রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

                               


 চর্যাপদ চর্যাগীতি ও সমীক্ষা (দ্বিতীয় পর্ব)

আজকের বিষয় : পুঁথি ও পরিচয়

এই পুঁথি আবিষ্কার শুধু বাংলা নয় হিন্দী মৈথিলী ওড়িয়া প্রভৃতি অন্যান্য নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রথম আলোড়ন নিয়ে আসে। ফলে নেপালের সমস্ত গ্রন্থাগারের পুঁথিগুলির প্রতি ভারতীয় গবেষকদের ঝোঁক বাড়তে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। এই তৎপরতা যেমন একদিকে বাংলা ভাষার প্রতি পুরোনো ধ্যান ধারণা পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে ঠিক তেমনই অন্যদিকে হরপ্রসাদশাস্ত্রী মহাশয়ের আবিষ্কৃত তথ্যাদির বিশ্লেষণ সমস্ত গবেষকদের অন্তরে নিবিড়তার জন্ম দেয়। তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় আবিষ্কৃত পুঁথি সম্পর্কিত চমকপ্রদ বিশ্লেষণ। সেই ফলস্বরূপ বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন সব প্রমাণাদি ও ব্যাখ্যামূলক তথ্য। যেমন উল্লেখ করা যেতে পারে এই পুঁথিগুলির নামকরণের নামে একটি অপভ্রংশের ইতিহাস। এক, পুঁথিগুলির ভাষাকে বাংলা বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে দেখা যায় এর সমস্ত ভাষা বাংলা নয়, এর তিন চতুর্থাংশই পশ্চিমা অপভ্রংশের। দুই, এই লিপিকর সম্পূর্ণটিই টোকা বা copied। এর কারণস্বরূপ হিসাবে দেখানো হয় 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' নামক একটি পুঁথি, যা এই কোপিডের প্রামাণ্য বিষয়। স্বভাবতই প্রমাণিত সমগ্র বিষয়টি যেহেতু মূল গ্রন্থ থেকে গৃহীত বা টোকা, তাই তাঁর নাম ভুলবশত চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়ের বদলে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়  রূপে নামাঙ্কণ ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে,অর্থাৎ নামটি ভুল করে লেখা হয়েছে- 'চর্য্যাচর্যবিনিশ্চয়' এই রূপে। এই মতানুসারে 'চর্য্যাচর্যবিনিশ্চয়' নামক অপভ্রংশে  পুঁথিটির পরিচয় টিকে যায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত। এছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পরবর্তীতে নাকি জানা যায়, মূল বৃত্তাকারের আসল নাম মুনিদত্ত। অনুমান করা হয়, নেপালের গ্রন্থাগার থেকে পুঁথিগুলি সম্পূর্ণ রূপে সুরক্ষিত হিসাবে না পাওয়া যাওয়ায় শেষের দিক থেকে অনেকগুলো পাতা সন্ধান মেলে না, হয়ত এই কারণকেই গবেষকগণ মুনিদত্ত নামটি মুছে যাওয়ার জন্য প্রধান দায়ী করেছেন। তবে মুনিদত্ত মাত্র পঞ্চাশটি চর্যার ব্যাখ্যা করে গেছেন।এতদপরেও  পুরো নির্মাণটি ত্রুটিময় হলেও এর সম্পূর্ণ ভাবার্থটির একেবারেই  অর্থহীন বা ভ্রান্তময়, একেবারেই বলা যায় না। কারণ, জানা গেছে, এই সমস্ত অনুবাদের ভার প্রথমে শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় নিলে, তাঁর সূত্র ধরে ডঃ প্রবোধচন্দ্র বাগচীও পরের দিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার পাশাপাশি অনুবাদও চালান, তাতে দেখা যায় তথ্যানুসারে মূল গীতিসংগ্রহের যে  আসল নাম উঠে আসে, তা হলো 'চর্যাগীতিকোষবৃত্ত'।

১৯১৬ সালে হাজার বছরের 'পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' প্রকাশের সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুঁথিটিকে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নামে আখ্যায়িত করেছেন কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রীয় অভিলেখায় পুঁথিটির নাম নাগরী হরফে 'চর্য্যাচর্য্যটীকা' হিসাবে উল্লেখ আছে। তাই তিনি হয়ত ১৯১৫ সালে তাঁর প্রকাশিত 'A catalogue of Palmleaf and selected Paper MSS  belonging to the Durbar Library Nepal' গ্রন্থে দুই জায়গায় ওই চর্য্যাচর্য্যটীকা নামটি ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষত, পুঁথিটি তালপাতায় লিপিতাত্ত্বিকদের পরিভাষায় প্রত্ন বাংলা অক্ষরে লেখা এবং দীর্ঘতর পাতাগুলির মাপ হিসাবে লেখা আছে "লে ১২এবং৩/৪ চৌ ১এবং৯/১০ ও শাস্ত্রী উল্লেখিত ক্যাটালগ মাপ ১২ এবং ১/২  X ২ ইঞ্চি। এছাড়াও, পুঁথির প্রথম পত্রের সামনের পৃষ্ঠায় বাঁ দিকের উপরে লাল কালিতে নাগরী হরফে লেখা আছে: "৭৪১ ভাদ ষমবাত" = ভাদ্র ৭৪১ সংবৎ। আবার নেওয়ার সংবতের সূচনা কাল হিসাবে ধরা হয় ২০ অক্টোবর ৮৭৯সাল বা বর্ষারম্ভ কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদ। অর্থাৎ ৭৪১ সংবৎ + ৮৭৯ সংবৎ = ১৬২০ সাল। যা অনুমান করা হয় পুঁথিটির সংগৃহিত সময়কাল হিসাবে। তবে এখানে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ ভাষাবিচারে মুনিদত্তের জীবৎকাল ত্রয়ো শতাব্দী ধরে নিলে বলা যেতেই পারে, চর্যা পুঁথিটি ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিক বা চতুর্দশ শতকের একবারে গোড়ার দিকে রচিত। এক্ষেত্রে চতুর্দশ শতক সময়কালটি প্রমাণিত।

প্রসঙ্গত, পুঁথি পরিচয়ের আরো গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যাবে অনেক জায়গায় পুঁথিতে উল্লিখিত গানের পাঠের সঙ্গে টীকা পাঠের বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা রয়ে গেছে। উহাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে "লাড়ীডোম্বীপাদানাং সূনেত্যাদি চর্যায়া ব্যাখ্যা নাস্তি" টীকাটি। যেখানে দশম চর্যার মূল পাঠ ও টীকার পরবর্তীতে এবং একাদশ চর্যার পূর্বে লাড়ীডোম্বীপাদের একটি চর্যা ও সেটির সূচনা সূন শব্দ দিয়ে হলেও নির্দিষ্ট টীকার অভাবে গানটি ব্রাত্য হয়েছে, যা এখানে একটি Collated text বা যুক্ত সংকলন হিসাবে নির্মিত। যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় অসামঞ্জস্যতার কারণসমূহ। তাই হয়ত লিপিকর পুঁথিকে দুইভাগে ভাগ করেছিলেন- ১. শুধু গানের পুঁথি যা টীকাহীন আর ২. শুধু টীকা পুঁথি যা গীতিহীন। এক্ষেত্রে এই শুধু গানের পুঁথি বলতে আমরা চর্যাগীতিকোষের কথাও বলতে পারি যা বুধগণের অনুদিত চর্যাগীতিকোষবৃত্তি একপ্রকার রতিব্বতি অনুবাদ, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়এই গানের পুঁথি মুনিদত্ত ব্যবহার করেন নি। সেকারণেই হয়ত তাঁর লেখার মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। তবে অনুমান করা যায় এই ধরনের collated text ধরনের পুঁথিগুলি বৌদ্ধ পন্ডিত ও বিদ্যার্থীদের ভীষণ প্রিয় ছিল। তাই এগুলো হয়ত অন্যভাষাতেও অনুবাদ হয়। যেমন- কাশ্মীর পন্ডিত কীর্তিচন্দ্রের উপদেশানুসারে চতুর্দশ শতকের তিব্বতীয় অনুবাদ Grags-pargyal-mchan ও Kvarne ১৭৪১ থেকে ১৭৪৯ সালের মধ্যে চীনের মঙ্গোলীয় অনুবাদ। সুতরাং বলা যেতেই পারে শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিটি চর্যাগীতির একমাত্র পুঁথি কিন্তু নয়, যা আসলে অন্যতম পুঁথির একটি রূপ।



ক্রমশ...........

পিয়াংকী

 .                                     



ছোড়ি ছোলে

 




"খুব হেকটিক সিডিউল চলছে মা, প্লিজ  কুক সাম ইয়াম্মি " গতকাল সন্ধেয় একথা ভেসে এসেছিল আমার সহযোদ্ধার ঘর থেকে।ফুর্তি। আমার মেয়ে।মা মেয়ে দু'জনেই... ডায়েটে আছি অনেকদিন হল। ডায়েট মানেই যে শুধু কাঁচা বা সেদ্ধ সবজি খাওয়া নয় সেটা ও জেনে গেছে আগেই।তাই অগত্যা বায়না মেটাতে যা করেছিলাম, আজ  'গরম বাহার' এ সেটাই বলব।


রবিবারের সন্ধেতে আড্ডাবাজি করতে করতে ঘরের সেই মানুষগুলোকেও এটা খাওয়াতে পারবেন যারা কিনা তেলালোঝোলালো শব্দ ছাড়া কিচ্ছু বোঝেন না।


প্রয়োজন পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় কথা হল মাতৃত্ব আমাদের অনেককিছুই শিখিয়ে নেয়। সেরকমই, ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছু ছোলারই কায়দা করে সদগতি করেছিলাম। ছোলা মিক্সিতে ঘুরিয়ে  ১০-১২ সেকেন্ড করে দু'বার। হ্যাঁ দুবার।  তাতে  মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ, অল্প কয়েক কোয়া রসুন, গ্রেটেড গাজর এবং বিন (ইচ্ছে মত অন্য সবজিও দেয়া যায়), কাঁচালংকা আর ধনেপাতা কুচি,পরিমাণ মত নুন, কয়েকদানা চিনি।এবার সামান্য জোয়ান, ড্রাইরোস্ট সাদা জিরে আর এক চিমটি গোলমরিচগুঁড়ো এবং দু'চামচ ব্যাসন। এক পিঞ্চ বেকিং সোডা। জোয়ান  জিরে গোলমরিচ ওয়েটলস স্টেজে খুব ভালো কাজ করে। এবার একটা বড় বাটিতে নিয়ে সব উপকরণ একত্র করে নরম হাতে মেখে ফেলুন। 


ননস্টিক প্যান ।ওয়ান কিউব বাটার ।মেল্ট হলে অয়েলব্রাশের সাহায্যে ছড়িয়ে দিন প্যানের গোটা সারফেস জুড়ে। হাতের দুই তালু জল নিয়ে স্যাঁতসেঁতে করে নিন,মেখে রাখা মিশ্রণ থেকে পাঁচ আঙুলে ওঠে যতটা ততটা পরিমান নিয়ে একটু চ্যাপ্টা আকৃতিতে গড়ে প্যানে দিন।আঁচ থাকবে মাঝারি। ঢাকনা দিন,তিন মিনিট, উল্টে নিয়ে আরও এক মিনিট। 


এরপরের স্টেজটা 'ডাকাতিয়া বাঁশি'র মত। আরে না না, চুরি ডাকাতি করতে বলব না আপনাদের। টিকিয়াগুলো একটা একটা করে একটা সাঁড়াশিতে চিপকে ধরে ডাইরেক্ট আগুনে।হালকা পোড়া পোড়া সেঁকা সেঁকা হলেই তৈরি  'ছোড়ি ছোলে'


টিপসঃ দু'বার মিক্সি চালান। অল্প অল্প আধভাঙ্গা করে,একেবারে এক মিনিট ঘোরালে ছোলার ছাতু হয়ে যাবে।ক্রিস্পি ভাব থাকবে না


আরেকটা টিপ শেয়ার করি। যেকোনো টিকিয়া গড়বার সময় হাতে জলের ওপর কাঠখোলায় ভাজা সুজি ছিটিয়ে নিন।শেপিং পরিপাটি দেখতে লাগবে সাথে অনেকক্ষণ মুচমুচে থাকবে।

সোনালী চক্রবর্তী

                                   


 

আঞ্জুমান




নীল কাঁচের ডোম, ক্ষীরোদ বিদ্যুত... "কুবলাই খাঁ" যারা পড়েছেন একটু ভেবে নিতে পারেন চেহারাটা। লৌকিক থেকে অলীকের তারতম্যে 'নীল' ছাড়া অন্য বর্ণের এখনো প্রবেশাধিকার নেই নশ্বর মুণ্ডুদের কল্পনায়। যে কোনো অলৌকিক আদতে নিষিদ্ধ রহস্য বই তো কিছু নয়। পৃথিবীর দুই প্রবল আলোচিত পুরুষ আজ মুখোমুখি। সিদ্ধার্থ ও আর্নেস্তো। সময়খণ্ড বা কর্মপরিধি যতই আলাদা হোক, কোনো না কোনো নারীর ইথারে পৃথিবীর সব দিকপালদেরই একদিন না একদিন কোর্ট মার্শাল হয়। আজ বুদ্ধ ও বিপ্লবীর পরস্পরকে খননের দিন।


মৃত শরীরেও যার চোখ বন্ধ করে ফেলার সমর্পণ আসেনি, খুব স্বাভাবিকভাবে তারই প্রথম প্রশ্ন ভেসে এল -

"কী পেলেন শ্রমণ? 'শান্তি' শব্দ যে শুধুই মোহের সর্বনাম এ বোধির উপাদান আপনার পরমান্নে বাদ থেকে গেলো কী করে?"

দুর্ভাগ্য, ট্যাটু আর টি শার্টে এঁকে যারা চে'কে সাজায় শরীরে, তারা বোঝার চেষ্টাই করলো না কোনোদিন, বুলেটের ভিতর কিছু থাকে না, আগ্নেয়াস্ত্রেও না, যে সিনা তা ওঠাতে সিদ্ধান্ত নেয়, যন্ত্রের সার্বিক সাফল্য আর ব্যর্থতা তার মাপেরই সমানুপাতিক। এখানেই নির্ধারণ হয় কে রাষ্ট্র বা রিপুর ভাড়াটিয়া আর কে দেশ-কাল-ইতিহাসকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করা লিজেন্ড, স্বয়ং অগ্নি।

নির্বাণ যিনি পেয়েছেন, যে কোনো আঘাতের প্রথম উত্তর তার কাছ থেকে পরম শূন্য এক হাসি দিয়েই আসবে, এও তো অস্বীকারের নয়। ব্যতিক্রম ঘটল না। তথাগত মৌনতা ভাঙলেন -

"তুমিও কি শান্তিই চাওনি? দ্রোহ, জেহাদ, গুয়েভারিসম... উদ্দেশ্য তো একটাই ছিলো"

-- "আমি অধিকার চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রের তরফে তার নাগরিকদের প্রাপ্য মৌলিক সুরক্ষা শুধু। আপনাকে তো রাষ্ট্রধর্মেই প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিলো, হায় কী প্যারাডক্স তথাগত! আপনি বলছেন আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটিই - শান্তি, তাই তো? তাহলে আমি যদি বলি পরিণতি আপনারও কিছু ব্যতিক্রম ঘটেনি আমার থেকে নিতান্ত হত্যা ছাড়া, কী বলবেন? আমার শরীরটুকু আর আপনার সমগ্র আদর্শ। এক, সম্পূর্ণই এক, যতদূর আমার দৃষ্টি যাচ্ছে।"


সিদ্ধার্থ স্তব্ধ হলেন। কী করে উচ্চারণ করবেন এই অমোঘ সত্যের যন্ত্রণা? আর্নেস্তো তো ভুল কিছু বলেনি। প্রথমে গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ভাগ... শেষে চন্ড এক ক্ষমতাভুক সাম্রাজ্যবাদীর হাতিয়ারেই তো পরিণত হয়েছিলো তার চতুরার্য সত্য। পরিহাস, সেই নৃপতি আজ শান্তির আইকন, আর তিনি? নির্বাসিত... মূর্তিপূজার মনেস্ট্রিতে। বুদ্ধ কবেই চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়ে গেছেন বিরাট বিরাট প্যাগোডার ধনসম্পদের শো অফে নিজের প্রাণাধিক বোধিদ্রুমকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যেতে দেখতে দেখতে। আজও গুয়েভারা আর গৌতমের যাবতীয় স্যুভেনিরের বাজার চাহিদা, তুঙ্গী। তাদের দৈহিক সৌন্দর্য কিঞ্চিত অনার্যসুলভ হলে বাস্তবচিত্র কী হতো সে অনুসন্ধানে বুদ্ধিমান মাত্রেই বিরত থাকে। কনসিউমার ইকোনমিক্সে লুম্বিনীর শাক্য বংশীয় রাজপুত্র আর আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী গেরিলা সম্রাটের কীর্তি কতটা প্রাসঙ্গিক তার থেকে অনেক বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের চেহারা কতটা খাবে তার উপরেই  বরাবর, ভবিষ্যতেও হবে। তথাগতের কান্না পেল খুব। তিনি খুঁজতে চাইলেন কার চিন্তার তরঙ্গ আজ এভাবে সত্য মিথ্যার যাবতীয় ধোঁয়া ভেঙে তাদের একাকার করে দিচ্ছে যৌথতায়... অসহায়, বড় অসহায় লাগছে তার।


ওহ! স্বধা...? দিনের আঠারো যার এখন কাটে বাবার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা কোভিড কেবিনে রোজ। যে এখনো জানেই না মৃত্যুভয়ের থেকেও বড় সংকট তার আগামী ঘন্টা কয়েকের ভিতর আসতে চলেছে। নারী যদি মেধা আর বোধের সঙ্গে চামড়াটাও ব্যতিক্রমী নিয়ে জন্মায় তার অনিবার্য পরিণতি হয় এসাইলাম নাহয় আত্মহনন এই অব্দি প্রমাণিত, তবে সঙ্গে যদি জিভ আর শিরদাঁড়া জুড়ে থাকে, তবে সভ্যতা ও সমাজের সংকট ঘনায় এ কথাও মিথ্যে নয়। না তারা মরে, না আপোস করে। ফলত: সহস্র সহস্র খঞ্জরে শান পড়তে থাকে তাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে। তেমনই কিছু ঘটতে চলেছে। তথাগত বিষণ্ণ হলেন।


আজ চে যাবতীয় বৌদ্ধিক নির্লিপ্তিকে বিদ্ধ করবেন বলেই নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জরিপ করলেন গৌতমকে... প্রশ্ন রাখলেন-

"আজ এত বিচলিত কেন আপনি তথাগত? যশোধরার জন্যে তো সামান্য মায়াও কখনো বরাদ্দ ছিলো না আপনার। নাকি ৪৮৩ বিসিই থেকে এই ২০২১ এর দীর্ঘ পথ আপনাকে স্বল্প হলেও মানবিক করে তুলেছে?"

--"তুমি যাকে যশোধরা বলো সে আমার ত্রিকালের সাধনসঙ্গিনী আর্নেস্তো, আমার বদ্দকাচন্না, আমার সমস্ত শক্তির অধিক ক্ষমতাশালী এক অলৌকিক নারী, আমার পথপ্রদর্শক, সে স্বীকৃতি কি তার অলাতশান্তির সময় আমি দি নি? কেন অকারণ আক্রমণ করছ? আমি তো তোমায় প্রশ্ন করছি না তোমার হিল্ডা বা এলেইডা অথবা চার দেবশিশুর মুখ উপেক্ষা করা নিয়ে, ডাক্তার হিসাবে তোমার কর্তব্যের অবহেলা নিয়ে কারণ এই ই পুরুষকার। আমাদের দুর্বল হলে চলে না। মহতী প্রয়োজনে ব্যাক্তিস্বার্থ ত্যাগ করাই নিয়তি।"


দুজনেই শান্ত প্রায়। অথচ কী এক অশান্তি দুজনের কাউকেই স্বস্তি দিচ্ছে না পার্থিব চুম্বকতরঙ্গ থেকে এই এতোদূরে বসেও। কোথাও একটা ঝড় উঠছে, অত্যুজ্জ্বল ধুলো রঙের, ডানাহীন অথচ প্রবল উড়ানে।কাদের যেন কন্ঠস্বর... ভার্জিনিয়া ব্রণ্টি প্লাথ গৌরি সাবিত্রী শিন্দে রামবাঈ... প্রশ্ন উঠছে, অজস্র প্রশ্ন, 'হিস-স্টোরি' নিয়ে। তাহলে কি ধর্ম শান্তি দ্রোহ বিপ্লব সবের শিকড়ে একটিই আদিম রহস্য, পুরুষতন্ত্র? যে ফ্যাসিজমে সিদ্ধার্থর সঙ্গে আর্নেস্তোর, রামের সঙ্গে ক্রাইস্টের, মোহাম্মদের সঙ্গে কানহার আদতেই কোনো পার্থক্য নেই? এই আগ্রাসনে সবাই ই হিটলার? পাঁচ হাজার বছরের গুহাঙ্কন স্বস্তিক যেভাবে একদিন অধিক পরিচিতি পায় নাজি প্রতীক হিসাবে, ঠিক সেভাবেই শুধুমাত্র মেয়ে বলে শক্তির বিস্ফার চিরকাল উপেক্ষিত? 

রিং বাজছে স্বধার মোবাইলে - তীব্র কর্কশ - মাত্র চোখ লেগে এসেছিল কুড়ি ঘন্টা পর বিছানার নরমে - 'নার্সিংহোম কলিং - আর্জেন্ট - লাল রে -' সে ঘোরে একটা মুখ দেখছিল তখন - অনেকটা যেন জন স্নো - এক হ্যাঁচকায় ছিঁড়ে গেলো... 

চিত্রঋণ - পারমিতা চক্রবর্ত্তী

জয়তী রায় মুনিয়া

                         


                



মনের ব্যাংক

আজ বলব মনের ব্যাংকিংয়ের কথা। ব্যাংক শব্দটা জড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। নিচুতলা থেকে উঁচুতলা ব্যাংকের দ্বারস্থ সবাই। কারণ, জমা থাক কিছু পুঁজি। অসময়ে কাজে লাগবে। বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। 

জমা করা ,জড়ো করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আরো নানান দিক আছে এই জমিয়ে রাখার ব্যাপারে। যেমন , কথায় কথায় আমরা বলি, এনার্জি বাঁচিয়ে রাখতে। একটু ঘুমিয়ে নিতে। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। পরে কাজ করার সময় বাঁচিয়ে রাখা এনার্জি সাহায্য করবে। ঠিকমত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সঠিক ব্যায়াম করে শরীর ঝরঝর তাজা করে ফেলার উপদেশ সর্বক্ষণ শুনতে হয়। 

তাহলে মনের ব্যাংকিং কি? মনের ঘরের জমা খরচের হিসেব ঠিক কি রকম?

     ******

  মুশকিল হল, ব্যবহারিক জগৎ আর তার উপযোগিতা নিয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিকেশ করে চলেছি। নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছি। চারিদিকে সবকিছু সামলে চলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে বাহবা দিচ্ছি। আজ এমন দুজন মহিলার  গল্প করি। গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 

 প্রথমজন  বাংলাদেশ হতে প্রচুর সংগ্রাম করে কলকাতা এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। জিরো থেকে একেবারে হিরো। ছেলেগুলো হীরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সেইসঙ্গে মা অন্ত প্রাণ। স্বামী অকালে স্বর্গে চলে গেলেও ওনার কোনও  সমস্যা হয় নি। উনি প্রচুর পুজো করতেন। উপোস করতেন। এবং কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এককথায় চতুর যাকে বলে। চারিদিকে সতর্ক নজর। টাকা পয়সা অনেক। ছেলেরা হাতের মুঠোয়। ধন্য ধন্য করত লোক। 

  আজ তিনি বিছানায় শয্যাগত। ছেলেরা রাজকীয় চিকিৎসায় রেখেছে। তার স্মৃতি ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে। কথা বলেন। কথার বেশিরভাগ হল অশ্রাব্য গালি। নোংরা কথার তুবড়ি। নিজের মনেই বলে যান। আয়া নাকি ওনার গোপনাঙ্গে হাত দিয়েছে। একটার পর একটা আয়া বদল। ওনার গালি গালাজ চলতেই থাকে। 


       গল্প ২

____________

 আরেক মহিলার গল্প। সংগ্রামের ইতিহাস দুজনের প্রায় সমান। সাফল্যের বিচারে দ্বিতীয়মহিলা অনেক কম। অর্থভাগ্য ভালো নয়। সন্তান ভাগ্য ভালো নয়। দিনান্তে নিজের ভাত নিজের ফুটিয়ে খাওয়া ছিল তার ভবিতব্য। 

********

এই মহিলা দুজনকে তাদের মধ্যবয়স থেকে দেখেছি। খুব কাছের থেকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করতাম। দুজন মহিলা আমার কাছের মানুষ। দুজনেই বিধবা। দুজনেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

আমি লক্ষ্য করতাম ওদের চলাফেরা, কথাবার্তা। সফল মহিলার চলা ফেরার মধ্যে উগ্র অহঙ্কার ফেটে পড়ত। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সর্বদা অবিশ্বাস। ভুরু দুটি কুঁচকে আছে। নিরামিষ খেলেও প্রচুর ফল দুধ হরলিকস একেবারে সময় মেপে খান। বাড়িঘর নিয়ে ভীষন সচেতন। সিল্কের শাড়ী, গহনা।  অপর মহিলা একবেলা আহার করেন। যত অল্প খাওয়া যায়। নিরন্তর মুখে হাসি। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যে সন্তান রোজ আঘাত করছে তার জন্য প্রার্থনা। অচেনা লোকের জন্যেও শুভ কামনা। সাদাথান ছাড়া কোনো কিছু নেই। এমনকি একটুকরো সোনা পযর্ন্ত নেই। আমি শুনেছি, সফল মহিলা ব্যঙ্গ করে বলতেন," তুমি ভাই ভীষন বোকা। 

উত্তরে মহিলা হাসতেন। বলতেন," আমি খুব শান্তিতে আছি। 

ব্যর্থ মহিলা সুস্থ থেকে সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছেন। এক ফোঁটা সেবা নেননি কারো কাছ হতে। সফল মহিলা বিছানায়। সাধের বাড়িতে রাজত্ব এখন আযাদের, ছেলেরা দেখাশোনা করে কিন্তু থাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সিল্কের শাড়ির হিসাব নেই। গহনা মেয়ের হেফাজতে। কোনো জ্ঞানই নেই। গালাগালি কেন দেন, সেটা এখন আমি জানি। এ বিষয়ে পড়াশুনো করে বুঝেছি, মনের ব্যাংকে যা যা সঞ্চয় হয়ে থাকবে সেগুলো অবচেতনে বেরিয়ে আসে।ওই যে ওনার স্বভাব, যাকে উনি লালন করেছিলেন সযত্নে, মনে করতেন এটাই উচিত। সন্ধ্যে হলেই বাংলা সিরিয়াল দেখতেন। রাতে সেই সিরিয়ালের গল্প বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা ওনার মন একটাই সংকেত দিত সেটা হল, কোথাও বিশ্বাস নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। এটা হয়ত কোনো অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার একটা উপায়। কিন্তু সে উপায় ঠিক না ভুল সেটার প্রমাণ দেয় সময়। উনি মারা গেলে কি হত জানি না তবে বেঁচে আছেন এবং নেগেটিভ স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে আছেন। ওনার মনের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে অবিশ্বাসের পুঁজি। অহঙ্কার। ক্ষমতা লিপ্সা। সেটাই এখন ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছে। 

 মন : ভীষণ শক্তিশালী যন্ত্র। সমস্ত রেখে দেয় নিজের ভিতর। মূল কথা হল আনন্দ এবং এনার্জি। ওই যে অসফল মহিলা , উনি ভিতরে কখনো ক্ষোভ পুষে রাখেন নি। যা পেয়েছেন যতটুকু পেয়েছেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তৃপ্ত থেকেছেন। সন্তান ওনাকে আঘাত করলেও উনি তার জন্য প্রার্থনা করেছেন আর ওই সফল মহিলার সন্তান মাথায় করে রাখলেও উনি ভাবতেন যথেষ্ট করা হচ্ছে না। সুতরাং, সচেতন থাকতেই হবে। আমরা সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করি মন নিয়ে। যা পারি, যেভাবে পারি ঢোকাতে থাকি। রাগ অভিমান দুঃখ ক্ষোভ ... যেন এটা আমার ডাস্টবিন। নাহ্। এই মন আমার বর্ম। আমার অস্ত্র। যা খুশি ভাবে তাকে ব্যবহার করার আগে ভাবতে হবে বইকি। এই ভাবনা আমাদের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেবে। শরীরের উপর কত নজর ! চুল এই করো, ত্বক ওই করো। কিন্তু, চিন্তন? মন? সারাদিন তাকে কি দিচ্ছি?

এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। লেখালিখি কথাটা বলতে এবং শুনতে যত সুন্দর হোক না কেন, সে জগৎ কত ভয়ঙ্কর সে কথা সকলেই জানি। দিনরাত সেখানে অবিশ্বাস আর দুর্নামের খেলা চলছে। একে অপরের নামে বলছি আমরা। পোস্ট লিখছি। ঠকছি। ঠকাচ্ছি। সারাদিন এইভাবেই ভাবছি কি করে আরো আরো লাভবান হওয়া যায়। 

 ঈর্ষা হোক মহতের তরে... 

    কালজয়ী কবি এমন বলতে পারেন। সৃষ্টির মূল কথা ঈর্ষা। 

প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে কাজের আনন্দ কিসের? কিন্তু তার মানে এই নয় যে , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা প্রতিদ্বন্দ্বী র কথা ভাবতে থাকব অথবা অপর কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ক্ষোভ আর হতাশায় ডুবে থাকব। 

  যদি প্রশ্ন হয়, ব্যবসা করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হবে, না হলে সফলতা আসবে না। সব সফল মানুষ কোনো না কোনো সময় অন্যায় করেছেন এবং করছেন। তবে? তারা কি ভালো নেই? সাধু আর বোকা হয়ে এই দুনিয়ায় কোনো লাভ নেই। 

 সমস্যা হল অন্য জায়গায়। জীবনে লাভ হচ্ছে না ক্ষতি সেটা বুঝতে যখন পারি তখন দেরি হয়ে যায় অনেক। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা পরিমিত, তার উপর অযথা ভার চাপিয়ে গেলে এক সময় সে বিদ্রোহ করে, মনের জমির নেওয়ার কিছু সীমিত ক্ষমতা আছে। তাকে এনার্জি তে ভরপুর রাখতে হয়। নেগেটিভ কথা আর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিতে দিতে এক সময় বিদ্রোহ করে সে। 

 শেষের সে দিন কে দেখেছে? লোকে বলবে ভালো লোক কি কষ্ট পায় না? কষ্ট কখনো ভালো মন্দ বিচার করে না। যার পাওয়ার সে পাবেই। কথা হল, মনের ধারণ ক্ষমতা বা শক্তি যার বেশি সে কষ্ট নিয়েও ভালো থাকে। সুন্দর ভাবনা থাকার ফলে তার ভিতর তৈরি হয় পজিটিভ এনার্জি। ওই এনার্জি সাহায্য করে। বয়স হলে শরীরের যন্ত্রপাতির ক্ষয় হবে। কালের নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, মনের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন এনার্জি যোগান দিলে মন সতেজ থাকবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মন ব্যাংকিং। জমা করতে হবে ভালো ভাবনা। সুন্দর চিন্তা। সুন্দর সঙ্গ। সুদে আসলে ফেরত পাওয়া যাবে সময় হলে। 

 টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে ফেলতে হয়। মন বাঁচিয়ে রাখতে হয় বইকি। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন কোন দিক আমাকে বিরক্ত করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গ আমাকে ক্লান্ত করে তুলছে ... এগুলো সুদূর ভবিষ্যতে  এনার্জি ব্যাংকের পুঁজি নষ্ট করে দেবে। সাবধান হতে হবে এখন থেকে। 

ভালো লেখক হওয়ার জন্য নামী পাবলিশার হওয়ার জন্য প্রতিদিন এই যে ধার করা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, ভাবছি কি ভবিষ্যত কি নিয়ে আসছে? অকারণ এনার্জি ক্ষয় করে লাভ নেই। বাঁচিয়ে রাখতে শিখতে হবে। জীবন থাকলে কোনো না কোনো দিকে আমাদের পথ খুলেই যাবে। 

  নিজে আনন্দে থাকলে জগৎ আনন্দময়। এমন চিন্তাশক্তি সবল থাক যার ফলে ভালো হতে বাধ্য। মনের ব্যাংকে বেড়ে উঠুক মঙ্গলধ্বনি। একদিন সেটা কাজে লাগবে আমাদের।।


চিত্রঋণ - অন্তর্জাল

শনিবার, ১৭ জুলাই, ২০২১

অমিতাভ সরকার

                                     


   



বেজন্মা ( নবম পর্বের পর) 


রবিবার দুপুরে কৃষাণকে ফোন করে রাবেয়া। রাবেয়া জানায়, লাভপুরের এক ব্যবসায়ী লোকজনকে নিয়ে আবার এসেছিল। তার মাকে কয়েক লক্ষ টাকা দেওয়ার কথাও বলে গেছে। বলতে বলতে ভেঙ্গে পড়ে রাবেয়া। কৃষাণ অনেক কষ্টে রাবেয়াকে আশ্বস্ত করে বলে যে, মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যে তারা আসছে। ফোন রেখেই সিংজী আর মানিক’দা জানায় কৃষাণ।          

বিকেল নাগাদ সিংজী খবর দেয়, একটা টাটাসুমো জোগাড় করা গেছে। তাঁর এক আত্মীয়র গাড়ির ব্যবসা, সব কথা শুনে সে নিজেই ড্রাইভ করবে বলে জানিয়েছে। মঙ্গলবার সকলে যেন বিকেল পাঁচটার মধ্যে ধাবায় চলে আসে। সেখান থেকে সোজা বোলপুর। রাতটা বোলপুরে থেকে ভোর চারটে নাগাদ লাভপুর…।      

বিকেলে স্টেশনে যাওয়ার পথে রাবেয়াকে ফোন করে কৃষাণ। জানিয়ে দেয় বুধবার ভোর পাঁচটার সময় দুজনে যেন রেডি থাকে, যাতে ফোন করা মাত্র বেরিয়ে পড়তে পারে। বাজারের রাস্তায় এটিএম বুথ থেকে বেরতেই দেখা হয়ে  যায় শ্যাম আর নান্টার সাথে। পরবর্তী ট্রেনের জন্য ওয়েট করছিল ওরা। কৃষাণকে দেখেই তাদের মালপত্র ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে সঙ্গ নিল। তাদের এই ভাবে কাজকর্ম বাদ দেওয়ার জন্য বকাবকি করল কৃষাণ। যদিও তাদের উৎসাহ দেখে  না করতে পারল না। মনে হল যেন, রোজকার গতানুগতিক ফেরি করা থেকে একটু অন্য কাজের স্বাদ পেয়েছে তারা। তাদেরই উৎসাহে আয়রণের খাট, গদি, তোষক, বালিস অর্ডার করে দেয়। ঠিক হয় মঙ্গলবার সকালে তারা নিয়ে যাবে। নান্টার কথামত, দেখেশুনে একটা আলমারিরও অর্ডার করে দেয় কৃষাণ। আসার সময় বাসনপত্রের দোকানও ঘুরে আসে। ধাবায় আসতেই সিংজী তাদেরকে কৃষাণদের জন্য বরাদ্দ ঘরটা একবার দেখে আসতে বললেন। দুজনকে নিয়ে সিংজীর বাসার দিকে এগোয়। তাছাড়া বিদ্যাভাবীর সঙ্গেও কথা বলা দরকার।       

#

সোমবার দুপুরে রাবেয়ার সঙ্গে কথা বলে নেয় কৃষাণ। রাবেয়া জানায় শামসুদ্দিন তাদের ফোন করেছিল। রাবেয়ার মা’র সঙ্গেও কথা হয়েছে কিছুক্ষণ। ভদ্রমহিলা রাবেয়ার জন্য চিন্তায় রাতে ঘুম হচ্ছে না, অশুভ সংকেত পাচ্ছেন তিনি। এটা নাকি কৃষাণ যাওয়ার পরই শুরু হয়েছে। অনেকেই রাবেয়ার সঙ্গে কৃষাণকে লক্ষ্য করেছেন।    

বিকেল সাড়ে তিনটের মধ্যে হাজির হয়ে যায় সকলে। আসন্ন ধর্মযুদ্ধে যাওয়ার উদ্দীপনা সবার চোখেমুখে। শ্যাম আর নান্টা মন খারাপ করে খাটিয়ার ওপরে বসে আছে দেখে কৃষাণ এগিয়ে যায়।   

“তোরা আগামীকাল ফার্নিচারগুলো নিয়ে আসিস। আমি তোদেরকে মাঝে মাঝে ফোন করে পরিস্থিতি জানাবো, মন খারাপ করিস না। তোদেরকে রেখে আমারও কি যেতে ইচ্ছে করছে? তোরা এর মধ্যে ওঁনাদের জন্য বিদ্যাভাবীর সঙ্গে কথা বলে খাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখিস। বিদ্যাভাবীর যদি কিছু দরকার হয়, নিয়ে আসিস”। কথা বলতে বলতে সিংজীর আত্মীয় মনজিৎ হাজির হয় সুমো নিয়ে। সিংজী ধাবার লোকজনদের কিছু নির্দেশ দিয়ে মনজিৎএর পাশে গিয়ে বসে।     

রাত্রি আটটার সময় বোলপুরে খুঁজেপেতে একটা লজে গিয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নেয় সকলে। সেই ফাঁকে রাবেয়াকে ফোন করে কৃষাণ। রাবেয়া জানায়, তার মা স্বামীর বাড়ি-জমি ছেড়ে যেতে চাইছেন না। শুধু রাবেয়াকে চলে যেতে বলছেন। রাবেয়া আম্মুকে ফোন দিলে কৃষাণ ভদ্রমহিলাকে আপ্রাণ চেষ্টা করে বোঝাতে…। বলে যে, বিয়ে হয়ে গেলেই কৃষাণ তাঁকে দিয়ে আসবে। খাওয়া দাওয়ার পর নিজেদের মধ্যে প্ল্যানটা একবার ঝালিয়ে নেয়। ঠিক হয় চারটে নয়, একটু আগেই বেরবে। গ্রামে সবার ওঠার আগে, মানে অন্তত চারটের সময় লাভপুর পৌঁছে যেতে হবে।   

কীর্ণাহার পৌঁছতেই আর একবার রাবেয়াকে ফোন করে কৃষাণ। লাঘাটা ব্রীজের সামনেই আসতেই মনজিৎ-কে সুমো থামাতে বলে। গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামার সাথে সাথে বিল্লুকে ডেকে নেয় কৃষাণ।      

“সিংজী এখানে ওয়েট করুন, ওদের নিয়ে আসছি”। বিল্লুকে সঙ্গে নিয়ে লাঘাটা ব্রীজের ধার দিয়ে নিচে নেমে যায়। একটু হেঁটে কোপাইয়ের সরু অংশটুকু এক লাফে পেরিয়ে বিল্লুকে হাত ধরে পার করায়। তারপর দু’জনে ওপরের অঙ্গনবাড়ি ট্রেনিং সেন্টারের পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে পেছনের দিকে একটা খেজুর ঝোপের কাছে বিল্লুকে দাঁড়াতে বলে গ্রামে ঢোকে কৃষাণ। রাবেয়ারা প্রস্তুতই ছিল, কৃষাণ এসে তাঁদের বড় ট্রাঙ্কটা কাঁধে তুলে নেয়। তাই দেখে হায় হায় করে ওঠে রাবেয়ার আম্মু। কৃষাণ চাপা স্বরে চুপ করতে বলে। খেজুর ঝোপের কাছাকাছি আসতেই বিল্লু এগিয়ে যায়। তাকে দেখে চমকে ওঠেন ভদ্রমহিলা। কৃষাণ বিল্লুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিল্লু এগিয়ে এসে রাবেয়ার হাত থেকে জোর করেই ব্যাগটা নিয়ে নেয়। ট্রেনিং সেন্টারের পাশ দিয়ে নীচে এসে কোপাইয়ের সামনে দাঁড়াতে নজরে পড়ে মানিকদা আর মনজিতের দিকে। তাদের সাহায্যেই সকলে পার হয়ে যায় কোপাই। ওপড়ে উঠতেই বিল্লুর স্ত্রী রাবেয়াকে জড়িয়ে হাত ধরে রাবেয়ার আম্মাকে ডেকে নেয়।  

“আমি মমতাজ, বিল্লুর বিবি। আসুন ফুফু আম্মা”। সিংজী কৃষাণের কাছ থেকে ট্রাঙ্ক নিয়ে গাড়ির ছাদে তুলে দেয়। মনজিৎ গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়িতে উঠে কৃষাণ রাবেয়ার দিকে তাকায়…। রাবেয়া চোখ জলে ভরে উঠেছে। রাবেয়া আর আম্মু একদৃশ্যে তাকিয়ে আছে ফেলে আসে তাঁদের গ্রামের দিকে…।   

“আম্মু, মন খারাপ করবেন না, আমরা আবার ফিরে আসবো”। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় মনাচিতোর, রাবেয়া কৃষাণের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে। কীর্ণাহার ছাড়িয়ে সোজা এগোয় সুমো।    

সিংজীর নির্দেশে ফুটিসাঁকো এসে একটা ধাবার দাঁড়ায় গাড়ি। অনেকের মধ্যেই একটা চাপা টেনশনে চুপ করে ছিল। সকলকে গাড়িতে বসতে বলে সিংজী আর মনজিতই গাড়ি থেকে নেমে বড় গ্লাসে চা আর বিস্কুট সকলের দিকে এগিয়ে দেয়। রাবেয়ার আম্মু খেতে চাইছিলেন না, সিংজীর অনুরোধে চায়ের গ্লাসটা হাতে নেন।       

বর্ধমানের হাইরোডে ল্যংচার দোকানের এসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সকলকে নেমে পড়তে বলে সিংজী। একবার হাত-পা ছাড়িয়ে নেওয়া দরকার। কৃষাণ ফোন করে শ্যামকে…। সিংজী সুমোর দরজা খুলে দিয়ে রাবেয়াদের বেরিয়ে আসতে বলে।   

“বহেনজী উতরিয়ে…। আউর কিছু চিন্তা নাই। একদম চিন্তা করবেন না। কৃষাণ আমার বেটা, এবার বেটী ভি পাবো। আমার ঘরের বগলমেই থাকবেন…। ঘরে আমার জেনানা ভি আছে, ও ভি আপনার সাথি হবে। সব ঠিক হো জায়গা”।      

সবাই একটা টেবিলের চারদিকে বসে পড়ে। কৃষাণ সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। বিল্লুর বৌ রাবেয়ার হাত ধরে নিয়ে বসে। ফিস ফিস করে কানে কানে কী যেন বলে বিল্লুর বৌ। চোখ মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায় রাবেয়ার। তা দেখে বিল্লু চিৎকার করা ওঠে…।     

“এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না, ওর সঙ্গে কানা কানে কথা বলা…। আমরাও তো শুনতে পারি, ঠিক না মানিক’দা?” বিল্লুর কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে। 

“এই চুপ কর। ওসব তুই বুঝবি না। ওসব মেয়েদের কথা। আমাদের বিল্লুটা একদম পাগল”। এবারে সকলের সঙ্গে রাবেয়া আর রাবেয়ার আম্মুও হেসে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাবেয়ারা সহজ হয়ে যায় সকলের কাছে। পেমেন্ট করতে কাউন্টারের দিকে এগোয় কৃষাণ। আলাদা করে কয়েকটা ল্যাংচার প্যাকেট নিয়ে গাড়ীতে ওঠে।   

সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সিংজীর বাড়ির সামনে পৌঁছায় সকলে। শ্যাম, নান্টা হৈ হৈ করে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বিদ্যাভাবি। তিনি রাবেয়া জড়িয়ে ধরে মমতাজকে রাবেয়ার আম্মুকে ভেতরে আসতে বলেন। কৃষাণ, শ্যাম আর নাণ্টার গলা ধরে সকলকে নিয়ে নতুন ঘরে ঢোকে। দুজন মিলে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে ঘরটাকে। একটা মাটির হাঁড়িতে রজনীগন্ধার স্টিকও রেখেছে এককোনে। সকলে দুজনের পছন্দের প্রশংসা করে।    

“কৃষাণ, আমি যাই রে, স্নান করে কাজে যেতে হবে। বিল্লু তুই যাবি না?” 

“তুমি এগোও মানিকদা। আমি আসছি…”।  

“একটু দাঁড়াও মানিকদা…এটা নাও, বৌদিকে দিও। আর একবার আসতে বলো। রাবেয়ার সঙ্গে আলাপ করে দেব”। কৃষাণ একটা প্যাকেট মানিকদার হাতে দেয়। মানিকদা কোনও ভনিতা ছাড়াই খুশী মনেই প্যাকেটটা নেয়। 

“বাব্বা, এই টেনশনে তোর মনেও আছে দেখছি ! এবার খরচ-টরচ একটু কম করে কর…। মনে রাখিস, তুই এবার সংসার করতে যাচ্ছিস…”। মানিকদা যাওয়ার একটু পরেই বিল্লুর বৌ তাদের জন্য কয়েকটা প্লেটে আলুর পরোটা আর রায়তা নিয়ে ঢোকে। 

“মানিকদা কোথায় কৃষাণদা?”

“মানিকদাকে কাজে যেতে হবে তাই চলে গেল। সত্যি…, অনেক ক্ষতি হয়ে গেল আমার জন্য”।      

“দূর ছাড় তো, তুই কি পর? আমিও তোর বৌদিকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে কাজে যাব। দে, আমার প্যাকেটটা দে”। বিল্লুর কথা শুনে সকলে হেসে ওঠে।   

“ও, দাঁড়া সিংজীর ঘরে মিষ্টির প্যাকেটটা দিয়ে আসি”। সিংজীর ঘরে গিয়ে দেখে রাবেয়াদের স্নান হয়ে গেছে। সকলে মিলে টেবিল চেয়ারে বসে আলুর পরোটা খাচ্ছে। কৃষাণকে দেখে বিদ্যাভাবি হেসে এগিয়ে আসেন। 

“বাবেয়া, মেরা বেটা আ গেয়া… তুমারে বিনা রহ নেহি সকতা”। সবাই হেসে ওঠে। শুন কৃষাণ, আজ কুছ পাকানেকা জরুরত নেহি। আজ তুমলোক রেস্ট লো, কাল সে বহুত টেনশন হুয়া। কাল দেখা জায়গা। রাবেয়া অউর বহেনজী ইখানেই থাকবে।        

একটু পরে বাবেয়া আর আম্মা নতুন ঘরে ঢোকে। সবকিছু দেখে আম্মা চোখেমুখে নিশ্চিন্তের ভাব চোখে পড়ে কৃষাণের। রাবেয়াকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যায় কৃষাণ। রাবেয়া আর আম্মির জন্য কিছু জামাকাপড়, রাবেয়ার কথা মত চাল, ডাল, মশলা আর রান্নার কাঁচা মালের সাথে একটা ছোট সিলিন্ডার আর ওভেন কিনে একটা রিকশায় উঠে। রিকশায় উঠে রাবেয়া কৃষাণের একটা হাত জড়িয়ে ধরে। কৃষাণ মনে করিয়ে দেয়, আজ সন্ধ্যায় রেজিস্টার আসার কথা।       

সন্ধ্যা সাতটায় মানিকদা রেজিস্টারকে নিয়ে হাজির হয় সিংজীর বাড়িতে। মনজিৎও চলে আসে ঠিক সময়ে। কৃষাণ অনেকবার ফোন করেছিল আসার জন্য। মানিকদা স্ত্রী তার বছর দশেক ছেলেকে নিয়ে একটু পরে আসে।  বিল্লুর বিবি আর বিদ্যাভাবি সুন্দর করে সাজায় রাবেয়াকে। সকলের প্রশংসায় লজ্জায় মাথা নিচু করে বিল্লুর বিবিকে আঁকড়ে ধরে থাকে রাবেয়া। কৃষাণ মুগ্ধচোখে তাকায় রাবেয়ার দিকে। কৃষাণকে দেখে সকলে হাসাহাসি শুরু করে দেয়। মানিকদা কনুইয়ের ঠেলা দিয়ে সতর্ক করে কৃষাণকে। কৃষাণ অপ্রস্তুত হয়ে চারদিক দেখে লজ্জায় হেসে ফেলে। হঠাৎ কাঁধের ওপর ভারি হাতের স্পর্শে ফিরে তাকায়।            

“এটা পরে লে…। শাদিমে তেরা এ প্যান্ট আচ্ছা নেহি লাগতা…” একটা নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবীর সেট এগিয়ে দেয় সিংজী। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না কৃষাণ। সকলের সামনেই কেঁদে ফেলে…। সিংজী দুহাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে কৃষাণকে। তা দেখে সকলে এসে কৃষাণের পাশে এসে দাঁড়ায়।   

পায়জামা, পাঞ্জাবী পরে এসে সিংজী আর বিদ্যাভাবিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে কৃষাণ। সিংজী কৃষাণকে নিয়ে রাবেয়ার আম্মুর কাছে নিয়ে যায়। তাঁকে প্রণাম করে কৃষাণ। রাবেয়াও প্রণাম করে সিংজী ও বিদ্যাভাবিকে। সিংজী দুজনকে রেজিস্টারের সামনে এসে বসায় বাবেয়া আর কৃষাণকে। রেজিস্টার কাগজ এগিয়ে দেন।     

“দাঁড়াও দাঁড়াও, সবচেয়ে জরুরী কাজটা এখনো বাকি যে…। কবুলনামা করতে হবে তো…”। বিল্লুর ভাব দেখে রাবেয়াও হেসে ফেলে।   

কবুলনামার পর কৃষাণ, রাবেয়া কাগজে সই করে। সাক্ষী থাকে রাবেয়ার আম্মু, মানিকদা, আর সিংজী দম্পতি। মানিকদা তার ব্যাগ থেকে দুটি রজনীগন্ধার মালা এগিয়ে দেয় দুজনের দিকে। ধাবা থেকে সকলের জন্য খাবার আসে। গল্পগুজবের পর অনেক রাতে সকলে ফিরে যায়।  

  

রোজকার অভ্যাসে ভোরে উঠে মোবাইলে একটা ম্যাসেজ দেখে কৃষাণ। গতকালই এসেছে, নানান কাজে খেয়াল হয় নি। ফোর্স থেকে জানিয়েছে, কৃষাণ যেন সাতদিনের মধ্যে জয়েন করে। খবরটা পেয়ে সকালেই মনটা ভারি হয়ে যায় কৃষাণের। খবরটা শুনলে নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়ে যাবে রাবেয়ার। কত আশা করে রয়েছে মেয়েটা…।   

সকালের নাস্তার টেবিলে সকলের সামনে কথাটা বলে কৃষাণ। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে সকলে। রাবেয়ার দিকে তাকায় কৃষাণ। রাবেয়া ছলোছলো চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অনেক কষ্টে হাসে কৃষাণ। 

“নিশ্চয়ই জরুরী দরকার হয়েছে…। সেই কাজ সেরেই আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবো”। 

“ঠিক হ্যায় বেটা, কুছ চিন্তা নাই। বহিনজী আউর বেটী আমার কাছে থাকবে। কীরে বেটী থাকতে পারবি না? রাবেয়ার কাঁধে রাখে বিদ্যাভাবী। ওড়না দিয়ে চোখ মুছে সায় দেয় রাবেয়া।

“একদম মন খারাপ করবে না। আমরা আছি, চিন্তা কি আছে…। বুলায়া হ্যায়, জানে তো পরেগাই”। সিংজী সাহস দেয় কৃষাণকে। 

“কবে ফিরবে বাবা? আমি জানি এখানে সবার সঙ্গে মেয়ে ভালো থাকিবে। এমন মানুষজন পাবে কোথায়? অনেক ভাগ্য মেয়ের, না হলে কী যে হতো। আমি বলছিলাম, আমাকে যদি মনাচিতোর রেখে আসতে…” 

“এক্ষণি যাওয়া ঠিক হবে না আম্মি। ওদিকে হয়তো শোরগোল পড়ে গেছে…। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসবো। এমনিতে আমার অনেক ছুটির পাওনাও আছে”। এখানে সকলে আছে, কোনও সমস্যা হবে না”।   

সকাল দশটায় হাওড়া গিয়ে পাশ ভাঙ্গিয়ে যাওয়ার টিকিট কেটে নেয় কৃষাণ। বিকেলে রাবেয়াকে সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। এটিএম বুথ থেকে কিছু টাকা তুলে একরকম জোর করেই রাবেয়ার হাতে দেয়। কৃষাণের চলে যাওয়ার খবর শোনার পর রাবেয়া চুপ হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে রাবেয়ার হাত ধরে কৃষাণ।    

“রাবেয়া, মন খারাপ করো না। তোমাকে তো বলেছি, এই আমাদের জীবন। ফেলে যেতে আমারও কি ভালো লাগছে? কিন্তু কী করব বলো? একটা কথা বলি, তোমাকে আমি শুধু আমার দুর্ভাগ্যের কথা বলে ছিলাম, কিন্তু আমার সৌভাগ্যের কথা বলিনি। আমার সৌভাগ্য, আমি সিংজী আর বিদ্যাভাবীর মতো অবিভাবক পেয়েছি, আর পেয়েছি আপন ভাইয়ের মতো বন্ধুরা। এখানে তোমার কোনও অসুবিধা হবে না। বিদ্যাভাবী তো আছেই, তাছাড়া মমতাজ বৌদি রোজ একবার করে আসবে। চলো বিল্লুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসি…”   

বিল্লুর স্ত্রী মমতাজ তাদের দেখে রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে নিয়ে যায়। কৃষাণ তার যাওয়ার কথা বলে। মমতাজ অভয় দিল, সে রোজ একবার রাবেয়ার সঙ্গে দেখা করে আসবে। তাছাড়া মাঝে মধ্যে আশপাশটা ঘুরতেও যাবে দুজনে।  

“কিরে…? দুই বন্ধু খুব মজা করবো। অবশ্য কৃষাণদা থাকলে যা হতো, সেটা অবশ্য হবে না…! মমতাজের কথা শুনে দুজনেই হেসে ফেলে।     

রাবেয়াকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে কৃষাণ স্টেশনে আসে। সকলের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। যাওয়ার আগে রাবেয়ার নামে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। সবচেয়ে বড় কাজ হলো, রাবেয়াকে স্কুলে ভর্তি করা। সেটা অবশ্য এর মধ্যে হবে কিনা কে জানে…। 

স্টেশনের প্রান্তে তাদের পরিচিত আড্ডায় সকলে একে একে জড়ো হয়। খবর শুনে সকলেরই মন ভারি হয়ে যায়। মানিকদা জানায় স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে গ্রামের মেম্বারের সঙ্গে কথা বলবে।   

রাত দশটায় শিয়ালদহে সবাই বিদায় জানাতে আসে, সিংজী, বিদ্যাভাবী, রাবেয়া আর আম্মু। জীবনের এক স্মরণীয় মূহুর্ত। স্টেশনে পৌঁছে সকলে মিলে কফি খেতে খেতে কৃষাণের বন্ধুরাও এসে যোগ দেয়। ট্রেন ছাড়তেই বিদ্যাভাবীকে ধরে কান্নায় ঢলে পড়ে রাবেয়া।  

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                            


খোঁজ (১৩)

--এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম l ভাবলাম তোদের পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে তোদের নিয়েই ফিরব l কেমন হল আজ পরীক্ষা? আজই তো শেষ ! আজ থেকে তোরা মুক্ত বিহঙ্গ l
--না গো কল্লোলদা, এরপরই  তো জয়েন্ট l আমার এখন ছুটি নেই l অবশ্য শর্মিলা এখন ফ্রি l ও  জয়েন্ট দেবে না l 

একটা ট্যাক্সি ডাকল কল্লোলদা l 

--শর্মিলা তুই কি আজ বাড়ি ফিরবি নাকি কাকিমার কাছে যাবি ?  
--বাড়ি ফিরব কল্লোলদা l কিন্তু এখন আগে কাকিমার কাছেই যাবো, কাকিমা বারবার বলে দিয়েছেন l 

কাবেরীকাকিমার কাছে খাওয়াদাওয়া করে সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরল শর্মিলা l মনটা ছটফট করছিল l কতদিন পরে আবার নিজের ঘরে মায়ের কাছে শোবে ও ! রেজাল্ট বের হতে এখনও তিনমাস l এত বড় ছুটিটা ও কাটাবে কিভাবে ! গানটা শুরু করবে আবার ! মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে l কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখল বাড়ির পরিবেশটা এখন যেন আরো থমথমে l মায়ের চোখমুখে অনিশ্চয়তার উৎকণ্ঠা l অজানা আশঙ্কায় মনটা ভরে উঠল l ব্যাপারটা অবশ্য আন্দাজ করতে পারছিল l রাতে বিছানায় শুয়ে অপর্ণা জানালেন এ বাড়িটা এবার বোধহয় ছেড়ে দিতে হবে l অলোকের প্রমোশন হওয়ার পরে দুর্গাপুরে ট্রান্সফার হয়ে গেছে l সামনের সপ্তাহেই সেখানে চলে যেতে হবে l শবনম রেলের কোয়ার্টার পেয়েছে  নারকেলডাঙায় l সেখানে থাকলে মুনমুনের স্কুলে যাতায়াতের সুবিধা l মুনমুন এবছরই বিডনস্ট্রীটের একটা নামকরা স্কুলে চান্স পেয়েছে l ওখানে স্কুলের বাস আসে l ছোট্ট,  দুকামরার ফ্ল্যাট l সেখানে কোনোরকমে মুনমুনকে নিয়ে থাকতে পারবে শবনম l এতজনের জায়গা কুলোবে না l অতএব সংসারখরচ চালিয়ে এই বাড়ির ভাড়া দেওয়া অপর্ণার পক্ষে অসম্ভব l শুধু এই বাড়ি কেন ! এরপর কোথায় থাকবেন, কিভাবে সংসার চলবে সেটা ভেবেও কূলকিনারা পাচ্ছেন না না অপর্ণা l নিজের হাত তো সম্পূর্ণ খালি l মরে গেলেও অলোকদের কাছ থেকে সংসারখরচ চাইতে পারবেন না তিনি l অল্প কিছু গয়না এখনও আছে, কিন্তু সেগুলো বেচে আর ক টাকাই বা পাওয়া যাবে ! 
হঠাৎই যেন নিজেকে অনেকটাই বড় মনে হল শর্মিলার l ওর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে গোটা সংসার l দায়িত্ব নেওয়ার সময় হয়েছে এখন l সংসারটাকে বাঁচাতে হলে এখনই একটা চাকরির খুবই দরকার l কিন্তু এই কোয়ালিফিকেশনে কোথায় চাকরি খুঁজবে ও ! তবু বলল, 

-- তুমি চিন্তা কোরো না মা l আমি আছি তো ! আমাদের একটা ছোট বাড়ি হলেই চলে যাবে l কাল থেকেই বাড়ি খুঁজব আমি l আর চেষ্টা করলে কিছুদিনের মধ্যেই একটা চাকরি নিশ্চয়ই জোগাড় করে ফেলতে পারব l কারুর সাহায্য লাগবে না আমাদের l

--তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে মুন্নি ! এখন চাকরি করে ভবিষ্যৎটা ঝরঝরে করবি তুই ! শোন,  কাবেরীদি সবটাই জানে l এরমধ্যে মৈনাক আমার একটা চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে ঢাকুরিয়ায় ডঃ সিনহার নার্সিংহোমে l রিসেপশনিস্ট কাম ক্লার্কের কাজ l দিনসাতেক ট্রেনিং নিলেই নাকি কাজটা করতে আর কোনো অসুবিধে হবে না l হাজার দেড়েক টাকা মাইনে দেবে ওরা l 

পরেরমাসে শবনমরা চলে যাওয়ার পরে অপর্ণারাও উঠে এলেন বেনিয়াপুকুর অঞ্চলের একটা আধাবস্তিবাড়িতে l একতলায় দেড়খানা ঘর, সামনে একচিলতে বারান্দা l সেখানেই রান্নার ব্যবস্থা l বাইরের উঠোনের টাইমের কল থেকে জল ভরে রাখতে হয় l এজমালি বাথরুম l আরো তিনঘর ভাড়াটের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয় l জিনিসপত্র প্রায় সবই শবনমকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন অপর্ণা l তার ঘরেও এত জায়গা নেই l অনেককিছুই বিক্রি করে দিতে হল শেষমেশ l বাড়ি দেখতে এসে রাজশ্রী কেঁদে ফেললেন l 

--এখানে তোমরা থাকবে কি করে বৌদি ! মুন্নি লেখাপড়া করবে কোথায়? এত করে তোমাদের বললাম, আমাদের বাড়িতে চল l জেদ করে তুমি মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করলে l 

ম্লান হাসলেন অপর্ণা l 
--তুমিই তো আমাদের শেষ ভরসা রাজু l তুমি না থাকলে আমাদের যে কি হত ! সারাজীবন আমাদের জন্য কম কিছু তো করলে না l আর কত টানবে? আর আমাদেরও তো এবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত ! আর মুন্নির যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে এখানে থেকেই  লেখাপড়া হবে l বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে ওকে l আর  বাড়িটা তো তোমার নয়, ওখানে থাকার রিকোয়েস্ট তুমি কোরো না প্লিজ l যত কষ্টই হোক, আত্মসম্মানটুকু বিসর্জন দিতে বোলো না আমায় l 

বাড়িভাড়ার দুশো টাকা দিয়ে হাতে যা থাকবে তাতে কোনোরকমে সংসার চলে যাবে l শর্মিলার পড়াশোনার খরচও আছে l কিন্তু বাবার ট্রিটমেন্ট চালাতে গেলে পিসির সাহায্য লাগবেই l কিন্তু সমস্যাটা হল শর্মিলার কলেজ শুরু হলে বাবাকে কে দেখবে l বাবাকে স্নান করানো, খাওয়ানো ছাড়াও চোখে চোখে রাখতে হয়ে সবসময় l শূন্য ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সারাদিন স্থবির হয়ে বসে থাকেন অরুণ l মাঝেমাঝে বিড়বিড় করেন নিজের মনে l হৃতচেতনার অন্তরালে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি এখনও l তবে মাঝে মাঝে অসম্ভব অস্থির হয়ে পড়েন, তখন দরজা খোলা পেলে বেরিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেন l এই সময়ে তাঁকে আটকাতে রীতিমত সমস্যায় পড়তে হয় l ডাক্তার বলেছেন এমন ডীপ অ্যামনেশিয়ার পেশেন্টকে কখনই একা রাখা চলবে না l 

এবাড়িতে শর্মিলাদের পাশের ঘরে যে পরিবারটি থাকে তাদের আগেই চিনত শর্মিলারা l ছোটবেলায় ওরা যে বাড়িতে থাকত তার পাশের বাড়িতে যে খ্রিস্টান পরিবারটি ছিল সেই বাড়িরই মেয়ে রেখাপিসি l বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল কার্তিক নামে পাড়ার এক উঠতি মস্তানকে l কার্তিক তেমন কোনো কাজকর্মই করে না l রেখাপিসিই ডঃ বাগচীর নার্সিংহোমে  আয়ার কাজ করে সংসার চালায় l কখনও কখনও দিন-রাত দু শিফটেও ডিউটি করে l সংসারের যাঁতাকলে পড়ে প্রেম এখন অদৃশ্য l ছিবড়ের মত পড়ে আছে বিবাহিত জীবনের শব l ভাগ্যিস ওদের কোনো ছেলেপুলে নেই l যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ দুজনের চিল চিৎকারে ঘরে থাকা দায় হয়ে যায় শর্মিলাদের l সকালে মা বেরোনোর আগেই জল তুলে, রান্নাবান্না আর সমস্ত কাজকর্ম সেরে নেয় l শর্মিলাকে বারবার বলে যায় যেন ও  ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে l কিন্তু তবু মাঝেমধ্যে প্রকৃতির ডাকে বা অন্যান্য প্রয়োজনে দরজা খুলে তো বেরোতেই হয় l কার্তিককাকুর গা ঘিনঘিনে দৃষ্টির সামনে পড়তে হয় তখন l মাকে সেকথা না বললেও অপর্ণা বুঝতে পারেন সবই l কিন্তু এখন তাদের দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার দিন l মাসদুয়েক পরে একদিন দুপুরে বাথরুমে যেতেই কার্তিক দেয়ালে ঠেসে ধরল শর্মিলাকে l টিনের চাল দেওয়া এই কলঘরে দিনের বেলাতেও ঘুটঘুটে অন্ধকার l চল্লিশ ওয়াটের একটা বাতি জ্বালাতে হয় l শর্মিলা বুঝতে পারেনি, আধো-অন্ধকারে কার্তিক আগে থেকেই লুকিয়ে বসেছিল l প্রাণপণে চিৎকার করে উঠল শর্মিলা l সামনের ঘরের জবাবৌদি আর ডলিকাকিমা টের পেয়েও ভয়ে এগিয়ে এল না l কার্তিক এলাকার ত্রাস l হয়ত ওরাও এর আগে কার্তিকের লালসার স্বীকার হয়েছে l বাবার ঘরের দরজা খোলা ছিল l বিস্ফারিত চোখে হঠাৎই শর্মিলা দেখল বাবা বাথরুমে ঢুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কার্তিককাকুর ওপর l অমানুষিক জোর বাবার গায়ে l আঁচড়ে, কামড়ে রক্তাক্ত কার্তিককে বাথরুমের মেঝেয় ফেলে এলোপাথাড়ি মারছে বাবা l জন্তুর মত গোঙানি বেরিয়ে আসছে কার্তিকের মুখ থেকে l সারাটা গা গুলিয়ে উঠল ওর l জোর করে বাবাকে সরাতে গিয়েও পারল না l হঠাৎই কার্তিক একটা লাথি মেরে উল্টে ফেলে দিল বাবাকে l মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এল বাবার l ইতিমধ্যে গোলমালের শব্দে বাইরে থেকে কিছু  লোকজন জমে গিয়েছে ওখানে l ডলিকাকিমা  তাড়াতাড়ি ওকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে  একগ্লাস জল খাওয়ালো l লোকজন আসার আগেই জ্ঞান হারাল বাবা l জবাবৌদি পাড়ার টেলিফোন বুথ থেকে মাকে ফোন করল নার্সিংহোমে l মা ফেরা অবধি কাঠের পুতুলের মত বসে রইল শর্মিলা l লোকজনই পুলিশে খবর দিয়েছে ততক্ষণে l বাবাকে ধরাধরি করে উঠোনে এনে শুইয়েছে l ব্লিডিং হয়েই চলেছে l কার্তিকেরও ওঠার ক্ষমতা ছিল না, সেও যথেষ্ট আহত l পুলিশ এসে অ্যারেষ্ট করল কার্তিককে l মা আসার পরেই অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল l কাবেরীকাকিমাকে নার্সিংহোম থেকেই ফোন করে দিয়েছিল মা l পিসিকে নিয়ে ততক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছে গেছে কাবেরীকাকিমা l এমার্জেন্সিতে কল্লোলদা আর মৈনাকদা রেডিই ছিল l আরো একজন সিনিয়র ডাক্তার পরীক্ষা করে তক্ষুণি আই সি ইউতে ভর্তি করে নিলেন বাবাকে l এতক্ষণ ধরে ক্রমাগত রক্তক্ষরণের ফলে কোমায় চলে গিয়েছে বাবা l কিছুক্ষণ পরে সমীরণকাকু আর কেয়ামাসিও এসে পড়লেন l একে একে পিসেমশাই, কাম্মাও চলে এল l ঘন্টাতিনেক  টানাপোড়েনের পর কল্লোলদা বেরিয়ে এসে মাথা নাড়ল l 
-- অনেক চেষ্টা করেছিলাম কাকিমা, কিন্তু এত ব্লিডিং হয়ে গেছে যে আর... 

রাজশ্রী অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন l 

অপর্ণার চোখ খটখটে শুকনো l 
--সারাজীবন হেরে গিয়ে অচেতন অবস্থাতেও অন্তত একটা যুদ্ধ জিতে চলে গেল মানুষটা l তোমার দাদা আমাদের মুক্তি দিয়ে গেল রাজু l আমাদের মেয়েটাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল l

ভীড় থেকে একটু একটু করে শর্মিলা পাশের অন্ধকার গলির দিকে সরে যাচ্ছিল, একা l ওর জন্যই আজ চলে যেতে হল বাবাকে ! জাগতিক বোধ থাকুক, না থাকুক, মানুষটা ছিল তো ! একটা মানুষের থাকা না থাকায় কতখানি পার্থক্য সেটা তো কয়েকমাস ধরেই টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে l নিজের ওপর অসম্ভব ঘৃণা হচ্ছিল শর্মিলার l এমন জীবন থাকার থেকে না থাকাই ভালো l বাবা চলে গেল, এরপর মাকেও যে কত বিপদে পড়তে হবে ওর জন্য, কে জানে l হঠাৎ ঘ্যাঁচ করে একটা অ্যাম্বাসেডর ওর সামনে দাঁড়াল l 

--কি করছেন কি ! মরবার ইচ্ছে হয়েছে আপনার ! 

ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটা চিৎকার করে উঠল l 

-- দাঁড়াও দাঁড়াও, এটা তো শর্মিলা ! তুই এত রাতে এখানে কি করছিস?  জানিস না এসব জায়গা ভালো না?  

মেঘনার গলা l কি অদ্ভুত সেজেছে মেঘনা ! একেবারে ট্রান্সপারেন্ট একটা শাড়ি, সরু স্লিভলেস ব্লাউজ, চড়া মেকআপ ! সঙ্গে এই লোকটা কে? এটা তো ওর বর না ! ইনি প্রায় ওর বাবার বয়েসী l মাথা কাজ করছিল না শর্মিলার l মেঘনা গাড়ি থেকে নেমে জড়িয়ে ধরল শর্মিলাকে l 

-- কি হয়েছে রে? তুই এত রাতে এখানে এসেছিস কেন?  কাকু - কাকিমা ঠিক আছেন তো? 

ইশারায় ওকে হসপিটালটা দেখাল শর্মিলা l

(চলবে )

মধুমিতা চক্রবর্তী

 


                                          




এই সংখ্যার কবি মধুমিতা চক্রবর্তী। আসুন পড়া যাক কবিতা।

পাগল ও সন্ত প্রেমিক


এইসব গ্লানি, পরাজয়

দীর্ঘশ্বাসের সাথে ছেড়ে রেখে যাব 


সে ঠিক একদিন চিনে নেবে পথ


ক্ষমা করে দেবে


দিন গেলে যে পাগল

অনুতাপের মিঠে বাস

শুঁকে শুঁকে ফেরে


যদি ঘৃণা বেড়ে যায় খুব

একরাত শুয়ে থেকো ঘাসে,

যদি কমে ভালোবাসা,

উপশম নিও


এইটুকু বলে

প্রেমের সন্তকবি

নেমে যান জলে


এইটুকু দিয়ে

বলেছেন ভেসে থাকা যাবে


একান্ত নিজস্ব বেদনার মত কিছু পাতা 

শুকিয়ে গিয়েও তবু আটকে রয়েছে ডালেই 

উঠোনের দড়িতে কাপড় মেলছে মেয়ে 

আর চোখ তুলে দেখছে গতিমান জড় মেঘ


মনে মনে সে আওড়াতে থাকে

''আমাদের চলা গভীরে......"


আমি এক ঘৃণ্যতর সুখ

তুমি অনাবিল আলো


অবনত, দীন ব্যবহারে 

বুঝিয়ে দিয়েছি কতটা ধন্য আমি।

যা কিছু মধুর, রসময়

ভরে দেব পূজার থালায়,

শুধু 


পতঙ্গজীবনের এই স্বাদ

তুমি যে পেলে না নাথ 


দুঃখ এটুকুই

রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১

শুভাশিষ সিংহ,পারমিতা চক্রবত্তী

                                



লকডাউন ডায়েরী-২


সমার্থক বলতে 

যদি নিকটবর্তী  কিছু হয় 

তবে এই ছোঁয়াচে দূরত্বকে আমি ঘেন্না করি 


আফসোস যদি 

অনুশোচনা পরম  আত্মীয় হয় 

তবে শোকের বার্ধক্যজনিত পীড়া 

আমি এখনও অনুভব করি 


আর অনুভব করি বলেই 

কারোর নাভিশ্বাসকে 

অন্তিমের  সূচনায় নামাঙ্কিত করতে বলি 


হে ধর্মাবতার 

আপনার কলমে বেঁচে থাকুক 

কোভিড সংক্রমিত অমর অসুখ 


পিয়াংকী

                                  



গোয়ালন্দ স্টিমার চিকেন কারী 


আজ রবিবার। চলুন ঘুরে আসি বাংলাদেশ। 


প্রায় দেড়শ বছর আগের ছবি । কয়েকশো লোক বোঝাই একটা স্টিমার, স্টেশন থেকে ছাড়ল, যেতে হবে অনেকটা পথ। পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে সে,যাত্রীরা গন্ধ পাচ্ছেন, ভয়ানক লোভনীয় গন্ধ।


অবিভক্ত বাংলা। সালটা ১৮৭১। সে বছরেরই পয়লা জানুয়ারি চালু হয়েছে রেল পরিষেবা। কুষ্টিয়া থেকে গোয়ালন্দ অবধি।হিন্দু বাঙালিদের ঘরে মুরগী তখনও আত্মীয় হয়ে ওঠেনি।ফলত যা হবার তাই হল।নিষিদ্ধ হবার টান ভয়ানকভাবে মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে চিরকাল। স্টীমার ঘাটের হোটেল রেস্টুরেন্টে অথবা মাঝিমাল্লাদের হাতের জাদু তাই চেখে দেখতে থাকলেন তৎকালীন সমস্ত যাত্রী।  

   

আমার বয়স তখন নয়দশ বছর হবে।শীতকাল।পিকনিক হচ্ছে মামাবাড়ির উঠোনে।অনেকদিন পর চেতন মামা এসেছেন বাংলাদেশ থেকে।আলোআঁধারীর  মত মনে আছে কিছুটা,  আমার বড়মামা আর চেতনমামা মিলে রান্না করছেন গোয়ালন্দ স্টিমার কারী। আজ যখন ফুডব্লগ লিখছি নস্টালজিয়া ভর করছে ভীষণ ।


ইতিহাসঃ  আসলে সেই সময়ে খেটে-খাওয়া মানুষের (মাঝি এবং  সংলগ্ন কর্মচারী ) জীবন ঘাঁটলে দেখতে পাই, তরিতোয়াজ করে ভেজে কষিয়ে রান্না করার, সময় ধৈর্য অর্থ কিছুই পর্যাপ্ত ছিল না। খুব সাধারণভাবে সমস্ত মশলা মাখিয়ে কম আঁচে চাপাঢাকা দিয়ে রান্না করা ছিল তুলনায় অনেক সহজ। স্টীমারে শিলনোড়া থাকত না।মিক্সি তো আকাশের চাঁদ তখন।এই রান্নার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল 'না-বাটা' মিহি কুচোনো এবং চিংড়িশুটকির ব্যবহার ... 


          


 ধুয়ে  পরিস্কার করা মুরগীর মাংস,  তাতে বড় মাপের কাটা আলু, মিহি করে কুচোনো পরিমাণ মত পেঁয়াজ, রসুন(বেশ খানিকটা ) আদা, কাঁচাপাকা লংকা, চিংড়িমাছ বাটা(অথেনটিক পদ্ধতি অনুযায়ী চিংড়ি শুটকি দেয়া হত) এবং সর্ষের তেল... একটা বড় গামলায় একসাথে সবকিছু যত্ন করে সময় নিয়ে মেখে  কয়েকঘন্টার বিশ্রাম। 


এরপর ভারী হাঁড়ি বা লোহার কড়াইতে বেশ করে সর্ষের তেল, তাতে লবঙ্গ এলাচ দারচিনি তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে মেখে রাখা মাংস। জলের প্রয়োজন নেই।পাঁচ মিনিট পর ঢাকা খুললেই দেখা যাবে অনেক জল বেরিয়েছে। সেই জলেই সবকিছু সেদ্ধ হয়ে যাবে।এই পর্যায়ে একটা গন্ধরাজ লেবু (ওপরের স্কিনটা সামান্য ঘষে নিলে তিতকুট ভাবটা চলে যায়) গোল গোল স্লাইস করে কেটে ডুবিয়ে  তারপর আরো কিছুক্ষণ। একটু গামাখা একটু ঝোল এরকম কনসিস্ট্যান্সি এলেই  তৈরি। 


 এখানে বলার, লেবু ব্যবহার নিয়ে কিন্তু ভিন্নমত আছে,বড়মামাকে ফোন করে জানলাম চেতনমামা নাকি বলেছিলেন বাংলাদেশের মানুষদের কাছে এই রান্নায়, হয় কাগজী নতুবা গন্ধরাজ কিন্তু  মাস্ট।

                   


আমি পরিবেশন করেছি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, মুসুরডালের বড়া আর সামান্য স্যালাড দিয়ে, তবে রুটি পরোটা দিয়েও জমে যায় ঐতিহাসিক এই পদ


আর দেরি কেন? রান্নাঘরকে নিয়ে যান অবিভক্ত বঙ্গে পদ্মার ভাসমান  স্টীমারে...


সোনালী চক্রবর্তী

                                            


এণেস্থেশিয়া (পর্ব ১) 



'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ' থুড়ি রাষ্ট্রীয় স্কন্ধকাটা কিছুর শেষ সম্মিলিত বৃহদায়তন (অজৈব) হত্যা উৎসবে যত সৈন্য সরাসরি নিহত হয়েছিল (একমাত্র যুদ্ধই সেই অভিধান যেখানে 'শহীদ' শব্দটি 'মাইনে করা মুরগি'র 'এক কথায় প্রকাশ' হিসাবে ব্যাকরণসম্মত) তার থেকে অনেক বেশী সংখ্যায় মারা গিয়েছিলো ১৮৪৬ সালের আগে এণেস্থেশিয়ার আবিষ্কার না হওয়ায়। সজ্ঞানে আহত হাত-পা কেটে বাদ দেওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি পেটের তাগিদে বেয়নেট বয়ে বেড়ানো অধিকাংশ মানুষ। যখন তা আবিষ্কার হয়ে গেলো, একটা মানুষ ঘোরে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় সঠিক টের পেলনা পরের জন্মদিনটা যে শরীরে আসবে তা নিয়ে সে মাতৃগর্ভ থেকে প্রথম আলো ছোঁয়নি। যখন অবশ দশা কাটলো, জানলো দ্বিতীয়বার জন্ম হয়েছে তার যেখানে তার নামের সঙ্গে পদবীর অধিক গাঢ়তা নিয়ে অবস্থান করবে 'প্রতিবন্ধী' শব্দটি। এই জাতীয় নশ্বর পুনর্জন্মের কথা ব্রাহ্মণ্যবাদের কোনো শাস্ত্রে বা পুরাণে উল্লেখ নেই কেন? এও তো 'দ্বিজ'। যদি বলো, উত্তরণ অর্থে ছাড়া এই শব্দের ব্যবহার হয় না, তাহলেও তো প্রশ্ন, কে নির্ধারণ করলো প্রিভিলেজড থেকে আরেকটু প্রিভিলেজড হয়ে ওঠা অবনমন নয়? আচ্ছা সে অন্য প্রসঙ্গ। এত গুলিয়ে যায় আসলেই মেয়েটার, জন্মইস্তক এই রকমই, খেই হারিয়ে যায়, পুরনো উলের বলের গিঁট তার সবই, একটা খুলতে গিয়ে আরেকটায় স্নায়ু জড়িয়ে যায়। 


তো, কী কথা হচ্ছিল? এনেস্থেশিয়া। আচ্ছা, এই যে বছরের প্রথম বৃষ্টি, বৈশাখের ২১ তারিখে, কালবৈশাখী'হীন অতিমারিধ্বস্ত প্রাচীন মফস্বলে, যেখানে চৈত্র কাব্যসম্ভব সর্বনাশ তো দূর, একফোঁটা অন্ধকারও নামায়নি সূর্য থেকে, তাও কি এণেস্থেশিয়া কোন? পোর্টিকোয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ভাবার পর মেয়েটার ভিতরে বিদ্যুত ঝলসালো সদ্য। তার সামনে কিছু এম্বুলেন্স, গাড়ি পার্ক করা, অভিজাত নার্সিং হোমে যেমনটি দেখানো হয় আর কী সিনেমা সিরিয়ালে আর কেণ্নোর মত অজস্র বিড়াল ও কুকুর, যাদের দেখানো হয় না, টি আর পি কমবে বলে। বিনোদনের দায় কি বাস্তব বেসাতির? মেয়েটা একটু সচেতন হলো এবার, সিউডো লকডাউনের প্রভাবে আশেপাশের দোকান, যাদের এনসিলিয়ারি ইন্ডাস্ট্রি বলা হয়ে থাকে, ধুঁকে ধুঁকে ভিজছে। তার মনে পড়ল মূলত ভিজতে চেয়েই সে পোর্টিকোয় এসে দাঁড়িয়েছিলো প্রথমে, সে চাওয়ায় জোর দেওয়ার কথা তারপর ভুলে গেছে। তার বাবা তিনতলার কেবিনে ক্যনুলা নিয়ে শুয়ে আছে এই মুহূর্তে। এককালের দোর্দন্ডপ্রতাপ বাঙালি উদ্যোগপতি, স্বাভিমানি, নৈতিক শুচিতা রক্ষায় আজীবন কঠোর, গোল্ড মেডেলিস্ট অঙ্কের অধ্যাপক, লড়াকু লাল ছাত্রনেতা (যিনি মানতে পারেননা তার একমাত্র সন্তান বিশ্বাস করে, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম নামের পার্টিটা যারা করে তারা কখনো মার্কস পড়েনি, উই কি আর মানে বুঝে বই এর পাতা কেটে পটি করে?)


আরেকবার মন দিয়ে এনেস্থেশিয়া ভাবতে গিয়ে মেয়েটা বুঝল পুরাতন ব্যাধির মত তার আবার ম্যাকেন্দো মনে পড়ছে। "অরেলিয়েনো, ইটস রেনিং ইন ম্যাকেন্দো"। তার কে আছে যাকে এটা এই মুহূর্তে ফোন করে বলা যায়? নার্সিংহোমের পাশে চার্চ, চূড়ার দিকে তাকিয়ে ক্রাইস্টের নম্বরটা খানিক হাতড়ানোর পর তার রিপুরা জানান দিল, বহুজনেরই প্রার্থিত এই কল। ঠিক এই সময়টায় সে বৃষ্টিকে গুরুত্ব দিতে চাইল অধিক অথবা এও হতে পারে বৃষ্টিই তাকে নির্বাচন করলো। পোর্টিকো ছেড়ে আকাশের নিচে দাঁড়ানোয় এক একটা জলবিন্দু একেকজনের স্মৃতিচারন দিল তাকে। শিহরণ তাকে কোনোদিন মুগ্ধবোধের পাঠ দেয়নি, আজও দিল না। গোধুলিয়ায় প্রথম যে নওল কিশোরটি বিশ্বনাথের গলিফেরতা তাকে এসে বলেছিলো "ম্যায় এক বাত পুঁছ সকতা হুঁ ক্যায়া?" থেকে বিদেশী সেই নীলা চোখের ছেলেটি, যে শেষমেষ তার আত্মজার নামের ভিতর দিয়ে মেয়েটাকে ধরে রাখতে চেয়েছে, অথবা গতকাল রাতে যে সেন্সিটিভ সেলেবটি তার পোস্টকে ভাইরাল করেছে, যে সাহিত্যিক তুলোর মত তাকে আগলে রাখতে চায় জীবনভোর, এছাড়াও যারা তাকে বলে উঠতে না পেরে অলিখিত এক অস্বীকার চুক্তির নৈ:শব্দ্যের সম্মানে বিশ্বাসী হতে বাধ্য হয়েছে, যারা তাকে বুঝতে চেয়ে না পেরে আক্রোশী হয়ে উঠেছে, আরও বহু নাম, বহু মায়া, বহু ঘ্রাণ, অজস্র অজস্র জলবিন্দুর অজুহাতে তাকে উন্মাদ করে দিয়ে গেলো। সে জানলো, সলিচিউডের এনেস্থেশিয়া মাথায়, বুকে আর শরীরে নিয়ে সে জন্মেছে, এই জন্মে সেই নর্সিসিজমকে অতিক্রম করতে পারে এমন পুরুষ এখনো তার গ্রীবা আর পদ্মনালকে একাকার করে দিতে সামনে এসে দাঁড়ায়নি। তিরিশটি বর্ষার আগুন তাকে ভিজাতে ভিজাতে আরও অলীক ও অপ্রতিরোধ্য ধোঁয়ার আবরণ দিয়েছে মাত্র, ভূ-গর্ভের প্লেট যেভাবে অতি ধীরে সরে, সংঘাতের তীব্র প্রার্থনা পুষে।

চিত্রঋণ- অন্তর্জাল 

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

                                   


 চর্যাপদ চর্যাগীতি ও সমীক্ষা



প্রথম পর্ব

অনুসন্ধান


চর্যাপদ বা চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় আবিষ্কার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সমগ্র উনিশ শতক তো বটেই, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত এই অমূল্য ঐতিহাসিক উপাদানটির অস্তিত্ব শিক্ষিত সমাজের অনেকটা অগোচরেই ছিল বলা যায়। যখন দিকে দিকে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার জন্য গজিয়ে উঠছে স্কুল বা প্রতিষ্ঠান এবং তারই সাথে বর্ণপরিচয়, কথামালা, চরিতাবলী ইত্যাদি হয়ে উঠছে বাংলা ভাষাশিক্ষার প্রাথমিক হাতিয়ার তখনও কারো ধারণাই ছিল না বিদ্যাসাগরের পূর্ব্বেও রামমোহন রায়, গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্যের মত প্রমুখ ভাষাপন্ডিত এই বাংলা সাহিত্যেই তাঁদের প্রচুর সৃষ্টি বা নিদর্শন স্থাপন করে গেছেন অন্তরালে, এবং সেইসব সৃষ্টি-কর্মের বহু প্রমাণাদি পুঁথি আকারে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। পরের দিকে রামগতি ন্যায়রত মহাশয়  বাংলা ভাষা ইতিহাস নিয়ে লেখালিখি বা উৎসাহ প্রকাশ করলে, সেই লেখায় কাশীদাস, কৃত্তিবাস কবিকঙ্কণ প্রভূত কয়েকজন প্রাচীন কবির সন্ধান মেলে। এ থেকে একপ্রকার ধারণা উদ্ভব হয় তিনশ বছরের পূর্ব্বে যে কয়েকটি কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে তা কেবল সংস্কৃতের নিম্নরূপ বা সংস্কৃতের অনুবাদ ব্যতীত আর কিছুই নয়। আরও পরে ন্যায়রত মহাশয়ের অনুকরণে আরও কয়েকটি সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় ঠিকই, বলাই বাহুল্য সেগুলির মধ্যে নতুনত্বের ছোঁয়া বলতে কিছুই পাওয়া যায় না। তাই এইসকল ইতিহাস অস্তিত্বের দরুণ আশি শতকে সাধারণ ধারণা ছিল যে বাংলা এমনই একটি ভাষা যা কেবল অনুবাদেই সীমিত, অর্থাৎ, আক্ষরিক ভাষায়- বাংলা ভাষা শুধুমাত্র ইংরেজি অথবা সংস্কৃত সাহিত্যের একটি অনুবাদীরূপ মাত্র।

1858 সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র 'বিবিধার্থ সংগ্রহ' পত্রিকায় 'বঙ্গভাষার উৎপত্তি' নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন সেখানে বাংলা ভাষার উৎসরূপ হিসাবে হিন্দির পূর্বী  শাখাকে নির্দেশ করা হয় এবং আদি নিদর্শন হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় বিদ্যাপতির রচনাবলী। এছাড়াও 1911  সালে প্রকাশিত হয় দীনেশচন্দ্র সেনের 'The History of Bengali Language and Literature', সেখানে বহু বৌদ্ধ প্রভাব সম্পর্কীয় তথ্যাদি সম্পর্কে ধারনা মেলে। যদিও এই তথ্যগুলোর সত্যতা প্রমাণের অভাবে সেভাবে এগুলোর প্রশস্ততা বিচার করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি। তাই ইতিহাসের এই শূন্যস্থান পূরণ ও পূর্ব অনুমিত সূত্রের পুনর্মূল্যায়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থভাণ্ডার। প্রকৃতপক্ষে, যেকারণে নেপাল ও তিব্বতে রক্ষিত বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থের পুঁথির দিকে দৃষ্টি নির্বাপিত হয় সব্বার, সর্বপ্রথম বিশেষ করে  বিদেশী গবেষকদের উৎসাহ এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসঙ্গত বলা যায়, প্রচলিত আছে Brian Hodgsen নামক এক জনৈক ইংরেজের তত্ত্বাবধানে নেপাল থেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বেশ কয়েকটি পুঁথি আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই নাকি তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস রচনা ও শাস্ত্র সম্পাদনার ব্যাপারে গবেষকদের অন্দরে একপ্রকার ঢেউ উঠতে শুরু করে। সেই সূত্র ধরে প্রথমে ১৮৪৪ সালে Eugene Burnouf, পরে Deniel Wright ও Cecil Bendall প্রভূত  গবেষকের নাম একে একে উঠে আসতে থাকে। প্রসঙ্গত, জানিয়ে রাখা ভালো ১৮২৮ সালে সর্বপ্রথম ইংরেজ গবেষক Brain Hodgson নেপাল থেকে সর্বপ্রথম তান্ত্রিকবৌদ্ধধর্ম বিষয়ক তাঁর আবিষ্কৃত পুঁথিগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছিলেন 1784 সালে প্রতিষ্ঠিত স্যার William Jones এর 'The Asiatic Reseaches' নামক পত্রিকাটিতে এবং 1844এ ফরাসি পন্ডিত Eugene Burnouf প্যারিস থেকে প্রকাশ করেন Introduction a I' histoire du Buddisme Indienনামক একটি বৌদ্ধ-ধর্মমূলক গ্রন্থ ও আরেক ইংরেজ গবেষক Daniel Wright তাঁর (Cambraige University) এর জন্য পুঁথি সংগ্রহ করতেও নেপালে যান বলে জানা যায়। এছাড়াও বাঙালি গবেষকরাও এইব্যাপারে মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না, যেমন এক্ষেত্রে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনিও 1882 সালে নেপালে গিয়ে বৌদ্ধ-সংস্কৃত পুঁথি অনুসন্ধান করার পরে 'Sanskrit Buddhist Literature In Nepal' নামে একটি পুঁথির তালিকা প্রকাশ করতে সচেষ্ট হন এবং পরবর্তীতে রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর সরকার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপর বাংলা-বিহার-আসাম-উড়িষ্যার পুঁথিসন্ধান ও সংগ্রহের দায়িত্ব এসে পড়লে সেই সূত্র ধরেই শাস্ত্রী মহাশয় শুরু করেন তার নতুন অনুসন্ধান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দীনতার বিষয়টি বুঝতে পেরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রাজেন্দ্রলালের তালিকা ও নবাবিষ্কৃত পুঁথির ভিত্তিতে নেপালের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৌদ্ধ-সংক্রান্ত নানা পুঁথির ও তথ্যের সন্ধানে সম্পূর্ণ মননিবেশ দিতে থাকেন। এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই দৈনতা থেকে মুক্ত পেতে হলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এইসব বৌদ্ধ উপাদান একান্ত অনস্বীকার্য। তাই বলা হয়, 1886 সালে বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের একটা নতুন নবজাগরণের সূচনা হয়।

                          


  

    বেঙ্গল লাইব্রেরির বৈষ্ণব গান ও সংকীর্তনের বিরাট সংগ্রহের পাশাপাশি জীবনচরিত  ও ইতিহাস সম্পর্কিত পুঁথির সংগ্রহ দেখে তিনি শুধু বিস্মিত হন নি, এই সংগ্রহশালার সম্ভার দেখে তাঁর লিখিত পুঁথির প্রতি তাঁর আগ্রহ বা ঝোঁক অনেকাংশে বেড়ে যায়, যা স্পষ্টভাবে বললে- তাঁর বাংলা ভাষার প্রতি একপ্রকার অমোঘ আকর্ষণ জন্মাতে শুরু করে। যার ফলস্বরূপ আকৃষ্ট হয়ে পড়েন শাস্ত্রী ধর্মঠাকুর সম্পর্কে। তাঁর ধারণা হয়- বৌদ্ধ ধর্মের শেষ দেবতা একমাত্র ধর্মঠাকুরই। তাই এই ধারণা সত্যতা প্রমাণের জন্য মননিবেশ করেন ধর্মমঙ্গল পুঁথির সন্ধানে এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে যান মাণিক গাঙ্গুলীর 'ধর্মমঙ্গল' ও রামাই পন্ডিতের 'শূন্যপুরাণ'। যার ফলস্বরূপ  তিনি মনস্থির করেন নেপালে গিয়ে এই পুঁথি ও তথ্যাদির ব্যাপারে নতুন নতুন অনুসন্ধান শুরু করবেন।
            
সেইমতো, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথমবারের মতো নেপালে যান 1887 সালে, দ্বিতীয় বারের জন্য যান তার ঠিক পরের বছরেই। দ্বিতীয় বারের যাত্রায় লাভ হিসাবে পান 'ডাকর্ণব'  নামে একটি পুঁথি। এই পুঁথির ভাষাটি তাঁর অজ্ঞাত হওয়াও তাঁকে বেশ সমস্যার মধ্যেই পড়তে হয়। যদিও তিনি বিচলিত না হয়ে সেই পুঁথি অবিলম্বে নকল করে নিয়ে আসেন। বিশেষ উল্লেখযোগ্য, সুভাষিত নামে আরও একটি পুঁথির ভাষা তাঁর নজর কারলেও, পরে অজান্তে ইংরেজ পন্ডিত Cecil Bendall সেটি নকল করে নিলে তাঁর এটি হাতছাড়া হয়ে যায়। এছাড়াও 'দোহাকোষপঞ্জিকা' নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁথিও এই ইংরেজ গবেষকের কারণেই নাকি পুনরায় হাতছাড়া হয়েছিল বলে সূত্র মারফত জানা যায়। প্রমাণ আছে,পরবর্তীতে  ঘটা করে বেন্ডেল 1905 সালে সেই পুঁথিগুলোর ভাষাকে Òdifficult Apabhramsa Prakrit” নামে প্রকাশও করেছিলেন। পুনরায় নতুন তথ্য উন্মোচনের আশায় শাস্ত্রী মহাশয় তৃতীয়বারের জন্য নেপাল যান 1907 সালে। এইবার নেপাল গিয়ে তিনি পেয়ে গেলেন তাঁর জ্যাকপট। এই সেই বহুকাঙ্খিত স্বর্ণভান্ডার- বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের পুঁথি 'চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়' ও তার পাশাপাশি খুঁজে পান সরোরুহপাদের দোঁহা ও অদ্বয়বজ্রের সংস্কৃতে রচিত 'সহজাম্নায়পঞ্জিকা' এবং কৃষ্ণাচার্য্যের দোঁহা ও আচার্য্যপাদের সংস্কৃতে রচিত 'মেখলা' নামক প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত টীকা সমগ্র। এই অসম্ভব সৃষ্টির আবিষ্কার সম্পর্কে তাঁর একটি উক্তি এক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ-

" ১৯০৭ সালে  আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানিক নাম 'চর্য্যাচর্য্য-বিনিশ্চয়', উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে ও তাহার সংস্কৃত টীকা আছে। গানগুলো বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম 'চর্য্যাপদ'। আর একখানা পুস্তক পাইলাম তাহাও দোঁহাকোষ, গ্রন্থাকারের নাম সরোরুহবজ্র, টীকাটি সংস্কৃতে, টীকাকারের নাম অদ্বয়বজ্র। আরও একখানি পুস্তক পাইলাম, তাহার নামও দোঁহাকোষ , গ্রন্থাকারের নাম কৃষ্ণাচার্য্য, উহারও একটি সংস্কৃত টীকা আছে। "

বাংলা ১৩২৩ সনে অর্থাৎ ইংরেজি সাল1907-এ আবিষ্কৃত 'চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়' এর পাশাপাশি 'সরোরুহবজ্র' ও 'কৃষ্ণাচার্য্য' নামে দুটি দোঁহাকোষ এবং 1887 ও 1888 মধ্যবর্তীতে কোনো একসময়ে পূর্বপ্রাপ্ত 'ডাকার্ণব' এই চারটি পুঁথি একত্রে নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ' থেকে প্রকাশ করেন একটি সম্মিলিত সাহিত্য সংকলন, যার নাম - "হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা।" যার ফলে এই গ্রন্থ প্রকাশের পর একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বিষয়ক পূর্বের সিদ্ধান্তগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়লো আবার তেমনই অন্যদিকে নেপালের পুঁথির প্রতি ভারতীয় গবেষকদের আগ্রহের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও তার উদ্ভব নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণের প্রারম্ভ হয়েছিল বলা যায়।



ক্রমশ..............

শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                       




মনের হদিশ/ কিছু কথা

_______________________

   প্যারাসাইকোলজি ব্যাপারটা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। যেহেতু সার্টিফিকেট মেলেনি বিজ্ঞানের কাছ থেকে।কূটতর্কে একদিন হয়ত যাব। কোনো মঞ্চে অথবা দূরদর্শনের পর্দায়। আজ লিখতে হচ্ছে তাদের জন্য, যারা আমার কাছে ক্লাস করতে চায়।

  প্রথমেই বলে রাখি , প্রথাগত কাউন্সিলিং আমি করি না। কিছুটা অতীন্দ্রিয় ব্যাপার থাকে। এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। অনুমান করার ক্ষমতা , কুকুর থেকে পিঁপড়ে প্রত্যেকের কম বেশি থাকে। বিপদের গন্ধ পাওয়ার ইন্দ্রিয় আদিম যুগে মানুষের মধ্যে ছিল। যন্ত্র যতদিন কব্জা না করে ফেলেছে, মানুষের অনুমান ক্ষমতা ছিল প্রখর। পশু ইন্দ্রিয় আজো সজাগ। কারণ ? তাদের যন্ত্র নেই। মানুষের ইন্দ্রিয় লুপ্ত হয়নি। শুধু ক্ষমতা কমে গেছে। 

   আমার থেরাপির মূল কথা হল , নষ্ট হয়ে যাওয়া ইতিবাচক অনুভূতি ফিরিয়ে নিয়ে আনা। এটা সময় সাপেক্ষ। অনেকেই সেটা বুঝতে চায় না। চটজলদি সমাধান চায়। বিনাওষুধে , শুধুমাত্র নিজের সাহায্যে নিজেকে ভালো রাখতে পারার নিয়ম জেনে গেলে জীবন আসে ম্যাজিক। দুঃখ কব্জা করে ফেলতে পারলে দুঃখ হয়ে পড়ে অক্ষম। এটা এখন অনেকেই বুঝে গেছেন। অনেকেই ভালো আছেন। তাদের শুভেচ্ছা নিরন্তর ঝরে পড়ছে , এ আমার পরম সৌভাগ্য। 

 এই যে অনুমান করার ক্ষমতা( মোটেই বিরল নয়) অথবা কাউকে দেখে কিছু আঁচ করার, এমনকি তার বিপদ আসছে না সৌভাগ্য সেটাও বুঝে যাওয়া... এগুলো শেখানো মুশকিল। কেউ কেউ ভাবেন বুঝি, মন্ত্র তন্ত্র অং বং টং করতে হয়। কেন এমন ভাবনা আসে? মন্ত্র শক্তির ক্ষমতা আলাদা। সে ছাড়াও ত হয়। উদাহরণ দিয়ে বলছি, যেমন দৌড়তে সকলে পারে, কিন্তু দৌড় বীর হতে গেলে অভ্যাস জরুরি। অভ্যাস যোগ। ।প্রতিদিন বাড়িয়ে তুলতে হবে নিজের এনার্জি। এনার্জি বাড়ানো কি মুখের কথা? শারীরিক ফিটনেস তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম। তেমনি , মন যাতে তীক্ষ্ণ হয়, বোধ যাতে সঠিক হয়, শান্ত থাকতে হয় তার জন্য। মৌন থাকতে হয়। সঙ্গী নির্বাচন ঠিক মত করতে হয়। সঙ্গী যেন বিরক্ত না করে। অযথা সময় নষ্ট না করে। আর যদি করেও, যদি সঙ্গী তেমন হয়েই যায়, খুব বেশি সময় তাকে না দেওয়াই ভালো। ভুল সঙ্গ দুঃখ তৈরির বড় কারণ। 

 নিয়মিত দর্শন আলোচনা করতে হয়। গভীরে পৌঁছতে হয় প্রতিদিন। প্রতিদিন। একদিন ও ফাঁকি দিলে চলবে না। দর্শন হল আলো। প্রথম প্রথম কঠিন মনে হয়, ধীরে ধীরে আত্মস্থ হয়ে যায়। কত কি ই তো আলোচনা করি কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কিছু বোধ নিয়ে আলোচনা করি না। কেন? কেউ কেউ আবার দর্শন বলতে কিছু সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে দেন 😀 আউড়ে দেন মানে নিজেই বোঝেন না। আমি বলি, কথামৃত পড়ো। সব আলো লুকিয়ে আছে ওখানে।❤️

     কাউন্সিলিং শেখানো যায়। কিন্তু অতীন্দ্রিয় বোধ শেখানোর বিষয় নয়। কেউ কেউ ভাবে😀 এইতো জয়তী দির মত ফোনে ভালো ভালো কথা বললেই তো হয়ে গেল। ওটাই তো জয়তীদি করে। 

ভালো শব্দের কোনো বিকল্প নেই, একথা সত্যি। বাতাবরণে ম্যাজিক তৈরি করতে জানে শব্দ। রাজনৈতিক নেতা কি করে? ধর্ম গুরু কি করে? শব্দের খেলাই তো করেন। কিন্তু, শব্দ দিয়ে মনের পরিস্থিতি বদল করতে চাইলে তার মধ্যে কিছু বস্তু থাকতে হবে। টেলিফোনে কথা বললেও মন পড়ে নিতে হবে। বুঝে নিতে হবে, অপর প্রান্তের মানুষের না বলা উদ্বেগ। আপাত স্বাভাবিক কথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে বড় কোনো অসুখের ইঙ্গিত। ধরে ফেলতে হবে। এটা নিরলস চর্চার কাজ। অসুবিধার কি আছে?😀 কঠিন তো নয়। যদি রান্না করতে পারি যদি রূপচর্চা করতে পারি তবে নিজেকে নিয়ে বসতেও পারি। 

  মূল কথা হল, সময় সকলের জন্য আছে কেবল নিজের জন্য নেই! একটা দিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা। আঠারো ঘণ্টা এনার্জি দিচ্ছি, অন্য লোক প্রশংসা করল না নিন্দে... এই ভেবে। 

 নিন্দে যে করার সে করবেই। সোনারথালায় খেতে দিয়ে,নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেও তারিফ জুটবে না। তারচেয়ে একটু তাকাই আমার দিকে। ক্ষয়ে যাওয়া মনের দিকে। লুকিয়ে থাকা শক্তি বাড়িয়ে তুলি। তবে, হয়ে উঠব নিজের ভরসা সেইসঙ্গে অপরের বন্ধু। মনের বন্ধু।

চিত্রঋণ - মলয় দত্ত

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                      






সাইকেল ( নবম পর্বের পর)


১০)

দিন যায় না জল যায়। দেখতে দেখতে দুমাস কেটে গেল সামুয়েলের এই গ্রামে। যেদিন থেকে বুলবুলকে গিটারে হাত দিতে দিয়েছে সামুয়েল, সেদিন থেকে সেই ছোট্ট রুবাইকেও দিয়েছে তার সাইকেলের চাবি। রুবাইও সাইকেল নিয়ে দিব্যি তরতর করে ঘুরে বেড়ায়। যতক্ষণ সাইকেলটাকে ও কাছে পায়, ততক্ষণ যেন ওকে ভূতে ভর করে। কোনোদিকে হুঁশ থাকে না ছেলেটার। অত বড় সাইকেল লেংচে লেংচে টেনে নিয়ে যায়। সাইকেলটাকে ধুয়ে, মুছে তকতকে করে রাখে। আর কাউকে হাত দিতে দেয় না। এদিকে লকডাউন খুলে যাওয়ার সময় হয়ে এলো প্রায়। আনন্দের সঙ্গে দিন গোণা ছাড়া আর সামুয়েলের কিছু করার ছিল না এই সময়ে। এতদিনে এই গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোর কাছে তো বটেই, বড়দের কাছেও সে ঘরের লোক হয়ে উঠেছে। সে এখন প্রায় শুদ্ধ অসমীয়া বলে। আর ছেলেমেয়েগুলোও স্প্যানিশ শিখে নিয়েছে কিছুটা। একটু বড় হয়েছে যারা, তারা কাজ চালানোর মতো স্প্যানিশ বলতে ও লিখতে শিখে নিয়েছে। আর বুলবুল এখন গোটা একটা গানই বাজাতে পারে গিটারে। স্প্যানিশ সুর পারে, নিজের ভাষার গানও পারে এই অল্প সময়ে। বুলবুলের দেখাদেখি আরও দুএকজন উৎসাহ দেখিয়েছিল গিটার শেখার জন্য। কিন্তু বুলবুল কাউকে গিটার ছুঁতে দেয়নি। ও এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ফলে গিটারের মোনোপলি ওর একারই থেকে গেছে। তবুও এই প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর ভেতরে যে এত সুপ্ত প্রতিভা ছিল, সামুয়েল ভাবতে পারেনি আগে। অবশ্য ওদের উসকিয়ে না দিলে এতকিছু হত না ঠিকই। এই লকডাউনের দীর্ঘ দুমাস ওরা খেয়েঘুমিয়ে বাড়িতে কাটিয়ে দিত। লকডাউন উঠে যাবে, সেই আনন্দ যেমন রয়েছে, সামুয়েল চলে যাবে বলে এক্ষণ থেকেই চোরা বিষাদ ছেয়ে যাচ্ছে বাচ্চাগুলোর মনে। সেদিন আচমকাই সামুয়েলের ক্ষুদে রাজকুমারী কেঁদে উঠল। ‘সামুয়েলদাদা তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?’ স্কুলে শেষের হুটোপাটি স্তব্ধ হয়ে গেল আচমকা। সামুয়েল কোনো উত্তর দিতে পারল না। কীই বা বলত ও? যেতে তো হবেই ওকে। টিকিট কনফার্ম হয়ে গেলেই চলে যাবে। এই বিদেশে তো আর সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে না ও! নিজের দেশ, নিজের পরিবার ওকে টানছে ভীষণ ভাবে। কতদিন যে নিজের ঘরে ঘুমোয় না! মায়ের গলা জড়িয়ে গান করে না! বোনের সঙ্গে খুনসুটি করে না! অন্য দেশে অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা যায়? যতই এরা আপন করে নিক না কেন…এবার যাওয়ার সময় হয়েছে তার।

