশ্রী ব্যানার্জী

ছোটগল্প

লাল-সাদা



আজ ভীষণ খুশি ইভান, এইলি আর ডাফিল্ড। একরাশ হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে মম আর ড্যাডাকে গুডনাইট জানিয়ে এইমাত্র শুতে গেছে। রোঁয়া ওঠা কম্বলটায় বাড়ন্ত তিন বাচ্চার আর কুলায় না। তাও গুটিসুটি মেরে যুদ্ধ করতে করতে, একে অন্যের ওম নিতে নিতে একসময়ে ঠিক ঘুময়ে পড়ে ওরা। মার্থা বাকি খাবার গুছিয়ে তুলে রাখছে। ডেরিক লক্ষ্য করে মার্থার বসে যাওয়া গালের কালো খসখসে চামড়ায় কুঞ্চন। দুহাত কঙ্কালসার। তবু আজ মুখে তৃপ্তি।

ডাউনটাউনে এক অপরিসর ভাড়ার কামরা আর নামমাত্র ডাইনিং-কাম-কিচেনে গুঁতোগুঁতি জীবন। কাঠের দেওয়ালের ফাঁকফোকর গুলো অহরহ শীতের জানান দিয়ে যায়। তাতে সাঁটা কাগজগুলো জানান দেয় দারিদ্রের। তবু তো মাথার উপর ছাদ!

বছর দুয়েক আগেও অবস্থা এমন ছিল না। অভাব ছিল। কিন্তু খেয়ে-পরে বাঁচার দুশ্চিন্তা ছিল না। তার উপর ইভানের আগমন বার্তায় আনন্দে ভরপুর কাটছিল জীবন। হঠাৎ একদিন চুরির অপবাদে ডেরিকের স্টোরের চাকরিটা দুম করে চলে যায়। জেলও খাটতে হয় ন’মাস! দুর্বিপাক পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে মার্থাকে। জিসাসের ভরসায় দুই ছেলেমেয়েকে রেখে সন্তানসম্ভবা মার্থা হন্যে হয়ে কাজ খুঁজে বেড়ায়। যুতসই কাজ না পেয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তার ধারে, স্টোরের সামনে বসে থাকে কিছু ভিক্ষের আশায়!

একসময় ছাড়া পায় ডেরিক। জন্তুর মত মার খেয়েও অপরাধ স্বীকার করেনি সে। আসল চোর ততদিনে ধরা পড়েছে। বাড়ি ফিরে একদৃষ্টে ইভানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোলে নিতেও ভুলে যায় যেন! ক্ষতচিহ্নে হাত বোলাতে বোলাতে একটা বদল টের পায় মার্থা। টের পায় চামড়ার দাগড়া দাগড়া দাগের শিকড় আরও অনেক, অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেরিক সকালে কাজের চেষ্টায় বেরোয়। কখনো সফল, কখনো নয়। ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত বা ভোর রাত। তবে আজকের ব্যাপারটা আলাদা। খ্রিস্টমাস ইভ। আজ ডিনারটা একসাথেই করার বায়না করেছিল ছেলেমেয়েগুলো। মার্থাও কি তাই চায় নি? নিশ্চয়ই চেয়েছে। কিন্তু বাবার কাছে স্পেশাল দিনে স্পেশাল খাবারের ফরমাইস করবে ইভান আর এইলি - এই তার ভয়! ডাফিল্ড তাদের জীর্ণদশার সাথে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে। না দিতে পারার যন্ত্রণায় ডেরিকের চোয়াল শক্ত হতে,  চোখ নিষ্ঠুর হতে দেখেছে মার্থা!

গত সপ্তাহে শুকনো ব্রেড ছাড়া কিচ্ছু জোটেনি। আজও অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত বাচ্চাগুলো ম্লান মুখে শুকনো পাঁউরুটির দিকে হাত বাড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই ড্যাডা সান্তাক্লজের পোষাক পরে ঝোলা ভরা কেক, অ্যাপল পাই, পাপ্পা জন’স পিৎজা আরও রকমারি খাবার, উপহার নিয়ে হাজির হয়েছে। তারপর সে কি উল্লাস! জিসাসকে থ্যাঙ্কস জানিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে খেতে শুরু করে সবাই মিলে। ডাফিল্ডের চোখেমুখেও আজ অকাল-পরিণত ভাব সরে যেন জেল্লা দিচ্ছে শৈশব। বাচ্চাগুলোর আনন্দে একবার জিসাসকে একবার ডেরিককে সজল নীরব চোখে ধন্যবাদ জানায় মার্থা। ডেরিকের মুখের রেখা আজ নরম, পরিতৃপ্ত! চোখ নিস্পৃহ।

