ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 

                




শ্রাবণের ধারার মত



শেষ পর্ব

ঊশ্রীকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে এসে নিজেকে হঠাৎ অনাথ মনে হল দেবপ্রিয়ার। বাবা চলে গিয়েছিলেন যখন তখন সে সবে সেভেন, কষ্ট হয়েছিল কিন্তু মায়ের আঁচলের নীচে কখনোই অনাথ মনে হয়নি নিজেকে। অনুজ চলে গেলেও তেমন মনে হয়নি আর মা চলে গেলে ভীষণ ফাঁকা লাগলেও ঊশ্রী যেন জড়িয়ে নিয়েছিল সবটুকু। আজ সারা বাড়ি জুড়ে নৈঃশব্দ‍্য তাকে গিলতে আসছে। চলে যাবার আগে একটা সাংঘাতিক কাজ করেছে ঊশ্রী যার কোনো আভাস বা কল্পনা দেবপ্রিয়ার ছিলনা। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে ঝোড়ো কাকের মত মেয়ে ফিরেছে। চোখের জলের দাগ তখনো লেগে রয়েছে। দেবপ্রিয়া পড়ছিলেন। দ্রুত উঠে এসে মেয়ের কাছে আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

-সব আড়াল আজ ভেঙে দিলাম মা। সব আড়াল। এতদিন লড়াইটা আমাদের ছিল। এবার ওদের পালা।

-কী হয়েছেরে মুনিয়া? 

-আজ জোনাকমাসির কাছে গিয়ে নিজে সব বলে এসেছি। সাথে বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলাম। ওদের বাইরে দাঁড় করিয়ে ভেতরে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম যদি শুনিস বেশি চিৎকার চ্যাঁচ্যামেচি হচ্ছে এই বাড়িতে সোজা ঢুকে আসবি।

দেবপ্রিয়া স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে শুনে। কী করে করল মেয়েটা এমন! সব বলে দিল সব! সোফায় ডুবে রয়েছে। ঘোরের ভেতর বলেই চলেছে বিড়বিড় করে।

-মাসির জন্য কষ্ট হচ্ছিল খুব তবু বলে এসেছি। আর কতোদিন এভাবে ভয় পেয়ে বাঁচবো? ঐ বরুণ দত্তের চোখে চোখ রেখে বলেছি আমার ছবি ভাইরাল করুন আপনি, তারপর আমি পুলিশে জানাব সবটা। আমার মায়ের জীবন নিয়ে কী ভাবে খেলছেন সেটাও বলবো।

দেবপ্রিয়া আজ আর কাঁদতে চায়না। লবণস্রোতে জীবন যার তার নতুন করে আর কান্না আসে না। চুপ করে থাকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। ঊশ্রী হঠাৎ যেন ঝলমল করে ওঠে, 'মা আমি অনেক আগেই এটা করতে পারতাম, করা উচিৎ ছিল। আমার নিজেকে হালকা লাগছে মা। বোধহয় দীপ্তার্ককে এবার একটু স্পেস দিতে পারবো।' নতুন চরিত্রের আগমনে নড়ে বসে দেবপ্রিয়া। মায়ের কৌতূহল লক্ষ্য করে ঊশ্রী বলে, 'এমন কিছু না। হ্যাণ্ডসাম একটা ছেলে ঐ পুলিশেই চাকরী টাকরী করে। ডিজি ফিজি কিছু একটা হবে। ফেসবুক থেকেই আলাপ। একটু বেশি এ্যাটেনশান দিচ্ছে মাস ছয়েক তাই বললাম আরকি।' হেসে ফেলে দেবপ্রিয়া। যদিও ঊশ্রী কথা থামায়নি।

-মরুণকিশোর আছেন বলেই তুমি যাচ্ছো না মা! উনি কিন্তু আজো তোমায় ভোলেননি। কত বছর আগের কথা একবার ভেবে দেখো। আশ্চর্য জানো আমার চোখে উনি যেন তোমাকেই দেখছিলেন। তুমি আমার সাথে আসলে ভালো করতে মা। হয়ত একটু শান্তি পেতে, ভালো লাগত তোমার।

-মুনিয়া, মরুণ আমাকে কেন ভালোবেসেছিল? কতটা ভালোবেসেছিল আমি জানিনা। জানতে চাইওনা কারণ আজ আর তার কোনো মানেই হয় না। এই বয়েসে হৃদয় অপর কারো দুঃখের কারণ হবার দায় নিতে চাইবে না বোধহয়। তাছাড়া আমার এখানে কিছু কাজ আছে। সেসব না মিটিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। যদিও যাবনা কখনো একথা বলছি না।

-বেশ তোমার যা ইচ্ছে। তবে আমি বেশিদিন তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা এটা মনে রেখো।

মেয়েটা নিজেকে ঠিক সামলে নিল। চারিদিক কেমন যেন শান্ত হয়ে আসছে। এই ফাঁকা বাড়িতে একাই থাকতে হবে এখন থেকে। দিন কারো জন্য বসে অপেক্ষা করেনা। বয়ে যায়। ঊশ্রী যাবার পাঁচ ছদিন পর ছেলেটা এল। বেশ উঁচু লম্বা গায়ের রঙ ঈষৎ চাপা তবে তিক্ষ্ণ চোখ। বসার ঘরে কথা হল ছেলেটির সাথে। দেখা মাত্রই দুহাত তুলে নমস্কার জানাল বেশ কেতাদুরস্ত। বসতে বলল দেবপ্রিয়া।

-আমি দীপ্তার্ক সেন। ঊশ্রী আমাকে আপনার সাথে দেখা করতে বলেছিল। আমি কোলকাতায় এসেছি একটা বিশেষ কাজে। আজ এই বেলাটা অবসর আছে তাই এলাম।

-বেশ করেছো। আমাকে ফোন করেছিল মুনিয়া। তোমার পোস্টিং এখন কোথায়?

-কার্সিয়াং...

-বাহ্ সুন্দর জায়গা। মা বাবা কী তোমার সাথেই থাকেন?

-না মা বাবা থাকেন ব্যাঙ্গালোর। বাবা এখনো ইন সার্ভিস। মা প্রফেসার ওখানেই একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আছেন।

-বাহ্ খুব ভালো। 

ছেলেটি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দেবপ্রিয়া ওকে দেখতে থাকতে মন দিয়ে। এরমধ্যে ধলিদি চা, কুকিজ, কেক, কাজুবাদাম রেখে যায়। 'তুমি কিছু বলবে?' দেবপ্রিয়ার প্রশ্নে একটু চমকে ওঠে ছেলেটি। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলে, 'আমি ঠিক জানিনা কী ভাবে কথাটা বলা উচিৎ। আসলে ঊশ্রী আমায় সবটা শেয়ার করেছে। সবটা। গত কয়েক মাসে ওর জীবনের সবটুকু আমায় বলেছে। আপনাদের সকলকেই আমি চিনি ওর কথা থেকে। দেখুন ম্যাম বরুণ দত্তের বাড়িতে যাবার সাজেশনটাও আমার। এখন বিষয় হল ঊশ্রীর ধারণা হয়েছে আপনার এই একা থাকাটা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। মানে বরুণ দত্ত মরিয়া হয়ে কিছু একটা করতেই পারে। ম্যাম আপনি ঊশ্রীর কাছে আপাতত কেন যেতে চাইছেন না সেটাও আমি জানি। এখন বিষয় হল আমি পরশু কার্সিয়াং ফিরে যাচ্ছি। আপনাকে এভাবে একা রেখে যেতে চাইছি না।' দেবপ্রিয়া অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কে এই ছেলে? এত মায়া দিয়ে একথা বলছে কী করে? অধিকারটাই বা কী? ঊশ্রী ওর বিশেষ বন্ধু যদি হয় তাতেও কী এতটা উদ্বেগ স্বাভাবিক?

-আমায় ভুল বুঝবেন না ম্যাম। আসলে ঊশ্রী এত চিন্তিত থাকলে কাজ কিছুই করতে পারবে না। ইনফ্যাক্ট আমার মনে হয়েছে ও যে কোনো মুহূর্তে কাজ ছাড়তে পারে। রাতে তো ঘুমাচ্ছেই না। ওর রাত বাড়লে আতঙ্ক বাড়ছে।

-তোমায় বলেছে এসব ও?

-না ম্যাম বলেনি, তবে টেক্সট করেছে। আমি সকালে দেখেছি। আমি বলি কি আপনার তো নতুন লেখা শুরুর জন্য একটা চেঞ্জ দরকার চলুন না আমার সাথে। ভালো লাগলে ওখানে থেকে যান কয়েক মাস। প্রথমে আমার বাংলোয় উঠুন পরে নয় একটা ঘর ভাড়া করে নেবেন পছন্দ মতো। এতে মেয়েটা একটু স্বস্তি পায় এই আরকি।

-তুমি তো বেশিদিন ঊশ্রীকে চেনোনা দীপ্তার্ক। এতটা ওর জন্য ভাবছো কী করে?

-সন্তান গর্ভে আসা মাত্র মা তাকে ভালোবাসে, না দেখে না জেনে, দশমাস তাকে শুধু অনুভব করেই জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে গ্রহণ করে তবে একটা মানুষকে দেখে জেনে বুঝে সাতমাসে এটুকু ভালবাসা যায় না ম্যাম?

-কী সহজে বললে তুমি। তোমায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। বেশ আমি কাল তোমায় জানাচ্ছি। তুমি কখন ফ্রি হবে কাল?

-কাল ফ্রি হয়তো হব না তবে আমার লোক থাকবে আপনার এখানে।

-আমি যে ক্রমশ ভিআইপি হয়ে উঠছি।

-হওয়াই তো উচিৎ ছিল। এতদিন কেন হননি সেটাই ভাবছি। 


দীপ্তার্ক চলে গেলে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল দেবপ্রিয়া। একটা ফোন করল খানিক পর।

-কেমন আছো?

-ভালো আছি। তুমি?

-আমি বোধহয় এবার ভালো থাকব। তোমায় একটা কথা জানাতে ফোনটা করেছি।

-হ্যাঁ বলো।

-আমি কোলকাতা ছেড়ে যাচ্ছি অনুজ। একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি। দেখি জীবন নতুন কিছু শুরু করতে দেয় কিনা।

-কোথায় যাচ্ছ?

-সত্যি তুমি জানতে চাও? কিন্তু কেন?

-না ঠিক আছে না বললেও চলবে।

-আমি কার্সিয়াং যাচ্ছি। যে শহরে তুমি নিয়ে যাবে কথা দিয়েছিলে।

-অথচ কখনো নিয়ে যাইনি। ভালো থেকো। ঊশ্রীর কাজে মন বসছে তো? ফোন করলে ধরো।

সত্যিই যে কোনদিন সব ছেড়ে যাওয়া যেতে পারে দেবপ্রিয়া ভাবিনি। কেয়ারটেকার রনেন ছাড়া সবাইকে দুমাসের মাইনে সহ ছুটি দিয়ে দিল। চলে এল অচেনা এক ছেলের হাত ধরে কার্সিয়াং। ছোট্ট বাংলোর ডানদিকে দীপ্তার্ক থাকে বাঁয়ে দেবপ্রিয়া। বাংলোর চারিদিকে পাইনঘেরা উঁচুনীচু জমি। নাম না জানা ফুলের সমারোহ। একটা পাহাড়ের প্রায় মাথার কাছাকাছি বাংলো। সামনে দিয়ে বড় রাস্তা চলে গিয়েছে। ওপাড়ে যতদূর চোখ যায় উঁচু নীচু পাহাড় আর তার মাঝেমাঝে গ্রাম। রোজ ভিডিও কলে কথা হচ্ছে মেয়ের সাথে। মেয়ে আনন্দে আটখান। গতরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের কথা শুনেছে দেবপ্রিয়া।

-ম্যাডাম এবার নিশ্চিন্ত তো! আর কোনো হুকুম?

-ভাবছি ভেবে বলছি। 

-আমাকে নিয়ে কিছু ভাবলেন?

-হুম্! আমার মায়ের পাশে আপনাকে বেশ মানাচ্ছে। ফেসবুকের ছবি দেখে একটু পোড়া গন্ধ পেলাম নিজের দীর্ঘশ্বাসে। আসলে মহিলা এখনো বড্ড সুন্দরী।

-তা ঠিক তবে লেখিকার সাথে প্রেম করার মতো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আমার হয়নি ম্যাডাম। তাছাড়া উনি একটু বেশিইই সুন্দরী । আমার আরেকটু কম সুন্দরী পছন্দ।

-মানেটা কী? আমি সুন্দর না?

-না না সুন্দর তবে একটু কম।

-যাও কথা বলবো না। তুমি বাজে জঘন্য। 

-একটা কথা বলবো ম্যাডাম? একদিনের জন্য আসবো আপনার ওখানে? আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরেই পরের প্লেনে ফেরৎ আসবো, পারমিশান দেবেন এই জঘন্য লোকটাকে। বড্ড ছুঁতে ইচ্ছে করছে ঊশ্রী। তোমার ঘাড়ের কাছের লালচে তিল আর...

