গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২২

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়


 স্বাভাবিকতা ফেরার অপেক্ষায়

— — —


‘গোপাল দা… একটা লিকার, চিনি ছাড়া।’ বলে কোমর থেকে ছোট আসনটা খুলে কাঠের বেঞ্চে পাতল সন্তু, তারপর সাবধানে বসল। উপস্থিত সকলেই একবার তাকিয়ে দেখে নিল ওকে, স্বাভাবিক। এমন কাছা-গলায় কাউকে দেখলে ভিড়ের মাঝেও মানুষ চোখ আটকে যায়। এলাকার ছেলে… কারো কারো মুখও চেনা। গোপাল একটা কেটলির মুখে  ছাঁকনি রেখে সস প্যান থেকে চা ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করল, ‘একাই বেরোলে?’

- কেন?

- এই সময়ে একা বেরোতে নেই কিনা…

- চা খেতে এলেও ল্যাজ নিয়ে আসতে হবে?

-

- থাকে, নেমন্তন্ন করতে সঙ্গে যায়। 

- কবে যেন ঘাটে ওঠা? তোমাদের তো দশ দিনে…

- হুম… পরশু ঘাট। 

- দেখতে দেখতে আট দিন হয়ে গেল! 

সন্তু কোন উত্তর দিল না, বাড়িয়ে দেওয়া চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিয়ে ঠোঁটে ঠেকাল। ছ্যাঁকা মাঝে মাঝে ফিরিয়ে আনে, মাঝে মাঝে অন্য কথা মনে করিয়ে দেয়। সন্তু সরাসরি মুখে নেয় না গরম কিছু, আগে ঠোঁটে নেয়। ছ্যাঁকার ক্ষমতা বুঝে তারপর জিভ ঠেকায়। অসাবধানে বা তাড়াহুড়োয় আগে জিভ পুড়েছে অনেকবার। এখন সচেতন থাকে। গোপাল একটা প্রতিক্রিয়া আশা করেছিল, এই ‘আট দিন হয়ে গেল’ বলার পর যেমন আসে। তাকিয়ে ছিল সন্তুর দিকে। উপস্থিত আরো দু-তিনজন তাকিয়ে ছিল– এই কিছু বলবে, এক চুমুক বা দু চুমুক পর। সন্তু অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। প্রথম দু চুমুক সামলে খেলেও বাকিটা দ্রুত শেষ করে একটা পাঁচ টাকার কয়েন কেকের বয়ামের ওপর ঠক করে রেখে দিয়ে চলে গেল। সন্তু চলে যাওয়ার পর গোপালকে একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল জানো? শুনলাম পোস্টমর্টেম হয়েছে।’ 


— — —


- চা টা খেয়ে নিন বাবা। ঠান্ডা হয়ে যাবে। 

- অ্যাঁ?
- এখানে রাখলাম, চাপা দিয়ে। 
- ওহ… আচ্ছা। 
- বিস্কুট দেব দুটো?
- সন্তু ফেরেনি না? 
- না।
- ফোন করেছিল?
- না
- সেকি!
- এসে যাবে, রাণাঘাট অবধি যাওয়া… আসা। বিকেল হয়ে যাবে। 
- কী দরকার ছিল… ফোনেই সেরে নিতে পারত!
- ওর এক বন্ধু গেছে সঙ্গে। 
- ওই তো সব বন্ধু… বন্ধু! 
- আজ একটু দেরি হয়ে গেল… আপনি চা-টা খেয়ে নিন। আমি চান করে এসে ভাত বাড়ছি। 
- হুম, এসো। 


শ্যামলবাবু কতটা স্বাভাবিক আছেন, আর কতটা শোকে মুহ্যমান– মাঝে মাঝে যেন কেউ না কেউ এসে একবার টোকা মেরে দেখে যাচ্ছে। ঘটনাচক্রে একটার পর একটা ঘটে চলেছে। ডমিনো এফেক্টের মত। অমন কিছু ঘটলে, যেভাবে তা পর পর আরো যা কিছু ঘটিয়ে নেয়। অল্প বয়সে ঠাকুমার মৃত্যুদিন দেখেছেন, কলেজে পড়তে পড়তে বাবা চলে গেল ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায়। মা গেল দীর্ঘ রোগভোগের পর, বিছানায় থেকে থেকে বেড-সোর হয়ে গেছিল। মনে মনে মুক্তি চাইছিল সবাই। চেনা আর কাছের মানুষের চলে যাওয়া নতুন কিছু না। মামাতো ভাই, শালা, ভগ্নিপতী… এদের সঙ্গে শ্মশানে গিয়ে শ্যামলবাবুই কাঁধে হাত রেখে দাঁড়্রিয়ে থেকেছেন। এ এক অভ্যেসের মত। পাড়ার সবাইও যেন জানে… এই লোকটা এইসব কাজ ভালো বোঝে। অথচ অবসর নেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই এই পারিবারিক অশৌচ, ধূপের গন্ধ, মালা, ফ্রেমে বাঁধানো ছবি– এসব উনি মেনে নিতে পারছেন না। কেমন একটা লাগছে। ‘এ অস্বস্তির কথা কাকে জানাব? কে বুঝবে?’... ভাবতে ভাবতে চশমা পরে আবার খবরের কাগজের দিকে মনটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। সেখানেও কারো অনন্তলোকে চলে যাওয়ার কথা স্মরণ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে পরলোকগতর পরিবার… ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধু, নাতি-নাতনীরা। সধবা মহিলা, হাসছেন না… হাসতে বলা হয়েছে, তাই হাসার চেষ্টা করছেন। 


     শ্রেয়সীর স্নানে যাওয়া হল না। শ্বশুরমশাইকে চা দিয়ে গামছাটা নিতে বারান্দার দিকে এগিয়েছিল… হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। জামাই বাবু… বিরক্তিকর কৌতূহলী মানুষ একটা। কিছু বলাও যায় না… শ্রেয়সীর বাবার অপারেশনের সময়ে অনেক করেছেন। আর্থিক সাহায্য তো বটেই, রীতিমত পুত্রের দায়িত্ব পালন। দিদির একটা অহঙ্কার তো ছিলই, আরো বেড়ে গেছে জামাইবাবুর আধিপত্যের কারণে।

দিদির বিয়ে হয়ছিল সম্বন্ধ করে, বয়সের পার্থক্যটা কোনো বিষয়ই হল না দেখাশুনোর সময়। দিদির মুখ দেখেই বোঝা যেত– শুধু অপছন্দ নয়, বিয়ের পরেও অস্বচ্ছন্দ। আর এখন আলাদাই হাবভাব। শ্রেয়সীকে একটু সুযোগেই শুনিয়ে দেয় ‘নিজে পছন্দ করে বিয়ে করার এই ফল’। শ্রেয়সীর বর অরূপের আর্থিক অবস্থা সব সময়ে একরকম যায় না… এটা ওদের কাছে একরকম দারিদ্রই। একটু ওপর থেকে নীচে তাকিয়ে দেখে শ্রেয়সীকে। জামাইবাবু তো মাঝে মাঝেই ঘুরিয়ে তুলনা টেনে কথা বলেন। একটা মিচকে কায়দা আছে– কোথাও একটা বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বলবেন, এখন থাক। তোমাদের এখন একটু সামলে চলতে হবে… এরপর দুজন থেকে তিনজন হবে।  

 প্রথমে ভেবেছিল ফোনটা তুলবে না, কিন্তু দু-তিনবার ফোন বাজতে ফোনটা তুলল শ্রেয়সী। ওপার থেকে ভেসে হল জামাইবাবুর কণ্ঠস্বর– “মেসোমশাই ঠিক আছেন তো?”

শ্রেয়সী অল্প কথায় সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল… বলতে পারছিল না ‘স্নান করতে যাব’। সবাইকে এই কথাটা বলতে পারে না… জামাইবাবুকে তো আরোই নয়। শ্বশুরমশাইকে খেতে দিতে যাচ্ছে বললে ফোনটা কাটার আগে যথারীতি জামাইবাবু জিজ্ঞেস করে বসলেন– “পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে তেমন দুশ্চিন্তার তো কিছু নেই বলো?” 


     শ্যামলবাবু তখনো খবরের কাগজের দিকে তাকিয়েই বসে আছেন। কারো ভুলে কিছু নিরীহ মানুষের হত্যা হয়ে যাওয়ার খবর। স্বপক্ষে আর কোনো যুক্তি না থাকলে, কত সহজে বলে দেওয়া যায় ‘ভুল হয়ে গেছে!’। চায়ের কাপটা তখনও ঢাকা দেওয়াই। একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে। 

এই ঘরে উনি অরুণার ছবি টাঙাতে দেবেন না। অরুণা হাসিমুখে সারাদিন ঘরের একটা নির্দিষ্ট দিক থেকে তাঁকে দেখে যাচ্ছে, কথা বলছে না, সাড়াও দিচ্ছে না… ভাবলেই কেমন লাগে!

‘কেন এভাবে পরলোকগত আত্মীয়ের ছবি বাঁধিয়ে রাখে? আমি তো মায়ের ছবিও ঘরে রাখতে পারি নি!’


— — —


- দেখা হল? 
- হুম
- কিছু বলল?
- কী আর বলবে নতুন করে!
- কিছু জিজ্ঞেস করছিল না?
- শুরু করেছিল… সে তো করবেই, এমন একটা টপিক। 
- কী বললে?
- এই ঢুকতে ঢুকতে এত প্রশ্ন করো না তো! এত প্রশ্ন করো না! অসহ্য লাগে! 


শ্রেয়সীকে পাশ কাটিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল সপ্তর্ষি। শ্রেয়সী না পাওয়া উত্তরের অনিশ্চয়তা নিয়েই তাকিয়ে রইল সেই চলে যাওয়ার দিকে। ইচ্ছে করছিল আরো জোরে চেঁচিয়ে বলতে– ‘চিন্তাটা একা তোমার না, তোমাদের পরিবারের নয়… আমিও এর মাঝে জড়িয়ে পড়েছি। আমাকেও জবাব দিতে হয়ে। সারাদিন জবাব দিয়ে যেতে হচ্ছে কাউকে না কাউকে!’ কিন্তু জোরে কথাও বলতে পারছে না এখন। শুধু শ্বশুরমশাই বা অশৌচ বাড়ির শোকের কথা ভেবে নয়… পরিস্থিতির জন্য, কাছাকাছি ঘেঁষাঘেঁষি জানলা আর কানগুলোর জন্য। এমন অবস্থা যে নিজের মা-বাবাকেও কিছু বলতে পারছে না মন খুলে। তারাও দূরত্ব রাখছে। একদিন এসে আতপ চাল, ফল-মিষ্টি, এসব দেওয়ার কর্তব্য করে গেছে। আবার ঘাটের দিন বাবা একা আসবে। দুই বোন, কোনো ভাই নেই। বাবাকেই ঠেকা দিয়ে যেতে হবে। জামাইবাবু আসতে চাইছে, শ্রেয়সী বাবাকে বলেছে… কাটিয়ে দিতে। মনে হয়, বাবা বুঝেছে ব্যাপারটা।

    মাথা থেকে চিন্তা যায় না। এত কিছুর জন্য… এসবের জন্য কে-ই বা প্রস্তুত থাকে? এমন কিছু তো প্রত্যাশিত নয়! এই অবেলায় হবিষ্যি করা… গ্যাস-ওভেনেই ম্যানেজ করতে হচ্ছে মালসার বদলে কাঁসার পাত্র বসিয়ে। ওভেনের আঁচে মালসা ফেটে যেতে পারে… ভয় ধরিয়ে দিয়ে গেছে পাড়ার লোকজন। দ্বিতীয় কোনো মহিলা নেই যে শ্রেয়সীকে সাহায্য করে। সন্ধের সময়ে ঠিক আসবে কেউ… একবার রান্নাঘরে আর একবার শোয়ার ঘরে উঁকি দিয়ে যেতে। 


- ট্রেনে ভিড় ছিল?

