অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

রাখী আঢ্য

                             



ফিরেআসা



-" একটু বসো,  কিছু কথা আছে। অবশ্য জানিনা সব কথাগুলো ঠিক মতো গুছিয়ে বলা হবে কিনা,তবে কথাগুলো..." বাকিটা আর  কাশির দমকে শেষ করতে পারল না। কাশির সাথে সাথে অনিরূদ্ধের রোগা শরীরের বুকের খাঁচাটাও যেন হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল। ওর দিকে জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, "কি এমন কথা যে তুমি যে সবাইকে চলে যেতে বললে?  সুস্থ হয়ে একেবারে বাড়ি চলো, তারপর না হয় কথা হবে।"

-"না, কাছে এসো। বড় দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছো যে, তোমাকে তো ভালো করে দেখতেই পাচ্ছি না।"

পিপিই কিট ও মাস্কের মধ্যে চেহারাটা সত্যিই মালুম হয় না। চেনা মানুষজনকেও অচেনা লাগে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম,"আমি কাছে গেলেও চিনতে পারবে না।"   মনে মনে ভাবলাম এত দিন যখন কাছে থেকে বুঝতে পারোনি তাহলে আজ কি করে চিনবে? আমার কথাগুলো বোধহয় অনিরুদ্ধর কান অবধি পৌঁছায়নি।  নিজের মনেই বিড়বিড় করে চলেছি কত কথা... বিড়বিড় করে চলেছি নাকি স্মৃতি রোমন্থন করছি সেটাই বুঝতে পারলাম না।


যেদিন অনিরুদ্ধের কাছ থেকে চলে আসব ঠিক করলাম সেদিনই দেশের সরকার ঘোষণা করল করোনা নামক এক অজানা ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাস বিদেশের মাটি থেকে চলে এসেছে এদেশে। এখন দরকার প্রচুর পরিমাণে সর্তকতা। মানুষ এখন নাকি মানুষের সঙ্গে মিশতে পারবেনা। মুখ ঢেকে রাখতে হবে মাস্ক  দিয়ে। সব থেকে বড় কথা হল লকডাউন নামক এক অচেনা শব্দের সাথে পরিচিত হলো সারা পৃথিবীর মানুষ। বন্ধ হয়ে গেল যানবাহন, দোকান-বাজার, মল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত। স্তব্ধ হলো জনজীবন। হঠাৎ করে সমস্ত মানুষ হল ঘরবন্দি, সব রকম কোলাহল থেমে গিয়ে এক আশ্চর্য নীরবতা  চারিদিকে। শুধু শোনা যায় প্রকৃতির কলতান, যেন মানুষকে বন্দি করতে পেরে প্রকৃতি আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে, স্বাধীনতা পেয়েছে।

এই অবস্থায় আমার  কলকাতা যাওয়াটাও  বাতিল হয়ে গেল।  সুদূর মুম্বাই থেকে কোনোভাবেই যাওয়া সহজ হলো না। অথচ দীর্ঘ এক বছর ধরে অনিরুদ্ধের সাথে নানান মতান্তরে মধ্য দিয়ে যেতে যেতে মনে হয়েছিল যে এটাই আমার শেষ উপায়, নিজেকে ওর থেকে সরিয়ে নেওয়া। তাহলে হয়তো সব ঠিক হবে। সেই মতনই ঠিক হয়েছিল যে মার্চ মাসের শেষদিকে আমি ফিরে যাবো নিজের বাড়ি কলকাতায়। সবথেকে আশ্চর্য লেগেছিল আমার এই সিদ্ধান্তে অনিরুদ্ধের কোনো হেলদোল ছিল না। বিমূঢ়ের  মত কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে চেয়ে ছিল। তারপর বলল, "তোমার যা ইচ্ছা তুমি করতে পারো।  আমি তোমাকে কোন বাধা দেবো না।" হ্যাঁ,সেও মেনে নিয়েছিল আমার চলে যাওয়াটা। আমার বুকের মধ্যে একটা ইস্পাত রাঙা মেঘের মতো ভয়, নাকি উদ্বেগ না  অস্থিরতা ছেয়ে গেছিল সেটা নিজেও জানিনা। তবে এটা বুঝেছিলাম আজ থেকে আমি একা, ভীষণই একা। নিজেকে গোছানোর জন্য কিছুটা সময় দরকার ছিল আমার।


*********


 আমার কলকাতা যাওয়া বাতিল হয়ে যাওয়ার খবরে  অনিরুদ্ধ  খুশি  হল না দুঃখিত হল সেটা বুঝতে পারলাম না। তবে দু'জনের মধ্যে সরু ফাটলটা যে  আস্তে আস্তে চওড়া হচ্ছে তা অনুভব করলাম।

 মাসখানেক পরের কথা।  একদিন সন্ধ্যাবেলায় অনিরুদ্ধ কে দেখলাম গুটিসুটি মেরে খাটের কোনটাতে শুয়ে আছে। ওর এইভাবে শোওয়াটা অস্বাভাবিক লাগলো আমার। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কপালে হাত দিতেই হাত সরিয়ে নিলাম। মনে হল যেন সারা মাথা থেকে আগুনের হল্কা বেরোচ্ছে। থার্মোমিটার দিয়ে চেক করে দেখলাম 103 এর উপর জ্বর। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে উনি বললেন তাড়াতাড়ি নার্সিংহোমে ভর্তি করে দিতে। প্রতিবেশী কয়েকজনের সহায়তায় নার্সিংহোমে ভর্তি করলাম। ‌ দু'দিন পর করোনা টেস্ট রিপোর্ট এলো পজেটিভ। মনে হয়েছিল পায়ের পাতা বরফে পুঁতে দিয়েছে কেউ। প্রচন্ড নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম।  আজ চারদিন হল অনি ভর্তি আছে। এই চারদিনে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে, রোজই এসেছি আমি দেখতে, কিন্তু আজকে হঠাৎ অনি এইভাবে কেন বলে উঠলো, "তৃষা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।"

-"বলো, কি বলবে? আর এত তাড়াহুড়ো কিসের? তুমি বাড়ি চলো তারপর না হয় আমরা কথা বলবো।"

-"না তৃষা আজ বলে নিতে দাও। আমার কোথায় কত টাকাপয়সা আছে তোমার জানা দরকার। আমি ভালো বোধ করছি না। এক এক সময় মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে, এত কষ্ট হচ্ছে। ভয় হচ্ছে যদি বেঁচে ফিরতে না পারি তাহলে তোমার কি হবে?"

পিপিই কিট,মাস্ক ভেদ করে আমার  শরীরের কাঁপন আর চোখের জল অনিরূদ্ধ কেন, কারোরই নজরে আসার কথা নয়। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় আমি বললাম," কেন ফিরবে না তুমি? তুমি আমি দুজনেই একসাথে ফিরে যাব আমাদের ফ্ল্যাটে।"  ঈশ্বর মানুষকে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ভাষা দিয়েছেন। সেই ভাষা অনেক সময় মনের মধ্যে যে কথা তোলপাড় হচ্ছে তাকে পরিপাটিভাবে ঢেকে অন্য কথা উচ্চারণ করার শক্তিও দিয়েছেন। তাই হয়তো আজ সকালেই ডক্টর মিত্র আমাকে যে কথাটা বলেছেন সেটা সকাল থেকে ওকে বলে উঠতে পারিনি। ক্রমাগত  অন্য কথাই বলে চলেছি।


এতক্ষণ অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার অনিরুদ্ধর একদম কাছে এগিয়ে গেলাম। পিপিই কিট সরিয়ে, মাক্স খুলে নিজেকে নিয়ে গেলাম অনিরুদ্ধর একদম কাছে। দুজনের শ্বাস, হৃদয়ের স্পন্দন যেন অনুভব করতে পারলাম বহুযুগ পর। অনিরুদ্ধর মুখটা  দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম," তুমি কি জানো অনি, পজেটিভে পজেটিভে নেগেটিভ হয়?" তাই তোমার আমার দুজনেরই আর কোন ভয় নেই। আমরা নিশ্চয়ই ফিরে যাব আমাদের ফ্ল্যাটে। নিজেদের জীবনটা আবার নতুন করে ফিরে পাবো।"

-"তার মানে?' অনিরুদ্ধের  অবাক কণ্ঠস্বর।

-" তার মানে এটাই যে আজ সকালে রিপোর্টে জানতে পেরেছি আমিও কোভিড পজেটিভ। ডক্টর আমায় আজ ভর্তি হতে বললেন।"

অনিরুদ্ধ এবার জোরে হা হা করে হেসে উঠে বললো, "সত্যিই তোমার যুক্তির কাছে সবকিছু হার মানে।"

অনিরুদ্ধর এই প্রাণখোলা হাসির সাথে মনে হল সে নিজের মধ্যে অনেকটা অক্সিজেন নতুন করে গ্রহণ করলো যা তাকে এবং আমাকে আগামী দিনে লড়ার অনেকটা শক্তি জুগিয়ে গেল।


অর্পিতা বোস

                   




অমলতাসের ডাইরি



____________


মানসীর হাতে ডায়েরিটা দিয়ে তিতিন  বলে,

-- পারলে ক্ষমা করো মামনি।

 অবাক চোখে মানসী তাকায়। তিতিন ডায়েরি খুলে সামনে রাখে মানসীর।  শুকিয়ে যাওয়া অমলতাসের বিবর্ণ পাতার  বুকমার্ক। বাঁদিকের পাতায় মানসীর শেষ  লেখা আর ডানদিকের পাতাটা থেকে তিতিনের হাতের লেখা!

তিতিন ধরা গলায় বলে,

-- মামনি অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই জানি। কিন্তু বাবা দিয়েছিল পড়তে। বাবাও পড়েছিল , আর পড়েই বোধহয় তোমাকে আরও শ্রদ্ধা আর আমার প্রতি...

 কথাটা আর শেষ করতে পারেনা তিতিন। চোখ মুছে একটু সময় নেয় যেন পরের কথাগুলো গুছিয়ে বলার জন্য।

  নীরব মানসীর চোখে শুধু শূন্যতা খেলা করে। আবার  তিতিন বলতে শুরু করে,


 -- মামনি তোমাকে তখন আমার মনে হতো রূপকথার গল্পের ডাইনি। তাই অমন করেছি। তোমাকে অ‍্যাসাইলামে পাঠিয়েও  রাগ কমেনি আমার। তুমি চলে যাওয়ার পরে ঠাম্মাম বাবাকে লুকিয়ে তোমার জামাকাপড় বের করে দিত। আর সব ধ্বংস করার নেশায় মেতেছিলাম আমি । তোমার সব শাড়ি কেটে কুচিকুচি করতাম। আমার খুব আনন্দ হতো। যেন তোমাকেই এভাবে শেষ করছি।মারছি । নিজের সব রাগটাই যেন তোমার জামাকাপড়গুলোতে  মেটাতাম আমরা। তারপর শুরু হলো তোমার গাছদের ধ্বংস করার পালা। আমি পারতাম না। ঠাম্মাম গরম জল ঢেলে দিত। গাছগুলো মরে যেত। কিন্তু একটা গাছ কিছুতেই মরছিলনা। তখন ভারী টবটা  

ঠাম্মাম তুলে ফেলে দিতে গেল। আর হঠাৎই ব‍্যালেন্স হারিয়ে ঠাম্মামও ছাদ থেকে পড়ে গেল। চোখের সামনে  ঠাম্মামকে পড়ে যেতে দেখে কেমন হয়ে গেছিলাম জানো। তোমার কথা মনে এসেছিল প্রথম। কিন্তু  তুমি তখন অনেক দূরে।

একটু থেমে আবার বলতে থাকে তিতিন,


   --  ঠাম্মামের মৃত্যুটা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে মামনি। মাকে কখনও দেখিইনি। ঠাম্মামই আমার সব ছিল।  যা বলত সবটাই ঠিক বলে জানতাম। তোমাকে বাবা বিয়ে করে আনল। ঠাম্মামের ইচ্ছে ছিল না।  তোমাকে নিজেও অপছন্দ করত আর আমাকেও শেখাতো যে তুমি খারাপ। তুমি  বাবাকে আমার থেকে নিয়ে চলে যাবে। তোমরা অন্য বাড়িতে থাকবে। আর তোমার পেটে একটা ভাই আছে। বাবা আমাকে না ঐ ভাইকেই বেশি ভালোবাসবে।

তখন  বুঝতাম না মামনি। ছোট আমি। নরম মাটির মতো মন ছিল। যা বলেছে ঠাম্মাম তাই বিশ্বাস  করেছি।


মানসী চুপ করে শুনছিল তিতিনের কথা। শুনছিল না আসলে ফিরে গিয়েছিল  সেই  কলেজজীবনের শেষ দিনে....

 পরীক্ষার ফলের লিস্টে দ্বিতীয় স্থানে  নিজের নামটা দেখেই খবরটা দিতে   অমলদার বাড়িতেই প্রথম ছুটেছিল তরুণী  মানসী। কিন্তু বাড়ির গলির সামনে  গিয়ে  পাদুটো আটকে গেল। থিকথিক করছে ভিড়। সদ‍্য পাওয়া চাকরি থেকে ফেরার পথে বাইকের সাথে মুখোমুখি ধাক্কায় অমলদার নিষ্প্রাণ দেহটা রক্তে মাখামাখি।

 নাহ্ আর এগোতে পারেনি মানসী। ঝাপসা চোখে ফিরেছিল বাড়ি। এরপর একমাত্র মানসী জানে অমলদা চলে যাওয়ার পর নিজের বদলে যাওয়া জীবনের যন্ত্রণা। অমলদাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট যতটা ছিল তারসাথে ছিল অন্য এক অনুভব। সময়ের সাথে সাথে শরীরের মাঝে অমলদার স্মৃতিকে অনুভব করতে থাকল। সেই বর্ষার সন্ধ্যায় অমলদার সাথের ঘনিষ্ঠতার ফসল।  অনেক চেষ্টাতেও লুকিয়ে রাখতে পারেনা মায়ের চোখকে। 

প্রচন্ড মার খেয়েও অমলদার নাম উচ্চারণ করেনি মানসী। মা চেয়েছিলেন নষ্ট করতে। কিন্তু  ডাক্তার জানাল অনেক দেরি হয়ে গেছে। লোকের চোখকে ফাঁকি দিতে  দিশেহারা তখন মা। তারপর কোথা থেকে  সম্বন্ধ আনল মায়ের বিশ্বস্ত বান্ধবী।  শুভব্রত অর্থাৎ তিতিনের বাবার সাথে। বিয়ে তো না শুভব্রতর সাথে অলিখিত  চুক্তি পত্রে সই হলো যেন।

অমলদার সন্তানকে বৈধ স্বীকৃতি দেবেন          

শুভব্রত। আর বিনিময়ে তিতিনের মা হয়ে  উঠতে হবে মানসীকে। অবশ্য রাজি হওয়া ছাড়া আর কিই বা করতে পারত!অনাড়ম্বর ভাবে বিয়ে  হলো।

কিন্তু এবাড়িতে এসে দেখে এক  ভয়ানক  পরিস্থিতি। তিতিন আর তিতিনের ঠাম্মাম  কিছুতেই সহ‍্য করতে পারত না মানসীকে। শুভব্রতর সামনে বুঝতে দিত না। শুভব্রত বেরিয়ে যেতেই বদলে যেত বাড়ির পরিবেশ। তিতিনকে ধারেকাছে আসতে দিতেন না শাশুড়িমা। মিষ্টি  কিশোরী   তিতিনকে মানসী কাছে ডাকতে গেলেই তিতিন ছুটে পালাতো। সাথে মুখে সবসময়  বলতে থাকত,

-- তুমি আমার  সৎমা। তুমি বাজে মা।তুমি ডাইনি।


 অসহায় মানসী একা ঘরে কাঁদত। তিতিনকে বারবার নিজের করে নিতে  চাইছিল। আর তিতিন ততটাই দূরে সরিয়ে   রাখছিল ঘৃণার সাথে। শুভব্রতকেও কিছু  বলতে পারতনা। শুধু কষ্টগুলো অক্ষরবন্দী করত অমলদার দেওয়া ডায়েরিতে। সেবছর জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল অমলদা। তিতিনদের বাড়ির সামনে থাকা  অমলতাস গাছের একটা পাতাকেই  মার্কার  হিসেবে ব‍্যবহার করত। 


 -- মামনি..

