সোনালী চক্রবর্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সোনালী চক্রবর্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

সোনালী চক্রবর্তী

                        



তাহতাজিজ






আয়াত ভুলে যাবে এতটা জুঁই এঁকে দিতে ইচ্ছে করে হৃদিতে- সিরোজেম উড়ে যাওয়ার স্বরে উচ্চারণ করলো স্বধা। তার থেকে সায়রের দূরত্ব এই মুহূর্তে বুদ্বুদের ভিতরের শূন্যতার সঙ্গে স্বাভাবিক জলীয় বাষ্পের ঠিক যতটুকু অনুমিত। বারো বছরের জন্মদিনে ॐ আকৃতির পেনডেন্ট দেওয়া যে চেনটি শ্রী তাকে পরিয়ে দিয়েছিলো, আঠারোর পর থেকে আর কখনো তা খুলে রাখার সুযোগ পায়নি যেহেতু সে সেই সময় থেকে শ্রীনজরের কাজললতার ভূমিকায়। ভুলেই গিয়েছিলো এতোদিন নিজস্ব রক্ত চামড়ার বাইরে আলাদা করে সেটির অস্তিত্বের কথা, যেভাবে মরচেরা ধীরে পরমাত্মীয় (সম্ভবত একমাত্রও) হয়ে যায় পরিত্যক্ত যে কোনও লৌহ সম্পদের। সায়রের আঙ্গুল সেই ॐ কে সরিয়ে দর্পণের অবস্থান দেখতে ও দেখাতে চাওয়ায় শতভিষার আদেশে চরাচর থির হলো ক্ষণ কয়েকের স্বার্থে। 




- "তোর এখানে আছি আমি, এখানে। কেন? কেন এনেছিস? কেন রেখেছিস? এবার মুছে দে। আমি ভয় পাচ্ছি। অপরাধী হয়ে গেছি। তোকে অস্বীকারের অজুহাতটা তো বিছাতে দে, অন্তত এবার। কিছু বলিস নি। একটা অক্ষরও না। তিরিশটা দিনের প্রতি সেকেন্ডে আমি অপেক্ষা করেছি সূক্ষ্ম চ্যুতির, সামান্য সূত্রের। পাই নি। এভাবে আমায় হারিয়ে কী পাচ্ছিস তুই? আজও এখানে দাঁড়িয়ে আছিস পাথরের মতো, ঠোঁটের এই ভাস্কর্যকে হাসিই তো বলে, না? কোথায় জল দেখতে চাইছি আমি? মেঘই জমেনি এক বিন্দু। নিশ্চিন্হ করে ফেলতে ইচ্ছে হয়। কে জানতে পারবে বল? যে কোনো ডাক্তার আদতেই নিপুণ খুনী হতে পারে যদি সে চায়, ন্যূনতম প্রমাণও থাকবে না। খাতায় কলমে আমি এখন ষাট কিমি দূরের হাসপাতালে অন ডিউটি। কে বিশ্বাস করবে, আমি নিজেও কি করবো, পরের দিন কারোর ডিসচার্জ সার্টিফিকেট লিখতে হবে বলে মাঝরাতে ড্রাঙ্ক সায়র সেন নিজে এক ঘণ্টা ড্রাইভ করে এসে পৌঁছেছে নিজেরই নার্সিংহোমের পাশের পোড়ো জমির অবসলিড স্পেসে? অথচ কেউ তাকে ডাকেনি। সে বাধ্য হয়েছে। আমি ভুডু মানিনা। এই পৈশাচিক আকর্ষণের ব্যাখ্যা কী? উত্তর দে।" 




--"পেনডেন্ট আমার কতটুকু স্কিন তোর চোখের আড়ালে রেখেছিল যে এতো ঈর্ষা এলো?"



---"স্বধা..."




----"শুনতেই তো চাইছিস, তাহলে কেঁপে উঠলি কেন?" 




-----"উত্তর লাগবে না। চুপ কর। একটা মাস আমি ধ্বস্ত নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে। তোকে আমি কী দেব? কিছুই না। সেই অধিকার আমার নেই ই কিন্তু সে কৈফিয়ত আমি কাকে শোনাবো? যার নিশ:ব্দ উথালপাথাল আমি প্রতিটা মুহূর্তে নিজের বেড়ে যাওয়া শ্বাসের গতি দিয়ে টের পাই। বলেছিলাম আমার হাতে তোর বাবার সারভাইভ্যাল চান্স পাঁচ শতাংশ। এত অতলান্ত নির্ভরতা কীসের তোর যে তা জেনেও তুই বন্ড সই করলি?  সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে মন্ত্রীমহল অবধি নার্সিংহোমের গাফিলতি নিয়ে আক্রমণের সময় সমস্ত দায় নিজের উপর নিলি কেন তুই? কীসের কৃতজ্ঞতা এতো তোর? কেন আমায় নিয়ে এই রেঞ্জে তুই সেন্সিটিভ?"




------------- " ময়াল খুঁজছিলি না? আলমুস্তাফা বলেছিলো- 'আদিম সর্পটি নিজের খোলস থেকে নির্বাণ পায়না বলেই প্রতিটি প্রেমকে নগ্ন ও নির্লজ্জ দেখে'। আর আজ স্বধা তোকে বলছে- 'সেই সুপ্রাচীন সর্পকেই তুমি প্রেম নামে চেনো অনিবার্য নির্বাণ আঁকা যার প্রতিটি খোলসে'। "





 --------- "নীলাদ্রি স্যার তোর কাছে কী আমি জানি। যখন প্রথম বলেছিলি "You belong just next to the Almighty", আমি আমার গুরুত্ব টের পেয়েছিলাম কিন্তু তোকে আঘাত দিয়ে হলেও সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাওয়ার সময় যখন ধাতব ছুরির মতো কেটে কেটে জানিয়ে দিলি-  "ঈশ্বর মানে বুঝিস? যার কাছে প্রত্যাশার অধিকার মাত্র থাকে কিন্তু অভিযোগের নৈকট্য থাকে না। বিধি নির্ধারিত। ঈশ্বরনির্মিত হওয়ায় তিনি নিজেও তা ভাঙতে পারেন না" - নি:স্ব হয়ে গিয়েছিলাম- এই ভার কী করে ওঠাব? এই প্রবল সমর্পণের?" 





---------"এতো যন্ত্রণা পাচ্ছিস...সিগারেটটা ফ্যাল। ভাঙা শেডের পুরনো ধুলোর উপর চকচকে নতুন ছাই অশ্লীল লাগে। তোকে বরং ফিল্মি ডায়লগ শোনাই। মনকে সারা । আফটার অল গ্যারেজ এটা।কোনটা বলি? 'হর ইশ্ক কা এক ওয়াক্ত হোতা হ্যায়। ও ওয়াক্ত হামারা নেহি থা ইসকা মতলব ইয়ে তো নেহি কে ও ইশ্ক নেহি থা'- নাহ, এটা বছর উনিশ কুড়ি পরে বলবো যখন তোর মেয়ে ডাক্তারি পড়বে, তোদের তিন পুরুষের ঐতিহ্য অনুযায়ী। শুধু 'পুরুষ' এর জায়গায় 'নারী' বসাতেই নাহয় ডাক্তার হলো সে, কী বলিস? তাহলে এখন কী বলা উচিত? 'মুহব্বত হ্যায় ইস লিয়ে জানে দিয়া, জিদ হোতি তো বাহো মে হোতা' - পারব না সায়র। এই তত্ত্বে আমি বিরোধ রাখি। যেতে দেওয়ার আমি কে? কোথায়ই বা যেতে দিলাম? কে কাকে যেতে দিতে পারে? তুই বলবি তোর হাতের রেখায় আমি নেই। আমি তোকে গালিবী অহংকার ছুঁড়ে দেবো- 'হাতো কে লকিড়ো পে মত যা, এ গালিব, নসিব তো উনকি ভি হোতি হ্যায় জিনকে হাত নেহি হোতে'। এইভাবে এই পরিত্যক্ত দেওয়ালেরা তর্কের পারদে আতুর হয়ে উঠবে, ধীরে শরীরী মর্ফিয়ারা সংশ্লেষের অন্ধকার গন্তব্যে এগোবে। সূর্য উঠলে চরাচর জুড়ে অজস্র ছাই- অনুশোচনার, গ্লানির, ক্লান্তির। আমি এত নরম সওদা করিনা রে। যেভাবে কোথাও কোনো প্রমাণ নেই আজ এই মুহূর্তে তুই ঠিক কোথায়, ঠিক সেভাবেই স্বধা কোনোদিন কিছু উচ্চারণ করেছে কেউ শোনেনি- এই ই সত্য। 




------"ধ্বংস এতো ভালোবাসিস?"




---------------"কাল সাক্ষী সায়র, কোনোদিন কোনো ভালোবাসা ধ্বংস গাঁথেনি। তা আনে কেন্দ্রটিকে অধিগ্রহণের দুর্দম স্কারলেট জিহাদ। ইদানিং সবকিছুরই 'লাইট' ভার্সন হয় তো, ভেবে দেখিস 'ধর্ষণের কারণ পোশাক' কথাটা 'যাবতীয় মহাযুদ্ধের কারণ কোনো না কোনো নারী' এই চিন্তনের লাইট এডিশনটা কিনা। "রামায়ন"-এর প্রায় তিনশ'টি সংস্করণের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত বা প্রচারিত নিশ্চয়ই বাল্মীকিরটা? রাম-সীতার প্রণয় সম্ভাষণগুলো পড়ে ওঠার ঘোর কাটিয়ে যারা যুদ্ধশেষে পায়ে হেঁটে অশোকবন থেকে ফিরতে বাধ্য হওয়া কুললক্ষ্মীকে বলা পুরুষোত্তমের যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্বন্ধীয় মর্যাদাঘন বক্তব্যে পৌঁছতে পারেন, অবশ্যই জানেন সেটির থেকে অগ্নিপরীক্ষা অনেক সম্মানজনক। "মহাভারত" নিয়ে কী আর বলি? ছেলেভুলানো শাক দিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবের মাছকে ঢাকার চেষ্টা যে কী প্রকট রে এখানে। স্পষ্ট লেখাই আছে ভিক্ষাভাগ রূপক মাত্র। অর্জুনের সঙ্গে আসা কৃষ্ণার দিকে বাকি তিন পাণ্ডবের দৃষ্টির নির্লজ্জতা দেখে ধর্মপুত্রের বুঝে নিতে পলমাত্র লাগেনি, যদি এই নারী তাদের মধ্যে শুধু একজনেরই অঙ্কশায়িনী হয়, কৌরবের প্রয়োজনই পড়বে না, না ধর্ম নামক রসিকতার, মহাযুদ্ধ আসন্ন আর আর তা পাণ্ডবগৃহেই। অতএব বাঁটোয়ারা ঘট স্থাপন করে পঞ্চপল্লব দিয়ে শান্তিজল ছিটিয়ে দাও। অপরাধ তো দ্রৌপদীর রূপেরই। ঠিকই। অথচ সে অবাঞ্ছিত। পাঞ্চালরাজের পুত্রকামনার যজ্ঞ থেকে উত্থিত বাইফারকেশন মাত্র, তৈল শোধনাগারে যেমন ভেসলিন। আহা এমন বায়াসড হচ্ছি কেন ভারতখণ্ড নিয়ে। ট্রয় মনে পড়ছে। অন্ধ সে মহাকবি বিরচিত আদিতম দুটি মহাকাব্যের জন্ম দিয়েছিলো সে রণ। হেলেন কারণ ছিলো তার আদৌ? উত্তর শুধু স্ক্যামেন্ড্রসের ঢেউ আর একিলিসের গোড়ালি জানতো। সেই কবে লিখেছিলাম- মিথ মানে অর্ধসত্য চুপকথার রূপসী বিনুনী। কই প্রামাণ্য নথিনির্ভর বিশ্বযুদ্ধগুলো নিয়ে তো কথা হয়না। তাদের ধ্বংসপ্রভাবকে ইগোলোসাইজ করা যায় না বলে? শোন সায়র, বডি শেমিং এটাও। যেভাবে খুঁত কেউ ইচ্ছেয় নিয়ে জন্মায় না বলে বিকৃতি নিয়ে ব্যঙ্গ অপরাধ ঠিক সেভাবেই কেউ নির্বাচন করে নিখুঁত হয়ে আসেনা বলে তার সৌন্দর্যকে অপরাধী করা পাপ। কী সহজে বলে দিলি ধ্বংস ভালোবাসি। ধ্বংস আসবে কেন? ভালোবাসা কি তোর কাছেও অধিকারের দাসত্বনির্ভর অসভ্যতা? ধারণ নেই? শুধুই প্রদর্শন অথবা সাম্রাজ্যস্থাপন? সে সমুদ্রকে আমি 'মহা' বিশেষণ দেবো কেন যে তার  ঝঞ্ঝাকে গর্ভে রাখতে পারেনা? সে বৃক্ষকে আমি 'প্রাচীন' স্বীকার করবো কেন সহস্র কাঠুরিয়া যার সামনে নতজানু হয়ে বসেনি? ভালোবাসাকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবহমান শুধু হিমদুর্বল করে রেখে দিলো, তাকে আগুনের ব্যবহার শেখালো না। দহনে সব প্রত্যাশা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে পড়ে থাকবে নিখাদ শুদ্ধ বোধটুকু- আমি ভালোবাসি- শুধু এই বোধ নূপুরের মতো ঘিরবে চৈতন্যের মেহফিল- "ঘিরি ঘিরি ঘিরি নাচে"- যাবি সাবিত্রী বাউলের আখড়ায়? দেখ, এই তোর ঠোঁট, কাঁধ, গলা- রক্তাক্ত করে দিতে পারি আমি এই মুহূর্তে। নখ দাঁত নেই আমার? কিন্তু তাতে এই অহং কি আমার আর থাকবে যে তোকে এতো তীব্র চেয়েছি, তুচ্ছ কিছু দিয়ে ম্লান করে ফেলিনি? পারবি এমন ভালোবাসতে? "






------" বাসিনি? রাতের পর রাত স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় পিরিডয়িক ক্র‌্যম্পের পেন নিতে না পেরে যখন মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলি ব্যালকনিতে, কে তুলে নিয়ে এসেছিলো নিজের হাতে ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে? কোনোদিন তোর সন্দেহ হয়নি নার্সিংহোমের বাকি একজনও ভোরের আগে যা জানতে পারত না, আমি কী করে জানলাম? পাঁচটা নার্সিংহোমের অজস্র উইং আর ফ্লোর, রুম, কেবিন জুড়ে হাজার খানেক সি সি আছে স্বধা, পঁচিশ জন অবসার্ভার আছে সব মিলিয়ে সেগুলোর জন্য, একমাত্র ইডেনের কেবিন ওয়ান বাদে। সেটার লিঙ্ক আমার ফোনের সঙ্গে করা। আমার কথা ছাড়, আর কার সম্মানের কথা ভেবেছিলাম সেই সময় আমি? বিধায়ক মা, ডাক্তার বাবা, প্রফেসর বৌ- সমাজ সংস্কার সর্বস্ব ভুলে গিয়েছিলাম। ইডেনের কোনো স্টাফ তার আগে চরম ইমার্জেন্সিতেও আমায় ঐ চেহারায় দেখেছে? সেদিন চোখ খুলে প্রথম আমার মুখটাই কি দেখতে পাসনি? তখনো তোর বরফের মতো আঙ্গুলগুলো আমারই মুঠোয়। হ্যাঁ, তুই সেন্সে ফেরার পর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইনি, সেটা বলতে পারিস। "




---------"এক্স্যাক্টলি এটাই বলছি। লোকলজ্জাকে উপেক্ষার সায়র যতটা সত্য আমার কাছে ঠিক ততটাই দামি মুহূর্তে নিজেকে সংবৃত করে নেওয়া পুরুষটি। বলেছি না, নরম সওদা করি না? আই রিপিট, তোর উচ্চতা আর আমার ধারণ- বিকাউ নয়। তোর দ্বন্দ্ব- সংশয়- ভয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে যে নীতিমালার শৃগালটি, যে তোকে শেখাচ্ছে স্বধা ধ্বংস আনবে, তাকে জানিয়ে দিস, স্বধা বলেছে- প্রতিটি হৃদয় নিপুণ ও অসংখ্য প্রকোষ্ঠ নির্মিত মহাকাশ। পতঙ্গ তাকেই নির্মাণের অনুকরণ করে মানুষ যা নিয়ে জন্মায়। এখানে কারোর প্রতি অনুভূতি অন্য কারোর অরি বা মিত্র হওয়া তো দূর, সম্পর্কিতই হয় না। যে যার নিজস্ব স্বাতন্ত্রে, স্বাভিমানে, স্মৃতিতে রাজ করে। শম আর দমের শাসন যদি আয়ত্বে আসে, রিপুযন্ত্রটি বড় যত্নে রামধনুর চাবি দিয়ে দেয়। একটিমাত্র রং দিয়ে বৈরাগ্য বা বাসর সাজায় মানুষ তার চামড়ার শরীরে। আকাশ-জল-বৃক্ষ- ঈশ্বরের নগ্ন শরীরের কোনো অংশের সঙ্গে তার সাযুজ্য আছে কি? নেই, থাকা সম্ভবও না কারণ তা সিদ্ধ। মানুষও পারে যদি নিজেকে উত্তীর্ণ করে। তুই হ, আমি আছি। দেখ, দক্ষিণ মধ্যমা দিয়ে চন্দ্র লিখে দিলাম তোর রুদ্রচিন্হে। আজ থেকে তুই স্বধার ধারণের অংশ। যখনই খুঁজবি, চোখ বন্ধ করলে এখান থেকে শুনতে পাবি-



"... as love crowns you so shall he crucify you... Love possesses not nor would it be possessed... For love is sufficient unto love... to bleed willingly and joyfully" "

রবিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                           


ফাত্রাতুন



"শিবে রুষ্টে গুরুস্ত্রাতা গুরুরুষ্টে ন কশ্চন:
ইতি কঙ্কালমালিনীতন্ত্রে..."

