নীপবীথি ভৌমিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নীপবীথি ভৌমিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

নীপবীথি ভৌমিক


 স্পর্শ


  এই তো দ্যাখো, তুলে রাখছি 
   ভাঙা পালক
  সাজিয়ে নিচ্ছি নিজেকে ক্ষত আর‌ বিক্ষতের‌ আদলে !

   এভাবে কি নিতে পারবে না আমাকে?
 পারবে কি ছুঁয়ে রাখতে অদৃশ্যে স্পর্শ তোমার? 

   আমি ছুঁয়ে আছি আজ এই দ্রোহ কাল
   মৃত্যু সাজে সাজিয়ে রাখা পৃথিবীর গান...

       আমার ভিতর ক্ষত জন্মায়
   আর আমি জন্ম নিই ‌শূন্যতার গভীরে ।


অর্জন
 নীপবীথি ভৌমিক

 এগুলো আর কথার কথা নয়,
   এগুলোই বাস্তব।

    এই যে, ক্ষত বিক্ষত আগুন রং
   এই যে নিরন্তর ছুটে আসা মৃত্যুপাখির ডাক...

      হত্যা চলে হত্যা।
   নিরবিচ্ছিন্ন অহঙ্কারে নিজের ভিতর

       অথচ, পার ভেঙে চলে যাব বলেছিলাম
      একদিন আমি
        
          শূন্যতায় নিঃশেষ হয়ে যায়  যাপন আমার
             সূর্যাস্তের শেষ আগুনে পুড়ে যায় আজ
                    হাজার মূহুর্ত কাল ।

জ্বর
  নীপবীথি ভৌমিক

এই যে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে
    আর আমি ছুঁতে গিয়েও ছুঁয়ে 
     যেতে পারছি না তাকে, এ এক জ্বরের
         পূর্বাভাস মাত্র।
 
          আকর্ষণ অমোঘ হয়। ক্রমবর্ধমান তাপের
     পারদে নামে বিন্দু বিন্দু জলকণা...
         
       লকডাউনের জানলাই জানে গহরজান কখন
       আসে আমার জ্বরের গায়ে ধূ ধূ রাস্তার
           নিঃসঙ্গতা উড়িয়ে।


শনিবার, ৩০ জুন, ২০১৮

নীপবীথি ভৌমিক


#মুক্তগদ্য

#ধর্ষণের মোমবাতি         


   একটা ধর্ষণ বিরোধী প্রতিবাদী মিছিল শহরের বুকে আজ  বেদনার ক্রন্দন স্বর আঁকতে চাইছে।মিছিলে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের হাতেই মোমবাতি,যার শিখা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে নতুন আরও একটা আন্দোলনের ডাক।
   
   খবরে প্রকাশ,শহরের উত্তর প্রান্তে ফুটপাথের উপর যারা রাতে একফোঁটা শান্তির ঘুমের জন্য আশ্রয় খোঁজে তেমনই কোনো বস্তি বাসিনী কিশোরীর সাথে ঘটা এঘটনা! মিছিল এগিয়ে চলেছে ক্রমশ শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত,এপাড়া থেকে ওই ব্লক !ফ্ল্যাটের জানালা বা ব্যালকনি থেকে অসংখ্য সারি সারি মুখের ভিড় চোখে পড়ে,যারা এই মিছিলের দর্শকাসন অধিকার করে আছেন। ধীরে ধীরে এই ভিড় বাড়তে বাড়তে দরজা জানলা এমনকি ফ্ল্যাটেরাও হাঁপিয়ে উঠছে। এক এক জনের মুখয়বে এক এক চিহ্ণ-দাগ! কারোর কোথায় প্রশ্নচিহ্ণ,আবার কেউ বা দাঁড়ি,কমা,সেমিকোলনের রেখা মুখে এঁকে নীরব আসনে। তবে বেশ বোঝা যায় সবাই বেশ ভাবিত,মাঝে মাঝেই ঘরের দম আঁটকানো পরিবেশ ভেদ করে বাইরে ছুটে বেড়িয়ে আসতে চাওয়া টেলিভিশনের আওয়াজটা বোধহয় তাই জানিয়ে যায়। সামান্য একটা ঘটনা বেশ নাড়িয়ে গেলো না সমাজটাকে!
    মিছিল শেষ! ঠিক সন্ধ্যা সাতটা এখন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী মানুষদের হাতে ধরা এখন গরম গরম চা-এর ভাঁড় সাথে চপ-মুড়ির ও ধুম্রপান সহযোগে হাল্কা আড্ডা। আর মোমবাতিরা!উঁহু,সে তো এখন মুঠোফোনে বন্দী,তোমার আমার সবার সেলফির সাথে। ইতিমধ্যেই সোশ্যালমিডিয়াতে বেশ কয়েকখানা পোস্ট,বেশ কিছু লাইক,কমেন্ট! অবশ্যই জোরালো ক্যাপশন সহ।
      আচ্ছা,রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা ওই কিশোরীটি কখনও দেখেছি কি এমন সাজানো মোমবাতির আলো? ও কি সাজিয়েছে ওর ভাঙা খড়কুটোর আশ্রয় অন্ততঃ একখানা মোমবাতি দিয়ে? আসলে,ধর্ষণ প্রতিরাতে,প্রতিদিনে,প্রতিমুহূর্তে শুধুমাত্র যেকোনো প্রন্তের কিশোরী বা মেয়ে মানুষদের সাথে ঘটেনা,আমরাও করি নিজেকে নিজেরাই ধর্ষণ,সস্তা বোধের হাতে,আত্ম বিবেকের ধর্ষণ ঘটে প্রতি  মুহূর্তে। ছিঁড়ে যায় আমাদের জঙ্ঘা,যোনির সহজ শুদ্ধ পথ,ঘৃণা বোধের রক্তপাতে। যন্ত্রণা হয় খুব,তবুও চুপচাপ থাকা বাধ্য মোমবাতির কাছে।