গোছগাছ সেরে ডেরিকের গা ঘেঁষে বসে মার্থে। গুডনাইট কিস দিয়ে এক স্বপ্নময় রাতের ইশারা করে যায়। পেটের খিদে মিটতেই আজ অনেকদিন পর শরীর তার খিদের কথা জানান দিয়েছে। ডেরিক ওষ্ঠপ্রান্তে সম্মতি সূচক হালকা হাসি ঝুলিয়ে সান্তাক্লজের ঝোলা নাড়াচাড়া শুরু করে। আর দাঁড়ায় না মার্থা।

অন্যমনস্ক ডেরিক ঝোলার ভিতর থেকে বার করে একটা বিয়ারের বোতল। সাথে একটা পেটমোটা পার্স। ক্রেডিট কার্ডসের আধিক্য থাকলেও তাতে ডলারের পরিমাণও নেহাত কম নয়। ত্বরিত গতিতে হাতড়ে চলে প্রতিটি পকেট। চোখের নিস্পৃহতা বদলে যেতে থাকে চকচকে লোভে। ড: হ্যারল্ড গার্বার -  ড্রাইভিং লাইসেন্সের উপরের নামটা বিশেষ দাগ কাটেনা ডেরিকের মনে। টেবিলে উল্টে রাখে। উল্টোপিঠে জেমস ক্লিপ দিয়ে আটকানো ফটোটাতে চোখ আটকায় এবার। লাললাল গোলগাল তিনটি বাচ্চার খুশি খুশি ছবি। ডেরিক অপলকে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। ওরা এখনো ওদের ড্যাডার পথ চেয়ে বসে। হ্যারল্ডকে বরফ সাদা ফুটপাতের উপর লাল রক্তে ভাসিয়ে আজ ডেরিক নিজের পরিবারের জন্য খুশি এনেছে ঝোলা ভরে!

বাইরে ঝোড়ো হাওয়া। সাথে অনর্গল তুষারপাতে দরজার সিকি ভাগ সেই কখন ঢাকা পড়ে গেছে! কিচেনের জানলার নড়বড়ে সার্সি ঝড়ের দাপটে ঝনঝন করে ওঠে। ঘোর কাটে ডেরিকের। নোনতা অনুতাপ মুছে ফেলে চটপট বাকি থাকা কেক, খাবারদাবার, আধখোলা গিফটের প্যাকেট ঝোলায় ভরতে থাকে। গায়ে আরও একবার চাপিয়ে নেয় সান্তাক্লজের পোষাক। দেড়ফুট ঝুরো বরফে পা গেঁথে গেঁথে এগিয়ে চলে ডেরিক। পিছনে বল্গাহরিণের ক্ষুরের সাথে ছাপ ফেলে যায় একজোড়া সমান্তরাল রেখা।

