রবিবার, ৯ মে, ২০২১

অমিতাভ সরকার

                                        


(মাতৃ দিবসে এক মায়ের গল্প)

#নকশী_কাঁথা#
                                                           
 
ফ্ল্যাটের ঢোকার দরজার কাছে গিয়ে আর একবার লিভিং রুমের চারিদিকটা পরখ করে নিলাদ্রী। গতকালের কেনা জানলা-দরজার পর্দাগুলো টাঙানো পর বেশ লাগছে ঘরটাকে। নিজের পছন্দের তারিফ করে মনে মনে। হঠাৎ দেওয়ালে টাঙ্গানো ফ্রেমে বাঁধানো বহুদিনের বিবর্ণ পারিবারিক ছবি দেখে ভ্রুঁরু কুঁচকে গেল নীলাদ্রির। ইসস, একদম চোখে পড়ে নি!! “মধু... মধু...”। মধুরিমা, নিলাদ্রীর স্ত্রী। “আসছি...। কী হলো আবার...?” কিচেন থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে মধুরিমা। আজ ভোর থেকেই রান্নার কাজে ব্যাস্ত মধু।
“এই দ্যাখো, পরিষ্কার করার সময় ভেবেছিলাম সরিয়ে দেব, একদম খেয়াল হয় নি...! তোমারও তো চোখে পড়েনি! ইসসস...!”
“আমি কী করে করবো? সকাল থেকেই তো কিচেনে...। তোমার আর কি, বাজার করেই খালাস...। নিলাদ্রী মধুর কথার জবাব না দিয়ে একটা টুলের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্রেমটা নামিয়ে আনে।
“গতকালের আনা রবীন্দ্রনাথের পোট্রেটটা কোথায় গো?” মধুরিমা বেডরুম থেকে নিয়ে এসে ছবিটা নিলাদ্রীর হাতে এগিয়ে দিতে দিতে বলে;
“শোনো, একটা বিষয় আমরা ভেবে দেখি নি...”। একটু চিন্তিত মনে হয় মধুরিমাকে।
“আবার কী হল...?” পোট্রেটটা টাঙ্গিয়ে দিতে দিতে বলে। ওঃ, সকাল থেকে যা চলছে...। শরীর আর চলছে না। ঘরদোর পরিষ্কার, পুরোনো নড়বড়ে ফার্নিচারগুলো সব ছাদে তোলা, ব্যালকনির টবগুলি রঙ করা, দু’রকম মাছ, মাংস...এখনও তো ফুল আর মিষ্টি আনতে বাকী। যদি কাজটা হয়ে যায়, তাহলে পরিশ্রমটা সার্থক হয়।
“না..., সে রকম কিছু না, ভাবছিলাম, তোমার মা’কে কোথায় রাখা যায়? মা কি তাঁর ঘরেই থাকবেন?
“তাই তো, এদিকটা একদম ভাবা হয় নি। সোফায় বসে নীলাদ্রী। “কী করা যায় বলো তো?”
“তোমাকে বলেছিলাম কয়েকদিন দেশের বাড়িতে কাকার কাছে রেখে আসতে। তুমি তো তখন পাত্তা দিলে না...,  এখন বোঝো!”
“এখন তো ওই সব ভেবে লাভ নেই...। প্লিজ, কী করা যায় বলো না।“ অনেকটা আবদারের সুরেই বললো নীলাদ্রির। মাথাটা একটু নীচু করে একটু ভেবে নেয় মধু।
“এক কাজ করো, পেছনের দিকে শোয়ার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে মা তো রোজই বসেন। আজ না হয় ওনারা না যাওয়া পর্যন্ত বসে থাকবেন। দু’তিন ঘন্টার তো ব্যাপার...। তেমন ঠান্ডাও পরে নি...”।
“তা অবশ্য ঠিক...” অনেকটা অনিচ্ছা যত্বে মেনে নেয় নিলাদ্রী।
“আর হ্যাঁ..., ফুল আনার সময় মা’র জন্য ভালো দেখে একটা হাউসকোট নিয়ে এসো। চিন্তা করো না, আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো। তুমি এগোও...আমার এখন অনেক কাজ”। বলতে বলতে কিচেনের দিকে এগোয় মধু।

বাজার থেকে ফিরে মা’র হাউসকোটটা হাত বাড়িয়ে মধুকে দিয়ে কয়েক ডজন রজনীগন্ধা স্টিক আর ফুলের বুকেটা ডাইনিং টেবিলে রেখে একটু জল ছিটিয়ে দেয় নিলাদ্রী। তারপর শেষবারের মতো লিভিংরুমের ফার্নিচারগুলো একটু ঠিকঠাক করে দেয়। দরজা থেকে দু’পা এগিয়ে বুকশেলফের পাশে সোফাসেট, মাঝখানে সেন্টার টেবিল, জানলার একপাশে একটু উঁচু টুলের ওপর স্কেলচেঞ্জার, তার পাশে টুল। তার ঠিক পেছনের ওয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি। ‘মধুকে দুটো  গান একটু প্রাকটিস করে রাখতে বলেছিলাম, করেছে তো?’ মনে মনে ভাবে নিলাদ্রী।

“মা দেখি, একবার পরে দেখুন তো ঠিক হয়েছে কিনা”। মধু হাউসকোটটা প্যাকেট থেকে বের করে শাশুড়িকে পরিয়ে দেখে নেয়। ভালোই লাগছে শাশুড়িকে, বোঝাই যায় একসময় বেশ সুন্দরী ছিলেন। যদি নেহাতই সামনে আসতে হয়, খারাপ দেখাবে না। মনে মনে ভাবে মধু।
“এটা কী বউমা? ম্যাক্সি...? আমার তো অনেক ম্যাক্সি আছে... এটা...?”
“এটা হাউসকোট, আজ বিকেলে ওঁর অফিসের বড়সাহেব তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন। সবাইকে একটু ফিটফাট থাকতে হবে। বিকেলে আপনি এটা ম্যাক্সির ওপর পরে থাকবেন। ও হ্যাঁ...আর একটা কথা, বিকেলে ওই সময়টুকু ব্যালকনি গিয়ে বসবেন। বুঝতেই পারছেন, আপনার ছেলের চাকরীর ব্যাপার। এর মধ্যে আপনার না থাকাই ভাল। একটু কষ্ট হবে হয়তো”।
“আমি বুঝতে পেরেছি বউমা। আমার কোনও কষ্ট হবে না। ওঁনারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি ওখানেই থাকবো। কোনও চিন্তা করোনা”।

বিকেলে নিলাদ্রী স্নান সেরে খদ্দরের পাঞ্জাবী আর পায়জামা পরে। মধুরিমা পরে সাদা লালপাড় টাঙ্গাইল। সাহেব ছ’টা থাকে সাড়ে ছ’টা মধ্যে আসবেন বলেছেন। একবার যদি সাহেবকে হাত করা যায়, তাহলে এরিয়া ম্যানেজারের পোস্টটা পাকা। যদিও ক’দিন ধরেই তেওয়ারিকে স্যারের চারপাশে ঘুরঘুর করতে দেখছে। অফিসের কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে তেওয়ারিই নাকী...। এই প্ল্যানটা অবশ্য মধুরই...।
“মধু পায়েসটা ফ্রিজে রেখেছো তো? ঠান্ডা না হলে ঠিক ভালো লাগে না’
“সব ঠিক আছে, কোনও টেনশন করো না। প্ল্যানটা যখন আমার, তখন অত ভাবতে হবে না।  এই রকম হাই-প্রোফাইলের গেস্টদের কী ভাবে এন্টারটেন্ট করতে হয়, তা তোমার থেকে ভালো জানি”।
“মা ঠিক আছে তো?”
“মা’কে ব্যালকনিতে বসিয়ে দিয়ে এসেছি। কোনও অসুবিধা হবে না। আর অসুবিধা হলেও তো কয়েক ঘন্টা।  মাঝখানে আমি একবার দেখে আসবো”।
“পোনে ছ’টা বাজে। যাই..., নীচে গেটে গিয়ে ওয়েট করি”। নিলাদ্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাঁকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেয় মধুরিমা।