আর দাঁড়ায়নি দেবপ্রিয়া ঘরে চলে এসেছে। সারা শরীর জুড়ে ভীষণ অতৃপ্তি তাকে ভেতর থেকে নিংড়ে নিয়েছে বারবার। আজ ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে কেবল সে রাতের কথাগুলোই মনে পড়ছে। কোনো মানুষের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়ে বেঁচে থাকায় কী ভীষণ তৃপ্তি। কতদিন কতদিন হল সে বৃষ্টিভেজে না! পাহাড়ের যে বাঁকটায় ধাপে ধাপে চা বাগান শুরু হয়েছে। সেখানেই রোজ চুপ করে বসে থাকে। যতদূর চোখ যায় সবুজ মনোরম শোভা। এখানেই একসাথে থাকবে কথা ছিল দুজনে। তবু অনুজ কিসের টানে সব ছেড়ে চলে গেল কে জানে সে কথা? সবাইকে যে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসার মত যোগ্যতা হয়ত দেবপ্রিয়ার ছিলনা। আর ঐ যে এক কিশোর তাকে আজো বাঁচিয়ে রেখেছে তাকেই বা সে ভালোবাসতে পারেনি কেন? কে জানে এই উত্তর? জীবন বয়ে চলে নিজের ছন্দে। আকাশ জুড়ে মেঘ আসে আপন খেয়ালে। একা মানুষী মধ্য যৌবনে হেঁটে যায় এই আশায় শ্রাবণের ধারার মতো কারো ভালোবাসা অঝোরে ঝরবে তার কল্পনায়। সে প্রেম বাঁচিয়ে রাখবে সে অক্ষরে অক্ষরে। নিজের সবটুকু অতৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে। ভালো থাকুক অনুজ, ভালো থাকুক মরুণকিশোর। ভালো থাকুক ঊশ্রী ভালো থাকুক তার সদ্য প্রেম। দেবপ্রিয়া হেঁটে যায় পাহাড়ি পথের বাঁকে একা।






রবিবার, ১২ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                   


পর্ব -১২
সৌমী আচার্য্য

আদিত‍্য ভাবিয়াছিল যেকথা কহিয়া সে চন্দ্রনাথের বাড়ি হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে সম্ভবতঃ ইহারপর চন্দ্রনাথ আর কখনো সোহাগকে লইয়া তাহার অসূয়া ব্যঙ্গ বিদ্রুপে প্রকাশ করিবে না। যদিও তাহার বুকের ভিতর একটি সূক্ষ্ম ব্যথা জাগ্রত হইয়া আছে। চন্দ্রনাথকে সে হয়ত ভালোবাসে তাই কঠিন বাক্য বলিবার অভিপ্রায় হয়না। তবু চন্দ্রনাথ গৃহে আসিয়াই যখন চড়বড় করিয়া উঠিল, তাহার যথার্থই মনঃকষ্ট হইয়াছে। বাহিরের আকাশও তাই বুঝি গভীর কালো হইয়া উঠিয়াছে।

-তোমার পৌরুষত্ব সম্পর্কে আমি ভাবিত হইয়া পড়ি। যাহার বিবাহ তাহার হুঁশ নাই আর পাড়া পড়শির ঘুম নাই। যাহার স্ত্রী সে থম মারিয়া বসিয়া আছে আর তুমি কিনা পূর্ব নির্ধারিত কাজকম্ম ছাড়িয়া তাহার স্ত্রীকে লইয়া ডাক্তার বদ্দ‍্যি করিতেছ। অথচ তুমি জানিতে তোমায় ছাড়া আমি অসহায় হইয়া পড়িব বারাণসীতে।

-আমি আশ্চর্য হইতেছি চন্দ্রনাথ তোমার অনুভূতি নামক বস্তুটি সম্ভবত লোপ পাইয়াছে। কর্কট রোগ শুনিয়াও এত কঠিন বাক্য তুমি বলিতে পারিলে।

-দেখ আদিত্য আমি তোমাকে চিনি এহেন ঘটনায় বিচলিত হইবার পাত্র তুমি নও। বাহিরের ডাক উপেক্ষা করিয়াছ আসলে অন্য কাহারো প্ররোচনায়।

-তুমি কি সোহাগকে দোষারোপ করিতেছ? এই ভ্রমে থাকিও না যে সে আমারে কিছু কহিয়াছে। বস্তুত তাহার সহিত আমার বাক্যালাপ প্রায় বন্ধ। বিগত একমাসে সে আমার ঘরে নিজে হইতে আসে নাই পর্যন্ত।

-বাব্বা ইহা আবার সদর্পে ঘোষণা করিতেছ। ভালো।

-চন্দ্রনাথ আজ তোমারে একটি কথা স্পষ্ট জানাইতে সাধ হয়। তুমি আমার বন্ধু তবে আমার স্ত্রীকে উপহাস করা তোমার এক্তিয়ার নহে। এমনকি ঠাট্টা করিয়াও তুমি তাহাকে অসম্মান করিতে পারো না। তোমার স্ত্রীকে আমি বৌঠান বলিয়া সম্বোধন করি, তাহাকে উপযুক্ত সম্মান করিয়া থাকি। সুতরাং তুমিও এই শালিনতাটুকু বজায় রাখিবে এই আমার আশা।

-আমার স্ত্রী আমার বিষয়ে খবরদালালিটি কম করেন কিনা।

-চন্দ্রনাথ, সোহাগ আর দশটি স্ত্রীলোকের হইতে আলাদা বলিয়াই তাহাকে ছোট দেখাইতে চাহে কেহ কেহ। তাহাকে ঈর্ষা অথবা তাহার মতো স্ত্রী রত্ন না পাইবার জ্বালা হইতেই সম্ভবতঃ এই আচরণ, আমি তাহা বুঝি। সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করিতে চাহেনা। কেবল তাহার হৃদয় জুড়ে আমার অবস্হানটিকে সগর্বে ঘোষণা করিতে চাহে মাত্র। 

চন্দ্রনাথ ফোঁস করিয়া 'আচ্ছা' বলিয়া হাঁটা লাগাইল। আদিত্য ভারী বিব্রত হইয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল সত্যিই কি এত কিছু বলিবার প্রয়োজন ছিল।

-তুমি বলিতে পারিতে বারাণসীতে যাইবার কথা, আমি ঠিক সামালাইতে পারিতাম।

চমকে ওঠে আদিত্য। সোহাগ একটি রেকাবিতে সাদা নাড়ু, কুচো নিমকি আর খাস্তা কচুরী লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। মেঘরঙা শাড়ির সহিত ফিরোজা পাড় মায়া জন্মাইয়াছে চেহারায়। চোখের নীচে কালচে ছোপ গভীর হইয়া জাগিয়া আছে। আদিত্যকে রেকাবিটি আগাইয়া দিয়া কহিল, 'কহো নাই কেন?'

-বসো সোহাগ। বৌঠান কি ঘুমাইতেছেন?

-না জোর করিয়া ভাসুরঠাকুরকে উহার সম্মুখে বসাইয়া আসিয়াছি। কথা কহিতেছে।

-বাহ্, উত্তম।

-আপনি কহিলেন না।

অতি আবেগে সোহাগ আদিত্যকে আপনি সম্বোধন করিয়া থাকে। আদিত্য আপনি ডাকটি শুনিয়া মনে মনে আবেগতাড়িত হইয়া উঠিল। এ যেন পূর্বরাগের প্রকাশ।

-সোহাগ মানুষ কখনোই নিজের অন্তরকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করিতে সমর্থ হয়না। আজ তুমি নিজে হইতে কেন আসিয়াছ আমার ঘরে ইহা তুমিও জানো আমিও। আমি বারাণসীতে যদি যাইতাম তুমি আরো দূরে যাইতে।

সোহাগের চক্ষু হইতে টপটপ করিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, 'আজ আপনি চন্দ্রনাথবাবুকে যাহা কিছু বলিয়াছেন আমি শুনিয়াছি। তবু মনে হয় আমি নিজেকে সঠিক ভাবে ব্যক্ত করিতে পারি নাই। আর আপনিও সবটা বোঝেন নাই।'

-আমিও পারি নাই সোহাগ।

-আপনি আমাকেও কখনো দূরদেশে সাথে করিয়া লইয়া যাইবেন। আপনি কখনো কখনো কেবল আমার জন্য সব ছাড়িয়া সবাইকে ছাড়িয়া আসিবেন। ঐ ছাদের আলসেতে আমরা দূর আকাশের ছায়াছবি দেখিব এইসব আশা করিয়াছি।

-সোহাগ!

আদিত্য সোহাগকে জড়াইয়া ধরিতেই সে বুকের উপর আছড়াইয়া পড়িল। আদরে আদরে পরস্পরকে অস্হির করিয়া তুলিতেই, বাহিরে শ্রাবণের ধারা ঝরিয়া পড়িল।

-----–------------------------------------------------------

এই প্রথমবার লেখা শেষ হতেই ঊশ্রীকে পড়ে শোনাল দেবপ্রিয়া। মেয়ে চেয়ে আছে বাইরে। দেওয়াল ঘড়িটা টিকটিক করেই চলেছে। নীচে ড্রাইভারের ঘর থেকে হিন্দীগানের সুর ভেসে আসছে।

-মা! জীবনের গল্পগুলো এত সহজে মেলেনা কেন?














রবিবার, ৫ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                  


শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব-১১

মরুণকিশোর কোলকাতা বিমানবন্দরে নেমেই থমকে গেল। বয়সের সাথে মনটা আরো একটু বাড়লে বোধহয় ভালো হত। এসব কাজ তার ভালো লাগেনা। আশাভরা মুখগুলির দিকে তাকিয়ে নিজেই কেমন হেরে বসে থাকে তবু সিদ্ধান্ত জানতে হয়। প্রত্যাখ্যান চিরকাল তাকে  এমন এক সুরঙ্গে নিয়ে যায় যেখান থেকে পরিত্রাণের পথ তার জানা নেই। কেবল দমবন্ধ করা পরিস্হিতিতে সময়ের উপর নির্ভর করে হাল ছেড়ে দিতে হয়। সাইন্সসিটির বড় অডিটোরিয়ামে একঝাঁক তরুণ ছেলেমেয়ে জড়ো হয়েছে। সেখানে পৌঁছে হলে ঢুকে মরুণকিশোর ভীষণ সংকুচিত হয়ে উঠল। উদ্যোক্তারা ভালো ভালো কথা বলেছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের উদ্দ্যেশ্য কী।

-আমরা চাই তোমরা যারা নতুন প্রজন্ম তারা প্রত্যন্ত এলাকা চেনো জানো। তোমাদের মধ্যে সবাই যে হায়ার স্টাডি করবে তেমনটা নয়। অনেকেই আছে বিভিন্ন কারণে এখনি উপার্জন করতে চায় অথচ তাদের রেজাল্ট আউট স্ট্যাণ্ডিং। আমরা চাই জিওলজিক্যাল সার্ভের বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলো তোমরা ভালো করে বুঝে নাও। ঘাটশিলার কপার মাইনের কর্মকর্তারা আমাদের এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। তোমাদের মধ্যে থেকে দশজনকে নির্বাচন করবেন তারা। একবছরের কাজ শেষে তোমরা পেপারস্ জমা দেবে ওনারাই তোমাদের কাজের ভিত্তিতে তিনজনের হায়ার স্টাডিজের ব্যবস্থা করবেন বা স্হায়ী চাকরীর। এই একবছর তোমাদের গবেষণামূলক কাজটির জন্য ওনারা তোমাদের চারলক্ষ টাকা দেবেন। অর্থাৎ নিজে উপার্জন করবে এবং স্বনির্ভর হবে।

সারা হল হাততালিতে ফেটে পড়ল। আরো অসহায় হয়ে উঠল মরুণকিশোর। গোধূলিমাসির বাড়িতে গরমের ছুটিতে এসেছে সে। তার গল্প বেরিয়েছে নামকরা পত্রিকায়। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে বলল, 'পড়ে দেখো আমাদের পুরীর গল্প আছে।'  পড়তে গিয়ে হতবাক হয়, এক এমন পুরুষের সাথে দেখা হয় এক অষ্টাদশীর যার গ্রেস স্টাইল সব যেন চমকে দেবার মতো। অষ্টাদশী যে দেবপ্রিয়া তা বোঝা যায় সহজেই কিন্তু পুরুষটি মরুণকিশোর নয়। বুকের ভেতর যে কারিগর নরম হাতে ছবি আঁকছিল আচমকা দুরমুশের শখ জাগে তার বুক মুচড়ে ওঠে। কী বলবে সে ঠিক কী বলা উচিৎ তার? ক্যারিয়ার সবার আগে! মন প্রেম মানুষ স্মৃতি সব ব্যর্থ?

-আমি আসলে খুব বাজে বক্তা। প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্ক নামক বস্তুটা আমার কমজোরি। তবে যদি সত্যিই অন্তরের তাগিদ অনুভব করো তবেই এসো এগিয়ে। টাকা সব নয় বলেই আমার অনুমান।

এটুকু বলে আবার গুটিয়ে গিয়েছে নিজের ভেতর। ছবি ছাড়া প্রোফাইল ও কেন কাজটা করতে চায় স্টুডেন্ট সেটাই জানতে চাওয়া হয়েছিল। সবচে ভালো লাগা কাগজের মেয়েটির নামটি ঊশ্রী রায়। মেয়েটি আসতেই মরুণ চোখ নামিয়ে নিল। এমন চোখ দেখলেই সে ভয় পায়।

-লিখেছো কুশ্রী অতীত থেখে মুক্তি চাও আর মাকে নিয়ে কোলকাতা থেকে দূরে যেতে চাও তাই এইকাজ চাই। পড়াশোনা বা অর্থ তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়?

-না নয়। আমার যতটুকু চাহিদা ততটুকু আমার মা ভালো মতো মেটাতে পারেন। আর পড়াশোনা আমি যতদূর চাই উনিই করাতে পারেন।

-হুম্! বাবাকে নিয়ে যাবেনা সাথে।

-জানিনা আপনার এই প্রশ্ন কতটা জরুরি তবু বলছি আমার ঠিকঠাক বুদ্ধি হবার আগে থেকেই বাবা মা আলাদা। আর কিছু জানতে চান?

-হ্যাঁ চাই। তুমি যদি কাজটা পাও কাকে জানাবে আগে?

-দিদামাকে।

মরুণ বলে, 'ওনাকে ফোন করো'। মেয়েটা ম্লান হাসে, 'ওখানে ফোন নেই।'

-কোথায়?

-স্বর্গে।

মরুণ তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিতেই মেয়েটি বলে, 'আর কিছু প্রশ্ন করবেন? নাহলে আমি যাব। মা আজকাল টেনশান করেন।'

-কী করেন তোমার মা?

-আমার মা লেখিকা। যদিও আরো অনেক কিছুই হতে পারতেন।

-তুমি তোমার মাকে খুবই ভালোবাসো মনে হচ্ছে।

-উনি ভালোবাসার মতোই। তাহলে আমি উঠি স‍্যার।

-হ‍্যাঁ এসো। এপয়েন্টমেন্ট লেটার পৌঁছে যাবে ঠিক সময়ে।

ঝলমল করে ওঠে মেয়েটা তবে আশ্চর্য সংযত। ওর চোখের ভেতর ছায়া জেগে আছে যার তাকে দেখার সাধটা নিষিদ্ধ বলে দেগে দিয়েছে সময়। মেয়েটা অপ্রস্তুত হচ্ছে হয়ত তাকে লম্পট ভাবছে। মরুণকিশোর চোখ নামিয়ে নেয়। ঊশ্রী যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়।

-স্যার আপনি কৈশোরে পুরীর মন্দিরে কী কিছু খুঁজতে গিয়েছিলেন?

চমকে ওঠে মরুণ। উঠে দাঁড়ায় চেয়ার থেকে। ঊশ্রী আলতো হেসে বলে, 'মাস তিনেক আগে মা সমুদ্রের পাড়ে বসে আপনার কথা বলেছিলেন এমন অদ্ভুত নাম খুব বেশি মানুষের হবেনা বলেই আমার মনে হয়েছিল তাই একটা চান্স নিলাম। স্যার আসবেন আমাদের বাড়ি সময় পেলে মা আপনাকে দেখলে খুশি হবেন। চলি স্যার।

-শোনো ঊশ্রী তোমার মায়ের নাম...

