যুগান্তর মিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
যুগান্তর মিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

যুগান্তর মিত্র

                           



অন্ধকার গুহাপথ 


সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ কলিং বেলের শব্দে অবাক হয়ে বেরিয়ে দেখলাম রীতিকা দাঁড়িয়ে আছে। এত সকালে রীতিকা কেন? কী এমন দরকার পড়ল এখন? মেয়ের পড়াশোনার খোঁজখবর নিতে এলেও এত সকালে কখনও আসেনি আগে। দরজা খুলে দাঁড়াতেই ছলছলে চোখে রীতিকার প্রশ্ন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, দাদা শুনেছেন খবর? 

খবর! মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কোনও খারাপ খবর বয়ে এনেছে। অজানা আশঙ্কায় আমার ভেতরটা নড়ে উঠেছিল। কীসের খবর? সংশয় নিয়ে পালটা প্রশ্ন করেছিলাম। 

শ্রাবস্তীর খবরটা… রীতিকার গলা কেঁপে যায়। 

কে শ্রাবস্তী মনে করতে পারছিলাম না তখনই। তবু অশুভ সংবাদের ইঙ্গিত থাকায় শ্রাবস্তীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে পারিনি। তার বদলে মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, কী হয়েছে শ্রাবস্তীর? 

কাল রাতে গলায় দড়ি দিয়ে… কথা শেষ করতে পারেনি রীতিকা। কান্নায় জড়িয়ে গিয়েছিল গলা। আমি ব্যস্ত হয়ে ওকে ঘরে আসার পথ করে দিয়েছিলাম। ততক্ষণে আমার স্ত্রী পুষ্পিতা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি খেয়াল করিনি। অস্ফুটে উচ্চারণ করেছিল, বাপ্পাদার মেয়ে? 

ভেজা কণ্ঠে রীতিকার জবাব, হুঁ, বাপ্পাদার মেয়ে। কাল রাতে সিলিং ফ্যান থেকে… স্কিপিংয়ের দড়ি দিয়ে… 

শ্রাবস্তী সুইসাইড করেছে? ঐটুকু মেয়ে! আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছিল পুষ্পিতার গলা। 

কোনওমতে টলতে টলতে বাড়ি ফেরার আগে রীতিকা জানিয়েছিল ওর শোনা বৃত্তান্ত। কাল রাতে আত্মহত্যা করেছে মেয়েটা। দোতলায় নিজের ঘরে একাই ঘুমোয় শ্রাবস্তী। অনেক রাতে বাপ্পা ল্যাপটপে অফিসের কাজ সেরে ছাদে যাচ্ছিল সিগারেট টানতে। সেইসময় শ্রাবস্তীর ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেয়েছিল একমাত্র মেয়ের ঝুলে-পড়া দেহ। তারপর হইচই চেঁচামেচি করে, প্রতিবেশীদের সাহায্যে দড়ি কেটে নামিয়েও এনেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। 

পুরো ঘটনাটা আমাদের ওপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিয়েছিল মুহূর্তের মধ্যে। দ্রুত পায়জামার ওপরে টি-শার্ট গলিয়ে ছুটেছিলাম বাপ্পাদের বাড়িতে। 

বাপ্পা আমার বাল্যবন্ধু। একই পাড়ায় থাকলেও একেবারে কাছাকাছি বাড়ি নয় আমাদের। যেতে মিনিট দু-তিন সময় লাগে। তাছাড়া আমাদের এলাকায় পাশাপাশি অনেকগুলো গলিপথ আছে। দুটো গলি পেরিয়ে বাপ্পাদের বাড়ি। এইসব কারণেই এইরকম একটা মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের কান পর্যন্ত তখনও পৌঁছয়নি। 

রীতিকা আমার বন্ধু সুশান্তের স্ত্রী। সুশান্ত আর আমি আলাদা স্কুলে পড়তাম। কিন্তু নিকট প্রতিবেশী হিসাবে আমাদের দুজনের জমাট সম্পর্ক। চাকরি, সংসার প্রভৃতি নানা ব্যস্ততায় দেখাসাক্ষাৎ কম হত, ফলে সম্পর্কও আলগা হয়ে পড়েছিল। পরের দিকে আমার ছেলে আর সুশান্তর মেয়ে এক ক্লাশে পড়ে, এমনকি একই শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট টিউশন নেওয়ার সুবাদে যোগাযোগটা বেড়েছে। আমাদের দুজনের থেকেও রীতিকা আর পুষ্পিতার সম্পর্ক অনেক বেশি জোরালো। ওরা দুজনেই ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে নানা আলোচনা হয়। 

(২)

শ্রাবস্তীর ডাকনাম বুচকি। আমি ওকে ডাকনামেই চিনতাম। আমার ছেলের থেকে দু-ক্লাশ নিচে পড়ত। পড়াশোনায় বরাবরই ভালো মেয়েটি। চমৎকার নাচ করত। প্রতি বরিবার আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে নাচের ক্লাশে যেত মা-মেয়ে। মাঝেমধ্যে আমার বা পুষ্পিতার সঙ্গে ওদের দুজনেরই কথা হত। 

বাপ্পার বাড়িতে গিয়ে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছিল। আমার বন্ধুর মেয়ে; আমারই মেয়ের মতো সে। কী এমন যন্ত্রণা ছিল যে বয়ে বেড়াতে না-পেরে ঝুলে পড়তে হল? কীসের চাপ ছিল যে সহ্যই করতে পারল না? নানা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঝিঁঝিপোকার মতো বেজে চলেছিল। বাপ্পা বা ওর স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারছিলাম না। হাত-পা কাঁপছিল আমার। বুকের মধ্যে হু হু হাওয়া খেলে বেড়াচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। পুষ্পিতা বাপ্পাদের বাড়িতেই থেকে গেল, কিন্তু আমি আর থাকতে পারিনি সেখানে। ঘরে ফিরেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। স্বভাবতই অফিসে যেতে পারিনি, বুকের মধ্যে সারাদিন অবিশ্রাম বৃষ্টি ঝরে গেছে। 

সন্ধ্যার আলোছায়া মুছে দিয়ে দিনটা যখন রাতের অন্ধকার গুহাপথে ঢুকে পড়েছে, সেইসময় বুচকির কাটাছেঁড়া করা দেহটা ফিরে এসেছিল ওদের বাড়িতে। দুঃসংবাদ হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় শিমুল তুলোর মতো। সেইরকমই ভেসে ভেসে আমার কানে পৌঁছল ‘বডি এসে গেছে’। একটা ফুটফুটে মেয়ের জীবন্ত শরীর ‘বডি’ হয়ে গেল! 

আবার ছুটে গেলাম বাপ্পাদের বাড়ি। আমি গেলাম না ঠিক, কে যেন আমার পা দুটো টেনে নিয়ে গেল। সারা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। তার মধ্যেই দেখতে পেলাম বুচকির মুখ ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা। উঠোনের মাঝামাঝি শুয়ে আছে। ওর মুখে ঘুমের প্রশান্তি লেগে আছে যেন। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কান্না ঠেলে আসছিল। অত্যন্ত ক্ষিপ্র পায়ে ফিরে এসেছিলাম ঘরে। ফেরার সময় চকিতে কি একবার বুচকির সাদা ফ্যাকাসে পা জোড়াও চোখে পড়েছিল? আমার ঠিক মনে নেই। 

লকডাউনের সময়কাল থেকে অনলাইন ক্লাশ শুরু হয়েছে ছেলের। সেই কারণেই প্রবল অনিচ্ছাতেও মোবাইল কিনে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার চাইতে পুষ্পিতার অনিচ্ছা বেশি ছিল। কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে এছাড়া পথ খোলা ছিল না আর। 

আমাদের সময় মাধ্যমিকের পরের সময়টুকু আমরা বেশিরভাগই আড্ডা মেরে, ঘুরেফিরে বা নানাভাবে কাটিয়ে দিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিকের পরেপরেই একাদশের পড়াশোনা শুরু করে দেয়। আমার ছেলেও শুরু করে দিয়েছে প্রাইভেট টিউশন পড়া। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইন ক্লাশও চলছে সমান তালে। ফলে ছেলের কাছেই থাকে তার মোবাইল। ছেলেকে কখনো-কখনো মোবাইলে গেম খেলতে দেখেছি। ইলেভেনে পড়ছে অথচ পড়াশোনায় তেমন মন না-দিয়ে গেম খেলছে বলে অনেক সময় বকাবকি করি। অভিমান করে কখনও খেতে চায় না পর্যন্ত। ওর মা বুঝিয়েসুঝিয়ে খাওয়ায়। এসব ভাবনা মাথায় ধাক্কা মারতে থাকে। একটু বকাবকিও করা যাবে না নিজের আত্মজকে! 

ছেলে আমার মায়ের সঙ্গে ঘুমোয় অনেকদিন হল। ও ঠাকুমার সঙ্গে ঘুমোতে ভালোবাসে। আমরাও বাধা দিইনি। আমার মা নানা গল্প বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে নাতিকে প্রশ্রয় দেন। ফলে নাতির প্রতি ঠাকুমা যেমন দুর্বল, নাতিও ঠাকুমাকে বেশিই পছন্দ করে। হয়তো আমাদের থেকেও বেশি ভালোও বাসে। 

সারারাত ঘুমোতে পারিনি। গতরাতেও তো ছেলেকে মোবাইলে গেম খেলা নিয়ে বকেছি খানিকটা! মধ্যরাতে উঠে গিয়ে মায়ের ঘরের জানালা দিয়ে দেখে এসেছি ছেলেকে। স্লিপিং লাইটের আবছা আলো ছেলের ঘুমন্ত মুখে পড়েছে দেখে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছি। ঘরে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলেও ঘুম আসতে চাইছিল না। আবার উঠে গিয়ে ছেলেকে দেখে এসেছি। অনেক সময় চেনাপরিচিতের আত্মহননের প্রভাব পড়ে। তাই কি সতর্ক হচ্ছিলাম! অস্থির অস্থির লাগছিল। পাশে শুয়ে বারবার নড়াচড়া আর পাশ ফেরা দেখে মনে হচ্ছিল পুষ্পিতাও ভীষণ উদ্বিগ্ন। একবার চোখ লেগে এসেছিল। পুষ্পিতা তখন উঠে গিয়েছিল বাইরে। বাথরুমে, নাকি ছেলেকে দেখে আসতে, বুঝতে পারিনি। তারপর থেকে আর ঘুম আসেনি। নিজের ভেতরে মেঘলা আকাশ নিয়ে রাত কাটিয়েছি। অপেক্ষা করেছি ভোরের আলো ফোটার। 

(৩)

প্রাইভেট টিউটরের সাম্মানিক ছেলের হাত দিয়ে কখনোই পাঠাই না। সাদা খামে ভরে নিজে হাতে দিয়ে আসি। সেইসময় ছেলের পড়াশোনার খোঁজখবরও নিতে পারি। পুষ্পিতাকে সেসব খবর জানাই। দুজন স্যার আছেন যাঁদের হাতে হাতে টাকা দিতে হয়। বাকি দুজনের অনলাইন পেমেন্ট। 

রবিবারের সকাল। বুচকির আত্মহত্যার ঘটনা পনের-ষোলো দিন গড়িয়েছে মাত্র। ফিজিক্স স্যার মৃগাঙ্কবাবুকে টাকা দিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ চোখ পড়ল ‘বন্ধু কজন’ ক্লাবের পিছনের জারুল গাছটার নীচে। গোল করে সিমেন্টের বেদি করা। বাপ্পা বসে আছে সেই বেদিতে। পাশে দাঁড় করানো সাইকেল। 

এর মধ্যে একবারও বাপ্পাদের বাড়িতে যেতে পারিনি। পুষ্পিতা দু-তিনদিন গিয়েছিল। বাপ্পা বা ওর স্ত্রী পল্লবীর সঙ্গে কী কথা হয়েছিল জানতে চাইনি। আমি বোধহয় এই প্রসঙ্গটা থেকে নিজেকে দূরে রাখতেই চেয়েছিলাম। তবু ঐ জায়গায় বাপ্পাকে বসে থাকতে দেখে বাইক দাঁড় করিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। একেবারে পাশে এসে দাঁড়ানোয় বাপ্পার চোখ পড়ল আমার ওপর। নির্লিপ্তভাবে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, বোস অঞ্জন। এখানে প্রতিদিন একবার করে আসি। সময় কেটে যায়… 

এত দূরে আসিস কেন? 

এই মাঠে একবার সারা বাংলা নৃত্য প্রতিযোগিতা হয়েছিল জানিস! বুচকি খ বিভাগে ফার্স্ট হয়েছিল। আমার প্রশ্নের জবাবের বদলে বাপ্পা মেয়ের কথা বলে। 

অনিবার্যভাবে বুচকির নানা প্রসঙ্গ তুলে আনে বাপ্পা। আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে থাকে। কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। চুপচাপ বাপ্পার পাশে গিয়ে বসি। এই শোক, এই যন্ত্রণার কোনও সান্ত্বনা হয় না। আমি আচমকা বলে বসি, তুই নাকি অফিসে যাচ্ছিস না? 

নাহ্। এখনও যাইনি। যেতেই ইচ্ছে করছে না। কী করব বল! 

সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে নয়, খানিকটা জ্ঞান দেওয়ার ঢঙে বলে ফেলি, নিয়মিত অফিসে যা বাপ্পা। কাজের মধ্যে থাক। ভোলার চেষ্টা কর ভাই। এভাবে কি চলে রে? তোর মা আছেন, পল্লবী আছে। অথর্ব ভাইটার কথাও ভাবতে হবে তো! 