জলতরঙ্গের মতো কলিংবেল বেজে উঠতেই মধু তাড়াতাড়ি দরজা খোলে। নিলাদ্রীর পাশে সাদা পাঞ্জাবীর ওপর র’সিল্কের জহরকোট পরা এক হাসিখুশী ভদ্রলোক এবং সিল্কের শাড়ি পরা এক ভদ্রমহিলাকে দেখে অবাক হয় মধু। তবে যে নিলাদ্রী বললো, ইউ এস থেকে এসেছেন !
“আসুন আসুন প্লিজ...” নিজেকে সামলে আলতো করে ভদ্রমহিলার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে আসে মধু।
“মধু... এই হল আমাদের সকলের প্রিয় মিষ্টার সান্যাল সাহেব আর উনি...”।
“বুঝতে পেরেছি... ‘দিদি’...” ইচ্ছে করেই ‘দিদি’ সম্বোধন করে মিসেস সান্যালের প্রতিক্রিয়া দেখে মধু। মিসেস সান্যালের হাসি মুখ দেখে নিশ্চিন্ত হয়।
মিস্টার সান্যাল লিভিং রুমের চারিদিকটা দেখতে দেখতে বলেন;
“বাঃ, আপনাদের রুচির তারিফ করতেই হচ্ছে...। সবই তো ম্যাডামের ক্রেডিট, তাইতো? নিলাদ্রীর আর সময় কোথায়...”।
“খুব অন্যায় হয়েছে। আপনার মিসেসকে ‘দিদি’ বলে ডাকাটা ঠিক হয় নি। ম্যাডাম বলা উচিত ছিল”। অভিমানী গলায় বলে মধু। মধুর বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলেন মিস্টার সান্যাল।
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি নাম ধরেই ডাকবো। কী যেন নাম...?”
“আমার নাম মধুরিমা। মধু বলেই ডাকবেন আমাকে। ও ওই নামেই ডাকে...”।
“স্কেলচেঞ্জারও আছে দেখছি...! কে গান করেন? মধু নিশ্চয়ই, তাহলে তো একটা গান শুনতে হয়...”। সত্যি মধুকে তারিফ করতেই হচ্ছে। কয়েক মিনিটেই বেশ জমিয়ে দিলো!  খুশী হয় নিলাদ্রী।
“এক সময় করতাম, বিয়ের পর ঠিকমতো রেওয়াজ করার সময় পাই না”।
“তা বললে তো আমি শুনবো না...”। মিসেসের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে মিষ্টার সান্যাল। মিসেসও সায় দেয় তাতে।
“নিশ্চয়ই স্যার, ও অবশ্যই করবে”। কথাটা বলে মধুকে ইশারা করে নিলাদ্রী।
“পাঁচ মিনিট দাদা, সবার জন্যে আগে কফি নিয়ে আসি”। কিচেনের দিকে পা বাড়ায় মধু। নাঃ, এলেম আছে মধুর। দশ মিনিটেই দাদা পাতিয়ে ফেললো! মনে মনে ভাবে নিলাদ্রী।
মিষ্টার ও মিসেস সান্যালের অনুরোধে পর পর দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত করে মধু। গল্প গান, কবিতা পাঠে সময় গড়িয়ে যায়। কারো খেয়াল থাকে না। মধু ঘড়ির দিকে তাকায়।
“আটটা বেজে গেছে। আপনাদের জন্য এবার ডিনারের ব্যবস্থা করি?”
“তার আগে চলো তোমাদের ফ্ল্যাটটা একটু ঘুরে দেখি”। মিসেস সান্যালের কথায় উঠে দাঁড়ায় সকলে।
বেডরুমে গিয়ে ব্যালকোনির দরজাটা খুলে দেয় মধু। আশপাশের ফ্ল্যাটের আলো ঝলমলিয়ে ওঠে। ব্যালকোনির ইন্ডোর-প্ল্যান্ট আর অর্কিডের তারিফ করে তাঁরা। সকলে পেছনের দিকে ছোট বেডরুমে এসে ঢোকে।
“এখানে কে থাকেন? মিসেস সান্যালের প্রশ্নে নিলাদ্রীকে ইতস্তত করতে দেখে এগিয়ে আসে মধু।
“এটা আমাদের মা, মানে আমার শাশুড়ী মা’র জন্য। মা সাধারণত দেশের বাড়ি বীরভূমেই থাকেন, মাঝেমধ্যে এখানে এলে...”। বেডরুম থেকে বেরোবার সময় হঠাতই থমকে দাঁড়ায় মিষ্টার সান্যাল।
“এখানে কী কেউ আছেন? একটা কাশির শব্দ শুনলাম মনে হোল!” মিষ্টার সান্যালের কথায় প্রমাদ গোনে নিলাদ্রী। মধুর দিকে অসহায়ের মতো তাকায় মধুর দিকে...।
“এই রে...মা এখনও ব্যালকোনিতে! ইসসস... কথায় কথায় ভুলেই গিয়েছিলাম... মা কয়েকদিন হোল এখানে এসেছেন”।  ব্যালকোনির দরজা খোলে মধু। মধুর সাথে সাথে মিষ্টার সান্যালও এগিয়ে যান।
ধীরে ধীরে মা’কে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয় মধু।
“কিছু মনে করো না বৌমা, ঘুমিয়ে পরেছিলাম”। হঠাৎ  মিষ্টার ও মিসেস সান্যালকে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যান।
“কী যে বলেন মা। আমারই ভুল, ওঁনাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাস্ত থাকায় একদম খেয়াল করতে পারি নি”।
মিষ্টার সান্যাল সামনে গিয়ে প্রণাম করেন নিলাদ্রীর মা’কে। তা দেখে বিস্মিত হয় নিলাদ্রী ও মধু।
মিসেস সান্যাল ঝুঁকে প্রণাম করে উঠতেই হঠাৎ গায়ের জড়ানো কাঁথার দিকে নজর পরে তাঁর। মিষ্টার সান্যালকে বলেন;
“দেখো..., নকশী কাঁথা...!!” মিসেসের কথা মিষ্টার সান্যাল ঘুরে ফিরে চারদিকে দেখতে থাকেন গায়ে জড়ানো কাঁথাকে। দুটি হাঁটুকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে মাথা নিচু করে আরো কুঁকড়ে যান নিলাদ্রীর মা।
“ দেখি মা...” মধু চট  করে একটা হালকা শাল নিয়ে এসে শাশুড়ীকে জড়িয়ে কাঁথাটা খুলে দেয়। তারপর সকলের সামনে এনে বিছিয়ে দেয় বিছানায়। বিস্ময়ে দুজনে কাঁথাটা খুঁটিতে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। কী অসম্ভব ধৈর্য্য, দক্ষতা আর নান্দিকতার অপূর্ব মেল বন্ধন... স্তম্ভিত হয়ে যান দু’জনে।
নিলাদ্রী আর মধু অবাক চোখে দাঁড়িয়ে ভাবে, এত মূল্যবান, এত কদর এই কাঁথার...! আগে জানলে তো...।
“মাসিমা, আপনি করেছেন?” মিস্টার সান্যাল পাশে বসে জিজ্ঞাসা করেন নিলাদ্রীর মা’কে।
“হ্যাঁ, বাবু যখন খুব ছোট, সেই সময়ে করেছিলাম...”।
“আমাকে একটা করে দেবেন মাসিমা?” দু’হাত দিয়ে নিলাদ্রীর মায়ের হাত ধরেন মিসেস সান্যাল ।
“এখন কি পারবো? চোখে ভালো দেখতে...”  কথাটা শেষ করতে দেয় না মধু।
“আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন দিদি, মা ঠিক পারবে”। এবারে কথা বলে নিলাদ্রী;
“ঠিক আছে মা, তোমার কী কী লাগবে বলে দিও, আমি এনে দেবো”।

ডিনারের পর মিষ্টার আর মিসেস সান্যাল বিদায়ের সময় আর একবার প্রণাম করলেন নিলাদ্রীর মা’কে। নিলাদ্রী নিচে নেমে তঁদেরকে গাড়িতে তুলে ফিরে এসে মা’কে জড়িয়ে পাশে বসে।
“আচ্ছা বাবু, ওদের কাঁথাটা করে দিলে তোর কি মাইনে বাড়বে?”
“হ্যাঁ মা, একটা প্রমোশন হবার কথা আছে। আর প্রমোশন হলে মাইনে তো বাড়বেই মা”।
“তাহলে তুই কালকেই নানা রঙের সুতো আর কয়েকটি সূঁচ নিয়ে আসিস। আমার করেকটি সাদা শাড়ী আছে, তাতেই হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না বাবু, আমার যত কষ্টই হোক, তোর জন্য ঠিক করে দিয়ে যাব”।
                     .....................

