শুভ আঢ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শুভ আঢ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

শুভ আঢ্য

কাসাহারা ও রবীন্দ্রনাথ

৫
ছায়া ছোটো করে টেবিলের সামনে মরিচদানিতে ঢুকিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া এখানকার ওয়েটারেরা আর কিছু করে না। এখানকার মেনুকার্ডের বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। মাশরুম দেওয়া চাউমিনে বৃষ্টি। কাসাহারার বাইরে কোথাও কোনো আবহাওয়া দপ্তর নেই। এখানে শুধুই কালো কালো ভেড়ার মতো দেখতে শুয়োরেরা টেবিলের তলায় ঘুরঘুর করে। ছায়া ছোটো হয়ে গেলে এখানে খেতে আসা মেয়েদের প্লেটে তা সাজিয়ে দেওয়া হয়। এখানে একটিও চেনাজানা টমেটো নেই। অচেনা টমেটোরা এখানে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলে। টেবিলটিতে ওয়েটারদের হাতের ছায়াটুকু পড়ে আছে, তাদের ঘরে বিছানায় এলানো শরীর ঘিরে কোনো মেয়ে নেই। অথচ এখানে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, প্রতিটি মেয়ের স্কার্টের ভেতর একটি করে সাদা পায়রা কখনও লাল হয়ে যায়... এখানে লাল রঙে ছবি আঁকা হয় না যদিও। এখানে মরিচদানি থেকে বৃষ্টি পড়ে না কোনো। শুধুই টেবিলের তলায় শুয়োরেরা একটার পর একটা ডিশ... এখানে কাসাহারায় বাইরে একটির পর আরেকটি মেয়ে অপেক্ষা করছে।





৬
রোদ্দুর কাসাহারাতে পড়ে। সেখানে রাখা মাচার ওপর মাছের ছায়া কি করে পড়ে কেউ জানে না। এখানে মাছরাঙাদের নিয়ে কথা বলতে আসা ছেলেমেয়েরা একে অপরের বুকের কাছে বসে, খাবি খায়। মাছগুলো রোদ্দুরে ভেজে আর ভাবে জলপাইহাটি থেকে এখানে আসার সময় ভিজতে ভিজতে একদিন তারাও ছেলেমেয়েগুলোর মতো বুকের কাছে বসতে পারবে, তাদের সতেজ আর নিস্তেজ স্তনের কথা জানতে পারবে, যদিও মাছরাঙারা কখনও বোতলে ঢুকতে চায় না। তারা রবীন্দ্রকবিতা পড়েনি। তবে জানে, বাবু পারিষদ সাথে ছিপ ফেলেন পুকুরমাঝে। ফাৎনায় মেয়েরা ওঠে, অনেক ঘুমের নীচে তাদের বাড়ি থেকে উঠে এসে রোদ্দুরে আলুথালু দাঁড়ায়। জলপাইহাটি রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে। কবিগুরু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, কাসাহারা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মাছেদের ছায়া আর অ্যাকোরিয়ামের ধারণা। তারা নিজেদের মতো করে জলপাইহাটির জালে জড়িয়ে পড়ছে। জাল মোহ, সেখানে রোদ্দুর পড়ে না। সেখানে স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় মাছগুলো মাছরাঙার সাথে কথা বলে, কাসাহারার টেবিলে




৭
অবিরত চলে যাচ্ছে কথোপকথন। সেখানে আলো জ্বলছে না, কাসাহারা পেরিয়ে সবুজ মাঠটির দিকে এগোলে দেখা যায় ক'টি মহিলার স্তনবৃন্তগুলি জোনাকির মতো জ্বলে উঠছে। এঁরা হতে পারেন রামকিঙ্করের সাঁওতাল রমণী বা উৎপল কুমারের নিরক্ষর বেশ্যা। এঁদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখাজোখা আছে কি না তা নিয়ে কাসাহারায় কোনো আলোচনা সভা হয়নি। সেখানকার কফিকাপগুলো এসব মেয়েদের স্পর্শ হয়তো বা পেয়ে থাকবে। এখানে বৃষ্টির সময় অবিরত হয়ে যাচ্ছে কথোপকথন। সবুজ মাঠটির দিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো ভিজছে। শেষের কবিতায় লাবণ্য যেভাবে কথা বলেছিল, সেই স্তনবৃন্তগুলো সেমতোই উন্মুখ। ফলে, কাসাহারায় কবিতা গোর দেবার কথা রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি। হয়তো উৎপল কুমার বা রামকিঙ্কর এখানে আলো নেভানোর কথা ভেবেছিলেন। এই নিয়ে কাসাহারায় কথোপকথন জারি থাকছে ছেলে ও মেয়েগুলোর মধ্যে।