---



 

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক


বাড়ির নাম সুখপাখি


   ___এই যে ওষুধগুলো সব দেখছেন র‍্যাকটার উপর,এগুলোর ঠিকানা এখন সুখপাখির এই ঘরটা জানেন। আসুন,এদিকে আসুন,দেখুন এই সব তত্ত্বকথা,মহাপুরুষদের বাণী সমৃদ্ধ গ্রন্থ দেখছেন, সবই এখন সুখপাখির ঠিকানায়__কি আশ্চার্য না, বীথি সেন আর তত্ত্বকথা ! হোয়াট আ জোক…! যে কিনা এসব কোনো দিনই পাত্তা দিতে চাইনি। আর তার থেকেও বড় আশ্চার্যের বিষয়, ঠিক এক বছরের মাথায় আপনাদের সামনে আবার আমি সেই উন্মাদ ডাক্তার বীথি সেন । অবশ্য আপনাদের দোষই বা দিই কিভাবে ? শহরের সবথেকে নামকরা অ্যাঙ্কোলজিস্ট ডক্টর বীথি সেন মানসিক বিকার গ্রস্ত। আর তার উন্মাদনার ঘটনায় আজ  খবরের শিরোণামে এই বিখ্যাত হাসপাতালটি।  অবশ্য আপনারা তো আপনাদের কাজ করে গেছেন ।এমন মুখরোচক খবর পেলে মশাই কোন পাগলে বলুন তো তাকে হাতছাড়া করতে পারে ? তাই নয় কি মিস্টার বাসু,ইউ… অ্যাম আই রাইট…? হা, হা, হা…

   ___অ্যাকচুয়ালি কি জানেন তো, পাগল আমি কোনো কালেই ছিলাম না । যেটা ছিলো আমার,তা হলো আমার দৌড়ানোর নেশা। এগিয়ে যেতে হবে অনেক অনেক দূর। আসলে, যখন সদ্য সদ্য অক্ষরের সাথে পরিচয় ঘটে আমার,ঠাকমার শেখানো একটা বিখ্যাত লাইন আমার মনে ধরে যায় । আপনারাও হয়ত ! আহা, হয়ত কেন আবার,অবশ্যই জেনে থাকবেন---“লেখাপড়া করে যে,গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে ।“ আর এই গাড়ি ঘোড়া চড়েই যে আমাদের এগিয়ে যাওয়াটাই প্রধান লক্ষ্য,সেটাই ধীরে ধীরে আমার রক্ত,মজ্জায় ঢুকে যেতে থাকে বায়ু সেনার অফিসার বাবা এবং অধ্যাপিকা মায়ের সহচর্যে । তবে যা ছিলাম,একটু বেশি অনুভূতিপ্রবণ । আর সেটাই হয়ত আমার প্রথম পাগলামির লক্ষণ !কখন যে কোথায় চলে যেতাম একা একা,নিজেই জানতাম না। একদিন তো মা কলেজ থেকে ফিরে দ্যাখেন,আমি ঘরে নেই। বাবাও খুব কম ফিরতেন সে সময় শহরে—তারপর আর কি ,খুঁজে খুঁজে আমাকে পাওয়া গেল আমাদের ফ্ল্যাটের ঠিক দক্ষিণ বরাবর যে রাস্তাটা চলে গিয়েছে,সেখানেই একটা কবরস্থানের কাছেই ।ভয় ডর তো প্রাণে তেমন ছিলো না,আবার ছিলো না বললেও হয়ত কিছুটা ভুল হবে। আসলে,কেন জানি,আমার এই একটা মনের ভিতরে অনেকগুলো মনের বাস ছিলো ।এই যেমন আমি ছুটতেও পারি জীবনের সাথে তেমনই এই একাকীত্ব,এই নির্জনতাও আমার প্রবল ভালোবাসার। তাই কখনো বা ফ্ল্যাটের জানলার রেলিং ধরে নিজের মনে কথা বলে যেতাম আবার কখনও বা আমার থেকে অনেক অনেক ছোট্ট বাচ্চাদের পেলেই বসে যেতাম ওদেরকে নিয়ে সেই ছোট্ট বেলার মতো । হ্যাঁ জানি,আশেপাশের লোকজন চোখ ট্যাঁরা করে দেখে নানান উপহাস করত,কিন্তু সত্যি বলতে কি,এসব সেভাবে আমার মনেই ঢোকেনি কখনও ।
    __  আরে মশাই দেখুন তো ভুলেই গেলাম…আসুন এবার একটু চা হয়ে যাক ।আজ  যেরকম ওয়েদার করে আছে সেই সকাল থেকে !এই পরিবেশে  গরম গরম চা কিন্তু ভালোই মানাবে…কি বলো বাসবী ? তুমি তো আমাকে অনেকগুলো বছর ধরেই চেনো ।খুব একটা ভুল না হলে তা সেই তোমার প্রথম অফিস থেকে ! যাইহোক, আমার বিশু কিন্তু বেশ ভালোই চা বানায়…নিন ! ( ট্রে টা সামান্য এগিয়ে দিলো বীথি )
   
