অনুবাদ সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনুবাদ সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

জয়া চৌধুরী

                           




Carta a dos desconocidas দুজন অচেনা মানুষকে লেখা চিঠি /  Octavio Paz ওক্তাভিও পাস/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

এখনও জানি না তোমার কী নাম। তোমাকে এত কাছের মনে হয় যে কোনো একটা নামে তোমাকে ডাকা যেন আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার মত মনে হয়। যে অক্ষর সাজিয়ে আমার নাম তৈরী হয় তার সারাংশ-র চেয়ে তুমি যেন একদম আলাদা… এমনটাই টের পাই। বরং ওর নাম আমি চিনি, বড় বেশিই চিনি, এবং আমাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য ও নমনীয় দেয়ালের মত ওই নাম কতদূর অবধি যেতে পারে তাও জানি। 

এসব কিছু তোমার কাছে নিশ্চয় ধাঁধার মত লাগছে। তোমাকে ব্যাখ্যা করে বলতে চাইছি ওকে কী ভাবে চিনলাম, তোমার উপস্থিতি সম্বন্ধে কীভাবে সজাগ করেছি ওকে, এবং কেনই বা তুমি এবং ও দুজনে একই রকম আবার একরকম নয়ও বটে। 

প্রথমবারের কথা মনে পড়ে না আমার। আমার সঙ্গেই জন্মেছিলে নাকী সেই প্রথম দেখা হওয়ার বিষয়টা এত পুরনো যে সেটা আমার ভেতরেই পরিণত হওয়ার এবং প্রোথিত হয় যেন, সেটুকু সময় ছিল তোমার কাছে। 

আমার ভেতরে দ্রবীভূত থাকো তুমি। অন্দরের বাকীটুকুর থেকে কিচ্ছুই তোমাকে পৃথক করতে, তোমাকে স্মরণ করতে, তোমায় নতুন করে চিনতে অনুমতি দেবে না। কিন্তু নৈঃশব্দ্যের দেয়াল  দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কাল ভাবনার পথ রুদ্ধ করে রাখে। নাভি থেকে কপাল পর্যন্ত বেয়ে ওঠে এক বর্ণনাতীত তরঙ্গ। শূন্যের সে তরঙ্গ এবং সেখানেই তা থেকে যায় এক আকাঙ্ক্ষা হয়ে যা সন্তুষ্টি আনে না। একপ্রকার দণ্ডাজ্ঞা যা টলে না। এক অদৃশ্য বোধগম্যতা যা কখনও কখনও খুলে যায় আমার সামনে। অনুপস্থিতির এক বিরাট মাতৃমুখ- এক জৃম্ভণরত যোনি। আমাকে গিলে ফেলে, গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করে, এবং বহিষ্কার করে- নির্দিষ্ট সময়ে; পুনর্বারও ঠিক সেই একই সময়ে। মাথা ঘোরানো এবং বমি আমায় যা প্রতিবার নিচে ছুঁড়ে দেয়। চোখের আন্দাজ অনুযায়ী প্রতিটি কন্ঠস্বর মিনারের ওই উঁচু স্তর থেকে চেয়ে থাকে আমার দিকে, আমার নিজের চোখদুটিও তাই… সবকিছু শেষ পর্যন্ত আমাকে যা শেখানো হয়েছে যে আমি এক অনুপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই নই। এই-ই প্রকাশিত হয়েছে আমার কাছে, এই-ই উন্মুক্ত করে দিত – কীভাবে যে বলব? - তোমার উপস্থিতি। তুমি আমার ভেতরে সেই যে অপ্রতিরোধ্য গিঁটগুলি মত বসবাস করতে তা মসৃণভাবে সরে যায় সূক্ষ্ম যান্ত্রিকতায়। এবং তুমি যদি এগিয়ে যেতে বাধা না দিয়ে থাকো, ওরা ওকে উন্মত্ত করে তোলে যতক্ষণে না এর কলকব্জা ক্ষয় হয়।

দ্বিতীয় দফাঃ একদিন তুমি আমার মাংস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলে। সাদা পোশাক পরা এক দীর্ঘকায়া স্বর্ণকেশীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে, এক ছো্ট জেটিতে সে হাসিমুখে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল।  মনে পড়ে চকচকে কালো কাঠ, ধূসর জল ওর পায়ের কাছে খেলা করছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ মাস্তুল, পাল, নৌকো, পাখি ও সামুদ্রিক পাখিরা কিচিরমিচির করছিল। তোমার পিছু পিছু গিয়ে সেই নাম না জানা মেয়েটির কাছে গেলাম। কোনো কথা না বলে আমার হাতখানি ধরল সে। নির্জন বালুভূমিতে হাতে হাত ধরে দুজনে দৌড়েছিলাম যতক্ষণ না পাহাড়ের কাছে পৌঁছই। সমুদ্র ঘুমোচ্ছিল। ওখানে গান গাইলাম, নাচলাম। ওখানেই কোন এক ভাষায় ঈশ্বরের নিন্দা করলাম। এখন সে ভাষা ভুলে গিয়েছি। আমার বান্ধবী প্রথমে হাসছিল- পরে কাঁদতে শুরু করল। শেষে পালিয়ে গেল। প্রকৃতি আমার চ্যালেঞ্জের সামনে অত নির্মম ছিল না। সমুদ্র যখন তার হাত মুঠো করে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল, সূর্য তখন ঠিক উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে সরল পথে নেমে আসছিল আমার দিকে। নক্ষত্র যখন আমার রুক্ষ মাথায় থাবা বসাল, আমায় পুড়িয়ে দিতে শুরু করল। তারপরে নিজের শৃঙ্খলা পুনস্থাপন করল। সূর্য তার নিজের জায়গায় ফিরে গেল অস্তে, সমস্ত চরাচর অসম্ভব একলা হয়ে গেল।  পাথরের ফাঁকে, ওই যেখানে পাখিরা তাদের ছোট্ট ছোট্ট ডিম লুকিয়ে রেখেছিল, সেখানে আমার ছাই খুঁজেছিল বান্ধবী।    

সেইদিন থেকে ওর পিছু পিছু যাই আমি। (এখন বুঝি আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম)। বহু বছর পরে, অন্য কোন দেশে কোন এক মন্দিরের লাল দেয়ালগুলো গোধূলির আলোকে যখন গিলে ফেলছিল, সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে ফের ওকে দেখলাম। ওকে আটকালাম, কিন্তু আমায় ও চিনতে পারল না। যাতে ও টের না পায় তেমন এক কৌশলে নিজেকে পালটে ফেললাম ওর ছায়ায়। সেদিন থেকে ওকে ফেলে যাই নি কোথাও। বছরের পর বছর মাসের পর মাস, নৃশংস মুহূর্তগুলোয় লড়েছি, ওর ভেতরে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি আমাদের সেই প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি। ব্যর্থ চেষ্টা করেছি বোঝাতে কীভাবে ওর ভেতরে বাস করতে চেয়ে তুমি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে আমার থেকে। সমুদ্রের ধারে আমাদের একসাথে হাঁটা, আমার বীভৎস বোকামি। তুমি আমার কাছে যতখানি ছিলে আমি ওর কাছে ঠিক ততখানি বিস্মৃতি। 