-অবিশ্বাস্য লাগছে আপনার তাইনা! আমারো লেগেছিল এখানে এসে আপনার নাম জেনে।তবে এটাই সত্যি আমার মায়ের নাম দেবপ্রিয়া।

পায়ের নীচের মাটিটা দুলে ওঠে। ঊশ্রী বেরিয়ে যেতেই হেরে যাওয়া মরুণকিশোর মনে মনে পলাশগাছ জড়িয়ে ধরে সর্ব শক্তি দিয়ে। যতগুলো দিন যতগুলো রাত কেবল তার সাথেই পথ হেঁটেছে সে মনে মনে, সেই ক্রমশ ছোট হতে হতে বিন্দু হয়ে যাচ্ছে অথচ গোধূলিমাসিদের ছাদের পাঁচিলঘেঁষে যেখানে বকুল গাছটা আলসেমি করে জাঁকিয়ে বসেছিল, সেখানেই বলেছিল দেবপ্রিয়া, 'তোমার সাথে থাকলে মনে হয় বৃন্দাবনের পথে পথে কী যেন এক কান্না ভেজা  সময় খুঁজে চলেছি। এই বকুলফুলের গন্ধে ভেতরে ভেতরে রাধা হয়ে উঠছি। অথবা রাজস্হানের এক মেয়ে যে গিরিধারীর প্রেমে বিভোর সে বুঝি আমায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমার খুব কষ্ট হয় আবার আমার খুব ভালো লাগে। কী করবো বুঝি পাইনা কেবল ছুটে ছুটে গোধূলিমাসির বাড়ি আসি। তুমি মনে মনে আমায় পাগল ভাবছ তাই না?' মরুণ সরমে মরে যায়। এমন মাধুকরীর সঙ্গী হবে বলেই সে যে  পাল তুলে রেখেছে। পাগল হতেই তো চায়। পাগল ভাববার অবকাশ যে তার নেই। 

-আজ থেকে বহু বছর পর আবার যখন দেখা হবে, তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, আমিও। সেদিনো তোমাকে দেখলেই আমি বকুলের ঘ্রাণ পাবো মরুণ। কাকে খুঁজছিলে পুরীর মন্দিরে বলো না?

কিছুতেই এই সহজ উত্তরটা দেওয়া হয়না। বুড়ো হলে দেখা হবে কেন? কেন জীবনের আগত সময় তাকে ছাড়া কাটবে এই ধাঁধাঁ কিছুতেই কাটাতে পারেনা মরুণ। আজো পারেনি। প্লেনটা মেঘের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কোলকাতাকে আবছা করে দিচ্ছে ক্রমশ।



(ক্রমশঃ) 










রবিবার, ২৯ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 


শ্রাবণের ধারার মত
সৌমী আচার্য্য

পর্ব-১০

বিন্দুবালা সোহাগের আচরণ কোনদিনই সঠিক ভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই। কিছুদিন পূর্বে তাহার স্বামী যে সোহাগকে নিয়া মাত্রা ছাড়াইয়া দুর্বল হইয়া পড়িতেছে একথা সে বিলক্ষণ বুঝিতে পারিয়াছিল। প্রথমাবস্হায় সোহাগ তাহাকে ঘিরিয়া বেতসলতার মতো বাড়িয়া উঠিতেছিল কিন্তু অকস্মাৎ তাহার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসিয়া পড়িল বিন্দু। তাহার ভালোবাসা দুর্নিবার। বুকের ভেতর চাপিয়া ধরিয়া যখন সে ঠোঁট ছোঁয়াইয়া কাঁদে বিন্দু আশ্চর্য সুখে হতভম্ব হইয়া যায়। কিছুদিন পূর্বে আদিত্য আকস্মিক ভাবে ঘরের অভ্যন্তরে ঢুকিয়া যাহা দেখিয়াছে আর যাহা বুঝিয়াছে সবটাই সত্য নয়। গতবছর বিন্দুবালার তিন নম্বর বাচ্চাটাও গর্ভেই মারা যাওয়ার পর বামস্তনের একাংশ কচড়া ধরিয়া ফোঁড়ার মতো ফুলিয়া উঠিয়াছে। প্রায় রাতে কম্প দিয়া জ্বর আসে। ক্রমশ সে ক্ষীণকায়া হইয়া উঠিতেছে। সোহাগকে বলিতেই সে যারপরনাই উদ্বেগে তৎক্ষনাৎ দেখিবার জন্য উদ্বিগ্ন হইয়াছে। ভয়ে বিস্ময়ে সে যখন বেড়ে ওঠা মাংসপিণ্ডে স্নেহের পরশ বুলাইতেছিল। অকস্মাৎ দরজা খুলিয়া  আদিত্য ঘরে প্রবেশ করে। দরজাটি সোহাগ কেন ভেজাইয়া রাখিয়াছিল ইহা জানা দুঃসাধ্য। তবে বিন্দুবালা অনুমান করিতে পারে আদিত্যকে আঘাত করিবার দুর্দমনীয় প্রচেষ্টা সোহাগ ক্রমাগত করিতেছে। আজ মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় সোহাগের রূপ ছিল শান্ত। শাশুড়িমা সোহাগকে অধিক স্নেহ করেন একথা সকলেই জানে। আজ তিনি সকলের সামনেই আদিত্যকে তিরস্কার করিয়াছেন।

-এমন লক্ষ্মীমন্ত বউ ঘরে ফেলে তোমার যে কেন বাইরের এত সাধ সে আমি বুজিনা বাপু। এবার ঘরে থিতু হও। জমিদারী কাজকম্ম বুজতে শেখো।

সোহাগ মৃদু স্বরে কহিয়াছে, 'বাহিরের জগতের আনন্দ আপনি আমি কী জানিতে পারি মা! আমার ভুল ভাঙিয়াছে। ওনাকে আটকাইবার মতো ভুল আর করিবনা। উনি মুক্ত। বাহিরে উনি আনন্দ খুঁজিয়া লইবেন আমি গৃহেই আনন্দ খুঁজিয়া লইব।' সোহাগের কথায় উপস্হিত সকলেই চমকিত। আদিত্যকে বিন্দুমাত্র যে চোখের আড়াল করিতে পারেনা তাহার মুখে এই কথা বিশ্বাস করিতে সংকোচ হয়। অপরাহ্নে গা ধুইয়া ভালো শাড়ি পরিয়া বিন্দুবালা নিজেকে আয়নায় দেখিতেছিল। স্বামী সোহাগ বিহীন জীবন বুঝি হাজার প্রচেষ্টাতেও সুন্দর হইয়া ওঠেনা। দাসী আসিয়া কহিল, 'ছোটোবউ তোমারে ডাকতেছে ছাতে।' বিন্দুর অত সাহস নাই যে সেই ডাক উপেক্ষা করিবে। সিঁড়িতে দুপা উঠিতেই আদিত্য তাহাকে ডাকিল।

-বৌঠান, সোহাগ কোথায়?

-ছাতে, সেখানেই আমাকে ডাকিয়াছে।

-বৌঠান আপনি নীচেই থাকুন আমি উপরে যাইতেছি।

বিন্দু ইতস্ততঃ করিতে লাগিল, 'কিন্তু না যাইলে সোহাগ রাগ করিবে।' ভুরু কুঁচকাইয়া আদিত্য বলিল, 'কিঞ্চিৎ লজ্জা সরম রাখলেন না বৌঠান ছিঃ। দাদা সব জানিয়া চুপ করিয়া রহিয়াছেন বলিয়া আমিও চুপ করিব এতখানি কাপুরুষ নই। আপনি নীচেই যান। আমি যাইতেছি উপরে।' বিন্দু এ রাগের কারণ বুঝিতে না পারিয়া ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। আদিত্য ছাদে গিয়া সুসজ্জিতা সোহাগকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। এই অপরূপ সাজ কিসের নিমিত্ত? যে রত্ন জীবনে পাওয়া হইয়াছিল তাহা বুঝি হারাইয়া ফেলিল সে। মৃদু স্বরে ডাকিল, 'সোহাগ।' সোহাগ গভীর ভাবনায় ডুবিয়াছিল যেন।

-ও তুমি!

-তুমি অন্য কাহকেও চাহিয়াছিলে।

-বিন্দুবালাকে ডাকিয়াছি। তাহার সহিত কিছু একান্ত আলাপ আছে।

-সোহাগ তুমি কি আমাকে যন্ত্রণা দিবার কারণে এইসব করিতেছ? বৌঠানকে নাম ধরিয়া ডাকিতেছ?

-তুমি সত্যিই জানো যন্ত্রণা কী? শোনো যে কোন কারণেই যে আমাকে ছাড়িয়া দিনের পর দিন অন্যত্র আনন্দ খুঁজিয়া পায় সে আমার কেহ নয়। যে আমার সুখে দুখে ছোটছোট রাগ অভিমানে পাশে থাকে সেই আমার সব। তুমি বোধকরি এইসব বুঝিবে না। উদার প্রকৃতি, মুক্ত পিছুটানহীন জীবন তোমায় অনেক বেশি আনন্দ দেয়। তবে এই মুহুর্তে আমার তোমার সহিত সময় নষ্ট করিতে ইচ্ছা নাই।

-এতখানি কঠিন হইতে তোমার বাধিল না? এত সহজেই বলিয়া ফেলিলে আমার অপেক্ষা বৌঠান তোমার অধিক আপনার?

-তোমায় একটা কথা বলি, দিদির বড়ো অসুখ, আমার সীমিত জ্ঞান বলিতেছে তাকে এইক্ষণে বড় ডাক্তার দেখানো আবশ্যক। আর শোনো দিদিকে বুকে জড়াইয়া যে সুখ পাইয়াছি সে সুখ তুমি কোনদিন দিতে পারিবে না। সে সুখ আশ্রয় দিবার। তুমি আমার কাছে আসিলে একটি মুখ ভাসিয়া ওঠে যাহার নিকট আমি হারিয়াছি। এই সত্য আমার। তোমার কোনো দায় নাই। তুমি চাহিলে আমায় ত্যাগ করিতে পারো।

আদিত্য সবটুকু শুনিয়া বলিল, 'সব কথার উত্তর সময় দিবে সোহাগ। আমি এখন আসি ডাক্তারের খোঁজ করি।'

রবিবার, ২২ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                 


পর্ব-৯


দেবপ্রিয়া ফোনটা কেটে খানিক সময় চুপ করে  চেয়ে রইল সমুদ্রের দিকে। সূর্য মধ্যগগনে। ঊশ্রী একা বসে রয়েছে হ্যামকে। কী ভাবছে কে জানে? ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে কাঁপা হাতে নম্বরটা ডায়াল করল।

-আমি দুঃখিত, উত্তেজনার বশে ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। আমি আজই কোলকাতায় ফিরে যাচ্ছি কিন্তু ঘটনাটার যে এখানেই শেষ এমন তো কোনো কথা নেই অনুজ।

-হ্যাঁ সেই গ্যারান্টি নেই বিশেষ করে তোমরা যখন একবার ওদের নজরে এসেছ তখন...আচ্ছা ঊশ্রীর এবার কোন ইয়ার?

-কেন বলোতো?

-ভাবছিলাম তোমরা যদি আমার এখানে আসো  মেয়ের সাবজেক্ট তো জিওগ্রাফি তাই না?

-এ খবর তুমি জানো? হ্যাঁ ওর এবছর বিএসসি ফাইনাল ইয়ার কিন্তু তোমার ওখানে যাবার প্রশ্ন উঠছে কেন?

-দেখ প্রিয়া আমার মনে হয় তুমি একা সবটা সামলে উঠতে পারবেনা তাছাড়া এখানে আমার অন্তত পাঁচ বছরের প্রজেক্ট। ততদিনে মেয়ের একটা চাকরীবাকরি হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় এই আরকি। আর শোন আপাতত বেশি ঘাবড়িও না, আমি ফোন করে দিয়েছি।

-কোথায়?

-যেখানে ফোন করলে কাজ হবে। হয়ত দেখতে পাবে দুজন ফলো করছে। দরকারে ওরা যোগাযোগ করে নেবে। ঘাবড়িও না। প্রয়োজনে ফোন করো। আর চিন্তাভাবনাটা মাথায় রাখো প্লিজ। অন্য কোনো ইস্যু নয় প্রিয়া তোমাদের সুরক্ষাটাই এখন আমার একমাত্র চিন্তা।

-এতদিন তো ভাবোনি অনুজ। আজো নাই ভাবলে। আমরা মা মেয়েতে ঠিক সব সামলে নেবো। আমি কোলকাতা ছাড়ব না অনুজ।

-প্রিয়া, এমন পরিস্হিতিও তো এতদিন হয়নি। প্লিজ।

ফোনটা রাখার পরে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। যে মানুষটা একদিন তার ছিল কেবল আজ ষোলাটা বছর তাকে ছাড়াই কেটে গেল। জীবন কত কী যে দেখায়। বাইরে মেঘ করেছে। ঊশ্রীর তাতে যেন কিছু যায় আসে না। নির্বিকার ভাবে বসে রয়েছে। দেবপ্রিয়া গিয়ে দাঁড়াতেই জলভরা চোখে তাকাল।

-কেন ফোন করেছে লোকটা?

-তুই কথা না বলে ফোনটা কেটেছিস কেন? আর লোকটা আবার কী? 

-আমার কাছে তার আর কোনো পরিচয় আছে কি? সারা দেশের মানুষের জন্য তার ভাবনা কেবল আমি তুমি ছাড়া।

-তুই কি ওর খবর রাখিস নাকি?

-হ্যাঁ রাখি। কেন তুমি আপত্তি করবে?

-মোটেই না। তোমার বাবার সাথে তুমি সম্পর্ক রাখলেও আমার কিছু যায় আসবে না মুনিয়া। 

-সম্পর্ক না মা। আমার কেবল একটাই রাগ আজ বাবা থাকলে বরুণ দত্ত কি আমাদের সাথে ঘটনাটা ঘটাতে পারত?

-হয়তো না, তবে ঘটনাটার জন্য তোমার কি কোনো দায়িত্ব নেই মুনিয়া।

-আছে মা, প্রথমে ও আমার কাছে ফাদার ফিগারই ছিল কিন্তু আমার দিকে ওর তাকিয়ে থাকা, আমাকে স্পেশাল ফিল করানো, তোমার অনুপস্হিতিতে একান্তে আমায় ছুঁয়ে যাওয়া আমার মনে আশ্চর্য শিহরণ জাগিয়েছিল। বোধহয় আমার তোমাকে বলা উচিৎ ছিল কিন্তু আমার সত্যি খুব ভালো লাগত। 

-তুমি চুপ করো মুনিয়া আমি শুনতে চাইনা।

-তুমি কখনোই চাওনি মা শুনতে। যতটা ভেবেছ তোমার চরিত্রদের নিয়ে ততটা আমায় নিয়ে ভাবোনি। তাহলে দেখতে পেতে তোমার পনেরো বছরের মেয়ের গায়ে লাভ বাইটের চিহ্ন ছিল।

-শাট আপ প্লিজ। 

-প্রথম দিদামা দেখেছিল, বুঝেওছিল। তাই কাছ ছাড়া করতো না আমায় কিন্তু দু'বছর বাদে দিদামা চলে যাওয়ার পর তুমি আরো ডুবে গেলে নিজের ভেতর আর আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ঠিক তখন বরুণ দত্ত আবার আমাকে গিলে নিল। আমায় না দেখে সে নাকি থাকতেই পারছেনা তাই ছবি তুলে নিল আমার। এমন ছবি যা তোলার সময় আমার আয়নাও লজ্জা পেয়েছে।

যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে গেল দেবপ্রিয়া। ঊশ্রীর হাতদুটো জড়িয়ে হ্যামকের কাছে বালিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, 'মুনিয়া আমি যে আর পারছি না।'

-আমিও পারিনি মা যখন দেখলাম আমার গোপন ছবি তোমায় দেখিয়ে আসলে বরুণ দত্ত তোমায় ভোগ করতে চাইছে। সেদিন আমি দুভাবে হেরেছি মা। আর ভীষণ ভীষণ রাগ হয়েছে বাবার উপর। বাবা থাকলে আমি কাউকে ফাদার ফিগার করতে চাইতাম না আর না তো কেউ আমাদের এভাবে ভোগ্যপণ্য ভাবত মা।

মায়ের কোমড় জড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে ঊশ্রী। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি আসে। শ্রাবণের ধারায় ভিজতে থাকে দুই অসম বয়েসী নারী। যাদের দুজনের তীব্র অভিমান অনুজের উপর আর ভয়ংকর রাগ বরুণের প্রতি।



(ক্রমশঃ)

রবিবার, ১৫ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                      



শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব-৮

সমুদ্রের নোনা হাওয়া চিটেচিটে জল নিয়ে ঝাপটা দিচ্ছে মুখে, চুল এলোমেলো হয়ে চরম বিভ্রাটে ফেলছে দুজনকেই। চোখ পিটপিটে হয়ে যাচ্ছে লক্ষ‍্য করে দুজনেই মৃদু হাসল। সমুদ্রের দিকে পিছন ঘুরে বসতেই প্রথম মেঘের গুরুম্ গুরুম্ আওয়াজ শোনা গেল।মেয়েটি নিজের বিনুনিতে আঙুল জড়িয়ে বলল, 'অকারণ সুখে বুকের ভেতর এমন করেই মেঘ ডাকে তাইনা?' 

