সোমবার, ২১ জুন, ২০২১
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
বিজন ঘরে
আয়নার মুখোমুখি হলেই সিঁথির চেরাপথে সোহাগের সাথে অভিজ্ঞতার সহবাস। রূপালি রেখা দিনে দিনে সংখ্যা গরিষ্ঠ। ক'দিন ধরেই ফরসেপটা খুঁজে পাচ্ছি না। বড় বাক্স, ছোট বাক্স, বড় ব্যাগ, ছোট ব্যাগ সব তন্ন তন্ন করে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ গিয়ে পৌঁছলাম পঞ্চাশ নম্বর সাতকড়ি চ্যাটার্জী লেনের বাড়িতে।
একতলায় দিনের বেলা আলো তেমন ঢোকে না। তাও ছুটির দুপুরে হাফ পর্দা ফেলা জানলার দিকের খাটে দুটো নরম বালিশে মাথা দিয়ে এলোচুলে শুয়ে থাকতে তুমি। আর আমি ফরসেপ হাতে অপরাধী খোঁজার মতোই প্রখর দৃষ্টি দিয়ে ধরতাম আর কুট কুট করে উপড়ে ফেলতাম তোমার মাথার ছোট্ট ছোট্ট পাকাচুলগুলো।
'পাকা চুল তুললে আরও বেশি গজাবে' এই কথাটা হেন লোক নেই যে আমাদের বলে নি। তবু থোড়াই কেয়ার করতাম? আমার উৎসাহ ছিল তোমার তিন গুন। কারণ প্রতি পাকাচুল পিছু প্রথমে দু'টাকা করে পেতাম। তারপর চুল যখন চক্রবৃদ্ধি হারে পেকেই চলল তখন এক টাকা, পঞ্চাশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা, এমনকি শেষে দশ, পাঁচ, এক পয়সায় এসে দাঁড়াল। কই পরোয়া নেহি। আমার লাভের খাতায় তাতেও বেশ ভালোই জমা হত। তখন আবার পাশে ঠোঙা নিয়ে বসতাম যাতে তোলা চুলগুলো ইতস্ততঃ ছড়িয়ে না পড়ে। হিসেবে আমি বড় পাকা!
তবে এই হিসেবের খেলাটায় তুমি সব সময় আমার গুণতি ভণ্ডুল করে দিতে। পঞ্চাশটা হয়ে গেলে বলতে সবে ত্রিশ। আর আমিও বুঝে শুনে ছদ্মকোপে ফেলে দিতাম সন্না 'যাও আর তুলে দেবো না'। তুমিও তখন 'লক্ষ্মী মেয়ে সোনা মেয়ে'র বন্যা বইয়ে দিতে। শেষে আমি বুদ্ধি বের করলাম ঢ্যাঁড়া কাটার। চুলের চুলচেরা হিসাবে কাঠের বিবর্ণ দরজার পিছনে চক দিয়ে দাগ টেনে দিতাম। পাওনাগণ্ডা না মেটা অবধি সেই দাগের পরের লাইনে আবার দাগ যোগ হত। হিসাব মিটলে যখন কাপড় দিয়ে মুছে দিতে দাগগুলো তখন দরজার পিঠটা ঘোলাটে সাদা হয়ে থাকত। তার উপরেই আবার নতুন করে দাঁড়ি কাটা হত পরের দিন।
দাঁড়ির কথায় মনে পড়ে গেল, ওই দরজার পিছনেই দাঁড়ি কেটে কেটে গুনতে শিখিয়েছিলে। দশ, কুড়ি, ত্রিশ মানেই আগের ন'টা দাগের পেট বরাবর একটা করে ঢ্যাঁড়া। দিনের আলোর ঘরে প্রবেশে যতটা দ্বিধা, রাতের ল্যাম্প পোস্টের ঘষা ঘষা হলদেটে আলোটার ততই উৎসাহ মশারির মধ্যে ঢুকে পড়ার। আলো নিভিয়ে দিলেও দিব্য দেখা যায় কড়িকাঠ। যেন একটা মস্ত হারমোনিয়াম কেউ উল্টো করে টাঙিয়ে রেখেছে। তখন তো আর মোবাইল অ্যাপে কাউন্টিং শেখার সুযোগ তৈরি হয়নি। কড়িকাঠ একবার সোজা দিকে আরেকবার উল্টো দিকে গুণেই পঞ্চাশ অবধি রপ্ত হয়ে যেত। দুটোর পরে আর দুটো কড়িকাঠ এগোলে চার, আবার একটা পিছিয়ে এলে তিন - সে এক ভারি মজার যোগ-বিয়োগ। মনে মনে রিড চেপে কখনও বা সা-রে-গা-মা!
