রীনা রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রীনা রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

রীনা রায়



তিস্তারা স্বপ্নটুকু অন্ততঃ দেখার স্বাধীনতা যদি পেতো

''তিস্তা''
*******
পুতুলটা দেখ মা, কত সুন্দর বটেক.... মা, দেখ কেনে না....
উসব ঐ বাবুদের বিটিছেলেদের লগে--তুয়ার লগে অন্য কিনে আনবক রে মা......
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখে তিস্তা.....
তার মা সাধ করে তার নাম রেখেছিলো 'তিস্তা'।
ভারী পছন্দ তার নিজের নামখানা, ঠিক বাবুদের বাড়ীর মতো!
বাবুদের বাড়ীর মতো নামটো তার হইত্যে পারে, আর পুতুলটা কেন হবেক লাই?
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখে পুতুলটাকে, তার সেই স্বপ্নের কথা বস্তির অনেকেই শোনে আর হাসে।  উয়ার বড়ঘরের বিটি হইবার সাধ হইনছ্যে রে তিতার মা...(তিস্তা, তাদের মুখে তিতা-ই হয়ে গেছে)

সেদিন, স্বাধীনতা দিবসে, গলির মোড়ে এলাকার বিধায়ক পতাকা তুলতে এসেছিলেন। বস্তিবাসী সকলকে নিজে লাড্ডু বিলি করেছিলেন, তারপর তার দীর্ঘ বক্তৃতা গোল হয়ে বসে সবাই শুনেছিলো..... দেশের,দশের কত কথা তিনি বলে গেলেন, মাথায় না ঢুকলেও সবাই বসে ছিলো, রান্নার ঝামেলা কারুর ছিলোনা, কারণ বিধায়কের সৌজন্যে দুপুরে সবাই পেটপুরে খিচুড়ি খাবে এমনটাই আশ্বাস পেয়েছে তারা। সবাই খুশীতে মশগুল ছিলো।

রাজুদা তিস্তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলো নির্মীয়মান ফ্ল্যাটবাড়ীতে, তার প্রিয় পুতুলটা তাকে দেবে বলে...
---------------
এখন আর সে তাকায় না কোনো পুতুলের দিকে, কেউ পুতুলের কথা বললে আতঙ্কে সে নীল হয়ে যায়, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে......

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

রীনা রায়





"সিদ্ধান্ত"
*******
কেন জানিনা, আজ আর কান্না আসছেনা। চোখের জল শুকিয়ে গেছে বোধহয়।
বহুতল এপার্টমেন্টের তেরো তলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টা আজ নিয়েই নিলো ঋতজা।
নিচের দিকে চোখ যেতে দেখলো আজও একঝাঁক উজ্জ্বল প্রজাপতির মত  বাচ্চাগুলো হুটোপাটি করতে করতে স্কুল বাসে উঠছে।
ওই যে গাঙ্গুলিদা বৌদিকে রোজকার মত স্কুটিতে বসিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিতে গেলো।
সৌরভ বাজারের ব্যাগ হাতে হন্তদন্ত হয়ে ফিরছে। এসেই অফিস ছুটবে। মাসিমার এই এক বাতিক, প্রতিদিন টাটকা সবজি আনা চাই।
পুজোর সময় এদের সবার সাথে হইহই করে দিন কেটে যায়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঋতজা।
সবকিছু কালকেও একই নিয়মে চলবে। সবার জীবন ছন্দ মেনেই চলবে, শুধু ঋতজার জীবন আজকের পর থেকে বদলে যাবে।
" ইউথ্যানাশিয়া"..শব্দটা মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছেনা।
এই একটা শব্দ ওর জীবনটাকে সম্পূর্ন পাল্টে দেবে।
ও জানেনা ও কি করে স্পন্দনকে ছাড়া বাঁচবে। কিন্তু দীর্ঘ সাতমাস কোমায় থাকা মানুষটা কোনোদিন যে সুস্থ হয়ে উঠবে সে আশাও তো নেই। ঘাড় থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্যারালাইসিস হয়ে গেছে।
এই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় বলে কোয়াড্রিপ্লেজিক !
এখন তো শরীরের বেশিরভাগ অর্গানই কাজ করছেনা। শুধু বাইরে থেকে যন্ত্রের সাহায্যে ওকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরে সবাই বলা সত্বেও কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না ঋতজা।
একটা ছোট্ট একসিডেন্ট এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে ও বোঝেনি।
অফিসের কাজে সিমলা গেছিলো স্পন্দন। ফেরার পথে ড্রাইভারের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে শুরু করে। একপাল ভেড়া যাচ্ছিলো, পাস কাটাতে গিয়ে গাড়ি ধাক্কা লাগে পাহাড়ের গায়ে। কতটা ইনজুরি তখন বোঝা যায়নি।
মাত্রই তিন বছরের বিবাহিত জীবন হলেও স্পন্দন ওর জীবনে নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মত। এত এত স্মৃতি ... ওর জীবনের সবটাই তো স্পন্দন! স্পন্দন ছাড়া ওর অস্তিত্ব শুন্য।
দ্বিধাগ্রস্ত মন বারবার বলেছে, হসপিটালের বেডে কোমায় থাকলেও মানুষটা তো আছে, দুবেলা তাকে দেখতে তো পাচ্ছে ছুঁতে পারছে।
সে না থাকলে এই বিশাল শূন্যতা কিভাবে বইবে ও?
মনে মনে আউড়ায় ,পরজন্ম বলে সত্যি কিছু আছে কি না আমার জানা নেই। তবু আমি বারবার তোমাকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে চাই ।
....
আজ স্পন্দনের লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হবে।
বহুতলের তেরো তলায় একমুঠো ঘুমের ওষুধকে সঙ্গী করে ঋতজা চিরনিদ্রায় যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
"আমি আসছি স্পন্দন! তোমাকে ছাড়া আমি যে অসম্পূর্ন।পরজন্মে বিশ্বাস করিনা আমি। কিন্তু আজ ভীষণভাবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে জানো! পরজন্মে আবার আমাদের দেখা হবে .... "
ঘুমের ওষুধগুলো জলে গুলে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো ঋতজা।
ফোনটা বাজছে... কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করলো ঋতজা....
"মিসেস বাসু, আহুজা হসপিটাল থেকে বলছি। আপনি কোথায়? স্পন্দন বাবু তো রেসপন্স করছেন। এ যাত্রা বোধহয় আপনার প্রার্থনা ভগবান শুনেছেন।আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন..."

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

রীনা রায়




পরিবর্তন(পঞ্চম পর্ব)
*******
প্রায় দু মাস হয়ে গেল পরি অনন্যার কাছে আছে। ওর মা বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, কোথাও কোনো মিসিং ডায়েরিও নেই। পরির ছবি খবরের কাগজে, টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হলেও কেউ দাবি জানাতে আসেনি।
আশ্চর্য, এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের কেউ নেই ভাবলে অনন্যার অবাকই লাগে! অত রাত্রে ও একা যাচ্ছিলোই বা কোথায়? কোনো জামাকাপড় বা তেমন কিছু জিনিসও সঙ্গে ছিলোনা।
অনেক অনেক চেষ্টার পর ওর নাম বলেছিলো 'পরি', তবে অনন্যা ছাড়া আর কাউকেই ও যে বিশ্বাস করেনা, সেটা ওকে দেখলেই বোঝা যায়, আঁকড়ে থাকে অনন্যাকে।
সেদিন ট্রেন থেকে ওকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে কম ঝামেলা পোয়াতে হয়নি।
বৌদি কিছুতেই ওকে ঘরে ঢুকতে দেবেনা, অনেক অনুরোধ, উপরোধের পর বাইরের বারান্দায় ওকে থাকতে দিতে রাজি হয়েছিলো, ওখানে একটা চৌকি আছে, সেখানেই পরির তখনকার মতো শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
অনন্যার খুব খারাপ লাগলেও কিছু করার ছিলোনা।
বৌদির নিজের মেয়ে থাকা সত্বেও পরিকে পরার জন্য একটাও জমা দিতে রাজি হয়নি, শেষে অনন্যা, আলমারি খুলে ঋকের পুরোনো জামা প্যান্ট বার করে পরিকে পরতে দিয়েছিলো।
পরদিন ওকে নিয়ে থানায় গিয়ে অবাক, দ্যাখে, ছোটবেলার পাড়ার বন্ধু শুভাশীষ ওখানকার থানার এস আই।
শুভাশীষকে ও সব খুলে বলেছিলো, এদিকে, পরি অনন্যাকে কিছুতেই ছাড়তে রাজি না হওয়ায়, অনন্যা শুভাশীষকে অনিরোধ করেছিলো, যতদিন পরির মা বাবার খবর না পাওয়া যায়, ততদিন যদি পরি অনন্যার কাছে থাকে, শুভাশীষ জানিয়েছিল, সেটা আইন বহির্ভুত কাজ হবে, অনাথ আশ্রমেই পাঠানো হয় এদের।
কিন্তু অনন্যার একান্ত অনুরোধে, ব্যক্তিগত দায়িত্বে শুভাশীষ পরিকে অনন্যার কাছে রাখার পারমিশন দেয়।
অনন্যা এখনো ওকে স্কুলে ভর্তি করেনি, কারণ পরির মা বাবার খবর পাওয়া গেলে তো পরিকে চলে যেতে হবে, দুরুদুরু বুকেঅনন্যা রোজ প্রতীক্ষা করে, কখন শুভাশীষ ফোন করে ওর বাড়ির সন্ধান দেবে!
মেয়েটার ওপর কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে, ছাড়তে মন চায় না, কিন্তু পরের সন্তানকে আটকে রাখেই বা কি করে!
পরি প্রতিদিন ওর সাথে স্কুলে যায়, বড়দির পারমিশন নিয়েই অনন্যার সাথে জুনিয়র ক্লাস গুলোতেও যায়, অনেক কিছু শিখেও গেছে, এখন একটু করে গল্পও করে অনন্যার সাথে। অনন্যার ইচ্ছে থাকলেও ওকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেনা। মা বাবার নাম কি দেবে? পরি মা বাবার ভালো নাম বলতে পারেনি।
তাও যেটুকু কথা বলে,সবকিছু গুছিয়ে না বলতে পারলেও মোটামুটি একটা ধারণা অনন্যা নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে।
পরির মা বাবা দুজনেই আছেন, এমনকি ওর একটা ছোট্ট ভাইও আছে। ভাইটাকে ও বড্ড ভালোবাসে!
----
রাত প্রায় এগারোটা বাজে।খেয়েদেয়ে পরি ঘুমিয়ে পড়েছে, অনন্যা ওর মুখের দিকে চেয়ে মনটা মায়ায় ভরে গেল।কে জানে, ওর বাবা মাকে আদৌ পাওয়া যাবে কি না...মেয়েটাকে ছাড়তে মিন চায়না, এই কদিনেই বড্ড মায়ায় জড়িয়েছে!
নিজের ছেলেটাকে তো মনের মত করে বড় করা হলোনা, একে যদি কাছে রাখতে পারতো!
অনন্যা অনেক চেষ্টার পর ঋকের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে।
ছেলে এখন মাঝেমাঝেই মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে।
এইমাত্র ঋকের সাথে কথা বলে স্কুলের খাতাগুলো নিয়ে বসলো।মগ্ন হয়ে খাতা দেখতে দেখতেই মোবাইলটা বেজে উঠলো।
তাকিয়ে দেখে, ওর এস আই বন্ধু শুভাশীষ ফোন করছে....
বুকটা ধক করে উঠলো, তবে কি পরির মা বাবার সন্ধান পাওয়া গেছে? পরি কি তবে চলে যাবে?
মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ও বললো, "হ্যালো, বল কি খবর..."

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

রীনা রায়


#বিষয়:দ্বন্দ্ব

"সিদ্ধান্ত"
*******
রীনা রায় 
শুধু এক মিনিট, মাত্র এক মিনিট যদি বিবেকটাকে বিসর্জন দিতে পারে, নগদ পাঁচলাখ মধুরার হাতে আসবে! 
একসপ্তাহ ধরে মনের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করেও এখনো কাজটা করে উঠতে পারেনি।
বুড়ির তো হার্টের ব্যামো, কেউ সন্দেহও করবেনা, বুড়ির ছেলে মেয়ে তাকে এই টোপটা দিয়েছে।
বুড়ি না মরলে তারা সম্পত্তির ভাগিদার হতে পারছেনা।

বিদেশবাসী শিক্ষিত পুত্র কন্যার কাছে মা আজ মূল্যহীন, মা চোখ বুজলে, এই বাড়ি, সম্পত্তি বিক্রি করে ওরা বিদেশ ফিরে যাবে। একমাসের ছুটিতে এসে ওরা নার্স মধুরাকে এই টাকার অফার দিয়েছে।
একবছর ধরে পঁচাত্তর বছরের রেণুবালা দাশগুপ্ত বিছানায় শয্যাশায়ী, প্রথমদিকে উনি তো হাত পাও নাড়াতে পারতেন না, মধুরার পরিচর্যায় এখন অনেকটা সুস্থ।
মধুরার মনটা আনচান করে, এই মাসিমা ওকে মেয়ের স্নেহ দিয়েছেন, যখনি যা দরকার, সব দিয়েছেন, আর এই মাসিমাকে.....
কিন্তু পাঁচলাখ টাকা পেলে যে  মায়ের চিকিৎসার জন্য আর ভাবতে হবেনা, টাকাটা যে বড্ড দরকার, এত তাড়াতাড়ি এতগুলো টাকা যে আর কেউ ওকে দেবেনা।
"তুমি শুধু মিনিটখানেক বালিশটা চেপে ধরবে....", এইভাবেই বলেছিলো মাসিমার ছেলে, মেয়ে!
আজ ওরা আল্টিমেটাম দিয়েছে, ও না পারলে ওরা ওকে ছাড়িয়ে অন্য নার্স অ্যাপয়েন্ট করবে!
.....
মনের সব দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে , নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে মধুরা সোজা থানায় গেল ।
না ,ও পারবেনা। এক মাকে বাঁচাতে ও আর এক মায়ের জীবন নিতে পারবেনা!

