তপন কুমার বসু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তপন কুমার বসু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

তপন কুমার বসু

         


 
       
       প্রতিদিন বই পড়া নিয়ে কিছু কথা।
    

প্রথমেই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগবে যে আজকের এই গতিময় জীবনে মানুষের সময় কোথায় বই পড়ার। কিন্তু এ ধারণাটা ঠিক নয়। আমরা চাইলে দিনের যে কোন সময় একটু বার করে নিতে পারি  বই পড়ার জন্য। বর্তমান আধুনিক যুগে তো e-book এরও প্রচলন হয়েছে।
 ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই  পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটা ভাল বই  মানুষের মনের চোখ যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভেতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে। বারট্রাণ্ড রাসেল বলেছেন, " সংসারে জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়।"
   অর্থাৎ সাহিত্যে সান্ত্বনা না পেলে দর্শন, দর্শন কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস না মানলে ভূগোল -- এরকম আরো কত কি ? এখন প্রশ্ন এত ভুবন সৃষ্টি করব কি করে? সেটা করা যায় বই পড়ে বা ভ্রমণ করে। সেক্ষেত্রে বইপড়াটা সকলের নাগালের মধ্যে।
  জীবনে চূড়ান্ত সফল অনেক মানুষই বইপড়ায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বইপড়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা রোজ নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
  এখন বই পড়ব কেন ? সে প্রসঙ্গে যে কথাগুলো বলা যায় তা হল বই পড়লে জ্ঞান বৃদ্ধি হয়। বইপড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যত বেশি বই পড়া যাবে, তত জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। বই-ই পারে একজন মানুষকে যথার্থ জ্ঞানী বানাতে, আর জ্ঞান সবসময় একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে।
 বর্তমানে depression একটা সুপরিচিত শব্দ। Depression আসে জীবনের কোন বিশেষ পরিস্থিতি মেনে নিতে না পারার জন্য। দেখা গেছে বই পড়লে সেই বই তার নিজস্ব পরিস্থিতি, আবহাওয়া পাঠকের মনকে সম্পূর্ণ অধিকার করে। ফলে কিছু সময়ের জন্য depression থেকে বেরিয়ে আসা যায়।বই পড়ায় মানসিক উদ্দীপনা তৈরি করে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে বইপড়ার অভ্যাস মানুষকে Dementia এবং Alzheimer's নামে দুটি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বই পড়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যা মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীর সুস্থ রাখতে যেমন ব্যায়াম করি তেমনি মস্তিষ্ককে সবল ও কর্মচঞ্চল রাখতে বইপড়া বিশেষ জরুরী।
   এছাড়া বইপড়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ২০০৯ সালে ইউনাইটেড কিংডম এর সাসেক্স ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিকরা হার্টরেট ও মাসল্ টেনসন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন যে কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাতে দেখা গেছে মাত্র ছয় মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮% কমে যায়, যা হাঁটা (৪২%}, কফি পান (৫৪%} বা গান শোনা (৬১%} থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বইপড়ার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার ফলে আমরা এক মুহূর্তের মধ্যে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছতে পারি যা প্রতিদিনকার বাস্তবতা ও   নানা  দুঃখ কষ্ট থেকে একটু হলেও রেহাই দেয়, ফলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
বই পড়লে কল্পনাশক্তির বৃদ্ধি হয়। গল্প বা উপন্যাস যাই হোক তার বর্ণনা আমাদের কল্পনাকে দূর বিস্তৃতি দেয়। কোন জায়গার বর্ণনা পড়ে কল্পনায় আমরা সেইরকম স্থানে চলে যাই। কোন চরিত্র তার বইয়ের বর্ণনার সঙ্গে নিজের কোন চরিত্র মিলে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। এইভাবে বই আমাদের কল্পলোক ভ্রমণ করায়। যত বেশি বই পড়া যাবে ততবেশি কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।
 স্মরণশক্তিরও বৃদ্ধি ঘটে। যখন কোন বই পড়ি তখন বইয়ের অগণিত তথ্যগুলি মনে রাখতে হয়। মস্তিষ্কের অনেক exercise হয় ফলে memory power বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রোজ নিয়ম করে বই পড়লে একাগ্ৰতা শক্তি বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে আত্মসম্মানবোধ তৈরি হয়। এই আত্মসম্মানবোধ আসে তখনই যখন মানুষ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় প্রভৃতি মানবিক গুণগুলির মূল্য বুঝতে শেখে। বই পড়তে পড়তে মানুষের মনে এই বোধ জন্মায়। ফলে মানুষ অন্যকেও সম্মান জানাতে শেখে।
Virginia Woolf এর একটা সুন্দর উক্তি দিয়ে লেখা শেষ করি -- "Books are the mirrors of the soul."
 