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

শুভ আঢ্য

শিল্পের বিপক্ষে... নান্দনিকতার চামড়া তোলা একটি পক্ষপাতদুষ্ট ফুটবল প্রতিবেদন /

আপনার সারনেম দে, বা মান্না নয়? গানটাও শোনেন নি? তা’ও নিজেকে বাঙালী বলে দাবি করেন? তাহলে আপনার আগামী ফুটবল বিশ্বকাপ দর্শনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল। আপনি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান নিয়েও মাথা ঘামান না? আপনি জানেন নি চিমা ওকোরির ঘরে কোন দেওয়ালে যীশু ঝোলেন; আচ্ছা, আপনার নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরও কিছুটা বাড়িয়ে রাখা হল আগামী দু’টি বিশ্বকাপ। এখন প্লিজ এটা বলবেন না, আপনি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেন না, প্লিজ... আপনার যাবজ্জীবন হোক আমি চাই না। এত নেগেটিভিটি নিয়ে আপনি খেলা দেখতে বসেন যখন, নিশ্চয় আপনি ‘অ্যাই গরু, সর না’ প্রজাতির! সুতরাং আপনার ওপর যা কিছু ফুটবল ও ইতিহাস বোধ চাপিয়ে দেবার অধিকার আমার জন্মগত, বিশ্বাস না হয় সংবিধান দেখুন, ও পাতা না মিললে তা গরমিলের দায়েও যাবজ্জীবন আপনার বাঁধা, সুতরাং বুঝতেই পারছেন...
এবার ধীরে অতি ধীরে রক্ষণভাগ সামলাতে সামলাতে ডজ করতে করতে বিশ্বকাপের দিকে এগোনো যাক, উল্লেখ্য এই ২০১৮’র বিশ্বকাপের দিকেই এগোই, যিনি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করার কথা ভাবেন না, তাঁকে নিয়ে আর খুব বেশী কদ্দূরই বা এগোব। আমাদের উদ্দেশ্য হবে খেলা’কে খেলার বাইরে রেখে দেশ ও তার পারিপার্শ্বিক ক্ষেত্রে আপনার নজর ঘুরিয়ে রাখা। আর যদি বা ইতিহাস প্রসঙ্গ এসে পড়ে তবে আগেই বলে রাখা হয়েছে, আপনাকে ব্রাজিলের পাঁচবার বিশ্বকাপ জয় ও আর্জেন্টিনার ১৯৮৬’র বাইরে কথা বলতে দেওয়া হবে না। এবার আপনি আমার নাম পালটে অ্যাডলফ্‌ রাখবেন না কি রিল্‌কে রাখবেন সেই গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু আপনার ওপর ছেড়েছি বলে আইদার মারাদোনার হ্যাণ্ড অফ গড ভেবে আমার হাতে বা মেসির বাঁ পা ভেবে আমার বাঁ পায়ে চুমু খেলে আপত্তি করবো না। ছেলে হলে সামান্য মুখ বেঁকিয়ে হলেও, খেতে দেবো। ওই চুমু আর কি।
দেখেছেন, গৌরচন্দ্রিকার সাইজ ক্রমশই বাড়ছে এবং ঢুকতে পারছি না বিশ্বকাপে, বারবার রক্ষণের সামনে বল চলে আসছে, তো আমরা হলাম গিয়ে বল প্লেয়ার, রক্ষণ সেরকম বুঝি না, আর রক্ষণ যারা বোঝে তাদের করুণার চোখের দেখি, এই যেমন ধরুন না, ইতালি এই বিশ্বকাপটা খেলতে পারল নি, কি দুঃখু, আমাদের তো প্রায় নাওয়া খাওয়া ছাড়ার জোগাড়। বলা বাহুল্য গৌরকে ডবল এক্সেল সাইজের জার্সিতে খেপ খেলতে যদি আপনি না’ই দেখে থাকেন, তাহলে আর করলেন কি! বাবলু দা’র কস্‌ম, পেলের কসমস আর গৌরের খেপ... সে খেলা দেখে এখনও বিছানায় বাইসাইকেল কিক করা যায়। চিন্তা নেই, আপনি পারবেন না, যার ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা রোচে না, বাঙালী হয়ে কেন আছেন বলুন তো! একটু সময় সুযোগ করে বিষ্যুৎবার দেখে দেহ রাখবেন, কেমন? শুক্কুরবার ছুটি, আর শনি রবি তো রইলই। দীঘার বিচে খানিক খালি পায়ে ড্রিবল দেখিয়ে আসব!
খেলা দেখবেন? কেন? জগতে কত সমস্যা রয়েছে, ব্রাজিলের পার ক্যাপিটা ইনকাম কত কম, মাত্র ২৫ শতাংশ লোকের পকেটে অর্থনীতির ৮০ শতাংশ টাকা ঢুকে পড়ছে। গরিব, আরও গরিব হচ্ছে তো বড়লোকের ক্ষেত্রেও ভাইসভার্সা। আপনি জানেন? আর্জেন্টিনার কত জন মানুষ ইউনেস্কোর সমীক্ষা অনুযায়ী দারিদ্রসীমার নীচে? খবর রাখেন আপনি? এখানে বলতে আসবেন না খুন-জখম, ছিনতাইয়ের বিশ্ব অনুযায়ী রেট কি রকম, তাহলে আপনাকে মনে করিয়ে দেবো, ইংরেজ হুলিগ্যান মব মার্কা সমর্থকদের কথা... এবার কিছু বলবেন?! লাতিন আমেরিকান কবিতা, সাহিত্য কিছু পড়েছেন কোনোদিন? এর মধ্যে যদি মুখটি তুলে প্রশ্ন করেছেন কি এসব তথ্য নিয়ে বিগত চার বছর কথা হয়নি, তো, মরেছেন। নিজের গুহ্যদ্বার যথেষ্ট পরিমাণ বাঁশ মজুত রাখার উপযুক্ত হলে করুন না, সব কিছুতে নিষেধাজ্ঞা নেই, আমরা উদার। নাহ্‌, শুধু ফুটবল নিয়ে কথা বলা কেমন রুচিতে বাঁধছে। বাঙালী হয়ে ভার্সেটালিটি থাকবে না, মেনে নেওয়া যতটা চাপের ততটাই। আসুন আমরা ফুটবল বিশ্বকাপের সাথে কথা বলি জার্মানির নাৎসি নিয়ে, ইহুদী বিদ্বেষ নিয়ে। কথা আমরা বলি, আসুন না, সেই কবে কবে মারাদোনা বিশ্বকাপ জিতিয়েছিল সেই নিয়ে... আসুন না, আপনাকে, আপনার সমর্থনকে একটু হেয় করে দেখিয়ে আমরা পিচৎজার ওপর এক্সট্রা টপিংসের মতো নাল ফেলি। আসুন শিল্প নিয়ে সামান্য... এই চা খেতে খেতে... তো, বুইলেন কি না, ব্রাজিল হল শিল্পের আঁতুড়ঘর। কত শত জগদ্বিখ্যাত প্লেয়ার জন্ম দিয়েছে, যদিও তা খুঁজতে গেলে আপনাকে বেশ কিছু বছর পিছলে যেতে হবে পিছনে, তা না হয় যাবেন। তবু শিল্পের জন্য সামনে যাবেন না, খবরদার, এই ২০১৪’র পর খোঁজার কিছু চেষ্টা করবেন না। আপনার অনর্থক হয়রানি হোক, চাই না বলেই বলা।