তিতিনের ডাকে বাস্তবে ফেরে  মানসী। তিতিন বলে,


-- মামনি, ঠাম্মামের মৃত্যুর পর সব বদলে গেল জানো। একা একা এই বাড়িতে  ঠাম্মামের অভাব পূরণ করার জন্য  তোমার ঘরে আসতাম।মনে হতো যদি তুমি  কাছে ডাকতে  তখন  তবে ছুটে চলে যেতাম  তোমার কাছেই। কিন্তু  তুমি তো তখন  কোথায়  হারিয়ে গেছিলে। বাবা আর আমি  অনেক খুঁজেছিলাম তোমাকে কিন্তু খুঁজে পাইনি।


মানসী আপনমনে ভাবে, সত্যিই  হারিয়ে গিয়েছিল। অ‍্যাসাইলামের ডাক্তার  দিদিমনির সাহায্যেই হারিয়ে গিয়েছিল  অনেক  দূরে।হ‍্যাঁ, ডাক্তার দিদিমনির  চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠা মানসী বলেছিল জীবনের প্রতিটা কথা। আর সাহায্য চেয়েছিল ডাক্তার দিদিমনির কাছে নতুন করে বাঁচার। সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিদিমনির প্রশিক্ষণে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন। সমাজের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে  শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত  হলো। তারপর এই অনাথাশ্রমের দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন ডাক্তার দিদিমনি। এখানেই ভালো থাকার চেষ্টায় আছে। সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ভুলতে পারেনি সন্তান হারানোর শোক। অমলদার স্মৃতিচিহ্ন চিরদিনের মতো মুছে দেওয়ার অপরাধী আজ মানসীর সামনে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। বুকের মধ‍্যে লুকিয়ে রাখা নরম ক্ষতটা  আজ আবার  কষ্ট দিচ্ছে।


-- মামনি....


     তিতিনের মুখে " মামনি" সম্বোধনটা যেন  সেই নরম ক্ষততে কাঁটার আঘাত দিচ্ছে।তবে সেদিন বোঝেনি ছোট্ট তিতিনের কাজের পেছনে আরেকজন ছিল।সেদিন এই তিতিন আর ওর ঠাম্মামের  ষড়যন্ত্রেই মানসীর এই সন্তানশোক।


--  মামনি তুমি এমন চুপ করে থেকোনা  প্লিজ। কিছু  বলো...


অনেককিছুই বলতে পারে মানসী কিন্তু কিছুই বলতে পারছেনা। উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ায়। 

 --  মামনি,  আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি মামনি। শুধু তোমার কাছে সব দোষ স্বীকার করব বলে। তোমার ডায়েরি পড়ে বুঝেছি আমি কত ভুল করেছি। মামনি যা করেছি তার কোনো ক্ষমা হয় না তবু যদি পারো ক্ষমা করো।


নিজেকে সামলে কান্নাভেজা গলায় তিতিন বলে,

--  মামনি, ডায়েরিটা রেখে গেলাম তোমার কাছে।  আমার অপরাধের স্বীকারোক্তি  হিসেবে। বাকিটা তোমার হাতেই ছেড়ে দিলাম। আমি আসছি মামনি। 


 মানসী ঝাপসা চোখে দেখে তিতিন অনাথাশ্রমের গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে  গেল একটু একটু করে।বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। কত ছোট ছিল মেয়েটা। অনেক বড় হয়ে গেছে।


ডায়েরিটা তুলে নেয়। অমলতাসের শুকনো পাতার গায়ে হাত বুলিয়ে যেন অমলদার  স্পর্শ  অনুভব করে। বুকমার্ক। জীবনের  একটা অধ‍্যায়ের নিশান।  ডানদিকের পাতায় তিতিনের হাতের  লেখা। মানসী পড়তে  শুরু  করে....



ভোরের আলো ছুঁয়ে যায় মানসীর খাট।  ডায়েরিটা পড়তে পড়তে কখন রাত শেষ হয়েছে খেয়াল নেই। পাতায় পাতায়  অপরাধবোধের অনুতাপ। আর মানসীকে খুঁজে  না পাওয়ার হাহাকার। কোথাও লেখা,

"একবার ফিরে এসো মামনি, তুমি  যা বলবে তাই করব"

 আবার কোথাও  লেখা,

"  কখনওই কি আর তোমাকে  খুঁজে  পাব না মামনি!"

 

 অমলতাসের পাতা দিয়ে নিশান করেছিল  যে পাতাটা মানসী। পাতাটা আবার খোলে। তিতিনের লিখিত  স্বীকারোক্তি,


"  ঠাম্মাম বলেছিল যদি তোমার পেটের ভেতরে থাকা ভাইটা আর তুমি দুজনেই  মরে যাও তবে বাবা আবার  আমাকেই  শুধু  ভালোবাসবে। 

মামনি, সেদিন তাই ঠাম্মামের কথা শুনে আমিই  তোমাকে ডেকেছিলাম নীচ থেকে।ঠাম্মাম সিঁড়িতে জল আগেই ফেলেছিল।  যাতে তুমি দৌড়ে নামতে গিয়ে অসতর্ক হয়ে  পড়ে যাও। আজ স্বীকার করতে বাধা নেই। যখন তুমি পড়ে গেলে চোখের সামনে। তখন খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তুমিও মরে গেছ। বাবা শুধু আমাকেই  ভালোবাসবে। কিন্তু  হঠাৎই দেখি ঠাম্মাম বাবার অফিসে ফোন করল। বাবা এলো তোমাকে নিয়ে নার্সিংহোমে গেল। আর তারপর যেদিন তুমি বাড়িতে এলে। আর আমাকে দেখেই কেমন হয়ে গেলে। কিসব বলতে বলতে আমাকে মারতে  আসলে। ভয় পেয়েছিলাম খুব। ঠাম্মাম আর বাবা তোমাকে ধরে রাখতে পারছিল না। তারপর তোমাকে নিয়ে গেল অ‍্যাসাইলামে।  মামনি তারপর সব কেমন  বদলে গেল। "

অমলতাসের বুকমার্কটা আবার  ডায়েরির সেই পাতায় রেখে ডায়েরিটা বন্ধ করে মানসী। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের ছবি। সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা মানসী সেদিন দুপুরে একটু চোখ বুজেছে। তিতিনের স্কুল ছুটি। ঠাম্মামের ঘরেই আছে। হঠাৎই তিতিনের একটা চিৎকার  শুনে ঘুমটা ভাঙে। দৌড়ে বেরিয়ে দেখে তিতিন একতলায় মাটিতে বসে কাঁদছে।  তাড়াহুড়োয় ঘুমচোখে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। 

জ্ঞান আসতে নিজেকে নার্সিংহোমের বেডে খুঁজে পায় মানসী। সিস্টারের থেকে  জানতে পারে অমলদার শেষ চিহ্ন চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। আর এটা যে একটা সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো  দুর্ঘটনা সেটা বুঝতে পারে। এক প্রচণ্ড  আক্রোশ আর ঘৃণা জন্মায় তিতিনের  ওপর। সুস্থ হয়ে  বাড়ি  ফিরতেই  তিতিনকে দেখেই  আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনা মানসী। 

    তারপর ...

 জীবনটা বদলে গেল অ‍্যাসাইলামে আর পরবর্তী সময়ে। শুধু সেদিনের জন্য  ক্ষমা করতে পারে না তিতিনকে। কিন্তু  আজ ডায়েরির লেখাগুলো নাড়া দিয়ে গেল মানসীকে। তিতিনের দিক থেকে ভাবে।  একটা ছোট বাচ্চার মনে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন শাশুড়ি মা। তিতিনের দোষ   বোধহয় সেভাবে দেখতে গেলে ছিল না।  আর এতগুলো বছর ধরে যে অপরাধবোধের গ্লানিতে ভুগছে মেয়েটা। তাতেই বোধহয় এই অপরাধের থেকে  মুক্তি  দেওয়া যায়  তিতিনকে। শুধু অমলদার  শেষ চিহ্নটা...

      

ডায়েরির থেকে অমলতাসের শুকনো পাতার বুকমার্কটা তুলে নেয় মানসী।এই ডায়েরিটাই তো অমলদার দেওয়া। অমলতাসের পাতাটা বের করে আবার   সেই পাতার মাঝে রাখে মানসী। বাঁদিকে মানসীর শেষ লেখা আর ডানদিকে  তিতিনের লেখা শুরু। দুটো মনের ভিন্ন ভাবনার যোগসূত্রের মতো আটকে থাকে অমলতাসের শুকনো পাতার বুকমার্ক...

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

প্রগতি মাইতি

                    




এদিক ওদিক সেদিক



একদিকে জাতীয় গ্রন্থাগার, অন্যদিকে চিড়িয়াখানা। আমি চিড়িয়াখানায় ঢুকলাম। একদিকে প্রেসিডেন্সি, অন্যদিকে কফিহাউস। আমি কফিহাউসে ঢুকলাম । একদিকে মেডিক্যাল কলেজ, অন্যদিকে হাড়কাটা গলি। আমি গলিতেই ঢুকলাম ।একদিকে প্রাচুর্য, অন্যদিকে দারিদ্র। আমি দারিদ্রের মধ্যে ছিলাম, আছি, থাকবোও। একদিকে গল্প, অন্যদিকে কবিতা। আমি কবিতায় ডুব দিলাম। একদিকে মৃত্যু, অন্যদিকে পরমা সুন্দরী । কী ভাবছেন? আমি কোনদিকে যাবো? এবার আমি থমকে দাঁড়ালাম।

পাপিয়া গাঙ্গুলি

                           


চা চাই 
 

বাসটা মিস করলো গুপি। রাতের শেষ বাস ছিল। দূরপাল্লার টাইমের বাস। অফিসে আজ মিটিং ছিল। শেষ হতে রাত হয়ে গেল। বাবুরা তো গাড়িতে উঠে হাওয়া। তাদের আর কি। কাল রবিবার ভাগ্যিস। নাহলে আবার ভোর না হতেই অফিস খুলতে দৌড়াতে  হতো। সকাল নটায় অফিস শুরু। গুপি তার আগে এসে  অফিস খুলে আলো জ্বালায়। এসি চালিয়ে সাফ সাফাই করে রাখে। এমনিতে খুব দেরী হলে গুপি রাতে  থেকে যায় অফিসে। কাল মায়ের কি একটা পুজো আছে। ফোনে অনেকবার বলে দিয়েছে। বাড়ি যেতেই হবে। ট্রেন ধরা ছাড়া উপায় নেই।দুপুরে আকাশভাঙা বৃষ্টি হয়েছে। গরমের থেকে একটু রেহাই। এখন বৃষ্টির জোর কমলেও পুরোপুরি থামেনি। জল কাদা পেড়িয়ে শিয়ালদা স্টেশন পৌঁছলো। আধঘন্টায় পরের ট্রেন। এই বৃষ্টিতে চা ছাড়া বসে থাকা বিরক্তিকর। খিদেও পেয়েছে অল্প। চা পেলে খিদেটাও মরতো কিছুটা। 
চা খুঁজতে শুরু করলো। রাতের স্টেশন আজ অনেক খালি। হয়তো বৃষ্টির জন্য।
 " চায়ে গরম চায়ে "বলে কোনো হাঁকাহাঁকিও নেই। 
গুপি হাঁটাচলা করতে করতে একটা বেঞ্চে বসলো। মনটা চা চা করছে।  চা পাচ্ছে না।  একটু বিরক্তি এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এমন মুহুর্তে একটা চায়ের কাপ তার সামনে ঝুলতে দেখলো। 
 আনমনা ছিল তাই তার পাশেই এক চাওয়ালা  কখন এসে নিশব্দে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। চা'ওয়ালা ছেলেটা নিজে থেকেই একটা কাগজের কাপে চা এগিয়ে দিয়েছে  তার দিকে। ছেলেটা কি তার মন পড়তে পারলো? সে যেমন জানতে পারে অফিসার বাবুদের চা চাওয়া মন।  কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে চায়ের পয়সা এগিয়ে দিয়ে  কাপটা নিল  গুপি। ধোঁয়া ওঠা চা... মনটা খুশী হয়ে গেল। 
ট্রেনের হুইসেল। দ্রুত চুমুকে শেষ করলো চা। আজ ঠেলাঠেলি নেই । ঠেলাঠেলি কি প্রায় কোনো লোকই নেই। আশ্চর্য লাগলো।
একটা বসার জায়গায়ও পেল। জানলার পাশে। সেই ছোটো থেকেই জানলার পাশে সিট পেলেই তার মন ভালো হয়ে যায়। জানলার পাশে গুছিয়ে বসলো। এই কামরায় আর কেউ নেই। নিশ্চিন্ত লাগলো। নাহ্!   একজন প্যাসেন্জার  এলো পাশে । গুপী তাকিয়ে দেখলো।  মুখটা কেমন চেনা লাগলো ।  কোথায় দেখেছে। মাথা খাটাতে ইচ্ছে করছে না। তবে মাথায় ঘুন পোকার নিঃশব্দে কাজ চালাচ্ছে ভাবনাটা। ট্রেনটা খালি। সাড়াদিন খুব ধকল গেছে।  জানলার ঠান্ডা হাওয়া চোখটায় ঘুম এনে দিয়েছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানেনা।  একটা ঝাঁকানির  আওয়াজে ঘুমটা ভাঙলো। কোন স্টেশন দেখলে বোঝা যাবে কতটা ঘুমালো সে।
বাইরে তাকিয়ে দেখলো কোনো স্টেশন নয়। ঘুটঘুটে অন্ধকার শুধু। যাকে নিকষ কালো বলে। কিছু ঠাহর করা যাচ্ছেনা। 
কি আবার হলো!  ঘুম চোখে এদিক ওদিক  দেখলো।  পাশের লোকটা তার দিকে তাকিয়ে। কেমন অর্থহীন এক চাহনি। তার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেন? সেই চেনা চেনা মুখটা। 
হ্যাঁ ঠিক, মনে পরেছে এটা তো স্টেশনের চা'ওয়ালা ছেলেটা । চা বিক্রি করতে করতে ওর সহযাত্রী হলো কি করে!  ভাবতে ভাবতে নিজের জায়গায়  গুটিয়ে বসলো গুপী। কি এক অস্বস্তিকর অনুভূতি। শান্ত হয়ে বসতে পারছে না।  চারপাশে তাকিয়ে দেখলো।  এত ভিড় তো ছিল না!!! আশ্চর্য,  ভীড়ে  কোনো লোক দেখা যাচ্ছেনা।  সবকটা শুধু মুখ আর জোড়া জোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে। বেড়ালের চোখের মত চোখ গুলো জ্বলছে।   তার দিকেই তাকিয়ে চোখ গুলো । প্রতিটি মানুষের মুখ একই রকম দেখতে। মানে প্রত্যেকের মুখ ঠিক  স্টেশনের চা ওয়ালা ছেলেটার মতো। ঠান্ডা নিস্প্রাণ জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিয়ে পুরো ভীড়টা তার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে বসা সহযাত্রীও  একই দৃষ্টিতে একটা কাগজের কাপে চা এগিয়ে দিয়েছে তার দিকে। কাপটা দেখা যাচ্ছে। কারোর হাত দেখা যাচ্ছে না।   হিমেল হাওয়া গুপীকে আরও ঠান্ডা করে দিচ্ছে। ভেতরেও একটা ঠান্ডার স্রোত।  গুপী জোর করে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ের কাছে ফিসফিসানি " চা' টা গরম কিন্তু। " মনে হচ্ছে অনেক লোক একসাথে হিসহিসিয়ে  কথা বলছে।
গুপী সামনে হুটোপাটি করে এগোতে থাকলো। মনে হলো অনেক পায়ে তার পা আটকে যাচ্ছে ।অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গুপী ভিড় ঠেলে এগোবার মত করে চেষ্টা করলো ।  দিশেহারা অবস্থা।  ট্রেনটাও চলছে না।  আলো গুলোও জ্বলছে না।  হঠাৎ অনেক লোকের গলা শুনতে পেল। সামনেটা খালি লাগছে। এখন একটা আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে কিছুটা। একটা জটলা।  নিজেকে সে ট্রেনের দরজায় আবিস্কার করলো। জটলাটা ট্রেনের পাশের লাইনে।  গুপী অতগুলো মানুষ দেখে স্বস্তি পেলখানিক।  একলাফে নীচে নামলো। তারপর জটলার দিকে এগোলো। ভেতর উঁকি দিয়ে দেখল। একটা থ্যাতলানো মৃতদেহ। মুখটা চেনা যাচ্ছে না। শার্টটা চেনা।  পকেট থেকে আইডি  কার্ডটা বেড়িয়ে আছে। ছবিটা তার নিজের। জামাটাও শেষ পুজোয় মায়ের দেওয়া নীল শার্টটা।  গুপী চমকে উঠলো।  চারপাশের লোকগুলোকে দেখলো। সব লোকগুলো অবিকল চা' বিক্রেতা ছেলেটা। তার দিকে তাকিয়ে শীতল ক্রুর দৃষ্টিতে হাসছে।  পেছনে ট্রেনটা চলতে শুরু করলো ঘটাং ঘটাং শব্দ তুলে। প্রতিটা চা'ওয়ালা এক কাপ করে চা ঢেলে দিচ্ছে তার থ্যাতলানো মুখের ওপর। চারপাশে হাওয়ার মত উড়ে বেড়াচ্ছে একটা কথা "চা চাই, চা চাই। " 