রীনা রায়। 

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

রীনা রায়





তৃতীয় পর্ব:
এক একটা মানুষের চেহারা এমন হয় যে কিছুতেই বয়স বোঝা যায় না, কেমন একটু পাকানো টাইপের, এদের ত্রিশ বছর বয়সেও পঞ্চাশ মনে হয়, আবার সত্তর বছরেও পঞ্চাশ লাগে।
শেখরকে দেখতে ঠিক ঐ ধরনের, ওর বয়স এখন ছত্রিশ/সাঁইত্রিশ হলেও ওকে দেখে পঞ্চাশোর্ধ মনে হয়। নিজের এই পাকানো চেহারাটা নিয়ে শেখর একটুও খুশী নয়। সারাক্ষণ চোখে মুখে কি যেন একটা বিরক্তি লেগে থাকে, কোনো কিছুতেই যেন তৃপ্ত নয়।
চেহারা অনেকসময়ই একটা মানুষকে বিচার করতে সাহায্য করে, তার ইতিহাস বলে দেয়।
যেমন শেখরকে দেখেই বোঝা যায় ওর চলার পথটা মোটেও মসৃণ ছিলোনা এবং সেটা একশভাগ সত্যি।
শেখরের বাবা একটা প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন। তখন বেতনও পেতেন খুবই কম। কোনোরকমে দিন গুজরান হতো। তখন শেখর সবে ক্লাস এইট, আচমকাই বাবার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়, দিনদুয়েক টানাপোড়েনের পর উনি মারা যান। জমানো পুঁজি কিছুই ছিলোনা, যেটুকু ছিলো বাবার চিকিত্সায় তাও শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই শেখরকে রোজগারের চেষ্টা করতে হয়। বাড়িতে ওর মাও টুকটাক সেলাই ফোঁড়াই করতেন।
সারাদিন নানারকম ছোটোখাটো কাজ, টিউশন পড়ানো আর রাত জেগে পড়াশোনা করে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে শেখর একসময়ে ইতিহাসে এম এ পাশ করে ফেললো। এরপর ভগবানের দয়ায় স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করে একটা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে চাকরিও পেয়ে গেলো।
কিছু টাকা জমিয়ে শেখর ততদিনে একটা দোতলা বাড়িও করে ফেলেছিলো।
শেখরের কোনো এক দূরসম্পর্কের পিসির ননদের বাড়ি ছিলো ওদের পাড়াতেই। কলেজে যেতে আসতে অনন্যাকে উনি দেখতেন।
অনন্যার তখন এম এ ফাইনাল ইয়ার। ইউনিভার্সিটি বাড়ি থেকে খুব দূরে ছিলোনা, তাই ও বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতো। একদিন বাড়ি এসে দেখে পাড়ার ঐ কাকিমার সাথে আরও দুই ভদ্রমহিলা বসে আছেন । মা ওকে ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো, ওনারা নাকি ওর জন্য বিয়ের সম্বন্ধ এনেছেন।
বাবার রিটায়ারমেন্টের সময় এগিয়ে আসছিলো, তাই ওর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও বিয়েটা হয়েই গেলো। অবশ্য ওর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত ওরা অপেক্ষা করেছিলো।
শেখরকে তখন অপছন্দ না করার মতো কিছু ছিলোনা। বাবা বললেন, ''দেখেই বোঝা যায় পরিশ্রমী ছেলে, আমার মেয়ে ওখানে খারাপ থাকবেনা"। কিন্তু মানুষকে ওপরে দেখে আর কতটুকু চেনা যায়! যে ঘর করে সেই জানে।
শেখরের মায়ের মিষ্টি ব্যবহারেও মা বাবা মুগ্ধ হয়েছিলো। উনি মানুষটা সত্যি তেমন খারাপ ছিলেন না, কে জানে হয়তো ওরই কপালে সইলোনা! না হলে এত যে ভালো মানুষ, ওর সাথে এত দুর্ব্যবহার কেন করতেন?
যাইহোক, এক শুভদিন দেখে, অনেক পাঁজিপুঁথি বিচার করে ওদের রাজযোটক সাব্যস্ত করে বিয়েটা হয়েই গেলো!
প্রথম প্রথম ওর ভালোই লাগতো, ভাবতো ওর স্বামী কতো কেয়ারিং! দিনে দিনে ও বুঝতে পারলো আসলে মানুষটা ভীষণভাবেই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, নিজের পাকানো চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগে, আর অনন্যা যেহেতু দেখতে সুন্দর ছিলো তাই সবসময় ওর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতো। কারণে অকারণে ওকে সন্দেহ করতো, এবং দিনে দিনে রোগটা বেড়েই চললো।
একদিন ও মন্দিরে পুজো দিতে গেছে, লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ দেখলো শেখর লাইন থেকে বেরিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ও অবাক হয়ে যায়, তারপর দেখে একটু দূরে একটা ছেলে ওকে দেখছিল, তাকেই আড়াল করে শেখর দাঁড়িয়ে! দিনকে দিন এই পসেসিভনেস বেড়েই চললো। ও একা কোথাও বেরোতে পারতোনা, এমনকি ওর কোনো প্রয়োজনে টাকা পয়সা নিলেও তার প্রতি পয়সার হিসেব দিতে হত। কারুর সাথে ফোনে কথা বললে মোবাইলে স্পীকার অন রাখতে হতো। বাপের বাড়ি গেলে সঙ্গে করে গিয়ে আবার নিজে নিয়ে ফিরতো।
প্রতি মুহূর্তের এই নজরদারি ওর কাছে অসহ্য হয়ে উঠছিল।
একবার সম্পর্ক ভাঙার কথাও ভেবেছিল। ঠিক সেই সময়েই ও সন্তানসম্ভবা হোল, অন্যদিকে ওর বাবাও হঠাৎই মারা গেলেন।
সবদিক থেকে ও যেন অসহায় হয়ে পড়লো।
(ক্রমশঃ)

