মানসী গাঙ্গুলী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মানসী গাঙ্গুলী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

মানসী গাঙ্গুলী

                  



পুনর্মিলন


     মা মারা যাবার পর অতনু তার বাবা নীরেনবাবুকে গ্রামের বাড়ীতে একা রাখবে না বলে, নিয়ে আসে তার কলকাতার ফ্ল্যাটে। যদিও পর্যাপ্ত জায়গা আছে তবু তাঁর ব্যবস্থা হয় এককোণের ছোট একটা ঘরে। এসবই সীমা করে তার মায়ের পরামর্শে। সীমাকে সর্ব ব্যাপারে চালনা করেন তার মা। অতনু শান্তিপ্রিয় মানুষ, গ্রামের সাদাসিধে মানুষেরা যেমন হয়, এ নিয়ে কোনো ঝামেলা সে করে না, চুপচাপ মেনেই নেয়। বস্তুত দু'জনের দশবছরের সংসার হলেও ওদের দু'জনের জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা, কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভালবাসা? ছিল প্রথমে, সীমার মায়ের দাক্ষিণ্যে তা আজ পাখা মেলেছে। প্রথম থেকেই সীমার মায়ের মত ছিল না গ্রামের ছেলে অতনুর সঙ্গে তাদের মেয়ের বিয়ে দিতে। কিন্তু, সীমার বাবার আন্ডারে কাজ করার সময় থেকেই অতনুকে ওনার চোখে পড়ে, মনেও ধরে। আর তাঁর একমাত্র মেয়ের জীবন যে তার মায়ের মতোই চলবে যেটা যে কেউ মেনে নেবে না তাও উনি জানতেন। তাই এমন এক ছেলেই যে সীমার জন্য উপযুক্ত তা তিনি বেশ বুঝেছিলেন এবং প্রায় নিজের মতের জোর খাটিয়েই তিনি অতনুর সঙ্গে সীমার বিয়ে দেন, স্ত্রীর প্রবল আপত্তি অগ্রাহ্য করে। সীমার মায়ের ইচ্ছে ছিল সোসাইটির উঁচুতলায় মেয়ের সম্বন্ধ করার যা তিনি প্রচুর চেষ্টা করেও পারেননি।

       অতনু কানপুর আইআইটির ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশী ফার্মে চাকরী করে, তার মধ্যে আজও গ্রাম্য সরলতা বিদ্যমান যা আজকাল এককথায় বিরল বলা চলে। এমন একটি ছেলের কাছে যে মেয়ে সুখে থাকবে এ সীমার বাবার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি অতনুকে কেবল অনুরোধ করেন যাতে সীমাকে গ্রামের বাড়ীতে সে না নিয়ে যায়। অতনু রেখেছে সে কথা, নিজে গেছে, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসাবে দায়িত্ব কর্তব্য সে করে এসেছে চিরকাল, সেখানে কোনো ত্রুটি সে রাখেনি। তবে বিয়ের পর বাবা-মাও আর কখনও আসেননি কলকাতায় তার ফ্ল্যাটে। অতনুও আনেনি তাঁদের। বোঝে দুই-পরিবারের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক, সেখানে তার বাবা-মাকে এনে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলতে চায়নি সে। তবে ফারাক হলেও নিজে গেছে সে মাঝেমধ্যে শ্বশুরবাড়ি নিমন্ত্রণ পেলে। শ্বশুরমশাই তাকে অত্যন্তই স্নেহ করতেন তাই সেখানে তার যত্ন আপ্যায়নের ত্রুটি ছিল না। কিন্তু সেই মানুষটা চলে গেলে সে বোঝে তার শাশুড়ি তখনও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করেন গ্রামের ছেলে বলে। এতদিন শ্বশুরমশাই থাকায় সেটা বোঝাতে পারেননি, যা প্রকট হয়ে ওঠে। 

         এর মধ্যে ওদের একটি সন্তানও হয়েছে, অরিত্র। সন্তানকে ঘিরে সীমা-অতনুর কত খুশীর দিনও কেটেছে কিন্তু সীমার বাবা মারা যাবার পর ওর মা সীমার ওপর আধিপত্য চালান বড় বেশী। মায়ের হস্তক্ষেপে ওদের সম্পর্ক ক্রমে খারাপ হতে থাকে মানসিকভাবে। সীমা মায়ের সঙ্গে যখনতখন রাতে পার্টিতে চলে যেত বাচ্চাকে আয়ার কাছে রেখে যেটা অতনু মেনে নিতে পারত না কিন্তু অশান্তি করবে না বলেই সে চুপ করে থাকত। ক্রমে ওদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। আর নাইট ক্লাবে যাওয়া, পার্টিতে যাওয়া করতে করতে সীমা একটু একটু করে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে লাগল, রাতে প্রায় টলতে টলতে বাড়ী ফিরত। লা মার্টিনের ছাত্রী, প্রেসিডেন্সির অনার্স গ্র‍্যাজুয়েট, সে তখন একজন সোসাইটি মহিলা।

      ছোট্ট অরিত্র রাতে শোবার সময় মাকে কাছে পেতে চাইত, বায়না করত, শেষে জলভরা চোখে আয়ামাসির কাছেই ঘুমাত। বাবাও রাতে ফিরতেন বলে বাবাকে তেমন কাছে পেত না আর তাই দাদু এলে দাদুকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে সে। দাদুও নাতির সঙ্গে মহাখুশীতে থাকতেন। ছেলে সারাদিন ব্যস্ত, সীমা তার নিজস্ব সমাজ নিয়েই থাকতে পছন্দ করত। নীরেনবাবুর প্রথম প্রথম নিজেকে একটু অবাঞ্ছিত মনে হত, পরে ছোট্ট অরিত্র ওর দাদুর শুষ্ক মরুভূমিতে সাহারা হয়ে উঠেছিল। অবসরে দাদুর কাছেই থাকত অরিত্র, দাদুর সঙ্গে খেলা, দাদুর কাছে গল্প শোনা, অরিত্র মায়ের অভাব ভুলতে শুরু করল। স্কুল থেকে ফিরে সব কথা তার দাদুর সঙ্গে, দাদুর কাছে সম্পূর্ণ মেলে ধরত সে নিজেকে অনায়াসে, যা এতদিন সে কারও কাছে করতে পারেনি। ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা নেড়েচেড়ে নাতি যখন কলকল করে দাদুর সঙ্গে গল্প করত, দাদুর মনে হত তাঁর জীবনে আর কিছু পাওয়ার বাকী নেই, তিনি যেন এক সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে গেছেন। এক বৃদ্ধ আর এক শিশুর বন্ধুত্বে বাড়ীটা তখন খুশীর আলোয় ঝলমল করে উঠত। নাহলে প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ নীরেনবাবু ছেলের বাড়ী এসে, ওদের জীবনযাত্রা দেখে থতমত খেতেন। বিশেষ করে বৌমা সীমার হালচাল সম্বন্ধে তিনি কিছুই অবগত ছিলেন না। অবাক হয়ে সব দেখতেন কিন্তু কিছু বলতেন না। বুঝতেন তাঁর কোনো বক্তব্যের সেখানে কোনো মূল্য নেই তবে ছেলে অতনু যতটুকু পারত বাবাকে সময় দিতে চেষ্টা করত।

       এভাবেই চলছিল জোড়াতালি দেওয়া সম্পর্ক। দু'জনে দেখাই কম হয়, সীমা বাড়ী ফেরে প্রায় মাঝরাতে নেশাগ্রস্ত হয়ে, ততক্ষণে অতনু গভীর ঘুমে। ওদিকে রাত করে ফেরার জন্য সে লেট-রাইজার। ঘুম থেকে উঠে দেখে অতনু, অরিত্র বেরিয়ে গেছে। অতনু অফিস যাবার পথে অরিত্রকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে যায় রোজ আর সারাটা রাস্তা অরিত্র বকবক করতে থাকে। কত কি যে ওর বলার থাকে বাবাকে, আর অতনুও বেশ উপভোগ করে সেটা। ছুটির সময় ড্রাইভার বাড়ী নিয়ে আসে অরিত্রকে, তখন সীমা হয়তো বা শপিংএ কিংবা পার্লারে অথবা কোনো বন্ধুর বাড়ী, এই ছিল ওদের রোজনামচা। একরাতে সীমা বোধহয় একটু বেশিই মদ্যপান করে ফেলেছিল তাই মা তাকে সঙ্গে করে ওপরে ওর সাততলার ফ্ল্যাটে পৌঁছতে আসেন। আয়া দরজা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকে সে পড়ে যায়। এতে একটু জোরে কথাবার্তায় নীরেনবাবু ঘুম ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে বলে ফেলেন, "একি বৌমা, ছি ছি"। ব্যস আর যাবে কোথায়? সীমার মা তো রেগে আগুন, নীরেনবাবুকে যথেচ্ছ অপমান করেন, একটা হেস্তোনেস্ত করেই তিনি ছাড়বেন। এই 'গেঁয়ো ভূত'কে না তাড়ালে তাঁর শান্তি নেই।

       এরপর অতনুও উঠে আসে ঘুম ভেঙ্গে। তার বাবার অনেক অবহেলা, অপমান দেখেছে সে মুখ বুজে, কিন্তু এবারে আর সে সহ্য করতে পারে না। পরদিন অরিত্রকে স্কুলে ছেড়ে সে ফিরে আসে, অফিসে আর যায় না। সীমা ঘুম থেকে উঠলে শান্ত-কঠিন স্বরে জানিয়ে দেয় যে সে সীমার সঙ্গে একসঙ্গে এক ছাদের তলায় আর থাকতে চায় না। কাজেই অবশ্যম্ভাবী ডিভোর্স। অরিত্র কিন্তু বাবাকে, দাদুকে ছেড়ে মায়ের সঙ্গে যেতে চায় না। বস্তুত মা কি জিনিস তা যে তার জানাই হয়নি। অতঃপর মায়ের আশকারায় জেদী হয়ে ওঠা সীমা গিয়ে ওঠে তার মায়ের কাছে। নতি স্বীকার সে করবে না।

      এতে দু'পক্ষের কারোরই কোনো অসুবিধা হয়নি, যে যেমন ছিল সে তেমনই রইল। কিন্তু কয়েকমাস পরে নীরেনবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনদিনের মাথায় চলে গেলেন সকল মায়া ত্যাগ করে, এই জগৎ ছেড়ে। খুব কাঁদল অরিত্র দাদুকে হারিয়ে। অতনুও যেন বাবাকে হারিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। বাড়িটা যেন খাঁ খাঁ করে গিলে খেতে আসত ওকে। খোঁজখবর করে চাকরী নিয়ে অতনু তাই লন্ডন চলে গেল অরিত্রকে নিয়ে। এদেশে আর আসত না, কার কাছেই বা আসত সে! কে ছিল তার জন্য এখানে অপেক্ষায় পথ চেয়ে! তাই ওদেশেই থাকতে থাকতে সেখানে একটা বাড়ীও করে সে। বাবা-ছেলে সেই বাড়ীতে থাকে। ছেলেটাও বড় হয়েছে, সে-ই ওর বন্ধু, সঙ্গী। অরিত্র পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট বাবার মত, সেখানে ডাক্তারি পড়ে সে। দেখতেও হয়েছে একেবারে সাহেবের মত। পাশ করার বহুবছর পর অতনু তাকে নিয়ে দেশে আসে। কলকাতার ফ্ল্যাট, দেশের বাড়ী, সব জায়গায় নিয়ে যায় ছেলেকে, আগে তো কখনও নিয়ে যেতে পারেনি। অরিত্র দাদুর ঘরে যায়, সেখানে রাখা ধূলোপড়া দাদুর ছবিতে হাত বোলায়। গ্রামের বাড়ী গিয়ে ও ঘুরে ঘুরে সব দেখে, যেখানে তার বাবা বড় হয়েছে, দাদু-ঠাকুমা সারাজীবন থেকেছেন। ও যেন ছোটবেলায় ফিরে গেছে।

       অতনুরও বাবা-মার জন্য মন কেমন করে খুব, তবু অরিত্রর মনখারাপ দেখে তার মাথায় হাত রাখে এসে, অরিত্র বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকে কিছুক্ষণ। অতনু বোঝে সব, সস্নেহে ছেলের গায়ে হাত বোলায়। কলকাতায় ফিরে অতনু কিছু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করে, অরিত্রর বিয়ে দিতে চায় সে আর সেটা এদেশের মেয়ের সঙ্গেই।

       ওদিকে সীমার মা-ও আর বেঁচে নেই। বুকভরা হাহাকার, শূন্যতা, একাকীত্বকে সঙ্গী করে সীমা কলকাতার অভিজাত এলাকার বিশাল বড় বাড়ীতে একাই থাকে। শরীরে বয়সের ছাপ প্রকট, আর একাকীত্ব যেন গিলে খায় তাকে আজকাল। কিছু ভাল লাগে না তার, পার্টি, হুল্লোড়, কিচ্ছু না। মদ্যপান আর সে করে না, অতনু, অরিত্রর জন্য বুকের ভেতরটা তার খাঁ খাঁ করে। ফিরতে চায় সে, উপায় নেই। মা তার সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। মায়ের ওপর হয় তার দুরন্ত অভিমান। মা-ই জীবনটা শেষ করে দিল তার। অতনুর মত স্বামী, যে চিরকাল মুখ বুজে সব সহ্য করেছে, তার সঙ্গে ওর বিচ্ছেদও তো মায়েরই কারণে, অতনুর সঙ্গে তো ওর কোনোদিনই কোনো বিবাদ ছিল না।

    আজকাল সীমা বইপড়া, গানশোনা, সাহিত্যসভা, এইসব নিয়েই থাকে। তাতে কিছুটা হলেও শান্তি পায় ও। এইভাবে বাইরে বেরিয়ে কিছু পরিচিতি, কিছু সঙ্গী তার হয়েছে। তাদেরই একজন একদিন ফোন করে জানায় অতনু আর অরিত্রের দেশে আসার কথা। বুকের ভেতর তার হাজাররকমের আওয়াজ, বড় উতলা লাগে মন। কতদিন দেখেনি ছেলেটাকে, কত বড় হল, কেমন দেখতে হয়েছে! অস্থিরতাকে দমন করতে না পেরে ছোটে অতনুর ফ্ল্যাটে। দরজা খুললে মা -ছেলে মুখোমুখি, অবাক চোখে সীমা তাকিয়ে থাকে অরিত্রর দিকে, এ তার ছেলে! এত্ত সুন্দর হয়েছে! একেবারে সাহেবের মত। অতনুও 'কে কে' করতে করতে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে দরজায়। চেহারাটা ঈষৎ ভারী হয়েছে, মাথার সামনের চুলে রূপোলী রেখা, তিনজনের মুখেই কোনো কথা নেই।

       কোনোরকমে সামলে অতনু ভেতরে ডাকে সীমাকে আন্তরিকভাবে নরমস্বরে। সীমার চোখে জল, কন্ঠরুদ্ধ। মাথা নীচু করে সোফায় বসে সামলাবার চেষ্টা করে নিজেকে, কথা বলতে পারে না। তারপর সহসা অতনুর হাত চেপে ধরে সে, "আমি ফিরতে চাই, তোমাদের ছেড়ে থাকা আমার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আমি আর পারছি না, অনেক শাস্তি আমি পেয়েছি, এবার আমায় ক্ষমা করে দাও"। অরিত্ররও চোখদুটো জলে ভিজে উঠেছে।

       এরপর কি আর ফেরানো যায়! তিনজনে ওরা আবার এক ছাদের তলায় থাকতে শুরু করে তখন এক সুখী পরিবার গড়ে নতুন করে। সীমার ইচ্ছে তার বাবার অতবড় বাড়ী পড়ে র‍য়েছে, অরিত্র সেখানে নার্সিংহোম করুক। এখানেই থাকুক অরিত্র কিন্তু অতনুর চাকরী রয়েছে এখনও, তাকে তাই ফিরে যেতে হবে লন্ডনে। এরপর তোড়জোড় করে ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিনক্ষণ ঠিক করে সবাই ওরা লন্ডনে যায়। বিয়ের তখনও আটমাস বাকী, অরিত্র ততদিনে একটা ডিপ্লোমা করে নিতে চায়। সীমা সেখানে গিয়ে মন দিয়ে সংসার করে স্বামী সন্তান নিয়ে যা সে কোনোদিনও করেনি আগে, আর এতে যে কি আনন্দ সে স্বাদও সে পায়নি কখনও আগে।

       ওরা ঠিক করে অরিত্রর বিয়ের পর কিছুদিন লন্ডনে এসে থেকে অরিত্রর কোর্স কমপ্লিট হলে ওরা কলকাতায় সীমার বাবার বাড়ীতে থাকবে। আপাতত সেখানে চেম্বার, পরে নার্সিংহোম করবে। আর সীমা ও অতনু যতদিন অতনুর চাকরী থাকবে ততদিন লন্ডনে থাকবে তারপর দেশে ফিরে ওরা একসঙ্গে থাকবে। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাবে অরিত্র বউকে নিয়ে সেখানে গিয়ে।

       সীমা ভাবে মনে মনে, এই সুখ ছেড়ে ও কিসের নেশায় সব অবহেলা করেছিল এতদিন। অতনু ভাবে, ভালবাসা মরে না, চাপা থাকে পরিস্থিতির চাপে। সুযোগ পেলেই তা ডানা ঝাপটায়, ভালবাসার মানুষের কাছে যেতে চায়। অরিত্র ভাবে, আজ সে কত সুখী, এই সুখটাই তো চেয়েছিল সে ছোট থেকে। যাই হোক দেরীতে হলেও সে পেয়েছে অবশেষে, better late than never.


 


শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মানসী গাঙ্গুলী

                            


 গৃহপ্রবেশ 

       নির্ঝরের বাড়ির আজ গৃহপ্রবেশ। অনিতার নিমন্ত্রণ। কি উপহার দেবে ভেবে নিজের হাতে একটা টুকরো কাপড়ে ফেব্রিক রং দিয়ে আঁকা ছবি বাঁধিয়ে এনেছে সে। আরে, এটা তো সেই পুরনো বাড়িটাই, তবে কি নির্ঝর পুরনো বাড়িটা কিনে নিয়েছে! মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলেও ওদের পুরনো বাড়ির নতুন রূপায়ন বাইরে থেকে দেখতে বেশ লাগছে অনিতার। দরজার দুপাশে দুটো ঘট ও কলাগাছ, দরজার মাথায় তেল সিঁদুর দিয়ে ওঁ চিহ্ন ও একপাশে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা। পুরোহিতমশায়ের মন্ত্রোচ্চারণে বাড়ী গমগম করছে। নির্ঝর কোনোদিনই পুজোপাঠে বিশ্বাসী ছিল না। এ নিয়ে মাসিমার কিছু ক্ষোভও ছিল, কিন্তু নির্ঝর হেসেই উড়িয়ে দিত।
       সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে নির্ঝরকে লাগছে বেশ। আর ওর বউ ঝুমা লালপাড় সাদা শাড়ি পরে পুরোহিতমশাইকে হাতে হাতে সব এগিয়ে দিচ্ছে, ধুনুচিতে হাওয়া দিচ্ছে। ঘর ধূপধুনোর গন্ধে ভরপুর, বেশ একটা পবিত্র, মাঙ্গলিক পরিবেশ।
        ওরা কলেজের বন্ধু, একসময় প্রায় নিত্য ওদের বাড়ি যাতায়াত ছিল অনিতা ও আরও চার বান্ধবীর। এখন অনিতার সঙ্গেই কেবল যোগাযোগ আছে নির্ঝরের, বাকিরা ছিটকে গেছে। ওদের দুজনের সঙ্গেই তাদের আর যোগাযোগ নেই। নির্ঝরের বাবা খুব অল্প বয়সে মারা যান, খুব কষ্ট করে বড় হয়েছে ওরা তিনভাই, তবু মাসিমার মুখে কখনও দুঃখ দেখেনি অনিতা, সর্বদা হাসিমুখ। ওদের বলতেন, "তোরা আসিস তাই একটু রঙিন কাপড় দেখি, এ বাড়ি থেকে তো সব রঙ হারিয়ে গেছে সেই কবে"। খুব শান্ত, ঠান্ডা কিন্তু বুঝদার মানুষ ছিলেন উনি, ছেলেদের নামকরণ থেকেই বোঝা যায় তা -নির্ঝর, কল্লোল, প্রবাহ। নির্ঝর কল্লোল তুলে প্রবাহিত হচ্ছে, আহা।
         ভাড়া বাড়ি, একটা ঘর, এক চিলতে বারান্দা আর ছোট উঠোন পেরিয়ে টালির চালের রান্নাঘর, আরেক দিকে অন্ধকার বাথরুম। এই একখানা ঘরের সংসারেই ছিল আনন্দ, হাসি অত অভাবের মধ্যেও। নিচের তলায় পাশে আরেকটি ঘর, খানিক বারান্দা আর রান্নাঘর ছিল বাড়িওয়ালার, উপরতলায় দুটি ঘর, বারান্দা যেখানে থাকতেন বাড়িওয়ালা ও তাঁর স্ত্রী। ওনাদের কোনো সন্তানাদি ছিল না। দুজনেরই যথেষ্ট বয়স হয়েছে, অসুস্থ হলে নির্ঝরই ডাক্তার, ওষুধ এসবের জন্য ছোটাছুটি করত, আর ওর মা তাঁদের সেবা, পথ্য, আহারের দায়িত্ব নিতেন নিজের থেকেই। এই বাড়িওয়ালার ছিল একদা সোনার দোকান আর বড়মা, মানে বাড়িউলি, নির্ঝররা তাই বলেই ডাকত, এক গা গয়না পরে থাকতেন সর্বদা।
        অনিতার আজ সব ধারাবাহিকভাবে মনে পড়ছে। শাঁখঘন্টার আওয়াজে মাঝে মাঝে সম্বিত ফিরলেও অল্প পরেই আবার অতীতে ডুবে যাচ্ছে ও। ওই অভাবের সংসারেও মাসিমা রোজ মুড়িমাখা, চা খেতে দিতেন ওদের সবাইকে, কখনও বা নিজে বাড়িতে চপ ভেজে খাওয়াতেন ওদের। তখন ওরা ছোট থাকায় অত ভাবত না রোজ রোজ ওদের কত খরচা হয়ে যায়, আজ অনিতা পরিণত মনে সেসব ভেবে লজ্জা পায়। মনে পড়ে শুভ্রা, রুমা, সুমিতা, গোপালি আর ও এই পাঁচজন বি.এসসি ফাইনাল পরীক্ষার পর প্রায় রোজ ওদের বাড়ি গিয়ে আড্ডা জমাত, তখন খুব তাস খেলার নেশা হয়েছিল ওদের। হৈ হৈ, হুল্লোড়, হাসি দারুণ ছিল দিনগুলো। শুভ্রার হাসিটা ছিল বিখ্যাত, মোড়ের মাথা থেকে শুনতে পাওয়া যেত। রবিবার ওরা যেত না, সবার বাবা বাড়ি থাকতেন, তাই আড্ডা বন্ধ, কিন্তু মাসিমা যেন হাঁপিয়ে উঠতেন। ওদের উচ্ছ্বলতা দেখে নিঃসন্তান বড়মাও ঘরে এসে বসতেন। বড়মা, মাসিমা সবাই ওদের আনন্দে খুশি হতেন, সমবয়সীর মত হইচই করতেন ওদের সঙ্গে। অত অভাবেও মানুষ অমন খুশি হতে পারে এ অনিতার কাছে রীতিমত বিস্ময়কর। ওরই মাঝে শুভ্রা একদিন দুম করে বলে বসল, "এ বাড়ি তো পরে নির্ঝরেরই হবে"। সেদিন থেকে বড়মা শুভ্রার ওপর খুব বিরক্ত, ওর সাথে ভাল করে কথা বলতেন না আর। আসলে ওনার দুর্বল জায়গায় আঘাত লেগেছিল। যেহেতু ওনার সন্তান নেই তাই নির্ঝর, এই জায়গাটায় উনি ব্যথা পেয়েছিলেন খুব।
          এরপর আবার সবার পড়াশোনা শুরু হল, রোজের আড্ডা তো বন্ধই, মাঝে মাঝে এক-আধদিন হতে হতে তাও বন্ধ হয়ে গেল। শুভ্রা কলকাতার এক স্কুলে চাকরি পেয়ে গেল। ও বাবা-মায়ের একই মাত্র সন্তান। তাঁদের দায়িত্ব তাই ওর, চাকরিটা ওর খুব দরকার ছিল। রুমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিয়ে করল বাড়ির অমতে, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। সুমিতার এক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে সে জাহাজে ঘোরে বরের সঙ্গে, আর গোপালী যে বিয়ের পর কোথায় হারিয়ে গেল! অনিতারই কেবল কাছাকাছি বিয়ে হওয়ায় যোগাযোগটা আছে তাও ব্যস্ততায় খুব কম। আগে মাসিমা থাকতে তাও অনিতা স্বামীকে নিয়ে যেত ওদের বাড়ি মাঝেমাঝে, মাসিমা জামাইকেও বেশ পছন্দ করতেন, বড়মাও ভালোবাসতেন ওদের। বড়মা ওদের সবার মধ্যে অনিতাকেই বেশি পছন্দ করতেন। অনিতা কনসিভ করলে ওর বাচ্চার জন্য বড়মা একটি মোহর রেখেছিলেন কিন্তু নিজে হাতে দিতে পারেননি, তার আগেই উনি মারা যান। সেই মোহর পরে মাসিমা অনিতার হাতে দেন বড়মার নাম করে।
         ভাবনার সুর কাটল যখন নির্ঝরের মেয়েটা এসে গলা জড়িয়ে ধরল ওর, একটু আদর করল ওকে। বেশ মিষ্টি হয়েছে দেখতে, অনেকদিন পরে দেখল ওকে। এখন তো এখানে থাকে না, দিল্লীতে থাকে, JNUতে পড়ে। নির্ঝর ছেলেমেয়েদের ভালো জায়গায় দিয়েছে পড়াশুনার জন্য, গাড়ি কিনেছে, পরিবার নিয়ে বিদেশ ঘুরেছে, কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছে, আজ ও একজন সফল মানুষ। 
           বাড়িতে অতিথিরা আসছেন, নির্ঝর আজ খুব ব্যস্ত। দিনের বেলায় পুজোপাঠ হয়েছে তাই রাতে প্রীতিভোজের আয়োজন। অনিতা সকাল থেকেই রয়েছে। নির্ঝর ওর খুবই বন্ধু, বন্ধুত্বটা খানিকটা ভাইবোনের পর্যায়ে, তাই ওর সাফল্যে অনিতা খুবই খুশি। তবু কেন বারবার চোখের জল চলে আসে, তবু কেন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ওবাড়িতে যাতায়াত ছিল যখন রোজ তখন মাসিমা, বড়মা সবাই ছিলেন, অনিতা আজ ওঁদের হারাচ্ছে বড্ড বেশি ক্ষণে ক্ষণে আর দেখছে নির্ঝরকে, ওকে তো কতই খুশি দেখাচ্ছে, ওর কি মনে পড়ছে না মায়ের কথা! খুব চুপচাপ রয়েছ অনিতা, হঠাৎ ঝুমার ডাকে সম্বিত ফিরল। ঝুমা ওর নতুন কিছু বন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য ডাকছিল ওকে। সেখানেও মাসিমার কথা উঠল, মাসিমা ঝুমার শাড়িতে ফলস পাড় লাগিয়ে দিতেন, নাচ শিখতে পাঠাতেন, ওর ঘুঙুর বেঁধে দিতেন, সেসব কথা। বউদের মেয়ের মতই ভালবাসতেন। সত্যি কোনো কোনো মানুষের অনুপস্থিতি বড্ড পীড়া দেয়, তেমনই একজন মানুষ ছিলেন মাসিমা। এই মানুষটার ছবিতে মালা দিয়ে দেয়ালে টাঙানো দেখাটাও বড্ড পীড়াদায়ক। মালা গলায় মাসিমার ছবিটা বড় জীবন্ত লাগছে আজ যেন। মনে পড়ছে অনিতার, একদিন দুঃখের দিনের কথা বলতে বলতে মাসিমার মত অমন হাসিখুশি মানুষটার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিল, গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেসব অপমানের স্মৃতি উনি আমৃত্যু ভুলতে পারেননি। বরাবরই অভাবের ঘরে বাস, তবুও নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আত্মীয়ের বাড়ির বিয়েতে গিয়েছিলেন দু'দিনের জন্য  তিন ছেলেকে নিয়ে। সে বিয়েবাড়িতে এক আত্মীয়ের কানের দুল হারিয়ে যাওয়ায় আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল নির্ঝরকে। সেদিনের সে অপমান ওনাকে প্রতিমুহূর্তে দগ্ধ করেছে। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল যে কানের দুলের জন্য নির্ঝরকে ক্ষণিকের মিথ্যে আসামী হতে হয়েছিল তা তিনি বাড়ি থেকে আনেনইনি বিয়েবাড়িতে। আনতে ভুলে গিয়েছিলেন, পরে বাড়ি ফিরে পেয়েছিলেন। এসব মাসিমা শুধু  অনিতাকেই বলেছিলেন কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে। সেদিন  তিনি বলেছিলেন, অভাব মানুষের সবথেকে বড় শত্রু, তিনি যদি অবস্থাপন্ন হতেন, তাঁর ছেলেকে ওভাবে সবার কাছে ছোট হতে হত না ক্ষণিকের জন্য হলেও।
        কিন্তু নির্ঝরকে আজ খুব খুশি দেখাচ্ছে। আজ বৈভবের আতিশয্যে ওর সে অপমান হয়ত চাপা পড়ে গেছে, সে ক্ষতে হয়তবা প্রলেপ পড়েছে। ভাবে অনিতা, 'থাক নির্ঝর তুই খুশিই থাক'। মাঝে নির্ঝরের সঙ্গে একটা ভুল বোঝাবুঝিতে কিছুদিন দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল না। নির্ঝর তার শ্রীরামপুরের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় থাকবার জন্য মাসিমাকে সমেত নিয়ে যখন চলে যায় অনিতাকে সে কথা জানায় না সারপ্রাইজ দেবে বলে। আর অল্প কিছু দূরত্বে থাকা অনিতা তা জানতে না  পারায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে আর ওর সঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয়। নিত্য হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। নির্ঝর ওকে কিছুতেই মানাতে পারেনি। এরপর যোগাযোগ বন্ধ থাকাকালীনই মাসিমা অগ্নিদগ্ধ হন আর সে খবর নির্ঝর আর জানায়নি অনিতাকে। অনেকদিন পর অনেক নিচে চলে যাওয়া নির্ঝরের নম্বরে ও দেখতে পায় একটা মেসেজ, "মা চলে গেলেন"। কি কারণে যেন সেদিন হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রল করতে গিয়ে অনিতার চোখে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে অনিতা, ততদিনে কাজ মিটে গেছে। খুব কষ্ট হয় অনিতার মাসিমাকে শেষ দেখা দেখতে পেল না বলে। আর আজ যখন নির্ঝরের বাড়িতে উৎসব, চারিদিক মুখর আনন্দ, হাসি, গান, বাজনা আলোর জৌলুসে, তখন অনিতার বুকের ভেতরটা হু হু করছে। ভীষণভাবে মাসিমার অভাব বোধ করছে ও। মাসিমা ওর কাছে মায়ের মতই ছিলেন। খুবই স্নেহশীলা, কাছে গিয়ে বসলে মনে হত যেন এক নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয়টা আজ নেই অনিতার। আজ এত জৌলুসের মধ্যেও নিজেকে কেমন নিরাশ্রয় লাগছে ওর। দেওয়ালে বড় বড় চারটি ছবিতে চন্দন ও মালা পরানো, মাসিমা, মেসোমশাই, বড়মা ও জেঠুর। মেসোমশাইকে ও বরাবরই ছবিতেই দেখেছে, জেঠু ঘরেই থাকতেন, মাঝেমধ্যে দেখতে পেত কিন্তু মাসিমা আর বড়মার স্মৃতি যে বড়ই উজ্জ্বল। মনে পড়ে অনিতার সেদিনের শুভ্রার কথায় বড়মা রাগ করলেও, সে কথাই সত্যি হল। বড়মা তাঁর একঝুড়ি গয়না নির্ঝরের বউকে দিয়ে যান আর বাড়িটা নির্ঝরকে। ওঁদের অবর্তমানে নির্ঝরই হবে মালিক। ঝুমার কাছেই জানতে পারল একথা অনিতা। বড়মা নির্ঝরকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন। নির্ঝরের অনেক গুণ ছিল, মায়ের দায়িত্ব, বড়মা জেঠুর দায়িত্ব, ভাইদের মানুষ করার চেষ্টা, নিজের পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে টিউশন করে সংসারটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা। কিন্তু আর দুজনের কোন হেলদোল ছিল না, তাই হয়তো বড়মা ওকেই বাড়িটা দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অত অভাবের মধ্যে জীবন কাটিয়েও একফোঁটা লোভ ছিল না ওর। ও নিজে ওই সম্পত্তির একক মালিকানা পেতে চায়নি তাই তিন ভাইয়ের নামে রেজিস্ট্রি করায় তা। একসঙ্গেই সংসার, মেজো ভাইটাও বেশ দাঁড়িয়ে গেছে কেবল ছোটটাই তেমন কিছু করতে পারল না। তবু একান্নবর্তী পরিবারে অসুবিধা কিছু ছিল না, নির্ঝরই দায়ভার বহন করত, কিন্তু মুশকিল হল এই ছোট ভাইটির বিয়ে দিয়ে। বনিবনা না হওয়ায় নির্ঝর তার অফিস থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটে চলে গেল মাকে সঙ্গে নিয়ে। আগেই পেয়েছিল, তবু এতদিন একসঙ্গে থাকবে বলে যায়নি। মেজোভাই কর্মসূত্রে অন্য রাজ্যে, পড়ে রইল বাড়িতে কেবল ছোট ও তার পরিবার। আর বড়মার দেওয়া বাড়ি ও গয়না তিন সমান ভাগে ভাগ করেছে ও, ভাইদের বঞ্চিত করেনি। ছোটভাই কমজোরি, তাই তার দাবী মত বড়মার রান্নাঘর, সিঁড়ি যে দিকটা সেদিকটা তাকে দিয়েছে। উপরে নিচে একটা করে ঘর, বাড়ির সামনে ওপরে নিচে সরু বারান্দা আর পিছন দিকে ওপরে নিচে দুফালি দালান, যাতে ওকে আর কিছু পয়সা খরচ করতে না হয় বাড়ির পিছনে। ওর ক্ষমতাও নেই খরচ করার আর গয়না যা পেয়েছে তাতে ওর মেয়ের বিয়ের জন্য রেখেও বাকি বিক্রি করে বিয়ের খরচ উঠে যাবে। বাড়ির অর্ধেকটা নির্ঝর নিয়ে নিজের মত পিছন দিকে বাড়িয়ে নিয়েছে আধুনিক কায়দায়, ইন্টিরিয়ার ডেকরেটার দিয়ে বাড়ি সাজিয়েছে সুন্দর করে। মেজোভাই বাড়ির অংশ নিতে চায়নি বলে পিছনের জমিটা তার বরাদ্দ হয়েছে। সততার মূল্য আজও আছে, ভাবে অনিতা। মাসিমা ও নির্ঝর নিঃস্বার্থভাবে অসহায় বড়মা, জেঠুকে যেমন বিপদে আপদে দেখাশোনা করেছে নিজের মত করে, তার পুরষ্কারও তারা পেয়েছে। আজ মাসিমা নেই, কলকাতায় নির্ঝরের ফ্ল্যাটে থাকার সময় সন্ধ্যে দিতে গিয়ে প্রদীপের আগুন গায়ে লেগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কদিন কষ্ট পেয়ে মারা যান। বাকি সব দেখে গেছেন কেবল এই বাড়িটা আর দেখে যাওয়া হয়নি তাঁর, ভাগাভাগি অবধি জেনে গেছেন।
        নিজেকে আজ বড় অপরাধী মনে হচ্ছে অনিতার। নির্ঝরের ওপর নিছক অভিমানে পরোক্ষে তার প্রিয় মাসিমার কাছ থেকেও দূরে সরে গিয়েছিল ও, আর সেই ফাঁকে মাসিমাও ফাঁকি দিলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, আর কখনও প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকবে না। একা একপাশে চুপ করে বসেছিল অনিতা আনমনে। 'কিগো অনিতাদি খাবে চলো', ঝুমার ডাকে চমক ভাঙ্গল ওর। জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে চলল অনিতা ঝুমার সঙ্গে গৃহপ্রবেশের ভোজ খেতে।




সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

মানসী গাঙ্গুলী

                                                    




কিশলয়


     যতদূর চোখ যায় আকাশটা ঘোর কালো রঙ ধরেছে, বৃষ্টি এল বলে। জানলা দিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে নগেনের মনটা আজ হারিয়ে যাচ্ছে বারেবারে। ওর একটা অফিসঘর আছে, যেখানে বড় পর্দায় ষোলটা সিসি ক্যামেরায় নজর রাখে সারাক্ষণ ৪০ বিঘা নার্সারির চারিদিকে। তার স্বপ্নের নার্সারি।  এছাড়া পাশে একটা বড় ঘর। নানানরকমের সার বিভিন্ন গাছে দেবার জন্য, গাছের পোকা মারার ওষুধ, বিভিন্ন গাছের বাল্ব বস্তাবন্দি হয়ে সব ওই ঘরে আশ্রয় পেয়েছে। পাশে আরও একটা ঘর, সেখানে নানানরকম সৌখিন টব, ইনডোর প্ল্যান্ট রাখার স্ট্যান্ড, ছোট-বড়, গাছে জল দেবার রকমারি ঝাঁঝরি, গাছ ছাঁটাই করার কাঁচি, শাবল, কোঁদাল, কুড়ুল, খুরপি, কাস্তে, মানে গাছপালা করতে আনুষঙ্গিক যা যা প্রয়োজন সবই রয়েছে তার জিম্মায়। খদ্দেরকে যাতে শখের বাগান করতে এখানে সেখানে ছুটোছুটি না করতে হয়, একই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে সবই যাতে তারা সহজে পেয়ে যায়। আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর, ছোটখাটো কিচেনই বলা যায়। সেখানে চায়ের সরঞ্জাম, একোয়া গার্ড, জলের বোতল, একটা ফ্রিজ, কিছু গ্লাস, প্লেট, চায়ের কাপ-প্লেট, এছাড়া হাঁড়ি, কড়াও রয়েছে, কখন কি প্রয়োজন হয় সেইজন্য। সামনে অনেকটা চত্বর ছাউনি করা। খদ্দের গাড়ি নিয়ে এলে, পার্ক করে নামলেই ছাউনির তলায় এসে যাবে, রোদবৃষ্টি স্পর্শ করবে না তাদের। ছাউনির নিচে অফিসঘরের ঠিক সামনে একটা টেবিল পাতা ও বেশ কয়েকটা চেয়ার। সম্মানীয় অনেক ব্যক্তিত্বই এই নার্সারিতে আসা-যাওয়া করেন প্রায়শঃই। তাদের সেখানে চা পরিবেশন করা হয়। নগেনের এখন বিরাট পরিচিতি। এলাকার সব থেকে বড় নার্সারি তার এই কিশলয়, কত বড় বড় মানুষের সঙ্গে তার ওঠাবসা এই গাছের খাতিরে। গ্রামের চাষির ঘরের ছেলে ১২ ক্লাস পাস করার পর বাবা বললেন, "আর পড়াতে পারব না বাবা, এবার আমার সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করবি চল। আমার বয়স হচ্ছে, একা একা আর পেরেও উঠি না, তুই পাশে থাকলে বড় সুবিধা হয়"। পড়াশুনার ওখানেই ইতি নগেনের।
         অফিসঘরে নিজের টেবিলে বসে কিছু জার্নাল নাড়াচাড়া করতে করতে আকাশের দিকে চোখ যায় নগেনের। রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে উঠে পড়ে সে। পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে। ডানদিকে জমিতে ভাগ ভাগ করে কোথাও গোলাপ, কোথাও রংবেরঙের একপাটি জবা, কোথাও পঞ্চমুখী জবারা সব বাগান আলো করে রেখেছে। এরা নগেনের প্রাণ।  নগেনের যাবার সময় দুলে দুলে যেন তারা অভিবাদন জানায় তাকে। কতটুকুই বা সম্বল ছিল তার শুরুতে। বাবার সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করার সময় মাটি চিনতে শুরু করল সে। কোন মাটিতে কি ধরনের গাছ ভাল হয়, কোন মাটি কতটা জল চায়, এরকম চাষের নানান কথা। বাবা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকেন। নগেন বুঝতে পারে, এই অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষাই হল আসল শিক্ষা। এই শিক্ষা পুঁথিগত শিক্ষার থেকে অনেক জোরদার। কিন্তু এও বুঝল, সে মাঠে এভাবে বাবার সঙ্গে ঘুরে চাষবাসকেই জীবিকা করে নিলে বাবার মতোই ছাপোষা হয়ে থাকতে হবে তাকে আজীবন। তাহলে ভবিষ্যতে সেও তার ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে পারবে না। না, এমন জীবন সে চায় না। টাকার অভাবে যখন তার পড়া বন্ধ হয়েছিল, কষ্ট হয়েছিল তার। খুব মেধাবী না হলেও আরও বেশ কিছুদুর এগোতে পারত হয়ত সুযোগ পেলে। বন্ধুরা শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হলে বুকটা বেদনায় ভার হয়ে গিয়েছিল তার, যা ও বাবাকে বুঝতে দেয়নি সেদিন। কিন্তু এবার যে বাবাকে কিছু কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন। মনের মধ্যে  কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে কিছুদিন থেকে যা ও বাবাকে খুলে বলতে পারছে না পাছে তিনি ব্যথা পান মনে। কিন্তু এভাবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, বাবাকে বলতেই হবে। তার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে লাগল নগেন যাতে বাবা বুঝতে পারেন তার পরিকল্পনা, অযথা দুঃখ না পান মনে।
         বলি বলি করেও বলতে পারে না বাবাকে। বাবা রোজই ছেলেকে ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে চাষবাস শেখাতে থাকেন, বলার সুযোগ আর হয় না। সুযোগ এল অবশেষে। একদিন নগেনের এক বন্ধু বীরেন, ওদের গ্রামেরই ছেলে, কলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, নামী কলেজে পড়ে, এল ওদের বাড়ি। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দুটো গল্পগুজব করার ইচ্ছা। সেই সময় বাবা নগেনকে ডাকতে থাকেন ক্ষেতে নিয়ে যাবেন বলে। বীরেনকে দেখে ওর বাবা কুশল সংবাদ নেন আর একথা সেকথায় ওর কলকাতায় পড়াশোনার কথা জানতে পারেন। তিনি বীরেনের সামনেই দুঃখ করেন ছেলেকে আর পড়াতে না পারার জন্য। পরিবেশটা থমথমে হয়ে যায়। বীরেন বুঝতে পারে ও ভুল সময়ে এসে পড়েছে, ওর জন্য ওদের কাজের দেরী হয়ে যাচ্ছে। তাই, "আজ আসি রে" বলে উঠে পড়ে। ক্ষেতে যাবার পথে নগেনের বাবা বারেবারে বিলাপ করতে থাকেন, "আমি তোর অপদার্থ বাবা, তোকে একটু পড়াশোনা করানোর ক্ষমতাও আমার নেই। বীরেন কেমন সুন্দর কলেজে পড়ছে। আজ আমার সামর্থ থাকলে তুইও কলেজে যেতিস।" নগেন কী করে বাবাকে চুপ করাবে ভেবে পায় না। বলে, "বাবা, তুমি যে কত ভালোবাসা দিয়ে আমায় হাতে-কলমে কাজ শেখাচ্ছ এটাই বা কম কী?" বাবার মন ভোলে না তাতে। চোখে তাঁর জল এসে যায়। চোখের জল মুছে বলেন, "তুই আমার বড় ভাল ছেলে রে, তাই আমার অক্ষমতাকে ঢাকবার জন্য এমন কথা বলছিস"। নগেন বলে, "বাবা অনেকদিন থেকেই তোমায় দুটো কথা বলব, বলেও বলতে পারছি না, পাছে তুমি মনে কষ্ট পাও। আজ ভাবছি কথাগুলো বলা বড় দরকার। আজ তুমি আমায় পড়াতে পারছ না বলে মনে যে কষ্ট পাচ্ছ, আমিও যদি এই চাষবাস নিয়ে পড়ে থাকি, ভবিষ্যতে আমাকেও তোমার মত এমন মনোকষ্টে ভুগতে হবে। চাষবাস করে আমিও আমার সন্তানদের পড়ার খরচ জোগাতে পারব না, তাই আমাকে অন্য কিছু ভাবতে হবে। ক'দিন থেকেই আমার মাথায় একটা কথা ঘুরছে। চাষবাস যেমন চলছে চলুক, আমি যতটা পারি তোমার সঙ্গে থাকব, প্রয়োজনে দু'একটা লোক রাখব, জানি তাতে তাদের রোজ দিয়ে আমাদের রোজগারে টান পড়বে, কিন্তু বাবা আমার ওপর ভরসা রাখো। কিছুদিন কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নাও, আমার বিশ্বাস আমি তোমাদের সুখের মুখ দেখাতে পারব। তুমি আমায় চারশোটা টাকা দাও, আমি একটা জমি দেখে রেখেছি, সেটা কিনব। সেখানে আমি একটা নার্সারি করব। আজকাল মানুষের মধ্যে ফুল-ফলের গাছ লাগানোর একটা বেশ ঝোঁক এসেছে, সেটাই আমার মূলধন। এই নার্সারি সাজিয়ে-গুছিয়ে তুলতে যেটুকু সময়, তারপর আমার বিশ্বাস এই নার্সারি আমাদের সুখের মুখ দেখাবে।"
          বাবা হাঁ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথাগুলো শোনেন অবাক বিস্ময়ে। এ জীবনে সুখের মুখ তিনি দেখেননি। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুটো পেটের জোগাড় কোনরকমে করতেই তিনি হিমসিম খেয়েছেন।  তার পেটের তাগিদে লড়াই জারি রয়েছে আজও। ছেলের কথাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন তিনি। মনে মনে ভাবেন,  "ছেলের পেটে দু'কলম বিদ্যে রয়েছে বলে সে এভাবে ভাবতে পারছে। কই আমি তো এমন অন্য কিছুর কথা ভাবতেও পারিনি কোনোদিন! বাপ-ঠাকুরদাদার মত চাষবাস নিয়েই পড়ে আছি, এর বাইরে কিছু করতে পারি তা কখনও ভাবনায় আসেনি। তবে ছেলে যখন চাইছে করুক, আমার তরফ থেকে যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করব"। কিন্তু কিভাবে যে সাহায্য করবেন তা তার মাথায় আসে না। সে আমলে গরিব চাষির ঘরে এক কথায় চারশো টাকা বের করে দেওয়া বড় সহজ ছিল না। মুশকিল আসান হয়ে পাশে দাঁড়ালেন মা।  ছেলের স্বপ্ন চরিতার্থ করতে মা এতদিন আগলে রাখা তাঁর বিয়ের কাঁসার দানের বাসন বিক্রি করে, তাতে কষ্ট করে জমিয়ে রাখা লক্ষীর ভান্ডারের পয়সা মিলিয়ে চারশো টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
           শুরু হল নগেনের নার্সারি। প্রথমে নিজে হাতে কাজ করত। লোক রাখবার, তাকে রোজ দেবার ক্ষমতা ছিল না। সকাল থেকে গাঁইতি, কোঁদাল চালিয়ে মাটি আলগা করে বিভিন্ন জায়গায় কোথাও পেঁপের বীজ কোথাও আমের আঁটি কোথাও নারকেল আবার কোথাও বা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা রঙবেরঙের জবা গাছের ডাল বসানো, রকমারি পাতাবাহারের ডাল সংগ্রহ করে চারা তৈরি করা শুরু হল। চাষবাসের জ্ঞান যা তৈরি হয়েছে তার ওপর নির্ভর করেই চলতে লাগল তার নার্সারি তৈরি। বড় যত্ন নিয়ে সে কাজ করে যদিও ফুল-ফল গাছ তৈরির জ্ঞান তার তেমন নেই, কেবল আছে অসম্ভব মনের জোর, আছে উদ্যম, আছে পরিশ্রম করার ক্ষমতা। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব তার, 'কিছু আমি করবই'। ছোট ছোট ডালগুলো যখন শিকড় দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরে, কচি কচি পাতা গজায় ডালের আগায়, খুশিতে নগেনের চোখ ঝলমল করে ওঠে। যখন বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হয়ে সবুজ উঁকি মারে মাটির ওপরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় সে, ওইদিকে তাকিয়েই যেন তার দিন কাটে। এইভাবে একটু একটু করে ভরে ওঠে তার নার্সারি। নাম দেয় কিশলয়। দিনান্তে বেশিরভাগ সময় পড়ে থাকে ও কিশলয়ে। পাশেই আছে একটা পুকুর, সেখান থেকে জল তুলে গাছে জল দেয়। কত জায়গায় ছুটে গাছ সংগ্রহ করে, বিভিন্ন নার্সারি ঘুরে ঘুরে শেখে গাছেদের পরিচর্যা। পুঁথিগত কোনও শিক্ষা যে তার নেই, সবই হাতে-কলমে। সেই ছোট্ট কিশলয় আজ বিঘা বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত। পাশের সেই পুকুরটাও এখন তার কিশলয়ের অন্তর্গত। পুকুরের চারপাশে ঘিরে রয়েছে নারকেল গাছের সারি। যতদূর চোখ যায় সবুজ, সবুজ আর সবুজ। ঐ সবুজের ঘেরাটোপে সারাদিন কাটায় ও মনের আনন্দে। বাড়িও ওকে তেমন টানে না। এ মাটির টান, সবুজের টান তার সাংঘাতিক। এদের ভালবেসেই জীবনে আজ সে প্রতিষ্ঠিত। অল ইন্ডিয়া নার্সারি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এখন সে। কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছে এই গাছ নিয়ে, গাছের ওপর বিভিন্ন সেমিনারে সে কত বক্তব্যও রেখেছে দেশে বিদেশে। একটুকরো বিদেশকে এনে ফেলেছে সে তার কিশলয়ে। বিভিন্ন দেশের নানারকম গাছ এনে আমাদের দেশের জলবায়ুতে, আমাদের দেশের মাটিতে তা কেমন হয় সেইসব তার এখন গবেষণার বিষয়।
            অতীত রোমন্থন করতে করতে অনেকদূর পৌঁছে গেছে সে। টিপটিপ করে বৃষ্টি হতে হতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসে আদ্যপ্রান্ত ভিজিয়ে দেয় তাকে। মনের সুখে ভিজছে নগেন। অনেকদিন প্রখর রোদের পর বৃষ্টি এল। নগেন ভিজছে আর দেখছে তার কিশলয়ের গাছপালারা কেমন তার সঙ্গে মহাসুখে বৃষ্টিস্নান করছে।


রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

মানসী গাঙ্গুলি

নুড়িপাথরের ভাত

           মায়ের অনেক জ্বালা। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে কত কি-ই করতে হয় যা করার জন্য তিনি আদৌ প্রস্তুত নন। আদ্যন্ত সৎ হয়েও কখনও-বা করতে হয় মিথ্যাচার। এমনই এক মা হল এই নুপুর। পিঠোপিঠি তিন সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় গ্রাম ছেড়ে তপন পা রাখল শহরে,পরে সেখান থেকে বিদেশের মাটিতে। গ্রামে রইল তার যুবতী স্ত্রী ও তিনটি শিশুকন্যা। প্রতিমাসে তপনের পাঠানো টাকায় বেশ ভালই চলছিল নুপুরের,পোশাকে-আশাকে চেহারায় চাকচিক্য দেখলেই তা বোঝা যেত। বড়টাকে গ্রামের স্কুলে দিয়েছে কেবল,বাকিদুটো তো নেহাতই শিশু। বাচ্চারা বাবার কথা জানতে চায়,বায়না করে বাবার জন্য। তাদের শান্ত করা দায় হয়ে দাঁড়ায় নুপুরের। তবু চলছিল ভালই খেয়েপরে। এমন সময় বিদেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে হাজারে-হাজারে মানুষ মারা যেতে লাগল। একদিন জানা গেল তপনও করোনার বলি হয়েছে। 
         গ্রামের লোক শুনল নুপুরের বুকফাটা আর্তনাদ। সান্ত্বনা দিতে এল তারা। কিন্তু শুকনো কথায় তো চিঁড়ে ভেজে না,ক'দিন পরেই তপনের পাঠানো টাকা শেষ হয়ে গেল। কিছু টাকা জমিয়েছিল নুপুর অনেক আশা করে। আর কিছু জমাতে পারলেই একটা আলমারি কিনবে সে,তার পাল্লাজুড়ে লাগানো থাকবে একটা বড় আয়না,সেজেগুজে সেই আয়নায় নিজেকে দেখবে সে। এ তার অনেকদিনের স্বপ্ন। সে টাকাও শেষ। স্বপ্ন ভেঙ্গে পেটপুজো হয়ে গেছ। ক'দিন নিজে আধপেটা খেয়ে,না খেয়ে কোনোরকমে তিন শিশুকন্যার জন্য খাবার মজুত রাখছিল সে কিন্তু সে আর ক'দিন? নিজেরও যে দেহ চলে না,স্বামীর জন্য শোক করবে কি? সে তো দূর অস্ত। নেই কোনো সঞ্চয়। ভাবে বাচ্চাগুলোকে বিষ খাইয়ে নিজেও বিষ খেয়ে মরবে,কিন্তু বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ ভরে ওঠে জলে। পড়শীদের পরামর্শে লোকের বাড়ি কাজ নেয় সে যা স্বপ্নেও কখনও ভাবেনি। গ্রামেগঞ্জে অল্পশিক্ষিত মহিলা নুপুরের দ্বারা অন্য কোনো কাজও আর সম্ভব ছিল না। কাজের বাড়ি থেকে পাওয়া জলখাবারটুকু তিন সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে নিজে জল খেয়ে থাকছিল। ফলে ক'দিন পর কাজ করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সে। তারা জিজ্ঞেস করলে সে কেঁদে ফেলে। দয়াপরবশ হয়ে তারা তাকে পেট ভরে খাওয়ায়,বাচ্চাদের জন্যও কিছু খাবার দিয়ে দেয় আর মাইনের টাকার কিছুটা আগাম দিয়ে দেয় যা দিয়ে সে কটা দিন অন্তত চালিয়ে নিতে পারে। এরপর আরো দুটো বাড়ি এক এক করে কাজ নিলে সে বাচ্চাদের দুটো খেতে দিয়ে নিজেও খেতে পায়। গ্রামেগঞ্জে কাজের মানুষকে সবাই দুটো খেতে দেয়,তাই তার একবেলা রান্না করলেও চলে যায়।
           ক্রমে করোনা থাবা বসালো এদেশেও। ঘোষিত হল লকডাউন। সব কাজের বাড়ি থেকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হল। জলখাবারটুকু বন্ধ হয়ে গেল। মাস গেল,দু'মাস গেল মাইনের টাকা পুরো পেলেও তাতে মাস চলে না। তিনমাস পার হলে কাজও গেল,কদ্দিন আর মানুষ বসিয়ে বসিয়ে পয়সা গুনবে?এদিকে বাচ্চারা খিদেয় কাঁদতে থাকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার নামগন্ধ নেই। পেট চলে কি করে? আগান বাগান ঘুরে শাকপাতা এনে সেদ্ধ করে খাওয়ায় তাদের। তাতে কি হয়? কি করে ভোলাবে বাচ্চাদের? মনে পড়ে ছোটবেলার কথা,মিছিমিছি রান্নাবাটি খেলার কথা। সবটাই তখন ছিল মিছিমিছি,খাওয়াটাও মিছিমিছি। এও কিছুটা সেইরকম,কিন্তু খাওয়াটা তো মিছিমিছি সম্ভব নয়! তবু সেই পথই অনুসরণ করে নুপুর। তবে কিছুটা ফারাক রয়েছে। এখানে খেলার আনন্দ নয়,বরং খিদেয় কাঁদতে থাকা সন্তানদের ভোলাতে মিছিমিছি রান্নাবান্নার আয়োজন মায়ের। উপকরণ বলতে নুড়িপাথর,সেগুলিই হাঁড়িতে চাপিয়ে চোখের জল সংবরণ করে ফোটাতে থাকে মা। উনুনে কাঠকুটো গুঁজে দেয়,সন্তানরা যেন ভাবে খাবার তৈরি হচ্ছে,মিলবে অল্পক্ষনেই। ভাবতে ভাবতে পেটে খিদে মনে আশা নিয়ে উনুন ঘিরে বসে থাকে তারা। মায়ের ভাঁওতাবাজি কাজ দেয় সাময়িকভাবে। মিছিমিছি রান্নায় পেট ভরে না,তবু ক্লান্ত অবসন্ন দেহে অনেক আশা বুকে নিয়ে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ে তারা উনুনের আশপাশে।
          এই ঘটনা প্রতিবেশীদের নজরে পড়লে কিছু সাহায্যের হাত এগিয়ে আসে। কথাটা ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য আসতে লাগল বিভিন্ন জায়গা থেকে। ঘোর কাটে না মায়ের। সরল মনে প্রশ্ন করে,"মানুষ এখনও এত ভালবাসতে পারে?"
 

