ঋতুপর্ণা রুদ্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঋতুপর্ণা রুদ্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

ঋতুপর্ণা রুদ্র

#বুধবারের_প্রবন্ধ

আজকের দিনে রবীন্দ্রসংগীত কতটা প্রাসঙ্গিক


মন এই বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী আর সর্বত্রগামী বস্তু, সেই মনের চোখে দেখি, ছোট ষোল বছরের ছেলেটি নিজের ঘরে একান্তে লিখছে 'সজনি সজনি রাধিকা লো', 'শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা', বৈষ্ণব পদাবলীর অনুকরণে ব্রজবুলি ও মৈথিলি ভাষায় রচিত তাঁর পদাবলীর নাম ভানুসিংহের পদাবলী। ভানুসিংহ নাম নিয়ে সে নিজেই রোমাঞ্চিত। এই সব ছাড়াও পিতৃদেব পছন্দ করেন ব্রহ্মসংগীত,  একের পর এক লিখে চলে ছেলেটি। পিতা পশ্চিম থেকে ফিরলেই রবির ডাক পড়বে। ছোটবেলায় রবির কবিতা পড়ে হেসে ফেলেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ,  সেই তিনিই এখন পুত্রের সৃষ্টিতে মুগ্ধ। ধীরে ধীরে  ব্রাহ্মসমাজের অধিবেশনেও রবিকে গান গাইতে হয়। মাঘোৎসবের অধিবেশনের  জন্য লিখলেন 'নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছো নয়নে নয়নে'। উৎসবে নিজেই গাইলেন সেই গান। পিতা সেইসময়ে কলকাতায় ছিলেন না, কিন্তু খবর পেয়ে ফিরে সেই গান শুনতে চাইলেন।  পিতা এক আরাম কেদারায় আসীন, জ্যোতিদাদা হারমোনিয়ামে, রবি গাইছেন সেই  গান,

নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায়না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।।
বাসনার বশে মন অবিরত, ধায় দশ দিশে পাগলের মতো
স্থির-আঁখি তুমি মরমে সতত জাগিছ শয়নে স্বপনে।
সবাই ছেড়েছে নাহি যার কেহ তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ-
নিরাশ্রয় জন, পথ যার গেহ,  সেও আছে তব ভবনে।

গান শেষ হতে চোখ মেলল রবি, তাঁর চোখের কোণ চিকচিক করছে। স্তব্ধ পিতা বলেন দেশের রাজা যদি এ গানের ভাষা,  এ গানের কদর বুঝতেন, তবে কবিকে তিনিই পুরস্কৃত করতেন। রাজার তরফ থেকে যখন সে সম্ভাবনা নেই, তখন সে কাজ আমাকেই করতে হবে।" এই বলে পুত্রের হাতে দিলেন পাঁচশ টাকার এক চেক, সেযুগে যার মূল্য ছিল অপরিসীম।

জীবৎকালের প্রায় ৬১ বছর ধরেই তিনি গান লিখে গেছেন, জীবনের প্রথম কয়েক বছর বাদ দিলে প্রায় সারা জীবনই। আড়াই হাজার গানের সম্ভার বড় কম কথা নয়। চারপাশের মানুষের তাগিদেও গান লিখতেই হোত। যেকোন বিষয়ে, যে কোন উপলক্ষ্যে লোকে এসে ধরত যে তাকে। আজ নলকূপ খনন হবে, শান্তিনিকেতনে অসহ্য জলের কষ্ট, গুরুদেব লিখলেন, "এসো এসো হে তৃষ্ণার জল"। জাপানি যুযুৎসু পালোয়ান টাকাগাকি বোলপুরে আসছেন,  ছেলেমেয়ের এই শিক্ষায় উৎসাহ দিতে গুরুদেব সেই অনুষ্ঠানের জন্য লিখলেন "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান"।  গ্রামবাংলা পরিভ্রমণ কালে চাষী ঘরের ছোট এক মেয়েকে ভারি ভালো লাগল, সাথে করে নিয়ে এলেন তাকে। সেই মেয়েটির নৃত্য পরিবেশন অনুষ্ঠান উপলক্ষ্য করে লিখলেন, "দুই হাতে কালের মন্দিরা"। এমনি আরও অজস্র,  এছাড়াও নিজের মনের তাগিদে লিখে যেতেন একের পর এক। একবার ঠাণ্ডা লেগে গলা ভেঙে যেতে লিখলেন "আমার কণ্ঠ হতে গান কে নিল ভুলায়ে",  তাই যে কোন অনুষ্ঠানের জন্যই তাঁর গান খুঁজে পাই আমরা।