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

রীনা রায়



দ্বিতীয় পর্বঃ
স্কুল, বাড়ি, বাজার, কলিগদের সাথে সময় কাটানো, মাঝে মাঝে ঋকের সাথে দেখা করে আসা, এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল অনন্যার।
ক্লাস ফাইভের ক্লাসটিচার ছিলো ও।
সেদিন রোলকল শেষ করে সবে পড়ানো শুরু করেছে, 
পিছনের বেঞ্চ থেকে রিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 'ম্যাম, অনিন্দিতা কাঁদছে', অনন্যা প্রথমে বুঝতে পারলোনা ঠিক কি হয়েছে, তারপর নিজেই উঠে দেখতে গেল কি হয়েছে, গিয়ে দেখে অনিন্দিতা নামের বাচ্চা মেয়েটা কাঁদছে আর চোখেমুখে প্রবল আতঙ্কের ছাপ।
বারবার জিজ্ঞেস করেও তেমন কোন সদুত্তর পেলনা,শুধু ওর ছোট্ট শরীরটা বারবার আতঙ্কে কেঁপে উঠছিল ।
অনন্যা ওর পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে চেষ্টা করলো ওর ভয় কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে, তারপর অনেক চেষ্টায় মেয়েটি যা বললো খানিকটা এইরকম, ও যে স্কুলভ্যানে করে আসে তার হেল্পার ও ড্রাইভার দুজনেই ওকে শারীরিক নিগ্রহ করে, আর ওকে ভয় দেখিয়ে রেখেছে যে কাউকে কিছু বললে ও আর কোনোদিন মা বাবার কাছে ফিরতে পারবেনা।
যেহেতু ও সবার প্রথমে গাড়িতে ওঠে, আর সবার শেষে নামে তাই বেশ কিছুটা সময় ওকে একা থাকতে হয়, ওরা সেই সুযোগটাই নেয়।
ও ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।
--
আর দেরি না করে অনন্যা সব ঘটনা স্কুলের হেডমিস্ট্রেসকে জানালো।
আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হল যে, মেয়েটির মা বাবাকে স্কুলে ডেকে পাঠিয়ে সব জানানোই শুধু নয়, ঐ পুলকারের ড্রাইভার ও হেল্পারকে দেরি না করে এখনই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ।
ঘটনা ছড়িয়ে পড়তে বেশী সময় লাগলোনা।
সমস্ত অভিভাবকদের ভিড় জমতে লাগলো স্কুল চত্বরে। অনেকেই বলতে লাগলেন তাদের বাচ্চারাও এইধরনের কথা বাড়িতে বলেছিল, এমনকি কেউ কেউ তাদের পুত্রসন্তানদের মলেস্টেশনের কথাও জানালো।
কিন্তু ছোটোরা কি বলতে কি বলছে ভেবে তারা আর গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু এখন তারা বিপন্ন বোধ করছে,সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে আতঙ্কিত।
হঠাৎ করেই অনন্যার ঋকের জন্য খুব মন খারাপ করতে লাগলো। একটা ঘটনার কথা আচমকাই মনে পড়ে গেল।
ঋক তখন সবে প্রি নার্সারীতে ভর্তি হয়েছে, ওদের ক্লাস টিচার একদিন গার্জিয়ান কল করলেন। এসব ব্যাপারে অনন্যাকেই যেতে হত।গিয়ে দেখলো আরও দুজন বাচ্চার মাকেও ডাকা হয়েছে।মিস ওদের জানালেন ঐ তিনটি ছেলে ক্লাসে ড্রেস খুলে নিজেদের প্রাইভেট পার্টে হাত দিচ্ছিলো।ওরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিল। 
পরে ছেলের সাথে কথা বলে অনন্যা জেনেছিল, বাকি দুই বন্ধুর মধ্যে একটি ছেলে তাদের এটা করতে বলেছিল, তার মায়ের সাথে কথা বলে ওরা জেনেছিল ওরা নতুন এসেছে শহরে, ভালো জায়গায় বাড়ি না পেয়ে এমন এক জায়গায় ওদের বাড়ি ভাড়া নিতে হয়েছে যেখানে পাশেই একটা বস্তি, ওরা দুজনেই সার্ভিস করে, ছেলের দিকে ভালভাবে নজর দিতে পারেনা, ছেলে বলেছে কাজের মাসির ছেলেটা তাকে ঐরকম করতে বলেছিল।
ঋক ভালো আছে তো? আচ্ছা, ঋক ওর সবকথা মন খুলে ওর বাবাকে, ঠাকুমাকে বলতে পারে তো? নাকি, ওর মনের কথা কেউ শুনতেই চায়না? 
বড়দির কাছে একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে অনন্যা বাড়ি ফিরে ঝটপট ব্যাগ গুছোতে থাকলো।
আধঘন্টা পরেই একটা ট্রেন আছে, ওকে এক্ষুনি ঋকের কাছে যেতে হবে।
(ক্রমশঃ)

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

রীনা রায়


"পরিবর্তন "
*********
আজ রোববার, স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই। অনেকদিন বাদে আজ অনন্যার ইচ্ছে হল ছুটিটাকে একটু নিজের মতো করে উপভোগ করার। কতদিন, মনে হয় যেন এই জন্মে নয়, সব আনন্দগুলো আগের কোনো জন্মে করে এসেছে। কতদিন ও যেন বিছানায় শুয়ে আয়েশ করতেই ভুলে গেছে, কতদিন কোনো সিনেমা দেখেনি, মন খুলে শপিংও করেনি।
যদিও বাজার হাট সবই এখন ওকে নিজেকেই করতে হয়, কিন্তু সে তো শুধুই প্রয়োজনের সামগ্রী কেনা, তাকে শপিং বলেনা!
আচ্ছা আজ মল্লিকাদিকে ডেকে নিলে কেমন হয় । সেও তো একা, ছেলে চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে গেল, কিন্তু মল্লিকাদি, স্কুলের টানে এখানেই রয়ে গেল।
মল্লিকাদির সাথে এখানেই লাঞ্চ করে, মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে একটা সিনেমা দেখে, তারপর যা মন চাইবে এলোমেলো শপিং করে কোনো রেস্তরাঁয় ডিনার সেরে ফিরলে কেমন হয় ।
হ্যাঁ, এখন ওকে বাধা দেবার কেউ নেই । এই ক মাসে নিজের ওপর বিশ্বাসটাও একটু করে ফিরে এসেছে ।
কতদিন হল,,,, প্রায় সাতমাস হতে চলল। প্রতিদিনের অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে সে মুক্তি পেয়েছে।
না ভাববোনা,,,,, ভাববোনা,,, ,, আমি ভুলে যেতে চাই, কিন্তু ভুলবো কি করে! ওরা যে ঋককেও কেড়ে নিলো।
তখনও ও চাকরিটা পায়নি, মা ছেলের ভরণপোষণে অক্ষম, এই অজুহাতে ওরা ছেলের কাস্টডি পেয়ে গেল ।
হ্যাঁ, সপ্তাহে একবার ছেলের সাথে দেখা করার পারমিশন্ ও কোর্ট থেকে পেয়েছে। ছেলের প্রতিদিন স্কুল, টিউশন থাকে, তাই ও রবিবার যেতো, কিন্তু এখন এই স্কুলের চাকরিটার জন্য ওকে অনেকটা দূরে চলে আসতে হয়েছে, তাই এখন আর ইচ্ছে হলেও হয়না। প্রায় ছয় ঘণ্টার জার্নি করে যাওয়ার পর সেদিন ফেরা সম্ভব হয়না। পরেরদিন স্কুল থাকে, ও অনেকবার চেষ্টা করেছে ছুটি নিয়ে ছেলের সাথে দেখা করতে, নতুন চাকরি, কয়েকবার ওর মুখ চেয়ে কনসিডার করলেও প্রতি সোমবার ছুটি দিতে স্কুল যে অপারগ সেটা বড়দি, সুমিতাদি জানিয়ে দিয়েছেন।
এখন ও নিজেকে অনেক সামলে নিয়েছে।
গরমের ছুটিতে ও যখন গেল, শুনলো ওরা সবাই ঋককে নিয়ে বেড়াতে গেছে ।আশ্চর্য, ওকে একবার জানানোর দরকারও মনে করলো না।
কেনই বা করবে,,,,, ওরা তো চায়না যে ঋকের সাথে ও দেখা করুক।
সম্বিৎ ফিরতেই দেখে ওর দুচোখ জলে ভরে গেছে । তাড়াতাড়ি উঠে বসে চোখ মুছে ভাবলো, যাই মল্লিকাদিকে আগে ফোনটা করে নিই, এখুনি আবার সীমা চলে এলে কি রান্না হবে না হবে ওকে সব বুঝিয়ে বলতে হবে। কিছু আনতে হবে কিনা দেখতে হবে।

