হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

পথের ওপর পথ
------------------
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়




         পথের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে কত কত মানুষ। সকলের পথ তো এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন পথে তাদের হেঁটে চলা। আমার সামনে কত কত মানুষ। আমার পিছনেও অনেক। আমরা কি সবাই তাহলে এক পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি। কখনোই নয়। আমার পথ সে তো আমারই। আমারই রঙে রঙিন হয়ে আছে সে। আমারই শব্দ দিয়ে সাজানো তার শরীর। আমার জন্যেই কথা বলে ওঠে আমার পথ। 

          আজকের কথা তো নয়। সেই কোন সকালে পথে পা রেখেছি। এখন অনেকটাই বেলা হল। এখনও পথ আমাকে তার বুকের ওপর ধরে রেখেছে। আমাকে পথ একটু একটু করে চিনিয়ে দেয় তার শরীর। আসলে আমি তো পথ চলি না। সবাই যখন দেখে আমি পথ হাঁটছি, আমি নিজেও যখন আমাকে পথের ওপর সচল দেখি তখন সকলের মতো আমারও মনে হয় আমি পথ হাঁটছি। কিন্তু এই চলা তো পথচলা নয়। পথের শরীরকে একটু একটু করে চেনার চেষ্টা। পথের বর্ণমালাকে আপন হৃদয়ে ধারণ করার অভিযান। 

          বর্ণমালা চেনার পর্ব শেষ হলে আমি শব্দ চিনি। কত কত শব্দ। মনে হয় তারা আমার খুব চেনা। হাঁটতে হাঁটতে কোথাও যেন তাদের দেখেছি বলে মনে হয়। তাদের শরীরের গন্ধও যেন আমার কত চেনা। মনে পড়ে, এ তো পথের শব্দ। কত সময় ধরে সে আমাকে একটু একটু করে সবকিছু চিনিয়েছে। এত সহজে কি তাদের ভুলে যাওয়া যায়? সাহসে ভর করে আমি একটার পর একটা শব্দ সাজাই। অশক্ত বাক্যগুলোর গায়ে দেখতে পাই হিম পড়েছে। অদ্ভুত ভাবে তারা কাঁপে। বুঝতে পারি আমার পা টলছে। এগিয়ে আসে পথ। হাতে ধরে বাক্য ঠিক করে দেয়। আমার খাতা জুড়ে শুধু সংশোধন। আমি বুকে জোর পাই। এক একটি সঠিক বাক্যের উত্তাপ আমাকে হিমশীতল গহ্বর থেকে উঠিয়ে আনে। 

          আমি পথকে ধরতে পারি। একটু একটু করে বাক্যজালে বেঁধে ফেলি পথের শরীর। এখন পথ তো আমার হাতের মুঠোয়। আমি দেখতে পাই পথ নিজেও অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। আসলে আমার গতিপথ দেখেই তার এই স্থিরতা। আমি আমার সাদা ক্যানভাসে বাক্য সাজাই। একটার পর একটা বাক্য। তৈরি করে ফেলি পথের শরীর। 

          আমার পথ সে তো আমারই কথা। আমারই প্রিয় রঙে রঙিন হয়ে আছে সে। আমার কষ্ট কষ্ট কথার মালায় ফুল হয়ে ফুটে আছে সে। কখনও দুপুরের ভীষণ উত্তাপে সে উজ্জ্বল। আমাকেই সে চেনা দেয় আমার মতো করে। 

          কত না মানুষ হেঁটে গেছে পথ ধরে। তাদের মতো করে তারা তাদের পথকে সাজিয়েছে। হয়ত সে রঙকে আমি চিনি। কিন্তু তার ইতিহাস আমার অজানা। আমার অপ্রয়োজনীয় রঙেই সে গড়ে তুলেছে তার পথের আল্পনা। কখনও কোথাও দেখি আমার প্রয়োজনীয় রঙের ছিটেফোঁটা লেগে আছে তার পথের চোখে মুখে। কিন্তু তা দিয়ে তো চেনা যায় না সমগ্রকে।

          আমার আগের মানুষ তার নিজের মতো করে চিনে নিয়েছে তার পথকে। এক পা , এক পা করে রেখা এঁকে গেছে তার পথে পথে। সে রেখার যা অর্থ হয় তা শুধু খুঁজে পাওয়া যায় তারই অভিধানে। সে বিমূর্ত রেখার একমাত্র সমর্থক শুধু সে নিজেই। তার মতো করে সেই রেখার সমীকরণ সঠিক। এই রেখায় সে এতটাই বিশ্বাসী হয়ে পড়ে যে, চোখের সামনেও সে ওই একই রেখার মিছিল দেখে। দেখতে চায় অন্যের পথেও। সফলতার যে রেখাচিত্র সে সারাজীবন ধরে এঁকেছে সেটাই সে মনে করে সর্বজনগ্রাহ্য রেখাচিত্র। 

          প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব পথের সপক্ষে চিৎকার করে। আমার পথ নিয়ে শুধু আমিই ব্যস্ত থাকি না। কি দরকার আমার অন্যের পথের মূল্যায়নে। প্রতিটি পথ তার নিজের ঘাম, রক্তবিন্দু দিয়ে তৈরি। আমার পথে তোমার পথের সমীকরণ কিছুতেই খাটবে না। আবার এটাও তো সত্যি, আমার পথের ওপর কিভাবেই বা মেনে নি অন্যের পথের শরীর। 

          সেই কবে প্রথম যখন পথের ওপর এসে দাঁড়াই তখন কে-ই বা আমায় চিনত! পথ আমাকে নিয়েছিল তো। একটু একটু তাকে চিনেছি। কত কাছ থেকে গভীরভাবে তাকে দেখেছি। ভালোবেসে ফেলাটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্যকে অস্বীকার করা -------
" আমি ঠিক পথে হাঁটছিলাম / আর সে ভুল পথে / কিন্তু সে-ও ভাবছিল / সে-ই ঠিক পথে হাঁটছে / আর আমি ভুল পথে ; / কেউ একজন মনে হয় / আমাদের দুজনকে দেখেই / ফিক্ ফিক্ করে হাসছিল । "

          একসময় কত মানুষ আমার দিকে আঙুল তুলেছে  -------- আমার পথ নাকি ভুল। আমি খুব হেসেছি। পথ কি ভুল হয় কোনোদিন? না, পথ ভুল হয় না। যে পথের জন্য যে যোগ্যতা লাগে ------ এটা তো আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। যে পথের জন্য যে কৃচ্ছ্রসাধন ------ মাথায় রাখতে হবে সে কথাও। আমরা যদি সেই সাধনপথে যেতে অপারক হই, পথ আমাকে কেন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে? এ তো ভুল পথের দৃষ্টান্ত নয়। এ আমারই অক্ষমতা। পথের মতো হয়ে আমি পথে হেঁটে যেতে পারি নি। এমনও তো হয়েছে পথ বদলে এসেছে আকাঙ্ক্ষািত সাফল্য। এই সাফল্যও ওই পথের ইতিবাচক দিক নয়। আসলে ওই পথ যা চেয়েছে আমার মধ্যে তা-ই ছিল। আজকের সফলতা সে পথেই।











বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়





কথার উষ্ণতাহীন শীতার্ত মানুষেরা
-------------------------------------






          চোখের সামনে কথাগুলো কেমন যেন ভেঙে ভেঙে যায়। কথার শরীরে লেগে থাকে গুঁড়ো গুঁড়ো আস্তরণ। অথচ এই তো সেদিনও কথার নিপাট ভালো মানুষের শরীর জুড়ে ছিল বসন্তের আয়োজন। দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে গজগামিনীর মতো এগিয়ে এসেছিল দখিনা বাতাস। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিল কথার যাবতীয় সবুজ রঙ। কিন্তু কোথায় আজ সেই সবুজের সহজতা। জায়গায় জায়গায় সবুজের মনভূমিতে কালচে ছোপ। এ কি আমার সেই চির চেনা সবুজের গন্ধ বাতাস? না, তা তো নয়। পাঁচমাথার ডানদিকে সোজা গিয়ে বাঁক ঘুরতেই দেখি আয়োজন। কথার আয়োজন। মেরুদণ্ড কোথায়? বিশ্বাসের গ্রন্থি ভেঙে ভেঙে সবুজ আজ ধুলোকণা। আকর্ষকে পাথেয় করে সে আজ অবলম্বনের ভরসায়। 

          কথার ভার কোথায়? কথা তো আজ যেকোনো কথা। সব কথার রঙই আজ এক। দু'পা হাঁটতেই তোমার কথার শরীর আমার কথায় মিশে যায়। কোনো প্রতিবাদ নেই। বিনা আয়োজনেই তারা একে অপরের সফর সঙ্গী। সময় সুযোগ বুঝে কথারা এক এক  জায়গায় ঝাঁক বেঁধে থাকে। 

          অসহায়ের পাশে কোথায় কথা? কথারা উড়ে গেছে সেই কোন ভোরে। অনেকেই তাদের দেখেছে মাচায়। অনেক অনেক উঁচুতে মাচা। সেখান থেকে তো কিছুই প্রায় দেখা যায় না। দেখতেও কি আছে? আসলে কথারা একদিন দল বেঁধে উঠে গিয়েছিল মাচায়। বোজা ছিল তাদের চোখ। এই শর্তেই তো তারা পেয়েছিল সিঁড়ি। তাই ফিরে আসার পথ তারা জানে না। অবশ্য সে ইচ্ছাও তাদের নেই। 

          শীতার্ত মানুষের বুক আজ কথার উষ্ণতাহীন। তাই কথা আজ আর আরোগ্য আনে না। কথার মেঘে নেই কোনো বৃষ্টির প্রতিশ্রুতি। কথাহীন ঠাণ্ডা প্রদেশের ফুটপাতের বাসিন্দা আমরা। অথচ চারপাশে কথার ফোয়ারা ছোটে। কিন্তু সেই কথাদের ধরবে কে? সেই কোন কালে তারা তো সব বিক্রি হয়ে গেছে। তাদের ধরার মতো অত বড় হাত তো আমাদের নেই। যাদুকাঠির অনেক নিচে আমাদের চলাফেরা। আমরা তো পরিবর্তন জানি না। পরিবর্তনের কেনই বা প্রয়োজন সে ব্যাপারেও আমরা বিশেষ জ্ঞাত নই। আমরা তো জানি ধারাবাহিক ভাবে পথ হেঁটে চলা। কোথাও থামা নেই। নেই পিছন ফিরে মূল্যায়নের কোনোরকম প্রস্তুতি। পথ পেরোলেই তো বদলে যায় চারপাশ। তার সাথে আমিও তো বদলে বদলে যাই। তাহলে কেন এই পরিবর্তনের আয়োজন? 

          আজন্ম যেসব কথার হাত ধরে হয়েছে আমাদের দিনরাত তাদের আজ আর চিনতে পারি না। বুঝতে পারি পরিবর্তনের কথায় আজ আর আমাদের কোনো অধিকার নেই। সহজ কথায় সহজ প্রবেশের সময় আজ অন্তর্হিত। 

          ফুটপাতের শীতার্ত মানুষ তাকিয়ে দেখে অনেক দূরে মাচা। কথা হয়। কানে আসে শুধুমাত্র কিছু বিমূর্ত শব্দধ্বনি। ওরা কারা কথা বলে? ওদের কথায় কেন চোরা স্রোতের টান? কানের কাছে কে যেন বলে যায় অনুবাদকের নাম। কিন্তু আমি তো তাকে চিনি না। আর তাছাড়া সে আমাকে কেনই বা বলে দেবে ওইসব বিমূর্ত শব্দধ্বনির অর্থ। তারা আরও বলে খাতার কথা। নাম জিজ্ঞাসা করলে আমি সেটাই ঠিক করে বলতে পারি না। আসলে আমার তো কোনো নাম নেই। নাম কে রাখে তাই তো জানি না। কোনো দিন তো খাতা দেখি নি, তাই নামের প্রয়োজন পড়ে নি। 

          আমাকে কে ডাকবে? আমার তো নামই নেই। ভাষাও তো বুঝি না। খোলা আকাশের নিচে সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করি। পারি না কিন্তু তবুও মনে হয় আমি সোজা হয়েই আছি। চারপাশে তাকিয়ে দেখি আরও কত কত মানুষ। সকলের চোখেই একটা নিরাসক্তের ছাপ। যেন আর কেউ কিছু পাবে না। নতুন করে আর যেন কিছুই শুরু করা যাবে না। শুধুই দীর্ঘশ্বাস। চোখের সামনে মৃত্যুর ছায়া। আলোর দেশের ঠিকানা সবাই যেন ভুলে গেছে ------- " দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে / জন্মাতে দেখেছি। "



(গদ্যে ব্যবহৃত কবিতাটি কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর লেখা )

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়




বিমূর্ততার অনন্ত প্রবাহে
--------------------------






     গানের ভেতরে যে মানুষটা গান গায়, শিল্পীর ভেতরে বাস করা যে মানুষটা ছবি আঁকে তাকে কি দেখা যায়? না, তাকে দেখা যায় না। গায়কের ভেতরে গানের মানুষ গান হয়ে থাকে। সে গান ভোরবেলা, সে গান দুপুরবেলা, আবার কখনও সে গান সন্ধ্যের অন্ধকারের মধ্যে সম্পৃক্ত থাকে। কখনও আবার তাকে দেখা যায় পূর্ণিমার চাঁদঘরে। শিল্পীর ভেতরের শিল্পী মানুষ গ্রীষ্মের দুপুরে মেঠোপথ ধরে হেঁটে যায়। আবার কখনও আশ্বিনের সকালে সাদা মেঘ নিয়ে আকাশ জুড়ে মনভাসানো গান গেয়ে যায়।
     গানের ভেতরে গান, শিল্পের ভেতরে শিল্প অবয়বহীন এক অস্তিত্ব। তাকে দেখা যায় না। কিন্তু তাকে কি দেখতে আছে? গানের ভেতরে যে গান তার সম্পূর্ণতা নিয়ে সম্পৃক্ত তা তো পবিত্র। সারা গাছ জুড়ে ফুল হয়ে ফুটে আছে। ফুলের ভেতরে যে ফুল, যা ফুলকে সর্বক্ষণ ফুটিয়ে রেখেছে তা তো পবিত্রতার আধার। নৈঃশব্দ্যের ভেতরের নৈঃশব্দ্য যা সবসময়ের আলোকথা, গানকথা। সে তো চিরকালের আলো, নদীর অনন্ত প্রবাহের মতো বয়ে যাওয়া গান।
     গানের ভেতরে গানকে দেখতে নেই। চোখ মেলে তাকাতে নেই শিল্পের ভেতরের শিল্পের দিকে। অনন্ত নৈঃশব্দ্যের প্রবাহমালায় সামান্য দৃষ্টিও কোলাহলের সৃষ্টি করতে পারে। ছিন্ন হতে পারে অনন্ত মগ্নতা। তাই চোখ বন্ধ করে তাকে দেখতে হয়। অদ্ভুত এক গন্ধ-বাতাস যেন আমাকে ছুঁয়ে যায়। অনেক দূরের ফুলের গাছ থেকে ভেসে আসা গন্ধের মতো। আমাকে ভরিয়ে দেয়। এ যেন পরিপূর্ণতার রসস্রোতে অবগাহন। বিমূর্ততার মধ্যেই নিহিত থাকে মূর্ততার আভাস। এলার্দের কবিতায় পাই এই বক্তব্যেরই প্রশ্রয় ------ " তার দিকে তাকাতে নেই / চোখ বন্ধ করে দেখতে হয়। "
    আমাদের ভেতরে যে মানুষটা পার্থিব বিষয়ের নেশায় অষ্টপ্রহর আপ্লুত, সামান্য প্রাণটুকু নিয়ে যে মানুষটা পৃথিবী ভাগের চেষ্টায় ব্যস্ত ----- এই গান থেকে সে বহুদুরে। গ্রীষ্মের দুপুর দেখার আনন্দে যে মাতোয়ারা, সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে সম্পৃক্ত নৈঃশব্দ্য নিয়ে যে গর্বিত ----- গান তাকে এসে ছুঁঁয়ে যায়। দীর্ঘসময় গানের ঘরে যে নিবিষ্ট, পৃথিবীর রঙের মধ্যেই যে শিল্পী খুঁজে পেয়েছে তার মর্মরহস্য, সে চোখ বুজে গানকে ছুঁতে ছুঁতে তার ভেতরের দস্যি মানুষটা ঘুমিয়ে পড়ে। তার মধ্যে নেই কোনো "আমি"-র প্রকাশ। সে তখন মৃত। আসলে প্রকৃত জাগরণ তখন থেকেই শুরু হয়। এই জাগরণের ভেতর থাকে সর্বক্ষণের গান, শিল্পীর শিল্পসত্ত্বার এক প্রবাহ। শিল্পীর শিল্পচর্চা সর্বক্ষণ চললেও সে আসে মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। আর তখনই শিল্পীর হাত দিয়ে বেরিয়ে আসে ধ্রুপদী রেখামালা। পৃথিবীর মৌলিক সৃজন। একমাত্র জাগরণপর্বেই এই সৃষ্টি সম্ভব। 
     বাকি আমরা যারা ভীষণভাবেই দাবি করি যে, জাগার মতো জেগে আছি তারা আসলে ঘুমিয়ে। এ যেন পৃথিবীর দ্রুততম যানে চেপে নিজেকে গতিশীল বলার প্রচারে নেমে পড়া। আসলে আমরা যারা বাহ্যিক জাগরণের সমর্থক তারা চিরনিদ্রায় নিদ্রিত। ঘুমের মধ্যে এক স্বপ্নিল আবেশে আমরা নিমজ্জমান। কোনো একদিন প্রকৃত জাগরণে জেগে উঠব ----- এই ভাবনায় সম্পৃক্ত থেকে তারা শেষ ঘুমের দিকেই এগিয়ে যায়। বাহ্যিক গতিশীলতায় আপ্লুত আত্মশ্লাঘার চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে গিয়ে আমাদের প্রচলিত মৃত্যুতেই গন্তব্য স্থির হয়ে যায়। এখানেও স্মরণে আসে এলার্দে ----- " মৃতরাই জেগে / আমরা ঘুমিয়ে / স্বপ্নের মধ্যে। "





                        **********************

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

কাকতাড়ুয়া কেন






কাকতাড়ুয়া কেন ?
মানুষের ফসলে 
              আমাদের কোনো অধিকার নেই ?
আমরা কি অন্য কেউ
হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি

আমাদেরকেও তো পৃথিবী দেখানো হয়েছিল
বলা হয়েছিল, চোখের সামনে সব তোমাদের

পৃথিবী ভাগ হয়ে গেছে অনেকদিন

কেড়ে নিলে নিজের জমি কি থাকে ?

শনিবার, ৩০ জুন, ২০১৮

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


আত্মশ্লাঘার বিসর্জনের মধ্যাহ্ন



 রোদ্দুরের সময়। রোদ্দুরের হাত ধরে এলোমেলো বিচরণ। গণনার সময় এলোমেলো। তখন কে-ই বা জানে পথের উদ্দেশ্য। পথের টানেই পথ চলা। দিনরাত এক করে অবিরত হেঁটে যাওয়া। পথের দুধারে যা কিছু দৃশ্যমান সবই গোগ্রাসে গিলে চলা। নিজেকে যেভাবে হোক দ্রষ্টব্য করে তোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। কখনও তা সফল হয়। কেউ একজন আমার পথ চলার মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে। কত কিছুই না তার জিজ্ঞাস্য। উত্তর দিতে পেরে আমারও কম তৃপ্তি হয় না। তৎক্ষণাৎ ভেবে ফেলা আমি বোধহয় তার ভাবনার রাজ্যে প্রবিষ্ট হলাম। কত কত বিনিদ্র রাত্রি যাপন। মুখাবয়বও এইভাবে হৃদয়পুরে রাজত্ব করতে পারে তা রাস্তার মাঝে আমাকে কেউ না দাঁড় করালে আমি জানতেই পারতাম না। কিন্তু কতদিন বা চলতে পারে এই পরিভ্রমণ? মনে মনে এক আত্মশ্লাঘা অনুভব করি ------- এই ক'দিনে সবটুকুই যেন পড়ে ফেলা গেছে। 

     আবার পথ চলা শুরু। এইবার চোখের মধ্যে যেন এক অন্য নেশা। চিরপরিচিত বস্তুখণ্ডও যেন অন্য চেনায় চোখে ধরা পড়ে যায়। আমি মাঝে কত কত জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ি। আমি তো দাঁড়াই কিন্তু আমার জন্যে কি কেউ দাঁড়াবার প্রয়োজন মনে করেছে? ভীষণ দুপুরে এই সূক্ষ্ম তত্ত্ব মাথায় আসে না। আমিই একা দাঁড়িয়ে থাকি। কোনো জানলাই খোলে না আমায় দেখে। কিন্তু একবারের জন্যও বিফল মনোরথ মনে হয় না। আসলে তখন তো নিজেকে পড়তেই পারি নি। কী চাই আমি সত্যিই কি জানি! নেশায় দাঁড়িয়ে থাকি। সময় যায়। অটল ধৈর্য্যে এতটুকুও চির খায় না। 

     দেখতে পাই কেউ কেউ দাঁড়িয়ে কানে কানে কথা বলছে। আরও অনেকই দেখতে পাই। কানে আসে "ভালোবাসা"। কিছুই তো জানি না, কিন্তু তবুও শব্দটায় কেমন যেন লোভ জড়িয়ে থাকে। বড় ধরতে ইচ্ছা হয়। মনে হয় হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি। মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্নের ভিড়। আমিও কি এইভাবে কানে কানে মেতে উঠতে পারি না? 

