শর্মিষ্টা দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শর্মিষ্টা দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                                




না ফেরা পথে 

**************

রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর l অন্ধকারের বুক চিরে দ্বারকা থেকে বৃন্দাবনের দিকে উল্কার  গতিতে ছুটে চলেছে একটি স্বর্ণরথ l সোনার পালঙ্কে ঘুমন্ত রাজমহিষী সত্যভামার পাশ থেকে উঠে কাকে দেখার জন্য আজ ব্যাকুল কৃষ্ণ ! এ জীবনে কাঙ্খিত যা কিছু সবই তো পাওয়া হয়ে গিয়েছে তাঁর l অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি, প্রেম সব সব l এই সুবিশাল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্রে দ্বারকা এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এক রাজ্য l এখানকার সমৃদ্ধি সারা ভারতবর্ষের নাগরিকদের মুখে মুখে ফেরে l দ্বারকাধিপতি কৃষ্ণের অঙ্গুলিহেলনে চালিত হন ভারতের তাবড় ক্ষমতাবান নৃপতিরা l তাঁর মত বিদগ্ধ কূটনীতিক কোন অভাববোধ থেকে ছুটে চলেছেন ক্ষুদ্র এক জনপদের দিকে ! 

রাজকার্যে সারাটাদিন কেটে যায়, তারপরে নানারকম সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা পালন করে প্রায় মধ্যরাতে  নিজের সঙ্গে একা হন কৃষ্ণ l একটুআগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে l আকাশ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, তারা দেখা যায় না l অনেকদিন পরে কানে ভেসে এল বাঁশির সুর l মিঞামল্লারে কে বাঁশি বাজায় ? কোন রাখালবালক ? সঙ্গে নারীকণ্ঠে মৃদুস্বরে উচ্চারিত কিছু শব্দ... 
"জনম অবধি হাম রূপ নেহারলু 
নয়ন না তিরপিত ভেল l
সোই মধুর বোল শ্রবণহি শুনলু 
শ্রুতিপথে পরশ না গেল ll
কত মধুযামিনী রভসে গোঁয়ায়েলু 
না বুঝলু কৈছন কেল l
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখলু 
তব হিয়া জুড়ন না গেল ll"
বড্ড চেনা এই সুর ও বাণী l 
বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে মূর্ত হয়ে ওঠে এক প্রতিচ্ছবি l যমুনার তীরে অপেক্ষমান এক নারীমূর্তি l ঘননীল আকাশের প্রেক্ষাপটে স্পষ্টতর হাতির দাঁতের মত তাঁর গাত্রবর্ণ l ডালিমফলের মত রক্তিম ওষ্ঠ আর  টানাটানা হরিণীর মত কালো চোখে অন্তহীন আকুতি l যমুনার নীল জলের থেকেও গাঢ়  অঙ্গবাসের আড়াল থেকে স্পষ্টমান তাঁর অনিন্দ্যসুন্দর দেহ সৌষ্ঠব l 

আর ঘরে থাকতে পারেন না কৃষ্ণ l নিজের উচ্চাকাঙ্খাকে  কর্তব্যপরায়ণতার মোড়কে মুড়ে  একদিন যে গ্রাম ছেড়ে চিরতরে চলে এসেছিলেন মথুরায়, এক নারীর চোখের জলকে অস্বীকার করতে দ্বিধা করেননি, সেখানেই ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লেন তিনি l ওই তো সেই ঘাট, নৌকা বাঁধা আছে এখনও l গোপললনারা কি এখনও মথুরায় দধি বেচতে যাওয়ার জন্য পারাপার করে ! রাইও কি আছে তাদের দলে?  নাহ, তা কি করে হবে ! রাই কি এখনও সেই ভরা যুবতীটি আছে ! তাঁরও তো বয়েস হয়েছে নাকি ! সে তো কৃষ্ণের থেকেও বয়েসে বড় l তবু তাঁকে এক পলকের একটু দেখার জন্য কৃষ্ণের মত প্রাজ্ঞ হিসেবী মানুষও ছুটে আসে !
রথ থেকে নেমে গাঁয়ের পথে হাঁটতে থাকেন কৃষ্ণ l এ গাঁয়ের পথঘাট হাতের তালুর মত চেনা তাঁর l এত বছরে কিছুই বদলায়নি এখানে l ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ান আয়ান ঘোষের বাড়ির সামনে l ওই তো দধিমন্থধ্বনি শোনা যায় l রাত্রি তৃতীয় প্রহর, এসময়ে ঘুম থেকে উঠে গোপললনারা গৃহকর্ম শুরু করে l ভোরের আলো ফুটতেই দধিভাণ্ড নিয়ে হাজির হয় যমুনার কূলে l সরল, সাদাসিধে যাপন এদের l কৃষ্ণের জীবনটাও কি এমন হতে পারত না ! এখন সারা ভারতবর্ষের মানুষের মুখে মুখে ফেরে  তাঁর নাম, কীর্তির কথা l এটাই কি জীবনের কাছে চাওয়ার ছিল তাঁর ! একের পর এক সাফল্য মুঠোতে এসেছে, আর এই সারল্য থেকে, প্রেম থেকে ক্রমশ দূরে সরে গেছেন তিনি l অথচ কি নেই আজ কৃষ্ণের জীবনে? পারিবারিক জীবনও পরিপূর্ণ তাঁর l সুন্দরী স্ত্রী, কীর্তিমান পুত্র l কিন্তু সে জীবনে রাই নেই l রাইয়ের প্রেম নেই l সে জীবন এই ঘনঘোর বর্ষার রাতের থেকে গাঢ় অন্ধকার l 

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন কৃষ্ণ l রাই কি থাকে না এখানে ! উঠোনে কর্মব্যস্ত নারীদের মধ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে না তো ! কুঞ্জবনের দিকে ফিরে চললেন তিনি, বংশীবটের ছায়ার এসে এক মুহূর্ত থামলেন l ওই তো গাছের কোটরে গুঁজে রাখা মোহনবাঁশি l ঠিক যেমন অনেক অনেক বছর আগে কানু রাখত l সেদিন চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে রাত্রিবাস করে ফেরার পর রাগ করে কথা বলেনি রাই l  ওই কুঞ্জবনে বসে মুক্তোদানার মত হস্তাক্ষরে লিখেছিল, 
"বঁধু, কি আর বলিব তোরে 
অলপ বয়সে পিরীতি করিয়া 
রহিতে না দিলি ঘরে l 
কামনা করিয়া সাগরে মরিব 
সাধিব মনের সাধা 
মরিয়া হইব শ্রীনন্দের নন্দন 
তোমারে করিব রাধা ll" 

রাত্রি শেষ প্রহর l পূব আকাশ রাঙা হয়ে এল l ঘোর কাটে কৃষ্ণর l এবার ঘরে ফেরার পালা l আবার রাজা সেজে কর্তব্যের ঘেরাটোপে বন্দী হতে হবে l দীর্ঘশ্বাস ফেলে রথের দিকে এগিয়ে যান তিনি l হঠাৎই কুঞ্জবনের ভিতর থেকে সঙ্গীত ভেসে আসে, 
"আজু রজনী হাম ভাগে পোহায়েলু 
পেখলু পিয়া-মুখ-চন্দা l 
জীবন যৌবন সফল করি মানলু 
দশ দিশ ভেল নিরদন্দা ll" 
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কৃষ্ণ l ভাবোল্লাসে মগ্ন এক নারী সুরের মায়াজাল বুনে চলেছে আপনমনে তার সামনে কানুর একটি মৃৎপ্রতিমা l সময় একটিও আঁচড় কাটতে পারেনি তার শরীরে l চিরযৌবনা শাশ্বতী রাইয়ের সামনে থেকে সরে আসেন প্রৌঢ় দ্বারকাধিপতি l তিনি তো এখন আর সেই ব্রজের  রাখাল বালক নন, রাইয়ের সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা কই তাঁর ! ভালো থাকুক রাই তার কল্পনার জগতে l রাখালরাজা ভরিয়ে রাখুক তার সমস্ত সত্ত্বা l  স্বর্ণরথ ফিরে যায় লৌকিক সুখসমৃদ্ধির পথে l শুধু বৃন্দাবনের পথের ধুলোয় মিশে থাকে তাঁর কান্নাজলের দাগ l 

রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                   



খোঁজ 
(১৫)

দুপুরবেলা খাওয়ার পরে ওদের ঘরের সামনে তিনতলার ছাদে বসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ছিল শর্মিলা l টুবলুদা বেরিয়েছে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে l পরেরদিনই ইভলিনকে নিয়ে বিষ্ণুপুর যাবে, দুদিন পরে ফিরে এসে টুবলুদা একা ফিরে যাবে ইংল্যান্ডে l ইভলিন এখন এদেশে কিছুদিন থাকবে l পড়াশোনা ছাড়াও ওর নিজস্ব কিছু কাজ আছে l লাঞ্চের পর ও জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল l হঠাৎই শর্মিলা দেখল ইভলিন ওর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে 

--মে আই কাম ইন শর্মিলা? 

--হ্যাঁ হ্যাঁ, এসো l

--আমি আগামীকাল বিষ্ণুপুর যাবো জানো তো?  তারপর সাউথ বেঙ্গলের আরো কিছু জায়গায় যেতে হবে l আজ ফ্রি আছি l তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে একটু গল্প করি l তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে l তুমি খুব সুন্দর l ইউ হ্যাভ ভেরি ব্রাইট অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট আইজ l

বেশ লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল শর্মিলা l ইভলিন নিজেই ভারি সুন্দর l গোলাপি রং আর  নীল চোখের একটা পুতুলের মত l 

--জানো, আমি কিন্তু পিওর ব্রিটিশ নই l আমার মা ইন্ডিয়ান, বেঙ্গলি লেডি ছিলেন l তোমার মতই সুন্দরী l মা অক্সফোর্ডে ইংলিশ লিটারেচার পড়তে গিয়ে বাবাকে বিয়ে করেছিল l তারপর ওখানেই থেকে যায় l দুজনেই  লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে পড়াত  l মাই আমাকে বেঙ্গলি শিখিয়েছিল l আমাদের বাড়িতে এখনও কিছু কিছু বেঙ্গলি কালচার মেনটেইন করা হয় l বাঙালী রান্নাও করে মা l আমি ফিশকারী খেতে খুব ভালোবাসি l মায়ের ইন্টারেস্টেই আমি ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ নিয়ে পড়েছি l

--হ্যাঁ, তুমি প্রথমদিন এসেই সবাইকে প্রণাম করেছিলে l সবাই খুব খুশি হয়েছিল l কি সুন্দর কাঁটা বেছে মাছ খেয়েছিলে ! আমরা তো খুব অবাক হয়েছিলাম l ভেবেছিলাম টুবলুদা শিখিয়েছে l আচ্ছা, তোমার মা আর কোনোদিন এদেশে আসেন নি? ওঁর নিজের বাড়ি কোথায়, কলকাতায়? 

--না, মায়ের বাড়ি ছিল বোলপুরে l শান্তিনিকেতনে পড়ত l গ্র্যান্ড পার ইচ্ছে ছিল না মা বিদেশে পড়তে যাক l গ্র্যানির ইচ্ছেতেই মা গিয়েছিল l মা অক্সফোর্ডে হায়ার স্টাডিজ করতে যাওয়ার পর আমার বাবার সঙ্গে রিলেশনশিপ হয় l আর সেটা জানতে পেরে মায়ের বাবা খুব রেগে যান l আমার গ্র্যানিকে ব্লেম করেন l সেই অশান্তিতে গ্র্যানির সাডেন ডেথ হয় l  কিন্তু তারপর থেকে মা আর তার বাবার  সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেনি l আর কোনোদিন ফেরেওনি ইন্ডিয়ায় l আমার এক মাসি ছিলেন l তার সঙ্গেও মা কোনো যোগাযোগ রাখেনি l কিন্তু মা এখনও ইন্ডিয়াকে, নিজের বাড়িটাকে মিস করে l

--তুমি যে এখানে এলে, তোমার মা কিছু বলেননি? 

একটু থেমে ইভলিন বলল 

--না, মা কিছু বলেনি l কিন্তু আমি ঠিক করেছি একবার শান্তিনিকেতন যাবোই  l মাকে জানাবো না এখন l আমি মায়ের বাড়িটা দেখব l বাড়ির অ্যাড্রেস আমি জানি, পুরোনো ফটোও দেখেছি l আমার মাসিকেও খুঁজে বার করব l দীপ মানে তোমার টুবলুদা এত কিছু জানে না l তুমি কি কখনো শান্তিনিকেতনে গিয়েছ শর্মিলা ? 

শর্মিলা মাথা নাড়ল l শান্তিনিকেতন কেন ! একবার দুদিনের জন্য দীঘার সমুদ্র ছাড়া আর কোনোদিনই কোথাও যাওয়া হয় নি ওর l 

--তুমি যাবে আমার সঙ্গে? অথবা তোমার চেনা কেউ আছে, আমাকে একটু গাইড করতে পারবে? 

--আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করব l

সেদিন বিকেলে মৈত্রেয়ীকে কথাটা বলতেই ও বলল 

--আরে, আমরা তো নেক্সট উইকেই দুদিনের জন্য শান্তিনিকেতন বেড়াতে যাচ্ছি l ওখানে কল্লোলদাদের একটা বাড়ি আছে l বাবা নিজে যেতে পারবে না বলে গাড়ি ঠিক করে দিয়েছে l তোদেরও নিয়ে যাবে মা বলেছে l আজকেই সন্ধ্যেবেলা তোদের বাড়ি গিয়ে কাকিমাকে বলবে ভেবেছে l কেয়ামাসিকেও বলেছে l ভালোই হল, ইভলিনও আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে l 

--কিন্তু নেক্সট উইকেই তো আমাদের রেজাল্ট বেরোবে l এখন যাবোই বা কি করে? 

