সাহিত্যের বারান্দা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্যের বারান্দা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২২

শৌনক দত্ত

              





পঞ্চাশ দশকে পূর্ববঙ্গের কবিতা ও একজন অনালোচিত কবি




ধর্মীয় হঠকারিতার ফসল হিসেবে দেশবিভাগ (১৯৪৭) যখন মেনে নিতে হয় সবাইকেই, তখন হাজার বছরের অভিন্ন বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় স্থায়ী সীমানা-দেয়াল। ফলে পূর্ববঙ্গের কলকাতাবাসী কবি-লেখক-শিল্পীদের নাগরিকত্বের বদল ঘটে। তাঁরা চলে আসেন খন্ডিত ভূখন্ডে। আটচল্লিশে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন এই ভূখন্ডের কবি-শিল্পীদের স্বতন্ত্র স্বকীয়তা দান করে। এই স্বকীয়তাতেই ধরা পড়ে নতুন সংকটের চিত্র, নতুন স্বপ্নের বার্তা, নতুন শত্রুর পরিচয়, নতুন সম্ভাবনার মন্ত্র। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলনে ভাস্বর এই সব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ কবিতাই স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখন্ডেরও আগে বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতির বাতাবরণে মৌলিকত্ব নিয়ে হাজির হয়। ফলে বাংলাদেশের কবি ও কবিতা (সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রেও) বলতে বিবেচনায় নিতে হয় সাতচল্লিশের দেশভাগের কাল-পরিসর থেকে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব বাংলার নতুন কবিরা তাঁদের সৃষ্টির জন্য নতুন ভাষা ও নতনু দিশার সন্ধান শুরু করেন। কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার বিকল্প হিসেবে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার নতুন এক পরিমন্ডল। এখান থেকে চর্চিত-সৃজিত সামগ্রিক সাহিত্যকর্মই পরে বাংলাদেশের সাহিত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই সময়ের কবিতায় একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটানো, নিজেদের কণ্ঠস্বরে নতুনত্বের প্রকাশ এবং নিজ দেশের মানুষের আবেগ চিত্রিত করা কবিদের দায়িত্ব হয়ে ওঠে। তাই নতুন এই পরিমন্ডলকে ঘিরে এই অঞ্চলের কবিরা পরিচিতি পান বাংলাদেশের কবি হিসেবে। তাঁদের রচিত কবিতাই বাংলাদেশের কবিতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বাংলাদেশের কবিরা সাতচল্লিশের পর বা উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে যে কবিতাভাবনা ও কাব্যপ্রয়াস তুলে ধরা শুরু করেন পাঠকের সামনে, তার সবই ছিল নতুন ভাষা এবং নতুন ধ্যান পঞ্চাশের বাংলা কবিতায় তেমনভাবে আজীজুল হকের নাম আলোচিত নয়। মফস্বল শহরে বসে কবিতা চর্চা করে গেলেও তাঁর কবিতা বাংলা কবিতায় অন্যস্বর ও আঁখড়ের কথা বলে। 

বাংলাদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্খাই কবিতায় গণচেতনায় রূপান্তরিত হয়। এই গণচেতনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই সময় বাংলাদেশের কবিতার মহাসড়কে আবিভূর্ত হন বেশ কয়েকজন তরুণ কবি, যাঁরা পরেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের কবিতায় গণচেতনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬), ফজল শাহাবুদ্দিন (১৯৩৬-২০১৪), আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) প্রমুখ। তাঁদের আবির্ভাব ঘটে মূলত ভাষা-আন্দোলন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে। তবে এই কবিরাই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যেমন, তেমনি সত্তর-আশিনব্বইয়ের দশক তথা জীবনের শেষ পর্যন্ত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের কবিতার পাশাপাশি গণচেতনামূলক কবিতার চর্চা করে গেছেন। অবশ্য আল মাহমুদ ছিলেন ব্যতিক্রম। প্রথম দিককার কাব্য-কবিতা বাদ দিলে তাঁকে আর বাংলাদেশের কবিতার মূলধারায় খুব একটা পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যক্তিচেতনায় সংঘটিত বড় পরিবর্তনই সম্ভবত তাঁকে মূল পথ থেকে ভিন্ন পথগামী করেছে। যা-ই হোক, উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিই যে গণচেতনামূলক কবিতা সৃষ্টির একমাত্র ভিত্তি, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যাবে না। কারণ, রাজনৈতিক সংকটের বাইরেও সাধারণ মানুষের জীবনে নানা রকম সংকট ও বঞ্চনা লুকিয়ে থাকে, যা সূক্ষ্মভাবে প্রতিনিয়ত সমাজচৈতন্যে প্রভাব ফেলে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যদি কোনো কবি সেসব বিষয়কে তাঁর কবিতায় আশ্রয় দিতে চান, তবে তাতেও গণচেতনারই রূপায়ণ ঘটে। তাই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে সময়ে-সময়ে, দশকে-দশকে বাংলাদেশের কবিতায় আবির্ভূত হতে থাকেন প্রতিশ্রুতিশীল কবিরা। কবিতায় তাঁদের ভাষার ব্যবহার, বিষয়ের ঐক্য, শব্দের নতুনতর বিন্যাস যেন সবকিছুর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে থাকে।পঞ্চাশের তরুণদের মতো অন্যান্য দশকেও স্বকীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন নতুন কবিরা। এই ধারা চলতে থাকে।একাত্তর হয়ে উত্তাল নব্বই পর্যন্ত। বাংলাদেশের কবিতা প্রধানত গণচেতনায় ঋদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পঞ্চাশ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত। পঞ্চাশের প্রধান কবিদের গণচেতনামূলক কবিতায় স্বকীয় শব্দের প্রায়োগিকতা অন্বেষণ করলে দেখা যায়। এই সময়ের কবিরা একই পরিস্থিতিতে কবিতা লিখেছেন, আবার তাতে মৌলিকতার স্বাক্ষরও রেখেছেন নিজস্ব প্রতিভাগুণে। শব্দের স্বকীয় ব্যবহারে তা হয়ে উঠেছে নিজস্ব কণ্ঠের পরিচায়ক। প্রতিটি কবির নির্বাচিত শব্দের ব্যবহারই তাঁকে স্বমহিমায় স্বীকৃতি প্রদান করেছে। 



নীলাভ কাচের প্লেটে হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত উজ্জ্বল

ছিঁড়ে এনে রাখলে টেবিলে

সূর্যোদয় হলো

সমুদ্রের জলে।

আজকের প্রগাঢ় সকালে

কী দেবো তোমাকে? কী দেবো, কী দেবো!

রক্তমুখী নীলা।

এর চেয়ে অন্যতর কী বা দিতে পারি।

উত্তোলিত প্রাসাদের নিচে

অবধ্বস্ত সে নগরী একদিন আবিষ্কৃত হবে।

রমণীর ধবল করোটি, ডানচক্ষু দৃষ্টির কবর,

অন্যতর চোখের কোটরে সুদুর্লভ মণি

রক্তমুখী নীলা,

যেন তার তীরবিদ্ধ গাঢ় নীল চোখ

এক ফোঁটা রক্ত জ্বেলে অন্ধকারে চেয়ে থাকে

কারো দিকে।

কার দিকে হে বিশ শতক?


(রক্তমুখী নীলা)



উপরের কবিতাটি লিখেছেন কবি আজীজুল হক (জন্ম ১৯৩০, মৃত্যু ২০০১)। যিনি প্রতিভার স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল, বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশকের এক প্রতিশ্রুতিশীল কাব্যশিল্পী। সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব-দ্রোহ ও রক্তপাতের প্রেক্ষাপটে অনিবার্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি শিল্পীত করেছেন তাঁর কবিতায়। আপন অস্তিত্বকে বোধ করে তা রক্ষার প্রগাঢ় আর্তনাদে মুখর থাকতে দেখা যায় তাঁকে। কখনো এ প্রসঙ্গেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন তিনি। কবি আজীজুল হক ছিলেন আপন ইতিহাস-ঐতিহ্যে আস্থাশীল, মানবতায় পূর্ণ, প্রগতিধর্মে দীক্ষিত ও জীবনমুখীনতায় উচ্চকণ্ঠ। 


৫২তে ভাষার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও পাকিস্তান বিরোধ অস্থির অভিঘাতী তরঙ্গ এদের মধ্যকার আবার কোনো কোনো কবিকে স্বাধিকারের চেতনা জাগরণের রসদও জুগিয়েছিল । এই রাজনৈতিক অভিঘাতী ৬০এর দশকে এ বাংলার নিজস্ব কাব্য সাহিত্যাঙ্গনকে আরো আধুনিকতা সংলগ্ন করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে । আবার আধুনিকতা যদিও চেতনা ও মননশীলতার মধ্য দিয়ে মানবতাবাদকে শাণিত করে তোলে; তবুও সময় ও নগর বাস্তবতার সাথে এর রয়েছে পৌণঃপুনিক সম্পর্ক। এই বাংলার কবিতা তাই নগর ও চারপাশের বাস্তবতাকে অন্তরে বাহিরে ও চেতনায় তুলে নেবার মোক্ষম পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিল ।

১৯৬০ সালে প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার সাথে ঢাকা নগরীর পৌনঃপুনিক সম্পর্কের সাঁকো নির্মাণের পাশাপাশি এ বাংলার কাব্য সাহিত্যের সত্যিকার আধুনিকতার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন কবি শামসুর রাহমান । অপরদিকে, তিরিশি কাব্যজগত ধারাবাহিকতার উত্তর প্রজন্মের কবি শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থটি ওপার বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রায় পরিণত ও আধুনিকতা–উত্তর সম্পর্কসূত্র পুনঃনির্মাণ করেন । নিরঙ্কুশ আধুনিকতার বহিস্রোত ক্ষুব্ধ শামসুর রাহমানের কবিতা এ বাংলার নাগরিক মনস্বীতায় নতুনতর প্রসাদ সৃষ্টির পাশাপাশি, স্বাতন্ত্রে বৈচিত্র্য ভিন্নতায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । এরপর ১৯৬৩ সালে -“রৌদ্র করোটি”তে কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে ৪৭পরবর্তী ওপার বাংলার সমস্ত ঐতিহ্যমণ্ডিত, ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী ও প্রভাববাদী কাব্যবলয়কে পাশ কাটিয়ে বাংলা কবিতাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধশালী স্তরে তুলে আনেন । অন্যভাবে বলা যায়, রৌদ্র করোটিতে নামকরণের ভেতরেই নিহিত আছে হয়তো আধুনিক বাংলা কবিতা করোটির ভেতর বাহিরে প্রতিভা, মেধা ও ব্যক্তি–স্বাতন্ত্রের ঝলকানির অবিস্মরণীয় এক সৃজন উপাখ্যান। অতঃপর, ১৯৬৭তে কবি শামসুর রাহমানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বিধ্বস্ত নিলীমা প্রকাশের পর আধুনিক বাংলা কবিতা ধারার এক পরিণত বিকিরণ প্রভা সমকালের বিচিত্র ল্যাম্পপোষ্ট তির্যকভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করে । বিশেষত কবিতার কাব্যসত্তাকে উচ্চকিত রেখেই বর্ণনাময়ী বক্তব্যে, স্বকীয় ভাব ও প্রতিভাবের ঋদ্ধ সমীকরণে তিনি বাংলা কবিতায় ডিসকোর্সের শাণিত ধারার প্রতি–নন্দনত্ব উপস্থাপন করেন । যা ছিল বাংলা কবিতার সর্বাঙ্গীন অবয়ব ও মনোজগতের প্রায় পরিপূর্ণ বিস্তৃতির মানসকল্প বিন্যাস । এভাবে শামসুর রাহমানের কাব্যজগৎ জুড়ে জেগে ওঠে নগর স্বদেশের বিপুলা এক মানচিত্র । 

এসব কিছুই মাথায় রেখেও বলতে পারি আজীজুল হকের -ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে (১৯৬১),বিনষ্টের চিৎকার (১৯৭৬), ঘুমও সোনালী ঈগল (১৯৮৯)। তিনটি কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতাকে নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে, আমরা জেনেছি কবি হওয়ার জন‍্য প্রচুর বই পকাশ করা জরুরি নয়, জরুরি হচ্ছে চিন্তা ও চেতনার উন্নয়ন, উন্নত লেখা। তার প্রমাণ তিনি। এছাড়াও জানা যায় বন্ধু ও প্রকাশকরা শ্রেষ্ঠ কবিতা বা নির্বাচিত কবিতা প্রকাশের কথা বললে তিনি কখনও সম্মত হননি। নির্বাচিত বা শ্রেষ্ঠকে স্বীকার করতেন না। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিদ‍্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় তিনটি বই থেকে বাছাই করা লেখা নিয়ে আজীজুল হকের কবিতা। একটি মাত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে।

রাজধানীর মোহময় হাতছানিকে উপেক্ষা করে সারাজীবন যশোর শহরে অধ‍্যাপনা আর সাহিত‍্যসেবায় জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। যশোরের তরুণ কবিদের অনিবার্য অভিভাবক হয়ে সাহিত‍্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। আমরা এই কৃতি কবিকে যথার্থ মূল‍্যায়ন করতে পারিনি বা করিনি।

আজীজুল হকের কবিতায় একদিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতন শিল্পদৃষ্টি প্রতিভাত অন্যদিকে, অস্তিত্ববোধ ও ভাবনাপ্রসূত কবিতার বিষয় ও উপকরণ-অনুষঙ্গ অভিনব মর্যাদায় সিদ্ধ হয়ে ওঠে। দুঃস্বপ্ন, মৃত্যু, অন্ধকার, রক্তপাত প্রভৃতি উপমা-প্রতীক সাম্রাজ্যবাদ ও অস্থির সময়কে যেমন নির্দেশ করে, তেমনি দীর্ঘদিনের পরাধীন বিপন্ন জাতিসত্তাকে সংহতি দানের চেষ্টায় তাঁকে সংগ্রামী হতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি কবিতায় নিয়ে আসেন দ্যুতিময় সব মুহূর্ত-প্রতীক। কখনো তীব্র কৌতুক ও ব্যাঙ্গবাণে তাঁকে সমকালীন পরিস্থিতিকে তীক্ষ্ণ করে তুলতেও দেখা যায়-


এক. 

আদিম সমুদ্র থেকে অন্তিমের স্থলভাগ জুড়ে

বিশাল পাহাড় এক অণুতম সূর্যকে ছুঁয়ে

পড়ে আছে, যেন

মহাকাল শিলীভূত, মসৃন পিচ্ছিল।

একদিন মানব সমাজ

ওই খানে যাবে, এখন যন্ত্রণা শুধু আজ, এখন কেবল

শব থেকে শবের সিঁড়িতে একটি আকাঙ্ক্ষা হেঁটে যায়

জীবনের নামে, এখন সে জীবনের নাম

স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম। 

(যন্ত্রণা; ঝি.মু.সূ)


দুই. 

অতীতে প্রোথিত দেখি অর্ধাঙ্গ আমার

এবং দুচোখ

শামুকের ঠোঁটে বিদ্ধ নীলকান্ত মনি

যেন এক নিহত সময়

দুর্ঘটনার পিঠে ঠেস দিয়ে পড়ে থাকে

হাজার বছর। 

(যন্ত্রণার মৃত্যুতে; ইচ্ছার নায়ক, ঝি.মু.সূ)


তিন. 

নীলাভ কাঁচের প্লেটে হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত উজ্জ্বল

ছিঁড়ে এনে রাখলে টেবিলে

সূর্যোদয় হলো

সমুদ্রের জলে।

আজকের গ্রগাঢ় সকালে

কী দেবো তোমাকে? কী দেবো, কী দেবো!

রক্তমুখী নীলা। 

(রক্তমুখী নীলা; ঝি.মু.সূ)


চার. 

অবশ্যই আমি সেই ব্যবহৃতা রমণীর সজ্ঞান প্রেমিক।

জীবনকে সুনিপুণ আলিঙ্গনে বেঁধে

চিরকাল বেঁচে থাকে নির্বিঘ্নে যেমন

মৃত্যুটা; তারো চেয়ে অধিক নিকটে আমি তার। 

(বিনষ্টের চিৎকার; বি.চি.)


পাঁচ. 

একালের কবিতা ফুলকে বাদ নিয়েছে।

আকাশে মেঘ, কালো মেঘ

সূর্য নেই।

যে ফুলের নাম সূর্যমুখী সে নামেই সে ফুটলো।

আগুন রঙ পাঁপড়ি কী ধূসর!

আগুন থেকে ছাই। 

(মেঘমুখী সূর্যমুখী; ঘু.ও সো. ঈ.)


ছয়. 

রাজার আশ্বাস-দুর্গসঙ্ঘের আড়াল আর

মহান নগর

পলাতক বন্ধুদের নির্বিঘ্ন আশ্রয়। 

(প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবিম্ব; ঘু.ও সো. ঈ.)


সাত. 

দারুন দু:স্বপ্ন ছাড়া গাঢ় কোন মধ্যরাত নেই

নীল নীল মৃত্যু ছাড়া স্বপ্নহীন দীর্ঘ ঘুম নেই

অনিদ্রার জ্বালা ছাড়া নিদ্রাস্নাত জাগরণ নেই। 

(ঘুম ও সোনালি ঈগল; ঘু.ও সো. ঈ.)

মিথ বা পৌরাণিক উপাদানের ব্যবহার আজীজুল হকের কবিতাকে সার্বজনীনতা দান করে। দ্বন্দ্বময় অস্তিত্ব-সচেতন কবিমানস থেকে ভারতীয়, গ্রিক প্রভৃতি পুরাণের উপাদানসমূহ তিনি সমকালীন জীবন-প্রসঙ্গে রূপায়ণ করেছেন-যা মানুষের চিরন্তন ভাবনার মাধ্যম ও রূপকল্প হিসাবে কাজ করেছে। বৃহত্তর জীবনকে কবি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাণ ব্যবহারসূত্রে সম্ভাবনাময় করে তুলেছেন। তাঁর কবিতা থেকে-

এক. 

সূর্যই আমাদের প্রথম নায়ক

চিরকাল আমাদের নায়কই সে আছে। 

(মেঘমুখী সুর্যমুখী; বি.চি.)


দুই. 