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

তপন কুমার বসু

                          






ভেজাল


    এবারে বর্ষাটা বেশ ভালই পড়েছে। তার ওপর গত ৩/৪ দিন ধরে বৃষ্টিটা হয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে যা একটু বিশ্রাম দিচ্ছে।
   কিন্তু পরিমলকে আজ একবার বেরোতেই হবে। বৃষ্টিটা একটু থামতেই পরিমল বেরিয়ে পড়ল নিজের কাজে। হাতিবাগানের কাছে এসে বৃষ্টিটা আবার জোরে এল। উপায় কিছু না পেয়ে একটা গাড়ি বারান্দার নীচে আশ্রয় নিল। মনে মনে ভাবল আপাতত এখানেই আশ্রয় নেওয়া যাক। কিন্তু নাঃ। এখানেও আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না।
     হঠাৎ মনে পড়ে গেল এখানেই তো দু-একটা গলি পরেই তো পাড়ার খুকুদির বিয়ে হয়েছে। এক দৌড়ে সেখানে হাজির হয়ে দেখে খুকুদি খাটের ওপর বসে আলুর চপ মুড়ি খাচ্ছে।
     আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতেই মোটামুটি খবরাখবর নিয়ে একগাল হেসে বলে ঠিক সময়েই এসেছিস। আয়, দুটো গরম গরম আলুর চপ খা।
    তেলেভাজা খাওয়া আমার নিষিদ্ধ। খুকুদির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বললাম এই ভেজালগুলো কি না খেলেই নয়। জান, এগুলো কি তেলে ভাজে ? এই ভেজাল জিনিসের প্রতি আসক্তির জন্যই দেশটা ভেজাল জিনিসে ভরে গিয়েছে। 
  আমার কথাগুলো খুকুদি রুদ্ধনিঃশ্বাসে শুনছিল। আমি থামা মাত্রই খুকুদি আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
  আমি এই পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমতা আমতা করে বললাম খুকুদি কিছু মনে কোরো না। তেলেভাজা যে তোমার এত প্রিয় তা জানতাম না।
   খুকুদি চোখ থেকে আঁচল সরিয়ে বলল, না ঠিক তা নয়। বাজারে ব্যাপক ভেজাল চলছে বলেই তুই আজ আমাকে এই পোশাকে দেখতে পারছিস।
  খুকুদির কথাটা ঠিক বোধগম্য হল না। বললাম, তার মানে?
    খুকুদি চোখ মুছতে মুছতে বলল, আর বলিস কেন। গত রবিবার তোর জামাইবাবুর সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। তোর জামাইবাবু প্রবল চীৎকারে ঝগড়া করে ঢকঢক করে এক শিশি আইডিন খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে খবর চাপা থাকল না। পাড়ার ছেলেরা জানতে পেরে সোজা নিয়ে গেল হাসপাতালে।
   বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। পাড়া প্রতিবেশীরা বাড়িতে এসে সব ভীড় করেছে। ঠিক সেই সময়ে খবর এর আইডিনে ভেজাল থাকার জন্য জামাইবাবুর কোনো ক্ষতি হয়নি। বহাল তবিয়তে জামাইবাবু বাড়ি ফিরে আসছে।
   খুকুদি একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে বলল, বল আইডিনে ভেজাল ছিল বলেই তো বৈধব্যের
হাত থেকে রক্ষা পেলাম।
  নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম ভাগ্যিস!!
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ে চলেছে।