--রেজাল্টের আগেই তো যাবো আমরা l অপর্ণার এখন একটু চেঞ্জ দরকার l কেয়ারাও যাবে l সবাই মিলে দুদিন একটু আনন্দ করে আসব l তাছাড়া কল্লোলের মা নীলিমাদিও আসবে আসানসোল থেকে l দেখবি কেমন ভালো মানুষ l

কাবেরীকাকিমা বললেন l 

কলকাতার রাস্তায় নতুন মারুতি ভ্যান চলতে দেখেছিল শর্মিলা l তেমনই একটা ঝকঝকে সাদা মারুতি ভ্যান ভাড়া করে পরের রবিবার ওরা শান্তিনিকেতনের পথে রওনা দিল l রাজশ্রী, অপর্ণা, মৈত্রেয়ী আর শর্মিলা ছাড়াও কেয়ামাসি, শর্বরীদি আর শম্পাও ওদের সঙ্গী l নার্সিংহোমে বলেকয়ে  দুদিনের জন্য মায়ের ছুটির ব্যবস্থা করেছে মৈনাকদা  l শুক্রবার টুবলুদা  ফিরে গেছে ইংল্যান্ডে l রবিবার বিকেলে বিষ্ণুপুর থেকে ইভলিন এসে যোগ দেবে ওদের সঙ্গে l মৈনাক কলকাতা থেকে একটা অ্যাম্বাসেডর নিয়ে ভোরবেলাতেই চলে গেছে বিষ্ণুপুর l ওখান থেকে বোলপুর পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে ওদের l বোলপুরের  ভুবনডাঙায় কল্লোলের দাদুর বাড়ি l এখন অবশ্য কেয়ারটেকার দেখাশোনা করে l দাদু মারা গেছেন l ওই বাড়িতেই ওদের থাকার ব্যবস্থা করেছে কল্লোল l ও সকালেই  আসানসোল থেকে ওর মা-বাবাকে নিয়ে বোলপুর চলে আসবে l 

চারদিকে বাগানঘেরা খুব সুন্দর একটা বাংলোটাইপের মাটির দোতলা বাড়ি l কাঠের গেট পেরিয়ে লাল মোরামের রাস্তা l দুধারে নানা রংয়ের ফুলগাছ l কলকাতার বাইরে বেরিয়েই মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল l এই বাড়িতে পা দিয়ে মনটা হালকা হয়ে গেল শর্মিলার l বাড়ির পিছনদিকে ফলের বাগান l একতলা আর দোতলা মিলিয়ে মোট পাঁচটা শোবারঘর l মাটির দেওয়ালে কি অপূর্ব ম্যুরালের কাজ l দোতলার ডানদিকের ঘরে শর্মিলা, মৈত্রেয়ী আর শম্পা থাকবে l বাঁপাশের ঘরটা অনেক বড় l সেখানে দুটো ডবলবেড খাটে মা, পিসি, কেয়ামাসি আর কাবেরীকাকিমা থাকবে l মাঝের ঘরে শর্বরীদির সঙ্গে ইভলিনের থাকার ব্যবস্থা হল l নীচের একটা ঘরে কল্লোলদা  আর মৈনাকদা  থাকবে l অন্য ঘরটা কল্লোলদার মা -বাবার l বেশ একটা জমজমাট পিকনিকের মত ব্যাপার l 

দুপুরে বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থেকে নামতেই কল্লোলদার মা আর বাবা হৈহৈ করে এসে ওদের অভ্যর্থনা জানালেন l কেয়ারটেকার বংশীদার বউ রান্নাবান্না করে রেখেছিল l খাওয়াদাওয়া মিটতেই বিকেল l সেদিন আর আশ্রমে যাওয়া হল না শর্মিলাদের l খাওয়াদাওয়ার পর বাগানে বসে গল্প করতে করতেই মৈনাকদা ইভলিনকে নিয়ে চলে এল l শর্মিলারা  বুঝতে পারছিল নিছক বেড়াতে আসা ছাড়াও কাবেরীকাকিমার অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে l কল্লোলদার সঙ্গে শর্বরীদির বিয়ের সম্বন্ধ করছে কাকিমা l বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কল্লোলদার মাকে মেয়ে দেখানোও হয়ে যাবে l ওদের তিনজনের মধ্যে এই নিয়ে রীতিমত ফিসফাস শুরু হয়ে গেল l শর্বরীদিও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা, আর যারপরনাই লজ্জাও পাচ্ছে l তারমধ্যে শম্পা আবার দিদির লেগপুল করতেও ছাড়ছে না l সব মিলিয়ে বেশ একটা মজাদার  পরিবেশ l নীলিমামাসি আর মেসোমশায়ের বেশ পছন্দ হয়েছে শর্বরীদিকে l কল্লোলদাও রাজি l অবশ্য শর্বরীদি বিএ পরীক্ষা দেওয়ার পর বিয়ে হবে l এখনও কয়েকমাস দেরি আছে l কলকাতায় ফিরে বিয়ের ডেট ঠিক করা হবে l 

পরেরদিন সকালে ওরা সবাই মিলে আশ্রম দেখতে গেল l কালোবাড়ি  থেকে সঙ্গীতভবনের দিকে এগোতেই হঠাৎ ইভলিন একজন ভদ্রমহিলাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল l অস্ফুটে বলল 

--শি ইজ লুকিং জাস্ট মাই মম l 

ভদ্রমহিলা বেশ পরিচিত মুখ l প্রায়ই টেলিভিশনে খবর পড়তে দেখা যায় l তাছাড়া উনি একজন নামকরা বাচিকশিল্পী l ওঁর সাজপোশাক, হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি সবই অত্যন্ত রাবীন্দ্রিক আর রুচিসম্মত l শর্মিলারাও দেখেই চিনতে পারল l 
ইভলিন সটান তাঁর সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল 

--আর ইউ সোমশুক্লা মিত্র?  

ভদ্রমহিলা একটু হকচকিয়ে তাকাতেই ইভলিন ব্যাগ থেকে ওর মায়ের ফটো বের করে ফেলেছে l 

--সোমদত্তা মিত্র ক্লার্ক l তুমি কি চিনতে পারো?  

--তু -তুমি? 

কাঁপা গলায় বললেন সোমশুক্লা l তারপর কঠিন গলায় বললেন 

--সোমদত্তা নামে আমার একজন বোন ছিল l কিন্তু এখন আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই l তুমি কি ওকে চেনো?  

-- আমি সোমদত্তার মেয়ে l তুমি আমার মাসি হও l নিজের কাজ ছাড়াও তোমাকে খুঁজব বলে ইন্ডিয়া এসেছি l দেখো, সাডেনলি খুঁজে পেয়ে গেলাম l 

--সোমা নিজেই আমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেনি l ডক্টর ক্লার্ককে বিয়ে করার জন্য মা মারা গেলেন l বাবা বললেন আর কোনোদিন ওর মুখ দেখবেন না l তারপর আমাকেও ও চিঠিপত্র লেখা বন্ধ করে দিল l কোনো যোগাযোগ রাখল না l 

--মা তখন অভিমান করে ভুল ডিসিশন নিয়েছিল মাসি l এখনও সেজন্য মনে মনে কাঁদে, আমি বুঝতে পারি l মায়ের জন্যই আমি ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে ইন্টারেস্ট পেয়েছি l রিসার্চ করতে ইন্ডিয়া এসেছি l আট বছর আগে আমার বাবার ডেথ হয়েছে l মা ছাড়া আমার কেউ নেই l শি ইজ অলসো সাফারিং ফ্রম ক্যান্সার l আমি চাই লাস্ট ডেজগুলোতে মা নিজের লোকজনকে ফিরে পাক l প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিও না মাসি l 

--ঠিক আছে l তুমি কলকাতায় ফিরে আমার বাড়িতে এসো l তখন কথা হবে l আমার অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার দিচ্ছি l 

--আর তোমাদের বাড়ি?  আমি তো মায়ের বাড়ি দেখব বলেই শান্তিনিকেতনে এলাম l 

--ওই বাড়ি আমি বিক্রি করে দিয়েছি l এখানকার প্রফেসর মিস্টার দেশপাণ্ডে ওই বাড়িতে থাকেন l  রতনপল্লীতে গিয়ে দেখে আসতে পারো l আমি এখানে এলে গেস্টহাউজেই থাকি এখন l

চোখের সামনে যেন একটা নাটকের অভিনয় দেখতে পেল শর্মিলারা l সোমশুক্লা মিত্র চক্রবর্তী চলে যাওয়ার পর ইভলিনকে নিয়ে ওরা বাড়ি ফিরল l মৈনাকদা বলল কলকাতায় ফিরেই ও ইভলিনকে ওর মাসির বাড়ি নিয়ে যাবে l ইভলিন বলল পরেরদিন শর্মিলাদের  নিয়ে রতনপল্লীতে দাদুর বাড়ি দেখতে যাবে l ওই বাড়িতে নাকি যেতেই হবে ওকে l

(চলবে )



শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                             


খোঁজ  (একাদশ পর্বের পর)
(১২)

অরুণ ফিরে আসার দিনকয়েকের মধ্যে মেয়ের  বাড়িতেই একদিন ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে চলে গেলেন যোগমায়া l সেরিব্রাল অ্যাটাক l কোমরভাঙার পর বার্ধক্যজনিত সমস্যায় শরীরের কলকব্জা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল l ইদানিং ওষুধের ঘোরে সারাক্ষণই ঝিমোতেন l জাগতিক বোধও লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল l তাঁর সংসারে যে কত বড় বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে যাওয়ার আগে তা টেরও পেলেন না l নীরবেই পৃথিবী থেকে মুছে গেল একটা প্রজন্ম l সন্তানদের কাছে অবাঞ্ছিত হওয়ার শুরুতেই তাঁদের মুক্তি দিলেন যোগমায়া l কোনো কোনো মৃত্যু নিকটজনের কাছেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে l বিশেষত সংসারের এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে যোগমায়ার জন্য শোকতাপের অবকাশও ছিল না কারুর l অরুণ জ্যেষ্ঠ সন্তান হলেও মাতৃদায় উদ্ধার করার মত অবস্থায় নেই l অলোক ঘোরতর কমিউনিস্ট, সে এই সব শ্রাদ্ধশান্তির অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে না l রাজশ্রী নিজেই দাহকাজ থেকে শুরু করে পারলৌকিক সব কাজই সামলে নিলেন l  যোগমায়ার সামান্য কিছু চিহ্ন পড়ে রইল তাঁর ঘরে l অরুণকে নিয়ে নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া, পরিচর্যা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন অপর্ণা l তাঁর নিজের শরীরও ভালো নয় l কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর একদিন রাজশ্রী এসে খাটের তলা থেকে মায়ের ট্রাঙ্কটা বের করলেন l বাক্সের ভিতর অপাংক্তেয় কিছু জিনিস l কয়েকটা সাদা থান,  আর টুকরো কাপড়ে বাঁধা অল্প কয়েকটা খুচরো পয়সা আর নোট l ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ঝাপসা কাচের ভিতরে প্রায় সাদা হয়ে যাওয়া যোগমায়া আর তাঁর স্বামীর বিবাহকালীন ফটো l এছাড়াও স্বামীর ব্যবহৃত একটি নিকেলের চশমার ফ্রেম একটা ছোট বাক্সে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা l আরো কিছু টুকিটাকি l যোগমায়ার গচ্ছিত সম্পদ বলতে এটুকুই l অনেকদিন পরে শাশুড়ির ঘরে খাটের ওপর বসে সেই সাদা থানে হাত রেখে কেঁদে ফেললেন অপর্ণা l এই মানুষটির সঙ্গে কোনোদিনই হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি তাঁর l দুজনের মানসিকতার বিস্তর ব্যবধান, সম্পর্কের মধ্যে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে রেখেছিলেন নিজেই l তবু এই মুহূর্তে শাশুড়ির জন্য চোখের জলটুকু মিথ্যে নয় l এভাবেই  সংসারে প্ৰিয় - অপ্রিয় সবকিছুই কখন যেন  জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে l  

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিৎসায় একটু একটু করে সাড়া দিতে শুরু করলেন অরুণ l চিকিৎসা ও ওষুধের প্রভাবে, বাড়ির পরিবেশ আর পরিবারের সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগলেন l এখন অল্পস্বল্প কথা বলেন অপর্ণার সঙ্গে l হ্যাঁ অথবা না বলে মতামত দিতে পারেন l একমাত্র অপর্ণা ছাড়া আর কাউকেই বোধহয় চিনতে পারেন না l চোখের দৃষ্টিটাই যেন পাল্টে গেছে, বড্ড ভয় করে শর্মিলার l বাবার সামনে যায় না বড় একটা l অলোক, শবনম নিজেদের কাজে ব্যস্ত l এক বাড়িতে থেকেও ওদের বৃত্তটা ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছে l রান্নার লোক পুষ্প ছাড়াও মালতী নামে একটি মেয়েকে সারাদিন কাজের জন্য রাখা হয়েছে l মুনমুনের দিকে এখন আর তেমন নজর দিতে পারেন না অপর্ণা, মালতীর মূল কাজ মুনমুনকে দেখাশোনা করা l তাছাড়াও  শবনমের মাও রোজই দুপুরে এসে মুনমুনের কাছে থাকেন l মুনমুন বেশিরভাগ সময় দিদার সঙ্গে নীচের ঘরেই থাকে l আগের মত আর শর্মিলা বা অপর্ণার কাছে ঘেঁষে না l অবশ্য অপর্ণার সময়ও নেই, তবু কষ্ট হয় খুব l মেয়েটা তো তাঁকে এখনও মা বলেই ডাকে ! 
রাজশ্রীও প্রায় রোজই আসেন এ বাড়িতে l শর্মিলার পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন l রোজ বইপত্র নিয়ে বসলেও পড়ায় মন বসে না l এরমধ্যেই টেস্টের রেজাল্ট আউট হল l বাড়ির এই বিপর্যয়ের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে  কোনোরকমে টেস্টে অ্যালাও হলেও ফাইনালের রেজাল্ট অবধারিতভাবে খারাপ হবে এটা যেন ধরেই নিয়েছে শর্মিলা l অবচেতনে মনের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয় l ক্রমশ নিজের ভিতরে গুটিয়ে যেতে থাকে l রাজশ্রী বিষয়টা নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে শর্মিলাকে বললেন 
-- মুন্নি, এবাড়িতে থাকলে তোর পড়াশোনা হবে না l তুই বরং আমার সঙ্গে ও বাড়িতে চল l 
--তোমার তো স্কুল আছে পিসি...একা একা থাকলে আমার আরোই পড়া হবে না l 

