পিনাকী মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পিনাকী মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

পিনাকী মুখোপাধ্যায়



পরকীয়া
 
“ ধূর ! ভাল্লাগে না ! “ স্মার্ট ফোনটা সজোরে বিছানায় ছুঁড়ে স্বগতোক্তি করে উঠল দিয়া ।
কুরুশ দিয়ে একটা টেবিলক্লথ বুনছিলেন সুনয়না । মৃদু হেসে বললেন , “ কী হল ? মোবাইল আবার কী দোষ করল ? “
ভুরু কুঁচকে ঠাম্মির দিকে তাকিয়ে দিয়া বলল , “ ফেসবুক , হোয়াটস অ্যাপ জুড়ে শুধু পরকীয়া আর পরকীয়া । আর যেন কোথাও কোন বিষয় নেই । একটা ইস্যু পেলেই হল ! এদের কি কারো কোন কাজ নেই ? “
সুনয়নার মুখের হাসি আরও একটু প্রসারিত হল । বললেন , “ তুই বুঝিস পরকীয়ার    মানে ? “
ঠোঁট বেঁকিয়ে দিয়া বলল , “ না বোঝার কী আছে ? বিবাহিত হয়েও অন্য একটা সম্পর্ক প্যারালালি চালিয়ে যাওয়া … “
“ তা তোর কী মত ? সেটা ভালো না খারাপ ? “ জিগ্যেস করলেন সুনয়না ।
এতক্ষণ উপুড় হয়ে পা নাচাচ্ছিল দিয়া । এবার উঠে বসে বেশ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, “ অবভিয়াসলি খারাপ । একটা সম্পর্কে লয়ালিটি থাকবে না ? বনিবনা না হলে সেপারেট হয়ে যাও । তারপর অন্য সম্পর্কে যেতেই পার । কিন্তু একসঙ্গে গোপনে একাধিক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া ! আমি জাস্ট ভাবতে পারি না । “
সুনয়না স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন দিয়ার দিকে । বললেন , “ জীবনের সব হিসেব অঙ্ক কষে হয় না রে দিদি । দুয়ে দুয়ে সবসময় চার হয় না । “
“ তার মানে তুমিও পরকীয়াকে সাপোর্ট করছ ? আচ্ছা ধর , তুমি জানতে পারলে মা তার কোন অফিস কলিগের সঙ্গে প্রেম করছে , ভালো লাগবে তোমার ? মেনে নেবে তুমি ? রাগ হবে না ? কষ্ট হবে না ? আমি তো তবে কোন সম্পর্কই রাখব না মায়ের সঙ্গে । “
এবার হেসে ফেললেন সুনয়না । বললেন , “ বাপ সোহাগি মেয়ের কথা শোন ! যদি উল্টো টা হয় ? যদি তোর বাবা অমনটা করে ? “
অপ্রতিভ মুখে দিয়া বলে ওঠে , “ ধ্যাত ! বাবা অমন করতেই পারে না । মা ও পারবে না । আমি তো জাস্ট কথার কথা বললাম । তুমি পরকীয়াকে সাপোর্ট করছিলে তাই … “
১
হাতের বোনাটা একপাশে রেখে বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে সুনয়না বললেন , “ আমি সাপোর্ট করি কি করিনা সে কথা বলিনি । আমি বলছি জীবনটা বড্ড জটিল । চলার পথে  অনেক অনেক বাঁক । কোন বাঁকে কী অপেক্ষা করে আছে কিচ্ছু বলা যায় না । আরও জটিল মানুষের মন । কখনো সে প্রবৃত্তির বশীভূত কখনো সে পরিস্থিতির শিকার । “
তর্কের সুরে দিয়া বলল , “ পরিস্থিতির দোষ দিচ্ছ কেন ঠাম্মি ? পরকীয়া যারা করে তারা প্রবৃত্তির জন্যই করে । “
“ বোধহয় সবসময় তা নয় রে দিদি । একটা ঘটনা বলি তবে । শোনার পরে তুই বিচার করিস । “
গল্পের গন্ধ পেয়ে ঠাম্মির কোল ঘেঁসে এল দিয়া । সুনয়না বলতে শুরু করলেন ।
“ আরতি আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল । আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না ওদের । কিন্তু পড়াশুনা খুব ভালোবাসত মেয়েটা । টিউশুনি করে নিজের পড়ার খরচা চালাত । এভাবেই ভর্তি হয়েছিল কলেজে । স্বপ্ন ছিল টিচার হওয়ার ।
“ কলেজে যাওয়া আসার পথে তাকে দেখে পছন্দ করেছিল এক অভিজাত বাড়ির সুচাকুরে ছেলে ।প্রস্তাব এল আরতির মা , বাবার কাছে । দাবি দাওয়াহীন এমন সুপাত্র পেয়ে তাঁরা তো হাতে চাঁদ পেলেন ।আরতির কথা কেউ শুনতেই চাইল না । শিক্ষিকা হবার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল । বিয়ে হয়ে গেল আরতির ।
“ বিয়ের পরে পরেই বউকে নিয়ে বর চলে গেল ভিন রাজ্যে তার কর্মক্ষেত্রে ।বিরাট কোয়ার্টার । অনেক ঠাকুর চাকর । তেমন কোন কাজই ছিল না আরতির । সে ভেবেছিল সুযোগ মত  বরকে বলে নতুন করে পড়াশুনা শুরু করবে ।
“ কিন্তু তার আগেই প্রকাশ হয়ে পড়ল বরের প্রকৃত স্বরূপ । সে ছিল প্রচণ্ড বদমেজাজি আর সন্দেহপ্রবন । তার ওপর যখন সে ড্রিঙ্ক করত তখন আক্ষরিক অর্থেই অমানুষ হয়ে যেত । কাজের লোকেদের নিয়েও নোংরা সন্দেহ করত আরতিকে । মার খেতে খেতে সারা শরীরে কালশিটে পড়ে গিয়েছিল আরতির ।
“ বাপের বাড়িতে জানিয়ে কোন লাভ হয় নি । তাঁরা বলেছিলেন অ্যাডজাস্ট করে নিতে । আরতি আর পারছিল না ।সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছিল যেন । আরতি যখন নিজেকে শেষ করে দেবার কথা ভাবছিল তখনই ঠিকে কাজের মেয়ে একটা চিরকুট এনে দিয়েছিল তার হাতে ।
“ পশ্চিম দিকের বন্ধ জানলাটা খুলে সেদিনই প্রথম চোখাচোখি হয়েছিল তার সঙ্গে । অতলান্ত সেই চোখদুটোতে ছিল সমবেদনা আর নির্ভরতার আশ্বাস ।
২