     এইবার অপেক্ষা পীড়া দেয়। প্রাপ্তির ইচ্ছা এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নিজেকে আর অবহেলায় ফেলে দিতে মন চায় না। ভালোবাসার লোভ রয়েই যায়। পাশাপাশি নিজের অপারকতাও নিজেকে কোথাও যেন একটা কোণে ঠেলে দেয়। অনুভব করি কোথাও নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। এই প্রস্তুতির রূপ যে কত বিচিত্র তা বলে শেষ করা যায় না। আবার এটাও সত্য আমার প্রস্তুতি আমার মতোই। কাউকেই আমার জগতে এনে ফেলতে পারি না। পাশাপাশি আমার প্রস্তুতিকে কেউ আমলও দেয় না। একটা মানুষ নিজের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে পথ চলবে, এটাও কেউ প্রশ্রয় দেয় না। তাই নিজেকে ভালোবেসে আমি নিজেই নিজের পৃথিবী তৈরি করে ফেললাম।

     কত কথা যে আমার বলার আছে তা সাদা পাতার সামনে বসে বুঝতে পারলাম। আমার কথা ----- আমার ভালোলাগা জগৎ , যেখানে বাসা বেঁধে আছে আমার কবিতার শব্দেরা, আমার দুপুর, অজানা স্টেশনে উদ্দেশ্যহীন বসে থাকা। সব আমার। বুঝলাম ভালোবাসা কী! 

     আমার আমিতে ডুবে নিজেকে ভেঙে ফেলার কী প্রগাঢ় ইচ্ছা। দুপুরের নিজস্ব ঘ্রাণ হৃদয়ে না জড়ালে আমি কী পেতাম? নিজের কাছে দাঁড়াতামই বা কোন মুখে। আমার হাতে কী থাকত? পার্থিব বস্তুসকল? আমি পথ চলতাম কীভাবে? নিজের বলে সত্যিই কাউকে দেখাতে পারতাম? উদ্দেশ্যহীন পথ চলার যে দারুণ আনন্দ তা কখনও হৃদয় দিয়ে ছুঁতে পারতাম? অপুর মতো অপরের দুঃখে চোখের জল ফেলার যে আনন্দ তা বুকে নিয়ে কখনও ধনী হতে পারতাম?

     জৈষ্ঠ্যের এক দুপুরে রবীন্দ্রনাথ আমাকে শোনালেন, "আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায় / আমি তার লাগি পথ চেয়ে আছি পথে যে জন ভাসায়।" কোনোদিন বুঝিনি আমার হাতে কী আছে। হাতে কী থাকা উচিত তাও কী কোনোদিন ভেবেছি। জানলা খুলে যেদিন দুপুর দেখলাম সেদিনই প্রথম চিনলাম নিজেকে। নিজেকে দেখতে শিখলাম। হাতের মুঠো খুলে দেখলাম, এক মাঠ খাঁ খাঁ দুপুর। আমার হৃদয়পুরে রাজত্ব করছে। আমি ভেসে গেলাম। আমার চেনা জগৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। যে ধুলো নিয়ে আমি এতকাল খেলেছি তারা যেন আজ আর আমার কেউ নয়। চিরচেনা জগৎ ছেড়ে আজ আমি
বসন্তপুরের পলাশবনে একাকী দন্ডায়মান। মনে হয় কিসের পরিচয়? কেনই বা পরিচয়? পরিচয়ের আছেই বা কী? এই যে আমাতে আমিকে দেখতে পাচ্ছি, অনুভব করছি অনন্ত রোদ্দুরের স্পর্শ, সকালের পবিত্রতা ------- আমার এই পরিচয়ের জন্যই কী আমি পথ চেয়ে বসে থাকি নি? 

