রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

পূর্বা দাস

 


                         (১)

ত্রাণ


ওরা শুধু ঝড়কে ভয় পেত
আকাশকে নয়
মাথার ওপর কোন না কোন আকাশকে 
টেনে নিতেই হয়
আকাশ যে অহরহ রং বদলায়
সে কথা জানত না মৌসুনি দ্বীপ।

কিশোরী মেয়ের হাতে ঢলঢলে কাঁচ, শাখাপলা
দুদিনের নির্জলা একাদশীর পর আজ
পূর্ণিমার চাঁদ দেখেছিল 
জলের পাউচ,গুঁড়ো দুধ, বিস্কুট -
জেটিতে সরকারি লঞ্চ।
গনগনে দুপুরে অনেকটা দূর পেরোনোর পর
প্রশ্ন এল, 'এই, তোমার বাচ্চা ক'জন?'
উত্তর দেয়নি মেয়ে।

শিয়াল কুকুর তাড়ানোর মত দূর করে দিয়েছে
মুশকো লোকগুলো - ওরা জানে না
আসলে, ওর তো বাচ্চা হয়েছে;  বাচ্চা -
জলের তোড়ে দু'বছরের টা ভেসে গেলে
দুদিন শুধু চোখের পানি খায় ও

মাথার ওপর নীল চাঁদোয়া শুধু রং বদলায়
কোন দায় নেয় না।


                               (২)


একান্তে

বৃষ্টিরা নিজস্ব হলে
ওরা ফিরে যাবার পর অনেক কাজ থাকে
জল থৈ থৈ উঠোন
খুব তাড়াতাড়ি ঝাঁটপাট দিয়ে
সদরটি নিকিয়ে নিতে হয় যত্ন করে
বৃষ্টির জলে ভেসে আসা কিছু বিষাক্ত কীট এদিক-ওদিক
জানালার শার্সি অথবা কুলুঙ্গি থেকে
সরিয়ে দিতে হয় আলগোছে।

এরপর আগদুয়ার হাট করে দাও
বহির্জনেরা এসে বসবে
সাজানো বৈঠকখানায়

যেটুকু জল থেকে যাবে ঘরের চালে, অথবা
একান্ত স্নানঘরটিতে; ভাবনা নেই -
সে কারোর চোখে পড়বে না।


                              (৩)


গাছপুতুল

সদ্য বীজমুক্ত শিশু গাছটির
আঁকাবাঁকা শাখা, পত্রল প্রশাখা
সবুজ করে তুলল এক ঋতুর বর্ষা
সরস মাটির পুষ্টিতে তার লাবণ্য মেলে দেয় আকাশে; দুর্নিবার প্রেমে, ঔদ্ধত্যে -

ঠিক তার পরের বর্ষাতেই 
তার সব অহংকার কেড়ে নেয়
বজ্রগর্ভ অশনি মেঘের দুরূহ কারুকাজ
শিরা-উপশিরা অব্দি জ্বলে গেলে
মরণের অপেক্ষায় তরুটি
স্তব্ধ হয়ে থাকে মেঘের কুশলী খেলায়

সেটুকুও শেষ হয়, 
যে দিন ভরা কোটালের জল 
শিকড়শুদ্ধ উপরে নিয়ে যায়
এখন আর কোন আশা নেই ওর 
কোন ঋতুর কাছেই।



                            (৪)

ডেলিউশন

আকাশ জুড়ে মেঘের ছায়া মেঘের গায়ে গল্প আঁকা
চিলের ছাদে একলা দুপুর মেঘের সুবাস যায়না ঢাকা

দুপুর শেষে স্বপ্ন বিকেল মেঘ বলেছে চায়ের কথা
মুখোমুখি বসবে নাকি একটি দিনের বনলতা!

আনমনা ঠোঁট, গরম চায়ে পুড়ল তবু মুচকি হাসি
এরপরেতেই মেঘ ঢেলেছে জল ঝমঝম রাশি রাশি।

কোথায় যেন জুঁইকুড়িদের ফোটার সময় এগিয়ে এলো
শ্রাবণ মেঘও তার স্বভাবে তুমুল বজ্রগর্ভ হল

বনলতার মেঘলা সাজটি বেশ
চায়ের কাপে অর্ধ অবশেষ।

অন্তর চক্রবর্তী

                        



ছুটি

————————

দস্যুপলক মাঠ ছাড়াল
ছুটল দুপুর দিগ্বিদিক 
মেঘের দিকেই গড়িয়ে গেল
শেষ প্রহরের মাধ্যমিক

পন্থা হারায় সরলরেখা 
জংলা সে বাঁক লিখছে ঝড়
বিদ্যাপীঠের আগল পেল
বাদলবিধুর আকাশঘর

হদিশ পিছোয় দশমিকের
অকালশ্রাবণ দিব্য সুখ
শেষ পাতাটির অমিল যারা 
শূন্য আলোয় লুকোক মুখ

কোন কূলে আজ রইল কথা?
অন্ত্যমিলের কপর্দক 
বাদলকিশোর জড়ায় কাঁধে
গনগনিয়ার অনোন্যক...

( ২০১৭ )

( কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ইন্দ্রনারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় )


প্রাক্-শ্রাবণ
————————

স্বপ্নের ভেতর উল্টে যায় অনেককিছুই। পথ, ঘর, ইচ্ছে, মন, মানুষ। আরো কত কী। তবে গতস্বপ্নে ঠিক কী কী ওলটপালট হয়েছে, মনে নেই বিলকুল। স্বপ্ন দেখেছি কিনা, তাও মনে করতে পারছি না। ঘুম ভেঙেই চমকে উঠেছি। এ কেমন উলটপুরাণ! শুয়ে আছি বল্গাহীন নীলটির কোলে। শ্যামলা অনন্তছাদ থেকে অনবরত ঝরে পড়ছে মহীরুহ, চারাগাছ, গুল্মশিশুরা। অজস্র সবুজ উপড়ে আসার প্রখর শব্দে শিথিল হয়ে আসছে আলো। আশরীর নীলাভ শয়ান হয়ে উঠছে ঘনঘোর কাজরী দিকশূন্য। ঢুলে আসছে চোখ।

ঠিক তখনই, আবার স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়ছি আমি। উপুড়-হওয়া চরাচর উল্টে যাচ্ছে ফের। অঝোর বৃক্ষরঙ রুমঝুম বেয়ে আমারই অশ্রুদল ঔরসের সুরে বিঁধে যাচ্ছে, খাঁ খাঁ অরণ্যের সদ্য সন্ততিশোকে...

( ২০১৮ )

( কৃতজ্ঞতা স্বীকার : সুশীলাপর্ণা বইঘর )


বাদর
——————

তিনকলি টুপটাপ? মনে পড়ে তোর?
আষাঢ়, শ্রাবণ, আর, এ মাহ ভাদর

নিরালা সাঁকোটি শুয়ে পুনর্ভবায়
একলা ছাতার ঠাঁই যায়, উড়ে যায়

দু'জোড়া অবাধ চোখে বৃষ্টিবাতাস
ঝিনুকঠোঁটের কোণে থেমে আছে শ্বাস

ডুব, ডুব, ডুব, দোলে ছায়ামরশুম
বিরহী আলোয় কাঁপে বিকেল নিঝুম

নিথর চিঠির ভাঁজে অপলক স্নান
ঠিকানাশিবির নেয় সুদূর ভাসান

শীত ছুঁয়ে ভেঙে যায় মেঘের বরাত
হরি বিনে কীভাবে যে কেটে যায় রাত

তিনকলি রিমঝিমে লেখে স্মৃতিচোর
দু'ফোঁটা নয়ন, আর, এ ভরা বাদর...

( ২০১৮ )

( কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ঝিনুক ও পুনর্ভবা )

সমর্পিতা ঘটক


 

জল ঘুরে যায়, জল ঘুরে যায় নিখিলবিশ্বচরাচরে --

আমার ঘরে, তোমার ঘরে !


আটপৌরে লাল পাড় সস্তা কোরা রঙের সিন্থেটিক শাড়ি পরনে। উপরের বাঁদিকের

হাতটিতে ফাটল ধরেছে। তিনজন কোনোরকমে ভ্যান থেকে নামিয়ে কয়েকপাক ঘুরিয়ে

ফেলে দিল জলে, ফেলার আগেই খসে পড়ল বাঁ হাতটি, ঘাটের কাছটিতেই হাঁটু ভাঙা জলে

মুখ গুঁজে পড়লেন মা কালী। শরীরে অযত্নের ছাপ দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ভেসে যেতে

চেয়েছিলেন আগেই, এক বছরের অপেক্ষা সুখকর ছিল না হয়তো। কে জানে জলের কাছে

পৌঁছতে নিয়মের বেড়াজাল ডিঙোতে হয় কতখানি! পুজোর দিন সকালে পুরনো মূর্তি ভাসান

দেওয়াই প্রথা হয়তো এদের কিংবা পড়ে গিয়েছিল কোনও বাধা! তিনটে লোক এসে

ভাসিয়ে দিল শ্যামলা মূর্তিখানি। বাদ্যি, বাড়তি জমায়েত, নাচন, জয়ধ্বনি কিছুই ছিলনা

