তিমিরণ দত্তগুপ্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তিমিরণ দত্তগুপ্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

তিমিরণ দত্তগুপ্ত

সিঁড়ি

দোতলা বাড়ির ডানধারে আমলকি গাছের গা  ঘেঁসে লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি উঠে এসে ঠিক জায়গায়  শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।অথচ অদ্ভুত খেয়ালে দোতলা ছাড়িয়ে উঠে গেছে আরো খানিকটা,একদম উপরের  ন্যাড়া ছাদ পর্যন্ত।বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে এমন সিঁড়ি দেখে জয়া অবাক হয়েছিল।কয়েকটা দিন কেটে যাওয়ার পরে অপূর্বকে জিজ্ঞেস করেই বসল,তোমাদের বাড়িতে এমন অদ্ভুত সিঁড়ি কেন?
অপূর্ব খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে বলল,অদ্ভুত কেন?
‘অদ্ভুত নয়?সবার বাড়িতে দেখেছি একতলা বাড়ির ভিতর থেকে সিঁড়ি উপরে ওঠে।’
অপূর্ব হাসতে হাসতে বলল,অনেকের বাড়িতে বাইরে থেকেও সিঁড়ি থাকে।তুমি দেখোনি তাই বলছো।উত্তর কলকাতা ঘুরলেই দেখতে পেতে।
জয়া হার মানতে রাজি নয়।তর্কের সুরেই বলল,তাই বলে ছাদ পর্যন্ত।ন্যাড়া ছাদ,ওঠারও তো উপায় নেই।
অপূর্ব বিজ্ঞের মতো বলল,কখনো তিনতলা করবো না?ভবিষ্যতটাও তো ভেবে রাখতে হবে।
জয়ার  রোজ রোজ বাইরের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা একেবারেই পছন্দ নয়।যখনই ওঠে বা নামে তার মাথা ঘুরতে থাকে।শ্বশুর-শাশুড়ি নিচে থাকেন।রান্নার ব্যবস্থা উপরে।রোজ দু’বেলা নিচে খাবার পৌঁছে দিয়ে আসা,এছাড়াও খুচখাচ অনেক কারণে নিচে নামতে হয়।অপূর্বকে  বলেও কিছু লাভ হয়না।তার ওই ঘুরে ঘুরে ধাপ গুনে গুনে দোতলায় ওঠা আর নামা  ভাল লাগে।শ্বশুর,শাশুড়ি ছেলেকে একতলায় চলে আসতে বলা সত্বেও সে গা করেনি বাবা-মায়ের কষ্টের কথা ভেবে।
জয়া সাধারণত সকাল সকাল উঠে পড়ে।আজ ছুটির দিন,একটু দেরি করেই বিছানা ছাড়ল।রাত পোষাকের ভাঁজে ভাঁজে তখনও আলস্য জড়িয়ে।অগ্রহায়ণের শেষ,শীত এসে গেল প্রায়।হাওয়া দিচ্ছে শীতের।বাতাসে আমলকির গন্ধ।গাছের মাথার পাশ থেকে সূর্য উঠে এসেছে খানিকটা।এখন আর শীতের কনকনে ভাবটা নেই।সকালে ছিল।ক’দিন ধরে সকাল সন্ধেতে গা শিরশির করে।রাত্রে শীতই করে।গাছের পাতা টুপটাপ করে খসে পড়ে এদিকে সেদিকে।জয়া বালতি করে জল এনে উপর থেকে সিঁড়ি ধুয়ে দেয় রোজই।

আগের দিন রাতে শ্বশুর মশাই খেতে বসে বলেছিলেন,বৌমা,বাবুকে কাল বাজার থেকে ট্যাংরা মাছ আনতে বোলো তো।বড়ি দিয়ে রেঁধো।
অপূর্বকে বাজারের থলে হাতে নিচে নামতে দেখে জয়ার মনে পড়ল।ঘর থেকেই চেঁচিয়েই বলল,বড় দেখে একটু ট্যাংরা মাছ নিয়ে এসো।আর ডালের বড়ি।বাবা খেতে চেয়েছেন।
একটু পরেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে অপূর্বকে উপরে আসতে দেখে জয়া অবাক হয়ে গেল।বলল,কি হল।ফিরে এলে যে?
যন্ত্রণাকাতর মুখে যতটা সম্ভব হাসি ফুটিয়ে অপরাধীর মতো মুখ করে অপূর্ব বলল,পড়ে গিয়েছি সিঁড়িতে।
জয়া দেখল সাদা পায়জামার হাঁটুর কাছে রক্তের দাগ ফুটে উঠেছে।
 ফুটে উঠেডেটল লাগিয়ে পোষাক পাল্টে দ্বিতীয় দফায় অপূর্ব যখন বাজার গেল,জয়া দেখল সেই দুরদার করে সিঁড়ি ভাঙা নয়।বরঞ্চ সন্তর্পনে রেলিং ধরে ধরে এক পা এক পা করে নিচে নামা।আগের সেই আত্মবিশ্বাস যেন টাল খেয়েছে আচমকা।

