জয়তী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয়তী রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

জয়তী রায়

গুপ্ত হত্যার নেপথ্যে
___________'____________
    
________________

ভালোবাস আমাকে? তারা? ভালোবাসো? 
   সন্ধ্যার ঘন আধাঁর শরীরে জড়িয়ে বসে আছে তারা আর কিস্কিন্ধ্যা রাজ বালি। মনোহর উদ্যান। প্রযুক্তিবিদ নল তার সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান উজাড় করে সৃষ্টি করেছে দেবলোকের চাইতেও  সুন্দর উদ্যানটি।  কিন্তু,  উদ্যানের আলোকময় দ্যুতি ,সমস্ত অহঙ্কার ,প্রকৃতির অনিন্দ্য শোভা __সব ম্লান হয়ে যায়, যখন,  তারা সেখানে এসে বসে। ঈশ্বর ,তাঁর ঝুলির সবটুকু সেরা সম্পদ উজাড় করে দিয়েছেন এই রমণী কে। পৃথিবীর সেরা রূপবতী জীবন সঙ্গিনী হলে, পুরুষদের হাল বড়ই করুণ হয়, রাজা বালির চাইতে একথা আর কে বেশি জানে?  বার বার আবোধ   প্রশ্ন করে নিশ্চিন্ত হতে চায়: 
আমাকে ভালোবাসো? তারা? আমাকে ভালোবাসো। 
অবুঝ স্বামীর সবল বুকে পিষ্ট হতে হতে  , অস্ফুটে তারা  বলে ভালবাসি ভালোবাসি। 

     ____তুমি কত সুন্দর তারা! যত দেখি, মুগ্ধ হই। মুগ্ধতা যেন কাটতেই চায়না। 
___আপনি বীর শ্রেষ্ঠ। স্বাধীন রাজা। আপনার শৌর্য বীর্য্য লজ্জা দ্যায় দেব দানব মানবকে। রমণী মনোহর রূপ আপনার। এমন আকুলতা আপনাকে শোভা দ্যায় না মহারাজ। মৃদু তিরস্কার করে তারা। 
____ভয় করে তারা। তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। 
___পৃথিবীর কোনো পুরুষের ক্ষমতা নেই আপনার কাছ থেকে আলাদা করে আমাকে। আপনার সামনে অন্য পুরুষ , নারী বলে ভ্রম হয়! 
 জোরে হেসে উঠে বালি বলে, 
 ভ্রাতা সুগ্ৰীব আর বিরক্ত করেনি তো তোমাকে? তাকে খুব করে তিরস্কার করেছি। 
___তাতে কোনো প্রতিকার হলো না মহারাজ। তার পত্নী, রুমার  চাইতে আমি তার বেশি প্রিয়। সারাক্ষণ আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।
___ শোনো শোনো। এতে দোষের কিছু নেই। পুরুষ সর্বদা অপরের পত্নীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। 
___পরিহাস নয় । 
___আপনি জানেন না মহারাজ, রাজ্যে এসেছে দুই মহা শক্তিধর।  রাম লক্ষণ। তারা মহাবীর। সুগ্ৰীব তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।  কাম মানুষকে উন্মাদ করে দ্যায়। আমি ভীত। 
___,ভয় নেই মহারানী। যত বড় বীর হোক। সামনে থেকে যুদ্ধ করলে, আমাকে কেউ হারাতে পারবে না। তাই তুমি নিশ্চিন্তে  আমার বুকের ভিতর ছোট্ট পাখিটির মত থাকো।
___আপনার কোনো বিপদ হলে, ওই সুগ্ৰীব আমায় ছিঁড়ে খাবে। যে ভোগ্য দেবতার , সে ভোগ্য কখনো শৃগালের যেন না হয়। 
বালি সজোরে জড়িয়ে ধরল প্রিয় তমা পত্নী কে। আশ্বাসে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে থাকল প্রিয়ার শরীর। হঠাৎ অন্ধকার চিরে বিদ্যুৎ ঝলকের মত বালির পিঠে বিঁধে গেল বাণ। একটি। দুটি। তিনটি। পর পর। যতক্ষণ না লুটিয়ে পড়ে বালি। উন্মাদের মত চিৎকার করতে লাগল তারা। খোলা চুল, সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। মহা বলশালি বালির শরীর তখনো কাঁপছে। ছেড়ে যেতে চাইছেনা সাধের রাজ্য। প্রিয় পত্নী। প্রিয় পুত্র। 
কে এই গুপ্তঘাতক! সামনে আসুক
  আগুনের মত জ্বলছে বালির চোখ। ধীরে ধীরে সামনে এল ঘাতকের দল। রাম লক্ষণ আর সুগ্ৰীব। 
    সুগ্ৰীব এসেই তারার কোমরে হাত রেখে কাছে টানল
       " এবার? এবার কি হবে? দ্যাখ। কেমন করে হত্যা করলাম তোর ওই নায়ক কে। এবার? 
___কোনোদিন তুই আমাকে পাবি না, নরাধম।
___রাজি হতেই হবে। নতুবা তোর পুত্র অঙ্গদ হবে আমার শিকার। 
বালির শরীর ছুঁয়ে বসে রইল তারা। জ্বলছে দুটি চোখ। সমস্ত শরীর মাখামাখি প্রিয়তমের রক্তে। হিম শীতল গলায় উচ্চারণ করল:
 তুই পাবি   শরীর। আমার মন আজ চলে গেল সহমরণে। মন দ্বিচারিনী হবে না কখনো।  বালি পত্নী তারা __এই নাম থাকবে অমর হয়ে। 
    রাত শেষ হতে চলল। এক লজ্জাজনক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ক্লান্ত সূর্য  উদিত হল কিষ্কিন্ধার আকাশে।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