সেদিন। সোনালি খাঁড়া জলের ওপরে জেগে ছিল তখনও। দুপুরের রোদে কচুরিপানার আড়াল

থেকে ঝিলিক দিচ্ছিল সোনালি রঙ। রুপোলি আঁশ ওদিকের ঘাটে রঙ ছড়ায় রোদে তাপে

পুড়ে যাওয়া তাম্রলিপ্ত মুখে। অনে্কক্ষণের অপেক্ষায় চারা গিলেছে মাঝারি কাতলা।

বঁড়শির টান সামলে নিতে শিকারি জানে বিলক্ষণ। জমা করে দিনের সঞ্চয়, জলের গল্পে

যোগ বিয়োগ মিলে যায় নিরন্তর।

মেয়েদের পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকে জল। বিলি কেটে দিয়ে যায় বারবার। স্বচ্ছ পরতের

তলায় নুড়ি, পাথর আর রঙিন নেল-পালিশ মোহজন্ম নেয়। অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙচঙে

পৃথিবীর মতো। সেখানে গল্পরা টুকরো হয়ে যায়। গোল গোল বুদবুদ উর্ধ্বমুখী। লাল,

নীল, হলুদ, কমলা সদস্যরা সংখ্যায় বাড়ে কমে কিন্তু অগভীর মেক বিলিভ জগতে

সম্পর্কের আঠায় বাঁধেনা নোঙর। কাচের দেওয়ালে ঠুকরে মরে, গুমরে মরে তাজুর মতন।

চোখধাঁধানো বিপুল ওই শপিংমলের কাচের দরজায় চোখ লাগিয়ে যেমন চেয়ে থাকে তাজু।

মলের পাশের গলিতে চায়ের দোকানে গ্লাস ধোয়ার কাজ করে সে। এক এক দিন দোকান

খোলার নির্ধারিত সময়ের আগে এসে পড়ে আর ধাঁ করে চলে যায় মলের কাছে। দরজার

গায়ে নাক ঠেকিয়ে দেখে, কত মানুষ উঠছে, নামছে, ঝলমল করছে সবকিছু স্বর্গের

মতো, কাচে বাষ্প জমে যায় আর নাকে কফির গন্ধ আসে। থমকে যায় বাকি সব।

মাছগুলোও কাচের ওপার থেকে গন্ধ শোঁকে মানুষের। কিন্তু ছুঁতে পারে না।


মন কেবল সেঁধিয়ে যায় অতলে। মুখ বন্ধ ঝাঁপি সে উপুড় করে দেয় নদীর কাছে, যে নদীতে

যত গল্প জমা হয় সেখানে তত নুড়ি পাথর। ধূসর, শ্যাওলা, মেটে, হলদেটে, আকাশি,

সবজে, সাদাটে নুড়ি সব গোপন অক্ষর। যে কথা কেউ জানে না সে কথা নদী জানে।

কতবার উপুড় করেছি নিজেকে তিস্তার কাছে, তোর্সার কাছেও। তিস্তা এখন মরা সোঁতা,

ওর হাতে, পায়ে বেড়ি পরিয়েছে হর্তাকর্তা মাথারা। ও গুমরে থাকে, স্থির আয়নার মতো।

যেন হারিয়ে যাওয়া সেই সবুজ শাড়িটা! যার খোঁজ কেউ করেনি, কোনোদিন। তবে একদিন

ও ফুঁসে উঠবেই, ভাসিয়ে দেবে চরাচর। মন্ত্র পড়ে আনবে হরপা বান, ছটফটে দুষ্টু হয়ে

ফিরে আসবে আবার! লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে পথ চলত ও অচেনা পথিকের সঙ্গে আর কত

গল্প... অনর্গল হই হই। রাফটিং করতে গিয়ে উলটে যদি পড়ত কেউ অমনি হেসে উঠত

হাততালি দিয়ে। কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারি না উচ্ছলতা। থাকতে দিই না তাকে তার মতো

করে। মরা সোঁতা হয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করি, তারপর যখন টলে যায় নিজেদের

অস্তিত্ব, তখন বাঁচাও বাঁচাও হাহাকার। আন্দোলন। কমিটি। অনশন।

নাকানিচোবানি, লোনা গল্প, মাথার ওপরে ঢেউ, উজিয়ে থাকা শ্বাসমূল ভাসিয়ে নিয়ে নিয়ে

যেতে পারে সে। এগিয়ে আসে হৃৎপিন্ড অবধি দামাল প্রেমিকের মতো আর টেনে নিয়ে

যায় জমে থাকা জঞ্জাল। আর প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় ঝিনুকে ঝিনুকে। প্রত্যুত্তর।

কুড়িয়ে নিয়ে আসি রেশমি বটুয়ায়। প্রেমিকের চিঠি। সংকেত আর কবিতা তাতে। কান

পাতলেই শুনতে পাবে ডাক। আকুলি বিকুলি মন। বালি আর আঁশটে গন্ধ রয়ে যায়

অনেকদিন যতদিন না আবার নতুন গল্প নিয়ে ফিরে যাচ্ছি বালিরেখা পথে।

কিন্তু যাদের নৌকা আটকে গেছে পাঁকে কিংবা হারিয়ে ফেলেছে নোঙর খোলার কৌশল,

যারা সহজে পৌঁছতে পারে না জলের কাছে, তারা অপেক্ষা করে আষাঢ়ে দুপুরের, যখন

আকাশ ভেঙে নামবে মেঘমল্লার আর উত্তর কলকাতার গলিপথগুলো হয়ে উঠবে আস্ত

এক একটা নদী, ওরা এক দৌড়ে চৌকাঠ পেরিয়ে নৌকা ভাসিয়ে দেবে জলে। এ গলি, ও

গলি হয়ে সে নৌকা ঠিক পৌঁছে যাবে গঙ্গায়। ঝুরি বট ধরে ডাঙার গল্প শোনাবে নাবাল

মন, সোঁদা জীবন সহজ হয়ে থাকতে জানে সেইখানে।

গ্রিলের বাইরে হাত বাড়িয়ে বিন্দু জল দিয়ে মেয়েটি আঁকবে কপালে টিপ, গাইবে

ভাটিয়ালি গান, তারা জানে তাদের পোষা নদী শুকনো দিনেও সে গান শুনতে পায়। প্রত্যেক

মেয়েই জানে কিভাবে নদীকে পোষ মানাতে হয়। তারপর এপ্রিল মাসের খটখটে দুপুরেও

পিচ কালো রাস্তায় তাদের ছেড়ে দিতে হয়, তারা বয়ে যায় শহর জুড়ে, আবার ফিরেও


আসে মেয়েটির কাছে। খুব প্রিয় বন্ধুকে সে মেয়ে দেখায় পোষা নদী, জানলার বাইরে হাত

গলিয়ে জল ছিটিয়ে দেয় বন্ধুর মুখে। তারপর অনেকেই বায়না করে সে নদী দেখতে চেয়ে।

মেয়ে দেখায় না সবাইকে। দেখাতে নেই যে! যাদের তৃষ্ণা নেই তেমন, শুকনো হরীতকীর

মতো মন, তারা ওকে পাগল ভাববে! সেদিন পাঁচ তলার বারান্দা থেকে হাত নীচু করে ছুঁয়ে

এল ঢেউ, যেমন করে নৌকা থেকে খানিক হেলে পড়ে ছুঁয়ে দেখি জল! ঠিক তেমন... কেউ

বিশ্বাস করবে?

যারা নদী পোষে তারাও ভাবে এক একদিন, কি হবে একবুক তৃষ্ণা নিয়ে? এই আকুলি

বিকুলি, এই হাহাকার, হাসান-হোসেন দশা, কারবালা মাঠের খাঁ খাঁ বালিয়াড়ি বয়ে নিয়ে

কতদূর যাবে তারা? কত দিন কথা শুনবে পোষ্য নদী? তারপর? কেবলই খুঁড়ে যেতে হবে

বালি? ভয় হয়।


“সারা দুপুর খরায় তোমার ধান পুড়েছে।

বিকেলবেলা

হঠাৎ শুরু উথালপাথাল জলের খেলা।

জল ঘুরে যায়, জল ঘুরে যায় নিখিলবিশ্বচরাচরে --

আমার ঘরে, তোমার ঘরে !”

-নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী


বৃষ্টিবিহীন ধান কেটে নেওয়া তপ্ত খর বুক স্নাত হয় কবির কথায়। দুহাতে জল কেটে

ডুব দেয় অতলে। নীলচে রঙের সাবমেরিন হয়ে যায় সে। আর ভুলে যায় ডাঙার গল্প।


এসো এসো হে তৃষ্ণার জল



জয়ীতা ব্যানার্জী

                                                             


আসন্ন বৃষ্টির কথা ভেবে




কলতলা ঘন হয়ে এলো
পশ্চিম আকাশে মেঘ। পাকা খেজুরের মতো রঙ
তার ছেঁড়া আঁচলের

ও বাড়িতে আজ বুঝি রান্নায় দেরি
স্নান, খাওয়া সেরে অন্যদিন নীল শাড়ি ছাদটুকু আলো করে রাখে
আজ নেই। বরং অশ্বত্থের লাল পাতা এককোণে ছায়া সাজিয়েছে

এসব দেখার চোখ কবেই তো হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়
আর বেলা পড়ে আসে 
আসন্ন বৃষ্টির কথা ভেবে
তড়িঘড়ি জোড়া হাঁস নেমে যায় ডোবার গভীরে


অপরাহ্ণ ফুরিয়েছে । রেল-গেটে গাড়ি আর মানুষের ঢল

পোষা হাঁসেদের ঘরে ফেরা ডাক ভেসে আসে
হেজ-বাগানের থেকে বেনামি ফুলের ঘ্রাণ
আপাদমস্তক ভেজা কলমের আমগাছখানি
তার পোয়াতি-দশার নিচে ঝরে পড়ে আছে ফল
কী এক নীরব শোক ছায়া করে রেখেছে এখানে

ও বাড়ির ছেলেটি ফিরেছে
 সাইকেলে মোরামের কাদা লেগে
কুয়োর হু হু জল তুলে ঢালছে সে উঠোনে, চাকায়
বাউন্ডুলে মেনিটির খোঁজে এতক্ষণে ছাদে এসে ঝুঁকেছে আঁচল

শহরে লোডশেডিং। অথচ এ বেয়াদপ জানালা আমাকে
এইসব দৃশ্য জুড়ে কবিতা লিখতে বলেছে


ভিতরে শোকের ছায়া। দরজায় গোলাপি বালিকা
তাঁকে বসবার পিঁড়ি, আসন দিয়েছে। ততক্ষণে
বুঝি সে-ও মুঠি খুলে দেখিয়েছে মারবেলগুলি।
ঘর কেটে রেখে ওই মন্দির চাতালে অবশেষে
সে এসেছে খোঁজ নিতে। এ বাড়ির কেউ কবে যেন
ছুটি পড়বার কথা বলেছিল। বলেছিল এ-ও
কতদিন খেলেনি সে মাঝ দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদে
সে এসেছে এতখানি রোদ নিয়ে মাথার উপর 
কথা দেওয়া আছে আর ফেরানো যায় না কোনওভাবে
বাদবাকি ছাইটুকু জড়ো করে তাঁকে পাঠালাম

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

                                                                     


ফিরে দেখা এক বর্ষার দিন....


সকালে খুব তাড়াতাড়ি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে গেলেও মনটা অস্থির, মেঘলা হয়েছিল দীপের।

বাড়িতে আবারো সেই একই কারণে ঝামেলা। কাল রাতেও রাগে, দুঃখে কিছু খায়নি, সকালেও নয়।

ক্যান্টিনে কিছু খেয়ে নেবে ভেবেছিল কিন্তু মাসের শেষে পকেটের অবস্থাও সুবিধার নয়।

নিজের টেবিলে বসে ব্যাগ থেকে ঘরে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্রের বোঝা বের করে বসল। তাড়াতাড়ি এই

কাজগুলো সেরে ফেললেই বেরিয়ে পড়তে পারবে। ওর সহকর্মী বোধহয় মুখ দেখেই কিছু আঁচ করেছিল।

উঠে এসে বলল, ‘চল একটু চা খেয়ে আসি আগে। আজও না খেয়ে এসেছিস, তাইনা?’

‘না না খেয়েই এসেছি, তবে চল চায়ে তো আপত্তি করার কিছু নেই’। ব্যাগটা ড্রয়ারের নিচে ঢুকিয়ে

উঠেছিল দীপ। ক্যান্টিনে বসার পর শুধু চা নয়, সাথে বাটার টোস্টের অর্ডারও দিয়েছিল রীতা। বাধা

দেওয়ায় বলেছিল, ‘আমি তো খেয়ে আসি নি, একা একা খাবো নাকি। দুটোমাত্র টোস্ট খেতে পারবি না।

সবসময় এমন না না করিস কেন বুঝিনা বাপু’।


কথা বাড়ালো না দীপ। চুপচাপ টোস্টদুটো খেয়ে চায়ে চুমুক দিল। ওকে অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি

চুপচাপ দেখে রীতা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে তোর আজকে মুড ঠিক নেই মনে হচ্ছে। এলি কিসে

অফিসে? অটোতে না রিকশায়?’


‘নাঃরে, হেঁটেই এসেছি। আর মুড আমার ঠিকই আছে আসলে সবকিছু তো একসাথে ঠিক রাখা যায়না।

একটা ঠিক হলে আরেকটা বিগড়ে যায়। জীবনটা সবসময় যে আমার মর্জী মতো চলবে তা তো আর

হওয়ার নয়। সকলে সেই ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। বাদ দে এসব কথা। চল আমি হাতের কাজ শেষ করে

একটু আগে বেরিয়ে যাব আজকে’।


রীতার মুখটা ম্লান হয়ে গেল দীপের কথা শুনে। এতো ভালো একটা ছেলে অথচ জীবন সত্যিই ওর সাথ

দেয়না কখনোই। যখন যা করবে বলে ভাবে তার উল্টোটাই হয়। এতো মেধাবী অথচ সাধারন মানসিকতার

মানুষ। নিজের কথা ভাবেই না তেমন করে, শুধু কিভাবে সংসার আরেকটু সামলে নেবে সেই চেষ্টাই করে

যায়। অথচ ওকে কেউ বুঝতে পারেনা, চায়ও না বুঝতে। রীতা চেষ্টার ত্রুটি রাখেনা। একমাত্র ওই

বোঝে দীপের ভেতরকার যন্ত্রণা। দীপ জানে সেটা, সেজন্যই একমাত্র ওর সামনেই খানিক স্বচ্ছন্দ

বোধ করে।


‘তুই যাবি কোথায়, কলেজে? তোর তো পরীক্ষাও চলে এল সামনে। আজ কি আছে, ক্লাস তো করিস না,

তাহলে?’ রীতার প্রশ্নের উত্তরে, দীপ বলল, ‘পরীক্ষার ফী জমা দিতে হবে। কালকেই শেষদিন।

পরীক্ষাটা না দিতে পারলে হবেই না। আমি একবার যদি না বসি তবে আর এ জীবনে আমার গ্রাজুয়েশন

করা হবেনা। কাল অনেক কষ্টে টাকা যোগাড় করেছি। ভালো লাগেনা আর এভাবে চলতে, তাছাড়া আজ

সব চুকিয়ে আসব....’। কথাটা শেষ না করেই চুপ করে গেল দীপ।


অফিস থেকে বেরোনোর আগেই বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। বর্ষা এসে গেছে। এই অঞ্চলে, একসময়, নিজের

ছোটবেলায় দশ পনেরো কুড়িদিন ধরেও টানা বৃষ্টি হতে দেখেছে দীপ। এখন তেমন হয়না এটাই রক্ষা।

ওর নিজের কোন ছাতা নেই, নেই অনেক কিছুই, সব কথা সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া যায়না একমাত্র

রীতা ছাড়া। মাথার ওপর থেকে ছাতটাই সরে গেছিল যেদিন সেদিন থেকেই এমন একটা অসম পরিস্থিতির

সাথে নিয়ম করে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।


শুধু নিজের জন্য হলে একটা কথা, আজ আরেকজনকে নিয়েও ভাবতে হয়। আর পেরে উঠছে না দীপ।

আজ খুলে বলতেই হবে শ্রাবণীকে সব কথা। ওকে বলতেই হবে, এমন আঘাটায় আটকে থাকা নৌকায়

উঠলে কখনো কোন তীরেই পৌঁছতে পারবেনা ও। ভালবাসার সমস্ত রঙ দেখতে দেখতে ফিকে হয়ে যাবে।

সংশয়, অভাবের সাথে কদিন মানিয়ে চলতে পারবে ও। এমন অভ্যেস তো নেই। নেই সেই অবস্থাও। ওর

জন্য একটা আলোয় ভরা জীবন অপেক্ষা করছে। যেখানে সামান্য একটা মোম আলাদা করে কেনার

ক্ষমতাও নেই দীপের। ওর নাম দীপ হলেও তা যে জ্বালানী ছাড়া, এটা সহ্য করার জন্য, একটা

অন্ধকার ভবিষ্যৎ কিভাবে দেবে ওকে?


বাস রাস্তায় বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হল, ভাবনাগুলোও এইসব সময়ে উড়ে এসে জুড়ে বসে

মনে। ঝিরঝির করে হয়ে যাওয়া অবিশ্রাম বৃষ্টিতে ভিজে গেল ওর একমাথা চুল, ঝাপসা হয়ে এল চশমার

কাঁচ। অটোগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে কিন্তু এদের ভাড়া বেশি। বাসে আটআনা দিলেই যাওয়া যায়।

হোক দেরী। ওর তাড়া নেই।


কলেজের গেটের সামনে পৌঁছনোর আগেই চোখ পড়েছিল দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণীর

দিকে। বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকলেও, ওদের কথা কতটা শুনছে কেজানে। দৃষ্টি তো রাস্তার দিকে।

অপেক্ষায় আছে কখন দীপের দেখা পাওয়া যায়। অফিসে ঢুকে পরীক্ষার ফী টা জমা দিল দীপ আগে।

তারপর হিসেব করে দেখল পকেটে এখন টাকা সাতেক মতো আছে। আজকের দিনটা কাটানো যাবে। কাল

কে দেখেছে? এখন দীপ যে প্রতিদিনের জন্য জ্বলে, বেঁচে থাকে। ওর কথায় রেগে যায় শ্রাবণী। কিন্তু

বোঝেনা যে দীপ যেটা ভাবে সেটাই বলে। বানিয়ে বলার অভ্যেস আগেও ছিল না, নতুন করে শিখতেও

চায়না আর।


দোতলার সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় দেখল শ্রাবণী নেমে আসছে, একাই। মাঝপথে থেমে গেল দীপ। হাসার

চেষ্টা করলেও সেটা হাসি হল কিনা জানেনা। ‘কোথায় যাবে আজ? সোজা বাড়ি নাকি এদিক সেদিক

ঘুরবে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কিন্তু’।


শ্রাবণীর দৃষ্টি ওর ভেতরকার অনেককিছু পড়ে নিল। আজ দীপের মন ভালো নেই এটাও পরিষ্কার হয়ে

গেল ওর সামনে। রোজ যে বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত করায় আজ সে বাড়ি যেতে বলছে মানে কিছু তো

গণ্ডগোল আছে। ভেতরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে এল শ্রাবণীর। বেশ কদিন ধরেই ও একটা ঝড়ের

অপেক্ষায় রয়েছে। জানে একটা কিছু আসবে। সেটা দীপের তরফ থেকেই হোক বা অন্যকোন জায়গা

থেকে। ওদের এই স্বপ্ন দেখার অধিকারটাকে ভেঙ্গেচুরে খানখান করে দেওয়ার ইচ্ছে শানানোর

মানুষও যে কম নেই। আজ দীপকে বড্ড অস্থির দেখাচ্ছে, আপাত শান্ত, যেকোন বিপদে মাথা ঠান্ডা

রাখা দীপ তো এটা নয়। কি হয়েছে ওর?