সীমা ওর রান্না করা ছাড়াও বাকি কাজগুলোও করে দেয়। ও অন্য লোক রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু সীমার কথায় 'তুমি তো একলা মানুষ গো বউদিমণি, আর কাউকে রাখতে হবেনি বাপু, এ আমি একাই সামলে নিবো'।পরিবর্তে অবশ্য মাইনেটা ভালই নেয়। তা হোক, দশরকম লোকের থেকে এই একজনই ভালো।
ও অবশ্য প্রথমে রান্নার লোক রাখতেই চায়নি। মল্লিকাদিই জোর করেছে, বলেছে, 'রাখ, দেখবি, শরীর খারাপ হলে বা স্কুলে কাজের চাপ বাড়লে তখন কত উপকার হয়।তাছাড়া বাড়িতে একজনের সাথে দুটো কথাও তো বলতে পারবি!'
সত্যি, নিজের জন্য ও কোনোরকমে কিছু একটা করে চালিয়ে নিত, এখন তাও সীমাটার দৌলতে এটা ওটা খাওয়া হয় ।
ও কতবার বলেছে, তুই আমাকে বৌদিমণি বলবিনা, দিদি বলবি। কিন্তু কে শোনে কার কথা।মনে করালে তখন জিভ কাটে, আবার পরমুহূর্তেই সেই বৌদিমণি!
অনন্যা এখন আর কিছু বলেনা।
ওর স্কুল থাকলে সীমা সকালেই চলে আসে, ও যখন স্কুলে বেরোয়, সীমাও ওর সাথে বেরিয়ে যায় । আর রবিবার সীমা সারাদিন থাকে, মাঝে মাঝে বললে বা দরকার হলে রাত্রেও থেকে যায় । নিজের বাড়ীর প্রতি খুব একটা টান নেই। স্বামীটা মাতাল, রাত্রে এসে পেটায়। ও-ও মাঝে মাঝে নাকি দু চার ঘা দিয়ে দেয়, আবার কখনও কখনও খুব সেজেগুজে আসে, জিজ্ঞেস করলে সাতকাহন করে স্বামীর সোহাগের কথা বলে। ছেলে-মেয়ে নেই , একটা মেয়ে হয়েই মারা যায়, তারপর আর হয়নি। এদের বয়স কত আন্দাজ করা যায়না, জিজ্ঞেস করলেও ঠিকঠাক বলতে পারেনা।
মল্লিকাদিকে ফোন করার পর অনন্যা ভাবতে বসলো, কি কি রান্না হবে ।
কারণ স্বামী মারা যাওয়ার পর মল্লিকাদি এখন নিরামিষ খান ।
ও সীমাকে ডেকে বললো, "শোন, আজ নিরামিষ রান্না হবে। মল্লিকাদিকে
খেতে বলেছি।আজ আমি রান্না করবো, তুই চট করে কটা জিনিস কিনে আন।
অনন্যা মনে মনে ভেবে নিলো কি রান্না করবে, --নারকেল দিয়ে ভাজা মুগের ডাল, ঝিরঝিরে আলুভাজা, পোস্তবড়া, দই পটল, ফুলকপির তরকারি, ছানার ডালনা আর আলুবোখরার চাটনী। সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের বিখ্যাত লাল দই থাকবে।
সীমাকে বাজারে পাঠিয়ে অনন্যা স্নানটা সেরে নিতে বাথরুমে গেল ।

--ক্রমশঃ

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

রীনা রায়।


"তিতলি"
*******

ছোট্ট তিতলি ,ছটফটে তিতলি, ছোট থেকেই মাছ খেতে চায় না । মা অনেক চেষ্টা করেও তাকে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করাতে পারেনি। মা বলতেন "মাগো মেয়ে হয়ে জন্মেছো, পরের বাড়ি যেতে হবে, ওখানে কেউ তোমার আবদার শুনবে না।" তিতলি ঠোঁট বেঁকিয়ে চলে যেত।
বাবা বলতেন "ছেড়ে দাওনা, মা বাবার কাছে অন্তত একটু ডানা মেলে ভেসে বেড়াক, শ্বশুরবাড়িতে তো সব মেয়েকেই মানিয়ে নিতে হয়।" 
বাবার প্রশ্রয়ে , মায়ের আদরে তিতলি ডানা মেলে বেড়াতো।
চব্বিশ বছর বয়েসে তিতলি ভালবেসে বিয়ে করল নীলাজ্ঞনকে। বিয়ের আগে তিতলি, নীলাজ্ঞনকে বারবার বলেছিল, মাছের গন্ধেই তার বমি আসে, তাকে যেন মাছ খাবার জন্য কেউ জোর না করে।
নীলাঞ্জন বলেছিল তার মা খুব উদার মনের, সে কখনও সুপ্রিয়া ওরফে তিতলির ওপর জোর করে কোনও কিছু চাপিয়ে দেবে না। অষ্টমঙ্গলার পর শ্বশুরবাড়ি এলে, দিন কয়েক বাদে শাশুড়ি মা সুপ্রিয়াকে (এখানে সবাই তাকে সুপ্রিয়া বলে, তিতলি কেউ বলেনা, তার মনে হত তিতলি যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ) বললেন "দেখ বৌমা,সধবা মেয়েদের মাছ খাবোনা বলতে নেই, স্বামীর মঙ্গলের জন্য সধবা মেয়েদের পাতে প্রতিদিন একটু করে মাছ থাকা উচিত। অগত্যা স্বামীর মঙ্গলের জন্য তিতলিকে মাছ খাওয়া শুরু করতে হল, তার চব্বিশ বছরের অভ্যাস ত্যাগ করে তাকে নতুন অভ্যাস তৈরি করতে হল। প্রথম প্রথম তার বমি হয়ে যেত, শাশুড়ি মা বলতেন, "ও কিছু না, দুদিন পরেই অভ্যেস হয়ে যাবে। মেয়েমানুষকে সব অভ্যাস করতে হয়।" মাত্র দুমাস পর তিতলি আশ্চর্য হয়ে দেখল, এখন সে মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারে না, উপোষের দিনগুলো নিরামিষ খেতে তার কষ্ট হয়। পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনের সাথী নীলাঞ্জন একদিন রাত্রে হঠাৎ করেই কিছু না বলে, চলে গেল অনেক দূরে। 
তিতলি বিধবা হল, সমাজ নিদান দিল, মাছ মাংস খাওয়া চলবেনা। কারণ সে বিধবা, তার সমাজের নিয়ম মেনেই চলা উচিত। যে তিতলি পঁয়ত্রিশ বছর মাছ ছাড়া ভাত খায়নি, তাকে আবার নতুন অভ্যেস করতে হবে। মেয়ে তাকে জোর করে নিজের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে কিছুদিন থাকার পর ছেলে-বউমার সংসারে এল সে। মাস ছয়েক যাওয়ার পর বৌমা রুমা একদিন বলল, "মা দেখো, এখন আর কেউ অতো মানেনা, তুমি মাছ খাওনা, আমার একার পক্ষে নিরামিষ, আমিষ ঝামেলা পোয়ানো বেশ কষ্টকর হচ্ছে , সকাল দশটার মধ্যে এত রান্না, তারপর অন্য কাজও তো আছে..." মেয়ের সংসারে গিয়েও সে দেখেছে, সেখানে তার একার জন্য মেয়েকে নতুন করে সব ধুয়ে নিরামিষ রান্না করতে হচ্ছে। প্রথমদিকে হাসিমুখে করলেও শেষদিকে সেও যেন একটু বিরক্ত হত। 
ছোট্ট তিতলি এখন আর ছোট্ট নেই। তিনি এখন সুপ্রিয়াদেবী। ষাট বছর বয়েস তার। তিনি ভাবলেন, আর কতবার বদলাবো নিজেকে ? কতবার অন্যের ইচ্ছেকে নিজের ইচ্ছেতে পরিনত করতে হবে ? 
বৌমা রুমিকে তিনি ডেকে বল্লেন, "রুমি, তুমি আমার জন্য ভেবনা। হ্যাঁ, তোমার কষ্ট হচ্ছে আমি বেশ বুঝতে পারছি । আমি তো এখনও অথর্ব হয়ে যাইনি , নিজেরটুকু আমি নিজেই বেশ করে নিতে পারব। কাল থেকে আমি নিচের তলায় সব বন্দোবস্ত করে নেব।"
রুমি বলল, "মা তুমি রাগ করেছ জানি, ঠিক আছে, আমি সব সামলে নেব। তুমি এসব কথা বললে তোমার ছেলে দুঃখ পাবে।" ছেলে এসে অনেক বোঝানো সত্ত্বেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলালেন না। 
অনেক তো হল, তিনি ঠিক করলেন, বাকি জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচবেন। 
তাঁর খেতে ইচ্ছে হলে খাবেন, না হলে খাবেন না। 
তিনি মনে মনে ভাবলেন, নিজের ইচ্ছে, নিজের ভালোলাগা গুলোকে এবার সম্মান জানাবেন।