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

মেঘশ্রী ব্যানার্জী



#বড়গল্প
#বোধন


(১)
- 'সুপ্রিয়াদি তোমার মোবাইলটা কখন থেকে কেঁপে যাচ্ছে। ধরে নাও।'
- 'তুই লেখ ঠিক করে যা বলছি। ফোন বাজুক। গতকালের ভুল রিপিট না হয়।'
প্যাথোলজি সেন্টারের টেকনিশিয়ান সুপ্রিয়া নিজের কাজে খুব সিরিয়াস। তার উপর রিডিং গুলো লিখছে যে মেয়েটি সে নতুন আর তার বয়সটাও কম। কালই একটা ভুল করে ফেলেছিল। অবশ্য সুপ্রিয়া শুধরে দিয়েছে। তাই কোনভাবেই অন্যমনস্কতাকে প্রশ্রয় দেয়না সে। 
- 'বেডের ওপাশে টিস্যু আছে। আপনি ওখানে নেমে জেলটা মুছে নিন।'
এই মেয়েটি প্রথমবার ইউ.এস.জি করাচ্ছে। নরম করে ইন্সট্রাকশন দেয় সুপ্রিয়া। মোবাইলটা আবার কেঁপে ওঠে। চেনা কোন নাম নয়। টেবিলে ওটাকে নামিয়ে রেখে অপেক্ষারত পরের জনকে ডেকে নেয়। এক মাঝবয়সী দেহাতি লোক। প্রেসক্রিপশন আগেই নেওয়া ছিল। তাকে হিন্দীতে বোঝাতে শুরু করতে না করতেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকল রিসেপশনিস্ট সুমনা।
-'সুপ্রিয়াদি সেই অ্যাডভোকেট বারবার ফোন করছেন গো! তোমাকে ফোনে পাননি। এক্ষুনি কথা বলবেন বলছেন!'
-'আমার সেল নাম্বার উনি পান কি করে? আমি এই তো ঘন্টা খানেক আগে কথা বলে এলাম ফেস টু ফেস! আবার কি চাই? আচ্ছা সমস্যা তো!' এবার মেজাজ হারায় সুপ্রিয়া।
-'আরে আমাকেই তো জিজ্ঞেস করতে লেগেছেন বারবার- রিপোর্টে কি আছে - এক্স না ওয়াই? আমি জানিনা বলাতে তোমাকে ফোন করেছেন বোধহয়। তুমি ওঠাওনি তাই আবার রিসেপশনে ফোন করেছেন! আমি কি করি বলোতো!' কাঁদো কাঁদো হয় সুমনা।
-'আরে ঘাবড়াবার কি আছে? বলো এটা আইনত অপরাধ!' কথায় কথায় ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ একদম ভালো লাগে না সুপ্রিয়ার।
-'দিদি বাসু স্যর নাকি ওনাকে কল করে জেনে নিতে বলেছেন। উনি হুমকি দিচ্ছেন না বললে মি: বাসুকে জানিয়ে দেবেন!' গলা নামিয়ে বলে সুমনা।
এবার বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে যায় সুপ্রিয়ার। মি: বাসু এই সংস্থার গভর্নিং বডির একজন। লোকটার কিছু পলিটিক্যাল হোল্ডও আছে। ঠিক সৎ বলা যায়না। 
-'আচ্ছা তুমি যাও আমি দেখছি। 
আরে!! আপ অভিতক খাড়ে কিঁউ হ্যায়? লেটিয়ে উধার...' 
কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সুপ্রিয়া। কিন্তু মনে মনে প্রস্তুতি চলতে থাকে আরেক লড়াইয়ের। ভালোই জানে সুপ্রিয়া এবার মি: বাসুর কেবিনে তার ডাক পড়তে চলেছে।
যা ভেবেছিল ঠিক তাই! সুমনা বলে যাবার পরও যখন সুপ্রিয়া ব্যাপারটা পাত্তা দিল না মি: বাসু তাকে ডেকে পাঠালেন সেদিনই বিকেলে। আজ সারাদিন প্রচুর পেশেন্ট ছিল। ক্লান্ত শরীর আর অবসন্ন মনটাকে টেনে নিয়ে গেল সুপ্রিয়া একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে। ঘরে ঢুকতেই ভনিতা না করে মি: বাসু সরাসরি আক্রমণে এলেন 
-'আমার ক্লিয়ার ইনস্ট্রাকশন থাকা সত্ত্বেও আপনি টেস্ট রেজাল্ট কেন জানাচ্ছেন না মি: চ্যাটার্জীকে?'
-'নিশ্চয় জানাবো। আপনার অফসিয়াল প্যাডে লিখিত ইনস্ট্রাকশন দিন তারপর। আসি তাহলে?' 
নমস্কার ঠুকে বেরিয়ে পড়ে সুপ্রিয়া - পিছনের দুজোড়া শিকার ফসকে যাওয়া আশাহত বাজের কুটিল দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। খুব ভালো করেই জানে সুপ্রিয়া আজ না হোক কাল নয়তো পরশু তাকে কোন অযুহাত দেখিয়ে কাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে বা এর চেয়েও খারাপ কিছু। সে একা মানুষ। তার অভিজ্ঞতা আর কর্মদক্ষতা কোথাও না কোথাও চাকরি ঠিক পাইয়ে দেবে। তবু এই অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবে না সুপ্রিয়া - যেমন মাথা নোয়াননি তার মা। মা শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে বেরিয়ে না এলে কবেই প্লাস্টিক বন্দী এক রক্তাক্ত ফিটাস হয়ে কুকুরের খিদে মেটাতো সুপ্রিয়া ! 

