রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১

পিয়াংকী

                               


  


বাতাসে বিষাদের সুর।মায়ামায়া আকাঙ্ক্ষা, কোথায় যেন একটা নেই-নেই আহুতি। মনের ভেতরঘরে জল,বাইরের শরীরে কচুপাতার আবরণ। কিভাবে যেন দশমীও পেরিয়ে গেল।হুস করে ছুটে গেল ট্রেন।আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম প্ল্যাটফর্মে, জানি আবার ফিরবে আসছে বছর। এখন লক্ষ্মীঘট কচুপাতায় পুঁটিমাছ আর ইঁদুরের মাটি দিয়ে নিয়মকানুন, এখন কাঁসার থালায় বাটি সাজিয়ে দশব্যঞ্জনে খাওয়াদাওয়া পর্ব।


আসলে এ সব আয়োজনই, কিছু ভুলিয়ে রাখা কিছু  ভুলে থাকার পদ্ধতি। মরসুম উৎসবের,মহল্লায় আহার বাহারের তোড়জোড় 





এসব নিয়েই গরম বাহার এসে পৌঁছল ষোলতম পর্বে।দশমীর দিন বাড়িতে এলেন নন্দাজামাই।শাশুড়ী মা গত হয়েছেন প্রায় এগারো বছর। কিন্তু জামাই আদরে ভাটা পড়তে দিই নি কোনদিন। আজ যাদের জন্য এই থালা সাজালাম তারা অক্ষয় হোন জামাইবাবু ডাকে,জামাই-আদরে



 দশমীর থালায়...


১.গোবিন্দভোগ ভাত ধোঁয়া ওঠা

২.কাঁচালঙ্কা ঘি লবণ 

৩.মাছ ভাজা 

৪.রাঁধুনি মুসুর 

৫.মুসুরপেঁয়াজি

৬.কাতলা কালিয়া

৭.চিকেনকষা

৮.ড্রাইফ্রুট চাটনি

৯.রসগোল্লা 

১০.মিষ্টি দই




গরম বাহার।আজ ষষ্ঠদশ পর্ব।

সোনালী চক্রবর্তী

 

                     


আঞ্জুমান ২





"সাংকাশ্য নগরীর এখন কী নাম আর্নেস্তো?"



-- "প্রবারণার তো এখনো অনেক দেরী তথাগত, আজ হঠাৎ ?"



" 'বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়' যদি শ্রমণদের কোনো একদিন বলে এসে থাকি 'চরত্থ্বে ভিক্ষবে চারিকং', নিজে আজ তার ব্যতিক্রম হবো? নিজেই না বললে খানিক আগে আদর্শকে হত্যা করেছে আমার আর তোমার শরীরকে? তোমায় প্রত্যক্ষ করতে হবে না তোমার আদর্শের পরিণতি? অন্ততঃ আমি মহাপরিনির্বাণ নিয়েছিলাম ব্যক্তিগত নির্ধারণে আর তা প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতির আগেই। কিন্তু আর্নেস্তো, তুমি তো আজও সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু ভ্রমে। সব পেরিয়ে তোমায় আমি কবিই তো দেখি। আর কোন উন্মাদ বিপ্লব আনতে এমন প্রেমিক হতে পারে? চাই না আঁশটুকুও থাকুক, তাই আজই। তাকাও... স্বধাকে দেখতে পাচ্ছ?"




-- " পাচ্ছি। ভূতগ্রস্তের মতো ভাঙা ঘুম হাতে করে বসে আছে। প্রথমটা কিছু বোঝেনি। ধীরে আতঙ্ক তার ডানার মধ্যে মুড়ে নিচ্ছে, সংজ্ঞা মুচড়ে উঠছে "




মহকুমা মফস্বলটি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতরাষ্ট্রে, সুতরাং কিছুমাত্র বিস্ময়ের নয় তার সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অক্সিজেন প্ল্যান্টটির দূরত্ব চুরাশি পূর্ণ আট কিলোমিটার। একটি মাত্র জাতীয় সড়ক (এন এইচ চৌত্রিশ, বর্তমানে বারো) যা দিয়ে দুটি অঞ্চল যুক্ত, সেটিই উত্তরবঙ্গে পৌঁছানোরও একমাত্র স্থলমাধ্যম প্রায়শই অতি বর্ষায় যার অন্তর্গত কিছু ব্রীজ ভেসে ও ভেঙে যায় এবং জলস্রোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাকি ভূ-খণ্ড থেকে। বর্ষা ব্যতীত তাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া প্রতিদিনের কোটি খানেক যান কল্পনা করে মেঠো পথের গোরুর গাড়ি তাদের তুলনায় কতটা সৌভাগ্য পোষণ করে আর অবশ্যই প্রার্থনায় থাকে কবে পুরোপুরি এই স্থলজ অসভ্যতা থেকে নদীমাতৃক সভ্যতায় ফিরে যাওয়া যেতে পারে। এ নরক থেকে ত্রাণ দেবে এমন পুত্রাণের আশা "দেহি দেবী" মন্ত্রেও উচ্চারণ করা পাপ, এমত স্বধারও বিশ্বাস। ট্র‌্যাফিক আইন যারা রক্ষণাবেক্ষন করেন তারা জানাতে ত্রুটি রাখেন না ইমার্জেন্সি সার্ভিসগুলির জন্য সড়কে সর্বদাই অগ্রাধিকার থাকবে যেমন এম্বুলেন্স, বেবিফুড, লাইফ সেভিং ড্রাগস ইত্যাদি কিন্তু এই আইনের নির্দেশিকায় যে 'সড়ক' শব্দটির অস্তিত্ব আছে "ইতি গজ"র মতো করে যা সমগ্র আইনটিকেই প্রহসনে পরিণত করেছে তা জানার বা জানানোর কোনো দায় তাদের থাকে না। এ রাজ্যে তুখোড় আন্তর্জাতিকতায় ক্ষমতার পায়ের নিচে লাল কার্পেট পাতা, দামী মৃতদেহের সদগতিতে হাজির গ্রিন করিডোর, দফতরের দেওয়ালদের পরানো থাকে নীল জার্সি... আর যাদের মুখে রক্ত উঠিয়ে রোজগারের অংশ থেকে কেটে নেওয়া ট্যাক্সে এই লাল সবুজ নীল আতসবাজি তাদের জন্য 'পূর্ত দফতর' নিতান্তই ডাইনোসর বা ডোডো পাখি। মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দূরের মহানগরীতে পৌঁছতে বা ফিরতে দিনের সিংহভাগ সময়কাল কাটিয়ে দেওয়া স্বধার কাছে জন্মইস্তক এই অভিজ্ঞতা নিত্যকর্ম পদ্ধতির মতোই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু কিছুক্ষণ আগের ফোন তাকে যে খবর দিলো তাতে সে ফুটন্ত তেল আর জ্যান্ত আগুনের মধ্যের পার্থক্য স্পষ্ট বুঝতে পারল। রিফিলড অক্সিজেন সিলিন্ডারের যে ট্রাকটি প্রতিদিন সন্ধ্যায় সদরে ঢোকে, ডিফারেন্সিয়াল ভেঙে যাওয়ায় আজ কতক্ষণ পর আসবে সংবাদ নেই। নার্সিংহোমের মজুদ থেকে নীলাদ্রি আর মাত্র ঘন্টা দুয়েক সরবরাহ পাবেন তার ক্যনুলায়, বাকিটা ঈশ্বর।



" কিন্তু তথাগত, আপনি এই পরিস্থিতি দেখিয়ে আমায় কী বোঝাতে চাইছেন? আমার আদর্শ এখানে আঘাত পাচ্ছে কোথায়? "



-- " বড় অধৈর্য হয়ে পড়ো তুমি আর্নেস্তো, বালক স্বভাব। যা দেখাতে চাইছি তা আমায় প্রশ্ন করে জানতে হবে না। প্রসববেদনা উঠলে কি ধাইমাকে জাগিয়ে তুলতে হয় আসন্নপ্রসবাকে? "





প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ আছে যেমন প্রতিটি ক্রীড়ার নিজস্ব অনুশাসন, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব বিধান আর প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব ব্যবধান। সোশ্যাল মিডিয়া কোনো ব্যতিক্রম কি? যারা এটিকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান বলে স্বীকার করে নেয় তারা মানবে এরও নিজস্ব ব্যাকরণ, অনুশাসন, বিধান, ব্যবধান সবই বর্তমান। নিজস্ব গণ্ডিতে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিকে তাহলে কেন প্রকাশ করা যাবে না নির্দ্বিধায়? অন্ততঃ স্বধা এমনই জানত। সে যেমন নীলাদ্রির নার্সিংহোমে এডমিটের খবর জানিয়েছিলো ঠিক তেমনভাবেই তার সঙ্কটও। একটি সিলিন্ডারের অভাবে যে তার বাবা তার চোখের সামনে ডাঙায় তোলা মাছ হয়ে যাবে এই সাদা ও সরল সত্যকে সে ভিক্ষার আবেদনে পোস্ট করেছিলো স্নায়ু সামান্য নিয়ন্ত্রণে আসতেই। 




স্বধার প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়নি। তার অতি সংক্ষিপ্ত বৃত্তও প্রায় হাজার দুয়েক শেয়ারে তার আবেদন পৌঁছে দিয়েছিলো সেলেব, সাহিত্যিক প্রশাসক মহলে। প্রত্যেকেই পূর্ণোদ্যমে তাকে সাহায্যের চেষ্টা করেছিলেন। ফল এসেছিলো মন্ত্রবৎ। আধ ঘন্টার মধ্যে সায়রের ফোন তাকে জানিয়েছিলো প্রশাসন সহ বিভিন্ন মহল থেকে ইডেনের কেবিন ওয়ানকে নিয়ে এত উৎকণ্ঠার কৈফিয়ত তাকে দিতে হচ্ছে যে সে সমস্যায় পড়ছে। সায়রের মালিকানার অন্য নার্সিংহোমগুলিতে ক্যারিয়ার পাঠিয়ে সিলিন্ডার আনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বধাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কোনো সাহায্য চাইবে না, এর বিনিময়ে সায়র ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকলেন নীলাদ্রিকে পরিষেবা সংক্রান্ত কোনো অভাবে না পড়তে দেওয়ার। অতি সহজ চুক্তি। একপক্ষে নীলাদ্রির আয়ু, বিপরীতে ইডেনের নিরাপত্তা। যে পরিমাণ আলোড়ন এই মুহূর্তে স্বধার পোস্টকে ঘিরে শুরু হয়েছে, কেন নার্সিংহোমের অধীনে থাকা সত্ত্বেও পেশেন্ট পার্টির ফরেন হেল্প লাগবে এই ইস্যু তুলে, তাতে ইডেন ঘোরতর বিপদে। চরম স্বার্থপর স্বধা, নীলাদ্রির মুখ স্মরণ করে চোখ বুজে কথা দিয়েছিলো- ভবিষ্যতে ইডেনে তার চোখে যাইই পড়ুক, যাইই ঘটুক যে কারোর সঙ্গে, একমাত্র নীলাদ্রির প্রসঙ্গ ব্যতীত সে প্রত্যেককে এবং সবাইকেই অগ্রাহ্য করবে-  "মাস্টারমশাই, আপনি কিছু দেখেন নি"। কতো যে ডিল হয় প্রতিটি পলে এই সংসারে, কতো শতরঞ্জ... তবুও দ্যূতক্রীড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই গান্ধার যুবরাজকে স্মরণ করে ইতিহাস... এ বড়ো দুর্ভাগ্যের। 




"আর্নেস্তো, যেটুকু দেখলে তা এক রোপণ উপাখ্যান মাত্র। সব বীজের নিয়তিতে মহিরুহ থাকে না, কিছু বিষজ হাহাকারও ধারণ করে। পোখরান মনে পড়ে? আমি হাসছিলাম তাই না? ভারতরাষ্ট্র তার কূটনৈতিক তুরুপে পৃথিবীর ষষ্ঠতম শক্তিশালী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করলো, তার দায় কার - স্মাইলিং বুদ্ধ - আমারই না? আজও দেখবে। তাকিয়ে থাকো..."



--" তাকিয়েই তো আছি তথাগত কিন্তু এখানে কী করে আমার ভ্রম ভাঙার কাঠামো গড়া হবে সে চালচিত্র এখনো অব্দি পেলাম না। আমি অনুমান করছিলাম আপনি মৌলবাদ কীভাবে মহামারী হয়ে উঠছে এই অতিমারি পীড়িত উপমহাদেশেও সেই নিয়ে কিছু বলবেন। আচ্ছা খেয়াল করেছেন, জাত নির্বিশেষে মৌলবাদীদের নিজেদের মধ্যে কী প্রগাঢ় মিল? অন্ধত্ব ভিন্ন এদের দ্বিতীয় ধর্ম থাকে না, পৈশাচিকতা ভিন্ন দ্বিতীয় ধর্মাচরণও নয় অথচ এদের চামড়ার নাম 'ধার্মিক'। কী পরিহাস না? আমি এও ধারণা করছিলাম তথাগত আপনি মার্কস নিয়ে হয়তো বলবেন। "রিলিজিয়ন ইজ দ্যা ওপিয়াম অব দ্যা পিপল"- এই বিকৃত, খণ্ডিত কোটেশনের মূল ও পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি তুলে হয়তো স্বচ্ছ করে দেবেন কেন মৃত্যুমুহূর্ত অবধি মার্কসের গলায় ক্রুশের চেনটি ছিল। এও বলবেন পশ্চিমবঙ্গের রক্তাভ জারজেরা জনগণকে এতটাই অশিক্ষিত ভেবেছিলেন যে তারা ধরেই নিয়েছিলেন কেউ মার্কস পড়ে না, বোঝে না, জানে না। ফলে হাতের যাবতীয় মাদুলি ও তাবিজদের যত্ন করে সাদা পাঞ্জাবির হাতায় ঢেকে, তিন দশকেরও বেশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করে তখ্ত অধিকারে রেখেছিলেন "



--"যা তুমি নিজেই বোঝো তা যদি নতুন করে তোমাকে দেখাতে যাই তবে যে 'বোধি' শব্দের অর্থ 'নির্বোধ' হয়ে যায় আর্নেস্তো। নীরবতা পৃথিবীর ভয়ংকরতম শীতল মারণাস্ত্রের নাম। কিছুক্ষণ না হয় তারই অনুশীলন করলাম আমরা? এসো... বেশী নয়, বুদ্ধের আত্মার নাম পরিমিতি... নিপ্পন আলো হয়ে ওঠা অবধি, এসো"





"Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people."

রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২১

পিয়াংকী

                               



আজ তেইশে আশ্বিন, আপামর বাঙালির প্রিয়তমা শারদোৎসবের সূচনা হয়ে গেল বিরাট এক আনন্দযজ্ঞের মধ্য দিয়ে,  আজ শুভ মহাপঞ্চমী,যদিও পঞ্জিকা তিথি নক্ষত্র অনুযায়ী হিসেব বা হিসেবের গরমিল ভুলচুক, শাস্ত্রমত অথবা জনজোয়ার। তবু আমাদের প্রাত্যহিক দিনগোনা আর  যাপনে পঞ্চমী-আলো।


আজ রবিবার, যথারীতি আমি চলে এসেছি সৃ প্রকাশনের সাপ্তাহিক রান্নাব্লগ নিয়ে। তবে এই উৎসব আবহাওয়ায়  আজ কোনো রেসিপি নয়।আজ ঘরোয়া উদযাপনে পঞ্চমীর দুপুরভোজ


কাঁসার থালায় রয়েছে


বাসমতী ভাত

কাঁচালঙ্কা ঘি

উচ্ছেভাজা

ইলিশ মাছের মাথা ভাজা

ইলিশ ভাজা

মাছের তেলের বড়া

লাউখোসা ঝিরি

লাউউচ্ছে তিতো ডাল

আলুসেদ্ধ 

বেগুনভাজা 

পাঁপড়ভাজা

বেগুন কালোজিরেবাটা ইলিশঝোল

ইলিশভাঁপা

চাটনি 


সকলে ভালো থাকুন।শারদীয়া শুভ হোক

তিস্তা

                      




বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা...



৬/
বেঁচে থাকাও এক দক্ষতা লতিফা। আমি আগাছার কাছে শিখেছি, প্রতিবার ছেঁটে ফেলবার পরেও কতটা জেদে আরো বৃহৎ জায়গা জুড়ে  ভরিয়ে ফেলতে পারা যায় নিজেকে!


কী কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছিলো আমার চোখের পাতা, আজ আর কিছুতেই মনে করতে পারি না। পুরনো একটা কাঠের দরজার পিছনে ফেলে এসেছি আমার গতজন্ম। এমব্রয়ডারি করা কুশন, পেল্লাই এক জানলা আমার শোয়ার ঘরের, আরমকেদারা, কিছু সাবেকি আসবাব এবাং জল রঙে আঁকা একটা ফ্যামিলি অ্যালবাম। কাউকেই চিনতে পারি না। শুধু দাউ দাউ একটা শিখা মনে পড়ে। একটা বিস্মৃত ছায়া এবং একটা শৈশব!

পেঁচার চোখের মতো অন্ধকার প্রিয়তা নিয়ে আমি পৃথিবীতে ফিরে এসেছি আবার। একে অপরের উদ্বিগ্ন এবং অধৈর্য হাতের তালুর ওপর জ্বলন্ত মোমের ড্রপলেট ফেলছি গোটা গোটা রাত!  এ এক অদ্ভুত উন্মাদনা! তুমুল প্রশান্তি! যৌনতার বিপরীতে আর এক অপার যৌনতা! রাতকে তো আটকে রাখা যায় না! জাদুকরী ছায়ার মতো সে জেগে ওঠে। তুমি অপরিহার্য হয়ে ওঠো আমার ভিতর এবং তোমার ভিতরে আমি। অথচ কী আশ্চর্য দেখো, আমরা মিথ্যে বলি। প্রতারণা করি। বিভ্রান্ত করি একে অপরকে। কারণ আমরা আড়াল খুঁজি। কারণ আমরা জানি– " আমি"-টুকু ছাড়া আমাদের কাছে আসলে আর কিছুই অপরিহার্য নয়।

বিশ্বাসঘাতকতা মানে কী, জানো লতিফা? বিশ্বাসঘাতকতা হলো– প্রতিশ্রুতিময় শান্ত একটা হত্যাকাণ্ড। ব্রতের বন্ধ চোখে বোহেমিয়ান অন্ধ নদী! আজকাল চাঁদ সহ্য করতে পারছি না কিছুতেই।

অপরিমেয়তা ভেঙে যাচ্ছে ক্রমে...


( ক্রমশ)


শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

         


ইলুশিও



তুমি দেখো অকালমৃত্যু, আমি জানি বিচ্ছেদের আতঙ্ক কতদূর তীব্র হলে প্রেমিকের করতলে হত্যারেখা জাগ্রত হয়- আমাদের এক অদ্ভুত সংস্কার, যে কোনো শব্দের বহুমুখীনতাকে আমরা জেদে অস্বীকার করি অথবা যে উপেক্ষার প্রয়োজন ছিলো বন্দিত্ব আরোপের প্রক্রিয়ায়, তা বরাদ্দ হয় ঝাঁকের কৈ হতে গিয়ে, লালন ভাসেন লালনের জলে, আবাদহীন জমি পড়ে থাকে রামপ্রসাদী খরায়। কমলিনী নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন বহুক্ষণ ধরে (এই ইথারে কাউকে স্মরণ না করা অব্দি সে এসে অনধিকার চর্চা করে না) । যদি শরীরে প্রাণের অভাবের পরিভাষা 'মৃত্যু' হয় তবে হৃদে নয় কেন? কালরেখা প্রতিটি আয়ুতে ভিন্ন হলে অকালের সংজ্ঞা কী? যদি আত্মরক্ষার্থে হত্যা আইনসিদ্ধ হতে পারে তাহলে আজও ইউথেনেশিয়া অস্বীকৃত কেন? এত প্রশ্নের ক্ষত যে উদ্ধারণ পালার বিবেক পলাতক। আজ দেখতে যাবেন স্বধাকে, এই স্ফুরণে এখন লেডি ম্যাকবেথও যদি তার সঙ্গে কফিতে আসে, খুব ক্ষতি? কার ক্ষতি?


"মরলে ভাই? বেশ... এ রাসের ঘোর ভাঙাবো না আজ, ভাঙবেও না"


কমলিনীর তো সুখের কথা হবেই, স্বধার গ্রীবায় অভ্রান্ত স্কারলেট, চলনে গর্ভিণী কাছিম। তাকে সমাজ যারপরনাই ভৎর্সনা তো করতোই নাগালে পেলে এই মুহূর্তে রাবাবের যে তারে তার আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে পাপ সাব্যস্তে, কিন্তু তিনি তো কমলিনী, একশো আট তার সংস্কারে। তার মানসী আজ এমন আশ্লেষে যা পেতে প্রতিটি অবতার শরীরে, ঔরস-যোনির চক্রে, কোটি কোটি জন্ম ধরে মাথা ঠোকে শ্রী ভগবান।


নাড়িতে যে নৌকা ছিঁড়ে ভঙ্গুর পদ্ম কিছু রসস্থ থেকে গেলো, ঘাতক রাজহাঁস সে ঘুণ বিস্মৃত হলো না- তত্ত্বগত অভিজ্ঞান আর প্রকৃত উপলব্ধিতে যে ফারাক তাকে আসমান জমিন বলে নিতান্তই লঘু করে ফেলা হয়, আসলেই তারা দুই মেরুর। প্রতিলিপি বা ছবি কল্পনায় অরোরা বেরিয়ালিস ভাবাতে পারে কিন্তু তা বিশ্বরূপের বিদ্যুত সঞ্চালনে ব্যর্থ। অদ্ভুত ঘোরের ভিতর ঘাড় গুঁজে ভাবছিলো স্বধা। তাকে শীতল রক্তের সরীসৃপ বলে ব্যঙ্গ শুনতে হয় বিস্তর, একেবারেই তাপ সহ্য করতে পারে না বলে অথচ গত কয়েক ঘন্টা সে প্রায় ফার্নেসের ভিতর ছিলো বলা যায়। অব্যবহার্য-পরিত্যক্ত জিনিস বোঝাই একটা ঘর যাকে গুদাম বললে বিন্দুমাত্র নামকরণ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। স্বেদবিন্দুর স্রোত ছাড়া চন্দন পালঙ্কের থেকে ব্যবধান বোঝেনি তো অথচ এই প্রলয়, প্রবল প্রার্থিত হলেও তার প্রস্তুতি ছিলো না কোনো, পরবর্তী ধারণাও, ঠিক এইখান থেকেই তার বিস্ময়যাত্রা। 


কোথাও একবারের জন্যেও স্বধার দ্বন্দ্ব আসেনি এতোদিন শৈবলিনী-কমলিনীর আধ্যাত্মিকতা আর ট্যাঙ্গো সালসার উন্মাদ আবেগের মধ্যে। দুইই ছান্দ্যোগ্য, দুইই এক সত্যের কথা বলে, শকট ভিন্ন, পথ এক। প্রথমটি মূলাধার-স্বাধিষ্ঠান-নাভি-হৃদ-বিশুদ্ধ-আজ্ঞা-সহস্রারকে জাগ্রত করে সূক্ষ্মতায় বিলীনে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়টি নির্মেদ আধারকে ভেঙেচুরে মিলন ও মুক্তি বিন্যাসে শরীরকেই অতিক্রম করে চলে। কোথায় বিরোধ? বাউলাঙ্গে রজ-রক্তও তো সেই দিকই নির্দেশ করে। সবই 'ইত্থুসে ব্রহ্ম'। এই মতবাদ স্বধার স্নায়ুতে বিশ্বস্ত আশ্রয়ে ছিলো ফলত সে শরীরকে কোনোদিন অস্বীকারের চেষ্টামাত্র করেনি, অবদমন এক আত্মঘাত মাত্র জেনে অপেক্ষা করেছে। অথচ তবুও আজ মনে হলো সে কিছুই জানতো না এতদিন, একে চন্দ্র থেকে চন্দ্রবিন্দু, কিছুই নয়।


শ্বেতপাথরকে জড়িয়ে থাকো আগুনের সাপ, দেখো নাভি থেকে কিছু ব্যথা ফ্লেমিংগো হয়ে উড়ে যাচ্ছে শেষ সন্তের খোঁজে- নিশ্ছিদ্র যন্ত্রণা স্বধার সর্বশরীরে। সেই অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে পশমে মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্টারলিউড শ্রান্তিতে, এই ক্ষণে তার অনুপস্থিতি। দংশন... এতো নিষ্ঠুর হয়? বজ্রের শক্তিতে বেঁধে রাখা উর্দ্ধবাহুদ্বয়ের ভিতর মাথা থাকলে, শ্বাসরোধী চিৎকারটিও কি নিস্তেল প্রাপ্তির? তার অতলে প্রোথিত হচ্ছিলো যার নৃশংস স্তম্ভ, উপসংহারী তন্দ্রায় তাকেই অসহায় পেয়ে এতো আদরের আলপনা কীভাবে আঁকলো সে? শরীরে এভাবে মায়ামেঘ ঘনায়? এইই কি সেই বিশালাক্ষীর থান শৈবলিনী যাকে নির্দেশ করতেন পঞ্চভূতের ফাঁদ নামে? কাঁদছে স্বধা আপাতত... শৈবলিনী দেখছেন কুয়াশার আলোয়... ভাঙছে, নামছে, অঘোর বর্ষা...


যখন শারীরিকভাবে পুরুষ নারীকে চায় অথবা নারী পুরুষকে, সেই আকর্ষণে বহু স্তরবিন্যাস থাকে, শ্রেণীভেদও, কোনোটিই বিচারাধীন নয় কারণ যে কোনো শরীর আসলেই এক আশ্চর্য আলাদিন। জাদু কি প্রদীপে থাকে? সম্ভব? প্রতিটি মানুষের ভিতর বসত করে যে দুর্দম শক্তি সেই তো রূপকে চিরাগ। যে বোঝে সে খোঁজে, যে বিশ্বাস করেনা, পায় না, এতো জলবৎ অঙ্ক মাত্র। শরীর নিয়ে এতো শুচিবায়ুগ্রস্ত যারা, একবারও যে কেন তারা ভাবেনা- "যদৃচ্ছা লাভ"। তেষ্টাকে প্যারামিটার ধরলে আরও সহজ হয় ধারণের আদল। জলের সন্ধানে কেউ পুকুরে অভ্যস্ত, কেউ খোঁজে নদী, যার তৃষ্ণা মেটেনা সে ডোবে, তলিয়ে যেতে যেতে এল ডোরাডো। আর বাকি অংশের কিছুই লাগেনা, বন্ধ বোতল থেকে প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়া, সুতরাং বিচার খাটে না, খাটতে পারে না। অযথা উৎকর্ষ অপকর্ষ ন্যায় অন্যায় নিয়ম নীতির খাপ। 


কিন্তু আজ একথা স্বধা নিশ্চিতভাবেই বলবে যেহেতু শরীরের দূরত্ব শেষ হওয়ার ঠিক পর থেকে টান বিদ্ধংসী হতে শুরু করলো সুতরাং গন্তব্য "দ্যা থার্ড শিপ"। যুক্তি সাজাচ্ছিলো সে সাদা কালো চৌষট্টি খোপে। এখানে ভিজে যাওয়া তালুতে চুমু রাখতে তোলপাড় এসেছে, তুরপুন নখে তৈরী হওয়া আঁচড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে সাধ গেছে, বরাবরের সম্বোধন 'তুই' অতর্কিতে বার কয়েক 'তুমি' হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরের মানুষটা বীজতলার পরেই যেন পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছিন্নভিন্ন করে চলে যাওয়ার পর বার্তা এসেছে "বুকে আয়, এবার ঘুমো, ঘুমিয়ে পড়, মাথায় হাত দিয়ে রেখেছি"। বারবার প্রশ্নেরা এসেছে "শরীর ঠিক আছে? ঠিক করে কথা বল, শরীর কি ঠিক আছে?" সে উত্তর দেয়নি কারণ এই উৎকণ্ঠায় শরীর যতটুকু থাকে তার থেকে অযুত মাত্রায় বেশী থাকে শরীরের অপ্রাসঙ্গিকতা। 


এখন মণিমালা'কাল। বারিধারা শঙ্খ শরীরের হাঁসুলি বাঁক ছুঁলে অনুপ্রবেশ বোধ হচ্ছে। স্পর্শের স্মৃতি- যারে হেরিলে এ দেহলতা তাবিজ বোধ হয় যেমত। হাওয়ায় বৃন্দাবনী সারং উড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সেই অনন্ত লম্পট। অজস্র ময়ূরের পালক উড়ে বেড়াচ্ছে দিগন্ত বিস্তারে। স্বধার মনে করতে ইচ্ছে করলো তার নাম যিনি লিখেছিলেন "নারী নরকের দ্বার"। তিনি কি কৃষ্ণভক্ত ছিলেন? জানা নেই তার। তিনি সম্ভবত ময়ূরও দেখেননি। স্বধা হেসে উঠল। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতিবিদটি প্রতারকই তো ছিলেন। ফেরেননি গোকুলে না? কেনই বা ফিরবেন? অথচ নশ্বর শেষ মুহূর্ত তক স্বর্ণমুকুটে শিখিপাখা যে কেন গুঁজে রাখলেন? স্টাইল স্টেটমেন্ট? যেভাবে ক্রাইস্টের ট্যাটুর ভিতর দিয়ে ইদানীং নিপুণ শৈল্পীতে আঁকা থাকে বিলাভেডের নাম, আপাত অদৃশ্য। "বুঝে লহো মন যে জানো সন্ধান"। শ্রীমতির যোনিচিহ্ন আজীবন মস্তকে ধারণ করে মহাভারত সৃষ্টি আর দ্বাপর ধ্বংসের লীলা করে গেলেন যাদবকুলপতি অথচ কেউ টেরটিও পেলো না। স্বধাকে যে নীল নীল দহনে আজ ছেড়ে গেলো সে তবে কে? কেদার মনে পড়ছে তার। ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে উত্থিত ব্যপনে কস্তুরীঘ্রাণ। শুভ্র পাথরে আছাড় খেয়ে ভেঙেচুরে যাচ্ছে অজস্র পিতলের ঘন্টাধ্বনি। কৃষ্ণসর্পটি কাকে আঁকড়ে আজ প্রস্তরীভূত হলো?

সুবীর সরকার

            


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


১৩.
তামারহাটের ভেঙে যাওয়া হাটের বাইরে আসতে আসতে সিকান্দার মিস্তিরি তার ঝাঁকড়া চুল নাড়াতে নাড়াতে বেশ মজাদার এক ভঙ্গি তার দীঘল শরীরে বহন করে আনতে থাকে আর কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হয়েই গানের দু এক কলি কিংবা গেয়েই ওঠে_
"ও কি মাহুত রে
মোক ছাড়িয়া কেমনে যাইবেন
তোমরা হস্তির শিকারে"
এই গানের হাহাকারের মতন সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দ্রুত লয়ে।গঞ্জ বাজার খেত খামার আর মানুষের ঘরবাড়ি পেরিয়ে এই গান তার সুরসমেত মিশে যেতে থাকে গঙ্গাধর নদীর মস্ত বালার চরে।
সিকান্দারের চোখ ভিজে ওঠে।এই জীবন এই জীবন মায়া নিয়েই তো আবহমান বেঁচে থাকা মানুষের।
সিকান্দার হাঁটতেই থাকে।লিলুয়া বাতাসে দোল খায় সিকান্দারের মাথার বাবরি চুল।
ফাঁকা প্রান্তরে সে আচমকা দু তিন পাক নেচেই ওঠে আর ঝুঁকে পড়ে নুতন গানের ওপর_
"বিনা বাতাসে ভাসা
ঢোলে রে"
সিকান্দার সিকান্দার হয়েই থেকে যায়।দূরে ক্রমে আবছা হয়ে আসে তামারহাটের ভরসন্ধ্যাবেলা।
১৪.
গঙ্গাধরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সিকান্দার মিস্তিরির
শরীরের পুলক সহসা ভেঙে যায়।তার প্রাচীন কালের কালো পাথরের মত কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে। সে কি তবে কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়!
সিকান্দার আসলে নৌকো বানানোর দক্ষ এক কারিগর।আর এই জল ও জলার দেশে ধনী বল জোতদার বল জমিদার বলো বা গৌরীপুরের রাজাই বলো,নৌকো বানাবার কাজে প্রায় সারা বছরই ডাক পড়ে সিকান্দারের।প্রায় পঞ্চাশ বছর জুড়ে এই কাজ করে চলেছে সে।এই জনপদ তাকে সিকান্দার    মিস্তিরি বলেই জানে।চেনে।একসময় সিকান্দার কালু বয়াতির দলে সারিন্দা বাজাতো।তার সারিন্দা কত কত ভরযুবতী নারীকে উন্মনা করেছে!কত নারীকে এক সংসার থেকে অন্য সংসারে ঠেলে দিয়েছে!কত চেংড়া কে বাউদিয়া করেছে!তার কোন ঠায় ঠিকানা নাই।
তাকে দেখলে এখনও কত মানুষ মজা করে গেয়ে ওঠে_
"কি ডাং ডাঙ্গালু বাপই রে
নাঠির গুতা দিয়া"
তবে কি সিকান্দার তার সারিন্দার জীবনের কথা ভাবছিল!না কি গয়েশ্বর ধনীর জোতজমি আর বাইচের নাও তাকে আরো আরো এক ভাবনার জটিলতায় ঠেলে দিচ্ছিল!

সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০২১

পিয়াংকী

                      



ঝটপট চিকেন 




আজ রবিবার, চলে এলাম রান্নাবান্না নিয়ে। আসলে প্রতিদিনের মেনু ঠিক করে সেটাকে রূপদান করাটা সবচেয়ে কঠিন কাজ একজন রাঁধুনির পক্ষে,তিনি পুরুষ হতে পারেন তিনি একজন মহিলা হতে পারেন,কিন্তু যিনি এই কাজটা করেন একমাত্র তিনিই জানেন এর কীইইই মহিমা।একই রান্না রোজ যেমন ভালো লাগে না ঠিক সেভাবেই রান্নায় প্রতিদিন ফিউশন ক্রিয়েট করলে  নস্টালজিয়ায় আঘাত আসে।এই ধরুন, ছোট থেকে আপনি পছন্দ করেন মৌরলা মাছের টক খেতে অথচ নতুনত্ব কিছু করার নামে রোজই আপনার রান্নাঘরে সজ্জিত হচ্ছেন সাহেব মেম।


তাই একদিন চলুন সব রেসিপিবই বন্ধ করে দিই,অফলাইন হয়ে যাই ইউটিউব থেকে।রাতে চুপচাপ শুয়ে ভাবি ছোটবেলায় কোন খাবার কিভাবে আমাদের মা ঠাম্মা বা পিসি জ্যেঠিরা করে করে খাওয়াতেন


আজ আমি তেমনই একটা চিকেন প্রিপারেশন করেছি যেটা একসময় আমার মেজো মাসীর শ্বশুর রান্না করতেন,আজ দুপুরে সকলে যখন খাচ্ছিল আমি ভেসে যাচ্ছিলাম ফেলে আসা নব্বইয়ের দশকে 


এক কেজি মুরগির মাংস চার চামচ পেঁয়াজ বাটা এক চামচ রসুনবাটা আধ চামচ আদা বাটা, কাঁচালঙ্কাবাটা  সাদাতিল পোস্ত চারমগজ কাজুবাদাম কিসমিস  একসাথে অল্প দুধ দিয়ে বাটা...এই সমস্ত উপকরণ একসাথে মেখে ঘন্টা দুয়েক ম্যারিনেট করে রেখে এরপর কড়াইয়ে রিফাইন্ড অয়েল আর বাটার দিয়ে গরম হলে এলাচ দারচিনি লবঙ্গ তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে মেখে রাখা মাংস দিয়ে অল্প আঁচে কষাতে থাকলেই মাত্র কুড়ি মিনিটে তৈরি হয়ে যায় ঝটপট চিকেন


গরম ভাত বা রুটি পরোটা লাচ্ছা... সবকিছুর  সাথে দুপুর বা রাতে পারফেক্ট জুটি এই ঝটপট চিকেন


করে দেখতে পারেন কিন্তু একবার 🙂




রবিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২১

বিতস্তা ঘোষাল

                   


একা হওয়ার যুদ্ধ 


একটা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলছে
এ যুদ্ধে রক্তক্ষরণ নেই, নেই বন্দুক
কামান গোলাগুলি
এখানে শুধু নির্জনতা
গাঢ় অন্ধকার চাদর বিছিয়ে 
অপেক্ষা করছে 
অপেক্ষা করছে 
কখন পাশের ছায়াটা বলবে
এসো নির্জন থেকে আরও একা হই

সুবীর সরকার

                              


১১।
'ধওলি রে মোর মাই
সুন্দরী মোর মাই
দোনো জনে যুক্তি করি চল পলেয়া যাই'

গঙ্গাধরের পাড়ে পাড়ে চরে চরে সেই কত কত যুগ ধরে গোয়ালপাড়ার মেয়েরা এই গান তাদের কণ্ঠে তুলে নিয়ে কি এক হাহাকারের সুরে সুরে তাদের শরীরে নাচ জাগাতে জাগাতে জীবনের আবহমান এক আর্তি ছড়িয়ে দেয়।দূরের মাঠপ্রান্তরে তখন বিকেলশেষের  মায়া।মায়ায় মায়ায় বুঝি আস্ত এক জীবনের ঘোর।গানের দেশে নাচের দেশে হেমন্তের হিমের দেশে গানভরা এক জীবনের গল্প প্রখরতার উত্তাপ ছড়াতে থাকলে আবার ঘুরে ঘুরে গান নেমে আসে মরণ ও জন্মের এই দুনিয়াদারির ভিতর-
'নাল টিয়া নাল টিয়া রে তোর ভাসা নলের আগালে/বিনা বাতাসে ভাসা ঢোলে রে'
১২।
এইসব চলতে থাকে।ভরা হাটের ভেতর থেকে এক পেশীবহুল দীর্ঘ শরীর নিয়ে বেরিয়ে আসে নাজিমুদ্দিন ওস্তাদ।সে তার জীবনের গল্পের দিকে একপর্বে আমাদেরকে প্রবল টেনে আনবে।আমরা নুতন করে শুনে নেব চর দখলের লড়াই আর হাতিক্যাম্পের গল্প।বিষ্ময় নিয়ে শুনতে থাকবো কিভাবে গান আর বাজনা আর নাচ দিয়ে বুনো হাতিদের পোষ মানানো হত কুমারসাহেবের জঙ্গলবাড়ির সেই ক্যাম্পে।
নাজিমুদ্দিন তখন গাবুর বয়সের চেংড়া।আব্বার সাথে রূপসীর জমিদারের লেঠেলবাহিনীর হুকাতামাকের দায়িত্ব তার উপর।পাশাপাশি মুন্সি চাচার কাছে লাঠি চালনার তালিম নিচ্ছে।আর ফাঁক পেলেই গঙ্গাধরের কাছারে কাছারে জল ভরতে আসা সুন্দরী কইন্যাদের সাথে রঙ্গরস করা আর খোসা নাচের মত গেয়েও ওঠা-
'আন্ধ্যারে ধান্দারে নাচবা নাকি দুলাভাই
দুলা তুই হ্যাচাকের বায়না দে'
এইসব দেখে জরিনা আবেদা হাসিনা ফুলেশ্বরীদের কি খলখল হেসে ওঠা।তারাও কখনো গানে গানে প্রতি উত্তর দিত-
'ফাতেরা রে ফাতেরা
বগরিবাড়ির ফাতেরা
এত্তি ক্যানে আসিলু"

কি অন্যরকম জীবন ছিল তখন।আলো ছিল।স্বপ্নের ভেতর খেলে বেড়াতো হলখল মরিচের খেত।আর সেই নদীপাড়ের জীবন থেকেই তো সে তার জীবনে টেনে এনেছিল জরিনাকে।
হায়রে জীবন!সে বারবার তাকে ডুবিয়েই মারলো এই ধানপাটকামলাকিষান আর ভরা সব হাট পাচালির ভিতর!

রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পিয়াংকী

                        




গতকাল যাহা গোলারুটি আজ তাহাই প্যানকেক 


একটা আলসে দুপুর, ঝিমঝিমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলা। একটা ছোট্ট শালিক কাকভেজা হয়ে বসে আছে পাতার আড়ালে...এসব দেখতে দেখতে কখন যে  লাঞ্চটাইম চলে এল টেরই পাইনি।কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে বিড়ালের মত ঘুরঘুর করছি,আচমকা চোখ পড়ল কৌটোঘরের তৃতীয় তাকে।এখানে আটা ময়দা ব্যাসন ওটস চালগুঁড়ো এসব রাখা থাকে। দেখা মাত্রই মাথায় কিলবিল করে উঠল খাদ্যপোকারা।

     


একটা বড় ডিপ বাটি নিলাম।সেখানে চারচামচ করে ব্যাসন ওটসগুঁড়ো আর আটা, দু'চামচ করে ময়দা কর্ণফ্লাওয়ার এক পিঞ্চ বেকিং সোডা স্বাদমতো নুন দু'চামচ চিনিগুঁড়ো নিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিলাম, এরপর  একটা ডিম একটা কলা অল্প দুধ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে মাঝারি ঘনত্বের ব্যাটার তৈরি করে নিয়ে একটা ননস্টিক প্যানে দু'ফোঁটা অলিভ অয়েল ব্রাশ করে তৈরি করে রাখা মিশ্রণ কিছুটা ঢেলে গোল করে ঘুরিয়ে নিয়ে একটা ঢাকনা দিয়ে পাঁচ মিনিট গ্যাসের আঁচ কমিয়ে রাখলাম।এরপর ঢাকা খুলে অপর দিক উল্টে দিয়ে আবার দু'মিনিট।  


মা খুব ভালো গোলারুটি করত। ঝাল হোক বা মিষ্টি মায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মা নিজেই।আজ যাকে আমরা প্যানকেক বলি বহুবছর ধরেই বাংলার রান্নাঘরে সে ই ছিল গোলারুটি। 


এর সাথে সাইড ডিশ হিসেবে খেলাম  খাকড়ি গুড়।এখন আপনারা বলবেন এটা কি বস্তু? এর খায় নাকি মাথায় দেয়?আমি বলব এটা দারুণ লোভনীয় পদ।যারা বাড়িতে ঘি তৈরি করেন তারা জানবেবই ঘি ছেঁকে নেবার পর ছিবড়ে অংশটা পড়ে থাকে, অনেকেই গরম ভাতে বা মুড়ি দিয়ে ওটা খান,আমি খাকড়িটার সাথে একটু গুড় মিশিয়ে একটা প্যানে একদম লো স্টিমে ক্রমশ নেড়ে তৈরি করেছি খাকড়িগুড়।


গোলারুটি বলুন বা প্যানকেন, খাকড়ির সাথে জমে গেল বৃষ্টিধোঁয়া একাকী লাঞ্চ।.

            


জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                         


                                                                    



অশান্তি 😌 থেকে শান্তি😊

💕💕💕💕💕💕💕💕💕

  মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হল অশান্তি। এ এক ভয়ঙ্কর রোগ। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে এই রোগের শিকার। মহামারীর চাইতে অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। অশান্তিতে যে ভুগছে, সে সবসময় চাইবে অপরজন তার অসুবিধাটা বুঝুক। চুপ করে থাকলেও তার শরীর হতে বিচ্ছুরিত হয় অশান্তির আলো, যা পরিবার বন্ধু এবং সমাজ করে তোলে অন্ধকার। 

💕💕💕💕

অশান্তির সমস্ত কারণের পিছনে বাস্তব সম্মত কিছু ভিত্তি থাকে। কোনো কিছু অকারণ হয় না। সেই কারণ বলতে না পারা বা বুঝতে না পারার সঙ্গে লড়াইতে ক্লান্ত মানুষ, সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য, নিজের এক কাল্পনিক দুনিয়া তৈরি করে, সেটা ঠাকুরঘর হতে পারে, গানের ঘর হতে পারে, লেখার টেবিল অথবা পরকীয়া। ধীরে ধীরে সেই কাল্পনিক দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে পড়ে, আর মুক্ত হতেই চায় না, এমন ও দেখা গেছে, সেই দুনিয়ায় কিছু মানুষজনের দেখা পায় সে। অর্থাৎ, মনের স্থিতি তখন নষ্ট হতে চলেছে। 

আর, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ শরীরের মধ্যে সৃষ্টি করে না না রোগের। ক্যান্সার সহ  সুগার প্রেসার বহু রোগের কারণ অশান্তি থেকে উৎপন্ন নেগেটিভ এনার্জি।  নষ্ট করতে থাকে কাজের উৎসাহ উদ্দীপনা আনন্দ। অকারণ কান্না পায়, দুনিয়া ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে আসে।

😊😊😊😊😊😊

আগেই বলেছি, অশান্তি অমূলক নয়। থাকে কিছু তো ঘটনা থাকে। প্রথম কারণ আমি বলব , কথা। শব্দ ব্রহ্ম। কথার শক্তি প্রচন্ড। শব্দবাণ রক্তাক্ত করে দিতে পারে মানুষকে। পরিবারের একটি কথা, ফেসবুকের একটি পোস্ট ... বদলে দিতে পারে আগামী কিছু ঘণ্টা। কথার আঘাত সামলে ওঠা খুব মুশকিল। বিশেষত, কুৎসা রটনা শুনলে মন খারাপ হয়। কুৎসা মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। ফলে, কেউ কাজ ছেড়ে দেয়, কেউ আত্মহত্যা করে। তাহলে কথা একটা কারণ। এবার, দিনের শুরু থেকে রাতের ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত শুধু মাত্র ভালো কথা শুনব এটা হতে পারে না। মনে রাখতেই হবে, বাজে কথা ভেসে আসবেই। স্বামী সন্তান ভার্চুয়াল জগৎ... টুক করে খারাপ কথা এসে নাড়িয়ে দেবে মনের স্থিতি। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভালো কথা তোষামোদি কথা মন উৎফুল্ল করছে, কুৎসা মন খারাপ করছে। দুটো অভিঘাত আসছে বাইরে থেকে। এবার আমার করণীয় কী? সুতরাং, সকালে উঠে সবচেয়ে আগে আয়না থেরাপি করে নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে: আমি শক্তিশালী একজন মানুষ। আজ যে কথাই আসুক, আমার সুবিধা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ অথবা বর্জন করব। সারাদিন দেখতে হবে অপরের মুখ তাই আয়নায় আগে নিজেকে দেখি, নিজেকে তৈরি করি তারপর দেখব অপরে কি বলে! কুৎসার আয়ু বেশিদিন থাকে না। বিচলিত হলে বরং কুৎসার রটনাকে ইন্ধন দেওয়া হবে। 

এই থেরাপি খুব কাজে দেয়। টানা কয়েকদিন করলে তফাৎ বোঝা যায়। 

 *****

অশান্তির আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল অবদমন। চেপে রাখা। অনেক কিছু আমরা চেপে রাখতে বাধ্য হই, যৌনতা থেকে জীবনের অসফল কিছু মুহূর্ত চেপে রাখি সযত্নে। এই চেপে রাখার ফলে ভিতরে ভিতরে বাড়তে থাকে অশান্তি। এই চেপে রাখা কিন্তু ঘুন পোকার মত। তিলে তিলে শেষ করে দেবে। নাহ্, বাইরের কাউকে বলতে না পারলে, নিজেকে বলা যাক। নিজেকে বন্ধু করে তুলতে হলে, 5 মিনিট সময় দিতেই হবে। এবং, জিজ্ঞেস করতে হবে কোথায় হচ্ছে গন্ডগোল। আজকাল এটা ট্রেন্ড, নিজেকে ব্যস্ত প্রমাণ করা। কেবল বলে যাবে, এক ফোঁটা সময় নেই অথচ অনর্থক চ্যাট করার সময় আছে। কি হবে নিজেকে  5 মিনিট দিলে? চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটবে। পরিণত হবে। 5 মিনিট শারীরিক ব্যায়াম যেমন শক্ত করে শরীর, তেমনি মনের ব্যায়াম পুষ্টি জোগায়, পরিণত করে,  ঘটনাটার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে দেখা যাবে, চেপে রাখা ঘটনা নিজের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে ঘটনাকে কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তার একটা উপায় বার হয়। না হলে, অনর্থক উত্তেজিত মন ক্লান্ত অবসাদ আচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। এই সময় একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে পারলে আরো ভালো।

*******

আপোষ অথবা কম্প্রোমাইজ , অশান্তি সৃষ্টির বড় কারণ। আপোষ করে চলতে হবেই, নাহলে সংসারে থাকা মুশকিল। কিন্তু, একটা সীমার পরে মন আর নিতে পারে না, তখন শরীরও বিদ্রোহ করে। আপোষ করে চলতে ভালো লাগে না, কথায় কথায় মন চায় , মুক্ত বিহঙ্গের মত বেরিয়ে পড়তে। যদিও, বিহঙ্গ ও মুক্ত নয়, তাকেও আপোষ করতে হয়, সুতরাং, ব্যাপারটাকে ইতিবাচক নজর দিয়ে দেখতে হবে। ওই যে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে চলার প্রক্রিয়া, সেই শক্তিমান চিন্তা শক্তি সাহায্য করবে, আপোষ করেও কি করে নিজেকে সুন্দর এবং ভালো রাখা যায়, সেটা করতে। মনে রাখতে হবে, অশান্তি হল ধোঁয়া, আর স্ট্রেস হল আগুন। 

শুরু থেকে অশান্তির উৎস খুঁজে বার করে তার উপর কাজ না করলে ধীরে ধীরে সেটাই পরিণত হবে মারণ দায়ী স্ট্রেস এ। 

*******

অশান্তি থেকে আসে অবসাদ। মনের নিজেরও কিন্তু ইমিউন পাওয়ার আছে , আছে অরা অর্থাৎ প্রচুর পজিটিভ এনার্জি নিয়েই আমরা জন্মায়। প্রবল অবসাদের আক্রমণে ক্ষয় হতে থাকে এনার্জি। মন দিশেহারা হয়ে পড়ে, ডিসিশন নিতে ভুল করে ফলে আবার অবসাদ আসে। এইখানে বলব, দুই ভুরুর মাঝখানে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ টিপে রাখুন। এটা একটা মারাত্মক থেরাপি। যেখানে যখন ইচ্ছে করে নেওয়া যায়। অবসাদে খুব কাজে দেয় ওম মন্ত্র কানে শোনা অথবা মুখে উচ্চারণ করা, দিনে দশবার। অবসাদের সূচনা হলেই এই থেরাপি প্রয়োগ করুন। ভয়ঙ্কর কিছু হলে কিন্তু তখন ডাক্তার আর ওষুধ।

******

আলোচনা শেষ করার আগে বলি, অন্যের উপর সুখ নির্ভর করে না কিন্তু দুঃখ নির্ভর করে। জীবনের নব্বই ভাগ অমুকের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছি, বাইরের প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে অশান্তির বীজ, এইখানে থেরাপি হ'ল, বাইরে নিয়ে যখন চলতেই হবে, তখন মন আর বাইরের মাঝখানে একটা পাঁচিল তৈরি হোক। প্রতিদিন ধ্যান করলে, প্রতিদিন একটু একটু করে আত্মশক্তির উন্নতি করলে, বাইরে থেকে ধেয়ে আসা ঝড় বৃষ্টি খুব বেশি ভেঙ্গে ফেলতে পারে না , মনের দুর্গ। প্রতি রাতে না হোক, কিছুদিন অন্তর অন্তর এক জায়গায় নিজের জন্য কিছু পজিটিভ বার্তা লিখে রাখি। যে সময়টা গালে হাত রেখে চিন্তা করছি, অথবা অমুকের সঙ্গে চ্যাট করে হা হুতাশ  করছি, সেই সময় নিজেকে দিয়ে, নিজেকেই শোনাই, আমি অমৃতপুত্র। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না। 


 💕💕💕💕💕💕

সামনে আসছে বিশ্বশান্তি দিবস। গোটা বিশ্ব হল আমার মন। তাকে প্রতিদিন যত্ন করুন। নিজের চারিদিকের প্রতিরক্ষা গড়ে তুলুন। অশান্তির ঝড় থেমে গিয়ে পাবেন সুন্দর নির্মল জীবন।

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                       


মেটামরফসিস 





অবশেষে এক আশ্চর্য ছায়াসম্ভব আলো আমায় নিষ্কৃতি দেয়- বেতস সুষুম্না ভিজে উঠছে স্নানজলে, শৈবলিনী চোখ বুজে সদ্যোজাত তাপে স্বস্তি খুঁজছিলেন অথবা আঁকতে চাইছিলেন। একাই যে পথ পেরিয়ে এলেন এতোদিন, যার শুরু ছিলো যৌথতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই, এমনও বলা যায় যৌথতার নিমিত্তেই মন্ত্র দিয়ে গেঁথে যে জীবন নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিলো, শুধু কি তার একারই দায় ছিলো তাকে ধারণের? বহমান রাখার ? এমনকী হয়তো শেষ সমাগত, এই শ্বাসেরও? প্রশ্ন আসে না আর। পথ দীর্ঘ হলে তার ক্লান্তি পথিককে গন্তব্য প্রসঙ্গে উদাসীনতা দেয়, যে কোনো দীর্ঘতর দৈর্ঘ্যের এইই সাফল্য। 




খুব সহজ ছিলো না। অনভিজ্ঞ ষোড়শী ছিলেন। সতেরোতে মা, উনিশে দ্বিতীয় সন্তান, তেইশে কাশের রঙে প্রায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এও এক রহস্য। যে মেয়েটি লাল রঙ ভালোবেসে বড় হলো, আমিষ গন্ধ ছাড়াও যে ভাত মাখা যায়, বিশ্বাস করতে শিখলো না, তার নর্ম সহচর পঞ্চভূতে বিলীনের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঙ সেই অন্নঘ্রাণই তার কাছে নিষিদ্ধ, কী করে যে এই ফতোয়া দেওয়া যায়...কই জায়া বিয়োগে তো এমনটি হয় না, এমনকী প্রভু-ভৃত্য পরম্পরাতেও নয়, তাহলে এই অদ্ভুত নীতি শুধুমাত্র এক ব্যতিক্রমে কেন? শৈবলিনী এভাবে ভাবেননি, তার সন্তানেরা ভেবেছিলো। ধ্রুপদী সুন্দর মা'কে বোধ হওয়া ইস্তক শুধুই শুভ্রতায় দেখতে দেখতে তাদের ক্ষোভ এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিলো বিস্তীর্ণ বাগান আলো করে থাকা জুইঁ আর কুন্দ ঝাড়ের একটি ফুলকেও রোদ্দুর ওঠার পরে গাছে দেখা যেতো না। ঋজু ব্যক্তিত্ব অভেদ্য প্রাচীর হয়ে তার সঙ্গে তার সন্তানদের অনাবিলে বাধা হয়ে থেকেছে বরাবর। মা'কে তারা তাদের হাস্য পরিহাসের অংশে পায়নি কখনো। ভাবতে ভাবতে শৈবলিনী ভিজে ওঠেন ভিতরঘরে। তিনি অপরাধী কি? বিশাল এক জীর্ণ অট্টালিকা, অকালপ্রয়াত স্বামীর অপরিকল্পিত সামান্য সঞ্চয় দিয়ে দুই সন্তানকে যে নারীর একা হাতে 'মানুষ' করে তুলতে হয়েছিলো সত্তরের দশকে, চৈতন্যে পুঁতে দিতে হয়েছিলো অর্থের সঙ্গে আভিজাত্যের কোনো সম্পর্ক থাকে না, থাকে আত্মাভিমানের- এই দর্শন, শুধু সেইই জানে নিরেট গাম্ভীর্য কোনো বর্ম বা মুখোশের মতো আত্মরক্ষার অধিক প্রত্যাঘাতের নাম। এ বাসরে ছিদ্রের অধিকার তিনি দেবতাদের দেননি ফলত দানবেরা অনুপ্রবেশের পথ পায়নি। 



মাটি যে কতদূর ভারী ঠেকলে কেউ স্বেচ্ছায় জলজ হতে চায় শৈবলিনী সেদিন টের পেয়েছিলেন যেদিন তার বাইশ বছরের ছেলে ইণ্ডিয়ান নেভির  নিয়োগপত্র হাতে মায়ের অনুমতি নিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। শৈবলিনী বন্দরের থেকে বেশী বাতিঘর হতে চাওয়ায় সে বাধা পায়নি কোনো। তিনি জানেন, সামান্য বিরোধ প্রত্যাশিত ছিলো মায়ের তরফ থেকে স্বয়মের, অপত্য হলেও সে পুরুষ, যাদের দৃষ্টি বুঝতে তার এক পল মাত্র লাগে। কিন্তু শৈবলিনী বিশ্বাস করেন বিচ্ছেদ তুল্য মায়াবিস্তার কোনো বন্ধনই নির্মাণ করতে পারে না, সুতরাং অবিচল ছিলেন। 



 গত বছর শ্রী'কে সম্প্রদান করেছেন। সেই শূন্যতায় পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই স্বয়ম তাকে জানিয়ে গেলো ঘোর অরণ্যেও প্রতিটি বৃক্ষের একাকী থাকাই বিধি। এখন তার দিলরুবায় অসীম নৈশব্দ্য। অবশ্য এই দেওয়ালেরা প্রগলভতার অভিজ্ঞতা পেলোই বা কখন? বড় শান্ত মেয়ে ছিলো তার শ্রী। মায়ের কাঠিন্য তার নরমে আঁচড়ের অবসর পায়নি কোনোদিন। কথা সে প্রায় বলতোই না। তার আনন্দ অভিমান যে কোনো তরঙ্গের সামান্য সরণ তাকে রেওয়াজে বসাত। সেই সুরই সম্ভবত তাকে নীলাদ্রীর কাছেও পৌঁছে দিলো, ভাবছিলেন শৈবলিনী। যতটুকু তিনি তাকে দেখেছেন, শ্রী যতই অনিন্দ্যসুন্দরী হোক, "রূপে তোমায় ভোলাবো না" এই স্বীকারোক্তির জায়গা অন্তত নীলাদ্রী নন, এইটুকু বুঝেছেন তাই আশ্বস্ত বোধ করছেন। রিপুজয়ের কথা যারা বলে থাকে তারা সম্ভবত প্রথম ইন্দ্রিয়টিকে নিরীহ জ্ঞানে রাখে। অথচ যাবতীয় ভ্রম ও ভ্রমভঙ্গের দায়ভাগ যদি কিছুকে দেওয়া যায় তবে তা 'চোখ'ই। শৈবলিনীর ব্যক্তিগত বিচারে গান্ধারীর অপরাধ অনেক বেশী ধৃতরাষ্ট্রের সাপেক্ষে। জন্মান্ধের অজুহাত যদিও বা গ্রহণীয় কিন্তু সক্ষমের ভাণজনিত বিকার কোনোভাবেই নয়।




বেলা গড়াচ্ছে। স্বয়ম আর শ্রী থাকার সময় বহুসময় তার উনুনের আঁচে কাটতো। রন্ধনশিল্পে বিক্রমপুরের মেয়ের নৈপুণ্যের খ্যাতি মূলত লক্ষ্মীপুজোর ভোগ হেতু পাড়ায় সুবিদিত ছিল। অবশ্য সে এক এমন সময়ের কথা যখন কোনো সংসারের সব ক'টি তৈজস দিনান্তে নিজের আস্তানাতেই থেকে গেছে, এ'ঘটনাকে বিরল মানা হতো। প্রতিবেশীরা শুধু একটি তথ্য জানতো না, একটা সময়ের পর হাজার চেষ্টাতেও শৈবলিনী তার হেঁসেলে আমিষ রাঁধতে পারেননি। এই একটি বিষয়ে ভাই-বোন দুজনেই অসম্ভব জেদে তাকে হারিয়ে দিয়েছে বারবার এবং প্রতিবার। সামান্য বোধের বয়সে পৌঁছে যেদিন থেকে তারা বুঝতে শিখেছে কী এমন অসুস্থ তাদের মা রোজই এমন হয়ে পড়ে যে তাদের রান্না সেরে স্নান করে ভিজে কাপড়ে নিজের জন্য একটা পাত্রে সিদ্ধ ফুটিয়ে নিতে হয় সারাদিনের নামে, তারা সেই সমস্ত কিছুর স্বাদকে অস্বীকার করতে চেয়েছে যাতে মায়ের অধিকার নেই। ফলে শৈবলিনীকেও হার মানতে হয়েছে। আঁশহীন অজস্র প্রণালীতে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে হয়েছে। 'ঘাটতি' - সঠিক শব্দ হলো কি? শৈবলিনীর অহং জাগল। কখনো 'ভালোবাসি' শব্দ উচ্চারণ করেনি তার কাছে তার সন্তানেরা। হাজারো প্রাপ্তিতে উচ্ছল হয়নি। সহস্র অপ্রাপ্তিতেও অভিযোগ আনেনি। অথচ তাদের সংবেদন এতো সূক্ষ্ম যে কীভাবে কবে হয়ে উঠলো তিনি কর্তব্যের ভারে ঠাহরই করে উঠতে পারলেন না। পিতৃহীন সন্তানদের সব মা'ই কি পৃথা?



ভাবতে ভাবতে উঠছিলেন, প্রায়োবেশনে স্পৃহা নেই প্রমাণে পুরনো একাহারী অভ্যাসে ফিরতে। সিংদুয়ারের কড়া তাকে বিচলিত করল। প্রাচীন আবলুশ, লোহার ভারী শিকল, নির্জন ছিঁড়তে যথেষ্ট সক্ষম। হতেই পারে আত্মীয় পরিজন অথবা ফেরিওয়ালা কিন্তু নৈঋতে কাকের কর্কশ তাকে অদ্ভুত অসামঞ্জস্য দিয়ে গেলো। এমনটি যেন হওয়ার কথা ছিলো না। আয়ুর প্রথমার্দ্ধে সামর্থ্য, দ্বিতীয়ার্দ্ধে প্রয়োজন তাকে পরিচারকহীন করেছে। সুতরাং কিছু সময় লাগলো জানতে সদর সংবাদ।


-- " একী ! শিয়া তুমি? চিঠি দাওনি তো আজ আসবে... কী হয়েছে? "


বরাবরের ধীর মেয়ে তার বরফ এখনো


--" ভিতরে আসি? "



হাজারো ঝঞ্ঝাতেও যে নন্দিনীকে তিনি অভিভাবকহীন চারণের অনুমতি দেননি বহু শঙ্কায়, অনেক দ্বিধায়, সে আজ আটপৌরেতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখের দীঘল বলে ঘুম হয়নি বিগত বেশ কিছু প্রহর, অবিন্যস্ত চুল হাতপ্যাঁচে ঘাড়ের উপর ফেলা। সঙ্গে সামান্য হাতব্যাগটিও অনুপস্থিত। তার বুক বসে যেতে লাগলো চোরাবালির গতিতে।



স্নান সেরে শ্রী ঘুমোতে চাইলে শৈবলিনী জিজ্ঞাসার চৌহদ্দিও পেরোননি। কুম্ভক তার নিয়ন্ত্রণে। ঘুমোক, যতক্ষণ সম্ভব। যে কোনো বিপর্যয়ে এইই বিশল্যকরণি শরীর মনের ভারসাম্য রাখতে। সন্ধ্যায় শ্রী জানিয়েছিলো অতি সংক্ষেপে। মধুপুরের চ্যাটার্জি ফ্যাক্টরি আর সংলগ্ন বাগান ঘেরা বাংলোটি গত রাতে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়েছে। বোমা, গুলি কিছুই বাদ থাকেনি। বিশ্বস্ত এক সূত্র সামান্য আগে খবর পেয়ে তাদের কাছে লুকিয়ে রাখায় নীলাদ্রি ও শ্রীয়ের প্রাণ দুটি রক্ষা পেয়েছে মাত্র। বাকি সর্বস্ব নিতান্তই ভগ্নস্তূপ এখন। ভোর রাতের প্রথম ট্রেনে শ্রীকে তুলে দিয়ে নীলাদ্রি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গেছেন অনির্দিষ্ট কাল সময় চেয়ে নিয়ে। বেনারসের আদি বাড়ি অথবা আসানসোলে দাদার কাছে যাবেন, এমন শিরদাঁড়া তার নয়। সুতরাং, তিনি কোথায়, শ্রী জানে না।



কিছু রাত কুরুক্ষেত্রের, কিছু জোনাকির, আর কিছু সংজ্ঞাহীনতার। শৈবলিনী জানতেন না ঠিক কোন স্তরে সে রাতকে ফেলা যেতে পারত। শৈশবে শ্রী'র জ্বর হলে যেভাবে রাতপাহারা দিতেন শিয়রে, ফিরে গেলেন সেই সময়ে। হঠাৎ শিয়ার ঘুমন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে জন্মদাত্রীর অভিজ্ঞ স্নায়ু তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করল। এই প্রবল অন্ধকারের ভিতরে কি কোনো তীব্র আলোর সংকেত লুকিয়ে যা তিনি অনুমান করছেন? ডাক্তার এসেছিল। ধারণা অভ্রান্ত, আনন্দে জানিয়ে ফিরে গিয়েছিল।  




শৈবলিনী ঠিক তিনদিন আগের মতো, আজও সেই সময় একই ভাবে দাঁড়িয়ে। শুধু সেদিন যে 'নিষ্কৃতি' শব্দোচ্চারণ করেছিলেন, তাকে প্রত্যাহার করছেন আজ সজ্ঞানে। যার লগ্নে সংগ্রাম, এত সহজে কি তার মুক্তি আসে? অনির্ধারিত অজ্ঞাতবাসে যাওয়া নীলাদ্রির আগামীকে গর্ভে ধারণ করে শ্রী এসেছে তার কাছে। তার যাবতীয় ছায়া আজ আলোময়। আজ সত্যিই তিনি সিংহের প্রয়োজন বোধ করলেন, রাশি থেকে খুবলে হৃদয়ে প্রতিস্থাপন নিমিত্তে। সন্তান সংকটাপন্ন হলে কোন গর্ভধারিণী অবিকল সিংহবাহিনী নয় আর তিনি তো শৈবলিনী, গায়ত্রীজল সবিতাকে অর্পণ করে বীজস্বার্থে মহাতেজা রূপ পরিগ্রহ করলেন।

চিত্র - অন্তর্জাল

সুবীর সরকার

                        


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


৯.
চর কালপানি দিয়ে মন্থর লয়ে ছুটতে শুরু করে মজনু শাহের ঘোড়াটি।বাদামি কেশর।নিভৃত আর মায়াময় চক্ষুদ্বয়।মজনু তার এই ঘোড়াটি কিনেছিল ছত্রশালের হাটে।বিবি ফুলজান ঘোড়াটির নাম রেখেছে সুমি।এই ঘোড়া নিয়ে,ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে ধান পাট তামাক নিয়ে এক হাট থেকে আরো আরো দূরে কাছের হাটগুলোতে ঘুরে বেড়ায় মজনু।মজনু শাহ।ভালো বাঁশি বাজাতে পারে বলে লোকমুখে তার নাম মজনু মাস্টার।ধুবুরি শহরের এক কবি মজনু আর তার ঘোড়াটিকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিল।সেই থেকে গঞ্জ হাটে মজনুর বেশ কদর।খাতিরদারি।
মাঝে মাঝে মজনু মনের সুখে ফাঁকা রাস্তায় সুমিকে  ছোটাতে ছোটাতে গলা ছেড়ে গান ধরে_
"আরে চলে রে মোর ঘোড়ার গাড়ি রে
কাদো পন্থ দিয়া
আরে নওদারি নাইওরি গুলা
দেখি থাকে চায়া রে"
আমরা দেখি মস্ত এক আবছায়ার ভিতর লীন হয়ে যাচ্ছে মজনু শাহের ঘোড়াটি।
১০.
শুকনো চরের বালু শরীর জুড়ে লেগে থাকা মরিচ বেচা পাইকার, রেডিও বাজাতে বাজাতে কিংবা বলা ভালো রেডিওতে গোয়ালপাড়ার গান শুনতে শুনতে এই প্রাক সন্ধ্যেতে কোন এক হাট থেকে ফিরতে ফিরতে বারবার কেন জানি আনমনা হয়েই পড়ছিল!
এই কুড়ি পঁচিশ মাইল পরিধি জুড়ে তার পরিচিতি মরিচ বেচা পাইকার।আবার পাইকারের রেডিও প্রীতির কারণে সম্প্রতি অনেকেই তাকে "রেডিও বাজা পাইকার" বলেও ডাকতে শুরু করেছে।প্রায় তিন কুড়ি বছর ধরে তার কাজ মরিচের পাইকারি।তার বাবা,বাবার বাবা সকলেই ছিল মরিচের পাইকার।সেই কবে যে সে তার আসল নাম নিজেই ভুলে গেছে তার কোন ঠায় ঠিকানা নাই!আচ্ছা,এই সব বিস্মরণ কি তাকে আনমনা করে দিয়েছে!
এইসব ভাবতে ভাবতে পাইকার তার অন্যমনস্কতা আর রেডিও সমেত গঙ্গাধরের ফেরিঘাটে এসে পৌঁছান।আর শুরু হয় ঘাটোয়ালের সাথে কিঞ্চিৎ হাসিমস্করা।তখন রেডিওতে বেজে উঠেছে আব্দুল জব্বারের গান_
"চাষার মুখত আর
 নাইরে সেই গান"
 

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বীথি চট্টোপাধ্যায়

               



বড়দিন 


জীবন থাকলে পেরেকও থাকবে;ক্ষমা করে ভালবেসে

আর কতদিন কাটাব এভাবে মিথ্যে মিথ্যে হেসে?  

খাবার চাইতে হাত বাড়াচ্ছে রোগা অভুক্ত শিশু

চার্চে দাঁড়িয়ে মুখ নিচু করে পেরেক বিদ্ধ যিশু।

তারাভরা রাতে বরফ পড়ছে কত ক্রিসমাস ট্রিতে

কেউ কি কোথাও কষ্ট পাচ্ছে পেরেকে অথবা শীতে? 

#

সান্তাক্লজের গাড়ি  যদি থামে দুঃখের ফুটপাতে

যেখানে মানুষ চট পেতে শোয় হিম-কুয়াশার রাতে।

#

এবার একটু হাসি ফুটে থাক যিশুর করুণ মুখে,

মার্কিন সেনা খাবার বিলোক,ইথিওপিয়ায় ঢুকে।

পথের কুকুর মায়াভরা চোখে সামনে দাঁড়ালে এসে

তাকে কোলে তুলে বিস্কুট দিক শাহরুক হেসে  .... 


স্বদেশ  / বীথি চট্টোপাধ্যায় 


স্বাধীনতা কীসে আর দেশ বলে কাকে?

শুধু কি সীমানা দিয়ে মাপা যায় তাকে?


এই মাটি, এই জল, এ সংবিধান

দেশ মানে সেইখানে কবুল এ-প্রাণ।


স্বাধীনতা মানে খুব বেশি কিছু নয়,

নিজের হৃদয় খুঁড়ে আনা পরিচয়। 


রক্তবিন্দু দিয়ে যাকে গড়া যায়

দেশ মানে মানুষের মুক্তির উপায়।


কতখানি দিতে পারে কেউ ভালোবেসে?

অনেকেই ঘরে আর ফিরলনা শেষে। 


মৃত্যুর মুখে দেওয়া বাঁচার শ্লোগান

দেশ মানে সেইখানে কবুল এ-প্রাণ।


জয়হিন্দ

সম্পাদকীয়

             


বর্ষার ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রেশ কাটিয়ে ফুটে উঠেছে ছোট ছোট কাশফুল ৷কাশফুল মানেই শরৎ । আকাশে উড়ে বেড়ায় পেঁজা তুলোর ন্যায় মেঘ।ভেসে বেড়ায় ভালোবাসার ধূলিকণা । শরৎ আসা মানেই সৃজন শারদ সংখ্যা প্রকাশ করতে হবে ৷ এই সংখ্যায় যুক্ত হয়েছেন অনেক নবীন , প্রবীণ লেখকবৃন্দ। সবার সুন্দর সুন্দর সৃষ্টিতে সেজে উঠেছে "সৃজন" শারদ সংখ্যা। 

সকলের লেখা নিজে বসেছি প্রকাশ করার জন্য। প্রচছদ সহকারে একে একে সেজেছে প্রতিটি পাতা। সব শেষে সম্পাদকীয় লেখার পালা৷ কিন্তু বেশ কিছুদিন হল কিছু ভাবতেই পারছি না । কী লিখব সম্পাদকীয়! এত গুণী মানুষের সৃষ্টিতে সেজেছে এ সংখ্যা তার কাছে নিজেকে তুচছ মনে হয়৷আগে ভাবতাম কবিতায় আমি বেশ স্বচছন্দ‍্য ।কিন্তু কালের নিয়মে তাতেও পড়েছে ভাটা । এক সময় কত ভাবনা পাখা মেলে উড়ত। কত স্বপ্ন উঠোনে রোদ পোয়াত। ছোট ছোট ইচ্ছেরা চিনেবাদাম খেতে বেড়ত বিকেলবেলায় ৷ সবই ইতিহাস। সময়ের টানাটানিতে শব্দরা নিঃস্ব। কোথা থেকে শুরু আর কোথায় গিয়ে শেষ তার কোন সীমারেখা ছিল না। কী যে লিখব ভাবতে বসলে হাহুতাস করে ভাবনারা ।

বাসাবদল
বেশ কিছু সময় ফেলে এসেছি 
নিঙড়ানো স্মৃতিগুলোকে সরিয়ে রেখেছি কৌটোয় 
বিস্কুটের মত মিইয়ে গেছে সেগুলো

যেখানে বসে তোমার কথা ভাবতাম
যাবতীয় সংলাপ  তুলে রাখতাম
সেই চেয়ারটা আর নেই জানো 

তুমি  ওই নারকোল গাছের মাথার থেকে আমাকে দেখতে
আমাকে জড়িয়ে ধরতে সোহাগে
বাকিটা ব্যক্তিগত

সেই বাসাটা আজ ছেড়ে আসতে হল
আমি অনেক চেষ্টা করেছি সময়গুলোকে কাঁধে করে আনতে 
কিন্তু পারলাম কই

হয়ত বলবে হারানো মানেই নতুন প্রত্যয়
কিন্তু আমার কাছে হারানো মানেই ক্ষয়
ঋতুযোগে তা বেড়ে চলে 

এখন যেখানে আছি দু হাত দূরত্বে নারকোল গাছের মাথা
তোমার নিঃশ্বাসের কাছাকাছি
আজ আর দূরে থেকো না

এসো ক্ষয় তোমাকে নিবিড় করে পাই
বহুদিন পর ঘুমোতে যাচ্ছি

ঘুম আসে না। চোখ বুজে শুয়ে থাকি৷ চোখ খুললেই অস্বস্তি শুরু হয়৷

মেঘের ইনসুইং হলে 
একটা অবযব ফুটে ওঠে
লম্বা ,সুদর্শন ,কামরাঙা ঠোঁট 
আপনারা বলবেন 
" এই সেলফিশ ন্যাকামিগুলোর কি দরকার?"

আসলে নিজের প্রতি টায়ার্ড  হতে হতে 
কেমন যেন একটা ফাও মনে হয় 
উদ্বৃত্ত 

সত্যি বলতে কী যতবার ইউটার্ন নিয়েছি
একটা হ্যাংলামি পেয়ে বসেছে
কাছে যাবার, নিবিষ্ট হওয়ার
মে বি  ইট ইস রঙ
আসলে" ক্ষয় নেই জাগরণের"
ফেসবুক ঘাটতে গিয়ে কিছু অপশান চোখে আসে
" মৃত্যুর পর এই অ্যাকাউন্টিটিকে কী করতে চান ?"

মুহূর্তে গলায়  একদল দুষ্কৃতী ছুরি মারে 
সিওর ইট ইস কল ট্রমা
 
 জীবনে ন্যাকামির প্রয়োজন আছে
তাকে মান্যতা দিতে গিয়ে দেখা
ক্ষতচিহ্ন জানে তাকে ক্ষমা করতে কতটা ক্লান্তি লাগে 

আর বুঝলাম সব থেকে বড় ন্যাকামি ছিল জীবনে
" তুমি"

তাকে রাইট অফ...




