অন্বেষা রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অন্বেষা রায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

অন্বেষা রায়

কফি ও গৃহপ্রবেশ
-------------------------

-----------------

(১)

আজ বিকেলে বাড়িতে একটা ছোট্ট কফির আসর বসবে।আমন্ত্রিত দুজন। মৈনাক, সঙ্গে মন্দাক্রান্তা। মৈনাক আমার স্বামী আর মন্দাক্রান্তা ওর প্রেমিকা। আচ্ছা আপনি শর্মিলা ঠাকুর,সঞ্জীব কুমার আর সারিকার 'গৃহপ্রবেশ' ছবিটা দেখেছেন? বাসু ভট্টাচার্যের পরিচালনা?  না দেখে থাকলে দেখে নেবেন। ভাল ছবি। 

ছবিতে স্বামী এক সহকর্মীর প্রেমে পড়েছেন এবং স্ত্রীর কাছে বিবাহবিচ্ছেদ চাইছেন।স্ত্রী সাধারণ ঘরোয়া গৃহবধূ। ভাড়া বাড়িতে থাকেন এবং  পয়সা জমান নিজের একটা বাড়ি বানাবেন বলে। স্বামীর প্রস্তাবের প্রাথমিক ধাক্কাটুকু সামলে স্ত্রী সম্মত হলেন কিন্তু সঙ্গে জুড়ে দিলেন একটি শর্ত। স্বামীর প্রেমিকার সাথে আলাপ করাতে হবে। যেদিন মেয়েটি আসবে সেদিন স্ত্রী তার সঞ্চয় ভেঙে বাড়ি এবং নিজেকে ঢেলে সাজালেন। বিকেলে প্রেমিকা সমেত স্বামী ঘরে ঢুকে তো হতবাক।নিজের ঘর,সংসারকে বাঁচানোর জন্য মেয়েটির এই আকূল প্রচেষ্টা স্বামীর ভেতরে এক প্রবল ধাক্কা দিল। ছবির শেষে দেখা গেল স্বামীটি তার প্রেমিকাকে বাড়ি পৌঁছানোর জন্য এগিয়ে দিতে গিয়ে এক চরম মানসিক দোলাচলে পড়েছেন এবং শেষমেশ নিজের স্ত্রীর কাছে ফিরে আসছেন।
আমার আর মৈনাকের গল্পটাও খানিকটা এই ধাঁচের। কিছু সামান্য এবং কয়েকটা প্রধান পার্থক্য থাকলেও মোটের ওপর আজকের কফির আসর বাসু ভট্টাচার্যের 'গৃহপ্রবেশ' ছবির সেই ক্লাইম্যাক্সের মতোই বলতে পারেন। এখন ছটা বাজে, আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই মন্দাক্রান্তাকে নিয়ে  মৈনাক উপস্থিত হবে,তার আগে আপনাকে আমার এবং মৈনাকের সম্পর্কে কিছু বলে নিই।

মৈনাক আর আমার ভালোবেসে বিয়ে। ভালোবাসাটা প্রাথমিকভাবে ( যদিও এখন মনে হচ্ছে পাকাপাকিভাবেই) একতরফা ছিল। আমিই কলেজে পড়াকালীন মৈনাকের প্রেমে পড়েছিলাম।শুধু আমি নই আমার তুলনায় ঢের ঢের গুণ বেশি আকর্ষণীয়, বুদ্ধিমতী বেশ কয়েকজন মেয়েও মৈনাককে প্রেমিক হিসেবে চেয়েছিল। কিন্তু শিকে ছিঁড়ে ছিল আমার ভাগ্যে। কলেজের শেষ বছর, বুকে প্রচুর সাহস নিয়ে মৈনাককে বলেছিলাম মনের কথা। মৈনাক হ্যাঁও বলেনি আবার না বলে কাটিয়েও দেয়নি।ঝুলিয়ে রেখেছিল।আসলে খেলাচ্ছিল। এইসময়টা আমি ওকে পাওয়ার জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলাম। ওর হয়ে নোটস কপি করা, টিফিন নিয়ে যাওয়া, গরমকালে জলের বোতল যোগান দেওয়া।আসলে কি জানেন আমি মেয়েটা না ভেতরে ভেতরে বরাবরই একটু সতীলক্ষ্মী টাইপের।আমার প্রিয়বন্ধু তানিয়ার ভাষায় 'বউ বউ মতন'। 
তা আমার এতো সেবা বিফলে গেলনা।মাসখানেকের মধ্যে মৈনাক হ্যাঁ বললো। আমি আনন্দে ভেসে গেলাম। এরপর পাঁচ বছরের মাথায় আমাদের বিয়ে হয়। এই পাঁচ বছরে মৈনাকের চাকরি পাওয়া, আমার শখের কম্পিউটার কোর্স হওয়া আর বিস্তর সম্বন্ধ নাকচ করা হল। এমনকি প্যানপ্যানে হিন্দি রোম্যান্টিক ছবির মতন আমার আর মৈনাকের মাঝে মিথিলা কয়েকমাসের জন্য ঢুকে আবার বেরিয়ে গেল। 
মিথিলার সাথে মৈনাক যখন লুকিয়ে সিনেমা দেখছে, বেপাড়ায় রোল খাচ্ছে বা ট্যাক্সিতে ওর শ্যামলা হাতের পাতায় আদর রাখছে তখন আমি বাড়িতে বসে কেবল টিভিতে বাসু ভট্টাচার্যের 'গৃহপ্রবেশ' দেখছি। শর্মিলা ঠাকুরের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে কষ্ট পাচ্ছি, লড়াই করছি, সঞ্জীব কপুররূপী মৈনাককে ভালোবাসছি আর সিনেমার শেষে তৃতীয়জনের বিরুদ্ধে জিতে যাচ্ছি।

খবরটা দিয়েছিল তানিয়া। ভাগ্যিস সেসময় বাড়িতে কেউ ছিল না। তাহলে মৈনাক আর আমার বিয়েটা সম্ভব হত কিনা জানিনা।ঘরে ঢুকে বিছানায় ব্যাগটা ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠেছিল তানিয়া।
" মৈনাক তোকে ঠকাচ্ছে সে খবর রাখিস?" 
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কাঁপা কাঁপা হাঁটুতে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। তানিয়া উত্তেজনায় গলা চড়াচ্ছিল।
"বাসের জানলা থেকে আমি পরিষ্কার দেখেছি পৃথা। মেয়েটার কাঁধে হাত রেখে সেঁটে বসেছিল মৈনাক। তুই এক্ষুনি  ফোন কর ওকে।" 
তানিয়ার কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিলাম। তানিয়া এরকমই। ও না থাকলে আমি বোধহয় পড়াশোনা ছেড়েই মৈনাকের সেবা করে যেতাম।তানিয়া আমাকে টেনে রাখে। 
 মৈনাককে সাত আটবার ফোন করেও ধরতে পারিনি। পরেরদিন বিকেলে দেখা করে পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করে ও।তানিয়া নাকি ভুল দেখেছিল। আমারও কেন জানিনা মৈনাকের কথাই সত্যি বলে মনে হয়েছিল।দাঁত কিড়মিড় করতে করতে  শাসিয়ে ছিল তানিয়া( মৈনাকের ওকালতি করতে যাওয়া আমাকে)। 
"পরেরবার ছবি তুলে রাখবো।"

তানিয়া ছবি তুলবে বলে, নাকি আমার কান্নার জেরে জানিনা মৈনাক আমাকে পরের বছর ভাল ছেলেটির মতন বিয়ে করে ফেললো।স্মার্ট ছেলে, চাকরির ক্ষেত্রে উন্নতিও করছিল।আমি বাড়িতে একটা টিউটোরিয়াল খুলে বসলাম। ফোর থেকে এইট সায়েন্স গ্রুপ।ভালই চলছিল।

 বিয়ের পরের বছরই আমাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে হল। তিন বছরের মাথায় দ্বিতীয় কন্যা। তানিয়া চাকরি নিয়ে ভিন শহরে চলে যাওয়াতে আমার রাশ যেন আরো আলগা হয়ে গেল।আমি একেবারে পঞ্চাশের দশকের নায়িকাদের মতন পতিপ্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। এরই মধ্যে কসবায় দারুণ একটা ফ্ল্যাট পছন্দ করে ফেললো মৈনাক। দামটা একটু বেশি। লোন পেতে পারে তবে অতটা লোন নিলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। অগত্যা........আমার বাবার থেকে কিছু টাকা ধার আর সঙ্গে আমার সমস্ত গয়না। ফ্ল্যাটে ঢোকার মাস দেড়েকের মধ্যে মন্দাক্রান্তার ব্যাপারটা  জানতে পারলাম।মৈনাকের ফোন মেসেজ থেকে।


(২)

বাসু ভট্টাচার্যের 'গৃহপ্রবেশ' আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। দ্বিতীয় নারীর থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে আনছেন স্ত্রী।ভালোবাসার জোরে। তবে আমার গল্পটা সিনেমার প্লটের থেকে বেশ আলাদা। আমার স্বামী শুধু পরনারীর প্রেমে পড়েই ক্ষান্ত দেননি, তাকে নিয়ে বার দুয়েক মন্দারমণিও ঘুরে এসেছে। আমার স্বামী সিনেমার মতন নিজে থেকে কিছু বলেননি। আমি ধরতে পেরে প্রচন্ড কান্নাকাটি করায় নিজের কর্মকান্ড স্বীকার করেছেন মাত্র। পরিষ্কার জানিয়েছেন মন্দাক্রান্তাকে তিনি বিয়ে করতে চান অতএব আমি যেন এক দেড় মাসের জন্য নিজের ব্যবস্থা নিজে করি। আর তৃতীয় তফাৎ সিনেমার স্বামীটির মতন মৈনাকের এটা প্রথম পরকিয়া নয়। তানিয়া না থাকলেও দু চারজন বন্ধু আমাকে এষা আর পিয়ালীর কথা জানিয়েছে। যারা একমাত্র মৈনাকের ভাষাতেই 'শুধু ভাল বন্ধু'।

যাইহোক,  মন্দাক্রান্তার কথা জানামাত্র বাসু   ভট্টাচার্যের 'গৃহপ্রবেশ'  আবার মাথায় হানা দিল। আমি গোটা একটা দিন না খেয়ে কাটালাম এবং দিনের শেষে খেয়াল করলাম, আমার দুটি শিশু সন্তান আমার শোক পালনের জেরে অভুক্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে। মৈনাক সেইরাতে বাড়ি ফেরেনি। আমার নতুন ফ্ল্যাট, আমার সমস্ত গয়না দিয়ে কেনা শখের বাড়ি,গোছানো সংসার সব ছত্রখান হয়ে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে 'গৃহপ্রবেশ' এর কথা ভাবছিলাম। স্ত্রীর ভালোবাসায় স্বামীর প্রত্যাবর্তন। 
 শেষমেশ এক সন্ধ্যায় মন্দাক্রান্তাকে নেমন্তন্ন করেই ফেললাম। আজ সেই সন্ধ্যা।

সিনেমায় শর্মিলা ঠাকুর সারাদিন ধরে নিজেকে এবং বাড়িটিকে সাজিয়েছিলেন। আমিও ঘরগুলো গুছিয়ে ফেললাম। ভাল করে স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম প্রস্তুত হব বলে।মেয়েদের আগেভাগেই এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সন্ধ্যে সাতটা বেজে পাঁচ এ মন্দাক্রান্তাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো মৈনাক।আমাকে দেখে চমকে উঠলেও কিছু বললো না। গায়ের রঙ ফর্সা হলেই যে কেউ সুন্দরী হয়না আমি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাকে দেখলে প্রথমেই 'ময়দার তাল ' মনে হবে। তারমধ্যে শাঁখা পলা, সিঁদুর শাড়ি আর আত্মবিশ্বাসের অভাবে আরো ভ্যাদভ্যাদে ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আজ সবকিছু আলাদা।
মন্দাক্রান্তাকে আপ্যায়ন করে ঘরে বসালাম। ওদের সাথে দরকারি কথাগুলো সেরে ফেলতে হবে
।মৈনাককেও বোঝাতে হবে আমার অবস্থা,আমার মেয়েদের কথা.....
 মৈনাকের চোখ অবাক বিস্ময়ে আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার।আমার এই সাজ ওর অচেনা। 
কাপে কফি, প্লেটে খাবার এগিয়ে দিয়ে আমি বসলাম মুখোমুখি। মন্দাক্রান্তাকে একটু অস্বচ্ছন্দ মনে হল। আমি সময় নষ্ট না করে কথা শুরু করলাম।

" তাহলে কতদিনের মধ্যে যাচ্ছো?"

মৈনাক থমকাল।

"মানে?"

আমি আমারা শাঁখা পলাহীন হাতটা মুখের কাছে নিয়ে ছোট্ট করে কাশলাম।

" দেখো মৈনাক, বাড়িটা তো আমার আর আমার বাবার টাকায় কেনা তাই তোমাকে তো আর এখানে থাকতে দিতে পারছিনা। তুমি মন্দাক্রান্তার কাছে কবে যাচ্ছো? "

 মন্দাক্রান্তা প্রচন্ড বিস্ময়ে মৈনাকের দিকে তাকালো।
  
আমি ততক্ষণে আত্মবিশ্বাসী। গলা আরেকটু শীতল করে বললাম,

"সোফার পাশে দুটো বড় ব্যাগ আছে। গুছিয়ে ফেলো। মেয়েরা আসার আগে বেরিয়ে যাও কেমন।  তোমায় ঘর থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছি এটাও যেমন ওদের দেখা উচিৎ নয় তেমনি তুমি আমার ঘাড়ে পা দিয়ে নিজে টুকু  নিঙড়ে নেবে সেটাও কি ওদের শেখা উচিত? "

মৈনাক বাক হারা। দু একবার উত্তেজিত হয়ে 
"তুমি এরকম করতে পারোনা"র বেশি কিছু বলতে পারেনি। আর মন্দাক্রান্তা?  মৈনাককে অগ্নি দৃষ্টিতে জ্বালিয়ে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেছে।

এই কফি আসরের পরের পরের দিন মৈনাক বাড়ি থেকে চলে যায়। খুব সম্ভবত কোনো মেসে। ডিভোর্সের কেস ফাইল হবে দু এক দিনেই।আমার টিউটোরিয়াল রমরমিয়ে চলছে।
  আজ বাড়িতে নারায়ণ পুজো। আমার ছাত্রছাত্রী আর দু চারজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসবে। আজ আমার বাড়িতে আমার ' গৃহপ্রবেশ।'

-----------------------
  
      
  

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

অন্বেষা রায়



 এক গুচ্ছ লাল বেলুন
-------------------------------

-----------------
সাহস করে এবার একটা গ্যাস মেশিন কিনেই ফেলল রফিক।গত বছর যেমন হাসি মুখো হলুদ বেলুন কিনেছিল।উফ! কি বিক্রি।প্রথমদিন ভয়ে ভয়ে বিশটা ফুলিয়েছিল।বাপরে সে তো আধ বেলাতেই খতম।কেকের দোকানে আসছে আর বেরোবার সময় রফিকের থেকে বেলুন কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
"বড়দিন আসছে চাচা, আরো বেলুন তোলো,সব বিক্কিরি হয়ে যাবে।" ব্যস্ত হাতে কেকের বাক্স গোছাতে গোছাতে বলেছিল অমর।
তা অমরের কথা শুনে লাভই হয়েছিল।সাতদিন ধরে ছেলে ছোকরাদের বেলুন কেনার কি ধুম।রফিক একা মানুষ।নেশা ভাং করে না। বেলুন বিক্রি করে একসাথে অতগুলো টাকা পেয়ে প্রথমে বুঝতেই পারেনি কীভাবে খরচ করবে।
বড়দিন কেক খেতে হয় নাকি।নাজনীন বলত।ছেলেমানুষের মতন বায়না জুড়ত কেক কিনে দেওয়ার জন্য।তা কেক কেনার আর সুযোগ পেল কই রফিক। নিকাহর বছর দেড়েকের মধ্যেই তো......
উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকায় বৃদ্ধ বেলুনওয়ালা রফিকউদ্দিন। আর সংসার পাতার সাধ হয়নি তার।এই দিব্যি আছে।আগে রিক্সা চালাত, গতবছর দুর্ঘটনায় পা টা বাদ যাওয়ার পর বেলুন বিক্রি করা শুরু করেছে।
লাল টুকটুকে হিলিয়াম মেশিনটার গায়ে হাত বোলায় সে।
অমর বলছিল, "গ্যাস বেলুন তোলো চাচা।মেয়েদের, বাচ্চাদের হেব্বি পছন্দ।দেখো কেমন সেল হয়।"
সেই হুজুগেই কেনা।পানপাতার মতন লাল বেলুনগুলো টানটান সূতোর মাথায় থোকা হয়ে দুলছে।হাত থেকে ফসকালেই ছিটকে যাবে আকাশের দিকে।ওই আকাশের ওপারে যেখানে কোথাও নাজনীন আছে।
আজ বড়দিন।সকাল থেকে দলেদলে বাচ্চা বুড়ো সব রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে।দুপুর হতে না হতেই সকালের ফোলানো সবকটা বেলুন বিক্রি হয়ে গেল।পকেটে হাত দেয় সে।খুচরো পয়সা আর নোটে একটু যেন ভারি হয়েছে।হঠাৎ কি মনে হওয়াতে দ্বিগুন উদ্দ্যমে বেলুন ফোলাতে লাগল সে।একটা,দুটো,তিনটে.........পুরো এক থোকা।
"ছোট্ট দেখেই দে দেখি একটা।"
টাকাটা বাড়িয়ে রফিক নির্দেশ দেয় অমরকে।
সূতোগুলো জোট করে শক্ত করে বাঁধে কেকের প্যাকেটটার সাথে। আগে পারেনি তো কি হয়েছে, আজ সে নাজনীনকে কেক খাওয়াবেই।হাত আলগা করতেই ছোট্ট কেকের প্যাকেটটা নিয়ে উড়ে যায় বিরাট একগুচ্ছ গ্যাস বেলুন।আকাশের দিকে................

...................উৎসবের দিনে ভিক্ষে দিতে ভুলে যায় লোকে।মোটে দশটাকা এনেছিল বলে কাল সারা রাত খেতে দেয়নি লোকটা।মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে ছ বছরের দুর্গার।চারপাশ ঝলমল করছে।আনন্দে ডুবে আছে সবাই।কে দেবে ভিক্ষা তাকে?  দেবে একমুঠ খাবার?

চলনের শক্তি কমছিল একটু একটু করে।নীচের দিকে নামছিল।ফট ফট শব্দে কয়েকটা ফেটে যেতেই ঝুপ করে কেকের প্যাকেটটা এসে পড়ল দুর্গার সামনে।প্রায় ওর ময়লা জামায় ঢাকা কোলের ওপর।প্যাকেটটা খুলে প্রথমে বেশ ঘাবড়েই গিয়েছিল।আকাশ থেকে বেলুন চেপে কেক এলো!!! কে পাঠালে?
মুঠোয় ধরে তৃপ্তি করে কেকের টুকরোয় কামড় দেয়।দুর্গা? নাকি নাজনীন?
--------------------------+-----------------------------------

শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

অন্বেষা রায়

পাপোশ
-------------

------------------

(১)

এতো রাতে পার্থদা কে দেখে আমি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।যদিও রাত দশটা টা আমার বা পার্থদা কারো কাছেই তেমন রাত নয় তবু দিদির পাল্লায় পরার পর পার্থদা এখন সাহেবি রুটিন মেনে চলে।বলা ভালো মেনে চলতে বাধ্য হয়।দিদি বরাবরই একটু অন্যরকম।আমার মতন অগোছালো, আপাটে নয়। পড়াশুনো বা ক্যারিয়ারের ব্যাপারেও আমার মতন আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেমেয়ের দেখাদেখি গড্ডলে গা ভাষায়নি। একটা নামকরা কোম্পানিতে  চাকরি করে। ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন। তবে বছরখানেকের মধ্যেই যে নিজের ব্যবসা শুরু করবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।দিদি তার ভাইয়ের ঠিক উল্টোটি, উদ্যোগী মহিলা।
পার্থদার হাতে একটা পেল্লাই প্যাকেট। মুখ চিন্তিত।
গত ছ মাস ধরে আমি আর দিদি এক শহরে।দিদিই আগে এসেছে তারপর গুঁতিয়ে নিয়ে এসেছে আমাকে।প্রবাসে আত্মীয়স্বজন ঘরের কাছে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।তবে এক্ষেত্রে সৌভাগ্যের সুবিধেটুকু যে পার্থদার দিকেই বেশি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।পার্থটা সাদামাটা, অলস,ভালোমানুষ। দুজনের মধ্যে আলস্যগত মিল দেখে,আর জন্মে আমি পার্থদারই ভাই ছিলাম কিনা এই বিষয়ে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়।
পার্থদা আমার হাতে প্যাকেটা ধরিয়ে বলল,
"একগ্লাস জল দে তো।"
বুঝলাম কেস সিরিয়াস।জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে প্যাকেট ফাঁক করে দেখলাম ভেতরে একটা পাপোষ। টুকটুকে লাল, পুরু, নরম বেশ জমকালো একখানা পাপোশ।গায়ে আটকানো প্রাইস ট্যাগের আট পাঁচ শূন্য সংখ্যাটা আমাকে চমকে দিলো।
"সাড়ে আট শ টাকার পাপোশ! "
"ওটা বাতিল"
জলটা গিলে, কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কোনোক্রমে বলল পার্থদা।মার্চ মাসে রাত্রিবেলা পুনে শহরে এতো গরম পড়ে না যে রুমাল দিয়ে ঘাম সাফ করতে হবে।তারমধ্যে পার্থদা এসেছে বাইকে।আমার আর দিদির বাড়ি বাইকে দু মিনিটের পথ। পার্থদা ভয়ে ঘামছে।
"বাতিল কেন?"
আমি কৌতুহল চাপতে পারছিলাম না।

