ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

                                         





ভাষা দিবসের তাৎপর্য


১৯৯৯এর ১৭ই নভেম্বর বিশ্ব সংগঠন ইউনেসকো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পর বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে এ বাংলাতেও ‘ভাষাদিবস’ পালনের রেওয়াজ শুরু হয় । ওপার বাংলাতো বটেই এ বাংলাতেও দু একটি ভাষাসংগঠন আরো আগে থেকেই ‘ভাষা শহিদ দিবস’ পালন করে আসছে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে । এপারের বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীরা বিনম্র শ্রদ্ধায় একষট্টির ভাষা আন্দোলনে হত এগারো শহিদের স্মৃতিতর্পন করেন প্রতি বছর ১৯শে মে । এটা ভাষাদিবস পালনের একটি দিক ।

একুশে পালনের তাৎপর্য শুধুমাত্র ভাষা শহিদদের স্মৃতিতর্পন নয়, আরো কিছু । একুশে যেমন ভাষা শহিদ দিবস তেমনই মাতৃভাষা দিবস । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং আমাদের জীবনচর্যায় মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দানের প্রত্যয়কে প্রসারিত করার দিনও । ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন – মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে সেদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অবশেষে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । একুশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ওপারে বাংলার মত এক সমৃদ্ধ ভাষার সম্ভাব্য বিলুপ্তি রোধ করেছিল । ১৯৬১র ১৯শে মে’র বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন সেখানে মতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই । কিন্তু এই ইতিহাস চর্চার বাইরে ভাষা দিবসের তাৎপর্য নবীন প্রজন্মের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছে, সে বিষয়ে সংশয় থেকে যায় ।

ভারতে বাংলা ভাষা দুটি রাজ্যের সরকারী ভাষা । কিন্তু এই যে গত ষোল বছর ধরে আমরা ঘটা করে ভাষসদিবস পালন করছি, নবীন প্রজন্মের কাছে তার আবেদন কতটুকু পৌঁছায় কিংবা ভাষা-আবেগ তাদের কতটুকু স্পর্শ করে তা বোঝার উপায় নেই । এখানে বাংলা চাকুরি পাওয়ার ভাষা নয়, উচ্চশিক্ষা লাভের ভাষা নয় এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ভাষাও নয় । কিন্তু সেটাই বাংলা ভাষার নিজভূমে দুয়োরাণি হয়ে থাকার একমাত্র কারণ নয় । তবে হ্যাঁ, ক্ষীণ কন্ঠে এটা জানান দেওয়া গেছে যে বছরের ৩৬৫ দিনের একটা দিন ভাষা দিবসের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে । অনেকে আবার ভাবতে পারের, ভাবেনও যে তা হোক না । নারী দিবস, প্রবীণ নাগরিক দিবস, বাবা দিবস, এমনকি হুইস্কি দিবসও তো  বরাদ্দ আছে । আশঙ্কা হয়, এদেশে ভাষাদিবস ভাষা উৎসব না হয়ে যায় । কারণ উৎসবের ফন্দি-ফিকির খুঁজতে আমরা বেশ দড় । তাই ভাষাদিবসের তাৎপর্য যাদের সবচেয়ে বেশি জানা দরকার সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থেকে যায় অন্ধকারে  ।

আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে ‘বিশ্বায়ন’ নামক পাঁচ অক্ষরের এক দানবীয় বন্দোবস্ত তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের কৌশল হিসাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিসাবে আমরা টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনের এসএমএস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক বিকৃত ভাষা রপ্ত করে নিচ্ছে নবীন প্রজন্মের শিশুরা, গড়ে তুলছে নিজ মাতৃভাষার সঙ্গে অনাত্মিয়তা ।

বিশ্বের আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মাতৃভাষার ক্রমবিলুপ্তি রাষ্ট্রসঙ্ঘকে বিচলিত করেছিল । বস্তুত, বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানিরা ধারাবাহিক গবেষণা শুরু করেছিলেন, বিশ্বায়ন কি ভাবে অনুন্নত জনগোষ্ঠীগুলির ভাষাগত ভারসাম্য এলোমেলো করে দিতে পারে সেই বিষয়ে ।  রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধীনে এই বিষয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে, যেখান থেকে উঠে এসেছিল এক ভয়াবহ ছবি । তারা রাষ্ট্রসঙ্ঘকে সতর্কিত করেছিলেন যে এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের ছয় হাজার মাতৃভাষার বিলুপ্তি ঘটবে, যদি না ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতাকে ঠেকানো যায় । আমরা জানি আদিম ভাষাগোষ্ঠীর ক্রমবিলুপ্তি ছিল উপনিবেশবাদের অনিবার্য ফল । আজকের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদের আবহে সেই ট্রাডিশনের অন্যথা হবার কথা নয় ।

        কোন ভাষার  বিলুপ্তি ঘটে তখন, যখন সেই ভাষায় কথা বলার আর একটি লোকও থাকে না । আমরা জানি, গত দুশো বছরে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ বহু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে চিরতরে লোপাট করে দিয়েছে । আমেরিকার আদিম জনগোষ্ঠী বা কালো মানুষরা জানে না, তাদের মাতৃভাষা কেমন ছিল । মেক্সিকো কিংবা মরিসাসের মানুষ জানে না তাদের মাতৃভাষা কি ছিল । আমরা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারি এই ভেবে যে, বাংলার মত এতো সাহিত্য-সম্পদ সমৃদ্ধ ভাষা, যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ আছেন সে ভাষার মৃত্যু হতে পারে না কোন দিন । হ্যাঁ, পারে । সংস্কৃতেও তো কালিদাস, ভারবি, ভাস ছিলেন , সে ভাষাও মৃত । অহম ভাষা একসময় খুব সমৃদ্ধ ভাষা ছিল । ১৩ থেকে ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শাসন করতো অহম জনজাতি । ১২২৮ থেকে ১৮২৬ পর্যন্ত অহম গণরাজ্যের প্রধান ভাষা ছিল ‘অহম’। ১৯ শতাব্দীর মধ্যে এই ভাষাটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে । বিষয়টা তো এই যে আমরা সেই ভাষায় কথা বলছি কি না, সেই ভাষাতেই আমার সৃজনশীলতা পুষ্ট হচ্ছে কি না । শিশুরা বা নবীন প্রজন্ম যদি তাদের দৈনন্দিন জীবনে, জীবনচর্যায় মাতৃভাষার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে তবে সেই ভাষার মৃত্যু ঠেকানো যায় না । এপারের বাঙ্গালাভাষীদের অশেষ সৌভাগ্য যে বাঙ্গালী জাতিসত্তার একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে – বাংলা দেশ, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । 

ভাষা বিলুপ্তি সম্পর্কে সারা বিশ্বকে প্রথম যিনি সচেতন করেছিলেন সেই আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ক্রাউস ২০০৭এ একটি তথ্য দিয়েছিলেন যে, সারা বিশ্বে সক্রিয় ভাবে চালু সাত হাজার ভাষাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়  নিরাপদ, প্রায় বিপন্ন ও বিপন্ন ভাষা । তাঁর মতে সেই ভাষাকেই নিরাপদ বলে মনে করা হয় যদি শিশুরা ও নবীন প্রজন্ম আগামী একশো বছরে সেই ভাষা ব্যবহার করে তার দৈনন্দিন জীবনে । না করলে সেই ভাষা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে, ক্রম বিলুপ্তিই যার অনিবার্য পরিণাম । ২০০৯এ ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ সমিতির প্রতিবেদনে একই কথা বলা হয় যে, “একটি ভাষায় কথা বলা জনগন যদি তার দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকে, সেই ভাষায় আদান প্রদান করা মানুষের সংখ্যা যদি ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে এবং সেই ভাষায় কথা বলার ধারা যদি  পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত না হয় তবে তা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে” । 

তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য তছনছ করে দেওয়াই উন্নত দেশগুলির অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের লক্ষ্য । তারা চাইছে  সারা বিশ্বে মাত্র পাঁচ-ছটি ভাষায় মানুষ কথা বলবে । কারণ তারা মনে করে ভাষার কাজ শুধু সংযোগ সাধন করা বা ‘কমিউনিকেট’ করা । ভাষার নৃতাত্বিক উপযোগিতা তাদের কাছে গৌণ । তিন ধরনের প্রবণতা কোন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় । প্রাধান্য বিস্তারকারী কোন ভাষার চাপে নিজের মাতৃভাষার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই  কয়েকটি প্রজন্ম ধরে কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা ‘ভাষামৃত্যু’র দিকে এগিয়ে যায় । আবার কোন ভাষাগোষ্ঠী নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সেই প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষার প্রকরণকে নিজ ভাষার সঙ্গে মিশ খাইয়ে দিয়ে । বিশ্বায়নের আড়কাঠি কর্পোরেট সংস্থাগুলি এই প্রক্রিয়ায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে । তাদের বিজ্ঞাপন গুলিতে ব্যবহার হচ্ছে অদ্ভুত সব খিচুড়ি ভাষা ‘এ দিল মাঙ্গে মোর’, ‘ঠান্ডার নতুন ফান্ডা’ ইত্যাদি । 

দু বছর আগে , ২০১২র অক্টবরে লখণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যগে ভাষা সংক্রান্ত এক সেমিনার হয়েছিল । সেই সেমিনারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদপত্র ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ জানিয়েছিল যে, ভারতে চালু ৩৮০টি আঞ্চলিক ভাষার ৯৬শতাংশ ভাষাই বিলুপ্তির পথে । ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী ভারতে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছে ২৪২টি আঞ্চলিক ভাষা । এখন ভারতে মোট জনসংখ্যার ৪শতাংশ মানুষ এই মৃত্যুপথযাত্রী ভাষাগুলিতে কথা বলে, আর ৯৫শতাংশ মানুষ যে প্রধান ভারতীয় ভাষায় কথা বলে তা ভারতে চালু ভাষা সম্মূহের ৪শতাংশ মাত্র । কি ভয়ঙ্কর ছবি উঠে আসছে ভারতকে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’র গর্ব করা আমাদের কাছে ! 