প্রথম কুড়ি বছর গানগুলিতে রাগাশ্রয়ী প্রভাব, বিভিন্ন ভাঙা গানের প্রভাব। শেষ কুড়ি বছরে পরিপূর্ণ রাবীন্দ্রিক গান, অন্যান্য সঙ্গীতের প্রভাব মুক্ত। সুর তাল লয় অপেক্ষাকৃত সহজ,  কেবল গানের ভাব আর ব্যাপ্তি বড় গভীরে ছড়িয়ে যাবে শ্রোতার।

বেদনার সাথে লক্ষ্য করি আড়াই সহস্র গানের ২০০ থেকে ৩০০টি বহুল প্রচলিত। বাকি গানগুলি কম শ্রুত, গীত হয় কম। তাবলে কম প্রাসঙ্গিক তা বলা যায় না।!!সেই ৩০০টি গানের মধ্যেই দুঃখ,আনন্দ, বেদনা, হাসিকান্না সব অনুভূতি লীন হয়ে থাকে। জীবনে যখনই কঠিন ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছি, মনে হয়েছে এর পরে কী? জীবনদেবতা নতুন করে ঘট পূর্ণ করেছেন, মনে পড়েছে গুরুদেবেরই গান 'আমারে তুমি অশেষ করেছো,  এমনই লীলা তব। ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ,  জীবন নব নব।' আহা সে যেন আমার জন্যই লেখা।

মস্ত এই পৃথিবীতে ক্ষুদ্র সংসার রচনা করে,  কী অপরিসীম আনন্দ, "খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি,  আমার মনের ভিতরে", কদিনের বিরহের পরে প্রিয়র সাথে দেখা, মনে পাক দিচ্ছে আনন্দ "কেটেছে একেলা, বিরহের বেলা আকাশ কুসুম চয়নে, সব পথ এসে মিলে গেল শেষে,  তোমার দু'খানি নয়নে।"

বিপুল এই বিশ্বে কত তুচ্ছ কত ক্ষুদ্র আমার অস্তিত্ব, আমি কে? কেনই বা? সেই একই প্রশ্ন যেন ছিল কবিরও।
আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি, পেয়েছি মোর স্থান
 বিস্ময়ে তাই জাগে,  জাগে আমার গান।

এমনি আরও কত কী, সুখ দুঃখ আনন্দ, বিরহে বারেবারে ফিরেছি তাঁরই গানে। আশ্রয় পেয়েছি, উদ্দীপনা পেয়েছি। কারুর কারুর লেখায় দেখেছি, তাঁরা মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত মানুষের কাছেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গ্রহণযোগ্য, গ্রামের মানুষ বা দরিদ্র মানুষের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত তেমন জনপ্রিয় নয়, যদিও আমি এই বিষয়ে সহমত নই। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস, তাঁর গল্প,  প্রবন্ধ, নাটক অনেক ক্ষেত্রেই পরিশীলিত,  বুদ্ধিমান,  এবং বিদগ্ধ পাঠকের জন্য, যাকে বলে for class and not for mass। কিন্তু গানের ক্ষেত্রে সেকথা খাটে না। আপামর বঙ্গভাষী জনতা তাঁদের সুখে দুখে আনন্দে, বিরহে,  বিবাহে, জন্মদিনে, মৃত্যুতে, কনেদেখায়,  লেখায়, আঁকায়,  বর্ষবরণে, বৃক্ষরোপণে এই গানকে বাদ দিয়ে ভাবতে পারেন না। ট্র‍্যাফিক আলোতে, পাড়ার পুজোয়, ফেসবুক লাইভ থেকে সাহিত্যসভায়,  প্রভাত ফেরী থেকে স্মরণসভায়, হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিখুঁত স্বরলিপিতে বা  গিটার বাজিয়ে একলা তরুণী কলেজ ফেস্টেও গাইছেন সেই সব পরিচিত গান।
গাইছেন, 'আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে' বা 'আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে'। ফুলশয্যায় গান গাওয়ার অনুরোধে নতুন কনে লজ্জা লজ্জা মুখে গাইছে 'ভালোবাসি ভালোবাসি'।