বেরিয়ে পড়ল দুজনে, ওই শিপশিপে বৃষ্টির মধ্যেই। কলেজ থেকে বেরিয়ে, বিশাল মাঠটা পেরিয়ে যাওয়ার

রাস্তায় দীপকে নিজের ছোট্ট ছাতার নিচে ডাকল শ্রাবণী। ‘শুধু শুধু ভিজছ কেন? ছাতাটা মাথায় থাকলে

মাথাটা অন্তত ভিজবে না’।


দীপ হাসল, ‘আমাকে তো জানোই তুমি। আমার ভালোলাগে বৃষ্টি ভিজতে। ভালোলাগে রোদে পুড়তে। আমার

কিছুই হবেনা। আমার কিছু হতে নেই। আমি ক্রমশ মানুষ থেকে যন্ত্রমানুষ হয়ে যাচ্ছি এটা বেশ বুঝতে

পারি এখন। কোনদিকে যাবে বল তো? চলো আজ বরং নদীটাকে দেখে আসি। বর্ষার জলে কতোটা পুষ্ট

হল দেখি চলো’।


চেনা অচেনা রাস্তা ধরে প্রায় গ্রাম্য রাস্তার শেষে, একসময় পৌঁছে গেছিল নদীবাঁধের কাছে। তারপর

সেই বাঁধ ধরেই রওনা দিল দুজনে। বেশ খানিকটা পথ গাছপালায় ভরা, শুরুতে। বাঁধের নিচের দিকে থাকা

বাড়িগুলোর জানলা দিয়ে দুএকজনের উঁকিঝুঁকিও নজরে এলো বারকয়েক। বেশ বেড়েছে নদীর জল।

অনেকটাই। খানিক দূরে যাওয়ার পর বাড়িগুলো চলে গেল দূরে, এবার পথ অনেকটাই ভালো। শহরের

কাছাকাছি এলে যেমনটা হয়।


‘একটা ছাতা নিয়ে তো বেরোতে পারো। ছোট একটা ছাতা তো তোমার ব্যাগেই ধরে যায়। এভাবে ভেজাটা

ঠিক না’। শ্রাবণীর গলায় অনুযোগের সুর। দীপ বলল, ‘ঘরে গোনাগুনতি ছাতা। আমি তার থেকে একটা

নিয়ে বেরোলে বাকিদের অসুবিধে হবে। আর আমার নিজের বলতে কি আছে? তুমি তো জানো, এই জামা

প্যান্ট যা পরে আছি, এটাও অন্য কারুর। ভাগ্যিস আমার সেই আত্মীয় তার শখে, ঘন ঘন পোশাক

পোশাক বদলায়, একে তাকে না বিলিয়ে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেয়, তা না হলে কি করতাম কে জানে’।


কিছুক্ষন চুপ করে পথ চলার পর আবার কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি ঝমঝম করে শুরু হল বৃষ্টি।

সেইসাথে মেঘের গর্জন। তাড়াতাড়ি একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়াল দুজনে। এবার একটু

কাছাকাছি বলে হাত ধরে ওর অর্ধেক শরীর ছাতার নিচে টেনে নিল শ্রাবণী। বিকট শব্দে একটা বাজ

পড়ল দূরে। ভয়ে শিউরে উঠে দীপের আরো কাছে ঘেঁষে এল ও। গাছের পাতাগুলো থেকেও বড় বড় ফোঁটায়

জল ঝরছে তখন।


দীপ বলল, ‘আমি অনেক ভেবেছি এই কদিন ধরে। আমি আজো জানিনা যে চক্রব্যূহে আমাকে ঢুকতে

হয়েছে সেখানে তোমার জন্য একটা আলাদা জায়গা আমি আদৌ বানাতে পারব কিনা। তুমি বৈভবের

মধ্যে না থাকলেও অভাবের মধ্যে থাকো না। হয়তো অন্য কোনখানে তুমি আরো বেশী সুখী জীবন পাবে।

এভাবে কদিন পথ চলতে পারব জানিনা। একদিন অভাব অনটন ইত্যাদিরা এতো বেশি শক্তিশালী হয়ে

যাবে, ভালোবাসা পালাবার রাস্তা খুঁজবে। আমার সাথে জড়িয়ে গেলে সে রাস্তাও খুঁজে পাবেনা তুমি। আমি

তোমার জায়গায় কাউকে বসাবো না এটা কথা দিতে পারি। এই কথার নড়চড় হবেনা আমার জীবদ্দশায়।

কিন্তু তোমায় আমি সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিতে চাই। আজ এখুনি কিছু বলতে হবেনা। আজ

সারারাত ভাবো। বারবার ভাবো আমি যে কথাগুলো বলছি সেগুলো। একসময় আমাকে জানিও তোমার মত’।


ওদের এইসব কথার মাঝে, কখন বৃষ্টির জোর কমেছে এটা টেরও পায়নি দীপ, শ্রাবণীও। তখন

বারিধারা নেমেছে শ্রাবণীর দুচোখ দিয়ে, অবিরাম। ছাতার ওপরে থাকা ওর হাতটাতে চাপ দিল দীপ।

‘কেঁদো না। আমি তোমার চোখের জল সহ্য করতে পারিনা। আমি যা বলছি এটাই বাস্তব, আমরা যে পথে

এগোচ্ছি সেটা একটা সুখস্বপ্নের মতো হয়তো মনের এককোণে থেকে যাবে আমাদের দুজনেরই কিন্তু

আমি অন্তত এটা জেনে খুশি হবো, তুমি ভালো আছো, সুখে আছো। চলো এগোই আমরা। বড্ড খিদে পেয়ে

গেছে, এখানে কিছু পাবো কিনা কে জানে’।


বাঁধের রাস্তা ধরে খানিকটা গিয়ে শ্মশানঘাট। তার আগেই একটা সুঁড়ি পথ ধরে নিচে নেমে এলো দুজনে।

কয়েকটা দোকান রয়েছে। একটা ছোট চা, মিস্টির দোকানও আছে। একদিকের ঝাঁপ ফেলা। দোকানী

ভারাক্রান্ত মুখে কাউন্টারের বদলে, উনোনের পাশেই বসা। আজ খদ্দের জুটবে কি জুটবেনা তাই

হয়তো ভাবছে বসে। দীপ জিজ্ঞেস করল, ‘চা হবে দাদা? খাবার কিছু আছে কি?’


উনি আগুনের আঁচ পোয়াতে পোয়াতেই বললেন, ‘শিঙাড়া ভেজেছি এই একটু আগেই, এখনো গরম আছে। চা

হবে। একটু বসতে হবে। জলটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে’। ভেতরে ঢুকে কাঠের বেঞ্চে বসল দুজনে। এতক্ষনে

ব্যাগের চেনটা খুলে সিগারেটের প্যাকেট বের করল দীপ। ভেতরে ছিল বলে এখনো সুস্থ আছে

সিগারেটগুলো। দেশলাই দিয়ে ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিল। শ্রাবণীর হাতে ঘড়ি আছে। কটা বাজে

জিজ্ঞেস করায় বলল, ‘সোয়া তিনটে’। গলাটা ভার শোনালো ওর।


দীপ বলল, ‘চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ি চলো। আজ আর হেঁটে ফিরব না। স্ট্যান্ড থেকে বাস ধরে নিই বরং।

তোমাকে যা বললাম তা আমার মনের কথা। অনেক ভেবেছি আমি। কালও সারারাত ধরে এইসব নিয়েই

ভেবেছি। আমার সামনে যে আর কোনো পথ খোলা নেই শ্রাবণী। হয়তো ভবিষ্যতে খুলেও যেতে পারে

কিন্তু সেদিনের জন্য অপেক্ষা করার কোন উপায় তো নেই। আমার তো অফুরন্ত সময় কিন্তু তুমি?

তোমাকে, তোমার বাড়ির সবাই কি দেবে সে সময়? মনে হয় দেবে না। আজকের আমি যে জায়গায়

দাঁড়িয়ে, সেখানে তোমাকে আমি কি দিতে পারব বলতে পারো?’