সে বছর বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট ওঠার সময়ে উই লাগা কড়ি-বরগা সব ভাঙা পড়ল। বৃষ্টির জল ছাতে ঘর করতে করতে দেওয়াল বেয়ে নেমে এসে নানারকম ছবি এঁকে দিত। সেই ছবিগুলো কোনোটা মেঘ, ফুল, পরী হয়ে, কোনোটা চাঁদের বুড়ি, কোনওটা বা বিরাটাকার দৈত্য হয়ে দেওয়াল বেয়ে ছাত অবধি উঠে যেত। বাড়িটা ভাঙা পড়ার সময় সেই ছবিগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হাওয়ায় মিশে গেল। যেগুলোর লোহা-লক্করের বাজারে ভালো দাম সেইসব সিঙ্ক পাইপ কল পাম্প ট্যাঙ্ক আগেই বিক্রি হয়ে গেল। কুকুর ঢোকা বন্ধ করতে গলিপথের মুখে যে হুড়কো দেওয়া লোহার গেট, রক ঘিরে আর ওই যে দালানের ওইদিকের দরজা খুলে ছাতে ওঠার আগে ডানদিকের যে মস্ত বড় গ্রিলের দরজা লাগিয়েছিলে - যার এপারে দাঁড়িয়ে ঠায় কল্পনা করতাম বন্দিনী রাজকন্যের জন্য এক রাজকুমার ওই আকাশ পথে উড়ে আসছে - সেগুলোও সব ওরা বিক্রি করে দিল। শুধু দরজাটা পড়ে রইল ভাঙাচোরা স্তূপের উপর।
ক'দিন পরপর বৃষ্টিতে কাজ বন্ধ ছিল। সকালবেলা পায়ে পায়ে গিয়ে পড়লাম পুরোনো পাড়ায়। বাড়ি ভাঙার জায়গাটা আর ঘেরা নেই। দরকারও নেই। পুরোটাই ফাঁকা মাঠের মতো। ইতিউতি ভগ্নস্তূপ। তার মধ্যেই তুমি সকালে ভাত ডাল আর ঢ্যাঁড়শভাজা নামিয়ে স্নানে চলে গেলে। আপুমা মাছটা সামলে নিল। তারপর বাবা আর তুমি নাকেমুখে গুঁজে একসাথে বেরিয়ে পড়লে। বিকেলে ফেরার সময় সরাসরি দরজায় আসতে না। গ্রিল বসার আগে খোলা রকে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে ডাকতে! পিছনে দাঁড়িয়ে থাকত বাবা। কত বড় হয়ে তবে জেনেছি দু'জনের অফিস দু'জায়গায়।
ফিরেই জামাকাপড় পাল্টে চা বসাতে বসাতে রাতের রান্নার ফর্দটুকু আপুমার সাথে আলোচনা হয়ে গেল। ঠাকুরের সামনে শাঁখ বাজিয়ে একটা ঢিপ করে প্রণাম ঠুকে নিলে। ধূপের গন্ধটা আজও ধক করে নাকে এসে লাগে। দাদু, আপুমা, বাবার নির্দিষ্ট স্টিলের কাপ। আমার জন্য চা নেই, তবে কাপটা কাচের। দুধে বোর্নভিটা গোলা, সাথে চিংড়ির বড়া। প্রথম খোলের ভাজাগুলোয় আমার অধিকার। মেঝেয় বসে তখন স্কুলের পড়া করছি। তুমি পাশে বাটি রেখে গেলে। মাথায় একটা চকাস করে চুমু। সেদিনও মেঝেতেই বসে পড়ছিলাম। পাশের বাড়ির হাবুকাকু জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বললেন, "জলকাদার উপর কোথায় বসছ! আমাদের ঘরে এসে বোসো!" শুনেছি কাকুদের বাড়িটাও দর করা হয়ে গেছে। আমি আজ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে অতীত দেখছি, আর কাকু দেখছেন ভবিষ্যৎ!