স্বপ্নের মধ্যে আঁশ ঘোরাফেরা করে
চকচক অথচ পিচ্ছল
পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আসে পেঁয়াজের খোসার মত

ইদানিং তোমাকে দেখিনা সেখানে 
তারাখসা রাতের মত বিক্ষিপ্ত
তুমি 

সেই সব রাতের গল্পগুলো ধীরে ধীরে
তারা হয়ে যায়
মিটমিট করে আঁশের মধ্যে

না আজ আর অন্য কথা নয় । পুজো এসে গেছে৷ আমরা এখন সবাই ভালোবাসার গন্ধ গায়ে মেখে ঘুরি।এই সংখ্যায় যারা লিখেছেন তাদের সবার পক্ষ থেকে শারদীয়ার শুভেচছা।

প্রসঙ্গত আপনাদের জানিয়ে রাখি সৃপ্রকাশন নিবেদিন যৌনতা সংখ্যা খুব শীঘ্রই প্রকাশ পাচ্ছে। " সৃজন" "শারদীয়া" সংখ্যা সেজে উঠেছে অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্যে৷ এই সংখ্যায় নতুন কবিদের কবিতায় ভরে উঠেছে।।"সৃজন" পরবর্তী সংখ্যার নাম " শীত " সংখ্যা । এই পরিস্থিতিতে আমরা উৎসব উপভোগ করব ঘরে বসে কবিতা,গল্পে ,উপন্যাসে। সবাই খুব ভালো থাকুন, সৃজনে থাকুন, আনন্দে থাকুন৷ আমাদের লেখা পাঠান। সৃজন এখন থেকে সাপ্তাহিক ভাবেও কবিতা, ধারাবাহিক গল্প, ভ্রমণ প্রকাশ করতে চলেছে৷ সৃজনে লেখা পাঠানোর ঠিকানা কিন্তু একই আছে তাও ইমেইল আইডিটা আরও একবার  বলে রাখি। srijanblog10@gmail.com ইমেলে আপনি আপনার অপ্রকাশিত লেখা টা পাঠান আমরা আমরা খুব যত্নসহকারে আপনার লেখা প্রকাশ করব। সবাই খুব ভালো থাকুন আরো একবার বলি৷ শুভরাত্রি৷


পারমিতা চক্রবর্ত্তী

সম্পাদক

চিত্রঋণ - মলয় দত্ত

কৌশিক সেন

                 



অলিভ পাতার দেশ

এই সখ্যতা তোমায় দেবো বলে সামুদ্রিক প্রজাপতির পাখনায়
ক্রশ এঁকে দিয়েছিলাম একদিন। তিরতিরে কর্মমুখরতায় 
ছড়িয়ে দিয়েছিলাম শান্তি আর ক্ষমার সুবাস। প্রজাপতির দল
যেদিন পাড় হয়ে গেল নিকশিয়ার আকাশ, আমি ভূমধ্যসাগরের
পাড়ে পাড়ে বুনে দিয়েছিলাম ঈশ্বরের বীজ।

তোমার মতো বন্ধু পাবোনা এই ভূমণ্ডলে, জানি। তোমার কাছে 
পৌঁছে দেবো বলে নীলনয়না মৎস্যকন্যার হাতে রেখে এসেছিলাম
অলিভ গাছের নরম প্রশাখা। এই স্বর্গীয় সখ্যতা তোমায় দেবো বলে
এক এক করে সমাধান করে গেছি সিড়িভাঙা গণিত। সদর দরজা
সাজিয়ে রেখেছি বেগুনী অর্কিডে।

দেখবে, তোমাকে ভাই বলে ডাকবো একদিন। তোমার বোন
সারা সকাল উপবাস করে আমারও কপালে এঁকে দেবে
চুয়া-চন্দন তিলক, কোনো এক কার্ত্তিক দ্বিতীয়ার অমৃতযোগে।
এনে দেবে জন্মদিনের উপহার। সেইদিন হলুদ প্রজাপতিরা
ফিরে আসবে আমাদের ঘর আলো করে...

মীনাবাজার

নাভির উর্বরতায় একটা রক্তগোলাপের চারা, 
কয়েকটি মৃত আরকিয়প্টেরিক্স আর 
এল ডোরাডোর স্বপ্ন দেখেছিলাম।  
সওদা করে ফেরবার পথে 
শুনতে পেয়েছিলাম 
ভ্রমরের গুঞ্জন।

এখন গমগম করে 
গভীর খাদের কিনারায়।  
গোলাপি আভা ছড়িয়ে পরে কাচের চুড়ির শব্দে।
কাউকে বলা হয়নি এখনও, এই নিভৃতে
জীবাশ্ম গেঁথে গেঁথে খুঁজে পাই
অনন্ত কামনার মিসিং লিঙ্ক!


সাহিত্য উৎসব

আমরা চা খেতে খেতে আলোচনা করবো, কীভাবে অমুক লেখকের
সাম্প্রতিক উপন্যাস থেকে খসে পরছে দেয়ালের পলেস্তারা,
ভাঙা দালানের কোটরে বাসা বেঁধেছে সুন্দরী চন্দ্রবোড়া
আর কার্নিশ বেয়ে কোন প্রবাহে নেমে আসছে
পাকুড়ের মজবুত শেকড়গুলি।

গরম শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে আমরা আলোচনা করবো,
হটকেক কাব্যগ্রন্থ থেকে উঠে আসা উদ্ভিন্নযৌবনা নারিটি
ঠিক কাকে কাকে কল করে রাতের আমন্ত্রন জানিয়েছে।

দরবেশে ঠোট ঠেকিয়ে আলোচনা করে যাবো
মুক্তগদ্যে ধূসর মন্বন্তরের কাহিনী,
ক্ষুধার্ত শকুনের স্থির ধৈর্যের কথা।

তারপর, আঙুল চাটতে চাটতে সেরে নেবো কাকজ্যোৎস্নার বেচাকেনা   
আর গৃহযুদ্ধে নিহত কবিদের জন্য নীরবতা রেখে যাবো
এক পক্ষকাল!




শর্মিলা ঘোষ

                




বাতিল ঈশ্বর//শর্মিলা ঘোষ

একমুঠো নীল আকাশ হাতে ধরে শরতের গান গাইছি  মহা সমারোহে,
শয়তানের চোখ থেকে  বাঁচতে একতারা নিয়ে মেতে উঠছি মিঠে বাউল সুরে,বেলোয়ারি চুড়ির শব্দও ছন্দে বাঁধা স্বরলিপি;


ধানখেত  থেকে ঊষর শুষ্ক মরুতেও ফোটে বেনজির রক্ত পলাশ 
ধ্রুবতারা নেমে আসে স্টেশনে ব্রীজে গরিবের জলন্ত উনুনে
বিজ্ঞাপনের ক্রাইসিস ছিল ব্যাক্তিগত সরীসৃপ জীবনে
আঠালো পথ চলতে চলতেই লাভামুখে  আটকে পড়ে কাঠের শরীর;

অনেক অনেক পথ হাঁটা হলো যন্ত্রণার  রুটম্যাপ ধরে
সৃজনী সমাজ জুড়ে শারদীয়া  যাপন , তাতে প্রেম লেখা  হলুদ অক্ষরে
গিলোটিন  নেমে আসছে ,বাতিল  ঈশ্বর,  শুকনো পাতায় লেখা  হচ্ছে ক্ষুধিত পাষাণ।


 



অন্তর চক্রবর্তী

                   




অষ্টমীর পদ্য

––———————



অষ্টমীদিন ঘিরে বয়ে আসে ফাগুনের আঁচ

আঁজলার কূলে কূলে অবিচল মরমী মানত 


যত রঙ শিউলির, তত রঙ পলাশ-ছোঁয়াচ

'একবার দাও ঠাঁই প্রিয়মনে, সোহাগী বসত' 


দুরুদুরু অপলকে ঘন হয় প্রতীক্ষাঘোর

রোদ পড়ে আসে আর ভিড় ঠেলে একাকীর সুর 


বাঁধভাঙা দখিনায় আসবে কি মিঠে উত্তর?

কিশোর চাতকমন পড়ে থাকে বেহাগবিধুর 


আন্ধার চেয়ে চেয়ে গোধূলিবেলাটি কেটে যায়

অষ্টমীসাঁঝ জুড়ে ফিরে আসে শ্রাবণের বাঁক 


সন্ধিপুজোর উলু ভেসে চলে অশ্রুছায়ায়

বোধন যতটা দূর, তত দূর ভাসানের শাঁখ...



( বিশেষ ধন্যবাদ : অর্ঘ্যদীপ ঘোষ )

মিনাক্ষী ঘোষ

                     




 ভান

যে মেয়েটি

মালসায় আগুন আর নাভিমূলে

শ্বেতপদ্ম রেখে ভেবেছিল একদিন

মৃত্যু আর অমরত্বের মাঝখানে

সেতু নির্মাণ করা যায় অনায়াসেই!

শুন্যতার অতল খাদে

মনটাকে অনায়াস গড়িয়ে দিয়ে

প্রথাসিদ্ধ নিয়ম জলে আচমন সেরেছিল

এক কমন্ডলু বিবমিষায়!

অমরত্ব পাবে ভেবে

 অবিনাশী পাথরজন্মকে

আগুনে পোড়াতে চেয়ে বারবার

পদ্মের মৃণালে  ঢেকেছিল তার সমস্ত ক্ষত

বল্কল অথবা লজ্জাবস্ত্র

কোনটিই আজ আর গ্রহণযোগ্য নয় তার

 সেতুহীন অমরত্ব পেতে গেলে

মৃত্যুর আগুনে স্নাত হতে হয়।


মাভৈঃ



নিকষকালো গুহায় দাঁড়িয়ে থেকেও

বুকের ভেতর সহস্র সূর্যকে পুষে রাখি

 যত ই ঝঞ্ঝা ভাঙুক শাখা সম্বল

অন্য কোথাও নীড় খুঁজে নেবে পাখি

 

অন্ধকারের প্রাচীরগাত্রে ক্ষয়

জানি,জানি তাও নিশ্চিত হবে কোনদিন

ততোদিন চোখে জোনাকি জ্বালিয়ে রাখি

ভাদ্রের নদী যদিই উজানে বয়


ফাটলের গায়ে ক্ষীণ যে স্রোতস্বিনী

এতদিন ছিল একলাই নিরিবিলি

জোয়ার প্লাবনে বাঁধ ভাঙে উচ্ছ্বাস

পাথর ভাঙতে প্রয়োজনে রঙ তুলি


নাগপাশে আরো যতই কঠিনে বাঁধো

কান পেতে থাকো,শুনতে আর্তনাদ

হাজার আলোর ঝাড়বাতি তবু জ্বেলে রাখি

ধরেছি মুদ্রাতে আনন্দ বিষাদ যুগপৎ ।


কথা দিলাম


বর্ষার আগে

জমিতে নিড়েন দিতে হবে বলে

তুমি ঠা ঠা রোদ্দুর টুকু উড়ানিতে বেঁধে

মাঠে নেমেছিলে!


বর্ষা নামার আগে

ভাবী ফসলের আগমন

সুনিশ্চিত করা চাই!

জৈষ্ঠ্যের তীব্র পরাক্রম তোমায় ক্লান্ত করলেও

হতোদ্যম করেনি তাই

জানিনা,কতটা প্রদাহ তুমি

সয়েছিলে এই অবকাশে

শাখাহীন গাছের আড়ালে

এতটুকু বিশ্রাম চেয়েছিলে বুঝি!

তাই কি আভাসে

অনাহুত অতিথির মতো

মেঘ হয়ে উড়ে আসি

তোমার আকাশে

যদি এতটুকু ছায়া দিতে পারি

এই খরতপ্ত জীবন প্রদোষে

সেকথা অজানা থাক

আমার চিবুক জুড়ে ছড়ানো বিষাদ

আজ বাঁধভাঙা বৃষ্টি হয়ে

সোহাগ ছড়াক

পরিতৃপ্ত ঘুম নেমে আসা

তোমার নিবিড় দু'চোখে

একে যদি সামিয়ানা বলো

আমৃত্যু তাই হবো আমি


কথাদিলাম।

নদীজন্ম



আকাশের রূপোলী সিঁথিতে চলকে ওঠা আলো

নাকি আরণ্যক বিষাদ

কোনটা জন্ম দিয়েছিল হিরণ্যগর্ভ মেঘের 

সেকথা বুঝতে বুঝতে

কেটে গেল আরো এক নদীজন্ম

নুড়িপাথরের ঠোকাঠুকি,আর

গাছগাছালির ফিসফিসানি

সূর্যাস্তের সবুজকে যে গভীরতা দিয়েছিল 

সেকথা কেবলমাত্র  যুবতী নদী জানে

অবধারিত সমুদ্রস্নানে 

যদি আর না ই যেতে হয়

সম্পর্কের কাটাকুটি খেলা তবে

তার শেষ জন্মশোধ 

আর কোনো দায় নেই তার বহতা হবার

নিজের সাথে বোঝাপড়া সাঙ্গ হলে

মেনে নেওয়া

চিরস্থায়ী একলার বসবাস 

শ্যাওলায়,পাথুরে গুহায়


তবু

সহস্র প্রাচীন সেই 

কোটর জমানো জলে

ফাটলের চোরাপথে

 ক্ষণজন্মা মেঘেরাও

মাঝেমাঝে

বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে

চিরায়ুষ্মতী হবার নেশায়।


বিভাগীয় সম্পাদক

        




আর মাত্র কয়েকদিন। তারপরই দেবীপক্ষের শুরু। দাঁতাল অতিমারীর রেশ কাটিয়ে ফের মহোৎসবের দিন গুনছে উল্লাসপ্রিয় বাঙালি। অসুখের গভীর আঁচড় হোক বা প্রকৃতির ভয়ঙ্কর খামখেয়াল, টালমাটাল দৈনন্দিন বা চূড়ান্ত ঘুণ-লাগা রাজনৈতিক আবহ, এ সবকিছু উপেক্ষায় রেখে ধ্রুবের মতোই দাঁড়িয়ে মিলনপরবের বর্ণাঢ্য হাতছানি। শিউলি-কাশের দুধশাদা স্পন্দনে, আদ্যাশক্তির আগমনী দখিনায় ভরে উঠেছে পল্লী থেকে নগরী। অবশ্যম্ভাবী বিজয়াটি বুকে নিয়েও ক্ষণিকের উদ্বেল মানসমেলা ও পার্বণী ছলাৎছলে ভেসে যাব আমরা সক্কলে... 


সেই সন্ধিসুরেই অমরা হয়ে উঠুক বিশ্বচরাচর। তানে তানে মোক্ষমন্ত্র হোক বাংলা কবিতাও...


