কৌশিক চক্রবর্ত্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কৌশিক চক্রবর্ত্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

                  


হিন্দু কলেজ ও ডিরোজিয়ানরা


কলেজ স্কোয়ারের ভেতরে ঢুকে ওয়াই এম সি এ-র ক্যান্টিনে কখনো চিকেন স্টু আর পাঁউরুটি খেয়েছেন? অথবা গোলদিঘির পাড় ঘেঁষে দুপা হেঁটে যেতে যেতে কখনো তাকিয়েছেন হিন্দু স্কুলের বারান্দার দিকে? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন এই গোলদিঘির পাড় ঘেঁষে কলকাতা তথা নব্য বাংলার নবজাগরণের ঢেউটার দিকে? দেখেননি তো? চলুন একটু দেখে আসি। কলেজ স্কোয়ারে পায়চারি করতে করতে কখনো তাকিয়ে দেখেছেন উত্তর দিকে উঁচু ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে তৈরি কলেজ ভবনের একটা ত্রিকোণ চূড়ার দিকে? পূর্বে বিখ্যাত হিন্দু স্কুল আর পশ্চিমে সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলের ঠিক মাঝখানে আজও আপনি খুঁজে পেতে পারেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একখণ্ড জলজ্যান্ত ইতিহাস। বুঝতে পারছেন না তাইতো? সঙ্গের ছবিটিতে দেখুন। দেখতে পাচ্ছেন সেই চূড়া? গাছগাছালি ভেদ করে উঁকি মারছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়। বাংলার নব্য আধুনিক যুগে স্কুল কলেজগুলো স্বাভাবিক ভাবেই ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বেথুন কলেজ ভবন, শ্রীরামপুর কলেজ ভবনে আজও সেই রীতি স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বাংলার নবজাগরণে যে ভবন কলকাতার যুবক সমাজে ঝড় হয়ে আছড়ে পড়েছিল, যে ভবনে একসময় প্রতিদিন পা রাখতেন ডিরোজিও সাহেব, রিচার্ডসন সাহেব, টাইটলার সাহেবদের মতো রেনেসাঁসের কান্ডারীরা, কোথায় গেল সেই আস্ত বাড়িটা? হ্যাঁ, আমি ১৮১৭ সালে গোলদিঘির পাড়ে স্থাপিত হিন্দু কলেজের কথাই বলছি। পরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সাথে কলেজ কতৃপক্ষের গোঁড়া হিন্দু কর্তাব্যক্তিদের বিবাদের ফলে যা ভাগ হয়ে যায় দুটি ভাগে। কলেজ বিভাগটি আজকের প্রেসিডেন্সি কলেজ আর স্কুল বিভাগটি কলেজ স্কোয়ারের পাশে হিন্দু স্কুল। সে নয় হল। কিন্তু হিন্দু কলেজের ভবন?
            


 ভিক্টোরীয় স্থাপত্যে নির্মিত একটা বিরাট বাড়ি একেবারে ভেঙে ফেলা হবে তা আবার সম্ভব নাকি। তাই প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতোই। আর উত্তরও মিলে গেল একদিন। সেই কলেজ স্কোয়ারের উত্তরে ও সংস্কৃত কলেজের পিছন দিকে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা সুউচ্চ ত্রিকোণ আর্চটি। কখনো দেখেছেন যে একটি কলেজ ভবনের পিছনে আর একটি মুখ্য দরজা। লম্বা লম্বা স্তম্ভ, আকাশছোঁয়া দরজা। পা ফেলে ওঠবার সিঁড়ি। যেন সংস্কৃত কলেজের পিছনদিকে আরো একটি কলেজ। কিন্তু সামনে কলেজ স্কোয়ারের পাঁচিল দিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ, আর দরজাটির আশপাশে উদ্বাস্তু ঠাঁইখোঁজা মানুষের বাস। কলেজ স্ট্রিটের মাঝখানে আজও পড়ে থাকা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলার সামাজিক মানচিত্রে ঝড় তোলা একটা জীবন্ত অধ্যায়। কেউ ফিরেও তাকায় না সেদিকে। গাছগাছালির মধ্যে উঁকি মারা ত্রিকোণ আর্চ আর হিন্দু কলেজের মুখ্যদরজা আজ কেবল লোককথা। দরজা বুজিয়ে তা আজ সংস্কৃত কলেজের পিছনের দেয়াল। তিন বছর ধরে পড়ে যাওয়া আজকের ছাত্রদের অনেকে হয়ত জানেই না লুকিয়ে থাকা এই স্থাপত্য আর ইতিহাস। কিন্তু কলেজ স্কোয়ার থেকে আজও স্পষ্ট দেখা যায় ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঙালির নবজাগরণের প্রথম পথিকৃৎ ও রামতনু লাহিড়ী, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদারদের স্মৃতিবিজড়িত সেকালের হিন্দু কলেজের মেনগেট। যার বাকি অংশ আজ কেবল স্মৃতির পাতায়। সংস্কৃত কলেজ ও হিন্দু স্কুলের বর্তমান বাড়ির সঙ্গে মিশে গেছে কালের চাকায়। কিন্তু সংস্কার কই? যা হয়ত কলকাতার প্রধান দ্রষ্টব্য হবার দাবী রাখে তা পড়ে আছে একেবারে অবহেলায়? যার ঐতিহাসিক চূড়া আজ ভেঙে পড়ছে একটু একটু করে। কলেজ স্ট্রিটের বেশিরভাগ মানুষ তথা বইবিক্রেতাই জানেন না এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের কথা।এমনকি সংস্কৃত কলেজের গেটে বসা নিরাপত্তারক্ষীও উড়িয়ে দিলেন এই স্থাপত্যের কথা। বিখ্যাত ইংরেজ শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ডঃ রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরী প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ যদি ১৮১৮ সাল থেকে আজও সমান গরিমায় বাঁচিয়ে রাখতে পারে তাদের পুরনো ভবন (যদিই কলেজ ভবন ১৮২২ সালে তৈরি), তবে হিন্দু কলেজের পুরনো ও ঐতিহাসিক ভবন কেন নয়? বাঙালিকে কী দেয়নি হিন্দু কলেজ। গোঁড়া ঘুণ ধরা একটা সমাজকে দিয়েছে পাশ্চাত্যের তীব্র আলো। যে আলোয় একদিন ভেসে গেছে শহর কলকাতা। কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হাইড ইস্ট সাহেব, শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব, রাজা রামমোহন রায়, দেশবরেণ্য ডেভিড হেয়ার সাহেবদের মতো ব্যক্তিত্বদের আলোয় আর ডিরোজিও, রিচার্ডসনের শিক্ষায় এই ভবন একসময় বাঙালিকে শিখিয়েছিল প্রথা ভেঙে বেরোনোর কৌশল। সকলের আড়ালে হিন্দু কলেজের পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতির থামগুলো আজও জানান দিচ্ছে সেই দিনগুলোই। এবার কলেজ স্ট্রিটে গেলে অবশ্যই একবার কলেজ স্কোয়ারে ঢুকে প্রত্যক্ষ করে নিতে পারেন সেই জীবন্ত জীবাশ্মটিকে। 
অতিরিক্ত গোমাংস ভক্ষণের ফলে মৃত্যু। তাও আবার গোঁড়া হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল এক পরিবারের সদস্যের। মৃত্যুর এহেন রিপোর্ট যাঁর কথা স্মরণ করাচ্ছে, তিনি একসময়ের ভারত বিখ্যাত ল্যান্ড সার্ভেয়র রাধানাথ শিকদার। আবার গোঁড়া হিন্দু পরিবারের ছেলে হয়ে বন্ধুদের পার্টিতে গোমাংস ভক্ষণ। পরিণামে হিন্দু সমাজে একঘরে করে দেওয়া। কিন্তু উদ্যম না হারিয়ে ধর্মত্যাগ করে সোজা খ্রীষ্টমন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ ও কলকাতায় খ্রীষ্টধর্মের প্রচার। যাঁর কথা বলছি তিনি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা সকলেই হিন্দু কলেজের ডিরোজিয়ান। পলাশী যুদ্ধের পরে কলকাতায় গোড়াপত্তন হয় এক নতুন সামাজিক প্রেক্ষাপট। যেখানে ইংরেজ তাঁবেদারির পুরস্কার হিসাবে খুব তাড়াতাড়ি মিলে যেত রাজাবাহাদুর বা রায়বাহাদুর খেতাব। উদযাপনও ছিল আশ্চর্যের। মা দূর্গাকে উপলক্ষ্য করে কলকাতার বহু বড়লোক বাড়ি মোচ্ছব দেখেছে সেকালে। দেখেছে বাইজী নাচ, ধুলোর মতো টাকাখরচ। এই তোষামোদীর প্রতিযোগিতা অসুস্থতায় পরিণত হলে ও আপামর কলকাতাবাসীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে ভীষণ ভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ে একদল একদম নব্য শিক্ষিত যুবকের। হয়ত হিন্দু কলেজ তৈরির আগে কেউ পাশ্চাত্য শিক্ষার আঙ্গিক নিয়ে ভাবেই নি। ভেবেছিলেন রাজা রামমোহনের মতো কিছু দেশীয় মহানুভব মানুষ আর ডেভিড হেয়ার সাহেবের মতো ভারতপ্রেমী ভিনদেশী। মহাত্মা রামমোহনের কথা আর কি বলবো, কিন্তু যে মানুষটা বিলেত থেকে ঘড়ির ব্যবসা করতে এসে সব বাদ দিয়ে লেগে পড়েন শুধু নেটিভ এডুকেশনকে লক্ষ্য বানিয়ে, যে মানুষটার পালকির পিছনে একসময় ছুটতেন শিক্ষার্থী থেকে অবিভাবকের দল, সেই ডেভিড হেয়ার সাহেবের ঋণ কি বাঙালী একজন্মে শোধ করতে পারবে? কলেজ স্কোয়ারের পাশে মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে তাঁর সমাধিও আজ মানবচক্ষু উপেক্ষিত। আশপাশের দোকানদাররাও ব্যস্ত সময় থেকে একটু সময় বের করে চেয়ে দেখেন না আর সেদিকে। যাই হোক, অনেক পরিশ্রমের ফল সেকালের হিন্দু কলেজ। কলকাতায় কলেজ তৈরির পটভূমিটা খুব আকর্ষণীয়। বিলেত থেকে ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের কলকাতা শহরে হঠাৎ আগমন হলেও তারা এদেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে ছিল একেবারেই অন্ধকারে। লর্ড ওয়েলেসলী প্রথম এই অভাব অনুভব করেন। আর তারই ফলস্বরূপ কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। যা কলকাতার মাটিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার এক ম্যাসিভ রেভলিউশন। কে পড়াতেন না সেখানে। শ্রীরামপুর মিশনারীর বিখ্যাত উইলিয়াম কেরী সাহেব থেকে উড়িষ্যাদেশীয় বিখ্যাত পন্ডিত মৃত্যুঞ্জয়ী বিদ্যালঙ্কার ও চুঁচুড়ার আদ্যোপান্ত বাঙালি রামরাম বসু। ইংরেজ সিভিলয়ানদের বাংলা, ফার্সী, আরবি শিখিয়ে পড়িয়ে কোম্পানির দপ্তরের অফিসিয়াল কাজে লাগানোটাই একমাত্র উদ্দেশ্য। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ একটা অধ্যায়। খুব বেশিদিন না চললেও কলকাতার পাশ্চাত্য শিক্ষায় এই কলেজ একটা মাইলস্টোন। বাংলা গদ্য সাহিতে এই কলেজের অবদান সুবিদিত। কলেজে পড়ানোর জন্য দরকার বাংলা গদ্য বই। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে পরপর সেসময় প্রকাশিত হয় কেরী সাহেবের 'কথোপকথন'। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের 'রাজাবলী', 'হিতোপদেশ'। রামরাম বসুর 'প্রতাপাদিত্য চরিত্র'। বাংলা সাহিত্যে এইসব গদ্য বই আজও সম্পদ। যাই হোক, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কলকাতার মাটিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বীজটা বুনে দিলেও তা একান্তই ছিল বিলিতি সিভিলিয়ানদের জন্য। কিন্তু এদেশের বাঙালি হিন্দু সমাজের তরুণ যুবসমাজে গোঁড়ামি আর অবক্ষয়ের দিকটা নিয়ে ভাবেনি কোম্পানি বাহাদুরের উচ্চপদস্থ অফিসাররা। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা তাই বাংলা পাশ্চাত্য শিক্ষায় একটা প্রবল ঝড়। যে ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছিল বাঙালির গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ। গোলদিঘির পাড়ে ভিক্টোরীয় স্থাপত্যে তৈরি এই ভবনেই দলে দলে ভর্তি হয় বাঙালি যুবকের দল। হেয়ার সাহেব তৈরি করেন স্কুলবুক সোসাইটি। স্কটল্যান্ড থেকে জাহাজে এদেশে আসার পর কলকাতায় ঘড়ির দোকান করেন হেয়ার সাহেব। এদিকে ওপরদিকে খানাকুলের বাড়ি থেকে বহিস্কৃত রামমোহন রায়ও থাকতেন কলকাতায়। ডেভিড হেয়ারের সাথে ঘটনাচক্রে বন্ধুত্ব হয় রামমোহনের। আর  তখনই সকলের অজান্তেই তৈরি হয় হিন্দু কলেজের ভিত। এদেশীয় বাঙালি যুবকদের ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত করবার ব্যাপারটা নিয়ে প্রবলভাবে চিন্তা করতেন দুজন। এমনকি হেয়ার সাহেবের ঘড়ির দোকানে আসা ক্রেতাদের সাথেও তিনি আলোচনা করতেন নতুন কলেজের বিষয়ে। কলকাতায় ইংরেজি কলেজ একটা ভীষণ দরকার। গোঁড়ামির অন্ধকারে ডুবে যাওয়া বাঙালি যুবসমাজ যদি আলোর পথ না পায় তবে আর রক্ষে নেই। কারণ ইতিমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ধর্মের গোঁড়ামি। আর তার ফল হল সতীদাহ, সাগরে শিশু নিক্ষেপের মতো বর্বর সামাজিক প্রথা। বিভিন্ন দিক থেকে কেরী, মার্শম্যান, হেয়ার সাহেবরা দৌড়ে বেড়াতেন বটে, কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন যে বাঙালি হিন্দুর সামাজিক অবস্থান না পাল্টালে তা কখনোই ফলপ্রসু হবার সম্ভাবনা নেই। এর আগে সঠিক ইংরাজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি একটিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর আগে কলকাতায় কলেজ বলতে ওয়ারেন হেস্টিংসের হাতে তৈরি মাদ্রাসা (বর্তমানে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িটি) এবং ওয়েলেসলীর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। কিন্তু উভয়ই ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের দেশীয় শিক্ষালাভের কেন্দ্র। তবে বাঙালি যুবকদের ইংরাজি শিক্ষার জন্য কয়েকটি প্রাইভেট উদ্যোগ যে হয়নি তা নয়। ফিরিঙ্গীদের উদ্যোগে বসেছিল কয়েকটা ছোট বিদ্যালয়। সারবার্ণ নামে এক ফিরিঙ্গী চিৎপুর রোডে খুললেন স্কুল। দ্বারকানাথ ঠাকুর এক স্কুলেই পড়েছিলেন কিছুদিন। এছাড়াও মার্টিন বোউল, আরাটুল পেট্রাস নামক সাহেবরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকানায় সেযুগেই খুলে ফেলেছিলেন প্রাইভেট স্কুল। সেযুগে ইংরাজি শিক্ষা ছিল বড় অদ্ভুত। ছড়ার মতো করে শেখানো হত ইংরাজি শব্দ। আর পাস করবার পরে ছাত্র কতগুলো ইংরাজি শব্দ জানে তার ওপর দেওয়া হত শংসাপত্র। যেমন ধরুন -