এসব বলে তখনকার মত কাটিয়ে দিল শর্মিলা l নিজের বাড়ি ছেড়ে, মাকে ছেড়ে কোনোদিন কোথাও থাকেনি ও l পিসির কোলেপিঠে বড় হয়ে উঠলেও ওই বাড়িটাকে কিছুতেই আপন মনে হয় না ওর l বিকেলে পড়তে গিয়ে মৈত্রেয়ীকে সেকথা বলতেই ও বলল 
-- পিসি ঠিকই বলেছে l ও বাড়ির পরিবেশে তোর পড়াশোনা হবে না l  তুই বরং পরীক্ষার কটা মাস আমাদের বাড়িতে থেকে যা l আমিও  সারাদিন তোর ওপর নজর রাখতে পারব l
 শর্মিলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও কাবেরীকাকিমাকে পাকড়াও করে তখনই ছুটল শর্মিলাদের বাড়ি l কাবেরী অপর্ণাকে বললেন 

--অপর্ণা আমি তোমার দিদির মত, সেই অধিকারে বলছি শর্মিলাকে পরীক্ষা অবধি অন্তত আমি আমার কাছেই রাখব l মৈত্রেয়ীর সঙ্গে থাকলে সারাদিন পড়াশোনার পরিবেশে থাকতে পারবে l সেটা এখন ওর জন্য খুব দরকার l দেখো, এমনিতেই ওর পড়াশোনার যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে l এবাড়িতে ও কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারবে না l  ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে, এই দু - আড়াইমাস আদা- জল খেয়ে পড়লে নিশ্চিত ভালো রেজাল্ট হবে l 

অপর্ণাও বিলক্ষণ বুঝেছিলেন এভাবে চললে মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার l এইমুহূর্তে শর্মিলার জন্য এটাই সবথেকে ভালো ব্যবস্থা l 

--তুমি আমায় বাঁচালে কাবেরীদি l এ কটা দিন বরং মুন্নির দায়িত্ব তুমিই নাও l আমি তো আজকাল ওকে দেখতেই পারি না l 

রাজশ্রী একটু মনঃক্ষুন্ন হলেও মুখে বললেন 

--এটাই বরং ভালো হল l মুন্নি তোর জামাকাপড়, বইখাতা গুছিয়ে নে l এ কটা দিন মন দিয়ে পড় l দেখবি ঠিক ভালো হবে রেজাল্ট l মাঝেমাঝে দু - চারদিন পরপর একবার এসে একটু মাকে দেখে যাস l 

মৈত্রেয়ীর বাড়িতে আসার পরে একটু একটু করে আবার পড়াশোনার মধ্যে ডুবে যেতে লাগল শর্মিলা l মৈত্রেয়ী নিজে পড়তে পড়তেও ওর পড়ার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে l কাবেরীকাকিমা ঘড়ির কাঁটা ধরে ওদের খাবার খাওয়ান l না খেলে নিজের হাতে খাইয়েও দেন l ওরা টেস্টপেপার সলভ করে, উনি রাত জেগে ওদের সঙ্গে বসে থাকেন l মাঝেমাঝে কফি বানিয়ে এনে দেন l বড্ড স্নেহময়ী মানুষটি, নিজের সন্তানের থেকে বেশীই যত্ন করেন শর্মিলাকে l আদরে, শাসনে শর্মিলার সারাটা দিন ভরে থাকে l এ বাড়ির আশ্চর্য মায়াময় পরিবেশে একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাটা ক্রমশ ফিকে হতে থাকে  l পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা একটু একটু করে ফিরে আসে l নিজের প্রতি আস্থাও বাড়ে l রিজ্জুদার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে l সপ্তাহে এক - দুদিন অল্প কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি এলে মায়ের মুখটা আলোয় ভরে ওঠে l 

--মুন্নি, কাবেরীদির এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না l উনি আমাদের দুঃসময়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন ! তুমি কিন্তু কক্ষনো কাবেরীদির অবাধ্য হয়ো না l 

বাবার চাকরি নেই, জমানো টাকাও তেমন নেই l সংসারখরচের বেশিরভাগটা বাবাই দিতেন l  চিকিৎসার খরচ যদিও বেশিরভাগটাই পিসি দেয়, ছোটকাও দেয় কিছুটা l এখন সংসারটাও অলোকদের টাকাতেই চলে l সেজন্য মরমে মরে থাকেন অপর্ণা l সবই বুঝতে পারে শর্মিলা l উপর্যুপরি আঘাতে হঠাৎই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে ও l ছোটকা-কাম্মার নিস্পৃহ আচরণ মাকে কতখানি পীড়া দেয় সেটাও বোঝে l সময় আর পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন বদলায়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণও l শর্মিলা নেই, একা একা যুদ্ধ করতে করতে মা ক্লান্ত l মায়ের চোখের তলায় কালি, দৃষ্টিতে গভীর অবসাদ l ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে যেতে শর্মিলাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করে মা l নিজেকে মনে মনে ইস্পাতের মত ধারালো করে তোলে শর্মিলা l ভালো রেজাল্ট করতেই হবে ওকে l নিজের জন্য তো বটেই, মায়ের জন্যও l কাবেরীকাকিমার বাড়িতে ফিরে আবার ডুবে যায় পড়াশোনার মধ্যে l 
পরিমলকাকু ব্যস্ত মানুষ l পুলিশের চাকরিতে ছুটি পান না বললেই হয় l তবু বাড়িতে থাকলে এক এক দিন সন্ধ্যেবেলা ওদের ডেকে হই হই করে গল্প করতে বসেন l মৈনাকদা থাকলে সেও যোগ দেয় আড্ডায় l গ্রূপ করে ক্যারম খেলা হয় l কাকিমা চায়ের সঙ্গে নানারকম জলখাবার বানিয়ে আনেন  l এম বি বি এস পাশ করে সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছে মৈনাকদা l বাড়ি কাছে হলেও হোস্টেলেই থেকে যায় বেশিরভাগ সময় l ওর বন্ধু -সহকর্মী কল্লোলদাও আসে l কল্লোলদাকেও খুব ভালোবাসে কাকিমা l সবসময় বলে
-- কল্লোল আমার আর একটা ছেলে l 
কল্লোলদার বাড়ি আসানসোলে, মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে মৈনাকদার সঙ্গেই থাকে l ভালো কিছু রান্না করলেই কল্লোলদাকে ডেকে পাঠায় কাকিমা l  এ বাড়ির পরিবেশটা অনেক খোলামেলা, অনেকটা শর্মিলার চন্দননগরের দাদুর বাড়ির মত l.ঘণ্টাখানেকের আড্ডার পর ফ্রেশ হয়ে আবার পড়তে বসে ওরা l 
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অনেকটাই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল শর্মিলা l মৈত্রেয়ীর ধারেকাছে না হলেও প্রিপারেশন একেবারে খারাপ হয়নি l অন্তত পাশ করার চিন্তাটা নেই l এই ক মাস ক্রমাগত টেস্টপেপার সলভ করিয়ে আর নিজে পরীক্ষা নিয়ে মৈত্রেয়ী ওকে অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছে l ভাগ্যিস মৈত্রেয়ী আর কাবেরীকাকিমা ছিল ! ঈশ্বর আছেন কি নেই জানে না শর্মিলা l তবে তিনি বোধহয় কাবেরীকাকিমার মতই দেখতে ! 

ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয় l ওদের সিট পড়েছে তালতলার একটা স্কুলে l পরিমলকাকু গাড়ি করে ওদের পরীক্ষার সেন্টারে ছেড়ে দিয়ে আসেন l প্রতিদিন দুটো করে পেপার l মাঝখানে টিফিন ব্রেকে কাবেরীকাকিমা আসেন l জোর করে ডাবের জল, মিষ্টি খাইয়ে দেন l প্রিপারেশন অনুযায়ী পরীক্ষা ঠিকঠাকই হচ্ছে শর্মিলার l নিজের সম্পর্কে এর থেকে আর খুব বেশি কিছু আশা করে না ও l বিকেলে ফেরার সময় ওরা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে l পরীক্ষা দেওয়ার পর মৈত্রেয়ী আর পেপার নিয়ে কোনো আলোচনা করতে দেয় না l অ্যাডিশনাল বায়োলজি পরীক্ষার দিন হল থেকে বেরিয়েই ওরা দেখল কল্লোলদা দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের বাইরে l 

(চলবে )

শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                                       




দশম পর্বের পর 
খোঁজ (১১)

ইলেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে বেশ কয়েকদিন সর্দিজ্বরে ভুগল শর্মিলা l রেজাল্টও খুব একটা ভালো হল না l খাতায়কলমে শরৎকাল এসে গেলেও সেদিন দুপুর থেকেই ঘোর বর্ষা l ফিজিক্সের লাস্ট  প্রাকটিক্যাল ক্লাসদুটো হল না, দু পিরিয়ড আগেই স্কুল ছুটি হয়ে গেল l মৈত্রেয়ী অ্যাবসেন্ট, ওর জ্বর হয়েছে l শম্পার আরো আগে ছুটি হয়ে গেছে l একাই স্কুল থেকে ফিরছিল  শর্মিলা l সকাল থেকেই কেমন আনমনা হয়েছিল l বেশ কিছুদিন ধরেই রিজ্জুদার চিঠিপত্র বেশ অনিয়মিত l গতমাসে কলকাতায় আসেওনি l অফিসে নাকি খুব কাজের চাপ l কাল রাত্তিরে খাবার টেবিলে বসে কানে এল, কাম্মা খুব উত্তেজিত হয়ে ছোটকাকে বলছে রিজ্জুদাকে  নাকি অফিস থেকে ট্রেনিংএ বিদেশে পাঠাচ্ছে l আগামীমাসেই অন্তত বছরখানেকের জন্য জার্মানি চলে যাবে রিজ্জুদা l অফিসে কাম্মাকে ফোন করে জানিয়েছে l আজ সকালে মুনমুনও বলল 
--জানিস দিদিভাই, মামু না অনেক দূরের একটা দেশে চলে যাবে l 
অথচ আশ্চর্য ! শর্মিলাকে এ বিষয়ে বিন্দুবিসর্গও জানায়নি ! মৈত্রেয়ীদের বাড়িতে তো মাঝে মাঝে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলে l ওখানে কি একবারও ফোন করতে পারত না ! অভিমানে চোখে জল এসে গিয়েছিল  শর্মিলার l ক্লাসে পড়ায়ও  মন দিতে পারেনি l কেন এমন করল রিজ্জুদা ! অন্যমনস্ক হয়ে না দেখে রাস্তা ক্রস করার সময় একটা সাইকেল হঠাৎ করেই সামনে চলে এল l হুমড়ি খেয়ে মাঝরাস্তায় পড়ে গেল শর্মিলা l মুহূর্তে  জামাকাপড় জলকাদায় মাখামাখি l
--এই শর্মিলা, কি করছ ! এভাবে কেউ রাস্তা দিয়ে হাঁটে ! 
শর্মিলা তাকিয়ে দেখল কল্লোলদা, মৈত্রেয়ীর দাদা মৈনাকদার বন্ধু l মেডিকেল কলেজে পড়ে l ওদের পাড়াতেই থাকে, হোস্টেলে l কল্লোলদাই পৌঁছে দিল ওকে বাড়িতে l হাঁটুতে, কনুইয়ে একটু কেটে ছড়ে গিয়েছিল l জোর করে ওষুধ লাগিয়ে দিল l  এভাবেই শরীর -মনের ব্যথা নিয়ে কেটে গেল কয়েকটা দিন l সপ্তাহখানেক পরে রিজ্জুদার চিঠি এল l মন দিয়ে পড়াশোনা করার দীর্ঘ উপদেশ আর ছোট্ট করে জার্মানি যাওয়ার খবর l যেন এই খবরটার কোনো গুরুত্বই নেই l প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ, সেজন্য কোনো উত্তেজনা নেই l দীর্ঘ একটা বছর, হয়ত বা তারও বেশি দেখা হবে না, সেজন্য কোনো  দুঃখবোধও নেই l খুব উদাসীনভাবে যেন অন্য কারুর প্রবাসে যাওয়ার  কথা লিখেছে l যেন রিজ্জুদা থাকা না থাকায় শর্মিলার কিছু যায় আসে না ! এভাবে একতরফা আবেগে কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে ! আজকাল রিজ্জুদাকে অনুভূতিহীন পাথর মনে হয় ওর l সত্যিই কি শর্মিলার প্রতি ওর কোনো অনুভূতি নেই ! শর্মিলা কি একাই এই সম্পর্কটা নিয়ে সিরিয়াস ! নিজের ভিতরে ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকে শর্মিলা l আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে l 

কয়েকদিন পরে রিজ্জুদা কলকাতায় এল l বিদেশ যাওয়ার আগে অপর্ণা একদিন ওকে রাতে  নেমন্তন্ন করলেন, সকলের উপস্থিতিতে শর্মিলার সঙ্গেও  দেখা হল l নেহাতই সৌজন্য সাক্ষাৎ l ও আলাদা করে শর্মিলার ঘরে এসে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখাল না, শর্মিলাও না l রিজ্জুদা যাওয়ার আগেই মাথা ধরেছে বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল l ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও ইগোর লড়াইতে কোনোমতেই হারবে না শর্মিলা l মৈত্রেয়ী বলল 
--যে তোকে গুরুত্ব দেয় না, তাকে তুই কেন গুরুত্ব দিবি বল তো ! রিলেশনশিপকে যে রেজাল্টের মাপকাঠিতে মাপে সে এমন ব্যবহারই ডিজার্ভ করে l তুই যা করেছিস, একদম ঠিক l রিজ্জুদা যদি কোনোদিন সত্যিসত্যি মিস করে তোকে, তাহলে তোর ইমোশনকে ইম্পর্টেন্স দেবে নিশ্চিত l ও তোর ভালো রেজাল্ট দেখতে চায় তো ! সেটাই করে দেখা l তারপর দেখ না কি হয় ! 

