মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

পারমিতা চক্রবর্ত্তী

প্রাচীন যুগে রূপকথা 
_____________________


সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যুগে যুগে বদলাচ্ছে তা আমরা আশেপাশের পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারি I আজকের দিনে সবাই যেখানে স্লিম ফিগার’-এর দিকে ঝুঁকছে, সেখানে অতীত হাতড়ালে আমরা দেখতে পাই চীনে ট্যাং বা তাং রাজবংশের শাসনকালে ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। তখন স্থূলকায়, গোলগাল মুখ, লম্বা গাল এবং প্রশস্ত কপালের মেয়েদেরই সুন্দর বলে বিবেচনা করা হত। সুন্দর বা সুন্দরী কাকে বলব, মানে সৌন্দর্যের ভিত্তিটা কি ? বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে আমরা বুঝি ত্বক , চুল , দাঁত , নখ ইত্যাদি , ইত্যাদি ৷

চুল সৌন্দর্যের বড় একটি বিষয় ৷ মধ্যযুগের বিভিন্ন চিত্রকর্মে মহিলাদের যেসব ছবি আমরা দেখি, তার সঙ্গে আমাদের বর্তমান সমাজের মেয়েদের সাজসজ্জার বেশ বড় একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে তখনকার সময়ে নিজের কপালকে স্বাভাবিকের চেয়ে আরো বড় এবং কিছুটা বাঁকানো রূপে দেখানোই ছিল সৌন্দর্যের পরিচায়ক। সেজন্য তাদের অনেকেই সামনের দিকের কিছু চুল কাটা কিংবা তুলে ফেলার মতো কাজটি করত। পরবর্তীকালে চুলবাঁধাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নানা কলাকৌশল ৷ পুরানো এক প্রবাদবাক্য আছে মেয়েদের কেশেতেই বেশ । বিভিন্ন ধরণের খোপা তাতে ফুলের ব্যবহার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে বারবার ৷


বড় নখ নারীদের প্রাচুর্যের প্রতীক ৷ নেইল আর্ট যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে ৷ এককালে চীনের লোকদের হাতের নখ বড় রাখার চল ছিল। কিং রাজবংশের সময়কালে তাদের নারী-পুরুষদের হাতের নখ কখনো কখনো ৮-১০ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা দেখা যেত। কোনো কোনো নারীকে নখ ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে সোনার তৈরি নেইল-গার্ড ব্যবহার করতেও দেখা গিয়েছে। নখ বড় রাখার বিচিত্র এ চর্চা দেখা যেত মূলত ধনী সমাজের মাঝেই। তারা নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি দেখাতে নখের পরিচর্যা করত ৷ তারা এটা বোঝানোর চেষ্টা করত যে, এত টাকা-পয়সা তাদের আছে যে নিজ হাতে কাজ না করলেও দাস-দাসীদের দ্বারা দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পন্ন হবে ৷ দাস-দাসী দিয়েই জামা-কাপড় পরা ও খাওয়া-দাওয়ার কাজটা সেরে নিত তারা।

মধ্যযুগে এবং রেনেসাঁর সময়ে ইউরোপের নারীদের সাজসজ্জা শুধু মাথার চুল তুলে কপাল বড় করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চোখের পাতার লোমকে তখন অতিরিক্ত যৌনাবেদনময়তার প্রতীক হিসেবে দেখা হত। তাই অনেক নারীই তাদের সেই লোমগুলো একেবারে তুলে ফেলতেন। এছাড়াও প্রাচীন গ্রিসে জোড়া লাগা ভ্রু ছিল নারীদের পবিত্রতা এবং বুদ্ধিমত্তার প্রতীক। এটা না থাকলে অনেকেই চোখের সুরমা ব্যবহার করে সেই ঘাটতিটা পূরণ করত।