মৃত মাছের চোখের মতো স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে বাপ্পা। আমার ভেতরে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যায়। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে, ভোলার চেষ্টা! ভোলা কি যায় অঞ্জন? মনে ঠিকই থেকে যায়। কাজের মধ্যে থাকলে মন কিছুটা অবসর পায়। 

সেটুকুও তো দরকার ভাই! বোঝার চেষ্টা কর বাপ্পা। কথাটা বলেই চুপ করে থাকি। আর কী কী বলতে পারে সে ভাবনা আসে মাথায়। প্রতি-উত্তরে আমি কী জবাব দেবো, সাজিয়ে নিতে চেষ্টা করি মনে মনে। তার মধ্যেই বাপ্পা বলে ওঠে, বড্ড চাপা মেয়ে ছিল আমার মেয়েটা। কিছুই বলত না। ওর মায়ের সাথে কিছু কিছু কথা হত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে ধূপের আগুন ধোঁয়া ছড়াচ্ছিল, সেটুকুও বলেনি ওর মাকে। 

বাপ্পার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। মুখ ফিরিয়ে থাকি অন্যদিকে। বাপ্পা বিড়বিড় করে বলে যেতে থাকে মেয়ে সম্পর্কিত নানা কথা। যেন আমাকে নয়, নিজেকেই বলছে। 

আমরা ওকে পাড়ার কারও সঙ্গেই মিশতে দিতাম না। একা একাই ঘরে থাকত। ছবি আঁকত। কী সুন্দর করে প্রকৃতি আঁকতে পারত! ওর ঘরের দেওয়ালে বাঁধানো ছবি আছে দুটো। ওর আঁকা। 

নিজেই বলছে। নিজেই খানিকটা বিরতি নিচ্ছে। আমি মুখ ফিরিয়ে থাকা এক নিশ্চুপ শ্রোতা। 

কী এমন কষ্ট ছিল বুচকির কে জানে! আমকে বা ওর মাকে বললে কি তার কোনও সুরাহা হত না? কোনও সমাধান কি বেরিয়ে আসত না? 

অসহ্য লাগছিল বাপ্পার সঙ্গ। কিন্তু উঠে আসতে পারছিলাম না। খড়কুটোর মতো মনে ভেসে আসা শব্দগুচ্ছ আঁকড়ে ধরে বলি, আচ্ছা বাপ্পা, আমারও তো ছেলে আছে। আমার ধারণা আমি ওকে বুঝি। ওর চাহিদা জানি। ওর ভালোলাগা, মন্দলাগা বুঝি। সত্যিই কি বুঝি? আমরা কি এই প্রজন্মকে বুঝতে পারছি না? আমাদের বাবা-মা তো বুঝতেন আমাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে! তাহলে আমরা কেন বুঝতে পারছি না? 

আমাদের বাবা-মাও বুঝতেন না অঞ্জন। আমাদের মতামত কি জানতে চাইতেন সবসময়? চাইতেন না। নিজেদের সিদ্ধান্তেই আমাদের চালাতেন বেশিরভাগ। তবু তো আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠিনি! অসুখী হতে পারিনি সেভাবে! আর ওরা, কীরকম অভিমানী দেখ! 

অসহিষ্ণু! অভিমানী! কী অবলীলায় শব্দগুলো বলে ফেলল বাপ্পা! এভাবে তো ভাবিনি! সত্যিই কি ওরা অভিমানী? কী জানি! তাহলে কি আমিও আমার ছেলেকে ঠিকঠাক বুঝতে পারি না? ভাবনাগুলো আমার ভেতরে বুদবুদের মতো ভেসে ওঠে। সেই সঙ্গে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাথায়, অতিমারির সময়কালে স্কুলযাত্রাহীন, প্রায় গৃহবন্দি ছেলেমেয়েরা কি নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ হারিয়ে একা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ? 

সেইসময় বাপ্পার কথা যেন হাওয়ার ডানায় ভেসে এল। এখন বড্ড ফাস্ট লাইফ অঞ্জন। ওরা ফাস্ট লাইফের ঘোড়ার কেশর ধরে দৌড়োচ্ছে। আমরা ধরতে পারছি না ওদের। অবশ্য আমরাই ওদের ছুটতে উৎসাহ দিয়েছি বারবার, সেটাও ঠিক।  

জেনারেশন গ্যাপটা বড্ড বড় হয়ে গেছে বাপ্পা! কিছুতেই ছুঁতে পারছি আমরা। সময় এতটা বদলে গেল? কথার পৃষ্ঠে কথা বসাতে চেষ্টা করলাম আমি। বাপ্পা কী ভাবছিল জানি না। আমিই-বা কী ভাবছিলাম এরপর মনে নেই। শুধু দুজন দুদিকে তাকিয়ে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। 


বাপ্পা আর আমি এক স্কুলে পড়তাম। একই পাড়ায় বড় হয়ে উঠেছি। তবু বাপ্পার সাথে তেমন সখ্য ছিল না। ওর ছিল কমার্স। আমার সায়েন্স। মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটুকু মুছে গিয়েছিল পাশ করার পরে। আমরা যারা সায়েন্স নিয়ে পড়তাম, তারা মনে করতাম কমার্স বা আর্টস নিয়ে যারা পড়ে, তারা আমাদের থেকে খানিকটা নীচু। তাই ওদের এড়িয়ে চলাই ছিল আমাদের কাজ। সেই ভাবনা যে কতটা অসার ছিল, বড় হয়ে বুঝেছি নানা ঘাতপ্রতিঘাতে। সেই বোঝা-না-বোঝা ছাড়িয়ে আমরা দুই পিতা বসেছিলাম এক গাছের নীচে, একই বেদিতে। 

নীরবতা ভাঙল বাপ্পাই। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুই তো বাড়ি যাচ্ছিলি। আজ রবিবার। অনেক কাজ থাকে। বাড়ি ফিরে যা। 

দুঃসহ আলোচনায় ইতি টেনে দিল বাপ্পা। আমি স্বস্তি পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তুই বাড়ি যাবি কখন? 

যাব। আর একটু বসি। 

বাইক চালিয়ে বাড়ি ফিরতে থাকি আমি। বাড়ি নয়, আমি যেন বিরাট এক গহ্বরের দিকে এগিয়ে চলেছি। অন্ধকার গুহাপথে ঢুকে যাচ্ছে আমার বাইক। মাথাটা কেমন যেন এলোমেলো লাগে। বাইক দাঁড় করিয়ে প্রতিবেশী বঙ্কুদার বাড়ির সামনের কালভার্টে বসে পড়ি। বুঝতে পারি, কালভার্ট সমেত অন্ধকার গুহাগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছি আমি…

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                    




 জলপরি


চিঠিভর্তি প্লাস্টিকের প্যাকেটে ইটের টুকরো বেঁধে জলে ফেলে দেয় তুষার। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নভেম্বরের এইসময় এদিকে লোকজন প্রায় আসেই না। পুকুরের কালো জলে ডুবে গেল চিঠিগুলো। অপলক জলের বুদবুদের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। 

শান্তাদিদি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এক দমে যদি নীচ পর্যন্ত চলে যেতে পারিস, তাহলে জলকন্যার দেখা পাবি। 

তুষার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ডুব দিয়েছিল পুকুরে। কিছুটা গিয়েই হাঁসফাঁস অবস্থা। জলের ওপরে উঠে এসে দেখেছিল শান্তিদিদি হাসছে। তার ঝলমলে দাঁত থেকে সূর্যের আলো ছিটকে ছিটকে পড়ছিল জলের মধ্যে। 

পারলি না তো! জানতাম পারবি না। একবারে হয় না। 

একবারে হয় না মানে? চেষ্টা করলে হবে বলছ? 

হবে না কেন শুনি? রোজ প্র্যাকটিস করবি। ঠিক পারবি। শান্তাদিদির দিকে তাকিয়ে তুষার দেখেছিল, তার মুখ থেকে ঝলকে ঝলকে হাসি ছড়িয়ে পড়ছিল, মিলিয়ে যাচ্ছিল সূর্যের আলোয়। সেও একদিন ঠিক জলকন্যার দেখা পাবে, এই বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল তখনই। 

তুষার অনেক গল্প শুনেছে ঠাকুমার মুখে। জলের গভীরে থাকে এক পাতালপুরি। সেখানে এক জলকন্যা চুল এলো করে ঘুমিয়ে থাকে সোনার পালঙ্কে। তার মাথায় আর পায়ে থাকে সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি। সেই কাঠিদুটো অদলবদল করে দিলেই ঘুম ভাঙে। অপরূপ সুন্দরী জলকন্যাকে দেখার খুব শখ তুষারের। কাউকে একথা বলতে পারেনি কোনওদিন। পুকুরে স্নান করতে আসার সময় শান্তাদিদিকে কথাটা বলেছিল সেদিনই। শান্তা অবশ্য সাঁতার জানে না। তুষারের মুখে পুকুরে স্নানের কথা শুনে দেখতে এসেছিল। পাড়েই দাঁড়িয়েছিল সারাক্ষণ। 

শান্তাদিদিদের বাড়ি কলকাতায়। তুষারদের ঠিক পাশের বাড়িটাই ওর মাসির বাড়ি। মাসিকে শান্তাদিদি ছোটমা বলে ডাকত। শহুরে পরিবেশে থাকে বলে তুষারদের থেকে তার চলনবলন আলাদা। আগে তুষার, নীরূপ, বিমল, আবেশরা অবাক হয়ে শান্তাকে দেখত। তাদের থেকে কয়েক বছরের বড় দিদি। ঝকঝকে দাঁতে কেমন সুন্দর করে হাসে! গালে একটা টোল পড়ে। সারা শরীর যেন মোম দিয়ে তৈরি। শহরের মেয়েদের এইরকমই কোমল হয় শরীর! সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তুষাররা। 

গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে এসে কয়েকদিন এখানে থাকত শান্তা। অন্য সময় এলেও দু-একদিন বাদেই ফিরে যেত। তুষার সেই কদিন আঠার মতো লেগে থাকত শান্তাদিদির সঙ্গে। ওরা আসত সাদা একটা অ্যাম্বাসেডরে। তুষার শুনেছে গাড়িটা শান্তাদিদিদের। তাদের পাড়ায় তখন কারও বাড়িতেই গাড়ি ছিল না। দু-একজনের শুধু স্কুটার ছিল। ওর বাবারও ছিল সেইরকমই আকাশি রঙের একটা স্কুটার। তার গায়ে ইংরেজিতে লেখা ছিল ভেসপা। বাবার স্কুটারটা নিয়ে তুষারের চাপা গর্বও ছিল। 

এক রবিবার সকাল সাড়ে নটা নাগাদ গাড়িটা যখন এসে থেমেছিল, জানালা দিয়ে দেখেই তুষার বুঝে গিয়েছিল শান্তাদিদিরা এসেছে। দৌড়ে চলে গিয়েছিল সেখানে। শান্তাদিদির মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়া মুক্তো গড়াগড়ি খাচ্ছিল সবুজ ঘাসের জমিতে। তুষারকে দেখে হাসিমুখে শান্তা বলেছিল, দুপুরে আসিস। অনেক গল্প করব। কালই ভোরে ফিরে যাব তো। বাবার অফিস আছে। আসিস কিন্তু! 

তুষার বিকেলের দিকে যেতই ওই বাড়িতে। তার প্রিয় শান্তাদিদি এসেছে, না-গিয়ে থাকা যায়! দুপুরে যেতে বলাতে খুব আনন্দ পেয়েছিল। অনেকক্ষণ গল্প করা যাবে ভেবে খুশি উপচে পড়েছিল তখন। তুষার খুব আশ্চর্য হয়ে ভাবত, শান্তাদিদির ভাইটা কোনওদিন ওদের গল্পে যোগ দেয় না কেন? দূরে দূরে থাকে। দিদিকে ও যেন ঠিক সহ্য করতে পারে না। 

পড়াশুনা, স্কুল, এসব কথা বলতে বলতেই আচমকা শান্তা বলে উঠেছিল, তুই রামায়ণ পড়েছিস তাতাই? 

দু-দিকে মাথা নাড়িয়েছিল তুষার। না গো। পড়া হয়নি। তবে গল্পটা জানি। 

সব গল্প জানিস? সবার? শান্তা কে জানিস? 

হ্যাঁ, রামের দিদি। অনেকটা ঘাড় হেলিয়ে জবাব দিয়েছিল তুষার। 

আর কিছু জানিস? 

অবাক হয়েছিল তুষার। আর কিছু মানে? রামের দিদি হয় শান্তা। এর বেশি আর জানে না সে। তার মুখে ফুটে উঠেছিল না-জানার গ্লানি। 

তুষারের ঠাকুমা বলত, ‘শান্তারে নিয়া মহামুনি কিছু ল্যাখে নাই। মাইয়াটার কী হইল, কোথায় গেল, তার কোনও হদিশ দেয় নাই ব্যাটা।’ ওর ঠাকুমা এভাবেই বলত। বাল্মিকী মুনির প্রতি ভীষণ রাগ ছিল ঠাকুমার। কিন্তু কেন যে রাগ, তা বুঝতে পারেনি তুষার। এইসব ভাবনার মধ্যেই শান্তা বলে উঠেছিল, শান্তা এক উপেক্ষিতা নারী, জানিস! বাল্মিকীর রামায়ণে তেমন গুরুত্ব পায়নি। 

একটু বলো না শান্তাদিদি, কেন উপেক্ষিতা? 

শান্তাকে ওর মাসি-মেসো দত্তক নিয়েছিলেন। ভাব একবার, নিজের মেয়ে, তাকেও মানুষ করার ইচ্ছে হয়নি দশরথের! আসলে কী জানিস, মেয়ে সন্তান তো! তাই তার জন্মে বাবা-মা খুশি হতে পারেননি। মহান রাজা দশরথ মেয়েকে তুলে দিলেন বউয়ের বড় বোনের কোলে। ঠিক আমার মতো! 

‘আমার মতো’ কথাটাতে খটকা লেগেছিল তুষারের। কিন্তু অন্য একটা প্রশ্নে সেই খটকা তখনকার মতো চাপা পড়ে গিয়েছিল। ‘শান্তার মা কিছু বলেনি মেয়েকে দিয়ে দেওয়ার সময়?’ 

না রে। কৈকেয়ী হয়তো কিছুই বলতে পারেননি। তখন মেয়েরা কিছুই বলতে পারত না, তাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে বলে কিছু ছিল না। এখনও অনেকে পারে না। 

তুষারের কেমন যেন গুলিয়ে যায়। এখনও মেয়েরা কিছু বলতে পারে না? তার বাবা তো মায়ের সব কথা মেনে চলে! না-মানলে কুরুক্ষেত্র ঘটে যাবে। বরং বাবার কোনও কথাই মা শুনতে চায় না, মানতে চায় না। গুলিয়ে যাওয়া মাথায় ভেসে ওঠে আগের কথাটা, তোমার মতো বলছিলে কেন শান্তাদিদি? তোমার সঙ্গে রামায়ণের শান্তার মিল কোথায়? 

দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল শান্তার বুক থেকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, আমার ছোটমা আমার আসল মা। আর যাকে তুই আমার মা-বাবা বলে জানিস, ওরা আমার মেসো-মাসি। এক বছর তিন মাস বয়সে আমাকে দত্তক নিয়েছিল। তখন আমার ভাই সদ্য জন্মেছে। সেই থেকে আমি ওদের কাছেই থাকি। ওদেরকেই বাবা-মা ডাকি। ওরাই তো আমার প্রকৃত বাবা-মা, তাই না? এমনকি শান্তা নামটাও আমার নতুন বাবা-মায়ের দেওয়া। মেসো আর ছোটমা আমাকে বুড়ি বলে ডাকত। 

অবিশ্বাসের চোখে শান্তার দিকে তাকিয়েছিল তুষার। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। সেইসময় শান্তা বলে উঠেছিল, শোন তাতাই, এসব কথা আর কাউকে বলিস না যেন! তুই শুধু জানলি, আর কাউকে বলিস না প্লিজ। 

না না, কাউকেই বলব না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তুষার মনে মনেও প্রতিজ্ঞা করে, এমন কথা কাউকে সে জানাবে না। তার শান্তাদিদির গোপন যন্ত্রণার কথা সে একাই জানবে। এই একা জানার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ অনুভব করেছিল সে। 

তুমি তাহলে বাবাকে মেসো বলো কেন? 

মেসোই তো আমাকে এই বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল। আগে জানতাম না। যখন জানলাম কে আমার আসল বাবা, তখনও বাবা ডাকতে ইচ্ছে করেনি। ছোটবেলা থেকেই মেসো ডাকি। সেই ডাকটাই রেখে দিলাম। আমি অবশ্য কমই কথা বলি মেসোর সাথে। ইচ্ছেই করে না! 

আর তোমার ছোটমা? 

ছোটবেলায় মাসিই ডাকতাম। এখানে এলে খুব কাঁদত, জানিস? আমাকে জড়িয়ে ধরে বলত, আমাকে মাসি ডাকিস না মা, ছোটমা বলে ডাকবি। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, মনে আছে। তখন আমার মা বলল, ঠিক আছে শান্তা, ও যখন চাইছে, তুই ওকে ছোটমা বলেই ডাকিস। তখন থেকেই ছোটমা ডাকি। 

খাটে শুয়ে কথা বলছিল শান্তা। তুষার বসেছিল তার পাশেই। হঠাৎই উপুড় হয়ে শুয়ে বলেছিল, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে না তাতাই। 

শুধু মাথাতেই নয়, মাথা থেকে সারা পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল তুষার। কখন যে শান্তাদিদি ঘুমিয়ে পড়েছিল, টের পায়নি সে। যখন বুঝতে পারল, তখন ঘুমন্ত শান্তাকে রেখে চুপচাপ চলে গিয়েছিল নিজেদের বাড়িতে। সেবার মাত্রই দু-দিন ছিল। তারপর পুজোর ছুটিতে এসেছিল কয়েকদিনের জন্য। সেইসময় শান্তাদিদির সঙ্গে কতকিছু নিয়েই যে গল্প করেছে প্রত্যেকটা দিন, ভাবলে এখনও ভালো লাগে তার। 

একদিন শান্তা জিজ্ঞাসা করেছিল, হ্যাঁ রে তাতাই, তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে? 

তুষারের মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। তার সত্যিই কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই। কিন্তু শান্তাদিদি এমন একটা প্রশ্ন করে বসবে সে ভাবতেই পারেনি। শুধু বলেছিল, না না। আমার কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই গো। 

ওমা, লজ্জা পেলি নাকি? গার্ল ফ্রেন্ড থাকা অন্যায় নাকি রে? তুই এখন ইলেভেনে পড়িস। গার্ল ফ্রেন্ড থাকতেই পারে। আমার তো বয় ফ্রেন্ড আছে। 

তাই? আমার কিন্তু সত্যিই কোনও গার্ল ফ্রেন্ড নেই। 

একদিকে বেঁচে গেছিস। আমি খুব চিন্তায় আছি রে! 

কেন গো শান্তাদিদি? 

রফিক আসলে মুসলিম কিনা, তাই বাবা মেনে নেবে না। সাফ বলে দিয়েছে। 

কোন বাবা? 

বোকার মতো কথা বলিস না তো! কোন বাবা আবার? আমার বাবা একটাই। ইনি আমার মেসো। বাবার জায়গা কোনওদিনই দিতে পারব না। এমনভাবে ধমক খেয়ে চুপ করে গিয়েছিল তুষার। আলতো করে পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল, তুমি রাগ করলে শান্তাদিদি? বিশ্বাস করো, আমি সেরকম কিছু ভেবে বলিনি। প্রমিস করছি, আর কোনওদিন বলব না। 

খিলখিল করে হেসে উঠেছিল শান্তা। তড়াক করে উঠে বসে তুষারের গালে একটা চুমু খেয়ে বলেছিল, তুই খুব ভালো ছেলে রে তাতাই। খুব সরল। 

একথায় লজ্জা পাওয়ার কথা নয়। তবু তুষার লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে নিয়েছিল। শান্তা তখন তুষারের মাথাটা টেনে নিয়ে তার বুকের মধ্যে চেপে ধরেছিল। কী নরম বুকটা, হাতের থেকেও নরম, ফোলা ফোলা বুকে মাথা ডুবিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু শান্তাদিদি কিছুক্ষণ পরেই মাথাটা দুহাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এখন বাড়ি যা। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। তোর বাড়িতে চিন্তা করবে না? সেদিন আসার সময় আর-একটা কথাও বলেছিল শান্তাদিদি, তুই আমার থেকে অনেকটাই ছোট রে তাতাই। না-হলে রফিকের বদলে তোকেই বিয়ে করতাম। কথাটা বলে আর দাঁড়ায়নি। তুষারের আগেই নেমে এসেছিল একতলায়। 

(২) 

বেশ কয়েক বছর আর শান্তাদিদির দেখা পায়নি তুষার। অপেক্ষা করতে করতে প্রায় মাসখানেক পেরিয়ে গিয়েছিল। রবিবার সকালে পড়ার বই সামনে রেখে বসে থাকত সে। মন পড়ে থাকত জানালা দিয়ে বাইরের দিকে। তার চোখ দেখতে চাইত সাদা রঙের গাড়িটা, তার কান উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চাইত সেই পরিচিত গাড়িটার চাকার ঘর্ষণ। থাকতে না-পেরে একদিন গিয়ে ধরল শান্তার ছোটমাকে। অনেকদিন শান্তাদিদি আসছে না কেন গো কাকিমা? 

ছোটমা চুপ করে চলে গিয়েছিলেন রান্নাঘরে, কোনও জবাব না-দিয়ে। কাকু পাশের ঘর থেকে ধীরপায়ে এসে বলেছিলেন, তোর শান্তাদিদির খুব পড়ার চাপ তো, তাই এখন আসতে পারছে না। পরীক্ষা হয়ে গেলেই আসবে, কেমন? 

হতাশ তুষার ফিরে এসেছিল ঘরে। তারপর কেটে গেছে অনেকদিন। এতদিনে পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা! তাও আসছে না? আবার কি খোঁজ নেবে? কিন্তু কাকু-কাকিমার থমথমে মুখ দেখে আর জিজ্ঞাসা করতে পারেনি কোনওদিন। একদিন সে জানতে পারল শান্তার এখানে না-আসার আসল কারণ। পাড়ার অনেকেই ততদিনে জেনে গেছে। 

তখন থেকেই তুষার প্রতি রবিবার পড়তে বসে একটা করে চিঠি লিখত, শান্তাদিদিকে সে তার মনের কথা বলত। কখন যেন সেই চিঠি লেখাও থেমে গেল। একসময় শান্তাদিদি পাতালকন্যার মতো জলের অতলে হারিয়ে গেল। শুধু তার বুদবুদ মাঝে মাঝে তুষারের বুকের মধ্যে গুবগুব শব্দ তুলত। 

আপনাকে একবার ম্যাডামের ঘরে যেতে হবে স্যার।  

ম্যাডামের ঘরে! কেন? 

পেপারসে উনিই সাইন করেন। আর আপনাদের কোম্পানির চেকটাও উনিই দেবেন। 

ও। আপনাদের ল্যানের সমস্যাটা মিটে গেছে। আর আপডেটেড ভার্সনের সফটওয়্যার লোড করে দিয়েছি। মিস্টার বাসু সব দেখে নিয়েছেন। কথাটা বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তুষার। 

হ্যাঁ স্যার, জানি। বাসু স্যার ম্যাডামকে রিপোর্ট করেছেন। আপনি আমার সঙ্গে আসুন, ম্যাডামের ঘরে। 

যে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছিল, তাকে এত কথা বলার প্রয়োজন ছিল কিনা জানে না তুষার। মেয়েটিকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে সে। চ্যাটার্জি ইনফোটেকের কর্মী হিসাবে তুষার এখানে এসেছে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তুষার ভৌমিক কোম্পানির হয়ে ক্লায়েন্ট মিট করে। তাদের কোম্পানির সঙ্গে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চুক্তি করেছে, তাদের সফটওয়্যারের কোনও সমস্যা হলে চুক্তি অনুসারে কোম্পানি ইঞ্জিনিয়ার পাঠায়। এই কোম্পানিতে তুষার একেবারেই নতুন। তার পূর্ব-অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার জন্য আগের কোম্পানির থেকে বেশি পে-স্কেলে এখানে জয়েন করার সুযোগ পেয়েছে। একে একে নানা ক্লায়েন্ট মিট করছে সে। এই এনজিওতে প্রথম এল তুষার। কাচের দরজা ঠেলে মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে, ওনাকে এনেছি ম্যাডাম। 

চেয়ার ঘুরিয়ে ম্যাডাম তাকাতেই তুষারের ভেরতটা দুলে উঠেছিল। শান্তাদিদি! বয়স বাড়লেও চিনতে অসুবিধা হয়নি তার। 

আসুন মিস্টার রয়। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। শান্তাদিদির চোখেমুখে তাকে দেখে কোনও প্রতিক্রিয়া নেই বলে অবাক হয় তুষার। দ্রুত ঘরে ঢোকে সে। ইশারায় বসতে বলায় চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে ম্যাডামের দিকে। ম্যাডাম তখন ড্রয়ার খুলে কিছু কাগজপত্র বের করছেন। তুষারকেও যে কিছু কাগজে সইসাবুদ করাতে হবে, সেদিকে খেয়াল নেই তার। 

ম্যাডাম চোখ তুলতেই তুষার বলে ওঠে, আমি তাতাই শান্তাদিদি। চিনতে পারছ না? 

তাতাই? শান্তাদিদি? কী বলছেন মিস্টার রয়, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আপনি কি কারও সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন? 

অবিকল সেই মুখ, কানের নীচে কালচে লাল রঙের তিল, সেইরকম মিষ্টি কণ্ঠস্বর! তবে চামড়ার জৌলুস কিছুটা কমেছে বোঝা যায়। সে কি বয়সের জন্য! আমি কিন্তু ঠিক চিনেছি শান্তাদিদি! মনে মনে ভাবে সে। 

আমার নাম পারভিন সুলতানা। আপনি হয়তো কারও সঙ্গে আমার মিল পেয়েছেন। এইরকম হয় মিস্টার রয়। কথাগুলো বলেই হাত বাড়িয়ে দেন ম্যাডাম। আপনার পেপার্স দিন। আর চেকটা রেডি করে রেখেছি, নিয়ে যাবেন। আমি আজ একটু ব্যস্ত আছি। আমাকে এখনই উঠতে হবে। কিছু মনে করবেন না। 

যন্ত্রের মতো কাগজগুলো এগিয়ে দেয় তুষার। সইসাবুদ শেষে চেক ব্যাগে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়ানোর আগেই ম্যাডাম উঠে দাঁড়ান। 

আসুন মিস্টার রয়। আজ আমাকে অন্য একটা কাজে বেরোতে হবে। অন্য একদিন আপনার সঙ্গে অনেক কথা হবে। আপনার শান্তাদিদির ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে করছে খুব। মুচকি হেসে বলেন পারভিন। 

পরবর্তী ক্লায়েন্টের ঠিকানায় বাইক ছোটায় তুষার। মাঝরাস্তায় বুকপকেটে ফোন ভাইব্রেট করতেই বের করে দেখে অফিসের নম্বর। কথা বলে তুষার অবাক হয়, পারভিন সুলতানার প্রতিষ্ঠান চাইছে না সে আর এখানে মিট করুক। অন্য কাউকে পাঠাতে বলেছেন নাকি ম্যাডাম স্বয়ং। তার চাকরি জীবনে এই প্রথম এমন একটা অভিজ্ঞতা হল। বরং আগের কোম্পানিতেও ক্লায়েন্টরা তাকেই চাইত বেশি করে। এই কোম্পানিতেও কয়েকজন ক্লায়েন্ট তাকে খাতির করে খুব। তাহলে কি ম্যাডামকে শান্তাদিদি ভেবে বসায় রেগে গেলেন! কীভাবে অফিসে এই ব্যাপারটা ফেস করবে ভাবতে ভাবতে বাইক চালাতে থাকে তুষার। 

(৩) 

হ্যালো, আমি কি মিস্টার রয়ের সঙ্গে কথা বলছি? অচেনা নম্বরে মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠ বেজে ওঠে ফোনের ওপারে। রাত তখন সাড়ে নটা। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণ বাদে একপাক ক্লাবে ঘুরে আসে প্রতিদিন। ক্লাবে যাওয়ার পথেই ফোনটা বেজে উঠেছিল। 

হ্যাঁ বলছি। গম্ভীর কণ্ঠ তুষারের। মিস্টার রয় নামে ক্লায়েন্টরা ছাড়া আর কেউ তাকে ডাকে না। অফিসেও তুষার বলেই ডাকে বয়স্ক মালিক। অন্যরা কেউ তুষার, কেউ-বা তুষারদা। তাকে সরাসরি কোনও ক্লায়েন্ট সাধারণত ফোন করে না। অফিস মারফত কাজের কথা জানতে পারে। তাই খানিকটা বিরক্ত হয় সে। 

আমি শান্তাদিদি বলছি তাতাই! 