মৈত্রেয়ী যত সহজে কথাটা বলতে পারল, পড়াশোনা করাটা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল শর্মিলার কাছে l 
আগস্টের শেষ রবিবার দমদম এয়ারপোর্ট থেকে দিল্লির উড়ান ধরল রিজওয়ান l শর্মিলার বুকের ভিতরটা যেন খালি হয়ে গেল l ফাঁকা নিস্তব্ধ বাড়ি l অলোক, শবনম  আর মুনমুন গিয়েছে এয়ারপোর্টে l সন্ধ্যাবেলা ঘর অন্ধকার করে নিজের ঘরে শুয়েছিল শর্মিলা l পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙার পর যোগমায়া কিছুদিন ধরেই মেয়ের  বাড়িতে রয়েছেন l অপর্ণার শরীর বিশেষ ভালো নেই l হাই ব্লাডপ্রেশার ছাড়াও কার্ডিয়াক কিছু সমস্যায় এখন আর বেশী পরিশ্রম করতে পারেন না l বাবলু - টুবলু এখন ইংল্যান্ডে l রাজশ্রীর বাড়িটা প্রায় খালিই পড়ে থাকে, তাই রাজশ্রী  মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন l সেখানেই সকাল - বিকেল দুজন সেবিকা  তাকে দেখাশোনা করে l সন্ধ্যেবেলা অরুণ মাকে দেখতে গিয়েছেন l  চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার l অপর্ণা এসে বসলেন মেয়ের মাথার কাছে l 
--মুন্নি, তুমি তো আমার হেরে যাওয়ার মেয়ে নও ! যা ধরে রাখা যায় না, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা কোরো না কখনও l এই ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্তি দাও মা ! 
মায়ের কোলে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে ফেলল শর্মিলা l ওর মাথায় হাত রেখে মা আস্তে আস্তে বলতে থাকলেন 
 
--"আমারে সাহস দাও, দাও শক্তি, হে চিরসুন্দর,
দাও স্বচ্ছ তৃপ্তির আকাশ, দাও মুক্তি নিরন্তর
প্রত্যহের ধূলিলিপ্ত চরণপতনপীড়া হতে,
দিয়ো না দুলিতে মোরে তরঙ্গিত মুহূর্তের স্রোতে,
ক্ষোভের বিক্ষেপবেগে। শ্রাবণসন্ধ্যার পুষ্পবনে
গ্লানিহীন যে সাহস সুকুমার যূথীর জীবনে--
নির্মম বর্ষণঘাতে শঙ্কাশূন্য প্রসন্ন মধুর,
মুহূর্তের প্রাণটিতে ভরি তোলে অনন্তের সুর,
সরল আনন্দহাস্যে ঝরি পড়ে তৃণশয্যা 'পরে,
পূর্ণতার মূর্তিখানি আপনার বিনম্র অন্তরে
সুগন্ধে রচিয়া তোলে, দাও সেই অক্ষুব্ধ সাহস,
সে আত্মবিস্মৃত শক্তি, অব্যাকুল,সহজে স্ববশ
আপনার সুন্দর সীমায়, দ্বিধাশূন্য সরলতা
গাঁথুক শান্তির ছন্দে সব চিন্তা, মোর সব কথা।"

দেশজুড়ে তখন খালিস্তানি আন্দোলনের ঢেউ l স্বাধীন শিখরাষ্ট্রের দাবিতে সোচ্চার সমগ্র শিখসমাজ l অপারেশন ব্লু-স্টারের আঁচ কলকাতার বাঙালিদের ঘরেও এসে লেগেছে l তারস্বরে টিভির খবর চলে আর পার্টিঅফিস বা পাড়ার চায়ের দোকানের তর্ক উঠে আসে শর্মিলাদের বসার ঘরে l বাবা অফিস থেকে ফিরলে পাশের বাড়ির সমীরণকাকু রোজ সন্ধ্যেবেলা আড্ডা দিতে আসেন এ বাড়িতে l ছোটকা থাকলে শুরু হয় তুমুল তর্কবিতর্ক l রাজনৈতিক তরজায় মুখর হয়ে ওঠে বাঙালির অন্দরমহল l বছরখানেক আগে সমীরণকাকু অর্থাৎ শম্পার বাবা আর্মি থেকে রিটায়ার করে কলকাতায় চলে এসেছেন, মেডিসিনের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন ইদানিং l কেয়ামাসিদের  জমি কেনা হয়েছে  বেলেঘাটায় l কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ি করে চলে যাবে ওরা l 
প্রিটেস্ট হয়ে গেছে l এবারেও শর্মিলার রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি l একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়েই বইখাতা খুলে বসে থাকা l বাড়িতে থাকলে বইয়ের সমস্ত অক্ষরগুলোই দুর্বোধ্য ঠেকে l কোনো অঙ্কই মেলে না, মাঝপথে এসে আটকে যায় lআত্মবিশ্বাস ক্রমশ তলানিতে l এখন মনে হয় আর্টস পড়লেই ভালো হত l এভাবে চললে হয়ত পাশই করতে পারবে না শর্মিলা, ভালো রেজাল্ট তো দূরের কথা l আজকাল প্রায় রোজই মৈত্রেয়ীর বাড়িতে গিয়ে ওর কাছে পড়ে শর্মিলা l মৈত্রেয়ী নিজে পড়তে পড়তেও কড়া চোখে ওর পড়ার দিকে নজর রাখে l বারবার পড়া বুঝিয়ে দেয়, অঙ্ক প্র্যাক্টিস করায় l

অক্টোবরের শেষ দিন, বাতাসে হালকা শিরশিরে টান l স্নান করে মৈত্রেয়ীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিল শর্মিলা l বাইরে বেরোতেই তুমুল শোরগোল l অপর্ণা ছুটে এসে বললেন 
--মুন্নি তুই এখন বেরোস না l 
--কি হয়েছে মা?  
--টিভির খবরে বলল প্রাইম মিনিস্টার খুন হয়েছেন l ওঁর নিরাপত্তারক্ষী সামনে দাঁড়িয়ে গুলি করেছে ওঁকে l এবার তো শহরে গোলমাল শুরু হবে l তোর বাবা, ছোটকা, কাম্মা সবাই অফিসে বেরিয়েছে l কি হবে এখন?  
--আমি বরং কেয়ামাসির বাড়ি যাই l সমীরণকাকুকে কি বলে দেখি l 
কিছুদিন আগেই কেয়ামাসিরা  বাড়িতে ফোন কানেকশন নিয়েছেন l সমীরণকাকু ওঁর আর্মির বন্ধুদের থেকে খবরাখবর নিচ্ছিলেন l দিল্লিতে নাকি দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে l রাস্তায়-ঘাটে শিখনিধন যজ্ঞ চলছে l কলকাতা শহরেও  বাস এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার বেশিরভাগই শিখ পাঞ্জাবী, তাই ট্রান্সপোর্টের বেহাল অবস্থা l ছোটকাকে অফিসের ফোনে পাওয়া গেল l পরিস্থিতি বুঝে অফিস থেকে বেরোবে l শবনমকে তার এক কলিগ নিজের গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন l অরুণের অফিসে ফোন করে জানা গেল তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছেন l বিকেল চারটে নাগাদ অলোক ফিরল, কিন্তু অরুণের দেখা নেই l রেডিও টিভিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত গন্ডগোলের খবর  জানা যাচ্ছে l সন্ধ্যাবেলা অলোক, স্বরূপবাবু আর সমীরণবাবু গেলেন মৈত্রেয়ীর বাবা পরিমল রায়চৌধুরীর কাছে থানায় l দিনের পর দিন শহরের সমস্ত হাসপাতাল, থানায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না মানুষটাকে l কর্পূরের মত যেন উবে গিয়েছ শর্মিলার বাবা l অপর্ণা পাথরের মত স্থবির l যন্ত্রের মত সংসারের কাজকর্ম করে যান আগের মতই l শান্তশিষ্ট, একান্ত পরিবারঅন্তপ্রাণ মানুষটি যে সোচ্চার না হয়েও শর্মিলার  কতখানি জুড়ে ছিলেন সেটা টের পাচ্ছিল শর্মিলা l বাড়িতে এতগুলো মানুষের মধ্যে বাবার সঙ্গে দিনে কটাই বা  কথা বলত ! কিন্তু বাড়ির সবটুকু জুড়ে যেন বাবা ছিল l মাও এখন নিষ্প্রাণ একটা মানুষ l পিসি রোজ আসে,  মায়ের কাছে বসে কথা বলানোর চেষ্টা করে, কেয়ামাসিও l মা নির্বাক l ছোটকা নিয়ম করে থানায় যায় l পরিমলকাকু তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে বাবার সন্ধান জারি রাখেন l টিভিতে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণায় রোজই বাবার নাম বলা হয় l কিন্তু অরুণ বসু নামটা ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে l 

দিন যায় l শহর ক্রমশ তার নিজস্ব ছন্দে ফেরে l কিন্তু ওলোটপালোট হয়ে যায় ওদের মা - মেয়ের জীবন l 

মাসদুয়েক পরে তীব্র শীতের মধ্যে কাটোয়ার গঙ্গার ধার থেকে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় একজন  ভবঘুরেকে  উদ্ধার করে নিয়ে আসা হল  কলকাতায় l পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে অলোককে ডেকে পাঠানো হল l দাদাকে আইডেন্টিফাই করে সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে এল  অলোক l ডক্টর বাগচীর নার্সিংহোমে ভর্তি করার পর শারীরিকভাবে খানিকটা সেরে উঠলেন অরুণ l কিন্তু কিভাবে কাটোয়ায় গিয়ে পড়েছিলেন সেটা রহস্যই থেকে গেল l ডক্টর বাগচী গোবরা মেন্টাল হসপিটালে অরুণের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করে দিলেন l 

(চলবে )



শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                                                         


নবম পর্বের পর 


খোঁজ 
(১০)

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সিনিয়র ডিপ্লোমা পরীক্ষাটা আর দেওয়া হল না শর্মিলার l সেজন্য উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরোনো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে l উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া, টিউশন সব সামলে গানের ক্লাস, রেওয়াজ সবকিছুতেই বেশ ফাঁক থেকে যাচ্ছিল l অগত্যা গানের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হল শর্মিলা l গান শেখা একেবারে বন্ধ হয়ে যাক এটা অপর্ণা চাইছিলেন না l তিনি রবিঠাকুরের গানে নিবেদিতপ্রাণ, একনিষ্ঠ শ্রোতা l তাঁর মেয়ে হয়ে শর্মিলা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখবে না ! প্রধানত মায়ের ইচ্ছেতেই শর্মিলা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দময়ন্তী মুখোপাধ্যায়ের স্পেশাল ক্লাসে ভর্তি হল l বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে তাঁর বাড়ি l প্রতি রবিবার সকালে শর্মিলা একা একাই বাসে করে গানের ক্লাসে যাওয়ার অনুমতি পেল l এই প্রথম বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে একা বেরোনো, তার উত্তেজনাই আলাদা l একা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে ওঠা, নিজে নিজে টিকিট কাটা l হঠাৎই যেন  অনেকটা বড় হয়ে গেল শর্মিলা l মৌলালি থেকে ঋতু নামে একটি মেয়েও ওই ব্যাচে গান শেখে l সে অবশ্য অনেকটাই বড় l ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় এম এ ফাইনাল ইয়ারে পড়ে l কোনো কোনোদিন যাওয়ার সময় বাসে ঋতুদির সঙ্গে দেখা হয়ে যেত l ফেরার সময় দুজনেই এক বাসে ফিরত l ঋতু সঙ্গী হওয়াতে অপর্ণাও খানিকটা নিশ্চিন্ত হলেন l যদিও শর্মিলা অনেকটা বড় হয়েছে, কিন্তু সেটা মাকে বোঝানোর সাধ্য ওর নেই l অপর্ণার কাছে মুন্নি আর মুনমুনের তেমন কোনো ফারাক নেই l 
ঋতুদির বয়ফ্রেন্ডের নাম স্বপ্নদীপ রায়চৌধুরী l ওদের পাড়াতেই থাকে l সে একজন কবি l বাংলায় এম এ পাশ করে টিউশন করে আর কবিতা লেখে l বিভিন্ন নামকরা কাগজে তাঁর  লেখা ছাপা হয় l শর্মিলাও পড়েছে,  তবে আধুনিক কবিতা একেবারেই মাথায় ঢোকে না ওর l ঋতুদি স্বপ্নদীপকে নিয়ে গর্বিত হলেও সম্পর্কটার ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান l স্বপ্নদীপ কোনো স্থায়ী চাকরিবাকরির চেষ্টা করে না l বাউন্ডুলেপনা করে বেড়ায় বলে নিজের বাড়িতেও কোনঠাসা l এমন ছেলের সঙ্গে ঋতুদির বাড়ি থেকে বিয়ে দিতে চাইবেই বা কেন ! গানের ক্লাসে যাওয়া আসার পথে শর্মিলার এসব কথা প্রায় সবই জানা হয়ে গেল l রিজ্জুদার কথাও অবশ্য জানত ঋতুদি l ধ্রুবর ব্যাপারটাও বলেছিল l বেশ জমে উঠেছিল ওদের অসমবয়েসী বন্ধুত্ব l ঋতুদি একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল 
--রিজওয়ানের সঙ্গে তো তোর মাসে একবার মাত্র দেখা হয় l ধ্রুব বেচারা কি দোষ করল ! তুই ইচ্ছে করলে ওকে একটু সময় দিতেই পারতিস l তোরও সময় কাটত, ওকেও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হত না l 
-- কি যে তুমি বল না ঋতুদি ! আমি জেনেশুনে একটা ছেলের সঙ্গে ফ্লার্ট করব ! ধ্রুব এখন খুব মন দিয়েই পড়াশোনা করছে l নতুন স্কুলে ইলেভেন থেকে টুয়েলভে উঠতে ফার্স্ট হয়েছে l ওখানে গিয়ে ওর ভালোই হয়েছে l 

সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি l ক্লাসের শেষে ছাতা মাথায় দিয়ে দময়ন্তীদির বাড়ি থেকে বেরিয়েই বিপদে পড়ল ওরা l হাওয়ার তোড়ে ছাতা উল্টে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে চপচপে হয়ে কোনোরকমে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছল l বাসস্ট্যান্ডে শেডের নিচে স্বপ্নদীপদা দাঁড়িয়েছিল l ঋতুদিকে  বলল 
---গড়িয়াহাটে সুনীলদার কাছে এসেছিলাম l ভাবলাম তোমার তো আজ গানের ক্লাস, একবার দেখা করে যাই l তা হঠাৎ এমন জোর বৃষ্টি এল, বাস পেলাম না, হেঁটে হেঁটে এতটা আসতে হল l  হলুদ পাঞ্জাবী ভিজে গায়ে লেপ্টে রয়েছে l রোগা তালপাতার সেপাইয়ের মত চেহারায় একমুখ দাড়িগোঁফ, চোখে ভারি ফ্রেমের চশমা l ঋতুদির গোলগাল সন্ধ্যা রায়ের মত মিষ্টি চেহারার পাশে এক্কেবারে বেমানান l তবু এই প্রথম একজন জলজ্যান্ত কবি তার সামনে ! ওরা গল্প করছিল আর শর্মিলা সম্ভ্রমের চোখে স্বপ্নদীপদাকে দেখছিল l প্রায় আধঘণ্টা দাঁড়ানোর পর স্বপ্নদীপদা বলল 
--স্ট্যান্ডে এখনও একটা  ট্যাক্সি রয়েছে, ওটাই ধরি বরং l আজ আর বাস চলবে বলে মনে হচ্ছে না l শর্মিলা তুমিও চল আমাদের সঙ্গে, তোমার স্টপেজে নেমে যেও l 
ট্যাক্সিতে উঠে ঋতুদির পাশে গা ঘেঁষে বসল স্বপ্নদীপদা l তুমুল বৃষ্টিতে চারদিক সাদা l ঋতুদির অন্যপাশে বসে শর্মিলা বুঝতে পারছিল ওরা ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হচ্ছে l ঋতুদির ভেজা শরীরের ওপর উঠে আসছে স্বপ্নদীপদার হাত l জানলার ঝাপসা কাচের দিকে প্রাণপণে তাকিয়ে শর্মিলা ক্রমশ সিঁটিয়ে যেতে লাগল l শর্মিলার উপস্থিতি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ওরা নিজেদের মধ্যে মগ্ন হয়ে থাকল l রীতিমত কান্না পাচ্ছিল শর্মিলার l বাইরে মুষলধারে  বৃষ্টি, ট্যাক্সি থেকে নেমে যাওয়ারও উপায় নেই l মুহূর্তগুলো এত প্রলম্বিত কেন ! প্রবল অস্বস্তি নিয়ে 
নিজের স্টপেজের অপেক্ষায় বসে রইল শর্মিলা l ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থামাতে সম্বিৎ ফিরে পেল ওরা l ঋতুদি ঠেলে সরিয়ে দিল স্বপ্নদীপদাকে l একটাও কথা না বলে ট্যাক্সির দরজা খুলে নেমে গেল শর্মিলা l ওরা ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে গেল l 
বাসস্ট্যান্ডে নেমে দেখল ছাতা হাতে উদ্বিগ্ন মুখে মা দাঁড়িয়ে রয়েছে l তাঁতের শাড়ির নীচের দিকটা বৃষ্টিতে ভিজে সপসপ করছে l বাড়ির গলিতে একহাঁটু জল l মেজাজ হারিয়ে চিৎকার করে উঠল শর্মিলা 
--তুমি এখানে এসেছ কেন? এতটা পথ আসতে পারলাম আর এইটুকু রাস্তা যেতে পারব না ! 
--কি হয়েছে তোর মুন্নি? সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি, একটাও বাস আসছে না l আমার বুঝি চিন্তা হয় না ! তোর সঙ্গে ট্যাক্সিতে কে ছিল... ঋতু?  ওর বাড়ির কেউ কি গিয়েছিল ওকে আনতে? 
--আজ রোববার l বাড়িতে তো সবাই ছিল l বাবা, ছোটকা কেউ আসতে পারল না ! তোমাকেই আসতে হল ! আশ্চর্য ! 
চুপ করে গেলেন অপর্ণা l মায়ের উদ্বেগ, দুশ্চিন্তার কথা এখন এ মেয়েকে বোঝানো যাবে না l অরুণের শরীর ভালো নয়, সর্দিকাশি - জ্বর l আর অলোক- শবনম আজকাল বাড়ির অন্যান্য সমস্যা একটু যেন এড়িয়েই চলে l সারা সপ্তাহ দুজনেই অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে l রবিবার ছুটির দিনে বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে   একটু নিজেদের মত মুনমুনকে নিয়ে সময় কাটায় l কোনোদিনই নিজের সমস্যা বা দুশ্চিন্তার কথা কাউকে মন খুলে বলতে পারেননি অপর্ণা l এখন তো আরো ইতস্তত বোধ হয় l 
মায়ের প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়েও গুম হয়ে গেল শর্মিলা l মাকে কিছুতেই ওর দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারল না l 

বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু ধরলেও বাড়ির সামনের জমা জল নামল না l আজ মৈত্রেয়ীর সঙ্গে দেখা হওয়াটা খুবই দরকার ছিল l শম্পা এসেছিল বিকেলে, ওকেও কিছু বলতে পারল না শর্মিলা l বরং শম্পা খবর দিল সকালে মিষ্টি কিনতে গিয়ে ওর মেঘনার সঙ্গে দেখা হয়েছে l মেঘনার বিয়েটা  এখন ওর বাবা - মা মেনে নিয়েছেন l ও এখন কয়েকদিনের জন্য  বাপের বাড়িতে এসেছে l লাল শাড়ি, গয়না, একমাথা সিঁদুর পরে মেঘনাকে অপূর্ব লাগছিল l শম্পা বলল 
--- চল এরমধ্যে একদিন মেঘনাদের বাড়িতে যাবি? মঙ্গলবার তো টিউশন নেই তোর l আমিও ফ্রী l চল ওর সঙ্গে দেখা করে আসি l 
--হ্যাঁ, গেলে সৌমিলির সঙ্গেও দেখা হবে l অনেকদিন দেখা হয়নি ওর সঙ্গে l 
--হ্যাঁ... তোর তো প্রাণের বন্ধু ! দেখা হলেই শুধু নিজের গুণকীর্তন করবে ! আমরা তো কেউ ওর পায়ের নখের যোগ্য নই কি না ! কি করে যে ওকে সহ্য করিস তুই !
খুব হাসল ওরা দুজন l মনটা একটু হলেও হালকা হল l 
সোমবার স্কুলে মৈত্রেয়ীকে ঘটনাটা বলল শর্মিলা l মৈত্রেয়ী শুনে বলল 
--বিষয়টাকে এতটা ইম্পর্টেন্স দিস না শর্মিলা l ঋতুদির কাছে এটা একটা খেলা l ও নিজেও কিন্তু ওই পরিবেশ আর স্বপ্নদীপদাকে ইউজ করেছে l 
--কি বলছিস তুই ! ওরা সিরিয়াসলি কমিটেড ! কিন্তু আমার যেটা খারাপ লেগেছে সেটা হল ওদের প্রাইভেট মোমেন্টস ওরা পাবলিক করে ফেলল ! আমাকে একেবারে ইগনোর করল কেন !
-- তুই কি জানিস ঋতুদির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ! 
--ক কই না তো ! তুই কি করে জানলি? স্বপ্নদীপদা তো কিছুই করে না তেমন l আজই তো ঋতুদি বলছিল... 
--আরে এটা অন্য ছেলে l ঋতুদির বাবা আমার বাবার আন্ডারে কাজ করেন l এই তো দুদিন আগে বাড়িতে বিয়ের কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করে গেলেন l মেয়ের নাম আর ডেসক্রিপশন শুনেই বুঝতে পেরেছি এটাই তোর ঋতুদি l তখনই অবাক লেগেছিল l তোর কাছেই তো শুনেছি স্বপ্নদীপদার কথা ! ওর যার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে সে ইঞ্জিনিয়ার, ইউ এসে থাকে l বিয়ের পরেই ঋতুদি বিদেশে চলে যাবে l 
শর্মিলা বুঝতে পারল ঋতুদি ধ্রুবকে নিয়ে সেদিন যা বলেছিল, সেটা নিছক ইয়ার্কি নয় l ও ওরকমভাবেই ভাবে l স্বপ্নদীপদা ঋতুদির কাছে নিছকই সময়কাটানোর উপাদান l হয়ত স্বপ্নদীপদারও তাই ! ঋতুদির বিয়ে হয়ে বিদেশে চলে গেলে ও হয়ত অন্য  কোনো ঋতুদিকে খুঁজে নেবে l ওদের সম্পর্কটা আসলে অগভীর জলের ভাসমান শ্যাওলার মত l 

মঙ্গলবার স্কুল থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে শম্পা আর শর্মিলা মেঘনাদের বাড়ি গেল l ওদের হৈহৈ করে জড়িয়ে ধরল মেঘনা l একটা নীল রঙের চুড়িদার পড়েছে মেঘনা l হাতভর্তি শাঁখা - পলা, চুড়ি l সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর l অনেকদিন পরে দেখা হল, একদম অন্যরকম লাগছিল মেঘনাকে l শম্পা তো বলেই ফেলল 
--তোকে একদম শ্রীদেবীর মত সুন্দর দেখতে লাগছে রে মেঘনা l 
মেঘনার বর আউটডোর শুটিং এ গেছে, তাই মেঘনা এখন কিছুদিন বাবা - মায়ের কাছে থাকবে l 
ওর বর মেঘনার কাজের জন্যও খুব চেষ্টা করছে l এর মধ্যে দু - তিনটে প্রোডাকশন হাউজে অডিশনও দিয়েছে ও l শর্মিলা বলল 
--সব ঠিক আছে l কিন্তু তুই অন্তত মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দেওয়ার চেষ্টা কর l অভিনয় করতে গেলেও তো মিনিমাম পড়াশোনার দরকার হয় l পড়াশোনাটা ছাড়িস না l 
--তুইও দেখছি আজকাল সৌমিলির মত কথা বলছিস ! আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না, করব না ব্যস ! থাম দেখি ! এসব ঘ্যানঘ্যানানি আমার মোট্টে ভালো লাগে না l 

(চলবে )





সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

শর্মিষ্টা দত্ত

                                         



স্পর্শসুখ 



তোমার ছোঁয়াতেই পলকে মেঘ জমে 
তুমুল নিদাঘেও  নামে শ্রাবণ 
ঈশানকোণে দেখি আকাশে ঘনঘটা 
শান্ত নদীজলে  ঘোর প্লাবন 

তোমার ছোঁয়াতেই এ মরুপ্রদেশেও 
পলকে ঝরে পড়ে বৃষ্টিসুখ 
সান্ধ্য মেহফিলে মিঞা-কি-মল্লারে  
সুরপিয়াসী এই মন উন্মুখ

তোমার ছোঁয়াতেই উপোসী রাতে বুনি  
রঙিন স্বপ্নের ইন্দ্রজাল 
নিবিড় আশ্লেষে তোমাকে ছুঁয়ে ঠিক 
পেরিয়ে যাবো এই ক্রান্তিকাল

(২)
উপশম

খিল দেওয়া এই ভিতরঘরে মনখারাপের 
আরশিতে 
মুখ দেখতে গিয়েই দেখি জল জমেছে 
শার্সিতে  
বদ্ধ ঘরের দেওয়াল জুড়ে অগ্নিশিখার 
তাণ্ডবে 
পুড়ছে আমার আশিরনখর স্বস্ত্যয়নের 
গৌরবে 
বাইরে তখন মেঘবালিকা গান ধরেছে 
ঝাঁপতালে 
ঘুঙুরবোলে বৃষ্টিফোঁটা জানলাকাচের 
আবডালে 
হঠাৎ দেখি শার্সি বেয়ে গড়িয়ে আসা 
বৃষ্টিজল 
জুড়িয়ে দিল দহনজ্বালা ঘর জুড়ে আজ 
মেঘাঞ্চল

(৩)
মেঘঋণ 

অস্থির বৃষ্টির 
    কুহেলী সুনিবিড় 
         তাই তো রিমঝিম 
                বাউল দিন 

মেঘজল সম্বল 
     আকাশে টলোমল 
         বিন্দু সঞ্চয়
                আকাশ ঋণ 

ঝড় হোক নাই হোক 
     আকাশও বীতশোক 
          মেঘলা মন গায় 
                স্মৃতির গান 

মল্লার বিস্তার 
      আবহে বাজে কার 
           রাত্রি ভর সুর
                বেহাগ তান

রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                       


সপ্তম পর্বের পর 

খোঁজ 
(৮)

