কাজল সেন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কাজল সেন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

কাজল সেন

                                  



অমীমাংসিত খেলা

“আসলে বুঝলি, অনিরুদ্ধ ড্রিবলিংটা এত ভালো করে যে, ওকে আটকে রাখা খুব মুশকিল। আর ঐ

ড্রিবলিং করতে করতেই অনায়াসে পৌঁছে যায় একেবারে বিপক্ষের গোলপোস্টের মুখে”।

হঠাৎ তেড়িয়া হয়ে সান্টু বলল, “তুই থাম তো মনা! অনিরুদ্ধ ভালো ড্রিবলিং করে! আরে ব্রাদার,

শুধু ড্রিবলিং করলেই কি ভালো ফুটবলার হয় নাকি! ঘেঁচু হয়। ড্রিবলিং-এর সাথে সাথে ট্যাকেলিং

আর শ্যুটিংটাও জবরদস্ত হওয়া দরকার, বুঝলি?”

ত্রিদিব পাশে বসে একমনে সিগারেট টানছিল। কথাটা শুনে ফোড়ন কাটল, “আবে গুরু, আজকের দিনে

শুধু ঐটুকুতে চলে না, বুঝেছিস? ফুটবল এখন অনেক আধুনিক হয়ে গেছে। পাসিং হচ্ছে সব থেকে

জরুরি ব্যাপার। ওয়ান টাচ গেম। ঠিকঠাক পাশ করতে না পারলেই বল চলে যাবে অপোনেন্ট

প্লেয়ারের পায়ে। আর তখন উজবুকের মতো দাঁড়িয়ে বুড়ো আঙুল চোষ্‌!”

সুপ্তি এতক্ষণ বোর হচ্ছিল। ফুটবল নিয়ে এইসব বুকুনি তার ভালো লাগছিল না। ফুটবলটা সে ঠিক

বোঝেও না। বরং টিভির কল্যাণে যেটুকু খেলা দেখে, তা ঐ ক্রিকেট। ক্রিকেটও অবশ্য সে তেমন

কিছু বোঝে না, তবু ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা হলে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। আর তাই আলোচনাটা

ফুটবল থেকে ক্রিকেটে ঘোরাতেই অনেকটা বিশেষজ্ঞের মতো বলে, “তোরা যাই বল না কেন,

আসল খেলা হচ্ছে ক্রিকেট। ওসব ফুটবল-টুটবল ক্রিকেটের ধারে কাছে ঘেঁষতেই পারে না!”

শরদিন্দু চুপ করে সবার কথা শুনছিল। এবার সুযোগ পেয়ে সে নেমে পড়ল মাঠে, “তুই ক্রিকেটের কী

বুঝিস রে সুপ্তি? কিচ্ছু বুঝিস না! আর এই যে সব পন্ডিতরা ফুটবল নিয়ে বড় বড় বাতেলা ঝাড়ছে,

এরাও ফুটবলের ঘন্টা বোঝে! কোনোদিন বারপোস্টের ভেতর ঠিকঠাক একটা শট্‌ মারতে পারল না,

আর গান্ডুরা এয়েছেন আধুনিক ফুটবল নিয়ে সেমিনার করতে!”

সুপ্তি কথাটা মেনে নিল – “তা তুই কথাটা একরকম ঠিকই বলেছিস শরদিন্দু, আমিও কোনোদিন

ক্রিকেটব্যাট ধরিনি। তবু কী জানিস্‌, ক্রিকেট দেখতে আমার ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে!”

আজ বেমওকা ফুটবল নিয়ে কেন এরা মেতে উঠল, তা আঁচ করতে পারছিল না হেমলতা। তার

আশঙ্কা হলো, ফুটবলের পা ছেড়ে এবার হয়তো হাতে উঠে আসবে ক্রিকেটব্যাট। অসহ্য! অসহ্য!

