ভ্রমণ কাহিনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ কাহিনী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক








বাঘের খোঁজে বান্ধবগড়ে


এই গরমে কেউ জঙ্গলে যায় ? মানে জুন মাসের গরমে লোকে পাহাড়ে যেতে  পারে, সমুদ্রে যেতে পারে, নদীর ধারেও যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে জঙ্গলে ! পাগল না মাথা খারাপ !
জুনের শুরুতে আমাদের মধ্যপ্রদেশ যাবার খবরটা শুনে নানাজনের প্রায় এরকমই প্রতিক্রিয়া ছিল । তা আমরাও আমাদের সিদ্ধান্তে অনড়। মধ্যপ্রদেশেই যাব, তাও আবার এই জুন মাসেই। কারণ ? কারণ আর কিছুই না, দেশের বিভিন্ন জঙ্গল ঘুরে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে যে জঙ্গলে এসে জানোয়ার দেখতে হলে কিন্তু ভরা গরমেই আসতে হবে। যত বেশী গরম পড়বে তত জলের সোর্স কমবে। আর জলের সোর্স কমলে তবে না ভিভিআইপি জানোয়াররা জলাশয়ের আশেপাশে দর্শন দেবেন। তাই হিংস্র জন্তু জানোয়ার, বা সোজা বাংলায় বললে বাঘ দেখতে গেলে এই গরমেই যেতে হবে। হুঁ হুঁ বাবা, কষ্ট না করলে তো কেষ্ট মিলবে না। 
যাই হোক তল্পিতল্পা গুছিয়ে একদিন দুপুরে উঠে পড়লাম শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে।


একটা গোটা দিন ট্রেনে করে চলার পর অবশেষে পরেরদিন দুপুরে কাটনি স্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট গাড়ীতে করে রওনা দিলাম বান্ধবগড়ের জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। প্রায় দুঘণ্টা যাত্রাপথের আদ্ধেক রাস্তা পেরিয়ে যাবার পরেই চারপাশে জঙ্গলের রাস্তা শুরু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম, কিছুটা মাঠ আর তারপরেই আবার গাছের সারি। যদিও আসল জঙ্গল থেকে এখনো অনেকটাই দূরে আমরা তবু চারপাশে গাছের আধিক্য অমন কাঠফাটা  রোদেও চোখকে আরাম দেয়। জঙ্গলের বেশ কাছাকাছি এসে গেলে শুরু হয় লাল ধুলো। কিছুটা অংশে তো ধুলোর জন্য তো প্রায় রাস্তাই দেখা যায় না। একদম ফাঁকা এই রাস্তাটা। এতক্ষণ তবু মাঝে মধ্যে মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকটায় তাও নেই। যাই হোক অবশেষে বান্ধবগড়ে প্রবেশ করা গেল। ছোট্ট একটা টাউন, গুটিকয়েক টিমটিম করা দোকান, মনিহারি থেকে ওষুধপত্র বা হ্যান্ডলুম কিংবা স্থানীয় হস্তশিল্প সবকিছুরই দোকান রয়েছে। একটি গ্রামীন স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, অল্প কিছু পাকা বাড়ী আর তারপরেই শুরু হচ্ছে হোটেল আর জাঙ্গল রিসর্টের লাইন। এখানে প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেশী হাঁটাহাঁটি করতে বারণ করে। পুরো জায়গাটাই তো জঙ্গলে ঘেরা। আমাদের বুকিং ছিল সরকারী ফরেস্ট লজেই। কেন না আগে থেকেই জানা ছিল এটাই একমাত্র জঙ্গলের প্রায় ভেতরে। বাকি সব হোটেল জঙ্গল থেকে একটু দূরে।

“হোয়াইট টাইগার ফরেস্ট লজ” এর মেন গেট দিয়ে ঢুকতেই একটা বিরাট বড় সাদা বাঘের ছবি দেখে অত গরমে আর ক্লান্তিতেও মনটা খুশী হয়ে গেল। ঢুকেই অফিসঘরে বসে খানিক বিশ্রাম করে নিলাম সকলে। অফিসঘরের লাগোয়া একটা বিরাট ডাইনিং হল রয়েছে দেখেই খিদে পেয়ে গেল ভীষণরকম। সেই কোন সকালে ট্রেনে ব্রেকফাস্ট করেছি। ম্যানেজার ভারী অতিথিপরায়ন মানুষ। আমাদের নানা ব্যাপারে নিজেই জানালেন আর এও বললেন, ‘একদম ঠিক সময়ে এসেছেন আপনারা। এই সময় ভিড় থাকে না একদম। খুব কম লোকে এত গরমে আসে। কিন্তু যারা  আসে তারা সত্যি জঙ্গলপ্রেমী বলেই আসে। বাঘ পাবেনই, ও নিয়ে চিন্তা করবেন না।’
রুম পেয়েই সবাই মিলে দৌড় লাগালাম চান করতে। পেটে তখন তিন চারটে ছুঁচো একসঙ্গে লাফাচ্ছে।

অফিস থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা উঠে একটা বারান্দায় পড়তে হয়। খোলা আকাশের নিচে প্রচুর গাছগাছালিতে ঘেরা মাচার মতো টানা বারান্দা চলে গেছে বিভিন্ন ঘরের সামনে। লজের পাঁচিলের ওধারেই জঙ্গল। কিংবা বলা যায় জঙ্গলের কিছুটা অংশ এই লজের মধ্যেই চলে এসেছে। গাছগুলোয় ভর্তি পাখি, আর কয়েকটা ঘরের টিনের চালের ওপর হনুমানের দল আমাদের যেভাবে বন্য অভ্যর্থনা জানালো তাতে প্রথমটা একটু ঘাবড়েই গেছিলাম। হোটেলের কর্মচারী অবশ্য বললো হাতে খাবার জিনিস না থাকলে ওরা কিছু করবে না। এখানে ওরা হামেশাই আসে। সবুজ রেলিংওয়ালা লম্বা বারান্দা ধরে হেঁটে হেঁটে ডানদিক বাঁদিক ঘুরে অবশেষে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছলাম।
বেশ বড় ঘরে প্রথমেই যেটা চোখে পড়বে সেটা হল  উল্টোদিকের দেয়াল জুড়ে একটা বিরাট কাঁচের জানলা। জানলা না বলে কাঁচের দেয়াল বলাই ভাল। আর জানলার ওপাশেই এক টুকরো জঙ্গল। যদিও পরে জেনেছিলাম ওটা হোটেলের বাউন্ডারি ওয়ালের মধ্যেই, তবু তাতে ওই জঙ্গলের অনুভূতিটা যায় না। আর এটা আরো বেশী করে বুঝলাম রাতে খেয়ে ফেরার সময়।
দুপুরে সাদা ভাতের সঙ্গে উত্তর ভারতীয় আমিষ ও নিরামিষ খাবার ছিল। সঙ্গে রায়তা। সেটা গরমের কারণেই। রাতে মিলল রুটি/ভাত, কষা আলুরদম, পনির বাটার মসালা আর আমিষে চিকেন কষা। সঙ্গে পায়েস, যাকে ওরা ক্ষীর বলে। তবে বাঙালী পায়েসের মতো অত মিষ্টি নয়। এলাহি খাওয়াদাওয়া সেরে যখন বারান্দা ধরে হেঁটে আসছি তখন টিমটিমে আলোয় আসেপাশের গাছগুলোকে দেখে কেমন একটা গা ছমছম করে উঠলো। সঙ্গে দূর থেকে ভেসে এলো কোন এক অজানা জন্তুর ডাক। মনে হলো এক ছুটে ঘরে চলে যাই। সারাদিন অত গরম থাকা সত্বেও রাতে জঙ্গলের ভেতরে কিন্তু কেমন একটা হাল্কা শিরশিরে হাওয়া দেয়। এখানে রাতের খাওয়াদাওয়া সারা হয় খুব তাড়াতাড়ি। কেননা ভোরে সাফারি যাবার জন্য উঠতে হয় বোর্ডারদের। আমরাও তাই প্রায় কলকাতার “ভর সন্ধ্যেবেলায় ”, মানে ন’টার সময় ডিনার সেরে গুটিগুটি ঘরের দিকে এগোলাম। পরেরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় সাফারি শুরু।   