শর্মিলা ঘোষ

        




অণুগল্প

একটি অবিশ্বাসের জন্ম 


বুকের ভেতরটা কফি কাপের মতো উষ্ণ, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে চোখ।নীলা বসে আছে সমুদ্র শুষে নেবে বলে।তার এলোমেলো চুল ঝাউপাতার মতো দোলা খাচ্ছে।অমলেশ ছবি তুলতেই ব্যস্ত, সুন্দরী স্ত্রীর দিকে লক্ষ্য তার বরাবরই কম।ইংরেজির প্রফেসর অমলেশ, আর নীলার একটা বুটিক আছে গড়িয়াহাট থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে ।
রাকেশ একটু দূরেই ডাব কিনছে, সে চেঁচিয়ে ডাকলো , কি রে অমলেশ ডাব খাবি তো! অমলেশ হাত নাড়লো।রাকেশ দুটো ডাব নিয়ে নীলার পাশে এসে বসলো। নীলা আজ রাতেই কাজটা সেরে ফেলো , কোনো ঝক্কি ঝামেলা হবে না , খুব সহজেই হার্ট অ্যাটাক বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে , তারপর তুমি আমি আর অসীম সমুদ্র....... জলোচ্ছাস । নীলা আবার উদাসী অমলেশের দিকে তাকালো.......অমলেশের সাথে তার কলেজ থেকে প্রেম ছিল আর রাকেশ সেই কলেজ থেকেই তার পিছনে পড়েছিল।অমলেশের উদাসীনতা তাকে রাকেশের দিকে কিছুটা ঠেললেও সে অমলেশকে ঠকাতে চায়নি।অমলেশেকে নীলা সন্তান দিতে পারবে না জেনেও অমলেশ কোনোদিন কোনো অনুতাপ করেনি, অন্তত নীলার কোনোদিন তা মনে  হয়নি।
অমলেশ আসছে ঝাঁকড়া একমাথা চুল এলোমেলো হয়ে আছে, রাকেশের দিকে তাকিয়ে বলে , যা তিনকাপ চা নিয়ে আয়! সঙ্গে বিস্কুট আনিস।
রাকেশ চা নিয়ে আসছে, নীলার মুখটা ফ্যাকাশে আর চোখটা ঝপসা হতে থাকে।
রাকেশ চায়ের ভাঁড় গুলো তুলে দেয় ওদের হাতে;
সমুদ্র যেন ক্রমশ উত্তাল হচ্ছে, আর একটু পর জল ওদের পায়ের পাতা ছোঁবে।আকাশের রঙ এখন ঘন নীল, মনে হয় কে যেন অন্তরের সব অভিযোগ ঢেলে দিয়েছে আকাশের গায়ে।
অমলেশ বিস্কুটে কামড় দিয়ে চায়ে চুমুক দেবে বলে সবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ....... নীলা এক ঝটকায় ফেলে দেয় ভাঁড়।
অমলেশের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নীলা, কাঁদতে থাকে, অমলেশ স্থির, অবিচল।রাকেশ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে , এগোচ্ছে সমুদ্রের দিকে............



রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

চুমকি ভট্টাচার্য

              




রাখীবন্ধন



-তোমার জন্যে বেদানা ছাড়িয়ে রাখলাম মা।

ধারালো ছুরি দিয়ে মুসাম্বি টুকরো করতে করতে বলে মিতা।

রান্নাঘরের এক কোণের বেসিনের কলটা খুলে জলের ধারায় পানের গোছ থেকে এক একটা পান নিয়ে কাপড়ের টুকরো দিয়ে আলতো হাতে ঘসে পরিস্কার করছিলেন অনুপমা দেবী। মিতার কথার উত্তর না দিয়ে তিনি বললেন,  

-পঞ্জিকায় দেখলাম পড়শু রাখীপূর্ণিমা! আমার গোপালের জন্য সুন্দর একটা রাখি এনে দিতে বোলো তো শুভ্রকে। আর কিছু ফুল, ফল, মিষ্টির কথাও বলতে ভুলো না… তুমি যা ভুলো!


শাশুড়ীমায়ের খোঁচা দেওয়া কথাটা কানে নেয় না মিতা। রাখিপূর্ণিমার কথা শুনেই ভাইয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মায়ের সংগে যোগাযোগের মাধ্যমও শুধুই ফোন। মনে মনে হিসেব করে কতদিন মায়ের কাছে যায়নি সে। এমনিতেই এবাড়ীর লোকেরা তার বাপেরবাড়ী যাওয়া পছন্দ করে না, তার ওপর আবার এখন কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে চলেছে। শুভ্রর কড়া নির্দেশ মা আর মুন্নীর সুস্থতার কথা ভেবেই সে যেন কোথাও গেলে ভেবেচিন্তে যায়। শুভ্রর এটা ভদ্রভাবে না বলার নামান্তর তা মিতা বোঝে। 


-আচ্ছা মা।

মুন্নীর জন্য মুসাম্বির জুস বানাতে বানাতে শাশুড়ী মায়ের কথায় সায় দেয় মিতা। 

বাইরের ব্যালকনিতে আপনমনেই খেলছে মুন্নী। রান্নাঘর থেকেই মিতা শুনতে পায় দুদিন আগে শেখা রাইম বারবার সুর করে গেয়ে তার অদৃশ্য ছাত্রছাত্রীদের শেখাচ্ছে মুন্নী। মুন্নীর জন্য জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে যায় মিতা। কিন্তু ব্যালকনিতে এসেই দুর্গন্ধে মিতার সারা শরীর পাক দিয়ে ওঠে। নীচের রাস্তায় তাকিয়ে দেখে এই অবেলায় দুজন সাফাইকর্মী ডাস্টবিনের সব নোংরা পরিস্কার করে একটা গাড়িতে তুলছে। মিতার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে ডাস্টবিনের পাশে পড়ে থাকা একটা আধময়লা গদির ওপর। গতকাল থেকেই ডাস্টবিনের পাশে পড়ে আছে গদিটা। পাশের বাড়ির বৃদ্ধা গতকাল মারা গেছেন। 

- ডাস্টবিনের পাশে পড়ে থাকা বিছানার এই গদিটা আবার বৃদ্ধার নয়তো? 

ভয়ে শিউরে ওঠে মিতা!


এই আবাসনে তারা খুব বেশিদিন হয়নি এসেছে। আশেপাশের কারো সঙ্গে তেমন মেলামেশা নেই ওদের, শুধু এক নন্দা কাকিমা ছাড়া। তিনিই শাশুড়ীমাকে পাড়ার যাবতীয় খবরের জোগান দেন। আজ সকালেই নন্দা কাকিমা শাশুড়ীমাকে ফোন করে জানিয়েছেন পাশের বাড়ির বৃদ্ধার মৃত্যু সংবাদ। তবে সাধারণ মৃত্যু নয়, কোভিড কেস। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নাকি জানা গিয়েছিল বৃদ্ধা কোভিড আক্রান্ত। তাই, বাড়ীর লোক আর মৃতদেহ বাড়িতে না এনে সরাসরি নিয়ে গেছে বার্ণিংঘাটে। 


মিতা তাড়াতাড়ি মুন্নীকে নিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে গিয়েও বেড়িয়ে আসে

 - ওরা গদিটা আবার ফেলে যাবে না তো?

মিতা কোনোরকমে গায়ের ওড়না দিয়ে নাক ঢেকে সাফাইকর্মীদের বলে, 

-এই যে, তোমরা গদিটা নিয়ে যেও কিন্তু! 

মাস্ক পড়া দুই সাফাইকর্মী তাদের দোতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে প্রায় একই সংগে বলে,

-হা দিদি, আমরা গদ্দি লিয়ে যাব।

"দিদি" শব্দটা শুনে মিতার মন যেন কেমন ছ্যাৎ করে ওঠে। সে আনমনে বলে,

-হে ঈশ্বর ওদের রক্ষা কর! শুভ্র যদি আরও দুটো রাখী এনে দিতো…

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                             


     

রিভার্স

     তোর গল্প পরপর প্রিন্ট ম্যাগাজিন নিচ্ছে! গন্ধ পাচ্ছি যেন? 

শিউলি অবাক। কিসের গন্ধ! 

: একে যুবতী। তায় সুন্দরী। দেখিস বাবা। 

হাসির হররা উঠল কফিহাউসের টেবিলে।

 রাগে দুঃখে শিউরে উঠল শিউলি। এরা বন্ধু?  তার লেখাটা দেখে এইই মনে হল? বুকের কাছে চেপে ধরল সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই।যেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। প্রমাণ করতেই হবে। করতেই হবে। নিজেকে। যেভাবেই হোক। 

***

বিখ্যাত লেখিকা এবং সম্পাদিকা শিউলি সাহার চেম্বার থেকে  টলতে টলতে বেরিয়ে এলো কিশোরকবি সুপম। মিষ্টি ঝলমল হাসিমুখে কে যেন অপমানের কালি ঢেলে দিয়েছে।  কিশোরের অমলিন পৃথিবীর আকাশে আজো দেখা যায় রামধনু। আজো প্রতিদিন মায়ের বুকে খুঁজে পায় শৈশবের ঘ্রাণ। আজো মিলির ব্যালকনির নিচে থেকে যেতে যেতে উপরে তাকিয়ে অকারণ হর্ণ মারে বাইকে! সেখানে কোত্থাও ছিল না এমন অভিজ্ঞতা!

 *

 ঘটনা শুনে ধমকে ওঠে বিরাজদা। 

: সতীপনা করে কিস্যু লাভ নেই। সবার কপালে শিকে ছেঁড়ে?  একটু সঙ্গ টঙ্গ দিবি। টপাস করে লেখা ছাপা হবে।

: বিরজদা! 

: আরে ধুর। মনে কর সেবা করছিস। বয়স্কা একলা মহিলা, সময়কালে বিয়ে না হলে, ওমন একটু আধটু ... বুঝলি না?

: দাদা গো। গ্রামের ছেলে আমি। বড় আশা করে কবিতা লিখছি। এমন হবে... 

  চোখ ছলছল করে ওঠে সুপমের। 

: ধুর। নাকে কান্না ছাড়। বড় আশা করে ওই শিউলিও একদিন লেখা নিয়ে ঘুরত দরজায় দরজায়। তখন নিয়েছে সুযোগ অনেকে। আজ উনি সুযোগ নেন। রিভার্স গেম। 

চোখ বিস্ফারিত সুপমের। রিভার্স গেম! জীবন মানে কি তাই? 

বিরাজ দা, বক বক করেই চলেছেন: লেগে পড়। লেগে পড়। দেখবি, কালকেই কাগজে তোর নাম ছেপে বেরুবে। 

কবিতার খাতা হাতে উঠে দাঁড়ায় সুপম--

:পারব না বিরাজদা। শিউলি ম্যাডামের মুখটা ঠিক আমার মায়ের মত। মায়ের সঙ্গে আদান - প্রদানের খেলা ঠিক জমবে না গো!

বনবীথি পাত্র

                         


#স্বপ্ন_বিভ্রাট
#বনবীথি_পাত্র

মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো শেষ হওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই প্যাণ্ডেল প্রায় ফাঁকা। ঢাকী দুজন প্যাণ্ডেলের একপাশে বসে ঢাকে হেলান দিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। আর কাঁসর বাজায় যে বাচ্চা ছেলেটা, সে  প্যাণ্ডেলের মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা ক্যাপ বন্দুকের না ফাটা ক্যাপগুলো ধুলো ঝেড়ে তুলে এনে দালানে জমা করছে। তারপর দালানের ওপর রেখে একটা ইঁটের টুকরো দিয়ে ঠুঁকে ঠুঁকে ফাটাচ্ছে। আহা রে, বেচারার যদি একটা ক্যাপ বন্দুক থাকত কত খুশি হত। মানুষ ভাবে ঠাকুর দেবতারা বুঝি যা মন চায় তাই করতে পারে। এখন তো মা দুর্গার ওই বাচ্চাটাকে একটা বন্দুক দিতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ইচ্ছা করলেও কিছু করার নেই তাঁর। গতবছর সেই বুড়ি ভিখারীটাকে মণ্ডা খাওয়াতে গিয়ে যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছিল। বুড়ি ভিখারীটাই শুধু শুধু সবার কাছে চোর বদনাম পেয়েছিল। মা দুর্গা ক্লাবের সেক্রেটারিকে রাতে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলতে গিয়েছিলেন যে ওই ভিখারী বুড়ি নির্দোষ। কিন্তু এখনকার মানুষগুলো সব যেন কেমন ধরনের, পুজো টুজো করলেও ভগবানে তেমন কোন বিশ্বাস ভরসা কিছুই নেই। সেক্রেটারি তো স্বপ্নে মায়ের দেখা পেয়েও সেটাকে শুধু একটা স্বপ্ন বলেই দিব্যি এড়িয়ে গেল। ভোলানাথ বোধহয় ঠিকই বলে, মূর্তি এনে দেবীর আরাধনা এখন শুধুই মানুষের আনন্দের একটা উপলক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। মনের ভক্তি বলে মানুষের মধ্যে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ভোলানাথের কথা মনে পড়তেই মা দুর্গার মনে পড়ে, সন্ধিপুজোর আরতির সময় তাঁর মোবাইলটা বাজছিল। ভাগ্যিস তখন ঢাক কাঁসর বাজছিল তাই কেউ শুনতে পায়নি। কেউ শুনতে পেলে ঠিক একটা হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে যেত। পুজো শেষ হতে হতে ফোন আসার কথাটা ভুলেই গিয়েছিলেন মা দুর্গা। এখন মনে পড়তেই চারপাশটা খুব ভালো করে জরিপ করে নেন। এই বছর বেলা থাকতে থাকতে সন্ধিপুজো হয়ে গেছে বলে প্যাণ্ডেল এখন একেবারে ফাঁকা। ক্লাবের ছেলেছোকরার দলও বোধহয় বাড়ি গিয়ে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। ঢাকী দুজনও বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে কোথাও বোধহয় খেতে গেছে। গণেশ আর কাতু গেছে মুভি দেখতে। সেই ষষ্ঠীর দিন মর্ত্যে এসে থেকে মুভিটা দেখতে যাওয়ার জন্য ছটপট করছিল ওরা। আজকে সন্ধিপুজো শেষ হতেই দুজনে আর অপেক্ষা করেনি, সোজা মাল্টিপ্লেক্সে রওনা দিয়েছে। অষ্টমীর সন্ধেতে প্যাণ্ডেলে মানুষের ঢল সবথেকে বেশি হয়। ওদের তো বারবার করে বলে দিয়েছে তার আগে ফিরে আসতে। কখন যে তারা ফিরবে কে জানে! মানুষ এখন যা সব উন্নত মানের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করছে, হয়ত দেখা যাবে মোবাইলে ফটো তুলতে গিয়ে কোনো বিশেষ ধরনের সেন্সরে ধরে ফেলল, কার্ত্তিক গণেশের মূর্তিটাই শুধু পড়ে আছে। মূর্তির মধ্যে থেকে দেবতা পুরো হাওয়া। উফ্ এমনটা যদি সত্যি সত্যিই হয় ভাবতেও ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে মা দুর্গার। পৃথিবীর যত মিডিয়ার লোকজন এসে তখন ভিড় করবে এই প্যাণ্ডেলে। আজকাল মা দুর্গার এমনিতেই সবসময় কেমন একটা ভয় ভয় করে। মানুষের প্রতি তাঁর বিশ্বাসটা আর আগের মত নেই। দিনকটা কোন রকমে কাটিয়ে স্বর্গে ফিরে যেতে পারলে বাঁচেন।
লক্ষ্মী সরস্বতীও হয়েছে তেমনি। ভাইরা মুভি দেখতে গেছে বলে কী তোদেরও কোথাও ঘুরতে যেতে হবে! মেয়েরা নাকি মায়ের দুঃখ কষ্ট বোঝে। লক্ষ্মী সরস্বতী আদৌ কি মায়ের কষ্ট বোঝে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মা দুর্গা। মেয়ে দুটোও দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। ওদের বাবা ঠিকই বলে, ছেলেমেয়েগুলোর গায়ে মর্ত্যের হাওয়া লেগেছে।
কথায় কথায় আরতির সময়ে মোবাইলে কার ফোন এসেছিল সেটা দেখতেই ভুলে যান মা দুর্গা। আজ সারাদিনে ভোলানাথের সঙ্গে একবারও কথা বলা হয়নি। এরপর বেলা পড়তে না পড়তেই তো আবার লোকজন আসতে শুরু করবে। তখন সেই মাঝরাতের আগে আর কথা বলার সুযোগটাই পাবেন না! এই ভেবে শাড়ির আঁচলের ফাঁকে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা মোবাইলটা টুক করে বের করেন। ও বাবা তখন তো ভোলানাথই ফোন করেছিল। আশ্চর্য লোক তো ওই ভোলানাথ! সন্ধিপুজোর সময়টা তো তাঁর অজানা ছিল না। ওই সময়টাতেই কেউ ফোন করে! মেজাজটা খিঁচড়ে যায় মা দুর্গার। কোথায় ভাবছিল ছেলেমেয়েদের একটু শাসন করার কথা বলবেন ভোলানাথকে, তা নয় ওপারে হ্যালো বলতেই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন উনি।

-বলি আপনার কি কোনদিন কাণ্ডজ্ঞান হবে না! সন্ধিপুজোর আরতির সময় কেউ ফোন করে?

