মলয় রায়চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মলয় রায়চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

মলয় রায়চৌধুরী

                         

মলয়, ১৯৪১ সালে


 বাঁ দিক থেকে : মলয়ের বড়দি সাবিত্রী, দাদা সমীর, মেজজেঠিমা করুণা, মলয়, বড়জেঠিমা নন্দরাণী, মেজদা অরুণ, মা অমিতা, ছোড়দি ধরিত্রী

ধারাবাহিক

ছোটোলোকের জীবন

: মলয় রায়চৌধুরী


       চার বছর বয়সে ন্যাড়া ছাদে  উঠে ঘুড়ি উড়িয়ে পাতা-হাতে ছড়ির মার খেয়েও ওড়াতুম আর অন্যের ঘুড়ি কেটে নাচতুম  কপিলের দাদু একভাঁড় তাড়ি খাইয়েছিল আর মা মুখ শুঁকে গন্ধ পেয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল “তাড়ি নিশা নহি হ্যায় খোখা  ভুখ সে বচাতা হ্যায় বদন মেঁ তন্দুরুস্তি” কি করেছি আর কি করতে পেরেছি তার জন্য আপশোষ নেই অনেক মন্দিরে দেখতুম উপস্হিত সবাই মাটিতে  একেবারে বোবা হয়ে বসে আছে ঈশ্বরের শব রাখা রয়েছে সামনে পুরুষের আধ্যাত্মিকতা ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক তখন থেকেই যদিও মা-বাবা আদরযত্ন করে মানুষ করেছিলেন তবু একা রয়ে গেছি ইমলিতলার ছাদে প্যাকিংবাক্সে মাটি ভরে তাতে ফুলের গাছ পুঁতে ফুলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম কেন্নোদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম উচ্চিঙড়ের সঙ্গে কাঠবিড়ালিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম গেঁড়ি-গুগলিদের সঙ্গে শুঁয়াপোকার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ফাঁদে পড়া ইঁদুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ঘরে আটক চড়ুইপাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম বড়ো হওয়া মানে কুৎসিত অনিশ্চয়তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ।  

ইমলিতলা বাড়ির ছাদে : মেঝেতে বসে মলয়, চেয়ারে দাদা সমীর, দাঁড়িয়ে মেজদা অরুণ, দুইপাশে জাঠতুতো বোন ডলি আর মনু ( উকুন হতো বলে ন্যাড়া করে দেয়া হতো )



         পাঁচ বছর বয়সে রাস্তার কলে চান করার সময়ে যাকে ইচ্ছে কনভেন্টে শেখা  ‘ফাক ইউ’ বলতুম আর ইংরেজিতে তার সঙ্গে কথা বলেছি বলে তার আনন্দ উপভোগ করতুম  ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের মানে যারা গাঁজাচরস টানে তাদের জমায়েতে ছিলিম টানতে গিয়ে কেশেছি শুয়োরের মাংসের ঝোল খাইয়ে বনসি দুসাধ কাশি থামিয়েছিল “জিনদিগি ববুয়া য়হাঁ সে ওয়াহাঁ” শুয়োরের মাংস হয়ে যায় কতো কি শিখেছি কনভেন্ট ইশকুলে হ্যাম বেকন প্রোসিয়েটো সসেজ টেরিনস জেলাটিনো সালামি বোলোনা জামবন ট্যাকব্যাক মোরটাডেলা উইনার শুয়োর মানে গোলাপি শুয়োর যারা ঠোঁটে লিপ্সটিক মেখে জন্মায় আঘাতহীন শৈশব হয় না কখনও মা কখনও বাবা কি মনে করিয়ে দেননি তুই বাতিলের দলে তুই একটা ফালতু উধাও হবার আগে কেউই বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ে না যেমন-যেমন বুড়ো হও তেমন-তেমন তুমি তোমার বুড়ির মধ্যে তোমার মা-বাবাকে খুঁজে পাও যে তোমাকে চিপকে থাকবে যা বুড়ো বয়সে তোমার বড্ডো দরকার ।

         ছ’বছর বয়সে সারাদিনে একবস্তা কয়লা একা ভেঙেছি প্রায়ই প্রায়ই প্রায়ই আর মামার বাড়ি পাণিহাটির পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরেছি বঁড়শিতে আটকানো মাছের লাফানি-ঝাঁপানি সে কী মজা “দেখি কী মাছ ধরেছিস ? কী মা্ছ ওটা?” জানি না বঁড়শিতে আটকাচ্ছে তুলে নিচ্ছি  “খোট্টা মেড়ো কোথাকার, মাছের নাম জানিস না বিভাস ওকে আজকে মাছের বাজারে নিয়ে গিয়ে মাছেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিস” আসলে ইমলিতলার সব রকমের আনন্দে ভোগার প্রচুর সুযোগ পেয়েছি অথচ আমি আজও এই বুড়ো বয়সেও লেখালিখি করি তার কারণ আমি খুঁজে পাইনি যে আমি লোকটা কে প্রথম কবিতার বই “শয়তানের মুখ” কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বেরোলেও কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট এলাকার প্রেসগুলো আমার নাম দেখে ছাপতে চায়নি মানুষের মুখ আর শয়তানের মুখে পার্থক্য ছিল না  ছাপাতে হয়েছিল বহরমপুরে মণীশ ঘটক ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশক কিন্তু যে-কবিতাগুলো ছাপার পর আমার ভালো লাগেনি তাতে “CANCELLED” রাবার স্ট্যাম্প মেরেছিলুম বলে সুনীল গাঙ্গুলি খাপ্পা অথচ নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় আমার কবিতার বই রিভিউ করাতে চাননি আমার গদ্য ছাপতে চাননি কেননা আমার “নামগন্ধ” উপন্যাসে যিশু বিশ্বাস নামে চরিত্রের বাবার মোটর গাড়ি চুরি হয়ে গিয়েছিল সেই থিয়েটার হলের সামনে থেকে যেখানে বিজন ভট্টাচার্যের “নবান্ন” অভিনয় হচ্ছিল ব্যাপারটা এতোই আনন্দদায়ক যে মনে হয় তা বুঝি দুঃখ সময়ের রঙ হয় কুচকুচে কালো চাইবাসার রোরো নদীর ঠাণ্ডা জলে  চান করতে গিয়ে একাকীত্বের মাতনে মেতেছি আসলে আমি তো একজন আউটসাইডার জেলের দেয়ালে কয়েদিরা যা লিখে রাখে তা আমাকে উদ্দেশ্য করে । আমি বুলগাকভ পড়িনি ।

         সাত বছর বয়সে ঘুঁটে ভেঙে তার তলায় প্যাকিং-বাক্সের কাঠের টুকরো সাজিয়ে কয়লা রেখে উনোন ধরাতে পারতুম  সকালে দাঁত মাজার জন্যে সাদা রঙের ছাই বড়োজ্যাঠার জন্যে আলাদা করে রাখতুম মহাদলিত গঞ্জেড়িদের তবেলায় হাতে তমঞ্চা নাড়িয়ে দেখেছিলুম তেমন ভারি নয় অনেক সময়ে দুর্ভোগ অদৃষ্টের কোপ থেকে বাঁচায় আদালতের জজ যখন জিগ্যেস করেছিলেন “আর ইউ গিল্টি” তখন মিথ্যে কথা বলেছিলুম যে না আমি গিল্টি নই কিন্তু কতো যে বেআইনি কাজ করেছি তমঞ্চার গুলি চালানোর মতন তা উনি জানতে চাননি  আসলে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল মানুষের নাম যা গাঁজা ফুঁকে বা পাঁড় মাতাল হয়েও মগজ থেকে যায় না তার জন্য বদ্ধউন্মাদ হতে হয় চুল কাটার সময়ে সেলুনের আয়নায় নিজেকে আগন্তুক মনে হওয়ার সেই শুরু সকলকেই যে বুঝে উঠতে পারি তা নয় এই যে লিখতে বসেছি নিজের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না শুনতে পাচ্ছি পাণ্ডুলিপির গলার আওয়াজ আমার নিজের জীবন আমি বেঁচে নিচ্ছি ব্যাপারটা ত্যাবড়ানো নিঃশেষ না করে ছাড়ে না অস্হির অপরাধবোধে টইটুম্বুর তবুও  আমার জীবন একেবারে টানটান ।

         আট বছর বয়সে আলোয় গড়া চামড়ার কালো তেলালো কুলসুম আপার সঙ্গে প্যাণ্টুল খুলে লেংটুর ঘষাঘষি খেলেছি “কোশিশ কর  উল্লু কহিঁকা কোশিশ কর নহিঁ তো গোস্ত নহিঁ খিলাউঙ্গি” ওনার গায়ে জংধরা লোহার গন্ধ নোনতা তন্দুরি-চিকেন বুক ওনাদের বাড়ির গোরুর মাংসর মোগলাই খেয়ে বাড়ি ফিরে মাকে মিথ্যে কথা বলেছি  টাটকা মাংস আর রাঁধা মাংসের লোভে প্রায়ই মিথ্যে কথা বলেছি ইউ আর গিল্টি ইউ কেননা আমি তো দার্শনিক মিথ্যে কথা বলার অধিকার আছে আর খিদে তো জীবনশৈলী জেনেছি অন্ধকারে চোখের চরিত্র পালটে যায় আঙুলের ডগায় চোখ গজিয়ে ওঠে গির্জা মন্দির আর মসজিদের মধ্যেকার গন্ধ কিন্তু এক নয় রোমান্টিক প্রেম হল একেবারে অবাস্তব ব্যাপার নয়তো তক্ষুণি-চেনাকে স্পর্শ করলেই দুপক্ষের কালো জঙ্গলে কেন তরল ব্যাপার খেলা করতে থাকে  বুঝতে পারছেন এই যে হ্যালো শুনছেন ছায়াদের ভুতুড়ে জগত সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি তাতে কালো রঙের মাত্রা বেশি তখন জানতুম না কী কোশিশ করতে বলছেন কুলসুম আপা প্রেম জীবনকে থামিয়ে রাখে কিছুক্ষণ কিছুদিন কয়েকমাস কয়েকবছর ব্যাস কাফেরের সঙ্গে যৌনসংসর্গ করে কুলসুম আপাকে জন্নতে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে হবে ।

         নয় বছর বয়সে ব্লেড দিয়ে মুর্গির গলা কেটে গলা চিপে থেকেছি যাতে রক্ত বেরিয়ে স্বাদ না নষ্ট হয় চুড়িঅলা শিখিয়েছিল মুর্গির মাংস জায়ফল দিয়ে রাঁধলে গন্ধ কেটে যায় ছাদে দাঁড়িয়ে পালক ওড়া দেখেছি বুক-ওঁচানো মেয়েদের দিকে চোখ চলে গেলে ফিরিয়ে নিইনি মনে হয়েছে ওর হাতে কাতলা মাছের চোখ খুবলে আশীর্বাদী আংটি পরিয়ে দিই বলি উইল ইউ ম্যারি মি তুমি কি ঝড়ের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াও প্রতিটি প্রেম তার এক্সপায়ারি ডেট নিয়ে আসে তবু আমার মনে নেই শেষ কবে অবিবাহিতা যুবতীর আদর খেয়েছি পাহাড় ধ্বসে পড়লে তার চূড়াটা নামে সব শেষে অথচ তার ভারেই পাহাড়ের অধঃপতন সৎ আর সত্যবাদী হলে প্রেম উবে যায় যুক্তিতর্ক আমার সহজপ্রবৃত্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভুতকিমাকার করে দিয়েছে কেউই ব্যাখ্যা করতে পারে না কাকে আলোকপ্রাপ্তি বলে অথচ মানুষ ভয় পেলেও বোকার মতন হাসে যারা ড্রিফটার তাদের আমি পছন্দ করি না ।  

         দশ বছর বয়সে নমিতা চক্রবর্তী মানে নমিতাদিকে ‘ভালোবাসি তোমাকে’ লেখা চিরকুট দিয়েছিলুম যা উনি যত্ন করে বারো বছর রেখে দিয়েছিলেন চুমু খেতে চাইলে দিতেন হয়তো কিংবা নিশ্চই ওনার-আমার দুজনেরই সাহস হয়নি ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে গোখরোও ভিতু হয়ে যায় অনেক সময়ে কেবল “পুঁজিবাদ নিপাত যাক”, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” এই সব শুনতে নমিতাদির ভাল্লাগে ধুসসালা, “বই পড় বই পড় বই পড় বই পড় এই বইগুলো নিয়ে গিয়ে পড়” ফলে কাগজ পড়ি চিরকুট পড়ি ঠোঙা পড়ি পোস্টার পড়ি বাংলা হিন্দি ইংরেজি ভোজপুরি মৈথিলি আর দাদার সঙ্গে গঙ্গায় সাঁতার শিখতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিলুম বলে পরে চুমু খাবার মতনই সাঁতার শেখার সাহস হয়নি অথচ আমার জীবন আরম্ভ হয়েছিল নমিতাদির দেয়া প্রথম রবীন্দ্রনাথ থেকে তার আগে আনপঢ় ছিলুম ভাষাকে আক্রমণ করার গোপন চাবিকাঠি দিয়েছিলেন উনি  কর্তৃত্বকে আমি ইন্সটিংক্টিভলি ঘৃণা করি সমস্যা হল যে আমার নিজের কোনো বোন ছিল না ইসকুলের টিচাররা কোনোদিন শব্দের রহস্য বুঝিয়ে উঠতে পারেননি ।

