সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
মিঠুন চক্রবর্তী
সৌমনা দাশগুপ্ত
তিমির অবগুণ্ঠনে
১
ফিসফিস করে এক কলববর্জিত দেহ
#
শরীর কি মাছরাঙা, পোড়া এক বিলাবল ঠাট
পালকের ধারে-ভারে ঝুঁকে পড়া গাছ
#
পাথরযুগের থেকে তিমির রঙের গান
লৌহ আকরের ঘুম ভেঙে যন্ত্রের মর্মর
#
পাতারা এসব ভুলে বারবার ফুটে ওঠে
আকাশের শরীরের তরল সবুজ
২
এ এক পান্থনিবাস, কথা আসে কথা চলে যায়
#
অযথা বিভ্রমে তাকে ভেবে বসি ঘর
আদৌ ঘর ছিল কি দেহের মাঝে
#
দেরাজের ভাঁজে ভাঁজে মৃত টিকটিকি
ভেজা ফসিলের গান, ছায়ার পায়ের দাগ
#
কীটনাশক ছড়িয়ে দিচ্ছি শস্যবিছানায়
পেট্রলে চুবিয়ে রাখি স্বপ্নের হাড়গোড়
#
ঘুম আসে ঘুম নিভে যায়
পাখি আসে পাখি নিভে যায়
৩
সাজানো মঞ্চের থেকে একে একে নেমে যায় স্বপ্নেরা
#
তূণীরে যে তির রাখা সে-ও তাক করে তোমাকেই
আভোগে ও সঞ্চারীতে লেগে ছিলার অহংকার
#
তুলে নাও হলাহল
এ-সাগরে পাথর মাছের বিষবমি
গানে ও লবণে তাকে ভাসাও ডোবাও
#
নজরমিনার থেকে যে তোমাকে আঁধার চেনায়
সেই মেঘটির কাছে রাখা আছে আগুন-পাথর
#
তুলে নাও চকমকি, ঘষা লেগে জ্বলছে অক্ষর
৪
পায়ের পাতায় শুধু আঙরার দাগ, পারঅক্সাইড-ক্ষত
#
একলা ঈগল ভাসে, ভাসে তার ডানার দ্রাঘিমা
তোমার মুখের ছবি তার মুখে
তোমার ছায়ার শব তারই ছায়ায়
#
এসো ওই ছায়াটির কাছে বসে দু-দণ্ড জিরোই
ঢাকাচাপা দিয়ে রাখি ঘামের প্রপাত
হাওয়ায় পেতেছি ফাঁদ, জানি একদিন ধরা দেবে
ঘুমকুঠুরির থেকে আসবে ঠিকই উড়ে অচিন পাখিটি
#
তুমি তাকে শমন বলেছ, আমি বলি শ্যামরায়
৫
ভাষার বাগানে মাছি খুঁটে খায় গহন নির্যাস
#
মাংসের আবরণ খোলো, খুলে রাখো নিভাঁজ অব্যয়
অ-কার ই-কার খুলে শব্দ থেকে বেরিয়ে আসছে
উদোম অক্ষর যত, বোবাগাছে ঝুলছে অক্ষর
#
হাড়িকাঠে নিচুমাথা শুয়ে আছে আমার শব্দেরা
মধুমিতা বসু সরকার
স্বপন রায়
বকপাতি
..............................
কী ঠাণ্ডা তোমার মুখ
শরীরও
যে শরীর শীতলপাটির
কে যেন সব ছেড়ে পড়ে আছে
কে যেন ছেড়ে দিচ্ছে বলে অফস্টাম্প
যত ঘুম বাঁ-দিকে
যত জেগে ওঠা ড্রাইভ ডানদিকের কোণায়
ঈলতুঁতে তিল
বল ছেড়ে দিই
ধরে আর কি হবে যখন সেলাই তাকিয়ে আছে
কাজ করার সময় আছে আছে
লম্বা নাইটশিফট
চা
বিয়ারিং-এ সাপ্টানো বল
জ্যোৎস্নাক্যাঁচালে
শাদাটে
এল কারুবাসনাময় শীত
কারখানা
চাখানায়
ঠাণ্ডানিদান শুধু 'যেদিকে দুচোখ যায়'
কুয়াশায়
কোনও মুখই আর সীমানা হতে চাইছে না...
.....
হাতপাতি
....
বাড়ি ফেরার দিকে ঘর
ঘর আবার বাসাও
মালঞ্চ, দেখি মালঞ্চের বেড়া
তোমাকে না দেখেও তুমি
আজ ডুবছে আমার সব
এই লক্ষীট্যারা কিওস্কে
আমি মুছে দেয়া আমি আবার কিভাবে বেড়া আর সজনেছায়া
তুমি আর রোলকল ‘তুমি আজ কত দূরে’ হ’য়ে
স্টিম
ঝিকঝিক রোদের আধারে ওড়া দুপাট্টা
আজও হাওয়ায়
ঘরে বাসায় বাড়িবাড়িতে ওড়ে
পাখি হয়
আমি
আমার রাইফেল চলল চলল
দরজা বন্ধ ছিল
ফেরার কথাও তো ছিল
আমি নক করছি করে যাচ্ছি
করেই যাচ্ছি
এখনো...
