রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পিয়াংকী

                        




গতকাল যাহা গোলারুটি আজ তাহাই প্যানকেক 


একটা আলসে দুপুর, ঝিমঝিমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলা। একটা ছোট্ট শালিক কাকভেজা হয়ে বসে আছে পাতার আড়ালে...এসব দেখতে দেখতে কখন যে  লাঞ্চটাইম চলে এল টেরই পাইনি।কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে বিড়ালের মত ঘুরঘুর করছি,আচমকা চোখ পড়ল কৌটোঘরের তৃতীয় তাকে।এখানে আটা ময়দা ব্যাসন ওটস চালগুঁড়ো এসব রাখা থাকে। দেখা মাত্রই মাথায় কিলবিল করে উঠল খাদ্যপোকারা।

     


একটা বড় ডিপ বাটি নিলাম।সেখানে চারচামচ করে ব্যাসন ওটসগুঁড়ো আর আটা, দু'চামচ করে ময়দা কর্ণফ্লাওয়ার এক পিঞ্চ বেকিং সোডা স্বাদমতো নুন দু'চামচ চিনিগুঁড়ো নিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিলাম, এরপর  একটা ডিম একটা কলা অল্প দুধ দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে মাঝারি ঘনত্বের ব্যাটার তৈরি করে নিয়ে একটা ননস্টিক প্যানে দু'ফোঁটা অলিভ অয়েল ব্রাশ করে তৈরি করে রাখা মিশ্রণ কিছুটা ঢেলে গোল করে ঘুরিয়ে নিয়ে একটা ঢাকনা দিয়ে পাঁচ মিনিট গ্যাসের আঁচ কমিয়ে রাখলাম।এরপর ঢাকা খুলে অপর দিক উল্টে দিয়ে আবার দু'মিনিট।  


মা খুব ভালো গোলারুটি করত। ঝাল হোক বা মিষ্টি মায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মা নিজেই।আজ যাকে আমরা প্যানকেক বলি বহুবছর ধরেই বাংলার রান্নাঘরে সে ই ছিল গোলারুটি। 


এর সাথে সাইড ডিশ হিসেবে খেলাম  খাকড়ি গুড়।এখন আপনারা বলবেন এটা কি বস্তু? এর খায় নাকি মাথায় দেয়?আমি বলব এটা দারুণ লোভনীয় পদ।যারা বাড়িতে ঘি তৈরি করেন তারা জানবেবই ঘি ছেঁকে নেবার পর ছিবড়ে অংশটা পড়ে থাকে, অনেকেই গরম ভাতে বা মুড়ি দিয়ে ওটা খান,আমি খাকড়িটার সাথে একটু গুড় মিশিয়ে একটা প্যানে একদম লো স্টিমে ক্রমশ নেড়ে তৈরি করেছি খাকড়িগুড়।


গোলারুটি বলুন বা প্যানকেন, খাকড়ির সাথে জমে গেল বৃষ্টিধোঁয়া একাকী লাঞ্চ।.

            


জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                         


                                                                    



অশান্তি 😌 থেকে শান্তি😊

💕💕💕💕💕💕💕💕💕

  মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হল অশান্তি। এ এক ভয়ঙ্কর রোগ। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে এই রোগের শিকার। মহামারীর চাইতে অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। অশান্তিতে যে ভুগছে, সে সবসময় চাইবে অপরজন তার অসুবিধাটা বুঝুক। চুপ করে থাকলেও তার শরীর হতে বিচ্ছুরিত হয় অশান্তির আলো, যা পরিবার বন্ধু এবং সমাজ করে তোলে অন্ধকার। 

💕💕💕💕

অশান্তির সমস্ত কারণের পিছনে বাস্তব সম্মত কিছু ভিত্তি থাকে। কোনো কিছু অকারণ হয় না। সেই কারণ বলতে না পারা বা বুঝতে না পারার সঙ্গে লড়াইতে ক্লান্ত মানুষ, সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য, নিজের এক কাল্পনিক দুনিয়া তৈরি করে, সেটা ঠাকুরঘর হতে পারে, গানের ঘর হতে পারে, লেখার টেবিল অথবা পরকীয়া। ধীরে ধীরে সেই কাল্পনিক দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে পড়ে, আর মুক্ত হতেই চায় না, এমন ও দেখা গেছে, সেই দুনিয়ায় কিছু মানুষজনের দেখা পায় সে। অর্থাৎ, মনের স্থিতি তখন নষ্ট হতে চলেছে। 

আর, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ শরীরের মধ্যে সৃষ্টি করে না না রোগের। ক্যান্সার সহ  সুগার প্রেসার বহু রোগের কারণ অশান্তি থেকে উৎপন্ন নেগেটিভ এনার্জি।  নষ্ট করতে থাকে কাজের উৎসাহ উদ্দীপনা আনন্দ। অকারণ কান্না পায়, দুনিয়া ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে আসে।

😊😊😊😊😊😊

আগেই বলেছি, অশান্তি অমূলক নয়। থাকে কিছু তো ঘটনা থাকে। প্রথম কারণ আমি বলব , কথা। শব্দ ব্রহ্ম। কথার শক্তি প্রচন্ড। শব্দবাণ রক্তাক্ত করে দিতে পারে মানুষকে। পরিবারের একটি কথা, ফেসবুকের একটি পোস্ট ... বদলে দিতে পারে আগামী কিছু ঘণ্টা। কথার আঘাত সামলে ওঠা খুব মুশকিল। বিশেষত, কুৎসা রটনা শুনলে মন খারাপ হয়। কুৎসা মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। ফলে, কেউ কাজ ছেড়ে দেয়, কেউ আত্মহত্যা করে। তাহলে কথা একটা কারণ। এবার, দিনের শুরু থেকে রাতের ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত শুধু মাত্র ভালো কথা শুনব এটা হতে পারে না। মনে রাখতেই হবে, বাজে কথা ভেসে আসবেই। স্বামী সন্তান ভার্চুয়াল জগৎ... টুক করে খারাপ কথা এসে নাড়িয়ে দেবে মনের স্থিতি। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভালো কথা তোষামোদি কথা মন উৎফুল্ল করছে, কুৎসা মন খারাপ করছে। দুটো অভিঘাত আসছে বাইরে থেকে। এবার আমার করণীয় কী? সুতরাং, সকালে উঠে সবচেয়ে আগে আয়না থেরাপি করে নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে: আমি শক্তিশালী একজন মানুষ। আজ যে কথাই আসুক, আমার সুবিধা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ অথবা বর্জন করব। সারাদিন দেখতে হবে অপরের মুখ তাই আয়নায় আগে নিজেকে দেখি, নিজেকে তৈরি করি তারপর দেখব অপরে কি বলে! কুৎসার আয়ু বেশিদিন থাকে না। বিচলিত হলে বরং কুৎসার রটনাকে ইন্ধন দেওয়া হবে। 

