শৌনক দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
শৌনক দত্ত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২২

শৌনক দত্ত

              





পঞ্চাশ দশকে পূর্ববঙ্গের কবিতা ও একজন অনালোচিত কবি




ধর্মীয় হঠকারিতার ফসল হিসেবে দেশবিভাগ (১৯৪৭) যখন মেনে নিতে হয় সবাইকেই, তখন হাজার বছরের অভিন্ন বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় স্থায়ী সীমানা-দেয়াল। ফলে পূর্ববঙ্গের কলকাতাবাসী কবি-লেখক-শিল্পীদের নাগরিকত্বের বদল ঘটে। তাঁরা চলে আসেন খন্ডিত ভূখন্ডে। আটচল্লিশে শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলন এই ভূখন্ডের কবি-শিল্পীদের স্বতন্ত্র স্বকীয়তা দান করে। এই স্বকীয়তাতেই ধরা পড়ে নতুন সংকটের চিত্র, নতুন স্বপ্নের বার্তা, নতুন শত্রুর পরিচয়, নতুন সম্ভাবনার মন্ত্র। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলনে ভাস্বর এই সব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ কবিতাই স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখন্ডেরও আগে বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতির বাতাবরণে মৌলিকত্ব নিয়ে হাজির হয়। ফলে বাংলাদেশের কবি ও কবিতা (সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রেও) বলতে বিবেচনায় নিতে হয় সাতচল্লিশের দেশভাগের কাল-পরিসর থেকে। ফলে পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব বাংলার নতুন কবিরা তাঁদের সৃষ্টির জন্য নতুন ভাষা ও নতনু দিশার সন্ধান শুরু করেন। কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার বিকল্প হিসেবে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার নতুন এক পরিমন্ডল। এখান থেকে চর্চিত-সৃজিত সামগ্রিক সাহিত্যকর্মই পরে বাংলাদেশের সাহিত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই সময়ের কবিতায় একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটানো, নিজেদের কণ্ঠস্বরে নতুনত্বের প্রকাশ এবং নিজ দেশের মানুষের আবেগ চিত্রিত করা কবিদের দায়িত্ব হয়ে ওঠে। তাই নতুন এই পরিমন্ডলকে ঘিরে এই অঞ্চলের কবিরা পরিচিতি পান বাংলাদেশের কবি হিসেবে। তাঁদের রচিত কবিতাই বাংলাদেশের কবিতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বাংলাদেশের কবিরা সাতচল্লিশের পর বা উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে যে কবিতাভাবনা ও কাব্যপ্রয়াস তুলে ধরা শুরু করেন পাঠকের সামনে, তার সবই ছিল নতুন ভাষা এবং নতুন ধ্যান পঞ্চাশের বাংলা কবিতায় তেমনভাবে আজীজুল হকের নাম আলোচিত নয়। মফস্বল শহরে বসে কবিতা চর্চা করে গেলেও তাঁর কবিতা বাংলা কবিতায় অন্যস্বর ও আঁখড়ের কথা বলে। 

বাংলাদেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্খাই কবিতায় গণচেতনায় রূপান্তরিত হয়। এই গণচেতনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই সময় বাংলাদেশের কবিতার মহাসড়কে আবিভূর্ত হন বেশ কয়েকজন তরুণ কবি, যাঁরা পরেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের কবিতায় গণচেতনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬), ফজল শাহাবুদ্দিন (১৯৩৬-২০১৪), আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) প্রমুখ। তাঁদের আবির্ভাব ঘটে মূলত ভাষা-আন্দোলন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে। তবে এই কবিরাই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যেমন, তেমনি সত্তর-আশিনব্বইয়ের দশক তথা জীবনের শেষ পর্যন্ত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের কবিতার পাশাপাশি গণচেতনামূলক কবিতার চর্চা করে গেছেন। অবশ্য আল মাহমুদ ছিলেন ব্যতিক্রম। প্রথম দিককার কাব্য-কবিতা বাদ দিলে তাঁকে আর বাংলাদেশের কবিতার মূলধারায় খুব একটা পাওয়া যায় না। তাঁর ব্যক্তিচেতনায় সংঘটিত বড় পরিবর্তনই সম্ভবত তাঁকে মূল পথ থেকে ভিন্ন পথগামী করেছে। যা-ই হোক, উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিই যে গণচেতনামূলক কবিতা সৃষ্টির একমাত্র ভিত্তি, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যাবে না। কারণ, রাজনৈতিক সংকটের বাইরেও সাধারণ মানুষের জীবনে নানা রকম সংকট ও বঞ্চনা লুকিয়ে থাকে, যা সূক্ষ্মভাবে প্রতিনিয়ত সমাজচৈতন্যে প্রভাব ফেলে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যদি কোনো কবি সেসব বিষয়কে তাঁর কবিতায় আশ্রয় দিতে চান, তবে তাতেও গণচেতনারই রূপায়ণ ঘটে। তাই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতিতে সময়ে-সময়ে, দশকে-দশকে বাংলাদেশের কবিতায় আবির্ভূত হতে থাকেন প্রতিশ্রুতিশীল কবিরা। কবিতায় তাঁদের ভাষার ব্যবহার, বিষয়ের ঐক্য, শব্দের নতুনতর বিন্যাস যেন সবকিছুর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে থাকে।পঞ্চাশের তরুণদের মতো অন্যান্য দশকেও স্বকীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন নতুন কবিরা। এই ধারা চলতে থাকে।একাত্তর হয়ে উত্তাল নব্বই পর্যন্ত। বাংলাদেশের কবিতা প্রধানত গণচেতনায় ঋদ্ধ হয়ে প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পঞ্চাশ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত। পঞ্চাশের প্রধান কবিদের গণচেতনামূলক কবিতায় স্বকীয় শব্দের প্রায়োগিকতা অন্বেষণ করলে দেখা যায়। এই সময়ের কবিরা একই পরিস্থিতিতে কবিতা লিখেছেন, আবার তাতে মৌলিকতার স্বাক্ষরও রেখেছেন নিজস্ব প্রতিভাগুণে। শব্দের স্বকীয় ব্যবহারে তা হয়ে উঠেছে নিজস্ব কণ্ঠের পরিচায়ক। প্রতিটি কবির নির্বাচিত শব্দের ব্যবহারই তাঁকে স্বমহিমায় স্বীকৃতি প্রদান করেছে। 



নীলাভ কাচের প্লেটে হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত উজ্জ্বল

ছিঁড়ে এনে রাখলে টেবিলে

সূর্যোদয় হলো

সমুদ্রের জলে।

আজকের প্রগাঢ় সকালে

কী দেবো তোমাকে? কী দেবো, কী দেবো!

রক্তমুখী নীলা।

এর চেয়ে অন্যতর কী বা দিতে পারি।

উত্তোলিত প্রাসাদের নিচে

অবধ্বস্ত সে নগরী একদিন আবিষ্কৃত হবে।

রমণীর ধবল করোটি, ডানচক্ষু দৃষ্টির কবর,

অন্যতর চোখের কোটরে সুদুর্লভ মণি

রক্তমুখী নীলা,

যেন তার তীরবিদ্ধ গাঢ় নীল চোখ

এক ফোঁটা রক্ত জ্বেলে অন্ধকারে চেয়ে থাকে

কারো দিকে।

কার দিকে হে বিশ শতক?