জয়তী রায়

মন এবং আমি
_______________________
             
___________________________
     মন এবং আমির দ্বন্দ্ব চিরকালের।
           প্রচলিত কথা আছে__আমার মন খারাপ।
                  আমার মন, ভালো। আমার মন, বেড়াতে চায়। আমার মন, ঝগড়া করতে চায়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
  এমন নানাতর ব্যাপারে ___নিয়ে মানুষ খুব ব্যস্ত। আমি নিজেও কলকাতায় ফিরে আসার পরে, বেশ মন খারাপ করে থাকতাম। মনে হত, কিছুই যেন বুঝতে পারছিনা। কাউকে তেমন ভাবে আগে চিনতাম না, আর যাদের চিনতাম__তাদের ব্যবহার অচেনা ঠেকত। মজার কথা হল__যারা আমার কাছে কাউন্সিলিং করতে আসত, তারাই তখন স্বান্তনা দিচ্ছে __মন খারাপ করো না। সব ঠিক হবে।
    ডাক্তারের কি রোগ হবে না? মন নিয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকি বলে, আমার মন , খারাপ হতে পারে না?
     এই হল সূত্রপাত। খুব রাগ হল নিজের উপরে। এই " মন " ব্যাটাকে ধরত চেপে। তার এত সাহস? নিজে খারাপ হয়, আবার শরীরকে খারাপ করে ? রাগ করতে গিয়ে দেখলাম, ___মন তো আমার হাতে নেই! মন আমার কথা শুনছে না! উল্টে আমি শুনছি মনের কথা। অর্থাৎ মন চালিত রোবট একজন আমি। রিমোট হাতে মন , প্রভুত্ব করছে, শরীরের উপর, দেহের অণু পরমাণুর উপর ।
       দুঃখ কষ্ট জীবনের অঙ্গ। সুখ দুঃখ__আলো আর অন্ধকার। মানুষ জৈবিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হলে পরে শুরু হয় আবেগের চাহিদা। অন্তহীন সে চাহিদা।
   প্রেম করার, ঘুড়ি ওড়ানোর, মিথ্যা বলার, প্রতারণা করার, লেখার, আঁকার ___সহস্র আবেগ। এই আবেগের স্রোত বাধা পায় মাঝে মাঝে। কষ্ট হয়। আপনজন আঘাত করে__কষ্ট হয়। অফিসে, বন্ধুদের আড্ডায়__সব জায়গায়__কষ্ট লুকিয়ে থাকে বিষধর সাপের মত।
  ছোবলে ছোবলে রক্তাত্ব মন , বার্তা পৌঁছে দিতে থাকে মস্তিষ্কে। ব্রেনের হাইপোথ্যালামাসে সেই কষ্টের বার্তার আঘাতে, কিছু রাসায়নিক অনু , ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে।  আক্রান্ত করে হৃদপিন্ডকে। যার অবধারিত ফল __করোনারি হৃদরোগ।
      ডাক্তারী কচ্কচি র মধ্যে না গিয়ে, সহজ কথায় বলি, স্ট্রেস শব্দটা পৌঁছে গেছে মানুষের নিত্য জীবনে। খুব স্বাভাবিক। প্রতিদিনের জীবন কদর্য। বাস অটো খোলা রাস্তা নিজের গৃহকোণ__সদা শঙ্কিত মানুষ। সেইসঙ্গে রয়েছে, সম্পর্ককে নিয়ে দায়। তার থেকে চাপ। সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দিচ্ছে হাজার জানালা। সেই জানালা দিয়ে আলো যেমন আসছে, তেমনি আসছে ঝড় বৃষ্টি তুফান। মোকাবিলা করতে করতে ক্লান্ত মানুষ।

    মন না মস্তিষ্ক __মানুষকে কে চালায়__এই কচকচির ঝামেলা অনেক। মন নিয়ে কথা বলি বরং। সোজা কথা হল, সাধারণ মানুষকে চালায় মন। আর এই বেয়াদপ মনকে লাগাম পরাতে পারেন যারা , তারা হলেন নমস্য ব্যক্তি। মহামানব।
   মনকে খুশি রাখো, আনন্দে রাখো__তবে শরীর ভালো থাকবে__হামেশাই বলে থাকে ডাক্তার। কিন্তু, খুশি থাকার উপায় আমরা খুঁজি বাইরে থেকে। ফেসবুক , বন্ধু, বেড়ান__এগুলোর উপর নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে। কোনো একজন প্রিয় মানুষের মুখ মনে করলে দিন বদলে যায়। মন ভালো থাকে।
  তাই কি? ভালো থাকবে কি? বাইরের বস্তুর উপর নির্ভর যদি করে আমার মনের ভালো থাকা__তবে সেই _মন__আমার রইল কি?
   একদম সেটা সঠিক উপায় না। ফেসবুক, প্রকৃতি, বন্ধু __সব থাকুক জানালা হয়ে কেবল। দরকার মত খুলব, দরকার মত বন্ধ করব। তাদের ছাড়া মন খারাপ করা চলবে না।
  সেটা কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। শুধু কতগুলো পরিবর্তন আনতে হবে যাপনে। সঙ্গী হতে হবে পজিটিভ। জীবনে লক্ষ্য থাকবে, লোভ না।
  জীবন এক রঙ্গমঞ্চ। কোটিপতি ফিল্মস্টারদের জীবনে ঝড় আসছে । কেউ নিরাপদ না। কেউ জানেনা পরবর্তী দৃশ্য কি হবে? জীবন শুধু মুহূর্তের মধ্যেই সীমিত। কাজেই কালকের কথা ভেবে লাভ আছে কিছু? যখন আমার হাতেই নেই কিছু।
  মন কে হাতের মুঠোয় আনা যাবে না। কিন্তু তাকে বোঝানো যাবে। অবুঝ মন , ওরে অবুঝ মন__শান্ত থাক। সুন্দর থাক। এত বায়না করিসনি বাপ। বেশি বাড়াবাড়ি করলে, দেব অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে।
তুই ঐখানে বসে ঘ্যানর ঘ্যানর করে যা। আমরা ভালো আছি। ভালো থাকব।

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

জয়তী রায়

রুমাল
______
     তৃণা নাক কুঁচকে রইল। মলয়ের পকেটে টাকা, রুমাল আর এক বিশেষ গন্ধ। গত তিনদিন ধরে একই গন্ধ। আবার শুঁকল রুমাল। কোনো ভুল নেই।
    আজ পুরোনো বন্ধুদের গেট টুগেদার। এক এক বাড়িতে ঘুরে ফিরে হয়। এবার তৃণা মলয়ের বাড়ি। শনিবারের রাত। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে উন্মাদনা। হঠাৎ নীলা এগিয়ে আসে। পুরোনো বান্ধবী। পরম মমতায় তৃণার কাঁধে হাত রেখে বলে__কি গো। এত ব্যস্ত কেন আজকাল? বরের দিকে চোখ রেখ।
     তৃণা একদম চমকে উঠল! মানে? কিছু কি চলছে তবে? রুমালে কিসের গন্ধ? কার শরীরের নিষিদ্ধ গন্ধ?
   তৃণা অপেক্ষা করতে লাগল । পার্টি শেষ হতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল রাগী বিড়ালের মত
   বলতেই হবে। কিসের গন্ধ? রুমালে?
 ভালো করে চোখ খুলতে পারছে না। টলছে মলয়। অবোধের মত চাউনি__কিসের রুমাল? কিসের গন্ধ? কাল সকালে...।
__না। এখনি।এখুনি।
 মলয় ঝাঁকুনি দিয়ে সিধে দাঁড়াল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল
   আমার মায়ের। যে মাকে বিয়ের পর নানারকম অত্যাচার করে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য করেছ? সে ই মায়ের। হ্যাঁ । এখন আমি রোজ যাই। রোজ। রুমালের গন্ধ মায়ের শরীরের পান দক্তার গন্ধ।