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

রীনা রায়


আলোর প্রতিক্ষায়"


                
তৃতীয় পর্ব

ও টর্চের আলোটা ফেলতেই দেখলো সবার মুখ রুমালে ঢাকা, একটা ভয়ের স্রোত ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল । ও দৌড়ে পালাতে গেল, কিন্তু তার আগেই ওরা ওকে ধরে ফেলল। ও চীৎকার করার আগেই ও রা ওর মুখ চেপে ধরল। ও প্রানপনে বাধা দেবার চেষ্টা করলো, কিন্তু তিনজন শক্তসমর্থ পুরুষের সাথে ও পেরে উঠবে কি করে? 
ওরা খুব সহজেই ওকে তুলে নিয়ে চলে গেল । তারপর তিনজন মিলে ওর ওপর পাশবিক অত্যাচার করে গেছে । কতক্ষণ ও জানেনা কারণ ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল । ওরা প্রত্যেকেই নেশাগ্রস্ত ছিল। ওদের সবাইকে ও সহজেই চিনেছিলো।নেশার ঘোরে ওরা নিজেরাই জানিয়েছিল।
 
অভিদা , মজুমদার বাড়ির ছেলে অভিষেক মজুমদার । তাকে নাকি ভালবাসতো, কিন্তু অপর্ণার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বন্ধুদের পরামর্শে নাকি সে ওই কাজ করেছিল । হুঃ, ভালবাসা! ভালবাসা মানে কি শুধু শরীরের চাওয়া? না, ও ক্ষমা করতে পারেনি ওদের, কোনোদিন পারবেও না ।
 
সনাক্তকরণের দিন ওকে ডাকা হয়েছিল, ও প্রত্যেককে চিনিয়ে দিয়েছিল । মজুমদার বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাবার কাছে এসেছিলো। পরিবর্তে শর্ত ছিল অপর্ণা যেন ওদের চিনতে অস্বীকার করে। বাবা কঠোরভাবে ওদের ফিরিয়ে দিয়েছিলো।
সেদিন ওর ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে সাড়ে আটটার সময় বাবা বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ও না আসায় বাবা ভেবেছিলো ও হয়তো বাড়ি চলে এসেছে।বাড়ি এসে যখন শোনে যে অপু তখনও বাড়ি আসেনি, তখন গ্রামের কয়েকজনকে বলে । তারপর সারারাত ধরে খোঁজাখুজি চলে, পুলিশেও খবর দেওয়া হয়।
শেষে ভোরের দিকে কেউ একজন ওকে সংজ্ঞাহীন অবস্হায় রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখে ।
 
দুদিন হাসপাতালে থাকার পর ও বাড়ি ফিরেছিল ।কিন্তু ফিরে আসার পর মনে হয়েছিল, কেন ফিরল? বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিল । সবসময় একটা আতঙ্কে থাকত, একটা ট্রমার মধ্যে দিন কাটতো।
তার ওপর মা ঐরকম অসুস্থ, কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল, শুধু অপুর দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তো।
 
মাসখানেক এইভাবে যাওয়ার পর পিসিমণি ওকে এসে নিয়ে গেছিলো। বাবাকে বলেছিলো, 'এখানে থাকলে মেয়েটাকে বাঁচানো যাবেনা, ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, ওখানেই ওর চিকিত্সা হবে'।
 
তারপর ওর জীবনটা পুরোটাই বদলে গেছিলো। ডক্টর আকাশ সেনগুপ্ত অসীম ধৈর্যের সঙ্গে ওকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল । প্রথমদিকে কোনো ছেলেকেই ও সহ্য করতে পারতোনা। আতঙ্কে চীৎকার করে উঠতো। আকাশ ওকে বাঁচতে শিখিয়েছে, আবার ও মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখেছে। আস্তে আস্তে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ও ফিরে এসেছে। নিজেকে তৈরী করেছে।
 
আর সবসময় তার পাশে পেয়েছে পিসিমণি, পিসেমশাই ও আকাশকে । আকাশ ওর ভীষণ ভালো বন্ধু । আর এখন তো স্মিতার সাথেও ভীষণ ভাল একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, স্মিতা আকাশের স্ত্রী। খুব ভাল মনের একজন মেয়ে । এদের জন্যই ও বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়।
শুধু পড়াশোনা করে কেরিয়ার গড়াই নয়। শারীরিকভাবে অপর্ণা এখন অনেক সক্ষম। ও এখন ক্যারাটের ব্ল্যাক বেল্ট ধারী। ও অনুভব করেছে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই প্রত্যেকটি মেয়েরই নিজেকে গড়ে তোলা উচিত । তাই ওর প্রথমেই মনে হয়েছে নিজের গ্রামের মেয়েদের কথা, আর সেজন্যই প্রথম সুযোগেই ও গ্রামে এসেছে ।
কিন্তু গ্রামের কেউই তো কোনরকম আগ্রহই দেখালোনা। শুধু তাই নয় গ্রামে ওর উপস্থিতিটাও যেন কেউ সহ্য করতে পারছেনা।
ও ঠিক করলো যে কদিন এখানে থাকবে , বাড়িতে মা বাবা ভাই এর সাথেই সময় কাটাবে, তারপর ফিরে যাবে।
দিন কয়েক বাদে অফিসের একটা কাজে ওকে কলকাতায় যেতে হল। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা ছিলো। ফিরতে একটু দেরীই হয়ে গেলো।বাসে উঠে দেখলো নয়না বসে আছে, ও একটু হাসলো কিন্তু নয়নার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তাই একটু দূরে অন্য সিটে গিয়ে বসলো। লক্ষ্য করলো নয়না কেমন যেন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে, একটু পরেই কারণটা পরিস্কার হল। তিন চারজন ছেলে মিলে নয়নাকে সমানে বিরক্ত করে যাচ্ছে । ভালো করে তাকিয়ে দেখলো, ওরা কেউই ওদের গ্রামের নয়। প্রতিবাদ করতে গিয়েও নয়নার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ও চুপ করে বসে রইলো। ভাবলো আর একটু পরেই তো ওরা নেমে পড়বে।
গ্রামে বাস থামতেই ও নেমে পড়ল, ওর পরে নয়নাও। বৃষ্টিটা বেশ জোরে পড়ছে, অপর্ণা ছাতাটা বের করলো। চারিদিক বেশ ফাঁকা, হয়তো বৃষ্টির জন্যই।
অপর্ণা একটু তাড়াতাড়িই হেঁটে যাচ্ছিল, হঠাৎ পিছনে গোঙানির আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখে ছেলেগুলো নয়নার মুখটা চেপে ধরে ওকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ।
তার মানে ছেলেগুলো ওদের পিছু পিছু বাস থেকে এখানে নেমেছে! অপর্ণা আর একটুও সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেল । ওদের হাত থেকে নয়নাকে উদ্ধার করতে অপর্ণার খুব বেশী সময় লাগলো না । নয়না তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ওকে আগলে ধরে ওর বাড়ীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে অপর্ণা বাড়ি ফিরে এলো।
একটু রাতের দিকে অপর্ণাদের বাড়িতে বেল বাজলো। 'এতো রাতে কে এলো দেখি' বলতে বলতে বাবা দরজাটা খুলে দেখে নয়নার বাবা, মা এসেছে।
 