একবার একটি অন্যরকম রেস্টুরেন্টে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার, জায়গাটি এয়ারপোর্ট এর কাছে। ও অঞ্চলে এরকম বেশ কিছু আছে, উঠতি প্রমোটার, রাজনৈতিক নেতা,  সবাই সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আনন্দ করতে চলে আসেন, খানাপিনা চলে, সাথে গানও শোনেন। ছোট একটা মঞ্চে গান হয়, গায়ক গায়িকাদের গান ভালো লাগলে সরাসরি টাকাও দেওয়া হয় তাদের, টাকার মালা বা টাকার বৃষ্টির মত। আমি গিয়েছিলাম সহকর্মীদের সাথে,  এমন পরিবেশ কাছ থেকে দেখতে। ভেবেছিলাম বিড়ি জ্বালাইলা বা কাঁট লাগা ইত্যাদি গান টান হবে, সন্ধ্যা সাতটায়
গান শুরু করলেন এক তরুণ,  এবং ওরকম পরিবেশে তাঁর প্রথম গান ছিল "তুমি রবে নীরবে"। তাবৎ অর্ধশিক্ষিত,  অর্ধমাতাল জনতা চোখ বুঁজে বুঁদ হয়ে সেই গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছিল,  এ আমার নিজের চোখে দেখা।

জীবনের বেশ দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসে মনে হয়, আমাদের সমগ্র জীবনকে এমন করে কেই বা বুঝেছেন,
"বিপুল তরঙ্গ রে, গগন উদ্ভাসিত, 
মগন করি, অতীত অনাগত, আলোকে চঞ্চল, জীবনে উজ্জ্বল, একি আনন্দতরঙ্গ, বিপুল তরঙ্গ রে।"

টিভির জনপ্রিয় সিরিয়াল থেকে,  বিদগ্ধ সাহিত্যসভা, একাকী মানুষের নিসঙ্গ দিনযাপনের দিনলিপি থেকে,  বন্ধুদের জমাটি আড্ডা, রবীন্দ্রসঙ্গীত তাই প্রাসঙ্গিক ছিল ও আছে, থাকবেও আবহমান।

সমাপ্ত

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

ঋতুপর্ণা রুদ্র




সাধ
পার্কের বেঞ্চিতে বসে রূপকবাবু পকেট থেকে ঘুমের ওষুধগুলো বার করলেন। গতরাতে পাতে পড়েছিলো ভাত আর চচ্চড়ি,  অথচ মাংস রান্নার সুঘ্রাণ পেয়েছিলেন। একটু ভাত চাইতে বৌমার চীৎকার , “বুড়োবয়সে এত নোলা,  মরেও না।”
সূর্য উঠছে,  আকাশটা লাল, ওষুধগুলো রেখে মোবাইলে ছেলেকে ফোন করেন হঠাৎ, “২৪ ঘন্টার মধ্যে আমার বাড়ি খালি করে দেবে, নিজের টাকায় নিজে চালিয়ে নেবো।  খবরদার আমাকে বিরক্ত করবে না।”
ভোর বড় মোহময়, বাঁচতে সাধ হয়।
----------------------------------------------------------------------------------
ডিমের ঝোল (অণু গল্প)
বিষয় ফিরে দেখা।
দ্বিতীয় স্থান
ঋতুপর্ণা রুদ্র
শব্দ সংখ্যা ৫০
আমেরিকানিবাসী দুই বোন আজ খেতে আসছে রুমার বাড়ি। প্রায় দশ বছর পরে ফিরেছে ওরা। মেনু কি করবেন চাইনিজ না মোগলাই ভাবছেন রুমা।
খেতে বসে বোনেরা অবাক। কাঁসার থালায় ভাত, সুক্ত, ছ্যাঁচড়া, ডাল, বড়িভাজা, চাটনি আর হাফডিমের ঝোল। সাধারণ ভাবে শাড়ি পরা দিদির মুখে মায়ের আদল।  আবেগে অশ্রুতে ফিরে দেখা ছোটবেলা।