    __ যা বলছিলাম,আমার ছোটো বেলার কথা । সেভাবে হয়ত কাটেনি আমার ছেলেবেলা ।ঠামের মৃত্যুর পর বাবার অভাব আর মায়ের ব্যস্তময় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই আমাকে শিখিয়েছে ছুটতে হবে,ছুটে চলতে হবে । বই,খাতা,পেন নিয়ে গাড়ি,ঘোড়া থেকে আরও অনেক অনেক বড় রাস্তার উদ্দেশ্যে ।গতির নেশা পেয়ে বসেছিল আমায় । আর এই ছুটতে গিয়েই সব…( বীথির মুখটা এখন হয়ত সুখপাখির জানলায় কাউকে না কাউকে খুঁজতে চায় ) বরাবরই স্বাধীনচেতা মানসিকতার ছিলাম আমি । একা থাকব,কারোর উপর কখনই ডিপেন্টডেন্ট হবোনা,আর তাই মনে হয় এইসব প্রেমটেম আমার জীবনে তেমন পাত্তা পাইনি ।ঠিকই করেছিলাম বিয়ের পিঁড়িতে বসব না কোনোদিন।বিদেশে সেটইল করব । তবু মায়ের মৃত্যুর পর বাবা চাইলেন আমিও যেন সব মেয়ের মতো বিয়ে করে সুখী হই ।

   __তবে কি জানেন,সুস্থ হয়ে উঠছিলাম ধীরে ধীরে। আসলে,খুব যে একটা পাগলামি করতাম,তা তো নয় !হয়ত কিছুটা লক্ষণ ছিল। চিকিৎসায় ভালো রেসপন্সও ছিল। ক্রমশ নিজের চেম্বারে আবার বসতে শুরু করলাম,হাসপাতালেও নিয়মিত যাতায়াত শুরু করলাম । কিন্তু ওই যে,সেদিন! কি যে হলো ! আপনারা তো জানেন সব (মুখটায় তাচ্ছিল্যের হাসি রেখে) !  

    __অবশ্য সে সময় মনে হয় আমাদের এই সংবাদ মাধ্যমের ব্যবসা ভালোই চলেছিলো ।কি বলেন মিস্টার বসু ? আসলে কি জানেন তো,এই ‘পাগল’ শব্দটা আমার বড় অপছন্দের । অবশ্য সেটাই মনে হয় সব পাগলদের প্রাথমিক লক্ষণ ।কিন্তু কেউ কি আর নিজেকে সেভাবে মানতে চায় বলুন _( নিজের ডান হাতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে গেলেন বীথি ওর সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের ।)

   __হ্যাঁ,যা বলছিলাম, আর সহ্য করতে পারলাম না সেদিন ।কয়েকদিন ধরেই বেশ একটা কানাঘুষো শুনছিলাম। কিছুটা ট্রেস কাটিয়ে ফিরে আসার পর আমাকে নিয়ে মানে আমার পাগলামো নিয়েই চর্চা ,সে আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি আমার ।প্রথমে বিশেষ পাত্তা দিইনি জানেন, কিন্তু সেদিন ওই পেশেন্টের সাথে আসা ওই ব্যক্তি ! ওর রিলেটিভ কিংবা বন্ধু গোছের কেউ হবে,তার এমন অবাক করা আচরণ ! আসলে কি জানেন তো মানুষ কিন্তু আজও  মানসিক অবসাদ আর  পাগলামো,এই দুটো ভীষণই এক করে ফ্যালে । যাইহোক, এটাই আমার চাকরী জীবনের সমাপ্তি কাল ।তবু ওই যে,অপরিসীম জেদ,হারবো না কিছুতেই…ডুবে গেলাম ক্রমশঃ আরো গভীর ডিপ্রেশনের ভিতর ।যদিও অ্যাসাইলাম থেকে ফিরে আসার পর অতীতের ঘটনা তেমন করে আর মনে নেই,মনে রাখতেও চাইনা আর । তবে বিশুর মুখে শুনেছি সত্যিই আমি ধীরে ধীরে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম । কথাবার্তা,চালচলনে অসংলগ্নতা প্রকাশ পেতে থাকে। বদ্ধ উন্মাদের মতো যা খুশি তাই ভাঙচুর করা…উফ !!! এখন ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে । আর শৌনক! শৌনক মিত্র, যার সাথে সুখে থাকতে দেখলে আমার বাবা এবং প্রয়াত মা সবথেকে বেশি খুশী হতেন,সেই সহজ সরল মানুষটাকেও সুখে রাখতে পারলো বীথি সেন ।

    ___ছেড়ে এসেছিলাম শৌনক কে নিজের অত্যাধিক ইগোর বশে ।ও, এক মিনিট…প্লিজ নোট ডাউন…আমাদের কিন্তু আজও  ডিভোর্স হয়নি ।আসলে মনে মনে আমি চেয়েছিলাম ডিভোর্স । কিন্তু শৌনক যে শুধুমাত্র একজন মানুষ নয়,আরও অনেক বেশি কিছু,সেটা তখন বুঝে উঠতে পারিনি ।বাবার সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল । আরও অনেক অনেক নাম,যশের আশায় ছুটে চললাম রাতদিন ।এই ‘সুখপাখি’ তারই নিদর্শন । কত সুখ না আজ এই সুখপাখির ভিতরে, দেখেছেন ?