ম্যাডামের মুখটাই ভেসে ওঠে প্রথমে। শান্তাদিদি! মানে সেই পারভিন সুলতানা? তাই তো? 

হ্যাঁ তাতাই, তুই ঠিক চিনেছিলি। আমি ধরা দিতে চাইনি ওখানে। রফিকের কথা বলেছিলাম তোকে, মনে আছে নিশ্চয়ই। ওর সঙ্গে বিয়েটা টেকেনি রে তাতাই। হয়তো দোষ আমারই। তখন থেকেই আমি পারভিন সুলতানা। এই এনজিওতে আছি বছর ছয়েক আছি। আমি চাইনি আমার অতীত উঠে আসুক। পুরনো জীবন আমি ভুলে যেতে চাই। এভাবেই ভালো আছি। 

তুমি কেন আমাকে তোমাদের ওখানে যেতে বারণ করেছ? অভিমান ঝরে পড়ে তুষারের গলা থেকে। 

বললাম তো, আমার অতীত ঢেকে রাখতে চাই। নীচু কণ্ঠে জানায় শান্তা। 

তুমি বারণ করলে আমি সেসব কথা কাউকে বলতাম না! কিন্তু তার বদলে আমার অফিসে… 

এতে তোর চাকরির কোনও ক্ষতি হবে না তাতাই। আমি সেরকম ভাবেই কথা বলেছি। তোর নামে খারাপ কথা বলিনি। শুধু বলেছি, এত অল্পবয়সী কাউকে চাই না আমরা। আমাদের এনজিওর পক্ষে বয়স্ক মানুষই ভালো হবে। আরও কিছু কথা বলার পরে তুষার বলেছিল, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই শান্তাদিদি। তোমার ঠিকানা দাও। 

আজ থাক তাতাই। কিছুদিন পরে আমি জানাব। কথাটা বলেই ফোন কেটে দিয়েছিল শান্তাদিদি। তারপর থেকে যখনই সেই নম্বরে ফোন করেছে, শুনেছে সুইচড্‌ অফ। নিজেও আর কোনওদিন ফোন করেনি শান্তা নামের জলপরি। 

মাস দুয়েক পরে ওদিকেই এক ক্লায়েন্টের কাজ সেরে ফেরার পথে মরিয়া হয়ে বাইক থামিয়ে দিয়েছিল তুষার, তরতর করে উঠে গিয়েছিল দোতলায়। ম্যাডামের খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পারভিন সুলতানা প্রায় দেড় মাস আগে লেকের জলে ডুবে মারা গেছেন। পুলিশ জানিয়েছে আত্মহত্যা। বিধ্বস্ত তুষার ফিরে এসেছিল সেদিন। 

তারপর থেকে প্রতি রবিবার সারা দুপুর বিছানায় আধশোয়া হয়ে শান্তাদিদিকে চিঠি লিখত তুষার। অফিস ব্যাগের একটা কোণে জমা হত সেগুলো। জমতে জমতে অনেক হয়ে গেছে। এবার নতুন কোম্পানিতে জয়েন করবে সে। এই ব্যাগটা ফেরত দিতে হবে। তাই সে সমস্ত চিঠি বের করে পুকুরধারে এসে বসে। আজ রবিবার। আজও সে চিঠি লিখেছে। হয়তো শেষ চিঠি। 

চিঠিগুলো জলের নীচে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকে। আকাশভরা তারার মেলা। অর্ধচন্দ্রের আলো এসে পড়ছে পুকুরের জলে। তুষার সেদিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। সে নিশ্চিত, একসময় চিঠিগুলো পুকুরের তলদেশে পৌঁছে যাবে। সেখানে শান্তাদিদি জলকন্যা হয়ে শুয়ে আছে, তার চিঠির অপেক্ষায়।  

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                                                         




পুনর্গঠন 


এবার ভাবছি বাড়িটা রিপেয়ার করিয়ে নেব। অনেক জায়গায় ফেটে ফেটে গেছে। নতুন করে রঙও করিয়ে নেব বাবা। 
তা ভালো। কবে শুরু করবি? 
দুটো ফিক্সড ডিপোজিট ম্যাচিওর করেছে। হাতে টাকা এলেই হাত দেব। 
হয়তো এই রঙটাই করাব। রিপেয়ারের পরে তো নষ্ট হয়ে যাবে। তাই রঙ করাতেই হবে। 
হুম। আমার আর নতুন রঙ-করা বাড়ি দেখা হল না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ঋষিকেশ বলেন, এই রঙটা তোর মায়ের পছন্দের ছিল। দত্ত হার্ডওয়ারে আমার সঙ্গে গিয়ে নিজে রঙ পছন্দ করেছিল। 
আমাকেও মা বলেছিল। মা চেয়েছিল দেয়ালের একদিকের রঙ ডিপ হবে। তিনদিকে হালকা কোনও রঙ। তুমিই করতে দাওনি। 
কথাটা শুনে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর নিজেই নৈঃশব্দ্য চিরে বলে ওঠেন, হুম। তখন মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন ব্যাপার! তিনদিক একরকম রঙ, একদিক আলাদা! পরে দেখেছি অনেকের বাড়িতেই এইরকম আছে। 
আছে তো! বেশ ভালোও লাগে দেখতে। আমার পরিচিত অনেকের বাড়িতেই আছে। 
তোর মা অবশ্য খুব বেশিদিন পছন্দের রঙ-করা ঘরের দেয়ালে আটকে থাকল না। মাস ছয়েকের মধ্যেই চলে গেল! 
ক্যানসারটা লাস্ট স্টেজে ধরা পড়ল! মা এত কথা বলতে ভালোবাসত। অথচ গলাতেই ক্যানসার হল! শেষদিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকত মা! কথাটা বলেই বাবার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সুধন্য। 
ও যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে বুঝতে পারিনি! 
আবার কি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বাবা? ঠিক বোঝা গেল না। চোখের পাতা স্থির। বোঝার উপায় নেই বাবা আপশোস করলেন কিনা। 
তুমি বরাবরই এইরকমই বাবা। আমাদের কারও কথারই কোনও গুরুত্ব দাওনি। নিজের একগুঁয়ে ভাব বজায় রেখেছ। 
এভাবে বলছিস? 
খুব কি ভুল বললাম বাবা? ভেবে দেখো। কথাটা বলে সুধন্য আর বাবার দিকে তাকায় না। উঠে গিয়ে চায়ের কাপ-প্লেট সিঙ্কে নামিয়ে রাখে। ফ্লাক্সটা সরিয়ে রাখে টেবিলের কোণে। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একটা টান দেয়। ঠোঁট সরু করে ধোঁয়া ছাড়ে বাতাসে। আর-একটা টান দিতে গিয়ে থেমে যায়। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট রেখে ঘরে আসে সে। 
বাবা, তোমার মনে পড়ে একবার খুব মেরেছিলে আমাকে? 
হ্যাঁ, সে তো তোর ভালোর জন্যই। 
আমার ভালোর জন্য? ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসা করে সুধন্য।  
তা নয়তো কী? সেইসময় তুই কয়েকজন বন্ধু জুটিয়ে আড্ডা মারতিস খুব। ওই বয়সেই ওরা বিড়ি টানা শুরু করেছিল। তুইও কয়েকদিন খেয়ে বাড়ি এসেছিলি। মুখে লেবুতাপার গন্ধ পেতাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে জেনেছি বিড়ির গন্ধ ঢাকার কৌশল ওটা। খবর পেতাম মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে তাসও পেটাস। খুব রেগে গিয়েছিলাম। তখনও মারধর করিনি। শুধু বলেছিলাম, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। পড়াশোনাটাও তো করতে হবে! অপেক্ষা করছিলাম পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য। যখন দেখলাম কোনওমতে পাশ করলি, তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। সেদিন মারটা একটু বেশিই হয়ে গেছিল, এটা ঠিক। 
একটানা কথাগুলো বলে ঋষিকেশ থামেন। সুধন্য মাথা নীচু করে চুপ হয়ে থাকে। 
একটু দম নিয়ে ঋষিকেশ আবার বললেন, এরপর থেকেই তুই বদলে গেলি। একেবারে প্রথম তিনজনে বরাবর। ক্লাস সেভেনের সেই মার তোকে পাল্টে দিয়েছিল। এমএসসি পর্যন্ত আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 
সুধন্য সিগারেট আর টানে না। জ্বলতে জ্বলতে অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। ধোঁয়ায় ভরে গেছে ঘর। অ্যাসট্রেতে ছাই ঝেড়ে বারান্দায় চলে যায়। তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা ছুঁড়ে মারে দূরে। লেবুগাছের গোড়ায় পড়ে ধোঁয়া ছড়ায় আধ-পোড়া সিগারেট। ঘরে এসে প্রায় ফিসফিস করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি একটু আসছি বাবা। 
নিশ্চয়ই কোনও জনসেবা? 
না না। এই একটু ঘুরে আসছি। মুচকি হেসে জবাব দেয় সুধন্য। 
বেশ। যা। তবে নিজের কথাও একটু ভাবিস। 
কী কথা? 
এই যে বাড়িটা ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে… 
সব হয়ে যাবে বাবা, বললাম তো… 
কিছু কিছু টাকা জমা সু। টাকা ছাড়া সব অচল। একা থাকিস। বিয়ে-থা করলি না। কখন কী হয় বলা যায় না!  
তুমি কি এসব ভেবেছিলে কখনও? ভাবলে আমাদের এইরকম হত না বাবা। মার চিকিৎসা করা যেত আরও ভালোভাবে। বুকের মধ্যে এই কথাগুলো অভিমান হয়ে জমে আছে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসতে চায়। কিছুতেই আটকাতে পারে না সুধন্য। 
বেসরকারি চাকরি করতাম সু। তুই জানিস। কত আর মাইনে পেতাম! 
জানি। কিন্তু বাবা, বুলু পিসিদের সংসারও তুমি টানতে। এতে আমাদের অভাব দিনে দিনে বেড়েই গেছে। অনেক টাকা ধার হয়ে গেছিল। ধারের পর ধার। এই সেদিন সেসব শোধ করলাম। 
ঋষিকেশ ধারের প্রসঙ্গ পাশ কাটিয়ে বুলুর কথায় চলে গেলেন। বুলুটা একটা ভুল করে ফেলেছিল। না-বুঝেই ঝপ করে তারককে বিয়ে করে ফেলল। মদ্যপ একটা ছেলে! বাড়িতে এসে বউকে পেটাত! 
ওদের ব্যাপার ওদেরই বুঝে নিতে দিতে পারতে। তোমার তো নিজের বোন নয়। কাকার মেয়ে। তাও দূর সম্পর্কের। 
দূর সম্পর্কের বলিস না সু। সম্পর্ক রক্ত দিয়ে হয় না। নান্টুকাকার কথা ভুলি কী করে বল? আমরা যখন খেতে পেতাম না ঠিক করে, নান্টুকাকাই কিন্তু আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর মেয়ে… 
বাবা এই রেকর্ডটা মাঝে মাঝেই বাজান। মাও বিরক্ত হতেন। সুধন্য চুপ করে যায় বাবার কথা শুনে। সে শুনেছে সবই। একসময় সত্যিই খুব উপকার করেছিলেন সেই দাদু। বুলুপিসি দুম করে তারককাকুর সঙ্গে পালিয়ে গেল। তারককাকু এপাড়াতেই ভাড়া থাকত মাকে নিয়ে। বিয়ে করে চলে গেল পাশের পাড়ায়। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। প্রচুর মদ খেত। কী দেখে যে বুলুপিসির মতো ঠান্ডা মেয়ে তারককাকুকে পছন্দ করেছিল কে জানে! মদ খেয়ে খেয়েই লোকটা মরে গেল। 
তুই কিন্তু বুলুর পাশে দাঁড়ালি না! অনুযোগের সুর ঋষিকেশের কণ্ঠে। 
এখন আর দরকার নেই বাবা। পিসি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করে। 
তা জানি। কিন্তু মাইনে খুবই কম। 
এই তো বললে নিজের কথা ভাবতে! এখনই আবার অন্য কথা বলছ বাবা? সুধন্য বাবার দিকে চোখ রেখেই সরিয়ে নেয়। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোয় দেখতে পায় উঠোনের গাছগুলো স্থির হয়ে আছে। মায়ের প্রিয় সবেদা গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একা। অনেকটা যেন তারই মতো। 
যা ঘুরে আয়। বেশি রাত করিস না।  
হ্যাঁ যাচ্ছি। কথা শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়ে সুধন্য। দরজায় তালা মেরে চাবিটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ভাবে, আজ একটু এলোমেলো ঘুরে আসা যাক। বাবার বলা ‘জনসেবা’ কথাটা হাওয়ায় পাক খাচ্ছিল। বোধহয় সবেদা গাছে ধাক্কা খেয়ে তার কানে এসে পৌঁছেছিল আবার। আর তখনই ঠিক করল, আজ আর বেরোবে না। তালা খুলে ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, দাদার কথা মনে পড়ে বাবা? বাবার চোখে চোখ রাখে সে। বিষণ্ণ ছায়া কি ঝুলে আছে চোখে? খোঁজার চেষ্টা করে সুধন্য। 
মনে তো পড়ে! খুবই মনে পড়ে! 
দাদার লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে তুমি বলেছিলে এই বডি আমার ছেলের নয়! এই ঘটনাটা মা আমাকে প্রায়ই বলত আর কাঁদত। তুমি কী করে পারলে? নিজের ছেলে… 
পারতেই হয়েছিল সু। তোর মাও বুঝতে চায়নি। তুইও না। রত্না আমাকে অনেকবার অনুযোগ করেছে। আমি সবার ভালোর কথা ভেবেই প্রদ্যুম্নর মৃতদেহ চিনেও চিনতে চাইনি। আমি যদি সেদিন বলতাম, হ্যাঁ, এটাই আমার ছেলের লাশ, তাহলে রেহাই পেতাম? রাষ্ট্রের চোখে ওর মতো অতি বামপন্থীরা অপরাধী। ও আমার ছেলে স্বীকার করলে পুলিশ কি আমাদের ছেড়ে দিত? ইন্টারোগেশনের নামে কম হ্যারাসমেন্ট করত? কিছুটা দৌড়ঝাঁপ করে, অনেক ধরাধরি করে ব্যাপারটা সামলানো গেছিল। এসব না-করলে তোর পড়াশোনা, আমাদের সুস্থির ভাবে টিকে থাকা এখানে সম্ভব হত, বল? পাড়াপ্রতিবেশী আমাদের সহজভাবে মেনে নিত? 
না নিলে না নিত! দাদা তো খারাপ কাজ কিছু করত না। হতদরিদ্র, খেতে না-পাওয়া মানুষগুলোর জন্য কাজ করত। সেটা তো অন্যায় ছিল না বাবা! 
তা ছিল না। কিন্তু পুলিশ কি সেসব শুনতে চায়? প্রশাসনের কাছে এসবের মূল্য নেই! 
তা বলে নিজের ছেলের লাশ… মাথাটা ঝাঁকায় সুধন্য। বাবার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। 
তোরা কেউ কি আমার কথা একবারও ভেবেছিস? নিজের ছেলের লাশ দেখেও অস্বীকার করতে হয়েছিল আমাকে। সে যে কী যন্ত্রণার তোরা বুঝবি না! 
তুমি কীরকম দেখেছিলে দাদাকে? 
এই জিজ্ঞাসাটা না-করলেও পারত সুধন্য। কেননা বাবার মুখে অনেকবারই শুনেছে। বাবা নিজেই বলেছিলেন। সে নিজেও কয়েকবার জিজ্ঞাসা করে জেনেছে। তবু বারবার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে। বাবারও যেন এর জবাব দিতে ক্লান্তি নেই। ঘোরের মধ্যে থেকে প্রতিবারই একই জবাব দিয়েছেন। 
দেখলাম আমার প্রদ্যুম্নর ডানাদুটো পাশে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। নিষ্প্রাণ শরীরের নানা জায়গায় রক্তের দাগ। ও সবসময় বলত, আমি পাখি। পাখির মতো উড়ি। উড়ে উড়ে দেখি মানুষের যন্ত্রণা। খারাপ থাকা। ওদের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করি। সেই পাখিটার ডানা থেমে গেল রে, একেবারেই থেমে গেল! জনসেবাই আমার ছেলেটাকে কেড়ে নিল। কেন যে এসব পথ বেছে নিয়েছিল, কে জানে! 
সুধন্য কোনও কথা বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে খাটের পাশে। 
বেরিয়ে আবার ফিরে এলি যে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি? 
নাহ্, শরীর ঠিকই আছে। আজ আর বেরোতে ইচ্ছে করছে না। কেমন যেন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। 
এই তো চা খেলি। সিগারেট খেলি। তাও ঘুম কাটল না? 
নাহ্। খুব ক্লান্ত লাগছে বাবা। খুব… 
তাহলে ঘুমো। বিশ্রাম নে। 
হ্যাঁ বাবা। কথাটা বলে পোশাক না-ছেড়েই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয় সুধন্য। 
তুই কি বিয়ে করবি না? আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ঋষিকেশ। 
না বাবা। আমার বাঁধা পড়তে ইচ্ছে করে না। 
বাঁধা বলিস না। আমি কি বাঁধা পড়েছিলাম? 
তুমি হয়তো পড়োনি। কিন্তু মা পড়েছিল। গান ভুলে গেল। ছবি আঁকা ভুলে গেল। বাসন্তী কলোনির ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের পড়াত। তুমি বাধা দিলে। মানুষের পাশে থাকা তো খারাপ কাজ নয় বাবা! 
না, খারাপ নয়। আসলে তোর দাদার কথা মনে পড়লেই কেমন যেন ভয় করত। এখন অবশ্য সমস্ত ভয়-টয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে এসেছি। 
ওসব তোমার অমূলক ভয় ছিল বাবা। 
আচ্ছা আচ্ছা, অনেক হয়েছে। বাবাকে সুযোগ পেলেই সমালোচনা করিস। মরে গিয়েও শান্তি নেই। এখন ঘুমো। 
ঘুম! কতদিন যে নিশ্চিন্ত ঘুম আমার আসে না বাবা! কিছুতেই আসে না! 
আচ্ছা, মাঝে মাঝেই মধ্যরাতে ছাদে চলে যাস। কেন রে? 
আকাশ দেখি। ওটা আমার মায়ের আকাশ। সেই আকাশে মাকে খুঁজি। 
তোর মায়ের আকাশ? তোর মা বলত বুঝি? 
হ্যাঁ। বিনুকাকা মাকে দিয়েছিলে একটুকরো আকাশ। মা সেটাকেই যত্ন করে ধরে রেখেছিল। 
বিনুকাকা আকাশ দিয়েছিল মানে কী? 
মারা যাবার কিছুদিন আগে একবার বিনুকাকা ফোন করেছিল মাকে। সেদিন ছিল মায়ের জন্মদিন। মা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘জানো বিনু, আজ আমার জন্মদিন। তোমার দাদার মনে নেই। কোনওদিনই মনে রাখে না অবশ্য।’ তখন বিনুকাকা মাকে বলেছিল, তুমি জানলা দিয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছ বৌদি? মা বলেছিল, হ্যাঁ পাচ্ছি। বিনুকাকা বলেছিল, যতটা আকাশ দেখতে পাচ্ছ, সেটা তোমাকে দিলাম। ওটা তোমার জন্মদিনের উপহার। আজ থেকে ওটা তোমার। সেই থেকে মা পুব আকাশের ঐ অংশটা নিজের মনে করত। আমি খুঁজে দেখি মাকে পাওয়া যায় কিনা সেখানে। 
বিনুটা কী যে ভালবাসত তোর মাকে! ছোট থেকেই আমাদের বাড়িতে আসত। খুব বৌদি বৌদি করত রত্নাকে। সবাইকে অবশ্য বলত, বৌদি আমার মায়ের মতো। সেই বিনুও কেমন হারিয়ে গেল! ওই তো প্রদ্যুম্নর মনে মানুষের কথা ভাবার মন্ত্রটা দিয়েছিল। 
চুপ করে বিনুকাকার কথা ভাবে সুধন্য। দাদার থেকে সামান্যই বড় ছিল। দুটো বাড়ির পরে থাকত। পাড়া সম্পর্কে বাবাকে দাদা আর মাকে বৌদি বলে ডাকত বিনুকাকা। দাদা কাকা ডাকলেও তুই করে বলত। দুজনের খুব ভাব ছিল। কীভাবে যেন দাদাও জড়িয়ে গিয়েছিল বিনুকাকার সঙ্গে। মাকে মাঝে মাঝে ফোন করত। তবে কোথা থেকে করত, জানাত না। দাদা কমই ফোন করত। বিনুকাকাই দাদার খবর জানাত মাকে। তার এইসব ভাবনার মধ্যেই ঋষিকেশ বলে উঠলেন, তুই শুধু আমার দোষ ধরিস। তোর মাও ধরত। 
তোমার দোষ ধরতাম না শুধু, ভালোও বাসতাম। তুমি বুঝতে পারতে না। এখনও ভালোবাসি। না-হলে তোমার ছবির সঙ্গে এত কথা বলি? মায়ের ছবির সঙ্গে তো বলি না! মা ছিল সবচেয়ে প্রিয়… 
মায়ের ছবির সঙ্গে কথা বলিস না হয়তো, তবে শোবার ঘরে তোর মাথার কাছের দেয়ালে মায়ের ছবি রেখেছিস। 
হ্যাঁ বাবা, আমি ঘুমোলে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সারারাত। 
বড় ছেলেকে হারিয়ে রত্না তোকে বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিল। 
ঠিকই বলেছ। তুমি আমাদের দুজনের মাঝখানে কঠিন পাঁচিলের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। তাই আমি আর মা দুজনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। 
আচ্ছা ঠিক আছে। আর বকবক করিস না। সেই ছোটবেলার মতো আছিস এখনও। এবার ঘুমো। 
সুধন্য চোখ বুজে বাবার স্পর্শ অনুভব করে। তার মধ্যেই বাবার ফিসফিসে গলা শুনতে পায়, আমরা ভাবতাম নতুন প্রজন্ম শুধুই ক্যারিয়ারিস্ট। কিন্তু ওরা ক্যারিয়ারের পাশাপাশি মানুষের কথাও ভাবে! এসব দেখে খুব তৃপ্তি পাই এখন। আমরা তো সংসারটাকেই মুখ্য ভেবে জীবন কাটিয়ে দিলাম! ভালো থাকিস সু। মানুষের পাশে থাকিস। 

হাওয়ায় পাক খেতে খেতে ঋষিকেশের কথাগুলো ভেসে বেড়ায় ঘরের মধ্যে। সুধন্য চুপ করে শোনে। ঘুম জড়িয়ে আসে তার চোখে। 

রবিবার, ২৮ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

 



আলেকজান্ডারের স্বপ্ন 


হেফাস্টিয়ান! অ্যারিস্টটল হলেন মহান গ্রিক দার্শনিক। তাঁর বুদ্ধিমত্তা কী পরিমাণ আমি জানি। আমি তাঁর কাছে পাঠগ্রহণ করেছি। তিনি একজন অপরিচিতকে বিশ্বাস করবেন কী করে? তাকে আমিই যে পাঠিয়েছি, তেমন নিশ্চিত হবেন কী করে তিনি? ধরা যাক, আমি পাঠিয়েছি সেটুকু বিশ্বাস করলেন। কিন্তু তিনি মৌখিক যে পরামর্শ দেবেন বা পত্র দেবেন, সেটা যে আমার দূত শত্রুপক্ষকে জানিয়ে দেবে না, তার নিশ্চয়তাই বা কোথায়? তাই আচরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানেন, এই ছাত্রের পক্ষে তাঁর সংকেত বোঝা সম্ভব, কিন্তু সকলের পক্ষে নয়। এজন্যই তিনি আমার কাছে নমস্য ব্যক্তি। এই কারণেই আমি তাঁকে এতটা ভরসা করি হেফাস্টিয়ান! 
উজ্জ্বল হয়ে উঠল হেফাস্টিয়ানের মুখ। তিনি বলে উঠলেন, সত্যিই মহান  গুরু অ্যারিস্টটল। তাঁর বুদ্ধি ও কৌশলের কাছে আমরা নিতান্তই শিশু। তবে মহামান্য সম্রাট, আপনিও আমাদের মহান রাজা। ঠিক তাঁর কৌশল বুঝতে পেরেছেন। এমনি এমনি তো আর বিরাট ভূখণ্ডের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেননি! এত দেশ জয়, এত রাজাদের বশ্যতা স্বীকার তো এমনি হয় না। আপনি বুদ্ধিমান এবং মহান। 
হেফাস্টিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্রাট আলেকজান্ডার প্রবীণ সেনাপতিদের সরিয়ে দিলেন ক্ষমতা থেকে। বয়স্ক কয়েকজন সেনাকে বাহিনীর পেছনের সারিতে নিয়ে গেলেন। যারা সম্রাটকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের প্রাণদণ্ড দিলেন একে একে। আর এতেই কাজ হল।  
কিছুদিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে  শৃঙ্খলা ফিরে এল। তরুণ সেনাধ্যক্ষরা খুশি মনে আর উদ্যমে কাজ শুরু করে দিলেন। এবার আলেকজান্ডার নিশ্চিন্ত। তাঁর স্বপ্ন ভারত অভিযান। সেই অধরা স্বপ্নের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।   
দিনাবসানের সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। আলেকজান্ডার তাঁবুতে বসে আছেন। কিছুক্ষণ আগেও বন্ধু হেফাস্টিয়ান ছিলেন তাঁর সঙ্গে। এখন তিনি একা। দিনের আলো মুছে গিয়ে নেমে এল সন্ধ্যা। দ্বীপাধারে আলো জ্বেলে দিয়ে গেছে নির্দিষ্ট কাজের লোক। আকাশে লক্ষ কোটি তারা ফুটে উঠে ঝলমল করছে। সেদিকে তাকিয়ে আছেন সম্রাট। কিছুক্ষণ বাদে এসে দাঁড়ালেন তাঁবুর বাইরে।  
রোক্সানেকে তাঁর কাছে আসার জন্য খবর পাঠিয়েছিলেন। সডগিয়ার ব্যারণের কন্যা রোক্সানে। অপূর্ব তাঁর শ্রী। প্রথম দেখাতেই আলেকজান্ডার মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। কিছুদিন আগে তাঁকেই বিবাহ করেছেন তিনি। রোক্সানে যখন মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান, আলেকজান্ডারের সমস্ত ক্লান্তি কেটে যায়। অদ্ভুত এক মাদকতায় ভরে যায় তাঁর মনপ্রাণ। 
এবার ভারত জয় করতে পারলেই তাঁর যুদ্ধ অভিযানের সমাপ্তি ঘটবে। তিনি ফিরে যাবেন নিজের দেশে, ম্যাসিডোনয়ায়। সেখানে গিয়ে রোক্সানের সঙ্গে শুরু হবে তাঁর নতুন জীবন। 
পিছন ফিরে দেখতে পেলেন রোক্সানে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। আলেকজান্ডার তাঁর জন্য অপেক্ষা না-করে নিজেই এগিয়ে গেলেন কাছে। আগামীকালই ভারত অভিযানে যাত্রা করবেন। দু-হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রেয়সীর দিকে। যে ঝলমলে তারাগুলো তিনি একটু আগে দেখছিলেন আকাশের কালো চাদরের গায়ে আঁকা আছে, সেই তারাগুলোই যেন রোক্সানের চোখেমুখে ঝলসে উঠছে। মুগ্ধ হয়ে সেই ঝিকিমিকি তারা দেখতে থাকলেন রাজা আলেকজান্ডার। ভারত অভিযানের পূর্বরাত্রে তাঁর মন খুশিতে নেচে উঠল।
( সমাপ্ত)

রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                                        


আলেকজান্ডারের স্বপ্ন


 

  তোমাকে কিছুই বলতে হবে না। শুধুমাত্র আমি যা যা করলাম সেটুকুই দয়া করে সবিস্তারে জানিও। তাহলেই বুঝতে পারবে তোমাদের রাজা। এবার তুমি এসো। ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন অ্যারিস্টটল।হতাশ হেরাস সম্রাটের গুরুর মাথার ব্যামো আছে নিশ্চিত হয়ে ঘোড়ার পিঠে গিয়ে উঠল।

(৩)

আলেকজান্ডারের কাছে এসে আধোবদনে দাঁড়াল হেরাস। ম্যাসিডোনিয়ার বীর রাজা তাকে দেখে খুশি হয়ে উঠলেন। এবার সহজেই সংকট নিরসন করা যাবে। ভাবলেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলেন, কী পরামর্শ দিলেন গুরুদেব?