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

তপন কুমার বসু


 মা
মা এক অক্ষরের একটি শব্দ কিন্তু তাৎপর্য ব্যাপক। জগতে মায়ের সাথেই অন্য কেউ তুলনীয় নয়। মা একটি প্রিয় ও মূল্যবান শব্দ, একটিই এবং একটিই মাত্র। শুধু প্রিয় শব্দই নয়, প্রিয় বচন - মা, প্রিয় অনুভূতি - মা, প্রিয় আদর - মা ইত্যাদি সব প্রিয় শব্দগুলোই শুধুমাত্র মা-কে কেন্দ্র করেই সব প্রিয় স্মৃতি। কারণ পৃথিবীতে একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা নিঃশর্ত ভালবাসা দিয়েই যায় তার সন্তানকে কোন কিছুর বিনিময় ছাড়া। তাই তো কবি বলেছেন ---
    মায়ের করুণা সে তো অকূল অপার
    গোষ্পদে বিম্বিত যথা অনন্ত আকাশ।
  মা হচ্ছেন একজন পূর্ণাঙ্গ নারী, যিনি গর্ভধারণ করেন, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন। তিনি এক অর্থে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন এবং এইরূপে মা সর্বত্র পরিচিত। মা একটি প্রচণ্ড আকর্ষণীয় স্নেহময়ী ও আবেগময় শব্দ। গর্ভজাত হোক বা দত্তকই হোক সেখানে মা  মানেই একটি মায়াবী স্নেহময়ী অবস্থান।
   ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের কাছে তার মা অতি মূল্যবান হয়ে থাকে। শুধু মানুষ কেন? পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই তার মায়ের কাছে ঋণী। সে ঋণ অপরিশোধিত। মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ীর সম্পর্ক, যা একটু আঘাত লাগলেই প্রতিটি মানুষ 'মা' বলে চিৎকার দিয়ে জানান দিয়ে থাকে। মা-এর ত্যাগের তুলনা হয় না। জগতে একমাত্র 'মা'-এর কোন প্রতিশব্দ নেই। মা- মা-ই। সূর্য যেমন অনন্তকাল পৃথিবীতে আলো ছড়ায়, তেমনি মায়ের মমতা ছেয়ে থাকে সমগ্ৰ বিশ্বময়। মায়ের শূন্যতা কিছুতেই পূরণ হবার নয়।
     সন্তানেরা মায়ের সাথে অসদাচরণ করলেও মা কখনো সন্তানের অমঙ্গল চান না। এটা শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যই নয়।
   মা-এর এই যে ধারণা (concept) তার সমস্ত পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যিকদের মনে স্থান করে নিয়েছে। মা-কে নিয়ে সাহিত্য, গান, গল্প, কবিতা রচনা হয়েছে।
   ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস 'মা' বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে পঠিত উপন্যাস। এ উপন্যাসে মা হয়ে ওঠেন নির্যাতিত মানুষের বাঁচার এক আশ্রয়স্থল। সর্বজনীন মা হয়ে ওঠেন তিনি। বাংলা সাহিত্যেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে শ্যামা - মায়ের চরিত্রে। সে যতটা না মা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত তার চেয়ে ঢের বেশি জননী। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালি' উপন্যাসে একটি মনে রাখার মত চরিত্র হলো 'সর্বজয়া'। আবার গর্ভধারিনী মায়ের চেয়ে পালিত মায়ের স্নেহ-মায়া-মমতা কোনো অংশে কম নয়, যা দেখা যায় অনুরূপা দেবীর 'মা' উপন্যাসে।
  মা-কে নিয়ে অনেক গানও বাংলায় রচনা হয়েছে। একটা উদাহরণ হিসাবে বলা যায়--
  'ও তোতা পাখীরে, শিকল খুলে উড়িয়ে দেব
   মাকে যদি এনে দাও..'
সেরকম অনেক কবিতা রচনা হয়েছে মা-কে নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের 'বীরপুরুষ' কবিতাটি সেরকম একটি।
   পরিবারে মা-কে সম্মান জানাতে, এবং মাতৃত্ব ও জননী হিসাবে মায়ের বন্ধন (maternal bonds) ও সমাজের প্রতি মায়ের প্রভাব (Influence of mother in society) এ সবের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্বে 'মা-দিবস' (Mother's Day) উদযাপন এর ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ৮ই মে মার্কিন কংগ্ৰেসে। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার 'মা-দিবস'(Mother's Day) হিসাবে সারা বিশ্বে পালিত হয়।
  সনাতন হিন্দু ধর্মে উল্লেখ আছে --"স্ববংশবৃদ্ধিকামঃ পুত্রমেকমাসাদ্য...." আবার সন্তান লাভের পর নারী তাঁর রমণী মূর্তি পরিত্যাগ করে মহীয়সী মাতৃরূপে সংসারের অধ্যক্ষা করেন। তাই মনু সন্তান প্রসবিনী মা'কে গৃহলক্ষী সম্মানে অভিহিত করেছেন। তিনি মাতৃ গৌরবের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন এভাব--
"উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য্য আচার্য্যানাং শতং পিতা।সহস্রন্তু পিতৃন্মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে।" [মনু,২/১৪৫]
অর্থাৎ " দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন আচার্য্যের গৌরব অধিক, একশত আচার্য্যের গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর, সর্বোপরি সহস্র পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মার্নাহ।"





শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

তপন কুমার বসু


গল্প :

দলিল
   আমি ছোটবেলা থেকেই বাবাকে একদম পছন্দ করতুম না। আমার সবসময়ই মনে হয় বাবা খুব নীচু মনের মানুষ। ঠাকুর্দা ঠাকুমার যত্ন আত্তির কোন ত্রুটি ছিল না। মাকেও খুব ভালবাসত। কিন্তু আমার বাবার কিছু দোষ ছিল। জমি বাড়ির  ওপর বাবার একটা ভয়ানক লোভ বা আকর্ষণ ছিল।
   সেবার পিসির বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমি তখন ছোট। ঠাকুর্দা ঠাকুমা পিসিকে একজোড়া হালকা কানের দুল ছাড়া কিছুই দিতে পারেননি। বাবাকে দেখে মনে হয়  পিসিকে যেন কত ভালবাসে। কিন্তু আসলে তা নয়। কারণ ঠাকুর্দা যখন  বাবার কাছে রাখা গ্ৰামের এক টুকরো জমিসহ বাড়ির দলিলটা চাইল (যেটা আমার দাদু যৌতুক হিসেবে বাবার বিয়েতে বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন) তখন বাবা কিছুতেই দিতে রাজী হল না। ঠাকুর্দা ভেবেছিলেন ওটা বন্ধক দিয়ে পিসির জন্য আরও দু-একটা গয়না গড়িয়ে দেবেন। কিন্তু বাবার এক কথা- ওই দলিল আমি দিতে পারব না আমার খুব দৃষ্টিকটু ও খারাপ লাগত বাবার এই ধরণের আচরণ। বাবাকে খুব ছোট ও নীচু মনের মানুষ মনে হত। এরপর অবস্থা আরও খারাপ হল যখন মা একটা কঠিন অসুখে পড়ল। পেটে একটা বড় টিউমার ধরা পড়েছে। অসহ্য যন্ত্রণা। এবার ঠাকুর্দা বাবাকে বললেন- গ্ৰামের ওই বাড়িটা বিক্রি করে দে বৌমার চিকিৎসার জন্যে। না হলে বৌমাকে বাঁচানো যাবে না। বাবার এক জেদ। ওটা বিক্রি করব না। এদিকে দিনরাত এক করে বাবা মায়ের সেবা করতে লাগলো। অফিস থেকে ও আরো দু-এক জায়গা থেকে লোন করে যথাসাধ্য মায়ের চিকিৎসা হতে থাকল। কিন্তু অপারেশন ছাড়া তো মাকে বাঁচানো যাবে না। শুধু সেবায় কি প্রাণ বাঁচে। কিছুদিনের মধ্যে মা আর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আমি ঠিক করলাম, যে করেই হোক পড়াশোনা করে আমাকে দাঁড়াতে হবে। একটা ভাল চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ইতিমধ্যে ঠাকুর্দা ঠাকুমা গত হয়েছেন। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। টাকা পয়সা খুব একটা কিছু পায়নি। ধার দেনা শোধ করে হাতে খুব একটা কিছু ছিল না। বাবা টিউশনি শুরু করল। কোনরকমে সংসার চলত। লেখাপড়া শেষ করে আমি একটা মোটামুটি চাকরি জোগাড় করলাম। এসে জানালাম, এও বললাম তার সাথে আর এক ছাদের তলায় থাকার ইচ্ছে নেই। বাবাকে যে আমি ঘৃণা করি সেটা বাবা ভালই বুঝতে পারতো। সেদিন প্রথম মাসের মাইনে পেলাম। বাবাকে জানালাম যে  একটা ঘর দেখে এসেছি। আমি এবার থেকে সেখানেই থাকব। বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলল, তুই কেন এ বাড়ি ছেড়ে যাবি। আমিই বরং কা সকালে চলে যাব। বাবা এই কথা বলে ঘরে চলে গেল। রাতে আমরা একসাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। কেউই কোন কথা বললাম না। বাবা খেয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। আমিও মনে মনে একটু হালকা হলাম। কাল থেকে আর বাবার সঙ্গে থাকতে হবে না। ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।
     পরদিন ঘুম ভাঙ্গাতে একটু দেরি হয়ে গেল। নতুন চাকরি, তাড়াতাড়ি দু কাপ চা করে এক কাপ বাবাকে দিতে গিয়ে দরজা ঠেলে দেখি সিলিং ফ্যানের আশংকায় কাপড় বেঁধে বাবা ঝুলছে। চীৎকার করে লোক ডাকতে গিয়ে দেখি বিছানার উপর একটা চিঠির ও সেই দলিল। চিঠিটা আলতো করে তুলে নিলাম যাতে লেখা--
"কুর্চি,
  আমি জানি তুই আমাকে পছন্দ করিস না,কেন করিস না তাও জানি।আমি লোভী, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর। তার কারণ আমার  শ্বশুরমশায়ের মানে তোর দাদুর দেওয়া গ্ৰামের বাড়ির দলিল। চরম বিপদের দিনেও এটা আমি যখের ধনের মত আগলে রেখেছি। কারো হাতে তুলে দিই নি। সব সম্পর্কগুলো আমার নষ্ট হয়ে গেছে এক এক করে এটার কারণে। অবশেষে তুইও আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইলি। তাই তোকে সত্যটা জানিয়ে দেওয়া শ্রেয় মনে করলাম। আমার এই দলিলটা নকল। তোর ঠাকুর্দার কথা অনুযায়ী যৌতুক দেবার ক্ষমতা আমার শ্বশুরমশায়ের, মানে তোর দাদুর ছিল না। তাই তাই ঐ বাড়ির একটা নকল দলিল আমার হাতে তুলে দিয়ে কন্যাদায়গ্ৰস্ত পিতা অসহায়ের মত আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন যেন আমি ওনার মান বা লজ্জা রাখি। আমি সেদিনের সেই অসহায় মুখ দেখে আমৃত্যু শ্বশুরমশায়ের লজ্জা ঢেকে রেখেছি। হয়ত আজও রাখতাম। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর তোর নতুন সংসারে তুই যাতে এগুলো নিয়ে কোন বিপদে না পড়িস তাই সবকথা জানালাম। ভাল থাকিস। --বাবা।"
   জীবনে সেইদিন প্রথম বাবার জন্য হাউ হাউ করে কাঁদলাম।






মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

তপন কুমার বসু


আদি থেকে মধ্যযুগ বাংলা ভাষার রূপান্তর ---
 বিদ্যাপতি থেকে রবীন্দ্রনাথ।

বাংলা ভাষার আদি বলতে গেলে অনেক পূর্ব কথন এসে যায়। সে সব আলোচোনায় না গিয়ে বরং দেখি সংক্ষেপে এর উৎপত্তি।
     সংস্কৃত ভাষা লোকের মুখে মুখে রূপান্তরিত হয়ে প্রাকৃত ভাষায় পরিণত হয়। এই প্রাকৃত ভাষা ভেঙ্গে আবার বিভিন্ন আধুনিক ভাষা-যেমন বাংলা, আসামী, উড়িয়া, মৈথিলি, হিন্দী ইত্যাদি উৎপন্ন হয়েছে। আধুনিক ভাষায় পরিণত হওয়ার ঠিক আগে প্রাকৃতের যে রূপ ছিল তাকে বলা হয় অপভ্রংশ। 'সৌরশ্রেণী' ও 'মাগধী' এই দুই শাখায় প্রাকৃত ভাষা বিভক্ত ছিল। আর এই মাগধী প্রাকৃত অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার জন্ম খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী মতভেদে তারও কিছু আগে।
মোটামুটিভাবে বাংলা ভাষার ইতিহাসকে তিন পর্বে ভাগ করা যায় :-
১। প্রাচীন যুগ বা প্রাচীন বাংলা-- চর্যাপদ, ভক্তিমূলক গান এই সময়ের নিদর্শন।
২। মধ্যযুগ (১২০০ --১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ)--এই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন চন্ডীদাসের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন', কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত "চৈতন্যচরিতামৃত", বিদ্যাপতি পদাবলি ইত্যাদি।
৩। আধুনিক যুগ (১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে বর্তমান) -- আধুনিক যুগের দুটি ভাগ। আর একটি হল যুগসন্ধিক্ষণ (১৭৬১ -- ১৮৬০)

   প্রাচীন যুগের আদি ও একমাত্র নিদর্শন-'চর্যাপদ'
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল দরবারের গ্ৰন্থাগার ঘেঁটে এই পুঁথি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদ হচ্ছে গান ও কবিতার সংকলন যাতে আছে বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্মের সাধনতত্ত্ব। চর্যাপদের ভাষা অবিমিশ্র বাংলা নয়। চর্যাপদের ভাষার নাম সন্ধ্যাভাষা। উদাহরণস্বরূপ অতি পরিচিত শবরপদের নরনারীর প্রেমের এক অপূর্ব চিত্রণ
কটি লাইন :-
উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই সবরী বালী।
মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।
উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরী।
ণিঅ ঘরনি ণামে সহজ সুন্দারী।।
ণাণা তরুবর মৌলিল রে  গঅণত লাগেলি ডালী।
একেলী সবরী এ বণ হিগুই কর্ণ কুন্ডলবজ্রধারী।।
পদ ২৮,অর্থাৎ- উঁচু পর্বতে শবরী বালিকা বাস করে। তার মাথায় ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জমালিকা।
নানা তরু মুকুলিত হলো। তাদের শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত হলো। শবর - শবরীর প্রেমে পাগল হলো। কামনার রঙে তাদের হৃদয় রঙিন ও উদ্দাম। শয্যা পাতা হলো। শবর-শবরী প্রেমাবেশে রাত্রিযাপন করলো।
     চর্যাপদের পরে পাওয়া যায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা। চর্যাপদ থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষায় যেতে আরো কিছু স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে ভাষার কোন নিদর্শন হাতে পাওয়া যায় না। চর্যাপদের ভাষা হচ্ছে প্রাচীন বাংলা ভাষা আর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা হচ্ছে আদি মধ্যযুগের ভাষা।
  বাংলা ভাষায় মধ্যযুগের সময়কাল ১২০০ -১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কী আক্রমণ শুরু হয়। বাঙালির চিন্তা ও সাহিত্যচর্চায় বিরাট ধাক্কা লাগে। দেশে শান্তি নেই।সাহিত্যচর্চার প্রশ্নই নেই। ফলে দুই শতাব্দীতে কোন বাংলা কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায় না।
     চতুর্দশ শতাব্দী থেকে রাজকর্মচারীদের সহায়তায় পুনরায় বিদ্যা ও সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। এ সময়ের বাংলা ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় মালাধার বসুর 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়', কৃত্তিবাসের 'রামায়ণ পাঁচালী', কবীন্দ্র-পরমেশ্বর শ্রীকর নন্দীর 'মহাভারত পাঁচালী', বিপ্রদাস পিপলাই-বিজয় গুপ্তের 'মনসামঙ্গল', মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর 'চন্ডীমঙ্গল', ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল' প্রভৃতি কাব্যে। 'মনসামঙ্গল' ছাড়া এসব কাব্যে পশ্চিমবঙ্গ-বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যবহৃত হয়েছে অনেক সংস্কৃত শব্দ।
   'মনসামঙ্গল' কাব্যে পূর্ববাংলার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। কারণ 'মনসামঙ্গল' প্রধানত পূর্ববঙ্গে রচিত হয়েছে।
     চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পর মধ্যযুগে প্রচলিত ভাষায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বৈষ্ণব ও অনুবাদ সাহিত্যে প্রচুর তৎসম শব্দ ব্যবহৃত হতে থাকে। বৈষ্ণব পদাবলিতে বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাসের ভাষায় বাংলার পাশাপাশি মৈথিলি ভাষা স্থান পায়।
  মধ্যযুগে দুটো বিরামচিহ্ন ছিল। বিজোড় সংখ্যক লাইনের পর এক দাড়ি আর জোড় সংখ্যক লাইনের পর দুই দাড়ি।
    অন্যদিকে ষোড়শ শতাব্দী থেকে মুসলিম কবিদের রোমান্সমূলক প্রণয়কাব্যে প্রচুর পরিমাণ আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হয়ে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সঞ্চারিত হয়।শাহ মুহম্মদ সমীর,আলাওল, মুহম্মদ কবির, প্রমুখ কবি এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরও তার কাব্যে প্রচুর সংখ্যক আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে বাংলা ভাষার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
     ১৭৬০ সালে ভারতচন্দ্র মারা যাবার পর মধ্যযুগের সমাপ্তি হয়। কারণ মঙ্গলকাব্যের চারশ বছরের কাব্যধারার সমাপ্তি। কিন্তু এই কারণের সাথে আরও একটা কারণ জড়িত। রাজনৈতিকভাবে এই এলাকার পটভূমি পরিবর্তন হতে থাকে।১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইংরেজ তথা বৃটিশদের শাসন বলবৎ হয়। তখন যে সাহিত্যের আবির্ভাব হয় যা আধুনিক সাহিত্য ধারার প্রবর্তন করার অন্যতম কারণ।
    যুগসন্ধিক্ষণ - (১৭৬১-১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ) - যুগ সন্ধিক্ষণ মানে দুই যুগের মিলন। এটি এমন একটি যুগ যে যুগে মধ্য এবং আধুনিক যুগের মিশ্র বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
যুগসন্ধিক্ষণের কবি : ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত।
   উনিশ শতকে বাংলা ভাষা পদ্য ও গদ্য এই দুই ধারায় বিকশিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের প্রয়োজনে কাজের গদ্য সৃষ্টিতে সহযোগ দিয়েছিল। ক্রমেই কাজের গদ্য থেকে জন্ম নিল বাংলা গদ্য ভাষা। ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়েছে ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি ভাষার অনেক শব্দ। চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজের পরিধি অতিক্রম করে ক্রমেই এসব ভাষা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে আসে। উনিশ-বিশ শতকে বাংলা ভাষা নানা মাত্রিকতায় বিকশিত হয়েছে। মধুসূদনের হাতে বাংলাভাষা পেয়েছে পেশির লাবণ্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে করে তুলেছেন মানচিত্রের সমুদয় ভাবের প্রকাশক্ষম। ধরণীর রূপ রস যেন তাঁর চোখে নতুন মায়া বিস্তার করেছে। কাব্য, ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র প্রতিটিক্ষেত্রে তিনি সাহিত্যসৃষ্টিতে বিস্ময়াবহ বিচিত্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবন সাধনা তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যে চিরন্তন শিল্পরূপ গ্ৰহণ করেছে। আর তাঁর গানে সুরে তাঁর রসসিদ্ধি প্রকৃতির ঋতুচক্রের বিচিত্র সৌন্দর্যের সঙ্গে এক হয়ে গিয়ে দুর্লভ ভান্ডার সঞ্চিত করে রেখেছে।
কবির কথায়--।                                                 'গানের ভিত্তর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি,
তখন তারে জানি আমি তখন তারে চিনি।'