    __তবে, শৌনক আর আমার পিতৃদেব এখনও কিন্তু সেই আগের মতো আমার সুখ কামনা করে চলেছেন । অথচ, আজ  আমি,সেই উচ্চাকাঙ্খী বীথি সেন এত সুখ আর চাইনা । এবার থামতে চাই। শুধু থামতে…লিখে নিন, আপনাদের আজকের সান্ধ্য শিরোণাম_ উন্মাদ ডাক্তার বীথি সেন আজ  ক্লান্ত…ঘুমাতে চায়,শুধু ঘুম। আশাকরি,এই সোসাইটি বেশ ভালোই খাবে খবরটা ।


---



    


বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক


ভুতুর নীতু


   রামু দা টিফিনের ঘন্টা পেটাতে না পেটাতেই প্রতিদিনকার মতো গোটা স্কুলের সব ঘরগুলো মোটামুটি ফাঁকা করে বাচ্চারা যথারীতি মাঠের দিকে। মাঠ ভর্তি জল এখন,যদিও যতটা সম্ভব স্কুল কর্তৃপক্ষ ফি বছর বর্ষায় মাঠের ঘাসপালা ছেটে ফেলে চারিদিক পরিস্কার রাখার চেষ্টা করেন!তবুও গত এক সপ্তাহ ধরে যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে,তা তে স্কুলের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে মাস্টার মশাইদের স্টাফরুমও পর্যন্ত জলে জলাকার। যদিও হেডস্যার বলেই দিয়েছেন অভিভাবকদের এই জল ভেঙে স্কুলে না আসলেও চলবে, তবুও এই বাচ্চাগুলোর কাছে যেন এমন মাটি কাদা পথ,এগুলোই বড় আনন্দের। জল কাদার ধপাধপ্‌,ছপাছপ্‌...নিজেরাই কাদা মাখছে পায়ের সাথে সাথে ফুটবলকে সঙ্গী করে।


   রেল লাইনের এপারে যত ছোট বড় ঝুপড়ি গুলো গজিয়ে উঠেছে মূলত সেসব ঘরের ছেলে মেয়েরাই আসে এই লক্ষণপুর নিম্ন বুনিয়াদী স্কুলে পড়তে। পড়াশুনা যে একেবারেই হয় না সেখানে তেমনও নয়, মোটামুটি লক্ষণপুরের আর দুটো সরকারী স্কুলের থেকে ভালোই।
_______উ উ উ গোল ! হিপ হিপ হু-র-র-র-রে !  বর্ষার এই দিনগুলোতে বাচ্চাদের বড় প্রিয়জন হয়ে ওঠেন ওদের খেলার মাস্টার মশাই সুবল স্যার। মাস্টার মশাইও তেমন, বড় ভালো মনের মানুষ। অনেকখানি এই বাচ্চাগুলোর মতো। প্রত্যকের খবর নেন আলাদা আলাদা করে। যদিও লক্ষণপুরের এই স্কুলের সমস্ত শিক্ষকরাই খুবই আপনজন  গ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছে,বিশেষ করে এই ছোট্ট ছোট্ট ছেলেদের কাছে।


  ____ কি রে সব, আজও  তো আমাদের স্কুলের মারাদোনাকে দেখছি না এই বলটার পিছনে ছুটতে ? ব্যাটার হলোটা কি,জানিস তোরা ?____সুবল স্যারের চোখ কাউকেই যে এড়িয়ে যেতে পারে না। খোঁজ পড়বেই তাই,__ভুতু যা তো,দেখ তো গিয়ে মহাপুরুষ আবার কোথায় অন্তর্ধান হলেন। যেখানেই পাবি ব্যাটাকে এক্কেবারে পাঁজা কোলে করে তুলে নিয়ে আসবি__স্কুলে এসেছে জল কাদা ভেঙে, অথচ খেলার মাঠে নেই মারাদোনা, উঁহু, মতলব ঠিক ভালো ঠেকছে না মোটেই ।

  নীতুর এমনই পরিচয় স্কুলে, কেউ মারাদোনা, কোনো মাস্টার মশাই আবার মেসি আবার কোনো বন্ধু ওকে বাইচুং বলে ডাকে। নীতুর বেশ ভালোই লাগে অবশ্য তাতে,বেশ একটা গর্ব গর্ব ভাব তৈরী হয় মনের মধ্যে ওর। তাই বলে যে লেখাপড়াতে মোটেই মন নেই তার, তাও নয়, খুব ভালো ফল নাহলেও ভালোই ,বিশেষ করে লেখার হাতটা বেশ ভালোই । ছবিও আঁকে মন্দ না। সেই তো সেবার যেদিন ওর ঠাকুরদার সাথে এসে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলো,ওইটুকু একটা ছেলে,অথচ,কি সুন্দর একটা ভাবুক মনের পরিচয় রেখেছিলো ! বাড়িতে সাতকূলে যার কেউ কখনো পড়া তো দূরের কথা ইস্কুলেও যাইনি কোনোদিন। সেই থেকেই সবার খুব প্রিয় এই মহাপুরুষ নীতু। বিশেষ করে ভুতু তো ওর শ্বাস-প্রশ্বাস। এক পাড়াতেই থাকে ওরা।