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঋতুপর্ণা রুদ্র

চেনা অচেনা

দৌড়তে দৌড়তে স্টেশনে ঢুকে শম্পা দেখল চোখের সামনে দিয়ে  লোকাল টা বেরিয়ে গেল। এই সময় টা বড় অসহায় লাগে, এখন বসে থাকো পরের ট্রেনের জন্য। শাশুড়ির একটা কবিরাজি ওষুধ আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল, সেই বড়বাজারে কবিরাজের চেম্বার,  অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়েও সময় মত ট্রেন ধরা গেল না। আজ আবার মেয়ের ক্যারাটে ক্লাস থাকে, কে নিয়ে যাবে যদি শ্বশুর মশাই নিয়ে যান। বসে বসে শম্পা একটু ঝালমুড়ি কিনে খায়, আজ টিফিনে বিশেষ কিছু খাওয়া হয় নি। মেয়ের অবশ্য তের বছর হোলো, একাই যেতে পারে বাড়ির কাছেই ক্লাস তবুও ওর ঠাম্মা কিছুতেই একা ছাড়তে চান না,  দিন কাল বড়ই খারাপ, ট্রেন আসতে এখোনও প্রায় দশ মিনিট বাকি,  আগে এরকম সময় নীল কে ফোন করত শম্পা কিন্তু এখন আর করে না।  কেবলই কথা শুনতে হোতো সে নাকি কেবল নিজের সময়।মতই ফোন করে তাই আজ চুপ করে কেবল ভাবে, নীলের কথাই মনে পড়তে থাকে।
শম্পার বিয়ে হয়েছিলো বছর পনেরো আগে, রজত তার থেকে বছর দুএকের বড় দিব্বি স্বাস্থ্য খুব হাসিখুশী মানুষ ছিল, শম্পা তখন সবে সরকারি চাকরি তে ঢুকেছে। বিয়ের পর প্রথম দেড় বছর খুব ভাল ছিল শম্পা,
  শাশুড়ি ও শম্পাকে তখন খুব আদর করতেন,  দেড় বছরের মাথায় পেটে এল তিন্নি,  দু বাড়িতেই খুশীর বান ডেকেছিল। তারপর একদিন, বাড়িতে সেদিন প্রচুর লোক সমাগম, রজত সকাল থেকে দোকান বাজার কাজ সারতে গিয়ে জলখাবার খায় নি,  চা আর সিগারেটের ওপরেই ছিল, বেলার দিকে ভাত খেয়ে শম্পাকে বলল এত বেলায় ভাত খেয়ে শরীরটা ভাল লাগছেনা, শম্পা একটু জোয়ানের আরক দিল।  কলকাতা থেকে ছোটো পিসি এসেছিল তাদের ট্রেনে তুলতে বেরিয়ে গেল রজত,  শম্পারও তখন ভারি মাস খুব ক্লান্ত লাগছিল বিছানায় একটু গড়িয়ে নিচ্ছিল,  রজত ফিরে এসে বলল একটু চা খাওয়াবে? সেটাই শেষ কথা তারপর হুড়মুড় করে গড়িয়ে পড়ে গেল,  বাড়িশুদ্ধ লোক ছুটে এসে ডাক্তার ডাকার আগেই সব শেষ।
শম্পা ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে গেছিল, কি ঘটছিলো চারপাশে কিছুই বুঝতে পারছিল না। রজত, তার স্বামী আর নেই! তার সন্তান কোনদিন বাবাকে দেখতে পাবে না, রজত আর কখনো ভালবাসবে না,  আদর করবে না তাকে এ কি সত্যি না কোন দু:স্বপ্ন। কিন্তু সত্যিটাকে মানতেই হোল। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সে, রক্তচাপ বেড়ে শেষ কয়েক মাস ডাক্তার বেডরেস্ট বলেছিলেন। প্রচন্ড মোটা হয়ে গিয়েছিল ,কিছু ভাল লাগত না, তিন্নি হবার পরে আবার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। তারপর কেটেও গেছে প্রায় তের বছর।  রজত চলে যাবার পরে শ্বশুর শাশুড়ি ও খুব ভেঙে পড়েছিলেন, মা এর মনে কি জানি কেন শম্পার ওপর একটা চাপা রাগ, সেই যেন দায়ী। তিন্নি হবার আগে অসুস্থ শম্পাকে দেখতে এসেছে মাসি শাশুড়ি,  খাটে শুয়ে স্পষ্ট শোনে সে মা বলছেন এই অপয়া বৌ এসে জলজ্যান্ত ছেলে টাকে খেল। খুব কষ্ট হলেও শম্পা কখনো ঝগড়া করেনি, একমাত্র সন্তান হারা মা কে, ক্ষমা করে দিয়েছে। ছোটোবেলায় মাতৃহারা শম্পার বাবা থাকেন বেনারসে ভাইপোর কাছে। বেশিরভাগ সময়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান,  সাধুসঙ্গ করেন, তাই দুদিন কোথাও গিয়ে জুড়োনোর জায়গাও শম্পার নেই। ট্রেন এসে গেছে, লেডিস এও খুব ভিড়, দাঁড়িয়ে কোনমতে যেতে হবে। শম্পা পা বাড়ায়।
পর্ব ২
শম্পার জীবনে নীলের আগমন বছর দুএক আগে। ফেসবুকে হঠাৎ একটা মেসেজ,  সে কেমন আছে,  আবৃত্তি করে কিনা এখনো,  এরকম দু এক টা লাইন। শম্পা ভাল ভাবে দেখে প্রোফাইল টা, বেশ ভাল ভদ্রলোকের মতই চেহারা, বৌ আর ছেলের ছবিও  বর্তমান কিন্তু একদমই চিনতে পারল না সে। তবুও উত্তর দিল। উত্তর আবার এল অবিলম্বে। একই কোচিং ক্লাসে পড়ত তারা যদিও শম্পার কিছু মনে পড়ে না,  কিন্তু অল্পদিনে ফেসবুকে চমৎকার একটা বন্ধুত্ব্ব তৈরি হোল। সারাদিনে অন্তত একবার সব কথা গল্প না করলে যেন ভাল লাগত না। কিন্তু মাস খানেকের মধ্যে গল্প গুলো পালটে যাচ্ছিল। প্রেমের কবিতা বিনিময়,  একদিন কথা না বললে অভিমানের সুর,  শম্পার নিজের মধ্যেও চাপা কষ্ট,  সারাদিন মাথায় শুধু নীলেরই চিন্তা, নিজেকে অচেনা ঠেকছিল। তারপর একদিন দেখা করল তারা শম্পার সেই প্রথম দেখা, গল্প হোল খাওয়া ও হোল কিছু, দুজনেই যেন ঘোরের মধ্যে ছিল। এত ভালবাসা শম্পা রজতকে বেসেছিল কী? নিজের কাজ সংসার সব সামলে শম্পার নিজস্ব সময় বড় কম,  কিন্ত সবেতেই যেন ফাঁক পড়ে যাচ্ছিল। সারাক্ষণ এই নবলব্ধ ভালবাসা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত তার সাথে ছিল একটা অপরাধবোধ। তারা কি ঠিক করছে? এটা কি অন্যায়?  নীল জোর দিয়ে বলে না অন্যায় নয়। ভালবাসা কখনো অন্যায় হতে পারে না। কিন্তু মন থেকে এটা সরাতে পারে না সে। রজত না হয় আকাশের তারা হয়ে গেছে কিন্তু নীলের স্ত্রী স্বাতী?  তার প্রতি কি অন্যায় হচ্ছেনা কোনো? স্বাতী আর নীলের সম্পর্ক আসলে বহুদিন ধরেই নাকি ঠান্ডা বরফ। কোন রকম উত্তাপ সেখানে আর নেই, মাসে দু একবার বাঁধাধরা শারীরিক  সম্পর্ক ছাড়া। ছেলের জন্যই হয়তো দুজনে এখনো একসাথে আছে, নীলের কোন খেয়ালই স্বাতী আর রাখে না,  সে কি খেলো কোথায় গেল তাতে স্বাতী র কিছু আসে যায় না। নিজের বাপের বাড়ির লোকেদের নিয়ে সে বেশি ব্যাস্ত।