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

জয়তী রায়



সোনালী চিলের ডানা
------------------------------------
অফিস থেকে ফেরবার সময়, বাড়ির কাছে পার্ক টাতে একটু বসে যান , বিনয় বাবু। বাড়িতেও তো চাবি ঘুরিয়ে ঢুকতে হবে। রমা , নিশ্চয়ই বাড়িতে নেই। বুবাই কে নিয়ে টিউশনিতে গেছে। সেই তো একলা বাড়িতে ঢোকা, পরে ঢোকা আর আগে-- ফারাক কি?  
রমা খুব সংসারী মহিলা। খুব গোছানো।  সবচেয়ে বড় গুন, নিজের অবস্থান কে ভেঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, বিনয় বাবুর। সাধারণ গ্রামের মেয়ে হয়ে, এত উচ্চাশা কি করে নিজের ভেতরে , লুকিয়ে রেখেছিল, বুঝে পান না তিনি। 
বিয়ের পরে তো, বেশ সাধাসিধে, গোলগাল , মিষ্টি বউ হয়ে ঢুকলো, সোনারপুর এ বিনয়দের , যৌথ পরিবারে। 
বিনোয়বাবুর বাবা রা তিন ভাই। তিনজনে একসঙ্গে থাকেন। খোলামেলা বেশ বড়ো বাড়ি। বাংলাদেশ থেকে, ছিন্নমূল হয়ে ,আসবার পরে, নিজেদের চেষ্টায় একটু একটু করে বাবা , কাকা রা দাঁড়িয়েছেন। সুন্দর করে বাড়ি করেছেন। ফলফুলের গাছ লাগিয়েছেন। সময় মতন, বাড়ির বড়ো ছেলে, বিনয়ের বিয়ে দিয়েছেন , গ্রামের মেয়ে রমার সঙ্গে। 

 রমার ছিল, আকাশ ছোঁয়া উচ্চাশা। বিনয় চাকরি করতো কলকাতায়। রোজ যাতায়াত করতো সোনারপুর থেকে। রমা বায়না করতে থাকলো, কলকাতা তে থাকবার জন্য। এর মধ্যে, বুবাই এসেছে তাদের জীবনে। রমার বক্তব্য, বুবাই কে , ভালো করে মানুষ করতে হবে। তাই, শহরে গিয়ে থাকতেই হবে। তার জিদ এবং কৌশলের কাছে মাথা নত করে, শহরের ঘুপচি ভাড়া বাড়িতে গিয়ে  উঠলেন। বুকের ওপরে, একমন ওজনের দুঃখের পাথর বয়ে নিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করলেন বিনয় বাবু। 
কর্মী মেয়ে রমা , খুব  তাড়তাড়ি, শহরের জীবনে , অভ্যস্ত হয়ে উঠলো। বুবাই কে ভালো  স্কুলে ভর্তি করা শুধু নয়,বুবাইয়ে র জীবনের মধ্যে নিজের জীবন কে একবারে ঢুকিয়ে নিলো। নিজের কোনো আলাদা অস্তিত রাখলো না। বিনোয়বাবুর ও চাকরিতে উন্নতি হয়েছে। এক হাত পা ছড়ানো ফ্লাট কেনা হলো। বাবা , মারা গেলেন। মা কে নিয়ে আসবার কথা বলতেই, রমা হাঁ হাঁ করে উঠলো---" কেন? মা তো ভালোই আছেন ওখানে। সবার সঙ্গে আছেন। এখানে মা এলে আমি কি করে দেখবো? বুবাইকে দেখে , আমার কি আর সময় আছে? " 
*
ঠিক কথা। বিনোয়বাবু , অফিস ফেরত চাবি দিয়ে দরজা খোলেন, চা বানান। বারান্দাতে বসেন। মা র কথা ভাবেন। রমা , বুবাই কে  নিয়ে অংক টিউশনিতে গেছে।
সারাদিন শুধু বুবাই বুবাই আর বুবাই। সারাদিন বুবাইয়ে র কানে মন্ত্র পড়া,--"কোনো ছেলে কে খাতা দেখবি না।"
                             " কাউকে বেশী পাত্তা দিবি না।" 
                              এক ঘন্টা খেলবি। তার বেশী না."
                              ওর পায়ে ব্যাথা তো তোর কি? তুই ওকে পৌঁছে দিতে যাবি না।"
"ঠাকুমা কে দেখতে যেতে হবে না। তোকে ফার্স্ট হতে হবে বুবাই।  সময় নষ্ট করলে চলবে না।

*
বিনয় বাবু অবাক হয়ে দেখেন, সেজেগুজে একটা স্বার্থপর রোবটের মতো স্কুল যাচ্ছে বুবাই। কঠিন মুখ। সেই  চঞ্চল , বায়না করা ছেলে টা কোথায় হারিয়ে গেছে। তার বদলে , সে এখন কম কথা বলে। লড়াইয়ে র ময়দানের খেলোয়াড়ের মতো , তার মুখের পেশী গুলি শক্ত। কোনো দিকে দৃষ্টি নেই। শুধু ওকে ফার্স্ট হতে হবে , হতেই হবে। রাত বাড়তে থাকে। বুবাইয়ের ঘরের দরজার বন্ধ দরজার সামনে এসে স্তব্ধ হয়ে যায়, চাঁদ, তারা, শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত। মা- ছেলে দুজনের চোখে জ্বলে, শিকারীর হিংস্রতা। 
*
অথচ, কি আশ্চর্য! এত দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের পরেও, প্রত্যেক বার পরীক্ষা তে প্রথম হয়, তারই প্রতিবেশী র ছেলে সুমিত। সে ছেলে, হাসতে হাসতে রেজাল্ট নিয়ে তাদের বাড়ি ঢোকে। বিনয় কে প্রনাম করে। " কাকিমা" বলে, রমাকে জড়িয়ে ধরে। রমার চোখ ধক ধক করে জ্বলে। সুমিত খেয়াল ও করে না। আপনমনে খোলা হওয়ার মতো,নিজের বাড়ি চলে যায়। 
প্রত্যেক বছর একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হতে হতে, বুবাই ক্লাস টেন এ ওঠে।
*
রমা র মুখ দেখলে এখন ভয় করে, বিনয় বাবুর। সে মুখ মানুষের না এক ভয়ংকরী র? এক প্রেত সাধনা কারী ভৈরবী র মতো লাগে রমা কে। যন্ত্রে ফেলে লেবুকে চটকানোর মতো, নিংড়োতে থাকে বুবাই কে, রমা। বিনয় বাবু হাত জোড় করেন  রমা র সামনে -" ছেলে টা কে কি মেরে ফেলবে তুমি? সেকেন্ড তো হচ্ছে প্রত্যেক বার। তবে?"
" কেন পারবে না ফার্স্ট হতে? কি আছে ঐ সুমিতের মধ্যে? ফার্স্ট হতেই হবে। নইলে ওকে ছাড়বো না!"