খুঁজে দেখ, সেইসব বিদ্ধস্ত ও প্রোথিত নগর

হিংস্র দাঁতের ফাঁকে আর্যদের হাসি,

দ্রাবিড়ের বিচূর্ণ করোটি। 

(হাড়; ঝি.মু.সূ)


তিন. 

মনে করো, ইভের সান্নিধ্য ছেড়ে আমি এক আদিম পুরুষ

সুপ্রাচীন ব্যাবিলনে নিগূঢ় চুম্বন রেখে বিবাহিত রূপসীর ঠোঁটে

নিখোঁজ হয়েছি। 

(প্রাক উত্তর পর্বের সঙ্গীত; ঝি.মু.সূ)


চার. 

অপহৃতা রমণীর মতো এক স্মৃতিগন্ধা অনার্য রূপসী

ঝিনুক-রহস্য চোখ তুলে

সেই প্রশ্ন সম্প্রতি ও করেছে আমাকে

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। 

(রূপকথা; বুদ্ধ ও ড্রাগন, ঝি.মু.সূ)

সময় নিরন্তর হাঁটছে তার পায়ে ধুলো ওড়ে না। আক্ষেপে জুড়ে থাকে শুধু আজীজুল হককে আবিষ্কারের বিষয়টি। তাঁর কবিতা, তাঁর দর্শন যুগে যুগে আবিষ্কৃত হওয়ার মতো। কারণ তার কবিতার শরীরে আধুনিকতার আদলে আধুনিক জীবনেরই ধ্রুপদ বিন্যাস করা হয়েছে-যা খুললে উন্মোচিত হবে এক বিরাট ভুবন। আর তাঁর দর্শনও অভিনব। মানুষ সবকিছুই অস্তিত্বের প্রয়োজনে করে, এমনকি যে কবিতা লেখে তাও। এই হচ্ছে আজীজুল হকের দর্শন। এই দর্শনকে ঘাঁটলে কাব্যপ্রয়াসীরা পেতে পারেন অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর। কবিতা সময়ের সাথে বদলে যায়। নতুন কবিরা নতুনভাবে নির্মাণ করতে চান কবিতার শরীর। সেই সূত্রে কবিতা আধুনিকোত্তর যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু নানা কারণে পঞ্চাশের কবিরা ইতিহাসে বিশেষভাবে থাকবেন। থাকবেন আজীজুল হকও। এই বিষয়টি এখনই বিরাটভাবে দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যতে হবে। কারণ মহৎ কবিতা এক সময় না একসময় কথা বলে।

সংখ্যার দিক থেকে কবি আজীজুল হক লিখেছেন অল্প কিন্তু তাঁর সমগ্র রচনা শিল্পবিচারসূত্রে অনন্য এবং একথা বলা প্রয়োজন, তাঁর কাব্যকর্ম বাংলা কাব্যভূমির সমৃদ্ধি প্রসঙ্গে সসম্মানে বিবেচিত ও গৃহীত হতে বাধ্য। 


  


রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

পিয়াংকী

                



কা করু সাজনি আয়ে না বালম

 


 অশ্বত্থের গায়ে ঝুরি নামানো সন্ধে, উড়ে যাচ্ছে শুকনো পাতার  শোক। উদাসী সন্ন্যাসীর কালরাত্রি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আদিম এক শিকড়ের কাছে।

হাতের নাগালে যা কিছু তার এক পঞ্চমাংশও যদি মাটির হয় অথবা গাছের হয় অথবা নদীর হয়, আমি চুলভেজা জলে লিখে রাখব 'জোনাকিপোকা'। 

হয়ত এসব শুনে পথভ্রম হবে বাগদি মেয়েটার , হয়তবা আগুন খুঁজবে নাবিক। এতকিছুর পরও  চায়ের দোকানে বিড়ি ধরিয়ে বরফ লিখবে যারা তাদের সব্বার নামে একটা করে পৌষদিন বিলি করব ভেবে এগিয়ে যাব যে জলাশয়ের দিকে... 


খরাক্ষণ চলছে, মাছ আর মৌমাছিরা অজ্ঞাতবাসে। অববাহিকায় বিস্তর মেঘ আর জমানো ঘরবাড়ি। যারা এ রাস্তা ধরে ধানক্ষেতে যায় খালি পায়ে তাদের নখে ধুলো লেগে নেই।বরং  ঘামের নুনটুকু রসায়নবিজ্ঞান বইয়ের প্রচ্ছদে মিলেমিশে আরেকটু উলঙ্গ হয়ে গেছে 


বন্দর ভেঙে আসছে ভাবছ? ভাবছ এবার হুড়মুড়িয়ে পড়বে সযত্নে গুছিয়ে রাখা কাচের বাসনপত্তর? পূর্বে তাকাও। জাফরান ছড়ানো তোমার পোশাকআশাকে উল্টে গেল সূর্য। এবার কী হবে? বয়ে যাচ্ছে যাবতীয় আলো। ধরে রাখতে হবে। সঞ্চয় করতে হবে সবটুকু বিছিয়ে, কিন্তু ঘটিবাটি চালচুলো আর আশ্রয় ছাড়া তো কিছুই নেই। 

গভীরে লেগে থাকা যতটুকু ক্ষত,  দাগ তো ততটা দৃঢ় নয়,তবু সেটুকু ঘিরেই  অকাল বসন্ত, ধুয়ে ফেলা চিহ্নে  মাটি আর ভৈরবীর পূর্বস্পর্শ।  কাদামাটি গড়া মূর্তির নিমেষে উধাও হওয়া বা জলের তোড়ে  ফিরতি পথের  পায়ের খড়ম... এটুকুই তো সন্ন্যাস


চৌরাস্তার মোড়

বনলতার সমর্পণ 

এবং এযাবৎকালের পরিক্রমা 


আপনি বলেন, "আভি না যাও ছোড়কর কে দিল আভি ভরা নেহি"

আমি দুয়ারে সর্ষে ছিটাই, রেডিওতে ঘোষণা হয়...আয়ে না বালম কা করু সজনী

সুনৃতা মাইতি

                 


রম্যে রবীন্দ্রনাথ 


রম্য কথাটির আভিধানিক অর্থ হলো যা সুন্দর , মনোহর আর রমনীয়। ফরাসী শব্দ " Belles letters" এর প্রতিশব্দ হিসেবেই "রম্যরচনা" শব্দটির আবির্ভাব বলে ধরে নেওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে যে ইংরেজি সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক জোনাথন সুইফট হলেন সেই লেখক যিনি "রম্যরচনা" বিষয়টির প্রথম অবতারণা করেন। তবে ফরাসী শব্দটি ব্যাপকার্থে কাব্য বা নাটক কেই বোঝাত। পরবর্তীকালে অবশ্য লঘু চালের শৈল্পিক রস সাহিত্যকেই রম্যরচনা রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগে মনে করা হতো রম্যরচনায় আবেগ , অনুভূতি , পান্ডিত্য বা মেধা নিতান্তই কম; যা আছে তা অবান্তর এক প্রকারের ছ্যাবলামো। কিন্তু  আমাদের প্রিয়তম লেখকের মতে " রম্যরচনা হলো বাজে কথার প্রবন্ধ",আর " অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে যথার্থ চেনা যায়।"


 বাংলা সাহিত্যের রম্যরচনার ধারাটি কিন্তু  মোটেই ক্ষীণাঙ্গী নয় । বিস্মৃতপ্রায়  প্যারিচাঁদ মিত্র , কালীপ্রসন্ন সিংহ , বিদ্যাসাগর থেকে শুরু  হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র , প্রমথ চৌধুরী , সৈয়দ মুজতবা আলী, অন্নদাশঙ্কর রায়, রাজশেখর বসু, বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় , শিবরাম চক্রবর্তী , নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় , তারাপদ রায় পেরিয়ে শীর্ষেন্দু  মুখোপাধ্যায়  কিংবা নবনীতা দেবসেন পর্যন্ত প্রত্যেকের রচনাতেই সর্বোত্তম  শ্রেনীর রম্যের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এইসব কথাগুলো লেখার উদ্দেশ্য কিন্তু  রম্যরচনা নিয়ে সবিশেষ আলোচনা করবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবার জন্য মোটেই   নয়।  আসল উদ্দেশ্য হলো রবীন্দ্রনাথের লেখায় রম্যচিন্তার প্রকাশ নিয়ে কিছু  কথা লেখা যা নিশ্চিত ভাবেই একপ্রকারের গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো হিসেবেই ধরা যেতে পারে। তবে রম্য রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে খুব একটা বেশি লেখা পড়িনি এ যাবৎ । হয়ত কোনও সময় এ বিষয় নিয়ে বিস্তৃত কাজ হবে । সে আশা নিয়ে ছোট একটি ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে বিষয়টি ধরবার একটি ক্ষুদ্র এবং সীমিত প্রচেষ্টা করছি। আসলে কিনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বহু বহু কাজ হয়ে থাকে। অনেকেরই জীবন জুড়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ । আমাদের শহরের শামুদাতো রবীন্দ্রনাথের লেখার কোলাজ করে করেই কত যে অনুষ্ঠান করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাই একসময় তার নামই হয়ে যায় ভাঙা শামু। আমি কৌতুক প্রিয় তাই আমার কাছে বিশ্বকবির এই দৃষ্টিভঙ্গিটি বড্ড বেশি করে ধরা পড়ে। জানিনা আর কারও সাথে এটা ঘটে কিনা। হাজার হাজার উদাহরণ দেওয়া যায় এ প্রসঙ্গে। কিন্তু  আমার পরিসর সীমিত তাই আশা করছি এই অপ্রতুলতা পাঠক নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।


 পাশ্চাত্য মত অনুযায়ী হাস্যরস মূলতঃ চারপ্রকার। হিউমার , উইট , স্যাটায়ার এবং ফান। সবাই হয়ত জানেন যে হিউমার মৃদু এবং গভীর , তার ভেতরে কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে অশ্রুজল। সেখানে উইট মননশীল,পরিশীলিত ,তীব্র এবং  তীক্ষ্ম।  স্যাটায়ার অবশ্যই আক্রমণাত্মক এবং ফান অপেক্ষাকৃত  স্থুল রূচির কৌতুকরস।  আবার হিউমার  যেখানে বিশুদ্ধ  হাস্য রসাত্মক সেখানে  উইট অবশ্যই কিছুটা ব্যাঙ্গ বিদ্রুপাত্মক। হিউমার অনেকাংশেই  নির্মল হাসি। "উইট হচ্ছে গোলাপ স্পর্শ করতে গিয়ে কাঁটার আঘাত"।  আর রবীন্দ্র রচনাতে এই  উইট এবং হিউমার দুটোই এসেছে বহুল পরিমানে।  তার সাথে বিশ্বকবির প্রসন্ন দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়।  এ সব কিছু খুঁজতে  হলে ডুব দিতে হবে তার রচনাতে। আমরা আদার ব্যাপারী মাত্র। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গভীর আলোচনা করবার সামর্থ্য নেই ধরে নিয়েই ভয়ে ভয়ে কিছু  প্রসঙ্গের উল্লেখ করতে বড়ই সাধ জাগে।  কারণ আমার একান্ত  ব্যক্তিগত বিশ্বাস যে রবীন্দ্রনাথের রম্যচিন্তা বা রম্যলিখন বিষয়ক মুন্সিয়ানা শুধুমাত্র পঞ্চভূত বা বিচিত্র প্রবন্ধের লঘু চালের রচনাগুলির মধ্যেই  আবদ্ধ নেই।


 তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে  বিচিত্র প্রবন্ধ কিংবা পঞ্চভূতের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধগুলোতে হিউমার আর উইট দুটোই ব্যবহৃত হয়েছে বহুল পরিমাণে। দুটো উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। জাহাজ ভ্রমণ বৃত্তান্তের বর্ননা দিতে তিনি বলছেন...

মরিলাম না বটে কিন্তু যমরাজের মহিষের কাছ হইতে একটা রীতিমতো ঢুঁ খাইয়া ফিরিলাম।  কর্ত্তা বাবু রুষ্ট হইয়া বলিলেন, “সমস্তই মাঝির দোষ,” মাঝি কহিল, তাহার অধীনে যে ব্যক্তি হাল ধরিয়াছিল তাহার দোষ। সে কহিল, হালের দোষ। হাল কিছু না বলিয়া অধোবদনে সটান জলে ডুবিয়া রহিল-গঙ্গা দ্বিধা হইয়া তাহার লজ্জা রক্ষা করিলেন।"


আবার পরনিন্দা প্রবন্ধটিতে বলছেন...

" পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং এত ব্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে একটা যে-সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে।"

 অথবা হিন্দু গায়নরীতিতে পাশ্চাত্য প্রভাবের বিরোধিতা প্রসঙ্গে লিখতে বসে ক্ষুরধার উইটের অবতারণা করা হয়েছে...


"আমরা স্পষ্টই দেখ্‌তে পাচ্চি আমাদের দেশে গান জিনিষটা চল্‌ছে না। ওস্তাদরা বল্‌ছেন, গান জিনিষটা তো চল্‌বার জন্যে হয় নি, সে বৈঠকে ব’সে থাক্‌বে তোমরা এসে সমের কাছে খুব জোরে মাথা নেড়ে যাবে।"

 কিন্তু  এইসব সুনির্দিষ্ট রম্যরচনার মধ্যে রসিক রবীন্দ্রনাথকে কখনই বেঁধে ফেলা যায়না। তার রচনায় রম্যরস বারে বারে এসেছে। এসেছে গল্পগুচ্ছে, এসেছে উপন্যাসে ,এসেছে নাটকে কিংবা জীবনস্মৃতির পাতায় পাতায়। রসিক কবি অবশ্য কৌতুক রস সম্পর্কে লিখে গেছেন যে চারিদিকের যথাযোগ্যতার মাঝে হঠাৎ করে যদি অসংগতির উদ্রেক হয় তবেই চিত্তপ্রবাহ দুর্নিবার হাস্যতরঙ্গে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

এই হাস্যতরঙ্গ যে সবসময় উচ্চকিত হতে হবে তা তো নয়। রবীন্দ্রনাথ অতি সিরিয়াস কিছু  গল্পের মধ্যেও অবতারণা করেছেন কিছু  রম্যভাবের যা তার   মেধা ও পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। মেঘ ও রৌদ্র গল্পে পাঠরত শশিভূষণের কাছে গিরিবালার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টাটি  অতি মনোগ্রাহী এবং মৃদু কৌতুকসূচক।


 আবার ধরা যাক ছুটি গল্পটির কথা।গল্পের প্রথমদিকে বালকদের খেলাধূলার প্রকার ও ভাবসাব নিয়ে যে অদ্ভুত  কৌতুকরসের সৃষ্টি করা হয়েছে তা লেখকের শিশুচরিত্রের  অনবদ্য বিশ্লেষণ  । পড়তে পড়তে মনে নির্মল আনন্দের সঞ্চার ঘটে। আবার এক একটি বাক্যে প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বকবির মেধা এবং কৌতুকপ্রিয়তা। যেমন গ্রাম থেকে শহরে যাবার সময় ফটিকের কার্যক্রমের বর্ণনা ।

" ফটিকছড়ির ফটিক অবশেষে যাত্রাকালে আনন্দের ঔদার্য-বশত তাহার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্ত মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ভোগদখল করিবার পুরা অধিকার দিয়া গেল।"

এই রকম প্রচুর বাক্যের ছড়াছড়ি গোটা গল্পগুচ্ছ জুড়ে। বাক্যগুলোর গঠন সৌকর্য এবং গভীরতর অর্থ পাঠককে শুধুমাত্র কৌতুকাপন্নই করেনা ভাবতে বাধ্য করে। যেমন হৈমন্তি গল্পে বিবাহের তাড়ার কারণ সম্পর্কে লেখা হয়েছে...

"মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে, কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে, সেইজন্যই তাড়া। "


আবার পাত্র ও পাত্রী গল্পে কথক নিজের সম্পর্কে  বলছেন...

" আমি কৌমার্যের লাস্ট বেন্চিতে বসে শূন্য সংসারের কড়িকাঠ গণনা করে কাটিয়ে দিলুম।"

এইরকম প্রচুর উদাহরণ দেওয়া যায় অতি সহজেই। আবার কৌতুক নাটিকার মধ্যে "চিরকুমার সভা" যেমন প্রতি পদে পদে ক্ষুরধার কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে রম্য আবহের সৃষ্টি করে   তেমনই তাসের দেশ নাটকে খানিক উইট আর কিছু  স্যাটায়ারের অমোঘ প্রবেশ লক্ষ্য  করা যায়। শেষের কবিতা উপন্যাসে তো অমিতের মুখে দুর্দান্ত এক একটি রম্য ও বুদ্ধিদীপ্ত  বাক্যের ব্যবহার পুরো রচনাটিকেই একটি অপূর্ব  স্তরে উন্নীত করেছে।

আবার লেখকের বয়ানে বক্র কৌতুকেরও কমতি নেই। যেমন ধরা যাক সিসি লিসির বর্ণনা । অমিতের বোন সিসি এবং লিসিকে দেখে মনে হয়...

