সৃজন সংস্কৃতি ও শিল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৃজন সংস্কৃতি ও শিল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

ভজন দত্ত


            ।।  পুরুলিয়ার মুখ ।।
প্রথম পর্ব :
                                    
১.
কবি,প্রিয় কবি।'বাংলার মুখ' কবি দেখেছিলেন। তিনি তো কবি, দেখতেই পারেন, অসুবিধে কী! প্রিয় পাঠক, প্লিজ আমাকে এ প্রশ্ন করে বিব্রত করবেন না। আমি দুটি হাত তুলে আত্মসমর্পণ করছি। তাতে শান্তি না হলে,করজোড়ে মার্জনা চাইছি,আঞ্চলিক আমি, 'দেখা হয় নাই মুখখানি '।দার্জিলিং এ গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতকে দেখে মনে হয়েছে এই বুঝি সেই। আবার দীঘা বা সুন্দরবনে গিয়েও তাই মনে হয়েছে।
এবঙ্গের প্রান্তভূমি পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে যখন দেখছিলাম মুখোশ তৈরির 'কারিকুরি ' তখন মনে হলো এই তো সেই। না।আমি বাংলার মুখ খুঁজতে চাই না, বাংলার মুখ মনে করে করে কষ্টার্জিত নিদ্রাকে পরিত্যাগ করতে চাই না।( আজ ১৯/০১/২০১৮এ লেখা যখন লিখছি, তখন বাংলার মুখ মনে করলেই দেখতে পাচ্ছি সেই বুলেটবিদ্ধ নিষ্পাপ শিশুটিকে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এলোমেলো হয়ে যায় সব অক্ষর।পাঠক মাফ চাইছি। পারলে অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ উথ্থাপনের জন্য ক্ষমা করবেন।)