‘আমি জানিনা। আমি কিছুই জানিনা। তবে একটা কথা জানি, সেই ছোটবেলা থেকেই আমি তোমাকে ছাড়া

আর কারুর কথা ভাবিনি কখনো। ভাবতেও পারব না। যদি তুমি আমাকে এরপরও বল অন্য কিছু ভাবতে

তবে অনেকগুলো পথ খোলা আছে আমার কাছে। আমি জীবন কাটাতে হলে তোমার সাথেই কাটাবো, না

হলে জোর করে আমাকে অন্য কোথাও কেউই পাঠাতে পারবে না। তুমি ভাবার জন্য অনেক সময় দিচ্ছো

আমাকে। দরকার নেই সে সময়ের। আমার কথা আমি এখনি জানিয়ে দিলাম তোমাকে। দীপ আমরা তো

কোর্টে, রেজেস্ট্রী করে বিয়ে করে ফেলতে পারি। তাহলে আমাদের দুজনকে আর কেউ আলাদা করতে

পারবে না। তখন আমাদের সময় দিতেই হবে সকলেরই’। একটা আশার আলো যেন জ্বলে উঠলো ওর

মুখে।


‘পারি তো ঠিকই কিন্তু তারপর? সেটাকেও যদি মান্যতা না দেয় কেউ? আসলে আমি চাইনা তুমি তোমার

বাবামায়ের মনে দুঃখ দাও। আমার এখন যেটুকু ক্ষমতা তাতে যে সংসারের হাল ধরে আছি সেটাই

ঠিকমতো চলছে না। তারসাথে তোমার জীবনটাকে জড়িয়ে নেওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই শ্রাবণী।

তার চেয়ে দুরত্বটাকে বাড়িয়ে নেওয়াটাই ভালো হবে,’ কথা বন্ধ করল দীপ। চায়ের দোকানের ভদ্রলোক

একটা ট্রেতে করে দু গ্লাস চা আর প্লেটে শিঙাড়া নিয়ে এসে ওদের সামনের টেবিলে রাখলেন।


দু এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন সামনে তারপর বললেন, ‘কিছু যদি মনে না করেন, একটা কথা বলব?’ একটু

অবাক হয়ে গেল ওরা দুজনেই। ‘হ্যাঁ, বলুন, কি বলবেন’। শান্ত গলায় দীপ বলল।


‘এতটুকু দোকান আমার, তাই ইচ্ছে না থাকলেও দুএকটা কথা কানে চলে আসবেই। আমি আপনাদের

আগেও দেখেছি, এই রাস্তায় হেঁটে যেতে, কলেজের কাছেও। আমার বাড়ি ওদিকেই। বাড়িতে গিয়ে আমার

বৌকে আপনাদের কথাও বলেছি, দুএকবার। আমি নিজেও একসময় পড়তাম ওই কলেজেই। অনেক স্বপ্ন

দেখতাম। গরিবের ঘরে আমাদের মতো মানুষ যেমন স্বপ্ন দেখে, তেমন সব স্বপ্নই। আমার বৌ আমার

সাথেই পড়ত। এমন একটা টানাপড়েন আমাদের জীবনেও এসেছিল। আমি নিজের অক্ষমতা জানিয়ে সরে

আসতে চেয়েছিলাম আমার বান্ধবীর জীবন থেকে, ঠিক আপনার মতো করে কথাগুলো বলেই। সে রাজী

হয়নি। আমার সাথে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে চেয়েছিল’। চুপ করে গেলেন ভদ্রলোক।


ওনার দৃষ্টি দীপ শ্রাবণীকে ছাড়িয়ে, খোলা একফালি জানালা দিয়ে বাঁধের ওপরে একনাগাড়ে ঝরতে থাকা

মৃদু বৃষ্টিফোঁটাগুলোর সাথে হারিয়ে গেছিল, অতীতের সেই দিনগুলোতে হয়তো। ‘একদিন বাড়ি ছেড়ে এক

কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল সে। এখান থেকে অনেকটা দূরের এক মন্দিরে বিয়ে করে, ওকে বাড়িতে নিয়ে

এসেছিলাম আমি। শুরুতে একটু ঝামেলা যে পোয়াতে হয়নি তা নয়, কিন্তু আমার মা খুব তাড়াতাড়িই

মানিয়ে নিয়েছিল ওর সাথে। পড়াশুনোর মাঝে সামান্য কিছু কাঠের ব্যবসা করতাম। বলতে বাধা নেই,

চোরাই কাঠের ব্যবসাই ছিল সেটা। সামান্য কিছু টাকা জমিয়েছিলাম সেখান থেকে। বৌ প্রথমেই আমার

সেই ব্যবসা বন্ধ করিয়ে দিল। বলেছিল, ওর কাছেও কিছু টাকা জমানো আছে সেটা দিয়ে অন্যকোন

ব্যবসা করতে’।


‘খুব ভালো খাবারদাবার তৈরি করতে পারে বলেই, বলেছিল, এমন একটা দোকান খুলতে। প্রথমে ভাড়ায়

দোকানটা নিয়ে শুরু করলাম ব্যবসা। এই শিঙাড়া, চপ, নানারকমের পিঠে ইত্যাদি আমার বৌ, মা মিলে

বাড়িতেই তৈরি করে দেয়। আমি এখানে এনে ভাজি শুধু। আজকের এই দুর্যোগের দিনেও, দিনের শেষে

কিচ্ছু পড়ে থাকবেনা। সব বিক্রি হয়ে যাবে। বৌ বাড়িতে বেশ কিছু বাচ্চাদের পড়ায়। সেখান থেকেও আয়

হয়। শাড়িতে সুতোর কাজ, ফেব্রিকের কাজ ইত্যাদিও করে। তারপর একদিন এই দোকানটাকে কিনে

নিতেও পেরেছি। ভাঙ্গাচোরা কাঠের বাড়িতে দেওয়াল গেঁথে চেহারাও পালটে দিয়েছি। একটা বোন ছিল,

তার বিয়ে দিয়েছি। অথচ এগুলো করতে পারব এমনটা স্বপ্নেও ভাবিও নি কখনো’।


‘আপনি তো সরকারী চাকরি করেন, আজ যে অবস্থায় আছেন, কাল কিন্তু আর তা থাকবেনা। নিজেকে

গুছিয়ে নিতে পারবেন। তাই বলছি, কিছু মনে করবেন না যেন, দিদিভাই যা বলছেন সেটাকেই মানুন। একটা

সম্পর্ক ভেঙে দিতে, কয়েকটা মুহূর্ত লাগে, গড়ে তোলার জন্য সারাটা জীবন তো আছেই আপনাদের

সামনে। আমার শ্বশুরবাড়ি প্রথম অবস্থায় রাগ করলেও পরে সেটা পড়ে গেছে। আজ প্রয়োজনে

আমাকেই ডেকে পাঠান ওরা, ভরসাও করেন’।


‘আমি বলছি, আপনি দিদিভাইয়ের পরামর্শটা মেনে নিন। একটা আইনি বন্ধনে জড়িয়ে যান দুজনে যাতে

ইচ্ছে করলেই ওনাকে আপনার থেকে দূরে কেউ না সরিয়ে দিতে পারে। সেটা একটা ইনস্যুরেন্স হয়ে

থাক না। আপনারা সময় সুযোগ বুঝে বলবেন সে কথা। দরকার না হলে বলবেন না। কিন্তু নিজেদের

মধ্যে কোন দুরত্ব ভুল করেও তৈরি করবেন না। আমার অনুরোধ এটা’। উনি খানিকটা লজ্জা পেয়েই

বললেন, ‘দেখুন কান্ড আপনাদের চা তো একদম ঠান্ডা হয়ে গেল। দাঁড়ান একটু গরম করে দিই’। চায়ের

গ্লাসদুটো হাতে নিয়ে চলে গেলেন উনি উনোনের সামনে।


দীপ তাকালো শ্রাবণীর দিকে। এক অদ্ভুত আলোর রেখায় ঝলমল করছে ওর মুখ। এই ভদ্রলোকের

কথা যেন ওদের নিজেদের কথাই, ঠিক এমনটা তো দীপ নিজেও ভাবছিল ওনার কথা শোনার সময় আজ

শ্রাবণীকে এই কথাগুলো যে কিভাবে বলেছে তা একমাত্র ও নিজেই জানে। বর্ষার অবিরাম ধারা ধুইয়ে

দিচ্ছিল ওর মুখ তাই শ্রাবণী বুঝতে পারে নি। সবটুকু বৃষ্টির মিষ্টি জলের ধারা নয়, তাতে মিশে ছিল


চোখের লোনা জলও। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েছিল একদৃষ্টে। বুঝে নিতে চাইছিল একে অপরের

গভীরতা। ভদ্রলোক আবারো চায়ের গ্লাস নিয়ে এলেন। এবার একটা বাড়তি গ্লাসও এনেছেন, নিজের

জন্য।


ওদের থেকে একটু দূরের একটা বেঞ্চে বসে বললেন, ‘আমি জানি আপনারা আমার আপনাদের বিষয়ে

কথা বলায় বিরক্ত হননি। আমি যা বলেছি তা আমার মনের কথা, অভিজ্ঞতার কথা। আপনারা সেই ভুল

করতে যাবেন না, যেটার জন্য একদিন পস্তাতে হয়। আমিও করতে যাচ্ছিলাম। আমরা ছেলেরা বোধহয়

এমনধারাই হই। সঙ্গীকে কষ্ট না দেওয়ার বাসনায় দূরে সরে যেতে চাই, অথচ জেনেবুঝে সেই কষ্টই

দিয়ে ফেলি। দিদিভাইদের মতো মেয়েরা যে একটা মস্তবড় বল হয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে এমনটা ভাবিই

না। আপনি দাদা, নিজের ধারণা বদলান। সময় সব ঠিক করে দেয়। সময়ের চেয়ে বেশি শক্তি কারুর নেই।

শুধু দাঁতেদাঁত চেপে একটু অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটা কথা, বিয়ের সময় আমাকে এই ঘটকালির

জন্য নেমন্তন্ন করতে ভুললে চলবে না কিন্তু’।


চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে দুজনেই হেসে উঠল ওনার কথায়। শিঙাড়াটা সত্যিই অদ্ভুত সুন্দর

বানিয়েছেন ওনার স্ত্রী। খাওয়া শেষ করে টাকা দেবার জন্য পকেটে হাত দিতে যেতেই, ভদ্রলোক হাত