বাড়ি ঢুকে শম্পা দেখল মেয়ে তার দাদুর সাথে ক্যারাটে শিখতে গেছে। হাতমুখ ধুয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যায় সে। শাশুড়ি দিনের বেলা সামলালেও রাতে টিভির সামনে থেকে নড়বেন না। প্রথমে চা বানায় শম্পা, সবাইকে দিয়ে নিজের কাপে চুমুক দিতে দিতে আটা মাখে। রাত্তিরে চিকেন করবে আর রুটি। ওবেলার তরকারী আছে। রান্নার লোক রাখার কথা শম্পা অনেকবার তো বলেছে কিন্তু কেউ রাজি নয়। বাড়ির খরচ প্রায় পুরোটাই শম্পার ওপর, মাইনে খারাপ পায় না সে কিন্তু জমাতে পারে না তেমন, শ্বশুর মশাই বেসরকারি চাকরি করতেন পেনশন এর সুবিধে নেই,  নিজেদের হাতখরচ,  ডাক্তার ওষুধ, বাড়ির ট্যাক্স বা সারানো এসব অবশ্য ওনারাই চালান শম্পাকে দিতে হয় না কিন্তু খাওয়া খরচ ও বাকি সব শম্পার দায়িত্ব। -চিলি চিকেন করবে আজকে, তিন্নি খুব ভালবাসে।  
রাতে শুয়ে একটু বই পড়ে শম্পা,
  তিন্নি এগারোটা অবধি দিদার সাথে কখোনো টিভি দেখে কখোনো মাএর সাথে গল্প করে তারপর ঘুমোয়,  শম্পা বারোটা পর্যন্ত জাগেই, আগে এই সময়টাতে নীলের সংগে কথা হোত এখন আর শম্পা ফোনে নেট অন করে না। 
কি জানি শম্পার কপালটাই এত খারাপ কেন,  যাকে এত ভালবাসল সে কিছুতে কেন ওকে একটুও বুঝল না। মাস কয়েক আগে শম্পা নীলের সাথে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিল,  সেখানেই মাসতুতো ননদ আর তার মেয়ে তাদের দেখেছিল, ওরা থাকে কলকাতায়,  শম্পা আর নীলের হাত ধরে হলে ঢোকা আর ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে সিনেমা দেখা কিছুই বোধহয় ওদের নজর এড়ায় নি।  বাড়ি ফিরে শম্পা যেন ঝড়ের মুখোমুখি হোল, শ্বশুর শাশুড়ি এমনকি তিন্নিও তার কাজে স্তম্ভিত।  তিন্নি যদিও কারুর সামনে কিছু বলেনি কিন্তু তার কান্না থামানো মুশকিল হয়েছিল শম্পার। এর কিছু দিন আগে থেকেই শম্পার চালচলনে একটা পরিবর্তন নজরে এসেছিল সবারই। সবসময়ে মোবাইল নিয়ে বসে থাকা, অফিস থেকে ফিরতে দেরি,  সাজগোজেও কিছু পারিপাট্য এসে থাকবে, এসবই বাড়িতে একটু সন্দেহর বাতাবরণ তৈরি করে দিয়েছিল। সেদিন আবার ফিরে শম্পা একটা মিথ্যে কথা বলে তারপরই বোঝে যে সবটাই সবাই জেনে গেছে।
পর্ব ৩