দরজাটার উপর খুব মায়া হচ্ছিল। এই ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে আরও ঝুরঝুরে হয়েছে কাঠগুলো। এখানে ওখানে খয়েরি সবুজ ছাপ। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে যুদ্ধে হারা সৈনিকের মতো। কিন্তু এখনও কেমন তেজ! আগলে চলেছে নিচের ইট কাঠ পাথরের ডাঁইকে। আমাদের সেই চকের দাগগুলো এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। মলিন হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে প্রায় মিলিয়ে এসেছে। যেন ছোট্ট ছোট্ট শ্বাস নিচ্ছে। এইবুঝি পরেরটা নিতে ভুলে যাবে। কিন্তু আমি ঠিক খুঁজে নিয়েছি। আস্তে আস্তে হাত বোলাই ওগুলোর উপর। ভিজে ভিজে ঠেকে হাত! বৃষ্টির জলই হবে হয়তো! কড়ার গোড়ায় মরচে পড়ে মেটে মেটে রঙ ধরেছে। সেইখান থেকে একসার পিঁপড়ে দল বেঁধে চলেছে। ভেজা কাঠের নির্যাসে জন্ম নিয়েছে একটা উজ্জ্বল সবুজ চারা। তুলতুলে সবুজ কান্ডটা নুইয়ে আছে দুটো কচি পাতার ভারে। মুখটা নামিয়ে লক্ষ্য করলাম, একটা পাতা একটু বড়, আরেকটা ঠিক বাচ্চার মতো জড়োসড়ো হয়ে ঘেঁষে আছে ওর কোলে। দরজাটা আমাদের ভোলেনি। এবড়োখেবড়ো একটা পাথর তুলে দাগ কাটতে গেলাম ওর পাশটায়। দাগ আর পড়ল না। কোন শব্দও হলো না। শুধু একটু দেবে গেল জায়গাটা।
অঙ্ক তো শিখে নিয়েছি সেই কবেই। শুধু হিসেব মেলানোটা বাকি রয়ে যায়। এখনও দাঁড়ি কাটি। মনে মনে। তোমার জন্মদিনের বয়সটা আর দাঁড়ি কেটেও বাড়াতে পারি না। মৃত্যুদিনের বয়স বাড়ে কেবল। থামাতে পারি না।
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০
মেঘশ্রী_ব্যানার্জী
'কী রে সারাদিন মোবাইলে কী খুটখুট করিস?'
'লিখছি বাবা, লিখছি!'
'লিখছিস? মোবাইলে?'
'হুম'
'ধুর! যত্তসব ছাইপাশ'
'আজ্ঞে না! কাল একটা দশ শব্দের গল্প লিখেছিলাম। হুড়মুড়িয়ে লাইকস পড়েছে! সবার দাবি ২০২০ তে একটা কুড়ি শব্দ তো বনতা হ্যায়!'
'কুড়ি শব্দে একটা জীবনের গল্প? পারবি ধরতে?'
'পারব বাপি, খুব পারব! সবাই পারছে। ইট'স আ চ্যালেঞ্জ!'
'ও… হবেও বা!'
'দশ শব্দের গল্পটা পড়বে?'
'হুম পড়া'
'"আজ আকাশ বড্ড কালো। একফালি কালো মেঘ আজ অসীমার মনেও!"'
'তারপর?'
'তারপর আর কী! ফিনিসড!'
'শেষ কী রে? এ তো সবে শুরু…'
'শুরু বললে শুরু, শেষ বললে শেষ… সেটা পাঠক ডিসাইড করবে।'
'তোর পাঠকও আছে?'
'কাম্মন বাপি! ফেসবুক এখন সাহিত্যের নতুন প্ল্যাটফর্ম।'
'এই তোদের বাপ-মেয়ের কচরকচর শেষ হলে খাবি আয়। মেলা কাজ পড়ে আছে। মালতী আসছে না… ঘটিবাটি মেজে ধুয়ে কোথায় একটু সাহায্য করবে দু'জনে তা নয়! খালি ফেসবুক আর মোবাইল!'