আমি পুরুলিয়ার মুখ, হ্যাঁ, মুখ দেখেছিলাম, মুখোশ নয়।পুরুলিয়া জেলার বিখ্যাত পাহাড় অযোধ্যর পাদদেশে, বাঘমুন্ডি ব্লকের গ্রাম চড়িদা-য়।পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে তৈরি 'ছো নাচ' এর মুখোশ আজ যথার্থই তা পুরুলিয়ার মুখ হয়ে উঠেছে। তা কি, বাংলার মুখ নয়? কবি কি দেখেছিলেন কোনোদিন, কোনোদিন কি এ অহল্যাভূমি তাঁর পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল?
বাংলার মুখের একদিকে আমি দেখতে পাই পুরুলিয়ার মুখ আঁকা আরেকদিকে বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ায় তৈরি পোড়ামাটির ঘোড়া।
২.
গ্রামের নামটি কেউ বলেন চড়িদা, কেউ বা বলেন চোড়দা। তা নামে কি এসে যায় তো পুরনো কথা। বাঘমুন্ডির রাজবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে একবর্গ কিমি জুড়ে একটি গ্রামকে বিখ্যাত করে দিয়েছেন ছো নাচের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, পদ্মশ্রী গম্ভীর সিং মুড়া। তিনি বলেছেন, মুখোশ না থাকলে  তাঁদের নাচ এত বর্ণময় হয়ে উঠত না।এই গ্রামের সূত্রধর  সম্প্রদায় মুখোশ তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
গ্রামটি দুদিকে পাহাড় ও অরণ্য দিয়ে ঘেরা।রসহীন পাথুরে জমিতে সামান্য  কিছু চাষযোগ্য জমি।আকাশের বৃষ্টিতে পাথর না নড়লে চাষাবাদ করা যায় না সেসব জমিতে।এরমধ্যেই তাঁরা বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে নিয়েছিলেন।
তরুনদেব ভট্টাচার্য তাঁর 'পুরুলিয়া' গ্রন্থটিতে লিখেছেন।চড়িদা গ্রামের সূত্রধরগণ এসেছিলেন বর্দ্ধমান জেলা থেকে। ভাদু সহ অন্যান্য দেবদেবীদের মূর্তি গড়ে দেওয়ার শর্তে বাগমুন্ডির রাজা তাঁদের  জমি দিয়ে এখানে এনে বসিয়েছিলেন। সেসব মূর্তি তৈরি হত মাটি দিয়ে।
চল্লিশ - পঞ্চাশ বছর আগে ছো নাচের মুখোশ তো সারাবছর বিক্রি হত না।তাই জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা একসময় পালকি, কারুকার্য়সহ কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি করতেন। প্রতিমা তৈরির সময়ে অনেকে দূর দূর জায়গায় গিয়ে প্রতিমা তৈরি করার কাজেও যুক্ত হতেন। এখনো তাঁরা যান বিভিন্ন জায়গায়।
৩.
উপকরণ:
এখানে যে মুখোশগুলি তৈরি হয় তার প্রধান উপকরণ হল, এ্যাঁটেল মাটি,পুরাতন খবরের কাগজ,ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, ময়দা,আঠা, তেঁতুলের বীজ দিয়ে একরকম আঠা,মুখোশগুলি পালিশ করার জন্য গর্জন তেল, ধুনো,নকল চুল,পাখির পালক,পাট, নানা রকমের পুঁতি, রাংতা, শালমা, বিভিন্ন রঙের ও সাইজের চুমকি ও সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতি।
পদ্ধতি :
প্রথমে ছাঁচে ফেলে তাঁরা মূর্তিগুলির মুখমন্ডল তৈরি করেন। কিছুটা শুকনো হলে তার উপর ছাইয়ের গুড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওঁদের কথায় 'ছাঁচা' তৈরি।
এরপর তাঁরা পাতলা আঠার মধ্যে মাপমতন কাগজ ভিজিয়ে ঐ ছাঁচার ভেতরের দিকে আটকে দেওয়া হয়।এভাবে ৭- ১০ বার করার পর, আঠায় ভেজানো কাপড় ও কাগজ দিয়ে তা আরো মজবুত করা হয়। শক্তপোক্ত করা না হলে মুখোশগুলি পরে ছো নাচের মত বীরত্বপূর্ণ নৃত্য প্রদর্শন করা যায় না।
তৃতীয় ধাপে চলতে থাকে চরিত্রানুযায়ী মুখোশগুলির রূপদান। নির্মিত ঐ ছাঁচাটির ওপর মাটি দিয়ে নাক,চোখ,মুখ,ঠৌঁট,থুতনি,কান সব করা হয়। এরপর গোলা কাদামাটির মন্ডে পাতলা মিহি কাপড়ের টুকরো দিয়ে ওই ছাঁচাটির ওপরে টানটান করে আটকানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে ওরা বলেন 'কাবিজ লেপা '।
পরের ধাপে শিল্পীরা তাঁদের দক্ষ হাতে সেগুলিকে পালিশ করেন কাঠের তৈরি এক কর্ণিক দিয়ে।একে ওরা বলেন 'থাপি' বা 'থুপি'। পালিশের পর রোদে শুকিয়ে নেওয়ার পালা শুরু।আধশুকনো হলেই ওই ছাঁচা থেকে কাগজ ও কাপড়ের আবরণ খুলে ফেলা হয়।বাড়তি কিছু থাকলে তা কাটছাঁট করে সেই অবয়বটিকে নিঁখুত করে তৈরি করার চেষ্টা হয়।
এর পর ঐ অবয়বে চোখ ও নাকের জায়গায় ফুটো করা হয়। ছো নাচের শিল্পীরা যাতে মুখোশগুলি পরে দেখতে পান ও শ্বাসপ্রশ্বাস কাজ চালাতে পারেন সেদিকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখেন তাঁরা।
এভাবে মুখোশের কাঠামো তৈরির কাজ শেষ হলে শুরু সেই মুখোশগুলিতে চরিত্রানুযায়ী রঙ করার কাজ শুরু হয় প্রতিমা তৈরির মতো। গর্জনতেল লাগানো হলে এই পর্যায় শেষ হয়।
সেগুলিকে চুল,চুমকি,শলমা,রাংতা,পুঁতি, পালক ইত্যাদি যা দরকার তাই দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়।
মুখোশশিল্পীরা রামায়ণ, মহাভারত,পুরাণ বর্ণিত রূপ অনুযায়ী সেগুলিকে সজ্জিত করে থাকেন।
মুখোশ নির্মানের ক্ষেত্রে চড়িদা প্রাচীন ঐতিহ্যধারাকে অনুসরণ করে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
(পরের সংখ্যায় সমাপ্ত হবে) 


আলোকচিত্র : উজ্জ্বল দাস। 

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত

দ্বিতীয় পর্ব:

           হামদের ছ (ছো)

                            



খোলামাঠে আগে এই নৃত্যশৈলী প্রদর্শিত হলেও বর্তমানে প্রয়োজনমত মঞ্চেও প্রদর্শন করা হচ্ছে।তবে স্থায়ী মঞ্চ না হলে বিপদ ঘটার সম্ভবনা থেকে যায়। কারণ নৃত্যশিল্পীরা যেভাবে মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে নৃত্য করেন তাতে অস্থায়ী মঞ্চে কাঠের পাটাতন ভেঙে পড়তেই পারে। বিশেষ করে কোনো চরিত্র যখন দূরন্তগতিতে 'উলফা' প্রদর্শন করেন অর্থাৎ নাচতে নাচতেই শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে আবার যখন নীচে লাগাতার নেমে আসেন তখন শক্তপোক্ত মঞ্চ না হলে বিপদ ঘটতেই পারে।
সাধারণত সন্ধ্যে নামার পরই পুরুলিয়ার ফাঁকা টাঁড়জমিতে বা কোনো মাঠে এই নাচের প্রদর্শন করা হোতো। 

" সিন্দুর ভূষিত অঙ্গ,       মুষিকবাহন
সকল সিদ্ধিদাতা            হরগৌরীর বাহন
    চতুর্ভুজ গজেন্দ্রবদন, বিঘ্নবিনাশন।
                      জয় জয় হরগৌরীর নন্দন।। "
ছৌ নাচে গনেশ বন্দনার এই ঝুমুর গানটি বেঁধেছিলেন বৃন্দাবন সিংবাবু। আগেকার নাচ শুরু হত এই গনেশ বন্দনার মাধ্যমে। প্রথমে আসতেন গনেশ। ধূপ,দীপ জ্বালিয়ে,শঙ্খ বাজিয়ে শুরু হতো মূল পালা।এখন এই রেওয়াজ নেই।
বিদ্যুৎ ছিল না তখন, আলোর ব্যবস্থা বলতে ছিল হ্যাজাক।এই হ্যাজাক রাখা হোতো মাথায়। নাচের চরিত্ররা যেমন স্থান পরিবর্তন করতেন তেমনি লাইটম্যানদের স্থান পরিবর্তন করতে হতো। এখন মাঠে বা মঞ্চে উপর থেকে ফ্লাডলাইটের আলোয় এই নাচ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ছৌনাচের এককেটি দলে ১৫ থেকে ৩০ জন বা তার বেশী সদস্য থাকেন।এর মধ্যে বাজনদার থাকেন পাঁচ- ছ' জন। এক বা দু' জন থাকেন মূল সূত্রধর, গায়েন তাকে সঙ্গত করেন আরো কয়েকজন। বাকিরা প্রায় সবাই নাচ করেন।
গোল হয়ে মাঠে দর্শকেরা দাঁড়িয়ে বা বসে সহজেই এই নাচ দেখতে পারেন। বাজনদাররাও দাঁড়িয়েই বাজান।
নাচের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। পালা অনুযায়ী একেক রকম সময়।আগে সন্ধ্যায় শুরু হয়ে সারারাত ধরে চলতো এই নাচ। একেক রাতে চার পাঁচটি পালাকে অবলম্বন করে নৃত্য প্রদর্শিত হতো।বর্তমানে নানা অনুষ্ঠানে কোনো একটি পালার বিশেষ অংশ, সময় অনুযায়ী প্রদর্শন করা হচ্ছে।
পালার বিষয় সাধারণত রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনী অবলম্বনে হয়।
কিছু পালার নাম - রাবণবধ, কংসবধ, অভিমুন্যবধ,মহিষাসুরবধ, পরশুরামের কৈলাশযাত্রা,বকরাক্ষসনিধন, বৃন্দাবনলীলা,কিরাত অর্জুনের শূকর বধ ,শিব-দুর্গা প্রভৃতি।
পুরুলিয়া জেলায় গম্ভীর সিং মুড়া ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ছৌ নৃত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসাবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডির হাত থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে  " সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি " পুরস্কারও পান। ছৌ নৃত্যে পুরুলিয়া জেলার শ্রেষ্ঠত্ব  প্রমাণিত।তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
বর্তমানে বিশ্বায়ণের ধাক্কায় সব সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন হচ্ছে। সিনেমা,টিভি,টিউব, ভিডিও সর্বোপরি  ইন্টারনেট ও মোবাইলের ধাক্কায় লোক- সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। কোলকাতাতেই থিয়েটার হল বন্ধ করে বিয়েবাড়ি করতে হচ্ছে। যাত্রার মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমও আজ ধুঁকছে। সেখানে ছৌ নাচ আজও তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এখানেও ধ্রুপদ শৈলী ছেড়ে ফিল্মি জগতের চটুল সুর,মাইকের ব্যবহার, দলে সদস্য কমানোর জন্য মাইকের সাহায্যে  সিডিতেই গীতিনাট্য ও বাদ্য বাজানো হচ্ছে। অনেকে মনে করেন এভাবে ছৌ নাচের ফলে সেই বীরত্বব্যঞ্জক ভাবটাই চলে যাচ্ছে।দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি বলে! পুরুলিয়ার ছৌ পশ্চিমবঙ্গের গর্ব। পুরুলিয়ার " সিধু কানু বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়" ছৌ নাচের উপর সার্টিফিকেট কোর্স ও ডিপ্লোমা কোর্স শুরু করেছে। শুনেছিলাম চড়িদা গ্রামে গম্ভীর সিং মুড়ার নামে একটি ছৌ অ্যাকাডেমি হবে,জানিনা তার কাজ কতদূর! তা কি হবে না! ©
তথ্যসূত্র -
*অহল্যাভূমি পুরুলিয়া : সম্পাদনা -দেবপ্রসাদ জানা; দীপ প্রকাশন,কোলকাতা ২০০৩
*পশ্চিমবঙ্গ, পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা; তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ,প ব সরকার ২০০৭
* পুরুলিয়া : তরুণদেব ভট্টাচার্য, ফার্মা কে এল এম ; কোলকাতা, ১৯৮৬
* বাংলার আভাষ ( পত্রিকা) , জুন- আগস্ট সংখ্যা, ২০০৪ ও ডিসেম্বর'০৪- ফেব্রুয়ারী' ০৫ সংখ্যা
* সাক্ষাতকার : ডঃ প্রিয়নাথ হালদার, দয়াময় রায়,
                          উজ্জ্বল দাস, মীনাক্ষী লায়েক।
আলোকচিত্র : উজ্জ্বল কুমার দাস।