"ফ্যাশানের পসরায় আপদমস্তক যত্নে মোড়ক করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট বিশেষ"। 

 সিসির উচ্চহাসির উচ্ছ্বাসে যোগ দেওয়াটাকে  তাদের কুকুর ট্যাবিও তার সামাজিক কর্তব্য বলে মনে করে ।


কবি তার ছোটবেলার কথাও যখন লিখতে যান এই ভাবেরই প্রাধান্য দেখা যায়। রসিয়ে রসিয়ে লেখা তার ছোটবেলার স্মৃতি বড়ই স্বাদু ।মাস্টারমশাইদের আচরণ , পোড়োদের কীর্তি , পুরোনো কলকাতার বিবরণ, বউ ঝিদের ফ্যাশানের গপ্পো, দুপুরবেলায়  বঙ্গদর্শন নিয়ে কাড়াকাড়ি সবকিছুই লিখেছেন আদ্যোপান্ত রস মিশিয়ে। আসলে কিনা রবীন্দ্রনাথের  রচনা পড়লে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় জীবন নেহাতই বিশুষ্ক, গম্ভীর কিংবা কর্তব্যের নিগড়ে বাঁধা কোনও নৈতিকতার পাঠ নয় বরং অল্পবিস্তর রম্য ভাবেরও বিস্তারপথ। তাই বোধহয়  রম্যভাবকে কখনোই উপেক্ষা করেননি তিনি।

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

রত্না দত্ত

                   


 বই - আমাদের পরমাত্মীয়

বই মানুষের চিরন্তন বিশ্বস্ত সঙ্গী।বই মানুষের জীবনকে করে তোলে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক।মানুষের সুঅভ্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট হল বই পড়া এবং অন্যকে বই পড়ার উৎসাহ প্রদান করা।কেননা, বইপড়ার মাধ্যমে মানুষের মনে আসে আনন্দ - বেদনার কাব্যিক,দার্শনিক সত্যবোধ।
     শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সহচর হিসেবে বই পূর্বপরিচিত।বই মানুষকে হাসতে শেখায়,কাঁদতে শেখায়,নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়।শত শত কাগজের মাঝে সীমাহীন জ্ঞানকে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে।এই বই দুরন্ত শিশুকে যেমন আনন্দের খোরাক জোগায় তেমনি মাঝবয়সী,প্রবীণ ও নবীনদের
আত্মতৃপ্তির স্বাদ আহরণের সুযোগ দেয়। বিস্তীর্ণ পৃথিবীর দুর্লভ সব কার্যসিদ্ধির ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে বইএর পাতায় পাতায়।সেইসব কালজয়ী কাহিনী স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে বইএর পাতার প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে।সঙ্গীহীন বালকটিও অজান্তে বইকে সঙ্গী করে নেয়।প্রতিটি মানুষের কাছে নতুন বইএর মানে নতুন কিছু আবিষ্কার।তবে কৃত্রিমতার বিষাক্ত ছোবল জ্ঞানের আধার বইকেও রেহাই দেয়নি।ধ্বংসাত্মক জ্ঞান সম্বলিত বই মানুষের স্বাভাবিক চিত্তকে বিষিয়ে তোলে।বই যেমন অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তেমনি আলোকিত জীবনকেও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে পারে। তা সম্পূর্ণভাবে বই ও পাঠকের উপর নির্ভর করে।পাঠককে সচেতনতার সাথে বইএর মর্ম বা গুরুত্ব উপলব্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে সেটা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
     বই হল জ্ঞানের আধার।মানুষের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু বই।বইএর পাতার কালো অক্ষরগুলিতে সঞ্চিত হয়ে আছে মানবজাতির হাজার বছরের জ্ঞানপ্রবাহ।জ্ঞানের ধারক হিসেবে বই অতীত ও বর্তমানের সংযোগ সেতু।
বই পড়া হল একটি নির্মল আনন্দের উৎস।বইপ্রেমী মানুষ মাত্রই বই পড়ার আনন্দ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।মানুষ যুগে যুগে বই পড়ার মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে,নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জগৎকে বিস্তৃত ও প্রসারিত করেছে।মনের প্রসারতার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই।প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ - দুর্দশা,ক্লান্তি - হতাশা মানুষের মনকে যখন বিষিয়ে তোলে তখন বই পড়ার মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে অপার্থিব আনন্দ।মনীষীদের জীবনীপাঠে তাঁদের বইপড়ার অভ্যাস ও মানস গঠনে এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা অবগত হই। বিপুলা এই পৃথিবীকে জানার জন্য আমাদেরকে বইএর দ্বারস্থ হতে হবে।জ্ঞান - বিজ্ঞানের বিচিত্র শাখায় মানুষের ধ্যানধারণার যে প্রতিফলন ঘটেছে তা স্থান পেয়েছে বই এর পাতায়।ছোটবেলায় সমস্ত শিশুদের হাতেই দেখা যায় সেই বিশ্ববিখ্যাত ' সহজপাঠ ' ও ' বর্ণপরিচয় '। যার হাত ধরেই আমাদের সকলের শিক্ষার হাতেখড়ি।তাই যে বই হোক না কেন তাকে অস্বীকার করে আমাদের শিক্ষার পথকে প্রশস্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।পরবর্তী ক্ষেত্রে সাহিত্যের রস আস্বাদন,বিজ্ঞানের বৈচিত্রময় জগতে অবাধ বিচরণ কিংবা ইতিহাস,দর্শন তথা জ্ঞানের যেকোন শাখায় বিচরণের একমাত্র বাহন হল বইপড়া।তবে পড়ার জন্য বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।পাঠকের রুচি ও মানসিক পরিপক্কতার আলোকে বই নির্বাচন করতে হবে।শুধু নিজে বই পড়লেই হবে না আমার পাশের লোকটিকেও বই পড়ার জন্য অনুপ্রেরণা দিতে হবে।তার জন্য যেকোনো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বা অন্য কোনো পার্টিতে উপহারস্বরূপ তার পছন্দের ভালো কোনো সাহিত্যিকের বা ভালো কোনো কবির লেখা ভালো বই দেওয়া যেতেই পারে।
একটি ভালো বই পাঠকমনের সর্বোচ্চ উৎকর্ষসাধন করতে পারে।অন্যদিকে একটি বাজে বই পাঠকের মনকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। সুনির্বাচিত বই পাঠ আনন্দ লাভের পাশাপাশি নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর এক শ্রেষ্ঠ উপায়।বই পড়ার মাধ্যমে ঘরে বসেই আমরা বিশ্বের বিখ্যাত ও শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য পেতে পারি,পরিচিত হতে পারি তাদের চিন্তা,চেতনার সঙ্গে।নশ্বর এই পৃথিবীতে অপার্থিব আনন্দ কেবল বই পড়াতেই পাওয়া যায়।
বই পড়া হল শ্রেষ্ঠ ও অত্যন্ত উপাদেয় একটি শখ।অতীত ঐতিহ্য,নানা চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারার সাথে আমরা পরিচিত হই।বিচিত্র ধরণের বইএর মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে চেনে,নিজেকে জানে,বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে।সেইসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ব্যক্তিজীবন তথা সমাজ ও জাতীয় জীবনকে উন্নত করে,সমৃদ্ধ করে।প্রত্যেককে বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন।আজ ইন্টারনেটের যুগে,ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপ এর যুগে বই এর গুরুত্ব তলানিতে এসে ঠেকেছে।তাকে আবার জাগিয়ে তুলুন,একে অপরকে বই উপহার দিন।বই একটি অন্যতম উপহার সামগ্রীও হতে পারে। যার মাধ্যমে একে অপরকে বইপড়ার অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়।বইপড়ার মাধ্যমে সার্বিক মনের দিগন্ত উন্মোচিত ও প্রসারিত হয়,উদার ও মহৎ হয়।যাবতীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আমরা প্রত্যেকে বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল হতে পারি কেবলমাত্র ভালো বইএর সংস্পর্শে এসে।একারণে,পড়ার জন্য ভালো বই, আনন্দদায়ক বই আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।তাই আমাদেরকে পাঠাগারে যেতে হবে।না থাকলে সমবেত প্রচেষ্টা চালিয়ে পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে।বিশেষ করে আমাদের দেশ, জাতি ও সত্তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বই অবশ্যই আমাদেরকে পড়তে হবে ও অন্যকে পড়াতে হবে।
বই পড়লে আমাদের মনে জাগ্রত হবে মানবিক চেতনা,দেশপ্রেম,মহৎ জীবন ভাবনা,সত্য - সুন্দরের সাধনা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, সময়ানুশীলন ও অধ্যবসায়ের সুদৃঢ় মানসিকতা যা সুন্দর জীবন গঠনে,সমাজ গঠনে ও দেশ গঠনে উজ্জীবিত করে।তাই স্বশিক্ষা অর্জনে বা নিজেকে ও অন্যকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম।বই আমাদেরকে শোকে স্বান্তনা,দুঃখে দুঃখজয়ের ব্রত ও পরাজয়ে বা ব্যর্থতায় সহিষ্ণুতার দীক্ষা দেয়।নির্মল ও অকৃত্রিম আনন্দ লাভের অন্যতম হাতিয়ার হল বই।
ছোটবেলা থেকেই যদি একটি শিশুকে বিভিন্ন ধরণের কমিকসের বই,ঈশপের কাহিনীর বই,জাতক জাতিকাদের গলপকথার বই,হস্যকৌতুকের বই,বিভিন্ন ধরণের গল্প ও ছড়ার বই  এর সঙ্গে পরিচয় করানো যায় তাহলে আস্তে আস্তে সেই শিশুটির মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ ও মানসিকতা গড়ে উঠবে।পারিপার্শ্বিক ও বাহ্যিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়।ছোটো থেকেই তাকে মুঠোফোনের স্বপ্ন না দেখিয়ে একটি সুন্দর বউ যদি তার হাতে তুলে দেওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম সুস্থ,সুন্দর পরিবেশে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে।তাই ছোট বড় থেকে শুরু করে আবাল - বৃদ্ধ - বনিতা সবাই আমরা অধিক পরিমাণে বই পাঠে আগ্রহী হব যা দিতে পরে এক সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যত।



   

তপন কুমার বসু

         


 
       
       প্রতিদিন বই পড়া নিয়ে কিছু কথা।
    

প্রথমেই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগবে যে আজকের এই গতিময় জীবনে মানুষের সময় কোথায় বই পড়ার। কিন্তু এ ধারণাটা ঠিক নয়। আমরা চাইলে দিনের যে কোন সময় একটু বার করে নিতে পারি  বই পড়ার জন্য। বর্তমান আধুনিক যুগে তো e-book এরও প্রচলন হয়েছে।
 ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই  পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটা ভাল বই  মানুষের মনের চোখ যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভেতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে। বারট্রাণ্ড রাসেল বলেছেন, " সংসারে জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়।"
   অর্থাৎ সাহিত্যে সান্ত্বনা না পেলে দর্শন, দর্শন কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস না মানলে ভূগোল -- এরকম আরো কত কি ? এখন প্রশ্ন এত ভুবন সৃষ্টি করব কি করে? সেটা করা যায় বই পড়ে বা ভ্রমণ করে। সেক্ষেত্রে বইপড়াটা সকলের নাগালের মধ্যে।
  জীবনে চূড়ান্ত সফল অনেক মানুষই বইপড়ায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বইপড়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা রোজ নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
  এখন বই পড়ব কেন ? সে প্রসঙ্গে যে কথাগুলো বলা যায় তা হল বই পড়লে জ্ঞান বৃদ্ধি হয়। বইপড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যত বেশি বই পড়া যাবে, তত জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। বই-ই পারে একজন মানুষকে যথার্থ জ্ঞানী বানাতে, আর জ্ঞান সবসময় একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে।
 বর্তমানে depression একটা সুপরিচিত শব্দ। Depression আসে জীবনের কোন বিশেষ পরিস্থিতি মেনে নিতে না পারার জন্য। দেখা গেছে বই পড়লে সেই বই তার নিজস্ব পরিস্থিতি, আবহাওয়া পাঠকের মনকে সম্পূর্ণ অধিকার করে। ফলে কিছু সময়ের জন্য depression থেকে বেরিয়ে আসা যায়।বই পড়ায় মানসিক উদ্দীপনা তৈরি করে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে বইপড়ার অভ্যাস মানুষকে Dementia এবং Alzheimer's নামে দুটি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বই পড়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যা মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীর সুস্থ রাখতে যেমন ব্যায়াম করি তেমনি মস্তিষ্ককে সবল ও কর্মচঞ্চল রাখতে বইপড়া বিশেষ জরুরী।
   এছাড়া বইপড়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ২০০৯ সালে ইউনাইটেড কিংডম এর সাসেক্স ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিকরা হার্টরেট ও মাসল্ টেনসন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন যে কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাতে দেখা গেছে মাত্র ছয় মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮% কমে যায়, যা হাঁটা (৪২%}, কফি পান (৫৪%} বা গান শোনা (৬১%} থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বইপড়ার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার ফলে আমরা এক মুহূর্তের মধ্যে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছতে পারি যা প্রতিদিনকার বাস্তবতা ও   নানা  দুঃখ কষ্ট থেকে একটু হলেও রেহাই দেয়, ফলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
বই পড়লে কল্পনাশক্তির বৃদ্ধি হয়। গল্প বা উপন্যাস যাই হোক তার বর্ণনা আমাদের কল্পনাকে দূর বিস্তৃতি দেয়। কোন জায়গার বর্ণনা পড়ে কল্পনায় আমরা সেইরকম স্থানে চলে যাই। কোন চরিত্র তার বইয়ের বর্ণনার সঙ্গে নিজের কোন চরিত্র মিলে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। এইভাবে বই আমাদের কল্পলোক ভ্রমণ করায়। যত বেশি বই পড়া যাবে ততবেশি কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।
 স্মরণশক্তিরও বৃদ্ধি ঘটে। যখন কোন বই পড়ি তখন বইয়ের অগণিত তথ্যগুলি মনে রাখতে হয়। মস্তিষ্কের অনেক exercise হয় ফলে memory power বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রোজ নিয়ম করে বই পড়লে একাগ্ৰতা শক্তি বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে আত্মসম্মানবোধ তৈরি হয়। এই আত্মসম্মানবোধ আসে তখনই যখন মানুষ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় প্রভৃতি মানবিক গুণগুলির মূল্য বুঝতে শেখে। বই পড়তে পড়তে মানুষের মনে এই বোধ জন্মায়। ফলে মানুষ অন্যকেও সম্মান জানাতে শেখে।
Virginia Woolf এর একটা সুন্দর উক্তি দিয়ে লেখা শেষ করি -- "Books are the mirrors of the soul."
 

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কৌশিক চক্রবর্ত্তী

                  


হিন্দু কলেজ ও ডিরোজিয়ানরা


কলেজ স্কোয়ারের ভেতরে ঢুকে ওয়াই এম সি এ-র ক্যান্টিনে কখনো চিকেন স্টু আর পাঁউরুটি খেয়েছেন? অথবা গোলদিঘির পাড় ঘেঁষে দুপা হেঁটে যেতে যেতে কখনো তাকিয়েছেন হিন্দু স্কুলের বারান্দার দিকে? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন এই গোলদিঘির পাড় ঘেঁষে কলকাতা তথা নব্য বাংলার নবজাগরণের ঢেউটার দিকে? দেখেননি তো? চলুন একটু দেখে আসি। কলেজ স্কোয়ারে পায়চারি করতে করতে কখনো তাকিয়ে দেখেছেন উত্তর দিকে উঁচু ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যে তৈরি কলেজ ভবনের একটা ত্রিকোণ চূড়ার দিকে? পূর্বে বিখ্যাত হিন্দু স্কুল আর পশ্চিমে সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলের ঠিক মাঝখানে আজও আপনি খুঁজে পেতে পারেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একখণ্ড জলজ্যান্ত ইতিহাস। বুঝতে পারছেন না তাইতো? সঙ্গের ছবিটিতে দেখুন। দেখতে পাচ্ছেন সেই চূড়া? গাছগাছালি ভেদ করে উঁকি মারছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়। বাংলার নব্য আধুনিক যুগে স্কুল কলেজগুলো স্বাভাবিক ভাবেই ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বেথুন কলেজ ভবন, শ্রীরামপুর কলেজ ভবনে আজও সেই রীতি স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বাংলার নবজাগরণে যে ভবন কলকাতার যুবক সমাজে ঝড় হয়ে আছড়ে পড়েছিল, যে ভবনে একসময় প্রতিদিন পা রাখতেন ডিরোজিও সাহেব, রিচার্ডসন সাহেব, টাইটলার সাহেবদের মতো রেনেসাঁসের কান্ডারীরা, কোথায় গেল সেই আস্ত বাড়িটা? হ্যাঁ, আমি ১৮১৭ সালে গোলদিঘির পাড়ে স্থাপিত হিন্দু কলেজের কথাই বলছি। পরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সাথে কলেজ কতৃপক্ষের গোঁড়া হিন্দু কর্তাব্যক্তিদের বিবাদের ফলে যা ভাগ হয়ে যায় দুটি ভাগে। কলেজ বিভাগটি আজকের প্রেসিডেন্সি কলেজ আর স্কুল বিভাগটি কলেজ স্কোয়ারের পাশে হিন্দু স্কুল। সে নয় হল। কিন্তু হিন্দু কলেজের ভবন?
            


 ভিক্টোরীয় স্থাপত্যে নির্মিত একটা বিরাট বাড়ি একেবারে ভেঙে ফেলা হবে তা আবার সম্ভব নাকি। তাই প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতোই। আর উত্তরও মিলে গেল একদিন। সেই কলেজ স্কোয়ারের উত্তরে ও সংস্কৃত কলেজের পিছন দিকে পরিত্যক্ত পড়ে থাকা সুউচ্চ ত্রিকোণ আর্চটি। কখনো দেখেছেন যে একটি কলেজ ভবনের পিছনে আর একটি মুখ্য দরজা। লম্বা লম্বা স্তম্ভ, আকাশছোঁয়া দরজা। পা ফেলে ওঠবার সিঁড়ি। যেন সংস্কৃত কলেজের পিছনদিকে আরো একটি কলেজ। কিন্তু সামনে কলেজ স্কোয়ারের পাঁচিল দিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ, আর দরজাটির আশপাশে উদ্বাস্তু ঠাঁইখোঁজা মানুষের বাস। কলেজ স্ট্রিটের মাঝখানে আজও পড়ে থাকা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলার সামাজিক মানচিত্রে ঝড় তোলা একটা জীবন্ত অধ্যায়। কেউ ফিরেও তাকায় না সেদিকে। গাছগাছালির মধ্যে উঁকি মারা ত্রিকোণ আর্চ আর হিন্দু কলেজের মুখ্যদরজা আজ কেবল লোককথা। দরজা বুজিয়ে তা আজ সংস্কৃত কলেজের পিছনের দেয়াল। তিন বছর ধরে পড়ে যাওয়া আজকের ছাত্রদের অনেকে হয়ত জানেই না লুকিয়ে থাকা এই স্থাপত্য আর ইতিহাস। কিন্তু কলেজ স্কোয়ার থেকে আজও স্পষ্ট দেখা যায় ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঙালির নবজাগরণের প্রথম পথিকৃৎ ও রামতনু লাহিড়ী, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদারদের স্মৃতিবিজড়িত সেকালের হিন্দু কলেজের মেনগেট। যার বাকি অংশ আজ কেবল স্মৃতির পাতায়। সংস্কৃত কলেজ ও হিন্দু স্কুলের বর্তমান বাড়ির সঙ্গে মিশে গেছে কালের চাকায়। কিন্তু সংস্কার কই? যা হয়ত কলকাতার প্রধান দ্রষ্টব্য হবার দাবী রাখে তা পড়ে আছে একেবারে অবহেলায়? যার ঐতিহাসিক চূড়া আজ ভেঙে পড়ছে একটু একটু করে। কলেজ স্ট্রিটের বেশিরভাগ মানুষ তথা বইবিক্রেতাই জানেন না এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের কথা।এমনকি সংস্কৃত কলেজের গেটে বসা নিরাপত্তারক্ষীও উড়িয়ে দিলেন এই স্থাপত্যের কথা। বিখ্যাত ইংরেজ শিক্ষাবিদ ও মিশনারী ডঃ রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরী প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ যদি ১৮১৮ সাল থেকে আজও সমান গরিমায় বাঁচিয়ে রাখতে পারে তাদের পুরনো ভবন (যদিই কলেজ ভবন ১৮২২ সালে তৈরি), তবে হিন্দু কলেজের পুরনো ও ঐতিহাসিক ভবন কেন নয়? বাঙালিকে কী দেয়নি হিন্দু কলেজ। গোঁড়া ঘুণ ধরা একটা সমাজকে দিয়েছে পাশ্চাত্যের তীব্র আলো। যে আলোয় একদিন ভেসে গেছে শহর কলকাতা। কলকাতার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হাইড ইস্ট সাহেব, শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব, রাজা রামমোহন রায়, দেশবরেণ্য ডেভিড হেয়ার সাহেবদের মতো ব্যক্তিত্বদের আলোয় আর ডিরোজিও, রিচার্ডসনের শিক্ষায় এই ভবন একসময় বাঙালিকে শিখিয়েছিল প্রথা ভেঙে বেরোনোর কৌশল। সকলের আড়ালে হিন্দু কলেজের পাশ্চাত্য স্থাপত্যরীতির থামগুলো আজও জানান দিচ্ছে সেই দিনগুলোই। এবার কলেজ স্ট্রিটে গেলে অবশ্যই একবার কলেজ স্কোয়ারে ঢুকে প্রত্যক্ষ করে নিতে পারেন সেই জীবন্ত জীবাশ্মটিকে। 
অতিরিক্ত গোমাংস ভক্ষণের ফলে মৃত্যু। তাও আবার গোঁড়া হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল এক পরিবারের সদস্যের। মৃত্যুর এহেন রিপোর্ট যাঁর কথা স্মরণ করাচ্ছে, তিনি একসময়ের ভারত বিখ্যাত ল্যান্ড সার্ভেয়র রাধানাথ শিকদার। আবার গোঁড়া হিন্দু পরিবারের ছেলে হয়ে বন্ধুদের পার্টিতে গোমাংস ভক্ষণ। পরিণামে হিন্দু সমাজে একঘরে করে দেওয়া। কিন্তু উদ্যম না হারিয়ে ধর্মত্যাগ করে সোজা খ্রীষ্টমন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ ও কলকাতায় খ্রীষ্টধর্মের প্রচার। যাঁর কথা বলছি তিনি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা সকলেই হিন্দু কলেজের ডিরোজিয়ান। পলাশী যুদ্ধের পরে কলকাতায় গোড়াপত্তন হয় এক নতুন সামাজিক প্রেক্ষাপট। যেখানে ইংরেজ তাঁবেদারির পুরস্কার হিসাবে খুব তাড়াতাড়ি মিলে যেত রাজাবাহাদুর বা রায়বাহাদুর খেতাব। উদযাপনও ছিল আশ্চর্যের। মা দূর্গাকে উপলক্ষ্য করে কলকাতার বহু বড়লোক বাড়ি মোচ্ছব দেখেছে সেকালে। দেখেছে বাইজী নাচ, ধুলোর মতো টাকাখরচ। এই তোষামোদীর প্রতিযোগিতা অসুস্থতায় পরিণত হলে ও আপামর কলকাতাবাসীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিলে ভীষণ ভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়ে একদল একদম নব্য শিক্ষিত যুবকের। হয়ত হিন্দু কলেজ তৈরির আগে কেউ পাশ্চাত্য শিক্ষার আঙ্গিক নিয়ে ভাবেই নি। ভেবেছিলেন রাজা রামমোহনের মতো কিছু দেশীয় মহানুভব মানুষ আর ডেভিড হেয়ার সাহেবের মতো ভারতপ্রেমী ভিনদেশী। মহাত্মা রামমোহনের কথা আর কি বলবো, কিন্তু যে মানুষটা বিলেত থেকে ঘড়ির ব্যবসা করতে এসে সব বাদ দিয়ে লেগে পড়েন শুধু নেটিভ এডুকেশনকে লক্ষ্য বানিয়ে, যে মানুষটার পালকির পিছনে একসময় ছুটতেন শিক্ষার্থী থেকে অবিভাবকের দল, সেই ডেভিড হেয়ার সাহেবের ঋণ কি বাঙালী একজন্মে শোধ করতে পারবে? কলেজ স্কোয়ারের পাশে মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে তাঁর সমাধিও আজ মানবচক্ষু উপেক্ষিত। আশপাশের দোকানদাররাও ব্যস্ত সময় থেকে একটু সময় বের করে চেয়ে দেখেন না আর সেদিকে। যাই হোক, অনেক পরিশ্রমের ফল সেকালের হিন্দু কলেজ। কলকাতায় কলেজ তৈরির পটভূমিটা খুব আকর্ষণীয়। বিলেত থেকে ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের কলকাতা শহরে হঠাৎ আগমন হলেও তারা এদেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে ছিল একেবারেই অন্ধকারে। লর্ড ওয়েলেসলী প্রথম এই অভাব অনুভব করেন। আর তারই ফলস্বরূপ কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। যা কলকাতার মাটিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার এক ম্যাসিভ রেভলিউশন। কে পড়াতেন না সেখানে। শ্রীরামপুর মিশনারীর বিখ্যাত উইলিয়াম কেরী সাহেব থেকে উড়িষ্যাদেশীয় বিখ্যাত পন্ডিত মৃত্যুঞ্জয়ী বিদ্যালঙ্কার ও চুঁচুড়ার আদ্যোপান্ত বাঙালি রামরাম বসু। ইংরেজ সিভিলয়ানদের বাংলা, ফার্সী, আরবি শিখিয়ে পড়িয়ে কোম্পানির দপ্তরের অফিসিয়াল কাজে লাগানোটাই একমাত্র উদ্দেশ্য। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ একটা অধ্যায়। খুব বেশিদিন না চললেও কলকাতার পাশ্চাত্য শিক্ষায় এই কলেজ একটা মাইলস্টোন। বাংলা গদ্য সাহিতে এই কলেজের অবদান সুবিদিত। কলেজে পড়ানোর জন্য দরকার বাংলা গদ্য বই। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে পরপর সেসময় প্রকাশিত হয় কেরী সাহেবের 'কথোপকথন'। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের 'রাজাবলী', 'হিতোপদেশ'। রামরাম বসুর 'প্রতাপাদিত্য চরিত্র'। বাংলা সাহিত্যে এইসব গদ্য বই আজও সম্পদ। যাই হোক, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কলকাতার মাটিতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বীজটা বুনে দিলেও তা একান্তই ছিল বিলিতি সিভিলিয়ানদের জন্য। কিন্তু এদেশের বাঙালি হিন্দু সমাজের তরুণ যুবসমাজে গোঁড়ামি আর অবক্ষয়ের দিকটা নিয়ে ভাবেনি কোম্পানি বাহাদুরের উচ্চপদস্থ অফিসাররা। হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা তাই বাংলা পাশ্চাত্য শিক্ষায় একটা প্রবল ঝড়। যে ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছিল বাঙালির গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদ। গোলদিঘির পাড়ে ভিক্টোরীয় স্থাপত্যে তৈরি এই ভবনেই দলে দলে ভর্তি হয় বাঙালি যুবকের দল। হেয়ার সাহেব তৈরি করেন স্কুলবুক সোসাইটি। স্কটল্যান্ড থেকে জাহাজে এদেশে আসার পর কলকাতায় ঘড়ির দোকান করেন হেয়ার সাহেব। এদিকে ওপরদিকে খানাকুলের বাড়ি থেকে বহিস্কৃত রামমোহন রায়ও থাকতেন কলকাতায়। ডেভিড হেয়ারের সাথে ঘটনাচক্রে বন্ধুত্ব হয় রামমোহনের। আর  তখনই সকলের অজান্তেই তৈরি হয় হিন্দু কলেজের ভিত। এদেশীয় বাঙালি যুবকদের ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত করবার ব্যাপারটা নিয়ে প্রবলভাবে চিন্তা করতেন দুজন। এমনকি হেয়ার সাহেবের ঘড়ির দোকানে আসা ক্রেতাদের সাথেও তিনি আলোচনা করতেন নতুন কলেজের বিষয়ে। কলকাতায় ইংরেজি কলেজ একটা ভীষণ দরকার। গোঁড়ামির অন্ধকারে ডুবে যাওয়া বাঙালি যুবসমাজ যদি আলোর পথ না পায় তবে আর রক্ষে নেই। কারণ ইতিমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ধর্মের গোঁড়ামি। আর তার ফল হল সতীদাহ, সাগরে শিশু নিক্ষেপের মতো বর্বর সামাজিক প্রথা। বিভিন্ন দিক থেকে কেরী, মার্শম্যান, হেয়ার সাহেবরা দৌড়ে বেড়াতেন বটে, কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন যে বাঙালি হিন্দুর সামাজিক অবস্থান না পাল্টালে তা কখনোই ফলপ্রসু হবার সম্ভাবনা নেই। এর আগে সঠিক ইংরাজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি একটিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর আগে কলকাতায় কলেজ বলতে ওয়ারেন হেস্টিংসের হাতে তৈরি মাদ্রাসা (বর্তমানে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়িটি) এবং ওয়েলেসলীর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। কিন্তু উভয়ই ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের দেশীয় শিক্ষালাভের কেন্দ্র। তবে বাঙালি যুবকদের ইংরাজি শিক্ষার জন্য কয়েকটি প্রাইভেট উদ্যোগ যে হয়নি তা নয়। ফিরিঙ্গীদের উদ্যোগে বসেছিল কয়েকটা ছোট বিদ্যালয়। সারবার্ণ নামে এক ফিরিঙ্গী চিৎপুর রোডে খুললেন স্কুল। দ্বারকানাথ ঠাকুর এক স্কুলেই পড়েছিলেন কিছুদিন। এছাড়াও মার্টিন বোউল, আরাটুল পেট্রাস নামক সাহেবরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকানায় সেযুগেই খুলে ফেলেছিলেন প্রাইভেট স্কুল। সেযুগে ইংরাজি শিক্ষা ছিল বড় অদ্ভুত। ছড়ার মতো করে শেখানো হত ইংরাজি শব্দ। আর পাস করবার পরে ছাত্র কতগুলো ইংরাজি শব্দ জানে তার ওপর দেওয়া হত শংসাপত্র। যেমন ধরুন -

"গাড্ ঈশ্বর, লাড্ ঈশ্বর, কাম মানে এস
ফাদার বাপ, মাদার মা, সিট মানে ব'স
ব্রাদার ভাই, সিস্টার বোন, ফাদার সিস্টার পিসি
ফাদার ইন ল শ্বশুর, মাদার সিস্টার মাসী
আই মানে আমি, আর ইউ মানে তুমি
আস্ মানে আমাদিগের, গ্রাউন্ড মানে জমি
ডে মানে দিন আর নাইট মানে রাত
উইক হল সপ্তাহ আর রাইস মানে ভাত
পমকিন্ লাউ কুমড়ো, কোকম্বর শসা
ব্রিঞ্জেল বার্ত্তাকু আর প্লোমেন্ মানে চাষা।"

আজকের দিনে সত্যিই বড় অবাক হবার বিষয়। তাই না? অর্থাৎ ব্যকরণের দিকে জোর না দিয়ে শব্দের ভাণ্ডার বাড়ানো। আর বাঙালিদের ইংরাজিও ছিল তেমনই। শুধু নাউন জুড়ে বাক্য ঘটনার মতো। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর 'রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ' বইতে একটা মজার ইংরাজি বলার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। একজন ইংরেজ সাহেব তার বাঙালি কর্মচারীকে ঘোড়ার দানা চুরি করার অপরাধে ভর্ৎসনা করছেন। বাঙালি পরিচারক জবাব দিচ্ছেন - "ইয়াস শার‍্, মাই হাউস মর্নিং অ্যান্ড ইভনিং টুয়েন্টি লীভস্ ফল, লিটিল লিটিল পে, হাউ ম্যানেজ?" অর্থাৎ এই সামান্য আয়ে তাঁর বাড়িতে ২০ টি পাত পড়ে। এটি সাহেবকে বোঝানোই প্রধান উদ্দেশ্য। এই ছিল তখন শিক্ষিত বাঙালিসমাজের ইংরাজি আওড়ানো। 
এরপরে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর হিন্দু কলেজ এমন এক প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলো যেখানে শুদ্ধ ইংরাজি শিখিয়ে ও নীতিগত শিক্ষাদানের মাধ্যমে বাঙালি যুবসমাজকে আদর্শগত ভাবে তৈরি করা হত একটু একটু করে৷ ধর্মীয় গোঁড়ামির ওপরে উঠে মানবতার ধর্মে দীক্ষা নেবার শিক্ষা এখানেই তিল তিল করে বুনে দেওয়া হত সমাজের গোড়ায়। আর সেই শিক্ষাটুকুর আলো ছড়িয়ে পড়ত আসমুদ্রহিমাচল। নব্য ইংরাজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি যুবকরা যে একেবারেই বিশৃঙ্খলা করতেন না তা নয়। এবং স্বভাবতই সেই সমাজে তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটুও ঠেকেছিল একটা বড় অংশের। কিন্তু তার অনেক ওপরে উঠে হিন্দু কলেজের স্কলাররা যে ছিলেন এক একটা রত্ন, তা তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই পরবর্তীতে প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন। 
আবার শেষ করার আগে পৌঁছে যাই কলেজ স্কোয়ারের পাড়ে আজও দাঁড়িয়ে থাকা সেই ত্রিকোণ ভিক্টোরীয় আর্চের তলায়। আজও সকলের চোখের আড়ালে যার প্রতিটি সিঁড়িতে লেগে আছে সেইসব কৃতি বাঙালি সন্তানের পায়ের ছাপ। কিন্তু ছুঁয়ে দেখছে কে? কে একবার দাঁড়িয়ে আপামর গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলছে - "নিজেরা চিন্তা কর। বেকনের উল্লিখিত কোনও দেবতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ো না। সত্যকেই জীবন এবং মৃত্যুর অবলম্বন ধরে নাও" - হেনরী লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।


শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সমর্পিতা ঘটক

                              



আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়...


আমরা সেই সর্বনাশের পথেই যাচ্ছি। গুছিয়ে তুলছি চৌহদ্দি, ঘর। উঁকি মারছি পরজীবী পরন্মুখ কীটের মতো... সকল আছে তবু নেই নেই ভাব। আপশোশ, অম্বল দিনরাত। আলো দিয়ে সিলিং সাজাই। মিথ্যে সিলিং। টেক্কা দিই ফ্ল্যাট বি কে। হন্ডা সিটি হাঁকাই, টেক্কা দিই মেজ বৌদিকে। টুকটুকি কেমন আছে জিগ্যেস করাতে উত্তর পাই, ‘এক লাখ তিরিশ পাচ্ছে। কালিকাপুরে ফ্ল্যাট। দিব্য আছে।’ কেমন থাকার উত্তরগুলো কেবল পরিসংখ্যান এখন। ২বি এইচ কে, নাকি ৩ বি এইচ কে! সিটিতে মাইলেজ কত? সিটিসি কত দিচ্ছে? ‘পাপানকে স্কুলে ভর্তি করালে, কত লাগল? আমার তো ৮৬ হাজার লেগেছিল!’

কিছুক্ষণ পর মাথা ভোঁ ভোঁ করে। কিছুদিন পর পর গেজেট বা আসবাব না কিনলে, মোবাইল ফোন না পাল্টালে উদ্বেগ হয়... এই সমাজ আমাকে মেনে নেবে তো! কত কমে বেঁচেছিলাম এই দু বছর প্রত্যেকেই উপলব্ধি করেছি তবু মানুষ যাবেই বানের জলে ভেসে। বানের জল ঢুকেছে সর্বত্র। মেধায়, মননে, রুচি, সঙ্কল্পে... হাহাকার করে পরান... হু হু করে হৃদয়। বইয়ের থেকে বেশি দাম অন্তর্বাসের। কিনতে গিয়ে মনে হয় দু তিনটে বই হয়ে যেত! বিক্রিও অনেক বেশি। তবু পাণ্ডুলিপি তৈরি করি। যত্ন করে অক্ষর সাজাই। যে কলেজে-পড়া বেকার ছেলেটা পুরনো বই কেনে ফুটপাথ থেকে তাকে ঈশ্বরের দূত মনে হয়। ওর ময়লা শার্ট আর কম দামি জিন্সের গায়ে আমি হাজার অক্ষর দেখি। দেখি, ও এখনো পালটায়নি? কীভাবে এখনো রয়ে গেছে অন্য বলয়ে? কান্না পায়, ওই যে উঁচু বট, যেখানে তিনটি নুড়ি রেখে সাধনায় বসে ছিলেন মর্হষি দেবেন্দ্রনাথ, ওখানে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকি। খাঁ খাঁ করে চারিদিক। তিন পাহাড় ওই জায়গার নাম। কিছু কান্না রেখে আসি ওখানে। ওইখানটায় সময় থমকে যায়, তারপর চলাচলে ফিরে এলে ঝাঁকের কই হওয়ার সম্ভাবনা তীব্র হতে থাকে। ভেতরের আমিটাকে তখন চেপে ধরের বাইরের খোলস। তবে আমি এখন মনে মনে বাউল হয়ে থাকতে পারি। বিচ্ছিন্ন হয়ে। প্রকৃতি আর অক্ষর সে শক্তি দেয়।  

যার কাছে আমার স্টেটাস যেমন, তেমন উপহার পাই। আসলে উপহার দেখে বুঝতে পারি নিজের স্টেটাস। অদ্ভুত এক সময়! হিজিবিজবিজকে ডেকে এসব গল্প শোনাই। আর তার সে কি হাসি! তার হাসি এমন সংক্রামক আমিও ট্র্যাজেডিকে রূপান্তরিত করে দিই কমেডিতে। উপলক্ষ্য আর উপহার... এসব নিয়ে মগ্ন থাকার বিধান দেয় অনলাইন শপিং সাইটগুলো। কোনটায় কত ছাড়! ছেড়ে দিই পুরনো অভ্যেস। বই উপহার দিলে উপহাস জোটে। কেবল প্রদর্শনী, মনে হয় গ্যালারিতে বসে আছি। আর বন্ধু, পরিজন সব অ্যাম্বাস্যাডার... এক একটা ব্র্যান্ডের। ওদের গা হাত পা জুড়ে স্টিকার। মাথা থেকে পা অবধি... এমনকি পাকস্থলী, হৃৎপিন্ড খুলে দেখাতে চাইলে ওরা দেখাতে পারে দামি মদ, ওদের মা বাবার দামি স্টেন্ট, দামি লেন্স... বুঝতে পারি...

“... কে কাকে ঠিক কেমন দেখে

  বুঝতে পারা শক্ত খুবই

হা রে আমার বাড়িয়ে বলা

হা রে আমার জন্মভূমি!


বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া

  তোমার সাথে ওতপ্রোত

নিওন আলোয় পণ্য হলো

যা-কিছু আজ ব্যক্তিগত।


মুখের কথা একলা হয়ে

   রইল পড়ে গলির কোণে

ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু

ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে।”

(মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, শঙ্খ ঘোষ)


মানুষের মতো দেখতে এক একটা ডিভাইস্‌ তারা গুনতে শিখেছে বিল, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট, ট্যাক্স, শেয়ার, আর হিসেব কষে নির্ধারণ করতে পারে নিজের দাম। বিরাট সুড়ঙ্গ ধরেই তাদের যাতায়াত। অ্যাসেম্বল, জোড়াতালি, প্যাকেজিং, তারপর সুড়ঙ্গ দিয়ে নেমে যাওয়া বাজারে। তিন পাহাড়ের গল্পে রবীন্দ্রনাথ এসে গেলে তারা বিরক্ত হয়। আঁতেল ভাবে। তাই সুড়ঙ্গে মুখ ঢোকাই আমিও। কবিতা লিখি, আঁতেলের ছাপ লেগে গেলে আর নেবেনা কেউ দলে। কোন পথে যাব! কবি লেখকদের দলেও গুণ ভাগ যোগ লসাগু গসাগু আছে... সে অঙ্ক কাকেশ্বর কুচকুচে ছাড়া ধরতে পারবেনা কেউ। মুখে তত্ত্ব, ব্রহ্ম, অমৃত আর মনে গিটকিরি প্যাঁচ, কাকে কোন পথে আটকানো যাবে! 

এসব থেকে মুক্তি মেলে অক্ষরে... তখন এক বিরাট আকাশ আমার মাথার ওপরে। সে আকাশ ক্ষুদ্র নয়... খোপ খোপ ভাগ নেই... সেখানে মুক্তি আসে ইচ্ছে মতো। আমার চারপাশে তখন কোনো সুড়ঙ্গ থাকে না। কোনো সংখ্যা, কোনো পরিমাপ কিচ্ছু না। আমি তখন জিতেন মুর্মুর মতো কাদা পায়ে বিরাট জাল ছুঁড়ে দিই পুকুরে। হাসগুলো চই চই করে পাড়ের দিকে আসে। কাঁদা খুঁটে গুগলি ধরে। গেঁয়ো গন্ধ মেখে বসে থাকি, বিচ্ছিন্ন হয়ে। মুথা ঘাস আমার অক্ষর জমিতে। ঘেঁটু, আকন্দ, শিয়ালকাঁটা বাড়তে দিই নির্দ্ধিদায়।

সাবান কেনার পয়সা নেই জিতেনের কিন্তু মাছ ধরে নিয়ে আসে হাসি মুখে, কালো ঠোঁটের পাশে ঝিলিক দেয় আলো... দু চারটে চারাপোনা দিয়ে যায় আমার কলতলায়। কিছুতেই দাম নেবে না। আঁশটে হাতে চা খেয়ে যায়। নিয়ে যায় কুমড়োর ছক্কা আর কষা মাংস। ওর বউ নাকি এমন ভালো রাঁধতে পারে না। ওদের গ্রামে মাচার ওপর বসে ওরা জোয়ার ভাটা দেখে আর গল্প করে যা ইচ্ছে তাই। আলচিকি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা বলতে পারে ওর ছোটো মেয়ে। মাচার ওপর বসে দেখেছি আমি পায়ের একটু নীচেই নদীর ঢেউ, আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘ, আর আমার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আরামের পাতলা বাতাস। আমার সংস্পর্শে বেশিক্ষণ থাকলে ওরাও কি যন্ত্র হয়ে যাবে? ঢুকতে চাইবে সুড়ঙ্গে, বড়ো মোবাইল আর বাকি কত যন্ত্র তো ঢুকে পড়েছে ওদের জীবনেও... তাহলে?


বিরাট প্লাস্টিকের ওপর ছড়ানো ধান পা দিয়ে ছড়িয়ে দেয় ইসমাইলের মা। পাশে বসে থাকে ওর দিদি। বিশেষভাবে সক্ষম সে। তাই বসে বসে দেখে তার চারদিকের জগৎ আর তাড়ায় দানা খেতে আসা পাখি। অপূর্ব সুন্দর সে। চোখের মধ্যে মাণিক জ্বলছিল। ওইরকম চুল আর ত্বক আমি হিমাচলের মেয়েদের দেখেছি। ঠাঁ ঠাঁ রোদে বসে থাকে ও ধানের পাশে।ওকে নিয়ে বোধকরি খানিক বিব্রত ওর বাড়ির লোক। ওদের বাড়ির সামনে বিস্তৃত উন্মুক্ত জমি, সরকার থেকে সেখানে লাগিয়ে দেবে গাছ, খোঁড়া হয়ে গেছে মাটি। ঝাঁকড়া গাছের নীচে বিরাট ডাবায় খড় বিচুলি খাচ্ছে বিরাট সাইজের ধবধবে গরু। দু তিনটে। আমাদের সনাতনী পল্লী চিত্র ফুটে উঠেছে ওইখানটায়। পা নড়ে না ওখান থেকে। সমগ্র ভারতবর্ষ আমি ওই গ্রামের ওই অংশটুকুতেই খুঁজে পেয়ে যাই। ই্সমাইলের দিদিকে দেখে মনে হয় বসে আছে স্বয়ং কমলাসনা কিংবা অবনীন্দ্রনাথের আঁকা সেই ভারতমাতা। যে মন প্রাণ দিয়ে বলতে চায় কষ্টের কথা, বোঝাতে পারে না, যে লুঠেরাদের আটকাতে চায় কিন্তু ওঁত পেতে থাকে উচ্ছিষ্টভোগীরা।

উচ্ছিষ্টভোগী আমরা সবাই। প্রকৃতি থেকে কেবল সরে সরে যাই। আমরা কি অন্য গ্রহের? কেবল পর্যটকের মতো আসি, দেখি আবার নিজের খোলসে ফেরৎ যাই! আর কিছু নিই না। পৌঁছতে পারি না কোনো উৎসমুখে। কেবল ভিড় বাড়াই। বাজারের ভিড়। প্রদর্শনীর ভিড় আর আমরা ম্যানিকিন। খুঁজে নিতে পারি না যা আমাদের নিজস্ব। যা আমাদের আছে। যা নেই তার পিছনে ছুটে মরি। ‘যা ছিল মোর গেল ঘুচে যা নেই তার ঝোঁকে/ আমার ফুরোয় পুঁজি ভাবিস বুঝি মরি তারি শোকে’। বিরাট শোকের মধ্যে কুন্ডলী পাকিয়ে বসে আছি আর রুদালির মতো কেঁদে চলেছি নেইয়ের তালিকা হাতে নিয়ে। পকেটভর্তি স্বপ্নের ঝনৎকার নিয়ে হেঁটে যাওয়া কবির মতো কি আমরা বলতে পারব- আমি কিছুই কিনব না!


আমি কিছুই কিনবো না

শহীদ কাদরী


ঢিলে-ঢালা হাওয়ায়- ফোলানো ট্রাউজার, বিপর্যস্ত চুলে

উৎসবে, জয়ধ্বনিতে আমি

ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে, বিজ্ঞাপনের লাল আলোয়

সতেজ পাতার রঙ সেই বিজয়ী পতাকার নীচে

কিছুক্ষণ, একা

নতুন সোনালি পয়সার মতন দুই পকেট ভর্তি স্বপ্নের ঝনৎকার

আর জ্যোৎস্নার চকিত ঝলক আমার

ঝলসানো মুখের অবয়বে

সিনেমায় দীর্ঘ কিউ-এর-সামনে আমি

নব্য দম্পতির গা ঘেঁষে


চারিদিকে রঙ বেরঙের জামা-কাপড়ের দোকান

মদিরার চেয়ে মধুর সব টেরিলিনের শার্ট

ভোরবেলার স্বপ্নের চেয়ে মিহি সূক্ষ্ম সুতোর গেঞ্জি

স্বপ্নাক্রান্ত বালকের হাতেরও অধিক অস্থির রজ্জুতে- গাঁথা রাশি রাশি পুঞ্জ পুঞ্জ লাল, নীল উজ্জ্বল রুমাল

মেঘলোকে মজ্জমান রেস্তোরার দ্বারগুলো খোলা--

আমি অবহেলে চলে যাবো, যাই

আঁধার রাস্তার রানী চকোরীর মতো বাঁকা চোখে দ্যাখে

-আমি কিছুই কিনবো না! ...”



পণ্য ও বিজ্ঞাপনের মাঝে ক্রমশ একা হয়ে যাব। না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে উদ্ধত পতাকার নীচে আমি জড়োসড়, তবু অনন্যর খোঁজে ব্যপ্ত থাকব আজীবন। এটুকুই বলতে পারি। বাকি আর কিছু কি সোচ্চারে দাবি করতে পারব? গোলকধাঁধাঁয় সব একই... “আমি খুজছি, আমি খুঁজছি তোমার ঠিকানা, অলি গলি ঘুরে ক্লান্ত তোমায় পাচ্ছিনা। ... সারি বাধা সব বাড়ি যেন সারবাধা সব সৈন্য, সব এক রঙ, সব এক ধাঁচ তুমি কোথায় থাকো অনন্য?” (মৌসুমী ভৌমিক, অনন্য)। এই আর্তনাদ আছড়ে পড়ে অন্তরে। আর খুঁজতে থাকি। একেবারেই কি পাই না! পাই তো অনন্যকে। আলোর ঝলকানির মতো! তখন চিত্ত ঝলমল করে ওঠে। তারা হয়তো সংখ্যায় কম। তবু আছে এখানেই, আসেপাশে... খুঁজে নিতে হয়... তাই খোঁজ থাকুক নিরন্তর।


চিত্রঋণ- পারমিতা মন্ডল


অমিতাভ দাস

                        


পুরোনো কলকাতার দুর্গাপুজোর কিছু কথা


পুরনো কলকাতার গল্পের সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে আছে কলকাতার দুর্গাপুজো। আজ পুরনো কলকাতার দুর্গাপুজো নিয়ে কিছু গল্প করা যাক তাহলে।


বিপ্রদাস পিপলাইয়ের লেখা" মনসা মঙ্গল" কাব্যটি পঞ্চদশ শতকের লেখা । সেখানে আমরা দুগাপুজোর উল্লেখ পাই । ১৬১০ সালে লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে খেতাব লাভ করে হালিশহর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন । এবং শুরু করেন প্রথম সপরিবার দুর্গার পুজো ।পুজো হয়েছিল বড়িষা গ্রামে । পরে তাঁরা ১৬৯৯ সালে 'রায় চৌধুরী' খেতাব পান । 

কলকাতার দ্বিতীয় প্রাচীনতম পূজো কুমারটুলির গোবিন্দরাম মিত্রের বাড়ির পুজো ।তবে সে পুজোর সঠিক সন-তারিখ জানা যায় না । তবে প্রবাদ আছে 'গোবিন্দরামের ছড়ি বনমালি সরকারের বাড়ি ,আর উমিচাঁদের দাড়ি ।' গোবিন্দরাম ১৭২০ থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত জমিদার ছিলেন । গোবিন্দরাম ছিলেন তৎকালে ইংরেজের ডেপুটি কালেক্টর । থাকতেন গোবিন্দপুর গ্রামে । 'ব্লাকহোক' নামক পুস্তকে তাঁকে কালা ডেপুটি বলা হয়েছে । এই পরিবার বাবুয়ানির জন্য বিখ্যাত এবং পরে নিঃস্ব হয়ে যান ।এর পরের পুজোর যে তথ্য পাই তা হল রাজা নবকৃষ্ণদেব-এর বাড়ির পুজো । নবকৃষ্ণের পুজোই কলকাতার প্রথম জাঁকালো পুজো। এ পুজোতে লর্ড ক্লাইভ এসেছিলেন । বিখ্যাত সব নর্তকীরা আসতেন এই পুজোতে। এদেশীয় ভদ্রলোকেরা তখন সুরাপান সহযোগে বাইজীদের নাচ দেখতেন ।


কলকাতায় দুর্গা পুজো শুরু হয়েছিল মূলত পলাশীর যুদ্ধের স্মারক উৎসব রূপে ।যা আজ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে ।


পলাশী যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভে নবকৃষ্ণ দেবের কপাল খুলে যায় ।প্রচুর টাকার সাথে 'মহারাজা বাহাদুর' খেতাব পেলেন ।পুজো করলেন ১৭৫৭ সালে  নিজ ভবনে । লর্ড ক্লাইভ সে পুজোয় উপস্থিত থেকে একশো এক টাকা দক্ষিণা আর প্রচুর ফলমূল পাঠিয়ে ছিলেন ।


কলকাতার দুর্গা পুজোতে প্রথম বাঈ নাচিয়েছিলেন শোভাবাজারের মহারাজ নবকৃষ্ণ দেব। তৎকালের সেরা বাঈজী নিকী পুজোতে নাচ করে গেছেন ।


পুরনো কলকাতায় যে সব জমিদার বাড়িতে দুর্গোৎসব হত, সবেতেই বাঈজি নাচ থাকত ।

প্রথমে বাড়ি ,তারপর বারোয়ারি এবং তারপর এসেছে সর্বজনীন পুজো । 

কলকাতায় সর্বজনীন দুর্গা পুজোর পত্তন ১৯২৭ সালে । সিমলা ব্যায়াম সমিতি আর বাগ বাজারে ঐ বছর সর্বজনীন দুর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হয় ।

প্রথম দিকে দুর্গা প্রতিমা ছিল একাচালার । পরে ১৯৩৯ সাল থেকে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ প্রত্যেকের জন্য আলাদা চালের ব্যবস্থা হয় ।


আশ্চর্য এই , সর্বজনীন পুজোয় বাধা দিয়েছিলেন সেকালের অনেক পন্ডিত ।পরে অবিশ্যি পন্ডিত দীননাথ ভট্টাচার্যের হস্তক্ষেপে সে সমস্যা মিটে যায় ।

তখন কলকাতা গড়ে উঠছিল এক মিশ্র সংস্কৃতির ভিতর দিয়ে । বাবুদের হিঁদুয়ানির পাশাপাশি ইংরেজভক্তি , অন্যদিকে রামমোহনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের আধিপত্য, আবার শাক্ত- বৈষ্ণবের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব--- পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার জোয়ার-- সব মিলিয়ে দারুণ ব্যাপার । তো দুর্গাপুজো কেবল ভক্তি- ভালোবাসার জন্য ছিল না , নিজের প্রতিষ্ঠা, অর্থ ও কৌলিন্য প্রকাশের একটা মাধ্যম ছিল । বলা ভালো প্রতিযোগিতা বাবুদের , কে কত খরচ করল ! 