যাদব দত্ত
ওকে বোঝার
আম জামের ভেতর ওকে বোঝার কেউ নেই
একটু লজ্জা এঁটেল মাটি ওর গালে গলায় দি
পরালে মানাবে এমন পাখির জেদি পদচিহ্ন
যার নিভু নিভু তিল উড়বে আকাশের নিচে
দূরে দেখাই যোগ করে করে গুছিয়ে দেখা
নৌকার চোখ চোখের জল নির বধির
শিশির ভেজা হেলদোল ওর অন্তর্বাস পরাবে
মনের কাদা উতরে জলে চাঁদ পড়ে যাওয়ার মত
লেবুফুলের সবুজ বউ আর জাল ফেল না
ভাবো আমরা পথের মানুষ ইতু কুড়বো হাটে হাটে
বটগাছে জ্যোতস্না পা রাখতে রাখতে
জেদি কোমর লবণ চিকিৎসা কপালেই ছিল
খিদে রাজধানী এক্সপ্রেস বনবিভাগে ছুটছে
নদী এখনো নিম্নচাপের ছোট ছোট বাচ্চা
ধুতরাফুল একটা সোমত্থ জিরাফ
কলসি চিহ্ন খাচ্ছে কি খাচ্ছে না শুধু উঁকি দেবে
*****
2/ মেঘের ডাক / যাদব দত্ত
গলা ফাটিয়ে মেঘ ডাকে বৃষ্টি নেই
সেই অবোধ পাথর তবু সুন্দর রচনা প্রনালীতে
প্রণব শাসায় অনেক পতাকা দেখেছিস খাজোরাহের
রাতে বড় আলোটির দিকে আজ এগোবি না
বুকভাঙ্গা গানের একা মেঘগুলি পড়ে থাকবে
এখানে শুধু মাসকলাই এর চাষ
মাটির নীচে সামান্য ঝিরিঝিরি চিনে বাদাম
নাকে বিশ্রাম নিয়ে পরিপুষ্ট খালি আলোর ফুয়ারা
অমল অনড় মন্দিরে বায়ুকোনে শুয়ে পড়
জর্জরিত চুপ মেরে যাবি বিকেলের আলোয়
হলুদ মুখের হাতছুট সিক্ততা দেখে
তাপের অভাবে কাউকে ছুঁইনি কোনোদিন
খরকরে ডিমনা সড়কে ছোট বড় ভেজা
এমন রান্নার অবুঝ গ্রামোফোন
তেলে জলে ঢিল দাও স্পর্শ পায়ে পায়ে হাঁটবে
একটা পরিমাপের নীল স্টেসন
এজন্মে এতগুলো সাদা কালো হাত
খলবল গরল চূড়া তবু ছোঁয়া যাবে না
অরূপরতন হালদার
অভিসার
প্রণয় অংশত দাহ্য, বাকি দেহ খুঁড়ে ফেল
জল কতদূর?
সারসের ডানায় সূর্য নিজেকে হারিয়ে ফেলে
তারপর মীনরাশি পঞ্চমবাহিনী
ঘুম দূরে সরে গেছে, তার পায়ের ছাপ
আমাকে অশ্বত্থের থেকে দূরে মেয়েটির কাছে নিয়ে যায়
তার দেহ ঘিরে রাতের হাড়, নীল চন্দ্রাতপ বুনে চলে ঢেউ
ধুলোপড়া জালিকায় নীহারিকা ভাসে
তুলট কাগজ থেকে সন্ধ্যা ভেসে গেছে প্রাচীন আখরে
কুয়াশাজড়ানো বন্দরে মারীচের হাসি
একটা নিস্তব্ধ আয়না তুলে ধরে কেউ
মেয়েটি গোপনে আসে, তার মুখচ্ছবি মিলিয়ে যায়
বাষ্পলীন আঘাতের মতো
আমলকি বনে চাঁদ এলোমেলো
হৃদয়প্রসূত ছায়া নুন মাখে সারা গায়ে
পশুদের দল চোরাবালি ফেলে
বনের অন্ধকারে চলে গেছে
সপর্যা
লুপ্ত হ্রেষা, তুমি অমিতাভ, সূর্যপাথর নেমে এল দেহে
সেনানীর পরিহার অন্ধ বড়ো
জলের ভ্রান্তি আমাকে পোড়াও
ওই মাতৃরেখা শূন্য হয়ে আসে, অকাতর সমিধেরা
যেমন উদ্ভিদ, প্রাণসকল শোনে মহলা জেগে ওঠে
শীতলক্ষ্যার শরীর পেরিয়ে আরও অন্ধকারে
গ্রন্থি খুলে এলে নিসর্গের বেদনা একাকী ষাঁড়ের মতো স্থির
আলস্য নির্মাণ করো, কেবল তৃষ্ণা নয়
স্মরণিকাগুলি জানেনা অলিভ পাতার মুকুট
কখন নিঃশব্দে পুড়ে গেছে রক্তের ভেতর
আঙুর ও সনেটগুচ্ছ দ্রুত আরোগ্য থেকে তোমাকে দেখে
একটা পানপাত্রের সজীব অতীত আর
ছিটকে ওঠা কোহলে মিশে যায় জলবিভাজিকা
ওই তালবাদ্য তবে নিয়ন্ত্রক হল
মসৃণ প্রহরা থেকে সরে এসো, পর্দাগুলো ভৌতিক
কৌশিক সেন
বনসাই
তোমরা যখন মেঘের গল্প বল,
গোপের বালক আপনি বাজায় বাঁশি
শ্যামল দু’চোখ আপনি টলোমলো
ঠিক বুঝেছি, সে কোন সর্বনাশই!