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মানসী গাঙ্গুলী


ক্যাপশন

    রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে বেবী। বিএ পাশ করেছে ম্যাথস অনার্স নিয়ে,এমএসসি পড়ার ইচ্ছে কিন্তু বাবা দূরে কোথাও পড়তে যেতে দেবেন না,হোস্টেলেও থাকতে দেবেন না। বেবী পড়াশুনা এখনই থামাতে চায় না,সে পড়াশুনা করতে ভালবাসে,তাই সায়েন্স স্টুডেন্ট  হয়েও কাছাকাছি ল'কলেজে ভর্তি হল। অ্যাডমিশন টেস্টে বসেছিল ৭৫০এরও বেশি ছেলেমেয়ে,সিলেকশনে বেবী চান্স পেয়ে খুব খুশি নাহলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত ওর। ৮০টা স্টুডেন্ট, তার মধ্যে ৭৫জন ছেলে ও ৫জন মেয়ে। বেশির ভাগই বয়সে অনেক বড়,চাকরির উন্নতির জন্য একটা বাড়তি  ডিগ্রি নিতে এসেছে,সদ্য পাশ করা ছেলেমেয়ে হাতেগোনা ৫-৬জন। যদিও কো-এড কলেজে পড়েছে তবু অচেনা সবার মাঝে একটু অস্বস্তি তো হতই ওর,সবে ২০পেরিয়ে ২১ চলছে,পায়ে পায়ে লজ্জা,কুণ্ঠাবোধ ওকে জড়িয়ে ধরছে বারেবারে। কারও সাথে আলাপও হয়নি তেমন ওর,অল্প কয়েকজনের সাথে একটু কথাবার্তা বলে কেবল,নিজে যেচে আলাপটা কোনোদিনই করতে পারে না ,তবে কেউ করলে মুখ ফিরিয়ে নেয় না ও। আর তাই বড় একা ও। বাড়ি থেকে রোজ টিফিন নিয়ে যায়,সবাই যখন টি-ব্রেকে নিচে ভোলাদার স্টলে গিয়ে চা খায়, ও তখন একা একা ক্লাসরুমে বসে টিফিন খায়। কারও সাথে আলাপ করবে কি,ও যখন কলেজে ঢোকে,বুঝতে পারে জোড়ায় জোড়ায় চোখ ওর দিকে দৃষ্টি দিয়ে রয়েছে। ও তাই খুব সাবধানে থাকে,শামুকের খোলের মধ্যে গুটিয়ে থাকে যেন। বিকাল ৩টে থেকে ৮টা পর্যন্ত ক্লাস,বাবাকে সেটা জানায়নি,তাহলে আর ভর্তি হতে পারত না। বিএসসি পড়ার সময়কার এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে লুকিয়ে অ্যাডমিশন নিয়েছিল ও যে ওর বাবার সইটা করে দিয়েছিল নাহলে বাবাকে নিয়ে গেলে আর হত না অ্যাডমিশন নেওয়া। ৬টা পর্যন্ত ক্লাস করেই বাড়ী চলে যেত,সন্ধ্যের পর বাইরে থাকার অনুমতি ছিল না যে। একদিন হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট ডেকে বললেন,"ভাল ক্লাসগুলো ৬-৮টা পর্যন্ত হয় আর তুমি কোনোদিন ওই ক্লাসগুলো কর না,এরকম করলে কি করে রেজাল্ট ভাল হবে?" উনি বলার পরে বেবীর উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। প্রথম যেদিন ৮টা পর্যন্ত ক্লাস করল,বাড়ী ফিরে দেখে বাবার মুখ থমথম করছে। মাথা নিচু করে বেবী ঘরে চলে গেল যেন কতই অপরাধ করেছে ও। পরে অবশ্য তিনি সব জানলেন।
        তখন থেকে বেবী পুরো ক্লাস করেই বাড়ী ফেরে। আস্ত আস্তে জড়তা কিছুটা কেটেছে,আলাপও হয়েছে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। একদিন একজন টিচার না আসায়,সকলে ক্লাসরুমে বসে আছে,কেউ কেউ চা খেতে গেছে। সেইসময় দীপক বেবীকে অনুরোধ করল,"আগের ক্লাসে আমি অ্যাবসেন্ট ছিলাম,প্লিজ স্যারের নোটসটা একটু কপি করে দেবে?"বেবীর পড়াশোনা সংক্রান্ত যে কোনো কাজই ভাল লাগে,ও এক কথায় রাজী হয়ে যায়,"কেন নয়?নিশ্চয়ই দেবো"। বলে তখনই কপি করতে শুরু করে দেয়। এমন সময় রাজীব বাইরে থেকে ক্লাসে ঢুকে দেখে বেবী লিখছে। কি লিখছে মুখের ইশারায় জানতে চাইলে, দীপকই রাজীবকে সব বলে। রাজীব দীপককে বলে,"নোটস দেবার জন্য তোমার বেবীকে Amul chocolate দেওয়া উচিৎ"। বেবী হাসে,দীপকও হাসে। রাজীব এবার বেবীকে বলে,"Amul Chocolate এর ক্যাপশনটা জানো?" বেবী তার সহজ সরল চোখ দুটো তুলে তাকায়। বেবীর এই সরলতা রাজীবকে পাগল করে তোলে। রাজীব মিটমিট করে হাসে আর বলে,"Share it with someone you love","তুমি আমার সাথে share করবে তো?"বেবী কথার মারপ্যাঁচ অত ধরতে পারেনি,সরলভাবে বলে দেয় 'হ্যাঁ'। আবার লিখতে থাকে। এদিকে দীপক খুব হাসছে, ক্লাসের অনেকেই হাসছে। বেবী অত ভ্রূক্ষেপ করেনি,আর রাজীব ওদিকে ভেবে বসে আছে,বেবী সব বুঝেছে আর ওর ছুঁড়ে দেওয়া প্রোপোজাল অ্যাকসেপ্ট করেছে। অনেকদিন ধরেই ও বেবীর মন জয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু বেবীকে বোঝাতেই পারে না। রাজীব ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল,বেবী তাই ওকে বেশ পছন্দ করত,তার বেশী কিছু নয়। এদিকে রাজীব আর নিজেকে সামলাতে পারছে না,বেবীর ধারেকাছে বেশী থাকার চেষ্টা করে,বেশী ঘনিষ্ঠতা করার চেষ্টা করে। বেবী তাতেও ধরতে পারে না।
     একদিন টি-ব্রেকে হাত দেখার ছল করে বেবীর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বসে থাকে অনেকক্ষণ, বেবী আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে নেয় কিন্তু তখনও মনে অন্য কিছু চিন্তা আসে না। এদিকে রাজীব তারপর থেকে রোজ বেবীকে বাসে তুলে দিতে যায়। বেবী কোনো দোকানে গেলে সঙ্গে করে নিয়ে যায় আবার দীপক যখন লঞ্চ ধরতে যায়,বেবীকে বলে,"চল দীপককে ছেড়ে আসি,আর তোমারও লঞ্চঘাটটা চেনা হয়ে যাবে।"এভাবেই চলছিল,একদিন বেবীকে বাসে ছাড়তে গিয়ে বেবীর সাথে বাসে উঠে পড়ল। বেবী মিনিবাসে বাড়ী ফিরত। তখন পাশাপাশি দুজনের সীট থাকতো। বেবীর পাশে বসে চলল ওর সাথে। বেবী ভাল করে কিছু বোঝবার আগেই বাস ছেড়ে দিল। খুব অবাক হয়েছিল ও রাজীবের এমন অদ্ভুত আচরণে,তাই বলে "তোমার মাথায় ভূত চেপেছে"। এমনিই বলেছিল। কিন্তু রাজীবের আবারও মনে হল,বেবী বুঝেশুঝেই বলেছে। রাজীব বলে,"চল,গল্প করতে করতে যাই"। বেবীর বাড়ীর আগের স্টপেজে নেমে পড়ল রাজীব যদিও কলেজের কাছাকাছি ছিল ওর বাড়ী। এই ঘটনা তারপর থেকে রোজই চলতে লাগলো।
    এইভাবে চলতে চলতে এবার বেবীও যেন একটু দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলো। ছুটির দিনগুলো ভাল লাগে না। ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা হয়ে গেলে অনেকদিন ছুটি,বেবী ছটফট করে,রাজীবও। সে সময় হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না,ল্যান্ড লাইনেও কথা বলার অসুবিধে,তাছাড়া বেবী নিজের মনোভাব রাজীবকে বুঝতে দিত না। মাঝে একদিন ক্লাস অ্যাসেসমেন্টের খাতা জমা দেবার ডেট ছিল,সেদিন ছিল ৮ই ফেব্রুয়ারী,অর্থাৎ প্রপোজ ডে,রাজীব আর সুযোগের অপব্যবহার করেনি। গঙ্গার ধারে বেবীকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ওকে প্রপোজ করে। বলে,"তুমি যদি আমার পাশে থাকো, I'll go to the top, আর যদি না বল,তোমার সামনে আর আসবো না,কলেজ ছেড়ে চলে যাবো"। বেবীর প্রত্যাখ্যান করার কারণ ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না। চলতে লাগলো বাড়ী থেকে নানারকম অজুহাতে বেরিয়ে দেখা করা। দু'জনে ভাসতে লাগলো প্রেমের জোয়ারে।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

মানসী গাঙ্গুলী



#অপেক্ষায়

     হেমন্তের পড়ন্ত এই বিকেলগুলো বড় মনখারাপ করা,কেমন নিঝুম নিঝুম ভাব।মনে হয় যেন জনশূন্য চারিধার,অন্ধকার নামে বড্ড তাড়াতাড়ি বিকালকে ক্ষণস্থায়ী করে।
     এই বিকালের সাথে কত সুখস্মৃতি তবু খেলা করে মধুর মনের মাঝে।প্রথম ভালবাসার পরশের রোমাঞ্চটুকু যে এই হেমন্তের হাত ধরেই এসেছিল তার জীবনে।ছাদে আকাশপ্রদীপ জ্বালতে গিয়ে নাগাল পাচ্ছিল না যখন,সুমন্ত এগিয়ে এসেছিল সাহায্য করতে।তার হাতের ওপর হাতদুটো রেখে প্রদীপ ধরেছিল যখন,বুকের ভেতর দিয়ে শিরশির করে একটা কাঁপুনি বয়ে গিয়েছিল মধুর।সেই শুরু।তারপর কত সন্ধ্যে কাটিয়েছিল তারা আকাশপ্রদীপের দিকে তাকিয়ে,হাতে হাত রেখে।হালকা শীতের আমেজটুকু কেটে গিয়েছিল সুমন্তর উত্তাপে।
      গ্রামের বাড়ীতে নবান্নর উৎসবে দাদার বন্ধু হওয়ায় সুমন্তরও নিমন্ত্রণ ছিল।ভোরের আলো আঁধারিতে গ্রামের পথে পাকা ধানের শীষের দোলা দেখতে দেখতে মধুও সুমন্তর গায়ে আহ্লাদে ঢলে পড়েছিল সেদিন।হেমন্তের প্রথম শিশির পায়ে মেখে,হালকা ঠান্ডার আমেজে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল মধু সুমন্তর দুটি চোখের ছায়ায়।সুমন্ত ঘাসের ডগা থেকে শিশির ধার করে দু'হাত ভরে নিয়ে মধুর দু'গালে মাখিয়ে তার গালে গাল রেখেছিল সেদিন দু'হাত দিয়ে আদর করে জড়িয়ে ধরে।
     ঠিকানা না রেখে হারিয়ে গেছে সুমন্ত।কত হেমন্ত পার হল তার পর।মধু আজও তার অপেক্ষায়।

