স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক








বাঘের খোঁজে বান্ধবগড়ে


এই গরমে কেউ জঙ্গলে যায় ? মানে জুন মাসের গরমে লোকে পাহাড়ে যেতে  পারে, সমুদ্রে যেতে পারে, নদীর ধারেও যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে জঙ্গলে ! পাগল না মাথা খারাপ !
জুনের শুরুতে আমাদের মধ্যপ্রদেশ যাবার খবরটা শুনে নানাজনের প্রায় এরকমই প্রতিক্রিয়া ছিল । তা আমরাও আমাদের সিদ্ধান্তে অনড়। মধ্যপ্রদেশেই যাব, তাও আবার এই জুন মাসেই। কারণ ? কারণ আর কিছুই না, দেশের বিভিন্ন জঙ্গল ঘুরে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে যে জঙ্গলে এসে জানোয়ার দেখতে হলে কিন্তু ভরা গরমেই আসতে হবে। যত বেশী গরম পড়বে তত জলের সোর্স কমবে। আর জলের সোর্স কমলে তবে না ভিভিআইপি জানোয়াররা জলাশয়ের আশেপাশে দর্শন দেবেন। তাই হিংস্র জন্তু জানোয়ার, বা সোজা বাংলায় বললে বাঘ দেখতে গেলে এই গরমেই যেতে হবে। হুঁ হুঁ বাবা, কষ্ট না করলে তো কেষ্ট মিলবে না। 
যাই হোক তল্পিতল্পা গুছিয়ে একদিন দুপুরে উঠে পড়লাম শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে।


একটা গোটা দিন ট্রেনে করে চলার পর অবশেষে পরেরদিন দুপুরে কাটনি স্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট গাড়ীতে করে রওনা দিলাম বান্ধবগড়ের জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। প্রায় দুঘণ্টা যাত্রাপথের আদ্ধেক রাস্তা পেরিয়ে যাবার পরেই চারপাশে জঙ্গলের রাস্তা শুরু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম, কিছুটা মাঠ আর তারপরেই আবার গাছের সারি। যদিও আসল জঙ্গল থেকে এখনো অনেকটাই দূরে আমরা তবু চারপাশে গাছের আধিক্য অমন কাঠফাটা  রোদেও চোখকে আরাম দেয়। জঙ্গলের বেশ কাছাকাছি এসে গেলে শুরু হয় লাল ধুলো। কিছুটা অংশে তো ধুলোর জন্য তো প্রায় রাস্তাই দেখা যায় না। একদম ফাঁকা এই রাস্তাটা। এতক্ষণ তবু মাঝে মধ্যে মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকটায় তাও নেই। যাই হোক অবশেষে বান্ধবগড়ে প্রবেশ করা গেল। ছোট্ট একটা টাউন, গুটিকয়েক টিমটিম করা দোকান, মনিহারি থেকে ওষুধপত্র বা হ্যান্ডলুম কিংবা স্থানীয় হস্তশিল্প সবকিছুরই দোকান রয়েছে। একটি গ্রামীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, অল্প কিছু পাকা বাড়ী আর তারপরেই শুরু হচ্ছে হোটেল আর জাঙ্গল রিসর্টের লাইন। এখানে প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেশী হাঁটাহাঁটি করতে বারণ করে। পুরো জায়গাটাই তো জঙ্গলে ঘেরা। আমাদের বুকিং ছিল সরকারী ফরেস্ট লজেই। কেন না আগে থেকেই জানা ছিল এটাই একমাত্র জঙ্গলের প্রায় ভেতরে। বাকি সব হোটেল জঙ্গল থেকে একটু দূরে।

“হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজ” এর মেন গেট দিয়ে ঢুকতেই একটা বিরাট বড় সাদা বাঘের ছবি দেখে অত গরমে আর ক্লান্তিতেও মনটা খুশী হয়ে গেল। ঢুকেই অফিসঘরে বসে খানিক বিশ্রাম করে নিলাম সকলে। অফিসঘরের লাগোয়া একটা বিরাট ডাইনিং হল রয়েছে দেখেই খিদে পেয়ে গেল ভীষণরকম। সেই কোন সকালে ট্রেনে ব্রেকফাস্ট করেছি। ম্যানেজার ভারী অতিথিপরায়ন মানুষ। আমাদের নানা ব্যাপারে নিজেই জানালেন আর এও বললেন, ‘একদম ঠিক সময়ে এসেছেন আপনারা। এই সময় ভিড় থাকে না একদম। খুব কম লোকে এত গরমে আসে। কিন্তু যারা  আসে তারা সত্যি জঙ্গলপ্রেমী বলেই আসে। বাঘ পাবেনই, ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।’
রুম পেয়েই সবাই মিলে দৌড় লাগালাম চান করতে। পেটে তখন তিন চারটে ছুঁচো একসঙ্গে লাফাচ্ছে।

অফিস থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা উঠে একটা বারান্দায় পড়তে হয়। খোলা আকাশের নিচে প্রচুর গাছগাছালিতে ঘেরা মাচার মতো টানা বারান্দা চলে গেছে বিভিন্ন ঘরের সামনে। লজের পাঁচিলের ওধারেই জঙ্গল। কিংবা বলা যায় জঙ্গলের কিছুটা অংশ এই লজের মধ্যেই চলে এসেছে। গাছগুলোয় ভর্তি পাখি, আর কয়েকটা ঘরের টিনের চালের ওপর হনুমানের দল আমাদের যেভাবে বন্য অভ্যর্থনা জানালো তাতে প্রথমটা একটু ঘাবড়েই গেছিলাম। হোটেলের কর্মচারী অবশ্য বললো হাতে খাবার জিনিস না থাকলে ওরা কিছু করবে না। এখানে ওরা হামেশাই আসে। সবুজ রেলিংওয়ালা লম্বা বারান্দা ধরে হেঁটে হেঁটে ডানদিক বাঁদিক ঘুরে অবশেষে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছলাম।
বেশ বড় ঘরে প্রথমেই যেটা চোখে পড়বে সেটা হল  উল্টোদিকের দেয়াল জুড়ে একটা বিরাট কাঁচের জানলা। জানলা না বলে কাঁচের দেয়াল বলাই ভাল। আর জানলার ওপাশেই এক টুকরো জঙ্গল। যদিও পরে জেনেছিলাম ওটা হোটেলের বাউন্ডারি ওয়ালের মধ্যেই, তবু তাতে ওই জঙ্গলের অনুভূতিটা যায় না। আর এটা আরো বেশী করে বুঝলাম রাতে খেয়ে ফেরার সময়।
দুপুরে সাদা ভাতের সঙ্গে উত্তর ভারতীয় আমিষ ও নিরামিষ খাবার ছিল। সঙ্গে রায়তা। সেটা গরমের কারণেই। রাতে মিলল রুটি/ভাত, কষা আলুরদম, পনির বাটার মসালা আর আমিষে চিকেন কষা। সঙ্গে পায়েস, যাকে ওরা ক্ষীর বলে। তবে বাঙালী পায়েসের মতো অত মিষ্টি নয়। এলাহি খাওয়াদাওয়া সেরে যখন বারান্দা ধরে হেঁটে আসছি তখন টিমটিমে আলোয় আসেপাশের গাছগুলোকে দেখে কেমন একটা গা ছমছম করে উঠলো। সঙ্গে দূর থেকে ভেসে এলো কোন এক অজানা জন্তুর ডাক। মনে হলো এক ছুটে ঘরে চলে যাই। সারাদিন অত গরম থাকা সত্বেও রাতে জঙ্গলের ভেতরে কিন্তু কেমন একটা হাল্কা শিরশিরে হাওয়া দেয়। এখানে রাতের খাওয়াদাওয়া সারা হয় খুব তাড়াতাড়ি। কেননা ভোরে সাফারি যাবার জন্য উঠতে হয় বোর্ডারদের। আমরাও তাই প্রায় কলকাতার “ভর সন্ধ্যেবেলায় ”, মানে ন’টার সময় ডিনার সেরে গুটিগুটি ঘরের দিকে এগোলাম। পরেরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় সাফারি শুরু।   

  
গরম যতই প্রবল হোক জুন মাসের ভোরেও জঙ্গলে হালকা একটা ঠাণ্ডা ভাব থাকে। দু’দিন থাকবো আমরা। সেই দু’দিনের তিন বেলাই সাফারি বুক করা রয়েছে। বান্ধবগড়ের জঙ্গলকে তিনটে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, টালা, মগধি ও খিটৌলি। এর মধ্যে আবার সাব জোন আছে। প্রত্যেক জিপসিকে নির্দিষ্ট সাবজোন দিয়ে দেওয়া হয়। তার বাইরে তারা যেতে পারে না। প্রথম দিনে আমরা টালা জোনের টিকিট কেটেছিলাম। টালা হলো জঙ্গলের মূল অংশ। যদিও কোর এরিয়ায় সাধারণ পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হয় না, তবু বাঘের সাইটিং-এর জন্য টালা জোন বিখ্যাত। হুডখোলা জিপসি করে জঙ্গলের রাস্তায় যেতে যেতে হরিণ, বুনো শুয়োর, বনবিড়াল, ময়ূর, নানারকম পাখি দেখে ফেললাম কিন্তু তেনার আর দেখা নেই। পায়ের ছাপ দেখা গেল অনেক জায়গায়। সেই ছাপ ফলো করে গিয়েও কিছু মিললো না। এখানে এসে একটা জিনিস জানলাম যে বাঘকে হিন্দীতে কিন্তু বাঘই বলে। আমরা অনেকেই জানি বাঘ হলো শের। কিন্তু গাইড ভদ্রলোক জানালেন শের হলো সিংহ আর বাঘ হলো বাঘ।
জানোয়ারের খোঁজে এসে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম সেটা আগে বলি। চলতে চলতে এক জায়গায় পৌঁছে কেমন যেন অন্যরকম লাগল। এত খালি খালি কেন ? অনেকটা জায়গা জুড়ে কেমন যেন শুকনো বর্ণহীন বনভূমি, আর অস্বাভাবিক নিঝুম একটা ভাব। এতক্ষণ পাখির ডাক, বাঁদরের আওয়াজ কানে আসছিল। এখানে সেসব কিছুই নেই। চমকে তাকিয়ে দেখলাম পরপর সারি দিয়ে গাছেদের মৃতদেহ দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুধু কাণ্ডটাই রয়েছে কালো হয়ে, ওপরের অংশ পুরোটাই জ্বলে শেষ হয়ে গিয়েছে। গাইড বললেন প্রতিবছর ফরেস্ট ফায়ারে জঙ্গলের একটা অংশ এভাবে পুড়ে যায়। গরম আর শুকনো হাওয়ায় নাকি আপনিই জঙ্গলে আগুন ধরে যায়, আর তারপর তা ছড়িয়ে যায় মাইলের পর মাইল জুড়ে। ওদের কাছে বোধহয় খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, আমার কিন্তু ভয়ঙ্কর লাগলো দেখতে। প্রকৃতি এমন নিষ্ঠুর কেন ? এত এত পূর্ণবয়স্ক প্রাণকে এভাবে অকারণে নষ্ট করে কেন ? কেমন যেন একটা মৃতনগরী হয়ে রয়েছে জায়গাটা। একটাও আওয়াজ নেই। গাইড বললেন এদিকে কোন জানোয়ারও পারতপক্ষে আসে না। প্রায় এক দেড় কিলোমিটার জায়গা জুড়ে চললো পোড়া গাছেদের সেই অসহনীয় দৃশ্য। শেষে গিয়ে এক জায়গায় গাইড দেখালেন রাস্তা কাটা রয়েছে। বেশ কিছুটা জ্বালাবার পর যখন আগুনের তেজ একটু কমে তখন এভাবে রাস্তার মধ্যে পরিখা কেটে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে আরও একটা অদ্ভুত কথা বললেন তিনি। বোধহয় আমাদের মুখ দেখে বুঝেছিলেন এত পোড়া গাছ দেখে আমাদের মনের অবস্থা কি, বললেন, ‘ফরেস্ট ফায়ার কিন্তু একদিকে জঙ্গলের ভাল করে। আগুন লাগলে পুরনো শুকনো গাছ মরে গিয়ে জঙ্গল নতুন হয়। কোন বছর যদি আগুন না লাগে তাহলে জঙ্গলের সবুজ ভাব কমে যায়।’ সত্যি ! কি অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর, আগুনে পুড়ে সবকিছু শুদ্ধ হয়, এমন কি নতুন প্রাণের জন্মও হয়।
সাড়ে পাঁচটায় শুরু করে মাঝে দশ মিনিটের ব্রেক নিয়ে সাড়ে আটটা অবধি ঘুরেও বড়মিঞার দেখা পাওয়া গেল না। সবাই যখন হতাশ হয়ে পড়েছি, ক্যামেরা আর দুরবীনগুলো যখন হলুদ কালো খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত তখন একটা কাণ্ড ঘটলো। জঙ্গলের রাস্তা খুব এবড়োখেবড়ো, সাধারণ গাড়ী সেখানে চলতে পারবে না। জিপসিতে বসে যেভাবে আমরা আন্দোলিত হচ্ছিলাম তাতে নিজেদের টিনের ভেতর ঝাঁকিয়ে দেওয়া মুড়ির মত মনে হচ্ছিল। অনেক খাল বিল পেরিয়ে, গাছের ডালের ওপর নাচতে নাচতে যাবার পর একটা জায়গা এলো যেরকম জায়গা আমি সেদিন সকাল থেকে আর দেখিনি। একটা খোলা চত্ত্বর, তিনদিকে তিনটে রাস্তা গিয়ছে। ডানদিকে দূরে একটা ন্যাড়া টিলা, সেখানে ছোট বড় পাথরে ভর্তি। আর বাঁদিক ঘেঁষে গাছের সারি গিয়েছে। গাছের সারির পিছনে দেখা যাচ্ছে একটা খাদের ওপারে একটা গুহার মুখ। আকাশ তখন একটু মেঘলা। সকাল থেকে একটানা আগুন ঝরিয়ে আমাদের যেন কিছুক্ষণের জন্য ওয়াক ওভার দিয়েছেন সূর্যদেব। একটা অদ্ভুত ডাক শোনা যাচ্ছিল এদিক থেকে, সেই শুনেই ড্রাইভার এদিকে এসেছে। ডাকটা আসছে ডানদিকের টিলার ওপর থেকে। ডাকটা কোন চেনা পশুর নয়। অনেকটা মানুষের বাচ্চা যেভাবে প্রথম মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজে ডাকে সেরকম। এক নাগাড়ে সেটা হয়ে চলেছে। আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। গাছের পাতাও যেন থেমে গেছে। কেমন একটা বুক খালি করা ডাকটা যেন। আমাদের জিপসিটা থেমে গেল একপাশে। গাইড কোন কথা বলছে না, ইশারায় আমাদের চুপ করে থাকতে বলে কি যেন শোনার চেষ্টা করছে। হঠাৎ একটা বার্কিং ডিয়ারের ডাক চারদিকের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিল যেন। আমাদের গাইড এবার মুখ খুললেন। বললেন এই ডাকটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন উনি। ‘এতক্ষণ যে ডাকটা শুনছিলেন ওটা বাঘের ছানার ডাক। কিছুদিন আগে এখানে তিনটে বাচ্চা দিয়েছে বাঘিনী। এখানে মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা একা রয়ে গেছে। সেটাই মাকে ডাকছে। ওর ডাকে ওর মা আসবেই। বাচ্চাকে ছেড়ে খুব দূরে যায় না। এটাও কাছাকাছি কোথাও রয়েছে। এখন বার্কিং ডিয়ার ডাকছে মানে ছানার ডাক শুনে মা এদিকেই আসছে।’ আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও আর কোন ডাক শোনা গেল না। আমাদের জিপসিটা একটু এগিয়ে গেল যেদিক থেকে বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা এসেছিল। একটা গোল চক্কর ঘুরে এসে যখন হতাশ আমরা আগের জায়গাটায় আবার ফিরে এলাম তখন সেখানে আর একটা জিপসি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের গাইড বললো বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা পাশে চলে গেছে। তার মানে এই রাস্তায় বাঘ আসবে না। দুই ড্রাইভারে কি যেন ঠিক করে নিয়ে যে রাস্তা দিয়ে আগে আমরা এসেছিলাম সেদিকে রওনা দিল। বেশ কিছুটা ঘুরে একটা ঝোপ জঙ্গল মতো জায়গায় আমরা এসে পড়লাম। বোঝা গেল এটা ওই টিলাটার পিছনের দিক। এখান থেকে টিলাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। একগাদা ঝোপে ঢেকে রয়েছে জায়গাটা। টিলার সামনের দিকটা যেমন ন্যাড়া এদিকটায় আবার তেমনি জঙ্গল। আবার বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা শোনা গেল। এবার আর একটু কাছ থেকে। সঙ্গে বাঁদরের ডাকো। এদিকে আবার সেই বাচ্চাটা দুবার ডেকে উঠলো। গাইড বলে দিয়েছিল বলেই কিনা জানি না এবার কেমন যেন মনে হলো স্পষ্ট শুনলাম ডাকটার সঙ্গে আমাদের ‘মা” ডাকের খুব মিল আছে। এবার গাইডের নির্দেশ অনুযায়ী দূরে এক জায়গায় চোখ রাখতেই বুঝলাম ঝোপগুলো দুলছে। সেখান দিয়েই আবির্ভূত হলেন তিনি। চকচকে হলুদ কালোর চলমান গোলা নিঃশব্দে ঝোপের পাশ দিয়ে ঢুকে ধীরে ধীরে টিলার ওপরে উঠে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাচ্চার ডাকে সাড়া দিতে এক মায়ের ব্যস্ততা দেখলাম।
সেদিন সময় শেষ হয়েই এসেছিল, তাই ফেরার পথে পা বাড়ালাম আমরা। সেদিন বিকেলে মগধি জোনে ও পরেরদিন টালাতে আবার এসেও আর তেনাদের দেখা পাওয়া যায়নি। তবে তাতে জঙ্গল দেখার মজা কিছুমাত্র কমে যায়নি। প্রচণ্ড দাবদাহ সহ্য করে আড়াই দিন কাটিয়ে যখন ফেরার ট্রেনে উঠলাম তখন আমাদের মন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রকৃতি যে এই চরম গ্রীষ্মের নির্মম রোদে আমাদের জন্য এতরকম চমক সাজিয়ে রেখেছে তা সত্যিই আমরা ভাবতে পারিনি। আবার কোন এক গ্রীষ্মে চলে আসবো ওদের সঙ্গে দেখা করতে। তখন হয়তো এই ছানাটাই একটা বড়সড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়ে দর্শন দেবে আমাদের।
 


শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক



সাইক্লোন




সাজছে আকাশ সাঁজোয়া মেঘ সাজে
ঝোড়ো হাওয়ায় ভাঙছে রঙীন দিন
প্রেম অপ্রেম দুলছে সাঁকোর মাঝে
শোধ দিতে হবে শ্বাস-প্রশ্বাস ঋণ।

রামধনু রঙ ছাইছে মেঘের কালো
নামলো আঁধার মেঘের লেপ চাদরে
কান ফাটানো বাজ বিদ্যুৎ আলো
ডাকছে কে আজ মৃত্যুকে সাদরে!

হাত বাড়িয়ে হাত আসেনা হাতে
আলগা আদর হাতড়ানো অভ্যেস
রূপকথারা আগুন ছড়িয়ে রাতে
এক দেয়ালের আড়াল মাপছে বেশ।

আড়াল কিন্তু এক বিঘতের মাঝে
মাঝ সমুদ্রে উথালপাথাল তরী
এক পা এগোলে মরণঘন্টা বাজে
সজ্ঞানে তাই সহস্রবার মরি।




দুঃস্বপ্ন




এ শহরে আর কেউ আসে না।
এ শহরে কেউ কোন পাতে না।
কলকাতা শহরে শীত কি সত্যিই আসে?
এ নির্মম শহরের কঠিন পিচের রাস্তায়
শীতের নরম রোদ, আদুরে বিকেল বড্ড বেমানান।
এ শহরে বর্ষাও আজকাল আর আসে না। 
সেও ছুটিতে আছে অনির্দিষ্টকালের জন্যে।
এ শহর শুধু জ্যৈষ্ঠের, কিংবা ভাদ্রের অথবা চৈত্রের
পিচগলা রোদ্দুরে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলে যেমন লাগে
কাঠফাটা আগুনের তাপে ক্লান্তি যেভাবে গ্রাস করে
ধূ ধূ ফাঁকা রাস্তায় চলতে চলতে যেরকম ধুঁকতে হয়
এ শহরটা তেমনই কঠিন কঠোর।
এ শহরে আর কেউ আসে না।
এ শহরে কেউ কোন পাতে না।
এ শহরে স্নেহ নেই, প্রেম নেই, যত্ন নেই, 
আদর আর আবদারও নেই। 
এককালে সবই ছিল।
এখন প্রখর তাপে শুকিয়ে গেছে সমস্ত কিছু।
পালিয়ে গেছে সবাই এ মৃতের শহর ছেড়ে।
রয়ে গেছে কিছু মৃত প্রেমিকের প্রেত
যারা এখনো উদভ্রান্তের মতো প্রেম খুঁজে চলেছে
প্রত্যেক রাস্তার মোড়ে মোড়ে।
একফোঁটা প্রেম পেলে যারা মানুষ হয়ে যেত,
প্রেমহীনতায় তারা সবাই উন্মাদ হয় গেছে।
একটু ভালবাসার ছোঁয়া পাবার তেষ্টায় 
ছাতি ফেটে গেছে ওদের
কেউ ওদের পিঠে হাত রাখেনি
কেউ ওদের হাতে ঠোঁট ছোঁয়ায়নি
কেউ ওদের কাছে টেনে নেয়নি।
তাই ওরা আজও সরীসৃপের মতো
হেঁটে বেড়ায়, হামা দেয়, গড়িয়ে যায়
হাহাকার করে, এতটুকু যত্নের আশায়।
এ শহর একটুও আদর দিতে পারেনি।
এ শহর একফোঁটা স্নেহ দিতে জানেনা।
এ শহর দুটো মায়ার কথা বলতে জানে না।
তাই এ শহরে আর কেউ কখনো আসবে না।



না মেলা অন্ত্যমিল




আমি তো ফিরে চাইনি কোনকিছু
আমি তো ফিরে চাইনি কোন মানে
যত্নে সাজানো মনের দালান কোঠা
একলা বিকেলে দস্যু আঘাত হানে।
আপন খেয়ালে খেলনাবাটির বেলা
দুরন্ত পায়ে দৌড়ে বেড়ানো দিন
আচমকা সেই নিকষ হাতের ছায়া
মুখোশে কিন্তু হাসিটা তার রঙীন।
পিছলে যাচ্ছে খিলখিলিয়ে হাসি
হারিয়ে যাচ্ছে দুষ্টুমি সাইকেল 
এলাডিং আর বেলাডিং দুই সই
একলা চোখেও মনে রাখে সে বিকেল।
অন্ধকারটা ক্রমশই কাছে টানে
আয় কাছে আয়, আর একটু কাছে থাক
জাপটে ধরছে ভয় ভাবনারা যেন
চেনা অচেনায় মস্ত একটা ফাঁক।
ছুট ছুট ছুট, খুব জোরে ছুটে চলা
থামবে কোথায় কে জানে কতটা দূরে
আরো জোরে ছুট কাউকে যাবে না বলা
আতঙ্ক নামে সমস্ত মন জুড়ে।
যুগ যুগান্ত প্রাচীন গল্পকথা
একলা গোপনে মনের ছায়ারা জানে
বিস্মৃত শোকে দু মিনিট নীরবতা
এখনো বিকেলে দস্যু আঘাত হানে।।

সিলভিয়া ঘোষ ,স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক

দ্বিচারিনী


©সিলভিয়া ঘোষ
©স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক


চৈত্রের ঠা ঠা রোদের পর বিকেলের লাল আকাশ, এলোপাথারি হাওয়ায় ধুলোঝড়, মাঝে মাঝে কড়াৎ কড়াৎ শব্দে  বিদ্যুতের চমক ফাঁকা ক্ষেতের উপর যখন পড়ছে,  শুকনো আলের উপর চলাফেরা করা হাতেগোনা মানুষ গুলির হৃদক্ম্পন দু এক সেকেণ্ডের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়  অনন্ত ঠাকুরের হাত ধরে রাণু বোষ্টমী প্রায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে এ গাঁয়ের  শেষপ্রান্তে থাকা সনাতন মহান্তর আখড়ার পাশে  নিজের ছোট চালা ঘরে।

রাণু বোষ্টমী এই গাঁয়ে এসেছে তা প্রায় পাঁচ বছর। বয়স তার এই এক কুড়ি পাঁচ কিম্বা সাত হবে। তবে মুখটা আজও ষোড়শী। গায়ের রঙ কালো, দাঁতগুলি ঝকঝকে,  নাকটি টিয়া পাখির মতোন, কণ্ঠস্বরে মধু ঢেলে দিয়েছে যেন শ্রীহরি। সনাতন মহান্ত তাই তাকে এক ফালি জায়গা দিয়েছে আখড়ার পাশে। সকাল সাঁজে তার আরতিতে আখড়া যেন মেতে ওঠে। সে সুর কোন চলতি সিনেমার গানের সুর নয়, সে সুর তার আকুল হয়ে ডাকা শ্রীহরির চরণে সমর্পিত সুরাধনা। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলেই আপনা থেকেই দু চোখে জল ভরে আসে। সেই সুরের সঙ্গে সঙ্গত করতেই তো অনন্ত  ঠাকুরের এখানে আগমন আর তারপর থেকেই রাণুর একান্ত বাউল সে। সে কথা বাঁধে একের পর এক তাতে সুর দেয় রাণু  বোষ্টমী, এভাবেই মাধুকরীতে দিন কাটে তাদের। 

তবে অনন্ত বেশ বুঝতে পারে  এ কালবোশাখী তাদের জীবনের মূল্য নিতেই এসেছে, নইলে এতবছর এগাঁয়ে বাস করেও আজকের মতো ঝড়ে তো কোনদিন তার বুক কাঁপেনি, তবে আজ কেন এমনটা হচ্ছে! সে কি তবে ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনছে ? নিজের মনের ভিতর প্রশ্নগুলো  তাকে বারেবারে খোঁচাচ্ছে। রাণু বোষ্টমী  হাত ধরে টানতেই প্রায় হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিল অনন্ত, তা দেখে রাণু বেশ করে হেসে বললে, 'কী গো ঠাকুর, খোয়াব বুনছো না কি দিনে? নাও নাও পা চালাও দেহি। ঝড় জলের আগে ঘরকে চলো,  দুটো চালে ডালে ফুটিয়ে নেবোখন।'
অনন্ত যেন মনে মনে হেসে সব হিসেবটা মিলিয়ে নেয়। 
একটু  আস্তে করে রাণুর প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলে, 'আজকাল তুই আর পানী বলিস না তেমন, নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিস বেশ। আমারো স্বপ্ন বুনতে বেশ লাগে। তোকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখি রে পাগলী, বাঁধবি আমার সঙ্গে ঘর?' 
হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেলো রাণু কি যেন ভাবলো  মিনিট দুয়েক ,তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে  নিয়ে চলল অনন্ত ঠাকুরকে তার ঘরে। শুধু চোখগুলো তার অন্ধকারের মধ্যে বাঘিনীর  মতোন জাজ্বল্যমান হয়ে রইল ঐ শুকনো আলপথের মধ্যে। অনন্ত ঠাকুরের  ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বলছে, 'অন্ধকানাই আজ তুই মৌচাকে সঠিক ঢিল মেরেছিস ইনামও আজই পাবি।'

দুজনে জোরে জোরে হাঁটতে হাঁটতে গাঁয়ের পথের শেষ সীমানায় পা রাখতেই অন্ধকার থেকে এক লম্বা চওড়া,লুঙ্গি ,ফতুয়া পরিহিত শ্যামবর্ণের এক মানুষ রাস্তা অাটকিয়ে দাঁড়িয়ে রাণু কে উদ্দেশ্য করে বলে, 'তারপর! কেমন চলছে সব কিছু জারিনা বিবি?'
আচমকা ভয় পেয়ে থমকে যায় রাণু। বিদ্যুতের আলোয় তার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ দেখতে পায় অনন্ত। মুহূর্তে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে রাণু, 'কে গা তুমি ভরা দুর্যোগের দিনে পথ আটকাচ্চ? কাকে দেকতে কাকে দেকেছো? সরো দেকি বাপু যেতে দাও আমাদের।' তারপর ব্যস্ত হয়ে অনন্তর দিকে ফিরে ডাকে, 'হ্যাঁ গা তুমি  দাঁইরে দেখছ কি, পা চালাও না। আকাশের অবস্তা দেকছ নি!' লোকটা কিছু না বলে পথ ছেড়ে দেয়। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। দুজনেই ভিজে যায়। অনন্তর হাত ধরে একরকম প্রায় উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দোর দেয় রাণু বোষ্টমী। তারপর দরজার খিল ধরে হাঁপাতে থাকে। অনন্ত একটু সময় দেয় ওকে। তারপর এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে। রাণুর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে ডাকে, 'এমন হুড়ো দিয়ে নিয়ে এলি কেনে রাণু?' রাণু যেন কোন অন্য জগতে ছিল এতক্ষণ, অবাক হয়ে ফিরে তাকায় সে অনন্তর দিকে। আবার এক লহমায় নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, 'রোসো বাপু, উঠোনে যেয়ে দেখি কি হাল হয়েছে। এমন ঝড়জল হবে কে জানত বলো দিকি। সকালে কেমন কাঠফাঁটা রোদ্দুর ছিল আর একন আকাশ ভেঙে বিষ্টি নামলো!' বলতে বলতে রাণু উঠোনে চলে যায়। মিনিটখানেক পরে ঘরে ঢুকে দেখল অনন্ত বাউল জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে। গামছাটা এগিয়ে দেয় রাণু, 'নাও মাথাটা মুছে জামাখানা পাল্টে ফেলো দিকি ঠাকুর। খাটের ওপর একটা কাপড় আর চাদর রেখেচি। পুরুষ মানুষের পোশাক তো আর আমার ঘরে পাবে নে। আমিও কাপড়টা বদলে আসি গে।' কিছুক্ষণ পরে রাণু কাপড় বদলে ঘরে ঢোকে। অনন্ত তখনও একইভাবে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। ব্যস্ত হয়ে রাণু কিছু বলতে যাবে এমন সময় অনন্ত তার সামনে দাঁড়ায়, 'ওই লোকটা কে ছিল রাণু? তুই ওকে চিনিস তাই না?' চোখ সরিয়ে নেয় রাণু, 'কাকে আবার চিনি, কি যে বলো তুমি ঠাকুর। যাও কাপড়টা বদলে এসো। আমি একটু চালে ডালে চড়িয়ে দিই।' রাণুর হাত ধরে তাকে আটকায় অনন্ত, 'কথা ঘোরাস নি রাণু, কে ওই লোকটা? ও তোকে কোন নামে ডাকলো? আর তুই অমন ভয় পেলি কেন?' চোখ তোলে রাণু, সেই চোখে ভয় নেই, ছলনা নেই, বিরক্তি নেই, আছে শুধু আকুতি, 'আগে কিছু খেয়ে নাও ঠাকুর। কতা বলার জন্য তো অনেক সময় পড়ে রয়েচে। আমি ভাতটা বসিয়ে দিই। সব বলবো তোমায়। বলবো বলেই তো ডেকে এনিচি গো।' অনন্ত নারাজ, জোর দিয়ে বলে, 'এখনই বল। আমি বাড়ি ফিরে যাব। এখানে থাকতে আসিনি।' অনন্তর হাতের ওপর হাত রেখে আলতো চাপ দেয় রাণু, 'দোহাই তোমার ঠাকুর, সব বলবো আমি, কিন্তু এই ভিজে কাপড়টা তুমি ছেড়ে এসো। শান্ত হয়ে বসে সবকথা শুনো আমার।' অগত্যা রাণুর জেদের কাছে হার মানে অনন্ত। রাণুর দেওয়া কাপড়টা ধুতির মতো করে পরে গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘরের চৌকির ওপর বসে। 

খানিক চুপ করে বসে থাকে রাণু। তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে শুরু করে।
-'আমাকে আজ তোমরা যেমন দেখতাসো আমি তেমনি ছিলাম না। আমার আসল নাম জারিনা। বাপের এক মেয়ে ছিলাম। বড় আদরে মানুষ করছিল আমারে বাপটা। আমার যখন চোদ্দ বছর বয়স তখন একদিন শহর থেকে বাড়ি ফেরার সময় খালের ধরে বাস উল্টে বাপটা মরে গেল। আমি আর মা খুব কাঁদলাম কদিন। তারপর একদিন মা বললো সে আসলাম চাচারে নিকা করতে চায়। শুনে খুব রেগে গেছিলাম আমি। আসলাম চাচা আমাদের গ্রামেই থাকতো। আব্বা কোনদিন ওরে দেখতে পারতো না। খালি বড় বড় কথা বলতো। আমারও ভাল লাগতো না। মায়ের কি করে ভাল লাগলো জানিনা। আব্বা মারা যাবার এক বছর কাটতেই মা আবার নিকা করলো। আমি বুঝলাম আমার সুখের দিন শ্যাষ হয়েস ।

আসলাম চাচার নজর আমার ভাল লাগতো না। আমি চাচা কইরাই বলতাম। মা বলতো আব্বা বলতে। আমি শুনতাম না। একদিন মা বাড়ি ছিল না। চাচা জোর করে আমারে বিছানায় লয়ে গেল। আমি কত কাঁদলাম কেউ বাঁচাতে এলো না। মা ফিরলে সব বললাম। মা বললো পুরুষমানুষের খিদে একটু বেশি হয়, অত উতলা হবার কিছু নেই।' বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠে রাণু। তাকিয়ে দেখে বিস্ফারিত চোখে অনন্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ মুছে সে আবার বলতে শুরু করে।

-'এরপরে একদিন রাতে মায়ের সামনেই লোকটা আমারে ঘরে ডাকে। আমি তখন কুটনো কুটছিলাম, যাইনি। মা জোর করে যাবার জন্য। আমি জেদ করে বসে থাকি। লোকটা এল আমাকে জোর করে নিয়ে যেতে। আমি কোনরকমে এক ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে আসি। নাম পাল্টিয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে এই মাঝেরপাড়ায় আসি। মহান্ত ঠাকুর আমার গান শুনে আমারে আশ্রয় দেন। সেই থেকে এখানেই রয়ে গেচি। আজ যারে দেখলে সে আসলাম চাচার ভাই, করিম আলী। ওরও নজর খারাপ। কি করে জানিনা আমারে এখানে খুঁজে পেয়েছে। কদিন ধরে দেখতাসি লোকটারে। আমারে বোধহয় এখানকার পাট উঠাতে হবে এইবার।' একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে রাণু একটু হাঁপায়।

অনন্ত একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার সে মুখ খোলে, 'তুই বিধর্মী হয়ে এখানে এসে ঠাকুরের নামগান করছিস? পরকালের ভয় করিস নে? এখানে জানাজানি হলে তোর কি হবে জানিস? পুঁতে ফেলবে তোকে গ্রামের লোকজন। মহান্ত ঠাকুর তোকে বিশ্বাস করে থাকতে দিয়েছে আর তুই নিজের পরিচয় লুকিয়ে এতবড় নাটক করে যাচ্ছিস রোজ!' রাণু ওরফে জারিনা এবার সোজাসুজি তাকায় অনন্তর দিকে, 'ঠাকুরের আবার জাত কি গো? তুমি না বাউল! জাত কি কেউ সাথে নিয়ে জন্মায়? জাত যদি গায়ে লেগেই থাকতো তাহলে অন্য জাতের ছোঁয়ায় তা নষ্ট হয় কি করে? জাত যদি গায়ে আঠার মতো সেঁটে থাকে তাহলে কেউ নিজের ধর্ম পাল্টায় কি করে গা? মানুষ আগে না জাত আগে? আমি এখনে এসে নাম পাল্টে না থাকলে আমার মা আর ওই লোকটা মিলে আমারে তো মেরেই ফেলতো। আমি জানি ওরা করিম আলীর সঙ্গেও আমাকে শুতে বলতো। জানোয়ারটা কি এমনি এমনি আমারে খুঁজতাসে নাকি!' 
অনন্ত গম্ভীরভাবে বলে, 'আর মহান্ত ঠাকুর? ওই দেবতার মতো মানুষটাকে তো তুই ঠকাচ্ছিস?' 
অট্টহাস্য করে ওঠে রাণু, 'দেবতা! হ্যাঁ গা তাই বটে। আমারো মনে হতো এমনটাই। বড় অপরাধী লাগতো নিজেকে। কাল  সন্ধেয় করিম আলী এসে মহান্ত ঠাকুরকে আমার নামে কি বলেছে জানিনা, কাল রাতে আমার ঘরে এসে তোমার দেবতা বলে গেলেন উনি করিম আলীকে বলেছেন আমাকে উনি ছোট থেকে চেনেন। আমি ওনার নিজের গাঁয়ের মেয়ে। করিম আলী কোনদিন সত্যিটা জানবে না যদি আমি ... আমি...থাক সে কথা। 
  অনন্ত বলে 'না থাকবে না,  এখনি বল আমি শুনবো'!
   রাণু বলে 'যদি আমি  মহান্ত ঠাকুরকে মাঝে মাঝে রাতে ঘরে আসতে দিই। আর যদি না আসতে দিই তাহলে দুদিন বাদে সারা গাঁয়ের লোক জেনে যাবে রাণু বোষ্টমীর আসল পরিচয়।'
হতভম্ব হয়ে যায় অনন্ত, 'মহান্ত ঠাকুর! মানুষ এমনও হয়? এর চেয়ে উনি তোকে বার করে দিতেন তাও বুঝতাম ধর্মভীরু। ছিঃ! ছিঃ! কিন্তু তুই আমাকে এসব বলতে গেলি কেন? আমিও তো গাঁয়ের লোককে বলে দিতে পারি।' 
চুপ করে থাকে রাণু। তারপর চোখ না তুলেই বলে, 'কারণ তুমি এমন এক মানুষ যাকে আমি আমার নিজের মতো করে বুঝতে পারি। যে আমারে ভালবেসে শাদি করতে চেয়েছে। প্রথম কেউ যে আমারে শুতে বলেনি, শাদি  করে ঘরে তুলতে চেয়েছে। তোমারে বলব না তো কারে বলবো আর।'

স্তব্ধ হয়ে যায় অনন্ত। কি বলবে ভেবে পায়না। রাণুই বলে, 'আমি জানি গো ঠাকুর কি ধর্ম সংকটে তোমারে আমি ফেলেছি। কাল অবধি যে রাণু বোষ্টমীরে তুমি চিনতে আজ সেই এমন অচেনা হয়ে গেলে তারে কি আর শাদি করন যায়? তুমি ভেবো না, আমি তোমারে জোর করুম না। তোমার যা ইচ্ছা যায় তাই করো। তবে আমিও বলে রাখি তোমায় ঠাকুর, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ আদায় করা আসলাম  চাচারে দেকসি, আবার পৈতে পরা হাতে জপের মালা নেওয়া মহান্ত ঠাকুরকেও দেকসি। ও আল্লাই বলো আর কৃষ্ণই বলো কেউই অবলা নারীরে বাঁচায় না। বাঁচতে হলে নিজেকেই বাঁচতে হয়। আর আমি যে করে হোক নিজেকে বাঁচিয়ে নেব। বাঁচতে আমার বড় ভাল লাগে। জারিনা হয়ে না পারি রাণু হয়ে বাঁচব, তাতেও না পারলে অন্য কোথাও অন্য কোন নামে বাঁচব। বাঁচতে আমারে হবেই।' 
অনন্ত উঠে পড়ে ধীরে ধীরে। বলে, 'আজ আমি আসি। বৃষ্টিটা ধরেছে। কাল আসবো 'খন। তুই সাবধানে থাকিস। আমরা তো বাউল মানুষ। এখানে নয় অন্য কোথাও গিয়ে ঘর বাঁধব নাহয়। এখানে এমনিও বেশিদিন থাকা তোর ঠিক হবে না। নিজেকে বাঁচিয়ে চলিস কয়েকটা দিন। আমি দেখি কি ব্যবস্থা করা যায়।' 
অনন্তর জন্য দরজা খুলতে গিয়ে কেঁদে ফেলে রাণু। অনন্ত তাকে কাছে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে সাবধানে থাকতে বলে নিজের ঝোলাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। 

পরেরদিন ঝলমলে আকাশ দেখে মনটা ভাল হয়ে যায় অনন্তর। মহান্তর বাড়ির দিকে যাবে মনে করে ঝোলাটা কাঁধে তুলতে যাবে এমন সময় গাঁয়ের ছেলে গোপাল দৌড়ে এসে বলে, 'শিগগির চলো অনন্ত দাদা, মহান্ত ঠাকুর খুন হয়েছে।' 
-'কি বললি? খুন? কোথায়?' চমকে যায় অনন্ত।
-'রাণু বোষ্টমীর ঘরে। কেউ কাটারী দিয়ে গলার নলি কেটে দিয়ে গেছে গো।'
-'সেকি! বোষ্টমী কোথায়?'
-'তারে পাওয়া যাচ্ছে না। পালিয়েছে মনে হয়।'

অনন্ত ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়। মহান্তর বাড়ির কাছে আসতেই জটলাগুলো চোখে পড়ে। সেখান থেকে জারিনা নামটা দু-একবার কানে আসে। গাঁয়ের বয়স্ক মানুষ নারায়ণ গাঙ্গুলিকে এদিকে আসতে দেখে তার দিকেই এগিয়ে যায় অনন্ত। 
-'কি হয়েছে গো দাঠাকুর?'
-'আর বলো কেন, এসব নোংরা মেয়েছেলেদের কারবার। মেয়েটা আসলে নাকি মুসলমান। নাম জারিনা। ওর মা দ্বিতীয়বার বে করলে সেই বাপকে এই একইভাবে খুন করে পালিয়ে আসে এই মেয়ে। এখানে এসে বছর পাঁচেক হলো বোষ্টমীর ভেক ধরে ছিল। কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে পারে নি। মহান্ত ঠাকুর বোধহয় বুঝে গেছিল, তাই তাকেও সরিয়ে দিল। পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে। দেখা যাক কি হয়।'
রাগে জ্বলে যায় অনন্তর মাথাটা। ধীরে ধীরে বলে, 'বোষ্টমীকে তুমিও তো খুব স্নেহ করতে দাঠাকুর। আর আজ সে নোংরা মেয়েমানুষ হয়ে গেল? কেন একটা মেয়ে দুটো পুরুষকে খুন করলো সেটা বুঝতে পারছো না? একটু ভেবে দেখো কখনো।'
রেগে যায় নারায়ণ গাঙ্গুলী, 'তুমি থামো তো বাউল। তোমাদের জাতধর্ম না থাকতে পারে, আমাদের আছে। মুসলমান মেয়েটা আমাদের সবার ধর্ম নষ্ট করে দিয়ে গেল। রোজ ওর হাতে প্রসাদ খেয়েছি আমরা। এখন গ্রামসুদ্ধু লোককে প্রায়শ্চিত্তির করতে হবে। তুমি মেলা জ্ঞান দিও না। এত তো গান গাইতে একসঙ্গে, তুমি নিজে যদি জানতে যে মেয়েটা বিধর্মী তাহলে গাইতে পারতে?'
মাথা নিচু করে অনন্ত নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে। মহান্তর মৃতদেহ দেখতে চায় না সে। কাল রাতে কি ঘটেছে সব সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। না, বাউল হয়েও সে জাতধর্মের ওপরে উঠতে পারেনি। গতকাল হলেও নারায়ণ গাঙ্গুলীর কথার সঙ্গে সে একমত হতো বোধহয়। কিন্তু একটা মুখ্যু মেয়েমানুষ কাল তাকে মনুষ্যত্বের পাঠ দিয়ে গেছে। আজ আর কিছুতেই সে তার রাণুকে দোষী ভাবতে পারে না। যতই রাণু আসলামকে খুনের ঘটনা তার কাছে লুকিয়ে যাক। যা করেছে সে নিজেকে বাঁচাতেই করেছে। এতে কোন অপরাধ থাকতে পারে না। সত্যিই তো ঠাকুরের আবার জাত কিসের? আর সেই ঠাকুর, সেই আল্লাকে নিয়ে বড়াই করা মানুষগুলোর তো একটাই জাত, খাদক। একটা অসহায় মেয়েকে আশ্রয় দিতে গিয়ে যারা বারবার মানুষ থেকে জানোয়ার হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই ফিসফিস করে অনন্ত, 'এ গাঁয়ে আমিও আর থাকবো না। বেরিয়ে পড়ব আবার, দেখি যদি আমার সুরের জুড়িদার, আমার বোষ্টমীকে খুঁজে পাই।'

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক

স্বপন যদি মধুর এমন




মাঝে মাঝে এমন সব স্বপ্ন আমরা দেখি যা দেখার পর ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় যেন আবার ঘুমিয়ে পড়ি। আবার উল্টোটাও হয়। ঘুম ভেঙে মনে হয় ভাগ্যিস এটা স্বপ্ন ছিল! স্বপ্নকে অবহেলা করার সাধ্য বোধহয় আমাদের কারোরই নেই। বিশেষ বিশেষ স্বপ্ন আমাদের ভাবনায় কিছুটা হলেও স্থান পায়। কেউ কেউ যদিও বলেন বটে যে তিনি মোটেও স্বপ্ন দেখেন না। এই দাবি কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল। আসলে কেউ কেউ স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন না। তাই হয়তো কারোর মনে হয় যে তিনি স্বপ্ন দেখেন না। বাস্তবিকই আমরা স্বপ্নে যা দেখি তার শতকরা নব্বই ভাগই আমরা ভুলে যাই। স্বপ্ন দেখে উঠে সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেললে তবু অনেকটা ফিরে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর পাঁচ মিনিটের বেশি স্বপ্নের স্পষ্ট স্মৃতি থাকে না। অর্থাৎ সব মানুষই স্বপ্ন দেখেন। একমাত্র যাদের খুব বেশি মানসিক সমস্যা বা psychological disorder থাকে তারাই স্বপ্ন দেখেন না।

স্বপ্ন আসলে কি? সাধারণভাবে বলা যায় ঘুমন্ত অবস্থায় মানসচক্ষে দেখা কিছু ইমেজ বা ছবির সিরিজের সাহায্যে কোন কাল্পনিক ঘটনাপ্রবাহকে দেখতে পাওয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দ্রষ্টা নিজেই সেই কাহিনীতে ভূমিকা নিয়ে থাকেন। আমি নেই অথচ সবকিছু আমি দেখতে পাচ্ছি এমন স্বপ্ন সাধারণত মানুষ কম দেখে। মানুষ স্বপ্ন দেখে যে অবস্থায় তাকে বলা হয় rapid eye movement (REM)। এই অবস্থায় চোখের মণির নড়াচড়া বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে হাত পা অবশ হয়ে যায়। প্রায় পক্ষাঘাতের মতোই। চাইলেও হাত পা নাড়ানো যায় না এই অবস্থায়। অর্থাৎ স্বপ্ন আমাদের ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। যদিও non rapid eye movement (NREM) এও কিছু স্বপ্ন আসে, তবে তা খুবই আবছা ও অস্পষ্ট। স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরী যে বিজ্ঞান তাকে Oneirology বলা হয়।

একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো স্বপ্ন হলো সম্পূর্ণ অন্য একটি দুনিয়ার ঘটনাবলী। আবার কেউ কেউ মনে করতেন ঘুমোবার সময় আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। সেই সময় সে শরীরের বাইরে যা কিছু প্রত্যক্ষ করে তাই আমাদের কাছে স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। প্রাচীন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী ধারণায় স্বপ্ন ছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চেনা অচেনা সমস্ত ঘটনার প্রতিচ্ছবি। কিছু প্রাচীন উপজাতীয় ধারণায় স্বপ্ন ছিল আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপনের উপায়। কোন কোন ধারণায় স্বপ্নকে অপদেবতার অভিশাপ বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ান স্নায়ুবিশেষজ্ঞ, সাইকো-অ্যানালিসিসের জনক, সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর "The Interpretation of Dreams" বইতে আগের সমস্ত স্বপ্নতত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে নতুনভাবে স্বপ্নের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলেন যুক্তির সাহায্যে। ফ্রয়েড তাঁর তত্ত্বকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন যে এরপর থেকে স্বপ্নকে আর অযৌক্তিক, অজ্ঞান চিন্তাধারার ফসল বা জীবনের বাইরের কিছু বলে বর্ণনা করা গেল না। আগে এমনভাবে স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করা হতো যেন কোন ব্যক্তি পিয়ানো না জেনেই পিয়ানোর সামনে বসে যেমন খুশী বাজিয়ে চলেছেন। কিন্তু তা যে একেবারেই নয়, বরং স্বপ্ন প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয় তা এই বই থেকেই জানা গেল। অর্থাৎ স্বপ্ন হলো এমন কিছু যা আমরা দেখেছি বা শুনেছি, যার সঙ্গে কখনো হয়তো আমাদের যোগাযোগ ঘটেছে, অথচ তেমনভাবে আমল দেওয়া হয়নি। যা আমরা দেখিনি বা যে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই নেই তেমন কিছু আমাদের স্বপ্নে আসতে পারে না। সারা পৃথিবী আজও ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্বকে একরকম প্রামাণ্য বলে মনে করে। আসুন একটু জেনে নিই ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব কি বলে। 

গবেষণা অনুযায়ী এক একটি স্বপ্ন দশ থেকে পঁচিশ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। অর্থাৎ পঁচিশ মিনিটের বেশি সময় ধরে স্বপ্ন স্থায়ী হয়না। আমরা প্রতিদিন ঘুমের মধ্যে চার থেকে সাতটি করে স্বপ্ন দেখে থাকি। যদিও সব আমাদের মনে থাকে না। স্বপ্ন হলো কতগুলি ছবি ও আবেগের সমাহার যা একজন ঘুমন্ত মানুষের কল্পনায় ধরা দেয়। ফ্রয়েড আমাদের মনকে তিনভাগে ভাগ করলেন। সচেতন মন বা conscious mind, অচেতন মন বা unconscious mind এবং অবচেতন মন বা subconscious mind। স্বপ্ন হলো এই অবচেতন মনের কারবার। এই মন আমাদের সচেতন মনের চেয়েও বেশি জানে। যা কিছু আমরা দেখি বা শুনি বা যে কোন ভাবে বলা যায় experience করি, যেমন শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য, স্বাদ, স্পর্শ বা অনুভূতি এই সবকিছুই আমাদের অবচেতন মনে রেকর্ড হয়ে যায়। আমাদের অজ্ঞাতেই। স্বপ্নে এই নানান সময়ের ইমেজ বা ছবিগুলো পরপর জুড়ে গিয়ে একটা গল্প তৈরী হয়। কিন্তু এই ছবিগুলো আসে এলোমেলো, অর্থহীনভাবে। যেভাবে আমরা স্বপ্ন বর্ণনা করি তেমন নিটোল কোন গল্প হয়ে স্বপ্ন কখনোই আসে না। স্বপ্নের বর্ণনা করতে গেলে কিছুটা কল্পনার আশ্রয় নেয়া ছাড়া আমাদের উপায় থাকে না। কারণ স্বপ্নের স্মৃতি খুবই স্বল্পমেয়াদি হয়। স্বপ্নে পরপর ছবিগুলি আসে পরস্পর সম্পর্কহীনভাবে। হয়তো অতীতে দেখা কোন জায়গায় সদ্য পরিচিত কোন ব্যক্তিকে দেখা গেল, যেখানে তিনি থাকতে পারেন না। স্বপ্নে এমনটা হয়েই থাকে। কখনো বা একজন মানুষের চেহারার সঙ্গে তার কাজের মিল থাকে না। মিল পাওয়া যায় অন্য কোন খুব চেনা কারোর সঙ্গে। তবে স্বপ্নে এমন কোন মুখ আমরা দেখি না যা আমরা কখনো দেখিনি। অর্থাৎ স্বপ্নে সর্বদা পরিচিত মুখ আসে। হয়তো কোন মুখ আপাত অচেনা মনে হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই সেই মুখ আমরা রাস্তাঘাটে কোথাও না কোথাও দেখেছি। হয়তো সচেতনভাবে খেয়াল করিনি। কিন্তু অবচেতন মনে সেই মুহূর্তের ছবি রয়ে গেছে। সাধারণত সাম্প্রতিক ঘটনা বা আসন্ন কোন ঘটনা নিয়েই স্বপ্ন তৈরী হয়। তবে অনেক সময় শৈশব বা কৈশোরের কোন স্থান বা ঘটনা স্বপ্নে বার বার ফিরে আসে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, অন্ধ মানুষও কিন্তু স্বপ্ন দেখেন। যদি তিনি জন্মান্ধ না হয়ে থাকেন তাহলে দৃষ্টিশক্তি থাকা অবস্থায় তিনি যা কিছু দেখেছেন স্বপ্নে তাই আসবে। আর যদি জন্মান্ধ হন তাহলে যা কিছু তিনি অনুভব করেছেন সে সমস্ত স্পর্শ গন্ধ বা শব্দ তার স্বপ্নে আসবে। 


ফ্রয়েডের মতে সব স্বপ্নই ইচ্ছাপূরণের স্বপ্ন। যেসব ইচ্ছা বা কামনা বাসনা আমরা সচেতনভাবে পূরণ করতে পারি না তাই আমাদের স্বপ্নে রূপকের মাধ্যমে দেখা দেয়। যেমন এমন অনেক ইচ্ছা বা কামনা আমাদের থাকে যা নিয়ে হয়তো আমরা সচেতন অবস্থায় ভাবতেও চাই না। লজ্জা, ভয়, আড়ষ্টতা, সমাজের বিভিন্ন নিয়ম আমাদের এইসব ইচ্ছাকে অঙ্কুরেই অবদমিত করে দেয়। আমরা শুরু থেকেই বুঝতে পারি এমন কিছু ভাবতে নেই। যেমন যৌন ইচ্ছা বা অর্থ প্রাপ্তির ইচ্ছা। এই ধরণের ইচ্ছা আমরা কখনোই বাস্তবে প্রকাশ করি না। কারণ আমরা সকলেই নিজেদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ও যত্নশীল। এই সমস্ত ইচ্ছা আমাদের অবচেতন মনে স্থান পায়। সচেতন মন তাকে অস্বীকার করতে চাইলেও এই ইচ্ছাগুলি কখনোই একেবারে বিনষ্ট হয় না। এগুলোই স্বপ্নে বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে আমাদের কাছে ধরা দেয় যাতে দ্রষ্টার সচেতন মনের আবেগে ধাক্কা না লাগে। কখনো তা সামান্য স্পষ্ট কখনো আবার অস্পষ্ট। যদিও ফ্রয়েডের এই ইচ্ছাপূরণ তত্ত্বকে সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল জং মেনে নিতে চাননি। তবে ফ্রয়েডের স্বপ্নতত্ত্ব সাধারণ মানুষের কাছেও গৃহিত হয়েছে কারণ যৌক্তিকতার বিচারে এভাবে আর কেউ স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। 

স্বপ্নে আমরা যে রঙ দেখতে পাই তা আমাদের বর্তমান জীবনের রঙ, যা আমরা রোজ দেখছি। জেগে থাকা অবস্থায় যেসব রঙ আমরা দেখতে পাই স্বপ্নেও সেসব রঙই দেখি আমরা। তবে ছবিগুলি হয় সামান্য অস্পষ্ট বা যাকে বলে out of focus। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সাদা কালো স্বপ্নও হয়ে থাকে। তবে সাদা কালো স্বপ্নের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম আসে। ফ্রয়েডের মত মেনে নিলে বলতে হয় সব স্বপ্নই কোন না কোনভাবে আমাদের ইচ্ছাপূরণ করে। যেমন একজন মেডিকেলের ছাত্র এমন স্বপ্ন দেখতেই পারে যে সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে এবং তার চিকিৎসা চলছে। এই ভেবে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে যে সে ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে গেছে। এই স্বপ্ন দেখার কারণ হলো তাকে সকালে তাড়াতাড়ি হাসপাতাল পৌঁছতেই হবে। 

শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিরাও কিন্তু স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্ন সাধারণত অন্য কোন প্রাণীকে তাড়া করা বা অন্যের আক্রমন ইহাকে বাঁচার জন্য পালানো নিয়েই হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আমাদের স্বপ্নে কিছু বাস্তব ঘটনাও ঢুকে পড়ে। যেমন স্বপ্নে ট্রেনের ঝাঁকুনি দেখে ঘুম ভেঙে হয়তো দেখা গেল মা ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করছেন। সাধারণভাবে পুরুষ ও মহিলাদের স্বপ্ন আলাদা ধরণের হয়। গবেষণা থেকে জানা যায় কোন ব্যক্তি যখন নাক ডাকেন তখন তিনি স্বপ্ন দেখেন না। 

স্বপ্ন সত্যি হওয়া নিয়ে অনেক রকমের ব্যাখ্যা রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি হলো আমাদের অবচেতন মন বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্নের তুলনা করতে চায়, তাই অনেক ক্ষেত্রে যা আমরা স্বপ্নে দেখি তা সত্যি হয়ে যায়। স্বপ্ন স্পষ্ট হোক বা অস্পষ্ট সব সময়েই একটা অনিশ্চয়তার বা দুশ্চিন্তার ভাব কাজ করে। স্বপ্নের অর্থ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। যেমন গর্ভবতী হওয়ার স্বপ্ন বোঝায় কোন নতুন ঘটনা বা কাজের সূত্রপাত। মৃত্যুর স্বপ্ন বোঝায় বহুদিন ধরে চলে আসা কোন ব্যক্তির বা কাজের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করাকে। বিভিন্ন প্রতীকও দেখা যায় স্বপ্নে। জল, লাঠি, সাপ এসব নানান প্রতীকের মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ বস্তু বা ঘটনাকে বোঝানো হয়।

শেষ করার আগে স্বপ্ন নিয়ে কিছু মজার তথ্য দিই। স্বপ্ন শুধুমাত্র অবচেতন মনের রচিত গল্পমাত্র নয়। স্বপ্ন অদ্ভুতভাবে অনেক সমস্যার সমাধানও করে। হয়তো কোন কঠিন সমস্যার সমাধান জাগ্রত অবস্থায় হয়নি, স্বপ্নে তার সমাধান হয়ে যেতে পারে। কঠিন অঙ্কের সমাধানসূত্র স্বপ্নে হয়েছে এমনও শোনা যায়। আবার বিখ্যাত সব আবিষ্কার বা সাহিত্য রচনাও স্বপ্নের প্রভাবে হয়েছে এমন শোনা গিয়েছে বহুবার। যেমন বৈজ্ঞানিক নিলস বোর তাঁর পরমাণু তত্ত্বের মূল ভাবনা স্বপ্নে পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানী মেন্ডেলিভও তাঁর পিরিয়ডিক টেবিলের ছকটি স্বপ্নে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন। আবার বেনজিনের গঠন তত্ত্বও বিজ্ঞানী কেকুলে স্বপ্ন থেকেই পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথের "রাজর্ষি" নাটকের কাহিনী যে স্বপ্নে পাওয়া তা আমরা অনেকেই জানি। আবার ইংরেজ কবি কোলরিজের বিখ্যাত কবিতা "কোবলা খান"ও তিনি আফিমের নেশায় ঘুমিয়ে স্বপ্নে পেয়েছিলেন। এ তো গেল স্বপ্নে পাওয়া কিছু অমূল্য প্রাপ্তির কথা। অন্যদিকে স্বপ্ন নিয়ে অজস্র গল্প কাহিনী রচিত হয়েছে। শুধু স্বপ্নের ধারণাকে কেন্দ্র করেই বিশ্ব সাহিত্যের প্রচুর গল্প কবিতা নাটক নভেল লেখা হয়েছে। লুই ক্যারোলের লেখা বিখ্যাত কাহিনী "অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড", আমাদের অবন ঠাকুরের লেখা "বুড়ো আংলা" বা সুকুমার রায়ের অমর সৃষ্টি "হ য ব র ল" প্রভৃতি- এই সমস্ত সাহিত্যই বিশ্বের বিস্ময় এই স্বপ্নকে কেন্দ্র করেই রচিত। তাই সবশেষে এই প্রতিবেদনটির শিরোনামের সুরে বলতে ইচ্ছে করে, 'স্বপন যদি মধুর এমন হোক সে মিছে কল্পনা, জাগিও না আমায় জাগিও না।'