জীবন খরচ করে ফেলেছি তোমাকে ভুলতে চেয়ে, তোমায় মনে করতে চেয়ে। তোমার কাছে থেকে পালাতে চেয়ে এবং তোমাকেই অনুসরণ করতে গিয়ে। যখন ছোট ছিলাম তোমাকে আবিষ্কার করেছিল সদ্য বৃষ্টি ধোঁয়া এক বাগানের ছোট্ট পুকুরে তখন যেমন ছিলাম এখনও ততখানি একলা। যখন বয়ঃসন্ধি তোমাকে দুটি ভাঙা মেঘের ফাঁকে দেখেছিলাম, এক বিকেলে ধংসের ভেতরে। তখন যেমন ছিলাম এখনও ঠিক ততখানি একলা। কিন্তু আমার নিজস্ব তুরপুনে আমি পড়ব না। অন্য শরীরে গাঁথব। অন্য কোন চোখে যা প্রসারিত এবং সংকুচিত হয়, আমাকে গ্রাস করে, আমায় অবহেলা করে, এক কালো উন্মোচন আমায় স্পন্দিত করে, জীবন্ত প্রবাল যেন, শীতল ক্ষতের মত লোভী। শরীর যেখানে হারিয়ে ফেলি শরীর, অনন্ত শরীর। কখনও যদি আমার পতন শেষ হয়, ওখানে, পতনের ওই অন্য প্রান্তে, হয়ত জীবন আমার দিকে উঁকি দেবে। এক সত্য জীবনে। যেখানে রাত কিংবা দিন কোনটাই নয়, সময় ও উসময় কিছুই নেই, স্থাবর ও জঙ্গম কোনটাই নয়, জীবনের এক ফুটন্ত প্রাণ, এক বিশুদ্ধ প্রাণ। তবে হয়ত এসব কিছুই মৃত্যুকে আহ্বান করার এক পুরনো ধরন হতে পারে। যে মৃত্যু আমার জন্মের সঙ্গেই জন্মেছিল, যা অন্য শরীরে বাস করতে আমার শরীরে ছেড়ে চলে গিয়েছে। 

শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

শ্যামলী সেনগুপ্ত

                             


                    চোখ
                            মূল গল্প : ওড়িআ
                              লেখক  : গায়ত্রী সরাফ
                             অনুবাদ  : শ্যামলী সেনগুপ্ত

