ধারাবাহিক গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

শর্মিষ্টা দত্ত


অভিযোজন (৬)

আশ্বিনের সোনা রোদে ভেসে যাচ্ছে সবুজ ঘাসজমি। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা । বাতাসে পূজোর গন্ধ। দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলে  এখনো জনবসতি তেমন বেশী নয়।বাড়িগুলোও বেশ ফাঁকা ফাঁকা ,সামনে  বড় বড় মাঠ-পুকুর-বাগান নিয়ে  বেশ খোলামেলা পরিবেশ। পাপাইয়ের জন্মদিনে সকালেই তিতলি আর তিতিরকে নিয়ে প্রভা এসেছেন বড় ছেলের বাড়ি। উমার স্কুল আছে ,সে আসতে পারবে না।মল্লিকাও খুব ব্যস্ত ,পূজো আসছে। ওরা দুজন সন্ধ্যেবেলায় আসবে। 

তিতলি এবছর উমার স্কুলেই  ভর্তি হয়েছে ,সকালবেলা পিসির সঙ্গেই স্কুলে যায় ,একসঙ্গেই ফেরে । সাড়ে তিন বছরের তিতিরের সঙ্গে সারাদিন বকবক  করে সময় কেটে যায় প্রভার।আজ তিতলি স্কুলে যায়নি,দাদার জন্মদিনে নেমন্তন্ন খাওয়ার উৎসাহে দুইবোনই রীতিমত উত্তেজিত । পাপাইও খুব খুশি , বোন দুটো খুব মিষ্টি আর বাধ্য । সেও  আজ স্কুলে যায়নি , বাড়ির সামনের মাঠে তিন ভাইবোন আপাতত খেলায় মগ্ন।কালই গড়িয়াহাটের একটা বড় দোকান  থেকে পাপাইয়ের জন্য একটা জামাপ্যান্টের সেট কিনে এনেছিল মল্লিকা। হালকা হলুদ রঙের টি-শার্ট আর নেভি-ব্লু প্যান্ট। “মা ,এটা আপনি নাতিকে উপহার দেবেন জন্মদিনে ”। প্রভার বুকের কাছটা চিনচিন করে ওঠে।মল্লিকা এখন প্রতিমাসে তাঁর হাতে সংসারখরচের নাম করে বেশ কিছু টাকা দেয়। তাছাড়াও বাড়ির সকলের জন্য এটাসেটা তো আনেই।শুধু প্রণবের নামটাই এবাড়ি থেকে মুছে গেছে চিরতরে । 

বছরখানেক হল  মল্লিকা গড়িয়াহাটে একটা ছোট্ট  শাড়ীর দোকান  করেছে। সকাল দশটা থেকে রাত প্রায় আটটা অবধি দোকানেই থাকে সে । সকালে উঠে উনুন ধরিয়ে রান্নাবান্না সেরে ভাত খেয়ে টিফিনবক্সে রুটিতরকারি ভরে  নিয়ে সে বেরিয়ে যায়।

প্রণব মারা যাওয়ার পরে ভারতীর সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করতে করতেই ব্যবসার চেষ্টা করছিল মল্লিকা।প্রভাকে না বলেই যৎসামান্য যা গয়না ছিল ,তাই বেচে মূলধন যোগাড় করেছিল। বড়বাজার থেকে সস্তায়  শাড়ী কিনে পাড়াপ্রতিবেশী ,আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে দু-চারখানা বিক্রি হতে না হতেই উৎসাহ বেড়ে গেল। ভারতীকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপুর-ফুলিয়া থেকেও শাড়ী আনতে শুরু করল সে। তাঁতীদের বাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হতে হতেই তাঁতে ওদের কাজ দেখে নানারকম ডিজাইনের আইডিয়া আসে মল্লিকার মাথায়।কয়েকদিন ওদের সঙ্গে বসে, ডিজাইন  এঁকে বুঝিয়ে, সামনে দাঁড়িয়ে  থেকে কয়েকটা শাড়ী তৈরী করে আনতেই হটকেকের মত বিক্রী হয়ে গেল সেগুলো। আরও উৎসাহ পেয়ে গেল মল্লিকা। হাতে মূলধনও জমল কিছু। বছরখানেকের মধ্যেই গড়িয়াহাটে বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে সস্তায় একটা ছোট্ট ঘরও পেয়ে গেল। অল্পসময়ের মধ্যেই বেশ নাম হয়েছে তার দোকানের।দুটি মেয়েকেও সেলসগার্ল হিসেবে রাখতে হয়েছে। এবার পূজোর আগে বহরমপুর থেকে কিছু সিল্কের শাড়ী এনেছিল,এরমধ্যেই সব বিক্রি হয়ে গেছে। কসবায় একটা ছোট ঘরে চার -পাঁচটা মেয়ে সুতি আর সিল্কের ওপর ব্লকপ্রিন্ট করে।নিজের ডিজাইনে  কিছু কাঠের ব্লক বানিয়ে ওদের দিয়েও কয়েকটা শাড়ী বানিয়েছিল,ওগুলোরও খুব ডিমান্ড। মল্লিকা ভেবেছে এবার ম্যাড্রাস আর ব্যাঙ্গালোর যাবে একবার ,ওখান থেকে নিজে পছন্দ করে শাড়ি নিয়ে আসবে। কিন্তু অচেনা জায়গা ,প্রভা বা ভারতী কি একা যাওয়ার অনুমতি দেবেন ! 

সকালে প্রসূন ওদের পৌঁছে দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে চলে গেছে ,সেও ইউনিয়নের কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যেবেলাতেই আসবে। রেখা আজকাল ওবাড়ির সবাইকে বেশ সমঝে চলে ,এটা বেশ বুঝতে পারেন প্রভা। দুপুরে বেশ কয়েকপদ নিরামিষ রান্না করেছিল। প্রভা বললেন,“এত কিছু রানছ ক্যান বড়বৌমা? আমার তো একটা তরকারী হইলেই খাওয়া হইয়া যায়। ” বাচ্চাদের মাংস-ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে রেখা বলেছিল ,“আমার কাছে তো আর আপনি রোজ খান না মা, মাঝেসাঝে এলে আমারও তো ইচ্ছে করে আপনাকে একটু যত্নআত্তি  করি।চেহারাটা কি খারাপ হয়েছে আপনার , বলুন তো ! সারাদিন দুটো বাচ্চার ঝক্কি ...এখন তো আপনার একটু ভালমন্দ খাওয়া দরকার । তা না ..রোজ একটা তরকারী। ওরা তো মাছটাছ খায় ,আপনার জন্য তো আর একটা তরকারী রান্না করতে পারে । ”  স্পষ্টতই মল্লিকার প্রতি ঠেস ...দেওর মারা যাওয়ার পর তার বৌ যে আমিষ  সবই খায় এটা নিয়ে তার বাপের বাড়ীতেও কম চর্চা হয় না। আজ সন্ধ্যেবেলা তো রেখার দাদা ,বৌদি ,দিদি সবাই আসবে , নিজের চোখেই দেখবে সব ।প্রমোদের প্রমোশন হয়েছে, ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা দিয়ে অফিসার হয়েছে তাই এবার পাপাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে শ্বশুরবাড়ি ,বাপেরবাড়ি তো বটেই ,আরও বেশ কিছু লোকজনকে নিমন্ত্রণ করেছে রেখা। 

