শঙ্খসাথি পাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শঙ্খসাথি পাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

শঙ্খসাথি পাল

নীলভ্রমরের বিষাক্ত ইতিকথা




শরৎকালের ঝলমলে আকাশে দিব্যি পেঁজা তুলোর মতো মেঘ উড়ছিল ।কলকাতা থেকে আসতে আসতে মনটা বেশ ভালো হয়ে গেছিল হিল্লোলের ।সারা বছর কলকাতার থাকতে হয়, শুধু দুর্গাপুজোর সময় গ্রামে আসতে পারে ।এতদিন কলকাতায় থেকেও গ্রামের টান যায় নি হিল্লোলের, মিঠি প্রায়ই বলি ।সত্যিই গ্রামের টান যায় নি তার ।মিঠি নিজেও গ্রাম ভালোবাসে ।তাই প্রতিবার পুজোর সময় গ্রামে আসার জন্য মুখিয়ে থাকে দু'জনেই ।
     গ্রামে ঢোকার কিছুটা আগেই গাড়িটা গেল বিগড়ে ।অগত্যা মিঠিকে গাড়িতে বসতে বলে মেকানিকের খোঁজে গেল হিল্লোল ।গাড়ি থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মিঠি ।খানিকটা দূরে একটা কুড়ে ঘর, বেশ ভাঙাচোরা ।শাশুড়ির মুখে শুনেছে, ওখানেই থাকে ডাইনি বুড়ি ।যদিও এই সময়ে এসব বিশ্বাসের কোনো মানেই হয় না ।তবু বিয়ে হয়ে থেকে এমনটাই শুনে এসেছে ।কখনও দেখে নি তাকে ।আজ একা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভীষণ কৌতুহল হচ্ছে ।যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতে শেষ অবধি পা বাড়ালো ওদিকেই ।

   ঘরের চাল অনেকটাই উড়ে গিয়েছে কোনো কালবৈশাখীতে, খাপরার বেড়াও নষ্ট হয়ে গেছে বৃষ্টির জলে ।ফাঁক দিয়ে ভেতরে চোখ রাখতেই আতঙ্কে মিঠির চোখ ঠিকরে বেড়িয়ে এল ।বুড়ির শরীর জুড়ে থিকথিক করছে পোকা ।একটা চোখ কোনো বন্য জন্তু উপড়ে নিয়ে গেছে ।অথচ বুড়ি তখনও বেঁচে, যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে ।

   সপ্তমীর সকাল.. মিঠি স্নান সেরে পুজোর মণ্ডপে এসেছে ।গত দুদিন ধরে শরীর খারাপ ।সেদিন হিল্লোল অজ্ঞান অবস্থায় তাকে গাড়ির কাছে পেয়েছিল ।তারপর থেকে সেদিনের ওই দৃশ্যটা বারবার ফিরে ফিরে আসছে, আর ভয়ে আঁতকে উঠছে সে ।অথচ কাউকে কিছু বলতে পারে নি ।অঞ্জলির জন্য ফুল নিয়ে মা দুর্গার মুখের দিকে তাকাতেই আবার সেই বীভৎস মুখটা...... নানাআআআআ.... 

  জ্ঞান ফিরতে শাশুড়ি মার কাছে ভেঙে পড়ে মিঠি ।আর পারছে না গুমরে মরতে ।সব শুনে শাশুড়ি মা বকাবকি করতে লাগলো মিঠিকে ।ওই ডাইনির বিষ নজরেই নাকি এমন হচ্ছে ।মিঠিকে বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলেন তিনি ।অসুস্থ দুর্বল শরীরে কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেল মিঠি ।


—"ডাইনি মরে না কেন এখনও? "
—" এত নিষ্ঠুর তুমি? "
—" হ্যাঁ হ্যাঁ আমি নিষ্ঠুর।ভুলে যেও না আমার হিয়াকে ও মেরে ফেলেছে ।"
—"ওটা নিছক দুর্ঘটনা ।"
—"না না তুমি জানো না ।"
—"কি জানি না? যে মানুষটা তোমার শূন্য কোল ভরাতে নিজের বুক থেকে তার সদ্যোজাত সন্তানকে তোমার কোলে তুলে দেয়, সারা জীবন ডাইনি অপবাদ মাথা পেতে বয়ে চলে সেই মানুষটাকে জানতে আর কি বাকি আছে?! "

খানিকক্ষণ সব চুপচাপ ।তারপর শাশুড়ি মার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে পাশের ঘর থেকে ।ততক্ষণে মিঠির কাছে সবটুকু জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেছে শ্বশুর শাশুড়ির কথোপকথন থেকে ।

বিকেলের দিকে ডাইনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে ।ডোমকে কিছু পয়সা দিয়ে বিদায় করে হিল্লোলের বাবা ।বাকি কাজ সেই সামলে নেবে ।মিঠি জানে কি অন্যায় হচ্ছে, তবু কিছু বলতে পারবে না হিল্লোলকে ।মনে মনে শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে ডাইনি মা-এর পা-এ ।

পরদিন সকালে অষ্টমীর পুজোর জোগাড় চলছে ।নীলপদ্মের মালা গাঁথতে গাঁথতে আবারও মিঠির চোখে ভেসে ওঠে সেই চোখ - কিন্তু আজ আর তার ভয় করে না ।হিল্লোলকে শহর থেকে ডাক্তারকাকু ফোন করে জানায়, মিঠি কনসিভ করেছে ।সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় ।মা স্বয়ং আসছেন মিঠির কোল জুড়ে ।মিঠিও জানে, মা-ই নিশ্চিত ফিরে আসবে তার কোল জুড়ে ।