আলেকজান্ডারের দিকে একবার তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিল হেরাস। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, আমাকে মার্জনা করবেন মহারাজ! আমি কোনও পরামর্শ আনতে পারিনি তাঁর থেকে!

তাঁর সঙ্গে কি তোমার দেখা হয়নি?  তিনি কি এখন এথেন্সে নেই?

দেখা হয়েছে মহারাজ। উনি আমার সবকথা শুনলেন মন দিয়ে। কিন্তু এই ব্যাপারে কোনও মতামত দিলেন না!

আজ তার মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত জেনে কুঁকড়ে রইল হেরাস।

আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছ! এত বড় স্পর্ধা তোমার? 

বিশ্বাস করুন মহামান্য! উনি সত্যিই কোনও পরামর্শ দেননি। আমার কথা শোনার পরেও ওনার কাণ্ডকারখানা দেখে আমি অবাক হচ্ছিলাম। শেষে বললেন, আমি যা যা করেছি সেটাই বোলো তোমাদের রাজাকে। তাহলে সে বুঝতে পারবে।

গুরুদেবও কি ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মেলালেন! ভাবলেন আলেকজান্ডার। নাকি আমাকে মিথ্যে কথা বলছে এই সেনা? গুরুদেবের সুপরামর্শ হয়তো জানিয়ে এসেছে আমার শত্রুপক্ষকে! মাথা গরম হয়ে উঠছে তাঁর। তবু বিচলিত না-হয়ে জানতে চাইলেন, গুরুদেব ঠিক কী কী করছিলেন আমাকে খুলে বলো।

এবার পূর্ণ চোখে তাকাল হেরাস। অবধারিত মৃত্যুর হাতছানি এগিয়ে আসছে তার দিকে বুঝতে পেরেছে সে। তবু গুরুদেবের সমস্ত কাণ্ডকারখানা সে বিস্তারিত জানাল।

প্রথমদিকে আলেকজান্ডার কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। পরে যখন বুঝতে পারলেন গুরুর ইঙ্গিত, তখন তাঁর মুখে ফুটে উঠল হাসি। বললেন, আমি বুঝেছি গুরুদেব কী বলতে চেয়েছেন। দীর্ঘ পথশ্রমে তুমি ক্লান্ত। এখন বিশ্রাম নাও। তার আগে সেফাস্টিয়ানকে একবার ডেকে দিও।

এসবের বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারল না হেরাস। মহারাজ মৃত্যুদণ্ডের বদলে তাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, এতেই তার ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। দ্রুত সে সম্রাটের সামনে থেকে সরে গেল।

প্রায় ছুটতে ছুটতে হেফাস্টিয়ান চলে এলেন সম্রাটের কাছে। এসেই জানতে চাইলেন, কী সংবাদ এনেছে হেরাস। আমি জানতে চেয়েছিলাম মহারাজ। কিন্তু ও কিছুই না-বলে চলে গেল। এতটা বেয়াদবি তো করার কথা নয়! এই সেনাকে হেফাস্টিয়ানই নির্বাচন করে দিয়েছিলেন। তাই উদ্বিগ্নতা তাঁকে ঘিরে রেখেছে।

আলেকজান্ডারের চোখমুখ থেকে ঝরে পড়ছে আলো। তিনি বললেন, হেরাস তোমাকে কী আর বলবে! ও নিজেই তো জানে না গুরু অ্যারিস্টটল কী নির্দেশনা পাঠিয়েছেন।

সম্রাটের কথাটা কেমন যেন হেঁয়ালির মতো মনে হল হেফাস্টিয়ানের কাছে। যে লোকটা নির্দেশ বয়ে নিয়ে এল, সে নিজেই জানে না! এ আবার কেমন কথা! সংশয় নিয়ে বললেন, আমাকে সব খুলে বলুন মহারাজ। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

আলেকজান্ডার অ্যারিস্টটলের ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ গুছিয়ে বললেন হেফাস্টিয়ানকে। কিন্তু তাঁর মাথায় কিছুই ঢুকল না। জিজ্ঞাসা করলেন, এমন অদ্ভুত আচরণের মানে কী সম্রাট?

গুরুদেব বোঝাতে চাইলেন বৃদ্ধ সেনাপতি আর সৈন্যদের অব্যাহতি দিতে, যাতে তরুণরা দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। তাই তিনি গাছের বড় বড় কয়েকটা ডাল ছেঁটে দিয়েছিলেন।

আর হলুদ ডালগুলো? জানতে চাইলেন হেফাস্টিয়ান। তখনও তাঁর ঘোর কাটেনি।

হলুদ ডালপালা কাটার অর্থ হল যারা কমজোরি, বা যুদ্ধের ব্যাপারে অনাগ্রহী, তাদের যুদ্ধের আয়োজন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। কেটে ফেলা ডালপালাগুলো মাটিতে পুঁতে দেওয়ার মানে কী জানো হেফাস্টিয়ান? এর অর্থ শত্রুদের এদের নিশ্চিহ্ন করে দাও।

কিন্তু মহারাজ, গুরুদেব তো খোলাখুলিই বলতে পারতেন দূতের কাছে। অন্তত একটা পত্র লিখে জানিয়ে দিতে পারতেন!

 

(ক্রমশ:)

চিত্র- অন্তর্জাল 

 



\

রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                        



আ

আমার মাথাতেও কিছু আসছে না মহারাজ। হতাশ গলায় হেফাস্টিয়ান কথাটা বলেই যোগ করলেন, এইসময় আমাদের দরকার ছিল গুরু অ্যারিস্টটলকে। তিনি সঠিক দিশা দিতে পারতেন।

ঠিক। একদম ঠিক বলেছ। আমার মাথাতেই আসেনি মাস্টারমশাইয়ের কথাটা। তাঁর পরামর্শ খুব জরুরি এখন। উনি আছেন এথেন্সে। তুমি দ্রুত যাও ওনার কাছে। ওনার মূল্যবান মতামত নিয়ে এসো।

এথেন্স এখান থেকে অনেক দূরে মহারাজ! সডগিয়ান থেকে সেখানে যাওয়া, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা, আবার ফিরে আসা... বিরাট সময়ের ব্যবধান। এই মুহূর্তে আপনার পাশে আমার সবসময় থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনাকে ছেড়ে কোথাও গিয়ে আমি স্বস্তি পাব না। তার চেয়ে একজন বিশ্বস্ত সেনাকে পাঠানো যেতে পারে। তার ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা যেভাবেই হোক এদের সামলাতে পারব।

কথাটা মনে ধরল অ্যালেকজান্ডারের। তিনি মনে মনে স্বীকার করলেন, হেফাস্টিয়ান সঙ্গে থাকা মানে মনোবল অনেকটাই বেড়ে যাওয়া। তাই বললেন, বেশ, তবে তাই করো। খেয়াল রেখো দূত যেন ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ না-করে। সে যেন গুরুর পরামর্শ ফাঁস করে না-দেয়।

আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ। আমি যাকে পাঠাব সে খুবই বিশ্বাসী। প্রাণ যাবে, তবু বেইমানি করবে না।

(২)

বিশ্বস্ত সেনা হেরাসকে পাঠানো হল এথেন্সে। সে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে, দীর্ঘদিন বাদে এসে পৌঁছল এথেন্সে। এখানে অ্যারিস্টটলকে সকলেই চেনে। তিনি একজন জ্ঞানী পুরুষ ও রাজা আলেকজান্ডারের গুরু হিসাবে পরিচিতি। তাই অতি সহজেই হেরাস পৌঁছে গেল অ্যারিস্টটলের গৃহে।

অ্যারিস্টটল তখন তাঁর ঘরে বসে আছেন। তাঁর চোখ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে। তবে তিনি যে কিছুই দেখছেন না তা বোঝা যাচ্ছে তাঁর বাহ্যজ্ঞানহীন দৃষ্টি দেখেই। কোনওকিছু নিয়ে তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। এমনকি ঘোড়ার পদশব্দও শুনতে পাননি তিনি, এতটাই নিমগ্ন হয়ে আছেন।

মহান রাজা আলেকজান্ডার আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। হেরাসের কথা অ্যারিস্টটলের কানে পৌঁছল না। তিনি ভেবেই চলেছেন কোনও গভীর বিষয়ে। হেরাস আবার বলল একই কথা। এবার বেশ জোরেই বলল সে।

সম্বিত ফিরল অ্যারিস্টটলের। তিনি মুখ ফিরিয়ে দেখলেন সেনাটিকে। হেরাস প্রায় একই কথা উচ্চারণ করল। তিনি তরুণ সেনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আলেকজান্ডার তোমাকে কেন পাঠিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে? তার কোনও বিপদ ঘটেনি তো!

না মহামান্য। বিপদ তেমন নয়। আবার বিপদও বলতে পারেন।

ভ্রু কুঁচকে উঠল অ্যারিস্টটলের। বিপদ নয়, আবার বিপদও! তুমি বোসো এখানে। তারপর সবিস্তারে বলো ঘটনাটা কী। কথাটা বলেই একটি পাথরের বেদি দেখিয়ে দিলেন অ্যারিস্টটল।

মহারাজার গুরু। তাঁর সামনে বসতে একটু ইতস্তত করলেও অবশেষে বসে পড়ল সেখানে হেরাস। এরপর আলেকজান্ডার ও হেফাস্টিয়ান যেমন করে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, হুবহু সেভাবেই বুঝিয়ে বলল অ্যারিস্টটলকে।

অ্যারিস্টটল কখনওই বক্তার কথার মাঝে কথা বলেন না। তিনি বক্তাকে বলতে দেন। তারপর নিজের মতামত দেন। এমনকি কারও ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়াও তাঁর নীতিবিরুদ্ধ। এক্ষেত্রেও হেরাসের কথা মন দিয়ে শুনলেন।

নিজের বলা শেষ হলে জিজ্ঞাসা করল হেরাস, এবার আপনি বলুন গুরুদেব, আমাদের মহান রাজার কর্তব্য কী? আপনার পরামর্শ নিয়ে দ্রুত ফিরে যাব সডগিয়ায়। সেখানে আপনার সুপরামর্শের আশায় অপেক্ষা করছেন আমাদের সম্রাট। 

অ্যারিস্টটল উঠে দাঁড়ালেন। একটি শব্দও উচ্চারণ না-করে চলে গেলেন পাশের ঘরে। তাহলে কি লিখবার সরঞ্জাম আনতে গেলেন গুরুদেব? শিষ্যকে লিখে জানাবেন তাঁর মতামত? ভাবল হেরাস। কিন্তু বিস্মিত হয়ে সে দেখল অ্যারিস্টটল একটা বিরাট আকারের ছুরি নিয়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। সোরেস আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে তো কোনও অন্যায় বাক্য বলেনি! মহারাজার হুকুম তামিল করেছে মাত্র! অ্যারিস্টটল তার দিকে দৃকপাত না-করে ছুরি নিয়ে চলে গেলেন বাগানের দিকে। তাকে যে হত্যা করতে ছুরি হাতে নেননি গুরুদেব, তাতেই সে আশ্বস্ত হয়ে তাঁর পিছন পিছন চলে এল বাগানে। অবাক হয়ে দেখল অ্যারিস্টটল ছুরিটা দিয়ে একের পর এক গাছের শুকনো ডাল কেটে চলেছেন। হলুদ হয়ে যাওয়া ডালপালা ছেঁটে দিচ্ছেন তিনি। কী আশ্চর্য! একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় জানতে সে এখানে এসেছে, সেসব গুছিয়ে বলেওছে। আর অ্যারিস্টটল সেসবের জবাব না-দিয়ে গাছপালা কাটছেন! হেরাসের মনে হল, আমাদের সম্রাট বদরাগী। আচমকা সেনা বা সেনাপতির ওপর রেগে যায়। যদিও সেই রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।  আর তাঁর গুরুদেব কেমন যেন আধ-পাগল। সবকিছু শুনেই নির্বিকার হয়ে বাগান পরিচর্যা করে চলেছেন। রাজার গুরু বলে কথা! তাঁর সঙ্গে তো আর খারাপ আচরণ করা যায় না। অপেক্ষা করতেই হবে তাকে। এই ভেবে হেরাস চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তফাতে।

কিছুক্ষণ পরে সমস্ত কেটে ফেলা ডালপালা জড়ো করে একটা গর্তের মধ্যে ফেললেন অ্যারিস্টটল। বিড়বিড় করে বললেন, এগুলো এখানে জমা থাক। এর থেকে ভালো সার হবে। এই বলে তিনি বাগানের মধ্যে থাকা একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন। বহুক্ষণ বাদে গুরুদেবের মুখে এইটুকু বাক্য শুনতে পেল হেরাস। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে বলল, আমাকে আপনার পরামর্শটা জানান মহামান্য। আমি দ্রুত ফিরে যেতে চাই। মহারাজা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন।

অ্যারিস্টটল মুখ তুলে তাকিয়ে ভালো করে জরিপ করলেন তরুণ সেনাটিকে। তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, আলেকজান্ডার যা জানতে চেয়েছে, আমি তো তার জবাব দিয়ে দিয়েছি!

জবাব দিয়ে দিয়েছেন! কখন দিলেন! এই নিয়ে তো একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি গুরুদেব! এবার সে নিশ্চিত হয়ে গেল, সে যা ভেবেছিল, ঠিক তাই। এই বৃদ্ধ ছিটগ্রস্ত। তবু সে আর-একবার জানতে চাইল, তাহলে আমি মহারাজাকে গিয়ে কী বলব?

 

(ক্রমশ:)

চিত্র- অন্তর্জাল 

রবিবার, ৭ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                                                    






আলেকজান্ডারের স্বপ্ন


 

হেফাস্টিয়ান, অত্যন্ত জরুরি ব্যপারে তোমাকে ডেকেছি। আলেকজান্ডার তাঁর প্রিয় সহচর ও প্রধান পরামর্শদাতার দিকে তাকিয়ে বললেন।

বলুন মহারাজা! আপনি কি নতুন কোনও অভিযানের কথা ভাবছেন? বেশ কিছুক্ষণ আগেই রাজা আলেকজান্ডারের সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন আবার তাঁকে ডেকে পাঠানোয় একটু অবাকই হয়েছেন হেফাস্টিয়ান।

হুম। ঠিকই ধরেছ। এই কারণেই তোমাকে এত ভালোবাসি  হেফাস্টিয়ান।

স্মিতহাস্যে আলেকজান্ডারের প্রশংসা উপভোগ করলেন হেফাস্টিয়ান। তিনি জানেন ম্যাসিডোনিয়ার রাজা, সদ্য পারস্যজয়ী আলেকজান্ডার তাঁকে কতটা ভরসা করেন। তিনিও তার প্রতিদান দেন সর্বদা সুপরামর্শ দিয়ে। তিনি মহারাজের প্রায় ছায়াসঙ্গী বলা যায়। মুখের হাসি ধরে রেখেই হেফাস্টিয়ান বললেন, এবার কোনদিকে আমাদের বিজয়রথ এগিয়ে নিতে চান রাজা?

ভারতবর্ষ! আমি এই মুহূর্তে ভারতবর্ষ অভিযান ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। সোনার এক দেশ ভারতবর্ষ। এশিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

বেশ মহারাজ। আমরা তাহলে তারই প্রস্তুতি নিই।

কিন্তু হেফাস্টিয়ান, শুধু ভারতবর্ষ অভিযানের কথা বলার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠাইনি। তা নিশ্চিত তুমি বুঝতে পেরেছ। আমি সংবাদ পেয়েছি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে আমারই কয়েকজন সেনাপতি। সে ব্যাপারেই তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।

ষড়যন্ত্র? মুখের রেখায় যতটা সম্ভব বিস্ময় এঁকে বললেন হেফাস্টিয়ান। ইতিমধ্যে তাঁর কানেও এইরকম একটি সম্ভাবনার কথা এসেছে। কিন্তু নিশ্চিত না-হয়ে রাজাকে বিষয়টা বলতে চাননি তিনি। এদিকে জেনেও তাঁকে না-জানানোর ব্যাপার বুঝতে পারলে ক্ষুব্ধ হবেন রাজা। তাই বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে তুলতেই হয়েছে। অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আপনাকে এই সংবাদ কে দিল মহারাজা?

গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি আমি। এবং নির্ভুল সংবাদ। বেশ জোরের সঙ্গে বললেন আলেকজান্ডার।

যে সূত্র থেকে হেফাস্টিয়ান ষড়যন্ত্রের কথাটা শুনেছেন, তার কথা ঠিক বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। আলেকজান্ডারের মতো এমন একজন রাজার বিরোধিতা কেউ করতে পারে! গভীর ভাবনায় তিনি যখন ডুবে আছেন, তখন আলেকজান্ডার বলে উঠলেন, আমি ম্যাসিডোনিয়ার সন্তান। তাই ম্যাসিডোনিয়ান ভাষায় কথা বলি। মাতৃভাষায় কথা বলতে আমার সবথেকে ভালো লাগে। গ্রিক সেনাপতিরা এতে নাকি ক্ষুব্ধ! তাদের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগে! গ্রিক হল মহান কবি হোমারের ভাষা। আমার গুরু অ্যারিস্টটলের ভাষা। আমি তো সেই ভাষাতেও কথা বলি মাঝে মাঝে! তাও এদের এত ক্ষোভ?

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন হেফাস্টিয়ান। তাঁর মনে পড়ে গেল, কয়েকদিন আগেই আলেকজান্ডার বিশাল সেনা সমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে সেনাপতিদের নাম ধরে ডাকছিলেন। গ্রিক সেনাপতিদের সঙ্গে গ্রিক ভাষাতেই কথা বলছিলেন। এসব ভেবেই হেফাস্টিয়ান বললেন, আপনি বিচলিত হবেন না মহারাজ! ম্যাসিডোনিয়ার সৈন্যসংখ্যা পঁয়ত্রিশ হাজার। আর গ্রিক সেনাদের সংখ্যা মাত্রই সাত হাজারের কিছু বেশি। গ্রিকরা খুব-একটা সুবিধে করতে পারবে না।

তা ঠিক হেফাস্টিয়ান। তবে শত্রু যত সামান্যই হোক তাদের অবহেলা করা যথাযথ মনে করি না আমি। আসলে আমি চাই ষড়যন্ত্রের বিনাশ হোক। ষড়যন্ত্র যদি সত্যিই দানা বাঁধে, তাহলে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তখন সেনাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না ঠিকভাবে। আমি সেইরকম পরিস্থিতি আসুক চাইছি না।

ঠিক বলেছেন মহারাজ। সবার আগে প্রয়োজন এই ষড়যন্ত্রকারীদের শক্ত হাতে দমন করা।

ঠিক। ঠিকই তাই। তুমি ভাবতে পারো হেফাস্টিয়ান, অশ্বারোহী কমান্ডার ফিলোটাসকে আমি বন্ধু মনে করি। তাকে নানাভাবে সুযোগসুবিধা দিই। সেও কিনা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে! সেনাপতি ক্লোটিয়াস, আমারই মাতৃভূমি মেসিডোনিয়ার সন্তান। সেও ষড়যন্ত্র করছে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার! আমাকে এরা হত্যা করতে চায়!

এদের কঠিন শাস্তি দিন মহারাজ। মৃত্যুদণ্ডই এদের প্রাপ্য।

এত দ্রুত কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না হেফাস্টিয়ান। আরও ভেবে দেখতে হবে। এতদিন ধরে এরা আমার সঙ্গে আছে। নানা যুদ্ধে আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। আচমকা তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আরও একটু ভাবতে দাও। এদের অভিসন্ধি ভালোভাবে না-জেনে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে হেফাস্টিয়ান।

রাজার কথা শুনে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন হেফাস্টিয়ান। কিন্তু আর কোনও মন্তব্য করলেন না। আলেকজান্ডারের মতামতের অপেক্ষায় থাকলেন।

এরা আসলে ভারতবর্ষ অভিযানে যেতে চাইছে না। সৈন্যদেরও ভুল বোঝাচ্ছে। আমি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলাম, ভারতবর্ষ অভিযানই আমাদের শেষ অভিযান। এই দেশ জয় করে আমরা ফিরে যাব আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে। এটুকু ধৈর্য তাদের থাকবে না! গ্রিকরা বীরের জাতি। তাদের পক্ষে যুদ্ধ না-করার বাহানা মেনে নেওয়া যায় না হেফাস্টিয়ান! অধৈর্য হয়ে বললেন আলেকজান্ডার।

সত্যিই তাই। আমাদের কাছে আছে বিশাল সেনাবাহিনী। তারা যুদ্ধে ভীষণ দক্ষ। এমনিতেই আমাদের বিশাল সাম্রাজ্য। আরও অনেক রাজ্য জয় করে অনায়াসে আমরা সাম্রাজ্য বাড়িয়ে নিতে পারি। বললেন আলেকজান্ডারের পরামর্শদাতা।

সেকথাই তো বলতে চাইছি হেফাস্টিয়ান। কত সৈন্যসামন্ত আমাদের। নানা দেশের। নানা জাতির। অথচ কী আশ্চর্য, সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র করছে আমার স্বদেশের মেসিডোনিয়ান আর গ্রিকরা! এই সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতেই হবে। ভারতবর্ষ অভিযান আমার স্বপ্ন হেফাস্টিয়ান। একে সফল করতেই হবে। তারপর ফিরে যাব স্বদেশে। কিন্তু কীভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় ভাবতেই হবে।


(ক্রমশ:)

চিত্র- অন্তর্জাল 

রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                       





নদীকথা 


নদীটি আমার কাছে নিয়মিত আসে। 

ঠিক যখন দিবালোক কেড়ে নিতে 

চুপিসারে আসে সান্ধ্যকাল। 

তিরতির বয়ে যায় আর 

একা একা গেয়ে যায় জীবনের গান। 



আমি তাকে কোনোদিন গাইতে বলি না।  

আমি তাকে কোনোদিন আসতেও  বলি না।  

তবু সে ঠিকই আসে 

গান নিয়ে 

কথা নিয়ে 

আর আনে 

বাংলাভাষার অহংকার। 



এই মহার্ঘ্যের জন্যই আমি তাকে 

বুকে এঁকে রাখি আজীবন।


চিত্রঋণ_ জয়ীতা ব্যানার্জী

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

যুগান্তর মিত্র

                                     

খোকন রে তুই ঘরে আয়


খোকন সামন্ত পুলিশে চাকরি করতেন। আমরা বলতাম খোকনকাকু। তাঁর ছেলে সুব্রত আমাদের বন্ধু। আমরা এক ক্লাবে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতাম। ক্যারাম পেটাতাম। 

পুলিশে চাকরি করলে কী হবে, এমন নিপাট গোবেচারা মানুষ আগে দেখিনি। আসলে পুলিশে চাকরি করা মানেই রাশভারী মানুষ হবেন, এমনটাই আমাদের ধারণা ছিল। তাঁর মতো এমন সরল-সাধাসিধে লোক আমাদের এলাকায় ছিলেন না, এমনকি এইরকম পুলিশ অথচ ঠান্ডা মানুষ আছেন কিনা, আমাদের সন্দেহ ছিল। আমরা অবশ্য কোনওদিনই খোকনকাকুকে পুলিশের পোশাকে দেখিনি। বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন। তাই সুব্রতরা যখন আমাদের এলাকায় এসেছিল, ক্লাশ নাইনে ভর্তি হয়েছিল আমাদের স্কুলে, তখন ওর বাবা রিটায়ার করে গেছেন। আগে ওরা বরানগরের দিকে ভাড়া থাকত। রিটায়ারমেন্টের পর আমাদের নৈহাটিতে এসে ফ্ল্যাট কিনেছেন খোকনকাকু।  

সুব্রত প্রথমদিকে খুব রাগ রাগ ভাব দেখাত। ধুর ধুর, বরানগরের মতো জায়গায় থাকার পর কেউ এই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে এসে ওঠে? ওর কথায় আমরা খুব রেগে যেতাম। আমাদের অঞ্চল মোটেও ধ্যাড়ধ্যাড়ে বলার মতো নয়। নিজেদের এলাকার অবমাননা ঠিক মেনে নিতে পারিনি। এই নিয়ে অনেক তর্কও করেছি একসময়। পরের দিকে সুব্রত নিজেই জায়গাটাকে ভালোবেসে ফেলল। ক্লাশ টেনে ওঠার পরে মৃত্তিকার সঙ্গে ওর প্রেম হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই মৃত্তিকার জন্মস্থানের মাটিকে ও ভালোবেসে ফেলেছিল। যদিও সেই প্রেম বেশিদিন টেকেনি। 

খোকনকাকু ছিলেন ছয় ফুটের ওপর লম্বা। দশাশই চেহারা। কিন্তু মুখটা দেখলে বয়স বোঝা যেত না। যেন কৈশোর কাটেনি। গায়ের রঙ কালো। মুখ থ্যাবড়া। নাক বোঁচা। চোখের মণিদুটো ঘন কালো। ঠোঁট ফাঁক হলেই সাদা ধবধবে দাঁতগুলো দেখা যেত। অনেকটা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ভিলেনের মতো বড়সড় চেহারা। অথচ একেবারে মাটির মানুষ। এই লোকটাই একসময় পুলিশ ছিলেন! মেলাতে পারতাম না ঠিক। তবে ভিলেনের মতো মোটা মোটা গোঁফ ছিল না খোকনকাকুর। একেবারে ক্লিন সেভ। প্রতিদিনই মনে হয় সেভ করতেন। কালো মুখে ক্লিন সেভ থাকলে কেমন যেন দাড়িগোঁফের জায়গাটা সাদাটে লাগে। ঠিক সাদা নয়, অনেকটা ছাই-ছাই রঙের। আগে কখনও এইরকম মুখ দেখিনি। তাই বুঝতে পারতাম না ক্লিন সেভের কালো মুখ কেমন লাগে। 

খোকনকাকু যখন সাইকেল চালাতেন, তখন তাঁকে দেখেই আমাদের হাসি পেয়ে যেত। অনেক দূরে লোক আছে। তবু টিং টিং করে বেল বাজাতেন তিনি। সাইকেল চালাতেনও খুব আস্তে। যেন রাস্তার ব্যথা লাগবে। যেন সাইকেল জোরে চালালে সাইকেলটার কষ্ট হবে। 

ওনাকে আমাদের জেঠু ডাকাই উচিত ছিল। কিন্তু সুব্রত চাইত না ওর বাবাকে জেঠু ডাকি। বন্ধুত্বের শুরুর দিকে পলাশ একদিন বলেছিল, জেঠুকে দেখলাম সাইকেলে করে কোথায় যাচ্ছেন। বাজারে যাচ্ছিলেন নাকি?  

সুব্রত অবাক হয়ে বলল, জেঠু কে? কার কথা বলছিস? 