এই থেরাপি খুব কাজে দেয়। টানা কয়েকদিন করলে তফাৎ বোঝা যায়। 

 *****

অশান্তির আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল অবদমন। চেপে রাখা। অনেক কিছু আমরা চেপে রাখতে বাধ্য হই, যৌনতা থেকে জীবনের অসফল কিছু মুহূর্ত চেপে রাখি সযত্নে। এই চেপে রাখার ফলে ভিতরে ভিতরে বাড়তে থাকে অশান্তি। এই চেপে রাখা কিন্তু ঘুন পোকার মত। তিলে তিলে শেষ করে দেবে। নাহ্, বাইরের কাউকে বলতে না পারলে, নিজেকে বলা যাক। নিজেকে বন্ধু করে তুলতে হলে, 5 মিনিট সময় দিতেই হবে। এবং, জিজ্ঞেস করতে হবে কোথায় হচ্ছে গন্ডগোল। আজকাল এটা ট্রেন্ড, নিজেকে ব্যস্ত প্রমাণ করা। কেবল বলে যাবে, এক ফোঁটা সময় নেই অথচ অনর্থক চ্যাট করার সময় আছে। কি হবে নিজেকে  5 মিনিট দিলে? চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটবে। পরিণত হবে। 5 মিনিট শারীরিক ব্যায়াম যেমন শক্ত করে শরীর, তেমনি মনের ব্যায়াম পুষ্টি জোগায়, পরিণত করে,  ঘটনাটার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে দেখা যাবে, চেপে রাখা ঘটনা নিজের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে ঘটনাকে কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তার একটা উপায় বার হয়। না হলে, অনর্থক উত্তেজিত মন ক্লান্ত অবসাদ আচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। এই সময় একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে পারলে আরো ভালো।

*******

আপোষ অথবা কম্প্রোমাইজ , অশান্তি সৃষ্টির বড় কারণ। আপোষ করে চলতে হবেই, নাহলে সংসারে থাকা মুশকিল। কিন্তু, একটা সীমার পরে মন আর নিতে পারে না, তখন শরীরও বিদ্রোহ করে। আপোষ করে চলতে ভালো লাগে না, কথায় কথায় মন চায় , মুক্ত বিহঙ্গের মত বেরিয়ে পড়তে। যদিও, বিহঙ্গ ও মুক্ত নয়, তাকেও আপোষ করতে হয়, সুতরাং, ব্যাপারটাকে ইতিবাচক নজর দিয়ে দেখতে হবে। ওই যে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে চলার প্রক্রিয়া, সেই শক্তিমান চিন্তা শক্তি সাহায্য করবে, আপোষ করেও কি করে নিজেকে সুন্দর এবং ভালো রাখা যায়, সেটা করতে। মনে রাখতে হবে, অশান্তি হল ধোঁয়া, আর স্ট্রেস হল আগুন। 

শুরু থেকে অশান্তির উৎস খুঁজে বার করে তার উপর কাজ না করলে ধীরে ধীরে সেটাই পরিণত হবে মারণ দায়ী স্ট্রেস এ। 

*******

অশান্তি থেকে আসে অবসাদ। মনের নিজেরও কিন্তু ইমিউন পাওয়ার আছে , আছে অরা অর্থাৎ প্রচুর পজিটিভ এনার্জি নিয়েই আমরা জন্মায়। প্রবল অবসাদের আক্রমণে ক্ষয় হতে থাকে এনার্জি। মন দিশেহারা হয়ে পড়ে, ডিসিশন নিতে ভুল করে ফলে আবার অবসাদ আসে। এইখানে বলব, দুই ভুরুর মাঝখানে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ টিপে রাখুন। এটা একটা মারাত্মক থেরাপি। যেখানে যখন ইচ্ছে করে নেওয়া যায়। অবসাদে খুব কাজে দেয় ওম মন্ত্র কানে শোনা অথবা মুখে উচ্চারণ করা, দিনে দশবার। অবসাদের সূচনা হলেই এই থেরাপি প্রয়োগ করুন। ভয়ঙ্কর কিছু হলে কিন্তু তখন ডাক্তার আর ওষুধ।

******

আলোচনা শেষ করার আগে বলি, অন্যের উপর সুখ নির্ভর করে না কিন্তু দুঃখ নির্ভর করে। জীবনের নব্বই ভাগ অমুকের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছি, বাইরের প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে অশান্তির বীজ, এইখানে থেরাপি হ'ল, বাইরে নিয়ে যখন চলতেই হবে, তখন মন আর বাইরের মাঝখানে একটা পাঁচিল তৈরি হোক। প্রতিদিন ধ্যান করলে, প্রতিদিন একটু একটু করে আত্মশক্তির উন্নতি করলে, বাইরে থেকে ধেয়ে আসা ঝড় বৃষ্টি খুব বেশি ভেঙ্গে ফেলতে পারে না , মনের দুর্গ। প্রতি রাতে না হোক, কিছুদিন অন্তর অন্তর এক জায়গায় নিজের জন্য কিছু পজিটিভ বার্তা লিখে রাখি। যে সময়টা গালে হাত রেখে চিন্তা করছি, অথবা অমুকের সঙ্গে চ্যাট করে হা হুতাশ  করছি, সেই সময় নিজেকে দিয়ে, নিজেকেই শোনাই, আমি অমৃতপুত্র। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না। 


 💕💕💕💕💕💕

সামনে আসছে বিশ্বশান্তি দিবস। গোটা বিশ্ব হল আমার মন। তাকে প্রতিদিন যত্ন করুন। নিজের চারিদিকের প্রতিরক্ষা গড়ে তুলুন। অশান্তির ঝড় থেমে গিয়ে পাবেন সুন্দর নির্মল জীবন।