চিত্র - ঋজু 

তৃষ্ণা বসাক

             




খিদে

 
পাশের ঘর থেকে গরম ভাতের গন্ধে
খিদেটা চাগিয়ে ওঠে,
আসলে আমার রক্তের মধ্যে এখন প্রচুর ফসফরাস,
চুলে জড়ানো ঝিনুক প্রবালের মালা,
কাঁদলে এখুনি মুক্তো ঝরবে,
কিন্তু আমি কাঁদব না, আমার খিদে পেয়েছে।
#
আমাদের বাস  বড় রাস্তা দিয়ে ছুটছে,
দুপাশ থেকে উঠে আসছে জাগুয়ার আর ব্রহ্মকমল,
হলুদ সাপের মতো সরু একটা নদীর চুল
এলোমেলো করে দিচ্ছে সাহসী সারস,
পাশের ঘর থেকে গরম ভাতের গন্ধে
খিদেটা চাগিয়ে ওঠে,
আসলে আমার রক্তের মধ্যে এখন
প্রচুর ফসফরাস,
তিনতলার বারান্দা থেকে দোল খেয়ে,
দোতলার ছাদে নেমে
চুলে ঝিনুক প্রবালের মালা জড়িয়ে
দুহাতে সমুদ্রের অন্ধ ফেনা নিয়ে
আমি ঠিক পৌঁছে যাব জন্মের শহরে।
চিত্র - পারমিতা মণ্ডল 
 

জয়া চৌধুরী

                       






Fernando Denis ফেরনান্দো দেনিস (কলম্বিয়া)-

কবি পরিচিতি- ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সিয়েনাগায় জন্ম গ্রহণ করেন এই কবি। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য জগতে সমসময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। এতাবৎ প্রকাশিত সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ La criatura invisible en los crepúsculos de William Turner বা বিকেলের আলোয় উইলিয়াম টার্নারের অদৃশ্য ভূত ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। এটির প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সে দেশের সাহিত্য জগতে আলোড়ন পড়ে যায়। বিংশ শতকের সে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কীর্তি হিসাবে পরিগণিত হতে থাকে এটি। এই বইটি লেখার সময় ব্রিটিশ চিত্রকর উইলিয়াম টার্নারের আঁকা কিছু গোধূলির ছবি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত LOS MOSAICOS DE BABILONIAবা ব্যাবিলনের মোজাইক কারুকাজ  y সেই সালেই LOS CINCO SENTIDOS DEL VIENTO  বা ঝড়ের পাঁচ অনুভূতি, ২০০৪ সালে Ven a estas arenas amarillas বা এই হলুদ বালুকায় আপনারা আসুন, একই সালে El vino rojo de las sílabas পদাংশের রক্তলাল ওয়াইন ইত্যাদি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির স্বনতার সঙ্গে বহিঃ প্রকৃতির রূপের মেলবন্ধন ধরা পড়ে। সমসময়ের অন্যান্য বিখ্যাত কবি রোমুলো গাইয়েগো পুরষ্কার বিজেতা উইলিয়াম ওসপিনা বা খোসে রামোন রিপোলি ম খোসে লুইস রিভাস ইত্যাদিরা স্বীকার করেন বর্তমান লাতিন আমেরিকার কন্ঠ বিধৃত হয় তাঁর কবিতায়। ভারতে সাহিত্য অকাদেমী ইতোমধ্যেই তাঁকে সে কলম্বিয়ার শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২০০৯ সালে তাঁর লেখা ১১৩ টি কবিতা সম্বলিত Geometry of Water” বা জলের জ্যামিতি বইটি অনূদিত হয়েছে ভারতে সাহিত্য অকাদেমীর মাধ্যমে ।  বর্তমান কবিতাগুলি তাঁর সাম্প্রতিকতম  LA MUJER QUE SUEÑA EN LAS MURALLAS বা দেওয়ালে তন্দ্রারত মেয়েটি থেকে নেওয়া। 



La mujer del fuego আগুনে মেয়ে/ ফের্নান্দো দেনিস ( কলম্বিয়া) 


১০

আমি নিজস্ব গোলকধাঁধায় বন্দিনী, গোপন যত

প্রলাপ যা আমার যাত্রীর ট্রাংকে সযত্নে বয়ে চলি,

আমার ত্বকের বর্তুলতায় , আমার মধুভান্ডে,

আমার আঙুলের কুসুমগুলিতে যারা বড় খারাপ ভাবে হয়েছে ক্ষতবিক্ষত

নীরবতা, গোধূলিতে তার চড়চড় করে ফাটা;

এক গভীর প্রভার কাছে বন্দিনী,

তার জেলকুঠুরীতে যন্ত্রণা সয়ে যাই। 


গ্রহের অনপনেয় সূর্যাস্তের নিচে সময়

ঘোরে আমার সাথে,

আমিও ছিলাম রাজকুমারী আরিয়াদনা- এক ইন্দ্রজালের ভেতরে বাস করি বদ্ধ

এবং নিজে রূপকথাও বটে; 

ষাঁড় মুখো কোন রাক্ষস আমায় তাকিয়ে দেখে না,

আমার ভেতর আরো বেশি সুন্দর কিছু করে বসবাস…,

তবে একইসাথে বড় ভয়ানকও বটে।  


১১

ঝড়ের চারপাশ ঘিরে থাকা রহস্যময়ী লতাদের ভেতরে থাকে

আমার সঙ্গীতের রূপ,

আমার শ্রবণের আগুনে থাকা ল্যুট গিটারের রূপ,

তার অনন্ত একাকীত্ব এবং জনশ্রুতির পাথরকুচিরা, তার চিত্তভ্রংশ।


তার মথিত করা স্মৃতির অবয়ব থেকে সেরে উঠি-

তার অহং, তার আনন্দ,

তার ছলনাময়ী কোমলতা যা স্ফটিকের যন্ত্রণায় 

স্বতন্ত্র বাস করে ,

সে আলোর প্রলেপ তেজীয়ান পরিবেশ রেখে যেতে যেতে

বিদীর্ণ হয় হিমঋতুর বরফপ্রদাহে,

ঝঞ্ঝাবাত্যা ভেদ করতে করতে, তামার অজানা মহাদেশ 

খাঁড়ির প্রবেশ দ্বারে মারা যাবে যারা, পবিত্র মৃত্তিকায়,

রক্তিম গতিরুদ্ধ উপত্যকায় যাদের প্রান্তরেখায়

প্রমিথিউসের স্বপ্ন থামে নি এখনও ,

দেহভস্ম এখনো যেখানে হয় না জয়ী।


প্রমত্ত, উদ্যমী, কমনীয়তার দিকে চেয়ে বুজে ফেলি চোখ,

নিখুঁত, অচেনা সুখে এবং অপ্রশমনীয়

সৌন্দর্যের শক্তিতে আমায় যে পরাভূত করে

এবং নীলার মত অগ্নিশিখা আমায় সময়কালকে প্রজ্জ্বলিত করে ঝড়ের আড়ালে। 


যুগান্তর মিত্র

                    




 জলপরি


চিঠিভর্তি প্লাস্টিকের প্যাকেটে ইটের টুকরো বেঁধে জলে ফেলে দেয় তুষার। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নভেম্বরের এইসময় এদিকে লোকজন প্রায় আসেই না। পুকুরের কালো জলে ডুবে গেল চিঠিগুলো। অপলক জলের বুদবুদের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। 

শান্তাদিদি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এক দমে যদি নীচ পর্যন্ত চলে যেতে পারিস, তাহলে জলকন্যার দেখা পাবি। 

তুষার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ডুব দিয়েছিল পুকুরে। কিছুটা গিয়েই হাঁসফাঁস অবস্থা। জলের ওপরে উঠে এসে দেখেছিল শান্তিদিদি হাসছে। তার ঝলমলে দাঁত থেকে সূর্যের আলো ছিটকে ছিটকে পড়ছিল জলের মধ্যে। 

পারলি না তো! জানতাম পারবি না। একবারে হয় না। 

একবারে হয় না মানে? চেষ্টা করলে হবে বলছ? 

হবে না কেন শুনি? রোজ প্র্যাকটিস করবি। ঠিক পারবি। শান্তাদিদির দিকে তাকিয়ে তুষার দেখেছিল, তার মুখ থেকে ঝলকে ঝলকে হাসি ছড়িয়ে পড়ছিল, মিলিয়ে যাচ্ছিল সূর্যের আলোয়। সেও একদিন ঠিক জলকন্যার দেখা পাবে, এই বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল তখনই। 

তুষার অনেক গল্প শুনেছে ঠাকুমার মুখে। জলের গভীরে থাকে এক পাতালপুরি। সেখানে এক জলকন্যা চুল এলো করে ঘুমিয়ে থাকে সোনার পালঙ্কে। তার মাথায় আর পায়ে থাকে সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি। সেই কাঠিদুটো অদলবদল করে দিলেই ঘুম ভাঙে। অপরূপ সুন্দরী জলকন্যাকে দেখার খুব শখ তুষারের। কাউকে একথা বলতে পারেনি কোনওদিন। পুকুরে স্নান করতে আসার সময় শান্তাদিদিকে কথাটা বলেছিল সেদিনই। শান্তা অবশ্য সাঁতার জানে না। তুষারের মুখে পুকুরে স্নানের কথা শুনে দেখতে এসেছিল। পাড়েই দাঁড়িয়েছিল সারাক্ষণ। 

শান্তাদিদিদের বাড়ি কলকাতায়। তুষারদের ঠিক পাশের বাড়িটাই ওর মাসির বাড়ি। মাসিকে শান্তাদিদি ছোটমা বলে ডাকত। শহুরে পরিবেশে থাকে বলে তুষারদের থেকে তার চলনবলন আলাদা। আগে তুষার, নীরূপ, বিমল, আবেশরা অবাক হয়ে শান্তাকে দেখত। তাদের থেকে কয়েক বছরের বড় দিদি। ঝকঝকে দাঁতে কেমন সুন্দর করে হাসে! গালে একটা টোল পড়ে। সারা শরীর যেন মোম দিয়ে তৈরি। শহরের মেয়েদের এইরকমই কোমল হয় শরীর! সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তুষাররা। 

গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে এসে কয়েকদিন এখানে থাকত শান্তা। অন্য সময় এলেও দু-একদিন বাদেই ফিরে যেত। তুষার সেই কদিন আঠার মতো লেগে থাকত শান্তাদিদির সঙ্গে। ওরা আসত সাদা একটা অ্যাম্বাসেডরে। তুষার শুনেছে গাড়িটা শান্তাদিদিদের। তাদের পাড়ায় তখন কারও বাড়িতেই গাড়ি ছিল না। দু-একজনের শুধু স্কুটার ছিল। ওর বাবারও ছিল সেইরকমই আকাশি রঙের একটা স্কুটার। তার গায়ে ইংরেজিতে লেখা ছিল ভেসপা। বাবার স্কুটারটা নিয়ে তুষারের চাপা গর্বও ছিল। 

এক রবিবার সকাল সাড়ে নটা নাগাদ গাড়িটা যখন এসে থেমেছিল, জানালা দিয়ে দেখেই তুষার বুঝে গিয়েছিল শান্তাদিদিরা এসেছে। দৌড়ে চলে গিয়েছিল সেখানে। শান্তাদিদির মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়া মুক্তো গড়াগড়ি খাচ্ছিল সবুজ ঘাসের জমিতে। তুষারকে দেখে হাসিমুখে শান্তা বলেছিল, দুপুরে আসিস। অনেক গল্প করব। কালই ভোরে ফিরে যাব তো। বাবার অফিস আছে। আসিস কিন্তু! 

তুষার বিকেলের দিকে যেতই ওই বাড়িতে। তার প্রিয় শান্তাদিদি এসেছে, না-গিয়ে থাকা যায়! দুপুরে যেতে বলাতে খুব আনন্দ পেয়েছিল। অনেকক্ষণ গল্প করা যাবে ভেবে খুশি উপচে পড়েছিল তখন। তুষার খুব আশ্চর্য হয়ে ভাবত, শান্তাদিদির ভাইটা কোনওদিন ওদের গল্পে যোগ দেয় না কেন? দূরে দূরে থাকে। দিদিকে ও যেন ঠিক সহ্য করতে পারে না। 

পড়াশুনা, স্কুল, এসব কথা বলতে বলতেই আচমকা শান্তা বলে উঠেছিল, তুই রামায়ণ পড়েছিস তাতাই? 

দু-দিকে মাথা নাড়িয়েছিল তুষার। না গো। পড়া হয়নি। তবে গল্পটা জানি। 

সব গল্প জানিস? সবার? শান্তা কে জানিস? 

হ্যাঁ, রামের দিদি। অনেকটা ঘাড় হেলিয়ে জবাব দিয়েছিল তুষার। 

আর কিছু জানিস? 

অবাক হয়েছিল তুষার। আর কিছু মানে? রামের দিদি হয় শান্তা। এর বেশি আর জানে না সে। তার মুখে ফুটে উঠেছিল না-জানার গ্লানি। 

তুষারের ঠাকুমা বলত, ‘শান্তারে নিয়া মহামুনি কিছু ল্যাখে নাই। মাইয়াটার কী হইল, কোথায় গেল, তার কোনও হদিশ দেয় নাই ব্যাটা।’ ওর ঠাকুমা এভাবেই বলত। বাল্মিকী মুনির প্রতি ভীষণ রাগ ছিল ঠাকুমার। কিন্তু কেন যে রাগ, তা বুঝতে পারেনি তুষার। এইসব ভাবনার মধ্যেই শান্তা বলে উঠেছিল, শান্তা এক উপেক্ষিতা নারী, জানিস! বাল্মিকীর রামায়ণে তেমন গুরুত্ব পায়নি। 

একটু বলো না শান্তাদিদি, কেন উপেক্ষিতা? 

শান্তাকে ওর মাসি-মেসো দত্তক নিয়েছিলেন। ভাব একবার, নিজের মেয়ে, তাকেও মানুষ করার ইচ্ছে হয়নি দশরথের! আসলে কী জানিস, মেয়ে সন্তান তো! তাই তার জন্মে বাবা-মা খুশি হতে পারেননি। মহান রাজা দশরথ মেয়েকে তুলে দিলেন বউয়ের বড় বোনের কোলে। ঠিক আমার মতো! 

‘আমার মতো’ কথাটাতে খটকা লেগেছিল তুষারের। কিন্তু অন্য একটা প্রশ্নে সেই খটকা তখনকার মতো চাপা পড়ে গিয়েছিল। ‘শান্তার মা কিছু বলেনি মেয়েকে দিয়ে দেওয়ার সময়?’ 

না রে। কৈকেয়ী হয়তো কিছুই বলতে পারেননি। তখন মেয়েরা কিছুই বলতে পারত না, তাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে বলে কিছু ছিল না। এখনও অনেকে পারে না। 

তুষারের কেমন যেন গুলিয়ে যায়। এখনও মেয়েরা কিছু বলতে পারে না? তার বাবা তো মায়ের সব কথা মেনে চলে! না-মানলে কুরুক্ষেত্র ঘটে যাবে। বরং বাবার কোনও কথাই মা শুনতে চায় না, মানতে চায় না। গুলিয়ে যাওয়া মাথায় ভেসে ওঠে আগের কথাটা, তোমার মতো বলছিলে কেন শান্তাদিদি? তোমার সঙ্গে রামায়ণের শান্তার মিল কোথায়? 

দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল শান্তার বুক থেকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, আমার ছোটমা আমার আসল মা। আর যাকে তুই আমার মা-বাবা বলে জানিস, ওরা আমার মেসো-মাসি। এক বছর তিন মাস বয়সে আমাকে দত্তক নিয়েছিল। তখন আমার ভাই সদ্য জন্মেছে। সেই থেকে আমি ওদের কাছেই থাকি। ওদেরকেই বাবা-মা ডাকি। ওরাই তো আমার প্রকৃত বাবা-মা, তাই না? এমনকি শান্তা নামটাও আমার নতুন বাবা-মায়ের দেওয়া। মেসো আর ছোটমা আমাকে বুড়ি বলে ডাকত। 

অবিশ্বাসের চোখে শান্তার দিকে তাকিয়েছিল তুষার। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। সেইসময় শান্তা বলে উঠেছিল, শোন তাতাই, এসব কথা আর কাউকে বলিস না যেন! তুই শুধু জানলি, আর কাউকে বলিস না প্লিজ। 

না না, কাউকেই বলব না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তুষার মনে মনেও প্রতিজ্ঞা করে, এমন কথা কাউকে সে জানাবে না। তার শান্তাদিদির গোপন যন্ত্রণার কথা সে একাই জানবে। এই একা জানার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ অনুভব করেছিল সে। 

তুমি তাহলে বাবাকে মেসো বলো কেন? 

মেসোই তো আমাকে এই বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল। আগে জানতাম না। যখন জানলাম কে আমার আসল বাবা, তখনও বাবা ডাকতে ইচ্ছে করেনি। ছোটবেলা থেকেই মেসো ডাকি। সেই ডাকটাই রেখে দিলাম। আমি অবশ্য কমই কথা বলি মেসোর সাথে। ইচ্ছেই করে না! 

আর তোমার ছোটমা? 