তোর বাবার কথা বলছি। 

মুখ গম্ভীর করে সুব্রত বলেছিল, আর কক্ষনও আমার বাবাকে জেঠু বলবি না। কাকু বলবি। কাকাবাবুও বলতে পারিস। কিন্তু জেঠু নয় কিছুতেই। জেঠু ব্যাপারটাই আমার কাছে খারাপ লাগে। 

কেন কেন? আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম। 

সে অন্য একদিন শুনিস। পরে কখনও বলব। 

আর সেই অন্য একদিন আসেনি। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, ওর কোনও জেঠু আছেন বা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ওদের সদ্ভাব নেই। বা তিনি অত্যন্ত খারাপ লোক। নিজেদের মতো করে বুঝে নিয়ে এই ব্যাপারে আর প্রশ্ন করিনি। কাকিমা, মানে সুব্রতর মা অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন। গায়ের রঙ যেন ফেটে পড়ছে। আমরা সুব্রতর আড়ালে ওর বাবা-মাকে নিয়ে মজা করতাম। আসলে আগে পুলিশ ছিল আমাদের কাছে ভয়ের ব্যাপার। কিন্তু খোকনকাকুকে দেখার পর সেই ভয় কেটে গিয়েছিল। শুধু ভয় কাটাই নয়, আমরা সুব্রতর আড়ালে ‘খোকন খোকন করে মায়…’ ছড়াটাও বলতাম মজা করে। তবে ‘মায়’-এর জায়গায় বলতাম ‘কাকিমায়’। ফলে খোকন খোকন করে কাকিমায় উচ্চারণে ছড়ার ছন্দ একটু টাল খেয়ে যেত। তাতে আবশ্য আমাদের তেমন যেত-আসত না। 

পুলিশের ছেলে আমাদের বন্ধু, এও ছিল আমাদের গর্বের বিষয়। ঐ বয়সে সুব্রতর মতো কেউ আমাদের ছয়-সাতজনকে ডেকে আলুকাবলি খাওয়াচ্ছে, শীতের সন্ধ্যায় ব্যাডমিন্টন খেলার সময় কর্ক কিনে আনছে দৌড়ে গিয়ে, এমন বন্ধুকে মনে মনে হিরো ভেবে নিয়েছিলাম। তাছাড়া সেইসময় আমাদের সবারই ঘরবাড়ি ছিল। চেনা কারও মধ্যে শুধু সুব্রতরাই ফ্ল্যাটে থাকত। সেই কারণেই ওদের নিয়ে আলোচনা হত আমাদের মধ্যে। ওর বাবা ও মায়ের মধ্যে চেহারার বৈপরীত্যও ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়। 

কেউ হয়তো বলত, খোকন সামন্তকে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট কী দেখে নিয়েছিল রে? চেহারা দেখে? পুলিশের কাজটা কি শুধু শরীর দিয়ে হয়? তার মেজাজ থাকবে না? তখনও ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া যায় এমন কথা আমরা শুনিনি। হয়তো পাল্টা কেউ বলে উঠত, কী দেখে কাকিমা এইরকম কুৎসিত লোকটাকে বিয়ে করলেন কে জানে! কেউ জবাব দিত, টাকা দেখে। তাছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আমরা সবাই হেসে উঠতাম। তবে কাকুর প্রতি কাকিমার ভালোবাসা দেখে আমাদের সেই হাসি দীর্ঘস্থায়ী হত না। এমন স্বামী-অন্ত মহিলাও আমরা তখন দেখিনি। সবসময়ই কাকুর দিকে খেয়াল রাখতেন, ছেলেকে আগলে রাখতেন, এমনকি ছেলের বন্ধুরা গেলেও ভালোবাসা ঝরে পড়ত তাঁর থেকে। এমন কেউ টাকার লোভে বিয়ে করতে পারেন, আমাদের বিশ্বাস হত না। 

কয়েক বছর পরে খোকনকাকু মারা গেলেন। আমরা তখন গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে কেউ চাকরি খুঁজছি, কেউ মাস্টার্সের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছি। এমন একটা সময় বচা এসে আমাদের জনে জনে বলে গেল সুব্রতর বাবা মারা গেছেন, আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে। বচা আমাদের বন্ধু আর সুব্রতদের ফ্ল্যাটের কাছাকাছিই ওদের বাড়ি। ফলে সবার আগে ও খোকনকাকুর মারা যাওয়ার খবর পেয়েছে। 

শীতের সন্ধ্যায় আমরা মন ভার করে চলে গিয়েছিলাম সুব্রতদের ফ্ল্যাটে। গিয়ে দেখি লম্বা মানুষটা শুয়ে আছেন, যেন ঘুমিয়ে আছেন। সাদা চাদরে সারা শরীর ঢাকা। শুধু নির্বিকার মুখটা আঢাকা। সেই প্রথম খোকনকাকুকে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম আমরা। ফ্ল্যাটের দু-একজন দাঁড়িয়েছিলেন ইতস্তত, স্পষ্ট মনে আছে। আর কাকিমা কেঁদে চলেছেন নীরবে কাকুর পায়ের কাছে বসে। আমাদের দেখেই সুব্রত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ওর চোখেমুখে শোকের ছায়া। ভীষণ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল ওকে। আমরাও বিমর্ষ ছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সবার মধ্যে একটা আলাদা উত্তেজনা চলে এল। এর আগে মরা পোড়াতে শশ্মানে গিয়েছিলাম বার কয়েক। কিন্তু তখন ছিল শুধু সঙ্গ দেওয়া। সেই প্রথম মরা পোড়ানোর যাবতীয় দায়িত্ব আমাদের ওপর দিয়েছিল সুব্রত। পুলক জিজ্ঞাসা করেছিল, তোদের কোনও আত্মীয়স্বজন নেই? আসলে আমাদের সেই দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে সংশয় ছিল। আত্মীয়স্বজনেরা চলে এলে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হতে পারে। পুলকের প্রশ্নটা তাই আমাদের সবারই ছিল। 

আরে না না, আমাদের তেমন কেউ নেই। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলেছিল সুব্রত। থাকলেও আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ রাখে না। আমরাও কাউকে পুঁছি না। এই কথাটা বলার সময় সুব্রতর মুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। আমরা ক্রমশ নিশ্চিন্ত হচ্ছিলাম দায়িত্বটার ব্যাপারে। সেই সময় সুব্রত আরও স্পষ্ট করে বলে দিল, যা করার তোদেরই করতে হবে। আমি আর কতদিক সামলাব, বল? 

সুব্রত কীভাবে যেন এর মধ্যেই ম্যাটাডোর জোগাড় করে ফেলেছিল। সেইসময় কাঁধে করে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হত। তাই ম্যাটাডোরের ব্যবস্থা করায় আমরা অবাক হয়ে সুব্রতর দিকে বার কয়েক দেখেছিলাম। মরা নিয়ে ম্যাটাডোরে যাওয়ার ব্যাপারটাও আমাদের উত্তেজনা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা সেদিন দলবেঁধে শ্মশানে গিয়েছিলাম। আমরা বন্ধুরা ছাড়াও ফ্ল্যাট ও আশেপাশের আরও কয়েকজন ছিল। ভালো মানুষ, ঠাণ্ডা মানুষ খোকনকাকুর চেহারা চিরকালের জন্য আমাদের থেকে হারিয়ে যাবে ভেবে খারাপ লাগছিল আমাদের। গরিফার রামঘাট শ্মশানের পাশে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে সুব্রত বলেছিল, ঠিক সন্ধ্যায় ছটা ছাপ্পান্ন মিনিটে বাবা চলে গেলেন। ছটা ছাপ্পান্ন। 

সুব্রত কেন যে মৃত্যুর সময়টা দুবার করে বলেছিল জানি না। তবে বিল্টু বলে উঠেছিল, সময়টা একটা ফ্যাক্টর জানিস? আমার ঠাকুরদা মারা গেছেন শুক্লা পঞ্চমীতে, সকাল সাতটা তেরো মিনিটে। সেই সময়টা ছিল খুব ভালো। প্রিয়জন মরার সময় আবার ভালো হয় কী করে, আমরা কেউ বুঝিনি। গঙ্গার দিক থেকে বিল্টুর দিকে চোখ সরিয়ে সুব্রত বলেছিল, তাই? ছটা ছাপ্পান্ন সময়টা কেমন জানি না, তবে আমার বাবা খারাপ সময়ে মরতে পারেন না। বরং আমাদেরই খারাপ সময় আসছে হয়তো। 

আমরা সুব্রতর কথা শুনে সবাই চুপ করেছিলাম। ওর কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তবে কথা আর এগোয়নি। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের ডাক এল। তারপর শ্মশ্মানের পুরোহিতের কাজ, ডোমেদের তৎপরতা, খোকনকাকুর শরীর ছাই হয়ে যাওয়া, সব একে একে ঘটে গেল আমাদের চোখের সামনেই। শুধু শেষকৃত্যই নয়, বাবার শ্রাদ্ধের কাজেও আমাদের দায়িত্ব ছিল পুরোটাই। জান লড়িয়ে আমরা সব কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম আমরা। 

সুব্রত আর মাস্টার্স করতে চাইল না। কীভাবে যেন ও পুলিশে চাকরি পেয়ে গেল। আমরা নিজেদের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকলাম যে-যার মতো। অনেক বন্ধুর মধ্যে শেষপর্যন্ত আমরা পাঁচজন আর সুব্রত, এই ছ-জনের মধ্যে যোগাযোগ থেকে গেল। শান্তনু, অঞ্জন, আমি আর পুলকও একে একে চাকরি পেয়ে গেলাম সরকারি বা বেসরকারি। একমাত্র শেখর পারিবারিক বইয়ের ব্যবসায় যোগ দিয়েছিল।  

খোকনকাকুর মৃত্যুর প্রথম বছরে আমাদের ডেকেছিল সুব্রত। বলেছিল, বাৎসরিক নামে কিছু করছি না। এসবের কোনও মানেও নেই, বুঝলি? পুরোহিত গুচ্ছের টাকা নেবে। আমি ভাবছি, বাবার একটা স্মরণসভা করব। মানে আমার মা আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা থাকবে। বাবার ছবি সামনে রেখে বাবা সম্পর্কে যে যেমন জানি বলব। তোরা আসবি তো? 

এইরকম আহ্বানে না-যাওয়ার কোনও কারণ নেই। সবাই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। সুব্রত বলেছিল, তোরা কিন্তু ঠিক সন্ধ্যা ছটা ছাপ্পান্ন মিনিটের মধ্যেই চলে আসবি। ঐ সময়ই ধূপকাঠি জ্বেলে বাবার স্মরণসভা শুরু করব। সময়টা একটা ফ্যাক্টর, মনে রাখিস। অবিকল পুলকের মতো শেষ কথাটা বলেছিল সুব্রত। 

ছটা ছাপ্পান্নর আগেই আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম সবাই। চন্দন দিয়ে সাজানো সাদা-কালো খোকনকাকুর ছবির সামনে গোল হয়ে বসেছিলাম সকলে। সুব্রত ঘড়ি দেখে ঠিক ছটা ছাপ্পান্নতে ধূপকাঠি জ্বালিয়েছিল আর কাকিমা দেশলাই কাঠি দিয়ে মোমবাতিতে আগুন দিয়েছিলেন। সেদিনই আমরা জানতে পারলাম, কাকিমার গলায় গান শুনতে ভালোবাসতেন কাকু। কাকিমাও যে এত ভালো গাইতে পারতেন, আমাদের জানা ছিল না। কাকুর একটা প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত যন্ত্রণার কথামালা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল কাকিমার গলা থেকে। আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে…। কাকিমা যখন গাইছিলেন, নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্য লেশ,… তখন ঘরের মধ্যে বাতাস যেন গুমরে উঠছিল। 

এরপর থেকে প্রতিবছর ঐদিনে আমরা ছ-জন আর কাকিমা চলে-যাওয়া মানুষটার ছবির সামনে বসতাম। এক মিনিট নীরবতা পালন করতাম। এছাড়া নানা কথা হত। কাকিমা মধুর কণ্ঠে কাকুর প্রিয় নানা গান গাইতেন। তবে কাকিমা মারা যাওয়ার পরে আর আমাদের বসা হয়নি। কিন্তু প্রতিবছর ছটা ছাপ্পান্ন মিনিটে ঘড়ির দিকে ঠিক চোখ পড়ে যায় আমাদের, হাতের কাজ থেমে যায়, কাকুর মুখ ভেসে ওঠে মনে। 

একবছর আমার উদ্যোগেই কাকুর মৃত্যুদিনে আমরা বন্ধুরা মিলিত হয়েছিলাম সুব্রতর বাড়িতে। কেননা ততদিনে সুব্রত বাবার স্মরণসভা করার ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। কাকিমার স্মরণেও কোনও সভা করতে চাইত না। সেবার আমিই জোর করলাম। সুব্রত রাজি হল। আসলে কেন যেন প্রায়ই খোকনকাকুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। খারাপ স্বপ্ন নয়, কিন্তু একটা অস্বস্তি ঘিরে থাকত সারাদিন ধরে। তখনও আমরা কেউ বিয়ে করিনি, সংসারে জড়িয়ে পড়িনি। 

ঠিক ছটা ছাপ্পান্ন মিনিটে ধূপকাঠি জ্বালিয়েছিল সুব্রত। তারপর মোমবাতি। কাকিমা নেই বলে এই কাজটা ওকেই করতে হয়েছিল। একটা চেয়ারে কাকুর ছবিটা রেখেছিল সুব্রত। ঠিক পাশেই ছিল কাকিমারও ছবি। আমরা দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের পর দেখলাম, সুব্রত সামনে দুহাত প্রসারিত করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। ওর দেখাদেখি আমরাও সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। সবাই চোখও বন্ধ করে রেখেছিলাম সুব্রতর মতো। আচমকা আমার কানে ভেসে এল সুরেলা কণ্ঠের আওয়াজ, “সাতটা কাকে দাঁড় বায়,/খোকন রে তুই ঘরে আয়।” চোখ খুলে কাউকেই দেখতে পাইনি। তবে আমাদের হাত বাড়িয়ে রাখার ভঙ্গিটা ছিল অনেকটা মাঝির মতোই। যেন আমাদের সাতজনের হাতেই আছে একটা করে দাঁড়। 

আমার ঠাকুমা বলতেন, বিমলের কথা খুব মনে পড়ে রে। কী তরতাজা পোলা ছিল। লেখাপড়ায়ও ভালো ছিল। কী যে মাথায় চাপল পোলাটার! সব ছাইড়া বনেজঙ্গলে ঘুইরা বেড়াইত নাকি। সমাজ বদলাইব হ্যারা! গুলি-বন্দুক নিয়া কি বদল হয়? একই তো আছে সব। ঘরের খোকা একবার বাইর হইলে আর ফেরে না। 

সেদিন দাঁড় হাতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, খোকনকাকু আর ফিরবেন না। মৃত্যুই নয় শুধু, ঘর ছেড়ে একবার বেরিয়ে গেলে খোকারা আর ফেরে না। আমাদের দাঁড় বাওয়ার কোনও মানে নেই তাই। তবু আমরা দাঁড় বেয়েই চলেছি। আর কে যেন অলক্ষে ডেকে চলেছে, খোকন রে তুই ঘরে আয়...।