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                      



 মুড সুইং/  সুগন্ধিবিষ  / কোভিড। 


  জ্ঞানচক্ষু মেলে পরিচিত হয়েছি ধূপকাঠির সঙ্গে। বাড়িতে পুজো আর রাশি রাশি ধূপ কাঠি জ্বালানো হচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতি সন্ধ্যা। 
ধূপকাঠির সুগন্ধ মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। সুগন্ধি রঙিন মোম জ্বালিয়ে চোখ তৃপ্তি পায়। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে পুজো মানেই ধূপের সুগন্ধি ছাড়া চলে না। 
   
    কেউ ই অবশ্য ঈশ্বরকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি কিভাবে ডাকলে আপনার ভালো লাগবে? আদৌ এই সব উপকরণ লাগবে কি না? নাহ্। করিনি। অন্ধের মত প্রথা মেনে চলেছি। স্বীকার করতে বাধা নেই, আমিও তাই করেছি। প্রচুর পুজো করি। প্রচুর কষ্ট করি। প্রচুর ধূপ জ্বালাই। মোমবাতি জ্বালাই। বিদেশের গির্জা , মসজিদ খুঁজে খুঁজে জ্বালিয়ে রেখে আসি ধূপ। আজ বুঝি , কত ক্ষতি করেছি নিজের এবং পরিবেশের। শুধু, একটি নমস্কারে পূর্ণ হয় না প্রার্থণা? হয় বইকি! যেটা হয়না, সেটা হল নিজের তৃপ্তি হয়না। ঈশ্বর ঠিক কি চান? সেটা কখনো জিজ্ঞেস করিনি! 
*******
কেউ সিগারেট খেলে কত বকুনি দিতে থাকি, কিন্তু ধূপের ধোঁয়া তার চেয়েও ক্ষতিকর বেশি।  এখানে থাকে কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য যা, জিনের( D NA) উপাদানে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে, পুজোর সঙ্গে জুড়ে যাওয়ায় আমরা উদাসীন থাকি ক্ষতিকর দিক থেকে। কেউ সিগারেট খেলে খুব বিরক্ত হই, কিন্তু ধূপকাঠি? 
মন ভালো করে। বাড়িতে একটা পজিটিভ চিন্তা আনে।
ধূপের স্নিগ্ধ গন্ধের সঙ্গে মুড ভালো করার ইচ্ছে কাজ করে। পবিত্রতা আর প্রশান্তি জড়িয়ে আছে ধূপের সঙ্গে।      

      কথাগুলি সত্য। কিন্তু,
  শ্বাসের সঙ্গে ওই ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ করেছি। ফুসফুসে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার মধ্যে আছে এমন টক্সিক পদার্থ ,যা ডেকে আনে ক্যান্সার। শ্বাস জনিত সমস্যা দেখা দেয় এখান থেকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিন ধরণের বিষ থাকে ধূপ কাঠির মধ্যে
  মিউটাজেনিক , জিনোটক্সিক সাইটোটক্সিক... যেগুলো প্রতিদিন ক্ষতি করছে আমাদের। 
****
এই প্রসঙ্গে বলি, পুরোহিতের কথা। 
দিনের পর দিন ধূপের ধোঁয়া সৃষ্টি  করছে সিওপিডি ( ক্রনিক অব স্ট্রাকটিভ পালমোনারিডিজিজ) 
সি ও পি ডি- কে বুঝতে হলে, আমাদের জানতে হবে, ফুসফুস কিভাবে কাজ করে। নিশ্বাস নিলে বাতাস আমাদের শ্বাসনালী  দিয়ে ছোট ছোট নালী ব্রঙ্কিওলস এ যায়। এই নলগুলোর শেষে আবার নানা  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র থলি a l v e o l i  থাকে। এই থলিগুলি থেকেই আমাদের রক্ত প্রযোজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহ করে। সি ও পি ডি  র ফলে এই থলি গুলিতে কম বাতাস যায়।    
****
     নানা কারণ থাকতে পারে ফুসফুস জখম হ ওয়া র, ধূপকাঠি জ্বালানো তার মধ্যে একটি। 
ধূপের বক্স এ সিগারেটের মত সতর্কীকরণ থাকা ভালো। কারণ, ঘুপচি মন্দিরে ধূপকাঠির ধোঁয়া 500 সিগারেট খাওয়ার সমান। 
এখন, পরিবারের সকলে বাড়িতে আছে। একসঙ্গে। সুতরাং, ধূপকাঠি আরো মারাত্মক। 
এখন বরং, একটি নমস্কারে কাজ চলুক। উপোস বন্ধ থাকুক। কর্পূর জ্বালানো যেতে পারে। সবই কম কম। ধোঁয়া সৃষ্টি করে এমন কিছু না জ্বালানো ভালো।



                                                             

কাজল সেন

                                                                  



চিত্রকলা 


নাম রাখা হয়েছিল চিত্রকলা। মা-বাবা কী ভেবে মেয়ের এই নাম রেখেছিলেন, তা কারও জানা নেই, চিত্রকলারও জানার তো কথাই নেই। কেননা সেই নিতান্ত ছোটবেলায় চিত্রকলার তখনও কোনো বোধের উদয় হয়নি, আর কিছুটা বড় হয়ে  মা-বাবাকে হারিয়েছে। চিত্রকলা তারপর থেকে দাদু-দিদার কাছেই থেকেছে, ক্রমশ আরও বড় হয়েছে। বড় হওয়ার সাথে সাথে যেসব ব্যাপার খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটে থাকে, চিত্রকলারও তাই তাই ঘটেছে। যেমন স্কুলে ভর্তি হয়ে একটার পর একটা ক্লাসে উঠেছে। স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নজরুল সদনে গান শিখেছে, নাচ শিখেছে, ক্যারাটে শিখেছে, আবৃত্তি শিখেছে, কিন্তু না, চিত্রকলা শেখেনি। পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, আঁকাআঁকি একদম নয়। আঁকাআঁকির সঙ্গে আমার জন্মের শত্রুতা। কিছুতেই শিখব না।
চিত্রকলা অঙ্কনশিল্প শেখেনি, সুতরাং তার এই শিল্পকর্মে দক্ষতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তি শিখলেও তাতে যে সে রীতিমতো বা মোটামুটি দক্ষ, তাও বলা যাবে না। এবং সে যে এসব যথাযথ মন দিয়ে শেখেনি, তারও অনেক প্রমাণ আছে। যেমন স্কুল বা কলেজের পরীক্ষাগুলোতে  কোনোরকমে পাস করে গেলেও পড়াশোনায় রুটিন করে ফাঁকি দিয়েছে, ঠিক তেমনি গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তির ক্লাসে সুযোগ পেলেই কারও সঙ্গে বকবক, কারও সঙ্গে খুনসুটি, কারও সঙ্গে ঝগড়া, আবার কারও সঙ্গে হেঁয়ালি করে সময় কাটিয়েছে। 
এমন এক মেয়ে চিত্রকলা, যে সর্বঘটে লবডঙ্কা, যার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দাদু-দিদা বিব্রত, সেই মেয়ে হঠাৎ একদিন সবাইকে ভড়কি দিয়ে একটা ট্যালেন্ট হান্ট কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করে অ্যাক্টিং সেশনের ফার্স্ট রাউন্ডে সিলেক্ট হয়ে গেল। চিত্রকলার যেসব বন্ধু-বান্ধবীরা সেখানে জড়ো হয়েছিল, তারা চিত্রকলার ক্যালি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। আসলে মুশকিল হচ্ছে, চিত্রকলা দেখতেও তো আদৌ সুন্দরী নয়! রঙটাও ফর্সা নয়, মূলত কালোই, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলে সান্ত্বনা দেওয়া যেতে পারে। বিচারকরা যে কী দেখে চিত্রকলাকে সিলেক্ট করল, কে জানে!
কম্পিটিশনের ফার্স্ট রাউন্ড হয়েছিল রাঁচিতে। সেকেন্ড রাউন্ড ছিল পাটনায়। চিত্রকলা পাটনায় পৌঁছে গেল। এবং কী আশ্চর্য, দ্বিতীয় রাউন্ডেও চিত্রকলা বাজি মারল। এবার ফাইন্যাল রাউন্ড কলকাতায়। চিত্রকলা রাঁচি ও পাটনায় একাই গেছিল। কিন্তু কলকাতায় যাবার জন্য দাদু-দিদাকে চেপে ধরল, তোমরাও চলো। দাদু-দিদার ততদিনে সিনা মানে বুকের পাটা একটু একটু করে ফুলতে শুরু করেছে নাতনীর কীর্তিকান্ড দেখে। চিত্রকলাকে নিয়ে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কলকাতায়। ফাইন্যাল রাউন্ড, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইতিপূর্বে সিলেক্টেড প্রতিযোগীরা এসেছে। যেদিন কম্পিটিশন সেদিন চিত্রকলা ভোর হতেই দাদু-দিদার সঙ্গে হাজির হলো স্টুডিওতে। সকাল দশটা থেকে ফাইন্যাল রাউন্ড শুরু হবে। 
চিত্রকলার যখন ডাক পড়ল তখন প্রায় রাত দশটা বাজে। সারাদিন উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় শ্রান্তিতে ক্লান্তিতে কাহিল হয়ে পড়েছিল চিত্রকলা। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে গ্যালারির দর্শক আর বিচারকদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আর তারপর শুরু হলো চিত্রকলার এতদিনে অর্জিত পড়াশোনা, গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তির  এক অবিশ্বাস্য কম্পোজিট এক্সপোজার। চিত্রকলা তখন নিজেই এক আশ্চর্য চিত্রকলা। 

শর্মিষ্ঠা দত্ত

                                                                     



খোঁজ 


(১)

"চাই---- শো-ও-ও-ওন পাপড়ি-ই- ই-ই ..." কালো টিনের বাক্স মাথায় শোনপাপড়িওয়ালা ঢুকলো তিন ফুট সরু গলিটার ভিতর l এটা একটা অন্ধগলি l ডানদিকে যে বাড়িটার টানা  দেওয়াল রয়েছে সেটা মুসলমানদের । ওপরদিকে খুব ছোট ছোট ঘুলঘুলির মত দুটো জানালা, দিনের বেলাও এত অন্ধকার যে সেটা দিয়ে ঘরের ভিতরের দৃশ্য কিছুই দেখা যায় না, শুধু মাঝে মাঝে একটা জানালার চিটচিটে পর্দার আড়ালে একটা কচি মেয়ের মুখ উঁকি মারে । ও বাড়িতে আরো অনেক বাচ্চার কিচিরমিচির  শোনা গেলেও, তাদের এ জানলায়  দেখা যায়না  কখনো l বাঁদিকে তিনটি বাড়ি, প্রথম বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের গায়ে একটা কাঠের দরজা, প্রবেশদ্বার l শেষ বাড়িরও তাই ।  শুধু দ্বিতীয় বাড়ির দরজার পাশে একটা ঘরে কাঠের পাল্লা আর গরাদ দেওয়া দুটো ছোট্ট ছোট্ট  জানালা খোলা l শোবার ঘরের খাটে দাঁড়িয়ে একটা ফুটফুটে পুতুলের মতো বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়ে গরাদের ভিতর থেকে হাত বাড়িয়ে রিনরিনে স্বরে  বলে উঠল 
--ও শোনপাপড়িওয়ালা ...আমাকে একটা শোনপাপড়ি দাও না l 
তার হাতের মুঠোয় পাঁচ পয়সার কয়েন l অনেক বায়না করার পর অফিসে যাওয়ার আগে বাবার কাছ থেকে আজ আদায় করেছে সে l 
ঘুলঘুলির জানলা দিয়ে অন্য বাড়ির  মেয়েটা জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে,  তারপর জানালা থেকে সরে যায়।শোনপাপড়িওয়ালা তার কালো ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে একটুকরো কাগজ বের করে তার ওপর সাজিয়ে দেয় নরম হলুদ রঙের চৌকো এক অমৃতখণ্ড ! যার প্রতিটি স্তরে স্তরে রয়েছে অফুরন্ত আনন্দের ভাণ্ডার । সেই স্বাদ পরবর্তীকালে কোনো বিখ্যাত ভুজিওয়ালার শোনপাপড়িতে খুঁজে পায়নি মেয়েটা ।

সময়টা বাহাত্তর -তিয়াত্তর সাল, মধ্যকলকাতার পার্কসার্কাস অঞ্চলের  একটা পুরোনো হিন্দুপাড়ায় গা-ঘেঁষাঘেঁষি বাড়িগুলোর মধ্যে শেষ হিন্দু গলিটায় ওদের বাড়ি ছিল । গলির ওপাশেই মুসলমানদের বাড়ি, যদিও এটা  তাদের বাড়ির পিছনদিক, তবু দু-বাড়ির জানালা দিয়ে দুজন কচিকাঁচার চোখাচোখি বা মুখ ভ্যাংচানোর মাধ্যমে অল্পস্বল্প ভাব হতে দেরি হয় না । কিন্তু ওই পর্যন্তই ... সালমা খাতুন বা শর্মিলা বসুর এর থেকে বেশি আলাপ এগোয়নি ছোটবেলায় ।

বাংলাদেশ যুদ্ধের সামান্য পরবর্তী সময়ে রেডিওতে তখনও "আমার সোনার বাংলা "বেজে উঠত প্রায়ই l সন্ধ্যেবেলা তোলা উনুনে রুটি সেঁকতে সেঁকতে মা গুণগুণ করে উঠতেন, "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী " l সেসময় ঠাম্মার ছলছলে চোখে ভেসে উঠত ঢাকা বিক্রমপুরের নদীঘেরা সবুজ ল্যান্ডস্কেপ । তার কাছে গল্প শুনে শুনে ওদেশটা খুব আপন মনে হত । তার বছর কুড়ি আগে বাহান্ন সালে ওদেশ থেকে এসে বৌ আর ছেলেমেয়েসহ এবাড়ির একতলার একটা অংশ  ভাড়া নিয়েছিলেন শর্মিলার ঠাকুরদা l আড়াইখানা ঘর, সামনে একটা ছোট বাঁধানো উঠোন, উঠোনের একধারে টালির চালা দেওয়া রান্নাঘর আর অন্যদিকে টিনের চালা দেওয়া বাথরুম l তার সামনে বাঁধানো কলতলা। ভাড়া দশ টাকা । তিনি চলে গেছেন শর্মিলার জন্মেরও আগে,বাবাও  একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির অতি সাধারণ চাকরির ভরসায় মা -ভাই -বোন আর স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে এর থেকে ভাল কোনো বাসস্থান যোগাড় করে উঠতে পারেননি । যদিও ভাড়া বেড়ে তখন একশ কুড়ি টাকা হয়েছিল ।

#খোঁজ 

(২)

