রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                                   


 

আঞ্জুমান




নীল কাঁচের ডোম, ক্ষীরোদ বিদ্যুত... "কুবলাই খাঁ" যারা পড়েছেন একটু ভেবে নিতে পারেন চেহারাটা। লৌকিক থেকে অলীকের তারতম্যে 'নীল' ছাড়া অন্য বর্ণের এখনো প্রবেশাধিকার নেই নশ্বর মুণ্ডুদের কল্পনায়। যে কোনো অলৌকিক আদতে নিষিদ্ধ রহস্য বই তো কিছু নয়। পৃথিবীর দুই প্রবল আলোচিত পুরুষ আজ মুখোমুখি। সিদ্ধার্থ ও আর্নেস্তো। সময়খণ্ড বা কর্মপরিধি যতই আলাদা হোক, কোনো না কোনো নারীর ইথারে পৃথিবীর সব দিকপালদেরই একদিন না একদিন কোর্ট মার্শাল হয়। আজ বুদ্ধ ও বিপ্লবীর পরস্পরকে খননের দিন।


মৃত শরীরেও যার চোখ বন্ধ করে ফেলার সমর্পণ আসেনি, খুব স্বাভাবিকভাবে তারই প্রথম প্রশ্ন ভেসে এল -

"কী পেলেন শ্রমণ? 'শান্তি' শব্দ যে শুধুই মোহের সর্বনাম এ বোধির উপাদান আপনার পরমান্নে বাদ থেকে গেলো কী করে?"

দুর্ভাগ্য, ট্যাটু আর টি শার্টে এঁকে যারা চে'কে সাজায় শরীরে, তারা বোঝার চেষ্টাই করলো না কোনোদিন, বুলেটের ভিতর কিছু থাকে না, আগ্নেয়াস্ত্রেও না, যে সিনা তা ওঠাতে সিদ্ধান্ত নেয়, যন্ত্রের সার্বিক সাফল্য আর ব্যর্থতা তার মাপেরই সমানুপাতিক। এখানেই নির্ধারণ হয় কে রাষ্ট্র বা রিপুর ভাড়াটিয়া আর কে দেশ-কাল-ইতিহাসকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করা লিজেন্ড, স্বয়ং অগ্নি।

নির্বাণ যিনি পেয়েছেন, যে কোনো আঘাতের প্রথম উত্তর তার কাছ থেকে পরম শূন্য এক হাসি দিয়েই আসবে, এও তো অস্বীকারের নয়। ব্যতিক্রম ঘটল না। তথাগত মৌনতা ভাঙলেন -

"তুমিও কি শান্তিই চাওনি? দ্রোহ, জেহাদ, গুয়েভারিসম... উদ্দেশ্য তো একটাই ছিলো"

-- "আমি অধিকার চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রের তরফে তার নাগরিকদের প্রাপ্য মৌলিক সুরক্ষা শুধু। আপনাকে তো রাষ্ট্রধর্মেই প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছিলো, হায় কী প্যারাডক্স তথাগত! আপনি বলছেন আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটিই - শান্তি, তাই তো? তাহলে আমি যদি বলি পরিণতি আপনারও কিছু ব্যতিক্রম ঘটেনি আমার থেকে নিতান্ত হত্যা ছাড়া, কী বলবেন? আমার শরীরটুকু আর আপনার সমগ্র আদর্শ। এক, সম্পূর্ণই এক, যতদূর আমার দৃষ্টি যাচ্ছে।"


সিদ্ধার্থ স্তব্ধ হলেন। কী করে উচ্চারণ করবেন এই অমোঘ সত্যের যন্ত্রণা? আর্নেস্তো তো ভুল কিছু বলেনি। প্রথমে গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ভাগ... শেষে চন্ড এক ক্ষমতাভুক সাম্রাজ্যবাদীর হাতিয়ারেই তো পরিণত হয়েছিলো তার চতুরার্য সত্য। পরিহাস, সেই নৃপতি আজ শান্তির আইকন, আর তিনি? নির্বাসিত... মূর্তিপূজার মনেস্ট্রিতে। বুদ্ধ কবেই চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়ে গেছেন বিরাট বিরাট প্যাগোডার ধনসম্পদের শো অফে নিজের প্রাণাধিক বোধিদ্রুমকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যেতে দেখতে দেখতে। আজও গুয়েভারা আর গৌতমের যাবতীয় স্যুভেনিরের বাজার চাহিদা, তুঙ্গী। তাদের দৈহিক সৌন্দর্য কিঞ্চিত অনার্যসুলভ হলে বাস্তবচিত্র কী হতো সে অনুসন্ধানে বুদ্ধিমান মাত্রেই বিরত থাকে। কনসিউমার ইকোনমিক্সে লুম্বিনীর শাক্য বংশীয় রাজপুত্র আর আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী গেরিলা সম্রাটের কীর্তি কতটা প্রাসঙ্গিক তার থেকে অনেক বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের চেহারা কতটা খাবে তার উপরেই  বরাবর, ভবিষ্যতেও হবে। তথাগতের কান্না পেল খুব। তিনি খুঁজতে চাইলেন কার চিন্তার তরঙ্গ আজ এভাবে সত্য মিথ্যার যাবতীয় ধোঁয়া ভেঙে তাদের একাকার করে দিচ্ছে যৌথতায়... অসহায়, বড় অসহায় লাগছে তার।


ওহ! স্বধা...? দিনের আঠারো যার এখন কাটে বাবার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা কোভিড কেবিনে রোজ। যে এখনো জানেই না মৃত্যুভয়ের থেকেও বড় সংকট তার আগামী ঘন্টা কয়েকের ভিতর আসতে চলেছে। নারী যদি মেধা আর বোধের সঙ্গে চামড়াটাও ব্যতিক্রমী নিয়ে জন্মায় তার অনিবার্য পরিণতি হয় এসাইলাম নাহয় আত্মহনন এই অব্দি প্রমাণিত, তবে সঙ্গে যদি জিভ আর শিরদাঁড়া জুড়ে থাকে, তবে সভ্যতা ও সমাজের সংকট ঘনায় এ কথাও মিথ্যে নয়। না তারা মরে, না আপোস করে। ফলত: সহস্র সহস্র খঞ্জরে শান পড়তে থাকে তাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে। তেমনই কিছু ঘটতে চলেছে। তথাগত বিষণ্ণ হলেন।


আজ চে যাবতীয় বৌদ্ধিক নির্লিপ্তিকে বিদ্ধ করবেন বলেই নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জরিপ করলেন গৌতমকে... প্রশ্ন রাখলেন-

"আজ এত বিচলিত কেন আপনি তথাগত? যশোধরার জন্যে তো সামান্য মায়াও কখনো বরাদ্দ ছিলো না আপনার। নাকি ৪৮৩ বিসিই থেকে এই ২০২১ এর দীর্ঘ পথ আপনাকে স্বল্প হলেও মানবিক করে তুলেছে?"

--"তুমি যাকে যশোধরা বলো সে আমার ত্রিকালের সাধনসঙ্গিনী আর্নেস্তো, আমার বদ্দকাচন্না, আমার সমস্ত শক্তির অধিক ক্ষমতাশালী এক অলৌকিক নারী, আমার পথপ্রদর্শক, সে স্বীকৃতি কি তার অলাতশান্তির সময় আমি দি নি? কেন অকারণ আক্রমণ করছ? আমি তো তোমায় প্রশ্ন করছি না তোমার হিল্ডা বা এলেইডা অথবা চার দেবশিশুর মুখ উপেক্ষা করা নিয়ে, ডাক্তার হিসাবে তোমার কর্তব্যের অবহেলা নিয়ে কারণ এই ই পুরুষকার। আমাদের দুর্বল হলে চলে না। মহতী প্রয়োজনে ব্যাক্তিস্বার্থ ত্যাগ করাই নিয়তি।"


দুজনেই শান্ত প্রায়। অথচ কী এক অশান্তি দুজনের কাউকেই স্বস্তি দিচ্ছে না পার্থিব চুম্বকতরঙ্গ থেকে এই এতোদূরে বসেও। কোথাও একটা ঝড় উঠছে, অত্যুজ্জ্বল ধুলো রঙের, ডানাহীন অথচ প্রবল উড়ানে।কাদের যেন কন্ঠস্বর... ভার্জিনিয়া ব্রণ্টি প্লাথ গৌরি সাবিত্রী শিন্দে রামবাঈ... প্রশ্ন উঠছে, অজস্র প্রশ্ন, 'হিস-স্টোরি' নিয়ে। তাহলে কি ধর্ম শান্তি দ্রোহ বিপ্লব সবের শিকড়ে একটিই আদিম রহস্য, পুরুষতন্ত্র? যে ফ্যাসিজমে সিদ্ধার্থর সঙ্গে আর্নেস্তোর, রামের সঙ্গে ক্রাইস্টের, মোহাম্মদের সঙ্গে কানহার আদতেই কোনো পার্থক্য নেই? এই আগ্রাসনে সবাই ই হিটলার? পাঁচ হাজার বছরের গুহাঙ্কন স্বস্তিক যেভাবে একদিন অধিক পরিচিতি পায় নাজি প্রতীক হিসাবে, ঠিক সেভাবেই শুধুমাত্র মেয়ে বলে শক্তির বিস্ফার চিরকাল উপেক্ষিত? 

রিং বাজছে স্বধার মোবাইলে - তীব্র কর্কশ - মাত্র চোখ লেগে এসেছিল কুড়ি ঘন্টা পর বিছানার নরমে - 'নার্সিংহোম কলিং - আর্জেন্ট - লাল রে -' সে ঘোরে একটা মুখ দেখছিল তখন - অনেকটা যেন জন স্নো - এক হ্যাঁচকায় ছিঁড়ে গেলো... 

চিত্রঋণ - পারমিতা চক্রবর্ত্তী

৮টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো লেখাটা। বুদ্ধর সঙ্গে চে-কে সম্পর্কিত করাটা দুরন্ত ভাবনার পরিচয়। উঠে এসেছে যশোধরার কথাও। সত্যিই তো তার প্রতি বুদ্ধর অস্বাভাবিক অবহেলা অনালোচিত থেকে গেল।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. বেশ ভালো লেগেছে লেখাটা।
    একটু সময় লাগলো পড়তে।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালও হচ্ছে লেখাগুলো। এই লেখার সিরিজ তো চমক আনছে। এতদিনে অলসতা ছেড়ে কাজে নামলে সিরিয়াসলি এটা মেনে নিচ্ছি কিন্তু। সিরিজ বন্ধ হলেই বাড়ি গিয়ে হামলা হবে।

    উত্তরমুছুন