সেকালে বাবুদের বাড়িতে দুর্গাঠাকুর দেখার অধিকার সবার ছিল না । কেবল অতিথিদের প্রবেশাধিকার ছিল। দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকত চাবুক হাতে । গরিব- দুঃখি ঢুকতে গেলেই চাবুক চালাত । দুর্গাপুজো জাতীয় উৎসব হয়েছে , যখন এই পুজো সর্বজনীন হয়েছে , তার পর থেকেই ।


পাঁঠার মাংস ছিল পুজোর প্রধান আকর্ষণ । সাহেবদের জন্য প্রচুর গোমাংস আর বিলিতি মদের আয়োজন থাকত । ১৮৩১ সালের ' সমাচার দর্পন' এ আছে ঢাকিদের মোষের মাংস দেওয়ার কথা । 


সেকালের দুর্গাপুজোতে কিছু কিছু পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল । যা আজো গল্পের ছলে মানুষের মুখে মুখে ফেরে । যেমন ,  কয়েকটি ধনী পরিবারে কলা বৌ স্নানের জন্য বিদেশ থেকে ছাতা আনা হত । ইংল্যান্ড বা তাইওয়ান থেকে ছাতা এনে সে ছাতায় সোনা- রুপোর তারের কাজের জন্য বেনারস থেকে কারিগর আনা হত । রানী রাসমণির বাড়ির পুজোতে ২ মন চালের নৈবেদ্য এবং ব্রাহ্মণ বিদায়ে একটি করে গিনি দেওয়ার প্রথা ছিল । গিরিশ ঘোষের বাড়িতে ৮ মন চালের নৈবেদ্য , একমন সের খাজা , এক মন গজা , এক মন বোঁদে , এক মন দরবেশ দেওয়া হত  । দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো জাঁকজমক পূর্ণ হয়ে ওঠে । ওই পুজোতে প্রতিমার অঙ্গে যত অলংকার দেওয়া হত সোনার , তা আর খোলা হত না । শোনা যায় , স্বর্ণালঙ্কার পরিহিতা দেবীপ্রতিমাকে কোনো অলংকার না খুলেই বিসর্জন দেওয়া হত । এমন আরো কত গল্প বাতাসে কান পাতলে আজো শোনা যায় । 


শোভাবাজার রাজবাড়ি আর চোরাবাগানের মল্লিক বাড়িতে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা আজো প্রচলিত আছে । তৎকালে হাওড়ার ডাঁসাই গ্রামের শিকারী কাঙালীচরণ ওই দুই বাড়িতে নীলকণ্ঠ পাখি যোগান দিত বলে জানা যায় । কলকাতার বাবুদের বিশ্বাস ছিল নীলকণ্ঠ পাখি শুভ বার্তা দেয় । তারা কৈলাসে গিয়ে খবর দেবে আগেভাগেই যে মা আসছেন । 


দুর্গাপুজোর সময় বিদ্যাসাগর মশাই কলকাতায় থাকতেন না এবং এ নিয়ে তেমন কৌতূহল বা আগ্রহ দেখাননি । তিনি নিজের গ্রামে দরিদ্র মানুষদের কাছে চলে যেতেন সে সময় । তাঁদের সঙ্গেই সময় কাটাতেন ।আর ব্রাহ্ম রামমোহন মূর্তি পূজার বিরোধী ছিলেন বলে কখনো কোনো প্রতিমা দর্শন করেননি । বন্ধু দ্বারকানাথ একবার নেমন্তন্ন করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে শোনা যায় । 


১৮২০ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর " সমাচার দর্পনে " চমৎকার একটি সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল । কালকাতার কাছেপিঠেই এক ভদ্রলোক ছিলেন নাস্তিক প্রকৃতির । পাড়ার কিছু  দুষ্টুছেলে চুপিচুপি তাঁর বাড়িতে দুর্গাপুজোর আগের রাতে একটি দুর্গা প্রতিমা ফেলে আসে । তারা ভেবেছিল পরদিন ভদ্রলোকটি অবশ্যই পুজো করবে । পরদিন সকালে দেখা গেল, লোকটি মূর্তিটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে কাছের এক পুকুরে ফেলে দিয়েছেন । বাধা দিতে গেলে সেই ছেলের দল খুব মার খেয়েছিল ওই ভদ্রলোকের হাতে । 

এই রকম কত যে গল্প আছে পুরোনো কলকাতার। যত দিন যায় এইসব গল্পগুলি আমরা কান পেতে শুনি। ভালো লাগে। একটা সময়কে যেন চোখের সামনে দেখতে পাই। আমরা আমাদের অতীত ঐতিহ্যকেও যেন এভাবে খুঁজে পেতে চাই।



রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

                                         





ভাষা দিবসের তাৎপর্য


১৯৯৯এর ১৭ই নভেম্বর বিশ্ব সংগঠন ইউনেসকো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পর বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে এ বাংলাতেও ‘ভাষাদিবস’ পালনের রেওয়াজ শুরু হয় । ওপার বাংলাতো বটেই এ বাংলাতেও দু একটি ভাষাসংগঠন আরো আগে থেকেই ‘ভাষা শহিদ দিবস’ পালন করে আসছে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে । এপারের বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীরা বিনম্র শ্রদ্ধায় একষট্টির ভাষা আন্দোলনে হত এগারো শহিদের স্মৃতিতর্পন করেন প্রতি বছর ১৯শে মে । এটা ভাষাদিবস পালনের একটি দিক ।

একুশে পালনের তাৎপর্য শুধুমাত্র ভাষা শহিদদের স্মৃতিতর্পন নয়, আরো কিছু । একুশে যেমন ভাষা শহিদ দিবস তেমনই মাতৃভাষা দিবস । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং আমাদের জীবনচর্যায় মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দানের প্রত্যয়কে প্রসারিত করার দিনও । ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন – মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে সেদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অবশেষে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । একুশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ওপারে বাংলার মত এক সমৃদ্ধ ভাষার সম্ভাব্য বিলুপ্তি রোধ করেছিল । ১৯৬১র ১৯শে মে’র বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন সেখানে মতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই । কিন্তু এই ইতিহাস চর্চার বাইরে ভাষা দিবসের তাৎপর্য নবীন প্রজন্মের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছে, সে বিষয়ে সংশয় থেকে যায় ।

ভারতে বাংলা ভাষা দুটি রাজ্যের সরকারী ভাষা । কিন্তু এই যে গত ষোল বছর ধরে আমরা ঘটা করে ভাষসদিবস পালন করছি, নবীন প্রজন্মের কাছে তার আবেদন কতটুকু পৌঁছায় কিংবা ভাষা-আবেগ তাদের কতটুকু স্পর্শ করে তা বোঝার উপায় নেই । এখানে বাংলা চাকুরি পাওয়ার ভাষা নয়, উচ্চশিক্ষা লাভের ভাষা নয় এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ভাষাও নয় । কিন্তু সেটাই বাংলা ভাষার নিজভূমে দুয়োরাণি হয়ে থাকার একমাত্র কারণ নয় । তবে হ্যাঁ, ক্ষীণ কন্ঠে এটা জানান দেওয়া গেছে যে বছরের ৩৬৫ দিনের একটা দিন ভাষা দিবসের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে । অনেকে আবার ভাবতে পারের, ভাবেনও যে তা হোক না । নারী দিবস, প্রবীণ নাগরিক দিবস, বাবা দিবস, এমনকি হুইস্কি দিবসও তো  বরাদ্দ আছে । আশঙ্কা হয়, এদেশে ভাষাদিবস ভাষা উৎসব না হয়ে যায় । কারণ উৎসবের ফন্দি-ফিকির খুঁজতে আমরা বেশ দড় । তাই ভাষাদিবসের তাৎপর্য যাদের সবচেয়ে বেশি জানা দরকার সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থেকে যায় অন্ধকারে  ।

আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে ‘বিশ্বায়ন’ নামক পাঁচ অক্ষরের এক দানবীয় বন্দোবস্ত তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের কৌশল হিসাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিসাবে আমরা টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনের এসএমএস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক বিকৃত ভাষা রপ্ত করে নিচ্ছে নবীন প্রজন্মের শিশুরা, গড়ে তুলছে নিজ মাতৃভাষার সঙ্গে অনাত্মিয়তা ।

বিশ্বের আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মাতৃভাষার ক্রমবিলুপ্তি রাষ্ট্রসঙ্ঘকে বিচলিত করেছিল । বস্তুত, বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানিরা ধারাবাহিক গবেষণা শুরু করেছিলেন, বিশ্বায়ন কি ভাবে অনুন্নত জনগোষ্ঠীগুলির ভাষাগত ভারসাম্য এলোমেলো করে দিতে পারে সেই বিষয়ে ।  রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধীনে এই বিষয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে, যেখান থেকে উঠে এসেছিল এক ভয়াবহ ছবি । তারা রাষ্ট্রসঙ্ঘকে সতর্কিত করেছিলেন যে এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের ছয় হাজার মাতৃভাষার বিলুপ্তি ঘটবে, যদি না ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতাকে ঠেকানো যায় । আমরা জানি আদিম ভাষাগোষ্ঠীর ক্রমবিলুপ্তি ছিল উপনিবেশবাদের অনিবার্য ফল । আজকের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদের আবহে সেই ট্রাডিশনের অন্যথা হবার কথা নয় ।

        কোন ভাষার  বিলুপ্তি ঘটে তখন, যখন সেই ভাষায় কথা বলার আর একটি লোকও থাকে না । আমরা জানি, গত দুশো বছরে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ বহু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে চিরতরে লোপাট করে দিয়েছে । আমেরিকার আদিম জনগোষ্ঠী বা কালো মানুষরা জানে না, তাদের মাতৃভাষা কেমন ছিল । মেক্সিকো কিংবা মরিসাসের মানুষ জানে না তাদের মাতৃভাষা কি ছিল । আমরা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারি এই ভেবে যে, বাংলার মত এতো সাহিত্য-সম্পদ সমৃদ্ধ ভাষা, যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ আছেন সে ভাষার মৃত্যু হতে পারে না কোন দিন । হ্যাঁ, পারে । সংস্কৃতেও তো কালিদাস, ভারবি, ভাস ছিলেন , সে ভাষাও মৃত । অহম ভাষা একসময় খুব সমৃদ্ধ ভাষা ছিল । ১৩ থেকে ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শাসন করতো অহম জনজাতি । ১২২৮ থেকে ১৮২৬ পর্যন্ত অহম গণরাজ্যের প্রধান ভাষা ছিল ‘অহম’। ১৯ শতাব্দীর মধ্যে এই ভাষাটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে । বিষয়টা তো এই যে আমরা সেই ভাষায় কথা বলছি কি না, সেই ভাষাতেই আমার সৃজনশীলতা পুষ্ট হচ্ছে কি না । শিশুরা বা নবীন প্রজন্ম যদি তাদের দৈনন্দিন জীবনে, জীবনচর্যায় মাতৃভাষার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে তবে সেই ভাষার মৃত্যু ঠেকানো যায় না । এপারের বাঙ্গালাভাষীদের অশেষ সৌভাগ্য যে বাঙ্গালী জাতিসত্তার একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে – বাংলা দেশ, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । 

ভাষা বিলুপ্তি সম্পর্কে সারা বিশ্বকে প্রথম যিনি সচেতন করেছিলেন সেই আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ক্রাউস ২০০৭এ একটি তথ্য দিয়েছিলেন যে, সারা বিশ্বে সক্রিয় ভাবে চালু সাত হাজার ভাষাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়  নিরাপদ, প্রায় বিপন্ন ও বিপন্ন ভাষা । তাঁর মতে সেই ভাষাকেই নিরাপদ বলে মনে করা হয় যদি শিশুরা ও নবীন প্রজন্ম আগামী একশো বছরে সেই ভাষা ব্যবহার করে তার দৈনন্দিন জীবনে । না করলে সেই ভাষা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে, ক্রম বিলুপ্তিই যার অনিবার্য পরিণাম । ২০০৯এ ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ সমিতির প্রতিবেদনে একই কথা বলা হয় যে, “একটি ভাষায় কথা বলা জনগন যদি তার দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকে, সেই ভাষায় আদান প্রদান করা মানুষের সংখ্যা যদি ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে এবং সেই ভাষায় কথা বলার ধারা যদি  পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত না হয় তবে তা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে” । 

তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য তছনছ করে দেওয়াই উন্নত দেশগুলির অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের লক্ষ্য । তারা চাইছে  সারা বিশ্বে মাত্র পাঁচ-ছটি ভাষায় মানুষ কথা বলবে । কারণ তারা মনে করে ভাষার কাজ শুধু সংযোগ সাধন করা বা ‘কমিউনিকেট’ করা । ভাষার নৃতাত্বিক উপযোগিতা তাদের কাছে গৌণ । তিন ধরনের প্রবণতা কোন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় । প্রাধান্য বিস্তারকারী কোন ভাষার চাপে নিজের মাতৃভাষার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই  কয়েকটি প্রজন্ম ধরে কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা ‘ভাষামৃত্যু’র দিকে এগিয়ে যায় । আবার কোন ভাষাগোষ্ঠী নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সেই প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষার প্রকরণকে নিজ ভাষার সঙ্গে মিশ খাইয়ে দিয়ে । বিশ্বায়নের আড়কাঠি কর্পোরেট সংস্থাগুলি এই প্রক্রিয়ায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে । তাদের বিজ্ঞাপন গুলিতে ব্যবহার হচ্ছে অদ্ভুত সব খিচুড়ি ভাষা ‘এ দিল মাঙ্গে মোর’, ‘ঠান্ডার নতুন ফান্ডা’ ইত্যাদি । 

দু বছর আগে , ২০১২র অক্টবরে লখণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যগে ভাষা সংক্রান্ত এক সেমিনার হয়েছিল । সেই সেমিনারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদপত্র ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ জানিয়েছিল যে, ভারতে চালু ৩৮০টি আঞ্চলিক ভাষার ৯৬শতাংশ ভাষাই বিলুপ্তির পথে । ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী ভারতে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছে ২৪২টি আঞ্চলিক ভাষা । এখন ভারতে মোট জনসংখ্যার ৪শতাংশ মানুষ এই মৃত্যুপথযাত্রী ভাষাগুলিতে কথা বলে, আর ৯৫শতাংশ মানুষ যে প্রধান ভারতীয় ভাষায় কথা বলে তা ভারতে চালু ভাষা সম্মূহের ৪শতাংশ মাত্র । কি ভয়ঙ্কর ছবি উঠে আসছে ভারতকে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’র গর্ব করা আমাদের কাছে ! 

এখন সারা বিশ্বে ৭৩৫৮টি ভাষা আছে, যার ৯০ শতাংশই ২০৫০এর মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান । এরমধ্যে ৩৩০টি ভাষায় কথা বলে ১০লক্ষের বেশি মানুষ, ১৭৮টি ভাষায় কথা বলে ১০জন মানুষ, ২০০টি ভাষায় ১০জনেরও কম আর ৫১টি ভাষায় মাত্র একজন করে কথা বলার লোক আছে । সেই শেষতম মানুষটির মৃত্যুর সঙ্গেই সেই জনগোষ্ঠীটি তার ভাষাপরিচয় হারিয়ে ফেলবে । পরের প্রজন্ম জানবেও না তার পূর্বজদের মুখের ভাষা কেমন ছিল, কেমন গান তারা গাইতো, কি রকম ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে তাদের শিশুরা ঘুমিয়ে পড়তো ! ঠিক পাঁচবছর আগে ২০১০এর ২৬শে জানুয়ারি ভাষাপ্রেমিকদের  সামনে এসেছিল এক বিষন্ন দিন যেদিন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮৫ বছরের নিঃসন্তান বৃদ্ধা বো সিনিয়রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে আন্দামানী জনজাতিরন্যতম প্রাচিন ভাষা ‘আকা বো’ । বো সিনিয়র ছিলেন সেই ভাষায় কথা বলা শেষতম মানুষ । ১৮৫৮তে ইংরাজরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে উপনবেশ করার সময় বো জনজাতির লোকসঙ্খ্যা ছিল পাঁচ হাজার আর বো সিনিয়রের মৃত্যুর সময় সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫৮ জনে, যাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সেই ভাষাটি জানতেন । এই ভাবে ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠাই যেন মুছে গিয়েছিল সে দিন ।

ভাষা বিলুপ্তির এই প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর উন্নত দেশগুলির প্রাধান্য বিস্তারের গতির সঙ্গে তাল রেখে । খোদ আমেরিকাতেই ১৯২টি জনজাতির ভাষা বিলুপ্তির পথে । ইন্দোনেশিয়ায় ১৪৭টি ও ভারতে ১৯২টি ভাষা অবলুপ্তির পথে । ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতা রোখা না গেলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান এই শতাব্দীর মধ্যেই ছ’হাজার ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংকট ঘনিয়ে আসবে ।

দু’বছর আগে ২০১৩তে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে ইউনেসকো একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছিল যে বিশ্বে এখন কথা বলা অর্থাৎ চলতি ভাষাগুলির মধ্যে ২৫০০ ভাষাই বিপন্ন ভাষা এবং গত তিন প্রজন্মে দু’শটি ভাষার বিলুপ্তি ঘটে গেছে । এই যে আড়াই হাজার ভাষাকে বিপন্ন বলে চিহ্নিত করেছে সেগুলিকে তারা ভাগ করেছে এই ভাবে –

নিরাপদ নয় (আন-সেফ) – ৬০৭টি ভাষা

নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন – ৬৩২টি

মারাত্মক বিপন্ন – (সিভিয়ারলি এনডেনজার্ড)- ৫০২টি এবং

ভয়ঙ্ক বিপন্ন (ক্রিটিকালি এনডেনজার্ড) – ৫৩৮টি ভাষা ।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন যে যখন তরুণ প্রজন্মএর মানুষ তার ভাষায় কথা বলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেমন বাড়িতে – সেও ভাষা বিপন্ন ভাষা । শিশুরা যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে না তখন সে ভাষা নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন । আবার যে ভাষায় বৃদ্ধ বা প্রবীণ অর্থাৎ দাদু-দিদিমারা কথা বলেন, পরের প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুটির পিতা-মাতা সে ভাষা বুঝতে পারেন কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের সন্তানদের সঙ্গে সেই ভাষায় আদান-প্রদান করেন না, সেই ভাষা ভাষা বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে মারাত্মক ভাবে বিপন্ন । আর একটি ভাষায় শুধুমাত্র প্রবীণরাই কথা বলেন নিজেদের মধ্যে – সে ভাষা ভয়ঙ্কর ভাবে বিপন্ন । 

স্বাধীন ভারতেও উপজাতি ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলিকে রক্ষা করার কোন অর্থবহ প্রয়াস দেখা যায় না । ভারতে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলি কতটা বিপন্ন সে হিসাব কোন সমাজতাত্বিক করে উঠতে পেরেছেন কি না জানা নেই । কিন্তু এটা তো জানি এদেশেও অনেক প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষা অনেক আঞ্চলিক ভাষাকেই গিলে ফেলেছে । ১৯৯১সালের জন গননায় স্বীকার করা হয়েছিল যে ভারতে হিন্দিভাষী মোট জনসংখ্যার  ১০কোটি ৭২ লক্ষ মানুষের পৃথক ভাষা পরিচয় আছে । ভোজপুরি, বুন্দেলখন্ডি, মৈথিলী গোষ্ঠীগুলির পৃথক ভাষা পরিচয় থাকা সত্বেও সেগুলকে হিন্দি গিলে ফেলে নিজের  কলেবর মোটা করেছে । ১৯৯১ ও ২০০১এর দুটি জনগননার প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে এই দুটি জনগননার মধ্যবর্তী সময়কালে সব প্রধান ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা কমেছে কিন্তু হিন্দির ক্ষেত্রে বেড়েছে ১৯৯১ তে ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮.২২% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন আর ২০০১এর জনগননায় এই সংখ্যাটা হয়ে গেছে ৮.০১% অর্থাৎ দশ বছরে ০.২১% মানুষ দশ বছর আগে যারা বাংলায় কথা বলতেন তারা অন্য ভাষায় কথা বলা শুরু করেছে ।