সন্ধেবেলা অপূর্বর হাঁটুতে মলম লাগাতে লাগাতে জয়া জিজ্ঞেস করল,সিঁড়িতে ওঠা নামার সময় তুমি বিড়বিড় করো কেন বলো তো?
অপূর্ব মুখ তুলে অবাক হয়ে তাকাল,আমি?
জয়া বলল,আমি স্পষ্ট শুনেছি।
অপূর্ব কিছুতেই বলবে না।জয়াও ছাড়বার পাত্রী নয়।শেষমেষ অপূর্ব বলেই ফেলল,সিঁড়ির ধাপ গুনি।সেই কবে থেকে গুনছি।
জয়াকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে অপূর্ব বলল,এ আমার বহুদিনের অভ্যেস।তোমার বাপের বাড়িতে চব্বিশটা ধাপ।অফিসে মোট চল্লিশটা ধাপ পেরোলে তবে আমাদের সেকশন।এই যেমন ধরো গঙ্গার ঘাট।তুমি উপর থেকে নামলে………।
অপূর্বকে শেষ করতে না দিয়ে জয়া বলল,কী হয় এইসব গুনে?
অপূর্ব বলল,তেমন কিছুই নয়।আত্মবিশ্বাস বাড়ে।আমি চোখ বন্ধ করেও ওঠানামা করতে পারি।অন্ধ মানুষদের দেখো না?
জয়া উঠে যাচ্ছিল।অপূর্ব হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে বলল,ওদের সবার নাম আছে জানো?
জয়া হাসি চেপে বলল,তুমি রেখেছো?
অপূর্বও হেসে ফেলল,হ্যাঁ তো।এই যেমন নিচের ধাপের নাম ইতি।আর একদম উপরের ধাপ,ওর নাম ছুটি।অন্যদেরও নাম আছে।আজ যখন পড়ে গেলাম,অলিককে বললাম,দেখেছিস সকাল সকাল তোদের বৌদি কেমন জল ঢেলে রেখেছে।
জয়া মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল,তুমি বদ্ধ পাগল।
অপূর্বও হেসে ফেলে বলল,হ্যাঁ পাগলই তো।কোন মানুষ পাগল নয় বলো।
জয়া আচমকাই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে বলল,দেখো,এই সিঁড়িই আমার সর্বনাশের কারণ হবে।

মাসখানেক বাদে জয়ার জেদাজেদির ফলেই হোক বা অন্য কোন কারণে অপূর্ব ঠিকই করে ফেলল কন্ট্রাক্টর ডেকে ভিতর থেকে সিঁড়ি তুলতে হবে।তবে তার জন্য কতটা কী ভাঙতে হবে আগে দেখা দরকার।এছাড়া বিস্তর টাকারও প্রয়োজন।অপূর্ব চিন্তিত মুখে বলল,প্রভিডেন্ট ফান্ডে হাত পড়বে।
জয়া বলল,পড়ুক গে।

