শর্মিষ্ঠা দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শর্মিষ্ঠা দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

শর্মিষ্ঠা দত্ত

              




অভিসার  



(১)



গত রাত থেকেই বৃষ্টি । প্রথমে রিমরিম থেকে শেষে ঝমঝম l বৃষ্টির তিরতিরে সুখ বুকে নিয়ে দিব্যি ঘুমিয়েছে পল্লবী । ফুলশয্যার দাগ এখনও মুছে যায়নি তার শরীর থেকে l বুকের গোপন ভাঁজে এখনও লেগে রয়েছে মেঘের স্পর্শ l বউমা, কাকিমা, বৌদি  ডাকগুলো এখনও ভাল ভাবে রপ্ত হয়নি l পল্লবীর চারপাশটা এখন বড্ড বেশী রকমের রঙিন ।


 


মাত্র এক মাস আগে মেঘের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে পল্লবীর l অ্যারেঞ্জড  ম্যারেজ l বিয়ের আগে বাড়িতে আর কফিশপে মাত্র দু - তিনবার মিট করেছে মেঘের সঙ্গে l ফলে মেঘকে সঠিক চেনা ফুলশয্যার রাতেই l এই কদিন দেখে তাকে যথেষ্ট কেয়ারিং আর রেস্পন্সিবল বলেই মনে হয়েছে পল্লবীর l এরমধ্যেই সে ভালোবেসে ফেলেছে তার জীবনের প্রথম পুরুষটিকে l ভালো পরিবার এবং ভালো ক্যারিয়ার দেখেই মেয়ের সম্বন্ধ ঠিক করেছিলেন অমিতবাবু l সম্বন্ধের বিয়েতে এর থেকে বেশী জানা সম্ভব ছিল না l নরম, লাজুক, অন্তর্মুখী মেয়েটির জন্য তাই খুব চিন্তা ছিল তাঁর l কিন্তু কথায় বলে "জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে ---তিন বিধাতা নিয়ে l" সুতরাং মেয়ের বাবা হিসেবে এই রিস্কটুকু নিতেই হয়েছিল অমিতবাবুকে l নাহ ! এখন পল্লবীকে মেঘের হাতে সঁপে দিয়ে  তিনি স্বস্তির নিশ্বাসই  ফেলেছেন l



(২)



নরম ভালোলাগার সঙ্গে তেতো বিরক্তি, মিষ্টি সুখের সাথে কান্না ভেজা নোনতা দুঃখ ---এসব নিয়ে তৈরি হয় জীবনের কোলাজ l সেটা এখন বেশ ভাল করে বোঝে পল্লবী l স্বপ্নে দেখা রাজ্যপাটের  সঙ্গে বাস্তবজীবনের কোনো মিলই থাকে না l শরীরে গৃহবধূর তকমা লেগে গেলে একঝটকায় অনেকটা  বড় হয়ে যায় মেয়েরা l অলিখিত অনেক দায়িত্ব, কর্তব্যের বোঝা চেপে বসে কাঁধের ওপর l ইচ্ছে না থাকলেও "পারব না" অথবা "করব না" বলার অবকাশই থাকে না কোনো l পল্লবীর শাশুড়ি মা মানুষটা এমনিতে খারাপ নন, তাকে ভালোওবাসেন l কিন্তু বাঁধাধরা কিছু সংস্কারের মধ্যেই তাঁর বসবাস l একমাত্র ছেলের বৌ হিসেবে সেসবই তিনি চাপিয়ে দিতে থাকেন পল্লবীর কাঁধে l আসলে একসঙ্গে সংসার করতে করতে একটা মানুষের ঝলমলে চরিত্রের আড়ালে অন্ধকার দিকগুলোও বেশ নজরে পড়ে l এবং ক্রমে তা গা-সওয়াও হয়ে যায় l ছটফটে হাসিখুশি মেঘের চট করে রেগে যাওয়া, অথবা ধৈর্যহীনতা এবং শাশুড়ির অর্থহীন সংস্কার ও নিয়মকানুনের সঙ্গে তাল দিতে দিতে নিজের অনেক ভালোলাগার অভ্যেস ছাড়তে হয়েছে পল্লবীকে l বিয়ের আগে মা শিখিয়েছিলেন মেনে নেওয়া আর মানিয়ে চলার নামই সংসার, আজ তাই আর অতটা কষ্ট হয়না তার l



সময়ের পালাবদলে অভ্যস্ত হয়েছে সে, বিয়ের তিন বছর পরে নতুন বউ থেকে পল্লবী এখন রীতিমত গৃহিনী l নতুন স্বামী থেকে মেঘ এখন পল্লবীর জীবনের সেই অনিবার্য পুরুষটি, যাকে ভাললাগার অভ্যাসটা জারী রেখেই চলতে হবে জীবনের বাকি কটা দিন l মনের মানুষটির সবকিছুই মনের মত হয় না, সম্বন্ধের বিয়েতে কোন অপশন  থাকে না  একথা ভালোমতই জানে পল্লবী । 



(৩)



দীর্ঘ একবছর  ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে গত মাসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন শাশ্বতীদেবী, পল্লবীর শাশুড়িমা l একটা বছর ধরে পল্লবী অক্লান্ত সেবা করেছে তাঁর l শেষ সময়টায় পল্লবীর ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তিনি l কিন্তু অনিবার্যকারণেই মারণরোগের সঙ্গে অসম লড়াই একদিন থেমে গেল l এই প্রথম এত নিবিড়ভাবে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করল পল্লবী l 



হসপিটালের বিল মেটাতে পার্সোনাল লোনের বোঝা কাঁধে নিয়ে  মেঘ এখন  আর্থিক ও মানসিক ভাবে অসম্ভব বিপর্যস্ত l একে মাতৃশোক, তার ওপর এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় তার যাবতীয় সঞ্চয় প্রায় তলানিতে l মেডিক্লেম থাকা সত্ত্বেও জলের মত অর্থব্যয়ের ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তার প্রভাব স্পষ্টতই তার ব্যবহারে দৃশ্যমান l আজকাল সামান্য ব্যাপারেই বড্ড তীব্রভাবে রিয়্যাক্ট করে মেঘ l বিয়ের পরে যে মিশুকে, অমায়িক মানুষটাকে  একটু একটু করে আবিষ্কার করেছিল পল্লবী... এ যেন সে নয় l  



 (৪)



জীবন  তার নিজের গতিতে চলে l শোক-দুঃখ , কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয় l মানুষ তার অতি প্রিয়জনকে ছাড়াই জীবনের সঙ্গে সমঝোতা করে নেয় l 


শাশ্বতী মারা গিয়েছেন প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল l মেঘ এখন অনেকটা স্বাভাবিক l পরিবর্তিত  পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে l আস্তে আস্তে  আর্থিক সংকটও কাটিয়ে উঠেছে অনেকটা l  আসলে সংসারের রুক্ষ পথে চলতে চলতে পল্লবী এখন অনেক পরিণত l সে জানে কোন পরিস্থিতিতে কেমনভাবে চলতে হয়, কিভাবে হিসেব করে সংসার চালাতে হয় l পল্লবীর উপর নির্ভরতাও ক্রমে বাড়ছে মেঘের l সে জন্য অবশ্য  পল্লবীকেও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে  দিনের পর দিন l 



জীবনের ফিকে হয়ে যাওয়া রংগুলো আবার একটু একটু করে গাঢ় হচ্ছে l অনভ্যস্ত তুলির টানে তাদের  ফিরিয়ে আনতে পারছে পল্লবী l


 (৫)



দিনকয়েক হলো নতুন ফ্ল্যাটের পজেশন পেয়েছে পল্লবীরা l সাবেকি বাড়িটার জায়গায় নতুন আবাসনে ওদের পরিবারের সবাই একটা করে ফ্ল্যাট পেয়েছে l নতুন রঙের গন্ধটা এখনও লেগে আছে এ ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণায় কোণায়, আসবাবপত্রের গায়ে l সমস্ত মলিনতা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে আবার নতুন করে সেজে উঠেছে পল্লবী আর মেঘের সম্পর্ক l সুখের তানপুরাটা ক্রমাগত রিনরিন করে বাজছে পল্লবীর বুকে l একটু একটু করে  নিজের মনের মত পল্লবী  গুছিয়ে নিচ্ছে তার নতুন সংসার l তার আর মেঘের স্বপ্নের নীড় l 



দাদাশ্বশুরের তৈরি সাবেকি বাড়িতেই নতুন বউ হয়ে পা রেখেছিল পল্লবী  l মেঘ শাশ্বতীর একমাত্র সন্তান হলেও  একই বাড়িতে জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে, যৌথ পরিবারের আবহেই বড় হযেছে l যেহেতু পল্লবী একটা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সন্তান, অমিতবাবুর একমাত্র আদরের মেয়ে তাই যৌথ পরিবারের কনসেপ্টটা এখন শুধু  টিভি সিরিয়ালেই সীমাবদ্ধ, এটাই ভেবেছিল সে l মেঘের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই মনের মধ্যে যে সুপ্ত আশঙ্কাটা ছিল, জয়েন্ট ফ্যামিলিতে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে কি না, এ বাড়িতে পা দিয়েই শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোর আন্তরিকতায় এক নিমেষে উধাও হয়ে গিয়েছিল সেটা l  আস্তে আস্তে কখন যে ওদেরই একজন হয়ে উঠেছিল, টেরই পায়নি l 



কিন্তু সংসার তো সকলেরই ক্রমবর্ধমান ! পুরনো বাড়িতে  স্থানাভাবের জন্য আলাদা বাসস্থানের চিন্তা শুরু করেছিল সবাই l এমনকি মেঘও l কিন্তু এ বাড়িটা ছিল শাশ্বতীর প্রাণ l এ বাড়ি জুড়ে ছিল তাঁর বৈবাহিক জীবনের অজস্র  সুখস্মৃতি l তাই এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না l আর এই ঘর, দালান, ছাদ, চিলেকোঠা আর বাড়ি ঘিরে ফলফুলের বাগান কোনো প্রোমোটারের হাতে তুলে দেওয়া তো ছিল  তাঁর স্বপ্নের অতীত l অসম্ভব মায়ার ডোরে বেঁধে রেখেছিলেন ভাসুর-দেওরের ছেলেমেয়েদেরও l তারা সবাইকেই তিনি নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতেন l অনেক অসুবিধে সত্ত্বেও তাই সবাই থেকে গিয়েছিল এই বাড়িতেই l শাশ্বতী যতদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর সেন্টিমেন্টের মর্যাদা দিয়েছিল বাড়ির সকলেই l কিন্তু পার্থিব প্রয়োজনের কাছে সেন্টিমেন্টও ক্রমে মূল্যহীন হয়ে পড়ে l তাছাড়া আজকাল এত বড় প্রপার্টির মেন্টেনেন্সের খরচও তো কম নয় ! 



সব দ্বিধা কাটিয়ে অবশেষে  সবাই মিলে বাড়িটাকে প্রমোটারের হাতেই তুলে দিয়েছিল l বিনিময়ে পেয়েছিল সেই একই ছাদের তলায়  মিলেমিশে থাকার আশ্বাস l



(৬)



মেঘের দেওয়া উপহার লাল-সোনালী কম্বিনেশনের নতুন ব্যাঙ্গালোর সিল্কটা পরে  ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিল পল্লবী, মেঘেরই  অপেক্ষায় l ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ, ঝিরঝিরে হাওয়া মাঝে মাঝে  এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে পল্লবীর শরীর l বুকের ভিতরে তিরতিরে সুখ l আজ ওদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী l আজই প্রেগন্যান্সি টেস্ট করেছে পল্লবী l পরিষ্কার করে না বললেও ফোনে মেঘকে একটা সারপ্রাইজ দেবে বলে জানিয়েও দিয়েছে  l 



আজ ওদের  ডিনারে যাওয়ার কথা l একটু আগেই মেঘ ফোন করেছিল l পল্লবীকে রেডি থাকতে বলেছে l  অফিস থেকে আজ একটু তাড়াতাড়িই বেরোবে ও l



পল্লবী বাইরের খাবার খুব একটা পছন্দ করে না l রান্নাটা ওর শখ l তবুও মাঝেমধ্যে হ্যাংআউটে যেতে মন্দ লাগে না ওর l পাঁচবছরের অভ্যস্ত দাম্পত্যে একটা বিশেষ দিন একান্তে একটু  অন্যরকমভাবে সেলিব্রেট করা হবে ওর নিজস্ব পুরুষটির সান্নিধ্যে l আপন মনে "ভালবাসি ভালবাসি"---গুনগুন করে উঠল পল্লবী l 



কলিং বেলটা বেজে উঠল না ! নিশ্চয়ই মেঘ ! দৌড়ে এসে দরজা খুলল পল্লবী l দরজার বাইরে অন্ধকার মুখে  দাঁড়িয়ে দাদাভাই , সুনন্দদা  আর ভাইয়া l মেঘের জেঠতুতো দাদা ,জামাইবাবু  আর  খুড়তুতো ভাই l 



 (৭)



শ্মশান থেকে ফিরে ওদের শোবার ঘরের বিছানায় শুয়েছিল পল্লবী, মেঘের বউদি শ্রীলেখার কোলে মাথা রেখে l ঘরভর্তি আত্মীয়স্বজন l অমিতবাবু ও তাঁর স্ত্রী এসে পৌঁছলেন এইমাত্র l আজ ভোরেই  কোচবিহারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে শিলিগুড়ি এসে বিকেলের  ফ্লাইটে এতক্ষণে কলকাতা  এসে পৌঁছেছেন l 



কাল সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফেরার সময় রানওভার  হয়েছিল মেঘের গাড়ির l মেঘ নিজেই ড্রাইভ করছিল l অবশ্য বরাবরই নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে মেঘ l দুর্ঘটনা তো রোজ রোজ ঘটে না ! পোস্টমর্টেমের পর আজই বিকেলবেলা বডি রিলিজ করে দাহ করা হয়েছে l 



বাবার  ডাকে চোখ খুলে তাকালো পল্লবী l দৃষ্টিতে গভীর  শূন্যতা l তাঁর আদরের মেয়েটাকে মেঘের  হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন অমিতবাবু l ঈশ্বর আর স্বস্তিতে থাকতে দিলেন কই ! মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তাঁর l


 (৮)



অপঘাতে মৃত্যু l তিনদিনেই শ্রাদ্ধ - শান্তি মিটে গেল l আরো মাসখানেক থাকার পরে  অমিতবাবু আর বন্দনা মেয়েকে নিজেদের কাছে কোচবিহারে নিয়ে যেতে চাইলেন l কিন্তু পল্লবী তার সিদ্ধান্তে অনড় l এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না সে l এ বাড়ির প্রতিটি কোণে, খাটে-সোফায়, দেওয়ালে -দরজায় -মেঝেতে মেঘ কি ভীষণ জীবন্ত ! তাকে ছেড়ে কি চলে  যাওয়ার উপায় আছে পল্লবীর ! মেঘ তো  থাকতেই পারে না পল্লবীকে ছাড়া !



তাঁর নরম লাজুক মেয়েটা  যে এমন দৃঢ়ভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত  ধরতে পারে, তা কোনদিন ভাবেননি অমিতবাবু l তাঁর পক্ষে তো নিজের বাড়িঘর ফেলে আর বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়, তাছাড়া  অফিসও  আছে l স্ত্রীকে বললেন মেয়ের কাছে থেকে যেতে l কিন্তু তাতেও রাজি নয় পল্লবী l বাবার বয়েস হয়েছে, মায়ের এখন বাবার সঙ্গেই সবসময় থাকা উচিত l একপ্রকার জোর করেই মাকে বাবার সঙ্গে ফেরৎ পাঠাল সে l তাছাড়া একা থাকার অভ্যেস তো করতেই হবে তাকে l পরিস্থিতির সঙ্গে যেন বড্ড তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছে পল্লবী l



(৯)



আজই অমিতবাবুরা ফিরে গেলেন কোচবিহারে l মেঘের দাদা বৌদি,আত্মীয়রা সবাই আশ্বস্ত করেছে তাঁকে l ওরা  সবাই পল্লবীকে আগলে রাখবে সাধ্যমত l তাছাড়া কলকাতাতেই  একটা জব পেয়েছে পল্লবী l প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন থাকায় তেমন সমস্যা হয়নি l খুব শিগগিরই জয়েনিং l তাই এ মুহূর্তে পল্লবীর কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাওয়া উচিতও নয় l 



অনেকদিন পর এই ফ্ল্যাটে পল্লবী একা l বিকেলবেলা আকাশ কালো করে ঝড় এলো হঠাৎ  l কালবৈশাখী ঝড় l পল্লবীর হঠাৎ এলোমেলো হয়ে ওঠা জীবনটার মত l ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ঝড়ের তাণ্ডব দেখছিল পল্লবী l কলিং বেলটা বাজল না ! 



এতদিন বাদে নিজের বাড়িতে ফিরছে মেঘ l বরাবরই বড্ড অধৈর্য স্বভাব ওর l সেই সারপ্রাইজটার জন্য ছটফট করছে নিশ্চয়ই ! পল্লবীর শরীরের ভিতরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে যে ছোট্ট মানুষটা, সেও তো একটুকরো মেঘ ! তার অস্তিত্বের কথা কি মেঘ জেনে ফেলেছে ! দরজা খুলে ঝাপসা চোখে মেঘকে দেখছিল পল্লবী l গ্রীষ্মের প্রখর  দাবদাহের পর আকাশ ছেয়ে এখন শুধুই  ঘন মেঘের রাশি l

শনিবার, ২৪ জুলাই, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                       


                                


খোঁজ 

(১৪)

--মুন্নি কোথায় ছিলিস তুই এতক্ষণ? দেখ, তোর মায়ের কি অবস্থা ! 

শর্মিলাকে দেখেই রাজশ্রী চিৎকার করে উঠলেন l শর্মিলা দৌড়ে ঢুকল এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে l বেডে শুয়ে অপর্ণা  ছটফট করছিলেন, শর্মিলাকে দেখে স্থির হলেন l  চোখদুটো টকটকে লাল l ইনজেকশন পুশ করলেন একজন সিস্টার l কল্লোলদা বসে রয়েছে মায়ের পাশে l শর্মিলা দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল l 

--মুন্নি... মুন্নি বলতে বলতে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল মা l কিছুক্ষণ পরে কল্লোলদার সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল শর্মিলা l 

--কাকিমার বিপিটা মারাত্মক বেড়ে গিয়েছিল l আজ অ্যাডমিট করে নিচ্ছি l হসপিটালেই অবজার্ভ করতে হবে l ভালো থাকলে কাল ছেড়ে দেব l তোকে খুঁজে না পেয়ে অসম্ভব টেনশন করছিল l তোকে কিন্তু এখন কাকিমার কথা ভাবতে হবে শর্মিলা l কাকিমা আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন এমনকিছু করিস না l 

মুখটা নামিয়ে নিল শর্মিলা l বাইরে শম্পা আর মৈত্রেয়ী দাঁড়িয়ে l ওরা কখন এল ! মেঘনাই বা গেল কোথায়? 

--মেঘনা কোথায় গেল জানিস? ও একটা গাড়িতে একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে...

--ও চলে গেছে l ব্যাপারটা পরে বলব তোকে l 

ছোটকা এসে পৌঁছয়নি এখনও l বাবার ডেথ সার্টিফিকেট লিখিয়ে বডি রিলিজ করার থেকে শুরু করে শ্মশানযাত্রার ব্যবস্থা পিসেমশাই আর সমীরণকাকুই  মিলেই করে ফেললেন l সকালে ছোটকা এসে পৌঁছলেই যাত্রা শুরু হবে l ততক্ষণে ডেডবডি  হাসপাতালের মর্গে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে l এই নিয়ে মৈনাকদা আর কল্লোলদার  সঙ্গে কথা বলছিলেন পিসেমশাই l রাত বাড়ছে l কাবেরীকাকিমা মৈত্রেয়ীর সঙ্গে শর্মিলাকে ওদের বাড়িতে চলে যেতে বললেন l শর্মিলা যেতে চাইল না l 

--আমি মায়ের কাছেই থাকব কাকিমা l সকালে তোমরা হসপিটালে থেকো, আমাকে তো আবার শ্মশানে যেতে হবে l 

শান্ত গলায় বলল শর্মিলা l 

--তোকে যেতে হবে না মুন্নি l অলোক যদি না করে দাদার মুখাগ্নি আমি করব l তুই কোত্থাও যাবি না l 
রাজশ্রী বলে উঠলেন l 

--না পিসি, ছোটকা নয় l বাবার সন্তান হিসেবে এটুকু আমাকেই করতে দাও l বাবার জন্য তো আর কোনোদিন কিছুই করতে পারব না l 

সকাল দশটা নাগাদ অলোক এসে পৌঁছনোর পর ওরা কেওড়াতলায় গেল l অপর্ণা তখনও ঘুমোচ্ছেন l নিষেধ করা সত্ত্বেও শর্মিলার জেদের কাছে হার মানল সবাই l খটখটে শুকনো চোখে যন্ত্রের মত বাবার মুখাগ্নি থেকে শুরু করে অস্থি বিসর্জন পর্যন্ত সবটুকুই করল ও l ইলেকট্রিক চুল্লির গনগনে আগুনে বাবার শরীরটা যখন ঢুকে যাচ্ছিল সেদিকে তাকিয়ে অন্তর্দহনে পুড়ে যাচ্ছিল শর্মিলা l সারাক্ষণ মৈত্রেয়ী আগলে রাখল ওকে l মৈনাকদা আর কল্লোলদাও ছিল ওদের সঙ্গে l 

বিকেলে ওকে নিয়ে পিসির বাড়িতে ফিরল সবাই l অপর্ণা খানিকটা সুস্থ, তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন রাজশ্রী l ওই বাড়িতে আর ওদের ফিরতে দেবেন না l কাবেরীবৌদি আর কেয়াবৌদির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দরকার হলে এবার বৌদির ওপর জোর খাটাবেন l অলোক আর শবনম বলেছিল ওদের না হয় নারকেলডাঙায় নিয়ে যাবে l কষ্ট করেই থাকবে সবাই l রাজশ্রী বলে দিয়েছেন, 

 --দরকার নেই, আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার ভাইঝি আর বৌদিকে আর চোখের আড়াল করব না l 

অপঘাতে মৃত্যু l তিনদিনেই শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে গেল l ছোটকারা আসেনি l পিসি আর পিসেমশাইই ব্যবস্থা করলেন, একটা মঠে কাজ করল শর্মিলা l পিসির যত্নে মা খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে l চন্দননগর থেকে অসীমমামা আর মাইমা এসেছিলেন l দাদু বলে পাঠিয়েছেন শর্মিলা যেন মাকে নিয়ে এখন থেকে চন্দননগরে গিয়ে থাকে l ওখানে অনেক ঘর, থাকার কোনো অসুবিধা নেই, তাছাড়া ওখানকার কলেজে ভর্তি হতেও শর্মিলার কোনো অসুবিধে হবে না l ইতিমধ্যে অপর্ণা নিজেকে সামলে নিয়েছেন l মেয়ের জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই হবে তাঁকে l 

আশ্চর্য লাগে শর্মিলার l এখন সবাই ওদের মা- মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইছে l অথচ বাবাকে নিয়ে ওরা যখন বিপর্যস্ত তখন পিসি ছাড়া কেউ একবারও ওদের আশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবে নি l 

অপর্ণা বললেন, 

--কাকাকে বলিস আমরা দু- চারদিনের জন্য চন্দননগর থেকে ঘুরে আসব l কিন্তু এই মুহূর্তে এই চাকরিটা আমি ছাড়তে পারব না l তাই কলকাতাও ছাড়তে পারব না l চাকরিটা এখন আমার খুব দরকার l 

স্বরূপবাবু অপর্ণাকে বললেন, 

--বৌদি আমাদের বাড়িতে এতগুলো ঘর খালি পড়ে রয়েছে, তুমি কেন অন্য বাড়িতে থাকবে বল তো ! তিনতলার ছাদের সঙ্গে যে ঘরটা আছে সেখানে  তোমরা থাকবে l তুমি তো চাকরি করছই বরং বাড়িভাড়া হিসেবে আমাকে কিছু টাকা দিও, তাহলে তো তোমার খারাপ লাগবে না ! 

এত কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেললেন অপর্ণা l 

--বৌদি আমার নিজের বোন থাকলে কি আমি তাকে নিজের কাছে রাখতে চাইতাম না ! তুমি কি আমাদের এখনও নিজের লোক বলে ভাবতে পারো না?
  
সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন স্বরূপবাবু l 

-- রাজু আমার নিজের বোনের থেকেও বেশি স্বরূপদা l ও আমার জন্য যা করেছে আমার নিজের বোনরাও করতে পারেনি l সুখে নয়, সংকটে বন্ধু চেনা যায় l কিন্তু  সমাজে তো আরো পাঁচজন রয়েছে l আপনার আত্মীয়স্বজনই বা কি ভাববে? 

--তুমিও সারাজীবন আমাদের জন্য কম কিছু করনি বৌদি l যারা দাম দিতে পারে না, তাদের  দূরে থাকাই ভালো l আর এখন না হলে আর কবে তোমার পাশে দাঁড়াব বল তো ! আমি নিজে স্বাবলম্বী l তাই কারুরই কিছু বলার নেই l  আমাকেও তো একটু ঋণশোধের সুযোগ দাও ! আর মুন্নি আমার ভাইঝি হলেও আমার সবটুকু জুড়ে রয়েছে সেটা বোঝো না ! ওর নিরাপত্তার জন্যই তোমাদের আমি অন্য কোথাও থাকতে দিতে পারব না l

--হ্যাঁ রাজু, এই পরিস্থিতিতে তুমিই আমাদের সবথেকে নিরাপদ আশ্রয় l এখন তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য নেই আমার l 

জীবন থেমে থাকে না l পথচলার সঙ্গী হাত ছেড়ে চলে গেলেও মানুষ আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখে যায় l আরো কিছু বন্ধুর হাত এসে তাকে ঘিরে ধরে l ওই বাড়ি থেকে যৎসামান্য যা জিনিসপত্র ছিল, সেসব নিয়ে আসা হয়েছে পিসির বাড়ির তিনতলার ঘরে l ওখানে মাত্র কয়েকদিনের বসবাসেই জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গিয়েছে শর্মিলার l সামান্য আঘাতেই  নুইয়ে পড়ত যে ভীতু গাছটা, প্লাবন দেখে নিয়েছে সে l ঝড়জলের সামনে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে সে ভয় পায় না আর l অপর্ণা আবার নার্সিংহোমের চাকরিতে যেতে শুরু করেছেন l রাজশ্রীও স্কুলে চলে যান l পিসেমশাই চেম্বারে l দুপুরবেলাটা যেন হাঁ করে গিলে খেতে চায় শর্মিলাকে l পরীক্ষার আগে পিসির বাড়ি থাকতে চায়নি শর্মিলা l কিন্তু এখানে এখন মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যাই হল না l এ বাড়িতে অনেক বই l সারা দুপুর নানারকম বিষয় নিয়ে পড়তে পড়তেই সময় কেটে যায় l  মাঝে মাঝে চলে যায় মৈত্রেয়ীদের বাড়ি l মৈত্রেয়ী জয়েন্ট ছাড়াও আরো কিছু পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত l কাকিমার সঙ্গে বসে বসে গল্প করে l শম্পাদের বাড়িতেও গেল একদিন l শম্পার কাছেই শুনল মেঘনা এখন একজন ফিল্ম প্রোডিউসারের সঙ্গে মেলামেশা করছে l সেদিন সন্ধ্যেবেলা তার সঙ্গেই গাড়ি করে ফিরছিল পার্কস্ট্রীটের কোনো হোটেল থেকে l সেখানে নাকি শ্যুটিং চলছে l একটা সিনেমায় সহনায়িকার পার্টে অভিনয় করছে l 

--আর ওর বর? 

--তুই জানিস না? ওর বর তো এখন ওকে ছেড়ে অন্য একটা ঘাটে নৌকো বেঁধেছে l মেঘনা তো এখন বাবা- মায়ের কাছেই থাকে l কি জানি কি করে বেড়াচ্ছে ! দেখে তো মনে হয় হাতে প্রচুর পয়সা l সৌমিলি তো সেদিন যাচ্ছেতাই বলল ওর নামে l ওই আধবুড়ো প্রোডিউসারটার সঙ্গে নাকি ওর রিলেশন l এমনি এমনি কি আর সিনেমায় চান্স পেয়েছে ! ওর জন্য নাকি কারুর কাছে মুখ দেখানো যায় না l সৌমিলিটার জন্যই আরো খারাপ হয়ে গেল মেঘনা l 

--কাকু - কাকিমা কিছু বলে না ওকে?  

-- বললেই শুনছে আর কি ! দেখছিস তো ওকে ছোট থেকে l প্রচণ্ড ডেসপারেট l তবে ওর মনটা কিন্তু সত্যি ভালো l সেদিন ও না থাকলে তোর যে কি হত ! 


উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর সময় হয়ে এল l অথচ তেমন উত্তেজনা নেই শর্মিলার l রেজাল্ট যেমনই হোক, যে কোনো অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক জোর অর্জন করে ফেলেছে ও l এরইমধ্যে একদিন টুবলুদা কয়েকদিনের জন্য দেশে ফিরল l সঙ্গে তার বিদেশিনী বান্ধবী l কয়েকদিন কলকাতায় থেকে ওরা যাবে বিষ্ণুপুর l আর্কিওলজি নিয়ে পড়াশোনা করছে ইভলিন l প্রাচীন বাংলার মন্দির ওর গবেষণার বিষয় l ইভলিন ভাঙা ভাঙা বাংলাও বলতে পারে l শর্মিলার সঙ্গে একটু একটু বন্ধুত্ব হয়ে গেল ওর l 

(চলবে )








শনিবার, ১৭ জুলাই, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                            


খোঁজ (১৩)

--এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম l ভাবলাম তোদের পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে তোদের নিয়েই ফিরব l কেমন হল আজ পরীক্ষা? আজই তো শেষ ! আজ থেকে তোরা মুক্ত বিহঙ্গ l
--না গো কল্লোলদা, এরপরই  তো জয়েন্ট l আমার এখন ছুটি নেই l অবশ্য শর্মিলা এখন ফ্রি l ও  জয়েন্ট দেবে না l 

একটা ট্যাক্সি ডাকল কল্লোলদা l 

--শর্মিলা তুই কি আজ বাড়ি ফিরবি নাকি কাকিমার কাছে যাবি ?  
--বাড়ি ফিরব কল্লোলদা l কিন্তু এখন আগে কাকিমার কাছেই যাবো, কাকিমা বারবার বলে দিয়েছেন l 

কাবেরীকাকিমার কাছে খাওয়াদাওয়া করে সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরল শর্মিলা l মনটা ছটফট করছিল l কতদিন পরে আবার নিজের ঘরে মায়ের কাছে শোবে ও ! রেজাল্ট বের হতে এখনও তিনমাস l এত বড় ছুটিটা ও কাটাবে কিভাবে ! গানটা শুরু করবে আবার ! মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে l কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখল বাড়ির পরিবেশটা এখন যেন আরো থমথমে l মায়ের চোখমুখে অনিশ্চয়তার উৎকণ্ঠা l অজানা আশঙ্কায় মনটা ভরে উঠল l ব্যাপারটা অবশ্য আন্দাজ করতে পারছিল l রাতে বিছানায় শুয়ে অপর্ণা জানালেন এ বাড়িটা এবার বোধহয় ছেড়ে দিতে হবে l অলোকের প্রমোশন হওয়ার পরে দুর্গাপুরে ট্রান্সফার হয়ে গেছে l সামনের সপ্তাহেই সেখানে চলে যেতে হবে l শবনম রেলের কোয়ার্টার পেয়েছে  নারকেলডাঙায় l সেখানে থাকলে মুনমুনের স্কুলে যাতায়াতের সুবিধা l মুনমুন এবছরই বিডনস্ট্রীটের একটা নামকরা স্কুলে চান্স পেয়েছে l ওখানে স্কুলের বাস আসে l ছোট্ট,  দুকামরার ফ্ল্যাট l সেখানে কোনোরকমে মুনমুনকে নিয়ে থাকতে পারবে শবনম l এতজনের জায়গা কুলোবে না l অতএব সংসারখরচ চালিয়ে এই বাড়ির ভাড়া দেওয়া অপর্ণার পক্ষে অসম্ভব l শুধু এই বাড়ি কেন ! এরপর কোথায় থাকবেন, কিভাবে সংসার চলবে সেটা ভেবেও কূলকিনারা পাচ্ছেন না না অপর্ণা l নিজের হাত তো সম্পূর্ণ খালি l মরে গেলেও অলোকদের কাছ থেকে সংসারখরচ চাইতে পারবেন না তিনি l অল্প কিছু গয়না এখনও আছে, কিন্তু সেগুলো বেচে আর ক টাকাই বা পাওয়া যাবে ! 
হঠাৎই যেন নিজেকে অনেকটাই বড় মনে হল শর্মিলার l ওর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে গোটা সংসার l দায়িত্ব নেওয়ার সময় হয়েছে এখন l সংসারটাকে বাঁচাতে হলে এখনই একটা চাকরির খুবই দরকার l কিন্তু এই কোয়ালিফিকেশনে কোথায় চাকরি খুঁজবে ও ! তবু বলল, 

-- তুমি চিন্তা কোরো না মা l আমি আছি তো ! আমাদের একটা ছোট বাড়ি হলেই চলে যাবে l কাল থেকেই বাড়ি খুঁজব আমি l আর চেষ্টা করলে কিছুদিনের মধ্যেই একটা চাকরি নিশ্চয়ই জোগাড় করে ফেলতে পারব l কারুর সাহায্য লাগবে না আমাদের l

--তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে মুন্নি ! এখন চাকরি করে ভবিষ্যৎটা ঝরঝরে করবি তুই ! শোন,  কাবেরীদি সবটাই জানে l এরমধ্যে মৈনাক আমার একটা চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে ঢাকুরিয়ায় ডঃ সিনহার নার্সিংহোমে l রিসেপশনিস্ট কাম ক্লার্কের কাজ l দিনসাতেক ট্রেনিং নিলেই নাকি কাজটা করতে আর কোনো অসুবিধে হবে না l হাজার দেড়েক টাকা মাইনে দেবে ওরা l 

পরেরমাসে শবনমরা চলে যাওয়ার পরে অপর্ণারাও উঠে এলেন বেনিয়াপুকুর অঞ্চলের একটা আধাবস্তিবাড়িতে l একতলায় দেড়খানা ঘর, সামনে একচিলতে বারান্দা l সেখানেই রান্নার ব্যবস্থা l বাইরের উঠোনের টাইমের কল থেকে জল ভরে রাখতে হয় l এজমালি বাথরুম l আরো তিনঘর ভাড়াটের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয় l জিনিসপত্র প্রায় সবই শবনমকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন অপর্ণা l তার ঘরেও এত জায়গা নেই l অনেককিছুই বিক্রি করে দিতে হল শেষমেশ l বাড়ি দেখতে এসে রাজশ্রী কেঁদে ফেললেন l 

--এখানে তোমরা থাকবে কি করে বৌদি ! মুন্নি লেখাপড়া করবে কোথায়? এত করে তোমাদের বললাম, আমাদের বাড়িতে চল l জেদ করে তুমি মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করলে l 

ম্লান হাসলেন অপর্ণা l 
--তুমিই তো আমাদের শেষ ভরসা রাজু l তুমি না থাকলে আমাদের যে কি হত ! সারাজীবন আমাদের জন্য কম কিছু তো করলে না l আর কত টানবে? আর আমাদেরও তো এবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত ! আর মুন্নির যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে এখানে থেকেই  লেখাপড়া হবে l বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে ওকে l আর  বাড়িটা তো তোমার নয়, ওখানে থাকার রিকোয়েস্ট তুমি কোরো না প্লিজ l যত কষ্টই হোক, আত্মসম্মানটুকু বিসর্জন দিতে বোলো না আমায় l 

বাড়িভাড়ার দুশো টাকা দিয়ে হাতে যা থাকবে তাতে কোনোরকমে সংসার চলে যাবে l শর্মিলার পড়াশোনার খরচও আছে l কিন্তু বাবার ট্রিটমেন্ট চালাতে গেলে পিসির সাহায্য লাগবেই l কিন্তু সমস্যাটা হল শর্মিলার কলেজ শুরু হলে বাবাকে কে দেখবে l বাবাকে স্নান করানো, খাওয়ানো ছাড়াও চোখে চোখে রাখতে হয়ে সবসময় l শূন্য ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সারাদিন স্থবির হয়ে বসে থাকেন অরুণ l মাঝেমাঝে বিড়বিড় করেন নিজের মনে l হৃতচেতনার অন্তরালে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি এখনও l তবে মাঝে মাঝে অসম্ভব অস্থির হয়ে পড়েন, তখন দরজা খোলা পেলে বেরিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেন l এই সময়ে তাঁকে আটকাতে রীতিমত সমস্যায় পড়তে হয় l ডাক্তার বলেছেন এমন ডীপ অ্যামনেশিয়ার পেশেন্টকে কখনই একা রাখা চলবে না l 

এবাড়িতে শর্মিলাদের পাশের ঘরে যে পরিবারটি থাকে তাদের আগেই চিনত শর্মিলারা l ছোটবেলায় ওরা যে বাড়িতে থাকত তার পাশের বাড়িতে যে খ্রিস্টান পরিবারটি ছিল সেই বাড়িরই মেয়ে রেখাপিসি l বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল কার্তিক নামে পাড়ার এক উঠতি মস্তানকে l কার্তিক তেমন কোনো কাজকর্মই করে না l রেখাপিসিই ডঃ বাগচীর নার্সিংহোমে  আয়ার কাজ করে সংসার চালায় l কখনও কখনও দিন-রাত দু শিফটেও ডিউটি করে l সংসারের যাঁতাকলে পড়ে প্রেম এখন অদৃশ্য l ছিবড়ের মত পড়ে আছে বিবাহিত জীবনের শব l ভাগ্যিস ওদের কোনো ছেলেপুলে নেই l যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ দুজনের চিল চিৎকারে ঘরে থাকা দায় হয়ে যায় শর্মিলাদের l সকালে মা বেরোনোর আগেই জল তুলে, রান্নাবান্না আর সমস্ত কাজকর্ম সেরে নেয় l শর্মিলাকে বারবার বলে যায় যেন ও  ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে l কিন্তু তবু মাঝেমধ্যে প্রকৃতির ডাকে বা অন্যান্য প্রয়োজনে দরজা খুলে তো বেরোতেই হয় l কার্তিককাকুর গা ঘিনঘিনে দৃষ্টির সামনে পড়তে হয় তখন l মাকে সেকথা না বললেও অপর্ণা বুঝতে পারেন সবই l কিন্তু এখন তাদের দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার দিন l মাসদুয়েক পরে একদিন দুপুরে বাথরুমে যেতেই কার্তিক দেয়ালে ঠেসে ধরল শর্মিলাকে l টিনের চাল দেওয়া এই কলঘরে দিনের বেলাতেও ঘুটঘুটে অন্ধকার l চল্লিশ ওয়াটের একটা বাতি জ্বালাতে হয় l শর্মিলা বুঝতে পারেনি, আধো-অন্ধকারে কার্তিক আগে থেকেই লুকিয়ে বসেছিল l প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল শর্মিলা l সামনের ঘরের জবাবৌদি আর ডলিকাকিমা টের পেয়েও ভয়ে এগিয়ে এল না l কার্তিক এলাকার ত্রাস l হয়ত ওরাও এর আগে কার্তিকের লালসার স্বীকার হয়েছে l বাবার ঘরের দরজা খোলা ছিল l বিস্ফারিত চোখে হঠাৎই শর্মিলা দেখল বাবা বাথরুমে ঢুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কার্তিককাকুর ওপর l অমানুষিক জোর বাবার গায়ে l আঁচড়ে, কামড়ে রক্তাক্ত কার্তিককে বাথরুমের মেঝেয় ফেলে এলোপাথাড়ি মারছে বাবা l জন্তুর মত গোঙানি বেরিয়ে আসছে কার্তিকের মুখ থেকে l সারাটা গা গুলিয়ে উঠল ওর l জোর করে বাবাকে সরাতে গিয়েও পারল না l হঠাৎই কার্তিক একটা লাথি মেরে উল্টে ফেলে দিল বাবাকে l মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল বাবার l ইতিমধ্যে গোলমালের শব্দে বাইরে থেকে কিছু  লোকজন জমে গিয়েছে ওখানে l ডলিকাকিমা  তাড়াতাড়ি ওকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে  একগ্লাস জল খাওয়ালো l লোকজন আসার আগেই জ্ঞান হারাল বাবা l জবাবৌদি পাড়ার টেলিফোন বুথ থেকে মাকে ফোন করল নার্সিংহোমে l মা ফেরা অবধি কাঠের পুতুলের মত বসে রইল শর্মিলা l লোকজনই পুলিশে খবর দিয়েছে ততক্ষণে l বাবাকে ধরাধরি করে উঠোনে এনে শুইয়েছে l ব্লিডিং হয়েই চলেছে l কার্তিকেরও ওঠার ক্ষমতা ছিল না, সেও যথেষ্ট আহত l পুলিশ এসে অ্যারেষ্ট করল কার্তিককে l মা আসার পরেই অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল l কাবেরীকাকিমাকে নার্সিংহোম থেকেই ফোন করে দিয়েছিল মা l পিসিকে নিয়ে ততক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছে গেছে কাবেরীকাকিমা l এমার্জেন্সিতে কল্লোলদা আর মৈনাকদা রেডিই ছিল l আরো একজন সিনিয়র ডাক্তার পরীক্ষা করে তক্ষুণি আই সি ইউতে ভর্তি করে নিলেন বাবাকে l এতক্ষণ ধরে ক্রমাগত রক্তক্ষরণের ফলে কোমায় চলে গিয়েছে বাবা l কিছুক্ষণ পরে সমীরণকাকু আর কেয়ামাসিও এসে পড়লেন l একে একে পিসেমশাই, কাম্মাও চলে এল l ঘন্টাতিনেক  টানাপোড়েনের পর কল্লোলদা বেরিয়ে এসে মাথা নাড়ল l 
-- অনেক চেষ্টা করেছিলাম কাকিমা, কিন্তু এত ব্লিডিং হয়ে গেছে যে আর... 

রাজশ্রী অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন l 

অপর্ণার চোখ খটখটে শুকনো l 
--সারাজীবন হেরে গিয়ে অচেতন অবস্থাতেও অন্তত একটা যুদ্ধ জিতে চলে গেল মানুষটা l তোমার দাদা আমাদের মুক্তি দিয়ে গেল রাজু l আমাদের মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল l

ভীড় থেকে একটু একটু করে শর্মিলা পাশের অন্ধকার গলির দিকে সরে যাচ্ছিল, একা l ওর জন্যই আজ চলে যেতে হল বাবাকে ! জাগতিক বোধ থাকুক, না থাকুক, মানুষটা ছিল তো ! একটা মানুষের থাকা না থাকায় কতখানি পার্থক্য সেটা তো কয়েকমাস ধরেই টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে l নিজের ওপর অসম্ভব ঘৃণা হচ্ছিল শর্মিলার l এমন জীবন থাকার থেকে না থাকাই ভালো l বাবা চলে গেল, এরপর মাকেও যে কত বিপদে পড়তে হবে ওর জন্য, কে জানে l হঠাৎ ঘ্যাঁচ করে একটা অ্যাম্বাসেডর ওর সামনে দাঁড়াল l 

--কি করছেন কি ! মরবার ইচ্ছে হয়েছে আপনার ! 

ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটা চিৎকার করে উঠল l 

-- দাঁড়াও দাঁড়াও, এটা তো শর্মিলা ! তুই এত রাতে এখানে কি করছিস?  জানিস না এসব জায়গা ভালো না?  

মেঘনার গলা l কি অদ্ভুত সেজেছে মেঘনা ! একেবারে ট্রান্সপারেন্ট একটা শাড়ি, সরু স্লিভলেস ব্লাউজ, চড়া মেকআপ ! সঙ্গে এই লোকটা কে? এটা তো ওর বর না ! ইনি প্রায় ওর বাবার বয়েসী l মাথা কাজ করছিল না শর্মিলার l মেঘনা গাড়ি থেকে নেমে জড়িয়ে ধরল শর্মিলাকে l 

-- কি হয়েছে রে? তুই এত রাতে এখানে এসেছিস কেন?  কাকু - কাকিমা ঠিক আছেন তো? 

ইশারায় ওকে হসপিটালটা দেখাল শর্মিলা l

(চলবে )

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                 


অষ্টম পর্বের 

খোঁজ (৯)

ক্লাস টেনে মৈত্রেয়ী এসে ভর্তি হল শর্মিলাদের স্কুলে l ওরা আগে থাকত বহরমপুরে l ওর বাবা পুলিশের বড় অফিসার, চাকরিসূত্রে কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছেন l সাধারণত ক্লাস টেনে নতুন স্টুডেন্ট নেওয়া হয় না l কিন্তু মৈত্রেয়ীর আগের স্কুলে দুর্দান্ত রেজাল্ট আর ওর বাবার চাকরির শর্ত অনুযায়ী ওর  ভর্তি হতে কোনো সমস্যা হল না l মৈত্রেয়ী প্রথমদিন থেকেই শর্মিলার পাশে বসতে শুরু করল l ছোট্টখাট্টো, টিংটিঙে রোগা, ঈষৎ উঁচু দাঁত আর চশমার মোটা কাচের আড়ালে ঝকঝকে দুটো চোখ সবসময় কৌতুক মাখানো l সকলের সঙ্গেই খুব তাড়াতাড়ি মিশে যেতে পারত মৈত্রেয়ী l শুধু শর্মিলা নয়, ক্লাসের সবাই খুব তাড়াতাড়ি ওর বন্ধু হয়ে গেল l থানার প্রেমিসেসে ওদের বিশাল কোয়ার্টার l শর্মিলাদের বাড়ির কাছেই l মৈত্রেয়ীর দিদি অনেকটা বড়, বিয়ে হয়ে গেছে, বম্বেতে থাকে l আর দাদা মেডিকেল কলেজে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে l ওর মা কাবেরীকাকিমা শর্মিলাকে খুব ভালোবেসে ফেললেন l প্রায়ই  দারুণ দারুণ রান্না করে ওকে বাড়িতে ডাকতেন l এতদিনের এত বন্ধু থাকা সত্ত্বেও মৈত্রেয়ীর সঙ্গে অন্তরঙ্গতাটা অনেক গাঢ়  হল শর্মিলার l মৈত্রেয়ীর একটা স্বাভাবিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল l মৈত্রেয়ী ওকে যতটা বুঝত, ও নিজেও বোধহয় নিজেকে তেমনভাবে বুঝতে পারত না l মৈত্রেয়ীরও অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট ছিল অঙ্ক l শনি রবিবার মাঝে মাঝে রিজ্জুদার কাছে অঙ্ক করতে শর্মিলাদের বাড়িতে আসত মৈত্রেয়ী l যে কথাটা শর্মিলা নিজেও বুঝতে পারেনি বা নিজের কাছে স্বীকার করেনি, অল্প সময়েই মৈত্রেয়ী সেটা ঠিক বুঝে ফেলল l এতদিনে নিজের মনকে একটু একটু করে পড়তে পারল শর্মিলা l এরই মধ্যে সাগরিকা, সুদেষ্ণাদের প্রেম বন্ধুমহলে নিত্যদিনের চর্চিত বিষয় l ওদের বয়ফ্রেন্ডরা কিভাবে ওদের প্রপোজ করেছে, চিঠি লেখা, মান -অভিমান, মানভঞ্জনের সব গল্পই  বন্ধুদের গ্রূপে শেয়ার করে ওরা l রিজ্জুদা ওকে কোনোদিন প্রপোজ করেনি, লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোনো আলোচনাও তেমনভাবে হয়নি ওদের মধ্যে কোনোদিন l একে কি প্রেম বলা চলে ! মনের মধ্যে সংশয়ের দোলাচল l রিজ্জুদা শর্মিলার থেকে অনেকটাই বড়, ওর শিক্ষক l তাই ওকে শ্রদ্ধা করে শর্মিলা l কেন যে অনুভূতিটা অন্য একটা মাত্রায় চলে গেল ! কিন্তু  ছাত্রী হিসেবে ওর প্রতি স্নেহ ছাড়া আর কোনো অনুভূতি কি আছে রিজ্জুদার? অসম্ভব একটা আলোড়ন শুরু হল  শর্মিলার মনের ভিতর l বয়ঃসন্ধির আবেগ যখন তখন চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল l
সেদিন মৈত্রেয়ী আসেনি, শর্মিলা একাই বইখাতা খুলে বসেছিল l প্রিটেস্টের রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি, অপেক্ষাকৃত অনেক সহজ অঙ্কই মেলাতে পারেনি শর্মিলা l ঘরে ঢুকে খাতা দেখতে দেখতে গম্ভীরমুখে রিজ্জুদা বলল 
--আজকাল মোটেই পড়াশোনায় মন নেই তোমার l কি ভাবো বল তো সবসময়? 
--জানি না 
--জানো না? না,  বলবে না?  
--বলব না 
--বলতে হবে না l তোমার কি হয়েছে, আমি  জানি l 
--কি জানো?  বল, কি জানো?  
--এই বয়েসে যা হয় আর কি ! কাউকে ভালো লেগেছে তোমার ! কিন্তু তুমি কি জানো, যাকে ভালো লেগেছে  রেজাল্ট খারাপ হলে সে ফিরেও তাকাবে না তোমার দিকে ! 
ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল শর্মিলা l ওর ভেজা গালে হাত ছুঁইয়ে  রিজ্জুদা বলল 
--তোমার ওপর আমার অনেক আশা মুন্নি l আমার কথা একটু কম ভাবো আর পড়াশোনায় মন দাও l আমি তো আছিই... শুধু একটা কথা মাথায় রেখো l আমাদের মধ্যে কিন্তু অনেক বাধা রয়েছে l সেটা অতিক্রম করতে গেলে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তোমায় l

সেবার মাধ্যমিকে শর্মিলাদের স্কুলের বেশ ভালো  রেজাল্ট হল l তিপ্পান্নজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একুশজন ফার্স্ট ডিভিশন, আর বাকি সবাই সেকেন্ড ডিভিশন পেয়েছে l কেউ ফেল করেনি l একুশজনের মধ্যে পাঁচজন স্টার l দেখা গেল সৌমিলি নয়, মৈত্রেয়ী স্কুলের মধ্যে প্রথম হয়েছে l এমনকি কুড়িজনের মেধাতালিকায়ও  জায়গা করে নিয়েছে l কম্পালসারি আর অ্যাডিশনাল ম্যাথসসহ চারটে সাবজেক্টে লেটার পেয়েও মাত্র দু নম্বরের জন্য স্টার পেল না শর্মিলা l 

রেজাল্টের দিন সকালেই  ছোটকা কলেজস্ট্রিট থেকে গেজেট  কিনে নিয়ে এল l বাড়িতে সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল l বাড়ির প্রথম মেয়ের জীবনের প্রথম পরীক্ষার রেজাল্ট বলে কথা ! রেজাল্ট দেখে খানিকটা হতাশ হলেও মা বললেন  মাধ্যমিকের রেজাল্ট নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট ভালো করার চেষ্টা করতে হবে l পিসি, কাম্মা সবাই অবশ্য খুশি l শম্পাও ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল l কেয়ামাসিও খুব খুশি l আগের বছর শর্বরীদি ফার্স্ট ডিভিশন পায়নি l ওদের সাফল্য উদযাপন করে দুবাড়িতে মিলে একদিন জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল l মা, আর কেয়ামাসি দুজনে মিলে অনেককিছু রান্না করলেন l সেদিন রাতে হঠাৎই মায়ের শরীরটা খুব খারাপ হল l মাথা ঘুরে রান্নাঘরে পড়ে গেলেন l ডাক্তার জেঠু বাড়িতে এসে প্রেশার মেপে বললেন ব্লাডপ্রেশার খুবই বেশী l আগুনতাতে আর রান্না করা চলবে না l ঈষৎ হাসলেন অপর্ণা l দুদিন ছুটি নিয়ে কাম্মা রান্নাবান্না করল l তারপর একজন রান্নার লোক রাখা হল l কিন্তু বাড়ির সবাই অপর্ণার রান্না খেয়ে অভ্যস্ত, লক্ষ্মীমাসির রান্না তাদের ভালো লাগবে কেন ! তাই প্রথমে অল্পস্বল্প হলেও পরে পুরোদমে রান্নাঘরে ঢুকতে শুরু করলেন অপর্ণা l ইতিমধ্যে অবশ্য শবনমের উদ্যোগে রান্নার গ্যাস এসেছে বাড়িতে l  

নিজের জন্য মনখারাপ হলেও মৈত্রেয়ীর জন্য খুব গর্ব হচ্ছিল শর্মিলার l স্কুল থেকেও  মৈত্রেয়ীকে সংবর্ধনা দেওয়া হল l ইলেভেনে ওরা প্রায় সবাই নিজেদের স্কুলেই ভর্তি হল l শম্পা, সাগরিকা, সুদেষ্ণারা আর্টস সেকশনে আর মৈত্রেয়ী, শর্মিলারা সায়েন্স সেকশনে l সৌমিলি চলে গেল অন্য স্কুলে l ওর বোন মেঘনা বলল 
--সৌমিলি বলেছে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে এক স্কুলে পড়বে না l 
মেঘনার তখনও  ক্লাস নাইন l চুটিয়ে প্রেম করছে একজন উঠতি অভিনেতার সঙ্গে l ছেলেটি নাটক করে l দু - একটা সিনেমায় হিরোর বন্ধু বা ভাইয়ের পার্টে অভিনয় করেছে l মেঘনাও নাকি গ্রূপ থিয়েটারে যোগ দেবে l এর মাসদুয়েক পরেই হঠাৎ উধাও হয়ে গেল মেঘনা l সৌমিলির সঙ্গে দেখা হয় না শর্মিলাদের l ওদের ক্লাসের মেয়েদের কাছেই খবর পেল  মেঘনা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে l

রিজ্জুদারও ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেল l জামশেদপুরে একটা স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি পেয়ে গেল রিজ্জুদা l কোম্পানির কোয়ার্টারও পেয়ে গেল l মাসে একবার দুদিনের জন্য বাড়ি এলে শর্মিলার সঙ্গে দেখা হত l সপ্তাহে একটা করে চিঠি লিখত রিজ্জুদা l সেই চিঠিতে সুন্দর শহরটার বর্ণনা থেকে দেশের রাজনীতি, প্রতিবেশীদের কথা, শর্মিলার লেখাপড়ার খোঁজখবর সবই থাকত l কিন্তু কোনোভাবেই কোনো প্রেমের কথা লেখা থাকত না l মৈত্রেয়ী এই নিয়ে খুব রাগাত শর্মিলাকে l অবশ্য পোস্টে চিঠি এলে বাড়ির লোকজনের হাতে হামেশাই সে চিঠি পড়ত l শিক্ষক আর ছাত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক বলেই বাড়ির কেউ সন্দেহ করত না কখনও l শুধু রিজ্জুদার চিঠি এলেই  মা মাঝে মাঝে কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাত শর্মিলার দিকে l 

স্যান্যাল স্যারের কোচিংয়েই ফিজিক্স আর ম্যাথস টিউশনে ভর্তি হল মৈত্রেয়ী আর শর্মিলা l শুভ্রকান্তি, ধ্রুব, অর্ণব সবাই একই ব্যাচে ভর্তি হয়েছে l ওদের স্কুলের আত্রেয়ীদির  কাছে বাড়িতে  কেমিস্ট্রির টিউশন l প্রথম ফিজিক্স ক্লাসের দিনই  মৈত্রেয়ীর খুব জ্বর, শর্মিলা একাই ফিরছিল টিউশন থেকে l সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে l অর্ণব সাইকেল নিয়ে ওর সঙ্গে  বাড়ি অবধি এল l 
--শর্মিলা তোকে না একটা কথা বলার ছিল l মানে.. ধ্রুব তোকে একটা কথা বলেছে l 
--কি কথা ?  ধ্রুব নিজে না বলে তোকে বলতে বলল কেন?  
খুব অবাক হল শর্মিলা l 
--তোকে এই চিঠিটা দিয়েছে ধ্রুব l 
ঘরে এসে চিঠি খুলে শর্মিলার চোখ ছানাবড়া ! এ তো প্রেমপত্র ! প্রতি লাইনে আবেগের বৃষ্টি ! সেই জন্যই কি ধ্রুব আজকাল বিশেষ কথা বলে না ওর সঙ্গে ! চোখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত !
মৈত্রেয়ীকে বলার পর খুব হাসল ও l 
--এতদিনে তুই ঠিকঠাক প্রেমপত্র পেলি l রিজ্জুদাকে বরং পাঠিয়ে দে l কিভাবে প্রেমিকাকে চিঠি লিখতে হয় শিখে নিক l 
মজা করলেও এই সমস্যাটা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল দুজনেই l ধ্রুব ভালো ছেলে, ওদের ভালো বন্ধু l শর্মিলার রিজেকশনে যদি ওর মানসিক কোনো ক্ষতি হয়ে যায় ! শর্মিলা জানে এই পর্যায়ে লেখাপড়ার কতটা ক্ষতি হয় l তবু ওকে তো বলতেই হবে সত্যিটা l পরেরদিন ক্লাসের পর ধ্রুবকে ডেকে মৈত্রেয়ী বলল 
--ধ্রুব, শর্মিলা একজনের কাছে কমিটেড l তুই প্লিজ  একটু বোঝ ব্যাপারটা l 
ধ্রুব একটাও কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল l পরেরদিন থেকে আর ক্লাসে এল না l অর্ণব বলত ধ্রুব  একদম পড়াশোনা করছে না l কতগুলো বাজে ছেলের সঙ্গে মিশছে l সিগারেট, গাঁজা খাচ্ছে l খুব খারাপ লাগত শর্মিলার l বিশেষত অর্ণবরা যখন বলত ওর জন্যই এত ভালো একটা ছেলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ! কিন্তু ওই বা কি করবে ! সেই মাসে রিজ্জুদা আসার পর সব কথা বলার পর ওকে অকারণ অপরাধবোধে বিক্ষত হতে দেখে রিজ্জুদা মৈত্রেয়ীকে বলল 
--তুমি ধ্রুবদের বাড়িটা চেনো? আমি আজ ওদের বাড়িতে যাবো l ওর গার্ডিয়ানদের সবটা খুলে বলব l ওকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিলে হয়ত ওর পক্ষে ভালো হবে l এখানে থাকলে ওর ক্যারিয়ারটা শেষ হয়ে যাবে l আর শর্মিলারও লেখাপড়া হবে না l অন্য পরিবেশে ও একটা ফ্রেশ স্টার্ট করতে পারবে l

কিছুদিন পরে অর্ণব বলল ধ্রুব ওর মাসির সঙ্গে যাদবপুরে চলে গেছে l এবার থেকে ওখানেই থাকবে l ওখানকার একটা স্কুলেই ট্রান্সফার নিয়ে নিয়েছে l 

(চলবে )

রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                                  



খোঁজ 


(৬)

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি কিছু বিত্তবান মানুষের বাড়ির ছাদে টেলিভিশনের অ্যান্টেনা দেখা যেতে শুরু করল l শর্মিলাদের নিম্ন মধ্যবিত্ত পাড়ায় টেলিভিশন নামক বস্তুটি তখনও  বিরল l শর্মিলা প্রথম টেলিভিশন  দেখেছিল সাগরিকাদের বাড়িতে l এক শনিবার বিকেলে গানের ক্লাসে যেতেই সাগরিকা ফিসফিস করে বলল, 

 --জানিস তো আমাদের বাড়িতে আজ টিভি এসেছে l কি  মজা ! এখন থেকে আমরা বাড়িতেই সিনেমা দেখতে পারব l আজ গানের ক্লাসের পর বাড়ি যাস না কিন্তু  l সন্ধ্যেবেলা বাংলা বই আছে l সৌমিত্র -অপর্ণা সেনের বই l


সেদিন গানের ক্লাসে ইমনের বোলতানে বারবার তালে ভুল করল শর্মিলা l এই প্রথম অন্যমনস্কতার জন্য মাস্টারমশাইয়ের কাছে বকুনি খেল l  মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পর সাগরিকাদের হলঘরে এসে দেখে সেখানে থিকথিকে ভিড় l ওদের বাড়ির লোকজন তো বটেই, পাড়ার ঠাকুমা -জেঠিমারাও হাজির l তারই মধ্যে এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল শর্মিলা l সামনে দরজাওয়ালা একটা কাঠের আয়তাকার বাক্স l সাগরিকার জেঠু দরজাটা খুলে দিতেই একটা নীলচে কাচের আয়না l তার পাশে রেডিওর মত নব রয়েছে l জেঠু নবগুলো ঘোরানোর পরে কাচের ওপর সিনেমার মত সাদাকালো ছবি ফুটে উঠল l কিন্তু শর্মিলার আর সিনেমা দেখা হল না l প্রতিদিনের মত পিসি এসে ডাকতেই প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে তার সঙ্গে বাড়ি ফিরতে হল ওকে l এমনিতেই মাস্টারমশাইয়ের কাছে বকুনি খেয়ে মেজাজটা খারাপ ছিল, তারওপর সিনেমাটাও দেখা হল না l মুখ গোঁজ  করে পিসির হাত ধরে হাঁটছিল শর্মিলা l বিকেলে সাগরিকাদের পাশের বাড়িতে রাজশ্রী টিউশন পড়াতে আসেন, ফেরার সময় শর্মিলাকে সঙ্গে নিয়েই ফেরেন l কিছুটা যেতে না যেতেই শর্মিলা বলল 

--এর পরেরদিন থেকে আর তোমার সঙ্গে ফিরব না, সিনেমা দেখে রাত্তিরে ফিরব l ছোটকা এসে আমায় নিয়ে যাবে l 

রাজশ্রী গম্ভীরমুখে শুনলেন l বাড়িতে এসে মাকে ডেকে বললেন, 

-- বৌদি, তোমার মেয়ের আর লেখাপড়া, গানবাজনা কিচ্ছু  হবে না l মাথায় এখন সিনেমার ভুত ঢুকেছে l

--কি হয়েছে রাজু?  

পিসি বলল ব্যাপারটা l

--শোনো ওবাড়ির গানের ক্লাসে আর মুন্নিকে পাঠানো যাবে না l বড়রাস্তার ওপারে নতুন একটা গানের স্কুল খুলেছে l ওখানে ভর্তি করে দেব l ওরা সবধরণের গান শেখায়, ডিপ্লোমাও দেয় l ভালো ভালো শিল্পীরাও আসেন শেখাতে l আমার স্কুলের শিউলি বলছিল ওর মেয়েকেও ভর্তি করেছে l ওর মেয়েও তো মুন্নিরই বয়েসী l 


--সেটাই ভালো হবে, তুমি খোঁজখবর নাও l তবে কেয়াদি বলছিল টেলিভিশনে শুধু সিনেমাই দেখায় না, অনেক ভালো অনুষ্ঠানও হয় l গান, আবৃত্তি, নাটক, এমনকি বাচ্চাদের অনুষ্ঠানও হয় l রেডিওর মত খবরও বলে রোজ l কেয়াদিও শিগগিরই টিভি কিনবে l 

পিসি আর কিছু বলল না l তখনকার মত কথাটা ওখানেই চাপা পড়ে গেল l 


সোমবার স্কুলে টিফিনের সময় মাঠে বেশ গুছিয়ে  বসে সাগরিকা ওদের বসন্তবিলাপ সিনেমার গল্পটা বলছিল l হঠাৎ মেঘনা বলল 

--এই সিনেমার একটা গান আমি জানি l বলেই  উঠে দাঁড়িয়ে হাত - পা নেড়ে "আমি মিস ক্যালকাটা নাইনটিন সেভেন্টিসিক্স" গেয়ে উঠল l ওরা সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল l মেঘনা যে এত ভালো গান গাইতে পারে সেটা জানতই না ওরা l 

--কি দারুণ ! তুই কি করে শিখলি? 

সোমালি মুখ বেঁকিয়ে বলল 

--পড়ার সময় রোজ বিবিধভারতী শুনলে সবাই ওরকম গাইতে পারে l

--শুনবই তো ! তোর তাতে কি? তুই মন দিয়ে পড়  না...ফার্স্ট হ l কে বারণ করেছে? আমি বাজে মেয়ে... বাজেই থাকব l

গজগজ করে উঠল মেঘনা l এরপর রোজ ফিসফিস করে সিনেমার গল্প, আর্টিস্টদের জীবনের গল্প করত সাগরিকা আর মেঘনা l সাগরিকাদের বাড়িতে ফিল্ম ম্যাগাজিন কেনা হত এবং বড়দের মধ্যেও এই বিষয়ে বেশ চর্চা হত l মেঘনা বলত ও বড় হয়ে সিনেমায় অভিনয় করবে l ওকে এমনিই সুন্দর দেখতে l তার মধ্যে ওই বয়েসেই বেশ নায়িকাসুলভ আচরণ দেখা যেতে লাগল l বন্ধুরাও ওকে বেশ উৎসাহ দিতে শুরু করল l কিন্তু ধারাবাহিকভাবে রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করল মেঘনার l ক্লাস সেভেনে ফেল করে ওদের নীচের ক্লাসে চলে গেল ও l

এভাবেই পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছিল ওরা l

 

ততদিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল l সাতাত্তরের ইলেকশনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে  সরকার গঠন করেছে বামফ্রন্ট l শর্মিলার ছোটকা অলোক একটা আধাসরকারি ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার মাস দুয়েকের মধ্যে হঠাৎই একদিন রেজিস্ট্রি বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এল কলেজের বন্ধু শবনমপিসিকে l শবনমপিসি আগেও ওদের বাড়ি এসেছে দু একবার, কিন্তু সে যে ওর কাকিমা হবে ভাবতেও পারেনি শর্মিলা l তারমানে ছোটকার সঙ্গে শবনমপিসির প্রেম ছিল ! অবশ্য ও তো ছোট, বড়দের মনেও একটা প্রবল ধাক্কা লাগল এ বিয়েতে l ছোট হলেও শর্মিলা  বাড়ির অশান্তিটা ও টের পাচ্ছিল ঠিকই l ঠাম্মা প্রথমে চিৎকার করে কিছুক্ষণ বিলাপ করলেন তারপর  সাফ বলে দিলেন ছোটকা যেন বৌ নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যায় l হিন্দু অসবর্ণ মেয়ে হলেও তিনি মেনে নিতেন কিন্তু মুসলিম বৌ নিয়ে তিনি কিছুতেই ঘর করবেন না l অরুণ রেগে বললেন 

--- সবে চাকরি পেলি, এখনও দিদির বিয়ে হল না এর মধ্যেই নিজে বিয়ে করে নিলি ! সারাজীবন শুধু আমাকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে নাকি ! 


রাজশ্রী বললেন, 

--আমার বিয়ে নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না l আমি বিয়ে করব না রে দাদা l কিন্তু তুই এত স্বার্থপর কি করে হলি রে অলোক ! সংসারটা একটু গুছিয়ে দিয়ে তো বিয়েটা করতে পারতিস ! 

ছোটকা মাথা চুলকে বলল, 

-- আসলে শবনমের বাড়ি থেকে অন্যজায়গায় বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল তো, তাই বাধ্য হয়ে হুট্ করেই বিয়েটা করতে হল l

অবস্থা সামাল দিতে আসরে নামলেন অপর্ণা l একমাত্র অপর্ণাই বোধহয় আগে থেকে একটু আঁচ করতে পেরেছিলেন ব্যাপারটা l 

--বিয়েটা যখন হয়েই গেছে তখন অশান্তি করে লাভ কি ! এখন কিছুদিন ওরা এখানেই থাকুক l একটা ভাড়া বাড়ি দেখে নিয়ে পরে ওরা না হয় চলে যাবে l তাছাড়া ঐটুকু ঘরে ওরা থাকবেই বা কেমনকরে ! শবনম কিন্তু  এখন আমাদেরই একজন, এটা মনে রেখো l 

মায়ের কথা ফেলতে পারল না বাড়ির কেউই l 


মাসখানেকের মধ্যেই তিলজলা এলাকায়  একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে গেল ছোটকারা l এই একমাসে শবনমপিসিকে কাম্মা বলা প্র্যাক্টিস করে ফেলল শর্মিলা l এই একমাস দুর্বিসহ জীবন কাটিয়েছিল কাম্মা l মা আর শর্মিলা ছাড়া আর কেউ কথা বলত না তার সঙ্গে l রান্নাঘরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না l হিন্দু ছেলে বিয়ে করার অপরাধে বাপের বাড়িও যাওয়ার পথও বন্ধ ছিল কাম্মার l ওদের যাওয়ার দিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে শর্মিলাকে নিয়ে অপর্ণাও ট্যাক্সিতে উঠলেন ওদের সঙ্গে l একটা খাট একটা বড় ট্রাঙ্ক আর টুকটাক কিছু বাসনপত্র ছোটকা কিনে রেখেছিল l সেসব গুছিয়ে ওদের সঙ্গে বাজার থেকে আরো কিছু দরকারি জিনিস কিনে গুছিয়ে দিয়ে সে রাতে ওখানেই থেকে গেলেন l এই জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা l গাছপালা, পুকুর রয়েছে l কাঁচা রাস্তার ধারে একটা ছিমছাম দোতলা বাড়ি l তার একতলার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে ছোটকা l কেরোসিন স্টোভ জ্বেলে সেদিন রাতে খিচুড়ি আর ডিমভাজা করেছিল কাম্মা l বেশ একটা পিকনিকের মত ব্যাপার l সবাই মিলে একসাথে খেতে বসে খুব মজা লাগছিল l  চন্দননগরে দাদুর বাড়ি ছাড়া এই প্রথম শর্মিলা মাকে অন্য কারুর রান্না করা খাবার খেতে দেখল শর্মিলা l এই নতুন বাড়িতে এসে মাকে একদম অন্যরকম লাগছিল l ওদের বাড়িতে কোনোদিন মাকে এমন উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত মনে হয় নি l পরেরদিন ভোরবেলা ট্যাক্সিতে ছোটকা ওদের বাড়ি পৌঁছে দিল l সেদিন রবিবার l স্কুল বা অফিসের তাড়া  নেই তবু মুখে আবার সেই একঘেয়েমির রুপটান মেখে  সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অপর্ণা l শর্মিলা স্কুলের হোমওয়ার্ক করতে করতে ঠিক করল বড় হয়ে মাকে ওই অন্যরকম জীবনটা উপহার দেবে ও l


(চলবে)


                                  

রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                              


 


খোঁজ (৫)


শর্মিলা যে গার্লস  স্কুলে পড়ত তার প্রাইমারি সেকশনটা ছিল মর্নিং শিফট l ঠিক সকাল ছটা কুড়িতে  প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়ত l স্কুলের দোতলার করিডোরে প্রত্যেক ক্লাসের মেয়েদের  ক্লাস টিচাররা লাইন করে দাঁড় করিয়ে দিতেন l নার্সারি থেকে ক্লাস ফোর, পাঁচটা ক্লাসের দশটা সেকশন l করিডোরের দুদিকে পাঁচটা করে লাইন, প্রতি লাইনের শেষে দাঁড়াতেন সেই ক্লাসের ক্লাসটিচার l মাঝখানে দাঁড়াতেন প্রাইমারি সেকশনের টিচার-ইন-চার্জ এবং গানের দিদিভাই l তার সামনে একটা টেবিলে হারমোনিয়াম l প্রেয়ার শুরু হত "অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময় " উপনিষদের এই শ্লোকটি দিয়ে l তারপর এক একদিন একেকটা প্রার্থনাসঙ্গীত গাওয়া হত l এটা শর্মিলার কাছে স্কুলে যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ ছিল l তাছাড়া প্রেয়ারের লাইনে কেউ উপস্থিত না থাকলে ফার্স্ট পিরিয়ডে তাকে কান ধরে ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হত l শাস্তি পাওয়ার ভয়ও ছিল  অবশ্য l তাই শীত বা বর্ষাতেও ভোর পাঁচটায়  ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজলে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে শর্মিলাও উঠে পড়ত l মা কেরোসিনের স্টোভ জ্বালিয়ে টিফিন বানিয়ে দিতেন l কোনোদিন আগেরদিনের মাখা আটা দিয়ে পরোটা আর আলুভাজা বা জ্যাম - পাঁউরুটি l মুখ ধুয়ে দুধ - বিস্কুট খেয়ে ইউনিফর্ম পরতে না পরতেই গলির মুখে রিকশা ঠুন ঠুন করে কাদের চাচা হাজির... ব্যাগ গুছিয়ে জুতোমোজা পরেই শর্মিলা তখন দে ছুট l 

ক্লাসে সাগরিকা ছাড়াও শম্পা, সোমালি আর মেঘনার সঙ্গেও বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল শর্মিলার l ওদের পাড়ার মোড়ের বাড়িটাই ছিল শম্পাদের, তাই স্কুলে যাওয়া -আসার সময় একই রিকশায়  যাতায়াত করত ওরা l শম্পার দিদি শর্বরী ওদের এক বছরের সিনিয়র l তিনজনেই যেত একই রিকশায়, ঠেসেঠুসে l শম্পার মায়ের সঙ্গেও শর্মিলার মায়ের বেশ ভাব হয়ে গেল l সাড়ে দশটায় স্কুল ছুটির সময় অবশ্য ওরা রিকশায় ফিরত না, হেঁটেই ফিরত l কেয়ামাসি আর মা একসঙ্গেই ওদের আনতে যেতেন l ক্লাসটিচারের সঙ্গে কথা বলে লেখাপড়ার খোঁজখবরও নিতেন l  মাঝে মাঝে রান্না শেষ না হলে অপর্ণা যেতে পারতেন না l সেদিন কেয়ামাসিই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতেন l অপর্ণা ততক্ষণে নিরামিষ রান্না শেষ করে আলাদা করে মিটসেফে  তুলে রেখে উনুনে হয়ত মাছের ঝোল বসিয়েছেন l স্টোভ জ্বালিয়ে  চা করে নিয়ে কেয়ামাসি আর আর মা গল্প করতে বসতেন l কেয়ামাসি বয়েসে খানিকটা বড় ছিলেন,  তাই অপর্ণা কেয়াদি বলে ডাকতেন l কেয়ামাসিও বই পড়তে ভালোবাসতেন, নিজেদের মধ্যে বই দেওয়া নেওয়াও চলত l কেউ কোনো ভালো বই পড়লে অন্যজনকে সেটা পড়তে দিতেন l তাছাড়া সাংসারিক গল্প তো হতই l ঠাম্মাও মাঝে মাঝে গল্প জুড়তেন ওদের সঙ্গে l সেই ফাঁকে শর্মিলারা উঠোনে কুমীরডাঙা বা চোর-চোর খেলা শুরু করে দিত l পাশের বাড়ির পিকলু, শেলীরা পড়ত নামীদামী ইংলিশ মিডিয়াম মিশনারি স্কুলে l স্কুলবাসে করে স্কুলে যেত l ওরা খ্রিষ্টান ছিল বলে মিশনারি স্কুলে মাইনে দিতে হত না l অবশ্য সরকারি স্কুল বলে শর্মিলাদের স্কুলেও মাইনে লাগত না l বছরে সামান্য অঙ্কের টাকা দিতে হত স্কুলের ফাণ্ডে l ছুটি থাকলে পিকলুরাও খেলতে  চলে আসত l তারপর হই হই করে খেলা হত বেলা বারোটা -সাড়ে বারোটা পর্যন্ত l কেয়ামাসির খুব একটা বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত না l আসলে শম্পার বাবা মিলিটারিতে চাকরি করতেন l থাকতেন ভারত-বাংলাদেশ হিলি সীমান্তে মিলিটারি ক্যাম্পে l ন মাসে -ছ মাসে বাড়িতে আসতেন l দুই মেয়েকে নিয়ে কেয়ামাসি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন l প্রায় একারই সংসার l রান্নাবান্না, কাজকর্মের চাপ ছিল না তেমন l কেয়ামাসির সিনেমা দেখার নেশা ছিল খুব l অপর্ণা আগে খুব একটা বেরোতেন না l সিনেমা দেখার আগ্রহ থাকলেও উপায় ছিল না l মফঃস্বলের মেয়ে, আর সঙ্গীসাথীও ছিল না তেমন l শর্মিলার বাবা অরুণবাবুর সময়ও ছিল না আর শুধুমাত্র  স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চক্ষুলজ্জায় বাধত তাঁর l দু একবার  খুব ভালো কোনো ছবি এলে ভাইবোনের সঙ্গে স্ত্রীকেও নিয়ে গিয়েছেন অবশ্য l বন্ধুত্ব হওয়ার পর মাঝেমধ্যে তাঁর কেয়াদির সঙ্গী হতেন অপর্ণা l ভালো লাগলেও নিজের শখে রাশ টানতে বাধ্য হতেন l শাশুড়ির মুখভার আর নিজের বিনোদনের জন্য টাকাপয়সা খরচ করার সাধ্য ছিল না বলে l প্রাচী, ছবিঘর বা পূরবী হলে উত্তম - সুচিত্রা, অথবা সৌমিত্র বা সুপ্রিয়ার সিনেমা এলে কেয়ামাসি ওঁদের বাড়িওয়ালার ছেলেকে দিয়ে টিকিট কাটিয়ে রাখতেন l মা সঙ্গে বেরোলে শর্বরী আর শম্পাকে শর্মিলাদের বাড়িতে ওর ঠাম্মার হেফাজতে রেখে ম্যাটিনি শো দেখতে যেতেন কেয়ামাসি l তবে বেরোবার আগে মা বারবার করে বলে যেতেন ওরা যেন ঠাম্মাকে বিরক্ত না করে l তাই সেদিন ঘরে বসে লক্ষ্মীমেয়ের মত  লুডো খেলত ওরা l ছোটদের ছবি এলে ওরাও যেত মায়েদের সঙ্গে l দুপুরবেলা সেজেগুজে দোতলাবাসে চেপে পৌঁছত শিয়ালদায় l প্রথম প্রথম বদ্ধঘরে অন্ধকারে কান্না পেত শর্মিলার l সিনেমার গল্পও বুঝতে পারত না l পরে শম্পার কাছ থেকে বুঝে নিত l কিন্তু বাসের দোতলায় চড়ার আকর্ষণটা ছিল অদম্য l শর্বরীদি আর শম্পা কেয়ামাসির সঙ্গে বড়দের সিনেমাও দেখতে যেত মাঝে মাঝে l আসলে ওদের রাখার ব্যবস্থা করতে না পারলে সঙ্গে করেই নিয়ে যেতেন কেয়ামাসি l ওরা পরে শর্মিলাকে সিনেমার গল্প বলত l নায়ক - নায়িকার প্রেমের গল্প শুনতে শুনতেই এভাবেই প্রেম সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা তৈরী হল শর্মিলার l 

সোমালি ছিল ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল l শর্মিলা আর শম্পাও ভালো রেজাল্টই করত, সাধারণত ক্লাসে  প্রথম পাঁচজনের মধ্যেই থাকত l একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসত সোমালি আর শর্মিলা l সোমালির খুড়তুতো বোন মেঘনা লেখাপড়ায় তেমন ভালো ছিল না l সাগরিকার পাশে বসত ও l দুজনেই ছটফটে আর দুষ্টুবুদ্ধিতে ভরপুর l মেঘনা প্রত্যেকবারই টেনেটুনে পাশ করত l এমনিতে যথেষ্ট বুদ্ধি, কথাবার্তায়ও চৌখস l কিন্তু অসম্ভব ফাঁকিবাজ ছিল মেঘনা l হোমওয়ার্ক করত না বলে প্রায়ই শাস্তি পেত l শর্মিলা, শম্পা ওকে বোঝাতে চেষ্টা করত, সাগরিকাও l যদিও মেঘনার  সমস্ত দুষ্টুমির দোসর ছিল সাগরিকা l তবু পড়াশোনাটা করত l সোমালি একেবারে পছন্দ করত না মেঘনাকে l নিজের কাকার মেয়ে হলেও সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলত l ফার্স্ট গার্ল বলে ক্লাসে অন্য মেয়েরা সোমালিকে সমীহ করেই চলত l মেঘনা ওকে পাত্তাই দিত না l আসলে ঐটুকু বয়েসেই একটা সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স গ্রো করে গিয়েছিল সোমালির মধ্যে l বাড়িতে, স্কুলে সবসময় তুলনামূলক আলোচনার ফলে অজান্তেই দুজনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল l

(চলবে)

রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                                




 খোঁজ ৪


স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর শর্মিলার প্রথম বন্ধু হল সাগরিকা l রোগা, লম্বাটে গড়নের হাসিখুশি মেয়েটা কয়েকদিনের মধ্যেই ওর বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেল l ওদের বাড়িতে একজন গানের মাস্টারমশাই প্রতি শনিবার বিকেলে ক্লাসিক্যাল গান শেখাতে আসতেন l সাগরিকার সঙ্গে আরো পাঁচজন জেঠতুতো -খুড়তুতো দিদিও তাঁর কাছে গান শিখত l কিছুদিন পরে ওদের পাড়ার আরো দু একজন মেয়েও সেই ক্লাসে ভর্তি হল l শর্মিলাও বায়না ধরল সেও গান শিখবে l শর্মিলার মা গান খুব  ভালোবাসতেন l কোনোদিন না শিখেও রবিঠাকুরের গান, আধুনিক গান ভারি সুন্দর গাইতেন l অবশ্য বাড়িতে নয়,শর্মিলারা যখন এক - দুদিনের জন্য চন্দননগরে ওদের কাকাদাদু অর্থাৎ মায়ের কাকার বাড়ি বেড়াতে যেত, তখন ওবাড়ির ছাদে সান্ধ্য আসরে মায়ের গান শুনেছে l ও বাড়িতে  অনেক লোক, বাড়িটাও বেশ বড়,  খোলামেলা l পাশেই গঙ্গা l ওখানে বেড়াতে যেতে খুব ভালোবাসত শর্মিলা l ওবাড়ির পরিবেশটা ওদের বাড়ির মত দমচাপা নয় l  দূরসম্পর্কের অনেক আত্মীয়ের ছেলেমেয়েরাও কাকাদাদুর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত l তাই অনেক অনেক মামা - মাসিদের নিয়ে ওবাড়ি সবসময় জমজমাট l মামা-মাসিরা সকলেই বলত মা খুব ভালো গায় l দাদু- দিদাকেও মাকে গান না শেখানোর জন্য আফসোস করতে শুনেছে l নিজের মেয়ে না হলেও অপর্ণাকে ওঁরা নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতেন l কিন্তু এতবড় একান্নবর্তী পরিবারে তার  জন্য আলাদা করে গান শেখানোর ব্যবস্থা তাঁরা করে উঠতে পারেননি l অল্পবয়েসে বিয়ে দিতেও বাধ্য হয়েছিলেন l তাই নিজের অপ্রাপ্তিটুকু ভরানোর জন্যই বোধহয় ওকে গান শেখানোর ব্যাপারে মা বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলেন l 

সাগরিকারা খাস কলকাতার মানুষ, বনেদী যৌথ পরিবার l ওদের বাড়িটা পুরোনো হলেও  বিশাল l বেশ উঁচু বাউন্ডারি ওয়ালঘেরা অনেকটা জায়গা জুড়ে বাড়ি l কলকাতা শহরে তখনও এত বড় বাড়ি কমই ছিল l একতলা -দোতলা মিলিয়ে সারি সারি প্রায় গোটা কুড়ি ঘর, তার দুধারে বিরাট বিরাট লম্বাচওড়া টানা বারান্দা l প্রতিটি ঘরই আকার আয়তনে শর্মিলাদের প্রায় পুরো বাড়িটার সমান l কড়িবর্গা দেওয়া সিলিং, লম্বা লম্বা দরজা আর বিরাট বিরাট খড়খড়ি দেওয়া জানালাগুলো খুব আকর্ষণ করত শর্মিলাকে l আরো ভালো লাগত ওদের ঘরের সাবেকী আসবাবগুলো l বিশাল বিশাল নিরামিষ, আমিষ রান্নাঘর, খাবারঘর আর বাড়ির সামনে-পিছনে বড় বড় ফলফুলের গাছঘেরা একটা বাগান ছিল l বাগানের একধারে ছিল  একটা ছোট্ট পুকুর l সেখানে বড়রা সাঁতার কাটতেন l ছোট্ট বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি ধরে ছোটরাও হাত-পা ছোঁড়া প্র্যাক্টিস করত l জেঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোন, কিছু সমবয়সী ভাইপো, ভাইঝি মিলিয়ে ওদের বাড়ি সবসময় সরগরম l ওবাড়ির বাগানে বা বিশাল ছাদে বাচ্চাদের খেলাটা বেশ জমত l শর্মিলাও জুটে গিয়েছিল ওদের সঙ্গে l বিকেল হলেই ও বাড়িতে যাওয়ার জন্য ছটফট করত l সেই  ছাদের এক কোণে মাদুর পেতে  বাড়ির মহিলারাও  বিকেলবেলা গা ধুয়ে, পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি পরে, সেজেগুজে চুল বেঁধে, চায়ের ট্রেতে ফ্লাস্কভর্তি চা আর নানারকম 'টা' সহযোগে গল্প করতে বসতেন  l  ঠাকুর -ঝি -চাকরেরও অভাব ছিল না তাই তাঁদের ওপর সংসারের চাপ ছিল না তেমন l  কাকিমাদের ওই বৈকালিক আড্ডাটা দু চোখ ভরে দেখত শর্মিলা l মায়ের জন্য কষ্ট হত খুব l রোজ বিকেলে ওই সময়টায় ওর মা কয়লার উনুন ধরিয়ে বিকেলের রান্না করতেন l পিসি রাজশ্রীও  টিউশনি করে ফিরে মাঝেমাঝে সাহায্য করতেন  অবশ্য l  সকালে মাঝেমধ্যে একটু আনাজ কেটে দেওয়া ছাড়া ঠাম্মাকে সংসারের আর কোনো  কাজ করতে দেখেনি শর্মিলা l সংসারের সম্পূর্ণ ভার মায়ের ওপরেই ছিল l তবে সেটা নিয়ে মায়ের মুখে কোনোদিন কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ শোনা যেত না l মায়ের যেন শরীর খারাপও হতে নেই, বারোমাস-তিরিশদিন যন্ত্রের মত সংসারের জোয়াল টেনে যাওয়াই তাঁর কাজ l রোজ বিকেল হলেই শিবমন্দিরে আরতি দেখতে  যেত ঠাম্মা l সারা পাড়ার হাঁড়ির খবর জোগাড় করে সন্ধ্যাবেলা রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে তেলমশলা সহযোগে সেসব পরিবেশিত হত l একটা টিমটিমে চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব জ্বলত রান্নাঘরে l শ্রোতাদের মধ্যে পাড়ার আরো দু - চারজন মহিলা থাকতেন l তখনও বাঙালীর ঘরে দূরদর্শন এসে পৌঁছয়নি l এই পরচর্চাটুকুই ছিল মহিলাকূলের বিনোদন l ওরা এলেই পিসি ঠাম্মার ঘরের খাটে বসে এম এ ক্লাসের  পড়াশোনা শুরু করে দিত l মায়ের ঘরে খাটের ওপর তখন হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করতে বসতে হত  শর্মিলাকে  l আর ছোটকার ওই আধখানা ঘরে তো বসার জায়গাই নেই l অগত্যা পরচর্চার আসরটা রান্নাঘরেই বসত l মায়ের কানে অবশ্য সেসব ঢুকছে কি না বোঝাই  যেত না, নির্লিপ্তমুখে রুটি সেঁকতেন l মায়ের বানানো চা খেতে খেতে নিচুস্বরে ঠাম্মা বলতেন 
--অন্যের কথা আর কি আর কমু ! আমার কপালেই যে বিদ্যাধরী জুটসে ! সংসারে মন নাই ! শুধু নাটক - নভেলের মইদ্যেই ডুইব্যা আসে l আর মাইয়াটাও হইসে তার দোসর l
 
আগুনের আঁচে মায়ের চোখমুখ লাল হয়ে থাকত l রুটি করা শেষ করে শর্মিলাকে পড়াতে বসাতেন মা l এমনিতে নরমসরম কিন্তু নিজের মেয়ের শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে খুব কড়া ছিলেন অপর্ণা l দেশভাগের পর বাংলাদেশ থেকে চলে আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মা- বাবা দুজনকেই হারিয়েছিলেন l তারা পাঁচ ভাইবোন কাকার সংসারেই মানুষ l অপর্ণাই  বড় l লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালো ছিলেন কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল অপর্ণার l বিয়ের পরেই সংসারের জোয়াল এসে পড়েছিল কাঁধে l কিন্তু লেখাপড়া ভালোবাসতেন বলেই মেয়েকে নিজের মনের মত করে  তৈরী করতে চেয়েছিলেন l ননদের লেখাপড়াতেও কোনো বাধাবিঘ্ন আসতে দেননি কখনো l সেইজন্যই বোধহয় প্রায় সমবয়সী ননদের সঙ্গে কোনোদিন কোনো মনোমালিন্য হয়নি l পড়তে ইচ্ছে না করলে  শর্মিলা মাঝেমধ্যে ঠাম্মার আঁচলের তলায় গিয়ে সেঁধোত l কিন্তু মায়ের কাছে কিছুতেই পরিত্রাণ পেত না l রাত দশটা অবধি মায়ের সামনে বসে লেখাপড়া করে তবেই ছুটি মিলত l সকলের খাওয়াদাওয়া হলে, রান্নাঘরের পাট মিটলে  রাত জেগে চলত মায়ের  বই পড়া l শর্মিলা আর ওর বাবার ঘুমোতে অসুবিধে হবে বলে ঘরের লাইট নিভিয়ে জানলার একটা পাল্লা খুলে স্ট্রিটলাইটের আলোয় বই পড়তেন  মা l মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে আবছায়া অন্ধকারে জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে আসা একচিলতে আলোয় আলোকিত মুখটা দেখে  মাকে ধ্যানমগ্ন তাপসী মনে হত l মায়ের মুখেই পুরাণের গল্প শুনেছিল শর্মিলা l মায়ের অপর্ণা নামটা সার্থক মনে হত তখন l

(চলবে )



             

                                                                  




রবিবার, ৯ মে, ২০২১

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                                     



খোঁজ 


(১)

"চাই---- শো-ও-ও-ওন পাপড়ি-ই- ই-ই ..." কালো টিনের বাক্স মাথায় শোনপাপড়িওয়ালা ঢুকলো তিন ফুট সরু গলিটার ভিতর l এটা একটা অন্ধগলি l ডানদিকে যে বাড়িটার টানা  দেওয়াল রয়েছে সেটা মুসলমানদের । ওপরদিকে খুব ছোট ছোট ঘুলঘুলির মত দুটো জানালা, দিনের বেলাও এত অন্ধকার যে সেটা দিয়ে ঘরের ভিতরের দৃশ্য কিছুই দেখা যায় না, শুধু মাঝে মাঝে একটা জানালার চিটচিটে পর্দার আড়ালে একটা কচি মেয়ের মুখ উঁকি মারে । ও বাড়িতে আরো অনেক বাচ্চার কিচিরমিচির  শোনা গেলেও, তাদের এ জানলায়  দেখা যায়না  কখনো l বাঁদিকে তিনটি বাড়ি, প্রথম বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের গায়ে একটা কাঠের দরজা, প্রবেশদ্বার l শেষ বাড়িরও তাই ।  শুধু দ্বিতীয় বাড়ির দরজার পাশে একটা ঘরে কাঠের পাল্লা আর গরাদ দেওয়া দুটো ছোট্ট ছোট্ট  জানালা খোলা l শোবার ঘরের খাটে দাঁড়িয়ে একটা ফুটফুটে পুতুলের মতো বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়ে গরাদের ভিতর থেকে হাত বাড়িয়ে রিনরিনে স্বরে  বলে উঠল 
--ও শোনপাপড়িওয়ালা ...আমাকে একটা শোনপাপড়ি দাও না l 
তার হাতের মুঠোয় পাঁচ পয়সার কয়েন l অনেক বায়না করার পর অফিসে যাওয়ার আগে বাবার কাছ থেকে আজ আদায় করেছে সে l 
ঘুলঘুলির জানলা দিয়ে অন্য বাড়ির  মেয়েটা জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে,  তারপর জানালা থেকে সরে যায়।শোনপাপড়িওয়ালা তার কালো ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে একটুকরো কাগজ বের করে তার ওপর সাজিয়ে দেয় নরম হলুদ রঙের চৌকো এক অমৃতখণ্ড ! যার প্রতিটি স্তরে স্তরে রয়েছে অফুরন্ত আনন্দের ভাণ্ডার । সেই স্বাদ পরবর্তীকালে কোনো বিখ্যাত ভুজিওয়ালার শোনপাপড়িতে খুঁজে পায়নি মেয়েটা ।

সময়টা বাহাত্তর -তিয়াত্তর সাল, মধ্যকলকাতার পার্কসার্কাস অঞ্চলের  একটা পুরোনো হিন্দুপাড়ায় গা-ঘেঁষাঘেঁষি বাড়িগুলোর মধ্যে শেষ হিন্দু গলিটায় ওদের বাড়ি ছিল । গলির ওপাশেই মুসলমানদের বাড়ি, যদিও এটা  তাদের বাড়ির পিছনদিক, তবু দু-বাড়ির জানালা দিয়ে দুজন কচিকাঁচার চোখাচোখি বা মুখ ভ্যাংচানোর মাধ্যমে অল্পস্বল্প ভাব হতে দেরি হয় না । কিন্তু ওই পর্যন্তই ... সালমা খাতুন বা শর্মিলা বসুর এর থেকে বেশি আলাপ এগোয়নি ছোটবেলায় ।

বাংলাদেশ যুদ্ধের সামান্য পরবর্তী সময়ে রেডিওতে তখনও "আমার সোনার বাংলা "বেজে উঠত প্রায়ই l সন্ধ্যেবেলা তোলা উনুনে রুটি সেঁকতে সেঁকতে মা গুণগুণ করে উঠতেন, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী " l সেসময় ঠাম্মার ছলছলে চোখে ভেসে উঠত ঢাকা বিক্রমপুরের নদীঘেরা সবুজ ল্যান্ডস্কেপ । তার কাছে গল্প শুনে শুনে ওদেশটা খুব আপন মনে হত । তার বছর কুড়ি আগে বাহান্ন সালে ওদেশ থেকে এসে বৌ আর ছেলেমেয়েসহ এবাড়ির একতলার একটা অংশ  ভাড়া নিয়েছিলেন শর্মিলার ঠাকুরদা l আড়াইখানা ঘর, সামনে একটা ছোট বাঁধানো উঠোন, উঠোনের একধারে টালির চালা দেওয়া রান্নাঘর আর অন্যদিকে টিনের চালা দেওয়া বাথরুম l তার সামনে বাঁধানো কলতলা। ভাড়া দশ টাকা । তিনি চলে গেছেন শর্মিলার জন্মেরও আগে,বাবাও  একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির অতি সাধারণ চাকরির ভরসায় মা -ভাই -বোন আর স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে এর থেকে ভাল কোনো বাসস্থান যোগাড় করে উঠতে পারেননি । যদিও ভাড়া বেড়ে তখন একশ কুড়ি টাকা হয়েছিল ।

#খোঁজ 

(২)

দোতলায় সপরিবারে থাকত বাড়িওয়ালা , একটি বাঙালি খৃষ্টান পরিবার । ওদের আচার-আচরণ ,সাজগোজ ,পোশাকআশাকে হিন্দুদের সঙ্গে কোনো পার্থক্য ছিল না । বিধবা ঠাম্মা সাদা থান পরতেন ,কাকিমারা শাঁখা -সিঁদুর সবই ব্যবহার করতেন । কিন্তু ওরা ছিল পাক্কা ঘটি ,শর্মিলারা বাঙাল ...তা নিয়ে খুনসুটি আর টিকা-টিপ্পনী চলতেই থাকত দু পক্ষে । আবার  শর্মিলাদের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় পাড়ার লোকজন , আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ওরাও একসঙ্গে বসে খিচুড়িভোগ  খেতেন । দুর্গাপূজার পর বাবা -কাকুর সঙ্গে কোলাকুলি করতেন ও বাড়ির কাকুরা । শর্মিলার ঠাম্মার সঙ্গে ও বাড়ির ঠাম্মাও  রোজ বিকেলে যেতেন শিবমন্দিরে ,সেখানে পাড়ার বুড়িদের বেশ একটা মিষ্টি আড্ডা হত । আবার শর্মিলাও ওবাড়ির পিকলু ,শেলীদের সঙ্গে শুক্রবার হলেই সেজেগুজে চার্চে ছুটত । বড়দিনে যে কতরকম লোভনীয় কেক-পেস্ট্রি  বানাত ওপরের কাকিমা ! বাবার অফিস থেকে ক্রিসমাস ঈভে বাক্সভর্তি যে ট্রিন্কাসের কেক দিত ,তার ধারেকাছে লাগত না ।

পাশের মুসলমান পাড়ায় যাওয়া অবশ্য নিষিদ্ধ ছিল ওদের । তবু মুখচেনা ছিল অনেকের সঙ্গেই । কাদের চাচার রিকশায় স্কুলে যেত শর্মিলা । আবার ও পাড়াতেই ডিস্পেনসারি ছিল ডক্টর বাগচীর,শর্মিলা ডাকত ডাক্তার জেঠু । জ্বরজারি হলে মাঝে মাঝে ওখানে গেলে দেখত  বিশাল বিশাল কাচের বয়ামে লাল-নীল মিক্সচার রাখা l জ্বর আর পেটখারাপের ওষুধ । কম্পাউন্ডার মামুনভাই প্রেসক্রিপশন দেখে দাগ দেয়া কাচের শিশিতে সেই মিক্সচার ঢেলে দিত । আর দিত ট্যাবলেট গুঁড়ো করে ওষুধের পুরিয়া l ডাক্তার জেঠুকে ও পাড়ার মানুষজন আল্লাহর মতই ভক্তি করত l প্রবল জ্বরে কাতরাতে কাতরাতে অথবা প্রচণ্ড পেটব্যথা নিয়ে ইব্রাহিম বা অন্য কোনো রিকশাওয়ালা বা কারখানার মজুর ডাক্তারখানায় এসে বলত 
--ডাগদারসাব মুঝে সুঁই দে দিজিয়ে না ! 
তখন ডাক্তারজেঠুর হাতে মোটা সিরিঞ্জটা দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে যেত শর্মি l আর অবাক হয়ে দেখত যে লোকটা সোজা হয়ে হেঁটে আসতে পারছিল না, সে কেমন টাট্টুঘোড়ার মত সাবলীলভাবে হাসিমুখে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে l ডাক্তারজেঠু ধমকাতেন ওদের 
--আর যদি নেশা করে করে লিভারের বারোটা বাজাবি তো, না দেব ওষুধ, না দেব সুঁই l
এই ধমকের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন ভালোবাসাটুকু থাকত তা ছেঁকে নিত ওরা কিন্তু  নেশায় লাগাম টানতে দেখা যেত না কাউকে l ওরা জানত ডাক্তারবাবু ভগবান l তিনি একটি ইনজেকশন দিলেই অসুখ দূরে পালাবে l এমনটাই ছিল ওদের বিশ্বাস l আসলে বাস্তুহারা ছিন্নমূল মানুষগুলোর জীবনে তখন প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই l নিম্নবিত্ত মানুষ বরাবরই নেশার দাস l ওই নেশাটুকুই ওদের জীবনের একমাত্র বিনোদন l আসলে  রাজনৈতিক ফায়দার জন্য আমজনতাকে ধর্মের আফিম খাওয়ানো শুরু হয়নি তখনও l

#খোঁজ 
(৩)
এরমধ্যেই একদিন বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল শর্মিলার ছোটকা । তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল পশ্চিমবঙ্গে । ওদের গলিতে ঢোকার প্রথম বাড়ির একতলার সামনের অংশটা ছিল পার্টিঅফিস, মাঝেমাঝেই পুলিশ  রেড হত । দুই বাড়ির  মাঝখানে ছিল একটা বড় চতুর্ভুজাকৃতি উঠোন l সেই উঠোনের দিকে ছিল শর্মিলাদের বাড়ির পিছনের দরজা l ছোটকার কমরেড বন্ধুরা  উঠোন পার হয়ে পিছনের দরজায় মৃদু  ঠকঠক করলেই সদা সতর্ক মা দরজা খুলে ঢুকিয়ে নিতেন সক্কলকে l কেউ পালাত পিছনের উঠোনের দেওয়াল টপকে, যারা পারত না তারা সেঁধিয়ে যেত মায়ের আর ঠাম্মার খাটের তলায় l পুলিশ এসে সদর দরজা খুলতে বললেও মা দৃপ্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিতেন, বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষের  অনুপস্থিতিতে তিনি কিছুতেই দরজা খুলবেন না l

দিনকয়েক পরে ছোটকার খবর পাওয়া গেল l মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি l সরকারি হাসপাতাল, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মী সেখানে নিরাপদ নয় l শর্মিলার বাবা বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে আনলেন ছোটকাকে l ডক্টর বাগচী প্রতিদিন এসে দেখে যেতেন আর পরম মমতায়, যত্নে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করতেন মা l গা মোছানো থেকে খাওয়ানো সবটাই মাই করতেন l বয়েসে সামান্য ছোট হলেও এই ছোট দেওরটিকে সন্তানবৎ স্নেহ করতেন তিনি l ছোটকার সমস্ত কাজকর্মেই  অবাধ প্রশ্রয় ছিল তাঁর l ঠাম্মা আর বাবার সমস্ত শাসন থেকে আড়াল করে রাখতেন বলেই ঠাম্মার ভাষায় ছোটকা 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারত l'

ছোটকার সারা ঘরে ছড়ানো ইস্তেহার, কাস্তে -হাতুড়ি -তারা আঁকা লাল পতাকা l বিছানার ওপরে আধখোলা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো l দুটো হাতই ভেঙে গিয়েছিল ছোটকার, তবু ধর্মগ্রন্থের মত প্রতিদিন তার পাতা ওল্টাতেন  l সেই অসুস্থতার সময় শর্মি বোধহয় তখন  ক্লাস থ্রি -ফোর , বই পড়ে শোনাত ছোটকাকে l  ম্যাক্সিম গোর্কির "মা" উপন্যাসটা তখনই পড়া হয়ে গিয়েছিল l সোভিয়েত রাশিয়া থেকে তখন প্রকাশিত হত আকর্ষণীয় ছবিওয়ালা বাংলা বই l বড়োদের সঙ্গে সঙ্গে ছোটদেরও বইও পাওয়া যেত বইমেলার স্টলে l সুন্দর ঝকঝকে পাতায় ঝলমলে ছবি আর ঝকঝকে প্রিন্ট l প্রচুর বই কিনে দিতেন মা l বাংলা তো বটেই, সারা বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের ভাণ্ডারও ক্রমশ উন্মুক্ত হচ্ছিল চোখের সামনে l মায়ের বুককেসও  তখন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী তো বটেই...সমকালীন নানা লেখকের বই দিয়ে ভরে উঠছিল l অভাবের সংসারে কিভাবে যেন বই কেনার টাকা ঠিক জোগাড় হয়ে যেত l সাপ্তাহিক এবং মাসিক বড়দের এবং  ছোটদের কিছু পত্রপত্রিকাও আসত বাড়িতে l এছাড়াও দু তিনটে লাইব্রেরির মেম্বারশিপ ছিল মায়ের l সেখানে শিশু বিভাগ থেকে শর্মিলাও বই নিয়ে আসত  প্রতি সপ্তাহে l  এরমধ্যে কবে যেন  উল্টোদিকের বাড়ির জানলাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল l শর্মিলা লক্ষ্যই করেনি l সালমার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল l স্কুলে, পাড়ায় তখন কয়েকজন বন্ধু হয়েছে শর্মিলার l তার মধ্যে সাগরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বটা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছিল l একটু দূরে, বাসরাস্তা পেরিয়ে যেতে হলেও প্রায় রোজই শর্মিলা যেত ওদের বাড়ি l 

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

শর্মিষ্ঠা দত্ত




বহুরূপে সম্মুখে তোমার
___________________________________

মন্দিরের বাইরে ঘুরঘুর করছিল ছেলেটা ...বছর সাতেক বয়েস ...মাথার চুলে জটা পরে গেছে ; ততোধিক নোংরা জামা ... গায়েও কাদামাটির প্রলেপ ...কতদিন স্নান হয়নি কে জানে ! বনানী পুজো দিয়ে বেরোতেই আঁচলটা চেপে ধরল l "দুটা টাকা দে না ক্যানে আম্মি  ...বড় খিদা লাইগছে ..."ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া হলো বনানীর l কালো হাড়-জিরজিরে শরীর কিণ্তু অদ্ভুত মায়াময় দুটো চোখ ... ডালা থেকে প্রসাদ বের করে দিতেই প্রায় ছোঁ মেরে মুখে পুরে দিল সে l

মন্দিরের বাইরেই বেশ অনেকগুলো ঝুপড়ির মত দোকান ...কচুরি-তরকারি , জিলিপি পাওয়া যায় I সেদিকে এগোতে এগোতে বনানী ডাকলেন "আয় l " সমীরণ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন ...."এখানে খাবে ! ..." সমীরণ নিজের ক্লাস সম্পর্কে অসম্ভব সচেতন ....তাই মুখে বিরক্তি স্পষ্ট l সমীরণ স্টীল-প্ল্যান্টের আধিকারিক হয়ে এ শহরে এসেছেন মাসখানেক হলো ...এই প্রথম এই মন্দিরে পুজো দিতে এসেছেন বনানী l

বনানী নির্বিকারমুখে কচুরি-তরকারির অর্ডার করলেন ...তারপর ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন "তোর নাম কি ?"... ওর নাম আব্বাস ; পথশিশুদের কোনো ঠিকানা থাকে না ... স্টেশনচত্বরে নানীর সঙ্গে থাকে ; বাবার নাম জানে না ...মা সালমা ওর দেড়বছর বয়েসেই পালিয়েছে দুসরা আদমির সঙ্গে l দাদীর নাম রাবেয়াবিবি ....সেও ভিখারিনী l

পরের সপ্তাহেই আবার দেখা হলো আব্বাসের সঙ্গে ...বনানীকে দেখেই একগাল হাসল ছেলেটা l আবার ঝুপড়িতে বসে খাওয়াদাওয়ার অবসরে অনেক গল্প হলো ; কি মনে হলো... একশটা টাকা ওর  হাতে গুঁজে দিলেন বনানী l

প্রতি সপ্তাহেই আব্বাসের সঙ্গে দেখা হয় ...বনানীকে এখন আম্মি বলেই ডাকে আব্বাস l ওর সঙ্গে গল্প করে পথশিশুদের অবস্থান সম্পর্কে  অনেককিছুই জেনেছেন ইতিমধ্যে l কুকুর-বেড়ালের মত ডাস্টবিন খুঁটে খাওয়া ; রোদ-ঝড়-জলে নিজের মাথাটুকু বাঁচানোর জন্য এই বয়েসেই নানারকম ছলচাতুরী ও লড়াই ; গাঁজা ও  ডেনড্রাইটের নেশায় জীবনীশক্তি খুইয়ে ফেলা আব্বাস , শংকর অথবা মাইকেলের মধ্যে কোনো তফাত নেই l

ওদের নিয়ে একটা স্কুল করেছেন বনানী ... স্টেশনচত্বরেই l পড়াশোনার সঙ্গে মিড-ডে মিলের ব্যবস্থাও হয়েছে একটা এন-জি-ওর সহযোগিতায় l নাচ-গান-ছবি আঁকা-নাটক ইত্যাদি  বিভিন্ন ধরনের অ্যাকটিভিটির মাধ্যমে ওদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটছে দ্রুত ...নেশার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে মানবিক চেতনা ফিরে পাচ্ছে বাচ্চাগুলো l  পাশে পেয়েছেন প্যাট্রিশিয়া আর নাজমার মত বন্ধুদের ...দুপুরবেলা ক্লাস শেষ হওয়ার পর  সবাই মিলে হইচই করে খিচুড়ি আর ঘ্যাঁট-তরকারি ...মাঝেমধ্যে ডিমভাজা দিয়ে দারুন পিকনিক হয় ওদের l

এখন আর মন্দিরে পুজো দেন না বনানী ....তাঁর ঈশ্বর যে স্বয়ং তাঁকে সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন !

ছবি সমরন্দ্র. মন্ডল 

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

শর্মিষ্ঠা দত্ত



বিহারীনাথ 


প্রায় বছর তিরিশ ধরে তাঁকে দেখছি , যদিও সরাসরি আলাপসালাপ হয়নি কখনও । বার্ণপুরে রিভারসাইড রোড থেকেই দেখতে পেতাম তাঁর  অটল গাম্ভীর্য ।  টাউনশিপে বসবাসের সূত্রে রোজই সাক্ষাৎ ঘটলেও সেই বিশাল উচ্চতায় বসে আমার মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষকে চোখেই পড়েনি তাঁর , তাই বোধহয় এতদিন কাছে ডাকেননি ।  তবে এতদিন পরে হঠাৎ কেন ! যাইহোক একবার ডাক দিয়েছেন যখন , আজই মন্ত্রমুগ্ধের মত ছুটে গেলাম তাঁর কাছে । 


আসলে এখানকার বন্ধুবান্ধব অনেকের কাছেই গল্প শুনেছিলাম , ছবিও দেখেছিলাম । দূর থেকে দেখা  ধূসর রহস্যময়তার জাল ছিঁড়ে সাদামাটা আন্তরিক চেহারাটা ক্রমশই টানছিল । তার সঙ্গে কোনো গোপন তন্ত্রীতে বেজে উঠেছিল ' দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া ...' আসলে কত দূরে দূরেই তো যাই প্রয়োজনে - অপ্রয়োজনে । কালই শুক্লা হুজুগ তুলল আর আজই সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম তাঁর উদ্যেশ্যে । হ্যাঁ তিনি বিহারীনাথ , প্রতিবেশী জেলা বাঁকুড়ার শালতোড়া গ্রামে তাঁর অবস্থান । 


সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ চন্দনদার সুইফট ডিজায়ারে বেরিয়ে পড়লাম আমরা চারজন । রাস্তা সাকুল্যে আট - ন  কিলোমিটার । রিভারসাইড রোড ধরে লা- মেয়ার পার্কের আগেই ডানদিকে বাঁক নিয়ে দু কিলোমিটার এগোলেই দামোদর । কাঠের তক্তা পেতে তৈরী ব্রিজ পেরোলেই বাঁকুড়া জেলা । মাটির চালা দেওয়া ঘরের পাশে  বাঁশের ব্যারিকেড , সেখানে টোল ট্যাক্স দেওয়া হল - আসাযাওয়া মিলে একশ টাকা । এবার আমরা তিনজন গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম । দামোদরের বিধ্বংসী রূপ নেই এখানে , মাঝে মাঝেই বিশাল চড়া । বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় মানুষজন হেঁটেই নদী পারাপার করে । নৌকো চলে বর্ষায় । চড়ায় দু একটা নৌকোকে আটকে থাকতে দেখলাম । হাঁটুজলে পুঁটিমাছের চাষ হয় , জেলেরা জাল ফেলছিল ।  চন্দনদা ড্রাইভ করে ব্রিজ পেরোলেন , আমরা পায়ে হেঁটে নড়বড় করতে করতে পেরোনোর আগেই আর একটা গাড়ি উঠে পড়েছে ব্রিজে । ওপারে পৌঁছে আরো পাঁচ - সাত কিলোমিটার রাস্তা , ঈশ্বরদাঁ আর বামুনতোড় গ্রাম পেরিয়ে , ডানদিকে তিলুরি গ্রামের রাস্তা ছেড়ে খানিকটা এগিয়ে বিহারীনাথের পায়ের নীচে পৌঁছলাম । সামনে মন্দির । বাইরে থেকে পুজোর ডালা কিনে মন্দির চত্বরে ঢুকে ডানদিকে তাঁর অবস্থান । সকাল সাড়ে আটটায় প্রায় ফাঁকা মন্দিরে খুব ভালভাবে ধীরে সুস্থে পুজো দিলাম । শুনেছি এখানে শ্রাবণ মাসে বাবার মাথায় জল ঢালার জন্য  মারাত্মক ভিড় হয় ।  পুরোহিত একটা ছোট্ট ছেলে বড়জোর কুড়ি বছর বয়েস । ঘরের মাঝখানে শিবকুণ্ড , একটা গোল গর্তের মধ্যে শিবলিঙ্গ , তার ওপরে একটুকরো পাথর ...তিনি এখানে মাটি থেকে উত্থিত দেবতা বিহারীনাথ । তাঁর নামেই এই পাহাড়ের নাম , এটি বাঁকুড়ার সর্বোচ্চ পাহাড় । উচ্চতা ১৪৮০ ফুট । মন্দিরের সামনে একটা টলটলে জলের দীঘি রয়েছে । আয়নাজলে দীঘির চারপাশ ঘিরে থাকা দেবদারু গাছের প্রতিবিম্ব । বাঁধানো ঘাট থেকে সিঁড়ি ধাপে ধাপে নেমে গেছে সবুজাভ জলে । ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ে ওঠার রাস্তার ধারে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা সুন্দর রিসর্ট রয়েছে । বাইরে থেকে দেখলাম । পাহাড়ের তলায় ঘুরলাম কিছুক্ষণ । শুক্লা ব্রেকফাস্ট বানিয়েছিল , লুচি - আলুর দম খাওয়া হল গাড়িতে বসে । মন্দিরের গায়ে চায়ের দোকানে বসে গরম গরম চা খেয়ে  ফটোসেশন শুরু হল । পৌনে বারোটা নাগাদ ফিরে এলাম । একবেলার বেড়ানো একরাশ খুশি এনে দিল । জীবনের কাছে এটুকুই তো চাওয়া !



সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

শর্মিষ্ঠা দত্ত

টেকেন ফর গ্র্যান্টেড 
___________________

ঠিক বিকেল পাঁচটায়  অ্যাকাডেমির সামনে চলে এল ব্রত...আজ নাট্যচিন্তার শো আছে । সাড়ে ছটায় শো । সুরঞ্জনা নিশ্চয়ই এখনই এসে গ্রীনরুমে ঢুকে পড়বে । আলাপ হওয়ার পর থেকে ওর প্রতিটি শোই দেখতে এসেছে ব্রত  , সে তার অফিসে  যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন । ফেসবুকেও  প্রতিদিন চ্যাটবক্সে  গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে একটা প্রত্যাশা জন্মেছিল মনে , তাই সরাসরি প্রেমের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলেছিল । প্রত্যুত্তরে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা নিয়ে সাতশো একান্ন শব্দের একটা জ্ঞানবহুল মেসেজ দিয়ে তাকে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লক করেছিল সুরঞ্জনা । 

ক্যাবটা আজ প্রায় সবকটা  সিগন্যালে আটকাতে আটকাতে অবশেষে পাঁচটা ঊনত্রিশে  অ্যাকাডেমিতে পৌঁছালো । গ্রীনরুমে ঢুকেই ডিরেক্টর মানসদার বকুনি খেতে হবে আজও । ওঁর দোষ নেই ...নাটকের প্রধান চরিত্রই  যদি সময়মতো উপস্থিত না হয় তাহলে টেনশন তো হবেই । এর মধ্যেই চারবার কল  এসে গেছে সুরঞ্জনার ফোনে ,  ক্যাব থেকে নেমে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল সুরঞ্জনা। 

গেটের সামনে আবার এসে দাঁড়িয়েছে ব্রত মিত্র নামের সেই  ছেলেটা , বিরক্তিতে সুরঞ্জনার মুখটা কুঁচকে গেল । হাতে আবার চকোলেট আর গিফটের প্যাকেট ! সাহস তো কম নয় ! ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছে ...তবু ! দেবে না কি  রামধোলাই ! সময় নেই অবশ্য । বন্ধু শর্মিলী আসবে আজ , সকালে ফোন করে বলছিল । ঝাড়ের  দায়িত্বটা ওকেই  দেওয়া যাক ...শর্মিলীর নম্বরটা ডায়াল করার  আগেই সুরঞ্জনা দেখতে পেল  বাঁ দিক থেকে শর্মিলী এগিয়ে যাচ্ছে ব্রতর দিকে ,  "সরি , দেরি হয়ে গেল গো ...অনেকক্ষন এসেছ ? "

গিফট আর চকোলেট ওর হাতে দিয়ে , হাত ধরে রাস্তা ক্রস করে মোহরকুঞ্জের দিকে  যেতে যেতে  ব্রত বলল  , "তুমি একেবারে পারফেক্ট টাইমে এসেছ শর্মিলী ..."

বুকের ভিতর একটা কাঁটা খচখচ করছে ...অপমানের নাকি বিশ্বাসঘাতকতার !  ধীর পায়ে গেটের ভিতর  মোরামের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল সুরঞ্জনা...


মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

শর্মিষ্ঠা দত্ত


#আত্মজন 

ফোনের ওপারে মিতুল তখনও বলে যাচ্ছিল ...
- মা আমি  ইউ-এস সিটিজেনশিপটা পেয়ে গেলেই  একটা বড় বাড়ি কিনে নিয়ে আসব তোমায় ...

দেবশ্রীর কানে ভেসে আসছিল  জলপাইগুড়ির শ্বশুরবাড়িতে  নিজের তিরিশ বছর আগের কণ্ঠস্বর ...
- মা , আপনার ছেলের প্রমোশনটা  হলেই  একটা বড়  ফ্ল্যাট ভাড়া করে  আপনাকে কলকাতায় নিয়ে আসব l 

প্রণতির কলকাতায়  আসা হয়নি ...দেবশ্রীরও কি .....


শূন্যতা
__________

ধূসরতামাখা বিবর্ণ  ক্যানভাসে 
জলরঙে আঁকি বিষাদের আলপনা 
জানলার কাচে সাদা কালো সিল্যুয়েট 
আঙুলের কোণে জমে ওঠে  জলকণা 

পোষা অবসাদ অলস দিনাতিপাতে 
একা বসে লেখে জীবনের মনোটনি 
ঘন মেঘে ঢাকা নষ্ট চাঁদের গায়ে 
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় মিয়াঁমল্লার ধ্বনি...