দোতলায় সপরিবারে থাকত বাড়িওয়ালা , একটি বাঙালি খৃষ্টান পরিবার । ওদের আচার-আচরণ ,সাজগোজ ,পোশাকআশাকে হিন্দুদের সঙ্গে কোনো পার্থক্য ছিল না । বিধবা ঠাম্মা সাদা থান পরতেন ,কাকিমারা শাঁখা -সিঁদুর সবই ব্যবহার করতেন । কিন্তু ওরা ছিল পাক্কা ঘটি ,শর্মিলারা বাঙাল ...তা নিয়ে খুনসুটি আর টিকা-টিপ্পনী চলতেই থাকত দু পক্ষে । আবার  শর্মিলাদের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় পাড়ার লোকজন , আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে ওরাও একসঙ্গে বসে খিচুড়িভোগ  খেতেন । দুর্গাপূজার পর বাবা -কাকুর সঙ্গে কোলাকুলি করতেন ও বাড়ির কাকুরা । শর্মিলার ঠাম্মার সঙ্গে ও বাড়ির ঠাম্মাও  রোজ বিকেলে যেতেন শিবমন্দিরে ,সেখানে পাড়ার বুড়িদের বেশ একটা মিষ্টি আড্ডা হত । আবার শর্মিলাও ওবাড়ির পিকলু ,শেলীদের সঙ্গে শুক্রবার হলেই সেজেগুজে চার্চে ছুটত । বড়দিনে যে কতরকম লোভনীয় কেক-পেস্ট্রি  বানাত ওপরের কাকিমা ! বাবার অফিস থেকে ক্রিসমাস ঈভে বাক্সভর্তি যে ট্রিন্কাসের কেক দিত ,তার ধারেকাছে লাগত না ।

পাশের মুসলমান পাড়ায় যাওয়া অবশ্য নিষিদ্ধ ছিল ওদের । তবু মুখচেনা ছিল অনেকের সঙ্গেই । কাদের চাচার রিকশায় স্কুলে যেত শর্মিলা । আবার ও পাড়াতেই ডিস্পেনসারি ছিল ডক্টর বাগচীর,শর্মিলা ডাকত ডাক্তার জেঠু । জ্বরজারি হলে মাঝে মাঝে ওখানে গেলে দেখত  বিশাল বিশাল কাচের বয়ামে লাল-নীল মিক্সচার রাখা l জ্বর আর পেটখারাপের ওষুধ । কম্পাউন্ডার মামুনভাই প্রেসক্রিপশন দেখে দাগ দেয়া কাচের শিশিতে সেই মিক্সচার ঢেলে দিত । আর দিত ট্যাবলেট গুঁড়ো করে ওষুধের পুরিয়া l ডাক্তার জেঠুকে ও পাড়ার মানুষজন আল্লাহর মতই ভক্তি করত l প্রবল জ্বরে কাতরাতে কাতরাতে অথবা প্রচণ্ড পেটব্যথা নিয়ে ইব্রাহিম বা অন্য কোনো রিকশাওয়ালা বা কারখানার মজুর ডাক্তারখানায় এসে বলত 
--ডাগদারসাব মুঝে সুঁই দে দিজিয়ে না ! 
তখন ডাক্তারজেঠুর হাতে মোটা সিরিঞ্জটা দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে যেত শর্মি l আর অবাক হয়ে দেখত যে লোকটা সোজা হয়ে হেঁটে আসতে পারছিল না, সে কেমন টাট্টুঘোড়ার মত সাবলীলভাবে হাসিমুখে চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে l ডাক্তারজেঠু ধমকাতেন ওদের 
--আর যদি নেশা করে করে লিভারের বারোটা বাজাবি তো, না দেব ওষুধ, না দেব সুঁই l
এই ধমকের মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন ভালোবাসাটুকু থাকত তা ছেঁকে নিত ওরা কিন্তু  নেশায় লাগাম টানতে দেখা যেত না কাউকে l ওরা জানত ডাক্তারবাবু ভগবান l তিনি একটি ইনজেকশন দিলেই অসুখ দূরে পালাবে l এমনটাই ছিল ওদের বিশ্বাস l আসলে বাস্তুহারা ছিন্নমূল মানুষগুলোর জীবনে তখন প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই l নিম্নবিত্ত মানুষ বরাবরই নেশার দাস l ওই নেশাটুকুই ওদের জীবনের একমাত্র বিনোদন l আসলে  রাজনৈতিক ফায়দার জন্য আমজনতাকে ধর্মের আফিম খাওয়ানো শুরু হয়নি তখনও l

#খোঁজ 
(৩)
এরমধ্যেই একদিন বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গেল শর্মিলার ছোটকা । তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল পশ্চিমবঙ্গে । ওদের গলিতে ঢোকার প্রথম বাড়ির একতলার সামনের অংশটা ছিল পার্টিঅফিস, মাঝেমাঝেই পুলিশ  রেড হত । দুই বাড়ির  মাঝখানে ছিল একটা বড় চতুর্ভুজাকৃতি উঠোন l সেই উঠোনের দিকে ছিল শর্মিলাদের বাড়ির পিছনের দরজা l ছোটকার কমরেড বন্ধুরা  উঠোন পার হয়ে পিছনের দরজায় মৃদু  ঠকঠক করলেই সদা সতর্ক মা দরজা খুলে ঢুকিয়ে নিতেন সক্কলকে l কেউ পালাত পিছনের উঠোনের দেওয়াল টপকে, যারা পারত না তারা সেঁধিয়ে যেত মায়ের আর ঠাম্মার খাটের তলায় l পুলিশ এসে সদর দরজা খুলতে বললেও মা দৃপ্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিতেন, বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষের  অনুপস্থিতিতে তিনি কিছুতেই দরজা খুলবেন না l

দিনকয়েক পরে ছোটকার খবর পাওয়া গেল l মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি l সরকারি হাসপাতাল, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মী সেখানে নিরাপদ নয় l শর্মিলার বাবা বন্ড দিয়ে ছাড়িয়ে আনলেন ছোটকাকে l ডক্টর বাগচী প্রতিদিন এসে দেখে যেতেন আর পরম মমতায়, যত্নে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করতেন মা l গা মোছানো থেকে খাওয়ানো সবটাই মাই করতেন l বয়েসে সামান্য ছোট হলেও এই ছোট দেওরটিকে সন্তানবৎ স্নেহ করতেন তিনি l ছোটকার সমস্ত কাজকর্মেই  অবাধ প্রশ্রয় ছিল তাঁর l ঠাম্মা আর বাবার সমস্ত শাসন থেকে আড়াল করে রাখতেন বলেই ঠাম্মার ভাষায় ছোটকা 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারত l'

ছোটকার সারা ঘরে ছড়ানো ইস্তেহার, কাস্তে -হাতুড়ি -তারা আঁকা লাল পতাকা l বিছানার ওপরে আধখোলা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো l দুটো হাতই ভেঙে গিয়েছিল ছোটকার, তবু ধর্মগ্রন্থের মত প্রতিদিন তার পাতা ওল্টাতেন  l সেই অসুস্থতার সময় শর্মি বোধহয় তখন  ক্লাস থ্রি -ফোর , বই পড়ে শোনাত ছোটকাকে l  ম্যাক্সিম গোর্কির "মা" উপন্যাসটা তখনই পড়া হয়ে গিয়েছিল l সোভিয়েত রাশিয়া থেকে তখন প্রকাশিত হত আকর্ষণীয় ছবিওয়ালা বাংলা বই l বড়োদের সঙ্গে সঙ্গে ছোটদেরও বইও পাওয়া যেত বইমেলার স্টলে l সুন্দর ঝকঝকে পাতায় ঝলমলে ছবি আর ঝকঝকে প্রিন্ট l প্রচুর বই কিনে দিতেন মা l বাংলা তো বটেই, সারা বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের ভাণ্ডারও ক্রমশ উন্মুক্ত হচ্ছিল চোখের সামনে l মায়ের বুককেসও  তখন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী তো বটেই...সমকালীন নানা লেখকের বই দিয়ে ভরে উঠছিল l অভাবের সংসারে কিভাবে যেন বই কেনার টাকা ঠিক জোগাড় হয়ে যেত l সাপ্তাহিক এবং মাসিক বড়দের এবং  ছোটদের কিছু পত্রপত্রিকাও আসত বাড়িতে l এছাড়াও দু তিনটে লাইব্রেরির মেম্বারশিপ ছিল মায়ের l সেখানে শিশু বিভাগ থেকে শর্মিলাও বই নিয়ে আসত  প্রতি সপ্তাহে l  এরমধ্যে কবে যেন  উল্টোদিকের বাড়ির জানলাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল l শর্মিলা লক্ষ্যই করেনি l সালমার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গিয়েছিল l স্কুলে, পাড়ায় তখন কয়েকজন বন্ধু হয়েছে শর্মিলার l তার মধ্যে সাগরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বটা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছিল l একটু দূরে, বাসরাস্তা পেরিয়ে যেতে হলেও প্রায় রোজই শর্মিলা যেত ওদের বাড়ি l 

তিস্তা

                                                                       



এই সংখ্যার কবি তিস্তাদি।আসুন পড়া যাক কবিতা।

মন

ঘুন বেজে যাচ্ছে হাড়ের ভিতর
মিহি ভস্মের ভিতর সন্তানের দগদগে নাভি
তুমি জেনে গেছো কতো দ্রুত আগুনের গতি
কতো দ্রুত বেশুমার পুড়ে গেলো সাধের কোরক
চাঁদের উল্টো পিঠে চাঁদই তো!
চব্বিশটা বসন্তের ইয়াব্বড়ো একটা মন...