              

বাবা রঞ্জিত ও মামা অমিতা


এগারো বছর বয়সে বাবার ফোটাগ্রাফির দোকানে বসে জিনিসপত্র বিক্রি করে তা ‘দিবসান্তে কতো টাকা রোজগার হইল’ ( Income ) বাঁদিকে আর  ‘দিনভর কি বিক্রয় হইল’ ( Items ) ডানদিকে খেরোর খাতায় লিখে রাখতুম বাবা কি পুঁজিবাদি উনি বলেন “বাড়িটা বানাবার জন্যে আর ভাইদের সংসারের জন্যে পুঁজিতে টান পড়ছে”  বাবা কি মজদুর আট ঘণ্টা ডার্করুমে কাটান অক্সিজেনের অভাবে প্লুরিসি হয়ে গেল মেজদা মারা গিয়ে আমাদের পরিবারে অমর হয়ে আছে জানেন কি আমার বাবা-কাকা-জ্যাঠা জীবন শুরু করেছিলেন ফিরিঅলা হিসেবে রঞ্জক সাবান জামের ভিনিগার পদ্মফুলের শুকোনো বিচি  নিচুতলায় বসবাস না করলে পুরো সমাজ সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না পর্ণোগ্রাফির ফিল্মের চরিত্রদের মতন সাংবাদিকরা তাদের মালিকের অনৈতিকতায় ভোগে তারা বিমূর্ত ভাবনাচিন্তাকে ভয় পায় বিশেষ করে দোজখ-নাজেলের আতঙ্ক ।

. বাবা-মায়ের সঙ্গে মলয় ও সমীর ( দরিয়াপুরের বাড়িতে তোলা 

(ক্রমশঃ)


শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মলয় রায়চৌধুরী

                 
মলয়ের ঠাকুরদা লক্ষ্মীনারায়ণ আর ঠাকুরমা অপূর্বময়ী



                               বাবা, মা ও দাদার সঙ্গে মলয়
ছোটোলোকের জীবন  ( ধারাবাহিক )

         
আমি আজও আমার প্রথম বইটা লেখার চেষ্টায় বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করে চলেছি ।
         ইমলিতলায় ছিলুম বামুনবাড়ির মহাদলিত কিশোর ।দেখি খুল্লমখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি  তুলে আনতে পারি উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না জীবনকেচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ খেয়ে যেতে পারে তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত ।


 ক্লাস টেন-এ পড়ার সময়ে ক্লাসটিচার অধিকারী স্যারের সঙ্গে ; সিঁড়ির দ্বিতীয় সারিতে বাঁদিক থেকে দ্বিতীয় মলয়

         ঘোঁচু ছিলুম স্বমেহন বলুন ম্যাস্টারবেশান বলুন আমাকে শুরু করতে হয়েছিল কলেজে ঢুকে আসলে জানতুমই না একদিন পাটনার গান্ধি ময়দানে বসে রুমালে চিনেবাদাম রেখে আমি সুবর্ণ তরুণ আর বারীন খাচ্ছিলুম সুবর্ণ তরুণকে বলল এই তুই বড়োগুলো খেয়ে নিচ্ছিস জবাবে তরুণ বলল কি করব বল চিন্তায় আছি আজকাল দিনে তিন বার হাত মেরে ফেলছি আমি জানতে চাইলে হাত মারা আবার কি ব্যাপার সুবর্ণ বললে শালা হাত মারা জানিস না নুনুর খোসার তলায় যে নোংরা থাকে তা পরিষ্কার করিস না বারীন বলল বাঞ্চোৎ মেয়ে ফাঁসিয়ে বেড়াচ্ছিস হাত না মারলে খোসার তলার নোংরা যদি কোনো মেয়ের লাবিয়া মাইনরায় ঢুকে যায় তার লাইফ হেল হয়ে যাবে বললুম আরে শালা চুতিয়া কাহিঁকা হাত মারা কী জিনিস সেটাই বলবি তো তাহলে খোসার তলাকার নোংরা পরিষ্কার করব সুবর্ণ বলল নুনুতে সাবান লাগিয়ে ডান হাতটা এইভাবে নিবি আর নুনুকে সাবান মাখাতে থাকবি ব্যাস ফণফণিয়ে বেরিয়ে পড়বে তোর লিকুইড ডায়মণ্ড কি লজ্জা কি লজ্জা নাইটফল নিয়েই ছিলুম মজায়  নিজেই পায়জামা পরের দিন সকালে কেচে ফেলতে হতো নয়তো ধোপাটা “ই কাহেকা দাগ লগলই” বলে টিটকিরি মারবে তাই কলেজে ঢুকে চেককাটা গাঢ় রঙের লুঙ্গি পরা শুরু করেছি যাক শুরু হয়ে গেল আমার ম্যাস্টারবেশানের কালখণ্ড সমস্যা হল যে বুড়ো বয়সে প্রস্টেটের জন্যে ইউরোলজিস্টকে দেখাতে গেলে ডাক্তার জিগ্যেস করলে আর ম্যাস্টারবেশান করেন না বললুম না কেন দরকার হয় না বউ আছে তো বউয়ের মেনোপজ হয়ে গেছে ডাক্তার বললে আপনাদের লোকে ভুল বুঝিয়েছে ম্যাস্টারবেশান পঞ্চাশ বছরের পর আবার শুরু করতে হয় যাতে প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড মরে না যায় আপনি ভাবলেন বউয়ের সঙ্গে শুলেই কাজ হয়ে গেল তা ঠিক নয় শোয়াটা মনের ব্যাপার দেহের ব্যাপার হল ম্যাস্টারবেশান যাকগে আপনি তো যে বয়সে পৌঁছেচেন আর ম্যাস্টারবেশান করে লাভ হবে না কেননা প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড অলরেডি মরে গিয়ে ফুলতে আরম্ভ করেছে শুধু ওষুধ খেয়ে ওর ফোলা থামিয়ে রাখতে হবে বছরে একবার সোনাগ্রাফি আর পেচ্ছাপের রিপোর্ট আনবেন তাহলেই হবে মনে রাখবেন ম্যাস্টারবেশনে প্রমোদকর লাগে না।
         সেক্স ? চিরকাল দিনের আলোয়  চোখ খুলে রেখে আমার ভালো লাগে  রাতের অন্ধকারে নয় রাতে হলে জোরালো আলো চাই । হাড়কাটা হোক, সোনাগাছি হোক, কালীঘাট হোক, খিদিরপুর হোক, পার্কস্ট্রিটের সন্ধ্যা হোক, ফ্রিস্কুল স্ট্রিট হোক, সব দিনে কিংবা আলোয় । খাটে নয়, চোটে ।
         যখন প্রথম পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম  দেখলুম তখন ভাবলুম যে কেন এদের ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ফিকশান বলা হয় না ।
         বাঙালি সাহিত্যিকদের চাঁদমারি ভাগ্য যে তাঁদের ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না বাংলা পাল্প ফিকশন হল ঘোলা জলের আয়নায় মুখদর্শন ।
         সাহিত্যজগত থেকে ছিঁড়ে নিজেকে আলাদা না করলে লেখালিখি করা যায় না  আমাকে বোঝার চেষ্টা করা হেঁয়ালি তাই আমার লেখালিখিকে বুঝুন ।
         আমি সাহিত্যিক লাউডগাগিরিতে ভুগি না বুঝলেন তো আমার লেখালিখি নিছক সাহিত্য নয় গণপাঠককে আনন্দ দেবার জন্যে নয় তা পাঠককে চৌচির করে তার ভেতরে সমাজরাষ্ট্রের গুগোবর ভরে দেবার জন্যে আর আমি শিল্প ব্যাপারটার বিরুদ্ধে কেননা আমাকে সারিয়ে প্রাচীন গ্রিক হেলেনিক সমাজের যোগ্য করে তোলা যাবে না  আমি চাই না যে আমার শবযাত্রায় কবি-লেখকরা ভিড় করুক একজনকেও চাই না সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো যখনই মরি না কেন যুবাবস্হায় মারা যাবো মাঝে পনেরো বছর মরে গিয়ে যাচাই করে নিয়েছিলুম আমি লেখালিখি বেছে নিইনি লেখালিখি আমাকে বেছে নিয়েছে লেখকদের একেবারে তলায় নেমে গিয়ে ধাঙড় হতে হয় জানি পরের জন্মে ঘুর্ণিঝড় হয়ে জন্মাবো ।
         কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর কপি কৈলাস পর্বতে তুলে রেখে এসেছি দেখলুম আগেই কেউ মনুস্মৃতি রেখে গেছে  ।
         প্রথম আদিম মানুষ যেমন পাথরের ছোরা আবিষ্কার করেছিল  তেমনই আমি নিজের লেখালিখির অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছি  কিন্তু সার্কাসে যে লোকটা সিংহদের আগুনের ভেতর দিয়ে লাফাতে বাধ্য করত তাকে আমি ছোটোবেলায় মাফ করতে পারিনি আমার সবক’টা দুঃস্বপ্ন চোখ খুলে কেননা ঘুমে সবচেয়ে রসালো স্বপ্নগুলো দেখি ভোরের পুকুরে মৌরলা-ঝাঁকের মতন সুন্দুরীদের দল আমার উচ্চাকাঙ্খা ছিল একটা বিশাল বেশ্যালয় কিনি আর চোরাকারবারের মালিক হয়ে লুকিয়ে বেড়াই কিন্তু যখন ভারতীয় বাস্তবে পচতে থাকি তখন মগজে লেখা আসেনা মনে হয় সেসময়ে কেউ একজন আমাকে একটা শ্মশান বা গোরস্তান উপহার দিক হোমো স্যাপিয়েন মানুষের প্রথম যে করোটি পাওয়া গিয়েছিল তা যে আমার  লেখালিখিই তার প্রমাণ।
         দেশটা দিনকেদিন চুতিয়ায় ভরে উঠেছে গুয়ের সমুদ্রে ডানে পড়ি বা বাঁয়ে । একজন কমিউনিস্ট নেতাকে জিগ্যেস করেছিলুম, দেশভাগের সময়ে তো ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন ধর্ম বাঁচাবার জন্য, তা এখানে এসে নাস্তিক হয়ে গেলেন যে ? ঢাকাতেই নাস্তিক থাকতে পারতেন, এই ধর্ম হোক বা সেই ধর্ম, নাস্তিকের আবার ধর্ম হারাবার ভয় আছে নাকি । শুনে, তাঁর চটি হয়ে উঠলো স্পোর্টস শু ।
         আমার দু’রকম চোখ নিয়ে রাস্তায়-রাস্তায় হাঁটতে আমার ভালো লাগে আমি তখন তাকিয়ে থাকি কিন্তু দেখি না অন্য সময়ে তাকাই আর দেখি পৃথিবীর কতো-কতো শহর গ্রাম গঞ্জের পথে-পথে এই ভাবেই চকরলস কেটেছি ।
        আমাকে নিয়ে ঠাকুমা অপূর্বময়ীর অতিকথায় বলা আছে যে আমি দু’বছর বয়সে ‘কুজঝটিকা’ স্পষ্ট উচ্চারণ করেছিলুম কিন্তু  কনভেন্ট ইশকুলে ভর্তি হবার পর আর পারতুম না বলে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হলে বাংলার মাস্টারমশায় এক্ষুনি নাম মনে পড়ছে না ও হ্যাঁ কর্মকারবাবু তবে  ওই ইশকুলে টিচারদের পদবি বা নামে বাবু যোগ করতে হতো ব্রাহ্মধর্মের ফিকে-রেশ হিসেবে বলেছিলেন “শব্দটা অরুন্ধুতী নয় রে অরুন্ধতী তুই কি ঘটি ” সহপাঠী তরুণ শূরকে জিগ্যেস করি ঘটি কী রে  গাণ্ডু ঘটি জানিস না পাটনাইয়া বওড়াহা ভঁয়সালোটন কোথাকার বাঙালের বিপরীত সমাস বাঙাল-ঘটি দ্বন্দ্বসমাস নীলাংশুবাবুর ক্লাসে জানতে পারবি উনি চাটগাঁর সত্যিই জীবনকে মরচে-পড়া থেকে বাঁচাতে হলে জিভে পালিশ দিয়ে রাখতে হবে ভালোবাসা এক রকমের কল্পনার অসুখ আর আমার ঠাকুমার নাম জানেন তো “অপূর্বময়ী” তাঁর শাশুড়ির নাম “মাতঙ্গিনী”। ঠাকুমার ছোটো বেয়ানের নাম বিবসনা । এমন অসাধারণ নামগুলোকে লোপাট করে দিয়েছে কসমোপলিটান আধুনিকতা ।
         তিন বছর বয়সে মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার গলিতে লেত্তি দিয়ে লাট্টু ঘোরাতে শিখে যাই  হাতের তালুতে কেয়া চকরলস কাটিস হ্যায় বাঙালিয়া গিল্লি-ডাণ্ডা বা ড্যাংগুলি খেলার চেষ্টা করতে গিয়ে কপালে আলু নিয়ে ফিরি  তিন বছর বয়সেই কনভেন্টে ভর্তি হবার জন্য নটিবয় শু কিনতে গিয়ে জানতে পারি যে আমার বাঁ পায়ের চেয়ে ডান পা বড়ো পায়ের কড়ে আঙুলের পাশের আঙুল ছোটো জানতে পারি যে আঁস্তাকুড়ের দিকে একবার তাকালেই যেমন টের পাওয়া যায় তা বাতিল জঞ্জালের জমঘট  তেমনিই অনেক লোকের দিকে এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারি যে তার জীবনের গর্তে আছে শুধুই টাকাকড়ি শুধুই শুধুই ইমলিতলায় বসবাস না করলে ইমলিতলাকে জানতে পারা অসম্ভব ইমলিতলার নানা রঙের নানা কাপড়ের নানা পোশাকের তাপ্পি মারা ক্যাঁদরায় আমি মোড়া সমস্যা হল যে আমি আবার খোলের ভেতরে ঢুকে যেতে পারি না আর তো গুটিপোকা নই বদলে গেছি তবু আজও সুন্দরীদের দিকে তাকালে মন দুঃখে ভরে ওঠে । 