-হ্যাঁ, খানিকটা তেমনি। তবে কারো মায়াভেজা চোখ দেখলেও এমনটাই হয়।

-মায়া ভেজা চোখ! সে কেমন জানিনা, তবে তোমার চোখের দিকে তাকাতে ভালো লাগে। কী ভীষণ নিষ্পাপ। তুমি লজ্জা পেলে? আমি সত‍্যি বলছি।

-যদি ভুল না বোঝ একটা অনুমতি চাইব?

-তোমায় ভুল বুঝব? অসম্ভব! বলো কিসের অনুমতি?

-একবার তোমার মাথার গন্ধ নিতে পারি?

-মাথার গন্ধ!

-না মানে তোমার চুলের।

খিলখিল করে হেসে মেয়েটি দুটো বিনুনি খুলে ফেলে। সমুদ্রের প্রবল হাওয়ায় রাশিরাশি নরম রেশমের মতো মেঘ চোখমুখ আবৃত করতেই দমবন্ধ হয়ে যাবার তীব্র অনুভবে উঠে বসে মরুণকিশোর। পাশে মিষ্টি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বিছানা থেকে নেমে বাইরে এসে একফালি বারান্দার বেতের চেয়ারে চুপ করে বসে মরুণকিশোর। যা কিছু শেষ পর্যন্ত পাওয়া হয় না, তার আকর্ষণ বা মোহ বোধহয় চিরকাল বিভ্রান্ত করে রাখে। ঘরের ভিতর যে নারী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তাকে সে গ্রহণ করতে পারল না কেন? বন্ধু চীরঞ্জীব তাকে মুখ খারাপ করে বলেছিল, 'চুপ কর শালা ন্যাকা। নিজের বউকে উপোসী রাখিস ভাবের ঘোরে! থাম শালা! আসলে শালা তুই নিমুরাইদ্যা। মিষ্টি যদি আমায় দাদা বলে রাখী না পরাত, তাহলে আমিই শালা...। তোকে না জ্যান্ত কবর দেওয়া উচিৎ।' মরুণকিশোর নিজের বুকের উপর হাত বোলাতে থাকে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায় মায়াচোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, 'কী খুঁজছ তুমি মরুণ?' ভীষণ বলতে ইচ্ছে করে 'তোমায় খুঁজছি, সেই কবে থেকে।'

"কি লাগিয়া ডাকরে বাঁশি আর কিবা চাও।
বাকি আছে প্রাণ আমার তাহা লইয়া যাও।"

গানের মৃদু সুরে মিষ্টির ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় বসে চাঁদের আলোয় প্রেতের মতো বসে থাকা মানুষটার জন্য বুক হুহু করে ওঠে। খুব জানতে ইচ্ছে করে এমন মানুষকে কোন মেয়ে ফিরিয়েছিল? তার চোখ চোখ রেখে প্রশ্ন করবে মিষ্টি, 'আমার বরকে হয় ফেরৎ নাও নয় ফেরৎ দাও।' বেয়ারা চোখের জল ঘর বারান্দা ভাসাতে থাকে সঙ্গে কাঁদে চণ্ডীদাস।

-------------------------------------------------------------

আদিত্য পাগল হইয়া উঠিয়াছে অপরদিকে সোহাগ অনড়। এতবড় অনাচার আর কাহাকেও বলিবার মতো শক্তি সে অর্জন করিতে পারে নাই। স্ত্রীর উপর শারীরিক জুলুম করিতেও তাহার রুচিতে বাধে। দাদার সহিত বাক্যালাপে সে কোন পথ দেখিতে পায় নাই বরং সৌমাদিত্য যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছে কিছু। তার অন্যমনস্কতা দিশাহীন নৌকার পাল তুলিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে। 'কেহ বোধকরি ডাকিল আমায়।' আকস্মিক এমন কিছু বাক্য বলিয়া চলিয়া গিয়াছে আদিত্যর সম্মুখ হইতে।'  তবে কি দাদা সকলি জানেন? আজ সে আসিয়াছে মায়ের ঘরে। মেঝেতে মায়ের পার্শ্বে বসিবামাত্র তিনি বলিয়া উঠিলেন, 'এইবার কতদিনের জন্যে এয়েচ। এয়েচ কেন? টাকার দরকার? চুপ করে রয়েচ যে!'

-মা সোহাগ!

-শোনো বাপু গরীব ঘরের মা মরা মেয়ে সে, তাকে যদি আজ তোমার আর মনে না ধরে তুমি আবার বে করতে পারো কিন্তু এবাড়িতে তার ভাগ এতটুকু কমবে না এ আমি বলে দিচ্চি। এখন যাও নিজের ঘরে যাও।

-না!মা! তাহা নহে আমি জানিতে চাহিতেছি সোহাগের আচার আচরণ কী রূপ!

-দেকো বাছা, আমি শুদু এটুকু জানি সে তোমার চেয়ে দশগুণ ভালো। সংসার ধর্ম নিয়ে সকলের সাথে মিলেমিশে সে ভালো আচে।

-এর চাহিতে অধিক কিছুই আপনি দেখেন নাই!

-আমি ঠিক ততটুকুই দেকেচি যাতে আমার পরিবার সঠিক থাকে।

-না, আপনি দেখেন নাই। আর আপনার পরিবার সঠিক নাই।

এই বলিয়া আদিত্য প্রস্থান করিতেই যমুনাবতী চিন্তিত হইয়া উঠিল। কী ইঙ্গিত দিয়া গেল সে? তবে কী সোহাগের সহিত সৌমাদিত্যের ঘনিষ্টতা বাড়িয়াছে? তবে যে বড়বউ কহিয়াছিল ছোটবউ  সৌমাদিত্য কে দূর দূর করিয়া খেদাইয়াছে। আদিত্য কি নতুন কিছু দেখিয়াছে? 

আদিত্য বেগে ঘরে প্রবেশ করিয়া সোহাগকে দেখিয়া খানিক বিহ্বল হইয়া গেল। সোহাগ তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিল না। গলা ঝাড়িয়া কহিল, 'আমি বাড়ি ছাড়িয়া যাইতেছি, এরূপে বসবাস করা আমার দ্বারা অসম্ভব।' ভারী নরম করিয়া সোহাগ বলিল, 'বাড়ি ছাড়িবার কারণটি যদি আমি হই, তাহা হইলে তুমি অবলীলায় বলিতে পার, আমি চলিয়া যাইব। আর যদি কারণটি চন্দ্রনাথবাবু তবে আর বিলম্ব করিও না এখনি যাত্রা করো।' আদিত্য সোহাগের কাছে আসিয়া হাত ধরিয়া বলিল, 'কেবল উহার সহিত ভ্রমণে গিয়াছি বলিয়া তুমি এতখানি সর্বনাশ করিতে পারিলে সোহাগ? আমার ভালোবাসা ভালোবাসা রহিলনা কেবল কিছুদিনের নিমিত্ত মুক্তি চাহিয়াছি বলিয়া!' সোহাগ রঙ্গ করিয়া বলিল, 'একটি নারী শরীরের মাঝে আনন্দ পাইয়াছি বলিয়া আমার ভালোবাসা ভালোবাসা রহিল না নাথ! অন্য পুরুষ শরীর তো কামনা করি নাই।' আদিত্য থরথর করিয়া কাঁপিয়া বসিয়া পড়িল। সোহাগ উন্মাদের মতো উচ্চস্বরে হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল খাটের উপর।






রবিবার, ৮ মে, ২০২২

শ্যামলী আচার্য

                        



মৃত্যু অথবা  ( সপ্তম পর্ব)

 
ল্যান্সডাউনের বাড়িটি বাইরে থেকে এখনও সেই পুরনো ঐতিহ্য আঁকড়ে রয়েছে। ভিতরে ঢুকলে আধুনিকতা চোখে পড়ে। তবে, সে ভারি মানানসই। এখনও লাল সিমেন্টের মেঝে, ঝুলবারান্দার জাফরি-কাটা রেলিং আর খড়খড়ি দেওয়া জানলায় খসখসের পর্দা দেখে অবাক হল রাণা। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে পকেটে রেকর্ডার নিয়ে অল-ইন-ওয়ান হয়ে রাণা ঢুকে পড়ল ডাক্তার রায়চৌধুরীর বাড়িতে।  
সকাল সাড়ে আটটা। আগে বিতান কথা বলবেন। তারপর তাঁর বাবার কাছে যাওয়া হবে। তিনি শারীরিকভাবে কেমন অবস্থায় আছেন, সেই বুঝে রেকর্ডিং। রাণা ঘড়ি দেখল একবার।
কিরণমালা আসতে চায়নি প্রথমে। কিন্তু দীপুর অনুপস্থিতিতে একটু সমস্যা হবে জানিয়েছিল রাণা।  
“তুমি প্রোফেশনাল প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর, তোমার কোনও ফুলটাইম অ্যাসিস্ট্যান্ট নেই? আমি ওখানে গিয়ে কী করব?” কিরণমালার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু রাণা কথার মোড় ঘুরিয়ে দিল। 
“আমি আপনাকে চাইছি অন্য কারণে। আপনি আপনার মায়ের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ করছেন, আর যিনি ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন, তাঁর মুখোমুখি একবার দাঁড়াবেন না? যদিও বিতানবাবু ইরাবতী সান্যালের তেমন ক্লোজ ছিলেন না বলেই দাবি করছিলেন, কিন্তু... আচ্ছা, আপনার মায়ের মৃত্যুসংবাদ আপনাকে কে প্রথম জানান?” রাণার কথায় ফোনের ওপ্রান্তে কিছুক্ষণ নীরবতা। কিরণমালা নিজেই নীরবতা ভেঙে বলে, “বিতানদার ফোনে জানতে পারি। আচ্ছা বেশ, আমি আসব।” তারপর চট করে ফোন কেটে দেয়।      
বিতান রায়চৌধুরী ঝকঝকে ফিটফাট চেহারায় নেমে আসেন ড্রয়িং রুমে। হালকা পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে যায় ঘরে।  
“আপনি একা?” প্রশ্ন করেই বিতান সামলে নেন নিজেকে। 
“হ্যাঁ, মানে, শুধু তো কিছু প্রশ্ন উত্তর, ক্যামেরা অন করে কথা বলব, বেশিক্ষণ লাগবে না।” 
বিতান বলেন, “বেশ বলুন।” 
রাণা ঘড়ি দেখে একবার। কিরণমালা আসেনি এখনও। কিন্তু আর সময় নষ্ট করা যাবে না। 
একেবারেই নীরস রুটিন কথা হল কিছু। একজন সাহিত্যিকের জীবন প্রসঙ্গে তথ্যচিত্রে সেসব কথা থাকার কোনও মানেই হয় না। ইরাবতী সান্যাল অত্যন্ত গম্ভীর, চুপচাপ প্রকৃতির মানুষ। বরাবর নিজের জগতে থাকতেন। একটা দীর্ঘ সময় অবধি তিনি ডাক্তার বিশ্বেশ্বর রায়চৌধুরীর কাছে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। বিতান শুনেছেন, ইরাবতী এই বাড়িতে বিয়ের আগেও আসতেন। ইরাবতীর সঙ্গে বিশ্বেশ্বরের পরিবারের যথেষ্ট অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। দুজনের মধ্যে বইপত্রের আদান-প্রদান হত। ইরাবতীর দাদু কবিরাজি করতেন বলে বিশ্বেশ্বর ঠাট্টা করে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘কবিরাজি’। লেখার জগতে ব্যস্ত হবার পর ইরাবতীর যাতায়াত কমে যায়। গত বছর দেড়-দুয়েক তো একেবারেই যোগাযোগ ছিল না। বিতান বরং অনেকবার বললেন কিংশুক রায়ের কথা। কিংশুক রায়ের সঙ্গে পার্টনারশিপে তাঁর একটি নতুন নার্সিংহোমের কাজের কথাও বললেন। সেই কাজ নিয়ে অনেক বেশি উত্তেজিত তিনি।   
    রাণা হঠাৎ জিগ্যেস করে, “আচ্ছা বিশ্বেশ্ববাবু কোন সময়ে বহরমপুরে ছিলেন?” 
বিতান হাঁ করে তাকায়। “বহরমপুর? বাবা কলকাতার বাইরে তো অন্য কোথাও প্র্যাকটিস করতেন না! কেন বলুন তো?”
“না এমনিই।” রাণা আর বাড়তি প্রশ্ন করল না কিছু। কিরণমালা কথা দিয়েও সময়মতো না আসায় মেজাজ খিঁচড়ে আছে। 
যথাসম্ভব হাসিমুখে পুরোটা শেষ করে বলল, “আপনার বাবার কাছে একবার যেতেই হবে। কথা না-ই বা বললেন... একটা রিসেন্ট ছবি অন্ততঃ...” 
“নো প্রবলেম অ্যাট অল। আমি বাবার অ্যাটেনডেন্টকে বলে দিচ্ছি। আপনি ফরচুনেট এনাফ, বাবা আজ একটু ফিট। দেখুন, যদি কথা বলাতে পারেন। বাবা তো ওনাকে খুবই পছন্দ করতেন... তবে মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হয়নি। দিয়ে কী লাভ? মনখারাপ করবেন, হয়ত সবটা বুঝতেও পারবেন না...” বিতানের কথা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে কিরণমালা। 
“এক্সট্রিমলি স্যরি...”, কিরণমালার কথায় রাণা কিছু বলার আগেই বিতান একটু বেশিই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যেন।
“কেমন আছ মালা? স্যরি, আমার তাড়া আছে একটু। এক কাজ করা যাক, মালা, তুমি যখন এসেই পড়েছ প্লিজ তুমিই ওঁকে গাইড করে নিয়ে যাও বাবার কাছে... কার্তিকদা, মীনুদি সবাইকে বলা আছে। আই হোপ, তোমার আমাদের বাড়ির ভেতরের ঘরগুলো সব মনে আছে...।”  
বিতানের দিকে তাকিয়ে কিরণমালা বলে, “ইটস ওকে, উই ক্যান ম্যানেজ... রাণা আমার একটু দেরি হয়ে গেল। তোমার কাজ হয়েছে তো?”  
রাণা হাসে। 
বিতান একটু তাড়াহুড়ো করে, “আমি তাহলে... মালা, বাবা তোমাকে চিনতে পারবেন কিনা আই ডাউট... দেখো গিয়ে। বহুকাল পরে এলে... আচ্ছা বাই। সী ইউ”, বলতে বলতেই যেন একটু দ্রুতই বেরিয়ে যায়। 
কিরণমালা রাণার দিকে তাকিয়ে বলে, “এই বাড়িটা কাজের লোকেদের কন্ট্রোলে। জেঠিমা মারা যাওয়ার পর থেকেই... কার্তিকদা, মিনুদি সকলেই আমাকে ছোটবেলা থেকেই চেনে। চলো, আমরা দোতলায় যাই। জেঠুর ঘরে।”    
বিশ্বেশ্বর রায়চৌধুরী জানলার দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন। সব কথার উত্তর দিলেন না। কথাগুলো ওঁর কাছে পৌঁছচ্ছিল না। আনমনা দৃষ্টি। ইরাবতীর নাম শুনে চিনতে পারলেন না। 
রাণা বলল, “কবিরাজিকে মনে পড়ে আপনার?” 
বিশ্বেশ্বর বললেন, “কবিরাজি কী কবিতা লিখত? লিখত না তো!” 
কিরণমালা ঘরে ঢুকে গিয়ে চুপ করে বসেছিল ওনার পায়ের কাছে, মাটিতে। বিশ্বেশ্বর তার দিকেও দু-একবারের বেশি তাকালেন বলে মনে হল না।   
কিরণমালা একবার অস্ফুটে বলল, “জেঠু মায়ের কথা মনে আছে তোমার?” 
বিশ্বেশ্বর খিল খিল করে হেসে উঠলেন, “প্রসব করলে হয় না মাতা, মা হওয়া কি মুখের কথা?” 
রাণা ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখল। দু’চারটে অ্যাঙ্গেল থেকে স্টিল ছবি নিল। হঠাৎ কাচের আলমারিতে একটা ছবির দিকে চোখ পড়ে ওর। বিশ্বেশ্বর, দুজন মহিলা, তাদের একজন ইরাবতী। আরেকজন সুপুরুষ ভদ্রলোক রয়েছেন ছবিতে। 
“এই ছবিটাতে...।” কিরণমালা তাকিয়ে বলে, “ওটাতে মা জেঠু আর জেঠিমা। সঙ্গে আমার দাদু। কল্যাণ রায়।”
“এই জায়গাটা তো কলকাতা বলে মনে হচ্ছে না। পিছনে কেমন একটা রাজপ্রাসাদ...”
“ওটা বহরমপুরে তোলা। মা সেখানে চাকরি করতেন। জেঠুর বিয়ের পর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ওরা চারজন খুব ক্লোজ ছিলেন।”    
রাণা ছবিটার একটা ছবি তুলে নেয়। “এই বাড়ির পারিবারিক অ্যালবাম কোথায় থাকে জানেন? একবার দেখলে ভালো হয়।”  
কিরণমালা মাথা নাড়ল। “আমি জানি না। মিনুদিকে বললে হয়ত এনে দেবে। দেখছি দাঁড়াও।” 
ঘর থেকে বেরোনোর মুখে বিশ্বেশ্বর বলে উঠলেন, “আচ্ছা বউমা, কল্যাণী কোথায়? কল্যাণী আসেনি? তোমরা কাকে নিয়ে এলে? কল্যাণীর শরীরটা খারাপ। এই সময় সাবধানে রেখো।” 
রাণা তাকিয়ে দেখে কিরণমালার চোখ ছলছল করছে। 
 বিশ্বেশ্বর আবার যেন অন্য রাজ্যে চলে গেছেন। 
দুজনে বেরিয়ে আসে বড় রাস্তায়। 
“কল্যাণী কে?”
“আমি জানি না। জেঠু যে কখন কোন কথা বলেন...।” 