এখন সারা বিশ্বে ৭৩৫৮টি ভাষা আছে, যার ৯০ শতাংশই ২০৫০এর মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান । এরমধ্যে ৩৩০টি ভাষায় কথা বলে ১০লক্ষের বেশি মানুষ, ১৭৮টি ভাষায় কথা বলে ১০জন মানুষ, ২০০টি ভাষায় ১০জনেরও কম আর ৫১টি ভাষায় মাত্র একজন করে কথা বলার লোক আছে । সেই শেষতম মানুষটির মৃত্যুর সঙ্গেই সেই জনগোষ্ঠীটি তার ভাষাপরিচয় হারিয়ে ফেলবে । পরের প্রজন্ম জানবেও না তার পূর্বজদের মুখের ভাষা কেমন ছিল, কেমন গান তারা গাইতো, কি রকম ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে তাদের শিশুরা ঘুমিয়ে পড়তো ! ঠিক পাঁচবছর আগে ২০১০এর ২৬শে জানুয়ারি ভাষাপ্রেমিকদের  সামনে এসেছিল এক বিষন্ন দিন যেদিন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮৫ বছরের নিঃসন্তান বৃদ্ধা বো সিনিয়রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে আন্দামানী জনজাতিরন্যতম প্রাচিন ভাষা ‘আকা বো’ । বো সিনিয়র ছিলেন সেই ভাষায় কথা বলা শেষতম মানুষ । ১৮৫৮তে ইংরাজরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে উপনবেশ করার সময় বো জনজাতির লোকসঙ্খ্যা ছিল পাঁচ হাজার আর বো সিনিয়রের মৃত্যুর সময় সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫৮ জনে, যাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সেই ভাষাটি জানতেন । এই ভাবে ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠাই যেন মুছে গিয়েছিল সে দিন ।

ভাষা বিলুপ্তির এই প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর উন্নত দেশগুলির প্রাধান্য বিস্তারের গতির সঙ্গে তাল রেখে । খোদ আমেরিকাতেই ১৯২টি জনজাতির ভাষা বিলুপ্তির পথে । ইন্দোনেশিয়ায় ১৪৭টি ও ভারতে ১৯২টি ভাষা অবলুপ্তির পথে । ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতা রোখা না গেলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান এই শতাব্দীর মধ্যেই ছ’হাজার ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংকট ঘনিয়ে আসবে ।

দু’বছর আগে ২০১৩তে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে ইউনেসকো একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছিল যে বিশ্বে এখন কথা বলা অর্থাৎ চলতি ভাষাগুলির মধ্যে ২৫০০ ভাষাই বিপন্ন ভাষা এবং গত তিন প্রজন্মে দু’শটি ভাষার বিলুপ্তি ঘটে গেছে । এই যে আড়াই হাজার ভাষাকে বিপন্ন বলে চিহ্নিত করেছে সেগুলিকে তারা ভাগ করেছে এই ভাবে –

নিরাপদ নয় (আন-সেফ) – ৬০৭টি ভাষা

নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন – ৬৩২টি

মারাত্মক বিপন্ন – (সিভিয়ারলি এনডেনজার্ড)- ৫০২টি এবং

ভয়ঙ্ক বিপন্ন (ক্রিটিকালি এনডেনজার্ড) – ৫৩৮টি ভাষা ।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন যে যখন তরুণ প্রজন্মএর মানুষ তার ভাষায় কথা বলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেমন বাড়িতে – সেও ভাষা বিপন্ন ভাষা । শিশুরা যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে না তখন সে ভাষা নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন । আবার যে ভাষায় বৃদ্ধ বা প্রবীণ অর্থাৎ দাদু-দিদিমারা কথা বলেন, পরের প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুটির পিতা-মাতা সে ভাষা বুঝতে পারেন কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের সন্তানদের সঙ্গে সেই ভাষায় আদান-প্রদান করেন না, সেই ভাষা ভাষা বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে মারাত্মক ভাবে বিপন্ন । আর একটি ভাষায় শুধুমাত্র প্রবীণরাই কথা বলেন নিজেদের মধ্যে – সে ভাষা ভয়ঙ্কর ভাবে বিপন্ন । 

স্বাধীন ভারতেও উপজাতি ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলিকে রক্ষা করার কোন অর্থবহ প্রয়াস দেখা যায় না । ভারতে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলি কতটা বিপন্ন সে হিসাব কোন সমাজতাত্বিক করে উঠতে পেরেছেন কি না জানা নেই । কিন্তু এটা তো জানি এদেশেও অনেক প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষা অনেক আঞ্চলিক ভাষাকেই গিলে ফেলেছে । ১৯৯১সালের জন গননায় স্বীকার করা হয়েছিল যে ভারতে হিন্দিভাষী মোট জনসংখ্যার  ১০কোটি ৭২ লক্ষ মানুষের পৃথক ভাষা পরিচয় আছে । ভোজপুরি, বুন্দেলখন্ডি, মৈথিলী গোষ্ঠীগুলির পৃথক ভাষা পরিচয় থাকা সত্বেও সেগুলকে হিন্দি গিলে ফেলে নিজের  কলেবর মোটা করেছে । ১৯৯১ ও ২০০১এর দুটি জনগননার প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে এই দুটি জনগননার মধ্যবর্তী সময়কালে সব প্রধান ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা কমেছে কিন্তু হিন্দির ক্ষেত্রে বেড়েছে ১৯৯১ তে ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮.২২% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন আর ২০০১এর জনগননায় এই সংখ্যাটা হয়ে গেছে ৮.০১% অর্থাৎ দশ বছরে ০.২১% মানুষ দশ বছর আগে যারা বাংলায় কথা বলতেন তারা অন্য ভাষায় কথা বলা শুরু করেছে ।

কোন ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য থাকা বা না থাকা সেই ভাষার বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত নয়, জরুরিও নয় । ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য এসেছে অনেক পরে । আমরা জানি যে, মৌখিক ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সম্পদ অনেক বেশি । এই যে আমরা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান শুনে বড় হই, চিরকাল শিশুরা মায়ের মুখে যে সব ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে ঘুমাতে যায়, সে তো মৌখিক সাহিত্য – আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসামান্য সম্পদ, আমরা জানিনা, জানার প্রয়োজনও নেই সেগুলি কার রচনা । সব আঞ্চলিক ভাষারই এই মৌখিক সাহিত্য-সম্পদ আছে । ভাষাচার্য সুকুমার সেন এই মৌখিক সাহিত্য বা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান প্রসঙ্গে লিখেছেন “শিশু-বেদ বয়স্কের সাহিত্য-ভুবন ধরে আছে বাসুকীর মতো । শিশু-বেদের মধ্যে ধরা আছে সমগ্র মানবজাতির জন্মপত্রিকা” । কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির অর্থ সেই ভাষাগোষ্ঠীকে ঘিরে যে যে জ্ঞানভান্ডার তারও বিলোপ । আদিম জনগোষ্ঠীর মৌখিক ভাষায় সঞ্চিত থাকে তার পরিবেশ, সংস্কৃতি, বন্য-প্রজাতি সম্পর্কিত জ্ঞানভান্ডার । সমস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষত্রেই একই কথা বলা যায় । কারণ মানুষের জ্ঞানভান্ডারের অতি সামান্য অংশই লিখিত ও সাহিত্য রূপে থাকে, মানুষের মৌখিক জ্ঞানসম্পদ অনেক বেশি ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ । কোন ভাষাগোষ্ঠীর বিলুপ্তির অর্থ অতয়েব  সেই ভাষা অঞ্চলের  নৃতাত্বিক ভারসাম্য তছনছ হয়ে যাওয়া ।

এই উদ্বেগের যায়গা থেকেই মাতৃভাষা পালনের আহবান জানিয়েছিল ইউনেসকো । মাতৃভাষায় কথা বলার পরম্পরাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তর করতে না পারলে – শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় কথা বলতে শেখানো আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়েই ভাষা-মৃত্যুর প্রবণতাকে রোধ করা যায় – অন্য কোন বিকল্প পন্থা নেই । এটাই ভাষাদিবস পালনের তাৎপর্য । একুশে যেমন ভাষাশহিদ স্মরণ দিবস তেমনই নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রত্যয় প্রসারিত করার দিনও ।

                                ========== XXX =========

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

                                          

তিন মায়ের গল্প


এক অক্ষরের একটা শব্দ – মা, কিন্তু কি অনন্ত ব্যাপ্তি শব্দটার !গর্ভধারিনী জননী,দেশ মাতৃকা, ঈশ্বর । আমাদের পরম স্নেহের আশ্রয় মা।বিশ্বের তাবৎ অভিধানে একই অর্থ এই একটিমাত্র অক্ষরের শব্দ মা’র ।মায়ের কথা, মা কে নিয়ে কথার কোন শেষ নেই । আমি তিন মায়ের কথা বলব ।তিন ‘মা’ই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্ধকার জগৎ থেকে এসেছিলেন, তারপর আপন নিষ্ঠা আর তন্ময় সাধনায় মহিয়সী নারীর মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিলেন ।সুকুমারী দত্ত বা গোলাপসুন্দরী প্রথম মহিলা নাট্যাভিনেত্রী থেকে বাংলার প্রথম মহিলা নাট্যকার , নটী বিনোদিনী তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেত্রী এবং ইন্দুবালা সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী ।এই তিন মায়ের গল্পে আছে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার কথা,অবহেলার অন্ধকারকে অগ্রাহ্য করে আপন প্রতীভায় মাথা-উঁচু করা প্রতিষ্ঠার কথা । 

সুকুমারী দত্ত

১৮৭৩ নগর কলকাতা থিয়েটারের শহর হওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে , এক বছর আগে  ধনি জমিদার বাবুদের প্রাঙ্গণ থেকে মুক্তি পেয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে থিয়েটারের দরজা । ১৮৭২এর  ৬ই ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যাশানাল থিয়েটার ‘নীলদর্পণ’ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ।বাংলা থিয়েটারের সেই শৈশবে ধনকুবের ছাতুবাবু বা আশুতোষ দেবের দৌহিত্র শরৎকুমার ঘোষ খুললেন বেঙ্গল থিয়েটার । শরৎকুমার মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নাটক লিখে দেবার জন্য ।মাইকেল নাটক লিখেদিতে সম্মত হলেন একটি শর্তে, তা হল তাঁর নাটকে স্ত্রী চরিত্রের অভিনয় নারী অভিনেত্রীকে দিয়েই করাতে হবে ।বেঙ্গল থিয়েটারের উদ্যোক্তারা বারাঙ্গনাপল্লী চারজন অভিনেত্রীকে নিয়োগ করলেন তাদেরই একজন ছিলেন গোলাপসুন্দরী । মাইকেল তখন মৃত্যুসশয্যায় তবু মাইকেল বেঙ্গল থিয়েটারের জন্য  নাটক লিখে দিলেন ‘মায়া কানন’ ।থিয়েটার উদবোধনের আগেই মধুসূদনের মৃত্যু হওয়ার কারণে তারা মায়াকানন দিয়ে থিয়েটারের উদবোধন করলেন না । ৮৭৭৩এর ১৬ই অগস্ট বেঙ্গল থিয়েটারের উদবোধন হল মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক দিয়ে ।অভিনয় করলেন বারাঙ্গনাকন্যা গোলাপসুন্দরী । বাংলা থিয়েটারের প্রথম নারী অভিনেত্রী ।শেষ হল নাট্যাভিনয়ে পুরুষের একচেটিয়া অধিকার ।এ ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা । মাইকেল মধুসূদন এই ঘটনা দেখে যেতে পারেননি ।

বারাঙ্গনাকন্যা গোলাপসুন্দরীর অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার সংগ্রাম বিস্ময়কর ।সাহায্য পেয়েছিলেন এক মহতী হৃদয় মানুষের, তিনি বেঙ্গল থিয়েটারের নাট্যপরিচালক উপেন্দ্রনাথ দাস । উপেন্দ্রনাথ গোলাপের বিবাহ দিয়েছিলেন থিয়েটারেরই এক অভিনেতা গোষ্ঠবিহারী দত্তর সঙ্গে । এই ঘটনা তখনকার সমাজে প্রবল নিন্দাবাদ হয়েছিল । উপেন্দ্রনাথকে নিজের পিতৃসম্পর্কও ত্যাগ করতে হয়েছিল । গোষ্ঠবিহারী – সুকুমারীর মর্যাদাপূর্ণ দাম্পত্যজীবনের ব্যবস্থা উপেন্দ্রনাথ করেছিলেন । তারা ভদ্রপল্লীতে বাসা বেঁধে ছিলেন । এই সময় উপেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পিতার সম্পর্ক পুণস্থাপিত হয় । তিনি উপেন্দ্রনাথকে বিলাতে পাঠিয়ে দেন । উপেন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে গোষ্ঠবিহারীও জাহাজের খালাশি হয়ে বিলাত চলে যান । সুকুমারী স্বামী পরিত্যক্তা হন, তখন সে এক কন্যাসন্তানের জননী । 