"বলেছিলো কালচে লাল।দেওয়াল আর পর্দার সাথে নাকি সেটাই মানানসই হতো।আগামীকাল  বস আসছেন দিল্লি থেকে।লাঞ্চে তার নেমতন্ন আমাদের বাড়িতে।সেই উপলক্ষ্যে গত সাতদিন ধরে ঘর সাজানো চলছে।ওয়ালপেপার, আলো, ল্যাম্পপশেড, শো পিস, কার্পেট এবং পাপোশ।ঘরের বাইরে একরকম,ভেতরে অন্যপ্রকার, বাথরুমের সামনে একজিনিস তো বাথটাবের পাশে আরেক।সে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ বুঝলি। তা সবই যাহোক করে তোর দিদি দিব্যি ম্যানেজ করে ফেলল কিন্তু ঝামেলা হলো ডাইনিং লাগোয়া বারান্দায় যাওয়ার মুখে।মানে সেইখানকার পাপোশের রঙ কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছে না।আমি বলেছিলাম উল্টোদিকের সাই স্টোর্সে একবার দেখো।তা সে কথা শুনে এমনভাবে তাকাল যে.....
পার্থদা মাঝপথে থেমে যায়।জানে আমি বুঝবো।মাঝেমধ্যে আমার ঘর গোছাতে আসে দিদি। চেয়ারে স্তূপীকৃত জামাকাপড়, তিনদিনের না তোলা বাসি বিছানা বা বিছানায় পড়ে থাকা ভেজা তোয়ালে দেখলে দিদি অমন চোখে তাকায়।শিরদাঁড়ায় ছ্যাঁকা লাগানো দৃষ্টি।
জলের গ্লাসটা পুরো শেষ করে পার্থদা যা বললো তার সং ক্ষেপে কিছুটা এইরকম।

দিদির আদেশানুসারে পার্থদা একখানা ডাকসাইটে শপিং মলে গিয়ে এই পাপোশ কিনে আনে।দিদি দেখামাত্র নাকচ করে এবং পালটে মেরুন রঙের পাপোশ কিনে আনতে বলে।দিদির দেওয়া রঙের স্যম্পেল মিলিয়ে( এই স্যাম্পেল আগে কেন দেয়নি জাতীয় প্রশ্ন করার দুঃসাহস বলাই বাহুল্য পার্থদার হয়নি।)  পার্থদা সাই স্টোর্স থেকে সাড়ে তিনশ টাকায় চমৎকার একটি পাপোশ পেয়ে যায়।পার্থদার প্ল্যান ছিল শপিং মলে গিয়ে আগের জিনিসটা ফেরত দিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় কিছু নিয়ে নেবে কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে আরেক ঝামেলা।পাপোশ টা কেনা হয়েছে যেখান থেকে সেখানে সেল চলছিল।বড় বড় করে লেখা আছে কেনা জিনিস ফেরত হবে না।পার্থদা আগেরবার লেখাটা খেয়ালই করেনি।কিন্তু সাড়ে আটশো টাকার জিনিস নিজের বোকামির জন্য ফেরত হয়নি একথা পার্থদা মরে গেলেও দিদির সামনে বলতে পারবে না।অতএব......
পার্থদা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে পাপোশ এবং আমার দিকে তাকায়। 
"অসম্ভব! আমি এতো টাকা দিয়ে পাপোশ কিনতে পারবো না।তোমার বউ, তোমার পাপোশ তুমি সামলাও।"
আমি ঝামেলা নামাবার চেষ্টা করি।
"আহ!  টাকা কে চাইছে তোর কাছে।তুই শুধু জিনিসটা রাখ তোর জিম্মায়।জানিসই তো তোর দিদিকে।এই পাপোশ নিয়ে ঘরে ঢুকতে পারবো আমি?  "
"আর দিদি আমার ঘর গোছাতে এসে যখন দেখতে পাবে?  তখন? আমি কি মনে করে রেখে দেবো কোথায় গুজেছি তোমার পাপোশ? "
আমি কিছুতেই রাখবো না ওটা।
"আরে ধূর! এটা একটা প্রব্লেম হলো? তুই ওটা আত্রেয়ী কে গিফট করে দে।"
পার্থদা সমাধানের সুরে বলল।আত্রেয়ী আমার বান্ধবী। একই অফিসে চাকরি করি।আগামী দুবছরের মধ্যে বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে।আমি আঁতকে উঠি।
"আত্রেয়ী কে গিফট করবো মানে!!!!"
"আহ! বলছিলি না কাল আত্রেয়ী দের বাড়ি তোর নেমতন্ন।তা খালি হাতে তো যাবি না, এটা দিয়ে দে।"
পার্থদা সহজ সুরে বলে।আমি থমকাই।আত্রেয়ীর ঘর সাজানোর শখ আছে তবে ওর থেকেও এব্যাপারে ওস্তাদ ওর ছোটমাসি।সে মহিলার বাড়ি নাকি ছবির মতন সুন্দর।ছোটোমাসির সাথে দেখা হলেই কিছু না কিছু ঘর সাজানোর জিনিস উপহার দেয় আত্রেয়ী। আগামীকাল এই ছোটোমাসির অনারেই আমার নেমতন্ন।পাপোশটার গায়ে হাত বোলালাম।খাসা জিনিস।আত্রেয়ীর মাসিকে দিলে কি খুব বোকা বোকা হবে?