বিনয় বাবু আর পারেন না। এটা একটা সংসার? মূল্যবোধ নেই। ভালোবাসা নেই। আছে শুধু, লোভ আর আকাঙ্খা র তীব্র বিষ! খুব শরীর খারাপ লাগে তার। আগামী কাল, ক্লাস টেনের ফার্স্ট টার্মিনাল এর রেজাল্ট বেরোবে। আগামী কাল , সুমিত আবার ফার্স্ট হবে। আবার মা ছেলে, ভাত খাবে না। আবার বাড়ী থেকে,শ্মশানে র চিতার  মরা পোড়ানো গন্ধ বেরোবে।
না, কাল ভোরে উঠেই , তিনি , সোনারপুর এ যাবেন। আর নিতে পারছেন না তিনি।
পরদিন ভোরের ট্রেনে, সোনারপুর চলে গেলেন , বিনয় বাবু। রমা শুধু একবার চোখ তুলে তাকালেন। বুবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে। একবুক কষ্ট নিয়ে , ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। আহারে! কি মায়াময়, ঘুমন্ত বুবাই। এক সুকুমার কিশোর, পরম শান্তিতে, বালিশ আঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে। একবার ভাবলেন, রমা কে কি হাতেপায়ে ধরবেন? বলবেন কি, ছেড়ে দাও ছেলেটা কে রমা। নষ্ট করো না ওর কৈশোর টা কে! 
নিঃশাস ফেলে  জুতো তে পা   ঢোকালেন ,বললেন," রমা, বুবাই যখন স্কুলে যাবে, যদি পারো , ইলেকট্রিসিটি বিল টা বিল টা দিয়ে এস। আজ লাস্ট ডেট। "  রমা ,কলের পুতুলের মতন মাথা নাড়ে। নিঃশাস ফেলে, সোনারপুর চলে গেলেন বিনয় বাবু।
*
সেদিন রাতেই ফোন এলো রমার।  উনি যেন এখুনি কলকাতায় চলে আসেন। একবুক  আশংকা নিয়ে পাখীর মতো উড়ে , বাড়ি চলে এলেন বিনয় বাবু। 
এসে যা দেখলেন, যা শুনলেন, তাতে মাথা ঘুরে গেল তার। বুবাই খুন করেছে সুমিত কে!  আকাশ যদি ভেঙে পড়তো মাটিতে, পৃথিবী তলিয়ে যেত অতলে, বিনয় বাবু, এত ভেঙে পড়তেন না। কিন্তু এ কি? এ কি করে সম্ভব? 
রেজাল্ট বেরোনোর পরে, দেখা গেল, সুমিত যথারীতি ফার্স্ট হয়েছে। বুবাই সেকেন্ড। ছুটির পরে, বুবাই , সুমিত কে,ডেকে নিয়ে আসে ওর বাড়িতে। রমা ছিল না। ফাঁকা বাড়িতে, সুমিত কে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে, কম্পাস দিয়ে খুঁচিয়ে , খুঁচিয়ে মেরেছে বুবাই।  মনের গোপন  কোনের সমস্ত হতাশা, রাগ, ঘৃণা সব দিয়ে মেরে ফেলেছে নিরীহ ছেলেটিকে।

রমা  হতবাক হয়ে বসে আছে। বুবাই ও তাই। সুমিতের মৃতদেহ ,সেপটিক ট্যাংক এ ফেলে দিয়েছে মা ছেলে মিলে। 
*
বিনয় বাবু ভাবলেন। অনেক ভাবলেন। তারপরে উঠে পুলিশ কে ফোন টা করলেন। 
 বুবাই একটা  কথা ও বলে নি। যে ছেলে ছিল , মায়ের হাতের যন্ত্র পুতুল, সে মার দিকে তাকালো না পর্যন্ত। পুলিশ আসার পরে ছেলেকে জড়িয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন বিনয় বাবু। 
খুব শান্ত  স্বরে বুবাই বললো," ঠিক করেছ ফোন টা করে বাবা। তবে তুমি ও যদি মায়ের হাতের পুতুল না হতে, আমাকে এই ভাবে জেলে যেতে হতো না। সুমিত কেও মরতে হতো না। আসি বাবা।" 
,-------------------------------------------------------------------
    
                 সত্য ঘটনা অবলম্বনে

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

জয়তী রায়

হলুদ পাথর ২
----------------------------
       মারিয়াকে সান্ত্বনা দিয়ে লাভ নেই। বাইরে থেকে আমেরিকানদের যত খানি দাম্ভিক মনে হোক না কেন, ভেতরে ওরাও উষ্ণতা খোঁজে, আপনজন খোঁজে।  আসলে অন্ধ বিশ্বাস করে যে কোনো লাভ হয়না কখনো ভালোবাসায় পড়লে মানুষ এটাই ভুলে যায় সবচেয়ে আগে। 
 পৃথিবীর এই প্রান্তের নাম পোর্টল্যান্ড। আমেরিকার পশ্চিমপ্রান্তে অরিগণ রাজ্যের এক ছোট্ট শহর পোর্টল্যান্ড। শহর না ছবি? বিদেশে এলে বোঝা যায় মানুষ নিজের শহরকে কতখানি ভালোবাসে। বছরের অর্ধেক সময় বরফের ভরে থাকে। শাবল গাইতি মেশিন দিয়ে বরফ সরিয়ে কাজ করা। বরফ নিয়ে কোনো আলহাদ নেই মোটেও। রীতিমতো খেটে খেতে হয় মানুষকে। আমরা ছবিতে লাল ফুল নীল ফুল কালো চকচকে রাস্তা দেখে হা হুতাশ করি, একটা কাগজের টুকরো ফেলবেন না কেউ। হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াবে ডাস্টবিন। আর কলকাতার বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলা নোংরার কথা কে না জানে? শুধু সরকারকে দোষ দিলেই " চলবে না চলবে না" করলেই কাজ সারা হয়ে গেল। পৃথিবীর কোনো দেশে ভোট নিয়ে এতো আদিখ্যেতা হয়না। থাইল্যান্ডে ভোট হয় রবিবারে। যাতে কোনো স্কুল ছুটি দিতে না হয়। কথা হচ্ছিল পোর্টল্যান্ডের। শান্ত শহর। সকাল হতেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। বাড়ি গুলো ছবির মতো। ভেতর বাইরে সব সাজানো। পদীর মাসি, রামের মা কিছু নেই। সব নিজের হাতে করে ঝকঝকে তকতকে। ফুল যে কতরকমের তাতে আবার হাত দেওয়া যাবে না। নির্জন রাস্তায় দুপুরবেলা এক থোকা ফুল যেই ছিঁড়তে গেছি এক লম্বা ছায়া পড়লো পিঠের পেছনে।
       ( চলবে)

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

জয়তী রায়


হলুদ পাথর ১

         এখন পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে। গাছের রং পাতার রং মাটির রং আলাদা । তোমার ওখানে দিন তো আমার রাত। তোমার শুরু তো আমার সারা। তবু কি আশ্চর্য! ভালোবাসার রং বদলায়না। মানুষের ভাব বদলায় না। সরলতা আবেগ ঘৃণা সবার চেহারা সব দেশে সব সময়ে এক রকম। 
    মারিয়া এসে হাজির রাত দুপুরে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আমরা সবাই। উদভ্রান্ত কলিং বেল উঠিয়ে দিলো আমাদের। ভেতরের ক্যামেরায় মারিয়াকে দেখে তাড়াতাড়ি দরজা খোলা হলো। হাড় কাঁপানো শীতের রাতে শহরের অন্য প্রান্ত থেকে গাড়ি চালিয়ে ছুটে এসেছে বাইশ বছরের মেয়েটি। কেন গো? কফি জল দিতে না দিতেই এক অসহায় মেয়ের মতো সোফাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লো সে, আমেরিকান অহংকার নয় যেন সেই চির পরিচিত কোনো  বিরহিণী।
   " ও মারিয়া কফি মুখে দাও।" 
" আমি আর পারছি না। আমি ওকে এতো ভালোবাসি। ও আমাকে প্রমিস করেছিলো। অন্ধের মতো বিশ্বাস করি ম্যাথুজকে। আজ আবার লিজিকে নিয়ে উএক এন্ড এ চলে গেলো বেড়াতে। কিছুতেই একলা থাকতে পারছিলাম না। তোমাদের কাছে চলে এলাম।"
           ( চলবে)