- কীসের ট্রেন?
- রানাঘাট যাওয়ার… আবার কোন ট্রেন?
- ও… ফোনেই বলে দিয়েছি। যাইনি। ইচ্ছে করছিল না। 
- সে কী! বাবা তো জানতে পারবে!
- জানলে জানবে। অত পারছি না। 
- তাহলে… 
- তাহলে কী?
- সারাদিন…
- অন্য কাজ ছিল।
-
- তারককে জিজ্ঞেস করে নিও… ও ছিল। 
- জিজ্ঞেস করার কিছু নেই… কিন্তু না জিজ্ঞেস করলে বলবে না?
-
- টাকার ব্যাপার?
- না। 
-
- থানায় গেছিলাম। তারক ছিল সঙ্গে। সেখান থেকে একজন লইয়ারের কাছে গেলাম। 
- কী বলছ কী এসব?!
- আসতে কথা বলো… বাবা শুনতে পাবে। জেগে থাকে রাতে। 
- থানা থেকে ডেকেছিল আবার?!
- ফোন করেছিল… ট্রিটমেন্টের কাগজপত্র, ওষুধের প্রেস্ক্রিপশন, রিপোর্ট, ওষুধের বিল… এইসবের অরিজিনাল দেখিয়ে, এক কপি করে জেরক্স দিয়ে যেতে। 
- তুমি সব নিয়ে গেলে, বলোনি তো? কীভাবে নিলে? ওই চটের ব্যাগটায়?
- হুম, তারক জেরক্স করেই রেখেছিল কাল সন্ধেবেলা। 
- আবার জিজ্ঞাসাবাদ করল? আবার ডাকবে? বাড়িতে আসবে?
- তেমন কিছু বলেনি, বলছে রুটিন এনকোয়ারি। এগুলো করতেই হয়। 
- আর লইয়ার?
- ওটা তারক বলল, এইরকম ক্ষেত্রে যদি ফার্দার কিছু এনকোয়ারি হয়, একটা কনসাল্টেশন করে রাখতে। 
- কার কাছে গেলে?
- বারীন মুখার্জী… নাম আছে। পলিটিকাল কানেকশনও আছে। খুবই ভদ্র।
- ফীজও তো বেশি পড়বে!
- এখনই ফীজের কথা আসছে কেন? জাস্ট কথা বলতে গেছিলাম… সিচুয়েশনটা…
- আমি কি বাবা আর জামাইবাবুর সঙ্গে কথা বলব?
- না না… একেবারেই না! এখনই কিছু বলতে হবে না। এমনিতেই তো জানে যা ঘটে চলেছে। তেমন খারাপ সময় এলে এটাও জানবে! 
কিচ্ছু হবে না…দেখো?
-
- কী হল… আর একটু খেয়ে নাও? রাতে তো খই আর মিষ্টি খেয়ে থাকতে হবে! 

সপ্তর্ষি খাবারের বাকিটা রেখে চলে গেল হাত ধুতে। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে চলে গেল ছাদের সিঁড়ি ধরে ওপরে… খট করে একটা শব্দ হল ছাদের দরজা খোলার। শ্রেয়সীরও সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। বর উঠে গেছে বলে, ও উঠে যেতে পারল না। ইচ্ছে করে না এই আতপচালের ভাত আর ডাল সেদ্ধ খেতে। এরপর আবার সব তুলে, ধুয়ে-মুছে শ্বশুরমশাই কী করছে দেখতে যেতে হবে। ননদ অথবা পিসিশ্বাশুড়ি এসে পড়বে এখনই। এমনভাবে এটা-ওটা করতে লেকচার দেবে… অসহ্য! ‘নিজেরা এসে করে দিয়ে যা না, যখন এত দরদ!’ 

     ছাদে তখন সন্ধের আঁধার নেমে এসেছে। আগে এই অঞ্চলটা অন্যরকম ছিল। সন্ধেবেলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকলে অন্যরকম লাগত আকাশ আর চারপাশের সিলোয়েটটা। এখন চারপাশে পুরনো একতলা-দোতলা বাড়িগুলো ভেঙে ভেঙে ফ্ল্যাট উঠে গেছে। গাছগুলোও সব মৃত। গাছেদের সৎকার হয় না, শ্রাদ্ধ-শান্তি হয় না। তাদের মৃত্যুদের অশৌচ পালনের কেউ নেই। হত্যা হলে রুটিন এনকোয়ারিও হয় না। ‘রুটিন এনকোয়ারি নাকি’, কথাগুলো নিজের মনেই বলে ফিক করে হেসে ফেলল সপ্তর্ষি। সপ্তর্ষিকে মা ছোটোবেলায় বলত ‘সোনটু’। আদরের সোনা আর সোনাই ক্রমে ‘সোনটু’। তারপর সোনটু থেকে ‘সন্তু’। এমন হেমন্তকালের সন্ধেবেলা সন্তু ছাদে একা একা খেলত শচীনের ছবি দেওয়া প্লাস্টিকের ক্রিকেট ব্যাট আর বল নিয়ে। দিদিকে গান শেখাতে আসতেন গানের মাস্টার অসিৎবাবু। ঠাকুমা শাঁখ বাজিয়ে সন্ধে দিত ঠাকুরঘরে। ছাদের তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বেলে যেত। ঠাকুমার পর মা। তুলশীতলায় সন্ধের অন্ধকার জমে গাঢ় হয়ে আছে… ভুসি অন্ধকার। আর সন্তু ছাদে একা… হঠাৎ বদলে যাওয়া সিলওয়েটের মাঝে একেবারে একা। মা-ও নেই। হাতের সিগারেটটা কাঁপা কাঁপা হাতে মুখে নিয়ে একটা শেষ টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল সন্তু। চোয়াল শক্ত করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তুলসীমঞ্চটা পাশ কাটিয়ে যেতে গিয়ে বসে পড়ল হাঁটু ভাঁজ করে। হাত দিয়ে মুখ চেপে যতটা সম্ভব কান্নাটা চেপে রইল। কান্না মুক্তির পথ খুঁজে নিল নিঃশব্দে। অন্য বাড়ি থেকে কেউ উঁকি দিয়ে দেখলে ভাববে ‘এই ভর সন্ধেবেলা ছাদে একা একা বসে ছেলেটা কেঁপে কেঁপে উঠছে কেন ওভাবে? কী হল আবার?!’



- চুলটা ঠিক করে নাও।
- ঘাটের আগে চিরুনি ঠেকাতে নেই… জানো না?
- তুমি এত কিছু সিরিয়াসলি মানছ?
- তোমার দিদি, পিসি, কাকিমা… সব তো দুবেলা দেখে যাচ্ছে। শোকের থেকে তদারকি বেশি। 
- মানুষের স্বভাব। নিজের ছেলের বউকে মানতে বলুক না! 
- নিজেদের সম্মান যদি রাখতে না জানে… পাবেও না।

সন্তুর এইসব শুনতে ভালো লাগছিল না। আসলে সন্তুর আর কিছুই বলতে বা শুনতে ইচ্ছে করছিল না। মার প্রসঙ্গ বার বার আসে সারাদিন। কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করেই। ইচ্ছে করেই খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে। শোক আর কজনের, কেনই বা হবে? সন্তুর বাবা বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন না, যারা আসে… ঘরে এসে জিজ্ঞেস করে যায়। যা ওঁকে জিজ্ঞেস করতে পারে না, সন্তুকে জিজ্ঞেস করে। যা সন্তুকে জিজ্ঞেস করে না, শ্রেয়সীকে জিজ্ঞেস করে। এখন সারাদিন পর শুয়ে এইসবের কিছু আর ভালো লাগে না। বাবা বারণ করেছিল, তাও মাটিতেই শুচ্ছে সন্তু, দুটো কম্বল পেতে। শ্রেয়সীও সন্তুর পাশেই শুচ্ছে। সন্তুর দিদি আর ভগ্নিপতি বাজিয়ে দেখে, ইচ্ছে করেই নিয়ম অত না মানতে বলে… দেখার জন্য, যে চট করে রাজী হয়ে যায় কী না। শ্রেয়সী এগুলো বুঝতে পারে। কিছু বলতে পারে না। দু’বছর হল বিয়ে হয়েছে… এর মধ্যেই সংসারে এত বড়ো অঘটন। শাশুড়ির মৃত্যুও অস্বাভাবিক হতে পারে, শুধু বউমার নয়– এই ইঙ্গিতটাই যথেষ্ট।

   এই কদিন নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়েই শুচ্ছে ওরা। শ্রেয়সী কোনো সময়েই কোনো ঘর অন্ধকার রাখতে চাইছে না। এই অল্প আলো চোখে পড়লেও সন্তুর অস্বস্তি হয় মাঝে মাঝে, তখন চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে শোয়ে। সেই চাদরের ভেতর চোখ বন্ধ করেই আসতে আসতে শ্রেয়সীর আরো কাছে ঘেঁষে গেল সন্তু। শ্রেয়সীর কাঁধে আলতো করে ঠোঁটটা চেপে পেটের ওপর হাত রাখতে শ্রেয়সী ওপাশ ফিরে শুয়ে বলল– ‘পেটটা কেমন ব্যথা ব্যথা করছে, বোধহয় পিরিয়ড শুরু হয়ে গেল!’ সন্তু ঠোঁটটা তুলে অস্ফুটে শুধু বলল, ‘কী?’ ‘পিরিয়ড শুরু হয়ে গেছে, একটা এক্সট্রা প্যাকেট ছিল প্যাডের… পরে শুলাম। কাপড়ে, চাদরে দাগ লাগলে বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে।’ একই ভাবে ওপাশ ফিরেই কথাগুলো বলেল শ্রেয়সী। ততক্ষণে সন্তুর মনের অভ্যেস আর আদর মেশানো ভাবটা কেটে গেছে। ‘মিচ’ করে একটা শব্দ করে উঠে বসল। তারপর ধুতির কোঁচাটা ঠিক করে নিয়ে উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে, হাতে মোবাইল ফোনটা নিয়ে। 

       বাথরুম থেকে ফেরার পথে দেখল বাবার ঘরেও অল্প পাওয়ারের নাইট ল্যাম্পটা জ্বলছে। সন্তু আসতে আসতে পর্দার আড়াল থেকে ঘরের ভেতরটা দেখল, যাতে বাবা বুঝতে না পারে।  বাবা খাটে বসে আছে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে। যেন দেওয়ালের দিক থেকে কেউ বাবাকে দেখছে। অথচ দেওয়ালে কোনো ছবি বা ক্যালেন্ডার নেই। বাবা বলেই দিয়েছে… মায়ের ছবি ঘরে টাঙাতে দেবে না। 

শ্যামলবাবু ঠিক বুঝতে পারলেন, কিন্তু বুঝতে দিলেন না যে তিনি বুঝতে পেরেছেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিৎ হয়ে শুলেন বিছানায়, চোখ বন্ধ করে। ছেলেকে নিশ্চিন্ত করা সম্ভব নয়… কিন্তু দুশ্চিন্তা বাড়ানোরও অর্থ হয় না। উনি নিজেও কি ভেবেছিলেন কখনো… যে অরুণা এভাবে চলে যাবে? শেষকালে পোস্টমর্টেম করতে হবে ওর? 