(২)

"পাপোশ! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো অম্লান?  পাপোশ একটা গিফট হতে পারে?"
রাগত স্বরে ফিসফিস করে বলল আত্রেয়ী। ছোটমাসি পাশের ঘরে।বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই আত্রেয়ী প্যাকেটটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে ওটা কি।পাপোশ শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
"তুমি জিনিসটা একবার দেখো।"
আমি বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করি।ব্রাউন পেপারের প্যাকেট থেকে পাপোশটা বার  করতেই কেন জানিনা বুকে বড় মায়া হলো।আহারে বেচারি পাপোশ।এতো সুন্দর,এতো মূল্যবান, কুলীন দোকানে থেকেও দেখো কেমন গড়াগড়ি খাচ্ছে।কেউ ভালোবেসে আপন করার নেই।সবই কপাল।পাপোশ হোক আর মানুষ।ভাগ্যের আগে কারো জো চলবে না।
"ওয়াও!!!"
হঠাৎ অচেনা স্বরে আমার আগডুম বাগডুম চিন্তায় ছেদ পড়ে।চমকে দেখি দরজায় ছোটমাসি।দৃষ্টি আত্রেয়ীয়ের হাতে ধরা পাপোশে।
"বিউটিফুল ডোরম্যাট! কোথা থেকে নিলি?"
আমি গর্বিত চোখে আত্রেয়ীয়ের দিকে তাকাই।

--------------------
পার্থদাকে ফোনে ঘটনাটা বলাতে, পার্থদা তো হেসে খুন।সামান্য একটা পাপোশ নিয়ে কি কান্ড অ্যা! খুশি খুশি গলায় বলল, 
"একদিন চলে আয় দুজনে আমাদের বাড়ি।অনেকদিন জমিয়ে আড্ডা দিই না।"
দিদির বাড়িতে আড্ডা মানেই জমাটি খাওয়া দাওয়া।পার্থদার প্রস্তাবে আমি উৎসাহী হয়ে উঠি।আর এই পাপোশ বিদায়টাও সেলিব্রেট করা দরকার।যতই হোক এটা আমার আর পার্থদার অন্যতম গোপন মিশন।

 পরের রবিবার সন্ধ্যেবেলা যখন দিদির বাড়ি পৌঁছলাম ততক্ষণে আত্রেয়ী এসে গিয়েছে।গোলাপি আর তুঁতে একটা লং স্কার্ট আর টপে দুর্দান্ত দেখাচ্ছে ওকে।আমাকে দেখে মুচকি হাসলো।দিদি দেখলাম খুশিতে ঝলমল করছে।আমাকে দেখে প্রায় উড়ে এলো।

" আত্রেয়ী তোর মতন আর্টিস্টিক্যালি চ্যালেঞ্জড ছেলেকে  কি করে পছন্দ করলো রে! "
"মানে?"
"লাল ডোরম্যাট টা দেখেছিস?তোর পছন্দ যে নয় সেটা আর আলাদা করে বলে দিতে হবে না।"
আমি আঁতকে উঠে আত্রেয়ীয়ের দিকে তাকাই।
দিদি কাগজের ব্যাগ থেকে টুকটুকে লাল,পুরু, নরম পাপোশটা বার করে মুগ্ধ চোখে দেখছে।

"আরে এটা এতো বড়ো কিছুতেই মাসির ব্যাগে ধরলো না।তো মাসি বলল আতু তুই রেখে দে জিনিসটা।নেক্সট টাইম এলে দেখা যাবে নিতে পারি কিনা। আর নেক্সট টাইম।মাসি তো আট মাসের জন্য  ছেলের কাছে ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছে তারপর মেয়ের কাছে প্যারিস যাবে।ফিরতে ফিরতে ভুলেই যাবে পাপোশের কথা।তাই ভাবলাম দিদি ঘর সাজাতে ভালোবাসে..."

আত্রেয়ী চুপ করে যায়।আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি।কার কপালে যে কী লেখা আছে কে বলতে পারে।সবই ভাগ্য।পাপোশ হোক মানুষ।


------------------------------------------------------------

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

অন্বেষা রায়


দুপুরের ফোন
-------------------

-------------------
আজ ভেবেছিল খেতে খেতে বিকেল গড়াবে।দুপুরে ফোনটা এলে ধরতে পারবে না।এত রান্না! রাতে ওঁর অফিসের লোকেরা আসবে।ভাবতেই বুক দুরু দুরু করে ওঠে।বড় বড় মানুষ, শুধু তো খাবার বেড়ে দিলেই হল না, মানানসই থালা বাসন, ন্যাপকিন ভাঁজ সব দিকে নজর রাখতে হয়।উনি আবার বলে দিয়েছেন একদম খাঁটি বাঙালি খাবার হতে হবে।মিস্টার আহুজা নাকি 'বাংগালি ফুড' বলতে পাগল।আর মিস্টার আহুজাকে খুশি করতে পারলে সিধুর বাবার ব্যবসার কিসব সুবিধে হয়।
  পারুল কিন্ত বলেছিল যদি কিছু গণ্ডগোল হয়! তার থেকে ভাল দোকান থেকে আনিয়ে নাও।কিন্ত সিধুর বাবা গম্ভীর গলায় বলেছিল,
" মন দিয়ে রাঁধলে তো তুমি মন্দ রাঁধো না, তুমিই করো।" 
পারুলের কান দুটো জুড়িয়ে গিয়েছিল। " তুমি তো মন্দ রাঁধো না!"
এমন কথা যে তাকে আগে কেউ বলেনি তা তো নয়।বরং এর থেকে অনেক বেশি প্রশংসাই পেয়েছে সে। তবু সিধুর বাবার কথা আলাদা।তাঁর মুখে তো চিরকাল একই ধাঁচের বুলি," রান্নাঘরে গা ঢেকেই তো কাটিয়ে দিলে, দুনিয়াদারির বোঝটা কি!"
"বুদ্ধি বলে তো ঘটে কিছু নেই, সব ব্যপারে কথা বলো না।" 
শুনতে শুনতে নিজেও সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে তার দ্বারা কিছু হবে না।সামান্য রান্নাবান্না ছাড়া।এই আত্মবিশ্বাসহীনতা,নিজের প্রতি অশ্রদ্ধার মাঝে যখন "তুমিও মন্দ রাঁধো না" গোছের বাক্যাংশ কানে আসে তখন ভেতরে এক অদ্ভুত অভিমান ভরা সুখ হয়।সেই সুখানুভূতি পারুলকে গলিয়ে দেয়।স্বামীর প্রতি আরো যত্নশীল করে তোলে।