'আসছি মাম্মা ডিয়ার…..ম্মুউউয়া….বাপি, তোমার ফেবু অ্যাকাউন্ট আছে না? তোমাকে ট্যাগ করব। লিখতে হবে কিন্তু! সবাই পারছে তুমিও পারবে।'
'আরে আমি তো তেমন…'
'আরে টেক-ফ্যাক্ট নিয়ে চাপ নিও না। আমি আছি তো! ইউ জাস্ট টাইপ!'
বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল তিতাস। মোবাইলটা হাতে ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন মহেনবাবু।
……………………………………………….
'বাবা...আসব?'
'কী চাই?'
'একটু কথা ছিল। একটু সময় যদি…'
'বলো শুনছি'
'একটা নতুন গল্প লিখেছি….একটু যদি পড়ে দেখেন…'
'কী করেছ? লিখেছ?'
'হ্যাঁ বাবা! একটা নতুন গল্প… ছোটকাকুকে পড়িয়েছি। কাকু বলেছেন গল্প্টার একটা ভবিষ্যৎ হতে পারে… আপনি যদি বোধিসত্ত্ব জ্যেঠুকে বলে একটু ওঁর ছাপাখানা থেকে….'
'বাঁদর ছেলে, তুমি গল্প লিখবে? কোবতে লিখবে? কবি হবে? কবি?'
'আআ….. বাবা…. লাগছে!'
'লাগুক! একটা অপোগন্ড মূর্খ তৈরি হচ্ছে দিনদিন! ছোটকাকু, না? ছোটকাকু? ছোটকাকুকে আদর্শ মেনেছেন উনি! ব্যাটা নিজে বাউন্ডুলে…জগৎ সংসারের বোঝেটা কী ও? জানে ও কেমন করে টানছি আমি এত বড় সংসারটা?
আবার কাঁদা হচ্ছে? চোখ মোছো। যাও পড়ায় মন দাও। তুমি বাড়ির বড় ছেলে। অনেক দায়িত্ব! কাব্যি করার বিলাসিতা তোমাকে মানায় না। তোমার পরে ছোটছোট ভাইবোন আছে….। তাদের কথা তোমাকেই ভাবতে হবে।
দাঁড়িয়ে রইলে কেন? যাও…..!' '
.………………………………………………….
'দাঁড়িয়ে রইলে কেন? এসো। তাড়াতাড়ি গিলে আমাকে রেহাই দাও…'
'বাপি এখন নির্ঘাত গল্প লিখছে মা…..'
চশমা খুলে চোখটা মোছেন মহেনবাবু। মেয়ে জানে না, মেয়ের মাও না, তার গল্পের খাতাগুলো কবেই রদ্দির সাথে কিলো দরে বিক্রি হয়ে গেছে!
মেয়েটা লিখছে…. দশ বিশ…. হোক না! তবু তো লিখছে! হয়তো এটাই ওকে আগামীতে উৎসাহ দেবে। বিশ থেকে পঞ্চাশ, পঞ্চাশ থেকে একশো, দু'শ হতে হতে একদিন…..চোখটা আবার ঝাপসা হয়ে আসে। ধীরে ধীরে মহেনবাবু এগিয়ে যান খাবার টেবিলের দিকে।
শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
লাল-সাদা
আজ ভীষণ খুশি ইভান, এইলি আর ডাফিল্ড। একরাশ হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে মম আর ড্যাডাকে গুডনাইট জানিয়ে এইমাত্র শুতে গেছে। রোঁয়া ওঠা কম্বলটায় বাড়ন্ত তিন বাচ্চার আর কুলায় না। তাও গুটিসুটি মেরে যুদ্ধ করতে করতে, একে অন্যের ওম নিতে নিতে একসময়ে ঠিক ঘুময়ে পড়ে ওরা। মার্থা বাকি খাবার গুছিয়ে তুলে রাখছে। ডেরিক লক্ষ্য করে মার্থার বসে যাওয়া গালের কালো খসখসে চামড়ায় কুঞ্চন। দুহাত কঙ্কালসার। তবু আজ মুখে তৃপ্তি।
ডাউনটাউনে এক অপরিসর ভাড়ার কামরা আর নামমাত্র ডাইনিং-কাম-কিচেনে গুঁতোগুঁতি জীবন। কাঠের দেওয়ালের ফাঁকফোকর গুলো অহরহ শীতের জানান দিয়ে যায়। তাতে সাঁটা কাগজগুলো জানান দেয় দারিদ্রের। তবু তো মাথার উপর ছাদ!