কোন ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য থাকা বা না থাকা সেই ভাষার বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত নয়, জরুরিও নয় । ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য এসেছে অনেক পরে । আমরা জানি যে, মৌখিক ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সম্পদ অনেক বেশি । এই যে আমরা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান শুনে বড় হই, চিরকাল শিশুরা মায়ের মুখে যে সব ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে ঘুমাতে যায়, সে তো মৌখিক সাহিত্য – আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসামান্য সম্পদ, আমরা জানিনা, জানার প্রয়োজনও নেই সেগুলি কার রচনা । সব আঞ্চলিক ভাষারই এই মৌখিক সাহিত্য-সম্পদ আছে । ভাষাচার্য সুকুমার সেন এই মৌখিক সাহিত্য বা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান প্রসঙ্গে লিখেছেন “শিশু-বেদ বয়স্কের সাহিত্য-ভুবন ধরে আছে বাসুকীর মতো । শিশু-বেদের মধ্যে ধরা আছে সমগ্র মানবজাতির জন্মপত্রিকা” । কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির অর্থ সেই ভাষাগোষ্ঠীকে ঘিরে যে যে জ্ঞানভান্ডার তারও বিলোপ । আদিম জনগোষ্ঠীর মৌখিক ভাষায় সঞ্চিত থাকে তার পরিবেশ, সংস্কৃতি, বন্য-প্রজাতি সম্পর্কিত জ্ঞানভান্ডার । সমস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষত্রেই একই কথা বলা যায় । কারণ মানুষের জ্ঞানভান্ডারের অতি সামান্য অংশই লিখিত ও সাহিত্য রূপে থাকে, মানুষের মৌখিক জ্ঞানসম্পদ অনেক বেশি ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ । কোন ভাষাগোষ্ঠীর বিলুপ্তির অর্থ অতয়েব  সেই ভাষা অঞ্চলের  নৃতাত্বিক ভারসাম্য তছনছ হয়ে যাওয়া ।

এই উদ্বেগের যায়গা থেকেই মাতৃভাষা পালনের আহবান জানিয়েছিল ইউনেসকো । মাতৃভাষায় কথা বলার পরম্পরাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তর করতে না পারলে – শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় কথা বলতে শেখানো আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়েই ভাষা-মৃত্যুর প্রবণতাকে রোধ করা যায় – অন্য কোন বিকল্প পন্থা নেই । এটাই ভাষাদিবস পালনের তাৎপর্য । একুশে যেমন ভাষাশহিদ স্মরণ দিবস তেমনই নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রত্যয় প্রসারিত করার দিনও ।

                                ========== XXX =========

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

রোহিণী ধর্মপাল

                             

গৌরী ধর্মপালঃ বড় যখন ছোট হয় 

গৌরী ধর্মপাল। বাইরে যেমন, ভেতরে ঠিক তেমনটি। এ কিন্তু বড় সহজ নয়। ভেতরের সুরের সঙ্গে বাইরের সুরটিকে মেলানো। অত্মরাত্মার সঙ্গে বহিরঙ্গকে এক করে দেওয়া। দুই ক্ষেত্রেই শুধু এ সম্ভব। শিশু হলে অথবা ঋষি হলে। ভেবে দেখুন, শিশু আর ঋষির মধ্যে কতগুলি সাদৃশ্য আছে। শিশু সহজ সরল। যতক্ষণ না সমাজ তাকে জটিলতা কলুষতা শেখাচ্ছে। শিশুকে মিথ্যা বলতে আমরাই শেখাই কিন্তু। শিশু তার কল্পনার প্রসার ঘটায়। সেই কল্পনাকে মিথ্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে মস্ত ভুল হবে। শিশুর কাছে ওই কল্পনাই সত্যি। মনস্তত্ত্বে একটা দুর্দান্ত তত্ত্ব আছে। সর্বপ্রাণবাদ। এও কিন্তু ভারতীয় দর্শনেরই তত্ত্ব যেন; তবে তখন তা বড়দের তত্ত্ব। কিন্তু ছোটদের এই তত্ত্ব আর বড়দের দার্শনিক ভারিক্কি তত্ত্বের মূল ধারণাটি এক। আর তা হল, সব কিছুর মধ্যেই প্রাণ আছে। তা জীব হোক বা জড়। আর ছোটদের মধ্যে কিভাবে এই তত্ত্বটি কাজ করে? আপনাদের মধ্যে কে কে ভাবেন নি বলুন তো, যে চাঁদমামা আপনাকেই ভালোবেসে আপনার সঙ্গে সঙ্গে সব জায়গায় যায়? হিসেব কষতে আমার সুবিধা হবে। অঙ্কে কাঁচা তো! কে কে ভেবেছেন বললে সংখ্যাটা এত বেড়ে যাবে যে গুণে উঠতে হাঁপিয়ে যাব! কারণ সারা পৃথিবীর শিশুরা চাঁদ নিয়ে ঘুরেফিরে এমনটাই ভাবে! বড় হওয়ার পরেও, একটু চিন্তা করুন, টানা বৃষ্টির পর রোদ উঠলে মনে মনে ভাবি, আমার জন্যেই এই আলো! আবার খুব কাজের দিনে অবিরল বৃষ্টিপাতে মনে ভাবনা আসে, আজ এত দরকারি দিনটা! আজকেই বৃষ্টি শুরু হল এমন! ঘুরেফিরে কিন্তু নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে আমরা বড়রাও যুক্ত করে দি! শুধু বাইরে বলি না। সচেতন মনে জানি, এ নেহাতই বোকা বোকা। সবাই শুনলে হাসবে! শিশু এসব ভাবনদারির তোয়াক্কা করে না। সে হাততালি দিয়ে বলে ওঠে, কী মজা কী মজা! আমিও যাচ্ছি, চাঁদমামাও যাচ্ছে। ছোটবেলায় আমার ধারণা ছিল, প্রতি স্টেশনে ট্রেন থামার পর, ভেতরে থেকে ট্রেনের জানলাতে যে ধাক্কাটা আমি দিই, তাতেই আবার ট্রেন চলে! নিজের বিপুল শক্তি সম্পর্কে গর্ববোধ হতো না, কারণ ওটাই স্বাভাবিক ছিল! আমি না ঠেললে ট্রেন চলবে কী করে!!!
আমার বিশ্বাস, আপনাদের অনেকেই ছোটকালে এমন শক্তিধর ছিলেন! ছোটদের শক্তিশালী হতে গায়ে জোর লাগে না! মনের সারল্য দিয়েই  ডানায়ালা পরীরা তাদের সঙ্গে কথা বলে যায়, পক্ষীরাজ ঘোড়া তাদের পিঠে চাপিয়ে তেপান্তরের মাঠে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গে দেখা করিয়ে আনে, ভাঁটার মত চোখ আর মূলোর মত দাঁত নিয়ে রাক্ষসেরা ভয় দেখায়! এ যদি মিথ্যা হয়, তবে এ মিথ্যা বড় মোহময়, বড় মধুর! কিন্তু গৌরীর এই সারল্য আজীবন ছিল! নয়ত এমন লিখলেন কি করে ----" কারিগর বানায় সব আজব আজব জিনিষ--
পিঁপড়েদের পায়ের নূপুর--
     সারাদিন আসবে যাবে
      ঝুমঝুম শব্দ হবে।
প্রজাপতি পাখার ঢাকা --
     সারা বছর রোদে জলে
      রঙ যেন না জ্বলে গলে।
ঘাসপোকা-পুকির ওড়না--
   আহা, ওরা বড্ড লাজুক 
   ওড়নায় মাথাটি ঢেকে
           সহজে চলুক ফিরুক।"
আর এসব বানাতে কারিগরের কি কি লাগে? গৌরী লিখছেন, 
       "নীল মাকড়সার জাল
সন্ধে মেয়ের এলোচুলে                              জোছনা জরির জাল।
       টাটকা দুধের ফেনা
ঝরছে ঝরুক ঝরছে ঝরুক 
ধান-শিশিরের কণা।
মেঘডম্বর কু  য়া  শা
শিমুলতলার তুলো।
ঘাসের বনে কে ছড়ালি রাঙা রোদের গুঁড়ো ।
   শিরীষ ফুলের রোঁয়া 
   পুজোবাড়ির ধোঁয়া 
    উড়াল পাখির পালক। 
     ভোরের হাওয়ার ঝলক।
   শোলার পঙ্খী শোলার ফুল সুখু মেয়ের রুখু চুল--এই সব।"
 
শিশু-মন ছাড়া রোদের গুঁড়ো জোছনা জরির জাল মেঘডম্বর কুয়াশা কি দেখা যায়? রাজকন্যা চাইলেই কি হাওয়ার মত হালকা আর রোদের মত শাড়ি, বৃষ্টি-রিমঝিম নূপুর আর সুরসুড়ি পাতার ঘন্টি লাগানো শুঁড় তোলা কাশ-ফুরফুরে জুতো বানাতে পারার মত কারিগর নির্মাণ করা যায়?

ঠিক একই রকম সৎ সহজ হলেন ঋষিও। সৎ চিৎ আনন্দ, এই দিয়ে তাঁর অন্তরাত্মার আকাশ গড়া। ঋষি কে? না যিনি সত্যবাক্। যিনি জ্ঞান ও সংসারের পারে চলে যান। জ্ঞানের পারে যাওয়া মানে কি? অর্থাৎ তুমি জেনেছ। অথচ জানার জন্য যে অহম্ হওয়ার কথা, সেটি হয় নি। হবেই বা কি করে! যে জানে, যে জেনেছে, সে এও বুঝে গেছে যে সেই সর্বশক্তিমান আর তুমি এক। যে ঈশ্বরের সাধনা ভজনা করে সবাই, যাঁর কাছে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করে; আর তুমি, একটা সাধারণ ময়লা মত, কোণের দিকে একটু ছেঁড়া মত, রান্না করছ বা আপিস করছ; আসলে এক! তখন আর অহম্ টি থাকে না। না জানলেই যত বড় বড় কথা আসে। নিজের সম্পর্কে বড় বড় ভাবনা আসে। যিনি জেনেছেন, তিনি সমাহিত হয়ে যান।
আর সংসারের পারে যাওয়া? শুনতে সহজ কিন্তু বড়ই দুরূহ। ঝগড়া ক্ষমতার লড়াই জটিলতা ঈর্ষা লোভ সব গিজগিজ করতে থাকে তো মনের মধ্যে! সেই সব নোংরা কাদা ঠেলে ক'জন পারে সেই গভীর অন্ধকারের পথ পেরিয়ে যেতে?
এই অন্ধকারটিকে আবার অন্ধকার বলে চেনা কঠিন। এই বাইরেটা চকচকে চোখ ধাঁধানো আলোতে আপাদমস্তক মোড়া। ভেতরটা ঢনঢনে। কিন্তু ঋষি যিনি, তাঁর মনের মধ্যে টিমটিম করে জ্বলে প্রাণের প্রদীপ। সেই স্বল্প আলো দিয়ে তিনি বুঝে যান কোনটি অবিদ্যার আলো, কোনটি বিদ্যার আলো। গৌরী ছিলেন এমন এক ঋষি। সেই বেদের যুগের ঋষিদের মতোই। জ্ঞানের গরিমায় যেন বাক্, প্রতিবাদের তেজে যেন গার্গী, গৃহকর্মে সন্তান প্রতিপালনে যেন কাত্যায়নী। সবেতে খুশি। কোনো চাহিদা নেই। লোভ নেই। ঈর্ষা নেই। আড়ম্বর নেই। বাইরের সাজ নেই। যত মধু যত স্নেহ মায়া দিয়ে হৃদয়টি এদিকে সোনায় মোড়া। এমন মানুষই তো শিশুদের জন্য লিখতে পারেন অনায়াসে। এমন লেখনী না হলে শিশুদের জন্য ভালবাসার গল্প লেখা যায়? এই পৃথিবীর মাটিতে বড় হওয়া চাঁদনি আর আকাশের চাঁদের প্রেমের গল্প?
" শুধু একেকদিন পূর্ণিমার রাতে চাঁদের সাধ যায় চাঁদনীকে নিয়ে পাড়ি দিতে, সেই চাঁদ-দূরে দুটি রূপোলি মাছের মত নীল জোছনার শায়রে ভাসতে ভাসতে। ভুবন-মা বলেন, যাস নেরে, যাস নে। চাঁদ তবু যায়। অমনি মায়ের বুক টনটন করে ওঠে। শিরায় শিরায় টান ধরে।
বুকের সাগর উঠাল পাথাল করে। বট শিমুল দেবদারুর মাথা পর্যন্ত গিয়ে আটকে যায় চাঁদ। ভুবন -মা বাড়িয়ে ধরেন তাঁর অলখ রশির মই। তাই বেয়ে তারা নেমে আসে। একজোড়া চাঁদ ৷ চাঁদ আর চাঁদনী।" (চাঁদনি)

 



ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

                                          

তিন মায়ের গল্প


এক অক্ষরের একটা শব্দ – মা, কিন্তু কি অনন্ত ব্যাপ্তি শব্দটার !গর্ভধারিনী জননী,দেশ মাতৃকা, ঈশ্বর । আমাদের পরম স্নেহের আশ্রয় মা।বিশ্বের তাবৎ অভিধানে একই অর্থ এই একটিমাত্র অক্ষরের শব্দ মা’র ।মায়ের কথা, মা কে নিয়ে কথার কোন শেষ নেই । আমি তিন মায়ের কথা বলব ।তিন ‘মা’ই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্ধকার জগৎ থেকে এসেছিলেন, তারপর আপন নিষ্ঠা আর তন্ময় সাধনায় মহিয়সী নারীর মর্যাদা আদায় করতে পেরেছিলেন ।সুকুমারী দত্ত বা গোলাপসুন্দরী প্রথম মহিলা নাট্যাভিনেত্রী থেকে বাংলার প্রথম মহিলা নাট্যকার , নটী বিনোদিনী তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ মঞ্চাভিনেত্রী এবং ইন্দুবালা সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী ।এই তিন মায়ের গল্পে আছে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার কথা,অবহেলার অন্ধকারকে অগ্রাহ্য করে আপন প্রতীভায় মাথা-উঁচু করা প্রতিষ্ঠার কথা । 

সুকুমারী দত্ত

১৮৭৩ নগর কলকাতা থিয়েটারের শহর হওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে , এক বছর আগে  ধনি জমিদার বাবুদের প্রাঙ্গণ থেকে মুক্তি পেয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে থিয়েটারের দরজা । ১৮৭২এর  ৬ই ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যাশানাল থিয়েটার ‘নীলদর্পণ’ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ।বাংলা থিয়েটারের সেই শৈশবে ধনকুবের ছাতুবাবু বা আশুতোষ দেবের দৌহিত্র শরৎকুমার ঘোষ খুললেন বেঙ্গল থিয়েটার । শরৎকুমার মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নাটক লিখে দেবার জন্য ।মাইকেল নাটক লিখেদিতে সম্মত হলেন একটি শর্তে, তা হল তাঁর নাটকে স্ত্রী চরিত্রের অভিনয় নারী অভিনেত্রীকে দিয়েই করাতে হবে ।বেঙ্গল থিয়েটারের উদ্যোক্তারা বারাঙ্গনাপল্লী চারজন অভিনেত্রীকে নিয়োগ করলেন তাদেরই একজন ছিলেন গোলাপসুন্দরী । মাইকেল তখন মৃত্যুসশয্যায় তবু মাইকেল বেঙ্গল থিয়েটারের জন্য  নাটক লিখে দিলেন ‘মায়া কানন’ ।থিয়েটার উদবোধনের আগেই মধুসূদনের মৃত্যু হওয়ার কারণে তারা মায়াকানন দিয়ে থিয়েটারের উদবোধন করলেন না । ৮৭৭৩এর ১৬ই অগস্ট বেঙ্গল থিয়েটারের উদবোধন হল মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক দিয়ে ।অভিনয় করলেন বারাঙ্গনাকন্যা গোলাপসুন্দরী । বাংলা থিয়েটারের প্রথম নারী অভিনেত্রী ।শেষ হল নাট্যাভিনয়ে পুরুষের একচেটিয়া অধিকার ।এ ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা । মাইকেল মধুসূদন এই ঘটনা দেখে যেতে পারেননি ।

বারাঙ্গনাকন্যা গোলাপসুন্দরীর অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার সংগ্রাম বিস্ময়কর ।সাহায্য পেয়েছিলেন এক মহতী হৃদয় মানুষের, তিনি বেঙ্গল থিয়েটারের নাট্যপরিচালক উপেন্দ্রনাথ দাস । উপেন্দ্রনাথ গোলাপের বিবাহ দিয়েছিলেন থিয়েটারেরই এক অভিনেতা গোষ্ঠবিহারী দত্তর সঙ্গে । এই ঘটনা তখনকার সমাজে প্রবল নিন্দাবাদ হয়েছিল । উপেন্দ্রনাথকে নিজের পিতৃসম্পর্কও ত্যাগ করতে হয়েছিল । গোষ্ঠবিহারী – সুকুমারীর মর্যাদাপূর্ণ দাম্পত্যজীবনের ব্যবস্থা উপেন্দ্রনাথ করেছিলেন । তারা ভদ্রপল্লীতে বাসা বেঁধে ছিলেন । এই সময় উপেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পিতার সম্পর্ক পুণস্থাপিত হয় । তিনি উপেন্দ্রনাথকে বিলাতে পাঠিয়ে দেন । উপেন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে গোষ্ঠবিহারীও জাহাজের খালাশি হয়ে বিলাত চলে যান । সুকুমারী স্বামী পরিত্যক্তা হন, তখন সে এক কন্যাসন্তানের জননী । 

স্বামী পরিত্যক্তা সুকুমারী থেমে থাকেননি । সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করলেন মেয়েদের নাচ ও অভিনয় শেখাবার একটা স্কুল খুললেন । কিন্তু বেশি দিন চালাতে পারলেন না ।  ন্যাশানাল ফিমেল থিয়েটারের উদ্যোগে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য নাটক করলেন ।  ইতিমধ্যে এক সহৃদয় মানুষ, নবভারত পত্রিকার সম্পাদক বাবু দেবপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সুকুমারীর কন্যার শিক্ষা ও প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন । অর্থকষ্ট সামাল দিতে  সুকুমারী নাট্যরচনায় মন দিলেন, নিজের ব্যক্তিজীবন ও নাট্যজীবনের অভিজ্ঞতা উজাড় করে রচনা করলেন ‘অপূর্ব সতী’ নামে একটি নাটক । নাটকটি অভিনীতও হয়েছিল । বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস সুকুমারীকে প্রথম মহিলা নাট্যকারের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিয়েছে ।

একমাত্র কন্যার শিক্ষার বিষয়ে কোন অবহেলা করেননি সুকুমারী । কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে । কিন্তু একটা দুঃখ বয়ে বেড়াতে হয়েছিল তাকে । মেয়ের শশুরবাড়িতে গিয়ে মেয়েকে একবার চোখের দেখা দেখার অধিকার ছিল না সুকুমারীর ।