           সবকিছু দেখতে পাচ্ছি কিন্তু অস্পষ্ট।
            খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখলেও বুঝতে পারছি না জিনিসটা কী?এমনকি আমার চারদিকে ঘিরে আছেন যারা,আমার দেখাশোনা করছেন,তাদের মুখগুলিও ঝাপসা লাগছে।ভুল,ওই মুখগুলিও নয়,ভুল,আমার চোখের।সময়ের বয়স্ক আদর আমার শরীরে বার্ধক্য এনে দিয়েছে। সারা শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে।শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় বাতাস ঝড়ের মতো ঢোকে আর বেরোয়।বেরনোর সময়  সমগ্র সত্তাকে জোর ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। শরীর বলতে এখন শুধুই যন্ত্রণা উপলব্ধি করি।যন্ত্রণা আর মৃত্যু  আমার কাছে এখন একটা রুপোর কয়েনের এ পিঠ আর ও পিঠ।ধুকপুক করতে থাকা প্রাণীটি এখনও স্বপ্ন দেখে।
        নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠেছিলাম অসহ্য যন্ত্রণায়।হঠাৎ অস্পষ্ট দেখতে পেলাম সাদা পোশাক পরিহিত কেউ একজন আমাকে ইঞ্জেকশন দিচ্ছে। নিশ্চয়ই একজন নার্স।ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরে তিনি জানতে চাইলেন,
      স্যার,এখন কেমন লাগছে?
      খুব কষ্ট হচ্ছে।
       ইঞ্জেকশন দিয়েছি তো,ভালো লাগবে।
       আমার সবকিছু ঝাপসা লাগছে।চশমাটা একটু এনে দেবে?
        দিচ্ছি স্যার,বলে সে চশমাটা  এনে আমার চোখে পরিয়ে দিল,হেসে জানতে চাইল,এখন দেখতে পাচ্ছেন ত?
        আচ্ছা, আমাকে দেখতে পাচ্ছেন?
         মাথা হেলিয়ে হ্যাঁ বললাম। কিন্তু ওই মুখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হলাম। বড়ো আপন ওই মুখ।স্মিত হাসি মাখানো মুখে উজ্জ্বল চোখ দুটি আমাকে টান মেরে ফেলে দিল কৈশোর বেলায়।কী দেখছি আমি?নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।সত্যিই কি এই সেই চোখ!যে চোখ দুটি নিয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ বছর আমি বেঁচে আছি।আজ সেই চোখ চিনতে ভুল হবেই  না। বলেই তো যে আত্মার  সঙ্গে চোখের সংযোগ আছে। চোখ আত্মার প্রতিবিম্ব।
           ওই চোখ দুটি থেকে আমি দৃষ্টি সরাতে পারছিলাম না।হারিয়ে যাচ্ছিলাম ওই দুই চোখে।আমাকে ওই চোখ দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল জীবনের ওই অবিস্মরণীয় উপত্যকায়
        ⚫
              স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সেদিন।আমাদের সুবর্ণমুণ্ডিয়ার দিকে দৌড়লাম।ততক্ষণে অখি,পপু,সানুরা পৌঁছে ঘুড়ি ছেড়ে দিয়েছে। ওদের দেখে আরও জোরে ছুটলাম।ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হল।সকলেই জানে আমি ঘুড়ি ওড়ানোর মাস্টার। লাটাই ছেড়ে ঘুড়ি উড়তে লাগল উঁচুতে, অনেক উঁচুতে। অন্য অন্য ঘুড়ির থেকে তিন গুণ উঁচুতে উড়ছিল আমার ঘুড়ি।বাদল-মেঘ আর অস্তগামী সূর্যের তেরছা কিরণের স্বপ্নময় এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল সে।
              একটু পরে আমার চারদিকে ঘিরে থাকা হৈচৈ চিৎকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।লাল ঘুড়ির সঙ্গে কখন যে হারিয়ে ফেলেছিলাম মনটাকেও, বুঝতে পারিনি।পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘেরাও আমার চঞ্চল মনটাকে স্বপ্নে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।নীচে থেকে যাওয়া জনবসতির ভিড়ে আমার মন খুঁজে চলেছিল ফ্রক পরিহিত এক অনামিকাকে।মনে হচ্ছিল কোনো এক অনন্ত দ্বীপের মাঝে হারিয়ে ফেলা মুক্তোটি খুঁজে চলেছি।সবই অস্পষ্ট অথচ অনন্ত যাত্রা।সমস্ত বাস্তব ও অবাস্তবের প্রহেলিকা অতিক্রম করে সাতপরত মনের নীচে সেই দুটি সরল,অকপট চোখ।মুক্তোর মতো উজ্জ্বল সেই চোখ দুটি বাদে আমার কাছে বাকি দুনিয়া হয়ে গেছিল অদৃশ্য।
            হঠাৎ মনে হল সুতোতে ঢিল পড়েছে। দেখলাম  পপু  আমার ঘুড়ি কেটে দিয়েছে।অন্যরা আনন্দে চিৎকার করছে।আমার স্বপ্নেও ঢিল পড়লো।আকাশ থেকে ধপাস করে পড়ে গেলাম নিজেরই উপরে,হুঁশ ফিরল কিন্তু তখনও স্বপ্ন চোখকে রঙিন করে রেখেছে।
            মন্দিরে সান্ধ্য ঘন্টা বেজে উঠতেই  মায়ের কথা মনে পড়লো,"ঘন্টা বাজার আগেই বাড়ি ঢুকবে।নয়তো বাবা খুব রেগে যাবে।" বাড়ি ফিরলাম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে বইপত্র নিয়ে বসলাম কিন্তু মন তখন ছেঁড়া ঘুড়ির জট পাকানো সুতোর মতো। অথচ আমার চোখদুটিকে অধিকার করে আছে ওই নরম মুখ।মন থেকে মুছে ফেলতে কাগজের ওপরে পেনসিল দিয়ে দাগ কাটতে শুরু করলাম,যেন সেই মুখ ও চোখ এঁকে ফেলতে ছাইছি।আঁকা হল বটে কিন্তু তারা আমাকে তাচ্ছিল্য করতে লাগলো যেন।বিরক্তিতে আঁকিবুকি কাটা কাগজগুলো দলেমুচড়ে মায়ের রান্নাঘরের উনুনের মধ্যে ফেলে দিলাম। পুড়ে যেতে যেতে ওই অর্ধ সমাপ্ত চোখ দুটি যেন বলছিল,"তুমি যে চোখ খুঁজে চলেছ,তা সারা দুনিয়ায় ঈশ্বরের একটিমাত্র সৃষ্টি। পারলে খুঁজে নাও।তোমার ভিতরের অশান্ত প্রগলভতা নির্বাপিত হবে।"
             পরের দিন সকাল। স্কুল বসার অনেক আগেই বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ঘাটের দিকে দৌড়লাম।ছোট ঘাট থেকেই নৌকা চেপে ছোট নদী পেরিয়ে ওপারের স্কুলে যাই রোজই।আমাকে সম্মোহনে ঘিরে রাখা ওই চোখদুটিও একই নৌকায় যায়। তাই আমি বেশ খানিকটা আগেই ঘাটে পৌঁছাই যাতে ও আগেই পেরিয়ে না যায়। যতক্ষণ ও না পৌঁছয়,আমি নানা বাহানায় এড়িয়ে যাই পরিচিত মাঝিকে।তবে সেদিন পৌঁছে দেখি ও বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।নৌকো এসে ঘাটে লাগল।বাবার সঙ্গে বসল ও।আমিও সুযোগ করে ওর সামনে বসলাম। নৌকো ছেড়ে দিল।আমি ব্যাগটা ঠিক করে রাখতে রাখতে টের পেলাম ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।আমি চাইতেই কেমন যেন দু'জোড়া চোখ হারিয়ে গেল পরস্পরের ভিতরে।অপলক সেই দৃষ্টি। নৌকো দুলছে,সঙ্গে ঘাটও যেন দুলছে।দুলছে আকাশ কিন্তু দু'জোড়া চোখ স্থির।অপলক দৃষ্টির মাঝে দুটি স্বপ্নিল আত্মা আত্মস্থ।এর মধ্যেই শোনা গেল মাঝির হাঁকডাক,"ভাই ঘাটে লাগল, নামো,নেমে যাও সকলে।"
         নৌকো গিয়ে ঘাটে লাগলো আর তখনই ওই চোখ যেন বিদ্যুতের মতো ঝলমল করে উঠল।সকলে নেমে যাচ্ছে, আমার চোখ সরছে না।ওর বাবা ওর হাত ধরে নামিয়ে দিলেন,ও বারবার পেছন ফিরে দেখছিল।মাঝির হাতে পয়সা দিয়ে আমি দ্রুত ওর পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। বাজার পেরিয়ে ওর প্রাইমারি স্কুল।ও স্কুলের গেট দিয়ে ভিতরে চলে গেল।ব্যাকুল হয়ে সামান্য সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করলাম। মনের মধ্যে ওই চোখের প্রতিফলন।আর আমার অবাধ্য ঠোঁট দুটি প্রসারিত হয়ে স্মিত হাসিতে ভরে উঠছিল।ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ান গেট বন্ধ করে দিল।মনে হচ্ছিল, আমার মন ওই গেটের ও পারে আর ভারি পা নিয়ে নিজের স্কুলের দিকে এগিয়ে চলেছে আমার শরীর।গুম হয়ে বসেছিলাম ক্লাসে।অন্যমনস্ক, ভয়ংকর অন্যমনস্ক অথচ সারা ক্লাস জুড়ে হৈচৈ,হাসাহাসি, স্যারদের উঁচু গলায় পড়ানো।আমার কাছে তখন সবকিছুই বরফের মতো!সমস্ত দুনিয়া যেন নীরব!একসময় স্কুল ছুটি হল।ছুটির ঘন্টার প্রথম ঠং শুনতে শুনতেই গেট পেরিয়ে গেলাম।এক নিঃশ্বাসে পৌঁছে গেলাম ওর স্কুলের সামনে।দারোয়ান খুলে দিয়েছে ওদের গেট।
           ওহ্!যেন আমার মন ও শরীরের মাঝের তালাটা খুলে গেল।ঝিলমিল তারাদের মতো এখন অনেক চোখের ভিড়ে আমার স্বপ্নের চাঁদের উদয় হবে!কিন্তু এ কি!সব তারা চলে গেল,আমার চন্দ্রমালা কোথায়?আমার মনের আকাশ জুড়ে কালো মেঘ।স্কুল তো ফাঁকা হয়ে গেল!দৌড়লাম ঘাটের দিকে।সকলে বসে আছে নৌকোয়,ওকে পেলাম না।এদিক ওদিক তাকালাম,দেখতে পেলাম না।হঠাৎ দেখি নৌকোর এক কোণায় চাদর মুড়ি দিয়ে  বসে আছে বাবার পাশে।বাবা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।ঠেলেঠুলে কায়দা করে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম ওর কাছে।ওর চোখ বন্ধ, সারা শরীর কাঁপছে।আমার খুব কষ্ট হলো অথচ জিজ্ঞেস করতে পারছিলাম না কিছুই। ওদের পাশে বসে থাকা এক বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, মেয়ের শরীর খারাপ?
         হ্যাঁ।
          আমার বুক মুচড়ে উঠতে লাগল।অনুভব করলাম যেন ওর বন্ধ দুই চোখের পাতার ভেতরে আমার সব স্বপ্ন  ভালোবাসা ভাবনারা বন্দি হয়ে আছে।সূর্য পাটে নামছিল।ঘাটে এসে লাগল নৌকো।ওর বাবা  প্রথমে নেমে গেলেন।তারপর ওকে কাঁধে বসিয়ে  লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে লাগলেন। আমি পাগলের মতো ওদের পেছনে পেছনে প্রায় দৌড়তে লাগলাম। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি ও চোখ মেলে আমাকে দেখছে।চোখদুটি ছলছলে,লাল।মনে হল,অস্তগামী আকাশ থেকে লাল রং এনে আমাকে প্রেমের রঙ উপহার দিল।ওরা নদীর বাঁধ পেরিয়ে ক্ষেতের আলপথ দিয়ে দূরে চলে গেল।আমি স্থাণুর মতো সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
         এর মধ্যে দশ দিন পেরিয়ে গেছে।
          সেদিন শরতের প্রাক্ সন্ধে।মলিন হয়ে আসা লোহিত সূর্যের আলোয় সারা আকাশ লাল,নদীর জলেও তার ছবি।নদীর তীরের ঢেউ খেলে যাওয়া কাশের ডাঁটায় লাল রঙ।যেন আমার অভিমানের সঙ্গী সমস্ত প্রকৃতি।কত যে বিকেল কেটে গেছে নদীর ঘাটে পারাপারের দিকে তাকিয়ে। যদি সে ফিরে আসে।ওকে দেখতে না পেয়ে মলিন সূর্যের মতো অবসন্ন মন নিয়ে আমিও বাড়ি ফিরতাম।
           নাঃ,আর পারছিলাম না।
           আমার এই অবস্থার জন্য সকলে দায়ী।
           এই নদী।এই নৌকো।এই কাশফুল।আর দায়ী ওই গভীর ক্ষেত।রোজ নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে আমি ওই আলপথের দিকে তাকিয়ে  দিগবলয় প্রকম্পিত করে  দিনের পর দিন চিৎকার করেছি,উত্তর পাইনি।আজ সকলের কাছ থেকে উত্তর চাই।বসে ছিলাম ঘাটের পাশে একটি পাথরের উপরে।ক্লান্ত শরীর,সারা শরীর কেমন অবশ।নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে চোখ বুঁজে আসছিল।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারিনি। জ্ঞানশূন্য  হয়ে গেছিলাম ।মনে হলো সোনালি কাশের বনে একটা লাল ফ্রক পরে ও দৌড়চ্ছে।ফিরে ফিরে আমাকে দেখছে,ডাকছে,আবার দৌড়চ্ছে। আমিও ওর দিকে পাগলের মতো হাত বাড়িয়ে দৌড়চ্ছি।ও হারিয়ে যাচ্ছে কাশের বনে।
            দাঁড়াও...
           চিৎকারের সঙ্গে পড়ে গেলাম পাশের কাদাজলে। ঘুম ছুটে গেল। সারা শরীরে কাদা। নদীর জলে নামলাম। আর ঠিক তখনি ঝাঁকে ঝাঁকে চিল শকুন  ক্যাঁ ক্যাঁ  করতে করতে উড়ে গেল আমার মাথার উপর দিয়ে। কিছু দূরে গিয়ে  নদীর পৈঠায় নেমে কি সব ঠুকরে ঠুকরে ছিঁড়তে লাগল ।শিরশির করে উঠলো সমস্ত শরীর।বুক ফাটানো কান্না ছড়িয়ে পড়লো আমার সারা শরীরে।চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। বুকজলে দাঁড়িয়ে ডুব দিলাম।জলের ভিতরে সেই মোহিনী চোখ দুটো আমার দিকে তাকিয়ে। শ্বাসকষ্ট হতেই মাথা তুললাম জলের ভিতর থেকে আর আমার শ্বাসশব্দ ছাপিয়ে  শুনতে পেলাম কাঁসর ঘন্টা ঢাকের আওয়াজ। জয়জয়কার করতে করতে মা দুর্গার মূর্তি  বিসর্জন দিতে শোভাযাত্রা করে  লোকেরা আসছে।আমি স্থাণুবৎ তাকিয়ে ছিলাম।
          শোভাযাত্রা এসে পৌঁছলো একটু দূরে একটা সামান্য উঁচু জায়গায়। উলুউলু শঙ্খের শব্দে প্রতিমা নামানো হল।বিসর্জনের আরতি হল।এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আমি সব দেখছিলাম। মাতৃমুখ যেন আমার দিকেই তাকিয়ে। এক নিমেষে পুরোহিত জল ছিটিয়ে বুঁজিয়ে দিলেন মাতৃদৃষ্টি।কাঁসর ঘন্টায় কেঁপে উঠলো চারদিক।জয় মা দুর্গা শব্দে সামান্য ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হল মায়ের মূর্তি জলের মধ্যে। জনে জনে ফিরে গেল।ফাঁকা হয়ে গেল নদীর তীর।আমার মনে হল,ঠিক ওই জায়গায় বুদ্বুদ উঠছে।ভেসে উঠল মূর্তির কিছু অংশ।দেখলাম মায়ের মুখ।আমি যেন কখন পৌঁছে গেছি ওইখানে, যেখানে প্রতিমা বিসর্জন হয়েছিল।দেখলাম, দেবী মায়ের মুখ যেন অবিকল তার মুখ।নির্বাপিত চোখ দুটি  দৃষ্টিতে পরিপূর্ণ। বড়ো বড়ো চোখ দুটি আমার দিকে তাকিয়ে ...ওহ্...সেই চোখ!
              সেই চাহনি!
    ⚫
               স্যার...!
       নার্সের ডাকে ফিরে তাকাই।একটু নুইয়ে পড়ে সে আমার চশমা খুলে দিল।আমি তখনও ঘোরের ভিতরে।কোন কালের সেই নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে সেই চোখের দৃষ্টিতে হারিয়ে গেছিলাম। ধীরে ধীরে ফিরে পেলাম নিজেকে।অতি পরিণত বয়সের মুমূর্ষু ফাটকে বন্দি ,শয্যাশায়ী আমি।
            ঝাপসা দৃষ্টি।
             নিষ্প্রভ মন।
            অক্সিজেন মাস্ক থেকে  অম্লজান নিয়ে  সংকোচন-প্রসারণের হৃৎপিণ্ড।আর তার ভেতরে সারা জীবনের সঞ্চয় অসংখ্য ভাবনা আর অনুভূতি ।আজ 'আমি' মানে কুড়িয়েবাড়িয়ে এইটুকুই।এটুকুই আমাকে জীবন্ত বলে প্রমাণ করছে নয়তো দাগের ওপারে আমার সঙ্গে জন্মে দীর্ঘ বাহাত্তর বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা মৃত্যু। হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে উঠল।শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে লাগল।সামান্য সক্রিয় হাত নেড়ে  সংকেত দিলাম।নার্স দৌড়ে এলেন।আমার অবস্থা দেখে ডাক্তারকে কল করলেন।
          ডাক্তার এলেন, সঙ্গে সেই নার্স,যার মুখটি আমার বড় আপন।ডাক্তারের নির্দেশ মতো তিনি আমাকে দুটো ইঞ্জেকশন দিলেন।আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।ডাক্তার চলে যাওয়ার পরেও তিনি পাশে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।আমার প্রিয় চোখদুটির দিকে তাকিয়ে আমিও।
           অনুভব করছিলাম আমার সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে।নিষ্প্রভ হয়ে আসছে অনেকানেক সূক্ষ্মতম চেতনা।
            আমার চোখদুটি কিন্তু ওই দুটি চোখের  সঙ্গে এক হয়ে গেছে।
                                       *******