— — — 


“আরে এই যে, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? মেসোমশাই বললেন দোকানে গেছ… এই সময়ে এভাবে দোকান-বাজার না গেলেই নয়?”

শ্রেয়সীকে দরজার সামনে দিয়ে যেতে দেখেই কথাগুলো বলে উঠলেন শ্রেয়সীর জামাইবাবু। যেন এতক্ষণ ওঁৎ পেতে বসেছিলেন, কখন ফিরবে ছোটো শালী। এই লোকটারই এসবের মাঝে আসা বাকি ছিল। রগড় দেখতে এসেছে! শ্বশুরমশাই এত কিছু বোঝেন না, বুঝলেও প্রকাশ করেন না। শ্রেয়সীর দিকে এমন ভাবে তাকালেন, বোঝাই যায় অতিথিকে এক কাপ চা করে দিতে বলছেন… সঙ্গে নিজে পেলেও ভালো হয়। ‘হ্যাঁ বাবা… আপনারা কথা বলুন। নিয়ে আসছি।’ বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল শ্রেয়সী। 

     এই জামাইবাবু লোকটাকে আজকাল আর সহ্য হয় না। বছর দশকের আগের সব কিছু এখন মনে পড়লে অন্য রকম লাগে। একেবারেই অন্যরকম। দিদির যখন বিয়ে হয়, শ্রেয়সী সবে মাধ্যমিক দিয়েছে। দিদির থেকে এতটা বয়সে বড়ো… দিদির মনে মনে ভালো লাগছে না। স্টেডি রিলেশন থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল দিদিকে, ছেলের পদবী বাবার পছন্দ ছিল না বলে। দিদি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বা পালিয়ে কিছু করতে পারেনি, ছেলেটাও চায়নি। সম্ভবতঃ আর্থিক অসঙ্গতিও ছিল। আর এই জামাইবাবুকে দেখে মনে হত ‘কাকু কাকু’। অথচ খুব আলাপী বা মিশুকে না হলেও, লোকটার ব্যবহারে একটা স্নিগ্ধতা ছিল, কেমন একটা অভিভাবকোচিত আন্তরিকতা ছিল… বিশেষ করে শ্রেয়সী সেটা অনুভব করত।

      দিদির তখনো বাচ্চা হয়নি… কোথাও বেড়াতে গেলে, বা ডিনারে গেলে জামাইবাবু শ্রেয়সীকেও যেতে বলত সঙ্গে। দিদিকে বলত, ‘ও যাবে কি না একবার জিজ্ঞেস করে দেখো।’ প্রথম প্রথম দিদিও রাজী হয়ে যেত… শীতকালে বা স্কুলের ছুটি থাকলে কাছাকাছি ঘুরতে যাওয়া, একসঙ্গে বেরানো… ছবি তোলা– এগুলোই স্বাভাবিক মনে হত। কিন্তু শ্রেয়সী যখন কলেজে, সেই সময় থেকেই দিদি বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারগুলো চেপে যেত। জামাইবাবুর সঙ্গে পরে কথা হলে বুঝতে পারত যে দিদি মিথ্যে বলেছে। কখনো– কোথাও গেছে অথচ জানায়নি, আবার কখনো– জামাইবাবুকে বলেছে ‘অনেক রিকোয়েস্ট করলাম… কিছুতেই রাজী হল না। কলেজে পড়ছে এখন, বুঝতেই পারছ।’

জামাইবাবুকে নাকি দিদি অকারণে সন্দেহ করত। বয়সে বেশি বড়ো তাই খুশি নয়। বিয়ের আগে যাকে ভালোবাসত, তাকেও ভুলতে পারেনি।  ‘এভাবে জোর করে সুখী থাকার চেষ্টা দিনের পর দিন করা যায়?’... বলে ফুঁপিয়ে উঠে একদিন আসতে আসতে মাথাটা ঝুঁকিয়ে শ্রেয়সীর কোলে পেতে দিল জামাইবাবু। গা শিরশির করে উঠেছিল শ্রেয়সীর। মা তখন চান করছে, বাথরুমে জলের শব্দ। বাবা বাইরে। আসতে আসতে ডান হাতটা জামাইবাবুর মাথায় রাখল। কোল ঢেকে রাখা পাজামা ভিজে যাচ্ছিল, কোলের ত্বক অবধি পৌঁছে যাচ্ছিল নোনা জল। 

     এভাবেই কয়েকবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। চুমু খেয়েছিল কপালে। জামাইবাবু সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল ওর জন্য। নিকোটিনের গন্ধমুক্ত নিঃশ্বাস, প্রমাণ দিয়েছিল ঠোঁটে-ঠোঁট রেখে। শ্রেয়সীর কখনো মনে হয়নি পাপ। কখনো মনে হয়নি দিদির ঘর ভাঙছে। নিজেই বলেছিল–  ‘দিদি চায় না যখন… আর আপনাদের ফ্যামিলি আউটিং-এ আমাকে এভাবে ডাকবেন না। আপনার অস্বস্তি আর অশান্তি বাড়বে। আমারও ওসব ভালো লাগবে না। মা-বাবাকে দিদি যদি এইসব বলে…’ 

আসলে, জামাইবাবুও জানত শ্রেয়সী আর ওর দিদি… দুজন একেবারে অন্যরকম মানুষ। যেন ভুল করে দিদির সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে, শ্রেয়সীই বেশি ঠিক ছিল। শ্রেয়সীরও মনে হত… দিদির জন্য হোক বা ওদের পরিবারের জন্য, অথবা নিজের জন্যই– এই মানুষটাকে ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না, আগলে রাখতে হবে। এখন ভাবলে হাসি পায়, একটা কুড়ি-একুশ বছর বয়সের অনার্স পড়া মেয়ে… সে চলেছিল ‘আগলে রাখতে’। 

      শ্রেয়সী মাস্টার্স করতে ঢোকার একমাসের মধ্যেই খবর এলো, দিদির প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট পজিটিভ। দিদির শাশুড়ি আর মায়ের সে কী উচ্ছ্বাস আর আনন্দ! হওয়াই স্বাভাবিক। খবরটা শুনে শ্রেয়সীরও আনন্দ হল। কিন্তু বুকের মধ্যে কী একটা এমন খামচে ধরল, যে আনন্দটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারত না সেভাবে। জামাইবাবুর ফোন তুলত না। দেখা হলে এড়িয়ে যেত। একদিন হাত ধরে টানাটানি করল– বলতেই হবে কী হয়েছে। জোর করে হাত ছিটকে চলে গেছিল শ্রেয়সী। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কদিন পর জানালো সপ্তর্ষির কথা। খুব স্পষ্ট ভাবেই জানাল… ‘এবারে একটা স্টেডি রিলেশনের কথা ভাবছি, বুঝলেন। ছেলেটা মধ্যবিত্ত পরিবারের, তেমন কিছু করেও না… কিন্তু খুব সৎ। আর আপনারও দিদিকেই বেশি সময় দিতে হবে। এখন তো শুধু দিদি নয়… আরো একজন ছোট্টো মানুষকে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে!’ জামাইবাবুর চোখটা ধক করে জ্বলে উঠেছিল সপ্তর্ষির কথা শুনে। আর দিদি? টুসু পেটে আসতেই কেমন রাজরানির মত চেহারা হয়ে গেল দিদির। মুখ-চোখের ভাবই বদলে গেল। সেই যে ছোটো বোনকে সুযোগ পেলে আরো ছোটো করা শুরু করল মিষ্টি মিষ্টি হেসে… তা আর বন্ধই হল না। বোকা মেয়ে… কোনোদিনই জানবে না তার সন্তানের পিতা সেই কবে অন্য কারো কাছে নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছে! 


   ‘ক্রাইসিসের সময়ে পার্সনাল ডিফারেন্স পুষে রাখতে নেই… বুঝলে?’ 

চায়ের জল ফুটছিল, আর একটু হলে তেতো হয়ে যেত হয়ত। জামাইবাবুর গলায় আওয়াজে চমকে ফিরে এলো শ্রেয়সী। এখন আর দুজনের মাঝে কোনো নাটুকেপণা অবশিষ্ট নেই। অতিথির প্রতিটা যতটা সৌজন্যবোধ রাখা কর্তব্য, ততটাই রেখে বলল– ‘এ মা, আপনি আবার উঠে এলেন কেন? গল্প করুন… আমি এখনই আসছি চা নিয়ে!’ 

- তোমার সঙ্গেই কথা ছিল… 
- ও… কী নিয়ে?
- তুমিও বুঝতে পারছ। সপ্তর্ষি কিন্তু প্যানিক করছে… 
- কে বলল আপনাকে? ও কেন প্যানিক করবে? প্যানিক করার মত ঘটেছে টা কী?
- ডোন্ট অ্যাক্ট লাইক আ ফুল। খুব ভালোই বুঝতে পারছ প্যানিক কেন করে মানুষ এমন অবস্থায়। 
-
- তোমাদের সমস্যাটা কোথায়? আমি বুঝতে পারছি না। একটা পরিস্থিতি এসেছে… সকলে মিলে একটু প্ল্যান করে, প্রিকশান নিয়ে চললে সিচুয়েশনটা ওভারকাম করা সহজ হয়। 
- দেখুন, বাবা হয়ত আর পাঁচজনের কথা শুনে ভয় পাচ্ছেন। আমরা কেউ ভয় পাচ্ছি না। আমাদের কোনো ফল্ট নেই। যেমন যেমন ফর্ম্যালিটি করার, করা হচ্ছে। 
- তুমি চাইলে, সপ্তর্ষিকে নিয়ে কিন্তু আমি ভালো…
- জানাব… পরিস্থিতি সেদিকে গেলে তো জানতেই পারবেন। কাজটা মিটুক আগে। 
- ভুল ভাবছ। সব সময়ে অমন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ব্যাপার হয় না। ইন্টেরোগেশনের নামে কত দিন, কত মাস চলবে… একটু হোল্ড থাকলে ব্যাপারটা সেটল করে নিতে প্রবলেমটা কোথায়? 
- আপনিও তো গার্ডিয়ানের মতন। ওকে বলে দেখুন। 
- বলছি… পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা তুমি নিজে দেখেছ?

চা কাপে ঢালা, প্রস্তুতি… এসবের মাঝে কথাবার্তা চলছিল। প্রশ্নটা শুনে, চায়ে চিনি মেশানো থামিয়ে জামাইবাবুর দিকে একবার তাকাল শ্রেয়সী। তারপর হেসে কাপ দুটো ট্রেতে নিয়ে শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে দিকে এগিয়ে গেল। দু-পা ফেলে থেমে বলল, ‘ইন্টেরগেশনটা পুলিশকেই করতে দিন না জামাইবাবু।’ তারপর এগিয়ে গেল শ্যামলবাবুর বিছানার পাশে রাখা টেবিলটার দিকে। শ্যামলবাবু তখন ঘরের একপাশে রাখা শোকেসটার দিকে তাকিয়ে। ওখানে একটা ঝিনুকের তৈরি গণেশ সাজিয়ে রাখা… প্রায় তেইশ বছর আগে পুরী থেকে অরুণা কিনে এনেছিল। 



— — — 


- তুই এখন এইসব কথা কেন তুলছিস?
- আমি তুলছি না… তুলছে অনেকেই। আমি শুধু সামনাসামনি জানাচ্ছি। র‍্যাদার, জানাতে বাধ্য হচ্ছি। আমার একটা শ্বশুরবাড়ি আছে। সেখানে অনেকের অনেকরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। 
- তা এখন আমাকে ঠিক কী করতে হবে?
- দ্যাখ ভাই, তোকে আবার বারণ করছি… একদম আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলবি না!