এসব পোষায় না তার একেবারেই। শরদিন্দুর টি-শার্টের হাফহাতা ধরে সে টপকে পড়ল মাঝমাঠে –

“মাইরি, যা বলেছিস তুই শরদিন্দু! এরা কেউ কিছুই বোঝে না। নিরেট গবেট। শুধু অন্যের মুখের ঝাল

খেয়ে বেড়ায়। আসলে খেলাটা তো অন্য কেউ খেলছে!” হেমলতা এবার সুপ্তিকে নিয়ে পড়ল, “আর

তোর ক্রিকেট কেন ভালো লাগে রে সুপ্তি?” হকচকিয়ে সাদামাটা গলায় সুপ্তি বলল, “কেন ভালো

লাগে মানে? ভালো লাগে, তাই ভালো লাগে”।


হেমলতা এবার নিজের মনের মতো বিষয় পেয়ে হামলে পড়ল সুপ্তির ওপর – “দেখ্‌ সুপ্তি, তুই যেটা

তোর নিজের ভালো লাগা বলে মনে করছিস, সেটা আসলে কিন্তু তোর নিজের ভালো লাগা নয়। তোকে

অন্য কেউ সেটা ভালো লাগতে বাধ্য করছে। মানে তোর ভালো লাগাটা তোর হাতে নেই, অন্য কারও

হাতে আছে। এই যেমন দেখ্‌ না, তুই কোন্‌ পেস্টে দাঁত মাজবি, সেটা ঠিক করে দেবে অন্য কেউ।

তুই মাথায় কোন্‌ তেল মাখবি এবং কোন্‌ শ্যাম্পু দিয়ে আবার সেই তেল তুলবি, সেটাও তোর ভালো

লাগায় কিছু এসে যায় না, অন্যের ভালো লাগার ওপর নির্ভর করে। এবং এভাবেই কোন্‌ সাবান,

কোন্‌ মিনারেল ওয়াটার, কোন্‌ টিভি, কোন্‌ ফ্রিজ, কোন্‌ হেয়ার রিমুভার, কোন্‌ স্যানিটার

ন্যাপকিন্‌, এমন কী কোন্‌ কন্ডোম তোর ভালো লাগা উচিৎ, সেসব অন্যরাই ঠিক করে দেবে,

যারা আসল খেলাটা খেলছে। কিছু বুঝলি? তোর ক্রিকেট খেলা ভালো লাগার পেছনেও ঠিক এই

খেলাটাই খেলছে ওরা। এটাকে তুই বলতে পারিস বাজার-বাজার খেলা। এমন কী দেখ্‌ না, কোন্‌ বছর

কোন্‌ দেশের মেয়ে বিশ্বের সুন্দরী শ্রেষ্ঠা হবে, যাকে সবার ভালো লাগবে, তাও ওরাই বেছে দেবে।

বুঝলি কিছু?”

সুপ্তির মনে হলো হেমলতা কথাটা হয়তো ঠিকই বলছে। তবু একটা কিছু না বললে তার মুখরক্ষা হয়

না। তাই বলল, “তুই কিন্তু খুব জ্ঞান দিচ্ছিস্‌ আমাকে! এবার থাম্‌। আমার পেট ভরে গেছে”।

হেমলতা হেসে বলল, “বুঝেছি বুঝেছি, এসব শুনতে তোর ভালো লাগবে কেন! জমিয়ে প্রেম করছিস,

ছোঁয়াছুয়ি করছিস্‌, প্রেমের ন্যাকা ন্যাকা ফ্যাচফ্যাচানি শুনছিস, এসব কেন ভালো লাগবে এখন!

আর জুটিয়েছিস্‌ও এমন একজনকে, কী আর বলব তোকে! আজ তো দেখছি সে আবার ফুটবলের

ড্রিবলিং নিয়েও লেকচার ঝাড়ছে!” ফাঁক পেতেই শরদিন্দু এবার বিশেষজ্ঞের মতামত পেশ করল,

“আমিও তো তাই ভাবছি রে হেমলতা! মনা ফুটবলের ভক্ত আর সুপ্তি ক্রিকেটের। তা হ্যাঁ রে,

তোদের প্রেম হলো কেমন করে?”


প্রেমের কথায় খুব বিষণ্ন হলো ত্রিদিব। শরদিন্দু যাই বলুক না কেন, ফুটবল সে খেলেছে, ভালোই

খেলেছে, ফুটবলের নিয়ম কানুন সে জানে। এবং আধুনিক ফুটবলেরও খোঁজখবর রাখে। টোটাল

ফুটবলের ধারণাটা তার মাথায় ঢুকিয়েছিল তার পাড়ার ক্লাবের কোচ পল্টুদা। পল্টুদা বলত, বল

কখনও বেশিক্ষণ নিজের পায়ে ধরে রাখবি না। সহ খেলোয়াড়কে পাস করবি। এবং এভাবেই পাসিং

গেম খেলতে খেলতে গোটা দলটাই উঠে যাবি বিপক্ষ দলের গোলের মুখে। আবার যখন বিপক্ষ দলের

পায়ে বল চলে যাবে, তখন গোটা দলটাই নেমে আসবি রক্ষণ সীমানায়। মনে রাখবি, ফুটবল কারও

একার খেলা নয়, এটা দলগত খেলা, টিম গেম।

ত্রিদিব আরও জানে, মাঠের খেলাটা মাঠেই রেখে আসতে হয়। মাঠের বাইরে তা কখনই নিয়ে আসা

ঠিক নয়। আবার মাঠের বাইরের কোনো খেলাও কখনই মাঠে নিয়ে যেতে নেই। কিন্তু মধুপর্ণা কেন

এমন করল? সে কেন তাদের ব্যক্তিগত নিভৃতের খেলাকে টেনে নিয়ে গেল মাঝমাঠে? ত্রিদিব তো

মধুপর্ণাকে একান্তই নিজের করে পেয়েছিল। নিজের কাছে ধরে রাখতে চেয়েছিল। এটা তো ফুটবল

নয়! সে তো কোনো পাসিং গেম খেলতে চায়নি মধুপর্ণাকে নিয়ে! তাহলে? তাহলে মধুপর্ণা কেন তাকে

ছেড়ে চলে গেল অনিরুদ্ধর কাছে?

রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

কাজল সেন

                                                       



 পুজোর ছুটি 

ছেলে-বৌমা ফোন করে জানিয়েছে, এবছর পুজোয় তাদের বাড়িতে আসা সম্ভব হবে না, কেননা ছুটি পায়নি। লিচুবাবু জানেন, কথাটা আংশিক সত্য। হ্যাঁ, একথা ঠিক যে, ছেলে-বৌমা দুজনেই চাকরি করে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। ব্যাঙ্গালোরে থাকে। এসব কোম্পানিতে ছুটিছাটা খুবই কম। তাছাড়া দুজনে আলাদা আলাদা কোম্পানিতে কাজ করে। একজন ছুটি পেলেও যে আর একজনও সেইসময় ছুটি পাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবু প্রত্যেক মা-বাবাই আশা করেন যে, অন্তত পুজোর ক’টা দিন ছেলেমেয়েরা ঘরে আসবে। লিচুবাবু ও তাঁর স্ত্রী সীমাদেবীও আশা করেন। কিন্তু ছেলে-বৌমা স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে যে, যেহেতু লিচুবাবু ও লিচুবাবুর বেয়াইমশাই এই দুটি কোম্পানির মালিক নয়, তাই তাদের ছুটি মঞ্জুর হয়নি। আর ঠিক এইখানেই লিচুবাবুর সন্দেহ ও সংশয়। ছেলে-বৌমা কি সত্যি সত্যিই আবেদন জানিয়েছিল ছুটির জন্য? নাকি তারা ছুটি জমিয়ে রেখেছে শীতকালে কোথাও বেড়াতে যাবার জন্য? 


গতবছরও ঠিক তাই হয়েছিল। বিয়ের পর সেটাই প্রথম শারদ উৎসব। লিচুবাবু ও সীমাদেবী এবং তাঁদের বেয়াই-বেয়ান আশা করেছিলেন, ছেলেমেয়ে নিশ্চয়ইছুটি নিয়ে আসবে পুজোর দিনগুলোতে। আসার কথা তারা জানিয়েও ছিল। কিন্তু তারপর কী যে হলো, পুজোর দিনকয়েক আগে জানালো, না যাওয়া হচ্ছে না। ছুটি ক্যান্সেল হয়ে গেছে। হতাশাটা মুখ বুজে গিলতে হয়েছিল লিচুবাবুদের। কী আর করা যায়! চাকরি বলে কথা! সেখানে তো আর নিজেদের মনমৌজি চলে না! কিন্তু তার মাস দুয়েক পরেই ছেলে-বৌমা জানালো যে, তারা দুজনে দিন দশেকের ছুটি পেয়েছে অফিস থেকে। আর এই ছুটিতে গোয়া বেড়াতে যাচ্ছে। 


সুতরাং এবছরও যখন লিচুবাবু জানতে পারলেন যে, অফিস থেকে দুজনেই ছুটি পায়নি, তিনি অনুমান করার চেষ্টা করলেন, এবার শীতকালে কোথায় বেড়াতে যেতে পারে তাঁর ছেলে-বৌমা! 