স্বামী পরিত্যক্তা সুকুমারী থেমে থাকেননি । সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করলেন মেয়েদের নাচ ও অভিনয় শেখাবার একটা স্কুল খুললেন । কিন্তু বেশি দিন চালাতে পারলেন না ।  ন্যাশানাল ফিমেল থিয়েটারের উদ্যোগে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য নাটক করলেন ।  ইতিমধ্যে এক সহৃদয় মানুষ, নবভারত পত্রিকার সম্পাদক বাবু দেবপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সুকুমারীর কন্যার শিক্ষা ও প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন । অর্থকষ্ট সামাল দিতে  সুকুমারী নাট্যরচনায় মন দিলেন, নিজের ব্যক্তিজীবন ও নাট্যজীবনের অভিজ্ঞতা উজাড় করে রচনা করলেন ‘অপূর্ব সতী’ নামে একটি নাটক । নাটকটি অভিনীতও হয়েছিল । বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস সুকুমারীকে প্রথম মহিলা নাট্যকারের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিয়েছে ।

একমাত্র কন্যার শিক্ষার বিষয়ে কোন অবহেলা করেননি সুকুমারী । কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে । কিন্তু একটা দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয়েছিল তাকে । মেয়ের শশুরবাড়িতে গিয়ে মেয়েকে একবার চোখের দেখা দেখার অধিকার ছিল না সুকুমারীর ।

১৮৯০-৯১ পর্যন্ত গোলাপ নানান থিয়েটারে অভিনয় করেছেন । তারপর কবে চলে গেলেন তা জানা যায় না । অন্ধকার জগত থেকে আলোয় ফেরা গোলাপদের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ তখনকার সমাজ মনে রাখেনি । গোলাপ তার কন্যাকে পিতৃ ও মাতৃ পরিচয় দিতে পেরেছিলেন কিন্তু আর এক জননী বিনোদিনী তাও পারেননি ।

বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনীর সঠিক জন্মতারিখ জানা যায় না, জানা যায় না তাঁর পিতৃপরিচয়ও । আনুমানিক ১৮৬৩তে তাঁর জন্ম। বিনোদিনীর জন্মবৃত্তান্তে নিশ্চিত ভাবেই আমাদের আগ্রহ নেই । তিনি তাঁর আত্মকথায় বারবার নিজেকে হীন বারাঙ্গনা বলে উল্লেখ করেছেন । বাংলা থিয়েটারের সেই আদিপর্বে,  সহায়সম্বলহীনা এক বালিকা সমাজের অন্ধকার স্তর থেকে ঊঠে এসে অসামান্য প্রতিভা ও মেধায় , থিয়েটারকে ভালোবেসে, আপন তন্ময় সাধনায় এক মহিয়সী নারীর মর্যাদা অর্জন করেছিলেন । থিয়েটারকে ভালোবেসে পবিত্র হতে চেয়েছিলেন । 

থিয়েটারের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন বিনোদিনী – নিজেকেও । মারোয়াড়ি যুবক গুর্মুখ রায় একটা স্থায়ী থিয়েটার নির্মাণ করে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। বিনিময়ে বিনোদিনীকে তাঁর রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে । এবং সেই থিয়েটারের নাম হবে বিনোদিনীর নামে ‘বি থিয়েটার’ । সমস্ত আত্মগ্লানি দূরে সরিয়ে রেখে বিনোদিনী সম্মত হলেন ।  তাঁর নাট্যশিক্ষক গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীকে এক অর্থে বিক্রি করে দিলেন গুর্মুখ রায়ের কাছে । থিয়েটার নির্মিত হ’ল , কিন্তু প্রতিশ্রুতি মতো ‘বি থিয়েটার নয় - বিনোদিনীকে বঞ্চনা করে গিরিশ বাবুদের কৌশলে সেই থিয়েটারের নামকরণ হল ‘ষ্টার থিয়েটার’ , ১৮৮৩’র ২১শে জুলাই । কারণ , এক বারাঙ্গনার নামে থিয়েটার নাকি সেকালের সমাজপতি ও ভদ্রসমাজের  অনুমোদন পেতো না । বিনোদিনী গুর্মুখ রায়ের সঙ্গে ছিলেন মাত্র ছ মাস ।  গুর্মুখ চেয়েছিলেন যার নামে থিয়েটার করেছেন তাকেই অর্থাৎ বিনোদিনীকে ষ্টার থিয়েটার’এর মালিকানা দিয়ে যাবেন , অন্তত ৫০ভাগ অংশ তাঁকে দেবেন । এ ক্ষেত্রেও গিরিশচন্দ্র, অমৃতলাল মিত্ররা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেন, বিনোদিনী তাঁর অংশ পেলেন না । মাত্র ১১হাজার টাকায় ষ্টার থিয়েটারের মালিকানা হস্তান্তরিত হ’ল অমৃতলাল মিত্র সহ চার জনের নামে ।

বিনোদিনী শুধু নিজেই অভিনয় খ্যাতির শিখর স্পর্শ করেছিলেন তা নয় তাঁর অসামান্য অভিনয় সেকালের বাংলা থিয়েটারকেই মর্যাদামন্ডিত করেছিল । সে যুগে সম্ভ্রান্ত মানুষের চোখে নাট্যাভিনয় হীন কাজ বলেই বিবেচিত হতো ।  বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে থিয়েটারে এসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র । তাঁর ‘মৃণালিনী’ নাটকে মনোরমার চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র মন্তব্য করেছিলেম “আমি মনোরমার চরিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ করিব আমন আশা করিনাই । আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল” । ১৮৮৪র ২রা আগস্ট গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা মঞ্চস্থ হল স্টার থিয়েটারে । চৈতন্যের ভুমিকায় বিনোদিনী । রামকৃষ্ণদেব এসেছিলেন নাটক দেখতে । শ্রীচৈতন্যের চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয়ে পরমপুরুষ রামকৃষ্ণদেব ভাববিহ্বল হয়ে বিনোদিনীকে আশির্বাদ করেন । বলেন “আসল নকল এক দেখলাম” । পঙ্ক থেকে পঙ্কজা হয়ে ওঠার মত বিনোদিনী শ্রীচৈতন্যের চরিত্রের সার্থক রুপায়নের মধ্য দিয়ে বারাঙ্গনা জীবনের আত্মগ্লানি মুছে ফলতে চেয়েছিলেন । শ্রীরমকৃষ্ণের স্পর্শে বারাঙ্গনা নটী বিনোদিনী কলুষমুক্তির আস্বাদ পেলেন, তেমনই রঙ্গালয়েরও অস্পৃষ্যতা মুক্তি ঘটলো, থিয়েটারকে মর্যাদার আসনে স্থাপন করলেন বিনোদিনী । 

১৮৮৬তে মঞ্চ ত্যাগের ২৬ বছর পরে বিনোদিনী তাঁর আত্মকথা ‘আমার কথা’ লিখতে শুরু করেন । আমাদের নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে বিনোদিনীর উল্লেখ নিতান্ত দায়সারা ভাবে একজন অভিনেত্রী রূপে উল্লেখ হয় । আত্মকথার ভুমিকায় বিনোদিনী লিখেছেন “ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া ! পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা,শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা ! কিন্তু তাহা শুনিবারও লোক নাই ! মনের ব্যথা জানাইবার লোক জগতে নাই – কেননা আমি জগত মাঝে কলঙ্কিনী, পতিতা । আমার আত্মীয় নাই, বন্ধু নাই, বান্ধব নাই, এই পৃথিবীতে আমার বলিতে এমন কেহই নাই” । সেকালের সমাজের কাছে বিনোদিনীর জিজ্ঞাসা ছিল “... বারাঙ্গনার জীবন কলঙ্কিত  বটে ! কিন্তু সে কলঙ্কিত ঘৃণিত কোথা হইতে হয় ? জননী জঠর হইতে তো একেবারে ঘৃণিত হয় নাই । ...অনেকেই পুরুষের ছলনায় ভুলিয়া তাহাদের বিশ্বাস করিয়া চির কলঙ্কের বোঝা মাথায় লইয়া অনন্ত নরকযাতনা সহ্য করে। সে সকল পুরুষ কাহারা ? যাহারা সমাজ মধ্যে পূজিত আদৃত তাহাদের মধ্যে কেহ নন কি” ?

অথচ কি হিমালয়প্রমাণ বঞ্চনা, প্রতারনা আর উপেক্ষার স্বীকার হয়েছিলেন পঙ্কজা থেকে মহিয়সী হয়ে ওঠা এই রমনী । মঞ্চ ও অভিনয় ত্যাগের পরও বিনোদিনী বেঁচে ছিলেন আরো পঞ্চান্ন বছর তার মধ্যে সাহিত্যচর্চা করেছেন চল্লিশ বছর । দুটি পর্বে তাঁর আত্মকথা ছাড়াও রচনা করেছিলেন ‘বাসনা’ ও ‘কনক ও নলিনী’  নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ । কিন্তু লেখিকা রূপে বিনোদিনীর অবদান এখনো গ্রাহ্য হয় নি । যদিও তিনিই ছিলেন বাংলার ২য় মহিলা আত্মচরিত লেখিকা । বাংলা সাহিত্যের পাঠ্য ইতিহাস তন্নতন্ন করে খুঁজলেও সেকালের মহিলা লেখিকা রূপে বিনোদিনীর বিন্দুমাত্র উল্লেখ পাওয়া যাবে না ।

১৮৮৬’তে থিয়েটার থেকে বিদায় নেবার পর বিনোদিনী উত্তর কলকায় এক উদার হৃদয় ব্যক্তির আশ্রয়ে বধু জীবন যাপন করেন । সেখানেই তাঁর এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে, নাম দেন শকুন্তলা । কন্যাকে আশ্রয় করে বিনোদিনী পূর্বের অনেক ক্লেদাক্ত স্মৃতি ভুলে যান । বিনোদিনীর বাসনা ছিল কন্যা শকুন্তলাকে শিক্ষাদান করে সমাজের মুলস্রোতে নিয়ে আসবেন । কিন্তু সেকালের রক্ষণশীল সমাজ শকুন্তলার বিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন । অথকথায় বিনোদিনী তীব্র ধিক্কার জানিয়ে লিখেছেন "... আবার এই বিপন্নাদের পদে পদে দলিত করিবারজন্য ঐ অবলা-প্রতারকেরাই সমাজপতি হইয়া নীতি পরিচালক হন । যেমন ভাগ্যহীনাদের সর্বনাস করিয়াছেন, তাহারা যদি তাহাদের সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের সত১১পথে রাখিবার জন্য কোন বিদ্যালয়ে বা কোন কার্য শিক্ষার জন্য প্রেরণ করে, তখন ঐ সমাজপতিরাই শত চেষ্টা দ্বারা তাহাদেরসেই স্থান হইতে দূর করিতে যত্নবান হন"। ... শত দোষ করিলে ক্ষতি নাই ; কিন্তু 'নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ' । কন্যাকে আশ্রয় করে বিনোদিনী তাঁর বারাঙ্গনা জীবনের গ্লানি ভুলতে চেয়েছিলেন ।  কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৯১এ সেই কন্যার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন বিনোদিনী । এর দুবছর পর তাঁর  শেষ আশ্রয়দাতারও মৃত্যু হয় , বিনোদিনী ফিরে যান তার ১৪৫ নম্বর কর্নোয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িতে । সেখানেই সবার অলক্ষ্যে অনাদরে অবহেলায় একদা পঙ্কজা থেকে বাংলা থিয়েটারের রাজেশ্বরী হয়ে ওঠা বিনোদিনীর মৃত্যু হয় ১৯৪১এ । না কোন শোক সভা হয়েছিল কিনা, কোন সংবাদ পত্র প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল কিনা তাও জানা যায়না । 