সেই রাত্রে জয়া স্বপ্ন দেখল,লোহার সিঁড়িটা বটগাছের মতো শাখা প্রশাখা বিস্তার করে দোতলার ন্যাড়া ছাদ ছাড়িয়ে আরও অনেকটা উপরে উঠে যাচ্ছে।আর এদিক সেদিক থেকে বটের ঝুড়ির মতো শিকড় বেড়িয়ে সারা বাড়িটা কিরকম আঁকড়ে ধরে আছে।উপর থেকে অপূর্ব ডেকেই চলেছে,জয়া আমার নীল শার্টটা কোথায় রেখেছো?
জয়া আপ্রাণ চেষ্টা করছে উপরে ওঠার।যতই উঠতে চাইছে,ততই কেউ যেন তার পা আঁকড়ে ধরে আছে।
বাড়ির কাছেই পায়ে হাঁটা পথে গঙ্গার ঘাট।অনেকদিন সংস্কার হয়নি।সাবেক বাঁধন আলগা হয়ে গেছে।পইঠের কিছু কিছু হেলে গেছে।এইবার যে কোনও দিন জোয়ারের গাঙে গা ভাসিয়ে দেবে। পথের মাঝে মা কালীর  মন্দির।ছুটির দিন ছাড়া অপূর্ব  রোজ ভোরবেলায় জয়াকে নিয়ে গঙ্গায় স্নান সেরে মন্দিরে পুজো দিয়ে বাড়ি ফেরে।
সেদিন জয়ার  জ্বর।ঘাটের একবারে উঁচু ধাপে বসে দেখলো গঙ্গায় জোয়ার এসেছে।কোমর পর্যন্ত জলে অপূর্ব যতটা সম্ভব সাবধানে ডান পা নিচের দিকে বাড়াল।পা ক্রমশ নিচের দিকে নামছে তো নামছেই। বা পা ঘাটের পইঠেতে,ডান পা নেমে চলেছে অতলে।বিব্রত মুখে যেন কিছু খুঁজে চলেছে।শেষ পর্যন্ত দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পেরে উঠেই এলো।জয়া বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,কী হলো,স্নান করলে না?
অপূর্ব অদ্ভুত গলায় বললো,পনেরোটা ধাপ শেষ করে মাটি পাওয়ার কথা।অথচ,আজ তেরো পর্যন্ত গুনলাম…….।বাকিদুটো কী জলের তোড়ে ভেসে গেছে?
জয়া বলল,এত ভারী বাঁধানো জিনিস জলের তোড়ে ভেসে যাবে?হয় কখনো?তোমারই ভুল হয়েছে।
অপূর্বর তখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা।কেমন ঘোর লাগা গলায় বলল,সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি।প্রত্যেকটা ধাপ আমার চেনা।ভুল হওয়ার তো কথা ন   
ফেরার পথে মন্দিরে গেলো না।জয়ার সাথে কথাও হলো না।বাড়ি ফিরে জয়া শাশুড়ির সথে দেখা করতে নিচের তলায় ঢুকেছে।হঠাৎ বিকট শব্দে বেরিয়ে এসে দেখলো সিঁড়ি থেকে অপূর্ব পড়ে গেছে।যে মানুষটা  গুনে গুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতো,সে কী করে পড়ে গেলো,বুঝেই পেলোনা জয়া।

ছয় মাস হাসপাতালে কাটিয়ে যমে মানুষে লড়াই করে অপূর্ব যখন বাড়ি ফিরল,তখনও তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্ষতের দাগ স্পষ্ট।স্বামীর চলাফেরা,চোখের চাউনি দেখে জয়া বুঝল বিপর্যয় শুধু শরীরে নয়,শরীর ছাড়িয়ে মনেও শিকড় গেড়েছে।
মাঝে একদিন শ্বশুর মশাই কষ্ট করে উপরে উঠে এসে বললেন,বৌমা তোমরা বরং নিচে চলে যাও।বাবুর সুবিধে,তোমারও ভাল লাগবে।আমি আর তোমার মা তো ঘর থেকে বিশেষ বেরোই না।
জয়া ঠান্ডা মাথায় বলে দিল,না বাবা,আমার কোন অসুবিধে হচ্ছে না।আপনার ছেলে গেলে যাক।
অপূর্ব কাঠ হয়ে শুনছিল দু’জনের কথা।জয়ার মুখে আপত্তির কথা শুনে যেন স্বস্তি পেল।ঘরের অন্য দু’জনের কারুরই চোখ এড়াল না।