 শাশুড়িকে পানটা সেজে ঠিক তিনটে নাগাদ ঘরে ঢুকে দরজা দিল পারুল। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। কাপড়ের গায়ে জেদি দাগের মতন একটা অপরাধবোধ লেগে আছে ভেতরে। ঝুমির কথা রাখতে সেদিন ফোন করেছিল।ঝুমি সম্পর্কে পারুলের ননদ।দিনরাত খোঁটা দিচ্ছে পারুলকে।
"দাদাকে বিয়ে করে পেয়েছটা কি তুমি! সারাদিন ঝিগিরি করা আর তার মেজাজ সওয়া। লজ্জা করে না তোমার? পালাতে ইচ্ছে করে না? এত সুন্দর দেখতে,এতো গুণ! দাদার গলাতেই মালা দিতে হল শেষপর্যন্ত?  এইজন্য তোমার মা এত কষ্ট করে জন্ম দিয়েছিলেন বুঝি?"
পারুলের কষ্ট হয় ঝুমির কথা শুনে।স্বামীর দায়সারা প্রশংসায় গলে যেতে যেতে কোথাও যেন ধাক্কা লেগে শক্ত হয়ে যায় ফের।ঝুমির তো ভালবেসে বিয়ে ছিল।পাঁচ বছরের সম্পর্ক,  দু বছরও টিকলো না বিয়েটা।দুটো প্রমোশনের পরেই বিগড়োতে লাগল সবকিছু।ঝুমি বলে, " ওসব সন্দেহ ফন্দেহ স্রেফ অজুহাত বৌদি।আসল কথা হিংসা।আমার উন্নতি সহ্য হচ্ছিল না ওর।তাই মাঝখান থেকে আমার বসকে টেনে....."
বস ভদ্রলোক মানে ওই অভিরূপ বরাট কিন্তু বেশ ঝকঝকে।বয়সটাও মানানসই ঝুমির সাথে।ঝুমির ফ্ল্যাটেই আলাপ হয়েছিল।পারুল কথায় কথায় আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করেছিল সত্যিই কিছু আছে কিনা ওদের মধ্যে।কিন্তু ওরাই উলটে পারুলকে নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে উঠল.....

এলোপাথাড়ি ভাবনার মাঝেই ফোনটা কাছে নেয়। 
ফোনটা যদি আসে তাহলে এই সময়েই আসার কথা।
 এর আগে দুদিন ঝুমির ফ্ল্যাটে যাওয়ার নাম করে.......
সিধুর বাবাকে না জানিয়ে এতোটা করা ঠিক হচ্ছে কিনা জানেনা পারুল।কিন্তু জানালে যে আর এগোতে পারবে না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত।শুধু নিরাপত্তার উষ্ণ আশ্রয় নয়,জীবনকে কখনো কখনো ধাক্কাও দিতে হয়।  ঝুমির কথা উড়িয়ে দিতে পারে না পারুল।এত বড় একটা চ্যানেলের দায়িত্বপূর্ণ পদে রয়েছে মেয়েটা।নিজের বোনের মতন ভালবাসে বৌদিকে।খালি বলবে, "রোজগার করছো না তাও মানলাম তা বলে তোমার নিজের একটা পরিচয় থাকবে না?"

বাইরে বাজ পড়ে কোথাও। চমকে ওঠে পারুল।
"আমাদের সবথেকে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।আড্ডা হেঁসেল।আমি চাই ওদের আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় তুমি যাও।তোমার স্পেশাল কোনো রান্না সকলকে শেখাতে।"
ঝুমির কথাটা তখন বিরাট একটা ঠাট্টা মনে হয়েছিল।কিন্তু ও এতো জোর দিয়ে বলছিল যেন পারুলকে স্বীকৃতি দেওয়াটাই ওর একমাত্র স্বপ্ন।
" তুমি অডিশনটা দাও অন্তত।দেখোনা কি হয়।অভিরূপদাও তোমাকে নিয়ে খুব আশাবাদী।শুধুমাত্র অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার জন্য এ পৃথিবীতে আসোনি তুমি।প্লিজ না কোরোনা।যদি জিতে যাও তাহলে পরপর তিনটে পর্ব সঞ্চালনা করার সুযোগ পাবে। সেই সংগে প্রাইজ মানি তো আছেই।দরজাটায় ধাক্কা দিয়েই দেখো না সেটা খোলে কিনা।"

 অডিশন খুব সহজেই উৎরে গিয়েছিল পারুল।তারপর ছিল আসল প্রতিযোগিতা। আর আজ সেই প্রতিযোগিতার ফলাফল।হাতে ফোনটা  ধরে বসে থাকে পারুল।অনেক সাহস করে দরজায় ধাক্কা দিয়েছে সে।দেখা যাক  খোলে কিনা.....
------------------------শেষ-------------------------------

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অন্বেষা রায়




পর্দা
-------

(১)

"এক একটা পর্দা চার ফুট জাগা কোভার করবে।তার মানে ইস খিড়কির লিয়ে আপনার লাগবে তিনটে পর্দা।না না মাপের হিসাব করে কম কাপড়ে পর্দা বানাবেন না ছোটে সরকার,ইটা পর্দা, বিছানার চাদর থোড়ি না আছে যে একদোম টানটান, ভাঁজ ছাড়া হোবে। যত কুচি পোড়বে তোতো ভাল দিখাবে। কামরার শান বাড়বে।নতুন দুলহানিয়া একদম তাজ্জব বনে যাবেন।"

একদমে কথা কটি বলে একটু থামলেন বৃদ্ধ দর্জি মোহনলাল। সাহাবাড়িতে গত চল্লিশ বছর ধরে কাজ করছে সে। শুধু কি পর্দা! বৌদিদিদের জামা, দাদাবাবুদের পায়জামা পাঞ্জাবী, খোকাবাবুদের বাহারি পোশাক সব নিজে হাতে সেলাই করে সে।কোন ছোট্টবেলা থেকে সেলাই শিখেছে। শামসুর মিঞার সাগরেদ, সেলাই তার ধমনীতে। উত্তর কলকাতার রক্ষণশীল এই সাহা বাড়ির অন্দরমহলে হাতে গোনা যে কয়েকজন বহিরাগত পুরুষের প্রবেশের অনুমতি আছে মোহনলাল তাদের মধ্যে পয়লা নম্বর। শুধু অন্দরমহলই নয় ভেতরবাড়ির দালানের শেষঘরটাতেও বারদুয়েক ঢুকেছে সে।সেটা অবশ্য খোদ বড়কর্তার সংগে নয়ত বাড়ির বড় ছেলে বিক্রম সাহার পাহারায়। খুব সম্ভবত আজও যেতে হবে দোতলার বারান্দার শেষে গাছ ঘেরা ওই ঘরে।ভাবতেই বুকের ভেতরটা ছমছম করে ওঠে মোহনলালের।
ছোট খোকাবাবুকে সে স্নেহের প্রশ্রয়ে ছোটে সরকার ডাকে।সেই ছোট সাহার বিয়ে আগামী মাসে।পাত্রীও বড়ঘরের মেয়ে।বিখ্যাত গাইয়ে দেবকুমার মল্লিকের একমাত্র কন্যা।সারাবাড়িতে সাজ সাজ রব।প্রতিটি ঘর,দালান,খিড়কি,দুয়ার নতুন করে রঙ হচ্ছে। আধুনিক সব রকমারি আসবাব আসছে। সজ্জার অংশ হিসেবে ঘরে ঘরে লাগছে বাহারি পর্দা।
স্পাইরাল করা ছোট্ট নোটবইতে জানলার মাপ লিখে নেয় মোহনলাল। সাতবছর আগে বিক্রম সাহার ছেলে হওয়ার পর এমন হৈ হৈ আনন্দ হয়েছিল সাহাবাড়িতে।বিয়ের পাঁচ বছর পর সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পেরেছিল সুভদ্রা।আগের দুইবার বাচ্চাদুটোকে মাস তিনেকের বেশি শরীরে রাখতে পারেনি মেয়েটা।
মনে পড়তেই শোক ছুঁয়ে যায় মোহনলাল কে।শান্ত, ধীর  সুভদ্রার মুখখানি চোখে ভাসে তার।ছেলে কোলে পেয়ে এখন বুঝি কিছুটা দুখ ভুলতে পেরেছে।এই পরিবারে মহিলা বলতে সুভদ্রা একা। তার শাশু মা মানে বড়ে ভাবির দিমাগ কি বিমারি। শেষ ঘরটার দিকে দৃষ্টি পড়ে মোহনলালের।বড় ভাবীর ঘর।বাড়ির বহু বলে পাগলখানায় দাখিলা করায়নি সাহাবাবুরা।নয়ত একদম পুরা পাগল হয়ে গিয়েছেন বড়ে ভাবি। ঘরের কাছে কেউ গেলেই জানলা দিয়ে ডাকবে.....
     " জাম গাছের গোড়াটা একটু খুঁড়ে দেবে???
      দাও না গো।"