তিন মায়ের গল্পের তৃতীয় যে মায়ের কথা বলব তিনি সুকুমারী ও বিনোদিনীর চেয়ে আরো চল্লিশ বছর পরে জন্মেছিলেন । এদের চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক প্রতিষ্ঠাও তিনি পেয়েছিলেন । কিন্তু নিষিদ্ধপল্লী রামবাগানের বাস ছেড়ে কোন সম্ভ্রান্ত অঞ্চলে চলে আসতে চাননি । বলতেন 'রামবাগান আমাকে যশ, খ্যাতি, অর্থ সব দিয়েছে । আমি রামবাগান ছেরে যাব কেন ? আমি রামবাগানের ইন্দু' । তিনি সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা যাকে চিত্র-মঞ্চ - যাত্রা-সাংস্কৃতিক জগতের শিল্পী_কলাকুশলীরা আজও 'ইন্দুমা' বলে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন ।

এই লেখার অন্য দুই মায়ের মত ইদুবালা পিতৃপরিচয়হীনা ছিলেন না, বরং পিতা ছিলেন নামকরা মানুষ । মায়ের নাম রাজবালা । রাজবালার মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা, স্বামীর অকালমৃত্যুর পরে অবস্থার বিপাকে এক ধনীর রক্ষিতার জীবন পান এবং আশ্রয় হয় রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীতে । মায়ের মৃত্যুর পরে অন্য দুই বোনের সঙ্গে রাজবালারও আশ্রয় হয় নিষিদ্ধপল্লীতে । নিতান্ত বালিকা রাজবালা নিষিদ্ধপল্লীর ভবিতব্য মানতে চাননি । সেখান থেকে মুক্তির জন্য সুযোগ পান সার্কাশের দলে যোগ দেবার । সাত বছরের বালিকা যোগ দেন প্রফেশর বোসের সার্কাশে । মালিক ছিলেন মতিলাল বোস – সেকালের প্রসিদ্ধ নাট্যকার মনমোহন বোসের পুত্র । ছবছর পরে মতিলাল বিবাহ করের রাজবালাকে । ইন্দুবালার জন্ম হয় অমৃতশরে ।

মতিলাল চেয়েছিলেন মেয়ে ইন্দুকে নিয়ে রাজবালা সার্কাশেই থাকুন আর রাজবালা চেয়েছিলেন কলকাতায় স্বামী কন্যাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে ।রাজবালা আর সার্কাশে ফিরে যাননি । তিনবছরের মেয়ে ইন্দুকে নিয়ে রামবাগানেই বাসা বাঁধেন । সেকালে থিয়েটার ছিল বারাঙ্গনা কন্যাদের মুক্তির আশ্রয় । রাজবালা থিয়েটারে যোগ দিলেন, খ্যাতিও পেলেন যথেষ্ঠ । 

রাজবালা ইন্দুর লেখাপড়ার আয়োজন করেছিলেন, তাকে ভর্তি করেছিলেন স্কুলে । কিন্তু মায়ের অসুস্থ্যতার কারনে ইন্দুর স্কুলশিক্ষায় ছেদ পড়ে । জনৈক সহৃদয় ব্যক্তির সহায়তায় ইন্দু নার্সিং ত্রেনিং নিতে শুরু করেন কলকাতা মেডিকেল কলেজে ।  কিন্তু সেখান থেকেও পালিয়ে আসেন । এরপর শুরু হল গান শেখা । ওস্তাদ গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে তালিম নিতে শুরু করলেন । সেকালের বিখ্যাত গায়িকা গহরজানের সান্নিধ্য লাভ করলেন । ক্রমে ইন্দু সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠা পেলেন । বিভিন্ন দেশীয় রাজার দরবারে দরবার গায়িকা রূপে ক্যাতি ও প্রতিপত্তি পেলেন ।

ইন্দুর সঙ্গীত প্রতিভাকে ব্যবহার করতে দেরি করেনি সেকালের বাংলা থিয়েটার ।সবকটি পেশাদারী থিয়েটার স্টার, মিনার্ভা মনমোহনে ইন্দু অভিনেত্রী ও গায়িকা রূপে খ্যাতি অর্জন করলেন ।এই সময়ে ইন্দু কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসেন । ইন্দুবালা থিয়েটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু গানেই ডুব দিলেন । ১৯১৬তে প্রথম গ্রামফোন রেকর্ডে গান করেন আর তারপরেই ক্রমে প্রবল জনপ্রিয়তায় হয়ে ওঠেন 'সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী' । একদিকে খেয়াল, দাদর্‌ ঠুমরি কিংবা ভজন, অন্যদিকে নজরুলের গান, ভক্তিগীতি, নাটক ও সিনেমার গান – ইন্দুবালার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হল । ১৯৭৫এ পেলেন সঙ্গীত নাটক আকাডেমি সম্মাননা, পরের বছর গ্রামফোন কোম্পানী তাঁর সম্মানে প্রকাশ করলো গোল্ডেন ডিস্ক । কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ আর তাঁর পদপ্রান্তে বসে উদবোধনী সঙ্গীত গেয়েছিলেন ইন্দুবালা । খ্যাতির শীর্ষ স্পর্শ করেও ইন্দুবালা কোনদিন মাটি থেকে পা সরিয়ে নেননি । দেশজোড়া খ্যাতি সত্তেও ইন্দুবালা রামবাগানের বাসা ছেড়ে যাননি । একদিকে দেশজোড়া খ্যাতির আলো আর অন্যদিকে রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার । এই দিয়ের মাঝে সুরের আকাশে উজ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন ইন্দুবালা – সকলের শ্রদ্ধার ইন্দু মা ।

সাহিত্যিক সমরেশ বসুর স্ত্রী গৌরী বসু, যিনি ইন্দুবালার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে তাঁর কাছে সঙ্গীতশিক্কা করকে, তাঁকে লেখা এক পত্রে ইন্দুবালা লিখেছিলেন " কেন আমি ভদ্র ঘর থেকে ইন্দুবালা হতে পারিনি । কিসের জন্য এই পল্লীর মেয়ে আমি ! জানো মা গৌরী । দুনিয়াসুদ্ধ সকলে বলে আপনি ভদ্র পল্লীতে যান, স্কুল করুন, আপনার জিনিস সব দান করুন, শেখান ইত্যাদি ইত্যাদি । তা কি হয় নাকি ? দিদিমা বনবিষ্ণুপুর থেকে এসেছিলেন, চাটুজ্জেবাড়ির মেয়ে মুখুজ্জেবাড়ির বৌ হয়ে । পরে বিধবা হয়ে এই পাড়ায় । তিন পুরুষের বাস কি ভাঙতে পারি ! পারবো না । কারণ ভগবান যে শাস্তি দিয়েছেন মাথা পেতে নিয়েছি...কিছু তো লুকুই নি মা ।... মানা অর্থাৎ প্রণব(ইন্দুমার পালিত পুত্র)সেও জানে যে তার জীবনে সে যখন অভিজাত পাড়ায় বাড়ি করবে তখন তার এই মা কোনদিন যাবে না "। এই রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীতেই সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী – সকলের ইন্দূমা'র মৃত্যু হয় ১৯৮৪র ৩০শে নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে ।

তিন মায়ের অন্ধকার থেকে লড়াই যেন একাকার হয়ে গেছে । এই লেখা শুধু তিন মায়ের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার কথা নয়, সেই সময়ের অনেক মায়ের কথাই ধরা আছে এই লেখায় ।

তথ্যসূত্র (১) 'রঙ্গালয়ে বঙ্গনটী'/ অমিত মৈত্র (২)'আমার কথা' / বিনোদিনী দাসী (৩) 'সুকুমারী দত্ত ও অপূর্বসতী নাটক' / সম্পাদনা বিজিতকুমার দত্ত, নাট্য আকাদেমি পত্রিকা, জানুয়ারি ১৯৯২ (৪)'ইন্দুবালা – স্মৃতি ও প্রণতি' / বাঁধন সেনগুপ্ত ।

 

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়


ফ্রাঙ্কেনস্টাইন !

“আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক
আমি চাইনা হতে নব বঙ্গে নবযুগের চালক”
আমি যে বিষয়টি নিয়ে শব্দ সাজাবো তাতে রবীন্দ্রনাথের ‘জন্মান্তর’ কবিতার এই প্রথম দুটি পঙক্তি সুপ্রযুক্ত এমন কথা না বললেও, কোথাওনা কোথাও এই পঙক্তি দুটির ভাবগত প্রাসঙ্গিকতা খুজতে চেষ্টা করেছি । মারণ বিজ্ঞানের ধ্বংশকামী অনুশীলন ও আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার ধ্বংসমুখী শক্তির বিরুদ্ধে মানব মনের অনন্ত মুক্তির সন্ধান পেতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । ধ্বংসকামী শক্তি কখনোই কাম্য ছিলনা তাঁর কাছে ।
একথা সত্য, জীব ও জড় জগতের তাবৎ সৃষ্টিই তার নিজের মধ্যে নিজের ধ্বংসের বীজ বহন করে চলে। কিন্তু তা প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের সূত্র মেনে । সেই সূত্রকে অস্বীকার করে বিজ্ঞানের সৃষ্টিও ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর হতে পারে মানব ইতিহাসে তার অজস্র নজির রয়েছে । বিজ্ঞানী ওপেনহিমার কি জানতেননা তাঁর আবিষ্কৃত এটম বোমা হিরোশিমা, নাগাসাকি শহর দুটিকে ধ্বংস করে কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করবে, মানব সমাজের কি বিপর্যয় ঘটাবে ! তবুও অপেনহিমার ভগবৎ গীতার উদ্ধৃতি উচ্চারণ করে সদম্ভে বলেছিলান “মনে হচ্ছে আমিই মৃত্যু, বিশ্বের ধ্বংসকর্তা” ।
আধুনিক বিজ্ঞান নাকি মানুষের প্রতিরূপ ‘ক্লোন’ সৃষ্টি করতে সক্ষম । ১৯৬০এর দশক থেকে এরকম প্রয়াস শুরু হয়েছিল । নোবেল জয়ী জসুয়া লিডারবার্গ প্রথম ১৯৬৬তে তাঁর একটি লেখায় ‘ক্লোন’ সৃষ্টির পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিলেন । জন্ম – মৃত্যুর চিরন্তন সূত্রকে অস্বীকার করে মানুষের প্রতিরূপ সৃষ্টি হলে  কি ব্যাপক সামাজিক বিপর্যয় ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক চলে । অবশেষে ২০০১এ রাষ্ট্রসঙ্ঘ সব ধরণের মানব প্রতিরূপ বা ‘হিউম্যান ক্লোনিং’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার আহ্বান জানায় তার সদস্য দেশগুলির কাছে । অস্ট্রেলিয়া , কানাডা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি , বৃটিশ যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানান প্রদেশ এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে । আর মুসলিম রাষ্ট্রগুলিতো ‘খোদার ওপর খোদকারি’র এই প্রয়াসের বিরুদ্ধে ফতোয়াই জারি করেছিল । জন্ম-মৃত্যুর জাগতিক সূত্রকে জীবন সৃষ্টির প্রয়াস কি বিপর্যয়কর হতে পারে এমনকি তার স্রষ্টার কাছেও তা আজ থেকে দুশ’ বছর আগেই জেনেছিলাম মেরি শেলীর উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’এ । হ্যাঁ বাংলা উচ্চারণ এটাই হওয়া উচিত (Frankenstein) ।
‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ -- এই নামটা প্রায় দুশ’ বছর যাবত প্রায় প্রবাদের মত এক ভয়ংকর কল্প-বস্তু হয়ে আছে যে তার সৃষ্টিকর্তাকেও রেয়াত করেনি । আমরা প্রবাদের মত বলি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ সৃষ্টি করেছ, সে তোমাকেও রেয়াত করবেনা’ । আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে ভয়াল ভয়ংকর ধ্বংসকামী এক বিকট মূর্তি । না , সেই বিকট মূর্তি কিন্তু ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নয় , তার সৃষ্টিকর্তার নাম ফ্রাঙ্কেনস্টিন – ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টিন । সেই নামেই মেরি শেলী তাঁর এই সাড়া জাগানো উপন্যাসের নামকরণ করেছিলেন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন অর মডার্ন প্রমিথিউস’ । বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে মানুষের প্রতিরূপ - সেই ভয়াল সৃষ্টির জনক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টিন কে কেন লেখিকা গ্রীক পুরানের বীর নায়ক প্রমিথিউস এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন জানিনা । গ্রীক পুরানের কাহিনি , প্রমিথিউস দেবলোক থেকে আগুন চুরি করে এনেছিলেন মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে । মানব অস্তিত্বের অগ্রদূত হিসাবেই প্রমিথিউস পূজ্য । দেবলোক থেকে আগুন চুরি করার জন্য প্রমিথিউসকে শাস্তি দিয়েছিলেন সম্রাট জিউ,একটা প্রস্তরখন্ডের সঙ্গে তাকে বেঁধে রেখেছিলেন তার দেহাংশ, শকুনের ভক্ষ্য রূপে । গ্রীকবীর হারকিউলিস অমরত্ব অর্জন করা প্রমিথিউসকে মুক্ত করেছিলেন । লেখিকা মেরি শেলি তাঁর উপন্যাসের নায়ক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টিনকে আধুনিক প্রমিথিউস মনে করেছিলেন, হয়তোবা রীতিবিরুদ্ধ বা নিষিদ্ধ বিজ্ঞান সাধনার জন্য, যেমন নরলোকে নিষিদ্ধ আগুন প্রমিথিউস চুরি করেছিলেন দেবলোক থেকে যার দন্ডও তিনি ভোগ করেছিলেন । প্রমিথিউস অমরত্ব অর্জন করেছিলেন আর মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’ নামটি প্রায় দুশ বছর ধরে অমর হয়ে আছে প্রবাদের মত, হয়তো থাকবেও আরো অনেকদিন ।
মেরি শেলি তার এই প্রবাদ প্রতীম উপন্যাসটি লিখেছিলেন ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে - যখন তাঁর বয়স ১৮ বছর , শেষ করেছিলেন ২১ বছর বয়সে, অর্থাৎ তিনবছর লেগেছিল উপন্যাসটি লিখতে । লর্ড বায়রন, পি বি শেলী, জন কীটস’এর সমসাময়িক মেরি শেলী ইংরাজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের লেখিকা । আমাদের দেশে তখন গদ্য সাহিত্যের জন্মই হয়নি । সবেমাত্র শ্রীরামপুর মিশনারীরা রামরামবসু প্রমুখদের দিয়ে কিছু পন্ডিতি বাংলা লেখা শুরু করেছেন, প্রকাশিত হয়েছে ‘সংবাদ কৌমুদি’ ইত্যাদি সংবাদপত্র । ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ছদ্মনামে লন্ডন থেকে । ১৮২৩এ ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত ২য় সংস্করণ থেকে লেখিকা মেরি শেলীর নাম জানা যায় । উপন্যাসটিকে বলা হয় একাধারে গথিক উপন্যাস এবং বিজ্ঞান কাহিনি বা সায়ান্স ফিকশন’, আবার রোমাঞ্চ কাহিনি বা ‘হরর স্টোরি’ ও বটে । বস্তুত মেরি শেলীর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’ বিশ্বের প্রথম সার্থক সায়ান্স ফিকশন রূপেই খ্যাত । এরপরে যুগে যুগে অনেক রোমাঞ্চ কাহিনি লেখা হয়েছে  সেগুলির চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে- কিন্তু কোনটাই ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’এর মত প্রবাদ-প্রতীম হয়ে ওঠেনি ।
উপন্যাসটি আত্মকথনের ভঙ্গিতে লেখা । উত্তর মেরু অভিযানকারী জাহাজের ক্যাপ্টেন রবার্ট ওয়ালটন তার বোন মার্গারেটকে চিঠিতে তার অভিজ্ঞতা জানাচ্ছেন, এভাবেই শুরু হয়েছে কাহিনি । ক্যাপ্টেন ওয়ালটন ছিলেন এক ব্যর্থ লেখক , বাসনা ছিল উত্তর মেরু অভিযানের মধ্যদিয়ে জানবেন বিজ্ঞানের রহস্য আর তা দিয়ে তিনিও বিখ্যাত হয়ে যাবেন ।
ওয়ালটনের জাহাজের কর্মীরা এক অতিকায় মানবকে একটি কুকুরকে নির্দয় ভাবে হত্যা করতে দেখেন , কয়েক ঘন্টা পরে তারা এক বিধ্বস্ত, মৃতপ্রায় লোককে উদ্ধার করে , তিনিই বিজ্ঞানী ভিকটর ফ্রাঙ্কেনস্টিন – ঐ অতিমানবের সৃষ্টিকর্তা । সুস্থ হবার পর ভিক্টর তার কাহিনী বলতে থাকেন । বলেন কিভাবে বিজ্ঞানের উচ্চাশা ও রীতিবিরুদ্ধ চর্চা যার ফলশ্রুতি এক অতিমানবের সৃষ্টি এবং সে তার জীবনে কি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল, সেই রোমাঞ্চকর কথা ।