প্রচ্ছদ শিল্পী : সুদীপা কুন্ডু

শঙ্খসাথি পাল


মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০১৭

শঙ্খসাথি পাল


ইচ্ছাবৃষ্টি
 

বিদেশ থেকে আসি বললেই যে আসা যায় না, এই সহজ সরল সত্যিটা গত তিনদিন ধরে কাউকে বোঝাতে পারছে না জুঁই ।সব আত্মীয় স্বজন কেমন যেন বাঁকাভাবে দেখছে তাকে অথচ তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায় ।মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে থেকে কী মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে কাজ শেষ করেছে, সে নিজেই জানে ।এই যে  সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে পড়া, বিদেশে কাজের সুযোগ অ্যাকসেপ্ট করা - সব তো মায়েরই স্বপ্ন ছিল ।কিন্তু মায়ের স্বপ্নপূরণ করতে গিয়ে শেষদিনে আর মায়ের কাছেই থাকা হল না জুঁই-এর ।
       আজ আত্মীয় স্বজনদের ভিড় অনেকটাই কমে এসেছে ।বাবা নিজের ঘরে ।অনেকদিন পর পারিজাত কাকু এসেছে আজ ।বাবার সাথে কথা বলছে ।জুঁই মায়ের ঘরে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে চলে যাওয়া মায়ের ফেলে যাওয়া চিহ্নগুলো ।তানপুরাটায় হাত বুলিয়ে ফিরে যাচ্ছে অতীতে ।আবছা সে সব স্মৃতি ।বাবা তখন দেরাদুনে থাকতো বোধহয় ।প্রতি সন্ধ্যায় ছাদের ফুলবাগানে পারিজাত কাকু মাকে গান শেখাতো ।কিছুই বুঝতো না তখন জুঁই গানের, কিন্তু ভেসে যেত সুরের মূর্চ্ছনায় ।
        মায়ের ড্রেসিং টেবিলে সেই হাতির দাঁতের ছোট্ট বাক্সটা আজও রয়েছে কৌতুহলে সেটা খুলতেই বেশ অবাক হলো জুঁই ।বাক্সের ভিতরে একটা রূপোর সিঁদুর কৌটো আর লাল টুকটুকে একটা ছোট্ট ডায়েরি ।ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা... "তোমায় দিলেম ছুটি..." ।নাহ, আর তেমন কিছু নেই ।মাঝের দিকে একটা পাতায় লেখা একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত... 

" কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া
তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া
চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি
গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি।
ভেবেছিনু কোথা তুমি স্বর্গের দেবতা,
কেমনে তোমারে কব প্রণয়ের কথা।
ভেবেছিনু মনে মনে দূরে দূরে থাকি
চিরজন্ম সঙ্গোপনে পূজিব একাকী--
কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়,
কেহ দেখিবে না মোর অশ্রুবারিচয়।
আপনি আজিকে যবে শুধাইছ আসি,

কেমনে প্রকাশি কব কত ভালোবাসি॥"


তারপর নেই, কিছু নেই ।শেষের দিকে পাতার পর পাতা জুড়ে একটাই কথা লেখা বারবার , "বৃষ্টি আসুক....." 
        জুঁই জানে না কার জন্য এত ভালোবাসা মা যত্ন করে রেখে দিয়ে গেছে।বড্ড অস্থির, অসহায় লাগে নিজেকে?! এ কেমনতর রূপকথা?! কখনো তো মায়ের কোথাও শূন্যতা দেখে নি সে ।তবে মা এত বৃষ্টি চেয়েছিল কেন?! কেনই বা সে সাধ অপূর্ণ রয়ে গেল ।জুঁইরা তো যখন তখন রেইনমেশিন দিয়ে বৃষ্টি এনে দিতে পারে ।ইসস.. মা-কে যদি বৃষ্টি এনে দিতে পারতো...... 
       কখন যে সন্ধ্যে নেমেছে বুঝতেও পারে নি জুঁই ।পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে পারিজাত কাকুর ভেঙে যাওয়া গলায় মায়ের সেই প্রিয় গান, " এই করেছ ভালো, নিঠুর হে, নিঠুর হে, এই করেছ ভালো ।
এমনি ক'রে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো ।।
আমার এ ধুপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে দেয় না কিছুই আলো ।।
যখন থাকে অচেতনে এ চিত্ত আমার
আঘাত সে যে পরশ তব, সেই তো পুরস্কার ।
অন্ধকারে মোহে লাজে চোখে তোমায় দেখি না যে,
বজ্রে তোলো আগুন ক'রে আমার যত কালো ।।"

অজানা রূপকথাটি জ্যোৎস্নার আলোয় জ্বলজ্বল করছে জুঁই-এর সামনে, আর সেই আলোয় চিকচিক করছে পারিজাত কাকুর চোখের জল ।বাঁধ ভাঙা বৃষ্টি নামছে জুঁই-এর চোখেও ।মা তো যে সে বৃষ্টি চাই নি তবে, এতো তার স্বপ্নের ইচ্ছাবৃষ্টি - দেবতা জ্ঞানে পূজা করে প্রেমের নিষ্পাপ কান্না ।আকাশের যে তারাটি দূর থেকে দেখছে তাদের, তাঁকে ফিসফিস করে বলে জুঁই - "দেখো মা, তোমার বৃষ্টি এসেছে আজ..... "