শেষটুকু উচ্চারণের আগেই প্রায় বিবর্ণ পাতা প্রথমে ঝাপসা আর তারপর- 'তুমি তো নারী, তোমার কবিতায় জলের অধিক কিছু থাকার ছিলোনা'। কে রুষ্ট হলো তার? জন্মইস্তক শিবপূজা করে আসছে প্রায় ভগ্ন, অশ্বত্থঘেরা দেউলঘাটে শ্রী, যে পুণ্যভূমি হালিশহরের গঙ্গাজলমৃত্তিকার ঘ্রাণের মধ্যে মিশে থাকেন মহাসাধকের বেড়া বাঁধার সঙ্গিনী লীলাবতী মহাকালী। লোকে বলে তারই অর্জন চট্টোপাধ্যায় বংশে তার বিবাহ, তিন পুত্রের সর্বকনিষ্ঠটির বধূ হলেও তারই হাতে দেড় শতাধিক বৎসর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত পঞ্চলিঙ্গের (বাণেশ্বর, চন্দ্রমৌলীশ্বর, রত্নেশ্বর, রামেশ্বর, অর্ধনারীশ্বর) নিত্যপূজার দায়িত্ব কমলিনী মারফত এসে পড়া। সেই রাতেও কি আরিদ্রা নক্ষত্র হেসেছিলো? জানা নেই। এই প্রাপ্তির লৌকিক ব্যাখ্যা চন্দ্রস্রোতে ভেসে যায় তার গুরুসম্বন্ধীয় অলৌকিক সৌভাগ্যে। সপ্তমবর্ষীয়া কন্যাটি দীক্ষা পেয়েছিলো স্বয়ং শ্রী সারদা মায়ের সাক্ষাত গৃহীশিষ্য শ্রী লাবণ্যকুমার চক্রবর্তীর থেকে। পরমহংসের নশ্বরতা বিষয়ে যারা চর্চা করে থাকেন তাদের কাছে পরিচিত "যুগজ্যোতি" ও "ঠাকুরের বাউল" সহ বহু গ্রন্থের রচয়িতা, প্রেমেশ মহারাজের প্রিয়তম কবি এই সাধকের নাম। শৈবলিনীও বিস্মিত ছিলেন বরাবর এত কিছুর পরেও শ্রীয়ের অন্তর্মুখীনতায়, অধ্যাত্মের পারদভারকে স্ফটিকের স্বচ্ছে নীরব জ্বালিয়ে রাখার দক্ষতায়। সন্তানকে পার্থিব প্রাপ্তিতে সন্তৃপ্ত দেখে সন্তুষ্ট হওয়ার সাধারণ মা তিনি ছিলেন না। ফলত, যোগীচক্ষুর বিচলনের প্রয়োজন পড়েনি। নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন মেয়ে তার শান্তিসূত্রের সমীকরণ নিজেই এঁকে নিচ্ছে বলে। নীলাদ্রীকে দেখে তার নিয়তিতে বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল- "বারাণস্যাং তু বিশ্বেশম ত্র্যম্বকং গৌতমীতটে" । তিনি মেনকা ছিলেন না কিন্তু একথাও তো সত্য পার্বতী শুধুমাত্র কিছু পুরাণমতের নাম। শক্তি ও তার আধার প্রসঙ্গে পুঁথি মানা হলে শেক্সপিয়র কেন নয়? "What's in a name?" 


সেই শ্রী আজ অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষত। কোনো অসতর্ক মুহূর্তে কি বাণলিঙ্গ আঘাত পেয়েছেন? সদাশিবের অত্যন্ত উগ্ররূপ এই উপবৃত্তাকার স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। রুদ্রজ ব্রাহ্মণেরাও অতি সন্তর্পণে তাঁকে আরাধনা করে থাকেন। কিন্তু তবুও তো শ্রীয়ের গুরুদাদু আছেন। সে জানে শ্রীশ্রীমা নহবতখানায় থাকাকালীন একদিন তাঁর স্বপ্নধ্যানে পিঙ্গলজটা দুলিয়ে বাঘছাল পরা এক শুভ্রকায় শিশু দৌড়াতে দৌড়াতে এসে নালিশ জানিয়েছিলো- "আমায় ফেলে দিয়েছে"। মা তাকে কোলে বসিয়ে আদর করে বুঝিয়ে শান্ত করেছিলেন এই বলে যে "ইচ্ছে করে তো করেনি বাবা, সবই তো তোমার সন্তান, অপরাধ নিতে নেই"। তাহলে? কীসের অপরাধে তাহলে এই শূন্য বাড়িতে অধিকতর শূন্যতা ধারণ করে তার তাকিয়ে থাকা? আজ ষোলোদিন পেরিয়ে গেলো নীলাদ্রি নার্সিংহোমে। স্বধা রোজ ছয় ঘন্টার জন্য বাড়ি ফেরে। মেয়ের মুখ দেখে সে কোনো প্রশ্ন না রেখেই বুঝে যায় অমাবস্যার দেরী নেই। তাহলে কি... তাহলে কি... সে নিজেই হোতা, অধ্বর্যু ও উদ্গাতা এই আকস্মিক 'যজ' ধাতু ', 'ঞ' প্রত্যয়ের অবশ্যম্ভাবী আবির্ভাবের? আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে যে সূক্ষ্ম চিড় ধীরে মহাখাত হয়ে আলাদা দুটি সভ্যতায় পরিণত করলো তাকে ও নীলাদ্রীকে, সে কি জেন হ্যারিসনের তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা দিলো তবে?

"Collectivity and emotional tension, two elements that tend to turn the simple reaction into a rite"

শীতল লাভার মতো তার অভিমানসমূহ এভাবে বধযোগ্যতা দিলো নীলাদ্রীকে? 



চন্দ্রগর্ভের ক্ষতগুলিকে কলঙ্ক নামে রোম্যান্টিসাইজ করাই প্রথা। সেইহেতু এই প্রশ্ন কখনো ওঠেনা যে শুধুমাত্র শ্রেষ্ঠ সুন্দরী তথা পাণ্ডবশক্তির কেন্দ্রস্থল বলেই দ্যূতসভায় রজস্বলা পাঞ্চালীকে বিবস্ত্র করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো নাকি কেশবসখী হওয়ার দায়ে তাঁর জন্মলগ্ন থেকে বিবাহ- প্রতি পলেই কুরুক্ষেত্র? শুধু কৃষ্ণা তো নন, অজস্র উদাহরণ রয়েছে যেখানে ঈশ্বরনির্ভরতাই কারণ জীবনব্যাপী দুর্ভাগ্যের। "দুঃখ তাঁর দয়ার দান" উচ্চারণকারী গান্ধারী কি বাসুদেবকে অভিসম্পাত দানে বিরত থাকতে পেরেছিলেন শেষতক? শ্রী তার জীবনের প্রেক্ষিতে এই সূত্রের বহু সম্ভাব্যতা খোঁজার চেষ্টা করেছে এতো বছর ধরে। সে শৈবলিনীর মতো বৈরাগ্যপ্রতিমা নয়, কমলিনীর মতো সিংহতেজাও না। এই দুইজন ব্যক্তিগত আদর্শকে যাপনে পরিণত করতে পেরেছিলেন কারণ ভাগ্য তাঁদের যে মুক্তি দিয়েছিলো তাতে তারা মেধা ও কাঠিন্য মিশিয়ে নিস্তেল স্বাধীনতার অণ্বেষণে নিজেদের ব্যস্ত করে তুলেছিলেন। অথচ শ্রী? অধ্যাত্মের তীব্র ফল্গু তার মধ্যে প্রবহমান জেনেও তার মা তাকে পাত্রস্থ করেছিলেন অতিরিক্ত দ্রুততায়। যতই শৈবলিনী দাবী করুন নীলাদ্রি সাধারণ পুরুষ নন কিন্তু একমাত্র নিজস্ব মায়াবিশ্বাস ছাড়া এ প্রমাণ তিনি কোথায় দিয়েছিলেন শ্রীকে যে তার জন্য নির্বাচিত জন শর্ব? শ্রী যা পেয়েছে তাতে যদি নীলাদ্রি অনঘও হন তবুও তার রূপ মণিকর্ণিকায় শবের কানে তারকব্রহ্ম নামদায়ী কামারী, কৈলাসে উমার পুরুষ সোম নন। রাগ-রাগিণী সামপ্রিয় নীলাদ্রীর দুর্বলতা অথচ কখনো শ্রীকে শুনতে চাইলেন না তো তিনি। প্রাইমারি থেকে উচ্চবিদ্যালয়- যে শ্রীয়ের দিকে তাকিয়ে হেন প্রাণী নেই অবাক হতোনা গন্ধর্বসম আলোয়, কখনো তাকেই দেখার সময় নীলাদ্রীর চোখে তো মুগ্ধতার অঞ্জন লাগলোনা। কেন? অথচ নীতিজ্ঞান ও চরিত্রে নীলাদ্রীতুল্য পুরুষ দুর্লভ। এক্ষেত্রে তিনি অবিসংবাদী অজাতশত্রু। তাহলে কি অতিশৈশব থেকে ঈশ্বরবোধের যে বেদী নির্মাণ করেছিলেন শৈবলিনী তাইই শ্রীয়ের বোধ ছাপিয়ে শরীরী উপত্যকাকে দেবজ অংশ করে তুলেছিলো যাকে ঘিরে মন্ত্রোচ্চারণ করা যায় কিন্তু অন্তরঙ্গে আনার স্পর্ধা দেখানো যায়না? অগ্নিকে আলিঙ্গন কেই ই বা করেছে কোনদিন? তাহলে কি যে অনীশ্বরকে ভিত্তি করে কমলিনী ও শৈবলিনী সাম্রাজ্যজয়সুলভ সুখলাভ করেছিলেন সেইই শ্রী ও নীলাদ্রীর মধ্যবর্তী আলোকবর্ষ ব্যবধানের মূল রহস্য? 


স্বধা পৃথিবীতে আসার আগে ও পরে, মাত্র একবার, প্রথম ও শেষবারের মতো নীলাদ্রীকে আঘাত করতে চেয়েছিলো শ্রী, যদি রূপকথার মতো গুহামুখ থেকে পাথর সরে গিয়ে জন্ম নেয় নদী না হোক অন্তত কোনো সিল্করুট। সে তখন দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা। ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ তখনো নিষিদ্ধ না হওয়ায় কে আসবে সে জানত। 

-- "পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা"
যাক, তোমাকে অন্তত এই যুক্তিতে বিয়েতে রাজি করানো গেছিল"

মুহূর্ত কয়েকমাত্র। উত্তর এসেছিল...


-- "নির্বাচন করো শ্রী। আমি তোমায় চব্বিশ ঘন্টা দিলাম। তুমি এই সন্তানকে জন্ম দেবে কিনা, দিলে আমায় সারাজীবনের জন্য হারাবে। যদিও আমি আমার জীবদ্দশায় তোমার কোনো দায়িত্ব কর্তব্যেই ত্রুটি রাখবো না সে তুমি যে সিদ্ধান্তই নাও। স্বামী কিনা, প্রেমিক তো নই"


পরবর্তী ইতিহাস কোনো পাঁচালী নয়। গর্ভস্থ পুত্রটি হত্যা হয়েছিলো। আর ঠিক সেইদিন থেকে স্বধা দেখেছিলো কীভাবে একই রাতের আকাশের নিচে একই যুদ্ধক্ষেত্রে অন্ধ নৈশব্দ্য নিয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে দুই শত্রুশিবির, পরের কোনো সূর্যই যেখানে এমন আসেনা যখন শঙ্খনাদে রণ ঘোষিত হবে। শুধু অস্ত্রেরা নিপুণ থেকে নিপুণতর হতে থাকে, কৌশলেরা নিখুঁত থেকে নিখুঁততর, লক্ষ্যরা তীক্ষ্ থেকে তীক্ষ্তর আর দূরত্ব... অনতিক্রম্য।



স্বধা শুধু ভেবে চলে মাধবের 'শত্রু' সম্বন্ধীয় শ্লোকটি। কী প্রবল পারস্পরিক সংবেদী হলে দুইটি অস্তিত্ব এইভাবে নিজেদের উন্মাদ ক্ষয়কে শক্তিস্তম্ভে প্রতিস্থাপিত করতে পারে? সমর্পণ নয় অথচ প্রত্যাহারও নৈব নৈব চ। যদি এ প্রেম না হয় তাহলে আজ অবধি পৃথিবীতে একটিও কবিতা লেখা হয়নি। 




রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

 

                     


আঞ্জুমান ২





"সাংকাশ্য নগরীর এখন কী নাম আর্নেস্তো?"



-- "প্রবারণার তো এখনো অনেক দেরী তথাগত, আজ হঠাৎ ?"



" 'বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়' যদি শ্রমণদের কোনো একদিন বলে এসে থাকি 'চরত্থ্বে ভিক্ষবে চারিকং', নিজে আজ তার ব্যতিক্রম হবো? নিজেই না বললে খানিক আগে আদর্শকে হত্যা করেছে আমার আর তোমার শরীরকে? তোমায় প্রত্যক্ষ করতে হবে না তোমার আদর্শের পরিণতি? অন্ততঃ আমি মহাপরিনির্বাণ নিয়েছিলাম ব্যক্তিগত নির্ধারণে আর তা প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতির আগেই। কিন্তু আর্নেস্তো, তুমি তো আজও সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু ভ্রমে। সব পেরিয়ে তোমায় আমি কবিই তো দেখি। আর কোন উন্মাদ বিপ্লব আনতে এমন প্রেমিক হতে পারে? চাই না আঁশটুকুও থাকুক, তাই আজই। তাকাও... স্বধাকে দেখতে পাচ্ছ?"




-- " পাচ্ছি। ভূতগ্রস্তের মতো ভাঙা ঘুম হাতে করে বসে আছে। প্রথমটা কিছু বোঝেনি। ধীরে আতঙ্ক তার ডানার মধ্যে মুড়ে নিচ্ছে, সংজ্ঞা মুচড়ে উঠছে "




মহকুমা মফস্বলটি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতরাষ্ট্রে, সুতরাং কিছুমাত্র বিস্ময়ের নয় তার সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অক্সিজেন প্ল্যান্টটির দূরত্ব চুরাশি পূর্ণ আট কিলোমিটার। একটি মাত্র জাতীয় সড়ক (এন এইচ চৌত্রিশ, বর্তমানে বারো) যা দিয়ে দুটি অঞ্চল যুক্ত, সেটিই উত্তরবঙ্গে পৌঁছানোরও একমাত্র স্থলমাধ্যম প্রায়শই অতি বর্ষায় যার অন্তর্গত কিছু ব্রীজ ভেসে ও ভেঙে যায় এবং জলস্রোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাকি ভূ-খণ্ড থেকে। বর্ষা ব্যতীত তাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া প্রতিদিনের কোটি খানেক যান কল্পনা করে মেঠো পথের গোরুর গাড়ি তাদের তুলনায় কতটা সৌভাগ্য পোষণ করে আর অবশ্যই প্রার্থনায় থাকে কবে পুরোপুরি এই স্থলজ অসভ্যতা থেকে নদীমাতৃক সভ্যতায় ফিরে যাওয়া যেতে পারে। এ নরক থেকে ত্রাণ দেবে এমন পুত্রাণের আশা "দেহি দেবী" মন্ত্রেও উচ্চারণ করা পাপ, এমত স্বধারও বিশ্বাস। ট্র‌্যাফিক আইন যারা রক্ষণাবেক্ষন করেন তারা জানাতে ত্রুটি রাখেন না ইমার্জেন্সি সার্ভিসগুলির জন্য সড়কে সর্বদাই অগ্রাধিকার থাকবে যেমন এম্বুলেন্স, বেবিফুড, লাইফ সেভিং ড্রাগস ইত্যাদি কিন্তু এই আইনের নির্দেশিকায় যে 'সড়ক' শব্দটির অস্তিত্ব আছে "ইতি গজ"র মতো করে যা সমগ্র আইনটিকেই প্রহসনে পরিণত করেছে তা জানার বা জানানোর কোনো দায় তাদের থাকে না। এ রাজ্যে তুখোড় আন্তর্জাতিকতায় ক্ষমতার পায়ের নিচে লাল কার্পেট পাতা, দামী মৃতদেহের সদগতিতে হাজির গ্রিন করিডোর, দফতরের দেওয়ালদের পরানো থাকে নীল জার্সি... আর যাদের মুখে রক্ত উঠিয়ে রোজগারের অংশ থেকে কেটে নেওয়া ট্যাক্সে এই লাল সবুজ নীল আতসবাজি তাদের জন্য 'পূর্ত দফতর' নিতান্তই ডাইনোসর বা ডোডো পাখি। মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দূরের মহানগরীতে পৌঁছতে বা ফিরতে দিনের সিংহভাগ সময়কাল কাটিয়ে দেওয়া স্বধার কাছে জন্মইস্তক এই অভিজ্ঞতা নিত্যকর্ম পদ্ধতির মতোই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু কিছুক্ষণ আগের ফোন তাকে যে খবর দিলো তাতে সে ফুটন্ত তেল আর জ্যান্ত আগুনের মধ্যের পার্থক্য স্পষ্ট বুঝতে পারল। রিফিলড অক্সিজেন সিলিন্ডারের যে ট্রাকটি প্রতিদিন সন্ধ্যায় সদরে ঢোকে, ডিফারেন্সিয়াল ভেঙে যাওয়ায় আজ কতক্ষণ পর আসবে সংবাদ নেই। নার্সিংহোমের মজুদ থেকে নীলাদ্রি আর মাত্র ঘন্টা দুয়েক সরবরাহ পাবেন তার ক্যনুলায়, বাকিটা ঈশ্বর।



" কিন্তু তথাগত, আপনি এই পরিস্থিতি দেখিয়ে আমায় কী বোঝাতে চাইছেন? আমার আদর্শ এখানে আঘাত পাচ্ছে কোথায়? "



-- " বড় অধৈর্য হয়ে পড়ো তুমি আর্নেস্তো, বালক স্বভাব। যা দেখাতে চাইছি তা আমায় প্রশ্ন করে জানতে হবে না। প্রসববেদনা উঠলে কি ধাইমাকে জাগিয়ে তুলতে হয় আসন্নপ্রসবাকে? "





প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ আছে যেমন প্রতিটি ক্রীড়ার নিজস্ব অনুশাসন, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব বিধান আর প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব ব্যবধান। সোশ্যাল মিডিয়া কোনো ব্যতিক্রম কি? যারা এটিকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান বলে স্বীকার করে নেয় তারা মানবে এরও নিজস্ব ব্যাকরণ, অনুশাসন, বিধান, ব্যবধান সবই বর্তমান। নিজস্ব গণ্ডিতে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিকে তাহলে কেন প্রকাশ করা যাবে না নির্দ্বিধায়? অন্ততঃ স্বধা এমনই জানত। সে যেমন নীলাদ্রির নার্সিংহোমে এডমিটের খবর জানিয়েছিলো ঠিক তেমনভাবেই তার সঙ্কটও। একটি সিলিন্ডারের অভাবে যে তার বাবা তার চোখের সামনে ডাঙায় তোলা মাছ হয়ে যাবে এই সাদা ও সরল সত্যকে সে ভিক্ষার আবেদনে পোস্ট করেছিলো স্নায়ু সামান্য নিয়ন্ত্রণে আসতেই। 




স্বধার প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়নি। তার অতি সংক্ষিপ্ত বৃত্তও প্রায় হাজার দুয়েক শেয়ারে তার আবেদন পৌঁছে দিয়েছিলো সেলেব, সাহিত্যিক প্রশাসক মহলে। প্রত্যেকেই পূর্ণোদ্যমে তাকে সাহায্যের চেষ্টা করেছিলেন। ফল এসেছিলো মন্ত্রবৎ। আধ ঘন্টার মধ্যে সায়রের ফোন তাকে জানিয়েছিলো প্রশাসন সহ বিভিন্ন মহল থেকে ইডেনের কেবিন ওয়ানকে নিয়ে এত উৎকণ্ঠার কৈফিয়ত তাকে দিতে হচ্ছে যে সে সমস্যায় পড়ছে। সায়রের মালিকানার অন্য নার্সিংহোমগুলিতে ক্যারিয়ার পাঠিয়ে সিলিন্ডার আনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বধাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কোনো সাহায্য চাইবে না, এর বিনিময়ে সায়র ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকলেন নীলাদ্রিকে পরিষেবা সংক্রান্ত কোনো অভাবে না পড়তে দেওয়ার। অতি সহজ চুক্তি। একপক্ষে নীলাদ্রির আয়ু, বিপরীতে ইডেনের নিরাপত্তা। যে পরিমাণ আলোড়ন এই মুহূর্তে স্বধার পোস্টকে ঘিরে শুরু হয়েছে, কেন নার্সিংহোমের অধীনে থাকা সত্ত্বেও পেশেন্ট পার্টির ফরেন হেল্প লাগবে এই ইস্যু তুলে, তাতে ইডেন ঘোরতর বিপদে। চরম স্বার্থপর স্বধা, নীলাদ্রির মুখ স্মরণ করে চোখ বুজে কথা দিয়েছিলো- ভবিষ্যতে ইডেনে তার চোখে যাইই পড়ুক, যাইই ঘটুক যে কারোর সঙ্গে, একমাত্র নীলাদ্রির প্রসঙ্গ ব্যতীত সে প্রত্যেককে এবং সবাইকেই অগ্রাহ্য করবে-  "মাস্টারমশাই, আপনি কিছু দেখেন নি"। কতো যে ডিল হয় প্রতিটি পলে এই সংসারে, কতো শতরঞ্জ... তবুও দ্যূতক্রীড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই গান্ধার যুবরাজকে স্মরণ করে ইতিহাস... এ বড়ো দুর্ভাগ্যের। 




"আর্নেস্তো, যেটুকু দেখলে তা এক রোপণ উপাখ্যান মাত্র। সব বীজের নিয়তিতে মহিরুহ থাকে না, কিছু বিষজ হাহাকারও ধারণ করে। পোখরান মনে পড়ে? আমি হাসছিলাম তাই না? ভারতরাষ্ট্র তার কূটনৈতিক তুরুপে পৃথিবীর ষষ্ঠতম শক্তিশালী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করলো, তার দায় কার - স্মাইলিং বুদ্ধ - আমারই না? আজও দেখবে। তাকিয়ে থাকো..."