শ্যামলবাবুর বয়স হয়েছে, এমনিতেই অশান্তি সহ্য করতে পারেন না। শরীর উত্তেজনা নিতে পারে না, সামনে কেউ চেঁচামেচি করলে একটা সময়ের পর হাত কাঁপে। চোখের পাতা কাঁপতে শুরু করে। ইনভলিউন্টারি মাসল টুইচিং। ছেলে-মেয়ে দুজনকেই শান্ত করার জন্য কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, ‘তোরা এখন এইসব নিয়ে কথা বলছিস? কাজটা অন্ততঃ শান্তিতে মিটতে দে! নিজেদের মধ্যে এমন করলে তো লোকে হাসবে!’ এই অবধি বলতেই গলাটা এক পর্দা চড়িয়েছিলেন, বেশিক্ষণ টানতে পারলেন না। থেমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের চশমাটা কপালে তুলে ভুরুর মাঝে ডান হাতের  আঙুল দুটো দিয়ে টিপে বসে রইলেন চোখ বন্ধ করে। সন্তু কিছু না বললেও, ওর দিদি চুপ থাকল না। কান্না মেশানো গলায় থেমে থেমে বাবার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকল– 

‘আমার অবস্থাটা ভাবো তো একবার? কোনটা করিনি আমি? তারপরও লোকের কথা শুনতে ভালো লাগে? মানুষটা তো সাতে-পাঁচে কিচ্ছুতে থাকে না… কোনোদিনও একটা টাকা চায়নি, কোনো অধিকারের কথা বলেনি। তাকে কেন এসব শুনতে হবে বলতে পারো? ‘

শ্যামলবাবু একই রকম ভাবে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন। সন্তু কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না, দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাবার দিকে তাকিয়ে। দিদি একটু থেমে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করল– 

‘পুলিশকে সমীরণেরও নম্বর দিয়েছিস… বেশ করেছিস। পুলিশ ওর অফিসে অবধি গেছিল, দেখা করতে… বুঝতে পারছিস? অফিস অবধি! ও ডিজার্ভ করে এগুলো? আমরা ডিজার্ভ করি?’

সন্তু যতটা সম্ভব শান্ত ভাবে বলার চেষ্টা করল ‘পুলিশ যা ইনফরমেশন চেয়েছে, দিতেই হয়েছে। আমার কিছু করার নেই। আর সমীরণদার এত চাপের কী আছে? বলে দেবে অফিসে ছিল…’

‘বলে দেবে অফিসে ছিল! ওয়াও… ফুরিয়ে গেল। সো ইজি! আমাদের নিয়ে কেন টানাটানি ভাই? যা-ই ঘটে থাকুক তা তো এই বাড়িতে ঘটেছে!’ দিদির শেষ কথাগুলো শুনে সন্তু বাবার দিকে তাকাল। শ্যামলবাবুও চোখ তুলে তাকালেন মেয়ের দিকে। দুজনেরই চোখে একটাই প্রশ্ন– 

‘যা-ই ঘটে থাকুক’ মানে?


শ্রেয়সী পাশের ঘরে চুপ করে বসে আছে, হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে। পাশের ঘরের কথা সবই শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু যাবে না ও ঘরে। ভাই-বোনের নিজেদের মধ্যে কথা, তার ওপর বাবা আছেন। ননদকে বিয়ের আগে থেকেই একটু নিজেরটা বুঝে নেওয়া বলেই চিনেছে শ্রেয়সী। এখানেও এক জামাইবাবুর গল্প আছে, সপ্তর্ষির জামাইবাবু… সেই গল্পটা অন্যরকম। সপ্তর্ষির বাবার জাঁকজমক করে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। অথচ মেয়ে পাত্র পছন্দের ব্যাপারে একেবারেই কম্প্রোমাইজ করতে রাজী নয়। তেমন কিছু উচ্চশিক্ষিতা না হলেও অনার্স গ্র্যাজুয়েট… আর দেখতে রীতিমত সুন্দরী, অস্বীকার করে লাভ নেই। অবশেষে সমীরণদার বাড়ির সঙ্গে যখন কথা চলছে, দিদি নাকি কোনোভাবে সমীরণদার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে… এটা সপ্তর্ষির থেকে শোনা। সমীরণদা বাড়িতে জানিয়েই দিল যে বিয়ে করলে দিদিকেই করবে। বাড়ি থেকে যে সামান্য দাবি থাকে তাও ছিল না। এমনকি রিসেপশনটাও দুই পরিবারের একসঙ্গে। বিয়ের দিনে সামান্য অনুষ্ঠান হয়েছিল… শুধু নিজেদের আত্মীয়দের ডেকে। সপ্তর্ষির তখন কোনো রোজকারই ছিল না, কিছুই দিতে পারেনি। তাই স্বাভাবিক ভাবেই, বিয়ের পর থেকে সমীরণদার একটা আলাদা জায়গা হয়ে যায়। উনি সুবিধেবাদী বা দখল করা মানুষ নন। সত্যি বলতে খুবই সোজা মনের মানুষ। অফিস আর ঘর নিয়ে থাকেন, ছবি তুলতে ভালোবাসেন, মাঝে মাঝে পাহাড়ে-জঙ্গলে চলে যান। অন্যরকম মানুষ। কিন্তু সপ্তর্ষির দিদি তা নয়। তার একটা কর্তৃত্ব ফলানোর অবসেশন আছে। আর ওটা আরো বেড়েছে সপ্তর্ষির বিয়ে হওয়ার পর থেকে। অন্ততঃ শ্রেয়সীর সেরকম-ই মনে হয়। দিদি শ্রেয়সীকে দেখতে পারে না। ইনসিকিওরিটি? সংকীর্ণতা?… শ্রেয়সী প্রথম প্রথম চুপ করে থাকত, সপ্তর্ষিকেও জানাত না। এখন একটু একটু উত্তর দেয়। অশান্তি না করে যতটা শক্ত থাকা যায়। মানুষ চলে গেলে তাকে নিয়ে বলতে নেই, কিন্তু শ্রেয়সীর খালি মনে হয়– ননদের এই বাড়াবাড়ির জন্য তার শাশুড়িই দায়ী। উনিই মেয়েকে এত ছাড় দিয়ে রেখেছিলেন। নিজে পারতেন না, চাইতেন মেয়ে সব কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুক। সপ্তর্ষিকেও। মায়ের তো এমন কিছু গয়নাগাটিও নেই, বাবারও এমন কিছু টাকা অবশিষ্ট নেই ব্যাংকে… সামান্য মাসিক সুদ আর পেনশনেই চলে। তাহলে, কী এক্সপেক্ট করে… কী নিয়ে ক্রিয়েটিভ অশান্তিটা করছে? মায়ের এভাবে চলে যাওয়া নিয়ে যে ক্রাইসিস, জটিলতা… এটাকে ইস্যু করে একটা ঝামেলা করতে চাইছে… ইচ্ছে করেই করছে এটা… বুঝতে পারছে শ্রেয়সী, কিন্তু তাও ও যাবে না। নেহাৎ নাগালের বাইরে পরিস্থিতি না হলে যাবে না। আর সেরকম হলে সোজা সমীরণদাকে ফোন করবে… দরকার হলে নিজের বাড়িতেও।

‘অশান্তিই যদি হতে হয়, ভালো ভাবে হোক। তোমার বাপ-মাকে তুমি দেখতে না এসে। দেখত তোমাদের এই অযোগ্য ভাইটাই। যতটুকু ক্ষমতা, সেই দিয়েই চেষ্টা করেছে। তোমরা শুধু এসে খুঁত ধরতে পারো।বলে কি না ‘যা ঘটার এই বাড়িতেই ঘটেছে!’... কিছু না বলে বলে এই অবস্থায় পৌঁছেছে! নিজের বাবাকে পর্যন্ত রেস্পেক্ট করতে শেখেনি। ভাইটা কাছা-গলায় দাঁড়িয়ে… তাকে চার্জ করছে! বিচ!’

মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে মনকে অন্যদিকে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছিল শ্রেয়সী, ঠোঁট কামড়ে। টপ করে এক ফোঁটা চোখের জল পড়ে ভিজিয়ে দিল ফোনের পর্দা।  


— — — 


পুরোহিত যা বলে, কেমন আচ্ছন্নের মত পর পর সেগুলো করে যায় মানুষ। সন্তু আগেও দেখেছে, নিজের বেলাও বুঝতে পারছে। পুরোহিত মন্ত্র পড়ছে, অর্ধেক কানেও যাচ্ছে না, বিড়বিড় করে বলছে যতটা শুনতে বা বুঝতে পারছে। বাস মিস করার মত পিছিয়ে পড়ছে, পুরোহিত চলে যাচ্ছে পরের ধাপে। শুধু যা যা আচার করে যেতে বলছে করে যাচ্ছে। মাটি দিয়ে জায়গা করে। ভাত, তিল এসব মিশিয়ে আলাদা আলাদা ছোটো ছোটো পিণ্ড। অতৃপ্ত অপঘাতে মৃতদের জন্য আলাদা পিণ্ড। মাঝে গঙ্গাজল ছিটিয়ে যাওয়া তুষে করে। ভুল হচ্ছে, আবার পুরোহিত দেখিয়ে দিচ্ছে… আবার করছে। কাকগুলো বসে আছে। উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে, আবার ঘুরে আসছে। কাজ মিটে গেলে ওরা ভাতগুলো খায়। ওদের অভ্যেস আছে। রোজ কেউ না কেউ এসে এখানে ঘাটের কাজ করে। রোজ। অবাক লাগে সন্তুর, এখানে রোজ ঘাটের কাজ হয়– এই কথাটা বুঝতে পারার পর। পাশে সরঞ্জাম কিছু রাখাই থাকে, যাতে কেউ এলে অসুবিধে না হয়। এখানকার লোকেরা ড্রামে করে গঙ্গাজল অবধি তুলে রেখে দেয়, যাতে পাঁক ঘেঁটে পার্টিকে নামতে না হয়। পার্টি… ঘাটের কাজ করতে আসা আলাদা আলাদা পার্টি। 


দিদি আসেনি। আসবে না জানত। শ্রেয়সীর বাবা এসেছেন, এই শরীর নিয়েও। শ্যামলবাবুকে আসতে দেওয়া হয়নি, সন্তুর পিসি গতকাল রাত থেকেই বাড়িতে আছে… যাতে বাবাকে একা না থাকতে হয়। পিসির থাকাও সমস্যা, নিজে কিছু করবে না… শ্রেয়সীকে দিয়ে করাবে। ঘরে ফিরে দেখবে সব যেমন কে তেমন, শ্রেয়সীকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে। জামাইবাবু নাকি বেলার দিকে আসবে, আগামীকাল কীভাবে কী হবে সব ঠিক করতে। পাড়ার একটা মন্দিরেই নমো নমো করে সেরে ফেলা হবে। যাদের না বললেই নয়, সেই কজনকেই বলা হয়েছে। মন সায় দেয় না অত করার, করতে হয়। আর এক্ষেত্রে তো ব্যাপারটাই একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। 

     নাপিতটা সব চুল-দাড়ি কামিয়ে ফেলল। অশৌচের ভার যেন অনেকটা হাল্কা হয়ে যায় ঘাট-কামানের পর। সাময়িক হলেও, কেমন ফ্রেশ লাগছিল সন্তুর। মাথায় গঙ্গা-জল ছিটিয়ে আড়ালে গিয়ে পোশাক পালটে ফেলল। শ্রেয়সীও তাই করল, শ্রেয়সীর বাবা আর পুরোহিত বলে দিচ্ছেন… কার পর কী করতে হবে। কোনো মহিলা সঙ্গে আসেনি নিয়ম নির্দেশ দেওয়ার মত। ঠিক যখন পুরোহিতকে দক্ষিনাটা গুণে দিচ্ছে সন্তু, তখন একটা পুলিশের জিপ ঘাটের কাছে এসে থামল। পুলিশের জিপ দেখতে পেয়েই শ্রেয়সী ওর বাবার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। সন্তুই পাশে ছিল, সন্তুর থেকে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়াল শ্রেয়সী। পুরোহিত বা অন্য কেউ সেই নিয়ে সচেতন বলে মনে হল না। অন্য পরিবার আসছে। আবার তাদের জন্য আচার-পদ্ধতির আয়োজন হচ্ছে। একজন মহিলা মাদুলী বাঁধা হাতে আঙুল দিয়ে দিয়ে এদিক ওদিক দেখিয়ে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন কাউকে… সে আয়োজন করছে, সেই মত গুছিয়ে রাখছে জিনিসপত্র। আর এক পরিবারের কাজ শেষ, একজন প্রৌঢ়া মহিলা খয়েরী পার সাদা কাপড় পরা, আর এক মহিলার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে যাচ্ছেন, সান্ত্বনার চেষ্টা দেখছে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে দু-তিনজন। সকলেরই মাথার চুল ভিজে, রোদে চিকচিক করছে। মানুষের এইসব দিকেই চোখ চলে যায়। পুলিশের জিপ না অন্য কোনো গাড়ি এসে থামল, চট করে দেখে না। সন্তু আড়চোখে দেখল, প্রতিক্রিয়া দেখাল না। দুজন কনস্টেবল নেমে এলো আগে, তারপর একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নামলেন। চোখের চশমা খুলে বুক-পকেটে ঢুকিয়ে নেমে এলেন সিঁড়ি দিয়ে, পায়ের জুতো খুলে ঢুকলেন ওই জায়গায়… যেখানে আয়োজন চলছে। সম্ভবতঃ ওই পরিবারের কেউ… পুলিশে চাকরি করে। 

আর সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি সব কিছু মিটিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে নিল সন্তুরা। এই প্রথম সন্তুর মনে হল… পুলিশের ভয়ে পালাচ্ছে। শ্রেয়সীর বাবাও নিশ্চয়ই আন্দাজ করেছেন ব্যাপারটা, কিছু বললেন না… বলবেনই বা কী? ট্যাক্সিতে উঠে কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বাবার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল শ্রেয়সী। সন্তু একবার তাকাল শ্রেয়সীর দিকে, শ্রেয়সীর বাবা একবার তাকালেন সন্তুর দিকে। তারপর দুজনেই জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। শ্রেয়সীর বাবার একটা হাত তাঁর কোলের ওপর রাখা মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরেছিল। 


— — — 


‘দেখুন, আমাদেরও তো একটা প্রটোকল মেনে চলতে হয়… আপনারা যেমন কোঅপারেট করবেন, তেমনই এগোবে। আপনারা মানে আপনাদের কথা বলছি না। আপনাদের থেকে এখনো অবধি যা চেয়েছি, সমস্যা হয়নি। তবে সব ক্ষেত্রে তো একরকম হয় না। সহজ ব্যাপারও এমন জটিল করে দেয়। আমরা খোঁজ খবর নিয়েছি… খোঁজ খবর নিয়েছি, যা জানার দরকার মনে হয়েছে… আমাদের কাছে আছে। আপনারা যা-ই বলুন, আমরা কাজটা ঠিকঠাকই করি। আপনারা মানে আপনারা নন… এই জেনারালি আর কি! কেউ কোনো অভিযোগ তো করেনি। জিডি বা এফআইআর এর ব্যাপারও নেই। আমাদের তো অনেকরকম দেখতে হয়… আমরা বুঝি। একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেছে। অনেক বাড়িতেই এমন হয়। বুড়ো মানুষ একা থাকতেন, বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেছেন। সাত দিন পর ডিকম্পোজ করতে করতে… যাকগে ছাড়ুন। তা এগুলো কি আর সবই ফাউল প্লে সাসপেক্ট করা যায়? লোকজন ভর্তি বাড়িতেও হতে পারে, হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ। আসলে… আজকাল এতরকম ঝামেলা বেড়ে গেছে, হাসপাতাল নার্সিংহোমগুলোকে দোষও দেওয়া যায় না। কিছু এদিক ওদিক হলে আমরাই ঝাড় দেব গিয়ে… হে হে। সরি… যেটা বলছিলাম আর কি। এমন হয়েই থাকে… অ্যাঁ? দেখুন… কারো ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেওয়া আমাদের কাজ নয়। আর এটা সে অর্থে কোনো ইনভেস্টিগেশন নয়… আবারো বলছি। নার্ভাস হবেন না, বা প্যানিক করবেন না শুধু শুধু। কোঅপারেট করুন। ওটাই আসল। আউট অফ স্টেশন কোথাও যাওয়ার হলে একটু লোকাল থানায় আগে ইনফর্ম করবেন। আর… আমার অ্যাডভাইস যদি নেন, এ এক-দুমাস আউট অফ স্টেশন না গেলেই ভালো… কেমন?’ 


     শ্যামলবাবুর ঘরেই একটা স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারে বসে কথাগুলো বলছিলেন লোকাল থানার সাব-ইন্সপেক্টর। অন্যরা চুপ করে শুনছিল। শ্যামলবাবু কারো দিকে তাকাচ্ছিলেন না, মাথা নীচু করেই বসেছিলেন, ভুরুর মাঝখানটা দু-আঙুল দিয়ে টিপে ধরে। সন্তু আর শ্রেয়সী তাকিয়েছিল সাব-ইন্সপেক্টরের দিকে। মাঝে মাঝে শোক আর মাঝে মাঝে সম্মতির শুকনো হাসি দেখিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল। সাব-ইন্সপেক্টর কিন্তু এদের দুজনের থেকে বেশি লক্ষ করছিলেন শ্যামলবাবুকেই। কথাগুলো শেষ করে সামান্য বিরতি নিলেন। কাপ থেকে চায়ের শেষটুকু খেয়ে চোখের ইশারায় জানতে চাইলেন ‘কোথায় রাখব?’। শ্রেয়সী আঁচল টেনে ডান কাঁধটা ঢেকে তৎপরতার সঙ্গে এগিয়ে এসে সঙ্গে সঙ্গে কাপটা নিয়ে নিল। কিন্তু ঘরে থেকে গেল না। কাপ হাতেই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। শ্যামলবাবু একবার মুখ তুলে চাইলেন, বলতে চাইছেন ‘আর কিছু?’, কিন্তু পারছেন না। একটা পাঁচ থেকে ছ সেকন্ডের নীরবতা… অল্প গতিতে ঘোরা ফ্যানের শব্দ। সাব-ইন্সপেক্টরই আবার শুরু করলেন– 

‘সবাই ভাবে আমি বেশি কথা বলি। কিন্তু আপনারা যদি একেবারেই কেউ কিছু না বলেন, তাহলে তো অটোমেটিকালি আমাকেই… তবে কথা কম বলা একদিক থেকে ভালোই। সময় মত চুপ থাকা আরো ভালো। এই প্রফেশনে থাকতে থাকতে দেখেছি, বোবার কোনো শত্রু নেই কথাটা অনেক ক্ষেত্রেই খুব এফেক্টিভ। ওই বিদেশী সিনেমার মত কায়দা করে না বললেও, আমাদেরও প্রটোকলে থাকে… ইচ্ছে করলে চুপ থাকতে পারো, কিন্তু কিছু বললে তা তোমার বিরুদ্ধে চলে গেলেও যেতে পারে। আমরা অত কায়দা করে বলি না, কিন্তু মিথ্যে বলব না… কথা বা হাবভাবের বেচাল মাঝে মাঝে সত্যিই মনে থেকে যায়। মানে, আপনারা বলে নয়… আমি সকলকেই এমন মাঝে মাঝে সাবধান করে দিই। ডিউটি করছি বলে তো আর এনিমি নই। নাকি?!’

সবাই চুপ দেখে শ্রেয়সীই বলো, ‘আর এক কাপ চা খাবেন?’। কেন বলল নিজেও যানে না, ভেতর ভেতর নার্ভাস লাগছে, এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাও সমস্যা… চলেও যেতে পারছে না। সাব-ইন্সপেক্টর সঙ্গে সঙ্গে হাত নেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘ নো নো… আজ উঠি, অন দ্যি ওয়ে আরো কিছু কাজ আছে। আমাদের লাইফ, বোঝেনই তো। তবে ঐ যেগুলো বললাম, একটু মনে রাখবেন। কোঅপারেশন। কোঅপারেশন ঠিকঠাক হলে কোনো সমস্যাই নেই। আর অযথা একে তাকে জড়াবেন না। প্রবলেম সল্ভ করার নামে চারটে ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোকের নাম জড়িয়ে গেলে গাজন নষ্ট হয়ে যায়… তখন আমার বদলে ওপর তলার কারো হাতে দায়িত্ব চলে যাবে। যেটা আপনাদের মত নর্মাল কেসে একেবারেই আননেসেসারি। এটা কোনো কেসই না। কেমন? আনঅফিশিয়ালিই বলে যাচ্ছি… কাগজপত্র সব একবার দেখে নিয়ে আপনাদের দিয়ে একটা সই করালেই মিটে যাবে। মুশকিল কী জানেন… হাসপাতালের ল্যান্ডলাইন থেকে ওই বেনামী ফোনটা এমন এলো… নাহলে এগুলোও কিছু করতে হত না। কে যে করল ফোনটা… ট্রেসই করা যাচ্ছে না। এদিকে উনি যখন ছাদ থেকে পড়ে গেলেন… আপনারা কেউই সামনে ছিলেন না। কেউই জানেন না, কেউই দেখলেন না– কীভাবে পড়লেন। আশপাশের কেউও… এনিওয়ে… আজ চলি কেমন? কাজের বাড়ি, শোকের পরিবেশ… খারাপই লাগছে আমার, আপনাদের বিরক্ত করে গেলাম এভাবে। আচ্ছা… গুডনাইট তাহলে? 