ওদিক থেকে গাঁকগাঁক গলায় ভোলানাথ উত্তর দেয়,

-নিজের বাঘছাল খুঁজে না পেলে অত শত আরতি অঞ্জলির সময় মনে থাকে না।

ভোলানাথের কথা শুনে তো আকাশ থেকে পড়েন মা দুর্গা। নিজের অজান্তেই তাঁর তিন নম্বর বাঁহাত নিজের মাথায় উঠে আসে। ভোলানাথের কোন তালজ্ঞান থাকে না বলেই আসার আগে ভোলানাথের সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে নন্দীকে সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। অথচ এর মধ্যেই বাঘছাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! অথচ তিন তিনখানা বাঘছাল গুছিয়ে রেখে এসেছিলেন তিনি।

রাগী রাগী গলাতে তিনি বলেন,

-নন্দীকে তো সব দেখিয়ে দিয়ে .....

মা দুর্গা কথা শেষ করার আগেই রীতিমত চিৎকার করে ওঠেন ভোলানাথ।

-তোমার নন্দী গাঁজা খেয়ে তিনদিন ধরে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে পাহাড়চূড়ায়।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মা দুর্গা।

-যেমন ভোলানাথ, তেমন হয়েছে তার দুই চ্যালা নন্দী আর ভৃঙ্গী!

ওপারে ভোলানাথের গলাটা এবার একটু নরম শোনায়।

-তুমি কবে ফিরছ বলো দেখি!

মা দুর্গা বলেন,

-আজ তো সবে অষ্টমী।

-উফ্ এখনও দুটো দিন!

ভোলানাথের করুণ গলাটা শুনে কষ্ট হয় মা দুর্গার। তাঁকে ছাড়া উনি যে সম্পূর্ণ অচল।

মা দুর্গাও এবার নরম সুরে জানতে চান,

-বাঘছাল তো খুঁজে পাননি। তাহলে আপনি কী পরিধান করেছেন প্রভু!

-কী আর পরব, কৌপিন পরে তো আর থাকতে পারি না! তোমার একটা শাড়ি পরেছি বুঝলে?

দেবাদিদেব শেষে কি না শাড়ি পরেছেন! কথাটা ভাবতেই কেমন যেন থতমত খেয়ে মা দুর্গার হাত থেকে মোবাইলটাই পড়ে যায়। আর ঠিক তখনই একদল ছেলেমেয়ে হৈ হৈ করতে করতে প্যাণ্ডেলে ঢোকে ঠাকুর দেখতে। মোবাইল খোঁজা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি ঠিকমত পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন মা দুর্গা। ছেলেমেয়েগুলো ঠাকুর দেখে বেরিয়ে যেতেই তিনি মোবাইলটা খুঁজতে লাগলেন। সামনে তো একরাশ পুজোর উপাচার। সব সামলিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। সামনের ওই ঘটেই তাঁদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা আছে। এখন তিনি নিজেই যদি ওই ঘট নাড়িয়ে ফেলেন তো যা তা অনর্থ হয়ে যাবে।

বিকাল হওয়ার আগে থেকেই মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। লক্ষ্মী সরস্বতী সময়ে ফিরলেও কার্ত্তিক গণেশের ফিরতে সন্ধে পুহিয়ে গেল। প্যাণ্ডেলের সামনে তখন বিশাল লাইন। ক্লাবের স্বেচ্ছাসেবকরা ভিড় সামলাতে রীতিমত নাজেহাল হচ্ছে। এত লোকের সামনে মোবাইল খোঁজার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কার্ত্তিককে একবার তার মোবাইলটা থেকে নিজের মোবাইলটায় রিং করার কথা বলার অবসরটুকুও পেলেন না মা দুর্গা। অন্যান্য বছরের থেকে এবারে মানুষের ভিড় যেন অনেক বেশি। মানুষের ভিড় কমতে কমতে মাঝরাতও পেরিয়ে গেল। অতক্ষণ একটানা দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেমেয়েরা সব ক্লান্ত, তখন কী আর মোবাইল খোঁজার কথা বলা যায়!
সারাদিনের ক্লান্তিতে মা দুর্গাও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন কে জানে! স্বপ্নে তিনি ভোলা মহেশ্বরকে দেখছিলেন। হঠাৎ ঢাক কাঁসরের আওয়াজে ধড়ফড় করে কাঁচা ঘুমটাই ভেঙে যায় দুর্গার। আজ তো অনেক সকাল সকাল পুজোর আয়োজন শুরু হয়ে গেছে! কাল কত রাতে ঘুমিয়েছে বাছারা। তবু ছেলেমেয়েদের ডেকে ঘুম থেকে তোলেন। মনটা ভালো নেই মা দুর্গার। স্বপ্নেও তিনি মহেশ্বরকে দেখলেন তাঁর একখানা শাড়ি পরে আছেন।
মুখভার করে দাঁড়িয়েছিলেন মা দুর্গা। পুজোর জোগাড় আর ঠাকুরমশাইয়ের কথা শুনে এতক্ষণে মনে পড়ে, আজকে তো নবমী-দশমী দুটো পুজো একদিনে। সেই জন্য কাল সন্ধেতে এত মানুষের ভিড় হয়েছিল প্যাণ্ডেলে। অন্যবার দশমীর দিন মনখারাপ হয়ে যায় মা দুর্গার। এবার মর্ত্যে একদিন কম থাকা হবে কথাটা ভেবেও মনখারাপের মধ্যে যেন একটা স্বস্তি অনুভব করছেন তিনি। ভোলানাথকে ওই শাড়ি পরা রূপে তিনি ভাবতেও পাচ্ছেন না। তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে তাঁকে তাঁর বাঘছাল খুঁজে দিতে পারলেই এখন মায়ের শান্তি।
এরই মাঝে সবাই যখন নবমী পুজোয় ব্যস্ত,  গণেশকে মোবাইল হারানোর কথাটা বলেন মা দুর্গা। ইঁদুর এইসব ব্যাপারে একেবারে ওস্তাদ। সবার চোখের সামনেই দিব্যি মোবাইলটা খুঁজে নিয়ে এল, কেউ তাকে খেয়ালও করল না। নবমী পুজো শেষে দশমী তিথি এমনিতেই অনেকটা বেলায় ছিল। দশমী পুজো শেষ হয়ে ঠাকুরমশাই ঘট নাড়িয়ে দর্পণে বিসর্জন করে দিতেই আর একটু সময়ও নষ্ট করেন না মা দুর্গা। এবার নৌকায় গমন। ছেলেপুলে বাহন সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ময়ূরপঙ্খী নৌকা ভাসিয়ে দেন নদীতে। কিন্তু আজকালকার দিনের ছেলেমেয়েগুলোর কী যে কেনাকাটার এত বাতিক মা হয়েও তিনি  বুঝতেও পারেন না। নদীর ধারে একটা মার্কেট দেখে এমন বায়না করে যে নৌকা পাড়ে ভেরাতেই হয়। বাহনদের রেখে সবাই হৈ হৈ করে নেমে যায় নৌকা থেকে। মা দুর্গা একবার ভাবলেন ছেলেমেয়েদের একটা বাঘছাল কিনে আনার কথা বলবেন। কিন্তু বলতে গিয়েও কথাটা আর বলে উঠতে পারেন না। নৌকাতেই আনমনে বসে থাকেন মা দুর্গা। বাপের বাড়ি থেকে ফিরে যাচ্ছেন, যতই হোক তাঁর মনটা একটু তো খারাপ। নদীর ধারের কাশফুলের শোভা দেখে মনটা কেমন যেন দুঃখ দুঃখ করছে তাঁর। সবাই বলে স্বর্গ সুন্দর। এত বছর তো কৈলাশে রয়েছেন, তাঁকে কিন্তু মর্ত্যের সৌন্দর্যই এখনও অনেক বেশি আকর্ষণ করে। আবার এক বছর পর তবে মর্ত্যে আসতে পাবেন। একটা বছর তো আর কম সময় নয়!
হঠাৎ তাঁর মোবাইলটা বেজে ওঠে। মহেশ্বরের ফোন।

একদিন আগে তাঁরা মর্ত্য থেকে ফিরে যাচ্ছেন বলে মহেশ্বরের দারুণ আনন্দ। খুশি খুশি গলায় বলেন,

-মর্ত্য থেকে আমার জন্য কী আনছ গিন্নি?

মা দুর্গাও হেসে বলেন,

-বাঘছাল।

ওমা ভোলানাথ খুশি হবে কোথায়, তা নয় রেগেমেগে বলেন,

-অতগুলো বাঘছাল আছে আবার বাঘছাল নিয়ে আমি কী করব? অকারণ টাকাপয়সা নষ্ট করে কী যে সুখ পাও!

-কাল তো আপনিই বললেন, বাঘছাল না পেয়ে আপনি আমার একখানা শাড়ি পরেছেন!

অভিমানী স্বর মা দুর্গার।

-মর্ত্যে গিয়ে তোমার মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। আমি কখন তোমায় ও কথা বললাম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছ নাকি!

রেগেমেগে ফোন রেখে দেন মহাদেব।

-ও ঠাকুরমশাই, মা দুর্গার কি ঠিকমত প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি নাকি! মা তো ঘুমে ঢুলে পড়ছে মনে হচ্ছে।

শেষ কথাটা তো মহেশ্বের বললেন বলে মনে হল না। তবে কে বলল কথাটা? মা দুর্গা চোখ খুলে পিটপিট করে তাকাতেই কয়েক ফোঁটা গঙ্গাজল এসে পড়ল চোখের মধ্যে। দু চোখ বড় বড় করে তাকালেন মা দুর্গা। ওমা কোথায় নদী, কোথায় নৌকা! এখন তো সকালবেলা। পুজো শুরু হয়ে গেছে। এতক্ষণে আসল ঘটনাটা বুঝতে পারলেন মা দুর্গা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পুরোটাই স্বপ্ন দেখছিলেন তাহলে! ঘাড় ঘুরিয়ে মূর্তির পিছনে মহাদেবের ছবিটা দেখে হেসে ফেলেন দুর্গা। কাল সরস্বতী বলেছিল,

-বাবার ছবিটা দেখো মা। বাঘছালটা কেমন পুরনো হয়ে গেছে। এবার কৈলাশে ফেরার আগে বাবার জন্য একটু নতুন বাঘছাল কিনে নিয়ে যাব।

এতক্ষণের স্বপ্ন কাহিনী মনে করে নিজের মনেই হাসতে থাকেন মা দুর্গা।

-ও মা দেখো দেখো দুর্গা মা কেমন হাসছে।

একটা বাচ্চা মেয়ে তার মাকে ডেকে কথাটা বলছে শুনতে পেয়েই নিজের হাসি সংবরণ করে নেন দুর্গা। তবে মনে মনে ভালো লাগে, নিষ্ঠুর পৃথিবীটাতে শিশুদের মধ্যে এখনও সরলতা টিকে আছে। তাই তো কত সহজে বাচ্চা মেয়েটা দেবদর্শন করতে পারল।

#সমাপ্ত 


চিত্রঋণ- সংঘমিত্রা মান্না





শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

তপন কুমার বসু

 

              



                

























  

















প্রতিমা
    বলাই জাতে কুমোর। গাঁয়ে সে ঠাকুর গড়ত। প্রতিমা গড়তে তার জুড়ি ছিল না। গ্ৰামে আমাদের বাড়িতে বলাই প্রতিমা গড়ত। অন্যান্য গ্ৰাম থেকেও আমাদের প্রতিমা দেখতে ভীড় করত।
     লোকে বলত দুর্গা প্রতিমার মুখে বলাইয়ের বউকে আমি দেখেছি। অপরূপ সুন্দরী।
      তারপর নানা কারণে আমরা কলকাতায় চলে আসি। অনেকদিন পর প্রায় পুজোর মাসখানেক আগে কলকাতার রাস্তায় হঠাৎ বলাইয়ের সঙ্গে দেখা। চেনার উপায় নেই। এক মুখ দাড়ি, ছেঁড়া কাপড়, খালি পা। বলাই রাস্তায় ভিক্ষা করছিল। আমি চিনতে পারিনি। ও কিন্তু আমাকে ঠিক চিনেছে।
      ছেলেপুলে হয়নি। সুন্দরী বউকে নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে এসেছিল। দিনের পর দিন অভাবে না খেতে পেয়ে অমন সুন্দরী বউ শেষে বীভৎস হয়ে উঠেছিল। তারপর একদিন কোথায় যে হারিয়ে গেল। বলাই নিজেও জানে না।
        বলাইকে বললাম ----- চল্ ; আমাদের বাড়ি চল্। এখানেও আমাদের বাড়িতে পুজো হয়। গাঁয়ের থেকেও বেশি ধুমধাম হয়। এবারের প্রতিমা তুইই গড়বি।
        কাঠামো এর, খড় এর, মাটি লেপা হল। রং করা শেষ হল। বাকি রইল তুলির কাজ। আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছি। বলাই দুর্গার চোখ আঁকছে। তুলি দিয়ে আঁকার পর সাদা রং দিয়ে মুছছে।  হঠাৎ বলাই কিরকম অস্থির হয়ে উঠল। বারবার আঁকছে আর মুছছে। হঠাৎ চীৎকার করে বলে উঠল-- পারলামনি বাবু, আমি পারলামনি।
      বলাই সরে যেতেই ঠাকুরের মুখ দেখতে পেলাম। পৃথিবীর সমস্ত ক্ষুধা দুর্গা প্রতিমার চোখে জড়ো হয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
                     ____________

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

                        