  
গরম যতই প্রবল হোক জুন মাসের ভোরেও জঙ্গলে হালকা একটা ঠাণ্ডা ভাব থাকে। দু’দিন থাকবো আমরা। সেই দু’দিনের তিন বেলাই সাফারি বুক করা রয়েছে। বান্ধবগড়ের জঙ্গলকে তিনটে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, টালা, মগধি ও খিটৌলি। এর মধ্যে আবার সাব জোন আছে। প্রত্যেক জিপসিকে নির্দিষ্ট সাবজোন দিয়ে দেওয়া হয়। তার বাইরে তারা যেতে পারে না। প্রথম দিনে আমরা টালা জোনের টিকিট কেটেছিলাম। টালা হলো জঙ্গলের মূল অংশ। যদিও কোর এরিয়ায় সাধারণ পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হয় না, তবু বাঘের সাইটিং-এর জন্য টালা জোন বিখ্যাত। হুডখোলা জিপসি করে জঙ্গলের রাস্তায় যেতে যেতে হরিণ, বুনো শুয়োর, বনবিড়াল, ময়ূর, নানারকম পাখি দেখে ফেললাম কিন্তু তেনার আর দেখা নেই। পায়ের ছাপ দেখা গেল অনেক জায়গায়। সেই ছাপ ফলো করে গিয়েও কিছু মিললো না। এখানে এসে একটা জিনিস জানলাম যে বাঘকে হিন্দীতে কিন্তু বাঘই বলে। আমরা অনেকেই জানি বাঘ হলো শের। কিন্তু গাইড ভদ্রলোক জানালেন শের হলো সিংহ আর বাঘ হলো বাঘ।
জানোয়ারের খোঁজে এসে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম সেটা আগে বলি। চলতে চলতে এক জায়গায় পৌঁছে কেমন যেন অন্যরকম লাগল। এত খালি খালি কেন ? অনেকটা জায়গা জুড়ে কেমন যেন শুকনো বর্ণহীন বনভূমি, আর অস্বাভাবিক নিঝুম একটা ভাব। এতক্ষণ পাখির ডাক, বাঁদরের আওয়াজ কানে আসছিল। এখানে সেসব কিছুই নেই। চমকে তাকিয়ে দেখলাম পরপর সারি দিয়ে গাছেদের মৃতদেহ দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুধু কাণ্ডটাই রয়েছে কালো হয়ে, ওপরের অংশ পুরোটাই জ্বলে শেষ হয়ে গিয়েছে। গাইড বললেন প্রতিবছর ফরেস্ট ফায়ারে জঙ্গলের একটা অংশ এভাবে পুড়ে যায়। গরম আর শুকনো হাওয়ায় নাকি আপনিই জঙ্গলে আগুন ধরে যায়, আর তারপর তা ছড়িয়ে যায় মাইলের পর মাইল জুড়ে। ওদের কাছে বোধহয় খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, আমার কিন্তু ভয়ঙ্কর লাগলো দেখতে। প্রকৃতি এমন নিষ্ঠুর কেন ? এত এত পূর্ণবয়স্ক প্রাণকে এভাবে অকারণে নষ্ট করে কেন ? কেমন যেন একটা মৃতনগরী হয়ে রয়েছে জায়গাটা। একটাও আওয়াজ নেই। গাইড বললেন এদিকে কোন জানোয়ারও পারতপক্ষে আসে না। প্রায় এক দেড় কিলোমিটার জায়গা জুড়ে চললো পোড়া গাছেদের সেই অসহনীয় দৃশ্য। শেষে গিয়ে এক জায়গায় গাইড দেখালেন রাস্তা কাটা রয়েছে। বেশ কিছুটা জ্বালাবার পর যখন আগুনের তেজ একটু কমে তখন এভাবে রাস্তার মধ্যে পরিখা কেটে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে আরও একটা অদ্ভুত কথা বললেন তিনি। বোধহয় আমাদের মুখ দেখে বুঝেছিলেন এত পোড়া গাছ দেখে আমাদের মনের অবস্থা কি, বললেন, ‘ফরেস্ট ফায়ার কিন্তু একদিকে জঙ্গলের ভাল করে। আগুন লাগলে পুরনো শুকনো গাছ মরে গিয়ে জঙ্গল নতুন হয়। কোন বছর যদি আগুন না লাগে তাহলে জঙ্গলের সবুজ ভাব কমে যায়।’ সত্যি ! কি অদ্ভুত নিয়ম পৃথিবীর, আগুনে পুড়ে সবকিছু শুদ্ধ হয়, এমন কি নতুন প্রাণের জন্মও হয়।
সাড়ে পাঁচটায় শুরু করে মাঝে দশ মিনিটের ব্রেক নিয়ে সাড়ে আটটা অবধি ঘুরেও বড়মিঞার দেখা পাওয়া গেল না। সবাই যখন হতাশ হয়ে পড়েছি, ক্যামেরা আর দুরবীনগুলো যখন হলুদ কালো খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত তখন একটা কাণ্ড ঘটলো। জঙ্গলের রাস্তা খুব এবড়োখেবড়ো, সাধারণ গাড়ী সেখানে চলতে পারবে না। জিপসিতে বসে যেভাবে আমরা আন্দোলিত হচ্ছিলাম তাতে নিজেদের টিনের ভেতর ঝাঁকিয়ে দেওয়া মুড়ির মত মনে হচ্ছিল। অনেক খাল বিল পেরিয়ে, গাছের ডালের ওপর নাচতে নাচতে যাবার পর একটা জায়গা এলো যেরকম জায়গা আমি সেদিন সকাল থেকে আর দেখিনি। একটা খোলা চত্ত্বর, তিনদিকে তিনটে রাস্তা গিয়ছে। ডানদিকে দূরে একটা ন্যাড়া টিলা, সেখানে ছোট বড় পাথরে ভর্তি। আর বাঁদিক ঘেঁষে গাছের সারি গিয়েছে। গাছের সারির পিছনে দেখা যাচ্ছে একটা খাদের ওপারে একটা গুহার মুখ। আকাশ তখন একটু মেঘলা। সকাল থেকে একটানা আগুন ঝরিয়ে আমাদের যেন কিছুক্ষণের জন্য ওয়াক ওভার দিয়েছেন সূর্যদেব। একটা অদ্ভুত ডাক শোনা যাচ্ছিল এদিক থেকে, সেই শুনেই ড্রাইভার এদিকে এসেছে। ডাকটা আসছে ডানদিকের টিলার ওপর থেকে। ডাকটা কোন চেনা পশুর নয়। অনেকটা মানুষের বাচ্চা যেভাবে প্রথম মুখ দিয়ে অর্থহীন আওয়াজে ডাকে সেরকম। এক নাগাড়ে সেটা হয়ে চলেছে। আর কোন আওয়াজ নেই কোথাও। গাছের পাতাও যেন থেমে গেছে। কেমন একটা বুক খালি করা ডাকটা যেন। আমাদের জিপসিটা থেমে গেল একপাশে। গাইড কোন কথা বলছে না, ইশারায় আমাদের চুপ করে থাকতে বলে কি যেন শোনার চেষ্টা করছে। হঠাৎ একটা বার্কিং ডিয়ারের ডাক চারদিকের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিল যেন। আমাদের গাইড এবার মুখ খুললেন। বললেন এই ডাকটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন উনি। ‘এতক্ষণ যে ডাকটা শুনছিলেন ওটা বাঘের ছানার ডাক। কিছুদিন আগে এখানে তিনটে বাচ্চা দিয়েছে বাঘিনী। এখানে মনে হচ্ছে একটা বাচ্চা একা রয়ে গেছে। সেটাই মাকে ডাকছে। ওর ডাকে ওর মা আসবেই। বাচ্চাকে ছেড়ে খুব দূরে যায় না। এটাও কাছাকাছি কোথাও রয়েছে। এখন বার্কিং ডিয়ার ডাকছে মানে ছানার ডাক শুনে মা এদিকেই আসছে।’ আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও আর কোন ডাক শোনা গেল না। আমাদের জিপসিটা একটু এগিয়ে গেল যেদিক থেকে বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা এসেছিল। একটা গোল চক্কর ঘুরে এসে যখন হতাশ আমরা আগের জায়গাটায় আবার ফিরে এলাম তখন সেখানে আর একটা জিপসি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের গাইড বললো বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা পাশে চলে গেছে। তার মানে এই রাস্তায় বাঘ আসবে না। দুই ড্রাইভারে কি যেন ঠিক করে নিয়ে যে রাস্তা দিয়ে আগে আমরা এসেছিলাম সেদিকে রওনা দিল। বেশ কিছুটা ঘুরে একটা ঝোপ জঙ্গল মতো জায়গায় আমরা এসে পড়লাম। বোঝা গেল এটা ওই টিলাটার পিছনের দিক। এখান থেকে টিলাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। একগাদা ঝোপে ঢেকে রয়েছে জায়গাটা। টিলার সামনের দিকটা যেমন ন্যাড়া এদিকটায় আবার তেমনি জঙ্গল। আবার বার্কিং ডিয়ারের ডাকটা শোনা গেল। এবার আর একটু কাছ থেকে। সঙ্গে বাঁদরের ডাকো। এদিকে আবার সেই বাচ্চাটা দুবার ডেকে উঠলো। গাইড বলে দিয়েছিল বলেই কিনা জানি না এবার কেমন যেন মনে হলো স্পষ্ট শুনলাম ডাকটার সঙ্গে আমাদের ‘মা” ডাকের খুব মিল আছে। এবার গাইডের নির্দেশ অনুযায়ী দূরে এক জায়গায় চোখ রাখতেই বুঝলাম ঝোপগুলো দুলছে। সেখান দিয়েই আবির্ভূত হলেন তিনি। চকচকে হলুদ কালোর চলমান গোলা নিঃশব্দে ঝোপের পাশ দিয়ে ঢুকে ধীরে ধীরে টিলার ওপরে উঠে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাচ্চার ডাকে সাড়া দিতে এক মায়ের ব্যস্ততা দেখলাম।
সেদিন সময় শেষ হয়েই এসেছিল, তাই ফেরার পথে পা বাড়ালাম আমরা। সেদিন বিকেলে মগধি জোনে ও পরেরদিন টালাতে আবার এসেও আর তেনাদের দেখা পাওয়া যায়নি। তবে তাতে জঙ্গল দেখার মজা কিছুমাত্র কমে যায়নি। প্রচণ্ড দাবদাহ সহ্য করে আড়াই দিন কাটিয়ে যখন ফেরার ট্রেনে উঠলাম তখন আমাদের মন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। প্রকৃতি যে এই চরম গ্রীষ্মের নির্মম রোদে আমাদের জন্য এতরকম চমক সাজিয়ে রেখেছে তা সত্যিই আমরা ভাবতে পারিনি। আবার কোন এক গ্রীষ্মে চলে আসবো ওদের সঙ্গে দেখা করতে। তখন হয়তো এই ছানাটাই একটা বড়সড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়ে দর্শন দেবে আমাদের।
 


শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

ফাল্গুনী ঘোষ

বেড়ু বেড়ু ৪
 জয় মাতা দি
    আধা জাগরণ আধা ঘুমের ধোঁয়াশা ছিঁড়ে ‘কুঁকুরু কুঁ’ ডাকে তেড়েফুঁড়ে উঠল মন। না না, মোরগ মুরগী ভাবার কারণ নেই, ডিজিটাল যুগ কিনা! ভোর চারটেতে গরম জলের ধারায় শরীরের আড় ভাঙতে না ভাঙতেই হাজির সেই রাজপুত্তুর। আহা এজেন্ট কয় যাহারে! ‘যাত্রী পরচি’ বানানোর অফিসিয়াল খুঁটিনাটি সেরে লাইনবন্দী ঘোড়ার সামনে দাঁড়ানো। জীবনে ঘোড়া অনেকবারই দেখেছি, কিন্তু এইরকম তেজী, নরম, কর্কশ, মোলায়েম নানান পরিচয় ও আকৃতির ঘোড়া দেখে মন বেশ থমকে গেল। আমি তো আর রাজপুত্রী হয়ে জম্মায় নি রে বাবা! নিদেনপক্ষে ইংরেজ আমলের লেডি। এই পাহাড়ি রাস্তায় ঘোড়া ছুটবে টগবগিয়ে, আর আমি ঘোড়ার পিঠে! বয়স্ক মায়ের কথাটা তাহলে একবার ভাবুন! আমাদের ছ’জনের টিমে কাকু, কাকীমা, জেঠ্যু জেঠিমার দলে আমিই শুধু ‘হংসমধ্যে বক যথা!’ আমার মুখে নিরুপায় হয়ে তাই দেঁতো হাসি ঝোলাতেই হল।
    কিন্তু ওকি দেখি! চিরিদিনের ঘোমটা টানা বাঙালি গৃহবধূরা আজ দলে দলে চুড়িদার পাজামা’তে সজ্জিতা। পোশাকের সাথে সাথে মনের ভারও তাদের হালকা হয়ে উঠেছে দেখলাম। আমার এইসব ভাবতে ভাবতে তাঁরা অশ্বারোহী। প্রত্যেকটা ঘোড়ার সাথে একটা করে সহিস। আমার কপালে জুটলো তাজা ছটফটে ঘুড়ী। সে মহিলা আবার মাঝে মাঝে হালকা চালে দৌড় বা নেচে নেয়। সব শুনে মনে হল এর থেকে হাঁটা ছিল ভালো। আর রাজপুত্ররূপী এজেন্ট সেই যে মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে, তাতে এক বাঙালি ললনার চোখে ভীতি দেখলে সে যে সমগ্র বাঙালি নারীদের লজ্জা, সে অস্বীকার করার নয়। সুতরাং ঘোড়াযাত্রা শুরু হল। প্রথমে ভয়ে ভয়ে ঘোড়ার রাশটি প্রাণপণ আঁকড়ে থাকলেও সেই দুলকি চালে শরীর অভ্যস্ত হতেই মন আর চোখ ছুটে গেল দুপাশের দৃশ্যে। ঘন সবুজের চাদর মোড়া পাহাড়ের দুর্ভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। হিমেল হাওয়ায় হেমন্তের অনুভূতি। সারারাত হেঁটে ক্লান্ত কোনও যাত্রী পথের পাশে পা ছড়িয়ে ঝিমোচ্ছে। স্থানীয় কিশোর গরম তেলে জলের মালিশ দিচ্ছে উদরপূর্তির আশায়। সে খাড়াই রাস্তার দুপাশে অগুনতি ঝুলন্ত দোকান খাবার ও ধর্মীয় পসরা নিয়ে। এদের ঈশ্বরসাধনার মূল মন্ত্রই হল—“ আরামসে চলো! সামালকে চলো! খাতে খাতে চলো!” উপোসী হয়ে দন্ডী কাটা এই প্রকৃতি ও পরিবেশে পোষানোর নয়।
    যেহেতু সারারাত পূণ্যার্থীদের সমাগম তাই পাহাড় তার সম্পূর্ণ সত্তা নিয়ে জাগছে তাতো বলা যায় না। তবে কোথাও আড়মোড়া ভাঙছে তো কোথাও ঝিমুচ্ছে। হঠাত ঘোড়া দুলকি চাল ছেড়ে নাচতে শুরু করল। আমার মনের প্রশান্তি যে আমার ঘোড়ার দিকে ট্রান্সফার হয়ে তাকে আনন্দে উজ্জীবিত করে তুলবে কে জানত! ‘ওরে বাবা! বাঁচাও!’ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলেও সহিসের জন্য বাকি গালিগালাজ গুলো মনে মনেই সমাপ্ত করলাম। কিন্তু কোথায় কি! আমার চীৎকার সার! ওদিকে ঘোড়া ছেড়ে সহিস বাকিদের সাথে ‘ডোগরী’ ভাষায় আলাপে মশগুল।


আমার চীৎকার শুনে সে কি সমবেত হাসি! “জলদি আইয়ে। আ কর থামাইয়ে!”— আমার মুখ নিঃসৃত এই রাগমিশ্রিত চোস্ত হিন্দীও তাদের জোরালো হাসির বড় কারণ ছিল বোধহয়। কারণ এরা যে বাংলাটা বেশ বোঝে তা মালুম হয়েছিল শ্রীনগরের ডাল লেকে। সে গপ্পের জন্য অবশ্য আপনাদের ধৈর্য রাখতে হবে। যাকগে সহিসের হাতের সিপিসিপে বেতের বাড়ি আর ‘চল কুড়ি! ধিককিত ধিককিত’—এই ধমকে আবার ঘোড়া দুলকি চালে ফিরল, আমার জানে জান এল।
    ঘোড়া, ব্যাটারিচালিত টোটো এইসব অধ্যায় পেরিয়ে মাতারানীর ভোগ কিনে ‘লাইন লাগাও’। মূলমন্দিরের কিছু আগে থেকে সেই বিপুল জনস্রোত। নিজের পায়ে দু’পা আর স্রোতের টানে দশ পা এগিয়ে যাবেনই, পিছোনোর সম্ভাবনা নেই পাক্কা। এই কায়দার মাঝে এজেন্টের ‘চালাকি ন চলিষ্যতি’। ত্থুত্থুড়ে দাদু, টগবগে জোয়ান, ছটফটে উচ্চিংড়ি বাচ্চা, হাঁসফাঁসে হিন্দিভাষী বহুরানী সব্বার মুখে নাড়া –“জোরসে বোলো জয় মাতা দি!” “ফিরসে বোলো জয় মাতাদি!” আমার মত নাস্তিকের মুখ দিয়েও দু-একবার বেরিয়েছিল বৈকি। তবে গুহাবাসিনী বৈষ্ণদেবীর কাছে পৌঁছানোর রোমাঞ্চ মার্বেল, টাইলস মোড়া সিঁড়ি নষ্ট করে দিয়েছে। সেই শিকড়বাকড় ঝোলা, নুড়ি পাথরে পিচ্ছিল অন্ধকার গুহার বন্ধ দরজার মুখে বিষণ্ণ মন ঠোক্কর খেতে থাকল। এইবার সময় পেয়েছি কিছু মিথ কপচানোর। তাছাড়া দেবীমহিমা দু-চার কথা না কইলে নয়, পাপ পূণ্যের একটা ব্যাপার আছে। দেবী এখানে পিন্ডি রূপে ধরা দিয়েছেন। মহালক্ষ্মী, মহাকালী, মহাসরস্বতী রূপে অধিষ্ঠাত্রী বৈষ্ণদেবী ভীষণ জাগ্রত। পিন্ডিরূপিনী দেবীর চরণতল থেকে নিঃসৃত জলস্রোত চরণগঙ্গা নামে পরিচিত, যা পান করলে রোগমুক্তি হয়। এটাই জনশ্রুতি।

      এই গুহাগুলি কিকরে তৈরী হল তা আজও কুয়াশায় ঘেরা কুহেলিকা। মোট তিনটি গুহার মধ্যে  শুধুমাত্র একটি গুহাই জনসাধারণের জন্য খোলা থাকে বাকি গুলো বিভিন্ন সময়েই বন্ধ। মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকালে অর্জুন এই মহাদেবীর উল্লেখ করেন, যিনি যম্বু( জম্মু ও কাশ্মীর) পর্বতে অবস্থান করেন। ত্রিদেবী। মন্দির স্থপতিদের দাবী, প্রায় ৭০০ বছর আগে স্থানীয় কোনও পুরোহিতকে কন্যা রূপে মা দেখা দেন, আর স্বপ্নে এক দুর্গম গুহা পথের নির্দেশ দেন। ত্রিকূট পাহাড়ের সেই চূড়োয় যাত্রা করলে ব্রাহ্মণ গিয়ে তিনটি পাথরের শিলা পান। দেবী তখন তাকে তাঁর স্বরূপ দেখান। তখন থেকেই বৈষ্ণদেবীর পুজো প্রচলিত হয়। এই সব তথ্যের ঠিক ভুল বিচারে বসার ভুল করলে হতাশ হবেন কারণ আমার সব ঐ ‘এজান্টায় নমঃ।’ বকতে বকতে এবার জিভ তালু সব শুকিয়েও এসেছে তাছাড়া।
    পুজো, ভোগের থালি, পবিত্র জল এদের সাথে পাল্লা দিয়ে পেটে ছুঁচোর দৌড় দুশ থেকে চারশ মিটারে পরিণত হচ্ছে দেখে মন্দির থেকে বেরিয়ে আলু পরাঠা, ছোলে বাটোরা(সব নিরামিষ্যি) যা যা গোগ্রাসে ঢোকে থলিতে ঠুসা হল। নাহলে এইসব বুড়োবুড়িদের নিয়ে আবার ঘোড়দৌড় করতে হবে হেলিপক্টার স্টেশনে। ফট- ফট- ফট... গোঁ গোঁ আওয়াজে কান ফাটিয়ে লাল কালোর কনট্রাস্টে দুটি কপ্টারের চরকিবাজি চলছে ‘সঞ্জিছট’ এরোড্রামে। কাটরা থেকে সঞ্জিছট তিন-চার মিনিটের উড়ানের চক্কর। কপ্টারযানে সওয়ারি হওয়ার এই প্রথম অভিজ্ঞতা। রীতিমতো হুকোমুখো হ্যাংলার হাঁ নিয়ে ধুলোর ঝড় গিলছি। এক ট্রিপে ছ’জন। ওজনের মাপজোপ করে দুই কাকু কাকীমা অন্য দলে ভিড়লেন। মাথার উপরে মাঝ দুপুরের চড়া রোদ্দুর, আর এরোড্রামের চারদিকে ছবি তোলার কড়া নিষেধ। প্লাস্টার চটে যাওয়া লাল-হলুদ রাস্তাপথের নির্দেশের মুখে দাঁড়িয়ে মোবাইলে লুকোচুরি খেলতে খেলতে যথাস্থানে ডাক এল।

      এবার আমাদের নম্বর। আমার জায়গা হল সামনে। চালকের আসনের পাশে চৌকি চেপে (পড়ুন সিট চেপে) কষে আমাকে বেঁধে দেওয়া হল। মন তখন ফুরফুরে। পাখির মতো আকাশে চক্কর কাটতে কাটতে নীচেটা দেখব। আহা! গোঁত্তা খেয়ে একবার আকাশে উড়ুক। ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে কাঁচের ফটফটে জানলা। পায়ের নীচে একটু এগিয়ে ইঞ্জিনের কাছে ইঞ্চিখানেক ফাঁকা জায়গা। আশ মিটিয়ে দেখে নেব! এই তো ডানা মেলেছে। কিন্তু পেটের তলার দিকটা হালকা লাগছে কেন! পা কি ছেড়ে গেল নাকি! অনুভব করছি না তো! আর পায়ের নীচের ঐ ফাঁক থেকে ঘন সবুজ পেল্লাই পাথরের স্তুপগুলো ওরকম কটকটে চোখে চাইছে কেন! হে মাতারানী, আমি না করলেও মা তো মন দিয়ে পুজো করেছে। জয় মাতা দি!
    হোটেলে ফিরে আলুপোস্ত কলাইয়ের ডাল ভাত খেয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লুম। আলসে কুঁড়ে, আড্ডাবাজ বাঙালি হয়েই জীবন সার্থক বাপু। বিকেলে অন্যান্য সহযাত্রীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাত পা মেলে  হোটেলে বা হোটেলের সামনের সারিবাঁধা দোকানপাট থেকে ‘মাতারানীর’ রেপ্লিকা ব্যাগে পুরে কাটাচ্ছিল। আর আমি ব্যাগ সামলাতে সামলাতে সুইজারল্যান্ডের দিবাস্বপ্নে বিভোর হচ্ছিলাম। আরে আমাদের ভারতের সুইজারল্যান্ড।  

তন্ময় ধর

ঙ্গা, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো?
                               

তপোলোক-দেবলোক-ব্রহ্মলোকের ছোঁয়াছুঁয়িতে এখানে সব পথ মৃত্যু পেরোনো অমরত্বের পথ। পৃথিবীর সংসারের দুঃখ-যন্ত্রণা-মলিনতা পেরিয়ে অপার শাশ্বত সৌন্দর্য্যের ধাক্কায় সম্মোহিত হয়েই আপনাকে এপথে চলতে হবে। যাত্রা শুরু হবে কাকভোরে, সে আপনি দেরাদুন থেকেই আসুন কিম্বা হরিদ্বার-হৃষীকেশ থেকেই আসুন। হরিদ্বার-হৃষীকেশ থেকে চাম্বা হয়ে যে পথটি উত্তরকাশীর পথে গিয়েছে, সেটি দীর্ঘ, তার সৌন্দর্য্যেও কিছু কমতি রয়েছে। সুতরাং আপনাকে বেছে নিতে হবে দেরাদুন-মুসৌরি-সুবাখোলির পথ। সে পথ বড় দুর্গম।  পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া সর্পিল সংকীর্ণ পথের পাশে একবার অপরূপকথার আলোর উঁকি তো পরমুহুর্তেই ভয়ঙ্কর ধস আর অতল খাদের ভয়াল ভ্রুকুটি। স্বর্গ ছেঁড়া জলপ্রপাত এসে কখনো ভিজিয়ে দিয়ে যায়। কখনো পাইন-দেওদারের শরীর ছোঁয়া একিচলেত রোদ্দুর এসে এক অন্য পৃথিবীর উষ্ণতার ছোঁয়া দিয়ে যায়। প্রভাতকল্পার তরল আলো ভেঙে দেরাদুন থেকে বাস যাত্রা শুরু করতেই ঘন্টাখানেকের মধ্যে মুসৌরির ৬০০০ ফুট পাহাড়ের কুয়াশা ভিজিয়ে দেব আপনাকে। পিছনে ফিরে দেখবেন, বহুদূরে পড়ে রয়েছে মানুষের সংসারের কোলাহল।


সবুজে মাখা পাহাড়, দুধেল শাদা ঝর্ণা, নাম-না-জানা ফুলের উপত্যকা আর অজানা পাখির কলকাকলির পাশ দিয়ে আপনি যখন এক অজানা মায়াময় জগতের গহনে হারিয়ে যাবেন, তখন হঠাৎই ব্রেক কষবে বাস। জায়গাটার নাম সুবাখোলি। সত্যিই সুবহ মানে ভোরের এক অনন্য সৌন্দর্য্য চোখ মেলে রয়েছে পথে, পথিকের চোখে, পথিকবনিতার স্বপ্নে। এখানেই পাইন-দেওদারের নরম রৌদ্রছায়ার খেলার ভেতর সেরে ফেলতে হবে প্রাতরাশ। ধোঁয়ার গন্ধ মাখা চা আর গরম পরাটা বা থুকপার স্বাদই আলাদা।   আবার যাত্রা সর্পিল পথে। হঠাৎ একটা নদীর সঙ্গে দেখা। নদীর গহন নীল চোখে চোখ রাখতেই যুগযুগান্ত পেরিয়ে ভেসে আসবে অদ্ভূত একটা পাহাড়ী গানের সুর। পাইন-দেওদারের লুকোচুরি থেক একটা পাখি করুণ সুরে ডেকে উঠবে। দূর পাহাড়ী গ্রাম থেকে এক দেবশিশু হাত নেড়ে টা-টা করে দেবে। ঘুম-ঘুম সব পাহাড়ের শিলালিপি পড়তে পড়তে আপনি হঠাৎ দেখবেন, নরম আলো মাখা সূর্যটা প্রায় মাঝ আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। আর শীতল হাওয়া মাখা একটা মস্ত পাহাড়ী ধ্বসের সামনে এক তেমাথার মোড়ে বাস থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এ জায়গাটার নাম ধরাসু। ‘বাঁটুল দ্য গ্রেট’ কমিক্সের খলনায়ক ভক্করাসুর সাথে নামের মিল খুঁজে পেলেন নাকি? এ জায়গার ধস সত্যিই গোটা পথের ভিলেন অংশ। ধুলো, নুড়িপাথর আর বিপজ্জনকভাবে ঝুলে থাকা পাথরখন্ডের পাশ দিয়ে খুব সাবধানে পেরোতে হবে পথের এই অংশটুকু। যারা বড়কোট-হনুমানচটি হয়ে যমুনোত্রীর পথে যাবেন তারা বাঁদিকের পথ ধরবেন। আপনি যাবেন ডানদিকে, গ্যানসু-উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রীর পথে। ভোর সাতটায় যে বাস দেরাদুন ছাড়ে, তা উত্তরকাশী পৌঁছায় দুপুর দেড়টা নাগাদ। উত্তরকাশীতে দুপুরের আহার সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে গঙ্গোত্রী যাওয়ার ছোট বাস বা গাড়িতে চেপে যান বিকেল তিনটের আগেই। সাড়ে তিন ঘন্টার পথ।