--" তাকিয়েই তো আছি তথাগত কিন্তু এখানে কী করে আমার ভ্রম ভাঙার কাঠামো গড়া হবে সে চালচিত্র এখনো অব্দি পেলাম না। আমি অনুমান করছিলাম আপনি মৌলবাদ কীভাবে মহামারী হয়ে উঠছে এই অতিমারি পীড়িত উপমহাদেশেও সেই নিয়ে কিছু বলবেন। আচ্ছা খেয়াল করেছেন, জাত নির্বিশেষে মৌলবাদীদের নিজেদের মধ্যে কী প্রগাঢ় মিল? অন্ধত্ব ভিন্ন এদের দ্বিতীয় ধর্ম থাকে না, পৈশাচিকতা ভিন্ন দ্বিতীয় ধর্মাচরণও নয় অথচ এদের চামড়ার নাম 'ধার্মিক'। কী পরিহাস না? আমি এও ধারণা করছিলাম তথাগত আপনি মার্কস নিয়ে হয়তো বলবেন। "রিলিজিয়ন ইজ দ্যা ওপিয়াম অব দ্যা পিপল"- এই বিকৃত, খণ্ডিত কোটেশনের মূল ও পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি তুলে হয়তো স্বচ্ছ করে দেবেন কেন মৃত্যুমুহূর্ত অবধি মার্কসের গলায় ক্রুশের চেনটি ছিল। এও বলবেন পশ্চিমবঙ্গের রক্তাভ জারজেরা জনগণকে এতটাই অশিক্ষিত ভেবেছিলেন যে তারা ধরেই নিয়েছিলেন কেউ মার্কস পড়ে না, বোঝে না, জানে না। ফলে হাতের যাবতীয় মাদুলি ও তাবিজদের যত্ন করে সাদা পাঞ্জাবির হাতায় ঢেকে, তিন দশকেরও বেশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করে তখ্ত অধিকারে রেখেছিলেন "



--"যা তুমি নিজেই বোঝো তা যদি নতুন করে তোমাকে দেখাতে যাই তবে যে 'বোধি' শব্দের অর্থ 'নির্বোধ' হয়ে যায় আর্নেস্তো। নীরবতা পৃথিবীর ভয়ংকরতম শীতল মারণাস্ত্রের নাম। কিছুক্ষণ না হয় তারই অনুশীলন করলাম আমরা? এসো... বেশী নয়, বুদ্ধের আত্মার নাম পরিমিতি... নিপ্পন আলো হয়ে ওঠা অবধি, এসো"





"Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people."

শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

         


ইলুশিও



তুমি দেখো অকালমৃত্যু, আমি জানি বিচ্ছেদের আতঙ্ক কতদূর তীব্র হলে প্রেমিকের করতলে হত্যারেখা জাগ্রত হয়- আমাদের এক অদ্ভুত সংস্কার, যে কোনো শব্দের বহুমুখীনতাকে আমরা জেদে অস্বীকার করি অথবা যে উপেক্ষার প্রয়োজন ছিলো বন্দিত্ব আরোপের প্রক্রিয়ায়, তা বরাদ্দ হয় ঝাঁকের কৈ হতে গিয়ে, লালন ভাসেন লালনের জলে, আবাদহীন জমি পড়ে থাকে রামপ্রসাদী খরায়। কমলিনী নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন বহুক্ষণ ধরে (এই ইথারে কাউকে স্মরণ না করা অব্দি সে এসে অনধিকার চর্চা করে না) । যদি শরীরে প্রাণের অভাবের পরিভাষা 'মৃত্যু' হয় তবে হৃদে নয় কেন? কালরেখা প্রতিটি আয়ুতে ভিন্ন হলে অকালের সংজ্ঞা কী? যদি আত্মরক্ষার্থে হত্যা আইনসিদ্ধ হতে পারে তাহলে আজও ইউথেনেশিয়া অস্বীকৃত কেন? এত প্রশ্নের ক্ষত যে উদ্ধারণ পালার বিবেক পলাতক। আজ দেখতে যাবেন স্বধাকে, এই স্ফুরণে এখন লেডি ম্যাকবেথও যদি তার সঙ্গে কফিতে আসে, খুব ক্ষতি? কার ক্ষতি?


"মরলে ভাই? বেশ... এ রাসের ঘোর ভাঙাবো না আজ, ভাঙবেও না"


কমলিনীর তো সুখের কথা হবেই, স্বধার গ্রীবায় অভ্রান্ত স্কারলেট, চলনে গর্ভিণী কাছিম। তাকে সমাজ যারপরনাই ভৎর্সনা তো করতোই নাগালে পেলে এই মুহূর্তে রাবাবের যে তারে তার আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে পাপ সাব্যস্তে, কিন্তু তিনি তো কমলিনী, একশো আট তার সংস্কারে। তার মানসী আজ এমন আশ্লেষে যা পেতে প্রতিটি অবতার শরীরে, ঔরস-যোনির চক্রে, কোটি কোটি জন্ম ধরে মাথা ঠোকে শ্রী ভগবান।


নাড়িতে যে নৌকা ছিঁড়ে ভঙ্গুর পদ্ম কিছু রসস্থ থেকে গেলো, ঘাতক রাজহাঁস সে ঘুণ বিস্মৃত হলো না- তত্ত্বগত অভিজ্ঞান আর প্রকৃত উপলব্ধিতে যে ফারাক তাকে আসমান জমিন বলে নিতান্তই লঘু করে ফেলা হয়, আসলেই তারা দুই মেরুর। প্রতিলিপি বা ছবি কল্পনায় অরোরা বেরিয়ালিস ভাবাতে পারে কিন্তু তা বিশ্বরূপের বিদ্যুত সঞ্চালনে ব্যর্থ। অদ্ভুত ঘোরের ভিতর ঘাড় গুঁজে ভাবছিলো স্বধা। তাকে শীতল রক্তের সরীসৃপ বলে ব্যঙ্গ শুনতে হয় বিস্তর, একেবারেই তাপ সহ্য করতে পারে না বলে অথচ গত কয়েক ঘন্টা সে প্রায় ফার্নেসের ভিতর ছিলো বলা যায়। অব্যবহার্য-পরিত্যক্ত জিনিস বোঝাই একটা ঘর যাকে গুদাম বললে বিন্দুমাত্র নামকরণ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। স্বেদবিন্দুর স্রোত ছাড়া চন্দন পালঙ্কের থেকে ব্যবধান বোঝেনি তো অথচ এই প্রলয়, প্রবল প্রার্থিত হলেও তার প্রস্তুতি ছিলো না কোনো, পরবর্তী ধারণাও, ঠিক এইখান থেকেই তার বিস্ময়যাত্রা। 


কোথাও একবারের জন্যেও স্বধার দ্বন্দ্ব আসেনি এতোদিন শৈবলিনী-কমলিনীর আধ্যাত্মিকতা আর ট্যাঙ্গো সালসার উন্মাদ আবেগের মধ্যে। দুইই ছান্দ্যোগ্য, দুইই এক সত্যের কথা বলে, শকট ভিন্ন, পথ এক। প্রথমটি মূলাধার-স্বাধিষ্ঠান-নাভি-হৃদ-বিশুদ্ধ-আজ্ঞা-সহস্রারকে জাগ্রত করে সূক্ষ্মতায় বিলীনে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়টি নির্মেদ আধারকে ভেঙেচুরে মিলন ও মুক্তি বিন্যাসে শরীরকেই অতিক্রম করে চলে। কোথায় বিরোধ? বাউলাঙ্গে রজ-রক্তও তো সেই দিকই নির্দেশ করে। সবই 'ইত্থুসে ব্রহ্ম'। এই মতবাদ স্বধার স্নায়ুতে বিশ্বস্ত আশ্রয়ে ছিলো ফলত সে শরীরকে কোনোদিন অস্বীকারের চেষ্টামাত্র করেনি, অবদমন এক আত্মঘাত মাত্র জেনে অপেক্ষা করেছে। অথচ তবুও আজ মনে হলো সে কিছুই জানতো না এতদিন, একে চন্দ্র থেকে চন্দ্রবিন্দু, কিছুই নয়।


শ্বেতপাথরকে জড়িয়ে থাকো আগুনের সাপ, দেখো নাভি থেকে কিছু ব্যথা ফ্লেমিংগো হয়ে উড়ে যাচ্ছে শেষ সন্তের খোঁজে- নিশ্ছিদ্র যন্ত্রণা স্বধার সর্বশরীরে। সেই অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে পশমে মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্টারলিউড শ্রান্তিতে, এই ক্ষণে তার অনুপস্থিতি। দংশন... এতো নিষ্ঠুর হয়? বজ্রের শক্তিতে বেঁধে রাখা উর্দ্ধবাহুদ্বয়ের ভিতর মাথা থাকলে, শ্বাসরোধী চিৎকারটিও কি নিস্তেল প্রাপ্তির? তার অতলে প্রোথিত হচ্ছিলো যার নৃশংস স্তম্ভ, উপসংহারী তন্দ্রায় তাকেই অসহায় পেয়ে এতো আদরের আলপনা কীভাবে আঁকলো সে? শরীরে এভাবে মায়ামেঘ ঘনায়? এইই কি সেই বিশালাক্ষীর থান শৈবলিনী যাকে নির্দেশ করতেন পঞ্চভূতের ফাঁদ নামে? কাঁদছে স্বধা আপাতত... শৈবলিনী দেখছেন কুয়াশার আলোয়... ভাঙছে, নামছে, অঘোর বর্ষা...


যখন শারীরিকভাবে পুরুষ নারীকে চায় অথবা নারী পুরুষকে, সেই আকর্ষণে বহু স্তরবিন্যাস থাকে, শ্রেণীভেদও, কোনোটিই বিচারাধীন নয় কারণ যে কোনো শরীর আসলেই এক আশ্চর্য আলাদিন। জাদু কি প্রদীপে থাকে? সম্ভব? প্রতিটি মানুষের ভিতর বসত করে যে দুর্দম শক্তি সেই তো রূপকে চিরাগ। যে বোঝে সে খোঁজে, যে বিশ্বাস করেনা, পায় না, এতো জলবৎ অঙ্ক মাত্র। শরীর নিয়ে এতো শুচিবায়ুগ্রস্ত যারা, একবারও যে কেন তারা ভাবেনা- "যদৃচ্ছা লাভ"। তেষ্টাকে প্যারামিটার ধরলে আরও সহজ হয় ধারণের আদল। জলের সন্ধানে কেউ পুকুরে অভ্যস্ত, কেউ খোঁজে নদী, যার তৃষ্ণা মেটেনা সে ডোবে, তলিয়ে যেতে যেতে এল ডোরাডো। আর বাকি অংশের কিছুই লাগেনা, বন্ধ বোতল থেকে প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়া, সুতরাং বিচার খাটে না, খাটতে পারে না। অযথা উৎকর্ষ অপকর্ষ ন্যায় অন্যায় নিয়ম নীতির খাপ। 


কিন্তু আজ একথা স্বধা নিশ্চিতভাবেই বলবে যেহেতু শরীরের দূরত্ব শেষ হওয়ার ঠিক পর থেকে টান বিদ্ধংসী হতে শুরু করলো সুতরাং গন্তব্য "দ্যা থার্ড শিপ"। যুক্তি সাজাচ্ছিলো সে সাদা কালো চৌষট্টি খোপে। এখানে ভিজে যাওয়া তালুতে চুমু রাখতে তোলপাড় এসেছে, তুরপুন নখে তৈরী হওয়া আঁচড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে সাধ গেছে, বরাবরের সম্বোধন 'তুই' অতর্কিতে বার কয়েক 'তুমি' হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরের মানুষটা বীজতলার পরেই যেন পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছিন্নভিন্ন করে চলে যাওয়ার পর বার্তা এসেছে "বুকে আয়, এবার ঘুমো, ঘুমিয়ে পড়, মাথায় হাত দিয়ে রেখেছি"। বারবার প্রশ্নেরা এসেছে "শরীর ঠিক আছে? ঠিক করে কথা বল, শরীর কি ঠিক আছে?" সে উত্তর দেয়নি কারণ এই উৎকণ্ঠায় শরীর যতটুকু থাকে তার থেকে অযুত মাত্রায় বেশী থাকে শরীরের অপ্রাসঙ্গিকতা। 


এখন মণিমালা'কাল। বারিধারা শঙ্খ শরীরের হাঁসুলি বাঁক ছুঁলে অনুপ্রবেশ বোধ হচ্ছে। স্পর্শের স্মৃতি- যারে হেরিলে এ দেহলতা তাবিজ বোধ হয় যেমত। হাওয়ায় বৃন্দাবনী সারং উড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সেই অনন্ত লম্পট। অজস্র ময়ূরের পালক উড়ে বেড়াচ্ছে দিগন্ত বিস্তারে। স্বধার মনে করতে ইচ্ছে করলো তার নাম যিনি লিখেছিলেন "নারী নরকের দ্বার"। তিনি কি কৃষ্ণভক্ত ছিলেন? জানা নেই তার। তিনি সম্ভবত ময়ূরও দেখেননি। স্বধা হেসে উঠল। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতিবিদটি প্রতারকই তো ছিলেন। ফেরেননি গোকুলে না? কেনই বা ফিরবেন? অথচ নশ্বর শেষ মুহূর্ত তক স্বর্ণমুকুটে শিখিপাখা যে কেন গুঁজে রাখলেন? স্টাইল স্টেটমেন্ট? যেভাবে ক্রাইস্টের ট্যাটুর ভিতর দিয়ে ইদানীং নিপুণ শৈল্পীতে আঁকা থাকে বিলাভেডের নাম, আপাত অদৃশ্য। "বুঝে লহো মন যে জানো সন্ধান"। শ্রীমতির যোনিচিহ্ন আজীবন মস্তকে ধারণ করে মহাভারত সৃষ্টি আর দ্বাপর ধ্বংসের লীলা করে গেলেন যাদবকুলপতি অথচ কেউ টেরটিও পেলো না। স্বধাকে যে নীল নীল দহনে আজ ছেড়ে গেলো সে তবে কে? কেদার মনে পড়ছে তার। ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে উত্থিত ব্যপনে কস্তুরীঘ্রাণ। শুভ্র পাথরে আছাড় খেয়ে ভেঙেচুরে যাচ্ছে অজস্র পিতলের ঘন্টাধ্বনি। কৃষ্ণসর্পটি কাকে আঁকড়ে আজ প্রস্তরীভূত হলো?