বছর দুয়েক আগেও অবস্থা এমন ছিল না। অভাব ছিল। কিন্তু খেয়ে-পরে বাঁচার দুশ্চিন্তা ছিল না। তার উপর ইভানের আগমন বার্তায় আনন্দে ভরপুর কাটছিল জীবন। হঠাৎ একদিন চুরির অপবাদে ডেরিকের স্টোরের চাকরিটা দুম করে চলে যায়। জেলও খাটতে হয় ন’মাস! দুর্বিপাক পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে মার্থাকে। জিসাসের ভরসায় দুই ছেলেমেয়েকে রেখে সন্তানসম্ভবা মার্থা হন্যে হয়ে কাজ খুঁজে বেড়ায়। যুতসই কাজ না পেয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তার ধারে, স্টোরের সামনে বসে থাকে কিছু ভিক্ষের আশায়!
একসময় ছাড়া পায় ডেরিক। জন্তুর মত মার খেয়েও অপরাধ স্বীকার করেনি সে। আসল চোর ততদিনে ধরা পড়েছে। বাড়ি ফিরে একদৃষ্টে ইভানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোলে নিতেও ভুলে যায় যেন! ক্ষতচিহ্নে হাত বোলাতে বোলাতে একটা বদল টের পায় মার্থা। টের পায় চামড়ার দাগড়া দাগড়া দাগের শিকড় আরও অনেক, অনেক গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ডেরিক সকালে কাজের চেষ্টায় বেরোয়। কখনো সফল, কখনো নয়। ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত বা ভোর রাত। তবে আজকের ব্যাপারটা আলাদা। খ্রিস্টমাস ইভ। আজ ডিনারটা একসাথেই করার বায়না করেছিল ছেলেমেয়েগুলো। মার্থাও কি তাই চায় নি? নিশ্চয়ই চেয়েছে। কিন্তু বাবার কাছে স্পেশাল দিনে স্পেশাল খাবারের ফরমাইস করবে ইভান আর এইলি - এই তার ভয়! ডাফিল্ড তাদের জীর্ণদশার সাথে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে। না দিতে পারার যন্ত্রণায় ডেরিকের চোয়াল শক্ত হতে, চোখ নিষ্ঠুর হতে দেখেছে মার্থা!
গত সপ্তাহে শুকনো ব্রেড ছাড়া কিচ্ছু জোটেনি। আজও অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত বাচ্চাগুলো ম্লান মুখে শুকনো পাঁউরুটির দিকে হাত বাড়াচ্ছিল। ঠিক তখনই ড্যাডা সান্তাক্লজের পোষাক পরে ঝোলা ভরা কেক, অ্যাপল পাই, পাপ্পা জন’স পিৎজা আরও রকমারি খাবার, উপহার নিয়ে হাজির হয়েছে। তারপর সে কি উল্লাস! জিসাসকে থ্যাঙ্কস জানিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে খেতে শুরু করে সবাই মিলে। ডাফিল্ডের চোখেমুখেও আজ অকাল-পরিণত ভাব সরে যেন জেল্লা দিচ্ছে শৈশব। বাচ্চাগুলোর আনন্দে একবার জিসাসকে একবার ডেরিককে সজল নীরব চোখে ধন্যবাদ জানায় মার্থা। ডেরিকের মুখের রেখা আজ নরম, পরিতৃপ্ত! চোখ নিস্পৃহ।
গোছগাছ সেরে ডেরিকের গা ঘেঁষে বসে মার্থে। গুডনাইট কিস দিয়ে এক স্বপ্নময় রাতের ইশারা করে যায়। পেটের খিদে মিটতেই আজ অনেকদিন পর শরীর তার খিদের কথা জানান দিয়েছে। ডেরিক ওষ্ঠপ্রান্তে সম্মতি সূচক হালকা হাসি ঝুলিয়ে সান্তাক্লজের ঝোলা নাড়াচাড়া শুরু করে। আর দাঁড়ায় না মার্থা।