তিনটের পরে আর বাস পাবেন না। আর যদি একটা দিন উত্তরকাশীতে বিশ্রাম নিতে চান, তাহলে প্রচুর সস্তার হোটেল আছে। রয়েছে অনেক ধর্মশালাও। সন্ধেয় ঘুরতে পারেন ভাগীরথীর তীরে মায়াময় পথে পথে। শক্তিমাতার মন্দির এবং বিশ্বনাথ মন্দির দেখে নিতে পারেন পায়ে হেঁটেই। কোন প্রবেশমূল্য বা লাইন দেওয়ার ব্যপার নেই। একটু দূরে রডোডেনড্রনের বাগান কিম্বা মানেরি ড্যাম দেখতে যেতে পারেন, হাতে দু-তিন ঘন্টা সময় থাকলে।
পরের দিন খুব সকালে গঙ্গোত্রীর পথে বেরিয়ে পড়ুন। তীর্থের মরশুমে অর্থাৎ মে থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তরকাশী থেকে গঙ্গোত্রী পর্যন্ত ছোট বাস চলে। বাকি সময় ছোট গাড়ি। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এপথ তুষারপাতের জন্য বন্ধ থাকে। উত্তরকাশী থেকে গঙ্গোত্রীর দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। পথের এক-তৃতীয়াংশ পেরোতেই তুষারধবল পর্বতশৃঙ্গেরা আপনার চোখ আটকে রেখে দেবে। দেবলোকের এই পথের ঝর্ণা-নদী-গাছ-ফুল-পাখি সব লক্ষ্য করতে করতে এগিয়ে চলুন। এমন দৃশ্যসুখ জীবনে খুব বেশী আসে না। মাঝপথে গাংনানিতে থামবে গাড়ি। উষ্ণজলের একটি ক্ষীণধারার ঝর্ণা আছে এখানে। স্থানীয় মানুষদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এই ধারা। আশেপাশের দোকানে সামান্য জলপানের ব্যবস্থা আছে। গরম চা, পরোটা, পকোড়া খেতে পারেন। ঠান্ডা হাওয়া আর কুয়াশামোড়া পরিবেশে ওসব খাবারের স্বাদই আলাদা। খাওয়া সেরে স্থানীয় উলের শীতবস্ত্র কিনে নিতে পারেন। এরপর যত গঙ্গোত্রীর দিকে এগোতে থাকবেন, দুর্গম পথে হাড়হিম শীতল বাতাসের তীব্রতা বাড়তে থাকবে। এরই মধ্যে গাড়ির ড্রাইভার পাইনবনের পাশে এক চিলতে নদীবিধৌত এক গ্রামের পথে থেমে যাবে। এই গ্রামের নাম হর্শিল। আপেল এবং অন্যান্য সুস্বাদু পাহাড়ী ফলের বাগান আছে। দুরন্ত এক ঝর্ণাধারা দেখিয়ে ড্রাইভার বলবেন, এখানেই ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ ছায়াছবির ‘তুঝে বুলায়ে ইয়ে মেরি বাহেঁ’ গানের দৃশ্যায়ন হয়েছিল।
গঙ্গোত্রীর ছোট্ট বাসস্ট্যান্ড থেকেই শুরু হয়ে গেছে দোকানের সারি। বিচিত্র পূজার সামগ্রীর অভাব নেই সেখানে। তবে সব কোলাহল ছাড়িয়ে ভরে আছে গঙ্গা এবং অসিগঙ্গার তীব্র জলধ্বনি। আর সব দৃশ্যের উপর উজ্জ্বল হয়ে আছে শিবলিঙ্গ এবং ভাগীরথী গ্রুপের অন্যান্য তুষারশুভ্র শৃঙ্গগুলি। গঙ্গোত্রীতে হোটেল এবং ধর্মশালা রয়েছে প্রচুর। মন্দির এবং নদীসঙ্গমের কাছাকাছি কোন হোটেলে থাকতে পারেন। গঙ্গোত্রীতে দ্রষ্টব্য স্থান প্রচুর। বাসস্ট্যান্ডের গা বেয়ে ট্রেকিং-এর রাস্তা চলে গিয়েছে ভোজবাসা-গোমুখ-তপোবনের পথে। এই পথে যেতে হলে সকালেই অনুমতি নিয়ে নেতে হবে স্থানীয় ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস থেকে। গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ হিমবাহ প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ। দুর্গম এই পথে পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে প্রায় ৫ ঘন্টা। প্রতিদিন মাত্র ২০০ পর্যটককে এপথে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কাজেই সকালে দ্রুত নাম লেখাতে না পারলে এর আশা ত্যাগ করতে হবে। সেক্ষেত্রেও আপনার জন্য অজস্র দ্রষ্টব্য অপেক্ষা করে আছে গঙ্গোত্রী মন্দিরের আশেপাশে।
গঙ্গোত্রী মন্দিরটির বয়স বেশী নয়। অষ্টাদশ শতকে জেনারেল অমর সিং থাপা এই মন্দির তৈরি করেন। বর্তমানে সংস্কার করে ঝকঝকে-তকতকে করা হয়েছে। মন্দিরের একপাশে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসতে পারেন ভগীরথশিলায়। এখানে বসে তপস্যা করেই ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে মর্ত্যে আনেন। সিঁড়ি বেয়ে আরো নীচে নেমে স্নান করে নিতে পারেন ভাগীরথীতে। মন্দিরে পূজা দিয়ে দুপুরের আহার সেরে নিতে পারেন কাছাকাছি কোন রেস্টুরেন্টে। এরপর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন স্থানীয় দ্রষ্টব্যগুলির জন্য। মন্দির থেকে কয়েক পা এগিয়ে লোহার সেতু পেরিয়ে পৌঁছে যান গৌরীকুন্ড এবং সূর্যকুন্ডে। এখানে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখুন উন্মত্ত জলরাশির খেলা, সুবিশাল প্রস্তরখন্ডের মৌনতা, ঘিরে থাকা চির-অরণ্যের আলোছায়ার খেলা, চিরচঞ্চল জলরাশি থেকে বিচ্ছুরিত তীব্র জ্যোতি। ব্যাকগ্রাউন্ডে চির-উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে শিবলিঙ্গের তুষারশৃঙ্গ। এখানে জীবন তুচ্ছ। অনন্ত সৃষ্টির এক চিরায়ত সৌন্দর্য্যের সামনে বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন। মহাকালের জপের মালায় আজকের দিনটি নেই। জন্ম-মৃত্যু-দুঃখময় সংসারের অন্ধকার পেছনে ফেলে আপনি চলে এসেছেন আলোকতীর্থে। এরপর ভাগীরথীর তীরের অরণ্যময় পথ ধরে এগিয়ে চলুন পান্ডবগুহার দিকে। মাত্র দু’ কিলোমিটার পথ। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে সেই জনবিরল পথ আর ফুরোতে চাইবে না। সন্ধের নির্জনতায় সে পথ আরো গা-ছমছমে হয়ে ওঠে। ফিরে এসে জলমগ্ন শিবলিঙ্গ দেখতে চলুন। এখানেই শিব তাঁর জটা থেকে মুক্ত করেছিলেন দেবী গঙ্গাকে। আরো অসংখ্য দ্রষ্টব্য ছড়িয়ে রয়েছে আশেপাশে।
গঙ্গোত্রীতে কিন্তু কোন এটিএম নেই। পথে শেষ এটিএম হর্শিলে, গঙ্গোত্রী থেকে ২৮ কিলোমিটার আগে। বিএসএনএল ছাড়া বাকি সংস্থাগুলির টেলিফোন নেটওয়র্ক অত্যন্ত দুর্বল।

কিভাবে যাবেনঃ-
দেরাদুন থেকে উত্তরকাশীর বাস ছাড়ছে সকাল ৭ টায়, ৮ টায়, বেলা ১ টায় এবং ২টোয়। সময় লাগে সাড়ে ছ’ঘন্টা। উত্তরকাশী থেকে ছোট গাড়িতে গঙ্গোত্রী যেতে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘন্টা।
তীর্থের মরশুমে হৃষীকেশ থেকে সরাসরি গঙ্গোত্রী যাওয়ার বাস ছাড়ছে সকাল ৭টায়। সময় লাগে প্রায় এগারো ঘন্টা। 

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ফাল্গুনী ঘোষ

জয় মাতা দি
    ভারী মন নিয়ে পাঞ্জাবের হোটেল থেকে চেক আউট করেছিলাম। কোনও জায়গার সাথে এত্ত অল্প সময়ে নাড়ি নক্ষত্রের টান গড়ে ওঠা সম্ভবপর না হলেও চিনচিনে বুক নিয়ে অমৃতসর স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা শুরু হল। শুনলাম পায়ে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথার জন্য সেই ট্রেন গজগমনে আসছেন। অগত্যা স্টেশন চত্বরে ফটফটে আকাশের তলায় হাত পা ছড়িয়ে চাঁদের হাট বসল। চাঁদের হাট সহযাত্রীদের ক্লান্তি, বিরক্তিভরা কোঁচকানো ভ্রুর সাথে উড়ে আসা ব্যঙ্গবাণে মাছের হাটে অচিরেই পরিণত হল। বেশ মালুম পেলাম রাতটি আক্ষরিক অর্থে ‘কোজাগরী’ হয়ে উঠতে চলেছে। এরপর গজেন্দ্রগামিনীর দেখা মিলল। ‘জলদি’,’ইধার আও’, ‘উপর মে সিট হ্যায়’, ‘তাড়াতাড়ি আয়’—ইত্যাদি শব্দের মিছিল পেরিয়ে নিজ নিজ বার্থ দখল করতেই গাইডকাকুর নির্দেশ –“যা পারেন তিন চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নিন।“ অর্থাৎ আমার আশেপাশের বার্থের হিন্দীভাষীদের নিয়ে গবেষণা করার মত সময় নেই। সুতরাং...।
     অমৃতসর থেকে জম্মুর সম্পূর্ণ জার্নিটা যেহেতু চার পাঁচ ঘন্টার তাই সাধারণ কুপেতেই সবার সিট ছিল। খোলা জানলা দিয়ে শিরশিরে জমাট বাতাস বাধ্য করল তখনই হালকা পাতলা চাদর জড়াতে। অথচ অমৃতসরে কি ধুন্ধুমার গরম ছিল, মে জুন মাসে সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই চোখের পাতা জ্বালা করলেও ঘুমোতে মন চাইল না। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ট্রেনের ছুটে চলার তালে দুপাশের প্রকৃতির ধীরে ধীরে বদলে যাওয়ার দিকে চোখ ছুটে চলল। কোথাও ঢালু জমি, ছোটো ছোটো গুল্ম ঝোপ, জমির ঢালে জল বয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্বরূপ নুড়ি পাথরগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাঝে মাঝে ছোটো মাঝারি উচ্চতার টিলা। কিন্তু পাহাড় কই! এ তো আমার বাড়ির পাশের সুরিচুয়া, বড়পাহাড়ির মতো এলাকা। তফাৎ শুধু মাটির রঙে। আমার বীরভূম লাল মাটির দেশ আর এখানে সাদা নয়তো উজ্জ্বল শ্লেট রং-এর ছোঁয়া মাটিতে। তাহলে যে শুনেছিলাম বৈষ্ণ দেবীর মন্দির পাহাড়ের চূড়োয়। মনে প্রশ্নরা গিজগিজ করতে থাকল জম্মু স্টেশনে পা রাখতে রাখতে।


      স্টেশন থেকে কাটরামুখী বাস ছোটার তালে তালে টিলার উচ্চতা, জঙ্গলের ঘনত্ব দুই-ই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। লোহার রেলিং ঘেরা রাস্তার পাঁকে পাকে যে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে তা জম্মু শহরটির ছোটো হয়ে যাওয়া তেই মালুম পড়ছিল। যেতে যেতে তন্দ্রা ছিঁড়ে যাওয়ার মত ‘টানেল’, ‘টানেল’ চীৎকারে বাস মুখর হয়ে উঠল। আশেপাশে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা চোর ডাকাতের দল সশস্ত্রে যদি ঘিরে ধরে টানেলের দুদিকের মুখে বা দুয়েকটা পাহাড়ি ভূত পেত্নী। তো নির্ঘাত হৃদযন্ত্রের চাপে কিছু কিছু মানুষ পরকালবাসী হবেন। টিমটিমে আলোয় নিজেদের মুখ চেনা যায় না। পর পর বেশ কয়েকটা ঘুটঘুটেশ্বরের রাজত্ব পেরিয়ে বাসের গতি কমে এল। যদিও যাত্রাপথের চমকে খিদে তেষ্টা মাথায় উঠেছিল, সামনে পাঞ্জাবি ধাবার খুশবুতে মনে হল ছুঁচোগুলো হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে।
    আলু গোবিওয়ালা নান কুলচা আর স্পেশাল আনারদানা চাটনি কাঁচা পেঁয়াজ সহযোগে। নান কুলচা ওভি মাকখন মারকে। এরা বাটার না দিয়ে খাবার খেতেই পারে না। ‘মাখন ছোড়কে’ বলে খাবারের অর্ডার দিলেও কুলচার উপর পাবেন এক কিউব বাটার। প্রশ্ন চিহ্নসহ তাকালেই ততোধিক ভ্রু কুঁচকে উত্তর পাবেন ‘মাকখন দিয়া হি কাঁহা!’ হয়ত পাহাড়ি রাস্তার পরিশ্রমে প্রবল এনার্জির জোগান হিসেবে মাখন, কুলচা জাতীয় খাবার গুলি খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পেটরোগা বাঙালির কি পোষায়? ধাবার একপাশে বিক্রি হওয়া ফ্রুট সালাড চাখতে চাখতে একটা শসার দাম কুড়ি টাকা শুনে চোখ কপালে উঠতে দেখে ভেসে এল উত্তর- ‘বহুত মেহেঙ্গা হ্যায় না! ইধার নেহি হোতা! আপলোগ বেঙ্গল কা হো না! বেঙ্গলসে ইয়ে চীজ লানা পড়তা হ্যায়! এই জোলো স্বাদের নিতান্ত হেলাফেলার বঙ্গদেশীয় ফসলের কি কদর! সাধেই কি বলে গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।
     ঘন্টা তিনেকের বাসযাত্রার ক্লান্তিতে কাটরা’র হোটেলে ঢুকে গরম জলে স্নান করে পেটে চাট্টি পড়তেই চোখ টেনে আসতে লাগল। কিন্তু বৈষ্ণ মাতা দর্শনে যারা হেঁটে ত্রিকূট পাহাড়ে চড়বেন তাদেরকে তো সন্ধ্যে থেকেই হাঁটা লাগাতে হবে। আমার প্রেশার সুগারে ভোগা মা তো অত হাঁটতে পারবে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় হোটেলের জানলা থেকে ত্রিকূট পাহাড়টিকে দেখতে দেখতে ভাবনার সমুদ্রে ডুবে গেলাম। মহালক্ষ্মী, মহাকালী আর মহাসরস্বতীর মিলিত রূপ এই বৈষ্ণ দেবী। ত্রিকূট পাহাড়ে তাঁর অবস্থান। বৈষ্ণ দেবী দর্শনে যেতে হন্টন ছাড়াও ঘোড়া(পনি), পালকি(ডুলি) বা হেলিকপ্টার সার্ভিসের সাহায্য নেওয়া যায়।



     অগত্যা ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে এলেন গাইড কাকু আর হোটেল ম্যানেজার। এদের বদান্যতায় সেই রকমই এক এজেন্টের আগমন ঘটল হোটেলে। আমি তো মিনিট দশেক সেই এজেন্টকে হাঁ করে দেখে চলেছি। এজেন্ট নাকি আধুনিক পোষাকে রাজপুত্র! পশ্চিমবঙ্গে কোনও(কোম্পানীর নয়)নিজ উদ্যোগে এজেন্ট মানেই খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা গালভরতি দাড়ি, ক্ষয়াটে চাউনি, খোয়ানো জুতোর মালিকটির কেবল গছানোর ধান্দা। কিন্তু এই লাল টুকটুকে সুদর্শন এজেন্টের হাসি হাসি চোখ আর মিষ্টি মধুর ব্যবহার রীতিমতো সম্মোহনের মায়াজাল বিস্তার করবে। আপনার পকেটে রেস্ত থাকে তো নিজ গরজে আপনি এই এজেন্টকে যোগাযোগ করবেন। যেরকম আমরা তিনটি পরিবার মিলে করলাম। যাই হোক সেদিন বাকি সহযাত্রীরা হেঁটে পড়েছে মাতারানির উদ্দেশ্যে, আর আমরা সাকুল্যে কয়েকটি প্রাণী উদ্দেশ্যহীন। সেকারণে সন্ধ্যে নামার সাথে সাথে ত্রিকূট পাহাড়কে আলোর মালায় সেজে উঠতে দেখার অনবদ্য অভিজ্ঞতা লাভ হল।     

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

ফাল্গুনী ঘোষ

পঞ্চনদের দেশ- ২

   হরমন্দির সাহিব দেখে আসার পুলকে পরের দিন সকালে আরো পালক জুড়তে চলেছে—রাত্রে হোটেলের ডাইনিং হলে এই সংবাদটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। স্বর্ণমন্দিরের পাশের বাজারের ভিতর দিয়ে মিনিট দশেকের হাঁটাপথেই ইতিহাস বিজড়িত বহুশ্রুত ঘটনার আবাসস্থল জালিয়ানওয়ালাবাগ। আর অমৃতসর শহর থেকে পশ্চিমে ২৮ কিমি গেলেই ভারত পাকিস্থানের সীমান্তরেখা ওয়াগা বর্ডার। ভারতীয় হিসেবে গর্ব বোধ করার মতো জায়গা দুটি। রাত্রি থেকেই পরের সারাদিনের কথা ভেবে শিরায় শিরায় দ্বিগুন বেগে রক্তের প্রবাহ শুরু হয়ে গেল।
      রাত পুইয়ে সকালের রোদ উঠল যেন দেশভক্তির রঙে রাঙিয়ে। ভাবগভীর মুখ নিয়ে সবাই  জলখাবারের পর্ব সেরে গুটি গুটি পায়ে জালিয়ানওয়ালাবাগের দিকে এগোতে থাকলাম। সবার মুখের ভূগোল বলে দিচ্ছিল তারা ইতিহাসের পাতায় বিচরণ করতে শুরু করেছে। হোটেল থেকে হরমন্দির সাহিবের পথে গুরু মান্ডি বা গুরু বাজার—সেই বাজারের পাশ দিয়ে গেলেও কেউ দেখলাম মার্কেটিং-এ মন দিল না। পায়ে পায়ে দোকান বাজার পেরিয়ে চৌমাথার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফেরাতেই ইতিহাস বই-এর পাতা থেকে যেন উঠে এল সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ। ‘বাগ’ তো বাগান কিন্তু, আমার চোখ ততক্ষণে ভয়ানক ইতিহাসের সাক্ষ্য খুঁজে চলেছে। প্রাচীর ঘেরা উদ্যানের প্রতিটি ইঁটে সেই সাক্ষী, গুলির দাগ, নম্বরের খতিয়ান! তা দেখতে দেখতে কোথাও যেন হৃদয় ক্ষরিত হচ্ছিল। এই যে গুলির গভীর গর্ত ইঁটের গায়ে স্পর্শ করার আগে তা কত হৃদয়, পাঁজরা ভেদ করে মায়ের কোল শূণ্য করেছে সে ভাবতে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।


       কুয়োর মুখে জালবাঁধা গর্তের অন্ধকারে ঢিল আর গুলির আঘাতের দীর্ঘশ্বাস বুঝি এখনও কান পাতলে শোনা যায়। সে কারণেই হয়ত এই বাগের গাছ গাছালির মধ্যেও কাটছাঁট করে সেই ঘটনার দৃশ্য ফুটে ওঠে বন্দুকধারী বৃটিশ সৈনিকের আদলে। ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিলকে বুকে ধারণ করে শহীদ স্মরণে সবসময় অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেই আগুনে বাগের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে আছে সর্বক্ষণ। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছিলাম এখানে ঘুরতে ঘুরতে কমবেশি বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই কথা বলার স্রোত হারিয়ে যাচ্ছিল। সুদূর পশ্চিমবঙ্গ থেকে গিয়েও কেমন যেন একটা নাড়ির টান অনুভব করলাম। আমাদের দলের সকলে বাগের ঘাস, ইঁট পাথরে মগ্ন হয়ে কোথাও না কোথাও বসে ছিল। দেখার পালা শেষ হয়ে গেলেও ইতিহাস অনুভবের পালা সহজে শেষ হয়নি।