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

ভজন দত্ত


প্রসঙ্গ টেরাকোটা     
চতুর্থ পর্ব
------------------
১.
টেরাকোটা শিল্পে বাঁকুড়া জেলার ঐশ্বর্য, গর্ব করার মতো।দেখলাম যে,শুধু মন্দির অলঙ্করণেই নয় বাস্তব জীবনের নানান লৌকিক ও ধর্মীয় উপকরণ হিসাবে টেরাকোটা এখনো ব্যবহৃত হয়ে চলেছে।
১৯৬৯ এর ২৪ জানুয়ারি,রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন পাঁচমুড়ার শিল্পী রাসবিহারী কুম্ভকার মহাশয়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন National Awards for Master Craftsman এর পুরস্কার। বাঁকুড়ার ঘোড়া বলে বিশ্বব্যাপী যা পরিচিত তা নির্মিত হয় পাঁচমুড়া গ্রামে।
রবীন্দ্রনাথ সামন্ত লিখেছেন,এই ঘোড়া ---            " হেনরি মুরের ঘোড়া নয়, সুনীল দাসের ঘোড়ার ছবির একটির মতোও নয়, ঘোড়া মন্দির টেরাকোটায় অলংকৃত হয়ে যে দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে তাও নয় বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া।কোলকাতার শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়ের নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ঘোড়াটির মতো তো নয়ই।বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া নিজস্ব শৈলীতে একক ও অনবদ্য।অবাস্তব গড়ন কিন্তু অনস্বীকার্য ভঙ্গি।প্রতীকী,তাই এমন। " বিশ্বে আর কোথাও এমন ঘোড়ার দেখা মেলে না। এ কারনেই বাঁকুড়ার বিভিন্ন স্থানে যেমন, রাজগ্রাম,মুরলু,সোনামুখি, কেয়াবতী,স্যান্দরা, রাণীবাঁধ,বিবড়দা প্রভৃতি স্থানে কুমোরেরা নানারকম স্টাইলের ঘোড়া তৈরি করলেও "বাঁকুড়ার ঘোড়া" বলতে যে ঘোড়াটির ছবি মনের আয়নায় ধরা পড়ে সেটি হোলো পাঁচমুড়ার ঘোড়া।যত বড় বলবেন তত বড়ই ওরা তৈরি করে দেবেন। পোর্টেবল। ভেতরটি ফাঁপা,ফলে ভার কম।কাজেই ঘোড়াটি সহজেই 'উড়ে বেড়াতে' পারে।  কান,
মাথা,ধড়, লেজ আলাদা আলাদা প্যাকিং করে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্যই ঘোড়া
সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়েছে অনায়সে।
বৈশিষ্ট্যে অনন্য হওয়ার জন্যই এই ঘোড়া বাংলার হস্তশিল্পের প্রতীক। 
২.
   উঁচু, লম্বা গলা এই পাঁচমুড়ার ঘোড়ার বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। কেন লম্বা হোলো এখনকার তৈরি ঘোড়ার গলা? এখানে কি কখনো জিরাফেরা ঘুরে বেড়াত! এমন গলার সঙ্গে তো জিরাফেরই মিল। কিন্তু তার প্রমাণ অনুসন্ধান করেও পাইনি। (যদি কেউ পেয়ে থাকেন দয়া করে জানাবেন।) তবে! খোঁজ করছিলাম নানান জনের কাছে। কেউই সদুত্তর  দেননি। উল্টে হাসিঠাট্টাও  হজম করতে হয়েছে। যাঁদের কাছে উত্তর পাওয়া যেতে পারে তাঁদের প্রায় সকলকেই এই প্রশ্ন করেছি।গত বছর (১৪২৩) লক্ষীপুজোর সময় বিখ্যাত কবি ও 'কবিতা পাক্ষিক' এর সম্পাদক শ্রদ্ধেয় প্রভাত চৌধুরী এসেছেন তাঁর গ্রামের বাড়ি বাঁকুড়ার কাদাকুলিতে ( ছান্দারের কাছেই)। দাদার ডাক পেলেই, আসার খবর পেলেই, যাই তাঁর কাছে। বাড়তি পাওনা ছিল ছান্দারে গিয়ে উৎপল চক্রবর্তীর (১৩৪৫-১৪২৪) সান্নিধ্য লাভ করা। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ফাঁক বুঝে আমি প্রভাতদার কাছেও রাখি প্রশ্নটি। প্রভাত বললেন,ও আমি কিছু জানিনা।আমি হতাশ। আমার মুখ দেখে বোধহয় প্রভাতদার খানিক মায়া হোলো কি না কে জানে!  তবে , --- বলে প্রভাতদা খানিক থামলেন। আমি বলি, কি, কি তবে?  প্রভাতদা তাঁর অতুলনীয় বৈঠকি মেজাজে শুরু করলেন, একটা গল্প শোনো। গল্পটা অবশ্য আমার না। ( খানিক থেমে)  গল্পটা আমি শুনেছিলাম, মাণিকদার কাছে। মাণিকলাল সিংহ। আমারও তোমার মতোই প্রশ্ন ছিল, ঘোড়ার ঘাড় কেন ওরকম হোলো! তিনি আমাকে যেটা বলেছিলেন সেইটা বলছি শোনো মন দিয়ে।
বাঁকুড়ার মানুষ তো গরীব। অভাব তাদের নিত্যদিন। রোগজ্বালা এসবও ছিল। তখন মানুষ তা থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন দেবদেবীর " থানে " মানত করত। তো, এমনি এক গরীব ঠাকুমা মানত করেছেন, কোনো এক লৌকিক দেব বা দেবীর থানে। জোড়া ঘোড়ার মানত।ঠাকুমার সম্বল তো একটি কানা বা ফুটো কড়ি। সেটা নিয়েই তিনি কুমোর বাড়ি গেলেন।কুমোরকে বেশ তোষামোদ- খোষামোদ করে,বাবা- বাছা করে,রাজি করান ঘোড়া তৈরি করে দিতে। ঠাকুমা বাড়ি ফিরে আসেন খুশিখুশি। মানত পূর্ণ হবে তাঁর।
ঠাকুমা রোজ কুমোর বাড়ি গিয়ে ধর্ণা দেন।কুমোরের তৈরি মাটির নানান জিনিষ,হাতি,ঘোড়া সব দেখেন। বসে থাকেন। কুমোরের হাতের জাদু দেখেন।একতাল নরম মাটি নিয়ে গল্প করতে করতে কুমোরের সৃষ্টি দেখেন অবাক হয়ে। আর কুমোরকে কাতর আর্জি জানান,দেখবি বাপধন , থানে  আমার ঘোড়া জোড়াটাই যেন সবার থেকে বড় হয়। রোজ একই কথা বলেন ঠাকুমা। দেখবি বাপ আমার ঘোড়াটা যেন সবার থেকে উঁচু হয়।কুমোরতো জানেন, ঠাকুমার পয়সা নেই অথচ বড় ঘোড়ার শখ। রোজ রোজ ঠাকুমার একই বায়ণা। বায়ণাক্কার ঠেলায় অস্থির কুমোর একদিন ঠাকুমার উপস্থিতিতেই একই পরিমাণ মাটিতে আঙুলের টিপসিতে দিলেন ঘোড়ার ঘাড়টি লম্বা করে।ব্যাস,ঠাকুমা খুশি। তার মানতের ঘোড়া হলো সবার থেকে বড়। সেটা সকলের পছন্দও হলো খুব। সবাই চাইল ঐরকম ঘোড়া।ব্যাস হয়ে গেল ঘোড়ার ঘাড় লম্বা।
গল্পটা শুনে প্রথমে খুব হাসলাম।পরে পরে ভাবলাম, তাই তো, এরকমও হতে পারে। যুক্তি আছে একটা।
তবে কি, ঠাকুমার দাবিতেই একদিন এভাবেই তৈরি হয়ে গেল বিশ্ববিজয়ী বাঁকুড়ার ঘোড়া?
     কাদাকুলি থেকে বেরিয়ে সদ্যপ্রয়াত বহুমুখী ব্যক্তিত্ব উৎপল চক্রবর্তীর শিল্পচর্চা কেন্দ্র ছান্দারে গিয়ে দেখলাম সেখানের লম্বা ঘাড়ের দৃপ্ত দুটি ঘোড়া সামনে না তাকিয়ে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখছে। থমকে গেলাম।তাই তো,এটাও তো দারুণ।অন্যরকম।
৩.
ভাবছিলাম। বাঁকুড়ার মতো রুখাশুখা একটা জায়গা,দারিদ্র যাদের নিত্যসঙ্গী সেখানকার মানুষের এত ঘোড়ার প্রতি টান কেন! দেবতাদের হাতি ঘোড়া দেওয়ার,মানত করার বাসনা কেন এল?  এক্ষেত্রে আদিবাসীদের একটা প্রভাব তো আছেই। পিরের দরগা বা থানই হোক বা কবরস্থান, সকলেরই দেবদেবী  থানে গাছতলায় ডাঁই করা নানান সাইজের, রকমের মাটির হাতি ঘোড়া। কিন্তু নিত্যদিনের খরা-দারিদ্র-দুঃখ-যন্ত্রণা-বেদনা উপেক্ষা করে এই যে 'মানত' তাদের--, এর মনটি কোথা থেকে এল? একসময় অরণ্য অধ্যুষিত হওয়ার কারণে এ অঞ্চলে হাতি ছিল প্রচুর। আজও দলমার দামালরা উৎপাত করেই চলেছেন। রক্ষা পাওয়ার জন্য " হাতিখেদা ঠাকুর " এর কাছেও মানত হচ্ছে, ঠিক আছে, হোক।কিন্তু ঘোড়া! ছিল কিছু,রাজা ও জমিদাররা ব্যবহার করতো।তাদের হাতিশালে হাতি,ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকত। হ্যাঁ,থাকতো।এখনো বাঁকুড়া শহরের কালিতলায় গার্লস স্কুলের পিছনে হাতিশাল স্থানটি বর্তমান। মালিয়াড়াতে দেখেছি হাতিবাঁধার জন্য লোহার তৈরি মজবুত শিকল।ছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ঘোড়া ও ঘোড়ারগাড়িও ছিল। তবে "আম আদমি"র কাছে তা ছিল কি, না, থাকতে পারে?