সাব-ইন্সপেক্টর গট গট করে জুতোর শব্দ তুলে বেরিয়ে গেলেন। পাশের বাড়ির জানলার পর্দাটা টেনে দিয়ে চলে গেল কেউ। বাইকটা স্টার্ট দেওয়ার শব্দ হল, তারপর বাইকের যান্ত্রিক শব্দ মিলিয়ে গেল দূরের রাস্তায়। 


— — — 


- সাব ইনস্পেক্টর লোকটা কিন্তু এমনিতে ভদ্র… না?
- শুধু শুধু অভদ্রতা করবেই বা কেন?
- আপার হ্যান্ড নেওয়ার সুযোগ পেলে স্কুলের দারোয়ানও ছাড়ে না। বুঝেছ?
-
- লোকটা ভালো, একটু ট্যাক্টফুলি ম্যানেজ করো ওকে। চটিও না। 
- আমার তো মনে হয় লোকটা বেশ ধুরন্ধর। আমাদের রিয়্যাকশন স্টাডি করছিল। আমরা রিলিভড, না কনশাস, না কিছু লুকনোর চেষ্টা করছি…
- অতিরিক্ত ভাবছ তুমি, মাথার চুলগুলো গিয়ে ওভার-অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে ব্রেইন।
- উঁহু… সত্যিই আমার খুব একটা সুবিধের লাগে না ওকে। একটু বেশি চালাক মনে হয়। কেমন যেন ল্যাজে খেলাচ্ছে। 
-
- যাক গে… টেনশন করে তো কিছু হবে না। আর আমাদেরও পজিটিভ থাকতে হবে। একটা মানুষ যে হঠাৎ করে নেই হয়ে গেল… সেটাই…
- হুম… নিজের ক্রাইসিস এলে শোক-টোক সব ব্যাক সিটে চলে… সে যতই নিকট আত্মীয় হোক। স্ট্রেঞ্জ… না?
- বাবাকে লক্ষ করেছ?… পুলিশের কথাগুলো কেমন নির্লিপ্ত ভাবে শুনছিল। ঘরে থেকেও নেই... 
- তোমার তাই মনে হচ্ছে?
- ধাক্কা তো একটা লেগেছেই...
- উনিও কনসার্ন্ড। একটা শকের মধ্যে আছেন। বয়স হয়েছে… অনেক কিছুই বলতে পারছেন না। 


কথার মাঝেই একটা খুট করে শব্দ হল। ছিটকিনি নামানোর মত শব্দ। রাতের নিস্তব্ধতা বলেই স্পষ্ট শোনা গেল। সন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল, শ্রেয়সীও সজাগ হয়ে তাকাল সন্তুর দিকে। সন্তুর বাঁ হাতটা আঁকড়ে ধরল অজানা ভয়ে। অথচ এই সামান্য খুট শব্দে ভয় পাওয়ার কথা নয়। ‘ও কিছু না, আমি দেখে আসছি’ বলে সন্তু মোবাইল ফোনের আলোটা জ্বালিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাবার ঘর অন্ধকার, আলো ফেলে দেখল বিছানায় কেউ নেই। বাথরুমেও কেউ নেই। একটা অন্য সম্ভাবনা মাথায় আসতেই… সন্তু আর দেরি না করে দ্রুত ছাদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। ছাদের দরজা খোলা। বাবা একা দাঁড়িয়ে আছেন ছাদের পাঁচিল ধরে… আকাশের দিকে তাকিয়ে। মেঘলা লালচে আকাশ। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে ঘোলাটে চাঁদ। সন্তু ছাদে আসতেই উনি যেন বুঝতে পারলেন… পেছন ফিরে তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর বললেন– ‘তোর মা সেদিন দুপুরে বলেছিল, কী একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করার আছে। কী নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিল বল তো?’

সন্তু অন্ধকারে বুঝতে পারল না, কথা বলার সময়ে শ্যামলবাবুর আবার চোখের পাতা কাঁপছে। ও মোবাইল ফোনের আলোটা নীচের দিকে করে নিয়েছিল। কেউ যদি আবার বুঝতে পারে এত রাতে এদের বাড়ির কেউ ছাদে এসেছে… আর একটা সমস্যা হবে। ইচ্ছে হল একটা ধমক দিক বাবাকে, এত কিছুর পরেও এত রাতে আবার ছাদে এসে কেন বিপদ ডাকছে। কিন্তু বাবার গলার আওয়াজটা শুনে আর পারল না কড়া ভাবে কিছু বলতে। যতটা সম্ভব গলা খাদে নামিয়ে বলল ‘শরীর খারাপ করবে… প্লিজ, এমন করো না, এসো… নীচে চলো।’ শ্যামলবাবু এগিয়ে এসে ছেলের বাড়ানো হাতটা ধরে ছাদের দরজার দিকে দু-পা এগোলেন। তারপর আবার ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন– ‘পুলিশের লোকটা একটা কথা ঠিক বলেছে… আমরা কেউই অরুণাকে সেদিন সেই সময়টা দেখতে পেলাম না। কী আশ্চর্য! আসলে… আমরা কেউই, তোর মাকে কখনো দেখতে পাইনি। দেখতেই পাইনি… না রে?’


রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

অমর মিত্র

                    




মান্টো ও    মুক্তামালা  

    রেড ওয়াইন তৈরি হয় কালো  আঙুরের রস থেকে। অপূর্ব ! 

    

    তুমি খেয়েছ  বিরামদা ? 

   

  হুঁ। বিরাম সাহা ক্যামেরা তাক করতে করতে বলল। লেন্সের কেন্দ্রে মুক্তামালার মুখ। রাজকন্যার  মুখখানিতে এমন এক মায়া আছে, হাসি আছে, বিরাম ফোটোওয়ালা তা বেচতে পারে নানা কোম্পানিতে। বিজ্ঞাপন। সব  চুক্তিই  মুক্তার সঙ্গে হয়, কিন্তু ছবি এই ফোটোওয়ালার। একটা নতুন দেশি ওয়াইন নামছে বাজারে। তার বিজ্ঞাপন শুরু করবে কোম্পানি। করছে এক বিখ্যাত পরিচালক। নতুন ছবি আরম্ভের আগে এই কাজটি করতে চায়। বিজ্ঞাপন চিত্র করেন তিনি, শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টারি আর ফিচার ফিল্ম...সবই করেন। এক ঝসূত্রে বিরাম সাহার কাছে কয়েকটা মুখ চেয়েছেন তিনি। ্মুক্তা দীর্ঘাঙ্গী। পাঁচ ফুট চারের উপরে। অ্যাভ্যারেজ বাঙালি কন্যাদের চেয়ে বেশি। কিন্তু গায়ে মেদ জমছে। গড়নই অমন। কিছুই করার নেই। ও জানে  জিম করে ফিট রাখতে হবে নিজেকে। ফিট থাকলেই হলো।  আর সামান্য মেদ কমলে মুক্তা  পারবে। এখনো পারবে কয়েক বছর। কম বয়সেই  চোখে চশমা উঠেছে। চশমায় বয়স বেড়ে যায়, মুক্তারও বেড়েছে। অবশ্য চশমা তো ছবিতে থাকে না। অপূর্ব চোখ। চোখেই সে জয় করে নেয়। কোন দৃষ্টির কোন মেসেজ তা মুক্তা  জানে। বিরামকে শেখাতে হয় না কিসে বিস্ময়, কিসে মুগ্ধতা, কোন দৃষ্টিতে প্রেমের উদ্ভাস, কোন দৃষ্টি নির্মোহ। মুক্তা  জানে। অভিনেত্রী হতে চায়। কিন্তু সুযোগ করে নিতে পারছে না। বিরাম জানে পারবে। সময় একদিন আসবে। মুক্তা  বলে, হচ্ছে না গো ফোটোওয়ালা, হচ্ছে না, কেন যে হচ্ছে না, বলতে পারব না।

     

 অনেকদিন বাদে এসেছে মুক্তা। বিরাম ডেকেছিল। ভালো পরিচালক। লেগে গেলে মুক্তার দাম বাড়বে। বিজ্ঞাপনের নারী থিয়েটারেও সুযোগ পাবে। সিনেমা, সিরিয়ালেও।  ্মুক্তার  লক্ষ্যই  মেগা সিরিয়াল। সিনেমা। মেগা সিরিয়ালে লোকে চেনে বেশি। একটি দুটিতে অপ্রধান চরিত্র করেছে। সে চায় প্রধান চরিত্র।  ঘুরছে, খুব ঘুরছে। স্টুডিও পাড়ায় ঘোরার শেষ নেই। বসে বসে ফিরে আসে। অডিশন নেয়, ছোট চরিত্রে সুযোগ হয়। বিরাম একদিন বলেছিল, সেদিন একটা খবর দেখলাম, মেগা সিরিয়ালের।

     

 কী খবর ফোটোওয়ালা ?


এক পরিচালক কী বলেছে নতুন অ্যাকট্রেসকে।

  

ওয়ান নাইট বেড শেয়ার ?


 হুঁ। বিরাম ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে নিল। থাক ক্যামেরা। অনেকদিন বাদে এল, গল্প করবে আজ। আজ তো ফোটোশ্যুট হবে না।

      

রোল না পেলে অনেকে এমন বলে ফোটোওয়ালা।

     

সত্যি না?

     

 সত্যি কি সত্যি না কে বলবে বলো।

 

 তোমার কী মনে হয়?


কিছুই মনে হয় না বিরামদা, মনে করে লাভ কী, আমাকে কাজ পেতে হবে, মডেলিঙ তো বড়জোর ২৮-৩০ অবধি, এখন হাই টাইম, যেভাবে হোক আমাকে আমার কেরিয়ার করতে হবে, জানি না কীভাবে। 

      

এখন তার সামনে বসে আছে ২৫ প্লাস। মনে হয় ২০-২১। মুক্তার মুখের ভিতরে বিরাম সাহা কোন এক অভিনেত্রীর ছায়া দেখতে পায়। রাজশ্রী। কয়েকটি ছবি করে আমেরিকা চলে গিয়েছিল। আর ফেরেনি সিনেমায়। ব্রহ্মচারী। শাম্মি কাপুর ও রাজশ্রী। সেই যে অনাথ শিশুদের সঙ্গী  ব্রহ্মচারী শাম্মি কাপুর নিয়ে এল ক্ষুধার্ত রাজশ্রীকে। আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল সে সমুদ্রে। সেই রকম, ঠিক সেই রকম। যেমন কোমল, পবিত্র তেমন আকর্ষণীয়, বিষাদময়ী, যৌন আবেদনে ভরা সেই রাজশ্রী। অসম্ভব ভালো নাচতে পারত। পাগল শাম্মি কাপুরের সঙ্গে পাগলিনী হয়ে অভিনয় করেছিল।  একটা গান ছিল চাক্কা মে চাক্কা, চাক্কে সে গাড়ি, গাড়ি সে নিকলি, আপনে সওয়ারি...।  অনাথ শিশুরা আর সেই দুজনের কথা মনে পড়ে তনিমাকে দেখলে। সত্যিই কি মুক্তা  রাজশ্রীর মতো? ঠিক মনে নেই। ইউ টিউবে দেখে সে বলেছিল একদম না। একদম না। 


না কেন ? 


আমি ঐ রকমই না।   


তা হবে কেন, তুমি তোমার মতো।


মুক্তামালা  বলেছিল, ফোটো-আঙ্কেল আমার পছন্দ মহুয়া রায়চৌধুরী। 


আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল। তা কি জানে মুক্তা ?  তার জন্মের আগের ঘটনা। মহুয়া কেন রাজশ্রীও তো অনেক আগের। অনেক অনেক। এখন সে বেঁচে আছে না নেই, তা জানে না বিরাম সাহা। শাম্মি কাপুর নেই। কাপুর পরিবারের সেই প্রজন্মের কেউ নেই, রাজ কাপুর, শশী কাপুর, শাম্মি কাপুর। এঁদের বাবা ছিলেন পৃথ্বিরাজ কাপুর। কাপুর পরিবার শাখায় প্রশাখা অনেক। প্রায় সকলেই সিনেমায় জড়িয়ে আছে। পুত্র, পুত্রবধূ...। মহুয়া রায়চৌধুরীর সিনেমা দেখেছে তনিমা ইউ টিউবে। মহুয়ার কথা বললে বিরাম সাহার মনে পড়ল রত্না ঘোষালের কথা। একেবারে আটপৌরে মেয়ে। পাশের ফ্ল্যাটের মেয়ে। রত্না ঘোষালের নাম কি মুক্তা  শুনেছে ?  মুক্তা  হেসে বলল, না গো ফোটোওয়ালা।

 

 ফোটোওয়ালা বলল, সে রত্না ঘোষালের স্টিল ফোটো তুলেছিল একবার। ছবির নামটি ভুলে গেছে। রত্না ঘোষালের কথা সেদিন আচমকা মনে পড়তে ইউ টিউবে খুঁজেছিল। এখন তিনি প্রায় বৃদ্ধা। উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয়ের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ধরেছিলেন। সুপ্রিয়া চৌধুরীর কথা বলছিলেন।  সেই আটপৌরে ভাবটি আছে বটে, কিন্তু এও বেশি মনে হয়েছিল বড় বেশি আটপৌরে। সে তো সকলেই তা হয়ে যান বয়সকালে। মুক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে বিরাম সাহার মনে এল প্রবীণা অভিনেত্রীর কথা। আজ থেকে তিরিশ, চল্লিশ বছর বাদে ্মুক্তার চেহারাটি বিরাম যেন দেখতে পায়। ভারি শরীর, ভারি মুখ, গোলগাল এক ঘরোয়া মহিলা। মহুয়ার তা হয়নি। মহুয়া মরে গেছে তার রূপ নিয়েই। মুক্তা  ভেবেছে ঐ চিরকালের রূপ নিয়েই জীবন কাটাবে। মধুবালা মারা গিয়েছিল রূপ নিয়ে। মুক্তার পছন্দ মধুবালাও। একদিন বলেছিল মধুবালার কথা। আজ বলছে মহুয়ার কথা। 

 

মুক্তামালা শ্বাস নিতে নিতে ক্লান্তির স্বরজড়িয়ে  বলল, ফোটোওয়ালা আমি কি পারব ?


কী পারবি ?


মহুয়া বা মধুবালার মতো ? মুক্তামালা পা ছড়িয়ে দিয়েছে কারপেটের উপর। নীল রঙের কুর্তি ও ঢোলা পায়জামা, একই রঙের। কানে নীল বিন্দু।  নাকে নীল নথ। কপালে নীল টিপ। নীল রিবনে চুলের গোছ  বাঁধা। সব রঙ মিলিয়ে পরা। মুক্তামালার দিকে তাকিয়ে ছিল বিরাম। মুক্তামালা হেসে  জিজ্ঞেস করে, কী দেখছ গো ফোটোওয়ালা ? 

বিরাম বলল, দেখছি কোন অ্যাঙ্গেলে কেমন তুই।


ইসস, দ্যাখোনি যেন,  তোমার চোখ কি ক্যামেরা ? 


তাইই।


মুক্তা বলল, ‘না, তোমার চোখে পুরুষ মানুষ।’


খুব সাহস এই মেয়ের। একদিন ফোটোশ্যুট হলো একটু খোলামেলা, জিন্সের শরটস আর শ্লিভ্লেস  টি শার্ট, উদ্ধত ছবি,  জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা আমার যদি বিয়ে হয়ে যায়, তুমি খুশি হবে ফোটোদাদা ? 


অখুশি হব কেন ? শান্ত গলায় বলেছিল বিরাম।


আমার তো আর মডেলিং হবে না।


হুঁ। বিরাম অস্ফুট উত্তর দিয়েছিল। 


হিহি করে হেসেছিল মেয়ে, তুমি আর আমাকে দেখতে পাবে না, আমি হয়ত  ইউ, এস কিংবা ইউ কে চলে যাব, তুমি মন খারাপ করে বসে থাকবে, ইউ আর দ্য অনলি পারসন হু ক্যান সি মায় বিউটি  ইন সাচ আ ক্লোজ ডোর রুম। 


বিরামের কান গরম হয়ে গিয়েছিল, কী সোজা কথাই না বলতে জানে মুক্তামালা,  একটু সময় নিয়ে বলেছিল, বলতে পারছি না কিছুই।  


কী চুপ করে আছ কেন, ক্যামেরার লেন্স আমি চিনি ফোটোওয়ালা, তোমার চোখও লেন্স। 


বুক ধক করে ওঠে বিরামের। সে এখন মধ্য পঞ্চাশ। তার মাথা ভরা চুল। লম্বায় সে প্রায় ছ’ফুট। শীর্ণকায়। তবে প্রশস্ত বুক তার। চোখে চশমা নেই। পড়ার সময় লাগে। এই মেয়ে  এসেছিল তার ঠাকুরদার সঙ্গে। বৃদ্ধ তখন সত্তর। সবে  আঠের। সবে কলেজের প্রথম বর্ষ। ছবি দরকার ছিল মুক্তারই। পাশপোরট সাইজ। দেখে অবাক হয়েছিল বিরাম। একেবারে প্রস্ফূটিত ফুল। বিরাম এইটুকু ভাবতে পারে। কবি হলে অনেক রকম উপমা দিতে পারত। তার সে ক্ষমতা নেই। একজন উলুঝুলু চুলের বছর  চল্লিশের মানুষ এসেছিল সেই সময়, জানত অধ্যাপক, ‘প্রফেসর’। জ্ঞানী। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল বিরাম, আচ্ছা স্যার, ফিমেলের বিউটি কী রকম বলা যায়, সুন্দরী মেয়ে ?


লোকটি অবাক হয়ে তাকে দেখেছিল, কেন বলুন তো ? 


বিরাম বলেছিল কত মেয়েদের ছবি, ভালো ক্যাপসন যদি লিখে ডিসপ্লে করি, স্টুডিওর নাম হবে।


লোকটা বলেছিল, কী বলল তা বুঝতে পারেনি বিরাম। সংস্কৃত। তখন লোকটা বলেছিল খাতা দিন।

খাতায় লিখে দিয়েছিল যা, তা এখনো বিরামের কাছে রয়েছে…


                                   হিরক দশনা তন্বী, পক্ক বিম্বাধরা

                               শ্যামা, আর সুদন্তিনী নিম্ননাভি ক্ষীণমধ্যা,

                                   চকিত হরিণী প্রায় চঞ্চল নয়না

                                   নিবিড় নিতম্বভরে  মন্থর গমনা

                                   স্তনভরে আছে দেহ স্তোকন্ম্রা হয়ে

 

আরো বিবরণ দিয়েছিল লোকটি।  মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতম কাব্যের শ্লোক, বাংলা করেছে সে নাকি। কিন্তু ঐ শ্লোক লিখে ছবি ডিসপ্লে করলে স্টুডিও উঠে যেত। শুধু একটি লাইন নিয়েছিল সে। বড় ভালো লেগেছিল, ‘ চকিত হরিণী প্রায় চঞ্চল নয়না’। এই মেয়ের মুখের ছবি তার শো কেসে জ্বলজ্বল করছে।  এখনো আছে। তার ঠাকুরদাকে বলেছিল, এমন সুন্দর মুখ, ছবি তুলব...।

 

  তারপর মুক্তার বাবা এল একদিন সঙ্গে। মেয়ের রূপ আছে, মেয়ে কি মডেলিং করবে ? বাবা মানুষটি হ্যাঁ করেছিল। তাঁরও প্যাশন ছবি তোলা। তবে একেবারে এমেচার। বললেন, আমাকেও ফোটো তোলা শিখিয়ে দেবেন।

    

শেখাতে হয় নাকি, তুলতে তুলতে হবে।

    

সেই তপন কুণ্ডু  ছবি তুলত আর তার কাছে নিয়ে আসত। একবার উড়ন্ত পাখির ছবি তুলল। একবার গঙ্গার ঘাটের ছবি। জলে ঝাঁপিয়েছে দুরন্ত বালক। উড়ন্ত বালক। বিরাম বলেছিল, শিখে গেছেন আপনি। আসলে শেখেনি নতুন করে, জানত। তপন কুণ্ডু বলেছিল, দেখুন, ওর খুব ইচ্ছে অভিনয় করবে। বিরাম বলল, তুই কি প্রেম করছিস ?


হঠাৎ এ কথা?


আর আসিস না, মাঝখানে তোকে ফোনেও পাইনি।


ব্যস্ত ছিলাম, তোমার কল দেখেছিলাম, কিন্তু...।


মডেলিং করতে বারণ করেছে সে ?


আমি কারো প্রেমে পড়তে পারি না ফোটোওয়ালা, একজন হয়েছিল ছ-মাস, কিন্তু তার জন্য মন উতলা হয় না কেন জানি না, সাতদিন দলে আসেনি, আমি একটি ফোনও করিনি।


কেন, করিসনি কেন ? 


সে যে আসছে না, তা আমার মনেই আসেনি, তখন খুব রিহার্সাল চলছিল, তার  ইনফ্লুয়েঞ্জা  হয়েছিল। 


একে প্রেম বলে না। বিরাম বলল।


বলে আঙ্কেল, তাকে দেখা মাত্র তাকে মনে পড়ে গেল, আবেগ উথলে উঠল, মনে হলো ভুলে ছিলাম কী করে অনিন্দ্যকে?


ফোটোশ্যুট করবি তো, পাঠাতে হবে সেই পরিচালককে।


তাঁর সঙ্গে দেখা করলেই তো হয়। বলল  সুপ্তি।


না, তিনি কয়েকজনকে নির্বাচন করে ডাকবেন। 

কেমন ফোটো, একরাশ  গয়না পরে, মাথায় কাপড়  বউ ? জিজ্ঞেস করল সুপ্তি।

 

না, আটপৌরে কিন্তু সুন্দর, ওয়াইন হয়, আবার হয় না।


সে আবার  কেমন, এই তো আমি আটপৌরে হয়েই এসেছি, মহুয়া মহুয়া লাগছে না ? 


তুই আজ নীল মুক্তাপরী, কী সুন্দর যে হয়েছিস।


কী যে বলো তুমি  ফোটোওয়ালা! মুখ ঘোরায় মুক্তামালা।  বিরাম সাহার ক্যামেরা চোখ। শাটার মারল। ঝলক। মুখ তুলল মেয়ে, হাসল, কী ছবি তুললে ?


এমনি, সাইড থেকে, স্বাভাবিক। 


মুক্তা বলল, কিছু তো হচ্ছে না ফোটোওয়ালা। 


হবে, অপেক্ষা করতে হয়।


চুপ করে থাকে মুক্তা, তারপর বলল,  কতদিন, মডেলিঙের ডাকও তো তেমন হয় না, আমি আর করব না।


বিরাম সাহা ভাবছিল কত ছবি তুলেছে এই মেয়ের। এর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন হয়েছিল। চশমা কোম্পানি। তারপর হলো থিয়েটার আর সিনেমার আকাঙ্ক্ষ্যা। সাধ পূরণ হচ্ছে না সেখানে। শাড়ির বিজ্ঞাপনে ডাক পেয়েছিল। করেছিল। একবার মাত্র। তারপর আরো পেয়েছিল। কিন্তু পিছিয়ে এসেছে। সাহসী ছবি। সাহসী ছবি তুলেছে বিরাম। আবার মুছে ফেলেছে ওকে দিয়ে। ওর নিজের কাছে আছে হয়তো। কিংবা মুছে দিয়েছে। বিরাম বলল, কথা বলছিস না যে?


হবে না।


কী হবে না?