"গাড্ ঈশ্বর, লাড্ ঈশ্বর, কাম মানে এস
ফাদার বাপ, মাদার মা, সিট মানে ব'স
ব্রাদার ভাই, সিস্টার বোন, ফাদার সিস্টার পিসি
ফাদার ইন ল শ্বশুর, মাদার সিস্টার মাসী
আই মানে আমি, আর ইউ মানে তুমি
আস্ মানে আমাদিগের, গ্রাউন্ড মানে জমি
ডে মানে দিন আর নাইট মানে রাত
উইক হল সপ্তাহ আর রাইস মানে ভাত
পমকিন্ লাউ কুমড়ো, কোকম্বর শসা
ব্রিঞ্জেল বার্ত্তাকু আর প্লোমেন্ মানে চাষা।"

আজকের দিনে সত্যিই বড় অবাক হবার বিষয়। তাই না? অর্থাৎ ব্যকরণের দিকে জোর না দিয়ে শব্দের ভাণ্ডার বাড়ানো। আর বাঙালিদের ইংরাজিও ছিল তেমনই। শুধু নাউন জুড়ে বাক্য ঘটনার মতো। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' বইতে একটা মজার ইংরাজি বলার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একজন ইংরেজ সাহেব তার বাঙালি কর্মচারীকে ঘোড়ার দানা চুরি করার অপরাধে ভর্ৎসনা করছেন। বাঙালি পরিচারক জবাব দিচ্ছেন - "ইয়াস শার‍্, মাই হাউস মর্নিং অ্যান্ড ইভনিং টুয়েন্টি লীভস্ ফল, লিটিল লিটিল পে, হাউ ম্যানেজ?" অর্থাৎ এই সামান্য আয়ে তাঁর বাড়িতে ২০ টি পাত পড়ে। এটি সাহেবকে বোঝানোই প্রধান উদ্দেশ্য। এই ছিল তখন শিক্ষিত বাঙালিসমাজের ইংরাজি আওড়ানো। 
এরপরে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর হিন্দু কলেজ এমন এক প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো যেখানে শুদ্ধ ইংরাজি শিখিয়ে ও নীতিগত শিক্ষাদানের মাধ্যমে বাঙালি যুবসমাজকে আদর্শগত ভাবে তৈরি করা হত একটু একটু করে৷ ধর্মীয় গোঁড়ামির ওপরে উঠে মানবতার ধর্মে দীক্ষা নেবার শিক্ষা এখানেই তিল তিল করে বুনে দেওয়া হত সমাজের গোড়ায়। আর সেই শিক্ষাটুকুর আলো ছড়িয়ে পড়ত আসমুদ্রহিমাচল। নব্য ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি যুবকরা যে একেবারেই বিশৃঙ্খলা করতেন না তা নয়। এবং স্বভাবতই সেই সমাজে তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটুও ঠেকেছিল একটা বড় অংশের। কিন্তু তার অনেক ওপরে উঠে হিন্দু কলেজের স্কলাররা যে ছিলেন এক একটা রত্ন, তা তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই পরবর্তীতে প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন। 
আবার শেষ করার আগে পৌঁছে যাই কলেজ স্কোয়ারের পাড়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা সেই ত্রিকোণ ভিক্টোরীয় আর্চের তলায়। আজও সকলের চোখের আড়ালে যার প্রতিটি সিঁড়িতে লেগে আছে সেইসব কৃতি বাঙালি সন্তানের পায়ের ছাপ। কিন্তু ছুঁয়ে দেখছে কে? কে একবার দাঁড়িয়ে আপামর গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলছে - "নিজেরা চিন্তা কর। বেকনের উল্লিখিত কোনও দেবতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ো না। সত্যকেই জীবন এবং মৃত্যুর অবলম্বন ধরে নাও" - হেনরী লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।


সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

                                             


 বর্ষানগর


এই আকাশের নীল রং চেয়ে খুঁজব বৃষ্টিদিনে
থরে থরে কিছু অজানা শিশির বেছে নেব ঠিক চিনে

ঘর থেকে আজ অঝোর শ্রাবণে ভেজাব নিজের ছবি
আর কেউ নয়, বৃষ্টিফোঁটারা মনপ্রিয় বান্ধবী

ঘন কুয়াশায় আঁকা হলে নদী পাহাড় হয়েছে ম্লান
জমা জল থেকে তুলে নেব সেই স্বপ্নের সন্ধান

মন বলে আজ ভিজব অঝোরে খেলিয়ে চাঁচর চুল
শ্রাবণের কাছে জমা হবে সব জাহাজের মাস্তুল

হেঁটে যাই যদি শরীর ভেজাতে ক্ষণিকের সম্পাত
ছিঁড়ে গেছে সব প্রেমের আদলে রাঙিয়েছি দুই হাত

মেঘের দেয়ালে এঁকেছি ছায়াকে লুকিয়ে নিয়েছি চোখ
ভিজে আয়নায় বসিয়েছি সেই শ্রাবণের সম্ভোগ।