সেদিন কথায় কথায় লিচুবাবু পাড়ার বুড়োদের আড্ডায় তাঁর মনোবেদনা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। এই বুড়োরা সবাই চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত। এক বুড়োর কথায় আড্ডার কয়েকজন বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তাঁদেরও একই মনোবেদনা। বাকিরা অবশ্য জানালেন, না, এবছর ছেলেমেয়েরা তাঁদের দয়া করেছে, পুজোর দিনগুলোয় তাদের গায়ের গন্ধ তাঁরা শুঁকতে পাবেন। এইকথা শুনে, যাঁরা ছেলেমেয়ের গায়ের গন্ধ এবছর শুঁকতে পাবেন না, তাঁরা মুখে আনন্দ প্রকাশ করলেও মনে মনে বিষণ্ন হলেন। আর এই বিষণ্নতায় পরের দিন আড্ডায় বুড়োদের দুটো গ্রুপ তৈরি হলো। প্রথম গ্রুপ, যাঁরা এবছর পুজোয় ছেলেমেয়ের গায়ের গন্ধ শোঁকার সুযোগ পাবেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে মশগুল হয়ে পড়লেন নিজের নিজের ছেলেমেয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনায়। আর দ্বিতীয় গ্রুপ, যাঁরা এবছর ছেলেমেয়ের গায়ের গন্ধ শোঁকা থেকে বঞ্চিত, তাঁরা নিচুস্বরে শলা পরামর্শ করতে লাগলেন, কীভাবে প্রথম গ্রুপের বুড়োদের টাইট দেওয়া যায়। এমন কিছু একটা করতে হবে, যাতে দ্বিতীয় গ্রুপের বুড়োরা দেখিয়ে দেবেন, ছেলেমেয়ে পুজোর ছুটিতে না এলেও কুছ পরোয়া নেই। তাঁরা নিজেরাই প্রত্যেকে একাই একশ। আর ঠিক তখনি লিচুবাবু প্রস্তাবটা দিলেন, চলুন না, আমরা সবাই দার্জিলিং বেড়াতে যাই!

রবিবার, ৯ মে, ২০২১

কাজল সেন

                                                                  