দুষ্টু আকাশ কলমা পরে চোখে
উপচে পড়ে দু’পাড় ছলাচ্ছল,
কদম্ববন ঢাকলে সুরলোকে
আরেকটু পর থামলে কোলাহল।
সুর লেগেছে নিভন্ত কিংশুকে
স্বপ্নঘোরে অবাক ধুলোবালি
তোমরা যাকে মেঘ বলেছ সুখে,
তাকেই বলি পদ্য লেখার কালি।
শোক জমেছে কাজলাদীঘির পাড়ে
নাগকেশরের পাতায় ভেজে রোদ
আলগা পাঁজর বেঁধেছে মাল্হারে
তবুও কোথাও ভাঙছে প্রতিরোধ।
তোমরা যাকে স্পর্শসুধা বল
একলা ঘোরে যত্নে রাখি তাই,
তোমরা যখন মেঘের কথা বল
আমার ঘোরে ভিজেছে বনসাই।।
বহুদূরের বিন্তিকে...
ডুব দিয়ে দেখা তোর নামে যত শব্দ
কথা উড়ে গেলে ধরে ফেললেই পারতিস
কাটা ঘুড়ি মেখে মেঘেরা বিপ্রলব্ধ
চিঠি হয়ে যাক আকাশের যত আর্তি।
দুটি জুঁইফুল, টুলটুল করে সন্ধে
টিমটিম জ্বলা তেলকুপিটাই ভরসা
নীলাভ জ্যোৎস্না উঁকি দেয় কটিবন্ধে
দুটি গলি ছেড়ে তোর নামে ছিল বর্ষা।
আচমন সারা ফোঁটা ফোঁটা যত ঝুমকো
রতি রতি দাম গড়ালে বিকেল সন্ধ্যায়
কুচিকুচি কাচ, অভিমান যত ঠুনকো
প্রতিপদ ঢাকা নিবিড় রজনীগন্ধায়।
তবু সাঁতারের, ডুব সাঁতারের দিনটি
মৌসুমি বায়ু সব জানে অনাসৃষ্টি
ছাতা ভুলে গেছি। জানতিস বল্ বিন্তি
দুটি গলি পর... আমি, তুই আর বৃষ্টি!!
রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২
তৃষ্ণা বসাক
নব্বই সিরিজের কবিতা
ভালবাসা (১)
রেখেছি আঙুল
তার একান্ত আঙুলে,
এর মধ্যে অন্য কোন আঙুলের খেলা
(সুতোর নাচনে যথা
পুতুলের হেলা নিষিদ্ধ করেছি)
#
তারপর দুদণ্ড জিরোই,
সে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে,
তাকে তুলে রাখি
তার হাত থেকে খসে পড়া বই,
চশমা খুলে রাখি চোখ থেকে,
পাশের চেয়ারে বসে একদৃষ্টে চেয়ে থাকি,
পায়ের নখ থেকে চুল অব্দি
আমি তার আদরিণী হই,
শুধু আর ঘুমোতে পারিনা,
এর পর কোনদিনই ঘুমোতে পারি না।
ইতিহাস
একজন চল্লিশোত্তর, আর একজন পঁচিশ ছুঁই ছুঁই,
দুই মিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে এই দুই পুরুষ,
একজন ইতিহাসমগ্ন, খুব দূরবর্তী কিছু নয়,
বছর পনেরো আগে এই জায়গা কীরকম ছিল...
অন্যজন শুনতে শুনতে
ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখে,
শ্বেতপাথরের এই স্বপ্নোত্থান গ্লসে নাকি ম্যাটে...
#
একজন চল্লিশোত্তর, আর একজন পঁচিশ ছুঁই ছুঁই,
তরুণীটি কোনভাবে মাঝখানে ছিল না,
অথচ সে সারাক্ষণ দেখে গেল
জল ভেঙে ভেঙে এগোচ্ছেন উত্তর চল্লিশ
ফেরার সময় তাঁর দুই হাতে আখ্যান মঞ্জরী!
#
তরুণীটি কোনভাবে মাঝখানে ছিল না,
বিশীর্ণা যমুনা নিয়ে সে বড় ভাবনায় ডুবে ছিল,
যেমন যেখানে ছিল ফিরে গেল উপাখ্যানমালা,
গ্রুপ ফটোয় তরুণী দেখে
ধড় আছে, মুণ্ডুখানা নেই!
বহুদিন হয়ে গেল, চাদর পালটানো হল না
এসেছি বিশেষ কাজে,
হোটেল ঠিক করাই ছিল,
শুধু চাবি নেওয়া
আর এক লাফে তিন-চার সিঁড়ি,
কোন সঙ্কেত নয়, চাবি, এমনি সাধারণ চাবি।
ঘর খুললাম আর ঢুকে পড়লাম,
ঢুকে পড়লাম আর ব্যাগ রাখলাম,
ব্যাগ রাখলাম আর...
আয়নায় মেরুন টিপ, ছেঁড়া চুল, অসংলগ্ন চুল,
সাত দিন থাকলাম, চাদর পালটানো হল না,
ওখানেই ফুল পড়ল, ওখানেই ভেসে উঠল মাছ,
আঙুলের ফাঁক দিয়ে অনর্থক গলে গেল বালি,
বহুদিন হয়ে গেল, চাদর পালটানো হল না!