রাতে খাবার সময়ে দীপু অস্থির হয়ে উঠছিল। গত দু’দিন ধরে রাণার সঙ্গে সেভাবে কথা হয়নি তার।  
“কিছু বলবি?” 
রাণার প্রশ্নে রেগে যেতে গিয়েও হেসে ফেলে দীপু। “নাঃ, কী আর বলব! খুনি ধরতে পারলি কিনা তা’ই জানতে চাইছি...”  
“সারাদিন প্রচুর খাটাখাটনি যাচ্ছে ভাই। শান্তিতে খেতে দে প্লিজ।”
খাওয়াদাওয়া শেষ করে জমিয়ে বসে দুজনে। 
“আজ কোথায় কোথায় গেলি শুনি...”
“প্রথমে গেলাম অনমিত্রর পৈতৃক বাড়িতে। যে বাড়ির মালিকানা ঠাকুরদা থেকে ইরাবতী হয়ে এখন কিরণমালার। তবে তা’ নিয়ে অনমিত্রর সাদাসিধে বউয়ের বিশেষ মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না। সে একটু বোকাসোকা। গরিবের মেয়ে। ছেলেমেয়ে নিয়ে মোটামুটি খেয়েপরে থাকতে পারলেই খুশি।  মালতীকে আমার খুব দরকার। আর দরকার বহরমপুরে পোস্টেড ছিল এমন এই কোম্পানির পুরনো স্টাফ কাউকে। কোম্পানির পুরনো স্টাফদের খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। ইরাবতীর সময়কার স্টাফেরা কে কোথায় আছেন...। আর একটা অস্বস্তি ওই জীবনী নিয়ে, যেটা কিরণমালার মতে মারাত্মক বিতর্কিত। কী সেই বিতর্ক?”    
“কিংশুক রায়ের সঙ্গে কথা হল?”
“সেভাবে নয়। পিএ জানাল, উনি ব্যস্ত। সাংবাদিক শুনে স্মরণসভায় আসার জন্য নেমন্তন্ন করল। ইরাবতী সান্যালকে নিয়ে কিংশুক রায় সেদিনই যা বলার বলবেন। অতএব...”   
“ডাক্তারের বাড়ি গিয়ে কী বুঝলি?” 
“বুঝলাম, ডাক্তার জীবনে উন্নতি করতে চায়, তার নিজস্ব নার্সিংহোমের জন্য সে কিংশুক রায়ের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সাহায্য নিচ্ছে। পারিবারিক পরিচিতিটাও খুব বড় ফ্যাকটর। শুধু কিরণমালার সঙ্গে বিতান রায়চৌধুরীর বিয়েটা কেন হল না, এটাই প্রশ্ন।”
“সে কি রে! বিয়ে হওয়ার কথা ছিল নাকি?” 
“ডাক্তারের বাড়ির কাজের লোকেরা তো সেইরকমই আভাস দিল। বহু পুরনো লোক তারা। ইরাবতীকে বিয়ের আগে থেকে চেনে। কিরণমালাকে ছেলেবেলা থেকে বাড়িতে আসতে দেখেছে। বিশ্বেশ্বর কিরণমালাকে ‘বউমা’ বলেই ডাকতেন। বিতানেরও দুর্বলতা ছিল না, এমন বলা যায় না। কৃতী সুপুরুষ ডাক্তার। এখনও বিয়ে-থা করেনি। অবশ্য দেবারও কেউ নেই। বাবা-ছেলের সংসার চলে কাজের লোকেদের ভরসায়। বিতান একেবারে বিরহী দেবদাস সেজে বিয়ে করেনি, এমন ভাবার কারণ নেই, কিন্তু তার উৎসাহ ছিল ভরপুর ষোলোআনা। তাহলে কিংশুক রায়ের জামাই হিসেবে সে বাই ডিফল্ট কিছু সুযোগ-সুবিধে পেতেই পারত।”  
“তাহলে বিয়েতে বাগড়া দিল কে?”
“বলা মুশকিল।”   
রাণা সিগারেটের ধোঁয়ার প্যাঁচ দেখতে দেখতে গম্ভীর হয়ে যায়। দীপু অবাক হয়ে জিগ্যেস করে, “এই বিয়েটা হলে তো ইরাবতীরও সুবিধেই হত। মেয়ে ঘরের কাছেই থাকত।”  
“গত দুদিন ঘোরাঘুরি করে যা বুঝলাম ইরাবতী তাঁর পালিতা কন্যাটিকে ওভার প্রোটেক্ট করতেন। একটু বেশিই আগলে রাখতেন।”   
কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন বেজে ওঠে। রাণা ফোনটা ধরেই লাফিয়ে ওঠে এক মুহূর্তে। 
“পাওয়া গেছে? ভেরি গুড। এক্ষুনি গিয়ে কথা বলা যাবে?” 
ফোন রেখে রাণা তাকায় দীপুর দিকে। 
“মালতী কলকাতাতে আছে। পুলিশ খোঁজ পেয়েছে। চ’ শিগগিরই।”  

(ক্রমশঃ)

সৌমী আচার্য্য

                                 


শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব -৭

ঝাউবনের মাঝে মা মেয়েতে দীর্ঘসময় চুপ করে বসে আছে। দূরে সমুদ্রে দু তিনটে জেলিনৌকা। টকটকে লাল ছোট পাল তুলে মনের আনন্দে ঢেউ ভাঙছে যেটা তার দিকে তাকিয়ে ঊশ্রী বলল, 'মা ঐ নৌকাটা আমি। আর দূরের বড়োটা তুমি।' দেবপ্রিয়া মৃদু হাসল। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'হ‍্যাঁ রে, এইসব ছেলেমানুষী তোর বন্ধুদের আছে?' 

-কেন থাকবে না! আমরা তো ছোটোই।

-তাই বুঝি! 

-একদম। আচ্ছা মা তোমার উপন‍্যাসের সোহাগ তো আমাদের বয়েসী তাই না!

-মুনিয়া আমার উপন‍্যাসের চরিত্র নিয়ে কথা বলবে না।

-কেন তুমি এত রিজিড বলোতো! তোমার মাথায় যে কী ঘুরছে জানিনা বাপু । বলোনা প্লিজ আদিত‍্য কী দেখল বাড়ি ফিরে? বলোনা।

-না একদম না, কিছুতেই না।

ঊশ্রী অভিমানে উঠে চলে গেল। ঝাউবন পেরিয়ে বালির উপর হেঁটে সমুদ্রের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দেবপ্রিয়া উঠে দাঁড়ায়। মেয়েকে নজরে রেখে দূর দিয়ে হাঁটে। যতই অভিমান করুক কিছুতেই নিজের লেখার উপর কারো প্রভাব পড়তে দিতে ও রাজি নয়। আর ঊশ্রী রীতিমতো নিজের প্রভাব খাটায়। বিন্দুবালা আর সৌম‍্যাদিত‍্যের সম্পর্কের মাঝে সোহাগ যে কাঁটা হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছে। 

-কেন তুমি সোহাগকে খল নায়িকা বানিয়ে দিচ্ছ মা! প্লিজ ওর এমন ভালোবাসা ভরা মনটা বিষিয়ে দিও না। ওমা! শোনো না এমন কিছু করো না যাতে সৌম‍্যাদিত‍্য আর আদিত‍্য দুজনেই জব্দ হয়।

দেবপ্রিয়া কোনো কথা না বলে উঠে গিয়েছিল মেয়ের সামনে থেকে। চরিত্রগুলোর উপর সে নিজেই কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে রাজি নয়। আর এই মেয়ে সব পাল্টে দিতে চায়। পুরুষের উপর ওর এত রাগের  কারণ বোঝে তবু এড়িয়ে যায়। সবচে অবাক লাগে গত দু তিন বছরে যন্ত্রণার একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। সব সময় পজেটিভ মানসিকতা মেয়েটার। দেবপ্রিয়া যেন দেখতে পায় ওর মায়ের এক টুকরো রয়ে গেছে মেয়ের ভেতর। তবে আজ এই ঝাউবনে বসে প্রথম কথাটাই বলেছিল, 'আচ্ছা মা একটা মেয়ের পুরুষ সঙ্গী কেন লাগে? নিরাপত্তার জন‍্য নাকি সেক্সের জন‍্য? না মানে আমি বলতে চাইছি এই দুটো কারণ ছাড়া বিয়ে করার আর কোনো কারণ আছে কী?' চমকে গিয়েছিল দেবপ্রিয়া। মেয়েটা ঠিক কী ভাবছে জীবন নিয়ে। সমুদ্রের ঢেউ পায়ে এসে ভাঙছে ওর।স্কার্টটা বাঁহাতে সামাণ‍্য উপরে তুলে অল্প দৌড়াচ্ছে ঊশ্রী যেন ভাসছে। দেবপ্রিয়ার চোখটা জ্বালা করে উঠল।

--------------------------------------------------------------
ধর্ণামঞ্চ থেকে বক্তৃতা শেষ করে মহেশ  নেমে আসতেই ত্রিচি এগিয়ে এল। হাতের মোবাইলটা এগিয়ে দিল মহেশের দিকে। একটা কফি রঙা লিপস্টিক আর সাদা মুক্তোর দুল। মুহূর্তে একটু দুলে উঠল মহেশ। ধর্না মঞ্চে ইংরেজিতেই চলছে ভাষণ। ত্রিচি কঠিন মুখে বলল, 'অনুজবাবু, নাম ভাঁড়িয়ে পরিচয় গোপন করার অপরাধেই আপনাকে পুলিশে দেওয়া যায় কিন্তু তারচে অনেক বেশি জরুরি অন‍্য কিছু। গাড়িতে উঠুন। কথা হবে।' মহেশ মোবাইলটা ফিরিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, 'আমার নাম অনুজ রায় এবং মহেশ আমার ডাকনাম। মহেশ নামেই এই অঞ্চলে আমি পরিচিত। এতে পুলিশে ধরার মত অন‍্যায় আপনি দেখতেও পেলেও আমি পাচ্ছি না। চলি।' ত্রিচির শান্ত সুন্দর মুখে হিংস্রতা খেলা গেল। 

-ছবিটা গতকালকের মহেশবাবু। বুঝতেই পারছেন আমরা কতটা মরিয়া। আপনি এসব আন্দোলন বন্ধ করুন। পুরুলিয়ায় আপনার জন‍্য আমাদের বড় প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে নাক গলাতে এলে আমরা বোধহয় আর সভ‍্যতা ধরে রাখতে পারব না।