অণুগল্প : ফেরা
                   
            বিয়ের কিছুদিন পরেই পলাশের মনে হলো ওর আর রিয়ার বিয়েটা 'মিস ম্যাচ' ! যত দিন যায় দাম্পত্যের বাকল খুলে খুলে পড়ে। সেখানে শুধু শরীরের নীরাজন। ভালোবাসা গুমরে মরে প্রতি মুহূর্তে। কষ্টের অন্তর্লীন স্রোত যাপনে অহর্নিশ। ফুলশয্যার রাতেই পলাশ বুঝেছিল,
রেখা শরীর বিলাসী। শঙ্খিনীর মতো ফণা তুলে সারা রাত ছোবল মেরে গেলো শরীরী রিরংসায়।ঐ রাত স্পষ্ট করে দিয়ে গেল, রমনে রেখা বেজায় পটু।ভয় পেয়েছিল পলাশ সে রাতেই।একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল ওর হৃদয়। বন্ধুদের মুখে অনেক ঘটনা যে ওর শোনা! 
            গড়াতে গড়াতে কাটলো একবছর। ছেলে সোহাগ এলো ওদের ঘরে। দাম্পত্যের শূণ্যস্থান কিছুটা ভরাট হতে থাকলো। সত্যিই কি তাই? বিধাতা বোধহয় মুচকি হেসেছিলেন অলক্ষ্যে। আস্তে আস্তে হাজার দুয়ারী কামনার আগুন পোড়াতে লাগলো দাম্পত্যের শব। প্রায়দিনই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সিগারেটের গন্ধ পেত।পলাশ ধূমপায়ী নয়। জিজ্ঞাসা করলেই জোর করে ওর ঘাড়েই দোষ চাপাতো রেখা।কোন কোন দিন 'পাগল' তকমাও দিত ওকে।"ওকে অহেতুক সন্দেহ করা হচ্ছে" বলে প্রচন্ড চিৎকারে পাড়া মাথায় করতো রেখা। লজ্জায় পলাশ চুপ থাকতো। মনে পড়তো বাবার কথাটা :"ইডিয়েটের সাথে তর্ক জুড়লেই প্রমাণ হবে সেখানে দুজন আছে"!পলাশ বুঝতো রেখা ওকে লোক চক্ষে ছোট করতে চাইছে।ওটা রেখার এক রাজনীতি। অভিজ্ঞ বাবা মায়ের মদত পেত রেখা সবসময়। মনে মনে সন্দেহ বাড়তেই লাগল।অফিস থেকে ফোন করলে ফোন ধরতো না সহজে। অনেক দিন ফোনে রাস্তায় রিক্সা বা গাড়ির আওয়াজ পেত পলাশ।খটকা লাগত। জিজ্ঞাসা করলে রিয়া বলতো ,পলাশ ভুল শুনেছে। রাতের বিছানায় রিয়ার সারা শরীরে নখের দাগে পলাশ উত্তর পেত সবকিছুর। বড়ো অসহায় লাগত ওর।এক কালো গহ্বর যেন ওকে গ্রাস করতো প্রতি রাতে। সাক্ষী থাকতো আকাশের তারারা অপলক।
        সেদিন যথারীতি অফিস বেড়িয়েছে ও। ব্যান্ডেল পৌঁছে শুনলো গাড়ি আর যাবে না।খন্যান ষ্টেশনে ওভারহেড তার ছিঁড়েছে।সারাতে সারাতে সেই বিকেল। অগত্যা বাড়ি ফেরা। বাড়িতে পৌছে দেখল,সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ নেই। চাপ দিতেই খুলে গেল। ব্যাগপত্র নীচে রেখে ও ওপরে উঠতেই নাকে সিগারেটের গন্ধ পেল। শোবার ঘরে ঢুকতেই দেখল বিছানায় রিয়া আর ওর পিসতুতো দাদা বুবাই নগ্ন হয়ে শরীরী উল্লাসে। মাথা ঘুরে গেল ওর। ছিটকে বেরিয়ে এলো বাইরে। বুকফাটা কান্না চোখ থেকে শ্রাবণের ধারার মতো বেড়িয়ে আসছে। আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ওর মনাকাশ ! এতোটা বিশ্বাস ঘাতকতা ! লজ্জায় অসহায়তায় মাটিতে মিশে যাচ্ছে ওর শরীর।কি রইল আর ওর? বেঁচে থেকে কি লাভ আর? শেষ করে দেবে এ জীবন ও। টলোমলো পায়ে এগিয়ে চললো রেল গেটের দিকে।
      রেলগেটে পৌঁছে দেখল ষ্টেশনের পাগলটা রেল লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছুটে আসা ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে :"আয়, আয়! আমার ওপর দিয়ে চলে যা "। কেঁপে উঠলো পলাশ । তাহলে কি পাগলটা ওর মতোই আত্মহত্যা করতে চাইছে ? ট্রেনটা কাছে আসতেই এক লাফে লাইন থেকে সরে এসে পাগলটা আবার চিৎকার করতে লাগলো ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে :"কি ভাবলি আমি মরবো? আমি কি বোকা যে শুধু শুধু তোর চাকার তলায় যাবো? আমার আরো অনেক কাজ বাকি জানিস "। হঠাৎ ঘুরে পলাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো :"আমি বোকা নাকি যে ট্রেনের তলায় মরবো? আমি কি বোকা" ? হা হা করে  হাসতে হাসতে এগিয়ে চললো সামনে।পাগলটার শেষের কথাগুলো যেন চাবুকের মতো পড়তে লাগলো ওর মনে।এক ধাক্কায় বাস্তবে ফিরলো ও। সত্যিই তো ,বোকা ছাড়া কেউ আত্মহত্যার কথা ভাবে এভাবে? আর ও তো কোন পাপ করেনি। কারোর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। তাহলে মরবে কেন? সত্যিই তো,ওর ও অনেক কাজ বাকি। ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে।ও না থাকলে ছেলেটা যে ভেসে যাবে ওর মায়ের পাপের স্রোতে।ছেলেটার মুখটা মনে পড়লো ওর। বাঁচতে হবে ওকে। বাঁচতেই হবে ছেলের জন্য। বুকের ভেতর হারিয়ে যাওয়া আগুনটা জ্বলে উঠলো যেন। পাগলটাকে মনে মনে প্রণাম করে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চললো ছেলের স্কুলের দিকে স্কুল ছুটি হলে ওকে বাড়ি নিয়ে আসবে বলে।

                                         ***************


শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

অদিতি ঘোষদস্তিদার

                        



বহিবারে দাও শকতি


 

প্রতিবছর ছেলেটা স্বাধীনতা দিবসের বেশ কিছুদিন আগে থাকতে স্বাধীন ভারতের পতাকা বিক্রি করে।
দাঁড়ায় ব্যস্ত শহরের মোড়ে। হাতে থাকে একগুচ্ছ পতাকা
। গেরুয়া, সবুজ আর সাদা রঙের মাঝখানে নীল অশোক চক্র!
সিগন্যাল লাল হলেই  দাঁড়ানো গাড়ির সামনে ছুটে যায়। 
 
কেউ কেনে।

 কেউ কেনে না।

কেউ কেউ জ্ঞান দেয় এসব না করে অন্য কাজ করতে।

কেউ কেউ উদাস হয়ে বলে, "ধুস! কিসের স্বাধীনতা!"
কারুর কারুর মনে পড়ে যায়, "আরে! ১৫ই অগস্ট আসছে তো! কী বার যেন! দুদিন ডুব মারলে মন্দারমণিটা হয়ে যাবে!"
১৬ই আগস্ট বিক্রি না হওয়া বাকি পতাকাগুলো খুব যত্ন করে প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে ছেলেটা তুলে রাখে ওদের দশ 
 ফুট বাই দশ ফুটের ঘরের টালির ছাউনির নিচের বাঁশের আড়ালে।
পরের বছর 
 ১৫ই অগস্টের আগে আগে সেগুলো বের করে,  আরো কিছু নতুন কিনে আবার দাঁড়ায় একই জায়গায়।
সারাবছর আরো নানা রকম কাজ করে পেটের 
 ধান্দায়।
কিন্তু বছরের এই সময়টা আর কিচ্ছু নয়!

এবছর এসেছে প্রলয় ঝড়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তুমুল বৃষ্টি।

গাছ পড়ে ভাঙল টালির ভিটে। ভেসে যায় ঘরদুয়ার। মা, ভাইবোনেরা প্রাণপণে বাঁচাতে চায় যতটুকু পারে।
ছেলেটা তখন গাছের ডাল কেটে পাতার বোঝা সরিয়ে কী যেন খোঁজে পাগলের মত। 
   
ইলেক্ট্রিকের তার ছিঁড়ে পড়ল গাছের ডালে জড়িয়ে। ছেলেটার ভ্রূক্ষেপ নেই।

 মা চেঁচায়, "যাস না, যাস না! যা গেছে যাক!"

বোনটা বোঝে। মায়ের হাত ছাড়িয়ে সেও এগিয়ে যায় দাদার লক্ষ্যে।  

ছেলেমেয়েদুটো বেশ খানিক পরে ভিজে কাক  হয়ে বেরিয়ে আসে ধ্বংসস্তূপ থেকে। বুকের মধ্যে থেকে বের করে আনে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট।

মুখে তাদের গৌরবের হাসি।  

সুচেতা বিশ্বাস

                               


পাখির পালক 

অপর্ণার এখন কিছুই ভালো  লাগে না ۔۔۔۔কোনো রকম এ রান্নাটা রোজ করে ۔۔তাও ও তেল কম ۔۔ঝাল  কম ۔۔সারাদিনে  কত গ্লাস জল যে সে খায় ۔۔۔অনেকে বলে এটা নাকি ম্যানিয়া ۔۔۔রুমা অনেকদিন ধরে দেখছে অপর্ণা কে ۔۔সপ্তাহে একবার ডাক্তারের কাছে যায় ۔۔তখন রুমার সাথে দেখা হয়ে ۔۔অটো স্ট্যান্ডের গায়েই রুমাদের বাড়ি ۔۔রান্নাঘর থেকে দেখতে পেলেই  ছুটে আসে রুমা ۔۔"দিদি কেমন আছো " 
"ভালো লাগছে না গো শরীরটা ۔۔۔"
" কি হলো আবার ۔۔আগের সোমবার ই তো ডাক্তারের কাছে গেলে " 
" ওষুধ এ কাজ হয় নি ۔۔উল্টে মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে " 
"তুমি এবার অন্য ডাক্তার দেখাও দিদি " 
" কত ডাক্তার তো দেখলাম "
‌রোজ ই একই রকম কথা ۔۔۔তাই চুপ করে যায় রুমা ۔۔পাশের বাড়ির  রুবি বৌদি ও দেখে অপর্ণা কে ۔۔ভালো জানাশোনা ও আছে ۔۔কিন্তু অপর্ণা কে দেখলে ই ঘরে ঢুকে যান ۔۔উনি ই তো বলেন "ওর ওটা ম্যানিয়া ۔"۔ মাঝে মাঝে রুমার মনে হয় পাশের বাড়ি র বৌদি ই ঠিক ۔۔সুন্দর সংসার ۔۔বাড়ি গাড়ি কি নেই অপর্ণার  ۔۔তা  ও মুখে হাসি নেই ۔۔একপাড়াতে আজ এগারো বছর একসাথে ۔۔সেই বিয়ের পর থেকে রুমা পাড়ার সবাই কে দেখছে ۔۔পরিবর্তন তো আসে সবার ই ۔۔এটাই জীবনের নিয়ম ۔۔۔অপর্ণার পরিবর্তন টা  একেবারেই অন্য রকম ۔۔۔রুমা একদিন ওর স্বামী কে জিজ্ঞাসা করেছিল . " তুমি তো ছোটোর থেকে দেখছো অপর্ণা দি কে ۔۔আগে ও এই রকম ছিলেন " 
‌" ঘরে থাকতো নাকি ۔۔দিনরাত টই টই  .  একটা দল ছিল ওদের  ۔۔ছেলেদের  কে স্কুলে দিতে যাবার নাম করে۔۔সুইমিং ক্লাস এর নাম করে  কোথায় কোথায় যে সব কটা যেত ۔۔পাড়া তে সবাই জানতো ۔۔মার্কেট, সিনেমাহল, ডিস্কো থেক۔۔সব জায়গায় দেখা যেত ۔۔বাড়ি  তেও এই নিয়ে খুব অশান্তি ছিল" 
‌এই টুকুই বলেছিলো সমীর ۔۔۔কৌতুহল টা  রয়েই গিয়েছিলো ۔۔পাশের বাড়ি র রুবি বৌদি বাকি টা বললো একদিন ۔۔"ছেলে রা বড়ো হলো ۔۔দল  ভাঙলো ۔۔দলের মধ্যে ওর ই  ছিল ভীষণ রেশারেশি ۔সব থেকে বেশি হিংসুটে ছিল۔ ۔۔আমার বড়দি ও তো ছিল ওই  দলে ۔۔দিদির কাছে শুনেছি যার যা দেখতো সেটাই ওর চাই ۔۔কারুর ভালো ও দেখতে পারতো না " 
‌রুমা সেদিন  ই বুঝেছিলো রুবি বৌদি ওই অপর্ণা দি কে এড়িয়ে যায় ۔۔কি এমন হলো যে উনি এমন হয়ে গেলেন ۔অতীতের ۔۔উশৃঙ্খল জীবন কি  ওকে খুঁড়ে খুঁড়ে খায় ? কি এমন বিষাদ যে পুরো শরীরটা কে নষ্ট করে  দেয় ۔۔না পড়ে একটা ভালো শাড়ী না একটু সেজেগুজে থাকে ۔এ কেমন বিষাদ ? 
‌শাশুড়ি মায়ের কাছে শুনেছে অপর্ণা দির কিডনির প্রব্লেম ছিল ۔۔۔ভেলোর নিয়ে গিয়েছিলো ۔۔খরচের কোনো ত্রুটি রাখেন নি গৌরব দা ۔۔এর সঙ্গে বেশ একটা মজার ঘটনাও মা বলেছিলেন মা ۔۔" ওই যে শরীর টা খারাপ হলো ۔۔তার পর থেকে কোনো বন্ধু ফোন করলেই বলতো ওর শরীর টা আজ খুব খারাপ ۔۔প্রায় ই এই ভাবে ওর শরীর খারাপের কথা শুনে বন্ধুরা 
‌রাতের কিংবা দুপুরের সব রান্না করে দিয়ে যেত ۔۔আর ও ওই সুযোগে সেদিন 
‌টা রান্না করতে হবে না বলে সেজেগুজে বর ছেলে নিয়ে বেড়াতে যেত " 
‌এটা আপনি কি করে জানলেন মা " রুবির বড়দি যেদিন ওদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিল ۔۔সেদিন ওই ই ওদের বাজার এ দেখছে ۔۔۔" 
‌রুমা অনেক কোথা ই  জানে ۔۔কানে আসে ۔۔কিন্তু অপর্ণার সাথে বসে কোনোদিন গল্প করে নি ۔۔মাঝে মাঝে অপর্ণাদির সাজপোশাক ও বড্ডো উগ্র লাগে রুমার ۔۔রবিবার প্রায় ই দুপুরে গৌরবদার সাথে বেরোয় এই পঞ্চাশেও টাইট জিন্স জিনস উপরে বাচ্চা মেয়েদের মত রংচঙে টপ ۔۔পাড়ার অনেক ই হাসাহাসি করে "۔۔ফিসফাস শোনা যায় " স্বামীর শাসন নেই " 
রুমার সবই শোনা কথা ۔۔শুনে শুনে মনের মধ্যে কল্পনা করে নিয়েছে কিন্তু সত্যি কি সব টা ঠিক ۔۔আর সবাই তো এক রকম হয় না ۔۔ আমাদের সমাজে কেউ একটু আলাদা হলেই সবার আগে আমরা মেয়েরা ই তাকে নিয়ে  বেশি সমালোচনা করি۔۔ ۔۔ যুগ যুগ ধরে মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু ۔۔অপর্ণা কে দেখলেই রুমার মনের দ্বন্দ্ব তৈরী হয় ۔۔
" কোথায় গিয়েছিলে  অপর্ণা দি ?۔۔ এসো না একদিন ۔۔গল্প করবো۔۔ " 
সেই মিস্টি হাসি "  আসবো আসবো ۔۔۔ গাইনির কাছে গিয়েছিলাম ۔۔۔দূর কিছুই হয় নি ۔۔"
" কেন কোনো অসুবিধা হচ্ছে " 
" তলপেটের ডান দিকে একটু ব্যাথা۔۔কোনো ওষুধ ই দিলেন না ۔۔জানো ডাক্তার হাসতে হাসতে কি বললেন "অপর্ণা কে এত খুশি দেখে রুমার ও উৎসাহ বেড়ে গেলো۔۔ "
" কি বললেন গো "
" বললেন সব ওষুধ বন্ধ করে দে ۔۔একটা  বয় ফ্রেন্ড বানা ۔۔আর ওকে নিয়ে পার্ক এ ঘুরে বেড়া ۔۔"
দুজনেই হো হো করে  হাসতে লাগলো ۔۔রুমা মনে মনে ভাবছে সত্যি তো সব  রোগের ই ওষুধ আছে ۔۔মনের রোগের ওষুধ ক জন দিতে পারে ۔۔সে তো۔ পাখির পালকের মতন ۔۔ভোরের  শিশিরে র মতন۔ ۔۔শিউলি গন্ধের মতন ۔۔۔নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়۔۔




সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

সুচেতা বিশ্বাস

                      




জন্মদিন 


বৃষ্টি টা ধরে এসেছে, সকাল থেকে ই অসহ্য গরম ,তাতেও সব কাজ মুখ বুজে করে গেছে পুনম , মায়ের শরীরটা ভালো নেই তার উপর গরমে নাজেহাল.. তাও মা সোফায় বসে বসে সবজি কেটে , রুটির আটা  টা মেখে দিয়েছিলো , ছুটির দিন ভাই ভাইবৌ দেরিতে ই উঠেছে , সব রবিবার যেমন ওঠে ,ওদের আজ বন্ধুদের সাথে কোনো রিসোর্ট এ পিকনিক ,সেজে গুজে সকাল সকাল রওনা দিলো , লাঞ্চের পর  .স্কুলের বাচ্ছাদের . টেস্ট পরীক্ষার খাতা  গুলো সারা দুপুর বসে চেক করলো  .ছেলে কে নিয়ে পড়াতে বসলো  ,তার পরে ই হঠাৎ মনে পড়লো ,আজ তো রবিবার  ..নীল এখুনি বায়না করবে  মল যাবার জন্য ...সারা সপ্তাহের পর রবিবার মানেই . .মল এ গিয়ে    পেট পুরে  বার্গার খাওয়া,  ম্যাকডোনাল্ড থেকে .,এটাই নীলের একটু খানি জীবনে খুশিই মুহূর্ত ...সারা সপ্তাহ সে অপেক্ষা করে যায় দিনটার জন্য ..কিন্তু আকাশ এর অবস্থা  দেখে  পুনম বুঝেছে  আজ নীলের মন খারাপ হবে.. ..কিন্তু নীল গেলো কোথায় ? 
এখন নীল কে খুঁজতে যাওয়া মানে সারা বাড়ি খুঁজে দেখা ... ..গলা চড়িয়ে ডাক দিলো পুনম " নীল ...কোথায় গেলি " 
"আসছি মাম্মা "
একছুটে দৌড়ে এসেছে নীল ..জোরে জোরে  হাঁপাচ্ছে
হাতে একটা চার্ট পেপার না ? 
মিট মিট হাসছে ছেলেটা ..
মায়ের কাছে এসে  ই চার্ট পেপার এ এগিয়ে দেয় .
চার্ট পেপার  দুভাজ করে বানানো একটা বার্থডে কার্ড. 
বাড়ির কারুর মনে নাই আজ পুনমের জন্মদিন ..মা বাবার তো বয়স হয়েছে ..ওদের কথা পুনম ধরে না ..কত কথাই  তো ওরা ভুলে যায় ..ভাই ও ভুলে গেলো ..কাল রাতে ই পুনম ভেবেছিলো বিকেল হলে ই অন  লাইনে এ সবার মনের মতন কিছু খাবার দাবার আনিয়ে নেবে ..তখন ঠিক কারুর না কারুর মনে পরে যাবে ..
আজ 7 বছর হয়ে গেছে সন্দীপ সেই যে পুনম কে বাপের বাড়ি দিয়ে গেলো ...তখন পুনম অন্তসত্তা ..আর আসে নি সন্দীপ ..এই সাত বছরে একবার নিজের ছেলে কেও দেখতে আসে নি ..দুবাই এর  ভালো ব্যাবসায়ী পরিবার দেখে পুনমের বাবা খুব ঘটা  করে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম ...মন খুলে দুহাত উজাড় করে খরচ করে ছিলেন ..সন্দীপের ব্যাবসার জন্য কিছু টাকার দরকার ছিল ... তা ও তিনি দিয়েছিলেন বিনা দ্বিধায় ..না গয়না না টাকাপয়সা ..কোনো টাই  পুনম নিয়ে আস্তে পারেনি ..কোনো রকম যোগাযোগের রাস্তাই  ছিল না ..বড়ো আদরের মেয়ে তাদের ...কাছে টেনে নিলেন মা বাবা ভাই ....ভালো ছবি আঁকার  হাত 
ছিল পুনমের ...কনভেন্ট এ পড়াশুনা করেছে ....শহরের  নাম  করা একটা ইংলিশ মিডিয়াম এ বাবার চেষ্টাই পুনমের চাকরি হয়ে যায় ..ছেলে নীল কে সবার মাঝে ভালো ভাবে মানুষ করছে ...তাও ছেলেটার দিকে তাকালে ই ভিতর টা ডুকরে ওঠে ...বাবার জায়গাটা তো শূন্য  ..নীল কে সে ছোট বেলার থেকে যা সত্যি সেটা  ই বলেছে ..মাঝে মাঝে বড়ো মন মরা হয়ে থাকে ছেলেটা ..আর এটাই পুনম কে  কুড়ে কুরে শেষ করে দিচ্ছে ..
বার্থডে কার্ড টার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না পুনম ..কার্ড এ মা আর ছেলে ...নিচে লেখা আছে " মা আর নীল " কত বেলুন ,কেক ,চকলেট ....ভীষণ কান্না পাচ্ছে পুনমের ...নিজেকে সামলে নেয় , "তোর মনে ছিল " 
"না মাম্মা ..মামু  আমাকে কাল রাতে ই মনে করিয়ে দিয়েছে ..মামু তোমার জন্য রাতে সারপ্রাইজ পার্টি রেখেছে ",...কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে যাচ্ছে একনাগাড়ে কথা গুলো নীল ..."আমি তো তোমাকে সব বলে দিলাম যা হ ...."
এবার ও খুব সামলে নেয় নিজেকে পুনাম ...ওতো অন্য কিছু ভেবেছিলো ..."আমি কাউ কে কিচ্ছু বলবো না .ঠিক আছে ...যা হ সারপ্রাইজ পার্টির জন্য রেডি হয়ে নে "..
নীল খুশিতে এদিক ওদিক দৌড়া দৌড়ি করে বেড়াচ্ছে ..পুনম নীলের আঁকা কার্ড টার  দিকে তাকিয়ে থাকে ..বাইরে একটানা বৃষ্টি আজ সারাদিন 

শ্রীজিতা বেরা,

                                 



খোকা-খুকুর কান্ড


বর্ষাকাল এসে পড়ায় খুব সুবিধা হয়েছে মেয়েটার।ভেজা জামাকাপড় দেওয়ার নাম করে ছাদে ওঠে ,তারপর

টিপিরটিপির বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে সেগুলো তুলতে লাফিয়ে লাফিয়ে থুড়ি পা টেনে টেনে ছাদে ওঠে।তারপর যেই

সুয্যিঠাকুর মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দেন ওমনি মেয়েটা ভেজা জামাকাপড় গুলো নিয়ে আবার নড়ে নড়ে ছাদে

ওঠে। বৃষ্টির আসা যাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে মেয়েটার এই ছাদে ওঠা-নামা। রোজ জোর করে

কাজের মেয়ে লীলার হাত থেকে কেড়ে নেয় একগাদা জামাকাপড় ভর্তি বালতিটা,তারপর পা বাড়ায় তেতলার

দিকে।আপাতত সে তার সব রুমমেটদের ভিজে জামাকাপড় রোদে শুকানো করার দায়িত্ব নিয়েছে। দুটো বাড়ি পরের

ছাদে মাঝে মাঝেই আজকাল দেখা যায় ছেলেটাকে।লাঠি ঠুকে ঠুকে সেও প্রায়শই তিনতলার ছাদে ওঠে,আড়চোখে

তাকায় এপাশের ছাদের দিকে। হুঁ হুঁ বাবা! কি ভেবেছে টা কী,আমি কি কিছু বুঝি না,বয়স তো আমার কম হল

না!আমার বয়স যদি হয় দেড়শো বছর ,তো ওই ছেলে-মেয়ে দুটোর সত্তর খানেক। আমার কাছে ওরা কচি খোকা-

খুকু। বর্ষা এলে আমার শাখা-প্রশাখায়,পাতায়-পাতায় খুশি যেমন উপচে পড়ে,ওদের মনেও এখন তেমনি এক নতুন

ধরনের পুলকের ঝর্না বইছে , খুব বুঝতে পারছি আমি। এমনি এমনি এতদিনে আমার আসল গুঁড়িখানা থেকে গোটা

পঞ্চাশেক ঝুরি নামেনি!

চৈতালী ভৌমিক

                                                         



প্রেম ঝরে অনিবার
চৈতালী ভৌমিক

স্কোরপিয়ো গাড়ির একিধারের দুটি দরজাই খোলা। গাড়ির মধ্যে বসে আছেন পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গাড়ির মধ্যে বেজে চলেছে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গাওয়া ' এমনো দিনে তারে বলা যায় '।  সুরার গ্লাস হাতেই ধরা, অপর হাতে নিঃশেষ হচ্ছে সিগারেট। তন্ময় হয়ে বৃষ্টি দেখছে কুনাল সান্যাল। বিশ্বচরাচর জুড়ে শুধু বৃষ্টির শব্দ। বিদ্যুৎ ঝিলিকেই একমাত্র বোঝা যাচ্ছে কুনালের চোখের নোনা পানির ধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে বুক। 
  দোর্দণ্ড প্রতাপ কুনাল স্যারের চোখেও জল আছে ! ভেবে অবাক হয় নতুন ড্রাইভার বিরাজ। একবার ভাবলো স্যারকে ডাকবে কিনা,তারপরেই কি ভেবে চুপ করে গেলো। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চাঁদুর চরে, সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে দ্বারকেশ্বর। ওপাশের চড়ের সবুজ বনানী উথাল-পাতাল হয়ে যেনো মিলিত হতে চায় দ্বারকেশ্বরের সাথে। নদীর আকাশে কালো মেঘের ঘূর্ণি হুহু করে বয়ে যাচ্ছে এধার থেকে ওধার, যেনো কোনো বন্য পাগল হাতি উদ্দামতার সাথে ছুটে চলেছে সংগীনীর দিকে। বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা জল নদীর বুকে সহস্র বৃত্ত রচনা করে চলেছে।তার দিকে একমনে তাকিয়ে কুনাল ভাবে, তার জীবনের বৃত্ত কি  পূর্ণতা পাবে কখনো?  নাকি এভাবেই শুধু ছন্নছাড়া হয়ে নিঃশব্দে বয়েই যাবে ভালোবাসার ফল্গুধারায়।
  হঠাৎ গান থেমে যেতেই, বিরাজ চালিয়ে দেয় তার প্রিয় কিশোরের  গান ' রিমঝিম গিরে শাওন '। ছন্দ পতন হতেই চমকে ওঠে কুনাল। বিরক্তি হতে গিয়েও হাতের গ্লাস টা শেষ করে, আরো দু পেগ খেয়ে নেয়। তারপর বিরাজ কে বলে আবার সেই রবীন্দ্র সংগীতটাই চালিয়ে দিয়ে, গাড়ি এগিয়ে সামনের এক সরকারী বাগান বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে। বাগান বাড়ির কেয়ার টেকার কুনালের চেনা। তাই কুনালের পছন্দের একটি ঘর খুলে দেয় সে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে কুনাল  এগিয়ে যায় সামনের পুকুরটার দিকে।পা টা কি অল্প টাল খেলো! ভেবেই কুনাল পুকুরের দুপাশে বসার জায়গায় বাঁধানো ঘাটের একটি তে বসে ঝুপুস হয়ে ভিজতে থাকে। কানের মধ্যে, বুকের মধ্যে বাজতে থাকে একটিই গান  ”এমনো দিনে তারে বলা যায় 

 সে কথা শুনিবে না কেহ আর,

নিভৃত নির্জন চারি ধার।

দুজনে মুখোমুখি         গভীর দুখে দুখি,

আকাশে জল ঝরে অনিবার –

জগতে কেহ যেন নাহি আর॥"
কোথায় পিহু, আর কোথায় সে। কিছুতেই পিহুকে ভুলতে পারেনা কুনাল। আজকের এই দোর্দণ্ড পুলিশ কেন যে তখন বলতে পারেনি পিহুকে তার মনের সকল কথা সাহস করে! আজ তাহলে হয়তো তার পাশে, তার সাথে থাকতো পিহু। 
   তখন সদ্য কলেজ পাশ করে, বেকার কুনাল কিছু টিউশনি জুটিয়ে নিয়েছিলো হাত খরচের জন্য। সাথে চলছিলো পুলিশে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পড়াশোনা ও শরীর চর্চা। প্রথম দেখাতেই পিহুকে পছন্দ হয়ে যায়। কিন্তু শিক্ষক হয়ে সদ্য ঢুকেছে, এখনি প্রেম নিবেদন ঠিক নয় ভেবে, নিবেদিত প্রান হয়ে পিহুকে পড়াতো কুনাল। সময়ের অপেক্ষা করছিলো শুধু। ভেবেছিলো পিহুর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই তার মনের কথা জানিয়ে দেবে। কিন্তু এদিকে ভিতর ভিতর পিহুও যে কুনালের প্রতি আকৃষ্ট বুঝেও বোঝেনি পিহুর স্বার্থে। এদিকে পিহুর পরীক্ষা চলা কালীন কুনাল পাশ করে পুলিশের পরীক্ষায়। পিহুর সাথে ঠিক মতো দেখা করার ও সুযোগ পায় না, চলে যেতে হয় ট্রেনিং এ। ট্রেনিং শেষে বাড়ি ফিরে শোনে পিহুর বিয়ের সব ঠিক। সেই সময় হঠাৎ একদিন পিহু চলে আসে কুনালের কাছে। বলে তার আকাংখিত মনের সেই কথাটি। কিন্তু সদ্য চাকরি পাওয়া কুনাল সাহস পায় না দুঃসাহসিক কিছু করে ওঠার। ফিরে যায় পিহু।
  কিছুদিন আগে কোচবিহারে একটি কাজে গিয়ে হঠাৎ দেখা পিহুর সাথে। কোনো এন জিওর সাথে যুক্ত সে। বিয়ে ভেংগে গেছে বিয়ের পরপরেই। ফিরিয়ে আনতে চায় এখন সে পিহুকে নিজের জীবনে। কিন্তু পিহু কঠিন বর্মে ঢেকে নিয়েছে নিজেকে।
   কথা হয় ফোনে, তবে সে শুধুই কথা। মনের কথা বলার সাহস আজও পায়না। ভয় পায় কুনাল, যদি পিহু ফিরে আসতে না চায়।
  বাগান বাড়ির রুমে ফিরে যায় বৃষ্টি স্নাতো কুনাল। ফ্রেশ শাওয়ার নিয়ে টাওয়াল জড়িয়ে আবার বসে বোতল আর গ্লাস নিয়ে। সামনের জানালা দিয়ে হালকা ছাঁট আসছে বৃষ্টির।  পুকুরের চারপাশে তালগাছের সারি। তার ছাওয়া পরে পুকুরের চারপাশ  অপূর্ব এক ছবি এঁকেছে যেনো।  আজ যেন প্রকৃতি চাইছে কুনাল দুঃসাহসিক কিছু করুক। হাতে ফোন টা তুলে ডায়ল করলো 9433544142. 
- হ্যালো, স্যার 
- পিহু
- হ্যাঁ আমি বলছি
 কুনাল কানে ফোন চেপে ধরে আছে, শুনতে পাচ্ছে ওধারে গান চলছে ' এমনো দিনে তারে বলা যায় '
- পিহু, আজ আর স্যার নয়। আজ কুনাল সান্যাল ফোন করেছে তোমায়।
খানিক চুপ থেকে, পিহু শুনছে কুনালের ঘরেও গান চলছে ' এমনো দিনে তারে বলা যায় '...
 
  



সিলভিয়া ঘোষ

                                              



এক পশলা বৃষ্টি 




আচমকা  ছুটির  দিনের ভাত ঘুমটা  ভেঙে যেতেই জানালায়  চোখ চলে গেল  অন্বেষের।   মেঘ করে  এসেছে চারিদিকে, বিদ্যুৎ এর  পলকের সঙ্গে  বড় বড় ফোঁটা বৃষ্টি নামছে  এই  রূক্ষ  ঝাড়খণ্ডের  টিলার ঘেরা শহরতলী  চাতরা  অঞ্চলে।  বৃষ্টি  এখানে  কম হয় না  তবুও খুব  রূক্ষ  এই  জঙ্গলাকীর্ণ  মালভূমি।  অন্বেষ  এখানে আসা অবধি   তেমন  ঝড়  বৃষ্টি  দেখেনি  যা দেখেছিল  আয়লা,  বুলবুল , ফেণীর  সময়  কলকাতা কিম্বা  খড়্গপুরে।  বড় বড় বৃষ্টিফোঁটা গায়ে পড়তেই  ধড়মড়িয়ে  উঠে ঘরের বাকী দরজা জানালা বন্ধ  করে দিয়ে  ছোট্ট ব্যালকনিতে এসে  বসল টুল নিয়ে।    বাড়ির সামনেই সাপের মতোন ভিজচ্ছে বড় রাস্তাটা তার পিছনে বড় বড়  দেবদারু গাছ, ঝাউ গাছ  যেন  দীর্ঘ দাবদাহের পর  বৃষ্টি ফোঁটার আনন্দ  উপভোগ  করছে।  মাথা নেড়ে বর্ষাকে  যেন  স্বাগাত  জানাচ্ছে।  এমন মন খারাপ করা বিকেলে  অন্বেষের  ফেলে আসা  দিন গুলোর কথা  মনে পড়ে।  মনে পড়ে জেলের  ভিতর  পক্স হয়ে পড়ে থাকার  দিনগুলোর কথা,  এক ফোঁটা  জলের জন্য  আকুতি মিনতির  কথা,  বদলে জুটেছে তিরস্কার  আর অবহেলার  কথা।  অথচ  যার জন্য  এত  যাতনা সহ্য  করেছে সে তখন দিব্যি  ভিনদেশী তারা হয়ে  ধ্রুব তারার আশেপাশে  প্রতি দিন  জেলের  সেই এক টুকরো জানালার  ভিতর দিয়ে লুকোচুরি  খেলে অন্বেষের  সঙ্গে।  অন্বেষ আজও বুঝে উঠতে পারেনি  হঠাৎ  করে এমন শাস্তি কেন সে পেল?  সে তো কোন বড় রকমের অপরাধ  কোনদিন করেনি।  অপরাধ  তার একটাই হয়েছিল।৷   আজ তা বারবার নিজেকে প্রশ্ন  করে জানতে পেরেছে।  ভালোবাসা,  হ্যাঁ  এই ভালোবাসাই   ছিল তার সব রকম  কাঁটা। কিন্তু  কী করেনি সে এই ভালোবাসার জন্য।  জলের মতো টাকা,  বিদেশ  বিভুঁইতে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ, রঙীন জলের  আসর ,  আই ফোন  সব...
 সওব  দিয়েছিল ভালোবাসাকে  বাঁচিয়ে  রাখতে। অথচ কী থেকে  কী যে হয়ে গেল!  ভাবতেই অবাক লাগে!  সে তো  জানত   অন্বেষ  তার  থেকে  দূরে  বেশিদিন  থাকতে পারেনা তবুও এই রকম সিদ্ধান্ত কেন যে  সে নিল  তা সহজে  বহুদিন পর্যন্ত  বোঝেনি অন্বেষা।  যত দিন গেছে ততই সে বারবার  নিজেকে প্রশ্ন করে করে বুঝতে পেরেছে 
যে  সমাজ ও পরিবারের প্রিয় সদস্যদের  বুঝিয়ে উঠতে অক্ষম হয়েছিল  তার ভালবাসা।  তাই  নিজেকেই  ডুবিয়ে রাখত   অলীক  জগতের আড়ালে। সে হয়তো বুঝতেই পেরেছিল নিয়তি তাদের মিলন হতে দেবে না সুস্থ  ভাবে।  সব কিছুর থেকে নিজেকে নির্বাসিত করে এক রঙীন সন্ধ্যায় মুখোমুখি  দু গেলাস রঙীন পাত্রকে সাক্ষী রেখে চারতলা থেকে ঝাপ দিয়ে সরিয়ে নিয়েছিল সে। বোবা  প্রেমিকের মতো সেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  দেখেছিল অন্বেষ সবটা।  সে যে একমাত্র  সাক্ষী ছিল এমন  আচমকা  দুর্ঘটনার!  কিন্তু  ঈশ্বর সাক্ষী, আকাশের চাঁদ ,  তারারা সাক্ষী ছিল  যে, অন্বেষ  নির্দোষ।   তবুও ... তবুও   জেলের শাস্তি সে  ভোগ করেছ  মুখ বুঝে।  এই বোধহয় ভালোবাসার  প্রতিদান।  যাকে ভালোবাসো তার জন্য  মুখ বুজে  শাস্তিও মাথা পেতে নেওয়া।  বাইরে তখন  হু হু করে  হাওয়া বইছে, এক পশলা মুষল ধারায়  বৃষ্টির পর চোখে  মুখে লেগে থাকা শীতল  বৃষ্টি ফোঁটা   আর  অশ্রুজল  কেমাফ্লেজ  হয়ে  গেছে অন্বেষের  মুখমণ্ডলে... ব্যালকনির  রেলিং  এ  দুহাত চেপে ধরে সে  মনে মনে বলে ওঠে আমাকে বাঁচতে দে  রাজা, আমাকে বাঁচতে দে!   আমাকে বাঁচতেই হবে  নিজের জন্য  নয়  এক জোড়া  বাবা মায়ের জন্য।  সেই  কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখা  রাজা  তখন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে টুক করে ।  মধ্যবয়সী অন্বেষ  বর্ষাকে  গায়ে মাখে,  মুখে মাখে,  মাথা ভিজিয়ে শীতল হতে চায় বারে বারে! ভুলে থাকতে চায় বিগত অতীত কে!  কিন্তু  এই   এক পশলা বৃষ্টি তাকে  ভাসিয়ে দেয় এই ভাবেই ! 

তপন কুমার বসু

                          






ভেজাল


    এবারে বর্ষাটা বেশ ভালই পড়েছে। তার ওপর গত ৩/৪ দিন ধরে বৃষ্টিটা হয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে যা একটু বিশ্রাম দিচ্ছে।
   কিন্তু পরিমলকে আজ একবার বেরোতেই হবে। বৃষ্টিটা একটু থামতেই পরিমল বেরিয়ে পড়ল নিজের কাজে। হাতিবাগানের কাছে এসে বৃষ্টিটা আবার জোরে এল। উপায় কিছু না পেয়ে একটা গাড়ি বারান্দার নীচে আশ্রয় নিল। মনে মনে ভাবল আপাতত এখানেই আশ্রয় নেওয়া যাক। কিন্তু নাঃ। এখানেও আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না।
     হঠাৎ মনে পড়ে গেল এখানেই তো দু-একটা গলি পরেই তো পাড়ার খুকুদির বিয়ে হয়েছে। এক দৌড়ে সেখানে হাজির হয়ে দেখে খুকুদি খাটের ওপর বসে আলুর চপ মুড়ি খাচ্ছে।
     আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই মোটামুটি খবরাখবর নিয়ে একগাল হেসে বলে ঠিক সময়েই এসেছিস। আয়, দুটো গরম গরম আলুর চপ খা।
    তেলেভাজা খাওয়া আমার নিষিদ্ধ। খুকুদির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বললাম এই ভেজালগুলো কি না খেলেই নয়। জান, এগুলো কি তেলে ভাজে ? এই ভেজাল জিনিসের প্রতি আসক্তির জন্যই দেশটা ভেজাল জিনিসে ভরে গিয়েছে। 
  আমার কথাগুলো খুকুদি রুদ্ধনিঃশ্বাসে শুনছিল। আমি থামা মাত্রই খুকুদি আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
  আমি এই পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমতা আমতা করে বললাম খুকুদি কিছু মনে কোরো না। তেলেভাজা যে তোমার এত প্রিয় তা জানতাম না।
   খুকুদি চোখ থেকে আঁচল সরিয়ে বলল, না ঠিক তা নয়। বাজারে ব্যাপক ভেজাল চলছে বলেই তুই আজ আমাকে এই পোশাকে দেখতে পারছিস।
  খুকুদির কথাটা ঠিক বোধগম্য হল না। বললাম, তার মানে?
    খুকুদি চোখ মুছতে মুছতে বলল, আর বলিস কেন। গত রবিবার তোর জামাইবাবুর সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। তোর জামাইবাবু প্রবল চীৎকারে ঝগড়া করে ঢকঢক করে এক শিশি আইডিন খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে খবর চাপা থাকল না। পাড়ার ছেলেরা জানতে পেরে সোজা নিয়ে গেল হাসপাতালে।
   বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। পাড়া প্রতিবেশীরা বাড়িতে এসে সব ভীড় করেছে। ঠিক সেই সময়ে খবর এর আইডিনে ভেজাল থাকার জন্য জামাইবাবুর কোনো ক্ষতি হয়নি। বহাল তবিয়তে জামাইবাবু বাড়ি ফিরে আসছে।
   খুকুদি একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে বলল, বল আইডিনে ভেজাল ছিল বলেই তো বৈধব্যের
হাত থেকে রক্ষা পেলাম।
  নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম ভাগ্যিস!!
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ে চলেছে।

শ্রাবণী সোম যশ

                                




স্বর্ণকুঠি' 



"ওরে আস্তে আস্তে বাছা  , এই আধভাঙ্গা মার্বেলের বুকে কান পাতলে আজও মলের ঝমঝম শব্দে পায়ে পায়ে ঘুরতে ইচ্ছে করে। তোদের  কাছে এখন চুন সুড়কির গাদা বৈ আর  কিছুই তো নয়। কিন্তু আমার তো সর্বস্ব। একটাই শান্তি  জায়গাটা ভালো কাজে লাগবে। এই মহীপাল গ্রামেরই ছেলে নির্মল ঠিকাদার। ওর ঠাকুর্দা ছিল নামকরা লেঠেল। তারই নরম-সরম  নাতি নির্মল। পেশায়   ঠিকাদার। ওর যখন দু বছর , গাঁজাখোর বাপটা মরলো কামবেশ্বর তলার ঝোপে সাপের কামড়ে।  বড়ো জাগ্রত শিব এই কামবেশ্বর। কামবেশ্বরের ফুল বেলপাতা দিয়েই তো আমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহানারায়ণ পাল। যেমন ধনী তেমনই গুণী জমিদার। তার নামেই তো চন্দ্রপুরের নতুন নাম হলো মহীপাল। ওরে ওরে দেখে বাপ আমার, এই জীর্ণ শরীরে এখনও ব্যথা টের পাই রে। লোকে বলে খ্যাপাটে নির্মল। নিজের মনে কথা কয়।  আমার সুখদুখের কথা তো ওই একমাত্র বোঝে। বেটা এখন কাজ পেয়ে কথায় গা করছেনা"।
- আহ থামো দিকিনি , না আছে তোমার ঐ স্বর্ণকুঠি নাম আর না আছে আগের সেই গৌরব। এখন তো লোকে ভাঙ্গাকুঠি নাম দিয়েছে তোমার । তাও এত দেমাক কিসের।
ধমকায় নির্মল। ভাঙাচোরা রাবিশ সরানোর কাজে ব্যস্ত কুলি- কামিনরা ওর আপনমনে  বকবকানি দেখে হাসে। এসব গায়ে মাখে না ও।

ছোটবেলায় মায়ের সাথে স্বর্ণকুঠির বাগানে প্রথমবার  কাঠ কুড়াতে এসে  রংচটা থামগুলোর গায়ে হাত বোলাতেই শুনতে পেয়েছিল,
- আহ ! কতদিন বাদে সেই কমলাবতীর মতো মিঠে হাতের ছোঁয়া পেলাম।
চমকে সরে এসেছিল নির্মল। খুব ভয় পেয়ে গেছিলো সেদিন। আবার পরেরদিন কি এক অদ্ভুত নেশার টানে  এসে  এই বিশাল বাড়িটার আধখসা থাম দেওয়াল জং ধরা গরাদ দরজার ইয়া পাল্লা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছিল। পায়ে পায়ে লম্বা বারান্দা ছাড়িয়ে বাগানের কোণে কামবেশ্বর মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসেছিল। পেয়ারা কাঁঠাল জামরুল আম সবেদা কি নেই ! যে যার খুশিমত পেড়ে খায়। সাপখোপ , দু চারটে হাড়গিলে শেয়াল বেঁজির রাজত্ব আছে ঠিকই তবে তাতে ও ডরায় না। পাঠশালায় ছুটি হলেই আধখামচা সোনালী রঙের  ভাঙাচোরা ঘরগুলোয় ঘোরার নেশায় ছুটে আসতো ও। মায়ের কাছে শুনেছে  আরও অনেক আগে পুরো বাড়িটাই সোনালী রঙের ছিলো। আর  একদম ওপরে একটা ছোট সোনার স্তম্ভ ছিল তাতে অনেক আলো বসানো ছিলো। সেই আলো যখন গোটা বাড়িতে ঠিকরে পড়তো সত্যিই নাকি মনে হতো সোনার বাড়ি। নামও ছিল স্বর্ণকুঠি।

পাঠশালায় ছুটি হলেই  রোজ চলে আসতো এখানে। কি করে যেন ভারি বন্ধুত্ব হয়ে গেল এই স্বর্ণকুঠির সাথে। প্রতিটি দেওয়াল কড়ি বরগার কথা শুনতো মুগ্ধ হয়ে।  শিকড় গজানো লোহা বের করা সিঁড়ির ধাপে আলতো পায়ে ভর দিয়ে পৌঁছে যেত দোতলার বিশাল হলঘরে, যেখানে ঝাড়লণ্ঠনের স্মৃতি আঁকড়ে শূন্য আংটাগুলো মূকাভিনয় করছে।   দেওয়ালের ফ্রেশকো ছিঁড়ে গজিয়ে ওঠা লতাগুল্মের বাহুডোরে ধরা দিয়েছে স্যাঁতস্যাঁতে ঐতিহ্য। আবার কখনও আগাছার ঝোপ সরিয়ে নেমে যেতো মন্দিরের নিঃঝুম গর্ভগৃহে। মুগ্ধ হয়ে শুনতো কমলাবতীর কথা স্বর্ণকুঠির জবানে,
- দুধে-আলতায় ডোবানো পায়ের ছাপ ফেলে ষোড়শী কমলাবতী এগিয়ে চললো  অন্তঃপুরে। গায়ের রং আর পায়ের ছাপ দুই  মিলেমিশে একাকার। সাথে নতুন বউয়ের গয়না,  মলের ঝমঝম শব্দ। আমার পাথুরে বুকটা জুড়িয়ে যেত ওর কোমল স্পর্শে মিঠে সুরেলা গলার স্বরে।
শুনতে শুনতে কিশোর নির্মলেরও মনে খুব সাধ হতো সেও একবারটি কমলাবতীকে ছুঁয়ে দেখবে। প্রশ্ন করতো,
- কমলাবতী কে ?
-মহানারায়নের পুত্র বীরনারায়ণ, তার যমজ পুত্র হোল প্রতাপনারায়ণ  আর প্রদীপনারায়ণ । প্রসূতিগৃহেই মোহানারায়নের স্ত্রী   রানিমা মারা গেলেন। এমনই লিখন,  তার কিছুদিনের মধ্যেই দুই ছেলেও পিতৃহারা হলো। দুই ভাইয়ের কারোরই ঝোঁক ছিলোনা জমিদারীতে। নায়েবই ওসব সামলাতেন। কমলাবতী হল ছোটছেলে প্রদীপের স্ত্রী। প্রদীপ ছিল আমুদে  দিলদরিয়া কিন্তু রাগলে চন্ডাল।  শিকারের প্রবল নেশায় মাসে অন্ততঃ সাতদিন জঙ্গলেই কাটাতেন।   জঙ্গলের মোহিনী আকর্ষণের  কাছে হার মেনেছিলো কমলাবতীর স্নিগ্ধ রূপলাবণ্য। এদিকে প্রতাপ ছিল আত্মকেন্দ্রিক ঘরমুখী কিন্তু সুরের সাধক। যেকোন বাদ্যযন্ত্র ওর আঙুলে প্রাণ পেতো। কিন্তু কিছুতেই সংসারী হতে রাজি হলেন না।
গল্প শুনতে শুনতে সড়সড় করে হয়তো সাপ চলে যেতো নির্মলের গা ঘেঁষে। হুশই  থাকতোনা ওর বাড়ি ফেরার। কতবার যে লাঠিপেটা খেয়েছে মায়ের কাছে।


