ভজন দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভজন দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

ভজন দত্ত

জানো দেবাশিস,
মাঠের সাইডলাইনে বসে আছি। ঘরকে যদি প্যাভিলিয়ন ভাবো,তবে ধরে নাও প্যাভিলিয়নেই বসে আছি প্যাড পরে। টিভিতে লাইভ দেখাচ্ছে খেলা। এত ফার্স্ট বোলিং হচ্ছে যে,পৃথিবীর বাঘা বাঘা সব  ব্যাটসম্যানরা ঘায়েল। ধরো,এক একটা ব্যাটসম্যানের নাম এক-একটা দেশের নামে। তারা যখন সব অসহায়, একের পর এক প্রতিদিন উইকেটে পতনের শব্দে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে ,স্কোর দেখছি না নির্বাচনী ফলাফল দেখছি, সব যখন ঘেঁটে ট, তখন মনের অবস্থা বুঝতেই পারছো! যেকোনো সময়,কারোর না কারো ডাক পড়তেই পারে। আমি প্যাড পরেই আছি। মাঝে মাঝে চার দেওয়ালের ভেতর রিচার্ডসের মতো ব্যাট ঘোরাচ্ছি, ওয়ার্ম আপ করছি, এক্ষুনি নামতে হলো বলে!নিজেকে তৈরি রাখছি। জানি আউটের কপাল! তায় আবার কিছু বুঝে ওঠার আগেই আউট হতে হবে যে খেলায়, সেই খেলায় নামার আগে তাই পিছনে তাকিয়ে দেখি বারবার। ওদের ভবিষ্যৎ ভেবে আকুল হই,বাজারে ভিড় বাড়িয়ে ইমিউনাউজেশন বাড়ানোর জন্য  প্রাণিজ প্রোটিন নাহোক, সাধারণ ডালভাত শাকসবজির আয়োজন করার চিন্তা করি। মোবাইলে খোঁজ নেয় দূরের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরা, 'মাঠে নামিনি এখনো' বলি ওদের। বলি,'ভালো আছি, ঘরে আছি'।
তারপর,মোবাইলের নেট অন করলেই হড়হড় করে জল ঢুকে। এখানে ওখানে উইকেট পতনের খবর,খেলার নিয়ম না মেনে বিশৃঙ্খলার খবর আসে।আইনের রক্ষকদের সভয়ে পলায়নের দৃশ্য দেখি, আর আসে এতএত লাইভ ও ভিডিও। বিশ্বাস করো,মানুষের যে এতএত প্রতিভা লুকিয়ে ছিলো জানতাম না এই লকডাউনে না পড়লে!কজনই বা দেখে সেসব!আমার সেসবের কিছুই দেখা হয় না,কত কত লেখা দেখি তার ভেতরে ঢোকা হয় না, আমি লাইক দিয়ে দিয়ে নিজের অস্তিত্ব,নিজের বেঁচে থাকা প্রবলভাবে জাহির করি।
ঘরের বইগুলো এর আগে কোনোদিন সময় পায়নি,আমাকে এভাবে দেখতে!ওর সব জুলজুল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে,ওদের গায়ে জমে আছে এত এত ধুলো না জীবাণু কেজানে!
খুব ইচ্ছে করে, ওদের স্যানিটাইজ না করি,একটু পরিষ্কার করে গুছিয়ে সুন্দরম করে তুলি।সত্যি বলছি,করা হয়না।একেকটা বই খুলে পাতার পর পাতা উল্টে যাই শুধু  পড়া হয়না। সেই কবে থেকে প্যাড পরে বসে আছি, কখন যে ডাক আসে কেজানে! 
জানো,দেবাশিস খুব পড়তে ইচ্ছে করে কিন্তু বেহায়া মন কিছুতেই সায় দেয় না। সে এসে আমার দুচোখের পাতায় দুদণ্ড বসে না। আমার  পড়া হয় না। এই প্যাড,হেলমেট,গ্লাভস, ব্যাট যদি একবার  নামিয়ে রাখতে পারতাম তবে হয়তো....


শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

ভজন দত্ত


 বাইক,পথ ও আপনি  //

বাইক আর রাস্তার একটা মধুর, মাখোমাখো বা চ্যাটচ্যাটে কিংবা খিটখিটে সম্পর্ক আছে।
কোন রাস্তার সবটা খারাপ বা সবটাই ভালো হয় না।কখনো গন্তব্যস্থানের যাত্রাপথের শুরুওয়াত খারাপ হলেও শেষ ভালো হয়।কারো কারো স্টার্টিং এর 'প'য়ে প্রবলেমও হয়। শেষ অব্দি 'সব ভালো যার শেষ ভালো তার' বলে কথা চলাচলি হয়। আর শেষ ভালো না হলে অর্থাৎ গন্তব্যে ঠিকঠাক না পৌঁছালেই  খটখট নটখট। গিয়ারের অনর্থক ওঠানামায় শক্তি বা মাইলেজ ক্ষয়।বাইক নিজের হলে তা সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ী। পরের হলে, তাতে চড়লে বা চালালে একটা চাপ তো থাকেই।সে সব বাইক ব্যবহারবিধি যারা জানেন না তাদের সমস্যাবলী নিয়ে স্বতন্ত্র একটি চ্যাপটার লিখে কেউ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেন।লোকে বলেন সেসব রিস্ক।সে রিস্ক ফ্যাক্টর কাটানোর কোন ফ্যাক্টরি নেই।বাইক সৃষ্টির সূচনা কাল থেকে তবুও মানুষ পরের বাইকে চড়ার সুযোগ পেলেই তাতে চাপেন, চড়েন, চালান। সেসব চালানো স্মুথ হলে ওয়াহ ওয়াহ! এক্সিডেন্ট হলেই রাব্বা রাব্বা গান বাজে পথে। সে গানে ডেসিবল ছিঁড়ে যায় কানের।পোকা নড়ে।পাকা ধানে মই হয়। সে সকল কেস জন্ডিস হয়। সেসব কেসে ফেসে যাওয়ার ভয় যাদের থাকে না, তারা জানে সেভ এন সেফ ড্রাইভ। 

রাস্তা ভালো ও বাইক নিজের হলে সাধারনত তা নির্ঝঞ্ঝাট টপ গিয়ারেই ছোটে। তখন যে স্পিড লিমিট থাকে তা মোলায়েম রাস্তার মনে থাকলেও বাইকের থাকে না।মাইলেজের জন্য স্পিড লিমিট চল্লিশ থাকলে না কি ভালো?
তা কী আর এক্সেলটর মনে রাখে? 

চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি কখন যে স্পিড লিমিট পার হয়  সে কথাটি কী রাস্তা মনে রাখে?  বাইকের সেকথা মনে পড়লে স্পিড আবার কমে আসে, আবার বাড়ে।বাড়ে অখেয়ালে।
মসৃণ গতি, মোলায়ম পথ ও বাইকের চির সনাতনী কথায় মাইলেজ কে মনে রাখে?
এভাবেই একদিন গন্তব্যস্থান এলে বাইক থামে। তেল পুড়ে।ওলেক্সে সেলের কথা হয়।এক্সচেঞ্জের কথা হয়।কারো কারো নতুন নতুন বাইকে চড়ার শখ ও সাধ থাকে। তারা সব শৌখিন চালক। তারা সব জানে সেফ ড্রাইভ সেফ বাইক বা লাইফ।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কথা হয় একদিন চুপিচুপি। একদিন ধর্মঘট হয় বা ভাঙে। বাইক ছোটে। মসৃণ বা অমসৃণ পথে। লোকে তবু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা আলোচনা করে আর রাস্তায় রাস্তায় লেখা সেফ ড্রাইভ সেভ লাইভ লেখা মনে মনে আউড়ে আউড়ে চলে.... 

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

ভজন দত্ত

ভরসা যখন "বাংলা"
                                    