সন্ধ্যেবেলা মল্লিকার দোকানে চলে এল উমা। দুজনে একসঙ্গে যাদবপুরে যাবে। সঙ্গে একজন  বছর চল্লিশেক বয়সের ভদ্রলোক,আসাযাওয়ার পথে পাড়ায় কয়েকদিন ধরে ওঁকে দেখেছে মল্লিকা। উমা আলাপ করিয়ে দিল। ওঁর নাম তন্ময় সিরাজ ,ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন । কয়েকমাসের জন্য ঢাকা থেকে রিসার্চের কাজে এসেছেন , কলকাতার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ওপরে কিছু সার্ভে করছেন ।মাসতিনেক আগে  স্কুলেই আলাপ উমার সঙ্গে । ওরা কিছু বলার আগেই মল্লিকা বুঝে গেল কি হতে চলেছে । জীবন তাকে এই বয়েসের মধ্যেই শিখিয়েছে অনেককিছু। তন্ময়কে বসতে বলল মল্লিকা।

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

রীনা রায়




পরিবর্তন(পঞ্চম পর্ব)
*******
প্রায় দু মাস হয়ে গেল পরি অনন্যার কাছে আছে। ওর মা বাবার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, কোথাও কোনো মিসিং ডায়েরিও নেই। পরির ছবি খবরের কাগজে, টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হলেও কেউ দাবি জানাতে আসেনি।
আশ্চর্য, এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ের কেউ নেই ভাবলে অনন্যার অবাকই লাগে! অত রাত্রে ও একা যাচ্ছিলোই বা কোথায়? কোনো জামাকাপড় বা তেমন কিছু জিনিসও সঙ্গে ছিলোনা।
অনেক অনেক চেষ্টার পর ওর নাম বলেছিলো 'পরি', তবে অনন্যা ছাড়া আর কাউকেই ও যে বিশ্বাস করেনা, সেটা ওকে দেখলেই বোঝা যায়, আঁকড়ে থাকে অনন্যাকে।
সেদিন ট্রেন থেকে ওকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে গিয়ে কম ঝামেলা পোয়াতে হয়নি।
বৌদি কিছুতেই ওকে ঘরে ঢুকতে দেবেনা, অনেক অনুরোধ, উপরোধের পর বাইরের বারান্দায় ওকে থাকতে দিতে রাজি হয়েছিলো, ওখানে একটা চৌকি আছে, সেখানেই পরির তখনকার মতো শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
অনন্যার খুব খারাপ লাগলেও কিছু করার ছিলোনা।
বৌদির নিজের মেয়ে থাকা সত্বেও পরিকে পরার জন্য একটাও জমা দিতে রাজি হয়নি, শেষে অনন্যা, আলমারি খুলে ঋকের পুরোনো জামা প্যান্ট বার করে পরিকে পরতে দিয়েছিলো।
পরদিন ওকে নিয়ে থানায় গিয়ে অবাক, দ্যাখে, ছোটবেলার পাড়ার বন্ধু শুভাশীষ ওখানকার থানার এস আই।
শুভাশীষকে ও সব খুলে বলেছিলো, এদিকে, পরি অনন্যাকে কিছুতেই ছাড়তে রাজি না হওয়ায়, অনন্যা শুভাশীষকে অনিরোধ করেছিলো, যতদিন পরির মা বাবার খবর না পাওয়া যায়, ততদিন যদি পরি অনন্যার কাছে থাকে, শুভাশীষ জানিয়েছিল, সেটা আইন বহির্ভুত কাজ হবে, অনাথ আশ্রমেই পাঠানো হয় এদের।
কিন্তু অনন্যার একান্ত অনুরোধে, ব্যক্তিগত দায়িত্বে শুভাশীষ পরিকে অনন্যার কাছে রাখার পারমিশন দেয়।
অনন্যা এখনো ওকে স্কুলে ভর্তি করেনি, কারণ পরির মা বাবার খবর পাওয়া গেলে তো পরিকে চলে যেতে হবে, দুরুদুরু বুকেঅনন্যা রোজ প্রতীক্ষা করে, কখন শুভাশীষ ফোন করে ওর বাড়ির সন্ধান দেবে!
মেয়েটার ওপর কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে, ছাড়তে মন চায় না, কিন্তু পরের সন্তানকে আটকে রাখেই বা কি করে!
পরি প্রতিদিন ওর সাথে স্কুলে যায়, বড়দির পারমিশন নিয়েই অনন্যার সাথে জুনিয়র ক্লাস গুলোতেও যায়, অনেক কিছু শিখেও গেছে, এখন একটু করে গল্পও করে অনন্যার সাথে। অনন্যার ইচ্ছে থাকলেও ওকে স্কুলে ভর্তি করতে পারেনা। মা বাবার নাম কি দেবে? পরি মা বাবার ভালো নাম বলতে পারেনি।
তাও যেটুকু কথা বলে,সবকিছু গুছিয়ে না বলতে পারলেও মোটামুটি একটা ধারণা অনন্যা নিজের মতো করে তৈরি করে নিয়েছে।
পরির মা বাবা দুজনেই আছেন, এমনকি ওর একটা ছোট্ট ভাইও আছে। ভাইটাকে ও বড্ড ভালোবাসে!
----
রাত প্রায় এগারোটা বাজে।খেয়েদেয়ে পরি ঘুমিয়ে পড়েছে, অনন্যা ওর মুখের দিকে চেয়ে মনটা মায়ায় ভরে গেল।কে জানে, ওর বাবা মাকে আদৌ পাওয়া যাবে কি না...মেয়েটাকে ছাড়তে মিন চায়না, এই কদিনেই বড্ড মায়ায় জড়িয়েছে!
নিজের ছেলেটাকে তো মনের মত করে বড় করা হলোনা, একে যদি কাছে রাখতে পারতো!
অনন্যা অনেক চেষ্টার পর ঋকের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে।
ছেলে এখন মাঝেমাঝেই মায়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে।
এইমাত্র ঋকের সাথে কথা বলে স্কুলের খাতাগুলো নিয়ে বসলো।মগ্ন হয়ে খাতা দেখতে দেখতেই মোবাইলটা বেজে উঠলো।
তাকিয়ে দেখে, ওর এস আই বন্ধু শুভাশীষ ফোন করছে....
বুকটা ধক করে উঠলো, তবে কি পরির মা বাবার সন্ধান পাওয়া গেছে? পরি কি তবে চলে যাবে?
মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ও বললো, "হ্যালো, বল কি খবর..."

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

শর্মিষ্ঠা দত্ত,

অভিযোজন (৩)

এ বাড়িতে  একমাত্র স্থায়ী রোজগার উমার ...সে একটা সরকারি স্কুলে প্রাইমারী সেকশনের শিক্ষিকা ।বিএ ,বি টি পাশ করে বছর চারেক হলো স্কুলের চাকরিটা করছে সে ।তবে ইদানিং তার আয়ের সিংহভাগটাই চলে যায় সংসারে ।চার বছর চাকরি করলেও বিশেষ কিছু জমাতে পারেনি উমা ।তাই ধবধবে ফর্সা রঙ ,সুন্দর মুখশ্রী থাকা  স্বত্ত্বেও একটা কাঠিন্য  তার চেহারা ও  স্বভাবে ছাপ ফেলে চলেছে ক্রমশ । বড়দা প্রমোদ ব্যাংকের ক্লার্ক ...বিয়ের আগে সংসারে তাঁর অবদান থাকলেও ,বছর সাতেক হলো বিয়ে করে যাদবপুরে অফিসের কাছাকাছি আলাদা থাকেন ...বৌ আর ছ 'বছরের ছেলে নিয়ে নিজের সংসারের দায় সামলাতেই ব্যস্ত ।এ বাড়ীতে আসেন  কালেভদ্রে ...পুজোয় মা আর বোনকে দু খানা শাড়ি দেওয়া ছাড়া এ সংসারের প্রতি আর কোন কর্তব্য অবশিষ্ট  নেই তাঁর ।মেজদা প্রণবের চাকরিটা স্থায়ী নয় ...ধর্মতলায় একটা ওষুধের কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করে ...রোজগারও তেমন নয় ।এর মধ্যেই আড়াই বছর আগে দুম করে পাশের পাড়ার মেয়ে মল্লিকাকে বিয়ে করে , পরপর দু বছরে দুটো মেয়ের বাবা হয়ে বসল ।ফলত বিধবা মা আর ছোট ভাই প্রসূনের সব দায় তো বটেই ...বলতে গেলে গোটা সংসারটাই  এসে চাপল উমার ঘাড়ে ।বাবা মারা গেছেন সেই কবে ...তাঁর জমানো টাকা আর কিছুই তেমন অবশিষ্ট নেই ।নিজের বিয়ে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রমশ অনিশ্চয়তা বাড়ছে উমার ...তারই ফলশ্রুতি তার উত্তপ্ত মেজাজ ।আজকাল ভাইরা তো বটেই ...মা ও রীতিমতো সমঝে চলে তাকে ।বৌদি মল্লিকা অবশ্য ভারী ঠান্ডা মেয়ে ...যথাসম্ভব মন জুগিয়ে চলে তার ...তবু তাকে দেখলেই কেন যে মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে  , বুঝতে পারে না উমা ।

ঝোঁকের মাথায় মল্লিকাকে কালীঘাটের মন্দিরে নিয়ে গিয়ে সিঁদুর পরিয়েছিল প্রণব ...মল্লিকার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিনে । নিজের বিদ্যে যদিও স্কুল ফাইনালের বেশি এগোয়নি তবু নিজের বিশ্বজিত মার্কা চেহারাটা দিয়ে প্রণব বেশ ইমপ্রেস করে ফেলেছিল মল্লিকাকে ।মাত্র দু মাসের প্রেম ...তারপরেই বিয়ে করে তাকে ঘরে নিয়ে তুলেছিল প্রণব ।রোজগারের কোন স্থিরতা নেই ,তাই এ বিয়েতে সায় ছিল না কোনো পক্ষেরই ।দু দিন বাদেই  মল্লিকাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতী , মাসখানেক বাদেই বুঝেছিলেন মল্লিকা অন্তঃসত্ত্বা ...অতএব সামাজিকভাবে বিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায়ই থাকলো না কোনো পক্ষেরই ...এমনিতেই তো পাড়ায় কান পাতা যাচ্ছিল না ! 

তিতলি হওয়ার পর অভাব থাকলেও এক ঝলক টাটকা হাওয়ার মতো  আনন্দ এসেছিল সংসারে ।উমার কঠিন মনও দ্রবীভূত হচ্ছিল আস্তে  আস্তে ।তিতলির একবছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ফের দুঃসংবাদ !...দুঃসংবাদই বটে ...মল্লিকা বুঝতেই পারেনি তার শরীরে ফের বেড়ে  উঠছে  আরো একটা প্রাণ ।ততদিনে প্রণবের প্রেম এসে  দাঁড়িয়েছে কঠোর বাস্তবের কাঠগড়ায় ! নামমাত্র রোজগারে কি করে  দুটো বাচ্চার বাপ হতে চলল এ নিয়ে উমার অভিযোগের উত্তরে দৈনন্দিন চাপান-উতোরে বাড়ির পরিবেশ উত্তপ্ত হতে শুরু করল । একটু আধটু অভ্যেস আগেই ছিল ...এবার নিয়মিত মদ্যপান শুরু করল প্রণব ।আগে যত্সামান্য টাকাপয়সা যাও বা দিত সংসারে , এখন তাও অনিয়মিত হয়ে উঠল ,উমার ওপরেই ক্রমে সংসারের যাবতীয় চাপ এসে পড়তে লাগলো । মেজদা তো বটেই মেজবৌদিকে দেখলেও আজকাল মাথার ভিতরে আগুন জ্বলে ওঠে উমার ...ওদের  জন্যই তো আজ নষ্ট হতে বসেছে তার জীবনটা !

মর্নিং স্কুল উমার ।দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে স্নান সেরে মল্লিকার উদ্দেশ্যে চিত্কার শুরু করল সে "এই যে নবাবনন্দিনী , খেতে দেবে না কি  পেটে কিল মেরে বসে থাকবো ! ...সেই সাতসকালে নামমাত্র কিছু মুখে দিয়ে বেরিয়ে যাই , খেটেখুটে এসে টাইমলি ভাতটাও পাব না নাকি ! সারাদিন ঘরে বসে বসে করটা কি ..."তার কথা শেষ না হতেই প্রভা ডাকলেন "খাইতে দিসি ...আয় ।"
"তুমি কেন ?...তোমার মেজবৌমা গেল কোথায় ?"গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে ঢুকলো উমা ।নির্বিকারমুখে প্রভা বললেন ,"ভারতী আইস্যা  অগো লইয়া গেসে গিয়া...তর মেজদা তো কাইল রাতে বাড়ি ফেরে নাই ,কই ছিল কি জানি ! আইজ সকালে বাড়ি ফিরার পর বৌমা বোধহয় কিসু কইসে ... তার লাইগ্যা বৌয়ের গায়ে হাত তুলসিল ...আমি প্রসূনরে দিয়া ভারতীকে ডাইক্যা কইসি অগো লইয়া যাইতে ..."

কি জানি কেন হঠাতই খিদেটা মরে গেল উমার ।

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

পিয়ালী বসু ঘোষ

সাঁঝবিহান
পর্ব -7

সতীশ এসে কলমির ঘরের পথে পা রাখতেই ছুটে এলো ফজিরাম । ওর চোখে মুখে অনাবশ্যক হাসি । হাতে সর্ষের শাক ।বলল কলমি পাঠিয়েছে দাদাবাবু ।তুমি আজ ফিরবে বলে আমার হাতে দু গাছি শাক ধরিয়ে দিয়ে বলল ফজি দাদা বাবু কে দুটি রেঁধে দিও । আমরা গরীব গুর্বো মানুষ আমরা রাঁধলে বাবুর ভালোলাগবেনা  তাই তুমিই দিও রেঁধে।
সতীশ মনে করলো শীত শুরুতে ঘরের পাশের জমিতে সর্ষের চাষ করতে বুদ্ধি দিয়েছিলো কলমিকে ও । কলমি বলেছিল সর্ষের শাক খেতে নাকি খুব ভালো হয় ।সতীশ কলকাতার বাড়ীতে খায়নি কখনও ।আজ ফজিরাম কে বলল কলমি কে বলো এ শাক আজ ওকেই রান্না করতে আর সাথে কলাই এর ভাঙা ডাল। সঙ্গে গন্ধরাজ লেবু আর ওর হাতের পাঁচমেশালি আচার ।আজ দুপুরে আমি ওর ওখানেই খাব । এই বলে আলমারি থেকে খদ্দরের মোটা পঞ্জাবিটা পাজামা সহ নিয়ে বেড়া দিয়ে ঘেরা ওর কুয়োতলি তে ঢুকে গেলো ।যাবার আগে ফজিরামের কাছে ধুধুলের ছোবড়টা চাইলো ।বলল ও যেন কলমি কে খবরটা দিয়েই ফিরে আসে ।ওর সাথে কিছু কাজের কথা আছে ।

ফজিরাম উসখুশ করছিলো ওকে সাঁঝ এর কথা বলার জন্য কিন্তু সতীশ কে কেমন উদাস বিষন্ন অথচ দৃঢ় মনে হলো ওর ।পুরুষের এই আশ্চর্য রূপ তখনই হয় যখন হয় সে হারিয়ে ফেলে কিছু তা সে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় ও.......

চানঘরে গিয়ে ধুধুলের খোসা দিয়ে বেশ করে রগড়ে স্নান করে সতীশ । দাঁড়ি কামায় । তারপর নিপুণ ভাবে দূরের বনপাহাড়ের গন্ধ গায়ে মাখে নগ্ন হয়ে ।দুদিন বাড়ীতে গিয়ে ও কেমন এলোমেলো হয়ে ফিরে এসেছে ।এই জায়গা তো ওর কর্মক্ষেত্র ওর আজন্মলালিত স্বপ্নভূমি তো নয় এটা তবু এখন এখানেই ওর সব ।ও ভাবতেই পারেনা এখান থেকে ও চলে যাবে কখনও । এখানকার জলহাওয়ার সাথেই ও একাত্ম বোধ করে যেন জন্মাবধি ও এখানেই ছিল......মা বলতেন শরীরে যা সওয়াবি তাই সইবে ।সত্যিই শরীর তো তাই কিন্তু মনও যে তেমনই এ কথা ও যেন এখানে এসেই জানলো। তবু কি এক তীব্র একাকীত্ব ওকে দিন দিন ওকে গ্রাস করছে.....
মন উড়ছে -সন্ন্যাসী মন,ধুলো উড়ছে -রুখু ধুলো তবু ফিরে যেতে ইচ্ছে করেনা আর ওর ।
কাকে ঠকাচ্ছে কি পাচ্ছে এসব ভাবতে ভাবতেই হেলাল হাফিজের কবিতার সাথেই নিজেকে মেলাতে থাকে

"জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি
বললো না কেউ তরুন তাপস এই নে চারু শীতল কলস।
লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম"

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

পিয়ালী বসু ঘোষ



সাঁঝবিহান --পর্ব ৫

মনের মধ্যে অস্থির একটা চঞ্চলতা সতীশের ।একবার শাল্মলীকে লিখবে বলে কাগজ কলম হাতে নেয় আর একবার তা রেখে ঘরময় হেঁটে বেড়ায় ।কি বলবে মেয়েটাকে ? বলবে সাঁঝ ও তার পরিবারকে  ঘিরে ওর অবচেতনে একটা অস্থিরতা তৈরী হয়েছে ?নানা ,কিকরে বলবে এসব ও?

কতো কি ভাবনা ভীড় করে আসে ।কিন্তু লিখে উঠতে পারেনা ।শুধু লেখে -"তোর সাথে আমার অনেক গল্প আছে শাল্মলী ।আজ জঙ্গলের পথে ফেরার সময় ইচ্ছে করে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম জানিস ।ভেবেছিলাম কোনো গন্তব্যেই ফিরবনা নির্ভুল ঠিকানা চিনে ।"

কিন্তু কি এক সংস্কার অবশ চেতনা কে তাড়া করে বেড়ায় ।অজানা কে জানতে এসে এই অসহায় পরিবারটির কষ্টকর জীবনযাত্রা ওর জানা জগৎটাকে ওর থেকে দূরের করে দিয়েছে ।এতে ওর আক্ষেপ নেই যদিও কোনোও, শুধু এই বদলে যাওয়া জীবনে শৈশব থেকে জমিয়ে রাখা স্বপ্নটার বদল হয়ে গেছে ।একথা এবার ওকে বলার সময় এসেছে ।কিন্তু ও জানেনা এই সত্যের মুখোমুখি করাবে কি করে শাল্মলী কে ।

গতকাল সতীশ চলে আসার পর গ্রামের হোমরাচোমড়াদের নিয়ে কলমির বাড়ীতে চড়াও হয়েছিলো গোমস্তা ।শাসিয়ে গেছে কলমিকে সতীশ যেন ওখানে আর না আসে ।বলেছিল যদি সতীশকে কলমির বাড়ির আশেপাশেও দেখে তবে ওর লাশ নাকি কাকে শকুনে খাবে এমন ব্যবস্থা করবে ।আর যদি সে সাঁঝকে বিয়ে করে তবে আলাদা কথা ।কিন্তু ও মেয়েকে বিয়ে করে আর কি হবে এই বলে তারা নিজেদেরই মধ্যে মস্করা করে ।আর এতেও যদি কাজ না হয় তবে সাঁঝের যা হয়েছিলো সেটা ওর ছোট দুই মেয়ের সাথেও হতে পারে । কলমি জ্বলে ওঠে এই প্রথম ।মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে বলে 'হারামির বাচ্ছারা' ।এরপর ফজিরাম কে সাথে নিয়ে থানায় যায় নালিশ জানাতে ।

ফজিরামই এসে জানালো সব ।বলল ছোট দারোগাবাবুও নাকি খুব হেনস্থা করেছে ।জিগ্গেস করেছে সতীশবাবু কি মা ও মেয়ে দুজনকেই........!এ পর্যন্ত বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ফজিরাম । আরও বলল কলমি নাকি লজ্জাতেই আসতে পারেনি ওর কাছে ।সে নাকি বলছে বারবার" আমার মেয়েটার চিকিৎসা করতে এসে এ কি বিপদে পড়তে হলো বাবুকে ফজি দাদা! "
এরপর  কুয়োতলিতে জল তুলতে তুলতেই ফজিরাম বলে,
---বাবু যে কোনোদিন হয়তো আপনার নামে ওয়ারেন্ট বেরোবে ।সতীশ ঘেন্নায় তেতো হয়ে যাওয়া মুখের থুথুটা ফেলে জিগ্গেস করে
 --কিসের ওয়ারেন্ট ?
----দারোগাবাবুর ইচ্ছাই ওয়ারেন্ট ।
---আচ্ছা
---আসলে ওরা আপনাকে এই দেশ ছাড়া করতে চায় বদনাম দিয়ে।
---আচ্ছা
---তবে তুমি চিন্তা করোনা বাবু, আমি গ্রামের লোকেদের জানিয়েছি
সবাই তো আর ওই জানোয়ার দের মতো নয় ।তোমাকে জবরদস্তি করলে আমরাও দেখে নেবো ।
সতীশ ঘেন্নার মধ্যেও ওই  অশিক্ষিত সরকারী উর্দিধারিদের বুদ্ধির বহরের কথা ভেবে হাসে  ।ফজিরামকে বলেনা কিছুই ।এই মানুষগুলোর কাছে ওর অনেক ঋণ । তাছাড়া শহুরে শিক্ষিত মানুষ যা করেনা এরা তাদের জীবন দিয়ে হলেও সেটা করে ।আত্মীয় শব্দটার প্রকৃত সত্ত্ববহনকারী হলো এরাই ।ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ।খানিক আগের তেতো ভাবটা কেটে গিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় নুয়ে আসে ওদের প্রতি ।

শাপলা সপর্যিতা


পর্ব – ৩
প্রথম গানের শিক্ষক। শ্রী স্বপন কুমার সরকার।মেঝো ভাইয়া উদীচীতে যায় গান করতে।সাথে আমারও উদীচীতে যাওয়া। সকাল সকাল ক্লাস। প্রতি শুক্রবার ক্লাস।আর তাই প্রতি ভোর বেলা দিনের শুরু আমার সারগামে। উদীচীর খুব প্রিয় দু’জন শিক্ষক ছিলেন।একজন সোবহান স্যার। রবীন্দ্র সংগীত শেখাতেন। আর অন্যজন স্বপন সরকার। তিনি আমাদের সারগাম করাতেন। কিন্তু মূলত ছিলেন গণসঙ্গীতের শিল্পী।নজরুল সঙ্গীতও করতেন।আর যতীন সরকার পড়াতেন কার্ল মার্কস, বস্তুবাদ, ডারউইনের তত্ত্ব। কিন্তু জন্ম থেকেই আমার প্রথম পছন্দ রবীন্দ্র সংগীত। ধ্রুব পরিষদে ভর্তি হলাম রবীন্দ্র আর শাস্ত্রীয় সংগীতে। পরীক্ষা দিতে হবে। রবীন্দ্র যা হোক কোনোমতে উতরে যাব। কিন্তু শাস্ত্রীয়? ঘরে আনা হলো ওস্তাদ।মেঝোভাইয়ার পছন্দ মতো গানের ওস্তাদ আমার, শ্রী স্বপন সরকার।প্রথমদিনই মাথায় হাত রেখে বললেন ‘কন্ঠটা ভালো তোমার। যত্ন করো। ঠিকঠাক রেওয়াজ করো। সরস্বতীর মন ভোলাতে হবে।ভালো করবে তুমি।’ তারপর - রোজ ভোরবেলা গলা সাধা একটা নিয়ম হয়ে গেল। ওটা হলো আমার জন্য একটা বিরক্তিকর কাজ। গান গাইতে ভালোলাগে কিন্তু প্রতিদিন ঘুম ভেঙেই গলা সাধতে বসা। উফ। তার মাঝে আমি চাই আমার প্রাণের ঠাকুরের প্রিয় প্রিয় সব গানগুলো তুলতে তিনি আমাকে নজরুলের গানের বিষয়ে উৎসাহী করতে সবরকমের প্রচেষ্টায় নিবেদিত।তার বদৌলতে বেশ কিছু নজরুল সঙ্গীত আমার তোলা হয়ে গেল। নজরুলের সেই সব গান....মনে পড়ে সে কোনো বিদায় সন্ধ্যা বেলা, তুলসী তলায় যবে সন্ধ্যা বেলায়... এসব গানের কথা এখনো মনে পড়ে। ধীরে ধীরে আমার নজরুলের গানের প্রতি আগ্রহ জন্মালো। একসময় বেশ নজরুল সংগীত শুনতেও শুরু করলাম আগ্রহ করে।তখন খুব শুনতাম অনুপ জালোটা, অনুরাধা পাড়ডোয়াল, ফিরোজা বেগম। সপ্তাহে তিনদিন ওস্তাদের কাছে নিয়ম করে হারমোনিয়াম তবলায় সুর সাধা গান শেখা জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়ালো। আর কোন উপায়ে আমার গানের প্রথম ওস্তাদকে বিতাড়িত করা আমার সম্ভব হলোনা।গান শেখালেন দীর্ঘদিন।গানের শিক্ষকের সাথে সম্পর্কটা এতটাই নিবিড় হয়ে পড়লো আমাদের পরিবারের সাথে যে তার বিয়ে বাবা হওয়া আর দুইবাড়ি আসা যাওয়াও চলতে থাকে বেশ। খুব সুন্দরী ছিল বৌদিও। ওস্তাদের ছেলে সন্তান দু তিন বছরে কি অদ্ভুত তবলা বাজাতো.......। আমাদের বাসায় এলে আমার বায়া তবলা দিয়ে সামনে বসিয়ে দিতেন স্যার। আর কি অসম্ভব সুন্দর বোলে বোলে তালে তালে হাত চালাতো সেই অবুঝ শিশু আজও মনে হলে মুগ্ধ হই।সময়ও গড়ালো অনেক। বছর বছর। যুগ যুগ।জানিনা আজ কোথায় তারা কেমন আছেন সবাই।একসময় আমি গাই না গাই একটা গানের যন্ত্র আর হারমোনিয়াম তবলা থাকতো আমার সাথে সাথে। কোথা থেকে কোথায় যাই জানিনা আজ বহুদিন হারমোনিয়াম তবলা গানের সুর ছাড়া আমি। দিনান্তে গান শুনবার অবসরটুকুও থাকেনা বেশিরভাগই। তবু জীবন চলছে ঠিকই। তবু কোনো এক বিষণ্ন দুপুরে কোথাও এক দারুণ দুঃসহ তৃষ্ণায় জেগে উঠি। ভেসে আসে রক্তে কাঁপন তোলা আমার স্যারের গণসঙ্গীতের সুর
নোঙ্গর তোলো তোলো/সময় যে হলো হলো/নোঙ্গর তোলো তোলো
সাথে ভেসে ওঠে দেবীর মুখ।হায় দেবী –ওস্তাদের কথা রাখিনি আমি।সরস্বতীর মন ভুলাতে আমি পারিনি নাকি ভুলাইনি সেটা আজও এক বিষ্ময়.........(চলবে)




রীনা রায়


আলোর প্রতিক্ষায়"


                
তৃতীয় পর্ব

ও টর্চের আলোটা ফেলতেই দেখলো সবার মুখ রুমালে ঢাকা, একটা ভয়ের স্রোত ওর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল । ও দৌড়ে পালাতে গেল, কিন্তু তার আগেই ওরা ওকে ধরে ফেলল। ও চীৎকার করার আগেই ও রা ওর মুখ চেপে ধরল। ও প্রানপনে বাধা দেবার চেষ্টা করলো, কিন্তু তিনজন শক্তসমর্থ পুরুষের সাথে ও পেরে উঠবে কি করে? 
ওরা খুব সহজেই ওকে তুলে নিয়ে চলে গেল । তারপর তিনজন মিলে ওর ওপর পাশবিক অত্যাচার করে গেছে । কতক্ষণ ও জানেনা কারণ ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল । ওরা প্রত্যেকেই নেশাগ্রস্ত ছিল। ওদের সবাইকে ও সহজেই চিনেছিলো।নেশার ঘোরে ওরা নিজেরাই জানিয়েছিল।
 
অভিদা , মজুমদার বাড়ির ছেলে অভিষেক মজুমদার । তাকে নাকি ভালবাসতো, কিন্তু অপর্ণার দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বন্ধুদের পরামর্শে নাকি সে ওই কাজ করেছিল । হুঃ, ভালবাসা! ভালবাসা মানে কি শুধু শরীরের চাওয়া? না, ও ক্ষমা করতে পারেনি ওদের, কোনোদিন পারবেও না ।
 
সনাক্তকরণের দিন ওকে ডাকা হয়েছিল, ও প্রত্যেককে চিনিয়ে দিয়েছিল । মজুমদার বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে বাবার কাছে এসেছিলো। পরিবর্তে শর্ত ছিল অপর্ণা যেন ওদের চিনতে অস্বীকার করে। বাবা কঠোরভাবে ওদের ফিরিয়ে দিয়েছিলো।
সেদিন ওর ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে সাড়ে আটটার সময় বাবা বাসস্টপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ও না আসায় বাবা ভেবেছিলো ও হয়তো বাড়ি চলে এসেছে।বাড়ি এসে যখন শোনে যে অপু তখনও বাড়ি আসেনি, তখন গ্রামের কয়েকজনকে বলে । তারপর সারারাত ধরে খোঁজাখুজি চলে, পুলিশেও খবর দেওয়া হয়।
শেষে ভোরের দিকে কেউ একজন ওকে সংজ্ঞাহীন অবস্হায় রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখে ।
 
দুদিন হাসপাতালে থাকার পর ও বাড়ি ফিরেছিল ।কিন্তু ফিরে আসার পর মনে হয়েছিল, কেন ফিরল? বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিল । সবসময় একটা আতঙ্কে থাকত, একটা ট্রমার মধ্যে দিন কাটতো।
তার ওপর মা ঐরকম অসুস্থ, কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল, শুধু অপুর দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তো।
 
মাসখানেক এইভাবে যাওয়ার পর পিসিমণি ওকে এসে নিয়ে গেছিলো। বাবাকে বলেছিলো, 'এখানে থাকলে মেয়েটাকে বাঁচানো যাবেনা, ওকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, ওখানেই ওর চিকিত্সা হবে'।
 
তারপর ওর জীবনটা পুরোটাই বদলে গেছিলো। ডক্টর আকাশ সেনগুপ্ত অসীম ধৈর্যের সঙ্গে ওকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল । প্রথমদিকে কোনো ছেলেকেই ও সহ্য করতে পারতোনা। আতঙ্কে চীৎকার করে উঠতো। আকাশ ওকে বাঁচতে শিখিয়েছে, আবার ও মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখেছে। আস্তে আস্তে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ও ফিরে এসেছে। নিজেকে তৈরী করেছে।
 
