শাপলা সপর্যিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শাপলা সপর্যিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

শাপলা সপর্যিতা

                         


মৃত্যু – সে এক দারুণ রোমান্স

সে যেন চুপি চুপি আসে, গোপন প্রেমিকার মতো বুকের কাছে এসে বসে।খুব সংগোপনে তারই জন্য প্রিয়-প্রহরের প্রতীক্ষা। এও এক অসম্ভবের গান।তিনি গেয়েছেন জীবনভর তাঁর কবিতায়, তাঁর লেখায়।তাঁর জীবন সাধনায় অনেক রাগ-বিরাগ প্রেম-বিরহের পাশাপাশি এ এক অসাধারণ অনুভূতি।একে আমি বলি এক দুর্দান্ত রোমান্স।পাওয়ার মাঝে না-পাওয়ার বেদনা। চাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে পাওয়ার অমিল-বেমিল। সবকিছু ছাপিয়ে দিয়েছেন এক অদ্ভুত নেশাতুর ভাবনায়। অদ্ভুত প্রত্যাশার প্রাণ।এ-ও কি সম্ভব? জন্মেই মৃত্যুর আহ্‌বান!এক জন্মে মৃত্যুর পরম সাধনা! পূর্বাপর জীবনপ্রবাহে যেখানে বারবার আরও কিছুটা সময় বেঁচে থাকার আরও এক দীর্ঘজীবনের প্রত্যাশা করা কথা! গৌতম যখন সাধনা করেন নির্বাণ, পুত্রের মুখদর্শন না করেই ঘর ছেড়ে যান সহজিয়া সাধনে।বাউল দেহের ভেতর বাস করেন নিয়ে পরমাত্মার পরম প্রত্যাশা।নখাগ্র থেকে ত্রিবেণী, কেশপাশ উথাল-পাথাল দেহভর পরমাত্মার খোঁজ। মরণ আর জনম। জনম আর মরণ এবং অবশেষে তার নির্বাণ।তখন তিনি আরাধনা করেন মৃত্যুর। বলেন,মরণ রে/তুঁহু মম শ্যামসমান  কে কবে বলেছে কোথায়  মরণ তুমি আমার প্রিয়তমার সমান?
কে কবে বলতে পেরেছে এমন হৃদয় উজাড় করা, হৃদয় হরণ করা কথা—
তুঁহুঁ নহি বিসরবি, তুঁহুঁ নহি ছোড়বি
রাধা-হৃদয় তু কবহুঁ ন তোড়বি
হিয় হিয় রাখবি অনুদিন অনুখন
অতুলন তোহার লেহ
দূর সঙে তুঁহুঁ বাঁশি বাজাওসি
অনুখন ডাকসি/অনুখন ডাকসি

রাধা রাধা রাধা  ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে এভাবেই মরণ কবিতায় মৃত্যুকে কৃষ্ণসঙ্গ কামনায় রাধার অধীরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কৃষ্ণের বাঁশি আর ঘুম হরণিয়া। রাধার পক্ষে কি সম্ভব ছিল কোনো কালে অবহেলা করা? বাঁশি বাজে, মধ্যরাত্রি। মন প্রিয়সঙ্গ অধীর। শিয়রে শাশুড়ি, ননদী পাশে। দুর্লঙ্ঘ্য এই প্রাচীর বরাবর ভেদ করেছে রাধা।যে বাঁশিতে ঝরেছে রাতভর অবিরত রাধা-রাধা নাম, মরণ কি বলা যায় তারে? অধীর প্রেমের এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই বুঝি মিলেমিমে রূপ নেয় মরণ! হতেও পারে, কবির মনোভূমি রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে যদি সত্যি হয়। তবে কি বলা যায়, এই যে মরণের জন্য অধীরতা কিংবা ভালেবাসা কিংবা প্রিয়রূপে অন্তরে ধারণে কিংবা প্রিয়তর হয়ে ব্যাকুল রূপে তার আহ্বান এও কি আবরণ! হতে পারে আভরণ? কবিতার কিংবা কবির হৃদয়ের অবগুণ্ঠন! না অসম্ভব। এ সত্যিই কবিরই ভালোবাসা। এ অলক্ষ্যে ধাবমান অন্য আরও এক জীবনদেবতাই বা বুঝি! যা নিত্য ধাবিত করেছে তারে জীবনের তরে। তাই একই লেখনীতে বসেছে জেঁকে জীবনের জয়গান  
মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। 
মৃত্যু কেমন করে আসবে আমার এই কর্মচঞ্চল জীবনে, তা নিয়ে কেউ কখনো নিবিড় করে ভাবে? কতটা সময় নিয়ে কত বিষণ্নতা ছড়িয়ে রাখে জীবনে একটি শব্দ মৃত্যু তা বোধ করি সবারই জানা। বরাবর মৃত্যু এক বিভীষিকা নিয়ে মূর্তমান। কোনো একদিন আসবে আজরাইল কি অন্য কোনো যমদূত। করবে হরণ এই জীবনভর বয়ে বেড়ানো দেহ থেকে তারে। ফেলে দিয়ে এই অলস-অবস মাটির দেহ চলে যাবে লয়ে চিরপ্রাণ পরমাত্মার দ্বারে। এই তো মরণের ক্ষণ কিংবা মরণের ধারণা। কেউ কি কখনো ভেবেছিল এও এক সাধনযোগ হয়ে বাস করে জীবনেরই একধারে? মরণের লাগিও বুঝি পরম প্রিয়র মতো দিন গোনা! তারেও বুঝি সাজানো যায় কাব্য-কথকতায়!কী অদ্ভুত ভালোবাসায় তারও আরাধনা করা যায়! শেখালেন তিনি, দেখালেন তিনি। আমার প্রাণের ঠাকুর। বললেন,
অত চুপি চুপি কেন কথা কও/ওগো মরণ, হে মোর মরণ,/অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,/ওগো একি প্রণয়েরই ধরণ!/…তুমি এমনি কি ধীরে দিবে দোল/মোর অবশ বক্ষশোনিতে?/কানে বাজাবে ঘুমের কলরোল/তব কিঙ্কিণি- রণরণিতে  
আসলে সত্যিটা কী? এই অদ্ভুত প্রেম। এ কি সম্ভব? নয়। সত্যিটাকে পরম করে মেনে নেওয়াই আসল। যদি বলি, এ অবশ্যম্ভাবী, এ বিকট শক্তিধারী, এ অবিনশ্বর, এ নির্দিষ্ট। কবে কে পেরেছে এরে ছাড়ায়ে যেতে? তাই বুঝি স্বীকার করে নেওয়া! স্বীকার করে নেওয়া প্রেমে। স্বীকার করে নেওয়া ভালোবাসায়। স্বীকার করে নেওয়াই তার শক্তি, তার মত্ততা, তার প্রলয় আবাহন।তার নিবিড় ঐকতান। প্রলয়ের বীণা বুকে ধারণ করা বুঝি তার জয়গান আর গীত লেখনীতে ধরা দেওয়া অন্য এক কায়ায় দারুণ প্রাণের নিনাদ। 
তুমি উৎসব করো সারারাত তব বিজয়শঙ্খ বাজায়ে/মোরে কেড়ে লও তুমি ধরি হাত/নব রক্ত বসনে সাজায়ে। এই হলো স্বীকারোক্তি। মেনে নেওয়া। নিজেকে সমর্পণ এক অদ্ভুত অলঙ্ঘ্যনীয় শক্তির পায়ের নিচে। সঙ্গে তারেই বরণ করে নেওয়া ফুলের মালায়।একই সঙ্গে গানের বাণীতেও। আমি এই বুঝেছি। এইখানে এসে আমি আমার বোঝাপড়ার একটা প্রায় উপকণ্ঠে পৌঁছেছি—‘প্রেম আকর্ষণে/যত গূঢ় মধু মোর অন্তরে বিলসে/উঠিবে অক্ষয় হয়ে নব নব রসে/বাহিরে আসিবে ছুটি/অন্তহীন প্রাণে/ জগতে তব প্রেমের আহবানে/নব নব জীবনের গন্ধ যাব রেখে/নব নব বিকাশের বর্ণ যাব এঁকে/কে চাহে সংকির্ণতার কূপে/ এক ধরাতল—মাঝে শুধু এক রূপে/বাঁচিয়া থাকিতে! নব নব মৃত্যু পথে/তোমারে পূজিতে যাব জগতে জগতে  
এ ভীষন পূজার। এ পরম প্রত্যাশার। এ মৃত্যু, এ নিশ্চিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু কেন এত প্রিয়? কেউ কি জানি তার কিছু। যে প্রিয়সঙ্গ এসেছিল নেমে একদিন পরম প্রদোষে গীত সুধা নিয়ে তার জীবনে, প্রভাতে, যে রবারবর কাব্যে সাধনায় দিনমান তার বিকাশে নিজেরে দিয়েছে উজাড় করে পায়ের কাছে, সে নিশিদিন-নিশিদিন বিরাজে আমার প্রাণের ঠাকুরের ব্যাপৃত জীবনে| জীবনের শেষ প্রবাহ অবধি, অবগুণ্ঠনে এক নিবিড় মৃত্যুর কাছে সঁপে দিয়ে নিজের জীবন। এক অধরা মাধুরী হয়ে জীবনের শেষ বেলায়ও। তারই জেরই অবাধ বিস্তৃতি লয়ে বসেছেন তিনি সাজায়ে। নিজের দেহ মাথা থেকে সৌরকপাল অবধি এঁকেছেন তার ছবি নিজেরই তুলিতে। আমি দেখেছি তারে যে ছবিতে তারই সাড়া পেয়ে এসেছি এ যাবতকাল যাপিত জীবনের লিপি গীত বাণীগুলিতে। অধরা। বিষন্ন। জীবন জীবন জুড়ে। প্রেমে পড়েছেন অজস্র। কাদম্বরী থেকে আন্না। আন্না থেকে ওকাম্পো। কোথাও তবু এতটুকু ম্লান হয়নি তারই ছায়া। স্বেচ্ছায় যিনি মৃত্যুরে দিয়েছেন রাজর্ষি সঙ্গ। মৃত্যু যারে গেছে লয়ে সঙ্গে আর যারে রেখে গেছে তারে দিয়ে গেছে বুঝি বা অসীম প্রেমের প্রচুর স্বাদ। গাইতে জীবন ভরে জীবনজুড়ে মৃত্যুর সঙ্গে তারই সঙ্গলাভ। এও তো এক দারুণ প্রেম। দারুণ এক রোমান্স সে বিদূষীর তরে।
এইভাবে মৃত্যু বিহার করেছে তাঁর কাব্যে। তাঁর কাব্য তার জীবন থেকে আলাদা করার নয়। তাই মৃত্যুর কিছুদিনও আগে এঁকেছেন নিজের যে আবক্ষ ছবি। তার দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে বিশাল মাথা আর কপাল। খুব সাদাসিদে চোখে যারে আড়াল করে। গভীরে তাকালে দেখা যায়, কোথা থেকে এক সুগভীর কলরোলে ছলছল এক ঝরনা নেমে এসেছে তাঁর কপাল বরাবর। যার নাম দিয়েছেন নির্ঝরীনি। যে কবিতা প্রথম প্রদোষে বৌদির সঙ্গে বদলে নিয়েছিল তার রূপ। ধরেছিল নতুন করে কায়া। ফেলে দিয়েছিলেন তারই ইচ্ছেয় প্রথম প্রায় ষোল লাইন।আর তারপর থেকে শুরু করেছিলেন  , 
আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের পর/কেমনে পশিল গুহার আঁধারে/প্রভাত পাখির গান 
সেই গান সেই প্রাণ কাব্যভাবনার প্রদোষ প্রত্যুষ থেকে মধাহ্ন গোধূলি পেরিয়ে পৌঁছেছে এক অন্তিম দীঘল রাত্রিতে। তারপর বহুরাত্রি একাকী অবসন্ন অপেক্ষমান চির প্রয়াতের তরে। দীর্ঘ দীর্ঘ একাকি বিনিদ্র যাপন শেষে হয়তো পেয়েছিলেন এক উদ্ভিন্ন অমর সৌরলোক। আর তাই মৃত্যুরে এত ভালোবেসে, এত কাছে চেয়ে এত প্রাণে এঁকেছেন প্রেয়সীর আসঙ্গ লাভের যাতনা, কিংবা বেদনা কিংবা গৌরব কিংবা বিরহযাপন। কে জানে এর সত্যাসত্য রূপ! কে জানে তার কথা? কে বলবে তার ভাষা? তিনি এক, তিনি দুই। একে দুই সত্তা। চির প্রবহমান এক নর আর এক নারী। সম্মিলনে ক্রম উদ্ভাসিত হয়েছেন এক ঊর্ধ্বতর মহাসত্তায়। অবগাহন করেছে পাঠক তাঁর কবিতা কিংবা কাব্যপাঠে এক অসাধারণ সাবলিমিশনে 
হেথায় যে অসম্পুর্ণ সহস্র আঘাতে চূর্ণ/বিদীর্ণ বিকৃত/কোথাও কি একবার সম্পূর্ণতা আছে তার/জীবিত কি মৃত/জীবনে যা প্রতিদিন ছিল মিথ্যা অর্থহীন/ছিন্ন ছড়াছড়ি/মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি তারে গাঁথিয়াছে আজি/অর্থপূর্ণ করি ।
তবু মৃত্যু তাঁর কাছে এক অসাধারণ। এক অন্য অস্বাদন। এক হৃদয়হরণ,উন্মার্গ চেতনা। এক সুন্দর শিল্পবাসনা। কে না বলবে এই কথাগুলো পড়লে, 
চৈত্রমাসের হাওয়ায় কাঁপা দোলনচাঁপার কুঁড়িখানি/প্রলয় দাহের রৌদ্রতাপে বৈশাখে আজ ফুটবে জানি/যা কিছু তার আছে দেবার/শেষ করে সব নিবি এবার/যাবার বেলায় যাক চলে যাক বিলিয়ে দেবার নেশায় মেতে/আয় রে ওরে মৌমাছি আয় আয়রে গোপন মধুহরা/চরম দেওয়া সঁপিতে চায় ওই মরণের স্বয়ম্বরা  । 
মৃত্যু তাঁরে চিরকাল ভুলায়েছে এক ভুবন ভোলানো রূপে। জানিনা কী তার অনুপ্রাণ? কী তার মহত্তর যোগ! কোথায় তার গভীর গাঁটছড়া, কোথায় তার কলতান? কোথায় নিকষে জ্বেলেছিল আলো কোনোদিন। যা মানব কিংবা কবিরে আক্রান্ত রেখেছে অধীর, কোন সে অমরাবতী! কিন্তু তিনি দেখেছেন তার কোনো এক অধরা মোহনরূপ। কার বুকে মানিক জ্বেলে তাঁর কাছে পেয়েছিল সে বীভৎস মৃত্যু এক চির সৌন্দর্যের রূপ। চিরকাল যা জনম কিংবা জীবনের সমান রূপে-অর্থে-ধ্যানে-কর্মে-কাব্যে বয়ে গেছে সমান্তরাল। কোথাও দেখিনি তাঁর কদর্যের ছায়াখানিরেও। বরং জন্মের ক্ষণ যেন আলো করেই তাঁর জীবনে চিরকাল বহমান এক মোহনরূপ। সে আমার প্রাণের ঠাকুরের মৃত্যুচেতনা। জন্মের সব ঋণ তাই শোধ করেছেন মৃত্যুতে। তার গুণে তার গানে তার জয় পতাকা বহন করেছেন এক অপূর্ব সুন্দররূপে। মোহন সে রূপ,অনির্বচনীয় তার সুধা। পান করে করে পার হলো এতবেলা। তবু সে নেশার ঘোর কাটেনি আজ অবধি। জানি না কাটবে কি সে নেশা মরণে আমারই
তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে!/জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে!/শরৎ আলোর আঁচল টুটে কিসের ঝলক নেচে উঠে/ঝড় এনেছ এলোচুলে/কাঁপন ধরে বাতাসেতে/পাকা ধানের তরাস লাগে, শিউরে উঠে ভরা ক্ষেতে।/জানিগো আজ হা হা রবে তোমার পূজা সারা হবে/নিখিল অশ্রু সাগর কূলে/মোহন রূপে কে রয় ভুলে। 

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

শাপলা সপর্যিতা



গুরু (পর্ব-৪)
এরই মাঝে ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষা দেব। সবাই পড়াশোনা করে। আমি করিনা।আমি অংকে কাঁচা। ঘরে বাবা বড় ভাইরা সব অংকের পন্ডিত। দারুন দারুন রেজাল্ট। বড় ভাই বোর্ডে তখন স্ট্যান্ড করে ফেলল।স্কলারশীপ নিয়ে প্যাটরিস লুমুম্বা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেল ইঞ্জিনিয়ারিং।মেঝো ভাই এপ্লাইড ফিজিক্স নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।সেজোভাই দূদান্ত রেজাল্ট করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। আমি অংকে কাঁচা। এও হয়? হতে পারে? পারে। কারন আমি প্র্যাকটিস করিনা। ঘরের বাপ ভাই দিয়ে হবেনা। লাগবে গৃহশিক্ষক।মা নিয়ে আসলেন শিশিরদা’কে।তিনি তখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। আমি দারুন মনোযোগ দিয়ে তার কাছে অংক পড়ি। সত্যি এবার আর গৃহশিক্ষকের প্রতি আমার কোন অভিযোগ বা বিতৃষ্ণা নেই। কারন আমি প্রেমে পড়েছি। হ্যা প্রথম ধ্বংশযজ্ঞ। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ক্রাশ’। ‘ফার্ষ্ট ক্রাশ।’ শিশির’দা পড়ান আর আমি মুগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে চেয়ে থাকি। যা বলেন তাতেই ভালোলাগে। গ্রামের ছেলে। হিন্দু উচ্চ ব্বংশীয় ব্রা্হ্মণ।পড়ার ফাঁকে ফাঁকে অসাধারণ সব গল্প করেন। গল্প বলেন- তার ছেলেবেলার। কি করে মাছ ধরতেন পুকুরে।গ্রামে গেলে কি করে ধানের ক্ষেতে আজও নিড়ানী দেন।এই এদো আর হাজার গলির শহরে আমার সেই বন পাহাড়ের লালমাইর গল্পের মতো যেন তার গল্প।শহরের আরও দশটা ছেলের মতো তেমন কিছুইতিনি নন।লিকলিকে শ্যামলা চেহারার একহারা গড়ন। মাঝারি তার উচ্চতা। দেখে মুগ্ধ হবার মতো একেবারেই কিছু নন। অন্য অনেক স্মার্ট ছেলেরা আমার কথা কি ভাবছে তা ভাববার মতো সময় তখন আমার নেই। শিশিরদা নিরাসক্ত। আমি মুগ্ধ। মুগ্ধ আমি একজন গাঁয়ের ছেলের অসাধারণ সাধারনতায়। আমি প্রথম প্রেমে পড়লাম।আমার দিনরাত শুধু মোহনীয় আবেশে জড়ানো। তিনি পড়াতে পড়াতে যখন আমার দিকে একবার তাকান আমার সদ্য কৈশোর উর্ত্তীণ মন জানে, তিনি ঠিক পড়ে ফেলছেন আমার মন। জেনে ফেলছেন আমার ভেতর। আমি চোখ নীচু করে অমনোযোগে পড়ায় মন দেবার চেষ্টা করি।বয়স কতই আর।অবদমন তখন ভীষণ কঠিণ বিষয়। খুব গোপনে চিঠি লিখি একদিন। এবং যথারীতি মা’র কাছে ধরা পড়ি। চিঠিটি আর তার হাতে পৌঁছায় না।অংকেও আমার আর ভালো করা হয়না।ফিজিক্স ক্যামিষ্ট্রি বায়োলজিতে ৮৫ ৮২ ৮৮ নম্বর নিয়ে অংকে কোনমতে পাশ করি। অংকে পাশ করি স্ট্যাটিক্স ডিনামিক্সের উপপাদ্য দিয়ে কোনোমতে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করি।আমার রেজাল্ট দেখে আমার মা কাঁদেন। অংকে যদি ভালো করতাম তাহলে আমি কত ভালো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতাম সেই আক্ষেপ আমার মায়ের রয়ে গেল সারাজীবন। আর প্রথম ধ্বংসাত্বক অনুভব সত্যি সব কিছু ধ্বং করে কোথায় যেন চির অমলিন এক বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেল। শিশিরে প্রদীপ। বহুদিন জ্বলছিলেন তিনি আমার মনের আকাশে। পড়ে ছিলেন আলসে শরীর বিছিয়ে মনের সবুজ ঘাসে শিউলীর ঘ্রাণে। অনেকদিন অনেক বছর আর তার কোন খবর পাইনা। ২৪ বছর পর এই সেদিন খবর পেলাম নিভেছে সে প্রদীপ। সত্যি সত্যি ক্রাশ হয়ে গেছেন।কোন এক শ্মসান ঘাটে। গভীর বিষাদে বিশুদ্ধ প্রথম প্রেমের স্থির নিশ্চল আবেগে এখনো এতটা জড়িয়ে আছেন তিনি মনোবেদনায় তার মৃত্যু আমাকে জানিয়ে গেছে। তিনি আমার গুরু.......(চলবে)



মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

শাপলা সপর্যিতা


পর্ব – ৩
প্রথম গানের শিক্ষক। শ্রী স্বপন কুমার সরকার।মেঝো ভাইয়া উদীচীতে যায় গান করতে।সাথে আমারও উদীচীতে যাওয়া। সকাল সকাল ক্লাস। প্রতি শুক্রবার ক্লাস।আর তাই প্রতি ভোর বেলা দিনের শুরু আমার সারগামে। উদীচীর খুব প্রিয় দু’জন শিক্ষক ছিলেন।একজন সোবহান স্যার। রবীন্দ্র সংগীত শেখাতেন। আর অন্যজন স্বপন সরকার। তিনি আমাদের সারগাম করাতেন। কিন্তু মূলত ছিলেন গণসঙ্গীতের শিল্পী।নজরুল সঙ্গীতও করতেন।আর যতীন সরকার পড়াতেন কার্ল মার্কস, বস্তুবাদ, ডারউইনের তত্ত্ব। কিন্তু জন্ম থেকেই আমার প্রথম পছন্দ রবীন্দ্র সংগীত। ধ্রুব পরিষদে ভর্তি হলাম রবীন্দ্র আর শাস্ত্রীয় সংগীতে। পরীক্ষা দিতে হবে। রবীন্দ্র যা হোক কোনোমতে উতরে যাব। কিন্তু শাস্ত্রীয়? ঘরে আনা হলো ওস্তাদ।মেঝোভাইয়ার পছন্দ মতো গানের ওস্তাদ আমার, শ্রী স্বপন সরকার।প্রথমদিনই মাথায় হাত রেখে বললেন ‘কন্ঠটা ভালো তোমার। যত্ন করো। ঠিকঠাক রেওয়াজ করো। সরস্বতীর মন ভোলাতে হবে।ভালো করবে তুমি।’ তারপর - রোজ ভোরবেলা গলা সাধা একটা নিয়ম হয়ে গেল। ওটা হলো আমার জন্য একটা বিরক্তিকর কাজ। গান গাইতে ভালোলাগে কিন্তু প্রতিদিন ঘুম ভেঙেই গলা সাধতে বসা। উফ। তার মাঝে আমি চাই আমার প্রাণের ঠাকুরের প্রিয় প্রিয় সব গানগুলো তুলতে তিনি আমাকে নজরুলের গানের বিষয়ে উৎসাহী করতে সবরকমের প্রচেষ্টায় নিবেদিত।তার বদৌলতে বেশ কিছু নজরুল সঙ্গীত আমার তোলা হয়ে গেল। নজরুলের সেই সব গান....মনে পড়ে সে কোনো বিদায় সন্ধ্যা বেলা, তুলসী তলায় যবে সন্ধ্যা বেলায়... এসব গানের কথা এখনো মনে পড়ে। ধীরে ধীরে আমার নজরুলের গানের প্রতি আগ্রহ জন্মালো। একসময় বেশ নজরুল সংগীত শুনতেও শুরু করলাম আগ্রহ করে।তখন খুব শুনতাম অনুপ জালোটা, অনুরাধা পাড়ডোয়াল, ফিরোজা বেগম। সপ্তাহে তিনদিন ওস্তাদের কাছে নিয়ম করে হারমোনিয়াম তবলায় সুর সাধা গান শেখা জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়ালো। আর কোন উপায়ে আমার গানের প্রথম ওস্তাদকে বিতাড়িত করা আমার সম্ভব হলোনা।গান শেখালেন দীর্ঘদিন।গানের শিক্ষকের সাথে সম্পর্কটা এতটাই নিবিড় হয়ে পড়লো আমাদের পরিবারের সাথে যে তার বিয়ে বাবা হওয়া আর দুইবাড়ি আসা যাওয়াও চলতে থাকে বেশ। খুব সুন্দরী ছিল বৌদিও। ওস্তাদের ছেলে সন্তান দু তিন বছরে কি অদ্ভুত তবলা বাজাতো.......। আমাদের বাসায় এলে আমার বায়া তবলা দিয়ে সামনে বসিয়ে দিতেন স্যার। আর কি অসম্ভব সুন্দর বোলে বোলে তালে তালে হাত চালাতো সেই অবুঝ শিশু আজও মনে হলে মুগ্ধ হই।সময়ও গড়ালো অনেক। বছর বছর। যুগ যুগ।জানিনা আজ কোথায় তারা কেমন আছেন সবাই।একসময় আমি গাই না গাই একটা গানের যন্ত্র আর হারমোনিয়াম তবলা থাকতো আমার সাথে সাথে। কোথা থেকে কোথায় যাই জানিনা আজ বহুদিন হারমোনিয়াম তবলা গানের সুর ছাড়া আমি। দিনান্তে গান শুনবার অবসরটুকুও থাকেনা বেশিরভাগই। তবু জীবন চলছে ঠিকই। তবু কোনো এক বিষণ্ন দুপুরে কোথাও এক দারুণ দুঃসহ তৃষ্ণায় জেগে উঠি। ভেসে আসে রক্তে কাঁপন তোলা আমার স্যারের গণসঙ্গীতের সুর
নোঙ্গর তোলো তোলো/সময় যে হলো হলো/নোঙ্গর তোলো তোলো
সাথে ভেসে ওঠে দেবীর মুখ।হায় দেবী –ওস্তাদের কথা রাখিনি আমি।সরস্বতীর মন ভুলাতে আমি পারিনি নাকি ভুলাইনি সেটা আজও এক বিষ্ময়.........(চলবে)




শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০১৭

শাপলা সপর্যিতা


গুরু (পর্ব – ২)
শাপলা সপর্যিতা

ক্লাস নাইনে পড়ি। নতুন একটা সাবজেক্ট জোগ হল জ্যাকা। জ্যামিতি ও কারিগরী। ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে নম্বর তোলা খুব সহজ বলে খুব আগ্রহ করে জ্যাকা নিলাম। আমার কোনদিন উপরি শিক্ষকের কাছে পড়বার বাতিক ছিলনা। কিন্তু জ্যাকা আমাকে পড়াবে কে? এই সাবজেক্ট আগে ছিলনা বিধায় বড় ভাইবোনরা কেউ এটা পড়েনি। গৃহশিক্ষক দরকার। কিন্তু গৃহশিক্ষকে আমার বড্ড এলার্জি। এ বড় বিরক্তিকর কাজ।সবাই যখন নোট সাজেশনের জন্য প্রাইভেট টিউটরের কাছে দৌঁড়ায় আমি তখন নিশ্চিন্তে ঘরে বসে পড়ি এলেচি আমাদি আগাথা ক্রিষ্টি আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।শিউলী ফুলে মালা গাঁথি আর দুচার পংক্তি কাব্য রচনার ব্যর্থ প্রয়াস চালাই।বরাবরই পড়াশোনায় মনোযোগ কম তার ছোট মেয়েটির আমার মায়ের ধারণা। কিন্তু পড়তে বসলে ঠিক মতো বুঝতে পারে সব। কিন্তু সে পড়তে বসেই না।বসলেও ক্ষণিকের জন্য। বইর সাথে বেশিক্ষণ সে থাকতেই পারেনা। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে আমার মায়ের চোখে ধরা পড়ে। অতএব তাকে পড়তে বসাতে হবে। সত্যিই, আমার এখনো মনে পড়ে মা আমাকে সব সময় বলতেন ‘মা রে তুই একটু পড়ার টেবিলটাতে বই নিয়ে বসে থাক শুধু। তোর পড়াও লাগবেনা। তুই কেবল বইর সাথে কয়েক ঘন্টা একটা জায়গায় থাকতো মা।’ ধুর আমার ভাল্লাগেনা এক জায়গায় বসে বসে বক বক বক করে জপে জপে পড়া মুখস্ত করা। আমার যতটুকু পড়ার আমি পড়ে নেই আবার কিছুক্ষণ পড়ই উঠে পড়ে এদিকে ঘুরি ওদিকে ঘুরি। আম্মার ধারণা এর জন্য আমার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। রেজাল্ট খারাপ মানে কুমিল্লায় লালমাইর কোলে ল্যাবরেটরী স্কুলে ফার্ষ্ট হতাম। ক্লাশ ফাইভে বৃত্তিও এনে দিলাম – আর কি দিলে যে মা খুশী হবেন কে জানে। ক্লাশ সিক্স এ ময়মনসিংহে বিদ্যাময়ী স্কুল। রেজাল্ট খারাপ  হওয়া শুরু। স্কুলে আশা যাওয়ার পথে কেমন কেমন চোখে তাকিয়ে থাকা বখাটে ছেলেরা টিজ করে। এদো গলি-গলির পাশেই ড্রেন থেকে তুলে ময়লাগুলো আবার ড্রেনের পাশেই রেখে দেয়া। এমন একটা রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতে যেতে আমি হারিয়ে যাই কেবলই আমার লালমাইর বুকে স্কুলে যাবার পথের পানে। আহা কি সবুজ কি মায়া কি মনোহর কি অবিরাম। সেই একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ পেরিয়ে লম্বা সর্পিল পায়ে চলার পথ ধরে খেজুর গাছে ঝুলানো রসের হাড়ি দেখতে দেখতে পুকুরের ধার ঘেষে বড় মাঠটা পার করে আব্বার অফিসের ফুল চুরি করে ব—ড়—রাস্তাটা পার হয়ে স্কুলে ঢুকলেই বিশাল মাঠ। বর্ষায় জল জমে জমে পায়ের কাছে ঠেকলে কিংবা বাড়ি থেকে বের হয়ে ছোট মাঠের কিনার দিয়ে হাঁটতে গেলে পুকুর থেকে উপচে পড়া জলের সাথে ছোট মাঠে উঠে আসা মাছ গুলোকে আজলা ভরে তুলে নিতাম যে আনন্দে।সেই আনন্দের মৃত প্রহরের সাথে আমি চলি ময়মনসিংহ শহরে। স্কুলে যাবার পথে। এখানে পড়ায় আমার মন বসেনা। বরং আমি পড়ি আগাথা ক্রিষ্টি – আহা অনন্ত সেই রাত। আমি পড়ি এলিচি আমাদি – আহা আফ্রিকান সেই গাথা।পড়ি শেষের কবিতা – আহা, কালের যাত্রায় ধ্বনি। পড়ি দেবদাস হায় দেবদাস, পরিণীতা এমনকি গৃহদাহ। পড়ি শীর্ষেন্দু বঙ্কিম এমনকি মানিক বন্দোপাধ্যায়। পড়ার বইর নীচে লুকিয়ে। বাথরুমে শাওয়ার ছেড়ে ঘন্টার পড় ঘন্টা গোসলের নামে। এমনকি ক্লাশে যাদরেল শিক্ষকের ক্লাশেও ভূগোল বইর নীচে নির্মলেন্দু গুণ কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিয়ে কাটাই নিশ্চিন্তে আমার স্কুলের পড়া করবার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এভাবে কি আর রেজাল্ট ভালো হয়? এই ধরণের উচাটন মনের ছোট মেয়েটিকে পড়ায় মনোযোগী করার জন্য একমাত্র মহামন্ত্র হলো গৃহ শিক্ষক। এখন নতুন বিষয় জ্যামিতি ও কারিগরী বিদ্যা – জ্যাকা। কে পড়াবে? জ্যাকার জন্য জীবনে প্রথম একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হল বাসায় এসে পড়াবেন। তিনি তখন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন ময়মনসিংহ পলিটেনিকেল ইন্সটিটিউটে।আব্বাই তার ছাত্রদের মধ্যে ভদ্র সভ্য দেখে একজনকে নিয়োগ দিলেন আমাকে জ্যাকা পড়াবার জন্য। প্রথম গৃহশিক্ষক। মা বললেন, ‘যিনি শিক্ষক, যার কাছে একটি অক্ষরও শিখেছ তার নাম সারাজীবন মনে রাখবে আর তাকে শিক্ষাগুরু হিসেবে শ্রদ্ধা করবে।’’ আমি জ্যাকা শেখার চেয়ে স্যারের নামের প্রতি বেশি মনোযোগ দিলাম। খুব যত্নে মনে রাখলাম আমার জ্যাকার শিক্ষকের নাম গৌরাঙ্গদাস। তিনি খুব নম্র আর ভদ্র। হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যত্ন নিয়ে পড়ান। কিন্তু আমার ওই যত্নে বিরক্তি। কোনমতে বিষয়টা বুঝে নিয়েই যখন উপলব্ধি করতে পারলাম আমি একাই পেরে উঠবো তখন আর কে পায় আমারে। নিয়ম করে স্কুলের পড়ার বাইরেও গানের শিক্ষকের কাছে নিয়ম করে গান শিখতে বসার সাথে সাথে আবার বাড়ি বসে বসে শিক্ষকের চেহারা দেখার মত অতটা ধৈর্যশীল মানুষ আমি একদম নই। খুব দ্রুতই তাই ধৈর্যের শেষ সীমার আমি পৌঁছে গেলাম। কিছুদিনের মধ্যেই নানা অজুহাত তুলে দ্বিতীয় শিক্ষকের বাড়া ভাতে নুনের ছিটা দিয়ে বিদায় করলাম।............(চলবে)


বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

শাপলা সপর্যিতা



গুরু।।
পর্ব - ১
গুরুর কথা বলি। আমার গুরু। বাবা মা আর স্কুলের শিক্ষক বাদ দিলে জীবনের প্রথম গুরু বাসায় আরবী পড়াতে আসা হুজুর।আমরা ছিলাম ছ’ভাই বোন। চারভাই দু’বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। আমার ছোট এক ভাই আর সবাই বড়।চিরাচরিত কঠোর মুসলিম অনুশাসনে চলে আমাদের সংসার।মুসলমানের ছেলে মেয়ে হিসেবে সবাইকে কোরআন খতম করতে হবেই্।আর তার জন্য একজন হুজুর নিয়োজিত আছেন। আমরা পাঁচ’ভাইবোনই তাঁর কাছে পড়ি।কুমিল্লায় বসবাস। লালমা্ই পাহাড়ের পায়ের কাছে কোটবাড়ি - সরকারী ল্যাবরেটরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ান থেকে ফা্ইভ পর্যন্ত সকাল সাতটা থেকে ১০টা পর্যন্ত ক্লাস।ঠিক বাসায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই হুজুর আসেন। তখন বয়স কত হবে, বড়জোড় ৬ কি ৭? অজু কর পাজামা পড় মাথায় বড় ওড়না দিয়ে হুজুরের কাছে পড়তে বসো।সপ্তাহের ছ’দিন। এই ঘেনর ঘেনর করে আরবী পড়া। বড় বিরক্তিকর। প্রতিদিন ভাবি আজ যদি হুজুর না আসেন খুব ভালো হয়। কিন্তু হুজুরও এমন সহি পরহেজগাড় যে রোজগাড়েরর টাকায় কোন ভেজাল পছন্দ করেন না। নিত্য দিন এসে হাজির। অদ্ভুত এক মানুষ। তার কি একটু জ্বর জ্বারিও হয়না। মেশিন না কি? আজ সত্যি করে বলি, মনে মনে খুব প্রত্যাশা করে থাকি যেদিন হুজুর না আসুক অথচ চলে এলেন সেদিন মনে মনে তাঁকে গালাগাল দিতেও বাদ রাখিনি।তাঁর নাম সাদেক হুজুর।কি অদ্ভুত স্বার্থপর মানব জীবন। সেই যে সাদেক হুজুর বলে ডাকতাম। যখন ছোট। মানুষের পুরো কিংবা আধেক নামের বিষয়টা বোধে ধরা দেয়না তখন থেকেই তাকে এই নামে ডেকেছি। কোনদিন তাঁর পুরো নাম জানা হয়নি আর। বাবা নিশ্চই জানতেন। অতচ আজ অবধি তাঁর পুরো নাম আমি জানিনি।তিনি খুব আদর করে পড়াতেন। আমার ছোট ভাইটা তখন ফিডার দিয়ে দুধ খায় আর হুজুরের কোলে বসে দোল খায়। হুজুর তাকে ডাকতেন ‘ভাইয়া’। আমরা যখন পড়ছি গুটি গুটি পায়ে সে এসে হুজুরের কাছে ঘুরঘুর করতো। আর ফিডারটা কে বলতো কোতল। বোতল বলতে পারতোনা তাই। হুজুর বলতেন ভাইয়া কি খাইছ? আমার ছোট ভাই বলতো কোতল। আবার কোন কোন দিন হুজুর তাকে আদর করে কোলে নিতেন। কোলে নিয়ে বলতেন এখানে বস। আজকে কোতল খাওনাই ভাইয়া।এমনই সুন্দর ছিল তার স্বভাব আর ভালোবাসা। আমাদের অসময়েও জায়নামাজে দাঁড় করিয়ে শিখিয়েছেন পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ।আজ বহুবছর পর আমি যখন ছাত্র পড়াতে বসি। ওয়াসীকে পড়াতে পড়াতে তার ছোট ভাই জায়ানকে কোলে নেই, খেলি ছড়া বলি তখন কেন যেন বারবার সাদেক হুজুরের কথা মনে পড়ে।সেই যে জীবনের প্রথম গুরু। যাকে মনে মনে গালাগাল করতে করতে পড়তে বসতাম। তাঁর অদ্ভুত মায়াময় চেহারাটা আজো ভেসে থাকে মনের পর্দায়। আর মানুষকে ভালোবাসার চর্চ্চা টা বোধকরি তাঁকে গাল দিতে দিতে মনের ভেতর গভীর অনুরাগে বসে গেছে। সেটাই আজকের আচরনে অলক্ষ্যে বের হয়ে আসে।আব্বা কুমিল্লা পলিটেকনিক ছেড়ে ট্রান্সফার হযে ময়মনসিংহে এলেন।ততদিন ছোট ভাই ছাড়া আর সবার দু’তিনবার করে কোরআন খতম শেষ।আর হুজুর পাওয়া গেলনা। আমরা এক অসাধারন গুরুর সান্নিধ্য হারালাম। এখনো কোন নামাজ কোন কারনে পড়তে না পারলে ‍হুজুরের কথা মনে হয়। আর মনের পর্দায় একটা বিষন্ন অপরাধবোধ সহ জেগে থাকে সাদেক হুজুরের ছবি। আমার জীবনের প্রথম গুরু।তারপর ক্লাস নাইনে পড়ি...........নতুন সাবজেক্ট যোগ হলো জ্যাকা। জ্যামিতি ও কারিগরী...... (চলবে)


মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০১৭

শাপলা সপর্যিতা

মৃত্যু – সে এক দারুণ রোমান্স।। 
সে যেন চুপি চুপি আসে,গোপন প্রেমিকার মতো বুকের কাছে এসে বসে।খুব সংগোপনে তারই জন্য প্রিয়-প্রহরের প্রতীক্ষা।এও এক অসম্ভবের গান।তিনি গেয়েছেন জীবনভর তাঁর কবিতায়, তাঁর লেখায়।তাঁর জীবন সাধনায় অনেক রাগ-বিরাগ প্রেম-বিরহের পাশাপাশি এ এক অসাধারণ অনুভূতি।একে আমি বলি এক দুর্দান্ত রোমান্স।পাওয়ার মাঝে না-পাওয়ার বেদনা। চাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে পাওয়ার অমিল-বেমিল।সবকিছু ছাপিয়ে দিয়েছেন এক অদ্ভুত নেশাতুর ভাবনায়।অদ্ভুত প্রত্যাশার প্রাণ।এ-ও কি সম্ভব? জন্মেই মৃত্যুর আহ্‌বান!এক জন্মে মৃত্যুর পরম সাধনা!পূর্বাপর জীবনপ্রবাহে যেখানে বারবার আরও কিছুটা সময় বেঁচে থাকার আরও এক দীর্ঘজীবনের প্রত্যাশা করা কথা! গৌতম যখন সাধনা করেন নির্বাণ, পুত্রের মুখদর্শন না করেই ঘর ছেড়ে যান সহজিয়া সাধনে।বাউল দেহের ভেতর বাস করেন নিয়ে পরমাত্মার পরম প্রত্যাশা।নখাগ্র থেকে ত্রিবেণী,কেশপাশ উথাল-পাথাল দেহভর পরমাত্মার খোঁজ। মরণ আর জনম। জনম আর মরণ এবং অবশেষে তার নির্বাণ।তখন তিনি আরাধনা করেন মৃত্যুর। বলেন,মরণ রে/তুঁহু মম শ্যামসমান কে কবে বলেছে কোথায় মরণ তুমি আমার প্রিয়তমার সমান?
কে কবে বলতে পেরেছে এমন হৃদয় উজাড় করা, হৃদয় হরণ করা কথা—
তুঁহুঁ নহি বিসরবি, তুঁহুঁ নহি ছোড়বি/রাধা-হৃদয় তু কবহুঁ ন তোড়বি/
হিয় হিয় রাখবি অনুদিন অনুখন/অতুলন তোহার লেহ/
দূর সঙে তুঁহুঁ বাঁশি বাজাওসি/অনুখন ডাকসি/অনুখন ডাকসি/
রাধা রাধা রাধা
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে এভাবেই মরণ কবিতায় মৃত্যুকে কৃষ্ণসঙ্গ কামনায় রাধার অধীরতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কৃষ্ণের বাঁশি আর ঘুম হরণিয়া। রাধার পক্ষে কি সম্ভব ছিল কোনো কালে অবহেলা করা? বাঁশি বাজে, মধ্যরাত্রি। মন প্রিয়সঙ্গ অধীর। শিয়রে শাশুড়ি, ননদী পাশে। দুর্লঙ্ঘ্য এই প্রাচীর বরাবর ভেদ করেছে রাধা।যে বাঁশিতে ঝরেছে রাতভর অবিরত রাধা-রাধা নাম, মরণ কি বলা যায় তারে? অধীর প্রেমের এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই বুঝি মিলেমিমে রূপ নেয় মরণ!হতেও পারে, কবির মনোভূমি রামের জন্মস্থান অযোধ্যার চেয়ে যদি সত্যি হয়। তবে কি বলা যায়, এই যে মরণের জন্য অধীরতা কিংবা ভালেবাসা কিংবা প্রিয়রূপে অন্তরে ধারণে কিংবা প্রিয়তর হয়ে ব্যাকুল রূপে তার আহ্বান এও কি আবরণ! হতে পারে আভরণ? কবিতার কিংবা কবির হৃদয়ের অবগুণ্ঠন! না অসম্ভব। এ সত্যিই কবিরই ভালোবাসা। এ অলক্ষ্যে ধাবমান অন্য আরও এক জীবনদেবতাই বা বুঝি! যা নিত্য ধাবিত করেছে তারে জীবনের তরে। তাই একই লেখনীতে বসেছে জেঁকে জীবনের জয়গান 
মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর মৃত্যু কেমন করে আসবে আমার এই কর্মচঞ্চল জীবনে, তা নিয়ে কেউ কখনো নিবিড় করে ভাবে? কতটা সময় নিয়ে কত বিষণ্নতা ছড়িয়ে রাখে জীবনে একটি শব্দ মৃত্যু তা বোধ করি সবারই জানা। বরাবর মৃত্যু এক বিভীষিকা নিয়ে মূর্তমান। কোনো একদিন আসবে আজরাইল কি অন্য কোনো যমদূত। করবে হরণ এই জীবনভর বয়ে বেড়ানো দেহ থেকে তারে। ফেলে দিয়ে এই অলস-অবস মাটির দেহ চলে যাবে লয়ে চিরপ্রাণ পরমাত্মার দ্বারে। এই তো মরণের ক্ষণ কিংবা মরণের ধারণা। কেউ কি কখনো ভেবেছিল এও এক সাধনযোগ হয়ে বাস করে জীবনেরই একধারে? মরণের লাগিও বুঝি পরম প্রিয়র মতো দিন গোনা! তারেও বুঝি সাজানো যায় কাব্য-কথকতায়!কী অদ্ভুত ভালোবাসায় তারও আরাধনা করা যায়! শেখালেন তিনি, দেখালেন তিনি। আমার প্রাণের ঠাকুর। বললেন,
অত চুপি চুপি কেন কথা কও/ওগো মরণ, হে মোর মরণ,/অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,/ওগো একি প্রণয়েরই ধরণ!/…তুমি এমনি কি ধীরে দিবে দোল/মোর অবশ বক্ষশোনিতে?/কানে বাজাবে ঘুমের কলরোল/তব কিঙ্কিণি- রণরণিতে

আসলে সত্যিটা কী? এই অদ্ভুত প্রেম। এ কি সম্ভব? নয়। সত্যিটাকে পরম করে মেনে নেওয়াই আসল। যদি বলি, এ অবশ্যম্ভাবী, এ বিকট শক্তিধারী, এ অবিনশ্বর, এ নির্দিষ্ট। কবে কে পেরেছে এরে ছাড়ায়ে যেতে? তাই বুঝি স্বীকার করে নেওয়া! স্বীকার করে নেওয়া প্রেমে। স্বীকার করে নেওয়া ভালোবাসায়। স্বীকার করে নেওয়াই তার শক্তি, তার মত্ততা, তার প্রলয় আবাহন।তার নিবিড় ঐকতান। প্রলয়ের বীণা বুকে ধারণ করা বুঝি তার জয়গান আর গীত লেখনীতে ধরা দেওয়া অন্য এক কায়ায় দারুণ প্রাণের নিনাদ। 
তুমি উৎসব করো সারারাত তব বিজয়শঙ্খ বাজায়ে/মোরে কেড়ে লও তুমি ধরি হাত/নব রক্ত বসনে সাজায়ে । এই হলো স্বীকারোক্তি। মেনে নেওয়া। নিজেকে সমর্পণ এক অদ্ভুত অলঙ্ঘ্যনীয় শক্তির পায়ের নিচে। সঙ্গে তারেই বরণ করে নেওয়া ফুলের মালায়।একই সঙ্গে গানের বাণীতেও। আমি এই বুঝেছি। এইখানে এসে আমি আমার বোঝাপড়ার একটা প্রায় উপকণ্ঠে পৌঁছেছি—‘প্রেম আকর্ষণে/যত গূঢ় মধু মোর অন্তরে বিলসে/উঠিবে অক্ষয় হয়ে নব নব রসে/বাহিরে আসিবে ছুটি/অন্তহীন প্রাণে/ জগতে তব প্রেমের আহবানে/নব নব জীবনের গন্ধ যাব রেখে/নব নব বিকাশের বর্ণ যাব এঁকে/কে চাহে সংকির্ণতার কূপে/ এক ধরাতল—মাঝে শুধু এক রূপে/বাঁচিয়া থাকিতে! নব নব মৃত্যু পথে/তোমারে পূজিতে যাব জগতে জগতে এ ভীষন পূজার। এ পরম প্রত্যাশার। এ মৃত্যু, এ নিশ্চিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু কেন এত প্রিয়? কেউ কি জানি তার কিছু। যে প্রিয়সঙ্গ এসেছিল নেমে একদিন পরম প্রদোষে গীত সুধা নিয়ে তার জীবনে, প্রভাতে, যে রবারবর কাব্যে সাধনায় দিনমান তার বিকাশে নিজেরে দিয়েছে উজাড় করে পায়ের কাছে, সে নিশিদিন-নিশিদিন বিরাজে আমার প্রাণের ঠাকুরের ব্যাপৃত জীবনে| জীবনের শেষ প্রবাহ অবধি, অবগুণ্ঠনে এক নিবিড় মৃত্যুর কাছে সঁপে দিয়ে নিজের জীবন। এক অধরা মাধুরী হয়ে জীবনের শেষ বেলায়ও। তারই জেরই অবাধ বিস্তৃতি লয়ে বসেছেন তিনি সাজায়ে । নিজের দেহ মাথা থেকে সৌরকপাল অবধি এঁকেছেন তার ছবি নিজেরই তুলিতে। আমি দেখেছি তারে যে ছবিতে তারই সাড়া পেয়ে এসেছি এ যাবতকাল যাপিত জীবনের লিপি গীত বাণীগুলিতে। অধরা। বিষন্ন। জীবন জীবন জুড়ে। প্রেমে পড়েছেন অজস্র । কাদম্বরী থেকে আন্না । আন্না থেকে ওকাম্পো। কোথাও তবু এতটুকু ম্লান হয়নি তারই ছায়া। স্বেচ্ছায় যিনি মৃত্যুরে দিয়েছেন রাজর্ষি সঙ্গ । মৃত্যু যারে গেছে লয়ে সঙ্গে আর যারে রেখে গেছে তারে দিয়ে গেছে বুঝি বা অসীম প্রেমের প্রচুর স্বাদ। গাইতে জীবন ভরে জীবনজুড়ে মৃত্যুর সঙ্গে তারই সঙ্গলাভ। এও তো এক দারুণ প্রেম। দারুণ এক রোমান্স সে বিদূষীর তরে।
এইভাবে মৃত্যু বিহার করেছে তাঁর কাব্যে। তাঁর কাব্য তার জীবন থেকে আলাদা করার নয়। তাই মৃত্যুর কিছুদিনও আগে এঁকেছেন নিজের যে আবক্ষ ছবি। তার দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে বিশাল মাথা আর কপাল। খুব সাদাসিদে চোখে যারে আড়াল করে। গভীরে তাকালে দেখা যায়, কোথা থেকে এক সুগভীর কলরোলে ছলছল এক ঝরনা নেমে এসেছে তাঁর কপাল বরাবর। যার নাম দিয়েছেন নির্ঝরীনি। যে কবিতা প্রথম প্রদোষে বৌদির সঙ্গে বদলে নিয়েছিল তার রূপ। ধরেছিল নতুন করে কায়া। ফেলে দিয়েছিলেন তারই ইচ্ছেয় প্রথম প্রায় ষোল লাইন।আর তারপর থেকে শুরু করেছিলেন , 
আজি এ প্রভাতে রবির কর/কেমনে পশিল প্রাণের পর/কেমনে পশিল গুহার আঁধারে/প্রভাত পাখির গান 
সেই গান সেই প্রাণ কাব্যভাবনার প্রদোষ প্রত্যুষ থেকে মধাহ্ন গোধূলি পেরিয়ে পৌঁছেছে এক অন্তিম দীঘল রাত্রিতে। তারপর বহুরাত্রি একাকী অবসন্ন অপেক্ষমান চির প্রয়াতের তরে। দীর্ঘ দীর্ঘ একাকি বিনিদ্র যাপন শেষে হয়তো পেয়েছিলেন এক উদ্ভিন্ন অমর সৌরলোক। আর তাই মৃত্যুরে এত ভালোবেসে, এত কাছে চেয়ে এত প্রাণে এঁকেছেন প্রেয়সীর আসঙ্গ লাভের যাতনা, কিংবা বেদনা কিংবা গৌরব কিংবা বিরহযাপন। কে জানে এর সত্যাসত্য রূপ! কে জানে তার কথা? কে বলবে তার ভাষা? তিনি এক, তিনি দুই। একে দুই সত্তা। চির প্রবহমান এক নর আর এক নারী। সম্মিলনে ক্রম উদ্ভাসিত হয়েছেন এক ঊর্ধ্বতর মহাসত্তায়। অবগাহন করেছে পাঠক তাঁর কবিতা কিংবা কাব্যপাঠে এক অসাধারণ সাবলিমিশনে 
হেথায় যে অসম্পুর্ণ সহস্র আঘাতে চূর্ণ/বিদীর্ণ বিকৃত/কোথাও কি একবার সম্পূর্ণতা আছে তার/জীবিত কি মৃত/জীবনে যা প্রতিদিন ছিল মিথ্যা অর্থহীন/ছিন্ন ছড়াছড়ি/মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি তারে গাঁথিয়াছে আজি/অর্থপূর্ণ করি ।
তবু মৃত্যু তাঁর কাছে এক অসাধারণ। এক অন্য অস্বাদন। এক হৃদয়হরণ,উন্মার্গ চেতনা। এক সুন্দর শিল্পবাসনা। কে না বলবে এই কথাগুলো পড়লে, 
চৈত্রমাসের হাওয়ায় কাঁপা দোলনচাঁপার কুঁড়িখানি/প্রলয় দাহের রৌদ্রতাপে বৈশাখে আজ ফুটবে জানি/যা কিছু তার আছে দেবার/শেষ করে সব নিবি এবার/যাবার বেলায় যাক চলে যাক বিলিয়ে দেবার নেশায় মেতে/আয় রে ওরে মৌমাছি আয় আয়রে গোপন মধুহরা/চরম দেওয়া সঁপিতে চায় ওই মরণের স্বয়ম্বরা । 
মৃত্যু তাঁরে চিরকাল ভুলায়েছে এক ভুবন ভোলানো রূপে। জানিনা কী তার অনুপ্রাণ? কী তার মহত্তর যোগ! কোথায় তার গভীর গাঁটছড়া, কোথায় তার কলতান? কোথায় নিকষে জ্বেলেছিল আলো কোনোদিন। যা মানব কিংবা কবিরে আক্রান্ত রেখেছে অধীর, কোন সে অমরাবতী! কিন্তু তিনি দেখেছেন তার কোনো এক অধরা মোহনরূপ। কার বুকে মানিক জ্বেলে তাঁর কাছে পেয়েছিল সে বীভৎস মৃত্যু এক চির সৌন্দর্যের রূপ। চিরকাল যা জনম কিংবা জীবনের সমান রূপে-অর্থে-ধ্যানে-কর্মে-কাব্যে বয়ে গেছে সমান্তরাল। কোথাও দেখিনি তাঁর কদর্যের ছায়াখানিরেও। বরং জন্মের ক্ষণ যেন আলো করেই তাঁর জীবনে চিরকাল বহমান এক মোহনরূপ। সে আমার প্রাণের ঠাকুরের মৃত্যুচেতনা। জন্মের সব ঋণ তাই শোধ করেছেন মৃত্যুতে। তার গুণে তার গানে তার জয় পতাকা বহন করেছেন এক অপূর্ব সুন্দররূপে। মোহন সে রূপ,অনির্বচনীয় তার সুধা। পান করে করে পার হলো এতবেলা। তবু সে নেশার ঘোর কাটেনি আজ অবধি। জানি না কাটবে কি সে নেশা মরণে আমারই ৷ 

তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে!/
জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো
ওই চরণমূলে!/শরৎ আলোর আঁচল
 টুটে কিসের ঝলক নেচে উঠে/ঝড়
 এনেছ এলোচুলে/কাঁপন ধরে
বাতাসেতে/পাকা ধানের তরাস লাগে,
 শিউরে উঠে ভরা ক্ষেতে।      
/জানিগো আজ হা হা রবে তোমার
পূজা সারা হবে/নিখিল অশ্রু সাগর

 কূলে/মোহন রূপে কে রয় ভুলে।