'তোমরা এত রাতে? কোনো বিপদ ঘটে নি তো? '
আমরা একটু অপুর কাছে এসেছি।

অন্তিম পর্ব
অপু বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলেনি। কাকেই বা বলবে! মা অসুস্থ, শুধু শুধু টেনশন করবে । ভাইটা কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, ওর সাথে এসব কথা আলোচনা করা যায়না। আর বাবাকে ও কত দুশ্চিন্তায় ফেলবে? তাও ভেবেছিলো রাতের খাওয়ার পর বাবাকে বলবে, তার আগেই তো ওরা চলে এলো।
অপু এগিয়ে গিয়ে বললো, কাকিমা তোমরা ভেতরে এসো। ও তাকিয়ে দেখলো নয়নার মায়ের দুচোখ জলে ভেসে যাচ্ছে ।
 
কাকিমা ওকে দেখতে পেয়ে ওর হাতদুটো দু হাতে ধরে শুধু কেঁদে চললো, আর একটাই কথা বারবার বলে গেল ।তোকে অপমান করেছিলাম, তাই ঠাকুর আমাকে শিক্ষা দিলেন ।
 
কাকু ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, তুই আমার নয়নাকে রক্ষা করেছিস, আমার ঘরের সম্মান বাঁচিয়েছিস, ঠাকুর তোর মঙ্গল করুন, তোর সব ইচ্ছে যেন পূর্ণ হয়।
অপর্ণা একটু হেসে বললো, 'আমার চাওয়া টা তো তোমরা জানোই কাকু, ওইটুকু পূর্ণ হলেই আমার অনেকটা পাওয়া হবে।'

এদিকে বাবা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে । তখন ওরাই সব ঘটনা বিস্তারিত ভাবে বললো। বাবার দুচোখে জল, অপর্ণার মাথায় শুধু হাতটা রাখলো, অপর্ণার মনে হল ওর সব পাওয়া হয়ে গেছে ।

পরের দিন একটু বেলার দিকে অপর্ণা মেঘটা কেটেছে দেখে জামাকাপড় গুলো শুকোতে দিচ্ছিলো।
বেল বাজতে দরজা খুলে দেখে নয়নার ঠাকুমা এসেছেন । সঙ্গে নয়নার মা।
 
নয়নার মা-ই প্রথম কথা বললো। 'দ্যাখ না, মা তোর কাছে আসার জন্য এত জোর করলো যে না নিয়ে এসে পারলাম না।'
অপু মনে মনে ভাবলো, কয়েকটা মাত্র দিন আগেই তোমরা আমার মুখ দেখতে চাইতেনা আর আজ,,,,, মুখে বললো, 'এসো, এসো ভেতরে এসো।'
ও শুনেছিলো নয়নার ঠাকুমা বাঙলাদেশের মেয়ে । তখনকার দিনে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তারপর জোর করে ওনার বিয়ে দিতে গেলে উনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে গেলে কয়েকজন অসাধু লোকের হাতে পড়েন। তারা ওঁকে পাচার করার চেষ্টা করছিলো। তখন নয়নার ঠাকুর্দা ওনাকে উদ্ধার করেন ।ঠাকুমা আর বাড়ি ফিরে যেতে চাননি, তখন ঠাকুর্দা ওনাকে বিবাহ করেন ও গ্রামে নিয়ে আসেন ।

ঠাকুমা অপর্ণার হাত দুটো ধরে বললেন, 'সেদিন তুই আমার লগে কি কইবার তরে গেছিলি? আজ আমি নিজে তোর লগে শুনবার তরে এলুম।তুই আমার ঘরের মান বাঁচাইছস,,, ঠাকুর তোর মঙ্গল করবেন ।'
অপর্ণার মন আনন্দে নেচে উঠলো। তার আশা পূর্ণ হবে তাহলে!
 
ও ওর সমস্ত পরিকল্পনা বুঝিয়ে বললো।
ঠাকুমা সব শুনে বললেন, 'আর তোর চিন্তা করনের কিছু নেই, সব হয়ে যাবেখন্ ।'
ঠাকুমা এবার নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার সাথে কথা বললেন ।অনেকেই অনিচ্ছা সত্বেও ঠাকুমার পীড়াপিড়িতে মত দিতে বাধ্য হল।
এরপর কয়েকটা দিন খুবই ব্যস্ততার মধ্যে কাটলো। 
খুব রিলাক্স লাগছিল অপর্ণার।অবশেষে তার একটা স্বপ্ন পূর্ণ হল। 
এদিকে ওর ছুটি শেষ হয়ে আসছে, ওকে ফিরতে হবে । ওখানে 'অ্যালেন' যে ওর প্রতীক্ষায় দিন গুনছে।
------------সমাপ্ত-------


শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

রীনা রায়


"আলোর প্রতিক্ষায়"(দ্বিতীয় পর্ব)