থলে থেকে নমুনার খাতাটা বার করে সম্রাট সাহার সামনে ধরে মোহনলাল।
"এই লিন ছোটে সরকার। কালার বলেন।বেডরুম কে লিয়ে কটন কাপড়া লিন,গরমি কম লাগবে।পিলা দিওয়ারের উপর এই রংটা দেখেন,বড়িয়া দিখাবে।"
  পাত্রী অভিজাত বাড়ি থেকে আসছে তার ওপর লেখাপড়া জানা। পর্দার রঙ সচেতন হয়ে বাছে। শুধু কি সেলাই! কোন দেওয়ালে কি পর্দা মানাবে সেই ব্যাপারেও ওস্তাদ মানুষ এই মোহনলাল।বসারঘরের জন্য ফ্রিল দেওয়া জমকালো নীল কাপড় টিক দিয়ে রাখে।স্টাডির জানলায় হাল্কা সবজেটে শেড আর বড়কর্তার অফিসে খয়েরি চেক কাপড়।এত বছর ধরে এইবাড়ির শুধু জানলার পর্দাই কি লাগিয়েছে সে! বড়লোক বাড়ি, বৌবাজারে দুটো সোনার দোকান। অন্ধকার পর্ব কি নেই। আর সেইসব আঁধার কোষ্ঠের প্রতি সাধারণ মানুষের অপার কৌতুহল।

বড়কর্তা বারিদবরণ সাহার বদমেজাজি ছোটভাই কে খুনের অভিযোগে পুলিশ তুলে নিয়েগিয়েছিল মাঝরাতে। বড়ছেলে বিক্রমের জন্মের দুবছর পরের ঘটনা।সম্রাট তখনো জন্মায়নি।অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, তাড়া তাড়া নোট ছড়িয়ে ভাইকে ফিরিয়ে এনেছিলেন বড়কর্তা।কার খুন,কিভাবে খুন সব খবরের ফিসফিসানি কানে এসেছিল মোহনলালের, সে পর্দা দিয়ে রেখেছে।জুবান খোলেনি।এমনকি নিজের স্ত্রীর কাছেও উচ্চারণ করেনি একটি শব্দ।কিন্ত ভেতরে শিহরিত হয়েছে।হে ভগবান এরা কি ইনসান!

"বড়ী ভাবী যব শাদি করকে আয়ী বিশ সাল কে থে হম।কিতনি পেয়ারি থি।একদম দুর্গা মা কি তরহা।ওউর স্বোয়াভাব তো পুরি আপনি মা জ্যায়সি।বাড়িতে কোই ভি আয়ে ভাবী নাস্তা না করিয়ে ছোড়বেন না।"

চা দিতে আসা ভৃত্যটিকেই বলতে থাকে  মোহনলাল। দরজা জানলার মাপ নেওয়া শেষ।এখন শুধু বাকি দালানের শেষ ঘরটা।
বয়স শরীরের সাথে সাথে মনকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।মাঝে মাঝে আচমকা ঘূর্ণিঝড়ের মতন হানা দেয় একরাশ স্মৃতি আর অনুভূতিগুলোকে ঘেঁটে ঘুরিয়ে সৃষ্টি করে যায়  বিভ্রান্তির। তার কি কিছু করার ছিল? তার কি কিছুই করার ছিল না!
কুঁচকে যাওয়া চামড়ার ভেতর থেকে চোখ চায় বাগানের দিকে।কলকাতার বুকে এমন বাগান সচরাচর মেলে না। সারি সারি আম, কাঁঠাল,কালোজাম আর নারকেল গাছ।নিস্তব্ধ, গম্ভীর।শুকনো পাতার সরসরানিতেও যেন জবাবদিহির গুঞ্জন। "আমাদের কি করার ছিল বলো?"
ও বাগানে ঢুকলেই নিশির মতন ডাকে সে।উন্মাদিনী বড়ে ভাবি।
"এই শুনছ,এদিকে এসো একবার। দক্ষিণের জাম গাছটার গোড়াটা খুড়ে দেখোনা...."

    (২)

মাধবী মোহনলালের থেকে ছোট হলে কি সম্মান ভরে তাকে দিদি ডাকত সে। বারিদবরণের একমাত্র বোন।বিক্রম, সম্রাটের না দেখা পিসি। 
"শাদি! মালতি বোল রহি থি সহেলী কে ভাইকে সাথ প্যায়ার চল রাহা হ্যায় উসকা? 
তাওয়ায় রুটি সেঁকতে সেঁকতে স্বামীকে প্রশ্ন করেছিল রাধা।"
মুখ খোলেনি মোহনলাল। বিরাট পরিবারে বিয়ে করতে রাজি নয় বলেই ভাইদের অগোচরে পালাবার পরিকল্পনা করেছিল মাধবী।প্রেমিকের সাথে। সহায় ছিল বড়ে ভাবি দীপালী আর স্নেহের মোহনদাদা। বড়বৌ  তখন সন্তানসম্ভবা।বারিদবরণ প্রথমবার পিতা হতে চলেছেন।পরবর্তী প্রজন্মের আগমনের দিকে  তাকিয়ে সাহাবাড়ি।বংশের প্রদীপ আসছে।
    পর্দা,পর্দা,পর্দা......কত গোপন প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর পর্দা দিয়ে এসেছে মোহনলাল।একি বিশ্বস্ততা নাকি ভয়? নাকি নিকমহারামির হুমকি দিয়ে সৎসাহস কে দাবিয়ে রাখা?এত ভাবনা ভারী হয়ে চাপ দেয় ধূসর কোষগুলোতে।
"কি করে দাদাবাবুরা টের পেলেন পতা হি নেহি চলা ভাবীজি।"
উৎকণ্ঠিত, হতাশ বড়গিন্নির সামনে ব্যার্থ মোহনলালের অসহায় উত্তর। পালাবার সময় হাতেনাতে দাদাদের কাছে ধরা পড়েছিলেন মাধবী। প্রেম পরিণতি পায়নি তার।তবে
মাধবীকে গৃহবন্দি করে রাখা যায়নি বেশিদিন।তৃতীয় রাত্রে পরিধানের শাড়ি খুলে পাখা থেকে ঝুলে পড়ে সে।
সেই বোধহয় শুরু।অন্ধকার দিনের।টাকার জোয়ারে মাধবীর মৃত্যুটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল।তবে তার প্রেমিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি আর।
ঘটনার কয়েকমাস পরে  মৃত সন্তানের জন্ম দিয়ে একেবারে বোবা হয়ে গেল বড়বৌ দীপালী। 
"চাচা।মোহনচাচা। মায়ের ঘরে চলুন।"