      তবুও শেষ হতে হয়। ভাগ্যক্রমে সঙ্গীদের মধ্যে দু-চারটে বালক বালিকা, কিশোর কিশোরী ছিল। তাদের আইসক্রিম আর চকোলেট তৃষ্ণা আমাদের বাজারমুখী করল। জালিয়ানওয়ালাবাগ আর হরমন্দির সাহিবের মাঝামাঝি এলাকায় ‘হল’ বাজার, ‘গুরু’ বাজারে রাস্তার উপরে খুব সহজলভ্য জিনিসের পসরা। কি পাওয়া যায় না সেখানে! শিখদের ধর্মশাস্ত্রীয় নিশান—কৃপাণ, বালা’র বড় এবং ক্ষুদ্র সংস্করণ বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে পাঞ্জাবি নান কুলচার গন্ধ ভেসে আসছে! প্রাণ জুড়াতে আছে ‘কুলফা’। এই কুলচা আর কুলফা’র গল্পটি আপনাদের যথাসময়ে বলব। এখন মার্কেটিং-এর সময়। পাঞ্জাবি ‘জুতি’, পাতিয়ালা, ‘জাদাউ’(Jadau) এসব কিনে ব্যাগ ভর্তি না করলেই তো নয়! কথায় আছে ‘সখের প্রাণ গড়ের মাঠ’। পকেট না হয় গড়ের মাঠ হল, সখ তো হেলাফেলার নয়।
   সে ধরুন কলকাতা বা ছোটোখাটো মফস্বলেও আজকাল ‘পাতিয়ালি’ সেটের ছড়াছড়ি। কিন্তু না, না, ঐ কতগুলি ভাঁজবিশিষ্ট ঢোলা পা হলেই পাতিয়ালি নয়। পাতিয়ালার সেলাই শৈলীতে আপনার মনে হবে কাছা দিয়ে ধুতি পড়ে আছেন। আর পাঞ্জাবি ‘জুতি’, আহা সে যেন মাখন। এই ফুলকাটা, চুমকুড়ি কাজের জুতো পায়ে দিলে আর হাঁটতে ইচ্ছে করবে না! তাছাড়া পাঞ্জাবিরা শুকতলা ছাড়াই জুতো পড়ে। ওদের জুতোর শুকতলা খুইয়ে কিছু পেতে হয়না বোধহয়। জুতো কিনলেন কি ফাঁসলেন। তাল মিলিয়ে পোশাক আশাক, গয়না বাকি রাখলে এক্কেবারে বেমানান। তাছাড়া মেয়েরা গয়না, শাড়ি কিনবে না- এমন উলট পুরান ভারতীয় সংস্কৃতিতে হওয়া ঘোরতর অন্যায়। অসংখ্য, অজস্র মীনাকারী, ফুলকারি, পোলকি আর জাদাউ এর সম্ভার। আসলি, নকলি চিনে নেওয়ার ভার আপনার। মীনাকারী, ফুলকারি, পোলকি সম্পর্কে কমবেশি অনেকেই জানেন, তবে জাদাউ হল সবগুলি শিল্পের একত্রীকরণ। জাদাউ-এর মূল জায়গা শুনলাম রাজস্থান। মোগল আমল থেকে এই শিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ। সে গয়নার চমকে দমকে আপনি পকেট ফাঁকা না করে পারবেন না।
   হোটেলে ফেরা, স্নান, খাওয়া এই পরবর্তী পর্বগুলি খুব দ্রুত সারতে হল কারণ ওয়াগা বর্ডারের বিশেষ ‘শো’টি বিকেল ৫.৩০/৬টায় অনুষ্ঠিত হলেও বসে দেখবার স্থান দখলদারির জন্য ৩.০০/৩.৩০ এর মধ্যেই রওয়ানা দিতে হল। চুয়াল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রার হলকা উপেক্ষা করে আমাদের টাটাসুমো ছুটলো দেশভক্তির জোয়ারে। বর্ডার লাইন যত কাছে আসতে থাকল চেকিং-এর কড়াকড়ি নজর করার মত। মূল বর্ডারের বেশ কিছুক্ষণ আগে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল আর আমরাও জলের বোতল, ব্যাগব্যাগেজ গাড়িতে রেখে ছাতা বগলে পয়সাকড়ি হাতে নিয়ে চরণবাবুর ট্যক্সি ভরসা করলাম। অনবরত দ্বিভাষিক(ইংরাজি, হিন্দি)ঘোষণা চলছে সেই স্থানের নিষেধাজ্ঞা আর আচার আচরণ সম্পর্কে। শুধু পিলপিলে কালো মাথার ভিড়ে নজর করার মত খাকি পোশাক ও মাথায় লাল মোরগঝুঁটি টুপি মিলিটারিদের। কখনও বা ঘোড়ায় চড়ে দুলকি চালে চলেছে। আবার কৌতূহলী জনতার সাথে হাত মিলিয়ে সেলফিও উঠছে ঘোড়াসমেত।



    নাহ, অত আগে বেরিয়ে এসেও ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’। অগত্যা ইতিউতি চেয়ে দুচার কদম আগিয়ে পিছিয়ে মার্চ ফাস্ট করে তাল মেলাতে থাকলাম। হঠাৎ ‘বর্ডারকে উস পার সে সেনা আ রহা হ্যায়’- সমবেত জনতার বুককাঁপানো আওয়াজে চোখ মেলে দেখলাম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি আসন্ন প্রায়। গোল্লা পাকিয়ে দেখলাম দু-দেশের সৈন্যদের কৌশল, লম্ফঝম্ফ শেষ হল উভয়ের পতাকাকে সম্মান জানিয়ে। গরমে জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু থামা নেই দৌড় লাগাও। এমতাবস্থায় প্রাণে হিমের পরশ ছোয়াতে হাজির পাঞ্জাবি ‘কুলফা’। কুলফির উপর ফলকুচির সাথে সেদ্ধ নুডলস জড়িয়ে হ্রস্ব-ই কার বিদায় নিয়েছেন আর ‘আ’এসে আদর জমিয়ে কুলফা বানিয়ে তুলেছে। গরমে আরও একটু এনার্জি শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকা। আরও আছে রাস্তার দুপাশে বাহারি হাতপাখার মেলা। আমাদের দেশ ঘরের তালপাতা পাখার মতো দেখতে হলেও তারের উপর পুরোটাই বাহারি উল দিয়ে হস্তশিল্প। হস্তশিল্প হস্তগত হল। গাড়িতে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, মাত্র দু-দশদিনের জন্য বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়েছি, সে ফাঁকেই পাঞ্জাবের খাদ্যাভ্যাস, আচার-আচরণ পরিবেশ প্রকৃতির সঙ্গে মনে মনে মাপ করে নিচ্ছি জন্মস্থানের। অথচ এই জওয়ানরা শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা উপেক্ষা করে আমাদেরকে অবিরত নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে নিজেদের বাড়ি ঘরের মায়া দূরে সরিয়ে রেখে। ভাবলে চোখে জ্বালা ধরে। আপাতত পঞ্চনদের পালা সাঙ্গ। রাতের ট্রেনে পাড়ি দেবো জম্মুর উদ্দেশ্যে।       



শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ফাল্গুনী ঘোষ


পঞ্চ নদের দেশ
         খুব ছোটো থেকেই ঘুরে বেড়ানোর সখ আমার প্রবল। কোনোমতে দু-একদিন বা এক আধটা বিকেলও যদি ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মত জুটত, মন ফুরফুরে পাখী হয়ে যেত। এ হেন আমি ফেবু’র ওয়ালে লোকের ঘুরতে যাওয়ার ছবি ও বর্ণনা দেখি এবং মুখ নামিয়ে বসে থাকি। কারণ ঘুরতে যাওয়ার দুটো প্রধান প্রয়োজন—সময় ও সঙ্গ। সময় যদি বা মেলে সঙ্গী’র বড় অভাব। কিন্তু আমি হাল ছাড়ার পাত্রী নই তাই গত বছর (২০১৬ সালে)শুরু থেকেই আঠঘাঁট বাঁধতে শুরু করি। চেষ্টায় কি না হয়! আমিও আমার এই ছোট্টো মফস্বল শহরে খুঁজে পেয়ে গেলাম ততোধিক ছোটো অচেনা/ আধাচেনা ট্যুর গ্রুপ। মা’কে সঙ্গী  করে থোড়- বড়ি- খাড়া’র জীবনকে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে বোঁচকা বেঁধে গ্রীষ্মের ছুটিতে বেরিয়ে পড়ার প্ল্যান রেডি হয়ে গেল। যেহেতু জম্মু-কাশ্মীর ভ্রমণ আমাদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, মে মাসের সময়টা না বেছে উপায়ও ছিল না। তাই উত্তর পশ্চিম ভারতে সেসময় চাঁদিজ্বলা গরম হলেও অমৃতসর তালিকায় ঢুকে পড়েছিল। হাতের কাছে স্বর্ণমন্দিরটা কিছুতেই ছাড়া যায় না।  