পুরনো মদে না কি জম্পেশ নেশা হয় ?সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় একটি পুরানো বিল ( প্লিজ, মদ পড়বেন না ) বর্তমান সরকার সর্বসম্মতিতে নতুন করে বিধানসভায় পাশ করিয়ে নিলেন।যখন বাজারদামের বাড়বাড়ন্ত, বৃষ্টি না খরা,শিল্পের চপ না তেলেভাজা বড়া,না কি সি বি আই ,না কি সারদা- নারদা,না কি বেতন কমিশন,না কি রাজ্যের ঘরে ঘরে বেকার ভাই- বোন বা ভাইপো- ভাইঝি কিংবা পুত্র-কন্যা বাড়ন্ত--- তখন এসব সরিয়ে আবার বেশ মৌতাতে মজেেছে ' বাংলা '।
সকল সরকার বাহাদুরের অসীম ক্ষমতা।আর ক্ষমতা হাতে থাকলেই নাম বদলের খেলা তো বহুত পুরনো। সে সরকার বাম বা রাম বা অন্য যে কোনো সরকারই হোক না কেন !
এরাজ্যের নাম পরিবর্তনে সেই বস্তা পচা যুক্তি তো আছেই । "ওয়েস্ট বেঙ্গল" হলে তালিকার প্রায় শেষ নাম, মহাহুজুরদের ও শ্রোতৃবর্গের ধৈর্য না কি আর রয় না? তাই "প্রাণ ভরিয়ে " আমাদের রাজ্যের সমস্যাবলীর কথা না কি সেভাবে বলা হয়ে ওঠে না ? তাই ,নাম 'বাংলা' হলে বড়ো হুজুরের কাছে সব সমস্যার কথা তুলে ধরে আমাদের ভিক্ষার ঝুলি প্রসারিত করতে আর কোনো বাধা রইলো না।স্বাধীনতার পর থেকে তো আমরা তাই করে চলেছি।ঋণ নিচ্ছি আর ঘি খাচ্ছি ।ঋণ আমাদের অতীত, আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যত ।আমাদের ঋণ মেটানোর জন্য ঋণের সুদ দেওয়ার জন্যও ঋণ করতে হয়।এমনকি কর্মচারীদের মাইনে দিতে ঋণ করতে হয়, উন্নয়নকাজ করতে বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্যও ঋণ করতে হয় । বলতে পারবেন, রাজ্যের স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো আর কবে গড়ে উঠবে , আম জনতা ? অথচ রাজ্য সরকারকে জনমনোরঞ্জনী কর্মসূচী বাড়িয়েই যেতে হচ্ছে ।ভোট বড়ো গরজ ।তাই সব সরকার একই পথের পথিক ।পাব্লিক কি আর সাধে বলেন ,যে যায় লঙ্কায় ...।দামে বড়ো ঝাল কাঁচায় বা শুকনোয়।
নাম নিয়ে নামমাত্র বিতর্ক হয়েছিল । 'বাংলা' না 'বঙ্গ' তাই নিয়ে হয়েছেও কিছু কিছু রঙ্গ । তো বিতর্কে তো আর অঙ্গহানি হয় না বরং মননে শান দেওয়াটা হয়।১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে রচিত " বঙ্গভাষা ও সাহিত্য " গ্রন্থে শ্রদ্ধেয় দীনেশচন্দ্র সেন " বঙ্গ" শব্দটিকেই মর্যাদা দিয়েছেন । আরেকজন শ্রদ্ধেয় মানুষ সুকুমার সেন
"বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস" গ্রন্থের রচয়িতা ।গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪০ খ্রীস্টাব্দে।মোট পাঁচ খণ্ডের এক অনবদ্য গবেষণামূলক কাজ তিনি করে গেছেন । দুজনেই কিন্তু শ্রদ্ধার সঙ্গেই 'বঙ্গ' শব্দটিকে গ্রহণ করেছেন।
প্রাচীনতার দিক থেকে 'বঙ্গ' নামটির সমর্থন অনেক পাওয়া যায়। আবার আধুনিকতার বিচারে পাওয়া যায় 'বাংলা' নামটির সমর্থন । এখন বাংলা নামটি ব্যবহারের মুশকিল হোল
(১) না, 'বাংলা' কোনো মদের নাম নয়। ঐ নামে কোনো মদও পাওয়া যায় না। কিন্তু দেশজ পদ্ধতিতে তৈরি অনেক মদকেই 'বাংলা' বলা হয় ।অনেক মদ্যরসিক না কি সেটিকে আদর করে 'বাংলু' বলেও ডেকে থাকেন ! ভাবুন ' বাংলা '।
(২) 'বাংলা দেশ ' নামে একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন দেশ আছে । আমাদেরই প্রতিবেশী রাষ্ট্র।তাদেরও জাতীয় সঙ্গীত  কবিগুরুর লেখা। " আমার সোনার বাংলা " গানটি শুনলেই সকল বাঙালির বুকে প্রাণ আসে।ভাবুন এবার সেই দেশের মানুষরা কী করবেন ? গানে কি 'দেশ' শব্দটি যোগ করবেন ? এমনিতেই না কি একটা চোরা স্রোত আছে গানটি বাতিল করার জন্য।তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির প্রতি সম্মান ও আন্তর্জাতিক সৌজন্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে 'বাংলা' নামটি গ্রহণ না করাই কি ভালো ছিল ?
(৩) রাজ্যের নাম যদি ছাড়তেই হতো , রাজ্য সারণীর উপরে যদি এভাবে উঠতেই হতো তবে বর্তমান নামের প্রথম অংশটি ছাড়লে তো সেই 'বঙ্গ'ই থাকতো।তবে ?
(৪) সব নামের পিছনে যেমন একটি ইতিহাস লুকিয়ে থাকে তেমনি পশ্চিম বঙ্গ নামটির পিছনেও আছে এক ইতিহাস।ক্ষমতা থাকলেই কী আর নাম পরিবর্তন করতে হয় ?
(৫) নাম পরিবর্তনের ফলে সরকারি, বেসরকারি স্তরে এক বিপুল পরিমাণ অর্থও তো খরচ হবে ? সেই তো আবার ঋণ করেই এসব করতে হবে।এত এত অফিস,আদালতের, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে, হোর্ডিং,লেটার হেড,কাগজপত্র সব ,সবকিছুই বদলাতে হবে । এরও তো একটা ব্যয় আছে ।জানিনা তার পরিমাণ কতো।যাইহোক ,যতটুকু হোক , তারও কী খুব প্রয়োজন ছিল ?
না,আমি নাম পরিবর্তনের পক্ষে একেবারেই নেই ।তাই বলে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবো,অকপটে বলছি তেমন কলিজার জোরও নেই। কিন্তু পরিবর্তন যদি করতেই হয় তবে তো ইতিহাসকে রক্ষা করেও করা যায়। ইতিহাসকে মুছে ফেলে করার কষ্টটা তো লাগবেই । তাই , ভাবুন আমরা কি ইতিহাসের প্রতি একটু শ্রদ্ধাশীল হতে পারি না?বাঙালি কি চিরকাল সেই আত্মবিস্মৃত জাতির কলঙ্ক বয়েই চলবে ?
যীশুখৃষ্টের জন্মের প্রায় ছ'শো বছর আগে যে জৈনধর্মের উৎপত্তি, সেই ধর্মের গ্রন্থ " ঐতরেয় আরণ্যক"(২-১-১-৫)-এ 'বঙ্গ' নামটির কথা পাওয়া যায়। তো,কত সহজেই পরিবর্তনের ফলে আমরা দুহাত তুলে সেই প্রাচীনতার অধিকার ছেড়ে দিলাম ?
ছাড়ুন , নাম বদলালেই বা কী এসে যায় ? আসুন একসাথে গাই , এই বেশ ভালো আছি ।খাচ্ছি, দাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি।আম আদমির আর কী ? নাম বদলালেও যা ,না বদলালেও তা।হে মহামহিম স্যার শেক্সপিয়ার আপনিই তবে ঠিক।আপনি তো সেই কবে বলে গেছেন ...।আহ ! এভাবে ভাবলে আর কী ? চালাও পানসি ।

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

ভজন দত্ত



(প্রিয় পাঠক গত সংখ্যায় লেখা দিতে না পারার জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি।না,কোনো অজুহাত নয়।পারলে ক্ষমা করবেন।)
            ।।  পুরুলিয়ার মুখ ।।
                                     ভজন দত্ত
দ্বিতীয় পর্ব :
৪.
বর্তমানে বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের ধাক্কায় সবকিছুর মধ্যেই নানান পরিবর্তন এসেছে।এই বাংলার 'মুখোশ গ্রাম ' চড়িদাতেও লেগেছে সেই পরিবর্তনের ঢেউ। টিভি ও ফিল্মি দুনিয়ার প্রভাব এসেছে।যেমন, শিবের মুখোশের মধ্যে ব্যাটারির আলো জ্বালিয়ে তৃতীয় নয়ন বা কোমরে ব্লাডার বেঁধে শিবের জটায় গঙ্গার জলধার করা এসব। অনেকে আক্ষেপ করে বলেন,  মুখোশ ও বীরত্ব ব্যঞ্জনাই হল ছৌনাচের আসল। তা যেন এখন পুতুল নাচ হয়ে যাচ্ছে। মুখোশ তৈরির ব্যয় বাড়ছে দিন দিন তাই সাদা সাপ্টা স্বল্পব্যয়ে মুখোশের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে পর্যটন শিল্পের বিকাশের ফলে পর্যটকরাও মুখোশ স্মারক হিসাবে ক্রয় করছেন পুরুলিয়া শহর বা চড়িদা বা ঝালদা বা জয়পুরে।জয়পুরের ডুমুরডি গ্রামেও মুখোশ তৈরি হয় একই পদ্ধতিতে। তরুণদেব ভট্টাচার্য্য তাঁর পুরুলিয়া গ্রন্থে  ( প্রকাশ:১৯৮৬) লিখেছেন, " দশবছর আগে চোড়দায় মুখোস তৈরি করতেন ২৯ টি পরিবার।পরবর্তীকালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ টি। ডুমুরডিতে সংস্থা আছে তিনটি। বর্তমানে আরো কটি জাশগায় মুখোশ তৈরি সুরু হয়েছে।তাদের মধ্যে অন্যতম,পাড়া,ঝালদা ১নং ব্লক,সাঁতুড়ি ও আড়শা। "( বানান অপরিবর্তিত, পৃষ্ঠা  ৩৩৭-৩৩৮) বর্তমানে পুরুলিয়ার শিল্প মানচিত্রে এই মুখোশ শিল্প এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিকমত বিপণন করতে পারলে মুখোশ শিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
৫.
চড়িদা গ্রামে দত্ত,শীল ও পাল পদবীধারী সূত্রধররা সপরিবারে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।লোকশ্রুতি যে তাঁরা এসেছিলেন বর্ধমান জেলা থেকে।তাদের জমি দিয়েছিলেন, তখনকার বাগমুন্ডির রাজা।তা এমনি এমনি দেননি সে জমি । তার পিছনে জমিদারের শর্ত ছিল।সে শর্তটি হোল,জমিদারের দেবদেবীর মূর্তি গড়ে দিতে হবে।নানান দেবদেবীর মধ্যে ভাদুও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরাই পুরুলিয়ায় মুখোশ তৈরির সূচনা করেন। আর তার পিছনে বাগমুন্ডির রাজা বা জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। যতদূর জানা যায় এই চড়িদা গ্রাম থেকেই জয়পুর থানার ডুমুরডি ও অন্যান্য জায়গায় তারা বসতি স্থাপন করে।
৬.
প্রস্তরযুগের পরবর্তীকাল থেকেই মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক সকল পর্বেই ব্যবহৃত হয়েছে মুখোশ।মুখকে ঢেকে রাখাই তার কাজ। আর নৃত্যে মুখোশের ব্যবহার আদিম লোকসমাজের এক অভ্যেস।পৃথিবীর সবদেশেই তা  দেখা যায়। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়ার জাভা,সুমাত্রা, বলীদ্বীপ, থাইল্যান্ড, আফ্রিকা মহাদেশে,সুমের সভ্যতায়,গ্রীক ও রোমান রাজত্বে, দক্ষিণ আমেরিকার পেরু অঞ্চলে ও পৃথিবীর আরো নানান জায়গায় নানান কারণে মুখোশের ব্যবহার দেখা যায়। প্রবহমান সেই  পরম্পরা বহন করে চলেছে পুরুলিয়ার মুখোশ।লোকায়ত স্তরে নৃত্যে বিশেষ করে ছৌ নৃত্য মুখোশ ছাড়া ভাবাই যায় না। বর্তমানে আজ তা বাস্তবিকই শুধু পুরুলিয়ার মুখ নয়, বাংলার রূপ হিসেবে স্থান লাভ করেছে। তো, কবি কী বলতেন, এই পুরুলিয়ার এই মুখোশ দেখে। আমাদের মুখোশ গ্রাম চড়িদা আজ বাংলার গর্ব।
ঋণ:
১/ পুরুলিয়া : তরুণদেব ভট্টাচার্য্য, ফার্মা কে এল এম, কোলকাতা : ১৯৮৬
২/ পশ্চিমবঙ্গ ( পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা),জুন, ২০০৭
৩/অহল্যাভূমি পুরুলিয়া : সম্পাদনা, দেবপ্রসাদ জানা, দীপ প্রকাশন, কোলকাতা : জুলাই, ২০০৩
আলোকচিত্র : উজ্জ্বল দাস। 