চিত্রকলা 


নাম রাখা হয়েছিল চিত্রকলা। মা-বাবা কী ভেবে মেয়ের এই নাম রেখেছিলেন, তা কারও জানা নেই, চিত্রকলারও জানার তো কথাই নেই। কেননা সেই নিতান্ত ছোটবেলায় চিত্রকলার তখনও কোনো বোধের উদয় হয়নি, আর কিছুটা বড় হয়ে  মা-বাবাকে হারিয়েছে। চিত্রকলা তারপর থেকে দাদু-দিদার কাছেই থেকেছে, ক্রমশ আরও বড় হয়েছে। বড় হওয়ার সাথে সাথে যেসব ব্যাপার খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটে থাকে, চিত্রকলারও তাই তাই ঘটেছে। যেমন স্কুলে ভর্তি হয়ে একটার পর একটা ক্লাসে উঠেছে। স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নজরুল সদনে গান শিখেছে, নাচ শিখেছে, ক্যারাটে শিখেছে, আবৃত্তি শিখেছে, কিন্তু না, চিত্রকলা শেখেনি। পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, আঁকাআঁকি একদম নয়। আঁকাআঁকির সঙ্গে আমার জন্মের শত্রুতা। কিছুতেই শিখব না।
চিত্রকলা অঙ্কনশিল্প শেখেনি, সুতরাং তার এই শিল্পকর্মে দক্ষতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তি শিখলেও তাতে যে সে রীতিমতো বা মোটামুটি দক্ষ, তাও বলা যাবে না। এবং সে যে এসব যথাযথ মন দিয়ে শেখেনি, তারও অনেক প্রমাণ আছে। যেমন স্কুল বা কলেজের পরীক্ষাগুলোতে  কোনোরকমে পাস করে গেলেও পড়াশোনায় রুটিন করে ফাঁকি দিয়েছে, ঠিক তেমনি গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তির ক্লাসে সুযোগ পেলেই কারও সঙ্গে বকবক, কারও সঙ্গে খুনসুটি, কারও সঙ্গে ঝগড়া, আবার কারও সঙ্গে হেঁয়ালি করে সময় কাটিয়েছে। 
এমন এক মেয়ে চিত্রকলা, যে সর্বঘটে লবডঙ্কা, যার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দাদু-দিদা বিব্রত, সেই মেয়ে হঠাৎ একদিন সবাইকে ভড়কি দিয়ে একটা ট্যালেন্ট হান্ট কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করে অ্যাক্টিং সেশনের ফার্স্ট রাউন্ডে সিলেক্ট হয়ে গেল। চিত্রকলার যেসব বন্ধু-বান্ধবীরা সেখানে জড়ো হয়েছিল, তারা চিত্রকলার ক্যালি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। আসলে মুশকিল হচ্ছে, চিত্রকলা দেখতেও তো আদৌ সুন্দরী নয়! রঙটাও ফর্সা নয়, মূলত কালোই, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলে সান্ত্বনা দেওয়া যেতে পারে। বিচারকরা যে কী দেখে চিত্রকলাকে সিলেক্ট করল, কে জানে!
কম্পিটিশনের ফার্স্ট রাউন্ড হয়েছিল রাঁচিতে। সেকেন্ড রাউন্ড ছিল পাটনায়। চিত্রকলা পাটনায় পৌঁছে গেল। এবং কী আশ্চর্য, দ্বিতীয় রাউন্ডেও চিত্রকলা বাজি মারল। এবার ফাইন্যাল রাউন্ড কলকাতায়। চিত্রকলা রাঁচি ও পাটনায় একাই গেছিল। কিন্তু কলকাতায় যাবার জন্য দাদু-দিদাকে চেপে ধরল, তোমরাও চলো। দাদু-দিদার ততদিনে সিনা মানে বুকের পাটা একটু একটু করে ফুলতে শুরু করেছে নাতনীর কীর্তিকান্ড দেখে। চিত্রকলাকে নিয়ে তাঁরা পৌঁছে গেলেন কলকাতায়। ফাইন্যাল রাউন্ড, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ইতিপূর্বে সিলেক্টেড প্রতিযোগীরা এসেছে। যেদিন কম্পিটিশন সেদিন চিত্রকলা ভোর হতেই দাদু-দিদার সঙ্গে হাজির হলো স্টুডিওতে। সকাল দশটা থেকে ফাইন্যাল রাউন্ড শুরু হবে। 
চিত্রকলার যখন ডাক পড়ল তখন প্রায় রাত দশটা বাজে। সারাদিন উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় শ্রান্তিতে ক্লান্তিতে কাহিল হয়ে পড়েছিল চিত্রকলা। সবকিছু ঝেড়ে ফেলে গ্যালারির দর্শক আর বিচারকদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আর তারপর শুরু হলো চিত্রকলার এতদিনে অর্জিত পড়াশোনা, গান, নাচ, ক্যারাটে, আবৃত্তির  এক অবিশ্বাস্য কম্পোজিট এক্সপোজার। চিত্রকলা তখন নিজেই এক আশ্চর্য চিত্রকলা। 

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

কাজল সেন






ন হন্যতে

এভাবে চলে যাবার কোনো মানেই হয় না। এটা নিতান্তই বোকামি এবং হঠকারিতা। জীবন তো একটাই। তাহলে সেই জীবনে মাঝপথে ইতি টেনে কী লাভ! এই কথাটা শ্রমণা বারবার বোঝাতে চেয়েছে  অতীন্দ্রিয়কে। কিন্তু অতীন্দ্রিয় সেকথা বেঁচে থাকতে যেমন কানে নেয়নি, তেমনি যখন তার নিষ্পন্দ ঝুলন্ত শরীরটা সিলিংফ্যান থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো, তখনও নয়। অথচ অতীন্দ্রিয় যে বিরাট আবেগপ্রবণ ছিল, তাও তো নয়! যথেষ্ঠ বিচার বুদ্ধি বিবেচনা ছিল তার। ছিল মানবিক এবং সংবেদনশীল। তবু কেন যে অতীন্দ্রিয় হঠাৎ এমন জীবনবিমুখ হয়ে উঠল, শ্রমণা তার কোনো কূল কিনারা খুঁজে পায় না। 

