শীর্ষা মণ্ডল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শীর্ষা মণ্ডল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

শীর্ষা মণ্ডল

                                




না-ফেরা কবিতাগুলির উড়ালপুল




সুদীর্ঘ পথটির শেষ – মাখামাখি আঁকা ফুলের পাপড়ি দ্যাখো জারুলের রঙে দ্রবীভূত গড়াগড়ি; যেন একদা একটি গাঢ় অস্তমিত সূর্যাস্তের ময়দান – লণ্ঠন নিবু নিবু হয়ে আসা আকাশী শরীর চিরে যায় পাখিটির নিস্তব্ধ উড়ানে 



এভাবে ফেলে রেখে যাওয়া – ঘর-বাড়ি-কফিহাউসের ময়দান জুড়ে বাউণ্ডুলে আঙুলের প্রলাপ, যেন শান্ত কোনো পাখি আরও শান্ত হয়ে গেছে ইলেক্ট্রিসিটির নব্য ছোঁয়ায়, মরা রাতের পেট চিরে সকালের ছানা বের করে আনছে প্রকৃতি, আর অতীব সন্তর্পণ দিয়ে ফ্যাকাশে চলে যাওয়ার কপালে এঁকে দিচ্ছে না ফেরার চুমু



তোমার চলে যাওয়া দিয়ে একটা আস্ত ক্যালেণ্ডার এঁকে ফেলা যায়, অথবা ভাস্করের যে কোনো কবিতা – হু হু করে কাঁদতে থাকা হাওয়ার নিঃসঙ্গতা – মরুভূমির বুকে, ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া রক্তসংবহনহীন ক্যাকটাসের অস্ত্রকেও, এরকম চলে যাওয়া বুকে নিয়ে আমারই মতো মরে গেছে পৃথিবীর সমস্ত প্রণয়ী মৌমাছির দল – শুধুমাত্র পুরুষ হবার শাপে যারা অমরত্ব নামের কবিতাগুলিকে তাচ্ছিল্য করেছিল একদা

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

শীর্ষা

                                                  




ভ্রমণ

খুলে রেখেছো জুতোর শৃঙ্গার,

বালির শরীরে গেঁথে দিচ্ছ লোমকূপহীনতা।

যে সমুদ্র বুকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে আশ্চর্যে মোড়া

নোনতা .তার নিপুণতা থেকে অভিনয়

শিখছ তুমি। মৃত ঝিনুকের খোল থেকে

মুখ গুঁজে থাকা কুড়িয়ে রাখছি আমিজমাচ্ছি

শাঁখের সমুদ্র ছেড়ে আসার কান্না। এরপর

বালিয়াড়ি থেকে দরদাম করে নুলিয়ার হাসি

ঘরে নিয়ে যাব আমরা – ওদের শিল্পী আঙুল আর

অভাবী ঠোঁট আমাদের বৈঠকখানার সাক্ষী দেবে

চিরকাল। বাৎসরিক সুখভ্রমণের সমুদ্র ছাড়া

আমাদের আঙুলশূন্য পাশাপাশি জুতো রাখাটুকু

আর কেউ জানতেই পারবে না


বেহালার গান

বেহালার কাঠটিও একদিন অরণ্য নামে আদর পেয়েছে।

পেয়েছে কাব্যে ভরা মধুসূদনরস !

বিচ্ছেদের যত সহ্যশক্তিপিষে দেওয়া বসন্তের চাকা

শরীরে নিয়েছে গুঁড়ির বৃত্তততটাই বল্কলের যোগবিয়োগ ক্ষত,

কোকিলের বাসার ভঙ্গুর !

কান পেতে শোনো জোনাকির কান্না থেমে গেলে

বেহালার কাঠ এখনো কণ্ঠ ছেড়ে গায় সমীকরণের গান –

কাঠ ফেটে ছড়িয়ে পড়ে মধুঝরা সুপ্রাচীন লালন গোঁসাই !



মশা

আমাকে কি তুমি ছুঁতে পেরেছ

আচমকা মশার মতো?

এক্ষেত্রে মশাকেই আমি ফার্স্ট প্রাইজ দেব,

আর তারপর

আমার রক্তে ঘনিষ্ঠতার সুগার লেভেল বেড়ে যাবে,

মশার চুম্বন থেকে জন্ম নেবে আদুরে পরজীবীর দল

ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে হাঁটব আমরা –

হাত ধরাধরি করে,

চুপচাপ।

আমার এই সুখের মহাপ্রস্থান তোমার চকচকে গালে

একটা পেল্লাই থাপ্পড় ছুঁড়ে মারবে,

মারবেই!

আমাকে কি তুমি একটুও ছুঁতে পেরেছ

অন্তত একটা ফালতু মশার মতোও?


রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০

শীর্ষা মণ্ডল



আমাদের এই সপ্তাহের কবি শীর্ষা মণ্ডল ৷জন্ম বীরভূমে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলজিতে স্নাতকোত্তর এবং গবেষণা। বর্তমানে মধ্যপ্রদেশে একটি কলেজের অধ্যাপিকা। শখ কবিতা-গল্প-উপন্যাস পড়া এবং টুকটাক লেখা। লেখালিখির সূচনা স্কুলজীবনের সাহিত্যসভা থেকে। একমাত্র বই 'তারাফুলের শবযাত্রা' (২০২০)।


উদযাপন এবং বেহালা

রঙ উঠে যায় বিকেলের জামার,
ফিকে হয়ে আসে মাঠের ওপর
গা-গড়ানো আলস্য রোদ,
বেলফুলের সাদাটুকু সক্রিয় হয়ে ওঠে –
অদৃশ্য মাদকতা দিয়ে আলোর
অভাব মুছবে বলে


মধ্যযামের কথা পশুর স্মরণশক্তি মাত্র।
কিংবা মধ্যযাম নিজেই পশুটির ছিন্নমস্তা দাঁত –
অদ্ভুত অলৌকিক দিয়ে প্রতিটি শব্দকে যে
কিনে ফেলতে পারে অনায়াসে


প্রতিটি ছেদ-পরবর্তী গোঙানি শুনেছিল বেলফুল,
বেলফুলে বসা ভ্রমর তার গুনগুন দিয়ে ঐকান্তিক কথা
চালান করেছিল সাদা পাপড়ির কানের মমতায় — বলিপ্রথা সাঙ্গ হলে
মমতার সাদা তাই নিজে থেকে
কাঁধে তুলে নিল মৃতকে সাজানোর
অভিযান।


রঙ উঠে যায় রাত্রির অন্তর্বাসের
কালোর পোঁচ জলধোওয়া হতে হতে
সাদাকে ডেকে আনে –
চড়ুইয়ের ফুড়ুৎ ওড়ে, রান্নাঘরে
ফুট-ফুট চা পাতার গান বেজে ওঠে – যেন কিছুই হয়নি!
যেন চা গাছ আর মানবী একটিই শব্দ –
মৃত্যুর ঘুমহীন উদযাপনকে প্রতিদিন
বেহালা বাজিয়ে শোনানোর গুরুদায়িত্ব নিয়েছে



অস্থির-বাস 
*
অসহ্য বিকেল
ঝাড়ুদার বিকেল
জংধরা বিকেল
সন্ধ্যাহীন
না-
ফুরোনো
বিকেল
এমন একটা বিকেলের জন্য
আমি মন্দিরে রোজ
ঘুষ দিতে যাই

*
পেরেকের বর্ম পরে পার হয়ে গেল শীতকাল
ঠুঁটো শীতকাল, জগন্নাথ শীতকাল – জানতেই পারল না অজস্র
চোখহারানোর অন্ধত্বে গাছ কেমন ছটফট করে মরে রাতদিন,
ব্যথার আলজিভে চুমু খায় –
দুটি পাখি তার শরীরে এসে ঘর করবে বলে

*
পৌনে চারটের কাঁটায় গুছিয়ে রেখেছি
দেখা করা –
এভাবে আমি তোমাকে নয়
প্রেমকে নয়
অভ্যাসকেও নয়,
শুধু মহাকালের কাছেই নতশির
জমা রেখেছি – ঋজুতা

*
তুমি কি পারবে তেত্রিশ কোটি মুখের ভাঁজওলা প্রান্তর
পেরিয়ে আসতে, আমার গলা যদি ডাকহরকরা সেজে ওঠে?
যেখানে ডাহুকের দুঃখ ঘুমিয়ে থাকে জীবনান্দের মৃত পাতায়,
সেইখানে বসে কুব কুব করে গান বেঁধে দিতে পারবে, স্বরলিপি ছাড়াই?
কিংবা ফল্গুনদীর ঢেউ দিয়ে একটা সোনালী মাছের চোখ এঁকে দিতে?
যার উজ্জ্বল মণিতে অর্জুনের পেশীসৌষ্ঠব আঁকা?
এটুকুও না পারলে আর কেঁদো না তুমি সারা রাত,
বরং একটা মহাকালের একক কান্নার পদ্য লিখে নামশূন্য লেফাফায়
পাঠিয়ে দিও আমাকে

*
চাঁদের সাদা মুগ্ধ করেছিল আমাদের।
জল দিয়ে, নুন দিয়ে গড়া মই দেখাল
সুদৃশ্য শ্যাওলা কতখানি বেকুব বানাতে পারে –
ঘরবাড়ির অশরীরী কালো ছায়ার মতো