     লেখক পরিচিতি  : শ্রীমতি গায়ত্রী সরাফ,কথাশিল্পী,অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ২০০৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড.আবদুল কালাম আজাদ-এর কাছ থেকে বেস্ট টিচার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।'ইটা ভাটির শিল্পী ' উপন্যাসের জন্য ২০১৭সালে সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারে সম্মানিত। মোট ১৪টি গল্প গ্রন্থ রয়েছে।বর্তমানে ভূবনেশ্বরে থাকেন।
       
                       
ছবি - আন্তর্জাল
           
  

    
            
        

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

স্বপন রায়


প্রথম পর্বের পর 

আহমেদ ফরাজের জীবন ও কবিতা  
.................................................................................................
      ‘অব কে বিছড়ে হ্যায় তো শায়দ কভি খ্বাবোঁ মে মিলে
      ‘ জিস তরহ সুখে হুয়ে ফুল কিতাবোঁ মিলে



আহমেদ ফরাজ, একদিকে যেমন পাকিস্তানের শ্রেণীবৈষম্য, একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে নষ্ট হতে থাকা গণতন্ত্রের জন্য ‘আওয়াজ বুলন্দ’ করেছিলেন, অন্যদিকে একইভাবে লিখে গেছেন তাঁর বিখ্যাত গজলগুলি। লিখেছেন অজস্র ‘নজ্‌ম’ যা গদ্যকবিতার কাছাকাছি একধরণের আঙ্গিক। কখনো দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লিখছেনঃ
‘খ্বাব মরতে নহি
খ্বাব দিল হ্যায়, না আখেঁ, না শ্বাসেঁ যো
রেজা রেজা হুয়ে তো বিখর জায়েঙ্গে
জিস্ম কে মৌত সে ইয়ে ভি মর জায়েঙ্গে..’
(স্বপ্ন মরেনা
স্বপ্ন তো হৃদয়, সপ্ন চোখ নয় অথবা নিশ্বাস
যে টুকরো টুকরো যদি হয় তো ছড়িয়ে পড়বে
মরে যাবে মৃতদেহের সঙ্গে )
কখনো সেই মৃত্যুর আরেক চেহারা দেখছেন বিষাদের অপরিমেয় স্তব্ধতা নিয়েঃ

