অর্পিতা বোস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অর্পিতা বোস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

অর্পিতা বোস

                   




অমলতাসের ডাইরি



____________


মানসীর হাতে ডায়েরিটা দিয়ে তিতিন  বলে,

-- পারলে ক্ষমা করো মামনি।

 অবাক চোখে মানসী তাকায়। তিতিন ডায়েরি খুলে সামনে রাখে মানসীর।  শুকিয়ে যাওয়া অমলতাসের বিবর্ণ পাতার  বুকমার্ক। বাঁদিকের পাতায় মানসীর শেষ  লেখা আর ডানদিকের পাতাটা থেকে তিতিনের হাতের লেখা!

তিতিন ধরা গলায় বলে,

-- মামনি অন্যের ডায়েরি পড়তে নেই জানি। কিন্তু বাবা দিয়েছিল পড়তে। বাবাও পড়েছিল , আর পড়েই বোধহয় তোমাকে আরও শ্রদ্ধা আর আমার প্রতি...

 কথাটা আর শেষ করতে পারেনা তিতিন। চোখ মুছে একটু সময় নেয় যেন পরের কথাগুলো গুছিয়ে বলার জন্য।

  নীরব মানসীর চোখে শুধু শূন্যতা খেলা করে। আবার  তিতিন বলতে শুরু করে,


 -- মামনি তোমাকে তখন আমার মনে হতো রূপকথার গল্পের ডাইনি। তাই অমন করেছি। তোমাকে অ‍্যাসাইলামে পাঠিয়েও  রাগ কমেনি আমার। তুমি চলে যাওয়ার পরে ঠাম্মাম বাবাকে লুকিয়ে তোমার জামাকাপড় বের করে দিত। আর সব ধ্বংস করার নেশায় মেতেছিলাম আমি । তোমার সব শাড়ি কেটে কুচিকুচি করতাম। আমার খুব আনন্দ হতো। যেন তোমাকেই এভাবে শেষ করছি।মারছি । নিজের সব রাগটাই যেন তোমার জামাকাপড়গুলোতে  মেটাতাম আমরা। তারপর শুরু হলো তোমার গাছদের ধ্বংস করার পালা। আমি পারতাম না। ঠাম্মাম গরম জল ঢেলে দিত। গাছগুলো মরে যেত। কিন্তু একটা গাছ কিছুতেই মরছিলনা। তখন ভারী টবটা  

ঠাম্মাম তুলে ফেলে দিতে গেল। আর হঠাৎই ব‍্যালেন্স হারিয়ে ঠাম্মামও ছাদ থেকে পড়ে গেল। চোখের সামনে  ঠাম্মামকে পড়ে যেতে দেখে কেমন হয়ে গেছিলাম জানো। তোমার কথা মনে এসেছিল প্রথম। কিন্তু  তুমি তখন অনেক দূরে।

একটু থেমে আবার বলতে থাকে তিতিন,


   --  ঠাম্মামের মৃত্যুটা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে মামনি। মাকে কখনও দেখিইনি। ঠাম্মামই আমার সব ছিল।  যা বলত সবটাই ঠিক বলে জানতাম। তোমাকে বাবা বিয়ে করে আনল। ঠাম্মামের ইচ্ছে ছিল না।  তোমাকে নিজেও অপছন্দ করত আর আমাকেও শেখাতো যে তুমি খারাপ। তুমি  বাবাকে আমার থেকে নিয়ে চলে যাবে। তোমরা অন্য বাড়িতে থাকবে। আর তোমার পেটে একটা ভাই আছে। বাবা আমাকে না ঐ ভাইকেই বেশি ভালোবাসবে।

তখন  বুঝতাম না মামনি। ছোট আমি। নরম মাটির মতো মন ছিল। যা বলেছে ঠাম্মাম তাই বিশ্বাস  করেছি।


মানসী চুপ করে শুনছিল তিতিনের কথা। শুনছিল না আসলে ফিরে গিয়েছিল  সেই  কলেজজীবনের শেষ দিনে....

 পরীক্ষার ফলের লিস্টে দ্বিতীয় স্থানে  নিজের নামটা দেখেই খবরটা দিতে   অমলদার বাড়িতেই প্রথম ছুটেছিল তরুণী  মানসী। কিন্তু বাড়ির গলির সামনে  গিয়ে  পাদুটো আটকে গেল। থিকথিক করছে ভিড়। সদ‍্য পাওয়া চাকরি থেকে ফেরার পথে বাইকের সাথে মুখোমুখি ধাক্কায় অমলদার নিষ্প্রাণ দেহটা রক্তে মাখামাখি।

 নাহ্ আর এগোতে পারেনি মানসী। ঝাপসা চোখে ফিরেছিল বাড়ি। এরপর একমাত্র মানসী জানে অমলদা চলে যাওয়ার পর নিজের বদলে যাওয়া জীবনের যন্ত্রণা। অমলদাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট যতটা ছিল তারসাথে ছিল অন্য এক অনুভব। সময়ের সাথে সাথে শরীরের মাঝে অমলদার স্মৃতিকে অনুভব করতে থাকল। সেই বর্ষার সন্ধ্যায় অমলদার সাথের ঘনিষ্ঠতার ফসল।  অনেক চেষ্টাতেও লুকিয়ে রাখতে পারেনা মায়ের চোখকে। 

প্রচন্ড মার খেয়েও অমলদার নাম উচ্চারণ করেনি মানসী। মা চেয়েছিলেন নষ্ট করতে। কিন্তু  ডাক্তার জানাল অনেক দেরি হয়ে গেছে। লোকের চোখকে ফাঁকি দিতে  দিশেহারা তখন মা। তারপর কোথা থেকে  সম্বন্ধ আনল মায়ের বিশ্বস্ত বান্ধবী।  শুভব্রত অর্থাৎ তিতিনের বাবার সাথে। বিয়ে তো না শুভব্রতর সাথে অলিখিত  চুক্তি পত্রে সই হলো যেন।

অমলদার সন্তানকে বৈধ স্বীকৃতি দেবেন          

শুভব্রত। আর বিনিময়ে তিতিনের মা হয়ে  উঠতে হবে মানসীকে। অবশ্য রাজি হওয়া ছাড়া আর কিই বা করতে পারত!অনাড়ম্বর ভাবে বিয়ে  হলো।

কিন্তু এবাড়িতে এসে দেখে এক  ভয়ানক  পরিস্থিতি। তিতিন আর তিতিনের ঠাম্মাম  কিছুতেই সহ‍্য করতে পারত না মানসীকে। শুভব্রতর সামনে বুঝতে দিত না। শুভব্রত বেরিয়ে যেতেই বদলে যেত বাড়ির পরিবেশ। তিতিনকে ধারেকাছে আসতে দিতেন না শাশুড়িমা। মিষ্টি  কিশোরী   তিতিনকে মানসী কাছে ডাকতে গেলেই তিতিন ছুটে পালাতো। সাথে মুখে সবসময়  বলতে থাকত,

-- তুমি আমার  সৎমা। তুমি বাজে মা।তুমি ডাইনি।


 অসহায় মানসী একা ঘরে কাঁদত। তিতিনকে বারবার নিজের করে নিতে  চাইছিল। আর তিতিন ততটাই দূরে সরিয়ে   রাখছিল ঘৃণার সাথে। শুভব্রতকেও কিছু  বলতে পারতনা। শুধু কষ্টগুলো অক্ষরবন্দী করত অমলদার দেওয়া ডায়েরিতে। সেবছর জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল অমলদা। তিতিনদের বাড়ির সামনে থাকা  অমলতাস গাছের একটা পাতাকেই  মার্কার  হিসেবে ব‍্যবহার করত। 


 -- মামনি..

তিতিনের ডাকে বাস্তবে ফেরে  মানসী। তিতিন বলে,


-- মামনি, ঠাম্মামের মৃত্যুর পর সব বদলে গেল জানো। একা একা এই বাড়িতে  ঠাম্মামের অভাব পূরণ করার জন্য  তোমার ঘরে আসতাম।মনে হতো যদি তুমি  কাছে ডাকতে  তখন  তবে ছুটে চলে যেতাম  তোমার কাছেই। কিন্তু  তুমি তো তখন  কোথায়  হারিয়ে গেছিলে। বাবা আর আমি  অনেক খুঁজেছিলাম তোমাকে কিন্তু খুঁজে পাইনি।


মানসী আপনমনে ভাবে, সত্যিই  হারিয়ে গিয়েছিল। অ‍্যাসাইলামের ডাক্তার  দিদিমনির সাহায্যেই হারিয়ে গিয়েছিল  অনেক  দূরে।হ‍্যাঁ, ডাক্তার দিদিমনির  চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠা মানসী বলেছিল জীবনের প্রতিটা কথা। আর সাহায্য চেয়েছিল ডাক্তার দিদিমনির কাছে নতুন করে বাঁচার। সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। দিদিমনির প্রশিক্ষণে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন। সমাজের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে  শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত  হলো। তারপর এই অনাথাশ্রমের দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন ডাক্তার দিদিমনি। এখানেই ভালো থাকার চেষ্টায় আছে। সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ভুলতে পারেনি সন্তান হারানোর শোক। অমলদার স্মৃতিচিহ্ন চিরদিনের মতো মুছে দেওয়ার অপরাধী আজ মানসীর সামনে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। বুকের মধ‍্যে লুকিয়ে রাখা নরম ক্ষতটা  আজ আবার  কষ্ট দিচ্ছে।


-- মামনি....


     তিতিনের মুখে " মামনি" সম্বোধনটা যেন  সেই নরম ক্ষততে কাঁটার আঘাত দিচ্ছে।তবে সেদিন বোঝেনি ছোট্ট তিতিনের কাজের পেছনে আরেকজন ছিল।সেদিন এই তিতিন আর ওর ঠাম্মামের  ষড়যন্ত্রেই মানসীর এই সন্তানশোক।


--  মামনি তুমি এমন চুপ করে থেকোনা  প্লিজ। কিছু  বলো...