সুভদ্রার কন্ঠে চমকে তাকায় মোহন। চিন্তারসূত্র ধরে কোন সুদূর অতীতে চলে গিয়েছিল সে।সুভদ্রাকে দেখে অবাক হয়।
তার হাতে বারান্দার শেষ ঘরের চাবি।এই চাবি বাড়ির পুরুষরা কাছ ছাড়া করেনা।

"দোকানে কি জরুরি দরকার কাকা ফোন করেছিলেন।বাবা, উনি,ভাই সব্বাই দেখি বেরুলো। যাওয়ার আগে ভাই চাবি দিয়ে গেল।আপনি পর্দার মাপ নেবেন তো? আসুন।"


বিক্রম জন্ম নেওয়ার পর প্রথম সন্তান শোক একটু একটু করে কাটিয়ে উঠলেও  হঠাৎ ই পাগলামীর লক্ষণ দেখা যায় দীপালীর মধ্যে। মাঝে মাঝেই চিৎকার আর কান্না শোনা যেত ওপরমহল থেকে। উগ্র হাসি, আর 'খুনি খুনি' বলে আর্তনাদ। বাইরের লোকের সাথে তখন থেকেই বড়ে ভাবির দেখা করা নিষেধ। 

এরই মধ্যে ছোটকর্তাকে পুলিশ গ্রেফতার করল।পুলিশের গাড়ি রওনা দিতেই দোতালা থেকে উল্লসিত হাসি আর করতালির শব্দ পেয়েছিল সারা পাড়া।কিন্ত বড় গিন্নির উন্মাদিনী রূপ দেখেনি কেউ।চিরদিনের জন্য বন্দিনী হয়ে গিয়েছিল সে।

(৩)

"আবার পর্দা বানাবি! হি হি হি হি। 
 আরো পর্দা বানাতে বলেছেন বুঝি তোর কর্তামশাই? হি হি হি হি হি.......পা আ প।
পাপ লুকাচ্ছিস মোহন,পারবি?কিছুতেই পারবিনা।সব ফাঁস করে দেব আমি।"

ফ্যাসফ্যাসে গলায় দ্বেষ ঝরে পড়ে।
স্বল্পালোকিত ঘরটায় ঢুকে নিঃশব্দে দরজা দেয় সুভদ্রা।এই ঘরে তার আসা নিষেধ।আজ বহুকষ্টে একরকম চুরিই করেছে সে বেখেয়ালে ফেলে রাখা চাবিটা।

বাগানে যেতে যে আকুল আহ্বান তার কানে গেছে এতদিন,কেমন করে উপেক্ষা করবে তাকে? 
"দক্ষিণ দিকের জাম গাছটার গোড়াটা একটু দেখ না মা..... "
অপ্রকৃতস্থ মানুষটার সামনে জড়সড় মোহনলাল ঝোলা থেকে ফিতে বার করে। ঈষৎ অপরিছন্ন পোশাক আর আলুথালু চুলে আগের দীপালী কে চেনা যায়না।বিবেকের মতন সোজা চোখে মোহনলালের দিকে তাকায় সে।
এবারও কিছু করবি না? আবার মরতে দিবি আরেকটাকে?
আচমকাই সুভদ্রাকে মোহনের প্রায় গায়ের ওপর ঠেলে দেয় সে।অপ্রস্তুত সুভদ্রার চোখে ভয় মিশ্রিত বিস্ময়।
"এই দেখ।জ্যান্ত লাশ। পেটের দুটো মেয়ে বলে খুন করে দিল তোমার বড়ে সাহেব।কিছু করতে পারলি তোরা? পর্দা টানাচ্ছে।হি হি হি।পাপ ঢাকছে।কিন্ত আমারটা!"

মোহনলাল কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার পা জড়িয়ে লুটিয়ে পড়েছে দীপালী।
"আমার মেয়েটা তো এসেছিল।আমি নিজে কানে কান্না শুনেছি। মেরে ফেলল আমার মেয়েকে ওরা।ওই জামগাছের তলায় ঘুমাচ্ছে আমার মেয়ে।মা রে.......মা ........
"শান্ত ভাবীজি।উঠিয়ে।"
অশান্ত শরীরটাকে তুলতে পারেনা দুজনে।
"এই সাহাবাড়িকে বেপর্দা করে দে মোহন।বিয়েটা ভেঙে দে বাছা।আরেকটা মেয়ের বলি দিসনা।ওরা খুনি। ওরা খুনি।"

(৪)

সিঁদুর হলুদের ফোঁটা দেওয়া কার্ডে লেখা মল্লিকবাড়ির ঠিকানাটা আরেকবার মিলিয়ে নিল মোহনলাল।দেবকুমার মল্লিকের আবাস।ছোটে সরকারের হবু শ্বশুরঘর। 
সত্যিগুলো তো মোহনলাল জানত।পর্দার নীচে চাপা রেখে ছিল।

অদ্ভুত এক ব্যবসায়ী বাড়ি এই সাহাদের।এমনটা দ্বিতীয় দেখেনি মোহনলাল।লক্ষী এখানে কেবলই মৃন্ময়ী মূর্তি।
প্রসব যন্ত্রণায় প্রায় অচৈতন্য দীপালীর কানে গিয়েছিল নবজাতিকার কান্না তাই মৃত সন্তানের কাহিনি বিশ্বাস হয়নি তার। একটু সুস্থ হতেই সে চেপে ধরে স্বামীকে। তর্কের মধ্যেই ঘটে যাওয়া ভয়ংকর ঘটনাটার আঁচ পায় সে। তারপর শুরু হয় খোঁজ।ধাইমা, চাকরানি গোপনে স্বীকার করে সবাই।সদ্যজাত কন্যাটিকে তুলে দেওয়া হয়েছিল ছোট কর্তার হাতে।বাড়ির চৌহদ্দি পেরোয়নি ছোট্ট প্রাণটি।কান্না থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার।
কাঁপা কাঁপা হাতে বেল বাজায় মোহনলাল।
নিজের চেষ্টায় অনেকদূর এগিয়েছিল তার ভাবীজী।ছোট সাহার গ্রেফতারি অবধি। কিন্ত আর পারেনি।সত্যি ই কি পারেনি?
কারুকাজ করা সদর দরজা খুলে যেতেই নিজেকে গুছিয়ে নেয় বৃদ্ধ দর্জি মোহনলাল।আজ সে পর্দা খুলতে এসেছে।লক্ষী মা কে বাঁচাতে এসেছে।