‘গম-এ-হায়াৎ কা ঝগড়া মিটা রহা হ্যায় কোই
চলে ভি আও কে দুনিয়া সে যা রহা কোই
#
আজল সে কহে দো কে রুক যায়ে দো ঘড়ি
শুনা হ্যায় আনেকা ওয়াদা নিভা রহা হ্যায় কোই
#
ও ইস নাজ সে বয়ঠা হ্যায় লাশ কে পাস
জ্যায়সে রোতে হুয়ে কো মনা রহা হ্যায় কোই
#
পলট কর না আ যায়ে ফির সানা নব্জোঁ মে ‘ফরাজ’
ইতনে হাসীন হাথোঁ সে মইয়ত সজা রহা কোই’
#
 (দুঃখ এবং জীবন নিয়ে করেই যাচ্ছ ঝগড়া তুমুল
  কেউ যে এদিকে মরতে বসেছে, ফেরৎ এসো, আসছো ফেরৎ? 
#
  সময়, আরো একটু দাঁড়াও, অল্প সময় চাইছি তোমার
  শুনেছি সে ফিরেই আসছে, চেষ্টা করছে কথা রাখবার
#
  এসেছে, আর কি অপূর্বতায় বসেছে শান্ত লাশের পাশে
  মনে হচ্ছে, কান্না মুছিয়ে অভিমানগুলো সরিয়ে দিচ্ছে
#
  এমন ছোঁয়া! আবার ফরাজ ফিরে যেওনা ফালতু লেখায়
  সাজিয়ে তুলছে মৃত তোমাকেই যখন মিষ্টি হাতের মায়া)
#
প্রেম আর সামাজিক সংলগ্নতা, বিষাদ আর দ্রোহের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে ফরাজের কবিতাজগৎ!জিয়াউল হকের সময় বাংলাদেশে পাক বাহিনির অত্যাচার এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করার কারণ হিসেবে দেখানো হয় কোন একটি মুশায়রায়(কবিতাপাঠের আসর)তিনি ‘হুকুমত’-এর বিরুদ্ধে ‘শের’ পড়েছেন।ওইসময় ছ’বছর তিনি দেশান্তরে থাকেন।ব্রিটেন,কানাডা এবং ইওরোপের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমান ফরাজ কবিতাকে আশ্রয় ক’রে তোপ দাগতে থাকেন সামরিক একনায়ক জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে।তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘মুহাসারা’(অবরোধ)এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা।তিনি স্বৈরাচারী শাসকের পরোয়া না ক’রে লেখেনঃ
ম্যায় কাট গিরুঁ কে সলামত রহুঁ ইয়াকিন হ্যায় মুঝে
কি ইয়ে হিসারে সিতম কোই তো গিরায়ে গা
তমাম উম্র কি ইজা-নসিবিয়োঁকি কসম
মেরে কলাম কা সফর রহেগা না জায়েগা
#
সরিস্ত-এ-ইশ্‌ক নে উফ্‌তাদগি নহি পাই
তো কদ-এ-সারভ নে বিনি ও সায়া পায়মায়ি

(ভাল থাকি বা খুন হয়ে যাই, বিশ্বাস শুধু আছে
 এই অত্যাচারীর দুর্গ কেউ ভেঙে দেবে একদিন
 জীবন, আমি  শপথ নিচ্ছি যাবতীয় দুর্ভাগ্যের
 আমার লেখা থামবে না আর ঝুঁকবে না কোনদিন
#
 মর্ষকামীর ইচ্ছে কখনো টিঁকবেনা দুনিয়ায়
 গাছের ছায়ায় হেঁটে চলে যাবে ভালবাসা দৃঢ় পায়..)
#
ফরাজের রাজনৈতিক অবস্থান বামপন্থী ছিল।কিন্তু অফিসিয়াল বামদলগুলি পাকিস্তানে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং বিলীন হতে থাকে স্বৈরাচার বিরোধী পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে। জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে থাকা ফরাজ জুলফিকার আলি ভূট্টো’র ঘনিষ্ঠ হলেও বাংলাদেশের ঘটনায় ভূট্টোর বিরোধীতা করতে পিছপাও হননি।আহমেদ ফরাজ ‘ইকবাল’ আর ‘ফয়েজ আহমেদ ফয়েজে’র পরে পাকিস্তানে প্রায় ‘কাল্ট ফিগার’ হয়ে ওঠেন।পাকিস্তানের নানাবিধ সাংস্কৃতিক পদ তিনি অলঙ্কৃত করেছেন, আবার ছেড়েও দিয়েছেন। ১৯৭৬ সালে ফরাজকে পাকিস্তানের একাডেমি অফ লেটারসের প্রথম ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে এখানেই চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁর শেষ সরকারী পদ ছিল পাকিস্তানের ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানশিপ, তবে তাঁকে নিয়ে মাথাব্যথা লেগেই থাকতো সরকারের। পারভেজ মুশারফের বিরোধীতা ক’রে ফরাজ ২০০৬ সালে পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ সিভিলিয়ান সম্মান ‘হিলাল-এ-ইমতিয়াজ’ ফিরিয়ে দেন। প্রত্যাখানের পরে দেওয়া তাঁর বিবৃতি এখনকার ভাষায় ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়ঃ
‘My conscience will not forgive me if I remained a silent spectator of the sad happenings around us,...the last I can do is to let the dictatorship know where it stands in the eyes of the concerned citizens, whose fundamental rights have been usurped’
#
আহমেদ ফরাজ তাঁর অসাধারণ গজলের জন্য ভারতেও সুপরিচিত ছিলেন।মেহেদি হাসান। গুলাম আলি যেমন তাঁর গজল গেয়েছেন,লতা মঙ্গেশকর, জগজিৎ সিং-এর কণ্ঠেও তাঁর লেখা গজল উঠে এসেছে। ফরাজের বোহেমিয়ান জীবনযাপন বিখ্যাত ছিল পেশোয়ারে। তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়েই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। তাঁর একটি প্রবল গর্জনওয়ালা বাইক ছিল।পেশোয়ার খাইবার পর্বতমালার ফুটহিল শহর হওয়ায় সৌন্দর্যে কোন খামতি ছিলনা। ফরাজের নেশা ছিল পান আর সিগারেটের।চেন স্মোকার ছিলেন। তো, ওঁর স্থায়ী দোকান থেকে পান মুখে দিয়ে, সিগারেট ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে ফরাজকে দেখা যেত প্রবল বেগে কোথাও যাচ্ছেন, যেন খুব জরুরী কাজ আছে তাঁর। অন্যমনস্ক ছিলেন পুরোদস্তুর।মৃত্যুর কয়েকবছর আগে ফরাজ ওয়াশিংটন ডি.সি. তে একটি অনুষ্ঠানে বিনা সিগারেটে প্রায় সারারাত মুশায়েরা ক’রে সিগারেটে খাওয়ার টানে নিজের ঘরের দিকে দৌড় দেন। ঘর আর চিনতে পারেন না। যে রুম নাম্বার বলেন, সেখানে চাবি ঢোকেনা। পরে দেখা যায় তিনি অন্য একটি হোটেলে এসে এসব ক’রে যাচ্ছেন। সারাজীবন ধরেই ভারত পাকিস্তানের বন্ধুত্বের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর লেখা এই বিখ্যাত ‘শের’ এই দুই প্রতিবেশী দেশের জন্যই নিবেদিতঃ
‘অব কে বিছড়ে হ্যায় তো শায়দ কভি খ্বাবোঁ মে মিলে / জিস তরহ সুখে হুয়ে ফুল কিতাবোঁ মিলে..’ আহমেদ ফরাজের জীবনাবসান হয় ২৫ শে অগাস্ট, ২০০৮ সালে। কবির অবসানে কবিতা অবসৃত হয়না। থেকে যায়, থেকেই যায়, আহমেদ ফরাজের মত সংবেদনশীল মানতাবাদী কবিরা!তো, পড়ে ফেলা যাক, আহমেদ ফরাজের কিছু নজম এবং গজলের ভাবানুবাদ।
১.
বুঝি নজর তো করিশ্মে ভি রোজো শব কে গয়ে
কে অব তলক নহি পলটে হ্যায় লোগ কবকে গয়ে