শ্রমণার জীবনের আয়োজন খুবই সামান্য। সে নিজেও অসামান্যা নয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের নিপাট গৃহবধূ। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখি পরিবার। শরীরও অসুখি নয়। যতটা চাহিদা সবটুকুই তার স্বামী পূরণ করে দেয়। সংসারে অনটনেরও কোনো চিহ্ন নেই। তবুও কী যে হয়, শ্রমণা নিজেও ঠিক অনুধাবন করতে পারে না, অতীন্দ্রিয় তাকে যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। শ্রমণা সেই আকর্ষণকে উপেক্ষা করতে পারে না। তাকে ছুটে ছুটে যেতেই হয়। অতীন্দ্রিয়র মুখোমুখি বসে। কথা হয়। অনেক কথা। কথা না বলে চুপ করে বসে থাকে। অনেকক্ষণ। অতীন্দ্রিয় খুশি হয় শ্রমণা এলে। শ্রমণাকে সে দেখে। গভীর চোখে দেখে। কিন্তু স্পর্শ করে না। কোনো ইঙ্গিতও করে না। শ্রমণা অতীন্দ্রিয়র ধরাছোঁয়ার সীমানায় অনেকটা সময় এভাবেই কাটিয়ে একসময় ফিরে আসে নিজের সংসারে। মন জুড়ে তখন তৃপ্তির আশ্চর্য এক শান্ত আবহাওয়া।

অতীন্দ্রিয় কখনও বাধা দেয়নি শ্রমণাকে। নিষেধও করেনি। শুধু জানিয়েছে তার  সীমাবদ্ধতার কথা। বোঝাতে চেয়েছে তার অক্ষমতার বেদনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই একসঙ্গে পড়ার দিনগুলো থেকে আত্মহননের আগের দিন পর্যন্ত শ্রমণাকে একই কথা বারবার বলে এসেছে, আমার জন্য তুই ভাবিস না শ্রমণা। তুই ভালো থাকিস। খুব ভালো থাকিস। তুই ভালো থাকলেই আমিও ভালো থাকব।

না, শ্রমণাও কখনও অনুযোগ জানায়নি অতীন্দ্রিয়র কাছে যে, সে কষ্টে আছে, দুঃখে আছে। বরং সে সত্যিই ভালো আছে। অতীন্দ্রিয় নিতান্তই সাদামাটা কথায় জানিয়েছিল, শ্রমণা তার জীবনে এলে কিছুই তো সে দিতে পারবে না! পরমতম শারীরিক সুখ, সন্তান, কিছুই না। তাহলে শ্রমণা কেন বঞ্চিত হবে এই জাগতিক চাওয়া পাওয়া থেকে! শ্রমণা অতীন্দ্রিয়র কথা মেনে নিয়েছিল। জীবনের সব আয়োজনই তার পূর্ণ হয়েছিল। তবু কী যে এক অদৃশ্য সূতোর টান তাকে বারবার টেনে নিয়ে যেত অতীন্দ্রিয়র কাছে, সে যেতে বাধ্য হতো, তার কার্যকারণ অধরাই থেকে যেত শ্রমণার কাছে।

সেইসঙ্গে অতীন্দ্রিয়কে সে বোঝাতো, তুইও ভালো থাকিস অতীন্দ্রিয়। জীবনে যে যতটুকু পায়, তাকে তাই নিয়েই ভালো থাকতে হয়। জীবনকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাবার কোনো যুক্তি নেই। তুই কখনও হারিয়ে যাস না অতীন্দ্রিয়। তুই হারিয়ে গেলে আমিও যে হারিয়ে যাব অতীন্দ্রিয়!

বেশিক্ষণ মৃতদেহের পাশে বসে থাকতে পারেনি শ্রমণা। পালিয়ে এসেছিল। পালাতে চেষ্টা করছিল নিজের কাছ থেকেও।