এই বাড়ির ঘরে,দেওয়ালে,বারান্দায়—সবটাই জুড়ে ঘন,মিশকালো একটা অসুখ ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দিন রাতের যন্ত্রণাকর অনুভুতি সকলের মনের সব বৃত্তিগুলোকে কীরকম স্থূল আর নিস্প্রভ করে দিয়েছে।জয়া সারাদিনের বেশিরভাগ সময়  পাশের ঘরে একলা থাকে,যন্ত্রের মতো কাজ করে।দু’বেলা শ্বশুর-শাশুড়িকে খাবার দিয়ে আসা ছাড়া পারতপক্ষে নিচেও নামে না।ওই সিঁড়ি তার দু-চক্ষের বিষ।অপূর্ব সারাদিন ঘরে শুয়ে,বসে থাকে।বিছানায় যেন একটা কঙ্কাল।এক একদিন হঠাৎ এই দৃশ্য চোখে পড়ে যায় জয়ার।চোখে চোখ পড়লে অপূর্ব কিছু বলার চেষ্টা করে।জয়া বুঝতে পারে না,বোঝার চেষ্টাও করে না।বেরিয়ে চলে আসে বাইরে।রাতে বিছানায় পাশাপাশি দু’জনে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকে।জানলা দিয়ে বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে বিছানার চাদরে আঁকিবুঁকি কাটে।তবুও অপূর্ব মৃত মানুষের মত বোধহীন হয়ে শুয়ে থাকে।জয়া বুঝতে পারে  অপূর্বর সমস্ত ইচ্ছে লোপ পেয়েছে।

মাস দুয়েকের মাথায় অপূর্ব অনেকটাই সুস্থ।ঘরের ভিতর হেঁটে চলে বেরায়।কখনও সখনও এক পা  টেনে নিচে নামে,বাবা-মায়ের সাথে গল্প করে।রাতে বাইরে চেয়ার টেনে অন্ধকারে বসে কস্তুরী আভার মতো চাঁদ ওঠা দেখে।যৌনার্ত কোন পশুর ডাক শোনে অন্ধকারে।ভিতরের ঘরে জয়া পুড়ে ছাই হয়।সেই তোলপাড়  বাইরে বসেও টের পাওয়া যায়।

ভোররাতে জয়ার ঘুম ভেঙে গেল টানা বৃষ্টির মতো কান্নার শব্দে।একটা হাত বিছানার পাশে রেখে বুঝল অপূর্ব  নেই।
নিচের তলা,আশপাশ খুঁজেও যখন পাওয়া গেল না,তখন আলো ফুটেছে।মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়াতে পূজারী বললেন,কারে খোঁজো বৌমা? সে তো অনেকক্ষণ আগেই ঘাটের দিকে গেছে।
বুকটা ধক করে উঠলো জয়ার।প্রায় দৌঁড়তে দৌঁড়তে ঘাটের কাছে গিয়ে দেখল একদম নিচের একটা ধাপে ভিজে শরীরে অপূর্ব বসে।উপর থেকে নাম ধরে ডাকতেই ঘাড় ঘুরিয়ে  শিশুর মতো হেসে বলল,আমারই ভুল হয়েছিল জয়া।তেরোটা নয়,পনেরোটাই ধাপ।ভাগ্গিশ পনেরোটা, না’হলে হয়তো আমাকে আর খুঁজেই  পেতেনা।
ভোরবেলার একঝলক ভেজা হাওয়া এসে জয়ার শরীর ছুঁয়ে দিল।এখন আশপাশ কি মনোরম লাগছে।এক্কা দোক্কা খেলার মতন পা ফেলার ভঙ্গিতে জয়া ধাপ ভাঙতে ভাঙতে ছুটে গিয়ে ভেজা ঘাটেই অপূর্ব পাশে বসে পড়ল।
গঙ্গার জলে কাঠ,কুটো,ফুল,পাতা ভেসে চলেছে সামনের দিকে।সময়ের ভাটিতে ভেসে চলা কালের স্রোতের মতো।একটু আগেও জয়া অসীম শূন্যতায় কাটা ঘুড়ির মতো একা,ভাসমান ছিলো।এখন গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে।অনেকদিন পরে ভারহীন হয়ে।
অনেকক্ষণ ওইভাবে বসে থাকার পরে জয়া অপূর্বর হাত ধরে টেনে তুলল,বুকে ঠান্ডা বসে যাবে।চলো এবার বাড়ি ফিরি।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

