নন্দিতা দাস বসু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নন্দিতা দাস বসু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

নন্দিতা দাস বসু

     


এলোমেলো কথারা...


মনখারাপের অলিখিত সুরে
বেজে ওঠে হঠাৎ ভৈরবী,
ইমনকল‍্যাণ কবেই নিয়েছে ছুটি
মল্লারের অস্থায়ী জলছবি;

আকাশে এখন বসন্তরাগ ভেসে
যদিও অবকাশে কালবৈশাখী আসে,
গন্ধরাজের পাগলপারা মন
স্নিগ্ধ জুঁইয়ের মাতাল আবেশে:

একটা দুটো এলোমেলো কথা
বুনতে চায় মস্ত উপন‍্যাস,
কথার পিঠে কেবল কথকতা
দাম্পত্যের নির্মেদ সহবাস;

নাগরদোলার হুল্লোড়ে আব্দার
রাখতে চাইছে মেলার আগুন্তুক-
তবুও আসে রংবেরঙের ইচ্ছে
বাউলকবি যেমন খুশী সাজুক;

কিছু স্বপ্নে অলীক ভাবনা মেশে
কোনটায় বা আগামীর অপেক্ষা ,
হয়তো বা আছে অজ্ঞাত ঈশারা
গোল্লাছুটে পেতেও পারো রক্ষা ;

সম্পর্কের গোলকধাঁধায় শুন‍্য
বদলায় শুধু তোমার আমার স্বপ্ন,
এক পলকেই সবটুকু অগোছালো
বেঁচে থাকুক স্বার্থহীন যত্ন.. 

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

নন্দিতা দাস বসু





মা
মা শব্দটির ব‍্যাপকতা ও গভীরতায় নিমগ্ন হতে কোন সন্তানকে বেশি সময় নিতে হয় না।মা তার সার্বক্ষণিক পরিচর্যায় সন্তানের জীবনে মননে এমনভাবে গেঁথে থাকেন সেখান থেকেই কোন সন্তান তার মাকে আপনমনের মাধুরী মিশিয়ে জানতে,বুঝতে ও ভাবতে পারে।মাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা কিংবা মায়ের সযত্ন স্পর্শে নিবিষ্ট হওয়া প্রতিটি সন্তানের সহজাত প্রত‍্যয়।যে বোধ তৈরি করতে মাকেই সন্তানের মধ্যে একাত্ম হয়ে যেতে হয়।মায়ের আজন্ম লালিত স্বপ্নিল অনুভুতি দশমাস দশদিন সন্তানদের জঠরে লালন করে একসময় পৃথিবীর আলো দেখানো হয়।মায়ের কল্পনা তাড়িত এই বোধ শুরু হয় সেই শৈশবের পুতুলখেলার মধ্যে দিয়ে।

মায়ের স্নেহ,মায়ের শাসন যে কোন সন্তানের জীবনের গতিকে নির্মল করে,নিস্কন্টক করে সর্বোপরি নিরাপদ করে।মায়ের অনুপস্থিতি সন্তানের জীবনকে ঠেলে দেয় তমসার গর্ভগৃহে।মায়ের অহংকার,আকাঙ্খা,প্রত‍্যাশা তৈরি হয় সন্তানের কর্মকুশলতার মধ্যে দিয়ে।মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক জন্মজন্মান্তেরর। মাতৃজঠর থেকে এযাত্রা শুরু হলেও আশৈশব চৈতন্যের আবেগে যে স্বপ্নের অনুভূতিকে লালন করে তা যেন অনন্তকালের পথযাত্রীদের এক অভিনব নিবিষ্টতার চুড়ান্ত নির্দেশনা।মা যেমন অণুক্ষনের,প্রতিদিনের,চিরকালের একইভাবে মা হয়ে ওঠেন সন্তানের জীবনব‍্যাপী সাধনার এক অক্ষয় বৈভব।সন্তানকে আগলে রাখতে স্নেহে আর শাসনে মায়ের যে দ্বৈতস্বত্তা তা প্রতিটি মায়ের এক অনুপম মঙ্গলশিখা।

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের অমরবাণী-নারীর দুটি রূপের মধ্যে একটি হলো স্নেহে,মায়ায়,মমতায় নারীমাতা আর প্রেমে পুজায় নিবেদনে নারী প্রিয়া।এই পরম সত্যটি নারী চরিত্রের দীপ‍্যমান শিখা।রবীন্দ্রনাথ নিজের মাকে সাহিত্যে নিয়ে আসতে না পারার কষ্ট জীবনভর লালন করেছেন।এক চিরাচরিত প্রথার অন্তরালে তিনি বড়ো হয়েছিলেন ধাত্রীমাতা ও গৃহপরিচারিকার তত্ত্বাবধানে।ফলে মাকে কাছে না পাওয়ার ফারাকটুকু ভরে দিতে পারেনি তার সাহিত্যে মায়ের অনুপস্থিতি।

এ প্রসঙ্গে 'কর্ণকুন্তীসংবাদ' ও 'গান্ধারীর আবেদন' কবিতায়  বলিষ্ঠ মাতৃশৌর্য বিভুষিত মাতৃমুর্তির পরিচয় পাওয়া যায়।অন‍্যদিকে মাতৃমহিমার আরেক জলন্ত শিখা ছিলেন ম‍্যাক্সিক গোর্কির 'মা'।যা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে।সৃষ্টির আদি থেকে এভাবেই মা যুগে যুগে সন্তানদের কাছে তো বটেই মননশীল ও সৃষ্টির দ‍্যোতনায় নিমগ্ন বিশিষ্টজনের কাছেও দুর্লভ রূপশৌর্য।পৃথিবীর আদি এবং অকৃত্রিম শব্দই হলো মা।পৃথিবীতে প্রথম পরিবারই ছিল মাতৃতান্ত্রিক।যার সামান্য অপভ্রংশ আজও পৃথিবীর কোনো কোনো জায়গায় দৃশ্যমান।

মা দেশমাতৃকার এক অনন্য প্রতিবিম্ব।মায়ের আদলে দেশকে অনুভব করে দেশমাতৃকার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করতে অনেক সন্তানকে দুর্বার,দুরন্ত মিছিলে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হয়েছে।মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর মহাদুর্যোগপুর্ণ রাতে একটি বিরাট স্রোতবাহী নদী সাঁতরে মায়ের কাছে পৌঁছে জগদ্বিখ‍্যাত হয়েছিলেন।পৃথিবীতে মহৎ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে একজন সুমাতার অবদান সর্বাগ্রে।শ্রেষ্ঠ মানুষেরা কখনো তাদের মাকে অমর্যাদা করেননি।একটি বিখ্যাত গানের কলি দিয়ে লেখনীর পরিসমাপ্তি ঘটালাম-
মধুর আমার মায়ের হাসি
চাঁদের মতো ঝরে
মাকে মনে পড়ে আমার
মাকে মনে পড়ে।।।



শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

নন্দিতা দাস বসু

#একমুঠো_ভাত



-ওমা মা,মা গো আর একমুঠো ভাত দাও না গো,শুন‍্য থালা আর একরাশ অবিন‍্যস্থ চুলে মাথা ঝাঁকিয়ে বছর আটেকের অনন্ত মাকে শুধায়।রূক্ষ চুলে একমাথা সিঁদুর পরে সামনে এসে দাঁড়ায় কণিকা।এ কদিনে যেন আরও শুকিয়ে গেছে সে।অমন কোমর ছাপানো চুলে আর ঢেউ খেলে না।মুখের হাসি মলিন হয়ে গেছে।সেদিনের ক্লাব থেকে পাওয়া চার কেজি চালের অবশিষ্টাংশ দিয়েই আজ হাড়ি চরিয়েছে।অনন্তর একারই কোনোমতে হবে।

ও আর অনন্তর বাবা দুজনে শুকনো মুড়ি জলে ভিজিয়ে খাবার মনস্থ হাঁড়ি কাছিয়ে ভাত দিয়েছিল কণিকা।একটা দানাও হাঁড়িতে নেই।আবার ছেলেটা ভাতের কথা বললে পেটের আগুনটা মুখে জ্বলে উঠলো।
বলে ওঠে, শুধু খাই আর খাই।আমার মাথা খা,হাড়হাভাতে ছেলে।

অনন্ত ফ‍্যালফ‍্যাল করে চেয়ে থাকে।সারাদিন পর শুধু একমুঠো ভাত।তাও মা বলে শুধু খাই খাই!অনন্তর আজ সকাল থেকে কতই না ক্ষিদে পেয়েছে,কেবলই কুঁজোটা থেকে জল নিয়ে খেয়েছে।

কাশতে কাশতে বিছানা ছেড়ে উঠে আসে অসীম,অনন্তর বাবা,ফুটপাতের এক সামান্য কাপড় বিক্রেতা।কদিন ধরে কাশিটা বড়ো বেড়েছে। লকডাউনের আগের মাসেই পাড়ার কোয়াক ডাক্তার রূপক দেব বলেছিল,
অসীম এবার কফটা পরীক্ষা করে নে।কাশিটা ভালো ঠেকছে না।ভেবেছিল চৈত্র সেলে বিক্রি বাটা হলে হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষাটা করেই নেবে।হাসপাতালে বিনা পয়সায় পরীক্ষা আর ওষুধ পেলেও যদি রিপোর্টটা খারাপ আসে।তাই ভয়ের চোটে সে পথ মাড়ায় নি অসীম।আর কণিকাকেও সব কথা চেপে গেছে।

ওকে আর মুখ কোরো না কণি, ওর কি দোষ বলো,পেট কি শুনবে মনের জ্বালা-অসীমের কথায় কণিকার পাথরের মতো কঠিন মুখে ঝর্ণার ফল্গুধারা নেমে আসে।অনন্তকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে সে।হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ানোর আওয়াজ আসে।এঁটো হাতেই অনন্ত দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখে পাশের বাড়ির সোমা কাকিমা টিফিন বক্সে গরম ভাত আর সব্জী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।।