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

ভজন দত্ত


            ।।  পুরুলিয়ার মুখ ।।
প্রথম পর্ব :
                                    
১.
কবি,প্রিয় কবি।'বাংলার মুখ' কবি দেখেছিলেন। তিনি তো কবি, দেখতেই পারেন, অসুবিধে কী! প্রিয় পাঠক, প্লিজ আমাকে এ প্রশ্ন করে বিব্রত করবেন না। আমি দুটি হাত তুলে আত্মসমর্পণ করছি। তাতে শান্তি না হলে,করজোড়ে মার্জনা চাইছি,আঞ্চলিক আমি, 'দেখা হয় নাই মুখখানি '।দার্জিলিং এ গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতকে দেখে মনে হয়েছে এই বুঝি সেই। আবার দীঘা বা সুন্দরবনে গিয়েও তাই মনে হয়েছে।
এবঙ্গের প্রান্তভূমি পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে যখন দেখছিলাম মুখোশ তৈরির 'কারিকুরি ' তখন মনে হলো এই তো সেই। না।আমি বাংলার মুখ খুঁজতে চাই না, বাংলার মুখ মনে করে করে কষ্টার্জিত নিদ্রাকে পরিত্যাগ করতে চাই না।( আজ ১৯/০১/২০১৮এ লেখা যখন লিখছি, তখন বাংলার মুখ মনে করলেই দেখতে পাচ্ছি সেই বুলেটবিদ্ধ নিষ্পাপ শিশুটিকে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এলোমেলো হয়ে যায় সব অক্ষর।পাঠক মাফ চাইছি। পারলে অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ উথ্থাপনের জন্য ক্ষমা করবেন।)



আমি পুরুলিয়ার মুখ, হ্যাঁ, মুখ দেখেছিলাম, মুখোশ নয়।পুরুলিয়া জেলার বিখ্যাত পাহাড় অযোধ্যর পাদদেশে, বাঘমুন্ডি ব্লকের গ্রাম চড়িদা-য়।পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে তৈরি 'ছো নাচ' এর মুখোশ আজ যথার্থই তা পুরুলিয়ার মুখ হয়ে উঠেছে। তা কি, বাংলার মুখ নয়? কবি কি দেখেছিলেন কোনোদিন, কোনোদিন কি এ অহল্যাভূমি তাঁর পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল?
বাংলার মুখের একদিকে আমি দেখতে পাই পুরুলিয়ার মুখ আঁকা আরেকদিকে বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ায় তৈরি পোড়ামাটির ঘোড়া।
২.
গ্রামের নামটি কেউ বলেন চড়িদা, কেউ বা বলেন চোড়দা। তা নামে কি এসে যায় তো পুরনো কথা। বাঘমুন্ডির রাজবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে একবর্গ কিমি জুড়ে একটি গ্রামকে বিখ্যাত করে দিয়েছেন ছো নাচের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া। তিনি বলেছেন, মুখোশ না থাকলে  তাঁদের নাচ এত বর্ণময় হয়ে উঠত না।এই গ্রামের সূত্রধর  সম্প্রদায় মুখোশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
গ্রামটি দুদিকে পাহাড় ও অরণ্য দিয়ে ঘেরা।রসহীন পাথুরে জমিতে সামান্য  কিছু চাষযোগ্য জমি।আকাশের বৃষ্টিতে পাথর না নড়লে চাষাবাদ করা যায় না সেসব জমিতে।এরমধ্যেই তাঁরা বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নিয়েছিলেন।
তরুনদেব ভট্টাচার্য তাঁর 'পুরুলিয়া' গ্রন্থটিতে লিখেছেন।চড়িদা গ্রামের সূত্রধরগণ এসেছিলেন বর্দ্ধমান জেলা থেকে। ভাদু সহ অন্যান্য দেবদেবীদের মূর্তি গড়ে দেওয়ার শর্তে বাগমুন্ডির রাজা তাঁদের  জমি দিয়ে এখানে এনে বসিয়েছিলেন। সেসব মূর্তি তৈরি হত মাটি দিয়ে।
চল্লিশ - পঞ্চাশ বছর আগে ছো নাচের মুখোশ তো সারাবছর বিক্রি হত না।তাই জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা একসময় পালকি, কারুকার্য়সহ কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি করতেন। প্রতিমা তৈরির সময়ে অনেকে দূর দূর জায়গায় গিয়ে প্রতিমা তৈরি করার কাজেও যুক্ত হতেন। এখনো তাঁরা যান বিভিন্ন জায়গায়।
৩.
উপকরণ:
এখানে যে মুখোশগুলি তৈরি হয় তার প্রধান উপকরণ হল, এ্যাঁটেল মাটি,পুরাতন খবরের কাগজ,ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, ময়দা,আঠা, তেঁতুলের বীজ দিয়ে একরকম আঠা,মুখোশগুলি পালিশ করার জন্য গর্জন তেল, ধুনো,নকল চুল,পাখির পালক,পাট, নানা রকমের পুঁতি, রাংতা, শালমা, বিভিন্ন রঙের ও সাইজের চুমকি ও সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতি।
পদ্ধতি :
প্রথমে ছাঁচে ফেলে তাঁরা মূর্তিগুলির মুখমন্ডল তৈরি করেন। কিছুটা শুকনো হলে তার উপর ছাইয়ের গুড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওঁদের কথায় 'ছাঁচা' তৈরি।
এরপর তাঁরা পাতলা আঠার মধ্যে মাপমতন কাগজ ভিজিয়ে ঐ ছাঁচার ভেতরের দিকে আটকে দেওয়া হয়।এভাবে ৭- ১০ বার করার পর, আঠায় ভেজানো কাপড় ও কাগজ দিয়ে তা আরো মজবুত করা হয়। শক্তপোক্ত করা না হলে মুখোশগুলি পরে ছো নাচের মত বীরত্বপূর্ণ নৃত্য প্রদর্শন করা যায় না।
তৃতীয় ধাপে চলতে থাকে চরিত্রানুযায়ী মুখোশগুলির রূপদান। নির্মিত ঐ ছাঁচাটির ওপর মাটি দিয়ে নাক,চোখ,মুখ,ঠৌঁট,থুতনি,কান সব করা হয়। এরপর গোলা কাদামাটির মন্ডে পাতলা মিহি কাপড়ের টুকরো দিয়ে ওই ছাঁচাটির ওপরে টানটান করে আটকানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে ওরা বলেন 'কাবিজ লেপা '।
পরের ধাপে শিল্পীরা তাঁদের দক্ষ হাতে সেগুলিকে পালিশ করেন কাঠের তৈরি এক কর্ণিক দিয়ে।একে ওরা বলেন 'থাপি' বা 'থুপি'। পালিশের পর রোদে শুকিয়ে নেওয়ার পালা শুরু।আধশুকনো হলেই ওই ছাঁচা থেকে কাগজ ও কাপড়ের আবরণ খুলে ফেলা হয়।বাড়তি কিছু থাকলে তা কাটছাঁট করে সেই অবয়বটিকে নিঁখুত করে তৈরি করার চেষ্টা হয়।
এর পর ঐ অবয়বে চোখ ও নাকের জায়গায় ফুটো করা হয়। ছো নাচের শিল্পীরা যাতে মুখোশগুলি পরে দেখতে পান ও শ্বাসপ্রশ্বাস কাজ চালাতে পারেন সেদিকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখেন তাঁরা।
এভাবে মুখোশের কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হলে শুরু সেই মুখোশগুলিতে চরিত্রানুযায়ী রঙ করার কাজ শুরু হয় প্রতিমা তৈরির মতো। গর্জনতেল লাগানো হলে এই পর্যায় শেষ হয়।
সেগুলিকে চুল,চুমকি,শলমা,রাংতা,পুঁতি, পালক ইত্যাদি যা দরকার তাই দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়।
মুখোশশিল্পীরা রামায়ণ, মহাভারত,পুরাণ বর্ণিত রূপ অনুযায়ী সেগুলিকে সজ্জিত করে থাকেন।
মুখোশ নির্মানের ক্ষেত্রে চড়িদা প্রাচীন ঐতিহ্যধারাকে অনুসরণ করে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
(পরের সংখ্যায় সমাপ্ত হবে) 