    হাতের টিফিন বাক্সখানা টক্‌ টক্‌ শব্দ করে একবার খুলছে,আর একবার বন্ধ করে কী যেন চারিদিকে সব উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে চলছে একমনে ভতুর প্রাণের বন্ধু নীতু।যদিও স্কুলে মিড ডে মিলের ব্যবস্থা আছে,তবু,বাপ মা মরা নাতিটার জন্য নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা ঠাকমা দুটো খানেক মুড়ি নিজের হাতে ভেজে নীতুর জন্য স্কুল ব্যাগটায় দিয়ে দেয়।__      হঠাৎ করে এভাবে ভুতুকে দেখেই যেন ওর সব ইচ্ছাই পূর্ণ হয়ে গেলো, এমনই একটা হাবভাব নীতুর চোখেমুখে।
   ____নে পিঠে ব্যাগ বাঁধ,চল, এক্ষুনি পালাই । নীতু বেশ খানিকটা রহস্যে রেখে ভুতুকে বললো।
  __মানে ! কোথায় পালাবি রে? সুবল স্যার মাঠে ডাকছেন তোকে। চল্‌ মাঠে চল্‌।__ভুতুর রাখা এসব কোনো বাক্যই কানে গেলো না একগুঁয়ে প্রকৃতির নীতুর। বরং হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে,ইস্কুলের দক্ষিণ দিকে যে ছোট্ট পাঁচিলটা আছে, সেটা অনায়াসে পেরিয়ে গেলো রোগা পাতলা ভুতুকে পিঠে চাপিয়ে।

     স্কুলের এইদিকে সচরাচর তেমন কেউ আসেন না। হেড স্যারের ঘরের ঠিক পিছন দিকে এই অংশটা। একটা মস্ত বড় বেলগাছ আর কয়েকটা ফলের গাছ সহ পাখ পাখালিদের দুপুরের কিচিরমিচির ছাড়া কিছুই নেই এখানে। একটু ভাবুক প্রকৃতির নীতুর তাই বড় আকর্ষণ ইস্কুলের এই অংশটায়। প্রথম যখন স্কুলে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই এই জায়গাটা তার খুব পছন্দের। টু তে পড়াকালীন তো একদিন তাকে গোটা স্কুলের টাইমেই পাওয়া যাইনি।  চারিদিকে খোঁজ খোঁজ, অথচ,রোল কলের খাতায় জ্বলজ্বল করছে তার উপস্থিতির চিহ্ন। হঠাৎ ছুটি হওয়ার একটু আগে সবাই দেখে চুপিচুপি নীতু বীর মুখখানা লুকিয়ে ক্লাসের পিছনের বেঞ্চে বসে আছে। পরে অঙ্কের স্যারের ভয়ে পেট থেকে বেরিয়ে আসে বাবুর অন্তর্ধান রহস্য।


    ___এই নীতু বলনা বাবা কোথায় যাচ্ছিস এভাবে ? ভয়ে ভুতুর মুখ ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকলো । 
___আরে বাবা! এতো ভয় কিসের রে তোর? তুই না নীতু বীরের বন্ধু ! এইজন্যই তোকে ক্লাসে সবাই ক্যাবলা দাশু বলে ক্ষেপায়___হা হা হা হা করে হেসে উঠে নীতু ভুতুকে আশ্বস্ত করলো।  জানিস তো, ক্যানেলের জল দেখতে যাবো,চল্‌ । সবাই বলছে এখন জল ছেড়েছে তো, তাই অনেক রকম মাছও নাকি উঠছে। এই হলো গিয়ে তোর মাছ ধরার বর্শি, আর এই ছিপে লাগানোর সুতো। স্কুলের ধ্বংস বিধ্বস্ত চিহ্ন যুক্ত ব্যাগটা থেকে স্বযত্নে বের করে ভুতুর হাতে ধরালো নীতু। আর ছিপ বানানোর দুটো কঞ্চি রাস্তার ঝোপঝাড় থেকেই পেয়ে যাবোক্ষণ __নীতু বেশ উৎসাহ নিয়েই এক নিমেষে বলে গেলো।  অবশ্য ভুতুর যে মোটেই ইচ্ছা ছিলো না এসব করার তাও  নয়। __কাল রাতেই পাড়ার জলদাদুর কাছ থেকেই এনেছি সবগুলো বুঝলি ভুতু হুনুমান__মুখে একগাল খোলা হাসি ছড়িয়ে দিয়ে নীতু মাছ ধরার চার বানানোর জন্য বেশ কিছুটা আটার গুঁড়ো একটা ছোট্ট প্যাকেট থেকে বের করে ভুতুর হাতে দিলো ।