সেপ্টেম্বর মাসের এক  সন্ধ্যাবেলা শবনমকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল l কয়েকদিন ধরেই  শরীরটা খারাপ ছিল, সেদিন সকাল থেকেই অল্প অল্প ব্লিডিং শুরু হল l বিকেলে অপর্ণা তাকে ডক্টর বাগচীর কাছে নিয়ে গেলেন l বাড়িতেই চেম্বারের  পিছনের অংশেই তাঁর নার্সিংহোম l সেখানকার গাইনোকোলজিস্ট ডক্টর সুরমা ব্যানার্জীর কাছেই এতদিন দেখানো হচ্ছিল শবনমকে l বেবির পজিশন ভালো নয়, তাই ঠিক হল পরেরদিন সকালেই সিজার করা হবে l পরেরদিন  ভোরবেলা উঠে রান্নাবান্না সেরে স্বামী, ননদ এবং মেয়ের টিফিন গুছিয়ে সবাইকে জলখাবার দিয়ে অলোকের সঙ্গে অপর্ণা চলে গেলেন নার্সিংহোমে l 
শর্মিলার এখন উঁচু ক্লাস, ডে শিফটে স্কুল l বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথেই কেয়ামাসির কাছে শর্মিলা শুনল কাম্মার মেয়ে হয়েছে l বাড়ি ফিরে দেখল ঠাম্মার মুখ অন্ধকার  l কারণটা অনুমান করতে অসুবিধে হল না শর্মিলার l ছোটবেলা থেকেই ঠাম্মার মুখে নাতি না হওয়ার আক্ষেপ শুনে এসেছে l এমনকি মায়ের যে শর্মিলার পরে একটি পুত্রসন্তান আনা উচিত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  সেকথা অনেকবার বলতে শুনেছে ঠাম্মাকে l কাম্মা সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর যিনি জাত্যাভিমান ভুলে "এইবার আমার বংশের বাতি আইব" বলে  আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠেছিলেন , সেই মুখে এখন নৈরাশ্যের অন্ধকার l অবশ্য যোগমায়া ছাড়া বাড়ির সকলেই খুব খুশি l অনেকদিন পরে বাড়িতে একটি সুস্থ, সুন্দর শিশু এসেছে l 

শর্মিলার আর তর সইছিল না, চটপট স্কুলড্রেস ছেড়ে ডাল আর মাছভাজা দিয়ে একটু ভাত খেয়েই পিসির সঙ্গে ছুটল নার্সিংহোমে l কাম্মার বেডের পাশে ছোট্ট বেবিকটে গোলাপী রঙের একটা ছোট্ট পুতুল ঘুমিয়ে আছে l এই প্রথম এত ছোট্ট একটা বাচ্চাকে  ছুঁয়ে দেখল শর্মিলা l তারপরেই কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল l এমন আগে কারুর প্রতি হয়নি, ও তো মা -বাবা - কাকা -পিসি এমনকি ওর বন্ধুদেরও খুব ভালোবাসে l কিন্তু অন্য সব ভালোবাসার থেকে এই অনুভূতিটা এক্কেবারে  আলাদা l এটাকেই কি স্নেহ বলে ! বড্ড কোলে নিতে  ইচ্ছে করছিল, কিন্তু মা বারণ করলেন l সিজারিয়ান বেবি, একটু বেশি সাবধানে রাখতে হবে, বাইরে থেকে এসে ওকে ধরা যাবে না l বোন বাড়িতে আসার পর ওকে দিব্যি কোলে নিতে শিখে গেল শর্মিলা l এতদিন যে পুতুলগুলো তার ভীষণ প্ৰিয় ছিল, এখন তাদের ছুঁয়েও দেখতে ইচ্ছে করে না l একটা জ্যান্ত খেলার পুতুল এখন তার বাড়িতে l এখন আর বাইরে খেলতে যেতেও ইচ্ছে করে না l বন্ধুরা বাড়িতে এলে বোনের নতুন নতুন কীর্তিকলাপ দেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে l 
বোনের নাম কাম্মা রেখেছিল ইয়াসমিন l কিন্তু এ বাড়িতে ওই নাম ধোপে টিকল না l অনেক তর্কবিতর্কের পর বাবা ওর নাম রাখলেন শতরূপা l মা ডাকনাম রাখলেন মুনমুন l

রেলওয়ে  সার্ভিসের পরীক্ষায় আগেই পাশ করে প্যানেলে নাম ছিল শবনমের l মুনমুন হওয়ার বছরদেড়েক পরে নতুন চাকরিতে জয়েন করল সে l অপর্ণার কোলেই  বড় হতে লাগল মুনমুন l প্রথম বুলি ফোটার পর শর্মিলার দেখাদেখি  অপর্ণাকেই মা আর শবনমকে কাম্মা বলে ডাকতে শুরু করল l এমনিতে সে বেশ রাশভারী মানুষ, কিন্তু শর্মিলাকে দেখলেই আধো আধো বুলিতে  কলকল করে ওঠে l  হাঁটা, চলা, কথাবলা সবকিছুতেই দিদিভাইকে নকল করার চেষ্টা করে l শর্মিলা গানের রেওয়াজ করতে বসলে তাকে সেখান থেকে নড়ানো যায় না l 

এ বাড়িতে রাজশ্রীর অবস্থানটা খানিকটা অতিথির মতই l বাড়িতে যতটুকু সময় থাকেন তাতে নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা আর টুকটাক কাজকর্ম ছাড়া বেশিরভাগ  সময়টুকু দুই ভাইঝির সঙ্গেই কাটে তাঁর l শর্মিলাকে পড়ানো আর মুনমুনের সঙ্গে খুনসুটির পর বাকি মানুষগুলোর জন্য সময় কমই থাকে l বৌদি এবং ভাইয়ের বৌয়ের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাবও রয়েছে যথেষ্ট, কিন্তু একটা অদৃশ্য দেওয়ালের আড়ালে নিজেকে ঘিরে রাখতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন তিনি l রাজশ্রীর বিয়ে নিয়েও এ বাড়িতে ইদানিং আর কোনো আলোচনা  হয়  না l শ্যামবর্ণা হলেও রাজশ্রী যথেষ্ট সুশ্রী, উচ্চশিক্ষিতা এবং চাকরি করেন l পাত্রী হিসেবে মোটেই ফেলনা নন l আত্মীয়মহল বা পরিচিতদের মধ্যে থেকে বিয়ের সম্বন্ধ হরদম আসতেই থাকত l কিন্তু রাজশ্রী বাড়িতে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন তিনি বিয়ে করবেন না l তাই পাড়ার কেউ কেউ বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলে বা প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে সন্তর্পনে এড়িয়ে যেতেন বাড়ির সবাই l কারণটা অবশ্য কারুরই অজানা নয় l সাগরিকাদের পাড়ায়  টুবলু - বাবলুকে পড়াতেন রাজশ্রী l শুধু পড়ানোই নয়, সবরকমভাবেই ওদের দেখাশোনা করতেন l ওদের মা সর্বানী ছিলেন রাজশ্রীর স্কুলের বন্ধু l স্কুলে পড়তে পড়তে খুব  অল্পবয়েসেই  বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তাঁর l ছেলেদের জন্মের পর থেকেই  মারাত্মক অসুস্থ এবং ক্রমে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন l ওরা দুই যমজভাই, শর্মিলার থেকে বেশ খানিকটা বড় l টুবলু -বাবলুর বাবা স্বরূপ সেনগুপ্ত ছিলেন নামকরা অ্যাডভোকেট l বাড়ির সামনের দিকেই তাঁর অফিস l এই বন্ধুর স্বামীর সঙ্গেই নাকি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজশ্রী l একসময় পাড়ায় এটা একটা মুখরোচক আলোচনার বিষয়ও ছিল অবশ্য l শর্মিলাদের বাড়ির লোকজনের সামনে না বললেও কানাঘুষোয় সবই কানে আসত ওদের l উচ্চশিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হলেও অবিবাহিত মেয়েরা  সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ বিশেষ করে মহিলাদের মাথাব্যথার কারণ l নিজেদের বাড়িতে টিভি আসার আগে অন্য বাড়িতে টিভি দেখার  আসরে  পাড়ার লোকজনের  মুখোমুখি দাঁড়াতে হত যোগমায়াকেই l কিন্তু শিক্ষিত, স্বাবলম্বী মেয়ের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার সাহস ছিল না তাঁর l মেয়ের ব্যক্তিত্বের সামনে রীতিমত কুঁকড়ে থাকতেন l তাই রাজশ্রীর সঙ্গে একটা চোরা সংঘর্ষ চলতেই থাকত তাঁর মায়ের l একটা সময়ের পর থেকে মা -মেয়ের সম্পর্কের মধ্যে একটা দুর্ভেদ্য বরফের প্রাচীর তৈরী হয়ে গিয়েছিল l কেউ কারুর এলাকায় বড় একটা প্রবেশ করতেন না l টুবলু -বাবলু যখন ক্লাস টেনে পড়ে, সেসময় ওদের মা মারা গেলেন l মাধ্যমিকের পর ওদের নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে পাঠিয়ে দিলেন স্বরূপবাবু l সেবার গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরে টুবলু - বাবলু একদিন রাজশ্রীর সঙ্গে দেখা করতে এ বাড়িতে এল l ছোটবেলা থেকে চেনা প্ৰিয় শিক্ষিকাকে এবার ওরা মায়ের জায়গাটা দিতে চায় l রাজশ্রী প্রথমে ওদের একটু বকাবকি করলেন  l এ বয়েসে বিয়ে ! শেষ পর্যন্ত লোকজনের সন্দেহই যে সত্যি হবে ! কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা l দুজনেই লেখাপড়ায় ভালো l উচ্চমাধ্যমিকের পর হয়ত বিদেশে পড়তে চলে যাবে l তখন তো বাবা আরো একা হয়ে যাবেন l আর যে মানুষটার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা নষ্ট করেছেন, তাঁর সন্তানদের পড়িয়েছেন, দেখাশোনা  করেছেন তাঁর  ইচ্ছের মর্যাদা দেবেন না রাজশ্রী ! দীর্ঘ আলোচনার পর রাজশ্রীকে  বিয়ের জন্য রাজি করিয়ে তবে ওরা  বাড়ি ফিরল l পরেরদিনই  বিয়ের প্রস্তাবসহ স্বরূপবাবুকে নিয়ে হাজির দুই ছেলে l ঠিক হল, শর্মিলাদের  বাড়িতেই পুরোহিত ডেকে নমো নমো করে বিয়ে হবে l পরে রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হবে l রাজশ্রী বা স্বরূপ কেউই ধুমধাম করে বিয়েতে রাজি নন l বাড়ির লোকজন বিশেষত ঠাম্মার ইচ্ছে ছিল একমাত্র মেয়ের বিয়েতে আত্মীয় স্বজন আসুক, উৎসব হোক l ছোটছেলে তো সে সুযোগ দেয় নি ! কিন্তু তাঁর কথা কেই বা শোনে !  স্বরূপ ও রাজশ্রীর কয়েকজন বন্ধু এবং  বাড়ির লোকজনের উপস্থিতিতেই খুব তাড়াতাড়ি, মাত্র দিন সাতেকের মধ্যেই নিতান্ত অনাড়ম্বরভাবেই  রাজশ্রীর বিয়েটা হয়ে গেল l অপর্ণা নিজের গয়নার কিছু অংশ দিয়ে যথাসাধ্য সাজিয়ে ননদকে সাজিয়ে দিলেন l রাজশ্রী অবশ্য কিছুই নিতে চাননি l গয়না পরার শখ তাঁর কোনোকালেই ছিল না, তাছাড়া বিয়ে করবেন না বলে নিজের জন্য গয়নাগাটি কিছু গড়িয়েও রাখেননি l জমানো টাকা কিছু দিতে চেয়েছিলেন, সেটাও  কিছুতেই খরচ করতে দিলেন না অপর্ণা l

পিসি ও বাড়িতে চলে যাওয়ার পর ওই ঘরটা শর্মিলার দখলে এল l ওই ঘরে বসেই পড়াশোনা, ও ঘরেই ঘুমোনো l নিজের সঙ্গে একান্তে সময়  কাটানোর জন্য একটা নিজস্ব ঘর ! 

শর্মিলার তখন ক্লাস নাইন l আগের মতই পিসির কাছে হিউম্যানিটিস পড়লেও সায়েন্স গ্রূপের জন্য একটা কোচিং ক্লাসে ভর্তি হতে হল l সংসারে তেমন কাজকর্ম করতে না হলেও চাকরি সামলে কাম্মার আর ওকে পড়ানোর সময় ছিল না l তাছাড়া স্যান্যালস্যার বয়েজ স্কুলের টিচার এবং মাধ্যমিকের এক্সামিনার l আসলে উত্তর লেখার পদ্ধতি ঠিকঠাক শিখলে তবেই বোর্ডের পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যায় l শম্পা, সৌমিলিরাও ওই ব্যাচেই পড়ে l একসঙ্গেই মিনিবাসে করে ওরা  বেকবাগানে স্যারের বাড়ি যাতায়াত করে l এখন আর মা বা কেয়ামাসির ওদের পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না l বয়েজ স্কুলের কয়েকটা ছেলেও পড়ে ওদের ব্যাচে l কয়েকমাসের মধ্যে ধ্রুব, অর্ণব, শুভ্রকান্তিদের সঙ্গে অল্পস্বল্প বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওদের l ওদের মধ্যে শুভ্রকান্তি বয়েজ স্কুলের ফার্স্ট বয় l উচ্চমাধ্যমিকের পর সে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়বে ঠিক করে ফেলেছে l সৌমিলি আর ধ্রুবর কেমেস্ট্রি নিয়ে পড়ার ইচ্ছে l অর্ণব মেডিকেল পড়বে l সাগরিকা, শম্পা, সুদেষ্ণারা মাধ্যমিকের পরেই আর্টস পড়বে ঠিক করেছে l শম্পা ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ভালোবাসে তাই  ইংলিশ বা কম্পারেটিভ লিটারেচার নিয়ে পড়তে চায় l শর্মিলাও সাহিত্য ভালোবাসে, আবার অঙ্কও ওর পছন্দের বিষয় l অনেক ভেবেও কিছুতেই ও এখনও নিজের লক্ষ্য স্থির করতে পারেনি l ওর অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট ম্যাথমেটিক্স l সেটার জন্য একটা এক্সট্রা কোচিং দরকার l তাই শনি -রবিবার  রিজ্জুদা এলে ওকে অ্যাডিশনাল ম্যাথসটা করিয়ে দিত l কঠিন অঙ্কের উত্তর মেলাতে পারলে রিজ্জুদার  কালো মেটাল ফ্রেমের চশমার পিছনে গভীর দুটো চোখদুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠত l রিজ্জুদার চোখে সেই মুগ্ধ দৃষ্টি দেখতে পাবে বলেই যেন প্রাণপণে জটিল  অঙ্কের জট খুলত শর্মিলা l সারাটা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকত এই দুটো দিনের জন্য l খাতা দেওয়ানেওয়ার সময় কখনও ওর আঙুলে আঙুল ঠেকে গেলেই  বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার অনুভূতি l এভাবেই বয়ঃসন্ধিতে প্রথম পুরুষের স্পর্শে শরীরের ভিতরের  ঘুমন্ত নারীসত্ত্বাকে আবিষ্কার করতে শুরু করে প্রতিটি নারী  l 