        গরমের ছুটি পড়লে রোদ গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল আমার উত্তেজনার পারদ। ধীরে ধীরে এল সেই নির্ধারিত দিন। দুটি মানুষ ততোধিক লোটাকম্বল(৩টে) নিয়ে বর্ধমানগামী শহীদ এক্সপ্রেসে চেপে বসা গেল। সহযাত্রী ভ্রমণসঙ্গী এক দাদা বৌদির সাথে আলাপ দিয়ে যাত্রা শুরু এবং বর্ধমান পৌঁছাতে পৌঁছাতে গরম চা আর ঝালমুড়ির সাথে তাদের ৭-৮ বছরের কন্যারত্ন আমার মায়ের নাতনী’র পদ অধিকার করে বসল। এরপর বর্ধমানে রাত্রি আটটায় অমৃতসর মেল এক্সপ্রেসের নির্দিষ্ট এসি কুপেতে সংসার পেতে বসলাম আয়েস করে। ছত্রিশ ঘন্টা যেতে হবে, সে তো সোজা নয়। আর ‘বিশ্বজোড়া আমার আপনজন’ মনোভাবেই সেই কুপেতে কলকাতার আরেকটি অচেনা পরিবারের সাথে আমাদের জবরদস্ত আলাপ হয়ে গেল। পরের দিন কাশীর ঘাট পেরিয়ে লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত রেল গাড়ির তালে তালে সেই কুপেতে যেন বিশ্ববাংলার আসর বসে গেল। কিন্তু হায়! সুখ মানুষের কপালে বেশিক্ষণ জোটে না। লক্ষ্ণৌ স্টেশনে সেই বাঙালি পরিবারের স্থান অধিকার করল দশাসই পাঞ্জাবি, মাঝবয়সী ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা! যাদের সাথে শুধু কৌতুহলী দৃষ্টি বিনিময় ছাড়া সে রাতের মত আর কিছুই হল না। তাছাড়া পরের দিন সকালেই আবার আমাদের নামতে হবে। তাই রুটি চিকেন খেয়ে রাতের মত চোখ বোজা গেল।  

‘এলাইচি চায়েএএএ’ – হাঁকে পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখি লুধিয়ানা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়ে। জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাতে সূর্যের রোদ পড়ে ঝিকমিক করছে। প্ল্যাটফর্ম চত্বরে পশমি পোশাকের পসরা। তাহলে তো পঞ্চনদের দেশে পা রেখেছি! কিন্তু নদীগুলো কই? মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে কানে এল-“অমৃতসর পৌঁহুছনেসে প্যাহেলে বিয়াস আয়েগা।“ দেখি গতকালের সেই পাঞ্জাবী মহিলা।সে নাকি  কলকাতায় গেছে, কালীঘাট দেখেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাঙালি আর যাই হোক আড্ডা জমাতে ওস্তাদ। হলই বা একজন হিন্দিভাষী আরেকজন বাঙালি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। সুতরাং দুই অসমভাষী গৃহবধূর আলাপচারীতা জমে উঠল। এদিকে দুপাশের চলন্ত দৃশ্য থেকে উঠে আসছে একটি বা দুটি ক্ষেতের মধ্যে একটি করে বাড়ি। যে ক্ষেতের যে মালিক সে নাকি সেখানেই বাড়ি করে থাকে এটাই দস্তুর। আর গমের পলুইগুলি সব শিবলিঙ্গাকৃতি। গম, যব, মকাই-এর হরিয়ালি ক্ষেত! হঠাৎ চোখে পড়ল চকচকে সাদা জলের রাশি। দু চোখ ভরে শুষে নিলাম বিপাশাকে। অবশেষে হাঁকডাক, হৈ চৈ-এর মাধ্যমে নেমে পড়া গেল অমৃতসর স্টেশনে।
    আমাদের ট্যুর গ্রুপের গাইড কাকুর পূর্ব পরিকল্পনামাফিক টাটা সুমোতে করে হোটেল সীতা নিবাস-এ পৌঁছালাম। আগের রাতে প্রবল ঝড় বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া আরামদায়ক ছিল। শুনলাম যে হোটেল থেকে মাত্র দু-মিনিটের হাঁটা পথে অমৃতসরের অন্যতম আকর্ষণ ‘স্বর্ণমন্দির’।শুনেই প্রায় দুদিনের জার্নির ধকল কোথায় উধাও হয়ে গেল! এখন শুধু স্নান খাওয়া করে বিকেল হওয়ার অপেক্ষা। বিকেল ছ’টায়(এখানে আটটায় সন্ধ্যে লাগে) ছোটো ছোটো দলে নিজেদের মনের মত করে বেড়িয়ে পড়া গেল। ছোটোখাটো বাজারের গলিপথ ধরে কয়েক পা হাঁটতেই সামনে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণমন্দিরের দরজা। পূর্ব দিকের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে এর বিশালত্ব মালুম পড়ল। মন্দিরে ঢোকার মুখেই সারি সারি জুতো রাখার জায়গায় টোকেন নিয়ে খালি পায়ে প্রবেশ। শীতকালে গরম আর গরমকালে শীতল স্বচ্ছ্ব একটি জলধারা আপনার পা ধুইয়ে দেবে। এরপর মাথায় কাপড় দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশ। যাদের কাপড় বা ওড়না নেই তাদের জন্য মন্দিরে প্রবেশের মুখে বিভিন্ন রঙের টুকরো রুমাল পাওয়া যাচ্ছিল। যাই হোক নারী পুরুষ নির্বিশেষে মাথার কাপড় যেন না সরে এরজন্য হাট্টাকাট্টা শিখ পালোয়ানেরা লাঠি ঠকঠকিয়ে নজরদারি করে বেড়াচ্ছে।

সম্পূর্ণ শ্বেতপাথরে মোড়া, মধ্যে স্বচ্ছ্ব সুন্দর বিরাট জলাধার। পূর্বদিকে ঢুকে পশ্চিম পর্যন্ত যাতায়াতের পথ কার্পেট মোড়া। পশ্চিম প্রান্ত থেকে আবার সরোবরের মধ্যে পূর্ব পর্যন্ত একটি সেতুর মধ্যে দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশের রাস্তা। সেই মন্দির যার চূড়াটি সুদৃশ্য সোনার পাতে মোড়া। চারদিকে চারটি দরজা – জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের সাদর আমন্ত্রণ সেখানে। মূল মন্দিরের বাঁধানো বেদির মধ্যে রয়েছেন ‘গ্রন্থসাহিব’। হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ । কিন্তু কি অদ্ভুত শান্ত কোলাহলহীন স্থান! গোটা এলাকা জুড়ে শুধু মধুর স্বরে অনুরণিত হচ্ছে নানক ও কবীরের দোঁহা। শিখদের সব থেকে বড় এই ধর্মস্থান হরমন্দির সাহিব বা ভগবানের দরবার। শিখগুরু পঞ্চম অর্জুন ১৫৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এই মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন পরে ১৬০৪ সালে আদি গ্রন্থকে এখানে স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে দশজন শিখ গুরুর বাণী সম্বলিত এই আদি গ্রন্থই ‘গ্রন্থসাহিব’ নামে খ্যাত হয়।
       অমৃত সরোবর থেকে ‘অমৃতসর’। এই সরোবরের জল শিখদের কাছে পরম পবিত্র। তাঁরা মাথায় ছোঁয়াচ্ছেন দেখলাম। আর আমার মত দর্শন পিপাসুর কাছে শান্ত, স্বচ্ছ্ব, শীতল, গভীর এই জলে লাল, কমলা, সাদা, ঘন শ্যাওলা রঙের নাম জানা/অজানা মাছের খেলা আর জলের উপরের স্তরে স্বর্ণমন্দির ও সূর্যের গোধূলিবেলার ছটার যে লুকোচুরি তা এক পরম প্রাপ্তি। মন্দিরের দোতলায় অকাল তখত, গুরু গ্রন্থসাহিবের রাত্রিকালীন আবাস। প্রতিরাত্রে সোনার পাল্কিতে করে বাদ্য সহকারে তাঁকে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার সেভাবেই ভোর রাত্রে নামিয়ে আনা হয়। এখানে প্রহরের পর প্রহর কেটে গেলেও স্থানমাহাত্ম্য আপনাকে  সমাহিত করে রাখবে। তাছাড়া ভুখা পেটে থাকারও প্রশ্ন নেই। লঙ্গরখানায় পাত পেড়ে উৎকৃষ্ট মানের খাবার খান। এছাড়াও কয়েকহাত অন্তর জলদান ও সুজির হালুয়া বিতরণের ব্যবস্থা র‍য়েছে। দুহাত জোড় করে ভক্তিভরে সেই হালুয়া মুখে দিলেই হুশশশ করে কোথায় মিলিয়ে যাবে আর অপূর্ব স্বাদের জোয়ারে আপনার মন পুলকিত হয়ে উঠবে।  
      চারিদিকে এইসব দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এল। নক্ষত্রখচিত পরিষ্কার আকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে ঝিকমিকে আলো মেখে স্বর্ণমন্দির এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করল। কি অনাবিল দৃশ্য সুখ! কি অপরিমিত শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশ। হাজার হাজার শিখ সম্প্রদায়ের শৃঙ্খলাপরায়নতা, ত্যাগ, ধৈর্য, সেবাদানের মনোবৃত্তি—শিক্ষনীয় বিষয় যে কোনো মানুষের কাছে। তিন চার ঘন্টা ওখানে সময় কাটানোর পর দলের ডাকে ফিরতে ফিরতে এক ভাবগম্ভীর আধ্যাত্মিকতা সবার মনে ভর করে ছিল। 

বুধবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৬

জয়তী অধিকারী



কিন্নর-কিন্নরী…শুনলেই মনে ভেসে ওঠে অপরূপ সুন্দর-সুন্দরী মানুষচেহারা। যদিও ব্যাপারটা যে আদৌ তা না ১৯৯৭ সালের পুজোর ছুটিতে হিমাচলপ্রদেশের কিন্নর ভ্রমণে না গেলে হয়ত অজানাই থেকে যেত। যাই হোক, কয়েকজন বন্ধু আর তাদের পরিবার মিলে মোট পনেরো জন গিয়েছিলাম কিন্নর-ভ্রমণে। অর্ধেক ট্যুর হয়ে যাওয়ার পর সারাহান থেকে যখন আমরা কল্পার পথে, মাঝরাস্তায় জানা গেল সামনে পথ বন্ধ। কারণ দিন দশেক আগেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাহাড়ের মধ্যে এসে উপস্থিত একরাশ মেঘ। দুজনেরই অহংকারী মাথা আকাশ ছুঁতে চায়।