আলোকচিত্র : উজ্জ্বল দাস। 

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত

দ্বিতীয় পর্ব:

           হামদের ছ (ছো)

                            



খোলামাঠে আগে এই নৃত্যশৈলী প্রদর্শিত হলেও বর্তমানে প্রয়োজনমত মঞ্চেও প্রদর্শন করা হচ্ছে।তবে স্থায়ী মঞ্চ না হলে বিপদ ঘটার সম্ভবনা থেকে যায়। কারণ নৃত্যশিল্পীরা যেভাবে মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে নৃত্য করেন তাতে অস্থায়ী মঞ্চে কাঠের পাটাতন ভেঙে পড়তেই পারে। বিশেষ করে কোনো চরিত্র যখন দূরন্তগতিতে 'উলফা' প্রদর্শন করেন অর্থাৎ নাচতে নাচতেই শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে আবার যখন নীচে লাগাতার নেমে আসেন তখন শক্তপোক্ত মঞ্চ না হলে বিপদ ঘটতেই পারে।
সাধারণত সন্ধ্যে নামার পরই পুরুলিয়ার ফাঁকা টাঁড়জমিতে বা কোনো মাঠে এই নাচের প্রদর্শন করা হোতো। 

" সিন্দুর ভূষিত অঙ্গ,       মুষিকবাহন
সকল সিদ্ধিদাতা            হরগৌরীর বাহন
    চতুর্ভুজ গজেন্দ্রবদন, বিঘ্নবিনাশন।
                      জয় জয় হরগৌরীর নন্দন।। "
ছৌ নাচে গনেশ বন্দনার এই ঝুমুর গানটি বেঁধেছিলেন বৃন্দাবন সিংবাবু। আগেকার নাচ শুরু হত এই গনেশ বন্দনার মাধ্যমে। প্রথমে আসতেন গনেশ। ধূপ,দীপ জ্বালিয়ে,শঙ্খ বাজিয়ে শুরু হতো মূল পালা।এখন এই রেওয়াজ নেই।
বিদ্যুৎ ছিল না তখন, আলোর ব্যবস্থা বলতে ছিল হ্যাজাক।এই হ্যাজাক রাখা হোতো মাথায়। নাচের চরিত্ররা যেমন স্থান পরিবর্তন করতেন তেমনি লাইটম্যানদের স্থান পরিবর্তন করতে হতো। এখন মাঠে বা মঞ্চে উপর থেকে ফ্লাডলাইটের আলোয় এই নাচ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ছৌনাচের এককেটি দলে ১৫ থেকে ৩০ জন বা তার বেশী সদস্য থাকেন।এর মধ্যে বাজনদার থাকেন পাঁচ- ছ' জন। এক বা দু' জন থাকেন মূল সূত্রধর, গায়েন তাকে সঙ্গত করেন আরো কয়েকজন। বাকিরা প্রায় সবাই নাচ করেন।
গোল হয়ে মাঠে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে বা বসে সহজেই এই নাচ দেখতে পারেন। বাজনদাররাও দাঁড়িয়েই বাজান।
নাচের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পালা অনুযায়ী একেক রকম সময়।আগে সন্ধ্যায় শুরু হয়ে সারারাত ধরে চলতো এই নাচ। একেক রাতে চার পাঁচটি পালাকে অবলম্বন করে নৃত্য প্রদর্শিত হতো।বর্তমানে নানা অনুষ্ঠানে কোনো একটি পালার বিশেষ অংশ, সময় অনুযায়ী প্রদর্শন করা হচ্ছে।
পালার বিষয় সাধারণত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে হয়।
কিছু পালার নাম - রাবণবধ, কংসবধ, অভিমুন্যবধ,মহিষাসুরবধ, পরশুরামের কৈলাশযাত্রা,বকরাক্ষসনিধন, বৃন্দাবনলীলা,কিরাত অর্জুনের শূকর বধ ,শিব-দুর্গা প্রভৃতি।
পুরুলিয়া জেলায় গম্ভীর সিং মুড়া ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ছৌ নৃত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসাবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডির হাত থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে  " সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি " পুরস্কারও পান। ছৌ নৃত্যে পুরুলিয়া জেলার শ্রেষ্ঠত্ব  প্রমাণিত।তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
বর্তমানে বিশ্বায়ণের ধাক্কায় সব সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন হচ্ছে। সিনেমা,টিভি,টিউব, ভিডিও সর্বোপরি  ইন্টারনেট ও মোবাইলের ধাক্কায় লোক- সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। কোলকাতাতেই থিয়েটার হল বন্ধ করে বিয়েবাড়ি করতে হচ্ছে। যাত্রার মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমও আজ ধুঁকছে। সেখানে ছৌ নাচ আজও তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখানেও ধ্রুপদ শৈলী ছেড়ে ফিল্মি জগতের চটুল সুর,মাইকের ব্যবহার, দলে সদস্য কমানোর জন্য মাইকের সাহায্যে  সিডিতেই গীতিনাট্য ও বাদ্য বাজানো হচ্ছে। অনেকে মনে করেন এভাবে ছৌ নাচের ফলে সেই বীরত্বব্যঞ্জক ভাবটাই চলে যাচ্ছে।দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি বলে! পুরুলিয়ার ছৌ পশ্চিমবঙ্গের গর্ব। পুরুলিয়ার " সিধু কানু বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়" ছৌ নাচের উপর সার্টিফিকেট কোর্স ও ডিপ্লোমা কোর্স শুরু করেছে। শুনেছিলাম চড়িদা গ্রামে গম্ভীর সিং মুড়ার নামে একটি ছৌ অ্যাকাডেমি হবে,জানিনা তার কাজ কতদূর! তা কি হবে না! ©
তথ্যসূত্র -
*অহল্যাভূমি পুরুলিয়া : সম্পাদনা -দেবপ্রসাদ জানা; দীপ প্রকাশন,কোলকাতা ২০০৩
*পশ্চিমবঙ্গ, পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা; তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ,প ব সরকার ২০০৭
* পুরুলিয়া : তরুণদেব ভট্টাচার্য, ফার্মা কে এল এম ; কোলকাতা, ১৯৮৬
* বাংলার আভাষ ( পত্রিকা) , জুন- আগস্ট সংখ্যা, ২০০৪ ও ডিসেম্বর'০৪- ফেব্রুয়ারী' ০৫ সংখ্যা
* সাক্ষাতকার : ডঃ প্রিয়নাথ হালদার, দয়াময় রায়,
                          উজ্জ্বল দাস, মীনাক্ষী লায়েক।
আলোকচিত্র : উজ্জ্বল কুমার দাস।

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত



হামদের 'ছ' (ছো) 

বিশ্বায়ণের ধাক্কায় যখন সারা পৃথিবীর লোকসংস্কৃতি প্রায় বিপন্ন,বহুজাতিক কোম্পানীগুলি
  যখন বিজ্ঞাপনব্যয় কম করার জন্য পৃথিবীজুড়ে গড়ে তুলতে চাইছেন তাদের পছন্দমত একটাই সংস্কৃতি।  আরো নাফার ধান্দায় মগ্ন হয়ে গলা টিপে শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে, সেখানে একটি লোকসংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, বেশ অবাক করার মতোই সংবাদ বই কি! প্রিয় পাঠক , একটু অনুধাবন করলেই জানতে পারবেন সত্যতা। হ্যাঁ,আমি 'ছো' করবো বলে কথটা বলছি না, ' ছো ' সম্পর্কে আমার জানা কিছু কথা লিখবো বলেই এমনতর অবতারণা। 

বরফি সিনেমাটা মনে আছে ! মনে আছে সেই বধির হিরোটিকে! ২০১২তে রিলিজ এই সিনেমাটিতে নানাভাবে ছৌ নৃত্য ও তার মুখোশকে
  ব্যবহার  করেছেন চিত্রপরিচালক অনুরাগ বসু! যা সিনেমাটোগ্রাফিতে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল।এর আগে ও পরবর্তীকালে আরো অনেক সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে এই নৃত্যশৈলী ও তার উপকরণকে। এই নাচ মানভূম সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 