(২)
বলাকা গলি থেকে শেষ পথটুকু প্রায় উড়ে এলো অটো স্ট্যান্ডে। এসময়ে বড্ড লাইন পড়ে। আজ এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। যদিও পুজোর ছুটি পড়ার দিন তেমন ক্লাস হবে না তবু দেরি হলে অ্যাটেন্ডেন্স নিয়ে সমস্যা করেন ব্যানার্জী ম্যাম। অটো স্ট্যান্ডে এসে সামান্য চমকায়! উৎসবের পরিবেশ পুরো। ড্রাইভাররা সবাই হাসছে আর একটা ছেলে যার অটোতেই বেশিরভাগ সময় যায় বলাকা সে সবাইকে একটা প্যাকেট থেকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। এদিকে লাইন লম্বা হচ্ছে ! অনেকে বিরক্তও বেশ। একজন একজন করে অটো স্টার্ট দিতে শুরু করল। প্রথম চারটে বেরিয়ে যাবার পর পাঁচ নম্বরে জায়গা হল বলাকার। ভাগ্যক্রমে সেই ছেলেটিরই অটো! কৌতূহলী হয় বলাকা
-'তোমরা কি এবার পুজো করছ নাকি? এত খুশি সব?'
-'না দিদি! আমার ঘরে মা দুগ্গা এয়েচেন! বউ এক ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে ঘরে এলো কাল। দেবিপক্ষে এমন আশীব্বাদ পেলাম তাই আরকি একটু খাওয়া দাওয়া!! মিষ্টি নিন না সবাই!' একগাল হেসে সে চারজন যাত্রীকে লাড্ডু ধরিয়ে দিল একেকটা - যেন মা দুর্গার আগমনে দক্ষরাজ প্রজাদের রত্ন বিলোচ্ছেন!
দশ মিনিট অটোয় গিয়ে এম.জি. থেকে মেট্রো ধরে কলকাতা ময়দান, সেখান থেকে দশ পনেরো মিনিট হেঁটে তবে স্কুলে পৌঁছবে বলাকা। আজ আর পা চলছে না। মেট্রো থেকে নেমে স্টেশনেই বসে রইল অনেকক্ষণ। হাতে সেই লাড্ডুটা ধরাই আছে! বলাকা স্মৃতিযানে চড়ে কয়েক মাস আগে ফিরে গেছে।
প্রথমবার মা হওয়াটা আলাদাই একটা অনুভূতি! সমীরণ আর তার ছোট্ট বেবিটাকে নিয়ে কত্ত জল্পনা কল্পনা! প্রথম ইউ.এস.জি. রিপোর্টটা কত রাত যে বালিশের পাশে নিয়ে শুয়েছে। ছবি দেখে কিছুই বুঝত না, তবু দেখে দেখে আশ মিটত না । তার ছেলেমানুষিতে খুব হাসত সমীরণ। তাদের ভালোবেসে বিয়ে। বন্ধন আরও মজবুত হতে চলেছে। তুরীয় আনন্দে দিন কাটছে বলাকার!
পরের ইউ.এস.জি. হবার পর থেকেই পাল্টে গেল সব। শ্বশুর শাশুড়ি যারা কিনা এত আনন্দে ছিলেন এত যত্ন করছিলেন - সবাই গম্ভীর হয়ে গেলেন। সমীরণও একটা চাপা টেনশনে। কাকে যেন বারবার ফোন করছে! বলাকার সাথে ভালো করে কথাই বলছে না!  বলাকা বুঝতে পারছে সাংঘাতিক একটা সমস্যা আছে তার রিপোর্টে - তবে কি বাচ্চাটা আর নেই? নাকি কোন অ্যাবনর্মালিটি নিয়ে জন্মাতে চলেছে সে? সমীরণ সেজন্যই হয়তো ফেস করতে চাইছে না বলাকাকে - জানেই তো কত আশায় ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে বলাকা তার বেবিকে!
কদিন পরে সমীরণ বলাকাকে নিয়ে যেতে চাইল অন্য কোন এক নামকরা ডাক্তারের কাছে। ঠিকই ভেবেছে বলাকা নিশ্চয় তার কম্প্লিকেটেড প্রেগনেন্সি! বাড়ির গাড়িতেই বেরোল তারা। অজানা আশঙ্কায় কেঁদেই চলেছে বলাকা! কি জানি নতুন ডাক্তার কি বলবে!
যেমনটা ভেবেছিল বড় কোন ডাক্তারের চেম্বার হবে তেমনটা নয়তো! ওরা বসতেই একটা ফর্ম দিয়ে গেল নার্স। পড়ে দেখার মত শক্তি নেই আর বলাকার। সমীরণ তো আছে পাশে - ও বুঝে নিক সব। সই করে ছেড়ে দিল শুধু। কেবিনে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে সমীরণের উষ্ণ হাত বলাকার তিরতির করে কাঁপতে থাকা হাতটা ধরে ঠান্ডা গলায় বলল
-'বলাকা আমরা এই বেবিকে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাকে আগে বললে তুমি মানতে না। দাদার আগেই দুটো মেয়ে আছে। আমার বাবা মা চাননা আমাদেরও মেয়ে হোক। বংশ রক্ষার তাগিদেই শুধু এই সিদ্ধান্ত! তুমি দয়া করে আমাকে ভুল বুঝো না! আমি বলতেই পারতাম বেবি অ্যাবনর্মাল! কিন্তু তোমাকে অন্ধকারে রাখতে চাইনা।'
কোন কোন ঘটনার অভিঘাত এতই নি:শব্দ-প্রবল হয় যে কিছুক্ষণের জন্য মানুষের বোঝার বলার চলার শক্তিকে সহজেই হরণ করে নিতে পারে। অভিশপ্ত অহল্যার মতই পাথর হয়ে গেল বলাকা। মস্তিস্কের কয়েকটা কোষ ওকে প্রতিবাদ করার বারুদ জুগিয়ে যাবার চেষ্টা করে চলেছে - অনুরণিত হচ্ছে মাথায় "এর চেয়ে বেশি অন্ধকারে আর কিইবা রাখতে পারত সমীরণ তোকে"! কিন্তু মন আর শরীর যন্ত্রবৎ আচরণ করছে - রিমোট সমীরণ আর নতুন ডাক্তারের হাতে।
অবসন্ন চিন্তার জাল ছিন্ন করে মেট্রো স্টেশনে স্বল্প সিগন্যালেও ফোনটা বেজে উঠল। রুনা - বলাকার কলিগ।
-'কি রে কোথায় তুই? তোর ক্লাসের বাচ্চাগুলোকে আর চুপ রাখা যাচ্ছেনা তো! নিজের ক্লাস ছেড়ে বারবার আসা যায় এভাবে? মেট্রোয় প্রবলেম নাকি?' কোন দূর থেকে যেন ভেসে আসে কথাগুলো।
-'আমি আজ আসছি নারে। শরীরটা বড্ড খারাপ! স্যরি আগেই ফোন করা উচিৎ ছিল। স্-স্যরি!' বলেই কেটে দিল বলাকা। আজকের দিনটা সে শুধুই নিজের সাথে কাটাবে। যে কষ্টটাকে গত আড়াই মাস ধরে রোজ বুকের মাটির ভিতর একটু একটু করে ঠেলে ঢুকিয়ে দিত আজ তাকে খুঁড়ে বার করবে। সেই কষ্টটা আজ অনেকদিন পরে দুটো কচি হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরবে - বন্ধনটা একটু একটু করে দৃঢ় হবে - আরও আরও চাপ দেবে তার কন্ঠনালীতে - রুদ্ধ করে দেবে তার শ্বাস - নিজের সাথে টেনে নিয়ে যাবে তার না দেখতে পাওয়া ছোট্ট দুনিয়ায় যেখানে বলাকা ছোট্ট দলা পাকানো কষ্টটাকে পরম মমতায় রক্ষা করবে সমস্ত বিপদ থেকে! 
একপা একপা করে এগোয় বলাকা! হাতে লাড্ডুটা ধরা। পরের মেট্রোটা তীব্র আলো আর বেগ নিয়ে ছুটে আসছে তারই দিকে! 