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

মানসী গাঙ্গুলী



দূর_তবু_দূর_নয়

        অরুন্ধতী ট্রেনে করে চলল দিল্লী,ফরাসি দূতাবাসের রিসেপশনিষ্টের চাকরীর জন্য ইন্টারভিউ দিতে। মনে মনে উত্তেজনা,কি হয় কি হয়। একাই যাচ্ছে সে,কেই বা আছে তার,মনে হতেই একঝলক কালো মেঘ এসে জড়ো হয় মনের মাঝে,মুখটা ভার হয়ে যায় তার। ট্রেনটা যে থেমে আছে সে খেয়ালও নেই ওর। একসময় জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখে 'মুঘলসরাই' স্টেশন এসে গেছে। দৃষ্টি সরিয়ে নেবার সময় হঠাৎই চোখে পড়ল কুণাল,ওর প্রাক্তন স্বামী,ওই ট্রেনেরই যাত্রী,প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল যাতে কুণালের সাথে চোখাচোখি না হয়ে যায়। কুণাল কি ওকে দেখেছে নাকি? বুঝতে পারছে না। সেই বাড়ী ছেড়ে আসার পর কুণালের মুখ আর দেখেনি ও,একই শহর কলকাতায় দুজনে থাকলেও পথেঘাটে,কোনোজায়গাতেই কোনোদিন দেখা হয়নি দুজনার তারপর,আর আজ এতদূরে এসে কেন তবে মনে হয় অরুন্ধতীর। কেন আজ এতদিন পর কুণালকে দেখে বুকের মাঝে এমন ধড়াসধড়াস শুরু হল ওর? ও তো কুণালকে ঘৃণা করে এখন। তবে,তবে কেন? ঘৃণার মাঝেও কি ভালবাসা লুকিয়ে রয়েছে ওর অবচেতনে? চাকরীর চিন্তা মাথা থেকে উধাও,সবটুকু জুড়ে এখন শুধুই কুণাল। ফিরে গেল সেই প্রথমদিনে,যেদিন কুণালের দৃষ্টিতে ছিল তার জন্য আবেশ মাখানো। সেই দৃষ্টিতেই তো নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল,আচ্ছন্ন হয়েছিল তখন ও।
     কলেজ লাইব্রেরীতে সদ্য কলেজে ঢোকা অরুন্ধতী একটা বইয়ের খোঁজ করার সময় 3rd yr.এর কুণালের সাথে হল পরিচয়। সেই প্রথম পরিচয়েই কুণালের দৃষ্টিতে বাঁধা পড়েছিল সে। ক্রমে লাইব্রেরীতে দেখা হতে লাগল প্রায়ই। লাইব্রেরী যাওয়াটাও একটা নেশার মত হয়ে গেল দু'জনেরই। পড়া কত হত তা ওরাই জানে,কিছু সময় পরপরই হত ওদের চারচোখের দৃষ্টি বিনিময়,পরে শুরু হল হাসি বিনিময়,দু'জনেই বুঝল দূরে দূরে থাকা আর সম্ভব নয়,তাই এল কাছাকাছি,পাশাপাশি। হল মন দেয়া নেয়া। কুণাল দেরি করেনি বেশি সুন্দরী  বিত্তবান বাবার মেয়েকে গেঁথে ফেলতে। অরুন্ধতীকে সে পড়াশুনায়ও সাহায্য করত। এভাবে সম্পর্কটা গাঢ় ও দৃঢ় হল ক্রমে।
     কুণাল গ্র‍্যাজুয়েশন করে কলেজ ছাড়ে,মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে,চাকরীর জন্য প্রস্তুতি নেয় আর দু'বেলা টিউশন। দেখা হত কম। দুজনেই অস্থির দেখা করার জন্য। এরই মধ্যে কুণাল একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরী জোগাড় করে ফেলল আর অরুন্ধতীকে বিয়ে করতে চাইল। বিয়ের পর বাকী পড়াটুকু হবে এই তার ইচ্ছে। অরুন্ধতীও কুণালকে পাবার জন্য এতটাই অধীর তখন,রাজী হয়ে গেল। বাধ সাধলেন তার বিত্তবান পিতা। কিন্তু প্রেম যে বাধা মানে না তাই নিজেরাই বিয়ের পরিকল্পনা করে সেইমত এগোতে লাগল। একদিন কলেজে গিয়ে আর বাড়ী ফিরল না সে। রেজিস্ট্রি বিয়ে করে একেবারে কুণালের বাড়ী। এরপর বাবা-মায়ের সাথে আর কোনো যোগাযোগই রইল না তার। এতটা তার বাবা-মা ভাবতে পারেন নি। তবু মা কিছুদিন পর একটু নরম হলেও বাবার কাঠিন্যে কিছু বলার সাহস পাননি। আর সত্যি তো,একমাত্র সন্তান তাঁদের,কত আশা ধূমধাম করে বড় ঘরে বিয়ে দেবেন তাঁরা,কিন্তু মেয়ে সে সুযোগ তো দিলই না,উপরন্তু বাবার মাথা হেঁট করাল সমাজের কাছে। বাবা কিছুদিন বাইরে বেরনো পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের মানুষ,কতদিন আর কাজ ফেলে ঘরে বসে থাকা যায় ! 
         অরুন্ধতী সুখেই ছিল কুণালের সাথে,তারও বাবার ওপর অভিমান কম নয় কুণালকে স্বীকার করে না নেওয়ার জন্য। কত আদরে যত্নে বৈভবের মাঝে মানুষ সে,কিন্তু কুণালরা নেহাতই ছাপোষা শ্রেণীর,বাবার আপত্তিটা সেখানেই,কোনোদিক থেকেই মেলে না তাদের সাথে। আর অরুন্ধতীও যেন বাবাকে দেখিয়ে দিতে চায়,প্রকৃত ভালবাসা পেলে আর সবই তুচ্ছ হয়ে যায় যদিও অনেক সময়ই তার কষ্ট হয়েছে,এত কষ্ট করে হিসাব করে থাকা অভ্যাস নেই যে তার,কিন্তু কুণালের ভালবাসায় ও তখন মগ্ন তাই মেনে নিতে পেরেছিল সব হাসিমুখে।
         ভালই চলছিল,কুণাল অরুন্ধতীর পড়ায় সবরকম সাহায্য করত। B.A পাশ করে M.A পাশ করার পর অরুন্ধতী যখন নেট দেবে স্থির করল,গোল বাধল তখনই। কুণাল ওকে পড়ায় ডিস্টার্ব করা,কারণে অকারণে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করল। বিভিন্ন কাজে ওকে আটকে দিত,মায়ের হাত থেকে রান্নার দায়িত্ব নিতে বলল,অরুন্ধতী সব মেনে নিয়ে সারাদিন সংসারের কাজকর্ম,কুণাল যেমন চায়,আর রাত জেগে পড়াশুনো করতে লাগল। কিন্তু না,কুণাল সেখানেও বাধ সাধল। রাতে তার বিছানায় অরুন্ধতীকে চাই। অরুন্ধতীর এতটা এগিয়ে যাওয়া বোধহয় মেনে নিতে পারছিল না সে,হীনমন্যতায় ভুগছিল তাই যে কোনো উপায়ে ওকে আটকাতে চাইছিল। অরুন্ধতীর আর নেট দেওয়া হল না। কিন্তু কুণাল তাতেও খুশী নয়,সর্বদাই তার সাথে বাজে ব্যবহার করা তার নিত্য ব্যাপার। এই কুণালকে সে চেনে না,কোথায় গেল তার ভালবাসা,সেই আবেশ জড়ানো দৃষ্টি,ভাবে অরুন্ধতী,মনে মনে কষ্ট পায় তার ভালবাসার পরিণতি দেখে,তবু মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ক্রমশ সহ্যের বাইরে চলে যেতে একদিন বিরোধিতা করতেই জুটল গালে এক চড়। না আর মেনে নেয় নি সে,রাতটা কোনোমতে বাড়ীতে কাটিয়ে পরদিনই অরুন্ধতী বেরিয়ে পড়েছিল ঘর ছেড়ে কাউকে কিছু না বলে। কিছুদিন এক বান্ধবীর বাড়ীতে থেকে কিছু টিউশন জুটিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করত দুটো পয়সা রোজগারের আর সাথে চাকরীর খোঁজ। না,বাবা-মায়ের কাছে ফিরে সে যায়নি,যাবেই বা কোন মুখে। কুণালও আর তার খোঁজ করেনি,তাতে অভিমান আরো গাঢ় হয়েছিল অরুন্ধতীর। বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান,জেদ তারও কম নয়। সব ভালবাসার জায়গা থেকে নির্বাসিত হয়ে তার জেদ আরও বেড়ে গেল। আর্থিক অবস্থা একটু স্থিতি হলে সে এক লেডিস হস্টেলে চলে যায় আর বন্ধুর মাধ্যমে কুণালের সাথে তার মিউচুয়াল ডাইভোর্সও হয়ে যায়। সেদিন সে কুণালের দিকে একবারও চোখ তুলে তাকায়নি আর অরুন্ধতী ওভাবে বাড়ী ছেড়ে চলে আসায় কুণালের শ্লাঘায় আঘাত লেগেছিল তাই সেও বিনা দ্বিধায় ডাইভোর্স দিয়ে দিয়েছিল। অরুন্ধতী কুণালের কাছে কিছু দাবী করে নি,যেখানে ভালবাসা নেই,সেখানে তার কোনো দাবীও নেই আর তাই ডিভোর্সটাও সহজ হয়ে গিয়েছিল। 
              নাঃ মাথাটা ভার হয়ে গেছে অরুন্ধতীর আর ভাবতে পারছে না সে,ভাবতে ইচ্ছে করছে না তার কিন্তু সে তো কুণালের ভাবনা কিছুতেই মন থেকে দূর করতে পারছে না,কুণালের ভাবনা তাকে সে রাতে ঘুমাতে দিল না। এরপর আর দেখতে পায়নি সে কুণালকে। অনেক কষ্টে মনকে ঠাণ্ডা করে অরুন্ধতী চাকরীর ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরে এল কলকাতায়। আবার নিজের মত ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে কুণালের স্মৃতি কিছুটা হালকা হল,কুণাল এখন আর তাড়না করে বেরায় না ওকে। একদিন হস্টেলে ফিরে ও চাকরীর চিঠি পেল,বুকের মধ্যে চেপে ধরল আনন্দে। কুণালের থেকে দূরে চলে যাবার জন্য আরো আগ্রহী ছিল ও এই চাকরীটায়।
       এরপর নির্দিষ্ট দিনে ও গিয়ে চাকরী জয়েন করল। মন দিয়ে কাজ বুঝে নিতে আর নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে কটা দিন সময় লাগল ওর। ক'দিন পর লাঞ্চ আওয়ারে এম্ব্যাসীর রেস্টুরেন্টে টিফিন করতে গেল। টিফিন শেষে বেরিয়ে আসার সময় চমকে গেল কুণালকে কাউন্টারে দেখে,রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের পদে বহাল হয়েছে কুণাল। দু'জনে অপলকে চেয়ে আছে দু'জনের পানে। এ ও কি সম্ভব! যার কাছ থেকে দূরে থাকবে বলে চলে এল সে এতদূরে,সে ও সাথে এল চলে!!!
    

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী



 সূর্যপ্রণাম

      রোজ বিকেলে গঙ্গার ধারে পার্কে এসে আরতিদেবী আগেই গঙ্গার দিকে ফিরে দুই হাত জোড় করে প্রণাম করেন,তারপর ঘড়িধরে আধঘন্টা হাঁটেন আর তারপর বেঞ্চে বসেন, যতক্ষণ না সূর্য অস্ত যায় উনি বসে থাকেন, এটা তাঁর নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার।হাঁটার সময় উনি কোনোদিকে তাকান না,কারো সাথে কথা বলেন না,সেটা ওখানে যাঁরা আসেন সবাই জানেন তাই কেউ ওনাকে বিরক্ত করেন না।না,তাই বলে উনি অসামাজিক নন,বেঞ্চে বসে উনি গল্প করেন যিনি বা যাঁরা পাশে বসে থাকেন তাঁদের সঙ্গে।তেমনি সূর্যাস্তের সময় অস্তগামী সূর্যকে প্রণাম করে বাড়ি ফেরেন।এমনই চলছিল গত চার পাঁচ বছর।
       এরপর অমিতবাবু পার্কে আসা শুরু করলেন। দীর্ঘকাল প্রবাসে বাস করে ফিরে এসেছেন ঘরে,ছেলে বউয়ের সংসারে।বাড়ি যদিও ওনারই,স্হায়ীভাবে বসবাস করেননি কখনও বাড়িতে। চাকরির সুবাদে বাইরেই কাটাতে হয়েছে ওনাকে চিরকাল,এমনকি রিটায়ারমেন্টের পরেও চাকুরী থেকে অব্যাহতি পাননি তাঁর কর্মদক্ষতা ও সুনামের জন্য।তবে গত চারমাস আগে স্ত্রীর মৃত্যুতে একা হয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ায় তাঁর ছুটি মেলে।কিন্তু বাড়ি ফিরেও তিনি শান্তি পান না একে তো জীবনসঙ্গিনীকে এইবয়সে হারিয়েছেন, তারপর এতদিন কর্মব্যস্ত ছিলেন,তাই অলস জীবন যেন তাঁর কাটতেই চায় না।ছেলে বউএর সাথে থাকাও অভ্যাস নেই,তারাও সারাক্ষণ নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত,তাই সব সময় নিজেকে অবাঞ্ছিত,অবহেলিত মনে হতে থাকে তাঁর।
        গত সাত-আটদিন থেকে তিনি আসছেন গঙ্গাধারের এই পার্কে আর প্রথমদিন থেকেই চোখে পড়ছে তাঁর আরতিদেবীকে।দেখেই যেন মনে হয় শান্তির প্রতিমূর্তি। তাঁর ভক্তিভরে গঙ্গাপ্রণাম দেখে অমিতবাবুর মনে হয় কত শান্তি ওনার জীবনে,তাই এত ভক্তি আসে ওনার প্রাণে। আস্তে আস্তে কয়েকজনের সাথে আলাপ হয়, ভালোই লাগে পার্কে আসতে।আরতিদেবীর সাথেও আলাপ হয়,প্রথম প্রথম হাসি ও কুশল বিনিময়,পরে ক্রমে তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়।
           ব্যক্তিগত কথার আদান-প্রদান শুরু হলে অমিতবাবু জানতে পারেন আরতীদেবীর স্বামী অনেককাল আগে গত হয়েছেন যখন তাঁর ছেলে ছয় বছরের।সেই ছেলেকে মানুষ করতে আরতিদেবীকে অনেক ঝড়ঝাপটা সামলাতে হয়,বয়স কম তাই নিজেকে সামলানোও প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল।সব কিছু অতিক্রম করলেন তিনি,সেই ছেলে বড় হলো,চাকরি পেল,উনি তার বিয়ে দিলেন নিজেই পছন্দ করে কিন্তু এই প্রৌঢ়বয়সেও পরিশ্রমের হাত থেকে তাঁর মুক্তি নেই। সংসারের যাবতীয় কাজ,রান্নাবান্না সবই নিজের হাতে করেন।অমিতবাবু তাঁর বৌমার কথা জিজ্ঞাসা করলে আরতিদেবী সস্নেহে বলেন,"আহা ছেলেমানুষ এখন, আমার মেয়েরই তো মত,একটা মেয়ে থাকলে কি আমি তাকে করতে দিতাম?সারাটা জীবন তো রইলোই পড়ে, যখন আমি থাকব না......" আরতিদেবীকে অবাক করে দিয়ে অমিতবাবু হঠাৎ হাত দিয়ে তাঁর মুখটা চেপে ধরেন, বলেন,"আর কোনোদিন এমন বলবেন না,আমি শুনতে পারি না। আপনার কথা শুনে আমার আপনার জন্য কষ্ট হচ্ছে,আপনাকে যত দেখি আমি অবাক হই,জীবনে এত কষ্ট পেয়েও আপনি এত শান্তভাবে এমন কথা বলেন কি করে? এত ভক্তিমতী হলেন কি করে? এমন এক শান্তির প্রতিমূর্তি,আপনাকে দেখলে মনে হবে না এত কষ্ট পেয়েছেন জীবনে আর আজ এই বয়সেও এত পরিশ্রম হাসিমুখে,কোনো অভিযোগ নেই,কি করে করেন আপনি? আমি যেন দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছি, জীবনটাকেই এখন অসহ্য মনে হয়"।আরতিদেবী অমিতবাবুর এই আচরণে খানিক থমকে যান কিন্তু চকিতে নিজেকে সামলে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মৃদু হাসেন,বলেন,"মশাই কষ্ট পেলে কি করে চলবে বলুন,আমাদের যার যেটুকু করবার তা তো করতেই হবে,যার যেটুকু পাবার সেটুকুই সে পাবে। আমার যে কদিন স্বামীসঙ্গ পাবার ছিল পেয়েছি,সেটাই মেনে নিয়েছি,তাই মনে কোনো অশান্তি ছিল না।হ্যাঁ,দুঃখ হত পাশের মানুষটাকে হারিয়ে,অসহায়ও লাগত অনেক সময়,কিন্তু নিজেকেই নিজে বোঝাতাম,না হলে আর কি-ই বা করতাম বলুন।আর নিজের সংসারের কাজ করব এতে দুঃখের কি আছে?আমি তো খুশিমনেই করি। আমি আমার সংসারটাকে বড় ভালবাসি জানেন"।অমিতবাবু যত দেখেন তত অবাক হন,কি অবলীলায় ভদ্রমহিলা বলে যাচ্ছেন,কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই ওনার তবে তিনি কেন পারছেন না সব মেনে নিতে,সবেতেই যে তাঁর অসহ্য লাগে,কেবল ভাল লাগে এই আরতিদেবীর সান্নিধ্যটুকু। এক অমোঘ আকর্ষণে ছুটে আসেন বিকেলে গঙ্গার ধারে এই পার্কে, ক্ষণিকের আনন্দ,ক্ষণিকের শান্তিটুকু পেতে।ওনার সান্নিধ্যে আস্তে আস্তে নিজেও একটু শান্ত হচ্ছেন অমিতবাবু,ওনার জীবনদর্শন অনুযায়ী চলার চেষ্টা করছেন,আর কিছুটা হলেও নিজেকে একটু করে শান্ত করতে পারছেন অমিতবাবু।
        কিন্তু আরতিদেবী সেদিন বাড়ি ফিরে আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারেননি,বাথরুমে ঢুকে অঝোরে কেঁদেছিলেন,অমিতবাবুর হাতের স্পর্শে যেন তার ঠোঁটের ওপর চিরকালের জন্য দাগ কেটে দিল, অনেকদিন পর আজ স্বামী হারানোর শোকটা যেন জেগে উঠল,কিন্তু স্বামীর কথা মনে করতে অমিতবাবুর মুখটাই তাঁর চোখে ভেসে উঠতে লাগল বারবার।স্বামী মারা যাবার পর কত হাতছানি উপেক্ষা করে নিজেকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করেছেন তবে আজ কেন এই স্পর্শ তাকে উতলা করে তুলল! আরতিদেবী নিজেকে শান্ত করতে পারছেন না,ভেতরে অপরাধবোধ হচ্ছে,এই প্রৌঢ়বয়সে এসে এ কি বিপর্যয়! সারারাত বিছানায় শুয়ে দুচোখ বেয়ে জল পড়েছে আর আকাশ-পাতাল ভেবেছেন,তাঁর কি করা উচিত,তিনি কি পার্কে যাওয়া বন্ধ করে দেবেন?পরদিন সকালে যখন তিনি অফিসযাত্রী ছেলেকে খেতে দিয়ে পাশে বসেছেন ছেলে সুখবরটি দিল যে তিনি নাকি ঠাকুমা হতে চলেছেন। আনন্দে আত্মহারা আরতিদেবীর কিন্তু প্রথমেই মনে হোলো অমিতবাবুর কথা,কখন তাঁকে এই সুখবরটা দেবেন।
         বিকালে যথারীতি পার্কে এসে আরতিদেবী দেখেন অমিত বাবু আগেই হাজির কিন্তু আরতিদেবীর নিয়মের ব্যতিক্রম নেই।তিনি তাঁর আবেগ দমন করে গঙ্গাপ্রণাম করে হাঁটতে শুরু করেন যেমন রোজ করেন।এক পাক ঘুরে আসার সময় দেখেন অমিতবাবুও গঙ্গাপ্রণাম করছেন।ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল আরতিদেবীর এই ভেবে যে মানুষটা বোধহয় কিছুটা হলেও মানসিক শান্তির সন্ধান পেয়েছেন।তারপর অমিতবাবুও হাঁটতে শুরু করেন,এতদিন পার্কে এসে চুপ করে বসেই থাকতেন,জীবনকে নিজের গতিতে চলবার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন।সেই তিনি আবার নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভাবছেন,জীবনে এই প্রথম আরতিদেবী জয়ের স্বাদ অনুভব করতে লাগলেন।একটা মানুষকে শান্তির সন্ধান দিতে পারার মধ্যে যে এত আনন্দ আছে তা আগে তিনি জানতেন না।এর পর হাঁটা শেষ হলে বেঞ্চে বসলে খানিক পর অমিতবাবু হেঁটে এসে বসেন আরতিদেবীর পাশে। তখন আরতিদেবী সুখবরটা জানান আর অবাক হয়ে দেখেন অমিতবাবু এতটাই খুশি হয়েছেন যে সুখবরটা যেন তাঁর নিজস্ব জীবনের।
        দিনমনি পাটে বসলেন,দিনের আলো ফুরিয়ে এল, আকাশ লালে লাল,আরতিদেবী উঠলেন সূর্যপ্রণাম করতে।চোখ বুজে প্রণাম শেষে চোখ খুলে তাকিয়ে দেখলেন অমিতবাবু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তখনও সূর্যপ্রণাম করছেন।




শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী


 #আত্মসুখ

       শহরের নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আজ বিশাল হইচই, চারিদিকে লোকে লোকারণ্য,কেউ জানে,কেউ না জেনেই ভিড় দেখে আরও ভিড় বাড়িয়ে চলেছে, কেউ বা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। টুকরো টুকরো কথা ভাসছে বাতাসে,তার থেকে অনুমান করা যায় কিছুটা। খানিক পরেই স্কুলে পুলিশ,অ্যাম্বুলেন্স,হই হই কান্ড।
       ক্লাস এইট এর সুদীপ্তা ক্লাস রুমের ফ্যানে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলছে,জিভটা তার বেরিয়ে আছে।ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে খাতায় আঁকিবুকি কাটছিল তাইতে মিস বকায় নাকি সম্মানে লেগেছে,তাই। এবার শুরু হলো জল্পনা,কিন্তু কখন করল? কেউ জানতে পারল না?গলায় ওড়না পেঁচিয়েছে ও কি জানত মিস বকবেন? আসল রহস্যটা যে কি কেউ জানে না। একজন মিসের নাম বারেবারে শোনা যাচ্ছে,তিনি নাকি খুব মুখরা আর তাঁর বিরুদ্ধে রোষ ওগড়াছে জনতা। সবাই তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছে যখন একজন তাঁর পক্ষ নিয়ে বলে আচ্ছা স্কুলে তো ক্লাস শুরুই হয়নি এখনও তাহলে মিস বকলেন কখন? অপর একজন বলল সেটা বোধহয় কালকের ঘটনা আর তার জেরেই......।
          অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে গেল বডি নিয়ে হাসপাতাল, পুলিশের গাড়িও বেরল,মেয়েরা কান্নাকাটি করছে,কেউ দুঃখে,কেউ ভয়ে,ক্লাসরুম তালাবন্ধ। স্কুল আজ বন্ধ করে দেওয়া হবে কিন্তু মেয়েরা যে গাড়িতে স্কুলে এসেছে তা তো বেশিরভাগ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে তাহলে ওই মেয়েরা কিভাবে পৌঁছাবে?সমস্যা অনেক। টিচাররা দায়িত্ব নিয়ে গেটের বাইরে যেসব গাড়ি তখনও ছিল তাদের সাথে কথা বলে যাদের গাড়ি বেরিয়ে গেছে তাদের পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকেন। যদিও অনেক গাড়িই তখনও ছিল।স্কুলে পৌঁছাবার পর ড্রাইভাররাও অনেকে খানিক সময় আড্ডা মারে স্কুলের বাইরে,আর তারপরেই আজ এমন একটা মুখরোচক খবরে অনেকেই প্রায় থেকে গিয়েছিল।
      সত্যিটা জানা গেল অবশেষে,বাপ সোহাগী মেয়ে বাবার ওপর তীব্র অভিমানে এই কাণ্ডটি করেছে। তিন বছর হলো মায়ের এক খুড়তুতো বোন মফস্বল থেকে শহরে এসেছে কলেজে পড়াশোনার জন্য,দিদির বাড়ি থেকেই পড়াশোনা চলছিল তার।ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেল।খুবই আনন্দে ছিল সুদীপ্তা মাসিকে পেয়ে,কত হইহই করে সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া,রেস্টুরেন্টে খাওয়া। রাতে মাসির সাথেই শুত ও,ভাই শুত মা-বাবার সাথে।ঘুমের মাঝে রাতে একদিন গরম লাগায় ঘুম হালকা হতে টের পায় বিছানায় আরও কেউ,ফিসফিস করে কথা কানে যায়, ঘুমের ঘোরে বোঝেনা অত তবে মনে হয়েছিল যেন বাবা এসেছিল ঘরে। এমন মাঝে মাঝেই মনে হতে একদিন কথাটা মাকে বলে আর এই নিয়ে বাড়িতে খুব অশান্তিও হয় বাবা মায়ের মধ্যে। মা মাসিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চায়,বাবা চায় না। এভাবে অশান্তি চলতে থাকে বাড়ির পরিবেশও খারাপ হয় ক্রমে। বড় হচ্ছে সুদীপ্তা,বুঝতে পারে যা ঘটছে তা না ঘটারই ছিল,মায়ের চোখের জল ওকে কষ্ট দিতে খুব। বাবাও আর কাছে ডাকত না,আদর করত না,ও ও অভিমানে বাবার কাছে আর কিছু আবদার করত না। এভাবে চলতে চলতে মাসির পড়া শেষ হলে মা ভাবল এবার বাঁচবে বোনকে পাঠিয়ে,শান্তি ফিরবে সংসারে।
        কিন্তু না,তা হবার নয়,একদিন অফিসিয়াল ট্যুরে যাবার মতন স্ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বাবা বেরিয়ে গেলে মাসিও
 ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে মাকে বলে,"আর তোমায় জ্বালাব না, আমি চলে যাচ্ছি"। মা কোন উত্তর দেন না।কদিন পরেও বাবা না ফিরলে অফিসে ফোন করে মা জানতে পারেন অফিস থেকেই তাদের আমেরিকার অফিসে পাঠানো হয়েছে সোমেশ বাবু মানে সুদীপ্তার বাবাকে।উনি নিজেই এই পোস্টিং এর জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এরপর মা কাকার বাড়ি ফোন করে জানতে পারেন মাসি সেখানে ফেরেনি। পরে ওরা জানতে পারে মাসিকে বিয়ে করে বাবা আমেরিকা নিয়ে চলে গেছে চিরকালের জন্য,আর ফিরবে না।চোখের জলে মা ভাসছিল, চারিদিকে আঁধার,ভাইটা  ভালো করে বুঝতেও শেখেনি। বয়ঃসন্ধিক্ষণে যখন নানারকম মানসিক অবস্থায় সুদীপ্তা জর্জরিত সেই সময় ভেতরে ভেতরে গুমরে থাকতে থাকতে আর সহ্য করতে না পেরে এই কাণ্ডটি করেছে সে,আর মিসের বকুনিটা ইন্ধন যুগিয়েছে মাত্র তাতে।তবে সুদীপ্তার বই থেকে পাওয়া চিঠি বাঁচিয়ে দিয়েছে মিসকে যাতে বাবার উপর অভিমান ওগরানো ছিল। যার শেষে লেখা ছিল," বাবারা শুনেছি আশ্রয় হয়,বটগাছের মত আর বাবা তুমি আমাদের এভাবে নিরাশ্রয় করে চলে গেলে কেবল নিজের আত্মসুখের জন্য?তোমার সু-এর জন্য তোমার মনটা একটু কাঁদল না?"

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী

অসমাপ্ত

     বিয়ের সাতমাস পার হয়েছে সবে।গতমাসে চন্দ্রা পিরিয়ড মিস করেছে।কিছুদিন অপেক্ষা করার পর,রাজ আজকে তার ইউরিন নিয়ে ল্যাবে গেল প্রেগন্যান্সি টেস্ট করানোর জন্য।বেশি দূরে নয়,আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসার কথা,স্কুটার নিয়েই তো গেছে,কিন্তু এত দেরী হচ্ছে দেখে চন্দ্রার খুব চিন্তা হচ্ছে।
       শ্বশুরবাড়ী কলকাতা হলেও রাজের কর্মস্থল দূর্গাপুরেই তারা থাকে।বেলা ১২ টা বেজে গেলেও ফিরছে না দেখে চন্দ্রা ফোন করে কিন্তু রিং হয়ে গেল,চন্দ্রার মনটা অস্থির লাগতে শুরু করে।কিছু পরে আবারও ফোন করে,এবারও রিং হয়ে গেলে,মনটা চন্দ্রার কু গাইতে শুরু করে। ছটফট করে এঘর ওঘর করছে ও, কাজকর্ম সব সারা হয়ে গেছে,এমন সময় স্কুটারের চেনা আওয়াজ কানে এল ওর।রাজ বাড়ী ফিরল যখন বেলা তখন ১ টা বাজে।রাজকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ী ফিরতে দেখে চন্দ্রা তো তখন রেগেই আগুন,তাকে এভাবে টেনশনে রাখার জন্য,একটা ফোন  করে না জানানোর জন্য বা তার ফোন না ধরার জন্য।রাজের কোনো কথাই তখন সে শুনতে চায় না।রাজ অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করে,তারপর সব বলে।
      ল্যাবে ইউরিন জমা দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ এক ভদ্রলোক তার স্কুটারের সামনে দিয়ে রাস্তা পার হতে যান আর রাজের স্কুটারের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান,সামলাতে না পেরে রাজও পড়ে যায় রাস্তায়।রাস্তার আশপাশের লোকজন হৈ হৈ করে ছুটে আসে যদিও ওদের দুজনেরই তেমন একটা লাগেনি,তবে ভদ্রলোকের দু'এক জায়গায় ছড়ে যায়।রাজ খুবই ভদ্র ছেলে,সে নিজেই ভদ্রলোককে নিয়ে যেতে চায় হসপিটালে,প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য।যাঁরা ভিড় করেছিলেন, তাঁদেরও তাই মত,তাই রাজ তাঁকে নিয়ে হসপিটালে গেলে এমার্জেন্সীতে ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা করেন,ছড়ে যাওয়া জায়গা আয়োডিন দিয়ে পরিষ্কার করে,ইঞ্জেকশন দিয়ে প্রেসক্রিপশন করে ছেড়ে দেন।রাজ তাঁকে সঙ্গে করে ওষুধ কিনে তাঁর বাড়ীতে ছেড়ে দিতে যায়,এটা তার নৈতিক কর্তব্য বলে সে মনে করে।তাই সেখানে পৌঁছে দিলে,তাঁর বাড়ীর লোকজন রাজের কাছে সব জানতে চান।তাঁদের সমস্ত ঘটনা বলে,প্রেসক্রিপশন ওষুধ সব বুঝিয়ে তবে রাজ বাড়ী ফিরতে পারল এখন আর তাই ফোন করার বা ফোন ধরার অবকাশটুকু সে পায়নি।
        চন্দ্রা বড় বড় চোখ করে সব শুনল,এবার সে শান্ত হল,বলল,"যাও তাড়াতাড়ি স্নান সেরে এসো,খাবার রেডি করি"।রাজ তাকে অনুরোধ করে খেয়ে নেবার জন্য,এখন তার রাজের জন্য বসে থেকে দেরী করা ঠিক নয়,যে আসছে তার জন্য অন্ততঃ। চন্দ্রা শুনতে চায় না,আগে রিপোর্ট আসুক।রাজ বাথরুমে গেলে চন্দ্রা রান্নাঘরে যায় খাবার রেডি করতে আর দড়াম করে আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে সে।ছুটে যায় বাথরুমের কাছে,দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।দরজা ধাক্কায় চন্দ্রা, রাজের নাম ধরে ডাকে,কোনো সাড়াশব্দ নেই।চন্দ্রা চিৎকার করে ওঠে,কত জোরে সে নিজেও জানে না,পাশের কোয়ার্টারের লোক ছুটে আসে,চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়।শেষে বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে রাজকে বার করতে হয়।তার মুখ দিয়ে তখন গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে।সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়।এমার্জেন্সীতে সেই ডাক্তার তখনও ডিউটিতে ছিলেন।তিনি রাজকে দেখে চিনতে পারেন আর বলেন,"উনি তো কিছু আগেই অন্য একজনের চিকিৎসা করিয়ে নিয়ে গেলেন,ওনার কিছু হয়েছে তো বলেন নি"।ডাক্তারের খুব খারাপ লাগল ব্যাপারটা,কিন্তু ওনার চিকিৎসা শুরু করার আগেই রাজ চোখ বুজল।
       স্কুটার থেকে পড়ে গিয়ে রাজের ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়ে গিয়েছিল।ভেতরে ভেতরে অতসময় ধরে রক্তক্ষরণ  হয়েছে আর তাই তার পিঠে চামড়ার নীচে চারিদিকে লাল টকটকে ছোপ ছোপ হয়ে আছে,গায়ের রঙটা ফর্সা বলে আরো বোঝা যাচ্ছে।যারা নিয়ে গিয়েছিল হসপিটালে,ডাক্তার তাদের দেখালেন, নিজেও খুব আপশোস করতে লাগলেন চিকিৎসার সুযোগ পেলেন না বলে।
       সবাই হতবাক,ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না,স্তম্ভিত, শোকাহত রাজের এই অসমাপ্ত জীবনের সমাপ্তিতে।

শনিবার, ৩০ জুন, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী

ইন্টারভিউ
    
      আজ অর্কর ইন্টারভিউ,জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ,তাই ভিতরে ভিতরে খুবই উত্তেজনা।ইকনোমিক্স-এ M.A পাশ করে এই প্রথম একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে যাবে সে, তার জন্য ক'দিন ধরে চলছে তোড়জোড়। জামা-জুতো সব কি পড়বে সে সব রেডি করা, ইস্ত্রী,পালিশ,ওদিকে রাত জেগে পড়াশুনা, কোনোভাবে যাতে না ফসকায়।লাগাতে পারলে খুব ভাল স্টার্ট হবে।অনেকদিনের স্বপ্ন অর্কর এরকম নামী কোম্পানিতে চাকরী করবে।ঘুরে ফিরে মাকে বলছে সে,"মা,আমার জন্য প্রে কর,তুমি প্রে করলে ঠিক লেগে যাবে"।মা আদর করে বলেন,"ওরে তোর জন্য যে আমি সবসময় ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি,তুই ছাড়া আর কে আছে আমাদের বল?"তবু অর্ক বলে,"না মা, আজ একটু বিশেষ করে প্রে কর"।মা বলেন,"পাগল ছেলে তাই হবে"।
      খেতে বসে ভাল করে খেতে পারল না অর্ক,ভেতরে ভেতরে টেনশন হচ্ছে তার।মা কপালে আলতো করে একটা দইয়ের ফোঁটা পরিয়ে দিলেন।বাইক নিয়ে স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছেছে, দেখে ছোটখাটো একটা জটলা,না তাকিয়ে চলে যাচ্ছিল,যা হচ্ছে হোক,তার যে আজ বিশেষ দিন।কিন্তু ভিড়ের ফাঁক দিয়ে তার চোখে পড়ল,তার বাবারই বয়সী এক ভদ্রলোক মাটিতে পড়ে ছটফট করছেন, মাথা ফেটে গেছে,রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা,কিন্তু কোনো মানুষজন তাকে তুলছে না,কেবল ভিড় করে দেখছে।অর্ক আর স্থির থাকতে পারল না,বাইকটা সাইড করে এগিয়ে এসে ভিড় সরিয়ে ভিতরে গিয়ে ভদ্রলোককে তুলে ধরল,সবার উদ্দেশ্যে বলল,"আপনারা মজা দেখছেন?ওনার মাথা থেকে এত রক্ত পড়ছে,হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে,ওনার বাড়ীতে খবর দিতে হবে, এভাবে ফেলে রাখলে হবে?"অর্ক দেখল আস্তে আস্তে ভিড় হাল্কা হতে লাগল।দু'একজন ছাড়া আর সবাই চলে গেছে,কিন্তু অর্ক যে পারছে না।পাশের দোকান থেকে একটু জল চেয়ে সে ওনার মাথার রক্ত একটু জলহাত করে মুছিয়ে দিয়ে একটা টোটোতে বসাল,পাশে দু'জন যারা ছিল তাদের অনুরোধ করে উঠতে বলল আর নিজে বাইক নিয়ে চলল পিছন পিছন।ভদ্রলোক নেতিয়ে পড়েছেন,রাস্তা পার হচ্ছিলেন,সেসময় একটা ট্রেকারের ধাক্কায় ছিটকে পড়ে ওনার এই অবস্থা। ট্রেকারটি ধাক্কা মেরে স্পিডে পালিয়েছে কেউ কিছু বোঝার আগেই।
    হাসপাতালে এমার্জেন্সীতে নিয়ে যাওয়া হলে প্রাথমিক  কিছু চিকিৎসা করে ডাক্তার ভর্তি করে নিলেন,মাথায় ভাল রকম আঘাত পেয়ে ভদ্রলোক প্রায় অচৈতন্য তাই।।ইন্টারভিউয়ের কথা তখন আর মাথায় নেই অর্কর।ভদ্রলোকের পকেট থেকে তার মোবাইল বার করে সে তখন আন্দাজে কিছু কিছু নম্বরে ফোন করে।কিন্তু বাড়ীর অন্য কারো নম্বর ও পেল না।এরপর একজনকে ফোন করলে তিনি ওনার স্ত্রীর নম্বর দিলেন।অর্ক ফোন করে তাঁকে জানাতে,ফোনের ওপারে প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।অর্ক তাঁকে আশ্বাস দিয়ে ধীরেসুস্থে আসতে বলে,ততক্ষণ সে থাকবে দায়িত্বে।অর্কর এবার মনে পড়ে ইন্টারভিউয়ের কথা, ভাবে ভদ্রমহিলা এসে পড়লে ওনার কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ও রওনা দেবে,যদিও অনেক দেরী  হয়ে গেছে,সময়মত পৌঁছানো আর হয়ত সম্ভব হবে না।মনটা খারাপ হয় অর্কর,নতুন জীবনের প্রথম ধাপেই বাধা!তারপর ভাবে একেবারে মার্জিনাল টাইম,পৌঁছালে পৌঁছাতেও পারে হয়তো,কিন্তু ভদ্রমহিলার আসতে অনেকটা দেরী হয়ে গেল।অর্ক অস্থির ভাবে পায়চারী করছে তখন।এরপর ভদ্রমহিলা এসে তাকেই আঁকড়ে ধরেন,তিনি একেবারেই অনভিজ্ঞ এসব ব্যাপারে আর ছেলেমেয়েরা কাছে থাকে না,মেয়ে শ্বশুরবাড়ি আমেদাবাদে আর ছেলে চাকরীসূত্রে দিল্লী। তিনি বলেন, "বাবা,ছেলের মত এতটাই যখন করলে, আর একটু পাশে থেকে ওনার সব ব্যবস্থা করে ডাক্তারদের সাথে যা কথা বলার বল,আমার ছেলে এসে পৌঁছানো পর্যন্ত তুমি একটু পাশে থাকো বাবা"।এরপর আর কোনো কথা বলতে পারে না অর্ক।অসহায় ভদ্রমহিলার পাশে থাকে সে, বুঝতে পারে ইন্টারভিউ দেওয়া আর তার হল না এযাত্রা। মনটা খারাপ হল আশাভঙ্গ হওয়ায়।নিজেকে নিজেই সে সান্ত্বনা দেয়,ভাবে সে,জীবনে আরো ইন্টারভিউ দেবার সুযোগ সে পাবে কিন্তু একজন অসুস্থ অসহায় মানুষকে ছেড়ে কি করে যাবে সে,এমন অমানবিক কাজ সে যে করতে পারবে না।

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী

 মৃত্যুর বিনিময়ে


        জমিদার বংশে জন্ম মায়ার,যদিও রক্তেই কেবল জমিদারী এখন, তালপুকুরে ঘটি ডোবে না।বিশাল বাড়ীটাও আজ জরাজীর্ণ, পাঁচশরিকে ভাগ হয়েছে,যে যার নিজের অংশটুকু প্রয়োজনমত ব্যবস্থা করে নিয়েছে, কেবল মায়ার বাবা গোপাল নন্দী পারেননি নিজের অংশটুকু সারিয়ে নিতে,তাই সেটা পোড়ো হয়ে আজ বসবাসের অনুপযুক্ত। এখন তারা ভাড়া বাড়ীতে থাকে, অল্পজায়গায় খুবই কষ্ট করে।পুঁজিও বিশেষ নেই,যেটুকু বা ছিল,মায়ার বাবা মদ আর জুয়ায় তাও শেষ করে ভিটেমাটি চাঁটি করে এক সাইকেল সারানোর দোকান করে এখন সংসার প্রতিপালন করেন।সংসার বলতে তিনজন,তিনি নিজে,স্ত্রী ও মেয়ে মায়া।
         দোকান তো হল,জমিদারী রক্ত,নিজে তো এসব কাজ জানেন না,তাই কাজজানা একটি ছেলেকে রাখতে হয় দোকান চালাতে।দোকানঘরের ভাড়া,বাড়ী ভাড়া,কর্মচারীর মাইনে,সব দিয়ে যা থাকে তারও কিছু যায় মদের দোকানে।নেশা তো আর ছাড়া যায় না,না?এরপর সংসারটা চলবে কিসে?তাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই মায়াকে টিউশন করে নিজের পড়ার খরচ চালাতে হয়।টিউশন বেশ কিছু মায়া জোটাতে পেরেছিল পাঁচজনের দয়ায়।টিউশনের সাথে সাথে আরো কিছু পয়সা রোজগারের ধান্দা সে শিখে গিয়েছিল সেই ছোট্ট বয়স থেকেই।দেখতে মায়া বেশ চটকদার,আর যত বড় হতে লাগল,ওর চাহনি ঘায়েল করত অনেক পুরুষকেই।এসবের ফায়দাও মায়া লুটে নিতে শিখে গিয়েছিল বেশ তাড়াতাড়িই।এভাবে সংসারটা কোনোরকমে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে লাগল।
           গোপাল নন্দী ইদানীং মদ খেতেন না,মদই তাঁকে খেত।তাই লিভারের বারোটা,সঙ্গী অপুষ্টি তাকে হাওয়ার ভেলায় চাপিয়ে পাড়ি করিয়ে দিল চিরতরে,সেই নাম না জানা দেশে।মা-মেয়ের সংসার,চলে যায় কোনোরকমে।এরই মধ্যে মায়া ঘায়েল করতে পেরেছিল ওর বড়লোক বন্ধুর দাদা নির্মাল্যকে,ইলেকট্রনিকস গুডসের দোকান,সুপুরুষ চেহারা,মায়ার চোখের মায়ায় ধরা দিল সে।এরপর বাড়ীতে আসা-যাওয়া,মায়ার মা ও নির্মাল্য এলে তাকে চা-খাবার দিয়ে কোনো অছিলায় বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান ওদের ঘনিষ্টভাবে মেলার সুযোগ করে দিয়ে।এমন ছেলে তো হাতছাড়া করা যায় না,যেমন করেই হোক গেঁথে তুলতে হবে।সম্পর্ক অনেকদূর এগোয়,জন্মদিনে,পূজোয় সোনার গয়না আসে মায়ার জন্য,আর এত ভদ্র ছেলে যেসে অন্য কোনো মেয়ের দিকে মুখ তুলে তাকায় না।শীঘ্রই বিয়ে করতে চায় সে।
            মায়ার এদিকে পুরুষ ঘায়েল করা অভ্যাসটা গেল না,এর সাথে তাও চলতে লাগল।যাতায়াতে কিছু কথা নির্মাল্যের কানে আসে,সে গায়ে মাখে না কিন্তু এরপর একদিন মাঝে মায়ার জন্য মন খুব চঞ্চল হওয়ায় সে হঠাৎ করে কিছু না জানিয়েই মায়ার বাড়ী আসে আর দেখে অন্য এক পুরুষের সাথে মায়া হেসে হেসে গল্প করছে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আর যথারীতি ওর মা বাড়ী নেই।নির্মাল্যর খারাপ লাগলেও তা বুঝতে দেয়নি ও, কিন্তু মনে তার অশান্তি দানা বাঁধতে শুরু করেছে।এর বেশ কিছুদিন পর যখন নির্মাল্য নিজেই নিজেকে বুঝিয়েসুঝিয়ে শান্ত করতে পেরেছে, বাইক নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মায়াকে দেখতে পায় সেই ছেলেটির সাথে।সন্দিগ্ধ হয়ে দূর থেকে ওদের ফলো করে।ওরা একটা পার্কে ঢুকলে নির্মাল্য ওদের পিছু নেয়,কিছুদূর থেকে দেখে,একটা গাছের ঝোপের আড়ালে ওরা গিয়ে বসল।মায়া ছেলেটির হাত জড়িয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে তার কাঁধে মাথা রাখল আর ছেলেটি পিছন দিয়ে একহাতে তাকে বেস্টন করে।নির্মাল্য আর নিজেকে সংযত করতে পারে না কিন্তু তার শালীনতা বোধ সেইসময় তাকে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে দেয় না,নীরবে চলে আসে দূর থেকে সব দেখে।বাড়ী ফিরে চুপচাপ থাকে সে, এমনিতেও সে একটু চুপচাপ প্রকৃতিরই ছেলে,কিন্তু তার মনের ভেতর যে তান্ডবলীলা চলছিল সেদিন তা তার মুখ দেখে বা আচরণ দেখে কারো বোঝার উপায় ছিল না।সারারাত ঘুম নেই,তোলপাড় বুকের মাঝে।নিজের একান্ত আপনার জনকে অন্যের কন্ঠলগ্না দেখলে কারই বা ভাল লাগে।
           পরদিন মায়ার কাছে এসে সে কথা তুললে,মায়া অস্বীকার করে যদিও সেই একই শাড়ী সেদিন তার পরনে,আর তাই নির্মাল্য আরো বেশি নিশ্চিত।কিছু তর্কবিতর্ক হয় দুজনের মাঝে।মায়ার মা বোধহয় দুজনকেই হাতে রাখতে চেয়েছিলেন,যদি একজন ফসকায় তো আরেকজন থাকবে।বস্তুত,দুজনের সাহায্যে সংসারে বেশ স্বচ্ছলতা এসেছে।
            শান্ত স্বভাবের নির্মাল্যের বুকের ঝড় বেড়েই চলেছে।যাকে বিয়ে করে সুখের সংসার পাতবে বলে সুখস্বপ্ন দেখেছিল সে,যে মায়ার মায়ায় সে নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছিল, তার কাছ থেকে এই প্রতারণা,এই আঘাত সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি।অহরহ রক্তাক্ত হতে থাকে তার হৃদয়,নিজের সাথে নিজের যুদ্ধে অবশেষে সে পরাজিত।মায়াকে সে কিছু বুঝতে দেয় না।একদিন সে মায়াকে নিয়ে ঘুরতে যাবে বললে মায়া খুব সাজগোজ করে বেরয় নির্মাল্যর সাথে।ওরা রেলস্টেশনে পৌঁছায়।প্ল্যাটফর্মের একদম শেষের দিকে দাঁড়ালে মায়া সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে নির্মাল্য বলে পিছনে  ভিড় কম থাকবে।
          এরপর ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখে সবাইকে হতবাক করে দিয়ে নির্মাল্য ট্রেনের সামনে দিয়ে লাইনে ঝাঁপ দেয়।ঢোকার মুখে তখনও ট্রেনের স্পিড যথেষ্ঠ বেশি থাকায় নিমেষে নির্মাল্যর দেহটা দলাপাকানো মাংসপিন্ডে পরিণত হয়।স্টেশনে উপস্থিত সকলের চোখের সামনে এমন ঘটনায় সবাই হতচকিত আর মায়া অচৈতন্য হয়ে আছডে পড়ল প্ল্যাটফর্মে।
            নির্মাল্য কিন্তু তার ভালবাসাকে ঠকায় নি।মনে মনে প্ল্যান করেছিল যখন নিজেকে শেষ  করে দেবে তখনই সে মায়ার জন্য পর্যাপ্ত টাকা ব্যাঙ্কে মান্থলি ইনকাম স্কীমে রেখে দেয় যাতে আজীবন তার অর্থকষ্ট না হয়।
            সুস্থ হতে মায়ার সময় লেগেছিল বেশ।এরপর সে সাদা থান পরে তপস্বিনীর বেশ ধরে,কোনো সাজগোজ, গয়নাগাটি কিচ্ছু না।তার প্রকৃতিরও আমূল পরিবর্তন হয়।নিজেকে সে গৃহবন্দী করে ফেলে।এতদিনে বোধহয় নির্মাল্যকে সে প্রকৃত ভালবাসতে পারল।
            মৃত্যুর বিনিময়ে ভালবাসাকে জয় করল নির্মাল্য।

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

মানসী গাঙ্গুলী


                              শেষ বেলায়

        খবরটা পেয়ে মিতা কেমন হতভম্ব হয়ে যায়।কাঁদবে কি,সে তো ভাবতেই পারছে না এমনটা কি করে হয়।সুমন চলে গেল!এ যে বিনামেঘে বজ্রপাত! এইতো কিছু আগে সুস্থ মানুষ বাড়ী থেকে বেরল।এটা কি সত্যি নাকি দুঃস্বপ্ন!শেষ সময়ে সে ছিল না সুমনের পাশে।অফিসে গিয়ে ফাইল খুলে বসেই সে অসুস্থ বোধ করে আর অল্পক্ষণের মধ্যেই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজের টেবিলে লুটিয়ে পড়ে সে।অথচ সকালে বড় ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে খেয়েদেয়ে ছোট ছেলেকে আদর করে সুমন বেরল বাড়ী থেকে আর এইটুকু সময়ের মধ্যে এই খবর!সুমনকে ছাড়া একা পথ চলবে কেমন করে মিতা?কি করবে সে এখন?দু'দুটো দুধের শিশুকে একা বড় করবে সে কেমন করে?ছোটো ২ বড় ৫,সবে কেজিতে পড়ছে।
         বাড়ীর অমতে সুমনকে বিয়ে করে বাড়ী ছেড়েছিল সুমনের হাত ধরে।সে হাত ছেড়ে সুমন চলে গেল তাকে শূন্য করে দিয়ে,এ জীবনতরী  সে বাইবে কেমন করে!তবু চলতে হবে একাকী,জীবন যখন আছে বিশেষ করে ছেলে দুটোর মুখ চেয়ে।চোখের জল ফেলার বিলাসিতা বা সময় কোনোটাই তার নেই।চোখে এখন সে সরষের ফুল দেখছে।কিন্তু জীবন সব কিছু মেনে নিতে শেখায়, তাই মিতাকেও সব মেনে নিতে হয়।সুমনকে শেষ যাত্রায় সাজিয়ে দিয়ে শুরু হল তার জীবনযুদ্ধ।কর্মরত অবস্থায় অফিসে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায়,অফিস থেকে মিতাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরী দিতে চেয়েছিল কিন্তু মিতা তা নিতে পারেনি,দুধের বাচ্চাদের কার কাছে রেখে সে যাবে কাজে তাই।এবার সুমনের অফিস থেকে যা প্রাপ্য ছিল তা দিয়ে সে শুরু করল লড়াই,বাড়ীতে বসেই সে শুরু করল কাপড়ের ব্যবসা,সেটা দাঁড় করাতেও তাকে কম কষ্ট করতে হয় নি।কোনোরকমে চলে যাচ্ছিল,কিন্তু একটু স্বচ্ছলভাবে থাকার জন্য এবার সে বাড়ীর নীচতলার বসার ঘরটা খালি করে রাখল পেয়িং গেস্ট।
         জীবন তাকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে,আরও কত কি শেখার আছে বাকী,দেখা যাক।শোক আঁকড়ে বসে থাকলে চলবে না,চলতে হবে,যেতে হবে অনেকদূর, একা,এপথে কেউ নেই তার সঙ্গী।ছেলেরা বড় হবার সাথে সাথে খরচ বাড়তে লাগল,তাই ব্যবসার ফাঁকে শুরু হল টিউশনি।সারাদিনে ঘরের সব কাজ একা হাতে,নিজের ওপর যথেচ্ছ অবহেলা করে ছেলেদের মানুষ করাই তখন তার একমাত্র ব্রত।মায়ের একনিষ্ঠ সাধনায় ছেলেরা পড়াশুনোয় বেশ ভাল হয়ে উঠতে লাগল,তাই স্কুলের শিক্ষকেরাও তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করতেন।এভাবে সবার সহায়তায় ও আশীর্বাদে ছেলেরা এক এক করে স্কুল পার করল ভাল রেজাল্ট করে।বড় হবার সাথে সাথে মায়ের লড়াই তারা দেখেছে,মায়ের কষ্ট উপলব্ধি করেছে,বস্তুতঃ মা তাদের বাবার অভাব বুঝতে দেননি কোনোদিন।তাই ছেলেদের কাছে মা-ই সব।এই লড়াইয়ে চলার পথে কত কুপ্রস্তাব,কত লোভ হাতছানি দিয়েছে মিতাকে কিন্তু সে মোটেই সেসব আমল দেয়নি,মনপ্রাণ ঢেলে দুইছেলেকে মানুষ করেছে, নিজের দিকে তাকানোর কথাও তার মনে পড়ে নি বা সে ইচ্ছাও তার হয়নি।বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিংএ ভর্তি হল যেদিন,বাবার ছবিতে প্রণাম করে,মাকে প্রণাম করে রওনা দিলে সুমনের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ঝরঝর করে কাঁদে মিতা,তার তো কাঁদবার অবসরটুকুও নেই।দুই ছেলে হবার পর সুমন বলেছিল,"দু'জনকেই ইঞ্জিনিয়ার করব",একজনকে মিতা সেপথে এগিয়ে দিতে সফল হয়েছে,আর একজনকে এগিয়ে দিতে পারলে তবেই হবে তার কর্তব্য শেষ। তিনবছর পর মিতা পেরেছিল ছোটছেলেকেও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠাতে,কি শান্তি সেদিন তার,সুমনের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তার মনে হয়  ছবির সুমনের মুখে যেন খুশীর রেশ।কিছুদিন পর বড়র পড়া শেষ হলে মিতার পক্ষে তাকে আর পড়ানো সম্ভব হয়নি,সে চাকরী নিয়েছে।তার একাকীত্বে, সুমনের ছবিই তার সঙ্গী,তার সাথে কথা বলেই সে মনে শক্তি পায়।সেদিনও মিতা সুমনের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদে আর বলে,"জীবনের পথে চলতে একাকী লড়াই করতে করতে আমি ক্ষতবিক্ষত, ছোটটি চাকরী পেলে আমার লড়াই শেষ,সেই পর্যন্ত যাতে লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারি,আশীর্বাদ কর"।এমন একনিষ্ঠ ভালবাসা, এমন একনিষ্ঠভাবে সন্তানপালন সচরাচর দেখা যায় না।              ছেলেরা বড় হয়েছে,সময়ের সাথে মিতার শরীরে আজ বয়সের ছাপ স্পষ্ট, দেহে মনে ক্লান্ত যখন তখনই ঘটল বিপর্যয়।
          কিছুদিন যাবৎ মিতা মানসিকভাবে বড় অস্থির,সব কাজ ঠিকঠাকই করে কিন্তু মনকে শান্ত রাখতে পারে না।এতকাল যে নিজেকে সংযত করে চলেছে,আজ যখন চুলে রূপোলী রেখা দেখা দিয়েছে,তাই বলে সেইসময়!নিজেকে নিজেই বোঝায় সে,শান্ত রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু একি হল! রাতে ঘুম আসতে চায় না,কেবলই যে মিত্রবাবুর মুখটা ভাসে তার চোখে।হ্যাঁ,মিত্রবাবু তার পেয়িং গেস্ট এখন,গত কয়েকমাস হল তিনি এবাড়ী এসেছেন।আসার পর থেকেই তিনি মিতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ তার এই লড়াইয়ের জন্য।এরপর তার প্রতিটি রান্নার তারিফ করা,এভাবে আস্তে আস্তে দু'জনের মাঝে একটা সখ্যতা গড়ে ওঠে।মিতার ওনাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়,অবসরে বসে গল্প করে,আজকাল মিত্রবাবুর অনুরোধে ওনার সাথেই একসাথে খায় মিতা,খাবার সময় মিতা ভাল করে না খেলে মিত্রবাবু মৃদু রাগও করেন,বেশ লাগে মিতার।মিত্রবাবুর সপ্রশংস দৃষ্টিতে মিতা নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করে আজকাল।উনি যখন তাকান তার দিকে,মনে হয় যেন খোলা বইয়ের পাতার মত দেখতে পাচ্ছেন তার ভেতরটা।কতবছর পার হয়ে গেল আজ মিতা কোনো পুরুষের সপ্রশংস দৃষ্টিতে লজ্জা পাচ্ছে,কোনো পুরুষের সঙ্গ উপভোগ করছে।মাঝে মাঝে আজকাল তার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয়।আবেগে ভেসে যাচ্ছে মিতা,নিজেকে সংযত করতে ইচ্ছাও হয় না।কিন্তু ছেলে দুটো বাড়ী এলেই মনে হয় ছি ছি,এ ঠিক নয়,এ সে কি ভাবছে!কিন্তু সারাদিন যখন একা থাকে সে,মানুষটার সাহচর্যে সে বড়ই খুশী থাকে,কোনো কাজে আজকাল আর তার ক্লান্তি লাগে না।
         এভাবে চলতে থাকে,দিন যায়, মাস যায়,একদিন মিত্রবাবু মিতাকে প্রেম নিবেদন করে বসেন।অল্পবয়সে বাবা-মা মারা গেলে,ছোট ভাইবোনেদের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ওপর।সবার বড় হওয়ায়,তাদের লেখাপড়া  শিখিয়ে,বিয়ে দিয়ে,আজ তাদের সংসারে তিনি অবহেলিত,অপ্রয়োজনীয় হয়ে ঘর ছেড়েছেন।তাদের জন্যই তাঁর সংসার করা হয়ে ওঠে নি,ভাবেনওনি কখনো নিজের কথা,কিন্তু আজ যে তারা এতটা স্বার্থপর হয়ে যাবে তাও তিনি ভাবতে পারেননি।আজ তার আপন বলতে আর কেউ নেই। মিতাকে দেখার পর থেকে বড় আপনার মনে হয়েছে ওনার,বস্তুত দু'জনের জীবনে কিছু মিলও রয়েছে,দু'জনেই আজীবন যুদ্ধ করে কাটালেন সংসারের জন্য।তিনি বলতে দ্বিধা করেননি যে সারাজীবন দায়িত্বের চাপে যে প্রেম তার দরজায় কোনোদিন কড়া নাড়েনি,তা মিতাকে দেখে তার জীবনে এসে হাজির হয়েছে,যা তিনি উপেক্ষা করতে পারছেন না।মিতার হাতদুটি ধরে যখন উনি প্রেম নিবেদন করলেন,আবেগে সারাশরীর থরহর করে কেঁপে উঠেছিল মিতার,যে আবেগ মিতাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সুমনের শেষযাত্রার সঙ্গে,নাকি তাতে পলি পড়েছিল এতদিন,যা আজ হঠাৎ বাঁধভাঙ্গা হয়ে বুকের মাঝে উথালপাতাল করছে।ভেসে যেতে ইচ্ছে করছে মিতার,তবু সংযমের কাঠিন্য বজায় রেখে সে বলেছে তা সম্ভব নয়,এতে ছেলেরা তাকে সম্মান করবে না।মিত্রবাবু নিজে ছেলেদের সাথে কথা বলতে চেয়েছেন,মিতা রাজী হয় নি যদিও তিনি বুঝেছেন,মিতার অন্তরে তিনি তাঁর একটা জায়গা করতে পেরেছেন আর তাই তিনি বলেছেন অপেক্ষায় থাকবেন সেদিনের যেদিন মিতা রাজী হবে।
          মিতা সুমনের ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,বলে, "তুমি আমায় শক্তি দাও,তুমি ছাড়া এজীবনে আমার কাছে আর কেউ কোনোদিন আসতে পারে নি তোমার জায়গায়,এ জায়গা আমি অন্য কাউকে দিই কিভাবে"।মন অস্থির,রাতে শুয়ে ঘুম আসে না,স্বপ্নে দেখে সুমন যেন বলছে,"আমি তোমায় কি দিতে পেরেছি,দু'টো সন্তান দিয়ে সমস্যার মুখে ফেলে দিয়ে চলে এসেছি।আমার হাত ধরে তুমি সবাইকে ছেড়ে এলে,সেই আমি থাকতে পারলাম না তোমার বলভরসা হয়ে,সংসার আগলে।তুমি মিত্রবাবুকে বিয়ে করে খুশী থাকো, আমি তাতেই খুশী হব"।ঘুম ভেঙ্গে যায় মিতার,বুকের ভেতর তোলপাড় করছে,খুব ইচ্ছে করছে কারো বুকের মাঝে আশ্রয় নিতে বস্তুত একজন যখন তার জন্য বুক পেতে বসেই আছে।কিন্তু সমাজ,সংসার বড় বালাই।সংযমেরই জয় হল শেষে,আবেগকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে।
          এরপর ছোটছেলের চাকরী হলে,মিতা দুইছেলের একই সাথে বিয়ে দেবে মনস্থ করে,সেইমতই সব ব্যবস্থা হয়।মিত্রবাবু ততদিনে ওদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছেন,কবে থেকে যেন তিনি ছেলেদের অভিভাবক হয়ে উঠেছেন,ছেলেরাও তাঁকে খুব ভালবাসে।সব মিটে গেলে মিত্রবাবু এবার আর মিতার কথা শোনেন না।তিনি দুইছেলে ও দুই বউকে ডেকে আজ মিতাকে বিয়ে করার প্রস্তাব রাখেন,কেবল মিতা সেখানে থাকতে রাজী হয় নি,তাই ছিল না।নিমেষে বাড়ীর চিত্র বদলে গেল।যে মিত্রকাকুকে তারা নিজেদের অভিভাবক,একান্ত আপনার জন ভাবত এতদিন,তাঁকে অপমান করতে সেদিন তাদের বাধেনি,তার সাথে নিজেদের মাকেও তারা দেবীর আসন থেকে টেনে অনেক নীচে নামিয়ে ফেলে।মিতা এমনই আশঙ্কা করেছিল,তাই আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল সে,দুই ছেলেকে বাড়ীর দুটোতলা ভাগ করে লিখে দিয়ে নিজে স্বেচ্ছায় গিয়ে উঠল বৃদ্ধাশ্রমে,যেখানে আগে থাকতে তাঁদের দু'জনের জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মিত্রবাবু।এতে অন্তত সমাজ-সংসার তাদের দিকে আর আঙুল তুলবে না এই আশা করে।

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

মানসী গাঙ্গুলী

#পরাজয়

      দুটি মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার সুমিত ও রত্নার।ভালবেসে বিয়ে করেছিল দু'জন,দু'বাড়ীর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও। ভাড়া বাড়ীতে সংসার পেতেছিল দু'জনে।বাড়ীওয়ালি মাসিমাই ছিলেন তখন অভিভাবক, রত্নার শাশুড়ীর মত।রান্না শেখানো থেকে সর্ব খুঁটিনাটি ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া,খুব ভাল বাসতেন ওদের দু'জনকে।নিজের সন্তান না থাকায় ওদের নিয়েই ছেলে বউয়ের সাধ মেটাতেন।রত্নাও নিজের শ্বশুর -শাশুড়ীর মতই শ্রদ্ধা ভক্তি করত ওনাদের।সুমিত ব্যাঙ্কের অফিসার,তাই আর্থিক অসুবিধা ছিল না কিন্তু বিয়েতে বাড়ীর বড়রা না থাকায় দু'জনেই খুব কষ্ট পেয়েছিল তবে স্নেহময়ী মাসীমাকে পেয়ে কষ্টের কিছুটা লাঘব হয়েছিল।
      বছর দুই পরে সুমিত একটা 2BHK নেয় যদিও একটু interior এ কারণ এর বেশী তখন সুমিতের ক্ষমতায় কুলায় নি।কত আনন্দ করে দু'জনে মিলে সংসার গোছায় সেখানে।মাসীমাও ক'দিন এসে থেকে সাহায্য করেছিলেন।মাঝেমধ্যে মাসীমা-মেসোমশাইকে আসতে বলত রত্না ও সুমিত।ওনারা ক'দিন করে থেকে যেতেন তখন।রত্না যথাসম্ভব আদর যত্ন করত।কিন্তু কিছুটা দূরত্ব হওয়ায় আর বয়সজনিত কারণে আসাযাওয়া সম্ভব হত না তাঁদের।এরপর ক্রমে দুই সন্তান এলো ওদের ঘর আলো করে।ফুটফুটে দুটি মিষ্টি মেয়ে।সুখের সংসার।সুমিত মেয়েদের বড় স্কুলে ভর্তি করেছে,গাড়ী কিনেছে।হাসিখুশি আনন্দের জোয়ারে ভাসছে যখন,দুর্যোগ নেমে এল ওদের জীবনে।ব্যাঙ্কে কাজের সময় ব্যস্ত অবস্থায় একটা কাগজ ভাল করে না দেখে, না পড়ে সই করে দেওয়ায় প্রচুর টাকা তছরূপের কেসে ফেঁসে যায় সুমিত,যা থেকে মুক্তি পাবার মত কোনো প্রমাণ যোগাড় করতে না পেরে চাকরীটা খোয়াতে হয় এবং জেলও হয়।যদিও কিছু শুভানুধ্যায়ী ছিলেন যারা বিশ্বাস করতেন সুমিত এমন কাজ করতে পারে না কিন্তু প্রমাণাভাবে তাদের পক্ষেও কিছু করা সম্ভব হয় না।খবরের কাগজে এই সংবাদটি পড়ে মেসোমশাই এসেছিলেন দেখা করতে,কিছু আর্থিক সাহায্যও করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রত্না জানে ওনাদের ভাড়ার টাকায় ও পেনশনের সামান্য কিছু টাকায় সংসার চলে,তাই বলে প্রয়োজন নেই,প্রয়োজন পড়লে নিশ্চই জানাবে তাও বলে।এ হল কথার কথা,মেসোমশাইও বুঝলেন কিন্তু ওনার আর কিই বা করার ছিল।
       একটা সুন্দর, সুখের সংসার তছনছ হয়ে যায়।বড় মেয়েটা তখন ক্লাস 9 ছোট 3।রত্নার পক্ষে তাদের আর বড় স্কুলে পড়ানো সম্ভব হয় না,তাছাড়া পথেঘাটে চলাফেরা দায় হয়ে উঠেছে,চেনা পরিচিতের মাঝে ওরা তখন আলোচনার বিষয়বস্তু, মুখ লুকিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়।খুবই অভাবের মধ্যে পড়তে হয় ওদের।রত্না খুব গুণী মেয়ে,নানারকম কাজ জানে,তাই এটাসেটা করে কোনোরকমে সংসার চালায় আর জেলে গিয়ে সুমিতের সাথে দেখা করে।সুমিত রোজ রোজ ওকে জেলে যেতে বারণ করে,মেয়েদের সামলে নিয়ে থাকতে বলে আর তাছাড়া রোজ যাতায়াতে যে গাড়ীভাড়া লাগবে সেটাই বা জুটবে কোথা থেকে তাই।নিজে সে ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।নিজের ক্যালাসনেসের জন্য নিজেকে ওর শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে কিন্তু রত্নার কথা ভেবে অসহায় মেয়েদুটোর মুখ মনে করে সংযত থাকে।
      বড় মেয়ে মণি টিউশন খোঁজে কিন্তু ওদের কাছে কেউ বাচ্চাকে পড়াতে দিতে চায় না।এত প্রতিবন্ধকতা মাথায় করে মণি ভাল স্টুডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও কোনোরকমে খুবই নিম্নমানের result নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে।হাসিখুশি মেয়েটা কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে।কেবল চেষ্টা করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে আর বোনের গায়ে যেন আঁচ না পড়ে।মাত্র ১৮ বছর বয়সে মণি একজন পরিণত মহিলায় পরিণত হল।
        কোনোরকমে কলেজে ভর্তি হতে পারল কিন্তু আর যে চলে না,নুন ভাত,ফ্যান ভাত খেয়ে,পায়ে হেঁটে যাতায়াত করে।রত্নাও ঘরের সব কাজ একাই করে যা ওর কোনোদিন অভ্যেস ছিল না।এই সুযোগে অল্পপরিচিত এক মহিলা কদিন ধরে ওর সাথে খুব আলাপ জমায় আর বুঝিয়েসুঝিয়ে ওকে নোংরা পথে নিয়ে যায়।মণি প্রথমে রাজী হয় না কিন্ত মহিলা বোঝায়,কলেজের পরে অনেক মেয়েই এভাবে রোজগার করে সংসার চালায়।মণিও আর বাঁঁচার আর পথ খুঁজে না পেয়ে একপ্রকার রাজী হয়ে যায়।মহিলাই সঙ্গে করে ওকে নিয়ে যায়।মণি বুঝতে পারে মহিলাটি দালাল, এভাবেই মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কুপথে নামিয়ে এরা রোজগার করে।প্রথমদিন বাড়ী ফিরে বাথরুমে ঢুকে খুব কেঁদেছিল মণি,সারাশরীর জল ঢেলে ধুয়ে পবিত্র করার বৃথা চেষ্টা করেছিল।পরে এটাই দস্তুর হয়ে গেলো। মা জিজ্ঞেস করলে বলে কলেজের পরে টিউশন করে আস্তে রাত হয়ে যায়।সংসার একটু সচ্ছলতার মুখ দেখে আর চোখের জল মণির নিত্য সঙ্গী হয়।এরই মাঝে সুমিত ছাড়া পায় জেল থেকে।এই ক'বছরে যেন কত বুড়ো হয়ে গেছে,মাথা ভর্তি কাঁচাপাকা চুল,খোঁচা খোঁচা দাড়ি,গোঁফ পাকা,বিধ্বস্ত চেহারা।
      বাড়ী ফিরে সুমিত চারিদিকে চেষ্টা করে যদি কিছু কাজ পায়,কিন্তু না, কোথাও কিছু জোগাড় করতে পারে না।রত্না একবার বলেছিল,পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করতে কিন্তু সুমিত কোনো কথার উত্তর দেয় না,কেমন যেন হয়ে গেছে সুমিত,বাড়ীতে কারো সাথে কথা বলে না।বউ মেয়ে কারো মুখের দিকে তাকায় না,ওদের ধারেকাছেও ঘেঁসে না।ওদের কাছে সুমিতের নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়।দিনে দিনে সুমিত অবসাদের শিকার হয়ে উঠছে।মনের দুঃখে যেখান সেখান চলে যায়,নদীর ধারে বসে থাকে।এভাবে চলতে চলতে একজনের সাথে আলাপ হয় যে তাকে বাড়ী থেকে বেশ দূরে একটা দোকানে সামান্য মাইনের বিনিময়ে খাতা লেখার কাজ দেখে দেয়।এতই সামান্য যে সুমিতের বাড়ীতে বলতে লজ্জা করে।দেখে,বউ মেয়ে উদয়াস্ত এত পরিশ্রম করছে,সুমিত সর্বদা নিজেকে দায়ী করে আর তাই ওদের মুখের দিকে তাকাতে পারে না।এভাবে অবসাদে ক্ষয়ে যেতে যেতে মদ খেয়ে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করে।প্রথ যেদিন মদ খেয়ে বাড়ী এল,রত্না চমকে উঠল,না জানি আরো কত কি অপেক্ষা করছে তার জন্য।আগে সুমিত কখনো মদ ছুঁতো না,পছন্দই করত না।বন্ধুবান্ধব কখনো একসাথে আনন্দ করার সময়,সবাই একটু আধটু মদ খেলেও সুমিত মোটে ছুঁতো না।রত্না সব দেখছে,সব বুঝছে তবু মুখ বুজে সব শ্য করে চলেছে,সহ্য করাটা এখন তার অভ্যেস হয়ে গেছে।কেবল আশায় আশায় থাকে যদি ওর সুমতি হয়।
      ক্রমে সুমিত প্রায়ই নেশা করে বাড়ী ফিরত,বাড়ীতে কিছু বলত না সারাদিন কোথায় থাকে,কি করে।রত্নাও ওর মানসিক অবস্থা দেখে ওকে বিশেষ ঘাঁটায় না।মানুষটা বাড়ী এসেছে এটাই যথেষ্ট। দুটো মেয়ে নিয়ে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছিল বড়,তাই সুমিত ফিরে আসায় রত্না খানিকটা নিশ্চিন্ত। ও তো আর জানে না,মেয়েরা বড় হচ্ছে বলে যে এত চিন্তা,সেই বড় মেয়ে মণি কোন পথে চলাফেরা করছে।সুমিতের বাড়ী ফিরতে রাত হয় আজকাল,বাড়ীতে খায়ও না,রত্না তাও কিছু জিজ্ঞেস করে না।কোনোভাবেই বাড়ীতে যেন কোনো অশান্তি না হয় তাই সব হজম করে মুখ বুজে,কিন্তু এ যে আর বাড়ী নেই শ্মশানপুরী হয়ে গেছে,নিস্তব্ধ, হাসি নেই হুল্লোড় নেই,গল্পগুজব নেই।ছোট মেয়ে রিনি বড় হয়ে উঠছে,মণি যথাসাধ্য চেষ্টা করে বোনের পড়াশুনোটা যাতে ভাল হয়।বোনকে টিউশন দিয়েছে যা ও পায়নি।মনেপ্রাণে চায় বোনটা ভালভাবে মানুষ হোক,নিজে তো ধ্বংস হয়েই গেছে।কচি মনটা ওর কঠোর হয়ে গেছে,ভাবে নিজের যা হয় হোক,মা-বাবা-বোন যেন ভাল থাকে।
        কিন্তু ভাল থাকাটাও যে ভাগ্যে থাকা চাই,চাইলেই ভাল থাকা যায় না,বেচারী মণি তা আর জানবে কি করে,হাজার হোক ছেলেমানুষ। জীবনযুদ্ধে তার এতবড় লড়াই,নিজেকে তিলেতিলে শেষ করে দিয়েও বুঝি হেরে যায় জীবনের কাছে।কলেজ শেষে রোজের মত বেরিয়ে পড়ে মণি রোজগারের ধান্দায়।অন্ধকার ঘরে অপেক্ষায় থাকে খদ্দেরের,রোজ যেমন থাকে।আজকের মানুষটাকে তার মনে হয় যেন অতিমাত্রায় কামুক, কিছুতেই যেন তার আশ মেটে না।বহুকাল খেতে না পেলে মানুষ যেভাবে খায়,এ যেন সেইরকম। তৃপ্তি যেন আর হয় না তার,ছাড়তেই চায় না কিছুতে।মণি ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছে,রাত বাড়ছে,অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে,মা চিন্তা করবে।অবশেষে নিজেকে নিংড়ে শেষ করে দেবার পর যখন টাকার লেনদেন হয়, রোজের মত ঘরের আলো জ্বালিয়েই মণি আর্তনাদ করে ওঠে দু'হাতে মুখ ঢেকে "নাআআআআ" করে।আর লোকটি দৌড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
          যে মহিলা মেয়েদের দিয়ে এইসব কাজ করাত সে শুনতে পায় এই আওয়াজ কিন্তু অন্য ঘরে লোক পাঠানোয় ব্যস্ত থাকায় আসতে একটু দেরী হয়ে যায়।মণির ঘরের দরজা ঠেসানো ছিল।দরজা ঠেলতেই খুলে যায়,দেখে মণি ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছে ফ্যান থেকে।ততক্ষণে শেষ,তার জিভ বেরিয়ে আছে।
       আর কিছুদূরে রেললাইনে পাওয়া যায় সুমিতের মৃতদেহ।অনুতাপে,অবসাদে ক্ষয়ে ক্ষয়ে সুমিত ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারে আর সেদিনই প্রথমদিন, যেদিন ওর যৌনক্ষুধা তীব্র হয়ে উঠেছিল,ও কোনো মেয়ের সংস্পর্শ ভোগ করতে চেয়েছিল কারণ রত্নার কাছে এগোতে ওর লজ্জা করে।কিন্তু দীর্ঘদিনের বুভুক্ষু শরীর যেন কিছুতে বাধ মানছিল না,পেতে চাইছিল নারী সঙ্গ।তার জন্য যে এমন মূল্য দিতে হবে, ভাবেনি সুমিত।
     ভাবে নি মণিও,জীবনযুদ্ধে এমন চূড়ান্ত পরাজয় তার হবে।

ছবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার: Cesar Legaspi