অন্যমনস্ক ডেরিক ঝোলার ভিতর থেকে বার করে একটা বিয়ারের বোতল। সাথে একটা পেটমোটা পার্স। ক্রেডিট কার্ডসের আধিক্য থাকলেও তাতে ডলারের পরিমাণও নেহাত কম নয়। ত্বরিত গতিতে হাতড়ে চলে প্রতিটি পকেট। চোখের নিস্পৃহতা বদলে যেতে থাকে চকচকে লোভে। ড: হ্যারল্ড গার্বার - ড্রাইভিং লাইসেন্সের উপরের নামটা বিশেষ দাগ কাটেনা ডেরিকের মনে। টেবিলে উল্টে রাখে। উল্টোপিঠে জেমস ক্লিপ দিয়ে আটকানো ফটোটাতে চোখ আটকায় এবার। লাললাল গোলগাল তিনটি বাচ্চার খুশি খুশি ছবি। ডেরিক অপলকে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। ওরা এখনো ওদের ড্যাডার পথ চেয়ে বসে। হ্যারল্ডকে বরফ সাদা ফুটপাতের উপর লাল রক্তে ভাসিয়ে আজ ডেরিক নিজের পরিবারের জন্য খুশি এনেছে ঝোলা ভরে!
বাইরে ঝোড়ো হাওয়া। সাথে অনর্গল তুষারপাতে দরজার সিকি ভাগ সেই কখন ঢাকা পড়ে গেছে! কিচেনের জানলার নড়বড়ে সার্সি ঝড়ের দাপটে ঝনঝন করে ওঠে। ঘোর কাটে ডেরিকের। নোনতা অনুতাপ মুছে ফেলে চটপট বাকি থাকা কেক, খাবারদাবার, আধখোলা গিফটের প্যাকেট ঝোলায় ভরতে থাকে। গায়ে আরও একবার চাপিয়ে নেয় সান্তাক্লজের পোষাক। দেড়ফুট ঝুরো বরফে পা গেঁথে গেঁথে এগিয়ে চলে ডেরিক। পিছনে বল্গাহরিণের ক্ষুরের সাথে ছাপ ফেলে যায় একজোড়া সমান্তরাল রেখা।
সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
#বোধন
- 'তুই লেখ ঠিক করে যা বলছি। ফোন বাজুক। গতকালের ভুল রিপিট না হয়।'
প্যাথোলজি সেন্টারের টেকনিশিয়ান সুপ্রিয়া নিজের কাজে খুব সিরিয়াস। তার উপর রিডিং গুলো লিখছে যে মেয়েটি সে নতুন আর তার বয়সটাও কম। কালই একটা ভুল করে ফেলেছিল। অবশ্য সুপ্রিয়া শুধরে দিয়েছে। তাই কোনভাবেই অন্যমনস্কতাকে প্রশ্রয় দেয়না সে।
- 'বেডের ওপাশে টিস্যু আছে। আপনি ওখানে নেমে জেলটা মুছে নিন।'
এই মেয়েটি প্রথমবার ইউ.এস.জি করাচ্ছে। নরম করে ইন্সট্রাকশন দেয় সুপ্রিয়া। মোবাইলটা আবার কেঁপে ওঠে। চেনা কোন নাম নয়। টেবিলে ওটাকে নামিয়ে রেখে অপেক্ষারত পরের জনকে ডেকে নেয়। এক মাঝবয়সী দেহাতি লোক। প্রেসক্রিপশন আগেই নেওয়া ছিল। তাকে হিন্দীতে বোঝাতে শুরু করতে না করতেই হুড়মুড়িয়ে ঢুকল রিসেপশনিস্ট সুমনা।
-'আচ্ছা তুমি যাও আমি দেখছি।
আরে!! আপ অভিতক খাড়ে কিঁউ হ্যায়? লেটিয়ে উধার...'
কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সুপ্রিয়া। কিন্তু মনে মনে প্রস্তুতি চলতে থাকে আরেক লড়াইয়ের। ভালোই জানে সুপ্রিয়া এবার মি: বাসুর কেবিনে তার ডাক পড়তে চলেছে।
-'আমার ক্লিয়ার ইনস্ট্রাকশন থাকা সত্ত্বেও আপনি টেস্ট রেজাল্ট কেন জানাচ্ছেন না মি: চ্যাটার্জীকে?'
নমস্কার ঠুকে বেরিয়ে পড়ে সুপ্রিয়া - পিছনের দুজোড়া শিকার ফসকে যাওয়া আশাহত বাজের কুটিল দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। খুব ভালো করেই জানে সুপ্রিয়া আজ না হোক কাল নয়তো পরশু তাকে কোন অযুহাত দেখিয়ে কাজ থেকে বের করে দেওয়া হবে বা এর চেয়েও খারাপ কিছু। সে একা মানুষ। তার অভিজ্ঞতা আর কর্মদক্ষতা কোথাও না কোথাও চাকরি ঠিক পাইয়ে দেবে। তবু এই অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবে না সুপ্রিয়া - যেমন মাথা নোয়াননি তার মা। মা শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রতিবাদের আগুন জ্বেলে বেরিয়ে না এলে কবেই প্লাস্টিক বন্দী এক রক্তাক্ত ফিটাস হয়ে কুকুরের খিদে মেটাতো সুপ্রিয়া !
-'তোমরা কি এবার পুজো করছ নাকি? এত খুশি সব?'
-'না দিদি! আমার ঘরে মা দুগ্গা এয়েচেন! বউ এক ফুটফুটে মেয়ে নিয়ে ঘরে এলো কাল। দেবিপক্ষে এমন আশীব্বাদ পেলাম তাই আরকি একটু খাওয়া দাওয়া!! মিষ্টি নিন না সবাই!' একগাল হেসে সে চারজন যাত্রীকে লাড্ডু ধরিয়ে দিল একেকটা - যেন মা দুর্গার আগমনে দক্ষরাজ প্রজাদের রত্ন বিলোচ্ছেন!
-'বলাকা আমরা এই বেবিকে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাকে আগে বললে তুমি মানতে না। দাদার আগেই দুটো মেয়ে আছে। আমার বাবা মা চাননা আমাদেরও মেয়ে হোক। বংশ রক্ষার তাগিদেই শুধু এই সিদ্ধান্ত! তুমি দয়া করে আমাকে ভুল বুঝো না! আমি বলতেই পারতাম বেবি অ্যাবনর্মাল! কিন্তু তোমাকে অন্ধকারে রাখতে চাইনা।'
-'কি রে কোথায় তুই? তোর ক্লাসের বাচ্চাগুলোকে আর চুপ রাখা যাচ্ছেনা তো! নিজের ক্লাস ছেড়ে বারবার আসা যায় এভাবে? মেট্রোয় প্রবলেম নাকি?' কোন দূর থেকে যেন ভেসে আসে কথাগুলো।
একপা একপা করে এগোয় বলাকা! হাতে লাড্ডুটা ধরা। পরের মেট্রোটা তীব্র আলো আর বেগ নিয়ে ছুটে আসছে তারই দিকে!
-'কি রে কত দেরি? অনেক রাত হয়ে গেল তো!'
-'হয়ে গেছে মা! সবে রাত আটটা বাজে! এত চিন্তা করার কোন কারণ নেই মা! রাখছি।' এবার মা টেনশন আর রাগের মিশেলে একগাদা ইমোশনাল কথা বলবে। তাড়াতাড়ি ফোন কেটে পা চালায় বলাকা। স্কুলের চাকরির পর একটি এন.জি.ও তেও পড়াবার ভার নিয়েছে বলাকা। নিজের জীবনটাকে আস্তে আস্তে আবার সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। মায়ের চিন্তার কারণও বলাকা নিজেই মাকে দিয়েছে। সেদিন মেট্রো স্টেশনের ওই অবসাদী সিদ্ধান্ত তার জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারত -- কিন্তু সব ওলোটপালট করে দিল একজনের উপস্থিতি।
-'তোমার মেয়েকে আমি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। আজকে বুঝতে পারছি তুমি পারোনি। তাবলে নিজেকে শেষ করে দিতে হবে?' বলাকার মাথায় হাত রাখলেন সুপ্রিয়া।
শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮
মেঘশ্রী ব্যানার্জী
#শিরোনাম: মৌনমুখর