স্ত্রী সলিলার সঙ্গে মলয় । বিয়ের পরের দিন, ১৯৬৮ সালে

বাংলা অ্যাকাডেমিতে মলয় । দাদা, বউদি, স্ত্রী, নাসের হোসেন প্রমুখের সঙ্গে

(ক্রমশঃ) 


শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

মলয় রায়চৌধুরী

‘ওয়ান শট’ : একটি অসাধারণ ছোটোগল্পের বই - লেখক অবনী ধর

         অধিকাংশ পাঠক অবনী ধরের নাম শোনেননি, অথচ তিনি বাংলা সাহিত্যে একটি অসাধারণ ছোটোগল্পের বই দিয়ে গেছেন ।
           ১৯৬৮ সালের সন্ধ্যা । হাংরি আন্দোলনকারীরা খালাসিটোলায় জড়ো হয়েছেন জীবনানন্দ দাশের জন্মদিন পালনের জন্য । টেবিলে উঠে পড়লেন অবনী ধর আর নাচের সঙ্গে গাইতে লাগলেন এই গানটা, যা তিনি জাহাজে খালসির কাজ করার সময়ে গাইতেন, বিদেশি খালাসিদের সঙ্গে । উপস্হিত সবাই, এমনকি হাংরি আন্দোলনের কয়েকজন ভেবেছিলেন গানটা আবোল-তাবোল, কেননা ইংরেজিতে তো এমনতর শব্দ তাঁদের জানা ছিল না । যে সাংবাদিকরা খবর কভার করতে এসেছিলেন তাঁরাও গানটাকে ভেবেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীদের বজ্জাতি, প্রচার পাবার ধান্দা । পরের দিন দি স্টেটসম্যান যে সংবাদ দিয়েছিল তাতে ভাসা-ভাসা উল্লেখ ছিল । সেই সপ্তাহের ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ শিরোনামে ঠাট্টা করে দুই পাতা চুটকি লেখা হয়েছিল, অবনী ধরের কার্টুনের সঙ্গে ।
        ‘অমৃত’ পত্রিকায় ‘লস্ট জেনারেশন’ তকমাটি যিনি ব্যবহার করেছিলেন তিনি জানতেন না যে এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন গারট্রুড স্টিন এবং বিশ শতকের বিশের দশকে প্যারিসে আশ্রয় নেয়া আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, টি. এস. এলিয়ট, জন ডস প্যাসস, ই ই কামিংস, আর্চিবল্ড ম্যাকলিশ, হার্ট ক্রেন প্রমুখকে বলা হয়েছিল ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সদস্য ।
         অবনী ধর-এর নামের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন । যাঁরা তাঁর নাম শোনেননি এবং ওনার একমাত্র বই ‘ওয়ান সট’ পড়েননি, তাঁদের জানাই যে ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে মান্যতা দিলে বলতে হয় যে অবনী ধর ছিলেন হাংরি আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ ছোটো গল্পকার ।

         গানটা এরকম, মোৎসার্টের একটা বিশেষ সুরে গাওয়া হয়:
জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,
জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।
জিং গ্যাং গুলি গুলি গুলি গুলি ওয়াচা,
জিং গ্যাং গু, জিং গ্যাং গু ।
হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা উউউউউহ,
হায়লা, ওহ হায়লা শায়লা, হায়লা শায়লা, শায়লা, উহ
শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি, শ্যালি ওয়ালি ।
উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ, উউউমপাহ ।