ছোটবেলায় মাসিই ডাকতাম। এখানে এলে খুব কাঁদত, জানিস? আমাকে জড়িয়ে ধরে বলত, আমাকে মাসি ডাকিস না মা, ছোটমা বলে ডাকবি। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, মনে আছে। তখন আমার মা বলল, ঠিক আছে শান্তা, ও যখন চাইছে, তুই ওকে ছোটমা বলেই ডাকিস। তখন থেকেই ছোটমা ডাকি। 

খাটে শুয়ে কথা বলছিল শান্তা। তুষার বসেছিল তার পাশেই। হঠাৎই উপুড় হয়ে শুয়ে বলেছিল, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে না তাতাই। 

শুধু মাথাতেই নয়, মাথা থেকে সারা পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল তুষার। কখন যে শান্তাদিদি ঘুমিয়ে পড়েছিল, টের পায়নি সে। যখন বুঝতে পারল, তখন ঘুমন্ত শান্তাকে রেখে চুপচাপ চলে গিয়েছিল নিজেদের বাড়িতে। সেবার মাত্রই দু-দিন ছিল। তারপর পুজোর ছুটিতে এসেছিল কয়েকদিনের জন্য। সেইসময় শান্তাদিদির সঙ্গে কতকিছু নিয়েই যে গল্প করেছে প্রত্যেকটা দিন, ভাবলে এখনও ভালো লাগে তার। 

একদিন শান্তা জিজ্ঞাসা করেছিল, হ্যাঁ রে তাতাই, তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে? 

তুষারের মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। তার সত্যিই কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই। কিন্তু শান্তাদিদি এমন একটা প্রশ্ন করে বসবে সে ভাবতেই পারেনি। শুধু বলেছিল, না না। আমার কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই গো। 

ওমা, লজ্জা পেলি নাকি? গার্ল ফ্রেন্ড থাকা অন্যায় নাকি রে? তুই এখন ইলেভেনে পড়িস। গার্ল ফ্রেন্ড থাকতেই পারে। আমার তো বয় ফ্রেন্ড আছে। 

তাই? আমার কিন্তু সত্যিই কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই। 

একদিকে বেঁচে গেছিস। আমি খুব চিন্তায় আছি রে! 

কেন গো শান্তাদিদি? 

রফিক আসলে মুসলিম কিনা, তাই বাবা মেনে নেবে না। সাফ বলে দিয়েছে। 

কোন বাবা? 

বোকার মতো কথা বলিস না তো! কোন বাবা আবার? আমার বাবা একটাই। ইনি আমার মেসো। বাবার জায়গা কোনওদিনই দিতে পারব না। এমনভাবে ধমক খেয়ে চুপ করে গিয়েছিল তুষার। আলতো করে পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল, তুমি রাগ করলে শান্তাদিদি? বিশ্বাস করো, আমি সেরকম কিছু ভেবে বলিনি। প্রমিস করছি, আর কোনওদিন বলব না। 

খিলখিল করে হেসে উঠেছিল শান্তা। তড়াক করে উঠে বসে তুষারের গালে একটা চুমু খেয়ে বলেছিল, তুই খুব ভালো ছেলে রে তাতাই। খুব সরল। 

একথায় লজ্জা পাওয়ার কথা নয়। তবু তুষার লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে নিয়েছিল। শান্তা তখন তুষারের মাথাটা টেনে নিয়ে তার বুকের মধ্যে চেপে ধরেছিল। কী নরম বুকটা, হাতের থেকেও নরম, ফোলা ফোলা বুকে মাথা ডুবিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু শান্তাদিদি কিছুক্ষণ পরেই মাথাটা দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এখন বাড়ি যা। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। তোর বাড়িতে চিন্তা করবে না? সেদিন আসার সময় আর-একটা কথাও বলেছিল শান্তাদিদি, তুই আমার থেকে অনেকটাই ছোট রে তাতাই। না-হলে রফিকের বদলে তোকেই বিয়ে করতাম। কথাটা বলে আর দাঁড়ায়নি। তুষারের আগেই নেমে এসেছিল একতলায়। 

(২) 

বেশ কয়েক বছর আর শান্তাদিদির দেখা পায়নি তুষার। অপেক্ষা করতে করতে প্রায় মাসখানেক পেরিয়ে গিয়েছিল। রবিবার সকালে পড়ার বই সামনে রেখে বসে থাকত সে। মন পড়ে থাকত জানালা দিয়ে বাইরের দিকে। তার চোখ দেখতে চাইত সাদা রঙের গাড়িটা, তার কান উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চাইত সেই পরিচিত গাড়িটার চাকার ঘর্ষণ। থাকতে না-পেরে একদিন গিয়ে ধরল শান্তার ছোটমাকে। অনেকদিন শান্তাদিদি আসছে না কেন গো কাকিমা? 

ছোটমা চুপ করে চলে গিয়েছিলেন রান্নাঘরে, কোনও জবাব না-দিয়ে। কাকু পাশের ঘর থেকে ধীরপায়ে এসে বলেছিলেন, তোর শান্তাদিদির খুব পড়ার চাপ তো, তাই এখন আসতে পারছে না। পরীক্ষা হয়ে গেলেই আসবে, কেমন? 

হতাশ তুষার ফিরে এসেছিল ঘরে। তারপর কেটে গেছে অনেকদিন। এতদিনে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা! তাও আসছে না? আবার কি খোঁজ নেবে? কিন্তু কাকু-কাকিমার থমথমে মুখ দেখে আর জিজ্ঞাসা করতে পারেনি কোনওদিন। একদিন সে জানতে পারল শান্তার এখানে না-আসার আসল কারণ। পাড়ার অনেকেই ততদিনে জেনে গেছে। 

তখন থেকেই তুষার প্রতি রবিবার পড়তে বসে একটা করে চিঠি লিখত, শান্তাদিদিকে সে তার মনের কথা বলত। কখন যেন সেই চিঠি লেখাও থেমে গেল। একসময় শান্তাদিদি পাতালকন্যার মতো জলের অতলে হারিয়ে গেল। শুধু তার বুদবুদ মাঝে মাঝে তুষারের বুকের মধ্যে গুবগুব শব্দ তুলত। 

আপনাকে একবার ম্যাডামের ঘরে যেতে হবে স্যার।  

ম্যাডামের ঘরে! কেন? 

পেপারসে উনিই সাইন করেন। আর আপনাদের কোম্পানির চেকটাও উনিই দেবেন। 

ও। আপনাদের ল্যানের সমস্যাটা মিটে গেছে। আর আপডেটেড ভার্সনের সফটওয়্যার লোড করে দিয়েছি। মিস্টার বাসু সব দেখে নিয়েছেন। কথাটা বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তুষার। 

হ্যাঁ স্যার, জানি। বাসু স্যার ম্যাডামকে রিপোর্ট করেছেন। আপনি আমার সঙ্গে আসুন, ম্যাডামের ঘরে। 

যে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছিল, তাকে এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল কিনা জানে না তুষার। মেয়েটিকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে সে। চ্যাটার্জি ইনফোটেকের কর্মী হিসাবে তুষার এখানে এসেছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তুষার ভৌমিক কোম্পানির হয়ে ক্লায়েন্ট মিট করে। তাদের কোম্পানির সঙ্গে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চুক্তি করেছে, তাদের সফটওয়্যারের কোনও সমস্যা হলে চুক্তি অনুসারে কোম্পানি ইঞ্জিনিয়ার পাঠায়। এই কোম্পানিতে তুষার একেবারেই নতুন। তার পূর্ব-অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার জন্য আগের কোম্পানির থেকে বেশি পে-স্কেলে এখানে জয়েন করার সুযোগ পেয়েছে। একে একে নানা ক্লায়েন্ট মিট করছে সে। এই এনজিওতে প্রথম এল তুষার। কাচের দরজা ঠেলে মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে, ওনাকে এনেছি ম্যাডাম। 

চেয়ার ঘুরিয়ে ম্যাডাম তাকাতেই তুষারের ভেরতটা দুলে উঠেছিল। শান্তাদিদি! বয়স বাড়লেও চিনতে অসুবিধা হয়নি তার। 

আসুন মিস্টার রয়। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। শান্তাদিদির চোখেমুখে তাকে দেখে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই বলে অবাক হয় তুষার। দ্রুত ঘরে ঢোকে সে। ইশারায় বসতে বলায় চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে ম্যাডামের দিকে। ম্যাডাম তখন ড্রয়ার খুলে কিছু কাগজপত্র বের করছেন। তুষারকেও যে কিছু কাগজে সইসাবুদ করাতে হবে, সেদিকে খেয়াল নেই তার। 

ম্যাডাম চোখ তুলতেই তুষার বলে ওঠে, আমি তাতাই শান্তাদিদি। চিনতে পারছ না? 

তাতাই? শান্তাদিদি? কী বলছেন মিস্টার রয়, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আপনি কি কারও সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন? 

অবিকল সেই মুখ, কানের নীচে কালচে লাল রঙের তিল, সেইরকম মিষ্টি কণ্ঠস্বর! তবে চামড়ার জৌলুস কিছুটা কমেছে বোঝা যায়। সে কি বয়সের জন্য! আমি কিন্তু ঠিক চিনেছি শান্তাদিদি! মনে মনে ভাবে সে। 

আমার নাম পারভিন সুলতানা। আপনি হয়তো কারও সঙ্গে আমার মিল পেয়েছেন। এইরকম হয় মিস্টার রয়। কথাগুলো বলেই হাত বাড়িয়ে দেন ম্যাডাম। আপনার পেপার্স দিন। আর চেকটা রেডি করে রেখেছি, নিয়ে যাবেন। আমি আজ একটু ব্যস্ত আছি। আমাকে এখনই উঠতে হবে। কিছু মনে করবেন না। 

যন্ত্রের মতো কাগজগুলো এগিয়ে দেয় তুষার। সইসাবুদ শেষে চেক ব্যাগে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়ানোর আগেই ম্যাডাম উঠে দাঁড়ান। 

আসুন মিস্টার রয়। আজ আমাকে অন্য একটা কাজে বেরোতে হবে। অন্য একদিন আপনার সঙ্গে অনেক কথা হবে। আপনার শান্তাদিদির ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে করছে খুব। মুচকি হেসে বলেন পারভিন। 

পরবর্তী ক্লায়েন্টের ঠিকানায় বাইক ছোটায় তুষার। মাঝরাস্তায় বুকপকেটে ফোন ভাইব্রেট করতেই বের করে দেখে অফিসের নম্বর। কথা বলে তুষার অবাক হয়, পারভিন সুলতানার প্রতিষ্ঠান চাইছে না সে আর এখানে মিট করুক। অন্য কাউকে পাঠাতে বলেছেন নাকি ম্যাডাম স্বয়ং। তার চাকরি জীবনে এই প্রথম এমন একটা অভিজ্ঞতা হল। বরং আগের কোম্পানিতেও ক্লায়েন্টরা তাকেই চাইত বেশি করে। এই কোম্পানিতেও কয়েকজন ক্লায়েন্ট তাকে খাতির করে খুব। তাহলে কি ম্যাডামকে শান্তাদিদি ভেবে বসায় রেগে গেলেন! কীভাবে অফিসে এই ব্যাপারটা ফেস করবে ভাবতে ভাবতে বাইক চালাতে থাকে তুষার। 

(৩) 

হ্যালো, আমি কি মিস্টার রয়ের সঙ্গে কথা বলছি? অচেনা নম্বরে মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠ বেজে ওঠে ফোনের ওপারে। রাত তখন সাড়ে নটা। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণ বাদে একপাক ক্লাবে ঘুরে আসে প্রতিদিন। ক্লাবে যাওয়ার পথেই ফোনটা বেজে উঠেছিল। 

হ্যাঁ বলছি। গম্ভীর কণ্ঠ তুষারের। মিস্টার রয় নামে ক্লায়েন্টরা ছাড়া আর কেউ তাকে ডাকে না। অফিসেও তুষার বলেই ডাকে বয়স্ক মালিক। অন্যরা কেউ তুষার, কেউ-বা তুষারদা। তাকে সরাসরি কোনও ক্লায়েন্ট সাধারণত ফোন করে না। অফিস মারফত কাজের কথা জানতে পারে। তাই খানিকটা বিরক্ত হয় সে। 

আমি শান্তাদিদি বলছি তাতাই! 

ম্যাডামের মুখটাই ভেসে ওঠে প্রথমে। শান্তাদিদি! মানে সেই পারভিন সুলতানা? তাই তো? 

হ্যাঁ তাতাই, তুই ঠিক চিনেছিলি। আমি ধরা দিতে চাইনি ওখানে। রফিকের কথা বলেছিলাম তোকে, মনে আছে নিশ্চয়ই। ওর সঙ্গে বিয়েটা টেকেনি রে তাতাই। হয়তো দোষ আমারই। তখন থেকেই আমি পারভিন সুলতানা। এই এনজিওতে আছি বছর ছয়েক আছি। আমি চাইনি আমার অতীত উঠে আসুক। পুরনো জীবন আমি ভুলে যেতে চাই। এভাবেই ভালো আছি। 

তুমি কেন আমাকে তোমাদের ওখানে যেতে বারণ করেছ? অভিমান ঝরে পড়ে তুষারের গলা থেকে। 

বললাম তো, আমার অতীত ঢেকে রাখতে চাই। নীচু কণ্ঠে জানায় শান্তা। 

তুমি বারণ করলে আমি সেসব কথা কাউকে বলতাম না! কিন্তু তার বদলে আমার অফিসে… 

এতে তোর চাকরির কোনও ক্ষতি হবে না তাতাই। আমি সেরকম ভাবেই কথা বলেছি। তোর নামে খারাপ কথা বলিনি। শুধু বলেছি, এত অল্পবয়সী কাউকে চাই না আমরা। আমাদের এনজিওর পক্ষে বয়স্ক মানুষই ভালো হবে। আরও কিছু কথা বলার পরে তুষার বলেছিল, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই শান্তাদিদি। তোমার ঠিকানা দাও। 

আজ থাক তাতাই। কিছুদিন পরে আমি জানাব। কথাটা বলেই ফোন কেটে দিয়েছিল শান্তাদিদি। তারপর থেকে যখনই সেই নম্বরে ফোন করেছে, শুনেছে সুইচড্‌ অফ। নিজেও আর কোনওদিন ফোন করেনি শান্তা নামের জলপরি। 

মাস দুয়েক পরে ওদিকেই এক ক্লায়েন্টের কাজ সেরে ফেরার পথে মরিয়া হয়ে বাইক থামিয়ে দিয়েছিল তুষার, তরতর করে উঠে গিয়েছিল দোতলায়। ম্যাডামের খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পারভিন সুলতানা প্রায় দেড় মাস আগে লেকের জলে ডুবে মারা গেছেন। পুলিশ জানিয়েছে আত্মহত্যা। বিধ্বস্ত তুষার ফিরে এসেছিল সেদিন। 

তারপর থেকে প্রতি রবিবার সারা দুপুর বিছানায় আধশোয়া হয়ে শান্তাদিদিকে চিঠি লিখত তুষার। অফিস ব্যাগের একটা কোণে জমা হত সেগুলো। জমতে জমতে অনেক হয়ে গেছে। এবার নতুন কোম্পানিতে জয়েন করবে সে। এই ব্যাগটা ফেরত দিতে হবে। তাই সে সমস্ত চিঠি বের করে পুকুরধারে এসে বসে। আজ রবিবার। আজও সে চিঠি লিখেছে। হয়তো শেষ চিঠি। 

চিঠিগুলো জলের নীচে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকে। আকাশভরা তারার মেলা। অর্ধচন্দ্রের আলো এসে পড়ছে পুকুরের জলে। তুষার সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। সে নিশ্চিত, একসময় চিঠিগুলো পুকুরের তলদেশে পৌঁছে যাবে। সেখানে শান্তাদিদি জলকন্যা হয়ে শুয়ে আছে, তার চিঠির অপেক্ষায়।