প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের প্রথাগত বিজ্ঞানসম্মত সূত্রগুলি বোধয় ভিক্টরকে ক্লান্ত করেছিল । ভিক্টর আয়ত্ত করেছিলেন মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করার বিদ্যা । ল্যাবরেটরিতে মৃত মানুষের ও পশুর দেহাবশেষ দিয়ে জীবন সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন । ভিক্টর চেয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টি হবে সুন্দর , কিন্তু হ’ল ৮ফুট দৈর্ঘের , হলুদবর্ণ চোখের এক ভয়াল সৃষ্টি । ভিক্টর তার নিজের সৃষ্টিকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেলেন । সৃষ্টি করলেন বটে কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কায়দা তার আয়ত্তে ছিলনা । সে সৃষ্টির পরমুহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়, আতঙ্কিত ভিক্টরকে প্রতি মুহুর্তে তাড়া করে চলে , ভিক্টর গৃহত্যাগ করেন । মাস চারেক পরে ফিসে এসে দেখেন তার ছোটভাই উইলিয়াম খুণ হয়েছেন। উইলিয়ামের গলার লকেটটি পাওয়া যায় তার দিদিমা জাষ্টিনের পকেটে , দিদিমার ফাঁসি হয় । ভিক্টর ঘটনাস্থলে তার সৃষ্ট অতমানবটিকে দেখতে পান এবং নিশ্চিত হন যে সেইই প্রতিশোধ স্পৃহায় এই হত্যা ঘটিয়েছে, উইলিয়ামের লকেটটি তার দিদিমার পকেটে চালান করে তাঁরও মৃত্যুর কারণ হয়েছে । ভিকটর বিবাহ করেন তাঁর প্রেমিক এলিজাবেথকে , সেইদিনই এলিজাবের খুন হয়ে যান, ভিকটরের সেই ভয়াল সৃষ্টির হাতে । নির্মম প্রতিশোধ স্পৃহায় ভিক্টর সৃষ্ট দানবটি একে একে হত্যা করে তার সৃষ্টি কর্তার ভাই , উইলিয়াম, বন্ধু ক্লেভারেল, ও প্রেমিকা এলিজাবেথকে ।
ভিক্টর সৃষ্ট দানবটি তার সৃষ্টিকর্তার কাছে অবশেষে দাবী করে ভিকটর যেন তার মতই তার এক প্রেমিকা সঙ্গি সৃষ্টি করে দেন , কেননা তারও জৈবিক সুখের অধিকার আছে । তাহলে সে তার সঙ্গিকে নিয়ে জনমানব হীন কোন স্থানে চলে যাবে । পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভিক্টর সম্মত হয় । কাজটা করার জন্য চলে যায় ইংল্যান্ডে । সেখানেও হাজির হয় দানবটি , সে ভিক্টরের প্রতিমুহুর্তের গতিবিধি লক্ষ্য করে চলে । ভিক্টর সেই দানবের প্রেমিকা সৃষ্টির কাজ শুরু করেন । কিন্তু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভিক্টর উপলব্ধি করেন তাঁর এই দ্বিতীয় সৃষ্টি আরো কি ভয়ঙ্কর সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্ট করতে পারে । যদি তারা প্রজনন ক্ষমতার অধিকারী হন তবে হয়তোবা এক ভয়াল ভয়ঙ্কর অতিমানবের জাতি সৃষ্টি হয়ে যাবে যা সমগ্র মানব সভ্যতারই সংকট ডেকে আনবে । ভিক্টর তার অসমাপ্ত সৃষ্টিটি ধ্বংস করে দেন । ভিক্টর পালিয়ে যান । কিন্তু যাবেন কোথায় ? তারই সৃষ্ট দানব প্রতি মুহুর্তে তার পিছু পিছু থাকছে । অবশেষে ক্যাপ্টেন ওয়ালটন আন্টারটিকায় বিধ্বস্ত , মৃতপ্রায়  ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টেইনকে উদ্ধার করেন । উপন্যাসের শেষটা বড় করুণ – ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টেইনের মৃত্যু হয়েছে । ক্যাপ্টেন ওয়ানটন দেখলেন ভিকটরের সৃষ্ট সেই দানব তার সৃষ্টিকর্তার মৃত দেহের সামনে শোকার্ত অনুতপ্ত । নিজেই নিজেকে ধ্বংশ করতে উদ্যত, কারণ সে বুঝেছিল তার সৃষ্টিকর্তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার অস্তিত্বও অর্থহীন । ক্যাপ্টেন ওয়ানটন দেখলেন আন্টার্টিকার বরফের স্তুপের মধ্যে বিলিন হয়ে গেলো, মিলিয়ে গেলো গভীর অন্ধকারে ।
একটি সমাজ ছাড়া সৃষ্টি - দুশ’ বছর ধরে তাবৎ বিশ্বের মানুষের কাছে প্রবাদের মত হয়ে আছে । চলচ্চিত্র ও নাট্যাভিনয়ের মধ্যদিয়ে চিরস্থায়ী হয়ে আছে । রোমাঞ্চকর কাহিনি বা হরর ফিকশন বিশ্বসাহিত্যে কম নেই । ব্রাম স্ট্রোকারের ‘ড্রাকুলা’ , কোনান ডয়েলের ‘হাউন্ড অফ বাস্কার ভিল’ , ভ্যাম্পায়ার’ হিচককের ‘সাইকো’ এই রকম অজস্র রোমহর্ষক চলচ্চিত্র আমরা দেখেছি, কিন্তু তার কোনটাই ফ্রাঙ্কেনস্টিনের মত এমন স্থায়ী প্রভাব ফেলেনি । মজার কথা কাহিনির নাট্যায়ন বা চলচ্চিত্রায়ন দেখে যতটা আতঙ্কিত হই উপন্যাসটি পড়লে ততটা হইনা । কারণ চলচ্চিত্রে নানা ডালপালা যুক্ত হয়, প্রযুক্তির ব্যবহারে আতঙ্কের দৃশ্যায়ন করা হয় । ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’এর প্রবাদ প্রতীম হয়ে যাওয়ার সেটাই মুখ্য কারণ ।
আমাদের জানা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কি আদৌ ‘ধ্বংশকামী’ অতিমানবীয় সৃষ্টি ছিল ? উত্তর হ্যাঁ এবং নাও বটে । সে তো তার চারপাশের সমাজ সংসারকে ধ্বংশ করতে চায়নি । সেও এই সমাজেই বাস করতে চেয়েছিল । এমনকি সে বলেছিল তার সৃষ্টিকর্তাকে তারই মত এক সঙ্গিকে সৃষ্টি করতে যাকে নিয়ে সে মানব বহির্ভূত কোন স্থানে চলে যাবে । একটা প্রতিশোধ স্পৃহা তার ছিল, তা ছিল তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি – তাকে সকলে ভয় পাবে তার অতিমানবীয় ভয়াল ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে – এমন সমাজ ছাড়া সৃষ্টির জন্য । তার জিজ্ঞাসা ছিল ভিক্টর যদি তাকে সৃষ্টিই করলেন তাহলে সে জাগতিক সুখ থেকে বঞ্চিত হল কেন ?
কাহিনি থেকে জেনে যাই, ভয়াল অতিমানবটির স্রষ্টা ভিক্টর ছেলেবেলা থেকেই রীতি বিরুদ্ধ বিজ্ঞান চর্চায় আকৃষ্ট ছিল, অশ্রদ্ধা ছিল প্রচলিত মূল্যবোধগুলির প্রতি । তার সমাজ ছাড়া সৃষ্টিটিরও তাই সমাজের প্রতি, তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি একটা প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নিয়েছিল তার সৃষ্টির পরমুহুর্ত থেকেই । তবুও সে তার সৃষ্টিকর্তার মৃতদেহের সামনে এসে শোকানুতপ্ত হয়েছিল এবং নিজেকেই ধ্বংশ করেছিল ।  এই মনস্তাত্বিক প্রশ্নে কোন কোন সমালোচক উপন্যাসটির লেখিকা মেরি শেলীর ব্যক্তিজীবনের অপূর্ণতার  প্রতিফলন দেখতে চেয়েছেন  । লেখিকা মেরি শেলী তার জন্মের এগারো দিনের মাথায় তাঁর মাকে হারান, তার চার বছর বয়সে পিতা গডউইন পুণর্বিবাহ করেন । সতেরো বছর বয়সে মেরি তার পিতৃবন্ধু বিবাহিত পার্শি শেলীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়েন । পরের দুবছর তাদের জীবনে নানান বিপর্যয় , ঋণগ্রস্ততা, শিশু সন্তানের মৃত্যু ইত্যাদির পর পার্শিকে বিবাহ করেন , তা্র ব্যক্তিজীবনে কিছুটা স্থিরতা আসে । লেখা শুরু করেন সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টিন’,  কিন্তু ছদ্মনামে । ১৯২৩এ স্বনামে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের আগে ১৮২২এ মেরির স্বামী পার্শি শেলির মৃত্যু হয় জলে ডুবে ।
এই অভূতপূর্ব সৃষ্টিতে মেরি শেলীর ব্যক্তিজীবনের অপূর্ণতার ছায়াপাত ঘটেছে কিনা তা আমার আলোচ্য নয় । আমি বুঝতে চেয়েছি, দুশ’বছর আগে, কি অসামান্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে মেরি শেলী তার প্রবাদপ্রতীম উপন্যাস ‘ ফ্রাঙ্কেনস্টিন’এ শিল্পবিপ্লব পরবর্তী বিশ্বকে বিজ্ঞানের অপব্যবহার সম্পর্কে সাবধান বার্তা দিয়েছিলেন । এই অনুষঙ্গেই এটম বোমার আবিষ্কর্তা বিজ্ঞানী ওপেন হিমারের প্রসঙ্গ এনেছিলাম, কোথাও যেন ধ্বংশকামী ‘ফ্রাঙ্কেন্সটিন’ আর ওপেন হিমারের দম্ভোক্তি একাকার হয়ে যায় ।  ‘ফ্রাঙ্কেন্সটিন’ নিশ্চিত ভাবেই দুশ’ বছর আগের এক সাবধান বার্তা, যে প্রাকৃতিক ও জীবজতের দ্বান্দ্বিক সূত্রকে অস্বীকার করে বিজ্ঞানের যে অনুশীলন তা অপবিজ্ঞান এবং সেই অপবিজ্ঞান সৃষ্ট নিয়ন্ত্রণ হীন কোন কিছুই মানব সভ্যতার পক্ষে শুভ হতে পারেনা, সে তার সৃষ্টিকর্তাকেও রেয়াত করেনা । তাহলে কে সেই ভয়াল দানব ? আমাদের জানা মেরি শেলীর কল্প-চরিত্র অতিমানবটি  নাকি তার উপন্যাসের নায়ক ব্যর্থ বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টিন ?

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়




বাংলা সিনেমার কমেডিয়ানরা





                বাঙালির জীবন থেকে নির্মল হাসি কবেই চলে গেছে । একটা সময় ছিল যখন চলচ্চিত্র, নাটক, রেডিও, কিংবা সাহিত্যে হাস্য-কৌতুকের উপস্থিতি ছিল মর্যাদাময় । গানের জলসাতে হাস্য-কৌতুকের অনুষ্ঠান থাকতোই । অনেক কিছুর মতই বাঙালির সমাজজীবন থেকে নির্মল হাস্যকৌতুকও হারিয়ে গেছে । বাংলা চলচ্চিত্র ও পেশাদারী মঞ্চের নাটকে নবদ্বীপ হালদার, তুলসী চক্রবর্তী, শ্যাম লাহা, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, হরিধন মুখোপাধ্যায়, শীতল বন্দ্যোপাধ্যায়,অজিত চট্টোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, জহর রায়, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত প্রমুখ – এক দীর্ঘ তালিকা আর হাসির গানে রঞ্জিৎ রায়, মিন্টু দাসগুপ্ত, দীপেন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ কত নাম ।  
                এখন বাংলা সিনেমায় কৌতুক অভিনয় থাকে না, হাসির সিনেমা তো দূরের কথা । পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত বাংলা সিনেমায় কৌতুকাভিনেতারা সিনেমার প্রযোজক-পরিচালকদের কাছে গুরুত্ব পেতেন আর সিনেমার দর্শকরা পেতেন নির্মল আনন্দ । গত শতকের পঞ্চাশ থেকে আশির দশক এই সময়কালকে বলি বাংলা ছায়াছবির স্বর্ণযুগ । তখনকার সিনেমার নির্মাণে পরিচালকদের একটা রসায়ন ছিল বাঙালির আটপৌরে জীবনের হাসিকান্নার গল্প, ভালো অভিনয়, আর মন আন্দোলিত করা সঙ্গীত । ‘ভালো অভিনয়’এই ধারণার মধ্যে কৌতুকাভিনয়ও ধরতে হবে । কান্না ও কান্নায় চাপা পড়া হাসি ভিন্ন জীবনই অসম্পূর্ণ । কৌতুক অভিনয় করেই চার্লি চ্যাপলিন বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা । তাঁর সিনেমা শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী সিনেমাও ।
                বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের পিতৃপুরুষের মর্যাদা পান ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (বা ডি জি) । বাংলা ছায়াছবির পথচলা শুরু হয় ১৯১৯এর ১৯শে নভেম্বর কর্নওয়ালিশ থিয়েটারে (পরে যেটির নাম হয়েছিল ‘শ্রী’) ‘বিল্বমঙ্গল’ ছবির মুক্তির মধ্য দিয়ে । বিল্বমঙ্গলের নির্মাতা ছিল ম্যাডান কোম্পানী, পরিচালক রুস্তমজি ধোতিওয়ালা আর অভিনেতৃরা ছিলেন এংলোইন্ডিয়ান (নির্বাক চলচ্চিত্র যুগে এংলো ইনডিয়ানরা নায়িকার ভূমিকায় থাকতেন ) । এর দু বছর পরে ধীরেন্দ্রনাথের উদ্যোগে নির্মিত হল কমেডি ছবি ‘বিলাৎ ফেরত’ মুখ্য ভূমিকায় ধীরেন্দ্রনাথ । সেদিনের ইংরাজি নবিশ বাঙালি বাবুদের দেশীয় মানুষদের প্রতি ঘৃণা ও ইংরাজ প্রীতির প্রতি তীব্র ব্যঙ্গ ছিল এ ছবির কাহিনীসার । চার্লি চ্যাপলিনের অভিনয় ধারা অনুসরণ করতেন ধীরেন্দ্র নাথ । অর্থাৎ আমরা দেখলাম সম্পূর্ণ বাঙালি উদ্যোগে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রটিই ছিল কৌতুক-ব্যঙ্গরসাত্মক সিনেমা । বাংলা সিনেমা কথা বলতে শুরু করলো ১৯৩১এ অর্থাৎ স্ববাক হল । প্রমথেশ বড়ুয়া ১৯৩৯এ নির্মাণ করলেন একটি কমেডি ছবি ‘রজত জয়ন্তী’ । চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে বড়ুয়ার ‘রজতজয়ন্তী’ ছিল সেরা কমেডি ছবি ।
                চল্লিশের দশকটা বাংলার সমাজ জীবনে সুখের সময় ছিল না । ১৯৪৩এর মন্বন্তরে মৃত্যুর হাহাকার, ‘৪৬এর ভাতৃঘাতি দাঙ্গা আর ১৯৪৭এ দেশভাগ, ভিটেহারা উদবাস্তু স্রোত, সিনেমার পক্ষে অনুকুল সময় ছিল না । বাংলা ছবির বাজার দুই তৃতিয়াংশ সঙ্কুচিত হয়ে গেলো দেশভাগের ফলে । তবু, ‘কত রঙ্গ বঙ্গদেশে তবু রঙ্গে ভরা’ । ১৯৫০/৫২র মধ্যে উঠে এসেছিলেন এক ঝাঁক কৌতুকাভিনেতা – তুলসী চক্রবর্তী, হরিধন মুখোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, নবদ্বীপ হালদার, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, অজিত চট্টোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা প্রমুখ ।  
                ১৯৫১তে মুক্তি পেল রস-সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে সম্পূর্ণ হাসির ছবি ‘বরযাত্রী’ । এটিই সম্ভবত স্বাধীনতার পরে নির্মিত প্রথম হাসির সিনেমা । অভিনয় করেছিলেন কালি বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত চট্টোপাধ্যায়, অনুপকুমার, জহর রায় প্রমুখ,। ‘বরযাত্রী’র পর ১৯৫৩তে পেলাম হাসির ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ । বলা যায় সাড়ে চুয়াত্তর বাংলা কমেডি ছবির ধারা নির্দেশ করে দিল । এই ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সংলাপ ‘মাসিমা মালপো খামু’ প্রবাদের মত হয়ে গেল । তারপর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে অনেক কমেডি ছবি নির্মিত হল । ‘পাশের বাড়ি’ (১৯৫২), ‘ওরা থাকে ওধারে’ (১৯৫৪), ‘টনসিল’(১৯৫৬), ভানু পেল লটারি’ (১৯৫৮), ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ (১৯৫৮) ‘পার্সোনাল এসিসট্যান্ট’ (১০৫৯), ভ্রান্তি বিলাস’ (১৯৬৩), ভানু গোয়েন্দা জহর এসিসট্যান্ট (১৯৭১) । তখন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়া কমেডি ছবি বা সাধারণ সিনেমায় কমেডি অভিনয় ভাবা যেতো না । এমনই অপরিহার্য ছিলেন বাংলা সিনেমার সেরা কমেডিয়ান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ।
                আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ের এক শূন্যতা এল । তুলসী চক্রবর্তী চলে গেছেন অনেক আগেই ডিসেম্বর ১৯৬১তে, নৃপতি চট্টোপাধ্যায় মে ১৯৭৫এ জহর রায় অগস্ট ৭৭এ । একএকে চলে গেলেন অনুপকুমার ( সেপ্টেম্বর ৮৮), সন্তোষ দত্ত (ফেব্রুয়ারি ৮৮) আর রবি ঘোষ (ফেব্রুয়ারি ৯৭) । নব্বইএর শেষ পৌঁছে বাংলা সিনেমা হয়ে পড়লো কমেডি অভিনয় হীন । নবীন অভিনেতা অনেক এলেন বটে কিন্তু তারা কেউই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্তদের উচ্চতা ছুঁতে পারলেন না । আমরা জানি কমেডিয়ানরা শুধুমাত্র কৌতুকাভিনেতা নন, ভালো অভিনেতা । আর কে না জানি যে বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন শ্রেষ্ঠ কমেডিয়ানও বটে । বাংলা সিনেমার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, তুলসী চক্রবর্তী, অনুপকুমার, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্তরা কমেডিয়ান হয়েও উচ্চমানের চরিত্রাভিনেতার মর্যাদা পেয়েছেন ।
                পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গ থেকে ভিটামাটি ছেড়ে আসা বাঙালিরা কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে খুব অভিপ্রেত ছিলেন না তাদের ভাষাকে ভাঁড়ামির উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হত গল্প, উপন্যাস, থিয়েটা্‌ সিনেমায় । ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এই আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ে এক নতুন মাত্রা নিয়ে এলেন, সৃষ্টি করলেন কমেডি অভিনয়ের একটা টাইপ । অথচ এই টাইপের বাইরে গিয়ে অসামান্য অভিনয় করেছিলেন ‘জমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ‘ভানু গোযেন্দা জহর এসিসট্যান্ট’, ‘ভ্রান্তি বিলাস’, ‘পার্সোনাল এসিসট্যান্ট’ ছায়াছবিতে । কমেডি অভিনয়ে ভানু যে টাইপ সৃষ্টি করেছিলেন সেটি পরবর্তীকালে আর কেউ ছুঁতে পারলেন না । সিনেমা থিয়েটারের কমেডিয়ানদের একটা বেদনা, একটা উপেক্ষার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন । অনাবিল হাসি বিলোচ্ছেন যারা সেই আনন্দের পেছনে তাদের চাপা কান্নার কথা তারা দর্শকরা বুঝতে পারেন না। সে সব কান্নার কিছু বৃত্তান্ত রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’ কিংবা গৌতম ঘোষের ‘বাঘ বাহাদুর’ ছবিতে দেখেছি । কমেডিয়ানের জীবনের বেদনা নিয়ে ভানু ব্যানার্জীকে প্রধান চরিত্রে নিয়ে একটি ছবি হয়েছিল ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’ । সিনেমায় আসার আগে ভানু থিয়েটারে চন্দ্রগুপ্ত নাটকে চানক্যের মত কঠিন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন । অথচ সিনেমায় তিনি কমেডিয়ান হয়েই রইলেন । চরিত্রাভিনেতা হিসাবে তাঁর মূল্যায়ন হয়নি । সত্যজিৎ রায় ‘পরশ পাথর’ সিনেমায় তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় প্রতিভার ব্যবহার করেছিলেন, ‘পলাতক’ ছবিতে তরুণ মজুমদার অনুপকুমারের অবিস্মরণীয় অভিনয় প্রতিভার মর্যাদা দিয়েছিলেন তাঁকে প্রধান চরিত্রে নির্বাচিত করে । ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এটুকুই প্রাপ্তি যে তিনি বাংলা সিনেমায় এতাবৎ কালের সেরা কমেডিয়ান । চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদ ও গবেষক স্বপন কুমার ঘোষের একটা লেখা থেকে উধৃতি দিই – “ ‘লাইমলাইট’ দেখে বাড়িতে এসে কেঁদেছিলেন ভানুদা। স্বগতোক্তির মতো করে সেদিন তাঁর স্বজনদের তিনি বলেছিলেন, ‘‘মইর্যা গেলেও লোকে বিশ্বাস করব না, কইব আমি হ্যালারে হাসাইতাছি। আমাগো দেশে এইটাই ট্র্যাজেডি, কমেডিয়ানরে লোকে ভাঁড় ভাবে” । কৈশোরে স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া শহিদ বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তর বাল্যবন্ধূ ভানু (প্রকৃত নাম সাম্যময়) তাঁর ৩৭ বছরের সিনেমা জীবনে অভিনয় করেছেন ২৩৫টি চলচ্চিত্রে । তাঁর নিজের কথায় ‘‘বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যা কিছু সমাজের, সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, আমি দরকার মতো, সাধ্য মতো তার বিরুদ্ধে মানুষকে খোঁচা দিয়ে জাগানোর জন্য নাটক, সিনেমা করে যেতে চাই— তা সে ব্যঙ্গ বা সিরিয়াস, যা কিছু হোক না কেন। এটাই আমার কমিটমেন্টের শেষ কথা” ।
                ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা এলেই অবধারিতভাবে এসে যায় জহর রায়ের কথা, দুজনে যেন মাণিকজোড়, একই ব্রাকেটে দুটি নাম ভানু-জহর । চার্লি চ্যাপলিনকে গুরু মেনেছিলেন ভানুর চেয়ে এক বছর আগে সিনেমায় আসা জহর রায় । ভানুর প্রথম ছবি ১৯৪৭এ আর জহরের ১৯৪৬এ ।  ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন তিন কৃতি চিত্র পরিচালকের ছবিতেই জহর অভিনয় করেছেন । কমেডি অভিনয়ে জহর রাহের প্রধান অস্ত্র ছিল শরীরি অভিনয় ।  চিত্র পরিচালক তরুণ মজুমদার মত প্রকাশ করেছিলেন “ওঁর গায়ে কমেডিয়ানের তকমা জুড়ে দেওয়া অনুচিত।’’ ঋত্বিক ঘটকের সূবর্ণরেখায় ফোরম্যান মুখার্জী, সত্যজিতের হাল্লারাজার মন্ত্রী, তরুণ মজুমদারের ‘পলাতকএ সেই যাত্রাপাগল কবিরাজ চরিত্রাভিনেতা হিসাবে ভোলা যায় না জহর রায় কে । থিয়েটারেও তিনি অভিনয় দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন । কলকাতার রংমহল থিয়েটার যখন মালিক বন্ধ করে দিয়েছিল তখন তিনি উদ্যোগ নিয়ে রঙমহল শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে থিয়েটার চালিয়ে গিয়েছিলেন । শুধু কমেডিতে আটকে না থেকে সিনেমায় এবং থিয়েটারেও নতুন নতুন চরিত্রে রূপায়ন করতেন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেতা জহর রায় । তবু জহর রায়ের গায়ে কমেডিয়ানের তকমাই লেগে আছে । কোন অভিনেতাই নিজের গায়ে লেগে থাকা কমেডিয়ানের তকমা ভাংতে পারেন না, জহর রায়ও পারেননি । ‘দেহপট সনে নট সকলি হারায়’ ১৯৭৪এ শরীর ভাংতে শুরু করল । অমন গোলগাল শরীর ভেঙে যেন কঙ্কাল । সিনেমায় কাজ পাওয়া বন্ধ হল । ১৯৭৭এর ১১ই অগস্ট,  ৩২ বছর ধরে সিনেমা-থিয়েটারের দর্শককে নির্মল আনন্দ বিলানো জহর রায়ের মৃতদেহের পাশে শুধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর পাড়ার কিছু ছেলে । ভেঙ্গে পড়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘জহরের কি দেশের কাছে এইটুকুই পাওনা ছিল সৌমিত্র? অন্য দেশ হলে স্যার উপাধি পেত।’ ভানু-জহর ব্রাকেট ভেঙে জহর চলে গেলেন, ব্রাকেটের অপর জন ভানু গেলেন আরো ছ বছর পরে ।
                বাংলা সিনেমা কথা বলতে শুরু করেছিল অর্থাৎ স্ববাক হয়েছিল ১৯৩১এ । ১৯৩২এও ১০টি নির্বাক ছবি নির্মিত হয়েছিল । ১৮৩৩এ একটিও নয় অর্থাৎ ১৯৩৩ থেকে পুরোপুরি স্ববাক চলচ্চিত্রের যুগ । বাংলা সিনেমার আদিপর্বে বা প্রথম দশকে কমেডিয়ান বলতে ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী , নবদ্বীপ হালদার, শ্যাম লাহা আর নৃপতি চট্টোপাধ্যায় । হলিউডি কমেডি জুটির অনুকরণে বাংলা সিনেমাতেও নবদ্বীপ হালদার- শ্যাম লাহা জুটি বেঁধেছিলেন । দুজনকে নিয়ে ‘মাণিকজোড়’ নামে একটা সিনেমাও হয়েছিল । শ্যাম লাহা গান গাইতে পারতেন, পারতেন তবলা বাজাতে । লখনৌতে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানে পাহড়ি সান্যালের গানের সঙ্গে তবলা বাজিয়েছিলেন । পাহাড়ি সান্যাল শ্যামকে সিনেমায় নামতে বলেন এবং প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন । বাংলা সিনেমায় শ্যাম লাহা এলেন ১৯৩৪এ । হিন্দিতে কথা বলতে জানা ও চেহারার গুনে বোকা বোকা অবাঙালি চরিত্র, মারোয়ারি ব্যবসায়ী, বড়বাজারের গদির মালিক ইত্যাদি চরিত্রে অভিনয় করার জন্য শ্যাম লাহার ডাক পড়তো । নবদ্বীপ হালদারের প্রসিদ্ধি ছিলবিকৃত কন্ঠস্বর ও গ্রাম্য ভাষায় সংলাপ উচ্চারণ । গ্রামফোন রেকর্ডে দুজনের বেশ কয়েকটি কৌতুক নক্সা তখন জনপ্রিয় হয়েছিল ।

                খুবই শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন নৃপতি চট্টোপাধ্যায় । লোক হাসানোর জন্য কোন রকম ভাঁড়ামির আশ্রয় নিতেন না । অঙ্গভঙ্গি ও বাচনভঙ্গিতে এক স্বাতন্ত্র নিয়ে এসেছিলেন তিনি । ১৯৩৬এ প্রথম ছবি ‘দ্বীপান্তর’ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অকৃতদার নৃপটি চট্টোপাধ্যায় । কোন বড়  বা প্রচারের আলো পড়ার মত চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ তিনি পাননি তাঁর প্রায় চল্লিশ বছরের সিনেমা জীবনে, তবু যেটুকু সুযোগ পেয়েছিলেন তাতেই তিনি বাংলা সিনিমার কমেডি অভিনয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন । ১৯৪৩এ সিনেমায় এলেন হরিধন মুখোপাধ্যায় । তার বছর পাঁচেক আগেই নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ির দলে নাট্যাভিনয় শুরু করেছিলেন । বিচিত্র জীবন ছিল তাঁর । হাতিবাগান বাজারে আলু বিক্রি করেছেন, মনিহারি দোকান দিয়েছেন, স্যার আশুতোষ আর ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়েছেন । এহেন হরিধন বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ে যেন নতুন সংজ্ঞা নির্দেশ করে দিলেন । ছন্দময় সংলাপ উচ্চারণ ও বাচিক অভিনয়ে একটা নিজস্বতা বজায় রাখতেন তিনি ।
                শক্তিশালী অভিনেতা অনুপকুমারের গায়েও কমেডিয়ানের তকমা লেগে আছে । অথচ  কমেডি অভিনয়ের বাইরেও নায়ক ও খল চরিত্রেও সফল তিনি । তরুণ মজুমদারের ‘পলাতক’ (১৯৬৩)এ নায়কের ভূমিকায় অনুপের অবিস্মরণীয় অভিনয় তাঁকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান এনে দিয়েছিল । ১৯৬৫তে তরুণ মজুমদারের ‘আলোর পিপাসা’ ছবিতে তাকে খলচরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি । ১৯৩৮এ মাত্র ৮ বছর বয়সে শিশুশিল্পী রূপে বাংলা সিনেমায় এসেছিলেন অনুপ । তারপর ১৯৯৭এ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ৩৫০ ছবিতে অভিনয় করেছেন । সম্ভবত কোন একজন শিল্পীর এতো বিপুল সংখ্যক ছবিতে অভিনয় করার নজির বাংলা সিনেমায় নেই ।
                ১৯৫৩র সিনেমা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ বাংলা কমেডি সিনেমার একটা মাইলফলক হয়ে আছে । উত্তমকুমার – সুচিত্রা সেনের রোমান্টিক জুটির নির্মাণ এই ছবিতেই হয়েছিল। এই জন্য নয়, সাড়ে চুয়াত্তরকে মাইল ফলক বলবো এই জন্য যে এই ছবি থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রে কমেডি সিনেমা সিনেমা নির্মাণের এক দিকনির্দেশ হয়ে আছে । তখনকার বাংলা সিনেমার প্রায় কমেডি অভিনেতার সমাবেশ ঘটেছিল এই ছবিতে । তুলসী চক্রবর্তী, নবদ্বীপ হালদার, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, হরিধন মুখোপাধ্যায়, শ্যাম লাহা, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, শীতল বন্দ্যোপাধ্যায় – কে ছিলেন না এ ছবিতে ! আর একটা কথাও মনে রাখা দরকার যে, স্ববাক বাংলা সিনেমার বয়স তখন মাত্র কুড়ি বছর । এবং এই শিল্পীরাই পরবর্তী ত্রিশ বছর বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ের চাহিদা মিটিয়েছেন এবং কমেডি অভিনয়ের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করেছেন ।
                ১৯৫৩র সাড়ে চুয়াত্তরের পর বাংলা সিনেমা পেয়েছিল তিন শক্তিমান কমেডি অভিনেতাকে, তাঁরা হলেন রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্ত ও চিন্ময় রায় । সিনেমায় আসার আগে রবি ঘোষ ছিলেন উৎপল দত্তর লিটল থিয়েটার গ্রুপে । ১৯৫৮এ উৎপল দত্তর  ‘অঙ্গার’ নাটকে তাঁর অবিনয় সাফল্য রবি ঘোষকে সিনেমায় টেনে আনে । সিনেমায় প্রথম অভিনয় ১৯৫৯এ । তারপর ১৮৬২তে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’এর পর তপন সিংহর ‘গল্পহলেও সত্যি’ তে অবিস্মরণীয় অভিনয় । এবং ১৯৬৮তে ‘গুগাবাবা’।  প্রায় ২০০বাংলা সিনেমায় রবি ঘোষের উজ্বল উপস্থিতি । রবি ঘোষ বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ে এক মার্জিত ধারা নিয়ে এলেন, যা তাঁর নিজস্ব, দর্শককে জোর করে হাসানোর কোন চেষ্টা করতেন না । রবির অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য তাঁর সংলাপ বলার টাইমিং এবং মুহুর্তে মুখের ভাব পরিবর্তন । রবি ঘোষের অভিনয় প্রসঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও উৎপল দত্তর মন্তব্য স্মরণযোগ্য । সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন –“রবি বড় মাপের অভিনেতা ছিল বলেই বড় মাপের কৌতুকাভিনেতা হতে পেরেছিল ...যিনি বিশ্বের সেরা অভিনেতা তিনিই বিশ্বের সেরা কৌতুকাভিনেতা – চার্লস চ্যাপলিন” । আর উৎপল দত্ত লিখেছেন ... “এন্ড হি হ্যাস নাউ বিকাম হোয়াট হি ওয়ান্টেড টু বি, পারহ্যাপস দি সুপ্রিম কমেডিয়ান ইন আওয়ার সিনেমা ... হি ইস পারহ্যাপস দি বেস্ট অ্যাক্টর আই হ্যাভ এভার হ্যাড দি অনার টু ওয়ার্ক উইথ” । বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ে ভানু-জহর –রবি ঘোষদের দাপটের কালেই এসেছিলেন চিন্ময় রায়, দর্শক যাকে মনে রেখেছেন টেনিদার চরিত্র সৃষ্টীর জন্য ।
                সিনেমার নায়ক নায়িকার মতই কমেডিয়ানরাও তাদের সৃষ্ট চরিত্রের জন্য দর্শক মনে স্মরণীয় হয়ে থাকেন বহুদিন । তুলসী চক্রবর্তীর পরেশ বাবু (পরশ পাথর), রবি ঘোষের বাঘা ও গল্প হলেও সত্যির রাধুনী, চিন্ময় রায়ের ননী গোপাল ও টেনিদা । সেইরকমই লালমোহন বা জটায়ুর চরিত্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সন্তোষ দত্তও স্মরণিয় হয়ে আছেন । তার মৃত্যুর পর অনুপ কুমার, রবি ঘোষ ও বিভু ভট্টাচার্য জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কিন্তু এদের কেউই সন্তোষ দত্তর অভিনয়কে ছুঁতে পারেননি । পেশায় আইনজীবি সন্তোষ দত্ত খুব বেশি সংখ্যক সিনেমায় অভিনয় করেননি । তার ছবির সংখ্যা পঞ্চাশেরও কম । তারই মধ্যে বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়কে এক অভিজাত উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন । শিশুসুলভ অপাপবিদ্ধ মুখভঙ্গি তাঁরকথা বলা চোখের ভাষা ছিল তার অভিনয়ের সম্পদ ।
                বাংলা সিনেমার জন্মলগ্ন থেকে প্রায় সব সার্থক কমেডিয়ানদের ছুঁয়ে গেলাম, কিন্তু একজনের কথা এখনও বলিনি । আসলে তাঁকে আর কারো সঙ্গে মেলানো যায় না , তিনি এক ও অদ্বিতীয়, অনন্য তুলসী চক্রবর্তী । বাংলা সিনেমার নিতান্ত শৈশবে তিনি এসেছিলেন (১৯৩২ – পুনর্জন্ম ছবিতে) । এর অনেক আগেই সবে কৈশোর পেরনো তুলসী থিয়েটারে এসেছিলেন জ্যাঠামশাইএর হাত ধরে তবলা বাদক হিসাবে, এবং পরে অভিনয়ে । জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জিত ছিল নির্লোভ এই মানুষটির । শৈশবে পিতার অকালমৃত্যুর কারণে স্কুলের গন্ডি পেরনো হয়নি । চিৎপুরে একটা মদের দোকানে বয়ের কাজ, তারপর ঘড় সারাইয়ের দোকানের কাজ ফেলে পালালেন রেঙ্গুনে, হলেন সার্কাসের জোকার । ভালো লাগলো না । ফিরে এসে জ্যাঠামশাইএর হাত ধরে এলেন স্টার থিয়েটারে, হলেন পাঁচ টাকা বেতনের তবলা বাদক, পরে অভিনয়ে । জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর শিবপুর থেকে সেকেন্ড ক্লাস ট্রামে স্টুডিও যাতায়াতের সুবাদে নানা চরিত্রের মানুষকে পর্যবেক্ষনই ছিল তাঁর বাস্তব ঘেঁষা অভিনয়ের রসদ । বলেছেনও সে কথা “চোখ কান খোলা রাখি, আর সব ধরনের মানুষ দেখে বেড়াই। চরিত্রমতো যখন যাকে দরকার, তাকে তুলে ধরি। এ সব চরিত্র ফুটিয়ে তোলার দরকার হয় নাকি? এ সব তোমার আমার চার পাশে ঘুরছে। যে কোনো একটাকে তুলে এনে নিজের কাঁধে ভর করাও” । বাংলা সিনেমায় যেন অপরিহার্য ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী । প্রেস কিংবা হোটেলের মালিক, গ্রাম্য টোলের মাষ্টার কিংবা গ্রামের মুদিখানার দোকানি যে চরিত্রই পেতেন তুলে আনতেন তাদের বিশ্বাসযোগ্য ছবি । অভিনয় করতেন মনেই হত না । কোন রূপসজ্জার প্রয়োজন হত না । তার সিনেমা জীবন খুব দীর্ঘ ছিল না । মাত্র ২৮ বছরের চলচ্চিত্র জীবনে অভিনয় করেছিলেন ৩১৬টি বাংলা ও ২৩টি হিন্দি ছবিতে ।  সিনেমা জগতের উজ্বলতার মধ্যে থেকেও  আর একটু সাচ্ছন্দের লোভ তাঁকে ছুঁতে পারেনি । লোভি ছিলেন না, ছিলেন না বলেই ছিলেন অবহেলিত । পরিচালকের ডাক পেলে চলে আসতেন, পেতেন দৈনিক ২৫ কি ৩০টাকা । শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’এ দৈনিক ১৫০০ টাকা দিতেন । বিদেশের কোন শিল্পীর অনুকরণ নয়, তাঁর অভিনয় ছিল নিতান্তই দেশজ, দেশের মানুষের চরিত্রের মধ্যেই আছে সে অভিনয়ের শেকড় । পর্দায় দু তিন মিনিটের উপস্থিতি থাকতো তাঁর (ব্যতিক্রম ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ও ‘পরশ পাথর’)। সেই স্বল্প উপস্থিতিই দর্শকের কাছে অনাবিল আনন্দি নিয়ে আসতো । শিশুর সারল্য ভরা মুখ আর চোখের খেলায় শরীর নাচিয়ে এক অদ্ভুত অভিনয় ধারায় দর্শকদের মাতাতেন তুলসী চক্রবর্তী । সত্যজিৎ রায় ১৯৫৮তে যদি এই অসামান্য অভিনেতাকে মুখ্য চরিত্রে নিয়ে ‘পরশ পাথর’ না বানাতেন তাহলে বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ অপরাধী হয়ে থাকতো । সত্যজিৎ রায় স্বীকার করে গিয়েছেন যে, তুলসী চক্রবর্তী না থাকলে তিনি পরশ পাথর গল্পটি চলচ্চিত্রায়িত করতেন না । এবং এই মন্তব্যও করেছেন যে তুলসী চক্রবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করে থাকলে তাঁকে অভিনয় দক্ষতার জন্য অস্কার পুরস্কার প্রদান করা হত।
                তুলসী চক্রবর্তী, ভানু, জহর, নৃপতি, হরিধন, অনুপকুমার, রবি ঘোষ, সন্তোষ দত্তরা নেই । বাংলা সিনেমা থেকে কমেডি অভিনয়ও উধাও হয়ে গেছে, আছে শুধু স্মৃতি আর ইতিহাস । সেই স্মৃতি আর বাংলা চলচ্চিত্রের একশো বছরের ইতিহাস ঘেঁটে বাংলা সিনেমায় কমেডি অভিনয়ের ধারাটিকে ছুঁয়ে গেলাম ।
তথ্যসূত্র – ‘সোনার দাগ’ / গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ (২) ‘অগ্রপথিকেরা’ / সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (৩) গণশক্তি / শারদ সংখ্যা ১৪২৩