শীর্ষা মণ্ডল
না-ফেরা কবিতাগুলির উড়ালপুল
সুদীর্ঘ পথটির শেষ – মাখামাখি আঁকা ফুলের পাপড়ি দ্যাখো জারুলের রঙে দ্রবীভূত গড়াগড়ি; যেন একদা একটি গাঢ় অস্তমিত সূর্যাস্তের ময়দান – লণ্ঠন নিবু নিবু হয়ে আসা আকাশী শরীর চিরে যায় পাখিটির নিস্তব্ধ উড়ানে
এভাবে ফেলে রেখে যাওয়া – ঘর-বাড়ি-কফিহাউসের ময়দান জুড়ে বাউণ্ডুলে আঙুলের প্রলাপ, যেন শান্ত কোনো পাখি আরও শান্ত হয়ে গেছে ইলেক্ট্রিসিটির নব্য ছোঁয়ায়, মরা রাতের পেট চিরে সকালের ছানা বের করে আনছে প্রকৃতি, আর অতীব সন্তর্পণ দিয়ে ফ্যাকাশে চলে যাওয়ার কপালে এঁকে দিচ্ছে না ফেরার চুমু
তোমার চলে যাওয়া দিয়ে একটা আস্ত ক্যালেণ্ডার এঁকে ফেলা যায়, অথবা ভাস্করের যে কোনো কবিতা – হু হু করে কাঁদতে থাকা হাওয়ার নিঃসঙ্গতা – মরুভূমির বুকে, ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া রক্তসংবহনহীন ক্যাকটাসের অস্ত্রকেও, এরকম চলে যাওয়া বুকে নিয়ে আমারই মতো মরে গেছে পৃথিবীর সমস্ত প্রণয়ী মৌমাছির দল – শুধুমাত্র পুরুষ হবার শাপে যারা অমরত্ব নামের কবিতাগুলিকে তাচ্ছিল্য করেছিল একদা
শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২
জয়ীতা ব্যানার্জী
কৌশিক সেন
অবেলার খন্ডদৃশ্যগুলি
-১-
দৃশ্য পট থেকে শঙ্খচিল উড়ে গেলে তোকেই বসিয়ে রাখি স্বপ্নের কিনারায়। ভরদুপুরে গোলাপি বাতাবীলেবু ঠুকরে খায় নাম না জানা পাখিরা। জানলা দিয়ে দেখি বিক্ষিপ্ত রোঁয়া, রস, রমণ, রিরংসা। নিস্তেজ হাতে চাকা ঘুরাই অস্তাচলের দিকে।
-২-
অনেকটা চাঁদের মতো। অস্পষ্ট আলোয় বড়ই কাকতালীয় সে কলঙ্ক। নিষাদের লক্ষ্যভেদী তীর ধেয়ে আসে নিষেককামী শুক্রবীজের দিকে। অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকে মায়ের দূরসম্পর্কের চাঁদভাই। যাকিছু রিক্ততা, সবটাই রেখে আসি ভুবনডাঙার মাঠ বরাবর।
-৩-
চলে আসি। স্বাতিনক্ষত্রের আলোয় রেখে আসি অবধারিত বদনাম। বেগুনী আলোয় স্নান সারে হলুদবনের হরিণীরা। পথ ভুলে যায় নদীর ছায়াপথে। আমি চলে গেলে আমার এঁটো রেকাবী নামিয়ে রাখে মা। রূপকথার আলোয় স্পষ্ট হয় উচ্ছিষ্ট মাছের কাঁটা আর ক্ষুধার্ত আঙুলের দাগ।
-৪-
এখন রবিবার। কয়েকদিন ধরেই। দুপুরের গরাদে দোল খায় মাসকাবারি মুদিখানার ফর্দখাতা। খাতার পাতায় পাতায় এখন চড়াইপাখির মিথুনদৃশ্য। তেল হলুদে ভিজে ওঠে পাড়ার বিধবা ঠাকুমারা। মধ্যরাত পেরোলেই কাঁচাঘুম ভাঙিয়ে ছুট দেয় হারামজাদা সোমবার!
-৫-
পাশবালিশের গান শুনি। পথের দুধারে গজিয়ে ওঠা শিয়ালকাঁটার ঝোপে প্রজাপতির মতো নির্ভার স্বরলিপি সব। কানের ভেতর ডুগডুগি বাজিয়ে ভালুকনাচ দেখিয়ে গেছে দূরগাঁয়ের শাওনচাচা। কোর্টের বাজারে বিণ বাজে আজকাল। তালে তালে মাথা নাড়ে জাত খড়িশ।
-৬-
মৃত্যুর পূর্ববর্তী নিসর্গ এখন। পলেস্তারা খসা দেয়ালে জায়গায় জায়গায় এখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস। প্রশ্নাতীত কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। নিপাতনে সিদ্ধ সবকটি কবিতাই এখন প্রকাশিত হবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। আমার নির্বাণলাভ হলনা আর!
সব্যসাচী মজুমদার
ও জানে বাহার
দেবাশিস সাহা
পারসেপশান
গভীর জঙ্গলে হারিয়ে যায় একটি ছেলে
ছুটতে থাকে খালি এদিক ওদিক
অন্ধকারকে ওর ভয় করে।
একফোঁটা আলো চকিতে চোখে পড়ে।
এত অন্ধকারে সূচাগ্র নিশানা যেন,
ছেলেটি বাঁচার স্বপ্ন দেখে আবার-
যত ছোটে, আলো তত বড় হতে থাকে
আরো ছোটে, আলোর আরও কাছে যায়
হঠাৎ আলোর সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়--
ভাসতে থাকে-
পঁচিশ বছর এভাবেই ভেসে ছিল ছেলেটি।
একটা দারুন কবিতা ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিল
অন্ধকারের কাছে। কালোর কাছে।
এত আলো ওর ভাল্লাগে না !