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                       


মেটামরফসিস 





অবশেষে এক আশ্চর্য ছায়াসম্ভব আলো আমায় নিষ্কৃতি দেয়- বেতস সুষুম্না ভিজে উঠছে স্নানজলে, শৈবলিনী চোখ বুজে সদ্যোজাত তাপে স্বস্তি খুঁজছিলেন অথবা আঁকতে চাইছিলেন। একাই যে পথ পেরিয়ে এলেন এতোদিন, যার শুরু ছিলো যৌথতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই, এমনও বলা যায় যৌথতার নিমিত্তেই মন্ত্র দিয়ে গেঁথে যে জীবন নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিলো, শুধু কি তার একারই দায় ছিলো তাকে ধারণের? বহমান রাখার ? এমনকী হয়তো শেষ সমাগত, এই শ্বাসেরও? প্রশ্ন আসে না আর। পথ দীর্ঘ হলে তার ক্লান্তি পথিককে গন্তব্য প্রসঙ্গে উদাসীনতা দেয়, যে কোনো দীর্ঘতর দৈর্ঘ্যের এইই সাফল্য। 




খুব সহজ ছিলো না। অনভিজ্ঞ ষোড়শী ছিলেন। সতেরোতে মা, উনিশে দ্বিতীয় সন্তান, তেইশে কাশের রঙে প্রায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এও এক রহস্য। যে মেয়েটি লাল রঙ ভালোবেসে বড় হলো, আমিষ গন্ধ ছাড়াও যে ভাত মাখা যায়, বিশ্বাস করতে শিখলো না, তার নর্ম সহচর পঞ্চভূতে বিলীনের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঙ সেই অন্নঘ্রাণই তার কাছে নিষিদ্ধ, কী করে যে এই ফতোয়া দেওয়া যায়...কই জায়া বিয়োগে তো এমনটি হয় না, এমনকী প্রভু-ভৃত্য পরম্পরাতেও নয়, তাহলে এই অদ্ভুত নীতি শুধুমাত্র এক ব্যতিক্রমে কেন? শৈবলিনী এভাবে ভাবেননি, তার সন্তানেরা ভেবেছিলো। ধ্রুপদী সুন্দর মা'কে বোধ হওয়া ইস্তক শুধুই শুভ্রতায় দেখতে দেখতে তাদের ক্ষোভ এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিলো বিস্তীর্ণ বাগান আলো করে থাকা জুইঁ আর কুন্দ ঝাড়ের একটি ফুলকেও রোদ্দুর ওঠার পরে গাছে দেখা যেতো না। ঋজু ব্যক্তিত্ব অভেদ্য প্রাচীর হয়ে তার সঙ্গে তার সন্তানদের অনাবিলে বাধা হয়ে থেকেছে বরাবর। মা'কে তারা তাদের হাস্য পরিহাসের অংশে পায়নি কখনো। ভাবতে ভাবতে শৈবলিনী ভিজে ওঠেন ভিতরঘরে। তিনি অপরাধী কি? বিশাল এক জীর্ণ অট্টালিকা, অকালপ্রয়াত স্বামীর অপরিকল্পিত সামান্য সঞ্চয় দিয়ে দুই সন্তানকে যে নারীর একা হাতে 'মানুষ' করে তুলতে হয়েছিলো সত্তরের দশকে, চৈতন্যে পুঁতে দিতে হয়েছিলো অর্থের সঙ্গে আভিজাত্যের কোনো সম্পর্ক থাকে না, থাকে আত্মাভিমানের- এই দর্শন, শুধু সেইই জানে নিরেট গাম্ভীর্য কোনো বর্ম বা মুখোশের মতো আত্মরক্ষার অধিক প্রত্যাঘাতের নাম। এ বাসরে ছিদ্রের অধিকার তিনি দেবতাদের দেননি ফলত দানবেরা অনুপ্রবেশের পথ পায়নি। 



মাটি যে কতদূর ভারী ঠেকলে কেউ স্বেচ্ছায় জলজ হতে চায় শৈবলিনী সেদিন টের পেয়েছিলেন যেদিন তার বাইশ বছরের ছেলে ইণ্ডিয়ান নেভির  নিয়োগপত্র হাতে মায়ের অনুমতি নিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। শৈবলিনী বন্দরের থেকে বেশী বাতিঘর হতে চাওয়ায় সে বাধা পায়নি কোনো। তিনি জানেন, সামান্য বিরোধ প্রত্যাশিত ছিলো মায়ের তরফ থেকে স্বয়মের, অপত্য হলেও সে পুরুষ, যাদের দৃষ্টি বুঝতে তার এক পল মাত্র লাগে। কিন্তু শৈবলিনী বিশ্বাস করেন বিচ্ছেদ তুল্য মায়াবিস্তার কোনো বন্ধনই নির্মাণ করতে পারে না, সুতরাং অবিচল ছিলেন। 



 গত বছর শ্রী'কে সম্প্রদান করেছেন। সেই শূন্যতায় পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই স্বয়ম তাকে জানিয়ে গেলো ঘোর অরণ্যেও প্রতিটি বৃক্ষের একাকী থাকাই বিধি। এখন তার দিলরুবায় অসীম নৈশব্দ্য। অবশ্য এই দেওয়ালেরা প্রগলভতার অভিজ্ঞতা পেলোই বা কখন? বড় শান্ত মেয়ে ছিলো তার শ্রী। মায়ের কাঠিন্য তার নরমে আঁচড়ের অবসর পায়নি কোনোদিন। কথা সে প্রায় বলতোই না। তার আনন্দ অভিমান যে কোনো তরঙ্গের সামান্য সরণ তাকে রেওয়াজে বসাত। সেই সুরই সম্ভবত তাকে নীলাদ্রীর কাছেও পৌঁছে দিলো, ভাবছিলেন শৈবলিনী। যতটুকু তিনি তাকে দেখেছেন, শ্রী যতই অনিন্দ্যসুন্দরী হোক, "রূপে তোমায় ভোলাবো না" এই স্বীকারোক্তির জায়গা অন্তত নীলাদ্রী নন, এইটুকু বুঝেছেন তাই আশ্বস্ত বোধ করছেন। রিপুজয়ের কথা যারা বলে থাকে তারা সম্ভবত প্রথম ইন্দ্রিয়টিকে নিরীহ জ্ঞানে রাখে। অথচ যাবতীয় ভ্রম ও ভ্রমভঙ্গের দায়ভাগ যদি কিছুকে দেওয়া যায় তবে তা 'চোখ'ই। শৈবলিনীর ব্যক্তিগত বিচারে গান্ধারীর অপরাধ অনেক বেশী ধৃতরাষ্ট্রের সাপেক্ষে। জন্মান্ধের অজুহাত যদিও বা গ্রহণীয় কিন্তু সক্ষমের ভাণজনিত বিকার কোনোভাবেই নয়।




বেলা গড়াচ্ছে। স্বয়ম আর শ্রী থাকার সময় বহুসময় তার উনুনের আঁচে কাটতো। রন্ধনশিল্পে বিক্রমপুরের মেয়ের নৈপুণ্যের খ্যাতি মূলত লক্ষ্মীপুজোর ভোগ হেতু পাড়ায় সুবিদিত ছিল। অবশ্য সে এক এমন সময়ের কথা যখন কোনো সংসারের সব ক'টি তৈজস দিনান্তে নিজের আস্তানাতেই থেকে গেছে, এ'ঘটনাকে বিরল মানা হতো। প্রতিবেশীরা শুধু একটি তথ্য জানতো না, একটা সময়ের পর হাজার চেষ্টাতেও শৈবলিনী তার হেঁসেলে আমিষ রাঁধতে পারেননি। এই একটি বিষয়ে ভাই-বোন দুজনেই অসম্ভব জেদে তাকে হারিয়ে দিয়েছে বারবার এবং প্রতিবার। সামান্য বোধের বয়সে পৌঁছে যেদিন থেকে তারা বুঝতে শিখেছে কী এমন অসুস্থ তাদের মা রোজই এমন হয়ে পড়ে যে তাদের রান্না সেরে স্নান করে ভিজে কাপড়ে নিজের জন্য একটা পাত্রে সিদ্ধ ফুটিয়ে নিতে হয় সারাদিনের নামে, তারা সেই সমস্ত কিছুর স্বাদকে অস্বীকার করতে চেয়েছে যাতে মায়ের অধিকার নেই। ফলে শৈবলিনীকেও হার মানতে হয়েছে। আঁশহীন অজস্র প্রণালীতে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে হয়েছে। 'ঘাটতি' - সঠিক শব্দ হলো কি? শৈবলিনীর অহং জাগল। কখনো 'ভালোবাসি' শব্দ উচ্চারণ করেনি তার কাছে তার সন্তানেরা। হাজারো প্রাপ্তিতে উচ্ছল হয়নি। সহস্র অপ্রাপ্তিতেও অভিযোগ আনেনি। অথচ তাদের সংবেদন এতো সূক্ষ্ম যে কীভাবে কবে হয়ে উঠলো তিনি কর্তব্যের ভারে ঠাহরই করে উঠতে পারলেন না। পিতৃহীন সন্তানদের সব মা'ই কি পৃথা?



ভাবতে ভাবতে উঠছিলেন, প্রায়োবেশনে স্পৃহা নেই প্রমাণে পুরনো একাহারী অভ্যাসে ফিরতে। সিংদুয়ারের কড়া তাকে বিচলিত করল। প্রাচীন আবলুশ, লোহার ভারী শিকল, নির্জন ছিঁড়তে যথেষ্ট সক্ষম। হতেই পারে আত্মীয় পরিজন অথবা ফেরিওয়ালা কিন্তু নৈঋতে কাকের কর্কশ তাকে অদ্ভুত অসামঞ্জস্য দিয়ে গেলো। এমনটি যেন হওয়ার কথা ছিলো না। আয়ুর প্রথমার্দ্ধে সামর্থ্য, দ্বিতীয়ার্দ্ধে প্রয়োজন তাকে পরিচারকহীন করেছে। সুতরাং কিছু সময় লাগলো জানতে সদর সংবাদ।


-- " একী ! শিয়া তুমি? চিঠি দাওনি তো আজ আসবে... কী হয়েছে? "


বরাবরের ধীর মেয়ে তার বরফ এখনো


--" ভিতরে আসি? "



হাজারো ঝঞ্ঝাতেও যে নন্দিনীকে তিনি অভিভাবকহীন চারণের অনুমতি দেননি বহু শঙ্কায়, অনেক দ্বিধায়, সে আজ আটপৌরেতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখের দীঘল বলে ঘুম হয়নি বিগত বেশ কিছু প্রহর, অবিন্যস্ত চুল হাতপ্যাঁচে ঘাড়ের উপর ফেলা। সঙ্গে সামান্য হাতব্যাগটিও অনুপস্থিত। তার বুক বসে যেতে লাগলো চোরাবালির গতিতে।



স্নান সেরে শ্রী ঘুমোতে চাইলে শৈবলিনী জিজ্ঞাসার চৌহদ্দিও পেরোননি। কুম্ভক তার নিয়ন্ত্রণে। ঘুমোক, যতক্ষণ সম্ভব। যে কোনো বিপর্যয়ে এইই বিশল্যকরণি শরীর মনের ভারসাম্য রাখতে। সন্ধ্যায় শ্রী জানিয়েছিলো অতি সংক্ষেপে। মধুপুরের চ্যাটার্জি ফ্যাক্টরি আর সংলগ্ন বাগান ঘেরা বাংলোটি গত রাতে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়েছে। বোমা, গুলি কিছুই বাদ থাকেনি। বিশ্বস্ত এক সূত্র সামান্য আগে খবর পেয়ে তাদের কাছে লুকিয়ে রাখায় নীলাদ্রি ও শ্রীয়ের প্রাণ দুটি রক্ষা পেয়েছে মাত্র। বাকি সর্বস্ব নিতান্তই ভগ্নস্তূপ এখন। ভোর রাতের প্রথম ট্রেনে শ্রীকে তুলে দিয়ে নীলাদ্রি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গেছেন অনির্দিষ্ট কাল সময় চেয়ে নিয়ে। বেনারসের আদি বাড়ি অথবা আসানসোলে দাদার কাছে যাবেন, এমন শিরদাঁড়া তার নয়। সুতরাং, তিনি কোথায়, শ্রী জানে না।



কিছু রাত কুরুক্ষেত্রের, কিছু জোনাকির, আর কিছু সংজ্ঞাহীনতার। শৈবলিনী জানতেন না ঠিক কোন স্তরে সে রাতকে ফেলা যেতে পারত। শৈশবে শ্রী'র জ্বর হলে যেভাবে রাতপাহারা দিতেন শিয়রে, ফিরে গেলেন সেই সময়ে। হঠাৎ শিয়ার ঘুমন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে জন্মদাত্রীর অভিজ্ঞ স্নায়ু তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করল। এই প্রবল অন্ধকারের ভিতরে কি কোনো তীব্র আলোর সংকেত লুকিয়ে যা তিনি অনুমান করছেন? ডাক্তার এসেছিল। ধারণা অভ্রান্ত, আনন্দে জানিয়ে ফিরে গিয়েছিল।  




শৈবলিনী ঠিক তিনদিন আগের মতো, আজও সেই সময় একই ভাবে দাঁড়িয়ে। শুধু সেদিন যে 'নিষ্কৃতি' শব্দোচ্চারণ করেছিলেন, তাকে প্রত্যাহার করছেন আজ সজ্ঞানে। যার লগ্নে সংগ্রাম, এত সহজে কি তার মুক্তি আসে? অনির্ধারিত অজ্ঞাতবাসে যাওয়া নীলাদ্রির আগামীকে গর্ভে ধারণ করে শ্রী এসেছে তার কাছে। তার যাবতীয় ছায়া আজ আলোময়। আজ সত্যিই তিনি সিংহের প্রয়োজন বোধ করলেন, রাশি থেকে খুবলে হৃদয়ে প্রতিস্থাপন নিমিত্তে। সন্তান সংকটাপন্ন হলে কোন গর্ভধারিণী অবিকল সিংহবাহিনী নয় আর তিনি তো শৈবলিনী, গায়ত্রীজল সবিতাকে অর্পণ করে বীজস্বার্থে মহাতেজা রূপ পরিগ্রহ করলেন।

চিত্র - অন্তর্জাল

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

               


ইগনিস



মৃত জল জ্যান্ত শ্যাওলার উপর কী ভাস্কর্যের জন্ম দেয় যারা দেখতে চায়নি, বর্ষা তাদের ঋতু নয়। আঁচে আলস্য সেঁকে নেওয়া টুকু গন্তব্য হলে শীত সব ঠিকানায় আসনপিঁড়ি খোঁজে না। আর কোনো কোনো দিন প্রকৃতির স্নায়ু মদিরাপ্রবণ হলে পৌষালি শিশির যে মেঘে ডুবে যায়, তাকে ভোর রাতে পালাতে গিয়ে পা থেকে খুলে যাওয়া চাঁদের মোজা মেনে নিতে স্বধার সামান্য সংশয়ও আসে না। সে কোনোদিন 'ফেভারিট সিজন' এই প্যারাগ্রাফ লিখতেই পারেনি। শীতের কোনো কোনো অলীক দিনে বৃষ্টি এলে তাকে তো আর 'সিজন' বলা চলে না অথচ ওটাই তার প্রার্থিত। কেজো মানুষদের কাছে খুবই বিরক্তির এই বাক্সের বাইরের আবহাওয়া। নিতান্ত বাধ্য না হলে এই দিনগুলোকে তারা লেপ্রসি পেশেন্টদের মতোই ট্রিট করে সর্বত্র। ফলত নিখাদ বৃটিশ স্থাপত্যের এই কলেজ আজ প্রায় শূন্য। চোখ খুলেই স্বধার মনে হয়েছিলো আজ তার দিন। অন্তরীক্ষে মোহর গাইছেন - "আজ যেমন করে গাইছে আকাশ"।



অনুপস্থিত ছাত্র ছাত্রীর তালিকায় তিন বছর ধরে স্বধার নাম একদম প্রথমদিকে থেকেছে কারণ প্রথম বছরের প্রথম সপ্তাহে ছয় জন অধ্যাপকের ইন্ট্রোডাক্টরি ক্লাসের রাউন্ড শেষের পর থেকে অর্ক ছাড়া সে আর কাউকে শুনতে চায়নি। ডিরেক্ট এক্সাম দিয়ে সদ্য জয়েন করা, উদ্ধত, ক্লাসে মূল টেক্সটকে প্রায় ঐচ্ছিক বিষয়ের পর্যায়ে ফেলে দেওয়া, শ্যামবর্ণ, গ্রীসিয়ান স্থাপত্যের অর্ক বাগচী যার তিলফুল নাসা থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচের চৌহদ্দিটাকে কক্ষনো বোতামের শাসনে রাখা হতো না। স্বধার একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সেটাই গৌরচন্দ্রিকা - বোধ আর মেধাকে যারা মগজ থেকে রূহ অবধি একটা টানেল তৈরী করে একাকার করে ফেলতে পারে, তাদের শরীরী ভাষা অমোঘ হয়। অনুমানে সে যে ইঙ্গিত জমা করছিলো এগারো থেকে, ঠিক আঠেরো থেকে অর্ককে তিন বছর নেওয়ার পর তাতে সিলমোহর পড়েছিলো। এগারো - তোলপাড়ের - যা দেখছি যা ঘটছে তার অন্তরালে কোথাও অন্য সত্যেরা অপেক্ষায় - "I too am written" - পূর্ব নির্ধারিত যাবতীয় বহতা - রিনরিনে জাগানিয়ার - এগারো। ভেজা থামে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে করতে সে অতীতচারী হয়ে উঠলো (এই তার ব্যাধি যা সে লালন করে যত্নে) । 


সেই বছর নীলে কাশের বেহায়াপনা ছিলো তাকিয়ে দেখার মতো। ছুটি শুরুর প্রথম দিন। কেন প্রতিটা শরৎ এত খা খা করা হতো তার, সে কারণ খুঁজতো। অজস্র জামা হতো জন্ম ইস্তক, কক্ষনো একটাও পরে প্যান্ডেলে যাওয়ার আবহবিকার তৈরীই হয়নি। দুঃখ তার হয় যে প্রাপ্তির ধারণা জানার পর অপ্রাপ্তি টের পেয়েছে, সুতরাং কোনো বোধই তার আসেনি। তার কাছে নতুন জামার মানে একটাই ছিলো পুরনো গুলো খুব পুরনো, অব্যবহার্য যাতে না হয়ে যায় হস্তান্তরের আগে সেটারই নিশ্চিতকরণ। মহালয়ার সকালে নতুনের মত চেহারায় বাক্সবন্দী হয়ে তারা যে কোন তেপান্তরে যেতো, বেশ খানিকটা বড় হওয়ার আগে সে বোঝেনি। কিন্তু নতুন গুলো যত সুন্দরই হোক, লাল টুকটুকে গাউন বা গোলাপী বার্বি ড্রেস, মেয়াদ এক বছর, মায়া আসতে নেই, এটুকু বুঝে নিয়েছিল। খুব ছোটতে পাপাকে তার বড় নিষ্ঠুর মনে হতো। সে গল্প শুনতো সবার বাবাদের হাত ধরে ঠাকুর দেখার আর তার বাবা ... সে বেলুন ভালোবাসে বলে রাস্তা দিয়ে যে কটা বেলুনওয়ালা তিন চার দিন ধরে যেতো, সবাইকে ডেকে সব কটা বেলুন কিনে দিতে দিতে তাকে দেখতে শেখাতো বেলুনওয়ালাদের ছেঁড়া জামা, চিন্তা করতে বলতো তাদের বাড়িতে যে ছোট্ট ছোট্ট স্বধারা আছে একটাও রঙিন নতুন কাপড়ের রুমালও না পেয়ে, তাদের ইতিবৃত্ত। ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিতো বাঁশের জোগাড়ে থেকে শুরু করে ঢাকী, বিপুল শারদীয়া মূলত শ্রেণী বৈষম্যের বিকট উদযাপন। দেবীমুখের গর্জন তেল ততটাই উজ্জ্বল হয় মৃৎশিল্পী যতটা অন্ধকার ধারণ করতে পারে তার উপেক্ষিত যাপনকলায়। ফলে ছুটিতে বাড়ি ফেরার আগে তার অনেক বেশী উন্মাদনা থাকতো এবার কোন বইগুলো তার জন্য উপহার এসেছে ইলাহাবাদ থেকে সেটা জানার।



একইদিনে একই মেটারনিটি হোমে জন্মেছিলো স্বধা আর আয়ান। নিজের ছেলের মুখ দেখার আগে স্বধাকে কোলে নিয়েছিলেন আয়ানের বাবা, ক্রাইসিস ফরসেপ পেরিয়ে যে মেয়ে ডাক্তারদের নাভিশ্বাস উঠিয়ে জন্ম নিলেও মায়ের মুখ দেখতে পায়নি ভেন্টিলেশন ওভারের আগে। তার বাল্যবন্ধু নীলাদ্রির পৌঁছতে আরও তিনদিন লেগেছিলো। জন্মমুহূর্ত থেকে পরবর্তী বাহাত্তর ঘন্টা তিনিই ছিলেন একাধারে স্বধার পিতা ও মাতা। এর পরের কোনো মুহূর্তেই তিনি স্বধাকে নিজেরই অপত্যের বাইরে কিছু মানতে পারেন নি। এমন কোনো উপলক্ষ এরপর আসেনি যেখানে আয়ানের সমান উপহার নীলাদ্রির ঠিকানায় পৌঁছায়নি। স্বধার ভিতর দিয়ে স্বল্পায়ু জুনেইদ খান তার মেয়ের বাবা হওয়ার যাবতীয় উপলব্ধি পেতে চেয়েছিলেন প্রগাঢ় টানে। যখন স্বধা তাকে তার প্রকৃত মর্যাদা দেওয়ার বয়সে পৌঁছেছিলো, তিনি সাড়ে তিন হাত জমিতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছেন। শুধু উপহারগুলো থেকে গেছে। বই ব্যতীত অন্য উপহারকে জুনেইদ ব্লাসফেমি মনে করতেন, এইই রহস্য অজস্র দুষ্প্রাপ্য এডিশনে স্বধার ব্যক্তিগত স্টাডি আলোয় আলো হয়ে থাকার, তার লেখায় কাফনের রঙের আধিক্যেরও বটে। কেন বইকে সে শরীরের অংশ মানে, তারও একই সূত্র হয়তো। নিয়তি হিসাবে সে বই আর বই তাকে সহবাসে রেখে আসছে, নাড়ি ছেঁড়ার ক্ষণ থেকে, জুনেইদ কি জানতেন খুব বেশীদিন তিনি তার মেয়েকে ছুঁয়ে থাকতে পারবেন না? তাই এই আমবিলিক্যাল সাবস্টিটিউট পুঁতে যাওয়া?