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                       


মেটামরফসিস 





অবশেষে এক আশ্চর্য ছায়াসম্ভব আলো আমায় নিষ্কৃতি দেয়- বেতস সুষুম্না ভিজে উঠছে স্নানজলে, শৈবলিনী চোখ বুজে সদ্যোজাত তাপে স্বস্তি খুঁজছিলেন অথবা আঁকতে চাইছিলেন। একাই যে পথ পেরিয়ে এলেন এতোদিন, যার শুরু ছিলো যৌথতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই, এমনও বলা যায় যৌথতার নিমিত্তেই মন্ত্র দিয়ে গেঁথে যে জীবন নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিলো, শুধু কি তার একারই দায় ছিলো তাকে ধারণের? বহমান রাখার ? এমনকী হয়তো শেষ সমাগত, এই শ্বাসেরও? প্রশ্ন আসে না আর। পথ দীর্ঘ হলে তার ক্লান্তি পথিককে গন্তব্য প্রসঙ্গে উদাসীনতা দেয়, যে কোনো দীর্ঘতর দৈর্ঘ্যের এইই সাফল্য। 




খুব সহজ ছিলো না। অনভিজ্ঞ ষোড়শী ছিলেন। সতেরোতে মা, উনিশে দ্বিতীয় সন্তান, তেইশে কাশের রঙে প্রায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এও এক রহস্য। যে মেয়েটি লাল রঙ ভালোবেসে বড় হলো, আমিষ গন্ধ ছাড়াও যে ভাত মাখা যায়, বিশ্বাস করতে শিখলো না, তার নর্ম সহচর পঞ্চভূতে বিলীনের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঙ সেই অন্নঘ্রাণই তার কাছে নিষিদ্ধ, কী করে যে এই ফতোয়া দেওয়া যায়...কই জায়া বিয়োগে তো এমনটি হয় না, এমনকী প্রভু-ভৃত্য পরম্পরাতেও নয়, তাহলে এই অদ্ভুত নীতি শুধুমাত্র এক ব্যতিক্রমে কেন? শৈবলিনী এভাবে ভাবেননি, তার সন্তানেরা ভেবেছিলো। ধ্রুপদী সুন্দর মা'কে বোধ হওয়া ইস্তক শুধুই শুভ্রতায় দেখতে দেখতে তাদের ক্ষোভ এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিলো বিস্তীর্ণ বাগান আলো করে থাকা জুইঁ আর কুন্দ ঝাড়ের একটি ফুলকেও রোদ্দুর ওঠার পরে গাছে দেখা যেতো না। ঋজু ব্যক্তিত্ব অভেদ্য প্রাচীর হয়ে তার সঙ্গে তার সন্তানদের অনাবিলে বাধা হয়ে থেকেছে বরাবর। মা'কে তারা তাদের হাস্য পরিহাসের অংশে পায়নি কখনো। ভাবতে ভাবতে শৈবলিনী ভিজে ওঠেন ভিতরঘরে। তিনি অপরাধী কি? বিশাল এক জীর্ণ অট্টালিকা, অকালপ্রয়াত স্বামীর অপরিকল্পিত সামান্য সঞ্চয় দিয়ে দুই সন্তানকে যে নারীর একা হাতে 'মানুষ' করে তুলতে হয়েছিলো সত্তরের দশকে, চৈতন্যে পুঁতে দিতে হয়েছিলো অর্থের সঙ্গে আভিজাত্যের কোনো সম্পর্ক থাকে না, থাকে আত্মাভিমানের- এই দর্শন, শুধু সেইই জানে নিরেট গাম্ভীর্য কোনো বর্ম বা মুখোশের মতো আত্মরক্ষার অধিক প্রত্যাঘাতের নাম। এ বাসরে ছিদ্রের অধিকার তিনি দেবতাদের দেননি ফলত দানবেরা অনুপ্রবেশের পথ পায়নি। 



মাটি যে কতদূর ভারী ঠেকলে কেউ স্বেচ্ছায় জলজ হতে চায় শৈবলিনী সেদিন টের পেয়েছিলেন যেদিন তার বাইশ বছরের ছেলে ইণ্ডিয়ান নেভির  নিয়োগপত্র হাতে মায়ের অনুমতি নিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। শৈবলিনী বন্দরের থেকে বেশী বাতিঘর হতে চাওয়ায় সে বাধা পায়নি কোনো। তিনি জানেন, সামান্য বিরোধ প্রত্যাশিত ছিলো মায়ের তরফ থেকে স্বয়মের, অপত্য হলেও সে পুরুষ, যাদের দৃষ্টি বুঝতে তার এক পল মাত্র লাগে। কিন্তু শৈবলিনী বিশ্বাস করেন বিচ্ছেদ তুল্য মায়াবিস্তার কোনো বন্ধনই নির্মাণ করতে পারে না, সুতরাং অবিচল ছিলেন। 



 গত বছর শ্রী'কে সম্প্রদান করেছেন। সেই শূন্যতায় পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই স্বয়ম তাকে জানিয়ে গেলো ঘোর অরণ্যেও প্রতিটি বৃক্ষের একাকী থাকাই বিধি। এখন তার দিলরুবায় অসীম নৈশব্দ্য। অবশ্য এই দেওয়ালেরা প্রগলভতার অভিজ্ঞতা পেলোই বা কখন? বড় শান্ত মেয়ে ছিলো তার শ্রী। মায়ের কাঠিন্য তার নরমে আঁচড়ের অবসর পায়নি কোনোদিন। কথা সে প্রায় বলতোই না। তার আনন্দ অভিমান যে কোনো তরঙ্গের সামান্য সরণ তাকে রেওয়াজে বসাত। সেই সুরই সম্ভবত তাকে নীলাদ্রীর কাছেও পৌঁছে দিলো, ভাবছিলেন শৈবলিনী। যতটুকু তিনি তাকে দেখেছেন, শ্রী যতই অনিন্দ্যসুন্দরী হোক, "রূপে তোমায় ভোলাবো না" এই স্বীকারোক্তির জায়গা অন্তত নীলাদ্রী নন, এইটুকু বুঝেছেন তাই আশ্বস্ত বোধ করছেন। রিপুজয়ের কথা যারা বলে থাকে তারা সম্ভবত প্রথম ইন্দ্রিয়টিকে নিরীহ জ্ঞানে রাখে। অথচ যাবতীয় ভ্রম ও ভ্রমভঙ্গের দায়ভাগ যদি কিছুকে দেওয়া যায় তবে তা 'চোখ'ই। শৈবলিনীর ব্যক্তিগত বিচারে গান্ধারীর অপরাধ অনেক বেশী ধৃতরাষ্ট্রের সাপেক্ষে। জন্মান্ধের অজুহাত যদিও বা গ্রহণীয় কিন্তু সক্ষমের ভাণজনিত বিকার কোনোভাবেই নয়।