আর সবসময় তার পাশে পেয়েছে পিসিমণি, পিসেমশাই ও আকাশকে । আকাশ ওর ভীষণ ভালো বন্ধু । আর এখন তো স্মিতার সাথেও ভীষণ ভাল একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, স্মিতা আকাশের স্ত্রী। খুব ভাল মনের একজন মেয়ে । এদের জন্যই ও বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়।
শুধু পড়াশোনা করে কেরিয়ার গড়াই নয়। শারীরিকভাবে অপর্ণা এখন অনেক সক্ষম। ও এখন ক্যারাটের ব্ল্যাক বেল্ট ধারী। ও অনুভব করেছে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই প্রত্যেকটি মেয়েরই নিজেকে গড়ে তোলা উচিত । তাই ওর প্রথমেই মনে হয়েছে নিজের গ্রামের মেয়েদের কথা, আর সেজন্যই প্রথম সুযোগেই ও গ্রামে এসেছে ।
কিন্তু গ্রামের কেউই তো কোনরকম আগ্রহই দেখালোনা। শুধু তাই নয় গ্রামে ওর উপস্থিতিটাও যেন কেউ সহ্য করতে পারছেনা।
ও ঠিক করলো যে কদিন এখানে থাকবে , বাড়িতে মা বাবা ভাই এর সাথেই সময় কাটাবে, তারপর ফিরে যাবে।
দিন কয়েক বাদে অফিসের একটা কাজে ওকে কলকাতায় যেতে হল। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা ছিলো। ফিরতে একটু দেরীই হয়ে গেলো।বাসে উঠে দেখলো নয়না বসে আছে, ও একটু হাসলো কিন্তু নয়নার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তাই একটু দূরে অন্য সিটে গিয়ে বসলো। লক্ষ্য করলো নয়না কেমন যেন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে, একটু পরেই কারণটা পরিস্কার হল। তিন চারজন ছেলে মিলে নয়নাকে সমানে বিরক্ত করে যাচ্ছে । ভালো করে তাকিয়ে দেখলো, ওরা কেউই ওদের গ্রামের নয়। প্রতিবাদ করতে গিয়েও নয়নার মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ও চুপ করে বসে রইলো। ভাবলো আর একটু পরেই তো ওরা নেমে পড়বে।
গ্রামে বাস থামতেই ও নেমে পড়ল, ওর পরে নয়নাও। বৃষ্টিটা বেশ জোরে পড়ছে, অপর্ণা ছাতাটা বের করলো। চারিদিক বেশ ফাঁকা, হয়তো বৃষ্টির জন্যই।
অপর্ণা একটু তাড়াতাড়িই হেঁটে যাচ্ছিল, হঠাৎ পিছনে গোঙানির আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখে ছেলেগুলো নয়নার মুখটা চেপে ধরে ওকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ।
তার মানে ছেলেগুলো ওদের পিছু পিছু বাস থেকে এখানে নেমেছে! অপর্ণা আর একটুও সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেল । ওদের হাত থেকে নয়নাকে উদ্ধার করতে অপর্ণার খুব বেশী সময় লাগলো না । নয়না তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। ওকে আগলে ধরে ওর বাড়ীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে অপর্ণা বাড়ি ফিরে এলো।
একটু রাতের দিকে অপর্ণাদের বাড়িতে বেল বাজলো। 'এতো রাতে কে এলো দেখি' বলতে বলতে বাবা দরজাটা খুলে দেখে নয়নার বাবা, মা এসেছে।
 
'তোমরা এত রাতে? কোনো বিপদ ঘটে নি তো? '
আমরা একটু অপুর কাছে এসেছি।

অন্তিম পর্ব
অপু বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলেনি। কাকেই বা বলবে! মা অসুস্থ, শুধু শুধু টেনশন করবে । ভাইটা কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, ওর সাথে এসব কথা আলোচনা করা যায়না। আর বাবাকে ও কত দুশ্চিন্তায় ফেলবে? তাও ভেবেছিলো রাতের খাওয়ার পর বাবাকে বলবে, তার আগেই তো ওরা চলে এলো।
অপু এগিয়ে গিয়ে বললো, কাকিমা তোমরা ভেতরে এসো। ও তাকিয়ে দেখলো নয়নার মায়ের দুচোখ জলে ভেসে যাচ্ছে ।
 
কাকিমা ওকে দেখতে পেয়ে ওর হাতদুটো দু হাতে ধরে শুধু কেঁদে চললো, আর একটাই কথা বারবার বলে গেল ।তোকে অপমান করেছিলাম, তাই ঠাকুর আমাকে শিক্ষা দিলেন ।
 
কাকু ওর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, তুই আমার নয়নাকে রক্ষা করেছিস, আমার ঘরের সম্মান বাঁচিয়েছিস, ঠাকুর তোর মঙ্গল করুন, তোর সব ইচ্ছে যেন পূর্ণ হয়।
অপর্ণা একটু হেসে বললো, 'আমার চাওয়া টা তো তোমরা জানোই কাকু, ওইটুকু পূর্ণ হলেই আমার অনেকটা পাওয়া হবে।'

এদিকে বাবা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে । তখন ওরাই সব ঘটনা বিস্তারিত ভাবে বললো। বাবার দুচোখে জল, অপর্ণার মাথায় শুধু হাতটা রাখলো, অপর্ণার মনে হল ওর সব পাওয়া হয়ে গেছে ।

পরের দিন একটু বেলার দিকে অপর্ণা মেঘটা কেটেছে দেখে জামাকাপড় গুলো শুকোতে দিচ্ছিলো।
বেল বাজতে দরজা খুলে দেখে নয়নার ঠাকুমা এসেছেন । সঙ্গে নয়নার মা।
 
নয়নার মা-ই প্রথম কথা বললো। 'দ্যাখ না, মা তোর কাছে আসার জন্য এত জোর করলো যে না নিয়ে এসে পারলাম না।'
অপু মনে মনে ভাবলো, কয়েকটা মাত্র দিন আগেই তোমরা আমার মুখ দেখতে চাইতেনা আর আজ,,,,, মুখে বললো, 'এসো, এসো ভেতরে এসো।'
ও শুনেছিলো নয়নার ঠাকুমা বাঙলাদেশের মেয়ে । তখনকার দিনে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তারপর জোর করে ওনার বিয়ে দিতে গেলে উনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে গেলে কয়েকজন অসাধু লোকের হাতে পড়েন। তারা ওঁকে পাচার করার চেষ্টা করছিলো। তখন নয়নার ঠাকুর্দা ওনাকে উদ্ধার করেন ।ঠাকুমা আর বাড়ি ফিরে যেতে চাননি, তখন ঠাকুর্দা ওনাকে বিবাহ করেন ও গ্রামে নিয়ে আসেন ।

ঠাকুমা অপর্ণার হাত দুটো ধরে বললেন, 'সেদিন তুই আমার লগে কি কইবার তরে গেছিলি? আজ আমি নিজে তোর লগে শুনবার তরে এলুম।তুই আমার ঘরের মান বাঁচাইছস,,, ঠাকুর তোর মঙ্গল করবেন ।'
অপর্ণার মন আনন্দে নেচে উঠলো। তার আশা পূর্ণ হবে তাহলে!
 