তিমিরণ দত্তগুপ্ত




***ছাতা****
বাবা এই ঘর,সেই ঘর খুঁজেই চলেছেন।কিছুতেই পাচ্ছেন না।মুখে অস্থিরতা,একটা যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট।বারবার হাত উল্টে ঘড়ি দেখছেন।অফিস যাওয়ার সময় গড়িয়ে চলেছে।অথচ,জিনিষটাই পাওয়া যাচ্ছে না।আলমারির মাথা,জুতো রাখার তাক….কোথাও নেই।মা,আমি,দিদি আর পিসি হাঁ করে তাকিয়ে আছি।কারুর মুখে কোন কথা ফুটছে না।মা একবার মৃদুস্বরে বলেই ফেললেন,“থাক না এখন।বাইরে তো তেমন রোদ নেই।আজ না হয় না নিয়ে গেলে।কোথাও একটা আছে,আমি খুঁজে রাখবোখন”।

বাবা হাঁটু মুড়ে খাটের নিচে দেখছিলেন।ওইভাবেই ঘুরে মা’র দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন,“না নিয়ে যাবো?অসম্ভব,এতদিনের অভ্যেস পাল্টাবো কীভাবে”?

ধমক খেয়ে মা পিসির দিকে আড়চোখে তাকালেন,“দিদি আপনিই বলুন না”।

পিসি বার দু’য়েক বাবার দিকে তাকালেন।কিছু বলতে ভয় পেলেন বোধহয়।আন্দাজ করেই বাবা বললেন,“দিদি তুমি দয়া করে আর কথা বাড়িও না।জানই তো সব।ছাতা শুধু রোদ,জল আটকানোর জন্য নয়।একটা আশ্রয় বুঝলে।হাতে ছাতা না থাকলে কনফিডেন্স লেভেলটাই নষ্ট হয়ে যায়”।

বাবার একটা আদ্যিকালের কালো রঙের ঢাউশ ছাতা ছিল।আমার ধারণা ওটা কয়েক পুরুষের।দু’এক জায়গায় তাপ্পি মারা।অফিস,বাজার,এমন কি দিনের বেলায় অনুষ্ঠান বাড়িতেও বাবার সাথী।বেশ কয়েকবার দেখেছি ছাতাটা মাটিতে ভর দিয়ে বাবা বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন আত্মবিশ্বাসী মুখে।

আমি কোনকালেই ছাতা ব্যবহার করিনা।ছাতা নিয়ে বেরোলে হারানোর সম্ভবনা একশো ভাগ নিশ্চিত।এই নিয়ে বাবার অভিযোগের শেষ ছিল না।তবুও বলতেন,“খোকা বাইরে কড়া রোদ।ছাতা নিয়ে যাও।খোকা,

বৃষ্টি পড়ছে।জল মাথায় পড়লেই আর দেখতে হবে না”।

যথারীতি আমি শুনতাম না।আর,আমার ছাতা হারানোর বহর দেখে ধীরে ধীরে বকাবকিও বন্ধ হয়ে গেল।

গতকাল ছিল রবিবার।বাবা বাজার থেকে ফিরলেন এক হাতে ব্যাগ,অন্যহাতে ছাতা ঝুলিয়ে।ঘরের বাইরে একচিলতে জমিতে অন্য কয়েকটা গাছের সাথে অযত্নে বেড়ে ওঠা একটা কদম ফুলের গাছ।ছুটির দিন বাবা ওখানেই একটা নিচু ডালে ছাতা ঝুলিয়ে রাখতেন।স্নানের সময় ওটা পরিষ্কার হতো।মাথার উপর মেঘলা আকাশ।থেকে থেকে একটা দমকা হাওয়া দিচ্ছে।গাছের ডালে মলিন কালো ছাতাটা দেখে মনে হল,অনেক রোদ-বৃষ্টির গল্প নিয়ে এখন ঘুমোবে।

আমি ক্লাবে আড্ডা দিতে যাচ্ছিলাম।হাত বাড়িয়ে বাজারের ব্যাগ নিতে যেতেই বাবা আঙুল দিয়ে ছাতাটা দেখিয়ে বললেন,“তুমি বরং ওটা নিয়ে যাও।বৃষ্টি আসতে পারে”।

আমি ব্যাজার মুখে ছাতাটা বগলে চেপে বেরোতে বেরোতে শুনলাম বাবা সহাস্যে বলছেন,“কোথাও ফেলে এসো না যেন”।

আমার স্বভাব যাবে কোথায়!সন্ধেবেলা ক্লাবঘর,বন্ধুর বাড়ি ঘুরেও সেই আদ্যিকালের ছাতা পাওয়া গেল না।বাবার ভুলো মন।কখন আমাকে দিয়েছেন সে কথাও মনে নেই।

বাবা ব্যাজার মুখ করে খালি হাতে অফিসে বেরোনোর পর দিদি আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,“এটা নির্ঘাত তোর কাজ।”

সন্ধেবেলা বাবা থমথমে মুখে ঘর ঢুকলেন।চা নিয়ে এসে মা জিজ্ঞেস করলেন,“কী হয়েছে?”

“এই প্রথম অ্যাটেন্ডেন্সে লাল দাগ খেলাম”,বাবা সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন।

বাবার চোখে সবসময় একটা হাসি দেখতাম।আত্মবিশ্বাসী হাসি।দরজার আড়াল থেকে আজ সেই হাসিটা খুঁজে পেলাম না।ভীষণ এক অন্যমনস্কতা এবং বিষণ্ণতা মাখানো মুখ।বেশিক্ষণ সেদিকে তাকানো যায় না।একটা ছাতা হারালে মানুষ এত সর্বশান্ত হয় জানতাম না।মা দরজার দিকে ফিরে আমায় ডাকলেন,“আয় না।”

আমি দোকান থেকে বাবার জন্য একটা নতুন ছাতা এনেছিলাম।রঙ্গীন,বাহারি ফোল্ডিং ছাতা।ভয়ে ভয়ে বাবার দিকে এগিয়ে দিতে নির্লিপ্তভাবে দেখলেন।তারপর আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন,“তোমার দিদিকে দিও।ওর কাজে লাগবে।”

মা মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,“তোমার সবেতেই বাড়াবাড়ি।ছেলেটা নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছে।ব্যবহার করলেই হয়।”

বাবা দীর্ঘ করে নিঃশ্বাস ফেললেন।সামনের জানালা দিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন।তারপর একটা করুণ হাসি ঠোঁটের গোড়ায় ঝুলিয়ে বললেন,“এতদিন সংসার করলে।আর এইটুকু বুঝলে না?”

পরেরদিন অনেক খুঁজে কলেজস্ট্রীট থেকে ওইরকম একটা ঢাউশ,কালো,বাকানো কাঠের হাতলের ছাতা পেলাম।বাবা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন।বারকয়েক খুললেন,বন্ধ করলেন।আমরা দমবন্ধ করে বাবার মুখের দিকে চেয়ে রয়েছি।ছাতাটা বন্ধ করে আমার হাতে দিয়ে একটু হাসলেন,“টেবিলে রেখে দাও।কাল নিয়ে যাবো।”

পরের দিন খেয়েদেয়ে ছাতা হাতে নিয়ে অফিসে বেরোলেন।মা,দিদি হাসি হাসি মুখ করে দেখছে।পিসি হাতজোড় করে প্রণাম করে বললেন,“ঠাকুর,ঠাকুর।”

আমিও বাবার চলে যাওয়া দেখলাম।সেই ছাতা দোলাতে দোলাতে চকচকে জুতো পায়ে মশমশ করে আত্মবিশ্বাসী হাঁটা নয়।বগলে ছাতা নিয়ে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে গলির মুখে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

বাবার দুর্ঘটনার খবর পেলাম সন্ধের মুখে।রাস্তা পেরোতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কা খেয়েছেন।ভিড় সরিয়ে সামনে গিয়ে দেখলাম উপুড় হয়ে পড়ে আছেন।থ্যাঁতলানো মাথা,হাঁ মুখের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।ডান হাতের মুঠোয় তখনও সদ্য কেনা ছাতার হাতল।