এতোটা গ্রহণ, আমরাও জেনে গেছি, তুমি নিতে পারোনি–
নষ্ট পার্বণ



জলের স্থাপত্য


১/

ঋতু বদলের আগাম বার্তা নিয়ে

আমাদের ঘরে ঝুপ ঝুপ বর্ষা নেমে আসে


তুমি অন্তঃপুর চেনো, দেবল?

আঁচলের ঝুম ঝুম শব্দে টের পাও চাবির ঝনাৎ!

জলের স্থাপত্য!


এখানে প্রহার পঞ্চমস্বরে অমৃতের গান হয়ে বাজে

আর ঠিক তখন–

জ্বলেই নিবে যায় প্রাণহীন আর একটা সঙ্গম


গ্রহণ লাগে চাঁদে


২/

যে সব সন্ধ্যা নামেনি কখনো

অথবা নামবেও না কোনোদিন–

কেন তার অন্ধকারের কিনারে দাঁড়িয়ে

ফেরি করো গন্ধমাদন?

কেন তারে পরাতে চাও বৃষ্টির পোশাক?

হলুদ রঙের টিপ!


যা কিছু প্রণয়সূচক–

এ যাবৎ গাত্রদাহ– জ্বালা ; আমি তার পাশে

গান্ধার রেখে ফিরে এসেছি কবেই!


প্রিয় বান্ধবীর পায়ের কাছে রেখে এসেছি–

আমার সমস্ত শ্রী, আতর ও সৌরভ


৩/

" বিশালাক্ষী বিশালাক্ষী" - করে

আমাকে আর ধুনো দিও না

দেবীত্বে আমার রুচি নেই কোন


তুখোড় দস্যুবৃত্তির কাছে -

শীৎকারহীন আমার সমর্পণ

অথবা নিরুত্তাপ ঝরে যাওয়ার পাশে

তুমি আর কোন সন্তাপ রেখো না, দেবল,

বিচলিত হয়ো না


আমিও তেমন বধূটি ছিলাম না কোনদিন, যে -

বুনে রাখবো পঞ্চশস্য, সোহাগ!

গুনিনের কাছে মাথা কুটে মরবো তাকে ফেরাতে চেয়ে

কোন গুহ্যমন্ত্রেই আমিও তো বিশ্বাস রাখিনি কোনোদিন!

এয়োতি আচার দেহলিজ পেরিয়ে গেছে কবেই


অথচ আলগোছে খুলছো এমন

যেন রেওয়াজী দাস্তান, টুপ খসে পড়বো!

যেন কেঁদেকেটে আকুল হবো গোঁসাই গোঁসাই


৪/

যেখানে আবডাল নেই অথচ ফটক

তুমি তার নির্মাণ নিয়ে ভেবে দেখেছো কখনো?


সুচারু মৃৎশিল্পীর মতো প্রতিদিন, প্রতিটা দিন সে -

গড়েছে আর ভেঙেছে, ভেঙেছে আর গড়েছে

কিভাবে যে একের পর এক রূপ বদলে দিয়েছে প্রতিমার!

মুকুটের মতো পরিয়ে দিয়েছে

কবর খুঁড়ে তুলে আনা মৃত রমণীর চুল!

কিভাবে যে সস্তার রঙ লাগিয়ে দিয়েছে ঠোঁটে মুখে চোখে!


অতখানি আবাহনের পর বিসর্জনের উল্লাস -

তুমি দেখেছো দেবল? অনুভব করেছো!

বলো, অনুভব করতে পেরেছো সেই ব্যথা?


আজ আর ব্যতিব্যস্ত কোর না স্নান

বরং প্রলয় প্রস্তুত করো


আমাকে ভাসান পেয়েছে।


বান্ধবী

আমাদের বিগত ফটো ফেরি করতে করতে
দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে যে বান্ধবী আমার,
সে একদিন আমার-ই হাতের পায়সান্ন খেয়ে
আমাকে 'মা' বলে ডেকেছিল
সম্মোহন আর কতদূর!
জলোচ্ছ্বাস – সে-ও তো ক্ষণিক মাত্র!
তবু তারই ত্রুটিময় –
যন্ত্রণাকাতর জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে
ওহ্ এই দেখুন, আজও আমার কাজল স্প্রেড করে যাচ্ছে...


বড়ো অসময় এসেছেন হে
১/
সমস্ত কিছু হারিয়ে ফেলেছি আমি
আমার অগণিত দিন–
খাঁচার ভিতর কেটে গেছে শীতল ও শান্ত
আমার চোখের তলায়–
কালো হয়ে চেপে বসেছে গোপন যুদ্ধের দাগ
অদ্ভুত একটা হিমায়িত ঘুম!
যেন কতো বৎসর বরফ স্তরের নিচে–
চাপা পড়ে গেছে আমার নরম বাৎসল্য, প্রেম ও খুনসুটি
আর ধুলোয় ঢাকা পড়ে গেছে যে অমূল্য গুপ্তধন আমার–
তা তো গেছেই!
দুই প্রজন্মের সত্য ঘটনা অবলম্বনে–
এই আমার পায়রা জীবন মাজারের, প্রিয়
চৌচির চৌচির সমস্ত চাতাল
কী স্পৃহায় আর জেগে উঠি বলুন!

২/
এই সেই মৃত জলাভূমি–
যেখানে একা জেগে আছি আমি
আর আপনার ব্রাশের একেকটা স্ট্রোক
বদলে দিচ্ছে আমার ধাতব আদল, ভাঙা চোয়াল
শীতকালীন প্রাচুর্যের রঙে–
আমি ফুটে উঠছি টিউলিপের মতো!

৩/
দেয়ালে আঘাত করে ফিরে এসেছেন–
শৈশবের খেলার মতো
অথচ হার্ট টু হার্ট... বিট টু বিট...
যতক্ষণ না ছবি থেকে প্রতিচ্ছবির আয়না ভেঙে যায়
ঠিক ততক্ষণ এই ওয়েবসিরিজ চলবে
ঠিক ততক্ষণই মোহ
আয়নায় সূর্যাস্ত দেখছে রোজ–
দূর প্রাচ্যের প্রতিমা কোনো


স্ব-উপাসক


সে আমাকে গীর্জায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল একদিন
আজন্ম নাস্তিক আমি ; তেমন বাধ্যও তো নই কারো !
তবু, তাকে ফেরাতে পারিনি

কিন্তু পশ্চিমের ওই জানলাটা
জাফরি ভেদ করা বিকেলের ওই তেরছা আলো–
যা আমাকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছিল অনেকদিন পর্যন্ত!

সে-ও কী ততটা গভীর নয়! বলো ?

–'না, নয়।কবরের থেকেও গভীর কোন স্থান এই পৃথিবীতে নেই' –
ডোরিনা ক্রসিং পেরোতে পেরোতে সে বলেছিল।

'সে' – মানে মার্থা
মার্থা, মানে আমাকে 'নদী' বলে ডাকে যে মেয়েটি

কাল রাতে যার বুকে মুখ রেখে আমি ফুঁপিয়ে উঠেছিলাম!


জয়তী রায় ( মুনিয়া),

                                                             


মুড সুইং/  সুগন্ধিবিষ  / কোভিড। 


  জ্ঞানচক্ষু মেলে পরিচিত হয়েছি ধূপকাঠির সঙ্গে। বাড়িতে পুজো আর রাশি রাশি ধূপ কাঠি জ্বালানো হচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতি সন্ধ্যা। 
ধূপকাঠির সুগন্ধ মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। সুগন্ধি রঙিন মোম জ্বালিয়ে চোখ তৃপ্তি পায়। মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে পুজো মানেই ধূপের সুগন্ধি ছাড়া চলে না। 
   
    কেউ ই অবশ্য ঈশ্বরকে কখনো জিজ্ঞেস করিনি কিভাবে ডাকলে আপনার ভালো লাগবে? আদৌ এই সব উপকরণ লাগবে কি না? নাহ্। করিনি। অন্ধের মত প্রথা মেনে চলেছি। স্বীকার করতে বাধা নেই, আমিও তাই করেছি। প্রচুর পুজো করি। প্রচুর কষ্ট করি। প্রচুর ধূপ জ্বালাই। মোমবাতি জ্বালাই। বিদেশের গির্জা , মসজিদ খুঁজে খুঁজে জ্বালিয়ে রেখে আসি ধূপ। আজ বুঝি , কত ক্ষতি করেছি নিজের এবং পরিবেশের। শুধু, একটি নমস্কারে পূর্ণ হয় না প্রার্থণা? হয় বইকি! যেটা হয়না, সেটা হল নিজের তৃপ্তি হয়না। ঈশ্বর ঠিক কি চান? সেটা কখনো জিজ্ঞেস করিনি! 
*******
কেউ সিগারেট খেলে কত বকুনি দিতে থাকি, কিন্তু ধূপের ধোঁয়া তার চেয়েও ক্ষতিকর বেশি।  এখানে থাকে কিছু রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য যা, জিনের( D NA) উপাদানে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে, পুজোর সঙ্গে জুড়ে যাওয়ায় আমরা উদাসীন থাকি ক্ষতিকর দিক থেকে। কেউ সিগারেট খেলে খুব বিরক্ত হই, কিন্তু ধূপকাঠি? 
মন ভালো করে। বাড়িতে একটা পজিটিভ চিন্তা আনে।
ধূপের স্নিগ্ধ গন্ধের সঙ্গে মুড ভালো করার ইচ্ছে কাজ করে। পবিত্রতা আর প্রশান্তি জড়িয়ে আছে ধূপের সঙ্গে।      

      কথাগুলি সত্য। কিন্তু,
  শ্বাসের সঙ্গে ওই ক্ষতিকর পদার্থ গ্রহণ করেছি। ফুসফুসে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার মধ্যে আছে এমন টক্সিক পদার্থ ,যা ডেকে আনে ক্যান্সার। শ্বাস জনিত সমস্যা দেখা দেয় এখান থেকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিন ধরণের বিষ থাকে ধূপ কাঠির মধ্যে
  মিউটাজেনিক , জিনোটক্সিক সাইটোটক্সিক... যেগুলো প্রতিদিন ক্ষতি করছে আমাদের। 
****
এই প্রসঙ্গে বলি, পুরোহিতের কথা। 
দিনের পর দিন ধূপের ধোঁয়া সৃষ্টি  করছে সিওপিডি ( ক্রনিক অব স্ট্রাকটিভ পালমোনারিডিজিজ) 
সি ও পি ডি- কে বুঝতে হলে, আমাদের জানতে হবে, ফুসফুস কিভাবে কাজ করে। নিশ্বাস নিলে বাতাস আমাদের শ্বাসনালী  দিয়ে ছোট ছোট নালী ব্রঙ্কিওলস এ যায়। এই নলগুলোর শেষে আবার নানা  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র থলি a l v e o l i  থাকে। এই থলিগুলি থেকেই আমাদের রক্ত প্রযোজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহ করে। সি ও পি ডি  র ফলে এই থলি গুলিতে কম বাতাস যায়।    
****
     নানা কারণ থাকতে পারে ফুসফুস জখম হ ওয়া র, ধূপকাঠি জ্বালানো তার মধ্যে একটি। 
ধূপের বক্স এ সিগারেটের মত সতর্কীকরণ থাকা ভালো। কারণ, ঘুপচি মন্দিরে ধূপকাঠির ধোঁয়া 500 সিগারেট খাওয়ার সমান। 
এখন, পরিবারের সকলে বাড়িতে আছে। একসঙ্গে। সুতরাং, ধূপকাঠি আরো মারাত্মক। 
এখন বরং, একটি নমস্কারে কাজ চলুক। উপোস বন্ধ থাকুক। কর্পূর জ্বালানো যেতে পারে। সবই কম কম। ধোঁয়া সৃষ্টি করে এমন কিছু না জ্বালানো ভালো।


                           



রবিবার, ২ মে, ২০২১

জয়তী রায়(মুনিয়া)

                                       



 মধ্যবয়স/ মুড সুইং/ আধ্যাত্মিক দিক।


  আধ্যাত্মিকতা কথাটা খটোমটো। ইংলিশ সহজ। স্পিরিচুয়ালটি। spirituality.এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সংযোগ নেই। অর্থাৎ ধার্মিক লোক স্পিরিচুয়াল হতে পারে কিন্তু স্পিরিচুয়াল ব্যক্তিকে ধার্মিক হতে হবে না। 

  মধ্য বয়স আলোচনা করতে গিয়ে আধ্যাত্মিকতা কেন এলো , সেটা বোঝাতে গেলে, বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। 

ধৃ + মন = ধর্ম। ধৃ মানে হল ধারণ বা গ্রহণ করা আর মন হল অন্তর , আত্মা পরমাত্মা। তাহলে, ধর্মের অর্থ হল , মন যাহাকে গ্রহণ করে শান্তি লাভ করে। 

এখন ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। বৃহৎ অর্থ হারিয়ে গেছে। মধ্যবয়সে পৌঁছে মানুষের মন টাল মাটাল হতে থাকে। শরীর এবং মন উভয় দিকেই পরিবর্তন আসতে থাকে। পুরনো দিনের কথা বড় বেশি করে গ্রাস করে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, লেখক লেখিকা মধ্যবয়সে পৌঁছে অতীত চারণ করেন বেশি। পুরানো সেই দিনের কথা... আক্রান্ত করে। কলেজ লাইফের দুরন্ত জীবন...খুব মনে পড়ে। এইরকম একটা সময়ে বেশ অনেকেই ধর্ম করতে ছোটেন। এমনও বলতে শোনা যায়: বুড়ো হতে চলেছি। ধর্ম কর্ম নিয়ে থাকি এইবার। 

অতঃপর আশ্রম এবং বাবাজীর খপ্পরে পড়তে বেশি দেরি হয় না। 

 তাহলে? ঈশ্বর সাধনা করতে হবে না?  দান ধ্যান পুজো কিছুই লাগবে না? 

কিছু পুজো বাড়ির পরম্পরা। সেগুলি রক্ষা করতে হয়। কিন্তু, মধ্য বয়সে হঠাৎ করে ধর্মে আসক্তি হলে সমস্যা হয় এটাই, ভীষন ভাবে আচার সর্বস্ব হয় মন। অর্থাৎ, এই বারে এই খাব না। অমুক সময় ঘরে থাকব। আরো হাজার কিছু। কেউ কেউ প্রচন্ড রকম শুচি বাই হয়ে পড়েন। মহিলাদের ক্ষেত্রে বেড়ে চলে বাতিক। সুস্থ শরীর কে ব্যস্ত করে তোলার নানা প্রক্রিয়া চলে। মধ্য বয়সে মনের জানালা আপনা থেকেই সঙ্কুচিত হতে থাকে। ধর্ম যদি সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হয়, তবে জানালা বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। মন নষ্ট হতে থাকে। বিকার গ্রস্থ হতে থাকে।

 ***********

এখানেই প্রয়োজন spirituality. ধর্মকে ঠিক মত ব্যবহার করা যায়, যদি মানুষটা আধ্যাত্মিক হয়। অর্থাৎ পরিণত হয়। কোনো কিছুই অন্ধের মত বিশ্বাস করে আঁকড়ে ধরলে বিপদ হতে পারে। বয়সের তেজ যত ঢলে যেতে থাকে, লাঠির প্রয়োজন তত বেশি। মন সর্বদাই ভাবতে থাকে: অমুক এলে কি ভালো হয়। অথবা, আগে কত লোক আসত, এখন কেউ আসে না। আনন্দের উৎস, যদি ব্যক্তি বিশেষ অথবা বস্তু বিশেষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন  অনুগ্রহের পাত্র হয়ে দাঁড়াতে হয়। সবচেয়ে খারাপ লাগে, যখন বোঝা যায়, কেউ উপেক্ষা করছে। বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে আছে। খারাপ লাগলেও, সঙ্গ ছেড়ে দেবার মত মনের জোর পাওয়া যায় না। একা কি করে ভালো থাকা যায়?