কবিতার মতো মাঠের সবুজ গালিচায় যেভাবে বল নিয়ে যাবার কথা বলে রেডিও কমেন্ট্রি শুনতেন অজয়বাবুর ও বাবলু দা বলেছেন, তেমন শিল্প প্রসঙ্গে ঢোকা যাক। দেখুন, সামনে তিনজন প্লেয়ার, রোমারিও এগোচ্ছেন, তাঁর বল ড্রিবলের ভাঁজে দু’পাশ থেকে খড়ের মত ডিফেণ্ডারেরা পড়ে যাচ্ছে, আপনার বল জমি থেকে এক ইঞ্চিও উঠছে না, বল আপনার কথা শুনছে, যদিও মারাদোনার কথা আর সামান্য বেশী শোনে, এ দেখার মজা পাবেন কোথায় বাওয়া? এঁড়ে স্টুডেন্টের মতো, স্যরকে বিপদে ফেলার মতো প্রশ্ন করবেন না যে, সেটা পায়ে বেশীক্ষণ না রেখে হাওয়ায় ভাসিয়ে বড় পাশ খেলে দলের অপরজনকে দিয়ে দিলে কি ক্ষতি; বা গাঁতিয়ে ঢুকে পড়ে বিপক্ষের বুঝে ওঠার আগেই একটা গোলের চেষ্টায় ঝুড়ির ক’টা আম’ই বা পচে যায়? এসব প্রশ্ন অর্থহীন ও এই বয়সে নি-ডাউন বা মুরগী করে রাখলে কি ভালো দেখায়! এখানে হেজিমনির মদতো মাথায় ঢুকিয়ে রাখুন, শিল্প সর্বদাই গরিবের পক্ষে। শিল্প ততক্ষণই শিল্প, যতক্ষণ আধপেটা খেয়ে আপনি ছেঁড়া জামা নিয়ে বিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকছেন। শিল্প ততক্ষণই মহান, যতক্ষণ তা ইনফ্রাস্টাকচারের অভাবে আপনার গলার শিরা ফোলাবার জন্য উপযুকত বিষয়। যখনই উপযুক্ত সম্মান বা প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন, ব্যস, শিল্প থেকে আপনি চ্যুত। পথের পাঁচালীর উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটিকে বোঝানো যায়, কিন্তু সব জায়গায় এক উদাহরণ দিতে ভালো লাগে না। তাহলে খেলায় শিল্পের প্রয়োজনীয়তা বোঝা গেল? ধরা যাক, বিশ্বকাপ জিতেই ফেলছেন, বারবার, বারংবার জিতেই চলেছেন, আপনি কমিটির টিমও হয়ে উঠেছেন, আপনাকে অ্যাম্বাসাডর করে কত পথ চলে গেল ফিফা, এসব ভাববেন না, ঐতিহ্য নিয়ে বলুন, বল আবিষ্কারের পর তা’তে পা দিয়ে ছেলেখেলা করার কথা বলুন, তবে ভুলেও ইউরোপে খেলে আমাদের ধনী হবার কথা বলবেন না, যেমন এ’ও বলবেন না ইউরোপের স্কিল ও খেলার স্ট্রাকচার নিয়ে আমাদের মনেও সামান্য ভালবাসা জন্মে তো গেছেই, এসব বলা ও মনে আনা আমাদের হারাম। মানে ফুটবলের প্রসারের জন্য এক বা দুই বিশ্বকাপে আপনাকে এমন গ্রুপে রাখা হচ্ছে যে গ্রপে থাকা মানে আপনার বিদেশ সফরের সময়কাল একটা সময় অব্দি নিশ্চিত! এবং আমরা ফিফাকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে প্রভোক করছি বলা ঠিক না, তবে না নিলে ফুটবলের বিশ্বব্যাপী যে প্রসার আটকে যাবে, তা বুঝিয়ে দিচ্ছি ঠারেঠোরে... তো? সোচিয়ে মৎ। এ এক জন্মগত অধিকার, সাও পাওলো বা বুয়েনস আইরেসেতে জন্মানো মানে আপনি জীবনের বেশ কিছুটা সময় হয় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আপনার পায়ের যাদু দেখাবেন, নয়তো ওখান থেকে বিতাড়িত হলে এশিয়ার সর্ববৃহৎ বাজারে এসে গুটিকয়বছর কাটিয়ে বাবলু দা’র সাথে দেখা করে যাবেন। ও হ্যাঁ, যাবার সময় সম্মাননা-টনা আপনাকে দেওয়া হবেই, সাথে শাল ও অতি অবশ্যই আমাদের গোরা পিটিয়ে মাঠজয় করার রক্তিম অভিনন্দন। পাঁচবার জেতার পরেও যদি কেউ আপনাকে মানে আপনার দেশকে প্রতিষ্ঠান বলে থাকে, ও সেই প্রতিষ্ঠানের বিরোধীতা করে উঠতে চায় সটান বলে দেবেন, প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার কিছু ক্ষেত্র আছে, কিছু প্রি-আইডিয়া আছে, সেগুলো ছাড়া ব্যাপারটা ভেগ, দাঁড়ায় না। আর আপনি সাদা চামড়া, সামান্য ভালো খেতে পান, আপনার ক্লাবে গিয়ে আমায় ঘাম ঝরিয়ে ঘ্যাম বাড়াতে হয়, যার অর্থ, আপনি অর্থশালী, মানেই মাঠে ল্যাদাড়ু হবেন, এ এক অনস্বীকার্য স্বতঃসিদ্ধ। এ আলু সিদ্ধ হয়নি বলে গোল করবেন না, অযথা। একটা পস্ট কথা বলে রাখা ভালো, সবসময় মনে রাখবেন, আপনি গরিব হবেন না, দেখতে ভালো হবেন, ভালো করে ইংরাজীতে কথা বলতে পারবেন, আপনার দেশে ক্লাবে খেলার পরিকাঠামো ভালো হবে, রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড হবেন, আবেগ থাকবে না, মাঠে পড়ে যাবার পর রক্তাক্ত অবস্থায় উঠে আবার খেলবেন জাত্যাভিমানের কথা ভেবে ও একটার বদলে পাঁচটা ফাউল করবেন আর ভাববেন মিত্র ক্যাফের ফাউল কাটলেটের ভাগ পাবেন! বেড়ে তো!
বোঝার চেষ্টা করুন, যে বিশ্বকাপ খেলা টিভিতে দেখেন আপনি, তার রেজাল্ট ও রেজাল্টেন্ট ফ্যাক্টর বাঙালী সমাজ মনেপ্রাণে মানে না। অন্তত ফেস্ফবুক সমাজ তো নয়ই। পরাজিতের পক্ষে অনেক মানুষ থাকে, জয়ী উঁচুতে ওঠার পর একা। ধরুন না, এই ফাইনালের কথাই, ছোটো দেশ ক্রোয়েশিয়া উঠল, অসাধারণ ফুটবল খেলল, ফাইনালেও ভালই খেলল, তবে হেরে না গেলে মন কি পেত? কাপ নিয়েই পাড়ি জমাতে হত। অপরদিকে ফ্রান্স, একটা বুর্জোয়া দেশ, সেখানে একটা ঊনিশ বছরের ছেলে ভালো খেলেছে, মেনে নেওয়া কঠিন, তবু উদারতার নমুনাটা দেখুন, একবারও তো ডোপিং হয়েছিল বলে চিল্লাইনি! ের বেশী আর কি আশা করেন? জিদানের পর কাপ জিতল, বিশ সাল বাদ, তা’ও মোটে দু’বার। এখানে প্রেসিডেন্ট সংক্রান্ত ব্যাপারস্যাপার উহ্য রাখাই বাঞ্ছনীয়, কারণ না হলে কবিতাগুচ্ছের প্রসঙ্গ এসে পড়বে, দেবদাস, হাগ ডে’র মতো প্রায় বিপরীতধর্মী প্রসঙ্গ চলে আসলে ব্যাপারটাকে খেলা’র মধ্যে রাখা চাপের। জিজ্ঞাসা করে আর বিব্রত করবেন না ক্রোয়েশিয়াকে সেমসাইড করতে কে বলেছিল বা ভিডিও অ্যাসিটেন্সের পর যেহেতু রেফারিকে নিয়ে সেভাবে কথা বলা যাচ্ছে না, এবং প্রভূত বিশেষণ রেফারি সম্প্রদায়ের জন্য জমা করা আছে – জিজ্ঞাসা করলে সেগুলো আপনাকেই দিয়ে ফেলব! বমি আর আটকানো যায় কাঁহাতক। আপনাকে মানতেই হবে, সেখানে জি বাংলা বা রূপসী বাংলার মতো চ্যানেল নেই, ঘরে ঘরে সেখানে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার জন্য প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা করা হয় না। বোঝার চেষ্টা করুন প্লিজ বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না বা সোপ অপেরা দেখা লোকজন যেটাকে খেলা বলে মনে নিয়েছে সেটাকেই আপনাকেও খেলা বলে মেনে নিতে হবে। মনে রাখুন চৌত্রিশ বছর ধরে ফিকে গোলাপীকে লাল বলে মেনে নেওয়া একটা দল বা জাতি হঠাৎ সত্যিকারের লাল দেখে চিনে ফেলবে বললে তো চলে না, তাকে সময় দিতে হবে, তাঁর কর্নিয়ায় সেই পরিমাণ লাল আলো পৌঁছাবে সে দেস্খে উঠবে লাল জন্মাচ্ছে, তীব্র কালোর মধ্যে থেকে, বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সেই লাল হলুদে রূপান্তরিত হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। আর আগের লাইনের রংগুলি হরাইজ্যন্টালি সাজালে যদি জার্মানির পতাকা হয়ে যায়, তো সেটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যায় না। আমাদের ইহুদী ভাইদের যারা সেই অকথ্য অত্যাচার করেছে, তারা মাঝমাঠ থেকে দূরপাল্লার শটে গোল করলেও লাইন্সম্যান নিশ্চয় অন্ধ নন, তিনি নিশ্চয় বাঁশিটি বাজিয়ে মনে করিয়ে দেবেন অফসাইডের কথা। আপনি এখানে একটা কাস্ট সিস্টেমের ভেতরে বসে খেলা দেখছেন, যেখানে আপনার গায়ে হলুদ জার্সি বা নীল সাদা জার্সি থাকা মানেই আপনি খেটে খাওয়া সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বিশ্বের চূড়ান্ত অবমাননার জবাব আপনি দেবেন মাঠে। ধরুন বউ আপনাকে দেয় না, তো আপনি প্রুভ করার সুযোগ পাচ্ছেন না; বাসে বসার সিট পাচ্ছেন না, নৈতিকভাবে আপনার পাশে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ওঁর সামনের যাত্রীটি উঠে যাওয়ায় ওটি তাঁরই প্রাপ্য অথচ আপনার কাপড়েচোপড়ে অবস্থা... আবেগটাকে লক্ষ্য করুন, আপনার দেশে খুন, জখম, ধর্ষণের কাহিনী থাকতে পারে; সমীক্ষায় আপনি সেসবে অনেক ওপরের দিকেও থাকতে পারেন, কিন্তু আপনি তো নিজেকে বাকি সব কিছু থেকে বিছিন্ন করে রেখে নিজেকে ফোর্থ বা ফিফথ ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধি বলে ভাবছেন। দেখুন, রক্ত কি সুন্দর গরম হয়ে গেল না? আপনার চা বোধহয় এতক্ষণে জুড়িয়ে গিয়েছে। তা যাক, ওরে, আর এক কাপ চা বল। মাঠে আপনার পারফরম্যান্স হল খেলা নয় ইতিহাস... আপনি না পারলে অন্য কেউ হলেও ইতিহাস নিয়ে আসুন। সিপাহী বিদ্রোহ, বাস্তিল দুর্গ, গ্যাস চেম্বার। আহা, ওই বেঁটে মালটা কি খারাপ লোকই না ছিল, ইহুদীগুলোকে জ্যান্ত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে......... মা গো! বাবলু দা গো! এরা মানুষ! এরা কি না ভাল খেলতে পারে! এখনও কি মনে হচ্ছে না ওই এক অণ্ডকোষের লোকটা আপনারই ফুটবলারকে হার্ড ট্যাকল করলো, আর ওদের কাছে পয়সা আছে, মানে রেফারি তো কেনাই থাকবে! এর পরেও ওদের সাপোর্ট করবেন? এর পরেও মাঠে ফরাসি পারফিউমের কথা ঠোঁটে আনতে পারবেন! ওরা জয়ের পর ওদেরই কোনো ফ্যানের ঠোঁটে চুমু খেতে নিজেকে কাউন্ট ড্রাকুলা বলে মনে হবে না? আপনার ভেতরে রক্ত আছে তো, নাকি পাতিত জল?
তো, সেবার ১৯৮৬ তে, নিখাদ ভগবান এসে সেবারে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মেনে নিয়েই বলি, তাঁর খারাপ আবার কিছু আছে না কি! কি আশ্চর্য যিনি একা হাতে কাপ জেতাতে পারেন, তিনি ডোপ বা অন্যান্য কেলেঙ্কারিতে... জড়ালেও তা শোনা পাপ। বরং আপনি ভাবুন মেসির ওপর প্রত্যাশার চাপ, আপনি তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন তিনি কোন দাতব্য সংস্থায় কত অর্থ সপ্তাহান্তে বা মাসান্তে বা বৎসরান্তে দান করেন, কেন আপনি একথা জানতে চাইবেন, তার বিনিময়ে তিনি কত ট্যাক্সের সুবিধা পাচ্ছেন? আপনি আই টির লোক হন, পাবে গিয়ে লাতিন আমেরিকার জার্সি পরে খেলা দেখুন, ইনকাম ট্যাক্সের লোক হলে... ও বাবলু দা... নজরে রাখুন উঠতি তারকার থুড়ি লেজেণ্ডের পায়ের অস্ত্রোপচারের সংখ্যা। আপনি ম্যাচের স্কোরবোর্ডের পাশে একটা এক্সেল শিটে এগুলো মেনটেন করছেন না? কেন? এগুলোর সাথে মানুষের দয়া মায়া বা কতটা তার পরিমাপ নেই? কেন যে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না, খেলাটা আবেগ দিয়ে হয়, মিস পাস দিয়ে থাকলে সেই বল বিপক্ষের পায়ে ফিরিয়ে দেওয়ার নিয়ম সম্বন্ধে অবহিত করার জন্য আপনার জন্য আরেকটা স্পেশাল ক্লাস রইতল। তার বদলে আপনি কি না ওই এক দল যারা বিয়ার খেয়ে যথেচ্ছ পয়সা ওড়ায়, তাদেরকে দেখছেন? হোক না রক্ষণ খারাপ, হোক না বিশ্বমানের গোলকিপার কোনো দেশ প্রোডিউস না’ই বা করল গত ১২ বছর, হোক না ব্যক্তিগতভাবে খেলার জন্য আর বল পজেশন বাড়ানোর জন্য, সময় নষ্টের জন্য, প্লে-অ্যাকটিঙের জন্য কিছু বলা হল, তবু ইকবার আঁখ পে পানি ভরকে তো দেখিয়ে জনাব...
ফ্লুকে ঘটে যাওয়া একটা বিশ্বকাপ নিয়ে এত মাতামাতি করবেন না। একটা আধা ইউরো কাপের এত গ্ল্যামার নেই। শুনুন, কবিতার ক্ষেত্র আলাদা, সেখানে আমরা অলংকার বর্জন করে, শব্দরীতি, ধ্বনিরীতি, পরীক্ষামূলক, ট্রিগার... এ সব শব্দ আওড়াই বটে। এমনকী শ্রুতিমধুর না হলেও পরোয়া করি না, উলটে অনেকসময় সওয়াল করি শিল্পের অর্থই কি শ্রুতিমাধুর্য? এ’ও জিজ্ঞাসা করি না কি পাঠককে, একজন কবি কি শুধুই নান্দনিক দিকই দেখাবে? করি, করা হয়... তবে এ ক্ষেত্র ভিন্ন। যতক্ষণ পায়ে বল থাকছে, বল প্লেয়ার আমার শিল্পীসত্ত্বা থাকছে, ততক্ষণই আমি শিল্পের পক্ষে, পক্ষান্তরে যখন আমার বল, আপনার পায়ে, এবং আপনি মাঝমাঠ ধরে ফেলেছেন, বল ভাসিয়ে হাওয়ার সাথে খেলছেন, আক্রমণে যাবার পর ডিফেন্সে নামার ঐতিহ্য হারিয়ে আপনাকে নকল করে .আমায়ও আন্মতে হচ্ছে, তখন সেটা মেনে নেওয়া যায় না। প্লিজ, আদর করে বলছি, ওটা বলবেন না। তখন আমরাও রবীন্দ্রনাথের কপিরাইট বিশ্বভারতীর রাখার পক্ষেই। শ্রী দেবব্রত বিশ্বাস, শ্রী রামকিঙ্কর বেইজ এঁরা ভাল, ঠিক আছে, তবে কপিরাইটের ব্যাপারটা যেন ফস্‌কে অন্য কারো হাতে চলে না যায়। কবিতা আদতেই শ্রুতিমধুর বলে আমরা মানি। আর সহজ করে বুঝতে চাইলে একটা সহজপাঠ কিনে দেবো। কি বলেন, উডকাট প্রিন্ট, অবন ঠাকুরের কাজ... বহুদিন দেখিনা... শিল্প তাই’ই... পিকাসো নিজেকে বা ছবির সাবজেক্টকে নক্যারজনকভাবে দেখিয়েছেন যখন, এক্ষেত্রে তাঁর কাজের উদাহরণ থেকে সরে আসলাম। ভাবনাও কো সামঝো বস্...
চিত্রঋণ_ Andrey .Ermolenko