করেগা কৌন তেরি বেওয়াফাইয়োঁ কা গিলা
এহি হ্যায় রশমে জমানা তো হম ভি কবকে গয়ে

মগর কিসিনে হমে হমসফর নহি জানা
ইয়ে আউর বাত কে হম  সাথ সাথ সবকে গয়ে

অব আয়ে হো তো ইহাঁ কেয়া হ্যায় দেখনে কে লিয়ে
ইয়ে শহর কবসে হ্যায় বিরান উও লোগ কবকে গয়ে

গিরফ্‌তা দিল থে মগর হৌসলা নহি হারা
গিরফ্‌তা দিল থে মগর হৌসলে ভি অবকে গয়ে

তুম আপনি শমে-তমান্না কো রো রহে হো ‘ফরাজ’
ইন আঁধিয়োঁ মে তো প্যারে চিরাগ সবকে গয়ে
.................................................................

ভাবনুবাদঃ
চোখ বুঁজলেই অবাকহারা ভাবনা যাচ্ছে দিন ও রাতের
পাল্টে যায়নি মুখচ্ছবি সেই কবেকার আয়না পেয়েও
#
বিশ্বাসঘাতী তোমার সঙ্গে হারিয়ে গেছে ভরসা আমার
এটাই যখন নিয়ম তখন আমিও চলে যাচ্ছি তবে
#
চেয়েছি আমিও সঙ্গী হতে কিন্তু পাইনি সঙ্গী কোনও
অথচ সবার সঙ্গে ছিলাম, যেমন তেমন সব যাওয়াতেই 
#
আবার এসেছো, কি আছে এখন, কি আর তোমায় দেখাবো বলো
এ শহরে আর থাকেনা কেউই, সব ফাঁকা ফাঁকা সব নির্জন
#
স্তব্ধ হৃদয়, হারিনি শধু ভরসা রেখেছি কিভাবে যেন
স্তব্ধ আমার হৃদয় কিন্তু হারিয়ে গেল নির্জনতায়
#
কাঁদছো ফরাজ , নিভে গেছে ব’লে নিজস্ব এক আলোর শিখা
আঁধি আর ঝড়ে সব নিভে গেছে সমস্ত আলো, কেন দেখলে না..
#
২.


ফরাজ, অব কোই সৌদা কোই জুনুন ভি নহি
মগর করার সে দিন কট রহে হো ইয়ুঁ ভি নহি

লব-ও-দহন ভি মিলা গুফ্‌তগুকা ফন ভি মিলা
মগর জো দিল পে গুজরতি হ্যায় কহে সকুঁ ভি নহি

মেরি জুবাঁকি লুক্‌নত সে বদগুমা না হো
যো তু কহে তো তুঝে ওম্র ভর মিলুঁ ভি নহি

‘ফরাজ’ জ্যায়সে কোই দিয়া তুর্‌বত-এ-হাওয়া চাহে হ্যায়
 তু পাস আয়ে তো মুমকিন হ্যায় ম্যায় রহুঁ ভি নহি
.....................................................................

ভাবানুবাদঃ
ফরাজ, কেনাবেচা শেষ, ইচ্ছেও গেছে ফুরিয়ে
ভাল আছি খুব, এ কথাও বলা যাবেনা
ভাষা আছে, আছে প্রকাশের যত বাহানা
আমি ভাল নেই বোঝাবো কিভাবে কি দিয়ে
#
আমার কথায় কিবা আসে যায়, যদি
তুমি না বলো, দূরে চলে যাবো ঠিকই
#
আমি কথা বলি সে কথার দোষে যেন
একটি আঁচড়ও না লাগে অধরা তোমার
#
যদি এসে পড়ো এমনিই কোনদিন
দেখবে যেভাবে মোমের আলো গায়ে ঢেলে নেয় নিজেই মৃত্যু-হাওয়া
আর নিভে যায় একা একা
ফরাজও কোন আসন্ন হাওয়ায় নিভে গেছে তেমনই
সে কি ডেকেছিল, সে কি তোমাকেই ডেকেছিল...
#
৩.
উস সখ্‌স সে বস ইতনা সা তাল্লুক হ্যায় ফরাজ
ও পরেশাঁ হো তো হমেঁ নিঁদ নহি আতি
...................................................
ভাবানুবাদঃ
  ওর সঙ্গে এভাবেই জুড়ে আছি, ‘ফরাজ’
    ওর কষ্ট হলে আমার ঘুম আসেনা
#
৪.
বরবাদ করনে কে আউর ভি রাস্তে থে ‘ফরাজ’
না জানে ওনহে মুহব্বত কা হি খয়াল কিঁউ আয়া
..............................................................
ভাবানুবাদঃ
আমায় বরবাদ করার তো অনেক রাস্তাই খোলা ছিল, ‘ফরাজ’
কেন কে জানে ওর  মনে পড়েছিল ভালবাসার কথা
#
৫.
তু ভি তো আইনে কি তরহ বেওয়াফা নিকলা ‘ফরাজ’
যো সামনে আয়া ওসি কা হো গয়া
.................................................................
ভাবানুবাদঃ
তুমিও তো আয়নার মত অবিশ্বস্ত, ‘ফরাজ’
 যে সামনে এল, তারই হয়ে গেলে
#
৬.
ওসনে মুঝে ছোড় দিয়া তো কেয়া হুয়া ‘ফরাজ’
ম্যায়নে ভি তো ছোড়া থা সারা জমানা উসকে লিয়ে
.....................................................................
ভাবানুবাদঃ
ও আমায় ছেড়ে চলে গেছে তাতে কী ‘ফরাজ’
আমিও তো পুরো দুনিয়া ছেড়ে এসেছিলাম ওর জন্য
#
৭.
অকেলে তো হম ভি জী রহে থে ‘ফরাজ’
কিউঁ তন্‌হা সে হো গয়ে তেরে জানে কে বাদ
........................................................................
ভাবানুবাদঃ
একা তো আমি আগেও ছিলাম, ‘ফরাজ’
কেন একাকী হয়ে গেলাম তুমি চলে যাওয়ার পরেই
#
৮.
কুছ এয়সে হাদসে ভি জিন্দেগি মে হোতে হ্যায় ‘ফরাজ’
কে ইনসান তো বচ যাতা হ্যায় মগর জিন্দা নহি রহতা
..........................................................................
ভাবানুবাদঃ
এমন কিছু দুর্ঘটনাও জীবনে হয়ে থাকে, ‘ফরাজ’
মানুষ বেঁচে থাকে কিন্তু জীবিত থাকেনা
..........................................................................................