(৩)
ক্লাস শেষ হতে না হতেই ফোন বাজতে থাকে
-'কি রে কত দেরি? অনেক রাত হয়ে গেল তো!'
-'হয়ে গেছে মা! সবে রাত আটটা বাজে! এত চিন্তা করার কোন কারণ নেই মা! রাখছি।' এবার মা টেনশন আর রাগের মিশেলে একগাদা ইমোশনাল কথা বলবে। তাড়াতাড়ি ফোন কেটে পা চালায় বলাকা। স্কুলের চাকরির পর একটি এন.জি.ও তেও পড়াবার ভার নিয়েছে বলাকা। নিজের জীবনটাকে আস্তে আস্তে আবার সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। মায়ের চিন্তার কারণও বলাকা নিজেই মাকে দিয়েছে। সেদিন মেট্রো স্টেশনের ওই অবসাদী সিদ্ধান্ত তার জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারত -- কিন্তু সব ওলোটপালট করে দিল একজনের উপস্থিতি।
একপা একপা করে সে যখন কি এক অমোঘ টানে এগিয়ে চলেছে ছুটন্ত আলোর দিকে পিছন থেকে তার হাতটা শক্ত করে টেনে ধরলেন এক ফরিস্তা! ঘোর লাগা চোখে তাকে চেনা চেনা ঠেকলেও চিনে ওঠার আগেই বলাকা এলিয়ে পড়ে তার বুকে। জ্ঞান হতে দেখে তাকে ঘিরে একটা ছোট ভিড় জমেছে। পাশে বসে মানুষটি তার চোখেমুখে জল ছিটোচ্ছেন , গাল ধরে নাড়া দিচ্ছেন। জ্ঞান ফিরতেই একটা স্বস্তির বাতাবরণ চারিদিকে। ভিড় পাতলা হতে থাকল। মানুষটি সকলকে ধন্যবাদান্তে জানাচ্ছেন উনি মেয়েটিকে চেনেন - আর কোন সমস্যা নেই! অপলকে তাকিয়ে থাকে বলাকা ওই শান্ত কঠিন মুখটার দিকে।
-'এখান থেকে বেরিয়ে কথা বলি?' অনুমতির অপেক্ষা না করেই অতি যত্নে বলাকাকে মেট্রো স্টেশনের বাইরে আনেন উনি। কাছেই একটা স্ন্যাকস অ্যান্ড ফ্রুট জুসের দোকানে বসে ওরা। টুকটাক অর্ডার দিয়ে উনি আবার কথা শুরু করেন 
-'তোমার মেয়েকে আমি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। আজকে বুঝতে পারছি তুমি পারোনি। তাবলে নিজেকে শেষ করে দিতে হবে?' বলাকার মাথায় হাত রাখলেন সুপ্রিয়া।
বলাকা প্রথমটা চমকে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে মনে পড়ে প্যাথোলজি ল্যাবের ম্যাডামকে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। সেদিন সুপ্রিয়া মি: বাসু আর অ্যাডভোকেট চ্যাটার্জীর কথা সবটা জানাল বলাকাকে । দুজনে আরও কত কথা হল - কত শোকের আদান প্রদান - যেন জন্ম-জন্মান্তর ধরে তারা বিনি সুতোর মালায় গাঁথা! সুপ্রিয়ার ওই চাকরিটা গেছে।প্রেটোরিয়া স্ট্রীটের একটি নামী হসপিটালের সাথে এখন তিনি যুক্ত। সাথে সাথে বল্লরী নামের এক এন.জি.ও এর সাথে উনি বিশেষভাবে জড়িত। সুপ্রিয়াদিই তাকে বল্লরীতে পড়ানোর কথা ভেবে দেখতে বলেন।
সেদিনটা বলাকা তার শ্বশুরবাড়িতে ফিরেছিল। একদম স্বাভাবিক আচরণে রাতটা কাটায় আর নিজের সমস্ত ডিগ্রি সার্টিফিকেট, মেডিকেল রিপোর্ট আর টুকিটাকি গয়না ব্যাগে গুছিয়ে নেয়। পরের দিনই অ্যাডভোকেট সমীরণ চ্যাটার্জীর বাড়ি ছেড়ে মায়ের কাছে চলে আসে। মা, সুপ্রিয়াদি আর বল্লরীর এক উকিল বন্ধুর সহায়তায় ডিভোর্স কেসও ফাইল করে সমীরণের বিরুদ্ধে। হতচকিত সমীরণ আর তার বাবা-মা-দাদা প্রথমটা চোখ রাঙালেও সমাজে বদনামের ভয়ে পিছিয়ে আসে। শুধু একটাই আফসোস বলাকার এই রুখে দাঁড়ানোর শক্তি যদি সে কমাস আগে পেত!
-'অনেক রাত হল! আপনাকে এগিয়ে দেব একটু?' বর্তমানে ফেরে বলাকা। মায়ের চিন্তা যেন সাগ্নিকের মনে সঞ্চারিত হয়েছে। সাগ্নিকও পেশায় শিক্ষক। স্কুলের পর বল্লরীর একনিষ্ঠ কর্মীও। মানা করেনা বলাকা। রাতের অন্ধকার তার গালের কিঞ্চিৎ রক্তরাগের আনাগোনা লুকিয়ে ফেলে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাগ্নিকের বিবাহ প্রস্তাবকে সম্মান জানাবে - তবে সাগ্নিককে এখনো জানায়নি কিছু। মৃদু স্বরে গল্প করতে করতে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের এক সুন্দর স্বপ্ন।