সম্প্রতি কবিতা উৎসব থেকে ফিরে
জ্বালিয়ে দিয়েছিল সব পাণ্ডুলিপি।
দাউদাউ করে।
মূল্যহীন হবে সব- নিষ্পাপ কনফেশান।
বিচারকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত
পরিপাটি করে খাওয়ালাম আপনাকে।
খুঁটে খুঁটে এনেছিলাম শস্য দানা
আরও কতো মশলার সমাহার-
চেটেপুটে খেলেন আপনি।
থালা ফেরৎ নেওয়ার সময় হয়েছে। জানি
জানি এই মুখচোরা
পেট-ভরার খবর নিতে ভুলে গেছে।
ভালো মন্দ বলে যাবেন আপনি।
ত্রিবেণী সঙ্গম
মনোযুদ্ধে হার মেনে যাই রোজ
নিত্যকালের সকাল-সন্ধ্যে,
কারা যেন শাসিয়ে চলে অহরহ-
কল্মিলতার মতো বেঁকে যায় শিরদাঁড়া
ভালো-মন্দ'র ত্রিবেণী সঙ্গম জুড়ে থাকে সততা।
ওলট-পালট হয়ে ওঠে পাপ-পূণ্য'র অস্ত্র
এতো করেও মন পাখি খুশি হয় না,
মেলে না বাস্তু-বিবাহ শাস্ত্র।
অরিত্র সোম
সিঁড়ির আড়ালে - ৫
জানলার দিকে, সোজা চোখে
তাকিয়ে আছে
ইডিয়ট চেয়ারটা
দেখছে ঝুপড়ির ওঠানামা
দেখছে, সেসব গিলে নিলে কী করে
আরও পয়মন্ত রূপ পায় কিশোরী…
শিরদাঁড়া জমে যায় ঘামে
ক্রমশ আসবাব হয়ে ওঠার আগে
আমি শেষবার ডাকতে চাই নীহারিকা!
চেয়ারটার মাথা থেকে খসে গেল মেঘ।
দেওয়াল নেই
টিভি নেই – ভেতরে
ঝুপড়ির মেয়েটা ঘষে ঘষে
বুকের ময়লা তুলে রাখছে
ছেঁড়া মাংসের ওপর ডলে দিচ্ছে সিগারেট
নিজস্ব শহরের ওপার হতে – ২৬
মনে পড়ছে অ্যাম্বুলেন্সের কথা। ভারী হতে হতে মানুষটা হাত চেপে ধরল। গত দুদিনে নখ বেড়েছে। ডান কনুই ছড়ে যাচ্ছে মৃতের আঁচড়ে। এই করেই তুমি ঢুকে পড়ছ? চাদর থেকে সুন্দর জল পড়ে। ভিজে ওঠে সিঁড়ি। এইভাবেই পৌঁছতে চাও দরজায়। চাও, সময় থাকতে আঁচড় পড়ুক ডাকবাক্সে…
তিনজনের লাইন পেরিয়ে এখন জংধরা দরোজায়। স্থির হাত আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছ মুখে। ঘামে ভেজা জামা ছাড়তে পর্যন্ত পারোনি। ডাক পড়েছে। হোলিকার ঘর পেরিয়ে তোমায় তুলে নেওয়া কোলে। এখন তুমি শিশু; অসীম অক্লান্ত এক বালক মাত্র…
কেন মনে পড়ছে আজ? কেনই বা দাগ লেগে আছে চাদরে? সারা বাড়ি ঘুরে আমার কাছে এসেছে যে, তাকে কী বলে জল দেব? নিম দেব? সে শুধু ছবি চেনে। স্পর্শ চেনে।
তোমায় চেনে কি?
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ১
একবিংশ শতকের এক অক্টোবর মাসে নিজেকে ছড়িয়ে রেখেছি বিছানায়। পরবর্তী দশ বছরের কথা ভাবতে গেলে ঘুম আসে না। জেগে থাকতেও ইচ্ছা করে না। এমনই এক আধিভৌতিক পরিস্থিতিতে পোকারা তা দেয়। প্রজন্ম বা অভিযোজনের ভাবনা তাদের কেউ শেখায়নি। ওসব বড়োলোকি কারবার – এমনটাই লেখা থাকে পাঠশালার নোটবুকে।
হাবিজাবি লেখা ছাড়া আর বিশেষ কাজ নেই। পরবর্তী দশ বছরে আমার লেখা ঠিক ক’টা উইয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে – এটা নির্ধারণ করতে পারিনি বলেই খাদান ভরে রাখছি। ঠিক যেমন বাবার দেরাজে ধুলো খায় মেডিক্লেইম। ঠিক যেভাবে এই মিনিট দুয়েক ধরে মায়ের চিৎকার কানে আসছে। ভাত পোড়ার গন্ধ পেতে পেতে একসময় মনে পড়ে নোবেল শান্তি পুরস্কারের কথা
দোতলার লোকটা আবারও ফ্ল্যাট কিনেছে…
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ২
এসব লিখতে লিখতে আবারও মনে হচ্ছে, আমি অজিতেশ হতে পারতাম। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণবশত আমি বেলঘরিয়ায়, মাছিমরা ড্রেনের পাশে অরিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সিগারেটের বোঁটা খসে রঙ পড়ছে। এমন অশ্লীল দৃশ্য উপভোগ করার জন্য এক বোতল বাংলা দরকার। সঙ্গে সিরকায় ভেজা আদা, আর ছোলা। কিন্তু আমি মদ খাই না।
এবং এই মুহূর্তে আমার কাঁচুলি থেকে খসে পড়েছে আরও একটা ময়ূরপঙ্খী।
একটা ন্যাংটা কালো ছেলে, আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে রাস্তা পেরিয়ে গেল। লোকে সাধারণত এদের পাগল বলে।
যাই হোক, এই যে আমি সম্পূর্ণভাবে অজিতেশ হতে পারলাম না, এর জন্য দায়ী কে? হতে যে পারলাম না, এর ফলে ঠিক কী কী ক্ষতি হল? এসব ভাবতে পারছি, কারণ আমার মনে হচ্ছে সমান্তরাল বিশ্বের কারাগার থেকে কোনো এক উপস্থিতি আমাকে সম্ভোগ করছে।
অজিতেশ কাকে বলে? সে কি উপস্থিত, আবার?
আপনারা কিছু জানেন?
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৩
মানুষ আর পাঁঠার অস্থির মধ্যে তফাৎ কোথায়?
আত্মা বিসর্জন দিতে দিতে এই প্রশ্নটা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের; অর্থাৎ আমি এবং নীহারিকা। ছাব্বিশ বছরের জীবনে আমার প্রেমজ পরিণামের শতকরা হিসেব ১.০০২। বাকি জাহান্নামে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় যে পরিচিতি, তাহার নাম নীহারিকা। এক অনাবিল পাহাড়ি ধসের মতো সে আমার জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। অথচ এতটুকুও ক্লান্তি নেই এই কাজে। নীহারিকা তার ওষ্ঠস্থিত রক্ত এই সভ্যতার নদীতে ঢেলে দিয়েছে। সেখান থেকেই এত যুদ্ধবিবাদ, ট্রয়ের ঘোড়ার দাপাদাপি এবং আত্মহনন পদ্ধতির আবিষ্কার।
মৃত্যুতে কান্না আসে, এটাই স্বাভাবিক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বিধাতা। অটোস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে করতে মা’র মনেও কান্না আসে। নবমী নিশি পেরিয়ে পেরিয়ে গেছে দিন। বাজারের বাসি পাঁঠা মুখ ব্যাজার করে বসে আছে। বিবর্তনের ছোঁয়া? ঠিক উল্টোদিকেই অটোস্ট্যান্ড। পাশেই মা। ক্রন্দনরত…
মানুষ আর পাঁঠার মৃত্যুদৃশ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে ইতিহাস থেকে উড়ে যেতে লাগল পাতার পর পাতা। মন্দির-পরব-হাঁড়িকাঠ-জিহাদ-গিলোটিন-
এবং, নীহারিকা…
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৪
অজিতেশ আত্মহত্যাপ্রবণ। অতএব, আমিও। এমত সিদ্ধান্তে পৌঁছোবার জন্য কতকগুলো সিঁড়ি দরকার। আপাতত সেগুলোই একত্রিত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এমন নিকট স্বভাব পৃথিবীর পছন্দ নয়। সতত শান্ত ধরিত্রীকূলের স্বপ্ন দেখেন লেনন; কিন্তু ধরিত্রী কি তা ধারণ করেন? বরং সমস্ত সৃষ্টিই এক নিশ্চিত হত্যালীলার ফলপ্রকাশ – এমন সম্ভাবনাই বারবার খেলা করে খাতার পাতায়।
এত কথার মাঝে ব্যাগভর্তি ধূপকাঠি নিয়ে স্টেশনের দিকে হাঁটা দিল ছেলেটা। প্রথমে খেয়াল করিনি, অজিতেশ দেখিয়ে দিল। দেখাল খাটো হয়ে আসা চাদর, রোগা থপথপে একটা ছায়া, আর মাঝরাস্তায় চলতে পারার প্রতিবাদ। গতকাল এই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ হয়তো লাথি মেরেছিল পাথরে। ফাটা পায়ে আমরা সেই পথ পেরোচ্ছি। রক্তের নিশান ট্রাফিক সিগনালের মতো। মধ্যরাতের উল্লাস ক্রমশ দাঁড়া চিপে ধরছে। পর্দার এককোণে গুটিসুটি শরীর খুলে দিয়েছে মধ্য তিরিশ। তারই মিইয়ে আসা সন্তান ধূপ দেখাতে দেখাতে মুখে তুলে দিচ্ছে অন্ন…
অজিতেশের ঠোঁট চটচট করে। অগরু নেশা।
পশ্চাৎদৃশ্যে স্পষ্ট হচ্ছে সিঁড়ি।
ছেলেটা দেহ কুড়োচ্ছে। আমার, আপনার…
অজিতেশ বেপাত্তা।
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৫
দাদা বলেছিল পাহাড়ি বাঁক কখনও একরকম হয় না। প্রতিটা দৃশ্যেই নতুন কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে। হয়তো বা আদল পুরনো; একটু হেঁটে দেখলেই বোঝা যায় খাদের ধারেই লুকোনো আছে জন্মদিন।
আমার অবশ্য এসব লেখার কোনো মানে নেই। পথচলতি লোকের মতে, কাঠামোহীন একদলা অবয়ব। এই শরীরও দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। ওজোনস্তর ভেঙে যাওয়ার প্রভাব আমাদের সম্পর্কে পড়তে শুরু করেছে। আমরা প্রতিবাদ গিলে খাই। ভুল বানানের পোস্টার ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলো দেখে আমার আবার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর পাখিদের কোনো ডাকনাম নেই। ওদের শ্রাদ্ধ হয় না। রাত হলে সেই অসংখ্য অতৃপ্ত পাখির দল কুয়াশা হয়ে ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি বস্তিতে।
কারা যেন অভিযোগ করছিল প্রেম নিয়ে। স্টেশন তখনও নিজের খোলস ছাড়ায়নি। অন্ধকার লোহা-লক্কড় পেরিয়ে, আরও অন্ধ একটা গাছের পাশে এই বক্তব্য শুনিয়েছিল অজিতেশ। প্রেম বললে আমার অভূতপূর্ব সাধারণ একটা বাসের কথা মনে পড়ে। বানান খেয়াল রাখুন, কমরেড। মনে পড়ে সামনের সিটে দলাপাকানো একজোড়া দেহ। খবরের শিরোনাম অবধারিতভাবে তাদের বাঁচার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল। পৃথিবীপোড়া ক্ষত লিখতে লিখতে ভাইটাও নেমে গেল নদীতে। অতঃপর…
পূর্ণিমার চাঁদ অথবা ঝলসানো রুটি নয়। এক আশ্চর্য শাদা চাদর মুড়িয়ে রাষ্ট্র বসে আছে। কবিতা লেখার আহ্বান এলে তোয়ালের ভেতর থেকে একজোড়া হাত বলে – ক্লান্তি দাও
একজোড়া হাত;
লাল সুতো হলুদ সুতো…
একজোড়া হাত;
কঠিন। দুর্বোধ্য। আহাম্মক।
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৬
বছরের একটা সময় পোকাদের মৃত্যুসঙ্গম বেড়ে যায়। রাত পেরোলে করিডোর জুড়ে শুধুই বারুদের লাশ। পলক পড়লেই গোটা একটা সন্ধ্যার দাপাদাপি… ভুস! আর এমন বিপ্লবেই মনে পড়ে দেশ ও রাষ্ট্রের অভিধান।
কীভাবে পোকারা হাঁটে, কতটা চওড়া হয় ডানা – এবং অধিকারবোধ ছিঁড়ে নিলে কীভাবে হাজির হয় নিয়তি। আপাতভাবে রাস্তা পেরোলে এই সমগ্র বিষয়ই আমার ভাগ্যরেখা ছুঁয়ে ফেলে। মানুষ নয়; অজিতেশ তো ছারপোকাজন্মই চেয়েছিল। আড়ালে-বনবাসে রক্ত চুষে কোষাগার ভরো, তারপর সুযোগ বুঝে হেনে ফেলো কমণ্ডলু। আমাদের দেশে কোনো বাঁশিওয়ালা নেই (?)। তবুও পোকারা ছুটে চলে। আলো দেখে খাবি খায়। গান শোনে। শরীরে শরীর ভেঙে যায়।
অজিতেশ ছুটে মরে।
এবং পায়ে পায়ে জবুথুবু দেহ, আরও গুটিয়ে ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার ওপর।
আপাতত এই নৃশংস বিশল্যকরণীর চাপে, আমাদের রুমাল নাড়ানো ছাড়া কোনো গতি নেই…
রুমালের রঙ শাদা;
আমাদের ভাগ্যরেখা চিররুগ্ন, রক্তে-ক্রোধে আহাম্মক;
রুমাল ঘেমে ওঠে – জাহান্নাম… ইনকিলাব…
বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ, অজিতেশ।
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৭
পঁয়তাল্লিশ মিনিট নিজেকে সময় দিয়ে সরিয়ে রেখেছি। এই পঁয়তাল্লিশ মিনিটে অনেক কিছু হতে পারে। তবে এই দৃশ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে একটা চিমনি। দোনলা বন্দুকের মতো কাঁধ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার লক্ষ্য জানে না, শুধু জানে তাকে ধারণ করতে হবে। পেটের ভেতর নাগাড়ে ভেজে চলেছে পাপ-পুণ্য। একেকটা গলি, মোহিনী মিল, ওষুধের দোকান পার হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়েছে সংসার। সামনে ত্রস্ত মেঘ, চিলের ঠোকর খেয়ে মুখে জমে উঠেছে রক্ত। এইভাবেই নেশার কবলে পড়ে জীবন। হরিণের চোখ ঘনিয়ে ওঠে আততায়ীর স্পর্শে…
পঁয়তাল্লিশ মিনিটে বারবার হোমিওপ্যাথির শিশিটির দিকে ফিরে গেছে ইন্দ্রিয়। অপেক্ষার মুদ্রা পড়ছে সেখানেও। সকাল আর রাতের হিসেবের ভেতর যে আয়ু থেমেছিল, তা আজ নদীতীরে নাইতে যাবে। পরিপাটি করে সেজে উঠল রাসমঞ্চ। তার মাঝেই ছেলেটা বায়না ধরেছে গঙ্গা ছোঁয়ার। নিজেকে দেখার আয়না কি সে পায়নি এখনও? হাত ছেড়ে ছুটতে ছুটতে চলে যাচ্ছে ভেলা। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, ধর্মঠাকুরের ঠায় দৃষ্টি আমাদের দিকে। কিছু চোখ একে অন্যকে খুঁজবে বলে পেরিয়ে যাচ্ছে সাতজন্ম। তারা জানে, ঘণ্টা বাজলেই শেষ হয়ে যাবে অপেক্ষা। স্মৃতি ধুয়ে দেওয়ার পর আর পিছন ফিরতে নেই। তাকে রাত দাও, সমাধির ওম ছোঁয়াও…
যে যার মতো দোর বন্ধ করে বসে আছে। পথ থেকে একটানা পোকার আওয়াজ। দরোজার গা থেকে এখনও পায়ের ছাপ শুকোয়নি। সেদিকে তাকিয়ে শাদা থান আড়াল করে নিচ্ছে দুজন। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ধুলো বয়ে এবার পেরোতে হবে বাকি পথটা। এবং মনে পড়বে, পৃথিবী একটি সতত নদীমাতৃক সাম্রাজ্য। যেখানে ধুলো পায়ে অনন্ত ভিজে চলা ছাড়া আর কোনো মুক্তি নেই।
পাগলের অন্তিম ডায়েরি – ৮
এক…
দুই…
তিন…
চার…
ঘুড়িটা গোঁত্তা খেয়েই চলেছে। অসময়ের আকাশে এমন ঘুড়ি কে ওড়ায়, সেটা জানতে ইচ্ছা করছে। আপাতত ঘুড়িটার কোনো নাম নেই। স্থান-কাল-সময়েরও ঠিক নেই। পঞ্চাশ বছর পুরনো একটা ল্যাম্পপোস্টের বোঁটা ধরে সে গোঁত্তা খাচ্ছে। দিনের হিসেব নেই। অথচ আজ, কোনো এক অজ্ঞাতস্পৃহাবশত সে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
পাঠক নিশ্চয়ই হিসেব করছেন বেকারত্বের আয়ু। দেখছেন আমার পায়ের পাতা কতটা ফেটেছে।
ইতিমধ্যে আমাদের মধ্যে একটা ত্রিভুজ তৈরি হয়ে গেছে। একটা ঘুড়ি, তারকাটা ঘুড়ি, সেখানে সমানে দুলে চলেছে। মুহূর্ত আসন্ন – সেও জানে। তবুও অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। কীসের অপেক্ষা?
এখনও শীত পড়েনি সেভাবে। স্মশানের ওম ঘুরে বেড়াচ্ছে মফস্বলে। এতক্ষণে বুঝে গেছেন, এই লেখার কোনো উদ্দেশ্য-বিধেয় নেই। ঘুড়িটার মতো সেও গোঁত্তা খাচ্ছে
খাচ্ছে
এবং প্রচণ্ড আর্তনাদে একটা সাইকেল ছিটকে যাচ্ছে রাস্তার পাশে।
বড্ড অসময় জানলার দিকে চোখ চলে গেল সবার। রতি! রতি! এবং, চেয়ার ভাঙার শব্দ…
ঘুড়িটা প্রবল গোঙাচ্ছে। এখন আর কোনো টান নেই। পাঠকের দৃষ্টি খুঁজে নিয়েছে মাংসের দোকান।
আমিও নামছি;
আপনিও নামছেন;
আমাদের পায়ের তালে একটা বেরসিক নাট্যদৃশ্যের পর্দা পড়ছে।
পৌলমী ভট্টাচার্য
১] অলিভ গ্রিন করিডোর
অলিভ গ্রিন করিডোর
দুপুর নামলে উত্তাপ হয়
ভিঞ্চি সাহেবের হাতের তেলো
মশগুল হয় বাহারি রং -
ক্যানভাসের বুকে নামে রোমাঞ্চকর প্রবাস
গণিত সূত্র মেপে তুলি টানলে
ভিজে কাজল...
মন্দাক্রান্তা ছন্দর বেবাক অবয়ব -
বিদ্যাপতির পুরুষ পরীক্ষা
মাদল বাজায় কাজল কোণে
গ্রিন করিডোর মাতে মাতাল স্যাক্সোফোন
মোনালিসার ঠোঁটের ইন্টালেকচুয়াল এসথেটিক্স
আদ্রতা পৌঁছায় দুপুরের সেলসিয়াসের পাদদেশে
ইমপ্যাক্ট ফরম্যালিটি জারি হয়
অলিভ করিডোরের উত্তর সীমান্তে ।
২] পিচ্ছিল ডাক্ট বেয়ে
অক্সিন চক্কোর কাটে এরাবিডোসিস থালিয়ানায়
শিকড় রস খোঁজে -
নির্বাচন মহলে টহল দেয় গুপ্ত মনের চোরা শিকড়
কবিতার শরীর থেকে খুলে পড়ে
রেশম সুতোর অভিব্যক্তি ,
বে-আব্রু মুখ গুলো চকচকে...
স্টেরয়েড জৈব রাসায়নিক পদার্থ গড়িয়ে যায়
পিচ্ছিল ডাক্ট বেয়ে...
ফুৎকার তোলে সেকেন্ড ম্যাসেঞ্জার
লাল কোষের ছিদ্র ফুঁড়ে
বারবণিতার উদ্দাম ফাইন আর্টস -
পেপটাইড বিবস্ত্র প্রান্তরের কৌণিক দূরত্ব মাপে
বেহিসেবি,
স্বল্প বসনে তামাশা করে ব্রাসিনোস্টেরয়েড
ফুর্তি মাঠে শয্যা পাতে -
ফলিকল উদ্দীপিত হলে
কলম এবং অক্ষরের সহবাস চলে বিয়াড়ি ছন্দে
ডিনোমিনেটর রসদ খোঁজে ।।
অনিকেশ দাশগুপ্ত
অনির্বাণ দাশ