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


মাটি
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

স্থান নাটোর। গাছ-গাছালি ও অসংখ্য সরোবরের মাঝে এক মনোরম রাজপ্রাঙ্গন। যেখানে পাখি রোজ গেয়ে যায় ভোরের ব্রহ্মসংগীত। মানুষেরা পেট ভরে দুমুঠো খেয়ে চর্চা করে সংগীতের। এদিকে দরবারে রোজ চলে অপরাধীর সুবিচার। হ্যাঁ, বিচারটা নিঃসন্দেহে সু, কারণ পর্দায় আড়ালে যিনি বিচারকের আসনে বসে শাস্তি শোনান অপরাধীকে তিনি বিচক্ষণ ও সুশাসক। আইনের অন্ধত্বে নয়, অপরাধীর প্রতিটি অপরাধের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তবেই তিনি দরবারে মন্ত্রী দয়ারাম রায়কে দিয়ে পড়ে শোনান সাজা। বাংলার মসনদে নবাব আলিবর্দী খাঁ। মুর্শিদাবাদ থেকে সারা বাংলা বিহার উড়িষ্যা শাসন করেন তিনি। এমনই একদিন নাটোরের দরবারে বিচারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে তিন অপরাধী। প্রথম জন ব্যভিচারী, দ্বিতীয়জন দাঙ্গাবাজ আর তৃতীয়জন চোর। প্রতিজনের অপরাধ শোনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পরে রানী প্রস্তুত করলেন তাদের সাজার খসড়া। পর্দার পিছন থেকেই হাত বাড়িয়ে পৌঁছে দিলেন বিশ্বস্ত মন্ত্রী দয়ারামের হাতে। অনুগত অথচ বিচক্ষণ অবিভাবকের মত তা পড়ে দেখলেন তিনি৷ বিচারপদ্ধতি দেখেশুনে রীতিমতো অবাক হলেন। গ্রামবাসী অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বিচার শোনবার জন্য। পড়ে শোনালেন দয়ারাম। প্রথম জন সম্ভ্রান্ত কুলীন কায়স্থ ব্যক্তির ছেলে, অথচ ব্যভিচারী। দ্বিতীয় জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ঘরের বেয়াড়া ছেলে। এই দুজনেই ভীষণ কড়া ধমক আর নিন্দার পর পেলেন বেকসুর খালাস। আর তৃতীয় জন নাপিতের ছেলে। তাঁর সাজা ছয়মাস কারাবাস। সাজা শুনে গ্রামবাসীদের মধ্যেও কানাঘুষো। কিন্তু ধর্মের প্রতিমূর্তি রানীমার উপর কথা বলে সাধ্য কার। অর্থাৎ ফিসফিসানিই সার। সন্তুষ্ট নয় দয়ারামও। সোজা একদিন জিজ্ঞাসা করে বসলেন রানীকে। 'এ তোমার কেমন বিচার মা?'
রানী হেসে বলেন 'দেখোই না, এখন এর উত্তর দেব না, সময়ে বুঝবে।'
কেটে গেল ছয়মাস। হঠাৎ দরবারে পিছমোড়া করে ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হল এক ব্যক্তিকে। অভিযোগ চুরির। ব্যক্তির মুখ দেখেই চিনতে পারলেন সকলে। চোর আর কেউ না, সদ্য সাজা থেকে মুক্তি পাওয়া সেই নাপিতের বেটা। ছাড়া পেয়েই আবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে৷ রানীমা দয়ারামকে বললেন বাকি দুই ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে খোঁজ নিতে। চারিদিকে খোঁজ খোঁজ পড়ে গেল। খুব তাড়াতাড়ি খবরও এসে গেল দরবারে। রানীর আদেশ পাবার পরে চর বললেন, 
'রানীমা, বিচারের পরেরদিনই প্রথম ব্যক্তি ঘৃণায়, লজ্জায় আত্মঘাতী হয়েছেন। দ্বিতীয়জন নিজের পাপকাজ শুধরে নিয়েছেন এবং ফিরে গেছেন শাস্ত্র পড়াশোনায়।'
রানীর বিচারপদ্ধতিতে নিস্তব্ধতা নেমে এলো সভায়। অবাক দৃষ্টিতে একবার পর্দার ওপাশ থেকেই বয়সে ছোট রানীমার পায়ে হাত দিয়ে মনে মনে প্রণাম করে নিলেন দয়ারাম। তিনি বললেন 'সকলকে এক বিচারে শোধরানো যায় না। কাউকে অল্প ভৎসনা করলেই সে শোধরায় আবার কেউ স্বভাবদোষে হাজার শাস্তির পরেও জন্মজন্মান্তরেও বদলায় না।'
দয়ারাম বললেন 'হ্যাঁ মা, এই নাপতের বেটা ছয়মাস শাস্তি পেয়েও বদলায় নি। এই হতভাগা স্বভাবচোর। চুরিই ওর পেশা। ওর জন্য কয়েদবাসই উপযুক্ত শাস্তি।'
বিচারের সময় অপরাধীর পারিপার্শ্বিকতা আর মানসিক অবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে তবেই সাজা শোনানো তাঁর রাজ্যের নিয়ম। তিনি অর্ধবঙ্গেশ্বরী। রাজশাহী নাটোরের মহারানী স্বর্গীয় রাজা রামকান্তের মহিষী রানী ভবানী। বিয়ের আগের নাম গৌরী। রূপে গুণে স্বয়ং অন্নপূর্ণা। নাটোর, রাজশাহী, বগুরা, রংপুর, যশোর, কুষ্টিয়া থেকে মালদা, বীরভূম পর্যন্ত তাঁর বিশাল এস্টেট। লোকে কেন তাঁকে অর্ধবঙ্গেশ্বরী বলবেন না? মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারে প্রতি বছর প্রায় সাত লক্ষ সিক্কা টাকায় রাজস্ব জমা পড়ে তাঁর কল্যানে। সারা বাংলায় এত বড় এস্টেট ও এত বিশাল অংকের খাজনা আর একজনও জমিদার দেন বলে জানা নেই। নবাবও খুশি। মাত্র ৩২ বছর বয়সে স্বামী রামকান্তের মৃত্যুর পর নিজে সনদপত্র সমেত সমস্ত জমিদারি স্বয়ং তুলে দিয়েছেন রানীর হাতে। বিশাল এস্টেটের চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর তাঁর। কোন অঞ্চলে প্রজাদের জলকষ্ট, সেখানে খুঁড়ে দেন একাধিক পুকুর ও জলাশয়। খাদ্যের অভাব ঘোচাতে পাঠান অগাধ শস্য। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে যখন হাহাকার করতে করতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছে মানুষ, তখন তিনিই নিয়ম করে প্রায় প্রতিটি পরগনায় একনাগাড়ে জুগিয়েছিলেন সাহায্য। কখনো খাদ্য, কখনো বস্ত্র দিয়ে প্রজাদের দিকে মায়ের মত বাড়িয়ে দিয়েছেন আশীর্বাদের হাত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠছে তারা। রানীর একমাত্র কন্যা সাতরাজার ধন তারাসুন্দরী৷ দুই পুত্রের জন্মের পরে পরেই মৃত্যু। তারপরই কোল আলো করে এই তারার জন্ম। রাজা রামকান্তও চোখে হারাতেন একমাত্র মেয়েকে। সাত বছরের বিজোড় বয়সে নাটোর রাজবংশের একমাত্র নক্ষত্র তারার বিয়ের ঠিক করলেন রানীমা। পাত্র রাজসাহীর খাজুরা গ্রামের সম্ভ্রান্ত লাহিড়ী বাড়ির উজ্জ্বল তরুণ। বিয়েও হয়ে গেল রমরম করে। নাটোর রাজকন্যার বিয়ে বলে কথা। ঢাক ঢোলের বাদ্যে মেয়ের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন মা ভবানী। কিন্তু মেয়ের কপালে সুখ সইল কই৷ বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সব অন্ধকার করে বিধবা হল তারা। আবার লোকলস্কর দিয়ে নিজের মেয়েকে বাপের ঘরেই নিয়ে এলেন রানী। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, 'আজ থেকে নিজের ঘরেই থাক মা। আজ থেকে তোকে নিয়েই সমস্ত তীর্থে তীর্থে ঘুরব।' 
এই সেই বঙ্গেশ্বরী, যাঁর ছোঁয়ায় নিজের রাজপাট থেকে আপামর বাংলা, সবকিছুই পরশ পাথরের মত সোনা হয়ে যায়। যাঁর কল্যানে বাংলা থেকে সুদূর কাশী পর্যন্ত তীর্থযাত্রার সুবিধার জন্য নিমেষে তৈরি করা হয় রাস্তা। দিকে দিকে তৈরি হয় অজস্র মন্দির। কাশীতে ভবানীশ্বরী মন্দির তার মধ্যেই একটি। কিন্তু মেয়ের যন্ত্রণা তাঁর যে আর সহ্য হয় না। একরত্তি মেয়ের বৈধব্য তাঁকে তিলে তিলে হত্যা করে প্রতিদিন। অবশেষে উপায়হীন রানী সিদ্ধান্ত নেন নাটোর ও রাজপাট ত্যাগ করবার। ছেড়ে যাবেন অকূল সম্পত্তি। কিন্তু রক্ষা হবে কিকরে। অগত্যাই একদিন দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণকে সমস্ত এস্টেট বুঝিয়ে রানী চড়ে বসলেন নৌকায়। গঙ্গার তীরবর্তী কোনও জায়গা পছন্দ করে আজ থেকে বাকি জীবনটা থাকবেন তিনি। জায়গাও মিলে গেল খাসা। আজিমগঞ্জের কাছে বড়নগর গ্রাম। সেখানেই রয়েছে নাটোর এস্টেটের এক ঠাকুরবাড়ি। রানী ও তারাসুন্দরী উঠলেন সেখানেই। রাজ্যপাট ছেড়ে সে এক সাধিকার জীবন। প্রায় ৫০ বছরের বিশাল রাজত্ব হেলায় ছেড়ে রানী মন দিলেন ধর্মকর্মে। সঙ্গী তাঁর তারাসুন্দরী। এদিকে রানীমার অবর্তমানে রাজধানী নাটোরের অবস্থা শ্রীহীন। রামকৃষ্ণ মেতে থাকেন আধ্যাত্মিক সাধনায়। তাঁর বিন্দুমাত্র মন নেই রাজকার্যে। এভাবেই চলছিল কিছুদিন। স্বভাবতই এস্টেটের দিকে চোখ পড়লো সদ্য ভারতবর্ষের ক্ষমতা বুঝে নেওয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। হঠাৎ ধেয়ে আসা বাজপাখির মত রানী ভবানীহীন নাটোরে উড়ে এলো শমন। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের চিঠি। নিলামে উঠবে এস্টেট। বিক্রি হয়ে যাবে অর্ধবঙ্গেশ্বরীর প্রাণের রাজসাহী৷ নিজের শক্তিবলে রাজ্য আগলানোর জন্য আজ আর নেই কেউ। নেই রানীর মমতার হাতও। নেই বিদেশীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও৷ পাল্টে গেছে বাংলার শাসকের চরিত্রও। নবাব পরিণত হয়েছেন হেস্টিংসের কাঠের পুতুলে। মাসে মাসে মাইনেভোগী কর্মচারী ছাড়া আর কিছুই নন তিনি। সুতরাং কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। নাটোরের অকূল সম্পত্তি ভাগ হল। অংশীদার হলেন অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বড়নগরে মাটি থেকেই একমুঠো ছাই সরিয়ে অর্ধবঙ্গেশ্বরী হাসলেন মনে মনে। নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠলেন ছেলেবেলায় গাওয়া সেই গান -
'মাগো আর কতকাল এ ভব যন্ত্রণা 
যাতায়াত ক্লেশ         হবে নাকি শেষ
জনমে জনমে আর যে পারি না।।'


(চিত্রে- নাটোর রাজবাড়ী) 




শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


আঙুল


বিক্রিবাট্টা ভীষণ কমে গেছে
তাই থরে থরে আঙুল খুলে সাজিয়ে রেখেছি আমি
তারাও বিপথগামী ছিল
কিন্তু গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় সই পাওয়া যায়নি একটাও...

হাতের কবলে হাত, ডুবন্ত শরীর-
আনাচেকানাচে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার তাগিদ
এসবের মধ্যে আঙুলহীন মানুষের সংখ্যাই বেশি...

বইমেলার মতই ভীষণ প্রয়োজন একটা পূর্ণাঙ্গ শরীরমেলার
যেখানে শখের অঙ্গ কিনতে মুহূর্মুহু ভিড় জমাবেন শরীরপ্রেমীরা
কোনোটা রঙিন, কোনোটাতে জড়ানো রয়েছে গামছা-

তখনও আঙুল তুলে কেউ আর প্রশ্নটা করে উঠতে পারে নি
যাদের পাশে শোয়ানো রয়েছে সংশ্লিষ্ট শরীর 
শুধুমাত্র সেইসব আঙুলের দর আকাশছোঁয়া কেন!


পুড়ে যাওয়া জামা
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

কাল সমস্ত বুক জুড়ে খুঁজেছি ইতস্তত খই
তন্নতন্ন করে খুঁজেছি সুগন্ধী-চন্দন আর গোলাপের বীজ
পরিবর্তে যতটা কুড়িয়ে এনেছি কাদামাটি 
তার মধ্যে সিংহভাগই পরজীবি গাছ -
সভ্যতার নাম দেওয়া থেকে শুরু করে আয়নায় চিড় খাওয়ার দাগ
কোনোটাতেই আমার কোনো ভুমিকা ছিল না কোনোদিন...

ঘাসেরা বিনিময় করত মাথা তোলার গর্বিত সংস্কৃতি 
তারাও প্রতিটা পায়ের ছাপ কিভাবে শুকিয়ে তুলত ঝড়বৃষ্টির অব্যবহিত পরেও--

খোঁজ নেওয়া শুরু হবে এবার
কেউ ডেকে বলবে আমার জন্য তোলা আছে ঘর
কেউ হঠাৎ আদর করে শরীরে গলাতে যাবে জামা
অথচ তারা কেউ বুঝবে না বন্ধ ঘরে আমি এখনো আয়নার সামনে 
কিভাবে সাবলীল খুঁড়তে চেয়েছি গোপন সুড়ঙ্গ...
তাই শুয়ে থাকলেও তুমি অনায়াসে ছিঁড়ে নিতে পারো আমার পোশাক
ভালোবাসবার জন্য আমি অনেক আগেই নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে নিতাম রোজ।


এই শহর
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

আজ একটা শহর কিনলাম
যে শহরে একটাও গোপনীয় নর্দমা নেই
স্নানের সময় একটাও মানুষ 
গলে যায় না শূন্য ম্যানহল খুঁজে
গা ভেজানোর পর তারা সকলেই
বেমালুম চেটে নেয় রোদের সাম্পান

একমাত্র নর্দমার অভাবই
প্রতিটি নাগরিককে বেছে দেয় পথ
কোনোকিছু হারানোর ভয় নেই বলে
আমিও গ্যাসের আলো সরিয়ে
নিয়মিত পরে নিয়েছি রক্ষার কবজ

আজ একটা শহর কিনলাম 
যে শহরে একটাও ঝোলাবারান্দা নেই
রাতের অন্ধকারে কোনও বাবা
নিজের অজান্তেই ছেলেকে 
ছুঁড়ে দেয়নি রঙিন ফুটবল

আজও এই শহর জেনে এসেছে
কেবল অন্ধকারের কোনো বিবর্তন নেই
নিজস্বতার জন্য কখনো বারান্দা
অথবা নর্দমা খুঁজতে হলে
আমাদের আজও ছেড়ে আসতে হয় শহর...

বলে রাখি...
এই শহরে অন্ধকার যথারীতি না বলেই আসে...







মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


মল্লভূমের মাটি
_____________

- 

মল্লভূম। বাংলার উর্বর অঞ্চলের রাজারাজড়াদের নাগালের বাইরে সে এক বিশাল অরন্য অধ্যুষিত স্বাধীন রাজ্য। রাজা আছে, সিপাই আছে, আছে অস্ত্র-শস্ত্র, পাইক, বরকন্দাজ। এমনকি বিখ্যাত কারিগর জগন্নাথ কর্মকারের নিজে হাতে তৈরি কামান। মুর্শিদাবাদের নবাবী নজরের বাইরে সে এক হিন্দুরাজাদের বিচরণভূমি। ভৌগলিক সীমানায় নবাবের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও বিস্তীর্ণ জঙ্গলের কারণে নবাব কখনোই ফিরে তাকাননি এই অঞ্চলের ত্রিসীমানায়। এমনকি নিয়মিত নবাবকে কর দিলেও মুর্শিদাবাদের দরবারে কখনো হাজিরা দিতে হয়নি মল্লভূমের রাজাদের। যদিও একজন প্রতিনিধি রাখা থাকতো নবাবের দরবারে। 
যাই হোক, ফেরা যাক ঘটনায়, ৬৯৪ খ্রীস্টাব্দে রাজা আদিমল্লের নিজেহাতে প্রতিষ্ঠিত রাজপাট। সেযুগের দুর্ধর্ষ মল্লযোদ্ধা হিসাবে তাঁর দিগ্বিদিক খ্যাতির কারণে মল্লরাজ নামেই লোকে বেশি চিনতে শুরু করে তাঁকে। আর এই মল্লরাজদের হাতেই সযত্নে গড়ে উঠতে থাকে মল্লভূম, আজকের বিষ্ণুপুর। সমগ্র রাজত্বকালের সবচেয়ে বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় ৪৯ তম রাজা হাম্বীর মল্ল দেবের সময়ে। রাজা হাম্বীর মল্ল ছিলেন পরম বৈষ্ণব। সে কথা না হয় পরে কখনো বলা যাবে। শহরের সমস্ত মন্দির ও স্থাপত্যই প্রায় এই হাম্বীর মল্লের সময় ও তার পরে পরে তৈরি। সম্রাট আকবরের সমসাময়িক রাজা হাম্বীর মল্লের শক্তিশালী রাজ্যপাটের কারণে বীর হাম্বীর নামেই লোকে ডাকতো তাঁকে। বাদশা আকবরের সাথে ছিল তাঁর সুসম্পর্ক। বর্তমানে ওয়াল্ড হেরিটেজ সাইট বিষ্ণুপুর রাসমঞ্চ তাঁর হাতেই নির্মিত। তবে রাজা বীর সিংহ, দুর্জন সিংহ (মদনমোহন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা), চৈতন্য সিংহ, রঘুনাথ সিংহের হাতেও তৈরি হয় বিভিন্ন চোখ ধাঁধানো পোড়ামাটির স্থাপত্য ও মন্দির৷ তৎকালীন আশপাশের ঘন জঙ্গল ও দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে বহুদূর থেকে পাথর আমদানি ছিল নিতান্তই খরচাসাপেক্ষ। তাই স্থানীয় লালমাটিতে কারুকাজ করে তা পুড়িয়ে মুর্তি নির্মাণ। এটিই হল টেরাকোটা। শ্যামরায় মন্দির, মদনমোহন মন্দির, কালাচাঁদ মন্দির, জোড়বাংলো, লালজি মন্দির আরো আনাচেকানাচে অজস্র টেরাকোটার স্থাপত্য এর মধ্যে অন্যতম। মন্দিরের গায়ে সুক্ষ্ম রামায়ন মহাভারত এবং মধ্যযুগীয় শিল্পকলা। তাকিয়ে থাকতে হয় অবাক বিস্ময়ে। কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতি ছাড়াই শুধুমাত্র হাতের কাজে দেয়ালগাত্রে পাতলা বাংলা ইটের ভিতের ওপর পোড়ামাটির কাজ। প্রতিটা ইটের ফাঁকে যেন লুকিয়ে আছে কত শত বীরত্ব আর শৌর্যের আখ্যান। কান পাতলে আজও অবিকল শোনা যায় কারিগরদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর শৈল্পিক আঙুলে নকসা বোনার শব্দ। 
রাজধানী প্রদ্যুম্নপুর থেকে বিষ্ণুপুরে স্থাপিত হবার পর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। তখন আটচল্লিশতম মল্লরাজ ধাড়ীমল্ল বয়সের ভারে ন্যুব্জ। যুবরাজ হাম্বীর শৌর্য বীর্যে বেশ উজ্জ্বল। আশেপাশের রাজ্যেও লোকের মুখে মুখে ফেরে তাঁর বীরত্বের কথা। রাজা হবার পর তাঁর বিচক্ষণ রাজনৈতিক বুদ্ধি আর অসীম বীরত্বের গল্প আজও বিষ্ণুপুরের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়। তবে সে অনেক পরের কথা। ধীরে ধীরে আমরা আলোচনা করব তাঁর সেইসব অমর কাহিনী। এখন আবার ফিরে আসি সেই যুবরাজ হাম্বীরের কথায়। হঠাৎ মোঘলদের চিরশত্রু উড়িষ্যার পাঠান নবাব সুলেমান কররাণির পুত্র দাউদ খাঁ বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে বসেন। যুবরাজ হাম্বীর তাঁর দক্ষ সেনাদল নিয়ে এগিয়ে যান শত্রুদের আটকাতে। প্রথমে দায়ুদ খাঁয়ের নেতৃত্বে লক্ষাধিক সৈন্য দেখে একটু পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন বীর যুবরাজ। কিন্তু তারপর নিজেকে গুছিয়ে কৌশলে আছড়ে পড়েন শত্রুদের ওপর এবং দুইপক্ষের প্রচুর প্রাণের বিনিময়ে তিনি পাঠান দায়ুদ খাঁকে পরাস্ত করেন। সেইদিন যুদ্ধের মাঠে জমে যায় মৃতদেহের স্তুপ আর কথিত আছে যুবরাজ হাম্বীর শত্রুদের মুণ্ড থেকে মালা বানিয়ে অর্পণ করেন কূলদেবী মৃন্ময়ী মাকে। শত্রুদমনের সেই জায়গা আজও বিষ্ণুপুরে মুণ্ডমালার ঘাট নামে বহু পরিচিত। এতো গেলো যুবরাজ তরুণ হাম্বীরের কথা। আর রাজা ধাড়ীমল্লের মৃত্যুর পর যখন তিনি সিংহাসনে বসেন তখন তাঁর বীরত্বের কাহিনী যেন শেষই হয় না। তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি আর দূরদর্শীতায় তিনি মোঘল - পাঠান যুদ্ধে মোঘল পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। সম্রাট আকবরের সাথে সুসম্পর্ক তাঁকে অনেকটা শক্তিশালী করেছিল সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহও নেই। সম্রাট আকবর শাসনের সুবিধের কথা ভেবে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যকে মোট ১৬ টি জায়গীরে ভাগ করেন। তার মধ্যে বাংলার দায়িত্ব পান স্ময়ং রাজপুত সেনাপতি মানসিংহ। একবার সন্ধি করার ফাঁদে ফেলে তৎকালীন পাঠান নবাব কতলু খাঁ মানসিংহের পুত্র জগৎসিংহকে তুলে নিয়ে যান উড়িষ্যায়। স্বাভাবিক ভাবেই বিচলিত হয়ে পড়েন রাজা মানসিংহ। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বর্তমান আরামবাগের কাছে ছাউনি ফেলেন তিনি। সেই সুযোগে নিজের রাজ্যের মধ্যে মোঘল পাঠান দ্বন্ধে তিনি সেনাসমেত সরাসরি সাহায্য করেন মানসিংহকে এবং প্রায় একক বিক্রমে যুদ্ধ করে ছাড়িয়ে আনেন জগৎসিংহকে এবং বন্দী অবস্থায় হত্যা করে সমাধিস্থ করেন কতলু খাঁকে। সেই স্থানটিই আজ কতলু খাঁয়ের নাম অনুযায়ী বর্তমান বাঁকুড়ায় কোতুলপুর নামে খ্যাত। যুদ্ধের পরে স্বাভাবিক ভাবেই মোঘলদের সুনজরে পড়ে যায় সেযুগের বন-বিষ্ণুপুর (বিষ্ণুপুরের তৎকালীন নাম)। এমনকি সেদিন বাদশার দরবারেও হাম্বীরের হয়ে বহু প্রশংসা করেছিলেন রাজা মানসিংহ। কৃতজ্ঞতাবশত বিষ্ণুপুরের ওপর থেকে করের বোঝা পর্যন্ত তুলে নিয়েছিলেন বাদশা আকবর। প্রায় ৫০০ বছর আগেও মল্লভূমের মত জঙ্গল অঞ্চলে তাঁর দক্ষ শাসনব্যবস্থার সুবিধার জন্য এক একটি দৃঢ় পদক্ষেপ আজকের মানুষকেও অবাক করে। দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধার জন্য তিনি সমগ্র মল্লভূম জুড়েই উঁচু উঁচু স্তম্ভ তৈরি করেছিলেন। শত্রু আক্রমণের খবর এতে তাঁর কাছে অনেক আগেই খুব সহজে পৌঁছে যেত। এই স্তম্ভগুলোকে তখন বলা হত 'মাচান'। আজও বাঁকুড়ায় কোনো কোনো জায়গায় এইসব স্তম্ভের ভাঙা অংশ দেখা যায়। বাঁকুড়া স্টেশনের কাছে 'মাচানতলা' অঞ্চলের নামকরণের কারণও এটিই। যদিও নাম থাকলেও এই অঞ্চলের মাচানটি বহুকাল আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। 
এ এক সফল রাজার কাহিনী। এক দোর্দন্ডপ্রতাপ অথচ প্রজাবৎসল শাসকের গল্প। তাঁর গল্প যত বলা যায় ততই কম হয়ে যায়। অথচ এই বীর রাজাকে আজও কতজন বাঙালি ঠিকমতো চিনে উঠতে পেরেছেন! ঘুরতে ঘুরতেও দেখেছি বিষ্ণুপুরের বেশিরভাগ ভ্রমণপ্রিয় বাঙালিই মন্দির দেখেন, বালুচরি কেনেন। কিন্তু বাংলার গর্ব রাজা বীর হাম্বীরের নাম পর্যন্ত জানেননা অনেকেই।
বিষ্ণুপুর বাংলার এমন এক অংশ যার কোনো অঞ্চলই মুসলিম শাসনে কোনোভাবেই প্রভাবিত হয়নি। অরণ্য ও মালভূমি আবৃত মল্লভূমকে কোনো সুবেদারই কখনো পুরোপুরি হস্তগত করতে পারেনি। তবে মুর্শিদাবাদকে মল্লরাজারা রাজস্ব দিয়ে দিত বলেই জানা যায়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ শাসনে এঁরা ছিলেন স্বাধীন। চিরাচরিত হিন্দু প্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে বাংলার মল্লভূমি, বীরভূম ও বর্ধমান বেশ উল্লেখ্য। যদিও বর্ধমান রাজবংশের শক্তি বাড়তে শুরু করলে বিষ্ণুপুরের রাজাদের নিয়ন্ত্রণ কমতে শুরু করে। বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে অনেকটা মল্ল প্রশাসিত অঞ্চল নিজের জমিদারির আওতায় আনেন। পরের দিকে বাংলায় মুহুর্মুহু বর্গী আক্রমণের ফলে মল্ল রাজারা বড় বেকায়দায় পড়ে যান ও বিষ্ণুপুর মল্লরাজত্বের পতন শুরু হয়। যদিও সেসব অনেক পরের কথা। ততদিনে এই অঞ্চলের রাজাদের বহু কীর্তি বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। ৬৯৪ খীষ্টাব্দে যখন আদি মল্লরাজের হাতে প্রতিষ্ঠা পায় এই রাজবংশের তখন এদেশের মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের নামও শোনেনি। এর অনেককাল পরে (প্রায় ৫০০ বছর পরে) বকতিয়ার খিলজী বাংলার হিন্দু শাসকদের থেকে বাংলা হস্তগত করেন। তবে মল্ল সাম্রাজ্যের কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যায় রাজা হাম্বীর মল্ল দেবের কথা ছাড়া। তাঁর সুশাসন ও প্রজাবৎসল রাজত্বের সময়কাল আজও বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা আছে। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এই বারো ভুঁইয়াদের ক্ষমতার সেযুগে সর্বজনবিদিত। বলে রাখি বাংলার অসীম ক্ষমতাধর এই শাসকদের ভাবগতিক মুঘল শাসকদেরও কখনোই শান্তি দেয়নি। সম্রাট শাহজাহানের আগে কোনো বাদশাই বাংলা থেকে সম্পূর্ণ রাজস্ব আদায়ে সক্ষম হন নি শুধুমাত্র এঁদের কারণে। এমনকি প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর বিব্রত হয়ে বাবরনামায় লিখছেন "...এই বাঙালিদের আমি দেখে নেব"। রাজা বীর হাম্বীরও সেই তালিকায় অন্যতম এক শাসক। তাঁর বীরত্ব ও শৌর্য বোঝাতে হয়ত আর কোনো উপমারই প্রয়োজন পড়বে না। শৈব বংশজাত হয়েও রাজার বৈষ্ণব জীবনযাপনের কথা না বললেই নয়। এই বিষয়ে একটি কাহিনী ঘোরে লোকের মুখে মুখে। চৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদ শ্রীনিবাস আচার্য ও অন্যান্য ভক্তরা বৃন্দাবন থেকে ফিরছিলেন বাংলায়। তখন পথে বিষ্ণুপুরের সৈন্যরা তাঁদের লুঠ করেন এবং বন্দী করেন। পরে আচার্যের ভাগবত পাঠ শুনে মল্লরাজ হাম্বীর বৈষ্ণব মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েন ও দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম মল্লরাজ যাঁর পর থেকে বিষ্ণুপুরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবমতের ব্যাপক প্রচার ঘটে। এরপর বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত রাসমঞ্চ তাঁর হাতেই তৈরি হয়। রোদে পোড়ানো ইটের ওপর টেরাকোটার কারুকাজ করা এই মন্দিরটি আজ ইউনেস্কো সুরক্ষাবলয়ের অন্তর্ভুক্ত একটি জাতীয় স্থাপত্য। 
বলা হয় দীক্ষা গ্রহণের পর রাজা হাম্বীর বৃন্দাবন যাওয়া মনস্থির করেন। এরপর বৃন্দাবন থেকে একটি যুগলমূর্তিও নিয়ে আসেন। ভাবা হয়, আজও বিষ্ণুপুর মদনমোহন মন্দিরে সেই মূর্তিই পূজিত হয়ে আসছে। মতান্তরে বলা হয় প্রাচীন  মূর্তিটি বর্তমানে কলকাতায় আছে। যদিও বিশ্ববন্দিত টেরাকোটা শিল্পের এই মন্দিরটি রাজা বীর হাম্বীরের মৃত্যুর প্রায় ৭৪ বছর পরে মল্লরাজ দুর্জন সিংহের হাতে নির্মিত হয়। পরে
রাজা বীর হাম্বীরের মধ্যে আমরা এক উচ্চমানের বৈষ্ণব পদকর্তাকেও দেখতে পাই। গৌরপ্রেমে মাতোয়ারা কবি বীর হাম্বীরের লিখিত পদ আজও গবেষকদের কাছে এক সম্পদ।
আজ তাঁর একটি বৈষ্ণব পদ দিয়ে বিষ্ণুপুরের পর্ব শেষ করব। ঘুরতে ঘুরতে এই পদটি রাসমঞ্চের পাশে রাজার গোশালার পাঁচিলের গায়ে চোখে পড়লো। এই পদ থেকে আমরা রাজধর্মের পাশাপাশি তাঁর বৈষ্ণব সত্ত্বায় নিজেকে সমর্পণ ও সাদামাটা জীবন সহজেই লক্ষ্য করতে পারব।