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

জয়তী রায়


             ৩ নং
----------------------------------------
*
 নিমাই গয়া গিয়ে কেমন থমকে  গেলেন। কি এক অনুভূতি হচ্ছে। কেন? তিনি পিতৃ শ্রাদ্ধ করতে গিয়ে  দর্শণ করলেন বিষ্ণু পাদ পদ্ম। প্রনাম করে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে গেলো।  যেন দেখলেন এক অসীম জলরাশি তার ওপরে সেই পাদ পদ্ম ---
       অশ্রুধারা বহে দুই শ্রীপদ্ম নয়নে।

          লোমহর্ষ কম্প হইলো চরণ দর্শনে।।
                   
সমস্ত বিদ্যার অহংকার ভাসিয়ে দিয়ে  আকুল কেঁদে উঠলেন নিমাই পন্ডিত।  যে তিনি যুব সমাজের নায়ক: যে তিনি দল গড়ে খোল বাজিয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাত করে দেন: যে তিনি কাজী দমনে দলবল নিয়ে তার বাড়ি গিয়ে উঠেছিলেন , তাঁর ঐ সমাজ সংস্কারের খোলসের মধ্যে লুকিয়ে ছিল যে ভক্তির সাগর তা ফুলে ফেঁপে বেরিয়ে এলো আজ। 
   খুব অন্যমনস্কের মতো পিতৃ তর্পণ করে রাস্তায় বেরিয়ে এসে চমকে গেলেন। সামনে আবার সেই বৃদ্ধ বৈষ্ণব ঈশ্বর পুরী! নিমাই আর ঈশ্বর পুরী! মুখোমুখি দুজন। একজন যুবক। অন্যজন বৃদ্ধ। একজন উদ্ধত অহংকারী পন্ডিত  একজন পরম বৈষ্ণব। তাকিয়ে রইলেন নিমাই। মিটি মিটি হাসছেন ঈশ্বর পুরী। শিষ্য যদি চৈতন্য মহাপ্রভু হন তাকে গুরু খুঁজে নিতে বাধ্য। নিমাই বুঝলেন সময় হয়েছে দীক্ষা নেবার। গুরু শিষ্য দুজন দুজনকে চিনলেন। পুরী কৃষ্ণের দশ অক্ষর  মন্ত্র " গোপালা কৃষ্ণ" উচ্চারণ করলেন নিমাই পন্ডিতের কানে। 
   শুধু একটি নাম  এমন অঘটন ঘটাতে পারে? নাকি তাঁর ভেতরেই ছিল এক পরম ভক্ত।  কোথায় গেল সেই  গোঁয়ার দাম্ভিক পন্ডিত নিমাই? তার জায়গায় এতো চোখের জলে ভেসে যাওয়া এক ভক্ত নিমাই।  নিমাই নিজেই বুঝে উঠতে পারছেন না ঠিক কি হলো? কেন এমন উথাল পাথাল করছে মনের ভেতর? কেন স্বেদ কম্পন অনুভূত হচ্ছে শরীরে? নিমাই নিজেকেই চিনতে পারছেন না। তাঁর ঘর, স্ত্রী, মা সব থেকেও যেন নিঃস্ব তিনি। 
*
গয়া থেকে  নবদ্বীপে ফিরে এলেন নিমাই পন্ডিত। একটা অদ্ভুত পরিবর্তন টের পাচ্ছেন নিজের ভেতরে। প্রথাগত পূজো তার পছন্দ ছিল না কোনো কালে। বরং খুব রেগেই যেতেন ব্রাহ্মণদের ঐ সারাক্ষন পৈতে সামলানো, ছোয়াঁ বাঁচানো , ভগবানকে একদম নিজের সম্পত্তি মনে করে আগলে বেড়ানো দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন। আরে মূর্খ ব্রাহ্মণ! এরা এটাও বোঝেনা এর ফলে মানুষ সরে যাচ্ছে মানুষের কাছ থেকে? মানুষ যদি না থাকে তবে ওমন ভগবান দিয়ে কাজ নেই!
              গয়া থেকে ফিরে আসার পরে সর্বক্ষণ কৃষ্ণনাম। পড়াতে বসে ছাত্রদের টীকার বদলে বলছেন কৃষ্ণকথা। যুবসমাজ বরাবর নিমাইয়ের কথা শোনে,নিমাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে  আজ তারাও কৃষ্ণকথা কইতে শুরু করলো। 
   " পঢ়িলাম শুনিলাঙ এতো কাল ধরি। 
       কৃষ্ণের কীর্তন করো পরিপূর্ণ করি।। 

             দীক্ষা মন্ত্র লাভ করেই এতো পরিবর্তন? এমন হয় নাকি? কিন্তু হলো। তেজের আগুন থেকে ফুটে উঠলো প্রেমের কমল। অন্তর থেকে  নিমাই অনুভব করলেন শুষ্ক জ্ঞান দিয়ে ঈশ্বর লাভ সম্ভব নয়। জ্ঞান ,যোগ নয়, এমনকি " মুক্তি" বলেও কিছু নেই, একমাত্র সাধনা হলো " হরিনাম"। নির্বিচার ভালোবাসা।  
              