জোর করে বললেন, ‘আমার দোকানে আজ প্রথম এসেছেন আপনারা, আমার কথায় যদি দুটো জীবন

একসাথে মিলে যায় তবে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা হবে। আজ আমি কোনো দাম নেবোনা। এরপর

আপনারা দুজনে স্বামীস্ত্রী হয়ে যেদিন আসবেন সেদিন উসুল করে নেব। কথা দিচ্ছি আমি’।


খানিকটা হতবাক হয়ে গেল ওরা দুজনেই। দীপ ভদ্রলোকের হাতটা চেপে ধরল। ‘একটা মস্তবড় ভাঙনের

হাত থেকে আপনি বাঁচালেন আমাদের। আমি নিজেও চাইনি ওকে দূরে সরিয়ে দিতে। অভাব যেটার ছিল তা

হল নিজের প্রতি আস্থার। আপনি সেটা আমাকে ফিরিয়ে দিলেন আজ। আমি কৃতজ্ঞ থাকব আপনার

কাছে’।


শ্রাবণের অবিশ্রাম ধারা থেমে গিয়ে, পশ্চিম আকাশে মেঘের ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে টুকটুকে লাল রঙের

সুর্য। রাস্তায় জমে যাওয়া জলে, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেল লাইনের চকচকে লোহার পাতে, গাছগুলোর

ভেজা পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে সেই রক্তিম আভা। দুজনে পা বাড়ালো বাসস্ট্যান্ডের দিকে। কিছুদূর গিয়ে

দুজনেই একবার ফিরে তাকালো। ভদ্রলোক দোকানের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। উনিও হাত নাড়লেন

ওদের দিকে।


দীপ বলল, ‘আমার এখন একটাই কাজ হবে, নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নেওয়া। তোমাকে আমার কাছে

আনতে গেলে যেটুকু দরকার সেভাবে সাজিয়ে নেওয়া সবকিছু। তুমি পারবে তো সব মানিয়ে নিতে,

শ্রাবণী?’


শ্রাবণী হাত বাড়িয়ে দীপের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ‘একবার সুযোগ তো পেতে দাও। আমি সব

ঠিক করে নেব। ঠিক হয়ে যাবে আমার বাড়িও। সময় লাগবে একটু হয়তো, কিন্তু হবেই। আমি জানি।

বিশ্বাস করি। তুমি আমার ওপরে ভরসা করতে পারো’।

নিলয় নন্দী


 


যদিও ঋতুর নাম বর্ষা ছিল না 


এই তো সেদিন। তখন রাত। ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে শুয়েছিলেন তিনি। নীলাভ চাঁদের জ্যোৎস্নায় অদূরে ঘাইহরিণী ডেকে উঠলে আমাকে বলে ওঠেন "শুনেছো?" আমি না শোনার ভান করে দূরে সরে যাই, প্রেম অপ্রেম থেকে দূরে... 

যদিও ঋতুর নাম বর্ষা ছিল না, তবুও বৃষ্টি এলো। চাঁদ ভিজে গেলো চুপচুপে। জল চুঁইয়ে পড়ছে মাধবীলতায়। মাধবীলতা কেবল শরীর! শ্রাবণের চিত্রকল্প! প্রেমিকের আনাগোনা। ফ্যাকাশে দিনের আয়ু উড়ে যায় বৃষ্টির স্কেচে। লেডিবার্ড মিশে যায় বিপন্ন স্নানে। তারপর গুঁড়ো কাচ, প্রতিবিম্ব নদী। লতা বা মাধবী, নৌকা নয় নারী, বা অপর্যাপ্ত শীৎকার...

হরিণী সবুজ ঘাসে হেঁটে যায় বুড়িচাঁদ বৃষ্টিদানা। অতর্কিত ট্রাম এসে গেলে রক্তে ভেসে যায় নাগরিক মেকওভার। পুরনো চৌকাঠ, কড়িবরগা, বৃষ্টি নামলে ছোপ ছোপ শ্যাওলা আর মুখবন্ধ খাম। "পড়বে না কী লিখে গেলাম হলুদ বিকেলে?"... ধূসরতা সম্বল। অভিমান আঁধারিয়া ক্যালিগ্রাফি। রঙিন ছাতার নীচে লেখা থাকে নাবালক চুম্বনকাব্য। গন্ধস্বাদ উবে গেলে বৃষ্টির কবিতা পড়তে হয় রাতভোর। এ বৃষ্টি ক্লান্তিহীন। জলের ভিতরে জল। কার চোখে রেখে গেলে ম্লান বেতফল? তুমিও না শোনার ভান করে দূরে সরে যাও...

এখন ধানসিঁড়ি মানে সাইরেন অবুঝ বর্ষাদিন
থরহরি হরি তোর... থরহরি হরি তোর...

এভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল না।

অমিতাভ সরকার

 



বৃষ্টির আকাশ...।।      


আজ তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে বৃষ্টি। সব কাজ সেরে বিছানায় শুয়ে সবে চোখ বুজেছে, টুং শব্দ শুনে মোবাইলের দিকে তাকাতেই ইন্দ্রের ম্যাসেজটা দেখতে পেল। দিনটির কথা ভোলেনি ইন্দ্র। ম্যাসেজ আসার পর থেকে সারারাত ঘুম আসেনি বৃষ্টির। প্রতিবছরের মতো গত বছরেও এই দিনটায় বাবা ভোরে উঠে খাটাল থেকে দুধ নিয়ে এসে নিজের হাতে পায়েস বানিয়েছেন। মা চলে যাওয়ার পর বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন মায়ের অভাব যেন টের না পায় দুই বোন।          

  

হাতমুখ ধুয়ে, স্নান করে গতবছরে বাবার দেওয়া নতুন শাড়িটা পরল বৃষ্টি। শাড়িটার সঙ্গে যেন বাবার স্নেহ, মমতা জড়িয়ে আছে। মনে হলো পাশেপাশে বাবা কোথাও আছেন। এই বুঝি ডাক দিলেন তাকে...বৃষ্টি’মা...।

  

এককাপ লাল চা নিয়ে খোলা জানলার কাছে চেয়ারে এসে বসল বৃষ্টি। খুব প্রিয় এই জানলাটি। বাড়িতে থাকলে একমাত্র এই জানলা দিয়েই আকাশ দেখতে পায় সে। আকাশের দিকে একবার তাকাল বৃষ্টি। আকাশটা তার মতোই মনমরা, তমসাচ্ছন্ন, সূর্যদেবের যেন ঘুম ভাঙ্গে নি এখনো। গুমোট গরম, এই সাত সকালেই বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে কপালে। মৌসুমি বায়ু এসে পড়েছে, বর্ষা আসতে শুধু সময়ের অপেক্ষা, জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।           

 

শহরতলীতে দুই কামরার টালির ছাদ দেওয়া ছোট্ট বাড়িতে একাই থাকে বৃষ্টি। প্রথম দিকে নানান ধরণের অসুবিধা হলেও এখন একা থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে। একা সোমত্ত মেয়ের যা হয় আর কি। উপকার করার আছিলায় কাছে আসার চেষ্টা লেগেই ছিল বেশ কিছুদিন। ইন্দ্রের যাতায়াতের পর থেকে ধারে কাছে ঘেঁসে নি কেউ। একবছর আগে যখন বৃষ্টি প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিল, তখন ইন্দ্র এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জুগিয়ে। আত্মীয় পরিজন চলে যাওয়ার পর বেশ কয়েকটা দিন দুইবেলা আসতো ইন্দ্র। পুরো নাম ইন্দ্রজিৎ সেন, বছর তিরিশের তরুণ পুলিশ ইন্সপেক্টর। না, বৃষ্টি কোনো রকম বেচাল দেখেনি তার মধ্যে।  

 

ঘটনার দিন স্থানীয় থানা থেকে সাব-ইন্সপেক্টর ইন্দ্রজিৎ এসেছিল ইন্সপেকশন করতে। সেই কারণে বার কয়েক বৃষ্টির কাছে আসতে হয়েছিল তাকে, বডি নিয়ে যাওয়া, পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজনদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে।  পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর বৃষ্টির অসহায়ত্বতা দেখে আগ বাড়িয়ে শ্মশানযাত্রার যাবতীয় কাজে সঙ্গে ছিল ইন্দ্র। দেহ চুল্লীতে দেওয়ার সময় বিপর্যস্ত বৃষ্টি ইন্দ্রের হাত আঁকড়ে ধরেছিল। সেই শুরু...। তারপর থেকেই ক্রমে পরস্পর কাছাকাছি এসেছে তারা। প্রকৃতপক্ষে ইন্দ্রের সাহচর্যেই উঠে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টি।      

 

বৃষ্টি আর মেঘা দুই বোন। বৃষ্টি বছর পাঁচেকের বড়। বাবা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। একসময়ে রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন। আদর্শচ্যুত হননি কোনোদিন। এলাকায় মানুষজন সম্মান করেন তাঁকে। মা মারা গেছেন মেঘার জন্মের সময়। বাবা প্রতিষ্ঠানের সামান্য বেতনে দুই মেয়েকে অনেক কষ্টে নিজের মনোমত বড় করার চেষ্টা করেছেন।               

 