বেলা গড়াচ্ছে। স্বয়ম আর শ্রী থাকার সময় বহুসময় তার উনুনের আঁচে কাটতো। রন্ধনশিল্পে বিক্রমপুরের মেয়ের নৈপুণ্যের খ্যাতি মূলত লক্ষ্মীপুজোর ভোগ হেতু পাড়ায় সুবিদিত ছিল। অবশ্য সে এক এমন সময়ের কথা যখন কোনো সংসারের সব ক'টি তৈজস দিনান্তে নিজের আস্তানাতেই থেকে গেছে, এ'ঘটনাকে বিরল মানা হতো। প্রতিবেশীরা শুধু একটি তথ্য জানতো না, একটা সময়ের পর হাজার চেষ্টাতেও শৈবলিনী তার হেঁসেলে আমিষ রাঁধতে পারেননি। এই একটি বিষয়ে ভাই-বোন দুজনেই অসম্ভব জেদে তাকে হারিয়ে দিয়েছে বারবার এবং প্রতিবার। সামান্য বোধের বয়সে পৌঁছে যেদিন থেকে তারা বুঝতে শিখেছে কী এমন অসুস্থ তাদের মা রোজই এমন হয়ে পড়ে যে তাদের রান্না সেরে স্নান করে ভিজে কাপড়ে নিজের জন্য একটা পাত্রে সিদ্ধ ফুটিয়ে নিতে হয় সারাদিনের নামে, তারা সেই সমস্ত কিছুর স্বাদকে অস্বীকার করতে চেয়েছে যাতে মায়ের অধিকার নেই। ফলে শৈবলিনীকেও হার মানতে হয়েছে। আঁশহীন অজস্র প্রণালীতে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে হয়েছে। 'ঘাটতি' - সঠিক শব্দ হলো কি? শৈবলিনীর অহং জাগল। কখনো 'ভালোবাসি' শব্দ উচ্চারণ করেনি তার কাছে তার সন্তানেরা। হাজারো প্রাপ্তিতে উচ্ছল হয়নি। সহস্র অপ্রাপ্তিতেও অভিযোগ আনেনি। অথচ তাদের সংবেদন এতো সূক্ষ্ম যে কীভাবে কবে হয়ে উঠলো তিনি কর্তব্যের ভারে ঠাহরই করে উঠতে পারলেন না। পিতৃহীন সন্তানদের সব মা'ই কি পৃথা?



ভাবতে ভাবতে উঠছিলেন, প্রায়োবেশনে স্পৃহা নেই প্রমাণে পুরনো একাহারী অভ্যাসে ফিরতে। সিংদুয়ারের কড়া তাকে বিচলিত করল। প্রাচীন আবলুশ, লোহার ভারী শিকল, নির্জন ছিঁড়তে যথেষ্ট সক্ষম। হতেই পারে আত্মীয় পরিজন অথবা ফেরিওয়ালা কিন্তু নৈঋতে কাকের কর্কশ তাকে অদ্ভুত অসামঞ্জস্য দিয়ে গেলো। এমনটি যেন হওয়ার কথা ছিলো না। আয়ুর প্রথমার্দ্ধে সামর্থ্য, দ্বিতীয়ার্দ্ধে প্রয়োজন তাকে পরিচারকহীন করেছে। সুতরাং কিছু সময় লাগলো জানতে সদর সংবাদ।


-- " একী ! শিয়া তুমি? চিঠি দাওনি তো আজ আসবে... কী হয়েছে? "


বরাবরের ধীর মেয়ে তার বরফ এখনো


--" ভিতরে আসি? "



হাজারো ঝঞ্ঝাতেও যে নন্দিনীকে তিনি অভিভাবকহীন চারণের অনুমতি দেননি বহু শঙ্কায়, অনেক দ্বিধায়, সে আজ আটপৌরেতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখের দীঘল বলে ঘুম হয়নি বিগত বেশ কিছু প্রহর, অবিন্যস্ত চুল হাতপ্যাঁচে ঘাড়ের উপর ফেলা। সঙ্গে সামান্য হাতব্যাগটিও অনুপস্থিত। তার বুক বসে যেতে লাগলো চোরাবালির গতিতে।



স্নান সেরে শ্রী ঘুমোতে চাইলে শৈবলিনী জিজ্ঞাসার চৌহদ্দিও পেরোননি। কুম্ভক তার নিয়ন্ত্রণে। ঘুমোক, যতক্ষণ সম্ভব। যে কোনো বিপর্যয়ে এইই বিশল্যকরণি শরীর মনের ভারসাম্য রাখতে। সন্ধ্যায় শ্রী জানিয়েছিলো অতি সংক্ষেপে। মধুপুরের চ্যাটার্জি ফ্যাক্টরি আর সংলগ্ন বাগান ঘেরা বাংলোটি গত রাতে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়েছে। বোমা, গুলি কিছুই বাদ থাকেনি। বিশ্বস্ত এক সূত্র সামান্য আগে খবর পেয়ে তাদের কাছে লুকিয়ে রাখায় নীলাদ্রি ও শ্রীয়ের প্রাণ দুটি রক্ষা পেয়েছে মাত্র। বাকি সর্বস্ব নিতান্তই ভগ্নস্তূপ এখন। ভোর রাতের প্রথম ট্রেনে শ্রীকে তুলে দিয়ে নীলাদ্রি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গেছেন অনির্দিষ্ট কাল সময় চেয়ে নিয়ে। বেনারসের আদি বাড়ি অথবা আসানসোলে দাদার কাছে যাবেন, এমন শিরদাঁড়া তার নয়। সুতরাং, তিনি কোথায়, শ্রী জানে না।