মহেশ ওরফে অনুজ নির্বিকার ভাবে পেছন ফিরে হাঁটতে যাবে এমন সময় ত্রিচি আর ধৈর্য রাখতে পারে না।

-আপনার স্ত্রী মেয়ের ছিন্নভিন্ন লাশের ছবি আজ সন্ধ‍্যেতেই আপনার মোবাইলে চলে যাবে মহেশবাবু। আপনি এমন ভাবেই গাছপালা পশুপাখি বাঁচাতে থাকুন।

মহেশের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। মোবাইলটা কানে লাগিয়ে বলে, 'মিস্টার.কুট্টি আশাকরি এইটুকুই যথেষ্ট মিস্ ত্রিচিকে এই মুহূর্তে গ্রেফতার করার জন‍্য। আর ধন‍্যবাদ আমি কল করেও কথা বলিনি তবু যে আপনি কিছু একটা আন্দাজ করে ফোনটা অন রেখেছিলেন তার জন‍্য। এবার আপনার যা করণীয় করুন।' ত্রিচির হতভম্ব ভাব কাটার আগেই কর্ণাটক পুলিশ চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে ত্রিচি ও তার সাঙ্গপাঙ্গর গাড়ি। মহেশ কাছেও যায় না কিছুই বলে না। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ত্রিচির হিংস্র ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখতে দেখতে ফোন করে। রিং হয়ে যাচ্ছে ধরছে না। বিরক্ত হয়। আবার কল করে এবার ফোনটা রিসিভ হয়। অপর প্রান্তের হ‍্যালো শুনে বোঝে কাঙ্খিত ব‍্যক্তি নয়। আরেক প্রস্থ বিরক্তি দাঁতে চেপে নেয়।

-আমি অনুজ রায় কথা বলছি। দেবপ্রিয়ার সাথে কথা বলতে চাই। বিষয়টা জরুরি, প্লিজ।

(ক্রমশ:)





রবিবার, ১ মে, ২০২২

শ্যামলী আচার্য

                          



মৃত্যু অথবা 

পর্ব - ৬

“পোস্ট-মর্টেম হয়নি, কারণ পুলিশ নিজে থেকে তদন্ত শুরু করতে পারেনি। অনেক চাপ ছিল। এত প্রভাবশালী পরিবার... বাড়ির ডাক্তার পরিষ্কার লিখছেন ন্যাচরাল ডেথ... ইরাবতী সান্যালের ডায়ালেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি ছিল। ওষুধপত্র খেতেন না, অনিয়ম করতেন। ফলে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের দেওয়া হার্ট অ্যাটাকের সার্টিফিকেটে আমাদের আর কিছু করার ছিল না। তাছাড়া কিংশুক রায় একেবারেই চাননি তাঁর স্ত্রীর শরীর নিয়ে অহেতুক কাটাছেঁড়া হোক।”   
স্থানীয় থানার ওসি রক্তিম বেশ চটপটে। দীপু আর রাণাকে অনেকটাই সময় দিলেন। 
“ইরাবতী সান্যাল মারা যাবার সময় কে কোথায় ছিলেন?”   
“আমরা যদ্দূর জানি, কিংশুক রায় তার দিনকয়েক আগে থেকেই ব্যাঙ্ককে ছিলেন। সকালে খবর পেয়ে ফেরেন। মেয়ে বিদেশে। সে আসার আগেই দাহ হয়। বাড়িতে থাকার মধ্যে কয়েকটি কাজের লোক। ইরাবতী দেবীর ভাই। যিনি সেই রাতে এই বাড়িতেই ছিলেন না। তাদের আর আমরা কিছু জিগ্যেস করিনি। তদন্তের প্রয়োজন হয়নি।” 
থানায় বসে রাণার সঙ্গে কথা বলতে বলতে রক্তিম অফিশিয়ালি তদন্ত করা সম্ভব নয় বলেও যথাসাধ্য সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
থানা থেকে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় দাঁড়ায় দুজনে। শহরে আকাশ কম, হাইরাইজ বেশি। নিয়নের আলোয় ভেসে যাওয়া কলকাতার ব্যস্ত রাজপথে একটা সিগারেটের ধোঁওয়া উড়িয়ে দেয় দীপু। রাণার দিকে তাকিয়ে বলে, “এবার?” 
রাণা লাইটপোস্টে ঝুলতে থাকা একটা বিজ্ঞাপন দেখছিল মন দিয়ে। বলে, “কাল তো তোর অফিস। তার আগে চল আজকেই ডাক্তার দেখিয়ে আসি।”  
“ডাক্তার? সে কি রে! কী হল?” দীপুর আঁতকে ওঠা প্রশ্নে একগাল হেসে রাণা বলে, “অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তুই কেন যে এত কাঁচা মন্তব্য করিস... বিতান রায়চৌধুরীকে একটু মেপে আসি চল।”  
বিতান রায়চৌধুরীকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া দেখানো যায় না। তার ওপর রবিবারের সন্ধে। চেম্বারে গোনাগুনতি দশজন। সকলেরই মাসখানেক আগে থেকে ডেট ঠিক করা রয়েছে। রাণা তার এতক্ষণের সাংবাদিক পরিচয়টাই ব্যবহার করল। রিসেপশনিস্ট বেশি ঘাঁটালেন না। দশজন রোগীর শেষে মিনিট দশেকের ছাড়পত্র মিলল ভেতর থেকে।  
ঝাঁ-চকচকে চেম্বার। দক্ষিণ কলকাতার পশ অঞ্চলে পসার ভালো না হলে এইরকম চেম্বার মেনটেন করা চাট্টিখানি কথা নয়। ডাক্তারবাবুর সুনাম রয়েছে বলতে হবে। 
যথাসময়ে ডাক এল। ডাক্তার বিতান রায়চৌধুরী সুপুরুষ। নির্মেদ ঝকঝকে চেহারা। স্বচ্ছন্দে সিনেমার নায়ক হতে পারতেন। বিতানের জিজ্ঞাসু চোখের উত্তরে রাণা হাতজোড় করে বলে, “ইরাবতী সান্যালকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্র করছি আমরা। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা। আপনাকে ছাড়া সবটাই অসম্পূর্ণ... বুঝতেই পারছেন।”     
ভুরু কুঁচকে যায় বিতানের। “আমি ওনার সঙ্গে খুব অ্যাটাচড ছিলাম না যদিও, আমার বাবা ওনাকে খুব স্নেহ করতেন। কী বলতে হবে বলুন। তবে, আজ সম্ভব নয়...” 
“না না, আজ আমরা জাস্ট পারমিশন নিতে এলাম। আমরা বাড়িতে গিয়েই শ্যুট করতে চাইছি। মানে, যদি সম্ভব হয়, আমরা বিশ্বেশ্বরবাবুর সঙ্গেও... বুঝতেই পারছেন, আমাদের প্রোডিউসার বাংলাদেশের, তিনি খুব তাড়া দিচ্ছেন...”।
খুব অনিচ্ছা আর বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ল বিতান রায়চৌধুরীর চোখেমুখে। 
“ওনাকে নিয়ে ঠিক কী বলব জানি না। হার্টের সমস্যা ছিল। ওষুধপত্র হয়ত খেতেন না রেগুলার। এই বয়সে চলে যাওয়ার কথা নয়... এনি ওয়ে, লেখিকা হিসেবে নাম-টাম হয়েছিল। তবে আমি কিন্তু খুব বেশি সময় দিতে পারব না, আগেই বলছি। ওনার সঙ্গে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না।” 
“কিন্তু আপনিই তো বরাবর ওঁদের পরিবারের ফিজিশিয়ান...”
“কিংশুকবাবু আমাকে বেশি পছন্দ করতেন। ওনার সঙ্গে যোগাযোগ বেশি আমার। আপনারা বরং পরশু আর্লি মর্নিং আমাদের বাড়িতে আসুন। আমি মিনিট দশেকের বেশি সময় দিতে পারব না। আর, আমার বাবা নার্ভের রোগী। ডিমেনশিয়ায় ভোগেন। দেখুন তাঁর কাছে আপনারা কী পান... আজকাল এই হয়েছে ঝামেলা। সাংবাদিকদের কোনও কথায় না বলা যায় না। কোথায় যে কোন কথা লিখে ফাঁসিয়ে দেবেন...।”   
বলতে বলতেই দাঁড়িয়ে পড়েন বিতান রায়চৌধুরী। প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে বোঝাই যায়, তিনি আর কথা বাড়াতে চাইছেন না। 
রাণা উঠে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করে, “ডেথ সার্টিফিকেটে আপনার সই, এদিকে কিরণমালাও বারবার আপনার কথাই বললেন... তাই আপনার কাছে আসা।” 
কিরণমালার নাম শুনে বিতানের চোখে একটা আলো জ্বলে উঠে এক পলকে নিভে যায়, আর সেটা দৃষ্টি এড়ায় না রাণার। 
“অনেক ভোরে কিংশুকবাবুর বাড়ি থেকে ফোন আসে। আমি গিয়ে আর কিছু করার সুযোগ পাইনি। মালাকে খবরটা আমিই দিয়েছিলাম... ও প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। তারপর... মালা কলকাতায় এসেছে শুনলাম। কথা হয়নি...” 
বিতানের নরম কথার মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়ে রাণার মোক্ষম অস্ত্র, “পরশুর শ্যুটিঙে কিরণমালা থাকলে আপত্তি আছে আপনার?” 
“অ্যাঁ...” কেমন স্তম্ভিত হতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেন বিতান, “ও যদি সময় পায়, নিশ্চয়ই আসবে... তবে আমি তো সকালে বেশিক্ষণ... বুঝতেই পারছেন চেম্বার আছে...।”   
“ওকে ডক্টর। তাহলে পরশু সকালে। আমরা আসছি। তিনজন। ভয় নেই। একদম বেশি সময় নেব না আপনাদের।” 
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে হাঁটাপথে বেশ খানিকটা গেলে সামনে অটোস্ট্যাণ্ড। গম্ভীর হয়ে হাঁটছিল দুজনে। এত রাতে অটো প্রায় নেই বললেই চলে। দুপুর থেকে দুজনের কম ধকল যায়নি। দাঁড়াতে ইচ্ছে করছিল না। ফোন করে একটা ক্যাব বুক করে দীপু। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। মাথার ভেতরটা একদম ফাঁকা। 
ঘরে ফিরে খেতে বসে কথা বলতে শুরু করল রাণা। 
“কিংশুক রায় নিজের ব্যবসার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত। ইরাবতী সান্যালের সাহিত্যজীবন বা ব্যক্তিজীবন নিয়ে তাঁর তেমন কিছু মাথাব্যথা ছিল না। দুজনে দুটি আলাদা বৃত্তের মধ্যে বাস করতেন। ইরাবতীকে খুন করে কিংশুক রায়ের কিছু পাওয়ার নেই। বাড়ি বা কোম্পানির শেয়ার বাই ডিফল্ট ওনার আর কিরণমালার মধ্যে ভাগ হবে। ইরাবতীর ভাই অনমিত্র দিব্যি আছেন খেয়ে-পরে। দিদি না থাকাতে তাঁর কোনও অসুবিধে হচ্ছে না, দিদি থাকাকালীনও তাঁর কোনও অসুবিধে হত বলে মনে হয় না। ডাক্তারকে সন্দেহ করারও সেই অর্থে কোনও জোরদার কারণ নেই। এখন রইল বাকি ওই মালতী। ইরাবতী মারা যাওয়ার পরেই সে কাজ ছেড়ে দেশে চলে গেল কেন, এটা জানা জরুরি.....”   
দীপু বলে, “কাল মালতীকে খুঁজতে যাচ্ছিস?”
রাণা অন্যমনস্ক হয়ে বলে, “ডায়মণ্ডহারবার বিশাল জায়গা। শহরে এতকাল আরামের জীবন কাটিয়ে একদিনের মধ্যে কেউ গ্রামে ফিরে যায় না। অপরাধ করে থাকলে তো আরও যাবে না। আমার ধারণা, মালতী এই শহরেই আছে কোথাও। দেখি, পুলিশের সাহায্যে কতটা কি করা যায়...। অনমিত্রও কিছু চেপে যাচ্ছে। এই কোম্পানির পুরনো স্টাফদের সঙ্গে কথা বলা দরকার...। আর বাকি রইল ঐ ডেস্কটা। ওটা খুলতে পারলে...”   
(ক্রমশঃ)

সৌমী আচার্য্য

                                 


শ্রাবণের ধারার মত (পর্ব-৬)

গৃহের দিকে আসিতেই আদিত‍্যনাথ প্রথম বাঁদরলাঠি গাছটির দিকে চোখ ফেলিয়া মুগ্ধ হইয়া গেল।আহা কী করিয়া যে এমন সুন্দর ফুল বাংলা সাহিত‍্যে স্হান পাইল না কে জানে?প্রকৃতি যে কত সৌন্দর্য অকৃপণ ভাবে বিলাইয়াছে তাহা গুণিয়া শেষ করা যায় না।কী মনে করিয়া আদিত‍্য কয়েকখানি ফুল পাড়িয়া লইল তাহা বলা মুশকিল।গৃহে প্রবেশ করিয়াই মোতির মার সহিত সাক্ষাৎ হইল।আদিত‍্যকে দেখিয়া তাহার মুখখানি সহসা আলোকিত হইয়া উঠিল।

-ছোটখোকা এয়েচ?আহা বাছার মুকখানা যে শুকিয়ে গিয়েচে।যাও মার সাতে দেকা করে উপরে যাও।

আদিত‍্যর হাতের ফুলগুলিকে মোতির মা লক্ষ‍্য করিল না দেখিয়া সে খানিক বিচলিত হইয়া বলিল,'ফুলগুলি কেমন মোতির মা?' হাসি চাপিয়া সে বলিল,'ভালোই তো যাও ভেতরে যাও।'প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের এই উদাসীনতা মোটেই পছন্দ করিতে পারেনা আদিত‍্য।এই রূপ রস আস্বাদন করিতে অধিক শিক্ষার কী প্রয়োজন?আসলে অধিকাংশ মানুষের বাঁচিয়া থাকাটা আদতে পশুপাখির মতোই বাঁচিয়া থাকা।গভীরতা নাই,প্রেম নাই,দর্শন নাই।এমনকি চন্দ্রনাথের কিছু বোধ আদিত‍্য ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারে না।মাস ছয়েক আগে একদিন সোহাগের সহিত সাক্ষাতের সময় চন্দ্র কী এক কথার পৃষ্ঠে মুখ বাঁকাইয়া বলিয়াছিল,'বৌঠান তোমার ন‍্যায় স্বামী লইয়া, সাহিত‍্য লইয়া সময় অতিবাহিত করা বা কল্পনায় ভাসিয়া যাইবার মতো সৌভাগ‍্য অথবা অভিপ্রায় সকলের থাকে না।আমাদিগের আবার সাংসারিক বিষয়ের উপরেই অধিক টান।'সোহাগ এরূপ কঠিন কথায় আঘাত পায়।মুখ কালো করিয়া কহিয়াছিল,'তবে যে আপনি আপনার বন্ধুটিকে কেবলি দেশ ভ্রমণে বাহির হইতে প্ররোচনা প্রদান করেন তাহাও কী সাংসারিক কর্ম?'চন্দ্রনাথের রক্তিম মুখমণ্ডল,কম্পিত ওষ্ঠ আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস জানাইতেই আদিত‍্য পরিবেশ শান্ত করিবার অভিপ্রায়ে বলিয়া বসিল,'দেখ সোহাগ যে যাহার মত করিয়া সঠিক।আর তাহা ছাড়া চন্দ্র আমারে বাড়ির বাহির করিতে প্ররোচনা প্রদান করে নাই কখনো। প্রকৃতি নিজেই সেই কাজটি করিয়াছে।'সোহাগ তীব্র বিদ্বেষে দৃষ্টিপাত করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিল।এই সকল অকারণ কথাগুলি ভাবিতে ভাবিতে কখন যে দোতলার বারান্দায় উপস্হিত হইয়াছে তাহা আদিত‍্য খেয়াল করিতে পারে না।দুপুরের রোদ মরিয়া আসিয়াছে,আকাশের কোলে কালবৈশাখীর ঘনকৃষ্ণ মেঘখানি হাতছানি দিতেছে।এমন সময় হাসির মৃদু মধুর শব্দে আকৃষ্ট হইয়া ডান পার্শ্বের ঘরখানিতে উঁকি দিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল আদিত‍্য।যাহা দেখেতেছে তাহার অর্থ খুঁজিয়া না পাইয়া ডাকিয়া উঠিল,'এ সব কী সোহাগ?'