ও ওর সমস্ত পরিকল্পনা বুঝিয়ে বললো।
ঠাকুমা সব শুনে বললেন, 'আর তোর চিন্তা করনের কিছু নেই, সব হয়ে যাবেখন্ ।'
ঠাকুমা এবার নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার সাথে কথা বললেন ।অনেকেই অনিচ্ছা সত্বেও ঠাকুমার পীড়াপিড়িতে মত দিতে বাধ্য হল।
এরপর কয়েকটা দিন খুবই ব্যস্ততার মধ্যে কাটলো। 
খুব রিলাক্স লাগছিল অপর্ণার।অবশেষে তার একটা স্বপ্ন পূর্ণ হল। 
এদিকে ওর ছুটি শেষ হয়ে আসছে, ওকে ফিরতে হবে । ওখানে 'অ্যালেন' যে ওর প্রতীক্ষায় দিন গুনছে।
------------সমাপ্ত-------


শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

পিয়ালী বসু ঘোষ


সাঁঝবিহান


লন্ঠনের অস্পষ্ট আলোয় ওকে কেমন কল্পলোকের রাধা বলে মনে হচ্ছিলো ।যেন সতীশ স্বপ্ন দেখছি।যেন এক অসম্ভব প্রত্যাশায়,অপ্রাপ্যর তপস্যায়, অনন্ত প্রতীক্ষার সংকল্প নিয়ে বসে আছে  কোনো এক শুক্লপক্ষের চাঁদের গায়ে হেলান দিয়ে । ঘরের ভিতরে সাঁঝ ।আর বাইরে দাওয়ায় প্রতীক্ষারত সতীশ ।
কলমি গিয়েছে পাশের গ্রামের বনবিবির থানে মেলা দেখাতে ছোট মেয়ে  দুটোকে নিয়ে ।মেয়ে দুটোর তো কোনও আনন্দ নেই ।সাঁঝ পঙ্গু হয়ে যেন ওদের সকলকেই পঙ্গু করে দিয়েছে ।মেয়ে দুটো সারাদিন মুখ কালো করে বসে থাকে ।সতীশ ওদের বলে "খেলিস না কেন তোরা ?"
কলমি গলায় ভয়ের শিহরণ তুলে বলে "আর খেলতে লাগবেনা বাবু ,মেয়ে মানুষ ।কি থেকে আবার কি হয় ! এমনিতেই আমার মেয়েদের সবাই কেমন আড়াল চোখে দেখে "
সতীশ চুপ করে থাকে ।কলমির ওই মায়ের মনটাকে খরগোশের মতো ভয়ে চঞ্চল হতে দেখে অহেতুক ওর গায়েই কাঁটা দিয়ে ওঠে ।
ও-ই বলে কলমিকে "আজ আসার সময় দেখলাম,সকলে বনবিবির থানে মেলা দেখতে যাচ্ছে ,তুমি তবে মেয়েদুটোকে নিয়ে ঘুরে এসো " ওদের ভালো লাগবে ।
কলমির প্রশ্নবোধক চোখকে আশ্বাস দিয়ে ও বলল,"তোমরা না ফেরা পর্যন্ত আমি সাঁঝকে দেখবো ,এখন যদি তুমি বিশ্বাস করে আমার কাছে ওকে ছেড়ে যেতে পারো "
কলমি ঝাঁঝিয়ে ওঠে সতীশকে ।বলে,"তুমি থামো ডাগদার, এসব বলোনা, 
সেই কোন ছোট্টবেলায় বে করে এসেছি ,দুদিনে সংসারে মন উঠে গেলে সাঁঝের বাপ টা যখন চলে গেলো তারপর থেকে পুরুষের চোখ আমার অনেক দেখা বাবু ,যে চোখে চিতার মতো লোভ থাকে । আড়াল থেকে ঝাঁপিয়ে পরে নিঃশব্দে শিকার করার পরও রক্ত চুষে একেবারে ছিবড়ে করে ছেড়ে দেবার পরও তাচ্ছিল্য ও প্রতিহিংসা থাকে । তুমি তো আমাদের ভরসা গো বাবু "এই বলে এই প্রথম এগিয়ে এসে ওর থুতনি ধরে চুমু খেল  মায়ের মতো ।তারপর মেয়ে দুটোকে নিয়ে ঝর্ণার মতো চকিতে বেরিয়ে গেলো ।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে পথঘাট জনমানব শূন্য হতে থাকে ।তাই ওদের একটু তাড়াতাড়ি ফেরার কথা বলে দিয়েছে সতীশ ।কিন্তু সন্ধ্যা উতরে গেছে অনেকক্ষন । বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে সতীশ ।নির্মল স্বচ্ছ আকাশের গায়ে একটা একটা করে উজ্জ্বল তারা ফুটে উঠতে দেখছে ও ।বারান্দায় বসে থাকতে আর ভালোলাগছিলোনা ।বেশ দেরি করছে কলমিরা ।একটা আলগা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে ।ভাবছে ঘরে গিয়ে লন্ঠনটা ভালো করে উসকে দিয়ে খানিক সাঁঝের পাশে গিয়ে বসে ।
ওমন সময় ভয়ানক এক চিত্কারে ঘরের ভিতরে ছুটে গিয়ে সতীশ দেখে সাঁঝের বিস্ফারিত চোখ পশ্চিমের জানলার দিকে কি যেন নির্দেশ করছে ।
সতীশ ছুটে গিয়ে জানলার ধারে দাঁড়াতেই দেখে একটা ধুতি পরা লোক ভাঙা একটা সাইকেলে জলদি প্যাডেল করতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছে তবুও তড়িৎ গতিতে ছুটছে ।