কিছু রাত কুরুক্ষেত্রের, কিছু জোনাকির, আর কিছু সংজ্ঞাহীনতার। শৈবলিনী জানতেন না ঠিক কোন স্তরে সে রাতকে ফেলা যেতে পারত। শৈশবে শ্রী'র জ্বর হলে যেভাবে রাতপাহারা দিতেন শিয়রে, ফিরে গেলেন সেই সময়ে। হঠাৎ শিয়ার ঘুমন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে জন্মদাত্রীর অভিজ্ঞ স্নায়ু তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করল। এই প্রবল অন্ধকারের ভিতরে কি কোনো তীব্র আলোর সংকেত লুকিয়ে যা তিনি অনুমান করছেন? ডাক্তার এসেছিল। ধারণা অভ্রান্ত, আনন্দে জানিয়ে ফিরে গিয়েছিল।  




শৈবলিনী ঠিক তিনদিন আগের মতো, আজও সেই সময় একই ভাবে দাঁড়িয়ে। শুধু সেদিন যে 'নিষ্কৃতি' শব্দোচ্চারণ করেছিলেন, তাকে প্রত্যাহার করছেন আজ সজ্ঞানে। যার লগ্নে সংগ্রাম, এত সহজে কি তার মুক্তি আসে? অনির্ধারিত অজ্ঞাতবাসে যাওয়া নীলাদ্রির আগামীকে গর্ভে ধারণ করে শ্রী এসেছে তার কাছে। তার যাবতীয় ছায়া আজ আলোময়। আজ সত্যিই তিনি সিংহের প্রয়োজন বোধ করলেন, রাশি থেকে খুবলে হৃদয়ে প্রতিস্থাপন নিমিত্তে। সন্তান সংকটাপন্ন হলে কোন গর্ভধারিণী অবিকল সিংহবাহিনী নয় আর তিনি তো শৈবলিনী, গায়ত্রীজল সবিতাকে অর্পণ করে বীজস্বার্থে মহাতেজা রূপ পরিগ্রহ করলেন।

চিত্র - অন্তর্জাল

সুবীর সরকার

                        


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


৯.
চর কালপানি দিয়ে মন্থর লয়ে ছুটতে শুরু করে মজনু শাহের ঘোড়াটি।বাদামি কেশর।নিভৃত আর মায়াময় চক্ষুদ্বয়।মজনু তার এই ঘোড়াটি কিনেছিল ছত্রশালের হাটে।বিবি ফুলজান ঘোড়াটির নাম রেখেছে সুমি।এই ঘোড়া নিয়ে,ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে ধান পাট তামাক নিয়ে এক হাট থেকে আরো আরো দূরে কাছের হাটগুলোতে ঘুরে বেড়ায় মজনু।মজনু শাহ।ভালো বাঁশি বাজাতে পারে বলে লোকমুখে তার নাম মজনু মাস্টার।ধুবুরি শহরের এক কবি মজনু আর তার ঘোড়াটিকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিল।সেই থেকে গঞ্জ হাটে মজনুর বেশ কদর।খাতিরদারি।
মাঝে মাঝে মজনু মনের সুখে ফাঁকা রাস্তায় সুমিকে  ছোটাতে ছোটাতে গলা ছেড়ে গান ধরে_
"আরে চলে রে মোর ঘোড়ার গাড়ি রে
কাদো পন্থ দিয়া
আরে নওদারি নাইওরি গুলা
দেখি থাকে চায়া রে"
আমরা দেখি মস্ত এক আবছায়ার ভিতর লীন হয়ে যাচ্ছে মজনু শাহের ঘোড়াটি।
১০.
শুকনো চরের বালু শরীর জুড়ে লেগে থাকা মরিচ বেচা পাইকার, রেডিও বাজাতে বাজাতে কিংবা বলা ভালো রেডিওতে গোয়ালপাড়ার গান শুনতে শুনতে এই প্রাক সন্ধ্যেতে কোন এক হাট থেকে ফিরতে ফিরতে বারবার কেন জানি আনমনা হয়েই পড়ছিল!
এই কুড়ি পঁচিশ মাইল পরিধি জুড়ে তার পরিচিতি মরিচ বেচা পাইকার।আবার পাইকারের রেডিও প্রীতির কারণে সম্প্রতি অনেকেই তাকে "রেডিও বাজা পাইকার" বলেও ডাকতে শুরু করেছে।প্রায় তিন কুড়ি বছর ধরে তার কাজ মরিচের পাইকারি।তার বাবা,বাবার বাবা সকলেই ছিল মরিচের পাইকার।সেই কবে যে সে তার আসল নাম নিজেই ভুলে গেছে তার কোন ঠায় ঠিকানা নাই!আচ্ছা,এই সব বিস্মরণ কি তাকে আনমনা করে দিয়েছে!
এইসব ভাবতে ভাবতে পাইকার তার অন্যমনস্কতা আর রেডিও সমেত গঙ্গাধরের ফেরিঘাটে এসে পৌঁছান।আর শুরু হয় ঘাটোয়ালের সাথে কিঞ্চিৎ হাসিমস্করা।তখন রেডিওতে বেজে উঠেছে আব্দুল জব্বারের গান_
"চাষার মুখত আর
 নাইরে সেই গান"
 

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বীথি চট্টোপাধ্যায়

               



বড়দিন 


জীবন থাকলে পেরেকও থাকবে;ক্ষমা করে ভালবেসে

আর কতদিন কাটাব এভাবে মিথ্যে মিথ্যে হেসে?  

খাবার চাইতে হাত বাড়াচ্ছে রোগা অভুক্ত শিশু

চার্চে দাঁড়িয়ে মুখ নিচু করে পেরেক বিদ্ধ যিশু।

তারাভরা রাতে বরফ পড়ছে কত ক্রিসমাস ট্রিতে

কেউ কি কোথাও কষ্ট পাচ্ছে পেরেকে অথবা শীতে? 

#

সান্তাক্লজের গাড়ি  যদি থামে দুঃখের ফুটপাতে

যেখানে মানুষ চট পেতে শোয় হিম-কুয়াশার রাতে।

#

এবার একটু হাসি ফুটে থাক যিশুর করুণ মুখে,

মার্কিন সেনা খাবার বিলোক,ইথিওপিয়ায় ঢুকে।

পথের কুকুর মায়াভরা চোখে সামনে দাঁড়ালে এসে

তাকে কোলে তুলে বিস্কুট দিক শাহরুক হেসে  .... 


স্বদেশ  / বীথি চট্টোপাধ্যায় 


স্বাধীনতা কীসে আর দেশ বলে কাকে?

শুধু কি সীমানা দিয়ে মাপা যায় তাকে?