      দেখতে দেখতে সেই প্রতীক্ষিত দিন এসে গেল। দীর্ঘ আড়াই মাস পরে সামুয়েল আজ বাড়ি ফিরবে। চোখের জল আটকিয়ে রাখতে পারছে না ও কিছুতেই। একদিকে বিদায় বেদনা, অন্যদিকে আনন্দ অশ্রু—কে কাকে সামলাবে আজ? বুলবুল কোথায় যেন লুকিয়ে আছে। সামুয়েলের কাছে আসছে না আজ কিছুতেই। রুবাই, সেই ক্ষুদে রাজকন্যে সবাই কাঁদছে। অভিজিৎ আর তার মা তো ঘরের ছেলে বিদায় জানানোর দুঃখে কাতর। পুরো গ্রাম সামুয়েলকে বিদায় জানাতে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়েছে সামুয়েল অভিজিৎকে সঙ্গে নিয়ে। অনেকটা পথ যেতে হবে তাকে। গুয়াহাটি এই গ্রাম থেকে অনেকটাই দূরের পথ। কিন্তু বুলবুলের কাছ থেকে বিদায় না নিলে সামুয়েল যায় কী করে? অগত্যা অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তাকে সেই স্কুলের আটচালায় আবিষ্কার করা গেল। দরজা বন্ধ করে ফুলে ফুলে কাঁদছে সেই কিশোরী। সামুয়েল ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল নিঃশব্দে। তারও বুক ফেটে যাচ্ছে। চোখের জল কষ্ট করে আটকে রেখেছে। সংযত না থাকলে বুলবুলকে সামলানো দায় হয়ে যাবে এখন। গিটারটা বুলবুলের কোলে নামিয়ে রাখল সামুয়েল। ফোলা ফোলা চোখ মুখ নিয়ে বুলবুল মুখ তুলে তাকালো ওর দিকে। সামুয়েল ওর মাথায় হাত রেখে বলতে শুরু করল, ‘আজ থেকে এই গিটার তোমার কাছে থাকবে। এই গিটার আর আমার আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, তুমি ভালো করেই জান। ধরে নাও, আমিই গচ্ছিত রইলাম তোমার কাছে। এবার মন শক্ত করে হাসিমুখে আমাকে বিদায় জানাও। তোমার সামনে এক সুন্দর পৃথিবী রয়েছে। তোমাকে তার উপযুক্ত হতে হবে। এসো, চল এখন আমার সঙ্গে’। চোখ মুছে গিটার কাঁধে নিয়ে বুলবুল সামুয়েলকে বিদায় জানাতে উঠে এলো এবার। রাস্তায় রুবাইকে কাছে ডেকে সামুয়েল সাইকেলের চাবি ওর হাতে দিয়ে বলল, ‘আর এই সাইকেল দিয়ে গেলাম তোমাকে। আমি তোমাদের সঙ্গে রইলাম সারা জীবন। সবার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে। এখন তো পৃথিবীটা ছোট হয়ে এসেছে। আমি সময় পেলেই তোমাদের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলব। আর পারলে সামনের বছর এখানে আবারও চলে আসতে পারি! তোমরা আমাকে যেভাবে ঘরের ছেলের মতো ভালোবেসেছ, তার তুলনা নেই। এবার আমাকে তোমরা হাসিমুখে বিদায় জানাও। চল একসঙ্গে গান গাই আজ’…

Voy a reír, voy a bailar
Vivir mi vida lalalalá
Voy a reír, voy a gozar
Vivir mi vida lalalalá

(আমি হাসতে চাই, আমি নাচতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা

আমি হাসতে চাই, আমি আনন্দে থাকতে চাই

জীবন উপভোগ করছি লালালালা।)

 

                (শেষ পর্ব )

          

অমিভাভ সরকার

 

                                         


বেজন্মা ( অষ্টম পর্বের পর)

বোলপুর সিনেমাতলা নেমে একটা হোটেলে লাঞ্চ করে নেয় কৃষাণ। ভেবেছিল একদিন এখানে থেকে শান্তিনিকেন ঘুরবে… আম্রকুঞ্জ… ছাতিমতলা… সংগ্রহশালা…। কিন্তু রাবেয়ার চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে…। কিচ্ছু ভালো লাগে না তার। এখন অনেক কাজ তার। ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে একবার আলোচনা করতে হবে। সিংজীদেরও বলা দরকার। বড্ড স্নেহ করে তারা। আত্মীয় পরিজন বলতে তো এরাই। বোলপুর স্টেশনের দিকে এগোয় কৃষাণ…।        


স্টেশনে পৌঁছে পরিচিত স্টেশনমাস্টারের খোঁজ করে। জানতে পারে তাঁর এখন সেকেন্ড নাইট ডিউটি চলছে, তাই রাত্রি ছাড়া পাওয়া যাবে না তাঁকে। তাদের কাছ থেকে খবর নিয়ে তিনটে নাগাদ রামপুরহাট-শিয়ালদহ এক্সপ্রেসে রওনা হয়। ট্রেনে বেশ ভীড়, সকলের কপালে সিঁদুর দেখে মনে হলো অধিকাংশ তারাপীঠ থেকে ফিরছে। দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়াল কৃষাণ। মাত্র দুটো দিন, এই দুটো দিনেই কেমন করে যেন উলটপালট করে দিল তার জীবন। একটা সুর শুনে পাশ ফিরে তাকায় কৃষাণ। একটু দূরে ট্রেনের দোলার গেরুয়াবসনে এক প্রবীণ বাউল ঘুংঘুর পায়ে একতারা হাতে গাইছেন;   

‘মনের ভেদ মন জানে না, 

একি কারখানা।

এ মন ও মন করছে ওজন,

কোথা সেই মনের থানা।


মন দিয়ে মন ওজন সই হয়

দুই মনে এক লেখে খাতায় 

তাইবি ধরে যোগসাধনে 

কর গো মনের ঠিকানা…।। 

মন এসে মন হরণ করে 

লোকে ঘুম যায় বলে তারে

কত আনকা নহর, আনকা শহর

ভ্রমিয়ে দেখায় তৎক্ষণা ।।    


শুনতে শুনতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় কৃষাণ কেমন একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। ‘বর্ধমান’…, গান শেষ করেন বাউল। ওয়ালেট বের করতেই একশো টাকা উঠে আসে হাতে। একটু ভেবে বাউলের হাতে একশো টাকার নোটটাই গুঁজে দেয়। “মন ভালো রেখো গোঁসাই”। ‘মনের ভেদ মন জানে না, একি কারখানা। এ মন ও মন করছে ওজন…’। আপন মনে গুনগুন করতে করতে বর্ধমানে নেমে যান প্রবীণ বাউল।             

 

ট্রেন ব্যান্ডেল আসতে নেমে পড়ে কৃষাণ। সেখান থেকে লোকালে হাওড়া হয়ে আন্দুল। আন্দুল স্টেশনে নেমে কাউকে না পেয়ে চায়ের দোকানের মালিকের কাছে খোঁজ নেয় নিত্যযাত্রী বোসবাবুর। তারপর স্টেশন থেকে বাইরে এসে হাইরোডের দিকে এগোয়। রাত্তিরে থাকার জন্য সিংজীর ধাবায় একবার বলে আসা দরকার। এখন আর স্টেশনে থাকা যাবে না, এতদিন পরে জিআরপি-র লোকজন চিনবেও না তাকে।             


বেশ কিছুক্ষণ সিংজীর সঙ্গে খাটিয়ায় বসে পুরনো দিনের গল্প করে কৃষাণ। রাত্রি ন’টা নাগাদ সিংজীকে থাকার কথা বলে স্টেশনের দিকে এগোয়…। এবারে একে একে হকার বন্ধুরা কাজ সেরে আসবে। স্টেশনে আসতেই মানিক’দার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। স্টেশনের এক প্রান্তে এক বেঞ্চিতে গিয়ে বসে দুজনে। একে একে বাদরুল, ওরফে বিল্লু, শ্যাম, নান্টা সকলে হাজির হয়ে যায়। কৃষাণ সব কথা খুলে বলে তাদের।  

“আরিব্বাস!! কৃষাণ, তুই প্রেম কচ্ছিস…? 

“এই চুপ করত, সবসময় ফাজলামি”। মানিকদার ধমকে চুপ করে যায় বিল্লু।  

“দেখ, যা পরিস্থিতি শুনিলাম, তাতে শুধু রাবেয়াকে নিয়ে আসলে হবে না। সব চাপ গিয়ে পড়বে পিসিমার ওপর। আর মেম্বার কালীবাবু কিছু করতে পারবেন বলে মনে হয় না, না হলে…”।       

“ও আর কী করবে, শালাদের কাছ থেকে পয়দা খায় যে…”। বিল্লু তার টিন থেকে মুড়ি মেখে সকলের হাতে দেয়।  

“সেটা হতে পারে, তাই হয়তো সব জেনেও সোজাসুজি প্রতিবাদ করতে পারেন না তিনি। তবে, উনিও বোধহয় চান না বাবেয়া বদমাইশদের পাল্লায় পড়ুক”।     

“চল, সকলে মিলে যাই…” মানিকদা থামিয়ে দেয় বিল্লুকে। 

“দাঁড়া, আগে একটু ভাবতে দে, খুব প্ল্যান করে এগোতে হবে… নে, আগে চা খা…” সকলকে চা দিয়ে আনমনে চুপচাপ বিড়ি টানে মানিকদা।  

আলোচনায় শেষে ঠিক হোল, আগামীকাল শামসুদ্দিনকে বলবে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে। বলবে ভিসা করে এখানে চলে আসতে। তাঁকে নিয়ে লাভপুরে নিয়ে যাবে কৃষাণ। কয়েকজন একটা সুমো ভাড়া করে যাবে বোলপুর বেড়াবার আছিলায়। তারপর সুযোগ বুঝে তাদের নিয়ে লাভপুর হয়ে সোজা এখানে। ততদিনে একটা বাড়ি ভাড়া ঠিক হয়ে যাবে।   

“সে তো অনেকদিনের ব্যাপার…!” মানিকদার কথা শুনে কৃষাণ বলে।   

দেখ, তাড়াহুড়ো করলে সমস্যা আরো বাড়বে। তুই তাড়াতাড়ি কাজে জয়েন কর। শামসুদ্দিনের আব্বা আসার ব্যবস্থা হয়ে গেলে, তুই ছুটি নিয়ে চলে আসবি। তোদের অফিসারকে তোর বিয়ের জন্য ছুটির আবেদন করে রাখ। আজকে কোথায় থাকবি? চল, আমার বাসায় চল। না কোনও লজে উঠবি?” 

“দূর, লজ-টজ ভালো লাগে না আমার। ঠেলায় না পড়লে… তোমাদের সঙ্গে থাকার চেয়ে ভালো কিছু নেই। কত বছর কাটিয়েছি তোমাদের সঙ্গে...। একটু আগে সিংজীর সঙ্গে গল্প করছিলাম। আসার সময় আমি সিংজীকে বলে এসেছি।     

“কৃষাণ, তুই বরং আমার সঙ্গে চল। তোর বৌদি তোকে দেখলে খুশী হবে। আজকেই তোর কথা হচ্ছিল”।    

“না রে বিল্লু, আজ সিংজীর ধাবায় থাকি। আগামীকাল যাওয়ার আগে বৌদির সঙ্গে দেখা করে আসবো” ।  

“তাহলে দুপুরে ওখানেই আমাদের সঙ্গে খাস। আমি সকালের কাজটা সেরেই ফিরে আসবো”। সকলে মিলে কৃষাণকে সিংজীর ধাবা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। তাদের দেখে সিংজী জোর করেই চা আর পাঁপড় ভাজা খাওয়ায়।       

“কৃষাণ, আভি রাতমে ঠান্ড হোতা হ্যায়। তেরে লিয়ে অন্দর বিস্তারা কিয়া। খানা খাকে শো যা”। সিংজী কাউন্টারে যেতেই কৃষাণ শরীর টানটান করার জন্য ধাবার সামনে পড়ে থাকা খাটিয়াতেই করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন পরিশ্রম, টেনশনে চোখ বুজে আসে…।       

ঘুম ভাঙ্গে সিংজীর ডাকে। তাকিয়ে দেখে একটা থালায় রুটি আর তরকা নিয়ে খাটিয়ার বসে সিংজী…। ঘড়িতে প্রায় রাত বারোটা। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে কৃষাণ। 

“স্যরি সিংজী, আঁখ লাগ গিয়া থা”। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে পড়ে কৃষাণ।        

“তেরে লিয়ে আমি বানায়েছি। তেরা তো তরকা ভালো লাগে, তাই…। খা লে বেটা, বহুত রাত হয়ে গেল”। সত্যি, এখানে সকলেই যেন একটি পরিবারের সদস্য…। এঁদের ঋণ সারা জীবনেও শোধ হবার নয়। কথায় বলে ‘যার কেউ নেই, তার ঈশ্বর আছে’। আর মানুষের মধ্যেই যে ঈশ্বরের বাস, তা এদের সঙ্গে না থাকলে বিশ্বাস করবে না কেউ।   

#  

ভোর চারটায় ঘুম ভেঙ্গে গেল কৃষাণের। ধাবার লোকজন তখনও ঘুমিয়ে…। মুখ-হাত ধুয়ে স্টেশনের দিকে পা বাড়ায়। সকাল পাঁচটায় মেদিনীপুর লোকাল ধরে মানিকদা আর বিল্লু। স্টেশনে পৌঁছতেই বিল্লু আর মানিকদাকে স্টেশন কাউন্টারের একদিকে বসে থাকতে দেখে। মানিকদার কেটলী থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে…। পাশে মুড়ির টিন নিয়ে বসে বিল্লু। পেছন থেকে দুজনের গলা ধরে মাঝখানে বসে পড়ে কৃষাণ। প্যাসেঞ্জারেরা মানিকদার কাছে চায়ের জন্য দাঁড়ায়। কৃষাণ মানিকদার সঙ্গে হাতে হাতে যাত্রীদের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। মাইকে ট্রেনের খবর বলতেই বিল্লু মুড়ির টিনের চার পাশে লাগানো স্টিলের গ্লাসে চানাচুর, কাটা পেঁয়াজ, লঙ্কা, তেল, মশলা গুছিয়ে নেয়। ভোর পাঁচটা নাগাদ মেদিনীপুর লোকাল ঢুকতেই  মানিকদা আর বিল্লু উঠে পড়ে…। মানিকদা ট্রেনে স্টোভ-কেটলী রেখে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।   

“এলাম রে সন্ধ্যায় দেখা হবে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো”।       

 “আমি চলি রে…, বারোটার মধ্যে ফিরে আসছি। দেরী করিস না…”। ট্রেন ছাড়তেই চিৎকার করে বলে বিল্লু। 

মেদিনীপুর লোকাল ছেড়ে যেতেই হাঁটতে হাঁটতে সিংজীর ধাবার দিকে এগোয়…। ইতিমধ্যে ধাবার লোকজন উঠে পড়েছে, চুল্লীতে আগুন ধরানো হয়েছে, এলোমেলো হাওয়ায় ধোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশ। এখন শামসুদ্দিনের ডিউটি অফ হবার কথা, ফোন করবো? ভাবতে ভাবতে ফোন করে কৃষাণ।     

“হ্যালো… শামসুদ্দিন? আমি কৃষাণ… এখন কথা বলা যাবে…?” গতকাল রাত্রে বন্ধুদের সাথে আলোচনার কথা, জানায়। সব শুনে শামসুদ্দিন বলে যে, ‘আব্বুর বয়স হয়েছে, এই সব ঝামেলার মধ্যে তাঁর না পড়াই ভাল। তাছাড়া কোনও সমস্যা হলে বাংলাদেশী হিসাবে আব্বু বিপদে পড়তে পারে। তার চেয়ে বরং কৃষাণ নিয়ে আসুক, আব্বু পরে দেখা করে আসবে। সব শুনে খাটিয়ায় চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কৃষাণকে ঐ অবস্থায় দেখে এগিয়ে আসে সিংজী।      

“ক্যায়া হুয়া কৃষাণ? কোই প্রবলেম? ক্যায়া হুয়া আমাকে বোল …”। কৃষাণের পাশে বসে সিংজী মাথায় হাত রাখে। কৃষাণ সিংজীর হাত চেপে ধরে। সব শুনে সিংজী চাপড় মারে কৃষাণের কাঁধে।      

“আরে এহি বাত, কোই চিন্তা নেহি, তেরা সাথ এ গুরুবক্স সিং হ্যায়। ম্যায় লে আউঙ্গা বহুকো। আজ রাত আট বাজে সব কো ইধার বুলাও, আজ সবকা সাথ বাতচিৎ করেঙ্গে…। ‘আরে… মেরা বেটাকে লিয়ে চা লে আও’। কিচেনের এক ছোকরাকে উদ্দেশ্য করে হাঁক দেয় সিংজী।                

#  

ধাবায় একপাশে চৌবাচ্চায় স্নান করে জামাকাপড় পরে দুটো রুটি আর ডিমের ভুজিয়া খেয়ে নেয় কৃষাণ। কাউন্টারে সিংজীর কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে বিল্লু এসে হাজির হয়। কৃষাণের ফোন বেজে ওঠে… রাবেয়ার ফোন। কৃষাণ এক পাশে সরে দাঁড়ায়। বেশ কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কথা হয়। কৃষাণ রাবেয়াকে বলে, একসপ্তাহের  মধ্যেই যেন গোছগাছ করে নেয়। মুরগী আর ছাগলের ঘরের চাবি পড়শিদের কাউকে দিয়ে আসে। বিশেষ করে যাবতীয় দলিল, কাগজপত্র, সার্টিফিকেট যেন সঙ্গে নিয়ে নেয়। আর পিসিমাও যেন তৈরি থাকে, এখানেই তাদের রেজিস্ট্রি হবে। আকবর চাচা দেখা করতে এখানে আসবেন। শামসুদ্দিনের ফোন নম্বর ম্যাসেজ করে রাবেয়াকে।         