 
তাদের এই গ্রামটা খুব ছোট, মুখে মুখে চাউর হয়ে গেছে অপুর গ্রামে ফেরার কথাটা । অনেকেই দেখা করতে এসেছে, কিন্তু অপু লক্ষ্য করে দেখেছে তার বন্ধুরা বা কোনো মেয়ে তার সাথে দেখা করতে আসেনি বরং ওরা যেন ওকে এড়িয়ে চলছে । কিন্তু কেন? যা ঘটেছে তাতে ওর নিজের তো কোনো দোষ ছিলোনা, তবে? ওর সমবয়সীদের না হয় বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু বাকিরা, যাদের সাথে ওর বড়ো হয়ে ওঠা তারাও তাকে দূরে ঠেলে দিল? 
একটু বেলার দিকে সে বাবার সাথে তাদের গ্রামের হাইস্কুলের হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেল । 
বাবা এই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক ছিলেন । আর এখন যিনি প্রধান শিক্ষক , তিনি তখন উপ প্রধান শিক্ষক ছিলেন। 
ওরা ঘরে ঢুকতেই তিনি নিজে উঠে দাড়িয়ে 'আসুন স্যার, ভেতরে আসুন ' বলে বাবাকে বসতে বললেন ।
প্রাথমিক কথাবার্তার পর অপর্ণা বলল, ' স্যার, আপনি বাবার কাছে আমার প্রস্তাবটা শুনেছেন নিশ্চয়ই,,,,,,, ' 
'
হ্যাঁ, কিন্তু কেউ তো রাজী হচ্ছে না। কি জানো তো, আমাদের দেশটাকে আমরাই এগোতে দিইনা। দেশ তো তখনই এগোবে , যখন আমরা আমাদের বাড়ীর মেয়েদের সঠিকভাবে মানুষ করতে পারবো। আর মেয়েরা যদি স্বনির্ভর না হয়,,,,, শুধু আর্থিকভাবে নয়, তারা শারীরিকভাবেও সক্ষম হলে তবেই দেশের উন্নতি হবে'
অপর্ণার প্রস্তাবটা ছিল এই যে, স্কুলের ছুটির পর সব ছেলে মেয়েদের যোগব্যায়াম এবং ক্যারাটে শেখানো । সে নিজে প্রথমে এককালীন কিছু অর্থ সাহায্য করবে, যা দিয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা হবে আর যিনি শেখাবেন তাঁর বেতন ও অন্তত একবছর ঐ টাকা থেকেই দেওয়া হবে। তারপর সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই খুব সামান্য বেতন নেওয়া হবে ।
কিন্তু , এদের কাছে এইসব শুধু সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়।পয়সা খরচ করে শরীরচর্চার কথা ওরা ভাবতেই পারে না। ছেলেরা তো তবু মাঠে ফুটবল খেলে, তাও ছেলেদের ব্যাপারে ওরা নিমরাজী হয়েছিল, কিন্তু মেয়েদের বেলায় কিছুতেই রাজী করানো যাচ্ছেনা । আর অপর্ণার বেশি আগ্রহ ঐ মেয়েদের জন্যই।
অপর্ণার মনে হয় এই গ্রামের মানুষগুলো কি মধ্যযুগে বাস করে? এদের কাছে পড়াশোনা শেখানো হয়, শুধু ভাল বিয়ে দেওয়ার জন্য! স্কুলে পাঠানো হচ্ছে এই যেন অনেক ।স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে সংসারের কাজকর্ম করুক , মানে বিয়ের পর যাতে শ্বশুরবাড়ীতে সুনাম অর্জন করতে পারে তারজন্য এখন থেকেই ট্রেনিং দেওয়া আর কি! অপর্ণার হতাশ লাগছিল তবু ও ঠিক করলো সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভাল করে বুঝিয়ে বলবে ।
পরের কয়েকটা দিন সে মান্তু, বুবুন, রিম্পি, টিকলি, সোমা, চম্পা সবার বাড়িতেই গেল, কিন্তু আশার আলো কেউই দেখালোনা।
এদিক থেকে দেখতে গেলে তার নিজের বাড়ি অত্যন্ত আধুনিক মনোভাবাসম্পন্ন । তার বাবা ইংলিশ এ এম এ পাশ করেছেন। অবশ্য সেদিক থেকে ভাবতে গেলে বাবা তো এই গ্রামের ছেলেই নয় । বাবার তো এটা মামার বাড়ি । বাবার মা ছোটবেলায় মারা যাওয়াতে দাদু নাকি আবার বিয়ে করেন । তখন বাবার মামা মামি বাবাকে নিজেদের কাছে এনে মানুষ করেন । বাবা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন, নিজের স্কলারশিপের টাকা থেকে উচচশিক্ষার খরচ চালিয়েছেন। বাবার সৎ ভাই বোনেদের সাথেও তাদের সম্পর্ক খুবই ভাল।মামার একমাত্র মেয়ে এখন দিল্লির বাসিন্দা । ঐ ঘটনার পর পিসিমণি যদি তাকে না নিয়ে যেতো, তাহলে সে হয়তো বাঁচার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলতো।
যাই হোক, এই করে করে বেশ কয়েকদিন পেরিয়ে গেল, অপর্ণা ঠিক করলো কাল নয়নাদের বাড়ি একবার যাবে । নয়নার ঠাকুমাকে গ্রামের অনেকেই খুব মান্য করে।প্রায় আশি বছরের একজন বয়স্কা মহিলা, তাকে রাজী করানো গেলে পরের ধাপ গূলো অনেক সহজ হবে।
পরেরদিন সকালে সে নয়নাদের বাড়ি গেল । নয়নার মা দরজা খুলে তাকে দেখে একটু বিরক্ত হয়েছে মনে হল। 'কাকিমা, ভেতরে আসবো? 
'
কি ব্যাপার? ' 
'
এই এলাম একটু' 
'
অ, আয়'
অপর্ণা এই কদিনে এইরকম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোনো বাড়িতেই সে উষ্ণ অভ্যর্থনা পায়নি। সে কিছু না বলে বাড়ির ভেতরে পা দিল। 
ভেতরে ঢুকেই দেখে নয়নার ঠাকুমা বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে যাঁতি দিয়ে সুপারি কাটছেন । 'কেমন আছো ঠাকুমা? আমি অপু, চিনতে পারছো? ' বলে সে এগিয়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। ঠাকুমা প্রথমে তার আপাদমস্তক দেখেন, তারপর বলেন, 'হ, বউমার লগে শুনি তোর কথা। তা আমাগো সনে কি কাম তোর?'
নয়নার মা কথার মাঝেই বলে ওঠেন, 'শোন অপু, তুই বিদেশে থাকিস, ওখানে কি করছিস আমরা দেখতে যাই না। তুই নিজে তো নষ্ট হয়ে গেছিস। আমরা গাঁ গজ্ঞে থাকি, মেয়ের বিয়ে দিতে হবে।তুই বাপু আমাদের বাড়িতে আসিস না।'
অপু কিছু বলতে পারে না, স্তব্ধ হয়ে যায় । তার মাথাটা কেমন দুলে ওঠে,,, সে নষ্ট মেয়ে,,, নষ্ট? সেই দিনটা যেন অপর্ণার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল। 
ও তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী । মেধাবী ছাত্রী হিসাবে বরাবরই তার সুনাম ছিল। 
তাদের গ্রামে দোল উৎসব বেশ ধুমধাম করে পালন করা হয়। অনেকের বাড়িতেই আত্মীয়- বন্ধু ওইসময় আসেন । দোল উৎসব উপলক্ষে মেলাও বসে । সেবারেও বাইরে থেকে অনেকেই এসেছিলেন। অভিদার কলেজের দুজন বন্ধুও এসেছিল। তাদের হাবভাব অপর্ণার একটুও পছন্দ হয়নি। 
কয়েকদিন কলেজ যাওয়া হয়নি, সেদিন ফিজিক্স এর প্রাকটিক্যাল ছিল, আর দুটো ইমপরট্যান্ট ক্লাস ও ছিল, তাই সে ঠিক করেছিল সেদিন কলেজ যাবে । মা বলেছিলো ফেরার পথে কয়েকটা জিনিস কিনে আনার জন্য। অপর্ণা বাড়িতে বলে গেছিলো যে ফিরতে দেরি হতে পারে । কারণ, যেদিনই ফিজিক্স এর প্রাকটিক্যাল ক্লাস টা শেষ পিরিয়ড এ থাকে, সেদিন কিছুতেই ওই পাঁচটার বাসটা ধরতে পারে না। বাড়িতে এটা সবাই জানে, কিন্তু কিছু তো করার নেই ।পরের বাসটা প্রায় দু ঘন্টা পরে। অনেকেই ফেরে, তাই অপর্ণা ক্লাস শেষ করে পরের বাসটাই ধরে। 
সেদিনও অপর্ণা ঐ বাসটাই ধরেছিল, 
কিন্তু ওর দুর্ভাগ্য যে সেদিন ও বাসে উঠে গ্রামের কাউকেই দেখতে পেলনা। মনের মধ্যে একটু খচখচ করলেও ও নিজেকে ক্রমাগত সাহস দিয়ে যাচ্ছিল । কেন জানিনা ওর মন কু ডাকছিল।
অনেকটা রাত হয়ে গেছিলো। বাস থেকে নেমে দেখলো আটটা কুড়ি বাজে। রাস্তা বেশি না হলেও কোনো আলো নেই । ব্যাগ থেকে টর্চটা বের করে ও দ্রুতপায়ে হাঁটা শুরু করলো।
গ্রামের মোড়টা আসতেই কতকগুলো আগুনের ফুলকি ওর নজরে পড়লো। ও একটু নিশ্চিন্ত হল। যাক্, এখানে আড্ডাটা আজকেও বসেছে । ও একটু এগোতেই কতকগুলো ফিসফিস আওয়াজ যেন ওর দিকেই এগিয়ে আসছে । ও থমকালো, কি হলো, ওকে কি কিছু বলবে ওরা?
-------ক্রমশঃ