        রাত ভোর সংকীর্তন চলতে লাগলো। জমায়েত হচ্ছে  এখানে সেখানে।  

            মধ্যমণি সেই নিমাই। চোখ দিয়ে জল, মুখে ভাব সারাক্ষন কৃষ্ণনাম। কোনো অং বং টং মন্ত্র পাঠ নয়, কোনো ছোয়াঁ বাঁচানো নয়, ব্রাহ্মণ চণ্ডাল সবাইকে বুকে টেনে কৃষ্ণ নামে নেচে গেয়ে মাতোয়ারা হয়ে গেলেন একেবারে। নিচু জাত বলে যারা দূরে ছিল এতদিন , আজ দলে দলে চলে আসতে লাগলো। ১৪৮৬ সালে চৈতন্যদেবের জন্ম। সেই সময় ব্রাহ্মণদের রমরমা এতো বেশী যে মানুষ ভয়ে ভয়ে থাকতো। নিয়ম আচার ব্রত উপবাস ছাড়া পূজো হয় , শুধু নাম জপ করে মন গঙ্গা স্নান করতে পারে, সংকীর্তনের তালে তালে নেচে শরীর ভালো থাকে, সবচেয়ে বড়ো কথা সমাজ এক সূত্রে  বাঁধা থাকে, এসব তথ্য ছিল একেবারে নতুন। 
     সমাজের যাঁরা আচার বিনা নিয়ম বিনা জ্ঞান বিনা ভগবান কে ডাকা নিষিদ্ধ মনে করে, সেই দলটি আবার ক্ষেপে গেলো। একি অদ্ভুত কান্ড! সবচেয়ে বড়ো কথা, নিমাই সবাইকে বুকে টেনে নিচ্ছেন। জাতের বাধা, কৌলিন্যের বাধা কোনো কিছুই ভগবানকে ভালোবাসার অন্তরায় হতে পারে না। এমনকি মুসলমানকেও শিষ্য করে নিচ্ছেন। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু উপদেশ নীতিকথা র ধার দিয়েও গেলেন না। এই ছুঁয়োনা, ঐ করোনা এই সব নিয়মকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ভক্তি আর শরণাগতি --এই তাঁর মূলমন্ত্র। 
   সে এক দৃশ্য বটে। হরে কৃষ্ণ নাম সঙ্গে নিয়ে মানুষ সব কিছু ভুলে রাস্তা দিয়ে কীর্তন করতে করতে যাচ্ছে। তখন শাসক ছিল মুসলমান কাজী। সে একেবারে ক্ষেপে উঠলো। হিন্দুর দল চুপচাপ পূজো করবে, সে ঠিক আছে। সারা দেশ জুড়ে নেচে বেড়াবে নাকি? বন্ধ করো। বন্ধ করো সব,আদেশ করলো কাজী। আর বন্ধ করা! সাগরের জলের মতো ভক্তি তরঙ্গ ভাসিয়ে নিয়ে গেলো কাজী কে । সে এক দেখার মতো দৃশ্য ----
        " মধ্যে নৃত্য করি যাইবেন যবন হরিদাস।
                এক সম্প্রদায় গাইবেন তান পাশ।।
     আহা! শুধু কৃষ্ণ নাম গো। হরেকৃষ্ণ হরেকৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে,,,,,, 
      শ্রীবাস পন্ডিত, হরিদাস ঠাকুর,নিত্যানন্দ মহাপ্রভু থেকে নবদ্বীপের চোর পর্যন্ত নামের জোয়ারে ভেসে গেলেন-" কৃষ্ণের কীর্তন করে নীচ রাড় বাড়।" অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতদিন কাজী ভাবতেন হিন্দুরা দল পাকাচ্ছে। কিন্তু আজ যখন মহাপ্রভুকে ঐ বিরাট কীর্তন দলের সঙ্গে দেখলেন, দেখলেন কৃষ্ণ নামের সঙ্গে সঙ্গে এই যুবকের ভাব। তাঁর পতন ও চোখের জল, তিনি বুঝলেন এ কোনো রাজনৈতিক হিন্দু জাগরণ নয়। কাজীকেও বুকে জড়িয়ে ধরলেন মহাপ্রভু। গলায় মালা, চন্দন সুবাসিত শরীর, চোখে জল, মুখে নাম--- মুগ্ধ কাজী নিজেই ভেসে গেলেন প্রেমে।
          --------------------------------------
                ৪নং
--------------------------------------------
        শ্রীবাস মহাপ্রভুর প্রিয় শিষ্য। তাঁর ঘরেই রাত ভোর সংকীর্তন করেন চৈতন্যদেব। ততদিনে তিনি সিদ্বান্ত নিয়েছেন আর সংসার নয়। সন্ন্যাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভেতরে যে আকুলতা কাজ করছে সংসারে থেকে নিজেকে ঠকানো হয়ে যাবে মনে হয়। তিনি তখন এক মহা ভাবে মগ্ন। কৃষ্ণ সঙ্গ ছাড়া আর কিছু সত্য নয়। মহাপ্রভুর এই ভাবটি কিন্তু গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্বের মূল কথা।  কৃষ্ণ  সমস্ত বেদের প্রতিপাদ্য, তিনি ই মুখ্য ব্রহ্ম, তাঁর কথা না জানলে সমস্ত জ্ঞান মিথ্যা হয়ে যায়। 
চৈতন্য নিজের অন্তরে উপলব্ধি করেন এই কৃষ্ণ ভগবান কে পাবার জন্য যাগ যজ্ঞ ধ্যান জ্ঞান দিয়ে দরকার নেই।ভক্তি আনতে হবে অন্তরে। প্রেম জাগাতে হবে। তবে ভগবান আপনি ধরা দেবেন।
    ধর্মের এই সহজ ব্যাখ্যায় চমকে উঠলো আপামর। দেখো, সকলে ভালোবাসার বশ। শ্রী চৈতন্যের ভালোবাসার ডাকে ঘুরে গেলো জনসাধারণ। মৃদু হাসলেন মহাপ্রভু। 
     " নগরে হিন্দুর ধর্ম  বাড়িল অপা
          