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

মেঘশ্রী ব্যানার্জী




#শিরোনাম: মৌনমুখর

হাওড়ার এক ঘুণ ধরা পুরনো পাড়ায় আর চারঘর ভাড়াটের সাথে বাস অলকের। মাকে ছোটবেলাতেই হারিয়েছে। বাবা ছিলেন রাজ্য সরকারী অফিসে টাইপিস্ট। চাকরির অবসরের পর আরো দুটি বছর দিনগত পাপক্ষয় করে জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন তাও প্রায় বছর দুই হল। ছেলে অলককে নিয়ে না বাবা না মা কেউই কোন স্বপ্ন দেখেন নি কোনদিন - যেমন স্বপ্ন এই পুরোনো পাড়ার অন্য বাবা-মায়েরা দেখেছিলেন তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। তারই ফলস্বরূপ আজ গোটা পাড়াটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার দাম মেটাচ্ছে প্রায় বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়ে!
অলক একটু আলাদা। ছোট থেকে 'মূক-বধির' স্কুলে তার পড়াশুনা। খুব যে ভালো রেজাল্ট করতে পেরেছে তা নয়। প্রতিবন্ধী কোটা সত্ত্বেও সরকারী চাকরির পরীক্ষাতে সুবিধা করতে পারেনি। তাই বাবা বেঁচে থাকতে থাকতে তাঁর বন্ধু অতীন্দ্রমোহন বসুর প্রকাশনায় ছোটখাটো একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আহিরীটোলায় কাকাবাবুর তিনতলা বাড়ির নিচের তলায় অফিস। যাতায়াতের মাধ্যম হিসাবে অলক লঞ্চকেই বেছে নিয়েছে। এতে যেমন যানজট থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তেমনই গঙ্গার বক্ষবিভাজিকায় টলমল করতে করতে পৌঁছে যাওয়া যায় লক্ষ্যে।
ফেরার পথে কখনও বা একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চুপটি করে বসে থাকে আহিরীটোলার ঘাটে কিম্বা এপারের বাঁধাঘাটে নেমে জলের ধারে বসে কাটায় কিছু সময়। দেখে ফেরিঘাটের ব্যস্ততা। সদাই ফেরির আসা যাওয়া - মানুষের ছুটোছুটি - সিঁড়ির চাতালে হরেকরকম চটপটা খাবার নিয়ে হকারের সওদা - ঘাটে সময় কাটাতে আসা প্রেমিক-যুগলের উষ্ণতার আদানপ্রদান -- সমস্ত ঐ বাঙ্ময় দুইচোখ দিয়ে প্রাণ ভরে শুষে নেয় অলক। আশেপাশের প্রতিটি ক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তার মনবীণার তারে সৃষ্টি করে চলে মানানসই শব্দতরঙ্গ! সেই শব্দকোষের মালিকানা তার একান্ত আপন! কোন কোনদিন বুক ভরে নেয় সূর্যাস্তের ঘ্রাণ। গঙ্গাবক্ষের রঙ পরিবর্তন দেখে অপলকে - সকাল থেকে ব্যস্ত 'মা' গঙ্গা যেন অস্তরাগের সোহাগ মেখে হয় লাজে রাঙা 'প্রেয়সী'। অলক এখানে প্রথমবার প্রেমে পড়ে -- প্রকৃতির প্রেমে!
প্রকাশনার অফিসঘরে অলক ধীরে ধীরে প্রেমে পড়ে দ্বিতীয়বার - এবার সাহিত্যের প্রেমে। দিনরাত এক করে পড়তে থাকে ছাপতে আসা সমস্ত রকম পাণ্ডুলিপি। সাহিত্যে আগ্রহ দেখে কাকাবাবু তাকে আস্তে আস্তে প্রুফ রিডারের কাজে নিযুক্ত করেন। যেহেতু জন্মবধির তাই চারপাশের শব্দে তার মন সংযোগ নষ্ট হয়না। খুব তাড়াতাড়ি এই কাজে পারদর্শী হয়ে ওঠে সে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে একটু শিখেপড়ে নিতেই তাকে পুরনো ডেস্কটপ এ বসে ইমেইলে আসা স্ক্রিপ্ট পড়ার দায়িত্বও দিয়েছেন কাকাবাবু।
