অজিত রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অজিত রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

অজিত রায়

বাংলা পর্নোগ্রাফির ভূত ও ভবিষ্যৎ
------------------------------------------------

পম্পেই মন্দির ও প্রাসাদ পৃষ্ঠে খোদাই করা মূর্তিগুলি ছিল পর্নোগ্রাফির  বেহতৃণ নমুনা, যা কালক্রমে একটি গ্রিক জঁর হিশেবে স্বীকৃতি পায়।  কিন্তু আমাদের অজন্তা-ইলোরা বা খাজুরাহো-কোনারকের স্থাপত্য অমন কোনো পৃথক জঁর বলে দাগায়িত হয়নি।  কারণ এ দেশীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে যৌনতা মোটেই অনৈতিক বা অবৈধ ছিল না।  যৌনতা বিষয়ে সনাতন ভারতীয় মূল্যবোধটি ইসলামিক চাপে পিষ্ট হয়ে ছিটকে গিয়ে পড়েছিল বৃটিশ ইম্পিরিয়ালিজমের থাবায় তলায়।  ওই শ্বেতাঙ্গ বণিকরাই এ দেশে পর্নোগ্রাফি ইমপোর্ট করেছিল ফের তাকে নিষিদ্ধ করার আইনটিও।  সিকিভাগ রেনেসঁসের কৃপায় বাঙালির শব্দ ও তার অর্থ মেট্রপলিস গিল্টি পায় এবং বাংলা শব্দ ক্ৰমে 'নান্দনিক' হয়ে ওঠে।  বেশি নয়, উনিশ শতকীয় সহজ সরল শব্দ 'মাগী' কীভাবে কালক্রমে নিছক অবজ্ঞা, হীনতা ও খিস্তির রূপ পরিগ্রহ করল সেটি ঠিকঠাক গবেষিত হলে বাঙালি কৌমের স্মৃতি বিপর্যয়ের ধন্দটিও ফাঁস হয়ে যাবে।
বৃটিশ হস্তক্ষেপে বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের কর্তৃত্বটি চলে যায় 'ছোটো ইংরেজ', অর্থাৎ হিন্দু সবর্ণদের হাতে।  মানে, বাউন-কায়েত-বদ্যিদের কব্জায়।  ফের রবিবাবু নোবেল পেলে বাঙালি কবিসাহিত্যিকদের কৃশ গাঁড়ে 'বুদ্ধিজীবী'র ঠাপ্পাটাও গেঁথে বসে এবং সবর্ণপুঞ্জের উক্ত চাঙড়টি একটি 'সুবর্ণ মডেল' ধার্য করে বাংলা সাহিত্যের ন্যাড় আটকে দেন।  নিক্তির মাপে, এবং যষ্টির প্রহারযোগে তাঁরা বুঝিয়ে দেন, 'এটা' লিখবে কিন্তু 'ওটা' লিখবে না।  এ-ভাষায় লিখবে, ও-ভাষায় লিখবে না।  প্রেম লিখবে, কিন্তু রতি লিখবে না।  বোঝানো হলো :  জীবন সম্ভোগ মানে পাপ।  যাহা পাপ, তাহা সাহিত্যে বর্জ্যবস্তু।
কিন্তু ইতিহাস নামক গুনিনটি অতিশয় ঘাগু।  সে ওই ধাপকি ধরে ফেলল।  কলকাত্তাই সবর্ণপুঞ্জের সমস্ত গদ ও মালিন্য তথা জরা কালক্রমে ফাঁস হয়ে পড়তে থাকে একশ্রেণীর লেখকদের কাছে। তাঁরা বাংলা সাহিত্যের ওই কলোনিয়াল ভাবকল্পটিকে ক্রমশ ঘৃণিত ও ত্যাজ্য মনে করতে থাকেন।  তাঁরা বিশ্বাস করেন যে জীবন-সম্ভোগ মানে পাপ নয়।  জীবনে যা-কিছু সম্ভোগ, কোনোটাই পাপ নয়।  জীবনকে লেখা পাপ নয়।  সাহিত্যে ভদ্র-অভদ্র, শ্লীল-অশ্লীল, ছাপ্য-অছাপ্য বলে কিছুই হয় না।  সাহিত্যের ভাষা বা বিষয় কারুক্কে শ্লীল বা অশ্লীল করে না।  হিংসা, হত্যা ও রেন্ডিগিরি সমাজের আদিমতম এবং সবচেয়ে জমাটি বৃত্তি।  হিংসা ও হত্যার খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয় বেস্টসেলার ক্রাইম স্টোরি।  কেউ সেটাকে পাপ বলে না।  অশ্লীল বা অভদ্র বলে না।  এক মৈথুন বিষয়ক খুঁটিনাটি লিখলেই কাশীদাসী থানইট পাপবিদ্ধ হয়?
ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের আগে পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য 'পাপ' বা 'অশ্লীলতা'র তোয়াক্কা করেনি।  কারণ তা স্ফুরিত হতো মূলত দেশজ বাঙালি ----- কর্মকার-মালাকার-বৈরাগী-ময়রা-মুচি প্রভৃতির মাধ্যমে, ইংরেজদের জলচোয়া জ্ঞান-যুক্তি-এনলাইটেনমেন্টের আলোয় যাঁরা কখনই আছন্ন হয়নি।  তবু কেন-জানি বাংলায় কামসাহিত্যের আগাগোড়া অভাবই থেকে গেছে।  উনিশ শতকের আগে অব্দি ভারতচন্দ্রের 'বিদ্যাসুন্দর'ই ছিল বাংলা কামসাহিত্যের সম্ভবত একমাত্র, এবং অবশ্যই সর্বাধিক প্রভাবশালী নিদর্শন-গ্রন্থ।  বিদ্যাসুন্দরের জনপ্রিয়তা ছিল গগনস্পর্শী।  অতএব অনুমান করা যেতে পারে বিদ্যাসুন্দরের দেখাদেখি বা তাকে নকল করে বাংলায় সেসময় আরও অনেক বই লেখা হয়ে থাকবে।  কিন্তু সেইসব কাম ও যৌনকেন্দ্রিক তামাম 'অশ্লীল' সাহিত্যকর্মের সঙ্গে, লোকসমাজে প্রচলিত ধাঁধা-কৌতুকী-ছড়া এবং সামাজিক বিশ্বাসের মতই, ব্যবসায়িকতার সরাসরি কোন সম্পর্ক ছিল না বলে সেগুলি তেমন প্রচার পায়নি।  ফলে, সেহেন অজস্র বইয়ের হদিশও লঙ সাহেব বা তাঁর অনুচরের দল পায়নি।  বাংলায় তথাকথিত শিষ্ট সাহিত্যের পাশাপাশি আদিরসাত্মক বা পর্নোগ্রাফিক লেখার ঢল শুরু হয় ছাপা বইয়ের বাজার গড়ে ওঠার পর ----- উনিশ শতকের মাঝামাঝি।
সেসময় দেশীয় উচ্চবর্গের তথাকথিত 'শিষ্ট-ভদ্র' সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকদের হায়রার্কির চোখে বইগুলি 'বিপজ্জনক' প্রতিভাত হয়েছিল।  অর্থাৎ ঘুরেফিরে আবার সেই তথাকথিত ভদ্রপুঞ্জের লোকেদের নিরেট ধাপ্পাবাজির কথাই এসে পড়ে।  যাদের চিরাচরিত আতঙ্ক যে এহেন সাহিত্য অশ্লীল এবং এই অশ্লীলতার টুঁটি টিপে না ধরলে তাদের ভদ্দরপুঞ্জের সাহিত্য কলুষিত হয়ে পড়বে।  ভাষা ও সংস্কৃতির যে স্ট্যান্ডার্ডাইজেশান প্রক্রিয়াটি সেদিন এলিট অভীষ্ট ছিল, সেই কর্তৃত্বের ধারণাটিকেই যেন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল ওইসব বটতলা ও আদিরসাত্মক বইপত্র।  দেশজ ব্রাহ্মণ্য রক্ষণশীলতা এবং ভিক্টরীয় মূল্যবোধ যুগপৎ মিলেমিশে গড়ে তুলেছিল ভাষা-র ভিতর থেকে আদিরসাত্মক অনুষঙ্গ, শরীরী উল্লেখ বর্জন করার এই ক্ষমতা-প্রক্রিয়া।  স্পষ্টতই বটতলার আদিরসত্মক বই ছিল সেই ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতি এক ধরনের অন্তর্ঘাত, বা ঘামলাঘাট।
যৌনতাকে 'অশ্লীলতা'র সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করতে হয়, সাহিত্যে যৌনতাকে কীভাবে আড়ালে-আবডালে রাখতে হয় ---- এর কেরদানি আমরা ইংরেজদের কাছে শিখলাম।  উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালির এই যৌনসংস্কার ও যৌন-অবদমন পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে রাহুর মতো গ্রাস করেছিল।
কামসাহিত্য যদি পাপ হয়, মাঝেমাঝে অমন পাপ করা উচিত।  পুণ্যের মত।  পাপ না করলে পুণ্যের স্বাদ মেলে না।  শুধু কিনারে দাঁড়িয়ে আচমন-মাত্র করে সমুদ্রের স্বাদ পাওয়া অসম্ভব, তাতে নামতে হয়।  বইপাড়া বা বইমেলায় সহজলভ্য যেসব ব্লো-হট উপন্যাস বিকোয় মনোলোভা ব্রেসিয়ারের মোড়কে, সেসব গল্প-আখ্যান আর যাই হোক ---- প্ৰকৃত কামসাহিত্য বা পর্নোগ্রাফি নয়।  তাছাড়া আজকের দিনে ফুটপাথে বস্তা বিছিয়ে যেসব চক্ষুহারী হলুদ বই দেখা যায়, সেগুলিও কাম সাহিত্য নয়।  সেসব ভুল বানান ও প্রমাদ-কণ্টকিত অক্ষরে ছাপা অতি-চটুল পুস্তিকা সমূহ আমাদের অভিনিবেশ দাবি করতে পারে না।  সেগুলিই আসল অশ্লীল বই।  সেগুলিই আসল মল, যা বর্জ্যবস্তু।  আদিরসত্মক ন্যারেটিভ বা পর্নোগ্রাফি ওসব নয়।  সত্যিকারের পর্নোগ্রাফি, যাহা একাধারে কাম ও সাহিত্য, যতই অশ্লীল বা পাপকর্ম হোক, পড়তে হয়।
অথচ বাংলা ভাষায় 'পর্নো' আর 'সাহিত্য' এখনো দু-ফালা বেদানার মত দু সাইডে আরক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।  শরৎচন্দ্র গৃহভৃত্য আর ঝি-এর মশলা-প্লট যদি বা এনেছিলেন, ----- ঝিয়ের সঙ্গে মালিকের গাবগুচিই দেখাতে পারলেন না।  তেমনি, দেওর-বৌদির প্রেম ও যৌন সম্পর্ক যদি-বা 'নষ্টনীড়ে' একটু-আধটু এল ---- কিন্তু বড্ড মিউমিউ করে।  পরবর্তীকালে সুপারহিট সুড়সুড়িবাজ নিমে ভটচাজও বউদিকে শাড়ি-ব্লাউজের ওপাশেই রেখে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।  এমনকি, ---- বন্ধুর মা, মাতৃসমা নারী,  নয়নের সঙ্গে গোপালদেবের যৌনসম্পর্কও এনেছেন অসীম রায়, কিন্তু  সেখানেও 'অত হামলিয়ে আদর করিস নে, ওটা টেঁকে না' বলে শাড়ি জড়িয়ে ফেলেছে নয়ন।  ঝিয়ের সঙ্গে গৃহকর্তার গাবগুচির গল্প লিখেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ('মাঝের দরজা'), কিন্তু সেখানেও কন্ট্রাসেপ্টিভ লাগাবার পর মশারির অন্দরে অন্ধকার ঘনাইয়া আসে। 
এ কথা ঠিক যে প্রথম শ্রেণীর উচ্চাঙ্গ দেহব্রতী উপন্যাস রচনার চেষ্টা ---- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'চতুস্কোণ', সমরেশ বসুর 'বিবর', কমল চক্রবর্তীর 'ব্রাহ্মণ নবাব', সুবিমল মিশ্রর কতিপয় গ্রন্থ, এমনকি অজিত রায়ের 'যোজন ভাইরাস', 'ঘামলাঘাট' এবং 'খানাখারাব'কে মাথায় রেখেই বলছি ---- বাঙালি লেখকরা খুব-একটা করেননি।  কেননা যৌনতাকে নিয়ে লেখা সবচেয়ে কষ্টকর এবং সে-ক্ষমতার একান্ত অভাব থেকে গেছে তাঁদের মধ্যে।  এছাড়া কৈশোর থেকে কাম ও যৌন বিষয়ে নানারকম অবগুণ্ঠনজনিত বিকৃতি নিয়ে বেড়ে ওঠা বাঙালি লেখকদের মস্তিষ্কের কাছে যৌনতার মতো গম্ভীর বিষয় নিয়ে নিরপেক্ষ রচনা আশাও করা যায় না।
প্রকৃত সত্য হল, বাংলা সাহিত্যে 'পর্নো' আর 'সাহিত্যের' মাঝখানে এখনও সেই নষ্টনীড়ের দেওর-বউদি সম্পর্ক।  দুজনেই দুটি ভিন্-ভিন্ কামরায় শুয়ে কাতরাচ্ছে।  বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যে তাদের ঠাঁই জোটেনি।

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

অজিত রায়

বুদ্ধিজীবী
-------------------


'বুদ্ধিজীবী' কথাটা নিজের ক্ষেত্রে ভারি বকোয়াস আর বাওয়া মনে করি।  এমনিতেও শব্দটা যদৃচ্ছ ইস্তেমালের ফলে ঘষা আধুলি হয়ে গেছে, বাজারে ক্রেডিবিলিটি খুইয়েছে।  আচ্ছা, আপনারাই বলুন, বাঙালি লেখকরা কি প্রকৃতই বুদ্ধিজীবী?  না না, ভুল বললাম।  প্রশ্নটা হল, আমাদের ভাষায় যথার্থ বুদ্ধিজীবী-লেখক আছেন কি?  এদেশে দর্শনের অধ্যাপক মাত্রেই 'দার্শনিক', বিজ্ঞানের গবেষক মানেই 'বৈজ্ঞানিক'।  আর, যে-কোনও কলমচি মাত্রেই বুদ্ধিজীবী।  কিন্তু সেই কলমের সঙ্গে যে প্রতিভা, বোধ, বোধি, প্রজ্ঞা, মেধা, বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা, অন্তর্দৃষ্টি আর সৃজনশীলতার কিঞ্চিৎ রসায়ন থাকা বাঞ্ছণীয় সেটা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই।

'বুদ্ধিজীবী' লুগাতটা যদিও ইংরেজি intellectual শব্দের  বাংলার্থে ইস্তেমাল হয়ে আসছে ঢের দিন থেকে, কিন্তু মোদ্দায় এটি তার যথাযথ সংজ্ঞার্থ নয়।  আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত ইন্টেলেকচুয়াল-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিশেবে ' বিজ্ঞজন' ও 'প্রাজ্ঞ' শব্দ দুটির তরফদারি করবেন।  কিন্তু স্যার, ভেবে দেখুন, intellection নামক মনন ক্রিয়াটিতে বুদ্ধিরই প্রাথম্য বিদ্যমান।  বিদ্যাচর্চা যদিও এর আবশ্যিক অঙ্গ, তথাপি ভিত্তি নয়।  প্রজ্ঞা অবশ্যই লভ্য।  তবে একজন ইন্টেলেকচুয়াল সঠিক অর্থে savant বা sage না-ও হতে পারেন।  সেজন্যই বলছি, বুদ্ধিজীবীর বঙ্গীয় অর্থে বিজ্ঞজন বা প্রাজ্ঞ প্রযোজ্য নয়।

উনিশ শতকের পরিশিষ্টে একটি উক্তি নিয়ে বঙ্কিম আর রবিবাবুর মধ্যে তুমুল কাজিয়া বেধেছিল, যা ছিল বাস্তবত ইন্টেলিজেশিয়া ও বুদ্ধিবাদের যোধন।  বঙ্কিমবাবু মহাভারতের দোহাই পেড়ে বলেছিলেন, 'প্রাণরক্ষার্থে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ অপরাধ নহে।'  রবিবাবু লাইক দিয়ে কমেন্ট করলেন, 'মিথ্যার বিনিময়ে জীবন রক্ষা পাইলেও তাহাতে সত্যরক্ষা হয় না।'  রবীন্দ্রনাথ তাঁর যৌবনের সন্ধিক্ষণে নিশ্চয়ন্তিকা বুদ্ধি দিয়ে সত্যকে পরখ করতে চেয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাটের সঙ্গে ওই বিতর্কে।

বস্তুত, ইন্টেলিজেন্সিয়া শ্রেণীর মধ্যে তাঁরাই পড়েন যাঁদের কাজ হাতে নয়, মাথা দিয়ে।  যদিও বিগত শতকে এঁরাই ছিলেন বাংলা রেঁনেশসের ক্ষেত্রে বুদ্ধিবাদী, কিন্তু বর্তমানে মার্কসীয় রাজনৈতিক চেতনায় শব্দটি ঘৃণিত।  এঁরা নীতিগতভাবে বিপ্লব ও প্রগতিকে স্বীকার করলেও কার্যত প্রাচীন রক্ষণশীল চেতনাকে  আঁকড়ে ধরে প্রগতিকেই বানচাল করে দেন।  তাই ভারতের নিজভূমিতে কোনো রেঁনেশস হয়নি।

এই ক্যাটাগরির বুদ্ধিজীবীদেরই এখন এদেশে বাড়বাড়ন্ত।  আজকের 'সফল' কবি-লেখক বলতে এঁরাই।  এঁদের আবির্ভাব ঘটেছিল বিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরিজি শিক্ষা ও সংস্কৃতির জলবাতাসে।  এঁরাই আপনার চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শিল্প-সাহিত্যের ধারক ও বাহক বেশে।  এঁদেরি হাতে গোড়াপত্তন ঘটেছিল মনোপলি সাহিত্য প্রতিষ্ঠান আর সাহিত্যের ব্যবসা।  এঁরা সাধারণ পাঠককে একটা নির্দিষ্ট ভাবনাচক্রে (পড়ুন, ঘোরচক্রে) ঘুরপাক খেতে বাধ্য করেছেন।  গভীর কিছু ভাবা থেকে তাঁদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন আর নিজেদের মুনাফার জন্যে একের পর এক সস্তা, গণতোষণকারী ফ্যাদানো গল্প-উপন্যাস সাপ্লাই দিয়ে এসেছেন।  এঁরাই আপনাদের 'মূল'-ধারার 'জনপ্রিয়' লেখক।  আজ যে ত্রিশূলে কন্ডম পুঁতে দিল বলে এত হা-হুতাশ, এবং তার সপক্ষে এমন ফেসবুকিয়া একজোট, এসবই আমরা করছি একটি বেনিয়া  কালচারকে গ্লোরিফাই করে তুলতে।  এতে বাংলা সাহিত্য বা সংস্কৃতির নতুন কোনো উন্মেষ ঘটবে না।

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

অজিত রায়


আমায় ঘিরে যে নদী
-----------------------------------
দামোদর আমার কাছে এক অবসেশন।
ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলার টোরির কাছে সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু খামারপৎ পাহাড় থেকে নির্গত হয়েছে পূর্বভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নদ দামোদর।  যে জলধারাগুলি নেমে এসেছে ঐ পাহাড়ের গা বেয়ে, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় ধারাটির নাম সোনাসাথী।  এই সোনাসাথীই দামোদরের উৎস।  রামগড়ের শ'খানেক কিলোমিটার পশ্চিমে হাজার ফুট উঁচু হাজারিবাগ পাহাড় পেরিয়ে নাম নিয়েছে 'দামোদর' (অনেকের মতে 'দামুণ্ডা' থেকে এসেছে দামোদর নামটি।  জৈন নির্বাণগ্রন্থে বরাকর নদকে বলা হয়েছে 'ঋজুকলা'।  কল্পসূত্রে এই নদই 'উজ্জুবালিয়া'।  বরাকর বা দামোদর নামের উৎস নিয়ে বিতর্কের সমাধান আগেই হয়ে গেছে।  প্রবাদ মতে, 'ক্ষুদে, নোনা, বরাকর ---- এই তিন নিয়ে দামোদর'।  সুতরাং ঋজুকলা, ঋজুপালিকা আর উজ্জুবালিয়া এই দামোদরই।)  রামগড়ের ভুরকুন্ডার কাছে বাঁক নিয়ে রামগড়-হাজারিবাগ রোডের তলা দিয়ে চিত্তরপুর-গোলার দিকে এগিয়ে কিছুটা দূরে এসে বোকারোয় ঢুকে খানিকটা পুরুলিয়া ছুঁয়ে পুনরায় বোকারো মাড়িয়ে ধানবাদের দক্ষিণ সীমান্তে সিন্দ্রির পাশ দিয়ে কালুবাথানের দিকে ছুটে গিয়ে শালতোড়া থানার শিরপুরনামা গ্রামের কাছে বাঁকুড়ায় ঢুকে, ক্রমশ দক্ষিণপূর্ব দিকে শালতোড়া, মেজিয়া, অর্ধগ্রাম, বড়জোড়া, সোনামুখী, পাত্রসায়ের আর ইন্দাস থানার সোমসারে দামোদর বাঁকুড়া জেলা ছেড়ে বর্ধমান জেলায় ঢুকে রায়নগরের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ দু-ভাগ হয়ে একটি ধারা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে তারকেশ্বরের পানে ধেয়ে গেছে, আর অন্য একটি ধারা ৫৬৫ কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে অবশেষে গিয়ে মিশেছে বঙ্গসাগরে।
এই দামোদর আমার কাছে এক অবসেশন।
টোরি থেকে ডিসেরগড় পর্যন্ত দামোদরের উচ্চপ্রবাহ।  বরাকরের সঙ্গম থেকে বর্ধমান শহরের আগে পর্যন্ত মধ্যপ্রবাহ।  এরপর জলের তোড় ক্রমশ কমে গিয়েছে।  অতিকায় দামোদর ধানবাদ জেলার তেলমোচো-পারজুরিয়া-তালগড়িয়া-আমলাবাদ-ভাঁওরা-চাসনালা পেরিয়ে কান্দ্রার কাছে সামান্য বাঁক নিয়ে ক্রমশ সিন্দ্রি-কালিপুর-ঘরবার-বেগুনবাড়ি-দলদলি দিয়ে জেলার দক্ষিণ সীমানা চিহ্নিত করে পাঞ্চেৎ ড্যামে গিয়ে বরাকরের সঙ্গে মিশেছে।  একসময় পুরুলিয়া সদর থেকে ধানবাদ মহকুমাকে বিচ্ছিন্ন করেছিল নদীটি।  এঁকেছিল চাস থানার দক্ষিণ সীমান্ত।  ১৯৫৬-এ চাস থানা ধানবাদের অন্তর্ভুক্ত হলে প্রায় সাড়ে তিন দশক ছিল জেলার প্রাকৃতিক সীমারেখা বিলুপ্ত।  ১৯৯১-এ বোকারো জেলার জন্ম হলে এই নদই পুনরায় বিভাজক-রেখা হয়েছে বোকারো-ধানবাদের মাঝখানে।
     মাইথন আর পাঞ্চেৎ বাঁধ নির্মাণের আগে, অর্থাৎ ১৯৫৬-এর আগে পর্যন্ত, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে, শোকেরই শমন ছিল দামোদর।  আগে বলে নিই, যে জলাধার-দুটির উচ্চার এলো, পাঞ্চেৎ আর মাইথন, সে-দুটোয় বহু রক্ত বহু জ্বালা বহু অভিসম্পাত কবরিত।  কত যে গাঁ আর মন্দির জলের তলায় রয়ে গেছে!  আবার, বাঁধ না হলেও অতিকায় দস্যি দরিয়া শোকেরই সমন ছিল একদা, আকাশে আষাঢ় ছাইলে চরায় টান ধরত নৌকোর, মাঝির।  বছরের পর বছর ভয়াল বিগ্রহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে, দামাল দামুণ্ডা।  যেমন তার দাপ, তদনুগ কলোচ্ছ্বাস!  মাকড়া পাথরের রোড়া-বালি আর বড় বড় চাটান-চেরা খাত, দু'ধারে খাড়াই ডাঙা, অনাবৃত কঠোর শিলাস্তর ফেড়ে করোগেটেড বক্ষঃস্থল, যার ভাঙাভাঙা বেবন্দেজ খোয়াই পাড়ে মাটির গোচর মেলে ক্কচিৎ, কাঁধার জুড়ে কোথাও ছাড়া-ছাড়া প্যাংলা বাদাড়, পুটুশ বনতুলসী আর চোরকাঁটার গোঁফ, কোথাও-বা শাদা দানাদার পাথরের নিরবচ্ছিন্ন দাহাড়।  নারী যেমতি, প্রকৃতি যেরম, দামুণ্ডাও কিছুমাত্র উনিশ নয় তার-চে।  কিন্তু ঐ দাপ, ঐ মস্তি, সবই থেৎলে গেছে এই আগুনডাঙা ধানবাদে উচোট লেগে।  এখন দামুণ্ডা সহ এ টাঁড়ের যাবৎ নদী সম্বৎসর শুকিয়ে, অন্তঃসলিলা , এমনকি বালুকার তলহাটিতে তাদের তোয়প্রবাহ, বড়জোর পায়ের গুলি, মালাইচাকি ডোবে কদাচিৎ।  সেই দফনিত রক্ত ও খেদ মানুষের পিছা না ছাড়ে।
তো, যেটা বলছিলাম।  এই দামোদর আমার কাছে এক অবসেশন।
দাম যার উদরে, আগুনখেকো, বছরের পর বছর ভয়াল মূর্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই বহতা বলশালী বাওলা নদ, ধ্বংস করেছে জনপদ, তছনছ করেছে শস্যসম্পদ।  ১৮৯৮-এর বর্ষায় বন্যা এমন উগ্ররূপ ধারণ করেছিল যে সরকার বাধ্য হয় এ ব্যাপারে নজর দিতে।  অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।  ১৯১৩ আর ১৯৩৫ সালের বন্যায় দামোদর তার ভয়ানকতম রূপটিও দেখিয়ে দেয়।  বর্ধমান জেলার প্রায় অর্ধেক ডুবে গিয়েছিল জলের তলায়।  ১৯৪৩-এর বন্যা ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা।  গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নিমজ্জিত হয়েছিল জলের তলায়, রেল লাইনগুলি ঠাহর করা দুষ্কর হয়ে উঠেছিল।  কলকাতার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়েছিল।  দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সেই জরুরি মুহূর্তে এহেন দুর্বিপাকে স্বভাবতই চিন্তিত করে তুলেছিল সরকারকে।  সেই প্রথম সত্যিকার অর্থে টনক নড়ে সরকারের।  বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিক ড. মেঘনাদ সাহার সুপারিশে ১৯৪৩ সনেই আমেরিকা থেকে ডেকে আনা হলো টেনেসি ভ্যালি অথরিটির ইঞ্জিনিয়ার ডব্লিউ এল ভরডুইনকে।  ১৯৪৫সালে ভরডুইন নিজের রিপোর্টের মাধ্যমে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ সহ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরামর্শ দেন।  পরিকল্পনাটি ইংরেজ সরকারের মনে ধরেছিল।  কিন্তু বাস্তবায়ন হতে হতে ইংরেজ ভারত ছেড়ে চলে যায়।  ১৯৪৮-এর ৭ জুলাই আমেরিকা টেনেসি ভ্যালির ধাঁচে গঠিত হয় 'দামোদর ভ্যালি করপোরেশন'।  এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী চারটি বাঁধ দিয়ে ডি ভি সি বেঁধে ফেলে ৫৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দামাল নদ দামোদরকে।  বাঁধগুলি হলো তিলাইয়া ও মাইথনে বরাকর নদে, কোনারে কোনার এবং পাঞ্চেতে মূল দামোদর নদে।
এই দামোদর আমার কাছে এক অবসেশন।
বিরসা সেতুর কাঁখ বেয়ে কলকল বহে চলেছে দামোদর।  দু-কূলে এলায়িত বালুস্তূপের মধ্যে, তরল রজতরেখার সদৃশ।  বালির পর খাদ-প্রমাণ পাথুরে বাদাঁড়, বনতুলসীর ঝোপ।  পাখিদের জেগে ওঠা, গাছে-বেগাছে।  ঐ মহুলবনি ঘাট।  ঐ চেলেমার পাড়।  মাঝি-মাল্লাদের জটলা-করা অনেককটি নৌকো।  বালির পাড়ে খালুই, ফেটাজাল, খেপলা, চুপড়ি।  হাঁড়িয়ার তিতিল।  তীরে ফের বুনো ঝোপ, আলকুশি, সিয়াকুলের ঝাঁকা।  গাছে গাছে তিতির বটের ভারুই ঘুঘু সিপাহি বুলবুল।  পেয়ারা গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে গিরগিটি মোল্লার ঠায় বুকডন।  কোথাও ক্কচিৎ বুনো হনুমান দাঁত খিঁচিয়ে দিল।  হ্যা-হ্যা কুকুর খৈনি চেয়ে লালা ঝরাল।
এই দামোদর, আমার একটা অবসেশন।
দামোদরের কাছে এসে দাঁড়ালেই এমন।  পৃথিবীর থ্রি-ফোর্থ আঁধার ও উত্তেজনা এখানে।  কলকল কলকল।  অবিরত কলকল।  তিন হাজার ফুট খামারপত শৈল থেকে আছাড় খেয়ে, দাম যার উদরে, আগুনখেকো, বহতা বলশালী বাওলা  নদ, রামগড়-হাজারিবাগ-চিত্তরপুর-গোলা-বোকারা-পুরুলিয়া মাড়িয়ে শুধু যে আমারই জন্য।  যাবে সে শিরপুরনামা গাঁয়ের মাজা বেড়িয়ে শালতোড়া, মেজিয়ার পাড়ে আমাদের দেশের বাড়ি ভুলুই।  তারপর সেথায় খানিক নিদিয়ে সে ফের ধাইবে বড়জোড়া, সোনামুখী, পাত্রসায়ের, ইন্দাস থানার সোমসার হয়ে রায়নগরের সন্নিকটে, তদুপরি দু-বেণীতে ক্ষীণ হয়ে দ্বারকেশ কিম্বা বঙ্গসাগর।  আমি যে সেই বঙ্গসাগর ছুঁয়ে আছি ফের দ্বারকেশও।  ছুঁয়ে আছি ভুলুই, জগৎরাম, রামপ্রসাদ!!
ঝাড়খণ্ডের নদী তথা  নদী-উৎসের কথা বলতে গেলে প্রাগেতিহাসের প্রসঙ্গ আসে।  পনেরো-বিশ কোটি বছর আগেকার প্রাক-টার্সিয়ারি ভূ-দৃশ্য কল্পনা করা আজকের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।  ভাবলে কল্পকথা মনে হয়, একসময় আমাদের গোটা ভূখণ্ড জমাট বেঁধে একটি বৃহৎ মহাদেশ রূপে অবস্থান করত।  প্রায় উনিশ কোটি তিরিশ লক্ষ বছর আগে সেই অখণ্ড মহাদ্বীপ বিভিন্ন অংশে ভেঙে গিয়ে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।  ছোটনাগপুর মালভূমির অংশটিও প্রাগুক্ত মূল বৃহৎ ভূখণ্ডের দক্ষিণ ভাগ (গন্ডোয়ানা ল্যান্ড) থেকে আলাদা হয়ে ক্রমশ উত্তর দিকে চালিত হয়ে আজকের অবস্থানে চলে আসে।  ওই সময়েই জন্ম নেয় মৌসুমী বায়ুপ্রবাহ।  এই বায়ু থেকে যে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তারই জেরে জন্ম নেয় অসংখ্য নদী।  তাদের মধ্যে অন্যতম হলো আজকের দামোদর, সূবর্ণরেখা, উত্তর ও দক্ষিণ কোয়েল।
ছোটনাগপুর বা ঝাড়খণ্ডের নদীগুলির তোয়প্রবাহ অনুধাবন করলে বিশাল গাছের ডালপালার মত এক চমৎকার কেন্দ্রবিমুখ নদীব্যবস্থার ছবি ফুটে ওঠে, যে বৈচিত্র্য পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।  প্রায় একই উৎস থেকে জন্ম-পরিগ্রহ করেও উত্তর কোয়েল ছুটেছে উত্তরের শোন নদের পানে, দক্ষিণ কোয়েল ধেয়ে গেছে আরও দক্ষিণের দিকে, দক্ষিণ-পূর্বগামী সুবর্ণরেখা বয়েছে বঙ্গোপসাগরে মেশার তরে আর দামোদর চ্যুতি-উপত্যকার মধ্য দিয়ে ধেয়েছে পুবে ভাগীরথীর খোঁজে।  ছোটখাটো উপনদীগুলিরও এরকম ছন্নছাড়া গতিধারা।  সামগ্রিকতায় বৃক্ষরূপী নদীব্যবস্থা।  সবগুলিই বয়ে চলেছে ভূমির প্রকৃতি অর্থাৎ ধাপগত সাযুজ্য মেনে।  একা দামোদরই অতিক্রম করেছে তিনটি অসমান ধাপ।  এক-একটি ধাপ অন্য ধাপ থেকে ঝাঁপিয়ে দিয়েছে হঠাৎ-হঠাৎই।  এই আকস্মিক লাফঝাঁপ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামলাতে পারেনি দামোদর, ফলত তৈরি হয়েছে জলপ্রপাত।  হুড্রু, জোনহা, দুমারগারহি, দশম ইত্যাদির পেছনে একই কাহিনী।  ধানবাদ শহরের সন্নিকটে, প্রায় ৪৫ কিমি দূরে দামোদরের কোল থেকে খসে পড়া এমনি একটি জলপ্রপাতের হদিশ মেলে গিরিডি জেলার উশ্রীতে।  আরও একটি ছোট্টো প্রপাত রয়েছে ভাটিন্ডায়।
ধানবাদের কথাই বলি।  এখানকার বড়-ছোট সমস্ত নদীর জন্ম যেহেতু বৃষ্টিপাত থেকে, সুতরাং নদীগুলির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো সম্বৎসর জল না থাকা।  বেশির ভাগ নদীই অন্তঃসলিলা এবং বালুকার তলহাটিতে উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণপূর্ব অভিমুখে তাদের তোয়প্রবাহ।  ভীষণ বর্ষায় কিছুদিনের জন্যে নাব্য হয়ে উঠলেও, অধিকাংশ নদীর খাতগুলি গ্রীষ্মে তো বটেই, শীতকালেও প্রায়শ শুকনো থাকে।  দুটি পুরুষ নদ ও একটি নারী নদী পরিক্রমা করেছে ধানবাদকে।  এ-বাদে আরও তিন-চারটি ছোট নদী রয়েছে এই জেলার বুকে।  উলঙ্গ, কঠিন শিলার চাটান ব্যতিরেকে, সাধারণত নদীগুলি বয়েছে গভীর খাতের ভিতর দিয়ে।  খাতে-খাতে নুড়িবলি, বড় বড় পাথুরে চাঁই, দু'পাশে খাড়াই পাড়, অনাবৃত কঠোর শিলাস্তর কেটে রচিত হয়েছে সুগভীর নদীবক্ষ।  চাটানের পাড়ে মাটির দেখা মেলে ক্কচিৎ।  তটভূমি জুড়ে কোথাও ছাড়াছাড়া শীর্ণ জঙ্গল, আগাছা আর বনতুলসীর এলাহি ঝোপ; কোথাও-বা স্ফটিকের মতো শাদা দানাদার পাথর।  বালির প্রান্তর, ধূ ধূ।  বালি ফুরিয়ে ফের এবড়ো-খেবড়ো রুখু জমি, ধূসর গাছপাথর।  ধুলো ক্ৰমে কালো রঙ ধরে দিগন্তে হাপিশ।
ছোটনাগপুরের পালামৌ জেলার টোরির কাছে সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু খামারপৎ পাহাড় থেকে নির্গত হয়েছে দামোদর।  এই নদটির কথা বিশদে বলেছি এর আগের পোস্টে।  আজ বলব বরাকর এবং ডি ভি সির বাঁধগুলোর কথা।  ১৯৫৬ সালে দামোদরের ওপর রূপ পেয়েছে ১৩৪ ফুট উঁচু আর ২২১৫৫ ফুট লম্বা পাঞ্চেত ড্যাম ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে।  এটি ডিভিসির বৃহত্তম প্রকল্প।  ১২১৪০০০০ একর ফুট জল ধরে রাখার ক্ষমতা এই জলাধারের।  ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে এর হাইডেল পাওয়ার স্টেশনে।  আজ যেখানে এই পাঞ্চেত ড্যাম, ইতিহাসে তার নাম পঞ্চকোট পাহাড়।  পাঁচটি পাহাড়ের সমাহার ঘটেছে এই পাহাড়ে।  সুদূর অতীতে উঁচু মালভুমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এখানকার মাটি পাহাড়ের চেহারা নিয়েছে।  ধানবাদের দক্ষিণ-পূর্ব এবং পুরুলিয়ার উত্তর-পূর্ব কোণে চুরাশি পরগনায় বিরাজমান এই পাহাড়টি কামথি বেলেপাথরে তৈরি।  পাহাড়টি আকারে দীর্ঘ, শৈলশিরায় দাগ কাটাকাটা, শীর্ষে গিয়ে মিশেছে পূর্বান্তে।  ছোট ছোট ঘন জঙ্গলে ঢাকা উত্তুঙ্গ খাড়াই, মানুষ ও পথচারী ভারবাহী পশুর পক্ষে গম্য হলেও, ঢাকাওলা শকটের পক্ষে দুর্গম।  পাহাড়টি লাগাতার বাঁকুড়ার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিহারীনাথ পর্বতমালার সঙ্গে মিশে গিয়েছে।  বিহারীনাথ পাঞ্চেতেরই একটি শৃঙ্গ।  দামোদর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বয়েছে, তারই দু-তিন মাইল দূরে গিয়ে শালতোড়া থানার কাছে বিহারীনাথ সহসা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।  শালতোড়ায় শুশুনিয়া আর অন্যান্য পাহাড়েরও জমঘট হয়েছে।  তাদের মধ্যে মেজিয়া পাহাড়ের নাম উল্লেখযোগ্য।  সমস্ত পাহাড়ই পাঞ্চেতের জাতভাই।
দামাল দামোদর গিয়ে ঢুকেছে পাঞ্চেত পাহাড়ের বিরাট জলাধারের ভেতর।  এই জলাধারেই এসে মিশেছে বরাকর।  আর এখানেই সঙ্গম ঘটেছে ধানবাদ, পুরুলিয়া আর বর্ধমানের।  জলাধারের সীমান্তে গোয়াই নদীর অনেকটা পুরুলিয়ায় ঢোকা, খানিকটা বোকারোয়।  পাঞ্চেত পাহাড়ের পুব দিকে দামোদর বেঁকে গিয়েছে।  পাহাড়ের দু-দিক থেকে দুটি নদী এসে মিলেছে।  পশ্চিম থেকে এসেছে উতলা নদী আর পুব থেকে বিসরামঝোর।  পাঞ্চেতের উত্তরে ধাঙ্গি পাহাড়।  পাঞ্চেত থেকে দূরহত পাহাড়ের পনেরো-বিশ কিমি দক্ষিণে দ্বারকেশ্বর-দামোদর বিভাজিকা।  বর্ধমানের গা-ছোঁয়া বাঁকুড়ার সমতলভূমি জেলার মাঝ-বরাবর এসে উঁচু-নিচু গড়ন পেয়ে পশ্চিমে টিলা পাহাড় আর শৈলশিরায় রূপান্তরিত।  সেই পাহাড় প্রান্তর ক্ৰমে ধানবাদ ছুঁয়ে মিশে গেছে রাঁচির পাহাড়ে।  ভাষান্তরে, রাঁচির মালভুমি, পুরুলিয়া-বোকারোর বুকে চড়ে ধানবাদ মাড়িয়ে উঠেছে বাঁকুড়ার মাথায়।  মাটির ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেছে দক্ষিণ রাঢ়ের আসানসোল-রানীগঞ্জের পাহাড়ি এলাকায়, বাঁকুড়ার শুশুনিয়া-বিহারীনাথ শৈলভূমে।
দ্বাদশ শতকে রাজন্যপোষিত কবি সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর 'রামচরিত' কাব্যে লিখেছেন দামোদর তটবর্তী তেলকুপি গ্রামটি ছিল শিখর রাজাদের রাজধানী।  অর্থাৎ আজ যে জায়গাটি পাঞ্চেত জলাধারে নিমজ্জিত, সেটি ছিল শিখরভূম রাজ্যের অংশ।  অবশ্য আইন-ই-আকবরীতে শেরগড় পরগনাকেই বলা হয়েছে শিখরভূম, যা ছিল বর্ধমানের দামোদর-অজয়ের সংযোগস্থল।  যা হোক, ১৯৫৬ সালে পাঞ্চেত ড্যাম তৈরির সময় তেলকুপির বেশ কিছু প্রসিদ্ধ মন্দির জলের তলায় চলে যায়।  তলিয়ে যায় বহু শাক্ত-শৈব-জৈন সৌধ মূর্তি।  এছাড়া বেশ কিছু গ্রামও জলে ডুবে চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।  যে-কারণে বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষজন বেশ মারমুখী সংগ্রাম চালিয়েছিলেন।  সেই আন্দোলনের ছবি ধরা হয়েছে আমার যন্ত্রস্থ উপন্যাস 'দামুণ্ডাচরের কালিখপুরাণে'।  পাঞ্চেত পাহাড়ের পাদদেশে পঞ্চকোট রাজাদের প্রাচীন গড় আর রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে আজও।  ভাঙাচোরা কিছু মন্দিরও।  অন্যান্য পাহাড়ের চূড়াও দেখা যায় এখন থেকে।  একটি শিখরের নাম 'ঘাতক পাহাড়'।  জনশ্রুতি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের ওই পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে মেরে ফেলা হতো।
বরাকর দামোদরের ভাই।  তারও উৎস হাজারিবাগ পাহাড়।  জাতীয় সড়ক ২, ৩১ ও ৩৩-এর সংযোগস্থল বিরহী থেকে আঠারো কিমি দূরে বরাকর নদে ডিভিসির প্রথম প্রকল্প তিলাইয়া বাঁধ।  কোডরমা স্টেশন থেকে উনিশ কিমি।  ১২০০ ফুট দীর্ঘ এবং ৯৯ ফুট উঁচু এই বাঁধে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিরহী ছাড়িয়ে হাজারিবাগ রোড ক্রস করে বরাকর পিরটাঁড়ের দিকে এগিয়েছে অত্যন্ত শ্লথ গতিতে।  ধানবাদ জেলার উত্তর সীমান্ত শিখর ছুঁয়েছে সারা বা নওয়াটাঁড়ের কাছে।  তারপর পঞ্চাশ মাইলেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ধানবাদ-গিরিডি, ধানবাদ-সাঁওতাল পরগনা এবং ধানবাদ-বর্ধমানের সীমারেখা চিহ্নিত করে পাঞ্চেতে ঝাঁপ দিয়েছে দামোদরের বুকে।  গিরিডির সীমান্তে উশ্রী নদী এসে বরাকরকে দিয়েছে গতি।  তারপর টুন্ডি, পানড্রা, মাইথন, চিরকুন্ডা হয়ে বরাকর ছুটেছে পাঞ্চেত অভিমুখে।  ধানবাদ শহর থেকে ৫০ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড-পশ্চিমবঙ্গ বর্ডারে মাইথনে এই বরাকর নদের ওপর বাঁধা হয়েছে ১৫৭১২ ফুট লম্বা আর ১৬৫ ফুট উঁচু ডিভিসির অন্যতম প্রধান বাঁধ মাইথন ড্যাম।  সাবেক সালানপুর গ্রামের অর্ধেকটা হয়েছে আজকের মাইথন।  পর্যটকদের পাঞ্চেতের চেয়ে বেশি টানে মাইথন।  সত্যিই রমণীয় বাঁধটি।  বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে একপাশে চোখে পড়ে দু-পাশে বিস্তীর্ণ বালুকাস্তূপের মধ্যে তরল রজতের মত অতিকায় বরাকর।  অন্যপাশে দেড়শো ফুট নিচে খাদ-প্ৰমাণ জঙ্গল ও পাথুরে জমি।  বাঁধের নিচে ৬০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ তৈরির হাইডেল পাওয়ার স্টেশন।  পাহাড়ের গভ্যন্তরে ১৩৫ ফুট গভীর এই প্রকল্প।  এছাড়া রয়েছে ডিয়ার পার্ক, আর শীতের দিনে উড়ে এসে জুড়ে বসা হরেক রকম পাখিদের স্যাঙ্কচুয়ারি।  এখানকার আরেকটি আকর্ষণ বরাকর-দেন্দুয়া ভায়া মাইথন সড়কে হ্যাংলা পাহাড়ের গায়ে পাঁচশো বছর পুরনো কল্যাণেশ্বরী মাতার মন্দির।  শোনা যায়, কুষাণদের তাড়া খেয়ে হরিগুপ্ত পালিয়ে এই পাহাড়ে আশ্রয় নেন।  এখানে তিনি রাজ্য গড়ে তোলেন।  মন্দিরটিও তাঁর তৈরি।  কৃত্রিম গুহার দ্বারে অষ্টধাতুর প্রতিমা, অন্দরে সোনার তৈরি দেবীর মূল বিগ্রহ।  মন্দিরের উত্তরে স্রোতস্বিনী চালনা বা চাল্লাদহের পাড়ে দেবী কল্যাণেশ্বরী বা শ্যামা যেখানে শাঁখা পরেন তারই স্মৃতিতে তৈরি হয়েছে বিখ্যাত মন্দির।  পঞ্চকোটের মহারাজা কল্যাণ শেখর আনুমানিক ১২১৫ শকে সেনবংশের কুলদেবী শ্যামারূপাকে এনে শ্রীশ্রীকল্যাণেশ্বরী নামে এই অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা ত্রিপুরী দেবীর মূর্তিটি প্ৰতিষ্ঠা করেছিলেন।  মায়ের পদচিহ্নও রয়েছে পাষাণবেদিতে।  আর আছে চতুর্দশ শিবমন্দির।  শীতলা মায়ের থানে মনস্কামনা পূরণার্থে ঢিল বাঁধার প্রথা আছে।  এ-বাদে নতুন তৈরি হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির।  'মায়ের স্থান' বলেই তিন বর্গ কিমি জুড়ে তৈরি টাউনের নাম মাইথন।