কলেজের পাঠ চুকিয়ে একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকরী পেয়ে যায় বৃষ্টি। বেতন সামান্যই, তবু তাঁর চাকরী পাওয়ায় সংসারে একটু স্বচ্ছলতা এসেছিল। ছোট বোন মেঘা স্থানীয় কলেজে অ্যাডমিশন নেওয়ার পর থেকে ক্রমাগত চাহিদা বাড়তে থাকে। আর তার চাহিদা মতো অর্থের জোগান মেটাতে হতো বৃষ্টিকে। মেঘার এই বিলাসিতা ভালো না লাগলেও যতটা সম্ভব ছোট বোনের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করত বৃষ্টি। এই ব্যপারটাতে বাবাকে জড়াতে চায় নি। ভেবেছিল কলেজে উঠলে অনেকেরই প্রথম প্রথম খরচের বহর বাড়ে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে সব। সকলে তো আর বৃষ্টি নয়।  অভাবের সংসারে সেই সুযোগও ছিল না বৃষ্টির। মেঘার তো দিদি আছে...।        

 

কলেজে দ্বিতীয় বছরে মেঘা চালচলনে পরিবর্তন লক্ষ করল বৃষ্টি। তার পোশাকআশাক, সাজগোজের বহর, সব কিছুই যেন অদ্ভুত হালফ্যাসানের, যা কোনোদিন বৃষ্টি চিন্তাই করেনি। ক্রমে টাকাপয়সার চাওয়া মাত্রাতিক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন এই নিয়ে প্রশ্ন করায় রীতিমত অপমানিত হতে হয়েছিল বৃষ্টিকে। সেই অপমান নিরবে হজম করে পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় মেঘাকে হাত খরচের কিছু টাকা দিতে গেলে বলেছিল; “আমার হাত খরচের টাকা আমি নিজেই জোগার করে নেব, তোকে আর এই নিয়ে ভাবতে হবে না”। সেদিন চোখের জল লুকোতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল বৃষ্টি।      

 

অনেকবার ভেবেছিল সব কথা বাবাকে বলবে। কিন্তু কয়েকবার বলতে গিয়েও বলতে পারেন নি বৃষ্টি। প্রতিষ্ঠানের কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেত বাবার। তাই বাবাকে না জড়িয়ে সব অপমান দূরে সরিয়ে মেঘাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার ফল হয়েছিল বিপরীত। এবিষয়ে কিছু বলতে গেলে উন্মত্ত হয়ে উঠত মেঘা তার  অস্বাভাবিক আচরণের ফলে ভয়ঙ্কর ঘটনার আশঙ্কায় চুপ করে থাকতে হয়েছে বৃষ্টিকে।      

 

একদিন রাতে রান্নাবান্না সেরে মেঘার জন্য অপেক্ষা করছে, বাবার ফিল্ড ডিউটি, ফিরতে দেরী হবে। এদিকে রাত প্রায় ন’টা বাজে। মেঘার দেখা নেই। এই সময় যদি বাবা ফিরে আসে, কী জবাব দেবে বাবাকে। এই দুশ্চিন্তায় নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল বৃষ্টি...।   

 

হঠাৎ একটা গাড়ির আলো চোখে এসে লাগল বৃষ্টির। একটা প্রাইভেট কার এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। প্রাইভেট কারের পেছনের সিট থেকে নামল মেঘা। বৃষ্টি দরজা খুলে দিতেই পা থেকে জুতো জোড়া একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বৃষ্টি এসে মেঘার জামা কাপড় পাল্টে দেওয়ার সময় একটা কটু গন্ধ নাকে লেগেছিল। সেই রাতে মেঘা কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। পরের দিন সকালে প্রশ্ন করায় মেঘা জানিয়েছিল, এক ফিল্মের প্রডিউসার তাকে লিফট দিয়েছে। তারপর থেকে প্রায়ই কোনও না কোনও গাড়ী এসেছে তাকে নামিয়ে দিতে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে চরম লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল বৃষ্টিকে। না, আর নয় বাবাকে খুলে বলা দরকার। সকালে মেঘা কলেজে চলে যাওয়ার পর সব কথা বাবাকে খুলে বলে বৃষ্টি। বৃষ্টির কথা শোনার পর বাবা কোনও কথা বলেন নি। থমথমে মুখে কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।              

 

সেদিন বাবা একটু আগে আগেই ফিরেছিলেন কাজ থেকে। ফিরে এসে বলেছিলেন, মেঘা ফিরলে তাঁর ঘরে পাঠিয়ে দিতে। রাত আটটা নাগাদ ফিরেছিল মেঘা। আসার সাথে সাথে তাকে কথামত বাবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল বৃষ্টি। মেঘা বাবার ঘরে দিকে পা বাড়াতে সেও পিছু নিয়েছিল তার। আসন্ন উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা ভেবে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল।    

 

মেঘা ঢোকা মাত্র বাবা দরজাটা বন্ধ করে দিতে বললেন মেঘাকে। বাইরে থেকে কান পেতে ছিল বৃষ্টি। বাবা খুব শান্ত ভাবেই বিস্তারিত জানতে চাইলেন মেঘার কাছে। বাবার কথাটা শোনা মাত্র উত্তেজিত হয়ে উঠল মেঘা। মেঘার কথায় বাবা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না, চিৎকার করে উঠলেন। তর্কাতর্কি চরম জায়গায় পৌঁছাতে বাবার শরীরের কথা ভেবে বৃষ্টি আর বাইরে থাকতে পারল না। সজোরে দরজায় ধাক্কা দিল। দরজা খোলার আগে শুনতে পেল, মেঘা উন্মত্তের মতো বলছে;  “আমি অ্যাডাল্ট, আমার জীবন কিভাবে চলবে তা আমিই ঠিক করব। তোমাদের মত নোংরা বস্তিতে আমি থাকতে পারব না। তোমরা আদর্শ ধুয়ে জল খাও...। আমাকে আমার মতোই চলতে দাও...”।    

“তুই বেরিয়ে যা, এই বাড়িতে থেকে এসব চলবে না”। আর কথা বলতে পারলেন না বাবা, বিছানায় এলিয়ে পড়ছিলেন, দৌড়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়েছিল বৃষ্টি। সশব্দে দরজা ধাক্কা বেরিয়ে গিয়েছিল মেঘা।           

  

সেরাত্রে অনেক চেষ্টা করেও কাউকে খাওয়াতে পারে নি বৃষ্টি। বাবার মাথায় হাত বোলানোর সময় বৃষ্টির হাত চেপে ধরে বলেছিলেন; “আমি হেরে গেলাম রে মা...”। ভোর রাত্রে বিছানার পাশে মেঘাকে না পেয়ে সারা বাড়ি খুঁজেছিল বৃষ্টি।  কোথাও পায়ই তাকে। এই ভোরে কোথায় গেছে মেঘা...? মেঘার জন্য দুশ্চিন্তায় আর ঘুম এলো না বৃষ্টির...। বেলা বাড়তে চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে বাবার দরজায় ধাক্কা দিল বৃষ্টি। বারবার ধাক্কা দিয়ে সাড়া না পেয়ে উৎকণ্ঠায় চীৎকার করে উঠেছিল। তার চীৎকারে আশেপাশের লোকজন এসে দরজা ভাঙ্গতে ঝুলন্ত দেহ দেখতে পায় বাবার। এই ঘটনার পর মেঘাকে আর খুঁজে পায়  নি বৃষ্টি।      

 

আনমনা হয়ে ভাবছিল বৃষ্টি। আজও বাবাকে মাপ করতে পারে না। বাবা আত্মহত্যাকে ঘৃণা করতেন, বলতেন;  আত্মহত্যা পালিয়ে যাওয়ারই নামান্তর। সেই বাবা কিনা আমাকে একা রেখে পালিয়ে গেলেন ! একবারও ভাবলেন না তার কথা ! ছোট বোন মেঘা আজ কোথায়...। তারও কি দিদির কথা মনে পড়ে না? তাকে খুঁজতে তো কম চেষ্টা করে নি সে!       

 

ভাবতে ভাবতে হারিয়ে গিয়েছিল বৃষ্টি। একটানা দরজায় কড়ানাড়ার শব্দে সম্বিৎ ফিরে পেল। দরজা খুলতেই দেখল, হাসিমুখে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ইন্দ্র। ব্লু জিন্সের ওপর কলার দেওয়া সাদা পাঞ্জাবীতে একদম অন্যরকম লাগছিল ইন্দ্রকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বৃষ্টি। “হ্যাপি বার্থডে”... বৃষ্টির থুতনি টিপে আদর করে কপালে চুম্বন এঁকে দিল ইন্দ্র। মুখ তুলতেই ইন্দ্র দেখল, বৃষ্টির চোখ থেকে নেমে আসছে অশ্রুধারা। বৃষ্টিকে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল ইন্দ্র। তারপর চেয়ারে বসিয়ে বৃষ্টির সামনে একটা টুল টেনে নিয়ে বসে পড়ল। টিফিন ক্যারিয়ার খুলে চামচে করে মুখে তুলে দিলো সঙ্গে আনা পায়েস। এমনই করেই বাবা খাইয়ে দিত তাকে। আর থাকতে পারলো না বৃষ্টি। বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল বৃষ্টি। উঠে দাঁড়িয়ে কাছে টেনে নিল ইন্দ্র...। কাঁদুক...কাঁদুক, হালকা করুক নিজেকে। মেঘের গুরু গুরু গর্জনে জানলা দিকে তাকাল ইন্দ্র। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে...। এক্ষুনি বর্ষা নামল বলে।     

“জানো, মা আজ ডেকেছে তোমাকে। ওখানেই আমরা সবাই সেলিব্রেশন করব। রেডি হয়ে নাও”। চোখ মুছে হাসল বৃষ্টি। আর তক্ষুনি বিদ্যুতের ঝলকানির সাথে অঝোর ধারায় নামল বর্ষা...।