--------------------------------------------------------------

-গোধূলিকাকিমা ঠিক কী বললেন তোমায় ফোনে?সেই থেকে গুম মেরে রয়েছ যে?

মরুণকিশোর দুহাতে চুলমুঠি করে ধরে খানিক বসে রইল।তারপর একটু ম্লান হেসে বলল,'একটা রামধনু রঙা অতীত পথ খুঁজছে মিষ্টি।আর কিছু না।'

-দেখ,খবরদার বলছি আমার সাথে হেঁয়ালি করবে না।

-এই দেখ হেঁয়ালি করলাম নাকি।সত‍্যি বলছি।

মিষ্টি অত সহজ মেয়ে নয়।নাম মিষ্টি হলেও মনে খটকা লাগলে যুতসই উত্তর না মেলা পর্যন্ত কাউকে তিষ্ঠতে দেয় না।মরুণকিশোর ততধিক সরল।ঠিক যেন সকালের প্রথম আলো।এমন নরম এমন পবিত্র যে কিছু দিয়েই তাকে ময়লা করা যায় না।মিষ্টি নানা প‍্যাঁচের প্রশ্ন শুরু করলে সে বোকার মতো হাসে।

-ঐ যে গো আমাদের ছোটবেলায় হত না সবাই মিলে বাসে করে ঘু্রতে যাওয়া!একবার তেমন একটা বেড়াতে যাওয়া হল পুরীতে।বিশাল বাসে বাহান্ন জন যাত্রী।আমার চোখ যা দেখে তাতেই অবাক হয়ে কেবলে যায়।পুরীর মন্দিরে গিয়ে কী যে হল মনে পড়ে গেল তাঁকে।

-কাকে?

-শ্রীচৈতণ‍্য মহাপ্রভুকে।কী যে হল মনে হল আমায় খুঁজে বার করতেই হবে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তাঁকে।শুরু করলাম খোঁজা।আর পরেরদিন পেয়েও গেলাম।

-কাকে?

-একটা মেয়েকে।ভীষণ গম্ভীর।চোখে চশমা আঁটা।সে যে ঠিক কেমন সুন্দর তোমায় বোঝানো মুশকিল মিষ্টি।সে সরস্বতী নাকি অপ্সরা?সূর্য নাকি চন্দ্র?সমুদ্র নাকি নদী?শুধু এটুকু জেনে রাখো তাকে যে একবার দেখেছে সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না কিছুতেই নয়।আমাকে গম্ভীর মুখেই বলল,'গতকাল থেকে দেখছি কিছু খুঁজছ,কী খুঁজছ বলো,সাহায‍্য করতে পারি।'আমি ভয় পেয়ে ছুট্টে পালিয়ে গেলাম।

-পালিয়ে গেলে?কেন?তোমার তখন কত বয়স?একটা মেয়েকে ভয় পেলে?

-বয়েসটাই ভয় পাবার মত ছিল যে।সতেরো অথবা আঠারো।কিন্তু তুমি কি ভাবলে সে আমায় ছেড়ে দিল?না সে আমায় ছাড়েনি।ঠিক আবিস্কার করেছে ভর দুপুরে একা বালির ঢিবির আড়ালে আমি চৈতণ‍্য মঙ্গল পড়ছি।তারপর...তারপর...

-কী হল কথা বলছো না কেন?এই!

মরুণকিশোর মায়াভরা চোখদুটো দিয়ে মিষ্টিকে দেখল।তার বিয়ে করা বউ।তার জীবনকে ছন্দে ফেরাতে চেয়ে পরিবারতন্ত্রের ঘটানো এক মস্ত ভুল।ভুল কারণ সে মিষ্টিকে কিচ্ছু দিতে পারেনি।আদৌ কোনদিন হয়তো পারবে না।দেবপ্রিয়া আজ এত বছর পরেও মনের গভীরে প্রদীপ জ্বেলে বসে রয়েছে।কিছুতেই অন্ধকার হয়নি।সে প্রদীপ টিমটিমে আলোর মায়ায় জাগিয়ে রেখেছে স্মৃতি।কিন্তু এত বছর পর কেন তাকে খুঁজছে দেবপ্রিয়া?অনুজের সাথে তাকে তো বেশ মানিয়েছিল।তাছাড়া অনুজের কত নামডাক।দেশের কথা দশের কথা ভাবে যে সুপুরুষ সেই তো তার মতো নারীর যোগ‍্য।এই নিতান্ত সাধারণ গড়পড়তা এলেবেলে মরুণকিশোর কে আজ এত বছর পর কী দরকার তার?মিষ্টি তাকিয়ে দেখে ঘাড় নুইয়ে চোখ মাটিতে প্রায় মিশিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে তার মানুষটি।তার মানুষ!মনে মনে একটু হেসে নিল মিষ্টি।এ মানুষ কোনদিনই তার নয়।ঘাটশিলার কপার মাইনের প্রোডাকশন ম‍্যানেজার মরুণকিশোর দাস মিষ্টির জীবনের সাথে বয়ে চলে মাত্র।না ঠিক বয়ে চলে না।বয়ে চলায় মিশে যাওয়া আছে।তাদের জীবন তো মেশেনি।মরুণকিশোর উদাস হয়ে বলেছিল,'মন জাগলে শরীর জাগবে মিষ্টি।তাকে জোর করে সংসারী করতে চাওয়া মুর্খামি।শরীর ছাড়াও এ জগৎ সংসারে কত গভীর সম্পর্ক আছে তাই না!আমরা বরং বন্ধু হতে পারি।আর যদি তুমি স্বাভাবিক কর্তব‍্যের দায়ে আমায় পেতে চাও তাহলে মনের আরামটুকুও থাকবে না।'মিষ্টি সাধারণ বিএ পাশ করা সাধারণ মেয়ে।এত কথা বোঝে না।তবে এটুকু বোঝে বন্ধু পাওয়া এ পৃথিবীতে সবচে কঠিন।অতীতের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মরুণকিশোরকে একটিবার দেখে গভীর নিশ্বাস ফেলে ঘরে যায় মিষ্টি।

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 

                                 

   












শ্রাবণের ধারার মত
(পঞ্চম পর্ব)


তাজপুরের রিসোর্টটি বেশ সাজানো গোছানো।ঊশ্রী এখনো বেহুশের মতো ঘুমোচ্ছে।ওর কপালে আলতো করে হাত রাখল দেবপ্রিয়া।ঘুমোক আরেকটু।এই ছোট্ট প্রাণটায় আঘাত তো কিছু কম নয়।ভোরের আলতো আলোর মায়ায় মন যেন জুড়িয়ে যেতে লাগল।অথচ গোধূলি মাসি বুকের ভেতর আস্ত সূর্য বসিয়ে দিয়েছে।সবাইকে আঘাত দিয়েছে দেবপ্রিয়া?বরুণ চিরকাল তার অন্ধ ভক্ত ছিল।তার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক।আকারে প্রকারে ইঙ্গিতে সরাসরি সব রকম ভাবে মুগ্ধতা জানিয়েছে।আর তারপরেও ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে।আর অনুজ সে তো থেকেও ছিলনা।ঊশ্রীর পাঁচ বছরের জন্মদিনেই অনুজকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল দেবপ্রিয়া।অনুজ কথাটা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি মন দিয়ে কিছু পেপারস্ দেখছিল।দেবপ্রিয়া বহুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘরে ফিরেছে ঊশ্রীর কাছে।খানিকপর অনুজ ধীর পায়ে বেডরুমে এসে বলে,'ঠিক আছে আজকের রাতটা থাকছি,আগামীকাল চলে যাব।তুমি উকিলের সাথে নিশ্চই কথা বলেছো।মিউচুয়াল ডিভোর্স ফাইল করো আমি সই করে দেবো।'এতটা নির্বিকার হতে পারে কোনো মানুষ!দেবপ্রিয়া ভাবতে পারেনা।অনুজ পরদিন চলে গিয়েছে।আর কখনো বাড়িতে ফেরেনি।কোর্টে এসে সই করেছে চলে গেছে।একবার কোনো খবর জানতে চায়নি ঊশ্রীর বা মায়ের।ডিভোর্সের পর বরুণ এগিয়ে আসার রাস্তা খুঁজেছে সব রকম ভাবে।মাত্র একদিন দেবপ্রিয়া দুর্বল হয়েছিল।সেও তো মানুষ সবাই কি সেটা ভুলে গিয়েছে।ঊশ্রী ভাইরাল ফিবারে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল সে সময়, এদিকে দুটো বড়ো হাউসের লেখা জমা দিতেই হবে।রাত জেগে জেগে মাইগ্রেনের পেন বেড়েছে।ঠিক তার মধ‍্যেই ওর মা দিপালীর সিঁড়ি থেকে পড়ে বাঁ দিকের ফিমার ভেঙে গেল।অসহায় দেবপ্রিয়ার পাশে বরুণ এসে দাঁড়াল ত্রাতার মত।লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডাক্তার, নার্সিংহোম, ওষুধ বাড়ির দায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল।ক্লান্ত ধ্বস্ত দেবপ্রিয়া।

-এভাবে একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছ যে?কী হয়েছে কাঁদছ নাকি তুমি?প্রিয়া?

-নাহ্ আমার কাঁদবার অধিকার নেই বরুণ।একজন মানুষ সারাজীবন বাইরের টানে ঘরের দিকে ফিরেও চাইল না।আমার ভালোবাসা, ইচ্ছে,জীবন সব একা গহীন রাতের তারা হয়ে জেগে রইল।কোণঠাসা হতে হতে ছেড়ে যাবার কথা উচ্চারণ করলাম কী করলাম না,সব শেষ হয়ে গেল।আমার হাত শূন‍্য হয়ে গেল।তবু আমায় কাঁদতে নেই।মেয়ে আর মা এই তো সম্বল।দুজনাই অসুস্থ অথচ আমায় কাঁদতে নেই।

-এমন ভাবে বলছো কেন প্রিয়া?

-কারণ আছে বরুণ,আজ তথাকথিত পড়াশোনা জানা সংস্কৃতি মনস্ক এক মানুষ আমায় বলেছেন,'তোমার মনটা খুব স্ট্রং দেবপ্রিয়া,অন‍্য কোনো মেয়ে হলে কেঁদেকেটে শেষ হয়ে যেত।ভালো ভালো।যে ভাবে লিখে যাচ্ছো মনটা পাথর না হলে এ পরিস্হিতিতে লিখতে পারতে না।অবশ‍্য হ‍্যাঁ রবীন্দ্রনাথ পারতেন।' ভাবতে পারছ আমি কতটা নির্দয়?

কথাটুকু শেষ করতে পারেনা ফুলেফুলে ওঠে।ভীষণ আবেগ পথ খোঁজে বাইরে বেরিয়ে আসার।বরুণ এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখে।আঙুল দিয়ে মোলায়েম ভাবে মাসাজ দিতে থাকে।

-মানুষ আঘাত কাকে করে জানো?যাকে সে ঈর্ষা করে,তার মতো হতে চায় কিন্তু তার সাধ‍্যে কুলায় না।আর তুমি!তোমার মেধা ঈর্ষণীয় তোমার রূপ লোভনীয়।অথচ তোমাকে কেউ ছুঁতেও পারে না।তো তোমাকে আঘাত করবে না?

বরুণের আঙুলের ছোঁয়া ধীরে ধীরে নেমে আসছে ঘাড় বেয়ে।বহুদিন পর সুখে জারিত হচ্ছে দেবপ্রিয়া।পদ্মকুঁড়িতে মৃদু সুখ কাঁটা।ডুবছে জাগছে।বরুণ দীর্ঘদিনের অপেক্ষা প্রবল আশ্লেষে পূর্ণ করতে লাগল।ভেসে গেল একটা রাত।ছাদের গন্ধরাজ ফুলগাছটা সাক্ষী কী ভীষণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছিল দেবপ্রিয়া।


-চলে যাও বরুণ প্লিজ।এসব আমি চাইনি।ছিঃ ছিঃ।

-কেন প্রিয়া?আমি তো কাওকে বঞ্চনা করছি না।তোমার কাছেও কিছু চাইছিনা।তোমার পাশে থাকতে চাই।তোমার সঙ্গ চাই।তোমার মনন,মেধা আমার বেঁচে থাকাটা সুন্দর করে।প্লিজ প্রিয়া।

-নাহ্ বরুণ!জোনাক আমার পিসতুতো বোন কেবল নয়,ও আমাকে ভীষণ মান‍্য করে আমি কিছুতেই ওকে ছোট করতে পারবো না।প্লিজ বরুণ।আর এগোনোর চেষ্টা করো না।

এসব ভাবতে ভাবতে কেঁপে উঠল দেবপ্রিয়া এরপরেও বরুণ কতবড়ো সর্বনাশে মেতে উঠেছিল।এরপরেও গোধূলিমাসির মনে হয় সেই সবাইকে আঘাত দিয়েছে।এই কি জীবনের পরিহাস!









শ্যামলী আচার্য

                                  


মৃত্যু অথবা  
 (পঞ্চম পর্ব)

চা অ্যান্ড টা--  বাঙালির রিল্যাক্স স্টেশন। বাঘাযতীন আই ব্লকে আনকোরা নতুন একটি টী-বুটিক। চায়ের সঙ্গে টা রয়েছে, আর রয়েছে অপূর্ব অন্দরসজ্জা। ঢুকলে চোখ জুড়িয়ে যায়। দুটি ঘর। মুখোমুখি আর বৈঠকী। মুখোমুখিতে এসে বসে দুজন। রাণা আর দীপু। ওরা আসার মিনিট দশেকের মধ্যে এসে পৌঁছয় কিরণমালা। 

“অত্যাধুনিক চায়ের দোকান, কী বলিস?” দীপুর কথায় হেসে ফেলে অর্ণব। এই বুটিকের তরুণ কর্ণধার। 
“তা বলতে পারেন দাদা। তবে কিরণদি এই প্রথম এল। ফেসবুকে রেগুলার ছবি দেখে, কমেন্ট করে, ভাবিনি বিদেশ থেকে এসে আমার এখানে পায়ের ধুলো দেবে।” 
“অর্ণব, তুই কি কি সার্ভ করবি দেখ, আমরা কাজের কথা সেরে ফেলি চটপট।” কিরণের কথায় একগাল হেসে অর্ণব বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। 
ইরাবতী সান্যালের মৃতদেহ পড়েছিল বাথরুমের দরজার বাইরে। অন্তত প্রত্যক্ষদর্শী মালতী তেমনই বলেছে সকলকে। সকালে আটটা নাগাদ ঘরের দরজা খুলে সে ভেতরে ঢোকে। বাথরুমের দরজায় মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন ইরাবতী। মালতী ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানকে আর অনমিত্রকে ফোন করে। ডাক্তার এসে জানান প্রায় শেষরাতে মৃত্যু হয়েছে। তখন কিংশুক রায় কলকাতার বাইরে। তাঁকে খবর দিয়ে আনা হয়। আর বাড়িতে মানুষ বলতে ওই অনমিত্র। ইরাবতীর ভাই। পুলিশি ঝামেলা সন্তর্পণে এড়ানো হয়। কেউই পোস্টমর্টেমের নামে কাটাছেঁড়া করতে চাননি।  
“আচ্ছা, এই মালতী, যে আপনার মা’কে শেষবার দেখেছিল, সে এখন কোথায়?”   
কিরণমালা বলে, “সে নাকি সেইদিনই কাজ ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। এমনকি মায়ের দেওয়া কোনও জিনিস সে নিয়ে যায়নি। আমি কলকাতায় ফিরে অবধি তাকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, তার ফোন সুইচড অফ। মালতী আমাদের বাড়ির অনেক পুরনো লোক। তার চলে যাওয়াতেই আমার সন্দেহ বেড়েছে... তোমরা জানো, আগামী রবিবার, ঠিক সাতদিন পরে মায়ের স্মরণসভা। আমি খুব চেয়েছিলাম মালতীদি অন্তত সেইসময় আসুক। কিন্তু, আমি তো তার বাড়ি চিনি না, ফোনও বন্ধ...। যতদূর জানি তার বাড়ি ডায়মন্ডহারবারে, উস্থিতে।”  
“মালতীর ছবি থাকলে দিন। আর, অবশ্যই ফোন নম্বর। তিনজন সম্পর্কে একটু ডিটেলে দরকার। মালতী, ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান, অনমিত্র সান্যাল তো বটেই...।” 
রাণার কথায় কিরণমালা একবার তাকায় দেওয়ালের দিকে। সত্যজিৎ রায়ের সমস্ত সিনেমার পোস্টার দিয়ে একটা চমৎকার কোলাজ টাঙানো রয়েছে দেওয়ালে। সেদিকে তাকিয়ে বলে, “ভালো করে দেখো, সবটাই কেমন মিলেমিশে একাকার করে দেওয়া হয়েছে। টোটালিটিতে কোলাজটা অপূর্ব, আবার ছবিগুলো আলাদাভাবেও...”, বলতে বলতে যেন সম্বিত ফিরে আসে কিরণমালার, “সহেলি নন্দী বাবার এখনকার পিএ। আগের পিএ ছিলেন রাজীব বর্মণ। তিনি মারা গেছেন। এর বেশি আমি এদের সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এখন আমাদের ডাক্তার বিতান রায়চৌধুরী, ওনার বাবা বিশ্বেশ্বর রায়চৌধুরী আসলে আমাদের এই পরিবারের ডাক্তার ছিলেন একসময়। ডাক্তারজেঠুকে আমি ছেলেবেলা থেকে দেখছি। ডাক্তারজেঠু কিন্তু আমার বাবার কাকার বন্ধু, কিন্তু তাঁকে দাদু না বলে জেঠু বলতাম। উনি খুব আসতেন, আমিও গিয়েছি ওঁদের বাড়িতে। ওনার বয়স হয়েছে অনেক। শুনেছি ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছে। বিতানদাই এখন আমাদের বাড়ির ডাক্তার। ল্যান্সডাউনে বাড়িতে পুরনো চেম্বারে বসেন, আর নিজের আলাদা চেম্বার আছে বালিগঞ্জে। আমি বিতানদার পার্সোনাল নম্বর দিচ্ছি।” 
বিতান রায়চৌধুরীর নাম খুঁজে নম্বর বের করে দেয় কিরণমালা।    
“আর আপনার মামা, অনমিত্র...” 
কিরণমালা ঢোঁক গেলে। স্পষ্টই একটা অস্বস্তি। 
“আমার মা ইরাবতী সান্যালরা তিন ভাই-বোন। আমার মা বড়। তার পরে অনমিত্র আর অনিন্দিতা যমজ। অনিন্দিতা অর্থাৎ আমার মাসির বিয়ে হয় খুব অল্প বয়সে। ডাকসাইটে সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তা’ই ছিলেন।” 
“ছিলেন মানে?” কিরণমালাকে বাধা দিয়ে জিগ্যেস করে রাণা।
“ছিলেন, কারণ অকালবৈধব্য তাঁকে অনেক সমস্যায় ফেলে। একই সঙ্গে আমার মায়ের বাবার পক্ষে সওদাগরি অফিসের সামান্য বেতনের চাকরি সম্বল করে তিন ছেলে-মেয়েকে খাইয়ে-পড়িয়ে মানুষ করা কঠিন ছিল। যদিও আমার মায়ের ঠাকুর্দা-ঠাকুমা খুবই গুণী মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাঁদের ছিল বইয়ের নেশা। মেহগনি কাঠের দুটি আলমারি আর ট্রাঙ্কে ছিল প্রচুর বই। সাধ করে একটা পড়ার টেবিল পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। আর একটি ইজিচেয়ার। কালক্রমে সেই টেবিল আমার মায়ের সম্পত্তি। শুনেছি দাদু কবিরাজি চর্চা করতেন। প্রচুর মানুষের উপকার করতেন এরা দু’জন। নিজেরা না খেয়ে অন্যকে খাবার খাইয়ে দিতেন। সংসারে একেবারেই মনোযোগী ছিলেন না। মা তাঁদের ওই গুণটি পান। মায়ের বাবা-মা একটি বছর উনিশের বিধবা মেয়ে, একটি অপোগণ্ড ছেলে এবং একটি কলেজে পড়া বাইশ বছরের মেয়েকে পৃথিবীতে ফেলে রেখে অকালে অতি অবিবেচকের মতো মারা যান। তখনও আমার মায়ের ঠাকুর্দা বেঁচে। তিনি কি ভেবে, সেই একটি ছোট্ট বাড়ি, ঠাকুর্দার নিজের নামে, সেটি উইল করে দিয়েছিলেন আমার মায়ের নামে। কেউ জানত না। মা একদিন ট্রাঙ্কের ভেতর সেটি খুঁজে পান। মায়ের ডেস্কে সেই উইল আমি নিজে দেখেছি। ঠাকুর্দার একটা খাতা ছিল... অনেক কবিরাজি ওষুধ লেখা ছিল তাতে... সেটাও মা খুব যত্ন করে রেখেছিলেন।   
“মায়ের ঘাড়ে সংসারের চাপ এসে পড়ে। মা পড়তে পড়তেই চাকরির চেষ্টা করেন। নানানরকম কাজের অভিজ্ঞতা হয়। কখনও স্কুলের পার্ট-টাইম চাকরি, কখনও ছোট অফিসে রিসেপশনিস্ট, সেলস-গার্লের কাজও নাকি করেছেন। এতরকম জীবন দেখছেন বলেই বোধহয় অত সাবলীলভাবে সেসব লিখতে পারতেন মা।” 
দীপু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। সাহিত্যিক ইরাবতী সান্যালের এই অতীত জীবন কেউ জানেন কী? একটু উসখুস করে সে কিরণমালাকে প্রশ্নটা করেই ফেলে। 
কিরণমালা একটু হাসে। করুণ হাসি। “মায়ের অতীত জানি শুধু আমি। মা বাইরের কাউকে বলত না। মা অতীত ভাঙিয়ে খেতে চাইত না।”   
“কিংশুক রায়ের সঙ্গে বিয়েটা তাহলে...”
রাণার প্রশ্ন শুনে কিরণমালা বলে, “সেই কথাতেই আসছি। আমার মাসি অনিন্দিতা নিজের দুর্ভাগ্য মেনে নিতে পারেনি। পাশের পাড়ার একটি বাউণ্ডুলে ছেলের সঙ্গে সে ঘর ছাড়ে। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। আর কোনও খোঁজ রাখেনি কেউ। আমার মামা বেশিদূর পড়েনি। কোনওক্রমে ঘষেমেজে পাস গ্র্যাজুয়েট। মাথার ওপরে কেউ নেই। এই সময়ে একটি কোম্পানিতে মা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যায়। সেই ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন আমার বাবা কিংশুক রায়ের কাকা কল্যাণ রায়। এই কোম্পানির গোড়াপত্তন তিনিই করেন। চাকরি পাওয়ার প্রায় বছরতিনেক পরে এই বাড়িতে মায়ের বিয়ে। যদিও সেটা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। অনেকেই এই বিয়ে মেনে নেয়নি। একেবারে পিতৃ-মাতৃহীন একটি মেয়ে, তার বিধবা বোন পালিয়েছে, ভাই অকালকুষ্মাণ্ড... তবুও একেই কেন? তবে ডাক্তার জেঠু মা’কে প্রচণ্ড ভালবাসতেন। তিনি এই বিয়ে সমর্থন করেন। কল্যাণ রায় আর তাঁরই ছেলেবেলার বন্ধু ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বিশ্বেশ্বর রায়চৌধুরীর চেষ্টায় এই বিয়ে হয়। অদ্ভূত ব্যাপার হল, মায়ের বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যে কল্যাণ রায় আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে স্পষ্ট লিখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। কিন্তু জেঠু বলতেন, কল্যাণের মৃত্যুর জন্য দায়ী সিস্টেম। সেটা ঠিক আজও আমি বুঝতে পারিনি।”             
“কিন্তু একটা বিষয় এখনও পরিষ্কার নয়। ইরাবতী সান্যালকে মেরে কার কী লাভ হতে পারে?”
“লাভ প্রত্যেকের। ইরাবতী সান্যালের নামে কোম্পানির শেয়ার, কল্যাণ রায় মা’কে বিয়ের সময় কোম্পানির কিছুটা অংশের ভাগ লিখে দিয়ে যান। এই বাড়ির অর্ধেক মালিকানা মায়ের। আমার মামা যে বাড়িতে থাকেন, সেটিও তাঁর নামে নয়। জানিনা, মা’কে চাপ দিয়ে মামা নিজের নামে বাড়ি লিখিয়ে নিয়েছেন কিনা। তবে মায়ের একটি অপ্রকাশিত আত্মকথা রয়েছে। সেটাতে মারাত্মক সব তথ্য লিখেছেন মা। সে তথ্য নাকি অনেকের জীবন উল্টেপাল্টে দিতে পারে। তার আভাস আমি পেয়েছি।”     
“আত্মকথা, আই মীন, নিজের জীবনের কথা?”   
“হ্যাঁ। আমি যতদূর জানি, সেটি ‘ভাষা আঙিনা’ পত্রিকার জন্য রেডি করছিলেন, শেষ পর্যন্ত মা জমা দিয়েছিলেন কিনা আমি জানি না। খুবই বিতর্কিত সব তথ্য রয়েছে। মা বলেছিলেন, ওই আত্মজীবনী প্রকাশিত হলে অনেকের খুব অসুবিধে হতে পারে...”     
“কার অসুবিধে? কিংশুক রায়ের?”
কিরণমালা চুপ করে থাকে। বলে, “আমি জানি না।” 
“আচ্ছা বেশ,” রাণা প্রশ্ন ঘুরিয়ে নেয়, “আপনার মামাকে তো দেখলাম। আপনার মাসি, যিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন, তিনি এখন কোথায়?”
কিরণমালা ঘড়ির দিকে তাকায় একবার। “তিনি বেঁচে নেই বলেই জানি। অন্তত মা আমাকে তাই বলেছিলেন। তাঁর কোনও ছেলে-মেয়ে ছিল কী-না... নাঃ, মা তাঁর কথা কখনও বলতেন না... কিন্তু মামা যে ফ্যাকটরিতে কাজ করতেন, সেটা বন্ধ হয়ে যাবার পর মা’ই বাবাকে বলে কিছু কাজ জোগাড় করে দেন। মামা প্রায়ই আসতেন। টাকা-পয়সা চাইতেন। কীরকম যেন হিংসে করতেন সকলকে... ভালো লাগত না। আমার বিয়ের পর ও-ই তো সব... যাক গে, আমাকে এবার উঠতে হবে। এবার তোমাদের হাতে বাকি কাজের ভার রইল,” বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় কিরণমালা।   
“ইরাবতী সান্যাল বহরমপুরে থেকে চাকরি করেছেন বহুদিন। সেই সময়কার কথা জানেন কিছু?”
“নাঃ। মা কখনও অতীতের কথা চট করে বলতে চাইতেন না।” 
“ইরাবতী সান্যালের উইলটা দেখেছেন আপনি?”
কিরণমালা পিছন ফিরে তাকায়। “যতদূর জানি, মায়ের উইল অনুযায়ী মায়ের সব বইয়ের কপিরাইট আমার। আর মায়ের সেই বাড়িটি, যেটিতে এখন আমার মামা-মামী থাকেন, সেটিও আমার নামে ট্রান্সফার করেছেন...ডেস্কের ওই তালাটা তো নতুন। ভাঙলে হয়ত দেখা যাবে গয়নাগাঁটি কিছুই নেই...। এসে অবধি লেখার পাণ্ডুলিপিটাও খুঁজে পাইনি। মায়ের কম্পিউটারে যা রয়েছে, সব বছরখানেক আগের লেখা। সাম্প্রতিক লেখা কিচ্ছু নেই...।”   
“আপনি ব্যাংকের লকারে গিয়েছিলেন?”
“গিয়েছিলাম। লকারে খুব সামান্য কিছু রয়েছে। মায়ের গয়নার প্রতি মোহ ছিল না। শুধু একটা হিরের আংটি মায়ের ডেস্কে থাকত। আর একটা পুরনো ডিজাইনের কানপাশা, কঙ্কন আর বিছেহার। ওগুলো মা কেন জানি না ওই ডেস্কেই রাখতেন।” 
“ওই গয়নাগুলো কার দেওয়া কিছু জানতেন?” 
“বিয়েতে ডাক্তারজেঠু দেন।”   
( ক্রমশঃ)