     
        হরি হরি ধ্বনি বই শুনি নাহি আর।
     ------------------

                     ধর্ম যদি উদ্ধার না করে তবে সে ধর্ম কিসের? চৈতন্য অনেক ভাবলেন। তাঁর নিজের মনে তখন ----" অচিন্ত্য অদ্ভুত কৃষ্ণ চৈতন্য বিহার/ / চিত্র ভাব গুণ চিত্র ব্যবহার।" গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্বের গূঢ় রহস্য সাধারণ মানুষের বোঝার কথা নয়। আগে তাদের সঙ্গে ভগবানের সখ্যতা স্থাপন করতে হবে। ভগবান মানে একজন দূরের কোনো বস্তু নয়, তিনি আলাদাও নন। ভক্তের সাথী তিনি। অনেকটাই এই উদ্দেশ্যে সফল হয়েছেন তিনি । আপামর বাংলাদেশ ভাসছে নাম জোয়ারে। ভগবান ভক্তি আর ভক্ত হচ্ছে ঘুড়ির মতো, সুতোর একদিকে ভক্ত অন্যপ্রান্তে ভগবান আর মাঝে ভক্তি রূপ সুতো। এই ভক্তি বোধ জাগিয়ে লোকসাধারণের মধ্যে নবজাগরণ আনলেন সার্থক ভাবে , কিন্তু তাঁর নিজের এমন অবস্থা কেন?
*
 আবার সেই প্রিয় গঙ্গা তীর। আবার গভীর চিন্তা মগ্ন মহাপ্রভু। সদ্য সন্ন্যাস নেওয়া মুন্ডিত মস্তক বসে আছেন যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হয়ে। ভেতরে এক অস্থিরতা, এক আলোড়ন। সমাজ আজ এক সূত্রে বাঁধা হয়েছে। মুসলমান অগ্রগতিও অনেকটাই আয়ত্বে এসেছে। কিন্তু তাঁর মন এতো ব্যাকুল কেন? কোথায় যেন বাজে বাঁশি ? সংকীর্তনের ছায়ায় দীন হীন নীচ ধনী একসঙ্গে বসে আছে আজ, তবে তাঁর কেন পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে? চোখ ভেঙে নেমে আসে জল! " হা কৃষ্ণ ,কোথা কৃষ্ণ" করতে করতে  বাহ্য জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েন। সামনে বয়ে চলা জলধারা যমুনা নাকি? সমাজ উদ্ধার, দেশ উদ্ধার সব কেমন তুচ্ছ মনে হয়। বৃন্দাবন যেতে হবে তাঁকে। সেখানে আছে ঐ কালো কিশোর। ঐ চতুর চূড়ামনি কৃষ্ণ। তাঁর প্রেমিক। চলো বৃন্দাবন। চলো প্রেমের কুঞ্জে। রাধা ভাবে আবিষ্ট শরীর আর তাঁর বশে নেই। অন্তরঙ্গ ভক্তরা সদা সতর্ক। মহাপ্রভু  উঠে দাঁড়ালেন। সদা সহচর নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে গিয়ে বললেন," চলো বৃন্দাবন।" 
নিত্যানন্দ বললেন," চলুন প্রভু। আপত্তি নেই। কিন্তু মনে আছে মাতৃ আজ্ঞা?"
চমকে উঠলেন চৈতন্য। মাতৃআজ্ঞা? না। ভোলেন নি। তিনি হৃদয়হীন সন্ন্যাসী নন। মা বলেছিলেন তাঁর নিমাই যেন সন্ন্যাস নিয়ে পুরী ধামে থাকে। আসতে যেতে বহুলোক পুরী ধামে যায়। তবে মা একটু খবর পাবেন। শ্বাস ফেললেন মহাপ্রভু। বৃন্দাবন যেতেই হবে তাঁকে। তারপরে কৃষ্ণ প্রেম বুকে নিয়ে চলে যাবেন নীলাচল। 
---------------------------------------------------
                  শেষ পর্ব
---------------------------------------------------
                কৃষ্ণ পুরুষোত্তম। জগতগুরু। একমাত্র পুরুষ। সমস্ত ভক্ত তাঁর রাধা। রাধা হলো সেই সাধনার নাম যে সাধনা সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় ভগবানের পায়ে। সম্পূর্ণ শরণাগত হওয়া হলো রাধা ভাব।  সেই অর্থে শুধু মহাপ্রভু নন সমস্ত কৃষ্ণ ভক্তই রাধা ভাবে সমৃদ্ধ। 
              বৃন্দাবন গিয়ে মহা বিপদে পড়লেন নিত্যানন্দ। এমন বিপদ নতুন নয় আর তাঁর কাছে। শ্রী চৈতন্যের যখন চব্বিশ বছর বয়স তখন তিনি সন্ন্যাস নিয়েছেন। আর তারপর থেকে যখন তখন তিনি বাহ্যজ্ঞান শুন্য হয়ে পড়েন। সেই সমাজ সংস্কারক তেজী একরোখা যুবকটির জায়গা নিয়েছে কোমল কৃষ্ণ প্রাণা ভক্ত। শুধু কৃষ্ণের জন্য বুকফাটা বিলাপ। এ এক পরম সাধনা। অকারণ কান্না নয়। ভক্ত আর ভগবানের মিলনের মাঝখানে যে বাধা টুকু থাকে তা অতিক্রম করার প্রয়াস হলো অভিসার, আর অভিসারের রাস্তাটুকুর কষ্ট দুঃখ হলো ঐ বিলাপ। তাই প্রভুকে আর একা ছাড়তে ভরসা করেন না অন্তরঙ্গ পর্ষদরা। 
     মায়ের আদেশে বৃন্দাবন ছেড়ে পুরী চলে এসে শান্তি নেই মহাপ্রভুর --" জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই" ---পুরীতে জগন্নাথ দেব আছেন বটে, কিন্তু যমুনা কই? কদম তলা কই? কই সে বাঁশির মধুর সুর?অস্থির হয়ে ওঠেন মহাপ্রভু। জগন্নাথ দেবের মধ্যে রয়েছেন সেই শ্যামল সুন্দর চিত চোরা তাঁর কৃষ্ণ। কিন্তু চারিদিকের আবহাওয়ায় নেই সেই মধুর ভাব। পরিবর্তে ব্রাহ্মণ দের আচার সর্বস্ব পূজা নিয়ম কানুনের পাহাড় দেখে মহাপ্রভু দিশাহারা হয়ে গেলেন যেন। 
     জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা চলছে। অগণিত ভক্ত, ঢাক ঢোল কাসরের আওয়াজ আর সঙ্গে সঙ্গে -- জয় জগন্নাথ । জয় মহাপ্রভু নীলাচল নাথ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। মহাসমারোহে এগিয়ে চলেছে জগন্নাথ দেবের রথ। ভিড়ের মাঝে  মহাপ্রভু দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ দিয়ে  জল পড়ছে অনর্গল। হঠাৎ তিনি সংস্কৃতে বিরহের শ্লোক পাঠ করতে লাগলেন। সুন্দর সরল প্রেমের শ্লোক--"প্রেমিকার সঙ্গে প্রেমিকের দেখা হয়েছে, কিন্তু যেখানে দেখা হয়েছে সেই জায়গা প্রেমিকার পছন্দ নয়। এ এমন এক জায়গা যেখানে পূজো আছে প্রেম নেই।"  অন্তরঙ্গ পার্ষদ ব্যাকুল হয়ে হাত চেপে ধরলেন মহাপ্রভুর । গম্ভীর হয়ে উঠলো উড়িয়া ব্রাহ্মণ দের মুখ। মহাপ্রভুকে থামবে কে? মুদিত নয়ন, মুন্ডিত মস্তক, সূর্যের আলোয় ঝকঝকে এক দিব্যকান্তি শরীর, গলায় মালা ---- মূর্তিমান কৃষ্ণ যেন -- আক্ষেপ করেই চলেছেন ---" হে কৃষ্ণ জগদ্বন্ধু, হে বনমালী, চলো আমরা সেই খানে ফিরে যাই। রেবা নদীর তীরে বেতসী লতার কুঞ্জ বন , চৈত্র পূর্ণিমাতে চলো সেখানে ফিরে যাই।" 
    জগন্নাথের রথের সামনে এক পাগল করা দৈবী ভাবের মধ্যে এ কেমন অনাচার? এ কেমন সন্ন্যাসী যিনি বলেন যে প্রেমহীন নীলাচল পুরীতে তিনি থাকতে চান না? আর এই সন্ন্যাসী এমন প্রাণ মন দিয়ে কাঁদছেন, ডাকছেন, গাইছেন যে সমস্ত ভক্তকুল মনে করছে জগন্নাথ দেব আর রথে উপবিষ্ট নেই। নেমে এসেছেন ঐ সন্ন্যাসীর কাছে।
    মহা রাগ ধরে গেলো পুরীর পাণ্ডাদের। এ তো সমূহ বিপদ উপস্থিত হলো  নীলাচলে!  এতো দিনের তৈরী করা সংস্কার, নিয়ম সব ভেসে যাবে নাকি ওই প্রেমের জোয়ারে? ছিঃ ছিঃ। ব্যাটা আবার মুসলমান নিয়ে ঘোরে। পুরীর মন্দিরে মুসলমান ঢোকাই নিষেধ। আর এই গৌড়ীয় সন্ন্যাসীর সঙ্গে থাকে রূপ সনাতন যবন হরিদাস। রসাতলে যাবে নাকি সব? আরো দেখা যাচ্ছে এই নবীন সন্ন্যাসী যেখানেই যায় মানুষ মন্ত্র মুগ্ধের মতো পেছন পেছন যায়। মন্ত্র তন্ত্র কিছুই নাকি লাগেনা শুধু প্রাণ দিয়ে ডাকলেই নাকি ভগবান দর্শন দেবেন। তাহলে পান্ডাদের কোনো কাজ নেই? আরে! পান্ডা টপকে জগন্নাথের কাছে পৌঁছনো যাবে শুধু নাম স্মরণ করে? অবাক কান্ড হলো, লোক শুনছে, বিশ্বাসও করছে। মহা চিন্তায় পড়ে গেলো পুরীর শক্তিশালী পান্ডা সমাজ। যাদের ভয়ে পুরীর রাজা পর্যন্ত সতর্ক থাকেন, তাঁদের কিনা পরোয়া করেন না ঐ চৈতন্য নামের সন্ন্যাসী? রাতের অন্ধকারে পান্ডা সমাজ বসলো গভীর আলোচনায়। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা আয় হয় মন্দির থেকে, সেগুলো রক্ষা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। তাড়াতে হবে পুরিধাম থেকে চৈতন্যদেব কে। কিন্তু উপায়? অগণিত ভক্ত মহাপ্রভুর। পনের বছর ধরে আছেন। অর্ধেক মানুষ  গৌড়ীয় ধর্মকে আপন করে নিচ্ছে। তবে? করণীয় কি? পাণ্ডাদের মাথা গুলো কাছাকাছি সরে আসে। রাতের অন্ধকার আরো ঘন হয়ে ওঠে। দূরে সমুদ্রের গর্জন ছাপিয়ে কেঁদে ওঠে অলুক্ষুনে শেয়াল। চমকে ওঠে ভক্ত বৃন্দ। মহাপ্রভু ঘরে নেই। কোথায় গেলেন তিনি? শরীর ভালো নেই তাঁর। মন ছুটে গেছে বৃন্দাবনে। শ্রী রাধিকার বিরহ, তাঁর শরণাগতি, কৃষ্ণের প্রতি প্রেম মহাপ্রভুর প্রতি রোমকূপে ফুটে উঠেছে। আজকাল প্রায়ই তাঁর জ্ঞান থাকে না। বিছানায় শুলেও ঘুমোন না। তাঁর কৃষ্ণ যদি কিছু চেয়ে বসেন রাতে? এক পাশ ফিরে জেগে শুয়ে থাকেন। অন্য পাশে কৃষ্ণ শুয়ে আছে। যদি ঘুম ভেঙে যায় প্রিয়তমের। এক পাশ ফিরে শুতে শুতে ঘা হয়ে গেছে মহাপ্রভুর। এমত অবস্থায় এই নিশুতি রাতে কোথায় গেলেন তিনি? ব্যাকুল ভক্ত বৃন্দ খুঁজতে বেরিয়ে যায়।
*
 সাগর কখনো অন্ধকার হয়না। গভীর রাতে একাকী সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে একথাই ভাবছিলেন মহাপ্রভু। ঢেউয়ের পরে ঢেউ তাদের মাথায় জ্বলছে আলো। ঠিক যেন তাঁর প্রেমিক চূড়ামনির মাথার মুকুট। হা কৃষ্ণ। কোথা কৃষ্ণ। হৃদয় তাঁর আচ্ছন্ন কৃষ্ণ প্রেমে, চির বিরহ কাতর রাধাভাবে তিনি ডুবে আছেন। পাণ্ডাদের ক্রোধের কথা কিছুই তিনি জানেন না। তিনি তো থাকতেও চান না, পুরী ধামে। মায়ের ইচ্ছার মূল্য দিতে গিয়ে তিনি বৃন্দাবনে থাকতে পারলেন না। জগন্নাথ দেবের মধ্যে কৃষ্ণ থাকলেও তিনি ফিরে পেতে চান সেই বৃন্দাবনের মিলন কুঞ্জ গুলির স্মৃতি ----
       " সেই তুমি সেই আমি সে নব সঙ্গম
                তথাপি আমার মন হরে বৃন্দাবন।
           ইঁহা লোকারণ্য হাতী ঘোড়া রথধ্বনী
                    তাঁহা পুষ্পবন  ভৃঙ্গ পিক নাদ শুনি।।
    তাঁহা গোপগণ সঙ্গে মুরলী বদন। 
         ব্রজে তোমার সঙ্গে যেই সুখ আস্বাদন।
             সে সুখ সমুদ্রের ইঁহা নাহি এক কণ।।
চব্বিশ বছর বয়সে সন্ন্যাস নিয়েছেন। তারপর ছয় বছর শুধু প্রচার আর প্রচার। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়েছেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম কে। আজ আর কাজ নয়। তাঁর কাজ শেষ। মানুষ তাঁর নিত্যকর্মের মধ্যে ভগবান কে নিয়ে আসতে পেরেছে। এবার মন চলো নিজ ধামে। এখন কত বয়স তাঁর? পঁয়তাল্লিশ হবে। ঊনত্রিশ বছর বয়স থেকে পুরীতে আছেন। আর নয়। আর নয়। সাগরের জলের মধ্যে  বেজে উঠলো মধুর বাঁশির সুর। প্রিয়তম কৃষ্ণ আর দূরে নেই। এইবার এসেছে সেই মহামিলনের মুহূর্ত। দূর থেকে  কারা আসছে ডাকতে ডাকতে। নির্জন বালিয়াড়ি, দুরন্ত সমুদ্র, এমন মোহময় রাত -- নাঃ। আর ফিরবেন না তিনি। পান্ডার দল ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তিনি চলে গেলে হয়তো বেঁচে যাবে তাঁর ভক্তবৃন্দ। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম ধ্বজা মাথা উঁচু করে থাকুক, তিনি চলে যাবেন তাঁর প্রেমিক কৃষ্ণের কাছে।  ধীরে ধীরে  জলের দিকে এগোলেন মহাপ্রভু। সাগরের জল দুহাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন শ্ৰী চৈতন্য মহাপ্রভুকে। তিনি চলে যেতে  চাইছিলেন বৃন্দাবন ধামে। সাগর যেন তার কোলে  মহাপ্রভুকে শুইয়ে  সেখানেই পৌঁছে দিতে গেলো। নির্জন বালিয়াড়ি শুন্য বুকে লোনা জলে ভেসে জেগে রইলো একলা। ।
---------------------------      -------------------------------------
     বিঃদ্রঃ--///--মহাপ্রভুকে পুরী ধামে মার্ডার করা হয়েছিলো বলে অনেকে মনে করেন।