গদ্য ভাষার ক্ষেত্রে প্রথমেই স্মরণে আসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা। অবশ্য তার আগে উইলিয়াম কেরি, রামরাম বসু, ম‌ত্যূঞ্জয় বিদ্যালয় কাম বা ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাও চলে আসে।
   তবে বাংলা ভাষাকে প্রথম সুশৃঙ্খল ও শিল্পিত করে তোলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।। বাংলা গদ্যে বিরাম চিহ্নের সুষ্ঠু ব্যবহার ও বিষয়ানুগ ভাষা প্রয়োগ বিদ্যাসাগরের অক্ষয় কীর্তি। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র, মোশারফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীর শিল্পিত হাত বাংলা গদ্য ভাষাকে নিয়ে গেছে শিল্পের সিদ্ধিচূড়ায়।
      ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তন-প্রক্রিয়ার পেছনে থাকে নানা ঘটনা, নানা অনুসঙ্গ।

যথাসম্ভব পরম্পরা মেনে কিছু নমুনা কাব্য ও গদ্য রীতির রূপান্তর নীচে দেওয়া হল :-

প্রাচীন বা আদি যুগ : চর্যাপদ- বৌদ্ধভাষার নমুনা-
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইবো কাল।।
মানে-(দেহরূপ) বৃক্ষের পাঁচটি শাখা। চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবিষ্ট হইল।
মধ্যযুগ :(কাব্য)
বিদ্যাপতি পদাবলী - নয়ন বয়ন দুই উপমা দেল।
                                এক কমল দুই খঞ্জন খেল।।
চন্ডীদাস পদাবলী- পূর্বরাগ:
            রাধার কি হৈল অন্তরে ব্যাথা।
            বসিয়া বিরলে    থাকয়ে একলে
                   না শুনে কাহারো কথা।।
বিজয় গুপ্ত-মনসামঙ্গল :
আইলা মনসা দেবী না করি বিচার
উনকোটি নাগ লইয়া দিলা পাটায়ার।।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী- চন্ডীমঙ্গল :
ধীরে ধীরে কহে রামা যত দুঃখ-বাণী।
ভাঙ্গা কুঁড়েঘর, তালপাতার ছাউনি।।
ভারতচন্দ্র রায় - অন্নদামঙ্গল :
বুড়াটি কহেন ব্যাস তুমি ত পন্ডিত।
কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসা করি কহিবে উচিত।।
সৈয়দ আলাওল - ঈশ্বর স্তোত্র :
প্রথমে প্রণাম করি এক করতার।
যেই প্রভু জীব-দানে স্থাপিল সংসার।।
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (যুগসন্ধিক্ষণ)
বন হতে এল এক টিয়ে মনোহর।
সোনার টোপর শোভে মাথার উপর।।

আধুনিক যুগ -- মধুসূদন দত্ত-চতুর্দশ পদাবলী
যশ : লিখিনু কি নাম মোর বিফল যতনে
       বালিতে, রে কাল, তোর সাগরের তীরে?
বিহারিলাল চক্রবর্তী - সমুদ্র দর্শন
একি এ প্রকান্ড কান্ড সম্মুখে আমার।
অসীম আকাশ প্রায় নীল জল রাশি!
নবীন চন্দ্র সেন - কীর্তিনাশা
সকলি কি স্বপ্ন! বল' ছিল কি এখানে
অভ্রভেদি সেই একবিংশতি রতন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বধূ
"কেহ বা দেখে মুখ কেহ বা দেহ,
কেহ বা ভাল বলে, বলে না কেহ।
ফুলের মালাগাছি,  বিকাতে আসিয়াছি
পরখ করে সবে, করে না স্নেহ'।।

আধুনিক যুগ - গদ্য রীতি
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর - শকুন্তলা
" ..... মহর্ষি শোকাকুল হইয়া মনে মনে কহিতে লাগিলেন, অদ্য শকুন্তলা যাইবেক বলিয়া আমার মন উৎকন্ঠিত হইতেছে; ..আমি বনবাসী, স্নেহবশত আমারও ঈদৃশ বৈক্লব্য উপস্থিত হইতেছে; না জানি সংসারীরা এমন অবস্থায় কি দুঃসহ ক্লেশ ভোগ করিয়া থাকে, বুঝিলাম, স্নেহ অতি বিষয় বস্তু। ..."
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - বিড়াল
 "........ দেখ, আমি তোর বটে, কিন্তু আমি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি ? খাইতে পাইলে কে তোর হয় ? দেখ যাঁহারা বড় বড় সাধু, চোরের নামে শিহরিয়া উঠেন, তাঁহারা অনেকে চোর অপেক্ষাও অধার্মিক। ..."
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - ক্ষুধিত পাষাণ
"... প্রায় আড়াই শত বৎসর পূর্বে দ্বিতীয় শা-মামুদ ভোগবিলাসের জন্য প্রাসাদটি এই নির্জন স্থানে নির্মাণ করিয়াছিলেন। তখন ইহাতে স্নানশালার ফোয়ারার মুখ হইতে গোলাপগন্ধী জলধারা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই শীকরশিতল নিভৃত  গৃহের মধ্যে মর্মরখচিত স্নিগ্ধ শিলাসনে বসিয়া কোমল নগ্ন পদপল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া তরুণী পারসিক রমণীগণ স্নানের পূর্বে কেশ মুক্ত করিয়া দিয়া সেতার কোলে দ্রাক্ষাবনের গজল গান করিত।"

গ্ৰন্থ ঋণ :                                                      বঙ্গভাষা প্রবন্ধ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সাহিত্যের কথা- সুকুমার সেন
Intermediate Bengali Selection - University of Calcutta
প্রাথমিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস
গল্পগুচ্ছ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর