জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

              


মাঝে নদী বহে রে 
 

আমরা যখনই সুখ-দুঃখের গল্প করতে বসি (বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্যকে নিয়ে), আমাদের অজান্তেই সুখের পরিমাণ কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকে। আর শেষে, ওই গল্প জীবনের প্রতি এক ব্যর্থ অভিযোগে রূপান্তরিত হয়। অদৃষ্ট নামক অদৃশ্য শয়তানের প্রতি এক বিরূপ মনোভাব জন্মায়। হালকা হাসি, অনুযোগ, অভিযোগ আর মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে চোখের জল সামলে নিতে নিতে জীবনের এক প্রান্তে এসে একদিন দেখা যায়, সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য ওইটুকু সম্বলই রয়ে গেছে। নিন্দুকেরা যাই বলুক, ওই সুখ-দুঃখের গল্পই সংসারীর পরম সম্পদ। ওটি না থাকলে তেঁতুলের আচার বিস্বাদ লাগে, বারবার চ্যানেল বদলেও টিভিতে কিছু ভালো লাগে না, স্কচ-হুইস্কি জোলো মনে হয়। এমন কি জনৈক সাহিত্যিকের লেখার রসদেও ভাঁটা পড়ে (চুপি  সাড়ে)।

রমাপদ পালিত মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। পরবর্তীকালে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা হন এবং বর্তমানে সেই পরিবারেরই বসত বাড়ির উত্তর দিকের আমগাছে থাকেন। হ্যাঁ আমগাছেই থাকেন, হপ্তা খানেক আগে তাঁর গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটেছে। তবে, পিছুটান এখনও ছিঁড়তে পারেননি, তাই আপাতত আমগাছ। সংসারের হিতে যে সব পরিকল্পনা ফেঁদে বসেছিলেন তা জীবদ্দশায় ফিনিশ করা হয়ে ওঠেনি। তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় পূর্ণ সময়টাই প্রয়োজনীয়, আসল কাজ ফেলে এদিক ওদিক চড়ে বেড়ালে উত্তরপত্র অসমাপ্তই থেকে যায়। তাই বলে, প্রাণ থাকতে কি রমাপদবাবু কিছুই করেননি? খুব করেছেন! বাপের সুপুত্তুর হয়ে শাঁসালো ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়েকে ঘরের লক্ষ্মী করেছেন। কলেজ পাশ দিয়েই টুক করে মামার ধরে দেওয়া আপিশের কেরানী হয়ে সাপ-সিঁড়ি খেলতে খেলতে ক্রমে বড়োবাবুর চেয়ার অবধি উঠেছেন। তারপর কোম্পানি বলল “এবার ছাড়েন কত্তা, ভি আর এস নেন!” টেবিলের ওপরে-নীচে যা আসত তাই দিয়ে তার আগেই শহরতলি অঞ্চলে আড়াই কাঠা জমিতে নিজের লাগসই বাড়ি, পেছনে বাগানের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ছেলে-বউ-নাতি-নাতনীদেরও তেমন কোনও অভিযোগ নেই রমাপদবাবুকে নিয়ে। তাঁর শ্রাদ্ধ-শান্তিও তাঁর ছেলেরা বাপের টাকাতেই দিব্যি চালিয়ে নিয়েছে। আর মেয়ে-জামাই কলোরাডো থেকে  ভিডিও কল করে পরোলোকগত পিতার আত্মার শান্তি কামনার কর্তব্য সেরে নিয়েছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে তেমন কোনও অশান্তি ছিল না। কিন্তু শেষের দিকে এসে কেমন সব হিসেব গোলমাল হয়ে গেল... এখন এই সাধের আম গাছটা ছাড়া সবই আধখাওয়া মালপোয়ার মত। তবে কি, দেহই যখন রইল না, তখন সেই দেহের সংসারের প্রতি আবদ্ধ হয়ে থাকা কি সুবিবেচকের কাজ? মায়াডোর আর সুপুরিগাছের পাতা-বাকল... সে তো কখনো না কখনো খসাতেই হবে।

জীবদ্দশায় রমাপদবাবুর দুটো বিশেষণ জুটেছিল... ‘কুচুটে’ আর ‘কিপটে’। এখন সেই সব প্রতিবেশীদের একটু শিক্ষা দেওয়ার দুষ্টু-বুদ্ধি মনে জাগে মাঝে মাঝে। কিন্তু, তখন ওইসব বাইরের আপদের টিটকিরি যতটা গা’জ্বালিয়েছিল, আজকাল নিজের পরিবারের আচরণ তার থেকে বেশি খোঁচা দিচ্ছে। বুকের মাঝখানটা ফাঁকা হয়ে গেছে বলে বোধহয় এখন বেশি হু হু করে! এখনও গাছের একটা ডালে ঠেস দিয়ে সেই অন্তঃপুরের দিকেই চেয়ে আছেন। মহামায়া সাতাত্তর বছরের মোহ-মায়ার জালে আটকে রেখেছিলেন, তা এই ক’দিনে ছিন্ন হওয়ার নয়।
শেষবারের মত চোখ বোঁজার আগে গিন্নি, আর বোধহয় কোনো এক ছেলের বউয়ের কান্নার শব্দ কানে এসেছিল, এছাড়া কিছু শুনতে পাননি। সূক্ষ্ম শরীর লাভের পর যখন আবার দৃষ্টি পরিষ্কার হল, তখন দেখলেন তাঁর এতকালের চেনা দেহর ওপর হালকা হয়ে ভাসছেন। আর সেই দেহটিকে, তাঁর বউমারা শেষবারের মত সাজিয়ে নিচ্ছে। লোকজনের অন্তিম যাত্রা দেখা রমাপদর কোনওদিনই ঠিক পছন্দ নয়, তাই নিজের খোলটার সামনে থাকতেও ইচ্ছে করল না। একলাফে খাট থেকে নামতে গিয়ে, পালকের মত ভেসে সদর দরজা অবধি এগিয়ে গেলেন, যেন ব্যোমযাত্রী! অল্প বয়সে কেউ কেউ বলতেন বটে “রমাপদ, তোমার গ্র্যাভিটি একটু বাড়াও... না হ’লে কোথাও পাত্তা পাবে না।” কিন্তু তাই বলে মরার পর যে এমন বায়বীয় হয়ে ভেসে বেড়ানো যাবে, একথা কে জানত? মৃত্যুর আগের যন্ত্রণা-কষ্ট, বিদেহী অবস্থার এই প্রাপ্তির আমোদে খানিকটা ফিকে হয়ে গেল। কিন্তু রমাপদ হিসেবী মানুষ, ছোটখাটো আনন্দে বড়ো চিন্তা ভুলে যান না। এতদিন যে গৃহিনীর পুষ্যি হয়ে ছিলেন, তার প্রতি আনুগত্য থেকে হোক অথবা অনুরাগ থেকেই হোক, একবার অন্দরমহলে তাকে দেখতে গেছিলেন ভেসে ভেসে। গিয়ে দেখলেন গিন্নি এক নিকট আত্মীয়ার কোলে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বিলাপ করছে। আর এক প্রতিবেশীর স্ত্রী তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সেই বিলাপের মাঝেই এক মহিলা গিন্নির গলা থেকে সোনার হারটা খুলতে গেল। রমাপদ ভাবলেন, এই বুঝি বুড়ি শোক ভুলে মারতে যায়! কিন্তু তাকে হতাশ করে একেবারে বিনা বাঁধায় তাঁর গিন্নিকে নিরাভরণ করে সেই মহিলা গয়নাগুলি সযত্নে অন্য ঘরে নিয়ে গেল। যে মানুষ সংসারে পা রাখার পর থেকে রমাপদকে একদিনও এক পয়সা বাজে খরচ করতে দেয়নি, চিরকাল নিজের বাপের বাড়ির লোক ছাড়া অন্য আত্মীয়দের উৎপাত এবং আতিথেয়তাকে আদিখ্যেতা বলে এসেছে, তার এমন আকস্মিক বৈরাগ্যে রমাপদ নিজের মৃত্যুর থেকেও বেশি মর্মাহত হলেন। তাঁর কষ্টার্জিত সম্পত্তি বারো-ভূতের পেটে যাওয়া থেকে আর ঠেকায় কে? আর সেখানে না থেকে, নিজের বাসা ত্যাগ করে ভেসে ভেসে পাড়ার মোড়ের কদমগাছটায় গিয়ে বসেছিলেন সেদিন। সেইখানে বসেই নিজের শব-যাত্রা দেখলেন। শ্মশান যাত্রার নামে পাড়ার ছোকরাদের ফূর্তি দেখে রমাপদর প্রেতজিহ্বা অস্থির হয়ে উঠেছিল। কিন্তু  প্রেতমুখের খিস্তির সবটাই ‘বলো হরি’ রবে চাপা পড়ে গেল।


--- --- --- ---

আজকাল সাত-পাঁচ চিন্তা হয়। শরীরের মায়া গেলেও, জগতের মায়া যাচ্ছে না। না মরলে বুঝতেই পারতেন না যে পুরনো দিনের সব লোকগুলো এখনো এতজনএই পাড়াতেই রয়ে গেছে। যে যার বাড়ির ছাদে, বা কাছাকাছি কোথাও একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে। এই ঠাঁই খোঁজাও একরকমের অভ্যেস। না পেলেও কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, অশরীরী হলেও ঠাঁই-নাড়া হতে ভালো লাগে না। গাছ কমে গেছে, পুকুর কমে গেছে, পোড়ো বাড়ি কমে গেছে। মুক্তি না পাওয়া আত্মাগুলো এখনো বেরোতে পারছে না মায়া কাটিয়ে। অত দাপুটে ভোলানাথ বাঁড়ুজ্জে, কেমন মুখ চুন করে ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে জলের ট্যাঙ্কের ওপর বসে থাকে। মাঝে মাঝে মাথা দোলায়, আর বলে -- 'স-অ-ব জলে গেল... স-অ-ব জলে গেল'। ফ্ল্যাটবাড়িটা ভোলা বাঁড়ুজ্জের চার-কাঠা জমির ওপর। ছেলেরা যে যার মত ফ্ল্যাট আর ক্যাশ পেয়েছে। নতুন ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে অন্য জায়গায়, আর এই ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। ভোলা বাঁড়ুজ্জেরও ইচ্ছে করে চলে যেতে, চেষ্টাও করেন। পারেন না, বেশি দূরে গেলেই কেমন জল থেকে ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খেতে শুরু করেন। মনে হয়ে 'আবার মরে যাব'। সে অসহ্য কষ্ট! অথচ, ওঁর স্ত্রী  নাকি পাকা আমের মত টুকুস করে খসে পড়ে মুক্তি পেয়ে গেছেন। বাঁধন কেটে উড়ে যেতে কোনো কষ্ট হয়নি। সুখেন, শঙ্করলাল...  এরা বলে আসলে সব ভ্যাজাল। কমিউনিস্ট হলেও, এদের ছেলেরা শ্রাদ্ধ-শান্তি নিয়ম মেনেই করেছিল। তাও আটকে আছে, ডাক পায়নি। জিনিসের ভ্যাজাল, নিয়ম-বিধিতে ভ্যাজাল, আচার-অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়াতে ভ্যাজাল... কী ঠিক আর কী ভুল সেই পদ্ধতিটাই হারিয়ে গেছে। যা হয় সব তালে গোলে। ঠিকঠাক প্রতিক্রিয়াও হয় না, জীবাত্মাগুলোও সব আটকে পড়ছে মায়াজালে মাছ আটকানোর মত। ব্রজেনের মত দু-চারজন এসব শুনে হাসে, বলে 'তোরা না লাল ঝান্ডা ওড়াতি? তোরাও এখন বলবি আচার-বিধির দোষ?'  রমাপদ এসব শুনে হাসে না, সবে সবে অশরীরী হয়েছে বলে সব কিছু ঠিক মত বোঝেও না। অস্বস্তি হয়। বেমানান লাগে নিজেকে এসবের মাঝে। আর সবাইকে যে বেঁচে থাকতে পছন্দ করত এমনও তো না। বরং এখন আর এড়িয়ে যেতেও পারছে না, চারপাশে চেনা-পরিচিত লোকদের মাঝে অপছন্দের লোকও অনেক। তাদের শোক আর অপূর্ণতাও অনেক, ঝুপ করে আঁধার ঘনিয়ে আসা মেঘের মত। রমাপদবাবুর মাঝে মাঝে এসব দেখে মায়া আরো বেড়ে যায়। চোখ ফেটে জল আসার মত লাগে... চোখ নেই, দু-ফোঁটা জলও ফেলতে পারেন না। বাপ-ঠাকুর্দা থাকত সেই ডোমজুরে। তারাও এখনো সেখানেই পড়ে আছে কি না কে জানে! ঠিক-ঠাক শ্রাদ্ধ-শান্তি না হলেই কি শুধু এমন হয়? তাহলে তো রমাপদরও দায়... তেনাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারেন নি। তাই যদি হয়, তাহলে রমাপদরও তো কোনো গতি হবে না! কেউ নিতে আসবে না তাকে।  
আছি, অথচ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছি না... মানে আসলে নেই-- এই স্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতেও মনের জোর লাগে। মনকে শান্ত করে অনুশীলন অধ্যায়নের দরকার হয়। 
 
“ওহে রমা, এই ভর সন্ধ্যেবেলা মুখ পেঁচা করে বসে আছো কেন?” কথাগুলো একসাথে চার দিক থেকে ভেসে এলো। ব্রজেন ঘোষাল বছর দুয়েক হল চোখ বুঁজেছেন। জীবিতাবস্থায় রমাপদর সঙ্গে বেশ ভাব ছিল। আর এই ভাবের মূল উৎস হ’ল বিকেলে রক্ষেকালীতলার পাশে চায়ের দোকানে বসে সুখ-দুঃখের গপ্পো করা। দু বছর আগে বায়ুচড়া হয়েছেন, তাই হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো, ভাসতে ভাসতে কথা বলা-- এগুলো বেশ রপ্ত হয়ে গেছে। রমাপদর চারপাশে দ্রুত একটা পাক খেতে খেতেই ওই কথাটা বলেছেন। রমাপদ প্রথমে টের পাননি, তারপর ঠাওর করে দেখলেন ব্রজেন ঘোষাল তাঁর ডালের সামনে ভেসে আছেন। ওঁর প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরের খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন রমাপদ। ব্রজেন ঘোষাল সেই দিকে তাকিয়ে বললেন “ওদিকে আর দেখছ কী? ওখানে কি আর তোমার যাওয়া হবে? না, গেলে কেউ টের পাবে?... আর টের পেলেও, সেটা কি খুব একটা ভালো হবে?” রমাপদ সেই দিকে চেয়েই বললেন “আর যাওয়া... আসলে...”

- আসলে কী?
- একটা ভারী গোলমাল চলছে... সকাল থেকেই...
- কীসের গোলমাল?”
- ওই যা হয়... মৎস্যমুখের পর কদিন যেতে না যেতেই  মাথায় কদমফুলের মত চুল নিয়ে দুই ভাই বসে গেছে কবে সার্ভেয়ার ডেকে জমির মাপ হবে সেই নিয়ে!
- ওহ! এ আর নতুন কথা কী?
- মানে? বাপের জমিদারি নাকি!
- ছিল... এখন নেই।
- খোঁটা মারছ!
- দূর! এই আমাকেই দেখো না... পাকাপোক্ত দোতালা বাড়ি ছেলেদের জন্য রেখে চোখ বুঁজলুম... এমন মালমুগুর জিনিস এখন আর হবে?... শালারা বছর ঘুরতেই প্রমোটর কে দিয়ে দিলে!    
 - সেই, তাপ্পর দেখো-- ভবতোষ লাহা, মন্টু ঘোষ... ছেলে-মেয়ে তো নয়, শকুন... বাপ চোখ বুঁজলেই কাটাছেঁড়া স্টার্ট!
- কুণ্ডুবাবুর তো বেঁচে থাকতেই...
- কোন কুণ্ডু?
- আরে ওই যে... যার মেন রোডে তিন-তিনটে ড্রেস মেটেরিয়াল্‌সের দোকান।”
- অ... তাকে তো ওল্ডেজে পাচার করে দিয়েছে শুনলাম...”
- তাহলেই ভাবো...

 
ব্রজেন ঘোষালের কথা শেষ হ’ল না... রমাপদ’র বাড়ির একতলা থেকে আবার কথা কাটাকাটির শব্দ ভেসে এলো। দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্ক চলছে, বেশ উঁচু গলায়। ব্রজেন ঘোষাল নিজের ভাসমান স্থিতিটা আমগাছের একটা ডালের আগায় জড়ো করে বললেন “ইয়ে, বলছি রমা... এভাবে তোমার বাড়ির ইন্টারনাল প্রবলেম দেখা... কিন্তু এখন আর কী তোমার, কী আমার... বলো?”
রমাপদ কোনও উত্তর দিলেন না... একাগ্র চিত্তে বোঝার চেষ্টা করছেন ঠিক কী চলছে দুই ভাইয়ের মধ্যে।

ঘরের ভেতরে দুই ভাইয়ের ক্যাচালটা রাস্তা অবধি শোনা যাচ্ছে এখন। তাদের বউরাও কেউ বাঁধা দিচ্ছে না, মনে মনে দু’জনেই চায় এর একটা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। সার্ভেয়ার আসবে, জরিপ হবে... কিন্তু দুই ভাইয়ের কার কতটা দাবী, অধিকার আর প্রাপ্য সেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তবে দু’জনেই মোটামুটি একটা ব্যাপারে এক মত-- সার্ভেয়ার আসছে। প্রেতরূপী রমাপদ দুই ভাইয়ের ডুয়েল দেখতে দেখতে কেবল একবার অস্ফুটে বললেন “ওরে, তোদের বাপ যে একটা উইল করেছিল... যার নামে সব কিছু, তাকে একবার জিজ্ঞেস করবিনি?” ছেলেরা সে কথা শুনতে পেলো কি না কে জানে, দু’জনেই হুড়মুড় ধুপধাপ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় মায়ের ঘরে গিয়ে হাজির। রমাপদবাবুর সদ্য বিধবা স্ত্রী সুলেখা দেবী ফুলো ফুলো চোখ (কেঁদে না ঘুমিয়ে বলা মুশকিল) বন্ধ করে রাধামাধবের ছবির সামনে আসনে বসে ছিলেন। ছেলেরা একসঙ্গে ঘরে ঢুকে, মাকে দেখে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়াল। মা-র কাছ থেকে কোনও সারাশব্দ না পেয়ে নিজে থেকেই দুই ভাই পালা করে বুঝিয়ে দিল, এবার একটা ব্যবস্থা করতে হবে... আগামী রবিবারই সার্ভেয়ার আসছে... ফয়সালা দরকার... তারা মাকে জানাবার কর্তব্য করতে এসেছে। সুলেখা দেবী সব শোনার পর চোখ খুললেন... কিন্তু কিছু বললেন না। 
     ব্রজেন ঘোষাল ডালের শেষ প্রান্তে হুমড়ি খেয়ে আছেন উত্তেজনায়, শরীরটা থাকলে নির্ঘাত গাছ থেকে পড়তেন, বায়ুচড়া বলে ভেসে আছেন। সত্তরের দশকে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে এমন উত্তেজনা হ’ত! রমাপদর বড়ো ছেলে মা’র দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে বলল “কী গো, তোমার অমত নেই তো?” আর ছোটো ছেলে একটু গলা চড়িয়ে বলল “যদি কিছু বলার থাকে, এখনই বলে দাও!... মামার পারমিশন ছাড়া তো আবার চলে না!” রমাপদ আড়ষ্ট হয়ে অপেক্ষা করছেন এর পর কী হয়। তাঁর গিন্নি নির্মোহ দৃষ্টিতে একবার বড়ো ছেলে, তারপর একবার ছোটো ছেলেকে দেখে করুণ ভাবে বললেন “উনি যাওয়ার আগে একটা উইল লিকে গ্যাচেন... জানিস তো? ওতে লেকা আচে পাওয়ার অব অ্যাটর্নী দিপুর... আর স্থাবর অস্থাবরের মালিকানা সবটাই আমার...” তাঁর কথা শেষ করতে না দিয়ে ছোটো ছেলে তড়পে উঠে বলল “সে যা আছে, আছে... কিন্তু আমাদেরটাও তো বুঝে নিতে হবে নাকি?” বড়ো ভাইও সায় দিয়ে বলল “হুম, ব্যাপারটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার।” সুলেখা দেবী আসন পাট করে উঠতে উঠতে একই রকম ধরা গলায় ক্ষীণ স্বরে বললেন “হ্যাঁ... রাজপাট রেখে চলে গেল মানুষটা...  বুজে তো নিতেই হবে... দে, দিপুকে খবর দে তাহলে, ও আসুক।” দিপু রমাপদ’র একমাত্র শালা, ঘোড়েল চিজ্‌ আর রমাপদর থেকেও বড় কুচুটে (কারণ রমাপদ নিজেও তাকে কুচুটে বলতেন)। এক কথায় বাস্তু-ঘুঘু। কীভাবে যে মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেকে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি করে ফেলল... রমাপদবাবু এখনো বুঝতে পারেন না। মনে হল, এতেই যেন সকলের ভালো। বাইরের লোক ছেলেদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে দাঁত ফোটাতে পারবে না। বাইরের লোক বলতে মূলতঃ বউমাদের বাপের-বাড়ির লোকজন আর কী! জীবদ্দশায় তার শালা দীপ্তিময়ের আসার কথা শুনলে রমাপদ মনে-মনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। কিন্তু এখন যেন অশান্তি ঠেকাতে ওইটাই শ্রেয় মনে হ’ল। ‘দিপু’-র নাম শুনে দুই ভাইও কেমন একটু দমে গিয়ে এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি-পাতা বউমারাও ভুরু কুঁচকলো। মোবাইল ফোনে পটাপট কিছু ম্যাসেজ চলে গেল কোথাও। বুড়ি ছেলেদের উপস্তিতিকে পাত্তাই দিলেন না। দুটো বাতাসা খেয়ে গেলাসে রাখা জল দু ঢোক খেলেন। তারপর খাটে উঠে বসে এক পায়ের পাতা দিয়ে অন্য পায়ের পাতা ঘষে পা-দুটো খাটে তুলে নিলেন। এমন ভাবে নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন, যেন এই বিষয়ে আর কোনো ভাবনাও নেই... কথাও নেই। এরপর মা-কে ম্যানেজ করতে কিংবা চ্যালেঞ্জ করতে বড়ো ছেলে আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যেতেই হঠাৎ কী হল, হাতের কাছের স্টিলের গ্লাসটা পটাং করে মেঝেতে আছড়ে দিলেন সুলেখা দেবী। সেটা ঠং করে শব্দ করে ছিটকে দরজার দিকে চলে গেল। তারপর ধপাস করে খাট থেকে নেমে একেবারে ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন “বাপটা বেঁচে থাকতে তো হাড়ে দুব্বো গজিয়ে দিল! এখন তোদের চলবে! কান খুলে শুনে রাখ--  কোত্থাও দাঁত-ফোটাতে দেব না... এই আমি বলে দিলুম!  বেশি জ্বালালে সব আশ্রমের নামে লিখে দিয়ে যাব! বউদের সঙ্গে ফন্দি কর, হাঁড়ি আলাদা কর, লোক ডাক... যা করবি নিজেদের ঘরে গিয়ে কর গে যা! বাপ মরেছে এক মাসও পেরোয়নি... বউগুলোও হয়েছে তেমনি!” 
শেষ কথাগুলো বলে বাঁ-পাটা একবার ঠুকলেন মেঝেতে। আরো উত্তেজিত করলে আরো বড়ো কিছু ঘটাতে পারেন... পাশের বাড়ির লোক চলে আসবে। 
বাইরে পায়ের শব্দ হল ধুপধাপ করে... বউমারা  সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজের নিজের ঘরে চলে যাচ্ছে। কয়েক সেকন্ড নীরবতার পর ছোটো ছেলে মাকে শুনিয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে বলল "তাহলে কী করব? সার্ভেয়ার..." বড়ো ছেলে কোনো উত্তর না দিয়ে চোয়াল শক্ত করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। সুলেখা দেবী ততক্ষণে আবার খাটে বসে পড়েছেন, দেওয়ালে টাঙানো রমাপদবাবুর ছবির দিকে উদাস ভাবে  তাকিয়ে আগের মতই করুণ স্বরে বললেন, "শোন না, বলছি লনড্রির ছেলেটাকে কাল সকালে একটু ডেকে দিবি বাবা? আলমারি ভর্তি মানুষটার জামা-কাপড়, কত শখের... স-অ-ব রয়ে গেল!"
ছোটো ছেলে 'পারব না' বলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বুড়ি আবার এক লাফে খাট থেকে নেমে চেঁচিয়ে উঠলেন "তা পারবি কেন? বউ কিছু বলুক... অমনি নেচে নেচে ছাগলের মত চলে যাবি তার বাপের-বাড়ি কুলির মত!"
রমাপদ টের পেলেন, গিন্নি পুরনো ফর্ম ফিরে পেয়ে গেছে। বুড়ি বেকায়দায় ফেলে দিচ্ছে দেখে, এবারে ছেলের বউরা ঘরে বসে অন্যভাবে মাথা খাটাবে... আবার পরে ছেলেদের পাঠাবে, কখনো আলাদা আলাদা, কখনো একসঙ্গে। তবে চিঁড়ে সহজে ভিজবে না। এরা শুরুতেই হুড়োহুড়ি করে ভুল করল। 
     বুড়ি উদাস চোখে কিছুক্ষণ রমাপদবাবুর ছবির দিকে তাকিয়ে রইল, তার একট হাই তুলে ঘরে রাখা টিভিটা চালিয়ে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পছন্দের বাংলা ধারাবাহিকের চ্যানেলে এসে থামল। একটা বেশ জমিয়ে পাক দিয়ে ওঠা ঝামেলা এমন সস্তা বাজির মত নিভে গেল দেখে ব্রজেন ঘোষাল ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “একবার চক্কোত্তিদের ছাদে যেতে হবে বুঝলে... দেরি হয়ে গেল, অপেক্ষা করছে।  আসছ তো?” রমাপদ ঘাড় নেড়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললেন "নাহ্‌! বরং পরে রাতের দিকে তোমাদের পুকুর পাড়ে... ওহ, সে পুকুর আর কোথায়, সেখানেও তো ফ্ল্যাট উঠে গেছে! সরি। " খোঁচাটা বুঝতে অসুবিধে হল না ব্রজেন ঘোষালের, আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোঁ করে ভেসে চলে গেল সেখান থেকে। বাতাসে দুলে উঠল আমগাছের ডালগুলো। 

     গিন্নি ভুরু কুঁচকে টিভির দিকে তাকিয়ে বসে আছে, টিভির যা ভলিউম তাতে পাশের বাড়ির লোকও শুনতে পাবে... আর রমাপদর তো এমনিই চোখ-কান খুলে গেছে শরীর থেকে বেরিয়ে আসার পর। অনেক দূরের কথাও কান পাতলে শুনতে পাচ্ছেন, অনেক দূরের জিনিসও একদম কাছের মনে হচ্ছে একটু মন-সংযোগ করলে। টিভির পেছনের দেওয়ালেই একটু ওপরে রমাপদবাবুর ছবিটা একটা সুন্দর চকচকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে টাঙানো হচ্ছে। সেদিকে চোখ গেলেই আবার অস্বস্তিটা জেগে ওঠে  রমাপদর। ব্রজেন বলেছে, এই ব্যাপারটা কাটতে মাস কয়েক সময় নেবে। অনেকের তারপরেও যায় না। 
     
     আসলে রমাপদর বেঁচে থাকতেও অনেক কিছু নিয়ে অনভ্যেস ছিল। অনেক কিছুই ধাতে সইত না। এখনো তা থেকে যাবে। তাই নিজেকে নিয়ে চিন্তাই হয়। আজকাল নিজেকে নিয়ে একটু বেশি-ই চিন্তা হয় রমাপদর। আগের মত দুশ্চিন্তা নয়, অন্যরকম। নিজের প্রতি একটা মায়া, যাকে ইংরেজিতে বলে এমপ্যাথি... যার জন্মও হয়ত এক প্রকার সেলফ-লাভ থেকেই। অথচ নিজের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে গেলে আরো দুর্বল লাগে। চোখের সামনে তো দেখছে অন্যদের অবস্থা! মনে হয় সুলেখার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে গেলেও ওকে আরো দুর্বল করে দেওয়া হবে। বরং স্মৃতি, অভ্যেস আর অতীত-বিরক্তি অতিক্রম করে এই বয়সে এসে ও কেমন থাকতে চায়... কেমন থাকতে পারে-- এটা দেখার ইচ্ছে বেশি। শুধু ছবিটা ওরা অন্য দেওয়ালে টাঙিয়ে দিক। বার বার চোখে পড়ে, অস্বস্তি হয়। আপনজনকে হারানোর ব্যথায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়। এ এক আশ্চর্য অনুভূতি... নিজে যে নিজের এতটা আপনজন, এতকাল বুঝতেই পারেনি এভাবে! হ্যাঁ... শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরেও অনুভূতি আর জমা কথাগুলো থাকে। বরং অনেকরকম অনুভূতি বাড়ে, অব্যক্ত... বেঁচে থাকতে যেগুলোর ব্যাপারে ধারণা ছিল না। মা বলতেন, 'অসহ্য কষ্ট হলে ঠাকুরের শেষ দিনগুলো মনে করিস... তারপর মা আর শিষ্যদের অবস্থা মনে করিস'। রমাপদর অত আধ্যাত্মিকতাও ছিল না, মনের জোরও ছিল না। ভাবেই নি এসব। শেষদিকে মা-কে আর মায়ের এই কথাগুলো মনে পড়ত। এখন মনে হয়... মা যেন ভোলা বাঁড়ুজ্জের বউয়ের মত এসব পিছুটান ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়ে থাকেন। মাকে যেন এভাবে দেখতে না হয়। 

ব্রজেনের জন্য খারাপ লাগল একটু। পুকুরের খোঁচাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। বড়ো সাধের পুকুর ছিল। একসাথে কত মাছ ধরেছে এক কালে। ঘাটে বসে চা-ফুলুরি খেয়েছে একসাথে। পুকুর, জীবজন্তু আর গাছগুলো মরে ভূত হয় না? সবাই কি সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি পায়? সম্ভব? হয়ত ওরাও প্রেত হয়ত হয়... কিছু একটা কায়দা আছে তাদের অশরীরীদের খুঁজে বের করার। সেটা শিখতে পারলে ব্রজেনকে আর মন খারাপ করতে হবে না। পুরনো ব্যবস্থা আবার বহাল করা যাবে! ভূত পুকুর, তাতে ভূত মাছ, চারপাশে পরিচিত ভূত লোকজন... পাঁচিল টপকে এপাড়ে চলে আসা সকলের একটা আলাদা জগত। এইসব ভাবতে ভাবতে ব্রজেনের মতই ভেসে উঠে উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ধপ করে ডালের ওপর পড়ে গেল রমাপদ। গাছের ডালগুলো হালকা মরমর শব্দ করল, বাতাস বইলে যেমন হয়। এতক্ষণে রমাপদর খেয়াল হল-- আকাশে থালার মত বড়ো একটা চাঁদ উঠছে, তবে নিটোল গোল না... হয়ত কাল পূর্ণিমা। দক্ষিণ দিকে হালকা বাতাসও বইছে। হালকা লালচে মেঘ দ্রুত ভেসে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে চাঁদের কাছ দিয়ে... মাঝে মাঝে তাকে আড়াল করে। টিভি, ছবি, গিন্নি, ঘর সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে চাঁদের দিকে মুখ তুলে তাকাল রমাপদ। আর অমনি... বাতাসে ভাসতে ভাসতে আমগাছটা নীচে রেখে একটু একটু করে ওপরে চলে যেতে লাগল। নীচে তাকাল না, তাই বুঝতে পারল  না বাড়ি, বাগান, পাড়া... এসব ছেড়ে কতটা ওপরে উঠে এসেছে! জ্যোৎস্নার আলোয় কুয়াশার মত মিহি হয়ে বিন্দু বিন্দু ছড়িয়ে যাচ্ছে আসতে আসতে... আবার জড়ো হয়ে যাচ্ছে পুঞ্জিভূত মেঘের মত। 
আছি, অথচ নিজেকেই দেখতে পাচ্ছি না... মানে আসলে নেই-- এই স্থিতিকে মানিয়ে নেওয়ার এ যেন এক অলৌকিক অনুশীলন। 
ছোটোবেলা বেসিক ডিস্কে শোনা কৃষ্ণ চন্দ্র দে'র কণ্ঠস্বরে সেই টান ভেসে আসে-- 
কেন কারাগৃহে আছিস বন্ধ
ওরে, ওরে মূঢ়, ওরে অন্ধ
ভবে সেই সে পরমানন্দ, যে আমারে ভালবাসে...



চিত্র- পারমিতা মন্ডল
 

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



হয়ত আমারই কাছাকাছি / 
-----------------------
ম্যানিকুইনটার বয়স হয়ত আমারই কাছাকাছি। অনেক ছোটবেলা থেকেই দেখছি, যবে থেকে এই পথে আসা-যাওয়া। এখন রঙ উঠছে। চিবুকের কাছে বিবর্ণ, চর্মরোগ হ'লে যেমন হয়। অথচ এক কালে খুবই সুন্দরী ছিল। ম্যানিকুইন নিয়ে ফ্যাসিনেশন, ফেটিশ বা যৌনবিকৃতির কথা মনে হ'লে অন্য দিকে তাকান, যেদিকে বাস-অটো চলে। মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার থেকে সহজ প্রতিক্রিয়া একটাই হয় - চোখ বন্ধ করে নেওয়া। ম্যানিকুইনও আপনাকে দেখছে না। পোস্টার থেকে ঋত্বিক, দীপিকা, শ্রদ্ধা - কেউই আপনাদের দেখে না। যাক গে, আসলে আমার ম্যানিকুইনকে যতটা চেনা লাগল, ততটাই চেনা লাগল দোকানের মালিককে। ওদের দোকানটা একসময় খুব চালু ছিল। তখন লোকটা মেনটেইন করা চাপ দাড়ি রাখত। চকচক করত চুল পাতলা হয়ে আসা চওড়া কপাল। দোকানের বাইরেও টু-পাইস কামানোর ব্যবস্থা ছিল।

দোকানের ভেতরে বসে থাকত, কাউকে 'আসুন আসুন' করত না। এখন দেখে বেশ রোগাটে লাগে। মাথায় টাক বেড়ে গেছে। গালের দাড়ি অযত্নে আগাছার মত, দুর্বল। চোখে যে ক্লান্তির ছাপ, তাও বয়সের নয়... লড়াইয়ের, যার থেকে মধ্যবিত্তের মুক্তি নেই। জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে একটা টুলের ওপর বসে থাকে। অভ্যেস ভেঙে 'আসুন আসুন' করতে চায়। অনেক সময়, বলার আগেই হেঁটে চলে যায় লোকজন।  অনেকদিন আগে এক প্রৌঢ়কে দেখতাম, বাড়ির দরজার সামনে এই ভাবে বসে অপেক্ষা করতে... পিওনের জন্য। পেনশনের টাকা নিয়ে আসত পিওন।

ম্যানিকুইন তাকিয়ে আছে দক্ষিণ দিকে, যেদিকে মন্দির। মন্দিরের বাইরে অসংখ্য ধূপ ছাই হয়ে যায়। কাছে হলেও তার গন্ধ এদিকে আসে না। এদিকে ভাসে ফাস্টফুডের গন্ধ। উত্তপ্ত চাটুতে চ্যাপটা খুন্তির ঠোকাঠুকির শব্দ। ভাজা গন্ধে জিভে জল আসে, পাক দিয়ে ওঠে ঘুমনো খিদে। প্রিয় খাবারের স্মৃতি। বার বার খেতে চাওয়ার প্রবৃত্তি। ম্যানিকুইনের খিদে নেই। অথবা অসীম সহ্যশক্তি। কোমরের কাছে আলতো করে ছুঁয়ে থাকা মধ্যমা, পাকস্থালী অথবা অন্ত্রের খবর রাখে না। লাস্যময়ী পুরুষকে বোকা বানাতে জানে। নিজেকে কী বানায় কে জানে। যাদের খিদে-ঘুম আছে তারাও তো অদ্ভুত রকম অবিচলিত, নিরুদ্বেগ, কর্তব্যনিষ্ঠ সারসের মত গ্রীবা হেলিয়ে অপেক্ষমান। সেখানেও তো ফাস্টফুডের ঠং ঠং। বাতাসে গরম তেলে কিছু ছেড়ে দেওয়ার সুবাস। এগরোলের মতই কাগজ ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে গোগ্রাসে গিলে চলেছে রাত। ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে টমেটো কেচাপ। ঠিক কতটা ক্ষতি করে যায় ক্ষতিকারক রঙ... বলতে পারো প্রবৃত্তিমার্গ?

আমি ভীষণ ভাবে চাইতাম - ম্যানিকুইনটাকে শাড়ী পরানো হোক। কেন চাইতাম? সে কথা থাক। একটা টিপ পরালে আরও ভাল লাগত। স্তন, কোমর, নাভি - এ নিয়ে তো কিছুই বলিনি। শুধু একটা টিপ, কপালটা ফাঁকা ফাঁকা লাগত। আজ শাড়ি নেই, টিপও নেই। যতটা সম্ভব ঢাকা একটা সালোয়ার স্যুট। হয়ত শরীরেও রঙ উঠছে। ঢেকে রাখতে হচ্ছে কুৎসিত চর্মরোগ। বাহ্যিক শ্রী অনেকের কাছেই গৌরবের। তা হ্রাস পেতে থাকলে তাদের মন খারাপ হয়। কেউ কেউ নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। উজ্জয়িনীর এক  জনপ্রিয় বারাঙ্গনা মা হওয়ার পর নিজের কন্যাকে ঘৃণা করত, তলপেটে প্রসবরেখা তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছিল বলে। মাতৃত্ব এই দাগগুলো ছাড়া নাকি আর কিছুই দেয়নি। নিজের মন খারাপ অথবা মনিবের জীর্ণতা সালোয়ার স্যুটের আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ম্যানিকুইন। তার আড়াল করার মত আর কোনও সুগভীর সুরঙ্গ পথ নেই। এক পুকুর মাছের মত খলবল করে ছুটে যায় না শুক্রাণুরা। সবাই মন দিয়ে টিন্টো ব্রাসের সিনেমা দেখছে।

যে মহিলা দোকানের সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল, আমি তার পিঠ দেখতে পাই। ব্লাউজের ঘেরাটোপ কাটিয়ে সস্নেহ উন্মুক্ত পিঠ। হালকা বাদামী, সন্ধের আলো পিছলে পড়ে। হয়ত মালিকের পরিচিত। দু'কথা-চারকথা বলতে গিয়ে দু'জনেরই মুখে সৌজন্যের হাসি। আমি অবশ্য শুধু মালিকের হাসিই দেখছি, বাকিটা আন্দাজ। অপরিচিতার শরীরের আদল এক পরিচিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রাথমিক ভাবে নিরুদ্দেশ হই, তারপর ফিরে আসি তিক্ত স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। আরও একবার কিছু কথোপকথনের মহড়া চলে মাথার ভেতর। হঠাৎ দু'জনের দেখা হ'লে যেসব কথা উঠতে পারে। অনেক বছর ধরেই ভাবি, মহড়া চলে... কিন্তু দেখা হয়নি। সেই অপরিচিতার হাত ধরে একটি পাঁচ-ছ' বছরের ছেলে। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে অস্থির হয়, মা'র হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চায়। সেই অপরিচিতার মুখ দেখতে পেলাম। একাধিক মৃদু ধমকের পরেও ছেলের টানে ভেসে গেল সে। ভেসে ঢেউয়ের সঙ্গে ফিরে যাওয়া পার্থিব স্মৃতিচিহ্নের মত। আবার আস্বস্ত হ'লাম, মোহ ভঙ্গ হ'ল... এ সে নয়। ভাগ্যিস... এ সে নয়!

একবার ইচ্ছে হ'ল ম্যানিকুইনটার শরীরে নতুন করে রঙের প্রলেপ দেওয়ার অনুরোধ করি। ইচ্ছে করল বলি - শুধু শাড়ীই পরিও, আর কপালে একটা টিপ... যেমন অনেক বছর আগে সাজাতে। কিন্তু দু'হাতে ব্যাগ থাকলে রিকশা ডাকা ছাড়া আর কিছুই পারি না। সেই পরিচিতা আর এই ম্যানিকুইন দুজনেরই জমে থাকা অভিযোগ বাজার ফেরত ব্যাগের ভারের মত ক্রমাগত শুষে চলেছে আমার শরীরের সঞ্চিত শক্তি। আমি পালটা দোষ দিতে দিতে রিকশায় উঠে বসি। বাতাস লেগে বুক হালকা হয়। বুকের বোতাম খুলতে খুলতে বুঝতে পারি - সে সব দিন, স্পর্শ, অভ্যেস একেবারেই ভুলে যাচ্ছে আঙুলগুলো ৷

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



খোসা 





- ডিম সেদ্ধ করতে খরচ কম। কিন্তু, সময়টা বেশি যাবে। 
- ধুর! এইভাবে হিসেব করে নাকি। ডিম ভাজবি একসাথে ক'টা? বড় জোর ডবল মামলেট। কিংবা ডিম পাউরুটি টোস্ট, সেও বেশি হ'লে একসাথে দু'টো ডিমের বেশি নয়। কিন্তু সেদ্ধ করলে, বড় ডেকচিতে একসাথে অনেকগুলো সেদ্ধ হয়ে যাবে। 

ডিম, ডেকচি, স্টোভ, কেরোসিন তেল, নুন, জলের ব্যবস্থা, বসার ব্যবস্থা... সব নিয়ে একটা হিসেব করে শুরু করার মত পুঁজি কত হ'তে পারে বুঝে নিলো প্রকাশ। সমান সমান হিসেবে তেল, পেঁয়াজ, পাউরুটি যোগ করলে খরচ অনেকটাই বেশি হয়ে যাচ্ছে। আপাতত সেদ্ধ ডিমেই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। লাভের মুখ দেখলে তখন ধাপে ধাপে অন্য ব্যবস্থা... এক এক করে। কিন্তু একটা জিনিস কেমন খচখচ করছে... প্রশ্নটা নিরাপদদাকে করাই হ'ল না। এমন ভাবে হিসেব বোঝালো, যেন প্রচুর লাভ। তখন মনেও এলো না। এখন মনে হচ্ছে। 

--- --- --- 

অরুণার ওপর থেকে নেমে, চিৎ হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার পর হঠাৎই বলে ফেলল প্রকাশ  "আচ্ছা, লোকজন সেদ্ধ ডিম খেতে বেশি ভালবাসে? না মামলেট?" 
এইসময় এমন প্রশ্নর মানে বুঝতে পারল না অরুণা। বুকের ওপর আঁচলটা টেনে প্রকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল "কি?!" 
প্রকাশ আগের মতই চিৎ হয়ে শুয়ে বুকের কাছে রাখা ডান হাতটায় কড় গুণতে গুণতে বলল "বুঝতে পারছি না। লোকে বিকেলে বা সকালে ডিম সেদ্ধ খায়। কিন্তু আমার থেকেই বা কেন খাবে? মামলেট, টোস্ট এগুলো তো বেশি খায়... তাই না? আমার তো সেদ্ধ ডিমের থেকে এইগুলোই বেশি ভাল লাগে!"  অরুণা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল, অন্ধকারেও ওর চোখের বিরক্তিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এক ঝটকায় প্রকাশের বাঁ হাতটা সরিয়ে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে বলল "সময় অসময় বলে কিছু নেই... রাতে শোয়ার পরেও.. ছিঃ... স্বার্থঃপর একটা!" 
প্রকাশ কী বলবে বুঝতে পারলো না। কিছু বলার চেষ্টাও করল না। মশারীর বাইরে হাত বাড়িয়ে জলের বোতল থেকে দু' ঢোক জল খেলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শুয়ে পড়ল চিৎ হয়ে। বিড়বিড় করে শুধু বলল "খুব ভুল হয়ে গেল... কাল আবার নিরাপদদাকে ধরতে হবে বাজারে গিয়ে।" অরুণা নিজের পা দু'টোও টেনে সরিয়ে নিলো, যাতে কোনও ভাবেই প্রকাশের ছোঁয়া না লাগে। 

--- --- ---  

"কেউ সেদ্ধ খায়, কেউ ভাজা... আবার সেদ্ধ আর ভাজাও আলাদা রকমের হয়। কীসব নাম আছে। দেখেছি। সবার ব্যবস্থা হ'লে লোক বেশি জুটবে।" 
সকাল থেকে এই প্রথম কথা বলল অরুণা। এতক্ষণ শুধু ঠুকঠাক জিনিসপত্র রাখা আর বাসনের শব্দ হচ্ছিল। কথাগুলো খুব একটা অন্যায্য বলেনি, কিন্তু প্রকাশের টাকার হিসেব করতে গেলেই টানাটানি পড়ে যাচ্ছে। অরুণার কথাগুলো শুনে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল "আমিও তো এই ভেবেই আর এগোতে পারছি না। শুধু সেদ্ধ থেকে কি আর লাভ আসবে?" 
রান্নাঘর থেকে উঠে এসে অরুণা জিজ্ঞেস করল - সেদ্ধ ডিমে খরচ কম?
- সেরকমই তো বলল নিরাপদদা। 
- কী বলল?
- ওই ডিমের দাম, ডেকচি, স্টোভ, কেরোসিন... সব মিলে। 
- দিনে ক'টা করে ডিম বেচবে?
- ক'টা বিক্রী হবে তা কি আর জানি? ওই দু' ডজন দিয়ে শুরু করব। তারপর তার থেকে যেমন বিক্রী হয়। 
- নিরাপদদা'র নিজের দোকানটা যেন কিসের?
- ও চায়ের দোকান...
- শুধু চা?
-  না না... চা বিস্কুট, সিগারেট, পাউরুটি টোস্ট, পান মশলা...
- আচ্ছাআআআআ... এবার বোঝা গেল। 
- অ্যাঁ?
- না... তুমি দু'ডজনের বদলে যদি দেড় ডজন নিয়ে যাও প্রথম দিন। আর ঘরের থেকেই ছোট কড়াটা, এক শিশি সরষের তেল, দুটো পেঁয়াজ আর ক'টা লঙ্কা... তাহ'লেও কি খুব বেশি খরচ হবে?
- না তো।
- তাহ'লে প্রথম দু-তিনদিন অল্প করে দেখো না। তারপর সেই মত না হয়...

বিকেল হওয়ার আগেই বাজারের দিকে সাইকেল নিয়ে চলে গেলো প্রকাশ। নিরাপদদা ব্যস্ত হওয়ার আগেই একবার ধরতে হবে। অরুণার কথা মত সব কাগজে লিখে নিয়েছে। এদিক-ওদিক মেরে কেটে সেদ্ধ, মামলেট দুটো দিয়েই শুরু কর যায়। খুব একটা হেরফের হচ্ছে না। 

--- --- --- 

"আসল কথাটাই নিরাপদদা সেদিন বলেনি... এইসব করতে ডেলি যা খরচ তা তো আছেই... এ ছাড়া ওই জায়গাটা পাওয়ার জন্য পার্টিকে কিছু অ্যাডভান্সও দিতে হবে... তারপর মাসে মাসে..."
সাইকেলটা এক কোণে দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতেই কথাগুলো জানিয়ে দিলো প্রকাশ... হাঁফাচ্ছিল, তাই সময় লাগল পুরোটে বলতে। অরুণা এই প্রসঙ্গে কোনও উত্তর দিলো না। নুন-চিনি মেশানো এক গ্লাস জল প্রকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধু বলল "বসো... চা খাও। শুনছি এক এক করে। বাসনগুলো মেজে নিই।" ঢকঢক করে সবটা জল খেয়ে জামার বোতামগুলো খুলে ফেলল ফেলল প্রকাশ। তারপর সেই জামা দিয়েই গায়ের ঘাম মুছে সেটা দিয়ে হাতপাখার মত নিজেকে হাওয়া করতে শুরু করল। অরুণার কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেলেও নিজের মনেই এক এক করে বলে যেতে লাগল, চায়ের দোকানের নিরাপদর সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে। যদিও তার থেকে কোনও নতুন অথবা বাড়তি তথ্য এলো না। তবে নিরুপায় মানুষের এতেই সান্ত্বনা, এক কথা বাড় বাড় বললেও মনে হয় কিছু কাজ এগোচ্ছে। কথা চলছে। 

অরুণা জানে, প্রকাশ অল্পেতেই ঘাবড়ে যায়, দুশ্চিন্তা করে... বেশি চাপ পড়লে দিকভ্রান্ত হয়ে যায়। ইংরিজীতে যাকে বলে 'নার্ভাস'। শব্দটা জানা না থাকলেও, ধাতটা অরুণার চেনা। তাই ইচ্ছে করেই প্রকাশের এতগুলো কথার কোনও উত্তর দিলো না। ঘরের সব কাজ সেরে দরজার কাছে এসে শান্ত ভাবে বলল "বাইরে মশা কামড়াবে, ভর-সন্ধেবেলা চৌকাঠে বসলে দেনা হয়।"; তারপর ঘরের ভেতর ঢুকে গেল বিছানার চাদর ঝাড়তে। 

- নিরাপদদাও টাকা দেয়?
- পার্টিকে?
- হুম?
- বলল তো সবাই দেয়। দোকান থাকলে নাকি দিতেই হয়...
- তোমাকে ক'ত দিতে বলেছে?
- পাঁচ হাজার কম করে। 
- তারপর?
- তারপর কি? মাসে মাসে?
- হুম?
- সে সব অতটা বলতে পারল না নিরাপদদা। বলল ওদের সঙ্গে কথা বলে সব আগে সেট করে নিতে হয়। না হ'লে পরে ঝামেলা হবে। 
- কার সঙ্গে কথা বলবে? তুমি তো চেনোই না কাউকে!
- নিরাপদদা চেনে। বলেছে কথা বলিয়ে দেবে। 
- বাবা, নিরাপদদার যে তোমার থেকেও বেশি গরজ!

প্রকাশ কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে অরুণার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভাতে খানিকটা ডালের জল ঢেলে খেতে শুরু করল। নিরাপদ'র বাড়তি আগ্রহটা প্রকাশও বোঝে। এসব সহজেই বোঝা যায়।

- হাজার পাঁচেক টাকা, তোমার কাছে হবে?
- দেখি। 
- কোথা থেকে দেখবে! ব্যাংকে তো ঐ ক'টা টাকা। ছেলে-পুলে এখনও কিছু নেই। কিন্তু ঘটির জল তো ওইটুকুই আছে। যদি ভালো-মন্দ কিছু...
- তাহ'লে আর কী করতে পারি বলো?!  
- হাতেরটা, গলারটা বেচে দাও... তাও আর বলতে পারছি না। আর টাকাগুলো নিয়েও যে সব মিটে যাবে... ওদের কথার দাম আছে? জানো না তুমি? মনে নেই?
- বাজারের দিকে নাকি এমনই রেট। অন্য দিকে কম। কিন্তু সেখানে কি  খদ্দের পাবো?

"শুরু করার আগেই পাঁচ হাজার। তারপর প্রতি মাসে নিয়ম করে... সময় মত। লাভের হিসেব যা করেছিল, তা আর থাকবে কী করে? ব্যবসা শুরু করার আগেই লসের খাতায় চলে যাবে। ওদের আর কি! ভালই কাটছে হারামখোরগুলোর এই করে! নাহ্‌... বাজারের দিকে বসা যাবে না। শ্মশানে যাওয়ার পথে নিমতলার মোড়, কিংবা স্টেশনের দিকে কলোনির রাস্তাটার কেমন রেট জিজ্ঞেস করতে হবে। যদি কিছু কমসম হয়..."
রাতের দিকে ভ্যাপসা গরম, তাই না ঘুমিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে এইসব সাত-পাঁচ চিন্তা করে যাচ্ছে প্রকাশ। দু'জনেই দু'জনের দিকে পিঠ করে শুয়ে। অরুণারও ঘুম আসছে না। হাতের ওপর মাথাটা রেখে ঘুমনোর চেষ্টা করছে চোখ বন্ধ করে। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে সরু শাঁখাটা। ভাগ্যিস... এখনও ওদের কোনও ছেলে-মেয়ে হয়নি। 

--- --- --- 

কাজ শুরু করতে গিয়ে খাতায় কলমে বসে দেখা গেল যা হিসেব করেছিল তার থেকে অনেকটাই বেশি খরচ। গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ হাজার টাকার অগ্রীম আর মাসিক হিসসার বাইরেও একটা ব্যাপার আছে - মাঝে মাঝে স্থানীয় থানা থেকে কেউ কেউ আসতে পারে। এটা বলে দেওয়া হয় না। ধরে নিতে হয়। পার্টির সঙ্গে বোঝাপড়া ভাল থাকলে, চাপ কম থাকে। কিন্তু এইসব যেমন গোড়ায় বলতে ভুলে গেছিল নিরাপদ, সেরকম এটাও বলতে ভুলে গেছিল যে একটা গুমটির দরকার হয়। দুটো সাইকেলের চাকা লাগানো গুমটি। যেটা নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এখানে সেখানে যাওয়া যায়, সেখানেই সরঞ্জাম রেখে ব্যবসা। সাময়িক এবং গমনশীল।  তারপর - 

 ডিমের খোসা (বিকল্প উপসংহার ১)
সব দিক ভেবে প্রকাশের শেষমেশ বাজারের আশা ত্যাগ করে শ্মশানের দিকের নিমতলা মোড়েই যেতে হ'ল। তাও মোড়ের মাথা নয়, সেখান থেকে একটু দূরে। অগ্রীমটা অনেক কমে গেল, কারণ শ্মশানে আসতে যেতে কেউ ডিম সেদ্ধ খায় না। হিসসা তখনই চাইবে, যদি কাস্টমার বেশি হয়। চাকা লাগানো গুমটিটা একজনের থেকে বাধ্য হয়ে কিনতে হ'ল। পার্টির চাপে। 
ডিম এমনিতেই অযাত্রা। তায় আবার সেদ্ধ। অরুণা বলল এক ডজনের বেশি রেখে লাভ নেই। চায়ের কেটলি আর প্লাস্টিকের কাপে একটু খরচ করল। আর কাজ চালানোর মত সিগারেট, বিস্কুট। সকালের দিকে প্রকাশ বসে, দুপুরের দিকে অরুণা, আবার সন্ধের পর প্রকাশ। একটু বেশি রাত অবধি থাকে, শ্মশান থেকে রাতে যারা ফেরে, মাঝে পাঁচ-ছজন দাঁড়িয়ে যায়। অরুণা রাতে থাকতে দিতে চায় না। নাহ'লে দিনে না বসে সারা রাত দোকান দিলেই ভাল হ'ত। দুপুর থেকে ভোর অবধি। 

যদিও একমাস হয়নি, তবে লাভ সামান্যই। আর এর থেকে বিশেষ বাড়ারও কথা নয়। মাঝে মাঝে এক আধ দিন দশ টাকাও লাভ হয় না। মাস গেলে কতই বা জমবে হাতে? এর ভরসায় বেশিদিন চলবে না। অন্য কিছু ভাবতে হবে। দু-তিন রকম ব্যবস্থা করতে হবে সংসার টানতে গেলে। অথচ পার্টির ছেলেগুলোকে বোঝানো মুশকিল। মাসের শেষ সপ্তাহ হ'তেই ওরা আসা যাওয়া শুরু করেছে। সত্যি হিসেব দেখালেও কি অমনি অমনি ছেড়ে দেবে? 

পেঁয়াজের খোসা (বিকল্প উপসংহার ২)
পাঁচ হাজার টাকা চাইলেই ওভাবে দিয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর মাসে মাসে, তার ওপর আবার থানা। নিরাপদদা এই ব্যাপারে সরাসরি কিছুই করতে পারল না, শুধু গোবিন্দ হাঁসদা বলে একটা লোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলো। তাকে একশো টাকা দিতে, সে নিয়ে গেল পার্টির ছেলেদের কাছে। পার্টি অফিস না, ক্লাব ঘর। ক্যারাম খেলতে খেলতে কথা বলল দু'টো ছেলে। নতুন কথা, পুরনো কথা... অনেক কিছু শোনার পরেও চুপচাপ রইল। পাত্তা দিলো না খুব একটা। সত্যি তো... প্রকাশ ওখান দোকান দিক বা না দিক, তাতে ওদের কী? প্রকাশের লাভ না হলেই বা ওদের কী? দোকান দিলে কিছু তো দিতেই হবে! বাজার একটা প্রাইম লোকেশন। প্রকাশ না বসলে ওই জায়গায় অন্য কেউ বসবে। এরা কেন লস খাবে? তাও প্রকাশ কিছুক্ষণ হাতকচলে গেলো। এক মিনিট করে চুপ করছিল, তারপর আবার নতুন করে বলছিল। জমিদার বা নায়েব-গোমস্তাদের কাছে যেমন চাষা-ভুষোরা হাত কচলে খাজনা মকুব করতে বলত। যেমন 'নার্ভাস' হ'লে প্রকাশ করে। শেষে একটা ছেলে বিরক্ত হয়েই বলল - "ঠিক আছে, আগে দু'হাজার দে... বাকিটা মাসে মাসে ভেবে দেখব।" এই ভেবে দেখার ব্যাপারটা প্রকাশ বুঝতে পারল না। গোবিন্দ হাঁসদা তাকে বুঝিয়ে দিলো - পাঁচ কমে দুই হয়েছে। বিশাল ব্যাপার। মাসে মাসে একটু বেশি দিয়ে বাকিটা পুষিয়ে দিতে হবে... ধারের সুদ দেওয়ার মত। 

বাজারে ব্যবসা করতে গেলে এতে রাজী না হয়ে উপায় নেই। ব্যাঙ্ক থেকে ঐ দু'হাজার তুলে দিয়ে দিলো প্রকাশ। কিন্তু এসবের কি আর সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকে? সবই ভরসা করা। জনদরদী দলের দুঃখী-দরদী ছেলেরা কথা দিয়েছে। এই অনেক। তবে গোবিন্দ ছেলেটা চালাক, এইসব রফার কথা পাঁচকান করতে বারণ করল। অরুণা বলল - "নিরাপদকেও বলো না। দরকার নেই!"
আপাতত অরুণার কথা মত সেদ্ধ আর ভাজা দু'টোই রেখেছে। তার সঙ্গে পাউরুটিও পাঁচ-ছটা। কেউ টোস্ট চাইলেও দেয়। বাজারে এমন দোকান আরও আছে। একচেটিয়া ব্যবসার ব্যাপার নেই। আর নিরাপদদাকে চটানো যাবে না... তাই এর বেশি কিছু করার কথাও ভাবা যাচ্ছে না আপাতত। গোবিন্দ বলেছে, দু-তিন মাস আগে টিকে থাকো... টিকে থাকাই আসল। রয়ে সয়ে খেলে সব হয়। আঁকুপাকু করলেই গলায় আটকে যাবে। 
এদিকে, মাসের শেষ হয়ে এলো... এই নামমাত্র লাভের রাখবে কি আর পার্টির ছেলেগুলোকেই বা দেবে কি?! এই ভাবতে ভাবতে প্রকাশ বিছানায় ঘেমে ওঠে রাতে। অরুণারও মাঝে মাঝে রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। গোবিন্দ বলে ছেলেটার পান খাওয়া দাঁতের হাসিটা স্বপ্নে তাড়া করে। ছেলেটা আজকাল নিয়ম করেই সন্ধেবেলা বন্ধুদের নিয়ে এসে ডিম সেদ্ধ, কিংবা টোস্ট খেয়ে যায়। সন্ধেবেলাই আসে, কারণ ওইসময়টা অরুণা দোকান সামলায়। 


 মানুষের খোসা (বিকল্প উপসংহার ৩)
প্রকাশ সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারে না। অনেক কিছু বুঝতে পেরেও চুপ থাকে। মাঝে মাঝে মাথা গরম হয়, মাঝে মাঝে ঘাড়ের কাছটা টনটন করে... মাথা ঝিমঝিম করে। চেঁচিয়ে বা অশান্তি করে কিছু কাজের কাজ হয় না, এটা শেষ ছ'-সাত মাসে হাতে কলমে বুঝে গেছে। অরুণাও বুঝিয়েছে অনেক করে। নিরাপদ লোকটা নিজে পাক্কা ব্যবসাদার। এটা-সেটা বুঝিয়ে নিজেই কিছু টাকা হাতিয়ে নেবে। ওর চেনা লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ওর চেনা লোকের থেকে মাল সাপ্লাই নিতে হবে, ওর ঠিক করে দেওয়া জায়গায় দোকান দিতে হবে... সবই ও বলে দেবে। চালাকি! 
নিরাপদ আর ওর দেঁতো হাসি হাসা চেনা লোকগুলোকে কাটিয়ে নিজেই পার্টি অফিসে চলে গেছিল প্রকাশ। অফিস থেকে ক্লাব, ক্লাব থেকে আর এক পাড়ার অফিস, সেখান থেকে আর এক ক্লাব। মোটামুটি সব জায়গা ঘুড়ে স্পষ্ট বুঝে গেল... হাজার নাক রগড়েও টাকা না খসিয়ে এক পা এগনো যাবে না।  শেষে গায়ে পড়েই একটা ফালতু রফা করল। সামনের ইলেকশন, ওদের লোক দরকার। প্রকাশও যাবে অন্য গ্রামে ডিউটি দিতে। দলের যা যা দরকার লাগে। ছোট-বড় কাজ, যতটা পারবে। প্রকাশ কী জানে আর কী পারবে... তা নিয়ে পার্টির ছেলেদের তেমন মাথা ব্যথা নেই, কারণ ওকে দরকারও নেই। কেমন যেন কাকুতি-মিনতিতেই রাজী হয়ে গেল শেষমেশ। পার্টির হয়ে বেগার খাটার জন্য এক পয়সাও পাবে না। রাতও জাগতে হ'তে পারে। অন্য গ্রামে গিয়ে পড়েও থাকতে হ'তে পারে যতদিন বলা হবে। বদলে ওই পাঁচ হাজারটা কমে যাবে। আর পার্টির কাজ পাকাপাকি ভাবে করে গেলে হয়ত মাসে মাসেও কমই দিতে হবে। তবে এইসব কিছু মুখের কথা... মুখের কথা মেনেই কাজ করতে হয়। প্রকাশের আর দোকান দেওয়া হ'ল না। তবে দোকানটা হয়েছে বাজারেই, নিরাপদর দোকানের থেকে একটু দূরে... প্রকাশের বউ অরুণাই সামলায়। প্রকাশকে চলে যেতে হয়েছে পাশের গ্রামে, পঞ্চায়েৎ ভোট শেষ হ'লে তবে ফিরবে। ততদিন অরুণা একাই। 

পার্টির ব্যাপার-স্যাপার অরুণারও কানে আসে। প্রকাশদের সঙ্গেই কাজ করত সজল। পার্টির ছেলে। আলাদা সুবিধে ছিল। বাইক অ্যাক্সিডেণ্টে মরে যেতেই সব ফক্কা। পার্টি থেকে বলেছিল বউকে একটা চাকরি পাইয়ে দেবে। মিথ্যে বলে লাভ নেই... পাইয়েও দিয়েছে। মাস মাইনে ভাল, মেয়েটার স্কুলের মাইনেও কুলিয়ে যায়। কিন্তু সজলদার বউ কাবেরীকে এক নেতার বাড়ি রান্নাটা করে দিতে হয়। সন্ধের দিকে চায়, রান্নাটা করে দিয়ে আসে। সেই নেতার বউয়ের নাকি হাঁটুর ব্যামো। নড়াচড়া বেশি করতে পারে না। অরুণা জানে, ওই রান্নার কাজটাই আসল... ওই দিকেই সংসারটা চলছে। খোঁজখবর রাখলে অরুণাও একটা রান্নার কাজ, কিংবা কাপড়-কাচা বা বাচ্চা-সামলানো, নাহ'লে নেহাৎ অথর্ব বাবা-মাকে দেখা... কিছু একটা জুটিয়েই নেবে। ভালমন্দ কিছু কপালে থাকলে শেষমেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে... তার কি ঠিক আছে? তার থেকে নিজেই যদি সময় থাকতে থাকতে একটা ব্যবস্থা করতে পারে... সংসারের অবস্থা থাকলে... সম্মানেরও ব্যবস্থা হয়ে যায়। 

--- --- ---  

এই তিনটে উপসংহারের মধ্যে কোনটা কতটা ভাল থাকা, তা আমি বা আপনি বলে দেওয়ার কেউ নই। আর বিচার করার তো প্রশ্নই ওঠে না। কি জানেন... আমাদের, কিংবা প্রকাশ আর অরুণাকে কষ্ট করে ডিম সেদ্ধর কারবার নিয়ে এত কিছু ভাবতেই হ'ত না; যদি প্রকাশের কারখানাটা হঠাৎ বন্ধ না হ'ত। 
কী ভাবছেন? আসল অ্যান্টিক্লাইম্যাক্সটা ঠিক কোথায়? এই কারখানা লকআউটের পরিচিত খবর? তিনটে উপসংহারের মাঝে ঘেঁটে যাওয়া গল্প? নাকি... এই চরিত্রের নাম দু'টো... প্রকাশ আর অরুণা?! 



শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


 মাদুলী 



তিলপাড়া ময়ূরাক্ষী ব্যারেজ থেকে একটু এগিয়েই শক্তিপুর, আর তার পাশে জুনিদপুর। নদীর পারে দুটো গ্রাম, এটা শুনতে ভাল লাগলেও... এইখানে ময়ূরাক্ষীতে চড়া, জল কম। ভরা শ্রাবণের কথা আলাদা, তবে ওই দু-একমাসে কী হয়... সেই ভেবে কি দিন কাটানো যায়? তারাপীঠ, বোলপুর, দুবরাজপুর, কেন্দুলী এদের অবস্থান বিন্দুগুলো জোড়া লাগালে একটা ঘুড়ি কিংবা হীরক খণ্ডের জ্যামিতিক আকারের মত দেখতে... আর তার প্রায় মাঝামাঝি অঞ্চলে এই শক্তিপুর। 
    নাহ্‌... শক্তিপুরের কোনও শক্তিপীঠের গল্প কিংবা বলার মত অন্য কোন গল্পও আছে বলে জানা নেই। তবে ওই বক্রেশ্বর, তারাপীঠ কিংবা আরও অন্যান্য দেশ-গাঁ জুড়ে ছোটবড় মন্দির, থান, মাজার - এসবের প্রভাবে... ঠাকুর-দেব্‌তায় ভক্তি, পাপ-পুণ্যের ভয়... এইসব এখানেও আছে। আর ঘটনা বা গোলমাল, এইসব কিছুও সেই নিয়ে। তাঁতিপাড়ায় একটা বুড়োশিবের মন্দির আর একটা মা মনসার থান আগে থেকেই ছিল, এই মাস চারেক হ'ল একটা রক্ষেকালীর বেদী বসেছে নিমগাছতলায়। বেদী ছিল না... মানে, কিছুই ছিল না। একটা পুরনো টালিভাঙা ঘরে গেল বছর একটা লোক এলো, সে নাকি ওই বাড়ির শরীক... এখন থেকে এখানেই থাকবে। তারপর দেখা গেল সে মাঝে মধ্যেই ভোরবেলা চান-টান সেরে নিমগাছটার তলায় বসে পুজোটুজো করে। ভিজে মাথা দিয়ে টপটপ করে জল পড়ে... ভিজে ধুতি... গাছতলার মাটি ভিজে যায় পূর্ণিমা, অমাবশ্যা, একাদশী... তিথিতে, বারে বেশ মন দিয়ে পুজো চলছে দেখে লোকজনও আসত প্রণাম ঠুকতে। পয়সা-টয়সা দিয়ে, ফল-শবজি রেখে যেত। তারপর এলো মানত... গাছের ডালে লাল সুতোয় বাঁধা ঢিল... মাটি ঠাসা মাদুলী। ব্যস্‌... সেই শরীক থেকে গেছেন। কপালে লাল তিলক আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা এসেছে। টালির চাল সারানো হ'ল এবছর বর্ষার আগেই... আর এই মা রক্ষাকালীর বেদী, নিমগাছ তলাটা সিমেন্টে বাঁধিয়ে দেওয়া হ'ল। লোকটা এসেছিল খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর এলোমেলো চুল নিয়ে, কিন্তু থাকতে থাকতে দাড়ি আর চুলও কেমন লম্বা হয়ে গেল - ঠিক যেমনটি সবকিছুর সাথে মানান সই হয়, তেমনটি। 

    প্রহ্লাদ সহিসের বউকে আজকাল একটু বেশি দেখা যায়, মায়ের বেদীতে মাথা খুঁড়তে, ফাঁড়া কাটাতে কড়ে আঙুল দিয়ে। প্রহ্লাদ সহিস ছাড়াও সহিসদের আরও তিন চারটে পরিবার বহুকাল ধরে আছে তাঁতিপাড়ায়; পুরুলিয়া থেকে এখানে এসেছে প্রায় দুইপুরুষ হয়ে গেল। বুড়োশিবের থান ছাড়া কোথাও এই সহিসদের এত মাথা ঠুকতে দেখা যায় না। অথচ এই মাস দুয়েকের মধ্যে নিমগাছের গোড়ায় চারটে লাল সুতো বাঁধা হয়ে গেছে প্রহ্লাদের বউয়ের। দু'বার এসে মাদুলীও নিয়ে গেছে। সব মেয়ের জন্য। মাস ছয়েক হ'ল প্রহ্লাদের মেয়ে রুমকি বাঁ চোখে কেমন ঝাপসা দেখছে। চোখে চশমা দিয়েও কমেনি। দু'তিন রকম ড্রপ দেওয়ার পর সদরের ডাক্তার বলেছে বড় শহরে নিয়ে গিয়ে দেখাতে, ছুড়িকাঁচি ছাড়া সারবে বলে মনে হয় না। উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়ে, সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে... কোথায় পড়াশুনো নিয়ে থাকবে, তা নয়, এই উটকো টানাপোড়েনে জেরবার। সেই রুদ্রাক্ষের মালা পরা লোকটা বলছে... মায়ের পা থেকে একটা ফুল নিয়ে মাদুলী দিলে মায়ের কৃপায় সব সেরে যাবে। মেয়ে রুমকি, মায়ের সঙ্গে রোজ সন্ধেবেলা আসে; লোকটার দেওয়া মন্ত্রপড়া জবাফুল চোখে ঠেকায়, মন্ত্রপড়া জল আই ড্রপের মত চোখে দেয়... ভেজা চোখ নিয়ে ঘরে ফিরে যায় ওপরের দিকে তাকিয়ে; যাতে জল গড়িয়ে পড়ে না যায়। 

     ওই তাবিচ কবচে হোক, ডাক্তারের আই ড্রপে হোক, বা হাবিজাবি যে কারণেই হোক... রুমকি আবার সন্ধেবেলা পড়তে শুরু করল। বই, নোটের খাতা... আর পাতার ফাঁকে গুঁজে রাখা কাগজ। বাপ মায়ের থেকে অনেক বেশি ভক্তি দেখা গেল রুমকির। মা বড়ই জাগ্রত। কলেজে যেতে আসতে দু'বার রক্ষাকালীর থানে মাথা ঠেকিয়ে যেত। সেই লোকটা কাছাকাছি থাকলে ফুলটা, বাতাসাটা দিয়ে দিতো হাতে; মুখে অমায়িক হাসি নিয়ে। রুমকিও হাসত। রুমকি সেই ফুল চোখে ঠেকিয়ে, চরণামৃতর হাত মাথায় মুছে কলেজ যাওয়ার বাস ধরবে বলে এগিয়ে যেত। আর মায়ের সেবায়েৎ সাইকেল বার করে, তাতে চটের ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরতো বাজারের দিকে। একা মানুষ তো কি?... রেঁধে-বেড়ে খেতে তো হয়। মা রক্ষাকালীর পুজো ভাল রকমই চলছিল। প্রহ্লাদ সহিসের মত অন্য আরও অনেকে বেশ ভালই ভক্ত হয়ে উঠল মায়ের। না ঠিক মা একা নয়, তার সঙ্গে তাবিচ, কবচ, আংটি, জল-পড়া... আরও যা কিছু ওই লোকটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে। মায়ার শরীর লোকটার। কাউকে ফেরায় না। এমনই একদিন সকালে বিপিন গড়াই এসেছিল মায়ের থানে। একদম সক্কাল সক্কাল এসে হাজির হয়েছিল, দুদিন ধরে পেটে একটা মোচর দিয়ে উঠছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। এই ভাবে মুদির দোকানে বসে থাকা দায়। লোকটা বলেছিল সকাল সকাল খালি পেটে আসতে, একটা শেকড়-বাটা দেবে। খালি পেটে মধু দিয়ে খেতে হবে। কিন্তু এসে দেখল মায়ের থানে কেউ নেই। মা রক্ষাকালী একাই মুখে সকালের রোদে মেখে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু দূরের ওই টালির চালের ঘরটার দরজা বন্ধ, বড় তামাটে রঙের একটা আট-লিভারের তালা সূর্যের আলোয় চকচক করছে। বেলা বাড়তে খবর পাওয়া গেল... প্রহ্লাদ সহিসের মেয়ে রুমকিকেও সকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।  ভোরবেলা শেষ দেখা গেছিল, বাড়ির পেছনে পানা পুকুরের দিকে যেতে.. যেমন রোজ সকালে যায়। সাত সকালে মেয়েটা হঠাৎ গেল কোথায়? ক'দিন আগে কলেজের পরীক্ষা শেষ হয়েছে বলে সকালের বাসে মামার বাড়ি চলে গেল? নাকি অন্য কোনও আত্মীয়ের বাড়ি? কাউকে না বলে একাই চলে গেল? প্রহ্লাদের বউ মুখে আঁচল গুঁজে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে শুধু ফুঁপিয়ে গেল । প্রহ্লাদ গেল পাশের গাঁয়ে শালার কাছে খোঁজ নিতে। পাড়ার, আর আশপাশের অঞ্চলের আর যারা এই খবর পেয়েছে তারা কেউ চিন্তিত হল, কেউ মুচকি হাসল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শুধু বিপিন এসবের মাঝে গাল চুলকোতে চুলকোতে বলেছিল - 'সকাল থেকে ওই মনোহর বাবারও দেখা নাই। পেটটাও শান্তি দেয় না... কী যে করি!' 

    নাহ্‌, তিনদিন পার হয়ে যাওয়ার পরেও রুমকির কোনও খবর পাওয়া গেল না। আশপাশের গাঁয়ে কাছাকাছি কোনও জ্ঞাতির বাড়িতেও সে যায়নি। উলটে এতে পাঁচকান হচ্ছে বেশি দেখে প্রহ্লাদ ক্ষান্ত দিলো। স্বদেশ মাস্টারের সদোপদেশ মেনে পুলিশে এফআইআর করল - মিসিং কেস। আর সেই লোকটা... মানে মনোহর; তাকেও আর দেখা গেল না শক্তিপুর বা তার আশেপাশের কোথাও। জাগ্রতা মা পুজো পাচ্ছেন না দেখে বুড়োশিবতলার বামুন তারক ভচ্চাযের ভাইপো বিভূতিই যেচে পড়ে নিমতলায় এসে বসতে শুরু করল। মাকে ত্রিসন্ধ্যা জল-বাতাসা দেওয়ার দায়িত্ব এখন বিভূতির। তবে ওইটুকুই, ওকে কেউ তাবিচ-কবচ-মাদুলী... এসবের জন্য বলে না। আর, মনোহরকে খোঁজার জন্য এফআইআর করার কথা কেউ ভেবেছিল কি না... তাও আর জানা যায় নি। 

                                                                                                            ---                  ---                  ---  

- খবরগুলো দেখলেই কেমন লাগে, মুসোলমান ছেলেগুলো বিয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে... বলছে 'লাভ জেহাদ'!'
- থাম তো... ফালতু ব্যাপার যেতো। এগুলো নিয়ে লোকে টাইম পাস করে। 
- তোমাদের গ্রামে লাভ জেহাদ হয়? এই যে তুমি আমাকে বিয়ে করে নিয়ে এলে। এটা লাভ জেহাদ হ'ল না?
কথাটা শেষে করে ঠাকুরের আসনের সামনে ধূপকাঠিটা রেখে একটা নমস্কার করল রুমকি, তারপর ছোটো প্লেট থেকে চারটে নকুলদানা তুলে এগিয়ে এলো শামসুরের দিকে। নকুলদানাটা একবার মাথায় ঠেকিয়ে মুখে চালান করে দিলো শামসুর। তারপর  হাসতে হাসতে বলল " 'লাভ', মানে প্রেমের জন্য কেউ কোথাও সত্যিই জিহাদ করলে তোকে আমাকে এভাবে পালাতে হ'ত? এভাবে বর্ধমানে এসে নাম ভাঁড়িয়ে লুকিয়ে থাকতাম? "  
শামসুরের মুখে একেবারেই দাড়িগোঁফ নেই, তাকে দেখে শক্তিপুরের কেউ এখন আর মনোহর বলে চিনতে পারবে কি না কে জানে? কিন্তু জুনিদপুরের লোকজন তো দেখলেই চিনবে! আপাতত, আরও একবার নাম পালটে এই বর্ধমানের একটা অনামী অঞ্চলে ভাড়াবাড়িতে থাকা ছাড়া বেচারার গতি নেই। রুমকি নাম পালটাতে পারেনি, তাহলে ওর আর নতুন কলেজে ভর্তি হওয়া হ'ত না।


রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


ওয়েসিস



এদিকে অনেকটা সবুজ। এদিকে অনেকটা জমি; এখনও প্রমোটারদের নজরে পড়েনি। দূরের জনবহুল পাড়াগুলোতেও, বাড়িগুলো খুব বেশি হ'লে দোতলা। বেশ ক'টা পুকুর বা দিঘীও পাওয়া যাবে কাছাকাছি। এই মন্দিরের জমিতেও একটা পুকুর আছে, একেবারে বাধানো ঘাট সমেত। প্রায় দু একর জায়গার পাঁচিল ঘেরা জমির একদিকে বেশি নারকোল গাছ ঘেরা পুকুর। হাঁস চরে বেড়ায় সবুজ পানাঢাকা জলে, মাছেরা বুদবুদ কেটে টুকি দিয়ে যায়। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া শান্তি আর শীতলতা। আর তার ঠিক কোণাকুণি ভাবে উলটো দিকে ধবধবে সাদা রাধাকৃষ্ণ মন্দির। তার চূড়োয় সুদর্ষণ চক্রের মত একটা ধাতব চাকা আর শঙ্খ আঁকা গেরুয়া পতাকা ঝলমল করে। আগে ছোট মন্দির ছিল, সীমানার পাঁচিল ছিল না, লোহার গেট ছিল না। এখন মন্দির বড় হয়েছে, চওড়া থামের ওপর নির্ভর করে বড় নাটমন্দিরের দালান। তিন বেলা খোল করতাল বাজে। মাথার চুলে পাক ধরেছে, কাছাকাছি প্রায় এমন সকলেই দিনে একবার অন্তত মন্দিরে মুখ দেখিয়ে যান। বিগ্রহের সামনে হাত জড়ো করে, চোখ বন্ধে করে, মাটিতে সাষ্টাঙ্গ হয়, জপের মালা নিয়ে দু দণ্ড বসে... যার যার নিজের মত। ওটা এখানে আসতে গেলে একটা আবশ্যিক ব্যাপার। তবে এছাড়াও নাটমন্দিরের চাতালে, সিঁড়িতে, পুকুরের ঘাটে, অথবা এই বিস্তৃত জমির অন্য যে কোনও চোখজুড়নো জায়গায় তিন-চার জন করে বসে থাকতে দেখা যায় এনাদের। সকালেও দেখা যায়, বিকেলেও দেখা যায়। দুপুরে ভোগের পর একটু কমে যায় কারণ  ওই সময় অনেকেই একটু জিরিয়ে নিতে চান। সন্ধেবেলা গেটের আলোগুলো জ্বলে যাওয়ার একটু পরেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেবায়েত আর গেটের সিকিওরিটি গার্ড তার আগেই আসতে আসতে এই সব জটলা হালকা করে দিতে শুরু করে। সন্ধ্যা আরতির পর মন্দিরের দরজা বন্ধ করে রাধাকৃষ্ণের শয়নের ব্যবস্থা হয়। শয়নের আগেই বাইরের গেট বন্ধ। সেবায়েত, হ্যাঁ মন্দিরের সেবায়েত আছে... এখন সংখ্যাতেও বেড়েছে। মন্দিরের পাশে ছোট করে তাদের থাকার জায়গা, বাথরুম আর রান্নার ব্যবস্থা, জলের লাইন - সব এসে গেছে। প্রধান পুরোহিত ছাড়াও আরও দু'জন সহকারী পুরোহিত। প্রধান পুরোহিত অবশ্য আশ্রমে থাকেন না, সন্ধেবেলা নিজের বাসায় চলে যান সাইকেল করে। দুপুরে ভাত, ডাল, ভাজা, চচ্চরি, চাটনি দিয়ে ভোগ হয়। শনি রবিবার খিচুরি বা পায়েসও হয়। এখন ছোটখাটো আশ্রমই বলা চলে। খরচের টাকা আসছে, সেবার প্রণামী। ভোগের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা হবে শোনা যাচ্ছে, এত লোক আসছে দুপুরে খাওয়ার সময়। আরও বাড়বে আশ্রমের কাজকর্ম। পরিধিও বাড়তে পারে বই কি! ঘনশ্যাম গোস্বামীর ছোট্ট রাধাকৃষ্ণ মন্দির যে একদিন এমন ফলন্ত আম গাছের মত ভরে উঠবে তা উনি জীবদ্দশায় হয়ত কল্পনাও করেন নি। এখন মার্বেল পাথরের মূর্তি হয়ে পুকুর ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন, ঝকঝকে মন্দিরের ইমারত দেখেন ওই দূর থেকেই। 

   যেহেতু মন্দির ক্রমে আশ্রম হয়ে উঠেছে, আর আশ্রমের ভেতরটা একেবারে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া ব্যাপার - তাই বেশ কয়েকদিন হ'ল তিন চারজন ভক্ত কিছুতেই মন্দির থেকে যেতে চাইছে না। সারাদিন এই মন্দিরের চাতালে, সিঁড়িতে অথবা অন্য কোথাও বসে থাকে। এমনকি রাতেও যেতে চায় না, কোনও রকমে গেটের বাইরে বার করলে সেই গেটের বাইরেই বসে থাকে। নিন্দুকেরা বলে - রাতের বেলা মন্দিরের বাইরের অঞ্চলটা খুব একটা নিরাপদ নয়। মানে, এই মন্দির হোক, আশ্রম হোক, যাই হোক... তার পাঁচিলের বাইরে আশেপাশের সব কিছু আর দুষ্টু লোকের প্রবৃত্তি তো আর রাতারাতি পালটে যাচ্ছে না? রাস্তার ধারের আলোও জায়গা বুঝে আধলা ইট ছুঁড়ে ভেঙে দেয়। রাত বাড়লে সেই সব রাস্তা দিয়ে কেউ একা যেতে চায় না। কেউ কেউ বলল - শেষে মন্দিরের সামনেই ভালমন্দ কিছু ঘটে গেলে মন্দিরের নাম জড়াবে। আবার কেউ কেউ সুবুদ্ধি দিলো - এই সুযোগে ক'টা ঘর বানিয়ে একটা মহিলা আশ্রম বানিয়ে নাও। আশ্রমের সুনাম হবে, দান আসবে। সমাজের বঞ্চিতা, অভাগিনীদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে! 
   হ্যাঁ, মহিলা আশ্রমের কথাই উঠল কারণ ওই তিন-চারজনের মধ্যে তিন জন মহিলা। দু'জন বৃদ্ধা আর একজন অল্পবয়সী। সেই অল্পবয়সী মহিলাটির আবার কোলে একটি বাচ্চা। বছর দুয়েক হয়েছে হয়ত। সবাই বাড়ি থেকে তাড়া খেয়েই এখানে, বাড়ি থাকলে কেউ এভাবে মন্দিরের আশেপাশে পড়ে থাকবে কেন? সুবুদ্ধি যদি সাত-পাঁচ বাঁচিয়ে লাভের কথা বলে, তাহ'লে তা সদোপদেশ হয়ে যায়। সদোপদেশ নিতে মন্দিরের সেবায়েতরা দেরি করল না। একটা সুদিন দেখে ক'জন জুলপিতে পাক ধরা আর কপালে টাক পড়া মাথা স্থির করল এই অভাগিনীদের জন্য একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্থা হোক। বুড়োটাকে নিয়ে অসুবিধে নেই, নাটমন্দিরের এক কোণে পড়ে থাকুক। তবে বেশি মাথায় তোলা যাবে না, নাহ'লে রোজ কেউ না কেউ এসে হাজির হবে। আপাতত এই ক'জনই থাক। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক তীর্থপতিবাবু অবশ্য সবটা মেনে নিয়েও বললেন, "চিন্তাটা ভালই, তবে একেবারেই আননোন লোকজন! একটা পরিচয় টরিচয়ের ব্যবস্থা থাকলে..." 
বুড়ি দু'টো একেবারে গলায় তুলসীর মালা নিয়ে বসে থাকে। আর মেয়েটাও নিয়ম করে মন্দিরের মেঝেতে মাথা ঠেকায়, কীর্তনের সময় গলা মেলায় উর্দ্ধ নয়ন হয়ে। এইটুকু পরিচয় আর মুখে নাম জিজ্ঞেস করে অন্যরা সন্তুষ্ট হলেও তীর্থবাবু হলেন না। 

    এও যেন একরকম স্বক্রিয় সমাজসেবা। তীর্থবাবু অবসরপ্রাপ্ত হয়েও বেশ উদ্যমের সঙ্গে সমাজসেবী হয়ে উঠলেন চট করে। তিনজনকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হ'ল, আর তার সঙ্গে স্বচিত্র পরিচয়পত্রও বানিয়ে দেওয়া হ'ল নিখরচায়। একদম আশ্রমের ঠিকানাই তাদের ঠিকানা। আশ্রমের ফোন নম্বরই তাদের যোগাযোগের নম্বর। শুধু আঙুলের ছাপ দাও, ছবি তোলো - ব্যস্‌! তীর্থবাবুই দায়িত্ব নিয়ে পরিচয় পত্রের ব্যবস্থা করে দিলেন। 
তীর্থবাবু কোনওদিনও রুকসারকে আগে দেখেননি, রুকসারও তীর্থপতিবাবুকে চেনে না। তবে পুলিশ কে এবং কী তা চেনে। এই গ্রামে অন্য কেউই তাকে চেনেনা বলে রুকসার নিজের নামটা খুব সহজেই প্রতিমা দাস বলে চালিয়ে দিতে পারল। কোলের ছেলেটার নাম মাধব দাস। পাশের গাঁয়ে থাকত,স্বামী বন্যায় ভেসে গেছে। এই অবধি। অভাগিনীদের দয়া করার পর এত প্রশ্ন করতে নেই, দেবস্থানের অকল্যাণ হতে পারে। 
ধর্ষণ হওয়া থেকে এই ছেলে নিয়ে এইখানে পৌঁছনো অবধি সে অনেক গপ্পো। এসব কেউ বলে না, বললে ফালতু ঝামেলা। আসল নাম বললে তো আরও ঝামেলা। তার থেকে এই আশ্রমের ওয়েসিসে প্রতিমা ছেলেটাকে মানুষ করুক। অন্ততঃ পাঁচিলের ঘেরা জায়গায় বাইরের ভয়গুলো ঢোকেনি এখনও; চোখ জুড়নো শীতলতা আছে, রান্নার গন্ধ পাওয়া যায় সময় মত। 


রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


পিকনিক বাস্কেট

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


নীল রঙের নতুন গাড়িটা যাচ্ছে মহানন্দা অভয়ারণ্যের দিকে। মহানন্দা অভয়ারণ্যে যাওয়ার পথে আসে তিস্তা নদী। আর তারও আগে সবুজ ক্রমে ঘন হয়। দেখা যায় দূরে... পেছনে ফেলে আসা চা বাগানের ঝলক, লুকোচুরি। নীল গাড়ি... ব্যাকসিটে পরিবার আর পিকনিক বাস্কেট।

     
চা-বাগানের সাহেব পরিবারের মেমরা এমনই পিকনিক বাস্কেট নিয়ে যেতো কমলা-বাগানে... সঙ্গে বিলিতী কুকুর, আকাশে নতুন শীতের মিঠে রোদ। তাদের দূর থেকে দেখত মজদুরদের বাচ্চারা। মাঝে মাঝে মেমরা খুশি থাকলে বিস্কুট দিতো, কুকিজ। একজনকে দিলে অনেক বাচ্চা চলে আসার ভয় ছিল। বেশি ভিড় হলে, বন্দুক তুলে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করত সাহেব। তারপর আবার সুগন্ধী কমলা বাগান... সুন্দরী মেমদের হাসি... আর সোনাঝুরি পিকনিকের দুপুর।

     
আজও এক পিকনিকের দুপুর, নদীর ওপারে অপেক্ষা করছে। আর ব্যাক সিটে ফুটফুটে হাসি। আরও আগে পৌঁছলে নদীর বুকে সকালের রোদ চিকচিকের ছবি ধরা পড়ত কিছু। এখন রইল শুধু দুপুর আর বিকেল। পথে একটা জায়গায় জমায়েতের জন্য আধ ঘন্টা লস্‌ হয়ে গেল। কোনও এক চা বাগানের শ্রমিকের অকাল মৃত্যুর প্রতিবাদ... কোটরে ঢোকা চোখেদের বিক্ষোভ। এসব এদিকে মাঝে মাঝে হয়। আসলে ‘এখানে এমন কিছুই হয় না’... ‘তেমন কিছুই হয় না’... লোকে ‘না জেনে’ কথা বলে। ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারের শব্দ কি আর আসে আগের মত? মজদুরদের বাচ্চারা এখনও ভিড় করে... নতুন গাড়ি দেখে। মাঝে মাঝে কিছু পাহাড়ি কুকুরও সমতলে নেমে আসে... ঠিক বিলিতী কু্কুরের মতই দেখতে, অথচ মজদুরদের হাড়গিলে বাচ্চাগুলোর সঙ্গে কী  ভাব!

     
নীল গাড়ি ধূলো উড়িয়ে সবুজের মাঝে ছোট হ'তে থাকে। সেই গাড়ীর ভেতরেই সুগন্ধী কমলা-বাগান... সুন্দরী মেমদের হাসি... আর সোনাঝুরি পিকনিকের দুপুর।


ছবি : গুগুল