জাপানি নারীদের প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস একেবারেই ছিল না ৷ আমাদের মাঝে গড়ে ওঠে সেই ছোটবেলা থেকে দাঁতের সুরক্ষা রক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দাঁতকে ঝকঝকে সাদা দেখানোও নিয়মিত এই ব্রাশ করার অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে জাপানি নারীদের মাঝে প্রচলিত সৌন্দর্য চেতনা ছিল এর ঠিক উল্টো। হাজার বছর ধরে জাপানি নারীরা তাদের দাঁতকে কালো রঙে রাঙিয়ে নিত। উনিশ শতক পর্যন্তও তাদের মাঝে এ চর্চা দেখা গেছে। সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি বিয়ের অঙ্গীকার রক্ষার একটা প্রতীকী রূপও ছিল কালো দাঁত।

আবার প্রাচীন ধনী রোমান সম্প্রদায়, আরো ভালো করে বলতে গেলে ধনী রোমান নারীরা তাদের দাঁতকে ঝকঝকে সাদা করার জন্য বেছে নিয়েছিল মানবমূত্রকে। সেই মূত্র দিয়ে ধুয়েই দাঁত পরিষ্কারের কাজটি তারা করত। তবে যেনতেন মানুষের মূত্রের উপর ভরসা করতে পারত না তারা। দাঁত পরিষ্কারের জন্য তারা শুধুমাত্র পর্তুগিজদের মূত্রই ব্যবহার করত। এজন্য জাহাজ ভর্তি করে জার পূর্ণ পর্তুগিজ মূত্র আসত রোমান নারীদের জন্য। মূত্রে থাকা অ্যামোনিয়া জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করত। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও সত্য যে, আঠারো শতক পর্যন্ত মাউথওয়াশ হিসেবে মূত্র ব্যবহৃত হয়েছে।

আঠারো শতকে এসে ইউরোপীয় নারীদের সৌন্দর্য চর্চায় পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। আগেকার সময়ের হালকা সাজসজ্জার বদলে তখন তারা বেশ ভারি সাজসজ্জার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। এরই একটা অংশ ছিল বিভিন্ন ধরনের বিউটি প্যাঁচ। চাঁদ, তারা, বর্গ, বৃত্ত ইত্যাদি নানা আকৃতির বিউটি প্যাঁচ পাওয়া যেত তখন। ছোট ছোট সেই ফেব্রিকগুলো মুখের বিভিন্ন জায়গায় লাগানো হতো। আর একেক জায়গায় লাগানোর অর্থ ছিল একেক রকম। যেমন- যদি কোনো নারী এমন বিউটি প্যাঁচ তার ডান গালে পরত তবে তার অর্থ হত যে, সে বিবাহিতা।


প্রাচীনকালের চীনের রূপচর্চায় ঢু মারলে দেখা যাবে তৎকালীন নারীরা তাদের ভ্রুকে কালো, নীল কিংবা সবুজ গ্রিজ দিয়ে রাঙাতে খুব পছন্দ করত। সেই সঙ্গে তখনকার ফ্যাশন অনুযায়ী ভ্রুকে দিত নানা আকৃতি। হান রাজবংশের সময়ে কোনো দিক নির্দেশ করা ভ্রুর স্টাইল বেশ জনপ্রিয় ছিল। আবার এককালে দুঃখের ভ্রুনামক একপ্রকার স্টাইল বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই স্টাইল অনুসারে কারো ভ্রুকে মাঝখানের জায়গায় বাঁকিয়ে কিছুটা উপরের দিকে তুলে দেওয়া হত।

প্রাচীনকালের নারীরা ভিন্ন উপায়ে নিজেদের রঙিন রাখার চেষ্টা করত ৷ তবে সর্বতোভাবে রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সজীব মন ৷ তার পরিচর্যাই হল রূপচর্চার আসল চাবিকাঠি ৷ রূপ নিয়ে পুরুষ কিংবা নারীর উন্মাদনা চিরকালই ছিল বেশী ৷ তাই সেই রূপকে নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই । 


--------------------

"সৃজন" নিবেদন 

পারমিতা চক্রবর্ত্তী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন