জয়ীতা ব্যানার্জী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয়ীতা ব্যানার্জী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

জয়ীতা ব্যানার্জী

              


স্মৃতিতুতো জলসায়



১
অনেক আগের কথা' ― বিস্ময়সূচক চিহ্ন। পাশে
কিছুটা অধিক শ্বাস, স্মৃতিনির্ভরতা, জোড়াতালি
পাখি তুমি গতজন্মে জানালারই ছিলে? হুটারের
তীব্র শব্দে প্রতিবার জেগে ওঠা নির্জন, বিচ্ছিন্ন
যেমন শোকের শেষে মানুষ একলা হয়, ঘিরে
থাকা আত্মীয়রা একে একে ফিরে যায় আলোমুখী
পৃথিবীর দিকে। তারা স্বজনহারার ডাক আরও
কয়েক প্রজন্ম ধরে বহন করবে বলে ক্রমে
পাথরের মতো স্থির, আগুনের মতো নিঃস্বপ্রাণ
তোমাকে একাটি ফেলে চলে গেছে। তারও যুগ পরে
তুমি এলে জানালায়। দেখো, আমি সে পালিয়ে যাওয়া
প্রান্তিক ও উদাসীন। আতিথ্যজ্ঞানেও নিষ্ঠুর, ম্লান

২
এই প্রত্যাশিত শীত, কোলাহল থেকে কিছু দূরে
স্বভাবে রোদের কাছে হাত পেতে বসি

পুরনো লেখার খাতা, শুকনো পাতার ঘ্রাণে
তোমাকে মুহূর্তে পাওয়া এবং হারিয়ে ফেলা
দোপাটি চারার মতো সাবলীল মনে হয়
যেন ভ্রমণ, চুলের শুস্কতায় নির্বিবাদী তোমার আঙুল

স্মৃতি স্পষ্টতর হয় চোখ বুজে এলে

৩
শোক, যাকে একান্তই আপন ভেবেছি সেও দেখি
সময়ে সময়ে ম্লান হয়ে আসে অবশেষে; শুধু
কয়েকটি স্মৃতি যেন শেষ আষাঢ়ের ঝমঝম
বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেঁটে যায়, সদর পেরোয়
প্রবল অনীহা যেন প্রদীপের এতটুকু জ্বলে
থাকবার কালে। আলো ফেরেনি। ফেরে না কোনদিন


----------

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

জয়ীতা ব্যানার্জী

                                                             


আসন্ন বৃষ্টির কথা ভেবে



১

কলতলা ঘন হয়ে এলো
পশ্চিম আকাশে মেঘ। পাকা খেজুরের মতো রঙ
তার ছেঁড়া আঁচলের

ও বাড়িতে আজ বুঝি রান্নায় দেরি
স্নান, খাওয়া সেরে অন্যদিন নীল শাড়ি ছাদটুকু আলো করে রাখে
আজ নেই। বরং অশ্বত্থের লাল পাতা এককোণে ছায়া সাজিয়েছে

এসব দেখার চোখ কবেই তো হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়
আর বেলা পড়ে আসে 
আসন্ন বৃষ্টির কথা ভেবে
তড়িঘড়ি জোড়া হাঁস নেমে যায় ডোবার গভীরে

২

অপরাহ্ণ ফুরিয়েছে । রেল-গেটে গাড়ি আর মানুষের ঢল

পোষা হাঁসেদের ঘরে ফেরা ডাক ভেসে আসে
হেজ-বাগানের থেকে বেনামি ফুলের ঘ্রাণ
আপাদমস্তক ভেজা কলমের আমগাছখানি
তার পোয়াতি-দশার নিচে ঝরে পড়ে আছে ফল
কী এক নীরব শোক ছায়া করে রেখেছে এখানে

ও বাড়ির ছেলেটি ফিরেছে
 সাইকেলে মোরামের কাদা লেগে
কুয়োর হু হু জল তুলে ঢালছে সে উঠোনে, চাকায়
বাউন্ডুলে মেনিটির খোঁজে এতক্ষণে ছাদে এসে ঝুঁকেছে আঁচল

শহরে লোডশেডিং। অথচ এ বেয়াদপ জানালা আমাকে
এইসব দৃশ্য জুড়ে কবিতা লিখতে বলেছে

৩

ভিতরে শোকের ছায়া। দরজায় গোলাপি বালিকা
তাঁকে বসবার পিঁড়ি, আসন দিয়েছে। ততক্ষণে
বুঝি সে-ও মুঠি খুলে দেখিয়েছে মারবেলগুলি।
ঘর কেটে রেখে ওই মন্দির চাতালে অবশেষে
সে এসেছে খোঁজ নিতে। এ বাড়ির কেউ কবে যেন
ছুটি পড়বার কথা বলেছিল। বলেছিল এ-ও
কতদিন খেলেনি সে মাঝ দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদে
সে এসেছে এতখানি রোদ নিয়ে মাথার উপর 
কথা দেওয়া আছে আর ফেরানো যায় না কোনওভাবে
বাদবাকি ছাইটুকু জড়ো করে তাঁকে পাঠালাম

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

জয়ীতা ব্যানার্জী

                               



এই সংখ্যার কবি জয়ীতা ব্যানার্জী।নিবাস - বাঁকুড়া। ২০১৬ সাল থেকে প্রত্যক্ষ ভাবে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও ব্লগে লেখেন। একক কোনও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। 



আতিথেয়তা ও শীতকাল
― জয়ীতা ব্যানার্জী


১

সেসব লোডশেডিং, আধখাওয়া চাঁদের কাছে
হাঁটুমুড়ে বসে থাকা। তারাদের উপকথা বেয়ে 
তখনও নামত নীল। মাকড়শার জালে আটকে 
শেষ হতে হতে ফের জ্বলে ওঠা। কাওকে না বলে

এমনি বেহায়া সিঁড়ি থেমে যেত। চিলেকোঠা একা
লোডশেডিং সেসব, রঙিন ছায়ার সমারোহ


২

আমাকে উঠোনে ফেলে উঠে গেছে ও বাড়ির সিঁড়ি
কলতলা বাঁয়ে রেখে চুপিচুপি সরেছে বয়স
আমার পায়ের থেকে বটগাছ দুহাত দূরেই- 
এখন অনেক বড়। ঝুরি বেয়ে ওঠে নামে স্মৃতি

কোথা থেকে জল আসে, পিছুটান ধুয়ে ধুয়ে শেষে 
পিছল শ্যাওলা আর একমুঠো ঘাস রেখে যায়


৩

ঠিকানা লিখতে বসি। সহজ যদিও চিঠি লেখা
প্রতিবার ভুল হয়, খাম থেকে চোখ তুলে আনি
লাল ধুলো মনে পড়ে, বালিহাস, দুচারটে নামও
অনায়াসে বলে দিই। অথচ বাড়ির মেঠোপথ

ঠিকানা লিখতে বসে সদর দরজা ঢেকে যায়
নামের আখর খুঁজি, নেমপ্লেট ভেঙে পড়ে থাকে


৪

কিছুটা রোদের মতো, একা একা জ্বলে আর নেভে
রাখতে শেখেনি তবু, পরিয়েছ স্মৃতির আগল
একটি মোটেই তালা ! বাঁধবে কীকরে ফিরে আসা
উঠোনের কাছাকছি শীত এলে বেশ বোঝা যায়

একদিন এখানেও ভোরের আজান শোনা যেত 
তুলসী মঞ্চের পাশে পরিপাটি আমপাতা, ঘট


৫

আঁচল পেতেছে ঘাটে সোহাগী শিশির বোনা আলো
সাদা কালো ঘুম ভেঙে তুমি ফেরো ভোরের উঠোনে
নদী পেয়ে বর্তে গেছে, ভুলে থাকা জনপদ ভাবে
জল পেয়ে জল ভাবে বয়ে চলা কতটা সহজ