ভাঙা স্বর্ণকুঠির  রাবিশ সরানোর কাজ পেয়েছে নির্মল। তারপর এই জমিতে মেয়েদের হাইস্কুল হবে। ইদানিং গ্রামের বেশ কিছু বখাটে ছেলে আস্তানা গেড়েছিলো ওই স্বর্ণকুঠিতে। নালিশ করেও লাভ হয়নি। এদ্দিনে একটা কাজের কাজ হবে। নির্মল মনে মনে ভাবে গ্রামের মেয়েগুলোকে আর ভিন গ্রামে যেতে হবে না পড়তে। ভাব
এটা সেটা ভাবতে ভাবতে  কখন যে স্বর্ণকুঠি পৌঁছে গেছে খেয়ালই করেনি। দু তিনটে করে সিঁড়ি টপকে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে দোতলায় দক্ষিনদিকের বিশাল ঘরটায় এসে দাঁড়ালো নির্মল। দেখলেই বোঝা যায় এটা প্রতাপনারায়ণের সংগীত মহল। ঘরের মেঝেজুড়ে উইযের আল্পনা।  এখনও দোয়ালের কোথাও কোথাও বাদ্যযন্ত্রের অংশবিশেষের মলিন চিত্র চোখে পড়ছে। কত অনুরণন কত সুর মুর্ছনার সাক্ষী এই ঘরের প্রতিটি কোণ ! ওমনি কানে এলো,
- সুর না সুরের অভিশাপ ! 
- অভিশাপ কেন হবে, ধনীদের ওসব বিলাসিতা তো থাকেই। কথা বলতে বলতেই কেমন দমবন্ধ লাগে নির্মলের। এতদিনের পুরোনো বাড়ি !  ওর মনের কথা যেন পড়ে ফেলে রংচটা দেওয়াল আধভাঙ্গা জানলা দরজা সবাই।
- এঘরের বাতাস তো ভারী , হাঁপিয়ে তো  উঠবেই তুমি । তার চেয়ে  বরং মন্দির চাতালে বসো। ওরা কাজ করুক ওদের মতন।
মন্দিরের শ্যাওলাধরা সিঁড়িতে বসে নির্মল উদাস হয়ে যায়। বাগানটারও  হতশ্রী দশা। ভেতর দালানের পাশে কয়েকটা পেয়ারা আর টগর গাছ টিকে আছে এখনও। দালানেই গাঁজা জুয়ার ঠেক বসছিল কয়েকমাস ধরেই।

মনটা হু হু করে নির্মলের, মনে পড়ে যায় পুরোনো কথা, কমলাবতীর কথা। তখন নেশা ধরে গেছিলো কমলাবতীর গল্প শোনার। দুপুর বিকেল যখন হোক লুকিয়ে চুরিয়ে পৌঁছে যেত স্বর্ণকুঠি, ডুবে যেত গল্পে, মুগ্ধ হয়ে শুনতো,
- কিশোরী কমলাবতী লঘুপায়ে এঘর ওঘর দালান ঘুরে বেড়াতো। সারাদিন শুনতাম  ওর মলের মিষ্টি শব্দ। বাগানে রঙিন প্রজাতির মতো ঘুরে বেড়াতো। ভারী ভালো মেয়ে। প্রতাপকে সমীহ করে একটু দূরে দূরেই থাকতো। একবার  হয়েছে কি , প্রদীপ গেছে শিকারে আর দুপুরবেলায় কমলাবতী ঘুরতে ঘুরতে প্রতাপের ঘরের সামনে যে বড় হল টা আছে ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে।  ওর সেতারের সুর মুগ্ধ হয়ে শুনছে। শুনতে শুনতে আপন খেয়ালে সুরের তালে হলময় ঘুরে ঘুরে নাচছে ঠিক যেন দেবতাকে সমর্পণ করছে ওর ভক্তি - ভালোবাসা। এরপর থেকেই রোজ ওই সুরের টানে কমলাবতী উঠে আসতো ওপরে।  কোনোদিন বাঁশি তো কোনোদিন এস্রাজ বা তবলায় বোল তুলতো প্রতাপ আপনমনে। ও টেরও পায়নি যে কমলাবতী রোজ সুর- তালের ছন্দে মেতে ওঠে। একদিন রাতের  প্রথম প্রহরে  প্রতাপ  বাজাতে বাজাতে বাঁশিটি রেখে হলে বেরিয়েই দেখলেন অপুর্ব লীলায়িত ভঙ্গিতে কমলাবতী নেচে চলেছে। যেন মীরা,  শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিবেদন করছে নিজের ভক্তি। মুগ্ধ হয়ে গেলেন প্রতাপ। বাঁশিটা নিয়ে আবার বাজাতে শুরু করলেন কমলাবতীর চারপাশে ঘুরে  ঘুরে। খোঁপা ভেঙে মেঘবর্ণ চুল লুটিয়ে পড়েছে কোমর ছাপিয়ে, স্খলিত আঁচল, পদ্মফুলের মতো মুখমণ্ডলে মুক্তোবিন্দু ঘাম। একজন সুরে মুগ্ধ আরেকজন সুষমায় ! কখন  যে সেখানে প্রদীপ ফিরে এসে দাঁড়িয়েছে দুজনের কেউই টেরও  পায়নি। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে গেল প্রদীপ। হাতে শিকারের দো-নলা বন্দুক। চিৎকার করে উঠলেন, এইসব রসলীলা  চলছে আমার অনুপস্থিতিতে। সম্বিৎ ফিরতেই চমকে নিজেকে গুটিয়ে নিলো কমলাবতী। প্রতাপও নিজ কক্ষে ফিরতে উদ্যত কিন্তু কোনকিছুরই সুযোগ দিলো না প্রদীপ। আমি চিৎকার করে বলেছিলাম ভুল হচ্ছে।  চরম ভুল। ফুলের চেয়েও নিষ্পাপ মেয়ে ও।  চিৎকার করে বলেছিলাম ওকে মেরো না। ওর যে অনেক কিছু বলার আছে তোমাকে। ততক্ষণে প্রতাপও নিজের ঘর থেকে বন্দুক নিয়ে এসেছে। কেউ শোনেনি আমার কথা। কেউ না। স্বর্ণকুঠির নোনা স্যাতস্যাতে দেওয়াল আরো একটু ভিজে ওঠে স্মৃতির ভারে।
- কি হলো চুপ করে গেলে কেন। বলো কি হয়েছিল সেদিন।
- যা হয়েছিল সেতো গ্রামের সবাই  জানে। প্রদীপের বন্দুকের গুলিতে লুটিয়ে পড়লো কমলাবতী। দু দুটো প্রাণ চলে  গেল একসাথে। প্রদীপকে বলার অপেক্ষায় ছিল ও। বলা হলো না। কেউ জানলো না কমলাবতী মা হতে চলেছিল। 
- হ্যাঁ জানি প্রদীপনারায়ণ বউকে মেরে দুঃখে নিজেও গুলিতে আত্মহত্যা করেছিল। তবে তার আগে প্রতাপ নারায়ণ এর মাথার খুলি দু টুকরো করে দিয়েছিল গুলিতে।
-  দুই ভাইয়ে তুমুল বচসা। দুজনের হাতেই বন্দুক। হাতিহাতিতে প্রদীপের  বন্দুকের গুলি প্রতাপের  মাথা ফুঁড়ে এসে  লাগলো আমার ছাতিতে। উফফ কি কষ্ট ! না না গুলিতে নয়, চোখের সামনে গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল। এতগুলো  প্রাণ চলে গেল!  অসহায় আমি চুপ করে দেখলাম। কাউকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার সর্বাঙ্গ  এমনভাবে জমির সাথে শক্ত করে গাঁথা ছিল আমি কিছুই করতে পারলাম না। সেইদিন থেকে চিড় ধরলো  আমার শরীরে ।

নির্মল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে বেশিরভাগ ভাঙা আবর্জনা সরিয়ে ফেলেছে ওর  লোকজন। কিন্তু এই কাজটা করে ও  একদম খুশি নয়। ওর ছোটবেলার স্বপ্নের রাজ্য এটা। শুধু ছোটবেলা কেন আজও ওর জীবনের অচ্ছেদ্য সঙ্গী এই স্বর্ণকুঠি। আজও দুজনে দুজনের সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয় চাতালে। ও না করলে অন্য কেউ করবে এই কাজটা। করবে নির্মম ভাবে। তবে নির্মল ভেবেই রেখেছে মূল ফটকের সামনের প্রিয় মার্বেলের টুকরোটা ও নিজের কাছেই রাখবে। স্বর্ণকুঠির মূল দুটো স্তম্ভ আড়াআড়ি এমনভাবে ভেঙে পড়েছে যে গোটা বাড়ির বেশিরভাগ অংশই  তাতে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে। একেবারে ধ্বংসস্তুপ। পেয়ারা গাছের খানিকটা থেঁতলে গেছে। আর গাছ !  বাড়িটারই কিছু বাঁচলো না। এইতো দু সপ্তাহ আগেও ও কতক্ষন কাটিয়ে গেছে বাইরের দালানে। কই একবারও মনে হয়নি তো এভাবে হঠাৎ সব ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বর্ণকুঠি নিজেও কি বুঝেছিলো শেষের সে দিন ঘনিয়ে এসেছে। স্কুলফেরত বাচ্ছাগুলো দুদ্দার ছুটে এসে পেয়ারা পাড়ছিলো। ওদের দলে মাঝে মাঝেই কমলিটাও থাকে। নির্মল দেখলেই সাবধান করতো বাচ্ছাগুলোকে, সাপখোপ আছে। মনে মনে হেসেছিল ওর মতো কমলিটারও কি স্বর্ণকুঠির নেশা ধরলো ! ওর ই তো মেয়ে। ও নিজেও তো কমলীর মতো 6 বছর বয়স থেকেই স্বর্ণকুঠিতে আসতো। পিলার দুটো সরালেই কাজ শেষ।  অদ্ভুত ব্যাপার এতবড় আর ভারী  পিলার উল্টে পড়েছে, কিন্তু টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি। যারা সেদিন ওই ভেতর দালানে জুয়ার আসর বসিয়েছিল তাদের মধ্যে দুজন আহত হয়েছে ওই পিলারের নীচে। একজনের কোমর থেকে নিম্নাঙ্গ থেঁতলে গেছে আরেকজনের হাত দুটো গুঁড়িয়ে গেছে। দুজনেই হাসপাতালে। আদৌ বাঁচবে কিনা কে জানে। পিলারগুলো ভেঙে ভেঙে সরাতে হবে। প্রথম পিলারের পর দ্বিতীয়টা একটু সরাতেই তলা থেকে একটা চ্যাপটানো জুতো আর ফ্রকের ছেঁড়া অংশ দেখা গেলো। চমকে উঠলো নির্মল, একি এত কমলির জামা জুতো। কমলি এসেছিল সেদিন এখানে ! কই বলেনি তো। থেবড়ে বসে পড়লো ও ওখানেই। কি সর্বনাশ ! যদি কমলির কিছু হতো ! যদি চাপা পড়ে যেতো পিলারের নীচে ! ও বাঁচতো না। জানতেই হবে কমলির জামা জুতো এখানে এলো কি করে । সব মজুরদের দুপুরের খাবারের ছুটি দিয়ে দিল নির্মল। আজ পুরোটা না জেনে ও কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না। কমলি যে এসেছিল সেটা তো বুঝতেই পারছে। কিন্তু কই কমলি তো কিছুই বলেনি । নাহ ওকে শুনতেই হবে। চিৎকার করে ওঠে নির্মল,
- বলো বলো আমার কলমী কি করছিল এখানে।
- তোমার কলমী তো ঠিক আছে কিছু ক্ষতি তো হয়নি ওর। তাহলে আর কেন চিন্তা করছো এত। আমি কি পারি তোমার কলমীর কোনো ক্ষতি করতে !  এবার আমায় বিদায় দাও। অস্থির হয়ে ওঠে পিতার বাৎসল্য। কিছু তো ঘটেছে যেটা ও জানেনা।
- বলতেই হবে তোমাকে । এই অস্থিরতার মধ্যে আমাকে ফেলে রেখে তুমি চলে যেতে পারো না।
- বাচ্ছাগুলো রোজই আসে পেয়ারা খেতে। ডালে চড়ে লাফায় ঝাঁপায় পেয়ারা খেয়ে বাড়ি যায়। সেদিন মেঘে কালো হয়ে এসেছিল চারিদিক। কলমী একাই এসেছিল পেয়ারা পাড়তে। ভেতর দালানে তখন দুজন বসেছে তাস আর গাঁজার ছিলিম নিয়ে। কলমীকে দেখেই ওরা হাত নেড়ে ডাকলো ভেতরে।
- আহ থেমো না বলো। চুপ করে থেকো না আর। জানি খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার। সবাই ভাবে তোমার সারা শরীরে নোনা ধরেছে কিন্তু আমি জানি ওটা তোমার কান্না, চোখের জল। একটিবার একটু কষ্ট সহ্য করে বলো
- ওরা কলমীকে বললো, অনেক পেয়ারা দেবে ওদের কোলে বসলে। আমি চিৎকার করে বললাম কলমী বাড়ি যাও ঝড় উঠবে এখুনি। ওরা দুষ্টু লোক। চঞ্চল কলমী লাফাতে লাফাতে ছুটে এলো ওদের কাছে। হেসে উঠলো ওরা দুজনেই। আমি ভয় পেয়ে গেলাম ওদের কান্ড দেখে। কি করি এখন । ওরা ওর গাল টিপছে জামা তুলে ওর পাপড়ির মতো শরীরে।
- আহ চুপ করো তুমি। আমি আর শুনতে পারছিনা। তুমি আমার কেউ না। চুপ করে দেখলে তুমি। কিন্তু কমলীর কিছু হলে ব্যথা পেলে ওর মা তো বলতো আমাকে। বলো তুমি আমি সব শুনবো।
- আমি অসহায় চিৎকার করছি কেউ এগিয়ে আসছে না। কিভাবে রক্ষা করি এই পাষন্ডদের কবল থেকে। কলমীর দু হাতে দুটো পেয়ারা ধরিয়ে দিয়েছে ওরা। এবার ওরা ওর ইজের ধরে টানছে। ছোট্ট ছোট্ট হাতগুলো দিয়ে কলমী ওদের হাত সরিয়ে দিচ্ছে। ওরা তত মজা পাচ্ছে। ভাবছি  আবার কি সেই আগের মতোই মুক আমি দেখবো। আগেরবার তো পারিনি, মান প্রাণ কিছুই রক্ষা করতে। এবারেও কি ! কি করি। কিন্তু হুড়মুড়িয়ে ওদের গায়ে পড়লে কলমীও তো বাঁচবে না। বাবা কামবেশ্বর সহায়। প্রচন্ড ঝড়ে ধুলোয় কলমী ছিটকে পড়লো উঠোনে। ওর জামাটা ছিঁড়ে গেল ওদের হাতের টানে। সুযোগ কাজে লাগলাম আমি। এই পোড়ো জান দিয়েও ক্ষতি হতে দেব না কলমীর। সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে নিজের মূল স্তম্ভ নড়িয়ে পড়লাম ওদের ওপর। ততক্ষনে কমলী ভয়ে খালি পায়েই ছুটছে বাড়ির পথে। আমি বুঝলাম আমি পেরেছি। আমি জিতে গেছি এবার। কমলিবালা না হোক কলমী রূপে তো তাকে রক্ষা কোরতে পেরেছি। আহ কি শান্তি !
আজ স্কুলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হলো। কলমীকেও এই স্কুলেই ভর্তি করে দিয়েছে নির্মল। বিশাল গেটের ওপর সোনালী ফলকে লেখা কমলিবালা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। আর শ্বেত পাথরের টুকরো টা আজও নির্মলের বাড়ির ঠাকুর ঘরের চাতালে লাগানো আছে।