রাতে চিলি চিকেন আর রুটি সবাই বেশ উপভোগ করে খেল। অথচ এই কদিন আগেই শ্বশুর মশাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন বলেছিলেন। প্রথমে খানিকক্ষণ অস্বীকার করলেও পরে শম্পা স্বীকার করে নিয়েছিল যে হ্যাঁ সে নীলকে বিয়ে করতে চায়। শুনে শ্বশুর শাশুড়ি প্রায় ভিরমি খান,  গালাগালি,  পুলিশে যাবার হুমকি,  তিন্নিকে সে আর পাবে না,  কিছুদিন বাদে নীল তাকে ছেড়ে পালাবে, কি না শুনতে হয়েছে তাকে। তিন্নির তখন পরীক্ষা, মেয়ে আর কিছুতেই পড়তে পারে না। শম্পা র জীবনে যেন কি খারাপ সময় একটা, একদিকে অফিস, সমস্ত কাজ,  প্রতিদিনের ডেলি প্যাসেঞ্জারি করা,  নিজের মনের উথাল পাথাল,  তিন্নি,  এত অশান্তি আর যেন বইতে পারছিল না। আর আশ্চর্য ব্যাপার নীল কেও একদম পাশে পেল না সে। এই ঝামেলার পরে শম্পা প্রথমে ভেবেছিল এই সম্পর্ক ভেঙে দেবে সে কিন্তু পেরে উঠল না,  নীল কে তখন বোঝাতে গেল, যে যদি যোগাযোগ রাখতেই হয় তবে খুবই সাবধানে সেটা করতে হবে। নীল কোন ফোন করতে পারবে না শম্পাকে,  বাড়িতে সবাই সন্দেহ করছে। সময় সুযোগ মতো শম্পাই বরং করে নেবে,  দেখা করাও খুব কমিয়ে দিতে হবে, মাসে একবারও হয় কি না হয়। নীল কিন্তু বুঝতে চাইলো না। তার মনে হোলো শম্পা প্রচন্ড স্বার্থপরের মতো কেবল নিজের কথাই ভাবছে। নীলের কথা একবারও ভাবছে না। নীল শম্পা কে সপ্তাহে দুদিন না দেখে থাকতে পারবে না,  ইচ্ছে হলে ফোন ও করবে।
শম্পা কি করবে ভেবে পায় না। সপ্তাহে দুদিনই বা কি,  রোজ দেখা হলে তার নিজেরই কত ভালো লাগে কিন্তু বাস্তব কে তো মানিয়ে নিতে হবে।  তাকে তো থাকতে হবে শ্বশুর শাশুড়ি কে মানিয়ে নিয়ে,  তিন্নির কথাও তো ভাবতে হবে, সে তো মা। আজকাল দেখা হলে বা ফোনে কেবলই ঝগড়া হয়,  শম্পার ক্লান্ত লাগে।  একটু গল্প একটু হাসি আনন্দ, বন্ধুতা ভালোবাসা এর জন্যই তো এত কষ্ট করে আসা,  তার বদলে যদি তিক্ততা হয় তবে কিসের জন্য কি।
প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত। নীল অনেক শান্ত হয়েছে এখন, কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে শম্পার, অনেক ভাবল ও,  দুটো ঘর , দুটো বাচ্চার ভবিষ্যৎ  সব কিছুই নিয়েই ভেবেছে সে। আর এই দুজন বুড়ো বুড়ি,  তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়েই তো বেঁচে আছেন তারা।  আজ তাই নীলের সাথে শেষ দেখা।  নীলের চোখে জল,  একটা ফুল দিলো ও শম্পাকে। শম্পা ওর প্রিয় খাবার বানিয়ে এনেছিল সেটাই দিল। তারপর উঠে পড়ল, মায়া বাড়িয়ে লাভ কি, শম্পার দুচোখ জলে ভেসে যাচ্ছে কিন্তু ওকে ফিরতেই হবে তিন্নির কাছে বাবা মা এর কাছে।