(চলবে ) 


                       


সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

শর্মিষ্টা দত্ত


অভিযোজন (৬)

আশ্বিনের সোনা রোদে ভেসে যাচ্ছে সবুজ ঘাসজমি। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা । বাতাসে পূজোর গন্ধ। দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলে  এখনো জনবসতি তেমন বেশী নয়।বাড়িগুলোও বেশ ফাঁকা ফাঁকা ,সামনে  বড় বড় মাঠ-পুকুর-বাগান নিয়ে  বেশ খোলামেলা পরিবেশ। পাপাইয়ের জন্মদিনে সকালেই তিতলি আর তিতিরকে নিয়ে প্রভা এসেছেন বড় ছেলের বাড়ি। উমার স্কুল আছে ,সে আসতে পারবে না।মল্লিকাও খুব ব্যস্ত ,পূজো আসছে। ওরা দুজন সন্ধ্যেবেলায় আসবে। 

তিতলি এবছর উমার স্কুলেই  ভর্তি হয়েছে ,সকালবেলা পিসির সঙ্গেই স্কুলে যায় ,একসঙ্গেই ফেরে । সাড়ে তিন বছরের তিতিরের সঙ্গে সারাদিন বকবক  করে সময় কেটে যায় প্রভার।আজ তিতলি স্কুলে যায়নি,দাদার জন্মদিনে নেমন্তন্ন খাওয়ার উৎসাহে দুইবোনই রীতিমত উত্তেজিত । পাপাইও খুব খুশি , বোন দুটো খুব মিষ্টি আর বাধ্য । সেও  আজ স্কুলে যায়নি , বাড়ির সামনের মাঠে তিন ভাইবোন আপাতত খেলায় মগ্ন।কালই গড়িয়াহাটের একটা বড় দোকান  থেকে পাপাইয়ের জন্য একটা জামাপ্যান্টের সেট কিনে এনেছিল মল্লিকা। হালকা হলুদ রঙের টি-শার্ট আর নেভি-ব্লু প্যান্ট। “মা ,এটা আপনি নাতিকে উপহার দেবেন জন্মদিনে ”। প্রভার বুকের কাছটা চিনচিন করে ওঠে।মল্লিকা এখন প্রতিমাসে তাঁর হাতে সংসারখরচের নাম করে বেশ কিছু টাকা দেয়। তাছাড়াও বাড়ির সকলের জন্য এটাসেটা তো আনেই।শুধু প্রণবের নামটাই এবাড়ি থেকে মুছে গেছে চিরতরে । 

বছরখানেক হল  মল্লিকা গড়িয়াহাটে একটা ছোট্ট  শাড়ীর দোকান  করেছে। সকাল দশটা থেকে রাত প্রায় আটটা অবধি দোকানেই থাকে সে । সকালে উঠে উনুন ধরিয়ে রান্নাবান্না সেরে ভাত খেয়ে টিফিনবক্সে রুটিতরকারি ভরে  নিয়ে সে বেরিয়ে যায়।

প্রণব মারা যাওয়ার পরে ভারতীর সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করতে করতেই ব্যবসার চেষ্টা করছিল মল্লিকা।প্রভাকে না বলেই যৎসামান্য যা গয়না ছিল ,তাই বেচে মূলধন যোগাড় করেছিল। বড়বাজার থেকে সস্তায়  শাড়ী কিনে পাড়াপ্রতিবেশী ,আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে দু-চারখানা বিক্রি হতে না হতেই উৎসাহ বেড়ে গেল। ভারতীকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপুর-ফুলিয়া থেকেও শাড়ী আনতে শুরু করল সে। তাঁতীদের বাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হতে হতেই তাঁতে ওদের কাজ দেখে নানারকম ডিজাইনের আইডিয়া আসে মল্লিকার মাথায়।কয়েকদিন ওদের সঙ্গে বসে, ডিজাইন  এঁকে বুঝিয়ে, সামনে দাঁড়িয়ে  থেকে কয়েকটা শাড়ী তৈরী করে আনতেই হটকেকের মত বিক্রী হয়ে গেল সেগুলো। আরও উৎসাহ পেয়ে গেল মল্লিকা। হাতে মূলধনও জমল কিছু। বছরখানেকের মধ্যেই গড়িয়াহাটে বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে সস্তায় একটা ছোট্ট ঘরও পেয়ে গেল। অল্পসময়ের মধ্যেই বেশ নাম হয়েছে তার দোকানের।দুটি মেয়েকেও সেলসগার্ল হিসেবে রাখতে হয়েছে। এবার পূজোর আগে বহরমপুর থেকে কিছু সিল্কের শাড়ী এনেছিল,এরমধ্যেই সব বিক্রি হয়ে গেছে। কসবায় একটা ছোট ঘরে চার -পাঁচটা মেয়ে সুতি আর সিল্কের ওপর ব্লকপ্রিন্ট করে।নিজের ডিজাইনে  কিছু কাঠের ব্লক বানিয়ে ওদের দিয়েও কয়েকটা শাড়ী বানিয়েছিল,ওগুলোরও খুব ডিমান্ড। মল্লিকা ভেবেছে এবার ম্যাড্রাস আর ব্যাঙ্গালোর যাবে একবার ,ওখান থেকে নিজে পছন্দ করে শাড়ি নিয়ে আসবে। কিন্তু অচেনা জায়গা ,প্রভা বা ভারতী কি একা যাওয়ার অনুমতি দেবেন ! 

সকালে প্রসূন ওদের পৌঁছে দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে চলে গেছে ,সেও ইউনিয়নের কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যেবেলাতেই আসবে। রেখা আজকাল ওবাড়ির সবাইকে বেশ সমঝে চলে ,এটা বেশ বুঝতে পারেন প্রভা। দুপুরে বেশ কয়েকপদ নিরামিষ রান্না করেছিল। প্রভা বললেন,“এত কিছু রানছ ক্যান বড়বৌমা? আমার তো একটা তরকারী হইলেই খাওয়া হইয়া যায়। ” বাচ্চাদের মাংস-ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে রেখা বলেছিল ,“আমার কাছে তো আর আপনি রোজ খান না মা, মাঝেসাঝে এলে আমারও তো ইচ্ছে করে আপনাকে একটু যত্নআত্তি  করি।চেহারাটা কি খারাপ হয়েছে আপনার , বলুন তো ! সারাদিন দুটো বাচ্চার ঝক্কি ...এখন তো আপনার একটু ভালমন্দ খাওয়া দরকার । তা না ..রোজ একটা তরকারী। ওরা তো মাছটাছ খায় ,আপনার জন্য তো আর একটা তরকারী রান্না করতে পারে । ”  স্পষ্টতই মল্লিকার প্রতি ঠেস ...দেওর মারা যাওয়ার পর তার বৌ যে আমিষ  সবই খায় এটা নিয়ে তার বাপের বাড়ীতেও কম চর্চা হয় না। আজ সন্ধ্যেবেলা তো রেখার দাদা ,বৌদি ,দিদি সবাই আসবে , নিজের চোখেই দেখবে সব ।প্রমোদের প্রমোশন হয়েছে, ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা দিয়ে অফিসার হয়েছে তাই এবার পাপাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে শ্বশুরবাড়ি ,বাপেরবাড়ি তো বটেই ,আরও বেশ কিছু লোকজনকে নিমন্ত্রণ করেছে রেখা। 

সন্ধ্যেবেলা মল্লিকার দোকানে চলে এল উমা। দুজনে একসঙ্গে যাদবপুরে যাবে। সঙ্গে একজন  বছর চল্লিশেক বয়সের ভদ্রলোক,আসাযাওয়ার পথে পাড়ায় কয়েকদিন ধরে ওঁকে দেখেছে মল্লিকা। উমা আলাপ করিয়ে দিল। ওঁর নাম তন্ময় সিরাজ ,ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন । কয়েকমাসের জন্য ঢাকা থেকে রিসার্চের কাজে এসেছেন , কলকাতার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওপরে কিছু সার্ভে করছেন ।মাসতিনেক আগে  স্কুলেই আলাপ উমার সঙ্গে । ওরা কিছু বলার আগেই মল্লিকা বুঝে গেল কি হতে চলেছে । জীবন তাকে এই বয়েসের মধ্যেই শিখিয়েছে অনেককিছু। তন্ময়কে বসতে বলল মল্লিকা।

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

শর্মিষ্টা দত্ত


অভিযোজন (৫)

বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে । প্রসূন,প্রমোদ আর পাড়ার কয়েকজন সকাল থেকেই মর্গে ।পোস্টমর্টেম শেষ করে বডি রিলিজ করতেই কেটে গেল সারাটা দিন । পাশের বাড়ির অনিলদা  কংগ্রেসের ডাকসাইটে  নেতা প্রিয়বাবুর চেলা , সে এসে না পড়লে  তাও হত কিনা সন্দেহ ।এই নৈরাজ্যে এখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো কাজই হয় না ।প্রসূন মারমুখী হয়ে উঠছিল ,প্রমোদ ধমকে থামালেন তাকে ।অঝোরবৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে জুলাই মাসের সন্ধ্যে । ।কেওড়াতলা শ্মশানে পৌঁছতে পৌঁছতেই সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত ।প্রণবের সঙ্গে শেষ কবে কথা বলেছেন  মনে করতে পারেন না প্রমোদ ...তবু গলার কাছে কেমন যেন তিতকুটে স্বাদ ।অম্বল হয়ে গেছে নির্ঘাত ,সারাদিন কয়েক কাপ চা ছাড়া তো আর কিছু পড়েনি পেটে ! ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা কেমন যেন সৃষ্টিছাড়া ।বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই পাড়ার আজেবাজে ছেলের সঙ্গে মিশে বখে গিয়েছিল ।অবশ্য প্রমোদও তেমনভাবে কোনোদিন শাসন করেননি ,সংসারের এসব ঝুটঝামেলার থেকে তিনি বরাবরই নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ।তাই বিয়ের পরেই দূরত্বের বাহানায়  নিজের পরিবারকে নিয়ে আলাদা সংসার গুছিয়ে নিয়েছিলেন । 

ভীষণ বিরক্ত লাগছিল প্রমোদের ,কিন্তু বাড়ির বড়ছেলে হিসেবে এ অবস্থায় এখানে  এই উপস্থিতিটুকু এড়াতে পারেননি ।সকালে বেরোনোর আগে রেখার মুখের অভিব্যক্তিতে শামুকের মতো গুটিয়ে যাচ্ছিলেন প্রমোদ । রেখা এদেশী বনেদী পরিবারের মেয়ে , অবস্থা যদিও পড়তি ,তবু বাঙাল শ্বশুরবাড়িকে কোনদিনই পছন্দ করেনি সে ।আইবুড়ো ননদ যদিও চাকরি করে ,বখাটে কার্তিকমার্কা মেজ দেওরের তো রোজগারের কোনো ঠিকঠিকানাই  নেই ।তারপর তার  বিয়ের সময় কেচ্ছা -কেলেঙ্কারি তো আর কম হয়নি ও বাড়িতে ! মল্লিকাও বাঙালবাড়ির মেয়ে তাই মনে মনে তাকে হেয় করলেও আজকাল তাকে ঈর্ষাও করে রেখা ,একে তো মল্লিকা  অসামান্য রূপসী ...রেখা টিপটপ সেজেগুজেও  তার পাশে নিতান্ত সাদামাটা ।তার ওপর সংসারের এত  অশান্তি ,ঝড়ঝাপটা সামলেও দুটো  ছোট বাচ্চা নিয়ে প্রাইভেটে বি এ পাশ করেছে এবার । ছোট দেওর প্রসূনও  বি এস সি পাশ করেছে সবে ,এখনও বেকার ।আজকাল আবার পার্টি নিয়ে মেতেছে...কবে যে শ্রীঘরে যাবে কে জানে ! আজকাল কমিউনিস্ট পার্টি করাটা শিক্ষিত ছেলেদের নতুন ফ্যাশন হয়েছে । তাই প্রমোদ বা তার রোজগারের ছিটেফোঁটাও  যেন ওবাড়িতে না যায় সেদিকে রেখার তীক্ষ্ণ নজর ।কাল রাতেই রেখা বলে দিয়েছে ,পাপাইকে এ অবস্থায় ও বাড়িতে নিয়ে যাওয়া চলবে না , ও বড় হচ্ছে এখন ,অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দক্ষিণ কলকাতার একটা নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে ওকে ।ওই পরিবেশের মধ্যে গিয়ে কি শিখবে ও ! এজন্যই কেবলমাত্র নববর্ষ আর বিজয়ায় শাশুড়ীকে প্রণাম করা ছাড়া  ছেলেকে নিয়ে ও বাড়িতে যায় না রেখা ।প্রমোদও দু -তিনমাস অন্তর বড়জোর আধঘণ্টার জন্য মায়ের কাছে যায় ।এভাবেই নিজের ছোট্ট বৃত্তটার মধ্যে আবর্তিত হতে গিয়ে পারিবারিক সূত্রটা ক্রমশ আলগা হয়ে আসছে প্রমোদের ।মুখাগ্নি করার সময় তবু কেন যে চোখে জল এল ...কে জানে ! প্রণবের মেয়েরা ছোট তাই দাদা হিসেবে প্রমোদকেই এ কাজটা করতে হল ।