না থাকতে পারে। কিন্তু আম আদমির মেজাজটা রাজা জমিদারদের চেয়ে কিছু কম ছিল না। নিজেরা না চড়তে পারেন,ব্যবহার না করতে পারেন, তো কি হয়েছে! তাদের মনের বাসনা পূরণ করা প্রিয় দেবতাকে তো মাটির হাতি ঘোড়া দিতেই পারেন।
তাই কি 'থানে-থানে' এত হাতি ঘোড়া?
৪.
সহৃদয় পাঠক,মাফ করবেন। আপনারা যাঁরা বাঁকুড়ায় বাস করেন বা এসেছেন,লক্ষ্য করেছেন ভালো করে। তাঁরা সকলেই জানেন- অনাদরে,গাছের তলায়,ভাঙা খড়ের চালায়  কিংবা ঠা ঠা রোদ্দুরে পড়ে থাকা এই সব শিল্পকর্মের মধ্যে যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে কে জানে! এ ঊষরভূমিতে কোথা থেকে এল এ্যাতো এ্যাতো হাতি ঘোড়া!
রহস্য উন্মোচন হবে হয়ত একদিন। প্রতীক্ষায় থাকলাম গবেষকবৃন্দর গবেষণার জন্য।
টেরাকোটা শিল্প নিয়ে আলোচনার শেষ নেই।এখনো অনেকটাই অনালোকিত।  বাঁকুড়ার পটভূমিকায় সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করলাম মাত্র। জানি,তা পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। আরে গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে বিষয়টি। উৎসাহী পাঠকগণ ঠিক পড়বেন,জানবেন, সমৃদ্ধ হবেন ও অন্যদেরও সমৃদ্ধ করবেন।
-------------------------------------------------------------
সহায়ক গ্রন্থ:
-----------------
১.
Bankura District  Gazetteers :BANKURA: A.K.Banerjee ( Edited) W.B.Govt.1968.
2.
পশ্চিম বঙ্গ : বাঁকুড়া জেলা সংখ্যা: বাঁকুড়ার টেরাকোটা শিল্প :টেরাকোটার কাব্য: রবীন্দ্রনাথ সামন্ত,পঃ বঃ সরকার,( পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭)
৩.
বাঁকুড়া পরিচয়( ১-৪ খন্ড),প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স,কোলকাতা ৭৩
৪.
ভারতের শিল্পসংস্কৃতির পটভূমিকায় বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা : চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত: বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া, পরিবেশক- দাশগুপ্ত এন্ড কোম্পানি প্রাঃ লিঃ,১৪০৭(ইং ২০০০).
৫.
বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা : চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত : টেরাকোটা, বিষ্ণুপুর,বাঁকুড়া।(প্রথম প্রকাশ ১৩৮৬) টেরাকোটা সং ১৪২২,
(
ইং ২০১৫)
৬.
বর্ণময় বাঁকুড়ার পথে প্রান্তরে:প্রভাত গোস্বামী :প্রকাশক : দেবীপ্রসাদ পালিত,বাঁকুড়া, জুন ২০০৭
৭.
পালিতের বাঁকুড়ার ভূগোল ও ইতিবৃত্ত ( ১৬শ সং) : সুধীর কুমার পালিত, লেখক কতৃক প্রকাশিত, বাঁকুড়া ১৩৭৩( বঙ্গাব্দ)
৮.
বাঁকুড়ার মন্দির : অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য সংসদ,কোলকাতা, ১৩৭১ ( বঙ্গাব্দ)
৯.
The Temples of Bankura District,( Re.Edn.)David Mc Cutchion, Writers Workshop Publication, Calcutta, 1972
-------------------------------------------------------------