অনেককিছুই বলতে পারে মানসী কিন্তু কিছুই বলতে পারছেনা। উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ায়। 

 --  মামনি,  আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি মামনি। শুধু তোমার কাছে সব দোষ স্বীকার করব বলে। তোমার ডায়েরি পড়ে বুঝেছি আমি কত ভুল করেছি। মামনি যা করেছি তার কোনো ক্ষমা হয় না তবু যদি পারো ক্ষমা করো।


নিজেকে সামলে কান্নাভেজা গলায় তিতিন বলে,

--  মামনি, ডায়েরিটা রেখে গেলাম তোমার কাছে।  আমার অপরাধের স্বীকারোক্তি  হিসেবে। বাকিটা তোমার হাতেই ছেড়ে দিলাম। আমি আসছি মামনি। 


 মানসী ঝাপসা চোখে দেখে তিতিন অনাথাশ্রমের গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে  গেল একটু একটু করে।বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। কত ছোট ছিল মেয়েটা। অনেক বড় হয়ে গেছে।


ডায়েরিটা তুলে নেয়। অমলতাসের শুকনো পাতার গায়ে হাত বুলিয়ে যেন অমলদার  স্পর্শ  অনুভব করে। বুকমার্ক। জীবনের  একটা অধ‍্যায়ের নিশান।  ডানদিকের পাতায় তিতিনের হাতের  লেখা। মানসী পড়তে  শুরু  করে....



ভোরের আলো ছুঁয়ে যায় মানসীর খাট।  ডায়েরিটা পড়তে পড়তে কখন রাত শেষ হয়েছে খেয়াল নেই। পাতায় পাতায়  অপরাধবোধের অনুতাপ। আর মানসীকে খুঁজে  না পাওয়ার হাহাকার। কোথাও লেখা,

"একবার ফিরে এসো মামনি, তুমি  যা বলবে তাই করব"

 আবার কোথাও  লেখা,

"  কখনওই কি আর তোমাকে  খুঁজে  পাব না মামনি!"

 

 অমলতাসের পাতা দিয়ে নিশান করেছিল  যে পাতাটা মানসী। পাতাটা আবার খোলে। তিতিনের লিখিত  স্বীকারোক্তি,


"  ঠাম্মাম বলেছিল যদি তোমার পেটের ভেতরে থাকা ভাইটা আর তুমি দুজনেই  মরে যাও তবে বাবা আবার  আমাকেই  শুধু  ভালোবাসবে। 

মামনি, সেদিন তাই ঠাম্মামের কথা শুনে আমিই  তোমাকে ডেকেছিলাম নীচ থেকে।ঠাম্মাম সিঁড়িতে জল আগেই ফেলেছিল।  যাতে তুমি দৌড়ে নামতে গিয়ে অসতর্ক হয়ে  পড়ে যাও। আজ স্বীকার করতে বাধা নেই। যখন তুমি পড়ে গেলে চোখের সামনে। তখন খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তুমিও মরে গেছ। বাবা শুধু আমাকেই  ভালোবাসবে। কিন্তু  হঠাৎই দেখি ঠাম্মাম বাবার অফিসে ফোন করল। বাবা এলো তোমাকে নিয়ে নার্সিংহোমে গেল। আর তারপর যেদিন তুমি বাড়িতে এলে। আর আমাকে দেখেই কেমন হয়ে গেলে। কিসব বলতে বলতে আমাকে মারতে  আসলে। ভয় পেয়েছিলাম খুব। ঠাম্মাম আর বাবা তোমাকে ধরে রাখতে পারছিল না। তারপর তোমাকে নিয়ে গেল অ‍্যাসাইলামে।  মামনি তারপর সব কেমন  বদলে গেল। "

অমলতাসের বুকমার্কটা আবার  ডায়েরির সেই পাতায় রেখে ডায়েরিটা বন্ধ করে মানসী। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের ছবি। সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা মানসী সেদিন দুপুরে একটু চোখ বুজেছে। তিতিনের স্কুল ছুটি। ঠাম্মামের ঘরেই আছে। হঠাৎই তিতিনের একটা চিৎকার  শুনে ঘুমটা ভাঙে। দৌড়ে বেরিয়ে দেখে তিতিন একতলায় মাটিতে বসে কাঁদছে।  তাড়াহুড়োয় ঘুমচোখে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। 

জ্ঞান আসতে নিজেকে নার্সিংহোমের বেডে খুঁজে পায় মানসী। সিস্টারের থেকে  জানতে পারে অমলদার শেষ চিহ্ন চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। আর এটা যে একটা সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো  দুর্ঘটনা সেটা বুঝতে পারে। এক প্রচণ্ড  আক্রোশ আর ঘৃণা জন্মায় তিতিনের  ওপর। সুস্থ হয়ে  বাড়ি  ফিরতেই  তিতিনকে দেখেই  আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেনা মানসী। 

    তারপর ...

 জীবনটা বদলে গেল অ‍্যাসাইলামে আর পরবর্তী সময়ে। শুধু সেদিনের জন্য  ক্ষমা করতে পারে না তিতিনকে। কিন্তু  আজ ডায়েরির লেখাগুলো নাড়া দিয়ে গেল মানসীকে। তিতিনের দিক থেকে ভাবে।  একটা ছোট বাচ্চার মনে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন শাশুড়ি মা। তিতিনের দোষ   বোধহয় সেভাবে দেখতে গেলে ছিল না।  আর এতগুলো বছর ধরে যে অপরাধবোধের গ্লানিতে ভুগছে মেয়েটা। তাতেই বোধহয় এই অপরাধের থেকে  মুক্তি  দেওয়া যায়  তিতিনকে। শুধু অমলদার  শেষ চিহ্নটা...

      

ডায়েরির থেকে অমলতাসের শুকনো পাতার বুকমার্কটা তুলে নেয় মানসী।এই ডায়েরিটাই তো অমলদার দেওয়া। অমলতাসের পাতাটা বের করে আবার   সেই পাতার মাঝে রাখে মানসী। বাঁদিকে মানসীর শেষ লেখা আর ডানদিকে  তিতিনের লেখা শুরু। দুটো মনের ভিন্ন ভাবনার যোগসূত্রের মতো আটকে থাকে অমলতাসের শুকনো পাতার বুকমার্ক...

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

অর্পিতা বোস






আত্মপক্ষ 

____________

                           

--মা,  নীলাদ্রির বয়স বত্রিশ আর আপনার ত্রিশ বছর হলো বিয়ে হয়েছে!  কি বলছেন!
  পুত্রবধু কোয়েলের কথায় চমক ভাঙে রঞ্জিতার। অসতর্কভাবে একি বলে ফেললেন!  এত বছর যে কারণে সবকিছু  মনের মাঝে লুকিয়ে রেখে, সবার থেকে দূরত্ব  রেখে এখানে  এলেন। আজ হঠাৎ  কি করলেন! আমতা  আমতা করেন । মিথ্যে কথাটাও কি বলবেন বুঝে পাননা। এতবছর মিথ্যে সম্পর্ক সবাইকে বোঝানোর  চেষ্টা করলেও ছেলের বউকে মিথ্যে বলতে পারলেন না। চোখ না তুলেও বুঝতে পারেন কোয়েল তার দিকে সন্দেহের চোখে  তাকিয়ে  আছে। 
  - মনে হয়  ফোন  বাজছে, আমি  ঘরে যাচ্ছি বৌমা। তুমি বাসনগুলো তুলে শুয়ে পড়ো।
 বলেই রান্নাঘর ছাড়েন।  খাটে বসে ভাবেন  এতটা অসতর্ক হলেন কি করে!  নীলাদ্রী সবটা জানলে যদি...
  নাহ্!  বুকের  কাছটা অজানা  আশঙ্কায় কেঁপে  ওঠে। শরীরটা কেমন করে ওঠে, ফ‍্যানটা ফুলস্পিডে থাকলেও খুব ঘাম  হতে থাকে। কাঁপা হাতে মোবাইলটা নিতে  গিয়ে  ভাবেন, এতদিন ধরে এতকষ্ট সবটা বোধহয়  শেষ  হয়ে গেল নিজের  একটা ভুলে....
     চোখে  ঘন অন্ধকার নেমে আসে রঞ্জিতার---

 __________________________________
                          **
     লকডাউনে স্কুল ছুটি থাকায় দুপুরে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়েছিল কোয়েল।মন বসছিল না বইতে।বারবার শাশুড়িমার আজকের  কথা আর ব‍্যবহারটা মনে পড়ছিল।
 ছ'মাস হলো বিয়ে হয়ে  এসেছে এবাড়িতে। এমন ছোট ছিমছাম পরিবারে  নীলাদ্রীর ভালোবাসায় কোয়েলের সুখী দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।চারজনের এই পরিবারে নীলাদ্রীর পরেই শাশুড়িমা  বড়ো আপন করে নিয়েছেন  কোয়েলকে। 
   চুপচাপ থাকা এই  মানুষটাকে কোয়েলের অদ্ভুত লাগে।কাজের লোক  থাকা সত্ত্বেও  সকাল  থেকে  রাত পর্যন্ত  সবসময়  বাড়িতে  টুকটাক  কাজ করতেই  থাকেন। কোয়েল, নীলাদ্রী আর শ্বশুরমশাই নীলাঞ্জনবাবুর যেন কোনো  অসুবিধা না হয়  সেদিকে সবসময়  সজাগ দৃষ্টি  শাশুড়িমার।তবে নীলাদ্রীকে নিয়ে যেন একটু বাড়াবাড়ি করেন মনে হয়  কখনও। বাচ্চা ছেলের মতো আগলে রাখার চেষ্টা করেন। অবাক লাগে মাঝে মাঝেই। 
  তবে  নিজের থেকে কখনও কোনো বিষয়ে কৌতূহল  দেখাননা অথবা কথাও বলেননা। কিন্তু সবাইকে এক অদৃশ্য ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু  শ্বশুরমশাইয়ের সাথে কোথাও  যেন অনেকটা দূরত্ব  আছে বলে কখনও মনে হয়  কোয়েলের। দুজনের দুই ঘরে বসবাস দেখে  অবাক  হয়েছিল। কিন্তু   শ্বশুরমশাইয়ের রাতজেগে বইপড়ার অভ‍্যাসে ঘুমের  ব‍্যাঘাত হয়  শাশুড়িমায়ের তাই আলাদা ব‍্যবস্থা। এই যুক্তিকে মেনে নিয়েছিল। আসলে এত ভাবনার জন‍্য বেশি সময়ও ছিল না এতদিন। সকালে একটু দেরি করেই ঘুম  থেকে  ওঠে নবদম্পতি। তারপর  স্কুলে যাওয়ার তাড়া থাকে। নীলাদ্রী অফিস যাওয়ার পথে তাকে নামিয়ে দেয়।
  এই লকডাউনে কাজের  লোক আসেনি  তাই  কোয়েল হাতে হাতে কিছু সাহায্য করে বটে কিন্তু  শাশুড়িমা নিজেই  যতটা পারেন করেন। এমনিতে চুপচাপ থাকা শাশুড়িমায়ের সাথে এই লকডাউনে কোয়েলের একটা সখ্যতা গড়ে ওঠে। যদিও  উনি নিজের  সম্পর্কে  কিছু  বলতেই  চাননা। কিন্তু কোয়েলের জোড়াজুড়িতে কখনও  কিছু কিছু কথা বলেন। এমন করেই আজ কথার মাঝে বলেন যে এই চব্বিশে আষাঢ় তাদের ত্রিশ বছরের বিবাহবার্ষিকী। অবাক কোয়েল বলে ফেলে,
--মা,  নীলাদ্রির বয়স বত্রিশ আর আপনার ত্রিশ বছর হলো বিয়ে হয়েছে!  কি বলছেন!         
   অবাক হয়ে দেখে শাশুড়িমায়ের মুখটা কেমন ফ‍্যাকাশে হয়ে গেছে। ফোনের  আছিলায় ঘরে চলে যান। হঠাৎ করে কেন এমন  করলেন মা?- এমন ভাবনার মাঝেই একটা ভারি কিছু পড়ার আওয়াজ আসে। দৌড়ে যায়  শব্দের  উৎসের দিকে---
____________________________________
                      ***
    নীলাঞ্জন বসে আছেন ভিজিটার্স লাউঞ্জে। রঞ্জিতার জন্য  খুব চিন্তা হচ্ছে। ম তার সংসারটাকে আগলে রেখেছেন এতবছর। অথচ স্ত্রীর অধিকার কখনও দাবী করেননি। কথা রেখেছেন বিয়ের পর থেকে।অবশ‍্য কথা রেখেছেন দুজনেই।   শর্তসাপেক্ষে করা এই  তিরিশ বছরের  বৈবাহিক  সম্পর্ক সত্যিই  অন‍্যরকম। রঞ্জিতা না থাকলে নিজের চাকরি বাঁচিয়ে  এভাবে নীলাদ্রীকে মানুষ করতে পারতেন কিনা খুব  সন্দেহ জাগে। রঞ্জিতাকে তিনি  সম্মান করেন তার কর্তব্য, নিষ্ঠা আর অধিকারের সীমারেখার মাত্রা  বজায় রাখার জন্য । কিন্তু নীলাদ্রীর কাছে তিনি ও রঞ্জিতা এক বড়ো  সত‍্য গোপন করেছেন। আজ  সবটা জানার পরে যদি ....
 এমন দোলাচলের মাঝেই  কাঁধে একটা চেনা স্পর্শে পিছনে ফিরে দেখেন নীলাদ্রী আর কোয়েল। দুজনের  চোখে-মুখেই অনেক  প্রশ্ন। 
আজ সব প্রশ্নের উত্তর  দিতে হবে ,জানেন নীলাঞ্জন। দুজনকে পাশে বসিয়ে  ফেরেন পুরোনো দিনে।

 বড়লোকের  একমাত্র  ছেলে নীলাঞ্জন  আর গ্রাম‍্য সরলতামাখা সুজাতার বিয়ে হয়। সেই সুখের সংসারে এল তাদের  ভালোবাসার সন্তান  নীলাদ্রী। তারপর  হঠাৎ ঝড়ের  মতো সব বদলে গেল যেন। সেবার নীলাঞ্জন অফিসের কাজে ট‍্যুরে গেলে দেড়বছরের ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন  সুজাতা । সেখানেই তিনদিনের জ্বরে হঠাৎ ..
   একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নীলাঞ্জন।সুজাতার চলে যাওয়াটা তখনও  মেনে নিতে পারেননি, আজও পারেননা। সেইকথাটাই  বিয়ের  আগে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন রঞ্জিতাকে। অবশ্য তিনিও জানতেন রঞ্জিতার কোনো মতামতের মূল্য দেওয়ার মতো অবস্থা ছিলনা। 
       সুজাতার একমাত্র ছোটবোন রঞ্জিতা   কলেজ থেকে এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় ফিরছিলেন। কে বা কারা তাকে ঘিরে ধরে আর ধর্ষণ করে আজ পর্যন্ত  কাউকে বলেননি। স্টেশনের পাশে তার ক্ষতবিক্ষত অচৈতন্য  দেহ উদ্ধার করে চিকিৎসা চললেও  দোষীদের সনাক্ত করতে  অদ্ভূতভাবে নিরুত্তর  থেকে গেছেন। 
   গ্রামে ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে বসবাস করা দায় হয়ে  উঠেছিলে। একদিন রঞ্জিতার  সাথে  বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে জোড়হাতে এসেছিলেন  শ্বশুর- শাশুড়ি।অস্বীকার করতে বাধা নেই নীলাঞ্জনও নিজের স্বার্থ  দেখেছিলেন। অত ছোট্ট  ছেলেকে সামলে অফিসের কাজ করতে  নাজেহাল  হচ্ছিলেন।
 শর্ত  রেখেছিলেন নিজের  স্বার্থেই -  বিয়ের পরে রঞ্জিতা শুধু  নীলাদ্রীর মা হয়েই থাকবেন। সুজাতার জায়গা রঞ্জিতাকে দিতে  অপারগ নীলাঞ্জন। স্পষ্ট সেকথা জানিয়েছিলেন। মেনে নিয়েছিলেন রঞ্জিতা।   শুধু নীলাদ্রীর আপন মাতৃত্বের  অধিকার চেয়েছিলেন । উভয় পক্ষের  সম্মতিতে  গোপনে বিয়েটা হয়ে যায় রেজিস্ট্রি করে। বিয়ের পর থেকেই  নীলাদ্রীর ঘরেই আশ্রয়  নিয়েছিলেন রঞ্জিতা।আর  সুজাতার ছবিও সরিয়ে  রেখেছিলেন  নীলাঞ্জন। এমন করে কিছুদিন কাটল। সুজাতাদের গ্রামের জমি বাড়ি বিক্রি করে প্রথমে  শ্বশুর- শাশুড়িকে নিজের  বাড়িতে  এনে তোলেন। তারপর  অফিসে  বদলি নিয়ে বহরমপুরের  পাট চুকিয়ে এখানে  নতুন  জীবন  শুরু করেন। 
   তবে রঞ্জিতা সংসার গুছিয়ে  নিলেও কখনও স্ত্রীর  অধিকার  দাবী করতে আসেননি। নীলাদ্রীর মা হিসেবেই থেকেছেন। রঞ্জিতার বাবা-মা একে একে গত হলে সেই  ঘরেই রঞ্জিতা নিজের ঠাঁই  করেছেন। নীলাঞ্জনও  লাইব্রেরী-কাম শোবার  ঘরেই  রাত কাটিয়ে দেন  সুজাতার স্মৃতির সাথে। একছাদের তলায়  বসবাস করলেও  নীলাঞ্জন আর রঞ্জিতা শুধু  কর্তব্য পালন করেছেন  একে অপরের প্রতি। কিন্তু  নীলাদ্রীকে কেন্দ্র  করেই রঞ্জিতার জীবনের  নতুন  অধ‍্যায় শুরু  হয়েছিল।
আর তাই আজ অজান্তেই  সত্যি  কথা বেরিয়ে ভয় পেয়েছেন রঞ্জিতা।সেই মানসিক চাপে অসুস্থ হলেন। 
 
 এতবড়ো সত‍্যিটা জেনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নীলাদ্রী। যাকে এতদিন  মা বলে   জেনে এসেছে তিনি আসলেই মাসি! সুজাতার ছবিটা দেখতে চায়। মানিব‍্যাগ থেকে  সুজাতার  একটা ছবি দেখান নীলাঞ্জন। দুচোখ  ভিজে যায়  অজান্তেই। চেয়ার ছেড়ে  এগিয়ে যায়  নীলাদ্রী। 


 জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা নীলাদ্রীর মনের ভেতরে ঝড় চলছে। এতবড়ো সত্যিটা এতবছর সে জানলোই না। নাড়ির  সাথে যার সম্পর্ক সেই গর্ভধারিনীকে আজ প্রথম  দেখল!তাও ছবিতে অথচ সেই ছোট থেকে  যাকে মা বলে জেনেছে, জীবনের প্রতিটা ওঠাপড়ায় পাশে যে ছিল মাতৃরূপে তিনি....
   চোখটা বন্ধ  করে সুজাতাকে  মাতৃরূপে অনুভব করতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই রঞ্জিতার  মাতৃত্বের সত‍্যকে অস্বীকার করতে পারছেনা । কোয়েলের ডাকে চোখ মেলে। আপন মনে বলে ওঠে,
--' মা ' শব্দটা আজ আমার কাছে বড়ো  অদ্ভুত লাগছে। ছোটবেলাতেই থেকে  যে মানুষটা আমার  ঘুম থেকে ওঠা থেকে আমার  ঘুমিয়ে পড়া, আমার  পড়াশোনা শরীর খারাপ  সব কিছুতে আমার  সাথে সাথে জড়িয়ে আছেন  তিনি  আমার  মা নন!  আর আমার আসল মা... 
  একটা দীর্ঘশ্বাস  ফেলে  আবার  বলতে শুরু করে,
-- জানো  চোখ বন্ধ করে নিজের মায়ের ছবিটা যতবার  দেখতে চাইছি ততবার মাকে মানে মাসিকে  ...

 কথাটা শেষ করার আগে কোয়েল মৃদু হেসে হাতে ভরসার হাত রেখে বলে ওঠে, 
-- হ‍্যাঁ, নীলাদ্রী,তোমার  মাকেই দেখছ। মাতৃত্ব যখন যখন  সব সম্পর্কের উর্ধ্বে চলে যায়  তখন  এমন হয়। মা অথবা মাসি যে নামেই ডাকোনা কেন, তোমার  চেতনে অথবা অবচেতনে একজনকেই দেখবে। তোমার স্বত্ত্বায় মাতৃত্বের একটাই মূর্তি। ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়ে গড়া এমন সম্পর্ককে  অস্বীকার করার ক্ষমতা  কারো নেই। 
-- কিন্তু  এতবড়ো মিথ্যে!
-- আমি  সত্যি-মিথ‍্যে এভাবে বুঝিনা নীলাদ্রী। আমি অনুভবে সম্পর্কের বাঁধন চিনি। ওনার জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তুমি। হ‍্যাঁ, কখনও কখনও  ওনার  তোমার প্রতি পজেসিভনেস দেখে আমিও  অবাক  হয়েছি। তবে একথা স্বীকার করি তোমার খুটিনাটি সব বিষয়ে ওনার যা নজর, ততটা আমার গর্ভধারিনীর নেই। এটাই ভালোবাসা  এটাই সত্য।যিনি তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে অসুস্থ  হয়ে  পড়েছেন।তাকে ভুল বুঝোনা প্লিজ। চলো ভিজিটিং আওয়ার শুরু  হয়েছে..


 
___________________________________
                  ****
      ঝাপসা ছবিগুলো স্পষ্ট  দেখতে  পাচ্ছেন  রঞ্জিতা--
     
    অষ্টাদশী রঞ্জিতা স্টেশনে নামতেই  ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি  নামল। আজ  কলেজের পরে লিলির জন্মদিনের জন্য  ফিরতে বেশ দেরি হলো। এদিক- ওদিক তাকাতেই দেখে স্টশনটা প্রায় ফাঁকা  হলেও  ঐ ছেলের দলটা বসে আছে। ওদের দেখেই বুকটা কেঁপে ওঠে। কতদিন  ধরেই  কলেজ  যাতায়াতের পথে বিরক্ত করছে। দলের পান্ডাটা আবার গ্রামের প্রধানের ছেলে। লিলির জন্মদিনের আনন্দে ভুলেই গেছিলেন এদের  কথা।ওদের  দেখে স্টেশনে আর দাঁড়িয়ে  না থেকে বৃষ্টির  মধ্যেই  পা বাড়ালেন। গ্রামের রাস্তা সন্ধের পরেই লোকজন কম থাকে,আর আজ তো বৃষ্টি। শুনশান  রাস্তায়  কিছুটা এগোতেই  বুঝতে পারেন বিপদ পিছু নিয়েছে...

সেই ভয়ানক সর্বনাশের পর হাসপাতালের বেডে শুয়ে চেয়েছিলেন  সত‍্যটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পুলিশ আসার একটু  আগেই  ওয়ার্ড বয়ের ছদ্মবেশে  সেই কুকীর্তির একজন এসেছিল। নিজের থেকেও বেশি  ভয় পেয়েছিলেন বাবা-মায়ের জন‍্য। তাই অপরাধীদের  শনাক্ত করতে পারেননি পুলিশকে জানান। কিন্তু বাড়িতে  ফিরতেই শুরু হলো আরেক অত‍্যাচার। ধর্ষকের নয় ধর্ষিতার শাস্তি হয়  সর্বদা। তাই প্রতিবেশী থেকে শুরু করে ধর্ষকের বাবার  হুমকি  আর মানসিক  চাপে নিজেকে শেষ করে দিতে  গিয়েছিলেন। কিন্তু  মা দেখে  ফেললেন, তারপর...
 তারপর  অন‍্য জীবন। সে জীবনের  একমাত্র  অবলম্বন  দুবছরের নীলাদ্রী। লতার মতো আগলে বাঁচতে চাওয়া। ওকে ঘিরেই  তো সবকিছু। কিন্তু  আজ হঠাৎ   ভুলে  বলে ফেললেন। সত্যিটা জেনে যদি নীলাদ্রী তাকে....
  বন্ধ  চোখের পাতা থেকে  গড়িয়ে  পড়া জলটা মুছে  দেয় চেনা হাতের স্পর্শ। চোখ মেলতেই দেখেন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে  আছে নীলাদ্রী আর কোয়েল। আর বেশ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখেমুখে আজ উৎকণ্ঠার ছাপ। 
  
  --মা,
-- তোকে বলিনি রে আমি  তোর মা...
    কথাটা শেষ করতে পারেননা রঞ্জিতা।
-- তুমিই  আমার  মা। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি চলো।

   রঞ্জিতার হাতটা শক্ত করে ধরে নীলাদ্রী। স্পর্শেরা জানান দেয় আত্মজ না হলেও মাতৃত্বের সম্পর্কের  বাঁধন অনেক শক্তিশালী। 
___________________________________

      



 


শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

অর্পিতা বোস


সম্পর্ক
----------

 
---------------------

-উফ্ অসহ‍্য লাগছে এই জীবন। না ভালো লাগছে ফেসবুক  না টিভি। আর চোখের  সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে  এই  কালো মোটা বউটা।
-- কি যে বলিস! মৌমিতা  কিন্তু খুব ভালো মেয়ে রে!তোর ঐ রায়ার থেকে  অনেক ভালো। আচ্ছা রে এখন রাখি। বউকে হেল্প করতে হবে  একটু..
-- বাবা  ঘরেও কাজ করিস! বউকে কতো পটাস রে
--  পটাই না, সংসারটা দুজনের।কাজ ভাগ করে নিচ্ছি আর সময়ও কাটে, কত আর ফেসবুক  আর টিভি দেখবো। তোর  মতো জীবন আর ক'জনের  হয়। ঘরে লক্ষ্মীমন্ত বউ আর বাইরে রায়া.. হে হে...
-- রাখি রে, একটু  বেরোবো। বাজার যাবো।
---আচ্ছা বাই
    ফোনটা রাখতেই  মুডটা আরও  অফ হয়ে গেল  তীর্থর। বুকটা কেমন করে ওঠে। ব‍্যালকনিতে সিগারেট  ধরিয়ে দাঁড়ায়। প্রায় জনমানবহীন রাস্তাটা দেখতে দেখতে  রায়ার কথা মনে পরে। মোবাইলে  দেখে এখনও কাল বিকেলের মেসেজটা আনসিন করে রেখেছে কিন্তু  অনলাইন দেখাচ্ছে। আজকাল রায়া আবার তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারে। 
সত‍্যিই রায়ার জন্যই  আজ তার জীবনটা এমন ওলোটপালট হয়ে গেল। 
    অফিসে কলিগ হয়ে আসা রায়ার সাথে তার লিভ-ইন করাকে  মা -বাবা মানতে পারেননি। তবুও  রায়াকে ভালোবেসে  তীর্থ আড়াই বছর  রায়ার সাথে ছিল। একগুঁয়ে  রায়ার সবরকম অন‍্যায় কাজকে মেনেও নিয়েছিল। অফিসের নতুন বসের সাথে রায়ার 
 সম্পর্ক নিয়ে উড়ো কথাকেও পাত্তা দিতো না।কিন্তু সেদিন রাতে বসের গাড়ি থেকে নামতে দেখেই মাথা ঠিক রাখতে পারেনি  আর। তুমুল  ঝগড়া করে সম্পর্কে বিচ্ছেদ আনে। 
   তারপর যেন পরপর  সব ঘটে গেল। রায়ার ওপর রাগে  বিয়েতে রাজি হতেই মা মৌমিতাকে পুত্রবধু করে নিয়ে এলেন। 
 নাহ্! পছন্দ  অপছন্দ বাছবিচার করেনি তীর্থ  জেদের বসেই। বিয়েটা হলেও দূরত্ব ছিল। আর মৌমিতাও কেমন যেন!ঠাণ্ডা আর নির্লিপ্ত। জৈবিক চাহিদার জন্য  কখনও এক হলেও মৌমিতা তীর্থর মনে দাগ কাটেনি। বরং  বিয়ের  পরপর মায়ের মৃত‍্যুর পর মৌমিতা আরও দূরে সরে গেছে। শুধুমাত্র  পরিবারের সদস্য  হিসেবেই আছে। তবে মা চলে যাওয়ার পর বাবার যত্ন করে এটা ঠিক। কিন্তু তীর্থর কাছে দিনদিন যেন আরও  অসহ‍নীয় হয়ে  উঠেছে।বরং  অফিসে বসের বদলি হবার পরে  আবার  রায়ার সাথে পুরোনো প্রেমটা বেশ মাখোমাখো হয়ে ওঠে।
  সিগারেট শেষ হতেই মনে পড়ল সিগারেটের  প‍্যাকেট শেষ প্রায়। কিনতে যেতে হবে। বেরোনোর সময়  হঠাৎ  একটা শব্দ  আসে কিচেন থেকে।  বিছানা থেকে বাবার উদ্বিগ্ন গলায় বিরক্ত হয়েই রান্নাঘরে যায়। 
 মৌমিতাকে  মাটি থেকে ওঠার  ব‍্যর্থ চেষ্টা করতে দেখে  আরও  মাথা গরমে  বলে ওঠে,
-- কাজটা কি করো সারাদিন? এই তো ঘরের কাজ! তাতে আবার  ধুপধাপ পড়ো। 
মৌমিতার জলভরা চোখে আর নির্বাক মুখে  কষ্টের ছাপ দেখে খারাপ লাগে তীর্থর। ধরে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে যেতে  বলে,
-- দেখে চলতে পারোনা?
--...
-- কি এমন কাজ করো যে চলাফেরাও করতে পারোনা ঠিক মতো।
 বিছানায়  বসিয়ে দিতে  গিয়ে মৌমিতার কঁকিয়ে  ওঠা শুনে দেখলো পায়ের পাতাটা ফুলে গেছে।
   বিরক্ত হয়ে  আইসব‍্যাগটা পাশে রেখে বেরোয়। 

    রাস্তায়  পুলিশ  নেমেছে  দেখে ওষুধের দোকানে  ঢোকে। কি মনে হতে  একটা ভলিনি স্প্রে আর পেইনকিলার কিনল। নাহ্ মৌমিতার জন‍্য নয়। ঘরে রাখা প্রয়োজন  তাই কিনল। আবার  কি মনে হতেই মোবাইলটা দেখে। রায়া এখনো  তার মেসেজ দেখেনি অথচ অনলাইন।
  নতুন জয়েন করা পিনাকীর সাথে রায়ার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে  দুচার কথা তীর্থর কানে এসেছে। 
  মুখটা তেতো লাগছে। বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে  এককাপ চা নিজেই করে নিল।

দুপুরে  সব সেরে এসে শুয়ে সিগারেটটি ধরায়। অনেক  কাজ  করলো। মৌমিতা  উঠতে পারছেনা দেখে বাবাকে খাইয়ে  মৌমিতাকে খেতে দিয়ে  নিজে খেয়ে  বাসন মেজে টেবিল মুছে এলো। মৌমিতা  ব‍্যথা নিয়েই  করতে চাইছিল। কিন্তু  তীর্থ আপত্তি করে। সত‍্যিই অনেক  কাজ করে মেয়েটা।পাশফিরে শুয়ে থাকা মৌমিতার প্রতি কেমন যেন মায়া হয় তীর্থর। মুখ বুজে  তার সাথে থেকেছে এতদিন।কখনো কোনো আবদার করেনি।অথচ রায়া..
 আবার  মোবাইল চেক করে। টিকগুলো নীল হয়নি।নাহ্ আর দরকার নেই।  
   রায়ার অ‍্যাকাউন্টটা ব্লক করে ভলিনি স্প্রে টার দিকে হাত বাড়ায় তীর্থ....



    

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

অর্পিতা বোস


শীতের  স্মৃতিচারণ
________________

  ___________


     এইযে পৌষের বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে আর শরীরের কাঁপন জানান দিচ্ছে বয়স বাড়ছে। আমি শীতের নরম মিঠে ওমে সেঁকে নেওয়ার চেষ্টা করছি নিজেকে। সাথে সাথে ফিরে ফিরে যাই আমার ছোটবেলার  সেই পৌষ-মাঘের শীতের বেলায়। 
তখন শীতকাল মানেই হরেক মজা। ফাইনাল পরীক্ষা শেষের ছুটি। সকালে ঘুম ভেঙ্গে কথা বলার সময় মুখ থেকে ধোঁয়া বের হওয়া নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে খুব মজা হতো।আর শীতের ছুটি মানেই অনেক অনেক গল্পের বই নিয়ে ছাদে সারাবেলা। শুধু কি গল্পের বই! নাহ্- মা-ঠাকুরমারা ছাদে বড়ি,আচার আর আমলকির নাড়ু শুকোতে দিতেন। আমরা পাহারা দেওয়ার নামে আচার আর আমলকির নাড়ু খেয়ে ফেলতাম। ঠাকুরমা জেনেবুঝেও বলতেন, কে যে আচার আর আমলকির নাড়ু খায় বুঝে পাইনা। 
 কৎবেল মেখে শুকোতে দিলে এসে দেখতেন এক চতুর্থাংশ খাওয়া হয়ে গেছে। 
 আরও আছে শীতের ছাদের গল্প। আমার আর ভাইয়ের ছিল খুব ঠান্ডা লাগার ধাত।তাই ঠাকুরমা রসুন-সর্ষের তেল গরম করে মাখাতেন আমাদের। আর শীতের স্নান করে আবার ছাদে দৌঁড়োতাম। শীত কাটাতে আর আমার কোমর ছাপানো চুল শুকোতে। আর খাওয়া সেরে আবার ছাদে এমন নরম মিঠে রোদ মেখে ফেলুদা, শুকতারা, আনন্দমেলা, কাকাবাবু-সন্তু,পান্ডব গোয়েন্দা,অথবা letter from a father to his daughter, Malgudidays, Dairy of a Young Girl, Discovery of India, The  story of my experiment with the Truth এমন সব গল্প কাহিনীর মাঝে হারিয়ে যাওয়া কমলালেবুর রসের আস্বাদন নিতে নিতে। 
আর পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের আলো বাবার তৈরি ছাদবাগানের গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা ফুলের ওপর রঙের খেলায় নামত। নারকেল পাতার ফাঁকে লুকোচুরি খেলার ছলে সূর্যাস্ত হতো। আমাদের তখন খেলা সেরে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে গিয়ে টিফিন খাওয়ার সময়। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ, তাই ছাদে আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা অথবা খুব ঠাণ্ডায় ঘরের ভেতর জমিয়ে লুডো-ক্যারামের সেই সন্ধ্যারা হারিয়ে গেছে আজ।
এছাড়া শীতকাল মানেই পিকনিক,সার্কাস, চিড়িয়াখানার মজা তো ছিলই। সবাই মিলে সার্কাসের জোকারের মজা বা বাঘ-সিংহের খেলা আর ট্রাপিজের খেলার সেই শিহরণ আজও ভোলা যায়না।  চিড়িয়াখানা যাওয়া হতো দলবেঁধে সকালে সকলে মিলে। ওখানেই সারাটাদিন খাওয়া দাওয়া,খেলা, পশুপাখিদের ছোলা খেতে দেওয়ার দেদার আনন্দ সেরে বাড়ি ফিরে ঠাকুরদার নির্দেশ ছিল- ইংরেজিতে কমকরে ২০ লাইন ও বাংলায় বড়ো রচনা লেখার জন্য সারাদিন চিড়িয়াখানার ও সার্কাস দেখার অভিজ্ঞতার। একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা হতো ভাইবোনদের মধ্যে কার লেখা ভালো হবে তা নিয়ে। এরপর আসতো রেজাল্ট আউটের বুকের দুরুদুরু ভয়ে স্কুল যাওয়া। যদিও রেজাল্ট ভব ভালো-মন্দের সমালোচনার পরে অবশ্যই শুনতাম- " আরও ভালো করতে হবে পরের বার। তুমি পারবে।" 
আর তারপর ঘোষণা হতো পিকনিকের ডেটের ।
যৌথ পরিবারের  রোজই  কুড়ি-বাইশজনের পাত-পেড়ে খাওয়ার জন্য রোজই পিকনিক ভাবা যায়। কিন্তু তবুও আমাদের পিকনিক শীতকালে হতই। নাহ্, খুব দূরে সবসময় যাওয়া হতো না পিকনিকের জন্য। বরং আমাদের বিরাট ছাদেই একদিন বিছানার চাদরের চাঁদোয়া টাঙিয়ে হতো পিকনিকের দেদার মজা। পিসি -পিসতুতো ভাইবোনেরা মিলে লোকসংখ্যা তখন পঞ্চাশ ছুঁয়েই যেত। বাবা-কাকাদের রান্নার গন্ধে চারদিক ম-ম করতো। এমন পিকনিক ছাড়াও যে আরেকটা জমজমাট মজা ছিল আমাদের পুরী ভ্রমণ । হ্যাঁ ,প্রায় প্রতি বছরই   ছাব্বিশে অথবা সাতাশ  ডিসেম্বর আমরা সপরিবারে জগন্নাথ এক্সপ্রেস করে পুরী যেতাম। ইউনিয়ন ব্যাংকের  হলিডে হোমে রুমগুলো  বরাবর এইসময় চিনিকাকুর নামে  বুক করা থাকতো। পুরীতে বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখে আবার ট্রেনে উঠতাম। আর নতুন বছরের সূর্যোদয় কলকাতায় দেখতাম।
 এভাবেই নতুন বছরের শুরু হতো। আর স্কুলে নতুন ক্লাস, নতুন বইয়ের গন্ধরা মিলে যেত জয়নগরের মোয়ার স্বাদে। হ্যাঁ, স্কুল ফাউন্ডেশন ডের জন্য প্রথম দিন আমাদের জয়নগরের  মোয়া দেওয়া হতো।
এরপর আসতো পৌষ-পার্বন। নলেনগুড়ের পায়েস, পুলিপিঠের  আনন্দ উৎসবও  শীতের মজার আরেক ছবি। সারাদিন ধরে পিঠে পায়েসের গন্ধে বাড়ি ম-ম করতো। তারপর হতো স্কুলের পাশের মাঠে বারোভুতের মেলার মজা। হাতভরে কাঁচের চুড়ি, পুতুলের বিয়েতে দেওয়ার জন্য খাট- আলমারি- আলনা-ড্রেসিং টেবিল, রান্না বাটি খেলার বাসনকোসন,এই সব কেনার মজা আজ হারিয়ে গেছে।
তারপর নতুন ক্লাসে পড়াশোনা শুরু কিন্তু অপেক্ষায় থাকতাম বীণাপাণির বন্দনার দিনের। আমার মতো ফাঁকিবাজ স্টুডেন্টদের উনিই ভরসা। শুধু কি পুজোই! নাহ্! আরও ছিল অনেক অনুভূতি। কাকিমা- মাসিদের শাড়ি আর ব্লাউজের সাথে সেজেগুজে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো। যৌথ পরিবারের কড়া শাসন মুক্ত সেই সরস্বতী পুজোর সেই নস্টালজিক অনুভব কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। 
সরস্বতী পূজোর সাথে সাথে শীতের প্রভাব কমতে থাকতো। 
আর তখন মনে আর প্রকৃতিতে লাগতো বসন্তের নতুন ছোঁয়া। তবুও সেই শীতের স্মৃতির হাওয়া আজও ছুঁয়ে যায় আমায়। আমিও ফিরে ফিরে যাই আমার সেই শীতবেলার পথে...

চিত্র - সমরেন্দ্র মন্ডল 

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

অর্পিতা বোস



নতুন  স্পর্শ  
------------------
 

আজ সেই প্রত্যাশিত রাত ।আজ সে আর তিয়াসা এক হবে।বাইরের  বারান্দাতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে  অপেক্ষা করছিল দীপ্ত।
সব লোকাচার শেষ হলে, ঘরে প্রবেশ করে দীপ্ত দরজা  বন্ধ করে। ঘরে সে আর তিয়াসা, তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী। দরজা থেকে  বিছানাতে বসে থাকা তিয়াসার কাছে  পৌঁছানোর মূহুর্ত পর্যন্ত সে যেন নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে।আস্তে আস্তে  বিছানাতে বসে আংটির বাক্স থেকে  আংটিটা হাতে নিয়ে  তিয়াসাকে ছুঁতে যেতেই ,তিয়াসা গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,আমার হাতে দিন আমি পরে নিচ্ছি। 
অবাক দীপ্ত  আংটিটা তিয়াসার হাতে তুলে দিল।সে আংটিটা নিজের আঙ্গুলে পরে বলে,দেখুন আমি খুব টায়ার্ড, ঘুমোতে চাই।
 --হ্যাঁ,অবশ্যই।
তিয়াসা উঠে  চেঞ্জ করে এসে শুয়ে পড়ে।
 অবাক দীপ্ত দেখে পাশ ফিরে  তিয়াসা  শুয়ে পড়েছে। একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে  একটা  সিগারেট ধরাতেই, তিয়াসা বলে, আমার  সিগারেটের ধোঁয়াতে  অসুবিধা হচ্ছে।
 সিগারেটটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে সে ভাবে,  আজকের  রাতটা সবার জীবনে অনন্য,সকলের মতো সেও আজকের রাতটা নিয়ে  অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। অথচ তিয়াসা,থাক ক্লান্ত  ঘুমোচ্ছে।
পরদিন  সব গোছগাছ শুরু করে মধুচন্দ্রিমাতে গোয়া যাবে তিয়াসা চুপচাপ তার জামাকাপড একপাশে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।তিয়াসার ব্যবহারে অবাক হলেও দীপ্ত ভাবে সময় লাগবে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে।বয়সের অনেক ফারাক  তিয়াসার সাথে তার। 
  অতি সাধারণ ঘরের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান  তিয়াসার কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা অভিজাত পরিবারের সুপ্রতিষ্ঠিত দীপ্তর থেকে  বারো বছরের ছোট তিয়াসার সাথে বিবাহের প্রস্তাব সাগ্রহে স্বীকার করে নেন। যদিও তিয়াসার দিদি তৃষার জন্য সম্বন্ধ আনা হয়েছিল। কিন্তু সদ্যকলেজ ফেরত তিয়াসাকে দেখে দীপ্তর মার পছন্দ হয়।প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকায় দীপ্ত সেসময় কলকাতা আসতে না পারায়,তাকে তিয়াসার ছবি পাঠানো হয়।
তিয়াসা ও তৃষার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ সে তিয়াসার মিষ্টি  ছবি দেখেই মত দিলে শুভ বিবাহে দেরি করেনি দুই পক্ষের কেউই।
 শিলিগুড়িতে কর্মরত 
দীপ্তকে মধুচন্দ্রিমা শেষে কর্মস্থলে ফিরে  যেতে হলেও তিয়াসা কলকাতাতেই তার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকবে।
   রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুতে এলে তিয়াসা বলে, আমার খুব মাথা ব্যাথা করছে, ঘুমোবো।
 দীপ্ত জিজ্ঞেস করে ওষুধ লাগবে কিনা, উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়ে তিয়াসা।
   তিয়াসার  আচরণে অবাক হয়ে সে সিগারেট ধরাতে গেলে মনে পড়ে তিয়াসার অসুবিধার কথা। তাকিয়ে দেখে বাইরের  জোৎস্নার আলোতে ভেসে যাওয়া আলোতে খাটে শুয়ে
থাকা তিয়াসাকে যেন  রূপকথার রাজকন্যার মতো মনে হচ্ছে।ইচ্ছে করেছে গিয়ে  পাশে বসে তিয়াসাকে ছুঁয়ে দেখতে। লাজুক স্বভাবের দীপ্ত তিয়াসার ছবি দেখেই প্রেমে পড়েছিল।কিন্তু তিয়াসা! একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
  সবাইকে বিদায় জানিয়ে ফ্লাইটে বসে তিয়াসা দীপ্তর হাতে প্রথম হাত রাখতে সে তিয়াসাকে ভয় পেতে দেখলে হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করে।নিদির্ষ্ট সময়ে হোটেলে ঘরে পৌঁছতেই তিয়াসা জিজ্ঞেস করে, আপনি আমাকে কেন বিয়ে করলেন? 
--মানে? 
--আমার দিদিকে বিয়ে না করে  আমাকে বিয়ে করলেন? কেন? 
--তোমার অমত ছিল? 
---হ্যাঁ,ছিল, কিন্তু আমাদের মতো ঘরে এমন সম্বন্ধ পেলে আর আমার মতের তোয়াক্কা কে করে?
--তুমি রাজি না হলেই পারতে?
---অরাজি হওয়াতে বলেছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে।কোথায় যাবো?প্রতীকতো চাকরি  পায়নি।
--চাকরি পেলে তুমি কি ওনাকে --
--হ্যাঁ, প্রতীককেই বিয়ে করতাম।আমি ভালোবাসি  প্রতীককে,শুধু ওর চাকরি পাওয়ার জন্য-
  ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে তিয়াসা। বজ্রপাত হলো যেন।দীপ্ত চুপ করে ব্যালকনিতে দাঁড়ালো।কেন এমন হলো?কি করবে সে? কেন বিয়ের আগে একবার দেখা করলোনা সে?নিজের ওপর বিরক্ত লাগছে তার।
 পরবর্তী তিনদিন  মধুচন্দ্রিমাতে এসে দুজন অচেনা মানুষের মতো সময় কাটিয়ে কলকাতা ফেরে।বাড়িতে ফিরে তিয়াসার স্বাভাবিক ব্যবহার দেখে অবাক হলেও দীপ্ত চুপ করে থাকে।কিছুই ভালো লাগেনা।পরদিন সকালে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় দীপ্ত।যাওয়ার সময়ে তিয়াসা চুপচাপ থাকলে দীপ্ত শুধু বলে,আলমারিতে টাকা আছে, দরকার হলে ব্যবহার করো।
নিরুত্তর তিয়াসা দাঁড়িয়ে দেখে  দীপ্ত ট্যাক্সি করে বেড়িয়ে গেলো।নিজেকে মুক্ত মনে হচ্ছে, কালকে যাবে কলেজের নাম করে তার প্রেম ,তার স্বপ্ন,প্রতীকের  কাছে ।ভাবতেই ভালো লাগছে।শুধু প্রতীকের চাকরিটা হয়ে গেলেই এই বন্ধন থেকে মুক্তি নেবে সে।
   পরদিন প্রতীকের বাড়ি গেলে তিয়াসাকে দেখে  বিদ্রুপ করে প্রতীক বলে, বড়োলোক বরকে ছেড়ে হঠাৎ এই গরীবের কাছে কেনো? 
তিয়াসা প্রতীকের গলা জড়িয়ে বলে, আমি তোমার  প্রতীক,শুধু তোমার। তোমার  চাকরির জন্য  অপেক্ষা করছি তারপর, ডিভোর্স দিয়ে তোমার সাথে ।
--হ্যাঁ,ততদিনে তোমাকে  লুটেপুটে খাক।
--ছি,এমন বলোনা।আমাকে ছুঁতেও দিইনি।
-- শোনো ওসব বলে  লাভ  নেই, আমি কি দেখতে গেছি গোয়াতে কি করেছ!একজন যখন থাকবেনা তখন  আমার কাছে --
কথাটা  শেষ করার  আগেই প্রতীকের গালে পাঁচটা  আঙ্গুলের ছাপ ফেলে বেরিয়ে আসে তিয়াসা।
বাড়িতে ফিরে ভাবে তাকে এতটুকু বিশ্বাস করলোনা এতদিনের চেনা প্রতীক অথচ ঐ মানুষটা -সেকি  ভুল করলো মানুষ চিনতে? অথচ অচেনা ঐ মানুষটা আমাকে-
 চোখ বেয়ে জল নামে তিয়াসার, কিছু  ভালো লাগছে না।রাতে শুতে এসে যেন ঘরটা যেন বড়ো ফাঁকা লাগছে,ঘুম আসছেনা ,ধুর  কিছু ভালো লাগছেনা।
   পরদিন থেকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে  তিয়াসা। বাড়িতে দীপ্তর মা-বাবার সাথে বড়ো ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠলেও তিয়াসার বড়ো একা লাগে এবাড়িতে । এরমাঝে একদিন ল্যান্ডলাইনে ফোন বাজলে তিয়াসা ফোনটা ধরলে সেই চেনা গলা , দীপ বলছি,কে মা?
 তিয়াসার বুকটা কেমন করে ওঠে, চোখটা জ্বালা করে, কোনো কথা বলতে পারেনা।
ওপারে আবার সেই গলা, আমি তিনদিনের জন্য একটু ইম্ফল যাবো,হয়তো ফোন করতে নাও পারি, মা-বাবা যেন  চিন্তা না করেন।
  ফোনটা কেটে গেল,কিন্তু তিয়াসার ইচ্ছে করছিল  আরও কথা শুনতে।তার কথা কি কিছুই  জিজ্ঞেস করতে নেই? বড়ো অভিমান চোখ বেয়ে  তার  অজান্তেই  নামলো।
  অ্যাডমিট কার্ড আনতে  গিয়ে দেখে,  প্রতীক যেন ইচ্ছে করেই তিয়াসাকে দেখিয়ে  শ্রেয়াকে বাইকে নিয়ে কোথাও  যাচ্ছে।
বাড়ি ফিরে তিয়াসা প্রতীকের কথাই চিন্তা করছিল, এতদিনের সম্পর্ক, অথচ মানুষ চিনতে এতো ভুল!সব রাগ-দুঃখ-অভিমান কোনও অজানা কারণে গিয়ে জমা হলো দীপ্তর ওপর।ফোনে একবার জানতেও চাইলোনা, সে কেমন আছে।
লাগবে না, কাউকে তার খোঁজ নিতে।কিছু ভালো লাগেনা। 
শেষ পরীক্ষার আগের দিন  তিয়াসা একা বাড়িতে, শাশুড়িমা একটু দরকারে বেরিয়েছিলেন ,আবার ফোন বাজছে।সে জানে দীপ্তর ফোন , প্রায়ই লাঞ্চ টাইমে দীপ্ত ফোন করে নাহলে রাতে। কখনো তার সাথে কথা বলেনা।শ্বশুর -শাশুড়ির ধারনা, মোবাইলে কথা হয় তাদের। কিন্তু কোথাও  কখনো দীপ্ত  ফোন করে না তাকে। খুব  রাগ দুঃখ অভিমান  নিয়ে ফোনটা তুলতে আবার সেই চেনা গলা ,আমি  দীপ-
--আপনার মা আজ একটু বেড়িয়েছেন, আর আপনার তো আমার সাথে কোনো কথা নেই, তাই ফোনটা  কেটে দিতে পারেন।
--তোমার সাথে কথা বলার জন্য তো তোমার প্রতীক-
---না ,সে আমার প্রতীক না ,শ্রেয়ার প্রতীক,  আমার  কেউ নেই, কারো লাগবেনা  আমার সাথে কথা বলতে ।
 অভিমানী গলা দিয়ে আর শব্দ  বেরোয়না ।ফোনটা রেখে  দেয়।
  সে রাতে তিয়াসার চোখ
বেয়ে শুধু জল নেমেছিল।
 পরীক্ষা দিয়ে তিয়াসা জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরে।রাত বাড়লে জ্বর বাড়ে।জ্বরের  ঘোরে অচৈতন্য তিয়াসার মুখে শুধু দীপ্তর নাম ।ভয় পেয়ে  দীপ্তর বাবা ডাক্তার ডাকলে তিনি ওষুধ আর কিছু পরীক্ষা করতে বলেন।পরদিন দুপুরে তিয়াসার মা-বাবা দেখতে আসলে সে জানতে পারে
দীপ্তর বন্ধুর সাথে তৃষার বিয়ের জন্য দীপ্ত চেষ্টা করছে।
বড়ো কান্না পায় তিয়াসার, সবাইকে ফোন করে, সবার সাথে কথা বলে, সবার কথা ভাবে শুধু  তার কথা ছাড়া।
সন্ধেবেলা আবার জ্বর আসছে তিয়াসার, প্রচন্ড গরম কপালে ঠান্ডা হাতের ছোঁয়া,তিয়াসা যেন দেখতে পাচ্ছে দীপ্ত --না-কেমন করে হয়? সে তো শিলিগুড়ি, আর  কেন আসবে তার  কাছে? সে কে?
   তবুও  হাতের  স্পর্শটা সত্যিই  অনুভূত হচ্ছে, সাথে  কানে ভেসে আসছে 
--তিয়া,কেমন  আছো? নিকোটিনের গন্ধটা খুব কাছে এগিয়ে  আসছে,চোখ বেয়ে জল  নামছে  তিয়াসার ,আর সেই জল শুষে নিচ্ছে  দুটো ঠোঁট।
   আজ আবার  জোৎস্নার আলোতে  ঘর ভাসছে।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

অর্পিতা বোস

আত্মজ 
_________



_____________

  অনাথাশ্রম থেকে বাড়িতে ফিরে  তিস্তা দেখে ত্রিদিবের ফটোর সামনে তীর্থ চুপ করে একটা চেয়ারে বসে আছে। কোনো কথা না বলে ফ্রেশ হয়ে শোবার ঘরেএসে বসে।ড্রেসিং টেবিলের দুজনের ফটোতে  ত্রিদিবের হাসিটা এখনো যেন জীবন্ত।ফোটো টাতে হাত বোলাতে বোলাতে বলে , আমি কী করবো এখন?আমাকে কার কাছে  রেখে গেলে?  
    এমন সময়ে  আরতী এসে   রাতের খাবার গরম করবে কিনা জানতে চাইলে, তিস্তা  জানায় তার খিদে নেই। তীর্থকে খেতে দিয়ে আরতীকে খেয়ে নিতে বলে।
   নিজেকে বড়ো অসহায়, একাকী লাগে তিস্তার ,তবু বুকের কষ্টটা চোখ বেয়ে নামেনা। হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দে তিস্তা দেখে তীর্থ দাঁড়িয়ে, আসব ?
--এসো।
 কি বলবে তিস্তা বুঝতে পারেনা,বুকের ভেতর ঝড় ।তীর্থ খাটের পাশে দাঁড়িয়ে বলে,তুমি  খাবেনা? 
  একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিস্তা বলে,খিদে নেই,তুমি খেয়েছ ?
--আমারও খিদে নেই ।
   ঠিক ত্রিদিবের মতোই বললো তার সন্তান।শুধু কি ত্রিদিবের সন্তান তীর্থ? সে তো তারও সন্তান ।বুকটা মোচড় দেয়,তার আত্মজ অথচ যেন কতদূরের মানুষ।দোষ কার! নাহ্-এসব ভাবার সময় নেই।তীর্থকে বলে,তুমি খেয়ে নাও।কাল তো বেরোবে।
প্যাকিং হয়ে গেছে? 
তীর্থ বলে,প্যাকিংতো তেমন কিছুনা।বেশি কিছুতো আনিনি, তবে বাবাই  সবসময়ই --
   তীর্থের গলাটা ধরে এলো, তিস্তা নিজেকে সামলে বলে, খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি।
 আরতী--
    হাঁক দিয়ে নিজেই খাবার টেবিলে খাবার বেড়ে দিতে   লাগল তিস্তা। শুধু তীর্থের খাবার বেড়ে দিলে তীর্থ বলে ওঠে,খালি পেটে শুলে তোমার শরীর খারাপ করবে,একটা রুটি খেয়ে নাও।
  চোখটা জ্বালা করে ওঠে তিস্তার,কিন্তু নাহ্ ,দুর্বলতা প্রকাশ করা তিস্তার স্বভাব নয়।তবু এমন করে এই প্রথম তার সন্তান তাকে খেতে অনুরোধ করলো,বুকটা কেমন করে ওঠে। নিশ্চুপে দুজনে খেয়ে ওঠে।খাওয়া শেষ করে তিস্তা শোবার ঘরে এসে বসে,তীর্থের তার জন্য আজ প্রথম অনুভূতির প্রকাশ, তিস্তার ভালো লাগে।ঘুম  আসছেনা দেখে বাইরের বারান্দাতে গিয়ে বসে তিস্তা।
 রাস্তার ওপারে একটা কুকুর আর তার বাচ্চাটা খেলছে।
তিস্তার বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছে নার্সিংহোম তার কোলে সদ্যোজাত তীর্থ।বহু চিকিৎসার পরে তার  আত্মজকে স্পর্শ করে তিস্তার সাথে সেদিন ত্রিদিবের চোখেও জল ছিল।কিন্তু সুখের সময় ছিল স্বল্পস্থায়ী।বাড়িতে আসতেই তিস্তার চেনা সংসারটা কেমন চোখের সামনে বদলে যেতে লাগল।একমাত্র বংশধরের সঠিক দেখভাল করতে অনভিজ্ঞ তিস্তার সক্ষমতা নিয়ে সদ্য স্বামীহারা শাশুড়ির সন্দেহ প্রকাশে তিস্তা অবাক হলেও ভাবতো,হয়তো দীর্ঘপ্রতীক্ষার অবসানে নাতির প্রতি স্নেহের কারণে এমন করতেন এবং তীর্থের সাথে সময় কাটালে শোকার্ত একাকী শাশুড়িমার ভালো লাগবে।তিস্তা তাই প্রথমে তীর্থকে তার শাশুড়িমার কাছেই বেশি সময় রাখতো।কিন্তু ধীরেধীরে সমস্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো, এরমাঝেই আবার শারীরিক জটিলতার কারণে তিস্তাকে অপারেশনের জন্য ছোট্ট তীর্থকে তার ঠাকুরমার জিম্মায় রেখে তিস্তা দশদিন নার্সিংহোমে রইলো।সেসময়টা ছোট্ট তীর্থকে দেখার জন্য,তাকে কাছে পাওয়ার জন্য তিস্তার মন ছটফট করতো।স্তনবৃন্ত উপচে তীর্থের আহার বয়ে যেত যখন, অথচ তীর্থ কৌটোর দুধ খাচ্ছে, তখন তিস্তার চোখে অকাল শ্রাবণ নামতো।আকুল হয়ে  দিন গুনতো ছুটির।
বাড়িতে পা দিয়েই তীর্থকে কোলে নিতে চাইলে, শাশুড়িমা বলেন, ঘুমোচ্ছে ,পরে দেখো,ঘরে গিয়ে রেস্ট নাও।
  ত্রিদিবও তার মাকে সমর্থন করলে ক্লান্ত তিস্তা মনখারাপ করে নিজের ঘরে তীর্থের ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করে।
  ছোট্ট তীর্থের কান্নার আওয়াজে তিস্তা তীর্থকে কোলে নিতে শাশুড়িমার ঘরে ছুটে গেলে,শাশুড়িমা ওঠেন, অসুস্থ শরীরে তোমার এসব করতে হবেনা।আমি তো আছি।
  কিংকর্তব্যবিমূঢ় তিস্তা চোখের জলে নিজের ঘরে ফেরে। 
  ধীরে ধীরে তিস্তা সুস্থ হয়ে উঠলেও তীর্থকে সেভাবে কাছে পায়না।আকুল হয়ে একদিন ত্রিদিবের কাছে তার কষ্টের কথা জানাতেই ,শোনে, বাড়িতেইতো আছে,  এঘর আর ওঘর,আর তোমারও রেস্ট দরকার।তাছাড়া মারও তো তীর্থকে নিয়ে ভালো সময় কাটছে।এসব ভেবোনা।ঘুমিয়ে পড়।
   অভিমানী তিস্তা সেদিন কথা বাড়ায়নি।কি বলবে? কাকে বলবে ?অভিযোগ জানানোর কে আছে তার?
  অসহায় তিস্তা ধীরে ধীরে সংসারে তার অবস্থান বুঝতে পারছিল।তীর্থকে ঘিরে তার ঠাকুরমা একটা বলয় তৈরি করেছেন যেখানে তিস্তার প্রবেশাধিকার নেই।একদিন এই বিষয়ে তিস্তা ও ত্রিদিবের মতানৈক্য চরম পর্যায়ে  ওঠে।ত্রিদিব এই বিষয় ভালো করে  লক্ষ্য করে,তার মায়ের তীর্থের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত স্নেহ, যা স্বাভাবিকতার সীমানা ছাড়িয়েছে।ত্রিদিব এই নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়।চিকিৎসক জানালেন,যে তার মা’র একাকীত্বের সময়ে  তীর্থকে আগলে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেছেন।
 এটা  একধরনের মানসিক ব্যাধি।এখন তীর্থকে ওনার কাছ থেকে কেড়ে নিতে গেলে  মানসিক  আঘাতে আঘাতে তিনি  মানসিক  ভারসাম্য  হারাতে পারেন।
   অসহায় দম্পতি  কি করবে ,বয়স্কা মাকে এমন জীবনযাপনে আর বাঁধা না  দেওয়ার  সিদ্ধান্ত নেয়।
  সময় এগিয়ে চলে কালের নিয়মে,তীর্থ বড় হয়ে ঠাকুরমাকে 'মা' আর তিস্তাকে  'মামনি' বলে ডাকে।তিস্তা বিনাl প্রতিবাদে 'মামনি' ডাককেই আপন করে নেয়।শুধু অবাক হয়,তিস্তাকে তীর্থের কাছে দেখলেই শাশুড়িমা ছুটে এসে তীর্থকে নিয়ে চলে যান। তিস্তা দেখে তার সন্তান তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে, চাইলেও তীর্থকে সে ইচ্ছেমতো আদর করতে পারেনা।কিন্তু ঐ বয়স্কা মাতৃসমা  মানুষটিকে কেন যেন আঘাত দিতে মন চায়না তিস্তার।সে মনে করে তার সন্তান একদিন ফিরে তারকাছেই আসবে, সেদিন  তীর্থকে প্রাণভরে আদর করবে তিস্তা ।কোথাও একটা নাপাওয়ার  শূন্যতা তিস্তার বুকে জমতে থাকে।
 তীর্থ বড়ো হলে তাকে স্কুলে দিয়ে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে  পড়ানো, সব বিষয়ে সব দায়িত্ব তীর্থের ঠাকুরমা নিজের হাতে তুলে নেন। তিস্তা  অসহায়ভাবে শুধু দেখতে থাকে ।তীর্থ যতো বড়ো হতে লাগল,ততোই তিস্তার সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
    তারপর সেই দিন,তিস্তার মনে পড়ে, ছাদে জামাকাপড় তুলতে গিয়ে তিস্তা দেখে ক্লাস এইটে পড়া তীর্থের মুখে সিগারেট। নিজেকে সামলাতে পারেনা সেদিন। তীর্থের ফর্সা গালে তিস্তার পাঁচটা আঙ্গুলের ছাপ চেপে বসেছিল।তীর্থের মুখে অনুতাপের ছায়া না দেখে আশ্চর্য হয়েছিল তিস্তা।নিচে নেমে ত্রিদিব আর শাশুড়িমাকে বলতেই সবাইকে  অবাক করে তীর্থ উগ্রভাবে বলে ওঠে,কে তুমি আমাকে শাসন করার? জন্ম দিলেই 'মা' হওয়া যায়না।যা করেছে আমার মা-
  ঠাকুরমাকে ইঙ্গিত করে বলে,  যদি কিছু বলার থাকে, আমার মা বলবে।
     নিস্তব্ধ ঘরে অভিমানী তিস্তা জলভরা চোখে ত্রিদিবের দিকে তাকালে, ত্রিদিব বলে, গায়ে  হাত তোলাটা ঠিক না।
  স্তম্ভিত তিস্তাকে আরও অবাক করে শাশুড়িমা বলেন,  এই বয়সে অমন একটু আধটু -
কথার শেষটুকু না শুনেই তিস্তা ঘরে চলে যায়। কষ্ট, অভিমান বুকে চেপে বসলেও চোখ বেয়ে নামেনা।
   তিস্তার বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সেই থেকে তীর্থ আর তিস্তার মাঝে একটা অদৃশ্য পাঁচিল গড়ে ওঠে।তীর্থ তখন থেকে  তিস্তাকে প্রায় এড়িয়ে চলতো।তিস্তার বুক ফেটে যেত,কিন্তু তিস্তার মনেও একবুক অভিমান জমে বরফ  হচ্ছিল। তীর্থ ক্লাস টুয়েলভে উঠার পরেই তীর্থের  ঠাকুরমা  মারা গেলেন, তখন একাকী তীর্থকে কাছে টানার জন্য তিস্তার সবরকম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে  দুরত্ব আরও বাড়ে।সময়ের সাথে তীর্থ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে ম্যানেজমেন্ট  পড়তে  দিল্লি যয়।
তখনও অভিমানী  তিস্তা ভেবেছিল অন্তত দিল্লি যাওয়ার সময়ে তাকে যাওয়ার কথা বলবে।কিন্তু  সব ভুল ভেঙ্গে তীর্থ আর ত্রিদিব দিল্লি গিয়ে তীর্থকে  সেটল করে ফিরে আসে ত্রিদিব। ছুটিছাটায় তীর্থ কলকাতা খুব কম এসেছে, ত্রিদিব  দিল্লি গিয়ে দেখা করে  এসেছে।
    বাড়িতে একাকী তিস্তার সময় যেন কাটতে চাইতোনা।এমন সময়ে তিস্তা একজনের থেকে এই 'আলোর  দিশা'- নামের অনাথাশ্রমের সন্ধান পায়।এখানে যেন তিস্তা  নতুন করে নিজেকে খুঁজে পেল, ঐ ছোট ছোট  অনাথ শিশুদের মধ্যে।ত্রিদিবও কোনও আপত্তি করেনি,উল্টে সেও মাঝেমাঝে  তিস্তার সাথে 'আলোর দিশা'তে যেত।এমন করেই দিন কাটছিল,  কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ ত্রিদিবের বুকে ব্যথা, দিশেহারা তিস্তা ডাক্তারকে ফোন করে উঠে ত্রিদিবের বুক ডলতে থাকে কিন্তু সেচেষ্টা ব্যার্থ করে হঠাৎই ত্রিদিবের মাথাটা তিস্তার কাঁধে এলিয়ে পড়ে। ডাক্তার এসে দেখেন সব শেষ।খবর পেয়ে পরদিনই ফ্লাইটে তীর্থ কলকাতা আসে।গতকাল সব কাজ মিটলে রাতে  বসে  ভাবছিল তিস্তা,তীর্থ চলে গেলে,একা একা  এই বাড়িতে সে কিকরে থাকবে? ঠিক করে, তীর্থ চলে গেলে সেও এই বাড়িতে থাকবে না, চলে যাবে যেদিকে দুচোখ যায়।
 কিসের পিছুটান তার?তীর্থর ক্যাম্পাসিং এ ওবেরয় গ্রুপে সিলেক্টেড।তাই  তীর্থের  ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা নেই, তাছাড়া ত্রিদিবের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ও কম নয়।নাহ -তিস্তাকে কারো আর প্রয়োজন নেই।
আজ গিয়েছিল তাই তিস্তা  আলোর দিশা'তে।তিস্তা l ওখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে থাকার জন্য  আগ্রহ প্রকাশ করলে,সাদর অভ্যর্থনা পায়।তাই তিস্তা ঠিক করেছে,তীর্থ চলে গেলে, তার ঠিকানা হবে  'আলোর দিশা।'
   দরজায় নক করার শব্দে তিস্তা তাকিয়ে দেখে সকাল হয়ে গেছে।নিজেকে বারান্দায় চেয়ারে খুঁজে পেয়ে বোঝে , কখন চোখ লেগেছে কাল  রাতে টের পায়নি।দরজা খুলে দেখে তীর্থ, হাতে ট্রেতে দুটো চায়ের কাপ, আর নীচে  একটা  ট্রলি ব্ব্যাগ।হতবাক তিস্তাকে তীর্থ  বলে, ট্রেটা  ধরে ভেতরে চলো।স্তম্ভিত তিস্তা চায়ের ট্রে নিয়ে খাটে এসে বসে।তীর্থ ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে ঘরে এসে বিছানাতে বসে বলে, নাও গুছিয়ে নাও। দিল্লিতে কিন্তু  ঠান্ডা  পড়ে খুব, শীতের জিনিস বেশি করে নিও।
       তিস্তা অবাক হয়ে তীর্থের দিকে তাকাতেই, তীর্থ ট্রলি ব্যাগ থেকে একটা ডাইরি  বের করে তিস্তার হাতে দেয়। তিস্তার কাঁধে হাত রেখে বলে, বাবাইয়ের ডাইরি, আমাকে পড়তে  দিয়েছিল, মামনি। শেষবার  বাবাই যখন দিল্লি গেল আমাকে  এই ডাইরি টা দিয়েছিল। মা'র আমাকে তোমার থেকে  দুরে নিয়ে যাওয়া, তোমার কষ্ট, সব বাবাই লিখে গেছে ।কিন্তু মা'র থেকে আমাকে  কেড়ে নিয়ে তোমার কাছে  দিলে মা যে আরও অসুস্থ হয়ে যেত,তাই তুমি  এতোটা sacrifice করেছো মামনি!আমি তোমাকে ভুল বুঝেছি মামনি ,তোমার  কষ্ট, বাবাইয়ের কষ্ট,মা'র সমস্যা,মামনি আমি ডাইরিটা   পড়তে পড়তে অনুভব করছিলাম। এরপর মাঝেই  এমনভাবে বাবাইয়ের এই --
    ধরা গলায় তীর্থর কথাগুলো  মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল তিস্তা।বুঝতে পারছিলনা, সে কি  স্বপ্ন দেখছে কিনা!
  সম্বিত ফেরে  তীর্থের কথায়,   আমি অনেক ভুল বুঝেছি তোমাকে।কতো কষ্ট তুমি  পেয়েছ মামনি, আর না।মামনি আজ এই মুহুর্ত থেকে আর ভুল বোঝাবুঝি নয়,তোমাকে ছাড়া আমি  আর থাকবোনা।কালকের  টিকিট  ক্যানসেল করে   পরশুরাম দুটো এয়ার টিকিট কেটেছি। আমার সাথে তুমি  দিল্লি যাবে। আপাতত এক বন্ধুর খালি ফ্ল্যাট  ভাড়া নিয়ে থাকবো দুজনে। তারপর অন্য ব্যবস্থা করে নেবো,ভরসা করতে পারো। 
 তিস্তা তার কাঁধে  তীর্থের ভরসার  হাতে মাথা রাখলো।
---তোমাকে ছেড়ে আর   থাকবোনা,মামনি ।
    তীর্থ জড়িয়ে ধরে  তিস্তাকে।
এতবছরের জমানো কষ্ট তিস্তার চোখ বেয়ে আজ আনন্দাশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে,আজ তার আত্মজ শুধুই তার ,একান্ত নিজস্ব