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

শুভ আঢ্য





যে জন আছেন পদ্যে আর মদ্যে 
(১)
(গলা খাঁকারি – ধরতাইও বলতে পারেন, মানে সন্ধ্যেবেলা মদের টেবিলে বসার আগে পাঁড় লোকজন যেমন গুছিয়েগাছিয়ে পাঞ্জাবিটা, ধুতির খুঁটটা সামলে বসতেন একসময়, তেমনই আর কি... আর কিছুক্ষণের মধ্যে গ্লাস আসিবেক, একটা আঙ্গুলে গ্লাসে ডুবিয়ে সামান্য মদ ছুঁইয়ে নিয়ে শুরু হবে গলায় ঢালা অনেকটা কমলকুমারের ইস্টাইল... উচ্ছুগ্‌গ করা আর কি) 
‘আন্‌ধেরা কায়েম রহে্‌’... সেই কিলবিষ! ছোটোবেলার শক্তিমানের ভিলেন। তো, শক্তিমান হয়ে উঠতে হয় কাউকে না কাউকে, যাকে দেখে, যার চারপাশ মে গুল খিল্‌তে হ্যায় ইয়াহা... তেমনই তো, নাহ্‌, সেভাবে ভিলেন কেউ নেই, আবার আছেও। চল্লিশ, পঞ্চাশের দশকে যখন বাংলা সাহিত্যকে দেখে ভক্তিবাদী অনেকে হয়তো বলে উঠছেন, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছো?’ আর তাদের সামনে জলপান করাতে আসছেন, আর সেই অবাক জলপানে তেষ্টা মিটে আর উঠছে কই! মানে ওই এন্তার সস্তা লেখার মধ্যে সেভাবে আলাদা করে দাগ কেটে উঠছেন না কেউ, ব্যতিক্রম জীবনবাবু, আর ঠাকুরমশাইয়ের অতি-দানবিক ব্যাপারস্যাপারের বাইরে এসে কিছু করে উঠতে পারছেন না, তখন জানা গেল, কিছুদিনের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের মেনস্ট্রিমের বাইশ গজে নেমে পড়তে চলেছেন সেকেণ্ড ডাউন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। মানে সাধারণ ছাপোষা বাঙালী যার বছরে তিনবার করে শান্তিনিকেতনে গুরুদেবকে দেখে আসার সামর্থ্য নেই, বা চান না ততটাও, বা যার মধ্যে কিছুটা ব্যাডবয় ইমেজ রয়ে গেছে (অভিযোজন ইনকমপ্লিট) যা তৎকালীন লেখাপত্তর পড়ে হেজে উঠেছে আর তিনি একটা টোটাল আইকনের খোঁজে তাকিয়ে বসে আছেন পথপানে চেয়ে... শক্তি চাটুজ্জে তাকেই আর কিছুদিনের মধ্যে পাকড়াও করবেন। অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মত ব্যাপার, অনেকটা ছেলেধরা টাইপের আর ওই কি যেন বলে না, হ্যামলিন, হ্যাম-লীন হয়ে যেতে শুরু করবে যার মধ্যে, সেই মানুষ রেডি হচ্ছেন। 
ওপেনিংয়ের সমস্যা বলুন, বা সুবিধেই, হ্যাজ। তেমন ভাবেই মিডল অর্ডারেরও সমস্যা বলুন, আর সুবিধেই, সে’ও হ্যাজ। নতুন বলে যেমন কিছু বাউন্সার আসতে পারে আর তা থেকে ইনিংসকে পথ দেখানো কঠিন হয়ে পড়ে, তবে আবার এও বটে তখনও ফাস্ট বোলারের জড়তা কাটেনি, তেমন অভাবনীয় খেলার সামান্য কাঠিন্য দেখাতে পারলে তা অনেকাংশেই দর্শকের মন জিতে নিতে পারে (এক্ষেত্রে রবিবাবুর ব্যাপারটার সাথে কোনো সামঞ্জস্য না খুঁজতে যাওয়াই সমীচীন, তিনি ব্র্যাডম্যান। আপনি প্রাজ্ঞ হে পাঠক, জানি, সে ভুল আপনি করবেন না... আর এমন ভুলও করে উঠবেন না যে জড়তাময় বোলারকে আমি পাঠক বলে সামান্য এসেন্সও দিতে চেয়েছি... বেড়াল প্রথম রাতেই মেরে রাখা ভালো। পরে সে কি অলুক্ষুণে কাণ্ডই না ঘটাতে পারে তা তো নিউটনের গল্পে পড়েইছেন, ওই রিসার্চের কাগজপত্র পুড়েটুড়ে গিয়ে এক্‌সা।) 

ক্রমশঃ 


বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

শুভ আঢ্য


৮
বাসস্থান হিসেবে আপনাকে যা দেখানো হয় তা আসল নয়
আমি আমার নিজের মধ্যেই থাকি প্রকৃতঅর্থেই

যেটুকু বহিরাবরণ একটা ফলের শাঁসকে রক্ষা করে সরল ও জটিলগতভাবে
এখানে ততটাও প্রয়োজন নেই, কারণ পেরিফেরি হিসেবে
৭৫ মাইলের কাছে আর কোনো মানবসন্তান নেই
শুধুমাত্র আমার চিন্তা করা ছাড়া

সুতরাং, বরফের দেওয়াল, ইগলু সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা থেকে
মুক্ত থাকুন আপনি, এবং ভাবুন নিজের মধ্যে
যতটা নেই, উদ্বাস্তু ততটাই আপনিও

এই সাদা বরফের মাঝে আপনাকে মানসিকভাবে
জোড়া লাগানোর কোনো জড়িবুটি, পাওয়া যাচ্ছে না যখন
আশা করি ভাল থাকতে পারবেন আপনি নিজেই


 ৯
শিকার ঢাকতে পারেনি নিজেকে

এই বরফ তাকে মৃতদেহ বানানোর পরও
সতেজ রাখে বেশ কয়েক ঘন্টা, সময় ওটুকুই
আমি চাই, তার থেকে নিজের জীঘাংসা বের করার জন্য

চোখে দেখতে না পাওয়া একটা হরাইজন্টাল লাইনের ওপারে
বাকি পশুদের সাথে এপারের আমার পার্থক্য খুব কম
এই নিয়ে চিন্তা করিনা আমি খুব বেশী
কারণ শিয়ালগুলো থেকে দাঁত এগিয়ে এলে
দাঁত বের করে ওঠাটাই প্রয়োজন হয়ে পড়ে

আমার বৌয়ের লাশও বেশ কিছু সময় তাজা ছিল
তার ফারের টুপি থেকে বরফের কুচির মত পুরুষ কান্না
লুকিয়ে নিয়েছিলাম

ছবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার: Cesar Legaspi

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

, শুভ আঢ্য


উত্তর মেরুর কবিতা / 
১
পেরোনোর জন্য কোনো ব্রীজ বা মৃতদেহ নেই
এখানে তাজা থাকে বলে প্রচলিত ধারণা থেকে
ফ্রিজ কোম্পানী তাদের মস্করায় ও বোগেনভেলিয়ার পাশে
দেখায় ও ব্যবহার করে আমাকে

এখানে কোনো প্রাণ নেই যদিও এবং ঘাসের রংও ভুলে গেছি
রোদ্দুরের যথাযথ তাপের অভাবে, কারণ ৬ মাস পর আমি
আপনার টিভিতে দেখা দেব আপাদমস্তক
আর সূর্য দেখে নেবো ভার্টিকালি
        নেবো চেখেও

আপনার জল ঠাণ্ডা করানোর
একমাত্র কারিগর হিসাবে ডাকা হবে আমাকে সেই মেরুপ্রদেশ থেকে
তুষারঝড় পেরিয়ে

আর আমি লুকিয়ে থাকব আপনার
পেঙ্গুইন আঁকা অতিরিক্ত খাবারের পাশের বাটিতে


২
অন্ধকার থেকে কোনো গাছ আমাকে চিনতে পারেনি
আমিও চিনতে পারিনি কোনো ফল বাঁ-পাশে ছিল কিনা রাখা
কোন গাছ উষ্ণতার অভাবে হল ফসিল

চোখ ততটাই গাছশূন্য স্থান ছেড়ে আর এগোতে পারে না
যদিও দৃষ্টির সে বাধা নেই, তবুও কিছু তো থাকেই

বস্তুত আমি বরফের কথার ওপর ধোঁয়া ওঠে, আমি জমাট বাঁধানো
প্রক্রিয়াজাত যা কিছু, রেখে দিই ফারের নীচে
অথচ আর কিছু ফারের ভেতর বরফ জমা হয়, তখনও

সেলসিয়াস বা ফারেনহাইটের চিহ্ন আমার কপালে নেই
অথচ মাইনাস থেকে আরও মাইনাসের দিকে
এগিয়ে যেতে যেতে বরুফে ভোঁদড়ের সাথে
রাত কাটাই কোনো কোনো দিন

আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রণের কারণে ঈর্ষা করেন অবস্থান আমার


শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

শুভ আঢ্য



দৈনন্দিন  


অতএব আপনি সন্ত নন

এই টেনশনের দিনেও আপনার খিদে, প্রস্রাব কিছুই বাগ মানাতে পারেন না, অথচ দেখুন কি সুন্দর ছাগলগুলো নাদি ছড়াচ্ছে ভুবনময়... তারা লাফাচ্ছে আপনার কোল টিপ করে, ভিল বা মুণ্ডা হলে অন্য কথা অবশ্যি। আপনার জামায় হাল আমলের ডিজিটাল ঘ্রাণ,

আপনি তড়পাচ্ছেন               অরণ্যদেবের মতো
মনে কি পড়ে না                 আপনার অন্তর্বাসের ফুটো
দেখতে দেখতে শেষ বাস মিস হয়ে যায়!!

আপনার সুগন্ধ আপনিই নিচ্ছেন 
পাশের বার্থে জন্মাচ্ছে নতুন দম্পতির সন্তান
সে'ও ছাগলের মত লাফিয়ে উঠবে, নাদি ছড়িয়ে দেবে
এই আনন্দের দিনেও আপনি পেপারক্লিপ আটকে
সামাল দিতে চাইছেন ঝড়, গতি, ফর্মুলা ওয়ান

সুতরাং সন্ত নন আপনি, কিছুই বাগ মানাতে পারছেন না
দেখছেন ছাগলগুলো হাঁড়িকাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
পশুপ্রেম পেছনে তাকিয়ে

শুনুন, আপনি সন্ত টন্ত কিছু নন, রোববার সকালে বাজারে দাঁড়িয়ে খুনের রাজসাক্ষী যে বাড়ি এসে পাত পেড়ে বসে ঝোল আলু সাবাড় করে...


ধুর ধুর...

বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

শুভ আঢ্য


তেরোর অস্ট্রেলীয় কিশোর-কিশোরীরা / মাইক হপকিন্স
(মায়া অ্যাঞ্জেলু’র পর)

(কালো চামড়া)
তাড়িত হয়েছে মা
বাবা তোমার বিয়ারে আসক্ত
ভাই খুইয়েছেদৃষ্টি, হারিয়ে গেছে তোমার বোন...
আর একইরকম আছে বছর তেরোর কিশোরেরা

তোমার অন্য ভাইয়েরা গন্ধ নিচ্ছে পেট্রলের
কাকা জেলে, সঙ্গীরা অনুনয় করছে অর্থের,
রেস্তোরাঁয় খরচের জন্য...
অথচ তেরোর কিশোরীরাএকইরকম আছে

আর তুমি, লজ্জিত করে তুলছ আমায়
যেমন তুমি আছ, আমি বলছি থাকো,
যেমন থাকা হয়
আর তুমি বিদ্রুপ করছ শুধুই,
অথচ সেই তেরোরা একইরকম থাকছে




(সাদা চামড়া)

তোমার মা বেঁকে উঠেছে ওষুধের প্রতিক্রিয়ায়
বাবা বন্ধুদের সাথে, আর ক্ষুধামান্দ্য বোন
চোখের সামনেসে হয়ে যাচ্ছে ফ্যাকাসে
যদিও একইরকম আছে,কিশোরী তেরোরা

তোমার মেয়ে নেশাড়ু
ছেলের আনন্দ বারংবার আঘাতে
যাজক তাদের স্থির থাকতে দেয় না
আর শুধুই চেয়ে থাকো তুমি
অথচ একইরকম থেকে যায় ওই তেরোরা

তুমি ওই শহরে থাকো
এবং কেনো প্রয়োজনীয় জিনিস
অথচ তোমাকে তখনও অসুখী লাগে
কারণ কখনই যথেষ্ট পাওয়া হয় না
নাহ্‌,
এবং তেরোরা সে’রকমই থেকে যায়



মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০১৭

শুভ আঢ্য


রেইন - পেইন এণ্ড মেশিনারি  

১

পাখীর ঝাঁক নেমে আসে, ওড়ার রাস্তায়
সেখানে মেঘের আঙুল ক্ষয়ে একটার পর দু'টো,
দু'টোর পর তিনটে... তরিবৎ করে হাজার তিরিশেক
পাখী নামে, তাদের নামের কোনো বাহুল্য নেই,
ওড়ার রাস্তায় পাখীর ঝাঁক নেমে আসে জলের মতই

শ্যুটিং-য়ের প্যাক আপ নিয়ে ডাউন হচ্ছে পাখীগুলো
সেখানে জেলফেরত জলেরা একহাজার গ্যালন 
বৃষ্টি নিয়ে নেমে আসছে, আর সিঁড়িগুলোর কোনো বিকল্প নেই
সেই ল্যাণ্ডিং-য়ের ওপর জলের পাখীগুলো নেমেই আসছে
তাদের ডাকের চিহ্নগুলো ভিজিয়ে দিচ্ছে তাদেরই ওড়ার রাস্তাটুকু

২

তারপর ভিজে ওঠে সেই লোহালক্কড়
সেই মেশিনকোড থেকে ঝাঁঝরি অবধি, বর্ষাতি অবধি
ভিজে ভিজে গান হয়, সরিয়ে রাখে সুরের অঞ্চল ভি জে -টি
অথচ সেই সুর নেশার মত পড়ে, নেশারঝোঁকের মতই
লোহামুখ থেকে পাটিগণিত ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে
অংকের খাতা থেকে সংকেতময় বেরিয়ে আসা হয় তার

মেঘালয় আসে, মেঘালয় বৃত্তাকারে ঘুরে ওঠে
ওই লোহার মেশিনের ভেতর, আর চেরাপুঞ্জির বানান থেকে
দীর্ঘতর হয় বারিষ, এই ড্রামাটিক ঋতু 

এবং ভি জে -টি ভিজে টিজে মেশিনকোড থেকে মুছে
রাখে মেঘালয় অঞ্চল, গান ভিজে ওঠে তার... বুকের
ওপর জমা হয় মিলিমিটার আর রেডিওর সতর্কবার্তা

৩

যন্ত্রণার ধারে তারা জমে, সেই এক কালো আকাশ
গর্ভ খসিয়ে নামিয়ে দেয় লাখ লাখ বাচ্চা, ন্যাংটো...
অথচ ধারণ ক্ষমতা ছাড়া ধর্ম বলে যা কিছু ভাবা যেত
সেগুলো বৃষ্টির নাম নিয়ে কাঁটাঝোপের পাশে পড়ে থাকে

সেই মেশিনচালক গর্ভাশয় থেকে তুলে নিলে পুরুষাঙ্গ,
লাখ লাখ বাচ্চা বেওয়ারিশ নেমে আসে,
তারা একে অপরের ওপর লাফায়, মিশে ওঠে, কোনো ধর্ম
নেই তাদের, শুধুই ধারণ ক্ষমতার বাইরে তারা বেজন্মা
কাঁটাঝোপের ওপর পড়ে থাকে শুধু, যন্ত্রণার ধারেই জমে

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

শুভ আঢ্য



আমেরিকান কবি Sheldon Allan "Shel" Silverstein –এর জন্ম, সেপ্টেম্বর ২৫, ১৯৩০-এ। তিনি একাধারে যেমন কবি, তেমন গায়ক, গীতিকার, কার্টুনিস্ট এমনকি চিত্রনাট্যকারও। ছোটোদের লেখাতেও সিদ্ধহস্ত। Uncle Shelby নামেও কিছু কিছু কাজ করেছেন ছোটোদের জন্য। তাঁর বই ৩০টিরও বেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এবং বহুল বিক্রীত। তিনি দু'দুবার গ্র‍্যামি পেয়েছেন এবং এক বার গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ড ও অস্কারের জন্যও মনোনয়ন পেয়েছেন। ১০ই মে ১৯৯৯ সালে তিনি মারা যান। 



যেখানে পাশাপাশি হাঁটা যায় না / শুভ আঢ্য

কিছু এমন জায়গা, যেখানে পাশাপাশি হাঁটা যায় না 
রাস্তা শুরু হয় যখন,
এবং ঘাসগুলো, সাদা আর নরম বেড়ে ওঠে 
আর বেড়ে ওঠে টকটকে লাল সূর্যও 
আর রাতপাখী বিশ্রাম নেয় ওড়া থামিয়ে
তেমন এক ঠাণ্ডা গন্ধবহ হাওয়ায়

চলো আমরা এই জায়গা ছেড়ে যাই যেখানে 
আহত করে কালো ধোঁয়া এবং 
অন্ধকার রাস্তা পাক খায় হাওয়ায়
যে সমস্ত নরকগর্তে অ্যাসফল্ট ফুল জেগে ওঠে
সেখানে ধীরে হাঁটাই নিয়ম,
এবং লক্ষ্য রাখো চকের মতো সাদা তীরেরা যাচ্ছে সেদিকেই
যেখানে পাশাপাশি হাঁটা যাচ্ছে না আর

চলো সেখানেই যাই আমরা যেখানে ধীরে হাঁটা যায়
সেখানেও যাই যেখানে চকের মতো সাদা তীরেরা থাকে আর 
ছোটোদের জন্য দাগায়, ছোটোদের জন্য তারা জানায়
সেখানে হাঁটা যায় না পাশাপাশি


অগোছাল ঘর / শুভ আঢ্য

এমন ঘরের জন্য লজ্জা পাওয়া উচিৎ
যেখানে তার অন্তর্বাস বাল্বের ওপরে ঝুলছে আর 
যে চেয়ারে রাখার জায়গা নেই কোনো 
সেখানেই ঝুলছে তার বর্ষাতিও,
স্বভাবতই চেয়ারটি নোংরা ও স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে পড়েছে।
জানলার ধারে তার নোটবুক,
সোয়েটার মেঝেতে, স্কার্ফ এবং একটা স্কি টেলিভিশনের পাশে,
অযত্নে ঝুলছে তার প্যান্ট দরজায়।
বইগুলো তার বাথরুমে জমছে স্তুপাকার,
তার গেঞ্জি বড়ঘরেই পড়ে আছে।
ঘুমোচ্ছে এড (টিকটিকি) তার বিছানায়, 
আর দেওয়ালে ঝুলছে তার দুর্গন্ধী মোজাগুলো
লজ্জা পাওয়াই উচিৎ এমন ঘরের জন্য!
কার এ ঘর? ডোলাল্ড, রবার্ট না উইলি... !! 
তুমি বলছ এটা আমার? আহ্‌... 
আমি জানি আমারটাও এর চেয়ে আলাদা কিছু নয়


যদি / শুভ আঢ্য

আমি যখন এখানে বসে ভাবছিলাম গতরাতে,
কিছু ‘যদি’ ঢুকে পড়েছিল কানে আমার
আর সারারাত লাফালাফি করেছিল
গেয়েছিল তাদের সেই পুরোনো ‘যদি’র গানঃ
কি হতো যদি আমি যদি বোবা হতাম?
কি হতো যদি তারা বন্ধ করে দিতো সাঁতার আমার?
কি হতো যদি আমি প্রচুর মার খেতাম?
কি হতো যদি আমার কাপে ধরা থাকত জেলখানা কোনো?
কি হতো আমি কাঁদতে শুরু করলে?
কি হতো অসুখের পর মারা গেলে আমি?
কি হতো বিপত্তি ঘটালে স্বাদ নেবার সময়?
কি হতো যদি বুকে আমার ঘাস বেড়ে উঠতো?
কি হতো যদি পছন্দ করতো না কেউ আমায়?
কি হতো বজ্রাহত হলে আমি?
কি হতো যদি আমি না হতাম এমন?
কি হতো যদি আমার মস্তিষ্ক ক্রমশ ছোটো হয়ে যেত?
কি হতো যদি মাছগুলো ঠুকরাতো না আর?
কি হতো হাওয়ার ছিঁড়ে গেলে ঘুড়ি?
কি হতো তারা শুরু করলে যুদ্ধ আবার?
কি হতো আমার বাবা-মা’র ছাড়াছাড়ি হলে?
কি হতো বাসটার সামান্য দেরীতে?
আমার দাঁত সোজা বেড়ে না উঠলেই বা কি হতো?
কি’ই বা হতো ছিঁড়ে ফেললে প্যান্ট আমার?
কি হতো আমি যদি নাচতে না জানতাম?
ঠিক থাকতো সবকিছুই, 
যেমন দুঃস্বপ্ন আবার ফিরে আসে




সেখানে একটা ভাল্লুক / শুভ আঢ্য

আমাদের ফিজের মধ্যে একটা মেরুভাল্লুক আছে
সে জানে সেখানে ঠাণ্ডা, আর ভালবাসে
সেই মাংসের ওপর বসার জায়গা
আর তার মাছের দিকে মুখ
আর লোমশ থাবা মাখনের প্লেটে ওই
সে ঠোক্কর দিচ্ছে নুডলসে
খচরমচর করছে ভাত
আর কতকোঁত খাচ্ছে সোডা
চাটছে বরফ।
দরজা খুললেই চিৎকার করে উঠছে
যা দেখে ভয় পাচ্ছি আমি, কারণ
আমি জানি যে আমাদের ফ্রিজে
একটা মেরুভাল্লুক আছে 



ছোট ছেলেটি আর ওই বৃদ্ধ লোকটা / শুভ আঢ্য 

“
আমি মাঝেমধ্যেই চামচ ফেলে দিই” ছোটো ছেলেটা বলল
“
আমিও” বললেন বৃদ্ধ লোকটি
ছোট ছেলেটি ফিসফিসিয়ে তার প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলার গল্প বললে 
বৃদ্ধ লোকটি হেসে জানালেন একই পরিণামের কথা
ছেলেটি তার প্রায়শই কান্নার কথা বলতে
বৃদ্ধ লোকটিও বলল, “আমিও”
সবচেয়ে দুঃখের কথা যে বড়রা তাকে দেখেও দেখে না বলতে
ছোট ছেলেটি কোঁচকানো হাত পেল তার হাতের ওপর 
বৃদ্ধটি বলল, “আমি জানি তুমি কি বলতে চাইছ”
আমার Samsung Galaxy স্মার্টফোন থেকে পাঠানো হয়েছে।