বনবীথি পাত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বনবীথি পাত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বনবীথি পাত্র

                         


#স্বপ্ন_বিভ্রাট
#বনবীথি_পাত্র

মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো শেষ হওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই প্যাণ্ডেল প্রায় ফাঁকা। ঢাকী দুজন প্যাণ্ডেলের একপাশে বসে ঢাকে হেলান দিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। আর কাঁসর বাজায় যে বাচ্চা ছেলেটা, সে  প্যাণ্ডেলের মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা ক্যাপ বন্দুকের না ফাটা ক্যাপগুলো ধুলো ঝেড়ে তুলে এনে দালানে জমা করছে। তারপর দালানের ওপর রেখে একটা ইঁটের টুকরো দিয়ে ঠুঁকে ঠুঁকে ফাটাচ্ছে। আহা রে, বেচারার যদি একটা ক্যাপ বন্দুক থাকত কত খুশি হত। মানুষ ভাবে ঠাকুর দেবতারা বুঝি যা মন চায় তাই করতে পারে। এখন তো মা দুর্গার ওই বাচ্চাটাকে একটা বন্দুক দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ইচ্ছা করলেও কিছু করার নেই তাঁর। গতবছর সেই বুড়ি ভিখারীটাকে মণ্ডা খাওয়াতে গিয়ে যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছিল। বুড়ি ভিখারীটাই শুধু শুধু সবার কাছে চোর বদনাম পেয়েছিল। মা দুর্গা ক্লাবের সেক্রেটারিকে রাতে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলতে গিয়েছিলেন যে ওই ভিখারী বুড়ি নির্দোষ। কিন্তু এখনকার মানুষগুলো সব যেন কেমন ধরনের, পুজো টুজো করলেও ভগবানে তেমন কোন বিশ্বাস ভরসা কিছুই নেই। সেক্রেটারি তো স্বপ্নে মায়ের দেখা পেয়েও সেটাকে শুধু একটা স্বপ্ন বলেই দিব্যি এড়িয়ে গেল। ভোলানাথ বোধহয় ঠিকই বলে, মূর্তি এনে দেবীর আরাধনা এখন শুধুই মানুষের আনন্দের একটা উপলক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। মনের ভক্তি বলে মানুষের মধ্যে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ভোলানাথের কথা মনে পড়তেই মা দুর্গার মনে পড়ে, সন্ধিপুজোর আরতির সময় তাঁর মোবাইলটা বাজছিল। ভাগ্যিস তখন ঢাক কাঁসর বাজছিল তাই কেউ শুনতে পায়নি। কেউ শুনতে পেলে ঠিক একটা হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে যেত। পুজো শেষ হতে হতে ফোন আসার কথাটা ভুলেই গিয়েছিলেন মা দুর্গা। এখন মনে পড়তেই চারপাশটা খুব ভালো করে জরিপ করে নেন। এই বছর বেলা থাকতে থাকতে সন্ধিপুজো হয়ে গেছে বলে প্যাণ্ডেল এখন একেবারে ফাঁকা। ক্লাবের ছেলেছোকরার দলও বোধহয় বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ঢাকী দুজনও বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে কোথাও বোধহয় খেতে গেছে। গণেশ আর কাতু গেছে মুভি দেখতে। সেই ষষ্ঠীর দিন মর্ত্যে এসে থেকে মুভিটা দেখতে যাওয়ার জন্য ছটপট করছিল ওরা। আজকে সন্ধিপুজো শেষ হতেই দুজনে আর অপেক্ষা করেনি, সোজা মাল্টিপ্লেক্সে রওনা দিয়েছে। অষ্টমীর সন্ধেতে প্যাণ্ডেলে মানুষের ঢল সবথেকে বেশি হয়। ওদের তো বারবার করে বলে দিয়েছে তার আগে ফিরে আসতে। কখন যে তারা ফিরবে কে জানে! মানুষ এখন যা সব উন্নত মানের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করছে, হয়ত দেখা যাবে মোবাইলে ফটো তুলতে গিয়ে কোনো বিশেষ ধরনের সেন্সরে ধরে ফেলল, কার্ত্তিক গণেশের মূর্তিটাই শুধু পড়ে আছে। মূর্তির মধ্যে থেকে দেবতা পুরো হাওয়া। উফ্ এমনটা যদি সত্যি সত্যিই হয় ভাবতেও ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে মা দুর্গার। পৃথিবীর যত মিডিয়ার লোকজন এসে তখন ভিড় করবে এই প্যাণ্ডেলে। আজকাল মা দুর্গার এমনিতেই সবসময় কেমন একটা ভয় ভয় করে। মানুষের প্রতি তাঁর বিশ্বাসটা আর আগের মত নেই। দিনকটা কোন রকমে কাটিয়ে স্বর্গে ফিরে যেতে পারলে বাঁচেন।
লক্ষ্মী সরস্বতীও হয়েছে তেমনি। ভাইরা মুভি দেখতে গেছে বলে কী তোদেরও কোথাও ঘুরতে যেতে হবে! মেয়েরা নাকি মায়ের দুঃখ কষ্ট বোঝে। লক্ষ্মী সরস্বতী আদৌ কি মায়ের কষ্ট বোঝে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মা দুর্গা। মেয়ে দুটোও দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। ওদের বাবা ঠিকই বলে, ছেলেমেয়েগুলোর গায়ে মর্ত্যের হাওয়া লেগেছে।
কথায় কথায় আরতির সময়ে মোবাইলে কার ফোন এসেছিল সেটা দেখতেই ভুলে যান মা দুর্গা। আজ সারাদিনে ভোলানাথের সঙ্গে একবারও কথা বলা হয়নি। এরপর বেলা পড়তে না পড়তেই তো আবার লোকজন আসতে শুরু করবে। তখন সেই মাঝরাতের আগে আর কথা বলার সুযোগটাই পাবেন না! এই ভেবে শাড়ির আঁচলের ফাঁকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা মোবাইলটা টুক করে বের করেন। ও বাবা তখন তো ভোলানাথই ফোন করেছিল। আশ্চর্য লোক তো ওই ভোলানাথ! সন্ধিপুজোর সময়টা তো তাঁর অজানা ছিল না। ওই সময়টাতেই কেউ ফোন করে! মেজাজটা খিঁচড়ে যায় মা দুর্গার। কোথায় ভাবছিল ছেলেমেয়েদের একটু শাসন করার কথা বলবেন ভোলানাথকে, তা নয় ওপারে হ্যালো বলতেই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন উনি।

-বলি আপনার কি কোনদিন কাণ্ডজ্ঞান হবে না! সন্ধিপুজোর আরতির সময় কেউ ফোন করে?

ওদিক থেকে গাঁকগাঁক গলায় ভোলানাথ উত্তর দেয়,

-নিজের বাঘছাল খুঁজে না পেলে অত শত আরতি অঞ্জলির সময় মনে থাকে না।

ভোলানাথের কথা শুনে তো আকাশ থেকে পড়েন মা দুর্গা। নিজের অজান্তেই তাঁর তিন নম্বর বাঁহাত নিজের মাথায় উঠে আসে। ভোলানাথের কোন তালজ্ঞান থাকে না বলেই আসার আগে ভোলানাথের সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে নন্দীকে সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। অথচ এর মধ্যেই বাঘছাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! অথচ তিন তিনখানা বাঘছাল গুছিয়ে রেখে এসেছিলেন তিনি।

রাগী রাগী গলাতে তিনি বলেন,

-নন্দীকে তো সব দেখিয়ে দিয়ে .....

মা দুর্গা কথা শেষ করার আগেই রীতিমত চিৎকার করে ওঠেন ভোলানাথ।

-তোমার নন্দী গাঁজা খেয়ে তিনদিন ধরে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে পাহাড়চূড়ায়।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মা দুর্গা।

-যেমন ভোলানাথ, তেমন হয়েছে তার দুই চ্যালা নন্দী আর ভৃঙ্গী!

ওপারে ভোলানাথের গলাটা এবার একটু নরম শোনায়।

-তুমি কবে ফিরছ বলো দেখি!

মা দুর্গা বলেন,

-আজ তো সবে অষ্টমী।

-উফ্ এখনও দুটো দিন!

ভোলানাথের করুণ গলাটা শুনে কষ্ট হয় মা দুর্গার। তাঁকে ছাড়া উনি যে সম্পূর্ণ অচল।

মা দুর্গাও এবার নরম সুরে জানতে চান,

-বাঘছাল তো খুঁজে পাননি। তাহলে আপনি কী পরিধান করেছেন প্রভু!

-কী আর পরব, কৌপিন পরে তো আর থাকতে পারি না! তোমার একটা শাড়ি পরেছি বুঝলে?

দেবাদিদেব শেষে কি না শাড়ি পরেছেন! কথাটা ভাবতেই কেমন যেন থতমত খেয়ে মা দুর্গার হাত থেকে মোবাইলটাই পড়ে যায়। আর ঠিক তখনই একদল ছেলেমেয়ে হৈ হৈ করতে করতে প্যাণ্ডেলে ঢোকে ঠাকুর দেখতে। মোবাইল খোঁজা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি ঠিকমত পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মা দুর্গা। ছেলেমেয়েগুলো ঠাকুর দেখে বেরিয়ে যেতেই তিনি মোবাইলটা খুঁজতে লাগলেন। সামনে তো একরাশ পুজোর উপাচার। সব সামলিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। সামনের ওই ঘটেই তাঁদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা আছে। এখন তিনি নিজেই যদি ওই ঘট নাড়িয়ে ফেলেন তো যা তা অনর্থ হয়ে যাবে।

বিকাল হওয়ার আগে থেকেই মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। লক্ষ্মী সরস্বতী সময়ে ফিরলেও কার্ত্তিক গণেশের ফিরতে সন্ধে পুহিয়ে গেল। প্যাণ্ডেলের সামনে তখন বিশাল লাইন। ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবকরা ভিড় সামলাতে রীতিমত নাজেহাল হচ্ছে। এত লোকের সামনে মোবাইল খোঁজার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কার্ত্তিককে একবার তার মোবাইলটা থেকে নিজের মোবাইলটায় রিং করার কথা বলার অবসরটুকুও পেলেন না মা দুর্গা। অন্যান্য বছরের থেকে এবারে মানুষের ভিড় যেন অনেক বেশি। মানুষের ভিড় কমতে কমতে মাঝরাতও পেরিয়ে গেল। অতক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেমেয়েরা সব ক্লান্ত, তখন কী আর মোবাইল খোঁজার কথা বলা যায়!
সারাদিনের ক্লান্তিতে মা দুর্গাও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন কে জানে! স্বপ্নে তিনি ভোলা মহেশ্বরকে দেখছিলেন। হঠাৎ ঢাক কাঁসরের আওয়াজে ধড়ফড় করে কাঁচা ঘুমটাই ভেঙে যায় দুর্গার। আজ তো অনেক সকাল সকাল পুজোর আয়োজন শুরু হয়ে গেছে! কাল কত রাতে ঘুমিয়েছে বাছারা। তবু ছেলেমেয়েদের ডেকে ঘুম থেকে তোলেন। মনটা ভালো নেই মা দুর্গার। স্বপ্নেও তিনি মহেশ্বরকে দেখলেন তাঁর একখানা শাড়ি পরে আছেন।
মুখভার করে দাঁড়িয়েছিলেন মা দুর্গা। পুজোর জোগাড় আর ঠাকুরমশাইয়ের কথা শুনে এতক্ষণে মনে পড়ে, আজকে তো নবমী-দশমী দুটো পুজো একদিনে। সেই জন্য কাল সন্ধেতে এত মানুষের ভিড় হয়েছিল প্যাণ্ডেলে। অন্যবার দশমীর দিন মনখারাপ হয়ে যায় মা দুর্গার। এবার মর্ত্যে একদিন কম থাকা হবে কথাটা ভেবেও মনখারাপের মধ্যে যেন একটা স্বস্তি অনুভব করছেন তিনি। ভোলানাথকে ওই শাড়ি পরা রূপে তিনি ভাবতেও পাচ্ছেন না। তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে তাঁকে তাঁর বাঘছাল খুঁজে দিতে পারলেই এখন মায়ের শান্তি।
এরই মাঝে সবাই যখন নবমী পুজোয় ব্যস্ত,  গণেশকে মোবাইল হারানোর কথাটা বলেন মা দুর্গা। ইঁদুর এইসব ব্যাপারে একেবারে ওস্তাদ। সবার চোখের সামনেই দিব্যি মোবাইলটা খুঁজে নিয়ে এল, কেউ তাকে খেয়ালও করল না। নবমী পুজো শেষে দশমী তিথি এমনিতেই অনেকটা বেলায় ছিল। দশমী পুজো শেষ হয়ে ঠাকুরমশাই ঘট নাড়িয়ে দর্পণে বিসর্জন করে দিতেই আর একটু সময়ও নষ্ট করেন না মা দুর্গা। এবার নৌকায় গমন। ছেলেপুলে বাহন সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ময়ূরপঙ্খী নৌকা ভাসিয়ে দেন নদীতে। কিন্তু আজকালকার দিনের ছেলেমেয়েগুলোর কী যে কেনাকাটার এত বাতিক মা হয়েও তিনি  বুঝতেও পারেন না। নদীর ধারে একটা মার্কেট দেখে এমন বায়না করে যে নৌকা পাড়ে ভেরাতেই হয়। বাহনদের রেখে সবাই হৈ হৈ করে নেমে যায় নৌকা থেকে। মা দুর্গা একবার ভাবলেন ছেলেমেয়েদের একটা বাঘছাল কিনে আনার কথা বলবেন। কিন্তু বলতে গিয়েও কথাটা আর বলে উঠতে পারেন না। নৌকাতেই আনমনে বসে থাকেন মা দুর্গা। বাপের বাড়ি থেকে ফিরে যাচ্ছেন, যতই হোক তাঁর মনটা একটু তো খারাপ। নদীর ধারের কাশফুলের শোভা দেখে মনটা কেমন যেন দুঃখ দুঃখ করছে তাঁর। সবাই বলে স্বর্গ সুন্দর। এত বছর তো কৈলাশে রয়েছেন, তাঁকে কিন্তু মর্ত্যের সৌন্দর্যই এখনও অনেক বেশি আকর্ষণ করে। আবার এক বছর পর তবে মর্ত্যে আসতে পাবেন। একটা বছর তো আর কম সময় নয়!
হঠাৎ তাঁর মোবাইলটা বেজে ওঠে। মহেশ্বরের ফোন।

একদিন আগে তাঁরা মর্ত্য থেকে ফিরে যাচ্ছেন বলে মহেশ্বরের দারুণ আনন্দ। খুশি খুশি গলায় বলেন,

-মর্ত্য থেকে আমার জন্য কী আনছ গিন্নি?

মা দুর্গাও হেসে বলেন,

-বাঘছাল।

ওমা ভোলানাথ খুশি হবে কোথায়, তা নয় রেগেমেগে বলেন,

-অতগুলো বাঘছাল আছে আবার বাঘছাল নিয়ে আমি কী করব? অকারণ টাকাপয়সা নষ্ট করে কী যে সুখ পাও!

-কাল তো আপনিই বললেন, বাঘছাল না পেয়ে আপনি আমার একখানা শাড়ি পরেছেন!

অভিমানী স্বর মা দুর্গার।

-মর্ত্যে গিয়ে তোমার মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। আমি কখন তোমায় ও কথা বললাম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছ নাকি!

রেগেমেগে ফোন রেখে দেন মহাদেব।

-ও ঠাকুরমশাই, মা দুর্গার কি ঠিকমত প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি নাকি! মা তো ঘুমে ঢুলে পড়ছে মনে হচ্ছে।

শেষ কথাটা তো মহেশ্বের বললেন বলে মনে হল না। তবে কে বলল কথাটা? মা দুর্গা চোখ খুলে পিটপিট করে তাকাতেই কয়েক ফোঁটা গঙ্গাজল এসে পড়ল চোখের মধ্যে। দু চোখ বড় বড় করে তাকালেন মা দুর্গা। ওমা কোথায় নদী, কোথায় নৌকা! এখন তো সকালবেলা। পুজো শুরু হয়ে গেছে। এতক্ষণে আসল ঘটনাটা বুঝতে পারলেন মা দুর্গা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পুরোটাই স্বপ্ন দেখছিলেন তাহলে! ঘাড় ঘুরিয়ে মূর্তির পিছনে মহাদেবের ছবিটা দেখে হেসে ফেলেন দুর্গা। কাল সরস্বতী বলেছিল,

-বাবার ছবিটা দেখো মা। বাঘছালটা কেমন পুরনো হয়ে গেছে। এবার কৈলাশে ফেরার আগে বাবার জন্য একটু নতুন বাঘছাল কিনে নিয়ে যাব।

এতক্ষণের স্বপ্ন কাহিনী মনে করে নিজের মনেই হাসতে থাকেন মা দুর্গা।

-ও মা দেখো দেখো দুর্গা মা কেমন হাসছে।

একটা বাচ্চা মেয়ে তার মাকে ডেকে কথাটা বলছে শুনতে পেয়েই নিজের হাসি সংবরণ করে নেন দুর্গা। তবে মনে মনে ভালো লাগে, নিষ্ঠুর পৃথিবীটাতে শিশুদের মধ্যে এখনও সরলতা টিকে আছে। তাই তো কত সহজে বাচ্চা মেয়েটা দেবদর্শন করতে পারল।

#সমাপ্ত 


চিত্রঋণ- সংঘমিত্রা মান্না





সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

বনবীথি পাত্র

                          




 শেষচিঠি






........,

          একটু আগে ডাক্তারবাবু বলে গেলেন , আজ আমি ভালো আছি । অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে ভালো থাকা আর না থাকার ফারাকটাও আর ঠিকমত বুঝতে পারিনা । সিস্টারকে অনুরোধ করেছিলাম , সারা শরীরে জড়ানো নলগুলো খুলে দিতে । হালকা হেসে এড়িয়ে গেছেন সিস্টার । ঐ হাসিই বলে দিয়েছে , এগুলো আমার শেষযাত্রার সাথী । 

আইসিইউ.র ভেতরটাতে অদ্ভুত এক নীরবতা । শুধু যান্ত্রিক কিছু আওয়াজ , তাও যেন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে । বাইরের কোন শব্দের প্রবেশাধিকার নেই এখানে । আমার সাত নম্বর বেডটা ঠিক স্লাইডিং উইণ্ডোটার পাশেই । বাইরে বর্ষা , অঝোরধারায় বৃষ্টি হচ্ছে । জানলার কাচে বৃষ্টির ছাটের ফোঁটাগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে যেন কতরকমের আলপনা আঁকছে ।

        শৈবাল , তোমার মনে আছে এমনি একটা বৃষ্টিদিনে প্রথম আমরা কাছে এসেছিলাম । মুসলধারায় বৃষ্টি আর ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানিতে আমি চমকে চমকে উঠেছিলাম । তুমি তোমার চওড়া বুকের আড়ালে লুকিয়ে নিয়েছিল আমাকে , বলেছিলে সারাজীবন ওভাবেই আগলে রাখবে আমাকে । কিন্তু কথা রাখোনি তুমি । আমার শরীরে নতুন প্রাণের কথা জানতেই তুমি বদলে গিয়েছিলে অদ্ভুতভাবে । ওতো আমাদের ভালোবাসার ফসল ছিল শৈবাল , তাও তাকে নষ্ট করার কথা কি করে ভাবতে পেরেছিলে!

তোমাকে ছাড়াই সে পৃথিবীর আলো দেখেছে । তুমি তাকে অস্বীকার করেছ , তাই "বৃষ্টি" শুধু আমার সন্তান । 

আজ এতোবছর পরে এভাবে দেখা হবে ভাবিনি । বিখ্যাত অঙ্কোলোজিস্ট শৈবাল মিত্র এই হসপিটালেরই ডাক্তার আর ভাগ্যক্রমে আমিও পনেরদিন ধরে এখানেই রয়েছি । যদিও দেখা হয়নি তোমার সাথে । সত্যি বলছি চাইনা আর দেখা হোক্ তোমার সাথে । 

সিস্টাররা প্রয়োজনটুকু ছাড়া কথা বলেন না । তবু সেদিন ঐ বয়স্কা সিস্টারকে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম । প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পরে কিছু কথা বলেছিলেন তোমার সম্বন্ধে । 

শৈবাল তুমি বিয়ে করোনি কেন ? সারাটা জীবন এইভাবে একা কাটিয়ে দিলে!

একবার ফিরতে পারতে , সারাটা জীবন তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম ।

বৃষ্টির মনে ওর বাবার সম্বন্ধে কোন খারাপ প্রভাব পড়তে দিইনি । ও ওর বাবাকে খুব ভালোবাসে । ডাক্তারবাবু যতই বলুন , আমি বেশ বুঝতে পারছি আমার সময় ফুরিয়ে আসছে । কখনো তো সেভাবে কিছু চাইনি তোমার কাছে । আজ শেষবেলায় একটা জিনিস চাইলে দেবে ?

আমি চলে গেলে আমাদের বৃষ্টিকে একটু আগলে রেখো , মেয়েটা তোমার মতই বড্ড অভিমানী!

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

বনবীথি পাত্র





#মাতৃত্ব


-সারাদিনে ঐ ইস্টিশেনে বসে কটা টাকা কামাই করে আনো যে একখানা বাড়তি পেট সংসারে এনে তুলেছ! এত বছরে তো তোমার সে সোহাগী দিদির টিকিটাও দেখিনি। তা মরে গিয়ে এই আস্ত একখান পেটের বোঝা ভাইয়ের ঘাড়ে না চাপালেই কী চলছিল না! আর তোমাকেও বলিহারী, পাড়ার লোকে বলল আর অমনি তুমি ঐ দামড়া ছেলেটাকে ল্যাজে বেঁধে নিয়ে চলে এলে! অফিসে কলম পিষে মাসের শেষে মোটা টাকা তো ঘরে আনো না। করো তো প্লাটফর্মে ভিক্ষা। এই বাতাসী সেই আকাশে সুয্যি ওঠার আগে থেকে হোটেলে মুখে রক্ত তুলে খেটে তোমার আর তোমার দুই ব্যাটার পেট চালায় বুঝেছ। যদি এই বাতাসী না থাকত, তোমরাই না খেতে পেয়ে মরতে। আমার খাটনির পয়সাতে আমি পুষ্যি পুষতে পারব না।

মামা বুঝি নোটনের কান বাঁচিয়ে নোটন যাতে শুনতে না পায়, তাই চাপাস্বরে কিছু বোধহয় বলতে গিয়েছিল মামিকে। মামি তো তাতে আরও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল যেন। 

-ওসব নোটন পায়রা আমি পুষতে পারব না। কাল থেকে সাধের ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা  করতে যাবে। মা মরার অশৌচের বেশে আছে, আমদানি মন্দ হবে না।

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে হেসেই অস্থির মামি।

ছিটে বেড়ার ঝুপড়ি ঘরের বাইরের একফালি বারান্দায় জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল নোটন। সামনেই রেললাইন। হুহু করা খোলা হাওয়ায় হাতপা অবশ হয়ে আসছে। তার ওপর সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি। শুধু আজ কেন, কালকে সকালবেলা বুদোকাকু একটা পাউরুটি খেতে দিয়েছিল, তারপর তো আর কিছু খায়নি নোটন। রোজ দিনের মত কালকেও মা কাজে গিয়েছিল। কাজ বলতে মা বিড়ি বাঁধতে যায়। ইস্কুলে গিয়েছিল নোটন। দুপুরে তো ইস্কুলেই খায়। বাসস্যাণ্ডের উল্টো একটা মার্কেট তৈরি হতে হতে বন্ধ আছে, সেখানেই থাকে নোটনরা। মধুকাকা, হেনামাসিরাও ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার পেতেছে ওখানেই। শুধু ট্যারা লাল্টুকে রোজ দশটাকা করে তোলা দিতে হয়। মা কাজ থেকে ফেরে শেষ বিকালে, তখনই চাল-আলু কিনে নিয়ে আসে। সন্ধে হলেই কাঠকুটো জ্বেলে ভাত ফুটিয়ে নিয়ে, মায়ে-পোয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। ওদের কোন আলোর ব্যবস্থা ছিল না। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোটুকু ওদের ভরসা। ঐ আলোতে তো আর পড়াশুনো করা যায় না। তাই ভোরের আলো ফুটলেই উঠে পড়তে বসে যেত নোটন। ইস্কুলের মাস্টারমশাইরা বলেন, নোটনের মাথায় বুদ্ধি আছে। একটু ঘষামাজা করলে ওর লেখাপড়া হবে। লেখাপড়া শিখে বড় হওয়ার খুব ইচ্ছা নোটনের। তখন আর ও মাকে কাজ করতে দেবে না ভেবেছিল। নিজে কাজ করে মাকে খুব ভালো রাখবে ভেবেছিল। কিন্তু কাল কোথা থেকে কী হয়ে গেল! এখনও ঠিকমত ভাবতেই পারছে না নোটন।

মিড ডে মিলের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল নোটন। তখনই যতু আর জীবনকাকা গিয়ে খবর দিল, মায়ের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। রাস্তার লোকজনই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ওদের সঙ্গেই নোটন যখন হাসপাতালে পৌঁছায়, তার আগেই সব শেষ। মা মরে গেছে।

কেমন হতভম্বের মত হয়ে যায় ন'বছরের নোটন। কীভাবে কী যে হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছে না। মা ছাড়া আর তো কেউ নেই নোটনের! 

ওখানেই সবাই বলাবলি করছিল, মা মারা যাওয়ার আগে নাকি বলে গেছে নোটনের এক মামা আছে। তার কাছেই নোটনকে পৌঁছে দিতে বলেছে। এই শহরেই নোটনের মামা আছে, কোনদিনও তো শোনেয়নি নোটন। মামাকে প্রথম দেখল শ্মশানঘাটে। কারা মামাকে খুঁজে নিয়ে এসেছে কে জানে! দাহ কাজ সেরে কাল রাতেই এসেছে মামার বাড়ি। মামি তাকে দেখে থেকেই রাগারাগি করছে। সারাদিনে একটু কিছু খেতে অবধি দেয়নি।

দুটো ছেলে আছে মামার। তারাও কত বাজে বাজে কথা বলছিল সারাদিন। এখন আবার মামা-মামির ঝগড়া হচ্ছে তাকে নিয়ে। মায়ের ওপর ভীষণ অভিমান হয় নোটনের, এইভাবে ওকে একা ফেলে মা কেন যে চলে গেল! মামি আবার বলছে ওকে দিয়ে ভিক্ষা করাবে! মা যে বলত,

কারও কাছে হাত পাততে নেই। ষকী করবে এখন নোটন!

ঘরের ভেতর থেকে থালা বাসনের আওয়াজ পাচ্ছে। মামি ঝগড়া করতে করতেই নিজের দুই ছেলেকে দিচ্ছে। আজকেও খেতে দেবে না নোটনকে! মনটা ভীষণ খারাপ  হয় ওর। যেদিকে দুচোখ যাবে সেখানেই চলে যাবে নোটন, তবু কিছুতেই এখানে থাকবে না।

উঠে পড়ে নোটন। কেউ যেন শব্দ না পায় এমন করে পা টিপে টিপে বারন্দা থেকে নেমে আসে। মামা  মানুষটাকে ওর খারাপ লাগেনি। ওকে এইভাবে চলে যেতে দেখলে মামা কষ্ট পাবে। অন্ধকারে হাঁটতে থাকে নোটন। এই শহরের রাস্তাঘাট কিছুই তো চেনে না সে! যদি চিনত ফিরে যেত নিজেদের সংসারে। মা না থাকুক, মায়ের ছোঁয়া তো আছে ওখানে।

কী ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে নোটনের। ভীষণ খিদেও পেয়েছে। শরীর আর যেন চলছে না। একটা দোকানের বন্ধ শার্টারে হেলান দিয়ে বসে পড়ে নোটন। ক্লান্তিতে দুটো চোখ যেন বুজে আসছে তার। বোধহয় ঘুমিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন মায়ের হাতের ছোঁয়ায় ঘুমটা ভেঙে যায় নোটনের।

আরে এ তো ছায়া পাগলী। ওর ছেলেকে নাকি ছেলেধরায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় রাস্তায় ছেলেকে খুঁজে বেড়ায়। কোথায় ওর বাড়িঘর ছিল কিছুই বলতে পারে না। ছেলেকে হারানোর থেকেই বোধহয় ওর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। 

নোটনের গায়ে নিজের ছেঁড়া নোংরা চাদরটা মুড়িয়ে দিয়ে ওকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেছে। ঠিক এমন করেই তো মা ওকে জড়িয়ে ধরে থাকত। কাঁদছে কেন পাগলীটা? ওকে কাঁদতে দেখে নোটনেরও যে কান্না পাচ্ছে। মায়ের জন্য ভীষণ মনখারাপ করছে। নোটনকে কাঁদতে দেখে পাগলী আরও জড়িয়ে ধরে ওকে।

-কাঁদে না। আমার লাল্টুসোনা। এই তো তুই তোর মায়ের কাছে চলে এসছিস। আর ঐ দুষ্টু লোকগুলো তোকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না।

কথাগুলো কিছুই বুঝতে পারছে না নোটন। লাল্টু কে? লাল্টুই কি ওর সেই হারানো ছেলে! নোটনকে কি ও তবে ওর হারানো ছেলে মনে করেছে!

পাগলীকে আর যেন পাগলী মনে হচ্ছে না নোটনের। মাকে যেভাবে পরম নিশ্চিন্তে জড়িয়ে থাকত, ছায়া পাগলীকে ঠিক তেমন করে আঁকড়ে ধরে নোটন।



মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

বনবীথি পাত্র




#ওম
#

(1)

ক'দিন ধরেই শরীরটাতে তেমন জুত পাচ্ছে না আদুরী, বুঝতে পারছে রাতের দিকে রোজই গায়ের তাপ বেড়ে আগুনপারা হচ্ছে। শরীরের আর দোষ কী! আরাম-আয়েশ তো দূরের কথা, পেট ভরে খাবারটাও কি খেতে পেয়েছে রোজদিন! মা তো জম্ম দিয়েই খালাস, বাপটার তো সংসারে মতিগতি নেই কোনদিন। জীবনে যা পয়সা কামিয়েছে, চুল্লু খেয়ে তার থেকে উড়িয়েছে বেশি। ঐ বুড়ি দাদি না থাকলে কবেই বোধহয় মরে যেত আদুরী। মরে গেলেই বেশ হত। এই গরু-ভেড়ার মত বেঁচে থাকাটা আবার বাঁচা নাকি! এমন এক পোড়ারমুখো মিনসের সঙ্গে বিয়ে হল যে বছর না ঘুরতে পেটে একখান বাচ্চা ভরে দিয়ে ভেগে গেল নিজের আশনাইয়ের মানুষকে নিয়ে। তারপর থেকে তো জীবনে একটা দিনও বিশ্রাম নেই আদুরীর জীবনে। এই জীবনখানায় কে যে আবার সোহাগ করে "আদুরী" নামটা রেখেছিল কে জানে! মনে মনে সেই নামকরণদাতাকে গালাগালি দিতে দিতে পাশ ফিরে শোয় আদুরী। আজ আর বিছানা ছেড়ে উঠতেও ইচ্ছা করছে না। কয়েক মিনিট শুয়েই উঠে পড়ে আদুরী। সুরিয়া আর বাচ্চা তিনটের চিৎকারে কানে মনে হচ্ছে তালা লেগে যাবে। 

-আজ সবকটাকে এমন মার মারব, যে আর কোনদিন এই সাত-সকালে ব্যাঁ ব্যাঁ করে কানের মাথা খাবে না।

কোমরটা নিয়ে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারে না আজকাল। তাতেও কোনরকমে ঘরের কোণ থেকে কঞ্চিটা তুলে নিয়ে বাইরের ছোট কাঠের খুপরীর দরজাটা খুলে দেয় আদুরী। দরজাটা খুলতেই হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে সুরিয়া আর ওর তিন ছানা। সামনের উঠানে ছানাগুলো তিড়িংবিড়িং করে দুপাক খেয়েই সুরিয়ার কোল ঘেঁষে ওর ঘন পশমের মধ্যে মুখ গুঁজে দাঁড়ায়। যেন কিছুটা ওম শুঁষে নিচ্ছে মায়ের শরীর থেকে। মারবে বলে যে কঞ্চিটা এনেছিল, নিজের অজান্তেই যেন সুরিয়ার হাত থেকে খসে পড়ে সেটা। পুষ্পাও ঘুম থেকে উঠে ঠিক এইভাবেই লেপ্টে থাকতো আদুরীর শরীরের সঙ্গে। কতদিন বেটিটাকে চোখের দেখাও দেখেনি আদুরী। বুকের মধ্যেটা কেমন যেন হু-হু করে ওঠে ওর।

শরীর না চললেও ওদের নিয়ে ডিমার ধারে আসে আদুরী। বর্ষা পেরিয়ে এখন শরৎ এসেছে। নদীতে পাথর-বালি আর পায়ের চেটো ডোবা জল। নদীতে জল থাকে যখন চোখে চোখে রাখতে হয় ওদের একটু। এখন নিশ্চিন্তে ওদের ছেড়ে দিয়ে দূরে একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে আদুরী। সুরিয়া আর ওর বাচ্চাগুলো মনের সুখে কচি ঘাস খাচ্ছে। মাঝেমাঝে ওদের ওপর রেগে গেলেও ওদের ভালোবাসে আদুরী। ওরা ছাড়া আর কী আছে আদুরীর জীবনে! একটা কর্তব্য পালন করতে পারলেই এবার আদুরীর ছুটি।
সুরিয়ার বাচ্চাগুলোর গা জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করছে। বাচ্চাগুলোর শরীরেও লোম বের হতে শুরু করেছে। সেই জ্ঞান হয়ে থেকে ভেড়া পালছে আদুরী। ওর অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারে সুরিয়ার বাচ্চাগুলোর লোমও ওদের মায়ের মতই হবে। ভাদ্দর-আশ্বিন-কাত্যিক তিনমাসে পুরো লোমে ঢেকে যাবে। মনে মনে হিসাব করে আদুরী। শীত তো পড়বে সেই অঘ্রাণ মাসে! অজানা খুশিতে চিকচিক করে ওঠে আদুরীর কোঠরগত চোখ দুটো।


(2)

অসময়ে ডিমা নদীতে হড়কা বানে তলিয়ে যাচ্ছিল দুটি মেষশাবক। নিজের জীবন বিপন্ন করে তাদের বাঁচাল এক বয়স্কা আদিবাসী রমণী।

খবরের কাগজের ভেতরের দিকের পাতার এককোণে ছোট্ট খবরটা অনেকেই পড়ল, অনেকের চোখ এড়িয়েও গেল।

একদল পশুপ্রেমী সাংবাদিক ছুটে গেল ডিমা নদীর তীরে রাভাদের সেই ছোট গ্রামে।

স্থানীয় কিছু মানুষ যদি না বাঁচাত, আদুরী কাল হয়তো সুরিয়ার ছানা দুটোর সঙ্গে ভেসেই যেত বানের জলে। ডিমা নদীর ধরণটাই এমনি। ভুটানে বৃষ্টি হলে হঠাৎ করেই বান এসে যায় এখানে। কালকেও এমনটাই হয়েছিল। আদুরীর হয়তো চোখ লেগে এসেছিল খেয়াল করেনি। হঠাৎ দেখে নদীতে বান আর সেখানে হাবুডুবু খাচ্ছে সুরিয়ার দুটো বাচ্চা। কিছু না ভেবেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আদুরী।

আজ আদুরী অনেকটা সুস্থ। দাওয়াতে এসে বসেছে। সাংবাদিক-ক্যামেরা আর গাঁয়ের মানুষজন সবাই ভিড় করেছে ওর উঠোনে।

এক সাংবাদিক জানতে চান,

-আপনি নিজে বানের জলে ভেসে যেতে পারেন জেনেও ভেড়ার ছানা দুটোকে বাঁচাতে গেলেন কেন?

কী যে বলবে বুঝতে পারে না আদুরী। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ভ্যাবলার মত চেয়ে থেকে বলে,

-থোড়াসা ওমের জন্যি বাবু।

তার কথার অর্থ কেউই বুঝতে পারে না। আবার জানতে চায়,

-ওমের জন্য মানে কী?

-আমার একমাত্র বিটিয়া পুষ্পার শাদির সময় জামাইবাবাকে একটা আচ্চি পশমের সুইটার দেব বলেছিলাম বাবু। কিন্তু দিতে পারি নাই। ওরা পুষ্পাকে তার জন্য আমার কাছে পাঠায় না। এবার এই সুরিয়া আর ওর বাচ্চাদের পশম দিয়ে একটা আচ্চি সুইইটার বানিয়ে দেব আমার জামাইবাবাকে। তবে না পুষ্পা বিটিয়াকে আমার ঘরে পাঠাবে ওরা। সুরিয়া আর বাচ্চারা না থাকলে আমি তো আমার পুষ্পা বিটিয়াকে কাছে পাব না কোনদিন.....


চিত্র - আশীস পাইন 

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

বনবীথি পাত্র


#বোধন



ব্যস্ত জীবনে ছুটি খুব কম জোটে মন্দারের । রুগি-নার্সিংহোম-হাসপাতাল-ছুরি কাঁচি আর ওষুধের গন্ধের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে ব্যক্তিজীবনটা । তাই এই পূজোর চারটে দিন আর চার দেওয়ালের মাঝে নিজেকে আটকে রাখতে চায়না কিছুতেই । শহুরে কোলাহল ছাড়িয়ে খোলা পরিবেশে নিজের মতো করে দিনগুলো কাটাতে বেরিয়ে পড়ে প্রতিবার । হৈম অবশ্য বলে মন্দার নাকি নিজের জীবনের থেকে পালাতে ঐ পূজোর সময়টা শহরের বাইরে থাকে ।
সমুদ্র বরাবরের পছন্দ মন্দারের । হৈম পাহাড় ভালোবাসলেও , কিন্তু এতবছর মন্দারের সাথে থাকতে থাকতে কখন যেন সমুদ্রটাকে আপন করে নিয়েছে । অগুনতি এই ঢেউএর সামনে দাঁড়ালে নিজেকে কেমন যেন ভারমুক্ত লাগে । ওদের জীবনেও একসময় কতো ঢেউ এসেছে , ঈশ্বরের আশীর্বাদে অনেক কষ্টে সামলে উঠেছে দুজনে । প্রতিদিন  কত শিশু প্রথম পৃথিবীর আলো দেখছে মন্দারের হাত ধরে , অথচ নিজের সন্তানকে জীবিত অবস্থায় পৃথিবীতে আনতে পারেনি । নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল হৈম-র মা হওয়ার সব সম্ভাবনা টুকু । সারা শহর সেদিন দুর্গাপূজোর আনন্দ আর আলোয় মেতেছিল , শুধু অন্ধকার ছিল হৈম আর মন্দারের জীবনটা । হৈম খুব একটা ভুল বলেনা , আজ এতো বছর পরেও পূজোর দিনগুলো তাই বোধহয় পালিয়ে আসে চেনা সীমানাটা ছাড়িয়ে । সবটুকু মেনে আর মানিয়ে নিলেও এই পৌঢ়ত্বে এসেও উৎসবের দিনগুলোতে ফাঁকা ঘরটা যেন বেশি করে ফাঁকা লাগে ।
.
সব জায়গাতেই এতো মানুষের ভিড় , নিঃশ্বাসে প্রকৃতির গন্ধটাও যেন ভালো করে পাওয়া যায় না ।  এই তাজপুর জায়গাটায় মানুষের ভিড় এখনো তুলনাতে অনেকটা কম । পড়ন্ত বিকালের আলো গায়ে মেখে ভিজে বালি ধরে হাঁটছিল দুজনে । হৈমর হাতটা নিজের মুঠোয় ধরে রেখেছে মন্দার । জীবনের এতগুলো বছর তো এইভাবেই নিজের কাছে আঁকড়ে রেখেছে পরস্পরকে , তবু হৈমর হাতটা ধরতে ভালো লাগছে মন্দারের । ছোট ছোট ঢেউগুলো আপনগতিতে এসে ভেঙে যাচ্ছে ওদের পায়ের কাছে । তারপর যেন একবুক অভিমান নিয়ে ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরে । নোনা হাওয়া গায়ে মেখে এতোটা পথ যে হেঁটে ফেলেছে খেয়াল করেনি কেউ । হৈমর হাঁটুর ব্যথাটা জানান দিতেই ফেরার কথা মনে পড়ে । ইস অনেকটা পথ এসে পড়েছি !!!! এতোটা হেঁটে ফেরা হৈমর পক্ষে সত্যিই অসম্ভব । কিন্তু হোটেলে ফেরার বিকল্প ব্যবস্থাও তো নেই । দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য নিজেকেই দোষারোপ করে মন্দার , এতোটা আসার আগে একটু ভাবা উচিৎ ছিল ।
বালিতে পা ছড়িয়ে বসে পড়েছে হৈম । জলের বোতল খুলে একঢোকে অনেকটা জল খেয়েও হাফাচ্ছে যেন । এদিকে সূর্যও সমুদ্রের কোলে ঢলে পড়েছে । সম্পূর্ণ লোকালয় শূণ্য জায়গা , অন্ধকার হ্ওয়ার আগে যেভাবেই হোক ফিরতে হবে ।
ঐ দেখো একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে , ওখানে মনে হয় মানুষজন আছে । দেখো না ফেরার কোন একটা ব্যবস্থা হয় কিনা ।
হৈমর কথায় মন্দার খেয়াল করে সত্যি তো একটা গ্রাম , বেশিদূর ও নয় । ওখানে গেলে হোটেলে পৌঁছানোর একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় হবে । তবে হৈমকে সমুদ্রের ধারে একা বসিয়ে যাওয়ার সাহস হয়না মন্দারের । পায়ে পায়ে গ্রামে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগলো না ওদের ।
নিতান্তই ছোট একটা গ্রাম । রাস্তায় মানুষজন তো নেই , কাকে জিজ্ঞাসা করবো ফেরার ঠিকানা । একটু এগোতেই একটা ছোট গুমটি দোকান , সামনে প্রচুর লোক । সবাই-ই আদিবাসী প্রকৃতির মানুষ । কাছে গিয়ে বুঝতে পারে নিজেদের মধ্যে প্রচন্ড বচসা চলছে । পুরো ঘটনাটা বুঝে চমকে ওঠে মন্দার । এতদিন খবরের কাগজে আর টিভিতেই দেখেছ , কিন্তু আজ চোখের সামনে সেই ঘটনা । একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কি এমনটা হয় !!!! অতগুলো সশস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল মন্দার । কাজটা সহজ ছিলনা , তবু বাঁচাতে পেরেছিল মেয়েটাকে ।সদ্য স্বামীহারা মেয়েটাকে সবাই মিলে ডাইনি অপবাদ দিয়ে মারধোর করে গ্রাম থেকে বের দিতে চাইছিল । অসহায় মেয়েটা তবু স্বামীর বসত ভিটে ছেড়ে যেতে রাজি না হওয়াতে ওকে পুড়িয়ে মারতে চাইছিল সবাই ।
.
অজ্ঞান মেয়েটাকে হাসপাতালে দিতে চেয়েছিল মন্দার  । কিন্তু হৈম রাজি হয়নি । অনেক রাতে হোটেলে ফিরেছিল তারা । নিজে একজন নামকরা ডাক্তার হওয়াতে , অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয়নি । শারীরিক দুর্বলতা আর উত্তেজক পরিস্থিতির চাপেই জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা । প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করে ঘুমতে গিয়েছিল মন্দার । হৈম ঘুমতে যেতে পারেনি , সারা রাত কোলের কাছে নিয়ে বসে অসহায় মেয়েটাকে নিয়ে । 
.
ভোরের দিকে হয়ত চোখটা লেগে এসেছিল হৈমর । আচমকা "মা" ডাকে চমকে ওঠে হৈম । মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে .....
হৈমর ডাকে মন্দার ও ঘুম ভেঙে এসে দাঁড়িয়েছে বিছানার পাশে ।
নতুন পরিবেশে মেয়েটাও হতচকিত । তবু যেন পরম নিশ্চিন্তে শক্ত করে ধরে আছে হৈমর হাতটা ।
কাছাকাছি কোথাও বোধহয় পূজো হচ্ছে । ঢাকের বোলে ভেসে আসছে বোধনের বোল ।।


মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

বনবীথি পাত্র

#অকূল_আঁধার

.
কাল রাতে পাগলটা বড্ড চিৎকার করেছে। এমন চলতে থাকলে আর কিন্তু বাড়িতে রাখতে পারব না। অস্থি-চর্ম-সার শরীরটায় ইঞ্জেকশনের মোটা সূঁচটা ঢোকানোর সময় প্রতিবাদী মানুষটা যেন কেঁপে ওঠে। স্বামীর হাতটা ধরতে গিয়েও থমকে যায়, দুদিন আগের মচকে দেওয়া হাতের ব্যথাটা এখনও যায়নি।
নিজেদের সর্বস্বটুকু উজাড় করে মানুষ করেছিল মেয়েকে।
গতরাতের পুরুষসঙ্গীকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তাদের উচ্চশিক্ষিতা আদরের দুলালী। নতুন সঙ্গী নিয়ে ফিরবে দিনের শেষে....
ভোরের আলো ফুটছে বাইরে। অন্ধকার শুধু গাঢ় হচ্ছে সন্তানকে ভালোবেসে জীবন্মৃত মানুষদুটোর জীবনে.....


শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

বনবীথি পাত্র


#প্রতিশোধ

.
গতরাতেও হারানকাকা এসেছিল মায়ের কাছে। মাকে খুব বকাবকি করছিল। মায়ের কান্নার আওয়াজ আসছিল ঘরের ভেতর থেকে। হারানকাকা যেদিন আসে, সেদিন রাজুর ঘরে ঢোকা মানা। ঝুপড়ির বাইরে পলিথিন দিয়ে ঘেরা জায়গাটাতে মা ওর বিছানা পেতে দেয়। প্রথম প্রথম ভয় করতো, আর করে না। ভোরবেলাই পেটটা মোচড় দিয়ে ওঠে রাজুর। ঘরের দোর তখনও বন্ধ ভেতর থেকে। বালতি থেকে গলাকাটা বোতলে জলটা ভরতে গিয়েই বালতির পাশে জিনিসটা কুড়িয়ে পায়। এটা হারানকাকার মোবাইল, কতবার দেখেছে হারানকাকাকে এটায় কথা বলতে। কালকে হোটেল থেকে কতসব খাবার এনেছিল হারানকাকা, পেটের মধ্যে সব যেন গুড়গুড় করছে। আর দাঁড়াতে পারেনা রাজু, ছুট লাগায়। আজকাল মাঠে গেলে অফিসের বাবুরা বাঁশি বাজিয়ে তাড়া করে। অগত্যা ভরসা এই রেললাইন।
ধুস্ আলোও জ্বলছে না মোবাইলটাতে। হঠাৎ রাজুর মনে পড়ে গতরাতে ঘর থেকে ভেসে আসে মা আর হারানকাকার কথাগুলো। হারানকাকা বলছিল, মোবাইলের সব ছবি সবাইকে দেখিয়ে দেবে। মা কাঁদছিল আর বলছিল, ছবিগুলো সবাইকে দেখালে মাকে আত্মহত্যা করতে হবে। বস্তির পুঁটিপিসি আত্মহত্যা করেছিল, আর কখনো ফিরে আসেনি পুঁটিপিসি। আত্মহত্যা করলে মানুষ মরে যায়। মা মরে গেলে রাজুর ভীষণ কষ্ট হবে। মাকে কিছুতেই মরতে দেবে না রাজু। মোবাইলেই ছবিগুলো আছে বলছিল হারানকাকা। মোবাইলটা কানে নিয়ে টিভির মতো স্টাইল মনের সুখে গালাগাল দেয় হারানকাকাকে। হারানকাকা নাই বা শুনল, মনের রাগটা কিছুটা যেন কমল রাজুর। এবার মোবাইলটাকেই শেষ করে দেবে । এই মোবাইল আর কোনদিন খুঁজে পাবে না হারানকাকা.......




শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

বনবীথি পাত্র


আত্মীয়

.
শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে আদ্যন্ত শহুরে রাহুল বোস চলল গ্রামের স্কুলে চাকরি করতে । ডাক্তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান সুশিক্ষিত , সুদর্শন ও স্মার্ট রাহুল বোসের গ্রাম সম্পর্কে কোনও ঘৃণা বা নাকউঁচু ভাব কোনোদিনই ছিলনা । বরং হোস্টেলে থেকে পড়ার সময় গ্রামের ছেলেদের সরলতা রাহুলকে বেশ আকর্ষণ করত । 
তালডুংরী রাধানাথ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক রাহুল বোস নয় নয় করে ছ'মাস এই গ্রামে কাটিয়ে ফেলল। প্রথম কটা দিন হোস্টেলে কাটানোর পর রাহুলের আশ্রয় হয় গ্রামেরই মোড়ল, স্কুলের সেক্রেটারি অবিনাশ সেনের বাড়িতে। অবিনাশবাবুকে বেশ আকর্ষণ করেছিল সুদর্শন, সুশিক্ষিত রাহুলের ব্যবহার । যা তিনি কোনদিন করেননি, সাত পাঁচ না ভেবে রাহুলকে একেবারে অন্দরমহলে ঠাঁই দিয়েছিলেন । অন্য কোনো বাসনাও ছিলনা । কারণ দুই কন্যা সন্তানের পিতা অবিনাশের বড়টির বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক আগেই । দুই পুত্রসন্তানের জননী শরৎশশী এখন পাকা গৃহিণী । আর কনিষ্ঠা কন্যা বিন্দুবাসিনী পূর্বেই বাগদত্তা । এই গ্রামেরই সম্পন্ন ব্যবসায়ী অবিনাশের বাল্যবন্ধু মণীন্দ্রনাথের একমাত্র পুত্র সুকুমার অবিনাশের ভাবি কনিষ্ঠ জামাতা । আগামী মাসের ১১ তারিখ বিবাহের তারিখ ঠিক করা আছে ।
আজ তালডুংরীর প্রাক্তন জমিদার অবিনাশ সেনের বাড়িতে সাজো সাজো রব । বিন্দুবাসিনীর বিবাহ উপলক্ষ্যে অতিথি আপ্যায়নের সমস্ত দায়িত্ব রাহুলের হাতে সঁপে দিয়ে অবিনাশ নিশ্চিন্ত । অবিনাশ কন্যা সম্প্রদানের জন্যে প্রস্তুত । আর ওদিকে বিন্দু পাড়ার অন্যান্য এয়োতি ও তার বান্ধবীদের নিয়ে সাজসজ্জায় ব্যস্ত । বর আসার সময় হয়ে এল প্রায় । অবিনাশ ঘরণী বরণের জন্য প্রস্তুত । এমনসময় মণীন্দ্রনাথের বাড়ীর চাকর দৌড়াতে দৌড়াতে এসে অবিনাশকে বললে " বাবু , বাবু সর্বনাশ হয়েছে ...." ॥
এখন আর দাঁড়ানোর সময় নেই । শিগগির গাড়ি বের কর , ওকে নিয়ে এখুনি সদরে ছুটতে হবে । শরৎশশীর ছোটপুত্র চন্দ্রদ্যুতি বিয়েবাড়িতে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে । রক্ত ভেসে যাচ্ছে পাঁচবছরের ছোট্ট জ্ঞানহীন শরীরটা । দুই নাতি অবিনাশবাবুর প্রাণ । মেয়ের বিয়ে , অতিথি আপ্যায়ন , কন্যাদান সবকিছু ভুলে নাতির শরীরটা বুকে জড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসেন । সদরে পৌঁছাতেও দুঘন্টা লাগবে । শিশুটা বাঁচবে তো ? আনন্দের হাটে মুহুর্তে শোকের বাতাবরণ । 
            অবিনাশ - পত্নী শোক সামলেও বধূবেশী ছোট মেয়ের কথাও ভুলতে পারেন না । উনি তো চলে গেলেন , এখন কন্যাদান কে করবে ? বংশে তো অবিনাশবাবু একা । আর আত্মীয়স্বজন তো বেশির ভাগ ই ওনার সঙ্গে সদরে গেছেন । মেয়েটা কি তবে লগ্নভ্রষ্টা হবে ? মা - মেয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে কান্নাতে ভেসে যাচ্ছে । তখনি ঘরে ঢোকে রাহুল । ঠাকুরমশাই বলছেন এবার বিয়ে শুরু করতে হবে ।
বিয়ে তো হবে কন্যাদান কে করবে ?
মাসিমা আমি শুধু আপনাদের অতিথি, এখনো আপন হতে পারিনি। শুধু রক্তের সম্পর্ক থাকলেই বুঝি আত্মীয় হওয়া যায়, আত্মার বন্ধন বুঝি কিছু না ? কেন আমি কি বিন্দুর দাদা হয়ে ওকে সম্প্রদান করতে পারি না ?
রাহুলের এতবড় আন্তরিকতার কাছে কোন যুক্তিতর্কে না গিয়ে অবিনাশ পত্নী বিয়ে শুরু করতে বলেন ।
বিয়ের সমস্ত কাজ শেষে নবদম্পতি প্রণাম করে রাহুলকে । সুকুমারের হাত দুটো ধরে রাহুলের মিনতি, আমার ছোট বোনটাকে তোমায় দিলাম , ওকে ভালো রেখো। আমি একটু সদর থেকে আসি, এখনও কোন খবর তো পেলাম না ।
ধুতিটা ছেড়ে কোনরকমে জামা - প্যান্ট পড়ে বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সদর হাসপাতালের দিকে । অবিনাশবাবুর পাশে দাঁড়ালে উনি একটু মনের জোর তো পাবেন ।

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

বনবীথি পাত্র

দেখা

.
রোজকার মতো সান্ধ্যভ্রমণের ফাঁকে দেশপ্রিয় পার্কের নির্দিষ্ট বেঞ্চটার দিকে এগোতেই থমকে যায় ষাটোর্ধ কলি, কথাকলি মুখার্জ্জী!
ওর জায়গাটায় কে যেন বসে আছে! খুব যেন চেনা চেনা লাগছে!!
সেই ২০১৫-র এক সন্ধ্যায় 'ফেসবুক'-এ পরিচয়! কিন্তু পার্থকে, মানে পার্থসারথী চৌধুরীকে তো কোনদিন দেখেইনি কলি! তবু মনে আছে....
ধুসসস্!! টিন্ এজারদের মতো কি সব ভাবনা?!
চশমার কাঁচটা কলি মুছে নেয় একবার।
ভাষার ব্যবহার/বাচনভঙ্গীমা যেমন ছিল, তাতে 'সি-আই-ডি' গিন্নী কলির মন বলছে-
ওটা পার্থই.........
অবশ্য কলির মন সেদিনও বলেছিল , পার্থ আসবে ।
স্বামী-সন্তানের ব্যস্ত জীবনে একাকীত্ব থেকে পালিয়ে বাঁচতেই ফেসবুকে নাম লিখিয়েছিল কলি । অচেনার মাঝেই আর পাঁচজনের মতো আলাপ হয়েছিল পার্থর সাথে । পার্থ , সুরেন্দ্রনাথ কলেজের বাংলার অধ্যাপক , নিঃসন্তান , বিপত্নীক । আলাপ থেকে বন্ধুত্ব , আর সেই বন্ধুত্বটাই একসময় .....। মধ্যবয়সে প্রেম কথাটা বড্ড কানে লাগত বলেই বোধহয় শব্দটাকে নিজের কাছেও স্বীকার করেনি কেউ ।
কলির জন্মদিনে দুজনে দেখা করার কথা ছিল , এই পার্কেই । তেজপাতা রং শাড়িতে প্রথম দেখবে বলেছিল কলিকে । 
কলি এসেছিল তবে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল ।পার্থ তখন সেখানে ছিলনা অথবা হয়ত আসেই নি ।
অনেক রাতে ইনবক্সে একটা মেসেজ এসেছিল , " আজ দেখা হল না , তবে আমার বিশ্বাস হয়ত কখনও দেখা হবে । তুমি ভালো থেকো ।"
ফেসবুক থেকেই তারপর হারিয়ে গেছিল চেনা পার্থসারথী চৌধুরী নামটা ।
কলির মনে আবছা হয়ে এলেও এখনো জমানো আছে সেই পনের বছর আগের ভার্চ্যুয়াল স্মৃতি । ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বলছে , ইনিই সেই পার্থসারথী চৌধুরী ।
একটু যেচে আলাপ করার জন্যই বেঞ্চটার দিকে এগোতে যাচ্ছিল কলি ।
তখনি একটা চপল কিশোরী ছুটে আসে পার্কের অন্যপ্রান্ত থেকে । 
দাদু সন্ধ্যে হলো এবার বাড়ি চলো , তোমার কথাকলি আজও এলেন না । ওনার জন্য কেনা বইটা এবারেও আমার-ই থাকল । এই নিয়ে পনেরটা কবিতার বই হলো আমার ।
কলি ভুলেই গিয়েছিল , আজই তো ওর জন্মদিন ।
পার্থ আজও সেকথা মনে রেখেছে । চোখের কোণটা রুমালে মুছে পিছন ফিরে তাকায় কলি ।
পার্থ ততক্ষণে অনেকটা দূরে চলে গেছে...........