প্রায় শেষরাতে তাঁতীবাগানের বাড়িতে ফিরল ওরা ।আগুন ,লোহা ছুঁয়ে , নিমপাতা দাঁতে কেটে শ্মশানযাত্রীদের মিষ্টিমুখ করিয়ে বিদায় দেওয়ার পর প্রভার  ঘরে  এলেন  প্রমোদ ।তক্তাপোষের বিছানায় তখন  দুই মেয়েকে দুপাশে নিয়ে ঘুমোচ্ছে মল্লিকা ।সিঁদুর মুছে ,শাঁখা ভেঙে স্নান করিয়ে , খানিকটা সেদ্ধভাত খাইয়ে ওকে অনেকক্ষণ আগেই শুইয়ে দিয়েছে উমা ।মল্লিকাকে কোনোদিন এভাবে শুয়ে থাকতে দেখেননি প্রমোদ । শাড়িটা বুকের ওপর থেকে খানিকটা সরে গেছে ,গোড়ালির ওপরেও উঠে এসেছে খানিকটা ।ওর সদ্যফোটা ফুলের মতো পবিত্র মুখটা দেখেই শরীরে একটা আলোড়ন শুরু হল প্রমোদের ।প্রবৃত্তি পরিবেশ ,পরিস্থিতি কিছুই কি মানে না ...ছিঃ ! নিজেকে শাসন করে মায়ের কাছে এসে বসলেন তিনি । প্রভা তখনও শক্ত হয়ে বসে রয়েছেন ।উমা  ততক্ষণে খানিকটা দুধসাবু মেখে নিয়ে এসেছে ।"মা ,এবার অন্তত কিছু মুখে দাও ,সারাদিন কিছু খাও নি  ।"
"আইজ আর কিসু খামু না ..তরা খাইয়া ল ।"উমা আর কথা বাড়াল না ।দাদা আর ভাইকে খেতে দিয়ে তিতলির পাশে শুয়ে পড়ল ,কিছু মুখে না দিয়েই ।শারীরিক ও মানসিকভাবে সেও বিপর্যস্ত ।

অপঘাতে মৃত্যু তাই পাড়ার কালীমন্দিরে নম নম করে তিনদিনেই শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে গেল । মল্লিকা যেন একটু বেশিমাত্রায় স্বাভাবিক ...এটাই অস্বাভাবিক লাগছিল ওদের সবার ।একদিন দুপুরে প্রণবের ছবিগুলো পুড়িয়ে ফেলল ।প্রভা কষ্ট পেলেন তবু  কিছু বললেন না ওকে ...যেভাবে শান্তি পায় মেয়েটা ...পাক । তিতলি আর তিতিরের স্মৃতিতে ওদের জন্মদাতার আর কোনো অস্তিত্ব রইল না ।অবশ্য বাবাকে ওরা চিনেছিলই  বা কতটুকু ! 

তিন বছরের তিতলি ঠাম্মার গলা জড়িয়ে ধরে যখন গল্প শোনার বায়না করে ,দেড় বছরের তিতির আধো আধো বুলিতে ঠাম্মা বলে ডাকে তখন একটা স্বর্গীয় অনুভব ছড়িয়ে পড়ে প্রভার শরীরে ।না ...আর কোনো অভাববোধ নেই তাঁর ।ঈশ্বর তাঁকে যেমন সন্তানশোক দিয়েছেন ,আবার নাতনিদের নির্মল শৈশবের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগও তো দিয়েছেন ! নিজের সাধ্যমত ওদের পৃথিবীটা সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করবেন ।

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

শর্মিষ্টা দত্ত


অভিযোজন (২)

সকালে রান্না সেরে সেলাই মেশিন  নিয়ে বসেছিলেন ভারতী ।আজ বিকেলেই ডেলিভারি দিতে হবে ব্লাউজগুলো ।কাল সারাদিন মল্লিকাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন , কোন কাজই হয়নি ।পাড়ার দর্জির দোকান থেকে অর্ডার নিয়ে মেয়েদের জামা-কাপড়  সেলাই করেন ভারতী ।সামান্য যা আয় হয় তাতে তার নিজের খরচটুকু চলে যায় ।দাদার কাছে হাত পাততে হয়না ,সংসারের টুকটাক জিনিসপত্রও আনতে পারেন ,মল্লিকার হাতেও  অল্পসল্প দিতে পারেন কিছু  ।তাঁর নিজের আর কি ই বা এমন খরচ ! একা বিধবা ...তবু এই কাজটা করেন বলে নিজেকে এখনো দাদার সংসারের গলগ্রহ মনে হয় না । ভাইপোরা স্কুল আর দাদা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর বৌদি গেছে পাড়া বেড়াতে ।বাড়িতে ভারতী এখন একা ।আজ কিছুতেই কাজে মন বসছে না ,থেকে থেকেই কাল রাত্তিরে মল্লিকার জলভরা চোখদুটো চোখের সামনে ভাসছে । তাড়াতাড়ি হাত চালাতে লাগলেন ভারতী ।বাঁচাখোঁচা কাপড় দিয়েই বাচ্চার জন্য বানিয়ে ফেললেন দুটো ফ্রক ...ঝড়ের গতিতে ।

অর্ডারটা ডেলিভারি দিয়েই যেতে হবে মল্লিকার বাড়ি ।কে জানে ,কেমন আছে মেয়েটা ! নিজের বলতে তো এই একটা বোনই আছে তাঁর ।দাদা তো অনেক দূরের মানুষ এখন ...নেহাতই বেনিয়াপুকুরের এই বাড়িটা পৈত্রিক ,তাই ভারতী নিজের অধিকারেই থাকেন এখানে ।বছর তেরো  আগে ,বিয়ের দু বছরের মাথায় যখন ম্যালেরিয়ায় স্বামী মারা যান তখন বাবাই শ্যামবাজারের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁকে এখানে ফিরিয়ে এনেছিলেন ।মল্লিকা তখন মাত্র এগারো  বছরের মেয়ে ,ওই বয়সেই দিদিকে আগলে রেখেছিল দুহাতে ।মা তো মারা গেছেন সেই কবেই ...মল্লিকার জন্মের তিন বছর পরেই ।মল্লিকা ছোটবেলা থেকে দিদির কাছেই মানুষ ।বাবাও  চলে গেছেন তাও প্রায় সাত বছর হতে চলল ।দুই বোনই পরস্পরের অবলম্বন হয়ে উঠল অবশেষে ।ন 'বছরের ছোট বোনটাই এখন ভারতীর সব । সম্ভব হলে মল্লিকাকে এখানেই নিয়ে আসতেন হাসপাতাল থেকে , কিন্তু দাদা -বৌদি কালই সাফ বলে দিয়েছিল ,ভারতী যেন মল্লিকাকে তার শ্বশুরবাড়িতেই রেখে আসে ।দাদার পক্ষে আর দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব না ।

সারাটা দুপুর ধরে প্রায় দশটা ব্লাউজের বোতামঘর সেলাই করে ,হুক লাগিয়ে , গলায়-পিঠে হেম দিতে দিতেই বিকেল সাড়ে চারটে বেজে গেল ।রোদ পড়ে এসেছে , শীত কামড় দিচ্ছে শরীরে ...ঘরে পরার শাড়িটার ওপরেই একটা মোটা চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন ভারতী ।'পরিধান টেলর্সে ' গুণে -গুণে দশটা ব্লাউজ ডেলিভারি দিয়ে ,পরবর্তী কাজের জন্য ছিটকাপড় ভরে নিলেন ব্যাগে । তারপর টাকা-পয়সা বুঝে নিতে নিতেই সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল ।ইতিমধ্যেই  ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এসেছে ।তাড়াতাড়ি পা চালালেন ভারতী ...মোড়ের মাথার মিষ্টির দোকান থেকে পাঁচ টাকার সন্দেশ নিলেন ...মল্লিকা ভালোবাসে ।শুধু তার জন্য নিলে তো হবে না ...তার শ্বশুরবাড়ির সকলের জন্য সবসময়ই বেশি বেশি করেই জিনিস নিয়ে যেতে হয় ভারতীকে ।এসব সামাজিকতা -কর্তব্যের দায় তাঁরই ...দাদা থাকতেও ! অবশ্য দাদা যে প্রণবের সঙ্গে মল্লিকার বিয়েটা দাঁড়িয়ে থেকে দিয়েছে , এটাই অনেক ! নয়তো মল্লিকার বিয়ে নিয়ে অশান্তি তো কম হয়নি ।ভারতীই কি মেনে নিতে পেরেছিলেন ! তবু অদৃষ্ট বলে মেনে নিয়েছেন সব । নয়তো তাঁর বিএ পাশ ,এমন সুন্দরী বোনের কি প্রণবের মতো একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা !

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই তাঁতীবাগানে ঢুকে পড়লেন ভারতী ।গলির মোড় থেকেই উমা আর প্রণবের উত্তপ্ত বাক্যালাপ আর মল্লিকার চাপা কান্নার আওয়াজ কানে এল তাঁর ।বন্ধ দরজাটার সামনে মিনিটখানেক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে করাঘাত করলেন ...আকস্মিক থেমে গেল সব আওয়াজ ...নিরুপায় নৈঃশব্দে ডুবে গেল শীতের সন্ধ্যে ।

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

শর্মিষ্টা দত্ত


 
অভিযোজন (১)

সময়টা আটের দশকের শুরু ,তখনো মানুষের  সন্ধ্যেগুলো দূরদর্শন কেড়ে  নেয়নি । আত্মীয়-স্বজন ,বন্ধুবান্ধবের বাড়ি যাওয়া আসায় মানুষের সময় কেটে যেত বেশ ।শেষ ডিসেম্বরে কুয়াশার আস্তরণ মেখে শুনশান মধ্য কলকাতার তাঁতীবাগান লেন ।কলকাতায় শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে , পাড়ার সব বাড়ির জানলা-দরজা তাই  বিকেল থেকেই বন্ধ । সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ  আড়াই ফুট চওড়া অন্ধগলিটার সামনে একটা হাতে টানা রিকশা এসে থামলো । ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয়   এক টাকা চার আনা পয়সা  ভাড়া মিটিয়ে  রিকশা থেকে নামলেন  ভারতী  ,  হাত ধরে নামালেন ছোট বোন  মল্লিকাকে ।তার আগে  মল্লিকার কোল থেকে  ছোট্ট পুঁটলিটাকে  নিজের কোলে জড়িয়ে  নিয়েছেন তিনি । এই বারো মিটার লম্বা গলির তৃতীয় এবং শেষ বাড়িটার ঠিকানা  আট বাই তিনের এ । চোখসওয়া অন্ধকারে আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে  রঙচটা  কাঠের দরজাটায় ঠকঠক্  করে কড়া নেড়ে  অনুচ্চ স্বরে  বললেন ," মাসিমা দরজা খোলেন , আপনের বৌমা আর নাতনিরে লইয়া আইছি  ।" ভেতর থেকে কোন আওয়াজ আসে না ।সদ্য প্রসূতি মল্লিকা ক্লান্তিতে ঢলে পড়ে দিদির গায়ে ।এবার বেশ জোরে কড়া নাড়েন ভারতী ।দোতলা থেকে বাড়িওয়ালি  জেঠিমার গলা পাওয়া যায় ,"কে ?...বৌমা এল  নাকি হাসপাতাল থেকে ?" ভারতী উত্তর দেওয়ার আগেই সদর দরজাটা সশব্দে খুলে যায় । সামনে দাঁড়িয়ে  উমা ...মল্লিকার অবিবাহিত ছোট ননদ ।আবছায়া অন্ধকারেও তার চোখমুখের বিরক্তি ভারতীর চোখ এড়ায় না । " উমা , তোমার বৌদির  শরীরটা খুব খারাপ লাগতাসে ,খুব কাহিল ...ওরে ঘরে গিয়া শুইতে দাও ..." ভারতীর কথা শেষ না হতেই উঠোনের ওপাশের ঘর থেকে প্রভার গলার স্বর ভেসে আসে ..."বৌমারে আমার ঘরে নিয়া আসো ভারতী ।এই ঘরেই মাটিতে ওর বিছনা করসি ... 

অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে মল্লিকাকে নিয়ে প্রভার ঘরের ভেজানো  দরজাটা ঠেলে ভেতরে আসেন ভারতী ।টিমটিমে ষাট ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বলছে এ ঘরে । ইঁট দিয়ে উঁচু করা তক্তাপোশের ওপর  নিঃসাড়ে  ঘুমোচ্ছে তিতলি  ...মল্লিকার দেড় বছরের শিশুকন্যা ।অন্যদিকের সরু চৌকিটার ওপর মল্লিকার দেওর প্রসূন যথারীতি বইখাতা ছড়িয়ে বসে আছে ,আর তিন মাস বাদেই তার হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা । মেঝেতে মাদুরের  ওপর একটা পাতলা তোষক পেতে মল্লিকা আর তার সদ্যজাত কন্যার জন্য বিছানা করে রেখেছেন প্রভা ।ক্লান্ত মল্লিকা ধপ করে বসে পড়ল সেখানে ।ভারতীর কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে তার গোলাপী ফুটফুটে মুখের দিকে তাকিয়ে প্রভা বললেন "আসো দিদিভাই , নিজের ঘরে আসো ...আমার ঘরে জোড়া লক্ষ্মী আইসে ভারতী ...আমি খুব খুশি ...তিতলির বোনের নাম আমি রাখলাম তিতির ।কি বৌমা , কি কও ? " 

উমা বিরস মুখে বলে ওঠে , "মা , ভাই কিন্তু  পড়ছে ।সামনে পরীক্ষা ।আজ নাহয় আদিখ্যেতাটা  একটু কমই করলে !" প্রভা কিছু বলার আগেই পাশের ঘর থেকে জড়ানো গলায়  প্রণব কিছু বলে ওঠে ।ভারতী দেখলেন মল্লিকা চমকে তাকালো দু ঘরের মাঝে বন্ধ দরজাটার দিকে ...তার দু-চোখে টলটল করছে দু-ফোঁটা জল !