১৮৯০-৯১ পর্যন্ত গোলাপ নানান থিয়েটারে অভিনয় করেছেন । তারপর কবে চলে গেলেন তা জানা যায় না । অন্ধকার জগত থেকে আলোয় ফেরা গোলাপদের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ তখনকার সমাজ মনে রাখেনি । গোলাপ তার কন্যাকে পিতৃ ও মাতৃ পরিচয় দিতে পেরেছিলেন কিন্তু আর এক জননী বিনোদিনী তাও পারেননি ।

বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনীর সঠিক জন্মতারিখ জানা যায় না, জানা যায় না তাঁর পিতৃপরিচয়ও । আনুমানিক ১৮৬৩তে তাঁর জন্ম। বিনোদিনীর জন্মবৃত্তান্তে নিশ্চিত ভাবেই আমাদের আগ্রহ নেই । তিনি তাঁর আত্মকথায় বারবার নিজেকে হীন বারাঙ্গনা বলে উল্লেখ করেছেন । বাংলা থিয়েটারের সেই আদিপর্বে,  সহায়সম্বলহীনা এক বালিকা সমাজের অন্ধকার স্তর থেকে ঊঠে এসে অসামান্য প্রতিভা ও মেধায় , থিয়েটারকে ভালোবেসে, আপন তন্ময় সাধনায় এক মহিয়সী নারীর মর্যাদা অর্জন করেছিলেন । থিয়েটারকে ভালোবেসে পবিত্র হতে চেয়েছিলেন । 

থিয়েটারের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন বিনোদিনী – নিজেকেও । মারোয়াড়ি যুবক গুর্মুখ রায় একটা স্থায়ী থিয়েটার নির্মাণ করে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। বিনিময়ে বিনোদিনীকে তাঁর রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে । এবং সেই থিয়েটারের নাম হবে বিনোদিনীর নামে ‘বি থিয়েটার’ । সমস্ত আত্মগ্লানি দূরে সরিয়ে রেখে বিনোদিনী সম্মত হলেন ।  তাঁর নাট্যশিক্ষক গিরিশচন্দ্র বিনোদিনীকে এক অর্থে বিক্রি করে দিলেন গুর্মুখ রায়ের কাছে । থিয়েটার নির্মিত হ’ল , কিন্তু প্রতিশ্রুতি মতো ‘বি থিয়েটার নয় - বিনোদিনীকে বঞ্চনা করে গিরিশ বাবুদের কৌশলে সেই থিয়েটারের নামকরণ হল ‘ষ্টার থিয়েটার’ , ১৮৮৩’র ২১শে জুলাই । কারণ , এক বারাঙ্গনার নামে থিয়েটার নাকি সেকালের সমাজপতি ও ভদ্রসমাজের  অনুমোদন পেতো না । বিনোদিনী গুর্মুখ রায়ের সঙ্গে ছিলেন মাত্র ছ মাস ।  গুর্মুখ চেয়েছিলেন যার নামে থিয়েটার করেছেন তাকেই অর্থাৎ বিনোদিনীকে ষ্টার থিয়েটার’এর মালিকানা দিয়ে যাবেন , অন্তত ৫০ভাগ অংশ তাঁকে দেবেন । এ ক্ষেত্রেও গিরিশচন্দ্র, অমৃতলাল মিত্ররা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেন, বিনোদিনী তাঁর অংশ পেলেন না । মাত্র ১১হাজার টাকায় ষ্টার থিয়েটারের মালিকানা হস্তান্তরিত হ’ল অমৃতলাল মিত্র সহ চার জনের নামে ।

বিনোদিনী শুধু নিজেই অভিনয় খ্যাতির শিখর স্পর্শ করেছিলেন তা নয় তাঁর অসামান্য অভিনয় সেকালের বাংলা থিয়েটারকেই মর্যাদামন্ডিত করেছিল । সে যুগে সম্ভ্রান্ত মানুষের চোখে নাট্যাভিনয় হীন কাজ বলেই বিবেচিত হতো ।  বিনোদিনীর অভিনয় দেখতে থিয়েটারে এসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র । তাঁর ‘মৃণালিনী’ নাটকে মনোরমার চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র মন্তব্য করেছিলেম “আমি মনোরমার চরিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ করিব আমন আশা করিনাই । আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল” । ১৮৮৪র ২রা আগস্ট গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা মঞ্চস্থ হল স্টার থিয়েটারে । চৈতন্যের ভুমিকায় বিনোদিনী । রামকৃষ্ণদেব এসেছিলেন নাটক দেখতে । শ্রীচৈতন্যের চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয়ে পরমপুরুষ রামকৃষ্ণদেব ভাববিহ্বল হয়ে বিনোদিনীকে আশির্বাদ করেন । বলেন “আসল নকল এক দেখলাম” । পঙ্ক থেকে পঙ্কজা হয়ে ওঠার মত বিনোদিনী শ্রীচৈতন্যের চরিত্রের সার্থক রুপায়নের মধ্য দিয়ে বারাঙ্গনা জীবনের আত্মগ্লানি মুছে ফলতে চেয়েছিলেন । শ্রীরমকৃষ্ণের স্পর্শে বারাঙ্গনা নটী বিনোদিনী কলুষমুক্তির আস্বাদ পেলেন, তেমনই রঙ্গালয়েরও অস্পৃষ্যতা মুক্তি ঘটলো, থিয়েটারকে মর্যাদার আসনে স্থাপন করলেন বিনোদিনী । 

১৮৮৬তে মঞ্চ ত্যাগের ২৬ বছর পরে বিনোদিনী তাঁর আত্মকথা ‘আমার কথা’ লিখতে শুরু করেন । আমাদের নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে বিনোদিনীর উল্লেখ নিতান্ত দায়সারা ভাবে একজন অভিনেত্রী রূপে উল্লেখ হয় । আত্মকথার ভুমিকায় বিনোদিনী লিখেছেন “ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া ! পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা,শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা ! কিন্তু তাহা শুনিবারও লোক নাই ! মনের ব্যথা জানাইবার লোক জগতে নাই – কেননা আমি জগত মাঝে কলঙ্কিনী, পতিতা । আমার আত্মীয় নাই, বন্ধু নাই, বান্ধব নাই, এই পৃথিবীতে আমার বলিতে এমন কেহই নাই” । সেকালের সমাজের কাছে বিনোদিনীর জিজ্ঞাসা ছিল “... বারাঙ্গনার জীবন কলঙ্কিত  বটে ! কিন্তু সে কলঙ্কিত ঘৃণিত কোথা হইতে হয় ? জননী জঠর হইতে তো একেবারে ঘৃণিত হয় নাই । ...অনেকেই পুরুষের ছলনায় ভুলিয়া তাহাদের বিশ্বাস করিয়া চির কলঙ্কের বোঝা মাথায় লইয়া অনন্ত নরকযাতনা সহ্য করে। সে সকল পুরুষ কাহারা ? যাহারা সমাজ মধ্যে পূজিত আদৃত তাহাদের মধ্যে কেহ নন কি” ?

অথচ কি হিমালয়প্রমাণ বঞ্চনা, প্রতারনা আর উপেক্ষার স্বীকার হয়েছিলেন পঙ্কজা থেকে মহিয়সী হয়ে ওঠা এই রমনী । মঞ্চ ও অভিনয় ত্যাগের পরও বিনোদিনী বেঁচে ছিলেন আরো পঞ্চান্ন বছর তার মধ্যে সাহিত্যচর্চা করেছেন চল্লিশ বছর । দুটি পর্বে তাঁর আত্মকথা ছাড়াও রচনা করেছিলেন ‘বাসনা’ ও ‘কনক ও নলিনী’  নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ । কিন্তু লেখিকা রূপে বিনোদিনীর অবদান এখনো গ্রাহ্য হয় নি । যদিও তিনিই ছিলেন বাংলার ২য় মহিলা আত্মচরিত লেখিকা । বাংলা সাহিত্যের পাঠ্য ইতিহাস তন্নতন্ন করে খুঁজলেও সেকালের মহিলা লেখিকা রূপে বিনোদিনীর বিন্দুমাত্র উল্লেখ পাওয়া যাবে না ।

১৮৮৬’তে থিয়েটার থেকে বিদায় নেবার পর বিনোদিনী উত্তর কলকায় এক উদার হৃদয় ব্যক্তির আশ্রয়ে বধু জীবন যাপন করেন । সেখানেই তাঁর এক কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে, নাম দেন শকুন্তলা । কন্যাকে আশ্রয় করে বিনোদিনী পূর্বের অনেক ক্লেদাক্ত স্মৃতি ভুলে যান । বিনোদিনীর বাসনা ছিল কন্যা শকুন্তলাকে শিক্ষাদান করে সমাজের মুলস্রোতে নিয়ে আসবেন । কিন্তু সেকালের রক্ষণশীল সমাজ শকুন্তলার বিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন । অথকথায় বিনোদিনী তীব্র ধিক্কার জানিয়ে লিখেছেন "... আবার এই বিপন্নাদের পদে পদে দলিত করিবারজন্য ঐ অবলা-প্রতারকেরাই সমাজপতি হইয়া নীতি পরিচালক হন । যেমন ভাগ্যহীনাদের সর্বনাস করিয়াছেন, তাহারা যদি তাহাদের সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের সত১১পথে রাখিবার জন্য কোন বিদ্যালয়ে বা কোন কার্য শিক্ষার জন্য প্রেরণ করে, তখন ঐ সমাজপতিরাই শত চেষ্টা দ্বারা তাহাদেরসেই স্থান হইতে দূর করিতে যত্নবান হন"। ... শত দোষ করিলে ক্ষতি নাই ; কিন্তু 'নারীর নিস্তার নাই টলিলে চরণ' । কন্যাকে আশ্রয় করে বিনোদিনী তাঁর বারাঙ্গনা জীবনের গ্লানি ভুলতে চেয়েছিলেন ।  কিন্তু মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৯১এ সেই কন্যার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন বিনোদিনী । এর দুবছর পর তাঁর  শেষ আশ্রয়দাতারও মৃত্যু হয় , বিনোদিনী ফিরে যান তার ১৪৫ নম্বর কর্নোয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িতে । সেখানেই সবার অলক্ষ্যে অনাদরে অবহেলায় একদা পঙ্কজা থেকে বাংলা থিয়েটারের রাজেশ্বরী হয়ে ওঠা বিনোদিনীর মৃত্যু হয় ১৯৪১এ । না কোন শোক সভা হয়েছিল কিনা, কোন সংবাদ পত্র প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল কিনা তাও জানা যায়না । 

তিন মায়ের গল্পের তৃতীয় যে মায়ের কথা বলব তিনি সুকুমারী ও বিনোদিনীর চেয়ে আরো চল্লিশ বছর পরে জন্মেছিলেন । এদের চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক প্রতিষ্ঠাও তিনি পেয়েছিলেন । কিন্তু নিষিদ্ধপল্লী রামবাগানের বাস ছেড়ে কোন সম্ভ্রান্ত অঞ্চলে চলে আসতে চাননি । বলতেন 'রামবাগান আমাকে যশ, খ্যাতি, অর্থ সব দিয়েছে । আমি রামবাগান ছেরে যাব কেন ? আমি রামবাগানের ইন্দু' । তিনি সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা যাকে চিত্র-মঞ্চ - যাত্রা-সাংস্কৃতিক জগতের শিল্পী_কলাকুশলীরা আজও 'ইন্দুমা' বলে শ্রদ্ধায় মাথা নত করেন ।

এই লেখার অন্য দুই মায়ের মত ইদুবালা পিতৃপরিচয়হীনা ছিলেন না, বরং পিতা ছিলেন নামকরা মানুষ । মায়ের নাম রাজবালা । রাজবালার মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা, স্বামীর অকালমৃত্যুর পরে অবস্থার বিপাকে এক ধনীর রক্ষিতার জীবন পান এবং আশ্রয় হয় রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীতে । মায়ের মৃত্যুর পরে অন্য দুই বোনের সঙ্গে রাজবালারও আশ্রয় হয় নিষিদ্ধপল্লীতে । নিতান্ত বালিকা রাজবালা নিষিদ্ধপল্লীর ভবিতব্য মানতে চাননি । সেখান থেকে মুক্তির জন্য সুযোগ পান সার্কাশের দলে যোগ দেবার । সাত বছরের বালিকা যোগ দেন প্রফেশর বোসের সার্কাশে । মালিক ছিলেন মতিলাল বোস – সেকালের প্রসিদ্ধ নাট্যকার মনমোহন বোসের পুত্র । ছবছর পরে মতিলাল বিবাহ করের রাজবালাকে । ইন্দুবালার জন্ম হয় অমৃতশরে ।

মতিলাল চেয়েছিলেন মেয়ে ইন্দুকে নিয়ে রাজবালা সার্কাশেই থাকুন আর রাজবালা চেয়েছিলেন কলকাতায় স্বামী কন্যাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে ।রাজবালা আর সার্কাশে ফিরে যাননি । তিনবছরের মেয়ে ইন্দুকে নিয়ে রামবাগানেই বাসা বাঁধেন । সেকালে থিয়েটার ছিল বারাঙ্গনা কন্যাদের মুক্তির আশ্রয় । রাজবালা থিয়েটারে যোগ দিলেন, খ্যাতিও পেলেন যথেষ্ঠ । 

রাজবালা ইন্দুর লেখাপড়ার আয়োজন করেছিলেন, তাকে ভর্তি করেছিলেন স্কুলে । কিন্তু মায়ের অসুস্থ্যতার কারনে ইন্দুর স্কুলশিক্ষায় ছেদ পড়ে । জনৈক সহৃদয় ব্যক্তির সহায়তায় ইন্দু নার্সিং ত্রেনিং নিতে শুরু করেন কলকাতা মেডিকেল কলেজে ।  কিন্তু সেখান থেকেও পালিয়ে আসেন । এরপর শুরু হল গান শেখা । ওস্তাদ গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে তালিম নিতে শুরু করলেন । সেকালের বিখ্যাত গায়িকা গহরজানের সান্নিধ্য লাভ করলেন । ক্রমে ইন্দু সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠা পেলেন । বিভিন্ন দেশীয় রাজার দরবারে দরবার গায়িকা রূপে ক্যাতি ও প্রতিপত্তি পেলেন ।

ইন্দুর সঙ্গীত প্রতিভাকে ব্যবহার করতে দেরি করেনি সেকালের বাংলা থিয়েটার ।সবকটি পেশাদারী থিয়েটার স্টার, মিনার্ভা মনমোহনে ইন্দু অভিনেত্রী ও গায়িকা রূপে খ্যাতি অর্জন করলেন ।এই সময়ে ইন্দু কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে আসেন । ইন্দুবালা থিয়েটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু গানেই ডুব দিলেন । ১৯১৬তে প্রথম গ্রামফোন রেকর্ডে গান করেন আর তারপরেই ক্রমে প্রবল জনপ্রিয়তায় হয়ে ওঠেন 'সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী' । একদিকে খেয়াল, দাদর্‌ ঠুমরি কিংবা ভজন, অন্যদিকে নজরুলের গান, ভক্তিগীতি, নাটক ও সিনেমার গান – ইন্দুবালার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হল । ১৯৭৫এ পেলেন সঙ্গীত নাটক আকাডেমি সম্মাননা, পরের বছর গ্রামফোন কোম্পানী তাঁর সম্মানে প্রকাশ করলো গোল্ডেন ডিস্ক । কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ আর তাঁর পদপ্রান্তে বসে উদবোধনী সঙ্গীত গেয়েছিলেন ইন্দুবালা । খ্যাতির শীর্ষ স্পর্শ করেও ইন্দুবালা কোনদিন মাটি থেকে পা সরিয়ে নেননি । দেশজোড়া খ্যাতি সত্তেও ইন্দুবালা রামবাগানের বাসা ছেড়ে যাননি । একদিকে দেশজোড়া খ্যাতির আলো আর অন্যদিকে রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার । এই দিয়ের মাঝে সুরের আকাশে উজ্বল জ্যোতিষ্ক ছিলেন ইন্দুবালা – সকলের শ্রদ্ধার ইন্দু মা ।

সাহিত্যিক সমরেশ বসুর স্ত্রী গৌরী বসু, যিনি ইন্দুবালার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে তাঁর কাছে সঙ্গীতশিক্কা করকে, তাঁকে লেখা এক পত্রে ইন্দুবালা লিখেছিলেন " কেন আমি ভদ্র ঘর থেকে ইন্দুবালা হতে পারিনি । কিসের জন্য এই পল্লীর মেয়ে আমি ! জানো মা গৌরী । দুনিয়াসুদ্ধ সকলে বলে আপনি ভদ্র পল্লীতে যান, স্কুল করুন, আপনার জিনিস সব দান করুন, শেখান ইত্যাদি ইত্যাদি । তা কি হয় নাকি ? দিদিমা বনবিষ্ণুপুর থেকে এসেছিলেন, চাটুজ্জেবাড়ির মেয়ে মুখুজ্জেবাড়ির বৌ হয়ে । পরে বিধবা হয়ে এই পাড়ায় । তিন পুরুষের বাস কি ভাঙতে পারি ! পারবো না । কারণ ভগবান যে শাস্তি দিয়েছেন মাথা পেতে নিয়েছি...কিছু তো লুকুই নি মা ।... মানা অর্থাৎ প্রণব(ইন্দুমার পালিত পুত্র)সেও জানে যে তার জীবনে সে যখন অভিজাত পাড়ায় বাড়ি করবে তখন তার এই মা কোনদিন যাবে না "। এই রামবাগানের নিষিদ্ধ পল্লীতেই সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী – সকলের ইন্দূমা'র মৃত্যু হয় ১৯৮৪র ৩০শে নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে ।

তিন মায়ের অন্ধকার থেকে লড়াই যেন একাকার হয়ে গেছে । এই লেখা শুধু তিন মায়ের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার কথা নয়, সেই সময়ের অনেক মায়ের কথাই ধরা আছে এই লেখায় ।

তথ্যসূত্র (১) 'রঙ্গালয়ে বঙ্গনটী'/ অমিত মৈত্র (২)'আমার কথা' / বিনোদিনী দাসী (৩) 'সুকুমারী দত্ত ও অপূর্বসতী নাটক' / সম্পাদনা বিজিতকুমার দত্ত, নাট্য আকাদেমি পত্রিকা, জানুয়ারি ১৯৯২ (৪)'ইন্দুবালা – স্মৃতি ও প্রণতি' / বাঁধন সেনগুপ্ত ।