চিত্রঋণ : পাবলো পিকাসো 

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

বনবীথি পাত্র


একফালি মেঘ□□□□
...........................................
কি ব্যাপার,আজ এতো সাজের ঘটা,অফিস কেটে কি অন্য কোথাও যাওয়ার প্ল্যান আছে নাকি....তমালের মুখে মুচকি হাসি । 
ঠোঁটে লিপস্টিকটা লাগাতে লাগাতে আড়চোখে তাকায় পিয়ালী ,সাজের আবার কি দেখলে,আর কথার কি ছিরি !!!!
  প্রতিদিন ই তো নাকে মুখে দুটো গুঁজে বাসে ঝুলতে ঝুলতে তো অফিস ছুটছি । গলায় যেন একটু অভিমানের ছোঁয়া ।
তমাল একটু এগিয়ে এসে ঘনিষ্ঠ হতে চায়--এত চটছো কেন ম্যাডাম,কি এমন বললাম ? তবে আজ কিন্তু তোমায় দারুণ লাগছে,এক সাজে দশ বছর বয়স কমিয়ে ফেলেছ ।আহ্ ছাড়ো মিঠি পড়ছে ও ঘরে,এসে পড়তে পারে । বিমলা তোমার রান্না হলো ? রোজ বলি একটু তাড়াতাড়ি এসো,তাহলে রোজ আমাকে এই নাকেমুখে গুঁজতে হয়না । আর দেরি কোরো না যা হয়েছে তাই দিয়েই দাও । সাজানো ভাতের থালা নিয়ে ছুটে আসে বিমলা ।টেবিলে থালাটা রেখে ফ্যানটা চালিয়ে দেয় । পিয়ালী খেতে খেতেই বলতে থাকে,মিঠিকে বিকালে দুধটা দিও মনে করে । আর আমার তিনটে শাড়ি লন্ড্রীতে আছে নিয়ে এসো যেন । পিয়ালী মুখটা তুলেই দেখে বিমলা হ্যাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে । কি দেখছো অমন করে ? লজ্জা পেয়ে যায় বিমলা , তোমাকে না বৌদি আজ দারুণ লাগছে দেখতে , ঠিক কলেজের মেয়েদের মতো । পিয়ালী গম্ভীর হতে গিয়েও হেসে ফেলে ।
তমাল আর মিঠি দুজনের-ই স্কুলে পুজোর ছুটি চলছে পিয়ালীর অফিস খুলে গেছে একাদশীর দিন । মেয়েকে একটু আদর করে বেড়িয়ে পড়ল পিয়ালী ।
 
.
সত্যি তো আজ ও অফিস যাচ্ছে না । কিংশুক একবারের জন্য দেখা করতে চাইছে ওর সাথে । আজও কেন যে কিংশুকের কথা এড়াতে পারল না কে জানে । অথচ এই কিংশুক-ই ওকে একদিন ঠকিয়েছিল , বড়লোকের জামাই হওয়ার লোভে কাকিমার বোনঝিকে বিয়ে করে নিয়েছিল , পরে নাকি ওদের ডিভোর্স ও হয়ে গেছে । স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার পিয়ালীর ,তবু কেন পারল না কিংশুকের ডাক এড়াতে ? বড় অবাক লাগে নিজেরই । এখনো কি কিংশুকের প্রতি দুর্বলতা আছে তার ?নাকি নিজের ভালো থাকাটুকু দেখাতে চায় ওকে ? একটু আগেও তো রোদ ছিলো,হঠাৎ যেন একফালি মেঘে ঢেকে গেল আকাশটা । কি জানি বৃষ্টি আসবে নাকি । এই অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টি কেমন যেন এলোমেলো করে দেয় সবকিছু । সামনে দিয়ে বাসটা চলে গেল । আজ আর ভিড় বাসে উঠতে ইচ্ছা করলো না ।একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেবে নাহয় ।
.
ব্যাগের মধ্যে মোবাইলটা
  বাজছে । ইস্, বেড়নোর সময় ভুল করে তমালের ফোনটা নিয়ে এসেছে !!!! কোনদিন তো এমন ভুল হয়না । ওপাশ থেকে তমালের গলা,,তাড়াহুড়োয় তোমার মোবাইলটা ফেলে গেছো । একটা মেসেজ এসেছে , কিংশুক বিশেষ একটা কাজে আটকে পড়েছে তাই আজ দেখা করতে আসতে পারবে না....


শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

বনবীথি পাত্র


দেওয়া-নেওয়া

.
উফ্ এই সময় আবার কে এলো !!!!
দেখো না একটু কে .....
আদুরে গলায় কথাটা বলেই পাশ ফিরে শুলো তিস্তা ।
ধুস্ সপ্তাহে এই একটা দিনই তো দুপুরে একটু ঘুমাতে পায় , তাও অসময়ে চটকে গেল । মানুষের আসার একটু সময়জ্ঞান নেই । ঘর থেকে বেরতেই গ্রীষ্মের উষ্ণতা টের পাওয়া যাচ্ছে । ড্রয়িংরুমের দেওয়াল ঘড়িটায় দেখে , তিনটে চল্লিশ । এই ভন্যি দুপুরবেলাতে কার বেড়াতে আসতে মন হলো !!!! একমুখ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতে যায় শৌভিক । 

ধুতির ওপর নীল শার্ট পরা যাদবকে চিনতে অসুবিধা হয় না শৌভিকের । কতদিন আগের-ই বা ঘটনা , মাস তিনেক হবে ।
বিয়ের পর হানিমুনে দীঘার থেকে চটজলদি আর কি বা হতে পারে !!!!
তিস্তার জলে ভীষণ ভয় । একদিন কোনরকমে একটুখানি জলে নেমেছিল বরের হাত ধরে । বালিতে বসে সমুদ্র দেখাতেই ওর বেশি মজা । নতুন বৌয়ের ভয় কাটানোর জন্য একা একাই সমুদ্রে নেমেছিল শৌভিক । ছোট ছোট ঢেউগুলো ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যাচ্ছিল গভীরে । হঠাৎ একটা বিশাল ঢেউ আসায় সবকিছু মুহুর্তে এলোমেলো । জলের টানে ভেসে যাচ্ছে শৌভিক । দুহাত তুলে বাঁচতে চাইছে , অথচ দম বন্ধ হয়ে আসছে । চারদিকে ততক্ষণে হৈ-চৈ পড়ে গেছে । দুচোখে শুধুই অন্ধকার , বুকটা যেন ভারী হয়ে আসছে । ক্লান্ত শরীরটা ঢলে পড়ছিল মৃত্যুর কোলে ....
শক্ত হাতে সেদিন মৃত্যুমুখ থেকে শৌভিককে ফিরিয়ে এনেছিল এই যাদব-ই । সেই মানুষটাকে ভোলে কি করে !!!!
আর একটা দিনও থাকতে চায়নি তিস্তা ওখানে । তাড়াহুড়ো করে ফিরে এসেছিল সমুদ্র থেকে ।
যে মানুষটা নতুন জীবন দিল শৌভিককে , তাকে সামান্য ধন্যবাদ টুকুও জানাবে না !!!!
আসার আগের রাতে একবার সমুদ্রের ধারে গিয়েছিল দুজনে , যদি সেই উপকারী মানুষটাকে দেখতে পায় । স্বামীর জীবন বাঁচানোর জন্য কিছু সাহায্য করবেও ভেবেছিল তিস্তা ।
সমুদ্রের ধারের ছোট ছোট চায়ের দোকানের অনেকেই গতকালের সেই ঘটনার সাক্ষী ছিল । তাই যাদবের পরিচয় পেতে অসুবিধা হয়নি । ঐ চায়ের দোকানের একজনের কাছেই শুনেছিল যাদব নামটা । যাদব তখন নাকি সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছে । বড়ো নৌকা-জাল কিছু নেই , একটা ছোট ডিঙি নিয়ে সাগরে যায় । যা পায় তাই দিয়ে পেটের খোরাক জোটায় । মা মরা এক মেয়ে আর নিজে , সংসারে মানুষ তো এই দুজন । যা পায় তাতেই চলে যায় কোনরকমে ।
যাদবের অভাবের সংসারের একটা ছবি ফুটে উঠেছিল তিস্তা আর শৌভিকের ভাবনায় । ভেবেছিল কিছু টাকা ঐ চাওয়ালাকেই দিয়ে আসবে , যাদবকে দিয়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু চাওয়ালা যদি যাদবকে না দেয় !!!! ভরসা করে কিছু টাকা আর দিয়ে আসতে পারেনি । একটা কাগজে নিজের ঠিকানাটা লিখে দিয়ে এসেছিল চায়ের দোকানদারকে । যদি কখনো আমাদের শহরে প্রয়োজন পড়ে , যোগাযোগ করতে বোলো যাদবকে । তিস্তা বারণ করেছিল বলে মোবাইল নম্বরটা দেয়নি , বলা তো যায় না কারণে-অকারণে ফোন যদি বিরক্ত করে !!!!
যাদব যে সেই মেদিনীপুর থেকে মালদায় সত্যি সত্যি চলে আসবে ভাবতেও পারেনি শৌভিক । ড্রয়িংরুমে বসতে বলে তিস্তাকে ডাকতে যায় ।
-- ওঠো , কে এসেছে দেখো ।
ধ্যুত এখন আবার কে এলো ? ভাল্লাগেনা ....
-- যাদব এসেছে ।
-- যাদব আবার কে ?
-- আহ্ ওঠো না একটু , ওকে ড্রয়িংরুমে বসতে বলে এসেছি ।
-- কে এসেছে বুঝতেই পারছি না , ঘুম জড়ানো গলাতে তিস্তার উত্তর ।
-- আরে যাদব গো যাদব । দীঘাতে যে আমাকে বাঁচিয়েছিল .....
কথা শেষ হওয়ার আগেই ধুড়মুড় করে উঠে পড়ে তিস্তা ।
-- কি বলছো কি ? ওতোদূর থেকে ঠিকানা ধরে চলে এসেছে ? কিজন্য এসেছে কিছু বলেছে ?
-- না কোনো কথা হয়নি 

-- অজানা অচেনা একটা মানুষকে ঘরের মধ্যে বসতে দিয়ে চলে এলে ? ঐ ঘরে কতো দামি দামি জিনিস আছে বলো তো !!!! ততক্ষণে নাইটির ওপর হাউসকোটটা চাপিয়ে ফেলেছে তিস্তা ।
-- নিশ্চয় কিছু টাকাপয়সার ধান্দায় এসেছে । পাঁচশোর বেশি দিও না আবার । এ বাজারে পাঁচশো টাকা কিছু কম নয় ।
-- তোমার বরের দাম তোমার কাছে মাত্র পাঁচশ টাকা !!!! তিস্তার কানের কাছে চাপা স্বরে কথাটা বলে শৌভিক ।
তিস্তা কটমট করে তাকাতেই একমুখ হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শৌভিক । তিস্তাকে রাগিয়ে বেশ মজা পায় ও ।
আরে আরে ওখানে বসেছ কেন !!!! সোফাতে না বসে ঘরের মেঝেতে একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখে হাঁ হাঁ করে ওঠে শৌভিক ।
আমার ময়লা কাপড়ে আমি এখানেই ঠিক আছি ।
তিস্তা এমন কটমট করে শৌভিকের দিকে তাকায় , যেন অতো বলার কোন দরকার নেই । মাটিতে বসেছে ওটাই ঠিক আছে ।
তারপর বলো , কবে আমাদের শহরে এলে ?
আজ দুপুরেই এসেচি বাবু ।
কোন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়াতে এসেছ বুঝি ?
আমাদের আপন কেউ নেই বাবু এ শহরে । আমার মেয়েটার টানে ছুটে এসেছি বাবু ।
যাদবের চোখে জল....
কি হয়েছে তোমার মেয়ের , তিস্তা জানতে যায় ।
মনে পড়ে সেই চায়ের দোকানদার বলেছিল , যাদবের আপনজন বলতে ওর এক মেয়ে ।
মেয়েটা একটা ছেলের সাথে আপনাদের শহরে পালিয়ে এসেছে । ছেলেটা ভালো না বাবু । আমার মেয়েটা বড্ড বোকা আছে বাবু । মেয়েটাকে যদি বাংলাদেশে পাচার করে দেয় !!!!
তোমার মেয়ের বয়স কত ?
পনের-ষোলো হবে বাবু ।
পকেট থেকে একটা মেয়ের ফটো বের করে শৌভিকের হাতে দেয় যাদব ।
রোগা রোগা এক কিশোরী মেয়ের ছবি ।
দুবছর আগের ছবি বাবু....
তা জানলে কি করে যে তোমার মেয়ে এই মালদাতেই এসেছে ? আর তাহলে তোমাদের ওখানকার পুলিশকে জানালে না কেন ? তিস্তা জানতে চায় ।
মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলছে যাদব ।
আরে কাঁদলে কি খুঁজে পাবে মেয়েকে !!!! 

আমাদের চেনাজানা একটা লোক ঐ ছেলেটার সাথে আমার মেয়েকে মালদার বাসে উঠতে দেখেছে....
তাই শুনেই তুমি মালদা চলে এলে , পুলিশকে কিছু জানালে না  !!!! তিস্তা একটু ঝাঁঝিয়েই উঠে....

বাপের মন দিদিমণি , অতো কিছু না ভেবেই ছুটে এসেচি আপনাদের শহরে । 

হঠাৎ উঠে এসে শৌভিকের পা দুটো চেপে ধরে যাদব , মেয়েটাকে বাঁচান বাবু.....
আরে আরে পা ছাড়ো , আমি কি করে বাঁচাবো তোমার মেয়েকে !!!! আমি কি পুলিশ নাকি , কোথায় খুঁজবো তোমার মেয়েকে !!!!
তখনো বড়ো আশায় যাদবের চোখদুটো তাকিয়ে শৌভিক আর তিস্তার দিকে ।
মোবাইলটা নিতে ঘরে আসে শৌভিক , পিছন পিছন তিস্তাও আসে ।
তুমি কাকে ফোন করবে এখন ?
আরে তোমাকে বলেছিলাম না আমার এক বন্ধু ইংলিশবাজার থানায় বেশ ভালো পোস্টে আছে , ওকে একবার ফোন করে বলি ব্যাপারটা ।
তোমার কি মাথা খারাপ হলো নাকি , এই সব ফালতু ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় !!!!
আহ্ আস্তে বলো , যাদব শুনতে পাবে ।
ওর চেনাজানা কেউ নেই এই শহরে , একটু সাহায্য না করলে কে মেয়েটাকে খুঁজে পাবে কি করে !!!!
ওর মেয়ে এই শহরেই আছে তুমি জানো ? শেষ অবধি দেখবে মেয়ে পাচারের অভিযোগে নিজেই না ফেঁসে যাও ।
অযথা ঝামেলায় জড়ানোটা হয়তো ভুল-ই হচ্ছে । তিস্তা তো ভুল বলছে না , অকারণ কোন ঝামেলায় ফেঁসে গেলে জীবনটাই বরবাদ হয়ে যাবে ।
আজ বিকালে দিদিভাইরা আসবে ভুলে গেলে নাকি তুমি ? যা হোক্ কিছু টাকা নিয়ে বিদায় করো ওকে এবার । যত সব উটকো ঝঞ্ঝাট.....
সত্যিই ওদের আসার কথাটা ভুলেই গিয়েছিল শৌভিক ।
ওর মেয়েকে খুঁজে দিতে সাহায্য করার কোনো পথ জানা নেই কথাটা যাদবকে বলতেই ওর মুখটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে আসে নিমেষে ।
পাঁচশ টাকা ওর হাতে জোর করে গুঁজে দিতে গেলেও নেয়না যাদব ।
টাকা নিয়ে কি করবো বাবু ? মেয়েটাকেই যদি না ফিরে পাই.....
দেখো কোনো পুলিশ স্টেশনে গিয়ে বলো , ওনারা তোমাকে ঠিক সাহায্য করবেন ।
আমরা জল চিনি বাবু , সাগর চিনি-ঢেউ চিনি-ঝড়ের মেঘ চিনি , ইসব শহরের পুলিশ ইস্টিশন চিনি না । ঢেউয়ে ভাসা মানুষকে খুঁজে আনতে পারি কিন্তু আপনাদের এই ঝকমকে শহরে এতো লোকের ভিড়ে নিজের মেয়েটাকেও খুঁজতে জানি না বাবু ।
শৌভিকদের যাবতীয় আভিজাত্য-বিদ্যে-বুদ্ধি-অহংকারকে মাটিতে মিশিয়ে ব্যস্ত শহরের ভিড়ে মিশে যাচ্ছে যাদব.....
তিস্তা ব্যস্ত ঘর সাজাতে । চারতলার ওপরে ব্যালকনি দাঁড়িয়ে যাদবকে দেখছে শৌভিক । বুকের মাঝখানটাতে কি অসহ্য একটা চিনচিনে কষ্ট ।
স্বার্থপর মানুষদের এই যন্ত্রণাটুকু হয়তো সারাজীবন সহ্য করে যেতে হয় নীরবে

জয়িতা সরকার, বনবীথি পাত্র,


বারের গল্প "হেঁসেল সম্রাজ্ঞী" লিখছেন বনবীথি পাত্র বনবীথি’র কাছ থেকে ওর সম্পর্কে যা যা জানা গেল সেগুলি এইরূপ,উনি পূর্ব বর্ধমান জেলার পাটুলিতে থাকেন। হাত-খুন্তির সাথে বন্ধুত্ব বিয়ের পর । কিন্তু ভালো লাগে রান্নাটা । নতুন নতুন রেসিপি বানানোর বদঅভ্যাস আছে একটু । লিখতে ভালোবাসি , তবে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি পড়তে ।

"হেঁসেল সম্রাজ্ঞী"র আজ ফাইনাল এপিসোড । পঞ্চাশজন প্রতিযোগী থেকে বাদ হতে হতে আজ ফাইনালের মঞ্চে পাঁচজন । নৈঋতা কোনদিন-ই রন্ধন পটিয়সী নয় , বরঞ্চ খাদ্যরসিকই বলা চলে । বিয়ের আগে তো কোনদিন রান্নাঘরে ঢুকেছে বলেও মনে পড়ে না । বিয়ের পরে মামণির নতুন নতুন রান্না খেতে খেতে নিজেও নতুন কিছু রান্না করার নেশাটা চেপে গিয়েছে নৈঋতার মনে । টিভিতে যেদিন "হেঁসেল সাম্রাজ্ঞী"র এডিশনের জন্য একান্ত নিজের তৈরি রেসিপি চেয়েছিল , সেদিন খেলাচ্ছলেই মেলটা করেছিল নৈঋতা । সেদিন ভাবতেও পারেনি যে "হেঁসেল সাম্রাজ্ঞী"র ফাইনাল মঞ্চ অবধি আসতে পারবে । ভেতরের টেনশন কিছুতেই চেপে রাখতে পারছে না , অসম্ভব ঘাম হচ্ছে । কি জানি আজ পারবে তো !!!! মামণি বারবার বলে দিয়েছে , তুই তো খেতে ভালোবাসিস , নিজের স্বাদ আর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ভালোবেসে রান্নাটা করবি । কিন্তু আজ বড্ড নার্ভাস লাগছে । উত্তেজনার পারদ আরো চড়তে থাকল যখন নিরুপম মল্লিককে দেখল বিচারকদের মধ্যে । নৈঋতার স্বপ্নের রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক , কিশোরীবেলার প্রথম ভালোলাগা ।তিনটে পর্বের দুটিতে উত্তীর্ণ হয়ে প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে তিনজন । শেষ রাউন্ড বিচারকের পছন্দ ।মনে মনে ঠাকুরকে স্মরণ করছে নৈঋতা , ভগবান এবারের মতো উতড়ে দাও ।নিরুপম মল্লিক ওর সাথে কথা বলছে , হাত-পা যেন শিরশির করছে নৈঋতার । মনে মনে এমনটাই আশঙ্কা করছিল নৈঋতা । নিরুপম মল্লিক বললেন , ঠাকুর বাড়ির একটা স্পেশাল খাবার বানাতে । ইস্ হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে নৈঋতার । কেন যে একটু ঠাকুর বাড়ির রেসিপিগুলোতে চোখ বুলিয়ে এলো না !!!! উপকরণের ঝাঁপি খুলে তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড় । কি বানাবে এইগুলো দিয়ে ???? সময় মাত্র ৪৫ মিনিট ।হঠাৎ করে মনে পড়ে গেলে , গানের দিদিমণি একবার পঁচিশে বৈশাখের অনুষ্ঠানে এমনি কি একটা যেন খাইয়েছিলেন । বলেছিলেন এটা ঠাকুরবাড়ির রান্না । আর দেরি না করে চটপট রান্না শুরু করে দেয় । বানিয়ে ফেলে মটরশুটির চপ ।মাত্র তিন নম্বরের জন্য নৈঋতা ফার্স্ট রানার আপ । একটু মনখারাপ হলেও নিরুপম মল্লিকের সাথে সেলফি তুলতে পেরেই ধন্য নৈঋতা । জীবনে কখনো ভাবেনি যে নিরুপম মল্লিকের সাথে একফ্রেমে তার ছবি থাকবে । পুরষ্কার বিতরণীর শেষে ডিনারের জব্বর ব্যবস্থা ।ওরা না হয় জমিয়ে ডিনার করুক । আমরা ততক্ষণ জেনে নি


"কড়াইশুটির চপ" এর রেসিপিটা ।উপকরণ :--- #আলু_500গ্রাম #মটরশুঁটি_500গ্রাম #বিস্কুটের_গুঁড়ো #তেল #ঘি #হিং #গরমমশলা #আদা #শুকনো_লঙ্কা_বাটা #এরারুট #লবণ #চিনিপ্রণালী :---মটরশুঁটি ছাড়িয়ে মিহি করে বেটে নিন । ঘি গরভ করে হিং ফোড়ন দিন । মটরশুঁটি বাটা, আদা ও শুকনো লঙ্কবা টা দিয়ে খুব ভাল করে কষিয়ে নিন । লবণ ও চিনি দিন স্বাদমত । কষানো হলে গরমমশলা গুঁড়ো দিয়ে নামিয়ে নিন।আলু সিদ্ধ ছাড়িয়ে গরম থাকতে থাকতে স্বাদমত লবণ ও ঝাল দিয়ে খুব ভাল করে মেখে নিন ।এরার ঘন করে এরারুট গুলে রাখতে হবে।আলুর খোলের মধ্যে পুর দিয়ে চপের আকারে গড়ে দিয়ে দুপিঠে বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে নিন। এরারুটের গোলায় ডুবিয়ে ডোবা তেলে ভেজে তুলে নিন ।

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

বনবীথি পাত্র



রাত_ভোর_বৃষ্টি

.
(1)
টিফিনের সময় বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সৌমি । আজকেই কোর্টে কেসটার শেষ দিন । আইনত ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে অনীকের সাথে । এমনটাই চেয়েছিল , তবু মনটা আজ খারাপ । সাড়ে তিনবছর সংসার করেছিল দুজনে । বাসের জন্য দাঁড়িয়ে , মোবাইলটা বাজছে ব্যাগে ।
 
অনীকের বাইক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে , অবস্থা সিরিয়াস । বৃষ্টির জমা জলে বাইকের চাকা স্কিড করে গিয়েছিল । সকালেই ফোন করেছিল অনীক , কোর্টে যাওয়ার কথাটা মনে করানোর জন্য । কলহিস্ট্রি দেখে কোন এক পথচারী ফোন করে সৌমিকে ।
 
মাথার আঘাতটাই গুরুতর , জ্ঞান ফিরেছে ছাপান্ন ঘন্টা পর । জ্ঞান না ফেরা অবধি সৌমি আইসিইউ র করিডোরেই বসেছিল , কেউ ওকে বাড়ি ফেরাতে পারেনি ।
আজ অনীকের ছুটি হসপিটাল থেকে । রাত ভোর বৃষ্টি , এখনো চলছে সমানে । সৌমি সকাল থেকেই হসপিটালে । অনীককে নিয়ে আজ একসাথে নিজেদের ঘরে ফিরবে সৌমি ।
(2)
তোর বরটা খুব বাদুলে বাপু , কদিন ধরে বৃষ্টি যেন ধরছেই না ।
ফুলদিদার কথায় হেসে উঠেছিল সকলে ।
বাড়ির একমাত্র মেয়ে সুমিতার বিয়ে , বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই আনন্দে মেতেছে সকলে ।
মেরুন বেনারসী-সোনালী চেলি আর গা'ভরা গয়নাতে সুমিতা যেন রাজেন্দ্রাণী । আলো-সানাই-রজনীগন্ধার গন্ধে মুখরিত বাড়ি । সান্ধ্যলগ্নে বিয়ে । বড়রা চিন্তিত বৃষ্টি একটুও কমছে না । এখনো বর এসে পৌঁছায়নি । ফোন করেছিল ছোটকা , বৃষ্টিতে রাস্তা বন্ধ । ঘুরে আসতে হচ্ছে বলে দেরি হচ্ছে একটু ।
বর আসার বদলে ফোন এসেছিল সুমিতার বাবার মোবাইলে । বৃষ্টির জমা জলে রাস্তা বুঝতে না পেরে নয়নজুলিতে পড়ে গেছে বরের গাড়ি ।
  সাথে সাথে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল বাবা-ছোটকা-বড়মামা আরো অনেকে ।
অনেক রাতে খবর আসে । গাড়ির পাঁচজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে , শুধু বর আর ওর এক বন্ধুকে বাঁচাতে পারেননি ডাক্তাররা ।
রাত ভোর বৃষ্টি .....
ছাতনাতলা , বরাসন সাজানো গোছানো পড়ে আছে এখনো । চোখের জলে শুধু ধুয়ে গেছে সুমিতার সব রঙ......

(3)
বিলের জল ছাপিয়ে ঢুকে পড়েছে ইস্টিশেনের পাশের পাটক্ষেতে । বিলের মাছগুলোও তারমানে ভেসে এসেছে । কতদিন ভাতের পাতে মাছ খায়নি । বাপটা বেঁচে থাকতে তাও মাঝেমধ্যে মাছ আনতো । মায়ের চোখ এড়িয়ে গামছাখানা নিয়ে পাটের ক্ষেতে গিয়েছিল তের বছরের সাবিনা ।
রাত ভোর বৃষ্টি । ঘরে ফেরেনি মেয়েটা । ঘর মানে রেললাইনের পাশে পলিথিনের ঝুপড়ি ।
 
সকালবেলায় পুরনো মালগুদামের পিছনে একটা ডেডবডি পড়ে থাকার খবরে ছুটে গিয়েছিল আমিনার মা । উপুড় হয়ে পড়ে আছে সাবিনার পোশাকহীন নিষ্প্রাণ দেহটা । কই-ল্যাঠা মাছগুলো গামছা থেকে ছিটকে পড়ে তখন ছটফট করছে বাঁচার জন্য ....

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

বনবীথি পাত্র


জ্বালা

.
"আমি ভাবি ঘোড়া হয়ে
মাঠ হব পার ,
কভু ভাবি মাছ হয়ে 
কাটিব সাঁতার ।
কভু ভাবি পাখি হয়ে
উড়িব গগনে ,
কখনো হবে না সে কি
ভাবি যাহা মনে ।"
দিদিমণি ক্লাসে ছড়াটা পড়াচ্ছেন আর ক্লাসের ঐ নীল-সাদা জামা পরা ছেলেমেয়েগুলো দুলে দুলে কবিতাটা বলছে । 
ক্লাসঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল পাঁচবছরের ফেলি । ওর জন্মের পর নাকি  ওকে কারা ফেলে পালিয়েছিল । মা কুড়িয়ে এনে নাম দিয়েছে ফেলি । 
কবিতাটা শুনতে শুনতে ফেলির ও মনে মনে ভাবতে থাকে , ঐরকম নীল-সাদা জামা পড়ে সেও বই-খাতা-ব্যাগ নেই বেঞ্চে বসে দুলে দুলে পড়া করছে । 
তখনি কেঁদে ওঠে ছোট বোনটা । কাল রাতে কিছু খাবার জোটেনি । ক্ষিদে পেয়েছে ওর । ফুলির ও ক্ষিদে পেয়েছে । কিন্তু ফুলি ক্ষিদে পেলে দু-তিনবার ঢোক গিলে পেট ভরাতে শিখে গেছে এখন ।
ইঁটভাটায় কাজ সেরে ফিরে এসে মা ভাত রাঁধবে বলেছে ।
কিন্তু সে তো অনেক দেরি । বোনটা যে কেঁদেই চলেছে....
ঐ বড়ো তিনতলা হলুদ বাড়ির কালকে ওদের বাড়ির সামনের ঘাসগুলো তুলে দিলে পাঁচটাকা দেবে বলেছিল ।
ঘাসগুলোর মধ্যে অনেক পিঁপড়ে ছিল বলে রাজি হয়নি ফেলি ।
ক্লাসে বসে পড়া করার মিথ্যা স্বপ্ন দেখে লাভ নেই ....
আজ যদি ঘাস পরিষ্কারের কাজটা পায় করবে । পিঁপড়ের কামড়ের জ্বালা কি ক্ষিদের থেকেও বেশি !!!!
বোনটাকে কাঁখে নিয়ে হলুদ বাড়িটার দিকে হাঁটতে থাকে ফেলি...

বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

বনবীথি পাত্র


দৃষ্টি_ভঙ্গী 

.
(1)
দোকানটা বন্ধ করার আগে হৈমন্তীর প্রেগন্যান্সি টেস্টের রিপোর্টটা আরো একবার করুণ দৃষ্টিতে দেখছে অঞ্জন
রিপোর্ট নেগেটিভ
এবার বড্ড আশা করেছিল দুজনেই  
দাদা আনওয়ান্টেড প্রেগন্যান্সি , জোরালো দেখে একটা ওষুধ দিন তো ....
পনের বছর ওষুধের দোকান চালাচ্ছে , মহিলাটির ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে বাকী কথাটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয়না অঞ্জনের
মনের দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে হৈমন্তির কান্নাভেজা মুখটা !!!!!
.
.
(2)
মোবাইল থেকে যতবার চোখ তুলেছে শ্রীজিতা , ভিড়ে বাসে পাশে দাঁড়ানো বুড়োটার সাথে চোখাচোখি
উফ্ অসহ্য....
এই বয়সেও মেয়েদের প্রতি নোংরা দৃষ্টি দেওয়ার স্বভাব যায়নি বুড়োটার আজ একটা চরম শিক্ষা দেবে বুড়োটাকে
উঠে দাঁড়িয়েই এক থাপ্পড় বুড়োটার গালে
ভবিষ্যতে মেয়েদের দিকে নোংরা দৃষ্টিতে তাকানোর সময় এই থাপ্পরটা মনে রাখবেন
সারা বাসের লোক ছিঃ ছিঃ করছে
পরের স্টপেজেই নেমে যায় বুড়ো মানুষটা নামার আগে একবার পিছন ফিরে দেখে শ্রীজিতাকে চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসছে চোখের দৃষ্টি
জবার মুখটা মনে পড়ছে বারবার
ভগবানের চোখ নেই.....
নাহলে বুড়ো বাপটাকে ফেলে মেয়েটা অকালে চলে যায় !!!!!
.
.
(3)
ইস্ আমাদের কৃষ্ণার এমন রাজপুত্তুরের মতো বর হবে কেউ ভাবতেই পারিনি
বাব্বা বর-বৌ তো পূর্ণিমা আর অমাবস্যা
কেলটি মেয়েটার কপাল বটে , কেমন সুন্দর বর জুটেছে দেখো
চোখে পানপাতা ঢাকা দিয়ে থাকলেও বিয়েবাড়ির পাঁচজনের ফিসফাস মন্তব্য সবই শুনতে পাচ্ছে কৃষ্ণা
কালো বলে ছোট থেকে মানুষের কাছে তো সে কম কথা শোনেনি !!!!
চারদিকে উলু আর শাঁখের আওয়াজ , শুভদৃষ্টি হচ্ছে চোখের পানপাতা সরিয়ে প্রথম দৃষ্টি বিনিময় কৌস্তবের সাথে .....
বিয়েবাড়ির লোকজনদের না বললেও দাদা কৃষ্ণাকে আগেই জানিয়ে রেখেছে , কৌস্তভের একটা চোখ পাথরের !!!!!
.
.
(4)
অ্যাই দুটো ভাত দিবি , কদ্দিন ভাত খাইনি .... 
একতলার বারান্দাটাতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থামার পরের ভিজে আকাশটা দেখছিল মানসী   পাগলিটার ডাকে চমকে ওঠে
ইচ্ছা করছিল না খায়নি দুপুরে , ভাত-তরকারি সব টেবিলেই ঢাকা দেওয়া আছে
খাবারগুলো এনে ঢেলে দেয় পাগলির ভাঙা অ্যালুমিনিয়ামের থালাটায় ভাতের সাথে মাছের টুকরোটাকে লোলুপ দৃষ্টিতে দেখছে পাগলিটা
আর মানসীর দৃষ্টি পাগলিটার কোলে ছেঁড়া নেকড়ায় মোড়া শিশুটার দিকে
পাগলিটাও মা হতে পেরেছে !!!!!
.
.
(5)
....সাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে , আর কাঁদিস না

.... এখন তো ফোনে সবসময় কথা বলবি মা-বাবার সাথে , যখন ইচ্ছা চলে আসবি

....এমন কাঁদছিস মনে হচ্ছে বিয়ে হয়ে বিদেশ চলে যাচ্ছিস্ , এই তো চল্লিশ মিনিটের পথ

ভালোবেসেই বিয়ে মৈনাকের সাথে , তবু বিদায়ের সময় কান্না থামাতে পারছে না ঋতু  
গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সজল দৃষ্টিতে পিছনে তাকিয়ে থাকে , যতক্ষণ বাড়িটাকে দেখা যায় .....
একসময় দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় ঋতুর মেয়েবেলা
ঋতু ফিরলেও , মেয়েবেলাটা আর ফিরবে না কোনদিন.......