বিখ্যাত "মুকাবিলা হো মুকাবিলা " গানের সঙ্গে প্রভুদেবার নাচটি মনে আছে! শুধু দুটি পা বা হাত বা মাথার ছন্দময় সেই আন্দোলনের কথা। " Chou Dance of Purulia " গ্রন্থে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য এই নাচের অঙ্গ-সঞ্চালনাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। ১/ ছৌ নাচে সমস্ত শরীর স্থির রেখে মাথার মুকুটখানি নড়ানো - মস্তক সঞ্চালন ; ২/ সারা শরীর স্থির রেখে কাঁধটিকে শুধু নড়ানো। মাথা নড়বে না,শরীরের নীচের অংশটিও নড়বে না।শুধু কাঁধ দুটি নড়বে।এটি এই নাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ
  মুদ্রা- কাঁধ সঞ্চালন; ৩/ গতিতে নাচতে নাচতে লাফিয়ে উঠে পা দুটি জোড় করে এক বা একাধিকবার তালে তালে বসে পড়া বা সামনে পিছনে চলা।এটি এই নাচের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।স্থানীয় ভাষায় এটিকে বলা হয় ' উলফা' যা উল্লম্ফনের অপভ্রংশ রূপ। - উল্লম্ফন ; ৪/ সমস্ত শরীর স্থির রেখে শুধুমাত্র বক্ষদেশ নড়ানো। বাজনার তালে তালে চরিত্রের ঝলমলে পোষাকও নড়ে।- বক্ষ সঞ্চালন। ৫/ সানাই ও ঢোলের তালে তালে পদসঞ্চার বা পদক্ষেপ। এটি নানা রকম হয়। যেমন দেবতাদের চলা - দেবচাল,বীরের মত চলা - বীরচাল, রাক্ষসের মত চলা - রাক্ষসচাল বা পশুর মত চলা - পশুচাল প্রভৃতি।
এই চালগুলির মধ্যেও আবার নানা ভাগ আছে। যেমন - ডেগা,ফন্দি,উড়ামালট, উলফা,বাঁহি মলকা বা বাহু নড়ানো, মাটি দলখা।
সানাইয়ের সুর, ঢোলের সূক্ষ্ম তাল, মাত্রা ও কাড়া নাকড়ার আওয়াজে এই নাচের চরিত্ররা নূপুরধ্বনির সঙ্গে প্রয়োজন মত অঙ্গ সঞ্চালন করে থাকেন। অদ্ভূত নিয়ন্ত্রণ নূপুরের! তারা প্রয়োজন মতন নূপুরধ্বনি করে থাকেন। বর্তমানে ক্যাসিও,গীটার,ক্যাবাকাশ ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।


মানভূমের মানুষ এই নাচকে বলেন " ছো "। কেউ কেউ আবার বলেন " ছ"। ভারতে যেকটি নৃত্যের মধ্যে বীররস পাওয়া যায় তারমধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানটি এই ছৌ নৃত্য দাবি করে থাকে। পৌরুষদৃপ্ত এই নাচটির বাংলা, বিহার,ওড়িশা -- কোথায়
  উৎপত্তি তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য আজও বর্তমান।
বর্তমানে এই নৃত্যের যেসব ঘরাণা দেখা যায় তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১/ ঝাড়খন্ড-সেরাইকেলা, ২/ পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও চিলকিগড় ( ঝাড়গ্রামের কাছে), ৩/ ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার।আবার ইন্দোনেশিয়া ও বালির ফ্রিশ ও বরং নৃত্যের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য আছে।কেরালার কথাকলি নাচের সঙ্গেও কিছুটা মিল আছে। মাথায় মুকুট ও চিত্রিত মুখ যেন মুখোশকে মনে করায়। পুরুলিয়াতেও প্রথমে কথাকলি নাচের মত রং মেখে 'একুড়া ছো ' নাচা হত।পরে কাগজের আবরণ তার অনেক পরে এসেছে আজকের মুখোশ। মাটির ছাঁচে বিভিন্ন আকৃতির মুখ তৈরী করে তার উপর কাগজ,কাপড়,মাটির আস্তরণ দিয়ে ভেতরের অংশ বের করে কাগজ ও কাপড়ের অংশটি নিয়ে হালকা ও নৃত্যের উপযোগী মজবুত মুখোশটি তৈরী হয়। চরিত্র অনুযায়ী
  নানা রঙে রাঙিয়ে শিল্পীরা মুখোশগুলিকে জীবন্ত করে তোলেন । আবার নানান রকম পুঁতি,কাঠি, মালা, চুমকি, টিকলি,চুল, অলংকার,  ময়ূরপালক দিয়ে চারপাশে সাজানো হয় চরিত্র মতন।সাজ অনুযায়ী একেকটি মুখোশের ওজন ২০০- ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বেশ কয়েকটি গ্রামে মুখোশ তৈরী হলেও মুখোশ তৈরীতে পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামটির খ্যাতি আন্তর্জাতিক। 

ছৌ নাচের মধ্যে সবদিক থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য, একথা প্রায় সকলেই স্বীকার করে থাকেন।বর্তমানেও এই খ্যাতি অব্যাহত রয়েছে।
পুরুলিয়ার এই খ্যাতির পিছনে আছে ছৌ নৃত্যের মুখোশ ও পোষাক।কথায় আছে, " জমিদারও ভিকারি হয় ছো নাচে "। কারণ এই নৃত্যের জন্য ব্যবহৃত মুখোশ ও পোষাক নির্মাণব্যয় বেশ বেশী।

পুরুলিয়া জেলার মধ্যে বাগমুন্ডিতেই এই নাচের উৎপত্তি তা গবেষকগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন।আর ছৌ নৃত্যের মহাগুরু হিসাবে যাঁর নাম সকলে একবাক্যে স্মরণ করেন তিনি হলেন গম্ভীর সিং মুড়া। জেলায় তাঁর পিতা চিপা সিং ও বাবুলাল মিস্ত্রিকে এই নাচের পথ প্রদর্শনকারী বলে মনে করা হয়।
পুরুলিয়া জেলার বাগমুন্ডি ছাড়াও ঝালদা, বলরামপুর,
  বরাবাজার, বান্দোয়ান, হুড়া, পুঞ্চাতেও এই নাচ দেখা যায়।তাদের নৃত্যশৈলীর মধ্যে সুক্ষ্ম পার্থক্যও বিদ্যমান। তবে ছৌ বিশারদ যাঁরা, তাঁরা মনে করেন ঠাটে এবং ভাবে বাগমুন্ডি ও ঝালদার ছৌ অনবদ্য। 

(পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় পর্বে)
 
চিত্রঋণ : উজ্জ্বল দাস


শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত



নাচনী
                          

( দ্বিতীয় পর্ব ) 

নাচনীদের ভিত্তি:

" এ ছার দেশে নাহি রব পিরীতি নগরে যাব
বেছে লিব রসিক সুজনা প্রাণবন্ধু হে
পিরীতি রতন কাঁচা সোনা "

জনপ্রিয় মনোরঞ্জনী ঝুমুর ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা হল এই নাচনীদের নাচের ভিত্তি। আদিরসাত্মক ঝুমুর গানে জমজমাট হয়ে যেত আসর। অথচ রাধা-কৃষ্ণের প্রেমতত্ত্বাশ্রয়ী একটি পরিশীলিত নৃত্যশৈলীর বিকাশ ঘটানো যেতে পারতো এই নাচনী নাচকে কেন্দ্র করে। অনেক সাধক রসিক এই চেষ্টা করে গেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তা জনপ্রিয় না হওয়ায় সেই চেষ্টা প্রত্যাখাত হয়েছে বলা যায়। নাচে যৌন আবেদন থাকতো প্রচুর। পাব্লিক ডিমান্ড!
  
'টাঁড় ' বা পাথুরে জমিতে যারা চাষআবাদ করেন, তাদের পরিশ্রমকেই যথার্থ "হাড়ভাঙা পরিশ্রম " বলা যেতে পারে। এই হাড়ভাঙা খাটুনিতে ক্লান্ত মানুষ যখন রাত জেগে নাচনীদের নাচ দেখতে যেতেন, তখন তাদের জাগিয়ে রেখে, মনোহরণ করার
  সব চাইতে সহজ পদ্ধতি যৌন সুড়সুড়ি । নাচনীরা গানের তালে তালে নাচের মুদ্রায় কোমর ও বুক নাচিয়ে,ঝাঁকিয়ে , জাগিয়ে রাখতেন  দর্শক- শ্রোতাদের। 
মঞ্চের একপাশে সাজিয়ে রাখা হত রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি। দর্শক,শ্রোতারা উঁচু মঞ্চের বা ঢিবির চারপাশে গোল হয়ে বসে, দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করত। যাদের হাতে কাঁচা টাকা থাকত বা কারুর যদি ভীষণ ভালো লেগে যেত কোনো নাচনীর নাচ তবে সে তার শেষ সম্বলটিও সেফটিপিনে (টাকা) গেঁথে দিত
  নাচনীর বুকের কাপড়ে,ব্লাউজে। সেই অছিলায় নাচনীর বুকে হাত দেওয়ারও যে চেষ্টা করতেন না কেউ কেউ, সেকথা বলা যায় না।
সাজপোশাক : 
নাচনীর সাজপোশাক বেশ রংচঙে হত। রং বেরঙের ঘাঘরা পরে তারা নাচ করত।সাধারণত তারা তিনটি বা তিন থাকের রঙিন ঘাঘরা ব্যবহার করত।সিল্ক বা সার্টিন জাতীয় চকচকে ব্লাউজ ও খোপায় রঙিন জরির ফিতা থাকত।মাথায় বেলকুঁড়ির মালা,নাকে বড় নথ ও হাতে থাকত রংবেরঙের চুড়ি।পাতলা উজ্জ্বল রঙের ওড়নার সঙ্গে দুহাতে ধরা থাকত দুটি রঙিন রুমালের কোণা।বাজনদারের বাজনার তালে তালে রসিক বা অন্য কোন 'ঝুমুরিয়া' গাইত গানের কলি। সেই কলির সুরে তালে নানান ভঙ্গিতে ঘুঙুর পায়ে নাচত কখনো সখনো গাইতও নাচনী।
বাদ্য: 
প্রধানত ঢোল,ধামসা,শিঙা,'কেড়কেড়ি', সানাই, ফ্লুট, হারমোনিয়াম, আড়বাঁশি, ঝুমঝুমি ও ঘুঙুর। পরে পরে এর সাথে সিন্থেসাইজারের মত অন্যান্য আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও যোগ হয়েছে।
দল: 
একেকটি দলে পাঁচ থেকে কুড়ি জন সদস্য থাকত।স্বাভাবিক ভাবেই দলের প্রধান হতেন রসিক।স্থানীয় ভাষায় ' রসক্যা '। বড় দল গুলিতে একাধিক নাচনী থাকত।

নাচনী নাচে ব্যবহৃত মুদ্রা ও ঠাঁট : 
নাচনীর নাচের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় প্রধানত আটটি অঙ্গ। মাথা,ভুরু, চোখ, মুখ,বাহু, বুক বা ছাতি,কোমর ও পা। সুস্পষ্ট ভাবে কোনো মুদ্রার ব্যবহার এই নৃত্যে দেখা যায় না।হস্তক,বিভিন্ন গতি, চারী, ভ্রমরী প্রভৃতি ঠাঁটের লক্ষণ এই নৃত্যে দেখা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপট : 
আঠারো ও উনিশ শতকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে রাজা ও জমিদারদের পৃষ্টপোষকতায় বাঈজী নাচের যে ধারা প্রবাহিত হয়েছিল,মানভূম অঞ্চলে তারই ক্ষয়িষ্ণু রূপ হল নাচনী নাচ। এই অঞ্চলের 'বৈভবহীন' রাজা ও            ' বিত্তহীন ' জমিদাররা তাদের অবসর বিনোদনের জন্য ব্যয়বহুল বাঈজীদের পরিবর্তে নাচে-গানে          'পাকা' নাচনীদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেছিলেন। আর জমিদারদের অনুকরণ করে স্থানীয় মানুষদের মধ্যেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই নাচ। যা কোনোদিন নৃত্যের মর্যাদা পায়নি। নৃত্যশৈলীর এক অবহেলিত শাখা হিসাবে স্বীকৃত না  হলেও,  লোকসংস্কৃতির এক শাখা হিসাবে যা আজও বর্তমান পুরুলিয়া জেলা ও ঝাড়খন্ডে। এখানের অনেক মানুষ আজও হাড়িয়া খেয়ে, মুখে বিড়ি জ্বালিয়ে, রাত জেগে উপভোগ করেন 'অশৌচ' এই নৃত্যশৈলীটি।
স্মরণীয় শিল্পী : 
এই নাচের প্রবাদপ্রতিম একজন শিল্পী হলেন সিন্ধুবালা দেবী। প. ব. সরকার তাঁকে      " লালন পুরস্কার " দিয়ে সম্মানিত করেছে। ১৯৮৬ তে রাজ্যপাল পুরুলিয়ায় এসে তাঁকে সম্মান  জানিয়েছেন। এছাড়াও গীতারাণি,বিমলা , রাজবালা, মালাবতী,পস্তুবালা, বুটন দেবী, জ্যোৎস্না দেবী, শিলাবতী,কাজল প্রমুখের নাম শোনা যায়।
রসিকদের মধ্যে খুদুভিরসু, চাঁদ মাহাতো,লালমোহন সিং,বুরুহাতুর দিবাকর সিং পাতর, চকহাতুর পদ্মলোচন সিং ও চামু সিং,উলুডির ভুদল সিং,ইছাডি( রাঁচি)র চক্রধর সিং প্রমুখের বেশ নামডাক ছিল বলে জানা যায়।
শেষ বলে কিছু নেই :
ঝুমুর গান ও নাচনী নাচের সম্পর্ক  সুগভীর। কালে কালে ঝুমুর গানের উত্তরণ ঘটলেও নাচনী নাচের ক্ষেত্রে তা হয়নি।এখনো নাচনীদের জীবন জীবিকার প্রশ্নে সামাজিক দৃষ্টিকোণের খুব একটা বদল হয়নি।সরকার এদের কয়েকজনকে স্বীকৃতি দিলেও সমাজ এদের আপন করে নিতে পারেনি। বাউল বাউলানিরা ধর্মের তকমা লাগিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারলেও,কিংবা সেবাদাসীরা রূপবতী হলে কোথাও রানির মর্যাদা পেলেও নাচনীরা তা পাননি। নাচনীর উপার্জিত অর্থে রসিক,বাজনদার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের পরিবার প্রতিপালিত হলেও তাদের ঘরে ঢোকার অনুমতি নাচনীরা কোনোদিন পাননি। আবার যারা নাচনীদের প্রতি মানুষ হিসাবে সহমর্মিতা দেখিয়েছে সমাজের রোষদৃষ্টি থেকে তারাও রেহাই পাননি। সুপ্রাচীন নাচনী নাচও স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে সূক্ষ্মমার্গে পৌঁছাতে পারেনি আজো।
প্রায় একদশক হল গ্রামগঞ্জে জনপ্রিয় হয়েছে "বুগিবুগি" নামে আর এক উদ্দাম যৌণ আবেদন মূলক নাচ। চটুল হিন্দি,ভোজপুরি বা পুরুলিয়ার ভাষার গানের সঙ্গে প্রায় নগ্ন ও যৌণক্রিয়ার ভঙ্গিতে সেই সব নাচের গুতোয় লোকসংস্কৃতি আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। 
টিমটিম বাতির মত যে কজন আছেন তারাও অচিরেই হারিয়ে যাবেন কালের গর্ভে।কলেজ সোশ্যালের মঞ্চেও যখন এরকম
  "বুগিবুগি" নাচের ছবি ভাইরাল হয় তখন কি আর সে বিষয়ে সংশয় থাকতে পারে!
________________________________________
তথ্যসূত্র :
১) নাচনী নাচ জমিদারী ঘরানা, সুবোধ বসু রায়
২) পুরুলিয়া পরিচয়,অসিত বসু
৩)
  অহল্যাভূমি পুরুলিয়া (১ম খন্ড), সম্পাদনা - দেবপ্রসাদ জানা
৪) প্রসঙ্গ পুরুলিয়া ( ১ম খন্ড), সম্পাদনা - সুভাষ রায়
৫) পুরুলিয়া সাহিত্য সংস্কতি রাজন্য অবদান, প্রবীর সরকার
৬) ঝুমুরবালা ( উপন্যাস), শ্রমিক সেন
সাক্ষাতকার : 
১/ শ্যামল কিশোর তেওয়ারী,
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, "বর্ডার লাইন দি" , পুরুলিয়া।
  ২/ উমা মাহাতো, কবি ও শিক্ষিকা।
https://ssl.gstatic.com/ui/v1/icons/mail/images/cleardot.gif


মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

ভজন দত্ত


 নাচনী

                                 
১.
গভীর রাত।পূর্ণিমা। ছায়া ছায়া কয়েকটি গাছ নিশ্চুপ জেগে। দূর থেকে ভেসে আসছে এক নিঃসঙ্গ কুকুরের করুণ কান্নার শব্দ।পুরুলিয়ার টাঁড়জমিতে দাঁড়িয়ে ঐ কয়েকটি গাছের অস্পষ্ট ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক মানুষ।দূর থেকে বোঝা যায় কিছু একটা ঘষটে ঘষটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরা কাছে এলে বোঝা যায় সেটা একজন মানুষের। পাথরে, মাটিতে ঘষা খেতে দেখা যায় একটি শবদেহ। মাথার চুল,হাতের চুড়ি,পায়ের আলতা দেখে বোঝা যায় সেই শবদেহ একজন মহিলার। শবদেহ টানতে টানতে রুখুটাঁড়ে মিলিয়ে যায়  মানুষটি।আবহে জেগে থাকে একটি শবদেহ টেনে, হিচড়ে, ঘষটে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। 

কাট। কাট।কাট।

না।

কোনো ছায়াছবির বর্ণনা নয়।নাচনীদের জীবনের অন্তিম ছবিটা আরো মারাত্মকভাবে দৃশ্যায়িত হতে পারে।
এদের জীবন বড়ো কষ্টের, বেদনার। রসিক, যিনি নাচনীর মালিক,তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে যতদিন তাদের যৌবন থাকে, ' গতর' থাকে,মজা,আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে ততদিন তাদের খাওয়াপরা,চিকিৎসার সুযোগ থাকে।কিন্তু বার্ধক্যে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় লোকচক্ষুর আড়ালে নাচনীদের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।  সমাজে এরা     ' বিষকন্যা ', 'অস্পৃশ্য' হিসাবে গ্রামে থাকার সুযোগ পেতেন না। গ্রামের এক প্রান্তে তাদের কোনোরকম ঠাঁই হোতো।কোনো সামাজিক স্বীকৃতি তাদের ছিল না। নাচনীদের সঙ্গে রসিকরা বা তারই ঠিক করে দেওয়া কোনো খদ্দের বা ইয়ার শয্যাগমন করলেও কোনোদিন জীবনসঙ্গিনীর মর্যাদা তাদের জুটত না। তারা যাতে সন্তান ধারণ করতে না পারে তার জন্য দেশীয় উপায়ে তাদের বন্ধ্যা করে দেওয়া হোতো। এরপরেও কারো যদি সন্তান হয়ে যেত,  তার পিতৃ পরিচয় জুটত না। সমাজে  সেই শিশুটির পরিচয় হোতো 'বেদ্উাবাচ্চা ' বলে। সমাজের ভোগলালসার শিকার হয়ে, 'নীলকন্ঠ ' হয়ে যেদিন তারা " অমরলোকে" যাত্রা  করতো,তখন কেউই  তার শবদেহ সৎকার করতেও আসতেন না ।রাতের অন্ধকারে গরুর জোয়ালের সঙ্গে শবদেহের পায়ে দড়ি বেঁধে সম্পূর্ণ অবজ্ঞার সঙ্গে ফেলে আসা হত ভাগাড় থেকে আরো দূরে। শ্মশানেও তাদের ঠাঁই হত না।স্বর্গে যাওয়ার জন্য তাদের কাছে ধোঁয়ার রথের স্বপ্ন দ্যাখাও ছিল নিষিদ্ধ। এ অভাগীদের কাছে স্বর্গের স্বপ্নও ছিল নিষিদ্ধ। 

#
নাচনী শব্দটি কানে 'প্রবেশিলে' তথাকথিত  'ভদ্দরনোক'দের গা টা যেন রি রি করে উঠে এখনো। একসময় মানভূম অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল এই নাচনীদের 'লাচ'। বাঈজীদের নিকৃষ্ট বা অপভ্রষ্ট রূপ এই নাচনীরা। জনপ্রিয় ঝুমুর গানের সঙ্গে, তালে তালে এই নাচের বিস্তার।
পুরুলিয়ার 'ছো' বা 'ছৌ' নাচ যেমন পৌরুষদৃপ্ত তেমনি নাচনী নাচ হল রমণীস্নিগ্ধ।

#
সাধারণত সামাজিক, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেনির মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত নাচনী। অনেকক্ষেত্রে তারা কিছু পুরুষের লালসার শিকার হয়ে বা সামন্তশ্রেনির কিছু মানুষের উচ্ছৃঙ্খলতার শিকার হয়ে, ভারতীয় নৃত্যকলা শিল্পের এই ব্রাত্য শাখায় যোগ দিতে বাধ্য হত। অভাবের তাড়নায় বা কোথাও আবার প্রেমের ফাঁদে পড়েও নাচনী হওয়ার ঘটনা শোনা যায়।মূল 'নাটেরগুরু' বা ' কলকাঠি'র কাজটি করতো  'রসিক'। রসিকদের একাজে সাহায্য করতো সমাজের নানানজন।এব্যাপারে মহিলারা ছিলেন অগ্রণী। একজন মহিলা 'কানাঘুঘু'র ভূমিকায় অভিনয় করে সহজেই আরেকজন মহিলাকে রসিকের হাতে তুলে দিতেন,সব জেনে বুঝেই। প্রতিটি নাচনী, রসিকের অধীনে ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে ব্যবহৃত হত।

#
মানভূমের সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে দেখা যায় অনেকক্ষেত্রে ছোট ভূস্বামী নিজেরাই ছিলেন রসিক। নাচনীরা যেহেতু রসিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হত  সেহেতু নাচনীদের পারিশ্রমিকের সিংহভাগ বা পুরোটাই রসিক নিজে আত্মসাৎ করত।
 জমিদার বাড়িতে সেই সময় ঝুমুর গান সহযোগে নাচনী নাচ সাদরে আমন্ত্রিত হত ও প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক পেত। নাচনীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য,তার 'গতর'টিকে আকর্ষণীয় রাখার জন্যই নাচনীদের খাওয়া-পরা-চিকিৎসার দেখভাল ও যোগাড় করত রসিক। বিনিময়ে তারা ইচ্ছেমত নাচনীদের ব্যবহার করত। রূপ- যৌবন-শরীর ক্ষয় হলে তাদের ত্যাগ করে রসিকরা আবার সন্ধান করত অন্য এক নাচনীর।অনেকে না হলেও কয়েকজন রসিকের কথা জানা যায় যারা নাচনীকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিলেও ' রাখনী' হিসাবে রেখে দিতেন। শোনা যায় আবার নাচনী লুঠের ঘটনাও। চুরির উপর তো বাটপাড়ি হয়। হয়তো সেই নাচনীর এত সুনাম,আকর্ষণ ছিল যে লুঠ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। গায়ের জোর,ক্ষমতা বা 'পৌরুষ' দেখানোর জন্য অনেক সামন্তপ্রভু বা রসিক বা অর্থবান মানুষেরাই যুক্ত থাকতেন এই  "নাচনীলুঠ" করার ঘটনায়।


(আগামী সংখ্যায় শেষ হবে )


শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

ভজন দত্ত


প্রসঙ্গ টেরাকোটা     
চতুর্থ পর্ব
------------------
১.
টেরাকোটা শিল্পে বাঁকুড়া জেলার ঐশ্বর্য, গর্ব করার মতো।দেখলাম যে,শুধু মন্দির অলঙ্করণেই নয় বাস্তব জীবনের নানান লৌকিক ও ধর্মীয় উপকরণ হিসাবে টেরাকোটা এখনো ব্যবহৃত হয়ে চলেছে।
১৯৬৯ এর ২৪ জানুয়ারি,রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন পাঁচমুড়ার শিল্পী রাসবিহারী কুম্ভকার মহাশয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন National Awards for Master Craftsman এর পুরস্কার। বাঁকুড়ার ঘোড়া বলে বিশ্বব্যাপী যা পরিচিত তা নির্মিত হয় পাঁচমুড়া গ্রামে।
রবীন্দ্রনাথ সামন্ত লিখেছেন,এই ঘোড়া ---            " হেনরি মুরের ঘোড়া নয়, সুনীল দাসের ঘোড়ার ছবির একটির মতোও নয়, ঘোড়া মন্দির টেরাকোটায় অলংকৃত হয়ে যে দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে তাও নয় বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া।কোলকাতার শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ের নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঘোড়াটির মতো তো নয়ই।বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া নিজস্ব শৈলীতে একক ও অনবদ্য।অবাস্তব গড়ন কিন্তু অনস্বীকার্য ভঙ্গি।প্রতীকী,তাই এমন। " বিশ্বে আর কোথাও এমন ঘোড়ার দেখা মেলে না। এ কারনেই বাঁকুড়ার বিভিন্ন স্থানে যেমন, রাজগ্রাম,মুরলু,সোনামুখি, কেয়াবতী,স্যান্দরা, রাণীবাঁধ,বিবড়দা প্রভৃতি স্থানে কুমোরেরা নানারকম স্টাইলের ঘোড়া তৈরি করলেও "বাঁকুড়ার ঘোড়া" বলতে যে ঘোড়াটির ছবি মনের আয়নায় ধরা পড়ে সেটি হোলো পাঁচমুড়ার ঘোড়া।যত বড় বলবেন তত বড়ই ওরা তৈরি করে দেবেন। পোর্টেবল। ভেতরটি ফাঁপা,ফলে ভার কম।কাজেই ঘোড়াটি সহজেই 'উড়ে বেড়াতে' পারে।  কান,
মাথা,ধড়, লেজ আলাদা আলাদা প্যাকিং করে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্যই ঘোড়া
সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়েছে অনায়সে।
বৈশিষ্ট্যে অনন্য হওয়ার জন্যই এই ঘোড়া বাংলার হস্তশিল্পের প্রতীক। 
২.
   উঁচু, লম্বা গলা এই পাঁচমুড়ার ঘোড়ার বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। কেন লম্বা হোলো এখনকার তৈরি ঘোড়ার গলা? এখানে কি কখনো জিরাফেরা ঘুরে বেড়াত! এমন গলার সঙ্গে তো জিরাফেরই মিল। কিন্তু তার প্রমাণ অনুসন্ধান করেও পাইনি। (যদি কেউ পেয়ে থাকেন দয়া করে জানাবেন।) তবে! খোঁজ করছিলাম নানান জনের কাছে। কেউই সদুত্তর  দেননি। উল্টে হাসিঠাট্টাও  হজম করতে হয়েছে। যাঁদের কাছে উত্তর পাওয়া যেতে পারে তাঁদের প্রায় সকলকেই এই প্রশ্ন করেছি।গত বছর (১৪২৩) লক্ষীপুজোর সময় বিখ্যাত কবি ও 'কবিতা পাক্ষিক' এর সম্পাদক শ্রদ্ধেয় প্রভাত চৌধুরী এসেছেন তাঁর গ্রামের বাড়ি বাঁকুড়ার কাদাকুলিতে ( ছান্দারের কাছেই)। দাদার ডাক পেলেই, আসার খবর পেলেই, যাই তাঁর কাছে। বাড়তি পাওনা ছিল ছান্দারে গিয়ে উৎপল চক্রবর্তীর (১৩৪৫-১৪২৪) সান্নিধ্য লাভ করা। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ফাঁক বুঝে আমি প্রভাতদার কাছেও রাখি প্রশ্নটি। প্রভাত বললেন,ও আমি কিছু জানিনা।আমি হতাশ। আমার মুখ দেখে বোধহয় প্রভাতদার খানিক মায়া হোলো কি না কে জানে!  তবে , --- বলে প্রভাতদা খানিক থামলেন। আমি বলি, কি, কি তবে?  প্রভাতদা তাঁর অতুলনীয় বৈঠকি মেজাজে শুরু করলেন, একটা গল্প শোনো। গল্পটা অবশ্য আমার না। ( খানিক থেমে)  গল্পটা আমি শুনেছিলাম, মাণিকদার কাছে। মাণিকলাল সিংহ। আমারও তোমার মতোই প্রশ্ন ছিল, ঘোড়ার ঘাড় কেন ওরকম হোলো! তিনি আমাকে যেটা বলেছিলেন সেইটা বলছি শোনো মন দিয়ে।
বাঁকুড়ার মানুষ তো গরীব। অভাব তাদের নিত্যদিন। রোগজ্বালা এসবও ছিল। তখন মানুষ তা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন দেবদেবীর " থানে " মানত করত। তো, এমনি এক গরীব ঠাকুমা মানত করেছেন, কোনো এক লৌকিক দেব বা দেবীর থানে। জোড়া ঘোড়ার মানত।ঠাকুমার সম্বল তো একটি কানা বা ফুটো কড়ি। সেটা নিয়েই তিনি কুমোর বাড়ি গেলেন।কুমোরকে বেশ তোষামোদ- খোষামোদ করে,বাবা- বাছা করে,রাজি করান ঘোড়া তৈরি করে দিতে। ঠাকুমা বাড়ি ফিরে আসেন খুশিখুশি। মানত পূর্ণ হবে তাঁর।
ঠাকুমা রোজ কুমোর বাড়ি গিয়ে ধর্ণা দেন।কুমোরের তৈরি মাটির নানান জিনিষ,হাতি,ঘোড়া সব দেখেন। বসে থাকেন। কুমোরের হাতের জাদু দেখেন।একতাল নরম মাটি নিয়ে গল্প করতে করতে কুমোরের সৃষ্টি দেখেন অবাক হয়ে। আর কুমোরকে কাতর আর্জি জানান,দেখবি বাপধন , থানে  আমার ঘোড়া জোড়াটাই যেন সবার থেকে বড় হয়। রোজ একই কথা বলেন ঠাকুমা। দেখবি বাপ আমার ঘোড়াটা যেন সবার থেকে উঁচু হয়।কুমোরতো জানেন, ঠাকুমার পয়সা নেই অথচ বড় ঘোড়ার শখ। রোজ রোজ ঠাকুমার একই বায়ণা। বায়ণাক্কার ঠেলায় অস্থির কুমোর একদিন ঠাকুমার উপস্থিতিতেই একই পরিমাণ মাটিতে আঙুলের টিপসিতে দিলেন ঘোড়ার ঘাড়টি লম্বা করে।ব্যাস,ঠাকুমা খুশি। তার মানতের ঘোড়া হলো সবার থেকে বড়। সেটা সকলের পছন্দও হলো খুব। সবাই চাইল ঐরকম ঘোড়া।ব্যাস হয়ে গেল ঘোড়ার ঘাড় লম্বা।
গল্পটা শুনে প্রথমে খুব হাসলাম।পরে পরে ভাবলাম, তাই তো, এরকমও হতে পারে। যুক্তি আছে একটা।
তবে কি, ঠাকুমার দাবিতেই একদিন এভাবেই তৈরি হয়ে গেল বিশ্ববিজয়ী বাঁকুড়ার ঘোড়া?
     কাদাকুলি থেকে বেরিয়ে সদ্যপ্রয়াত বহুমুখী ব্যক্তিত্ব উৎপল চক্রবর্তীর শিল্পচর্চা কেন্দ্র ছান্দারে গিয়ে দেখলাম সেখানের লম্বা ঘাড়ের দৃপ্ত দুটি ঘোড়া সামনে না তাকিয়ে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখছে। থমকে গেলাম।তাই তো,এটাও তো দারুণ।অন্যরকম।
৩.
ভাবছিলাম। বাঁকুড়ার মতো রুখাশুখা একটা জায়গা,দারিদ্র যাদের নিত্যসঙ্গী সেখানকার মানুষের এত ঘোড়ার প্রতি টান কেন! দেবতাদের হাতি ঘোড়া দেওয়ার,মানত করার বাসনা কেন এল?  এক্ষেত্রে আদিবাসীদের একটা প্রভাব তো আছেই। পিরের দরগা বা থানই হোক বা কবরস্থান, সকলেরই দেবদেবী  থানে গাছতলায় ডাঁই করা নানান সাইজের, রকমের মাটির হাতি ঘোড়া। কিন্তু নিত্যদিনের খরা-দারিদ্র-দুঃখ-যন্ত্রণা-বেদনা উপেক্ষা করে এই যে 'মানত' তাদের--, এর মনটি কোথা থেকে এল? একসময় অরণ্য অধ্যুষিত হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে হাতি ছিল প্রচুর। আজও দলমার দামালরা উৎপাত করেই চলেছেন। রক্ষা পাওয়ার জন্য " হাতিখেদা ঠাকুর " এর কাছেও মানত হচ্ছে, ঠিক আছে, হোক।কিন্তু ঘোড়া! ছিল কিছু,রাজা ও জমিদাররা ব্যবহার করতো।তাদের হাতিশালে হাতি,ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকত। হ্যাঁ,থাকতো।এখনো বাঁকুড়া শহরের কালিতলায় গার্লস স্কুলের পিছনে হাতিশাল স্থানটি বর্তমান। মালিয়াড়াতে দেখেছি হাতিবাঁধার জন্য লোহার তৈরি মজবুত শিকল।ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ঘোড়া ও ঘোড়ারগাড়িও ছিল। তবে "আম আদমি"র কাছে তা ছিল কি, না, থাকতে পারে?
না থাকতে পারে। কিন্তু আম আদমির মেজাজটা রাজা জমিদারদের চেয়ে কিছু কম ছিল না। নিজেরা না চড়তে পারেন,ব্যবহার না করতে পারেন, তো কি হয়েছে! তাদের মনের বাসনা পূরণ করা প্রিয় দেবতাকে তো মাটির হাতি ঘোড়া দিতেই পারেন।
তাই কি 'থানে-থানে' এত হাতি ঘোড়া?
৪.
সহৃদয় পাঠক,মাফ করবেন। আপনারা যাঁরা বাঁকুড়ায় বাস করেন বা এসেছেন,লক্ষ্য করেছেন ভালো করে। তাঁরা সকলেই জানেন- অনাদরে,গাছের তলায়,ভাঙা খড়ের চালায়  কিংবা ঠা ঠা রোদ্দুরে পড়ে থাকা এই সব শিল্পকর্মের মধ্যে যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে! এ ঊষরভূমিতে কোথা থেকে এল এ্যাতো এ্যাতো হাতি ঘোড়া!
রহস্য উন্মোচন হবে হয়ত একদিন। প্রতীক্ষায় থাকলাম গবেষকবৃন্দর গবেষণার জন্য।
টেরাকোটা শিল্প নিয়ে আলোচনার শেষ নেই।এখনো অনেকটাই অনালোকিত।  বাঁকুড়ার পটভূমিকায় সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করলাম মাত্র। জানি,তা পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। আরে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে বিষয়টি। উৎসাহী পাঠকগণ ঠিক পড়বেন,জানবেন, সমৃদ্ধ হবেন ও অন্যদেরও সমৃদ্ধ করবেন।
-------------------------------------------------------------
সহায়ক গ্রন্থ:
-----------------
১.
Bankura District  Gazetteers :BANKURA: A.K.Banerjee ( Edited) W.B.Govt.1968.
2.
পশ্চিম বঙ্গ : বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা: বাঁকুড়ার টেরাকোটা শিল্প :টেরাকোটার কাব্য: রবীন্দ্রনাথ সামন্ত,পঃ বঃ সরকার,( পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)
৩.
বাঁকুড়া পরিচয়( ১-৪ খন্ড),প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স,কোলকাতা ৭৩
৪.
ভারতের শিল্পসংস্কৃতির পটভূমিকায় বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা : চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত: বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া, পরিবেশক- দাশগুপ্ত এন্ড কোম্পানি প্রাঃ লিঃ,১৪০৭(ইং ২০০০).
৫.
বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা : চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত : টেরাকোটা, বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া।(প্রথম প্রকাশ ১৩৮৬) টেরাকোটা সং ১৪২২,
(
ইং ২০১৫)
৬.
বর্ণময় বাঁকুড়ার পথে প্রান্তরে:প্রভাত গোস্বামী :প্রকাশক : দেবীপ্রসাদ পালিত,বাঁকুড়া, জুন ২০০৭
৭.
পালিতের বাঁকুড়ার ভূগোল ও ইতিবৃত্ত ( ১৬শ সং) : সুধীর কুমার পালিত, লেখক কতৃক প্রকাশিত, বাঁকুড়া ১৩৭৩( বঙ্গাব্দ)
৮.
বাঁকুড়ার মন্দির : অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য সংসদ,কোলকাতা, ১৩৭১ ( বঙ্গাব্দ)
৯.
The Temples of Bankura District,( Re.Edn.)David Mc Cutchion, Writers Workshop Publication, Calcutta, 1972
-------------------------------------------------------------