স্বপন রায়





আহমেদ ফরাজ, একদিকে যেমন পাকিস্তানের শ্রেণীবৈষম্য, একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে নষ্ট হতে থাকা গণতন্ত্রের জন্য ‘আওয়াজ বুলন্দ’ করেছিলেন, অন্যদিকে একইভাবে লিখে গেছেন তাঁর বিখ্যাত গজলগুলি। লিখেছেন অজস্র ‘নজ্‌ম’ যা গদ্যকবিতার কাছাকাছি একধরণের আঙ্গিক। কখনো দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লিখছেনঃ
‘খ্বাব মরতে নহি
খ্বাব দিল হ্যায়, না আখেঁ, না শ্বাসেঁ যো
রেজা রেজা হুয়ে তো বিখর জায়েঙ্গে
জিস্ম কে মৌত সে ইয়ে ভি মর জায়েঙ্গে..’
(স্বপ্ন মরেনা
স্বপ্ন তো হৃদয়, সপ্ন চোখ নয় অথবা নিশ্বাস
যে টুকরো টুকরো যদি হয় তো ছড়িয়ে পড়বে
মরে যাবে মৃতদেহের সঙ্গে )
কখনো সেই মৃত্যুর আরেক চেহারা দেখছেন বিষাদের অপরিমেয় স্তব্ধতা নিয়েঃ

‘গম-এ-হায়াৎ কা ঝগড়া মিটা রহা হ্যায় কোই
চলে ভি আও কে দুনিয়া সে যা রহা কোই
#
আজল সে কহে দো কে রুক যায়ে দো ঘড়ি
শুনা হ্যায় আনেকা ওয়াদা নিভা রহা হ্যায় কোই
#
ও ইস নাজ সে বয়ঠা হ্যায় লাশ কে পাস
জ্যায়সে রোতে হুয়ে কো মনা রহা হ্যায় কোই
#
পলট কর না আ যায়ে ফির সানা নব্জোঁ মে ‘ফরাজ’
ইতনে হাসীন হাথোঁ সে মইয়ত সজা রহা কোই’
#
 (দুঃখ এবং জীবন নিয়ে করেই যাচ্ছ ঝগড়া তুমুল
  কেউ যে এদিকে মরতে বসেছে, ফেরৎ এসো, আসছো ফেরৎ?
#
  সময়, আরো একটু দাঁড়াও, অল্প সময় চাইছি তোমার
  শুনেছি সে ফিরেই আসছে, চেষ্টা করছে কথা রাখবার
#
  এসেছে, আর কি অপূর্বতায় বসেছে শান্ত লাশের পাশে
  মনে হচ্ছে, কান্না মুছিয়ে অভিমানগুলো সরিয়ে দিচ্ছে
#
  এমন ছোঁয়া! আবার ফরাজ ফিরে যেওনা ফালতু লেখায়
  সাজিয়ে তুলছে মৃত তোমাকেই যখন মিষ্টি হাতের মায়া)
#
প্রেম আর সামাজিক সংলগ্নতা, বিষাদ আর দ্রোহের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে ফরাজের কবিতাজগৎ!জিয়াউল হকের সময় বাংলাদেশে পাক বাহিনির অত্যাচার এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করার কারণ হিসেবে দেখানো হয় কোন একটি মুশায়রায়(কবিতাপাঠের আসর)তিনি ‘হুকুমত’-এর বিরুদ্ধে ‘শের’ পড়েছেন।ওইসময় ছ’বছর তিনি দেশান্তরে থাকেন।ব্রিটেন,কানাডা এবং ইওরোপের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমান ফরাজ কবিতাকে আশ্রয় ক’রে তোপ দাগতে থাকেন সামরিক একনায়ক জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে।তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘মুহাসারা’(অবরোধ)এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা।তিনি স্বৈরাচারী শাসকের পরোয়া না ক’রে লেখেনঃ
ম্যায় কাট গিরুঁ কে সলামত রহুঁ ইয়াকিন হ্যায় মুঝে
কি ইয়ে হিসারে সিতম কোই তো গিরায়ে গা
তমাম উম্র কি ইজা-নসিবিয়োঁকি কসম
মেরে কলাম কা সফর রহেগা না জায়েগা
#
সরিস্ত-এ-ইশ্‌ক নে উফ্‌তাদগি নহি পাই
তো কদ-এ-সারভ নে বিনি ও সায়া পায়মায়ি

(ভাল থাকি বা খুন হয়ে যাই, বিশ্বাস শুধু আছে
 এই অত্যাচারীর দুর্গ কেউ ভেঙে দেবে একদিন
 জীবন, আমি  শপথ নিচ্ছি যাবতীয় দুর্ভাগ্যের
 আমার লেখা থামবে না আর ঝুঁকবে না কোনদিন
#
 মর্ষকামীর ইচ্ছে কখনো টিঁকবেনা দুনিয়ায়
 গাছের ছায়ায় হেঁটে চলে যাবে ভালবাসা দৃঢ় পায়..)
#
ফরাজের রাজনৈতিক অবস্থান বামপন্থী ছিল।কিন্তু অফিসিয়াল বামদলগুলি পাকিস্তানে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং বিলীন হতে থাকে স্বৈরাচার বিরোধী পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে। জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে থাকা ফরাজ জুলফিকার আলি ভূট্টো’র ঘনিষ্ঠ হলেও বাংলাদেশের ঘটনায় ভূট্টোর বিরোধীতা করতে পিছপাও হননি।আহমেদ ফরাজ ‘ইকবাল’ আর ‘ফয়েজ আহমেদ ফয়েজে’র পরে পাকিস্তানে প্রায় ‘কাল্ট ফিগার’ হয়ে ওঠেন।পাকিস্তানের নানাবিধ সাংস্কৃতিক পদ তিনি অলঙ্কৃত করেছেন, আবার ছেড়েও দিয়েছেন। ১৯৭৬ সালে ফরাজকে পাকিস্তানের একাডেমি অফ লেটারসের প্রথম ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে এখানেই চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁর শেষ সরকারী পদ ছিল পাকিস্তানের ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানশিপ, তবে তাঁকে নিয়ে মাথাব্যথা লেগেই থাকতো সরকারের। পারভেজ মুশারফের বিরোধীতা ক’রে ফরাজ ২০০৬ সালে পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ সিভিলিয়ান সম্মান ‘হিলাল-এ-ইমতিয়াজ’ ফিরিয়ে দেন। প্রত্যাখানের পরে দেওয়া তাঁর বিবৃতি এখনকার ভাষায় ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়ঃ
‘My conscience will not forgive me if I remained a silent spectator of the sad happenings around us,...the last I can do is to let the dictatorship know where it stands in the eyes of the concerned citizens, whose fundamental rights have been usurped’
#
আহমেদ ফরাজ তাঁর অসাধারণ গজলের জন্য ভারতেও সুপরিচিত ছিলেন।মেহেদি হাসান। গুলাম আলি যেমন তাঁর গজল গেয়েছেন,লতা মঙ্গেশকর, জগজিৎ সিং-এর কণ্ঠেও তাঁর লেখা গজল উঠে এসেছে। ফরাজের বোহেমিয়ান জীবনযাপন বিখ্যাত ছিল পেশোয়ারে। তিনি পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়েই লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। তাঁর একটি প্রবল গর্জনওয়ালা বাইক ছিল।পেশোয়ার খাইবার পর্বতমালার ফুটহিল শহর হওয়ায় সৌন্দর্যে কোন খামতি ছিলনা। ফরাজের নেশা ছিল পান আর সিগারেটের।চেন স্মোকার ছিলেন। তো, ওঁর স্থায়ী দোকান থেকে পান মুখে দিয়ে, সিগারেট ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে ফরাজকে দেখা যেত প্রবল বেগে কোথাও যাচ্ছেন, যেন খুব জরুরী কাজ আছে তাঁর। অন্যমনস্ক ছিলেন পুরোদস্তুর।মৃত্যুর কয়েকবছর আগে ফরাজ ওয়াশিংটন ডি.সি. তে একটি অনুষ্ঠানে বিনা সিগারেটে প্রায় সারারাত মুশায়েরা ক’রে সিগারেটে খাওয়ার টানে নিজের ঘরের দিকে দৌড় দেন। ঘর আর চিনতে পারেন না। যে রুম নাম্বার বলেন, সেখানে চাবি ঢোকেনা। পরে দেখা যায় তিনি অন্য একটি হোটেলে এসে এসব ক’রে যাচ্ছেন। সারাজীবন ধরেই ভারত পাকিস্তানের বন্ধুত্বের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর লেখা এই বিখ্যাত ‘শের’ এই দুই প্রতিবেশী দেশের জন্যই নিবেদিতঃ
‘অব কে বিছড়ে হ্যায় তো শায়দ কভি খ্বাবোঁ মে মিলে / জিস তরহ সুখে হুয়ে ফুল কিতাবোঁ মিলে..’ আহমেদ ফরাজের জীবনাবসান হয় ২৫ শে অগাস্ট, ২০০৮ সালে। কবির অবসানে কবিতা অবসৃত হয়না। থেকে যায়, থেকেই যায়, আহমেদ ফরাজের মত সংবেদনশীল মানতাবাদী কবিরা!তো, পড়ে ফেলা যাক, আহমেদ ফরাজের কিছু নজম এবং গজলের ভাবানুবাদ।
#
১.
বুঝি নজর তো করিশ্মে ভি রোজো শব কে গয়ে
কে অব তলক নহি পলটে হ্যায় লোগ কবকে গয়ে