   আজ  ঠিক একমাস হলো, ভুতুটা যে কোথায় চলে গেল ? বেশ তো সবাই মিলে মাছ ধরছিলো ক্যানেল পারে। এক টুকরো নরম মাটি,তার এতো ক্ষমতা ! ছুটে আসা জলের কাছে ধরা দিতেই হবে তাকে ? পা ফসকে চোখের সামনে দিয়ে ভুতুকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল চিরদিনের জন্য ।  না, কেউ খুঁজে আর পেল না তাকে,কেউ না। ভেবেছিলো আর যাবে না নীতু ওই স্কুলে কোনোদিন, ভুতুকে ছেড়ে একা ওখানে থাকবে সে কিভাবে। পাড়ায় কানাঘুষো আলোচনাতে সে বুঝেছে ভুতুর বাড়ির লোকেরা নীতুকেই দায়ী করছে এরজন্য। ঠাম্মাও সেদিন কাজের বাড়ি থেকে ফিরে এমনটাই বলছিলো দাদুকে।  অথচ, শুনলেই তো হতো সেদিন ভুতুর কথা। সুবল স্যারের কথা। কি এমন ক্ষতি হতো ওকে নিয়ে না গেলে জল দেখতে ! ঠাম্মা কতবার বলেছে ওর থেকে একটু সরে থাকতে, ওদের পয়সা আছে, কিছু না হলেও এই ছোট্ট ঝুপড়ির ভিতরে একটা নিজস্ব মুদিখানার দোকান আছে ওর বাবার, বাপ মা মরা নীতুর দাদু ঠাকমার মতন তো লোকের বাড়ির এঁটো বাসন মেজে, অন্যের রিক্সা টেনে পেট চলে না !


    নীতু মন খারাপ করিস না রে ভাই আমার। আমি তো জানি,এতে তোর কোনো দোষই নেই। আসলে আমিই একটু বেশি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম বড়শিতে গাঁথা মাছটা তুলতে গিয়ে। যা এখন খেলার মাঠে,স্কুলের ফুটবলটার যে তোকে আজ  ভীষণ প্রয়োজন । কতদিন যে বেচারা তোর পায়ের লাথি খাইনি__ হা হা হা হা । আর যখনই তোর মন খারাপ করবে, দেখবি আমি ঠিক তোর পাশেই থাকবো সব সময়।
  গরীব বড়লোক বলে কিছুই নেই রে ভাই, শুধু এই বন্ধুত্বটুকুই সবকিছু...
    নীতুর কেন যেন মনে হলো ভুতু ঠিক আগের মত চুপিচুপি এসে ওর পিঠে একটা দড়াম করে কিল মেরে নিমেষেই লুকিয়ে গেলো কোথাও।


ছবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার :Cesar Legaspi

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক



#সেকালের বাঙালী বিয়ে

     “বিবাহ “ শব্দটি বি –পূর্বক বহ ধাতু এবং ঘঞ্‌ প্রত্যয় যোগে গঠিত ।যেহেতু বহ ধাতুর অর্থ বহন করা এবং বি উপসর্গের অর্থ বিশেষ রূপে , তাই “ বিবাহ” শব্দের অর্থ বহন করা এক পবিত্র সম্পর্ক । এক পবিত্র শ্লোকের ধারাপাত।  অক্ষরে অক্ষরে  জড়িয়ে আছে পরম বন্ধন কিন্তু , মনুষ্য সমাজে বিয়ের প্রচলন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতধারা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ে কখনো বলা হয়েছে পরিবারের কারণেই বিবাহের প্রচলন , আবার কখনো বলা হয়েছে বিয়ের কারণেই পরিবারের ভাবনা যাইহোক , মত পার্থক্য তো থাকতেই পারে , এবং সেটাই স্বাভাবিক

    মনুষ্য সমাজে পরিবারের উদ্ভব হয়েছে জীবজনিত কারণে বিবাহের মধ্য দিয়ে নারী পুরুষের সম্পর্ককে সামাজিক রূপ ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে আনেক পরে আদিম জন জাতির কাছে খাদ্য সংগ্রহ করাই ছিলো খুবই কঠিণ ব্যাপার মূলত , পশু খাদ্যই ভক্ষ্ণ করতো তারা  তাই পশু শিকারের উদ্দেশ্যে তাদের যেতে হতো দূর থেকে দূরান্তে এবং সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অসহায় ও রক্ষকহীন নারীকে একা পেয়ে অন্যকোনো পুরুষ বলপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে গেলে রক্তপাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো এরূপ পরিস্থিতি বর্জনের জন্যই মনুষ্য সমাজে বিয়ের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দান করা হয়েছে বিখ্যাত নৃতত্ববিদ ওয়ের্স্টারমার্কের মতে –“ পরিবার গঠন করে স্ত্রী ও পুরুষ একত্রে  বাস করা থেকেই বিবাহ প্রথার উদ্ভব হয়েছে, বিবাহ প্রথা থেকে পরিবারের সূচনা হয়নি “   মহাভারতে বিবৃত শ্বেতকেতু উপাখ্যান থেকেও আমরা এর সমর্থন পাই যেখানে বলা হয়েছে , শ্বেতকেতুই ভারতে প্রথম বিবাহ প্রথার প্রচলন করেন , কিন্তু বিবৃত কাহিনী থেকে পরিস্কার বোঝা যায় যে , বিবাহের আগে শ্বেতকেতু তাঁর মাতা পিতার সহিত পরিবারের মধ্যেই থাকতেন যদিও , পণ্ডিত সমাজে আজ একবাক্যে স্বীকৃত যে পরিবারের থেকেই বিবাহ প্রথার উদ্ভব , তবুও , বাখোফেন , মরগান প্রমুখ নৃতত্ববিদ একদা একথা স্বীকার করতে চাননি

       যাইহোক , স্মৃতি শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ “ মনুসংহিতায়” মোট আট প্রকার বিয়ের কথা উল্লেখ আছে। সেগুলো হলো , যথাঃ- ১) ব্রাহ্ম
                                 ২) আর্য
                                 ৩) প্রাজাপত্য
                                 ৪)আসুর
                                 ৫) গান্ধর্ব
                                 ৬) রাক্ষস
                                 ৭) দৈব
                                 ৮ ) পৈশাচ
বর্তমানে মনুষ্য সমাজে ব্রাহ্ম বিবাহই স্বীকৃত ও লক্ষণীয় । বিবাহের মাধ্যমে একজন নারী ও পুরুষ সারাজীবন একসাথে সুখ – দুঃখে থাকার প্রতিজ্ঞা করেন অগ্নিকে সাক্ষী রেখে ।
  “ যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম
  যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ‘’। অর্থাৎ তোমার এই  হৃদয় আমার হোক আর আমার এই হৃদয়ও তোমার হোক।

 বিবাহের সূচনা নিয়ে যেমন নানান মতবাদ আছে , তেমনি কালে কালে বিয়ের রীতিনীতি আয়োজনের ক্রমধারায় পরির্বতন লক্ষণীয়আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে বিয়ে প্রচলিত ছিলো দুটো অসমবয়সী নারী পুরুষের ভেতর  সেক্ষেত্রে হয়তো কন্যার বয়স চার , পাত্রের বয়স  পনেরো কিংবা আরো একটু বেশী আমাদের ঠাকুমা দিদিমার মুখে শোনা গল্প থেকেই বোঝা যায় সেই সময়ের বৈবাহিক পদ্ধতি সেই সময়ে বিয়ের কণেকে সাজানো হতো লাল চেলিতে , তবে বরের সাজ হতো বাঙালীর চির পরিচিত ধুতিতেই স্বর্ণালঙ্কারের প্রচলন যুগে যুগেই ছিলো

   যৌতুক প্রথা ছিলো বঙ্গদেশের বহু প্রাচীন প্রথা   শার্লি লিণ্ডেনবম পরিচালিত এক গবেষণায়  জানা যায় , বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিলো কৃষি নির্ভর আর বিবাহযোগ্য পাত্রের আয়ের উৎস তেমন ভালো ছিলোনা অন্যদিকে বিবাহযোগ্য পাত্রী পাওয়া যেত হাতেগোণা তাই সে সময় পাত্রপক্ষকে পাত্রীপক্ষকেই যৌতুক দিতে হতো পরে অবশ্য পরিবেশ অর্থনীতির  পরিবর্তন ঘটলে এই ধারারও আমূল পরিবর্তন ঘটে

     বঙ্গদেশে  বিয়ের ছাপানো আমন্ত্রণ পত্রের প্রচলন উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি । আগে আমন্ত্রিতদের বাড়িতে সশরীরে গিয়ে তেল , হলুদ, পান, সুপারি হাতে দিয়ে আমন্ত্রণ জানাতে হতো । তাছাড়া , নিমন্ত্রিত মেয়েদের তাদের বাড়ি থেকে গাড়ী করে নিয়ে আসতে হতো এবং ভোজনের পর আবার তাদের গাড়িতে করেই  পৌঁছিয়ে দিতে হতো ।আর যেসব নিমন্ত্রিতরা দূর থেকে আসতেন , তাদের গাড়ী ভাড়া বাবদ কিছু অর্থ দিতে হতো কর্মকর্তাকে । প্রাচীন রীতিনুযায়ী হিন্দু বাঙ্গালী বিয়েতে পাত্র পাত্রী দেখা , লগ্নপত্র/ পাটীপত্র লেখার মতো প্রাথমিক দেখাশোনা পর্ব শেষ হওয়ার পরেই আসে নিমন্ত্রণ পর্ব ।  একেবারে প্রথম দিকের আমন্ত্রণ পত্র কেমন ছিলো তা জানা না গেলেও উনিশ শতকের শেষ ভাগ ও তার পরর্বতী সময়ের কয়েকটি বয়ান দেখলেই সেই সময়ের আমন্ত্রণ পত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায় । লক্ষ্ণীয় যে এই সময়ের আমন্ত্রণ পত্রের কোথাও  পাত্র কিংবা পাত্রীর বংশ পরিচয় উল্লেখ থাকতো না।