সফর রেখেছ হাতে। পরিযায়ী শীতের কাছেই
সে সফর শেষ হলে, ওইচোখে পালক চিনিয়ো


৬

জানালা নিয়ম করে রঙিন শিশিতে রোদ ভরে
মেলে দেয় সারি সারি উপশম। প্রবীণ ব্যথারা
তখনও আলগা পায়ে রাত্রিদোষ জড়িয়ে রেখেছে
আপাত বিস্মৃত জ্বর। গরম জলের স্বাদ জিভে

তিক্ততাই সমঝোতা যতক্ষণে জেনেছে আত্মীয়
কোলের আতিথ্য ফেলে সোহাগী বিড়াল চলে গেছে


৭

পিছল পাথর আর পাতায় মেশানো যত জল
নীল হয়ে আছে মেঘ। অথচ তেমন বর্ষা কই
মাঠের হরিণ দেখে শিকারী ডেরায় ফিরে আসে
নামতে নামতে রাত হরিণ-ও ঘুমোতে গিয়ে দেখে

উল্টানো চাঁদের গায়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের সাথে 
শিকারীর মরদেহ। এমনি হেলায় পড়ে আছে


৮

ভুলবার মন্ত্র বল, দ্যাখো অনুরোধ করছি না
যতটা পেরেছ নিজে, ছিটেফোঁটা তার, বাকিটুকু
নেই বলে ধরে নেব কোনওদিন ছিল না আসলে
অথবা অতিথিসম। এসেছ খেয়ালে, চলে গেছ

আমিও লিখেছি কিছু আতিথেয়তা ও শীতকাল
প্রেমের আক্ষেপে নয়, ভালোবেসে অবজ্ঞা শেখাও


৯

মায়া ফেলে গেছে ভোর। উঠেছ যখন ক্ষীণ আলো
সুতোর মতন যেন মেঝের চাদরে ছায়া আঁকে
কুড়িয়ে নিয়েছে খই। একপাশে নিকোনো উঠোন
শেষযাত্রার মতন বিসমিল্লাহ বেজেছে তার
 
প্রতিটি শ্বাসের সাথে। মায়াময় ফেরেনি তবুও
শুধু ছায়া সরে এসে প্রশ্রয়ের সদর পেরোয়


১০

সেদিনও নবান্ন ছিল। দুধসাদা আতপের ঘ্রাণ
নিকোনো উঠোন আর আলপনা মাটির সরায়
ধূসর শীতের সাথে বোঝাপড়া সয়েছে। রয়েছে
ধানের আলোর কোলে মাথা রেখে জমিয়েছে জল

মলমাস শেষ হল ? ফিকে হয়ে এসেছে হলুদ
আরবার রং দিয়ো। রং ছাড়া অপেক্ষা বাঁচে না



সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০

জয়ীতা ব্যানার্জী

                

তারাদের সার্কাসে আলো জ্বলে


১

মনখারাপের দিনে বৃষ্টিকে অন্ধের ফেরিওয়ালা মনে হয়
অন্ধ কেবল ওই স্বরটুকু চেনে। বোঝে
নক্ষত্রের পসরা সাজিয়ে ভাঙাচোরা সাঁকোটি পেরোলে

মেঘের ভিতর থেকে তার-ই দুয়েকটি ঝরে কি পড়ে না
মাটির উপর তাঁরা গাছ হয়, অন্ধ জেনেছে
আর সবচেয়ে কোমলটিকে 'মা' বলে ডাকে

২

তুমি সোনার কাঠির মতো। জ্বরের ঘোরেই বুঝি
কত কথা বলা হয়ে উঠলো না এবার-ও তোমাকে

দূরে তারাদের সার্কাসে আলো জ্বলে। সারারাত
এত আলো তবু কেন
তোমার হাতের ছায়া পড়ে না কপালে

৩

তেরছা রোদ এসে ভরে দিচ্ছে শব্দছক। পেরে যাওয়া শব্দগুলিতে টিক দিতে দিতে বড় হয়ে উঠছে চাঁপাডালের ছায়াটি। আর সামান্য বড় হতেই উল-কাকু এসে দাঁড়ালেন। ঝরঝরে সাইকেল বোঝাই উলে আসল মানুষটিই ঢাকা পড়ে গেছেন যেন। মা-কাকিমারা পছন্দের রং বাছছেন। পুরনো রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে নতুন রং খুঁজছেন। তিনি টান মেরে বার করে আনছেন চকচকে শীতের ওম। হাতের কায়দায় ছুঁড়ে দিচ্ছেন শূন্যে! তারা নেমে আসতে আসতে সোজা-উল্টোয় কী সুন্দর সেজে উঠছে বাগান। রিনরিনে চুড়ির শব্দ কেড়ে বাবা বলে উঠছেন মায়ের হাতে না কি জাদু আছে। আমি তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। মায়ের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

৪

নামতার সুর যতখানি একঘেয়ে ঠিক ততখানিই মধুর। দুলে দুলে নামতা পড়ার অভ্যেসে মা এসে গরম দুধের গ্লাস রেখে যান। শীতের বিছানা জড়িয়ে ধরে আরও কিছুটা সকাল পেরিয়ে যাওয়া যায়। বন্ধ জানালার ফাঁক গলে সোহাগী রোদ ছুঁয়ে নিচ্ছি, নেব -- ভাবতে ভাবতেই মায়ের আঁচলের গন্ধ দূরে সরে যেতে থাকে। দুহাতে মুখ গুঁজে চেনা ঘ্রাণ হাতড়ে বেড়াই, রোজ। সবার মতো আমার আর বড় হওয়া হয় না, বাড়ির সবার আগে ঘুম ভেঙে ওঠা হয় না, গুছিয়ে কাজ শেখা হয় না আমার। দিন জিতে যাওয়া বন্ধুটি যেন, অনেকটা এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে ভেংচি কাটছে।

৫

পরমান্ন সাজিয়েছি। এসো সুখ পাত পেড়ে বোসো
তোমাকে একটি দিন আদরে খাওয়াই। আঁচলের
আলতো পরশে মুছি ছিটেফোঁটা নুনের দেমাক

তোমাকে দেখতে সুখ অবিকল মায়ের মতই

------------



শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

জয়ীতা ব্যানার্জী


দূর পাল্লার ট্রেন
----------------------


(১)

স্টেশন চত্তরের আকাশ এখন ঘন কালো অপরিস্কার টালি-র উপর সকালের কদম ঝরে ছড়িয়ে রয়েছে। প্লাটফর্মের ওদিকটায় এক ঝাঁক জারুলে ফুটফুটে রঙ ধরছে সবে। ট্রেন
আসবার ঘোষণা,লাইনের কাছে একটু ঝুঁকে
দেখে নেওয়া লাল বাতি

তোমার আসার কথা না জেনেই বেরিয়ে পড়েছি

আর ঝেঁপে বৃষ্টি নামলো চারপাশে


(২)

জল,দুই,তিন,চার...
অন্ধকার দুলে দুলে পড়ছে জানালা
তার শীতল ধাতব স্বর যেন কবেকার বিস্মৃত
ছেঁড়া বিকেলের রূপকথা শোনাতে এসেছে
ফিরে গ্যাছে

বৃষ্টিবিহীন রাতে
অদূরে মেঘের ডাক,আলোর ফুলকি

শেষ ট্রেন ক্রসিং পেরলো

অথচ যে যায় তাকে যেতে দেওয়া অনুচিত বলে
এ শহরে কতবার অসময়ে আষাঢ় নেমেছে


(৩)

ভেতরে এক ঝিঁঝিঁ ডাকা মাঠ
নিজেকে গুনছি - আলো,দুই,তিন,তারা,চাঁদ

সন্ধ্যার আজানে সিলভিয়া' শুনেছ কখনও
কাঁটা দেওয়া প্রতিটি শ্বাসের পর থেমে যান পাঠিকা আমার
দূর থেকে মোরামের পথে কার লন্ঠন দুলে দুলে ওঠে

মাধবী বোঁটায় রাত। শেষ স্তবকের আগে ঝরে যাবে
ফিরে যাই। শেকল আলগা তুলে রাখি
পৌঁছতে বুঝি ভোর? দূরভাষে,কবিতার কাছে

--------------