********

 আধ্যাত্মকিতা কিভাবে সাহায্য করে: 

 আবারও বলছি, ধর্ম বা আচারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। তাহলে? দরকার কি? এটা একটা থেরাপি। মনের অবস্থা উন্নত করার থেরাপি। যেমন, মানুষের শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী জীবন সম্পর্কে তাদের গভীর ভ্রান্ত ধারণা। অনেক মধ্য বয়েসী মনে করেন, দুঃখিত হয়ে কিছু পাওয়া যায়। কষ্টের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে লোকের কাছে সহানুভূতির আশা করে। 

 *** 

আধ্যাত্মিকতার অর্থ হল, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উপলব্ধি করা। আমার আনন্দের উৎস আমি নিজে... এই সত্য হৃদয়ে আত্মস্থ করা। মধ্যেবয়সে এসে আমরা অনুভব করি, পার্থিব অনেক কিছু আছে। যেটা নেই সেটা হল আনন্দ। শান্তি। কারণ, জীবন কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে বৈষয়িক উপার্জনে। শান্তি আনন্দ এগুলি যে উপার্জনের বিষয়, সেকথা কখনো ভাবার অবসর ছিল না। 

******

আধ্যাত্মিকতা কিভাবে সাহায্য করে। 


  There is something greater than myself, something more to being human than sensory experience, and that the greater whole of which we are part is coshmic or divine in nature. 

   খুব কটমট কথা। আসলে, এটা খুব সরল এক উপায়। মনের জমিতে নিয়মিত আলো, জল, সার ইত্যাদি দিয়ে তাকে উর্বর করে রাখা। তাহলে, আবেগের উপর সংযম আসবে। শরীর মন আবেগ শক্তি এগুলির সঠিক পরিচর্যা করলে,ধীরে ধীরে ভিতরে এক শক্তির জন্ম হয়। বিচার বুদ্ধি সতর্ক হয়। বোধ পরিণত হয়। জীবন তখন আলাদা মাত্রায় ধরা দেয়। 

**********

  মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হয়। নিজের গন্ডীর বাইরে গিয়ে তাকালে তবে বৃহতের অনুভূতি হয়। পার্থিব ছাড়তে শিখতে হয়। জলে দুধে মিশে থাকবে, দুধটুকু তুলে খেতে হবে। সংসার সর্বস্ব হতে নেই। তাহলে, সংসারের অবহেলা মনে ধাক্কা দেয় না। এই অভ্যাসটা হল আধ্যাত্মিকতা। জীবনের শিক্ষা মাত্র। যার জন্য আমরা আনন্দে থাকতে পারি। 

********

 বোঝা গেল, নিজের মনের গভীরে প্রবেশ করতে জানা হল এই প্রক্রিয়ার উৎস। যেমন, সাঁতার জানি, রান্না জানি, যৌনতা জানি তেমনি এটাও জানতে হয়, কিভাবে নিজের ভিতর হতে আনন্দের উৎস খুঁজে পেতে হয়। এই জানার অপর নাম spirituality. মধ্যবয়সে সবচেয়ে বেশি কাজের হল এই অভ্যাস।

         




                                       

অন্তর চক্রবর্তী

                                              



এই সংখ্যার কবি অন্তর চক্রবর্তী ৷জন্ম দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে, ১৯৯৪ সালের ৩১শে আগষ্ট। সেই জেলারই পাড়াগেঁয়ে মফস্বল গঙ্গারামপুরে বেড়ে ওঠা। স্বভাববালক ও উচ্চিংড়ে। ভাবতে ভালোবাসে। ছোট থেকেই পাগলামিতে ঝোঁক। তারপর সাহিত্যের কাছাকাছি আসা। কলেজে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াকালীন কবিতায় বিশেষ আগ্রহের সূত্রপাত। তখন থেকেই টুকটাক লেখালিখির শুরু।এযাবৎ কয়েকটি ছোট পত্রিকা ও ব্লগজিনে লেখা প্রকাশিত হয়েছে।কবিতার পাশাপাশি পছন্দ ক্রিকেট ও ফুটবল। ভালোবাসে গান শুনতে, সিনেমা দেখতেও।

ত্রিনয়ন উবাচ
—————————



কবিদের কোনো ঘুম
ঘুম নয়
কেবল পথ

এক চোখ দিয়ে ঢুকে
অন্য চোখ দিয়ে
হাসিমুখে বেরিয়ে আসে

ক্ষেতমজুরের দল...



পাহাড় জোগাড় করছে
চিরকিশোর

কেটে যাচ্ছে কয়েকশো জলবায়ু

পাহাড়ের ভেতর জেগে উঠছে

অন্ধত্বের
কিছু আগে
ঘুমিয়ে পড়া
আলোর দীঘিটি...



সন্ধে নিকোনো আটচালায়
ফুটছে শাদা
শুধু শাদা

ঝুঝিনি-

পারিজাত
না
ধবধবে আড়চোখ,

ঠেলে দিলাম তোমার জানালায় ?



শীত ছাড়িয়ে
উঠোন ছাড়িয়ে
সরে যাচ্ছি দূরদেশে

'গায়ে শালটা জড়াসনি কেন ?'
পিছু ডেকে
হঠাৎই শুধোলেন জন্মান্ধ মা

মাটি শিউরোয়
শিউরোয়

খানিক আগেও অসহ্য নাস্তিক ছিলাম আমি...



কাছে এলে ছেয়ে আসে
পাতালের ভয়

কেঁদে ওঠে
সুদূর বিদেহী ঝলোমল

শারদ আকাশ,

অনন্ত ছেড়ে
এবেলা

এই যমজ গহীন বেছে নাও...



মাঘের স্বপ্নে রঙ নেই কোনো

যেন
জোছনায় তরুণী বিধবাটি

থানের চেয়েও

রঙহীন
হিমেল
শূন্য

তার চেয়ে থাকা

রাত পোহালেই
চক্ষুদান হাতে ছুটে আসবে ফাল্গুন...



ভরা চাঁদের নীচে
প্রতিটা দোরে
লক্ষ্মীর পা আঁকছেন মা

আজ মা নেই

আটটি পা চারজোড়া চোখ হয়ে

ভিটের নাভিতে বেঁধে রাখছে আমায়...



ঈশ্বরীর দুইখানি নয়ন

জ্যৈষ্ঠদুপুর

মাঘীপূর্ণিমা

এই দুইয়ের মাঝেই
শ্রাবণ হইয়া

বহিয়া যায় তৃতীয়টি...



চোখ গিলে নেওয়ার
রোয়াব দেখিও না

হ্যাঁ,
তরবারি

বলছি তোমায়

আলো ঠিকরে এলে
চুরমার হয়ে যাবে

তোমার কণ্ঠজৌলুস...

১০

তোমার শৈলী

ধড়হীন করোটি নিয়ে
সহাস্য লোফালুফি

ভুলে যেও না,

দুধশাদা অস্থিপলক
শুধু তোমাকেই নয়

গিলে নিতে পারে তামাম ব্রহ্মাণ্ড...

—————————
( বিশেষ ধন্যবাদ : বিশ্বজিৎ দাস, সব্যসাচী মজুমদার। )