         ১৯২০ সালে,, প্রথম বিশ্ব স্কাউট জাম্বোরির জন্য, রবার্ট ব্যাডেন-পাওয়েল, প্রথম বারন ব্যাডেন-পাওয়েল (স্কাউটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা) সিদ্ধান্ত নেন যে একটা মজার গান পেলে ভালো হয়, যা সব দেশের স্কাউটরা গাইতে পারবে ; কারোরই কঠিন মনে হবে না । উনি মোৎসার্টের  এক নম্বর সিম্ফনির ইবি মেজরে বাঁধা সুরটি ধার করেছিলেন । গানটা স্কাউটদের মধ্যে তো বটেই সাধারণ স্কুল ছাত্রদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়েছিল । এই স্কাউটদের কেউ-কেউ জাহাজে চাকরি নিয়ে খালাসি এবং অন্যান্য কর্মীদের মধ্যে এটাকে ছড়িয়ে দিতে সফল হন । অবনী ধর বেশ কিছুকাল জাহাজে খালাসির কাজ করেছিলেন এবং তাঁরও ভালো লেগে যায় সমবেতভাবে গাওয়া গানটি । শতভিষা, কৃত্তিবাস, কবিতা, ধ্রুপদি পত্রিকার কর্নধারদের প্রিয় সঙ্গীত-জগত  থেকে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া এই গান সেসময়ে নিতে পারেননি সাংবাদিক আর বিদ্যায়তনিক আলোচকরা, তার ওপর যেহেতু হাংরি আন্দোলনের ব্যাপার, তাই তাঁরা এটাকে অশিক্ষিত নেশাখোর-মাতালদের কারবার ভেবে হেঁ-হেঁ করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ।
         প্রথম ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ও প্রথম ছোটোগল্পকার পূর্নচন্দ্র থেকে হাল আমলের মফসসলের কথাসাহিত্যিক, প্রান্তিক ও শহুরে গল্পকার কিংবা মেট্রপলিটান ঔপন্যাসিক, তাঁদের লেখক প্রতিস্ব অবিনির্মাণ করলে প্রথম যে উপাদানটি পাওয়া যাবে, তা তাঁদের মাতৃভাষায় এবং অন্যান্য যে ভাষায় তাঁদের দখল আছে, সে ভাষায় পূর্ব প্রজন্মগুলোর সাহত্যিকদের লেখা গল্প-উপন্যাসের পঠন-পাঠনের জমা করা স্মৃতি । ব্যক্তিপ্রতিস্ব নির্মাণে ভাষার অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু লেখক-প্রতিস্ব নির্মাণে ভাষাসাহিত্যের জ্ঞান তথা সাহিত্যের বিশেষ ঝোঁকের প্রতি লেখকের টান, তাঁর লেখনকর্মের আদল আদরা দিশা তাৎপর্য অন্তর্নিহিত-সম্পদ দাপট চৈতন্য অস্তিত্ব আত্ম-উন্মোচন এমনকী তাঁর সাহিত্য চক্রান্তক কলমটির গঠনকারী মূল উপাদান । তাঁদের লেখন-অভিজ্ঞতার মালিকানার বখরা কিন্তু তাঁদের পড়া পূর্বসূরী গল্পকার-ঔপন্যাসিক-দার্শনিকদের প্রাপ্য।
         আমি যে প্রতিস্ব-নির্মাণের কথা বলছি তা বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ বাঁকবদলের সময়কার । উল্লেখ্য যে ভারতবর্ষে পঞ্চতন্ত্র, হিতোপদেশ, বেতাল পঞ্চবিংশতি, কথাসরিৎসাগর, বৃহৎকথা, কথামঞ্জরী, দশকুমার চরিত, বাদবদত্তা ইত্যাদি গদ্যে রচিত কথাবস্তুর অতিপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে । ইংরেজরা আসার পর, এবং ফলে, বাংলা গদ্যসাহিত্য ও গদ্যে নানা ধরণের সংরূপের উদ্ভব জলবিভাজকের কাজ করেছিল ; আমি সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি । এক নতুন নন্দনক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল সাহিত্যের এলাকায়, যে এলাকায় লেখক নামের নির্মিত-প্রতিস্বের মানুষটির লেখনকর্মকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে নৈতিকতা আর বৈধতা আরোপের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল । ফলে লেখনকর্ম বা পাঠবস্তুতে সতত কেন্দ্র দখল করে থাকলেন লেখ-সৃষ্টিকারী ব্যক্তিমালিকটি ।
         ইংরেজরা আসার পরই, আর বাংলা কথাসাহিত্যের শুরুতেই যে লেখকরা নির্মিত-প্রতিস্ব নিয়ে লেখন-পরিসরে নেমেছিলেন, তা কিন্তু নয়। লেকন পরিসরে ব্যক্তিনামের লালন, ব্যক্তি-আধিপত্যের ছাপ, ব্যক্তিপ্রসূত রচনাগত মৌলিকতা, ব্যক্তিসৃজনশীলতা ইত্যাদি প্রতর্কগুলো হিন্দু বাঙালির জীবনে প্রবেশ করতে পেরেছিল  সেই সময়কার কলকাতায় ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তির মননবিশ্বটি পাকাপাকি ভাবে থিতু হয়ে বসার পর । ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা, ১৮৩৫ থেকে শিক্ষার বাহন হিসেবে ইংরেজি, তারপর ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষিত বাঙালির সমাজে ওই মননবিশ্ব প্রবেশ করতে পেরেছিল। বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে, লেখক হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের মননবিশ্বটি ওই আদরায় নির্মিত হবার পর এবং ফলে, আর একই কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্র দ্বারা রচিত হলো, ১৮৭৩ সালে, প্রথম বাংলা ছোটোগল্প ‘মধুমতী’ । তার আগে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং ১৮৩১ সালে প্রকাশিত ‘নববাবুবিলাস’ আর ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ পাঠবস্তুগুলোতে ওই মননবিশ্বের ছাপ ছিল না ।
         পূর্ণচন্দ্র তাঁর গল্পটিতে নামস্বাক্ষর করেননি । ‘নববাবুবিলাস’ আর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ছদ্মনামে লেখা । নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাংলা ছোটোগল্প -- সংক্ষিপ্ত সমালোচনা’ বইতে জানিয়েছেন যে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সময়কালে ( ১২৮০ থেকে ১৩০৬ বঙ্গাব্দ ) বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একশ ছাব্বিশটি ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছিল যেগুলোয় লেখকরা নামস্বাক্ষর করেননি, এমনকী ছদ্মনামও নয় । রচনার সঙ্গে লেখকের নাম দেওয়ার প্রথাটি প্রবর্তন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবশালী প্রতিনিধি । সেসময়ে ব্রা্‌হ্মধর্ম হয়ে উঠেছিল ওই মননবিশ্বের ধারক ও বাহক । নামস্বাক্ষর না-করার প্রক্রিয়াটি থেকে স্পষ্ট যে কথাবস্তুর রচয়িতারা জানতেন না যে লেখকসত্তা বলে কোনো ব্যাপার হয়, এবং লেখকের নামটি সত্তাটিকে বহন করে । কোনও কথাবস্তু যে মেধাস্বত্ত, সে ধারণাটির প্রতিষ্ঠা হতে সময় লেগেছিল । তার কারণ অস্তিত্বের কেন্দ্রে ব্যক্তিমানুষকে স্হাপনের কর্মকাণ্ডটির প্রভাব, যাকে উনিশ শতকের রেনেসঁস বলা হয়, সেই চিন্তাচেতনাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য অজস্র নির্মিত-প্রতিস্বের প্রয়োজন ছিল । ইউরোপীয় চিন্তনতন্ত্রটির বাইরে যে নন্দনক্ষেত্রটি রয়ে গেল, জলবিভাজিকার অন্য দিকে, তাকে বটতলা নামে এইজন্য দোষারোপ করা হল যে সেই এলাকায় ব্যক্তিএককগুলো অনির্মিত। জেমস লঙ বললেন বটতলার বইগুলো অশ্লীল ও অশোভন, যার দরুন বাংলার সংস্কৃতি থেকে লোপাট হয়ে গেল বইগুলো ।
         ইউরোপ থেকে আনা সাহিত্য-সংরূপগুলোর সংজ্ঞার স্বামীত্ব, তাদের ব্যাখ্যা করার অধিকার, দেশীয়করণের বৈধতা, সেসব বিধিবিধান তত্বায়নের মালিকানা, কথাবস্তুটির উদ্দেশ্যমূলক স্বীকৃতি, চিন্তনতন্ত্রটির অন্তর্গত সংশ্লেষে স্বতঃঅনুমিত ছিল যে, অনির্মিত লেখকপ্রতিস্বের পক্ষে তা অসম্ভব, নিষিদ্ধ, অপ্রবেশ্য, অনধিকার চর্চা । ব্যাপারটা স্বাভাবিক, কেননা যাঁরা সংজ্ঞাগুলো সরবরাহ করছেন, তাঁরাই তো জানবেন যে সেসব সংজ্ঞার মধ্যে কী মালমশলা আছে, আর তলে-তলে কীইবা তাদের ধান্দা । ফলে, কোনও কথাবস্তু যে সংরূপহীন হতে পারে, লেখক-এককটি চিন্তনতন্ত্রে অনির্মিত হতে পারে, রচনাকার তাঁর পাঠবস্তুকে স্হানাংকমুক্ত সমাজপ্রক্রিয়া মনে করতে পারেন, বা নিজেকে বাংলা সাহিত্যের কালরেখার বাইরে মনে করতে পারেন, এই ধরণের ধারণাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয়নি ওই চিন্তনতন্ত্রটি । বর্তমান কালখণ্ডে, আমরা জানি, একজন লোক লেখেন তার কারণ তিনি ‘লেখক হতে চান’ । অথচ লেখক হতে চান না এরকম লোকও তো লেখালিখি করতে পারেন । তাঁরা সাহিত্যসেবক অর্থে লেখক নন, আবার সাহিত্যচর্চাকারী বিশেষ স্হানাংক নির্ণয়-প্রয়াসী না-লেখকও নন । তাঁদের মনে লেখক হওয়া-হওয়ি বলে কোনও সাহিত্য-প্রক্রিয়া থাকে না ।
         বহুকাল যাবৎ বিভিন্ন আলোচককে মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, উপন্যাস আর্ট ফর্মটির বঙ্গীয়করণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, ছোটোগল্প আর্টফর্মটিকে সম্পূর্ণ দেশজ করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সনেট-তের্জারিমা-ভিলানেলকে এতদ্দেশীয় করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী ইত্যাদি ।  এই যে একটি ভিন্ন ভাষসাহিত্যের সংরূপকে আরেকটি ভাষাসাহিত্যে এনে সংস্হাপন, এর জন্য দ্বিভাষী দক্ষতা এবং সংরূপটি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানই যথেষ্ট নয় । যিনি এই কাজটিতে লিপ্ত, তাঁর গ্রাহীক্ষমতা, বহনক্ষমতা ও প্রতিস্হাপন ক্ষমতা থাকা দরকার। অমন ক্ষমতা গড়ে ওঠে জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে । আর এই জ্ঞান আহরণ তখনই সম্ভব যখন আ্হরণকারীর লেখক-প্রতিস্বের নির্মাণ ঘটে জ্ঞানটির পরিমণ্ডলে ।
         অনির্মিত লেখক-একককে ব্র্যাণ্ডার ম্যাথিউজ প্রণীত ছোটোগল্পের সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা যাক । ‘দি ফিলজফি অফ দি শর্ট স্টোরি’ বইতে ম্যাথিউজ বলেছেন, “যাহা কেবলমাত্র গল্প এবং পরিসরে ক্ষুদ্র, তাহাই ছোটোগল্প নহে । ভাবের ঐক্য ছোটোগল্পের পক্ষে অপরিহার্য এবং এইখানেই উপন্যাসের সহিত ইআর পপধান প্রভেদ । ছোটোগল্পে ভাবের ঐকভ আছে, উপন্যাসে নাই ।  ক্ল্যাসিকাল ফরাসি নাটকের তিনটি ঐক্যই ফরাসি নাটকে আছে ; ইহা একটি ক্ষেত্রে, একটি দিনে, বিশেষ একটি ঘটনা দেখায় । ছোটোগল্পে একটিমাত্র চরিত্র, ঘটনা বা ভাব থাকে, অথবা একটিমাত্র পরিস্হিতির পটভূমিকায় কতকগুলো ভাবের সমাবেশ ঘটে।” এখন, অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কাছে ‘ভাবের ঐক্য’, ‘ভাবের সমাবেশ’ ‘ক্লসিকাল ফরাসি নাটক’ ইত্যাদি ভাবকল্পগুলো দুর্ভেদ্য থেকে যাবে, এবং ব্যাখ্যার পরও বিমূর্ততা কাটবে না ।
         ‘অ্যান ইনট্রোডাকশান টু দি স্টাডি অফ লিটারেচার’ বইতে দেয়া ডাবলু. এইচ. হাডসন-এর তৈরি অনুশাসনের প্রেক্ষিতেও ব্যাপারটা বিচার করা যেতে পারে । হাডসন বলেছেন, “ছোটোগল্পে শিল্পকলার মূল্য নির্ধারণের জন্য ‘একক উদ্দেশ্য ও ভাবের ঐক্য’ বজায় আছে কিনা তা দেখা উচিত।” এখানেও প্রশ্ন উঠবে ‘শিল্পকলা’, তার ‘মূল্য নির্ধারণ’ এবং ‘একক উদ্দেশ্য’ ভাবকল্পগুলো নিয়ে । বস্তুত যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার সরবরাহ করা সংজ্ঞায় খাপ খায়নি বলে পূর্ণচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের লেখা ‘মধুমতী’ রচনাটিকে সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হয়নি । সার্থক ছোটোগল্পের তকমা দেয়া হল ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘দেনাপাওনা’ রচনাটিকে । ছোটোগল্পের সংজ্ঞাকে গভীরভাবে বুঝতে না পারলে ‘সার্থক’ ছোটোগল্প লেখা সম্ভব ছিল না । সার্থকতা নামের মানদন্ডটি ওই চিন্তনতন্ত্রের ফসল । বর্তমান কালখণ্ডে ওই চিন্তনতন্ত্র বাতিল হয়ে গেছে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ ।
        ওপরের কথাগুলো এইজন্য বলতে হল যে অবনী ধর, যাঁর চোদ্দটি গদ্য নিয়ে ‘ওয়ান সট’ বইটি  প্রকাশিত হয়েছিল, তিনি ছোটোগল্প-লেখক বা গল্পকার হওয়া-হওয়ি অবস্হান থেকে সেগুলো লেখেননি, এবং তাঁর লেখক-প্রতিস্বটি ছিল অনির্মিত । ১৯৬৯ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত, এই কালখণ্ডে তিনি এও চোদ্দটি গদ্যই লিখেছিলেন। ১৯৭৫ সালের পর তিনি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনের সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছিল, অশোকনগরে, কিন্তু তখনও তিনি লেখালিখি আরম্ভ করেননি, যদিও তিনি নিজের জীবনের এই ঘটনাগুলো শোনাতে ভালোবাসতেন । তাঁর কথনভঙ্গিমা ও জীবননাট্যের ঘটনা থেকে স্পষ্ট ছিল যে কথাবস্তুর পরিসরটি সেই সময়ের সাহিত্যিক ডিসকোর্স এবং কাউন্টার-ডিসকোর্স থেকে একেবারে আলাদা, এমনকী হাংরি আন্দোলনের গল্পকার-ঔপন্যাসিক থেকেও আলাদা । ১৯৯৪ সালে কলকাতায় ফিরে জানতে পারি যে অবনী ধরের রচনাগুলো নিয়ে বই বের করার উৎসাহ কোনও হাংরি আন্দোলনকারী দেখাননি । আমি শর্মী পাণ্ডেকে অনুরোধ করি যে অবনী ধরের গদ্যগুলো নিয়ে একটা সংগ্রহ ওদের শিলালিপী প্রকাশনী থেকে বের করতে । শর্মী আর ওর স্বামী শুভঙ্কর দাশ তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায় আর আমাকে একটা ভূমিকা লিখে দিতে বলে । এই সময়ে অবনী ধরের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ ঘটে আর ওনার জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে ফেলি । অবনী ধর বইটার নাম রেখেছিলেন ‘ওয়ান শট’, কিন্তু প্রচ্ছদ আঁকার সময়ে তা ‘ওয়ান সট’ হয়ে যায় ।
         অবনী ধর জন্মেছিলেন ১৯৩৪ সালে, তখনকার পূর্ববঙ্গের মাদারিপুর জেলার কালাকিনি থানার পাঙাশিয়া গ্রামে. তাঁর মামার বাড়িতে । মারা যান ২০০৭ সালে, অশোকনগরে । তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র ধর ( ১৯০৫ ) ওই জেলার মাইচপাড়া গ্রামের নিবাসী ছিলেন, সাত ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট ; বঙ্কিমচন্দ্র ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন, কিন্তু কখনও কোনও চাকরি বা ব্যবসা করেননি ; স্বাদেশী আন্দোলনে যোগ দেবার কারণে কয়েকমাসের জেল হয়েছিল তাঁর । বঙ্কিমচন্দ্র তখনকার দিনের ম্যাট্রিক পাশ ছিলেন, অর্থাৎ যে চিন্তনতন্ত্রের কথা একটু আগে বলেছি, তার মননবিশ্বে অবনী ধরের প্রতিস্বনির্মাণের সুযোগটি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল, বিশেষ করে অবনী ধর যখন তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ।