দিন কয়েক পরে শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ করে ফিরছি।বেশ রাত হয়েছে।হবিষাণ্ণ খেয়ে খেয়ে শরীর দূর্বল।সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ।কখনও সখনও এক-আধ পশলা বৃষ্টিও হয়েছে।বড় রাস্তার মুখ থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে মিনিট পনেরো লাগে।রাস্তার বাতির ম্লান আলোয় ভাল করে কিছু দেখা যায় না।হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি নামলো।কাছাকাছি কোন রিক্সাও দেখতে পেলাম না।দৌড়ে সামনের বন্ধ দোকানের শেডের তলায় পৌঁছনোর আগেই ভিজে একসা।পরনের কোরা কাপড় ভিজে জবজবে,মাথা দিয়ে জল গড়াচ্ছে।ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতেই ঘাড়ের কাছে একটা তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়া পেলাম।চমকে মুখ ঘোরাতেই দেখি কাঁচা-পাকা দাড়ি মুখে এক বৃদ্ধ।লম্বা,ঢাউশ এক ছাতা মাথার উপর মেলে বললেন,“এমন বৃষ্টিতে ছাতা ছাড়া কেউ বেরোয়।”

আমি কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।এখানে আশ্রয় নেওয়ার সময় কাউকে দেখিনি।বললাম,“বৃষ্টি হবে বুঝতে পারিনি।”

হালকা অন্ধকারেও বুঝলাম ভদ্রলোক হাসলেন।বললেন,“কোন কিছুই কী আগে ঠিক করা থাকে।তবু প্রস্তুত থাকা ভাল।কখন কী হয়ে যায় কে জানে।ছাতা একটা আশ্রয়,হাতে থাকলেও বল ভরসা।চলো,তোমাকে এগিয়ে দেই।”

আমি বাধা দিয়ে বললাম,“না,না।তার দরকার নেই।বৃষ্টি থামলেই চলে যাবো।”

বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার হাত ধরে টান দিলেন,“এই বৃষ্টি থামবার নয়।তোমার অশৌচ চলছে।বৃষ্টির জল মাথায় পড়লেই হলো।এখন একটু সাবধানে থাকতে হয়।”

বাড়ির সামনে আসতেই বৃষ্টি থেমে গেল।কদম গাছের তলায় একটা কাঠের বেঞ্চি।গাছের কয়েকটি পাতা পড়ে আছে।বাবা ওখানে বসে চা খেতেন।মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ উঠেছে।চাঁদের আলো ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে মলিন হল সামান্য।কদম গাছের ছায়া যেন সামান্য হেলে বেঞ্চির উপর এসে পড়েছে।একটা কাঠবেড়ালি কদম গাছের ডাল বেয়ে উঠতে উঠতে একবার থমকে দাঁড়ালো।বৃদ্ধ ভদ্রলোক সেইদিকে তাকিয়ে ছাতা বন্ধ করে ভেজা কাঠের বেঞ্চিতে বসে অস্ফুটে বললেন,“বড় মায়া হে।ছেড়ে যেতে মন চায় না ।”

বললাম,“কিছু বললেন?”

“একটু জল খাওয়াতে পারো খোকা?”

‘খোকা’ ডাক শুনে একটু অবাক হলাম।বললাম,“ভিতরে আসুন না।”

ভদ্রলোক হাত তুলে মানা করলেন,“আগে মায়ের সাথে দেখা করে এসো।সদ্য বিধবা মা,তোমার পথ চেয়ে বসে আছেন।তুমিই তো এখন আশ্রয়।জল খেয়েই চলে যাবো,অনেকটা দূর যেতে হবে।”

ঘরে ঢুকে মাথা মুছে জল আনতে সামান্য দেরী হলো।বাইরে বেরিয়ে দেখলাম কেউ কোথাও নেই।কিছুক্ষণ আগেও বৃদ্ধ ভদ্রলোক এখানে এই কাঠের বেঞ্চিতে বসেছিলেন।ভেজা মাটিতে এখনও স্পষ্ট পায়ের ছাপ।অথচ,মানুষটিই নেই।আমার আসতে দেরী হওয়ায় বোধহয় অভিমান করে চলে গেলেন।ফিরে আসছিলাম।হঠাৎ চোখ গেলো কদম গাছের নিচু ডালের দিকে।দেখি একটা কালো,মলিন,ভেজা ঢাউশ ছাতা সেখানে ঝুলছে।ছাতাটা হাতে নিয়ে ঘরে এলাম।যদি ভদ্রলোক ফিরে আসেন কখনো।

আমার ছেলে ছাতা পছন্দ করে না।ওর সুন্দর রেইন কোট আছে।আমি এখন একটা লম্বা,কালো ছাতা নিয়ে বাজারে যাই,অফিসে যাই।বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগে।মনে হয়,বাবার হাত ধরে হাঁটছি।