    বিবাহের শাস্ত্রীয় আচার  ও মেয়েদের দ্বারা সম্পন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান সমূহ এখনও বজায় আছে বটে , কিন্তু বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে ভোজনের ব্যাপারে ।আগে বিয়েতে ফলার ও ভাতের পরির্বতে লুচির চল ছিলো , এমনকি রান্নাবান্নার ক্ষেত্রেও বাড়ির গিন্নিদের পরির্বতে সেখানে আসে উড়িয়া বামুন । সামাজিক নিয়ম এবং জাতপাতের চলমান ধারাকে মাথায় রেখে স্বাভাবিক ভাবেই ব্রাহ্মণরাই অগ্রাধিকার পেতো। সবার প্রথমেই তাদেরকেই ভোজনে আহ্বান করা হতো ।  গৃহকর্তা কে অতিথিবর্গের সকলের সামনে গিয়ে বলতে হতো _____” আপনাদের মধ্যে যারা ব্রাহ্মণ আছেন , তাঁদের গাত্রোস্থান করতে আদেশ হউক”। পরিবেশনও সম্পন্ন হতো ব্রাহ্মণদের দ্বারা , ভোজনের শেষে তাদের দক্ষিণা দানের রেয়াজও ছিলো । খাওয়ানো হতো কর্মকর্তার বাড়িতেই। মাটিতেই কুশাসন বিছিয়ে  কলাপাতায় খাওয়ানো হতো । পাতার সামনে জলভর্তি মাটির গেলাস, দই ও ক্ষীর পরিবেশনের জন্য মাটির খুরি, যা আজ অদ্দৃশ্য থেকেও বেশি । খাদ্য তালিকায় থাকতো , লুচি, বেগুন  ভাজা , ডাল , আলুর দম, মাছের কালিয়া এবং মিষ্টান্নের ভেতর, রসগোল্লা, মিহিদানা, লেডিকেনী ইত্যাদি । বাড়িতেই বসত ভিয়েন। মহিলাদের খাওয়ার জন্য ছিলো পৃথক পংক্তি। বর আসতো চতুর্দ্দোলায় চেপে , বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর কনে শ্বশুর বাড়ী যেতেন মহাপায়ার করে ।

      লৌকিকতার ক্ষেত্রটিও ছিলো তাৎপর্যময়।আটআনা বা একটাকা দিয়ে মূলত তা সারা হতো। বিশিষ্টজনরা চারটাকা পর্যন্ত দিতেন। পরে টাকার জায়গায় বই আসে। তবে সবথেকে চমকপ্রদ যেটা ছিলো, সেগুলো আসলে “ কবিত্বপূর্ণ “ কাগজ। এগুলো হয় সোনালী রঙের কিংবা রুমালের ন্যায় এক প্রকারের কাগজের ওপর লাল কালি বা সোনার জলে ছাপা কবিতা , ছড়া বা বিবাহ সম্পর্কিত যৌতূক ।দুই পরিবারের মানদণ্ড ধার্য করা হতো এগুলোর উপর।কেননা এর মাধ্যমেই উপস্থিত স্বজনেরা বিচার করতেন কোন পরিবার কখানা উপহার বিলি করেছেন।

---তবুও বিবাহ , যার অক্ষরে অক্ষরে জড়িয়ে থাকে পবিত্র এক বন্ধন !


প্রচ্ছদ শিল্পী : সুদীপা কুন্ডু




      

মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক

মরুভূমি


মরুভূমি


নীপবীথি ভৌমিক
অখণ্ড পাথর স্পর্শে রেখে এ শরীর বেঁধেছিলাম
হৃদয় জুড়ে তাই অনলদগ্ধ মন্ত্র, তাপদগ্ধ উচ্ছ্বাস
হিংস্রতার পাশাখেলা ।

কখনো কি দেখেছো তুমি আমার ভিতর
 বাদল বেলার সেই ভালোবাসার গান !
 কিংবা স্নিগ্ধ জুঁই ফোঁটা রাতের সরল মেয়ে বেলার শ্লোক ?

দ্যাখোনি,কিভাবেই বা দেখবে কেউ তাকে,
শান্ত পাহাড়ের বাঁক পথ যেমন করে ধীরে ধীরে বিপদসঙ্কুল সীমানা
হয়ে ওঠার হাতছানি খোঁজে নিজে নিজেই
আমিতো তেমনই এক পাথরখণ্ড !
এবার গাছ লাগাবো ভাবছি,এ আঙুলের স্পর্শ রেখায়
   কিছু লতা, কিছু বৃক্ষ আর অযুত সবুজ দূর্বাদেশ !
প্রাণ আসুক , জল আসুক
    নামুক আবার অনিঃশেষ বসন্ত উৎসব
ছবি : গুগুল

অখণ্ড পাথর স্পর্শে রেখে এ শরীর বেঁধেছিলাম
হৃদয় জুড়ে তাই অনলদগ্ধ মন্ত্র, তাপদগ্ধ উচ্ছ্বাস
হিংস্রতার পাশাখেলা ।

কখনো কি দেখেছো তুমি আমার ভিতর
 বাদল বেলার সেই ভালোবাসার গান !
 কিংবা স্নিগ্ধ জুঁই ফোঁটা রাতের সরল মেয়ে বেলার শ্লোক ?

দ্যাখোনি,কিভাবেই বা দেখবে কেউ তাকে,
শান্ত পাহাড়ের বাঁক পথ যেমন করে ধীরে ধীরে বিপদসঙ্কুল সীমানা
হয়ে ওঠার হাতছানি খোঁজে নিজে নিজেই
আমিতো তেমনই এক পাথরখণ্ড !
এবার গাছ লাগাবো ভাবছি,এ আঙুলের স্পর্শ রেখায়
   কিছু লতা, কিছু বৃক্ষ আর অযুত সবুজ দূর্বাদেশ !
প্রাণ আসুক , জল আসুক
    নামুক আবার অনিঃশেষ বসন্ত উৎসব




ছবি : গুগুল