এই মাটি, এই জল, এ সংবিধান

দেশ মানে সেইখানে কবুল এ-প্রাণ।


স্বাধীনতা মানে খুব বেশি কিছু নয়,

নিজের হৃদয় খুঁড়ে আনা পরিচয়। 


রক্তবিন্দু দিয়ে যাকে গড়া যায়

দেশ মানে মানুষের মুক্তির উপায়।


কতখানি দিতে পারে কেউ ভালোবেসে?

অনেকেই ঘরে আর ফিরলনা শেষে। 


মৃত্যুর মুখে দেওয়া বাঁচার শ্লোগান

দেশ মানে সেইখানে কবুল এ-প্রাণ।


জয়হিন্দ

সম্পাদকীয়

             


বর্ষার ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রেশ কাটিয়ে ফুটে উঠেছে ছোট ছোট কাশফুল ৷কাশফুল মানেই শরৎ । আকাশে উড়ে বেড়ায় পেঁজা তুলোর ন্যায় মেঘ।ভেসে বেড়ায় ভালোবাসার ধূলিকণা । শরৎ আসা মানেই সৃজন শারদ সংখ্যা প্রকাশ করতে হবে ৷ এই সংখ্যায় যুক্ত হয়েছেন অনেক নবীন , প্রবীণ লেখকবৃন্দ। সবার সুন্দর সুন্দর সৃষ্টিতে সেজে উঠেছে "সৃজন" শারদ সংখ্যা। 

সকলের লেখা নিজে বসেছি প্রকাশ করার জন্য। প্রচছদ সহকারে একে একে সেজেছে প্রতিটি পাতা। সব শেষে সম্পাদকীয় লেখার পালা৷ কিন্তু বেশ কিছুদিন হল কিছু ভাবতেই পারছি না । কী লিখব সম্পাদকীয়! এত গুণী মানুষের সৃষ্টিতে সেজেছে এ সংখ্যা তার কাছে নিজেকে তুচছ মনে হয়৷আগে ভাবতাম কবিতায় আমি বেশ স্বচছন্দ‍্য ।কিন্তু কালের নিয়মে তাতেও পড়েছে ভাটা । এক সময় কত ভাবনা পাখা মেলে উড়ত। কত স্বপ্ন উঠোনে রোদ পোয়াত। ছোট ছোট ইচ্ছেরা চিনেবাদাম খেতে বেড়ত বিকেলবেলায় ৷ সবই ইতিহাস। সময়ের টানাটানিতে শব্দরা নিঃস্ব। কোথা থেকে শুরু আর কোথায় গিয়ে শেষ তার কোন সীমারেখা ছিল না। কী যে লিখব ভাবতে বসলে হাহুতাস করে ভাবনারা ।

বাসাবদল
বেশ কিছু সময় ফেলে এসেছি 
নিঙড়ানো স্মৃতিগুলোকে সরিয়ে রেখেছি কৌটোয় 
বিস্কুটের মত মিইয়ে গেছে সেগুলো

যেখানে বসে তোমার কথা ভাবতাম
যাবতীয় সংলাপ  তুলে রাখতাম
সেই চেয়ারটা আর নেই জানো 

তুমি  ওই নারকোল গাছের মাথার থেকে আমাকে দেখতে
আমাকে জড়িয়ে ধরতে সোহাগে
বাকিটা ব্যক্তিগত

সেই বাসাটা আজ ছেড়ে আসতে হল
আমি অনেক চেষ্টা করেছি সময়গুলোকে কাঁধে করে আনতে 
কিন্তু পারলাম কই

হয়ত বলবে হারানো মানেই নতুন প্রত্যয়
কিন্তু আমার কাছে হারানো মানেই ক্ষয়
ঋতুযোগে তা বেড়ে চলে 

এখন যেখানে আছি দু হাত দূরত্বে নারকোল গাছের মাথা
তোমার নিঃশ্বাসের কাছাকাছি
আজ আর দূরে থেকো না

এসো ক্ষয় তোমাকে নিবিড় করে পাই
বহুদিন পর ঘুমোতে যাচ্ছি

ঘুম আসে না। চোখ বুজে শুয়ে থাকি৷ চোখ খুললেই অস্বস্তি শুরু হয়৷

মেঘের ইনসুইং হলে 
একটা অবযব ফুটে ওঠে
লম্বা ,সুদর্শন ,কামরাঙা ঠোঁট 
আপনারা বলবেন 
" এই সেলফিশ ন্যাকামিগুলোর কি দরকার?"

আসলে নিজের প্রতি টায়ার্ড  হতে হতে 
কেমন যেন একটা ফাও মনে হয় 
উদ্বৃত্ত 

সত্যি বলতে কী যতবার ইউটার্ন নিয়েছি
একটা হ্যাংলামি পেয়ে বসেছে
কাছে যাবার, নিবিষ্ট হওয়ার
মে বি  ইট ইস রঙ
আসলে" ক্ষয় নেই জাগরণের"
ফেসবুক ঘাটতে গিয়ে কিছু অপশান চোখে আসে
" মৃত্যুর পর এই অ্যাকাউন্টিটিকে কী করতে চান ?"

মুহূর্তে গলায়  একদল দুষ্কৃতী ছুরি মারে 
সিওর ইট ইস কল ট্রমা
 
 জীবনে ন্যাকামির প্রয়োজন আছে
তাকে মান্যতা দিতে গিয়ে দেখা
ক্ষতচিহ্ন জানে তাকে ক্ষমা করতে কতটা ক্লান্তি লাগে 

আর বুঝলাম সব থেকে বড় ন্যাকামি ছিল জীবনে
" তুমি"

তাকে রাইট অফ...