নিজের নামে একটা ফোল্ডার বানিয়েছে অলক। জন্মগত এক প্রতিবন্ধকতাই হয়তো তার অবসার্ভেশন পাওয়ার আর অনুভূতিকে করেছে প্রখরতর! ওই পুরনো কম্পিউটারের কি-বোর্ডের মাধ্যমে তার একলা বাঁধন ছেঁড়া মনকে ধীরে ধীরে উজাড় করতে থাকে। লেখে তার ফেরিঘাটের কথা - নিজের পাড়ার সমবয়সীদের বেড়ে ওঠার কথা - স্বপ্নপূরণের জন্য তাদের ইঁদুরদৌড়ের কথা - তাদের একদা গর্বিত বাবা-মায়েদের অহংকারী দৃষ্টির সময়ের বাড়ার সাথে সাথে কষ্ট-লাঞ্ছিত বোবা চাহনিতে পরিণত হওয়ার কথা এবং আরো কত কি!
আজ অলক আমন্ত্রিত অতিথি। তার ফোল্ডারে সযত্নে বেড়ে ওঠা 'বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা' কাকাবাবু পড়ে ফেলেন এবং তাকে না জানিয়ে বই হিসাবে ছাপিয়ে তাকেই উপহার দেন। তার বইয়ের প্রথম দেড়শো কপি নাকি হটকেকের মত বিক্রী হয়েছে। রয়্যালটি হিসাবে বেশ কিছু টাকা কাকাবাবু তাকে দিয়েছেন। সেদিন কথা বলতে পারলেও কি কাকাবাবুকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা তার থাকত? দুটো হাত ধরে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলেছিল অলক। কাকাবাবুর চোখের জলও বাঁধ মানেনি। তার নিজের ছেলে বাবার 'সিলি বিজনেস' এ যোগ দেবেনা বলেই যেন জেদ করে অস্ট্রেলিয়ায় রয়ে গেল। তাইতো উপন্যাসের সাথে এত একাত্ম হয়েছিলেন উনি। আজ বরাবরের করুণামিশ্রিত স্নেহের পাত্রটির জন্য তার ধুঁকতে থাকা প্রকাশনা ঘুরে দাঁড়াবার একটা আশা দেখছে আবার! একটা ওয়েলফেয়ার গ্রুপ যারা সপ্তাহান্তে বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমের অধিবাসীদের সাথে কিছুটা করে সময় কাটায় তাদের ধূসর দিনগুলো রঙীন করার জন্য আর মূক-বধির দের নিয়ে কাজ করা একটা এন.জি.ও. মিলিতভাবে তাকে সংবর্ধনা দিচ্ছে আজ।
একটি বৃদ্ধাশ্রমেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানকার সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন বয়সী কিছু মানুষও আছেন যারা অলকের মতই একটু 'আলাদা'। এক সুবেশী মহিলা তার উপন্যাসের নির্বাচিত অংশ পাঠ করে শোনাচ্ছেন আর একটি কিশোরী তা প্রকাশ করছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে। অলক আর কাকাবাবু স্মিতহাস্যে মঞ্চ আলোকিত করে আছেন। কাকাবাবুকে ছাড়া একা আসতে সে কিছুতেই রাজী হয়নি। আজ অলকের শুনতে না পাওয়ার কোন গ্লানি নেই - উপন্যাসটির প্রতিটি শব্দ তার মনের মাঝে গাঁথা। তার আজন্ম অকথিত চুপকথাগুলি আজ সকলের অনুভূতির সাথে একাত্ম হচ্ছে । পাঠ শেষের করতালিতে মুখরিত চারদিক - যেন অলকের মৌনতার পরিপূরক। বয়স্ক মানুষগুলি তাঁদের চোখ আর ঝাপসা চশমা মুছতে মুছতে অলকের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ জানাচ্ছেন - কেউবা টেনে নিচ্ছেন বুকে। আর উৎসাহিত অন্য একটি দলের মুখে অলক প্রদত্ত আশার আলো। এই মুহূর্তের একরাশ ভালোলাগার দোলা আর প্রেয়সী গাঙ্গেয় বিভাজিকার দোলা মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে অলকের সত্ত্বায়! দুচোখ বেয়ে নামছে মা গঙ্গার প্লাবন ।