     আমি তো আমাকে চারদেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাই নি। খুঁজে দেখতে চেয়েছি নিজেকে। আমৃত্যু সুখস্পর্শে কাটিয়ে দেওয়া যে জীবন আমার পৃথিবীতে তা কখনও গ্রহণযোগ্য হয় নি। আত্মশ্লাঘার মতো পেলব শব্দ-ধ্বনিতে আমি কখনও কান পাতি নি। তাই এই গান শ্রবণমাত্র আমার শরীরযন্ত্রটির মধ্যে রক্তের গতি প্রকৃতি এক অন্যরূপে ধরা  দিল। নিজেকে ভাঙার যে কর্মপরিকল্পনা সেই ইচ্ছা গগনচুম্বী হলো।

     সারাটা দুপুর গাছের নিচে বসে বসে দুপুরের ভেঙে যাওয়া দেখছি। ভাঙছি আমিও। কবেকার বাতাসপুরের মেজমাসির মেয়ে দিতি আজ মনের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন চলে আসে। কতদিন দেখিনি তাকে। তবুও মনের মধ্যে কোথাও যেন যত্ন করে তোলা ছিল। আজ কিছুটা উষ্ণ হলেও দখিনের বাতাস দিতিকে কোথা থেকে হৃদয়পুরে এনে হাজির করে দিল। আমি তো এতদিন দিতিতে থাকি নি। কিন্তু তবুও কোথাও যেন সে ছিল। অনেকবছর আগে আলো-আশার, ভালোবাসার প্রদীপ যা সে জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল আজও তা জ্বলছে। 

     আসলে ভালোবাসা কোথাও একটা ছিল। ভালোবাসা কোথাও একটা থাকে। অনন্ত পলাশের বসন্তপ্রবাস থেকে তাকে নিয়ে আসতে হয় প্রাত্যহিকতায়। প্রয়োজন হয় মনের ভীষণ প্রশ্রয়ের। বসন্তের সাধনার অন্তে ভালোবাসা আসে। " যে জন দেয় না দেখা, যায় যে দেখে --------- ভালোবাসে আড়াল থেকে --------" এতদিন যে ছিল বসন্তপ্রবাসে সে আজ আমার হৃদয়ঘরে। এই হৃদয়ঘর কোথায়? সেও তো আমার মনের মাঝেই। যেখানে আমার মনের মানুষ থাকে। আমৃত্যু তাকে ছোঁয়া যায় না। লালনের কন্ঠে ঘনিয়ে ওঠে এক অপ্রাপ্তির মেঘ  ------- " সে আর লালন একখানে রয় / তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে। "

     ছোঁয়া না গেলেও তাকে আমরা অনুভব করি। জীবন ভালোবাসাময় বলেই তো বসন্তে শিমুল পলাশের রঙে সম্পৃক্ত হয় আমাদের হৃদয়। দুপুরের রঙ থেকে আহরিত হয় জীবন-বাষ্প। সমুদ্রের অনন্ত ঢেউয়ের দোলায়িত ছন্দে আমাদের মনের ক্যানভাস রক্ত-রঙ পরিধান করে, আর মন গুনগুন করে -------- " আমার মন মজেছে সেই গভীরের গোপন ভালোবাসায়। "

     অনন্ত মগ্নতায় শিল্পীর রঙ তুলি আজ যেন অচিনপুরের পথে। অদ্ভুত এক রূপকথার মোহজালে আমরা আবদ্ধ। অচিরেই শিল্পীর এই ইতিবাচক মোহজাল ছিন্ন হবে। চোখের সামনে আমরা প্রত্যক্ষ করব আলোকিত পৃথিবীর তৃপ্ত যাত্রীদের। ভালোবাসার গভীর গন্ধে তারা মাতোয়ারা। তাদের মনের প্রশান্তি দু'চোখকে আলোময় করে তুলবে। সে প্রশান্তি ছুঁয়ে যাবে আমাদেরকেও। শিল্পীর প্রতিটি রঙ আমাদের সঙ্গে আলাপের জন্য অস্থির হয়ে উঠবে। আমরাও তাদের রঙে বিভোর হয়ে খুলে দেব আমাদের বাতায়ন। বিমূর্ততার জটিলতা মুছে গিয়ে রেখার প্রবাহ ভাষা পাবে আমাদের অনুভূতিলোকে।