সেই এগারোর ছুটির প্রথম দিনে ব্রাউন পেপার ছিঁড়ে স্বধা যে পাঁচটা বই জড়িয়ে ধরেছিলো, তিরিশ বছর পরের স্বধাকে ময়নাতদন্ত করলে হৃদপদ্মে তাদেরই কিছু শব্দকে খোদাই করা পাওয়া যাবে, এ ধ্রুব। সেই পঞ্চকই স্বধার নির্মাণবেদ। তার সমগ্র অস্তিত্বকে ময়ালের শ্বাসে টেনে নিয়ে জাদু আর পরার ইনফিউশনে ফেলে দেওয়ার বাস্তবগ্রন্থি। ছুটি শেষের দিন ফিরে যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় প্যাকিং চেক করার সময় তলপেটে যন্ত্রণা করায় সে যখন প্যান্টিতে ডার্ক চকোলেট পেস্ট আবিষ্কার করে, এগারো বছরের মেয়ের পড়া হয়ে গেছে তার মানে, সৌজন্যে - "ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড"। কিছু বছর পর পীতাম্বরপুরায় সত্তরোর্দ্ধ দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার সম্পর্ককে ঘিরে যখন বাঙালীটোলার মুখিয়ারা পুরোদস্তুর গেস্টাপোর ভূমিকায়, চবুতরায় মাথা নিচু করে বসে থেকেছে সে, একান্ত ব্যাক্তিগত এক সহজ সত্যের অনুভবকে সামাজিক তুলায় চাপানোর বাঙালী অশ্লীলতার গ্লানিতে, কারণ তার মাথার ভিতর দিয়ে তখন ভেসে চলেছে ডাজা আর আরিজার জাহাজিয়া নির্বাণ - "লাভ ইন দ্যা টাইম অব কলেরা"। 


ঘোরে "মিসিং ইউ জুনিপাপা" ফুঁপিয়ে উঠতে গিয়ে স্বধা দেখতে পেয়েছিলো অর্ক রাজহাঁস'রঙা শার্টের ভিতর কলোসাল গেট পেরিয়ে হেঁটে আসছেন। প্রাচীন বৃক্ষরাজির সদ্যস্নাত সবুজ চুইঁয়ে হীরের কুচিরা তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। চুল থেকে কপাল গড়িয়ে ঠোঁট - প্রশস্ত কাঁধ - দীর্ঘ বাহু - ভিজে উঠছে। ডানহাতে ট্রাইডেন্টের জায়গায় তিনটে বই। ব্যাস এটুকুই ব্যবধান পোসেডনের সমুদ্র থেকে উঠে আসার সঙ্গে। আঠারোর বুক জানে খরগোশের নরম ঠিক কতটা লাব ডুব নিতে জানে। হোক না তার বাবার নাম নীলাদ্রি চ্যাটার্জি, রিফুর নৈপুণ্যে যতই তার ভিতর বুনে দেওয়া হোক অকাল কাঠিন্য, জলোচ্ছাস তীব্র হলে চর ধ্বসে না যাক, ফাটল তো ধরেই। অশ্বত্থ ঘেরা ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশের স্যাঁতস্যাঁতে কড়িবরগার বিরাট হল... মেহগিনি গ্যালারির একদম শেষ রো'তে উঠে গিয়ে বসে পড়েছিলো। নিজের শ্বাসের শব্দ নিজের কাছেই কখনো কখনো ভয়ের দাবিদার। কিছুটা সময় একা থাকার দরকার ছিলো খুব। দেরী হয়ে গেছে। অর্ক ঢুকছেন হলে। প্রতিধ্বনি হলো -

-- "জানতাম... কেউ আসেনি...               অথচ আজ প্রুফ্রক'কে দেওয়ার         কথা... as far as my capacity       permits... স্বধা, তুমি কী চাইছ?        মানে, চাইছ কি?"

আত্মস্বরও আউটসাইডার হয়, স্বধার জ্ঞান বাড়ল উচ্চারণের পরেই -


-- "শেয়ার করার লোক না থাকলে         চাওয়ার টেনাসিটি বাড়ে বোধহয়"


--- "বেশ... let's begin then..."




 পরের আড়াই ঘন্টা এলিয়টকে "লাভ সংস অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক" এর চোখ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন অর্ক। সেদিন বর্ষণ সম্ভবত তার সঙ্গে ঈর্ষায় নেমেছিলো এবং...হেরেছিল। অর্ক তাকিয়েও দেখেন নি একবার, না ঘড়ি, না বারিধারার গতি। ডায়াস নয়, স্বধার ঠিক সামনের ডেস্কে ডিপ ব্লু ডেনিমে ক্রসলেগড অধ্যাপকটি একবারের জন্যেও রেফারেন্স হাতড়াতে চোখ নামান নি কোনো বইতেও। অর্ক হল ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে স্বধা টের পেয়েছিলো তার জ্বর এসেছে প্রবল।


সে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় অর্ক তার তিনজন কলিগের সঙ্গে স্মোকিং জোনে...

-- "স্বধা, শুনে যাও তো"

হে ঈশ্বর, ক্ষমা আঁকা যায় না? মরণ কি সর্বদাই শ্যামরূপী? কে. ভাস্করনকে মন দিয়ে শোনেনা বলে নীলাদ্রি দুঃখ পান, সেই শাস্তিই কি আজ পাচ্ছে সে? সে এগোনর আগেই অর্ক হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলেন -


-- "ডায়েরিটা রাখো, আমার                   পার্সন্যাল নোট, যখন তোমার             মতো বাচ্চা ছিলাম, এলিয়টকে         এখানে রাখতাম"


লাইটনিং স্পিডে স্বধার মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিলো অসুস্থ শরীরে -

-- " লাগবে না "

অর্ক থমকেছিলেন -

-- " মানে? নেবে না?"

স্বধা তখন অন্য মানুষ -

-- " না। বাচ্চাদের নিজেদের নোট            নিজেদেরই তৈরী করা উচিৎ।             আমিও করছি। গুড প্র্যাক্টিস। "



হা হা করে হেসে উঠেছিলেন অর্ক। নির্জন ইমারতটি অর্ক বাগচীর বিরল সেই হাসিতে বিস্ময়ে আছাড় খাওয়া সূক্ষ্ম চায়না ভাস হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। অসম্ভব গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন, তার সহজাত গাম্ভীর্যের থেকেও কয়েক মাত্রা গভীরে-- 



-- " লুটো ইগনিস... লুটো ইগনিস              তুমি স্বধা...
     অন্ধত্ব আরোপ করাই আমার            একমাত্র কর্তব্য এখানে। এত               বেশী বোঝো, এত কিছু জানো,           বেসিক'গুলো না দেখা থাকে কী         করে? আমিও মানুষ। "


স্বধা খড়ের কাঠামো হলে তার দুই কাঁধ ঝাঁকিয়ে অর্কর বলা কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই অগ্নিদেবের উদরপূর্তি হতো খানিক। ঘোর কলিতে তাও হয় না, এ কি কম যাতনার? স্বধার স্ট্যাচুর হাতে ডায়েরিটা ধরিয়ে দিয়ে কথা শেষের পর এক সেকেন্ড দাঁড়ান নি অর্ক। তার পরের সাতদিন কলেজ চত্বরে দুজনের কারোর পা পড়েনি। উত্তাপ যে কতদূর সংক্রামক, স্বধার স্নায়ু টের পেয়েছিল। সাতদিন... প্লাবনের প্রস্তুতি হিসাবে খুব কম সময় ছিলো না ঋষ্যমূকদের কাছে, সম্ভবত মৃগয়াভূমির কাছেও নয়।



শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                                



মহাফেজ



'অনুভূতির অনুবাদ সম্ভব নয় বলে কখনো কবিতা পড়িনি'- প্রিয় অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে আসা এক কৃতির সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন নীলাদ্রির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাদের মধ্যে শুধুমাত্র এটিরই বিক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিলো সেদিন স্বধার। "কানের ভিতর দিয়া মরমে" পৌঁছানো সব কিছুই যে ধনাত্মক হবে এমন আইন না থাকায় স্বধার তাকে আত্মিকরণে সমস্যা হয়নি বরং সে ভাবতে চেয়েছিলো যে সাতটি স্তর অতিক্রম করে কোনো ছেলেকে পুরুষ হয়ে উঠতে হয়, তা পেরনোর পর পরিখা বুজিয়ে দেওয়া হয় কেন? অথবা 'মেধা নাড়ি' জাগ্রত হলে যে কোনো পুরুষই কি প্রস্তর?


ইডেনের কেবিন ওয়ানে অদ্ভুত সুন্দর কুট্টি একটা ব্যালকনি আছে। খুব বেশী হলে চার পাঁচজন সেখানে একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে। গ্রিলের ওপারে কোনো এক কালে প্রতিষ্ঠিত, বর্তমানে মৃত ব্যবসায়ীর গোলা, পরিত্যক্ত গ্যারেজ। বাঙালীর ব্যবসা এখনো 'এক পুরুষের' এই বদনাম ঘোচাতে পারেনি এই শহরতলিতে অন্তত, সেহেতু দীর্ঘ দীর্ঘ গাছেরা ক্রমেই দীর্ঘতর হয়ে শিকড়ের দিকের আগাছাকে জঙ্গল করে তোলার বন্য আনন্দ পেয়েছে। সাত পা একসঙ্গে হাঁটলে বন্ধু হয় অথবা সপ্তপদীতে যাপনের সঙ্গী? প্রথম সাত মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর স্বধার মনে হয়েছিলো অরণ্য ভালবাসে বলে তার সাতজন্ম লতা গুল্মে জড়িয়ে থাকার সুযোগ পায় নিয়ত। তবে তখনো সে জানতো না আগামী প্রায় সাতশ ঘন্টায় চাণক্য মতে প্রকৃত বান্ধব তার এই ছোট্ট নির্জনটুকুই হয়ে উঠবে। এই মুহূর্তে এই মধ্যরাতে এখানেই দাঁড়িয়ে কেন হঠাৎ সেদিনের ভাবনার কথা তার মনে পড়লো, কারণ খুঁজতে গিয়ে সে অন্ধকারেই হারাতে চাইল।


আলেকজান্ডার পোপ নামের কবিটি সেই অগাস্টান পিরিয়ডে যে অসামান্য কিছু কথা লিখে গিয়েছিলেন স্বধা সেগুলোকে মানে ভীষণভাবে, নিজেকে দিয়েই। "A little learning is a dangerous thing" পাতি বাংলায় যাকে বলে "স্বল্পবিদ্যা ভয়ংকরী"। নিজেকে বাচাল মেনে নিয়েছে এই কারণেই। পূর্ণ কলসে শব্দ হয় না। সে অত্যন্ত অগভীর, ফাঁকা তাই এত এত কথা আসে তার, এমনই মনে হয়। সেও ঐ মনতস্ত্ব বিষয়ে বিশেষ পড়াশুনা না করেই ফ্রয়েডিয় কোট আউড়ানো লোকগুলোর দলে যারা অবসাদগ্রস্ত কাউকে পাগল আখ্যা দিয়ে দেয় নির্বিচারে, উড়ে উড়ে আসা গল্প কবিতায়, ইউ টিউবের লিঙ্ক দেখে ওয়েদিপাউস আর ইলেক্ট্রার প্রসঙ্গ এনে ফ্যালে, অথচ একটু তলিয়ে ভাবলে, সামান্য অনুধ্যানেই স্পষ্ট হতো যে কোন নারী তার প্রার্থিত পুরুষের মধ্যে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তার পিতাকেই সন্ধান করে এবং ভাইসি ভার্সা। কমপ্লেক্স ভিন্ন বিষয়। অতি সরলীকরণ কোনো জটিলতার না হওয়াই যুক্তিযুক্ত। 


স্বধার মনে হলো যেভাবে জয়েস নোরাকে লিখেছিলেন "তোমার সমাজ আমার শত্রু, তুমি নও", ঠিক সেভাবেই সে যে যে 'পুরুষ' দেখেছে এই তিরিশ অবধি তাদের অধিকাংশই পুরুষমাত্র, তন্ত্রধারী নয়। তাদেরকেও তার বলতে ইচ্ছে হয়েছে- 'আমি পুরুষতন্ত্রকে প্রতিপক্ষ মেনেছি, তোমাকে নয়'। পারেনি কারণ প্রকৃতি আর পুরুষের মূল ব্যবধান বাড়বাগ্নিতে। নারী এক জলজ সত্ত্বা, যে কোনো অভিঘাতের প্রতিসরণ তার আধারে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। পুরুষ নিরেট এক অস্তিত্ব, উদ্বেদী শিলাকে ধারণ করে থাকা আপাত প্রতিক্রিয়াহীন ঘন অবস্থান। অভিমান শব্দ মাত্রেই রমণীয় মেঘ ভেসে আসে অথচ তার প্রকৃত স্বরূপ হয়তো পুরুষেরই করায়ত্ত। সে স্থির হয়ে যায়। মন্দ্র নিনাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিস্তব্ধ কাঠিন্যে। যেমন কস্তুরীর বধবিন্দু তার শরীরস্থ ব্রহ্মকুণ্ডলীটিই ঠিক সেভাবেই পুরুষের অসহায়তা সে একজন পুরুষ'ই। একথা নীলাদ্রীকে পড়ে প্রথম জেনেছে স্বধা, পরবর্তীতে প্রতিটি ঈশ্বরসত্ত্বা, পরিযায়ী কিছু ঘনিষ্ঠরা তার পাঠকে নিবিড় করেছে, আপাতত ক্রাইস্ট শেখাচ্ছে আর একদম স্বচ্ছতায় আজ আরেকজনের বোধে দেখল। একটা গান মনে পড়লো- "একলা পুরুষ কর্তব্যে, একলা পুরুষ পিতায়"।

রিসেপশন থেকে আর্জেন্ট কল আসার পর দেখা করতে গিয়ে সে জেনে ফিরেছিলো ডক্টর সেনের বিশেষ নির্দেশের কথা। যেমত সে নিশাচর হলেও পাখি নয়, অসম্ভব বিধ্বস্ত মাথা আর শরীরের ইন্সট্যান্ট এলাইনমেন্ট সম্ভব হয়নি। বসে পড়েছিল। সামনে প্রবল অন্ধকার কড়কড়ে রোদ্দুরে, যতটা দৃশ্যময় তার থেকে অনেক বেশী অনিশ্চয় অদৃশ্যে। সে কোথায় নিয়ে যাবে এখন এই নিদ্রিত, অসুস্থ মানুষটিকে? তাবড় সেলিব্রিটিদের যেখানে আই সি ইউ পাওয়ার অপেক্ষা করতে হচ্ছে, স্বাস্থ্যভবন নথিকরণ বন্ধ করে দিচ্ছে ওয়েটিং লিস্ট মুনওয়াক হয়ে গেছে বলে, লকডাউনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া প্রতি দশ মিনিটের ছটা গাড়ির মধ্যে তিনটে এম্বুলেন্সের, একটা শববাহী যানের। সে কোথায় নিয়ে যাবে? সে এমন রাষ্ট্রে বাস করে যা বিশ্বব্যাপী অতিমারির প্রথম ঢেউ প্রত্যক্ষ করার পর দেড় বছর সময় পায় পরবর্তী আঘাত আসার আর সেই অন্তবর্তী সময়টুকুকে উপভোগ্য করে তোলে শুধুমাত্র কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনী আমোদে। একশন প্ল্যান, হসপিটাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তো দূর, একটিও অতিরিক্ত বেড, এক বোতল রক্ত, একটামাত্র সিলিন্ডারের সরবরাহকেও উপেক্ষা করে দিয়ে হত দরিদ্র জনসাধারণের করের অর্থভাণ্ডার দেউলিয়া করে দেয়  কোটি কোটি টাকার কপ্টার ভাড়ায়, ব্যাক্তিগত প্রচার বরাদ্দ খাতে। হায় দেশ... সে কোন দুয়ারে কড়া নাড়বে এখানে? নীলাদ্রীর ছাত্ররা ছড়িয়ে আছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়, সামান্য হলেও কিছু মন্ত্রী সান্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক স্বধাকে স্নেহে রাখেন কিন্তু তারা কি মহানগরীতে ময়দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? না রক্তবীজি প্রজননে চিকিৎসকের জন্ম দেবেন কেন্দ্র রাজ্যের প্রশাসনিক মান রক্ষার্থে? থাকলো বাকি এই মহকুমা মফস্বল। যে হাজারে হাজারে গ্রামবাসীদের দুইদিন আগেও ট্রাক বোঝাই করে এনে এনে তারকা খচিত মঞ্চের মাঠ ভরানো হয়েছে ক্যাডারদের বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধানে, তারা তো জানতেও পারেনি মাস্ক কী, দূরত্ববিধি কাকে বলে? অজান্তেই তাদের আয়ুর সুতো ছিঁড়ে গিয়ে এখন কাতারে কাতারে মাথা জমছে সরকারী হাসপাতালে ফলে নরককেও প্রতিযোগীতায় নামতে হচ্ছে ন্যূনতম পরিষেবার প্রেক্ষিতে। এ বস্ত্রহরণ পালার দুর্ভাগ্য রুখতে মাধবও প্রতিবন্ধী। তাহলে নীলাদ্রি কোথয় যাবেন? বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তাকে? উদ্ভ্রান্ত স্বধার কল লিস্ট জানে পরপর সত্তর টি ফোন সে করেছিলো ইডেনেরই দুই তিনজন ওয়ার্ড বয় এমনকী সুইপারের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দেওয়ার বিনিময়ে নম্বর জোগাড় করে (রাজপথে অন্ধকারের বিকিকিনি হয়না বলেই কানাগলি গুলো টিঁকে থাকে) সম্ভাব্য সমস্ত নার্স আর আয়াদের, পায়নি, একজনকেও নয়। 

নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়ার পর ঘুম তারও আসেনি। খুব ভোরে ডিউটি থেকে সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিলেন ইডেনে। কেন, এর উত্তর জানা থাকা বলেই আয়নার সঙ্গে পুরুষদের বড়ই বৈরিতা। ভিতরে ঝড় বইলেও তাদের চোয়াল, ভাঁজ ফুটিয়ে তোলার বিশ্বাসঘাতকতা করে না। একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে কেবিন ওয়ানের দিকে তাকিয়ে রিসেপশনে যা জানানোর জানিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন যেখানে অপেক্ষায় তার আত্মা ও রক্তের পুত্তলিরা। রিসেপশন থেকে প্রতিনিধি এসে স্বধাকে জানিয়ে গিয়েছিলো, পূর্ব পরিচিত নীলাদ্রীর দায়িত্ব ডক্টর সেন অন্য কোথাও, কারোর হাতে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃত হয়েছেন, তাকে ডিসচার্জ করা যাবে না। যখন স্বধা শুনছিলো এই কথা, দেখতে পেলো সায়রের গাড়ি পোর্টিকো ছেড়ে রাস্তায় নামলো সদ্য। 

নীতি, আদর্শ সব সব কিছুকে শব্দ মাত্র ধরে নিলেও সিংহের হৃদয় জানে 'একা' চারণের ক্ষমতা ধারণ করে বলেই সে নৃপতি। কাকে কৈফিয়ত দিয়ে এলেন সায়র আজ? নিজেকে? "ধরিত্রী দ্বিধা হও"- এক নারী উচ্চারণ করতে পারে, পুরুষ নয়। সে জানে তাকে নিয়ম গড়তে হবে, ভাঙতেও হবে অথচ কলঙ্কমাত্র যেন স্পর্শ না করে, সে দূরত্বও গাঁথতে হবে। 'টান' -অলীক এই শব্দকে পাঁজরে আটকে রেখে গলিয়ে নিতে হবে নীতিমালার শৃগালচর্ম। নাহলে তার ঘ্রাণে সহস্র হারপুন হাতে উল্লাসে ঘিরে ধরবে শ্বাপদদুর্লভ নৃশংসতারা। সে গরল নিজে নিয়ে নীলকণ্ঠ হবেন, এমনও এক্তিয়ার নেই। তিনি যে কারোর স্বামী, কারোর পিতা। তার সর্বস্ব দিয়ে হলেও স্বধাকে প্রত্যক্ষে আগলে রাখার অধিকার বা অনুমোদন কোনটাই তিনি নিজেকে দিতে পারেন না। শুধু আড়ালে থেকে নিরাপদ গণ্ডী টুকু কেটে দিতে পারেন মাত্র। কেউ যেন টের না পায়, যে লক্ষ্য সেও নয়। বজ্র দৃঢ় অথচ অসহায় এই পদক্ষেপের সংজ্ঞা- পুরুষ জানে, তার যমুনা নেই, কলসীও না। 


শুধু তাদের এটুকু জানা হয় না, সায়রেরও হলো না, 'ইনটিউশন' বলে যে শব্দটি আছে অথবা ষষ্ঠেন্দ্রিয়, তা নারীর অজ্ঞাত কিছু রাখতে দেয় না বলেই "স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা না জানন্তি, কুতো মনুষ্যা:"- এই প্রবাদ এসেছে। একটিও শব্দ উচ্চারণ না করলেও পুরুষের প্রতিটি আচরণের সুলুক সন্ধান নারীর কাছে প্রিজমের উজ্জ্বলতায় ধরা পড়ে। তার মনে পড়লো ভ্রূণহত্যা বা কন্যাসন্তান জন্মানোর অপরাধে খুনের খবরেরা যেদিন সংবাদপত্র আঁধার করে থাকতো, নীলাদ্রী লুকিয়ে রাখতেন। নৃশংস ধর্ষনকান্ডেরা যখন প্রচারমাধ্যমের খাদ্য হতো, স্বধার ঘনিষ্ঠ বান্ধবেরা চুপ হয়ে যেত কিছুদিনের জন্য হলেও। আজ সায়রকেও দেখলো সে, অবিকল হংলি, নিষ্পাপ জেনেও রুয়িকে কোল্ড প্যালেসে পাঠিয়ে ব্যাক্তিগত প্রহরায় রাখা সম্রাট। একটিই নরমে প্রত্যেকে বিদীর্ণ, পুরুষোচিত সংবেদন। নপুংসক পুরুষত্ব প্রমাণের দায়ে যখন যে মুহূর্তে কোনো মেয়ে আহত বা নিহত হয়, যে বা যারা মাথা নিচু করেন লজ্জায়, দীর্ণ হন আত্মসংকটে, সংগোপনে- অতি সংক্ষেপে তাদেরকেই স্বধা 'পুরুষ' নামে ডাকে। সম্ভবত সেই কারণেই কোনো এক সেমিনারে পেপার পড়ে নামার পর যখন এক বিশিষ্ট গবেষক তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন "Proud to see an emerging feminist" , সে গ্রহণ করতে পারেনি। কাষ্ঠ হেসে জানিয়েছিলো- "Thanks a ton but I would love to call myself a humanist as I have seen pangs of the first sex before learning mine" 


বেধড়ক সবুজে দুটো কাঠবিড়ালির বাসা। অষ্টপ্রহর ঝিলিক দিয়ে লাফিয়ে বেড়ায় শাখা থেকে প্রশাখায়। স্বধা তাকিয়ে আছে। ভাঙা রেমিঙটন পড়ে আছে জীর্ণ শেডের আড়ালে। অনেকদিন কিছু লেখেনি সে, অনেকদিন। মনে হয় কিছু দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থাকে বলেই তারা অনন্ত আকর্ষণের, যেমন পুরুষ ও প্রকৃতির অথবা জল ও প্রস্তরের।

কে কাকে বোঝে?
কে কাকে বোঝায়?
কে কাকে বুঝতে দেয়? 

ছবি - অন্তর্জাল

রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                                       


পরাগ 




মৎস্যকন্যার হিজাবের নিচে প্রেতমুখের অতিরিক্ত কিছু ছিলো না- এই সিদ্ধান্ত স্বধার মস্তিস্ক নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোর গতিবেগের লাজ রাখতে আধা পাথুরে প্রায় জোলো উপত্যকার প্রতিটি বৃক্ষ ফিসফিসিয়ে উঠলো- আদেশ ... আদেশ...


যে তাকে প্রথম জানিয়েছিলো এই প্রদেশের কথা, তার কথা স্বধার সম্যক মনে আছে। সে কৃতজ্ঞতা ধারণ করে পর্যাপ্ত কিন্তু সিসিফাসের স্ত্রী লিঙ্গের ভূমিকায় নিজেকে মনোনীত করার বিন্দুমাত্র স্পৃহা নেই বলে ছাই আর আঁশবটি- দুইকেই অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। 'সংসার' আর 'সম্পর্ক' এই দুই সংগ্রামে 'সার' ঠিক ততোটুকু যতখানি পরমহংস বৃত্তি, বাকিটা 'সংনামা'। হা হা করে হেসে উঠলো সে। প্রতিধ্বনি এলো না কারণ শুধুমাত্র তার কাছেই, তার জন্যেই আসা ক্ষতখচিত পাঁজরকে প্রকৃতি যখন আশ্রয় দেয়, মানুষের মতো লবণ লীলা করে না। 



বড় আশ্চর্য রূপ এই ময়ূর পাহাড়ের। সে বর্ষায় এসেছে, চ্যাপলিন মনে পড়েনি। পদ্মবিল দেখার সময় শ্যাম-নৌকা ভেসেছে। তার কিছু ব্যাক্তিগত রূপকল্প আছে যেগুলো ঘুমিয়ে থাকে অন্যসময় কিন্তু রিপ ভ্যান হতে পারে না। যখন একটিও দূর্বা পা ছুঁয়ে বলে ওঠে লেলিহা মুদ্রায় "অস্যৈ প্রাণা: প্রতিষ্ঠন্তু অস্যৈ প্রাণা: ক্ষরন্তু চ", মুহূর্তে চরাচর তার কবিতা বোধ হয়- 'অবাঙমানসগোচরম' ।


স্বধার মনে পড়তে থাকে শৈবলিনীর কথা। এই একজনই এখনো অবধি জীবিত অথবা একমাত্র প্রাণ যে তাকে 'স্বাধীনতা' শব্দের সংজ্ঞায় কোনো সৌজন্যসূচক ঝরোখা রাখতে শেখায়নি। একবার, মাত্র একবারই তিনি বেনারসে পা রেখেছিলেন তার বন্ধুর ডাক ফেরাতে না পেরে। সেইবার জন্মইস্তক স্বীয় করতলের মতো চেনা বেনারসকে স্বধার অপরিচিত লেগেছিলো বিস্ময়ে। এমনকী, সে যার পৌত্রী, তারও। কে না জানে (অন্তত তখনো অব্দি অবশ্যই জানত) লক্ষ্ণৌ-বেনারসে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঈজীদের মহল্লা। সময় শুধু স্থাপত্য গুঁড়িয়ে দেয় না, লঘু করে তোলে গভীরতা। নাহলে জ্ঞান, নৈপুণ্য, শিক্ষা, তালিম, নিষ্ঠা সমস্ত কিছু নিংড়ে যে অসামান্য শিল্পীদের নির্মাণ করা হতো অভিজাত হাভেলি গুলিতে, তাদের পরিচয় ধীরে 'তবায়েফ', আরও হীনতায় 'দেহপসারিণী' হয়ে যাবে কেন? শৈবলিনীর সঙ্গে তারা দুইজন ঘুরে বেড়াতো ভোরের আলো ঠিকঠাক ফুটে ওঠার আগে। একমাত্র এইসময়েই এই এলাকা নিস্তব্ধ থাকে। বাসিন্দারা হয় নিদ্রিত নাহয় ঘাটে। শৈবলিনী কথা বলতেন বৃদ্ধা কাউকে পেলে, আনমনে সিঁড়িতে বসা, অতীতের ফুলকারিটি গায়ে জড়িয়ে। জানতে চাইতেন ইতিহাস। বাড়ি ফিরে স্তব্ধ হয়ে থাকতেন। সন্ধ্যায় গঙ্গারতি দেখতে দেখতে উদাস হয়ে যেতেন। পরে, বহু পরে স্বধাকে বলেছিলেন-


--" আগুনের দুর্ভাগ্য অসীম না ভাই যদি ভাগ্য মানি? যত তীব্র তত উজ্জ্বলতা। যারা জ্বালায় কেউ জ্বলে না। কেউ উত্তাপ নেয়, কেউ আলো, কেউ পবিত্র হয়, কেউ শুদ্ধ, কেউ মুক্তি নেয়, কেউ শান্তি। সরে যায়। আগুন নিজে কী পায়, কাকে পায় বলতে পারো? আগুন একা, শুরু থেকে শেষ। তবু যদি তার স্বাধীনতা টুকুও থাকত। সে কি নিজের ইচ্ছেয় জ্বলে? কেউ দাবী তোলে শিখায় আদরের আঙ্গুল রেখে, অস্বীকার করো দাহ্যকে? আগুনের কি ব্যথা নেই? ভাই, বড়ো মিল, বড়ো মিল, প্রতিটি নারীই কি আগুনপাখি?"


গতরাতে দাবানলের খবর পেয়ে পৌঁছানো স্বধার অযোধ্যার দিকে তাকিয়ে খেয়াল হলো, তার কখনো তমাল দেখা হয়নি। এতো এতো অরণ্যে ঘুরেছে সে, এই মুহূর্তেও তো হাঁটছেই, তবুও হয়নি কখনো। অথবা এও হতে পারে, চেনেনা বলে অধরা রয়ে গেছে। শৈবলিনী বলতেন সপ্তপর্ণার কথা। তাও দেখা হয়নি। আবারও হাসতে ইচ্ছে হলো তার। বহু আগে লিখেছিলো- পালক খেললে ময়ূর তুমি, কৃষ্ণ জানলে না। তার শুধু খুঁজে বেড়ানোই হলো। জল কি কখনো ভেজে?


স্বধা গবেষণার জন্য প্রথম বেছেছিলো একটি অদ্ভুত বিষয়- 'ধর্মরূপ ও উত্তরসত্য' । যেভাবে একটি নদীখাতের উৎস থেকে মোহনা অবধি উপ আর শাখাতে বিভাজিত ও যুক্ত হতে হতে অস্তিত্বহীন হয়ে ওঠে মূলধারাটি, তেমনই তো যে কোনো মিথ, মিথ্যের সিনোনিম। কিন্তু বিশ্বাসকে ডিগ্রিতে রূপান্তরিত করতে যে তথ্য ও যুক্তির নিপুণ কৌশল লাগে, তা করায়ত্ত না হওয়ায় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে অন্বেষণ। একটিমাত্র উদাহরণ দেওয়া যাক? কীভাবে সে উপড়ে দেবে কোটি কোটি চার্চ থেকে অদ্ভুত সুদর্শন ক্রাইস্টের রেপ্লিকা? মুভমেন্ট করবে? রক্তে গেঁথে যাওয়া বিশ্বাসের কী হবে? আরবীতে যে স্থানের নাম 'মাংসের বাড়ি', হিব্রুতে 'রুটির ঘর', সেই বেথলেহেম শহরের ভৌগোলিক অবস্থান বিচার করলে কী দাঁড়ায়? ভূ-মধ্যসাগরীয় উপকূল- ইজরায়েল- ঈজিপ্ট- জর্ডন-  এই তো? ন্যূনতম চিন্তা করলে যে কোনো মানুষের কাছে স্পষ্ট হওয়ার কথা এই অঞ্চলে জন্মানো কারোর সোনালি চুল হয় না, বরফশুভ্র ত্বকও নয়। সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ক্লিওপেট্রাও তা ছিলেন না। অথচ, ক্রাইস্টকে স্মরণ করলেই যে আদল মাথায় ভেসে আসে সে পেন্টিং আর ভাস্কর্যের সর্বকালীন শ্রেষ্ঠ মডেল। স্বধারও তাই ই আসে। কেন অস্বীকার করবে? সত্য সম্ভবত তা নয়। জন্ম, নাসা, কাঁটা, ক্রুশ সমস্ত কিছুই এক মানবসন্তানকে অলৌকিক করে তোলার অনুপান মাত্র। 


মানুষ তার শরীরে মানুষ খোঁজে, মাথা নিচু করতে আর হৃদয়ে বসাতে চায় অতিমানুষ। "ম্যান" তার কাছে প্রশংসার শব্দ, ফ্যান্টাসিতে রাজ করে সুপারম্যান'ই। স্বধা অপেক্ষা করে থাকত কখন অরণ্যদেব মুখোশ খুলে নার্দার সঙ্গে দেখা করবে, ব্যাটম্যান কখন ক্যাটউমেনকে ভেবে মুখ গুঁজবে জাল ছিঁড়ে। উলটে যেতো পরপর পাতা। তার ভীষণ মনে হতো এই সব চরিত্র আসলে নিখুঁত উদাহরণ মানুষ আর ঈশ্বরের শতরঞ্জের। মায়ামুখোশ টুকুই আড়াল মাঝের ঝিল্লির। কখনো কখনো স্ট্রিপ শেষ হয়ে যেতো, পর্দাটা উঠতো না। প্রতিটা যাপন সম্ভবত এই উৎকণ্ঠার নাম। বিরাট হাঙর। ধরতেই হবে। জয় আসে। অথচ উপভোগ্য স্তর পাড়ে টেনে আনতে আনতে সে কঙ্কাল। "রাইডারস টু দ্যা সি"- এর মতো করে জীবন চেনাতে কেই ই বা পারলো আর। স্বধা কিছুটা পার্সোন্যালাইজড করে নিয়েছে এর ব্যাখ্যা। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা- নারী মাত্রেই জানে লিঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের বানান ঠিক কী। পূর্বরাগে প্রেমিকেরা উত্তাল, কেন না মায়াঅন্ধত্বে তাদের ভিতর বসত গড়ে ঈশ্বরসত্ত্বা, শোনপুর মেলার বিক্রির আগের চোখ সেলাই করা বাজপাখি। সময় পেরোলে হাতে থাকে শুধু করোটির পানপাত্রটি। আজ প্রচন্ড হাসি আসছে স্বধার, প্রেতের হাসি-

-- শৈবলিনী, সত্য তুমিই ছিলে। আগুনের ব্যথা হতে নেই। জলের ভিজতে নেই। যে ঈশ্বরীয় রূপ মানুষের ফ্যান্টাসি, তার মুখোশও নামিয়ে নিতে নেই।

ঘোর আঁধারে কোথাও তক্ষক ডাকছে। স্বধা চিনতে পারে যেমত সে সর্পযোনি। আজ নগ্নিকা তার এই অরণ্যে চন্দ্রপানের তিথি, ইস্তার জন্মের দায়...

ছবি- অন্তর্জাল

শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

          


    
মঞ্জিরা 



বন্দিশেরা নামছে সহস্রধারায় কৃষ্ণ অন্তরীক্ষ থেকে। নীলাদ্রি শুনছেন। বলা ভালো, শুষছেন। এই একটিই প্রেম তাকে কখনো গার্হস্থ্য চাওয়া পাওয়ার সরলবৃত্তে প্রবেশাধিকার দিলো না। উস্তাদ আমির খান যখন বিলাসখানি টোড়িতে "বাজে নিকি ঘুংঘরিয়া" ধরেন, ধর্মাচরন থেকে বহুদূরে থাকা নীলাদ্রির জগত, বৃন্দাবন হয়ে যায়। তিনি স্পষ্ট দেখতে পান খান সাহেব "রহিয়ে অব এয়সি জাগা" গাওয়ার সময় গজলের শেষ মীরটি শুনতে স্বয়ং গালিব এসে দাঁড়ান তার পানপাত্র ফেলে রেখে। অশ্রুই তো সেই নিরপেক্ষ বহতা যা যে কোন স্থান কাল পাত্রকে নিমেষে অপ্রাঙ্গিক করে দিতে পারে অপ্রতিরোধ্য তাড়নায়।
 

নীলাদ্রির বিশ্বাস মানুষ তার মানবিক পৃথিবীতে যাবতীয় বিগ্রহ এবং ধর্মের রূপকল্প নির্মাণ করেছে সঙ্গীতের স্বার্থে। একমাত্র সুরই সেই অতীন্দ্রিয় শক্তি যা শরীরে অবস্থান করেও আত্মাকে ত্রিলোকের উপলব্ধি দিতে পারে যদি আদৌ অদ্বৈতের অস্তিত্ব থাকে। শ্যামসুন্দর তার কাছে নজরুলের কৃষ্ণসঙ্গীতের বাইরে কিছুই নয়। তিনি হরিকে জানতে ব্যগ্র হননি শুধু "সে হরি কেমন বল" শুনে ভেসে গেছেন। তার হরি ঐ সৃষ্টিজারিত তুমুল আবেগটিই, কোনো আধার নয়। 


সময় কী কখনো ভাবার মতো সময়ের সন্ধান নীলাদ্রি করেন নি। ওয়ার্কহোলিক নয়, কর্মযোগও নয়, গণিত আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, এই দুই গহীন তাকে এতোটাই দুর্গম করে রেখে দিলো এত বয়স অবধি যে, সেই অরণ্যে তার নিবিড়ে বসা পাখিরা কতটা অভিমান জমিয়ে মেঘ হয়ে উড়ে গেলো, জানতে পারলেন না। কী বিচিত্র দ্বন্দ্ব আকীর্ণ সংবেদন। গওহরজানের ঠুংরির একটা মুড়কি যাকে তোলপাড় করে দেয়, বড়ে গুলাম আলীর "প্রেম যোগন বনকে" যাকে প্রেমিক করে তোলে লাজিজ মরহুমে, তিনি একবার তাকিয়েও দেখলেন না এতগুলো বছর ধরে দাবানল খুঁজে না পেয়ে পাথর হয়ে যাওয়া বৃক্ষবিষাদের শরমকে। অজস্র সূঁচ বিঁধে থাকা চামড়ার ব্যথাবোধ শরীর হারালে সম্ভবত মেধাবী মস্তিষ্ক অধিক সক্রিয় হয়ে ওঠে অচেতনে। হয়তো তাই আখতারী বাঈ- এর একটি আলাপ মনে পড়ছে তার অতিরিক্ত, ঘুরে ফিরে, "ইয়ে না থি হামারি কিসমত" ।

এও এক বিস্ময় স্বধার কাছে। সারা জীবনে হারমোনিয়াম, তানপুরা অথবা তবলার মতো নিরীহ, সহজপাচ্য বস্তুগুলি, বাঙালী সংসারে বাসনপত্রের মতোই যাদের উপস্থিতি ছিলো অন্তত কুড়ি পঁচিশ বছর আগেও, কোনোদিন ছুঁয়ে দেখেন নি নীলাদ্রি অথচ এক পলের অধিক সময় তিনি কখনো নেন নি খমক আর একতারার পার্থক্য বলে দিতে। তড়পেছেন সঙ্গোপনে যখন মিউজিক ট্যালেন্ট হান্টে অংশগ্রহণকারী কোনো শিশু তার কাছে বলতে পারেনি সেতারে ১৭ টি তার থাকলেও সুর নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে মাত্র তিনটিতে, বাকিগুলি 'তরপ'। নীলাদ্রির চরম শত্রুরাও তাকে প্রজন্মবিরোধী দলের শরিক এই অপবাদ দিতে পারবে না কিন্তু স্বধা তার উপর ক্রমবর্ধমান হতাশার ছায়ার অধিগ্রহণ দেখেছে নিয়ত যখন হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, শিবকুমার শর্মা, উস্তাদ নিশাত খান, পাঁচুগোপাল দত্ত, শুভলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণার মতো ব্যক্তিত্বরা নিছক কতগুলো নাম হয়ে বন্দিত্ব নিয়েছে কম্পিটিটিভ এক্সাম প্রার্থীদের বৃত্তে।


এক ফাল্গুনী সন্ধ্যা তিনি উপহার দিয়েছিলেন স্বধাকে। সে তখন এক কলিগের বিয়েতে না গিয়ে উপায় নেই বলে তৈরী হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো বাবার স্টাডিতে। নীলাদ্রি শুরু করেছিলেন "ফ্রী স্পিরিট" দিয়ে।

--"এসো, এসো, না হয় দেরীই হবে খানিক"


তারা পৌঁছেছিলো তারপর "ঘাট অব বেনারস" এ।

--"তুমি বিয়েবাড়ি যাচ্ছিলে না?
    অ্যারেঞ্জ না লাভ?
    বেশ, এই দুটো পরপর শোনো             তাহলে,
     "বিলাভেড কল" আর
     "মিসিং অব হার্ট"


ফল্গুর উচ্ছ্বাস স্মরণ করিয়ে স্বধাকে যখন শেষে শুনিয়েছিলেন নীলাদ্রি "হোলি ম্যাট্রিমনি", স্বধার জানা হয়ে গিয়েছিলো ভালোবাসা আর বিবাহের সংজ্ঞা শিখিয়ে দিতে একা বিসমিল্লা জন্ম জন্মান্তরের দায়িত্ব নিয়ে রেখেছেন। বিয়েবাড়ি আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কী প্রয়োজন লোকসমাগমের? তার তো অভিসার অধিগত হয়ে গেছে সদ্য, সিঁদুরের রঙও মাখা শেষ। 


--"তোমার আনুষ্ঠানিক সম্প্রদান আমি করবো না কখনো। সেই অধিকার আমার নেই। কোনো নারীকেই দানের অধিকার কোনো পুরুষের থাকে না আরেক পুরুষের হাতে। স্বধা, আমি ব্রাহ্মণ যে। ব্রহ্মজ্ঞান না হোক, আত্মার বর্ণকে অশুক্ল করি কী ভাবে? তুমি আমার অংশবীজ। গ্রহন বা অর্পণের দায় মানুষের হাতে থাকে কি? যোগসূত্রকে অস্বীকার করে, অজ্ঞাত যেমত, অনুষ্কাকে শুনো, নোরাকেও। পন্ডিতজীর অবয়ব ভাসবে না? দ্যুতির আহুতিতে অঙ্গুলিত্রাণ জরুরী, শিরস্ত্রাণ নয় "


বহুবার জানতে চেয়েছে স্বধা, নীলাদ্রি উত্তর দেন নি। আজ মনে হলো বড় দেরী হয়ে গেছে। হয়তো জানিয়ে দিলেই পারতেন। হিন্দুস্থানী মার্গসঙ্গীতের একনিষ্ঠ শ্রোতা কিন্তু অভিনিবেশে স্পষ্ট হয় নীলাদ্রির ঝোঁক আবদুল করিম আর ফায়েজ খানের গমকে যতটা, তার থেকে অনেক বেশী তাদের গোবিন্দ বন্দনায়। কেন? নীলাদ্রি মনে মনে উচ্চারণ করলেন, জানেন স্বধা বুঝে নেবে একদিন ঠিক। ঈশ্বরের অর্থ যদি নিখাদ ব্রহ্ম হয় তাহলে নীলাদ্রি তীব্র আশ্বাস রাখেন সেই সমস্ত সুরসাধকদের গায়কীতেই অধিক যারা ধর্মকে শুধুমাত্র একটি শব্দে পরিণত করতে পেরেছেন। অতিক্রম করে গেছেন লোকায়ত ও প্রচলিত ধারণা ও আচরণ। পৌঁছে গেছেন অনাদির সেই অভেদ অবস্থানে যেখানে রসুলের সর্বনাম সরস্বতী। 


মাঝে মাঝে স্বধার মনে হয় চেতন অবচেতন থেকে ক্রমশ অচেতনের দিকে সরে যাওয়া তার বাবার এই পরিণতি হয়তো সিদ্ধান্ত মাত্র। এই মুহূর্তে যে রাষ্ট্রে তাকে শ্বাস নিতে হচ্ছে তা তার অপরিচিত ও অসূয়ার কারণ। তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন নিজেকে ক্রমেই। যেভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে নগরীদের নাম, হয়তো তার প্রাণপ্রিয় ঘরাণাদেরও বদলে ফেলা হবে তাদের স্রষ্টাদের ধর্মবিচার করে। জয়পুর আত্রাউলি, পাতিয়ালা, রামপুর মহাস্বন, ইন্দোর, কিরাণা, আগ্রা, গোয়ালিয়র, দিল্লী, ভেন্ডিবাজার, মেওয়াটি, শ্যাম চৌরাশিয়া- সবকটি এবং প্রতিটিরই প্রতিষ্ঠাতা প্রো-হিন্দুত্ব সাম্রাজ্যবাদীর ষণ্ড দৃষ্টিতে অপরাধী, যেহেতু বিধর্মী। সেই নরকজল বাইতে পারবেন না, এই আতঙ্কেই কি যাবতীয় চিকিৎসাকে প্রার্থিত ফলপ্রসব করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন তিনি নিজেই?

বহুর মধ্যে বিশেষ করে একটি বিতর্ক বাকী থেকে গেছে স্বধা ও নীলাদ্রির। কেন এক জমিনে দুজনেই বিচরণ করেও তারা, পিতা ও কন্যা, মূল আদর্শগত কেন্দ্রে এতো বিরোধী। তাদের ফোর্ট এক নয়, আঙ্গিকও নয়। সেই কারণেই কি? নীলাদ্রি মানুষ থেকে ক্রমে দূরত্বে গেছেন যে পন্থায় ঠিক সেই প্রকরণে কেন স্বধা মানুষেরই মধ্যে খুঁজে ফিরছে পরশপাথর? পৃথিবীর যে তিনটি জায়গায় তাদের যাওয়ার কথা ছিলো অবরোধ উঠলেই, তাদের মধ্যে এই মুহূর্তেই তার পৌঁছে যেতে ইচ্ছে করছে সিস্টিন চ্যাপেলে। নীলাদ্রি বারবার শেখাতেন স্বধাকে শিল্পীর জীবন নিয়ে না ভাবতে। শিল্পই শিল্পীর সাক্ষর। যন্ত্রণা, অর্জন ও প্রাপ্তি-প্রাকাম্যের। সৃষ্টি ও স্রষ্টা একীভূত। যখন নীলাদ্রির ডোবার কথা ছিলো "ও গ্রেসিয়াস লাইট" অথবা অন্যান্য ভেসপারের অতলে পিয়ানোয় চোখ রেখে, স্বধা দেখে বেড়াতো ফ্রেস্কো, এঞ্জেলোর মায়া ধার করে। এর কারণ কী? নিজেকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে সামান্য কাঁপলো সে। তাহলে কি ব্যবধান রেখার কাছাকাছি পৌঁছাতে চাইছে সে ক্রুশ আর ক্রাইস্টের? ছুঁয়ে দেখতে চাইছে ইন্দ্রিয় সম্বল করে ফ্যান্টাসি আর স্পর্শযোগ্যতার লাইন অব কন্ট্রোল? বাবাকে বলা হলো না। আর কখনো সুযোগ আসবে কি?


ভোর হয়ে আসছে। ইডেনের কেবিন ওয়ানে ধ্রুপদে ভৈরবী ধরলেন আল্লাদিয়া খান। কে বলে 'হংসধ্বনি' রাগ মাত্র? কে বলে শুধু 'মিঞা কি মল্লার' পাবক শান্ত করে? অসংখ্য ভেজা ভেজা সাদা ডানা উড়ে যাচ্ছে কাদের তাহলে কাচ পেরিয়ে দিগন্তের দিকে? স্বধা দেখছে। অক্সিমিটারের নেমে যাওয়া কাঁটা তাকে বাধ্য করছে ডক্টর সেনকে ফোন করতে অথচ টের পাচ্ছে এ অন্যায়। যাত্রাপথে বাধা হতে নেই। হটাত তার সমস্ত কোষে জিহাদ জ্বলে উঠলো নৃশংস মাত্রায়। কেন প্রতিবার নির্লিপ্তিতে নীলাদ্রি পেরিয়ে যাবেন প্রতিটি সম্ভাব্য সংঘাত? অসীম নিস্তব্ধতা দিয়ে এড়িয়ে যাবেন অনিবার্য প্রতিরোধ? আজ তাকে ফিরতেই হবে। নাড়া স্বধার হাতেও বাঁধা হয়েছিল তিন বছর বয়সে ইলাহাবাদে। সে অন্য ইতিহাস। ইনশাল্লাহ, আজ সে হারবে না তার পঞ্চগুরুর প্রথম জনের কাছে।

ছবি - অন্তর্জাল 


শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                               


 

আতিশ






" কিছুকে ভাঙা বা গড়ার জন্যে ডেলিবারেট বা ইনটেনশনাল হতে হয় না। অন্তরঝাঁপিতে উঁকি দিতে হয়। রূহ কী চাইছে। যদি তোমায় দিয়ে নির্ধারিত থাকে ধ্বংস বা সৃষ্টি, সে তন্ত্র হোক বা সংস্কার, তা ঘটবেই, সময় করিয়ে নেবে। কিন্তু শুধুমাত্র ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকা বা ট্রেন্ডসেটার হতে গিয়ে মানুষ বড় নিষ্ঠাবান হয়ে পড়ে উদ্দেশ্যে। প্রয়োজন হয় সলিউবিলিটি, তারল্য অর্জন। আয়নার মত স্বচ্ছ সে মাধ্যমে অনায়াস খেলতে পারে তখন কালপ্রতিমার ছায়া " 



রাজহাঁসরঙা শাড়িগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাদের অধিশ্বরী কমলিনীর কথাগুলোর প্রতিধ্বনি পাচ্ছিলো স্বধা। বহুদিন হলো চারটে দেওয়াল থেকে পাথরের ছায়া ঝরাতে ঝরাতে এমন অদৃশ্য পাষাণ গেঁথে তুলছিলো সময়, ভুলে যাওয়া ডানাগুলো খোঁজা হচ্ছিলো না। অথচ এক দুপুরে, পলাতক রোদ্দুর আর কাঠবিড়ালির মধ্যে পার্থক্য কীভাবে করবে বুঝে উঠতে না পারায় তার মনে পড়লো প্রতিটি অপেক্ষার নিজস্ব সৌন্দর্য থাকে আর অপেক্ষা ঘন হতে থাকলে তার গায়ে যে সলিচিউডের পশম জড়িয়ে যায়, সে ওম থেকে খুব সহজে আর বেরনো যায় না। মুশকিল হলো তার অপেক্ষা আছে কিন্তু সে অপেক্ষার বর্ণ নির্ধারণ করতে বসলে নিজেকে রংকানা ঠাহর হচ্ছে। স্মরণে এলো সেই সঙ্কটে তার মাথায় হাত রেখে বলা কমলের (এই নামেই সে তার ঠাম্মিকে ডেকে এসেছে বরাবর) শেষ কথাগুলো।

(বেনারসে দশেরার ধুম শেষ হলে পঞ্চদশী স্বধার মেঘেদের দেশে ফেরার মেঘলা সকালে যা তিনি বলেছিলেন... আর দেখা হয়নি। ইউক্যালিপটাস ঘেরা নির্জন প্রিন্সিপাল রুমের ভারী কালো ল্যান্ডলাইনটা বেজে ওঠার বহু আগে সে টের পেয়েছিলো কমলের মুক্তি সংবাদ। অদ্ভুত কমলা রঙের আলো পিঠে ছড়িয়ে তার বেডের লাগোয়া  শার্সিতে এসে বসেছিলো সেই সকালে যখন এক গোল্ড নেপড ফিঞ্চ। এ পাখি বিরল নয় এই প্রদেশে কিন্তু অরণ্য ছেড়ে সে খুব কমই বেরোয়। বহু সাধ্য সাধনায় তার দর্শন পায় সারা পৃথিবী থেকে আসা অর্ণিথোলজিস্টরা। সে পড়তে পেরেছিলো কমলের বার্তা। বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমা অতিক্রম না করতে পারলে এই মায়াদিগন্তে পা রাখা যায় না, যুক্তি যাকে কাটতে পারে না, ব্যাখ্যা যার নাগাল পায় না, যেখানে নীলকন্ঠ উড়ে যায় দর্পণ বিসর্জনের পর খাঁচা থেকে আত্মারাম নিষ্কৃতির রূপকে)


--" কমফোর্ট জোন থেকে বেরোতে তোমার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে তুমি নিজেকেই প্রতি মুহূর্তে পাবে দিদিভাই। আপাত অজ্ঞাত প্রতিকূলতা তোমায় আলস্য দেবে আর সেই ই তোমায় ধীরে স্থবিরও করবে। আমি চাইবো এমন যখনই হবে, ছিঁড়ে দিও নিজেকে, ডিকন্সট্রাক্ট কোরো লিয়ারকে ভেবে নিয়ে। জানো তো সেই বিখ্যাত সাধক কখনো একই বৃক্ষের নিচে দুই বার ধ্যানে বসতেন না, যেন মায়া না বসে। অবিদ্যাকে না ভাঙলে বিদ্যা অর্থাৎ মহামায়া চৈতন্যে পা রাখেন না। তাই সতর্ক থেকো "


সুতরাং সে আজ আবার পথে, একবার ছুঁয়ে যাচ্ছে শুধু কমলভূমি। দেশ দেখা যে কী প্রবল ব্যঞ্জনাময় তা বোধ করি ঋতুপর্ণের মতো জানতে ও জানাতে কেউ পারেন নি ভারতীয় চিত্রপরিচালকদের মধ্যে। এই বিতর্কিত মন্তব্য বহুবার প্রকাশ্যে করে সমালোচিত হয়েছে স্বধা। বারবার তুলনা আনা হয়েছে কাশবনে অপু দুর্গার ট্রেন দেখাকে ঘিরে। কিন্তু সে এটা কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, কোনো মতকে পোষণ করা সিদ্ধান্ত আর মৃগদৃষ্টির মধ্যে আদতেই কোনো পার্থক্য আছে কিনা। অতএব সন্ধ্যার গঙ্গাবক্ষ থেকে আলোকউজ্জ্বল ঘাটের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে ব্যাসকাশীর দিকে তাকানো সে নিজস্ব সিদ্ধান্তেই ভিজে নিল আরেকবার। 


বোহেমিয়ানা যাদের অকৃত্রিম একমাত্র তারাই বোধ হয় বোঝে কেন গালিব বলতেন "নশা অগর শরাব মে হোতি তো নাচতি বোতল" । আসলে নেশা হলো স্নায়ুর সেই আশ্চর্য অবস্থান যেখানে নেশারু নিজের ভিতর ঈশ্বরসত্ত্বাকে আবিষ্কার করে, দ্যা সুপ্রিমো। ফলে যে কোনো মূল্যে বারবার পৌঁছাতে চায়। সুর, সুরা, শিল্প, সাহিত্য, একাকীত্ব, দেশ দেখা সব, সব তারই অনুসন্ধান মাত্র, যে যেভাবে পায়। যে যত সংখ্যক মাধ্যম ছুঁতে পারে, তার সংবেদন ততো সূক্ষ্ম। এসব একান্তই স্বধার ব্যাক্তিগত বিচার যদিও। যে স্বাধীন চিন্তার বীজ কমল পুঁতেছিলেন প্রথম কপালে হাত রেখে তার পৌত্রীর, তাই আজ তার সমস্ত শরীর বেয়ে উঠে মস্তিস্কের কোষে কোষে ছড়িয়েছে। এই কথা সে টের পায় একা হলেই অপূর্ব একা যখন হতে পারে আর কী। সর্বদা কী আর পারে? রক্তে লবণ কার না থাকে? নাভি থেকে পারাবত কার না উড়ে যেতে চায়? পৃথিবীতে এমন আনন্দ অথবা শোকের অস্তিত্ব আছে কি যে খিদে ভোলাতে পারে? ক্ষুধাপ্রবণ নশ্বরতা, কে পারে বিনা সাধনে তাকে অতিক্রম করতে। সে তো সামান্য নারী মাত্র। উদাসীন জাস্কর উপত্যকা থেকে নির্লিপ্তির চাদর জড়িয়ে তার ক্রাইস্ট যতই তাকে ঈশ্বরী হয়ে উঠতে বাধ্য করুক, নূপুর খুলছে কই? এও আরেক সমস্যা। ঈশ্বরবোধের ভিতর স্বধা কখনো ফুল ধূপকাঠি নৈবেদ্য ঢোকাতে পারলো না। অসম্ভব শরীরী তার আধ্যাত্মিকতা। রাসজ শ্বাসে তার ভক্তি আসে না, রমণস্পৃহা জাগে।


অলীক এই অন্তর্দাহ স্বধার মধ্যে প্রত্যক্ষ করতেন কমলিনী। লিখে গেছেন। বহুবার পড়েছে সে। আজ সেই ডায়েরি বরাবরের মতো নিজের কাছে নিয়ে যেতেই তার পীতাম্বরপুরার পাথরে পা রাখা, হয়তো শেষবারের মত। 

--" দিদিভাই,

তীব্র অহং ও যন্ত্রণা সমানুপাতে সম্বল করে আমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে এই জন্মের মেয়াদটুকু আজ। ভেবেছিলাম মুক্ত হয়েছি, পারলাম না। আমার প্রকৃত অংশের দায়টুকু তুমি নিয়ে রাখলে। তুমি বাঁচবে আমি জানি অথচ হেঁটে যাবে যে যে ভিস্তা দিয়ে তাতে নির্ধারিত আছে এমন কাঁটারা, পা থেকে রক্ত ঝরবে না, ক্ষতরা মারিয়ানা হবে। তুমি প্রেমে বিশ্বাস করো না, সম্পর্ক মানো না, অথচ নতজানু হয়ে থাকো ভালোবাসতে। তুমি মানুষের শরীরে প্রত্যাশা রাখো ঐশ্বরিক ধারণ আর ঈশ্বরের থেকে আশা করো মানবিক বোধ। এ কি সম্ভব? আমি যতটুকু দেখছি সামনের দিকে তাকিয়ে, প্রতিবার নি:স্ব হয়ে যাচ্ছ সমর্পণ ও প্রত্যাহার শেষে। আমি নিশ্চিত জানি আধারেরা টের পাবেনা। এক উত্তরই তো প্রতিবার পেয়েছি তোমায় বুঝতে গিয়ে 'ইশক কোই সনম ইয়া আপ খুদা কমল?' এ আমার হাহাকার, তোমার প্লাবনের মতো কাঙালপণাকে তীর থেকে তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে নোঙর ফেলতে দেখছি মাঝ দরিয়ায় যেখানে সূর্যও উদয় অস্তের নীতিহীনতায়। সদ্য রজস্বলার কী'ই বা বোধ থাকে মনের শরীর আর শরীরের মন নিয়ে অথচ তুমি সেই সময়েই আমার কাছে স্পষ্ট উচ্চারণ রেখেছিলে 'যাকে নিয়ে উত্তাল হবো আগে তো তাকে আমার মাথা পেরিয়ে আসতে হবে। চামড়ায় কিছু থাকে কি? মেটিয়াবুরুজের ট্যানারিতে শত শত ঝুলতে দেখেছি। হৃদমাঝারে রাখতে আর কাকে পারি সোনার গৌর ছাড়া? হৃদি গো হৃদি, সে না জাগলে আর এগোই কী করে?' দিদিভাই কাকে চাইবে তুমি অথবা অজস্র চাইবে। প্রতিটা চাওয়া একটা করে ভাঙনের উত্তরণ রেখে যাবে। না মানুষ কখনো ঈশ্বর হবে না ঈশ্বর কোনোদিন মানুষ। দুই'ই তো শব্দমাত্র, গড়ে নেওয়া আলেয়ার, আরোপিত সংজ্ঞার। অথচ এই দ্বন্দ্ব থেকেই উৎক্ষিপ্ত মহাজাগতিক কণার মতো আবর্তিত হতে থাকবে তুমি সমগ্র আয়ু। নিজের উপর ক্ষোভ আসছে আজ আমার। কেন চেয়েছিলাম তোমায় ব্যতিক্রমী? সাধারণ হলে না, অসাধারণ হতে চাইলে না, স্বধামাত্র হয়ে রইলে।



কমল "
চিত্র - অন্তর্জাল 

শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                                    


সেলেনা




--"দিদি, আকাশে কী রে? ক্রাইস্টকে মিস করছিস নাকি? সত্যি বলবি।


--"বলতে পারিস শিশু, উন্মাদ আর নেশারু এই তিনশ্রেণী ছাড়া কার উচ্চারণে শুদ্ধ সত্য সমাহিত থাকে? এখানে তুই অবশ্যই আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করবি 'সত্য' বলতে কী বুঝি সেও জানি সুতরাং ভেঙেই বলছি, আমি উল্লেখ করছি 'শুদ্ধ' বলে একটি শব্দ যার কাছাকাছি ব্যাখ্যার শব্দ হলো আনবায়াসড, প্রভাবঅদুষ্ট। এ যেন ঠিক এন্টিইনকামবেন্সি। সরকারকে নির্বাচিত করছি না কোনোবারেই, বাকি কোনো পক্ষ যাতে শাসনভার না পায় তাকে সুনিশ্চিত করছি। বিরাট আয়রনি। যাই হোক, বড় বেশী জড়িয়ে যাচ্ছে। দাঁড়া পেগটা শেষ করি। "


ক্যামেরা আবিষ্কার না হলে যে কোনো প্রাণ বা জড়ের বিবর্তনজনিত প্রতিটি রূপেরই যে নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, এত সহজে ধরা পড়তো না। হালিশহরের প্রায় ভগ্ন তিনমহলার চিলেকোঠায় বসে এইসব বলতে বলতে ভাবছিলো স্বধা। সে আর ভাই। শৈবলিনীর দুই সন্তান। স্বধা দৌহিত্রী আর শুভ পৌত্র। যদিও শুভ তার দিদির ঠিক পাঁচ বছর পর প্রথম সূর্য মেখেছে কিন্তু সে পার্থক্য নিতান্তই সংখ্যা মাত্র হয়ে থেকে গেছে তাদের ব্রীজে। অথচ তাদের দেখা হয় তিন চার বছর পর পর অবশ্য ছোটবেলায় বছরে বার তুই তিনেক করেই হতো। শুভর বাবা কর্মসূত্রে বরাবরই বাইরে বাইরে অতএব অপত্যও পরিযায়ী ইচ্ছে বা অনিচ্ছায়। নাড়ি, রক্ত ইত্যাদি অর্বাচীন আলাপ দূরে রাখলে বলা যায় ওয়েভ যদি কানেক্ট করে, কোনো টানেরই সংজ্ঞা লাগে না।


দুই ভাইবোনেরই জন্ম ইস্তক অসীম আকর্ষণ ভাঙা আলসে জুড়ে প্রাগৈতিহাসিক অশ্বত্থের ছায়াঘেরা এই বাড়ির প্রতিটা বন্ধ, তালাভাঙা, অব্যবহৃত ঘর, কুঠুরি, ভূপৃষ্ঠের রেপ্লিকার মত ছাদ আর আগাছাময় আদিম বৃক্ষসবুজ উঠোন বাগানের গর্ভ চিরে গঙ্গায় নেমে যাওয়া সিঁড়ির প্রতিটি বাঁকে। অনন্তের এক টুকরো বোধ হয় অজ্ঞাতে বা জ্ঞাতার্থেই ছেড়ে রেখে গিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তা এই ভিটেতে। মাটি আর শ্যাওলার মধ্যে মিশে বাঁচতে বাঁচতে শিকড় হয়ে যাওয়া বাস্তুসাপ'দের মতো তারই গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে আজও আনাচ কানাচে। যে পায় সে পায়। অজস্র অখ্যাত কাহিনীরা গেঁথে আছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নব্বই দশকে শৈশব কাটানো ছেলে মেয়েরাই সম্ভবত শেষ প্রজন্ম যারা দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ গ্রীষ্মে টানা একমাস ছুটির অপেক্ষা কী জানতো, জাম আর জামরুলের পার্থক্য গুগল সার্চ না করে বলতে পারতো, দুপুরে খেয়ে উঠে মাদুরের আলস্যে ঠ্যাং ছড়িয়ে ঠাম্মা দিম্মার পিতলের পানবাটার উপর সাম্রাজ্য বিস্তার করতো আর চোখ লেগে এলে বুরাতিনো- টকাই -গোগোল -টিনটিন -সাবুর সঙ্গে ঘুমের মধ্যে টই টই চষে বেরাতো। স্বধার হটাত করেই একটা লাইন মনে পড়ে গেলো "বয়স হচ্ছে বলেই বোধ হয় হাঁটতে হাঁটতে একলা লাগে"। হেসে উঠলো। শুভ না তাকিয়েই বলে উঠলো-


--"মনে পড়ছে না রে দিদি? তুই আর আমি তো সিওর ছিলাম কুয়োতলার ইঁটের পাঁজাটার নিচে গুপ্তধন আছে। কুয়োটা সুড়ঙ্গ। নাহলে ওভাবে পরিত্যক্ত বদনাম দিয়ে ফেলে রাখবে কেন দুটোকেই। উপরে আবার রাশি রাশি গাছ। নিশ্চয়ই বর্গীদের কাজ। "



এবার দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠল, অট্ট সে হাসি। যেভাবে শৈবলিনী প্রতি সেকেন্ডে দশ বছর বেশী আয়ু পেতেন এই হাসি দেখে কোনো এক অতীতে, তার হয়ে এই প্রাচীন অট্টালিকা আজ সেই দায়িত্ব পালন করলো। 


--"সত্য...
    নয়?

সেদিন সেই মুহূর্তে ঐ বিশ্বাস আমাদের সত্য ছিলো শুভ। আজ যা নিয়ে আমরা হাসছি, তাকিয়ে দ্যাখ, চাঁদ গলে মিশে যাচ্ছে সেই ইঁটেরই পাঁজায়। ফিরে যা আমাদের শৈশবে। দ্যাখ দুটো বাচ্চার বিশ্বাস আগলে কীভাবে আজও যক্ষ হয়ে আছে ভগ্নস্তূপ। একি তার সত্য নয়? তুই আমি পেরিয়ে এসেছি। সে আগলে আছে বিশ্বাস। আমাদের আগেও, আমাদের পরেও, নিয়তির মতো। যদি এ সত্য না হয় তাহলে তুই আমি মিথ্যে, এই ছাদ মিথ্যে, চাঁদ মিথ্যে। "



--" দিদি, তোর লেখাতেও চাঁদ, কথাতেও চাঁদ। এতো কী পাস বল তো? আমি প্রশ্নই করছি রে। আহত হোস না আবার শুভটাও "এট টু ব্রুট" হয়ে গেলো বলে। আমি জানতে চাইছি। তোর কিছু থাক না থাক, নাক তো গণ্ডার। কেউ প্রশ্ন করলেই বিদ্ধ হোস আমি জানি। ভাবিস ব্যাখ্যা চাইছে তোর আপাত দুর্বোধ্যতার। আরও গুটিয়ে ফেলিস নিজের ভিতর নিজেকে। ফলে জানা হয়না। "

--"তুই তো জ্যাভেরিয়ান, লুনার এক্লিপ্সের বাংলা জানিস? "


--"এমন করে ঠুকিস যেন তুই কারমেলার নোস। চন্দ্রগ্রহণ জানবো না কেন? "

শুভর এবার রাগ উঠছিল। বরাবর এইরকমই থেকে গেলো দিদিটা তার। কোনো কথার সহজ উত্তর দিতেই জানেনা। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সাতকাণ্ড না করলে চলে না, বাড়াবাড়ি যত।

--"গুড। এবার তাহলে লুনাটিকের বাংলা বল। "


--"দ্যাখ দিদি, তোকে বলতে হবে না। উত্তর দিবি না বলে আমায় র‌্যাপিড ফায়ার করবি জানলে তোকে জিজ্ঞাসা করতাম না। লুনাটিক হলো তোর মতো লোকেরা বুঝলি? তুই, আস্ত পাগল। "


--"আজ লিভেট খাচ্ছিস। কাল ফিডিচ খাবো আমরা, ওকে? গ্লেন সেগমেন্টে খেতে হলে ফিডিচ বেস্ট। তোর গিফ্ট ধরে নে। না বুঝেই একদম ঠিকঠাক নিজের উত্তর নিজেই দিয়ে ফেলেছিস বলে পাবি। "


--"মানে? "


--" ইংরাজি, বাংলা, স্প্যনিশ, ফ্রেঞ্চ, এসব খোলস ছেড়ে বেরিয়ে একটু ভিতরে ঢোক শুভ। ভাষা, সে যেটাই হোক, প্রত্যেকের মোকাম এক। আত্তিকরণ বলে একটা শব্দ আছে কেন ভুলে যাস? ভাষার আত্মা যদি ছুঁতে পারিস কোনো মানুষেরই কখনো প্রয়োজন হবে না তোর ভাষা সংক্রান্ত কিছুর উত্তর পেতে। লুনা হলেন রোমান চন্দ্রদেবী। লুনার আর লুনাটিক দুটো শব্দই এসেছে লাতিন শব্দ এই 'লুনা' থেকেই। অক্সফোর্ড বলছে চন্দ্রাহত'রাই লুনাটিক। চাঁদের বিভিন্ন ও প্রতিটি দশার প্রভাব যাদের স্নায়ুতে অভ্রান্ত তরঙ্গ তোলে, ফলে তরল জ্যোৎস্নার মত দাহ্য অনুভূতিপ্রবণতা বহন করতে হয় জনমভোর, তাদেরই তোরা নাম দিস পাগল। মনস্তত্ত্ববিদরা বলেন যাদের বিশ্বাস একটি নির্দিষ্ট সত্যের বিন্দুতে এসে স্থির হয়ে গেছে, উন্মত্ত দ্রুততায় উদ্দেশ্য জেনে না জেনে ধাবমান সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সমঝোতা করতে পারেনা যারা তাদের সেই বিশ্বাসের সত্য বা সত্যের বিশ্বাসকে, ভারসাম্য তারাই হারায় আর উপাধি পায় 'মানসিক ভারসাম্যহীন'। ভেবে দ্যাখ যে কোনো দিক আর সবদিক থেকে বিচারেই একমাত্র উন্মাদই সৎ কারণ সে যাকে সত্য বলে জানে তার উপরে বিশ্বাস হারাতে ব্যর্থ হয়। অথচ তার সত্যকে পাগলামি বলে দুনিয়া হাসাহাসি করে যেমন আমরা হাসলাম একটু আগে ইঁটের পাঁজাকে নিয়ে আমাদের অতীতের সত্যকে আগলে রেখেছে সন্তর্পণে বলে। 


গিরগিটি আত্মরক্ষার্থে যা করে, সফল মানুষ তা করে প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন সমারোহে তৃপ্তিসাধনের অজুহাতে। সফল ও সুস্থ কিছু হৃদিহীন দৈত্য মহা গৌরবে এগিয়ে নিয়ে চলে পচে গলে যাওয়া একটা সভ্যতার লাশ যেখানে সংবেদন শব্দ এক পাপ। এখানে কৃতী রিপোর্টার জোম্যাটোয় বিরিয়ানি অর্ডার করে এসি কিউবিকলে বসেন বন্যা পরবর্তী অনাহারে মৃত্যুর আবেগী খতিয়ান লিখতে আর প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ঘড়ি দেখেন ডেলিভারি বয় দেরী করলে খিস্তি মেরে পেমেন্ট না দিয়ে ভাগাবেন বলে। এটা এমন সময় যেখানে প্রতিবন্ধী সংস্থা থেকে মাউন্টেন ট্রেকারের জন্য সংবর্ধনা প্রত্যাশিত থাকে। আত্মোন্মাদ পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ বিবরণ দেন বিলাস উদযাপনের, তাকিয়ে দেখেন না শ্রোতার সঙ্গে হুইলচেয়ার আছে কিনা। ব্যাক্তিগত উল্লাস, ব্যাক্তিগত অর্জনের যথার্থ সঙ্গত দাবী করা হয় উপেক্ষিত ও অক্ষম সত্ত্বাদের থেকে। এই নৃশংসতা আমায় শীতল করে ভয়ে। অথচ এদের মধ্যে সাধারণ অধিকাংশই নয়। মেধাবী, সৃষ্টিশীল বহু শুধু তাদের চৈতন্যে ধরা দেয়না যা আমি পাচ্ছি তার আনন্দ যে পায়নি সহস্র ইচ্ছেতেও, পাবেনা কখনো, তার থেকে চাই কী করে? সক্ষম মানুষের নির্লজ্জ প্রদর্শনী আমায় আতঙ্ক দেয়। শোন শুভ, আমি ঘৃণা পুষি সুস্থতার জন্য, বিতৃষ্ণা বরাদ্দ রাখি স্বাভাবিকতার জন্য। প্রতিটি সুস্থ সক্ষম সফল লোক এক একজন ধৃতরাষ্ট্র। 

আমার অহং আসে যখন আমায় কেউ উন্মাদ বলে সনাক্ত করে। আমি শান্তি পাই। বুঝি চাঁদ ছুঁলে কেন কেঁপে উঠি। "লোটাস ঈটার" পড়েছিস তো? নাহলে পড়ে নিস। "


--"দিদি, বড় অচেনা লাগছে তোকে, চুপ কর প্লিজ। "


--"ভয় পাচ্ছিস ভাই? চন্দ্রের সব কলঙ্ক প্রতিটি চন্দ্রাহত অভিশাপ নামে তাদের যাপনে বহন করে, চিনতে শেখ। গুরু পূর্ণিমায় জন্মালি তুই, যেদিন ইডেনে ভারত হিরো কাপ জিতলো, আর ক্ষত হলো আমার। এও কি সত্য নয়? "


গঙ্গা, অশ্বত্থ, প্রাচীন প্রাসাদ ভেসে যেতে লাগলো নিস্তব্ধতা আর জোনাক স্রোতে। শুভকে অদ্ভুত মনখারাপের রাগিণীরা ঘিরে ধরলো ক্রমে। কেন কথা বলতে বাধ্য করিয়ে কোনোদিন দিদিকে মাঝপথে না থামিয়ে সে পারলো না? যে সামনে বসে থাকলে তার মনে হয় আলো ঠিকরাচ্ছে, কেন তার অনায়াস অধিকারে থাকা প্রবল অন্ধকারের তল পেলো না? অথচ দুই ই সত্য। তাহলে কি প্রতিটি সত্য'ই তাই? হিরণ্ময় রহস্যাবৃত বহুমুখী এক কালখণ্ড মাত্র? 


চিত্রঋণ - পারমিতা চক্রবর্তী