স্বপ্নের মধ্যে আঁশ ঘোরাফেরা করে
চকচক অথচ পিচ্ছল
পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আসে পেঁয়াজের খোসার মত

ইদানিং তোমাকে দেখিনা সেখানে 
তারাখসা রাতের মত বিক্ষিপ্ত
তুমি 

সেই সব রাতের গল্পগুলো ধীরে ধীরে
তারা হয়ে যায়
মিটমিট করে আঁশের মধ্যে

না আজ আর অন্য কথা নয় । পুজো এসে গেছে৷ আমরা এখন সবাই ভালোবাসার গন্ধ গায়ে মেখে ঘুরি।এই সংখ্যায় যারা লিখেছেন তাদের সবার পক্ষ থেকে শারদীয়ার শুভেচছা।

প্রসঙ্গত আপনাদের জানিয়ে রাখি সৃপ্রকাশন নিবেদিন যৌনতা সংখ্যা খুব শীঘ্রই প্রকাশ পাচ্ছে। " সৃজন" "শারদীয়া" সংখ্যা সেজে উঠেছে অনেক গুণী মানুষের সান্নিধ্যে৷ এই সংখ্যায় নতুন কবিদের কবিতায় ভরে উঠেছে।।"সৃজন" পরবর্তী সংখ্যার নাম " শীত " সংখ্যা । এই পরিস্থিতিতে আমরা উৎসব উপভোগ করব ঘরে বসে কবিতা,গল্পে ,উপন্যাসে। সবাই খুব ভালো থাকুন, সৃজনে থাকুন, আনন্দে থাকুন৷ আমাদের লেখা পাঠান। সৃজন এখন থেকে সাপ্তাহিক ভাবেও কবিতা, ধারাবাহিক গল্প, ভ্রমণ প্রকাশ করতে চলেছে৷ সৃজনে লেখা পাঠানোর ঠিকানা কিন্তু একই আছে তাও ইমেইল আইডিটা আরও একবার  বলে রাখি। srijanblog10@gmail.com ইমেলে আপনি আপনার অপ্রকাশিত লেখা টা পাঠান আমরা আমরা খুব যত্নসহকারে আপনার লেখা প্রকাশ করব। সবাই খুব ভালো থাকুন আরো একবার বলি৷ শুভরাত্রি৷


পারমিতা চক্রবর্ত্তী

সম্পাদক

চিত্রঋণ - মলয় দত্ত

কৌশিক সেন

                 



অলিভ পাতার দেশ

এই সখ্যতা তোমায় দেবো বলে সামুদ্রিক প্রজাপতির পাখনায়
ক্রশ এঁকে দিয়েছিলাম একদিন। তিরতিরে কর্মমুখরতায় 
ছড়িয়ে দিয়েছিলাম শান্তি আর ক্ষমার সুবাস। প্রজাপতির দল
যেদিন পাড় হয়ে গেল নিকশিয়ার আকাশ, আমি ভূমধ্যসাগরের
পাড়ে পাড়ে বুনে দিয়েছিলাম ঈশ্বরের বীজ।

তোমার মতো বন্ধু পাবোনা এই ভূমণ্ডলে, জানি। তোমার কাছে 
পৌঁছে দেবো বলে নীলনয়না মৎস্যকন্যার হাতে রেখে এসেছিলাম
অলিভ গাছের নরম প্রশাখা। এই স্বর্গীয় সখ্যতা তোমায় দেবো বলে
এক এক করে সমাধান করে গেছি সিড়িভাঙা গণিত। সদর দরজা
সাজিয়ে রেখেছি বেগুনী অর্কিডে।

দেখবে, তোমাকে ভাই বলে ডাকবো একদিন। তোমার বোন
সারা সকাল উপবাস করে আমারও কপালে এঁকে দেবে
চুয়া-চন্দন তিলক, কোনো এক কার্ত্তিক দ্বিতীয়ার অমৃতযোগে।
এনে দেবে জন্মদিনের উপহার। সেইদিন হলুদ প্রজাপতিরা
ফিরে আসবে আমাদের ঘর আলো করে...

মীনাবাজার

নাভির উর্বরতায় একটা রক্তগোলাপের চারা, 
কয়েকটি মৃত আরকিয়প্টেরিক্স আর 
এল ডোরাডোর স্বপ্ন দেখেছিলাম।  
সওদা করে ফেরবার পথে 
শুনতে পেয়েছিলাম 
ভ্রমরের গুঞ্জন।

এখন গমগম করে 
গভীর খাদের কিনারায়।  
গোলাপি আভা ছড়িয়ে পরে কাচের চুড়ির শব্দে।
কাউকে বলা হয়নি এখনও, এই নিভৃতে
জীবাশ্ম গেঁথে গেঁথে খুঁজে পাই
অনন্ত কামনার মিসিং লিঙ্ক!


সাহিত্য উৎসব

আমরা চা খেতে খেতে আলোচনা করবো, কীভাবে অমুক লেখকের
সাম্প্রতিক উপন্যাস থেকে খসে পরছে দেয়ালের পলেস্তারা,
ভাঙা দালানের কোটরে বাসা বেঁধেছে সুন্দরী চন্দ্রবোড়া
আর কার্নিশ বেয়ে কোন প্রবাহে নেমে আসছে
পাকুড়ের মজবুত শেকড়গুলি।

গরম শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে আমরা আলোচনা করবো,
হটকেক কাব্যগ্রন্থ থেকে উঠে আসা উদ্ভিন্নযৌবনা নারিটি
ঠিক কাকে কাকে কল করে রাতের আমন্ত্রন জানিয়েছে।

দরবেশে ঠোট ঠেকিয়ে আলোচনা করে যাবো
মুক্তগদ্যে ধূসর মন্বন্তরের কাহিনী,
ক্ষুধার্ত শকুনের স্থির ধৈর্যের কথা।

তারপর, আঙুল চাটতে চাটতে সেরে নেবো কাকজ্যোৎস্নার বেচাকেনা   
আর গৃহযুদ্ধে নিহত কবিদের জন্য নীরবতা রেখে যাবো
এক পক্ষকাল!




শর্মিলা ঘোষ

                




বাতিল ঈশ্বর//শর্মিলা ঘোষ

একমুঠো নীল আকাশ হাতে ধরে শরতের গান গাইছি  মহা সমারোহে,
শয়তানের চোখ থেকে  বাঁচতে একতারা নিয়ে মেতে উঠছি মিঠে বাউল সুরে,বেলোয়ারি চুড়ির শব্দও ছন্দে বাঁধা স্বরলিপি;


ধানখেত  থেকে ঊষর শুষ্ক মরুতেও ফোটে বেনজির রক্ত পলাশ 
ধ্রুবতারা নেমে আসে স্টেশনে ব্রীজে গরিবের জলন্ত উনুনে
বিজ্ঞাপনের ক্রাইসিস ছিল ব্যাক্তিগত সরীসৃপ জীবনে
আঠালো পথ চলতে চলতেই লাভামুখে  আটকে পড়ে কাঠের শরীর;

অনেক অনেক পথ হাঁটা হলো যন্ত্রণার  রুটম্যাপ ধরে
সৃজনী সমাজ জুড়ে শারদীয়া  যাপন , তাতে প্রেম লেখা  হলুদ অক্ষরে
গিলোটিন  নেমে আসছে ,বাতিল  ঈশ্বর,  শুকনো পাতায় লেখা  হচ্ছে ক্ষুধিত পাষাণ।


 



অন্তর চক্রবর্তী

                   




অষ্টমীর পদ্য

––———————



অষ্টমীদিন ঘিরে বয়ে আসে ফাগুনের আঁচ

আঁজলার কূলে কূলে অবিচল মরমী মানত 


যত রঙ শিউলির, তত রঙ পলাশ-ছোঁয়াচ

'একবার দাও ঠাঁই প্রিয়মনে, সোহাগী বসত' 


দুরুদুরু অপলকে ঘন হয় প্রতীক্ষাঘোর

রোদ পড়ে আসে আর ভিড় ঠেলে একাকীর সুর 


বাঁধভাঙা দখিনায় আসবে কি মিঠে উত্তর?