(রক্তমুখী নীলা)



উপরের কবিতাটি লিখেছেন কবি আজীজুল হক (জন্ম ১৯৩০, মৃত্যু ২০০১)। যিনি প্রতিভার স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল, বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশকের এক প্রতিশ্রুতিশীল কাব্যশিল্পী। সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব-দ্রোহ ও রক্তপাতের প্রেক্ষাপটে অনিবার্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি শিল্পীত করেছেন তাঁর কবিতায়। আপন অস্তিত্বকে বোধ করে তা রক্ষার প্রগাঢ় আর্তনাদে মুখর থাকতে দেখা যায় তাঁকে। কখনো এ প্রসঙ্গেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন তিনি। কবি আজীজুল হক ছিলেন আপন ইতিহাস-ঐতিহ্যে আস্থাশীল, মানবতায় পূর্ণ, প্রগতিধর্মে দীক্ষিত ও জীবনমুখীনতায় উচ্চকণ্ঠ। 


৫২তে ভাষার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও পাকিস্তান বিরোধ অস্থির অভিঘাতী তরঙ্গ এদের মধ্যকার আবার কোনো কোনো কবিকে স্বাধিকারের চেতনা জাগরণের রসদও জুগিয়েছিল । এই রাজনৈতিক অভিঘাতী ৬০এর দশকে এ বাংলার নিজস্ব কাব্য সাহিত্যাঙ্গনকে আরো আধুনিকতা সংলগ্ন করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে । আবার আধুনিকতা যদিও চেতনা ও মননশীলতার মধ্য দিয়ে মানবতাবাদকে শাণিত করে তোলে; তবুও সময় ও নগর বাস্তবতার সাথে এর রয়েছে পৌণঃপুনিক সম্পর্ক। এই বাংলার কবিতা তাই নগর ও চারপাশের বাস্তবতাকে অন্তরে বাহিরে ও চেতনায় তুলে নেবার মোক্ষম পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিল ।

১৯৬০ সালে প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার সাথে ঢাকা নগরীর পৌনঃপুনিক সম্পর্কের সাঁকো নির্মাণের পাশাপাশি এ বাংলার কাব্য সাহিত্যের সত্যিকার আধুনিকতার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন কবি শামসুর রাহমান । অপরদিকে, তিরিশি কাব্যজগত ধারাবাহিকতার উত্তর প্রজন্মের কবি শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থটি ওপার বাংলা কাব্যসাহিত্যে প্রায় পরিণত ও আধুনিকতা–উত্তর সম্পর্কসূত্র পুনঃনির্মাণ করেন । নিরঙ্কুশ আধুনিকতার বহিস্রোত ক্ষুব্ধ শামসুর রাহমানের কবিতা এ বাংলার নাগরিক মনস্বীতায় নতুনতর প্রসাদ সৃষ্টির পাশাপাশি, স্বাতন্ত্রে বৈচিত্র্য ভিন্নতায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । এরপর ১৯৬৩ সালে -“রৌদ্র করোটি”তে কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে ৪৭পরবর্তী ওপার বাংলার সমস্ত ঐতিহ্যমণ্ডিত, ধর্মীয়, জাতীয়তাবাদী ও প্রভাববাদী কাব্যবলয়কে পাশ কাটিয়ে বাংলা কবিতাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধশালী স্তরে তুলে আনেন । অন্যভাবে বলা যায়, রৌদ্র করোটিতে নামকরণের ভেতরেই নিহিত আছে হয়তো আধুনিক বাংলা কবিতা করোটির ভেতর বাহিরে প্রতিভা, মেধা ও ব্যক্তি–স্বাতন্ত্রের ঝলকানির অবিস্মরণীয় এক সৃজন উপাখ্যান। অতঃপর, ১৯৬৭তে কবি শামসুর রাহমানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বিধ্বস্ত নিলীমা প্রকাশের পর আধুনিক বাংলা কবিতা ধারার এক পরিণত বিকিরণ প্রভা সমকালের বিচিত্র ল্যাম্পপোষ্ট তির্যকভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করে । বিশেষত কবিতার কাব্যসত্তাকে উচ্চকিত রেখেই বর্ণনাময়ী বক্তব্যে, স্বকীয় ভাব ও প্রতিভাবের ঋদ্ধ সমীকরণে তিনি বাংলা কবিতায় ডিসকোর্সের শাণিত ধারার প্রতি–নন্দনত্ব উপস্থাপন করেন । যা ছিল বাংলা কবিতার সর্বাঙ্গীন অবয়ব ও মনোজগতের প্রায় পরিপূর্ণ বিস্তৃতির মানসকল্প বিন্যাস । এভাবে শামসুর রাহমানের কাব্যজগৎ জুড়ে জেগে ওঠে নগর স্বদেশের বিপুলা এক মানচিত্র । 

এসব কিছুই মাথায় রেখেও বলতে পারি আজীজুল হকের -ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে (১৯৬১),বিনষ্টের চিৎকার (১৯৭৬), ঘুমও সোনালী ঈগল (১৯৮৯)। তিনটি কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতাকে নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে, আমরা জেনেছি কবি হওয়ার জন‍্য প্রচুর বই পকাশ করা জরুরি নয়, জরুরি হচ্ছে চিন্তা ও চেতনার উন্নয়ন, উন্নত লেখা। তার প্রমাণ তিনি। এছাড়াও জানা যায় বন্ধু ও প্রকাশকরা শ্রেষ্ঠ কবিতা বা নির্বাচিত কবিতা প্রকাশের কথা বললে তিনি কখনও সম্মত হননি। নির্বাচিত বা শ্রেষ্ঠকে স্বীকার করতেন না। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিদ‍্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় তিনটি বই থেকে বাছাই করা লেখা নিয়ে আজীজুল হকের কবিতা। একটি মাত্র প্রবন্ধ গ্রন্থ অস্তিত্বচেতনা ও আমাদের কবিতা বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে।

রাজধানীর মোহময় হাতছানিকে উপেক্ষা করে সারাজীবন যশোর শহরে অধ‍্যাপনা আর সাহিত‍্যসেবায় জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। যশোরের তরুণ কবিদের অনিবার্য অভিভাবক হয়ে সাহিত‍্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। আমরা এই কৃতি কবিকে যথার্থ মূল‍্যায়ন করতে পারিনি বা করিনি।

আজীজুল হকের কবিতায় একদিকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতন শিল্পদৃষ্টি প্রতিভাত অন্যদিকে, অস্তিত্ববোধ ও ভাবনাপ্রসূত কবিতার বিষয় ও উপকরণ-অনুষঙ্গ অভিনব মর্যাদায় সিদ্ধ হয়ে ওঠে। দুঃস্বপ্ন, মৃত্যু, অন্ধকার, রক্তপাত প্রভৃতি উপমা-প্রতীক সাম্রাজ্যবাদ ও অস্থির সময়কে যেমন নির্দেশ করে, তেমনি দীর্ঘদিনের পরাধীন বিপন্ন জাতিসত্তাকে সংহতি দানের চেষ্টায় তাঁকে সংগ্রামী হতে দেখা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি কবিতায় নিয়ে আসেন দ্যুতিময় সব মুহূর্ত-প্রতীক। কখনো তীব্র কৌতুক ও ব্যাঙ্গবাণে তাঁকে সমকালীন পরিস্থিতিকে তীক্ষ্ণ করে তুলতেও দেখা যায়-


এক. 

আদিম সমুদ্র থেকে অন্তিমের স্থলভাগ জুড়ে

বিশাল পাহাড় এক অণুতম সূর্যকে ছুঁয়ে

পড়ে আছে, যেন

মহাকাল শিলীভূত, মসৃন পিচ্ছিল।

একদিন মানব সমাজ

ওই খানে যাবে, এখন যন্ত্রণা শুধু আজ, এখন কেবল

শব থেকে শবের সিঁড়িতে একটি আকাঙ্ক্ষা হেঁটে যায়

জীবনের নামে, এখন সে জীবনের নাম

স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম। 

(যন্ত্রণা; ঝি.মু.সূ)


দুই. 

অতীতে প্রোথিত দেখি অর্ধাঙ্গ আমার

এবং দুচোখ

শামুকের ঠোঁটে বিদ্ধ নীলকান্ত মনি

যেন এক নিহত সময়

দুর্ঘটনার পিঠে ঠেস দিয়ে পড়ে থাকে

হাজার বছর। 

(যন্ত্রণার মৃত্যুতে; ইচ্ছার নায়ক, ঝি.মু.সূ)


তিন. 

নীলাভ কাঁচের প্লেটে হৃৎপিণ্ড রক্তাক্ত উজ্জ্বল

ছিঁড়ে এনে রাখলে টেবিলে

সূর্যোদয় হলো

সমুদ্রের জলে।

আজকের গ্রগাঢ় সকালে

কী দেবো তোমাকে? কী দেবো, কী দেবো!