রাত্রি আটটার মধ্যেই ধাবায় হাজির হয় সকলে। সিংজী পুরো পরিস্থিতিটা সকলের সামনে রাখে। মানিকদা বলে, ‘শামসুদ্দিন ঠিকই বলেছে। যদি কোনও পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে যেতে হলে বাংলাদেশী ফরেনার হিসাবে শামসুদ্দিনের বাবাকে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাছাড়া ওনার বয়সও হয়েছে। এত চাপ না দেওয়াই ভাল। যা কিছু আমাদেরকেই করতে হবে’। বিল্লু বলে, ‘এই অবস্থায় দেরী করা ঠিক নয়’। নান্টা বলে, ‘তাদেরকে নিয়ে আসার আগে থাকার জন্য একটা ঘর ঠিক করা দরকার। এখানে এসে উঠবেন কোথায়?’ এতক্ষণ সিংজী সকলের কথা  চুপচাপ শুনছিলেন। সকলের কথা শোনার পর তাঁর মতামত দিলেন।   

“আরে কয়েকদিন আমার বাড়িতেই থাকতে পারে। কোনও মতে ঠিক হয়ে যাবে”। বিল্লুর কথা সিংজী সমর্থন করে। 

“বিল্লু ঠিকই বলা, কুছদিন কে লিয়ে হামলোককা ঘর মে হো জায়গা। হামারা ভি একঠো বড়াঘর তো খালি হ্যায়, উখানে আরাম সে থাকতে পারে। হামরা তো দোজন আছি, তেরা ভাবি কা ভি সঙ মিল জায়গা।  

“কৃষাণ, আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে। এক-দুইদিনের তো ব্যাপার নয়”। সিংজীর প্রস্তাবে সায় দেয় মানিকদা।   

“ভাইলোক, ইস বারেমে মেরা কহনা হ্যাঁ কী, আজ শুক্রবার, সোম ইয়া মঙ্গলবার হামলোক ইখান থেকে যাব…। কৃষাণ, ম্যায়, মানিক, বিল্লু অউর বিল্লুকা বিবি। এক জনানা ওদের জন্য দরকার আছে। তো হামলোক হুয়া পাঁচ…। আগর তুমলোগ রাজী হো তো, ব্যবস্থা হো জায়গা। একবার সোচ লো”। সিংজীর প্রস্তাব সকলে সমর্থন করে। যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে একযোগে আপত্তি করে ওঠে শ্যাম ও নান্টা। 

“সব ঠিক আছে। কিন্তু আমরা যাবো না? আমরা বাদ? এটা কিন্তু ঠিক নয় সিংজী…” এদের ভাব দেখে হেসে ফেলে সিংজী…।   

“আরে ভাই, টাটা সুমো ইয়া স্কোরপিও মে বেইঠনেকা লিয়ে হ্যায় সাত আদমী হবে। তার বেশী কী করে হবে, একবার সোচো”। শ্যাম আর নান্টার অবস্থা দেখে বিল্লু প্রস্তাব দেয়…।     

“তোদের মধ্যে কে যাবি বল? তাহলে আমি যাব না। আরে এখানেও তো অনেক কাজ আছে। ওনাদের থাকার জন্য ঘর ঠিক করা, বিছানাপত্র, রান্নার বাসন কেনা…। এগুলি কে করবে শুনি?  

“বিল্লু ঠিকই বোলা…। মগর বিল্লু, তেরা বহু’কো তো যাতে হবে…, তু নেহি জানেসে…”।  

“ঠিক আছে বিল্লু’দা তুমি যাও, বৌদি যাচ্ছে, তোমার যাওয়া দরকার, না হলে বৌদি বোর হবে। আমরা এ দিকটার ব্যবস্থা করছি”। কৃষাণ এতক্ষণ সকলের কথা শুনছিল আর ভাবছিল, কত ভাগ্যবান সে।  

“আমি বলি কী, একটা বাজেট করলে আমার সুবিধা হয়। আমিও এটিএম থেকে কিছু টাকা তুলে রাখতে পারি।”।  

“আরে বেটা উসব বাদমে দেখা যাবে। তু এক কাম কর, শ্যাম অউর নান্টাকে সাথ বইঠকর এক লিস্ট বানা লে। অউর, সামান খরিদ করনে কে লিয়ে ওদের কুছ রুপিয়া দে দেও।     

(ক্রমশঃ)

শর্মিষ্টা দত্ত

                             


খোঁজ  (একাদশ পর্বের পর)
(১২)

অরুণ ফিরে আসার দিনকয়েকের মধ্যে মেয়ের  বাড়িতেই একদিন ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে চলে গেলেন যোগমায়া l সেরিব্রাল অ্যাটাক l কোমরভাঙার পর বার্ধক্যজনিত সমস্যায় শরীরের কলকব্জা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল l ইদানিং ওষুধের ঘোরে সারাক্ষণই ঝিমোতেন l জাগতিক বোধও লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল l তাঁর সংসারে যে কত বড় বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে যাওয়ার আগে তা টেরও পেলেন না l নীরবেই পৃথিবী থেকে মুছে গেল একটা প্রজন্ম l সন্তানদের কাছে অবাঞ্ছিত হওয়ার শুরুতেই তাঁদের মুক্তি দিলেন যোগমায়া l কোনো কোনো মৃত্যু নিকটজনের কাছেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে l বিশেষত সংসারের এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে যোগমায়ার জন্য শোকতাপের অবকাশও ছিল না কারুর l অরুণ জ্যেষ্ঠ সন্তান হলেও মাতৃদায় উদ্ধার করার মত অবস্থায় নেই l অলোক ঘোরতর কমিউনিস্ট, সে এই সব শ্রাদ্ধশান্তির অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে না l রাজশ্রী নিজেই দাহকাজ থেকে শুরু করে পারলৌকিক সব কাজই সামলে নিলেন l  যোগমায়ার সামান্য কিছু চিহ্ন পড়ে রইল তাঁর ঘরে l অরুণকে নিয়ে নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া, পরিচর্যা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন অপর্ণা l তাঁর নিজের শরীরও ভালো নয় l কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর একদিন রাজশ্রী এসে খাটের তলা থেকে মায়ের ট্রাঙ্কটা বের করলেন l বাক্সের ভিতর অপাংক্তেয় কিছু জিনিস l কয়েকটা সাদা থান,  আর টুকরো কাপড়ে বাঁধা অল্প কয়েকটা খুচরো পয়সা আর নোট l ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ঝাপসা কাচের ভিতরে প্রায় সাদা হয়ে যাওয়া যোগমায়া আর তাঁর স্বামীর বিবাহকালীন ফটো l এছাড়াও স্বামীর ব্যবহৃত একটি নিকেলের চশমার ফ্রেম একটা ছোট বাক্সে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা l আরো কিছু টুকিটাকি l যোগমায়ার গচ্ছিত সম্পদ বলতে এটুকুই l অনেকদিন পরে শাশুড়ির ঘরে খাটের ওপর বসে সেই সাদা থানে হাত রেখে কেঁদে ফেললেন অপর্ণা l এই মানুষটির সঙ্গে কোনোদিনই হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি তাঁর l দুজনের মানসিকতার বিস্তর ব্যবধান, সম্পর্কের মধ্যে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে রেখেছিলেন নিজেই l তবু এই মুহূর্তে শাশুড়ির জন্য চোখের জলটুকু মিথ্যে নয় l এভাবেই  সংসারে প্ৰিয় - অপ্রিয় সবকিছুই কখন যেন  জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে l  

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিৎসায় একটু একটু করে সাড়া দিতে শুরু করলেন অরুণ l চিকিৎসা ও ওষুধের প্রভাবে, বাড়ির পরিবেশ আর পরিবারের সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগলেন l এখন অল্পস্বল্প কথা বলেন অপর্ণার সঙ্গে l হ্যাঁ অথবা না বলে মতামত দিতে পারেন l একমাত্র অপর্ণা ছাড়া আর কাউকেই বোধহয় চিনতে পারেন না l চোখের দৃষ্টিটাই যেন পাল্টে গেছে, বড্ড ভয় করে শর্মিলার l বাবার সামনে যায় না বড় একটা l অলোক, শবনম নিজেদের কাজে ব্যস্ত l এক বাড়িতে থেকেও ওদের বৃত্তটা ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছে l রান্নার লোক পুষ্প ছাড়াও মালতী নামে একটি মেয়েকে সারাদিন কাজের জন্য রাখা হয়েছে l মুনমুনের দিকে এখন আর তেমন নজর দিতে পারেন না অপর্ণা, মালতীর মূল কাজ মুনমুনকে দেখাশোনা করা l তাছাড়াও  শবনমের মাও রোজই দুপুরে এসে মুনমুনের কাছে থাকেন l মুনমুন বেশিরভাগ সময় দিদার সঙ্গে নীচের ঘরেই থাকে l আগের মত আর শর্মিলা বা অপর্ণার কাছে ঘেঁষে না l অবশ্য অপর্ণার সময়ও নেই, তবু কষ্ট হয় খুব l মেয়েটা তো তাঁকে এখনও মা বলেই ডাকে ! 
রাজশ্রীও প্রায় রোজই আসেন এ বাড়িতে l শর্মিলার পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন l রোজ বইপত্র নিয়ে বসলেও পড়ায় মন বসে না l এরমধ্যেই টেস্টের রেজাল্ট আউট হল l বাড়ির এই বিপর্যয়ের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে  কোনোরকমে টেস্টে অ্যালাও হলেও ফাইনালের রেজাল্ট অবধারিতভাবে খারাপ হবে এটা যেন ধরেই নিয়েছে শর্মিলা l অবচেতনে মনের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয় l ক্রমশ নিজের ভিতরে গুটিয়ে যেতে থাকে l রাজশ্রী বিষয়টা নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে শর্মিলাকে বললেন 
-- মুন্নি, এবাড়িতে থাকলে তোর পড়াশোনা হবে না l তুই বরং আমার সঙ্গে ও বাড়িতে চল l 
--তোমার তো স্কুল আছে পিসি...একা একা থাকলে আমার আরোই পড়া হবে না l 

এসব বলে তখনকার মত কাটিয়ে দিল শর্মিলা l নিজের বাড়ি ছেড়ে, মাকে ছেড়ে কোনোদিন কোথাও থাকেনি ও l পিসির কোলেপিঠে বড় হয়ে উঠলেও ওই বাড়িটাকে কিছুতেই আপন মনে হয় না ওর l বিকেলে পড়তে গিয়ে মৈত্রেয়ীকে সেকথা বলতেই ও বলল 
-- পিসি ঠিকই বলেছে l ও বাড়ির পরিবেশে তোর পড়াশোনা হবে না l  তুই বরং পরীক্ষার কটা মাস আমাদের বাড়িতে থেকে যা l আমিও  সারাদিন তোর ওপর নজর রাখতে পারব l
 শর্মিলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও কাবেরীকাকিমাকে পাকড়াও করে তখনই ছুটল শর্মিলাদের বাড়ি l কাবেরী অপর্ণাকে বললেন 

--অপর্ণা আমি তোমার দিদির মত, সেই অধিকারে বলছি শর্মিলাকে পরীক্ষা অবধি অন্তত আমি আমার কাছেই রাখব l মৈত্রেয়ীর সঙ্গে থাকলে সারাদিন পড়াশোনার পরিবেশে থাকতে পারবে l সেটা এখন ওর জন্য খুব দরকার l দেখো, এমনিতেই ওর পড়াশোনার যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে l এবাড়িতে ও কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারবে না l  ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে, এই দু - আড়াইমাস আদা- জল খেয়ে পড়লে নিশ্চিত ভালো রেজাল্ট হবে l 

অপর্ণাও বিলক্ষণ বুঝেছিলেন এভাবে চললে মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার l এইমুহূর্তে শর্মিলার জন্য এটাই সবথেকে ভালো ব্যবস্থা l 

--তুমি আমায় বাঁচালে কাবেরীদি l এ কটা দিন বরং মুন্নির দায়িত্ব তুমিই নাও l আমি তো আজকাল ওকে দেখতেই পারি না l 

রাজশ্রী একটু মনঃক্ষুন্ন হলেও মুখে বললেন 

--এটাই বরং ভালো হল l মুন্নি তোর জামাকাপড়, বইখাতা গুছিয়ে নে l এ কটা দিন মন দিয়ে পড় l দেখবি ঠিক ভালো হবে রেজাল্ট l মাঝেমাঝে দু - চারদিন পরপর একবার এসে একটু মাকে দেখে যাস l 

মৈত্রেয়ীর বাড়িতে আসার পরে একটু একটু করে আবার পড়াশোনার মধ্যে ডুবে যেতে লাগল শর্মিলা l মৈত্রেয়ী নিজে পড়তে পড়তেও ওর পড়ার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে l কাবেরীকাকিমা ঘড়ির কাঁটা ধরে ওদের খাবার খাওয়ান l না খেলে নিজের হাতে খাইয়েও দেন l ওরা টেস্টপেপার সলভ করে, উনি রাত জেগে ওদের সঙ্গে বসে থাকেন l মাঝেমাঝে কফি বানিয়ে এনে দেন l বড্ড স্নেহময়ী মানুষটি, নিজের সন্তানের থেকে বেশীই যত্ন করেন শর্মিলাকে l আদরে, শাসনে শর্মিলার সারাটা দিন ভরে থাকে l এ বাড়ির আশ্চর্য মায়াময় পরিবেশে একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাটা ক্রমশ ফিকে হতে থাকে  l পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা একটু একটু করে ফিরে আসে l নিজের প্রতি আস্থাও বাড়ে l রিজ্জুদার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে l সপ্তাহে এক - দুদিন অল্প কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি এলে মায়ের মুখটা আলোয় ভরে ওঠে l 

--মুন্নি, কাবেরীদির এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না l উনি আমাদের দুঃসময়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন ! তুমি কিন্তু কক্ষনো কাবেরীদির অবাধ্য হয়ো না l 

বাবার চাকরি নেই, জমানো টাকাও তেমন নেই l সংসারখরচের বেশিরভাগটা বাবাই দিতেন l  চিকিৎসার খরচ যদিও বেশিরভাগটাই পিসি দেয়, ছোটকাও দেয় কিছুটা l এখন সংসারটাও অলোকদের টাকাতেই চলে l সেজন্য মরমে মরে থাকেন অপর্ণা l সবই বুঝতে পারে শর্মিলা l উপর্যুপরি আঘাতে হঠাৎই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে ও l ছোটকা-কাম্মার নিস্পৃহ আচরণ মাকে কতখানি পীড়া দেয় সেটাও বোঝে l সময় আর পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন বদলায়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণও l শর্মিলা নেই, একা একা যুদ্ধ করতে করতে মা ক্লান্ত l মায়ের চোখের তলায় কালি, দৃষ্টিতে গভীর অবসাদ l ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে যেতে শর্মিলাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করে মা l নিজেকে মনে মনে ইস্পাতের মত ধারালো করে তোলে শর্মিলা l ভালো রেজাল্ট করতেই হবে ওকে l নিজের জন্য তো বটেই, মায়ের জন্যও l কাবেরীকাকিমার বাড়িতে ফিরে আবার ডুবে যায় পড়াশোনার মধ্যে l 
পরিমলকাকু ব্যস্ত মানুষ l পুলিশের চাকরিতে ছুটি পান না বললেই হয় l তবু বাড়িতে থাকলে এক এক দিন সন্ধ্যেবেলা ওদের ডেকে হই হই করে গল্প করতে বসেন l মৈনাকদা থাকলে সেও যোগ দেয় আড্ডায় l গ্রূপ করে ক্যারম খেলা হয় l কাকিমা চায়ের সঙ্গে নানারকম জলখাবার বানিয়ে আনেন  l এম বি বি এস পাশ করে সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছে মৈনাকদা l বাড়ি কাছে হলেও হোস্টেলেই থেকে যায় বেশিরভাগ সময় l ওর বন্ধু -সহকর্মী কল্লোলদাও আসে l কল্লোলদাকেও খুব ভালোবাসে কাকিমা l সবসময় বলে
-- কল্লোল আমার আর একটা ছেলে l 
কল্লোলদার বাড়ি আসানসোলে, মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে মৈনাকদার সঙ্গেই থাকে l ভালো কিছু রান্না করলেই কল্লোলদাকে ডেকে পাঠায় কাকিমা l  এ বাড়ির পরিবেশটা অনেক খোলামেলা, অনেকটা শর্মিলার চন্দননগরের দাদুর বাড়ির মত l.ঘণ্টাখানেকের আড্ডার পর ফ্রেশ হয়ে আবার পড়তে বসে ওরা l 
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অনেকটাই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল শর্মিলা l মৈত্রেয়ীর ধারেকাছে না হলেও প্রিপারেশন একেবারে খারাপ হয়নি l অন্তত পাশ করার চিন্তাটা নেই l এই ক মাস ক্রমাগত টেস্টপেপার সলভ করিয়ে আর নিজে পরীক্ষা নিয়ে মৈত্রেয়ী ওকে অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছে l ভাগ্যিস মৈত্রেয়ী আর কাবেরীকাকিমা ছিল ! ঈশ্বর আছেন কি নেই জানে না শর্মিলা l তবে তিনি বোধহয় কাবেরীকাকিমার মতই দেখতে ! 

ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয় l ওদের সিট পড়েছে তালতলার একটা স্কুলে l পরিমলকাকু গাড়ি করে ওদের পরীক্ষার সেন্টারে ছেড়ে দিয়ে আসেন l প্রতিদিন দুটো করে পেপার l মাঝখানে টিফিন ব্রেকে কাবেরীকাকিমা আসেন l জোর করে ডাবের জল, মিষ্টি খাইয়ে দেন l প্রিপারেশন অনুযায়ী পরীক্ষা ঠিকঠাকই হচ্ছে শর্মিলার l নিজের সম্পর্কে এর থেকে আর খুব বেশি কিছু আশা করে না ও l বিকেলে ফেরার সময় ওরা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে l পরীক্ষা দেওয়ার পর মৈত্রেয়ী আর পেপার নিয়ে কোনো আলোচনা করতে দেয় না l অ্যাডিশনাল বায়োলজি পরীক্ষার দিন হল থেকে বেরিয়েই ওরা দেখল কল্লোলদা দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের বাইরে l 

(চলবে )