করেগা কৌন তেরি বেওয়াফাইয়োঁ কা গিলা
এহি হ্যায় রশমে জমানা তো হম ভি কবকে গয়ে

মগর কিসিনে হমে হমসফর নহি জানা
ইয়ে আউর বাত কে হম  সাথ সাথ সবকে গয়ে

অব আয়ে হো তো ইহাঁ কেয়া হ্যায় দেখনে কে লিয়ে
ইয়ে শহর কবসে হ্যায় বিরান উও লোগ কবকে গয়ে

গিরফ্‌তা দিল থে মগর হৌসলা নহি হারা
গিরফ্‌তা দিল থে মগর হৌসলে ভি অবকে গয়ে

তুম আপনি শমে-তমান্না কো রো রহে হো ‘ফরাজ’
ইন আঁধিয়োঁ মে তো প্যারে চিরাগ সবকে গয়ে
.................................................................

ভাবনুবাদঃ
চোখ বুঁজলেই অবাকহারা ভাবনা যাচ্ছে দিন রাতের
পাল্টে যায়নি মুখচ্ছবি সেই কবেকার আয়না পেয়েও
#
বিশ্বাসঘাতী তোমার সঙ্গে হারিয়ে গেছে ভরসা আমার
এটাই যখন নিয়ম তখন আমিও চলে যাচ্ছি তবে
#
চেয়েছি আমিও সঙ্গী হতে কিন্তু পাইনি সঙ্গী কোনও
অথচ সবার সঙ্গে ছিলাম, যেমন তেমন সব যাওয়াতেই 
#
আবার এসেছো, কি আছে এখন, কি আর তোমায় দেখাবো বলো
শহরে আর থাকেনা কেউই, সব ফাঁকা ফাঁকা সব নির্জন
#
স্তব্ধ হৃদয়, হারিনি শধু ভরসা রেখেছি কিভাবে যেন
স্তব্ধ আমার হৃদয় কিন্তু হারিয়ে গেল নির্জনতায়
#
কাঁদছো ফরাজ , নিভে গেছে লে নিজস্ব এক আলোর শিখা
আঁধি আর ঝড়ে সব নিভে গেছে সমস্ত আলো, কেন দেখলে না..
#
২.


ফরাজ, অব কোই সৌদা কোই জুনুন ভি নহি
মগর করার সে দিন কট রহে হো ইয়ুঁ ভি নহি

লব-ও-দহন ভি মিলা গুফ্‌তগুকা ফন ভি মিলা
মগর জো দিল পে গুজরতি হ্যায় কহে সকুঁ ভি নহি

মেরি জুবাঁকি লুক্‌নত সে বদগুমা না হো
যো তু কহে তো তুঝে ওম্র ভর মিলুঁ ভি নহি

‘ফরাজ’ জ্যায়সে কোই দিয়া তুর্‌বত-এ-হাওয়া চাহে হ্যায়
 তু পাস আয়ে তো মুমকিন হ্যায় ম্যায় রহুঁ ভি নহি
.....................................................................

ভাবানুবাদঃ
ফরাজ, কেনাবেচা শেষ, ইচ্ছেও গেছে ফুরিয়ে
ভাল আছি খুব, কথাও বলা যাবেনা
ভাষা আছে, আছে প্রকাশের যত বাহানা
আমি ভাল নেই বোঝাবো কিভাবে কি দিয়ে
#
আমার কথায় কিবা আসে যায়, যদি
তুমি না বলো, দূরে চলে যাবো ঠিকই
#
আমি কথা বলি সে কথার দোষে যেন
একটি আঁচড়ও না লাগে অধরা তোমার
#
যদি এসে পড়ো এমনিই কোনদিন
দেখবে যেভাবে মোমের আলো গায়ে ঢেলে নেয় নিজেই মৃত্যু-হাওয়া
আর নিভে যায় একা একা
ফরাজও কোন আসন্ন হাওয়ায় নিভে গেছে তেমনই
সে কি ডেকেছিল, সে কি তোমাকেই ডেকেছিল...
#
৩.
উস সখ্‌স সে বস ইতনা সা তাল্লুক হ্যায় ফরাজ
ও পরেশাঁ হো তো হমেঁ নিঁদ নহি আতি
...................................................
ভাবানুবাদঃ
  ওর সঙ্গে এভাবেই জুড়ে আছি, ‘ফরাজ’
    ওর কষ্ট হলে আমার ঘুম আসেনা
#
৪.
বরবাদ করনে কে আউর ভি রাস্তে থে ‘ফরাজ’
না জানে ওনহে মুহব্বত কা হি খয়াল কিঁউ আয়া
..............................................................
ভাবানুবাদঃ
আমায় বরবাদ করার তো অনেক রাস্তাই খোলা ছিল, ‘ফরাজ’
কেন কে জানে ওর  মনে পড়েছিল ভালবাসার কথা
#
৫.
তু ভি তো আইনে কি তরহ বেওয়াফা নিকলা ‘ফরাজ’
যো সামনে আয়া ওসি কা হো গয়া
.................................................................
ভাবানুবাদঃ
তুমিও তো আয়নার মত অবিশ্বস্ত, ‘ফরাজ’
 যে সামনে এল, তারই হয়ে গেলে
#
৬.
ওসনে মুঝে ছোড় দিয়া তো কেয়া হুয়া ‘ফরাজ’
ম্যায়নে ভি তো ছোড়া থা সারা জমানা উসকে লিয়ে
.....................................................................
ভাবানুবাদঃ
ও আমায় ছেড়ে চলে গেছে তাতে কী ‘ফরাজ’
আমিও তো পুরো দুনিয়া ছেড়ে এসেছিলাম ওর জন্য
#
৭.
অকেলে তো হম ভি জী রহে থে ‘ফরাজ’
কিউঁ তন্‌হা সে হো গয়ে তেরে জানে কে বাদ
........................................................................
ভাবানুবাদঃ
একা তো আমি আগেও ছিলাম, ‘ফরাজ’
কেন একাকী হয়ে গেলাম তুমি চলে যাওয়ার পরেই
#
৮.
কুছ এয়সে হাদসে ভি জিন্দেগি মে হোতে হ্যায় ‘ফরাজ’
কে ইনসান তো বচ যাতা হ্যায় মগর জিন্দা নহি রহতা
..........................................................................
ভাবানুবাদঃ
এমন কিছু দুর্ঘটনাও জীবনে হয়ে থাকে, ‘ফরাজ
মানুষ বেঁচে থাকে কিন্তু জীবিত থাকেনা    
..........................................................................................