কিশোর চাতকমন পড়ে থাকে বেহাগবিধুর 


আন্ধার চেয়ে চেয়ে গোধূলিবেলাটি কেটে যায়

অষ্টমীসাঁঝ জুড়ে ফিরে আসে শ্রাবণের বাঁক 


সন্ধিপুজোর উলু ভেসে চলে অশ্রুছায়ায়

বোধন যতটা দূর, তত দূর ভাসানের শাঁখ...



( বিশেষ ধন্যবাদ : অর্ঘ্যদীপ ঘোষ )

মিনাক্ষী ঘোষ

                     




 ভান

যে মেয়েটি

মালসায় আগুন আর নাভিমূলে

শ্বেতপদ্ম রেখে ভেবেছিল একদিন

মৃত্যু আর অমরত্বের মাঝখানে

সেতু নির্মাণ করা যায় অনায়াসেই!

শুন্যতার অতল খাদে

মনটাকে অনায়াস গড়িয়ে দিয়ে

প্রথাসিদ্ধ নিয়ম জলে আচমন সেরেছিল

এক কমন্ডলু বিবমিষায়!

অমরত্ব পাবে ভেবে

 অবিনাশী পাথরজন্মকে

আগুনে পোড়াতে চেয়ে বারবার

পদ্মের মৃণালে  ঢেকেছিল তার সমস্ত ক্ষত

বল্কল অথবা লজ্জাবস্ত্র

কোনটিই আজ আর গ্রহণযোগ্য নয় তার

 সেতুহীন অমরত্ব পেতে গেলে

মৃত্যুর আগুনে স্নাত হতে হয়।


মাভৈঃ



নিকষকালো গুহায় দাঁড়িয়ে থেকেও

বুকের ভেতর সহস্র সূর্যকে পুষে রাখি

 যত ই ঝঞ্ঝা ভাঙুক শাখা সম্বল

অন্য কোথাও নীড় খুঁজে নেবে পাখি

 

অন্ধকারের প্রাচীরগাত্রে ক্ষয়

জানি,জানি তাও নিশ্চিত হবে কোনদিন

ততোদিন চোখে জোনাকি জ্বালিয়ে রাখি

ভাদ্রের নদী যদিই উজানে বয়


ফাটলের গায়ে ক্ষীণ যে স্রোতস্বিনী

এতদিন ছিল একলাই নিরিবিলি

জোয়ার প্লাবনে বাঁধ ভাঙে উচ্ছ্বাস

পাথর ভাঙতে প্রয়োজনে রঙ তুলি


নাগপাশে আরো যতই কঠিনে বাঁধো

কান পেতে থাকো,শুনতে আর্তনাদ

হাজার আলোর ঝাড়বাতি তবু জ্বেলে রাখি

ধরেছি মুদ্রাতে আনন্দ বিষাদ যুগপৎ ।


কথা দিলাম


বর্ষার আগে

জমিতে নিড়েন দিতে হবে বলে

তুমি ঠা ঠা রোদ্দুর টুকু উড়ানিতে বেঁধে

মাঠে নেমেছিলে!


বর্ষা নামার আগে

ভাবী ফসলের আগমন

সুনিশ্চিত করা চাই!

জৈষ্ঠ্যের তীব্র পরাক্রম তোমায় ক্লান্ত করলেও

হতোদ্যম করেনি তাই

জানিনা,কতটা প্রদাহ তুমি

সয়েছিলে এই অবকাশে

শাখাহীন গাছের আড়ালে

এতটুকু বিশ্রাম চেয়েছিলে বুঝি!

তাই কি আভাসে

অনাহুত অতিথির মতো

মেঘ হয়ে উড়ে আসি

তোমার আকাশে

যদি এতটুকু ছায়া দিতে পারি

এই খরতপ্ত জীবন প্রদোষে

সেকথা অজানা থাক

আমার চিবুক জুড়ে ছড়ানো বিষাদ

আজ বাঁধভাঙা বৃষ্টি হয়ে

সোহাগ ছড়াক

পরিতৃপ্ত ঘুম নেমে আসা

তোমার নিবিড় দু'চোখে

একে যদি সামিয়ানা বলো

আমৃত্যু তাই হবো আমি


কথাদিলাম।

নদীজন্ম



আকাশের রূপোলী সিঁথিতে চলকে ওঠা আলো

নাকি আরণ্যক বিষাদ

কোনটা জন্ম দিয়েছিল হিরণ্যগর্ভ মেঘের 

সেকথা বুঝতে বুঝতে

কেটে গেল আরো এক নদীজন্ম

নুড়িপাথরের ঠোকাঠুকি,আর

গাছগাছালির ফিসফিসানি

সূর্যাস্তের সবুজকে যে গভীরতা দিয়েছিল 

সেকথা কেবলমাত্র  যুবতী নদী জানে

অবধারিত সমুদ্রস্নানে 

যদি আর না ই যেতে হয়

সম্পর্কের কাটাকুটি খেলা তবে

তার শেষ জন্মশোধ 

আর কোনো দায় নেই তার বহতা হবার

নিজের সাথে বোঝাপড়া সাঙ্গ হলে

মেনে নেওয়া

চিরস্থায়ী একলার বসবাস 

শ্যাওলায়,পাথুরে গুহায়


তবু

সহস্র প্রাচীন সেই 

কোটর জমানো জলে

ফাটলের চোরাপথে

 ক্ষণজন্মা মেঘেরাও

মাঝেমাঝে

বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে

চিরায়ুষ্মতী হবার নেশায়।