প্রভু মোর শ্রীনিবাস     পুরাইলা মনে আশ
তুয়া পদে কি বলিব আর।।
আছিলুঁ বিষয়-কীট      বড়ই লাগিত মীঠ
ঘুচাইলা রাজ অহংকার।।
করিথু গরল পান         রহিল ডাহিন বাম
দেখাইলা অমিয়ার ধার।।
পিব পিব করে মন       সব লাগে উচাটন
গোরা পদে বান্ধি দিলা চিত।।
শ্রীরাধা রমন সহ        দেখাইলা কুঞ্জ গেহ
জানাইলা দুহুঁ-প্রেম-রীত।।
কালিন্দীর কূলে যাই       সখীগণে ধাওয়া ধাই
রাই কানু বিহরই সুখে।।
এ বীর হাম্বীর হিয়া         ব্রজ ভূমি সদা ধেয়া
যাহাঁ অলি উড়ে লাখে লাখে।।

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

কফিন

আমার অক্ষরজ্ঞান হয় নি--
আমার ছেঁড়া চটি
দুবেলা অসুখ-
তবু ক্ষত ঢাকতে
আর পোড়ানো হচ্ছে না বোরোলিন...
দরজায় কাজল ছাপ-
ইতিহাস বলছে
আমি আর আমার এক্স গার্লফ্রেন্ড
আজন্ম শুয়ে থেকেছি রাস্তায়।
এখনো গোপনীয়তা ভাঙার সময় আসে নি।
অথচ সকলের আড়ালেই
ডিম ফুটে জন্ম নিচ্ছে কোকিল--
ক্ষত'র কোনো নিরাময় নেই আর-
এখনই বোরোলিন লাগানোর জন্য
একটা জীবিত শরীরের খুব প্রয়োজন...
আমি জীবিত নই-
শুধু মুখ ঢাকব বলে কফিনের ভাঙা অংশে
বেমালুম গুঁজে রেখেছি সদ্য বেড়ে ওঠা অক্ষর।

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

আলোস্থপতি
আরেকবার নিরলস এগিয়ে যেতে গেলে সামনে পড়ছে বাঁক
এবার সিদ্ধান্ত নেবার সময়-
আরো এগিয়ে যাবে সকলের মত
নাকি পিছনে হেঁটে যাবে দরজাকে পক্ষপাতদুষ্ট ভেবে?
আমি নির্ভরতায় আছি, আমি ধর্মেও আছি
এখন সেলুনের সমস্ত পর্দায় মুছে রেখেছি বিভ্রান্তির ঘাম
বরং সকলের অজান্তেই আরেকটু পিছিয়ে যাও
প্রতিটা বাঁক আর আয়নায় ছত্রভঙ্গ করো জটলা
যতটা মিলিয়ে গেছো, ততটা শূন্যতার দখল নিচ্ছে মরুঝড়...
এবার সিদ্ধান্ত নেবার সময়-
নিঃশব্দে আরো শুষে নেবে লন্ঠনের নীল কেরোসিন 
নাকি ক্রমশ পিছিয়ে গিয়ে আলোস্থপতির চোখে ধুয়ে দেবে কুয়াশার ছাপ...
নাম: কৌশিক চক্রবর্ত্তী

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


অমৃতপানের জন্য
কৌশিক চক্রবর্ত্তী

এক সমুদ্রমন্থনে ঢেলে দিচ্ছো অবগাহন মেঘ
ঢুলে পড়ছে ব্যস্ত নাবিকের গায়ে-

ইতিহাস ঘেঁটে দেখো
শেষ কবে ভাষা ফুরিয়েছে বলে 
আমি সেজে উঠেছি নিঃস্ব, কপর্দকহীন... 

শুয়ে থাকার একটা নির্দিষ্ট দিক আছে,
অজস্র রোপণের পরও 
সেখানে গজিয়ে উঠছেনা ধান -

শুধুমাত্র প্রতিটি শূন্যস্থান এখনো স্বাধীন;
যেকোনো নিঃশ্বাসে তার বিপণন হবে
এমন কথা আমি দিয়ে আসি নি খোলাবাজারে-

বেঁচে থাকতে গেলে 
আমি খালিপেটে মন্থনের অমৃত ঢেলে নিই গায়ে

এখন একটা দেশলাইকাঠির খুব প্রয়োজন... 





শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


পুরুষোত্তম শ্রীচৈতন্যদেব
(পর্ব- চার)


চৈতন্যদেবের নবদ্বীপে বাল্যজীবন নিয়ে আলোচনার কোনো অবকাশ থাকে না৷ তা নিয়ে বহু গ্রন্থে ও গবেষণায় বহুবার আলোচনা হয়েছে৷ অন্নপ্রাশন, উপনয়ন থেকে গয়ায় পিতৃকার্য এবং ঘর ছেড়ে নীলাচল গমন- এই পর্যায়টুকু বহুল আলোচিত এবং সর্বজনজ্ঞাত৷ তবু জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখা যেতে পারে যে নবদ্বীপে চৈতন্য জীবনকে সরাসরি দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়৷ প্রথম পর্যায়ে যদি আমরা পরম জ্ঞানী, বিদ্যানিধি অধ্যাপক নিমাই পন্ডিতকে দেখি, তবে দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা যায় কৃষ্ণপ্রেমে দিব্যোন্মাদ এবং সংকীর্তনরত বিশ্বম্ভরকে৷ এই পরিবর্তনের পটভূমিকা হয়তো সাজানো ছিল বহু আগেই, শুধু গয়ায় শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর সংস্পর্শে এসে তিনি দিব্যচৈতন্য লাভ করেন৷ পিতৃকার্য সেরে গয়া থেকে নবদ্বীপ ফিরে আসার পর বৈষ্ণবরা পেয়েছিলেন এক নতুন নেতা'কে - সংকীর্তন কান্ডারি প্রভু বিশ্বম্ভরকে৷ এই সময়েই দূর হয়েছিল তাঁর সমস্ত পান্ডিত্যের অহংকার আর অধ্যাপনার ইচ্ছে৷ তথাপি ছাত্ররা আর কেউ অন্যত্র শিক্ষালাভে যেতে রাজি ছিলেন না৷ তাই সকলে মিলে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়৷ নবদ্বীপের পথেঘাটে সন্ধ্যেবাতি আর শাঁখের শব্দের সাথে ধ্বনিত হতে লাগলো খোল কর্তালের মাতন৷ সুসজ্জিত চৈতন্যদেবের অগ্রভাগে নাচ ও কীর্তনের মাধ্যমে নেতৃত্বদানে বৈষ্ণবরা পেলেন এক নতুন উদ্যমশক্তি৷ 
নগর কীর্তনে জমায়েত হতে শুরু করলেন অগণিত মানুষ৷ শুধুমাত্র চৈতন্যদেব নন, বৈষ্ণব সমাজের কান্ডারীদের মধ্যে নেতৃত্ব দিলেন দ্বিতীয় নেতা তথা অবধূত নিত্যানন্দ,  আচার্য অদ্বৈত, বণিক শ্রীবাস, গায়ক মুকুন্দ, গদাধর প্রভৃতি বৈষ্ণবগণ৷ বাংলার ইতিহাসে শাসকের অত্যাচারের ওপর কার্যত এ এক প্রথম প্রতিরোধ৷ 

জীবনী গ্রন্থকার বৃন্দাবন দাস ও কৃষ্ণদাস কবিরাজ এই সময়কালে প্রভুর একাধিকবার ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেছেন৷ দশ অবতারের ভাব থেকে হলধর ভাব- বিভিন্ন সময়ে ভক্তরা দেখতেন প্রভুর আবেশ৷ নিত্যানন্দ আগমনের পূর্বেও হলধর ভাবে আবিষ্ট হন চৈতন্যদেব৷ নিত্যানন্দ আসছেন এই স্বপ্ন দেখে প্রভু বলছেন 

কহিতে প্রভুর বাহ্য সব গেলো দূর
হলধর ভাবে প্রভু গর্জয়ে প্রচুর
"মদ আন, মদ আন" বলি প্রভু ডাকে
হুঙ্কার শুনিতে যেন দুই কর্ণ ফাটে 
(চৈ:ভা:)

হলধর বলরাম মদিরা পান করতেন৷ তাই হলধর আবেশে মদিরার কথাই বলতে শোনা যায় বিশ্বম্ভরের মুখে৷ এমন নিত্য আবেশে শিশুসুলভ চাঞ্চল্য প্রকাশ থেকে অবতার ভাব প্রদর্শন- প্রতি মুহূর্তে চলতো নিত্য নতুন লীলা৷ 

চৈতন্যদেবের নবদ্বীপ পর্যায়ে আরো দুটি বিখ্যাত ঘটনা হলো নবদ্বীপের অত্যাচারী চাঁদ কাজী এবং কোটাল জগ্ননাথ ও মাধবের (জগাই মাধাই) মধ্যে মানবপ্রেমের বীজবপন৷ চৈতন্য জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা শাসক ও রাজশক্তির সামনে চৈতন্যপ্রভাব বারে বারে দেখে থাকি৷ নবদ্বীপে কাজী থেকে উড়িষ্যার প্রবল পরাক্রমশালী গজপতি রাজা প্রতাপরুদ্রদেব বা রাজামুন্দ্রীর প্রশাসক রায় রামানন্দ - প্রত্যেকেই ছিলেন একনিষ্ট চৈতন্য সেবক৷ এমনকি গৌড় সুলতান হুসেন শাহের দুই উচ্চপদস্থ হিন্দু কর্মচারী দবীর খাস ও সাকর মল্লিক উড়িষ্যায় থাকাকালীন চৈতন্যদেবের সাথে গোপনে দেখা করতেন৷ পরবর্তী সময়ে এঁরাই বৃন্দাবনে বিখ্যাত ছয় গোঁসাইয়ের অন্যতম রূপ ও সনাতন গোস্বামী নামে শ্রীকৃষ্ণের গুপ্তলীলা প্রকাশ করেন৷ তবে অনেক গবেষকের মতে চৈতন্যদেব রাজা প্রতাপরুদ্র ও উড়িষ্যাকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন৷ উড়িষ্যার প্রধান শত্রু বাংলা। আর এই বাংলার দুই প্রধান রাজকর্মচারীকে কৃপাপ্রদান তারই অঙ্গ কিনা তা অবশ্য প্রমাণসাপেক্ষ৷ তবে বিভিন্ন সংকটে তিনি যে উড়িষ্যা ও তাঁর গজপতি রাজশক্তিকে ছায়াপ্রদান করেছিলেন তা অনস্বীকার্য৷ এই কারণেই তাঁর আর এক নাম 'প্রতাপরুদ্র সংত্রাতা'৷ উড়িষ্যার বিভিন্ন লৌকিক ও অলৌকিক ক্রিয়ার বিবরণগুলি পর্যায়ক্রমে আমরা পরবর্তী পর্বগুলিতে নিশ্চই আলোচনা করবো৷ 