#

বৃষ্টির কাছ থেকে মেঘার ছবি আর বিবরণ নিয়ে প্রায় এক বছর খোঁজ করেছে ইন্দ্র। গতকাল রাত্রে পার্ক্সট্রিট থানার একই ব্যাচের এক বন্ধু জানিয়েছে, চেহারার বর্ণনা অনুযায়ী একটি মেয়েকে পাওয়া গেছে। পার্ক স্ট্রীটের একটা হোটেল থেকে কয়েকটি মেয়ের সাথে তাকে এরেস্ট করা হয়েছে। অবশ্য তার নাম মেঘা নয়, ‘ম্যাডোনা’। কলকাতায় ব্যবসায়ী মহলে বেশ পরিচিত সে। একজন নাম করা কলগার্ল তথা পর্ণস্টার। আগামীকাল পার্ক স্ট্রীটে যাবে ইন্দ্র। একবার ইন্টারোগেট করলে সব বোঝা যাবে। না, এখন এসব কথা বলা যাবে না বৃষ্টিকে...।      

শর্মিলা ঘোষ

 


গুচ্ছ কবিতা

শিরোনাম-বৃষ্টির রিংটোন//শর্মিলা ঘোষ

মেঘের চিঠিতে ওলোটপালট হয়ে যায় ঋতু, আঙুল ছুঁয়ে অধোর ধারা,মন কেমনের গল্পে আমি সে ও সখা, আশমানী কবুতর

শার্সি ভিজে যাচ্ছে জলে,আবছা হচ্ছে অন্তর,
আলগোছে মুছে যাওয়া শরীর
পুরোনো মোবাইলের রিংটোন,
কার্ণিশে শেওলার পিচ্ছিল


বর্ষা নামলেই জলোচ্ছ্বাস
কফির কাপে তুফান, বাউল কথা ডিরেক্টরির পাতায়,
মনখুঁজে নেয় লিভিং রুমের গল্প,
কেউ আঁকছে জলছবি


জল মাপছে রাতের গভীরতা
স্বপ্নের বাইপাসে পেশমেকার
হাঁটুজলে ডুবে যাচ্ছে মন
অশরীরী বৃষ্টি তবু চলবে সারাজীবন,
তরঙ্গ জুড়ে প্রেমের অবগাহন

আষাঢ় শ্রাবণ দুলছে পেন্ডুলামের মতো,সময় ছুঁয়েছে মেঘ বালিকার মন
এবার বৃষ্টি রোমকূপের সেচন
অন্তমিলে মেঘ বাদলের আলাপন,
ট্রাফিক সিগন্যালে ভেজা ইচ্ছেরা দাঁড়িয়ে..........



অনিকেশ দাশগুপ্ত


 


দৌড়


বিক্ষিপ্ত কথোপকথনগুলি চলেছিল দিনভর
বাইরে তখন নৌকোর ছায়া, আরও কত কী প্রস্তুতি 

শান্তিকামী বক ক্রোশ-ক্রোশ দূরের অস্পষ্ট  আকাশরেখায়
ঘর ভরতি বিদ্যুৎ আলো তখন হলুদ মায়াটিপ,
পুরনো কাগজের ঢিবি থেকে বিফল শার্সিভাঙা অনায়তন;
কনুই অবধি এই পাটভাঙা বর্ষা চলেছিল

সারাটা শৈশবে অনুমানে আমাদের পাশেই ছিল
এমন ঝলমলে সাইকেল এবং সমবেদনা,
গাঢ় চিবুকের যেন কত-কত প্রতিধ্বনি সুদূর ঘরে হারাত

আমাদের গাল টিপে ধরেছিল  সেসব বিশুদ্ধ পাখিরা 
এখনও বৃষ্টি হয় তারা কাগজের নৌকো মুখে ক’রে 

  

ছেলেবেলার বৃষ্টি


মাটির ওপরে ওই যে একমুষ্টি শ্যাওলা ঘর
কোন গভীর খুঁড়ে আকাশবর্তী হয় বিপন্ন শামুক সেখানে
যেন পেছন ফিরলেই চুরি ক’রে নেবে অবিন্যস্ত শ্রম 

একলা কুসুম ছেলেবেলার 
দীর্ঘ উঁচানো কন্ঠস্বর নেমে যেত
জল-জল নৌকোঘরে বাতিল কৌটোর ভেতরে
ডিম ফোটাবার গন্ধে

বিষণ্ণ পিঁপড়েরা মুখে-মুখে বয়ে নিয়ে যেত শালিক-সুখ 
পরিহারের হলুদ বর্ণ 
নরম সবুজ রোঁয়ায় ভ’রে উঠত আমর্ম; 

দু’হাতে মুঠো ক’রে আমাদের চোখ-চোখের ছায়ায়
গাঢ় মাটির মণ্ড বৃষ্টির সহস্র ধরনে গ’লে পড়ত

জমকালো পৃথিবীর ছাউনি ছিন্ন পাতার আবৃন্ত কান্নায়
সুদূর রান্নাঘরের করুণ চুড়ির শব্দ সহসা উঁকি দিলে
চৌকাঠ-বারান্দা-আঙিনা 
বড় ছায়াময় মনে হ’ত সারাবেলা


সান্ত্বনা

দু’পাঁচ কথা শিখে সরে গেছে এক আকাশ চাঁদ
সূক্ষ্ম ও পরিপূর্ণ একটা রাত্রির গন্ধে

সুদূর খিলানের মতো আকাশের 
সমবেত স্মৃতি শুধু
অমৃত-বয়ান ,পাখির নির্লিপ্ত প্লবতা

এখানে একমাত্র বিকেল,
অন্যান্য আলোর চেতনায়
আমরা হাত রেখেছি একে অপরের পিঠে















সন্ধান

জনতা জাহাজের দিকে আমি 
ঝাঁপ দিয়েছি বিবশ
বোমারু হৃদয়ে 

নির্জন পলাতক দুপুর আর নিটোল সসার নিয়ে 
নীরবতার জল আমার পা টেনে ধরেছে

দিগন্ত, যেন দুরাশার মতো ফুঁড়ে ওঠে 
তামাম সমুদ্রে
প্রতিবার বেঁচে থাকার জন্য স্বরমন্থন –

নিখিল থুতু গড়িয়ে নেমেছে রঙের মূর্ছনায়
এ সমস্ত নিষিক্ত ফলে অবারিত মৃত্যুর মতন





সমিধ গঙ্গোপাধ্যায়

                                                        


বর্ষাবন্দিশ ১
------------------

----------------------------

'ভালবাসি' বলা ততটা সহজ নয়
নিষাদস্বভাবী অন্যায়প্রতিভাকে
বিষাদে যদিও মেঘ সারানোর ভয়
ঠোঁটের আদলে স্বস্তি দিও না তাকে

'ভালবাসি' আহা বোলোনা বালাইষাট
কাকভেজা গান শোনাবে, মানুষ কই?
রেডিওস্টেশনে ছাতা তৈরির হাট
অসুখ বাধিয়ে ভোলাচ্ছে থইথই

'ভালবাসি' বলা সনাতন পদ্ধতি
ডাকের সাজেই মুগ্ধতা, এনকোর
মন যদি হয় ব্যাটারিচালিত ক্ষতি
মুষলধারাটি যেতে না-দেবার ভোর

'ভালবাসি' তা'ও নতুন শব্দ চাই
ওটুকু রক্ত অনেকেই দিতে পারে
আনসিনে কত গ্রামার ভেজানো ছাই
বৃষ্টি তবুও কবিতায় খুঁজে মারে

'ভালবাসি' বলা ততটা কঠিন নয়
বারিশবিহনে কার কবে ঘুম আসে?
মেঘদূত যদি শহুরে তুলনা হয়
কলকাতা জুড়ে থাকব তোমার পাশে...



বর্ষাবন্দিশ ২
------------------

চোখের বোতাম
খুলে ফেলা নাম
পদ্যে রেখেছি সিন্দুক

ফসল দীঘল
কৃষি পরিমল
গদ্যের মত নিন্দুক

চেনা ঝোপঝাড়
শিশিরের ঘাড়
মুড়িয়ে ছুড়েছি বন্দুক

ছোট্ট গোড়ালি
প্রিয় চোরাবালি
বাদলা পোকার বন্ধু

মিল বুঝেশুনে
বেচে দেব গুনে
হুইসেল, রাতপাখিদের

পাঁজর কপাট
সময়ের ছাঁট
হাতের পাতায় রাখি ফের

ছন্দে বাঁধাই
চোখপোড়া ছাই
ভালও লেগেছে মন্দের

জ্যোছনার ঘাস
বৃষ্টিসমাস
রতিপরিহিত মন দে

শ্রাবণ তোমারই
আধভেজা বাড়ি
ছায়াভীরু সেই কাব্য

যদি বর্ষায়
পাই তার সায়
আবার তোমাকে ভাববো...


বর্ষাবন্দিশ ৩
-------------------

লোকায়ত অছিলায় নবারুণ তোমাদের স্নানে
গোলাপ পাহারা আনে ঝকঝকে মুদারার মত
অভক্ষ্য শিরানীল ব্যথা লেখে, তারানির্মাণে
সকরুণ শত্রুতা পাঁজরবাগানে অবনত

নিরবধি চঞ্চলা প্রতিমার কাঠামোপ্রলাপী
শয্যা সকাশে ঢালে এক লরি জ্যোছনার ফেউ
মৃগনাভি-অসময়ে সোঁদা সলজ্জ সংলাপী
রগুড়ে দেয়ালা ভাবে, মাথুর নামাবে কেউ কেউ...