হবে না ফোটোওয়ালা, আমাকে কেউ নেবে না। বিমর্ষ গলায় বলল মুক্তামালা।


নেবে, নেবে, আজই তুলে নিই ছবি, পরে কবে আসবি, জানি না।


বিরাম সাহা ভাবছিল ভাগ্যে হয় অনেক কিছু। এমন মুখ, এমন চঞ্চল হরিণীর মতো চোখ, পক্ক বিম্বাধরোষ্ট, স্তনভারে স্তোকনম্রা...তিনি যা লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন, সব মিলে যায়। বিরাম যেমন বলেছে তেমন ছবি তুলেছে। তুলে নিজেকে দেখে বলেছে মুছে দি, ক্যামেরা দাও। 


তাহলে যে তুললি ?


দেখছি ওই সব প্লে-বয় ম্যাগাজিনে আমি মানাব কি না, আমাদের এখানে ওসব হয় না,  আমি কী করতে পারব জানি না। 


বিরাম সাহার কথায় এই মেয়ে সেজেছে, সাজ খুলেছে। পোশাক পরেছে, আবার অনাবৃত হয়েছে। বিরাম সাহা কি চঞ্চল হয় নি? হয়েছে। মুক্তা একদিন আচমকা  বলেছিল, আমি জানি।


কী জানিস ?


তুমি আমাকে ভালোবেসেছ। সে কথাটা যেন ভাসিয়ে দিয়েছিল বাতাসে।


না। বিরাম প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুক্তা  তার অস্বীকার মানেইনি। বলেছিল, তুমি ভীরু মানুষ, ভাবছ তোমার পেশা নষ্ট হয়ে যাবে, তুমি খুব ভালো গো, ভালো মানুষ। 


বিরাম বলেছিল, তুই তো আমার সন্তানের মতো।


মিথ্যে বলো না ফোটোওয়ালা, তুমি আমাকে ডেকেছ কেন ? মুক্তামালা  ঘাড় তুলে জিজ্ঞেস করল। 


পুরোন কথার সঙ্গে নতুন কথা মিশে গেল, বিরাম বলল, বললাম তো।


না, পরিচালকের কাছে পাঠানর মতো ছবি কি তোমার স্টকে নেই, কম্পিউটারে ? নীলনয়ন নয়, ঈষৎ বাদামি এই মেয়ের চোখে মণি। আর সেই বাদামি চোখেই যত টান বিরাম সাহার। বিরাম ভেবেছিল অনেক দূর যাবে মুক্তামালা। কিন্তু পারছে না। বিরাম একটি ম্যাজিকের জন্য অপেক্ষা করছে। ম্যাজিক হয়ে যায়। আচমকা বড় একটা সুযোগ এসে যাবে।  এসে যাবেই।


 তুমি ডেকেছ কেন ? জিজ্ঞেস করল মুক্তা। 


তুই এলি কেন ? বিরাম পাল্টা জিজ্ঞেস করল। 


বাহ, ডাকলে আসব না ? 


অনেকদিন তোর ছবি তুলিনি, তাই।


তাহলে সিনেমার পরিচালক মিথ্যে ?


মিথ্যে না, সত্যিই ওয়াইনের জন্য শর্টফিল্ম,  কথা হয়েছে  আমি তার ফিচার ফিল্মের  স্টিল তুলব, অনেকদিন বাদে সুযোগ এসেছে, তোর স্টিল পাঠাব, সে আমার স্টিল ফোটোগ্রাফি চেয়েছে, দ্যাখ একে একে দুই হয়ে যাবে। বিরাম বলল। 


তার মানে আমার জন্য নয় ? প্রায় হিসহিস করে উঠল মুক্তা।


আমার কাছে কত স্টিল আছে, তা থেকেই দিতে পারতাম, তোরটা দেব কেন তাহলে ?


উফ, ফোটোওয়ালা, তুমি কি না আমার কাছে লুকোচ্ছ !


বিরাম সাহা দেখল মুক্তোমালার নাসারন্ধ্র স্ফূরিত হয়ে উঠেছে। চোখের মণিতে আগুনে ভাব এসে গেছে। সে ভাবল এই মুহূর্তের ছবিটি যদি...। ক্যামেরা তাক করতেই দুহাতে মুখ ঢাকল। সেই ছবিই তুলে নিল বিরাম। তখন মুক্তোমালা বলল, ডিলিট দ্যাট পিকচার ছবিওয়ালা, আই সে ডিলিট...।

বিরাম দেখল ছবিটি। খুব ভালো উঠেছে। দারুণ। ছবিটি তার জন্য ভালো, আবার মুক্তোর জন্যও। অদ্ভুত অভিব্যক্তি। মহুয়া। মহুয়ার কথা মনে পড়ে গেল বিরামের। সে বলল, মহুয়া রায়চৌধুরী, তোর প্রিয় অভিনেত্রী, তার মতো।


মুক্তামালা বলল, না মধুবালা।


এই দেখে যা। 


তুমি এস, দেখাও। তাকে যেন আদেশ করল মুক্তামালা। ঠোঁট চেপে হাসছে। বাদামি চোখের মণি ঘুরছে। বিরাম এগিয়ে গেল ক্যামেরা নিয়ে, ঝুঁকে পড়ল মুক্তার দিকে। সে বসেই আছে। এমনি মেজাজ এই মেয়ের। দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে মাথা তুলে, হাঁসের মতো দেখল তাকে। হাসল, বলল, ভালো হয়েছে, মহুয়ার মতো, মাই ফেবারিট অ্যাকট্রেস।


তুই আবার আসবি কবে ?


রিহার্সাল হচ্ছে, অনেক কাজ, নতুন নাটক নামবে।


তাহলে আজ, আজই করে যা।


হবে বলে এসেছি, অনেক সময় নিয়ে এসেছি। 


হবে, সালোয়ার কামিজ বদলে নে, আটপৌরে শাড়ি আছে…, লকার দেখে নে। 


হু জানি। বলল মুক্তামালা।


আছে, আমি কাচিয়ে রেখে দিয়েছিলাম, গতকাল লকার দেখেছি, জানি তুই একদিনের বদলে দুদিন আসবি না। 


হাসল মুক্তামালা, তুমি সব জেনে বসে আছ, হ্যাঁ, জানোই তো, ইয়েস জানো, ইউ ওল্ড ম্যান, তোমাকে না…, কিন্তু তুমি আমার লকার খুলেছ, কেন খুললে ?


কথায় শিহরিত হয় বিরাম সাহা,গা ছমছম করে, তারপর ধীরে ধীরে বলে,  তোর লকার না খুললে আমি শাড়ি  কাচতে দিতাম কী করে ? তুই সেই পুজোর আগে এসেছিলি, তারপর এই। মাঝখানে লম্বা শীত গেল। তুই ফোনই ধরার সময় পাসনি।


শীতে শো থাকে বেশি, আর একবার ডুয়ারস, একবার সিকিম গেলাম, রেড ওয়াইন আমি খেয়েছি, নাইস, শীতের সময় উত্তাপ দেয় ছবিওয়ালা, কিন্তু ওয়াইনের বিজ্ঞাপন আটপৌরে হবে কেন ?


জানি না, তোর ফিল্মের কথা ভেবেছি আমি, হবে কি না জানি না।


হবে না।


কিন্তু চেষ্টা করতে হবে ?


হ্যাঁ, দেখ পার কি না।


ভিতরে ঢুকে গেল মুক্তামালা। পোশাক বদল করবে। তারপর সময় গেল। মহুয়া রায়চৌধুরী হয়ে আসবে মুক্তামালা। সমস্ত ফ্ল্যাট কুকিং গ্যাসে ভরে গিয়েছিল। মহুয়া অকালে ঝরে গেল। মধুবালার হৃদপিণ্ডে ছিদ্র ছিল, অকালে ঝরে গেল। অপেক্ষা করছে বিরাম। মেয়েটা অদ্ভুত, বলেছিল, তোমায় না, একদিন আমি…, একদিন হোয়াটস আপে লিখেছিল, আই রেসপেক্ট ইউ ফোটোওয়ালা, কিস ইউ ফোটোওয়ালা, তুমি অনেকদিন বেঁচে থেক, অনেকদিন, আমি বুড়ি হয়ে গেলেও তুমি ছবি তুলে দেবে। 


পাগল নাকি তুই।


ইয়েস ফোটোওয়ালা। গুড নাইট। আমি এখন পড়ব, রাতে আমি বই পড়ি, মান্টোর নাম শুনেছ  ফোটোওয়ালা ?


না, কে মান্টো ?


সআদত হোসেন মান্টো, উর্দু লেখক, পাকিস্তানে গিয়ে লেখার জন্য  জেল খেটেছিলেন, মুম্বইয়ে থাকতেন।


জানি না, আমি মুম্বইয়ের  রাধু কর্মকারকে দেখেছিলাম, আর কী যেন মিস্ত্রি, বড় সিনেমাটোগ্রাফার, মনে নেই, ভেবেছিলাম মিঠুনের মতো বোম্বে মানে মুম্বই চলে যাব, সাহস হয়নি। 


 শাড়ি নয়, অদ্ভুত এক  কালো শালোয়ার পরে এল মুক্তামালা। কোথায় পেল? লকারে তো ছিল না। ছিল শাড়ি ব্লাউজ শায়া একসেট। আর লাল হলুদ সিল্ক। কালো শালোয়ার কোথা থেকে এল ?  কালো শালোয়ারের একটা গল্প শুনেছিল বিরাম। বলেছিল এই মুক্তা। কেন বলেছিল মনে নেই।  মনে সম্পূর্ণ কালোয় তার আপত্তি ছিল, কিন্তু মুক্তা বলেছিল, আমার কিছুই হবে না ফোটোওয়ালা,  আমি সেই মেয়েটা হব ছবিওয়ালা।  সে এক ভয়ানক কষ্টের  গল্প। স্বাধীনতার সময়ের গল্প। মুক্তামালা এসে বলল, তোলো ছবি, ব্ল্যাক শালোয়ার, কালি শালোয়ার।


কালো শালোয়ার এবং মাথায় ওড়না জড়ান মুক্তামালা। এই ছবি তুলবে কেন মুক্তামালার। শোকের পোশাক। সব কালো। মুসলমান, খ্রিস্টান মেয়েদের শোক। তুই এইটা পরবি কেন রে। এই ছবি কি ওয়াইনের বিজ্ঞাপনে যায়? তুমুল গোলমাল আরম্ভ হয়ে যাবে।


মুক্তামালা বলল, ছবি তুলে দাও, আমি এসেছি ঐ জন্য, আমার দরকারে এসেছি, আমরা  আমাদের বিজ্ঞাপন করব, ফ্লেক্সে  শহর ভরিয়ে দেব, “ আমাকে আমার দেশ দাও…,”  দিস ইজ দ্য মোমেন্ট...। হাত বাড়িয়ে আছে মুক্তামালা। মাথায় কালো ওড়না। ও এসেছে ঐ ছবি দিয়ে শহর ঘিরবে বলে। আজ মিছিলে যাবে। মিছিলে। মেয়েরা মিছিল করবে। সন্তান কোলে মা থাকবে, পুত্রীর হাত ধরে নানি, দাদি, সকলে কালো শালোয়ার পরে। ফোটোওয়ালা আমি থিয়েটার করি,  মডেলিং করি, মনে রেখ, আয়াম অ্যান আরটিস্ট, শিল্পীর দায় নেই ? এইটা হবে কালি ওয়াইনের বিজ্ঞাপন, আমার সন্তানকে দেশ দাও, ও মিঃ বিরাম সাহা, শুনছ!