রক্তমুখী নীলা। 

(রক্তমুখী নীলা; ঝি.মু.সূ)


চার. 

অবশ্যই আমি সেই ব্যবহৃতা রমণীর সজ্ঞান প্রেমিক।

জীবনকে সুনিপুণ আলিঙ্গনে বেঁধে

চিরকাল বেঁচে থাকে নির্বিঘ্নে যেমন

মৃত্যুটা; তারো চেয়ে অধিক নিকটে আমি তার। 

(বিনষ্টের চিৎকার; বি.চি.)


পাঁচ. 

একালের কবিতা ফুলকে বাদ নিয়েছে।

আকাশে মেঘ, কালো মেঘ

সূর্য নেই।

যে ফুলের নাম সূর্যমুখী সে নামেই সে ফুটলো।

আগুন রঙ পাঁপড়ি কী ধূসর!

আগুন থেকে ছাই। 

(মেঘমুখী সূর্যমুখী; ঘু.ও সো. ঈ.)


ছয়. 

রাজার আশ্বাস-দুর্গসঙ্ঘের আড়াল আর

মহান নগর

পলাতক বন্ধুদের নির্বিঘ্ন আশ্রয়। 

(প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবিম্ব; ঘু.ও সো. ঈ.)


সাত. 

দারুন দু:স্বপ্ন ছাড়া গাঢ় কোন মধ্যরাত নেই

নীল নীল মৃত্যু ছাড়া স্বপ্নহীন দীর্ঘ ঘুম নেই

অনিদ্রার জ্বালা ছাড়া নিদ্রাস্নাত জাগরণ নেই। 

(ঘুম ও সোনালি ঈগল; ঘু.ও সো. ঈ.)

মিথ বা পৌরাণিক উপাদানের ব্যবহার আজীজুল হকের কবিতাকে সার্বজনীনতা দান করে। দ্বন্দ্বময় অস্তিত্ব-সচেতন কবিমানস থেকে ভারতীয়, গ্রিক প্রভৃতি পুরাণের উপাদানসমূহ তিনি সমকালীন জীবন-প্রসঙ্গে রূপায়ণ করেছেন-যা মানুষের চিরন্তন ভাবনার মাধ্যম ও রূপকল্প হিসাবে কাজ করেছে। বৃহত্তর জীবনকে কবি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাণ ব্যবহারসূত্রে সম্ভাবনাময় করে তুলেছেন। তাঁর কবিতা থেকে-

এক. 

সূর্যই আমাদের প্রথম নায়ক

চিরকাল আমাদের নায়কই সে আছে। 

(মেঘমুখী সুর্যমুখী; বি.চি.)


দুই. 

খুঁজে দেখ, সেইসব বিদ্ধস্ত ও প্রোথিত নগর

হিংস্র দাঁতের ফাঁকে আর্যদের হাসি,

দ্রাবিড়ের বিচূর্ণ করোটি। 

(হাড়; ঝি.মু.সূ)


তিন. 

মনে করো, ইভের সান্নিধ্য ছেড়ে আমি এক আদিম পুরুষ

সুপ্রাচীন ব্যাবিলনে নিগূঢ় চুম্বন রেখে বিবাহিত রূপসীর ঠোঁটে

নিখোঁজ হয়েছি। 

(প্রাক উত্তর পর্বের সঙ্গীত; ঝি.মু.সূ)


চার. 

অপহৃতা রমণীর মতো এক স্মৃতিগন্ধা অনার্য রূপসী

ঝিনুক-রহস্য চোখ তুলে

সেই প্রশ্ন সম্প্রতি ও করেছে আমাকে

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। 

(রূপকথা; বুদ্ধ ও ড্রাগন, ঝি.মু.সূ)

সময় নিরন্তর হাঁটছে তার পায়ে ধুলো ওড়ে না। আক্ষেপে জুড়ে থাকে শুধু আজীজুল হককে আবিষ্কারের বিষয়টি। তাঁর কবিতা, তাঁর দর্শন যুগে যুগে আবিষ্কৃত হওয়ার মতো। কারণ তার কবিতার শরীরে আধুনিকতার আদলে আধুনিক জীবনেরই ধ্রুপদ বিন্যাস করা হয়েছে-যা খুললে উন্মোচিত হবে এক বিরাট ভুবন। আর তাঁর দর্শনও অভিনব। মানুষ সবকিছুই অস্তিত্বের প্রয়োজনে করে, এমনকি যে কবিতা লেখে তাও। এই হচ্ছে আজীজুল হকের দর্শন। এই দর্শনকে ঘাঁটলে কাব্যপ্রয়াসীরা পেতে পারেন অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর। কবিতা সময়ের সাথে বদলে যায়। নতুন কবিরা নতুনভাবে নির্মাণ করতে চান কবিতার শরীর। সেই সূত্রে কবিতা আধুনিকোত্তর যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু নানা কারণে পঞ্চাশের কবিরা ইতিহাসে বিশেষভাবে থাকবেন। থাকবেন আজীজুল হকও। এই বিষয়টি এখনই বিরাটভাবে দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যতে হবে। কারণ মহৎ কবিতা এক সময় না একসময় কথা বলে।

সংখ্যার দিক থেকে কবি আজীজুল হক লিখেছেন অল্প কিন্তু তাঁর সমগ্র রচনা শিল্পবিচারসূত্রে অনন্য এবং একথা বলা প্রয়োজন, তাঁর কাব্যকর্ম বাংলা কাব্যভূমির সমৃদ্ধি প্রসঙ্গে সসম্মানে বিবেচিত ও গৃহীত হতে বাধ্য। 


  


রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

শৌনক দত্ত

                                       




সৃজন এই সংখ্যার কবি শৌনক দত্ত।জন্ম - ৭ ই আগষ্ট( ২১ শে শ্রাবণ ) কোচবিহারের ব্যাঙচাতরা রোড। স্কুল জীবন শুরু জেনকিন্স -এ আর সেই সময় থেকেই লেখালিখির সূত্রপাত। সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা এবং ওয়েবজিনের। বর্তমানে ইরাবতী ডেইলি ওয়েবজিনের সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ :

জল ভাঙে জলের ভেতর (২০১১)

ঠোঁটে দাও জ্যোৎস্নার বিষ (২০১২)

ডুব সাঁতার (২০১৭)

নিরুদ্দেশ গাছে সন্ন্যাসীর মুখ (২০১৭)

গল্প গ্রন্থ :

কারুময় খামে অচেনা প্রেম (২০১২)

শখ বইপড়া, লেখালেখি, ছবিতোলা, গান শোনা, ভ্রমণ। বেশ কিছু গানও লিখেছেন।

রা' প্রকাশন থেকে দুই মলাটে বন্দী হতে চলেছে তাঁর প্রবন্ধের সমাহার।


পরকীয়া

অন্য  বিছানায় শুয়ে 

সমুহ সময় 

ধাতস্থ হবার

 আগে অন্যকেউ

 মুখস্থ করে ফেলে 

নকশীকাঁথা বুনন।

বৃষ্টির নকশীকাঁথা তুমি আমাকে উপহার দেবে

আর

আমি তোমাকে উপহার দেব নিঝুম দ্বীপের শাড়ি।


কুয়াশা ভেজা রোদ,দুপুর

০৭ জানুয়ারি,২০১৮



আমার ছেলেবেলা

যে-শহরে বেড়ে ওঠা-তার ডাকটিকিট জুড়ে পাহাড়। যখন-তখন আমরা সর্ষে ফুলের গন্ধ পকেটে নিয়ে পাহাড়ে যেতাম। বড়রা যেত সমুদ্রস্নানে।তোর্ষার বাতাসে ভেসে বেড়াত তাদের অলৌকিক মেয়েবন্ধুদের শিহরণজাগানো সব ফিসফাস। ঢেউয়ের ডানায় চেপে ‘লাল দোপাট্টা’ উড়িয়ে তারা ফিরে আসতো।আমরা রঙধনু বোতাম খুলে উড়িয়ে দিতাম ঘুড়ির শৈশব।


শীত সন্ধ্যা,আশ্রম

১২ ফেব্রুয়ারি,২০১৮


আমার শরীর


তোমার সাথে কাটানো যে শরীরটা রোদ ভাঙলো ...

সে শরীর প্রতি রাতে পাহারা দিই, 

দেখি 

এক নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের দিকে দরজা খোলা

যেখানে ধ্যানী বয়স শিরার ভেতর বিশ্রাম নেয় 

অবসন্ন জাহাজ চোখে অবতরণ করলে

আমরা প্রতিবিম্বিত হই

জোছনায় বোনা লাইট হাউজে।



বেডরুম,মধ্যরাত

১২ আগষ্ট,২০১৮



নির্জনতার ডাকনাম মৃত্যু


জন্ম খুলে বসে আছে মৃত্যুর বিস্ময়,একটা প্রেমহীন আয়নায় প্রতিদিন মুখগুলো গলে যায় রোদের বিকালে মৃত ডুমুরের নীরবতায়। ক্রমশই রহস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে চিলেকোঠায় পুরোনো চিঠির বান্ডিলে শব্দের সিম্ফনি, নৈঃশব্দ্যের নিঃশ্বাস।

বল “মৃত্যু” এবং পুরো বাড়িটা জমে যায়—


পড়ন্ত বিকাল, স্টাডি

০৩ জানুয়ারি,২০১৯



হঠাৎ পাওয়া ছেলেবেলা...


রাফ খাতা ভর্তি দুপুর, সাইকেল নির্জনতা

সেই সব ছায়াপথ… সেই সব মুখরতা

হঠাৎ পাওয়া ছেলেবেলা!

ঘড়িপাড়ার পুল পেরিয়ে স্মৃতি বনের পাশ দিয়ে যে রঙ্গীন ঢালু পথ চলে গেছে, তার শেষ মাথায় সুনসান একটা ছেলেবেলা দাঁড়িয়ে । নয়নাপাড়ায় কুটুম্ব বৃষ্টি নামলে নির্জনতার বুকে জমা হওয়া সমস্ত বিষন্নতার সংগীত আমার মুখস্থ আমি তার স্বরলিপি লিখে রেখেছি জং ধরা নীল বেহালার তারে.

ফেরিওয়ালাঘুম দুপুরে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা পথের উড়নচন্ডী ধুলোয় যত হাহাকার ডুবে থাকে,সোনালী, রুপালী আধুলির ছক আঁকতে আঁকতে খুব তাচ্ছিল্যে আটকা পড়েছে আমার যাবজ্জীবন আমার ক্ষয়ে যাওয়া পেন্সিলের পাশে,

সে পথ আমার সমগ্র সংসার হারিয়ে ঘরের দিকে ফিরে যাওয়া......

শীতে বেডরুম ঢাকা, 

মধ্যদুপুর

০৫ জানুয়ারি,২০১৯




শীত ২০১৯



দিন গুলো অ্যাজমাটিক… নিঃশ্বাসের টানাপোড়েন। আমাদের নাগরিক জনপদে শীত আসে দূরবর্তী মফঃস্বল থেকে উলাক্রান্ত জানালায় । শীত এলো আমাদের শহরে, শীতের গল্প নিয়ে....

আমাদের ক্যালেন্ডার শীত রঙের দাগে ভরে যাচ্ছে, হিমফুল চোখে প্রতিদিন দেখি। রঙিন শিশির বিন্দু বিন্দু মুগ্ধতায় নির্বাক বায়োস্কোপে ছবি হয়ে ফোটে। অমিলিত বিচ্ছেদে তুমি শেষমেষ দুরত্বপ্রবাল।

পায়ের ছাপ হারিয়ে যেতে যেতে হলুদাক্রান্ত দুপুর গুলো বাজেয়াপ্ত । শৈতপ্রবাহ শেখায় দুই অক্ষরের মাঝে বিচ্যুতির ব্যবধান। বার বছর আগের একটা শীতার্ত প্রেম কম ভোল্টেজের আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বুকের ব্যালকনিতে, প্রায়ই। খুব উসখুস ৷ একা একা এক কাপ লাল চায়ে ঊষ্ণতার ঘ্রাণ এবং কতিপয় দৃশ্যের বিষন্ন জলরঙ,

অথচ আমার কিছুই জানা হয়না…

শুধু শুধু সারাটা শীতঘুম জুড়ে সুনীতি হাইস্কুল

পুকুর ঘাটে সবুজ পাড়ের শাড়ি পুড়ে যায়, যাচ্ছেতাই....


সন্ধ্যা,বেডরুম

০৬ জানুয়ারি,২০১৯








শহরের শীতকালীন উৎসব

___________________________

আজকের আবহাওয়ায় কোন শোক নেই ।

জাহাজ ভিড়েছে 

নাবিকের সমুদ্র ভেজা নিঃশ্বাস ঢুকে পড়ছে... শহরে, অলিতে গলিতে ।


নিশুতি যাপন… খুব অগোচরে, 

যেমন করে পড়ে থাকে ঘুমের ভেতর বহুকাল আগের আধুলি স্বপ্ন ।

কবরের নৈঃশব্দ্যে সন্ধ্যা নামছে ৷গ্রীলে ঝুলছে তরুনী বউদের রাত্রিকালীন পোষাক । 

এখানে আমার কোন উপাসনালয় নেই ।


মাঝেমধ্যেই রানিপুরম ধরে ধরে একটা সুড়ঙ্গ পথে যেতে সাধ হয়

যে পাহাড়ের নিচে রেখে এসেছি সোনারঙ ‍দুপুর, 

রাতের ডুব, কিছু ভেজা আঙুল ।


আমি বাড়ি ফিরে এসেছি... অগোচরে 

দূরে... দূরে সরে যাচ্ছে বন্দর

ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে গুটিয়ে থাকা পথের রঙ ।

মধ্যদুপুর

১৬ জানুয়ারি,২০১৯


নগর

_______

ঝুপঝাপ সন্ধ্যা নামছে

গাছ মুছে দিয়েছে

রোদের যৌবন

করিডোরের অশ্রু চেটে নেয় অন্ধ স্ট্রীট লাইট

হেঁটে যায় জ্যামিতি-বক্সের দিকে-

ঠিকানাবিহীন এক চিঠি

গতি কামড়ে ধরেছে পা

পাতায় পাতায় ভেঙে পড়ছে ঘর-বাড়ি

উটের ছায়ায় ছায়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে নগর।


সন্ধ্যা,নগরের পথে

২০ জানুয়ারী,২০২০


ফ্যান্টাসি

__________

পেরেক আর দেয়ালের প্রেম নিয়ে কথা ফুরালে

চুমু থেকে উড়ে যায় ঠোঁট

শপিং মলের ভেতর জ্বল জ্বল করছে

এক আকাশ তারা।

জঙ্গল সাঁতরে ফিরে এসেছে ঘুম

যুবতীরা টুপটাপ ঢুকে পড়ছে আধ খাওয়া আপেলে

পাটিগণিতের প্রস্তাব থেকে

গড়িয়ে পড়ছে ঘুঙুর।

ভোরবেলা!

নদীর শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে পোড়াবাড়ির গন্ধ!


মধ্যরাত, ব্যালকনি

২৩ জানুয়ারী,২০২০



মাধুকরী হাতে নিয়ে

___________________________



পোয়াতি পালক থেকে ঝেড়ে ফেলো অতীতের সব পাণ্ডুলিপি। জানো তো-

সুতীব্র আলোও এক আজানা অন্ধকার।


যে শৈশব বন্ধু অলিন্দে সাগর হয়ে বেলাভূমি খোঁজে। তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি পাখির শিস!আলোর ফেনিল থেকে মুছে নিয়ে বিদেহী আগুন। কুটিরের দায় মুছে সূর্যের প্রলেপ দিয়ে প্রতিদিন অন্ধকার লিখি। আর,চিরুনী জুড়ে তল্লাসী জীবন!


গোপন জ্বরের মতো পৃথিবীরও আজ স্বপ্নদোষ। ঐ দেখো,ভিক্ষার থালা থেকে শালিক খুঁটে খুঁটে খায় দিন।

চোখেতে বর্ষামঙ্গল লিখে আমার নিখোঁজ। অন্ধ চিত্রকর ক্যানভাসে হাসি ছড়িয়ে কান্না আঁকছে হাজার বছর।


আমরা জবা ফুলের মতোন মুখস্থ করেছি বিমুগ্ধ জলের ছাপ!



বাসা,মধ্যরাত

১৬ জুলাই,২০২০



শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

শৌনক দত্ত

মন চায় মন চায় না 




বাইরে বৃষ্টি অঝোর ধারায় ঝরছে।এমন সময় অবসর ঠেলে ঘিরে আসে একরাশ স্মৃতি,অব্যক্ত অনেক কথা যা কখনো বলা হয়না।বৃষ্টিদিনের অলসতার এই এক ধারা বুঝি সবার থাকে।প্রতিটি মানুষের মাঝে যে মানুষের বাস সে এমন ধারা বৃষ্টির দিনে কখন বেরিয়ে আসে তা ঐ রক্তমাংসের মানুষটি বুঝতে পারেনা আর পারেনা বলেই হয়ত বৃষ্টির মতো ঝরে যায় মেঘ থেকে পৃথিবীর বুকে। 
মানিয়া... 
মানিয়া সাধারন মানুষগুলোর চেয়ে আলাদা।পেশায় শিক্ষক হলেও কোমল এই নারীর ভেতর কঠিন এক মানবীর বাস।ছাত্র রাজনীতি কিংবা ছোট্টবেলা থেকে বড় হবার সময় পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তার পাশে আবেগ বলে কিছু ছিলো না সেই কারণেই কিনা কে জানে মানিয়া আর পাঁচ দশটা মানুষের চেয়ে একেবারেই আলাদা।তাই বলে এমন ভাবার ও উপায় নেই সে পাথর!সে যেমন ভাল শিক্ষক তেমনি দক্ষ গৃহী।রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার আছে ভীষন দূর্বলতা।তার অবসর যদিও খুব কম তবু কখনো যদি অবসর মিলে যায় মানিয়া সাহিত্যে ডুবে যায়,গান শোনে।তার লেখার হাতটি শ্লোগানের সাথে আকাশের দিকে তোলা হাতের মতই বিপ্লবী,আস্থাশীল ও স্বপ্নময়।ছিপছিপে শরীরের মানিয়া শাড়িতে যতটা মমতাময়ী,সালোয়ার কামিজে ততটাই তন্বী।প্রখর মেধাবী মানিয়া চাইলেই ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অন্য যেকোনে পেশায় নিজেকে দেখতে পেতো কিন্তু অন্যসব পেশাকে কেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিক্ষকতা বেছে নিলো এই প্রশ্নটা আজো তার বন্ধু বা সহপাঠীদের কাছে বড় বিস্ময়।ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনীতি করা মানিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানও খুব দৃঢ় কিন্তু কোনদিন সে কোন পদ দখল করেনি।সুযোগ যে আসেনি তা কিন্তু নয় দলের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলকর্মীরা বারবার চেয়েছে,চায় সে তার জনপ্রিয়তা,দক্ষতা ও রাজনৈতিক মেধাকে কাজে লাগিয়ে সামনে থাকুক।মানিয়া তা কখনো করেনি।নিভৃতপ্রেমী মানিয়া রাজনীতির মতো ব্যক্তিগত এবং পেশাজীবনেও নিভৃতচারী অথচ খুব জনপ্রিয়! 
বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে।আকাশ এখন আগের চেয়ে বেশ পরিষ্কার।এখন যে ছন্দে বৃষ্টি ঝরছে তা যত না ভাবাতুর করে তার চেয়ে ঢের বেশি করে লোভী,বৃষ্টি মাখতে।একদল পাখি ভেজা পালক থেকে বৃষ্টি ঝেরে উড়ে যায় আবার পালকে বৃষ্টি মেখে দূরে হয়তবা আপন আশ্রয়ে। 
নিনাদ... 
নিনাদ পৃথিবীর আবেগময় মানুষদের একজন।অলস ও আরামপ্রিয়।মেঘের মতো অস্থির কোন কিছুই বেশিদিন ধরে রাখতে সে পারেনি কিংবা পারেনা।ছোট্টবেলা থেকে বাবা মা ছেড়ে বর্ডিং স্কুল কলেজের কঠোরতার ভেতর থাকা মানুষ যে এমন উদভ্রান্ত ছন্নছাড়া হতে পারে তা নিনাদ কে না দেখলে হয়ত বিশ্বাসই হবে না।রাজনীতি তাকে কখনো টানেনি,বোর্ডস্ট্যান্ড করা নিনাদ সবসময় ডুবে থাকে সাহিত্যে।অথচ বিজ্ঞান নিয়ে পড়া নিনাদের সাহিত্য প্রীতি খুব অস্বাভাবিক লাগে অনেকের কাছে।এমন একজন তুখুর মেধাবী কেন কোন চাকরী নিলো না এটা নিয়ে অনেক রকম গুঞ্জন থাকলে ও নিনাদ তা কখনো গায়ে মাখেনা,সে আছে তার খেয়ালে এক মফস্বল জেলা শহরে একান্তে।সব ছেড়ে গেলেও সাহিত্যসৃষ্টি তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি কিংবা সব ছেড়ে দিলেও নিনাদ কখনো সাহিত্য ছাড়তে পারেনি।সাহিত্যে নিনাদ পাহাড় পবর্ত ভেঙ্গেছে তেমন কিন্তু নয় বরং নদীর মতো টিকে আছে!জীবনানন্দ দাশের মাঝে নিজেকে খুঁজে ফেরা নিনাদ প্রথাগত সাহিত্যিকদের মতো নয়। 
আপন খেয়ালে চলছে তার সৃষ্টি,রাজহাসের মতো সারা গায়ে জল মেখেও কোথাও সে নেই।নিনাদের পরিচিতির গন্ডি বেশ লম্বাচওড়া হলেও তার উপর কখনো সাহিত্যসম্পাদকের সুনজর পড়তে দেখা যায়নি।সেও তার ব্যক্তিত্বের ঘোরটোপ পেরিয়ে কাউকে কখনো বলেনা।কেউ স্ব তাগিদে লেখা চাইলে নিনাদ তাকে লেখা দেয়।বাজারে গোটাকতক বই থাকলেও নিনাদ সেরকম বহুলপঠিত সাহিত্যিক নয়। 
বৃষ্টি থেমে গেছে।মাছরাঙার মতো বর্ণিল রোদ ঝিলিক দিচ্ছে।বেলা শেষের আকাশে ফুটে উঠেছে রঙধনু।দুধ কফি রঙের মতো জমে থাকা জল পেরিয়ে যাচ্ছে মানুষ। 

মানিয়া এবং নিনাদ... 

দুইপ্রান্তের দুটি মানুষ মানিয়া ও নিনাদ তাদের মাঝে সেতু গড়ে তোলে কবিতা।একটি বিশেষ দিনের উপর নিনাদের কবিতা পড়ে মানিয়ার আগ্রহ বাড়ে নিনাদের প্রতি।বয়সে কয়েক বছরের ছোট নিনাদের সাথে মানিয়ার সখ্যতা গড়ে তোলে নিনাদের লেখা আর মানিয়ার ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে নিনাদকে।বেশ কতক অমিলের মাঝেও যে এমন বন্ধুত্বতা গড়ে ওঠতে পারে তা হয়ত মানিয়া ও নিনাদ কে দেখলেই বোঝা যায়।পলকের সাথে সময় যায়।বন্ধুত্বতা গাঢ় হয়।নিনাদের বুকের কোণে মানিয়ার মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায় ভালোবাসায়।নিনাদ নিজেকে নিজেই বোঝায় অসম এ ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে না তাই এই ভালোবাসা নিজের মাঝেই লুকিয়ে রাখা হবে বুদ্ধিমানের কাজ কিন্তু মন মানবে কেন?মানিয়ার কাছ থেকে একটু একটু করে দূরত্ব তৈরী করে নিনাদ,এদিকে নিনাদের নিখাদ বন্ধুত্বতা, ম্যাচুরিটি মানিয়ার মনে দাগ কাটে ছেলেদের মাঝে মেয়ে দিয়ে যে ধরনের ভাবনা থাকে মানিয়া তা কখনো নিনাদের মাঝে দেখেনি আর তাই নিনাদকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা মনে হয় মানিয়ার।
নিনাদের কাছে ভালোবাসা আর প্রেমের সংজ্ঞা আলাদা।নিনাদের মনে হয় ভালোবাসা মানে ভালো লাগার সাথে বসবাস আর প্রেম মানে প্রেষিত কাম।এই জায়গা থেকে নিনাদের কখনো কখনো মনে হয় মানিয়া কে ভালোবাসায় কোন পাপ নেই কোন দায়বদ্ধতা কিংবা পাওয়া না পাওয়ার কোন টানাপোড়েন নেই।মানিয়ার ভালো যেসব সেসবের সঙ্গে কাটিয়ে দেয়ার নামই ভালোবাসা।নিনাদের ভেতর মানিয়ার জন্য প্রেম যে একেবারেই কাজ করে না তেমনটি নয় কিন্তু নিনাদ জানে প্রেমের চেয়ে মানিয়ার প্রতি তার ভালোবাসা অনেক বেশি। 

মানিয়ার ভেতরে যে আরেকটি মানিয়ার বসবাস তাকে মানিয়াই চেনে।বাইরে সে মানিয়া বড় অপরিচিত বড্ড বেমানান।শ্রাবণ শেষের এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলে মানিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে সহসা অপরিচিত মানিয়াকে খুঁজে পায় নিনাদ।বৃষ্টির ঘোরে নিনাদ কথার ফাঁকে একসময় বহুবছরের পুরোনো শিলালিপির পাঠ উদ্ধারের আনন্দের মতো অন্য এক মানিয়াকে খুঁজে পেয়ে নিজের অব্যক্ত ভালোবাসা ব্যক্ত করে মানিয়ার কাছে।মানিয়া জানে নিনাদ খুব মজা করতে ভালোবাসে আর তাই প্রথমে শোনার পর তার মনে হয় নিনাদ মজা করছে।সে বিশ্বাস করতে পারেনি নিনাদের মনে তার জন্য এমন পাগলামী থাকতে পারে।নিনাদ মাথা নিচু করে বসে থাকে।তার মনে হয় বাইরের আকাশের মেঘ ভেঙে পড়ার চেয়ে বেশি আওয়াজ তার ভেতরে।সম্পর্কটা কি ভেঙে যাবে?বলাটা কি উচিত হলো মানিয়াকে?এমন হাজারো প্রশ্নের ভেতর কতক্ষণ নিজের সাথে নিনাদের কথোপকথন হয়েছে নিনাদ তা বলতে পারবেনা। 

বাইরের বৃষ্টির ঘোর ঘরেও ছড়িয়ে গেছে।মানিয়ার চোখে মুখে বৃষ্টি শেষের নীরবতা। 

দূরের কোনো মসজিদ থেকে সন্ধ্যার আযান ভেসে আসে।পাশের কোনো বাসার উল্লুধ্বনি আর শাঁঙ কাসরের শব্দে নিমগ্নতা ভেঙে যায় ঘরময় ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার ভেঙে চুরমার করে মানিয়া আলো জ্বালে।দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে নিনাদ উঠে দাঁড়ায়।মনে মনে খুব,খুব চায় মানিয়া কিছু একটা বলুক।
বাইরের অন্ধকার বেশ গাঢ়।অমাবস্যা নাকি মেঘ নিনাদ ঠিক বোঝেনা।মানিয়ার সাথে সব সম্পর্কের ইতি টেনেই হয়ত এই শেষ মানিয়ার কাছে থেকে বেরিয়ে যাওয়া।মানিয়া দীর্ঘ নীরবতার গুমোট কাটিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে- 
-নিনাদ এটা কতদিন ধরে তোমার মনে চলছে? 
-অনেকদিন। 
-কাকে কাকে বলেছো তোমার প্রেমকাহিনী? 
-কাউকে না। 
-তা ভাই নিনাদ তুমি আমাকে বা আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো? 
-এই কয়বছরে যতটুকু জেনেছি 
-তাতে কি ভালোবাসা সম্ভব? 
-আমি জানিয়া মানিয়া। 
-আমার মনে হয় চাওয়াটা তোমার শরীরের। 
-না তা নয়। 
-তা নয় তো কি? 
-হয়ত কিছুটা শারীরিক তবে তা গৌন। 
-ভাই এগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো।মনে করো আমি কিছু শুনিনি তুমিও কিছু বলোনি। 
-কিন্তু মানিয়া 
-কোনো কিন্তু টিন্তু নেই নিনাদ। 

নিনাদ সেদিন খুব রাগেই বেরিয়ে আসে।এভাবে কেউ তাকে ফেরাতে পারে সে ভাবতে পারেনি।প্রত্যাখানের ভয়েই সে সব সময় দূরে থেকেছে।জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়ে কি দরকার ছিলো এই প্রস্তাবনার নিজেকে খুব ছোট মনে হয় নিনাদের।পরক্ষণেই নিনাদ হেসে ওঠে।তার মনে হয় সে মানিয়াকে ভালোবাসে।মানিয়ার যা কিছু ভালো তার সাথেই তার বসবাস এখানে দুঃখ বা প্রত্যাখান বলে কিছু নেই। 

নিনাদ বেরিয়ে যাবার পর মানিয়ার মনে হলো নিনাদকে এভাবে না বললেও হতো।নিনাদ হয়ত কষ্ট পেয়েছে।নিনাদের ভেতর অনেক ছেলেমানুষী আছে।আবেগে নিনাদ যদি কিছু একটা করে বসে।মানিয়ার চোখ মুখ অস্থির হয়ে ওঠে। 

আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে জোছনা ছড়িয়ে পড়ে।জল মেশানো দুধের মতো চাঁদ জেগে থাকে একা।জানালার গ্রীল গলে ঢুকে পড়ে জোছনা,আর মায়াবী রাত প্রশয় খোঁজে।একা.. 




প্রচ্ছদ শিল্পী : সুদীপা কুন্ডু





বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

শৌনক দত্ত

হিলষ্টেশন.....



হানিমুনে ঝাঁটিংগা এসেছে বিদুর আর বিভুঁই। 
অন্তরীপের কাছেই প্রথম ঝাঁটিংগার কথা শুনেছিলো বিদুর।তখন তারা সবে মাধ্যমিক দিয়েছে।ছুটির সেইদিনগুলোয় অন্তরীপ একদিন এসে বললো সে তার বড়কাকার সাথে ঝাঁটিংগা যাচ্ছে।অদ্ভুত নাম,বিদুর সহ সব বন্ধুরা বেশ অবাক হয়েছিলো।বিস্ময়ের আকাশ আরো বড় হলো যখন অন্তরীপ ফিরে এসে ঝাঁটিংগার প্রাকৃতিক রূপ ও পাখিদের রহস্যময় সুইসাইডের কথা জানালো।তখন থেকেই বিদুরের খুব শখ ঝাঁটিংগা দেখার।
বিয়ের পরে সেই ঝাঁটিংগা দেখার সুযোগটা তাই লুফে নিলো বিদুর।এখানে এসে প্রথমেই যার কথা মনে পড়লো বিদুরের সে অন্তরীপ।উচ্চমাধ্যমিকের পরে অন্তরীপ যে দিল্লি গেলো তখন থেকে ধীরে ধীরে বন্ধুদের সাথে অন্তরীপের যোগাযোগটা নষ্ট হয়ে গেলো।কোথায় আছে কি করছে আগে ওর মায়ের সাথে দেখা হলে জানা যেত বছর পাঁচেক হলো সেই সুযোগটাও বন্ধ হয়ে গেলো অন্তরীপের বাবা মা দিল্লি চলে যাবার পরে।
ওয়াচ টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বিদুর সিগারেট টানছে।
-বিদু না?

বিদুর বিস্ময়ে তাকায়।হ্যাঁ,কিন্তু আপনাকে ঠিক....
-আমায় চিনতে পারছিস না?ভাল করে তাকিয়ে দেখ।

বিদুর মনে করার চেষ্টা করে কিন্তু না পেরে মাথা নাড়ে।না,সত্যিই চিনতে পারছি না।
-আমি কিন্তু তোকে একবার দেখেই চিনেছি।আরে পাগলা আমি রিদিশা।

-রিদিশা,মাই গড।তোকে এখানে দেখবো স্বপ্নেও ভাবিনি।সেই মাধ্যমিকের পর মেসো বদলি হলো তোরা জামশেদপুর চলে গেলি তারপর তো আর আমাদের যোগাযোগ নেই কি করে চিনবো।তা এখানে কি বেড়াতে?

-হ্যাঁ।আর তুই?

-মুচকি হাসে বিদুর,হানিমুন।

-সে কি হানিমুনে এসে তুই একা ঘুরছিস?

-না,ও ফ্রেশ হচ্ছে তাই আমি একটু বের হলাম।

রিদিশা আর বিদুর স্মৃতিমন্হন করতে করতে হাঁটতে থাকে।দুই শৈশব বন্ধুর হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ের গায়ে।
দুই
বিভুঁই কিছুতেই এই বিয়েটা করতে চায়নি।কেন না সে জানে সে আর কোনদিন ছেলেদের বিশ্বাস করতে পারবে না।তার মামা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে অবশেষে তাকে এই বিয়েতে রাজী করিয়েছেন।বিয়ে সে করেছে যদিও কিন্তু আজো সেই ক্ষত থেকে বের হতে পারেনি।যদিও দুই ক্যালেন্ডার পাতা নিয়ে উড়ে গেছে সময়।বিভুঁইয়ের খুব ইচ্ছে একবার শুধু একবার যদি মানুষটাকে সে পেতো মুখোমুখি,শুধু জানতে চাইতো- সেদিন বিয়ের সব প্রস্তুতি সেরে কোর্টে না এসে কেন সে পালিয়েছিলো?বিদুরের ডাকে ঘোর কাটে।বাইরে তখন দুধ কফির মতো আলোয় ফিরে যাচ্ছে দুপুর।
-বিভুঁই,এ হচ্ছে রিদিশা,আমরা একই পাড়ায় থাকতাম।একই কিন্ডারগার্টেনে পড়েছি।মাধ্যমিকের পর আজ এতবছর পরে দেখা।

বিভুঁই হাত জোড় করে নমস্কার করতেই হাসিতে ফেটে পড়ে রিদিশা।এই রে, আমি বিদুর বন্ধু, মাসি না।তাই নো নমস্কার, বলেই বিভুঁই কে জড়িয়ে ধরে রিদিশা।
-বেশ লক্ষ্মীমন্ত বউ পেয়েছিস রে বিদু।বলেই দুই বন্ধু হাসতে থাকে।

-এতক্ষণ ধরে তো আমার কথাই শুনে যাচ্ছিস,তোর কথা তো কিছু বল।

-সারপ্রাইজ।বিভুঁই কে নিয়ে আমাদের ঢেঁড়ায় চল দেখবি কেমন অবাক করে দেই তোকে।এমন একজনকে দেখাবো তুই ভাবতেও পারবিনা।


বিভুঁইয়ের বিয়ে হয়েছে আজ দশ দিন।বিদুরকে অনিচ্ছায় যত জানছে মন্দ লাগছে না বিভুঁইয়ের, ব্যাঙ্গালুরুতে একটি বিদেশী সংস্থায় উচ্চপদে চাকরীরত।বেশ ভাল সেলারি।এইটুকু সে আগেই জানতো,বৌভাতের দিন জেনেছে বিদুর গানটাও ভাল গায়।
-তুমি নাকি অফিসিয়াল ট্যুরে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছো জুলাইয়ে?

বিদুর আর রিদিশার থেকে অনেকটা পিছনে হাঁটতে থাকা বিভুঁই রিদিশার প্রশ্নে থতমত খেয়ে পা চালায়,হ্যাঁ,তোমায় কে বললো?
-কে আবার তোমার বিদুর।তোমার কোন টেনশন নেই,শোন বিদু তুই ওর ফ্লাইট কনফার্ম হলেই আমায় একটা কল করবি।এই নে আমার কন্টাক্ট নম্বর।দুটো কার্ড দুজনকে বাড়িয়ে দেয় রিদিশা।

-জুলাই তো এখনো অনেক দেরি, ও তুই অট্রেলিয়া থাকিস?

-হুম।

সূর্য দেবতা অনেকক্ষণ আগেই ধ্যানে ফিরে গেছেন।ঘরে ফেরা পাখির ডানায় ঘিরে আসছে শ্লেটরঙা সন্ধ্যা।দূর থেকে দূরে পাহাড়ের গায়ে জোনাকির মত আলো স্থির জ্বলে আছে।কুয়াশায় সে আলো ধীরে ধীরে আবছায়ায় মিশে যাচ্ছে।তিনজন হাটঁছে পাশাপাশি,কথা আর হাসির ফাঁকে জোৎস্না ফেলে জেগে উঠছে পূর্ণিমার সুবিশাল চাঁদ।

তিন

এখানে বিদুরের জন্য এমন কিছু অপেক্ষা করছে বিদুর কল্পনাও করেনি।দরজা খুলে যে দাঁড়ালো তাকে বেশ চেনা মনে হলো বিদুরের।
-কি রে চিনতে পারছিস একে অপর কে?রিদিশা দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় ।

বিদুর একপলক তাকিয়ে থেকে বললো, রীপ না?
মাথাটা ঝুঁকিয়ে মুচকি হাসে অন্তরীপ, তুই,তুই.....বিদু তো,বলেই অন্তরীপ জড়িয়ে ধরে বিদুরকে।বিদুরের পেছনে বিভুঁই দাঁড়িয়ে।বিভুঁইয়ের চোখে চোখ পড়তেই অন্তরীপ নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
-আরে কি হলো রে।বলেই বিদুর পেছনে তাকায়।

বিভুঁই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, চোখের তারায় বিস্ময়।দুই বন্ধুকেই যেন দেখছে কিংবা শুধুই অন্তরীপকে।রিদিশা এগিয়ে এসে বিভুঁইয়ের হাত ধরে।আয় তো,ওদের গলাগলি,বকবক ওরা করুক তুই ভেতরে আয়।এই রে তুই করে বলে ফেললাম।সরি,সরি।
-সরি কেন,বলতেই পারিস।ও আমাদের চেয়ে অনেকটাই ছোট, বিদুর বলে।বিভুঁই কেমন যেন গুম মেরে বসে আছে।

-রীপ,এ হচ্ছে বিভুঁই।আর বিভুঁই,অন্তরীপ আমাদের ছোট্টবেলার বন্ধু।তা রিদিশা,তুই রীপ কে জুটালি কি করে রে?

পাখির ডানা ঝাঁপটানোর মতো হাসি থামিয়ে রিদিশা হঠাৎ চুপ করে গেলো বিদুরের প্রশ্নটা শুনেই।বিভুঁই ঘরে ঢোকার পরেই চুপ মেরে গেছে তার সঙ্গে অন্তরীপ ও, বিদুর খানিক বিব্রত বোধ করলো।সে খেয়াল করলো ঘরে মৃত্যুর পরের নির্জনতা।
নীরবতা ভেঙে রিদিশা পলকেই উঠে দাঁড়ালো।চল বাইরে যাই সবাই মিলে।ঘুরে ফিরে তারপর ডিনার করে নেবো একসাথে।বিদুর খেয়াল করলো বিভুঁই চুপ করে বসে একদৃষ্টিতে অন্তরীপের দিকে তাকিয়ে আছে।অন্তরীপ মাথা নামিয়ে বসে আছে যেন মাটিতে মিশে যাবে।বিদুর মুচকি হাসলো,অন্তরীপ চিরটাকাল লাজুক।বিদুরের মনে পড়ে স্কুল লাইফে অন্তরীপ শায়েরীকে খুব পছন্দ করতো।একদিন সকালে স্কুলে এসেই অন্তরীপ সব বন্ধুকে বললো সে যে মোটেই লাজুক না তা আজ স্কুল ছুটির পর শায়েরীর মুখোমুখি হয়ে শায়েরীকে তার পছন্দের কথা বলে সে প্রমান করবে।সব বন্ধুরা মিলে অন্তরীপকে নিয়ে শায়েরীর স্কুলের সামনে স্কুল ছুটির পরে গিয়ে দাঁড়ালো।যেই শায়েরী অন্তরীপের সামনে এসেছে সাইকেল ফেলে অন্তরীপের সে কি দৌড়।
-কি রে চল।

রিদিশার তাড়ায় সবাই মিলে বের হলো ঝাঁটিংগার পথে।

চার

ডিনার শেষ করে।বিদুর আর রিদিশা মিলে ঠিক করলো।রিদিশাদের রুমে বসে বাকী রাতটা আড্ডা দিয়ে কাটাবে তারা।
বিভুঁইয়ের একদম ইচ্ছে ছিলো না।কিন্তু মুখে সে কিছু বললো না।এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে সে ভাবেনি।তিনবন্ধুর মিলনমেলায় সে বড় বেমানান।তবে তার নীরবতা যে কিছুটা হলেও ওদের তিনজন কে বিব্রত করছে বিভুঁই তা বুঝতে পারছে।অন্তরীপ রিদিশার বিয়ে হয়েছে কিনা এখনো ঠিক বোঝা গেলো না।বিদুরের প্রশ্নটা যে বেশ কৌশলে এড়িয়ে গেলো রিদিশা সেটা সে খেয়াল করেছে।দুজন বন্ধু কি তবে লিভটুগেদার করছে?অন্তরীপের চোখে মুখে যে অপরাধ বোধ ফুটে উঠেছে তা মনে মনে বেশ উপভোগ করছে বিভুঁই। জোছনা ঠিকরে পড়েছে ঘরময় আর রিদিশা গ্লাসে গ্লাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে লন্ডন ড্রাই।

পরের দিন দুপুর.....

-কাল রাতে কি বিদুর বউকে দেখে কম খেলি?

-না তো। 

-ভোর রাতে একবার জেগেছিলাম,তুই হয়ত খেয়াল করিসনি।কাল একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি।

-হুম।

-মনে হলো তুই আর বিদুর বউ তর্ক-বিতর্ক করছিলি।ঘোর বোধ হয়।

-হ্যাঁ।ঘোর না ঠিকই দেখেছিস। তুই আর বিদু তো আউট হয়ে গেলি।তারপর...

-বিভুঁই কে দেখার পর থেকেই দেখলাম তুই কেমন গুটিয়ে গেছিস কিন্তু ভোরে তর্ক বিতর্ক করছিলি মানে কি?

-ওর নাম বিভুঁই।তুই হয়ত নামটা খেয়াল করিসনি।

-হ্যাঁ,জানি তো ওর নাম!বলেই রিদিশা থেমে গিয়ে উচ্চারণ করলো বি..ভুঁ..ই..পরক্ষণেই কি যেন আবিষ্কারের মতো বিস্ময়ে তাকালো অন্তরীপের চোখে।অন্তরীপের চোখে অসহায় দৃষ্টি।

-তুই বললি সব?

-না।যদিও বারবার জানতে চাইছিলো কিন্তু কি বলতাম।

-কি বলতি মানে।যা হয়েছিলো সেটা বলতি।

অন্তরীপ কোন উত্তর না দিয়ে উঠে গিয়ে সিগারেট জ্বালায়।রিদিশা অন্তরীপের এই রাগটা কে খুব ভাল চেনে।আড়াই বছর পর আজ আবার নিজেকে রিদিশার খুব স্বার্থপর মনে হয়। ঝাঁটিংগার পাহাড় পেরিয়ে উড়ে আসে বিভিষিকাময় একটি দিন রিদিশার চোখে মুখে।আড়াই বছর আগের সেই দিনে কিছু মাতাল অফিসফেরত রিদিশাকে ধর্ষণ করেছিলো।ধর্ষিতা রিদিশা সুইসাইড করতে মেট্রোর সামনে ঝাঁপও দিয়েছিলো কিন্তু কে যেন পেছন থেকে টেনে ধরলো।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে দূরের পাহাড়টা থেকে মনে হলো একটা পাখি ঝাঁপ দিলো।অন্তরীপের মনে পড়লো সেদিন মেট্রোতে অচেনা রিদিশা এভাবেই ঝাঁপ দিয়েছিলো।সে দ্রুত রিদিশাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছিলো।তখনো সে জানতো না যে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলো সে তার ছোট্টবেলার বন্ধু রিদিশা।রিদিশা যখন বুঝলো সে মরতে পারেনি ঘুরেই কষে এক চড় বসিয়েছিলো অন্তরীপের গালে।যখন মেয়েটি কেঁদে কেঁদে তার কলঙ্কিত রাতের কথা বলছিলো তখনো অন্তরীপ জানতো না এই মেয়েটি কে?রিদিশাও জানে না তাকে যে বাঁচালো সে তার শৈশবের খেলার সাথী।
রিদিশার মনে পড়ে যায় তাকে ঘরে পৌঁচ্ছে দেবার জন্য যখন টেক্সিতে বসে অচেনা মানুষটি তার মনযোগ অন্যদিকে ঘুরাতে তার ছোট্টবেলার বন্ধুদের গল্প শোনাচ্ছে তখন রিদিশার চোখের কোণায় চিকচিক করে উঠে তার শৈশব।অন্তরীপ যখন তার নিজের নাম বললো রিদিশার মনে পড়ে সে অন্তরীপ কে জড়িয়ে ধরেছিলো।তখনই তার মনে হয়েছিলো।এই সমাজ তাকে বাঁচতে দেবে না।অন্তরীপই হতে পারে তার উদ্ধার।সেটা আরো জোড়ালো মনে হলো যখন সে শুনলো আগামী কয়েকমাস পরেই অন্তরীপ অস্ট্রেলিয়া সেটেল্ড করতে যাচ্ছে।দেশ ছেড়ে নতুন করে বাঁচার হাতছানি রিদিশাকে সেদিন অন্ধ করে দিয়েছিলো।
সিগারেট শেষ করে ফিল্টারটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়ে অন্তরীপের মনে হলো,কাল যে বিভুঁই বারবার বলছিলো সে প্রতারণা করেছে।হয়ত সেটা ঠিক।সে বিভুঁইকে ঠগিয়েছে।কিন্তু বারবার মরতে যাওয়া একজন নারী,একজন বন্ধুকে নতুন একটা জীবন ফিরিয়ে দিতে এই যে আড়াই বছরের প্রবাসজীবন।তাতে কোন প্রতারণা নেই।
রিদিশার খুব ইচ্ছে করে এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে বিদুর কে বলে,বিদু আমি রীপকে জুটাইনি রে।আমি আজো স্বপ্নে ভয়ে কুঁকড়ে যাই,আমি এখনো পাশে কোন পুরুষের গন্ধ পেলে রিয়েক্ট করি।আড়াই বছর ধরে রীপ আমার চিকিৎসা করাচ্ছে।ইচ্ছে করে বিভুঁইকে চিৎকার করে বলে বিভুঁই এই দেখো তোমার অন্তরীপ যে আড়াইবছর ধরে বন্ধুত্ব পালন করে ফিরেছিলো তোমায় ফিরিয়ে নেবে বলে,অন্তরীপ সেই পুরুষ যে ভুল করেও কোনদিন আমার দূর্বলতার সুযোগ নেয়নি কেবল সে তোমার বলে।
দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে।দুজনের ঘোর কেটে যায়।

ঝড়ের রাত,ছাদ