“ আরতির বরের সাব অরডিনেট ছেলেটি থাকত আরতিদের উল্টোদিকের ব্যাচেলার’স কোয়ার্টারে । বেশ কিছুদিন পরে আরতি আর সেই ছেলেটা হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায় । শুনেছি পরে বরের থেকে বিচ্ছেদ নিয়েছিল আরতি । সেই ছেলেটার সঙ্গে বিয়েও হয়েছিল । আর শিক্ষিকা হবার স্বপ্নও সত্যি হয়েছিল আরতির । ওঁদের সম্পর্কটা কোন বাড়ি থেকেই কেউ মেনে নেয় নি । ওরা একলা হয়ে গিয়েছিল । তবে ওরা দুজনে খুব সুখী হয়েছিল । “
নিঝুম হয়ে বসে ছিল দিয়া । সুনয়না বললেন , “ আরতি আর ওই ছেলেটার সম্পর্ককেও  তো পরকীয়াই বলবে লোকে । খারাপও বলবে বেশিরভাগ লোক । আরতি যদি বরের অত্যাচার সহ্য করে থেকে যেত হাসিমুখে তবেই হয়ত সমাজ প্রশংসা করত তার।এবার বল তুই কী বলবি?”
“ আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে ওঁদের । “ ধরা ধরা গলায় দিয়া বলল  , “ কতটা ভালোবাসা আর উদারতা থাকলে তখনকার সময়ে এমন একটা কাজ করতে পারেন কেউ ! সামনে পেলে ভদ্রলোককে একবার প্রনাম করতাম । “
হঠাৎ বুক নিঙরে কান্না উঠে এল সুনয়নার । রুদ্ধ গলায় বলে উঠলেন , “ ওই তো দেওয়ালে ঝুলছে মালা পড়ান আমার ভগবানের ফটো । যা , প্রনাম করে আয় দাদুকে । “


মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

পিনাকী মুখোপাধ্যায়

ফেরা
-------------------------------------------
        কোর্টঅর্ডারে সাতদিন একসঙ্গে থাকতে এসেছে ওরা ।
        বাংলোর পিছনে কৃষ্ণচূড়া গাছটার গায়ে হাত বোলাতে গিয়ে দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে মীরার। দশবছর পরেও নামদুটো এত উজ্জ্বল ! 
         কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে , " খুব গভীরভাবে খোদাই করেছিলাম যে ... "
          উচ্ছসিত আবেগে থরথর করে কেঁপে ওঠে মীরা । দুহাতের ঘেরাটোপে বিভান বেঁধে ফেলে ওকে ।
                   

শনিবার, ৩০ জুন, ২০১৮

পিনাকী মুখোপাধ্যায়


 ভালোবাসা    
 
সম্বন্ধটা ভেঙে গেল ।রিসিভারটা নামিয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইলেন সুরেখা । পূর্ণার খুশি খুশি মুখটা ভাসছে চোখের সামনে । অনেক বোঝানোর পরে নিমরাজি হয়েছিল মেয়ে । ছেলের বাড়ি থেকে যেদিন দেখতে এল সেদিনও কেমন কাঠ কাঠ ব্যবহার করছিল পূর্ণা । অপ্রতিভ লাগছিল সুরেখার । কিন্তু সুরেখাকে অবাক করে পাত্রপক্ষ সেদিনই জানিয়ে দিয়েছিল , পূর্ণাকে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে । ফটো  দেখে আবির , মানে ছেলে আগেই পছন্দ করেছিল । তারপরেই বিবাহিত দিদিকে সঙ্গে নিয়ে দেখতে এসেছিলেন আবিরের মা , বাবা । আসার কথা ছিল আবিরেরও । কিন্তু শেষ মুহূর্তে অফিসিয়াল ট্যুরে কলকাতার বাইরে চলে যেতে হওয়ায় আসতে পারেনি সেদিন । তার জন্য আবিরের বাবা বার বার দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন ।  
ওঁদের সৌজন্য , আন্তরিকতায় অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন সুরেখা । ঠিক হয়েছিল ট্যুর থেকে ফেরার পরে এক বন্ধুকে নিয়ে আবির এসে আলাপ করে যাবে পূর্ণার সঙ্গে । আবিরের মা বলেছিলেন , “ আমাদের দিক থেকে আমরা ফাইনাল করে যাচ্ছি । এবার আবিরকে আপনাদের পছন্দ হলেই পাকা কথা হয়ে যেতে পারে  … “ 
এতটা বোধহয় পূর্ণাও আশা করে নি । ওর মুখের কঠিন রেখা গুলো নরম হয়ে আসতে দেখেছিলেন সুরেখা । বুক থেকে একটা ভারী পাথর যেন নেমে গিয়েছিল ।মনে হয়েছিল এবার বুঝি বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবেন । 
একটা অ্যাক্সিডেণ্টে পূর্ণার বাবা যখন  হঠাৎ করে চলে গেলেন তখন পূর্ণা মাত্র দেড় বছরের । মেয়েকে বুকে চেপে সেই শুরু  সংগ্রামের জীবন ।ওঁরা  বিয়ে করেছিলেন  দু বাড়ির অমতে । অমন দুঃসময়য়েও শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে কেউ এগিয়ে আসেন নি । সুরেখার দাদা পাশে এসে দাঁড়ালেও ঠারে ঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সুরেখা বা তার মেয়ের ভার নেবেন না তাঁরা ।সুরেখা আশাও করেননি ।
কম্পেনসেসন গ্রাউন্ডে স্বামীর চাকরিটা পেয়েছিলেন সুরেখা । স্বামীর সহকর্মীরা খুব সাহায্য করেছিলেন । মেয়েকে স্কুলের ডে বোর্ডিঙে রাখার ব্যাবস্থা করেছিলেন । অফিস থেকে ফেরার পথে মেয়েকে নিয়ে ফিরতেন । বহু প্রলোভন ছিল , ছিল হাজার প্রতিবন্ধকতা । দাঁতে দাঁত চেপে , মেয়েকে আগলে লড়াইটা ছিল  সুরেখার একলার ।
অফিসের সময়টুকু বাদ দিয়ে পুরোটা সময় দিয়েছেন মেয়েকে । সখ , আহ্লাদ  , সবই ছিল শুধুই মেয়েকে ঘিরে । বাবার অভাব কোনদিন বুঝতে দেন নি । ভারী বাধ্য ছিল পূর্ণা । পড়াশুনায় ভাল ছোটবেলা থেকেই । ইংরেজিতে ফার্স্টক্লাস নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনের পর সদ্য ভর্তি হয়েছে ইউনিভার্সিটিতে । অফিসের এক কলিগের মারফৎ এসেছিল সম্বন্ধটা । নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে             ১ 
বিয়ের কথা ভাবার  ইচ্ছে ছিল না সুরেখার । কিন্তু যে ভদ্রলোক এনেছিলেন সম্বন্ধটা তিনি বললেন দেখাশোনা হলেই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না । তাছাড়া পড়াশুনার ভীষণ গুণগ্রাহী ওরা । তাই বিয়েটা যদি হয়েও যায়  পড়াশুনা কনন্টিনিউ করতে কোন অসুবিধা হবে না ।   আর আপত্তি করতে পারেন নি সুরেখা । তারপর তো আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পর আক্ষরিক অর্থেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । সুদর্শন , মার্জিত , ভদ্র ইঞ্জিনিয়ার পাত্রটিকে যে মেয়েরও মনে ধরেছে সেটা পূর্ণার মুখ দেখেই বুঝেছিলেন । তাঁর সম্মতি নিয়েই এরপর দুবার বাইরে মিট করেছে ওরা । পূর্ণার মত নাকউঁচু মেয়েও প্রচ্ছন্নভাবে প্রশংসাই করেছে আবিরের । সবকিছুই তো ঠিকঠাক চলছিল । আচমকা কী এমন ঘটলো ভেবে পাচ্ছেন না সুরেখা । আবিরের মা যখন ফোন করে বললেন , এই সম্বন্ধটা নিয়ে তাঁরা আর এগোতে পারছেন না , সুরেখা এত অবাক হয়ে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণ কোন কথাই বলতে পারেন নি । তারপর জিগ্যেস করেছিলেন , “ অসুবিধেটা কোথায় যদি একটু বলেন ...”
অদ্ভ ুত  হেসে আবিরের মা বলেছিলেন , “ কথায় কথা বাড়ে ভাই । আমরা যখন ডিসিশন নিয়েই নিয়েছি তখন আর ...নমস্কার ...ভালো থাকবেন ...”
সুরেখাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রেখে দিয়েছিলেন ফোনটা ...
পুরো ঘটনাটা যেন ছায়াছবির মত দেখতে পাচ্ছিল পূর্ণা । আজ রবিবার ।  আজ বিকেলেই আবার আবিরের সঙ্গে দেখা করতে যাবার কথা । খুব যদি ভুল না করে ফোনটা দুপুরের মধ্যেই আসবে । পূর্ণার ইনটুইশন তাই বলছে । যে কোন মুহূর্তে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে ঘরে এসে ঢুকবে মা ।   
“ মা “ শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটা নরম আদরের বলয় যেন তৈরি হয়ে যায় পূর্ণাকে ঘিরে । নিরাপত্তার আশ্চর্য উষ্ণতা সেখানে ।হাজার ওঠা পড়া , ঘাত প্রতিঘাতের এতটুকু আঁচও সে বলয় ভেদ করে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি পূর্ণাকে । ভালোলাগায় , ভালোবাসায় দুচোখ বুজে আসতে চায় । ঠিক তখনই ঘরে এসে ঢোকেন সুরেখা ।
মায়ের এমন মর্মভেদী দৃষ্টি বুঝি কখনো দেখেনি পূর্ণা । বুকটা কেঁপে ওঠে । ফোনটা কি এসেছিল তবে ? আর কিছু ভাবার আগেই সজোরে একটা চড় এসে পড়ে পূর্ণার গালে । হিসহিসে গলায় সুরেখা বলে ওঠেন , “ কী বলেছিস তুই আবিরকে ? কেন বলেছিস ? তোর আবিরকে পছন্দ নয় তুই তো আমাকেই বলতে পারতিস । অন্য কাউকে যদি পছন্দ করে থাকিস আগে বলিসনি কেন আমাকে ? এরকম একটা প্রহসন কেন করলি তুই ? “
কান্নায় গলা বুজে আসে পূর্ণার । জীবনে এই প্রথম মা গায়ে হাত তুললেন তার । বলল , “ কাউকে পছন্দ করা নেই আমার । তোমাকে তো বলেইছিলাম  আমি রাজি নই । তবুও জোর করলে । কী করব আমি ? “
২

“ কী করবি মানে ? “ তল কূল খুঁজে পাচ্ছেন না সুরেখা । 
ফোঁপাতে ফোঁপাতে চিৎকার করে ওঠে পূর্ণা , “ শুনে রাখ আবার যদি কোন জায়গায় আমার বিয়ের চেষ্টা কর আমি এই একই কাণ্ড করব । জানিয়ে দেব তিন বছর আগে আমাকে মেণ্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি করার কথা । বাবাও যে পাগল ছিলেন জানিয়ে দেব সে কথাও । “
মাথায় যেন রক্ত চড়ে যায় সুরেখার । পূর্ণার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে ওঠেন , “ কেন ? কেন এসব বানিয়ে বানিয়ে বলেছিস তুই আবিরকে ? বল কেন বলেছিস ? “ 
কান্না জড়ানো গলায় পূর্ণা বলে ওঠে , “ কারণ ... কারণ  তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না আমি । তোমাকে একা ফেলে কোত্থাও যাব না আমি ... কোত্থাও না ... কক্ষনো না ... কোনদিন না ... “
হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন সুরেখা । বুক জুড়ে উথাল পাথাল ঢেউ । কী  যেন আটকে এল গলায় । চোখের বাঁধ ভেঙে গেল সহসাই । বুকের মাঝখানে টেনে নিলেন পূর্ণাকে । ভালোবাসার ওমে জড়িয়ে নিলেন সেই ছোট্টবেলার মত । হাসি আর কান্নার অনুরণন মিলে মিশে গেল তাঁর কণ্ঠস্বরে । বললেন , “ বোকা কোথাকার ! সত্যিই তুই পাগল । আমি ধরতে না পারলেও তোর পাগলামি যে ধরে ফেলেছে ওরা । আবিরের মা ফোন করে বললেন – ‘  অনেক ভাগ্য করে এমন মেয়ে পেয়েছেন ভাই ।ওকে বলবেন  ওর মত পাগলির খোঁজেই ছিলাম আমরা ।বলবেন আবির তার বাবা , মায়ের প্রতি যতটা দায়বদ্ধ ততটাই দায়বদ্ধতা থাকবে তার বউয়ের মায়ের জন্যও । ‘ “ 
একটু থেমে সুরেখা আবার বললেন, “ উনি বললেন তোর যখন খুশি তুই আসবি আমার কাছে । আমিও যাব যখন যখন আমার মন চাইবে । ওরা খুব ভালো রে । তুই আর অমত করিস না সোনা ... “ 
নির্বাক চেয়ে থাকে পূর্ণা । এমনটা হতে পারে কল্পনাই করেনি । আর কী আশ্চর্য !  মায়ের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মানুষগুলোর ওপর সেই আগের মত  রাগটা কেন যে  আসছে না আর !কেন যে কিছুতেই আর শএুপক্ষ ভাবা যাচ্ছে  না মানুষগুলোকে ! 
আজ সকালে ফোনে অ্যাসাইলামের গল্পটা শোনার পরে গম্ভীর গলায় আবির বলেছিল – ‘ এতো সাংঘাতিক ব্যাপার ! খুব ভালো করেছ জানিয়ে ... ঠিক আছে , আমি একটু ব্যাস্ত আছি এখন । পরে কথা বলছি ...’
পলকের জন্য থমকে গিয়েছিল পূর্ণা । ক্ষুব্ধ হেসে মনে মনে বলে উঠেছিল , “ প্রেমের বেলুন চুপসে গেল এক মুহূর্তে ! এই তো ভালবাসা ! ... “
সেই ‘ ভালোবাসা ‘ শব্দটাই এই মুহূর্তে পূর্ণার কাছে ধরা দিচ্ছে এক অন্যরকম ব্যঞ্জনায় ।মায়ের কোলে মুখ গুঁজে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ভালোবাসার এক বর্ণালি দেখতে পায় পূর্ণা ।বিভিন্ন রং গুলো তাদের স্বতন্ত্রতা নিয়েও মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল ।

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

পিনাকী মুখোপাধ্যায়


                                                                  প্রথম বৃষ্টি 
                                                         

                     “ জানো শ্রীতমার সঙ্গে ভীষণ মিল তোমার । “, হোয়াটসঅ্যাপে কী যেন টাইপ করতে করতে বলল রিয়া ।
         অফিসফেরত চা খেতে খেতে বিছানায় আধশোয়া হয়ে নতুন কেনা থ্রিলারের পাতা ওলটাচ্ছিলাম । ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করলাম , “ কে শ্রীতমা ? “
                     স্মার্টফোন থেকে চোখ তুলে বিরক্ত মুখে রিয়া বলল , “ এত ভুলে যাও কেন তুমি ? অর্কর মায়ের কথা কতবার বলেছি তোমায় … “
         আমি ঢোক গিলে বললাম , “ ইয়ে … মানে … কোন অর্ক যেন … “
         মোবাইল বন্ধ করে রিয়া সটান চাইল আমার দিকে । রাগের আঁকিবুকিতে গনগনে হয়ে উঠল ওর মুখটা । উষ্ণ গলায় বলে উঠল , “ তুমি আমার কোন কথাই শোন না মন দিয়ে । আর কিচ্ছু বলব না তোমাকে … “ , বলতে বলতে ঝটিতে খাট থেকে নেমে পড়ল ।
        আমি প্রমাদ গুনলাম । আসলে রিয়া এত কথা বলে আর এত বিষয় বৈচিত্রে সেসব ভরপুর থাকে , আমি সবটুকু ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারিনা মাথায় । পরে কথায় কথায় সেটা প্রকাশ হয়ে পড়লে ও খুব হার্ট হয় । 
       আঁতি পাঁতি করে খুঁজছিলাম অর্ক আর তার মাকে । মনে পড়ল । আমার ছেলের সঙ্গে পড়ে।একই স্কুলে নয় , এক কোচিং ক্লাসে । ছেলের সঙ্গে অর্কর যত না বন্ধুত্ব ,  রিয়ার সঙ্গে অর্কর মায়ের বন্ধুত্ব তার চেয়ে বেশি । সদ্য সদ্য গড়ে ওঠা বন্ধুতার  গাঢ়ত্ব যে ক্রমশই বাড়ছে ইদানীং মাঝে মধ্যেই সেটা মালুম হচ্ছিল । 
.       মা , বাবা ওপরের ঘরে , ছেলে কোচিংএ । চোখে দুষ্টুমি নিয়ে রিয়ার একটা হাত ধরে টান দিলাম । আমার গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল । দুহাতের বেষ্টনীতে জড়িয়ে নিলাম ওকে । ঘটনার আকস্মিকতায় লালচে হয়ে উঠল ওর মুখ । ছদ্মরাগে বলে উঠল , “ ছাড়ো ! আমার কথার কোন গুরুত্বই নেই তোমার কাছে … “ 
     ওর গাল টিপে বললাম , “ তোমাকে রাগাচ্ছিলাম । অর্ক ছেলের বন্ধু । আমি জানি । “ 
        পলকেই উজ্জ্বল ওর মুখ । আমার হাত ছাড়িয়ে উঠে বসল । উৎসাহিত গলায় বলল , “ শ্রীতমা , মানে অর্কর মা একদম তোমার মত । “
                                                                           ১
     
                 মজার গলায় বললাম , “ তুমি কি অর্কর মাকে পুরুষালি বলছ না কি আমাকে মেয়েলি বলছ ?“ 
      “ ধ্যাত ! “ , হেসে ফেলল রিয়া , “ শ্রীতমা খুব সুন্দর দেখতে । আমি বলতে চাইছি ও তোমার মতই রোম্যান্টিক  । “ 
      “ কী রকম ? “ , গলায় বাড়তি উচ্ছাস ফুটিয়ে জিগ্যেস করি ।
      “ এই তো , কাল ছেলেদের কোচিংএ পৌঁছে ফেরার মুখে ঝড় উঠল রাস্তায় । দেখতে না দেখতেই ঝেঁপে বৃষ্টি এল । আমি তো ব্যাগ হাতড়ে ছাতা খুঁজছি , শ্রীতমা বলে উঠল – ‘ ছাতা খুঁজছ কেন ? বছরের প্রথম বৃষ্টি । ভিজতে ভালো লাগে না তোমার ? ‘ 
     “ আমি তো থ ! বলে ফেললাম , ‘ একদম পোষায় না গো । ভিজলেই ঠাণ্ডা লেগে যায় ।‘ বেচারি আর কী করে ? বাধ্য হয়ে বের করল ওর  ছাতাটা  … “ 
      শুনতে থাকার ভঙ্গি করে আমি সন্তর্পণে উল্টে যাই থ্রিলারের আর একটা পাতা । রিয়া সোৎসাহে বলতে থাকে , “ … তোমার সঙ্গে আরও মিল আছে । ও তোমার মতই সফট হার্টেড , কাউকে কটু কথা বলতে পারে না । অত বড় চাকরি করে , অথচ টাকা পয়সার সব ঝামেলা ওর বর সামলায় ; তোমারটা যেমন সামলাতে হয় আমাকে । আর তোমার মতই বই পড়ার নেশা । কত যে বই কেনে …” 
       বলতে বলতেই হোয়াটস অ্যাপ থেকে ভদ্রমহিলার ডি পি টা বের করে আমার সামনে ধরে বলে ওঠে , “ দেখ , কী সুন্দর দেখতে ! তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে একেবারে রাজযোটক হত । “ , হাসতে  হাসতে একেবারে গড়িয়ে পরে রিয়া ।
       চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিতে দিতে এমন বিষম খেলাম মুখের থেকে চা ছিটকে বই , বিছনা সব ভিজে গেল । অপ্রতিভ মুখে আমার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে “ সরি “ “ সরি “ বলতে থাকে রিয়া ।
      অনেক রাতে আবার বৃষ্টি নামল । ঘুম আসছিল না । একটা সিগারেট ধরিয়ে পিছনের রেলিং ঘেরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম । বৃষ্টিতে আবছা হয়ে আছে চারদিক । সেই আবছায়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল একটা ছবি … মফস্বল শহরের তুমুল বৃষ্টি নামা রাস্তা দিয়ে সামনে একটা মেয়েকে বসিয়ে উদ্দাম গতিতে সাইকেল চালাচ্ছে ছেলেটা  … এলোমেলো হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ওদের এলোমেলো কথা … হাসি … ওরা ভিজে যাচ্ছে প্রথম ভালবাসার বৃষ্টিতে … আচ্ছা ,  অর্কর মাকেও কি  রিয়া তার বরের গল্প করেছে  ? …
     চমকে উঠলাম সহসাই । গাল বেয়ে লোনা জলের স্বাদ ঠোঁটে … নাগরিক রাত্রি  ভিজছে ভালবাসার বৃষ্টিতে ।