চৈতন্য চরিত্রে প্রকট ছিল অনেকগুলি সত্ত্বা৷ নবদ্বীপে কখনো তাঁকে দেখা যেত শিশুর মতো গঙ্গায় জলক্রীড়া করতে৷ আবার কখনো বলিষ্ঠ নেতার মতোই দৃঢ় ছিল তাঁর বজ্রকঠিন নেতৃত্ব৷ তাঁর নেতৃত্বগুনে দেখা যেত সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আকুতি, দোষীকে শাস্তিদানের ব্যবস্থা এবং জাতিভেদকে তুচ্ছ করে মানবধর্মকে শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করার মতো দৃঢ়চেতা পদক্ষেপ৷ তাঁর দণ্ডদানের সমতাভাব বোঝাতে নবদ্বীপের একটি ঘটনা আলোচনা করা যেতেই পারে৷ তিনি বলেছিলেন শচীমাতার বৈষ্ণব অপরাধ ছিল৷ আচার্য অদ্বৈতর কাছে তিনি অপরাধী ছিলেন৷ তাই তাঁর প্রেম ভক্তি পাবার অধিকার ছিল না৷ শচীমাতার জ্যেষ্ঠ পুত্র বিস্বরূপ ছিলেন আচার্যের ছায়াসঙ্গী৷ পরবর্তী সময়ে নিমাইও হয়ে ওঠেন তাঁর সহচর৷ স্বভাবতই মাতা শচী সবসময় শঙ্কিত থাকতেন এবং আচার্য কে খুব একটা পছন্দ করতেন না৷ তাই বিশ্বম্ভর বলেন আচার্যের পদধূলি গ্রহণ করলে তবেই মা হবেন অপরাধমুক্ত৷ এই কথা শুনে আচার্য অদ্বৈত বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং সেই অবসরে শচীমাতা আচার্যের পদধূলি গ্রহণ করেন৷ এমনই ছিলেন চৈতন্যদেব৷ মানবশিক্ষার প্রতিটি পর্যায়ে তিনি ছিলেন কাঁচের থেকেও স্বচ্ছ৷ তাঁর কাছে আপন-পর তুচ্ছ৷ তিনি নির্দ্বিধায় বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন ভিক্ষু শুক্লাম্বরকে, আবার অবলীলায় ত্যাগ করতে পারেন রাজ্আমন্ত্রণ৷ 

এহেন প্রভুর আবির্ভাবে নদিয়ার লোকজন যে বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট হবেন, তা বলাই বাহুল্যতা৷ চৈতন্যের শক্তিতে তাঁরা সকলে ছিলেন বলীয়ান৷ যে সময় নবদ্বীপের কাজী চাঁদ খানের সাথে বিবাদ বাঁধে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের, সেই সময় তিনি নিজে সংগঠিত করেন মানুষের আন্দোলন৷ কাজী হরিনাম সংকীর্তনের বিরোধিতা করবার জন্য নির্বিচারে মৃদঙ্গ ভাঙতেন, ছত্রভঙ্গ করতেন কীর্তন মিছিল৷ তখন প্রভু নবদ্বীপ থেকে বিশাল মিছিল সহযোগে এগিয়ে এসেছিলেন কাজীর দরজায়৷ প্রত্যেকের হাতে শান্তির মশাল৷ সেই সময় ভারতবর্ষ দেখেছিলো প্রথম মানুষের আন্দোলন, শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ৷ সেই প্রেম ভক্তির বন্যায় ভেঙে যায় কাজীর যাবতীয় প্রতিরোধ, কাজীও হয়ে ওঠেন চৈতন্য অনুগামী৷ বাংলার ইতিহাসে এ এক অনন্য গৌরবের কাহিনী৷ শাসকের অত্যাচারে অতিষ্ট মানুষের মুক্তিলাভের কথা৷ নেপথ্যে সেই চৈতন্যদেব৷ 

তাঁর মতো বলিষ্ঠ তথা সহানুভূতিশীল নেতা বর্তমান ভারতবর্ষের কাছে উদাহরণস্বরূপ৷ তাঁর অনুগামী ও ভক্তদের মধ্যে যে একতা এবং মৈত্রীভাব দেখা যেত, তা চৈতন্য পরবর্তী ভারতে সত্যিই বিরল৷ পন্ডিত শ্রীবাসের একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হয় তাঁর অন্দরমহলে চৈতন্যদেবের কীর্তন কালে৷ অন্য ভক্তদের কীর্তন আনন্দে বিঘ্ন ঘটবে বলে তিনি ঘরের রমনীদের কাঁদতে পর্যন্ত বারণ করেন৷ এমনকি বেদনায় জর্জরিত শ্রীবাস নিজেও কীর্তনে মেতে থাকেন বহু সময়৷ পরে চৈতন্যদেব জানতে পারলে নিজে হাতে শ্রীবাসের পুত্রের দেহ সৎকারে নিয়ে যান নবদ্বীপের গঙ্গার পাশে৷ মধ্যযুগের বৈষ্ণব ইতিহাসে এ এক উজ্জ্বল সময়৷ মৈত্রীর এমন উপমা সারা বিশ্ব কতবার দেখেছে, তা আজও গুনে বলা যায়৷

(ক্রমশ)

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

কৌশিক চক্রবর্ত্তী



পুরুষোত্তম শ্রীচৈতন্যদেব  
(তৃতীয় পর্ব)



প্রথম দুটি খণ্ডে সমকালীন সমাজ ও চৈতন্য জীবনীকারদের সম্বন্ধে আমরা কিছু ধারণা পেয়েছি। এবার সময় আসছে সেই সময়ের সাথে সাথে নবদ্বীপের সমাজচিত্র ও শিক্ষার সামগ্রিক রূপটি নিয়ে কিছুটা বিশ্লেষণ করার। দক্ষিণ রাঢ় বাংলায় গঙ্গার পশ্চিমে নদীয়া জেলার অন্তর্গত গ্রাম নবদ্বীপ। সংস্কৃত ও ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষায় তখন সমগ্র ভারতের মধ্যে অগ্রগণ্য এই গ্রাম। দূরদূরান্ত থেকে ছাত্র আসতেন ব্যাকরণ ও ন্যায়ের পাঠ নিতে। সংস্কৃত ব্যাকরণে নবদ্বীপের পন্ডিতরা সমগ্র দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আমাদের প্রাণের মানুষ চৈতন্যদেবের বাবাও (পন্ডিত জগন্নাথ মিশ্র) ছিলেন ব্যাকরণের বিশেষ পন্ডিত। তিনি নিজ পান্ডিত্যগুণে 'পুরন্দর' উপাধিও লাভ করেছিলেন। সেই সময় নবদ্বীপের পথে-ঘাটে ব্যাকরণ ও ন্যায় নিয়ে মুখে মুখে আলোচনা ও তর্ক লেগেই থাকতো। কিন্তু নবদ্বীপের পন্ডিতরা শাস্ত্র ও ব্যাকরণে চিরন্তন বুৎপত্তি লাভ করলেও বাংলায় ন্যায়শাস্ত্রের প্রচার ও শিক্ষাপ্রদানের কৃতিত্ব যদি কারো প্রাপ্য থাকে, তা একমাত্র দিগ্বিজয়ী পন্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্যের। পরে তিনিই ওড়িষ্যার রাজদরবারে আমন্ত্রিত হন রাজপণ্ডিতের আসন অলংকৃত করতে। তিনি আজও বাংলার গৌরব, প্রত্যেকটি ন্যায়ের ছাত্রের কাছে প্রাতঃস্মরণীয়। 
একটি সময়ে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়নের একমাত্র পীঠস্থান ছিল মিথিলা। মিথিলার পন্ডিতদের কাছে বাংলা থেকে অগণিত ছাত্র ছুটে যেতেন শুধুমাত্র ন্যায় অধ্যয়নের জন্য। কিন্তু বাংলার ছাত্রদের মেধা ও পান্ডিত্যের জন্য আশঙ্কায় থাকতেন মৈথিলী পন্ডিতের দল। তাই ন্যায়ের কোনো টীকাগ্রন্থ সঙ্গে করে বাংলায় নিয়ে আসা ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। এই প্রতিকূল অবস্থায় পন্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্য সমস্ত ন্যায়ের টীকা কণ্ঠস্থ করে বাংলায় ফিরে আসেন এবং শুরু করেন ন্যায়শিক্ষার টোল। তাঁর এই ঋণ বাংলা কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। 
ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন বলছেন- "নবদ্বীপে ন্যায়ের টোল তখন হিন্দুস্থানে অদ্বিতীয়; দর্শন, কাব্য, অলংকার প্রভৃতি শাস্ত্রেরও সেইসময় বিশেষরূপে চর্চা হইতেছিল।" তাঁর ভাষায়- "পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে নবদ্বীপ তিনটি শ্রেষ্ঠ পুরুষকে উপহার দিয়াছে - রঘুনাথ শিরোমনি, স্মার্ত রঘুনন্দন ও চৈতন্যদেব।" প্রথম দুজন শাস্ত্রকার সেইযুগের গর্ব। আর তৃতীয় জন? চলতে থাকুক আমাদের ধারাবাহিক, ধীরে ধীরে 
জানবো তাঁর পান্ডিত্য, ভক্তিরস ও দর্শন। 
এই হলো নবদ্বীপের পন্ডিত সমাজ ও শিক্ষার সামগ্রিক ছবি। কিন্তু ধর্ম? চৈতন্য জন্মের আগে সমাজের চিরকালীন ভেদাভেদ ও ধার্মিক সংকীর্ণতার ওপরে কখনোই উঠতে পারেনি শিক্ষিত নবদ্বীপ। উঁচু নীচু ব্রাহ্মণ শুদ্রের ভেদাভেদ কুরেকুরে খেতে থাকে সমাজের ভিতকে। চৈতন্যদেব ছিলেন উদার। তাঁর মানবধর্ম জাত চেনেনি কখনো। নিজে ব্রাহ্মণ হয়েও থোড়-মোচা বিক্রেতা গরিব শুদ্র শ্রীধরের সাথে যেমন তিনি মজা করে তর্ক করতেন, তেমন ভিক্ষুক শুক্লাম্বরের ঝুলি থেকে খাদ্য গ্রহণ করতেও পিছপা হতেন না কখনো। আজও মানুষ আত্মগরিমা প্রতিষ্ঠা করেন প্রতি ক্ষণে। কথায় কথায় স্থাপন করেন কাজের অহংকার। আর পঞ্চদশ শতকে তিনি ছিলেন সেসবের উর্দ্ধে। এখানেই তাঁর যুগোত্তীর্ণ মানবতা। তাই তিনি মানুষের দেবতা, অন্তজের প্রাণ।
রাতের অন্ধকারেও আকাশে থাকে আলোর তৃপ্তি, বয়ে নিয়ে যাওয়া ভালোবাসা। একটি মাত্র উজ্জ্বল চাঁদের উপস্থিতি চিনিয়ে দেয় আকাশের অস্তিত্ব। কিন্তু তারপাশেও অগণিত জ্যোতিষ্কের ভিড় যেন প্রতি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করে চাঁদের স্বকীয়তাকেই। মহামানব কখনো একা আসেন না, সঙ্গে আনেন তাঁর পারিষদদের। চৈতন্য আবির্ভাবের পূর্বে নবদ্বীপের বৈষ্ণব সমাজে অগ্রগণ্য ব্যাক্তিত্ব ছিলেন পন্ডিত অদ্বৈত আচার্য। চৈতন্য জীবনী বিশ্লেষণে তাঁকে উপেক্ষিত রাখলে যেন অধরাই থেকে যায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্বের আদি রূপ। তিনি ছিলেন তৎকালীন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অবিসংবাদী নেতা। শান্তিপুরের কমলাক্ষ ভট্টাচার্য নিজ নেতৃত্বগুনে হয়ে উঠেছিলেন অদ্বৈত, সংখ্যালঘু ভাববাদী বৈষ্ণবসমাজের গুরু। শুদ্ধ চিত্তে তিনি প্রতি সকালে গঙ্গাজল ও তুলসী নিয়ে আবাহন করতেন স্ময়ং নারায়ণকে। বৈষ্ণব সমাজ আজও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, চৈতন্যদেব তাঁরই ডাকে অবতীর্ণ হন নদিয়ায়, মান্যতা দেন অন্তজ শ্রেণীর সংগ্রামকে।
আর একজনের প্রসঙ্গ না আনলেই নয়। তিনি চৈতন্য আমলে বৈষ্ণব সমাজের দ্বিতীয় নেতা নিত্যানন্দ প্রভু (পিতৃদত্ত নাম 'কুবের গোস্বামী')। ধারে, ভারে, ও ব্যাক্তিত্বে তিনি সেই শতকের এক উজ্জ্বল পুরুষ। বীরভূম জেলার একচক্র বা একচাকা গ্রামে (বর্তমানে তারাপীঠের নিকটে বীরচন্দ্রপুর গ্রাম) ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের বেশিরভাগ সময় একজন অবদূত রূপে সারা ভারত ভ্রমণ করে কাটিয়ে দেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে অচেনা সন্ন্যাসীর সঙ্গে ঘর ছেড়ে তাঁর বেরিয়ে পড়া ঈশ্বর উপলব্ধির উদ্দেশ্যে। তারপর বৃন্দাবন থেকে শ্রীপাদ মাধবেন্দ্রপুরীর কাছে চৈতন্যদেবের কথা শুনে তাঁর নবদ্বীপে আগমন। আর সেই থেকেই শুরু দুই ভাইয়ের মানবধর্ম প্রচার। চৈতন্য জীবনী ঘাঁটতে গিয়ে আমরা বারে বারে তাঁর ওপর চৈতন্যদেবের অগাধ শ্রদ্ধা ও নির্ভরতার বিশেষ পরিচয় লক্ষ্য করেছি। একটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারলাম না - চৈতন্যদেব তখন মানুষের ঈশ্বর, ভক্তের ভগবান। তিনি একে একে বরদান করছেন সকল ভক্তকে। এমনকি আচার্য অদ্বৈতকেও। কিন্তু বরদান করলেন না শুধু প্রভু নিত্যানন্দকে। উপরন্তু প্রভুর পরনের বস্ত্র ছিঁড়ে তিনি শ্রদ্ধাভরে প্রদান করলেন আর তাঁর পাদোদক পান করতে বললেন সকল ভক্তকে। এই হলো নিত্যানন্দ স্বরূপ। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ তাঁকে স্ময়ং বলরাম বলেই বিশ্বাস করেন। চৈতন্যদেবও নবদ্বীপে নিত্যানন্দ আগমনকালে হলধর বলরামের স্বপ্ন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। 
এমনই ছিল তখনকার নবদ্বীপ। শিক্ষায়, চেতনায়, ধর্মসচেতনতায় সারা ভারতের মধ্যে তার স্থান ছিল সবার ওপরে। এহেন নবদ্বীপের জ্যোতি সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে নি। তারসঙ্গে যোগ হয়েছিল এতোগুলি মহামানবিক চেতনার আধার- তাই পঞ্চদশ শতকে নবদ্বীপ তথা বাংলার পথ আটকায়, এ সাধ্য কার। খুব তাড়াতাড়িই এই বৈষ্ণব সমাজে প্রচলিত মানবধর্মের ছাতার তলায় এসে পড়েন ভারতবর্ষের বিভিন্ন দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক, যুগপুরুষ এবং অগণিত সাধারণ মানুষ। পরবর্তী খণ্ডগুলিতে আমরা দেখবো কিভাবে অকূল চৈতন্য প্রভাবে সমাজের মাথা, রাজা, মুসলিম কাজী পর্যন্ত নগরে কীর্তন করতে করতে হেঁটেছিলেন নীচ চণ্ডালদের হাত ধরেও। 
আজও আমরা মুক্তি পাইনি ধর্ম সংকীর্ণতার প্রকোপ থেকে। আজও একজন মুসলিম বা হিন্দুকে নির্মমভাবে মরতে হয় নিছক জাতিদাঙ্গার কারণে, ধর্মাচরণের কারণে। ৬০০ বছর আগে সেই মহামানব যে ধর্মের পথ তুলে এনেছিলেন সমাজের সামনে, তার প্রত্যেকটি মুহূর্ত হয়তো আজও সমান প্রাসঙ্গিক, শিক্ষণীয়ও বটে। জাত নয়, ধর্ম হয়, মানুষের একমাত্র ধর্ম মানবধর্ম। আজও বারে বারে ফিরে আসে চন্ডিদাসের উক্তি - "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই"।

(ক্রমশঃ)
Attachments area

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

পুরুষোত্তম শ্রীচৈতন্য  
(দ্বিতীয় পর্ব)


পুরুষোত্তম শ্রীচৈতন্যদেব প্রথম ভাগে আমরা তৎকালীন সমাজ ও গৌড়-উৎকলের রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। দেখেছি রাজ্যবিস্তার ও কুলগৌরবের জন্য সমাজপতিদের পারস্পরিক চাপানউতোর। রাজ্যশাসকদের সামাজিক বৈষম্যরক্ষায় সদিচ্ছার অভাবের সুযোগ নিয়ে বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠছিল তথাকথিত ধর্মীয় অন্ধত্বের দিকগুলি। চৈতন্য জীবনের বিভিন্ন পর্যায়গুলিতে আমরা দেখতে পাই হিন্দু ও মুসলিম ধর্মগুরুদের গোঁড়ামির উদাহরণ। কখনো শুধুমাত্র হরিনাম করার মাসুল দিতে ভক্ত হরিদাসকে বাইশ বাজার ঘুরে সহ্য করতে হয় নির্মম বেত্রাঘাত, অথবা বৈষ্ণব ধর্মাচরণের পথে বারে বারে নেমে আসে জানা অজানা বিভিন্ন অন্তরায়। এমন প্রতিকূল সমাজে অন্তরের দৃষ্টিকোণ খুব স্পষ্ট রেখে বৈষ্ণব আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়া যে যুগপুরুষের পক্ষে বেদমন্ত্র হয়ে উঠেছিল, তিনিই তো 'চৈতন্য'।

 এই পর্বে কয়েকটি চৈতন্য জীবনীগ্রন্থ এবং তার পদকর্তাদের কথা আলোচনা করবো। চৈতন্যদেবের জীবনীপর্যায়গুলো যে সকল গ্রন্থে রূপ পেয়েছে, তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট হিসাবে ধরা হয় 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' কে। এই গ্রন্থের গ্রন্থকার শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী। চৈতন্য গবেষকদের মতে এই গ্রন্থ চৈতন্যজীবনের সর্বাধিক প্রামাণ্য দলিল। ১৪৯৬ ক্রিস্টাব্দে এক বৈষ্ণব পরিবারে জন্ম হয় গোস্বামীর। জীবনের শেষ পর্বে পৌঁছে এক ব্রজবাসীর ইচ্ছানুসারে তিনি সৃষ্টি করেন 'চৈতন্যচরিতামৃত'। তাঁর কাব্যসৃষ্টিতে মূল প্রেরণা ছিল গুরু রঘুনাথ দাসের চৈতন্য সঙ্গলাভ এবং পূর্ব গ্রন্থকার মুরারি গুপ্ত রচিত 'কড়চা'। চৈতন্য জীবনীকাব্যগুলির মধ্যে অন্যতম এই 'মুরারি গুপ্তের কড়চা'। সব গ্রন্থের মধ্যে এটিই সর্বপ্রথম রচিত চৈতন্যপদ। অন্য একটি প্রধান জীবনীগ্রন্থ বৃন্দাবন দাস রচিত 'শ্রীচৈতন্যভাগবত'। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মতানুযায়ী তিনি চৈতন্য লীলার ব্যাস। ভক্তিবাদ ও কাব্যমাধুর্যে এই গ্রন্থ যে শ্রেষ্ঠ, তা এককথায় অনস্বীকার্য। অন্যতম চৈতন্য পর্ষদ শ্রীবাস পন্ডিতের ভাইঝি নারায়ণী দেবীর গর্ভে ১৫০৭ ক্রিস্টাব্দে অবতীর্ণ হন বৃন্দাবন দাস। ১৫৩৫ ক্রিস্টাব্দে তিনি রচনা করেন চৈতন্যভাগবত। পূর্বে নাম চৈতন্যমঙ্গল থাকলেও পরে লোচনদাসের চৈতন্য জীবনী গ্রন্থের একই নাম থাকার সুবাদে বৃন্দাবন দাসের কাব্যকে চৈতন্যভাগবত নামে চিহ্নিত করা হয়। চৈতন্যচরিত্রে ভগবৎ দর্শন আরোপ করে তিনি চৈতন্যদেবের মহিমাকে গৌরবান্বিত করেন, একথা সকল বৈষ্ণব সমাজ মানে। অন্য একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হলো লোচনদাস রচিত 'চৈতন্যমঙ্গল'। উৎকৃষ্ট এই গ্রন্থ মোট চারটি পর্যায়ে বিভক্ত- সূত্রখণ্ড, আদিখণ্ড, মধ্যখণ্ড, শেষখণ্ড। চারখণ্ডে রচিত এই গ্রন্থের পদগুলি বৈষ্ণব কীর্তনেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে আসে। বর্তমানে গবেষণার ক্ষেত্রে এইসকল জীবনীগ্রন্থই একমাত্র   মাধ্যম এবং চৈতন্যসূত্র।

চৈতন্য পূর্ব যুগে রচিত বিভিন্ন বৈষ্ণবপদকর্তাদের মধ্যে মৈথিলী ভাষার প্রয়োগ বেশ লক্ষণীয়। বড়ু চন্ডিদাস বা বিদ্যাপতির প্রতিটি পদে আমরা এই রীতি লক্ষ্য করি। মূলত রাধা-কৃষ্ণের পার্থিব প্রেমভাব ও অষ্টসখীর কৃষ্ণ মাথুরের বর্ণনার দিব্যভাবে আলোকিত এইসকল গ্রন্থ। কবি জয়দেবও তাঁর 'গীতগোবিন্দম'এ উদার কাব্যমাধুর্যে গোপিনীদের কৃষ্ণ বিরহের কথা লিখেছেন, যেখানে আমরা প্রথম সরল কথ্য সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ দেখতে পাই। কিন্তু আদ্যোপান্ত বাংলা শব্দের প্রয়োগে নিপূণভাবে বৈষ্ণব কাব্যরস বিতরণের ধারা তৈরী হয় চৈতন্য পরবর্তী কাব্যে। চৈতন্যদেব বাংলার এক প্রকৃত যুগভেদ, সময়ের মানদণ্ড। তাঁর জন্মের পর যে সকল চৈতন্যপদ ও রাধাকৃষ্ণ জুগলকীর্তন রচনা হয়, সেগুলিতে আধুনিক বাংলা ভাষার দক্ষ লিপিকরণ বেশ লক্ষণীয়। আজও বাংলা ভাষা ও বাঙালির কাছে এগুলি পরম সম্পদ। সমস্ত আলোচনা থেকে আমরা বেশ বুঝতে পারি যে গৌর আবির্ভাব বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, কাব্যিক ও লৌকিক মানচিত্রে এক উজ্জ্বল ক্ষণ। 

বিশেষ করে বাংলা ও উৎকলের মাটিতে তাঁকে আঁকড়ে যে ভাবাবেগ জন্মেছিলো, তা আজ প্রায় ৬০০ বছর পরেও অটুট। তাঁর মাত্র ৪৮ বছরের জীবনে দুটি বেশ সুস্পষ্ট অধ্যায় লক্ষ্য করা যায়। প্রথম ২৪ বছর জন্মস্থান নবদ্বীপে বাল্য বয়স থেকে কৈশোরে প্রবেশ এবং তারপর বাকি ২৪ বছর সন্ন্যাস গ্রহণের পরে তৎকালীন নীলাচলে(বর্তমানে পুরী বা শ্রীক্ষেত্র) অবস্থান। এই শেষ ২৪ বছরের মধ্যে দীর্ঘ ৬ বছর কাটিয়েছেন দাক্ষিণাত্যের স্থানে স্থানে। সুবিশাল ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, তাঁর চরণধূলি পড়েনি, এমন যেন কোন স্থানই নেই। শুধুমাত্র পায়ে হেঁটে অনাড়ম্বর, একলা যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গী শুধু দুই ঠোঁটের মাঝে কৃষ্ণনাম এবং মনেপ্রাণে এক তীব্র আকুতি নাম মাহাত্ম প্রচারের। পরবর্তী বিভিন্ন পর্বে আমরা তাঁর ধর্মীয় গণআন্দোলন ও চেতনার অনেক উদাহরণ খুঁজতে চেষ্টা করবো। পুরীধামের শ্রী জগন্নাথদেব বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণরই অভিন্ন বিগ্রহ। তাই সন্ন্যাস গ্রহণের পর বৃন্দাবনধামে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও শচী মায়ের অনুমতিক্রমে তিনি নীলাচলবাসী হন(বাংলা থেকে নীলাচলের দূরত্ব ও অবস্থানগত সুবিধার জন্য মা তাঁকে এই অনুমতি দেন)। তাই তাঁর এই দুই লীলাক্ষেত্র (বাংলা ও উৎকল) আজও স্মৃতি বুকে ধরে জাগিয়ে রেখেছে ৬০০ বছরের অমলিন ইতিহাস। এমনকি শোনা যায় বর্তমান ওড়িশাতে চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির ও পুজনস্থলের সংখ্যা বাংলার থেকেও বেশি। 

'সৃজন' পত্রিকার প্রতিটি পর্বের হাত ধরে আমরা ধীরে ধীরে হেঁটে যাবো সেই সরণির পথে। খুঁজে দেখবো এই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের চারপাশে থাকা প্রতিটি জ্যোতির্পূঞ্জকে। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত অবিকৃত রেখে ইতিহাসের নুড়িপাথরগুলো সরালেই হয়তো ধীরে ধীরে উঠে আসবে অনেক অজানা বিস্ময়।

ক্রমশ...







মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


পুরুষোত্তম চৈতন্যদেব


চৈতন্যসিংহের নবদ্বীপে অবতার।
সিংহ গ্রীব সিংহবীর্য সিংহের হুঙ্কার।।
..................
দৈর্ঘ্য বিস্তারে যেই আপনার হাতে।
চারি হস্ত হয় মহাপুরুষ বিখ্যাতে।।
........
আজানুলম্বিত ভুজ কোমললোচন।
তিনফুল জিনি নাসা সুধাংশুবদন।।
(চৈতন্য চরিতামৃত, কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী)

মধ্যযুগে চৈতন্য আবির্ভাব - বাংলার আকাশে ধর্মীয় নবজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদেশী শাসকের অহেতুক অত্যাচারের হাত থেকে সনাতন ধর্ম তথা বাংলার সুবিদিত সভ্যতাকে সুপরিকল্পিত ভাবে রক্ষা করার এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। চৈতন্য পরবর্তী যুগে সুচিন্তিত চৈতন্য গবেষণার কোনো অভাব কোনোকালেই দেখা যায় নি। সমসাময়িক বৃন্দাবন দাস ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যে ডঃ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী - বিভিন্ন কালে আমরা বহু চৈতন্য জীবনী ও গবেষণা গ্রন্থের মাধ্যমে চিনতে পেরেছি সেই সিংহপুরুষকে। কিন্তু সকল গবেষণাকে আমরা যদি দুভাগে ভাগ করে নিই, তাহলে দেখবো একটি বিভাগে ধর্মের বন্ধনে চৈতন্য জীবনীতে অবতারতত্ব অর্পণ করে প্রাচীন গ্রন্থকাররা সেই সুবিশাল ব্যাক্তিত্বের সামগ্রিক পরিচয় ধরতে পারেন নি। কোনো একটি বই থেকে আমরা তাঁর সমগ্র জীবনচরিত সংগ্রহ করতে পারি না।১৪৮৬ ক্রীষ্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারী যে মহাপুরুষের জন্ম নদীয়া জেলার জনপদ নবদ্বীপে, সময়ের সাথে তাঁর বেড়ে ওঠা ও সমগ্র ভারতে ধর্মীয় সচেতনতার মাধ্যমে জনমানসে এক বলিষ্ঠ অবিসংবাদী নেতা হয়ে ওঠার কাহিনী আজ আমরা সঠিক ভাবে কতটা জেনে উঠতে পেরেছি, তা অবশ্যই প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
প্রকৃত অর্থেই সেই সময় ছিল ভারতের স্বর্ণযুগ। বাংলায় চৈতন্য, উত্তরে রামানন্দ, পশ্চিমে নানক, তুকারাম, মীরাবাঈ দক্ষিণে রামানুজ, ব্যাসরায়-দের সুযোগ্য নেতৃত্বে স্বকীয়তার সাথে এগিয়ে চলেছে ধর্মীয় গণঅভ্যুত্থান। আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগেও বাংলার মাটিতে এক আসনে খেতে বসছেন ব্রাহ্মণ ও তথাকথিত চণ্ডাল - এ এক অকল্পনীয় দৃশ্য। সপার্ষদ চৈতন্যদেবের সিংহহৃদয়েই হয়তো ছিল এমন নিহিত শক্তি - যা খুব অনায়াসেই তাঁকে দেবত্ব আরোপ করেছিল। বৃন্দাবনের কৃষ্ণ মানুষের আরাধ্য হয়ে ওঠেন খুব সহজে। কিন্তু মহাভারতে এক দক্ষ রাজনীতিজ্ঞ কৃষ্ণকে না জানলে যেমন প্রকৃত কৃষ্ণচরিত্র অধরা থেকে যায়, ঠিক তেমনি চৈতন্যচরিত্রের বহুমুখী দিকগুলো এবং তাঁর নেতৃত্বদানের কৌশলী দক্ষতা অজানা থাকলে তাঁকে অর্ধেক জানা হয়। এই মহামানব সম্বন্ধে বিবেকানন্দ বলছেন - "একবার মাত্র এক মহতী প্রতিভা জাল ছেদন করিয়া উত্থিত হইয়াছিলেন - ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। একবার মাত্র বঙ্গের আধ্যাত্বিক তন্দ্রা ভাঙিয়েছিলো।" তাঁর মহান ব্যাক্তিত্ব ও ক্ষুরধার দর্শনের কাছে ক্ষুদ্র ছিল শাসকের ইচ্ছে, সমাজপতিদের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মের বেড়াজাল। এমনকি সেযুগের কাহিনীকারদের কলমে আমরা প্রমান পেয়েছি যে  'গৌড়' ও 'গৌর' প্রায় সমার্থক ছিল। তাঁর চরিত্রের সাথে সাথে আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের মহান উদ্দেশ্য ও সামনে থেকে নেতৃত্বদানের বিষয়গুলি দেখবো।
পূর্ব ভারতের একমাত্র স্বাধীন বৈষ্ণব সম্রাট উড়িষ্যার গজপতি প্রতাপরুদ্রদেবের(১৪৯৭-১৫৪০) প্রতি তাঁর বিশেষ প্রভাববিস্তার ও দক্ষিণে সুবেদারদের মধ্যে বৈষ্ণব আচার বিতরণ তাঁর সুচিন্তিত নেতৃত্ত্বেরই দাবি রাখে। দক্ষিণ ভারতে আর এক বৈষ্ণব রাজা বিজয়নগরের কৃষ্ণদেব রায়(১৫০৯–১৫২৯) ছিলেন মহামতি ব্যাসরায় এর শিষ্য আর গজপতি মহারাজা ছিলেন আমাদের প্রানপ্রিয় চৈতন্যদেবের। এমনকি উড়িষ্যায় গজপতি বংশে বর্তমান কয়েক পুরুষ বাদ দিলে পূর্বের সকল রাজাই ছিলেন গৌড়ীয় চৈতন্য মতে দীক্ষিত।
সেযুগে গৌড়ের কথায় যদি আসতে হয়, তাহলে প্রথমেই দেখতে হয় রাজন্যবর্গের সামাজিক পরিকাঠামো ও তার শাসনপ্রণালীর শৃঙ্খলাগুলি। বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা ছিলেন মহারাজ সুবুদ্ধি খাঁ। গৌড় শাসনে তার প্রধান ভিত্তি ছিল সুশাসন ও প্রজার সন্তোষ। কিন্তু তারই বিশ্বস্ত মুসলিম কর্মচারী হোসেন খানের ষড়যন্ত্রে তিনি অন্যায়ভাবে সিংহাসনচ্যুত হন। হোসেন খান 'শাহ' উপাধি যোগে লাভ করেন বাংলার সুবেদারী। রাজ্যশাসনের সুবিধার জন্য বিভিন্ন স্থানে নিযুক্ত করেন মুসলিম কাজী। প্রামাণ্য গ্রন্থ অনুযায়ী জানা যায় তৎকালীন নবদ্বীপের তেমনই কাজী ছিলেন ‘চাঁদ খাঁ’। স্থানীয় হিন্দু জমিদার ও রাজাদের আনুকূল্যে তাঁরা সন্তুষ্ট রাখতেন বাংলার সুলতানকে। কর বাবদ যা আয়-উপায় হতো তার কিছু অংশ নিজে রেখে বাকিটা পাঠাতেন সুলতানের নজরানায়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ কাজীর শাসনকার্যে বিঘ্ন ঘটায় সাধ্য কার। এমন শাসনপদ্ধতির বেড়াজালে সেকালের হিন্দু বৈষ্ণবগণের যে ধর্মে-কর্মে খানিক বাধা উপস্থিত হতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন সমাজ কাঠামোয় আমরা পরবর্তীকালে দেখবো সেই উন্নত কাঁধ আর শক্ত চোয়ালের অধিকারী চৈতন্যদেবের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তিনি শুধু বলিয়ানের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজের অন্তজ শ্রেণীর ভগবান। নামের মাহাত্ম আর কর্তালের সুর অস্ত্র করে তাঁর নৃত্যকলা ও সিংহদৃষ্টি যেন আষ্টেপিষ্টে ধরেছিলো সমাজের শ্রেণীবৈষম্যকে। গঙ্গাতীরের ছোট্ট 'নিমাই' (একমাত্র শচীদেবী এই নামে ডাকতেন প্রভুকে) কখন যে হয়ে ওঠেন আপামর ভারতবর্ষের নয়নের ধন, নররূপী নারায়ণ - তা বোধহয় তৎকালীন সময়ও লিখে রাখতে পারে নি।
বিস্তৃত বঙ্গভূমির বাইরে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তখন চঞ্চল। ভারতবর্ষের প্রতাপশালী হিন্দু রাজা উড়িষ্যার গজপতি প্রতাপরুদ্র ছিলেন যুদ্ধে ব্যাতিব্যাস্ত। তাঁর প্রধান শত্রু বলতে বাংলার হোসেন শাহ আর দক্ষিণে কর্ণাটের (তৎকালীন বিজয়নগর) হিন্দু রাজা কৃষ্ণদেব রায়। পরবর্তী কালে আত্মীয়তার বন্ধনে সন্ধি হলেও দুই হিন্দু রাজা বহুকাল ছিলেন শত্রুতায় মেতে। কথিত আছে গজপতি রাজা যুদ্ধ জয় করে দক্ষিণে কাঞ্চি শহরের দেবতা শ্রীগণেশকে নিয়ে আসেন নীলাচলে। তারপর তাঁর রাজ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কাঞ্চিগনেশ মূর্তি। আজও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে আমরা স্বমহিমায় তাঁর উপস্থিতি দেখতে পাই। আবার ওপর দিকে দেখা যায় মহারাজা কৃষ্ণদেব রায় উড়িষ্যার উদয়গিরি দুর্গের কৃষ্ণ মূর্তি হরণ করে বিজয়নগরে প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহু জমি দেবোত্তর করে দেন। সঙ্গে নির্মাণ করেন সুবিশাল শ্রীকৃষ্ণ মন্দির। এমনি ছিল দুই শক্তিশালী বৈষ্ণব রাজার পারস্পরিক দ্বন্দ্বের চরিত্র।
তারপরও ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দু রাজ্য ছিল উড়িষ্যা। বহুকালে বহু বিদেশীশক্তির আক্রমণ থেকে এই রাজ্য কখনো  রক্ষা পায় নি। কিন্তু গজপতি রাজন্যবর্গের প্রতাপে শত্রু প্রতিহত হয়ে উড়িষ্যা বারে বারে পেয়েছে সতন্ত্রতার সম্মান। আজও গজপতি রাজা দিব্যসিংহদেব বাহাদুরকে আমরা প্রতি রথযাত্রায় ভক্তি সহযোগে রথ মার্জনা করতে দেখি।


(ক্রমশ…)