         অবনী ধরের বয়স যখন এক বছর, তখন তাঁর বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে, তাঁর মা লাবণ্য ধর ( ১৯১৫ - ১৯৭৭ ) , আর ঠাকুমাকে নিজেদের ভাগ্যের ওপরে ছেড়ে দিয়ে, অন্য এক তরুণীর সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, এবং বাকি জীবন বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গিনী বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরূপে ভিক্ষা করে চালিয়েছিলেন । যদিও বঙ্কিমচন্দ্র মারা যান ১৯৬২ সালে, তাঁর মৃত্যুর খবর অবনীরা পান ১৯৭২ সালে । ততোদিন তাঁর মা শাঁখা-সিঁদুর পরতেন । অবনী ধরের লেখক-প্রতিস্ব প্রাগুক্ত চিন্তনতন্ত্রের  পরিসরে যদি গড়ে উঠত, তাহলে তিনি এই ট্র্যাজেডির মুহূর্তটি নিয়ে একটি কথাবস্তু তৈরি করতে পারতেন, কেননা ইউরোপীয় সাহিত্যে গ্রিসের সময় থেকে ব্যক্তি-এককের ট্র্যাজেডিটি লেখকত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান ছিল, যা খ্রিস্টের নৃশংস হত্যা ও আত্মবলিদানের প্রতীকি অতিকথার প্রচার-প্রসারের কারণে সাহিত্যের নন্দনক্ষেত্রটিকে দখল করে নিতে পেরেছিল । তাছাড়া বাইবেলোক্ত “আরিজিনাল সিন” বা প্রথম পাপের পতনযন্ত্রণাকে সর্বজনীন নৈতিক-দার্শনিক বনেদে পালটে ফেলার জন্যেও জরুরি ছিল ইউরোপীয় সাহিত্যের পাতায় পাতায় ব্যক্তি-ট্র্যাজেডির উপস্হিতি ।
         অবনী ধরের জীবনে বহুবার বহুরকম ট্র্যাজেডি সংঘটন দেখা গেছে, কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতার সরাসরি মালিকানা সত্তেও তিনি সংঘটন-মুহূর্ত বা ক্লাইম্যক্স বা হুইপক্র্যাক এনডিং প্রয়োগ করে কথাবস্তুকে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-অনুশাসন ও হেলেনিক মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্ত করেননি । প্রকৃত প্রস্তাবে কথাবস্তুগুলো গড়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক সাহিত্য-মূল্যবোধের আওতার বাইরে । প্রসঙ্গত, যে সময়ে অবনী ধর তাঁর প্রথম পর্বের গদ্যগুলো লিখেছিলেন, সেসময়ে মান্যতাপ্রাপ্ত বাংলা ছোটো গল্পকাররা ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুশাসন মোতাবেক, বিষণ্ণতা, পারক্য, প্রেমের বিকার, মৃত্যুপ্রবণতা, নিঃসঙ্গতার বেদনা,শহুরে যৌনতা ইত্যাদির চর্চা করছিলেন ।
         বাবা বঙ্কিমচন্দ্র তাঁদের একা ফেলে নিরুদ্দেশ হবার কারণে বছর পাঁচেক অন্নকষ্টে ভোগার পর তখনকার বিহারে ( এখন ঝাড়খণ্ড ) মধুপুরনিবাসী অবনীর ‘বুড়োমা’ অর্থাৎ তাঁর ঠাকুর্দার ভাইয়ের স্ত্রী, অবনী ও তাঁর মাকে দেখাসোনার জন্য, ও নিজের বার্ধক্যে দেখভালের জন্য, সেখানে নিয়ে গেলেন । যদিও অবনীর জ্যাঠামশাবরা, প্রথম দুজন ডাক্তার, ততীয়জন উকিল, চতুর্থজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এবং পঞ্চম ও ষষ্ঠ যথাক্রমে দেওঘর ও মধুপুরে আশ্রম বসিয়ে তার মোহন্ত ছিলেন, অবনীর পড়াশুনার এবং স্কুলে ভর্তি হবার সুরাহা হলো না । বুড়োমার আশ্রয়ে অবনী ও তাঁর মায়ের অন্ন সমস্যার সমাধান হলেও, শিক্ষাপ্রাপ্তির সুযোগ ঘটল না । স্কুলে ভর্তির জন্য অবনীকে কলকাতার চেতলায় মামারবাড়ি যেতে হলো । প্রবাদবাক্যের মামার বাড়ির আবদারের বদলে অহরহ দুর্ব্যাবহার জোটায়, ১৯৫০ সালের পয়লা অক্টোবর, কাউকে না জানিয়ে, স্কুল থেকে পালিয়ে, অবনী চলে গেলেন মার্চেন্ট নেভিতে, খালাসির কাজ নিয়ে । তখন তাঁর ষোলো বছর বয়স ।
         এই সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো অবনী সংগ্রহ করেন জাহাজে খালাসির কাজ করার সময়ে, বিভিন্ন দেশের বন্দর-শহরে, ইউরোপ তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাঙন কাটিয়ে উঠতে পারেনি । বস্তুত তাঁর খালাসিপর্বের কথাবস্তুগুলো, কথনভঙ্গীর অন্তর্গত আহ্লাদময়তার কারণে, সুখশ্রাব্য ও কৌতূহলোদ্দীপক ছিল, যে গল্পগুলো বাসুদেব দাশগুপ্তকে তিনি শোনাতেন । অনেকে মনে করেন বাসুদেব দাশগুপ্তের গল্পগুলোর উৎস হলো অবনী ধরের অভিজ্ঞতা । লেখালিখি না করেও অবনী ধর তাঁর জীবনযাপনের কারণে নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করতেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে খালাসিটোলায় ঢুঁ মারতেন । বাসুদেব দাশগুপ্ত ও শৈলেশ্বর ঘোষের প্ররোচনায় সোনাগাছির যৌনকর্মী বেবি, মীরা এবং দীপ্তির সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ফেলেছিলেন ।
         হাংরি আন্দোলনের সময়ে, উৎসাহদানকারী সম্পাদক ও স্তাবকদলের অভাবে, এবং অবনী ধরের সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খার অনুপস্হিতিতে, তাঁর বলা কাহিনিগুলো লিখিত পাঠবস্তুর আকার নিতে পারেনি । জরুরি অবস্হার শেষে সারা পশ্চিমবাংলা জুড়ে লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটলেও, সম্পাদকরা অবনীর গদ্য সম্পর্কে আগ্রহী হননি, মূলত তাঁর কথনভঙ্গীর ও রচনাকাঠামো বিদ্যায়তনিক সংরূপ বহির্ভূত ছিল বলে । একজন খালাসির গদ্যসন্দর্ভে যে যাযাবরতার নিবাস, যার উপকরণগুলো যাত্রাপথের খুদে অনির্ণেয়তায় তাৎপর্যময়, যার বিন্যাসে ভাসমান পরিভ্রমণের অনুন্মোচিত বাচন, স্নায়ুভাষায় রচিত সেরকম স্বতঃজাত কৃৎপ্রকরণ, স্বীকৃতি পায়নি লিটল ম্যাগাজিন স্তরেও । যেহেতু অবনীর পাঠবস্তু আত্মমগ্নতাকে অতিক্রম করে যায়, এবং তাঁর বাকব্যঞ্জনা বদ্ধসমাপ্তির কাঠামোটাকেই উপহাস করে, প্রধাগত আলোচকদের দৃষ্টিও তিনি আকর্ষণ করতে পারেননি ।
         অবনীর ও তাঁর আত্মীয় পরিজনের পরিবারে নিরুদ্দিষ্ট, সাধু, সন্ন্যাসী, মোহন্ত, ভিখারি-বৈষ্ণব, বাউল ইত্যাদির পূর্বেতিহাস থাকার কারণে অবনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মা চিন্তিত ছিলেন । বয়ঃসন্ধি অতিক্রান্ত সন্ধিক্ষণে তাঁর ছেলে হয়তো কোনও বন্দরশহর থেকে বিদেশিনী বিয়ে করে বা না-করে সঙ্গে এনে একদিন হাজির হবেন, এমন দুশ্চিন্তাও লাবণ্য ধরের ছিল । ছেলের চরিত্রে অভিজ্ঞতাজনিত পার্থক্যও তিনি লক্ষ্য করে থাকবেন । তিনি অবনীকে বললেন জাহাজের চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসতে । খালাসির চাকরি ছেড়ে ১৯৫৫ সালে ফিরে এলেন অবনী ।  বুড়োমা মারা যেতে তাঁর মা মধুপুরে একা হয়ে পড়েছিলেন । অবনী দেশে ফিরে চেতলার একটা বস্তিঘরে, মামার বাড়ির কাছে, বাসা ভাড়া নিয়ে মাকে মধুপুর থেকে নিয়ে এলেন । ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩, এই আট বছর টাকা রোজগারের জন্য নানা রকম জীবিকার অভিজ্ঞতা হলো অবনীর --- ক্রেন-ড্রেজার-ডাম্পার অপারেটার, লরি-ট্যাকসি-প্রায়ভেট মোটরগাড়ি চালক, রেলওয়ে ক্যাটারিঙের বেয়ারা, কোককয়লা ফেরি, ঠোঙা ও প্যাকেট তৈরি, পোস্টার-ফেস্টুন লেখা ইত্যাদি, অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য যে-ধরণের কাজ পাওয়া যায় সবই করলেন । ১৯৬২ সালে অবনীর মা পাত্রী নির্বাচন করে সাধনার সঙ্গে তাঁর বি্য়ে দেন ।
         অবনী তাঁর সংসার ইতিমধ্যে চেতলা থেকে নতুন গড়ে-ওঠা উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কলোনি অশোকনগরে তুলে নিয়ে যান । তখন সেখানে স্হানীয় স্বায়ত্বশাসনের পরিকাঠামো বিশেষ ছিল না । তিনি নবতর অভিজ্ঞতার সামনে পড়লেন অশোকনগরে । তিনি এও দেখলেন যে, যাঁদের মাঝে তিনি বসবাস করতে এলেন, তাঁরা পপতিদিনকার মূর্ত নাগরিক অসুবিধা ও জাগতিক দুঃখকষ্টে ও অভাব প্রতিকারের বদলে সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, ভিয়েৎনাম, কিউবা, আমেরিকা, দিল্লী ইত্যাদি সুদূরবর্তী বিমূর্ত অদরকারি তর্কাতর্কিতে সময় ও ক্ষমতা অপচয় অপচয় করে আনন্দ পান । অর্থাৎ সুপ্রাইণ্ডিভিজুয়াল বা অধিব্যক্তিক ম্যাক্রোলেভেল ভাবুকদের পশ্চিমবাংলার মাটিপৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন তৎপরতার প্রেক্ষিতে, তাঁর মাইক্রোলেভেল খালাসিত্ব তাঁকে কল্যাণকামীতার স্বাভাবিক সনাতন মূল্যবোধে হায়ারার্কিবর্জিত করে রেখেছিল, এবং সেই ভূমিজ প্রবৃত্তিকে অবনী ধর কাজে লাগালেন ।
         তিনি এবং আরও কয়েকজন মিলে, বিশেষ করে শিক্ষক সমর ঘোষ, অশোকনগরে ডাকঘর বসানো, পৌরসভা গঠন, অসামাজিক কাজকারবার বন্ধ ইত্যাদির উদ্যোগ নিলেন । উদ্যোগটিকে কন্ঠস্বর দেবার জন্য, এবং তাঁদের অভাব-অভিযোগ যাতে কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছোয়, ১৯৬৪ সালে পপকাশ করা আরম্ভ করলেন ‘অশোকনগর বার্তা’ নামে একটি পাক্ষিক সংবাদপত্র, যেটি ছিল ওই অঞ্চলের প্রথম পঞ্জিকৃত সংবাদপত্র । পত্রিকাটির আয়ু ছিল তিন বছর, সম্ভবত যথেষ্ট । পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, নিজের অভিজ্ঞতাকে কথাবস্তুতে রূপান্তরিত করে ছাপাবার কথা তাঁর মনে আসেনি কখনও ; পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত অন্যেরাও তাঁর মুখে ঘটনা শুনেও তাঁকে লিখতে বলেননি । সম্ভবত সমাজচিন্তনকে আত্মসাৎ করে ব্যক্তি-ক্রিয়াকরণের চিন্তা-পরিসর লালিত হবার মতো পৃথকত্ববোধ জাগার সুযোগ বা মনস্হিতি তাঁর হয়নি । ১৯৬৩ সাল থেকে চাকুরিহীন অবনীর কাছে আপনা থেকেই পরিত্যক্ত হয়েছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দর্শন ।
         অবনী ধরের কথাবস্তুগুলোকে দুটি পর্বে চি্‌হ্ণিত করা যায় । প্রথম পর্বটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্বটি ২০০০ সালের পর । মাঝে লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন । প্রথম পর্বে তিনি ছিলেন অর্থস্রোতহীন এবং কোনও সাহিত্যিক স্বকীয়তা আনার প্রয়াস করেননি । তা আপনা থেকে হয়ে গিয়েছিল তাঁর অনির্মিত লেখক-প্রতিস্বের কারণে । অবনী ধরের ডিসকোর্স, কখনও খালাসির, কখনও বা অসংগঠিত শ্রমিক বা কর্মহীনের, ভূপ্রকৃতির উথ্থানভূমিলব্ধ, স্হানিক, অবিমিশ্র, মুক্ত, যৌগিক, বর্ণিল, অনুভূমিক, প্রতিসংস্হাপিত, কৌমনিষ্ঠ এবং অতিজ্ঞাপনমূলক । প্রথম লেখাটি, ‘আমার দুঃখী মা’ রচনার পর তিনি তা লাবণ্য ধরকেই পড়ে শুনিয়েছিলেন । স্তম্ভিত মা কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর. বলেছিলেন, ‘সত্য কথাই ল্যাখছস।’
         দ্বিতীয় পর্বের শুরু ২০০০ সালে । এই পর্বে অবনীর গদ্য-কাঠামোয় কয়েকটি কারণে সাইত্যিকতা এসে গেছে । তাঁর স্ত্রী, আরও কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে একজোট হয়ে মামলা করে ১৯৯০ সালে চাকরি পাবার পর অবনীর আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটে । তাঁর মেয়ে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ও বি এড এবং ছেলে বি এ পাশ করেন । অর্থাৎ প্রথম পর্বের জ্ঞান পরিমণ্ডলটি, তাঁর মেয়ে ও ছেলের প্রভাবে ক্রমশ অপসারিত হয়ে বাড়ির মধ্যে একটি ভিন্ন, যা অবনীর কাছে তুলনামূলকভাবে উচ্চতর ঠেকে থাকবে, জ্ঞানপরিমণ্ডলের প্রবেশ ঘটিয়েছে । তৃতীয়ত, তাঁর প্রথম পর্বের রচনাগুলো, অন্তত কিছু সাহিত্যপাঠকের, হাতে গোনা হলেও, দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে, যাঁদের পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় তিনি উৎসাহিত হয়ে থাকবেন গদ্যগুলোকে একটি সাহিত্যিক আদল-আদরা দেবার । দ্বিতীয় পর্বের কথাবস্তুগুলোর গদ্যবিন্যাসে ধরা পড়ে যে প্রথাবাহিত গদ্যসাহিত্যের সঙ্গে, যেগুলো তাঁর ছেলে-মেয়ে নিজেরা পড়ার জন্য বাড়িতে এনে থাকবেন, তাঁর যোগাযোগ ঘটেছে । অবনী নিজে চেষ্টা করলেও, এই বয়সে পৌঁছে, তাঁর পক্ষে মুকুরবিম্ব গড়া সম্ভবপর হয়নি, এবং তাঁর অপরত্ববোধ ও সাহিত্যিক অপরত্ব মুছে যায়নি । প্রথম ও দ্বিতীয়, দুটি পর্বেই, তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা তাড়িত হয়েছে অপরত্ববোধের অবস্হাননজনিত  বিপর্যয় দ্বারা। আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিকের কথাবস্তুতে, অপরত্ববোধের মাত্রাগুলোকে, অবনীর মতো করে ইতোপূর্বে উপস্হাপন করতে দেখা যায়নি । তাঁর মস্তিষ্কে আতিথ্য নেয়া কথাকারটি নিজেরই স্মৃতির ঐতিহাসিক হিসেবে অবনীর সামনে উদয় হয়েছে কখনও-সখনও, যিনি অতীতকে বাঁচিয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন না বা অতীতে বেঁচে থাকার কথা বলছেন না ; আসলে কথাকার ওই দূরবর্তী এবং নিকট অতীতের লোপাট হয়ে যাওয়া ও তাকে বাগে আনার বাচনক্রীড়ায় অংশগ্রহণকারীরূপে ‘অপর প্রতিসন্দর্ভের’ সতর্কতাগুলো জাহির করছেন ।
        অবনীর বইটি যদি আরেকবার প্রকাশ করা হয়, তাহলে গদ্যগুলোকে প্রকাশকাল অনুযায়ী সাজিয়ে নিলে ভালো হয় । সেই সঙ্গে বইয়ের নামটাও শুধরে নিতে হবে ; ‘ওয়ান সট’ এর পরিবর্তে ‘ওয়ান শট’ করে দিতে হবে।
        ২০০৭ সালের ৯ অক্টোবর অবনী ধর মারা যান ।


         
         

সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

মলয় রায়চৌধুরী

আমার বাপ-ঠাকুর্দার গল্প


আমার ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী (জন্ম: জানুয়ারি ১১, ১৮৬৬ - মৃত্যু: নভেম্বর ৮, ১৯৩৩) ভারত উপমহাদেশের প্রথম ‘ভ্রাম্যমাণ’ পেশাদার আলোকচিত্রী-চিত্রকরদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। দাদু ১৮৬৬-তে, বর্তমানে যা পাকিস্তান, সেখানে রায়চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি - ফোটোগ্রাফার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস নামে একটা ‘ভ্রাম্যমাণ’ সংস্হা আরম্ভ করেছিলেন; সংস্হা বলতে তিনি আর তাঁর যুবক-তরুণ ছেলেরা, কেন-না কোনো নির্দিষ্ট দোকান উনি প্রথমে খোলেননি, যাঁরা ফোটো তোলাতে চাইতেন, বেশির ভাগই রাজ-ঘরানা বা ধনী পরিবারের সদস্যরা, তাঁদের বাড়ি গিয়ে ফোটো তুলে কিংবা সেই ফোটো থেকে পেইনটিং এঁকে ডেলিভারি দিতে হত, ফলে শহরে-গঞ্জে ঘুরে-ঘুরে ফোটো তুলতে হত ওনাকে। নবাব বা রাজাদের ঘোড়ার বা উটের গাড়ি এসে ওনাকে নিয়ে যেত। এখনকার পাকিস্তানের প্রায় সমস্ত শহরে উনি ফোটো তুলতে যেতেন। সবই আমার ঠাকুমা এবং বড়োজেঠা ও বাবার মুখে শোনা। মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্পর্কে গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা বাবার নাম রেখেছিলেন রঞ্জিত।

১৯৩৩-তে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর জন্মের কয়েকদিন পরেই দাদু মারা যান। দাদু মারা যাবার পর প্রথমে আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী, আর এখন দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বড়ো ছেলে হৃদয়েশ (টোটোন) সংস্হাটাকে চালান। দাদুর সময় থেকে তাঁর ছেলের পৌত্র হৃদয়েশ রায়চৌধুরীর ফোটোগ্রাফির প্রযুক্তিগত কাজ এত পালটে গিয়েছে বলেই শিরোনামে গল্প শব্দটা ব্যবহার করেছি। দাদু কেমন করে ফোটোগ্রাফির ব্যবসায় ঢুকলেন, তা-ও এক গল্প, কেন-না সেসময়ে ইংরেজরাই এই কাজটা দখল করে রেখেছিল। আর রাজা দীন দয়াল।

রায়চৌধুরী পদবি সম্রাট আকবর আর জাহাঙ্গিরের দেয়া, একবার রায় আর একবার চৌধুরী। ১৬৯৮-এ সাবর্ণ রায়চৌধুরীরদের থেকে কলকাতা, সুতানুটি আর গোবিন্দপুরের ইজারা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হাতবদল করার পর তাঁদের আর্থিক অবস্হা খারাপ হয়ে যায়। তাঁরা ব্রিটিশদের সমর্থন করার বদলে সিরাজ-উদ্-দৌলাকে সমর্থন করার দরুন ইংরেজদের নেকনজর থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। সম্রাটের দেয়া সোনার গিনি আর রুপোর টাকা খরচ হয়ে যাবার পর আঠারো শতক থেকে পরিবারের সদস্যরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জীবিকার খোঁজে ছড়িয়ে পড়েন। আসলে শরিকের সংখ্যাও বেশ বেড়ে যাচ্ছিল, কেন-না অনেক সদস্য একাধিক বিয়ে করছিলেন।

দাদুর বাবা ষোলো বছর বয়সে লক্ষ্মীনারাণের বিয়ে তেরো বছর বয়সি কলকাতার পটলডাঙা নিবাসী মুখোপাধ্যায় পরিবারের অপূর্বময়ীর সঙ্গে দেবার পর, শ্বশুরের দাক্ষিণ্যে লক্ষ্মীনারায়ণ কলকাতার তখনকার বুদ্ধিজীবী সমাজের সদস্যদের সঙ্গে পরিচিত হন, যাঁরা বেশিরভাগই ছিলেন ব্রাহ্ম, এবং তাঁদের সান্নিধ্যে ভালো ছবি আঁকতে শেখেন। ব্রাহ্মদের সঙ্গে মেশা অনুমোদন করেননি লক্ষ্মীনারায়ণের মা-বাবা। লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অপূর্বময়ীর জেঠামশায়ের ছেলে। বাবার সংসারে বাবার দেয়া হাতখরচে, স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে লক্ষ্মীনারায়ণের আত্মসম্মানে লাগছিল বলে তিনি ছবি আঁকার মাধ্যমে রোজগারের প্রয়াস আরম্ভ করেন। ত্রৈলোক্যনাথ যখন কলকাতা মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যান্ট কিউরেটার ছিলেন, তখন তাঁর সুপারিশে আমার বড়োজেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থশ্রেণির কর্মীর চাকরি পান, মূর্তি আর ছবি ঝাড়পোঁছ করার; স্বাধীনতার পর বড়োজেঠার পদের নাম হয়েছিল ‘কিপার অভ পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার’, মাইনে একশো টাকা। আরম্ভ করেছিলেন দশ টাকায়। আমি শৈশবে গরমের ছুটিতে বড়োজেঠার সাইকেলের পেছনের সিটে বসে মিউজিয়ামে যেতুম আর ঘরে-ঘরে ঘুরে বেড়াতুম; সে অভিজ্ঞতা আমার লেখালিখিতে কাজে দিয়েছে।

ব্যবসার কাজে সে সময়ে বাহওয়ালপুরের (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত) আমিরের প্রতিনিধি কলকাতায় ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, এবং তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মীনারায়ণের পরিচয়ের সুযোগ হয়। আমিরের প্রতিনিধি লক্ষ্মীনারায়ণের আঁকবার প্রতিভায় মুগ্ধ হন, এবং দাদুকে বাহাওলপুর রাজ্যে রাজপরিবারের সদস্যদের স্কেচ আর তা থেকে পেইনটিং আঁকার জন্য সস্ত্রীক অতিথি হিসাবে যাবার আমন্ত্রণ জানান। লক্ষ্মীনারায়ণ ছয় মাস পর বাহাওলপুর পৌঁছান; আমির তাঁর আঁকা প্রতিকৃতি দেখে লক্ষ্মীনারায়ণেকে প্রশংসার চিঠি দিয়েছিলেন যা-তে তিনি চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ইত্যাদি রাজপরিবারে গিয়েও ছবি এঁকে রোজগার করতে পারেন। বড়োজেঠা বলেছিলেন যে বাহাওলপুরের দুটি ডাকটিকিটের ড্রইং লক্ষ্মীনারায়ণের আঁকা, তা-তে সেখানকার আমিরের মুখাবয়ব ছিল। পাকিস্তানে এখন যেমন সামন্তবাদের রমরমা, তখন আরও বেশি ছিল, তাঁরা এমনকি কেনা গোলাম আর বাঁদি রাখতেন। বড়োজেঠার মুখে শুনেছি যে, যারা হাজার-হাজার একরের মালিক ছিল তাদের বলা হত তালুকদার, মনসবদার, মাহের, নবাব, নবাবজাদা, চৌধারি, খান, জাগিরদার, সরদার, মাহালওয়ার ইত্যাদি --- এদের কাছ থেকে দাদু ফোটো তোলার জন্য ডাক পেতেন।



বিভিন্ন রাজপরিবারের সদস্যদের মুখাকৃতি আঁকার সূত্রে লক্ষ্মীনারায়ণ আফগানিস্তানের রাজপরিষদের সদস্যদের ছবি আঁকার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। অন্যান্য সামন্তপ্রধান অথবা শিয়া ধর্মগুরুদের দরবারে আতিথ্যের সময়ে তাঁর স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হন এবং লক্ষ্মীনারায়ণ লাহোর শহরে কিছুদিনের জন্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা আরম্ভ করেন। লাহোর শহরে রোজগেরে কাজের খোঁজে তিনি তখনকার মেয়ো কলেজ অভ আর্টসের (বর্তমানে পাকিস্তানের ন্যাশানাল কলেজ অভ আর্টস) অধ্যক্ষ জন লকউড কিপলিংয়ের স্টুডিয়োয় কর্মচারীর চাকুরি পান। জন লকউড কিপলিং পরে লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার হন। ইনি ছিলেন রুডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা।
জন লকউড কিপলিংয়ের বাড়িতে ও দফতরে কাজ করার সময়ে লক্ষ্মীনারায়ণ পরিচিত হন নতুন উদ্ভাবিত ফোটো তোলার ক্যামেরার সঙ্গে। ১৮৩০-এ লুই ড্যাগোরো ক্যামরা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু সেটিতে একবারে কেবল একটিই ফোটো তোলা যেত, সেই ফোটোকে নুনজলে চুবিয়ে স্হায়ীত্ব দেয়া হত, কিন্তু তা কিছুকাল পরেই হলদেটে হয়ে যেত। ১৮৪১-এ ফক্স ট্যালবট আবিষ্কার করেন ক্যালোটাইপ প্রক্রিয়া। ক্যালোটাইপের মাধ্যমে একাধিক ফোটো প্রিন্ট করা সম্ভব হতে লাগল, কিন্তু তখনও কাগজে। ১৮৮০ নাগাদ ভারতে জিলেটিন প্রক্রিয়ায় ফোটো তৈরির কৌশল এসে পৌঁছোয়, প্রধানত ব্রিটিশ ফোটোগ্রাফারদের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় কোলোডিয়ান প্রক্রিয়ার বদলে জিলেটিনের শুকনো প্লেট ব্যবহার করা হত— কাচের প্লেটের উপর লাগানো সিলভার হ্যালিডেসের ফোটোর রসায়ন। নতুন বেলোলেন্স ক্যামেরাও এই সময়ে আবিষ্কার হয়। হারমোনিয়ামের যেমন বেলো হয়, বেলোলেন্স ক্যামেরাতেও তেমন বন্ধ আর খোলার ব্যবস্হা ছিল।

দাদু ফোটোগ্রাফি শিখতে লাগলেন, কিন্তু নতুন কাজের জন্য ডার্করুমের দরকার পড়ল। লক্ষ্মীনারায়ণ একটি বেলোলেন্স ক্যামরা, ক্যামেরার তিন-ঠেঙে স্ট্যাণ্ড কিনে ১৮৮৬-তে লাহোরে স্হায়ী ব্যবসা আরম্ভ করলেন। বাড়িতে একটি ছোটো ঘরকে ডার্করুম হিসাবে ব্যবহার করতেন, জানলাগুলো কালো কাপড়ে ঢাকা দিয়ে। মুসলমান পরিবারের বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, পর্দাপ্রথার কারণে ঘরগুলোয় জানালা একটি বা দুটি ছিল। ব্যবসায়িক সংস্হার নাম রাখলেন রায়চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি - ফোটোগ্রাফার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস। বাবা যখন পাটনায় দোকান করেন তখন এই নামই বজায় রাখেন। আমার ভাইপো হৃদয়েশ. নামটা পালটে ফেলেছে, যা-তে অন্য শরিকরা গিয়ে ব্যবসার অংশ না দাবি করে; তাছাড়া বাবা নিজের পুঁজিতে ব্যবসা চালাতেন, তখন খদ্দেররা বক্স ক্যামেরা আর ভিউ ফাইন্ডার ক্যামেরা কিনত যা পনেরো টাকা থেকে সাতশো টাকায় পাওয়া যেত। ভাইপো যে-ক্যামেরা বিক্রি করা আরম্ভ করেছে তা এক লাখ-দুই লাখ টাকা দামের, যার পুঁজিনিবেশ ক্যামেরা কোম্পানিরাই করেছে, তারাই দোকানের ভোল মাঝে-মাঝে পালটে দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে থাকে। ক্যানন, নিকন-এর বিশাল বোর্ডের পাশে ছোটো করে লেখা থাকে ‘রায়চৌধুরী ফোটোগ্রাফার্স’। অ্যানালগ ফোটোগ্রাফি পৌঁছেচে ডিজিটাল ফোটোগ্রাফিতে। স্টুডিয়ো আর নেই, পুরো দোকানবাড়ি নানারকম ক্যামেরা, কম্পিউটার আর যন্ত্রপাতিতে ভরা।

বক্স ক্যামেরা আর ভিউফাইন্ডার ক্যামেরায় ফিলমের রোল লাগাতে হত, বাইরে লাল আর ভেতরে কালো কাগজের রোলের কালো দিকে কাঁচকড়ার লম্বা ফিল্ম, ক্যামেরার সাইজ অনুযায়ী বারোটা বা ষোলোটা উঠত, ফিলমের সাইজ সম্ভবত ছিল ১২০; এই সাইজে কম ফোটো হত বলে ৩৫ এমএম ফিল্ম বাজারে আসে যা-তে ৩৫/৩৬-টা ফোটো তোলা যেত। বাবা এই ফিল্মগুলো ডিভেলপ করে একটা তারে ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে ফ্যান চালিয়ে দিতেন। এখন আমার ভাইপোর দোকানবাড়িতে প্রতিটি ঘরে এয়ারকাণ্ডিশান বসাতে হয়েছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি বলে বিখ্যাত কোডাক কোম্পানি প্রায় উঠে যেতে বসেছে। লেন্স জিনিসটা এখন সর্বত্র, বাড়িতে, রাস্তায়, রকেটে, আকাশযানে, যুদ্ধাস্ত্রে, লুকোনো ছোট্ট গ্যাজেটে। বাবার বেলোলেন্স ক্যামেরার লেন্স কোনো কাজে লাগাতে না-পেরে দাদা সেটা উৎসব চট্টোপাধ্যায়কে দান করেছিলেন। উৎসব আমার মুখের একটা পেনসিল স্কেচ আর ‘জখম’ কাব্যগ্রন্হের কভার এঁকে দিয়েছিল।

ইতোপূর্বে মুখাকৃতি এঁকে তা থেকে দাদু তৈলচিত্র তৈরি করতেন। রাজপরিবারের সদস্যদের বেশ কিছুক্ষণ ঠায় তাঁর সামনে বসে থাকতে হত এবং সে কারণে তাঁরা বিরক্ত হতেন। পর্দাপ্রথার কারণে রাজপরিবারগুলোতে মহিলা সদস্যদের পেইনটিং আঁকতে লক্ষ্মীনারায়ণের অসুবিধা হত। ক্যামেরা কেনার পর আর তাঁর সামনে বসে থাকার সমস্যা রইল না। অন্যান্য রাজঘরানা ও ধনীদের ফোটোতোলারও সুযোগ পেলেন তিনি। বড়ো ছেলে প্রমোদের পর লাহোরে সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল, বিশ্বনাথ এবং একমাত্র কন্যাসন্তান কমলার জন্ম হয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ফোটো তোলার আমন্ত্রণ পেলে সেই সমস্ত মহারাজা, রাজা, রাজে, দেশমুখ, নবাব, বেগ, খান প্রমুখ পরিবারের সদস্যদের ফোটো তুলতে যেতেন। যানবাহনের ব্যবস্হা তাঁরাই করতেন।

দ্বারভাঙা মহারাজের ডাকে তিনি সপরিবারে পাটনা পৌঁছোন। অত্যধিক খাটুনি আর পাকিস্তানের চর্বিঠাসা মাংস খেয়ে-খেয়ে পাটনা শহরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ ৮ নভেম্বর ১৯৩৩-এ মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে ঠাকুমা আর জেঠা-বাবা-কাকারা দিশাহারা হয়ে যান, কেন-না ব্যবসায়ের জন্য যোগাযোগ পদ্ধতি ও বৈভবশালী ক্রেতাদের সঙ্গে আদান-প্রদানের কৌশল তখনও দাদুর ছেলেরা রপ্ত করতে পারেননি। আর্থিক অবস্হাও ভালো ছিল না। তাঁরা একটা চালাবাড়ি ভাড়া নিয়ে পাটনার বাজাজা নামে এক পাড়ায় বসবাস আরম্ভ করেন; এই বাড়িটা ১৯৩৪-এ পাটনার ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়েছিল। বাড়ির বউদের গয়না বিক্রি করে বড়োজেঠা পাটনার অন্ত্যজ বিহারি ও অত্যন্ত গরিব মুসলমান অধ্যুষিত পাড়া ইমলিতলায় একটা বাড়ি কেনেন। এই ইমলিতলার নানা ঘটনা আছে আমার বাল্যস্মৃতি ছোটোলোকের ছোটোবেলা বইতে।

মেজোজেঠা সুশীল, মেজোজেঠিমা করুণা আর দুই মেয়ে ডলি আর মনুকে নিয়ে বিহারের ছাপরায় একটি শাখা খুলেছিলেন, কিন্তু প্রথমত চালাতে পারলেন না, আর দ্বিতীয়ত মেজোজেঠিমা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলেন, তাই মেজোজেঠাকেও পাটনায় চলে আসতে হল। উত্তরপাড়ার দোকান চালাতে না-পেরে ন-কাকা অনিলও পাটনায় ফিরে যান। বাবা তখন পাটনায় বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিয়ে নীচের তলায় দোকান আর ওপরতলায় স্টুডিয়ো স্হাপন করেন। মেজোজেঠা আর ন-কাকার ওপর ফোটো থেকে পেইনটিং তৈরির কাজ বর্তায়। সকলের সংসার চালানোর দায় বাবার ওপর এসে পড়ে।

বড়োজেঠা পোরট্রেট আঁকতে পারতেন না, উনি প্রাকৃতিক দৃশ্য আর গ্রিক থাম, বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি পেইন্ট করতে পারতেন। স্টুডিয়োর পেছনের দেয়ালে বড়োজেঠা প্রাকৃতিক দৃশ্য এঁকে দিতেন আর একটা গুটোনো ক্যানভাস রোলে প্রাসাদ ইত্যাদি এঁকে দিতেন। যে খদ্দের যেমন ব্যাকগ্রাউন্ড চাইত তার জন্য তেমন ব্যবস্হা করা হত। জমিদার বাড়ির হলে কড়িকাঠের কাছে গুটিয়ে-ওঠানো ক্যানভাসটা নামানো হত। সেই সময়ে স্টুডিয়োতে ফোটো তোলার আলোর জন্য কুঁজোর মাপের বিরাট-বিরাট বালব উঁচুতে কড়িকাঠের কাছে লাগানো থাকত, এক হাজার আর দু-হাজার ওয়াটের। ভোলটেজ ফ্লাকচুয়েশানের কারণে বালবগুলো প্রায়ই ফিউজ হত, কেন-না তখনকার দিনে ভোলটেজ ফ্লাকচুয়েশান নিয়ন্ত্রণ করার যন্ত্র আসেনি। ফোটো তোলার সময়ে বাবা দোকানের সব আলো আর ফ্যান নিভিয়ে দিতেন।

অনেক খদ্দের তাঁদের মা বা স্ত্রীর পুরোনো ফোটো আনতেন, যা-তে কেবল তাঁদের মুখটুকুই আবছা দেখা যায়। এই মুখকে আরেকটি ফোটোর কাঁধে বসিয়ে একটা সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করা হত। মহিলার কাঠামো অনুযায়ী মা কিংবা জেঠিমা মডেলের কাজ করতেন। খদ্দেরের ইচ্ছে অনুযায়ী, পুজোয় বসেছেন বা জমিদারের অ্যাণ্টিক চেয়ারে বসে আছেন, তেমন ফোটো তৈরি করার জন্য মা কিংবা বড়োজেঠিমা পোজ দিতেন আর তাঁদের মুখ সরিয়ে কাঁধের ওপর খদ্দেরের দেয়া মুখ বসিয়ে দেয়া হত। তাঁদের বিধবার থান কাপড়ও পরতে হতো। মা আর জ্যেঠিমা বেশ আহ্লাদিত হতেন যখন শুনতেন যে তাঁদের চেয়ে বয়সে বড় স্ত্রী-পুরুষ তাঁদের পা-জোড়াকে নিজের মায়ের মনে করে প্রতিদিন সকালে প্রণাম করেন,যাঁরা অনেকেই প্রতিপত্তিসম্পন্ন ভূস্বামী। মা ছিলেন একহারা, জেঠিমা একটু মোটার দিকে। এখন ডিজিটাল ফোটোশপিঙের যুগে এসবই অবিশ্বাস্য মনে হবে।
দাদুর ফোটোগ্রাফি ছিল সংসারের জন্য টাকা রোজগারের ব্যাপার। তিনি জানতেন যে তাঁর আগে পেশাদার ফোটোগ্রাফাররা ‘শিল্প’ হিসাবে পেশাটাকে বেছে নিয়েছেন, যেমন স্যামুয়েল বোর্ন হিমালয়ের ফোটোসংগ্রহ গড়ে তুলছিলেন, ফেলিস বিটো তুলছিলেন মহাবিদ্রোহের ফোটো, লিনিয়াস ট্রাইপ দক্ষিণ ভারতের ভাস্কর্য ও স্হাপত্যের কাজ ধরে রাখছিলেন ক্যামেরায়, মেজোর গিল তুলছিলেন অজন্তা-ইলোরার ফোটো, প্রত্নতত্ব বিভাগের জে ডি বেগলার এবং হেনরি হার্ডি কোল পুরাতাত্বিক সংগ্রহগুলোর ছবি তুলছিলেন, কলকাতা শহরকে ক্যামেরায় ধরে রাখছিলেন ফ্রেডরিক ফিবিগ। কিন্তু তাঁরা ক্যামেরার মাধ্যমে যা করছিলেন তা উপনিবেশের প্রসারণ, তাঁরা ভারতবর্ষকে দখল করছিলেন ছবির মাধ্যমে। ব্রিটেন থেকে খ্রিস্টধর্মের প্রচারকরা ভারতে এসে তাঁদের কাজ সম্পর্কে ব্রিটেনে সংবাদ পাঠাতেন ফোটোর মাধ্যমে, যা-তে বৈভবশালীরা তাঁদের আর্থিক সাহায্য করেন।
উপরোক্ত প্রসঙ্গে বিট আন্দোলনের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের কথা বলে নিই। গিন্সবার্গ কলকাতা, বেনারস, পাটনা যেখানেই গেছেন ফোটো তুলেছেন মূলত নুলো, খোঁড়া, অন্ধ, ফুটপাতে আধমরা, নিঃস্ব উদ্বাস্তু, ল্যাংটো সাধু ইত্যাদির। গিন্সবার্গ আমার বাবাকে একটা ফিল্ম ডিভেলপ করতে দিলে, নেগেটিভটা সম্পূর্ণ দেখে বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, ‘তোমরা বিদেশিরা কবি হও বা ট্যুরিস্ট, ভারতে এসে ভালো কিছু দেখতে পাও না, কেবল এই সবই দেখতে পাও’। বস্তুত গিন্সবার্গ তাঁর নিজের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী লেন্সের দৃষ্টির মাধ্যমে একটি থার্ড ওয়ার্ল্ড তুলে ধরতে চাইছিলেন তার ‘ইনডিয়া জার্নালস’-এ, যাকে এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছেন ‘ওরিয়েন্টালিজম’। উনিশ শতকে ব্রিটিশদের উপনিবেশবাদী ফোটোগ্রাফিও ছিল ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’। বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড এবং জনস্টন অ্যান্ড হফম্যান কোম্পানিগুলোর ফোটোগ্রাফিও ছিল উপনিবেশবাদের প্রসার।

ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণকে টক্কর দেবার উদ্দেশ্যে ১৮৬২-এ জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মান সিং একটা ক্যামেরা কিনেছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শৌর্য ধরে রাখার জন্য। ব্রিটিশ শাসকদের অনুকরণ করে রাজা-মহারাজা-নবাবরাও বাঘ বা হরিণ মেরে তার ওপর পা রেখে ফোটো তোলাতে লাগলেন। ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য উনিশ শতকের মাঝামাঝি একটা ডাগেরোটাইপ ক্যামেরা কিনে রাজকীয় শখ হিসাবে ফোটো তোলা আরম্ভ করেন। তাঁর ছেলে বড়োঠাকুর সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মণ বাবার হবিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্রিটিশ পেশাদার ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামেন। লখনউ শহরের ফোটো ভারতীয় চোখে ধরে রাখার দায়িত্ব নেন শৌখিন ফোটোগ্রাফার আহমদ আলি খান আর হাজি আব্বাস আলি, দুজনেই শিয়া মুসলমান, যাঁদের নবাবি ব্রিটিশদের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা বা ‘ওরিয়েন্টালিজম’এবং দেশজ দৃষ্টিভঙ্গি বা ‘অকসিডেন্টালিজম’এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য গড়ার কাজটি করেন রাজা দীন দয়াল (১৮৪৪ - ১৯০৫ ), যিনি হায়দ্রাবাদের নবাবের আনুকূল্য পেয়ে ভারতীয় অভিজাত সমাজ ও ব্রিটিশ শাসকদের মাঝে ফোটোগ্রাফির একটি সেতু গড়তে পেরেছিলেন এবং তাঁকে কাজে লাগিয়ে অঢেল টাকাকড়ি করতে পেরেছিলেন। তিনিও তাঁর দুই ছেলেকে ফোটোগ্রাফির ব্যবসায় লাগিয়েছিলেন; দুর্ভাগ্যবশত তাঁর দুই ছেলে তাঁর আগেই মারা যান। ১৮৭৪-এ থেকে রাজা দীন দয়াল ফোটো তোলা আরম্ভ করেন। লর্ড নর্থব্রুক এবং প্রিন্স অভ ওয়েলসের সফরের ফোটো তুলে দীন দয়াল নিজের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হন। তারপর সাঁচি স্তূপে প্রত্নতত্বের সংরক্ষণকর্ম আর মহুতে ব্রিটিশ ফৌজি মহড়ার ফোটো তুলে শাসকদের নেকনজরে পড়েন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার ব্রিটিশ কর্মচারীদের পরামর্শ দিয়েছিল যে ফোটোগ্রাফি হল সবচেয়ে সস্তা মাধ্যম যার সাহায্যে তাদের শাসন সম্পর্কে ব্রিটেনে বার্তা পৌঁছে দেয়া যায়, এবং ফোটোগুলো দেখে ব্রিটিশ যুবক-যুবতীরা ভারতবর্ষে আসতে আগ্রহী হয়। ব্রিটেনের রাজার শাসন কায়েম হলে, ওরিয়েন্টালিজমের প্রসার হিসাবে ভারতে নতুন ধরণের স্হাপত্য দেখা দেয়, যেমন ভিকটোরিয় গথিক, নিও ক্লাসিকাল, প্যালাডিয়ান স্টাইল ইত্যাদি। এই নতুন স্হাপত্যও শাসক ধরে রাখতে চাইছিল ভবিষ্যতের জন্য। ভারতীয়দের সতীপ্রথা, শবদাহ, সাধু-সন্ন্যাসীদের ছবিও তুলে ব্রিটেনে পাঠানো হচ্ছিল। আমি অ্যামস্টারডামের ‘রিকস মিউজিয়ামে’ দেখেছি, ঢুকেই যা-তে চোখে পড়ে তাই সতীদাহের একটা পেইনটিং, যিনি এঁকেছিলেন, তিনি বিশেষ নামকরা নন, ওই মিউজিয়ামে দর্শকরা প্রধানত রেমব্রাঁর আঁকা পেইনটিং দেখতে যান।
দীন দয়ালের প্রসঙ্গে তুললুম আমার দাদুর সঙ্গে তুলনার জন্য। দাদু ফারসি, আরবি আর উর্দু পড়তে-লিখতে জানতেন, কিন্তু ইংরেজি ভালো বলতে আর লিখতে পারতেন না, কোনো স্কুলে কখনও যাননি, ওনার ট্যুরের কাজের দরুন ওনার ছেলেরাও কেউ স্কুলে পড়াশুনা করেননি। দীন দয়াল পড়াশুনা করেছিলেন রুড়কির টমসন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে; সেখান থেকে পাশ করে ইন্দোর পূর্তবিভাগে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পান। তিনি ভালো ইংরেজি এবং হিন্দি বলতে, লিখতে ও পড়তে পারতেন। ইন্দোরের মহারাজা দ্বিতীয় তুকোজি রাওয়ের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হন, যার দরুন তিনি হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিজাম মেহবুব আলি খানের সংস্পর্শে যেতে সক্ষম হন; এরপর ব্রিটিশ ভাইসরয় এবং ইংরেজ উচ্চ আধিকারিকদের কাছাকাছি যেতে তাঁর অসুবিধা হয়নি, এবং তাঁর তোলা ফোটোর সংরক্ষণ ব্যবস্হারও অবহেলা হয়নি। দেশীয় আর ব্রিটিশ শাসকরা রাজা দীন দয়ালকে ঘিরে একটি ‘মিথ’ গড়ার প্রয়াস করেছিলেন যা-তে তাঁদের চাকর-বাকররা যে উপেক্ষিত হয়েছে তা চাপা পড়ে যায়। দীন দয়াল তাঁর দোকানে ব্রিটিশ কর্মচারী রাখতেন, শাসকদের মাঝে প্রচারের উদ্দেশ্যে।

বর্তমান পাকিস্তান অঞ্চলে দাদু গিয়েছিলেন মূলত ভারতীয় ও ব্রিটিশ পেশাদার ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে যা-তে তাঁকে পাল্লা দিতে না হয়। অঞ্চলটি ছিল মুসলমান অধ্যুষিত এবং তাঁর ফারসি, আরবি ও উর্দু প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত। সাবর্ণ চৌধুরীদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের নবাবদের নৈকট্যের কারণে তাঁরা সতেরো শতক থেকে বংশানুক্রমিকভাবে ফারসি, আরবি এবং উর্দু শিখতেন। রাজা দীন দয়াল এবং ব্রিটিশ ফোটোগ্রাফারদের যে ইতিহাসবোধ ছিল, তা দাদুর ছিল না, তিনি কিছুই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে করেননি। কেবল দাদু নয়, আমি আর দাদা, আমাদের ছেলে-মেয়েরা, কারোর মনে ইতিহাসবোধ কাজ করেনি। দাদুর সম্পর্কে তাই কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না দীপালি দেওয়ান, ডেবোরা হাটন, জুডিথ গিটম্যান, নরেন্দ্র লুথার, সিদ্ধার্থ ঘোষ প্রমুখের বইতে। এনারা সকলেই কলকাতা, মুম্বাই, মাদ্রাজ-কেন্দ্রিক তথ্য সংগ্রহ করে বই লিখেছেন।

১৯৫০ নাগাদ বাবার দোকানের বাড়িঅলা (বি এন কলেজের সামনে ) বাড়ি ছেড়ে দেবার নোটিস দিলে বেশ কিছুকাল মামলা-মোকদ্দমা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত বাবা মামলায় হেরে যান। হেরে যাবেন আঁচ করে উনি পাটনার দরিয়াপুরে একটা জমি কিনে সেখানে দোকান করার মতন একফালি বাড়ি তৈরি করান, একতলায় বেশ বড়ো স্টুডিয়ো, রিটাচ করার জায়গা, ফোটোর ওপর মুখে নল লাগিয়ে স্প্রে করার জায়গা, ফোটো ডিভেলপ, এনলার্জ, প্রিন্ট, করার জায়গা, অনেক বড়ো প্রিন্ট হলে তাকে বহুক্ষণ জলে ডুবিয়ে রাখার জায়গা, তার জন্য জলের চৌবাচ্চা, রসায়নে চুবিয়ে সিপিয়া ফোটো বহুক্ষণ ধোবার জায়গা, প্রিন্ট কাটবার টেবিল, নেগেটিভের রোল শুকোবার জায়গা, মেজোজেঠা আর ন-কাকা যা-তে একান্তে পোরট্রেট পেইনটিং করতে পারেন তার জায়গা করিয়েছিলেন বাড়িটায়। ফোটো প্রিন্ট করা হত দু-রকম: ম্যাট আর গ্লেজড। প্রিন্টকে চকচকে বা গ্লেজ দেবার জন্য আয়নার মতন ধাতুর বোর্ডে শুকোনো হত। বাবার দোকানে প্রায় দশটা অমন গ্লেজিং বোর্ড ছিল।

এখন ফোটোকে সেপিয়া করে তোলার জন্য ফিলটার প্রয়োগ করা হয়। দাদুর সময়ে তা করা হত মাছের তেল থেকে তৈরি সালফাইডের সাহায্যে। সাদা-কালো ফোটোর টোনিং আরম্ভ করেছিলেন হ্যামিলটন স্মিথ এবং মাছের তেলের সালফাইড প্রয়োগ করার চল ছিল ১৮৬০ থেকে ১৯২০-এর মাঝে। রসায়নের বোতলে লেখা থাকতো কাটল ফিশ সেপিয়া কেমিকাল। পটাশিয়াম ফেরিসায়ানাইডে ধুয়ে স্হায়ীত্ব দিতে হত সেপিয়াকে। তিন রকমের সেপিয়ার চল ছিল। সোডিয়াম সালফাইডে রাঙানো, থিয়োইউরিয়ায় রাঙানো আর পলিসালফাইডে রাঙানো। স্মার্টফোনেই এখন এত ধরনের ফিলটার থাকে যে ফোটোগ্রাফারদের সেই সময়ের শ্রমকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। সেপিয়ার বিপরীত ছিল মোনোক্রোম ফোটো, অর্থাৎ সাদা-কালো ফোটো।
দরিয়াপুরের স্টুডিয়ো বেশ বড়ো ছিল, যা-তে কুড়িজনের গ্রুপ ফোটো ফিল্ড ক্যামেরায় তোলা যেত। স্টুডিয়ো অনেক বড়ো ছিল বলে কুঁজো মাপের বালবও এক হাজার-দুহাজার ওয়াটের ছিল। আমরা ওপরতলায় থাকতুম। একবার কাজের মাসি বাটনা বাটার সময়ে নোড়া ঠুকে হলুদ ভাঙতে গেলে একটা বালব ফিউজ হয়ে গিয়েছিল, বাবা সেসময়ে ফোটো তুলছিলেন। তারপর থেকে বাবা চেঁচিয়ে জানিয়ে দিতেন যে ফোটো তোলা হচ্ছে, কোনোরকম মশলাবাটা বা লাফালাফি যেন না-হয়। বাবা যখন বাইরে গ্রুপ ফোটো তুলতে যেতেন, তখন বেলোলেন্স ক্যামেরার বাক্স দোকানের কাজের লোক রামখেলওয়ন সিং ডাবরের কাঁধে চাপিয়ে, নিজে তিনঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় ঢাকা দেবার কালো কাঁথা নিয়ে যেতেন। তখন গ্রুপ ফোটো তোলার জন্য ফ্ল্যাশ লাইটের ব্যবস্হা ছিল না। ডাবর দুটো ম্যাগনেশিয়াম তারের বান্ডিলে আগুন ধরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত যা-তে ফোটো তোলার সময়ে দিনের মতন আলো হয়। এই কাজটা দাদা আর আমিও করেছি, যখন ডাবর ধান কাটার ঋতুতে নিজের গ্রামে যেত।

একটু আগেই বলেছি, সেসময়ে মেয়ো স্কুল অভ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিং, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই দাদু ফোটো তোলা শেখেন। ফোটো তোলা হত সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে। পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হত, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, ডার্করুমে প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হত, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হত।
বেলোলেন্স ক্যামেরা ছিল বেশ ভারী; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হত। বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হত। ফোটো তোলা হত তিন-ঠেঙে ক্যামেরা স্ট্যান্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে। ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু-এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হত। স্টুডিয়োতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হত, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয়। এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে বেলোলেন্স ক্যামেরাকে ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক। সেসময়ে প্রতিবিম্বও উল্টো দেখা যেতো। বাবা ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না। শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরার তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড় নিয়েছেন। দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়োজেঠা, মেজোজেঠা, বাবা, পিসিমা আর ন-কাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি। জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান।  
  
দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান। ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান। বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান। দুম্বা একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়োজেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।

আবার, ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পানিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল। কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক। রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন। এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু, সাদা-কালো কাচের প্লেটের ওপর তুলি দিয়ে স্বচ্ছ রং করা হত। কিশোরীমোহন তাঁর বড়ো মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন। বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর। কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে। বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী আর যাবতীয় সীমালঙ্ঘনকারী। দাদু প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে।

দুঃখের বিষয়, দাদু, লকউড কিপলিঙ, রুডিয়ার্ড কিপলিঙ এবং রাজা, মহারাজা, নবাবদের ফোটো তো সংরক্ষণ করেনইনি, তাঁদের সঙ্গে নিজের ফোটোও তুলিয়ে রাখেননি। আমি আর দাদা কখনও ভাবিনি যে ওকতাভিও পাজ, আরনেস্তো কার্দেনাল, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ডেইজি অ্যালডান, কমলকুমার মজুমদার, নিসিম এজেকিয়েল, ধর্মবীর ভারতী, খুশওয়ন্ত সিং, পুপুল জয়াকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সন্তোষকুমার ঘোষ. প্রকাশ কর্মকার, যোগেন চৌধুরী, ফণীশ্বরনাথ রেণু, রামধারী সিং দিনকর, রাজকমল চৌধুরী, পারিজাত প্রমুখের সঙ্গে ফোটো তুলিয়ে রাখা দরকার, যেমনটা বিট আন্দোলনের কবি-লেখকরা করেছেন। এমনকি হাংরি আন্দোলনে যাঁরা ছিলেন তাঁদের সঙ্গে গ্রুপ ফোটো তুলিয়ে রাখিনি, যেমনটা গিন্সবার্গ-ফেরলিংঘেট্টি করেছেন। যে দুটো গ্রুপ ফোটো হাংরিদের আছে তার একটা টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্টারের নেয়া, অন্যটা হিন্দি জ্ঞানোদয় পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়ার আগ্রহে তোলা। একশোর বেশি হাংরি বুলেটিন, কার্ড, পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছিল, সেগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে হয়নি।
দাদা সমীর রায়চৌধুরীর ছেলেদের মনেও ইতিহাসবোধ একেবারেই কাজ করেনি; বাবা মারা যেতেই দেয়াল থেকে ঠাকুমা, জেঠিমা, নকাকিমার পোরট্রেট নামিয়ে ফেলে দিয়ে দোকানকে বিশাল-বিশাল কাচে মুড়ে ঝকঝকে আধুনিক করে তুলেছে। চিলেকোঠার ঘরে বাবা প্রায় হাজার পাঁচেক তোলা-ফোটোর কাচের প্লেট রেখেছিলেন, বছর অনুযায়ী সাজিয়ে। সেগুলো কাচের দরে বেচে দিয়েছে, অথচ সেগুলো ছিল উনিশ শতকের শেষ দিকে যাঁরা ফোটো তুলিয়েছিলেন, তাঁদের প্লেট।

আর তাই এখন পূর্বপুরুষ ফোটোগ্রাফারদের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতির মিউজিয়াম ঘাঁটা ছাড়া উপায় বা কি! মনে হয় ছোটোবেলায় যেমন বড়োজেঠার হাত ধরে মিউজিয়ামে ঢুকে পড়তাম আর দৌড়ে এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে—তেমনই দৌড়ে বেড়াচ্ছি পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া স্মৃতির সলতে ধরে—আফগানিস্তান, উত্তরপাড়া, বাজাজা পাড়া, ইমলিতলা, দরিয়াপুর, পেনেটি—চারপাশে নবাব, বেগ, সাহেব, দিশি রাজা, দেহাতি বিহারি—সব জায়গা সব মুখ বোধহয় এখন আর চিনতে পারছি না...